Showing posts with label WikiCity. Show all posts
Showing posts with label WikiCity. Show all posts

Thursday, January 28, 2016

ছি ছি এত্তা জঞ্জাল- অবস্থা আগের মতোই by খালিদ সাইফুল্লাহ

২০১৬ সালকে ডিএসসিসি মেয়র পরিচ্ছন্নতা বছর
ঘোষণা করলেও এখনো নগরীর যত্রতত্র ময়লা পড়ে
থাকতে দেখা যাচ্ছে। ছবিটি গতকাল পুরান ঢাকার
দয়াগঞ্জ ব্রিজের নিচ থেকে তোলা : নয়া দিগন্ত
বর্তমান বছরকে পরিচ্ছন্নতা বছর ঘোষণা করলেও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়রের আহ্বানে তেমন সাড়া মিলছে না। বিভিন্ন এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করলেও এলাকার পরিবেশের কোনো হেরফের হয়নি। রাস্তায় রাখা ডাস্টবিনগুলো থেকে এখনো উপচে পড়ছে ময়লা-আবর্জনা। দিনের বেলাতেই চলাচল করছে ময়লাভর্তি গাড়ি। যত্রতত্র ময়লা ফেলার অভ্যাসের কোনো পরিবর্তন নেই। এমনকি সন্ধ্যা ৭টার পর ময়লা ফেলতে মেয়রের অনুরোধের প্রতিও কোনো পাত্তা দিচ্ছেন না নগরবাসী।
গত ২৩ ডিসেম্বর হোটেল সোনারগাঁওয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘পরিচ্ছন্নতা বছর-২০১৬’ ঘোষণা করেন মেয়র সাঈদ খোকন। সেদিন মেয়র রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে সাত দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এর প্রথম দফায় ছিল আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির প্রচলন। তিনি বলেন, প্রধান সড়ক থেকে আবর্জনার কনটেইনার স্থানান্তর এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে মোট ৫৭ সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ ও প্রতিদিন সকাল ৭টার মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকার্যক্রম সম্পন্ন করা। তিনি দ্বিতীয় দফায় পরিচ্ছন্নকার্যক্রম গতিশীল করতে জন সম্পৃক্ততা বাড়ানোর কথা বলেন। এ ল্েয অনলাইন মিডিয়াসহ সব গণমাধ্যমে প্রচারণা চালানোর কথা বলেন। তৃতীয় দফায় প্রধান জনসমাগম স্থলে ছোট আকারে ৫০টি আধুনিক গণশৌচাগার নির্মাণ করা হবে। চতুর্থ দফায় নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের লক্ষ্যে ঢাকা শহরকে দৃষ্টিন্দন করা হবে এবং পয়লা জানুয়ারি থেকে সরকারি-বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি অনুমতি ছাড়া ব্যানার-ফেস্টুন লাগাতে পারবে না। পঞ্চম দফায় আধুনিক পরিবেশবান্ধব সড়ক বাতি সংযোজন এবং ষষ্ঠ দফায় রয়েছে দখলমুক্ত সড়ক নিশ্চিত করা। শেষ দফায় ডিএসসিসির পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক অভিযোগ গ্রহণের জন্য ২৪/৭ হটলাইন খোলা হবে। পরিচ্ছন্নতার জন্য পুরস্কার এবং তিরস্কারের ব্যবস্থাও থাকবে বলে জানিয়েছেন মেয়র।
ওই ঘোষণার পর এক মাস পার হয়েছে। এর মধ্যে ডিএসসিসি ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে প্রায় প্রতিদিনই পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধন করেছেন মেয়র। এতে সরকারের মন্ত্রী, বিশিষ্ট নাগরিক, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অংশ নিচ্ছেন। এসব কর্মসূচি থেকে মেয়র নগরবাসীর প্রতি বারবার আহ্বান জানাচ্ছেন ময়লা ফেলার বিষয়ে সচেতন হতে। সন্ধ্যা ৭টার পর থেকে রাত ১০টার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে। তিনি প্রত্যেক নাগরিককে মেয়রের ভূমিকা নেয়ারও আহ্বান জানান। কিন্তু নগরী ঘুরে দেখা গেছে, মেয়রের আহ্বানে কোনো সাড়া নেই নগরবাসীর। দিনের বেলাতেই বাসাবাড়ির ময়লা সংগ্রহ করে তা ডাস্টবিনে ফেলছে এলাকাভিত্তিক ময়লা সংগ্রহকারীরা। বিভিন্ন সড়কে রাখা ডাস্টবিনে সারা দিনই এসব ময়লা ফেলছে তারা। সকাল ৭টার মধ্যে এসব ডাস্টবিন থেকে সিটি করপোরেশনের গাড়িতে ময়লা নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও দিনের বেলাতেও ময়লা পরিবহন করা হচ্ছে। এ ছাড়া সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে ময়লা ফেলার মেয়রের নির্দেশের বিষয়টি জনগণ বুঝতে পারছেন না। এমনকি বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহকারীরাও বুঝতে পারছেন না তারা কিভাবে রাতে ময়লা সংগ্রহ করবেন। এ ছাড়া চলতি পথে যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলার বিষয়ে জনগণের মধ্যে কোনো সচেতনতা গড়ে উঠছে না। আগের মতোই যেখানে সেখানে ময়লা ফেলছেন মানুষ।
পল্টন এলাকার বাসিন্দা রাশেদুল ইসলাম বলেন, বাসাবাড়ি থেকে এখন দিনে ময়লা সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু মেয়র সন্ধ্যা ৭টার পর ময়লা ফেলতে বলছেন। অথচ ময়লা সংগ্রহকারীরা ঠিকই দিনেই ময়লা নিয়ে তা রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলছেন। সিটি করপোরেশনের নিজের কাজেই ঠিক নেই তারা কিভাবে জনগণকে মানাবে।
গোপিবাগ এলাকার গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, রাতে কিভাবে ময়লা সংগ্রহ করবে বুঝতে পারছি না। রাতে একটা নিরাপত্তার বিষয় রয়েছে।
বাসাবো এলাকার ময়লা সংগ্রহকারী আমিনুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যার পর ময়লা সংগ্রহ করা বিষয়ে আমাদের কিছু বলা হয়নি। আমরা এখনো দিনের বেলাতেই সংগ্রহ করছি এবং দিনেই ডাস্টবিনে রেখে আসছি। রাতে ময়লা আনতে যেকোনো বাড়ি যাওয়ায় সমস্যা আছে। তিনি বলেন, মেয়রের এ নির্দেশ মনে হয় বড় সড়কের জন্য।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন রকিব উদ্দিন ভুঁইয়া নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিচ্ছন্নতা বছর সফল করতে মেয়রের নেতৃত্বে বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। আশা করছি আস্তে আস্তে মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়বে। সন্ধ্যার পর ময়লা সংগ্রহ করায় নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে ডিএসসিসিরও পক্ষ থেকে ভাবা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
এ ব্যাপারে মেয়র সাঈদ খোকন নয়া দিগন্তকে বলেন, ঢাকাকে পরিচ্ছন্ন রাখতে নাগরিকদের সচেতনতা সৃষ্টি করতে কাজ করছি আমরা। পরিচ্ছন্নতা বছর উপলক্ষে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ওয়ার্ডে অভিযান চালানো হচ্ছে। ৫৭ ওয়ার্ডে সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন তৈরির কাজ চলছে। সন্ধ্যা সাতটার পরে গৃহস্থলীর বর্জ্য নির্ধারিত স্থানে রাখার আহ্বান জানানো হচ্ছে। সন্ধ্যা ৭টার পরে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য রাখলে তা করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সরিয়ে নেবেন। একটি নিদিষ্ট সময়ে কেউ যদি নিদিষ্ট স্থানে ময়লা না ফেলেন তাহলে জরিমানার ব্যবস্থা করা হবে।
সাঈদ খোকন আরো বলেন, পরিচ্ছন্ন নগরী পেতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। এজন্য আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ‘লাভ ফর ঢাকা’ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। আস্তে আস্তে মানুষ সচেতন হবে। কাজটা শুরু হয়েছে, আমাদের একটু সময় দিতে হবে।

Wednesday, January 27, 2016

নিজের বেলায় ষোলো আনা! by সামছুর রহমান

উত্তরা রাজউক মার্কেটের পার্কিংয়ের জায়গাজুড়ে
বসানো হয়েছে অবৈধ দোকানপাটl -প্রথম আলো
বেসমেন্ট বা ভূতলের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা উচ্ছেদে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশেষ অভিযান চলছে। ভবনে আসা যানবাহনের কারণে সড়কে যানজট সৃষ্টি হয় বলেই এই অভিযান। কিন্তু নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বেলায় সে নিয়ম মানছে না রাজউক।
বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে ১৮ জানুয়ারি থেকে উত্তরার বেশ কয়েকটি এলাকায় অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ৭ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত রাজউক কর্মচারী কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের বেসমেন্টে গড়ে ওঠা ৫৭টি দোকান এখনো বহাল আছে। রাজউক বলছে, ভবনটির নকশায় বেসমেন্টে দোকান করার অনুমতি আছে।
রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ) আসমাউল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজউকের নিজস্ব ভবন বলে ছাড় দেওয়া হচ্ছে কি না, এটি যুক্তিসংগত প্রশ্ন। ভবনটির নকশায় অনুমোদিত আছে বলে জানি, পরীক্ষা করে দেখতে হবে কতটুকুর অনুমোদন আছে। নয়তলা ভবনের হিসাবে পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত জায়গা রাখা আছে কি না, তাও প্রশ্নসাপেক্ষ।’
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, ৭ নম্বর সেক্টরে ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের পশ্চিম পাশে নয়তলা রাজউক কর্মচারী কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সটি অবস্থিত। কমপ্লেক্সের বেসমেন্টের চারপাশে দোকান। বেসমেন্টের দোকানে প্রবেশের জন্য তিনটি সিঁড়ি আছে। বেসমেন্টের মাঝখানে গাড়ি রাখার জন্য একটু ফাঁকা জায়গা। সেখানে তিনটি গাড়ি ও কয়েকটি মোটরসাইকেল রাখা। গাড়ি প্রবেশের জন্য একটা ঢালু পথ আছে।
দোকানমালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কমপ্লেক্সটি রাজউকের কর্মচারীদের কল্যাণ সমিতির। ২০০০ সালে মার্কেট নির্মাণের পর থেকেই তাঁরা এখানে ব্যবসা করছেন। দোকানের জায়গাগুলো রাজউক স্থায়ীভাবে বিক্রি করেছে। এখন কেউ নিজেই দোকান পরিচালনা করছেন, কেউ ভাড়া দিয়েছেন।
রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল মালেক বলেন, ‘আমাদের এটি মার্কেট ভবন। গাড়ি এসে বেশিক্ষণ থাকে না। নকশায় অনুমোদন নিয়ে কিছু দোকান করা হয়েছে। পার্কিংয়ের জন্য যথেষ্ট জায়গা আছে।’ তবে গতকাল দেখা যায়, কমপ্লেক্সে আসা গাড়িগুলো ভবনের সামনের রাস্তায় রাখা। বেসমেন্টের গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা স্থাপনা যানজট সৃষ্টি করছে বলে গত রোববার উত্তরার ছয়টি মার্কেটে অভিযান চালিয়ে এ ধরনের শতাধিক স্থাপনা উচ্ছেদ করে রাজউক। রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের খানিক দূরে অবস্থিত কুশল সেন্টারের বেসমেন্টের ১৭০টি দোকান ভেঙে দেয় উচ্ছেদকারীরা। এ সময় রাজউক কমপ্লেক্সেরও সামনের দুটি দোকান, র্যাম্প, সিঁড়ি ভেঙে দেওয়া হয়। তবে বেসমেন্টের দোকানগুলোর বিষয়ে কিছু করা হয়নি।
গতকাল কুশল সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ হওয়া দোকানের লোকজন জড়ো হয়ে আছেন। ভাঙা জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দোকানি বলেন, ‘কুশল সেন্টারের বেসমেন্টে দোকান বেআইনি, তা মেনে নিচ্ছি। উচ্ছেদ করল, তা-ও মানলাম। কিন্তু রাজউকের কমপ্লেক্স বলে সেখানে দোকান থাকবে, এটা এক দেশে দুই আইনের মতো ব্যাপার।’
এ বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাজউক যদি বেসমেন্টে দোকান করে, তাহলে অন্যরাও করার অনুমতি চাইবে। বেসমেন্টে দোকান না করার আইন সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। রাজউকের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। কারণ, রাজউক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।’ রাজউক আশপাশের ভবনের বেসমেন্টে গড়ে ওঠা দোকানপাট ভেঙে দেওয়ায় আতঙ্কে আছেন রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের দোকানিরাও। মিতু অ্যাডসের স্বত্বাধিকারী নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘দোকানের কিছু হলে আমরা পথে বসে যাব। রাজউক নিজে বিক্রি করছে। ভাঙতে হলে আগে আমাদের পুনর্বাসন করতে হবে।’ এসব দোকানের বিষয়ে রাজউকের সদস্য আসমাউল হোসেন বলেন, পুরাতন ভবনগুলোর ক্ষেত্রে বেসমেন্টে পার্কিং না রাখার সমস্যা বেশি। রাজউক কমপ্লেক্সের বেসমেন্টের দোকানের বিষয়ে কী করা হবে, তা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে। যদি নকশা সংশোধনের প্রয়োজন হয়, তাহলে সংশোধন করা হবে।

Tuesday, January 12, 2016

সময় যাচ্ছে, খরচ ও দুর্ভোগ বাড়ছে by শরিফুল হাসান

এক বছর আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল মগবাজার-
মৌচাক ফ্লাইওভারের কাজ। কিন্তু এ বছরও
কাজ শেষ হবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।
মাঝে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে।
ছবিটি মগবাজার মোড় থেকে তোলা -সাইফুল ইসলাম
এই মুহূর্তে রাজধানীবাসীর সবচেয়ে বড় দুর্ভোগের নাম নির্মাণাধীন মগবাজার-মৌচাক সমন্বিত ফ্লাইওভার। ২০১৪ সালের মধ্যে এই ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হয়নি। এর পরে সময় নির্ধারণ করা হয় ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এবারও কাজ শেষ হয়নি। তবে ইতিমধ্যে খরচ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। আর দুর্ভোগ বেড়েছে ‘শত গুণ’। কবে নাগাদ এ ফ্লাইওভারের কাজ শেষ হবে, তা-ও নিশ্চত করে কেউ বলছেন না।
প্রধানমন্ত্রী, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী, ঢাকা দক্ষিণের মেয়রসহ সরকারের অনেক নীতিনির্ধারক এই ফ্লাইওভারের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য তাগাদা দিয়েছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। এখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ফ্লাইওভারের দুটি অংশের কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বছরের ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। বাকি কাজ শেষ হওয়ার সময় বলা হচ্ছে আগামী ডিসেম্বর।
সর্বশেষ আলোচনায় এসেছে ফ্লাইওভারের নকশার ত্রুটি। তবে এর জন্য কার কী দায়, তা নিয়ে কোনো কথা হচ্ছে না। এই ফ্লাইওভারটি ঢাকার যানজট কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এসব সমস্যা মানতে নারাজ তদারকি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
মগবাজার-মৌচাক সমন্বিত ফ্লাইওভারটির কাজ হচ্ছে তিন ভাগে। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, সাতরাস্তা থেকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত অংশের কাজ ৯০ শতাংশ, ইস্কাটন থেকে মৌচাক পর্যন্ত অংশের কাজ ৮৫ শতাংশ এবং রামপুরা থেকে মালিবাগ-মৌচাক হয়ে রাজারবাগ-শান্তিনগরের কাজের মাত্র ৪৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে শেষের দুই অংশের কাজ করছে তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। অভিযোগ উঠেছে, তাদের কারণেই কাজ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, সাতরাস্তা থেকে হলি ফ্যামিলি এবং ইস্কাটন থেকে মৌচাক পর্যন্ত কাজটি শেষ করার জন্য ২৬ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যেই তাদের কাজটি শেষ করতে হবে। তবে রামপুরা থেকে মালিবাগ-মৌচাক হয়ে রাজারবাগ-শান্তিনগরের কাজটি শেষ হবে চলতি বছরের ডিসেম্বরে।
মগবাজার-মৌচাক উড়ালসড়কের
মালিবাগ-রাজারবাগ-শান্তিনগর অংশের
অধিকাংশ পিলারই এখনো মাটি ফুঁড়ে
দাঁড়ায়নি। ছবিটি মালিবাগ মোড় থেকে তোলা
সাতরাস্তা থেকে হলি ফ্যামিলি, ৯০ ভাগ কাজ শেষ: তেজগাঁও সাতরাস্তা মোড় থেকে মগবাজার হয়ে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত অংশের (প্যাকেজ নং ডব্লিউ-০৪) কাজটি যৌথভাবে পেয়েছে সিমপ্লেক্স-নাভানা। ফ্লাইওভারের এই অংশের দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ১১ কিলোমিটার। খরচ ২১২ কোটি টাকা। প্রথম দফায় ২০১৪ সালে এবং পরে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে এই কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাতরাস্তার ৬৯ নম্বর পিলারের কাছে ঢালাই চলছে। সাতরাস্তা ধরে হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত সবগুলো পিলার নির্মাণ, ঢাল বসানো হয়ে গেছে। এই কাজের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কেউ কথা বলতে রাজি হননি।
তবে ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালক নাজমুল আলম বলেছেন, ‘এই অংশের কাজ ৯০ ভাগ শেষ হয়েছে। ২৬ মার্চের আগেই এটা উদ্বোধন করা সম্ভব হবে।’
ইস্কাটন থেকে মৌচাক, দুর্ভোগের শেষ নেই: ফ্লাইওভারের বাংলামোটরের ইস্কাটন থেকে মগবাজার মোড় হয়ে মৌচাক পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটারের ২০০ কোটি টাকার কাজটি যৌথভাবে পায় চীনা কোম্পানি এমসিসিসি-এসইএল-ইউডিসি। তবে উপঠিকাদার হিসেবে কাজটি করছে তমা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর এবং পরে গত বছরের ডিসেম্বরের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়নি। প্রকল্প পরিচালক গতকাল জানালেন, ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলামোটর অংশের ২৪০ থেকে ২৪৪ নম্বর পর্যন্ত পিলারের ঢাল এখনো বসেনি। ২১৩ নম্বর পিলারের সামনে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এখানে ফ্লাইওভারের নিচে কাঁচাবাজার বসে গেছে। বাংলামোটরের মোটর পার্টস ব্যবসায়ী দুলাল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘চার বছর ধরে কাজ হচ্ছে। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ। আল্লাহই জানে কবে কাজ শেষ হবে, কবে আমরা শান্তি পাব।’
ফ্লাইওভারের মগবাজার মোড় পেরিয়ে মৌচাকের দিকে যেতে আড়ংয়ের আগে রাস্তার বেহাল দশা। এখানে গাড়ি আটকে যাচ্ছে। শীতের মধ্যেও এই রাস্তায় কাদাপানি। ২০২ থেকে ২০৭ নম্বর পিলার পর্যন্ত একই দশা। এখানে আটকে থাকা প্রাইভেট কারের চালক মতিন সরকার বলেন, ‘ইস্কাটনের স্কুল থেকে স্যারের মেয়েকে নিয়ে প্রতিদিন মৌচাক যাই। এত কষ্ট হয়, মনে হয় গাড়ি চালানো বাদ দিয়ে দিই।’ পাশ থেকে কয়েকজন রিকশাওয়ালাও এ সময় ফ্লাইওভারের কাজ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ইস্কাটন থেকে মৌচাক অংশের কাজ শেষ
হওয়ার কথা ছিল গত বছর। কিন্তু এখনো
তা শেষ হয়নি। ছবিটি ইস্কাটন থেকে তোলা
মৌচাক-রাজারবাগ-শান্তিনগর, এখনো খোঁড়াখুঁড়িই চলছে: ফ্লাইওভারের তিনটি অংশের মধ্যে সবচেয়ে দুরবস্থা রামপুরা (আবুল হোটেল) থেকে মালিবাগ, মৌচাক মোড় হয়ে রাজারবাগ ও শান্তিনগর পর্যন্ত অংশের। প্রায় চার কিলোমিটার অংশের এই কাজ পেয়েছে এমসিসিসি-তমা। খরচ ৩৪৩ কোটি টাকা। প্রকল্প পরিচালক গতকাল জানালেন, এই অংশের মাত্র ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এলজিইডির গত বছর বার্ষিক প্রতিবেদনে এই অংশের কাজের ৩৬ শতাংশ শেষ হয়েছে বলে উল্লেখ করা আছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মালিবাগ মোড়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও শান্তিনগরের অন্তত আটটি পিলার এলাকায় সবে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। এ ছাড়া অধিকাংশ পিলারের রড বাঁধাই শেষ হয়নি। মৌচাক মোড়ে কাজ করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘নানা সমস্যায় কাজ করা কঠিন। তাই দেরি।’ একই কথা জানালেন শান্তিনগরের সামনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসান।
তবে স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ মতামত জানালেন। শান্তিনগরের বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, এই ফ্লাইওভারের কাজ নিয়ে এত দুর্ভোগ হচ্ছে যে নিজের বাড়ি না হলে এলাকা ছেড়ে চলে যেতাম।
অভিযোগ উঠেছে, তমার কারণে এই ফ্লাইওভারের কাজের দেরি হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। তবে প্রকল্প পরিচালক নাজমুল আলম বললেন, ‘আমরা তাদের বারবার কাজ শেষ করার জন্য তাগাদা দিয়ে চিঠি দিয়েছি।’ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেকও একই কথা জানালেন।
সাতরাস্তা থেকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল পর্যন্ত
কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছর। কিন্তু
এখনো চলছে শেষ সময়ের কাজ। এফডিসির
মোড় থেকে তোলা ছবি -সাইফুল ইসলাম
কাজ শেষ হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আতাউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘কোথাও পাইলিং করতে গেলে দেখা যায় মাটির নিচে বিদ্যুতের লাইন, ওয়াসার লাইন, টেলিফোনের লাইন। আমাদের যে নকশা দেওয়া হয়েছিল, তাতে এগুলো ছিল না। বিভিন্ন বিভাগ থেকে যে নকশা নিয়েছি, তাতেও দেখা গেছে অনেক জায়গায় পরিবর্তন। এসব মোকাবিলা করে কাজ করা কঠিন।’
যানজট কমবে না বাড়বে: বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বাঁ পাশে বসে চালিত যানের কথা মাথায় রেখে করা নকশায় এই ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে ডান হাতে চালিত যানের জন্য ব্যবহার করতে হবে। ফলে অনেক সমস্যা তৈরি হবে বলে মনে করছেন সড়ক যোগাযোগ নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানি সমীক্ষা করে এই উড়ালসড়েকর নকশা করে। আট বছর পর ২০১৩ সালে এই নকশা ধরেই কাজ শুরু হয়। কিন্তু তত দিনে এই প্রকল্প এলাকার পাশে হাতিরঝিল গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া প্রকল্পস্থলের মাটির নিচে বিভিন্ন সেবা সংস্থার পাইপ ও তার বসে গেছে। এসব যাচাই-বাছাই না করেই কার্যাদেশ দেওয়ায় কাজ শুরুর পর বারবার নকশা পরিবর্তন করতে হয়।
জানতে চাইলে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শহরের ভেতরে ফ্লাইওভার কখনোই সমাধান নয়। এটি যানজট কমায় না বরং বাড়ায়। ২০০৩-০৪ সালে ফ্লাইওভারের নকশা করা হয়। এই সময়ে নকশাটি অনেক বেশি আধুনিক করার সুযোগ ছিল। সেটি হয়নি। আমাদের কাছে যখন এই ফ্লাইওভারের কাঠামোগাত নকশা (স্ট্রাকচারাল ডিজাইন) নিয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়, আমরা যতটুকু সংশোধনের সুযোগ ছিল সেটি করে দিয়েছি।’
উড়ালসড়কের নির্মাণত্রুটির বিষয়ে জানতে চাইলে শামসুল হক বলেন, ‘শান্তিনগর, রাজারবাগ, মগবাজারসহ প্রতিটি ওঠা-নামার জায়গায় র্যাম্প অনেক বেশি জায়গা নিয়েছে। এর ফলে উড়ালসড়কের নিচের রাস্তা দিয়ে গণপরিবহনের চলতে সমস্যা হবে। ফলে নগরবাসীর যতটুকু উপকার হতে পারত তা হবে না।’
তবে প্রকল্প পরিচাক নাজমুল আলম বলেন, ‘সবার সামনেই এই ফ্লাইওভার হয়েছে। সবাই দেখেছে। নানা কথা বলা হয়েছে। ৬০টি পিলারে ত্রুটি। এগুলো ভাঙতে হবে। এসবের কোনো ভিত্তি নেই। বাম দিক থেকে গাড়ি উঠবে, ডান দিক দিয়ে নামবে। কোনো সমস্যা হবে না।’
খরচও বাড়ছে: ২০১১ সালে একনেকে মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। প্রথম ধাপে প্রকল্পের খরচ ছিল ৩৪৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় ধাপে এ খরচ নির্ধারণ করা হয় ৭৭২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। তবে এখন প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২১৮ দশমিক ৮৯ কোটি টাকা। ধরন বলছে, সময় যত যাবে, এই খরচ আরও বাড়িয়ে নেবে ঠিকাদার।
তবে প্রকল্প পরিচালক নাজমুল আলম মনে করেন, এই ফ্লাইওভারটি ‘সবচেয়ে সস্তায় হচ্ছে’।
খরচ ও জনদুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘একনেকের পরের সভায় খরচের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। তবে এই ফ্লাইওভারের কাজ এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে। দ্রুত এই কাজ শেষ করতে সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ২৬ মার্চের আগেই আমরা এটি উদ্বোধন করতে চাই।’

Thursday, December 10, 2015

প্রতারণার ভয়ঙ্কর ফাঁদ by মহিউদ্দিন অদুল

বর্ষার পানিতে ঢাকার আশপাশের বিলঝিলের জমির আইল বা সীমানা ডুবে গেলে সুবিধামতো জায়গায় বিশাল জমির মালিক বনে যান প্রতারক নিজাম মোল্লা। বর্ষা এলেই তার জমি বিক্রির ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিভিন্নভাবে ভুলিয়ে কম মূল্যে অন্যের জমি বিক্রি করে দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জমির রেজিস্ট্রিও সম্পাদন করেন। তার এ প্রতারণার শিকার হয়েছেন অনেকে। তিন বছর আগে একই কায়দায় নিজাম মোল্লা আশুলিয়ায় মহাসড়কের পাশে সাড়ে চার লাখ টাকায় ১৬ শতক জমি বিক্রি করেন শাহবাগ বটতলা ক্ষুদ্রফুল ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. আবুল কালাম আজাদকে। সম্প্রতি ওই জমি অন্য একজনকে বিক্রির চেষ্টার খরব পেয়ে জমিতে ছুটে যান আবুল কালাম। গিয়ে তাতে বাধা দেন। পরে জানতে পারেন ওই জমি আরও তিনজনের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। শেষে নিজাম মোল্লা ওই জমির মালিকই ছিলেন না জানতে পেরে হতবাক হয়ে যান তিনি। এরপর নিজাম মোল্লাকে এ প্রতারণায় হাতেনাতে ধরা হলে প্রতারণার কথা স্বীকার করে টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে আজ পর্যন্ত টাকা ফিরে পাননি তিনি। আবুল কালাম আজাদ মানবজমিনকে বলেন, নিজাম মোল্লা কয়েক বছর আগে আগ বাড়িয়ে আমার সঙ্গে পরিচয় ও সুসম্পর্ক গড়েন। এরপর আন্তরিকতা ও উপকারের মানসিকতা দেখিয়ে কমমূল্যে জমি দেয়ার নাম করে বর্ষায় আশুলিয়ায় নিয়ে জমি দেখান। জানান, ডুবে থাকা জমিগুলো তার। এরপর আমাকে জমি বিক্রি করে রেজিস্ট্রিও করে দেন। পরে তার প্রতারণা ধরা পড়ার পর দেখি ভিন্ন লোকের ওই জমিটি একই কায়দায় আরও তিনজনকে বিক্রি করেছেন। পরে জানতে পারি একইভাবে তিনি অনেক লোককে একইভাবে প্রতারণা করে জমি বিক্রির নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় সব দলিলপত্র, টাকা গ্রহণের ছবিসহ সব প্রমাণ থাকলেও আইনি জটিলতার কারণে এ প্রতারণার বিচারও চাইতে পারছি না। রাজধানীর চারদিকে ওত পেতে আছে এমনই নানা প্রতারণার ফাঁদ। রাস্তাঘাট, হাটবাজার, বিপণিবিতান, অফিস-আদালত, সচিবালয়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায়। বাকি নেই বাস-ট্রেনও। সকাল-সন্ধ্যে যে কোনো সময় যে কেউ অচেনা-অর্ধচেনা লোকের মন ভোলানো নানা তৎপরতায় এমন বহু প্রতারণার শিকার হচ্ছে। প্রতারণায় রাজধানীতে প্রতিদিনই একাধিক মানুষ হারাচ্ছেন টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার, জায়গা-জমি। শুধু তা-ই নয়। প্রতারণায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে প্রায় প্রতি মাসে। এতেই শেষ নয়। অনেকে চেনা বা অর্ধচেনা মানুষের কাছেও প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এসব প্রতারণার অভিযোগ থাকলেও নেই প্রতিকার। রাজধানীর সব থানায় প্রতারণার শত শত অভিযোগ গেলেও তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শিডিউলভুক্ত হওয়ায় থানা পুলিশ তদন্ত করতে পারছে না। আবার দুদকও লোকবল সংকটের অজুহাতে অভিযোগগুলো তদন্ত করছে না বললেই চলে। ফলে প্রতারণার প্রতিকার চাওয়ার রাস্তাও বর্তমানে কার্যত বন্ধ রয়েছে। এর ফল হিসেবে প্রতারণার ঘটনা বাড়লেও অভিযোগ ও মামলা করার প্রবণতা কমে গেছে। এ সুযোগে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে নানা প্রতারক চক্র।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান মানবজমিনকে বলেন, প্রায় সময় বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। প্রতারণার অভিযোগের ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করলে তথ্য-প্রমাণ নাও পাওয়া যেতে পারে। তাই প্রতারণার অভিযোগের তদন্ত দ্রুত সারতে হয়। কিন্তু লোকবল সংকটের পাশাপাশি সক্ষমতা না থাকলেও দুদককে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে এখন প্রতারণার তদন্ত প্রায় হচ্ছেই না। এতে প্রতারণার শিকার সাধারণ মানুষের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তারা ক্ষতির শিকার হলেও আইনি সুরক্ষা বা প্রতিকার পাচ্ছেন না, যা সুশাসন বাস্তবায়নে অন্তরায়।
বৃহস্পতিবার সকালে সরজমিনে দেখা তিন বেদেকন্যার আরেক প্রতারণা ছিল এমনই- ‘তোমার কপাল তো খুলে গেছে। এখন থেকে শুধুই উন্নতি হবে তোমার। তবে হাদিয়া ছাড়া তা জানানো যাবে না। অশুভ। ভাগ্য হাতছাড়া হয়ে যাবে। ২০ টাকা দাও।’ হঠাৎ এই বলে কাকরাইল মোড়ে ওই তিন মহিলা পথ আগলে দাঁড়ায় মধ্য বয়সী সুনিল চন্দ্র সাধুর। টাকা বের করতেই পুরনো টাকা না নিয়ে নতুন ১০০ টাকার একটি নোট পছন্দ করে বসে তারা। ৮০ টাকা ফেরত দেয়ার নাম করে তা হাতিয়ে নেয়। সঙ্গে সঙ্গে একজনের হাতে থাকা কৌটায় ঢুকিয়ে নেয়। বলে ‘পুরো টাকাই নিলাম। তোমার অনেক মঙ্গল হবে।’ একাধিকবার অনুরোধেও ওই টাকা ফিরে পায়নি সুনিল। এর কারণ জানতে চাইলে ওই তিন বেদেকন্যা জানায়, এমনি চাইলে তো কেউ টাকা দেয় না। তারা আরও জানায়, এভাবে প্রতিদিন ২০ থেকে ৫০ জন মানুষের কাছ থেকে প্রতিজন ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আয় করে। প্রতিদিন ৫০০-এর মতো মহিলা সাভার থেকে ঢাকা শহরে এসে বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে এ প্রতারণার কাজ করে বলে জানায় তারা। তবে তারা নিজেদের নাম ও দলনেত্রীর নাম জানাতে অস্বীকৃতি জানায়।
এর আগে গত ২৪শে নভেম্বর সকালে মিরপুরে ছদ্মবেশী ডাববিক্রেতা হাজি মহসিন (৫৫) নামের এক ব্যক্তিকে ভুলিয়ে ডাব খাওয়ায়। এরপর মেরুল বাড্ডার বাসায় যাওয়ার জন্য বাসে উঠে বসতেই তিনি অজ্ঞান। এরপর হাতিয়ে দেয়া হয় তাকে। ওই দিন অচেতন মহসিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর শেষরাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিষক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়।
গত এপ্রিলে কলাবাগান থানায় কর্মরত উপপরিদর্শক এস এম ফারুক আলমের (বর্তমানে বাড্ডা থানায় কর্মরত) মোবাইলে ফোন আসে। বিকাশের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয় ‘এজেন্ট কমিশন বা চার্জ ছাড়া বিকাশে টাকা লেনদেনের সিস্টেম আছে। সে সুযোগ নিন। এজন্য নতুন বিকাশ আইডি খুলতে হবে। আমি যেভাবে বলি সেভাবে আপনি নতুন আইডি খোলতে থাকুন।’ এই বলে সে আমাকে দিয়ে নতুন আইডি খুলিয়ে নিচ্ছিল। তাতে আমার বিকাশে থাকা ৮ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়ার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। এমন সময় সঙ্গে থাকা অন্য একজনের পরামর্শে শেষ কাজটুকু বাকি রেখে বলি ‘একটু অপেক্ষা করুন। বিষয়টি কাছে থাকা এক এজেন্টের কাছ থেকে জেনে নিই। এর পরই তিনি এজেন্টের কাছে না যেতে অনুনয়-বিনয় করতে শুরু করে। তা না শুনলে একপর্যায়ে গালাগাল শুরু করে। পরে নিজেই প্রতারণার কথা স্বীকার করে মোবাইলের সংযোগ কেটে দেয়।’ তবে বিকাশ নম্বরে ভিন্ন এক প্রতারণায় ৬ হাজার টাকা খুইয়েছে দক্ষিণ বাড্ডা বাজার এলাকার স্বয়ং বিকাশ এজেন্ট ফারুক হোসেন। সম্প্রতি তার বিকাশ নম্বরে বিকাশ কার্যালয় থেকে পাঠানোর আদলে ৮ হাজার টাকার একটি ভুয়া খুদে বার্তা আসে। এরপর সন্ধ্যার ব্যস্ততম সময়ে বারবার ফোন আসে আর বলতে থাকে ‘একজন লোকের জন্য ২ হাজার টাকা পাঠাতে গিয়ে ভুলে ৮ হাজার টাকা চলে গেছে। ৬ হাজার টাকা আমার নম্বরে ফেরত পাঠান।’ খুদে বার্তা দেখে তিনি ৬ হাজার টাকা বিকাশে ফেরত পাঠান। পরে ব্যালেন্স দেখে বুঝতে পারেন প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে ওপারের মোবাইল নম্বর।
এদিকে গত ২৭শে নভেম্বর সকালে রাজধানীর উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরের ১৫ নম্বর সড়ক থেকে মো. শহিদুল ইসলাম নামের এক প্রতারককে বিভিন্নজনের ২৭টি পাসপোর্ট ও প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়া সাড়ে তিন লাখ টাকাসহ আটক করে র‌্যাব-১। জিজ্ঞাসাবাদে শহিদ বিদেশে পাঠানোর নামে বিভিন্নজনের পাসপোর্ট নিয়ে প্রতরণা ও জিম্মি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে টাকা আদায়ের কথা স্বীকার করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা ও সক্ষমতার অভাবে এসব নানা প্রতারণার প্রতিকারই চাইতে পারছেন না ভোক্তভোগীরা। প্রতারণায় সর্বস্ব হারালেও ক্ষতিপূরণ চাওয়ার সুযোগই যেন নেই।
জানা যায়, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন ব্যস্ততম এলাকা, অফিস-আদালত, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় রয়েছে প্রতারক ও সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। নানা কায়দায় তারা প্রতারণার ফাঁদ পাতে। সাধারণ সহজ-সরল মানুষই তাদের লক্ষ্য। সুযোগ বুঝেই নানা ছল-চাতুরী ও মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে তারা প্রতারণা করছে। এসব প্রতারণার মধ্যে রয়েছে কম দামে জমি বিক্রি, চাকরি প্রদান, কম খরচে বিদেশ প্রেরণ, বিকাশ বা মুঠোফোনে বড় পুরস্কার জেতা, উন্নত ওষুধ বিক্রি, কম দামে বিদেশি ভালো জিনিস বিক্রি, ভাগ্য পরিবর্তন ইত্যাদি। এসব প্রতারণার কৌশলগুলো বিচিত্র ও অভিনব। প্রথমে পরিচয়, তার নানা কায়দায় বিশ্বাস জমানো, প্রয়োজনে আগে বিনিয়োগ, এরপর সুযোগ বুঝে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়া ইত্যাদি নানা পর্যায় ও স্তরে চলে প্রতারণায় কার্যসিদ্ধি। রাজধানী ঢাকায় কয়েক সহস্রাধিক লোক ও প্রতারক চক্র শতাধিক রকমের প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের কেউ কেউ ঘটনাচক্রে ধরপাকড় হলেও জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার প্রতারণায় জড়াচ্ছে। তবে চার বছর ধরে প্রতারণার অভিযোগ তদন্তের অভাবে মামলা করা প্রায়ই হচ্ছে না। এতে পার পেয়ে যাচ্ছে প্রতারক চক্র।
দুদক ও আদালত সূত্র জানায়, গত ২০১৩ সালের ২০শে নভেম্বর প্রতারণার মামলাগুলো আইন করে দুদক শিডিউলভুক্ত করা হয়। এরপর থেকে আদালত, থানা পুলিশ বা দুদকের কাছে প্রতারণার অভিযোগ গেলে সব অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা (আদালত ও পুলিশের পরিবর্তে) দুদকের ওপর ন্যস্ত হয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ৮ হাজারের বেশি প্রতারণার অভিযোগ থাকলেও তদন্ত হচ্ছে মাত্র হাতেগুনা কয়েকটির। লোকবল সংকটের কথা বলে দুদক প্রতারণার মামলা তদন্ত করছে না। এ সুযোগে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সদস্য ও আইনজীবী। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়লেও কমেছে অভিযোগ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, প্রতারণাকে আমরা দুই ভাগে দেখে থাকি। কিছু হচ্ছে সরকারি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পর্কিত। আর কিছু হচ্ছে এর বাইরের ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার প্রতারণা। এর আগে সব প্রতারণার মামলাই দুদকের তফসিলভুক্ত করা হয়েছিল। লোকবল সংকটসহ বিরাজমান সীমাবদ্ধতায় দুদকের পক্ষে এত মামলা তদন্তের চাপ নেয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে সারা দেশে পুলিশের নেটওয়ার্ক রয়েছে। আমরা সরকার সংশ্লিষ্ট মামলা ছাড়া বাকিগুলো তদন্তের দায়িত্ব পুলিশকে দেয়ার জন্য সরকারকে জানিয়েছি। অচিরেই সংসদে বিল আকারে পাস হতে পারে। তা হলেই পুলিশ তা তদন্ত করবে।
এজন্যই বর্তমানে ব্যক্তি খাতের প্রতারণার অভিযোগগুলো তদন্ত ছাড়াই ফাইলবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, একেবারে বন্ধ নেই। তবে এখন ওই অভিযোগ বা মামলাগুলোর তদন্ত ধীরগতিতে চলছে।

Wednesday, November 4, 2015

যানজট, জনজট ও জলজট: মহা​জটে কী করণীয় by মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন

৪০০ বছরেরও আগের কথা। বুড়িগঙ্গা নদীতীরে পত্তন করা হয় ঢাকা শহর: এলাকা ১ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার; লোকসংখ্যা সঠিক জানা নেই, হয়তো বা হাজার খানেক। আর ২০১৩ সালে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মহানগরীর আয়তন ৩০২ দশমিক ৪ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১ কোটি ৪৩ লাখ ৯৯ হাজার। দেশে-বিদেশে আলোচিত এবং সমাধানের বলিষ্ঠ প্রচেষ্টাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে এর যানজট, জনজট ও জলজট।
জনসংখ্যার ঘনত্ব
ঢাকা এখন পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম জনবহুল নগর। জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৫ হাজার। বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতির অন্যতম। দেশের জনসংখ্যা বছরে শতকরা ১ দশমিক ৩ ভাগ হারে বাড়ে তো ঢাকা মহানগরীতে বাড়ে শতকরা ৪ দশমিক ৫ ভাগ। দৈনিক গড়ে নিট দুই হাজারজনেরও বেশি মানুষ ঢাকার জনারণ্যে যোগ দেয়।
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর প্রায় চারশ বর্জ্যমুখ
১৬১০ সালের ১৬ জুলাই ঢাকাকে সুবে বাংলার রাজধানী করা হয়। অনেক পটপরিবর্তনের পর ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকাকে বাংলা ও আসামের রাজধানী করা হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ঢাকায় স্থাপিত হয় তদানীন্তন পূর্ব বাংলার (পরে পূর্ব পাকিস্তান) রাজধানী। বহু মূল্যে কেনা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা নবগৌরবে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। এসব ঘটনাপরম্পরায় ঢাকার গুরুত্ব যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি এর জনসংখ্যাও। কিন্তু আয়তন, সুযোগ-সুবিধা ও সেবা সৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে মহানগরী।
যানজট
ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন ২০০টিরও অধিক মোটরযান নিবন্ধিত হয়। এখানে রিকশার সংখ্যা ৪ লাখ ৫০ হাজার, তার মধ্যে নিবন্ধিত এক-চতুর্থাংশ। ঢাকায় পাকা রাস্তার দৈর্ঘ্য ২০০০ কিলোমিটারের মতো। চলাচল স্বস্তিদায়ক হতে হলে একটি মহানগরীতে ২৫ শতাংশ এলাকা রাস্তায় নিয়োজিত করতে হয়। ঢাকায় আছে মাত্র ৭ শতাংশ। ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী মোট যানের প্রায় এক–চতুর্থাংশ ব্যক্তিমালিকানাধীন; কিন্তু এগুলো সড়কের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ দখল করে রাখে। ৬৫০টি সংযোগকেন্দ্রের জন্য মাত্র ৬০টি ট্রাফিক লাইট। ঢাকার রাস্তায় মোট আট রকম গতির যানবাহন চলাচল করে। রাস্তা তুলনামূলকভাবে সরু বলে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন নেই। সম্প্রতি ফ্লাইওভার তৈরি করে যানজটের তীব্রতা সাময়িকভাবে কমানো হলেও যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ লোক স্থানান্তরে নগরে নতুন জনসংযুক্তি এবং জলাবদ্ধতার কারণে সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী তো নয়ই, মধ্যমেয়াদি সমাধানও দুরূহ হয়ে পড়েছে।
জলজট
ঢাকার কেন্দ্রীয় পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থায় নগরবাসীর পানি সরবরাহের জন্য যথেষ্ট না হলেও অন্যান্য শোধনাগারের মাধ্যমে শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি মানুষ সুপেয় পানি পাচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হয়; সরকারি ও বেসরকারি প্রচেষ্টায় খুবই কষ্ট করে এর ব্যবস্থাপনা হতো। সম্প্রতি বর্জ্য ও পানির লাইন পাকাপোক্তভাবে আলাদা করা হয়েছে। কিন্তু ৩৭টি খাল, তথা জলাধারের মধ্যে ১২টি বাদে বাকি সব কটি দখল অর্থাৎ ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে এবং চতুর্দিকে পাকা করা রাস্তা ও উদ্যানের উপস্থিতিতে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে বাধাগ্রস্ত হয় এবং বৃষ্টি হলেই জলজটের সৃষ্টি হয়।
সমাধানের উপায়
বাংলাদেশে নগরায়ণ হয়েছে খুব দ্রুত ও অপরিকল্পিতভাবে। যানজট বা নগর ব্যবস্থাপনাকে মূলত একটি যান্ত্রিক বা ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয় হিসেবে দেখা হয়। একটি সমন্বিত সামগ্রিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সময় নির্ঘণ্টক কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা দরকার। কবে হবে জানি না। তবে নিউইয়র্ক বা নয়াদিল্লির মতোই একটি আলাদা ঢাকা মেট্রোপলিটন গভর্নমেন্ট এখন সময়ের দাবি। যত দিন তা না করা যাবে তত দিন সুস্পষ্ট শর্তাবলি ও পুরস্কার-তিরস্কার প্রথা প্রবর্তন করে দৃঢ় ও কঠোর সমন্বয় ব্যবস্থা চালু করা সমীচীন হবে।
যানজট, জনজট ও জলজট সমস্যাটিকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি, টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি এবং বহুমাত্রিক আর্থসামাজিক-নৃতাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক ও দৃষ্টিভঙ্গিপ্রসূত বিষয় হিসেবে আনা প্রয়োজন। আরও দরকার অগ্রাধিকারভিত্তিক সম্প্রতি উচ্চারিত সরকারি কৃতসংকল্প কর্মকাণ্ড প্রণয়ন এবং ধাপে ধাপে কঠোর হস্তে তার বাস্তবায়ন।
ক) স্বল্প মেয়াদে:
অর্থাৎ তাৎক্ষণিকভাবে শুরু করে আগামী দুই বছরে যা শুরু করা প্রয়োজন তা হলো:
 ১. সব ধরন ও মাধ্যমের প্রথমে শতকরা ৫০ ভাগ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে ভর্তি অঞ্চলভিত্তিক বাধ্যতামূলক করা; দুই বছর পর তা শতকরা ১০০ ভাগে উন্নীত করা।
২. সব ধরন ও মাধ্যমের ছাত্রছাত্রীদের স্কুলবাসে যাতায়াত বাধ্যতামূলক করা।
৩. সরকারি ও বেসরকারি অফিসে নয়টা-তিনটা ও সাড়ে এগারোটা-সাড়ে পাঁচটা নমনীয় অফিস সময়সূচি পালন করা।
৪. গণপরিবহনে পুরোনো লক্কড়ঝক্কড় ছোট ছোট গণযানের পরিবর্তে বড় আধুনিক ও আরামদায়ক বাস রাস্তায় নামানো। আলাপ-আলোচনা, আইনগত ব্যবস্থা এবং সর্বে​াপরি ১০ বছরের পুরোনো গণযানে বেশি হারে রোড ট্যাক্স চালু করা।
৫. ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা মেট্রোপলিটন পুলিশের আর ট্রাফিক লাইটের অভিভাবক করপোরেশন হওয়ার ফলে সৃষ্ট দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটিয়ে একক কর্তৃত্বে লাইট বিশেষে (র‍্যাংগস বাইপাস, বসুন্ধরা সিটি সোনারগাঁও ইন্টার সেকশন, গুলশান) ১০, ১৫, এমনকি ২০ মিনিটের যতির পরিবর্তে তিন থেকে চার মিনিট পরপর গাড়ি ছাড়া। ক্ষমতার উচ্চতানির্বিশেষে উল্টো দিক থেকে গাড়ি চালানোর বিরুদ্ধে কঠিন পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৬. জলাধার উদ্ধার ও পুনঃখননের জন্য কৃতসংকল্প আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৭. ঢাকা মহানগরীর সব প্রবেশপথে টোল মেশিন বসিয়ে টোল আদায় করা।
৮. নিজ নিজ অঞ্চলে যাতে ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা সরকারিভাবে নির্মিত নিম্ন আয়ের শপিং মলে স্থানান্তরিত হতে পারেন, তার ব্যবস্থা করা।
৯. কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় (যথা মতিঝিল) যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা।
(খ) মধ্য মেয়াদে দুই থেকে পাঁচ বছরে:
১০. গৃহনির্মাণে ভূমিকম্প প্রতিরোধ ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা বিধান বাস্তবায়ন করা।
১১. নির্মাণাধীন সব ফ্লাইওভার শেষ করে চালু করা।
১২. বেশ কিছু সরকারি অফিস ঢাকার বাইরে স্থানান্তর করা, যেমন: রেলওয়ের হেড অফিস, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর এবং বন্দর, শিপিং ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চট্টগ্রামে স্থানান্তর। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও কৃষি মন্ত্রণালয়কে ময়মনসিংহে স্থানান্তর করা। শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়কে উত্তরবঙ্গে স্থানান্তর। বস্ত্র মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে ফরিদপুরে স্থানান্তর করা।
১৩. অনুরূপভাবে বেসরকারি খাতের ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-বাণিজ্য স্থাপনার হেড অফিস ঢাকার বাইরে স্থানান্তরে উৎসাহ ও প্রণোদনা প্রদান করা।
১৪. নিটওয়্যার ও তৈরি পোশাকশিল্প এবং ওষুধ কারখানাকে ঢাকার বাইরে স্থাপনের প্রণোদনা প্রদান করা।
(গ) দীর্ঘ মেয়াদে:
১৫. ঢাকা রেলস্টেশন টঙ্গীতে স্থানান্তর করা যাবে। কারণ, তত দিনে মেট্রোরেল চালু হবে এবং সার্কুলার রোড ও নৌ চলাচলে রুটগুলো ঢাকা মহানগরীর চতুর্দিকে যাতায়াত করবে।
১৬. বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বেশ দূরে ময়মনসিংহ, ফরিদপুর অথবা সিলেট অঞ্চলে স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে।
১৭. ২০৪০ সালে বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত দেশের পর্যায়ে উন্নীত হবে, তখন অবশ্যই শহর ও গ্রামের পার্থক্য থাকবে না এবং যানজট সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: সভাপতি, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।

Tuesday, October 20, 2015

নগরবাসীকে জাগিয়ে ঘুমাচ্ছে সিটি করপোরেশন- জরাজীর্ণ দশা রাস্তাঘাটের by খালিদ সাইফুল্লাহ

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় রাস্তার বেহাল দশা। গত রোববার
রাস্তার ওপর এভাবেই উল্টে পড়ে একটি ট্রাক : নয়া দিগন্ত
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আলস্য যেন কাটছেই না। রাজধানীর সড়কগুলোর ভগ্নদশা দিন দিন বেড়ে চললেও এগুলোর উন্নয়নে তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। নামকাওয়াস্তে পুটিং করেই দায়িত্ব শেষ তাদের। আর ভোগান্তি প্রতিনিয়ত পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এ নিয়ে বাসিন্দাদের ঘুম হারাম। তাদের মতে, মানুষকে জাগিয়ে ঘুমাচ্ছে সিটি করপোরেশন। এ বছর রেকর্ড বৃষ্টিপাত হয়েছে। বর্ষা মওসুম শেষ করে ভাদ্র-আশ্বিন মাসেও অঝোরধারার বৃষ্টিপাত নগরবাসীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। ড্রেনগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিটি সড়কে হাঁটুপানি জমে দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এখনো অনেক এলাকায় তা বিদ্যমান। এ কারণে এখন রাজধানীর বেশির ভাগ রাস্তারই পিচ উঠে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত হয়ে গেছে। অনেক স্থানে সড়ক দেবে গিয়ে বড় গর্ত হয়েছে। মূল সড়ক থেকে অলি-গলি সর্বত্রই একই অবস্থা। দুই সিটি করপোরেশন মাস দেড়েক আগে এক দফা ইট-বালু দিয়ে গর্ত সমান করার চেষ্টা করলেও আবার ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ায় সড়কগুলো আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। সম্প্রতি আরো এক দফা দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে রাস্তাগুলোর করুণ দশা হয়েছে। মেয়ররা সড়ক উন্নয়নে সরকারের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ পেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো কাজই শুরু করতে পারেনি।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী মাস নাগাদ টেন্ডারপ্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এরপর প্রক্রিয়া শেষ করে চূড়ান্তভাবে কাজ শুরু হতে আগামী বছরের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। শেষ করতে আরো আরো ছয় মাস। সে পর্যন্ত নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতেই হবে।
সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে রাস্তা রয়েছে প্রায় দুই হাজার ১১৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে আছে এক হাজার ৩৩৮ কিলোমিটার এবং দেিণ ৭৮১ কিলোমিটার। ঢাকায় বড় বড় যানবাহন চলাচল করতে পারে এমন প্রধান সড়ক (প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও সংযোগ) রয়েছে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা দেিণর বড় সড়ক ১৫৮ কিলোমিটার। বাকি প্রায় এক হাজার কিলোমিটার রাস্তা সঙ্কীর্ণ ও গলি। সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার দুই হাজার ১১৯ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে বর্তমানে হাজার কিলোমিটারের ওপর রাস্তা কম-বেশি খারাপ রয়েছে। তবে গত দেড় মাস আগে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এক জরিপের মাধ্যমে ১৬৫ কিলোমিটার ভাঙাচোরা সড়কের তালিকা তৈরি করেছে। একইভাবে উত্তর সিটি করপোরেশনও তাদের খারাপ সড়কের তালিকা প্রস্তুত করেছে। তাদের মোট সড়কের প্রায় অর্ধেকই ভাঙা বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মোড় দীর্ঘ দিন থেকেই যানজটের জন্য খ্যাত ছিল। এটি থেকে মুক্তি দিতে তৈরি করা হয় মেয়র হানিফ ফাইওভার। এতে খানিকটা স্বস্তি ফিরেছে। অতিরিক্ত টাকা খরচ করে ফাইওভারের ওপর দিয়ে যারা চলাচল করছেন তারা কিছুটা মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু ফাইওভারের নিচ দিয়ে চলাচল করা যানবাহন ও পথচারীদের চরম বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। নিচে গাড়ি চলাচলের জন্য কয়েকটি সরু লেন তৈরি করা হয়েছে। এগুলোই এখন মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে প্রতিটি লেন। বড় বড় গর্তের কারণে এখানে প্রায়ই গণপরিবহন দুর্ঘটনায় পতিত হচ্ছে। এ ছাড়া কাদাপানির কারণে পথচারীরাও চলাচল করতে পারছেন না।
অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান পল্টন মোড় ঘেঁষে সরকারের মূল কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয় অবস্থিত। এ সচিবালয়ে বসেই মন্ত্রীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। কিন্তু এ সচিবালয়ের পাশ ঘিরে পল্টন মোড় থেকে প্রেস কাব, জিরো পয়েন্ট রোড, দৈনিক বাংলা সড়ক ও বিজয়নগর সড়কের প্রতিটির অবস্থায়ই এখন শোচনীয়। পল্টন মোড়ের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। গুরুত্বপূর্ণ এ মোড়ে অসংখ্য ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মাসখানেক আগে এসব গর্ত ইট-বালু দিয়ে ভরাট করা হলেও ক’দিন না যেতেই আবার একই রূপ ধারণ করেছে। এখান দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে গণপরিবহন ও পথচারীরা সমস্যায় পড়ছেন।
মেরুল বাড্ডা কাঁচাবাজারের সামনে সড়কটিতে বেশ কিছু দিন ধরে পানি জমে রয়েছে। এ কারণে সড়কও ভেঙেচুরে গেছে। মধ্য বাড্ডায় ফুটওভার ব্রিজের নিচে পানি জমে আছে। ড্রেন বন্ধ থাকায় কিছুতেই তা সরছে না। বাড্ডা লিংক রোডের গুদারাঘাট এলাকায় মূল সড়ক ও আশপাশের বৈশাখী সরণি, গোল্ডেন প্লাজার সামনে এক সপ্তাহ ধরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। বৃষ্টির পানির সাথে স্যুয়ারেজের পানি মিশে এলাকার পরিবেশ দুর্গন্ধময় হয়ে পড়ে। গতকাল পানি অপসারণ করা হয়েছে। তবে এখনো কাদাপানি রয়েছেই। এ কারণে রাস্তাটির অবস্থাও করুণ। বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় কাঠের একটি ভাঙা টুল দিয়ে পরিবহনগুলোকে সতর্ক করা হচ্ছে। গুলশান-২ মোড়সহ আশপাশের অনেক সড়ক ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেছে।
মূল সড়কের চেয়ে অলিগলির অবস্থা আরো খারাপ। মতিঝিল মোড়ের অদূরে কবি জসীমউদ্দীন সড়ক। এখানকার প্রতিটি অলিগলিতে অসংখ্য গর্ত। অনেক স্থানে রাস্তা দেবে গিয়ে বড় গর্ত হয়ে গেছে। ফলে প্রাইভেট কার ও রিকশাকে অত্যন্ত সতর্কভাবে চলাচল করতে হচ্ছে। খিলগাঁও, বাসাবো, সবুজবাগ, মানিকতলা, মুগদাসহ ওই এলাকার সড়কগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে।
ফাইওভার নির্মাণের কারণে রাজারবাগ, মালিবাগ, মৌচাক থেকে রামপুরা পর্যন্ত সড়কে অসংখ্য বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। এক দিকে ফাইওভার নির্মাণজনিত সমস্যা, তার ওপর ভাঙাচোরা সড়কে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। মৌচাক থেকে মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেট সড়কেরও বেহাল দশা। মালিবাগ মোড় থেকে রাজারবাগ মোড় পর্যন্তও একই অবস্থা। পুরো সড়কটিই চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপোযোগী।
মগবাজার ওয়্যারলেস মোড় থেকে মধুবাগ সড়কটির অবস্থা খুবই করুণ। ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত তৈরি হওয়ায় সড়কটি দিয়ে যান ও জন চলাচলে মারাত্মক বিঘœ ঘটছে। প্রায়ই দুর্ঘটনায় আহত হচ্ছেন যাত্রীরা।
রাজধানীর বেশির ভাগ সড়ক ভেঙে যাওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে। রিকশা থেকে বাস সব ধরনের গাড়িই এর শিকার। গুলশান থেকে মতিঝিল চলাচলকারী ৬ নম্বর বাসের চালক অহিদুল জানান, ভাঙা রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে গাড়ির মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। টায়ার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দ্রত। পাতি ভেঙে যাচ্ছে। এতে গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। গাজীপুর-মতিঝিল-সায়েদাবাদ রুটে চলাচলকারী ছালছাবিল পরিবহনের চালক মো: সাগর তীব্র ক্ষােভ প্রকাশ করে বলেন, হয় যানজট না হলে রাস্তা খারাপ। একটা না একটা সমস্যা লেগেই থাকে। গাড়ি চালাতে গিয়ে মনমেজাজ ভালো থাকে না। যাত্রাবাড়ী-গাবতলী রুটে চলাচলকারী ৮ নম্বর গাড়ির চালক আনিছুর রহমান বলেন, খানাখন্দ ছাড়াও রাস্তার ওপর পড়ে থাকা ইট-পাথরের সুরকির ওপর দিয়ে গাড়ি চালালে টায়ারের বারোটা বেজে যায়। নতুন টায়ারগুলো পাথরের খোয়ায় লেগে কেটে যায়। আর একটা টায়ার নষ্ট হলেই ২০-৩০ হাজার টাকা গচ্চা।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সম্প্রতি তাদের ১৬৫ কিলোমিটার ভাঙাচোরা রাস্তার তালিকা তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি ড্রেন নির্মাণ, নর্দমার উন্নয়নসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ‘কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট অব রোড অ্যান্ড আদার ইনফ্রাস্টাকচার অব ফাইভ জোন আন্ডার ঢাকা সিটি করপোরেশন’ প্রকল্পের আওতায় সরকারের কাছ থেকে ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে তাদের কোনো তৎপরতাই এখনো চোখে পড়েনি। ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী মাস থেকে টেন্ডারপ্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এরপর চূড়ান্তভাবে কাজ শেষ করতে আরো এক-দেড় মাস লেগে যাবে। জানুয়ারি মাসের শুরুতে কাজ শুরু হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন এ ব্যাপারে গঠিত প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান।
উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরই আনিসুল হককে একনেক থেকে ২০০ কোটি টাকা দেয়া হয়। সড়ক, ড্রেন ও নর্দমা উন্নয়নে এ টাকা ব্যয় করার কথা রয়েছে। তবে টাকা বরাদ্দ করা হলেও এখনো কোনো কার্যক্রম শুরু করেনি ডিএনসিসি। মাস দেড়েক আগে ইট-বালু দিয়ে কোনো রকম ঠেকার কাজ চালিয়েছিল তারা। কিন্তু বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় রাস্তার সেসব ইট-বালু ধুয়ে এখন আগের থেকেও খারাপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরত উল্লাহ জানিয়েছেন, এ বছর বেশি সময় ধরে বৃষ্টিপাত হওয়ায় রাস্তা বেশি তিগ্রস্ত হয়েছে। এসব রাস্তার তালিকা আমাদের কাছে আছে। ছোটখাটো গর্তগুলো ইটের খোয়া দিয়ে আগে একবার ম্যাকাডাম করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এখন শুষ্ক মওসুম শুরু হওয়ায় আবার কাজ চলছে। এ জন্য প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৩০ অক্টোবরের মধ্যে রাস্তার ছোটখাটো গর্ত সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে পুরোদমে সব সড়কের কাজ শুরু করতে আরো সময় লাগবে। বর্তমানে কয়েকটি কাজের টেন্ডারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগামী মাসে টেন্ডারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ডিসেম্বর-জানুয়ারি নাগাদ রাস্তা মেরামত শুরু হবে। জুন মাস নাগাদ সব রাস্তা মেরামত সম্পন্ন করা হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

Monday, October 19, 2015

বিপর্যয়ের মুখে ঢাকা by হারুন-আর-রশিদ

কে বলে বাংলাদেশের উন্নতি হয়নি? অনেক ‘উন্নতি’ হয়েছে বাংলাদেশের। অনেকেই বলে উন্নতির চেহারাটা দেখতে তোমাকে বেশি কষ্ট করতে হবে না। যানজট, মানবজট, পানিজট ও বর্জ্যজট কি উন্নতি নয়? ৪৪ বছর আগে যা ছিল না সেটা যদি এখন দেখা যায়- তাহলে তো একে একধরনের ‘উন্নতি’ই বলা যায়। কেউ কেউ রসিকতার সুরে একে বলেন ডিজিটাল উন্নতি। পেঁয়াজের কেজি ৮০ টাকার ঊর্ধ্বে; এটাও একধরনের উন্নতি। রাষ্ট্র বলছে- দেশ এখন উন্নতির চরম শিখরে ধাবমান। অর্থাৎ উন্নতির গতিরোধ করা অসম্ভব।
মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিলের শাপলা চত্বর সাত কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিতে আধুনিক শহরে বড় জোর ৩০ মিনিট লাগার কথা। বাস্তবে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টা। ৬ সেপ্টেম্বর মিনিবাসে মতিঝিল আসতে মোহাম্মদপুর থেকে সময় লেগেছে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। শাপলা চত্বরে এসে যখন পৌঁছি তখন ৩টা ২৫ মিনিট। মোহাম্মদপুর থেকে যাত্রা করেছিলাম দুপুর ১২টায়। কোনো কাজ নিয়ে মতিঝিলে এলে ওই একটি মাত্র কাজ করাও সম্ভব হচ্ছে না যানজটে এত বেশি বিলম্ব ঘটার কারণে। প্রযুক্তির যুগে এটা চরম দুঃখজনক সংবাদ। আমার মতো শত শত মানুষ প্রতিদিন যানজটের বেহাল দশায় আক্রান্ত হয়ে আর্থিকভাবে প্রচুর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আসা-যাওয়ায় সময় লাগার কথা যেখানে এক ঘণ্টা, সেখানে সময় ব্যয় হচ্ছে এমনকি সাত ঘণ্টাও। অতিরিক্ত ছয় ঘণ্টা (৭-১) সময় যে অযথা নষ্ট হচ্ছে এর ক্ষতিটা অপূরণীয়। অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিদিন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে ছয় ঘণ্টা। ঢাকায় মতিঝিল-গুলশানে প্রতিদিন যারা আসা-যাওয়া করেন সব মিলিয়ে যদি ধরি প্রায় ৩০ হাজার মানুষ, তাহলে ছয় ঘণ্টা নষ্ট হওয়ার অর্থ কি দাঁড়ায়? অর্থাৎ পরিসংখ্যানই বলে দেয় নগরীর অন্তত ৩০ হাজার মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে (৩০,০০০´৬) = ১,৮০,০০০ ঘণ্টা। জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতির এ ধাক্কাটা প্রতিদিন যে ঘটছে সে ব্যাপারে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান থেকে শুরু করে মন্ত্রী মহোদয়রা কি এটা তাৎক্ষণিকভাবে অনুভব করতে পারেন? পারেন না। কারণ তাদের চলাচলের সময় সড়ক যানজটমুক্ত থাকে।
গত ১ সেপ্টেম্বর একটি স্মরণীয় দিন বিশেষ করে ঢাকাবাসীর জন্য। পত্রিকা লিখেছে- পানিপথের আরেক যুদ্ধ : শুক্রাবাদে বুক সমান পানি। ফুটপাথের এক দোকানদার তার বিক্রয়সামগ্রী নিয়ে রিকশায় করে যাত্রা শুরু করেছেন। গন্তব্য কী নিজেও জানেন না। রিকশাওয়ালাকে বললেন, মামা শুকনো কোনো জায়গা পেলে আমার মালসামানসহ আমাকে নামিয়ে দিলে খুশি হবো। ছবিসহ এ ধরনের একটি সংবাদ পত্রিকায় উঠেছে। ঢাকার জলাবদ্ধতার কোনো নিরসন হয়নি। বরং এ সমস্যা আরো জটিল রূপ নিয়েছে। ওই দিনের একটি টিভি চ্যানেলে তিনজন নগরবিশারদ যে বক্তব্য দিয়েছেন- তার সার সংক্ষেপ হলো (১) ঢাকার ১৬টি প্রধান খাল দখল ও ভরাট হয়ে গেছে। (২) ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়নি। (৩) ৪৮০ কিলোমিটার নালা-নর্দমা প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়নি। ঢাকার সমস্যাগুলো নিয়ে প্রতিদিন পত্রিকায় নিউজ ছাপানো হচ্ছে। নগরবিদদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হচ্ছে। গোলটেবিল বৈঠক, মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ দিন ধরে চলেছে। অথচ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ কোনো সরকার নেয়নি। উল্টো দেখা যায়, কিভাবে ঢাকার মৃত্যু ত্বরান্বিত করা যায় সে অপচেষ্টায় আমরা সবাই ব্যস্ত।
তিন ধরনের জট ঢাকাকে ব্যাধির শহরে পরিণত করেছে। এগুলো হলো- যানজট, জলজট এবং মানবজট। একদিন যদি সব যান বন্ধ হয়ে যায় সে দিন ঢাকা পরিণত হয় অধিকতর মানবজটে। এমনিতেই ঢাকায় এখন মানবজট প্রায় জায়গায় পরিলক্ষিত হয়। মতিঝিল অফিসপাড়ায় সব সময় মানবজট লেগে থাকে। মনে হয় যেন মস্ত বড় একটি বাজার। সব কিছুই এখন অফিসপাড়ায় মূল সড়কেও বেচাকেনা হচ্ছে। আজব সব কর্মকাণ্ড মহানগরীর সড়কপথকে অবলম্বন করে গড়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলতে গেলে নীরব। শোনা যায়, এসব অবৈধ ব্যবসায় সরকারি দলের লোকজনদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও জড়িত। বহু বছর ধরে সড়ক পথের ব্যস্ত স্থানে এ ধরনের বাণিজ্য চলায় পথচারীর ভোগান্তি কী পরিমাণ বেড়েছে তা সবার জানা। মূল সড়ক পথে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডিতেও দেখা যায়। নগরীর ফুটপাথ বহু আগেই ভাসমান হকারদের দখলে। এখন কিছু ফুটপাথে মোটরসাইকেল চলতে দেখা যায়। বড় ফুটপাথে গাড়ি পার্কিং করে রাখা হয়। গণপরিবহন যেসব সড়কপথে চলে, তা সরু হতে হতে মাত্র ১৫ থেকে ২০ ফুটে পৌঁছেছে। সড়কের ডান বামে সাত ফুট করে (৭´২) ১৪ ফুট জায়গা দখল করে রেখেছেন প্রাইভেট গাড়ির মালিকেরা।
আইন নিজস্ব গতিতে চলার পথে প্রতিবন্ধকদের বিরুদ্ধে আইনের রক্ষকেরাই নীরব। তাহলে আইন কাগজে থাকবে- বাস্তবে থাকবে না। বাংলাদেশে এ ধরনের বহু আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। আইন কার্যকর না থাকার কারণে দেশে যানজট, জলজট, বর্জ্যজট এবং মানবজট চরম আকার ধারণ করেছে।
আমরা নিজের দোষেই নিজে মরছি। দেশের চেয়ে বেশি ভাবছি নিজেকে নিয়ে। আসলে আমরা অদূরদর্শী। রাষ্ট্র ভালো থাকলে যে গোটা রাষ্ট্রের মানুষ ভালো থাকে- আমরা অবিবেচক বলে এ সত্যতা বুঝতে চাচ্ছি না। পৃথিবীর ১৯৪টি রাজধানী শহরের মাঝে ঢাকার অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এ তথ্য প্রকাশ করেছে। ঢাকার সৌন্দর্য ৭১-এর আগের চেয়ে নিম্নমানের হওয়ার পেছনে কারণগুলো নিয়ে সরকার শুধু কথাই বলেছে- কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।
ঢাকার কোটি মানুষ মাত্র পৌনে চার শত বর্গ কিলোমিটার এলাকায় বাস করছেন। একটি দেশে যত লোক বাস করে না- তা যদি একটি শহরে বাস করে তাহলে সেই দেশের রাজধানী কিভাবে পরিবেশবান্ধব হবে? বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডা- সেই কানাডার লোকসংখ্যা মাত্র সাড়ে তিন কোটি। নতুন ঢাকার মেগা পরিকল্পনার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও অবৈধ পথে ক্ষমতায় এসে কয়েকবারই বলেছিলেন, ঢাকার চিত্রকে পাল্টিয়ে দেবো। একটি বেড়িবাঁধ ও কিছু রাস্তা সংস্কার হয়েছে বটে কিন্তু সমস্যার জট কি কমেছে? যদি কমতো তাহলে ঢাকার আজকের চেহারাটা এতো কদর্য হলো কেন। একটি সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে যদি আরেকটি সমস্যার সৃষ্টি হয়, তাহলে বুঝতে হবে- পরিকল্পনার মধ্যে কোনো সমন্বয় ছিল না। যেমন ধরুন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা রাজধানী ঢাকার রাস্তার পাশে ফেলে রাখা বিশাল ভাগাড়ের কনটেইনারগুলো রাস্তার প্রসারতা কমাচ্ছে- অন্য দিকে দুর্গন্ধ ও দূষিত বায়ু ছড়াচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দীর্ঘ ৪০ বছর কোনো সরকারই করতে পারেনি। এলাকাভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যা দিয়ে সার তৈরি করা যায়- এ রকম কিছু সরকার গড়ে তুলতে পারেনি। এ কারণে ঢাকা আবর্জনার শহরে রূপ নিয়েছে।
জলাবদ্ধতার মূল কারণ নালা-নর্দমা-জলাশয়, খাল ভরাট করে বাণিজ্যে মেতে ওঠা, যা ঢাকাবাসীকে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। পয়ঃনিষ্কাশন, ড্রেনেজ সিস্টেম এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এখনো আধুনিকায়ন করা হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি কাজ স্বল্পমেয়াদি টার্গেট নিয়ে করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে কাজটির টেন্ডার বারবার সিটি করপোরেশন বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া যাবে না। কাজটি নিম্নমানের, কারণ কম খরচে সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু বিলে দেখানো হয় বড় অঙ্কের হিসাব। এভাবেই আমরা সঙ্কীর্ণ স্বার্থে জনস্বার্থকে উপেক্ষা করছি। জনস্বার্থের কাজটি যখন বাণিজ্যে রূপ নেয় তখন জনগণ ও রাষ্ট্র বঞ্চিত হবে।
ঢাকাকে মেগাসিটি করতে নাকি মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেস ওয়ে, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট, কয়েকটি নতুন ফ্লাইওভার, ঢাকার চার পাশে ২৪ কিলোমিটার নৌরুট নির্মাণের মহাপরিকল্পনার কথা বলছে সরকার। কিন্তু কোনো পরিকল্পনাই অদ্যাবধি পানিজট, যানজট ও মানবজট থেকে ঢাকাকে মুক্ত করতে পারেনি। বাপদাদার আমলে শোনা প্রবাদ বাক্যটি যে সত্য- সেটা বিশ্বাস করতে হয়। অর্থাৎ, যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। একসময়ে ঢাকায় খেলার মাঠ ছিল, খোলা জায়গা ছিল। ফুটপাথে হাঁটা যেত। সারা দিন বৃষ্টি হলেও ঢাকায় জলাবদ্ধতার দৃশ্য দেখা যায়নি। এখন কোনো খাল নেই- যা-ও দু-একটি ছিল সেগুলো ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ১ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে পুরো ঢাকা শহর বলতে গেলে প্রায় সাড়ে তিন শত বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত। বুকসমান পানি ঢাকার কোনো কোনো স্থানে। কেন এর নেই কোনো প্রতিকার?
৪৪ বছরে জনসংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। কিন্তু ভূখণ্ড এক ছটাকও বাড়েনি। আবাদি জমি কমেছে স্ফীত জনসংখ্যার কারণে। খাল, বিল, জলাশয়, নদী কমেছে। মানবসৃষ্ট পরিবর্তনের কারণে পরিবেশেরও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ঢাকা সিটি এসব বিপর্যয়ের কেন্দ্রভূমি। যে শহরে মানুষ বেশি- সেই শহর দূষণমুক্ত রাখা কঠিন। সুতরাং সরকারের মেগাসিটি পরিকল্পনা অতীতের মতো মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। ঢাকার অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ যেকোনো উপায়ে রোধ করতে হবে। ঢাকা শহরে মানুষ কেন আসছে- সেটা চিহ্নিত করে এরপর এর সমস্যার পথ খুঁজতে হবে। এককথায় বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ঢাকাকেন্দ্রিক বড় বড় অফিস, কলকারখানা, আবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক ভবন, সেক্রেটারিয়েট ভবন যেখানে দৈনিক ৩০ থেকে ৪০ হাজার মানুষ আসে, আদালতপাড়া, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি অপসারণ করতে হবে। নগরীর বাইরে এসব সরিয়ে নিতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে ব্যক্তিগত ও সরকারি পরিবহন বাড়ছে এবং মূল সড়ক পথকে গাড়ি পার্কিং হিসেবে ব্যবহার করছে। যানজট ও মানবজট বাড়ার মূল কারণ এগুলো। ঢাকার ধানমন্ডি মাঠ, ওসমানী উদ্যান ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান- এসব উদ্যানও এখন বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। বড় বড় ইমারত, অফিস কাম শপিং কমপ্লেক্সের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রাখা হয়েছে খেলার মাঠের পাশে।
শিশুদের খেলার মাঠও কর্তৃপক্ষ ‘খেয়ে ফেলেছে’। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন (Neat and clean) শহরের মুখরোচক শব্দ আওড়াবেন, আবার নিজেরাই ঢাকাকে কিভাবে শ্বাসরুদ্ধকর, ভাগাড় ও আবর্জনার শহরে রূপ দেয়া যায়- এর অনুমোদন দেবেন রাজউক ও সিটি করপোরেশনের কর্তৃপক্ষের সহায়তায়। তাহলে তো মেগা সিটির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হবেই। জরিপে স্পষ্ট উল্লেখ আছে- ঢাকার বর্তমান আয়তন হিসাবে লোকসংখ্যা এক কোটিই যথেষ্ট। এর বেশি জনসংখ্যা হয়েছে বলেই যান, জল ও মানবজট বেড়েছে ঢাকায়। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে মেগা সিটির পরিকল্পনার আগে বিকেন্দ্রীয়করণ পদক্ষেপ নিতে হবে। ঢাকাকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারের পাশাপাশি জনসচেতনতার উপায় বাতলিয়ে দিতে হবে। ঢাকাকে নিয়ে বাণিজ্য করতে গিয়ে আমরা ঢাকাকে অসুস্থ নগরীতে পরিণত করেছি। রাষ্ট্রকে নিয়ে বাণিজ্য, রাজধানীকে নিয়ে বাণিজ্য- যারা করেছে তারা দেশের কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর নয়। এ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর সে বচনটি যথার্থ বলেই মনে হলো- মানুষ পায় সোনার খনি, আমি পেয়েছি চোরের খনি।
লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক ও কলামিস্ট

Wednesday, October 14, 2015

রাজধানীর এ কী হাল by খালিদ সাইফুল্লাহ

বৃষ্টিতে গতকাল নয়াপল্টন থেকে ফকিরেরপুলমুখী
সড়কে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এতে যানবাহন ও
পথচারীদের পোহাতে হয় দুর্ভোগ : নাসিম সিকদার
অসময়ের হঠাৎ বৃষ্টিতে জনজীবনে চরম ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। সিটি করপোরেশন, ওয়াসার নানা পরিকল্পনা ও যন্ত্র আনার গল্প নগরজীবনে উন্নতির কোনো ছাপ ফেলতে পারছে না; বরং চিরচেনা দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। বৃষ্টির পানির সাথে ড্রেনের দুর্গন্ধময় পানি একাকার হয়ে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে নানা রোগব্যাধি। বৃষ্টির সাথে যানজট একে অপরের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। আধা ঘণ্টা পথ অতিক্রম করতেই পার হয়ে যাচ্ছে তিন ঘণ্টা। তবে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনের দাবি গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কোথাও পানি জমেনি।
এ বছর এমনিতেই পুরো বর্ষা মওসুম জুড়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। যা অন্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি। তার ওপর আশ্বিনের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করেই মওসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সোমবারের পর গতকালও সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত কখনো হালকা আবার কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আর এতেই রাজধানীর চিরচেনা রূপ আবারো হাজির হয়েছে। যে সড়কেই যাওয়া যায় সেখানেই পানি জমে রয়েছে। ড্রেন তো আগেই ভর্তি ময়লা আবর্জনায়, তাই বৃষ্টির পানি যাওয়ার কোনো পথ নেই। এ কারণে এক একটি সড়কই যেন পরিণত হয়েছে বড় ড্রেনে। অলি-গলি থেকে মূল সড়ক সর্বত্রই পানি থই থই করছে। এতে চলাচলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে নগরবাসীকে।
সরেজমিন দেখা যায়, কাকরাইল, শান্তিনগর, বিজয়নগর থেকে ফকিরাপুল-আরামবাগ-মতিঝিল এলাকায় সড়কে হাঁটু পানি জমে। এতে যানবাহন আটকে পড়ে। সৃষ্টি হয় যানজটের। জলাবদ্ধতার কারণে অনেকগুলো সিএনজিচালিত অটোরিকশা রাস্তায় বিকল হয়ে পড়ে। অটোরিকশা পরিবর্তন করে অনেককে গন্তব্যে যেতে হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে দেখা গেছে। মগবাজার, মৌচাক হয়ে মালিবাগ রেলগেট, রামপুরা ব্রিজ, মেরুল বাড্ডা, মধ্যবাড্ডা এলাকায় হাঁটু পানি জমে যায়। জমে যাওয়া পানির কারণে অটোরিকশা ও অন্য যানবাহন রাস্তায় আটকে পড়ে। মধ্যবাড্ডায় রাস্তার ওপর ময়লার ভাগাড় পানিতে মিশে সড়কে চলাচলকারী যাত্রীদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দেয়।
মালিবাগ থেকে রাজারবাগ হয়ে কমলাপুর সড়কেও পানিতে থই থই করতে থাকে। নর্দ্দা, কালাচাঁদপুর থেকে বারিধারা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কে হাঁটু পরিমাণ পানি জমে যায়। এতে যানবাহন আটকে পড়ে। দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। রিকশায় বাড়তি ভাড়া দিয়ে অনেককে অফিস ও কর্মস্থলে যেতে দেখা গেছে। উত্তরার এয়ারপোর্ট সড়ক, জসীমউদ্দীন রোড, গুলশান-বনানী, মহাখালী ফাইওভারের নিচে, আইসিসিডিডিআরবি থেকে মহাখালী বাসস্টান্ড পর্যন্ত হাঁটু পানি জমে যায়। পানির সাথে রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা মিলে দুর্ভোগে পড়েন পথচারীরা।
কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকার সব সড়ক ও স্টেশনের প্রবেশমুখ হাঁটু পানিতে তলিয়ে যায়। পানি দ্রুত নেমে না যাওয়ায় যাত্রীরা চরম বিড়ম্বনার শিকার হন। ভিক্টোরিয়া পার্ক থেকে সদরঘাট টার্মিনাল পর্যন্ত, ঢাকা মেডিক্যালের সামনে রাস্তা, গুলিস্তান গোলাপ শাহ মাজারের সামনে পানি জমে যায়। মিরপুরের বিভিন্ন সড়কে বৃষ্টির পানি দেখা যায়। বৃষ্টির পানিতে নিউমার্কেটের নিচতলার অধিকাংশ দোকানপাট তলিয়ে যায়। কোথাও কোথাও হাঁটু পানি উঠে যায়। নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। এ মার্কেটের বহু দোকানিকে বৃষ্টি থেকে তাদের জিনিসপত্র রার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। নিউমার্কেট এলাকার ফুটপাথের হকারদের দোকানপাটও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়। সাইন্স ল্যাব থেকে নিউমার্কেট হয়ে বলাকা পর্যন্ত এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন ক্রেতা, বিক্রেতা ও যাত্রীরা। শহীদ মিনার এলাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন সড়কও পানিতে তলিয়ে যায়। তৌহিদুর রহমান নামে এক রিকশাযাত্রী জানান, রাস্তায় পানি থাকায় চলতে গিয়ে ব্যাপক সমস্যায় পড়তে হয়। কোথায় গর্ত আছে তাও বোঝা যায় না। এজন্য অনেক সাবধানে চলতে হয়েছে। আবার অনেকে সাবধান হলেও চোরা গর্তে পড়ে রাস্তায় কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে গেছেন।
সড়কে পানি জমে যাওয়ায় গণপরিবহন, রিকশাসহ সব ধরনের যানবাহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। যানজটে পড়ে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে যাত্রীদের। রেজা করিম নামে এক যাত্রী জানান, মগবাজার থেকে ৬ নম্বর বাসে পল্টন আসতেই তার তিন ঘণ্টা লেগে গেছে।
জলাবদ্ধতা দূর করতে দুই সিটি করপোরেশন সম্প্রতি দফায় দফায় মতবিনিময় সভা করেছে। বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ার কথা শোনা গেছে। উত্তর সিটি করপোরেশন সম্প্রতি ঘটা করে জেড অ্যান্ড সাকার মেশিন নিয়ে এসেছে। যা দিয়ে খুব দ্রুত পানি অপসারণ করা যায় বলে তাদের দাবি। কিন্তু এসব কিছুই কাজে আসছে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টির পানি জমে থাকছে বিভিন্ন সড়কে। তবে এটি মানতে চান না উত্তর সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বি এম এনামুল হক। তার দাবি বৃষ্টি হলেও উত্তর সিটির কোথাও গতকাল পানি জমেনি। একই ধরনের অভিমত ঢাকা ওয়াসারও। ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল আলম চৌধুরী জানান, গতকাল রাজধানীর কোনো সড়কেই পানি জমেনি। পাম্পের মাধ্যমে পানি অপসারণ ছাড়াও ওয়াসার কর্মচারীরা পানি অপসারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়ায় পানি জমতে পারেনি বলে তার দাবি।

Tuesday, October 13, 2015

১ ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাজধানী অচল

এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় ঢাকার বেশির ভাগ রাস্তা। হাঁটুপানি থেকে কোথাও কোথাও কোমর পর্যন্ত পানি হয়েছে। ড্রেনগুলো বন্ধ থাকায় ময়লা-নোংরা পানিতে একাকার ছিল রাস্তাগুলো। বেশ কিছু রাস্তায় স্যুয়ারেজের ময়লা পানি উপচে পানির সাথে মিশে যায়।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে আকাশে মেঘ জমতে শুরু করে। সকাল ১০টায় বৃষ্টিপাত সূচিত হয়। প্রথমে মনে হয়েছিল এই বৃষ্টি কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি থেমে যাবে। না, সে আশায় গুড়ে বালি। বেলা দেড়টা থেকে দুইটা পর্যন্ত একনাগাড়ে বৃষ্টি হয়েছে। এরপর সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরতি ছিল। সন্ধ্যার পর আবার প্রবল বর্ষণ শুরু হয় ঢাকায়।
ময়লা-নোংরা ও দুর্গন্ধে একাকার ছিল পরিবেশ। আশ্বিনের শেষ সময়ে এ ধরনের ভারী বর্ষণ প্রত্যাশিত ছিল না। সাধারণত এ সময়ে হালকা ধরনের বৃষ্টি হয়ে থাকে। শরতের শেষ দিকে এ ধরনের ভারী বর্ষণের নজির খুব বেশি নেই। আবহাওয়া অফিস চলতি মাসের প্রথম দিক থেকেই দক্ষিণ-পূর্ব মওসুমি বায়ু দেশের উত্তর ও মধ্যভাগ থেকে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিলেও এখনো তা অব্যাহত রয়েছে দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, হঠাৎ বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সক্রিয় হয়ে ওঠায় মওসুমি বায়ুপ্রবাহ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বায়ু ভূভাগের দিকে প্রচুর জলীয়বাষ্প নিয়ে আসছে। এটি প্রবল বর্ষণের কারণ হয়েছে।
ভারী বর্ষণে গতকাল দুপুর ১২টার পর থেকে পুরো ঢাকা যেন আরো স্থবির হয়ে পড়ে। যানবাহনগুলো গন্তব্যে পৌঁছার জন্য দ্রুত চলতে শুরু করে। ইন্টারসেকশনগুলোতে বিপরীতমুখী যানবাহন একই সাথে চলতে গিয়ে শুরু হয়ে জট। সবাই শুধু আগে যেতে চায়। এই প্রতিযোগিতায় গাড়িগুলো থেমে যায় ইন্টারসেকশনগুলোতে। একটা সময় কেউই সামনে এগোতে পারছিল না। যানজট নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়েছে। রিকশাওয়ালাদের সামলানো আরো কঠিন ছিল। রিকশাওয়ালারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলতে চান না। একটু ফাঁকফোকর পেলেই সামনে বাড়তে শুরু করেন। ফলে যানজটের তীব্রতা বাড়ে।
গতকাল ঢাকার অনেক স্কুলে পরীক্ষা চলছিল। স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দেখা যায় বৃষ্টির মধ্যেই ভিজে স্কুলে যেতে। রিকশাওয়ালাদের আকাশছোঁয়া ভাড়া হাঁকানোয় ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকেরা হতাশ হয়ে বৃষ্টিতে ভিজেই স্কুলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রবল বর্ষণে রাজধানীতে যানজটের সাথে জনদুর্ভোগও শুরু হয় বেশ। ঢাকায় বাংলামোটর থেকে মগবাজার-মালিবাগ হয়ে শান্তিনগর পর্যন্ত এবং মৌচাক থেকে রামপুরার দিকে যেতে চৌধুরীপাড়া পর্যন্ত প্রধান রাস্তায় ফাইওভার নির্মাণকাজ চলছে। এ রাস্তার বেশির ভাগ দখল করে আছে নির্মাণসামগ্রী। এ ছাড়া পিলার নির্মাণের জন্য বিশাল বিশাল গর্ত খোঁড়া হয়। ফলে এসব গর্তের ময়লা ছড়িয়ে পড়ে আশপাশে। এ ছাড়া দীর্ঘ দিন থেকে আবাসিক এলাকার রাস্তাগুলো সংস্কার না হওয়ায় সেগুলো খানাখন্দে ভরে গেছে।
নিম্নাঞ্চলের পানি নিচের দিকে যাওয়ায় রাস্তার নিচে অনেকের ঘরে ও দোকানপাটে প্রবেশ করে প্রচুর ক্ষতি করে। দোকানে ঢুকে যাওয়ায় পানিতে নষ্ট হয় এমন পণ্যগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।
আবহাওয়া অফিসের কর্তব্যরত আবহাওয়াবিদ জানান, বৃষ্টি সারা দেশে ঘটেনি। কেবল দেশের মধ্যাঞ্চল, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে হয়েছে। এসব অঞ্চলে এখনো মওসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে। আবহাওয়া অফিস আবারো জানায়, সামনের দুই দিনের মধ্যে বৃষ্টি কমে যাবে এবং আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে দেশের অবশিষ্ট অঞ্চল বিরাজমান মওসুমি বায়ুমুক্ত হবে। গত রোববার ভারতের হিমালয় অঞ্চলে এক স্থল লঘুচাপ বিরাজ করছিল। গত বিকেল থেকে সাগরে লঘুচাপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অক্টোবরের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ মাসে বঙ্গোপসাগরে দু’টি নিম্নচাপের সৃষ্টি হতে পারে; যা থেকে কমপক্ষে ঝড় হতে পারে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও পাশের এলাকায় ঘূর্ণায়মান লঘুচাপটি আরো শক্তিশালী হবে কি না অথবা এটি থেকে কোনো নিম্নচাপের সৃষ্টি হবে কি না সেটি বলার সময় এখনো আসেনি।

Monday, September 21, 2015

‘ঢাকা আইসিইউ’র রোগীর মতো’

‘নগর ঢাকায় যানজট: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় খোদ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক মেগা এই সিটিকে আইসিইউ রোগীর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে ঢাকা শহরের অবস্থা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউতে) থাকা রোগীর মতো। এর ডাক্তার হচ্ছেন মেয়র, যিনি কখনও ডাক্তারি পড়েননি।
গতকাল শরতের বর্ষণসিক্ত সকালে নগরীর রাস্তাগুলো যখন তলিয়ে ছিল, যানজটে আটকা পড়েছিল হাজার হাজার গাড়ি, ঠিক তখন বনানীর হোটেল সেরিনায় ‘নগর ঢাকায় যানজট: উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক চলছিল। বৈঠকে  প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। আলোচনায় অংশ নেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা, ঢাকার দুই মেয়র আনিসুল হক এবং মো. সাঈদ খোকন, মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার গোলাম ফারুক এবং চার নগর বিশেষজ্ঞ। 
বৈঠকে মেয়র আনিসুল হক বলেন, রোগীকে বাঁচাতে হবে। রোগী মরে যাচ্ছে, আমরা শুধু গবেষণা করছি, তা হবে না। ঢাকাকে বাঁচাতে জরুরি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। সমস্যার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। তিনি বলেন, সবাই বলে ফুটপাথ থেকে হকার তুলে দেন। রাস্তা দখলমুক্ত করেন। কিন্তু বলা যত সহজ, করা  তত সহজ নয়। কারণ তারা টাকা দিয়ে বসেছেন। তাদের পেছনে অনেক শক্ত হাত আছে। উত্তর সিটি মেয়র বলেন, সমস্যার মধ্যেই আমরা কাজ শুরু করেছি। নগরীর বিত্তবানরাও আমাদের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন। তারা বলছেন, উদ্যোগ নিতে, ফান্ডের  সমস্যা হবে না। এ সময় তিনি বিভিন্ন সড়কে ইউলুপ নির্মাণ করার জন্য কিছু জমি চান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর কাছে। সেতুমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ জমি দেয়ার আশ্বাসও দেন। যানজট ও জলজটকে রাজধানীর প্রধান দুই সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, এ সব নিয়ে আমরা প্রায়ই আলোচনা করি। এখন অ্যাকশন দেখাতে চাই। কিছু কাজ দেখাতে  চাই। তিনি বলেন, যানজট নিরসনের দায়িত্ব ডিএমপি’র। তবে সিটি করপোরেশন এতে নেতৃত্ব দিতে চায়, ভূমিকা রাখতে চায়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার  গোলাম ফারুক বলেন, অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ, রাস্তা ভাঙা, উন্নয়নকাজে রাস্তা বন্ধ থাকা, বিপরীত থেকে আসা গাড়ির কারণে যানজট কমছে না। আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকার দুই মেয়রের উদ্দেশে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, এক ঝুড়িতে এত ডিম রাখলে হবে না। আপনারা আগে ছোট পরিকল্পনা নিন, বাস্তবায়ন করেন। রাস্তা দখলমুক্ত করেন। সবাই ভালো ভালো কথা বলে। কিন্তু অ্যাকশন নেই। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ, বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।  এতে যানজট সমস্যা  সমাধানে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা  তুলে চারটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রদর্শনীতে ঢাকার যানজটের কারণ, উত্তরণের উপায়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। তথ্যচিত্রে জানানো হয়, ২০১৩ সালে মোট যানবাহনের মধ্যে ঢাকায় চলাচলকারী মানুষের মাত্র ছয় শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন। অথচ এই গাড়িগুলো সড়কের ৮০ শতাংশ জায়গা জুড়ে থাকে। বৈঠকে নগর বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম, তানভীর নেওয়াজ, অধ্যাপক মোয়াজ্জেম হোসেন, স্থপতি ইকবাল হাবীব, উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিএম এনামুল হক বক্তব্য রাখেন।

Sunday, September 20, 2015

সড়ক মেরামতের ৩৫০ কোটি টাকা গেল কোথায়? by আহমেদ জামাল

মেগাসিটি ঢাকার রূপ যেন বদলে গেছে। যেন খানাখন্দ আর গর্তের শহর। ঘর থেকে পা বাড়ালেই গর্ত। দক্ষিণের যাত্রাবাড়ী থেকে উত্তরে উত্তরা, পূর্বে বাসাবো থেকে পশ্চিমে গাবতলী সর্বত্রই একই অবস্থা। অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি তার ওপর মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে রাস্তার কার্পেটিং, পাথরকুচি, ইট উঠে গিয়ে নাজুক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যানবাহন চলতে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে বিকল হয়ে পড়ছে। যখন তখন ঘটছে দুর্ঘটনা। সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। অথচ গত অর্থ বছরে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার রাস্তা মেরামতের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। এবারও দুই অংশ মিলে বরাদ্দ দেয়া আছে ৩৬৬ কোটি টাকা। বছর বছর বিপুল পরিমাণ টাকা ব্যয়ের পর রাজধানীর রাস্তাঘাটের তেমন কোন উন্নতি দৃশ্যমান নয়। প্রশ্ন উঠেছে রাজধানীর রাস্তাঘাটের উন্নয়নের এত টাকা গেল কোথায়। ভুক্তভোগীদের মতে, নগরবাসীকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকি, বিড়ম্বনা ও কষ্টকে সঙ্গী করেই রাস্তায় নামতে হচ্ছে। নাগরিকের এই ভোগান্তির শেষ কোথায়? গত কয়েকদিনে রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, কুড়িল, বাড্ডা, রামপুরা, মালিবাগ, মগবাজার, খিলগাঁও, বাসাবো, মুগদাপাড়া, মানিকনগর, যাত্রাবাড়ী, পুরান ঢাকার বিভিন্ন রাস্তা, মতিঝিল, শাহজাহানপুর, শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরের বিভিন্ন রাস্তাঘাট সরজমিনে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভাঙাচুরা রাস্তাঘাট মেরামতের জন্য গত অর্থ বছরে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই টাকার মধ্যে উত্তরের জন্য প্রায় ১৫০ কোটি আর দক্ষিণের জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়। উত্তর সিটি তাদের বরাদ্দকৃত টাকার প্রায় ১২৫  কোটি আর দক্ষিণ সিটি তাদের বরাদ্দকৃত টাকার চেয়েও বেশি টাকা খরচ করেছে। তবুও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের রাস্তা এখন স্মরণকালের ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন ভুক্তভোগীরা। এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী হাবিবুর রহমান বলেন, বৃষ্টির পানি জমার কারণে রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে বেশি। আমরা জরুরি ভিত্তিতে গর্ত মেরামত করার চেষ্টা করছি। প্রতিদিন আমাদের কর্মীরা বিটুমিন আর পাথর মিশিয়ে রাজধানীর রাস্তাঘাটের গর্ত ভরাট করে চলাচলের উপযোগী রাখার চেষ্টা করছে। তবে স্থায়ীভাবে মেরামতের ব্যাপারে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে সে ব্যাপারে মেয়র ভাল বলতে পারবেন। তিনি বলেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আর্থিক সংকট প্রকট। মেয়র এই সংকট কাটিয়ে উঠার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। ওদিকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী নুরুল আমিন বলেন, এ সিটি করপোরেশনের রাস্তাঘাটের উন্নয়নে আড়াই শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যথা শিগগির কাজ শুরুর চেষ্টা চলছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে আশাকরি অল্প সময়ের মধ্যে কাজ শুরু করা যাবে। ওদিকে এই সিটির প্রথম সারির ঠিকাদার আলতাফ হোসেন দুলাল বলেন, রাস্তাঘাট উন্নয়নে ইতিপূর্বে ঠিকাদারদের কমপক্ষে ২০০ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। বকেয়া টাকা না পেলে ঠিকাদাররা কাজ করবেন কি দিয়ে। তিনি বলেন, ব্যাংক লোন নিয়ে আমরা কাজ করেছি। কিন্তু এখন  ব্যাংকের দেনা শোধ করতে পারছি না। দেনার দায়ে সিটি করপোরেশন হিমশিম খাচ্ছে। প্রসঙ্গত, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিদায়ী দুই প্রশাসকের বিরুদ্ধে ২০০ কোটি টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠে।  এতে বলা হয় কাজ না করে বিল নেয়া, রাস্তা ঠিক থাকলেও খারাপ দেখিয়ে প্রকল্প নেয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এতে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ঠিকাদারদের বিল প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা বকেয়া পড়ে থাকে। প্রশাসক ও প্রকৌশলীদের অনেকেই আগাম প্রকল্প নিয়ে দরপত্র আহ্বান এবং কার্যাদেশ দিয়ে অগ্রিম কমিশন নিয়েছেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত ১৬ই জুনের বৈঠকে এসব অনিয়ম নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটি অনিয়ম তদন্তের জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করে। ১৬ই জুনের বৈঠকে সভাপত্বি করেন কমিটির সভাপতি আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে রাস্তা রয়েছে প্রায় ২১১৯.৭৪৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে উত্তরে আছে ১৩৩৭.৯১৩ কিলোমিটার এবং দক্ষিণে ৭৮১.৮৩৬ কিলোমিটার। ঢাকায় বড় বড় যানবাহন চলাচল করতে পারে এমন প্রধান সড়ক (প্রাইমারি, সেকেন্ডারি ও সংযোগ) রয়েছে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণের বড় সড়ক ১৫৮ কিলোমিটার। বাকি প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার রাস্তা সরু-সংকীর্ণ। ঢাকার ২১১৯ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে কমপক্ষে ১০০০ কিলোমিটার রাস্তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। এই খারাপ রাস্তাগুলোর বেশির ভাগই ঢাকা দক্ষিণে পড়েছে। তবে প্রধান সড়কগুলোর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের পথ গণভবন থেকে সংসদ ভবন হয়ে ফার্মগেট, কাওরান বাজার, শাহবাগ হাইকোর্ট হয়ে আবদুল গনি রোডের অবস্থা ভাল রয়েছে।
সূত্র জানায়, ঢাকা সিটি করপোরেশন দক্ষিণের ‘মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের’ নিচের রাস্তা সংস্কার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে ইতিমধ্যে ৭৯ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। সংস্কার করা হয়েছে কেবল কাগজে-কলমে। বর্তমান রাস্তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। আবার এই রাস্তা সংস্কারের নামে চাওয়া হয়েছে ২০ কোটি টাকা। গত বর্ষা মওসুমে হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা সংস্কারের নামে ৭২ কোটি টাকা খরচ করা হয়। রাস্তার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য খরচ করা হয় ৭ কোটি টাকা। এই উন্নয়ন খরচ ঠিকাদারকে সম্পূর্ণ পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু রাস্তার যে ভয়ঙ্কর দশা ছিল তা-ই আছে। বৃষ্টিতে পানি জমে রাস্তার বিভিন্ন অংশে গর্ত সৃষ্টি করে রাস্তাকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। রাস্তার এমন বিপজ্জনক অবস্থা যে ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা দিয়ে কোন প্রাইভেটকার চলাচল করতে পারে না। বড় বড় যানবাহন বিশেষ করে বাস ও ট্রাক চলাচল করলেও আচমকা গর্তের মুখে পড়তে হয়। গাড়িগুলো রাস্তার ডিভাইডারের সঙ্গে ধাক্কা খায়। কখনও কখনও রাস্তার মাঝেই গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি এ রাস্তার অবস্থা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সরজমিনে দেখা গেছে, শান্তিনগর-মালিবাগ মোড়ের সড়কের পূর্ব পাশের অংশটিতে বেশ কয়েকটি বড়বড় গর্ত রয়েছে। বৃষ্টি হলেই গর্তসহ পুরো সড়কটি তলিয়ে যায়। পানি জমে থাকলে অনেকেই গর্তের গভীরতা বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে হরহামেশাই এসব গর্তে পড়ে নাস্তানাবুদ হতে হচ্ছে পথচারীসহ গাড়ি চালকদের। যদিও গাড়িগুলো যাতে খাদে না পড়ে সে জন্য বেশ কিছু গর্তে গাছের ডাল কিংবা বাঁশ দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। শুধু শান্তিনগরের এই সড়কটিই নয়, রাজধানীর মহাখালী, নাবিস্কো, সাতরাস্তা, এফডিসি মোড়, মগবাজার, মৌচাক, মালিবাগ ও কাকরাইল সড়কের অধিকাংশ স্থানের একই অবস্থা। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব রাস্তায় তৈরি হয়েছে ছোট বড় বহু গর্ত। বর্ষার পানি আর গাড়ির চাকার ঘর্ষণে এসব গর্ত সৃষ্টি হচ্ছে। তা ছাড়া ওয়াসা, বিদ্যুৎ, তিতাস গ্যাস ও টেলিফোন বিভাগসহ নানা উন্নয়ন সংস্থার অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ির কারণেই এ দুর্ভোগ চরমে ওঠে। মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার নির্মাণকাজ চলায় এ এলাকার সড়কগুলোর অবস্থা খুবই বেহাল। বিশেষ করে মগবাজার, ইস্কাটন, এফডিসির সামনের সড়ক, সাতরাস্তার মোড় ও এর আশপাশের রাস্তার অবস্থা খুবই করুণ। রাস্তার বেহালদশার কারণে দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। রাস্তার ওপর যখন-তখন বিকল হয়ে পড়ছে গাড়ি। মগবাজার থেকে সাতরাস্তার মোড়ের দিকে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলায় এখানকার রাস্তায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে বৃষ্টি না হলেও নির্মাণ কাজের  পানি জমে কাদামাটিতে একাকার হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও গাড়ির চাকা ঘুরানো সম্ভব হয় না। তা ছাড়া একটু গতিতে গাড়ি ছাড়লেই রাস্তার ময়লা-কাদাপানি গিয়ে পড়ে পথচারীদের গায়ে। এ বিষয়ে ডিএসসিসির মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, ওয়াসার উদাসীনতার কারণেই সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যাচ্ছে। মূলত জলাবদ্ধতার কারণে সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামত করার জন্য তালিকা তৈরি করেছি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো মেরামত করা হবে। এর আগে একাধিকবার মগবাজার মৌচাক-মালিবাগ সড়কটি পরিদর্শন করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি সড়ক মেরামতের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখনও বিদ্যমান পুরনো সেই দুর্ভোগ। ওদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নতুন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কামরাঙ্গীরচর এলাকা। প্রায় এক বছর হয়ে গেলেও এখনও কামরাঙ্গীরচরের রাস্তা সংস্কারে হাত দেয়নি সিটি করপোরেশন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের পূর্ব আগারগাঁওয়ের রাস্তায় বড় বড় গর্ত হয়ে আছে। মিরপুর-১০ থেকে ১৪ নম্বর সেকশন পর্যন্ত সড়কটি সম্প্রতি প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামত করা হলেও সড়কটির দুই পাশে পাইপলাইন বসাতে বড় বড় গর্ত করে ঢাকা ওয়াসা। এসব গর্তের কারণে সড়কটির আশপাশে থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীরা মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, নগরীতে ২ লাখ যান চলাচলের সক্ষমতা রয়েছে। অথচ চলাচল করছে ১০ থেকে ১১ লাখ গাড়ি। এতে স্বাভাবিক কারণে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মেরামত কাজও টেকসই হচ্ছে না। এর বাইরে আছে বিভিন্ন সংস্থার উন্নয়ন কাজের সমন্বয়হীনতা। তিনি বলেন, রাজধানীর বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে রাস্তার সক্ষমতা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সমন্বয়, পানি নিষ্কাশনের বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে।

Monday, September 14, 2015

ঢাকার খসড়া পরিকল্পনায় আপত্তি মেয়রদের

রাজউক মিলনায়তনে গতকাল ‘ঢাকার খসড়া কাঠামো
পরিকল্পনা’ শীর্ষক সেমিনারে (বাঁ থেকে) ঢাকা দক্ষিণ
সিটির মেয়র সাঈদ খোকন, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী
মোশাররফ হোসেন, ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র
আনিসুল হক ও নারায়ণগঞ্জ সিটির মেয়র
সেলিনা হায়াৎ আইভী l প্রথম আলো
ঢাকার নতুন কাঠামো পরিকল্পনাকে (ডিএসপি) অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করেছেন চার সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, এ পরিকল্পনা প্রণয়ন-প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এ পরিকল্পনা বাস্তবমুখী হয়নি। ঢাকার সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে রাজউকের সঙ্গে সিটি করপোরেশনের যে সমন্বয় প্রয়োজন, তার প্রতিফলন এখানে নেই।
২০১৬ সাল থেকে পরবর্তী ২০ বছরের জন্য ঢাকার খসড়া কাঠামো পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার জন্য দুই দিনব্যাপী এক সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের মেয়ররা এসব কথা বলেন। গতকাল রোববার সকালে রাজউক মিলনায়তনে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরে সেমিনারে অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীরাও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেয়রদের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলেন, এ খসড়া পরিকল্পনাকে নতুন পরিকল্পনা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এটিকে বড়জোর পুরোনো পরিকল্পনার একটি পর্যালোচনা বলা যেতে পারে, যা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর করার বা হওয়ার কথা।
ঢাকার উন্নয়নে প্রথম মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয় ১৯৬০ সালে। সর্বশেষ ১৯৯৫ সালে নেওয়া হয় ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি)। ২০১৫ সালে তারও মেয়াদ শেষ হবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাজউক এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় ‘নগর উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় খসড়া পরিকল্পনা করে, যার মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত। রাজউকের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোরিয়ার সামান করপোরেশন ও হান আ আরবান রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশের ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট লিমিটেড ও শেল্টেক্ (প্রা.) লিমিটেড যৌথভাবে নতুন এ কাঠামো পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করেছে।
এ পরিকল্পনার খসড়ায় বলা হয়, ২০১১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল দেড় কোটি, ২০৩৫ সালে তা দাঁড়াবে ২ কোটি ৬০ লাখ। এই জনসংখ্যা মাথায় রেখেই সেবা সংস্থাগুলোর প্রসার ও বিন্যাসের কথা চিন্তা করা হয়েছে। পরিকল্পনায় পুরো ঢাকা মহানগরকে ছয়টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। ঢাকা মহানগরকে কেন্দ্র করে প্রতিটি অঞ্চলে বিভিন্ন স্তরের নগর কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এর মধ্যে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রকে ঘিরে গড়ে উঠবে আরও পাঁচটি অঞ্চল। এগুলো হলো গাজীপুর সদর উপজেলা নিয়ে হবে উত্তরাঞ্চল, রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ নিয়ে পূর্বাঞ্চল, নারায়ণগঞ্জ সদর, বন্দর ও সোনারগাঁ নিয়ে দক্ষিণাঞ্চল, কেরানীগঞ্জ নিয়ে হবে দক্ষিণ-পশ্চিম এবং সাভার এলাকা নিয়ে হবে পশ্চিমাঞ্চল। এর বাইরে থাকবে ১৮টি উপাঞ্চলিক এবং ছয়টি বিশেষায়িত এলাকা। খসড়া পরিকল্পনায় চারটি সিটি করপোরেশন—ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর; পাঁচটি পৌরসভা এবং ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার ৭০টি ইউনিয়ন পরিষদকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় বলা হয়, প্রত্যেক অঞ্চলকে স্বয়ংসম্পূর্ণ নগর এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ওই সব অঞ্চলে নাগরিক ও কর্মসংস্থানের সুবিধা বিকেন্দ্রীকরণ করা হবে। ঢাকা শহরে দ্রুতগামী পরিবহনসুবিধা থাকবে। চারদিকে থাকবে বৃত্তাকার সড়ক। মূল শহরের সঙ্গে অঞ্চলগুলোর সংযোগও থাকবে। ভূমি স্বল্পতাকে বিবেচনায় নিয়ে এসব পরিকল্পনা করা হবে। শহরের চারপাশে থাকবে বিশেষায়িত জোন। ট্রানজিট স্টেশনকে কেন্দ্র করে কর্মক্ষেত্রের চারপাশে মানুষের বসতির সুযোগ থাকবে। প্লটের পরিবর্তে ব্লক হাউজিং গুরুত্ব দেওয়া হবে। নদী, খাল, জলাশয়, সংরক্ষণ ও পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য ঠিক রাখা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিকল্পনায় পুরো ভূমি ব্যবস্থাপনাকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এলাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভার এলাকা নগর এলাকার বাইরের ভূমি যেসব জমি আসলে কৃষি থেকে শহুরে আবাসনে রূপান্তরিত হচ্ছে।
গতকালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনও বলেছেন, ঢাকার জন্য বাস্তবমুখী ও গ্রহণযোগ্য কাঠামো পরিকল্পনা করতে হবে। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নও করতে হবে মেয়রদের দিকনির্দেশনা নিয়ে।
রাজউকের চেয়ারম্যান জি এম জয়নাল আবেদীন ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম খসড়া কাঠামো পরিকল্পনার সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আনিসুল হক এ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আগের পরিকল্পনায় কী দুর্বলতা ছিল এবং নতুন করে আপনারা কতটুকু পরিবর্তন করেছেন, তা আপনারা এখানে বলেননি। ফলে শুধু এলাকা বৃদ্ধি ও বাড়তি জনসংখ্যার হিসাব ছাড়া এ খসড়া পরিকল্পনাটি বিদ্যমান পরিকল্পনার চর্বিতচর্বণে পরিণত হয়েছে।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘রাজউকের সমন্বয়হীনতা আমাদের জটিল একটা সমস্যার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা করতে না পারলে ঢাকাকে বাসযোগ্য করা সম্ভব নয়।’
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘তাড়াহুড়োয় টেকসই উন্নয়ন হয় না। আমরা কি শুধু পরিকল্পনা করব, নাকি সেই পরিকল্পনার বাস্তবায়নও করতে হবে?’
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান বলেন, ১৯৯৫ সালে প্রণীত ড্যাপেও অসংখ্য ভুল ছিল। এর জন্য গাজীপুরের মানুষ তখন রাস্তায় নেমেছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর কারিগরি অধিবেশনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে তিনটি নিবন্ধ উপস্থাপন ও তার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ পর্বে আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক আখতার মাহমুদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, এ পরিকল্পনাটি হয়েছে অন্ধের হাতি দেখার মতো। ঢাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন-প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের জনসম্পৃক্ততা নেই। এখানে পেশাজীবীদের যেভাবে অবহেলা করা হয়েছে, তাতে এটি কোনো পরিকল্পনাই হতে পারে না। এ ছাড়া রিহ্যাব ও বিজিএমইএর প্রতিনিধিরাও বক্তব্য দেন।
আজ সোমবার সেমিনারের দ্বিতীয় দিনের কারিগরি অধিবেশনে নতুন কাঠামো পরিকল্পনা নিয়ে আরও চারটি নিবন্ধ উপস্থাপন করবেন বিশেষজ্ঞরা।