Thursday, August 20, 2026

মার্কিন মহড়ার সময় ১০ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ উত্তর কোরিয়ার

যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া শেষ হওয়ার ঠিক আগে সমুদ্রের দিকে ১০টির বেশি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে উত্তর কোরিয়া। বৃহস্পতিবার দেশটির রাজধানী পিয়ংইয়ং এলাকা থেকে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের বরাত দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়ার এই উৎক্ষেপণের নিন্দা জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সামরিক মহড়ার মধ্যে দেশটির সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পিয়ংইয়ং এলাকা থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোরীয় উপদ্বীপের পূর্বদিকে সাগরের দিকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে।

উৎক্ষেপণের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি নিরাপত্তা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়, উত্তর কোরিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের গুরুতর লঙ্ঘন। পিয়ংইয়ংকে অবিলম্বে এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আন গিউ-ব্যাক আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছেন, উৎক্ষেপণ করা অস্ত্রগুলো ৬০০ মিলিমিটার মাল্টিপল রকেট লঞ্চার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি এসব অস্ত্র মোতায়েন করা হতে পারে, এমন আশঙ্কায় সিউল এগুলোর ওপর নজর রাখছে।

উত্তর কোরিয়া ৬০০ মিলিমিটার এই অস্ত্র ব্যবস্থাকে কৌশলগত পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনে সক্ষম বলে দাবি করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে এটি কেএন২৫ নামে পরিচিত।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, উত্তর কোরিয়ার কাছে আনুমানিক ৮০ থেকে ১২০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার চলমান যৌথ সামরিক মহড়া শুক্রবার শেষ হওয়ার কথা ছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে এটি নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ করা হচ্ছে। ট্রাম্প একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরায় শুরু করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

ট্রাম্প সোমবার জানিয়েছিলেন, মার্কিন অংশগ্রহণ কমানোর সিদ্ধান্তের পর তিনি কিম জং উনের কাছ থেকে একটি জবাব পেয়েছেন। তবে কিমের বোন ও উত্তর কোরিয়ার প্রভাবশালী কর্মকর্তা কিম ইয়ো জং বুধবার বলেন, দুই দেশের নেতার মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো যোগাযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রুতাপূর্ণ নীতিতে’ কোনো পরিবর্তন আসেনি।

সূত্র: রয়টার্স 

যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার মহড়ার পুরোনো দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র-দক্ষিণ কোরিয়ার মহড়ার পুরোনো দৃশ্য। ছবি: রয়টার্স

ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাতের ছক ইরানের

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে এবার সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানি অবকাঠামোয় সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখেন, তবে জবাবে ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোয় সরাসরি হামলার পরিকল্পনা করেছে তেহরান।

যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। একই সময়ে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, মার্কিন বাহিনীকে স্থান বা সামরিক সুবিধা দিলে সেসব দেশকে ওয়াশিংটনের যুদ্ধসঙ্গী বিবেচনা করে পাল্টা আঘাত হানা হবে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে আঘাত হানার নীতিগত সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখছে তেহরান। বিশেষ করে বুলগেরিয়ার বেজমের বিমান ঘাঁটি (যা মার্কিন ড্রোন ও রিফুয়েলিংয়ে ব্যবহৃত হয়) এবং সাইপ্রাসের সামরিক স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তেহরানের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ইউরোপের বোঝা উচিত তাদের ভূখণ্ডেও ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে পারে। আমাদের জাতীয় অবকাঠামো ধ্বংস করা হলে এই যুদ্ধ আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এছাড়া সংঘাত চরম আকার ধারণ করলে হরমুজ প্রণালির তলদেশের মূল সাবসি ফাইবার-অপটিক কেবল কেটে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তাদের।

সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) দাবি করেছে, তাদের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইরান। যদিও এতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, তবে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে ইরানের সঙ্গে যাবতীয় বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে দেশটি। যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই অভিযোগকে মিথ্যা ও উসকানিমূলক বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

অন্যদিকে জেনারেল আলী আবদুল্লাহি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, স্বাগতিক দেশের অনুমতি ছাড়া মার্কিন বিমান বা রিফুয়েলিং ট্যাংকার ঘাঁটিতে অবস্থান নেওয়া অসম্ভব। সুতরাং আক্রামণকারী মার্কিন বাহিনীকে যে কোনো সহায়তা প্রদান করা সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল।

দীর্ঘায়িত এই যুদ্ধ নিয়ে তেহরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি অন্ধ আবেগে চালিত হয়ে বিশ্ব পরাশক্তির সঙ্গে যুদ্ধ চালানোর পরিণাম নিয়ে সতর্ক করেছেন। বিপরীতে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপ ছাড়া এক নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ডাক দিয়েছেন।

এরই মাঝে নেটদুনিয়ায় ট্রাম্প ও তেহরানের মধ্যে এক অদ্ভুত মানচিত্র যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অঞ্চল দাবি করলে জবাবে ইরান মার্কিন অঙ্গরাজ্য ক্যালিফোর্নিয়াকে (যেখানে তেহরানজেলেস খ্যাত বিপুলসংখ্যক ইরানি থাকেন) নীল রঙে চিহ্নিত করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের নতুন ভূখণ্ড ঘোষণা করে ব্যঙ্গাত্মক বার্তা দিয়েছে। ৬০ দিনের শান্তি চুক্তি ব্যর্থ হওয়ায় এই পরিস্থিতি এখন এক সর্বাত্মক বৈশ্বিক যুদ্ধের রূপ নিচ্ছে।

ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাতের ছক ইরানের
ইউরোপের মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাতের ছক ইরানের

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি কমানোর সিদ্ধান্তে নিয়ে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। এ ক্ষেত্রে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কিছু মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরানি বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধ শেষে ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি কীভাবে রাখা হবে, তা মূল্যায়ন করছে পেন্টাগনের নীতি বিভাগ। একই সঙ্গে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ও জয়েন্ট স্টাফ।

পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পর্যালোচনার নির্দেশ দেননি। তবে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হবে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধকে ঘিরে দেশে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। এমনকি তার নিজের কিছু সমর্থকও প্রশ্ন তুলেছেন, কারণ নির্বাচনি প্রচারে ট্রাম্প ‘আর কোনো বিদেশি যুদ্ধ নয়’- এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

গত মাসে হেগসেথ জানিয়েছিলেন, ইরান সংঘাতে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় বেশ কয়েকটি মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক ডজন উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের (সিএফআর) তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এগুলো ইরাক, সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে অবস্থিত। এর মধ্যে আটটি স্থায়ী ঘাঁটি। সেন্টকমের হিসাবে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পেন্টাগনের প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে বেশি হতে পারে। এতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহকারী উড়োজাহাজে কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা হয়।

ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর। এই নৌবহর পারস্য উপসাগর, লোহিত সাগর, আরব সাগর এবং ভারত মহাসাগরের কিছু অংশে দায়িত্ব পালন করে।

কাতারে অবস্থিত ২৪ হেক্টরের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। ২০২৫ সালের সংঘাতের সময় এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও ঘাঁটিটি ইরানের হামলার লক্ষ্য হয়েছে। জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মার্কিন স্থাপনাগুলোও হামলার শিকার হয়েছে।

সংঘাতের ধরন অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনার সংখ্যা গত কয়েক দশকে ওঠানামা করেছে। সিএফআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় সামরিক অভিযানের সময় সেখানে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার সেনা মোতায়েন ছিল। ২০১১ সালে আফগানিস্তানেও ছিল প্রায় ১ লাখ মার্কিন সেনা।

এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি আরও বাড়িয়েছিল ওয়াশিংটন। ওই সময় বিপুলসংখ্যক যুদ্ধবিমান ও বিমানবাহী রণতরী ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়।

তবে যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর দীর্ঘ সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে দায়িত্ব পালন করা মার্কিন নৌসেনাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনসহ বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজে মোতায়েন থাকা সেনারা তাদের পরিবারের কাছে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব পালনের কারণে সৃষ্ট নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন।

সূত্র : দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট 

কাতারের আল-উদেদ বিমান ঘাঁটিতে সেনা পরিদর্শনে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি
কাতারের আল-উদেদ বিমান ঘাঁটিতে সেনা পরিদর্শনে ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

ঘুমন্ত ফিলিস্তিনিদের পুড়িয়ে মারতে বাড়িতে আগুন দিচ্ছে ইসরাইলিরা

অধিকৃত পশ্চিম তীরের দক্ষিণ হেবরন এলাকায় এক ফিলিস্তিনি পরিবারের বাড়িতে আগুন দিয়েছে সশস্ত্র ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা। হামলার সময় পরিবারের সদস্যরা ঘুমিয়ে ছিলেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সংবাদমাধ্যম।

বাড়ির মালিক মোহাম্মদ আল-নাওয়াজা ফিলিস্তিনের বার্তা সংস্থা ওয়াফাকে বলেন, ভোররাতে পাঁচজন সশস্ত্র ও মুখোশধারী বসতি স্থাপনকারী তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তাদের একজন জানালার কাচ ভেঙে ঘরের ভেতরে দাহ্য পদার্থ ছুড়ে দেয়। এতে বাড়িতে আগুন ধরে যায়।

ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কাছের অবৈধ ইসরাইলি বসতি ওতনিয়েল থেকে আসা বসতি স্থাপনকারীরা এ হামলায় জড়িত থাকতে পারে।

পশ্চিম তীরের দক্ষিণ নাবলুসের কুসরা গ্রামে ফিলিস্তিনিদের কয়েকটি বাড়ি ঘিরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের অবরোধ ১২তম দিনে গড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে।

এখনো তিনটি বাড়ি অবরুদ্ধ রয়েছে। এসব বাড়ির বাসিন্দারা বাইরে যেতে বা ভেতরে প্রবেশ করতে পারছেন না। একটি বাড়িকে ইসরাইলি সেনারা সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে বলেও অভিযোগ করেন গ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল আজিম ওয়াদি।

তিনি আরও জানান, অবরুদ্ধ পরিবারগুলো খাদ্য ও ওষুধের সংকটে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধে তাদের মানবিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা।

ঘুমন্ত ফিলিস্তিনিদের পুড়িয়ে মারতে বাড়িতে আগুন দিচ্ছে ইসরাইলিরা

বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার by শিশির মোড়ল

মাথাভর্তি চুল। মুখে কথা লেগে আছে। সারাক্ষণ কিছু না কিছু বলছে। বাবাকেও প্রশ্ন করে চলেছে। গান গাইছে একটার পর একটা। বাবার কোলে থাকা শিশুটি সবই করছে ঠিকঠাক। মনে প্রশ্ন জাগে, ও পারে না কী?

পারে না শুধু দাঁড়াতে, হাঁটতে। সোজা হয়ে বসতে পারে না। বসলে মাথা ঢলে পড়ে। এই বয়সী শিশুর পেশিতে যে শক্তি থাকা দরকার, তা ওর নেই। শিশুটি বংশগত রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগটির নাম স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (এসএমএ)।

শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির একমাত্র সন্তান এই শিশু। নাম অলিভিয়া সঞ্চারী নবনী, বয়স চার বছর দুই মাস। রাজধানীর মগবাজারে তাঁদের বাসা। সন্তানের এসএমএ আছে জানার মুহূর্ত থেকে এই দম্পতির কাছে দুনিয়ার সবকিছু যেন ধূসর হয়ে গেছে। তাঁদের মেয়ে বিরল রোগে ভুগছে। এমন রোগ কম দেখা যায়। এসএমএ একটি বিরল রোগ।

২৩ আগস্ট ওই দম্পতির বাসায় তাঁদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাসা ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কথা হয় শিশুটির সঙ্গে। শিশুর মা শাহিন আক্তার বলেন, ২০২১ সালের ২০ জুন নবনীর জন্ম। ঠিক সময়ে জন্ম হয়েছিল, জন্মের সময় ওজন ৩ কিলোগ্রামের বেশি ছিল। হাত–পা নড়াচড়াতেও সমস্যা ছিল না। জন্মের ২৫–২৬ দিন পর প্রথম চোখে পড়ল, মেয়ের পা দুটোর নড়াচড়া কমে গেছে। স্বামী–স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে শিশু স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিজানুর রহমানের শরণাপন্ন হন। ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন, যে পরীক্ষার ব্যবস্থা দেশে ছিল না।

শিশুর বাবা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘তখন করোনা শেষ হয়নি, বিদেশ যাতায়াত কঠিন ছিল। আমরা অক্টোবরে (২০২১) ভারতের চেন্নাই গিয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে মেয়েকে দেখাই। চেন্নাই থেকে রক্তের নমুনা পাঠানো হয় বেঙ্গালুরুতে। নভেম্বরে আমাদের জানানো হয় মেয়ের এসএমএ।’

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে এসএমএ মানুষের জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। মা ও বাবা উভয়ই এসএমএর বাহক হলে তাঁদের সন্তানদের ২৫ শতাংশ ঝুঁকি থাকে এসএমএ রোগী হওয়ার। এসএমএ থাকলে পেশি নিয়ন্ত্রণের শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবানো ও গিলতে অসুবিধা হয়, মেরুদণ্ড বাকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। এসএমএর রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্মে একটি শিশুর এসএমএ দেখা যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসএমএ–কে আমরা বিরল রোগ বলছি। তবে দেশে আরও অনেক ধরনের বিরল রোগ আছে।’

বিরল রোগ সংক্রামক বা অসংক্রমাক হতে পারে। তবে বিরল রোগ কেন্দ্রে কেন্দ্রে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো ধরনের কাজ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরল রোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথকভাবে কোনো শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কোনো কাজ নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন সেটার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’

বিরল রোগ কী

জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে রোগের প্রাদুর্ভাব কম দেখা যায়, তা বিরল রোগ। এ বছর ফেব্রুয়ারির বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি দলিল বলছে, বিরল রোগ হচ্ছে একটি বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, যা প্রতি দুই হাজার মানুষের মধ্যে একজনে বা তার কমে দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় সাত হাজার বিরল রোগ আছে, ভুগছে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। ৭০ শতাংশ বিরল রোগ শিশু বয়সে শুরু হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগ সাধারণত জটিল, একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এতে প্রভাবিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি সহ–অসুস্থতায় (কো–মরবিডিটি) ভোগে। রোগটি দ্রুত অবনতির দিকে যায়, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে ও অকালমৃত্যুর কারণ হয়।

বিরল রোগ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। এদের নিয়ে কাজও কম। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুই লাখ মানুষের মধ্যে একজনের যে রোগটি হয়, তা বিরল রোগ। দেশটিতে প্রায় ছয় হাজার বিরল রোগ আছে। এসব রোগে আড়াই কোটি মানুষ ভুগছে।

দেশে কত বিরল রোগ

এই প্রতিবেদক গত মার্চ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল, বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও ৩০ জনের বেশি অভিভাববক ও রোগীর সঙ্গে কথা বলে দেশে বিরল রোগের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছেন। এই সময়ে এসএমএ, ডিএমডি, হিমোফিলিয়া, মোয়ামোয়া, সিফা সিনড্রোম, রেটস সিনড্রোম, প্রজেরিয়া, ট্রি ম্যান সিনড্রোম, এক্সপির মতো বিরল রোগের কথা জানা গেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

এসএমএ জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। এতে পেশির নিয়ন্ত্রণ শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবোতে ও গিলতে সমস্যা হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে ও সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্ম নিলে তাদের মধ্যে একজনের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দেশে এই রোগী আছে ২০০ থেকে ৩০০।

জিনের ত্রুটিজনিত আরেকটি রোগ ডুচেনি মাসকুলার ডিস্ট্রোফি (ডিএমডি)। এটি ছেলেদের বেশি হয়। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়। অনুমান করা হয়, দেশে ডিএমডি রোগী আছে দুই শর কাছাকাছি। ১০ হাজার জীবিত জন্মে একজনের এটি দেখা যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের চিকিৎসকেরা ‘রেটস সিনড্রোম’ নামের একটি বিরল রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন। এটিও জিনের ত্রুটিজনিত স্নায়ুর রোগ। জন্মের দেড়-দুই বছর পর্যন্ত শিশু ভালোই থাকে। তারপর থেকে শিশুর খিঁচুনি হতে দেখা যায়। শিশুর মাথা বড় হয় না। শিশু ভুলে যেতে থাকে। কত মানুষ এতে আক্রান্ত, তা জানা যায় না।

দেশের গণমাধ্যমগুলো ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদারকে নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। আবুল বাজনদারের হাত ও পায়ের আকৃতি ছিল গাছের শিকড়ের মতো। জিনের নির্দিষ্ট ত্রুটি থাকা মানুষ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগটি দেখা দেয়।

আবুল বাজনদার ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি আবার অস্ত্রোপচারের জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত তাঁর দুই হাত ও দুই পায়ে ৩০টি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে।

প্রায় একইভাবে গণমাধ্যমের দৃষ্টি পড়েছিল একজন ‘প্রজেরিয়া’ রোগীর ওপর। এতে শিশুর চেহারা প্রবীণের মতো হয়। জিনের রূপান্তরে এটা হয়। মানুষ অল্প সময়ে বুড়িয়ে যায়। হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি থাকে। এক কোটি মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি একজন দেখা যায়।

রক্তের একটি বিরল রোগ হিমোফিলিয়া। কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ হয় না। এই রোগ সাধারণত পুরুষের হয়, নারী এই রোগের বাহক। ১০ হাজার মানুষের মধ্যে এই রোগে একজনকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।

২০১৬ সালের নভেম্বরে রাজধানীর উত্তরার একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে ৮ ও ১২ বছর বয়সী দুই ভাইবোনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এরা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দুই ভাইবোন জিনের ত্রুটিজনিত জেরোডার্মা পিগমেনটোসামের (এক্সপি) রোগী। এক্সপির রোগী আলোতে থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যে চামড়া শুকিয়ে যায়। তাদের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়, শ্রবণশক্তি কমে যায়। তাদের এখনো চিকিৎসা চলছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে অন্তত ২০০ জন ‘মোয়ামোয়া’ রোগী আছে। এটি মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ। এতে মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। রোগীর সাময়িকভাবে তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের একাংশে অবশ ভাব, খিঁচুনি, কথায় অস্পষ্টতা, চোখে ঝাপসা দেখা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া—এই রোগের লক্ষণ।  

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া জানান, তিনি ময়মনসিংহের একটি পরিবারে ‘সিফা সিনড্রোম’ (কনজেনিটাল ইনসেনসিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহিড্রোসিস)–এর দুজন রোগী পেয়েছেন। ঘর্মগ্রন্থি (সোয়েট গ্লান্ড) না থাকার কারণে এদের ঘাম হয় না। এদের গরম লাগে বেশি, হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। এরা ব্যথা অনুভব করে না।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক (শিশু নিউরোলজি বিভাগ) জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘দেশে স্নায়ুর বিরল রোগ আছে অন্তত ১৫টি। অন্য কতটি বিরল রোগের অস্তিত্ব আছে, তা জানা নেই। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, খোঁজা হয়নি।’

অবিরাম কষ্টের কাহিনি

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজের প্রথম সন্তান মুনতাসিরের জন্ম হয় ২০১৪ সালে। জন্মের পাঁচ বছর পর মুনতাসিরের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, পা বেঁকে যায়, পায়ের পেশিতে ব্যথার কথা বলতে থাকে। ২০২২ সালে শনাক্ত হয় মুনতাসির ডিএমডির রোগী।

ডিএমডির রোগীর বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত–পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়, আঙুল বেঁকে যায়। আক্রান্ত শিশুর বয়স ১০–১২ হতেই নিজ থেকে আর চলাচল করতে পারে না। বাবা–মায়ের সামর্থ্য থাকলে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে পারে। মুনতাসিরের ক্ষেত্রে ঠিক এমনই হয়েছে।

১৫ এপ্রিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে মুনতাসিরের বাবা মোহাম্মদ পারভেজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘কিছুই করতে পারলাম না। আমার চোখের সামনে ছেলেটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে গেল। বয়স মাত্র ১১ বছর। কিছুই করতে পারলাম না।’ চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন শিশুরা বেশি দিন বাঁচে না।

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষ, তাদের বাবা–মা–অভিভাবসহ অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের সবাই মোহাম্মদ পারভেজের মতো অসহায়। সন্তানের গল্প বলতে গিয়ে মায়ের চোখ ভেসে যায় জলে। কারও কষ্ট চিকিৎসা করাতে না পারার। কেউ জানেন চিকিৎসা করিয়েও সন্তানকে বাঁচাতে পারবেন না। ‘আমি মারা গেলে আমার সন্তানের কী হবে’, এমন চিন্তায় দিন যায় কোনো কোনো মায়ের।

২০ মার্চ কথা হয় খুলনার লবণচরার নূরজাহান রজনী ও মেহেদি হাসান আমিরের সঙ্গে। নূরজাহান রজনী কৃষি ব্যাংকে চাকরি করেন, মেহেদি হাসান আমির এলাকায় ছোটখাটো ঠিকাদারির কাজ করেন। তাঁদের তৃতীয় সন্তান আমিরা এসএমএর রোগী। আমিরা প্রায়ই তার বাবা–মা ও দুই বোনের উদ্দেশে বলে, ‘রাগ কোরো না। আমি বসতে পারি না, আমি হাঁটতে পারি না, রাগ কোরো না।’ নূরজাহান রজনী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বুক ফেটে কান্না আসে।’

এমন সন্তান নিয়ে মা–বাবার জীবন আমূল বদলে যায়। রাজধানীর মগবাজারের শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির ক্ষেত্রে তেমনই ঘটেছে। দুজন একসময় একটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিয়মিত ওই দলের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন, অংশ নিতেন। এখন সব বন্ধ। শাহাদাৎ হোসেন চাকরির প্রয়োজনে কর্মস্থলে যান। আপনার সময় কাটে কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মা শাহিন আক্তার বলেন, ‘আমার নিজের বলে আর কোনো সময় নেই। সারাটা সময় মেয়ের সঙ্গে। মেয়ে যখন ঘুমায়, তখনই কিছুটা ছুটি।’ ঘরের বাইরে যাওয়া নেই, আত্মীয় বাড়ি যাওয়া নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। শাহিন আক্তারের দুনিয়া আটকে গেছে মেয়েতে।

এমন সন্তান দুটো থাকলে সমস্যা কি বেড়ে যায়? দুঃখ কি দ্বিগুণ হয়? ব্যবসায়ী ওমর ফারুকের দুটি ছেলেই বিরল রোগে আক্রান্ত। ২৩–২৪ আগস্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে আয়োজিত একটি ওয়ার্কশপের প্রথম দিনের একটি অধিবেশনে ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে গেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, এমন বাবা–মাও আছেন, যাঁদের তিনটি সন্তানই বিরল রোগে ভুগছে। ঘরজুড়ে একটি খাট, তার ওপর তিন সন্তানকে নিয়ে স্বামী–স্ত্রী রাত কাটাতেন। ইতিমধ্যে একটি সন্তান মারা গেছে। এখন ওই খাটেই বাবা–মা রাত কাটান বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে।

সহজে রোগ শনাক্ত হয় না

পুরান ঢাকার সুজন সাহা ও রমা সাহার একমাত্র মেয়ে স্বস্তিকা সাহা। মেয়ের বয়স যখন ৯ মাস, বাবা–মা খেয়াল করলেন, মেয়ের বসতে ও দাঁড়াতে কষ্ট হয়। সুজন সাহা বলেন, ‘প্রথম মেয়েকে মিটফোর্ড হাসপাতালে দেখাই। পরে পিজি হাসপাতালে দেখাই। তারপর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। মেয়ে দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। আট মাস আগে ভারতের চেন্নাই গেলাম। পরীক্ষায় ধরা পড়ল মেয়ের এসএমএ। আগের তিনটি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসকই রোগ ধরতে পারেননি।’ একাধিক শিশুর মা-বাবার কাছ থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন আফরিন আক্তার। তিনি এসএমএর রোগী। তিনি বলেন, প্রথমে একজন চিকিৎসক মায়োপ্যাথির চিকিৎসা দেন। পরে দেশে-বিদেশে পরীক্ষায় নিশ্চিত হন যে তার এসএমএ। আফরিন আক্তার বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় আমি ভুল চিকিৎসার মধ্যে ছিলাম।’ তিনি এখন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।

প্রায় সব বিরল রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিই, যেন রোগী স্বস্তি বোধ করে, রোগটি যেন আর না বাড়ে।’

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওলী সরকার বলেন, ‘রোগনির্ণয় সঠিক না হলে ভুল চিকিৎসা হয়। এক রোগের লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়, তখন ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো রোগের চিকিৎসাই হয়তো জানা নেই, তখন রোগটি যেন না বাড়ে, সে জন্য কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভালো রেফারেল পদ্ধতি না থাকার কারণে রোগীরা ভুল প্রতিষ্ঠান বা ভুল ব্যক্তির কাছে চলে যান, এতে সঠিক চিকিৎসা রোগীরা পান না।’

৯৫ শতাংশের চিকিৎসা নেই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগের চিকিৎসা–সম্পর্কিত ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের দাম অনেক বেশি। অনেক দেশে এসব পণ্য ও ওষুধের প্রবেশাধিকার সীমিত। এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

যেমন স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফির (এসএমএ) কথা বলা যায়। চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এ রোগের চিকিৎসার ওষুধ তিনটি। প্রথমত জিনথেরাপি। ইনজেকশনের মাধ্যমে জীবনে তা একবারই দিতে হয়। এর দাম প্রায় ২২ কোটি টাকা। আরেকটি  ইনজেকশন আছে, প্রতি দুই মাস অন্তর রোগীর মেরুদণ্ডে দিতে হয়। একটি ইনজেকশনের দাম এক কোটি টাকা। আর আছে একটি সিরাপ। এর প্রতি বোতলের দাম ১০ লাখ টাকা। একজন রোগীর মাসে এক বোতল দরকার হয়।

জিনথেরাপি বাংলাদেশে দুটি শিশুকে দেওয়া হয়েছে। মেরুদণ্ডে দেওয়া ইনজেকশন কেউ পেয়েছে বলে জানা যায়নি। একটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশের তিনটি শিশুকে বিনা মূল্যে সিরাপ দেওয়া শুরু করে। এখন শুধু মগবাজারের নবনী ওষুধটি বিনা মূল্যে পাচ্ছে।

বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে ওষুধ উদ্ভাবন করে তা সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে বিক্রি করা ওষুধ কোম্পানির জন্য লাভজনক নয়। যে দু–একটি ওষুধ তৈরি হয়, তার দাম বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওষুধ উদ্ভাবনে সমতাভিত্তিক বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রণোদনার অভাবের কারণে সারা বিশ্বের ৯৫ শতাংশ বিরল রোগের এখনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।

রাষ্ট্র কী করছে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিরল রোগ নিয়ে তাদের কোনো ধরনের কাজ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর বলেন, ‘বিরল রোগ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কাজও নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’

ব্যতিক্রমী ভূমিকা নিয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠানের শিশু নিউরো বিভাগ। এই বিভাগ বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রতি সপ্তাহে বিশেষ ক্লিনিক চালু করেছে। এ ছাড়া প্রতি মাসের মাঝামাঝি এক দিন বড় করে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করে।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে একটি বিরল রোগের (এসএমএ) চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম কেনার জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের অনুকূলে ৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫ কোটি টাকার ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি টাকা খরচ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

আত্মশক্তির সন্ধান

বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা বা পাশে দাঁড়ানোর জন্য কয়েকটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠন তথ্য সংগ্রহ করে, দেশে–বিদেশে কোথায় রোগ পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, তা জানার ও জানানোর চেষ্টা করে।

এমনই একটি সংগঠন কিওর এসএমএ বাংলাদেশ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, ‘এসএমএ রোগী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে এই সংগঠন তৈরি হয়েছে। রোগটির ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রোগনির্ণয়ে জেনেটিক পরীক্ষা দেশে চালু করার জন্য আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি। ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি যেন কম দামে ওষুধ পাওয়া যায়।’

একইভাবে ডিএমডি রোগীদের জন্য গড়ে ওঠা সংগঠনের নাম ডিএমডি কেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। হিমোফিলিয়া রোগীদেরও আছে বাংলাদেশ হিমোফিলিয়া সোসাইটি। এই ধরনের সংগঠন বিদেশে আছে।

কী করা যায়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সার্বিক ও রোগীকেন্দ্রিক পন্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যক্তির সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া, সামাজিকভাবে তাদের সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিরল রোগের জন্য পৃথক শাখা খোলার দাবি করেছেন কেউ, কেউ সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও কেউ কেউ বলেন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। রোগ শনাক্তে উপযুক্ত ল্যাবরেটরি স্থাপন করা জরুরি।’

[প্রথম আলো রোগী ও রোগীর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে তাঁদের নাম এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে।]

বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার

তুরস্কের ঘাঁটি নিয়ে ইসরায়েলের ভয়: সিরিয়ায় হামলার আগে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ করেন মোসাদপ্রধান

রয়টার্সঃ সিরিয়ায় সম্প্রতি ইসরায়েলের বিমান হামলার কয়েক দিন আগে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধানের সঙ্গে সিরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি ফোনালাপ হয়েছে। এ ফোনালাপে তাঁরা সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

মোসাদপ্রধান রোমান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানির মধ্যে ১৪ আগস্ট এ ফোনালাপ হয়। এটি সিরিয়ার ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা প্রশাসনের সঙ্গে ইসরায়েলের এযাবৎকালের সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ। ফোনালাপের ঠিক চার দিন পর সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সাধারণত মোসাদ-সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দিয়ে থাকে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মুখপাত্রও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।

সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলার পর গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, দামেস্ক প্রশাসন সিরিয়ায় তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। নেতানিয়াহুর দাবি, সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েন করা হলে তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করবে। এ বিষয়ে তারা সিরিয়াকে বারবার সতর্ক করলেও আল-শারা প্রশাসন তা আমলে নেয়নি।

দুটি সূত্র বলছে, হামলার চার দিন আগে মোসাদপ্রধান গফম্যান ও সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাইবানির মধ্যে এ ফোনালাপ হয়। এতে সিরিয়াকে দেওয়া তুরস্কের সামরিক সহায়তার বিষয় বেশি গুরুত্ব পেয়েছিল। সূত্র আরও জানায়, ফোনালাপে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো, অস্ত্র বিক্রি, ড্রোন সরবরাহসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েল নানা তথ্য জানতে চায়। সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে তুরস্ক অস্ত্র সরবরাহ করছে কি না, গফম্যান সেটিও জানতে চান।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তৃতীয় আরেকটি সূত্র ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, দুই নেতার মধ্যে সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি নিয়েই মূলত কথা হয়েছে।

এদিকে এ ফোনালাপের বিষয়ে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তুরস্ক-সিরিয়া সম্পর্ক নিয়ে নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি

সিরিয়ায় ২০২৪ সালে ‘স্বৈরশাসক’ বাশার আল-আসাদ সরকারকে হটিয়ে দেন আল-শারার নেতৃত্বে দেশটির বিদ্রোহীরা। এর পর থেকে তুরস্ক শারা প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। এর আগেও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় তুরস্ক বাশার সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়। সিরিয়ায় তুরস্কের এ ক্রমবর্ধমান প্রভাব ইসরায়েলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিরিয়ার শাসক আল-শারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। গত জুলাই মাসে তিনি জানিয়েছিলেন, সিরিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে একটি নিরাপত্তাচুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ইসরায়েল যেন সিরিয়ার প্রতি আরও ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করে, সে জন্য অন্যান্য প্রভাবশালী দেশকে যুক্ত করে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টাও চালাচ্ছে দামেস্ক।

নেতানিয়াহু গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা একটি ভিডিও বার্তায় সিরিয়াকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘ইসরায়েলের জন্য হুমকি হতে পারে, সিরিয়ায় তুরস্কের এমন কোনো সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি ইসরায়েল সহ্য করবে না।’

সাম্প্রতিক ইসরায়েলি বিমান হামলার দিকে ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘আমরা তুরস্ককে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম, এমনটা করবেন না। তারা স্পষ্টত আমাদের বার্তা শোনেনি। তাই আমরা (সিরিয়ায় বিমান হামলা চালানোর মাধ্যমে) নিশ্চিত করেছি, যেন তারা (তুরস্ক) বার্তাটি আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে।’

তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় গত বুধবার ইসরায়েলের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এগুলো ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। তুর্কি প্রশাসনের মতে, সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর চালানো ‘অবৈধ বিমান হামলা’ বৈধতা দিতেই ইসরায়েল এ ধরনের অভিযোগ তুলছে।

তুরস্কের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার জন্য তারা বৈধ উপায়ে সিরিয়া সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। তবে নিজেদের সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনার বিষয়ে তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলেনি।

তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত এবং সিরিয়া ও ইরাকবিষয়ক বিশেষ দূত টম বারাক মঙ্গলবার বলেন, ইসরায়েলের এ বিমান হামলা ‘একটি অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে এ হামলা কোনো ভূমিকা রাখবে না’।

মঙ্গলবার রয়টার্সকে দেওয়া আরেক বক্তব্যে টম বারাক বলেন, ইসরায়েল, তুরস্ক ও সিরিয়ার মধ্যে যাতে কোনো সংঘাত না বাধে, সে জন্য ওয়াশিংটন একটি সমঝোতার উপায় খোঁজার চেষ্টা করছে। তিনি আরও জানান, এ তিন দেশের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে অপেক্ষা করছেন রোমান গফম্যান। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
হোয়াইট হাউসের স্টেট ডাইনিং রুমে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আগে অপেক্ষা করছেন রোমান গফম্যান। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

মক্কা চুক্তি কেন ইসরায়েল-আমিরাত জোটকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে by ডেভিড হার্স্ট

ডেভিড হার্স্টের বিশ্লেষণঃ যদিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চমক একদম পছন্দ করে না, তবু ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ছিল আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এক বিরাট চমক।

গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার জবাবে একটি মুসলিম জোট গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা বেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তবে আড়ালে থেকে চতুর চাল চেলেছেন সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক—ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। ইরান যুদ্ধের দুপক্ষই যাতে তাঁর পদক্ষেপে সমন্বয় বা সহমর্মিতা খুঁজে পায়, তিনি সেভাবেই এগোচ্ছিলেন।

গত মাসে ওয়াশিংটনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে বাদ সাধেন। তিনি পেছনের শর্ত হিসেবে সৌদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তাগিদ দেন।

দক্ষিণ ইরাকে ইরান–সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স বা মিলিশিয়াগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় সৌদি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান। এই মিলিশিয়াগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের আইআরজিসির ‘উপদেষ্টারা’।

সৌদি গোয়েন্দারা খবর পেয়েছিল, মিলিশিয়াগুলো কুয়েতে সীমান্ত পার হয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সময়ে ইয়েমেনের সানাতেও হামলা চালায় সৌদি যুদ্ধবিমান। কারণ, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল।

মৌলিক পরিবর্তন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরানবিরোধী হামলায় যারা যোগ দিয়েছিল, সেই জোটের কাছে মনে হচ্ছিল, সৌদির শাসক অবশেষে তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়া তাঁর ভাবনায় ছিল না।

এই পুরো অঞ্চলে এখন ঘটে চলেছে মৌলিক কিছু পরিবর্তন। ইরান, গাজা ও লেবাননে ইরানের সাম্প্রতিক তিন যুদ্ধ সৌদি মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে।

পশ্চিমে শিক্ষিত সৌদি বিশ্লেষকেরা দেখছেন, কীভাবে দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের গণহত্যাকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছেন। ফলে তাঁরা আর নিজেদের পশ্চিমা শিবিরের লোক ভাবতে পারছেন না। একই সঙ্গে তাঁরা দেখছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিজের বিমানঘাঁটিগুলোই রক্ষা করতে পারছে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তৈরি হয়েছে চরম অবজ্ঞা।

সৌদি শুরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি সেসব সৌদি বুদ্ধিজীবীর অন্যতম, যাঁদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। তিনি বললেন, ‘মক্কা চুক্তি এক চরম সংকটকালে আলোর মুখ দেখেছে। ট্রাম্পের ওপর থেকে সবাই আস্থা হারিয়েছে। এই চুক্তি শুধু এই তিন দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে। এটি পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরব ও মুসলিম বিশ্বের আরও দেশ এই চুক্তিতে যোগ দেবে।’

এ সংঘাতে ট্রাম্পের দুর্বলতা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। তিনি যুদ্ধে জিততে পারছেন না, আবার কোনো সমাধানও বের করতে পারছেন না। ইরানি মধ্যস্থতাকারীরা বিষয়টি ধরে ফেলেছেন। তাঁরা হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিতে চান। কারণ, তাঁরা হিসাব করছেন, ট্রাম্প কংগ্রেসে তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। আর তাতে দুর্বল অবস্থায় তাঁকে আলোচনার টেবিলে আনা সহজ হবে।
এই নতুন চুক্তিতে প্রতিষ্ঠাতা তিন সদস্যেরই নিজস্ব সুবিধা রয়েছে।

ড. আলতুওয়াইজরির মতে, ‘এটি ভারতকে সামলাতে পাকিস্তানকে সাহায্য করবে। তুরস্কও মনে করত, তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সরাসরি হুমকির সামনে ন্যাটো যথেষ্ট নয়। প্রকাশ্যেই বলা হচ্ছিল, ইরানের পর তুরস্কের পালা। আর সৌদি আরব কেবল তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক শক্তি দিয়েই সুবিধা পাবে না, তাদের গোয়েন্দা ও যুদ্ধকৌশলগত পরিকল্পনা থেকেও লাভবান হবে।’

আড়াল থেকে প্রকাশ্যে

ইসরায়েলি কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছিলেন, তাঁরা ‘সুন্নি’ মুসলিম জোটের বিরুদ্ধে একটি জোট তৈরি করতে চায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ছিল এ পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আক্রমণ সেই জোটকে আড়াল থেকে সামনে নিয়ে আসে।
যেটা আগে গোপনে চলত, সেটা এখন একেবারে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) আব্রাহাম আকোর্ডে বেশ উৎসাহের সঙ্গেই সই করেছিলেন। যুদ্ধের আগুনে সেই চুক্তির পরীক্ষাও হয়ে গেছে।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে যখন আবুধাবি কোণঠাসা, তখন ইসরায়েল সেখানে তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে। একটি আরব দেশে সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে তাদের সবচেয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করাকে তখন নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হয়েছিল।

ইসরায়েলের স্বপ্ন ছিল, শত্রুদের একবার পিষে ফেলতে পারলে ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল জোট তৈরি হবে। আর ইসরায়েল বসবে তেল, গ্যাস, অর্থ ও প্রযুক্তির সেই সংযোগস্থলের কেন্দ্রে। এই অঞ্চলের সামরিক চাবিকাঠি থাকবে তেল আবিবের হাতে।

এ পরিকল্পনায় মিসর ও সিরিয়ার মতো প্রথাগত আরব শক্তির পতন ছিল নিশ্চিত। তারা হয় নিঃস্ব হয়ে দেউলিয়া হবে, না হয় ধর্মীয় ও জাতিগত উপদলে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আহমদ আল-শারার সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের এখনো একই পরিকল্পনা।

আমিরাত ও ইসরায়েল—উভয়ের স্বার্থই ছিল অভিন্ন। তারা ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে চেয়েছিল। এমনকি সোমালিল্যান্ডের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে ব্যবহার করে সামরিক ঘাঁটির জাল বিছিয়ে নিজেদের জলপথের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিল। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঠিক এ প্রকল্পেরই এক মারাত্মক প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বী দুই জোট

এর প্রথম প্রভাব পড়বে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার কৌশলগত বিরোধকে আরও গভীর ও তীব্র করার মাধ্যমে। গত ডিসেম্বরে ইয়েমেন থেকে আমিরাতিরা বহিষ্কৃত হওয়ার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল খালেক আবদুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘ইয়েমেন নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য আছে। সংঘাতের কারণে তা এখন শীর্ষ পর্যায়ে। সহযোগীদের মধ্যে ঝামেলা হতেই পারে, কিন্তু তারা আবার এক হয়।’

কিন্তু জানুয়ারি আসতে না আসতেই আবদুল খালেক আবদুল্লাহর সুর বদলে গেল। তিনি লিখলেন, ‘সৌদি আরব আর আমিরাতের মধ্যকার দূরত্ব কেবল ইয়েমেন সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আরও গভীর।’ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ তখন বলেছিলেন, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ‘সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর’।

এরপর আরব আমিরাত তাদের দেশে আল অ্যারাবিয়ার এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং ওপেক ত্যাগ করে।

গত মাসে অবশ্য কিছুটা সম্পর্কের উন্নতি দেখা গিয়েছিল। সৌদি রাজকীয় উপদেষ্টা তুর্কি আল শেখ একটি ছবি শেয়ার করেন। সেখানে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান এবং আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘সৌদি আরব ও আরব আমিরাত: দুই ভাইয়ের গল্প এবং এক গভীর অংশীদারত্ব’। কিন্তু এই ঐক্য বেশি দিন টিকল না।

মক্কা চুক্তি নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ হলেন আবদুল খালেক আবদুল্লাহ। তিনি প্রশ্ন তুললেন, ‘এটি যদি কোনো জোট না হয়, তবে এর নাম কী?’ এরপর তিনি বড় অক্ষরে ট্রাম্পের স্টাইলে লিখলেন, ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা এখন ভালো অবস্থায় নেই। প্রধান দেশগুলো নিজ ঘরের বাইরে গিয়ে নিরাপত্তা খুঁজছে। নতুন আঞ্চলিক অক্ষ আর সামরিক জোট তৈরির এই দৌড় জিসিসি-কে দুর্বল করে দিচ্ছে।’

জবাবে সৌদি প্রিন্স আবদুলরহমান বিন মুসাইদ লিখলেন, ‘সমস্যা কোথায়, জনাব? যেকোনো দেশের কি নিজের পছন্দমতো চুক্তি করার অধিকার নেই? এটি কি প্রতিটি দেশের সার্বভৌম বিষয় নয়? নাকি সৌদি আরবের বেলাতেই এই যুক্তি খাটবে না!’

সৌদির ড. আহমেদ আল-সানি পোস্ট করলেন, ‘পাঁচ বছর আগে কোনো আমিরাতি অ্যাকাউন্ট থেকে “সৌদির কৌশলগত গভীরতা” নিয়ে আক্রমণ করার কথা কল্পনাই করা যেত না। মক্কা চুক্তি তেতো সত্যটা সামনে এনে দিল: বিরোধ সেখানে, যেখানে রিয়াদ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা কেবল অর্থায়নই করবে না, সিদ্ধান্তও তারাই নেবে।’

সৌদিরা এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ইয়েমেন ও সুদানে তাঁদের জীবন কঠিন করে তুলবেন। আমিরাত ইচ্ছা করেই ইয়েমেন ও সুদানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তারা মিসরকে সৌদির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে উসকানি দেবে।
পরিস্থিতি যদি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে রিয়াদ আবুধাবিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পথও ভাবতে পারে। স্থানীয় দ্বন্দ্ব থামানোর এটিই হবে সহজতম উপায়।

সৌদিরা তাঁদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সে কারণেই তাঁরা মক্কা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিলেন। গত সপ্তাহে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসর সফরকালে আশা প্রকাশ করেন, কায়রোও এই চুক্তিতে যোগ দেবে এবং চার দেশ মিলে কাজ করবে।

সুরক্ষা ও সমাধান

ওয়াশিংটনে এই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোটকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে দুভাবে—একটি হলো গভীর কৌশলগত জোট, আর অন্যটি ক্ষিপ্র কিন্তু লেনদেনসর্বস্ব জোট।
সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডর সিঙ্গার বলেন, ‘প্রথম দর্শনে আমিরাত-ইসরায়েল জোট দুপক্ষকেই তাৎক্ষণিক সুবিধা দেয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মক্কা চুক্তি আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে হয়তো ইসরায়েলের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু সেই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আঞ্চলিক বৈধতা তাদের নেই। তারপরও এ যুদ্ধগুলো তাদের সামরিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। নেতানিয়াহু আর ট্রাম্প পুরো উপসাগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের উপক্রম।

গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে বড় ধরনের অবকাঠামো তৈরি করছে। কোনো ফ্রন্ট থেকেই পিছু হটার লক্ষণ নেই। হামাস আর হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার সামরিক লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ও ট্রাম্পের চাপ সামলাতে গিয়ে ইসরায়েল কেবল নিজের অবস্থান কাঁটাতারে ঘিরেই শক্ত করছে।
এমন পরিস্থিতিতে আরব বিশ্ব সুরক্ষার জন্য এবং সমাধানের জন্য মক্কা জোটের দিকেই তাকিয়ে থাকবে।

* ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক। মিডল ইস্ট আই থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬।
মক্কায় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (মাঝে), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (বাঁয়ে) এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ৭ আগস্ট ২০২৬। ছবি: এএফপি

রবার্তো কার্লোস কি সত্যিই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন, আসল ঘটনা কী

গুঞ্জনটা শুরু হয়েছিল কয়েক সপ্তাহ আগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে, ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি ফুটবলার রবার্তো কার্লোস নাকি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। আসলে সত্যিটা কী? দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন রবার্তো কার্লোস নিজেই। এ খবরকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে জানিয়ে দিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই লেফটব্যাক।

কীভাবে গুঞ্জনের শুরু

বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছিল, কয়েক সপ্তাহ আগে ব্রাজিলের মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব শেখ জিহাদ হামাদার সঙ্গে দেখা করেছেন কার্লোস। পাশাপাশি অনলাইনে এমন কিছু ছবিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় একজন কাজির উপস্থিতিতে ইসলামিক রীতিতে বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে এবং সেখানে রবার্তো কার্লোসও আছেন। এতেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, কার্লোস ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং ইসলামিক রীতিতে একজনকে বিয়ে করেছেন।

আসলে কী ঘটেছিল


ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই লেফটব্যাক সম্প্রতি মরক্কোর ব্যবসায়ী সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই ছবিগুলো দেখে মনে হতেই পারে, স্ত্রীর ধর্ম অনুসরণ করে তিনিও বুঝি মুসলিম হয়েছেন। তবে গুঞ্জনের জট ছাড়াতে সম্প্রতি সৌদি আরবের দৈনিক পত্রিকা ওকাজের সঙ্গে কথা বলেছেন রবার্তো কার্লোস।

জেদ্দাভিত্তিক ওকাজে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কার্লোস বলেছেন, ‘ইসলাম ধর্মের প্রতি আমার সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রয়েছে। আমার স্ত্রীকে নামাজ পড়তে দেখাটা সত্যিই চমৎকার এক অভিজ্ঞতা। তবে আমার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের যে গুঞ্জন চারপাশে ঘুরছে, তা সত্য নয়।’

২০০২ বিশ্বকাপজয়ী এই লেফটব্যাক জানান, পারিবারিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানাতেই একাধিক রীতিতে সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে তাঁর বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। তিনি বলেছেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যরা ক্যাথলিক। তাদের বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে যেমন আয়োজন ছিল, তেমনই আমার মরোক্কান স্ত্রী ও তাঁর মুসলিম বন্ধুদের ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা মাথায় রেখে সেই ধর্মীয় রীতিও রাখা হয়েছিল।’

মূলত স্ত্রীর ধর্মীয় অনুভূতি ও বন্ধুদের সম্মানে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানের কারণেই অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কার্লোস স্পষ্ট করেছেন, স্ত্রীর ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার অর্থ এটা নয় যে তিনি নিজে ধর্ম পরিবর্তন করেছেন।

মরোক্কান স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয়ের গল্প

সাক্ষাৎকারে রবার্তো কার্লোস কীভাবে সোহাইলা তাহিরির সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল, সে গল্পও শুনিয়েছেন। ফুটবল–সম্পর্কিত এক ব্যবসায়িক বৈঠকে তাঁদের প্রথম পরিচয় হয়। কার্লোস জানান, সোহাইলা একজন অত্যন্ত সফল নারী ব্যবসায়ী। দুই বছর ধরে তাঁদের সম্পর্ক। এ দুই বছরে ব্যক্তিগত ও পেশাগত—উভয় দিক থেকেই তাঁদের বোঝাপড়া অনেক বেড়েছে।
মরক্কো ও ব্রাজিলে এ বিয়ে নিয়ে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছে। একদিকে সোহাইলার মরোক্কান পরিচিতি, অন্যদিকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় মুখ কার্লোসের বিশ্বব্যাপী পরিচিতি—সব মিলিয়ে তাঁদের এ বিয়ে বিশ্বজুড়ে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।

এটা কার্লোসের কত নম্বর বিয়ে

আনুষ্ঠানিকভাবে এটি ৫৩ বছর বয়সী কার্লোসের তৃতীয় বিয়ে। প্রথম স্ত্রী আলেকজান্দ্রা পিনহেইরোর সঙ্গে ২০০৩ সালে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। সেই সংসারে তাঁর তিন সন্তান। এরপর ২০০৯ সালের জুনে তিনি দ্বিতীয় স্ত্রী মারিয়ানা লুকনের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় সংসার করার পর ২০২৫ সালের শুরুতে তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। এই সংসারে কার্লোসের ২টি কন্যাসন্তান রয়েছে।  
সব মিলিয়ে ৭ জন নারীর গর্ভে কার্লোসের ১১ সন্তান। ২০১৭ সালের অক্টোবরে তাঁর মেয়ে জিওভানা এক পুত্রসন্তানের জন্ম দেওয়ায় তিনি এরই মধ্যে নানাও হয়ে গেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রবার্তো কার্লোসের বিয়ের ছবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রবার্তো কার্লোসের বিয়ের ছবি। মরোক্কান ওয়ার্ল্ড নিউজ

সৌদি আরবের ৪৮ তেলবাহী জাহাজ ঠেকানোর দাবি হুতিদের

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা গত ২০ জুলাই থেকে সৌদি আরবের ৪৮টি তেলবাহী জাহাজের চলাচল ঠেকানোর দাবি করেছে। একই সময়ে আটটি সৌদি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা।

হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে এসব দাবি করেন।

তিনি বলেন, সৌদি আরবের সমুদ্রপথে চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর থেকে হুতিরা আটটি সৌদি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর মধ্যে পাঁচটি লোহিত সাগরে এবং তিনটি এডেন উপসাগর ও আরব সাগরে ছিল।

সারি আরও দাবি করেন, হুতিরা ৪৮টি সৌদি তেলবাহী জাহাজকে আটকে দিয়ে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। এর মধ্যে ৩৪টি ছিল আরব সাগর ও ভারত মহাসাগর এলাকায় এবং ১৪টি লোহিত সাগরে।

সৌদিতে ৯ ও সামরিক স্থাপনায় ১৪ অভিযান

হুতি মুখপাত্রের দাবি, সৌদি আরবের ইয়ানবু, নাজরান, জিজান ও আবহা এবং দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশের তেল সরবরাহকে লক্ষ্য করে তারা নয়টি সামরিক অভিযান চালিয়েছে।

এ ছাড়া আল-রুওয়াইক, আল-আবর, আল-ওয়াদিয়াহ, মারিব ও আল-মাখা এলাকায় সৌদি সামরিক উপস্থিতি ও সমরসজ্জাকে লক্ষ্য করে আরও ১৪টি অভিযান চালানোর দাবি করেন তিনি।

সারি বলেন, হুতিদের এই পদক্ষেপের পেছনে তিনটি ‘সমীকরণ’ রয়েছে—একটি অবরোধের জবাবে পাল্টা অবরোধ, সৌদি সামরিক সমরসজ্জা যেখানেই থাকুক সেখানে হামলা এবং ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব রক্ষা।

সৌদি আরবকে আরও উত্তেজনা না বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, “যেকোনো ব্যাপক উত্তেজনার জবাব ব্যাপক উত্তেজনার মাধ্যমেই দেওয়া হবে।”

সৌদির কাছে হুতিদের দাবি

ইয়াহিয়া সারির ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সৌদি আরবের সামনে একমাত্র পথ হলো—অবরোধ তুলে নেওয়া, আগ্রাসন বন্ধ করা, সরকারি কর্মীদের বেতন পরিশোধ করা, বিদেশি বাহিনী প্রত্যাহার করা এবং ইয়েমেনের সম্পদ ইয়েমেনের জনগণের হাতে ছেড়ে দেওয়া।

তবে হুতিদের এসব দাবি ও সামরিক অভিযানের বিষয়ে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়ার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

সৌদি আরবের ৪৮ তেলবাহী জাহাজ ঠেকানোর দাবি হুতিদের
ছবি: সংগৃহীত।

টেক্সাসে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা, তীব্র হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষও

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষ করে ডালাসের আশপাশে। ভালো স্কুল, তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন এবং শক্তিশালী মুসলিম সম্প্রদায়ের কারণে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম পরিবারগুলো সেখানে বসতি গড়েছে। ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েক ডজন মসজিদ ও ইসলামিক প্রতিষ্ঠান। তবে মুসলিম সম্প্রদায়ের এই বিস্তারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অঙ্গরাজ্যটিতে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য, সামাজিক বৈরিতা এবং রাজনৈতিক প্রচারণাও জোরালো হয়েছে।

বুধবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

জুনের শুরুর দিকে ভোর হওয়ার আগেই ঘুম থেকে উঠেছিলেন গুলাম কেহার। টেক্সাসের আরভিংয়ে নিজের স্থানীয় মসজিদ ভ্যালি র‍্যাঞ্চ ইসলামিক সেন্টারে দিনের প্রথম নামাজ আদায় করে কয়েক মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কোস্ট গার্ডে দায়িত্ব পালনে যাওয়ার কথা ছিল তার।

এর আগেও তিনি দায়িত্ব পালনে গিয়েছেন। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। স্ত্রী ও চার সন্তানকে টেক্সাসে রেখে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন।

টেক্সাসের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের মুসলিমবিরোধী বক্তব্য তখন আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল এবং সেগুলোর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে হচ্ছিল। বিভিন্ন মসজিদের মুসল্লি ও ধর্মীয় নেতারা প্রকাশ্যে নামাজ পড়ার সময় কিংবা পার্কে বসে থাকার সময় তাদের উদ্দেশে করা কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছিলেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হিউস্টনের একটি বড় ইসলামিক সেন্টারে সন্ত্রাসী হুমকি দেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কনরো শহরে এক নারী মুসলিম ক্রেতাদের বলেন, তারা ‘এই অঙ্গরাজ্য বা এই দেশে স্বাগত নয়’। ওই মন্তব্যের ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর নারীটি চাকরি হারান। পরে সমর্থকদের কাছ থেকে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পান তিনি।

ডালাসের উপশহর ম্যাককিনিতেও একটি মসজিদ সম্প্রসারণ নিয়ে উত্তপ্ত সিটি কাউন্সিলের শুনানির সময় এক নারী সাবেক মেয়রের জামার ভেতরে ইসলামবিরোধী বার্তা লেখা কাগজ ঢুকিয়ে দেন।

‘এমন পরিবেশে তাদের একা রেখে যাওয়া কিছুটা উদ্বেগের বিষয় ছিল,’ নিজের পরিবারের প্রসঙ্গে বলেন কেহার। ‘বাইরে যেসব কথা বলা হচ্ছে, সেগুলোই ভয় ধরিয়ে দিচ্ছিল।’

পরে দায়িত্ব পালনের এলাকায় তার পরিবারকে যত দ্রুত সম্ভব তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।

কেহারের মতো গত কয়েক দশকে টেক্সাসে বসতি গড়া মুসলিমদের সংখ্যা বেড়েছে। ডালাসের দক্ষিণে ‘ডিসোটো হাউস অব পিস’-এর মতো প্রতিষ্ঠানও মুসলিম সম্প্রদায়ের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে।

‘আমেরিকান মুসলিমদের জন্য এটাই থাকার সবচেয়ে ভালো জায়গা,’ বলেন তাম্মাম আলওয়ান। ডেট্রয়েট থেকে আরভিংয়ে চলে আসা এই ব্যক্তি বলেন, ‘আমি প্রার্থনা করেছিলাম—হে আল্লাহ, আমাকে আরভিংয়ে পাঠান।’

কিন্তু মুসলিম সম্প্রদায় যত বেড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভও তত বেড়েছে।

‘র‍্যাডিক্যাল ইসলাম’ মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকান রাজনীতির অংশ। জাতীয় পর্যায়েও এই বক্তব্য আরও তীব্র হয়েছে। মুসলিম রাজনীতিকদের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জয় এবং মুসলিমদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে টেক্সাসের রাজনীতিকরা শুধু বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা কিছু মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেছেন।

২০২৫ সালের শুরুর দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। পূর্ব প্লানোর ইসলামিক সেন্টার বা এপিকের সদস্যরা ডালাসের পূর্বদিকে প্রায় ৪০০ একর জমিতে মসজিদকেন্দ্রিক একটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রকাশ করলে তীব্র বিরোধিতা শুরু হয়। প্রকল্পটির নাম দেওয়া হয় এপিক সিটি । পরে এর নাম পরিবর্তন করে ‘দ্য মেডো’ রাখা হয়। প্রকল্পটিতে এক হাজারের বেশি বাড়ি, মসজিদ, স্কুল, দোকান, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনমূলক স্থাপনা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রকল্পটি নিয়ে ইসলামবিরোধী প্রভাবক অ্যামি মেকেলবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা শুরু করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, টেক্সাসের বারবিকিউ রেস্তোরাঁগুলোকে একটি সমন্বিত ‘দখল’-এর অংশ হিসেবে ‘আরব শপিং প্লাজা’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। এপিক সিটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘এভাবেই পশ্চিমা বিশ্বের পতন হয়।’

তার প্রচারণা টেক্সাসের গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এরপর অ্যাবট প্রস্তাবিত প্রকল্প ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে রাজ্যীয় তদন্ত শুরু করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনও প্রকল্পটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন।

প্রকল্পটির সমালোচকেরা এটিকে ‘শরিয়াহ-নিয়ন্ত্রিত’ বা মুসলিমদের জন্য আলাদা এলাকা হিসেবে তুলে ধরলেও প্রকল্পের উদ্যোক্তারা বলেছেন, এটি সব ধর্ম ও পটভূমির মানুষের জন্য উন্মুক্ত।

রিপাবলিকান কনভেনশনে শরিয়াহবিরোধী প্রপাগাণ্ডা

মুসলিমবিরোধী বক্তব্যের বিস্তার টেক্সাসের রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

জুনে অনুষ্ঠিত টেক্সাস স্টেট রিপাবলিকান কনভেনশনে ‘Don’t Sharia Our Texas’ বা টেক্সাসকে শরিয়াহমুক্ত রাখার বার্তা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়। একাধিক প্যানেলে মুসলিম ‘আগ্রাসন’ নিয়ে সতর্ক করা হয় এবং শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করাকে গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয়। গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটও সম্মেলনে শরিয়াহ আইন নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানান।

সম্মেলনস্থলে টেক্সাস হাউসের নতুন ‘শরিয়াহ-মুক্ত ককাস’-এর একটি বুথও ছিল। সেখানে অ্যামি মেকেলবার্গের সংগঠনের পক্ষ থেকেও প্রচারণা চালানো হয়।

এক নারীর হাতে থাকা একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ‘আমার টেক্সাসকে শরিয়াহ আইনে শাসিত করো না। স্বাধীনতা রক্ষা করো। টেক্সাস রক্ষা করো।’

এরই মধ্যে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের রিপাবলিকান প্রার্থী বো ফ্রেঞ্চ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলিম চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি থামব না।’

২০১৫ থেকেই শরিয়াহবিরোধী রাজনীতি

টেক্সাসে মুসলিমদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৫ সালে আরভিংয়ের তৎকালীন মেয়র বেথ ভ্যান ডুইন শরিয়াহ আইনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসেন। তিনি বর্তমানে কংগ্রেসের সদস্য।

এর দুই বছর পর, ওয়াশিংটনভিত্তিক কট্টর ডানপন্থী থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসি-র উদ্যোগে আনা একাধিক বিলের অংশ হিসেবে টেক্সাসের রিপাবলিকানরা শরিয়াহবিরোধী আইন পাস করেন।

এরপর কিছু সময়ের জন্য কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিতে ইসলাম ইস্যুর গুরুত্ব কমে যায়। অভিবাসন, মহামারি ও লিঙ্গ রাজনীতি বেশি গুরুত্ব পায়।

কিন্তু পরে কট্টর ডানপন্থীদের একটি অংশ নতুন করে এমন একটি বিতর্কিত ধারণা সামনে আনে—ইসলাম কোনো ধর্ম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ।

এই ধারণার ওপর ভিত্তি করেই এপিক সিটি নিয়ে নতুন করে প্রচারণা শুরু হয়।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ

রিপাবলিকান রাজনৈতিক পরামর্শক অ্যান্থনি হোমের মতে, ইসলাম নিয়ে রিপাবলিকান ভোটারদের উদ্বেগ মূলত অবৈধ অভিবাসন নিয়ে তাদের ভীতিরই সম্প্রসারণ। গভর্নর অ্যাবটের বিভিন্ন পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি যা কিছু করেন, তা জনমত জরিপ দ্বারা চালিত।’

এদিকে অ্যাবট মুসলিম যাত্রীদের ধর্মীয় অজুর জন্য ব্যবস্থা রাখা টেক্সাসের বিমানবন্দরগুলোর সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করার হুমকি দেন। মুসলিমদের একটি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত একটি ব্যক্তিগত ওয়াটার পার্ক অনুষ্ঠান বাতিলের নির্দেশও দেন তিনি।

একই সঙ্গে অ্যাবট জাতীয় নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস বা সিএআইআর-কে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেন। সংগঠনটি আদালতে এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, সিএআইআর-কে লক্ষ্যবস্তু করার পাশাপাশি অন্যান্য ইসলামি প্রতিষ্ঠানকেও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

মুসলিম নেতাদের অবস্থান

টেক্সাসের মুসলিম নেতারা কীভাবে এই পরিস্থিতির মোকাবিলা করবেন, তা নিয়ে আলোচনা করছেন। কেউ আন্তঃধর্মীয় যোগাযোগ ও জনসম্পৃক্ততার পক্ষে। আবার কেউ মনে করছেন, শুধু নিজেদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ড তুলে ধরে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব নয়।

ভ্যালি র‍্যাঞ্চ মসজিদে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিশিষ্ট মুসলিম স্কলার ড. ওমর সুলেইমান বলেন, ‘আমরা সবসময় আমাদের কর্মকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করে আশা করেছি, আমাদের কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিকভাবে আমাদের পক্ষে কথা বলবে। আমরা সেটা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এতে আমাদের কোনো লাভ হয়নি।’

তার মতে, এখন পরিস্থিতির জন্য ‘শক্ত অবস্থান’ প্রয়োজন এবং মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে শক্তিশালী আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।

‘আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলাকে এসব মানুষের জন্য আইনগত ও রাজনৈতিকভাবে ব্যয়বহুল করে তুলতে হবে,’ বলেন তিনি। ‘আমাদের তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে।’

তিনি এমন প্রতিরোধের ভিত্তি হিসেবে মার্কিন সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার সুরক্ষার কথা উল্লেখ করেন। তবে কট্টর রক্ষণশীলরা কীভাবে সেই সুরক্ষা সীমিত করা যায়, তার পথ খুঁজছেন।

টেক্সাসে এমন একটি উদ্যোগ হিসেবে কিছু ইসলামি সাংস্কৃতিক চর্চা—যেমন বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়ে ধর্মীয় বিধানভিত্তিক সালিশি ব্যবস্থা—নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাজ্য আইন ব্যবহারের কথা আলোচনা হচ্ছে।

সান অ্যান্টোনিওর রিপাবলিকান স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যালান স্কুলক্রাফট বলেন, ‘আমরা প্রথম যে বিষয়গুলো করার চেষ্টা করব, তার একটি হলো—ধর্ম বলতে কী বোঝায়, সেটি সংজ্ঞায়িত করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়। এটি একটি ধর্মের চেয়েও অনেক বেশি কিছু।’

মুসলিম অধিকারকর্মীদের মতে, পরিস্থিতি এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু ইসলামবিদ্বেষী মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। রাজনৈতিক প্রচারণা, আইন প্রণয়নের উদ্যোগ এবং সরকারি পদক্ষেপের মধ্য দিয়েও এর প্রকাশ ঘটছে।

সিএআইআর-এর অস্টিন শাখার শাইমা জায়ান বলেন, ‘আমরা ইসলামোফোবিয়ার ঢেউয়ের সম্মুখীন হচ্ছি। এটি সবচেয়ে ভয়াবহ ঢেউ।’

সব মিলিয়ে, টেক্সাসে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিস্তারের পাশাপাশি ইসলামবিদ্বেষী রাজনৈতিক প্রচারণাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। মসজিদ ও মুসলিম অধ্যুষিত কমিউনিটি গড়ে ওঠা থেকে শুরু করে শরিয়াহ আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক—সবকিছু মিলিয়ে অঙ্গরাজ্যটির মুসলিমদের ঘিরে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হচ্ছে। 

টেক্সাসে বাড়ছে মুসলিমদের সংখ্যা, তীব্র হচ্ছে ইসলামবিদ্বেষও
ছবি: সংগৃহীত।

ত্রাণকর্মীদের জন্য আবারো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলাকা গাজা

ত্রাণ ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের জন্য ২০২৫ সালেও বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্থান ছিল ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। টানা তৃতীয় বছরের মতো প্রাণঘাতী এলাকার তালিকার শীর্ষে রয়েছে গাজা। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সেখানে ১৮৬ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন।

গাজার পর ত্রাণকর্মীদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী দেশ ছিল সুদান। চলমান সংঘাতের মধ্যে ২০২৫ সালে দেশটিতে ৭১ জন ত্রাণকর্মী নিহত হন।

জাতিসংঘের তথ্য ও এইড ওয়ার্কার সিকিউরিটি ডাটাবেস-এর হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মোট ৯০৭ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত, আহত অথবা অপহৃত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩৫০ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩৮৭ জন। তবে নিহত, আহত ও অপহরণের সম্মিলিত সংখ্যা ২০২৫ সালে আগের বছরের ৮৩৩ জনের তুলনায় বেড়ে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে।

জাতিসংঘ বলছে, সংঘাতপূর্ণ এলাকায় সস্তা ও সহজলভ্য সশস্ত্র ড্রোনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়াও ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা বাড়ার অন্যতম কারণ। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস মানবিক সহায়তাকর্মীদের ওপর এ মাত্রার সহিংসতাকে ‘ভয়াবহ’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলা এবং হামলাকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

২০২৬ সালেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং বছরের শুরু থেকে ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলা ও হতাহতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ৮২ জন ত্রাণকর্মী নিহত, ৯৭ জন আহত এবং ৩৯ জন অপহৃত হয়েছেন।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে অন্তত ৩২৬ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন এবং গত তিন বছরে নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। গাজা ও পশ্চিম তীরেই এই সময়ের মধ্যে ৫৬০ জনের বেশি মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হয়েছেন।

ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে গিয়ে জীবন হারাচ্ছেন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক কর্মীরা। ফলে যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে বেসামরিক জনগণের কাছে খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কাজ দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

ত্রাণকর্মীদের জন্য আবারো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এলাকা গাজা

ইউরোপে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের তীব্রতা আরও ছড়িয়ে পড়লে ইউরোপে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছে ইরান। সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে বুলগেরিয়া ও সাইপ্রাসে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনার কথাও উঠে এসেছে বলে ইরানি সরকারের দুই সূত্রের বরাতে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।

এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা কার্যত ভেঙে পড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার বলেছেন, বর্তমানে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন করে আলোচনা শুরুরও কোনো পরিকল্পনা নেই। এদিকে বুধবার সংযুক্ত আরব আমিরাত ঘোষণা দিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের ‘বাণিজ্য, বাণিজ্যিক বিনিময় ও আর্থিক লেনদেন’ স্থগিত থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র এখন হরমুজ প্রণালি। ট্রাম্প বারবার দাবি করছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি খোলা রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে। কিন্তু বাস্তবে প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনো খুবই কম।

চলতি সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলরত একটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলায় একজন নিহত হয়েছেন। ইরানের এক সামরিক মুখপাত্রকে উদ্ধৃত করে ফক্স নিউজ জানিয়েছে, প্রণালি দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করা জাহাজগুলোর হালে ‘কয়েকটি সুন্দর গর্ত’ দেখা যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক অভিযানে সহযোগিতা না করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্রদের বিরুদ্ধেও কঠোর ভাষা ব্যবহার করছেন ট্রাম্প। ওমানকে তার মধ্যপ্রাচ্য নীতির পথে বাধা সৃষ্টি না করার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।

সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও সিএনবিসি

ইউরোপে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পরিকল্পনা করছে ইরান

ভারতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫৯ বছরের পুরোনো মাদরাসার একাংশ, তীব্র ক্ষোভ

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলায় ৫৯ বছরের পুরোনো একটি মাদরাসার অর্ধেকের বেশি অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল ও নেতাকর্মীরা এ ঘটনাকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি প্রকাশ্য ঘৃণার এজেন্ডা’ এবং ‘অসাংবিধানিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

মঙ্গলবার জেলার পিপরা রামলাল গ্রামের আরাবিয়া জিয়া-উল-উলুম মাদরাসা, যা মক্তব মাদরাসা নামেও পরিচিত, ভাঙা হয়। প্রায় ১৪ হাজার বর্গফুট এলাকাজুড়ে থাকা মাদরাসাটির সাতটি কক্ষ, একটি দোকান এবং হলের অর্ধেক অংশ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনের দাবি, মাদরাসাটির একটি অংশ সরকারি জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছিল। আদালতের আদেশের ভিত্তিতেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।

আদালতের আদেশে উচ্ছেদ

২০২২ সালে গ্রামের পাঁচ বাসিন্দা কথিত সরকারি জমি দখলমুক্ত করার দাবিতে ডোমরিয়াগঞ্জ তহসিলদারের আদালতে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে উচ্ছেদের নির্দেশ দেওয়া হয়।

মাদরাসার তত্ত্বাবধায়ক আবদুল সালাম একই বছর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করেন। প্রায় তিন বছর ধরে শুনানি চলার পর ১৪ আগস্ট ২০২৬ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালত তহসিলদারের আদেশ বহাল রাখেন এবং মাদরাসার আবেদন খারিজ করে দেন।

এরপর প্রশাসন কথিত দখল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে নোটিশ জারি করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দখল সরানো হয়নি দাবি করে মঙ্গলবার মাদরাসা ভাঙার অভিযান চালানো হয়।

সকাল ৭টার দিকে ডোমরিয়াগঞ্জের এসডিএম বিবেকানন্দ মিশ্র, ডোমরিয়াগঞ্জের সিও ব্রিজেশ ভার্মা ও বানসি সিও শিবেন্দু সিংয়ের উপস্থিতিতে অভিযান শুরু হয়। ঘটনাস্থলে পাঁচটি থানার প্রায় ১০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।

বিক্ষোভ

মাদরাসা ভাঙার খবর পেয়ে ডোমরিয়াগঞ্জের সমাজবাদী পার্টির বিধায়ক সৈয়দা খাতুন, এসপি জেলা সভাপতি লালজি যাদবসহ ৫০ জনের বেশি দলীয় নেতা-কর্মী ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভ করেন। তারা মাদরাসা ভাঙার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং অভিযান বন্ধের দাবি জানান।

পুলিশ বিক্ষোভকারীদের বাধা দিলে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে সামান্য ধস্তাধস্তিও হয়।

এসপি নেতা কামাল আহমেদ খান মাদরাসার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ডোমরিয়াগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শ্রী প্রকাশ যাদব তাকে বাধা দেন। পুলিশ জোর করে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।

জবাবে খান বলেন, ‘ঠিক আছে, যা করার করুন। আপনারা কি আমার গায়ে হাত তুলবেন?’

পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে অন্য পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। বিধায়ক সৈয়দা খাতুনও দলীয় কর্মীদের শান্ত থাকার এবং আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আহ্বান জানান।

পরে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে বিক্ষোভকারীদের ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেয়।

প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে মাদরাসাটির সাতটি কক্ষ, একটি দোকান এবং হলের অর্ধেক অংশ ভেঙে ফেলা হয়।

‘অসাংবিধানিক’ বলল আম আদমি পার্টি

আম আদমি পার্টির উত্তরপ্রদেশ শাখা এই অভিযানকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে দাবি করেছে। দলটির উত্তরপ্রদেশের বুদ্ধিস্ট প্রদেশের সভাপতি ইমরান লতিফ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

আপ প্রশ্ন তুলেছে, কখন নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না।

দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, এই পদক্ষেপ “বাবাসাহেব ড. ভীমরাও আম্বেদকরের সংবিধানে আঘাত করেছে”, যেখানে প্রত্যেক নাগরিকের সমতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

আপের দাবি, বিষয়টি শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে নয়; বরং এটি আইনের শাসন ও সংবিধান রক্ষার লড়াই।

মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা

কংগ্রেস নেতা জাভেদ আশরাফ খান এই ঘটনাকে ‘মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্বেষের এজেন্ডা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিজেপি ও আরএসএসের কাছে “ধ্বংস করা ছাড়া আর কোনো সমাধান আছে কি না”। একই সঙ্গে তিনি এ ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

রাজনৈতিক কর্মী আবদুর রকীব খান বলেন, “আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।”

মাদরাসা ভাঙার আগে সব সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তিনি বলেন, এই পদক্ষেপ ‘শিশুদের শিক্ষা, সামাজিক ভ্রাতৃত্ব এবং জনআস্থার’ বিনিময়ে হওয়া উচিত নয় এবং রাস্তা বা সরকারি জমি দখল করে থাকা সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থাপনার বিরুদ্ধে “সমান, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা” নেওয়ার আহ্বান জানান।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, সিদ্ধার্থনগর জেলা সদর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে ডোমারিয়াগঞ্জ তহসিলে অবস্থিত মাদ্রাসাটি ১৯৩৮ সালে গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং ১৯৬৭ সালে পিপড়া রামলালের প্রধান সড়কে স্থানান্তরিত হয়।

কর্মকর্তাদের মতে, মাদ্রাসাটিতে প্রায় ৪০০ শিশু পড়াশোনা করছিল।

প্রশাসন দাবি করেছে যে, মাদ্রাসাটি প্রথমে ব্যক্তিগত জমিতে নির্মিত হলেও ক্রমান্বয়ে এর সামনের খালি সরকারি জমিতে তা সম্প্রসারিত করা হয়।

সূত্র: মক্তব মিডিয়া

ভারতে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫৯ বছরের পুরোনো মাদরাসার একাংশ, তীব্র ক্ষোভ
ভারতের উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলায় ৫৯ বছরের পুরোনো একটি মাদরাসার অর্ধেকের বেশি অংশ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় পিচ ফল

লালচে কমলা রঙের রসালো ফল পিচ। একটি পিচ সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ গ্রাম ওজনের হয়। মাঝেমধ্যে দু-একটির ওজন ২৫০ গ্রামের বেশি হয়ে থাকে। তাই বলে প্রায় ৮২৯ গ্রাম ওজনের পিচ!

বেশ বড় আকারের এই পিচ জন্মেছে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একটি বাগানে। বাগানটি ভার্জিনিয়ার ক্রোজে, নাম চিলস পিচ অর্চাড।

বাগান কর্তৃপক্ষ বলেছে, রেকর্ড গড়ার জন্য পরিকল্পনা করে বা গাছের খুব যত্নআত্তি করে তাঁরা পিচ ফলিয়েছে, বিষয়টা এমন নয়; বরং প্রাকৃতিকভাবে এ বছর উপযুক্ত আবহাওয়া সেটিকে এতটা বড় হতে সাহায্য করেছে।

এ মাসের শুরুতে বাগান থেকে ওই পিচ পাড়া হয়। সেটির আকার বাগান কর্তৃপক্ষকে বেশ অবাক করেছিল। এ জন্য তারা সেটির ওজন দেয়। ফলটির ওজন হয় ১ দশমিক ৮৩ পাউন্ড বা ৮২৮ দশমিক ৫ গ্রাম।

এত ওজন দেখে প্রথমবার তাদের মাথায় ঢুকে এটি কি বিশ্ব রেকর্ড হতে পারে।

বিশাল আকারের পিচটি জন্মেছে হেনরি চিলসের বাগানে। তিনি স্থানীয় একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে বলেন, ‘আমরা জেনেবুঝে পরিকল্পনা করে সবচেয়ে বড় পিচ ফলানোর চেষ্টা করিনি। শুধু এ বছর যে আবহাওয়া ছিল, তা আমাদের খুব ভালোভাবে সহায়তা করেছে। এ কারণে বাগানে একটি বিশাল পিচ বেড়ে উঠেছে।’

হেনরি পিচটির নাম দেন ‘পিএফ-২৭এ’। সবচেয়ে বেশি ওজনের পিচের স্বীকৃতি চেয়ে এরপর তাঁরা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষ পিএফ-২৭একে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ওজনের পিচের স্বীকৃতি দেয়।

আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে বাগান কর্তৃপক্ষ লিখেছেন, ‘এখন এটা আনুষ্ঠানিক। আমরা এখন বিশ্বের সবচেয়ে ওজনদার পিচ ফলানোর রেকর্ডের মালিক।’

পোস্টে আরও বলা হয়, ‘এত বিশাল আকারের ফলটি জন্মানোর জন্য হেনরি চিলসকে অভিনন্দন। আর তাদের স্বীকৃতির জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসকেও আমাদের ধন্যবাদ।’

পাশাপাশি রাখা একটি কুমড়া, বড় আকারের পিচ (বাঁ থেকে দ্বিতীয়), আপেল এবং একটি সাধারণ আকারের পিচ
পাশাপাশি রাখা একটি কুমড়া, বড় আকারের পিচ (বাঁ থেকে দ্বিতীয়), আপেল এবং একটি সাধারণ আকারের পিচ। ছবি: ইউটিউব ভিডিও থেকে নেওয়া