Friday, February 21, 2025

দ্য ডিপ্লোম্যাটের নিবন্ধ: শেখ হাসিনাকে কি ফেরত পাঠাতে রাজি হবে ভারত?

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পদত্যাগ করে ভারত পালিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার কথা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে ভারত আসলে তাকে ফেরত পাঠাতে রাজি হবে কিনা তা নিয়ে রয়েছে নানা আলোচনা।

বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্রুয়ারি) সংবাদমাধ্য দ্য ডিপ্লোম্যাটে এ সংক্রান্ত একটি লেখা প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১৩ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম নিশ্চিত করেছেন যে, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সব প্রয়োজনীয় নথিপত্র ভারতে পাঠিয়েছে। প্রয়োজনে এ বিষয়ে স্মারকপত্র জারি করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে বাংলাদেশ।

এর আগে ডিসেম্বরের শেষদিকে একটি মৌখিক নোটে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেয়নি ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি সংযত অবস্থান বজায় রেখেছে এবং বারবার জিজ্ঞাসাবাদ সত্ত্বেও তার অবস্থান কথা জানানো ছাড়া কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে হাসিনাকে ফেরত পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের অধিকার রয়েছে। ২০১৬ সালে এটির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য সংশোধন করা হয়। তবে ভূ-রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে প্রভাব জটিল রয়ে গেছে। ভারত যদি হাসিনাকে প্রত্যর্পণে সম্মত হয়, তবে দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির চিঠি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির কঠোর বাস্তবতা উভয়ের সাপেক্ষে প্রক্রিয়াটি একাধিক পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাবে।

পাঞ্জাবের রাজীব গান্ধী জাতীয় আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত শিক্ষাবিদ ও আইনবিদ ড. সঙ্গীতা তাক বলেন, যদিও কৌশলগত বা পরিভাষাগত বিষয়গুলো মূলত প্রত্যর্পণ চুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং মানবাধিকার বিবেচনা চুক্তিটিকে অবিশ্বাস্যভাবে জটিল এবং সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত করবে।

তিনি বলেন, ভারতে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণের অনুরোধ জমা দেওয়ার মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি শুরু হতে হবে। এতে হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ থাকতে হবে। এছাড়া বিচারিক আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অন্যান্য প্রমাণপত্রাদিসহ সহায়ক নথির একটি শক্তিশালী সমর্থন থাকতে হবে।

তাক আরও জোর দিয়ে বলেন যে, অনুরোধে [নিশ্চিতকরণ] অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে যে, বাংলাদেশে বিচার সুষ্ঠু হবে এবং এটি পক্ষপাতদুষ্ট হবে না।

অন্যভাবে বলতে গেলে কেবল অভিযুক্ত অপরাধের তালিকাভুক্তির বাইরেও, অনুরোধে এই নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে যে, হাসিনাকে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের দ্বারা দূষিত বিচারের সম্মুখীন করা হবে না। ভারতকে প্রত্যর্পণের কথা বিবেচনা করার আগে এটি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই এই প্রয়োজনীয়তা পূরণ করেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে এরপর কী হবে।

আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জমা দেওয়ার পরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ - মূলত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমস্ত চুক্তির বাধ্যবাধকতা পূরণ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শুরু করবে।

তাক ব্যাখ্যা করেছেন, যেহেতু ভারতের সাথে ইতোমধ্যেই একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে, তাই ভারত সরকার চুক্তি অনুসারে প্রত্যর্পণ চুক্তিটি পর্যালোচনা করবে এবং নিশ্চিত করবে যে, প্রত্যর্পণ চুক্তিটি যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে।

এই পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উভয় দেশে আইনত ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কিনা তা নির্ধারণ করা হবে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে এটিও পরীক্ষা করতে হবে যে, কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক, সামরিক বা ধর্মীয় অপরাধের জন্য ছাড়ের মধ্যে পড়ে কিনা। এসব কোনো কারণ মিললে প্রত্যর্পণ অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে ভারত।

প্রাথমিক প্রশাসনিক পর্যালোচনা অনুকূল হলেও, বিষয়টি এখানেই শেষ হবে না। ভারতে প্রত্যর্পণের অনুরোধ পরবর্তীতে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার বিষয় হবে, যেখানে বিশেষায়িত প্রত্যর্পণ আদালতগুলো এর বৈধতা এবং যোগ্যতা যাচাই করবে।

তাক আরও বলেন, ভারত প্রত্যর্পণের বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনাও করবে। প্রত্যর্পণের জন্য তৈরি বিশেষ আদালত প্রত্যর্পণের অনুরোধের বৈধতা এবং যোগ্যতা পরীক্ষা করবে। যদি আদালত দেখে যে রাজনৈতিক মামলার একটি বিশ্বাসযোগ্য হুমকি রয়েছে, তাহলে প্রত্যর্পণ আটকে দিতে পারে।

ভারতের আদালত এবং নির্বাহী শাখা যদি চূড়ান্তভাবে প্রত্যর্পণের সাথে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ হবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা। আর এজন্য উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ হতে পারে স্থানীয় পুলিশ অথবা কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা।

তাক বলেন, তাকে গ্রেপ্তারের পর সম্ভবত একটি নিরাপদ স্থানে রাখা হবে যখন তার প্রত্যর্পণের ব্যবস্থা করা হবে। আইন অনুসারে তাকে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার শেষ পর্যন্ত আটক রাখার অনুমতি দেয়।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : সংগৃহীত

কে জিতবে : ট্রাম্প নাকি বার্তা সংস্থার সম্পাদকীয় নীতি?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই একাধিক বিতর্কিত মন্তব্য এবং সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা সৃষ্টি করেছেন। কখনো গ্রিনল্যান্ড দখল করার হুমকি, কখনো পানামা খাল নিয়ে বিতর্ক, আর কখনো কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্য করার প্রস্তাব- এভাবেই তার মন্তব্য আলোচিত হচ্ছে।

তবে, এখন নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ট্রাম্পের এক সিদ্ধান্ত, যা যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিকতা এবং সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন : ট্রাম্পের নতুন উদ্যোগ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রশাসনকে একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন যে, মেক্সিকো উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ‘গালফ অব আমেরিকা’ রাখা হবে। এই নাম পরিবর্তনকে সমর্থন করলেও আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।

বার্তা সংস্থা এপি তাদের সম্পাদকীয় নীতিতে স্পষ্ট করে জানায়, তারা যেভাবে পৃথিবীর স্থানগুলোকে পরিচিত করে আসছে, সেভাবেই তা প্রকাশ করে থাকে। আর মেক্সিকো উপসাগরের নাম আন্তর্জাতিকভাবে ‘গালফ অব মেক্সিকো’ হিসেবেই পরিচিত।

এপির সঙ্গে হোয়াইট হাউসের বিরোধ

এই নামকরণের বিরোধের পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন এবং এপির মধ্যে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের মধ্যে এপির সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার স্থগিত করেছে, কারণ এপি ট্রাম্পের আদেশের প্রতি সম্মতি জানায়নি।

হোয়াইট হাউসের মতে, ‘গালফ অব আমেরিকা’ নামকরণ বৈধ এবং সংবাদ মাধ্যম হিসেবে এপিকে তা মেনে চলতে হবে।

অপরদিকে বার্তা সংস্থা এপি এই সিদ্ধান্তকে ‘সম্পাদকীয় স্বাধীনতা’ এবং ‘ভৌগোলিক নামের সঠিকতা’ হিসেবে রক্ষা করছে। এই নাম পরিবর্তন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই প্রযোজ্য, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে এখনো ‘গালফ অব মেক্সিকো’ নামটি বহাল রয়েছে।

ট্রাম্পের মন্তব্য ও এপির প্রতি আক্রমণ

সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প এপিকে ‘কট্টর বামপন্থি সংগঠন’ বলে উল্লেখ করেন এবং বলেন, এপি এখনো স্বীকার করতে রাজি নয় যে, গালফ অব মেক্সিকো এখন গালফ অব আমেরিকা। তারা সবসময় সবাইকে অসম্মান করে এবং আমাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে।

তিনি আরও বলেন, ‘তারা যদি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করে, তাতে কোনো সমস্যা নেই, তবে আমাদের জন্য এটি নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।’

এপির অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

এপি, যেটি ১৮০ বছরের পুরনো একটি সংবাদ সংস্থা, তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে।

সংস্থাটি জানিয়ে দিয়েছে, তারা সর্বাধিক পরিচিত ভৌগোলিক নাম ব্যবহার করে এবং এটি তাদের সম্পাদকীয় নীতিমালার অংশ।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর মধ্যে এপির রিপোর্টিংকে অনেক সংবাদপত্র এবং চ্যানেল অনুসরণ করে, তাই এই সংস্থার ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনা বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

কে জিতবে : ট্রাম্পের একগুয়েমি নাকি সম্পাদকীয় নীতি?

এখন প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্পের একগুয়েমি শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে নাকি সংবাদ সংস্থার সম্পাদকীয় নীতি? এটি শুধু এপির জন্যই নয়, সব গণমাধ্যমের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সংবাদ সংস্থাগুলোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে, ট্রাম্প প্রশাসন যদি সংবাদ মাধ্যমের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে, তবে এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনসাধারণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এখন দেখতে হবে, ট্রাম্প তার রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে সংবাদ মাধ্যমের প্রতি তার আদেশ বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন, নাকি এপি এবং অন্যান্য সংবাদ সংস্থাগুলোর সম্পাদকীয় নীতি ট্রাম্পের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করবে।

সূত্র : এএফপি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগৃহীত

আমরা এখনো বৈষম্যমুক্ত হতে পারলাম না : মাসুদ সাঈদী

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর পুত্র মাসুদ সাঈদী বলেছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বাংলাদেশ হাসিনা মুক্ত হলো, কিন্তু আমরা এখনো বৈষম্যমুক্ত হতে পারলাম না।

শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নাজিরপুর উপজেলার নাজিরপুর সদর ইউনিয়নের কুমারখালী বাজার মাঠে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে গণসমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

এ সময় তিনি বলেন, গত ৬ মাসে যত রাজনৈতিক নেতা ফাঁসির আসামিসহ বন্দি ছিলেন প্রায় সবাই মুক্তি পেয়েছেন, কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলামকে এখনো কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে বৈষম্য-জুলুম এখনো শেষ হয়নি। আজকের এই সমাবেশ থেকে এটিএম আজাহারুল ইসলামের মুক্তির দাবি করছি। একই সঙ্গে জামায়েতে ইসলামীর নিবন্ধন ও মার্কা দাড়ি পাল্লা ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, বৈষম্য কাকে বলে তা কড়ায়-গণ্ডায় জামায়াতে ইসলামীকে দেখিয়ে দিয়ে গেছে পাপিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ। আমাদের ১১ কেন্দ্রীয় নেতাকে তারা হত্যা করেছে, তার মধ্যে ৫ জনকে তারা ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছে। ৫ জনকে কারাগারে রেখে বিনা চিকিৎসায় হত্যা করেছে। আর একজন কোরআনের পাখি আল্লামা সাঈদীকে পরিকল্পিতভাবে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছে। বাংলাদেশে আর কোনো একটি রাজনৈতিক দল নেই, যে দলের ওপরে জামায়াতের মতো অত্যাচার করা হয়েছে। সারা বাংলাদেশে জামায়াত ও শিবিরের সব অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

মাসুদ সাঈদী বলেন, যে জিনিসের ভালো প্রসার যত বেশি, ওই জিনিসের বদনামও বেশি। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগের হাতে একটা তসবি ছিল, এই তসবিতে তারা একটা জিকির করত। সেই জিকির হলো- জামায়াত-শিবির, জামায়াত-শিবির। একই কায়দায় আমাদের বন্ধুপ্রতিম কিছু সংগঠন ওই একই ব্যবসা জামায়াত-শিবির, জামায়াত-শিবির।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমার এই বন্ধুপ্রতিম সংগঠনের কাছে বলতে চাই- ভাইয়েরা ১৯৭১-এর এই বস্তা পচা অভিযোগ জামায়াত এবং শিবিরের বিরুদ্ধে উত্থাপন করে আওয়ামী লীগ তার পুঁজি-পাট্টা সব হারিয়ে বাংলাদেশ থেকে পালিয়েছে। মেহেরবানি করে আপনারা কোথাও যাইয়েন না, আপনারা এখানে থাকেন। জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে যে অভিযোগটা আপনারা করেন এটি একটি অলাভজনক ব্যবসা, এ ব্যবসা করে লাভ নেই।

তিনি আরও বলেন, আমার পিতা দুইবারের এমপি ছিলেন, কেউ বলতে পারবেন না ১টি টাকার দুর্নীতি করেছেন। কারও ওপরে জুলুম করেছেন। জাহান্নামের আগুনকে যে ভয় করে সে অন্যের সম্পত্তি লুণ্ঠন করতে পারে না। আগামী সংসদ নির্বাচনে পিরোজপুর ১ আসনের প্রার্থী হিসেবে দোয়া চেয়ে বলেন, আপনাদের অনেক পছন্দের প্রার্থী থাকতে পারে। আপনারা দেখে-শুনে-বুঝে, প্রার্থী বাছাই করবেন।

এ গণসমাবেশে সভাপতিত্ব করেন এসএম শামসুল হক ও সঞ্চালনা করেন জামায়াতের উপজেলা বায়তুলমাল সম্পাদক মাওলানা আবু দাউদ।

এ সময় বক্তব্য দেন নাজিরপুর উপজেলা জামায়েতের আমির মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক, সেক্রেটারি কাজী মোসলেহ উদ্দিন, উপজেলা সাবেক আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, পিরোজপুর সদর থানা আমির মাওলানা সিদ্দিকুর রহমান, নাজিরপুর সদর ইউনিয়ন জামায়েতের সভাপতি মাস্টার আবুল হোসাইন, সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাড. আবু সাঈদ মোল্লা, নাজিরপুর শহীদ জিয়া কলেজের প্রভাষক প্রদীপ কুমার হালদার প্রমুখ।

মাসুদ সাঈদী এর আগে সকালে উপজেলা কৃষি প্রশিক্ষণ হলরুমে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। একই দিন সন্ধ্যায় তিনি উপজেলার বাবুরহাট শামসুল উলুম মাদ্রাসার বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন।

আমরা এখনো বৈষম্যমুক্ত হতে পারলাম না : মাসুদ সাঈদী


ভারতে উৎপাদিত মাদকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পশ্চিম আফ্রিকার লাখো যুবক -বিবিসি

অবৈধভাবে নিষিদ্ধ ওপিওয়েড মাদক তৈরি করছে ভারতের একটি ওষুধ কোম্পানি। যা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে। মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হওয়ায় বিশ্বব্যাপী ওই ওপিওয়েড মাদক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর উৎপাদন এবং আমদানি-রপ্তানিতে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। তবে বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ট্যাপেনটাডল ও ক্যারিসোপ্রোডলের মতো মানবদেহের জন্য ভয়াবহ রকমের ক্ষতিকর ওপিওয়েড মাদক উৎপাদন করছে মুম্বাই-ভিত্তিক অ্যাভিও ফার্মাসিউটিক্যালস নামের একটি ওষুধ কোম্পানি। বিশ্বের কোথাও এই মাদক উৎপাদনের অনুমতি নেই। কিন্তু অ্যাভিও এসব মাদক উৎপাদন করে তা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা, নাইজেরিয়া এবং আইভরি কোস্টের মতো দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। যার ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েছে এসব দেশের লাখ লাখ যুবক।

এ বিষয়ে বিশদ তদন্ত করেছে বিবিসি’র আই ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। তারা দেখতে পেয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে পাওয়া ওই ওপিওয়েড মাদকগুলোর উৎপাদন হচ্ছে ভারতে। যা তৈরি হচ্ছে মুম্বাই-ভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি অ্যাভিওর কারখানায়। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই অনুসন্ধান চালিয়েছে বিবিসির ওই বিশেষ ইউনিট। তারা অ্যাভিওর অন্যতম পরিচালক বিনোদ শর্মার ভিডিও ধারণ করেছে। যেখানে বিনোদ স্বীকার করেছেন যে, ভয়াবহ ওই মাদক ওষুধের নামে বাজারজাত করছে তার কোম্পানি। এর ভয়াবহতা জানা সত্ত্বেও তিনি এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছেন। বিনোদ জানিয়েছেন, ওপিওয়েডের বড়িগুলো বেশ সস্তায় বিক্রি করা হচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর, তরুণদের লক্ষ্য করে ভয়াবহ ওই মাদক আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলের দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যার ফলে সেখানে তরুণ এবং কিশোরদের মৃত্যুর ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আছে ঘানার তামালেতে নামক অঞ্চল। সেখানের প্রায় প্রতিটি যুবকই এই ওপিওয়েডের প্রতি আসক্ত। চোরাকারবারিদের ওপর অভিযান চালিয়ে এই মাদকের বিলোপ সাধন করতে একটি স্বেচ্ছাসেবী টাস্ক ফোর্স গঠন করেছিলেন অঞ্চলটির এক নেতা। যার নাম আলহাসান মাহাম। তবে তিনি জানিয়েছেন, তার গঠিত টাস্ক ফোর্সটি কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। কেননা প্রতিনিয়ত ওপিওয়েড বন্যার পানির মতো সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘানার পাশাপাশি নাইজেরিয়া এবং আইভরি কোস্টেও একই মাদক পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে কিছু ব্যবহারকারীরা এনার্জি ড্রিংকের সঙ্গে মিশিয়ে ওপিওয়েড সেবন করছে।
এই ওপিওয়েড উৎপাদনে ভারতের অ্যাভিও ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ওয়েস্টফিন ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেক কোম্পানি। মূলত এই কোম্পানিটির মাধ্যমেই পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে নিষিদ্ধ ওই ড্রাগ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শুধুমাত্র নাইজেরিয়াতেই এই মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা ৪০ লাখের ওপরে। তবে এই মাদক মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে নাইজেরিয়ার সরকার।

ইতিমধ্যেই ভয়াবহ এ মাদকের বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, ট্যাপেন্টাডল ও ক্যারিসোপ্রোডলের সংমিশ্রণ ট্রামাডলের চেয়েও আরও বেশি ভয়াবহ। মানবদেহের জন্য এই মাদক অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে একজন সেবনকারী দ্রুতই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। এই মাদক গ্রহণের ফলে ব্যবহারকারীর ঘুম, শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যুও হতে পারে। এসব নেতিবাচক প্রভাবের ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে এই মাদক নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মাদকের এই চোরাচালানের বিষয়ে অবহিত রয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। দেশটির সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও) দাবি করেছে যে, তারা যেকোনো অনিয়ম মোকাবিলায় রপ্তানি পর্যবেক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, আফ্রিকাতে নিষিদ্ধ ওই মাদক রপ্তানির জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারিই দায়ী। যার ফলে ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর জনস্বাস্থ্য।

mzamin

১০০ বছরেরও বেশি সময় পর মিশরে আবিষ্কৃত হলো ফারাওয়ের সমাধি

১০৩ বছর আগে এক বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টার খুলে দিয়েছিলেন মিশরের কিশোর ফারাও তুতেনখামেনের সমাধির দরজা। তার সঙ্গেই উন্মোচিত হয়েছিল কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন পৃথিবীর বহু অজানা রহস্য। কিং তুতেনখামেনের ঘুম ভাঙানোর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে মনে করিয়ে দিল ২০২৫ সালে তাঁরই পূর্বপুরুষ ফারাও দ্বিতীয় থাতমোসের সমাধি আবিষ্কার।ফারাওদের কয়েক শতাব্দীব্যাপী রাজত্বে দ্বিতীয় থাতমোসের সময়কাল খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৯৩ থেকে ১৪৭৯ পর্যন্ত। বছর চারেক আগে থিবসের ভ্যালি অফ দ্য কিংসের কাছে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া একটি  সিঁড়ি । দুটো পাহাড়ের মাঝখানে অনন্ত গহ্বরের মধ্যে সিঁড়িটা দেখেই সন্দেহ হয়েছিল সেটা কোনও প্রাচীন সমাধিক্ষেত্রে পৌঁছবে।

বৃটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ডক্টর পিয়ার্স লিদারল্যান্ডের আশা ছিল কোনও ফারাওয়ের রানি বা বংশধরের সমাধিতে পৌঁছেছে ওই পাথুরে সিঁড়ি। দীর্ঘ খননকার্যের পর সেই সমাধিতে পৌঁছনোর পর পাওয়া যায় এক টুকরো ভাঙা পাথর। নীল রং মাখানো সেই পাথরে হলদে তারার মোটিফগুলো দেখেই লিদারল্যান্ড বুঝতে পারেন এটা যার তার সমাধি নয়। কোনও ফারাওকে সমাহিত করা হয়েছিল এখানে। কারণ সোনালি তারায় ভরা নীল আকাশের নীচে ঘুমিয়ে থাকার অধিকার ছিল একমাত্র ফারাওদেরই। ১৯২২ সালে রাজা তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসে এটিকেই সবচেয়ে বড় আবিষ্কার বলে একবাক্যে মেনে নিচ্ছেন সকলে। গবেষকরা দ্বিতীয় থাতমোসের সমাধিতে শেষকৃত্যের আসবাবপত্রের টুকরো, নীল শিলালিপি, হলুদ তারা এবং ধর্মীয় লেখা সম্বলিত মর্টারের টুকরোও খুঁজে পেয়েছেন ।

তবে, ফারাও-এর  মৃত্যুর পরপরই বন্যার কারণে, সমাধিটি সাধারণত ভালোভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি । এর বেশিরভাগ সামগ্রী স্থানান্তরিত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে এবং সেগুলি পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে বলে জানা গেছে। তবে দ্বিতীয় থাতমোসের চেয়েও তাঁর রানি হাটশেপসুটকে মনে রেখেছে ইতিহাস। সম্পর্কে সৎ বোন হাটশেপসুটকে বিয়ে করে প্রধান রানি করেছিলেন দ্বিতীয় থাতমোস । তাঁর মৃত্যুর পর মিশরের ইতিহাসে একমাত্র নারী ফারাও হিসেবে সিংহাসনে বসেন হাটশেপসুট।

সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

mzamin

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত, শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা by আরিফ মাহফুজ

কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই লন্ডনে পালিত হয়েছে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।  বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন থাকার কারণে লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবার বড় ধরনের কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র ও বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর ক্রমান্বয়ে শ্রদ্ধা জানান যুক্তরাজ্য বিএনপি এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সহ সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকদের সংগঠন। সাধারণ মানুষও একক ভাবে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন, তবে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, মন্ত্রী কেউ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি। শুধু মাত্র সিলেটের সাবেক মেয়র ও যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী শহীদ মিনারে এসেছিলেন তবে আওয়ামীলীগের ব্যানারে নয়।  

যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ যখন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তখন আনোয়ারুজ্জামানকে দেখা যায়নি। একই সময় একটি সামাজিক সংগঠনের ভিড়ে তাকে এক ঝলক দেখা যায়, পরবর্তীতে শহীদ মিনারের সামনে কয়েকজন সঙ্গীসহ তাকে দেখা যায়, তার হাতে ছিল তার নাম সম্বলিত একটি পুষ্পস্তবক। আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে, বিএনপি কর্মীরা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে শুরু করেন। এসময়  তিনি গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে গেলে, নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে বাধা দেন। দ্রুত তাকে শহীদ মিনার ছাড়তে দেখা যায়। এসময় আওয়ামী লীগ কর্মীরাও উত্তেজনার সৃষ্টি করে।  পরে নিরাপত্তা কর্মীদের সহযোগিতায় তারা এলাকা ত্যাগ করেন।

পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে অবস্থিত শহীদ মিনারে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচ শতাধিক কর্মী জড়ো হন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

৫ আগস্টের পরে দেশত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেয়া নেতারা হলেন, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, সদ্য বিলুপ্ত সংসদ ও মন্ত্রিসভার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ও ফরিদপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান, সাবেক বৈদেশিক কল্যাণ ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান, সুনামগঞ্জ ১ আসনের সাবেক সাংসদ রণজিৎ সরকার, সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা বিধান চন্দ্র দাস, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার সহ আরো অনেকে।  তারা কেউই ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে আসেননি।

mzamin

ফ্যাসিবাদের জ্বালা থেকে মুক্ত হতে পারিনি: শফিকুর রহমান

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদীদের তাড়িয়েছে। কিন্তু আমরা ফ্যাসিবাদের জ্বালা থেকে এখনো মুক্ত হতে পারিনি। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের উদ্যোগে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষ্যে’ এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

শফিকুর রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদীরা যে সমস্ত অপকর্ম করতো, সেই অপকর্ম যদি আমিও করি তাহলে আমিও একজন ফ্যাসিবাদী। আমরা বারবার অনুরোধ করে বলেছি, দয়া করে শহীদের রক্তের প্রতি সম্মান জানান। দয়া করে আহত-পঙ্গু ভাই-বোনদের প্রতি সম্মান দেখান। তাদের রক্তকে, জীবনকে, তাদের ইজ্জতকে, তাদের আবেগকে, তাদের ত্যাগকে মেহেরবানি করে অপমানিত করবেন না।
তিনি বলেন, ঘাটে-ঘাটে যে চাঁদাবাজি হয় এর কারণে প্রত্যেকটা দ্রব্যমূল্য বহুগুণ বেড়ে যায়। এর চাপ এ দেশের একজন শ্রমজীবী মানুষের ওপর পড়ে। এমনকি রাস্তার আমার একটা ভিক্ষুক ভাই অথবা বোনের ওপরেও পড়ে। তাহলে তো আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। আমরা কেন এই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব, কেন আমরা নীরবে সহ্য করব? কাজেই এ ব্যাপারে আমাদেরকে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে ইনশাআল্লাহ।

জামায়াত আমীর বলেন, বিনয়ের সঙ্গে বলি, এ কাজ বন্ধ করুন। জাতিকে স্বস্তির সঙ্গে বাঁচতে দিন, সামনে এগিয়ে যেতে দিন। আবার যাতে ফ্যাসিবাদের নতুন ধারার অধ্যায় তৈরি না হয়, তার থেকে ফিরে আসুন। ফিরে না আসলে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমরা এ লড়াই বাদ দেব না। আমরা অবিরাম চলা সৈনিক। আমি দুনিয়া থেকে চলে যেতে পারি কিন্তু এই কাফেলা থাকবে ইনশাআল্লাহ।

তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনে অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের যতটুকু অংশ ততটুকু অংশের স্বীকৃতি দিতে অসুবিধা কোথায়? বিচারপতি আব্দুর রহমান চৌধুরী, যিনি ভাষা আন্দোলনের স্মারকের কাজ করেছিলেন, তাকে কোথাও স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না কেন? তমুদ্দিন মজলিস নামের যে সংগঠন এ আন্দোলনের সূচনা করল তারা ইতিহাস থেকে দূরে কেন? যার যেখানে জায়গা তাকে সেখানে জায়গা করে দিতে হবে। এ আন্দোলনের যার যতটুকু অবদান তার স্বীকৃতি দিতে হবে।

দক্ষিণের নায়েবে আমীর আব্দুস সবুর ফকিরে সভাপতিত্বে এবং সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য রাখেন দক্ষিণের নায়েবে আমীর এডভোকেট ড. হেলাল উদ্দিন, সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, সহকারী সেক্রেটারি  দেলাওয়ার হোসেন, কামাল হোসেন, ড. আব্দুল মান্নান, কামরুল আহসান হাসান, ড. মোবারক হোসেন, ডিইউজে সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

mzamin

ভেঙে যাচ্ছে হংকংয়ের প্রধান বিরোধী দল

ভেঙ্গে যাচ্ছে হংকংয়ের সর্ববৃহৎ বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টি। দলটির নেতারাই এ কথা জানিয়েছেন। হংকংয়ে গণতান্ত্রিক কাঠামো সংকুচিত হওয়ায় পদত্যাগ করার কথা জানিয়েছেন দলটির বহু নেতা। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে ৩১ বছর পুরনো দলটির চেয়ারম্যান লো কিন হেই। তিনি বলেছেন, দল ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে শীঘ্রই সদস্যদের ভোট নেবেন তারা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, ২০১৯ সালে বিক্ষোভ করার পর থেকে দলটির ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে চীন সরকার।

মূলত এরপর থেকেই টিকে থাকতে লড়াই করছে দলটি। তবে বেইজিং এবং হংকং সরকারের যুক্তি হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বিক্ষোভকারী দলগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার প্রয়োজন ছিল। কঠোর ব্যবস্থার অংশ হিসেবে হংকংয়ের ভোটদান ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে বেইজিং। সেখানে আগে বৃটিশ উপনেশবাদী ভোট ব্যবস্থা চালু ছিল। ২০২১ সালে হংকংয়ে তথাকথিত ‘দেশপ্রেম আইন’ বাস্তবায়ন করা হয়। মূলত এর মাধ্যমে বেইজিংয়ের কমিউনিস্ট শাসনের প্রতি অনুগত করতে বাধ্য করা হয় হংকংয়ের জনগণকে। এরপর থেকে হংকং আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ওই আইনের পর সেখানের প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখা হয়।

মঙ্গলবার সার্বিক বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছে দলটির নেতারা। এরপর লো কিন হেই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে দলের নেতারা পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন। হংকংয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সবসময়ই বেশ কঠিন বলেও মন্তব্য করেছেন ওই নেতা। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছর সেখানের গণতান্ত্রিক চর্চা বেশ ভেঙে পড়েছে। তবে রাজনৈতিক কোনো চাপের ফলে তারা দল ভাঙার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কিনা- এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। 

mzamin

‘এই বিপ্লবও কারও বাপের না’

ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এবারের একুশ পদক প্রদান অনুষ্ঠান ছিল ভিন্নমাত্রার। পদক তুলে দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এবার সংস্কৃতি ও শিক্ষায় একুশে পদক পেয়েছেন স্বনামধন্য আলোকচিত্রী ড. শহিদুল আলম।

নীল পাঞ্জাবি ও গলায় মাফলার জড়ানো শহিদুল আলম উপদেষ্টার কাছ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন। তিনি জুলাই আন্দোলন ও পতিত সরকারের সময় প্রতিবাদী এক কণ্ঠ ছিলেন। একুশে পদক গ্রহণকালে তার পরনের নীল পাঞ্জাবির পেছনে লেখা ছিল ‘এই বিপ্লবও কারও বাপের না’। পাঞ্জাবির পেছনের লেখাটি বেশ নজর কেড়েছে নেটিজেনদের।

গতকাল বৃহস্পতিবার পুরস্কার নেয়ার অনুষ্ঠানে অনেকে পেছন দিক থেকে শহিদুল আলমের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেছেন। অনেকে প্রশংসা করে নিজ নিজ ওয়ালে শেয়ার করেছেন ছবিটি।

যে বিপ্লবের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন হয়েছে, সেই বিপ্লবের একচ্ছত্র আধিপত্য যে কারও নয় সেটাই পাঞ্জাবির পেছনে লেখা দিয়ে বুঝিয়েছেন শহিদুল আলম। দেশবরেণ্য আলোকচিত্রী, সমাজকর্মী শহিদুল আলম সাইকেল চালিয়ে নিতে আসেন পুরস্কার।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মির্জা তাসলিমা সুলতানা ফেসবুকে অন্যজনের পোস্ট শেয়ার দিয়ে ক্যাপশনে লিখেছেন ‘Our inspiration! Congratulations Shahidul Alam’।

খন্দকার তানভীর মুরাদ এই ছবিটিসহ কয়েকটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ক্যাপশানে লিখেছেন ‘এই একজন মানুষ, যার আছে বিশাল হৃদয়, বুক ভরা সাহস আর কাজের প্রতি আত্ম-নিবেদন।’

এ বছর বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের ১৪ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও বাংলাদেশ নারী ফুটবল দলকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

শহীদুল আলম দৃক গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা। বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ক্যামেরা বন্দী করেছেন তিনি। তার আলোকচিত্র বিশ্বের অনেক নামকরা সংবাদপত্র এবং ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রজন্মের ফটোগ্রাফারদের প্রশিক্ষিত করার পেছনে অবদান রয়েছে এই আলোকচিত্রীর।

ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বৃটেন ও ইউরোপীয়ান নেতাদের আরও পদক্ষেপের প্রয়োজন -সাবেক বৃটিশ সেনাপ্রধান

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় মার্কিন সম্মতি না পেলে বৃটেন এবং ইউরোপীয়ান দেশগুলোকেই তা নিশ্চিত করতে হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বৃটেনের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল স্যার নিক কার্টার। বিবিসির ওয়ান কোয়েশ্চেন টাইম নামের এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এ মন্তব্য করেছেন তিনি।

সম্প্রতি ইউক্রেনকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেন ইস্যুতে বৈঠক করেছে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। এতে বেশ ক্ষোভ জানিয়েছে কিয়েভ এবং তাদের মিত্র ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের নেতারা। উদ্ভূত এমন পরিস্থিতিতে বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের সৈন্য মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে ইউক্রেনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন রাশিয়ার সঙ্গে পূর্ব বিরোধ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছেন। যা অনেকটাই বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বিরুদ্ধে বলে মনে করেন অনেকে।  

অনলাইন বিবিসি বলছে, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নিক কার্টার বলেছেন- তিনি বিশ্বাস করেন যে, রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের ন্যায্য নিষ্পত্তি বলতে যা বোঝায় তা ইউক্রেনেরই ঠিক করা উচিত। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনের জন্য তা করতে প্রস্তুত না থাকে তাহলে বৃটেন এবং ইউরোপীয়ান দেশগুলোকেই কিয়েভের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হবে। আগামী বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার। তিনি ইউক্রেন ইস্যুতে মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন। বলেছেন, রাশিয়াকে কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে হলে ‘মার্কিন নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত’ করাই একমাত্র উপায়।

বৃটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, বৃটেন মস্কোর শান্তি প্রস্তাব আন্তরিকতার সঙ্গে মেনে নিতে প্রস্তুত, যদি তারা ‘জারবাদী সাম্রাজ্যবাদ’ প্রত্যাখান করে ইউক্রেনের কথা শুনতে আগ্রহী হয়।

এদিকে সম্প্রতি সৌদি আরবে মস্কো-ওয়াশিংটনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আরও গভীর হতে দেখা যাচ্ছে। ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পাম বিচে অবস্থিত নিজের মালিকানাধীন মার-এ-লাগো রিসোর্টে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভলোদিমির জেলেনস্কিকে ‘ডিকটেটর’ বলে অভিহিত করেছেন ট্রাম্প। এছাড়া ট্রাম্পের বক্তব্যে এটি স্পষ্ট যে,  জেলেনস্কির কারণেই ইউক্রেন এই ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে জড়িয়েছে। তিনি বলেছেন, জেলেনস্কি চাইলেই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারতেন।

কিয়েভকে বাদ দিয়ে মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের বৈঠকের পরই ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি ইউক্রেনে স্থায়ীভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী তার দেশের সৈন্য মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে এক্ষেত্রে কিয়েভের শান্তি বজায় রাখতে এবং পুনরায় রাশিয়ার হামলা না চালানোর নিশ্চয়তায় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন প্রয়োজন।

mzamin

সাক্ষাৎকারে ভি এস নাইপল

লিটারেরি রিভিউর ২০০৬ সালের সাক্ষাৎকার।
ভি এস নাইপল এর সাক্ষাৎকার
লন্ডনের লিটারেরি রিভিউতে নেওয়া সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ ভাষান্তরিত। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ফাররুখ ধোনী

ভিএস নাইপলের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। ভারতীয় চিকিৎসক ও চিকিৎসা তাঁর কাছে ব্রিটেনের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের চেয়ে স্বস্তিকর মনে হওয়ায় চিকিৎসা ও সেরে ওঠার জন্য কয়েক মাস তিনি দিল্লিতে থেকে যান। তারপর লন্ডনে ফিরে আসেন এবং আবার লিখতে শুরু করেনে।

আমি তাঁর উইন্টশায়ার কটেজে আসি এবং দুদিন সময় নিয়ে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করি।

তিনি বললেন, তিনি আমাকে পছন্দ করেছেন কারণ সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য আমি তাঁর পদ্ধতিই অনুসরণ করি – সাক্ষাৎকারদাতা যা বলে যান আমি তার হাতে লেখা লম্বা নোট নিই। তিনি টেপ-রেকর্ডারকে বিশ্বাস করেন না। আমিও না। তাই আমি পকেট সাইজের দুটো

টেপ-রেকর্ডার নিয়ে এসেছি এবং অনধিকার চর্চা করে দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে কম ডাইনিং টেবিলের এমন একটা জায়গায় রেখেছি, তার আগে নিশ্চিত করেছি যে ব্যাটারিগুলো নতুন। বিড়াল অগাস্টাস কিছুক্ষণ পরপর জানালার চৌকাঠের সামনে আসছে এবং ভেতরে আসতে চাইছে। তার ধৃষ্টতা সাধারণ বিড়ালের চেয়ে বেশি এবং বিদ্যাধরের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য পীড়াপীড়ি করে। তিনিও তাকে শুয়ে পড়ার হুকুম জারি করার পথটি জানেন। অবাক করে দিয়ে অগাস্টাস বিদ্যাধরের হুকুম তামিল করে এবং আমাদের পায়ের কাছে কু-লী পাকিয়ে শুয়ে পড়ে।

লিটারেরি রিভিউর জন্য এটা আমার দ্বিতীয় বর্ধিত সাক্ষাৎকার। ২০০১-এর আগস্টে প্রকাশিত প্রথমটি বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ই এম ফর্স্টার, জন ম্যানার্ড কিনস এবং জেমস জয়েসের ওপর তাঁর মন্তব্যকে প্ররোচনামূলক মনে করা হয়েছে। আমরা যখন শুরু করি, আমি আমরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকব, তিনি সম্মত হন।

ফাররুখ ধোনী : একজন লেখকের লেখক-জীবন ও সাফল্যে ভাগ্যের কোনো ভূমিকা আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল : আমি অনেক বিষয় নিয়ে অনেক পরিশ্রম করেছি। ভাগ্য এসেছে গোড়ায়, যখন আমি শুরু করার চেষ্টা চালাচ্ছি। সেদিন ল্যাঙ্গহাম হোটেলে বিবিসি ভবনে কাজ করছি, পোর্ট অব স্পেনের যে-রাস্তায় আমি বেড়ে উঠেছি, হঠাৎ যদি সে-রাস্তার কাহিনি লেখার কথা মনে না হতো তাহলে হয়তো আরো অনেক বছর আমাকে কী লিখব তা নিয়ে হাতড়ে বেড়াতে হতো। বিবিসির সেই রুমে ফ্রিল্যান্সাররা যদি উৎসাহিত না করতেন তাহলে হয়তো আমার শুরুটাই কখনো হতো না।

আমি বেশ অনুভব করেছি, কাজটা আমি আমার নিজের মতো করে করছি – ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল না। আমি যে-বইটা, মিগেল স্ট্রিট, লিখছিলাম পরের চার বছরেও তা প্রকাশিত হয়নি। সেকালে লেখালেখি নিয়ে ইংল্যান্ডের ধারণা ভিন্ন ছিল –  আমি যা করছিলাম তা থেকে ভিন্ন।

ধোনী : আপনি কি বলছেন যে, ইংরেজি সাহিত্যের ঐতিহ্যের বাইরে আপনি লেখালেখি করছিলেন?

নাইপল : সেটা লিভিস (ফ্রাঙ্ক র‌্যায়মন্ড লিভিস তখন ক্যামব্রিজের তথা ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাহিত্য-সমালোচক) এবং ক্যামব্রিজ ঘরানার – এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ    কথাটি হচ্ছে – আমি কী কাজ করছি ইংল্যান্ড বুঝতে পারেনি। এটা যদি আমার নিজের ভূমি হতো তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কিন্তু আমার কোনো দেশ নেই। আমি যে-কাজ করেছি ইংল্যান্ড তার প্রশংসা করেনি, স্বীকৃতিও দেয়নি। আমার কাজ ছিল একটি পাঠকগোষ্ঠী গড়ে তোলা। আমার বেলায় এটা ছিল ধীরগতির – খুব ধীরগতির।

ধোনী : আপনি যে নিজস্ব পাঠকের জগৎ উন্মোচন করার চেষ্টা করছেন এ-সম্পর্কে নিজে কি সচেতন ছিলেন?

নাইপল : আমি সবসময়ই অতি ক্ষুদ্র একটি পাঠকগোষ্ঠীর জন্য লিখেছি : আমার স্ত্রী (প্যাট্রিসিয়া, এখন নাদিরা), বিবিসিতে আমার চেনা কেউ, আমার প্রকাশক, আমার প্রকাশক ডয়েসের সম্পাদক।

ধোনী : মুসলিম বিশ্বভ্রমণ শেষে লেখা আপনার বই অ্যামাং দ্য বিলিভার্স নিশ্চয়ই বৈশ্বিক পাঠকের জন্য লিখিত?

নাইপল : যেহেতু লেখালেখি হচ্ছে শেখার একটি প্রক্রিয়া, সেই বইটি লেখাও আমার জন্য একটি প্রক্রিয়া। প্রকাশিত হওয়ার পর বইটি পাঠক পেয়েছে। হার্ভার্ড ও ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) মতো জায়গায় এই বই নিয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে। এসব জায়গায় কিছু জ্ঞানী লোক আছেন, যাঁরা তাদের প্রাজ্ঞতা দিয়েই জানতে পারেন, কী ঘটছে দেখার জন্য তাঁদের যেতে হয় না। যা জানার তা এর মধ্যেই তাঁরা জেনে গেছেন। অবশ্য আমি এটা খুব জোর দিয়ে বলছি না যে, যা কিছু আমি আবিষ্কার করেছি এবং লিখেছি সবই আমার জন্য। দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে এমআইটিতে যাওয়ার কারণ বইটির ওপর কথা বলার জন্য তাঁরা আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, আমার মনে হয়েছে তাঁরা ইরান নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন। আমার মনে আছে রক্তের জন্য ইরানিদের ভালোবাসার কথা আমি বলেছি। একটি ধর্মীয় বিক্ষোভে একজন মানুষ যখন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল, লোকজন তার ক্ষত ও রক্তে হাত ও কাপড় ডুবিয়ে রক্তে ভেজাচ্ছিল। আমি এমআইটিতে যাদের সঙ্গে ছিলাম তারা এটি বিশ্বাস করতে অস্বীকার করল। এমন কিছু ঘটতে পারে না; ওহ্ ঈশ্বর! তারা কত জ্ঞানী। একটি আমেরিকান পত্রিকা তিন খ-ে আমার বইটি ছাপতে যাচ্ছিল; কিন্তু তা বাতিল করে দিলো।

ধোনী : কেন?

নাইপল : সেখানকার জ্ঞানী লোকজন তাদের বলে থাকতে পারে এটা প্রকাশ করা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। কুড়ি বছর পর মনে হতে পারে, অপেক্ষমাণ পৃথিবীকে যদি এই ভাবনাটা দেওয়া যেত … কিন্তু তখনো তাদের কঠিন সময় যাচ্ছিল।

এমনকি আমার প্রথম বই মিগেল স্ট্রিট­-এ আমি নিরীক্ষামূলক কাজ করেছি; আমি চেয়েছি এটা খুব সহজ হোক, নতুন হোক, দৃশ্যগুলো যেন ভেসে ওঠে। প্রতিটি বাক্যে তা-ই করেছি।

ধোনী : আপনি যখন এগোতে থাকলেন, আপনার লেখার অভিজ্ঞতাও কি বদলে গেল?

নাইপল : আমি যখন লিখতে থাকি লেখার ‘আইডিয়া’ গড়ে ওঠে। আমার একমাত্র আইডিয়া হচ্ছে লেখাটা নন-ফিকশন হলে এটা সত্যনিষ্ঠ হতে হবে। আমি যাদের নিয়ে লিখছি তারা এর ভেতর সত্যটা দেখতে পাবে। আমরা যে-বইটি নিয়ে কথা বলছিলাম অ্যামাং দ্য বিলিভার্স প্রকাশিত হওয়ার পর আমি ইরান থেকে চিঠি পেয়েছি যে, আমি মূল বিষয়টি ধরতে পারিনি। আমি তেহরানে গাড়ি চালানোর কথা লিখেছিলাম – এটা ভয়ংকর ও আশঙ্কাজনক অভিজ্ঞতা। আমি যে-গাড়িতে ছিলাম প্রত্যেক জায়গা থেকে অন্য গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়ে সে-গাড়ির কিছু রং তুলে এনেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রোতাদের সামনে যখন বইয়ের অংশবিশেষ পড়ি, তাদেরও একইরকম প্রতিক্রিয়া – সত্য কথা লেখা ‘ঔপনিবেশিক’ মানসিকতাজাত।

ধোনী : আপনি কি মনে করেন এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আপনি গোঁড়া কিংবা বোকাটে ধরনের লোকের দেখা পেয়েছেন? নাকি জ্ঞানী?

নাইপল : আমি সেরকম কিছু মনে করছি না। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শীর্ষ অতিক্রম করে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-ধারণা তা শেষ হয়ে গিয়ে থাকতে পারে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘসময় ধরে ‘ঐশ্বরিক’ উৎপাদন করেছে। তারপর অক্সফোর্ড একটা বাঁক নিল এবং চটপটে মানুষ তৈরি করতে শুরু করল। শেখার ধারণা এসেছে বেশ পরে, সম্ভবত উনবিংশ শতকে – কোনোভাবে বিংশ শতক পর্যন্ত এসেছে। এখন মনে হচ্ছে বিজ্ঞানের বিষয় ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার কোনো প্রয়োজন নেই। সমাজতন্ত্রীরাও সবাইকে এখানে পাঠাতে চায়। আমি মনে করি, এসব জায়গা গুটিয়ে ফেলা উচিত এবং চাইলে সার্টিফিকেট কিনতে মানুষ পোস্ট অফিসেই যেতে পারে।

ধোনী : নিশ্চয়ই বিজ্ঞান বিষয়ের সার্টিফিকেটও নয়।

নাইপল : না ওগুলো থাকতে হবে। মানবিক বিভাগ – ‘হিউম্যানিটিজ’ – আমার মনে হয় অর্থহীন বিষয়।

ধোনী : আপনি বলেছেন যখন লিখতে থাকেন, লেখার আইডিয়াটাও গড়ে উঠতে থাকে। অতীতে আপনি একটি সংস্কৃতিতে লেখালেখির ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছেন এবং লিখেছেন। যেমন রাশিয়া …

নাইপল : এবং ফ্রান্স। এই আইডিয়া নিজেরাই নিজেদের গড়ে তুলেছে। শুরুতে আমার কাছে আসেনি। আমি বেশ অজ্ঞ ছিলাম। আমি যখন মোপাসাঁ পড়তে শুরু করি আমি পুরোপুরিভাবে তাকে মূল্যায়ন করতে পারিনি। একটি সংস্কৃতি এবং সেই সংস্কৃতির একজন লেখককে দেখার আগে কিছু প্রাজ্ঞতা, কিছু অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। আপনি যদি পঁচিশ বছর আগে আমার সাক্ষাৎকার নিতেন তাহলে আমি বলতাম বালজাক ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ফ্রেঞ্চ লেখক। এখন আমি বলি মোপাসাঁ – একজন সত্যিকারের বড় মানুষ। আমি বালজাক পড়তে শুরু করি এবং তাঁকে নিয়ে আমার কিছু সমস্যা হয়। আমি নিজেকে নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ি। আমি মোপাসাঁর গল্প হাতে নিই। সবই গল্প – ১১০০ পৃষ্ঠা। গল্পগুলো লেখার কাল অনুযায়ী সাজানো এবং অনুবাদও চমৎকার। এটা আমার জন্য শিক্ষা।

শুরুতে তিনি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে লিখতেন, একটি ভুল পদক্ষেপও যেন না হয় খেয়াল রাখতেন। মাঝখানে এসে তিনি আরো বেশি নিরাপদ ও নিশ্চিত হলেন। তিনি সহজাতভাবে ভালো  কাজ করেছেন, শেষদিকে তাঁর মৃত্যুচিন্তা এসে যায়, তাঁর লেখাগুলো  সংক্ষিপ্ত এবং খুবই মেকি হয়ে আসে।

শেখভের নাটকে একটি চরিত্র আছে যে মোপাসাঁ সম্পর্কে কথা বলে; এবং বলে তাঁর মেধা অতিপ্রাকৃতিক। আমি তাঁর সঙ্গে একমত হই কারণ তাঁর প্রায় সব গল্পেই একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন তিনি দেখিয়েছেন। আর তাঁর গল্পের সংখ্যা কত! বিস্মিত হতে হয়, এত গল্পের উপাদান তিনি পেলেন কোথায় – প্রতিটি গল্পই মনে হয়েছে কেমন স্বাভাবিক ও সহজ।

আপনি যখন গল্পটা পড়েন, তা বিশ্লেষণ করতে পারেন, তাঁর গল্পের পদ্ধতিটি বুঝতে পারেন। তিনি সবসময়ই তাঁর গল্পের মানুষকে একটি চরিত্র দেন – সেটা খুব জরুরি। তাঁর এখানে একটি আবেগরেখা থাকে, তাঁর লেখার সঙ্গে সঙ্গে আবেগের

হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে, পাঠক গল্পের মামুলি বর্ণনা কেমন করে শেষ হয়ে এলো তা অনুসরণ না করে লেখকের আবেগকে অনুসরণ করেন। আমি মনে করি মোপাসাঁর মতো আর কেউ নেই।

তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের নির্মমতা রয়েছে। তাঁর বয়স যখন তিরিশের ঘরে তিনি লিখতে শুরু করেন, তারপর দশ বছরেই সব প্রায় শেষ হয়ে যায়। তিনি যন্ত্রণায় ছিলেন, তারপর পাগল হয়ে যান, কাজেই যা কিছু করার তিনি দশ বছরেই করেছেন। তাঁকে অবশ্য সারাক্ষণই লিখতে হয়েছে, তাও কত সহজভাবে লিখে গেছেন। এটি অতিপ্রাকৃতিক মেধা। তাঁর গল্প পড়তে পড়তে আপনি নিজেকে জিজ্ঞেস করেন কোন সেই দেশ, যে-দেশ তাঁকে লেখায় বিস্ময়কর এত উপাদান দিয়েছে; তারপর কিছু সময় পর আপনি বুঝতে পারেন কোনো দেশ তাঁকে এসব উপাদান দেয়নি। তাঁর দেখার শক্তি দিয়ে তিনি দেশ সৃষ্টি করছেন। অদ্ভুত ব্যাপার। আমরা যখন স্কুলে মোপাসাঁ পড়ি, আমরা বড্ড প্রাদেশিক হয়ে পড়ি – ফ্রেঞ্চ! এটা এখনো সত্য, কিন্তু তাঁর কাজ সবার জন্য।

ইংরেজি ভাষার লেখকদের নিয়ে এমন কথা বলা যায় না। (আমরা চার্লস ডিকেন্সকে আলোচনার বাইরে রাখতে পারি)। ইংরেজি ভাষায় লেখা স্পষ্টতই ইংল্যান্ডের জন্য, ইংল্যান্ডের মানুষের জন্য, খুব বেশি দূরে যাওয়ার জন্য নয়।

ধোনী : কোন কোন লেখক বিশেষ করে এই ইংরেজিপনা – ‘ইংলিশনেসে’র কাতারে পড়বে বলে আপনি মনে করেন?

নাইপল : (টমাস) হার্ডি। একজন অসহ্য লেখক।

ধোনী : কেন?

নাইপল : তিনি লিখতে জানেন না; একটা প্যারাগ্রাফ কীভাবে তৈরি করতে হয় তিনি জানেন না। আমি বলব রোমান্টিক মেয়েলি কাহিনির এরকম বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

ধোনী : এমনকি বড় লেখকরাও – জেইন অস্টিন?

নাইপল : জেইন অস্টিন নিয়ে আমার কী সমস্যা? যারা ইংরেজি কেতায় শিক্ষিত হতে চান জেইন অস্টিন তাদের জন্য। এটা যদি আপনার লক্ষ্য না হয়, তাঁর বই দিয়ে আপনি কী করবেন, তাও আপনার জানা নেই।

কবছর আগে বাথে একটি সম্মেলন হয়েছিল, আমাকে দাওয়াত করা হয়েছে। আমি বাজে ধরনের কনফারেন্স অতিথি। আমি একটি কথাও বলিনি। তাঁরা আমাকে বাথের প্রেক্ষাপটে লেখা জেইন অস্টিনের নর্থহ্যাঙ্গার অ্যাবে উপন্যাসটি দেন। সাম্প্রতিক অসুস্থতার পর থেকে আগে আমার যেসব বই পড়া হয়নি, সেগুলো তুলে নিচ্ছি। কাজেই বইটা নিলাম। বইটার অর্ধেক পর্যন্ত আমার মতো একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ, এই ভয়ংকর নীরস নারীর তথাকথিত প্রেমের জীবন – একজনের সঙ্গে একবার দেখা হওয়ার পরই তিনি বলছেন প্রেম – আমি এ-জিনিস নিয়ে কী করব? এটা আমার জন্য নয় – রাস্তার কারো পড়ার জন্য হতে পারে, আমার নয়।

ধোনী : জেইন অস্টিনকে নিয়ে এত কথা – আপনি কি তাতে বিস্মিত হলেন?

নাইপল : হ্যাঁ, এটা নির্ভর করে পৃথিবীর রাজনৈতিক শক্তির ওপর। আপনি যদি ইংল্যান্ডের হয়ে থাকেন, আপনার কাছে দেশ যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে এ-ধরনের বাজে অর্থহীন লেখা আপনার কাছে গুরুত্ব পাবে। উনবিংশ শতকে যদি দেশটির পতন ঘটত, তাহলে কেউ জেইন অস্টিন পড়ত না। বইগুলো হতো ব্যর্থতা নিয়ে। লেখকরা ব্যর্থতার কারণ প্রদর্শন করতেন।

আমি জেইন অস্টিন নিয়ে যা বলছি আর জ্ঞানী লোকেরা তাঁকে নিয়ে যা বলছেন, আমি তা গুলিয়ে ফেলতে চাই না। বিভিন্ন জ্ঞানবান স্থানের অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষেরা বলছেন জেইন অস্টিন একটি বড় ধরনের ভ্লাদিমির প্রতিনিধিত্ব করেন। যেখানে ক্যারিবিয়ান ফসলের ক্ষেতে ক্রীতদাসরা পরিশ্রম করে যাচ্ছে, সেখানে তরুণদের হৃদয়ের ব্যাপার নিয়ে মজে থাকা ভ্লামিই তো। কী ভ্লমি! জ্ঞানীরা এমনই বলে থাকেন। এটা বোকামি কারণ তাঁরা যদি তাঁদের নিজের বিষয়ের বাইরের কিছু বিষয় নিয়ে জানতেন, বুঝতেন ১৮০৭ সালে ক্রীতদাস ব্যবসা – ব্রিটিশ ক্রীতদাস ব্যবসা নিষিদ্ধ হয় আর এসবের যৌক্তিকতা সংবেদনশীলতা – এসব নিয়ে আলোচনা ১৮৩৪ সালে ক্রীতদাস প্রথা অবলুপ্ত করার পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজে লেগেছে। পরিশুদ্ধকরণ আচরণ এসবের ধারণা হচ্ছে অবলুপ্তির পরিবেশ।

ধোনী : তাহলে জেইন অস্টিনের কিছু প্রভাব আছে?

নাইপল : তাঁর কোনো প্রভাব নেই, তিনি ছিলেন এর অংশ। তিনি নিজেই এর প্রতিফলন। প্রাচীন রোমানদের সঙ্গে যদি এর তুলনা করি – তাঁরা ভালো জীবনের কথা বলেছেন আবার নিজেদের চারপাশে সবচেয়ে নির্মম দাসপ্রথাকেও উৎসাহিত করেছেন। তাঁদের চারপাশে যে-জীবন সে-জীবন নিয়ে তাঁরা কখনো প্রশ্ন করেননি। ক্রীতদাসদের সঙ্গে যে খারাপ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং অ্যারেনায় তাদের ভয়াবহ মৃত্যু হচ্ছে, এ নিয়ে সিসেরো কৌতুক করেছেন। দিনের বিভিন্ন সময়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের নির্মমতা নির্ধারিত ছিল। অপরাধীকে নিরস্ত্র অবস্থায় সশস্ত্র ব্যক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে পাঠানো হতো। অসমতার এই লড়াই তো আর সত্যিকারের লড়াই নয়, তবু তা জনতার মধ্যে এক ধরনের সরল উত্তেজনা জাগাত। সেনেকাই বলেছেন, তোমাদের মনে রাখতে হবে ক্রীতদাসও মানুষ। তিনি এর বেশি এগোননি। রোমান দাসত্ব ছিল অত্যন্ত পাশবিক।

ইংল্যান্ড দাসত্ব বিলোপকারী প্রথম দেশ। এটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। জেইন অস্টিনের উপন্যাস পড়ার দরকার নেই, তবে এটা মনে রাখতে হবে, যে আচরণ ও সংবেদনশীলতার কথা তিনি লিখেছেন, যে-শিক্ষা দাসত্বের বিলুপ্তি ঘটিয়েছে, এটা তারই অংশ।

ধোনী : ইংরেজ লেখকদের মূল্যায়নের সময় আপনি চার্লস ডিকেন্সকে ছাড় দিচ্ছেন কেন?

নাইপল : আমি কিছুদিন আগে তাঁর প্রথমদিককার লেখা

কিছু প্রবন্ধ পড়েছি। স্কেচেস বাই দ্য বজ খুবই ভালো। কিন্তু ডিকেন্সের লেখায় এত বেশি বাজে জিনিস। কেবল শব্দের জারিজুরি – বড্ড বেশি শব্দ, শুধু পুনরাবৃত্তি। তিনি কিছু একটা করতে চেষ্টা করছিলেন, দোহাই ঈশ্বরের আফ্রিকানদের কখনো জঘন্য শত্রু ছিল না। তাঁর একটি প্রবন্ধে …

ধোনী : কোন প্রবন্ধ?

নাইপল : আমি স্মরণ করতে পারছি না। যদি তারা দাসত্ব অবলুপ্ত না করত জ্ঞানী লোকেরা যে কত কথা বলত। ডিকেন্স কালো মানুষদের ঘৃণা করতেন। অদ্ভুত তাই না?

ধোনী : আপনি কি একইভাবে বিংশ শতকের ব্রিটিশ লেখকদের বিচার করেন?

নাইপল : এটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। এটা (এভলিন) ওয়াফের বেলায় সত্য। আন্তর্জাতিক পাঠক লাভের বিষয়টি খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। এইচজি ওয়েলস যখন তাঁর প্রথমদিককার গল্পগুলো লিখছেন তিনি বাইরের মানুষের জন্য লেখেননি। তিনি সাম্রাজ্যবাদের বহু চর্বিতচর্বণ গ্রহণ করে গল্পগুলো লিখেছেন, যদিও তিনি একজন ভালো লেখক। আশির দশক থেকে লেখা গল্পগুলোতে রয়েছে আফ্রিকান ভুডু – প্রেতধার্মিক, ভারতীয় যাজক ইত্যাদি। তিনি দেশের বাইরে যাচ্ছেন না, যেসব আইডিয়া তিনি গ্রহণ করছেন তা লেখায় কাজে লাগাচ্ছেন।

যদিও কোনো ফিকশন লেখেননি (বার্ট্রান্ড) রাসেল ছিলেন বৈশ্বিক। তিনি খুব সাধারণভাবে, স্পষ্টভাবে দার্শনিকী ভাবনা ব্যাখ্যা করেছেন।

ধোনী : ভারতে যাঁরা ইংরেজি বলেন তাঁদের মধ্যে রাসেলের বড় পাঠকগোষ্ঠী রয়েছে। যেমন হিস্ট্রি অব ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি।

নাইপল : হ্যাঁ, তবে সবাইকে বিশ্বের জন্য লিখতে হবে এমন নয়, তাঁরা অবশ্যই নিজেদের জন্য লিখবেন, তাঁদের বন্ধুদের জন্য লিখবেন।

ধোনী : কিন্তু তাতে কি বইয়ের গুরুত্ব অস্বীকার করা হয় না?

নাইপল : না। উত্তম যুগে লেখকরা নিজেদের জন্য যা লিখেছেন তা-ই মানুষের কাছে চলে এসেছে। বইয়ের এই সফরের ব্যাপারটি ঘটার কারণ, পৃথিবী এতটাই প্রতিবন্ধী যে দেখার মতো তার নিজের সামান্যই আছে। আমি এটা বলছি না বাইরের পৃথিবীর জন্য মানুষের বার্তা নিয়ে যাচ্ছে। বইয়ে যে-ধরনের কৌতূহল সঞ্চার করা হয়েছে স্বাভাবিকভাবে তা অন্য মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।

আমেরিকান লেখার কথাই ধরুন। মার্ক টোয়াইন হচ্ছেন বৈশ্বিক, যে কেউ তাঁর বই পড়তে পারেন এবং তাতে তাঁদের আগ্রহের বিষয় পেতে পারেন, কিন্তু আমেরিকার জন্য ফিটজেরাল্ড হচ্ছেন লোকাল – স্থানীয়। মার্ক টোয়াইনের লেখায় আমরা হিউমার পাই – এতে এমন এক স্বর রয়েছে যা সব মানুষের সঙ্গে কথা বলে; তারপর বস্তুর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, বস্তুর গুরুত্ব নিয়ে তিনি উচ্ছ্বসিত হননি।

দেখবেন এখনকার ভারতীয় লেখকরা তাঁদের বস্তুগত অর্জন নিয়ে উচ্ছ্বসিত। তাঁরা ড্যাডি, মাম্মি, চাচা, চাচি এসব নিয়ে লিখছেন, তাঁদের অর্জিত বস্তুর জন্য আনন্দিত হচ্ছেন। ভারতীয় বইয়ের   বেচারা সমালোচকরা হয়তো এই উপসংহারে আসতে পারেন : ‘হাঁ, ঈশ্বর! এক্স, ওয়াই, জেড এত বড় ভারতীয় পরিবার থেকে এসেছেন, আমরা জানতামই না।’

ধোনী : ভারতীয় লেখকদের বইয়ে আমরা শুধু এসবই পাই না।

নাইপল : আপনাকে ওই ভয়ংকর আমেরিকান হেনরি জেমসের দিকে তাকাতে হবে। আসলে পৃথিবীতে তিনি সবচেয়ে বাজে লেখক। তিনি কখনো নিজের ত্রিসীমানার বাইরে যাননি। হ্যাঁ, তিনি ইউরোপে এসেছেন, কিন্তু এখানে এসে ‘লেখকের জীবন’ যাপন করেছেন। তিনি কোনোকিছুর ঝুঁকি নেননি। তিনি নিজেকে কোনো ঝুঁকির সামনে দাঁড়াতে দেননি। তিনি ভদ্রলোক হিসেবে সফর করেছেন। আমেরিকান ম্যাগাজিনের জন্য যখন তিনি ইংলিশ আওয়ার্স লিখলেন, তিনি দূর থেকে এপসম (সারের একটি ছোট শহর) ঘোড়দৌড় নিয়ে লেখেন। তিনি কখনো ভাবেননি জনতার সঙ্গে মিশবেন, তারা কেন সেখানে এসেছে, কী তাদের আচরণ তা জানবেন। গাড়ির ওপরে থেকে কিংবা ট্যুরিস্ট কোচের ওপরতলায় বসে তিনি এ-কাজটি করবেন। তাঁর অনেক লেখা এরকমই। তাঁর লেখায় বস্তুর জয়গান, তিনি মনে করেন এ-বিষয়ের ওপর লেখার জন্যই তিনি অবতীর্ণ হয়েছেন, ইউরোপের জাঁকজমক এবং আমেরিকার নতুন টাকার চাকচিক্য কেউ ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। অনেক বছর আগে এলিজাবেথ হার্ডউইক (১৯১৬-২০০৭; সাহিত্য-সমালোচক) আমাকে বলেছেন, কী হচ্ছে? হেনরি জেমস যাদের সঙ্গে কথা বলছেন সবাই আমেরিকান। আর এর ফলে আমেরিকান তরুণরা ভাবছে তারা ইউরোপ দেখতে বেরোবে এবং তাঁর মতো ‘একটা হেনরি জেমস’ লিখে ফেলবে।

ধোনী : আপনি নিশ্চয়ই হেমিংওয়ে সম্পর্কে এ-কথা বলতে পারেন না, তরুণ আমেরিকানরা তাঁকেও অনুসরণ করার চেষ্টা করে। তিনি তো জনগণের সঙ্গে মেশেন।

নাইপল : হেমিংওয়ে কোথায় ছিলেন তিনি নিজেও জানতেন না। তিনি আমেরিকান হওয়া নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন আর তাঁর বিষয়ও তেমনই। আপনি হেমিংওয়ে কিংবা ফিটজেরাল্ডের গল্প কিংবা অন্য কোনো রচনা, কিংবা প্যারিস নিয়ে লেখা কোনো কিছু থেকে

এ-ধারণাই পাবেন না – দুই যুদ্ধের মাঝখানের সময়টাকে প্যারিসকে কী কঠিন অবস্থার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাঁরা কেবল কাফে, পানীয়, শামুক ঝিনুক এসব নিয়ে লিখেছেন। বাইরের বৃহত্তর পরিসরকে তাঁরা দেখেন না। এ-ধরনের লেখা পড়তে এবং এগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে আমার অসুবিধা হয়। এসব আমার জন্য নয়, রাস্তার অন্য মানুষের জন্য।

তাঁরা ‘গে প্যারিস’ কিংবা এ-ধরনের বিষয় নিয়ে লিখেছেন। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, মানুষের মৃত্যু – এসব নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামাতে চাননি। এখন তো কেউ ফ্রান্স নিয়ে লেখার জন্য সেখানে যাচ্ছেন না। কারণ একটা জায়গার যখন সব ঠিকঠাক, যেমন এখনকার ফ্রান্স, লেখাটা কেমন হবে জানা কঠিন। যেখানে গিয়ে আপনি স্থানীয় জনগণের ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন, সেখানে লেখা সহজ। আপনি ভারতে যেতে পারেন, নেপালে যেতে পারেন। সেখানে অগণ্য জনতার ভিড়। এসব লোকের জন্য যারা ঠেলে আপনার বইয়ে উঠে আসার জন্য পথ করে নেবে তাদের জন্য ট্রাভেল এজেন্ট খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রতি মাসে আমার কাছে অনেক বই আসে, তারা আপনার কাছে পাঠাবে না, কারণ আপনি তেমন করে ভারত নিয়ে বই লেখেননি।

জোনাথান রোসেন ও তরুণ তেজপালের নেওয়া  ১৯৯৮-এর প্যারিস রিভিউর সাক্ষাৎকার থেকে :

প্রশ্ন : আমি আপনার বইয়ের নাম অ্যা ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড শুনেই হতবাক। এটা আমাকে প্যারাডাইস লস্টের শেষাংশের কথা মনে করিয়ে দেয়। স্বর্গ থেকে বের করে দেওয়ার পর উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি। বাড়ি ছাড়ার পর আপনি যেখানে আসেন এটা সেই বিশ্ব?

নাইপল : আমার মনে হয়, আপনি কোথায় বাস করছেন তার ওপর এটা নির্ভর করে। আমি বুঝতে পারছি না এটা ন্যায্য কোনো প্রশ্ন কি না কিংবা আমি এর উত্তর দেবো কি না। আপনি বরং অন্যভাবে প্রশ্নটি করুন।

প্রশ্ন : আমার মনে হচ্ছে বিশ্ব বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন সেটাই জানতে চাচ্ছি।

নাইপল : মানুষ খুব সাদাসিধে জীবনযাপন করতে পারে। তাই না? চিন্তাভাবনা ছাড়া কোথাও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে। আমি মনে করি, আপনি যখন চিন্তা করেন তখন যেখানে প্রবেশ করেন সেটাই বিশ্ব – যখন আপনি শিক্ষিত হয়ে ওঠেন, যখন আপনি প্রশ্ন করতে পারেন – আপনি বিশাল বিশ্বে থাকতে পারেন এবং পুরোপুরি আঞ্চলিকও হতে পারেন।

প্রশ্ন : আপনি কি বৃহত্তর ভাবনার একটি বিশ্বে বেড়ে উঠেছেন? আপনার ‘বিশ্ব’ শব্দে যে ধারণা দিতে চেয়েছেন?

নাইপল : আমি সবসময়ই জানতাম বাইরে একটি বিশ্ব আছে। আমি সে-বিশ্বে বেড়ে উঠেছি – কৃষিভিত্তিক ঔপনিবেশিক সমাজ – আমি তা মেনে নিতে পারিনি। এত বিষণœ, এত সীমিত আপনি থাকতে পারেন না।

প্রশ্ন : অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করার জন্য আপনি ১৯৫০ সালে ত্রিনিদাদ ছেড়ে যান। আপনার উচ্চাশা চরিতার্থ করার জন্য সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অপরিচিত এক দেশে।

নাইপল : আমি খুব বিখ্যাত হতে চেয়েছিলাম। আমি একজন লেখকও হতে চেয়েছি, লেখার জন্য বিখ্যাত। আমার সেই উচ্চাশার অসম্ভব দিকটি ছিল – আমি কী লিখতে যাচ্ছি, সে-সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না। বাস্তবে আমার অনেক আগে উচ্চাশাটি এসে যায়। চিত্রনির্মাতা শ্যাম বেনেগাল একবার আমাকে বলেছিলেন, তিনি ছ-বছর বয়স থেকে সিনেমা বানাতে চেয়েছেন – আমি লেখক হতে চেয়েছি দশ বছর বয়স থেকে। …

প্রশ্ন : সবকিছুর সমাধানের পথ হিসেবে লেখালেখিটাই কেন আপনার জীবনের মূল প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে?

নাইপল : জীবনের লক্ষ্য হিসেবে এটা আমাকে দেওয়া হয়েছে। বরং আমি আমার বাবার উদাহরণ দিই। তিনি একজন লেখক ছিলেন – একজন সাংবাদিক; তিনি গল্পও লিখতেন। আমার কাছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি এটাকে পেয়েছেন নির্দয় প্রেক্ষাপটে; তাঁর গল্প থেকে আমি বুঝতে পারি তাঁরটা ছিল খুব নির্দয় বিশ্ব। কাজেই আমি এই ভাবনা নিয়েই বেড়ে উঠি যে, সবসময়ই বাইরের শত্রুকে খোলাসা করার দরকার নেই, জরুরি হচ্ছে নিজের ভেতর দিকটাতে তাকানো। অবশ্যই আমাদের নিজেদের পরীক্ষা করতে হবে – আমাদের নিজেদের দুর্বলতাকে পরীক্ষা করতে হবে। এটা আমি এখনো বিশ্বাস করি।

প্রশ্ন : আপনি বলেছেন, লেখালেখি আপনি দেখছেন সত্যিকারের মহান আহ্বান হিসেবে।

নাইপল : হ্যাঁ, আমার জন্য এটা মহান আহ্বান। এটা মহান, কারণ সত্য নিয়ে এর কারবার। আপনার অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করতে আপনাকে পথ খুঁজতে হয়। আপনাকে তা বুঝতে হয়, বিশ্বকে বুঝতে হয়। লেখালেখি হচ্ছে গভীরতর উপলব্ধির নিরন্তÍর প্রচেষ্টা। এটা বেশ মহান কাজ।

প্রশ্ন : আপনি কখন লিখতে শুরু করেন?

নাইপল : ১৯৪৯-এ একটি উপন্যাসের কাজ শুরু করি। মজার একটি চিন্তার এটা বেশ প্রহসনমূলক লেখা – ত্রিনিদাদের একজন কালো মানুষ আফ্রিকার একজন রাজার নামে নিজের নাম রাখছেন। আমি এই ভাবনাটিরই অনুসন্ধান করছিলাম। এই লেখাটা টানতে টানতে দুবছর নিয়ে নিই, কারণ আমি এতটাই তরুণ ছিলাম যে, বেশি কিছু তখনো আমার জানা হয়নি। আমি বাড়ি ছেড়ে বেরোনোর কদিন আগে লেখাটা শুরু করি, অক্সফোর্ডের একটা লম্বা ছুটির সময় শেষ হয়। আমি খুশি হই কারণ একটি বই শেষ করতে পারার যে-অভিজ্ঞতা তা আমি অর্জন করি। অবশ্যই এই বইয়ের কিছুই হয়নি।

আমি যখন অক্সফোর্ড ছেড়ে যাই সত্যিকারের আর্থিক টানাটানির মধ্যে পড়ে যাই – আমি খুবই সিরিয়াস কিছু একটা লিখতে শুরু করি। আমি আমার নিজের স্বর, নিজের সুর খুঁজতে থাকি – যা একান্তই আমার নিজের। কারো কাছ থেকে ধার করা নয়, কিংবা অভিনীত কিছু নয়। সিরিয়াস স্বর আমাকে নিয়ে গেল গভীর হতাশার দিকে। এটা আমাকে কিছুকাল টেনে রাখল, যতক্ষণ আমার পাঠানো পা-ুলিপি পড়ে একজন পরামর্শ দিলেন এসব ছেড়ে দাও। …

প্রশ্ন : এ-সময়ই কি আপনি মিগেল স্ট্রিট লিখতে শুরু করেন?

নাইপল : হ্যাঁ। কোনো কিছু নিয়ে সবার আগে কিছু লেখাটা খুব কঠিন কাজ। এরপর এটা অনুসরণ করা বেশ সহজ। আমি যে-বইটি লিখেছি তাতে রয়েছে আমার পর্যবেক্ষণ, লোককথা, সংবাদপত্রের ক্লিপিং এবং আমার স্মৃতির মিশ্রণ। এরকম অনেকেই করতে পারেন কিন্তু সে-সময় আমি যা করেছি ভেবেচিন্তে করতে হয়েছে।

একবার ভাবুন, ১৯৫৫ সালে মিগেল স্ট্রিটের মতো একটা বই লেখা হয়েছে। এখন তো মানুষ ভারতের এবং অন্য কোনো সাবেক উপনিবেশের লেখালেখি নিয়ে আগ্রহী, কিন্তু সে-সময় এগুলো লেখা বলে বিবেচিত হতো না। প্রকাশিত হওয়ার আগে চার বছর এই বইটি বহন করা আমার জন্য খুব কঠিন একটি কাজ ছিল। এতে আমি ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম এবং তা এখনো আমার ওপর কালো ছায়া ছড়িয়ে আছে।

প্রশ্ন : ১৯৫৫ সালে আপনি দুটি বই লিখেছেন। দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর এবং মিগেল স্ট্রিট। প্রথম বইটি ১৯৫৭-র আগে এবং গল্পগুলো ১৯৫৯-এর আগে প্রকাশিত হয়নি।

নাইপল : আমার জীবন ছিল বেশ কঠিন। যখন আপনি তরুণ যখন আপনি নিঃস্ব, যখন আপনি আপনার উপস্থিতি পৃথিবীকে    জানাতে চান, তখন অপেক্ষার দুবছর অনেক লম্বা সময়। আমাকে সত্যিই অনেক ভুগতে হয়েছে। দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর (এর বাংলা হতে পারে অতীন্দ্রিয় অঙ্গমর্দনকারী) শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে এবং আমার নিজের পত্রিকা (আমি তখন নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকায় কাজ করি) বইটিকে নাকচ করে দেয়। অক্সফোর্ড থেকে পাশ করা পরবর্তীকালে বেশ খ্যাতিমান একজন এটাকে ঔপনিবেশিক দ্বীপ থেকে আসা কিঞ্চিৎ চাটনি বলে উড়িয়ে দিলেন – এতে কোনো শ্রমের স্বাক্ষর নেই।

সে-সময় বইয়ের আলোচকরা কোনগুলোকে সত্যিকারের বই বলতেন তা দেখাটা কৌতূহলের ব্যাপার। এখন এসব আমাকে বলা অর্থহীন। যাকগে, বইটা তো চল্লিশ বছর ধরে বাজারে আছে এবং এখনো ছাপা হচ্ছে। কিন্তু আমি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমি উপেক্ষায় ক্ষত-বিক্ষত হয়েছি। এখন এ-ধরনের বই সহজেই প্রকাশিত হয় – এজন্যই অভিযোগ করেন। আমি কখনো অভিযোগ করিনি, আমি আমার মতো চালিয়ে গেছি।

প্রশ্ন : আপনি মূলত আত্মবিশ্বাসের বলে টিকে গেছেন?

নাইপল : এ নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। যখন আমি শিশু ছিলাম, সে-সময় থেকেই আমার বিশ্বাস ছিল আমি চিহ্নিত; আমি আলাদা।

প্রশ্ন : অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার পরই লিখতে শুরু করেন?

নাইপল : হ্যাঁ। আমি মরিয়া হয়ে একটি বিষয়ের জন্য চারদিকে খোঁজ করছিলাম। এটা খুব হতাশাব্যঞ্জক ছিল, আমি যথেষ্ট নিশ্চিতবোধ করছিলাম না বলে পেনসিল দিয়ে লিখতে শুরু করি। আমার যে-ধারণাটি কাজ করে, তাতে আমার বাবার মতো একটি চরিত্র, যে জীবনের শেষপ্রান্তে এসে যেসব জিনিসপত্র তাঁকে ঘিরে রেখেছে, সেগুলো দেখছে, ভাবছে এগুলো কেমন করে তাঁর জীবনে এলো। আমি দীর্ঘসময় কোনো ধরনের অনুপ্রেরণা ছাড়াই লিখে গেছি, প্রায় নয় মাস।

প্রশ্ন : আপনি কি প্রতিদিনই লেখেন?

নাইপল : প্রতিদিনই লিখি, কঠোরভাবে এটা বলা যায় না – মন খারাপ থাকলে অনুপ্রাণিত হয়ে আপনি লেখালেখির কাজটা চালাতে পারেন না। আমি একই সঙ্গে আমার লেখার রিভিউয়ার হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কেউ একজন নিউ স্টেটসম্যান পত্রিকার কাছে আমাকে সুপারিশ করেছিল। তারা আমাকে একটার পর একটা কাজ পাঠাতে থাকে, আমি খুব চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম, কিন্তু চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারপর তারা আমাকে জ্যামাইকার ওপর কিছু বই পাঠায়। একসময় চমৎকার সহজ স্বরটি আমার অধিকারে চলে আসে। তার মানে আমার সে-সময়ের কিছু সাফল্য আছে – কেমন করে একটা বই নিয়ে ছোট কিন্তু মজার একটা লেখা দেওয়া যায়, কিংবা কেমন করে বইটিকে পাঠকের কাছে সত্যিই বাস্তব করে তোলা যায় – এসব শিখেছি। শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটি গতি পেয়ে গেল, তারপর সে-গতিতেই চলতে থাকল। আমি প্রতি চার সপ্তাহের তিন সপ্তাহই লেখালেখির জন্য ছেড়ে দিচ্ছি। আমি খুব শিগগির বুঝতে পারি, এটি একটি ভালো বই হতে যাচ্ছে। আমি তখন খুব সন্তুষ্ট, আমি যদিও তরুণ তবু নিজেকে বড় কাজের জন্য প্রতিশ্রুত করাতে পেরেছি – আমি বরং ছোট আকারেই কাজটা শুরু করেছিলাম এবং ভেবেছি নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে পারলে বড় কাজ ধরব। সে-সময় কেউ যদি আমাকে রাস্তায় আটকে দিয়ে বলত, কাজটা বাদ দাও আমি তোমাকে এক মিলিয়ন পাউন্ড দেবো আমি তাকে বলতাম : কেটে পড়ো। আমার বই আমাকে শেষ করতেই হবে।

প্রশ্ন : বইটাকে (অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস) কেমনভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল?

নাইপল : প্রকাশক যখন বইটা পড়লেন তখন থেকেই বইটা ভালোভাবে গৃহীত হয়েছে বলা যায়। এটা বলতে পারলে ভালো হতো যে, প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বইটি সংগ্রহের জন্য ভিড় লেগে যায় – কিন্তু অবশ্যই সেরকম কিছু হয়নি। এটা বলতে পারলে ভালো হতো বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী দাঁড়িয়ে গেল এবং বইটি পৃথিবীর নজরে পড়ল – অবশ্যই সেরকম কিছু হয়নি। আমার অন্য বইগুলোর পাশে এটা মৃদু টুনটুন শব্দই করল, তবে বইটিকে নিজের পথ করে নিতে অনেকটা সময়ই পার করতে হলো।

গল্প- অতিকায় ডানাওয়ালা এক বুড়ো by গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ

অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী।
বৃষ্টিপাতের তৃতীয় দিন পর্যন্ত বাড়ির ভেতর তাদের হাতে এত কাঁকড়া মারা পড়ল যে পেলাইয়োকে ভেজা উঠোন পেরিয়ে এসব কাঁকড়া সমুদ্রে ছুড়ে ফেলতে হলো। কারণ নবজাত শিশুটির সারারাত জ্বর ছিল আর সবাই মনে করল এই দুর্গন্ধই অসুখের কারণ। সেই মঙ্গলবার থেকে পৃথিবীটা বিষণ্ণ হয়ে আছে। আকাশ আর সমুদ্র দুটোই একই রকম ছাই-ধূসর রঙের আর মার্চের রাতে যে-সৈকতের বালি আলোর গুঁড়োর মতো ঝিকমিক করত এখন তা কাদার দলা আর পচাগলা সামুদ্রিক মাছের মতো হয়ে গেছে। মরা কাঁকড়া সমুদ্রে ছুড়ে পেলাইয়ো যখন ফিরে আসছে আলো এতটাই ক্ষীণ, উঠোনে যে একটা কিছু নড়ছে আর গোঙাচ্ছে তা বলতে গেলে দেখাই যাচ্ছে না। দেখার জন্য তাকে খুব কাছাকাছি যেতে হলো – একজন বুড়ো, অত্যন্ত বুড়ো কাদায় মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন; আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাবার পরও অতিকায় দুটো ডানার কারণে উঠে দাঁড়াতে পারছেন না।

দুঃস্বপ্নে আতঙ্কিত পেলাইয়ো স্ত্রী এলিসেন্দার কাছে ছুটে গেল। স্ত্রী তখন অসুস্থ শিশুর মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল। পেলাইয়ো তাকে উঠোনের পেছন দিকে নিয়ে এলো। নির্বাক নিস্পন্দন দুজন মানুষ মাটিতে পড়ে থাকা দেহটির দিকে তাকিয়ে রইল। তার পরনে কাপড়-কুড়ানিদের ছিন্নবেশ। টেকো মাথায় কিছু বিবর্ণ চুলের আভাস তখনো রয়ে গেছে, মুখে অল্প কটি দাঁত, একদা যদি তার প্রপিতামহের মাহাত্ম্য থেকেও থাকে তার দুর্দশাগ্রস্ত ভেজা শরীর তা একেবারেই ম্লান করে দিয়েছে। তার বিশাল বাজডানার অর্ধেক পালক ঝরে গেছে, কাদামাটিতে মাখামাখি, যেন চিরদিনের জন্য মাটিতে গেঁথে গেছে। পেলাইয়ো এবং এলিসেন্দা দীর্ঘ সময় ধরে বুড়োর দিকে তাকিয়ে থেকে তাদের ঘোর কাটালো; একসময় মনে হলো বুড়ো তাদের চেনা। তারা সাহস করে বুড়োর সঙ্গে কথা বলল। বুড়ো দুর্বোধ্য এক আঞ্চলিক ভাষায় নাবিকের জোরালো স্বরে জবাব দিলো। ডানার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে এবার তারা বুদ্ধি খাটিয়ে বের করল বুড়ো আসলে ঝড়ে জাহাজডুবিতে বিচ্ছিন্ন বিদেশি নাবিক। তারপরও তারা প্রতিবেশী এক বৃদ্ধাকে ডেকে আনল। জীবন ও মৃত্যু সম্পর্কে বৃদ্ধা সবই জানে। একবার তার ওপর চোখ পড়লেই ডানাওয়ালা বুড়োকে নিয়ে তাদের যে-বিভ্রান্তি বৃদ্ধা তা কাটিয়ে দিতে পারবে। বৃদ্ধা বললেন, ‘তিনি একজন দেবদূত। নিশ্চয়ই তিনি শিশুটির জন্য এখানে আসছিলেন। কিন্তু বেচারা এতটাই বৃদ্ধ, বৃষ্টি তাকে আছড়ে ফেলে দিলো।’

পরদিন সবাই জানল রক্তমাংসের এক দেবদূত পেলাইয়োর বাড়িতে আটকা পড়েছেন। তাদের প্রতিবেশী সেই জ্ঞানী বৃদ্ধার এই রায়ের কারণে এই দেবদূত বেঁচে গেলেন – তখনকার আমলের ধারণা, এরা হচ্ছেন আধ্যাত্মিক ষড়যন্ত্রের বেঁচে যাওয়া পলাতক প্রাণী, যাদের মুগুরপেটা করে হত্যা করা হতো।

নিজ হাতে পেয়াদার মুগুর তুলে নিয়ে পেলাইয়ো সারা বিকেল রান্নাঘর থেকে তার ওপর চোখ রাখছিল। তবে ঘুমোতে যাওয়ার আগে তাকে টেনেহিঁচড়ে কাদা থেকে তুলে আনে এবং মুরগির খোঁয়াড়ে মুরগির সঙ্গে তালাবদ্ধ করে রাখে। মধ্যরাতে যখন বৃষ্টি থামে পেলাইয়ো ও এলিসেন্দা তখনো কাঁকড়া মেরে চলেছে। এর কিছুক্ষণ পরই শিশু উঠে বসে, তার গায়ের জ্বর ছেড়ে দেয় এবং সে খেতে চায়। তারা কৃতজ্ঞতার প্রশান্তি অনুভব করল, দেবদূতকে একটি মাচানের ওপর বসিয়ে তার জন্য পানি ও তিনদিন চলার মতো খাবারের জোগান দিলো; ঠিক করল তারপর তাকে নিয়তির কাছে ভরা সাগরে ফেলে আসবে। কিন্তু ভোরের আলো ফুটতেই তারা যখন উঠোনে নামল, দেখল প্রতিবেশীরা মুরগির খোঁয়াড়ের সামনে দেবদূতকে নিয়ে মজা করছে – তার ওপর এতটুকু শ্রদ্ধা তাদের নেই, খোঁয়াড়ের তারের ফাঁক গলিয়ে ভেতরে খাবার ছুড়ে মারছে – যেন তিনি কোনো অতিপ্রাকৃতিক সৃষ্টি নন, কেবল সার্কাসের একটি জন্তু মাত্র।

অদ্ভুত এই খবরটি শুনে ফাদার গনজাগা সকাল ৭টার আগেই এসে হাজির হলেন। ততক্ষণে আরো যেসব দর্শনার্থীর আগমন ঘটল তারা কেউই ভোরের দর্শনার্থীদের মতো এমন চপলচিত্তের নয়। তারা এই বন্দির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের জল্পনা-কল্পনা শুরু করল। তাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সহজ-সরল তারা ভাবল, এই দেবদূতকে গোটা পৃথিবীর মেয়র ঘোষণা করা উচিত। আর যারা একটু কঠোরমনা তারা মনে করল, ভবিষ্যতের সব যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য তাকে ফাইভ স্টার জেনারেল পদে উন্নীত করা দরকার। যারা ভাবুক ধরনের তারা মনে করল, এই দেবদূতকে আটকে রেখে তাকে দিয়ে জ্ঞানী ও পাখাওয়ালা সন্তান উৎপাদনের কাজে লাগানো যেতে পারে – এই নতুন প্রজন্মের জ্ঞানী মানুষ গোটা বিশ্বের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে। ফাদার গনজাগা পাদ্রি হওয়ার আগে বেশ দশাসই একজন কাঠুরে ছিলেন। খোঁয়াড়ের তারের বাইরে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তিনি দরজা খোলার নির্দেশ দিলেন। ভেতরে একদল বিমুগ্ধ মুরগির মাঝে তাকে হাড়-জিরজিরে অতিকায় একটি মুরগির মতোই মনে হচ্ছিল। তিনি এক কোণে শুয়ে রোদে সকালবেলার দর্শনার্থীদের ছুড়ে দেওয়া ফলের ছালবাকল ও অবশিষ্ট নাশতার মধ্যে তার ছড়ানো ডানা শুকাচ্ছিলেন।

ফাদার গনজাগা যখন মুরগির খোঁয়াড়ে ঢুকে ল্যাটিন ভাষায় তাকে সুপ্রভাত বললেন, পৃথিবীর প্রগল্ভতার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা এই দেবদূত কোনোরকমে তার প্রাচীন চোখদুটো তুলে নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষায় কিছু একটা বিড়বিড় করে তার জবাব দিলেন।

পাদ্রির আওতাধীন উপাসকরা যখন দেখল এই প্রাণী ঐশ্বরিক ভাষা বোঝেন না কিংবা পাদ্রিকে কীভাবে সম্ভাষণ জানাতে হয় তাও জানেন না, তাকে প্রতারক মনে করল। পাদ্রি আরো কাছে গিয়ে দেখলেন তিনি তো মানুষের মতোই, তার শরীরে লেগে থাকা আবর্জনার অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ, তার পাখার পেছন দিকটাতে প্যারাসাইট গজিয়েছে আর মহাজাগতিক ঝড়ের দাপটে ডানা দুটো কাহিল হয়ে পড়েছে; এসব আঘাতের কারণে কোনো মাপেই তাকে গর্বিত দেবদূতের মতো মনে হচ্ছে না। পাদ্রি মুরগির খোঁয়াড় থেকে বেরিয়ে এসে উৎসাহী দর্শকদের নসিহত করলেন এবং তাদের মূঢ়তার জন্য সতর্ক করে দিলেন। তিনি সকলকে স্মরণ করিয়ে দিলেন বিচিত্ররূপী শয়তান অসতর্ক মানুষকে বিভিন্নভাবে বিভ্রান্ত করে থাকে। বাজপাখি এবং উড়োজাহাজের পার্থক্য বুঝতে শুধু ডানা দেখাই যথেষ্ট নয়। আর দেবদূত শনাক্ত করার জন্য ডানা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তারপরও তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন বিষয়টি নিয়ে তিনি তার অধিকর্তাকে চিঠি লিখবেন, আর তিনি লিখবেন সুপ্রিম পনটিফের কাছে, সর্বোচ্চ আদালত থেকে এই অতিকায় ডানাওয়ালা বুড়ো সম্পর্কে রায় জানা যাবে।

পাদ্রির জ্ঞানগর্ভ নসিহত কৌতূহলী মানুষের বন্ধ্যা হৃদয় স্পর্শ করতে পারল না। দেবদূত ধরা পড়ার খবরটি এত দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ির উঠোন বাজারে পরিণত হয়ে বাড়িঘর ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। আর তাদের সামাল দিতে বন্দুকের ডগায় বেয়নেট লাগানো সৈন্যদের ডাকতে হলো। বাজারে পরিণত হওয়া আঙিনার ময়লা সাফ করতে গিয়ে এলিসেন্দার শিরদাঁড়া ভেঙে পড়ার অবস্থা। শেষ পর্যন্ত তার মাথায় বুদ্ধি এলো বরং উঠানের চারপাশে বেড়া দিয়ে আটকে দেবে, কেউ দেবদূতকে দেখতে চাইলে পাঁচ সেন্ট দিয়ে তবে ভেতরে যাবে।

বহুদূর থেকে মানুষ আসতে শুরু করল। ভ্রমণে বের হওয়া একটি কার্নিভাল এখানে এসে থামল। তাদের একজন উড়ন্ত বাজিকর কসরত দেখিয়ে দর্শক টানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। কারণ বাজিকরের ডানা দুটো দেবদূতের ডানার মতো নয়, বরং আকাশচারী বাদুড়ের মতো। সবচেয়ে হতভাগ্য পঙ্গু লোকজন সুস্বাস্থ্যের আশায় এখানে জড়ো হলো। সেই শৈশব থেকে হৃদ্যন্ত্রের ধুকপুক গুনতে থাকা এক বৃদ্ধার গোনার মতো সংখ্যা ফুরিয়ে গেছে, সেও এসেছে। পর্তুগিজ লোকটিকে আকাশের তারারা হইচই শব্দ করে বিরক্ত করছে, তারও সমাধান চাই। ঘুমন্ত অবস্থায় হেঁটে বেড়ানো একজন জেগে থাকা অবস্থায় সম্পন্ন করা তার সারাদিনের কাজ লন্ডভন্ড করে দেয়। যেনতেন রোগব্যাধি নিয়েও অনেকেই আসে। জাহাজডুবির পর বিশৃঙ্খল অবস্থা পৃথিবীতে কাঁপন তুলেছে; এত ক্লান্তির মধ্যেও পেলাইয়ো এবং এলিসেন্দা খুব খুশি –  কারণ এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তাদের ঘর টাকায় ভরে গেছে আর দেবতীর্থে ঢোকার জন্য অপেক্ষমাণ তীর্থযাত্রীর লাইন ততক্ষণে দিগন্তরেখায় গিয়ে ঠেকেছে।

এই কর্মযজ্ঞে একজনই কেবল নিজের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেননি। তিনি দেবদূত। তেলের বাতির নারকীয় উত্তাপ আর চারপাশে উৎসর্গের মোমের আলোতে বিভ্রান্ত দেবদূত অন্যের আশ্রয়ে যতটা সম্ভব নিজেকে সইয়ে নিচ্ছিলেন। তারা তাকে প্রথমে কর্পূর খাওয়াতে চেষ্টা করল, জ্ঞানী সেই বুড়ি জানিয়েছে দেবদূতদের জন্য খাবার হিসেবে এটাই নির্ধারিত। কিন্তু তিনি এ-খাবার প্রত্যাখ্যান করলেন। ঠিক একইভাবে তিনি প্রায়শ্চিত্তকারীদের আনা গির্জার মধ্যহ্নভোজ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ অবশ্য জানতে পারেনি তিনি বার্ধক্যের কারণে, না দেবদূত হওয়ার কারণে এই খাবার ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তিনি বেগুনের ভর্তা ছাড়া আর কিছুই খেলেন না। এ পর্যন্ত একমাত্র ধৈর্য ছাড়া তার মধ্যে অন্য কোনো অতিপ্রাকৃতিক গুণের প্রকাশ ঘটেনি। বিশেষ করে প্রথম দিনগুলোতে যখন তাকে মুরগি ঠোকর, ডানায় ঢুকে পড়া নাক্ষত্রিক প্যারাসাইট খোঁজা, তার শরীরের বিভিন্ন অংশ স্পর্শ করার জন্য টেনে পালক তুলে ফেলা, তাকে শোয়া অবস্থা থেকে দাঁড় করানোর জন্য এমনকি অত্যন্ত সদয় হয়ে নিক্ষেপ করা পাথর – সবকিছুতে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন। কেবল একবারই তারা দেবদূতকে নাড়াতে সমর্থ হয় যখন তপ্ত লোহার শলাকা তার শরীরের একাংশে লাগিয়ে দেয় – তিনি এতটা স্থবির হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিশ্চুপ পড়ে ছিলেন যে সবাই ধরে নিয়েছে তিনি মারা গেছেন। তবে শরীরে ঝাঁকি দিয়ে তিনি জেগে ওঠেন, তার তপোবনের ভাষায় কথা বলেন এবং তার চোখে অশ্রুপাত শুরু হয়।

তিনি কয়েকবার তার ডানা ঝাপটান, আর তাতে মুরগির বিষ্ঠা, মহাকাশের ধুলো এবং আতঙ্কের যে ঘূর্ণিপাত হতে থাকে তা নিশ্চয়ই পার্থিব কিছু নয়। অনেকেই তখন মনে করেছে দেবদূতের এই প্রতিক্রিয়া ক্রোধের নয়, বরং যন্ত্রণার আর এরপর থেকে কেউ তাকে উত্ত্যক্ত করতে চেষ্টা করেনি – তাদের অধিকাংশই বুঝতে পেরেছে এই নিষ্ক্রিয়তা সবকিছু মেনে নেওয়ার কারণে নয়, বরং তা ঝঞ্ঝার পর নীরবতার মতো।

ফাদার গনজাগা যখন বন্দির প্রকৃতির সম্পর্কে সর্বোচ্চ মহলের চূড়ান্ত রায়ের প্রতীক্ষা করছেন, জনতার এই খেয়ালিভরা চাপল্যকে কাজের বুয়ার কৌতূহল বলে মেনে নিলেন। পাদ্রির কাছে রোম থেকে যে পত্রটি এসেছে তাতে মনে হলো না বিষয়টি কত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ তা তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন। বন্দির নাভি আছে কি না, তার মুখের ভাষার সঙ্গে আরামায়িক ভাষার যোগাযোগ আছে কিনা, আলপিনের ডগার খোঁচা কবার সহ্য করতে পারেন, বন্দি আসলে ডানাওয়ালা নরওয়েজিয়ান কি না – এসব নিয়ে তারা সময় কাটিয়েছে। এসব তুচ্ছ বিষয় নিয়ে চিঠি চালাচালি চলতেই থাকত যদি না একটি দৈব ঘটনা পাদ্রিদের এসব কীর্তিকলাপের ইতি টানত।

সেই দিনগুলোতে শহরের মেলার একটি বড় আকর্ষণ ছিল মেলায় আসা এক নারী, বাবা-মায়ের অবাধ্য হওয়ায় সে মাকড়সাতে পরিণত হয়। তাকে দেখার জন্য যে দর্শনী নির্ধারণ করা হয় তা দেবদূতের দর্শনীর চেয়ে কেবল কমই নয়, উৎসুক জনতা চাইলে তাকে নারীর এই অসম্ভব রূপান্তর সম্পর্কে যে-কোনো ধরনের প্রশ্ন করতে পারে, যাতে তার এই ভয়াবহ দশা দেখে মনে কোনো সন্দেহ না জাগে সেজন্য উলটেপালটে পরীক্ষা করে দেখতে পারে। ভেড়ার আকৃতির একটি মাকড়সা, মাথায় বসানো বিষণ্ণ এক নারীর মুখ। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়টি এই নারীর আকৃতি নয়, বরং তার মুখে এই হতভাগ্য জীবনের বর্ণনা। যখন বলতে গেলে তার শৈশবও কাটেনি অনুমতি না নিয়ে চুপিচুপি বাবা-মায়ের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নাচের আসরে যোগ দিলো। সারারাত নাচানাচির পর যখন বনের মধ্য দিয়ে বাড়ি ফিরে আসছে, আকাশফাটা বজ্রপাত ঘটল আর সেই ফাটা অংশ দিয়ে বিদ্যুৎ ঝলকের সঙ্গে বেরিয়ে আসা গন্ধকের টুকরো গায়ে পড়ে সুন্দর সেই মেয়েটিকে মাকড়সাতে রূপান্তরিত করল। সদয় মানুষেরা তার মুখের দিকে যে মাংসের টুকরো ছিঁড়ে দেয়,  তা-ই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তার কাহিনিতে যে করুণ মানবিক সত্য ও ভয়ংকর শিক্ষা তা উদ্ধত বন্দি দেবদূতকে পরাস্ত করতে বাধ্য, তিনি তো এমনকি দয়াবশত মর্তের মানুষের দিকে চোখ তুলে তাকান না। তাছাড়া যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটানোর কৃতিত্ব দেবদূতকে দেওয়া হয়েছিল তাতে কিছু মানসিক বিপর্যয়ও ঘটে। যেমন একজন অন্ধের বেলায় দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার বদলে তার তিনটি নতুন দাঁত গজায়; পক্ষাঘাতগ্রস্ত একজন হাঁটার শক্তি ফিরে পাওয়ার বদলে জিতে নেয় লটারি আর কুষ্ঠরোগীর ক্ষতস্থানে বেরিয়ে আসে সূর্যমুখী ফুল। এগুলো অলৌকিক ঘটনার সান্ত্বনার বদলে বরং মজাদার কৌতুক – যখন মাকড়সাতে রূপান্তরিত নারীর আগমন ঘটল দেবদূতের খ্যাতি ধূলিসাৎ হয়ে গেল, মাকড়সা-নারী তাকে সম্পূর্ণভাবে পরাস্ত করল। এভাবে ফাদার গনজাগা তার অনিদ্রারোগ থেকে একেবারে সেরে উঠলেন আর পেলাইয়োদের বাড়ির উঠান তিনদিনের টানা বৃষ্টি আর শোবার ঘরে কাঁকড়া হাঁটাহাঁটির সময় যেমন জনশূন্য ছিল, ঠিক সে-অবস্থায় ফিরে এলো।

বাড়ির মালিকদের হা-হুতাশ করার আর কোনো কারণ রইল না। যে-টাকা তারা জমিয়েছে তা দিয়ে ব্যালকনি ও বাগানসহ দোতলা প্রাসাদ বানিয়ে ফেলল, চারদিক নেট দিয়ে ঘিরে দিলো যেন শীতকালে বাড়িতে কাঁকড়া ঢুকতে না পারে। জানালায় বসানো হলো লোহার পাত, যেন তা ঠেলে দেবদূত ঢুকতে না পারে। শহরের কাছাকাছি একটি খরগোশের খামার স্থাপন করে পেয়াদার চাকরিটা চিরদিনের মতো ছেড়ে দিলো। আর এলিসেন্দা কিনল উঁচু হিল সাটিনের পাম্প শু, বিচিত্রবর্ণ সিল্কের বহু পোশাক – সেকালের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত নারীরা রোববারে এসব পোশাকই পরত।

মুরগির খোঁয়াড়টার ওপর কারো নজর পড়েনি। তারা যে-ক্রেওলিন দিয়ে ভেতরটা ধুয়ে রাখত, চক্ষুজ্বলা ধূপ দিত, এর কোনোটাই দেবদূতের প্রতি সমীহের কারণে উপচার নয়, বরং গোবরস্তূপের দুর্গন্ধ সরাতে – যে-দুর্গন্ধ ভূতের মতো চারদিক লেপ্টে রেখেছে এবং নতুন বাড়িটাকে পুরনো বাড়িতে পরিণত করেছে। প্রথমে শিশুটি যখন হাঁটতে শিখল সবাই সতর্ক থাকল যেন সে মুরগির খোঁয়াড়ের কাছে না যায়। তারপর ধীরে ধীরে তাদের ভয় কাটতে লাগল, দুর্গন্ধ সহনশীল হয়ে উঠল, দু-নম্বর দাঁতটি উঠতেই শিশুটি খেলার জন্য খোঁয়াড়ে ঢুকতে শুরু করল। খোঁয়াড়ের তারগুলো খুলে খুলে পড়ছে। মর্তের অন্যদের বেলায় দেবদূত যেমন গুরুগম্ভীর ছিল, শিশুটির বেলাতেও এতটুকু ছাড় দেননি, তবে তিনি সব ধরনের যন্ত্রণা ও গঞ্জনা মোহমুক্ত কুকুরের মতো সহ্য করে চলেছেন। দুজনেরই একই সঙ্গে জলবসন্ত হলো। যে-ডাক্তার শিশুটির চিকিৎসা করলেন তিনি দেবদূতের হৃদ্স্পন্দন শোনার লোভ সংবরণ করতে পারলেন না। তিনি তার হৃৎপিন্ডের শোঁ-শোঁ শব্দ শুনলেন, কিডনিতেও বিচিত্র শব্দ; তিনি ধরে নিলেন দেবদূতের পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। তাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল দেবদূতের দেহে ডানা লাগানোর যুক্তি – অত্যন্ত প্রাকৃতিকভাবে স্বাভাবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতোই দেহসংলগ্ন; ডাক্তার বুঝতে পারেন না, তাহলে এরকম ডানা অন্য মানুষেরও নেই কেন।

শিশুটি ততদিনে স্কুলে যেতে শুরু করল; রোদে-বৃষ্টিতে মুরগির খোঁয়াড় ধসে গেল। পথেঘাটের মরণাপন্ন মানুষের মতো দেবদূত নিজের শরীর টেনে এখানে-ওখানে পড়ে রইলেন। ঝাঁটাপেটা করে তারা দেবদূতকে শোবার ঘর থেকে বের করতেই পরক্ষণে দেখা গেল তিনি রান্নাঘরে পড়ে আছেন। মনে হলো তিনি একই সঙ্গে কয়েক জায়গায় অবস্থান করছেন। তারা ভাবতে শুরু করল, তিনি নিজের মতো দেখতে হুবহু একজন দেবদূত সৃষ্টি করতে পারেন – এখন সারা বাড়িজুড়ে তার মতো একেকজন। ধৈর্যচ্যুত ও মুখে লাগামহীন এলিসেন্দা চেঁচিয়ে বলতে শুরু করল, দেবদূতে ভরা এই বাড়ি নরক হয়ে গেছে, এখানে বাস করা অসম্ভব।

দেবদূত খাবার মুখে তুলতে পারছেন না, তার প্রাচীন জোড়াচোখ এতই ঝাপসা হয়ে এসেছে যে তিনি খুঁটিতে খুঁটিতে ধাক্কা খাচ্ছেন। তার আর অবশিষ্ট রয়েছে ডানার কিছু পালক। পেলাইয়ো তার দিকে একটি কম্বল ছুড়ে দেয় এবং শেডের নিচে ঘুমোতে দেওয়ার মতো দয়ালু হয়ে ওঠে। তখনই তারা টের পায় দেবদূত জ্বরে আক্রান্ত। বৃদ্ধ নরওয়েজিয়ানে জিহবা জড়ানো শব্দে প্রলাপ বকছেন। আরো দু-একবারের মতো এবারো তারা আশঙ্কা করল, তিনি মারা যাচ্ছেন। এমনকি প্রতিবেশী জ্ঞানবৃদ্ধাও বলতে পারলেন না মৃত দেবদূতকে নিয়ে কী করতে হবে।

এদিকে দেবদূত কেবল সেই শীতে টিকেই রইলেন না, প্রথম কদিনের রৌদ্রালোকে তার শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতিও ঘটল। উঠানের সবচেয়ে দূরের এক কোণে তিনি কদিন অনড় পড়ে রইলেন, কেউ তাকে দেখতে আসেনি। ডিসেম্বরের গোড়ার দিকে তার পাখায় কিছু শক্ত পালক গজাতে শুরু করল, কাকতাড়ুয়ার পাখার মতো। দেখে মনে হলো, জরাজীর্ণ আরেকটি মূর্তিমান দুর্ভাগ্য। কিন্তু এ পরিবর্তনের কারণ নিশ্চয়ই দেবদূতের জানা, কারণ তিনি খুব সতর্ক ছিলেন যেন এই পরিবর্তন অন্য কারো চোখে না পড়ে। তারাভরা আকাশের নিচে কখনো কখনো তিনি যে-সাগরসংগীত গেয়েছেন, তা যেন কেউ না শোনে। এক সকালে এলিসেন্দা দুপুরের খাবারের জন্য কয়েকগুচ্ছ পেঁয়াজ কাটছিল, তখন তার মনে হলো গভীর সমুদ্র থেকে একটি ঝোড়ো বাতাস এসে রান্নাঘরের ভেতর বইছে। তখন সে জানালার কাছে গিয়ে দেখল, দেবদূত ওড়ার প্রথম চেষ্টাটি করছেন। কিন্তু প্রচেষ্টাটি এতই অগোছালো যে, তার আঙুলের নখের খামচিতে সবজির বাগানে বলিরেখার দাগ পড়েছে, পাখার দুর্বল ঝাপটায় তার শেডটি ভেঙে পড়ার অবস্থা, তার ঝাপটা ফসকে যাচ্ছে, বাতাসে ভর করতে পারছেন না। তারপরও দেখা গেল দেবদূত বেশ খানিকটা ওপরে উঠে গেছেন। এলিসেন্দা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল – নিজের জন্য, স্বামীর জন্য; অসুস্থ শকুনের মতো ঝুঁকি নিয়ে কোনোভাবে ডানা ঝাপটে বাতাসে ভর দিয়ে যখন তিনি শেষ বাড়িঘরগুলোর ওপর দিয়ে উড়ে গেলেন, এলিসেন্দা তাকিয়ে রইল। পেঁয়াজকাটার মাঝখানে এলিসেন্দা তাকে উড়ে যেতে দেখছে যতক্ষণ তাকে দেখা যায় – কারণ দেবদূত আর কখনো তার জীবনে বিরক্তি সৃষ্টি করবে না, বরং দিগন্তবিস্তৃত সাগরের ওপর একটি কল্পবিন্দু হিসেবে রয়ে যাবে।

গল্প- বুড়ি by হুমায়ূন আহমেদ

রাত দুপুরে কুঁ-কু পো-পো শব্দ।
সবে শুয়েছি, ঘুমে চোখ জড়িয়ে এসেছে- বিচিত্র শব্দে উঠে বসলাম,
ব্যাপারটা কী? আমেরিকায় নতুন এসেছি। এদের কাণ্ডকারখানার সঙ্গে এখনো
তেমন পরিচয় হয়নি। ক্ষণে-ক্ষণে চমকে উঠতে হয় ।
এখন যেখানে আছি তার আমেরিকান নাম রুমিং হাউস। পায়রার খোপের মতো ছোট্ট একটা ঘর। সেই ঘরে সোফা কাম বেড, পড়ার টেবিল। টেবিলের একপাশে একটা এফ.এম. রেডিও । এই হলো আমার ঘরের সাজসজা। ভাড়া পঞ্চাশ ডলার--- জলের দাম বলা চলে । আমেরিকান এক দম্পতি তাদের বসতবাড়ির দোতলার সব ক’টা ঘর ভাড়া দিয়ে দিয়েছেন। দরিদ্র বিদেশী ছাত্ররা এইসব ঘরে থাকে। কমন বাথরুম। রান্নাঘর নেই। খেতে হয় বাইরে। সিগারেট খাওয়া যায় না, ল্যান্ড লেডি ঘর ভাড়া দেয়ার সময় কঠিন গলায় এই তথ্য জানিয়ে দিয়েছেন। উচু ভল্যুমে স্টেরিও শোনা নিষিদ্ধ। নানান বায়নাক্কা। তবুও এখানে উঠে এসেছি। কারণ- সস্তা ঘর ভাড়া, তা ছাড়া জায়গাটা ইউনিভার্সিটির খুব কাছে। ওয়াকিং ডিসটেন্স। নর্থ ডেকোটার এই প্রচণ্ড শীতে দূর থেকে ক্লাস করতে আসা সম্ভব নয়। একটা গাড়ি কিনে নেব সেও দুরাশা। দুপুরে ইউনিভার্সিটি মেমোরিয়াল ইউনিয়নে খেয়ে নেই। সন্ধ্যায় যখন ঘরে ফিরি সঙ্গে থাকে একটা হ্যামবার্গার। ঐ খেয়ে রাত পার করি ।

রুমিং হাউসে উঠে এসেছি। পনেরো দিন হলো । কারো সঙ্গে তেমন পরিচয় হয়নি। আমার পাশের রুমে আছে। ভারতীয় ছাত্র অনন্ত নাগ । সে আমাকে দেখলেই “আবে ইয়ার’ বলে একটা চিৎকার দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ে। কথাবার্তা এই পর্যন্ত । কোনার দিকের ঘরে থাকে কোরিয়ান ছাত্র "হান”। সে ইংরেজি একেবারেই জানে না। আমাকে একদিন এসে বলল, “হেড পেই মার্ডার, মার্ডার’। অনেকক্ষণ পরে বুঝলাম।-- সে বলার চেষ্টা করছে মাথার যন্ত্রণায় মারা যাচ্ছি। তার সঙ্গে ভাষার কারণেই ভাব হবার কথা নয়। আমার ঠিক মুখোমুখি ঘরে থাকে ফিলিপিনো মেয়ে তোহা । তেইশ-চব্বিশ বছর বয়স, অত্যন্ত রূপবতী । এই মেয়েটির ভাবভঙ্গি বিচিত্র । সে কারো সঙ্গে কথা বলে না। প্রায়ই গভীর রাতে ফুপিয়ে কান্দে। পঞ্চম বোর্ডার এক আমেরিকান বুড়ি, নাম এলিজাবেথ । শুরুতেই আমাকে সাবধান করে দেয়া হয়েছিল-- আমেরিকান বুড়িদের কাছ থেকে যেন শত হস্ত দূরে থাকি। আমেরিকান সমাজে বুড়োবুড়ির কোনো স্থান নেই। তারা খুবই নিঃসঙ্গ। কাজেই কথা বলার কাউকে পেলে বুড়োবুড়িরা তার জীবন অতিষ্ঠা করে দেয়। অনন্ত নাগ আমাকে বলে দিয়েছে এই বুড়িকে পাত্তা দেবে না। পাত্তা দিয়েছ কি মরেছি। সিন্দাবাদের ভূতের মতো কাধে চেপে বসবে, আর নামাতে পারবে না।
বুড়ি কয়েক বারই আমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছে, আমি অনন্ত নাগের উপদেশ মনে রেখে শুকনো গলায় বলেছি- এখন তো কথা বলতে পারব না, পড়াশোনা করছি। বুড়ি সঙ্গে সঙ্গে বলেছে, “আচ্ছা আচ্ছা, পরে কথা হবে। এক জাহাজের যাত্রী, দেখা তো হবেই... হা-হা-হা । বরং এক কাজ করো, তোমার লেখাপড়ার চাপ যখন কম থাকবে আমার ঘরে চলে এসো। গল্প করব।”
আমি এখনো তার ঘরে যাইনি। যাবার উৎসাহ বোধ করিনি ।
এখন এই মধ্যরাতে বিছানায় জেগে বসে আছি- শুনছি। বিচিত্র কো-কো শব্দ। মেজাজ খুব খারাপ হয়ে গেল। পরদিন ভোরে মিডটার্ম পরীক্ষা। ভালো ঘুম দরকার। এ-কী যন্ত্রণা! শব্দের উৎসের সন্ধানে দরজা খুলে বাইরে বের হলাম। দেখা হলো অনন্ত নাগের সঙ্গে। সেও বিরক্ত মুখে বের হয়েছে। আমি বললাম, কীসের শব্দ?”
অনন্ত শুকনো গলায় বলল, “ব্যাগ পাইপ।”
‘ব্যাগ পাইপটা কী?”
“এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র। আইরিশরা বাজায়। ফুসফুসের মারাত্মক জোর লাগে৷ ”
“বাজাচ্ছে কে?”
‘এলিজাবেথ। কী যন্ত্রণা বল তো দেখি! তুমি কি বুড়িকে বলে আসবে এখন মিডনাইট । বুড়ির কোনো রাইট নেই মিডনাইটে আমাদের বিরক্ত করার।”
আমি এলিজাবেথের ঘরের দিকে এগুলাম। দরজা হাট করে খোলা। বুড়ি বিছানায় পা তুলে ব্যাগ পাইপ নিয়ে বসে আছে। এই বাদ্যযন্ত্রটি বাজাতে ফুসফুসের প্রচণ্ড জোর লাগার কথা। আশি বছরের বুড়ি এই জোর কোথায় পেল কে জানে?
আমাকে দেখেই বুড়ি হাসিমুখে উঠে এল— ‘আহমাদ ওয়েলকাম!”
প্রথমেই অভদ্র হওয়া যায় না। আমি বললাম, “কেমন আছ?”
‘ভালো। খুব ভালো। গ্যারাজ সেল থেকে একটা ব্যাগ পাইপ কিনে ফেললাম। একেবারে ব্রান্ড নিউ। মাত্র কুড়ি ডলারেই দিয়ে দিল। চমৎকার না। জিনিসটা ?”
“হ্যা, চমৎকার।’
‘অনেকদিন থেকেই শখ ছিল একটা বাদ্যযন্ত্র বাজান শিখব তাই...”
‘ব্যাগ পাইপ বাজান তো খুব কঠিন। শুনেছি ফুসফুসের খুব জোর লাগে।”
‘তা লাগে প্রথমে বাতাস ভরাটাই কষ্ট । একবার ভরা হয়ে গেলে মোটামুটি সহজ বলা চলে। তুমি বস না- দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
“আমি অন্য একদিন এসে বসব। কাল আমার একটা পরীক্ষা, মিডটার্ম। আমার ঘুম দরকার।’
‘অফকোর্স। আমার বাদ্যযন্ত্রে তোমার ঘুমের অসুবিধা করলাম কি?”
“কিছুটা করেছ।”
‘সরি! এক্সট্রিমলি সরি! আর বাজাব না। তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমাও । জাস্ট এ মিনিট, তোমাকে এক মগ হট কোকা বানিয়ে দিচ্ছি। হট কোকার মতো ঘুমের অষুধ হয় না।”
“তোমাকে ধন্যবাদ, হট কোকা খেতে ইচ্ছা করছে না।” “না বললে হবে না। আমার কথা শোন, খেয়ে দেখ। মরার মতো ঘুমুবে । হাসবেন্ডের মৃত্যুর পর আমার অনিদ্রা রোগ হলো। সারারাত জেগে থাকি, ঘুম আসে না। তখন এই অষুধটা আবিষ্কার করলাম।”
আমি লক্ষ করলাম কথা বলতে বলতে বুড়ি হিটিং কয়েল দিয়ে পানি গরম করে ফেলেছে । কোকা প্ৰস্তুত ।
আমাকে খেতে হলো। খেতে খেতে বুড়ির গল্প শুনতে হলো। তার চার ছেলে-মেয়ে। একেক জন একেক জায়গায় । গত দশ বছর ধরে কারো সঙ্গে দেখা নেই। তবে যোগাযোগ আছে। ওরা চিঠি লেখে, ছবি পাঠায় ।
‘আহমাদ, তুমি আমার নাতি-নাতনিদের ছবি দেখবা?” “আজ থাক, অন্য একদিন দেখব।” “আচ্ছা থাক। তুমি আরাম করে ঘুমাও । গরম কোকা খেয়েছ- চমৎকার ঘুম হবে। দেখবে এক ঘুমে রাত কাভার।'
গরম কোকা খাওয়ার কারণেই হয়তো সেই রাতে এক ফোটা ঘুম হলো না। বিছানায় এপাশি-ওপাশ করে কাটালাম। ভোরবেলা বাথরুমে যাচ্ছি, এলিজাবেথের সঙ্গে দেখা । সে হাসিমুখে বলল, “কেমন ঘুম হলো বল তো? আমি বিরক্তি চেপে রেখে বললাম, ভালোই।”
বুড়ি উল্লসিত গলায় বলল, “বলেছি না। চমৎকার ঘুম হবে। কি, কথা ঠিক হলো?”
রুমিং হাউসের বুড়ি আমাদের খুব বিরক্ত করতে লাগল। জানা গেল। সে ডাকযোগে ব্যাগ পাইপ বাজান শিখছে। ডাকযোগে বাইবেল শেখা যায় জানি, কিন্তু বাদ্যযন্ত্র বাজােনও যে শেখা যায়, তা জানতাম না । এই বিচিত্র দেশে সবই সম্ভব ।
কিছুদিন পরপরই মাঝরাতে কো-কো পো-পো শব্দ হতে থাকে। তিক্তবিরক্ত অবস্থা। একদিন অনন্ত নাগ খুব চিৎকার-চোঁচামেচি করে এল,
“তুমি বাজনা শিখছ ভালো কথা। দুপুর রাতে কেন? দিনে শিখতে পার না? দিনে আমরা কেউ থাকি না, ঘর থাকে ফাঁকা ।” “দিনে আমার নানান কাজকর্ম থাকে ।” “তোমার আবার কীসের কাজকর্ম? তুমি ঘুরে ঘুরে বেড়াও।” “এটাই আমার কাজ।” “খুব ভালো কথা। রাতে যখন তোমার ঐ যন্ত্র বাজাও— দরজাটা বন্ধ করে রাখতে পার না?”
“এই বাদ্যযন্ত্র ফাঁকা জায়গায় বজাতে হয়। ইনস্ট্রাকশানে লেখা আছে। বিশ্বাস না করলে পড়ে দেখতে পাের।”
“তোমার নামে বাড়িওয়ালার কাছে আমরা নালিশ করব।”
“করতে চাইলে কর। তাতে লাভ হবে না। বাড়িওয়ালার সঙ্গে আমার যে লীজ এগ্রিমেন্ট হয়েছে সেখানে লেখা নেই যে, ব্যাগ পাইপ বাজান যাবে না।”
“তুমি অতি নিম্নশ্রেণীর একটি প্রাণী।”
“ছিঃ ছিঃ! এমন কথা বলবে না। আচ্ছা যাও, আর বাজাব না।”
কয়েক দিন সত্যি বাজনা বন্ধ থাকে, আবার শুরু হয়। রাগে দাঁত কিড়মিড় করি। কিন্তু বুড়ি সদাহাস্যময়ী। দেখা হলে একগাদা কথা বলবেই।
“আমার নাতনি এ্যানির দাঁত উঠেছে। ছবি পাঠিয়েছে। দেখবে? কী যে সুন্দর! এঞ্জেলের মতো লাগে। আমার মনে হয় এই পৃথিবীতে তার মতো সুন্দর বাচ্চা জন্মায়নি। সামারে তাকে দেখতে যাব । ছেলেকে লিখেছি টিকিট পাঠাতে । ও টিকিট না পাঠালে যেতে পারব না। ও লিখেছে পাঠাবে।”
ছেলে টিকিট পাঠায় না। বুড়ির যাওয়া হয় না। আমেরিকার অসংখ্য হতদরিদ্র বুড়িদের সে একজন। সোস্যাল সিকিউরিটির টাকায় কোনোক্রমে বেঁচে আছে। বাড়ি ভাড়া, খাবার খরচ এবং মেডিক্যাল ইন্সুরেন্স দিয়ে বুড়ির কাছে কিছুই থাকে না। এর মধ্যে তার আবার পার্টি বাতিক আছে। সস্তা ধরনের কয়েক বোতল মদ কিনে সে প্রায়ই পার্টি লাগিয়ে দেয় । ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এসে দেখি দরজার গায়ে নোট ঝুলছে। নোটে প্যাচান হরফে লেখা --
প্রিয় বন্ধু,
আজকের দিনটি আমার জীবনের বিশেষ দিন । এই দিনে আমার স্বামী ববের সঙ্গে প্রথম দেখা । এই দিনেই আমরা প্রথম একসঙ্গে ডিনার করি এবং বব আমাকে বলে— I love you. বিশেষ দিনটিকে স্মরণ করে রাখার জন্যে ছোট্ট একটা পার্টির আয়োজন করেছি। আয়োজন অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তুমি আসবে ।
পার্টিতে যেতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু না গিয়েও উপায় নেই। বুড়ি দশ মিনিট পরপর এসে বলবে, কই এখনো এলে না। সবাই এসে গেছে শুধু তোমার জন্যে অপেক্ষা। আমি যাবার পর দেখি- আমিই শুধু এসেছি। আর কেউ আসেনি। বুড়ি এক কথা সবাইকে বলে বলে আসছে।
ঘরে মোমবাতি জুলছে। টেবিলে কিছু পটেটাে চিপস, চিনাবাদাম, কাজুবাদাম এবং দু'বোতল রেড ওয়াইন- যার দাম বড়জোর ছ’ থেকে সাত ডলার ।
ঠোঁটে টকটকে লাল রঙ মেখে বুড়ি হাসিমুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তার আনন্দের সীমা নেই। পাটিতে লোক বলতে আমরা ক’জন ।
বাড়িওয়ালা-বাড়িওয়ালী কখনো আসে না। বুড়ির বাইরের কোনো বন্ধুবান্ধবও নেই। আমাদেরই সে বোধহয় ঘনিষ্ঠ বন্ধু ধরে নিয়েছে।
পার্টির মধ্যমণি হয়ে লাল মদের গ্রাস হাতে নিয়ে বুড়ি এর-তার কাছে যায়। উজ্জ্বল চোখে বলে, “জীবন বড় আনন্দময়, কি বল?”
আমরা বিরস মুখে বলি, “হ্যাঁ।”
‘বড় সুন্দর পার্টি হলো। অসাধারণ।”
“হ্যা, অসাধারণ।”
“আমার মনে হচ্ছে, আমি আমার ইয়ুথে ফিরে গেছি।”
‘খুবই ভালো কথা— ফিরে যাও।”
এলিজাবেথ তার যৌবনে ফিরে যাবার ব্যবস্থা এত ঘনঘন করতে লাগল। যে, আমরা তিক্ত-বিরক্ত হয়ে গেলাম। পাটিতে যাওয়া বন্ধ। সে এসে করুণ গলায় বলে, ‘আজ আমার এমন একটা বিশেষ দিন আর তোমরা কেউ আসবে না?
“পড়াশোনার খুব চাপ।”
‘আজ দিনটি আমার জন্যে খুবই স্পেশাল। আজ বব আমাকে প্রপোজ করেছিল । ষাট বছর আগের কথা অথচ মনে হয় সেদিন...’
“প্লিজ, আজ যেতে পারব না। এ্যাসাইনমেন্ট রয়েছে।”
“ঘণ্টাখানিকের জন্যে এসো ।”
“অসম্ভব। একেবারেই অসম্ভব।”
বুড়ি একা একাই পার্টি করে এবং একসময় ভয়াবহ ব্যাগ পাইপ বেজে উঠে। আমাদের কাউকে-না-কাউকে ছুটে যেতে হয়। আমাদের কাছে অসহ্য বোধহয় । এ-কী যন্ত্রণা!
যাই হােক, শীতের শুরুতে যন্ত্রণার অবসান হলো- জানা গেল, টাকা পয়সার অভাবে এলিজাবেথ তার ব্যাগ পাইপ বিক্রি করে দিয়েছে । আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। বাচা গেল, এখন আর মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ছুটে যেতে হবে না ।
এক বিকেলের কথা। অনন্তের কাছে শুনলাম বুড়ি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। অবস্থা খুব ভালো নয়। মনটা একটু খারাপই হলো। সেন্ট জোসেফ হাসপাতালে বুড়িকে দেখতে গেলাম। বুড়ি মহাখুশি। উজ্জ্বল চােখে বলল, “কার্ড, কার্ড এনেছ?”
অসুস্থ কাউকে দেখতে হলে কার্ড নিয়ে যাওয়ার নিয়ম আছে। আমি গেট ওয়েল কার্ড নিতে ভুলে গেছি।
এলিজাবেথ বলল, “আমি কার্ডগুলি জমাচ্ছি। তুমি পরেরবার আসার সময় কার্ড নিয়ে এসো ।”
“আচ্ছা, আনব।”
“এই দেখ হানি কী সুন্দর কার্ড দিয়েছে! এই কার্ডটা দিয়েছে “তোহা’ । , আহা! মেয়েটা বড় ভালো। অনন্ত কী করছে দেখ! শুধু যে কার্ড দিয়েছে তাই না, ফুলও নিয়ে এসেছে। বেচারার টাকা পয়সা নেই— এর মধ্যে এত খরচ । আমি খুব রাগ করেছি।”
বুড়ির আনন্দ দেখে বড় ভালো লাগল। ভিজিটিং আওয়ারের শেষে বের হচ্ছি-- বুড়ি গলার স্বর নামিয়ে বলল, “তোমাদের কাছে আমার একটা ক্ষমাপ্রার্থনা করার ব্যাপার আছে।”
আমি আগ্রহ নিয়ে তাকালাম। বুড়ি লাজুক গলায় বলল, “ব্যাগ পাইপ কেন বাজাতাম জান? একা একা থাকতে এত খারাপ লাগত! কুৎসিত বাজনাটা বাজালেই তোমরা কেউ না কেউ আসতে- খানিকক্ষণ কথা বলতে পারতাম । স্যারি! তোমাদের কষ্ট দিয়েছি।”
আমার মনটা অসম্ভব খারাপ হলো । কোনো কথা বলতে পারলাম না।
বুড়ি দু’মাস রোগভোগ করে সুস্থ হলো। তার বাড়ি ফেরা উপলক্ষে আমরা ছোট্ট একটা পার্টির ব্যবস্থা করলাম। শুধু পাটিই না- বুড়ির জন্যে সামান্য উপহারও আছে- নতুন একটা ব্যাগ পাইপ। আমরা সবাই চাঁদা করে কিনেছি।
আমেরিকানরা কাঁদতে পারে না— এই কথা যে বলে সে মহামূর্খ। অনন্ত নাগ যখন ব্যাগ পাইপ বুড়ির হাতে তুলে দিল— বুড়ি অবাক হয়ে আমাদের সবার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর শিশুদের মতো চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। কান্নার এমন মধুর দৃশ্য আমি আমার জীবনে খুব বেশি দেখিনি।

মাটির তৈরি সব বহুতল ভবন টিকে আছে হাজার বছর

মাটির তৈরি আকাশছোঁয়া সব ভবন। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন উঁচু ভবনের নগরী, যেখানে সমস্ত বহুতল ভবন কাঁচা মাটি দিয়ে তৈরি। কোনো কোনো ভবনের উচ্চতা প্রায় ১১ তলার সমান। আকাশচুম্বী এসব ভবনের বয়সও প্রায় ১ হাজার ৭০০ বছর। এত বছর পরেও কীভাবে এসব ভবন এখনো টিকে আছে তা আশ্চর্যের বটে। মাটির তৈরি এসব ভবনই এখন এই শহরের শোভা।

ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হাদরামাউত উপত্যকার এক বিস্ময়কর শহর শিবাম। এই শহরকে বলা হয় মরুভূমির ম্যানহাটন বা পৃথিবীর প্রথম উঁচু ভবনবিশিষ্ট শহর। ১৯৮২ সালে ইউনেস্কো একে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। শিবামের স্থাপত্যশৈলী, নির্মাণপ্রক্রিয়া, ইতিহাস ও টিকে থাকার রহস্য এক অনন্য বিস্ময়।

শিবামের ভবনগুলো শুধু সুউচ্চই নয়, এর নকশাও অত্যন্ত কৌশলী। শহরটি একটি পাথুরে উচ্চভূমিতে অবস্থিত, যার চারপাশে রয়েছে বিশাল বন্যার ওয়াদি বা শুকনো নদী ও খাল। যা এই শহরকে বন্যা থেকে রক্ষা করে, আবার কৃষির জন্য পানির উৎসের কাছাকাছিও রাখে। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া এই শহরটিকে আবার পুনঃনির্মাণ করা হয় ১৬শ শতাব্দীতে।

১ হাজার ৭০০ বছর আগে তৈরি এই মাটির দালানগুলো আজও দাঁড়িয়ে আছে, যা মানব সভ্যতার এক অনন্য নিদর্শন। আধুনিক প্রযুক্তির আগে কীভাবে মানুষ টিকে থাকার জন্য স্থাপত্যশৈলীকে অভিযোজিত করেছিল, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ শিবাম শহর।

শিবামের নকশা শুধু সুন্দরই নয়, এটি একটি প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাও বটে। শিবামের প্রতিটি দালানই একেকটি দুর্গের মতো। শহরটি একটি আয়তাকার গ্রিডে সাজানো এবং একটি প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত। এই ব্যবস্থা শত্রুদের আক্রমণ থেকে বাসিন্দাদের রক্ষা করত এবং উচ্চতা থেকে শত্রুদের আগমন সহজেই দেখা যেত। এই শহর মূলত হাদরামাউত উপত্যকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল, যেখানে ব্যবসায়ীরা একত্রে বসবাস করতেন।

এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের সংযোগস্থল হওয়ায় শিবাম ঐতিহাসিকভাবে অনেকবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। ফলে স্থানীয়রা আত্মরক্ষার জন্যই শহরটিকে উঁচু ও সুরক্ষিত এই কাঠামোয় গড়ে তোলে।

শিবামের বহুতল দালানের সংখ্যা প্রায় ৫০০টিরও বেশি। সাধারণত ৫-১১ তলা, কিছু ভবনের উচ্চতা ৩০ মিটার পর্যন্ত। ভবনগুলো খেজুর কাঠের ফ্রেম দিয়ে শক্তিশালী করা এবং প্রতি কয়েক বছর পর পর নতুন কাদা দিয়ে সংস্কার করা হয়। প্রথম তলায় পশুর জন্য গোয়ালঘর বা দোকান থাকে, ওপরের তলাগুলো বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হয়।

এখানকার বাড়িগুলো কাঁচা মাটি দিয়ে তৈরি করার বিশেষ কিছু কারণও আছে। প্রথম কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার সাথে মানিয়ে নেওয়া। শিবাম মরুভূমির শহর, যেখানে বৃষ্টি খুবই কম হয়, কিন্তু যখন হয়, তখন তা হয় প্রবল। তাছাড়া, এখানে প্রচণ্ড গরম ও ধূলিঝড় লেগেই থাকে। কাঁচা মাটির দেয়াল গরমে ঘরকে শীতল রাখে এবং শীতকালে উষ্ণতা ধরে রাখে।

এছাড়া, ভূমিকম্প প্রতিরোধেও মাটির দালান বেশ কার্যকর। শিবামের আশেপাশে পাথরের যোগান কম থাকায় এবং কাঠের অভাব থাকায় স্থানীয়রা সহজলভ্য কাদা, খড় ও খেজুরগাছের কাঠ ব্যবহার করে দালান নির্মাণ করে। এর ফলে খরচ কমে এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ সম্ভব হয়।

মুসলিম অধ্যুষিত প্রাচীন এই শহরটি আজও তার ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। বর্তমানে প্রায় সাত হাজার মানুষ এই শহরটিতে বসবাস করে।

ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শিবাম শহর। ছবি : সংগৃহীত
ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত শিবাম শহর। ছবি : সংগৃহীত



ডিপ্লোম্যাটের রিপোর্ট: শেখ হাসিনাকে নিয়ে উভয় সংকটে ভারত

শেখ হাসিনাকে নিয়ে উভয় সংকটে ভারত। তাকে ফেরত দেয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। এখন সেই অনুরোধে রাজি হলেও ভারতের সামনে বিপদ। আবার প্রত্যাখ্যান করলেও বিপদ। দেখা দিতে পারে বিশৃঙ্খলা। অনলাইন দ্য ডিপ্লোম্যাটে প্রকাশিত ‘দ্য কমপ্লেক্স রোড টু এক্সট্রাডিশন: উইল ইন্ডিয়া এগ্রি টু সেন্ড শেখ হাসিনা ব্যাক টু বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ভারতের কাছে প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে পাঠিয়ে অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। ১৩ই   ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম এ কথা জানিয়েছেন। ডিসেম্বরে একটি নোট ভারবালের মাধ্যমে হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বার্তা দিলেও তাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের অনুরোধের কোনো উত্তর দেয়নি ভারত। নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘রিজার্ভ’ অবস্থান বজায় রেখেছে। বার বার অনুরোধ সত্ত্বেও তারা অনুরোধ পাওয়ার বিষয়ে স্বীকারোক্তি দেয়া ছাড়া আর কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত রয়েছে। ২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত বন্দিবিনিময় চুক্তির অধীনে শেখ হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বৈধতা আছে বাংলাদেশের। এই চুক্তিটি ২০১৬ সালে সংশোধিত হয়। হাসিনাকে ফেরত চাওয়ার বৈধতা থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে জটিল অবস্থায় রয়েছে। যদি হাসিনাকে ফেরত দিতে রাজি হয় ভারত, তাহলে প্রক্রিয়াটি ধারাবাহিক কিছু পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে হতে হবে। প্রথমত তাতে আসবে ভারত-বাংলাদেশ বন্দি বিনিময় চুক্তি এবং তারপরই আন্তর্জাতিক কূটনীতির কঠোর বাস্তবতা। এ বিষয়ে পাঞ্জাবে রাজীব গান্ধী ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহকারী প্রফেসর ড. সংগীতা তাক বলেন, যদিও বন্দিবিনিময় চুক্তিটি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় টেকনিক্যাল দিক দিয়ে, তবে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও মানবাধিকারের বিষয়গুলোর বিবেচনা এ প্রক্রিয়াকে অবিশ্বাস্য জটিল ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত করবে।

সংগীতা তাক বলেন, ভারতের কাছে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক ফেরত পাঠানোর আবেদন করার মধ্যদিয়ে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত বর্ণনা থাকতে হবে অনুরোধের সঙ্গে। সংগৃহীত নথির সমর্থন থাকতে হবে। এর মধ্যে আছে বিচারিক আদেশ, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের বিষয়। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের এই অনুরোধের সঙ্গে অবশ্যই নিশ্চিয়তা থাকতে হবে যে, বাংলাদেশে তার বিচার স্বচ্ছ হবে এবং কোনো পক্ষপাতিত্ব করা হবে না। অন্যকথায় অপরাধের নথিপত্রের বাইরে অনুরোধে অবশ্যই এটা নিশ্চয়তা দিতে হবে যে- রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বমূলক বিচারের শিকার হবেন না হাসিনা। এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট যা ভারত হাসিনাকে ফেরত দেয়ার কথা বিবেচনা করার আগে যাচাই করবে।

উল্লেখ্য, এরই মধ্যে এসব বিষয়ের সবটাই পূরণ করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এরপর কি?
একবার যখন আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে, তখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে দেখবে চুক্তির সব বাধ্যবাধকতা পূরণ করা হয়েছে কিনা। বিশেষ করে প্রাথমিকভাবে এই কাজ করবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সংগীতা তাক বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যেহেতু ভারতের এরই মধ্যে একটি বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে, তাই ভারত সরকার চুক্তি অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করবে। তারা এটা নিশ্চিত করবে যে, বন্দিবিনিময় চুক্তি যথাযথ পূরণ করা হয়েছে। পর্যালোচনা প্রক্রিয়ায় যাচাই করে দেখা হবে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তা আইনগতভাবে দুই দেশের ক্ষেত্রেই অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত কিনা। এই ধারণাকে দ্বৈত অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আরও যাচাই বাছাই করে দেখবে যে, কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক, সামরিক বা ধর্মীয় অপরাধের ছাড়ের ভেতরে পড়ে কিনা। এমনটা নিশ্চিত হলে তারা হাসিনাকে ফেরত দেয়ার অনুরোধকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। এমনকি প্রাথমিক প্রশাসনিক পর্যালোচনা অনুকূলে থাকলেও বিষয়টি সেখানেই শেষ হবে না। হাসিনাকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি এরপর ভারতের বিচার বিভাগের পর্যালোচনার বিষয় হবে। সেখানে বিশেষায়িত প্রত্যাবর্তন বিষয়ক আদালত ফেরত পাঠানোর বৈধতা ও মেরিট যাচাই করবে। যদি আদালত দেখতে পায় যে, রাজনৈতিক বিচার করার বিশ্বাসযোগ্য হুমকি আছে, তাহলে ফেরত দেয়ার অনুরোধকে আটকে দিতে পারেন আদালত। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রত্যাবর্তন বিষয়ক আইনের অপব্যবহার রোধে তা হবে বিচার বিভাগের অত্যাবশ্যকীয় সুরক্ষা। নিশ্চিত করতে হবে যে, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রে আইন অনুসরণ করা হয়েছে দৃঢ়ভাবে।

ভারতের আদালত এবং নির্বাহী শাখা শেষ পর্যন্ত যদি প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ- সেটা হতে পারে পুলিশ বা কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী এজেন্সি থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা। সংগীতা তাক বলেন, শেখ হাসিনাকে ভারতে গ্রেপ্তার করা হলে তাকে এমন একটি নিরাপদ স্থাপনায় রাখতে হবে- যেখান থেকে তাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেয়ার ব্যবস্থা আয়োজন করা যায়। আইন তাকে আনুষ্ঠানিক বিচারিক কার্যক্রমের জন্য আটক রাখা অনুমোদন করে। শেখ হাসিনার পরিচিতি এবং উচ্চপর্যায়ে জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের কারণে তাকে ব্যতিক্রমী নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিতে হবে- যাতে কোনো রকম বিঘ্ন বা পালানোর সুযোগ না থাকে। এমন হলে প্রত্যার্পণের শেষ পদক্ষেপ হবে শেখ হাসিনাকে শারীরিকভাবে ভারতের হেফাজত থেকে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের হেফাজতে দিয়ে দেয়া। এক্ষেত্রে দুই দেশের সরকারের মধ্যে সূক্ষ্ম সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে। নিশ্চিত করতে হবে যে, সব আইনগত এবং কূটনৈতিক প্রটোকল মেনে চলা হয়েছে। সংগীতা তাক আরও বলেন, এসব যাচাই বাছাই শেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের হেফাজত থেকে বাংলাদেশিদের কাছে তুলে দেয়া হবে। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে দুই দেশের মধ্যে সম্মতি থাকা একটি ব্যবস্থায়- সেটা হতে পারে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্তে বা বিমানবন্দরে। এক্ষেত্রে সরকারের ভাড়া করা একটি বিমান ভারতের কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করে অবতরণ করতে পারে ঢাকায়। অথবা পেট্রাপোল-বেনাপোল চেকপয়েন্টের মতো কোনো সীমান্ত পয়েন্টে হতে পারে এই বিনিময়।

এসব আইনগত ও পদ্ধতিগত পদক্ষেপগুলো বর্ণিত থাকলেও, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি হতে পারে অত্যন্ত রাজনৈতিক। সংগীতা তাক বলেন, রাজনৈতিক নেতারা কখনো কখনো সুনির্দিষ্ট দায়মুক্তি এবং সুরক্ষা ভোগ করেন। এ বিষয়টি হাসিনাকে ফেরত দেয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তিনি আরও যোগ করেন, এক্ষেত্রে মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলো হস্তক্ষেপ করতে পারে। তারা বলতে পারে, শেখ হাসিনা অন্যায্য বিচারের মুখোমুখি হবেন অথবা বাংলাদেশে তার বড় ক্ষতি হতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আইনগত চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে। এমন হস্তক্ষেপ হলে এই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে। তাতে ভারতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হবে মানবাধিকারের সব সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। উপরন্তু শেখ হাসিনা নিজে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে পারেন। বাংলাদেশে তার ওপর নিষ্পেষণের দাবি তুলতে পারেন। এমন হলে তাকে ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে উঠবে- বলেন সংগীতা তাক।

এসব আইনগত জটিলতার বাইরে ভারতকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা বাংলাদেশের অনুরোধ রক্ষা করবে নাকি প্রত্যাখ্যান করবে। এ অবস্থায় অবশ্যই সুদূরপ্রসারি পরিণতি  দেখা দেবে। ঢাকার দাবি মেনে নিলে অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে। তারা সেইসব দেশ যারা মনে করে শেখ হাসিনা রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার হতে পারেন। ভারতের ওপর চাপ বাড়লে শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়াকে দেখা হতে পারে একটি ‘নন-স্টার্টার’ হিসেবে। আবার সরাসরি যদি ঢাকার অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে ভারত তাহলে আরও বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, যেমনটা আগেই আন্দাজ করা হয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ ‘মনসুন আপরাইজিং’ শিরোনামে সম্প্রতি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের সঙ্গে আইনপ্রয়োগকারী এজেন্সিগুলোর মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করার কথা বলা হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার অনুরোধে রাজি হওয়া বা তা প্রত্যাখ্যান করা- উভয়ই নয়াদিল্লির জন্য পরিণতি বহন করবে। ঠিক এ কারণেই ভারত চুপ রয়েছে এবং তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার বিষয়টি ‘ওয়েট অ্যান্ড সি’ হিসেবে দেখছে। সম্ভবত এটাই এখন ভারতের জন্য সবচেয়ে ভালো সুযোগ।

mzamin

যৌথ বাহিনীর অভিযান: কী ঘটেছিল মোহাম্মদপুরে by সুদীপ অধিকারী

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে যৌথ বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে জুম্মন ও মিরাজ নামে দুইজন নিহত হয়েছে। এ সময় ঘটনাস্থল থেকে আরও ৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে চাঁদ উদ্যানের ৬ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়ির ছাদে এ ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী প্রস্তুতি নিচ্ছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা। এ সময় সন্ত্রাসীরা গুলি চালানো শুরু করে। আত্মরক্ষায় অভিযানে যাওয়া যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছোড়ে। এরই জেরে দু’জনের মৃত্যু হয়। পরে আটক ৫ জন হাত উঁচু করে আত্মসমর্পণ করলে তাদের থানা হেফাজতে নেয়া হয়। গতকাল সরজমিন মোহাম্মদপুর চাঁদ উদ্যান এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উৎসুক মানুষ ভিড় করছে লাশ উদ্ধার করা ওই ৯ নম্বর বাড়ির সামনে। টিনের ছাউনিঅলা আধাপাকা বাড়িটিতে বেশির ভাগই নিম্ন্নআয়ের মানুষের বসবাস। বাড়িটির মেইন গেটের উপরে ছোট্ট একতলা ভবন। সরু লোহার মই দিয়ে উপরে উঠে দেখা যায়- ওই ভবনের ছাদের উপর ছোট ছোট দু’টি রুমে বিভিন্ন পেশার কর্মজীবীরা মেস আকারে থাকেন। ওই রুমের টিনের চালার উপর থেকেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জুম্মন ও মিরাজের লাশ উদ্ধার করা হয়। বাড়িটির দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা মো.  জুলহাস বলেন, বুধবার রাত ১২টার পর হঠাৎ গোলাগুলির শব্দ পাই। সেনাবাহিনী-পুলিশের পক্ষ থেকে বার বার এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে মাইকে ঘোষণা করা হচ্ছে- আপনারা কেউ বাসা থেকে বের হবেন না। আপনারা সকলে ঘরের মধ্যে থাকুন। কাউকে বাসায় ঢুকতে দিবেন না। আমি তখন ভাব বুঝতে গেটের সামনে বের হই। তখন আমাদের সামনের বাজারের রাস্তার দুইপাশে অবস্থান নিয়ে একদল সন্ত্রাসীকে ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এরই মধ্যে কোনো দিক না পেয়ে জুম্মন, মিরাজসহ বেশ কয়েকজন দৌড়ে আমাদের গলিতে ঢুকে পড়ে। তারা আমাদের পাশের ৬ নম্বর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভ্যানের ওপর দিয়ে দেওয়াল বেয়ে ভবনের উপরে উঠে যায়। বাকিরা বাড়ির টিনের ওপরে উঠতে পারলেও একজন নিচ থেকেই ধরা পড়ে। এ সময় যৌথ বাহিনীর সদস্যরাও তাদের ধাওয়া দিলে আমাদের ছাদের ওপরের রুমের টিনের ওপর উঠে জুম্মন-মিরাজেরা গুলি ও ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করে। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। দুইপক্ষের গোলাগুলির শব্দে তখন পুরো এলাকা প্রকম্পিত হচ্ছিল। আমিও দৌড় দিয়ে ঘরে ঢুকে যাই। গুলির শব্দ থেমে গেলে আবারো আমিসহ অনেকেই বাইরে বের হই। একপর্যায়ে সেনাসদস্যরা উপরে গিয়ে দুইজনের লাশ উদ্ধার করে। পরে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় ৬ নম্বর বাড়ির ভাড়াটিয়া ভাঙ্গারি ব্যবসায়ী মো. বিল্লাল তার ভ্যানে করে ওই লাশ দু’টো সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপতালে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, নিহত মিরাজ ও জুম্মনের গ্রামের বাড়ি ভোলাতে হলেও বর্তমানে তারা  চাঁদ উদ্যান এলাকার ৮ নম্বর রোডে বসবাস করতেন। জুম্মনের বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। আর মিরাজ শাহ আলমের সন্তান। তারা তেমন কোনো পেশায় জড়িত ছিল না। সারা দিন ঘুরে বেড়াত। তারা মূলত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাথা ‘মাহী গ্রুপের’ লোক। তিনি বলেন, যে দু’জন মারা গেছে, তাদের নিয়ে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। তবে আটক হওয়া ৫ জনের মধ্যে ৪ জনই আমাদের মেসের ছেলে। একজন শুধু সন্ত্রাসী। তিনি বলেন, আটক হওয়াদের মধ্যে মেহেদী, মিরাজ, হোসেন ও মোমিন আমার মেসের ছেলে। এদের মধ্যে মেহেদী ও মোমেন স্থানীয় ঠিকাদার মান্নানের অধীনে রড কাটার কাজ করতো। হোসেন ইটভাঙার কাজ করে সঙ্গে তালার কাজ করে। আর মোমিন ভাঙ্গারির ব্যবসা করে। ঠিকাদার মান্নান বলেন, আটককৃতদের মধ্যে মেহেদী ও মিরাজ আমার এখানে রড কাটার নিয়মিত কাজ করতো। খাতা-পত্রে তাদের সব প্রমাণ রয়েছে। তারা কোনো ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত নয়। নারগিস, রেহেনা, বিল্লাল, জসিমসহ বেশ কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, ছিনতাইকারীদের দাপটে দিনের বেলায় রাস্তা দিয়ে চলতে পারি না। কাজ করে ফেরার পথে গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে সব নিয়ে চলে যায়। জুম্মন ও মিরাজের লাশ বহন করে নিয়ে যাওয়া ভ্যানের চালক মো. বিল্লাল বলেন, বুধবার রাতে যখন গোলাগুলি শেষে দু’টি লাশ উদ্ধার করা হয় তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমার ভ্যান দেখে চালকের খোঁজ করছিল। আমি তখন এগিয়ে যাই। আমাকে তারা বলেন- এখন তো তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছে না, আপনি একটু লাশ দুটো সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে দিয়ে আসেন। তখন তারাই আমার ভ্যানে লাশগুলো তুলে দেয়। আমি তাদের সঙ্গে লাশ নিয়ে হাসপাতালে দিয়ে আসি। তিনি বলেন, আমাদের গলির মাথায় একটি বহুতল ভবন আছে। বেশির ভাগ সময়ই এরা ওই ভবনের ছাদে আড্ডা দিতো।

এদিকে মোহাম্মদপুর থানার নথি থেকে জানা গেছে- যৌথ বাহিনীর গুলিতে নিহত জুম্মনের বিরুদ্ধে ১৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২২, ৯ই আগস্ট ২০২৩, ৪ঠা জুলাই ২০২৩, ১৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২রা জানুয়ারি ২০২৩, ৩১শে মার্চ ২০২০, ৫ই মার্চ ২০২৩, ৬ই মার্চ ২০২৩ ও ১৭ই ডিসেম্বর ২০১৮ সালে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। অস্ত্র, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, হত্যাচেষ্টা, মারামারি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে তার বিরুদ্ধে এসব মামলা হয়েছে। নিহত মিরাজের বিরুদ্ধে ৭ই জানুয়ারি ২০২৩-এ মাদক, ১৫ই ডিসেম্বর ২০২০-এ মারামারি, ১৫ই মার্চ ২০২৪ ও ১৫ই জুন ২০২১ সালে হত্যা চেষ্টা, ছিনতাইসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে।

এ বিষয়ে মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) হাফিজ উদ্দিন বলেন, চাঁদ উদ্যানের পাঁচ নম্বর রোডের এক বাড়ির চিলেকোঠায় ১০-১৫ জন সন্ত্রাসী থাকার খবর পেয়ে বুধবার রাত ১২টার দিকে সেখানে অভিযানে যায় যৌথ বাহিনী। সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। পরে  জুম্মন ও মিরাজ নামে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তারা দু’জনেই চাঁদ উদ্যান এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। আটককৃতদের বর্তমানে মোহাম্মদপুর থানা হাজতে রাখা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের আদালতে প্রেরণ করা হবে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ডিএমপি’র মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জুয়েল রানা বলেন, কব্জি কাটা আনোয়ারকে গ্রেপ্তারের পর থেকে অপর একটি গ্রুপ মোহাম্মদপুরে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। নিহতরা সেই গ্রুপেরই সদস্য। তিনি বলেন, বুধবার রাতে তাদের অবস্থানের খবর পেয়ে যখন চাঁদ উদ্যান এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর টিম যায় তখন সন্ত্রাসীরা একটি বাড়ির ছাদ থেকে ইট-পাটকেল ও গুলি ছোড়া শুরু করে। আত্মরক্ষার্থে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পাল্টা গুলি ছুড়লে ঘটনাস্থলেই ২ জনের মৃত্যু হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন পালিয়ে গেছে। পরে ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল ও একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়।

অপরদিকে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, চাঁদ উদ্যান এলাকায় ছিনতাইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে- এমন তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে যৌথ বাহিনীর একটি দল অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় একটি গলির দুই পাশ যৌথ বাহিনীর সদস্যরা ঘেরাও করলে ‘সন্ত্রাসীরা’ একটি একতলা ভবনের ছাদ থেকে অতর্কিত গুলি করে। আভিযানিক দলটি আত্মরক্ষার্থে তৎক্ষণাৎ পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং ৫ সন্ত্রাসীকে অস্ত্রসহ আটক করতে সক্ষম হয়। পরে ওই বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ছাদের উপর থেকে দু’জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। আর আটক ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি পিস্তল, চার রাউন্ড গুলি এবং একটি চাপাতি। আইনগত ব্যবস্থা নিতে তাদের মোহাম্মদপুর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। 

mzamin

রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধের জেরেই সর্বস্বান্ত হয়ে মৃত্যুর পথে কলকাতার দে পরিবার? by সেবন্তী ভট্টাচার্য্য

কলকাতার ট্যাংরার শীল লেন। গত মঙ্গলবার সেখানেই দে বাড়ির গ্যারাজ থেকে বেরিয়ে আসে একটি গাড়ি। চালকের আসনে ছোটভাই প্রসূন। পাশে নাবালক ভাইপো। আর পিছনের সিটে বড়ভাই প্রণয় দে। বুধবার ভোরে দেখা যায় বাইপাসের রুবি মোড় ও কালীকাপুরের মাঝামাঝি মেট্রোর পিলারে সজোরে ধাক্কা মেরে পড়ে আছে গাড়িটা। বনেট বলে কিছু নেই। ফেটে গিয়েছে এয়ার ব্যাগ। তড়িঘড়ি তিনজনকে নিয়ে যাওয়া হয় কাছের হাসপাতালে। তারপরই সাদা চোখে দেখা ‘দুর্ঘটনা’ এক ঝটকায় হদিশ দেয় তিনটি মর্মান্তিক রহস্যমৃত্যুর। পুলিশ ছোটে ট্যাংরায়। শীল লেনের চারতলা বাড়ি। দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা যায়, দোতলার তিনটি ঘরে পড়ে রয়েছে তিনটি দেহ। বড়বউ সুদেষ্ণা দে, ছোটবউ রোমি দে, আর তার মেয়ে প্রিয়ংবদা। তাহলে কি খুন করে নাবালককে নিয়ে দুই ভাই আত্মহত্যার চেষ্টায় বেরিয়ে পড়েছিলেন? কেনই বা এমন নৃশংস পথ বেছে নিলেন?  ইউক্রেন যুদ্ধ না গ্রোমোটিংয়ে বিপুল টাকা লগ্নি করার ফলেই ব্যবসায় মন্দা? ট্যাংরা-কাণ্ডের তদন্ত শুরু করে এখন  এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।

পুলিশের কাছে খবর, প্রোমোটিংয়ে লগ্নি ছাড়াও রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে তাদের রপ্তানির ব্যবসায় মন্দা শুরু হয়। পুলিশি তদন্তে আপাতত উঠে এসেছে, 'প্রোটেকটিভ লেদার গ্লাভস'-এর কারখানা ছিল ট্যাংরার দে পরিবারের। বাবার মৃত্যুর পর তার শুরু করা ব্যবসা বর্তমানে চালাতেন দুই ভাই। আর্থিকভাবে যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ ছিলেন তারা। পরিবার নিয়ে বিদেশ ভ্রমণ থেকে শুরু করে, দেদার পার্টি, সবই হত। পুরনো ব্যবসার মাঝে আবার তাঁরা নাকি নতুন 'ভেঞ্চার'ও এনেছিলেন। তাতেও বিপুল টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন দুই ভাই। কিন্তু শেষমেশ ব্যবসায় বিরাট ক্ষতি হওয়ায় দেনা হয়ে গেছিল তাঁদের। এও জানা গেছে, রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তাদের রফতানি ব্যবসায় মন্দা হতে শুরু করে। নতুন 'ভেঞ্চার'-এর জন্য বিনিয়োগ করতে যে টাকা খরচ হয়েছিল তা উশুল করতে পারছিলেন না তারা। ফলে বিভিন্ন জায়গা থেকে ঋণ নিতেন তারা। প্রতি মাসে অনেক টাকা শোধ দিতে হত। মূলত ২০২০ সালের পর থেকেই এই অবস্থা তৈরি হয়। ফলে বাজারে লক্ষ লক্ষ টাকা দেনা হয়ে যায় তাদের। পাওনাদারদের লাখ লাখ টাকার চেকও বাউন্স হচ্ছিল। তারপর থেকে বাড়িতে ভিড় বাড়তে শুরু করেছিল পাওনাদারদের। মনে করা হচ্ছে, আর্থিক অবস্থার জন্য মানসিক অবসাদ চলে গেছিল ট্যাংরার পরিবার। তাই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পুলিশের তরফে অবশ্য জানানো হয়েছে, বাড়িতে কোনও সুইসাইড নোট মেলেনি। এদিকে খুনের তত্ত্ব জোরাল হচ্ছে। কিন্তু কেন?
আসলে  ট্যাংরার বাড়ি থেকে যাদের মৃতদের উদ্ধার হয়েছে প্রত্যেকের হাতের শিরা কাটা। দুই নারীর গলায় ক্ষত রয়েছে, এদিকে নাবালিকার মুখে একাধিক ক্ষত চিহ্ন রয়েছে। যদি সে আত্মহত্যাই করে, তাহলে তার মুখে আঘাতের চিহ্ন কীভাবে এল, তা স্পষ্ট নয়। আপাতত ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য।

mzamin