Sunday, September 8, 2019

আবারো ছড়াচ্ছে অ্যানথ্রাক্স, যা জেনে রাখা প্রয়োজন

বাংলাদেশের কয়েকটি জেলায় সম্প্রতি অ্যানথ্রাক্স রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সেসব এলাকার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মানুষের অ্যানথ্রাক্স মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে - একধরণের অ্যানথ্রাক্স হয় পরিপাকতন্ত্রে, আরেক ধরণের অ্যানথ্রাক্স শরীরের বাইরের অংশে সংক্রমণ ঘটায়।
পরিপাকতন্ত্রে অ্যানথ্রাক্স জীবাণুর সংক্রমণ হলে সাধারণত হালকা জ্বর, মাংসপেশীতে ব্যাথা, গলা ব্যাথার মত উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে বাংলাদেশে যে অ্যানথ্রাক্স দেখা যায় তা শরীরের বাইরের অংশে প্রভাব ফেলে।
এধরণের অ্যানথ্রাক্সে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ফোঁড়া বা গোটা হয়ে থাকে।
ফোঁড়া ঠিক হয়ে গেলে হাতে, মুখে বা কাঁধের চামড়ায় দাগ দেখা যেতে পারে।
যেসব এলাকায় গবাদি পশু পালন করা হয় সেসব এলাকাতেই সাধারণত অ্যানথ্রাক্সের প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
বাংলাদেশের রোগতত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মেহেরজাদী সাবরিনা ফ্লোরা জানান বাংলাদেশে সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকাতেই অ্যানথ্রাক্স হয়ে থাকে।
"অ্যানথ্রাক্স গরু, ছাগল, মহিষ - এই ধরণের প্রাণির মধ্যে প্রথম দেখা যায়। এসব প্রাণির মাধ্যমেই অ্যানথ্রাক্স মানুষের মধ্যে ছড়ায়।"

কীভাবে অ্যানথ্রাক্স মানুষের মধ্যে ছড়ায়?

মূলত অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস কাটার সময় মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়ানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
অ্যানথ্রাক্স আক্রন্তা একজন কিশোর (ফাইল ছবি)
মিজ ফ্লোরা বলেন, "পশু জবাই করা, সেটির মাংস কাটাকাটি করা এবং মাংস ধোয়া বা রান্নার সময় অনেকক্ষণ মাংস, রক্ত ও হাড্ডির সংস্পর্শে থাকতে হয়। সেসময় আক্রান্ত পশুর রক্তের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে অ্যানথ্রাক্স।"
মাংস কাটাকাটির সময় মানুষের শরীরের চামড়ায় কোনরকম ক্ষত থাকলে তার দেহে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু প্রবেশ করার সম্ভাবনা বেশি তাকে বলে জানান তিনি।
"আমাদের দেশে পশুর অ্যানথ্রাক্স হলেও অনেকসময় তা জবাই করে মাংস কম দামে বিক্রি করে ফেলা হয়। ঐ মাংস কাটাকাটি করার সময় অ্যানথ্রাক্স আক্রন্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।"
মিজ. ফ্লোরা নিশ্চিত করেন, পশু থেকে মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ হলেও মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণ হয় না।

আক্রান্ত পশুর মাংস খেলে কী অ্যানথ্রাক্স হতে পারে?

মিজ. ফ্লোরা বলেন, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস খেয়ে পরিপাকতন্ত্রে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশে সাধারণত যেভাবে মাংস রান্না করে খাওয়া হয় তাতে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু মাংসে টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
"বিদেশে 'হাফ ডান' অবস্থায় মাংস রান্না করে খাওয়া হয়, সেই পদ্ধতিতে রান্না করলে মাংসে জীবাণু থাকার সম্ভাবনা থাকে।"
"কিন্তু আমাদের দেশে যেভাবে মাংস রান্না করা হয়, ঐ পদ্ধতিতে রান্না করলে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু থাকার সম্ভাবনা খুব কম থাকে।"
তবে, অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত পশুর মাংস না খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মন্তব্য করেন মিজ. ফ্লোরা।

অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে করণীয়

অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে মূলত দুই ধরণের পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানান মিজ. ফ্লোরা।
"প্রথমত, যাদের গরু, মহিষ, ছাগলের মত গবাদি পশু রয়েছে, তারা যেন তাদের পশুকে নিয়মিত অ্যানথ্রাক্সের টীকা দেন তা নিশ্চিত করতে হবে।"
আর পশুর যদি অ্যানথ্রাক্স হয়েই যায়, সেক্ষেত্রে পশুকে দ্রুত মাটির নীচে পুঁতে ফেলা প্রয়োজন।
পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন একজন পশু চিকিৎসক

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সমবায় সমিতি নেপালে

প্রতিবেশী দেশগুলোতো বটেই, উন্নত দেশগুলোর মধ্যেও বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সমবায় সমিতি রয়েছে নেপালে।

নেপাল সমবায় দফতরের উপ-রেজিস্টার শশী কুমার লামসাল বলেন, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির আকারের তুলনায় নেপালে অনেক বেশি সংখ্যক সমবায় সমিতি রয়েছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ ৫,৬৮৪টি সমবায় ছিলো। দেশটির ১১২.৬ মিলিয়ন জনসংখ্যা এসব সমবায়ের সঙ্গে জড়িত। একইভাবে ভারতের রয়েছে ২,৭০৫টি সমবায়, যেগুলো ২০ মিলিয়ন মানুষকে সেবা দিচ্ছে। আর বাংলাদেশে আছে মাত্র ৮৮৮টি সমবায় এবং এর সঙ্গে ৫৪৭,০০০ মানুষ জড়িত।

অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় সমবায় সংখ্যা যথাক্রমে মাত্র ৭৯ ও ৫৬৭টি।

কিন্তু নেপালে রয়েছে ৩৪,০০০ সমবায় এবং এগুলোর সদস্য সংখ্যা ৬.৫ মিলিয়ন।

বাংলাদেশে যেখানে জনসংখ্যা ১৬৫ মিলিয়ন সেখানে নেপালের জনসংখ্যা ২৯.৯৬ মিলিয়ন। এতে দেখা যায় বিশ্বে মাথাপিছু সমবায়ী সংখ্যা নেপালে সবচেয়ে বেশী এবং সরকারি ও বেসরকারি খাতের পর অর্থনীতির তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে এটি কাজ করছে।

তবে সংখ্যাধিক্যের কারণে নেপালে একাধিক সমবায় একীভূত করারও দাবি উঠেছে।

যৌন উত্তেজক ঔষধ: কাঁচামাল গোপনে বাংলাদেশে আসছে যে কারণে

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেনাপোল বন্দরে যৌন উত্তেজক ভায়াগ্রার সমগোত্রীয় ঔষধ তৈরির কাঁচামাল জব্দ করেছে শুল্ক কর্তৃপক্ষ।
মিথ্যে ঘোষণা দিয়ে ভারত থেকে এসব কাঁচামাল আমদানি করা হচ্ছিল।
শুল্ক কর্তৃপক্ষ গত কয়েকমাসে একাধিকার এ ধরণের চলান আটক করা করেছে।
ঔষধ শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলেছেন, বাংলাদেশে যৌন উত্তেজক ঔষধের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
যৌন উত্তেজক ঔষধের কাঁচামাল চোরাপথে আসা এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে এ ধরণের ঔষধের ব্যাপক চাহিদা আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মুনীরউদ্দিন আহমদ বলেন, যৌন উত্তেজক ঔষধের কাঁচামাল এখন নানাপথে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।
অধ্যাপক আহমদ বলেন, "এটার ডিমান্ড প্রচুর বাংলাদেশে। যেসব ঔষধের চাহিদা বেশি থাকে, সেটা নকল এবং ভেজাল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এবং বিদেশ থেকে চোরাপথে কাঁচামাল এনে এখানে উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হয়। "
বিশ্বখ্যাত ঔষধ কোম্পানি ফাইজার ভায়াগ্রা আবিষ্কার করেছে। এটা তাদের ব্র্যান্ড নাম। এই ঔষধের জেনেরিক নাম সিলডেনাফিল।
প্রথম যখন এটি উদ্ভাবন করা হয় তখন এনিয়ে বেশ শঙ্কা ছিল।
অধ্যাপক আহমদ বলেন, যারা ইরেকটাইল ডিসফাংশনে ভুগছেন বা যা লিঙ্গোত্থান ঘটেনা তাদের জন্য সীমিত আকারে চিকিৎসকের পরামর্শে এটি সেবনের অনুমোদন দেয়া হয়। এ ঔষধ নিয়ে বেশ কড়াকড়ি আছে।
একসময় বাংলাদেশে ভায়াগ্রা সমগোত্রীয় ঔষধ নিষিদ্ধ থাকলেও কয়েক বছর আগে সরকার কিছু কোম্পানিকে এসব ঔষধ তৈরির অনুমোদন দিয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, "বাংলাদেশে অসংখ্য রোগী আছেন, যারা ইরেকটাইল ডিসফাংশনে ভুগছে, তাদের কথা চিন্তা করে এই অনুমতি দেয়া হয়।"
দেশের ভেতরে ঔষধ না পেয়ে অনেকে বিদেশে গিয়ে ঔষধ আনতো নানা উপায়ে। ফলে দেশ থেকে বিদেশে অর্থ চলে যাচ্ছিল বলে সে কর্মকর্তা উল্লেখ করেন।
ভায়াগ্রা সমগোত্রীয় ঔষধের অনুমোদন দেবার ক্ষেত্রে সেটিও একটি কারণ ছিল।
কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব উপাদান দিয়ে ফাইজার কোম্পানি ভায়াগ্রা উৎপাদন করে সেসব উপাদান দিয়েই বিভিন্ন নামে বাংলাদেশে যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট প্রস্তুত হচ্ছে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশে যেসব কোম্পানি এ ঔষধ তৈরি করে তারা নিজেদের নাম দিয়ে তৈরি করে। এসব ঔষধের কার্যকারিতা এবং উপাদান ভায়াগ্রার মতো বলে উল্লেখ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যৌন উত্তেজক ঔষধ ব্যবহারে সতর্কতা

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশে যৌন উত্তেজক ঔষধের চাহিদা বেড়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সেজন্য ভায়াগ্রা সমগোত্রীয় ঔষধ বাংলাদেশে উৎপাদনের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
তবে সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ বাধ্যতামূলক।
কিন্তু বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এ ধরণের ঔষধ গ্রহণ করা একেবারেই অনুচিত বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক আহমদ।
তিনি বলেন, "এই ঔষধটা খুবই ভয়ঙ্কর ঔষধ। যাদের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি আছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত। এটা ব্যবহারে প্রচণ্ড রিস্ক আছে। "
সেজন্য এই ঔষধ ব্যবহারের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সাথে খোলামেলা আলাপ করতে হবে।
বাংলাদেশে এটি ঠিকমতো মানা হচ্ছেনা বলে উল্লেখ করে অধ্যাপক আহমদ বলেন, "ডাক্তারের কাছে গিয়ে অনেকে নিজের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত দুর্বলতার কথা খোলাখুলি প্রকাশ করতে চায়না। সেজন্য অনেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এ ধরণের ঔষধ কিনছে"

বছরে বিদেশে পাচার হচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা: -অর্থনীতি সমিতির সেমিনারে তথ্য

দেশের উচ্চবিত্ত কিছুসংখ্যক মানুষের মধ্যে কুক্ষিগত হয়ে আছে বেশির ভাগ সম্পদ। বর্তমানে মাত্র ২৫৫ জন ব্যক্তির কাছে বাংলাদেশের বেশির ভাগ সম্পদ আটকে আছে বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম। একই সঙ্গে বছরে দেশ থেকে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে দাবি করেন তিনি।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আয়োজনে ‘বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান আয়-বৈষম্য: সমাধান কোন পথে?’ শীর্ষক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে মইনুল ইসলাম এসব কথা বলেন। গতকাল রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শফিক উজ জামান, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুর্শিদ, অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ ও সহসভাপতি এজেডএম সালেহ আলোচনায় অংশ নেন।

ড. মইনুল ইসলাম বলেন, এক সময় বাংলাদেশের একমাত্র রপ্তানি পণ্য ছিল পাট। কিন্তু এখন তা পোশাক শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে। দুঃখজনক হলো ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ গার্মেন্ট মালিকরাই। তিনি বলেন, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের আয় বাড়ার হার বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। বছরে দেশ থেকে পাচার হচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন গার্মেন্ট মালিকরা। কিন্তু এই খাতের ৩৫ লাখ শ্রমিক আগের মতো দরিদ্রই থেকে গেছেন। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে নিয়মিত প্রতারিত হচ্ছে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। তিনি বলেন, মালয়েশিয়াতে সেকেন্ড হোমের মালিক এবং টরেন্টোর ‘বেগম পাড়ার’ বাড়ির মালিকদের মধ্যেও দুর্নীতিবাজ ইঞ্জিনিয়ার, সিভিল আমলা, সামরিক অফিসার, অর্থনীতিবিদদের পরিবারের পাশাপাশি গার্মেন্ট মালিকদের পরিবারই বেশি অনুপাতে চিহ্নিত করা যাচ্ছে। তিনি জানান, পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ীও দেশে প্রকট আকারে বৈষম্য বাড়ছে। যা স্বীকার করেন সম্মেলনে উপস্থিত অন্যান্য বক্তারাও।

ড. মইনুল বলেন, রিয়েল এস্টেট নির্মাণশিল্প, টেলিভিশন চ্যানেল, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ, প্রাইভেট ব্যাংক-বীমা, প্রাইভেট ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল-কলেজ, কিন্ডারগার্টেন, সংবাদপত্র, এনজিও, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিলাসী পরিবহন, হাসপাতাল-ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো দেশের দ্রুত বর্ধনশীল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে কৃষক শ্রমিকদের জীবনমান উন্নত হওয়ার চেয়ে ক্রমাগতভাবে নিচের দিকে নামছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে ১১ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। যেখানে পিতা-মাতার আর্থিক সামর্থের উপর সন্তানের স্কুলের এবং শিক্ষার মান নির্ভর করে। যা একটি দেশের জাতিগত উন্নয়নে মোটেও কাম্য নয়।
মইনুল ইসলাম জানান, ৮.১৩ শতাংশ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার নিয়ে বাহাদুরি করার কিছু নেই। বাহাদুরি না করার কারণ হিসেবে অধ্যাপক মইনুল বলেন, এই প্রবৃদ্ধির হার সত্ত্বেও দেশে বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন একটি ‘উচ্চ আয়-বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সুবিধাসমূহ, সামাজিক সূচকসমূহ, সচ্ছতার অঙ্গীকারসমূহ এবং নিরাপত্তা রক্ষাকবচ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবন্ধে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৮.১৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে বলে সরকারিভাবে প্রাক্কলিত হয়েছে। এ বিবেচনায় বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু দেশে আয় বৈষম্য বাড়ছে ব্যাপক হারে। আয় বৈষম্য বাড়তে থাকার এ প্রবণতাকে দেশের আসন্ন মহাবিপদ সংকেত বললে অত্যুক্তি হবে না।

সাড়ে তিন দশক ধরে সর্বশক্তি দিয়ে এ বিষয়ে জাতির মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হয়েছেন, এ কথা উল্লেখ করে মইনুল ইসলাম বলেন, দেশে কোটিপতিদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এর পেছনে ন্যক্কারজনক পন্থা হলো দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়া। এমন কোনো সরকারি সংস্থার নাম করা যাবে না, যেটা খানিকটা দুর্নীতিমুক্ত। এ ছাড়া বর্তমান জাতীয় সংসদে সাংসদদের ৬২ শতাংশই ব্যবসায়ী। এ সংসদ ব্যবসায়ীদের সংসদ এবং রাজনীতি এখন লোভনীয় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।

দুর্নীতি উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা উল্লেখ করে ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যার মধ্যে দিয়ে দেশে স্বজনতোষী পুঁজিবাদ ও পুঁজি লুণ্ঠনের যাত্রা শুরু হয়। দুর্নীতি ও পুঁজি লুণ্ঠনের মাধ্যমে গত ৪৪ বছরে দেশে লাখ লাখ ব্যবসা নির্ভর পুঁজিপতি, মার্জিন-আত্মসাতকারি রাজনৈতিক নেতাকর্মী, দুর্নীতিবাজ আমলা এবং সরকারি প্রকল্পের ঠিকাদার রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ধনাঢ্য ও উচ্চবিত্ত গোষ্ঠির অন্তর্ভূক্ত হয়েছেন। তিনি বৈষম্য বৃদ্ধির শক্তিগুলোকে শক্ত হাতে প্রতিরোধ করার জন্য রাষ্ট্রকে জনগণের স্বার্থের পাহারাদারের ভূমিকা পালনে বাধ্য করতে হবে বলে অনুরোধ জানান। মইনুল ইসলাম বলেন, আয় ও সম্পদ বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে হলে দূর্নীতি নিরসন করতে হবে। এর জন্য সকলকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদ বলেন, মাতৃমৃত্যুর হার ছাড়া মানব উন্নয়নের অন্যান্য সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভাল অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু দেশে ক্রমান্বয়ে আয় বৈষম্য বেড়ে চলেছে। কেবল মাথাপিছু আয় দিয়ে উন্নয়নকে বিচার করলে চলবে না। যে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে, তার ভাগ যেন সমাজের প্রান্তিক মানুষ পায় সেটা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বণ্টনের ন্যায্যতাসহ প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে যেতে হবে। কাউকে পেছনে ফেলে রেখে প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রায় সোয়া ১ কোটি মানুষের মাথাপিছু আয় ৪ হাজার ডলারের ওপরে। অথচ কর দেন মাত্র ২০ লাখ মানুষ। তাই রাষ্ট্রযন্ত্রকে উচ্চ আয়ের মানুষের কাছ থেকে কর আদায় বিশেষ করে প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা কার্যকর করতে শক্তিশালী ভূমিকা নিতে হবে। ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে তিনি বলেন, ৯০ এর দশকে সবচেয়ে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ব্যাংকিং খাতের জন্য। স্বল্পমেয়াদে আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ঋণ বিতরণ কোন দেশের জন্য সুখকর হতে পারে না। যেকোনোভাবে এই সিদ্ধান্তের পরিবর্তন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনতা ব্যাংকের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন (এফসিএ) বলেন, দেশে এখনো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ করার মতো শক্তিশালী কোন আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। শিল্পে বিনিয়োগের জন্য ইনভেস্টমেন্ট করপোরশন বাংলাদেশ (আইসিবি) কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। ফলে উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছেন। এসব সমস্যা সমাধানের দীর্ঘমেয়াদী বন্ড মার্কেট এবং শেয়ার বজার উন্নত করার পরামর্শ দিয়েছেন জামাল উদ্দিন।

অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত সম্পদ বণ্টনের ন্যায্যতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, রাষ্ট্রকে কেবলমাত্র প্রবৃদ্ধির পূজা করলে হবে না। সেই প্রবৃদ্ধি দিয়ে আসলে মানব উন্নয়ন হচ্ছে কি-না সেটা দেখতে হবে। তিনি বলেন, ধরুন দুই অংকের প্রবৃদ্ধি হলো, কিন্তু সেটা যদি সমাজের নিচু তলায় না যায়, তাহলে এই প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোন লাভ নেই। তিনি আংশকা প্রকাশ করে বলেন, নব্য উদারবাদী পুঁজিবাদ অর্থনীতিকে ধংবসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. কেএএস মুর্শিদ সমাজে আয় ও সম্পদ বৈষম্য নিরসনে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যায়ভিত্তিক ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আহবান জানান।

প্রবন্ধে বলা হয়, পরিমাপকের গতি-প্রকৃতির মাধ্যমে ২০১০ ও ২০১৬ সালের মধ্যে আয়-বৈষম্য বিপজ্জনকভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠির বিপক্ষে এবং ৫-১০ শতাংশ ধনাঢ্য গোষ্ঠিগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি ফুটে উঠেছে: ২০১০ সালে দরিদ্রতম ৫ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপি’র ০.৭৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে মাত্র ০.২৩ শতাংশে নেমে গেছে। ২০১০ সালে দরিদ্রতম ১০ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপি’র ২ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা মাত্র ১.০১ শতাংশে নেমে গেছে। সমস্যার আরেক পিঠে দেখা যাচ্ছে, দেশের ধনাঢ্য ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠির দখলে ২০১০ সালে ছিল মোট জিডিপি’র ৩৫.৮৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ৩৮.১৬ শতাংশে পৌঁছে গেছে। আরো দুঃখজনক হলো- জনগণের সবচেয়ে ধনাঢ্য ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠির দখলে ২০১৬ সালে চলে গেছে মোট জিডিপি’র ২৭.৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ২৪.৬১ শতাংশ।

প্রবন্ধে উল্লেখ্য করা হয়, গত ৫ বছরে ধনকুবেরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে গণচীনে ও হংকংয়ে, কিন্তু ধনকুবেরের সংখ্যার বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ১৭.৩ শতাংশ বাংলাদেশে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ধনকুবেরের সংখ্যা ছিল ২৫৫ জন। ২০১৬ সালের হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেন্ডিচার সার্ভে মোতাবেক বাংলাদেশের পা’মা বা পালমা অনুপাত নির্ণীত হয়েছে ২.৯৩, যার ফলে বলা যায় বাংলাদেশ এখন ‘বিপজ্জনক আয়-বৈষম্য’ এর স্তরের খুবই কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

এনআরসি থেকে বাদ পড়াদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশকে রাজি করানো উচিত ভারতের: -আসামের অর্থমন্ত্রী বললেন

আসামে নাগরিকপঞ্জী বা এনআরসি থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশকে রাজি করানো উচিত। এজন্য ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল চূড়ান্ত দফায় যেসব ব্যক্তিকে নাগরিকত্ব তালিকা থেকে বাদ রাখবেন তাদের বিষয়ে ঢাকার সঙ্গে আলোচনা করা উচিত নয়া দিল্লির। এ মন্তব্য করেছেন আসামের অর্থমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা। তিনি বৃহস্পতিবার এমন মন্তব্য করেছেন বলে খবর দিয়েছে অনলাইন স্ক্রল ডট ইন। এতে টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি রিপোর্টকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।

ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে গত ৩১শে আগস্ট আসামের চূড়ান্ত এনআরসি তালিকা প্রকাশিত হয়। এতে অবৈধ হিসেবে বাদ রাখা হয় ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ জনকে। এখন তাদের সামনে আপিল করার সুযোগ আছে। সেই আপিল ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালে শুনানি হবে। তাতে চূড়ান্ত দফায় যারা বাদ পড়বেন তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ দিয়েছেন হিমান্ত বিশ্ব শর্মা। বলেছেন, এজন্য ভারতের উচিত হবে বাদ পড়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশকে রাজি করানো। তার ভাষায়, চূড়ান্ত রায়ের পরে আমাদের উচিত হবে এসব নাগরিকদের গ্রহণ করতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা। এসব মানুষ ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করছিল। বাংলাদেশ ও ভারত বন্ধুপ্রতিম দেশ। বিভিন্ন সময় নিয়মিতভাবে ১০০ বা ১৫০ জনকে বাংলাদেশ ফিরিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এনআরসি পরবর্তীতে এই সংখ্যা হবে অনেক বেশি। হিমান্ত বিশ্ব শর্মা ভারতীয় জনতা পার্টির নেতা। তিনি প্রকাশিত      নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি নিয়ে ভীষণ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কারণ চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন অনেক হিন্দু। তিনি বলেছেন, যদি বাংলাদেশ তার নাগরিকদের গ্রহণ করতে রাজি না হয় তাহলে আমাদেরকে অন্য কোনো পথ খুঁজতে হবে। তবে আমি বলছি, কোনো বন্দিশিবির স্থাপন করা হবে না। তিনি এমনটি বললেও ভারতেরই অনলাইন নিউজ ১৮ সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যে, আসামে এরই মধ্যে ‘সেন্ট্রাল ডিটেনশন সেন্টার’ নির্মাণ করা হচ্ছে। এ খাতে খরচ ধরা হয়েছে ৪৫ কোটি রুপি। মোট ১১টি এমন বন্দিশিবির নির্মাণ করা হবে। তাতে অর্থ বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১০০০ কোটি রুপি। ওদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রত্যাবর্তন বিষয়ক কোনো চুক্তি নেই ভারতের। গত মাসে বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেছেন, আসামে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্তকরণ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।

হিমান্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, ক্ষমতাসীন বিজেপি’র সংশয় বাংলাদেশ সংলগ্ন জেলাগুলো যেমন করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, ধুবড়ি ও দক্ষিণ সাইমারাতে সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে এনআরসি করতে গিয়ে। তিনি আরো বলেন, পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসিত জেলাগুলোতে যখন তালিকা থেকে বাদ পড়ার হার শতকরা ১৬ ভাগ, সেখানে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে এই হার মাত্র ৬ ভাগ। তাই রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন জানিয়েছে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে শতকরা ২০ ভাগ যাচাই প্রক্রিয়া নতুন করে করতে এবং রাজ্যের অন্যান্য অংশের শতকরা ১০ ভাগ যাচাই করতে।

৭ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের কাছে বাদ পড়া ব্যক্তিদের চূড়ান্ত তালিকা জমা দেয়ার কথা বলে জানিয়েছেন তিনি। হিমান্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, এনআরসি থেকে প্রকৃত যেসব নাগরিক বাদ পড়েছেন তাদেরকে রক্ষার জন্য রাজ্য একটি প্রস্তাব আনবে বা তাদের পক্ষ অবলম্বন করবে বলে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রকাশিত এই রিপোর্টকে তিনি মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। তার ভাষায়, নির্বাচনী প্রচারণাকালীন বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যেসব হিন্দু ও বৌদ্ধ অভিবাসী হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছেন তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয়ার জন্য আমরা সিটিজেনশিপ বিল কার্যকর করবো। একই সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল যে, আসামের পর আমরা পুরো দেশে এনআরসি করবো। হিন্দু, বৌদ্ধ ও মুসলিম হিসেবে প্রকৃত অনেক নাগরিক এবারের তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন। এ বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। বলেছেন, এরই মধ্যে তাদের জন্য অতিরিক্ত ২০০ ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হয়েছে। এরই মধ্যে তার ১৬০টি কার্যক্রম শুরু করেছে। হিমান্ত বলেন, প্রকৃত অনেক নাগরিক বাদ পড়েছেন তালিকা থেকে। আবার অনেক ভুয়া পরিচয়ধারী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। প্রকৃত ওই নাগরিকদের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ের বিষয় ওই ভুয়া পরিচয়ধারীরা। তার মতে, রাজনৈতিক দলগুলো ও গ্রুপগুলো এনআরসি’র সমালোচনা করছে না। সমালোচনা করছে এর প্রয়োগ নিয়ে।

ঢাকায় কোনো গ্যাং থাকবে না-ডিএমপি কমিশনার

ঢাকায় কোনো গ্যাং থাকবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং, বড় গ্যাং, স্থানীয় গ্যাং সব ধরনের গ্যাং-কে নিশ্চিহ্ন করে দেব। কিশোর গ্যাংয়ের কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। গতকাল বেলা ১১টার দিকে ঢাকার লালবাগের হোসনি দালান ইমামবাড়ায় পবিত্র আশুরা উপলক্ষে নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, ঢাকায় গ্যাং বলে কোনো  শব্দ থাকবে না। সবাইকে নিশ্চিহ্ণ করা হবে। প্রতি বছর তাজিয়া মিছিলে কিশোর গ্যাংরা ঝামেলার সৃষ্টি করে। তাই এ বছর তাজিয়া মিছিলে কাউকেই নাশকতা করতে দেয়া হবে না।

শুক্রবার বিকাল সাড়ে চারটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত হাতিরঝিলে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে শতাধিক কিশোর ও তরুণকে আটক করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। এর আগে বুধবার রাতে মোহাম্মদপুর চান মিয়া হাউজিংয়ে কিশোর গ্যাং দ্বন্ধে মহসিন নামের ১৪ বছর বয়সী এক কিশোর খুন হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, আধিপত্য বিস্তার ও মেয়ে সংক্রান্ত জেরেই ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে। জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রার দিন মোহাম্মদপুরে দুই র‌্যাব সদস্যকে ধাওয়া করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

তাজিয়া মিছিলে থাকবে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা: ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত তাজিয়া মিছিলে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে মিছিল শুরু হওয়ার পর আর কাউকে মিছিলে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। হোসনি দালান, ইমামবাড়া, মিরপুর, বড়কাটারা, ছোট কাটারা ও মোহাম্মদপুর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতিটি ইমামবাড়া সিসিটিভি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। যারা শ্রদ্ধা জানাতে আসবেন তাদের প্রত্যেকেই আর্চওয়ে ও মেটাল ডিটেকটরে তল্লাশি হয়ে আসতে হবে।

কমিশনার বলেন, মিছিলে কোনো ধরনের ধাতব বস্তু, ছুরি-তরবারি, আগুন জাতীয় বস্তু আনা নিষিদ্ধ। মিছিল যে রাস্তা দিয়ে যাবে ওই রাস্তায় আমাদের চেকপোষ্ট থাকবে। মিছিলে সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ শোকের মিছিল। এছাড়া পাইকরা মিছিলে অংশ নিতে পারবে না। কারণ তারা মিছিলে অংশ নিয়ে তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে শোক প্রকাশ করত। এতে বিশৃঙ্খলা ও এক ধরণের ভীতি সৃষ্টি হত। তিনি বলেন, মিছিল চলা অবস্থায় ইমাম বাড়া গুলোতে আমাদের স্পেশাল ব্রাঞ্চ এবং কাউন্টার টেররিজম হউনিটের ডগস্কয়ার্ড দ্বারা সুইপিং করা হবে। নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে মিছিল পরিচালনা করব।

সুন্দরী জুঁইয়ের প্রতারণার ফাঁদ

খুলনায় ফারহানা নাসরিন জুঁই নামে এক সুন্দরী তরুণীর প্রতারণায় আপন ভাই ও দুই স্বামী সর্বস্বান্ত হয়েছেন। প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে সহোদর ও দুই স্বামীর ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে তার বিরুদ্ধে খুলনার আদালতে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) খুলনায় পাঠানো হয়েছে। এর আগে ৩রা সেপ্টেম্বর খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নালিশি মামলার আমলি আদালতে (দৌলতপুর থানা) মামলাটি দায়ের করেন ওই যুবতীর বড় ভাই মোস্তফা ফয়সাল। তিনি নগরীর গোয়ালখালী মেইন রোড এলাকার এসএম বাবর আলীর ছেলে। এছাড়াও মামলায় একাধিক পুরুষের সঙ্গে জুই’র অনৈতিক সম্পর্কের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে।

আদালতের সূত্র জানান, বাদীপক্ষে সিনিয়র আইনজীবী আব্দুল মালেক আদালতে মামলাটি দাখিল করেছেন। শুনানি শেষে মহানগর হাকিম মো. শাহীদুল ইসলাম মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআই খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বরাবর প্রেরণের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে আগামী ১৫ই অক্টোবর মামলার পরবর্তী দিন ধার্যসহ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলেরও নির্দেশ দিয়েছেন। এজাহারে বাদী মোস্তফা ফয়সাল উল্লেখ করেন, তিনি ২০১২ সালে সরকারিভাবে চাকরি পেয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় যান। যাওয়ার প্রাক্কালে তার বোন ফারহানা নাসনির জুই বিদেশ থেকে অর্জিত অর্থ তার নামে প্রেরণ করতে বিভিন্নভাবে ফয়সালকে উদ্বুদ্ধ করেন। এমনকি বলেন, ‘বাবা ও মায়ের নামে টাকা পাঠালে তারা সব টাকা খরচ করে ফেলবে, দেশে ফিরে কিছুই পাবে না’। এ ধরনের কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে তিনি ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত চার বছরে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ব্যাংক দৌলতপুর শাখায় জুই’র নিজস্ব ব্যাংক হিসেবে ৬০ লাখ টাকা পাঠান। ২০১৬ সালে দেশে ফিরে তিনি জুই’র কাছে নিজের প্রেরিত টাকা ফেরত চান। কিন্তু সে আজকাল করে বিভিন্ন টালবাহানা শুরু করে। বিষয়টি নিয়ে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয়। এ নিয়ে পারিবারিকভাবে একাধিকবার আলোচনা হলেও নানা অজুহাতে সে সময় ক্ষেপণ করে। সর্বশেষ গত ৩১শে আগস্ট টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সে রাখেনি। উপরন্তু ওইদিন সে টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করে।

বাদী আরও উল্লেখ করেন, ২০০৬ সালে আয়ারল্যান্ড প্রবাসী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ফারহানা নাসরিন জুই’র প্রথম বিয়ে হয়। বিয়ের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই জমি কেনার কথা বলে জুই তার কাছ থেকে তিন দফায় ১৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এরই মধ্যে সে মো. ইমরান নামে এক ব্যাংক কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানতে পেরে স্বামী জিয়াউর রহমান আয়ারল্যান্ডেই স্ট্রোকে মারা যান। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১১ই অক্টোবর ঢাকার ব্যবসায়ী মো. হুমায়ুন কবিরকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে জুই। বিয়ের পর তার কাছ থেকে বিভিন্ন মালামাল ও স্বর্ণালঙ্কারসহ ৮৪ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। আর্থিক বিষয় নিয়ে এক পর্যায়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। বিপুল অংকের এ অর্থ-সম্পদ স্থায়ীভাবে আত্মসাতের উদ্দেশে জুই স্বামী হুমায়ুন কবিরের সাক্ষর জাল করে ২০০৮ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি একটি ভুয়া খোলা তালাকনামা তৈরি করে। ওই ঘটনায় স্বামী হুমায়ুন কবির স্ত্রী ফারহানা নাসরিন জুইসহ কয়েকজনকে আসামি করে খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় জুইসহ আসামিরা এক মাস কারাবাস করেন। মামলাটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। এছাড়া জুই তার স্বামী হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধেও যৌতুক ও নারী নির্যাতনসহ একাধিক মামলা এবং হুমায়ুন কবিরও তার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন।

বাদী মোস্তফা ফয়সাল অভিযোগ করেন, তার এবং দুই ভগ্নিপতির বিপুল অংকের টাকা আত্মসাৎ করেই ক্ষান্ত হয়নি জুই। সে জহিরুল ইসলাম জনি, সাইফুল ইসলাম সাকিল, সায়মন ও মোস্তাফিজসহ আরো একাধিক পুরুষের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সময় সে তাদের বাসায় ডেকে আনে। এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করার কারণে সে তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা তো ফেরত দিচ্ছে না। উপরন্তু বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে তার ক্ষতি করার ষড়যন্ত্র করছে। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়া হলে বরগুনার মিন্নির মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থেকে তিনি আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।

এখনো হারিয়ে যায়নি নৌকাবাইচ by রাশিম মোল্লা

নদীতে পর্যাপ্ত পানির অভাব ও রাজনৈতিক মতানৈক্যের কারণে বিলুপ্তির পথে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। আবহমান গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে রোয়িং ফেডারেশনের নেই তেমন কোনো উদ্যোগ। কেবল মাত্র বুড়িগঙ্গা নদীতে বছরে একবার নৌকাবাইচ আয়োজন করেই তারা তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। তবে গত বছর অনুষ্ঠিত হয়নি এই আসর। এবারকার আয়োজনেরও হদিস নেই। তবুও থেমে নেই বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য নৌকাবাইচ। গ্রামবাসীর উদ্যোগে এখনো হচ্ছে সুস্থ বিনোদনের এই উৎসব।
এক সময় বর্ষায় নৌকাবাইচ ছিল দেশের প্রধান উৎসব। প্রতি বছর বর্ষাকালে ভরা ভাদ্রে এ উৎসব পালিত হতো। এখন সেটা আর নেই। তবে একেবারে নেই সেটা বলা যাবে না। গতকাল মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইরে অনুষ্ঠিত হলো নৌকাবাইচ। উপজেলার বালিরটেকের কালিগঙ্গা নদীর দুইপারে লাখো মানুষের উপস্থিতি ছিল। গত বুধবার অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা ও ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমান বলেছেন, নৌকাবাইচ বাঙালির জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। হাজার বছরের গ্রামবাংলার সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ধারাবাহিকভাবে সুস্থ বিনোদন হিসেবে চলে আসছে। তাই এই নৌকাবাইচকে ধরে রাখতে হবে। হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না। নৌকাবাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অংশ। তবে কবে এদেশে গণবিনোদন হিসেবে নৌকাবাইচের প্রচলন হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে দুটি জনশ্রুতি রয়েছে। একটি জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে। জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রার সময় স্নানার্থীদের নিয়ে বহু নৌকার ছড়াছড়ি ও দৌড়াদৌড়ি পড়ে যায়। এতেই মাঝি-মাল্লা-যাত্রীরা প্রতিযোগিতার আনন্দ পায়। এ থেকে কালক্রমে নৌকাবাইচ শুরু। দ্বিতীয় জনশ্রুতি পীর গাজীকে কেন্দ্র করে। ১৮ শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজী পীর মেঘনা নদীর এক পারে দাঁড়িয়ে অন্য পারে থাকা তার ভক্তদের কাছে আসার আহ্বান করেন। ভক্তরা তার কাছে আসতে একটি ডিঙ্গি নৌকা খুঁজে বের করেন। যখনই নৌকাটি মাঝ নদীতে এলো তখনই নদীতে তোলপাড় আরম্ভ হলো। নদী ফুলেফেঁপে উঠলো। তখন চারপাশে যত নৌকা ছিল তারা খবর পেয়ে ছুটে আসে। তখন সারি সারি নৌকা একে অন্যের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটে চলে। এ থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়। মুসলিম যুগের নবাব-বাদশাহর আমলে নৌকাবাইচ বেশ জনপ্রিয় ছিল। অনেকে মনে করেন, নবাব বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়। পূর্ববঙ্গের ভাটি অঞ্চলের রাজ্য জয় ও রাজ্য রক্ষার অন্যতম কৌশল ছিল নৌশক্তি। বাংলার বারো ভূঁইয়ারাও নৌ-বলেই মোগলদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। মগ ও হার্মাদ জলদস্যুদের দমনে নৌশক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এসব রণবহর বা নৌবহরে দীর্ঘাকৃতির ছিপ জাতীয় নৌকা থাকতো। একেক অঞ্চলে একেক রকমের নৌকার প্রচলন রয়েছে। তবে নৌকাবাইচের জন্য যে নৌকা ব্যবহার করা হয় সেটা হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ, সরু ও লম্বাটে হওয়ায় পানি কেটে দ্রুত চলতে সক্ষম এ নৌকা। নৌকার সামনের গলুইটাকে খুব সুন্দর করে সাজানো হয়। কখনো করা হয় ময়ূরের মুখ, কখনো রাজহাঁস বা অন্য কোনো পাখির মুখাবয়ব। ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ অঞ্চলগুলোতে বাইচের জন্য সাধারণত কোশা নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠন সরু এবং লম্বায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। কোশা নৌকার সামনের ও পেছনের অংশ একেবারে সোজা। বাইচের নৌকাগুলোর রয়েছে বিভিন্ন নাম। মাসুদ রানা, চার ভাই, দাদা-নাতী, পানির রাজ, শেখ বাড়ি, শিকদার বাড়ি, হাতনীর রাজ, বাংলার ঐতিহ্য, সোনার বাংলা, খান বাড়ি, জয় বাংলা, মধু মাঝি, নীল সবুজ, শাহজালাল, অগ্রদূত, ঝড়ের পাখি, পঙ্খিরাজ, ময়ূরপঙ্খি, সাইমুন, তুফানমেইল, সোনার তরী, দীপরাজ ইত্যাদি। নৌকায় ওঠার ক্ষেত্রে রয়েছে অনেক আনুষ্ঠানিকতা। সকলে গেঞ্জি গায়ে মাথায় একই রঙের রুমাল বেঁধে নেয়। সবার মধ্যখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। প্রতিটি নৌকায় ৫০ থেকে ১০০ জন মাঝি থাকে। যে কেউই নৌকার মাঝি হতে পারতো না। মাঝি হতে হলে তাকে একটু রুষ্টপুষ্ট হতে হতো। ছয় মাস আগে থেকেই বাছাই করা হতো মাঝিদের। সাধারণত ভাদ্র মাস আসার আগেই নদীপারের মানুষ প্রস্তুতি নেয় বাইচ উৎসবের। চলে নৌকার ঘষামাজা। সবার বাড়িতে চলে উৎসবের আয়োজন। বাড়ির বধূরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন নৌকাবাইচ দেখতে আসা আত্মীয়দের জন্য পিঠাপুলি বানাতে। সকালে দলবেঁধে ছোটে নৌকাবাইচ দেখতে। বিকালবেলা শুরু হয় নৌকাবাইচের মূল আসর। ‘হেইয়ো রে হেইয়ো’ বলে মাঝিরা একসঙ্গে বৈঠা লাগায় নদীতে। জোড়ায় জোড়ায় শুরু হয় প্রতিযোগিতা। সন্ধ্যায় চলে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান নির্ধারণী টান। তবে এখন আর আগের মতো দেখা যায় না নৌকাবাইচ। তবে স্বল্প পরিসরে এর আয়োজন এখন হলেও উৎসবের আনন্দ কিন্তু ভাটা পড়েনি। প্রতিবছরই আয়োজন করা হয় নৌকাবাইচ। ইতিমধ্যে ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জে স্থানীয়দের উদ্যোগে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী নৌকাবাইচ। এ ব্যাপারে নৌকাবাইচ ঐতিহ্য রক্ষা কমিটির সভাপতি মো. মাসুদ মোল্লা বলেন, এলাকার ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য কষ্ট হলেও প্রতিবছরই নৌকাবাইচের আয়োজন করছি। আবহমান গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে রোয়িং ফেডারেশনের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। তিনি বলেন, এক সময় নবাবগঞ্জে ইছামতি নদীতে প্রায় ৩০টি পয়েন্টে আয়োজন করা হতো নৌকাবাইচ। কিন্তু সরকারি সহায়তা না পেয়ে এখন অনেক স্থানেই বন্ধ হয়ে গেছে এ উৎসব। নবাবগঞ্জের শাহজালাল নৌকার মালিক ও নবাবগঞ্জ রোফিং ক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুব জামান বলেন, আমাদের এ এলাকায় পাঁচটি বাইচের নৌকা ছিল। এসব নৌকা উত্তাল পদ্মায় বাইচ দিতে যেত। ১৯৭৫ সালে আমাদের গ্রামের একটি নৌকা উত্তাল পদ্মায় বাইচ দিতে গিয়ে ডুবে যায়। তা আর পাওয়া যায়নি। তিনি আরো বলেন, এখন নৌকাবাইচে ফ্রিজ, মোটরসাইকেল ও টেলিভিশন পুরস্কার দেয়া হলেও আজ থেকে ৪০ বছর আগে পুরস্কার দেয়া হতো কলস ও শিল্ড।

মোদী সরকার কি কাশ্মীরকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিচ্ছে by শুভজ্যোতি ঘোষ

কারফিউতে মোড়া শ্রীনগরে ভারতীয় সেনার টহল
আপডেট- ১৬ অগাস্ট ২০১৯: বিগত প্রায় সত্তর বছর ধরে যা চলে আসছিল, এক ঝটকায় ভারত-শাসিত কাশ্মীরের সেই বিশেষ মর্যাদা ছিনিয়ে নিয়ে দিল্লির নরেন্দ্র মোদী সরকার যে বিরাট এক ফাটকা খেলেছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
তবে এই পদক্ষেপের পরিণাম যে কী হতে চলেছে, তা এখনও অনেকটাই অনুমানসাপেক্ষ।
কাশ্মীরের বেশির ভাগ মানুষ এই সিদ্ধান্তে যে প্রবল ক্ষুব্ধ তা আর গোপন নেই, এবং এর ফলে উপত্যকায় সশস্ত্র বিক্ষোভ নতুন করে প্রসার পাবে কি না সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।
আবদুল্লা বা মুফতি পরিবারের মতো কাশ্মীরের ''ভারতপন্থী'' রাজনীতিকদের কিংবা হুরিয়ত কনফারেন্সের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের প্রাসঙ্গিকতা কতটা বজায় থাকবে সেটাও বেশ অস্পষ্ট।
তবে সবচেয়ে বড় কথা - লক্ষ লক্ষ ফৌজ মোতায়েন করে কাশ্মীরকে বাকি ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ দিল্লি নিয়েছে তা আদৌ সফল হবে কি না, মূলত সেটাই এখন দেখার বিষয়।

'দিল্লির পদক্ষেপ আসলে মুসলিমদের শাস্তি দেওয়ারই ছল'

মোদী সরকারের নাটকীয় সিদ্ধান্ত কাশ্মীরে ঠিক কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে গত কয়েকদিনে শ্রীনগর, দিল্লি বা মুম্বাইতে কথা বলেছি অনেকের সঙ্গেই।
প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রির মাধ্যমে ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার ঠিক দুদিনের মাথায় যখন সেই অবরুদ্ধ ভূখন্ডে পা রাখলাম, কাশ্মীরি তরুণরা যেভাবে প্রায় ছেঁকে ধরে তাদের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলেন সে দৃশ্য ভোলার নয়।
কারফিউ সামান্য শিথিল হতেই শ্রীনগরের রাস্তায় বেরোনো
তারা নিশ্চিত ছিলেন, কারফিউ একবার উঠলেই কাশ্মীর গর্জে উঠবে - এবং দিল্লির এই পদক্ষেপ আসলে মুসলিমদের শাস্তি দেওয়ারই ছল।
বাডগামের বাসিন্দা আশরাফ-মুদাসসরারা বলছিলেন, "মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কাশ্মীরের প্রতিটা জেলায় মুসলিমদের হেনস্থা করা হচ্ছে।"
"গর্ভবতী মহিলারা পর্যন্ত হাসপাতালে যেতে পারছেন না। তল্লাসি-চৌকি আর ফৌজি ব্যারিকেডে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন বিপর্যস্ত হয়ে উঠছে।"
স্থানীয় যুবক বিলাল আহমেদ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে দ্বিধা করলেন না, "অমিত শাহ-র কথামতো কাশ্মীরের আশি শতাংশ মানুষের যদি এই সিদ্ধান্তে সমর্থন থাকে, তাহলে মাত্র আট মিনিটের জন্য তিনি কারফিউ তুলেই দেখুন না - কী হয়!"

কাশ্মীরি তরুণরা কোন্ পথে যেতে পারে?

কাশ্মীরের জনপ্রিয় লোকগীতি 'মাই চানি রাওয়াম রাত দো' যেমনটা বলে, প্রিয় জন্মভূমির জন্য এই মুলুকের যুবকরা জীবনের বহু দিন, বহু রাত উৎসর্গ করেছেন।
শ্রীনগরের কেন্দ্রস্থলে চায়ের দোকানকে ঘিরে জটলা
এখন ৩৭০ ধারা বিলোপের সবশেষ আঘাত কি তাদের আরও একবার অস্ত্র হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করবে?
কাশ্মীরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ হামিদা নাঈম বানো তার হায়দারপোরার বাড়িতে বসে বিবিসিকে বলছিলেন, "গত দুতিন বছরে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী কাশ্মীরে হাজারের ওপর কিশোর-যুবককে খতম করেছে। আর এখন তারা কী নতুন বার্তা দিল?"
"এটা তো বুঝতে হবে যে এই দুর্বিষহ জীবনে হতাশ হয়েই কাশ্মীরিরা বন্দুক হাতে তুলে নিচ্ছে।"
"নইলে কেন শিক্ষিত, প্রতিভাবান তরুণরা এমনি এমনি নিজেদের জীবন শেষ করে দিতে যাবে?", প্রশ্ন অধ্যাপক বানোর।
বছরতিনেক আগে বিদ্রোহী নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যু যেভাবে কাশ্মীরি তরুণদের দলে দলে সশস্ত্র পথে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এখন রাতারাতি ৩৭০ ধারা মুছে দেওয়ার সিদ্ধান্তও একই ধরনের ট্রিগারের কাজ করবে বলে অনেকেই মনে করছেন।
শ্রীনগরের রাজপুরায় গওহর বাট যেমন বলছিলেন, "তরুণদের যদি সরকার পাশে চায় তাহলে তাদের স্বপ্নটা কী, তা তো বুঝতে হবে!"
"তা না-করে আপনি দুম করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিলেন, এর লাভক্ষতি কী হবে সেটা তরুণদের বোঝানোর কোনও চেষ্টাই করলেন না। তা ওরা তো বিগড়ে যাবেই।"
তিন বছর আগে বিদ্রোহী নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল কাশ্মীর
তার বন্ধু মাজিদ পাশ থেকে যোগ করেন, "নিতান্ত বাধ্য হয়েই কিন্তু এই ছেলেপিলেরা পাথর ছোঁড়ে।"
"গতকাল দেখলাম দুই শিক্ষিত যুবকের বাইক আটকে পুলিশ অযথা তাদের হেনস্থা করছে, মামলা দেওয়ার ভয় দেখাচ্ছে।"
"পাবলিক সেফটি অ্যাক্ট একবার লাগলে তাদের চাকরি-বাকরির পথও বন্ধ, তো এই ছেলেগুলো কী করবে বলুন?"
কাশ্মীরি তরুণদের সশস্ত্র পথের দিকে ঝোঁকার আর একটা বড় কারণ হল বহু বছর ধরে সেখানে যারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।

ভারতপন্থী কাশ্মীরিদের অবস্থান

বাদামিবাগ এলাকার ব্যবসায়ী ইরফান জাভিদ যেমন বলছিলেন, "এই ফারুক আবদুল্লার পরিবারকেই দেখুন না! যাদের ভরসায় গত সত্তর বছর ধরে দিল্লি এখানে রাজত্ব করল, তাদেরকেও আজ প্রমাণ দিতে হচ্ছে তারা ভারতীয় কি না।"
"আবদুল্লা পরিবারের এই হাল হলে সাধারণ কাশ্মীরিদের কী অবস্থা বুঝতেই পারছেন।"
গত বেশ কিছুদিন ধরে পর্যটকশূন্য ডাল লেক। বসে আছে শিকারাগুলো
মুম্বাই আইআইটি-র সাবেক অধ্যাপক ও লেখক-গবেষক রাম পুনিয়ানি আবার মেহবুবা মুফতির দৃষ্টান্ত দিয়ে বলছিলেন, "একবার উগ্রপন্থীদের দিকে ঝুঁকে, একবার বিজেপির সঙ্গে গিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি নিজেই বিভ্রান্ত।"
"কাশ্মীর প্রশ্নে তিনি সংলাপ চেয়েছিলেন, কিন্তু নিশ্চিত করতে পারেননি সেটাও।"
অন্যদিকে মিরওয়াইজ ওমর ফারুক বা সৈয়দ আলি শাহ গিলানির মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী হুরিয়ত নেতাদের টানা গৃহবন্দী রেখে সরকার তাদের অনেকটাই নিষ্ক্রিয় করে দিতে পেরেছে।
দিল্লির নিরাপত্তা থিঙ্কট্যাঙ্ক বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো শ্রীরাধা দত্ত মনে করছেন এই পটভূমিতে এখন ভারত সরকারের প্রচ্ছন্ন মদতে কাশ্মীরে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উঠিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
তার কথায়, "যেটা মনে হচ্ছে মেহবুবার দল পিডিপি-র সমর্থনে ভাঁটা পড়েছে।"
কারফিউ-ঘেরা জনশূন্য শ্রীনগরে ঈদের আগে ভেড়ার পাল নিয়ে ব্যাপারি
"তবে ন্যাশনাল কনফারেন্স বহু পুরনো দল, তাদের এখনও জনভিত্তি রয়েছে। আর হুরিয়ত নেতারাও বেশির ভাগই নিশ্চিহ্ন।"
"এখন আমার ধারণা কেন্দ্র যেটা করতে চাইবে, নবীন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের তুলে এনে তাদের সঙ্গে সমঝোতা করে কাশ্মীরে কেন্দ্র-রাজ্য সমঝাতার মডেলে একটা আঞ্চলিক শক্তিকে গড়ে তুলতে চাইবে।"
"নতুন পলিটিক্যাল ডিসপেনসেশান কাশ্মীরে আমরা বহুদিন দেখিনি, তার একটা স্পেস বোধহয় ওখানে আছে", বিবিসিকে বলছিলেন ড: দত্ত।

কাশ্মীরে নতুন রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠা কি প্রভাব ফেলতে পারে

কিন্তু কাশ্মীরে দিল্লির সমর্থনপুষ্ট কোনও নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হলেই কি বাকি ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের আত্মিক যোগাযোগ সম্ভব?
কাশ্মীরের নবীন রাজনীতিবিদ ও জেএনইউ-র সাবেক ছাত্র-নেত্রী শেহলা রশিদ কিন্তু মনে করেন, "এই তথাকথিত ইন্টিগ্রেশনের তত্ত্বটা একেবারে অবাস্তব।"
বাইরে বেরোতে পারছেন না ওমর আবদুল্লা বা মেহবুবা মুফতির মতো নেতারা
তার প্রশ্ন, "যেখানে অমরনাথ তীর্থযাত্রীদের ভ্যালি থেকে এয়ারলিফট করে কিংবা ভারতীয় পর্যটকদের বিদেশিদের ডিপোর্ট করার মতো করে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করতে হয়, সেখানে কীভাবে ইন্টিগ্রেশন সম্ভব?"
"আমি তো বলব মোদীজি স্রেফ লোকের চোখে ধুলো দিচ্ছেন!"
কাশ্মীর গবেষক রাম পুনিয়ানও বলছিলেন, "একটা ভূখন্ডকে নিজের দেশে যুক্ত করার দুটো রাস্তা আছে। একটা হল সেই সমাজের গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে, ভরসার সেতু গড়ে এবং তাদের হৃদয় বা মন জিতে নিয়ে।"
"আর দ্বিতীয় পথটা হল সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে, ঠিক যেটা এখন ভারত করছে।"
লক্ষ লক্ষ ফৌজ ও আধাসেনা পাঠিয়ে পুরো কাশ্মীরকে হয়তো কিছুদিন গ্যারিসন বানিয়ে রাখা সম্ভব, তবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য একটা কার্যকরী রাজনৈতিক রোডম্যাপ অপরিহার্য।
কাশ্মীরে এখন মোতায়েন রয়েছে বেশ কয়েক লক্ষ ভারতীয় সেনা
কিন্তু কাশ্মীরে মোদী সরকারের তেমন কোনও পরিকল্পনা কি আদৌ আছে?
এখানে শ্রীরাধা দত্ত ভরসা রাখতে চান বিপুল লগ্নি আর উন্নয়নের ন্যারেটিভে।
তিনি বলছিলেন, "আমরা সব সময় কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলি, এত সুন্দর জায়গা - অথচ সেখানে প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন কিন্তু তেমন হয়নি কখনওই। শিক্ষা-শিল্পসহ নানা খাতে বাকি ভারতে যে ধরনের বিনিয়োগ হয়েছে, কাশ্মীরে সেটা কোথায়?"
"অথচ দিল্লি-চেন্নাই-ব্যাঙ্গালোরে তরুণরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, সেই একই ধরনের অ্যাকসেস যদি আমরা কাশ্মীরকেও দিতে পারি তাহলে সেখানেও আমরা ইতিবাচক সাড়া পেতে পারি বলেই আমার বিশ্বাস।"
দিল্লির জেএনইউ-তে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সঞ্জয় ভরদ্বাজও বলছিলেন, "প্রায় দুদশক আগে প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী কাশ্মীরের মন জেতার জন্য বলেছিলেন জমহুরিয়ত, কাশ্মীরিয়ত আর ইনসানিয়তের কথা - যার অর্থ হল যথাক্রমে গুড গভর্ন্যান্স বা সুশাসন, কাশ্মীরি জাতিসত্ত্বা আর মানবিকতা।"
শেহলা রশিদ
প্রফেসর ভরদ্বাজের বক্তব্য, "অন্য সব মডেল তো সত্তর বছর সময় পেল, এখন এটাকেও একটু সময় দিয়ে দেখাই যাক না - কাশ্মীরের মানুষ তা গ্রহণ করেন কি না!"

কাশ্মীরের বহুত্ববাদ রক্ষার প্রয়োজন

কাশ্মীরের একটা খুব পুরনো গান 'হুক্কুস বুক্কুস' এখন পুরো ভারত শুনছে।
বলিউড ফিল্মে যেমন ব্যবহার হচ্ছে, তেমনি গাইছেন কাশ্মীরি পন্ডিত সমাজের সঙ্গীতিশিল্পী আভা হানজুরা, যিনি থাকেন ব্যাঙ্গালোরে।
মিলিট্যান্সি আর মিলিটারির হাতে বুলেটবিধ্বস্ত কাশ্মীরের যে অন্য একটা চেহারাও আছে, তার সঙ্গে বাকি ভারতের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার নানা ধরনের চেষ্টা চলছে।
ঝিলমের বুকে সার সার হাউসবোটও এখন চুপচাপ বসে আছে
ইতিহাসবিদ মহুয়া সরকারের কথায়, "কাশ্মীরের মধ্যে চিরকালই কিন্তু একটা প্লুরালিজম ছিল, এবং সেটা এখনও আছে।"
"কলহনের রাজতরঙ্গিণী যেখানে লেখা, তার ইতিহাস আবহমানকাল ধরে বহুত্ববাদকে সম্মান করে এসেছে। ভারতের কাছে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"
"এখন আমার বিশ্বাস, যতটা সম্ভব আলোচনার মাধ্যমে ও ডেমোক্র্যাটিক পন্থায় সেটা রক্ষা করা যায় ততই ভাল!"
অর্থাৎ তিনিও কাশ্মীরের সেই বহুত্ববাদকে রক্ষা করার কথাই বলছেন - তবে যতটা সম্ভব গণতান্ত্রিক পথে।
সমস্যা হল, ৩৭০ ধারা বিলোপের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত কাশ্মীরের ওপর আচমকাই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভারতে সেখানে কাশ্মীরের মতামত নেওয়ার কোনও প্রয়োজন বোধ করেনি।
কাশ্মীরের গরিষ্ঠসংখ্যাক মানুষ প্রাণপণে তা রুখতে চাইছেন, ফলে সেই সংঘাতের পরিণতি উপত্যকায় শান্তি ও সমৃদ্ধি ডেকে আনবে তা এখন বিশ্বাস করা রীতিমতো অসম্ভবই মনে হচ্ছে!
কাশ্মীর উপত্যকার গান ভারতকে শোনাচ্ছেন আভা হানজুরা, যিনি নিজেই একজন কাশ্মীরি পন্ডিত

চোখ কাশ্মীরে, শঙ্কায় ভারতীয় নাগারা by বার্তিল লিন্টনার

নাগা স্বাধীনতা দিবস সাধারণত ভারতে বড় কোনো ঘটনা নয়। অবশ্য চলতি বছর উপনিবেশিক ব্রিটেনের কাছ থেকে নাগা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের স্বাধীনতা ঘোষণার বার্ষিকী পালনের জন্য হাজার হাজার জাতিগত নাগা দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য নাগাল্যান্ড ও মনিপুরে সমবেত হয়।

অন্যতম উদযাপন অনুষ্ঠান হয় মনিপুরের নাগা-অধ্যুষিত এলাকা সেনাপতিতে। এখানে সাদা তারকা-সংবলিত নীল নাগা পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরে সমবেত জনতা নাগা জাতীয় সঙ্গীত গায়।

নাগারা স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল ভারতের স্বাধীনতা লাভের এক দিন আগে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট। নাগা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা আনগামি জাপু ফিজো এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ আধা-স্বায়ত্তশাসন বাতিল করা ও এলাকাটিকে কেন্দ্রশাসিত দুটি ভূখণ্ডে বিভক্ত করার নয়া দিল্লির সাম্প্রতিক পদক্ষেপের মধ্যে চলতি বছর নাগাদের অনুষ্ঠানের বিশেষ তাৎপর্য ছিল।

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় জম্মু ও কাশ্মীর যে ধরনের সুবিধা (অন্যান্য এলাকার ভারতীয়রা সেখানে জমি ক্রয় করতে পারত না) পেত, তা ভারতের উত্তর-পূর্বের কয়েকটি রাজ্যও ভোগ করে।

গত ১৪ এপ্রিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী নাগা পিপলস মুভমেন্ট ফর হিউম্যান রাইটসের মহাসচিব নিনগুলো ক্রম এবারের স্বাধীনতা দিবসে বেশি লোকের সমবেত হওয়ার কারণ হিসেবে কাশ্মীর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সরকারের নীতির ফলে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

গত ৫ আগস্ট জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাপারে ভারত সরকার তার নতুন সিদ্ধান্ত ঘোষণা করার পরপরই লাল থানহাওয়াল টুইন করেন, উত্তরপূর্বের জনসাধারণের প্রতি রেড এলার্ট। সংবিধানে সংরক্ষিত মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুনাচলের মতো রাজ্যগুলোর জন্য এটি হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বের অনেকে এখন আশঙ্কা করছে যে তারাও তাদের বিশেষ অধিকারগুলো হারাবে। উল্লেখ্য, উত্তর-পূর্বের অনেক এলাকায় অনুচ্ছেদ ৩৭০ থেকেও কঠোর ব্যবস্থা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম বা অরুনাচল প্রদেশের বাইরের লোকদের এসব এলাকায় প্রবেশের জন্যও তথাকথিত ‌‘ইনার লাইন পারমিট’ দরকার হয়।

এই নিয়মটি ১৮৭৩ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ আমলে বেঙ্গল ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রেগুলেশনের মাধ্যমে জারি করা হয়। এখনো তা বলাল রয়েছে।

ভারতের নিম্ন এলাকার লোকজন যাতে উত্তর-পূর্ব সীমান্ত এলাকায় গিয়ে ব্রিটিশদের বাণিজ্যিক স্বার্থে আঘাত হানতে না পারে, সেজন্যই মূলত এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। স্বাধীন ভারতে স্থানীয় উপজাতীয় সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য তা বহাল রাখা হয়।

ভারতীয় সংবিধানে এই তিন রাজ্যের ভূমির মালিকানা ও সম্পদের ব্যবহারে বহিরাগতদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

ইনার লাইন পারমিট কেবল মনিপুর নয়, তথাকথিত সেভেন সিস্টার নামের রাজ্যগুলোতেও প্রযোজ্য।

ফলে জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাপারে সরকারি ঘোষণার পর উত্তর-পূর্বেও এ ধরনের পরিবর্তন হবে – এমন শঙ্কা দূর করতে ভারতের কর্মকর্তাদের সেখানে ছুটে যাওয়া বিস্ময়কর কোনো ঘটনা নয়।

নাগাল্যান্ডের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত গর্ভনর আর এন রবি ৬ আগস্ট এক সরকারি বিবৃতিতে বলেন, জম্মু ও কাশ্মীরের ঘটনার প্রভাব নিয়ে কিছু লোক উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আমি স্পষ্টভাবে আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে আপনাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছুই নেই।

১ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে সাবেক উপজাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবি নাগা বিদ্রোহী আন্দোলনের অন্যতম গ্রুপ ন্যাশনাল সোস্যালিস্ট কাউন্সিল অব নাগালিম (ইসাক-মুইভা গ্রুপ)’র সাথে শান্তি আলোচনায় নয়া দিল্লির প্রধান আলোচক ছিলেন।

১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে প্রথমে পাকিস্তানের ও পরে চীনের মধ্যস্ততায় নাগারা বিদ্রোহ করে ভারত থেকে আলাদা হতে চেয়েছিল। চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশে হাজার হাজার নাগা যোদ্ধ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে, তাদের অস্ত্র দেয় চীনের নিরাপত্তা বাহিনী।

তাদের অন্যতম থুইনগালেঙ মুইভা চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আদর্শ নিয়ে নাগা দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেন। তবে এতে করে নাগাদের মধ্যে বিভক্তি ঘটে। এনএসসিএন থেকে আলাদা হয়ে ১৯৮০ সালে নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল (এনএনসি) প্রতিষ্ঠিত হয়।

এনএনসির বর্ষীয়ান নেতা ইসাক চিশি সুইয়ের সহায়তায় মুইভা ভারতীয় সেনাবাহিনীর নাগালের বাইরে উত্তর-পশ্চিম মিয়ানমারে তাদের ঘাঁটি স্থাপন করে। তবে ইসাক ও মুইভা অল্প সময় পরেই মিয়ানমার নাগা মিত্র শানওয়াং শানিয়াং খাপলাঙের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। ফলে তিনি তাদেরকে ১৯৮৮ সালে তার এলাকা থেকে বের করে দেন।

মিয়ানমারের থাকার আশ্রয় হারিয়ে ১৯৯৭ সালে এনএসসিএন (আইএম) সরকারের সাথে আলোচনায় বসে।

তারপর প্রায় ১০০ রাউন্ড আলোচনার পর নাগাল্যান্ডের কয়েক দশকের বিদ্রোহ অবসানের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ৩ আগস্ট একটি কাঠামো চুক্তি হয়।

ভারতের কাছে আট দফা প্রস্তাব পেশ করে এনএসসিএন (আইএম)। এসবের মধ্যে রয়েছে নাগাদের জন্য আলাদা সংবিধান, আলাদা পতাকা, তাদের নিজস্ব পাসপোর্ট, মুদ্রা, নয়া দিল্লির সাথে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, জাতিসঙ্ঘে স্থায়ী প্রতিনিধি, এবং সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ বিষয় তথা বৃহত্তর নাগা পরিচিতি, যেটাকে বিদ্রোহীরা বলে ‘নাগালিম’ প্রতিষ্ঠা।

প্রস্তাবটি কার্যত সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। এতে কেবল নাগাল্যান্ড নয়, মনিপুর, আসাম, অরুনাচল প্রদেশ এবং উত্তর-পশ্চিম মিয়ানমারের একটি বড় অংশ (এখানেও নাগারা বাস করে) নিয়ে নাগাদের দেশ গঠনের কথা বলা হয়েছে।

গত জুনে স্থানীয় পত্রিকায় খবর প্রকাশ হয় যে নয়া দিল্লি এসব দাবি মেনে নিয়েছে। তবে রবি তা উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এটা স্রেফ গুজব।

তবে জম্মু ও কাশ্মীরে যা ঘটেছে, তাতে করে নয়া দিল্লি নাগাদের দাবি মেনে নেবে, তা মনে হয় না। আবার মনিপুর, আসাম ও অরুনাচল থেকে অংশবিশেষ কেটে নিয়ে নাগাদের দিয়ে দেয়ার যে দাবি জানানো হয়েছে, তাও এসব এলাকার রাজনীতিবিদেরা মেনে নেবেন না।

মনিপুরের ৩০ লাখ লোকের প্রায় ২০ ভাগ নাগা, কিন্তু তারা দাবি করছে ৭০ ভাগ। আসামে নাগা জাতিগোষ্ঠীর লোকজনের ছোট ছোট পকেট রয়েছে। আর অরুনাচলের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কিছু এলাকায় নাগারা সীমাবদ্ধ।

২০১৫ সালের আগস্টে তদানিন্তন আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন যে তারা সহযোগিতামূলক ফেডারেলবাদ ও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের চেতনা লঙ্ঘন করছেন এনএসসিএনের (আইএম) সাথে বৃহত্তর নাগালিম নিয়ে আলোচনার আগে তার ও অরুনাচল ও মনিপুরের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা না করে।

অন্যদিকে, রবি ১৭ আগস্ট ইন্ডিয়া টুডেতে উদ্ধৃত করা এক বিবৃতির উল্লেখ করে বলেন যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চান তিন মাসের মধ্যে এনএসসিএনের (আইএম) সাথে আলোচনা করতে।

এনএসসিএনের (আইএম) দাবিগুলো বিবেচনা করলে সেগুলোকে অবাস্তব মনে হবে। মনে হতে পারে যে এই ধরনের চুক্তি হলে নাগাদের সাথে আশপাশের এলাকার বৈরিতা সৃষ্টি হবে। মিজোরামেও ১৯৬০, ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে উপজাতীয় বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৮৬ সালে চুক্তির পর সেখানে শান্তি বিরাজ করছে।

মনিপুরে যুদ্ধবিরতি না হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেখানে প্রায়ই সংঘর্ষ ঘটে। এখানে সংঘর্ষ হয় মূলত নাগা আর মেইতেই বিদ্রোহীদের মধ্যে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে যেসব সুবিধা দেয়া হয়েছে, সেগুলো বাতিল করা হলে প্রায় অনিবার্যভাবেই প্রত্যাঘাতের সৃষ্টি হবে। মোদি সরকারও তা জানেন।

তবে ২২ বছর ধরে আলোচনার পরও এনএসসিএনের (আইএম) সাথে কোনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি না হওয়ায় ও নাগা বিদ্রোহীদের অতিরিক্ত দাবির ফলে অঞ্চলটি আবার আলোচনায় চলে আসতে পারে। তবে তা কেবল কেন্দ্র আর সশস্ত্র গ্রুপগুলোর মধ্যেই নয়, বিভিন্ন জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্যেও সঙ্ঘাতের সৃষ্টি করতে পারে।
ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলের ক্যাম্প হেবরনে ৭৩তম নাগা স্বাধীনতা দিবসের কুচকাওয়াজ চলাকালে নাগা পতাকা দোলাচ্ছেন ন্যাশনাল সোশিয়ালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-ইসাক মুইভা (এসএসসিএন-আইএম)’র এক ক্যাডার, ছবি: এএফপি

কেমিক্যালমুক্ত ফল চাষে সফল শিক্ষক শামছুল by আতিকুর রহমান

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নে কেমিক্যালমুক্ত ফল চাষ করে সফলতা পেয়েছেন শামছুল আলম দাখিল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও ঘাটাইল এস.ই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃষি বিষয়ক শিক্ষক শামছুল আলম। তার নিজ গ্রাম রসুলপুরে ৭ একর জমির ওপর দেশি-বিদেশি ৭৮ প্রকার ফলদ গাছ লাগিয়ে পুরো জেলাজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলে দিয়েছেন। পেশায় কৃষি শিক্ষক হওয়ার সুবাদে কৃষি কাজের প্রতি রয়েছে তার সীমাহীন আগ্রহ ও অদম্য চেষ্টা। গত ৫ বছরের অধিক সময় ধরে পাহাড়ি মাটিতে কেমিক্যালমুক্ত মাল্টা, লটকন, সৌদি খেজুর, মালয়েশিয়ার ডোরিয়ান, ফোর কেজি আম, ড্রাগন, রামভুটান কমলা, বারি-৪ মালটা, বাতাবি লেবু, আতা, আমড়া, জাম, বারোমাসি কাঁঠাল, চায়না-৩ লিচু, আপেল, ডালিম, তাল, লেবু, কলা, জামরুল, শরিফা, পেয়ারা, আতা, ডালিম, কামরাঙা, জলপাই, নারিকেল, মালবেরি, লেবু, পেঁপে, কদবেল, কালফল, বেল, বিলম্বি, কাজু বাদাম, পেস্তা বাদাম, মোসম্বি, ছাগলনাদা, তিতি জাম, লুকলুকি, তীনফল, কালো আঙ্গুর, আপেল, নাসপাতি, এগফ্রুড, দুরিয়ান, এভোগ্যাডো, ম্যাংগো স্টিন, কফি, মিরাক্কেল, জাপাটিকাবা, থাই বাতাবিলেবু, চায়না কমলা, থাই পেয়ারা, লকেট, সুদানী সরিফা, আলু বোখারা, প্লামফল, পামওয়েল, বিলেতি গাব, সাকরা, ব্রুনাই কিং আম (কেজিয়াম), আমলকী, চালতা, কাঠলিচু, গাব, পিচফল, জামানফল, চেরিফল, হেমফল, কাইফল, মিষ্টিগাব, প্লামফল, ছবেদা, অরবরই, আলো বোখড়া, আনারসসহ ৭৮ প্রজাতির মিশ্র ফল এবং মশলা জাতীয় কালো এলাচ, তেজপাতা, পোলাওপাতা। ঔষধি গাছ- কালোমেঘ, তুলসি, শতমুলি, ধুতুরা, গ্যাস্টিক গাছ চাষ করে কৃষি সেক্টরে আমূল পরিবর্তন এনে এ দেশের কৃষকের মনে আশা জাগিয়েছেন। তার এই কর্মযজ্ঞ দেখে অনেক কৃষক বাগান করার জন্য আগ্রহ পোষণ করেছেন। শামছুল আলম কৃষি বিষয়ক শিক্ষক হওয়ার কারণে তার নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অধিকতর শিক্ষার পাশাপাশি কৃষি বিষয়ের উপরে হাতে-কলমে শিক্ষা দেয়ার জন্য শখের বসে ফলের বাগান করেন। এ বাগান করার সুবাদেই মনে প্রবল আগ্রহ দেখা দেয় বাণিজ্যিকভাবে কেমিক্যাল মুক্ত ফল চাষ করার।
পরবর্তীতে উপজেলা ও জেলা কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে ৭ একর জায়গায় ওপর ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গড়ে তোলেন দেশি-বিদেশি ৭৮ প্রজাতির ফলদ বৃক্ষের বিশাল বাগান। এ ছাড়াও বাড়ির আঙ্গিনায়ও রয়েছে নানা প্রজাতির ফলের গাছ। বর্তমানে প্রায় সব গাছেই ফল আসা শুরু হয়েছে। এ বছর তিনি বাণিজ্যিকভাবেও ব্যাপক সফলতা পেয়েছেন। বাজারে তার ফলের ব্যাপক চাহিদা। সরকারি ভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা পেলে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেমিক্যাল মুক্ত ফল চাষের ব্যাপক বিস্তার ঘটাতে পারবেন বলে মনে করেন স্কুল শিক্ষক শামছুল আলম। তার বাগানের ৭ একর জমিতে ৩২ প্রজাতির বেদেশি ও ৪৬ প্রজাতির ফলদ বৃক্ষ রয়েছে। সরজমিনে দেখা ও কথা হয় শামছুল আলমের সঙ্গে। তিনি বাগান ঘুরে প্রতিটি প্রজাতির ফলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ও খোলামেলা কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি সিলেট শহরের মোহাম্মদ মকন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ছিলাম কিন্তু আমার এই বাগান আমাকে দূরে থাকতে দেয়নি। সব সময় মনটা পড়ে থাকতো বাগানের প্রতি। পরে অনেক চেষ্টা করে বদলি হয়ে ঘাটাইলে আসি। এখানে এসেই পুরোদমে বাগানের পরিচর্যায় মনোনিবেশ করি। বর্তমানে আমি সফলতার মুখ দেখছি। প্রতিদিন অনেক লোকজন আমার বাগান দেখতে আসেন এবং এমন বাগান করার জন্য উৎসাহিত হয়ে চারা নিয়ে বাগান তৈরি করছেন। আমি তাদের বিভিন্নভাবে সাহায্য, সহযোগিতা ও নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছি। এবং বেশ কয়েকটি বাগান পরিদর্শন করেছি। তিনি বলেন বর্তমানে কৃষকদের খুব দুরবস্থা চলছে। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যে পাচ্ছে না। ধানের দাম পাঁচশত টাকা মণ। বর্তমানে কৃষকদের পলিছি চেঞ্জ করা উচিত। এ ছাড়াও আমি চাই আমার দেশের মানুষ ভেজালমুক্ত বিষমুক্ত কেমিক্যালমুক্ত ফলমূল ও শাক-সবজি পাক যাতে বিদেশি ফলমূলের ওপর নির্ভরশীল না হতে হয়। আমার মূল উদ্দেশ্য ও আন্দোলনই হচ্ছে ভেজালমুক্ত কেমিক্যালমুক্ত ফল চাষ করা। এছাড়া তিনি কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এ ব্যাপারে ঘাটাইল উপজেলা কৃষি অফিসার মোহাম্মদ আবদুল মতিন বিশ্বাস বলেন, শামছুল আলমকে আমরা বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে সাহায্য, সহযোগিতা-পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ প্রদান করেছি। যার কারণে সে উৎসাহিত হয়ে কেমিক্যালমুক্ত ৭৮ প্রজাতির ফল চাষাবাদ করে যাচ্ছে। এবং বিভিন্ন প্রযুক্তির সহযোগিতা নিয়ে তিনি আজ সফল হয়েছেন।

হাজার কোটি টাকার ফ্লাইওভার অন্ধকারে: বাতি লাগাতে ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প by শুভ্র দেব

হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভার। উদ্বোধনের দুই বছরও হয়নি। এর মধ্যেই পুরো ফ্লাইওভারটি রাতের বেলা আলোহীন। কোনো সড়ক বাতি না থাকায় অন্ধকারেই ঝুঁকি নিয়ে চলে যানবাহন। একই সঙ্গে ঝুঁকি বেড়েছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের। সম্প্রতি এ ফ্লাইওভারের উপর গলা কেটে এক মোটরবাইক চালককে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। উদ্বোধনের পর ফ্লাইওভারটি সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়া হয়। এরপর থেকে ফ্লাইওভারের উপরে থাকা বাতি, তার চুরি হতে থাকে।
এখন পুরো ফ্লাইওভারের কোথাও বাতি জ্বলে না। এ অবস্থায় নতুন করে বাতি লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪৮ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প প্রস্তাব করেছিল সিটি করপোরেশন। এ প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে শুধু বাতি লাগাতে এতো পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেয়া যাবে না। এরপর নতুন করে সিটি করপোরেশন ৩০ কোটি টাকার আরেকটি প্রস্তাব জমা দিয়েছে। নির্মাণ তদারকি প্রতিষ্ঠান স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, কিছু বাতি চুরি ও নষ্ট অবস্থায় ফ্লাইওভারের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব এখন তাদের। আর সিটি করপোরেশন বলছে, দায়িত্ব গ্রহণের সময় কোনো বাতি ছিল না। তাই বাতি সংযোজন, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ প্রায় অর্ধশত কোটি টাকার একটি বাজেট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে আপাতত বাতি লাগানোর কাজ করার জন্য। সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ পরে হবে। তাই ফের ৩০ কোটি টাকার একটি সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেয়া হয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন হলেই বাতি লাগানো ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু হবে। মালিবাগ-মৌচাক-মগবাজার ফ্লাইওভারের প্রকল্প পরিচালক সুশান্ত কুমার পাল মানবজমিনকে বলেন, হস্তান্তরের সময় বেশিরভাগ বাতিই জ্বলতো। এটা ঠিক কিছু বাতি চুরি হয়ে গিয়েছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বলে আবার লাগানো হয়েছিল। কিন্তু বারবার চুরির দায়ভারতো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বহন করবে না। হস্তান্তরের আগে চার বার তার চুরি হয়েছে। তাই বলা হয়েছিল সিটি করপোরেশনই সেটা রক্ষণাবেক্ষণ করুক। এখন দায়দায়িত্ব সবই সিটি করপোরেশনের। কারণ আমরা তাদের বুঝিয়ে দিয়েছি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার দিন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেছেন, হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় স্বাক্ষর করার সময় বাতি ছিল না। বাতি ছাড়াই আমরা বুঝে নিয়েছিলাম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বাতি লাগিয়ে ছিল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাতি ও ইলেকট্রিকের তার চুরি হয়ে গেছে। গ্রহণের সময় মন্ত্রীকে এ বিষয়ে অবগত করেছিলাম। আমরা একটা বাজেটও মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। অর্থপ্রাপ্তি সাপেক্ষে সেটা আমরা করে দিব। এদিকে সিটি করপোরেশন সূত্র বলছে, প্রথমে ফ্লাইওভারে বাতি সংযোজন, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকার একটি বাজেট স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে জমা দেয়া হয়েছিলো। এর মধ্যে এলইডি বাতি ও আনুষঙ্গিক ফিটিংয়ের জন্য ২৭ কোটি ১৫ লাখ ১৭ হাজার, ফ্লাইওভারসহ নিচের রাস্তা, মিডিয়ান ও ফুটপাথ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৫ কোটি ৮৭ লাখ ৪২ হাজার, ওয়াটার স্প্রিংকলিং ভেহিকলের জন্য ৩ কোটি ৬০ লাখ, একটি জিপ গাড়ি কেনার জন্য ৯০ লাখ, তিনটি মোটরসাইকেল ক্রয় বাবদ ৯ লাখ, দুটি হাইড্রলিক লেডারের জন্য ২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ও ট্রাফিক সিগন্যাল, সাইন মার্ক, সিসি ক্যামেরা মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এই বাজেট জমা দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু মন্ত্রণালয় সেটি গ্রহণ করেনি। আপাতত বাতি লাগানোর কথা বলা হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। পরে সিটি করপোরেশন থেকে শুধুমাত্র এলইডি বাতি, ফিটিংস ও আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ৩০ কোটি টাকার সংশোধিত বাজেট জমা দেয়া হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্র বলছে, সব কিছুই চুরি হয়ে গেছে। এখন নতুন করে আবার সবকিছু কিনতে হবে। সব মিলিয়ে বড় বাজেট লাগছে। বাজেট না আসলে কাজ শুরু করা যাবে না।
সরজমিন ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা গেছে, ল্যাম্পপোস্ট ছাড়া আর কিছুই নাই। কোথাও কোথাও ২/১ টি বাতি থাকলেও নেই বিদ্যুৎ সংযোগ। চুরি হয়ে গেছে তার, বক্স। অন্ধকার ফ্লাইওভারে জমে উঠে অপরাধীদের আনাগোনা। রাত গভীর হলেই ছিনতাইকারী, মাদকসেবী, পেশাদার সন্ত্রাসীরা ফ্লাইওভারের ওপরে আড্ডা জমায়। সুযোগ পেলেই তারা মোটরসাইকেল আরোহীদের কাছ থেকে লুটে নেয় সবকিছু। আর গভীর রাতে পায়ে হাঁটা মানুষের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনা অহরহ। এসব ঘটনার পর থেকে রাতের বেলা ফ্লাইওভার দিয়ে চলাচলকারীরা আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। ২৬ শে আগস্ট পাঠাও চালক মিলনকে গলাকেটে হত্যা করে তার মোটরসাইকেল ও মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিল পেশাদার ছিনতাইকারী নুর উদ্দিন।
মঙ্গলবার রাতে হলি ফ্যামেলি-সাতরাস্তা ফ্লাইওভারে প্রাইভেট কার চালক হেমায়েত উল্লাহ বলেন, আলো না থাকাতে বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির আলো চোখে এসে পড়ে। এতে করে সামনের দিকে কিছু দেখা যায় না। এতে দুর্ঘটনা ঘটনার সম্ভাবনা বেশি। ওয়ারলেস মোড় থেকে ইস্কাটন পর্যন্ত ফ্লাওভারে সিএনজি চালক আলম হোসেন বলেন, গাড়ির হেড লাইট নষ্ট থাকলে চলাচল করা কঠিন। কারণ ওপরে পুরোপুরি অন্ধকার। শুধুমাত্র হেডলাইটের ওপরে ভরসা করে চলতে হয়। একই ফ্লাইওভারে মোটরসাইকেল চালক জুবায়ের হোসেন বলেন, মগবাজার চৌরাস্তার ওপরে প্রায়ই বখাটে ছেলেরা আড্ডা মারে। মাঝে মধ্যেই ছিনতাই হয়। শান্তিনগর-আবুল হোটেল ফ্লাইওভার অংশে আরেক মোটরসাইকেল আরোহী সীমান্ত আদিব বলেন, এই ফ্লাইওভারের ওপরে রাতের বেলা আমার এক বন্ধু ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছিল । রাত আনুমানিক ১২টার দিকে সে রামপুরা থেকে কাকরাইলের বাসায় যাচ্ছিলো। আবুল হোটেল থেকে ফ্লাইওভারে উঠে ফরচুন মার্কেটের অংশে আসার পর তাকে দু’যুবক পথরোধ করে তার কাছে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ও টাকা নিয়ে যায়। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) শেখ নাজমুল আলম মানবজমিনকে বলেন, এত বড় একটা ফ্লাইওভার অথচ কোন বাতি নাই। রাতের বেলা অন্ধকার হয়ে থাকে। এভাবে অন্ধকারে থাকলে রাতের বেলা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটতে পারে। যদিও বাতি লাগানোর বিষয়টা পুলিশের না। আমরা সিটি করপোরেশনকে বাতি লাগানোর কথা বলেছি। তাই খুব দ্রুত বাতি লাগাতে পারলে ভাল হবে। কারণ অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য ফ্লাইওভারের বিভিন্ন অংশে সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে। আলো না থাকাতে রাতের বেলা সিসি ক্যামেরা কাজ করে না।

ভারতে স্কুলেও জাতপাত

একদিকে চাঁদে পা রাখছে ভারত। অন্যদিকে জাতের পার্থক্য বোঝাতে, আলাদা আলাদা রঙের রিস্ট ব্যান্ড পরছে ছোট ছোট শিশুরা।

আর এই প্রথাকে সমর্থন জানাচ্ছেন খোদ শিক্ষামন্ত্রী। এমনটাই ঘটে চলেছে দেশটির তামিলনাড়ু রাজ্যে। সমর্থন জানিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী কেএ সেঙ্গোত্তাইয়ান। উঁচু জাত নাকি নীচু জাত চালু হয় অনেক স্কুলে। দায় এড়িয়ে গিয়ে ঘটনাটিকে এখন ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলছে রাজ্য সরকার। প্রথার কথা জানাজানি হতেই ভারতে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

তামিলনাড়ু শিক্ষা দফতরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলেন, যে স্কুলগুলোতে এ ঘটনা ঘটেছে তাদের খুঁজে বের করা হবে। জাত বৈষম্যের কালো বিষ সমাজে ছড়ানোর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সেই অনুযায়ী কাজ এগোচ্ছিল। কিন্তু তাদের এ উদ্যোগে রীতিমতো জল ঢেলে দিলেন ক্ষমতাসীন এআইএডিএমকে দলের শিক্ষামন্ত্রী। শিক্ষা দফতরের পাশে থেকে এ ঘটনার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো এই প্রথাকেই সমর্থন জানান তিনি।

ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যেমন চলছিল, তেমনই চলবে। কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। আমাকে না জানিয়েই এই প্রথা বন্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু আমি বিষয়টি জানতে পেরে পদক্ষেপ নিয়েছি।

ছাত্রছাত্রীরা যেমন রঙিন রিস্ট ব্যান্ড পরে স্কুল আসছিল; তেমনই আসবে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ২০১৮ সালের একটি সার্ভে থেকে জানা যায়; তামলিনাড়ুর কিছু স্কুলে জাত অনুযায়ী পড়ুয়াদের লাল; হলুদ, গেরুয়া কিংবা সবুজ রঙের রিস্ট ব্যান্ড পরে আসতে হচ্ছে।

এমনকি তারা উঁচু না নীচু জাতের তা বোঝাতে নির্দিষ্ট রঙের আংটি ও কপালে তিলক কাটতে হচ্ছে। আবার কয়েকটা স্কুলের পোশাকের নিচে নিজেদের জাতের নেতার ছবি দেয়া গেঞ্জি পরে আসতে হয়।

এই ‘জাতের বৈষম্য’ অঙ্গনওয়াড়ি থেকেই চালু করা হয়েছে স্কুলগুলোতে। বিশেষত দলিতদের আরও বেশি অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে।

জাতের তারতম্যের জন্য বিশেষ সুবিধাও পায় উঁচু জাতের শিশুরা। বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হলেও একটুও চিন্তিত নয় তামিলনাড়ু সরকার। কিছু সমাজকর্মী প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও অদ্ভুতভাবে চুপ রয়েছে সরকারবিরোধী সব দল।

>>>সাউথ এশিয়ান মনিটর,

এপ্রিলের সন্ত্রাসী হামলার পর পর্যটকদের ফেরাতে হিমশিম খাচ্ছে শ্রীলংকা

গত বছরের অক্টোবরে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ভ্রমণ কর্তৃপক্ষ লোনলি প্ল্যানেট ২০১৯ সালে ভ্রমণের জন্য আদর্শ যে জায়গাগুলোর তালিকা করেছিল, তাতে এক নম্বর অবস্থানে ছিল শ্রীলংকা। কিন্তু বিশ্ব সেই তালিকার কথা এখন ভুলে গেছে এবং এখন তাদের মাথায় আছে কেবল ইস্টার সানডের সন্ত্রাসী হামলার কথা, যে হামলায় ৩০০ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে ৪৭ জন হলো বিদেশী।
লোনলি প্ল্যানেটের মুখপাত্র ক্রিস জেইহার সে সময় বলেছিলেন, “২০১৯ সালে আমাদের হিসেবে ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত দেশ হলো শ্রীলংকা। নিরক্ষীয় এলাকার দেশগুলোর মধ্যে চমৎকার পর্যায়ে রয়েছে দেশটি”। তার এই অনুমান করার কোন কারণই ছিল না যে, মাত্র ছয় মাস পর আইএস স্টাইলের সন্ত্রাসী হুমকির কারণে এই পর্যটনের সম্ভাবনা সম্পূর্ণ তিরোহিত হবে। হোটেল এবং সৈকতগুলো খালি পড়ে আছে এবং সন্ত্রাসের আতঙ্ক মনে করিয়ে দিচ্ছে, এরপরও দ্বীপরাষ্ট্রটির পর্যটন শিল্প ছাইয়ের স্তুপ থেকে জেগে ওঠার চেষ্টা করছে।
২১ এপ্রিলের সন্ত্রাসী হামলায় যে বিপর্যয় ঘটে গেছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল খুঁজছে এখন শ্রীলংকা সরকার ও দেশটির পর্যটন শিল্প। সন্ত্রাসী হামলায় পাঁচতারা হোটেল ও চার্চগুলোকে টার্গেট করা হয়েছিল।
শ্রীলংকার পর্যটকদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস হলো চীন, যে দেশটি থেকে গত বছরে ২৬৫,৯৬৫ জন পর্যটক এসেছিল। ২১ এপ্রিলের হামলার পর প্রথম দেশ হিসেবে চীন তাদের ভ্রমণ নির্দেশনা শিথিল করেছে, যদিও সন্ত্রাসী হামলায় তাদের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী নিহত হয়েছে, যারা কলম্বোর কিংসবেরি হোটেলে সে সময় নাস্তা করছিল। যে পাঁচটি হোটেল সন্ত্রাসী হামলার কবলে পড়েছিল, সেগুলোর মধ্যে ওই হোটেলটি ছিল অন্যতম। শ্রীলংকা এখন চীনকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নতুন করে পদক্ষেপ নিচ্ছে, কারণ এই দেশটির দেশের বাইরে যাওয়ার মতো পর্যটক রয়েছে ১৫০ মিলিয়নেরও বেশি।
স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্ট, হোটেল ও সেবাদাতাদের নিয়ে শ্রীলংকা ট্যুরিজম প্রমোশন ব্যুরো (এসএলটিপিবি) ২০১৯ সালের বেইজিং ইন্টারন্যাশনাল ট্রাভেল এক্সপোতে (বিআইটিই) অংশ নিয়েছে। চীনের ন্যাশনাল কনভেনশান সেন্টারে বুধবার এই এক্সপো শুরু হয়ে ২০ জুন পর্যন্ত চলেছে। বৈশ্বিক পর্যটন সম্পদ ও পণ্যের প্রচার ও প্রসারের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিনিময় ও বাণিজ্য প্ল্যাটফর্ম এই বিআইটিই। এই এক্সপোতে বিভিন্ন ধরনের পর্যটন পণ্য, পর্যটন রিয়াল স্টেট এবং পর্যটন সুবিধার প্রদর্শনী ছিল। বিভিন্ন বিশেষ শহর ছাড়াও স্পোর্টস পর্যটন ও মেডিকেল পর্যটনের মতো বিশেষায়িত পর্যটনেরও প্রদর্শণী ছিল এক্সপোতে। এছাড়া সম্প্রতি ডাচ রাজধানী আমস্টারডামে সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিলাসবহুল পর্যটন নিয়ে যে প্রদর্শনী হয়েছে, সেখানেও সরব উপস্থিতি ছিল শ্রীলংকার। ইস্টার হামলার পর বহু ডাচ পর্যটক তাদের শ্রীলংকা সফর বাতিল করায় শ্রীলংকায় নেদারল্যান্ডস থেকে পর্যটক আগমণের হার ব্যাপক কমে যায়। ডাচ সরকার অবশ্য ৩১ মে তাদের ভ্রমণ সতর্কতা শিথিল করে, যেটা ২১ এপ্রিলের পর জারি করা হয়েছিল। সন্ত্রাসী হামলার সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে দেশের সবচেয়ে বিখ্যাত বিলাসবহুল হোটেলগুলোতে, যেগুলো রয়েছে কলম্বোর ঠিক কেন্দ্রস্থলে। হোটেলগুলো হলো সিনামন গ্র্যান্ড, সাংগ্রি-লা এবং কিংসবেরি।
২০১৮ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে শ্রীলংকার জিডিপির ৪.৯ শতাংশ এসেছিল পর্যটন খাত থেকে। ওই বছর ২.৩ মিলিয়ন পর্যটক শ্রীলংকা ভ্রমণ করেছিল, যারা সাথে এনেছিল ৪.৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭ সালের তুলনায় এই রাজস্বের পরিমাণ ছিল প্রায় ১২% বেশি।
উন্নত দেশগুলোর পর্যটকরা ভ্রমণে সবচেয়ে বেশি ব্যয় করে। সেই দেশগুলো তাদের ভ্রমণ নির্দেশনা শিথিল করার পর শ্রীলংকা আবার আশাবাদী হয়ে উঠেছে যে, তাদের এই শিল্প আবার দ্রুত চাঙ্গা হয়ে উঠবে এবং এই শিল্পের জন্য ইস্টারের ঘটনার আগের মতোই চলতে থাকবে।
তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পর্যটন শিল্পের বড় অংশই রয়েছে ক্ষুদ্র হোটেলগুলো এবং হাজার হাজার আবাসিক সুবিধাদাতাদের কাছে এবং পর্যটকদের আগমনের হার ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় এই ক্ষুদ্র পর্যটন ব্যবসায়ীদের উপর তার বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে, কারণ তারা মূলত তরুণ ব্যাকপ্যাকারদের উপর নির্ভর করে টিকে আছে। ক্ষুদ্র হোটেলগুলো একটা অনানুষ্ঠানিক খাত, যাদের জন্য সরকার ১.৫ বিলিয়ন রুপি জমা রেখেছে, যাতে তারা বিনা সুদে ৫ লাখ রুপি পর্যন্ত ঋণ নিতে পারে। এই ক্ষুদ্র হোটেল মালিকরা মূলত নিজেদের বাড়িতে স্বল্প ব্যয়ের পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।
এসএলটিডিএ সূত্র মতে, ২০১৮ সালের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে পর্যটকের আগমনের হার ৭০% কম হয়েছে। তবে কিছু পর্যটন বিশ্লেষক উল্লেখ করেছেন যে, ইস্টার সন্ত্রাসী হামলা ব্যায়বহুল পর্যটকদের উপর যতটা প্রভাব ফেলেছেন স্বল্প ব্যয়ী ব্যাকপ্যাকারদের উপর ততটা প্রভাব ফেলেনি।
বিস্ফোরণের আগে, লোনলি প্ল্যানেট শ্রীলংকাকে এক নম্বর পর্যটন কেন্দ্র ঘোষণা করায় সরকারের পরিকল্পনা ছিল ২০১৯ সালে পর্যটকের সংখ্যা ২.৫ মিলিয়নে নিয়ে যাওয়া, ২০১৮ সালে যে সংখ্যাটা ছিল ২.৩ মিলিয়ন। একই সাথে আয়ের পরিমাণ ৪.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
তবে, বর্তমানে পর্যটন খাতের আনুমানিক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বর্তমানে একটা বিতর্ক চলছে। অর্থমন্ত্রী মাঙ্গালা সামারাবিরা বলেছেন যে, এর পরিমাণ হবে ১.৫ বিলিয়ন ডলার কিন্তু ইকোনমিক রিফর্মস বিষয়ক মন্ত্রী ড. হার্শা ডি সিলভা বলেছেন যে, আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৫১ মিলিয়ন ডলার। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, ইস্টার সানডে হামলা শ্রীলংকার জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৪.৫% থেকে কমিয়ে ৩.৫ শতাংশে নিয়ে এসেছে।
এদিকে, পর্যটন বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, সন্ত্রাসী হামলার পর মুসলিম-বিরোধী যে দাঙ্গা শুরু হয়েছে, এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে, সেটা পর্যটন শিল্পকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। ইস্টার সানডে হামলার পর শ্রীলংকা সরকার যে জরুরি আইন জারি করেছিল, সেটাকে ৩০ জুনের পরে নিয়ে আর বর্ধিত করবে না সরকার। বিদেশী সরকারগুলো শ্রীলংকার পর্যটনের উপর যে ভ্রমণ সতর্কতা জারি রেখেছে, জরুরি অবস্থা তুলে নেয়ার পর তারা সেই সতর্কতা পুরোপুরি তুলে নিতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা এখন গলার কাঁটা: বাড়ছে অপরাধ, বহির্বিশ্বের নানামুখী রাজনীতি by জুলকার নাইন ও আইয়ুবুল ইসলাম

ক্যাম্পে নতুন নতুন ঘর বানাচ্ছেন রোহিঙ্গারা
প্রায় দুই বছরে গলার কাঁটা হয়ে গেল মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। একদিকে রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধ কর্মকা- সীমা ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে সর্বনাশা মাদকের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে ক্যাম্পগুলো। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে থাকা একেকটি ক্যাম্প হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে। ইতিমধ্যে সমূলে বিনষ্ট হয়েছে কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পাহারঘেরা নয়নাভিরাম পরিবেশ-বৈচিত্র্য। এখন নষ্ট হচ্ছে সামাজিক সম্প্রীতি। স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকদের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সহিংস আচরণই যেন সেখানে ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিপদগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের প্রতি সবার আগে হাত বাড়ানো স্থানীয়রাই এখন কোণঠাসা। গত কয়েক দিন কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বলছেন, দুই বছর আগে মানবতার জন্য নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেই সীমান্ত খুলে দিয়েছিল বাংলাদেশ সরকার। সেই দিন থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে সাধ্যের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের কোষাগার থেকে রোহিঙ্গাদের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে ৭২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বাংলাদেশে আশ্রয়ের জন্য আসা রোহিঙ্গাদের আরও ভালো থাকার সুযোগ সৃষ্টির জন্য শত শত বিদেশি সংস্থাকেও কাজ করার অবারিত স্বাধীনতা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে ‘রোহিঙ্গা কূটনীতি’ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহল শুরু করেছে নানা ধরনের খেলা। অস্থায়ী ক্যাম্প চিরস্থায়ী করার এই খেলা রোহিঙ্গাদের দিন দিন বাংলাদেশের গলার কাঁটায় পরিণত করছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রায় সব ‘এক্সিট রুট’- বলছেন কূটনীতিকরা।

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখ নিবন্ধিত রোহিঙ্গা আছে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে তারা এসে কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। তাদের ফেরত পাঠাতে ২২ আগস্ট সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু তারা যেতে না চাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি। এর আগে গত বছর ১৫ নভেম্বরও আরেক দফা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিক্ষোভ-সমাবেশের কারণে সে দফায়ও প্রত্যাবাসন ভ-ুল হয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায়ও শুধু নিজ মুখে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে দেশে ফেরা থেকে বেঁচে যাওয়া এবং সে জন্য কোনো ধরনের চাপ অনুভব না করা রোহিঙ্গারা যারপরনাই খুশি। কক্সবাজারে জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা অধ্যাপক আতাউর রহমান চৌধুরী মনে করেন, প্রত্যাবাসনের বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েও পরপর দুবারের ব্যর্থতা রোহিঙ্গাদের সহিংস স্বেচ্ছাচারী আচরণে প্রভাব রেখেছে। এ কারণেই বাজার থেকে তুলে নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকে গুলি করে হত্যার মতো রোমহর্ষক ঘটনা তারা ঘটিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
শুধু তা-ই নয়, একসময় রোহিঙ্গাদের খাবার আর আশ্রয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হওয়া কক্সবাজারের মানুষ এখন উদ্বিগ্ন ও বিরক্ত। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব ছড়াচ্ছে দাবানলের মতো। প্রত্যাবাসন স্থগিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ কক্সবাজারের সাধারণ মানুষ। তারা বলছেন, রোহিঙ্গাদের ভিড়ে এলাকার শ্রমজীবী মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। হাট-বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাচ্ছে। কক্সবাজার বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আয়াছুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা ও পরিবেশ বিপন্ন হচ্ছে। মানুষ এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। অনেকে ভুল পরিচয়ে পাসপোর্ট বানিয়ে বিদেশে চলে যাচ্ছেন।

গবেষণায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের নেতিবাচক প্রভাব : বিভিন্ন স্বীকৃত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের গবেষণা প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা সংকটের বিভিন্ন রকম বিরূপ প্রভাবের তথ্য উঠে এসেছে। ইউএনডিপির এক গবেষণায় দেখা যায়, কক্সবাজারের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জরিপে অংশ নেওয়া টেকনাফের শতভাগ এবং উখিয়ার ৮০ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তারা রোহিঙ্গাদের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। ব্র্যাকের গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় ৫ শতাংশ মানুষ বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া ঠিক হয়নি। কিন্তু চলতি বছর এপ্রিলের জরিপে তা বেড়ে ৮০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক মানুষ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াকে বড় ভুল বলছেন। ইউএনডিপি এবং পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) গবেষণায় দেখা যায়, রোহিঙ্গাদের জন্য টেকনাফ ও উখিয়ার দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৩ শতাংশ। স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাদের সময়ের ৫০ শতাংশই ব্যয় করেন রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। ফলে স্থানীয়রা সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন।

বনভূমি ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্য উজাড় : কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, উখিয়া ও টেকনাফের সবুজ পাহাড়ে রোহিঙ্গারা ঝুপড়িঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করে। তাদের এই ঘর তৈরিতে কেটে ফেলা হয়েছে পাহাড়ি ছোট-বড় অসংখ্য গাছপালা। একসময়ের সবুজ পাহাড় পরিণত হয় বৃক্ষশূন্যে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সেখানকার পরিবেশ, বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য। পাহাড়ে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এশিয়ান হাতির আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্রও। এ ছাড়া প্রতি মাসে রোহিঙ্গাদের রান্নাবান্নার কাজে ছয় হাজার ৮০০ টন জ্বালানি কাঠ প্রয়োজন। রোহিঙ্গারা এই জ¦ালানি কাঠগুলো পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে।

গত মাসের ৩ জুলাই কক্সবাজারের দক্ষিণ বন বিভাগ থেকে চট্টগ্রাম বন সংরক্ষক দফতরে পাঠানো এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে রোহিঙ্গার ঢল নামে। ওই সময় আসা এবং পুরনো ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, বালুখালী ঢালা, ময়নারঘোনা, থাইংখালী তাজনিমার খোলা, হাকিমপাড়া, জামতলি বাঘঘোনা, শফিউল্লাহ কাটা এবং টেকনাফের চাকমারকুল, উনচিপ্রাং, লেদা, মৌচনী, জাদিমুরা ও কেরানতলী এলাকাসহ বন বিভাগের গেজেটভুক্ত প্রায় ৬ হাজার ১৬০ একর বনভূমিতে বসতি স্থাপন করে। বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের এভাবে বসতি স্থাপনের কারণে টাকার হিসাবে সৃজিত এবং প্রাকৃতিক বনের ক্ষতি হয়েছে ৪৫৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। একইভাবে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৪০৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। সে হিসাবে বনজ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির পরিমাণ টাকার হিসাবে ১ হাজার ৮৬৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। দৃশ্যমান কুপ্রভাব রাস্তাঘাটে : শুধু বনভূমি বা জীববৈচিত্র্যে নয়, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গা বসতি মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কেও। ৭৯ কিলোমিটারের এই সড়কে স্থানীয়দের বহন করা গাড়ি চলছে। পাশাপাশি চলছে টেকনাফ স্থলবন্দরের পণ্যবাহী নিয়মিত পরিবহন। একই সঙ্গে এ সড়কে যাতায়াত করছে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ ও মালামাল বহনকারী শত শত ভারী যানবাহন। ক্যাম্পে কর্মরত বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার অন্তত আড়াইশ গাড়িও এ সড়কে চলাচল করে। তাই সড়কে যানজট যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে সড়ক ভেঙে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে যান চলাচলে অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
>>ছবিঃ -রোহেত রাজীব

কেন লিবিয়ায় এত অরাজকতা, নৈরাজ্য?

জীবনযাপনের মানের দিকে থেকে তেল-সমৃদ্ধ লিবিয়া একসময় আফ্রিকার শীর্ষে ছিল। স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা ছিল পুরোপুরি সরকারের দায়িত্ব। পয়সা লাগতো না।
কিন্তু যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ঐ ঐশ্বর্য নিশ্চিত করেছিল, সেটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় ২০১১ সালে যখন পশ্চিমা সমর্থিত বিদ্রোহীদের হাতে কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। তারপর থেকে লিবিয়ায় চলছে সীমাহীন নৈরাজ্য এবং অরাজকতা।
এমনকি রাজধানী ত্রিপলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এখন নতুন করে শুরু হয়েছে লড়াই। ফলে লিবিয়া পুনর্গঠনের জন্য এমাসে একটি জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে।
লিবিয়ায় কারো কি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে?
লিবিয়ায় এখন নানা মত ও পথের অসংখ্য সশস্ত্র মিলিশিয়া বাহিনী তৎপর। দেশের পূর্বে এবং পশ্চিমে রয়েছে দুটো ভিন্ন রাজনৈতিক শাসন কেন্দ্র। কিছু মিলিশিয়া দল পূর্বের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুগত, কিছু আবার সমর্থন করে পশ্চিমের অর্থাৎ ত্রিপলি নিয়ন্ত্রণকারী প্রশাসনকে ।
ত্রিপলির সরকার
রাজধানী ত্রিপলি নিয়ন্ত্রণ করছে যে সরকার সেটি জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার (জিএনএ) নামে পরিচিত। জাতিসংঘ এই সরকারকে লিবিয়ার বৈধ সরকার হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ফায়েজ সারাজ নামে একজন প্রকৌশলী এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় ঐক্যমত্যের সরকার গঠনে জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি চুক্তির চার মাস পর ২০১৬ সালের মার্চে তিনি ত্রিপলিতে আসেন।
গত তিন বছর ধরে মি সারাজ বিভিন্ন মিলিশিয়া এবং রাজনীতিকদের সমর্থন আদায়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু পুরো দেশের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এমনকি তার প্রশাসনের যে সেনাবাহিনী রয়েছে, তার ওপরও তার পূর্ণ কর্তৃত্ব নেই।
তবরুক সরকার
২০১৪ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের পর যে পার্লামেন্ট গঠিত হয় তাদের নিয়ে শুরু হয় এই সরকার। কিন্তু সেসময় যারা রাজধানী ত্রিপলি নিয়ন্ত্রণ করছিল তারা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়। ঐ এমপিরা তখন ১০০০ কিলোমিটার দূরে বন্দর শহর তবরুকে চলে যান।
২০১৫ সালে এই এমপিদের কেউ কেউ জাতিসংঘের উদ্যোগে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের চুক্তি সমর্থন করেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পার্লামেন্ট এখন পর্যন্ত ঐ সরকারকে সমর্থন দেয়নি।
এই সংসদ নতুন একটি নির্বাচনের প্রস্তাবও মানতে চাইছে না, কারণ তারা নিশ্চয়তা চাইছে যে ভবিষ্যতের যে কোনো সরকারে লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি বা এনএলএ নামের মিলিশিয়া বাহিনীর প্রধান জেনারেল খালিফা হাফতারকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দিতে হবে।
ঐ সংসদের এমপিদের অনেকেই খোলাখুলি বলেন যে জেনারেল হাফতারকেই ক্ষমতা দিতে হবে।
লিবিয়াতে এখন যার হাতে যত বেশি অস্ত্র , তার শক্তি এবং প্রভাবও তত বেশি। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন লিবিয়া এখন অস্ত্রের বাজারে পরিণত হয়েছে। গাদ্দাফি সরকারের অস্ত্রভাণ্ডার থেকে লুট হওয়া অস্ত্রে ছেয়ে গেছে লিবিয়া। আশপাশের একেকটি দেশ একেকটি মিলিশিয়া গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে, অস্ত্র যোগাচ্ছে।
এসব মিলিশিয়ারা নিজেদের সুবিধামত সময়ে সময়ে আনুগত্য পরিবর্তন করছে।
একসময় এরা সবাই কি মিত্র ছিলনা?
গাদ্দাফির বিরোধিতার প্রশ্নে এই মিলিশিয়াদের সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল। কিন্তু আর কোনো কিছুতেই তাদের মধ্যে মতের মিল ছিলনা। গাদ্দাফিকে হঠানোর লড়াইও কোনো একটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে হয়নি। একেকটি শহরে ছিল একেক মিলিশিয়া বাহিনী। তারা তাদের নিজের নিজের স্বার্থ রক্ষায় লড়াই করছিলো।
স্বার্থ ছাড়াও আদর্শগতভাবেও তারা বিভক্ত ছিল - কেউ কেউ ছিল কট্টর ইসলামপন্থী, কেউ বিচ্ছিন্নতাবাদী, কেউ ছিল রাজতন্ত্রের পক্ষে, আবার কেউ ছিল রাজনৈতিকভাবে উদারপন্থী।
এসব মিলিশিয়াদের কোনো কোনোটির কাছে আবার নেহাতই আঞ্চলিক এবং জাতি ও গোষ্ঠী-গত স্বার্থ রক্ষাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
সব মিলিয়ে জটিল এক জালে জড়িয়ে গেছে লিবিয়া।
দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনের পতন হলেও গত আট বছরে গণতন্ত্রের মুখ দেখেনি লিবিয়ার মানুষ। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে ধারণাও খুবই কম সেখানে।
২০১৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছিলেন - গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়ায় কী হবে তা ধারনা করে তার জন্য প্রস্তুতি না নিতে পারাটাই ছিল তার সরকারের 'সবচেয়ে বড় ভুল'।
লিবিয়ায় এই সঙ্কটের জন্য মি. ওবামা সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে অংশত দায়ী করেন। কে এই জেনারেল হাফতার ?
১৯৬৯ সালে সেনা অভ্যুত্থানে কর্নেল গাদ্দাফিকে সমর্থন করেছিলেন জেনারেল খালিফা হাফতার। । কিন্তু ১৯৮০র দশকে এসে তার সাথে গাদ্দাফির সম্পর্ক চটে গেলে, তিনি স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান। এরপর গাদ্দাফিকে উৎখাতের জন্য লড়াই শুরু হওয়ার পর তিনি দেশে এসে বিদ্রোহে যোগ দেন।
পরের তিন বছর ধরে তিনি বেনগাজিতে আল কায়দার সাথে সংশ্লিষ্ট কট্টর ইসলামপন্থী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়েছেন।
তবে জেনারেল হাফতারের সমালোচকরা বলেন, যারাই তার কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে তাদেরকেই তিনি নির্বিচারে 'সন্ত্রাসীর' কাতারে ফেলে দেন।
বেনগাজি দখলের পর তিনি লিবিয়ার সর্বেসর্বা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। কিন্তু বিরোধ তৈরি হয় জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির একটি শর্ত নিয়ে যাতে বলা হয়েছে কোনো সামরিক ব্যক্তিত্বকে সরকারের উঁচু পদে নিয়োগ করা যাবেনা।
তবে জাতীয় ঐক্যের ঐ চুক্তির বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না জেনারেল হাফতার। জানুয়ারিতে তার অনুগত বাহিনী দক্ষিণাঞ্চলের দুটো তেলক্ষেত্র দখল করে নেয়। বলা হয়, লিবিয়ার তেলের খনিগুলোর সিংহভাগই এখন নিয়ন্ত্রণ করছেন জেনারেল হাফতার। আন্তর্জাতিক সমর্থন কি তার রয়েছে?
অবশ্যই। মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত অনেকদিন ধরেই জেনারেল হাফতারকে সমর্থন করছে। এ মাসে ত্রিপলি দখলের অভিযান শুরুর এক সপ্তাহ আগে তিনি সৌদি আরব সফর করে এসেছেন।
এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে তিনি কয়েকবার রাশিয়ায় গেছেন। লিবিয়ার উপকূলের কাছে একটি রুশ বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজে তাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এ মাসেই ত্রিপলিতে অভিযানের নিন্দা করে নিরাপত্তা পরিষদে এক প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে রাশিয়া।
ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্র প্রথম কোনো পশ্চিমা নেতা যিনি জেনারেল হাফতারকে লিবিয়ায় শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানান। ফেব্রুয়ারিতে তার বাহিনীর সমর্থনে লিবিয়ায় বিমান হামরা চালায় ফ্রান্স।
তবে অধিকাংশ পশ্চিমা দেশ সমর্থন করছে ত্রিপলির জাতীয় ঐক্যের সরকারকে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, নতুন একটি নির্বাচনের প্রস্তাব নিয়ে জাতিসংঘ গাদামেস শহরে ১৪ই এপ্রিল থেকে তিন দিনের যে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে, তার আগে নিজের শক্তি প্রমাণের জন্য জেনারেল হাফতার ত্রিপলি দখলের এই অভিযান শুরু করেন। তিনি মনে করছেন, যত বেশি অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে থাকবে, ভবিষ্যতের মীমাংসা আলোচনায় তার তত সুবিধা হবে। তার জনপ্রিয়তা কতটা?
লিবিয়ায় তার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু- বলা মুশকিল, কিন্তু তার ত্রিপলি অভিযানের আগে লিবিয়ায় পশ্চিমাঞ্চলেও অনেকেই তার পক্ষে কথা বলতে শুরু করেন।
দুর্বল শাসন ব্যবস্থা, নিরাপত্তার অভাব এবং রাজধানীর নিয়ন্ত্রণে থাকা মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দুর্নীতির কারণে বহু মানুষ ক্ষুব্ধ। তারা আশা করছে, জেনারেলর হাফতারের মতো শক্ত কোনো নেতা এলে পরিস্থিতি হয়তো কিছুটা ভালো হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে জেনারেল হাফতার দক্ষিণের এবং পশ্চিমের বেশ কিছু মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং উপজাতীয় কিছু নেতার আনুগত্য অর্জন করতে সমর্থন হয়েছেন।
ইসলামিক স্টেট কতটা প্রভাবশালী?
গাদ্দাফির পতনের পর ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী প্রথমবারের মত লিবিয়াতে তৎপর হওয়ার সুযোগ পায়।
গাদ্দাফির জন্মস্থান সির্তের নিয়ন্ত্রণই নিয়ে নেয় আইএস।
কিন্তু ২০১৬ সালের অগাস্টে মার্কিন বিমান হামলার সহায়তায় মিসরাতা সহ মধ্যাঞ্চলের কিছু মিলিশিয়া গোষ্ঠী সির্ত থেকে আইএসকে উৎখাত করে।
আই এস, যাদের মধ্যে বিদেশী বেশ কিছু যোদ্ধা রয়েছে, এখন আর লিবিয়ার কোনো শহর নিয়ন্ত্রণ করেনা। তবে মরুভূমির প্রত্যন্ত কিছু এলাকায় এখনও তারা গোপনে ঘাঁটি গেড়ে রয়েছে।
লিবিয়ায় আইএস এখন ক্ষয়িষ্ণু একটি শক্তি, তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ত্রিপলিতে বেশ কিছু চোরাগোপ্তা হামলার পেছনের তাদের হাত ছিল। প্রধান প্রধান মিলিশিয়া গোষ্ঠী
জেনারেল হাফতারের স্বঘোষিত লিবিয়া ন্যাশনাল আর্মি (এনএলএ) বর্তমানে লিবিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর মিলিশিয়া গোষ্ঠী। লিবিয়ার সাবেক সেনাবাহিনীর বেশ কিছু ইউনিট রয়েছে এই বাহিনীতে। তবরুক-ভিত্তিক সরকার এনএলএ-কে সমর্থন করে। এই বাহিনীর প্রধান ঘাঁটি পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজিতে। দক্ষিণের বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং রক্ষণশীল সালাফি মিলিশিয়াদের সমর্থন পাচ্ছে তারা।
ত্রিপলি নিয়ন্ত্রণকারী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সহাবস্থান এবং সহযোগিতার সম্পর্ক থাকলেও বিভিন্ন সময়ে তাদের মধ্যে অর্ন্তকলহ তীব্র লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে।
জাতিসংঘ সবসময় এই অর্ন্তকলহ দূর করতে মধ্যস্থতা করে।
ত্রিপলিতে তৎপর মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়টির নাম ত্রিপলি প্রটেকশন ফোর্স। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এটি আত্মপ্রকাশ করে। প্রধানত চারটি মিলিশিয়া গোষ্ঠী মিলে এটি তৈরি হয়েছে : ত্রিপলি রেভল্যুশনারি, আবু সালিম সেন্ট্রাল সিকিউরিটি ফোর্সেস, নাওয়াসি ব্যাটালিয়ন এবং স্পেশাল ডেটারেন্স ফোর্সেস।
ত্রিপলি-ভিত্তিক সব গোষ্ঠীই সেখানকার বর্তমান সরকারকে সমর্থন করেনা। তাদের একটি সালাহ আল-বুরকি ব্রিগেড। তবে তারা জেনারেল হাফতারের ঘোরতর বিরোধী।
মিসরাতা কেন্দ্রিক ৩১০তম ব্রিগেড- যারা কর্নেল গাদ্দাফি এবং পরবর্তীতে আইএসকে উৎখাতের লড়াইতে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছিল- তারা জেনারেল হাফতারের এলএনএ-কে ঠেকানোর জন্য ত্রিপলিতে যোদ্ধা পাঠিয়েছে।
ত্রিপলির আশপাশের শহরগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই ভিন্ন ভিন্ন মিলিশিয়া দল রয়েছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিধর হচ্ছে তারহুনা সেভেনথ ব্রিগেড। তারাই এলএনএ-র হাতে ত্রিপলির পতন ঠেকাতে মুখ্য ভূমিকা রাখছে, এলএনএ বিরোধী মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমন্বয় করছে। জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে কীভাবে?
নতুন করে শুরু হওয়া লড়াইতে লিবিয়ায় তেলের উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
লিবিয়াতে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা আয়ত্তে এসেছে। কালোবাজারি অনেকটা বাগে এসেছে।
তবে হাসপাতালগুলোতে ওষুধপত্রের অভাব প্রকট। মানুষ সর্বক্ষণ নিরাপত্তা-হীনতায় ভোগে। বিশেষ করে মেয়েরা বাইরে যেতে ভয় পায়। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা অহরহ ঘটে।
এক অঞ্চলের মানুষের পক্ষে অন্য অঞ্চলে যাওয়া খুবই বিপজ্জনক। ফলে, জাতিসংঘের হিসাবে এখনও লিবিয়ায় কমপক্ষে ১৭০,০০০ মানুষকে নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র বসবাস করতে হচ্ছে।
বর্তমানে ত্রিপলিতে যে লড়াই শুরু হয়েছে তাতে এখন পর্যন্ত কম-বেশি তিন হাজার লোক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে।
সূত্রঃ বিবিসি