Wednesday, January 28, 2026

খালি হাতে ১০১ তলা ভবনে বেয়ে উঠলেন অ্যালেক্স হনল্ড by আহমাদ মুদ্দাসসের

প্রকাশ ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ঃ রবিবারের এক উজ্জ্বল সকাল। তাইওয়ানের রাজধানী তাইপের সবচেয়ে উঁচু ভবন তাইপে ১০১। ভবনটির নিচে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে হাজারো মানুষ। দাঁড়িয়ে থাকা দর্শকদের বুক ধুকপুক করছে। একই সঙ্গে পৃথিবীর নানা প্রান্তে মানুষ তাকিয়ে আছে নেটফ্লিক্স লাইভের দিকে। কারণ, ঠিক ৯২ মিনিট ধরে শ্বাসরুদ্ধকর এক মুহূর্তের জন্ম হচ্ছিল। বিশ্বখ্যাত ফ্রি সলো ক্লাইম্বার অ্যালেক্স হনল্ড পৃথিবীর অন্যতম উঁচু ভবন তাইপে ১০১ বেয়ে ওপরে উঠছিলেন।

২৫ জানুয়ারি ২০২৬ রোববার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৪৩ মিনিটে অ্যালেক্স হনল্ড ভবনের চূড়ার শেষ ইঞ্চিটুকু পার করেন, যার উচ্চতা ১ হাজার ৬৬৭ ফুট বা ৫০৮ মিটার। আরোহণ শেষ করে যখন তিনি ভবনের উঁচু চূড়ায় উঠে দাঁড়ান, তখন তাঁর মুখে চওড়া হাসি। নিচে উল্লাস করছে তাইপেবাসী। ভিড়ের দিকে হাত নাড়াচ্ছেন হনল্ড। এই দৃশ্য নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতে ক্লাইম্বিং ইতিহাসের এক আইকনিক মুহূর্ত হয়ে থাকবে। এরই মধ্যে দুইটি সেলফি ভাইরাল হয়ে গেছে। অ্যালেক্স হনল্ড তাইপে শহরকে পেছনে রেখে দুটি সেলফি তুলেছেন।
এই প্রথম কোনো মানুষ তাইপে ১০১ ভবনে ‘ফ্রি সলো’ করেছেন। ফ্রি সলো মানে কোনো রশি নেই, কোনো সেফটি নেট নেই। নেই কোনো যান্ত্রিক সহায়তা। শুধু খালি হাত আর গ্রিপ বাড়ানোর জন্য সঙ্গে আছে সামান্য চক।

ক্লাইম্ব শেষ করে সংবাদ সম্মেলনে হনল্ড বলেছেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য। কয়েক দিন ধরেই মনে হচ্ছে আমি যেন আলো ছড়িয়ে বেড়াচ্ছি। কত দিন ধরে ভাবতে হয়, কল্পনা করতে হয়, হবে কি না। কিন্তু যখন সত্যিই করে ফেলি, তখন অনুভূতিটা সব সময়ই আলাদা।’
২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি তাইওয়ানের এই গগনচুম্বী ভবনে ওঠা হনল্ডের বয়স এখন ৪০। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি ক্লাইম্বিং দুনিয়ার পরিচিত মুখ। বিশের কোঠায় থাকতেই কঠিন রুটে সফল ফ্রি সলো ক্লাইম্ব করে তিনি আলোচনায় আসেন। তবে ২০১৭ সালে ইয়োসেমাইট ন্যাশনাল পার্কের এল ক্যাপিটান সম্পূর্ণ রশিবিহীনভাবে বেয়ে ওঠার পরই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত নাম হয়ে যান। সেলিব্রেটি হয়ে ওঠেন। সেই ভয়ংকর অভিযানের গল্প ধরা পড়ে অস্কারজয়ী ডকুমেন্টারি ‘ফ্রি সলো’তে।
কখনো থেমে যাননি হনল্ড। নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ খুঁজে নিয়েছেন, রেকর্ড ভেঙেছেন। তাইপে ১০১-এ ওঠার ইচ্ছা তাঁর এক দশকের বেশি সময় ধরে। কিন্তু সুযোগ তৈরি হয়নি। শেষ পর্যন্ত নেটফ্লিক্সের প্রস্তাবে সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়। পুরো ক্লাইম্বটি নেটফ্লিক্সে লাইভ স্ট্রিম করা হয়। বেশ কয়েকটি ক্যামেরা ও ক্যামেরা পারসন রশি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঝুলে বিভিন্ন দিক থেকে হনল্ডকে ভিডিও করেন। হনল্ড এই বেয়ে ওঠাকে বলেছেন, এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শহুরে ফ্রি সলো ক্লাইম্ব।
আসলে এই অভিযান হওয়ার কথা ছিল শনিবার সকালে। কিন্তু খারাপ আবহাওয়ার কারণে তা পিছিয়ে যায়। রোবার সকালে আকাশ ছিল নীল, বাতাস ছিল শান্ত। একেবারে আদর্শ পরিবেশ। সেই সুযোগেই শুরু হয় আরোহণ।
হনল্ডের ভাষায়, ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেকে শান্ত রাখা। এত মানুষ, এত নজর, সব মিলিয়ে চাপটা বেশি লাগছিল। কিন্তু যত ওপরে উঠেছি, ততই শান্ত হয়ে গেছি। মনে হচ্ছিল, এ তো দারুণ মজা, এ জন্যই তো আমি এটা করি।

অ্যালেক্স হনল্ড অবশ্য এই ভবনের প্রথম আরোহণকারী নন। ২০০৪ সালে ফরাসি ক্লাইম্বার অ্যালাঁ রোবেয়ার্ট তাইপে ১০১-এর চূড়ায় উঠেছিলেন, তবে রশির সাহায্যে। ভবনটির উদ্বোধন উপলক্ষে আমন্ত্রিত হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সেদিন ছিল বৃষ্টি আর প্রবল বাতাস, ফলে তাঁর সময় লেগেছিল প্রায় চার ঘণ্টা। সে তুলনায় হনল্ডের লেগেছে মাত্র দেড় ঘণ্টা।
রোবেয়ার্ট আর হনল্ড, দুজনই বলেছেন, ভবনটি বেয়ে ওঠা তাঁদের পরিচিত পাহাড়ি বা পাথুরে রুটের মতো অতটা জটিল নয়। কাচের পিচ্ছিল দেয়ালে ঝুলে থাকতে হয়নি হনল্ডকে। ধাতব কাঠামো, বিম আর কাঠামোর বেরিয়ে আসা অংশ ছিল, যেগুলো ধরে ওপরে আগানো সম্ভব। যদিও ওপরে উঠতে গিয়ে কয়েকটি জায়গায় বেশ কিছু বিশেষ কৌশল করতে হয়েছে। সেগুলোও হনল্ড অনায়াসে পার করে দ্রুত ওপরে উঠেছেন। মাঝেমধ্যে বারান্দার মতো ধাপে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নিয়েছেন। নিচের মানুষদের দিকে হাত নেড়েছেন।
এই পুরো সময়ে মনে মনে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় ছিলেন অ্যালেক্স হনল্ডের স্ত্রী স্যানি ম্যাকক্যান্ডলেস। তিনি ভবনের ভেতর থেকে কাচের দেয়ালের মধ্য দিয়ে দেখছিলেন। একতলায় এসে হনল্ড যখন কাচের ওপাশ দিয়ে হাত নেড়েছিলেন, স্যানিও তাঁকে দেখে হাত নাড়ান। চূড়ায় ওঠার পর ভেতরের এক বারান্দায় দুজনের দেখা হয়। আলিঙ্গনের পর স্যানি মজা করে বলেন, ‘পুরো সময়টাই আমার প্রায় প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছিল।’
২০০৪ সালে উদ্বোধনের সময় তাইপে ১০১ ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ভবন। পরে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা সেই খেতাব ছিনিয়ে নেয়। এরপর আরও অনেক উঁচু ভবন তৈরি হয়েছে, নিউইয়র্কের ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারও যার মধ্যে আছে। তবু তাইপে শহরের আকাশরেখায় তাইপে ১০১ আজও এক অনন্য বিস্ময়।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে হনল্ডকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি এই ঘটনাকে ‘সত্যিই স্নায়ু কাঁপানো’ বলে বর্ণনা করেছেন। ক্লাইম্ব শেষ করে হনল্ড বলেছেন, তিনি চান এই দৃশ্য দেখে মানুষ নিজেদের লক্ষ্য আর চ্যালেঞ্জের পেছনে ছুটতে অনুপ্রাণিত হোক।
সূত্র: সিএনএন

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-27%2Fe1cg6jwu%2FAlex-Honnold2.webp?rect=148%2C0%2C1013%2C675&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
অ্যালেক্স হনল্ড। ইয়াহু

আমেরিকার ‘গানবোট পুঁজিবাদ’ বিশ্বকে আরও দরিদ্র করে তুলবে

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনঃ আধুনিক ইতিহাসের দীর্ঘ সময়জুড়ে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে হাত মিলিয়েই কাজ করেছে। বৃটেন ও নেদারল্যান্ডস তাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ অর্জন করেছিল। বিনিময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছিল। জার্মানির ক্রুপ ও জাপানের মিত্সুবিশি শিল্পায়নে সহায়তা করেছে, আর তাদের সরকার বিদেশে খনি ও বাজার নিশ্চিত করেছে। আমেরিকার হস্তক্ষেপ বহু ক্ষেত্রে তেল কোম্পানিগুলোকে বিদেশি সম্পদ দখলে সহায়তা দিয়েছে। এরপর ১৯৮০-এর দশক থেকে এক সময় সরকারগুলো পিছিয়ে যায় এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় বাধাহীনভাবে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আজ সেই গানবোট পুঁজিবাদ আবার ফিরে এসেছে। এসব কথা লিখেছে বিখ্যাত ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন

এতে আরও বলা হয়, আগামী সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের পর্বতঘেরা রিসোর্ট দাভোসে যখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বড় কোম্পানির প্রধানরা জড়ো হবেন, তাদের প্রধান উদ্বেগের বিষয় হবে- সরকারগুলোর ক্রমবর্ধমান হস্তক্ষেপ। ইউরোপে যুদ্ধ ফিরে আসা এবং কর্তৃত্ববাদী চীনের আগ্রাসী ভূমিকার কারণে রাজনীতিবিদরা বৈশ্বিক ব্যবসার মানচিত্র নতুন করে এঁকেছেন- কোথায় বহুজাতিকরা কাজ করতে পারবে আর কোথায় পারবে না, তা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। তিনি কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখেন। তিনি আমেরিকান তেল কোম্পানির কর্তাদের ভেনেজুয়েলার কারাকাসে ফিরে যেতে বলেছেন, না গেলে প্রতিশোধের হুমকি দিয়েছেন; প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোকে শেয়ার পুনঃক্রয় বন্ধ করতে চাপ দিয়েছেন; এবং চীনে উন্নত প্রসেসর বিক্রি করা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সরকারের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগি করতে বলেছেন।

রাষ্ট্রীয় এই হস্তক্ষেপ পশ্চিমা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য অস্থিরতা ডেকে আনবে, যারা বছরে প্রায় ২৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বিক্রি, ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলারের মুনাফা করে এবং সারা বিশ্বে কোটি কোটি মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়। এর ফল হবে কম সমৃদ্ধ একটি বিশ্ব।

ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন ইতিমধ্যেই বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর রূপ বদলে দিচ্ছে। শুল্ক, ভর্তুকি ও নিষেধাজ্ঞা চীন ও রাশিয়ার মতো দেশ থেকে পুঁজি সরিয়ে নিয়ে নিজ দেশের বাজারে ফেরত আনছে। ২০১৬ সালে আমেরিকান বহুজাতিকদের পুঁজিবিনিয়োগের ৪৪ শতাংশ ছিল দেশে; আজ তা ৬৯ শতাংশ। বিদেশে বিক্রি প্রকৃত অর্থে কমেছে, দেশে বিক্রি বেড়েছে। সফটওয়্যার, ওষুধ ও গাড়ি শিল্পের মতো কৌশলগত খাতগুলোতে এই পশ্চাদপসরণ আরও স্পষ্ট।

ট্রাম্পের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার যেমন বলেছেন, বিশ্বায়নের স্বর্ণযুগ আর ফিরছে না। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ আরও বাড়বে। বাণিজ্যিক লাভের লোভই ট্রাম্পকে ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে উৎখাতের পথে ঠেলেছে এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতিতেও প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যবসাকে রাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে বাঁধছে- কয়েকটি খনি কোম্পানি ও সংকটে থাকা একটি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে সরকার অংশীদারিত্ব নিয়েছে। আমেরিকা যত বেশি নিজের কোম্পানিকে সহায়তা করবে এবং অন্যদের শাস্তি দেবে, অন্য দেশগুলোর জন্যও নিজেদের কোম্পানিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া ততটাই যৌক্তিক হয়ে উঠবে।

নতুন গানবোট পুঁজিবাদ কেমন হবে?

এটি হবে আরও ব্যয়বহুল ও কম দক্ষ। আজকের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনীতির অনেক বড় অংশ- আমেরিকায় তারা বেসরকারি কর্মসংস্থানের এক-পঞ্চমাংশ, ভৌত বিনিয়োগের দুই-পঞ্চমাংশ এবং মুনাফার তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বৈশ্বিক অবকাঠামো পণ্য ও তথ্যের চলাচল সহজ করে সীমান্তজুড়ে ব্যবসাকে লাভজনক করেছে এবং ভোক্তাদের জন্য দাম কমিয়েছে। কিন্তু যখন কোম্পানিকে ভূরাজনৈতিক নির্দেশে পুঁজি বরাদ্দ করতে বাধ্য করা হয়, তখন তাদের উৎপাদনশীলতা কমে। ফলে সবারই ক্ষতি হয়।

ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার হার শুধু দেশীয়ভাবে কাজ করা কোম্পানিগুলোর চেয়ে পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৩-২৪ সালে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিক্রির পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে- নয়টি শিল্পের সাতটিতেই বহুজাতিকদের রিটার্ন কম। ২০১৮-১৯ সালের পর থেকে এই ব্যবধান আরও বেড়েছে।

তবু যদি এতে দেশগুলো নিরাপদ হতো, তাহলে এই খরচ মেনে নেয়া যেত। চিপ শিল্পে নিষেধাজ্ঞা যদি শত্রুপক্ষকে সামরিক সুবিধা পাওয়া থেকে আটকাতে পারে, তবে কিছু ক্ষতি যৌক্তিক। কিন্তু মূল কথা হলো- হস্তক্ষেপ হতে হবে বুদ্ধিদীপ্ত।

ট্রাম্পের নীতি এখানে ব্যর্থ। তিনি শক্তির ভুল উৎসে নজর দিচ্ছেন। আজ বাণিজ্যিক শক্তি আর তেল বা কাঁচামাল দখলে নয়, বরং তা উদ্ভাবন ও জ্ঞানভিত্তিক সম্পদ। অথচ বিজ্ঞান ও অভিবাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ট্রাম্প সেই উদ্ভাবনের সম্ভাবনাই দুর্বল করছেন।

আর নীতিগুলোও অস্পষ্ট ও অস্থির। চীনে সেমি-কন্ডাক্টর বিক্রির নিয়ম বারবার বদলাচ্ছে। এতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত লবিং, এমনকি দুর্নীতির ঝুঁকিতে পড়ছে। অনিশ্চয়তাই প্রশাসনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হওয়ায় ব্যবসাগুলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারছে না।বেশি গানবোট, কম মাখন

ট্রাম্প প্রশাসন এসব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠবে এমন আশা কম। প্রশ্ন হলো, অন্য সরকারগুলো কি ভালোভাবে এই মডেল চালাতে পারবে? ইকোনমিস্ট এ বিষয়ে সন্দিহান। ইতিহাস বলে- সরকার যখন ‘রেন্ট’ তৈরি করে, বাজার বিকৃত হয়; বিকৃত বাজার দেশকে দরিদ্র করে এবং নাগরিকদের উদ্যোগী মনোভাব কমিয়ে দেয়। গানবোট পুঁজিবাদের মোহ হলো, এটি একই সঙ্গে সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা দেবে। বাস্তবতা হলো এটি কোনোটাই দেবে না।

mzamin

হ্যাঁ, ট্রাম্প বিশ্বকে পরিত্যাগ করে চলে গেছেন by গর্ডন ব্রাউন

২৭ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নেওয়া প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হবে। এর কিছুদিন আগেই ৭ জানুয়ারি তিনি ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র আরও ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের অধীন ৩১টি সংস্থা এবং জাতিসংঘের বাইরে থাকা ৩৫টি আন্তর্জাতিক সংস্থা। ওই সংস্থাগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মনে করছে।

এক মাসের মধ্যে কোনো দেশের নেতা এত ব্যাপকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন, এমন দৃষ্টান্ত আগে কখনো দেখা যায়নি। শুধু তা-ই নয়, ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের প্রয়োজন নেই।’ কয়েক সপ্তাহ আগে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কখন আন্তর্জাতিক আইন প্রযোজ্য হবে, তা তিনি একাই ঠিক করবেন। তাঁর ক্ষমতার সীমা কেবল তাঁর ‘নিজস্ব নৈতিকতা’ ঠিক করবে, কোনো আইন নয়।

ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দেওয়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু এতে একটি বড় সত্য আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতির কারণে ইতিমধ্যেই মানুষের দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসন বৈশ্বিক মানবিক সহায়তা ও স্বাস্থ্য কর্মসূচির অর্থ বড় আকারে কমিয়ে দিয়েছে। সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের হিসাব অনুযায়ী, এর ফলে প্রতিবছর প্রায় ১০ লাখ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে।

বার্সেলোনা ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল হেলথ ও অন্যান্য সংস্থার করা একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ একসঙ্গে সহায়তা কমালে ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ২ কোটি ২৬ লাখ পর্যন্ত অতিরিক্ত মৃত্যু ঘটতে পারে। এর মধ্যে ৫৪ লাখ শিশু, যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ বলছে, আন্তর্জাতিক সহায়তায় আরও বড় কাটছাঁট আসছে। ফলে এ মৃত্যুর হিসাব আরও বাড়াতে হতে পারে।

আমরা আগে থেকেই জানতাম, ট্রাম্প প্রশাসন ইউনেসকো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা, ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মতো সংস্থাগুলোকে টার্গেট করবে। কিন্তু এখন আমরা জানলাম, যুক্তরাষ্ট্র জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য বৈশ্বিক চুক্তির মূল কাঠামো জাতিসংঘ জলবায়ু পরিবর্তন ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (ইউএনএফসিসিসি) থেকেও সরে যাচ্ছে। এক বছর পর এই প্রত্যাহার কার্যকর হবে।

এই কাঠামো ছেড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র হবে বিশ্বের প্রথম দেশ। একই সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন ঘোষিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বোর্ড জাতিসংঘের শান্তি স্থাপন ও শান্তিরক্ষা উদ্যোগের বিকল্প হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করবে। অথচ জাতিসংঘের এসব উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরেই পর্যাপ্ত অর্থায়ন পায় না। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতিতে একটি বড় ও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘আমেরিকান জনগণের রক্ত, ঘাম ও অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানে ঢালা আর গ্রহণযোগ্য নয়, যখন এর বদলে খুব কমই পাওয়া যায়।’ কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোর নারী ও কিশোরীদের কষ্ট লাঘবে কাজ করা সংস্থাগুলোর কারণে নাকি আমেরিকানরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—এই দাবি সম্পূর্ণ অসৎ। এতে মনে হয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণায় বলা ‘জীবন, স্বাধীনতা ও সুখের অনুসন্ধান’ অধিকার এখনো শুধু পুরুষদের জন্যই প্রযোজ্য।

এই সংস্থাগুলো আশ্রয়কেন্দ্র চালায়, আইনি সহায়তা দেয়, মানসিক সহায়তা দেয়। তারা বাল্যবিবাহ ও জোরপূর্বক যৌনাঙ্গ বিকৃতি বন্ধে কাজ করে। বিশ্বের বহু সংঘাতপূর্ণ এলাকায় বাস্তুচ্যুত নারীরা এখন নিরাপদ জায়গা হারাতে চলেছেন। রিপোর্ট বলছে, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সংঘাত-সম্পর্কিত যৌন সহিংসতা ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

জাতিসংঘ মনে করে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শিশুদের সুরক্ষা খুবই জরুরি। এ কারণেই শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা রোধে কাজ করা দপ্তর এসআরএসজি-ভিএসি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করে, যাতে নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা ভালো করা যায়। একইভাবে ইউএনএফপিএ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এইচআইভি সংক্রমণ কমানোর জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ ও সহায়তা দেয়। কারণ, এই রোগ প্রজনন বয়সী নারী ও কিশোরীদের মৃত্যুর একটি বড় কারণ।

যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার এই আঘাত শুধু স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে মেয়েদের শিক্ষা সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাবে। ইতিমধ্যে বিশ্বে স্কুলের বাইরে থাকা মেয়ের সংখ্যা ১২ কোটি ২০ লাখ। এই সংখ্যা আরও বাড়বে। এর প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদি ও ভয়াবহ। ট্রাম্প প্রশাসন ভুলভাবে ধরে নিচ্ছে যে আমেরিকান ও বিদেশি জনগণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ভেঙে ফেলার পক্ষে। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষই চায় দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করুক।

৩৪টি দেশে পরিচালিত একটি জনমত জরিপে (যেখানে বিশ্বের সব অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত) ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ বলেছেন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, মানবাধিকার ও সংঘাত প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যাবশ্যক। মাত্র ৫-৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এ ধরনের সহযোগিতা সময় ও অর্থের অপচয়।

আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো অনেক দেশে মানুষ নিজের সরকারের চেয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর বেশি আস্থা রাখে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতি বৈশ্বিক আস্থা ৬০ শতাংশ, আর সাব-সাহারান আফ্রিকায় তা ৮৫ শতাংশ। জাতিসংঘের প্রতি আস্থা ৫৮ শতাংশ। নারী ও মেয়েদের এগিয়ে নিতে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিষয়ে মানুষকে জিজ্ঞেস করা হলে একই রকম সমর্থনই পাওয়া যেত। কারণ, নারী ও মেয়েরা সুযোগ পেলে সমাজ ও পৃথিবী দুটোই ভালো হয়। কিন্তু সংকটের সময়ে নারী ও মেয়েদের পাশে না দাঁড়ানো কোনোভাবেই টাকা বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নয়। এর ক্ষতি বহু বছর ধরে, এমনকি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাজ ও অর্থনীতিকে ভোগাবে।

সবচেয়ে বড় কথা, এটা শুধু ভুল সিদ্ধান্ত নয়, এটা একটি গভীর নৈতিক ব্যর্থতা, যা আমাদের সবাইকে লজ্জিত করে।

* গর্ডন ব্রাউন, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল হেলথ ফাইন্যান্সিংবিষয়ক রাষ্ট্রদূত
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

গাজার তাঁবুতে মানবেতর জীবন

দুই বছর ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় উপত্যকাটির অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁবু টানিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাঁদের।

ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ভোগান্তি কমেনি সেখানকার বাসিন্দাদের। দুই বছর ধরে ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় উপত্যকাটির অধিকাংশ ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। বাধ্য হয়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাঁবু টানিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে তাঁদের, যেখানে বসবাসের ন্যূনতম কোনো পরিবেশ নেই। ফলে শ্বাসকষ্ট ও পেটের পীড়াজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সেখানকার বাসিন্দারা।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আবু আমর পরিবার ১৭ বারের বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছে। প্রতিবার স্থান পরিবর্তনের সঙ্গে তাদের জীবন আরও সংকুচিত হয়েছে। উপায়ন্তর না পেয়ে গাজার রিমাল এলাকায় আবর্জনার ভাগাড়ের পাশে তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করছে পরিবারটি। দূষণ, অসুস্থতা ও অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিদিন লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে তাদের।

৬৪ বছর বয়সী আবু আমর বলেন, ‘গাজায় আমরা দুটি যুদ্ধের মধ্যে বসবাস করছি—একটি বোমা হামলা, অপরটি আবর্জনা। আমার অ্যাজমার সমস্যা আছে। এ জন্য সব সময় ইনহেলার সঙ্গে থাকে। রাতে আমি সেটি বালিশের নিচে রাখি। ময়লার দুর্গন্ধে শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে গেলে কয়েকবার এটি ব্যবহার করতে হয়।’

আমরের পুত্রবধূ পাঁচ সন্তানের জননী সুরাইয়া আবু আমর। তিনি বলেন, তাঁবুতে ন্যূনতম স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। এখানে পানির ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে মাসে কয়েকবার পেটের পীড়ায় ভুগতে হয়।

অথচ সুরাইয়াদের জীবন এমন ছিল না। তাঁরা বাইত আল–লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে গাজা নগরীতে আশ্রয় নিয়েছেন। ইসরায়েলের হামলার আগে তাঁদের জীবন ছিল পরিপাটি। পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা ছিল তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি কখনো কল্পনাও করতে পারেননি যে এমন দুঃস্বপ্নের মধ্যে বসবাস করতে হবে।

হতাশা

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। হামলায় গাজার বেশির ভাগ ভবন ধ্বংস কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদিকে গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর হলেও গাজায় ইসরায়েলি হামলা চলছেই। যুদ্ধবিরতির পর এ পর্যন্ত চার শতাধিক শিশু নিহত হয়েছে। এসব হামলা গাজাকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলতে ইসরায়েলের পরিকল্পিত চেষ্টা বলে মনে করেন অনেক ফিলিস্তিনি।

তাঁদের একজন সেলিম (৪০)। তিনি বলেন, বর্জ্যের পাশে থাকার কারণে তাঁদের হতাশা গ্রাস করেছে। তিনি বলেন, ‘আমার সন্তানেরা শীত ও গরমে খুব কষ্ট পাচ্ছে। এখানে বাতাসের সঙ্গে দুর্গন্ধ নাকে আসে। খেতে বসলে খাবারও পেটে যায় না, বমি আসে।’

সেলিম আরও বলেন, ঝড়ের সময় নিয়মিত নর্দমার পানি তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়ে। তিনি বলেন, ‘ঝড়–বাতাস হলে নর্দমার পানি তাঁবুর ওপর চলে আসে। কখনো কখনো আমাদের কাপড়েও ছিট আসে। আমাদের কাছে বাড়তি কোনো পরিষ্কার কাপড়ও নেই। বেইত লাহিয়া থেকে কাপড় ছাড়াই পালিয়েছি। কখনো কখনো আমাকে নোংরা কাপড়ে নামাজ আদায় করতে হয়।’

এমন পরিস্থিতিতে শিশুরা বেশি সমস্যায় পড়েছে। ১৩ বছর বয়সী শিশু রাহাফ বলে, ‘পরিচ্ছন্নতার অভাবে আমার চুল পড়ছে, ত্বকেও সংক্রমণ হয়েছে।’

স্বাস্থ্য–সংকট

চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, ময়লা–আবর্জনা, নর্দমার পানির কারণে এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে গাজায় রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।

গাজার আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের ফুসফুস বিভাগের প্রধান আহমেদ আলরাবিই বলেন, ‘গাজার জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভয়াবহ। আমরা ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ দেখতে পাচ্ছি। ফলে এত কঠিন জটিলতা হচ্ছে, যা যুদ্ধের আগে আমরা কখনো দেখিনি বা মোকাবিলা করতে হয়নি।’

গাজার মিউনিসিপ্যাল কর্মকর্তাদের মতে, গাজা নগরী মানবিক ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি। ইসরায়েলের হামলায় সেখানকার পানি ও স্যানিটেশন অবকাঠামো প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে।

গাজা মিউনিসিপ্যালিটির জনসংযোগ বিভাগের প্রধান আহমেদ দিরিয়েমলি বলেন, গাজা নগরীর ভেতরে দেড় লাখ মিটার বেশি পাইপ এবং প্রায় ৮৫ শতাংশ পানির কূপ ধ্বংস হয়ে গেছে। একই সঙ্গে পানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্টও সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়েছে।

গাজার পূর্বাঞ্চলে বর্জ্য ফেলার জায়গায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েল। ফলে শহরজুড়ে বর্জ্যের স্তূপ জমে গেছে। গাজা মিউনিসিপ্যালিটির মুখপাত্র হুসনি মুহানা বলেন, উপত্যকায় ৭ লাখ টনের বেশি বর্জ্য জমা হচ্ছে, যার মধ্যে শুধু গাজা নগরীতেই জমেছে সাড়ে তিন লাখ টনের বেশি বর্জ্য।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-25%2Fdz5eti8l%2Fpalestinian-israel-gaza-conflict-094618.jpg?rect=0%2C0%2C3514%2C2343&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আবর্জনার ভাগাড়ের পাশে তাঁবুতে কাটছে ফিলিস্তিনিদের মানবেতর জীবন। খান ইউনিস, গাজা। ছবি: এএফপি

নুরি আল-মালিকি প্রধানমন্ত্রী হলে ইরাককে সহায়তা দেবে না যুক্তরাষ্ট্র: ট্রাম্প

ইরাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকিকে ক্ষমতায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হলে দেশটিকে দেওয়া সব ধরনের সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিযোগ, নুরি আল-মালিকি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের শত্রু ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছেন।

ইরাকের পার্লামেন্টে শিয়াদের বৃহত্তম অংশ ‘কো-অর্ডিনেশন ফ্রেমওয়ার্ক’ দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁদের প্রার্থী হিসেবে নুরি আল-মালিকির নাম জানিয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় গতকাল মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ইরাক ‘খুবই বাজে একটি পছন্দ’ বেছে নিয়েছে।

নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘মালিকির সর্বশেষ আমলে দেশটি দারিদ্র্য আর সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খলায় ডুবে গিয়েছিল। এটি আর ঘটতে দেওয়া উচিত নয়।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘তাঁর (নুরি আল-মালিকি) পাগলাটে নীতি ও আদর্শের কারণে, নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্র আর ইরাককে সহায়তা করবে না।’

‘আমরা যদি সহায়তার জন্য না থাকি, তাহলে ইরাকের সাফল্য, সমৃদ্ধি বা স্বাধীনতার সম্ভাবনা একেবারে শূন্য। ইরাককে আবার গৌরবের পথে ফেরান!’ বলেন ট্রাম্প।

দীর্ঘদিন ধরেই ইরাক নিজেদের দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র ওয়াশিংটন আর তেহরানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পথে হাঁটছে। তবে ট্রাম্প ইরাকের শাসনকাঠামো থেকে ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীলদের সরাতে চান। তাঁর সর্বশেষ মন্তব্যকে এ কৌশল বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে কড়া অবস্থান বলা যেতে পারে।

একটি চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা বলেছেন, নিজেদের প্রধানমন্ত্রী বেছে নেওয়ার বিষয়টি বাগদাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত। তবে ‘মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে’ ইরাকের পরবর্তী সরকার সম্পর্কে ওয়াশিংটন অবশ্যই নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেবে।

ইরানের মদদপুষ্ট ‘সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে’ পরবর্তী সরকারে অন্তর্ভুক্ত করা হলে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলেও ট্রাম্প প্রশাসন হুমকি দিচ্ছে—এমনটা জানিয়েছেন ইরাকের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিক। তাঁদের ভাষ্য, ট্রাম্পের চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে এটা করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স গত সপ্তাহে এ তথ্য জানিয়ে প্রতিবেদন করেছে।

নুরি আল-মালিকির বয়স ৭৫ বছর। তিনি ইরাকি শিয়া ইসলামপন্থীদের দাওয়া পার্টির জ্যেষ্ঠ একজন রাজনীতিক। ২০০৬ সালে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন নুরি আল-মালিকি। ক্ষমতায় ছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। ওই সময় সুন্নি ও কুর্দিদের সঙ্গে ক্ষমতার টানাপোড়েন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে।

২০১৪ সালে আইএস যখন ইরাকের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নেয়, তখন নুরি আল-মালিকি সরকারপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে ইরাকের রাজনীতিতে বরাবরই তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রেখেছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Fiq0i8pjo%2FUntitled-1.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নুরি আল-মালিকি। ফাইল ছবি: রয়টার্স

মিনিয়াপোলিসে ইলহান ওমরের ওপর হামলা

প্রকাশ ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ইলহান ওমরের ওপর হামলা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার নিজ অঙ্গরাজ্য মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে একটি টাউন হল সভা চলাকালে তাঁর ওপর হামলা হয়।

হামলাকারী একজন পুরুষ। তিনি সোমালি বংশোদ্ভূত এই ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতার ওপর অজ্ঞাত তরল পদার্থ ছিটান (স্প্রে)। হামলাকারীকে মাটিতে চেপে ধরে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, এই হামলায় ইলহান ওমর আহত হননি। তবে তাঁর ওপর ঠিক কী ধরনের তরল পদার্থ ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছিল বা হামলাকারীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনা হয়েছে কি না, এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কিছু জানায়নি।

হামলাকারীকে মাটিতে চেপে ধরা হলে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে উল্লাসধ্বনি শোনা যায়। তাঁর হাত পেছনে বেঁধে ফেলা হয়।

মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে গতকাল মঙ্গলবার টাউন হল বৈঠক চলাকালে এক ব্যক্তি ইলহান ওমরের দিকে কিছু একটা তরল পদার্থ ছিটিয়ে দিয়ে চিৎকার করছেন। ২৭ জানুয়ারি ২০২৬
মিনেসোটার মিনিয়াপোলিসে গতকাল মঙ্গলবার টাউন হল বৈঠক চলাকালে এক ব্যক্তি ইলহান ওমরের দিকে কিছু একটা তরল পদার্থ ছিটিয়ে দিয়ে চিৎকার করছেন। ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

ঘটনাটির একটি ভিডিও ক্লিপে শোনা যায়, ভিড়ের মধ্যে একজন বলছেন, ‘ওহ মাই গড, সে (হামলাকারী) তাঁর (ইলহান ওমর) ওপর কিছু ছিটিয়ে দিয়েছে।’ বার্তা সংস্থা এপি এ তথ্য জানায়।

হামলাকারীকে সভাকক্ষ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর মার্কিন কংগ্রেসের মুসলিম সদস্য ইলহান ওমর টাউন হল বৈঠক চালিয়ে যান।

হামলার ঠিক আগে ইলহান ওমর যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) সংস্থাটি বিলুপ্ত করার আহ্বান জানান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটিবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস্টি নোয়েমের পদত্যাগ দাবি করেন।

ইলহান ওমর বলেন, ‘আইসিইকে সংস্কার করা সম্ভব নয়।’

ইলহান ওমরের ওপর হামলার বিষয়ে মিনিয়াপোলিস পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও কিছু জানানো হয়নি।

হোয়াইট হাউস থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য আসেনি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-28%2Foozbl9ol%2FIlhan-Omar-right.webp?rect=1%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
টাউন হল সভা চলাকালে এক ব্যক্তি ইলহান ওমারের ওপর তরল পদার্থ স্প্রে করেন। তখন ইলহান ওমার এভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ছবি: এএফপি

আমার চোখের সামনেই শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল: মিয়ানমারে নিপীড়িত রোহিঙ্গা নারী

প্রকাশ ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ঃ ‘অবশেষে আমার মনে হচ্ছে, আমাদের কথা শোনা হচ্ছে। আর আমাদের সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য ভালো কিছু ঘটতে যাচ্ছে।’

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর জাতিগত নিধনের (জেনোসাইড) অভিযোগসংক্রান্ত শুনানি শুরু হওয়া প্রসঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন মোনাইরা (ছদ্মনাম)। তিনি মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো নির্মম দমন-পীড়নে বেঁচে যাওয়া মানুষদের একজন।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী যখন রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ চালায়, তখন এ রোহিঙ্গা নারীকে নিজের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছিল।

মোনাইরা বলেন, সেই সহিংসতার সময় তাঁর ভাইকে সেনাসদস্যরা ধরে নিয়ে যায়, গুলি করে হত্যা করে ও তাঁর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেনাসদস্যদের হাতে তিনি নিজেও ধর্ষণের শিকার হন।

মোনাইরা বলেন, ‘আমার চোখের সামনেই শিশুদের আগুনে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল।’

গতকাল সোমবার জাতিসংঘের শীর্ষ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। মোনাইরার মতো রোহিঙ্গাদের অনেকের আশা, এর মধ্য দিয়ে বহুল আকাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার পথে তাঁরা অন্তত এক ধাপ এগোতে পারবেন।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছে গাম্বিয়া। মূলত ২০১৬ ও ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর চালানো সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে এ মামলা করা হয়। ওই অভিযানের কারণে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

মোনাইরা বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার চাই।’ শুনানিতে অংশ নিতে তিনি বাংলাদেশের কক্সবাজারে অবস্থিত শরণার্থীশিবির থেকে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে গিয়েছেন।

এটি গত এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) প্রথম কোনো জাতিগত নিধনসংক্রান্ত মামলার শুনানি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে জাতিগত নিধনের অভিযোগগুলো কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সে ক্ষেত্রে এই শুনানি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

এর মধ্যে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার করা একটি মামলাও রয়েছে।

গতকাল সোমবার শুনানির শুরুতে গাম্বিয়ার আইন ও বিচারমন্ত্রী দাউদা জ্যালো আদালতকে বলেন, এই মামলা আন্তর্জাতিক আইনের দুর্বোধ্য তাত্ত্বিক বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাস্তব মানুষ, বাস্তব গল্প ও একটি বাস্তব মানবগোষ্ঠীকে ঘিরে মামলাটি করা হয়েছে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা হলো সেই মানবগোষ্ঠী, ধ্বংস করে দেওয়ার লক্ষ্যেই যাঁদের নিশানা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আছে—কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, মা, বাবা, ছেলে, মেয়ে, দাদা-দাদি।

জ্যালো আরও বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জীবনকে এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। তাঁদের এমন সহিংসতা ও ধ্বংসের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা কল্পনা করাও কঠিন।

গাম্বিয়া আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিচার আদালতে তাদের প্রথম পর্যায়ের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। দেশটির অভিযোগ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিকভাবে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা রোহিঙ্গাদের গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল, রোহিঙ্গাদের পুরোপুরি বা আংশিকভাবে ধ্বংস করা।

দাউদা জ্যালো আদালতে বলেছেন, ‘আমরা হালকা ধরনের প্রস্তুতির ভিত্তিতে এ মামলা করিনি। বহু বছর ধরে অবমাননা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া একটি অসহায় গোষ্ঠীর ওপর যে নৃশংস ও নির্মম নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করার পরই আমরা এই মামলা দায়ের করেছি।’

মিয়ানমার জাতিগত নিধন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তারা ১৬ জানুয়ারি থেকে ২০ জানুয়ারির ভেতর তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। নিপীড়নের ঘটনায় বেঁচে যাওয়া মানুষেরা এই মামলায় সাক্ষ্য দেবেন, যা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের জন্য বিরল ঘটনা। ২৯ জানুয়ারি শুনানি শেষ হবে।

এর আগে মিয়ানমারের ৮০ বছর বয়সী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি আদালতে গিয়ে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে জাতিগত নিধনসংক্রান্ত অভিযোগের বিরুদ্ধে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছিলেন। ওই সময় তিনি মিয়ানমার সরকারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী ছিলেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সেনা অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। বর্তমানে সু চি সেনাবাহিনীর নির্দেশে আটক রয়েছেন। ২০২১ সালের ওই সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা মিয়ানমারকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকের প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে আসা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হচ্ছে।

তুন খিন আরও বলেন, ‘এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির দীর্ঘ পথে বড় এক অগ্রগতি।’

তুন খিন আঞ্চলিক রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

২০২০ সালে আইসিজে মিয়ানমারের ওপর জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী পদক্ষেপ জারি করেছিল। এর আওতায় রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুর বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনমূলক সহিংসতা রোধ ও অতীতের অপরাধের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে মিয়ানমার সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সেনাবাহিনী এখনো নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক গবেষক শায়না বাউচনার বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর উচিত ‘নৃশংস নির্যাতন ও দমনমূলক অব্যবস্থাপনার চক্র’ শেষ করা। তাঁর মতে, দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের জান্তাকে আইসিজে-নির্ধারিত অস্থায়ী ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে আইনগত বাধ্যবাধকতা মেনে চলতে বাধ্য করা।

আইসিজেতে করা মামলাটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি কার্যক্রম নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে নির্ধারণ করা হবে, মিয়ানমার জাতিগত নিধন (জেনোসাইড) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি লঙ্ঘন করেছে কি না।

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত শুরু করেছিলেন। ২০২৪ সালে আইসিসির কৌঁসুলি মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান মিন অং হ্লাইং–এর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা চেয়ে আবেদন করেন।

লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইডের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক অ্যান্টোনিয়া মালভি বলেন, ‘আমরা যখন সশস্ত্র সংঘাত, ন্যায়বিচারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা দেখছি, তখন ২০২৬ সালের শুরুতেই এমন একটি মামলায় বিচারকাজ শুরু হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু হতে পারে না।’

মালভি বলেন, ছয় থেকে বারো মাসের মধ্যে মামলার রায় আসতে পারে। তিনি আরও মনে করেন, যদি মিয়ানমারে বর্তমান পরিস্থিতিতে আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না হয়, তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে থেকে যাবে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর বিমান হামলার পর আগুন ধরে যাওয়া একটি বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর বিমান হামলার পর আগুন ধরে যাওয়া একটি বাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরি: ইরানে হামলার আশঙ্কায় উত্তেজনা

মধ্যপ্রাচ্যে বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পর্যবেক্ষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ইরান সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যেই এ বিশাল সামরিক শক্তি জড়ো করা হচ্ছে। তেহরানের বিরুদ্ধে চলমান বিক্ষোভ সহিংসভাবে দমন এবং হাজার হাজার ইরানি নাগরিককে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী রণতরিগুলো এখনো চূড়ান্ত অবস্থানে না পৌঁছালেও ইরানের ওপর আঘাত হানার সীমানার মধ্যেই রয়েছে। তবে মার্কিন হামলায় ইরানে নতুন করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দানা বাঁধবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা কট্টরপন্থী নেতৃত্বের বিরোধী হলেও অনেক ইরানি বিদেশি শক্তির মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পক্ষপাতী নন।

কূটনৈতিক আলোচনার কোনো ইতিবাচক লক্ষণ না থাকায় গত সোমবার ইরানের পুঁজিবাজারে রেকর্ড দরপতন হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো জানিয়েছে, ইরানের ওপর হামলার জন্য তারা নিজেদের আকাশসীমা বা জলসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। তবে ভূমধ্যসাগরে মার্কিন রণতরির উপস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তৃতীয় কোনো দেশের অনুমতির প্রয়োজন পড়বে না।

এদিকে গত সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বাহিনী এ অঞ্চলে একটি মহড়া চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে কত দ্রুত তারা যুদ্ধজাহাজ থেকে যুদ্ধবিমান ওঠানামা করাতে পারে, তার সক্ষমতা যাচাই করা।

মূল লক্ষ্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য এই হামলার লক্ষ্য ইরানের আগে থেকেই বিপর্যস্ত পরমাণু কর্মসূচি নয়। এবার লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। উদ্দেশ্য হলো জীবনযাত্রার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষকে আবারও রাস্তায় নামিয়ে আনা। সরকারি তথ্যমতে, গত মাসে ইরানে মূল্যস্ফীতি ৬০ শতাংশে ঠেকেছে।

ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি দাবি করেছেন, হামলার আগেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামাজিক সংহতি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিকে ‘জরুরি অবস্থার’ মধ্যে ঠেলে দেওয়ার যে চেষ্টা করছেন, সেটি নিজেই এক ধরনের যুদ্ধ। শত্রুরা ঠিক এটিই চাইছে।

আলোচনার দাবি নাকচ

মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সম্ভাব্য কোনো কূটনৈতিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এমন দাবিকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। উইটকফ সম্প্রতি তাঁর শর্তের তালিকায় জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শক দল ফিরিয়ে আনা, ইরানের উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়গুলো যুক্ত করেছেন।

বাঘাই জানান, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী প্রতিটি গতিবিধি ‘সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ’ করছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন ও হুমকি প্রদান আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এসব নীতি লঙ্ঘন করা হলে পরিস্থিতি সবার জন্যই অনিরাপদ হয়ে উঠবে। আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরান ‘সর্বাত্মক ও অনুশোচনাজনক’ জবাব দেবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

দোলাচলে ট্রাম্প

বিক্ষোভের চরম পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও দুই সপ্তাহ আগে ইরানে হামলা থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। মূলত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর কোনো চূড়ান্ত বিকল্প বা ইরানের পাল্টা আঘাত থেকে ইসরায়েলকে রক্ষার বিস্তারিত পরিকল্পনা হাতে না থাকায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। তবে বিক্ষোভকারীদের সহায়তার যে প্রতিশ্রুতি ট্রাম্প দিয়েছিলেন, তা রক্ষা করতে না পারায় অনেক ইরানির মধ্যেই ক্ষোভ বিরাজ করছে। ৯ কোটি জনসংখ্যার একটি দেশে ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ পথে হাঁটবে কি না, তা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই মতভেদ রয়েছে।

ইউরোপের নতুন নিষেধাজ্ঞা

ইউরোপীয় রাজনীতিতেও এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে। ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি জানিয়েছেন, তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রবিষয়ক কাউন্সিলে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে (আইআরজিসি) একটি নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-27%2F3nm598zf%2Fuss.jpg?rect=132%2C0%2C588%2C392&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ডেকে সারিবদ্ধ যুদ্ধবিমান। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতেই কি নির্বাচন দিল মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান

মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং পাঁচ বছর আগে অবসরের কয়েক মাস আগে একটি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত নেন। গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে তিনি নিজেকে দেশের শাসক ঘোষণা করেন।

চশমা পরা এ সেনা কর্মকর্তা ২০১১ সালে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান হন। ঠিক ওই সময় দেশটি দীর্ঘদিনের কঠোর সামরিক শাসনের ইতিহাসকে ভেঙে দিয়ে গণতন্ত্রের নতুন পথে যাত্রা শুরু করেছিল।

৬৯ বছর বয়সী মিন অং হ্লাইং অভ্যুত্থান করার আগে প্রায় এক দশক ধরে নীরবে নিজের আধিপত্য সুদৃঢ় করেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে কারাগারে পাঠান। এর কয়েক মাসের মধ্যে দেশটিতে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।

গত মাসের শেষের দিকে মিয়ানমারে জাতীয় নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শুরু হয়। তিন ধাপে এ নির্বাচনের ভোট চলছে। তৃতীয় ও শেষ ধাপের ভোট গ্রহণ হয়েছে গত রোববার। মিন অং হ্লাইং নিজেই পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করেছেন।

মিয়ানমারের চলতি নির্বাচনে সু চির নেতৃত্বাধীন দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি–সহ (এনএলডি) গুরুত্বপূর্ণ অনেক দল অংশ নিচ্ছে না। তাই এ নির্বাচন কী ফল বয়ে আনবে, তা নিয়ে দেশটির জনগণ ও আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু মিন অং হ্লাই সব সন্দেহ উপেক্ষা করে বারবার বলেছেন, এ নির্বাচন দেশে শান্তি ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে।

এবারের নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত প্রধান রাজনৈতিক দল যাতে নিরঙ্কুশ জয় পায়, সেভাবেই সবকিছুর আয়োজন করা হয়েছে। আর মিন অং হ্লাইং নিজেই স্পষ্ট করে বলেছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এলে তিনি সামরিক ইউনিফর্ম খুলে প্রেসিডেন্টের পদ গ্রহণ করতে প্রস্তুত।

মিন অং হ্লাইং এখনো সেনাপ্রধান। আইনি বৈধতা না থাকলেও তিনিই দেশটির ক্ষমতার সর্বেসর্বা-এটা সব মিয়ানমারবাসী জানেন।

তৃতীয়বারের চেষ্টায় সেনাবাহিনীতে

মিয়ানমারের দক্ষিণাঞ্চলের দাওয়ে শহরে মিন অং হ্লাইংয়ের জন্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়াশোনা শেষে তিনি তৃতীয়বারের চেষ্টায় অফিসার ট্রেইনিং স্কুলে ভর্তি হন। এরপর ধাপে ধাপে সামরিক ক্যারিয়ারের শীর্ষে উঠতে থাকেন। চীনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য রুট আছে, এমন এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী একটি জাতিগত বিদ্রোহীদের দমন করে তিনি সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।

মিন অং হ্লাইংয়ের আগে সেনাপ্রধান ছিলেন থান শ্যে। তিনি প্রায় দুই দশক মিয়ানমার শাসন করেন। এর ভেতর তাঁর কপাল ঘটল এক বিরল ঘটনা—তিনি নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের অধীনে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু দেশটির খসড়া সংবিধান তাঁকে রাজনীতিতে নিজের অবস্থান দৃঢ় করার সুযোগ করে দিয়েছিল। দেশটির খসড়া সংবিধানে পার্লামেন্টের এক-চতুর্থাংশ আসন এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীপদ সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

রোহিঙ্গা নিধন

২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের আগে থেকেই মিন অং হ্লাইং অনেক দেশের কাছে অবাঞ্ছিত ব্যক্তির তালিকায় ছিলেন। ২০১৭ সালে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনী বড় সামরিক অভিযান চালায়। এতে করে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেন। এ অভিযানের সঙ্গে মিন অং হ্লাইংয়ের সংশ্লিষ্টতা থাকায় তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়েছেন।

হিংসাত্মক বক্তব্যের কারণে ফেসবুক মিন অং হ্লাইংকে নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের অনেক দেশ তাঁর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান প্রসিকিউটর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য আবেদন করেন।

কিন্তু মিন অং হ্লাইং বারবার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের দমনের জন্য সামরিক অভিযান জরুরি ছিল। অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে আধুনিকীকরণের বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছেন মিন অং হ্লাইং। এ প্রকল্পে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করছেন। চীন, রাশিয়া ও ইসরায়েল থেকে আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম কিনছেন।

মেডেলের আড়ালে অপকর্ম

প্রতিবছরের ২৭ মার্চ রাজধানী নেপিডোতে সশস্ত্র বাহিনী দিবসে জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক কুচকাওয়াজের নেতৃত্ব দেন মিন অং হ্লাইং। হুড খোলা জিপে দাঁড়িয়ে তিনি অভিবাদন গ্রহণ করেন। তাঁর দুই বাহু ও বুকে থাকে সামরিক ও বেসামরিক স্বীকৃতির অনেক মেডেল।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দাপ্তরিক পদবি হিসেবে মিন অং হ্লাইংয়ের একটি দীর্ঘ নাম লেখা হয়। তা হলো ‘স্টেট সিকিউরিটি অ্যান্ড পিস কমিশন চেয়ারম্যান কমান্ডার ইন চিফ অব ডিফেন্স সার্ভিসেস সিনিয়র জেনারেল থাদো মহা থ্রায় সিত্থু থাদো থিরি থুদধর্মা মিন অং হ্লাইং’। এতে তাঁর একাধিক সামরিক-বেসামরিক খেতাব ও দায়িত্বের কথা উল্লেখ আছে।

তবে মিন অং হ্লাইংয়ের খেতাব ও পদবি যত লম্বাই হোক, বার্ষিক কুচকাওয়াজে প্রতিবছর সেনাসংখ্যা কমছে। কারণ, তাঁর বাহিনীকে বিস্তৃত ও দুর্গম দেশটির নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জোরদার হচ্ছে সেনাশাসন

অং সান সু চিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাগারে পাঠানোর পর মিন অং হ্লাইং তাঁর বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ আনেন। কিন্তু নিজের দাবির পক্ষে তিনি প্রমাণ দিতে পারেননি।

বিশ্লেষকেরা তখন বলেছিলেন, ২০২০ সালের নির্বাচনে সেনা-সমর্থিত দলগুলো ভালো করতে পারেনি। তাই রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা কমা নিয়ে মিন অং হ্লাইং উদ্বিগ্ন ছিলেন।

অভ্যুত্থানের পর নাগরিকেরা বিক্ষোভ শুরু করেন। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনী তাঁদের শক্ত হাতে দমন শুরু করে। এ অবস্থায় বিক্ষোভকারীরা শহর ছেড়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। তাঁদের সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের পুরোনো অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠীও যোগ দেয়। কর্মজীবনের শুরুতে এসব বিদ্রোহী দমনে মিন অং হ্লাইং নিজেই লড়াই করেছিলেন।

পাঁচ বছরের গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারে কত মানুষ মারা গেছে, সেটার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডেটার (এসিএলইডি) তথ্য অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর থেকে সব পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহত মানুষদের একটি বড় অংশ জান্তার জোর করে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া সেনাসদস্য বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-25%2Fqijyidue%2FMyanmars-junta-chief-Min-Aung.png?rect=0%2C0%2C640%2C427&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভোট দেওয়ার পর মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। রাজধানী নেপিডোতে, ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ যৌন সহিংসতার শিকার সুদানের নারীরা

সুদানের যুদ্ধ ভোগাচ্ছে নারীদের, তাঁরা শিকার হচ্ছেন ‘বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ’ যৌন সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধের, যা ঘটছে দায়মুক্তি নিয়ে। একসময়কার মানবাধিকারকর্মী ও বর্তমানে সেনাবাহিনী-সমর্থিত সুদান সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী বার্তা সংস্থা এএফপিকে এ কথা বলেছেন।

সুদানের সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে লিপ্ত। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ। ব্যাপক যৌন সহিংসতা ঘটছে এই সংঘাতের মধ্যে।

সেনা-সমর্থিত সরকারের সমাজকল্যাণমন্ত্রী সুলাইমা ইশহাক আল-খলিফা বলেন, লুটপাট ও হামলার সঙ্গে নারী নির্যাতন ঘটছে অহরহ। ধর্ষণের ঘটনাগুলো প্রায়ই ‘পরিবারের সামনেই’ সংঘটিত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

‘বয়সের কোনো বাছ–বিচার হচ্ছে না। ৮৫ বছর বয়সী একজন নারীও ধর্ষিত হতে পারেন, এক বছরের শিশুও ধর্ষিত হতে পারে,’ বলেন তিনি।

পেশায় মনোবিদ এই নারী পোর্ট সুদানে তাঁর বাসভবনে এএফপির সঙ্গে কথা বলেন। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরে সরব সুলাইমা ইশহাক সম্প্রতি সরকারে যুক্ত হয়েছেন।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, নারীদের যৌনদাসী বানানো হচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া লজ্জা এড়াতে তাঁদের জোর করে বিয়েও দেওয়া হচ্ছে।

যুদ্ধরত দুই পক্ষ থেকেই নারীরা আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানান সুলাইমা ইশহাক। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আরএসএফ এটি ‘পরিকল্পিতভাবে’ করছে। তাঁর দাবি, আরএসএফ জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে একে ব্যবহার করছে।

তাঁর মন্ত্রণালয় ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে ১ হাজার ৮০০টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এই পরিসংখ্যানে পশ্চিম দারফুর ও পার্শ্ববর্তী কর্দোফান অঞ্চলে অক্টোবরের শেষভাগ থেকে নথিভুক্ত হওয়া নৃশংসতার ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এর উদ্দেশ্য হলো... মানুষকে অপমানিত করা, তাদের ঘরবাড়ি, এলাকা ও শহর ছাড়তে বাধ্য করা। এবং একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি... ভেঙে দেওয়া।’

‘যখন আপনি যৌন সহিংসতাকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তার মানে আপনি... যুদ্ধকে চিরস্থায়ী করতে চান,’ বলেন তিনি।

‘যুদ্ধাপরাধ’

হর্ন অব আফ্রিকায় নারীদের ওপর নির্যাতন পর্যবেক্ষণকারী মানবাধিকার সংস্থা এসআইএইচএ নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যৌন সহিংসতার নথিভুক্ত হওয়া ঘটনাগুলোর তিন-চতুর্থাংশের বেশি ধর্ষণের, যার ৮৭ শতাংশের জন্য দায়ী আরএসএফ।

সুদানের দারফুরে অনারব সম্প্রদায়গুলোর ওপর পরিকল্পিত হামলা নিয়ে বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে জাতিসংঘ। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) উভয় পক্ষের দ্বারা সংঘটিত ‘যুদ্ধাপরাধের’ আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে।

আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর নাজহাত শামীম খান জানুয়ারির মাঝামাঝিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, তদন্তকারীরা দারফুরে সেনাবাহিনীর শেষ ঘাঁটি এল-ফাশেরে একটি ‘সংগঠিত ও পরিকল্পিত অভিযানের’ প্রমাণ পেয়েছেন, যা অক্টোবরের শেষে আরএসএফ দখল করে নেয়।

তিনি বলেন, এই অভিযানের মধ্যে ছিল ‘ব্যাপক হারে’ গণধর্ষণ ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর, যা অপরাধীরা কখনো কখনো ‘ভিডিও ধারণ করে উদ্‌যাপন করেছে’ এবং ‘সম্পূর্ণ দায়মুক্তির বোধ থেকে’ এসব কাজ করতে উৎসাহিত হয়েছে।

২০০০-এর দশকের শুরুতে দারফুরে এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ চলেছিল। সম্প্রতি জানজাওয়িদ মিলিশিয়ার (যেটি পরে আরএসএফে রূপান্তরিত হয়) একজন সাবেক কমান্ডারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ধর্ষণসহ একাধিক যুদ্ধাপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছে।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘এখন যা ঘটছে, তা আরও অনেক বেশি কুৎসিত। কারণ, এখন গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এবং তা নথিভুক্তও হচ্ছে।’
এই নারী আরও বলেন, হামলাকারী আরএসএফ যোদ্ধারা ‘এসব কাজ খুব গর্বভরে করে এবং তারা এটিকে অপরাধ হিসেবে দেখে না।’

‘আপনার মনে হবে, তাদের যেন যা খুশি করার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে,’ বলেন তিনি।
দারফুরে বেঁচে ফেরা বেশ কয়েকজন নারী বলেছেন, আরএসএফ যোদ্ধারা তাদের নিচু জাতের মানুষের তকমা দিয়ে ‘দাস’ বলে সম্বোধন করত এবং বলত, আমি যখন তোমাকে আক্রমণ করছি, যৌন নির্যাতন করছি, তখন আমি আসলে তোমাকে ‘সম্মানিত’ করছি, কারণ আমি তোমার চেয়ে বেশি শিক্ষিত বা তোমার চেয়ে বেশি বিশুদ্ধ রক্তের অধিকারী।’

‘নির্যাতন অভিযান’

খার্তুম ও দারফুরের (এল-ফাশেরসহ) নারীরা বিভিন্ন বিদেশি নাগরিকের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, এদের মধ্যে ছিল পশ্চিম আফ্রিকার ফরাসিভাষী ভাড়াটে সেনারা, যাদের মধ্যে মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজেরিয়া, শাদ, কলম্বিয়া ও লিবিয়ার নাগরিকেরা ছিল, যারা আরএসএফের পক্ষে লড়াই করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই নারী বলেন, নির্যাতিতদের একটি অংশকে অপহরণ করে যৌনদাসী হিসেবে আটকে রাখা হয়েছে, আবার অন্যদের সুদানের অরক্ষিত সীমান্তজুড়ে সক্রিয় পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেঙে পড়ার কারণে এসব ঘটনার বেশির ভাগই নথিভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রক্ষণশীল সমাজে কলঙ্কের ভয়ের কারণেও প্রকৃত চিত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মন্ত্রীর মতে, ধর্ষণের ফলে গর্ভধারণের মতো ঘটনা ঘটলে পরিবারগুলো প্রায়ই তা চাপা দিতে নির্যাতিতকে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে।

সুলাইমা ইশহাক বলেন, ‘আমরা একে টর্চার অপারেশন (নির্যাতন অভিযান) বলি।’ তিনি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরীদের জোরপূর্বক বিয়েতে বাধ্য করার ঘটনাগুলোকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-25%2F0c6wdm2o%2FSudan-Sexual-Violence.jpg?rect=129%2C0%2C864%2C576&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সুদানের গেদারেফ প্রদেশের আবু আল-নাগা আশ্রয়শিবিরে ত্রাণের অপেক্ষায় বাস্তুচ্যুত নারীরা। ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রকে কড়া হুঁশিয়ারি: তেহরানে বিলবোর্ডে প্রতিশোধের বার্তা

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর সামরিক হামলার চেষ্টা করে, তবে তার ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে- সরাসরি এমন হুঁশিয়ারি দিয়ে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে একটি বিশাল বিলবোর্ডে দেয়ালচিত্র (মিউরাল) উন্মোচন করেছে ইরান। রোববার রাজধানীর এঙ্গেলাব স্কয়ারে এই দেয়ালচিত্র প্রকাশ করা হয়। এমন এক যুক্তরাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে এমন বিলবোর্ড উন্মোচন করা হলো যখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এ খবর দিয়েছে এনডিটিভি।

এতে বলা হয়, দেয়ালচিত্রটিতে উপর থেকে দেখা একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। রণতরীর ডেকে বিধ্বস্ত ও বিস্ফোরিত যুদ্ধবিমান, ছড়িয়ে থাকা মৃতদেহ এবং রক্তে ভেজা দৃশ্য দেখানো হয়েছে, যার রক্তধারা জাহাজের পেছনে পানিতে মিশে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার ডোরার মতো আকৃতি তৈরি করেছে। ছবির এক কোণে বড় অক্ষরে লেখা- তোমরা যদি ঝড় বপন করো, তবে সেটা ঘূর্ণিঝড় হয়েই ফুটবে।

এই মিউরাল বা দেয়ালচিত্র উন্মোচনের সময়েই মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ও তার সঙ্গে থাকা যুদ্ধজাহাজগুলো ওই অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার কথা মাথায় রেখেই এই মোতায়েন।

mzamin

ডিএনএ পরীক্ষায় সামনে এল শৈশবে মা হওয়া কিশোরীর জীবনের নির্মম বাস্তবতা

যেখানে শৈশব নিরাপদ ও যত্নে কাটার কথা, সেখানে ভয় ও নীরবতায় দিন পার করেছে রাজশাহীর এক কিশোরী। ১২ বছর বয়সেই ধর্ষণের শিকার হয়ে তাকে মাতৃত্বের ভার বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘ তদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, শিশুটি মামা ও সৎবাবার—দুজনের হাতেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

অভিযুক্ত সৎবাবার নাম মেহেদী হাসান ওরফে হৃদয় (২৫)। তাঁর বাড়ি রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার একটি গ্রামে হলেও রাজশাহী শহরের একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। আর মেয়েটির মামার বাড়িও বাঘা উপজেলার একটি গ্রামে।

ভুক্তভোগী ওই কিশোরীর জন্ম দেওয়া শিশুটির বয়স এখন ১ বছর ৯ মাস। ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন আসার পর অভিযুক্ত মেহেদী হাসান ২১ জানুয়ারি নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। পিবিআই বলছে, সৎবাবার কাছে ধর্ষণের শিকার হয়ে মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হলেও সে তার মামার হাতেও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তাই দুজনের বিরুদ্ধেই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রোববার রাজশাহী পিবিআইয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২১-২২ সালে ওই কিশোরী রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় তার নানার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করত। সেখানে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে। পরে সে জানায়, ২০২১-২২ সাল পর্যন্ত নানার বাড়িতে থাকার সময় প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে তার মামা দিনের পর দিন ধর্ষণ করেন।

ঘটনা জানাজানি হলে ২০২২ সালের ২২ নভেম্বর এলাকার লোকজন ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্র্যাম্পে সাত লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে মামার সঙ্গে মেয়েটির বিয়ে দেন। এ বিয়ে মানতে না পেরে তার মামা আত্মগোপন করেন। পরবর্তী সময় মেয়েটির মা তাকে রাজশাহী শহরের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর ২০২৩ সালের ৩ মার্চ মেয়েটি একটি পুত্রসন্তান প্রসব করে।

এরপর ভুক্তভোগী মেয়েটির মা বাদী হয়ে তাঁর ভাইয়ের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিল আদালতে মামলা করেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই। তারা আসামিকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর থেকে গ্রেপ্তার করে। এরপর আদালতের আদেশে ওই কিশোরী, তার সন্তান ও আসামির ডিএনএ নমুনা পরীক্ষা করা হয়। কিন্তু দেখা যায়, আসামির সঙ্গে নবজাতকের ডিএনএ মিলছে না।

পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে আরও অধিকতর তদন্ত শুরু করে পিবিআই। এরপর তারা জানতে পারে, মেয়েটির মা ২০২০ সালে তার দ্বিতীয় স্বামী মেহেদী হাসানের সঙ্গে রাজশাহী শহরে ভাড়া থাকতেন। ২০২২ সালে মায়ের সঙ্গে ঈদ করতে এসে প্রায় দুই মাস সেই বাসায় থাকে ওই কিশোরী। ওই সময় মেহেদী তাকে ধর্ষণ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রাজশাহী পিবিআইয়ের পরিদর্শক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন জানান, মামার সঙ্গে ডিএনএ না মেলায় মেয়েটির সঙ্গে তিনি আবার কথা বলেন। সে কোথায় কোথায় ছিল, তা জানার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ভুক্তভোগী জানায়, সে মায়ের বাড়ি এসে দুই মাস থেকেছে। তখন তিনি সৎবাবাকে সন্দেহ করেন। কিন্তু মেয়েটি জানায়, ঘুমের মধ্যে কিছু হয়েছে কি না, তা তার মনে নেই। পরবর্তী সময়ে ডিএনএ পরীক্ষা করে তাঁরা নিশ্চিত হন।

মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, ২১ জানুয়ারি অভিযুক্ত মেহেদীকে রাজশাহী নগরের মুক্তমঞ্চ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেন। পরদিন তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি সব স্বীকার করে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। এরপর আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান।

তদন্ত কর্মকর্তা আরও জানান, মেয়েটি আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে যে তার মামা তাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছেন। আবার মেহেদীও অপরাধ স্বীকার করেছেন। মেহেদীর ধর্ষণের কারণে মেয়েটি গর্ভবতী হলেও তার মামাও তার সঙ্গে একই কাজ করেছেন। বর্তমানে তার মামা জামিনে আছেন। আর মেহেদী কারাগারে। এখন বিষয়টির তদন্ত চলছে। মেয়েটিকে দুজন ধর্ষণ করে থাকলে দুজনকেই অভিযোগপত্রে অভিযুক্ত করা হবে।

ধর্ষণ
ধর্ষণ। প্রতীকী ছবি: প্রথম আলো