Monday, May 12, 2025

‘যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করেনি পাকিস্তান’

প্রায় দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র উত্তেজনা ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ভারত ও পাকিস্তান অবশেষে একটি পূর্ণাঙ্গ ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতায় এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে পাকিস্তান দাবি করে বলছে যে তারা যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করেনি বরং ভারতীয়দের অনুরোধে সাড়া দিয়েছে।

পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীর মিডিয়া উইং আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘পাকিস্তান কখনো কোনো যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করেনি।’ এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা আল জাজিরা।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আহমেদ শরীফ চৌধুরী বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের অনুরোধ ও হস্তক্ষেপের ভিত্তিতে আমরা ভারতীয়দের (যুদ্ধবিরতি) ইতোমধ্যেই করা অনুরোধে সাড়া দিয়েছি।’

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীর দীর্ঘ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠানের পর মহাপরিচালক জোর দিয়ে বলেছেন, ‘পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে মৌলিক বিরোধ হচ্ছে কাশ্মীর।’

‘আমরা যে সমস্যাটি দেখছি তা হলো ভারত এই বাহ্যিক সমস্যাটিকে অভ্যন্তরীণ করে চলেছে। এটি পাকিস্তান, ভারত ও কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে একটি বাহ্যিক সমস্যা,’ বলেন তিনি।

পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ভারতের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে না জানিয়ে সামরিক বাহিনীর এই মুখপাত্র বলেন, ‘আমি ২০০ শতাংশ নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণরেখা [নিয়ন্ত্রণরেখা] যুদ্ধবিরতি মেনে চলছে।’

‘আমরা একটি পেশাদার সেনাবাহিনী এবং আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি দৃঢ়ভাবে মেনে চলি এবং সরকারের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করি,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ‘পাকিস্তানের কি প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করার কোনো যুক্তি আছে? আমরা একটি শান্তিপ্রিয় জাতি—ভেতরে ও বাইরে। কিন্তু যদি কোনো আগ্রাসন হয়, আমরা জবাব দেব।’

এর আগে সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকালে এমন কিছু গোয়েন্দা তথ্য আসে যা স্পষ্ট করে দেয়, যুদ্ধ যদি অব্যাহত থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এরপরই মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সরাসরি ফোন করেন এবং অবিলম্বে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির আলোচনায় বসার অনুরোধ জানান।

সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের একটি উচ্চপর্যায়ের দল- ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও এবং হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস টানা ৪৮ ঘণ্টা ভারত-পাকিস্তানের উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

উক্ত ‘ভয়াবহ গোয়েন্দা তথ্য’ পাওয়ার পরই জেডি ভ্যান্স প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে মোদিকে ফোন করে ভারতকে সামরিক উত্তেজনা থেকে সরার আহ্বান জানান। ফোনালাপে ভ্যান্স হোয়াইট হাউসের উদ্বেগ তুলে ধরে বলেন, ‘এই সংঘাত বড় ধরনের যুদ্ধের দিকে গড়াতে পারে- এমনকি পরমাণু সংঘর্ষেও গড়াতে পারে।’

ছবি : সংগৃহীত

যুদ্ধবিরতি: মোদির ‘অপারেশন সিঁদুর’ কি হিতে বিপরীত হলো by সালেহ উদ্দিন আহমদ

ভারত–পাকিস্তানের যুদ্ধ বা সংঘাত নতুন কিছ নয়। ১৯৪৮ সাল থেকে এ দুই দেশ মাঝেমধ্যে যুদ্ধ ও সংঘাত করছে। কখনো শুরু করে এক পক্ষ, আবার কখনো অন্য পক্ষ। শুরু হয় আক্রমণ ও প্রতি–আক্রমণ। কয় দিন চলে, তারপর যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। কখনো নিজেদের প্রচেষ্টায়, আবার কখনো অন্যদের মধ্যস্থতায়। এর আগের বড় যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬৫ সালে, যা ১৭ দিন স্থায়ী ছিল। আসল যুদ্ধ শেষ হলেও এ দুই দেশের ঠান্ডা যুদ্ধ ও বাগ্‌বিতণ্ডা বছরের পর বছর চলতেই থাকে।

ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ যেভাবেই শুরু হোক না কেন, শেষটা মোটামুটি বলে দেওয়া যায়। যুদ্ধ শেষে, আজাদ কাশ্মীর ‘আজাদ’ই থাকবে। ভারত অধিকৃত কাশ্মীর ভারতের অংশ হয়েই থাকবে। সীমান্তের দুই পাশে অনেক সাধারণ মানুষ মারা যাবে দুই পক্ষেই। ভারতের কয়েকজন জেনারেলকে ভূষিত করা হবে ‘পরম বীরচক্র’ ও ‘মহাবীরচক্র’—এসব পদকে। পাকিস্তানি জেনারেলরা পাবেন ‘নিশানে হায়দার’ ও ‘নিশানে ইমতিয়াজ’। স্থগিত আইপিএল আবার শুরু হবে। শুরু হবে পিসিএলও। সবই আবার ঠিকঠাক। তাহলে যুদ্ধটা কেন হলো?

পৃথিবীর অন্য জায়গায় যুদ্ধ কেন হয়? ইউক্রেনের যুদ্ধে রুশরা ইউক্রেনের কিছু জায়গা দখল করতে চায়। কারণ, ওই জায়গাগুলোর অধিবাসীরা রুশ বংশোদ্ভূত। ইসরায়েল ফিলিস্তিনের জায়গা দখল করতে যুদ্ধ করে; কারণ, তাদের অনেক জায়গা দরকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ইহুদিদের তাদের ‘স্বপ্নের দেশ’ ইসরায়েলে স্থান দিতে।

ভারতের এই যুদ্ধে এসব জায়গাজমি দখলের ব্যাপার নেই। এবারের ভারত–পাকিস্তানের যুদ্ধটা হলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘হিন্দু প্রাইডের’ যুদ্ধ। এর নাম নামও দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। শুরু হয়েছিল কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলাকে নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের নেতাদের বাগ্‌যুদ্ধ দিয়ে। এই কথার যুদ্ধ দিয়ে ব্যাপারটা চাপা দেওয়া যেত।

কিন্তু মোদির ওপর পাকিস্তানের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো থেকে চরম চাপ শুরু হলো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উগ্র হিন্দু জাতীয়বাদী আদর্শ সামনে রেখে রাজনীতি করেন এবং হিন্দু ভোটারদের কড়া সমর্থন নিয়ে বারবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। কাশ্মীরের এই হামলার জবাব না দিলে তাঁর ভোট ব্যাংকে ধস নামবে। তাই তিনি জেনারেলদের নির্দেশ দিলেন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে। মোদ্দাকথা, পাকিস্তানকে শাস্তি দিয়ে মোদির ‘হিন্দু প্রাইড’ ও হিন্দু ভোট ব্যাংক টিকিয়ে রাখাই ছিল এ যুদ্ধের প্রধান উদ্দেশ্য।

পাকিস্তানও আঁচ করে নিয়েছিল যে ভারতীয় হামলা আসছে। ভারতের সঙ্গে যেকোনো সংঘাত মোকাবিলা করতে পাকিস্তানি জেনারেলরা মোটামুটি সব সময় প্রস্তুত থাকেন। আসলে এটাই পাকিস্তানের জাতীয় আকাঙ্ক্ষার একটা মূল স্তম্ভ। জন্মের পর থেকেই এই ‘ভারত জুজু’র ভয় দেখিয়ে পাকিস্তানি জেনারেলরা কখনো সামরিক শাসন দিয়ে, কখনো বেসামরিক প্রক্সি দিয়ে দেশ শাসন করছেন। যেহেতু ভারতের সঙ্গে বেশির ভাগ সংঘর্ষই কাশ্মীরকে ঘিরে, একে জেনারেলদের ‘কাশ্মীর কার্ড’ নাম অভিহিত করা হয়। পাকিস্তানি জেনারেলদের ‘কাশ্মীর কার্ড’ আর মোদির ‘হিন্দু প্রাইড’ হয়েছিল মুখোমুখি।

যুদ্ধটা ভারত বলেকয়েই শুরু করেছে। যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি দেখে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, ভারত যুদ্ধে যাওয়ার আগে তাদের ‘হোম ওয়ার্ক’ কি ঠিকমতো করেছে? যুদ্ধ ভারতীয়রা যে রকম চেয়েছিল, সে রকম কি হয়েছে? নাকি এই যুদ্ধ মোদির জন্য হিতে বিপরীত হলো?

যুদ্ধের শুরুতেই আধা ঘণ্টার মধ্যেই ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তর কয়েকটা ‘কাশ্মীরি ট্রেনিং ক্যাম্প’ ধ্বংস করে। ভারত দাবি করে আসছে, এগুলো থেকেই কাশ্মীরে হামলাকারীদের ট্রেনিং দেওয়া হয়। পাকিস্তান যদি চুপচাপ প্রাথমিক হামলা হজম করে নিত, তাহলে যুদ্ধটা হয়তো তখনই থেমে যেত। আর মোদি তাঁর লোকদের অপারেশন সিঁদুরের সাফল্য দেখিয়ে, ‘হিন্দু প্রাইড’ পুনরুদ্ধার করতে পারতেন। কিন্তু পাকিস্তান তাদের জাতীয় অহংকার বিসর্জন দেবে কেন?

পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে সমানতালে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে গেছে। যুদ্ধের প্রথম পর্বটা দুই পক্ষেই সীমাবদ্ধ ছিল মোটামুটি বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুকে ঘিরে। যদিও যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও মিসাইল—সবই ব্যবহার করা হয়েছে।

রয়টারের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তান বিমানযুদ্ধে ছিল এগিয়ে, ভারতের কমপক্ষে দুটি ফ্রান্স নির্মিত সর্বাধুনিক রাফাল যুদ্ধবিমানকে পাকিস্তান ভূপাতিত করেছে তাদের চীনে নির্মিত অত্যাধুনিক জে-১০সি ফাইটার বিমানের সাহায্যে। এই প্রথম কোনো যুদ্ধে চীনা জে-১০সি ব্যবহার করা হলো। চীন এই যুদ্ধে তাই অনেক লাভবান।

ড্রোনযুদ্ধে দুই দেশই সমানতালে ছিল। ভারতের আছে ইসরায়েলে তৈরি ড্রোন। পাকিস্তানের তুরস্কের তৈরি। মিসাইল দুই দেশ নিজেরাই তৈরি করছে। তা সমানতালে ব্যবহার করা হয়েছে।

কলকাতার বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা জম্মুতে মিসাইল হামলার বিবরণ দিয়েছে এভাবে, ‘জম্মুর আকাশে উড়ে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল বল, বিয়ের রোশনাই নাকি? সংবিত ফিরল হ্যাঁচকা টানে, ওগুলো সব মিসাইল!’ দুই দেশের ১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধ মূলত ছিল একে অন্যের জায়গা দখল করার যুদ্ধ। এবার জায়গা নিয়ে যুদ্ধ হয়নি। তাই ট্যাংক ব্যবহার করা হয়নি তেমন।

যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্যায়ে পাকিস্তান ও ভারত দুই পক্ষই একে অপরের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোয় হামলা করে। তখনই আশা করা হচ্ছিল, বিশ্বের মুরব্বিরা এই যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আগেই পারমাণবিক অস্ত্রধারী এ দুই দেশ যুদ্ধ থামাবে। হলোও তা–ই।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গতকাল শনিবার ঘোষণা দিয়েছেন, ‘সারা রাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার ফলে’ ভারত ও পাকিস্তান অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে রাজি হয়েছে। পাকিস্তান ও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ঘোষণায়ও যুদ্ধবিরতির কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধ থেমে যাবে। শুরু হবে জয়-পরাজয়ের হিসাব।

ভারতীয় বিরোধী দল যুদ্ধের সময় চুপচাপ থেকে সমর্থন জানিয়ে আসছিল। এখন প্রশ্ন উঠবে, এ যুদ্ধে ভারত কী পেল? যেভাবে ভারতীয় হামলার জবাব দিয়েছে, তাতে পাকিস্তান এই যুদ্ধ থেকে ভারতের চেয়েও বেশি সমীহ আদায় করে নিয়েছে, তা বলে দেওয়া যায়। কিন্তু এখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘হিন্দু প্রাইডের’ কী হবে? মোদি বোধ হয় এই যুদ্ধ লাগিয়ে তাঁর ও ভারতের সম্মানের অনেক ক্ষতি করেছেন। এমনিতে মোদির দলের লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই।

বিজেপি বিহারের নীতীশ কুমারের জনতা পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন করে সরকার বাঁচিয়ে রেখেছে। গত নির্বাচনে মোদির দল অনেক আসন হারিয়েছিল। এবার এই যুদ্ধের পর মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। যুদ্ধের লাভ-ক্ষতি আর মোদির নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধী দল, এমনকি হিন্দুত্ববাদী দলগুলো থেকেও প্রশ্ন আসবে। অনেকেই বলবেন, মোদির রাজনীতির শেষের বোধ হয় এবার শুরু হবে।

সব মিলিয়ে দেখা যাবে মোদির ‘হিন্দু প্রাইডের’ যুদ্ধ মোদির জন্য সম্ভবত হিতে বিপরীত হলো।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

alehpublic711@gmail.com

(নিবন্ধের মতামত লেখকের নিজস্ব)

অপারেশন সিঁদুর নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে  ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
অপারেশন সিঁদুর নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি : এএনআই

ভারত–পাকিস্তান: যুদ্ধে সবার আগে জেতে মিথ্যা by রিজওয়ান-উল-আলম

একটা কথা প্রচলিত আছে, যুদ্ধ শুরু হলে সবার আগে যার মৃত্যু ঘটে তা হচ্ছে ‘সত্য’। যুদ্ধ লাগলে মিথ্যা খবর ছড়ানো হয় আর সত্য চাপা পড়ে যায়। যুদ্ধের কাহিনি সৈন্যরা তৈরি করতে পারেন না। সেই কাহিনি তৈরি হয় মিথ্যা আর গুজব দিয়ে। বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ মরে, আহত হয়। কিন্তু তার আগেই খবরের যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সেখানেই জয়-পরাজয় ঠিক হয়। যারা এসব খবর নিয়ন্ত্রণ করে, তারা শুরুতেই জিতে যায়।

যুদ্ধের সময় সত্যিটা জানার চেয়ে দেশকে এক রাখা বা যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জোগানো বেশি জরুরি মনে করা হয়। তাই অনেক সত্যি কথা লুকিয়ে ফেলা হয় বা ঘুরিয়ে বলা হয়। যুদ্ধ মানেই প্রয়োজনীয় সবাইকে একসঙ্গে রাখার চেষ্টা। এর জন্য একটা জোরালো গল্প দরকার হয়, যাতে মানুষের মনোবল বাড়ে, যুদ্ধকে সঠিক মনে হয় আর শত্রুর প্রতি ঘৃণা জন্মায়। ইতিহাসে দেখা গেছে, সরকার ও সেনাবাহিনী যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন পেতে ইচ্ছা করেই এমন প্রচারণা চালায়।

সরকার বা সেনাবাহিনী যখন যুদ্ধের কথা বলে, তখন তারা বোঝায় যে দেশের স্বাধীনতা বা ভালোর জন্যই এই যুদ্ধ দরকার। তারা শত্রুকে বিপদ হিসেবে দেখায় আর নিজেদের সৈন্যদের সাহসী বলে তুলে ধরে। এতে মানুষ গর্বিত হয় ও দেশের প্রতি ভালোবাসা বেড়ে যায়। তারা সৈন্যদের কষ্টের কথা বলে, যুদ্ধে জেতার কাহিনি শোনায় আর শত্রুকে খারাপ, নিষ্ঠুর বা বোকা হিসেবে দেখায়, যাতে মানুষ শত্রুকে ঘৃণা করে। অনেক সময় শত্রুর দোষ বাড়িয়ে বলা হয়, মিথ্যা খবর ছড়ানো হয়, এমনকি খারাপ ভাষাও ব্যবহার করা হয়।

প্রচারণা শুধু বাইরের লোকদের মত বদলানোর জন্যই নয়, বরং নিজের দেশের মানুষ ও সৈন্যদের সাহস বাড়ানোর জন্যও দরকারি। শত্রুপক্ষের সৈন্যদের মনোবল ভাঙতেও এটা কাজে লাগে। আজকাল এই প্রচারণা সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়। পোস্টার, সিনেমা, উত্তেজক কথাবার্তা ও স্লোগানের মাধ্যমেও এটা করা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের সামনে যুদ্ধকে একটা মজার অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে শত্রুকে খারাপভাবে দেখিয়ে মানুষকে এক করা হয়েছিল। আজও যুদ্ধের সময় প্রচারণা একটা শক্তিশালী অস্ত্র, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা ছড়িয়ে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দেয়।

সম্প্রতি ভারত যখন পাকিস্তান ও পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে হামলা চালাল, তখন এক নতুন ধরনের যুদ্ধ শুরু হলো—তথ্যের যুদ্ধ। দুই দেশের মানুষই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা রকম কথা ছড়াতে লাগল, আর এতে দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার ভয় তৈরি হলো। দুই দেশই চাইছিল যেন মানুষ তাদের সমর্থন করে।

এ রকম অবস্থায় সত্যিটা খুঁজে বের করা খুব কঠিন। কারণ, অনেক উল্টোপাল্টা খবর একসঙ্গে ছড়াতে থাকে। আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কারণে আগের মতো সহজে খবর লুকানো যায় না। কিন্তু দুই দেশের নিজেদের সংবাদমাধ্যম সাধারণত সরকারের কথাই বলে। তাই সরকার এখনো মানুষের চিন্তাভাবনা সহজে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে দুই দেশের নেতারাই লাভবান হন। তাঁরা সরকারি সংবাদমাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো আবেগময় বা ভুয়া খবর ব্যবহার করে মানুষের সমর্থন আদায় করেন। সত্যি নিয়ে যখন সন্দেহ জাগে, তখন তাঁরা নিজেদের মতো করে ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারেন, শত্রুকে খারাপ বানাতে পারেন, এমনকি দেশের ভেতরের সমালোচকদেরও শত্রু বানিয়ে ফেলতে পারেন। ‘দেশের নিরাপত্তা’ আর ‘ঐক্যের’ কথা বলে তাঁরা মানুষকে নিজেদের গল্প বিশ্বাস করায়। তখন মানুষ নিজেরা চিন্তা না করে, যা বলা হয় তাই বিশ্বাস করে। আর যারা এই গল্পগুলো তৈরি করে, তারা অনেক শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

প্রচারণা হলো যুদ্ধের একটা কৌশল। এর মানে হলো সাধারণ মানুষ আর শত্রুকে ভুল খবর দিয়ে ধোঁকা দেওয়া। এই তথ্যের যুদ্ধে দুই পক্ষই দাবি করে তারা কত বিমান ধ্বংস করেছে বা কতজন মারা গেছে; কিন্তু একেক পক্ষ একেক রকম কথা বলে। সবাই দেখাতে চায় যে তারাই জিতেছে। একজন বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের সময় সত্যিটা এত দামি যে তাকে সব সময় মিথ্যার আড়ালে রাখতে হয়।’ অর্থাৎ যুদ্ধের সময় দেশের নিরাপত্তা বা মনোবল ঠিক রাখতে সত্যি না বলে মিথ্যা বলাটাকেই জরুরি মনে করা হয়।

যখন চারদিকে মিথ্যা খবর, পুরোনো ভিডিও আর বিভিন্ন দাবি ঘুরতে থাকে, তখন মানুষ কী করবে? প্রথমে বুঝতে হবে এটা একটা তথ্যের যুদ্ধ। সরকার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব আবেগময় বা বড় দাবি করা হয়, সেগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা উচিত। অনেক সময় ইচ্ছা করেই সত্যিটা লুকানো হয়। পুরোনো বা অন্য ঘটনার ভিডিও নতুন বলে চালানো হয়।

তাই যেকোনো খবর দেখার সময় ভাবুন—এটা কে বলছে? সরকার বা কোনো দল কি এটা দিয়ে নিজেদের সুবিধা করতে চাইছে? নাকি কোনো অচেনা সোশ্যাল মিডিয়া পেজ, যা এক পক্ষের হয়ে কথা বলছে?

ভুল খবর দেখতে পেলে তা ছড়ানো বন্ধ করতে সাহায্য করুন। যারা কোনো ঘটনার ভিডিও বা ছবি শেয়ার করে, তা শেয়ার করার আগে যাচাই করুন। গুগলে ছবি খুঁজে দেখুন বা ফ্যাক্টচেকিং ওয়েবসাইটে দেখে নিন এটা পুরোনো বা মিথ্যা কি না। যাচাই না করে আবেগময় বা বিভ্রান্তিকর কিছু শেয়ার করবেন না। এতে যুদ্ধ আর ঘৃণা আরও বাড়ে।

আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সত্যের চেয়ে আলোচনাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই সত্যিটা যাচাই করার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। যা-ই দেখি বা শুনি, তা নিজের বিচারবুদ্ধি দিয়ে বোঝা দরকার। কোনো কিছু শুধু আবেগের বশে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। সবাই যদি সত্যিটা খোঁজার চেষ্টা করে, তাহলে ভুল-বোঝাবুঝি ও সংঘাত কমে যেতে পারে।

এই যুদ্ধ আবারও মনে করিয়ে দেয় যে যুদ্ধ শুরু হলে তার প্রথম শিকার হয় সত্য। তখন মিথ্যা গল্প, প্রচারণা আর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ঘৃণার মধ্যে ডুবে যায়। ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক এমনিতেই খারাপ, তার ওপর এই তথ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। দুই পক্ষই নিজেদের গল্পে জিততে চায়, আর এতে শান্তি স্থাপন আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

তাই আমাদের দরকার প্রশ্ন করা, যাচাই করা আর চিন্তা করা। সত্যি খুঁজে বের করা কঠিন হলেও আমাদের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, সত্যি ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়।

রিজওয়ান-উল-আলম সহযোগী অধ্যাপক, মিডিয়া, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, নর্থ সাউথ  বিশ্ববিদ্যালয়

ভারত–পাকিস্তানের সংঘাত দুই দেশের তথ্যযুদ্ধেও রূপ নিয়েছে
ভারত–পাকিস্তানের সংঘাত দুই দেশের তথ্যযুদ্ধেও রূপ নিয়েছে। ছবি: এএফপি

জুলাইকে মেনে না নিয়ে বাংলাদেশে শান্তিতে থাকার সুযোগ নেই: উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া ‘জুলাই জনতার’ আরেকটি বিজয় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে থাকা আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘সতর্ক হয়ে যান। একটু অসতর্কতা পরের বার আপনাদের পতনের কারণ হতে পারে। জুলাইকে মেনে না নিয়ে বাংলাদেশে শান্তিতে থাকার সুযোগ নেই।’

রোববার রাত সাড়ে নয়টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক স্ট্যাটাসে এ কথাগুলো বলেছেন আসিফ মাহমুদ। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ গত বছরের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত হন। বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।

স্ট্যাটাসে আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া লিখেছেন, ‘স্বাধীনতা অর্জনের থেকে রক্ষা করা কঠিন। এর চেয়ে কঠিন সত্য আর নেই। লড়াই যেন থামছেই না। রাজপথের লড়াইটা সামষ্টিক, জুলাইয়ের যোদ্ধাদের মিলনস্থলে পরিণত হওয়ায় একধরনের ভালো লাগার জায়গাও তৈরি করে। মাঝে মাঝে মনে হয় ছেড়ে দিয়ে চলে যাই রাজপথে। সেটাই আমার জায়গা, যা করতে অভ্যস্ত এবং স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। ছেড়ে দেওয়ার চিন্তা মাথায় এলেও থেকে যেতে হয় গণ-অভ্যুত্থানের পাহারাদার হওয়ার জন্য, জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আওয়াজটা পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমাদের এই লড়াইটা হয়তো দেখা যায় না, শোনা যায় না।’

আসিফ মাহমুদ লেখেন, ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়ায় জুলাই জনতার আরেকটি বিজয় হলো। এ এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে যাঁরা আওয়ামী সিম্প্যাথাইজার আছেন, সতর্ক হয়ে যান। একটু অসতর্কতা পরের বার আপনাদের পতনের কারণ হতে পারে। জুলাইকে মেনে না নিয়ে বাংলাদেশে শান্তিতে থাকার সুযোগ নেই।’

স্ট্যাটাসে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু উপলব্ধির কথাও তুলে ধরেন আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেছেন, ‘সরকারে থাকাটা দুধারি তলোয়ারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার মতো হয়ে গেছে। সরকার কোনো ভুল করলে, সেটা আমাদের এখতিয়ারভুক্ত না হলেও জনতার কাঠগড়ায় আমাদের দুজনকে (মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ) দাঁড় করানো হয়। আবার ছাত্র-জনতা মাঠে নামলে রাষ্ট্রের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রগুলো আমাদের সন্দেহের চোখে দেখে, টার্গেট করে। এস্টাবলিশমেন্ট মনে করে, এটা আমরা করাচ্ছি। এ ছাড়া ক্ষমতার বিভিন্ন ভরকেন্দ্রের সঙ্গে জুলাই প্রশ্নে আপস না করতে পারায় তাদের চক্ষুশূলে পরিণত হওয়াটা বোনাস।’

আসিফ মাহমুদ লিখেছেন, ‘রাষ্ট্র অনেক বড় এবং জটিল জায়গা। এখানে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন। তবে স্বস্তির বিষয় হলো এই উপদেষ্টা পরিষদ অনেক বাধা এলেও দিন শেষে ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, জনরায়ের বাস্তবায়ন করতে পারছে; যত দিন পারবে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে থাকবে, গণ-অভ্যুত্থানের ভয়েসের (কণ্ঠ) যথাযথ গুরুত্ব এই উপদেষ্টা পরিষদ দেবে, তত দিনই আছি। গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের পক্ষ থেকে সরে গেলে আমার আর এখানে কাজ নেই।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে নিয়ে আজ দিনভর কিছু ভুয়া ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, মাহফুজ আলম উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

এই ফটোকার্ডগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন আসিফ মাহমুদ। তিনি লিখেছেন, ‘এমন মিথ্যাচার বন্ধ করুন। আপনার সঙ্গে কারও চিন্তাগত পার্থক্য থাকতেই পারে, সেটাকে নোংরা মিথ্যাচারের মাধ্যমে প্রকাশ করা উচিত নয়।’ তিনি বলেন, মাহফুজ আলম প্রথম থেকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা এবং এর সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা কী হতে পারে, তা নিয়ে আর্গুমেন্ট (তর্ক) করেছেন। বিস্তারিত বলতে গেলে গোপনীয়তার শপথ ভঙ্গ হতে পারে বলে এর বেশি আর কিছু লিখতে চাননি বলে স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন এই উপদেষ্টা।

উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ফাইল ছবি প্রথম আলো

পাক-ভারত সংঘাতে কারা এগিয়ে, চীন নাকি পশ্চিমারা?

কাশ্মীর ইস্যুতে যুদ্ধবিরতির পরও থামেনি উত্তেজনা। চলছে আলোচনা- কে এগিয়ে, চীন না পশ্চিমারা? সাম্প্রতিক সংঘাতে দুই দেশই ব্যবহার করেছে আধুনিক অস্ত্র। পাকিস্তানের অস্ত্রের বেশিরভাগ এসেছে চীন থেকে। আর ভারতের অস্ত্র এসেছে ফ্রান্স, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, পরমাণবিক শক্তিধর এ দুই দেশের সংঘাতে সমরাস্ত্রের আধুনিকতা নিয়ে এখনই কথা বলতে হবে। কেননা এই সমরাস্ত্রই ভবিষ্যত পৃথিবী নিয়ন্ত্রণের নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে ...

সাউথচায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষক সিনং হিয়োন চিও তার ‘চায়নিজ উইপনস পাওয়ার পাকিস্তান ইন কাশ্মীর কনফ্লিক্ট, বাট ডাউটস রিমেইন’ শিরোনামের প্রতিবেদনে লিখেছেন, গত সপ্তাহের বুধবার পাকিস্তান ও পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের বেশ কিছু স্থানে হামলা চালায় ভারত। যেই অভিযানের নাম দেয়া হয়েছে অপারেশন সিঁদুর। ভারতের এই অভিযানের পরই পারমাণবিক শক্তিধর দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। ২২ এপ্রিল ভারত-অধিকৃত পেহেলগামে এক সন্ত্রাসী হামলার জেরে পাকিস্তানে হামলা চালায় দিল্লি। পেহেলগামের পাহাড়ী মনোরম উপত্যকার ওই হামলায় মোট ২৬ জন নিহত হন। যাদের বেশির ভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ের না। এরপর গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে নয়াদিল্লি দাবি করে হামলায় জড়িত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীটি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত। যার জবাবে পাকিস্তানে নয়টি সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তারা। এসব হামলায় ফ্রান্সের তৈরি অত্যাধুনিক রাফাল নামের যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে ভারত। এছাড়া দূর এবং মাঝারি পাল্লার এএএসএম হামার নামের ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যবহারের কথা জানিয়েছে দেশটি। পাকিস্তান দাবি করেছে তারা ভারতের পাঁচটি বিমান ভূপাতিত করেছে। যার মধ্যে রাফাল ছিল তিনটি। যদিও ইসলামাবাদের এই দাবির বিষয়ে কিছুই জানায়নি দিল্লি। তবে সিএনএন জানিয়েছে, ফরাসি গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে যে, কমপক্ষে ভারতের একটি রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পদস্থ দুই কর্মকর্তা বলেছেন, পাকিস্তান চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমান দিয়ে ভারতের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে।

১৯৪৭ সালের পর থেকে কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করে আসছে ভারত ও পাস্তিান। এরমধ্যে হিমালয় অঞ্চলে দুই দেশের সঙ্গে কিছু অংশের দখলে রয়েছে চীন। শুরু থেকেই কাশ্মীরের দুটি অংশ ভারত ও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর যেই রেখার মাধ্যমে দুই অংশ বিভক্ত হয়েছে তার নাম লাইন অব কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ রেখা। কাশ্মীরের আঞ্চলিক বিরোধ দিল্লি এবং ইসলামাবাদের মধ্যে একটি প্রধান উত্তেজনার বিষয় হিসেবে রয়েছে। যা উভয় পক্ষের সামরিক দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পারমাণবিক অস্ত্রাগারের উন্নয়ন এবং সীমান্তের কাছে অবিরাম গোলাগুলি। পাকিস্তানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রয়েছে চীনের। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই) কর্তৃক পরিচালিত বিশ্বব্যাপী অস্ত্র স্থানান্তরের তথ্যানুসারে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট অস্ত্র আমদানির ৮১ শতাংশই চীন থেকে করেছে পাকিস্তান। বিপরীতে ভারতও চীনের কাছ থেকে কিছু যুদ্ধাস্ত্র আমদানি করে। তবে দিল্লির অস্ত্রদাতা দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ফ্রান্স ও রাশিয়া। গত চার বছরে যথাক্রমে এ দুই দেশ থেকে ৩৩ ও ৩৬ শতাংশ অস্ত্র আমদানি করেছে ভারত। আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ করেছে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। সুতরাং ভারত-পাকিস্তান সংঘাত মানেই চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমাদের সমরাস্ত্রের লড়াই।

চীনের তৈরি অস্ত্রের মধ্যে পাকিস্তানের কাছে সবচেয়ে বেশি রয়েছে যুদ্ধবিমান। সর্বশেষ সংঘাতে পাকিস্তানের ব্যবহৃত জে-১০সি এবং জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চীনের তৈরি। বুধবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার পার্লামেন্টে দাবি করেছেন, জে-১০সি বিমান দিয়েই ভারতের পাঁচটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করা হয়েছে। যদি পাকিস্তানের দাবি নিশ্চিতভাবে সত্য হয় তাহলে, আকাশযুদ্ধে চীনা যুদ্ধবিমানের এটিই হবে প্রথম সফলতা। পক্ষান্তরে ফরাসী রাফাল যুদ্ধবিমানের প্রথম ক্ষতি। জে-১০সি ৪ দশমিক ৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে পরিচিত। যা দিয়ে আকাশ থেকে আকাশ যুদ্ধে দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যায়। চীন ব্যতিত এই সিরিজের যুদ্ধবিমান একমাত্র পাকিস্তানের বিমারুরাই পরিচালনা করতে পারে। ২০২০ সালে চীন থেকে মোট ৩৬টি জে-১০সি যুদ্ধবিমান আমদানি করার চুক্তি করেছে পাকিস্তান। যা ২৫০ পিএল-১৫ই ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। বর্তমানে বিশেষ ওই যুদ্ধবিমানের ২০টি হাতে পেয়েছে পাকিস্তানের বিমান বাহিনী।  

শুক্রবার ভারত দাবি করেছে যে, তারা পাকিস্তানের জেএফ-১৭ সিরিজের একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। যদিও ইসলামাবাদ এই দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা জানিয়েছে ভারত কোনো যুদ্ধবিমানই ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়নি। জেএফ-১৭ হলো ৪ জেনারেশনের একটি যুদ্ধবিমান। যেটি পাকিস্তান ও চীন যৌধভাবে তৈরি করেছে। এই যুদ্ধবিমানও পিএল-১৫ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম।

এসআইপিআরআই- এর এক জ্যেষ্ঠ গবেষক সিমন ওয়েজম্যান বলেছেন, সংখ্যা এবং অনেক ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তিতেও এগিয়ে আছে ভারত। তবে, সীমিত এই সংঘাতের ফলাফল পাকিস্তানের পক্ষে যেতে পারে। কারণ এখানে সংখ্যার গুরুত্ব কম। এছাড়া এখানে ভারতের প্রযুক্তিগত সুবিধার পূর্ণ ব্যবহারের সম্ভাবনাও বেশি থাকে না। তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি আমরা দেখলাম চীনের সমরাস্ত্র পাকিস্তানের হাতে বেশ কার্যকর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশ্চিমা এবং রাশিয়ার অস্ত্রের তুলনায়ও চীনের অস্ত্র বেশ শক্তিশালী। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, গত দুই দশকে চীন সমরাস্ত্র তৈরিতে অনেক অনেক এগিয়ে গেছে। ওয়েজম্যান যোগ করেছেন, যদিও চূড়ান্ত ফলাফল দেয়ার জন্য আরও তথ্যের প্রয়োজন। কেননা চীনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে এখনও তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এটাই প্রথম, যেখানে চূড়ান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে চীনের এসব আধুনিক সমরাস্ত্র ব্যবহারের কথা জানা গেছে।

সিএনএনের রিপোর্ট: কেন যুদ্ধবিরতিতে রাজি হলো ভারত-পাকিস্তান

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য পান যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এরপরই ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করে যুদ্ধবিরতির আলোচনা শুরু করতে উৎসাহিত করেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন সিএনএন বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিও, হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি উইলিসসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা শুক্রবার সকালে যখন ভারত-পাকিস্তানের তীব্র উত্তেজনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যায় উদ্বেগজনক গোয়েন্দা তথ্য। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা এ কথা বলেছেন সিএনএনকে। কি জাতীয় তথ্য পেয়েছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা, স্পর্শকাতরতার কারণে তা জানাতে অস্বীকৃতি জানান ওই কর্মকর্তারা। তবে তারা বলেছেন, তিনজন কর্মকর্তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে- যুক্তরাষ্ট্রের এক্ষেত্রে সম্পৃক্ততা বাড়ানো উচিত। ফলে নিজে থেকেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করেন জেডি ভ্যান্স। এ পরিকল্পনা নিয়ে প্রথমে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে অবহিত করেন জেডি ভ্যান্স। তারপর শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুরে মোদিকে ফোন করে তিনি কথা বলেন। তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে পরিষ্কার করেন যে, হোয়াইট হাউস বিশ্বাস করছে যে উত্তেজনা উচ্চমাত্রায় নাটকীয় মোড় নিতে যাচ্ছে। ফলে মোদিকে সরাসরি পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য উৎসাহিত করেন জেডি ভ্যান্স। একই সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনের পথ বেছে নিতে বলেন। এ বিষয়ে এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হওয়ার বিস্তারিত তথ্য নেই। এক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী এই দুই দেশের মধ্যে কোনো কথা হচ্ছে না। তাদেরকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা দরকার। এ অবস্থায় মোদিকে পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার ওপর জোর দেন জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অনুধাবন করতে পেয়েছে- তাতে রাজি হবে পাকিস্তান। তবে এ বিষয়ে ওই কর্মকর্তারা আর কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি। এরপরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সহ তার মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা রাতভর ভারত ও পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনে আলোচনা চালিয়ে যান। মঙ্গলবার থেকে একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছার সাধারণ ধারণা দিয়ে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছিলেন মার্কো রুবিও। কিন্তু মার্কিন প্রশাসন এ বিষয়টি কীভাবে করা হবে সে বিষয় ছেড়ে দিয়েছিল ভারত ও পাকিস্তানের ওপর। মার্কো রুবিও ভারত ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে যখন ফোনে কথা বলেছেন তখন সে সম্পর্কে যেসব কর্মকর্তা ভালোভাবে জানেন তাদের একজন বলেছেন- এ সপ্তাহে উত্তেজনা কমিয়ে আনার যথেষ্ট প্রচেষ্টা ছিল। বিশেষ করে এক সময় দেখা যায় উভয় পক্ষ আর আলোচনা করছে না। এ সপ্তাহে যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় তাতে ভারত ও পাকিস্তানের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনাকে উৎসাহিত করা হয়। যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে উত্তেজনা হ্রাসের একটি পথ বের করতে বলা হয়। তবে যুদ্ধবিরতির খসড়া প্রণয়নে জড়িত নয় ট্রাম্প প্রশাসন। এমন অবস্থায় জটিল এক মুহূর্তে মোদিকে ফোন করেন জেডি ভ্যান্স। তিনি এর আগে গত মাসে ভারত সফর করেছেন এবং মোদির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়েছে। এর ফলে ট্রাম্পের কর্মকর্তারা মনে করেন  মোদির সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণে তার ফোনকল কাজে দেবে। ফলে কয়েকদিন আগে যে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ নিয়ে বলেছিলেন এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু করার নেই, তিনিই শেষ পর্যন্ত মোদিকে ফোন করেন। এর ফলে শনিবার তীব্র লড়াইয়ের পর উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছে। 

mzamin

সংস্কারক ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় রয়টার্সের দুই সাংবাদিক by সিরাজুল ইসলাম কাদির

২০১৩ সালের ১০ই ডিসেম্বর রয়টার্স কর্তৃপক্ষ লন্ডন থেকে মাইক কালেট হোয়াইট (Mike Collet-White)-কে ঢাকায় পাঠান আমাদের সহযোগিতা করার জন্যে। তিনি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বার্তা সম্পাদক। হালকা-পাতলা গড়নের এই বৃটিশ নাগরিক অত্যন্ত সাদাসিধে স্বভাবের একজন মানুষ। বন্ধুপরায়ণ,  সদালাপী এবং কোমল স্বভাবের। অত্যন্ত উঁচুমাপের এই সম্পাদক অনায়াসেই আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তিনি এসেই জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম প্রভাবশালী নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনে আমাদের সঙ্গে হাত মেলান।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যেসব মানুষ যুদ্ধাপরাধ করেন তাদের বিচার করার জন্যে বাংলাদেশ সরকার একুশ শতকে পা রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ((International Crimes Tribunal) গঠন করে। ২০১১ সালের ১৮ই ডিসেম্বর আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে এই আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করা হয়। তার বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বিভিন্ন দুষ্কর্মে সহায়তা করার অভিযোগ আনা হয়। আরও অভিযোগ ছিল অপ্রাপ্ত বয়স্কসহ বিভিন্ন নারী ধর্ষণ এবং ঢাকার উপকণ্ঠে মিরপুরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা করা।

আব্দুল কাদের মোল্লার রায় নিয়ে এক ধরনের বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর মাসে আইসিটি-র আইনজীবীর মধ্যেকার কথাবার্তা এবং যে ই-মেইল  চালাচালি হয় তা  ঞযব ঊপড়হড়সরংঃ প্রকাশ করে। এর ফলে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত রায় প্রদানের জন্যে আইসিটি-র ওপর যে চাপ প্রয়োগ করেছিল সেই তথ্য বেরিয়ে আসে। এই তথ্য প্রকাশের পর বিচারক নিজামুল হক পদত্যাগ করেন। এই রায়  মানবাধিকারের লংঘন- এই মর্মে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক এবং অস্ট্রেলিয়া উদ্বেগের কথা জানায়। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের বিশেষজ্ঞরা এই মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানান এই বলে যে আব্দুল কাদের মোল্লা সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
১১ই ডিসেম্বর আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাকা হয়। কারা মহাপরিচালক মঈন উদ্দীন খন্দকার তখন সাংবাদিকদের জানান, ফাঁসির মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। মোল্লার পরিবারকে শেষ বারের মতো সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়। মোল্লা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে অস্বীকার করেন-যদিও কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে তাকে তিনবার প্রস্তাব দেন।

মোল্লার আইনজীবীরা এই দণ্ডাদেশ বন্ধ করে তাকে আদালতে আবেদন করার অনুমতি দেয়ার জন্যে সুপ্রিম কোর্টের প্রতি নিবেদন জানান। এই নিবেদনে আইনজীবীরা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান সকল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে এ ধরনের আবেদন করার অধিকার দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ সৈয়দ মাহমুদ হোসেন এসব যুক্তি আমলে নিয়ে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করে মোল্লাকে ২০১৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর আবেদন করার অনুমতি দেন। আর এই অনুমতিপত্র মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন ও চূড়ান্ত হওয়ার মাত্র ৯০ মিনিট আগে প্রদান করা হয়। দুই ঘণ্টাব্যাপী শুনানি শেষে প্রধান বিচারপতি মুজাম্মেল হোসেন পরের দিন পর্যন্ত শুনানি স্থগিত করেন। বিবাদী আত্মপক্ষ সমর্থন করে যেসব যুক্তি দেখান তার মধ্যে অন্যতম ছিল যে, রাষ্ট্র প্রয়োজনীয় সকল আইনগত পদ্ধতি সম্পন্ন না করে এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বিবাদীর আবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। বিবাদী মৃত্যুদণ্ডের রায় পর্যালোচনার জন্যে আবেদন জানিয়েছিলেন। এ সময় রাষ্ট্রের প্রধান কৌঁসুলি মাহবুবে আলম রয়টার্সকে বলেন, “কাদের মোল্লার রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে আর কোনো অন্তরায় নেই।  আর এর মধ্যে কোনো সংশয় নেই।” অন্যদিকে বিবাদীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন এ প্রসঙ্গে রয়টার্সকে বলেন: “আমার মক্কেল ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তবে যেহেতু সর্বোচ্চ আদালত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাই আমাদের নতুন করে আর কিছু বলার নেই।”

মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর শাহবাগে ইতিপূর্বে সমবেত হওয়া হাজার হাজার বিক্ষোভকারী তাদের সন্তোষ ও আনন্দ প্রকাশ করেন। ২০১৩ সালের পাঁচ ফেব্রুয়ারি থেকে এসব লোক কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দাবি করে বিক্ষোভ করে আসছিল। মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং এই রায় কার্যকর করার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বিক্ষোভ করে এবং  দলটি ২০১৩ সালের ১১, ১২ এবং  ১৫ই ডিসেম্বর সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ চলাকালে  দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্তত ২৫ ব্যক্তি নিহত এবং বহু লোক আহত হয়। জামায়াত কর্মীরা সরকার সমর্থক লোকজনের ঘরবাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন ধরিয়ে দেন। এ ছাড়া তারা বিভিন্ন রেলস্টেশনে বোমা নিক্ষেপ এবং সড়কসমূহে অবরোধ করে। দলটি এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করে এবং মোল্লার রক্তের বিপরীতে প্রতিবিন্দু রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দু’জন কর্মীকে কলারোয়ায় হত্যা করা হয়। এ ছাড়া পুলিশ ও জামায়াত সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষে আরেক ব্যক্তি নিহত হন নোয়াখালীতে। একজন গাড়িচালকও জামায়াতের প্রতিবাদ চলাকালে সংঘর্ষে প্রাণ হারান। এ ধরনের সহিংসতা এবং ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত সহিংস সংঘর্ষ অব্যাহত থাকার প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সহিংসতা স্তব্ধ করে দেয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। নির্বাচনের আগে চলমান সহিংসতা এবং বিরোধী দলের সড়ক অবরোধের ফলে দেশের অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতির সৃষ্টি হয়। এই সংঘর্ষ আরও ছড়িয়ে পড়ারও আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর এ সংক্রান্ত সংবাদ রয়টার্স, এএফপি এবং বিবিসিসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা প্রচার করে। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এই সংবাদ ততটা গুরুত্বসহকারে স্থান পায়নি। বিভিন্ন দেশের সরকারের পক্ষ থেকেও  সেভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়নি। চীন যদিও মৃত্যুদণ্ড হরহামেশা কার্যকর করে। দেশটি কোনো পর্যায়েই আনুষ্ঠানিক বা সরকারি বিবৃতি দেয়নি। বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশী দেশ এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য শরিকদার ভারত সরকারও এ ব্যাপারে নীরব ছিল। তবে ভারতের সংবাদ মাধ্যম মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার খবর ব্যাপকভাবে প্রচার করে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিরুদ্ধে লন্ডন এবং পাকিস্তানে প্রতিবাদ হয়।

আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর মাইক জামায়াতে ইসলামীর সহকারী মহাসচিব ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক এবং ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরীর কন্যা নুজহাত চৌধুরীর পৃথক পৃথক সাক্ষাৎকার নেন রয়টার্সের জন্যে। ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী ছিলেন বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকবাহিনীর পতনের আগ মুহূর্তে ১৪ই ডিসেম্বর দেশের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। তিনিও তখন শহীদ হন।

১১ই ডিসেম্বর রাতে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ নির্ধারিত ছিল। আমরা সেভাবে ধানমণ্ডিতে তার বাসভবনে যাই। আমাদের ধারণা ছিল তার এপার্টমেন্টে প্রবেশের সময় ভবন রক্ষীদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো প্রশ্ন বা বাধা ছাড়াই আমরা তার গৃহে প্রবেশ করি। প্রায় আধা ঘণ্টার এই সাক্ষাৎকারে তিনি মাইককে এক রকম নিশ্চিত করে বলেন যে, আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ড কোনোভাবেই রহিত করা যাবে না। তিনি নিজেও মোল্লার অন্যতম আইনজীবী হিসেবে আদালতে লড়াই করেন। মাইক আগামীদিনে জামায়াতের রাজনৈতিক পথরেখা এবং পরিণতি কী হবে জানতে চাইলে রাজ্জাক বলেন, ‘বর্তমান নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রজন্ম কোনো আশা দেখে না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে নতুন নেতৃত্ব যাতে জামায়াতকে তার আদর্শের পথে পরিচালিত করতে পারে সরকারের উচিত সেই সুযোগ তৈরি করে দেয়া। কারণ এই নবীন প্রজন্ম কোনোভাবেই ৭১-এর প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত নয় এবং তারা মনেপ্রাণে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে গ্রহণ করেছেন। তারা নিজেদের এই দেশের নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন এবং সম্মানিত বোধ করেন।’ ব্যারিস্টার রাজ্জাকের আলাপচারিতায় মনে হলো তিনি জামায়াতের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যে দলের নেতৃত্বে বদল এবং সংস্কারের পক্ষে।  তিনি উদারপন্থি রাজনৈতিক আদর্শের ভাবধারায় বিশ্বাসী।

[সিরাজুল ইসলাম কাদির রচিত এবং ইউপিএল থেকে প্রকাশিত
“রয়টার্সের দিনগুলো: বাংলাদেশ ডায়েরি ১৯৯৬-২০১৯” গ্রন্থ থেকে সংকলিত]

mzamin


শাহবাগের জমায়েতে বিএনপি’র যে বিপদ দেখছেন ডা. জাহেদ উর রহমান

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ডা. জাহেদ উর রহমান তার ইউটিউব চ্যানেল ‘জায়েদ টেক’ -এ ‘শাহবাগের জমায়েতে বিএনপি’র যে বিপদ’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে তিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে শাহবাগে জমায়েতের নানানদিক বিশ্লেষণ করেন। বলেন, বিএনপিকে স্টিকমাটাইজড করা কারও কারও খোয়াব হতে পারে। এরকম পরিস্থিতি দফায় দফায় তৈরি করে নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তোলার চেষ্টা থাকতে পারে। এটা একটা শক্তি পরীক্ষা বিএনপি’র বাইরের যারা মাঠে আছেন তাদের সবাইকে নামাতে পারছেন কীনা এবং কতো শক্তিতে মাঠে নামাতে পারছেন।

ডা. জাহেদ বলেন, নানা ঘটনা ঘটলো। শাহবাগ মোড় অবরোধ করা হলো। সেই শাহবাগ মোড় যেখানে গণজাগরণ মঞ্চ হয়েছিল। আগের মতোই অবরোধ করে চাপ তৈরি করা হলো। চাপের মাধ্যমে কিছু অর্জন করার চেষ্টা করা হলো। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেয়া ছাত্রদের একাংশ। প্রত্যেক ছাত্ররা তাদের জায়গায় ফিরে গেছে। ছাত্রদলে ফিরে গেছে, শিবিরে ফিরে গেছে। তাদের নিজস্ব রাজনীতি আছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ইক্সক্লুড (বাইরে রাখা) হলো। যারা কোনো দল করে না তারা লেখাপড়ায় ফিরে গেছে। ছাত্রদের একটা ক্ষুদ্র অংশ যারা এনসিপিতে গেছে বা আরও যারা কিছু সংগঠনে জড়িত আছে তাদের ক্ষমতা দেখানোর চেষ্টা বৃদ্ধি পেলো।

রাজনৈতিক এই বিশ্লেষক বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই তারা রাজনীতিতে ম্রিয়মাণ হয়ে যাচ্ছে এই অংশটি। এই ম্রিয়মাণ পরিস্থিতি থেকে এটা তাদের খানিকটা বাঁচিয়ে তুলতে পারে, সেটা তারা মনে করেছেন। তারা একটা বিজয় চাইছে। শুধু তারা না, তাদের যারা বুদ্ধি পরামর্শ দেন... অনেক মানুষ আছেন যাদের বক্তব্যে বোঝা যায়। আরেকটা উদ্দেশ্য বেরিয়ে এসেছে, সেটা হলো বিএনপি’কে বিপদে ফেলা। এগুলো রাজনীতির খেলা। আমরা খেয়াল করলাম ক্রমাগত বিএনপিকে ডাকা হচ্ছে। সারজিস আলম ঐক্যবদ্ধ শাহবাগে বিএনপিকে আশা করছেন এমনটাই বলছেন। বেগম খালেদা জিয়াকেও আহ্বান জানানো হয়েছে। তিনি ওখানে যাবেন এবং ঐক্য প্রকাশ করবেন এটা চাওয়া হয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এই সদস্য বলেন, গত শুক্রবার তারা ৩ দফা দাবি দিয়েছে। হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছেন- আওয়ামী লীগসহ যত সহযোগী সংগঠন রয়েছে তাদের নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আওয়ামী লীগের দলগত বিচারের বিধান যুক্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র জারি করতে হবে। তিনি বলছেন, এই দাবি না মানা হলে কী আমরা মাঠ ছাড়বো? সবাই সমস্বরে বলেছেন, না।

তিনি বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হতে পারে সন্ত্রাস দমন আইনে। জামায়াত-শিবিরকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করেছিল এই আইনে। কিন্তু আওয়ামী লীগকে যদি নিষিদ্ধ করাই হয়, তাহলে আইসিটিতে কোনো তাদের বিচার করার কথা বলা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে এটা স্ট্যাবলিশ করতে চাইছে? সন্ত্রাস দমন আইনে যদি নিষিদ্ধ হয়েই যায় তাহলে ওটার দরকার কী? জুলাইয়ের ঘোষণাপত্র না হলে তারা মাঠ ছাড়বেন না। আইসিটিতে এই বিধানটা করা কঠিন কিছু না। জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে কথাবার্তা হয়েছিল সেটা কন্টিনিউ করেনি। অনেকক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের মতানৈক্য ছিল। এটা করতে বেশকিছু দিন লেগে যেতে পারে। তাহলে তারা সেই শাহবাগের মতো দুটো শাহবাগ হবে ভবিষ্যৎ ইতিহাসে। জানি না ওই শাহবাগের কাছাকাছিও হয়েছি কীনা।

ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করেন। তারা কন্সটিটিউশন মেনে চলে, তাদের ইসলামপন্থা রয়েছে। কিন্তু শাহবাগে কন্সটিটিউশনাল পলিটিক্স-ডেমোক্রেসি দেখতে পারে না, খেলাফত চায় এ ধরনের সংগঠনগুলোও হাজির হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট বলা হয়... আবার তারাই এসেছেন যারা নিজস্ব মতবাদ চাপিয়ে দিতে চান গায়ের জোরে।

বিএনপি’র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি এখানে যাচ্ছে না। বিএনপি সুতরাং আওয়ামী লীগের দোসর, এই ন্যারেটিভ চালিয়ে দেবার চেষ্টা হতে পারে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের যেহেতু গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ-সম্পর্ক আছে সেজন্য বিএনপি না গেলে ভারতের দোসর হিসেবেও স্ট্যাবলিশ করা হতে পারে। সেটারই চেষ্টা চলছে। রীতিমতো বেগম খালেদা জিয়াকেও ডাকা হচ্ছে। এই মুহূর্তে রাজনীতিতে তিনি সবথেকে রেসপেকটেড মানুষ। তাকেও স্টিকমাটাইজড করা হচ্ছে, দারুণ কিছু ভাষা দিয়ে। তারা বলতে পারেন, খালেদা জিয়াকে আমরা ডেকেছিলাম আওয়ামী লীগের বিচার চেয়ে তিনিও আসেন নাই। তিনিও কতো খারাপ; এটা এখন বলা না হলেও ভবিষ্যতে বলা হতে পারে। বিএনপি এটার জবাব দিয়েছে। জনাব মঈন খান বলেন, আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হবে কীনা সেটা বিএনপি নয় জনগণ ঠিক করবে। যেসব রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের কথা বলছে, তারা তাদের বক্তব্যে বলেছে। আমাদের মহাসচিব ইতিমধ্যেই বলেছেন, এটা জনগণের সিদ্ধান্তের বিষয়। তিনি বলেন, এটা সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

তিনি যোগ করেন, যতদূর জানি এটা নির্বাচন কমিশন করতে পারে না। যদি তারা ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করতে না পারে। সেক্ষেত্রে তারা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না কিন্তু দল হিসেবে থেকে যাবে। দল নিষিদ্ধের কাজ আসলে সরকারের। বিএনপি এক ধরনের অবস্থান জানিয়েছে, আমি এটা ধারণা করি এটা অনেকেরই ভালো লাগবে না। সত্যিকার অর্থে বিএনপি’র জন্য একটা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। কারণ আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ একটা পপুলার দাবি। তবে পপুলার দাবি যে সবসময় সঠিক এটা বলছি না। ২০১৩ সালে যখন গণজাগরণ মঞ্চ তৈরি হয়, আমার চারপাশের প্রচুর মানুষকে দেখেছি এটার পক্ষে দাঁড়াতে। সেই শাহবাগ পরে কী করেছিল তা আমরা দেখেছি। বিএনপি’র ২০০১-০৬ সরকারের সময় ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করা শুরু হলো, ভীষণ পপুলার ছিল। এটা ছিল অসভ্যতা-বর্বরতা। কিন্তু বিএনপি তো পপুলার পলিটিক্স করে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধতা চায়। আওয়ামী লীগ মানুষের ওপর নির্যাতন করেছে, ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পপুলার দাবিতে বিএনপি যখন যাবে না তখন একটা বড় অস্ত্র হবে যারা বিএনপি’র বিরুদ্ধে রাজনীতি করবে। রাজনীতিতে ঠিক আছে কিন্তু এরমধ্যে কারও কারও অন্যরকম স্বপ্ন আছে।

তিনি বলেন, এখন বিএনপি কী করতে পারে? হাসনাত আব্দুল্লাহ ডাক দিয়েছেন। তাদের সঙ্গে জামায়াত মিছিল নিয়ে গেছে। বিভিন্ন সংগঠন ভাগ ভাগ হয়ে শাহবাগে বসেছেন। অনেকেই দলীয় ব্যানার নিয়ে গেছেন, দলীয় স্লোগানও দিয়েছেন। সেখানে কেন বিএনপি যাবে? এখানে কিছু গায়ের জোরে চাপিয়ে দেয়া ইসলামিস্ট, গণতন্ত্রবিরোধী ইসলামিস্ট আছে। ধরে নেই, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সর্বোচ্চ একটা প্রতিনিধিদল সেখানে গেল বা একটি প্রতিনিধিদল গেল। এটাকে এনসিপি, জামায়াত বিজয় হিসেবে উদ্‌?যাপন করবে। তারা বলবে চাপের মুখে বিএনপি আসতে বাধ্য হয়েছে।

রাজনৈতিক এই বিশ্লেষক আরও বলেন, বিএনপি এটা হয়তো ভাবছে- আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের বিষয়ে বিএনপি কোনোদিন প্রতিবাদ করেনি। আমার যতদূর মনে পড়ে তারা বলেছে, এক্সিকিউটিভ অর্ডারের মাধ্যমে তারা কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়। তারা বলছে জনগণ যদি চায়। বিএনপি নিউট্রাল অবস্থান রাখতে চাইছে। আওয়ামী লীগের পক্ষে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিএনপি’র থেকে আওয়ামী লীগের হাতে বেশি নির্যাতিত কেউ হয় নাই। দলটাকে আবার প্রমাণ করতে হবে বিএনপি যে আওয়ামী লীগ বিরোধী। এটা যদি না করে তবে মোটাদাগে একটা অস্ত্র বিএনপি বিরোধীদের হাতে চলে যাবে। নির্বাচনে কিছুটা প্রভাব পড়তেও পারে। এটাকে ব্যবহার করা হবে জনসভা, বক্তৃতাতে। যদিও আমি মনে করি, এটা ব্যবহার করাও উচিত। রাজনীতি এটাই হওয়া উচিত, অপরপক্ষের নেগেটিভ বিষয়গুলো নিয়ে বলা উচিত। কিন্তু বিএনপিকে স্টিকমাটাইজড করা কারও কারও খোয়াব হতে পারে। এররকম পরিস্থিতি দফায় দফায় তৈরি করে নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তোলার চেষ্টা থাকতে পারে। এটা একটা শক্তির পরীক্ষা, বিএনপির বাইরের যারা মাঠে আছেন তাদের সবাইকে নামাতে পারছেন কীনা এবং কতো শক্তিতে মাঠে নামাতে পারছেন। নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে হাসনাত আব্দুল্লাহ যদি ঢুকে যেতে পারেন, এটা অবিশ্বাস্য বিষয়। একটা সরকারপ্রধানের বাড়ির ওদিকে মিছিল নিয়ে কতোটুকু দূরত্বে কে যেতে পারবেন এটা ক্লিয়ারলি রিটেন থাকার কথা। আছেও। কিন্তু যাওয়া গেছে। সেখান থেকে শাহবাগ ব্লকেড হয়েছে। কোনোদিন নির্বাচনের ডেট হলে নির্বাচন পেছাও বলে ব্লকেড। গণভোট করো, ড. ইউনূস থাকবেন কীনা; সেই দাবিতে ব্লকেড। এগুলো সামনে আসতে পারে। এই জমায়েত থেকে সেই পরীক্ষা চলছে বলে আমার মনে হয়।
উল্লেখ্য, এই ভিডিও বার্তা প্রকাশের পর শনিবার রাতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সকল কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনের অবস্থান কর্মসূচি চলার মধ্যেই সরকারের তরফে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

mzamin

একজন অজাতশত্রুর কথা by ড. নেহাল করিম

প্রতিটি মানুষের জীবনের চলার পথে কিছু দেখা, কিছু স্মৃতি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মনে গেঁথে থাকে। আত্মীয়-অনাত্মীয়, বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে এমন কেউ থাকেন, যিনি তাদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সমস্ত সত্তা জুড়ে থাকেন। এমনি একজন যাহেদ করিম স্বপন যে আমার সমস্ত সত্তা জুড়ে আছে এবং আমার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকবে। তার জন্ম তারিখ ১৯৫৪ সনের ৯ই মে। ঢাকা সেন্ট গ্রেগোরিস হাই স্কুল থেকে এসএসসি, নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রাপ্ত হয়েছিল। পরবর্তীতে ঢাকা ল’ কলেজ থেকে এলএলবি পাস করে হাইকোর্টে নিবন্ধিত হয়।

স্বপন এমন একজন ব্যক্তি, যে ছিল অজাতশত্রু। তার পরিচিতজন বা আত্মীয়স্বজন বা বন্ধু-বান্ধব কেউ বলতে পারবে না স্বপন কারোর সঙ্গে অশালীন আচরণ বা দুর্ব্যবহার করেছে বা ঠকিয়েছে। সে শুধু আদর্শবান ছিল না, নীতি-নৈতিকতায় ছিল দৃঢ়চিত্তের অধিকারী। তার যেমন ধৈর্য ছিল, তেমনি ছিল কায়িক পরিশ্রম করার শক্তি ও আগ্রহ। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই স্বপন ছিল এমন একজন মানুষ যে অত্যন্ত সৎ, সত্যবাদী, নিরঅহঙ্কার, অমায়িক, পরোপকারী, বন্ধুবাসল্য এবং চরম  ধৈর্যশীল ও মানবিক গুণের অধিকারী এক বাস্তব উদাহরণ।

এতক্ষণ যার কথা বললাম সে হচ্ছে আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ এবং আমাদের অত্যন্ত স্নেহের সে এত উদার ও মহৎ প্রাণের মানুষ ছিল তা নিম্নের কয়েকটি উদাহরণ থেকে বোঝা যাবে। আমাদের বড় ভাই মাহমুদ করিম রিজভী ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার খবর শুনে চিকিৎসার্থে স্বপন বড়ভাইকে পর্যায়ক্রমে ৪০ লাখ টাকা দিয়েছিল। আমার স্ত্রী বেলী যখন আমেরিকাতে ছিলেন সেখানে তিনি ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হন; অসুস্থতার খবর শুনে আমাকে ২০ লাখ টাকা নিয়ে এসে বললো, এই টাকা দিয়ে তুমি ভাবীর চিকিৎসা করাও। এ ছাড়া সে আত্মীয় এবং অনাত্মীয় অনেককেই বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রয়োজনে আর্থিক সাহায্য করেছে। বাড়িতে খাওয়ার টেবিলে আমরা সবাই একসঙ্গে বসতাম; কোনো সময় আমাদের কারোর যদি কোনো তরকারি পছন্দ না হতো আমরা তা নিয়ে চেঁচামেচি করতাম, কিন্তু স্বপন কোনো সময়ে এনিয়ে উচ্চ-বাচ্য করেনি। খাওয়ার টেবিলে যা পেতো বা থাকতো তা বিনা বাক্যব্যয়ে খেয়ে নিতো। দুঃখ হয় স্বপনের মতন এমন এক মানবিকসম্পন্ন ব্যক্তির দাম্পত্য জীবন ছিল খুবই বেদনাময়। সে নিঃসন্তান ছিল। বাড়িতে স্বপনের কোনো বন্ধুদের প্রবেশাধিকার ছিল না। আমরা নিজেরা স্বপনের জন্য দুঃখ করতাম; তার মতো অমায়িক ব্যক্তির জীবনে কী দুর্ভোগ। স্বপন নিজেও আমাদের কাছে কোনোদিন ঘরের অশান্তির কথা আলোচনা করেনি। অনেক পরে তার ঘনিষ্ঠজন ও কয়েকজন বন্ধুর কাছে তার বৈবাহিক জীবনের বিড়ম্বনার কথা বলতো। মানসিক অশান্তি তাকে শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে দুর্বল করে দিয়েছিল।  স্বপন ছিল আমাদের পিতা ড. আহমদ শরীফের সমস্ত সাহিত্য ও গবেষণা কর্মের তথ্য ভাণ্ডার। যেকোনো বিষয়ে, কারও কোনো তথ্যের প্রয়োজনে স্বপনের দ্বারস্থ হতো। আমি নিজেও লেখালেখির ব্যাপারে স্বপনের উপর নির্ভরশীল ছিলাম। আমাদের পিতা প্রয়াত হওয়ার পর তার ৪৩টি প্রকাশিত প্রবন্ধের বই থেকে বিষয়ভিত্তিক বিন্যাস করে মোট ২৭টি বই প্রকাশ করেছি। বলতে দ্বিধা নেই,  এক্ষেত্রে স্বপনের সহযোগিতা ছাড়া আমি একটি বইও সংকলন বা সম্পাদনা করতে পারতাম না।

স্বপন আইন ব্যবসায় যতটা মনোযোগী ছিল তার থেকে বেশি উৎসাহী ছিল সমাজ রূপান্তরের ক্ষেত্রে। প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে যোগাযোগ ছিল বামধারার বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে। তার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা পরিবারের কেউ জানতো না এবং সে নিজেও কাউকে জানায়নি। বাম রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক নথিপত্র ছাড়া দলীয় বা জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপর প্রায় সব প্রচারপত্র তার সংগ্রহে ছিল। অনেক বাম নেতা তথ্য সংগ্রহের জন্য তার সাহায্য নিতো। স্বপনের সংগ্রহে বহু মূল্যবান বই ও রাজনৈতিক দলের প্রায় ৫০ বছরের উপরে পুরনো প্রচারপত্র তার সংগ্রহে ছিল, যা অত্যন্ত অমূল্য সম্পদ এবং উচ্চতর গবেষণার জন্য অত্যন্ত সহায়ক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র, গঠনতন্ত্র ও লিফলেট সংগ্রহে রাখা ছিল তার অন্যতম শখ।  বলতে কোনো দ্বিধা নেই, অনেক বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী ও নেতাদের কাছে আমি স্বপনের ভাই হিসেবে পরিচিত ছিলাম।  সে নিজে সজ্জন ও অমায়িক ব্যক্তি ছিল বলে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিল। প্রত্যেকের মতন তার নিজস্ব জগৎ ছিল। বিশেষ করে তার চিন্তা-চেতনা ছিল মানবতা ও সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে। স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল ছিল না, খুব অবহেলা করেছে; এমন কি পরিবার থেকেও তেমন কোনো সাহায্য- সহযোগিতা পায়নি, বহুমূত্র রোগে ভুগছিল, সঙ্গে চোখেও ছানি পড়েছিল। বহুমূত্র রোগের কারণে চোখের ছানি অপারেশন করানো যায়নি। আবার অন্যদিকে ‘কিডনি’ অকেজো  হতে থাকে  এবং  ক্রমান্বয়ে শরীর দুর্বল হতে থাকে। প্রায়শ সে শুয়ে থাকতো। ক্রমান্বয়ে বাইরে যাওয়া কমিয়ে দিতে থাকলো। কিছুকাল সে বাড়ির সামনের রাস্তায় হাঁটতো, কোনো কোনো সময় ছাদেও হাঁটাহাঁটি করতো। ডাক্তারের চেম্বারে আসা-যাওয়া করতো। তবে মে ২০২৪ থেকে ঘন ঘন হাসপাতালে ভর্তি থাকতো। অক্টোবর থেকে একনাগাড়ে তিন মাস হাসপাতালে থেকে অবশেষে ২০২৪ সালের ৩১শে ডিসেম্বর রাত ১০টা ২০ মিনিটের সময় সে না ফেরার দেশে চলে যায়। স্বপন চলে যাওয়ার পর আত্মীয় পরিজন, ওর পরিচিতজন সবাই একবাক্যে তার অভাব অনুভব করেছে এবং বলেছে ওর মতন সহজ সরল ও পরোপকারী মানুষ বিরল। তার প্রয়াণে তার পরিচিতজনরা বলেছেন ‘স্বপনের তিরধানে ড. আহমদ শরীফের তথ্য ভাণ্ডার চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল। দুঃখ এই, স্বপন আমাদের পরে এসে, আমাদের আগে চলে গেল। 
লেখক: প্রাক্তন চেয়ারম্যান, সামাজিকবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল:nehal.karim@yahoo.com 

mzamin

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ রাজনীতিতে চাঞ্চল্য: কার্যক্রম চালালে যে শাস্তি হতে পারে by রাশিম মোল্লা

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তে রাজনীতিতে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকা দলটির কার্যক্রম স্বাধীন দেশে প্রথমবার নিষিদ্ধ ঘোষিত হলো। গণতন্ত্রের নীতি সামনে রেখে গড়া দলটি গত দেড় দশকে যে দানবীয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল তার মাসুল হিসেবে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন এর নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগের টানা ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দেশের গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। দলটির কার্যক্রমের প্রতি মানুষের ক্ষোভ আর হতাশা থেকেই গড়ে উঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, যা পরে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় গণ- আন্দোলনে রূপ নেয়।

জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বর্বর গণহত্যার দায়ে ৫ই আগস্টের পরই আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আওয়াজ উঠে বিভিন্ন পক্ষ থেকে। গণহত্যা ও লুটপাটে জড়িত দলটির নেতাকর্মীদের বিচারে ইতিমধ্যে সরকারের তরফে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগের ধীরগতিতে হতাশ জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে অংশ নেয়া পক্ষগুলো। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ অনেক নেতা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মেয়াদের সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ দেশ ছাড়ায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। নতুন করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় সারা দেশে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান থেকে পরে শাহবাগে টানা দুইদিনের অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। তাদের জোরালো দাবি ও কর্মসূচির জেরেই শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ছিল নানা আলোচনা। নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া বিভিন্ন পক্ষ, জামায়াতসহ বিভিন্ন ইসলামী দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের জোরালো দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি সরাসরি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিরোধী ছিল। দলটির পক্ষ থেকে কয়েক দফা প্রধান উপদেষ্টাকে এ বিষয়ে পরামর্শ দেয়া হয়। বিএনপি’র দাবি ছিল গণহত্যা ও লুটপাটে জড়িত আওয়ামী লীগের নেতাদের বিচার নিশ্চিত করা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা। সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি এমনটাই দাবি করে আসছিল। সরকারের এ সিদ্ধান্তকে বিএনপি স্বাগত জানিয়েছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পরপরই আনন্দ মিছিল করে জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতাকর্মীরা রাতে শোকরানা নামাজও আদায় করেন। দলটির আমীর রাতে তাৎক্ষণিক জমায়েতে বক্তব্যও রাখেন। সরকারি সিদ্ধান্তের পর কিছুটা সময় নিলেও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীরা শেষ রাতে শাহবাগের অবস্থান তুলে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার সরকারি সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগের মতো তাদের সহযোগী অন্যান্য দলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানাচ্ছে এসব দল।

ওদিকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পর রাজনীতিতে চলছে নানা আলোচনা। দেখা দিয়েছে চাঞ্চল্য। দলটির ভবিষ্যৎ কী হবে, রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন থাকবে কিনা, না থাকলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এই দলটির নেতাকর্মীদের অবস্থান কী হবে- এমন নানা প্রশ্ন সামনে আসছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে কার্যত আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। সামনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির শীর্ষ নেতাদের বিচার হবে। ব্যক্তির অপরাধের বিচারের সঙ্গে সংগঠনের বিচারের এখতিয়ারও এই ট্রাইব্যুনালকে দেয়া হয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতারা গণহত্যার দায়ে দণ্ডিত হলে দল হিসেবে আওয়ামী লীগও শাস্তির মুখে পড়বে। দলটির কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হতে পারে। সম্ভাব্য এমন পরিস্থিতি মাথায় রেখে দলটির নেতাকর্মীরাও চিন্তিত। দল নিষিদ্ধ থাকলে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বা দলটির নেতাদের অংশ নেয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে বিচার প্রক্রিয়া জোরালো হলে শীর্ষ অনেক নেতা এমনিতে নির্বাচনের অযোগ্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামনের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ছাড়া নয়া এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। মাঠের রাজনীতিতে এখন প্রধান দল বিএনপি এবং জামায়াত। নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি দলীয় অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। চরমোনাই’র পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ইসলামী দলগুলোর একটি নির্বাচনী মোর্চা গঠনের চেষ্টা করছে। ভোটের মাঠে এই মোর্চা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের জোট সঙ্গীদের নিয়ে লড়বে- এমনটা বলা হচ্ছে। জামায়াত কোনো জোট গড়বে নাকি এককভাবে নির্বাচন করবে- তা এখনো স্পষ্ট নয়। এনসিপি’র অবস্থাও একই। এ ছাড়া অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে জোট গড়ার প্রচেষ্টা রয়েছে। দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও  ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের অবস্থান কোনো না কোনোভাবে থেকে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচনের সময় দলটির নেতাকর্মীদের কৌশল ভোটের মাঠের পরিস্থিতিও বদলে দিতে পারে। বিশেষ করে রাজনীতির ময়দানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গন্তব্য কী হবে- এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতিমধ্যে দলটির অনেক নেতাকর্মী বিভিন্ন দলে ভিড়তে শুরু করেছেন।

যদিও আগামী নির্বাচন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তার ঘোর কাটেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে পারেনি। গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর নতুন গুঞ্জন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। সরকারের মেয়াদ বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে এমন কথাও বলছেন কেউ কেউ। রাজনীতিতে মাইনাস ফর্মুলার আলোচনাও জারি আছে। এমন অবস্থায় সামনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। 

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালালে যে শাস্তি হতে পারে

পতিত আওয়ামী লীগ সরকার গত বছরের ১লা আগস্ট সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অঙ্গসংগঠনকে। এর প্রায় তিন মাস পর বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন ছাত্রলীগকে। গত শনিবার ওই একই আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে প্রাচীনতম দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম।  আইনজীবীদের দেয়া তথ্যমতে, ইতিপূর্বে হরকাতুল জিহাদ, জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবিরসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ওই একই আইনে প্রথমে ছাত্রলীগ এবং শনিবার নিষিদ্ধ করা হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করলে এবং তা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যূন ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে এটা করতে আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে উপদেষ্টা পরিষদ। এতে বলা হয়, কতিপয় সন্ত্রাসী কার্য প্রতিরোধ এবং উহাদের কার্যকর শাস্তির বিধানসহ আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়ন করার নিমিত্ত সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ প্রণয়ন করা হয়। উক্ত আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কার্যের সহিত জড়িত রয়েছে মর্মে যুক্তিসঙ্গতকারণের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারে। বর্তমান আইনে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের বিষয়ে কোনো বিধান নেই। উক্ত বিষয়টি স্পষ্টকরণসহ বিধান সংযোজন আবশ্যক হেতু সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-কে সময়োপযোগী করে উক্ত আইনের অধিকতর সংশোধন সমীচীন ও প্রয়োজন। বর্ণিত প্রেক্ষাপটে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন করে সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা, প্রয়োজনীয় অভিযোজন করা এবং অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার নিষিদ্ধকরণের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ও সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী মো. মহসিন রশিদ। তিনি বলেন, আইনে বলা আছে কি কি করলে একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা যায়। আর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হতে যা যা করা লাগে তার সব কিছুই করেছে। আমি মনে করি আরও আগেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা দরকার ছিল। এ বিষয়ে সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু মানবজমিনকে বলেন, গত ১লা আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ করে। ওই একই আইনে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের অক্টোবর মাসে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। শনিবার নিষিদ্ধ করলো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। তিনি বলেন, এখন থেকে আওয়ামী লীগ আর কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারবে না। কর্মসূচি পালন করলে তা আইনত অপরাধ। তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারবে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সাবেক সম্পাদক ও বিএনপি’র নির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ইতিপূর্বে এই আইনে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, শিবিরসহ কয়েকটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করেছেন। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নেয়ার পরেও ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করেছেন এবং তফসিলভুক্ত করেছেন। শনিবার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। আমি আপনাদের বলতে চাই, ইতিপূর্বে বিএনপি’র পক্ষ থেকে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দীন আহমেদ সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে একই প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে কিংবা সংগঠন হিসেবে বিচারের প্রস্তাব করেছিলেন। তখন তিনি উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন। এ ছাড়াও আইন উপদেষ্টাও বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া উপদেষ্টামণ্ডলীর সবাই গিয়েছিলো কিন্তু সেটি মঞ্জুর হয় নাই। রোববার আবার তারা এ ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিকল্প ধারা বাংলাদেশের মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট শাহ আহমেদ বাদল মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ যে অত্যাচার নির্যাতন করেছে, তা কল্পনাকেও হার মানায়। এই দল নিষিদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো পথ ছিল না। এই দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের মধ্যে দিয়ে অন্য দলগুলোর শিক্ষা নিতে হবে। ফ্যাসিজম করে কারও রক্ষা নেই।  

কার্যক্রম পরিচালনার শাস্তি: সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সন্ত্রাসী কাজ করলে, সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিলে, সন্ত্রাসী কাজের জন্য প্রস্তুতি নিলে বা সন্ত্রাসী কাজ সংঘটনে সাহায্য বা উৎসাহ দিলে, সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত কাউকে সমর্থন বা সহায়তা দিলে সেই ব্যক্তি, সত্তা বা সংগঠন সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত বলে বিবেচিত হবে। সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার মানবজমিনকে বলেন, সন্ত্রাস দমন আইনের ধারা অনুযায়ী সত্তা বলতে কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, বাণিজ্যিক বা অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী, অংশীদারি কারবার, সমবায় সমিতিসহ এক বা একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত যেকোনো সংগঠনকে বোঝানো হয়েছে। সংগঠন নিষিদ্ধ করা মানে হচ্ছে- এ সংগঠন কোনো কার্যক্রম চালাতে পারবে না। নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন যদি কার্যক্রম কোনো ভাবে চালু রাখে, তাহলে এর বিরুদ্ধে সরকার যেকোনো রকম স্টেপ নিতে পারে। এই আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ১৮ এর অধীন কোনো নিষিদ্ধ সত্তার সদস্য হন বা সদস্য বলিয়া দাবি করেন, তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন এবং উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য তিনি অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ১৮ এর অধীন কোনো নিষিদ্ধ সত্তাকে সমর্থন করিবার উদ্দেশ্যে কাউকে অনুরোধ বা আহ্বান করেন, অথবা নিষিদ্ধ সত্তাকে সমর্থন বা উহার কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো সভা আয়োজন, পরিচালনা বা পরিচালনায় সহায়তা করেন, অথবা বক্তৃতা প্রদান করেন, তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন। ৯(২) ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নিষিদ্ধ সত্তার জন্য সমর্থন চেয়ে অথবা উহার কর্মকাণ্ডকে সক্রিয় করার উদ্দেশ্যে কোনো সভায় বক্তৃতা করেন অথবা রেডিও, টেলিভিশন অথবা কোনো মুদ্রণ বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো তথ্য সম্প্রচার করেন, তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন। ৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) অথবা (২) এর অধীন কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তিনি অনধিক সাত বৎসর ও অন্যূন দুই বৎসর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডও আরোপ করা যাবে। ১০ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র করেন, তাহলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং তিনি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির দুই তৃতীয়াংশ মেয়াদের যেকোনো কারাদণ্ডে, অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং যদি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব চৌদ্দ বৎসরের কারাদণ্ড হইবে, কিন্তু উহা ৪ (চার) বৎসরের কম হবে না। ১১ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি বা সত্তা এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনের প্রচেষ্টা করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি বা সত্তা অপরাধ সংঘটন করিয়াছেন বলে গণ্য হবে এবং উক্ত ব্যক্তি বা উক্ত সত্তার প্রধান, তিনি চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী বা অন্য যেকোনো নামে অভিহিত হোক না কেন, উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির দুই-তৃতীয়াংশ মেয়াদের যেকোনো কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং যদি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে উক্ত অপরাধের শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর ও অন্যূন ৪ (চার) বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড, এবং উহার অতিরিক্ত সংশ্লিষ্ট সত্তার বিরুদ্ধে ধারা ১৮ অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে। ১২ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি বা সত্তা এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে- (ক) সাহায্য বা সহায়তা করে; বা (খ) সহায়তাকারী হিসেবে অংশগ্রহণ করে; বা (গ) অন্যদের সংগঠিত বা পরিচালনা করে; বা (ঘ) অবদান রাখে; তাহলে উক্ত ব্যক্তি বা সত্তা অপরাধ সংঘটন করিয়াছেন বলে গণ্য হবে এবং উক্ত ব্যক্তি বা উক্ত সত্তার প্রধান, তিনি চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী বা অন্য যেকোনো নামে অভিহিত হোক না কেন, উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির দুই-তৃতীয়াংশ মেয়াদের যেকোনো কারাদণ্ডে, অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং যদি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে উক্ত অপরাধের শাস্তি হইবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর ও অন্যূন ৪ (চার) বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে। 

mzamin

সরজমিন কুমিল্লা: ‘বাহার ট্রমা’ কাটিয়ে সরব রাজনীতি by মারুফ কিবরিয়া

কুমিল্লা কান্দিরপাড়ের সীমানার শুরুতেই পড়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়। নয় মাস আগেও এই ভবনটিকে ঘিরে দলীয় নেতাকর্মীদের ছিল হাজারো ব্যস্ততা। এখান থেকেই নানা সিদ্ধান্ত নিতেন দলীয় সভাপতি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার। যার কথায় চলতো পুরো শহর। এখন সেই জৌলুস নেই। কান্দিরপাড়ের আওয়ামী লীগ কার্যালয় সুনশান। ৫ই আগস্ট দলটির পতনের পরপর পুড়িয়ে দেয়া হয় পুরো ভবন। সেদিনই প্রতাপশালী বাহার অধ্যায়ের অবসান ঘটে। স্থানীয় রাজনীতিতে সাবেক এই সংসদ সদস্য ছিলেন এক আতঙ্কের নাম। ‘বাহার ট্রমা’ কাটিয়ে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল এখন স্বস্তিতে। বিশেষ করে টানা ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনে কোণঠাসা বিএনপি রাজনীতিতে পুরোপুরি সরব হয়েছে। সক্রিয় হয়েছে জামায়াতও।

যেভাবে চলছে বিএনপি’র কর্মকাণ্ড: কুমিল্লা শহর জুড়েই বিএনপি’র নেতাদের ছোট বড় পোস্টার সাঁটানো। কদিন আগেই জেলা ও মহানগর কমিটি হয়েছে। ২৭টি ওয়ার্ডের কমিটি নিয়েও জোরদার কাজ করে যাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া প্রস্তুতি রয়েছে ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি নিয়েও। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও কুমিল্লা দক্ষিণের সাবেক আহ্বায়ক আমিন উর রশীদ ইয়াছিনের সঙ্গে আলাপে এমনটাই জানা গেছে। তিনি জানান, ৫ই আগস্টের পরপরই কুমিল্লার রাজনীতিতে নতুন এক আবহ তৈরি হয়েছে। সাবেক এমপির একচেটিয়া শাসন থেকে মুক্তি পেয়েছে কুমিল্লাবাসী। বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল নিজ নিজ দলীয় কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাধাবিঘ্নের সম্মুখীন হচ্ছে না।  বিশেষ করে ১৬ বছরে কোণঠাসা করে রাখা বিএনপি এখন দলের কাজগুলো করতে পারছে স্বাধীনভাবে।

আমিন উর রশীদ ইয়াছিন মানবজমিনকে বলেন, এখন দলের কাজগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় করা যাচ্ছে। ওয়ার্ড কমিটির কাজ শেষ হয়েছে প্রায়। ২৭টি ওয়ার্ডে নেতৃত্ব নির্বাচন করা বড় একটা কর্মজজ্ঞ। কে  সভাপতি কে সাধারণ সম্পাদক সেগুলো ভোটের মাধ্যমে ঠিক করা হচ্ছে। এর সবই দলীয় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাহেবের নির্দেশ মোতাবেক চলছে। এসব কাজ করতে গিয়ে টুকটাক ভুলত্রুটি তো থাকবেই। সেগুলো আবার সংশোধন করা হচ্ছে। এক কথায় দলীয় চেয়ারম্যান একটাই নির্দেশনা দিয়েছেন, মানুষের জন্য ভালো ভালো কাজ করে যেতে হবে। আমরা সেটাই করছি। শহরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। কুমিল্লাকে একটি সুন্দর শহর উপহার দেয়ার জন্য নগর বিএনপি’র কমিটির পক্ষ থেকেও কাজ করা হচ্ছে।

সাবেক সংসদ সদস্য বাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন তারা কেউই নেই। ৫ই আগস্টের পরে সবাই পলাতক। আওয়ামী লীগের কোনো অবস্থান নেই। ১৬ বছরের শাসনের অবসান হয়েছে। এখন শহর একেবারেই শান্ত।

বাহার ট্রমা কাটিয়ে বিএনপি’র রাজনীতিকে আরও ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে কাজ করছে কুমিল্লা মহানগর বিএনপিও। সভাপতি উদবাতুল বারী আবু জানান, সাবেক এমপি বাহারের কাছে জিম্মি ছিল কুমিল্লাবাসী। তিনি এমন কোনো কাজ নেই করেননি। এখন তারা পালিয়ে যাওয়ায় মানুষ স্বাধীনভাবে সব কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারছে। মানুষের মধ্যে এখন কোনো ভয় নেই। তিনি বলেন, মহানগর কমিটির দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে নিয়মিত কাজগুলো করতে পারছি। গ্রেপ্তার জেলের ভয় এখন নেই। এক সময় শহরে পা দিতেও সমস্যা হতো। অর্ধশত মামলার আসামি ছিলাম আমি। ২৭টি ওয়ার্ডের শৃঙ্খলায় মহানগর নেতৃত্বে কাজ করে যাচ্ছে। সবমিলিয়ে সামনে জাতীয় নির্বাচনের জন্য দল গোছানোর চালিয়ে যাচ্ছে সবাই।

অন্যদের যা অবস্থা: ৫ই আগস্ট থেকে নিয়মিত দলীয় কর্মকাণ্ডে সরব কুমিল্লা মহানগরীর জামায়াতে ইসলামীও। এতদিন গোপনে থাকলেও বর্তমানে প্রকাশ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মহানগর জামায়েতের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহেল। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আমরা তিন বা পাঁচজন একসঙ্গে থাকলেও নানা হয়রানির শিকার হতাম। বলা হতো গোপন বৈঠক করছি। এখন এসব নেই। প্রকাশ্যেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছি। কেউ বাধা দেয়ারও নেই। সাবেক এমপি বাহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাহার আমাদের সঙ্গে তেমন কোনো ঝামেলা করতেন না। কারণ সেন্ট্রাললি আমাদের দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে বাধা থাকায় পুলিশ প্রশাসন নিয়ে সমস্যায় পড়তাম।

৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে কুমিল্লার রাজনীতিতে অনেকটা অকার্যকর হয়ে গেছে জাতীয় পার্টি। দলটির কোনো কার্যক্রম এই মুহূর্তে নেই শহরে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় জাতীয় পার্টির নেতারা অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। সেই প্রসঙ্গে না বললেও দলীয় কার্যক্রম স্থগিতের কথা স্বীকার করেছেন  জেলা জাপা সভাপতি এয়ার আহমেদ সেলিম। তিনি মানবজমিনকে বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সাল থেকেই আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে। সর্বশেষ ১৫ বছরেও শেষ করে দিয়েছে। এ মুহূর্তে আমাদের দলীয় কোনো কর্যক্রম নেই বললেই চলে। ৫ আগস্টের পর থেকে সব বন্ধই রয়েছে।

যেমন ছিল ‘বাহার ট্রমা’:
কুমিল্লার রাজনীতিতে সাবেক এমপি বাহার ছিলেন আতঙ্কের নাম। বলা হতো এই শহরে তিনিই সব। তার কথাই শেষ কথা। মুন্সেফবাড়ি থেকে কান্দিরপাড় পর্যন্ত পুরো পথটুকুতে আসা-যাওয়ায় যে সিদ্ধান্ত হতো তা-ই বহাল থাকতো। নিজেকে ‘কুমিল্লার অভিভাবক’ হিসেবেই পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন বাহার। কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে থাকা বাহার নিজেকে ভাবতেন কুমিল্লার গণমানুষের নেতা। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কুমিল্লায় রাজত্ব শুরু করেন। দিন যত গেছে বাহারের রাজত্ব ততই বেড়েছে। একটা সময় শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, নিজের দলের বিরোধীদেরও রাজনীতির মাঠে কোণঠাসা করে ফেলেন বাহার। স্থানীরা জানায়, গত কয়েক বছরে কুমিল্লা জুড়ে একক রাজত্ব চলেছে বাহাউদ্দীন বাহারের। কুমিল্লা সদরের এমপি হলেও পুরো জেলাতে যেন বাহারের কথাই ছিল শেষকথা। জেলার ১১টি সংসদীয় আসনের বেশির ভাগ সংসদ সদস্য ছিলেন বাহারের বলয়ে। শুধু তা-ই নয়, গত বছর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও জেলার বেশির ভাগ উপজেলাতেই ছিল বাহারের আধিপত্য।
mzamin

মাহফুজের দুই স্ট্যাটাস নিয়ে ব্যাপক আলোচনা

আবারো আলোচনায় সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। ‘একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাওয়া’ সংক্রান্ত তার এক স্ট্যাটাস নিয়ে যখন পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হচ্ছে, ঠিক তখনই তিনি আরেকটি স্ট্যাটাস দেন। যেখানে শিবিরের ওপর নিজের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন। বলেছেন, পাকিস্তানপন্থিরা যেখানেই থাকবে, সেখানেই আঘাত করা হবে। এ ছাড়াও কয়েকটি আপত্তিকর শব্দও ব্যবহার করেন স্ট্যাটাসে। যদিও সমালোচনার মুখে তাৎক্ষণিক স্ট্যাটাসটি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে নেন তিনি। শনিবার আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের পর সব আন্দোলনকারী যখন ঘরে ফিরে যায় তখন মাহফুজ আলম তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একাত্তর ও মুজিববাদী বাম ইস্যুতে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘একাত্তরের প্রশ্ন মীমাংসা করতেই হবে। যুদ্ধাপরাধের সহযোগীদের ক্ষমা চাইতে হবে। বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে পাকিস্তানপন্থা বাদ দিতে হবে। পাকিস্তান এদেশে গণহত্যা চালিয়েছে। সহযোগীদের ইনিয়ে বিনিয়ে গণহত্যার পক্ষে বয়ান উৎপাদন বন্ধ করতে হবে। জুলাইয়ের শক্তির মধ্যে ঢুকে স্যাবোটাজ করা বন্ধ করতে হবে। সাফ দিলে আসতে হবে। তিনি আরও বলেন, ‘মুজিববাদী বামদের ক্ষমা নেই। লীগের গুম-খুন আর শাপলায় মোদিবিরোধী আন্দোলনে হত্যাযজ্ঞের মস্তিষ্ক এরা। এরা থার্টি সিক্সথ ডিভিশন। জুলাইয়ের সময়ে এরা নিকৃষ্ট দালালি করেও এখন বহাল তবিয়তে আছে। আজ পর্যন্ত মুজিববাদী বামেরা কালচারালি ও ইন্টেলেকচুয়ালি জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করে যাচ্ছে। দেশে বসে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এরা চক্রান্ত করেই যাচ্ছে। লীগের এসব বি-টিমও শিগগিরই পরাজিত হবে। অন্য কারও কাঁধে ভর করে লাভ নেই।’ এ স্ট্যাটাসে একাত্তর ইস্যু টানায় অনেকে তার পক্ষে-বিপক্ষে সমালোচনা করেন। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার মাদ্রাসা জীবনের বেশ কিছু ছবি ভাইরাল হয়। পাঞ্জাবি পরিহিত ওসব ছবি মূলত শিবিরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বলেও প্রচার করে কেউ কেউ। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন উপদেষ্টা মাহফুজ। গতকাল সন্ধ্যায় পাল্টা স্ট্যাটাস দেন তিনি। মুহূর্তেই স্ট্যাটাসটি সরিয়ে নেন তিনি। ততক্ষণে স্ক্রিনশট ভাইরাল হয়ে যায়। সে স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘আমাকে নিয়ে নোংরামি করতেসো, ঝামেলা নাই। ফ্যামিলি টাইনো না, যুদ্ধাপরাধের সহযোগী রাজাকারেরা। এটা লাস্ট ওয়ার্নিং। আর, যে চুপা শিবিররা এ সরকারে পদ বাগাইসো আর বিভিন্ন সুশীল ব্যানার খুলে পাকিস্তানপন্থা জারি রাখসো, তোমরা তোমাদের পূর্বপুরুষ রাজাকার আর দালালদের তুলনায় আরও অধিক ভুগবা। যারা বিতর্কের এবং গালাগালির লিমিট জানে না, তাদের আমি সহ-নাগরিক মনে করি না। পাকিস্তানপন্থিরা যেখানেই থাকবে, সেখানেই আঘাত করা হবে। আমৃত্যু! ঢাবিতে এ রাজাকারদের আগে ঠেকানো হবে, যারা এদের স্পেস দিসে তাদের জন্য গত পঞ্চাশ বছরের তুলনায় অধিক জিল্লতি অপেক্ষা করসে!’।

মাহফুজের দুই স্ট্যাটাস নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে- বিপক্ষে আলোচনা- সমালোচনা চলছে। প্রথম স্ট্যাটাসে অধিকাংশ ফেসবুক ব্যবহারকারী যখন মাহফুজের পক্ষে অবস্থান নেন ঠিক দ্বিতীয় স্ট্যাটাসের কারণে তার বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। কেউ কেউ জামায়াত-শিবিরের যেমন সমালোচনা করছেন ঠিক তেমনই মাহফুজের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। এমন কি মাহফুজ কোনো গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে বক্তব্য দেয়ার মাধ্যমে উপদেষ্টা পদে নেয়া তার শপথ ভঙ্গ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন অনেকে। মীর আরশাদুল হক নামে এনসিপি’র এক নেতা লেখেন, ‘বাংলাদেশে সব দলের বিপক্ষে বলা যাবে কিন্তু জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে বলা যাবে না, বললেই সবাই মিলে হামলে পড়বে। আর যদি কখনো তাদের খারাপ সময় আসে তখন হয়তো এই দলে- সেই দলে ঘাপটি মেরে থাকবে, আবার একটু সুযোগ পেলেই সেই আগের রূপে ফেরত যাবে। বিএনপি’র সমালোচনা করলে কিন্তু এইটা হয় না, কিংবা অন্য যেকোনো দলের। খুবই অদ্ভুত ব্যাপার মুক্তিযুদ্ধের টপিক উঠলেই একদম দিশাহারা হয়ে যায় এরা। যেখানে তাদেরই অনেক সিনিয়র নেতা মুক্তিযুদ্ধের ভুল অবস্থানের সমালোচনা নিজেরাই করেন।’ তাজওয়ার মাহমিদ সিয়াম নামে একজন লেখেন, ‘উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গতকাল রাতে ’৭১-এর পাকিস্তানপন্থি এবং মুজিববাদী বাম সম্পর্কিত একটা পোস্ট দেয়ার পর থেকে গত ১৫-২০ ঘণ্টায় নজিরবিহীন নোংরামির শিকার হইতে হইছে। একটা অর্কেস্ট্রেটেড মিথ্যাচার করা হইছে মাহফুজ নাকি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিছে। সরকারে একমাত্র সমস্যা না কি মাহফুজ আলম। সম্ভবত সেই আক্রমণ মাহফুজের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাইছে। এর প্রেক্ষিতে কিছুক্ষণ আগে একটা পোস্ট দিয়ে দুই মিনিটের মাথায় ডিলেট করে দিছে।’

mzamin

পীযূষ কান্তির বিরুদ্ধে বেপরোয়া দুর্নীতির অভিযোগ by প্রতীক ওমর ও ইফতেখায়রুল ইসলাম

বগুড়ার শিবগঞ্জে দেউলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মচারী, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। প্রধান শিক্ষকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা শিক্ষা অফিসার, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর সকল শিক্ষক কর্মচারীদের স্বাক্ষর সম্বলিত লিখিত অভিযোগপত্র প্রদানের দীর্ঘদিন হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন শিক্ষকমণ্ডলী। অভিযোগ সূত্রে দেখা যায়, ২০২১ সালে করোনার কারণে এসএসসি শিক্ষার্থীদের জন্য ৯ হাজার ৫০০ টাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে ফেরত আসে। সে টাকা শিক্ষার্থীদেরকে না দিয়ে প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি আত্মসাৎ করেন। স্কুলের হিসাবে ২০২২ সালে ২২ হাজার ৫০০ ও ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৫০০ টাকা স্কুল ফান্ডের অ্যাকাউন্টে জমা রাখার কথা বলে নিজ পকেটে উঠান তিনি। ২০২৩ সালে স্কুল সভাপতি ফজলুল বারি কাটুর স্বাক্ষর জাল করে স্কুলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ হাজার টাকা উঠিয়ে আত্মসাৎ করেন। পরবর্তীতে সোনালি ব্যাংক পিএলসি মোকামতলা শাখা, বগুড়া জেনারেল ফান্ড থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে প্রায় লক্ষাধিক টাকা উত্তোলন করে লোপাট করেন। একই সালে শিক্ষক কর্মচারীদের মাঝে ৪৫ হাজার টাকা বণ্টন করার কথা বলে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা উঠিয়ে তা নিজেই নিয়ে নেন।

২০২৩ সালে ইউনিক আইডি খোলার নামে শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে আদায়কৃত ৩০ হাজার টাকা তুলে কাজ না করে আত্মসাৎ করেন প্রধান শিক্ষক। প্রশংসাপত্র প্রদান বাবদ শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা করে নিয়ে নিজের পকেটে উঠান। সরকারি বিধি মোতাবেক শিক্ষক ও অন্যান্য কর্মচারীদের উচ্চতর বেতন প্রাপ্তির ব্যাপারে নানাভাবে হয়রানিও করেন তিনি। পীযূষ কান্তি সাহার অপসারণ চেয়ে গত ৭ই মে প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী, অভিভাবক, এলাকাবাসী ও শিক্ষক কর্মচারী সকলে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে মানববন্ধন করেন।

মানববন্ধন শেষে প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার অপসারণ চেয়ে গণস্বাক্ষর সম্বলিত এক অভিযোগপত্র উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বরাবর দায়ের করা হয়। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সহকারী শিক্ষক জাহেদ আলম বলেন, প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহা আওয়ামীপন্থি হওয়ায় বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মচারী ও অভিভাবকদের সঙ্গে অসদাচরণ ও দুর্ব্যবহার করেন এবং চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখান।

সহকারী শিক্ষক দুলালুর রহমান দুলাল বলেন, প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহা আমাদের সহকারী প্রধান শিক্ষক এ কে এম রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে তার মানহানির চেষ্টা করছে। রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। বরং প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার বিরুদ্ধে অনেক অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এর আগে আমরা সকল শিক্ষক মিলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উপজেলা নির্বাহী অফিস ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে অভিযোগ দায়ের করেছিলাম। তার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহার সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি এবং তার ফোনে খুদেবার্তা পাঠালে কোনো উত্তর জানাননি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান মানবজমিনকে বলেন, এ বিষয়ে মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারকে দায়িত্ব দিয়েছি তদন্ত করার জন্য। তদন্ত প্রতিবেদন দিলে সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেবো।

mzamin

নবাবগঞ্জে আবাসন প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ রিমনের হাতে! by ইমরান হোসেন সুজন

রিমন রহমান। সরকারি কোনো কর্মকর্তা না হয়েও দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকার নবাবগঞ্জের চর মাহতাবপুর (পাড়াগ্রাম) এলাকায় আবাসন প্রকল্প-১ ও চরকোন্ডা মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এ দুইটি আবাসন প্রকল্পের। প্রকল্পের বাসিন্দাদের কাছে তিনি ‘রিমন স্যার’ হিসেবেই পরিচিত। স্থানীয়দের জানান, আবাসন প্রকল্পে কে থাকবে আর কে থাকবে না তা নির্ধারণ করে এ রিমন ও ভূমি অফিসের কর্মচারী নাসির। প্রকল্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভূমিহীনদের জন্য মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে চর মাহতাবপুর (পাড়াগ্রাম) এলাকায় আবাসন প্রকল্প-১ এ ১৪০টি ঘর ও চরকোন্ডা মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এ ১৯৯টি ঘর নির্মাণ করা হয়। জমিসহ ঘর পেয়ে অনেকটা খুশি ছিলেন ভূমিহীনরা। তবে আয়ের পথ না থাকায় সেই সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পরিকল্পনা ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চলে আবাসন প্রকল্প নির্মাণ করায় দেখা দেয় নানা সমস্যা। এত সমস্যা নিয়ে বিপাকে পড়েন  ঘর বরাদ্দ পাওয়া লোকজন। বিশেষ করে আয়ের পথ না থাকায় বাধ্য হয়ে কাজের সন্ধানে ঘর তালা দিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যায় তারা। এ সুযোগে কোনো ঘর ১০/১৫ দিন বন্ধ থাকলেই তালা ভেঙে দখল করে নেন রিমন গংরা। স্থানীয়দের অভিযোগ পরবর্তীতে সে ঘরগুলো নিজেদের লোকদের বরাদ্দ দেন রিমন।

স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, সংশ্লিট অফিস সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করার কারণে শিক্ষা, চিকিৎসা, সুপেয় পানি, বিদ্যুৎ, মাদক ও নিরাপত্তাসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত আবাসন প্রকল্প দুইটি। দীর্ঘদিনও সরকারি কোনো কর্মকর্তা না আসায় ঘর বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রেও নিজের কর্তৃত্ব জাহির করেন রিমন। উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী নাসির ও স্থানীয় কথিত যুবদল নেতা সুমনকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন নতুন  সিন্ডিকেট। তবে আবাসনের কোনো সমস্যা হলে তা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেন না রিমন। আবাসনের সব কিছু তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন।

চরকোন্ডা মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর বাসিন্দা হরিপদ পাল বলেন, পাড়াগ্রামের রিমন ও স্থানীয় সুমন এরাই প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করে। কে ঘরে থাকবে, কে থাকবে না সব কিছুই তারা করেন। তারা একটা গ্রুপ তৈরি করছে, তারা তালা ভেঙে ভেঙে মানুষজনকে বের করে দেয় আবার ঢুকায়। টাকার বিনিময়ে ঘর বরাদ্দ হওয়ার ঘটনা সবাই জানে কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় নাই।
একই প্রকল্পের বাসিন্দা সাগির আহমেদ বলেন, সরকার আমাকে ঘর দিছে, আমি না থাকলে সরকার আমাদের বের করে দিবে। কিন্তু বিশেষ প্রয়োজনেও ১০/১২ দিন লাগাতার না থাকলেই ওরা ঘর প্রথমে তালা দেয়, পরবর্তীতে তা অন্যজনকে দিয়ে দেয়। আর এ সিন্ডিকেটের মূলহোতা হলো পাড়াগ্রামের রিমন। তাকে সহযোগিতা করেন উপজেলা ভূমি অফিসের নাসির ও এলাকার কিছু পাতি নেতা।

নজরুল নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, প্রকল্পের বাসিন্দারা খুব কষ্টে আছে। এতদিন হয়ে গেল আমরা কোনো মিটার পাচ্ছি না, গরমে খুব কষ্ট করতে হয়। এ ছাড়া একটা কবরস্থানও নেই, কেউ মারা গেলে মাটি দিতে পারি না। প্রথম থেকেই রিমন ভাই প্রকল্প দুইটির দায়িত্বে আছে। শুধু ঘর তালা দিয়ে অন্যজনকে বুঝিয়ে দেয়ার সময় তাকে দেখি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমার এক আত্মীয়ের জন্য একটা ঘরের জন্য ডিসি স্যার ও এসিল্যান্ড অফিসে গিয়েছিলাম। তারা বলেছিল কোনো ঘর নাই আপাতত, তাহলে রিমন ভাই ঘর কীভাবে পায়। আসলে সব টাকার খেলা।

আশুতোষ পাল বলেন, চরকোন্ডা মুজিবনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এ একপাশই আছে হিন্দুদের জন্য। এখানে সব হিন্দুদের ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যাতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আমরা একসঙ্গে আনন্দ উৎসব পালন করতে পারি। কিন্তু এখন রিমন কয়েকজন মুসলমান পরিবারকে সেখানে ঘর বরাদ্দ দিয়েছে। এতে যেমন ধর্মীয় উৎসব পালনে আমরা বিব্রত হই, তেমনি যিনি ঘর পেয়েছেন তিনিও অস্বস্তিতে পড়েন। তিনি আরও বলেন, যদি চিকিৎসার জন্য আপনি ১৫দিন বাইরে থাকেন, তাহলে ফিরে এসে ঘর পাবেন কিনা সন্দেহ আছে। রিমন স্যাররা সব তালা দিয়ে দখল করে নিবে।

চর মাহতাবপুর (পাড়াগ্রাম) এলাকায় আবাসন প্রকল্প-১ এর সভাপতি নুর ইসলাম বলেন, অফিসের বাইরেও কয়েকজন দালাল আছে, যারা মন মতো লোকজনকে ঘর বরাদ্দ দেয়। এ প্রকল্পে ১৪০ ঘরের মধ্যে এখন ৭০টা মতো পুরাতন পরিবার আছে। আর সবগুলো হাত বদল হয়েছে। রিমনের নেতৃত্বে এসব হয়। আমিও শুনেছি টাকার বিনিময়ে এসব ঘর হাতবদল হয়েছে। এ ছাড়া আবাসন প্রকল্পে মাদকের উপদ্রব বেড়ে গেছে। পানিসহ নানা সমস্যা কিন্তু সমাধানে কেউ এগিয়ে আসে না। এ বিষয়ে অভিযুক্ত রিমন রহমান জানান, আমাকে ভূমি অফিস থেকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। আমি কাউকে ঘর থেকে বের করে দেয় নাই। এসিল্যান্ড অফিসের অনুমতি ছাড়া কাউকে নতুন করে ঘর দেয়ার সুযোগ নেই। যা করি অফিসের অনুমতি নিয়েই করি। অনেকে আছে মাসের পর মাস ঘরে থাকে না, কই আমি তো তাদের ঘরে তালা দেই না। আর টাকার বিনিময়ে ঘর দেয়ার প্রশ্নই আসে না। আসলে একটি চক্র আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আবাসন নিজেদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যেন তারা মাদক ব্যবসাসহ অপকর্ম করতে পারেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসিফ রহমান বলেন, আবাসন প্রকল্পগুলো আমরা  দেখভাল করি। স্থানীয় চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় সব কাজ করা হয়। রিমনের ব্যাপারে আমি অবগত নয়। সেখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। খোঁজ নিয়ে দেখবো তাদের কি সমস্যা আছে।

mzamin