Monday, February 13, 2017

ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা সফল বলে দাবি, কিম জং উন খুশি

একটি আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে উত্তর কোরিয়া। তাদের নেতা কিম জং উন পরীক্ষাটি তত্ত্বাবধান করেন। তিনি পরীক্ষার সাফল্যে ব্যাপক সন্তুষ্ট। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা কেসিএনএর প্রতিবেদনে জানানো হয়, ক্ষেপণাস্ত্রটি ভূমি থেকে ভূমিতে উৎক্ষেপণযোগ্য। এটি মধ্য থেকে দূরপাল্লার আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র। উত্তর কোরিয়া গতকাল রোববার ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষা চালায় বলে বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, পশ্চিমাঞ্চলীয় নর্থ পিয়ঙ্গান প্রদেশের বাঙ্গিয়ন বিমানঘাঁটি থেকে গতকাল সকালে জাপান সাগরের দিকে (পূর্ব সাগর) উত্তর কোরিয়া ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারে। এটি প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সাগরেই আঘাত হানে।
সিউল বলছে, নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া যাচাই করার লক্ষ্যেই পিয়ংইয়ং উসকানিমূলকভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সবশেষ এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকার অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। সংবাদ সংস্থা কেসিএনএর ভাষ্য, উত্তর কোরিয়া পুকগুকসং-২ নামের ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। এটি নতুন ধরনের কৌশলগত অস্ত্র। এই ক্ষেপণাস্ত্রটি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বহনে সক্ষম। কেসিএনএ জানায়, কিম জং উন নিজে পরীক্ষাটি তত্ত্বাবধান করেন। পরীক্ষার ফলাফলে তিনি সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। কেসিএনএ বলছে, গতকাল যে ক্ষেপণাস্ত্রটির পরীক্ষা চালানো হয়, তা উত্তর কোরিয়ার বহরে প্রচণ্ড শক্তি যুক্ত করেছে। ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর পিয়ংইয়ং প্রথম কোনো ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল। জবাবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও উত্তর কোরিয়ার বৈরীভাবাপন্ন দেশ জাপানের প্রতি শতভাগ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মেক্সিকোতে ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভে হাজারো মানুষ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি ও মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তোলার পরিকল্পনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে হাজারো মানুষ। মেক্সিকোর বেশ কয়েকটি এলাকায় এই বিক্ষোভ চলছে। আজ সোমবার বিবিসির খবরে জানা যায়, সাদা পোশাকে মেক্সিকান পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমেছে। ট্রাম্পবিরোধী বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড রয়েছে তাদের হাতে।
বিক্ষোভের সংগঠকেরা বলছে, তারা এই বার্তা দিতে চায় যে মেক্সিকো ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ। ম্যাক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এনরিক পেনা নিয়েতোর দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থতারও সমালোচনা করেছে বিক্ষোভকারীরা। মারিয়া আমপারো কাসার নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ট্রাম্পের অভিবাসন নীতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে অভিবাসীদের নিয়েই মার্কিন সমাজ। মেক্সিকো কোনো দেয়ালে বিশ্বাস করে না বলেও তিনি জানান।

গ্রিনহাউস ঠেকাতে ‘গাছ ভবন’ বানাচ্ছে চীন

নিজ দেশে দূষণ ঠেকাতে এগিয়ে এসেছে চীন। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ঠেকাতেই ওই দেশের দুটো ভবনের মধ্যে রোপণ করা হবে হাজারো গাছ। আগামী বছরে এর নির্মাণকাজ শেষ হবে। এই ভবনের নকশা করেছেন পৃথিবী বিখ্যাত স্থপতি স্টেফানো বোইরি। চীনের শহরগুলোতে দূষণের কারণে ইতিমধ্যেই বিশ্ব গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। তাই হয়তো তা থেকে রক্ষা পেতে উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি। ডেইলি মেইল ও নিউইয়র্ক পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, চীনের পূর্ব উপকূলবর্তী শহর নানজিংয়ে নির্মিত হতে যাচ্ছে দুটি ভবন, যেখানে ভবনের প্রতি ধাপে রোপণ করা হবে সবুজ গাছ। ৩৫০ ফুটেরও বেশি উচ্চতার একটি ভবনে থাকবে ১১ হাজার সবুজ গাছ। আর এতে করে সেখানে বসবাসকারী মানুষের প্রয়োজনীয় অক্সিজেন চাহিদা মিটবে বলে আশা করছে দেশটি। ওই দুটি ভবনের নকশায় দেখা গেছে, ভবনের বাইরেটা থাকবে গাছপালাবেষ্টিত।
ভবনে শপিং কমপ্লেক্স, সুইমিং পুল, জিম, হোটেল, রেস্তোরাঁ, কনফারেন্স হল, প্রদর্শনীর জন্য ফাঁকা জায়গা, বিনোদনমূলক স্থাপনার পাশাপাশি থাকবে বাচ্চাদের স্কুলও। এই কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তারা জানান, ইতিমধ্যে ভবনগুলোর নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের মধ্যে এগুলো তৈরি হয়ে যাবে বলে আশা করছে দেশটি। এগুলোর পর দেশটির আরও কয়েকটি শহরে এমন ভবন বানানো হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ‘নানজিং গ্রিন টাওয়ার’ নামের ওই ভবনগুলোর নকশা করেছেন বিখ্যাত স্থপতি স্টেফানো বোইরি। তিনি বলেন, ভবন দুটো হবে পুরোপুরি সবুজ। নানজিং গ্রিন টাওয়ারের দুটোর মধ্যে একটি ভবনের উচ্চতা ৬০০ ফিট। অপর, অর্থাৎ দ্বিতীয়টির উচ্চতা ৩৫৫ ফিট। ভবনের ছাদে থাকবে মিউজিয়াম ও ব্যক্তিগত ক্লাবও। ১ হাজার ১০০ গাছের মধ্যে ৬০০টি বড় লম্বা ধরনের আর ৫০০টি থাকবে মধ্যম আকার গাছ থাকবে। এগুলোর পাশাপাশি থাকবে আড়াই হাজার ছোট গাছও। এ গাছগুলো থেকে দৈনিক ৬০০ কেজি অক্সিজেন সরবরাহ হবে বলে আশা করছেন উদ্যোক্তা। এ ছাড়া বছরে ২৫ টন কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করবে গাছগুলো। এর আগেও বোইরির পরিকল্পনা ও নকশায় ভবন তৈরি হয়েছে। ইতালির মিলান টাওয়ার বানিয়েছেন তিনি। ওই ভবনে ৯০০ গাছ লাগানো হয়। নানজিং শহরের যে ভবনগুলো হচ্ছে, সেগুলোর গঠনও অনেকটাই তেমন। মিলানের ওই ভবন ২০০৯ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে শেষ হয় ২০১৪ সালে। তবে চীনের ভবনগুলোর আবাসিক কাঠামোতে গাছপালার সংখ্যা দ্বিগুণ। সেই সঙ্গে ভবনগুলো মোট উচ্চতাও বেশি। সুইজারল্যান্ডেও এমন ভবন বানানো হয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

উত্তর কোরিয়া গতকাল রোববার একটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর পিয়ংইয়ং এই প্রথম এমন কাজ করল। জবাবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র ও উত্তর কোরিয়ার বৈরীভাবাপন্ন দেশ জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রতি শতভাগ সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় নর্থ পিয়ঙ্গান প্রদেশের বাঙ্গিয়ন বিমানঘাঁটি থেকে গতকাল সকালে জাপান সাগরের দিকে (পূর্ব সাগর) উত্তর কোরিয়া ওই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে মারে। এটি প্রায় ৫০০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে সাগরেই আঘাত হানে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটির ধরন সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি।
পিয়ংইয়ং নিজেদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র-সামর্থ্য বৃদ্ধির ব্যাপারে বৈশ্বিক মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যেই পরীক্ষাটি চালিয়েছে। পাশাপাশি তারা নতুন মার্কিন প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের লক্ষ্যেই এই উসকানিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র সফররত জাপানি প্রধানমন্ত্রী আবে উত্তর কোরিয়ার ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁকে আশ্বস্ত করে ট্রাম্প এশীয় মিত্র দেশটির নিরাপত্তা রক্ষার ব্যাপারে ওয়াশিংটনের অঙ্গীকারের উল্লেখ করেছেন। আর টোকিওর মুখপাত্র ইয়োশিহিদে সুগে বলেন, এটা জাপান ও আশপাশের অঞ্চলের প্রতি স্পষ্ট উসকানিমূলক পদক্ষেপ। জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী উত্তর কোরিয়ার যেকোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু পিয়ংইয়ং ২০০৬ সালে প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর পর থেকে তাদের ওপর জাতিসংঘ ছয় দফা অবরোধ আরোপ করার পরও দেশটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বন্ধ করেনি। উত্তর কোরিয়ার যুক্তি, তারা প্রতিরক্ষার স্বার্থেই এ ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণ ও ব্যবহার করছে। উত্তর কোরিয়া গত বছরও বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সংশয়, পিয়ংইয়ং নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সমপর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে। প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হয়াং গিও-আন উত্তর কোরিয়ার সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ‘শাস্তি’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস চলতি মাসের শুরুর দিকে সিউল সফর করেছেন। তিনি পিয়ংইয়ংকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,
যেকোনো পারমাণবিক হামলার ‘কার্যকর ও বিধ্বংসী’ জবাব দেওয়া হবে। উত্তর কোরিয়া আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির ‘শেষ ধাপে’ রয়েছে বলে দেশটির নেতা কিম জং-উন গত মাসে ঘোষণা দেন। প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প টুইটারে বলেছেন, ‘এটা হবে না।’ ওয়াশিংটন বারবার বলে এসেছে যে তারা উত্তর কোরিয়াকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ হিসেবে মেনে নেবে না। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার ট্রাম্পের জন্য একটি পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পিয়ংইয়ংকে রুখতে হলে তাঁকে উত্তর কোরিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে কিছুটা ভাটা পড়েছে। অবশ্য ট্রাম্প চীনের নেতা সি চিন পিংয়ের সঙ্গে সর্বশেষ ‘উষ্ণ’ ফোনালাপে ‘একক চীন’ নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

অস্ত্রবিরতির প্রস্তাব সু চির

দেশের সব কটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি সরকারের সঙ্গে অস্ত্রবিরতি চুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। দেশটির শান রাজ্যের প্যাংলং শহরে গতকাল রোববার ইউনিয়ন ডে উদ্যাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
৭০ বছর আগে ১৯৪৭ সালে এই প্যাংলং শহরেই সু চির বাবা অং সান মিয়ানমারের একীভূতকরণের ব্যাপারে শান্তিচুক্তি করেছিলেন। গতকালের অনুষ্ঠানে সু চি দেশজুড়ে অস্ত্রবিরতির চুক্তিকে স্বাক্ষর না করা গোষ্ঠীগুলোর প্রতি শান্তিপ্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এবং ২১ শতকে প্যাংলং সম্মেলনে যোগ দিতে আহ্বান জানান। এক বছর আগে ক্ষমতায় আসার সময় সু চি এবং তাঁর দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, শান্তিই তাঁদের কাছে প্রাধান্য পাবে। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর সরকারও সমালোচনার মুখে পড়ে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুদক

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আজ সোমবার ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও ডেপুটি রেজিস্ট্রার এইচ এম তায়হিদ জামান, সহকারী রেজিস্ট্রার মো. সিদ্দিকুর রহমান ও সহকারী পরিচালক মো. মোফাজ্জল হোসাইনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বেশ কয়েক বছর আগে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সিলেকশন গ্রেড দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ২০১২ সালে জনৈক এক ব্যক্তি মামলা করেন। মামলার অভিযোগে বলা হয়, এই তিন কর্মকর্তা মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এক কোটি ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩৯৪ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বা সরকারের ক্ষতি করেছেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য দুদকে পাঠান। মামলাটি তদন্ত করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক ফজলুল বারী। মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এই তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে দুদকের উপপরিচালক মোরশেদ আলমের নেতৃত্বাধীন একটি দল।

সুন্দরবনে বনদস্যু বাহিনীর সঙ্গে র‍্যাবের গুলিবিনিময়

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের ছোটকলাগাছি এলাকায় পশুরতলা খালে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব-৮) সঙ্গে বনদস্যুদের একটি বাহিনীর গুলিবিনিময়ের খবর পাওয়া গেছে। আজ সোমবার সকালে র‍্যাব-৮-এর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো মোবাইল ফোনের খুদে বার্তায় এই তথ্য জানানো হয়।
পরে র‍্যাব-৮-এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবির প্রথম আলোকে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ছোটকলাগাছি এলাকায় অভিযানে যায় র‍্যাব। সকাল সোয়া আটটার দিকে বনদস্যু নুরু বাহিনীর সঙ্গে র‍্যাবের গুলিবিনিময় শুরু হয়।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণে জোর দেওয়ার তাগিদ

পরিবেশবান্ধব নির্মাণে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট স্থপতি, পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলেছেন, শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার পাশাপাশি নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের পরিবেশবান্ধব নকশা ও উপকরণ ব্যবহার করা এবং নির্মাণকালে বায়ু ও শব্দদূষণ রোধে ব্যবস্থা নিতে হবে। গতকাল রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘পরিবেশবান্ধব নির্মাণ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।
তাঁরা বলেন, রাজধানীর বাতাসে উচ্চমাত্রায় ধূলিকণার অন্যতম কারণ নির্মাণকাজ চলাকালে ইট-বালু রাস্তায় ফেলে রাখা এবং খোলা ট্রাকে পরিবহন। এটা ঠেকাতে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজক প্রথম আলো। সহযোগিতা করেছে ক্রাউন সিমেন্ট ও হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই)। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম। অনুষ্ঠানে এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির উপাচার্য জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, সাত বছর আগে মেক্সিকোতে টেকসই নির্মাণ নিয়ে একটি কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে মেক্সিকো ইশতেহার নামে একটি ঘোষণা দেওয়া হয়, তার নাম ছিল ‘ট্রিপল জিরো’ (তিন শূন্য)। এই তিন শূন্য হলো নির্মাণসামগ্রী উৎপাদনে পরিবেশদূষণ শূন্যে নামিয়ে আনা, ভবন ব্যবহারকালে দূষণ শূন্যে নামিয়ে আনা এবং ভবন ভাঙা বা পুনর্নির্মাণে দূষণ শূন্যে নামিয়ে আনা। জার্মানি হলো প্রথম দেশ, যারা আগামী তিন-চার বছরের মধ্যে এটি অর্জন করতে পারবে। জামিলুর রেজা চৌধুরী আরও বলেন, মাটি পুড়িয়ে তৈরি করা ইটের বিকল্প ব্যবহার করা দরকার। তবে খেয়াল রাখতে হবে, তা যাতে টেকসই হয়। তিনি ছোট ছোট ভবনের বদলে বড় ভবন নির্মাণের তাগিদ দিয়ে বলেন, এতে আবাসন ব্যবসায়ীদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। তিনি এমন উপকরণ ব্যবহারের পরামর্শ দেন, যার মধ্য দিয়ে পানি ভূগর্ভে যেতে পারে। এমন প্রযুক্তি এসেছে বলেও তিনি জানান। প্লাস্টিকের ব্যবহার অতিমাত্রায় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, এখন ভবনের দরজার চৌকাঠ তৈরিতেও প্লাস্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্লাস্টিক পচনশীল নয়। অতিমাত্রায় প্লাস্টিক ব্যবহার ভবিষ্যতে বিপদ তৈরি করতে পারে। ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) নিয়ে তিনি বলেন, এখন ড্যাপ আছে কি নেই, তা বোঝা যাচ্ছে না। নতুন করে কী হচ্ছে তা-ও জানা নেই। দেশে পরিবেশ নিয়ে অনেক আইন আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসবের প্রয়োগ হয় না। সরকারকে এ ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে। নাগরিকেরাও ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন। হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এইচবিআরআই) পরিচালক মোহাম্মদ আবু সাদেক ‘পরিবেশবান্ধব নির্মাণ ও বিকল্প প্রযুক্তি’ শিরোনামে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রতিবছর দেশে প্রায় আড়াই হাজার কোটি ইট তৈরি হয়। এতে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টন ভূমির উপরিভাগের উর্বর মাটি ব্যবহার করা হয়। ইট পোড়াতে ৫০ লাখ টন কয়লা ও ৩০ লাখ টন কাঠ ব্যবহার করা হয়। এতে প্রায় দেড় কোটি টন কার্বন নিঃসরণ হয়। ইটের বিকল্প হিসেবে ফেরো সিমেন্ট, স্যান্ড সিমেন্ট, অটোক্লেভড অ্যারেটেড কংক্রিট (এসিসি), সেলুলার লাইটওয়েট কংক্রিট (সিএলসি) ইত্যাদি বিকল্প পণ্য ও প্রযুক্তি এসেছে বলে উল্লেখ করেন আবু সাদেক। তিনি দেশে এসব উপকরণ দিয়ে তৈরি কয়েকটি ভবনের ছবি দেখিয়ে বলেন, ইটের বিকল্প উপকরণের খরচও তুলনামূলক কম। বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের সাবেক সভাপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, পরিবেশবান্ধব নির্মাণকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক দিক হলো ভবনটি পরিবেশবান্ধব করে নির্মাণ করা; অন্যটি হলো নির্মাণকালে পরিবেশ রক্ষা করা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের উর্বর মাটি দিয়ে তৈরি ইট ভারতে রপ্তানি হচ্ছে। ত্রিপুরার মন্ত্রীরা বলছেন,
সেখানে উপরিভাগের উর্বর মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে কঠোরতা আছে। এভাবে মাটি নষ্ট করে ইট রপ্তানি বন্ধ করা দরকার। মোবাশ্বের হোসেন আরও বলেন, ঢাকায় অনেক পরিবেশবান্ধব ভবন হচ্ছে। এসব ভবনে পানির পুরোটা পুনর্ব্যবহার করা হয়। বিশেষায়িত কাচ ব্যবহার করে ভবনে তাপমাত্রা বৃদ্ধি রোধ করা হচ্ছে। তবে এসব নিয়ে প্রচার হওয়া উচিত। পাশাপাশি কী কী পরিবেশবান্ধব উপকরণ আছে, কারা সরবরাহ করে তা নিয়েও গণমাধ্যমের উচিত প্রচারণা চালানো। গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আইনুল ফরহাদ বলেন, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো অনেক এগিয়ে গেছে। তারা এখন লিড (যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের সনদ) সনদপ্রাপ্ত কারখানা করছে। সরকারি ভবনে এখনো লিড সনদের পর্যায়ে আসেনি। তবে ঢাকায় দুটি পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ করবেন। একটি হবে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কার্যালয়। অন্যটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি ভবন। তিনি বলেন, আগুনে না পুড়িয়ে ইট তৈরির জন্য জাপানের সহায়তায় সরকার একটি প্রকল্প নিয়েছে। এটা সফল হলে উর্বর মাটি ব্যবহার করে ইট তৈরি কমানো যাবে। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক খুরশীদ জাবিন হোসেন ঢাকার পরিবেশ রক্ষায় এলাকাভিত্তিক জনসংখ্যার ঘনত্ব ঠিক করে দেওয়ার তাগিদ দেন। বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের সভাপতি এ কে এম আবুল কালাম বলেন, কতটুকু জায়গা খালি রাখা দরকার, কতটুকু সবুজ রাখা দরকার, দুই ভবনের মাঝে কত জায়গা খালি থাকবে—এসব আগে ঠিক করে সে অনুযায়ী নির্মাণ করতে হবে। শুধু ঢাকা শহর নয়,
বাংলাদেশের সব জায়গায় নির্মাণকাজ পরিবেশবান্ধব করার তাগিদ দেন ক্রাউন সিমেন্টের টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার মো. শাহ্ আলম। তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব নির্মাণের অনেক প্রযুক্তি এসেছে। সেগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। জিপিএইচ ইস্পাতের নির্বাহী পরিচালক মাদানি এম ইমতিয়াজ বলেন, কিছু নিয়ম ঠিক করে ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সময় সেগুলো মানতে বাধ্য করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমরা যে হারে পরিবেশ দূষিত করছি, তাতে পরিবেশ আমাদের বেশি সময় দেবে না।’ শেলটেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌফিক এম সেরাজ বলেন, হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণা অপ্রতুল। সেখানকার গবেষকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিতে হবে। সরকারি কাঠামোতে বেতন দিয়ে গবেষণা হয় না। পৃথিবীর কোথাও হয়নি। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণা করতে হবে। তিনি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশে আইন অনেক আছে, কিন্তু সেগুলোর প্রয়োগ নেই। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আফসানা হক বলেন, প্রতিটি প্রকল্পের পরিবেশগত সমীক্ষা (ইআইএ) করা উচিত। এখন এটা শুধু বড় প্রকল্পে হচ্ছে। তিনি বলেন, এখন ঢাকা শহর ধুলায় ধূসরিত। ইআইএ থাকলে এটা কীভাবে রোধ করতে হবে তা বলা থাকত। তা মানানোও জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার দাবি মন্ত্রী–সাংসদদের

পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে অপমান করেছে বলে মন্তব্য করেছেন মন্ত্রী-সাংসদেরা। তাঁরা এ জন্য বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার দাবি তুলেছেন। একই সঙ্গে তাঁরা বলেন, একটি জাতির বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনার জন্য বিশ্বব্যাংককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী-সাংসদেরা এ দাবি করেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘বিশ্বব্যাংককে বাংলাদেশের কাছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এবং এই মামলার আসামিদের কাছে মাফ চাইতে হবে। যদি মাফ না চান, অর্থমন্ত্রীকে বলব, তিনি যেন প্রটেস্ট নোট পাঠান।’ তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। জাসদের মইন উদ্দীন খান বাদল গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলার বাদী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুললে ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তখনকার যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন।
পরে বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে অভিযোগ তুলে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। তবে এই প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ খারিজ করে শুক্রবার কানাডার আদালত বলেছেন, এই মামলায় কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি। প্রমাণ হিসেবে যেগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, সেগুলো অনুমানভিত্তিক। কানাডার আদালতের এই রায়ের পর সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিশ্বব‌্যাংকের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। গতকাল সংসদে এই বিষয়ে অনির্ধারিত আলোচনার সূচনা করেন বিরোধী দলের সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ। তিনি সরকারের কাছে পদ্মা সেতুর বিষয়ে আইনমন্ত্রীর বিবৃতি দাবি করেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তোলার জন্য বিশ্বব্যাংককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে মাফ চাইতে হবে। তিনি বলেন, ‘পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার সময় আমি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান আইনজীবী ছিলাম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা নিজেরা তদন্ত করতে চাইলে দেশের সার্বভৌমত্বের কথা উল্লেখ করে তা নাকচ করে দিই। আমার সঙ্গে মিটিং করে সেই রাতেই তাঁরা বিশ্বব্যাংকের আবাসিক পরিচালকের বাসায় কার কার সঙ্গে ডিনার করেছিলেন, তার বিস্তারিত আমার কাছে আছে।’
এ সময় সাংসদেরা নাম প্রকাশ করতে বলেন। আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বলব, সবই বলব। আমার কাছে বিস্তারিত আছে। তবে এটা নাম বলার প্ল্যাটফর্ম না। দুদকের অভিযোগপত্রে আবুল হোসেনের নাম নেই কেন জানতে চেয়েছিল বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদল। ঝগড়াই হয়ে গেল প্রায়। বললাম, তদন্তে যা বেরোয়, তা-ই হবে। হঠাৎ শুনলাম, কানাডায় মামলা হয়েছে।’ ওই ঘটনায় যাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত, তাঁদের মামলা করার পরামর্শ দিয়ে আনিসুল হক বলেন, আইনজীবীর কাছে গেলে তাঁরা বলে দেবেন মামলার অধিক্ষেত্র কোথায়। এখানে-ওখানে দুখানেই আছে। বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের কারণে রাষ্ট্রের মর্যাদাহানি হয়েছে। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা উচিত। রাষ্ট্রের মর্যাদা পুনরুদ্ধারে রাষ্ট্রীয়ভাবে মামলা করতে হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্প সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকার প্রশংসা করে ধন্যবাদ প্রস্তাব গ্রহণের কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যা করেছেন, তা-ই সঠিক। পদ্মা ব্রিজ নিয়ে যাঁরা বিদেশিদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছেন, সরকারকে হেয় করেছেন, সুনাম ক্ষুণ্ন করেছেন, তাঁরা এ দেশের শত্রু। তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই আবুল হোসেনকে দেশপ্রেমিক বলেছিলেন। অথচ সেই সময়ে সমকাল পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, দুর্নীতির অভিযোগে পদত্যাগ করা একজন মন্ত্রীকে দেশপ্রেমিক বলা হয়েছে। জনগণ বিষয়টি ভালোভাবে নেবে না।’ কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘বিশ্বব্যাংক নিজেদের কী মনে করে জানি না। আমি মনে করি, তারা এতটা শক্তিশালী নয় যে একটি স্বাধীন দেশের মানুষকে অপমান করতে পারে। কিছু লোক রিটায়ার করেন, টাকা নাড়াচাড়া করেন, নানান ধরনের কথা বলেন।
টিআইবি বলছে, বিশ্বব্যাংকের কাছে জবাবদিহি চাওয়া উচিত। কিন্তু আমরা চাইব কেন? টিআইবি, আপনারা কী করছেন? আপনারা কেন চাইছেন না? লেজ যাদের সুতায় বান্ধা, তারা ওই ধরনের চ্যালেঞ্জ রাখার সাহস রাখে না।’ মতিয়া চৌধুরী আরও বলেন, ‘ড. ইউনূস কলকাঠি নেড়েছেন। যে কারণে অন্যায়ভাবে সৈয়দ আবুল হোসেনসহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো। এত গ্লানি ও কলঙ্কের বোঝা মাথায় নিয়ে কেউ যদি আত্মহত্যা করত, আশ্চর্য হতাম না।’ আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, রাষ্ট্র, সরকার ও আওয়ামী লীগকে হেয় করার জন্য কানাডার আদালতে মামলা হয়েছিল। এদের যারা ইন্ধন দিয়েছিল, তারা বুদ্ধিজীবী না, চুক্তিজীবী। কারণ এরা বিদেশি টাকা খেয়ে বিদেশের পক্ষে কথা বলে। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি বলেন, তিনি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় মার্কিন কূটনীতিকেরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছিলেন, ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে সরানো হলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন করবে না। জাতীয় পার্টির জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, ‘পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের কথা বলা হলো। বিশ্বব্যাংকের দেশীয় দালালদের উন্মোচন করতে হবে। একজন ড. ইউনূস বা ড. কামাল নন, এদের অনেক প্রেতাত্মা আছে। এরা দেশপ্রেমিক নয়। এদের চিহ্নিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।’ সরকারি দলের সাংসদ আবদুল মান্নান বলেন, দেশের সম্মান নষ্ট করার জন্য বিশ্বব্যাংকের কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়া উচিত। সংসদে পদ্মা সেতু নিয়ে এই আলোচনা চলার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন না।

মেলায় যাওয়া হলো না ওঁদের

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচরে কাল মঙ্গলবার থেকে মেলা বসবে। গ্রামীণ মেলা। এলাকায় থাকবে উৎসবের আমেজ। এলাকার যাঁরা বাইরে থাকেন, এ সময় তাঁরা বাড়ি ফেরেন। তাঁদের ১২ জনেরও যাওয়ার কথা ছিল। এ জন্য ঢাকা থেকে ফিরছিলেন। কিন্তু মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তাঁদের সবার প্রাণ। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নরসিংদীর বেলাব উপজেলার দড়িকান্দি বাসস্ট্যান্ডে গতকাল রোববার সকালে এ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। ছাতিরচরের বাসিন্দা বাছির হারিয়েছেন চার স্বজনকে। নিহত হয়েছেন তাঁর দুই বোন হালিমা বেগম (২৫) ও ঝুমা বেগম (১৫), হালিমার স্বামী হাসান মিয়া (৩৪) ও তাঁদের ছেলে ঈশান মিয়া (৮)।
দুপুরে ভৈরব হাইওয়ে থানায় গিয়ে দেখা যায়, লাশের সারি। স্বজনেরা লাশের কাছে বসে বিলাপ করছেন। থানা চত্বরের এক পাশে বসে বিলাপ করছিলেন বাছির। স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাছির বলেন, মাইক্রোবাসে ওঠার আগে তাঁর কাছে বোনের মুঠোফোন থেকে ফোন করে ভাগনে ঈশান। আবদার করেছিল, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ছাতিরচরে যে গ্রামীণ মেলা শুরু হবে, সেখানে তাকে নিয়ে যেতে হবে। ভাগনের সে আবদার পূরণ করার আগেই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল তার প্রাণ। বাছির জানান, মাইক্রোবাসের হতাহত আরোহীরা কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ছাতিরচর গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় থাকেন। তাঁদের কেউ রিকশা চালাতেন। কেউ হকার। নারীরা বাসাবাড়িতে কাজ করতেন। ছাতিরচরে গ্রামীণ মেলা উপলক্ষে তাঁরা বাড়ি ফিরছিলেন।

মূলনীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী

১৯৫০ সালে শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি কমিটির সুপারিশের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গের রাজপথে যে তুমুল আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল, এর আগে সে রকম দেখা যায়নি। মূলনীতিতে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সুপারিশ ছিল। এর তীব্র প্রতিক্রিয়ায় স্তিমিত ভাষা আন্দোলনের পালে আবার হাওয়া লাগে। প্রতিক্রিয়া শুধু শহর ঢাকায়ই সীমাবদ্ধ ছিল না, আন্দোলন প্রদেশের বড় বড় শহরে, বিশেষ করে জেলা শহরগুলোতে প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ১৯৫০-এর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শুরু হলেও এ আন্দোলনের তীব্রতা সভা-সমাবেশ ও মিছিলে গুরুত্ব পায় অক্টোবর মাসজুড়ে এবং নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত মহাসম্মেলনে পায় এর পরিণতি।
সে পরিণতি বাস্তবিকই ঢাকার শিক্ষিত সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিবাদ সুসংগঠিত করতে তৈরি হয় ভাষা আন্দোলনের মতোই সংগ্রাম কমিটি। এ আন্দোলনের রাজনৈতিক গুরুত্ব একালে অনেকে মনে রাখেননি। অক্টোবর থেকে ৫ নভেম্বর পর্যন্ত একাধিক স্থানে অর্থাৎ পাকিস্তান অবজারভার অফিস থেকে নেতা-বিশেষের বাসভবনে একের পর এক বৈঠকে ছাত্ররাও যোগ দিয়েছে। এতে উপস্থিত দেখা গেছে মধ্যপন্থী থেকে বামপন্থী রাজনীতিক ও ছাত্র-যুব নেতাদের। তবে ৪-৫ নভেম্বর বিকেলে ঢাকা বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদী সম্মেলনে উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। আতাউর রহমান খানের সুদীর্ঘ বক্তৃতা সত্ত্বেও শ্রোতাদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়নি। বরং একটি ঘটনা আমাদের মতো অনেকের কাছে হয়ে ওঠে সরস অভিজ্ঞতা। বিষয়টি ছিল শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হককে নিয়ে বিতর্ক। সে বিতর্ক করাচিতে অনুষ্ঠিত সংবিধান সভায় তাঁর নীরব ভূমিকা নিয়ে। তাই হক সাহেব এ সম্মেলনে কিছু বলতে চাইলে কেউ কেউ পূর্বোক্ত প্রসঙ্গ তুলে আপত্তি জানালে সভায় গভীর অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। বিব্রত বোধ করেন সভাপতি আতাউর রহমান খান। কিছুক্ষণ টানাপোড়েনের পর অনেকে হক সাহেবের পক্ষে দাঁড়ান। এমনকি জহিরুদ্দিন সাহেব বলে ওঠেন,
‘লেট দ্য লায়ন স্পিক’। এ কথায় সবাই বেশ মজা পান। হক সাহেব তাঁর স্বভাবসুলভ ধারায় করাচিতে তাঁকে একরাশ আঙুর খাওয়ানোর গল্প বলে তাঁর নীরবতার কারণ ব্যাখ্যা করলে উপস্থিত সবার সশব্দ হাসিতে মেঘ কেটে যায়। হক সাহেব রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পক্ষে রীতিমতো জ্বালাময়ী বক্তৃতা করেন। এমনই হক সাহেবের রাজনীতি। আমার বিশ্বাস, মূলনীতি কমিটির প্রস্তাববিরোধী আন্দোলন একুশের ভাষা আন্দোলনের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। যেমন করেছিল দ্বিতীয় ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠনের পর লাগাতার ভাষাবিষয়ক কার্যক্রম। এ কমিটি গঠিত হয় ১১ মার্চ পালন উপলক্ষে ১৯৫০-এ। এর আহ্বায়ক আবদুল মতিন এমনটাই মনে করেন। তাঁর মতে, এ লড়াই তাঁকে একাই চালাতে হয়েছিল। এমনকি বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ১১ এপ্রিল (১৯৫১) গণপরিষদের সদস্যদের কাছে স্মারকলিপি গণপরিষদ সদস্যদের প্রভাবিত না করলেও কিছুটা ইতিবাচক ছাপ রেখেছে সেখানকার সংবাদপত্র মহলের একাংশে। এভাবে এক একটি ঘটনা বিস্ফোরক একুশের ক্ষেত্র তৈরি করে।

ফুটপাতে দলীয় কার্যালয়, দোকানপাট

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কার্যালয়। দখলদারের তালিকায় আছে অসংখ্য দোকান ও কাঁচাবাজার। ওয়ার্ডের বেশির ভাগ সড়কই ভাঙাচোরা। আছে মাদকের সমস্যা। গতকাল রোববার সরেজমিন ঘুরে এবং এলাকার বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে এ পরিস্থিতি দেখা যায়।
মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ‘এ’ থেকে ‘এইচ ব্লক’, উত্তর বিশিল, তুরাগ সিটি, গুদারাঘাট, বক্সনগর, চিড়িয়াখানা ও বোটানিক্যাল গার্ডেন এলাকা নিয়ে গঠিত উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৮ নম্বর ওয়ার্ড। ৩ দশমিক ৭৭৬ বর্গকিলোমিটারের এ ওয়ার্ডের ভোটার ৭৭ হাজার। বসবাস করেন দেড় লক্ষাধিক লোক। দেখা যায়, মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের এ ব্লকের ৩ নম্বর সড়কে ফুটপাতের ওপর গড়ে তোলা হয়েছে যুবলীগের কার্যালয়। বেশ বড় আকারের একতলা পাকা ঘর। বাইরে লেখা ‘ঢাকা মহানগর যুবলীগ, শাহ আলী থানা’। ভেতরে কয়েকজন যুবক বসে আছেন। কার্যালয়টির বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তাঁরা কোনো কথা বলতে রাজি হননি। নাম না প্রকাশের শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ১০ তলা আদর্শ টাওয়ারের নিচেই এই কার্যালয়টি কয়েক মাস আগে বানানো হয়। লোকজনের চলাচলে সমস্যা হচ্ছে আর সারাক্ষণই আবাসিক ভবনের নিচে আড্ডা জমছে। কার্যালয়ের সামনে রিকশা মেরামতের দোকান, পাশে চায়ের দোকানও বসিয়েছে তারা। একই চিত্র মিরপুর-১ নম্বর পানির পাম্পের সামনের ফুটপাতে। সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ ৯৩ নম্বর ওয়ার্ডের কার্যালয়। বাইরে বেশ বড় সাইনবোর্ড টানানো। ফুটপাতে কার্যালয় থাকায় পথচারীরা সড়কে নেমে হাঁটছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ফুটপাতে কার্যালয় থাকা ঠিক নয়। তবে এই কার্যালয়টি বহু বছর ধরে এখানে। ওয়াসার পাম্প থেকে লরিতে করে কিছুক্ষণ পরপর পানি নেওয়া হয় বলে এখানকার ফুটপাত খুব একটা ব্যবহার হয় না। ওয়ার্ডের সনি সিনেমা হল থেকে চিড়িয়াখানা ঢাল পর্যন্ত সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য দোকানপাট ও কাঁচা বাজার। দেখা যায়, মিরপুর-১ নম্বর সেকশনের ঈদগাহের সামনের মূল সড়কের ওপর বসেছে অস্থায়ী বাজার।
এর মধ্যে ভ্যানগাড়ির ওপর ভাসমান কিছু দোকান যেমন আছে, তেমনি আছে সড়কের ফুটপাত দখল করে বসানো স্থায়ী অস্থায়ী দোকান। দোকানদার ও বাজার করতে আসা ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন সকাল সাতটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত এ বাজার বসে। তবে স্থায়ী দোকানগুলো সারা দিনই থাকে। গত বছর বাজারটি উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এর কয়েক দিন পরেই আবার বাজারটি বসে যায়। ওয়ার্ডের সড়কগুলো ভাঙাচোরা। তবে গতকাল দেখা যায়, বেশ কিছু সড়কের সংস্কারকাজ চলছে। পানিনিষ্কাশনের বড় বড় পাইপ বসানো হচ্ছে। ২০১৫ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর থেকে ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি সড়ক সংস্কার করা হয়েছে বলে এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। ওয়ার্ডের তুরাগ সিটি প্রিয়াঙ্কা হাউজিং সোসাইটিতে প্রায় ১৫ হাজার লোকের বাস। কিন্তু এ হাউজিংয়ে প্রবেশপথ এবং ভেতরের প্রতিটি সড়ক এখনো বালি-মাটির তৈরি। সড়কে পিচ ঢালাই তো বহুদূর, ইট বিছানোও হয়নি। দেখা যায়, প্রিয়াঙ্কা হাউজিং থেকে মিরপুর-১ নম্বরে যাতায়াতের প্রধান সড়কটি শুরু হয়েছে এ-ব্লকের ৫ নম্বর সড়কের শেষ প্রান্ত থেকে। ৫ নম্বর সড়কের শেষ মাথা থেকেই আর কোনো যানবাহন চলে না। ফলে হাউজিংয়ের বাসিন্দাদের প্রতিনিয়ত চলাচলে পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। তবে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সড়কগুলোতে পানিনিষ্কাশনের পাইপ বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। ওয়ার্ডের অন্তত ১০ জন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, এ ওয়ার্ডে মাদক বড় সমস্যা। আর মাদকের এ ব্যবসা মূলত গুদারাঘাট এলাকাকেন্দ্রিক। গুদারাঘাট এলাকার বস্তিগুলোতে চলে মাদকের ব্যবসা। মাদকবিষয়ক চাঁদা আদায়-সংক্রান্ত ঝামেলায় পুলিশের শাহ আলী থানার সোর্স গত বছর গুদারাঘাটের এইচ ব্লকের বস্তির চা-দোকানি বাবুল মাতবরকে জ্বলন্ত চুলার ওপর ফেলে দেওয়া হয়। মারা যান বাবুল।

ফুটপাতে দলীয় কার্যালয় দৃষ্টিকটু

২০১৫ সালের এপ্রিলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী কাজী টিপু সুলতান। গতকাল রোববার ওয়ার্ডের বিভিন্ন বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন তিনি। টিপু সুলতান বলেন, ‘ফুটপাতের ওপরে যুবলীগের কার্যালয়টি খুব দৃষ্টিকটু লাগে। এলাকার বাসিন্দাদের বিষয়টি নিয়ে আপত্তি আছে। একাধিকবার যুবলীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছি।
তারা নতুন কার্যালয় খুঁজছে। তখন ফুটপাত থেকে কার্যালয়টি সরিয়ে নেবে। ফুটপাত দখলমুক্ত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের তারিখ নেওয়া হচ্ছে।’ কাউন্সিলর বলেন, ওয়ার্ডে ভাঙা রাস্তায় বাসিন্দাদের সমস্যা ছিল। বর্তমানে ওয়ার্ডের অধিকাংশ সড়ক সংস্কার শুরু হয়েছে। এ বছরের সংস্কারকাজ শেষ হলে রাস্তার সমস্যা সিংহভাগ কমে যাবে। ওয়ার্ডের নবাবের বাগ, গড়ান চটবাড়ি এলাকাগুলোতে উন্নয়নকাজ চলছে, যা আগে কখনোই হয়নি।
তিনি বলেন, সড়কগুলোতে শতভাগ সড়কবাতির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। রূপনগর খালের কারণে রাইনখোলা ও চিড়িয়াখানার ঢালে জলাবদ্ধতার সমস্যা আছে। গুদারাঘাট এলাকাটি ঘিঞ্জি ও বস্তি হওয়ায় সেখানে মাদকের ব্যবসা হচ্ছে। গুদারাঘাট এলাকার সড়কগুলো প্রশস্ত করা হচ্ছে। সেখান সড়কবাতি লাগানো হয়েছে।

আলুবাজারের বাজনদারেরা

টুপিতে রঙিন পালক। গায়ে রাজকীয় পোশাক। বাদ্য বাজিয়ে সারি বেঁধে এগিয়ে যাচ্ছে একটি দল। কর্নেটে বাজছে সুর, ‘মালকা বানুর দেশে রে, বিয়ার বাদ্যবালা বাজে রে...।’ সঙ্গে ড্রামের দ্রিমদ্রিম, করতালের ঝমঝমানি আর ট্রাম্পেটের পোঁ পোঁ আওয়াজ। গমগম করছে পুরো রাস্তা। বাজনদারদের দেখতে ছুটে আসছে ছেলের দল। বারান্দা থেকে উঁকি দিচ্ছেন বউ-ঝিরা। কায়েতটুলীর বাসিন্দা পারভীন হকের স্মৃতিতে এভাবেই ধরা দেয় ঢাকার বাজনদারেরা, যাঁদের পোশাকি নাম ব্যান্ড পার্টি। পারভীন বলেন, ঢাকার রাস্তায় বছর তিরিশেক আগেও নিয়মিত এদের দেখা যেত। ব্যান্ড পার্টি ছাড়া পুরোনো ঢাকার বিয়ে ভাবাই যেত না। মুসলমানি (সুন্নতে খতনা), কান ফোঁড়ানোর আয়োজনেও ব্যান্ড পার্টির ডাক পড়ত। এখন আর সেই চল প্রায় নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানে ব্যান্ড পার্টি এখন খুব কমই চোখে পড়ে। ঢাকায় ব্যান্ড পার্টির ইতিহাস বেশ পুরোনো। এখানকার ছিল নবাবদের নিজস্ব বাদকদল। নাজির হোসেনের কিংবদন্তীর ঢাকায় বলা আছে,
বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলে ঢাকার আলুবাজারে বাদক দলের আগমন। নাজির বলেছেন, ‘বাদক দলের প্রয়োজন হলে আল্লুর বাজার যেতেই হতো। আজ হয়তো অন্যান্য মহল্লায় বাদক দল দেখা যায়। তবে আল্লুর বাজার মহল্লার বাদক দলই ঢাকার আদি বাদক দল।’ আলুবাজারে এখন টিকে থাকা ব্যান্ড পার্টির সংখ্যা চারটি। এলাকার বাসিন্দারা বলেন, বছর পনেরো আগেও এই সংখ্যাটা ছিল দ্বিগুণ। এখানকার সবচেয়ে পুরোনো বাদক দল বাংলাদেশ ব্যান্ড পার্টি। গত শনিবার গিয়ে দেখা যায়, স্যাক্সোফোন, ছোট-বড় ড্রাম, বাঁশিসহ সব বাদ্যযন্ত্র অলস পড়ে আছে। ব্যান্ডটির কর্ণধার মো. ইব্রাহিম। তাঁরা তিন পুরুষের বাজনদার। বাবা মাস্টার কালু মিয়ার সময় জনপ্রিয়তা পায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে মূল ব্যবসা তাঁর দাদার। বাদক দলটির পুরোনো সদস্য, কর্নেট বাদক মো. হুরমায়ূন বলেন, এই ব্যান্ড পার্টির বয়স প্রায় ১০০ বছর। হুদমায়ূন তাঁর খালাতো ভাইয়ের কাছে শিখে শখের বশে এই দলের সঙ্গে ঘুরতেন। এরপর এটাই তাঁর পেশা হয়ে যায়। ‘কাজটা করে আনন্দ পান?’ হুদমায়ূনের জবাব শুনে ধাক্কা লাগে, ‘আনন্দ পাই না, আনন্দ দেই। কষ্ট পাই।’ বললেন, কর্নেট-ট্রাম্পেট বাজানো খুব পরিশ্রমের কাজ। খুব জোর দিয়ে ফুঁ দিতে হয়। ধাতব বাঁশিতে দাঁত নষ্ট হয়ে যায়। এই বাঁশিবাদকদের শ্বাসকষ্ট-হৃদ্রোগ খুব স্বাভাবিক ঘটনা। নিজেও ভুগছেন। বাংলাদেশ ব্যান্ড পার্টির সদস্য ৪০ জনের মতো।
কিন্তু প্রায় সবাইকেই পাশাপাশি অন্য কোনো কাজ করতে হয়। হুজমায়ূন বলেন, আগে এই কাজ করে চলা যেত। এখন কেউ চলতে পারে না। ‘সিজনে’ সপ্তাহে গড়ে তিন দিন কাজ থাকে। বাকি চার দিন বসে খেতে হয়। যে আয় তাতে পোষায় না। আলুবাজারের নিউ ন্যাশনাল ব্যান্ড পার্টির স্বত্বাধিকারী মো. রিয়াজ বললেন, শুধু ব্যান্ড পার্টি নিয়েও এখন আর চলে না। তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে এখন ঢোল, পালকি, ঘোড়ার গাড়িও ভাড়া দেওয়া হয়। তিনি বলেন, পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন—এই তিন মাস ব্যবসার মৌসুম। শুধু এর ওপর নির্ভর করে চলে না। মূলত পুরোনো শিল্পীরাই ব্যবসা ধরে রেখেছেন। নতুনেরা কেউ আর এই পেশায় আসছেন না। এলাকার বাকি দুটো ব্যান্ড পার্টি, ঢাকা ব্যান্ড পার্টি ও ন্যাশনাল ব্যান্ড পার্টির চিত্রটাও এক। ব্যান্ড পার্টিগুলোতে চিকন কালো ক্ল্যারিওনেট এবং থলের মতো ব্যাগপাইপ বাজানোর মতো শিল্পী নেই। যাঁরা বাজাতে জানতেন, তাঁরা বেঁচে নেই। হুেমায়ূন-রিয়াজ দুজনই বললেন, আর ২০-২৫ বছর পর আলুবাজারের ব্যান্ডগুলো হয়তো আর থাকবে না।

মাংসের দোকান ৬ দিন বন্ধ রাখার ঘোষণা

গাবতলী পশুর হাটে অতিরিক্ত খাজনা আদায় বন্ধসহ চার দফা দাবিতে আজ সোমবার থেকে আগামী শনিবার পর্যন্ত ছয় দিনের ধর্মঘট ডেকেছে মাংস ব্যবসায়ী সমিতি। এই ছয় দিন তারা মাংস বিক্রি না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গতকাল রোববার সকাল ১০টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে এ ঘোষণা দেন সমিতির নেতারা। বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতি ও ঢাকা মেট্রোপলিটন মাংস ব্যবসায়ী সমিতি যৌথভাবে এই মানববন্ধনের আয়োজন করে। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আট মাস ধরে গাবতলী পশুর হাটে মাংস ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করছেন হাটের ইজারাদার। কেউ প্রতিবাদ করলে তাঁকে নির্যাতন করা হয়। বিষয়টি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে (ডিএনসিসি) একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বক্তারা বলেন, সীমান্ত থেকে গাবতলী পর্যন্ত একটি গরু আনতে পথে পথে চাঁদা দিতে হয়।
পরে গাবতলীতে আদায় করা হয় অতিরিক্ত খাজনা। এতেই মাংসের দাম দিনে দিনে বাড়ছে। অথচ চাঁদাবাজি বন্ধ হলে আরও কম টাকায় মাংস বিক্রি করা সম্ভব। জানতে চাইলে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির মহাসচিব রবিউল আলম বলেন, গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের প্রমাণ নিয়ে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছেন মাংস ব্যবসায়ীরা। কিন্তু আজ পর্যন্ত তা তদন্ত করেনি ডিএনসিসি। ব্যবসায়ীদের কোনো মতামতও নেওয়া হয়নি। রহস্যজনকভাবে তা স্থগিত আছে। তাই এই ধর্মঘট ঘোষণা করা হয়। আগামী সাত দিনের মধ্যে এই সমস্যার সমাধান না হলে সারা দেশে ধর্মঘট ডাকতে বাধ্য হবেন ব্যবসায়ীরা। বিষয়টি সম্পর্কে জানতে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মেসবাউল ইসলাম ও প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা আমিনুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তাঁকে পাওয়া যায়নি।

দুই সপ্তাহ পর বিয়ের পিঁড়িতে বসতেন আসিফ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে বছর খানেক আগে চাকরিজীবন শুরু করেছিলেন আসিফ মাহমুদ ওরফে শোভন (২৮)। সব ঠিকঠাক চলছিল। ২৪ ফেব্রুয়ারি বিয়েও ঠিক হয়েছিল তাঁর। কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘটনায় এলোমেলো হয়ে গেছে সব। মোটরসাইকেলে করে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল যাওয়ার পথে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকায় গতকাল রোববার ট্রাকের ধাক্কায় নিহত হন আসিফ। গত শনিবার অফিসের কাজে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। স্বজনেরা জানান, আসিফের বাবা আখতার হামিদ ও মা আফরোজা খানম সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। দুজনেই এখন অবসরপ্রাপ্ত। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে আসিফ সবার ছোট।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ৩৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার হিসেবে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে যোগ দেন। কর্মরত ছিলেন টাঙ্গাইলে ব্যাংকটির সখীপুর শাখায়। রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় বাসা থাকলেও আখতার ও আফরোজা দম্পতি ছোট ছেলে আসিফের সঙ্গে সখীপুরেই থাকেন। আসিফের বন্ধু নকিবুল হাসান বলেন, আসিফ জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলেছেন। সেখান থেকে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলেন খেলতে। আসিফের আরেক বন্ধু তাহের মাহমুদ বলেন, আসিফের লাশ শেওড়াপাড়ার বাসায় নেওয়ার পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে সেখানকার পরিবেশ। জানাজা শেষে আসিফকে মিরপুর কবরস্থানে দাফন করা হবে।

৫৫ বছরে পূর্ণিমা স্ন্যাকস

গরম স্বচ্ছ তেলে হাত ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছাড়া হচ্ছে ময়দা-বেসনের মিশ্রণ। তেলে পড়তেই জিলাপি হয়ে ভেসে উঠছে সেগুলো। তেল ঝরিয়ে চিনির শিরায় কয়েক মুহূর্ত, তারপর সরাসরি প্লেট থেকে মুখে চালান। সোনালি-বাদামি জিলাপিগুলো বাইরে মচমচে আর ভেতরে রসে টসটসে। নিউ পূর্ণিমা স্ন্যাকস বারে এই জিলাপির কদর ক্রেতাদের কাছে সবচেয়ে বেশি। আঙুলের মতো চওড়া বলে মুখে মুখে নাম হয়ে গেছে ‘মোটা জিলাপি’। দোকানটির মালিকদের একজন শেখ মঈনউদ্দিন বললেন, ১৯৬২ সালে তাঁর বাবা শেখ আমিনউদ্দিন দোকানটি চালু করেন। তখন ঢাকায় জিলাপি তেমন পাওয়া যেত না।
ভারতের নাগপুরে ছেলেবেলা কাটানো তাঁর বাবা সেখানকার হালুইকরদের মতো করে মোটা জিলাপি বিক্রি শুরু করেন। অল্প সময়েই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে সেই জিলাপি। এখনো মোটা জিলাপি বলতে লোকে পূর্ণিমার জিলাপিকেই বোঝে। ৫৫ বছর ধরে ১৮ নম্বর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের ঠিকানায় টিকে আছে নিউ পূর্ণিমা স্ন্যাকস বার। ৮৬ বছর বয়সী শেখ আমিনউদ্দিন এখনো প্রতিদিন দোকানে আসেন। তবে তাঁর তিন ছেলে মিলে এখন বেচাবিক্রি সামলান। মেজ ছেলে মঈনউদ্দিন বলেন, শুরু থেকেই তাঁদের কলিজা শিঙাড়া, ডিম চপ, শামি কাবাব বন, চিকেন ফ্রাই, সমুচা, প্যাটিস ঢাকাবাসীর পছন্দের তালিকায় চলে আসে। বললেন, ‘তখন তো বার্গারটার্গার কেউ চিনত না। এখানকার শামি বনই তখন ছিল আধুনিক। খুব বিক্রি হতো।’ এত বছরেও তাঁদের খাবারের তালিকায় তেমন রদবদল হয়নি।
শুরুর দিকের পদগুলোই এখনো বিক্রি হচ্ছে। এক বিক্রেতা বললেন, এখানকার জিনিসপত্রের দাম কম, স্বাদও মন্দ নয়। এ কারণে সবাই পূর্ণিমাতে আসেন। এই দোকানের উল্টো দিকেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়। এ কারণে সারা দিন সেখানে লোকজন থাকে। এসব লোকজনও পূর্ণিমার ক্রেতা। তবে আশপাশের অফিসগুলোর কর্মীরা এখানকার খাবারের মূল খদ্দের। সারা দিনই ভিড় লেগে থাকে তাঁদের। ব্যাংকার আবদুল হালিম প্রতিদিন মধ্যদুপুরের নাশতা সারতে এখানে আসেন। বললেন, ‘এদের কলিজার শিঙাড়া আর জিলাপি খুব ভালো। দামেও সস্তা। ১০ টাকায় নাশতা হয়ে যায়।’ প্রতিদিন সকাল নয়টা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। খাবারের তালিকায় আছে ১৪-১৫ ধরনের নাশতা। দাম ৫ থেকে ৮০ টাকা। আর পূর্ণিমার জিলাপি প্রতি কেজি ১৪০ টাকা। জিলাপি, শিঙাড়া, সমুচা, চিকেন ফ্রাই—এই চার পদ সারা দিনই পাওয়া যায়।

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে হবে

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে আনসার-ভিডিপির সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘মানুষের ভেতরে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং এই সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধ করে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখায় বিশেষ ভূমিকা আপনারা রাখবেন, সেটাই আমরা চাই।...যেন আমাদের ছেলেমেয়েরা মাদকাসক্তি এবং জঙ্গিবাদে না জড়ায়, এ ব্যাপারে আপনাদের একটা ভূমিকা রাখতে হবে।’ টাঙ্গাইলের সফিপুর আনসার একাডেমিতে গতকাল রোববার বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৩৭তম জাতীয় সমাবেশ-২০১৭ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ শুধু বাংলাদেশের নয়, সারা বিশ্বের সমস্যা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আনসার-ভিডিপির সদস্যদের মধ্যে যাঁরা গ্রাম-গঞ্জে থাকেন, তাঁরা সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদকাসক্তি ও মাদক পাচারে জড়িত ব্যক্তিদের সচেতন করে তুলতে পারেন। জাতির ক্রান্তিকালে আনসার বাহিনীর সদস্যদের বলিষ্ঠ ভূমিকা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দেশে যখন কোনো সমস্যা দেখা দেয়, আনসার বাহিনীর সদস্যরা তখন সেই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি নির্বাচনেই আপনারা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় আপনাদের ভূমিকা অপরিসীম। বিশেষ করে শিল্প-কলকারখানা, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় অর্ধলক্ষাধিক আনসার সদস্য সব সময় উপস্থিত থেকে দেশের অর্থনীতির চাকা নিরাপদ ও গতিশীল রেখেছেন।
বিমানবন্দর নিরাপত্তায় গঠিত “অ্যাভিয়েশন সিকিউরিটি”তে এই আনসার বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক পাড়া থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন আনসার বাহিনীর সদস্যরা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরাপত্তার জন্য আজকাল আনসার বাহিনীকেই নিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।’ শেখ হাসিনা বলেন, সারা দেশে ২৪টি ব্যাটালিয়নে মোতায়েন করা সদস্য পুলিশ, র্যা ব, বিজিবি ও ডিজিএফআইয়ের সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবন, নির্বাচন কমিশন ও সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে আনসার বাহিনী।’ দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্বে এখন বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা নিম্নমধ্যবিত্তের দেশে উন্নীত হয়েছি। প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ১ ভাগে উন্নীত হয়েছে। রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।’ এর আগে একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্রসচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ এবং আনসার ও ভিডিপির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মিজানুর রহমান খান।

কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়ার জীবনাবসান

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য ও শ্রমিক নেতা কমরেড হাফিজুর রহমান ভূঁইয়া (৭৩) গতকাল রোববার দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি স্ত্রী, এক মেয়ে, দুই ছেলে, নাতি-নাতনিসহ অনেক আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য হাফিজুর রহমানের মরদেহ আজ সোমবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত রাজধানীর তোপখানা রোডে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ের সামনে এবং কাল মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত খুলনার হাদিস পার্কে রাখা হবে।
জানাজা শেষে ফুলতলা উপজেলা সরকারি কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হবে। ১৯৬০-৬১ সালে দৌলতপুর বিএল কলেজে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদানের মাধ্যমে হাফিজুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়ার কারণে সরকারের রোষানলে পড়ে বহুবার তাঁকে কারাভোগ করতে হয়েছে। বিজ্ঞপ্তি

রাঙামাটি পাবলিক কলেজের ভবন নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধন

রাঙামাটি পাবলিক কলেজের একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। গতকাল রোববার সকাল ১০টায় রাঙামাটি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে একাত্মতা ঘোষণা করেন অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার, রাঙামাটি পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ মো. তাছাদ্দিক হোসেন, রাঙামাটির পৌর মেয়র মো. আকবর হোসেন চৌধুরী, রাঙামাটি চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. বেলায়েত হোসেন, রাঙামাটি পাবলিক কলেজের প্রভাষক মো. আদনান হোসেন, রাঙামাটি বাস মালিক সমিতির সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান, সুশীল প্রসাদ চাকমা প্রমুখ। মানববন্ধন শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

হল থেকে মাদক, অস্ত্রসহ সাত বহিরাগত আটক

মাদক, দেশীয় অস্ত্র এবং ককটেল তৈরির উপকরণসহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হল থেকে বহিরাগত সাতজনকে আটক করা হয়েছে। রোববার রাত সাড়ে ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত পুলিশের সহযোগিতায় হল প্রশাসন অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করে। ওই বহিরাগতরা হলেন লিমন দাড়িয়া, মো. সানি, মো. রিয়াজ, মো. টিটন, তপু, ইমন হোসেন এবং সজীব। তাঁদের শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়েছে। অভিযানের পর হলের চারটি কক্ষ সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। হলের ৩১৩ ও ৩১৪ নম্বর কক্ষ থেকে অস্ত্র-মাদকসহ ওই সাতজনকে আটক করা হয়। ৩১৫ নম্বর কক্ষ থেকে কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এই কক্ষে ওই হল শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরেফিন সিদ্দিক থাকতেন।
সাতজনকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এএসএম মাসুদ কামাল বলেন, রোববার অস্ত্রসহ কাশেম নামের এক ব্যক্তিকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে ওয়ারি থানা-পুলিশ। কাশেমকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ জানতে পারে, তিনি বহিরাগত হিসেবে সূর্যসেন হলে থাকেন। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ওয়ারি থানা থেকে শাহবাগ থানায় জানানো হয়। পরে পুলিশের সহযোগিতায় হল প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ওই সাতজনকে আটক করে। এ সময় কক্ষগুলো থেকে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক, ককটেল তৈরির উপকরণ, চাইনিজ কুড়াল, রাম দা এবং লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়। পরে চারটি কক্ষ সিলগালা করে দেওয়া হয়।

সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে ইউপি ভবন দখল

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের মাধবপুর এলাকায় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভবন ও জমি দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই ব্যক্তির নাম মো. হানিফউল্লাহ (৫০)। তিনি পটুয়াখালী কৃষি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে ওই ইউপি ভবন ও জমি দখল করে নিয়েছেন বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ। স্থানীয় লোকজন, ইউপি চেয়ারম্যানের কার্যালয় ও অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬১ সালের ৮ আগস্ট স্থানীয় উপেন্দ্র লাল ওঝার কাছ থেকে ৪৫ শতাংশ জমি আদাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের নামে দলিল করা হয়।
এরপর থেকে ওই জমিতে নির্মাণ করা হয় একটি আধা পাকা টিনশেড ঘর। ওই ঘরটিতেই চলে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম। ২০১৫ সালের শেষের দিকে সরকারিভাবে একই ইউনিয়নের মিলঘর এলাকায় আরও একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। সেই থেকে নতুন ভবনে চলে ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম। আর সেই সুযোগে ২০১৬ সালের শুরুর দিকে পুরোনো ইউপি ভবনসহ ৪৫ শতাংশ জমি দখল করে নেন হানিফউল্লাহ নামের প্রভাবশালী স্থানীয় ওই ব্যক্তি। সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটির সামনে পটুয়াখালী কৃষি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড রয়েছে। তবে ভবনটি তালাবদ্ধ। ভেতরে কিছু চেয়ার ও বেঞ্চ দেখা যায়। ওই সময়ে আশপাশে কোনো শিক্ষার্থী কিংবা কোনো শিক্ষক পাওয়া যায়নি। ওই ভবনের দক্ষিণ পাশে আরেকটি টিনশেড ঘরের একটি কক্ষে বসে কম্পিউটারে কাজ করছিলেন দুই ব্যক্তি। তাঁদের একজন ওই প্রতিষ্ঠানের সাহায্যকারী পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমার নাম মো. মাসুম (৩০)। সেমিস্টার পরীক্ষা চলছে এ জন্য এখানে কেউ নেই।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের নাম মো. হানিফউল্লাহ। খবর পেয়ে সেখানে উপস্থিত হন হানিফউল্লাহ। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে ইউনিয়ন পরিষদের কোনো জমি নেই। তবে পরিষদের পুরোনো একটি আধা পাকা টিনশেড ঘর আছে। তা আমি বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান সাহেবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মেরামত করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চালাচ্ছি।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
‘আমি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা এবং দেখাশোনা করি।’ আবদুস সালাম হাওলাদার নামের এক ব্যক্তি বলেন, প্রায় এক বছর আগে তিনি (হানিফউল্লাহ) ইউপি ভবনসংলগ্ন গ্রাম্য আদালতের সাইনবোর্ডটি মুছে সেখানে পটুয়াখালী কৃষি ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউটের নাম লিখে দেন এবং জমি দখল করে নেন। আদাবাড়িয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে কৌশলে হানিফউল্লাহ ওই জমি দখল করে নিয়েছেন।’ তিনি ওই জমি উদ্ধারের জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এ বিষয়ে আদাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মো. সামসুল হক ফকির বলেন, ‘কাউকে ইউপি ভবন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি। ভবনটি দখলের বিষয়ে আমি শুনেছি। উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

গোপনীয়তা রক্ষা ও আইন ভঙ্গের ‘ঐক্য’ নয়

আমরা দুঃখের সঙ্গে লক্ষ করছি, সমাজের দায়িত্বশীলেরা যদি ঐক্য করে আইন থেকে বিচ্যুত হন, তাহলেও সেটা গণতান্ত্রিক বলে চালানোর চেষ্টা চলে। অনুসন্ধান কমিটির গোপনীয়তা রক্ষা ও নির্বাচন কমিশনের বিলম্বিত শপথ অনুষ্ঠান নিয়ে আমরা সেই রকম চেষ্টার অনুশীলন লক্ষ করছি। আশা করেছিলাম সমাজে একটা দাবি উঠবে যে নির্বাচন কমিশন হয়েছে যেভাবে, অন্যান্য সাংবিধানিক পদধারীদের নিয়োগ হবে সেভাবে। যদিও অনুসন্ধান কমিটি গোপনীয়তা রক্ষা করে প্রমাণ করেছে যে তারা রাজনীতিকদের বিনা অনুমতিতে গোপনীয়তা রক্ষাবিষয়ক অচলায়তন ভেঙে দিতে রাজি নয়।
তবে এবার যেটা প্রমাণ হলো, সেটা হলো আমরা যদি গোপনীয়তার দুর্গে আঘাত হানতে পারি, তাহলে রাষ্ট্র গঠনে আমরা কিছুটা অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারি। তবে সে জন্য সবার আগে যেটা বুঝতে হবে সেটা হলো, শাসকগোষ্ঠীর (সরকারি ও বিরোধী শিবির) ঐক্য এখনো দৃঢ়। এই দৃঢ়তার কাছে অনুসন্ধান কমিটি মাথা নত করেছে। সুতরাং অনুসন্ধান কমিটির সদস্যদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও বলতে হবে, তাঁরা দলগুলোর তালিকা ও শর্ট লিস্টেড ইসি সদস্যদের নামের গোপনীয়তা বজায় রেখে আইন ভেঙেছেন। আর সে জন্য তাঁদের দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। জনস্বার্থকে জিতিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁদের এই ত্যাগ স্বীকার করাটা জরুরি। তাঁরা যদি এটা স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান যে ২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন তাঁরা ভঙ্গ করেননি, তাহলে তার থেকে বেশি পরিহাসের আর কিছুই হতে পারে না। জনগণ শান্তি চায়।
এ কারণে দুই বড় দল যখনই কোনো বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বলে একটা ধারণা জন্মে , তখনই মানুষ ভাবে এই বুঝি একটু শান্তির সম্ভাবনা বাড়ল। কিন্তু শাসনগত (প্রধানত অপশাসন) প্রশ্নে এই দুই দলের মধ্যে ঐক্য অটুট, এবারও তা অক্ষুণ্ন থেকেছে। বিএনপির আক্ষেপ সম্ভবত শুধু এই কারণে যে, রাষ্ট্র পরিচালনায় যেভাবে যা আওয়ামী লীগ করতে পারে, সেটা কেন তারা করতে পারে না। তারা নির্বাচন চায়, শুধু ওইভাবে করাটা করতে পারার জন্য। তারাও সুশাসন দেওয়ার কথা বলে তবে সেটার চেহারা দেখতে গেলে ওকে ক্ষমতায় নিতে হবে। এ কারণে মাত্র পাঁচজন সাংবিধানিক পদধারীর জন্য এত হুলুস্থুল ঘটার মধ্যে একই সংবিধানের আওতায় আটজন সাংবিধানিক পদধারী গতকাল রোববার শপথ নিলেন, অথচ এসব নিয়োগ নিয়ে টুঁ শব্দটি উঠল না। তাঁদের বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে কেউ কোনো কথা তুলল না। অথচ নতুন কমিশন সংবিধানের অধীনে যে শপথবাক্য পাঠ করবেন, সেই শপথ তাঁরাও পড়বেন। কোনো দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনেরও ফারাক নেই। ইসি নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। এই আটজনেরও নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। উচ্চ আদালতের বিচারকেরা যেভাবে, সেই একইভাবে ইসি সদস্যরাও অপসারিত হবেন। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে সিইসির পদমর্যাদা আপিল বিভাগের বিচারপতিদের এবং নির্বাচন কমিশনারদের পদমর্যাদা হাইকোর্টের বিচারপতিদের সমান।
অথচ গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিবেচনায় বিচারপতিদের অবস্থান আরও অনেক উঁচুতে হওয়াই সংগত। কিন্তু আমরা কী দেখলাম। আটজন বিচারকের স্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় গাছের পাতাটিও নড়ল না। দুই বছর আগে ১০ বিচারককে অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে একজন মারা গেছেন। আর একজনকে স্থায়ী করা হয়নি। কেন করা হয়নি তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। সেটা কেউ দেবে না। কারণ আমাদের কোনো কার্যকর নাগরিক সমাজও নেই, যারা এ বিষয়ে উদ্বেগ অনুভব করবে। ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে হাঁ করে থাকা বিএনপি নামের একটি দল যথারীতি নীরব। ইসি গঠন পরবর্তী বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘শেষ মুহূর্তে রুদ্ধশ্বাস দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণ অনেক সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।’ কিন্তু এই আটজনের বিষয়ে তাঁদের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই! এ কারণে জনগণকে বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বুঝতে হবে, তাদের সামনে এমন কিছু কাজ জমে আছে, যে বিষয়ে কেবল তাদেরই মুখ খুলতে হবে। তাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়ে সোচ্চার হতে হবে। তাদের বুঝতে হবে, জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কীভাবে ‘গণতন্ত্র ও সুশাসন’ প্রতিষ্ঠা বলতে শুধু নির্বাচনসর্বস্ব একটি ব্যবস্থা হিসেবেই ধারণা দিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। কারণ তারা রুগ্‌ণ হয়ে পড়েছে। বিএনপি নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে যে লিখিত বিবৃতি দিয়েছে,
তাতে রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে তাদের অত্যন্ত ক্রূর দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তারা তাদের চরিত্র অনুযায়ী বলেছে, ‘একমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের নীতিতে তারা বিশ্বাসী।’ সত্যিই ‘একমাত্র নির্বাচন’ই তাদের ধ্যানজ্ঞান। কারণ নির্বাচনই ÿক্ষমতা দিতে পারে। তারা বলেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের কারণেই ‘সৃষ্টি হয়েছে গভীর জাতীয় সংকট’। এই দাবি বহুলাংশে অসত্য। বরং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ পদ্ধতিগতভাবে বাকি রাখার কারণেই শাসন-সংকট আজ গভীরতর হয়েছে। বিএনপি তার তালিকার গোপনীয়তা বজায় রাখলেও এখন উল্টো সরকারকে দোষারোপ করছে। তাই বলি তরুণদের যা বুঝতে হবে তা হলো, শাসনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকা (বিএনপি ও আওয়ামী লীগ যে যখন যে অবস্থায় থাকুক) ব্যক্তি ও গোষ্ঠী গোপনীয়তা বজায় রাখতে আগ্রহী। অনুসন্ধান কমিটিও সেই বৃত্ত ভাঙতে পারেনি। আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র এক ঝাঁক আমলাকেই শ্রেষ্ঠ মেনেছে। যেমন বিএনপির তালিকায় মাহবুব তালুকদার ও ড. তোফায়েল আহমেদের নাম ছিল। এই আমলা রাষ্ট্র একজন আমলাকেই পরম বন্ধু মনে করেছে। অনুসন্ধান কমিটি কাদের নিয়ে হবে বিএনপি সেখানে কিন্তু আমলা রাষ্ট্রের প্রতিভূ সাবেক আমলাদেরই দেখতে চেয়েছিল।
আমরা তথ্য অধিকার আইনে অনুসন্ধান কমিটির কাছে দরখাস্ত করেছিলাম এই আশায় যে বিষয়টি অন্তত কমিটির বৈঠকে তোলা হবে। মন্ত্রিসভা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে আমি সেই অনুরোধ করেছিলাম, কিন্তু সেটা ঘটেছে বলে জানা যায় না। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আমাকে বলেছিলেন, সার্চ কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে গোপনীয়তা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর এখন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম নিশ্চিত করছেন যে রাজনৈতিক দলগুলো গোপনীয়তা বজায় রাখতে চেয়েছে বলে তাঁরাও গোপনীয়তা বজায় রেখেছেন। এতে ধারণা করা যায়, অনুসন্ধান কমিটি ২০০৯ সালের আইন কী বলে সেটা খতিয়ে দেখেনি। দলগুলোর কথামতো গোপনীয়তা বজায় রেখে অনুসন্ধান কমিটি বদিউল আলম মজুমদার বনাম তথ্য কমিশন মামলায় হাইকোর্টের রায় অগ্রাহ্য করেছে বলে প্রতীয়মান হয়। তবে আক্ষেপ হলো দায়িত্বশীলেরা আইন মানবেন না, কিন্তু তার প্রতিকার আমরা মামলা লড়ে আদায় করব, এই সংস্কৃতি তো আরও ভয়ংকর। আইনের শাসন আমরা চাই কারণ তা বৃহত্তর জনস্বার্থ রক্ষা  করে। শর্ট লিস্টেড করার দিনেই যদি নামগুলো প্রকাশ করা হতো, তাহলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু সেই ঝুঁকি কেউ নিতে চায়নি। অনুসন্ধান কমিটি সংসদ ও আদালতের আইনের বিপক্ষে গিয়ে রাষ্ট্রকে সুরক্ষা দিয়েছে। এবারের বাছাই-প্রক্রিয়ায় কোনো বিষয়কে যদি সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক হিসেবে বিবেচনা করতে হয়, তবে তা হচ্ছে এই গোপনীয়তা। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী মো. এজাহারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২০১৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ওই মামলায় যে রায় দিয়েছিলেন, সম্প্রতি তার পূর্ণ বিবরণ বেরিয়েছে। আমরা জানি,
অনুসন্ধান কমিটিকে দলগুলো গোপনীয়তা রক্ষা করতে কোনো চিঠি দেয়নি। তাই অবস্থাটি যা দাঁড়াল, তা আমরা হাইকোর্টের ওই রায়ে উল্লিখিত পর্যবেক্ষণের আলোকে বলতে পারি: ‘রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা তাদের আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত হিসাবের তথ্য “গোপনীয়” বলেনি। অথচ সেই তথ্য যখন চাওয়া হলো, তখন তথ্য প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিতরা দলগুলোর কাছে মতামত চাইলেন। আর তখন দলগুলোর অধিকাংশই, যাদের কিনা সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ দায়িত্ব হচ্ছে তথ্য প্রকাশ করা ও জনগণের কাছে জবাবদিহি করা, তারা নাগরিকের জানার অধিকার লঙ্ঘন করে এসব তথ্য না প্রকাশের পক্ষে মত দিল। এতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার নীতির জলাঞ্জলি ঘটেছে, যা দুর্ভাগ্যজনক ও সমর্থনের অযোগ্য।’ বদিউল আলম মজুমদার তাঁর আইনি লড়াইয়ে জয়ী হয়েছেন। আশা করব কে এম নুরুল হুদাকমিশন অন্তত হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলে গিয়ে দলগুলোর আয়-ব্যয়ের তথ্য জানতে মানুষের অধিকারকে তাদের পূর্বসূরিদের মতো আরও কণ্টকিত করবে না। ওই মামলায় বিচারপতি কাজী মো. এজাহারুল হক আকন্দ যেভাবে উষ্মা প্রকাশ করেছেন, সেভাবে আমরাও অনুসন্ধান কমিটিসহ সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে বলতে পারি: ‘আমাদের মতো গণতান্ত্রিক দেশে’ জনগণকে অন্ধকারে রাখা এবং তাদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা (আদালতের কথায়, ‘কিপিং দেম ইন ডার্ক অ্যান্ড প্লেয়িং হাইড অ্যান্ড সিক উইথ দেম’) জনগণের জানার অধিকার অস্বীকার করার নামান্তর।’ দুই বড় দল তাদের আয়-ব্যয়ের বৃত্তান্ত প্রকাশ করতে চায়নি বলে রকিব কমিশনআইন অমান্য করে ‘দলীয় গোপনীয়তা’ রক্ষা করেছে। সার্চ কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচন কমিশন গঠনসংক্রান্ত ‘আইন’ চেয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ রেখেছে।
কিন্তু মনমানসিকতা না পাল্টালে শুধু আইন তৈরি করলে আমরা নিস্তার পাব কি? আমরা এমন একটা সংস্কৃতি চাই, যেখানে এমন কতগুলো কমিটি ও সংস্থা কাজ করবে, যারা ‘আইন’মতে চলবে। দলগুলোর মন জুগিয়ে চলবে না। আর এই ব্যবস্থা চালু করতে চাইলে বিএনপি বর্ণিত নির্বাচন একমাত্র হাতিয়ার নয়। অনুসন্ধান কমিটি তথ্য অধিকার আইন ভঙ্গ করল। অথচ জোর গলায় তাদের অভিযুক্ত করারও (বিএনপিকে অন্যায্য ফায়দা না দিয়ে) এই সমাজে কেউ যেন নেই। মির্জা ফখরুল তাঁর বিবৃতিতে গোপনীয়তার বিরুদ্ধাচরণ (স্ববিরোধিতা) করলেও তথ্য অধিকার আইনের দোহাই দেননি, কারণ তঁারা কার্যত ‘আইন’ বিশ্বাস করেন না। নতুন নির্বাচন কমিশন ১৫ ফেব্রুয়ারি শপথ নেবে। অথচ ইচ্ছে করলেই একটা সাংবিধানিক শূন্যতা এড়ানো যেত। সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদ বলেছে, বাংলাদেশে সিইসির নেতৃত্বে একটি নির্বাচন কমিশন থাকবে। এই ‘থাকবে’ মানে সব সময় থাকবে। মাঝেমধ্যে শূন্য থাকবে, সেটা বলা নেই। অথচ এই মুহূর্তে সিইসিসহ তিনটি পদ শূন্য। এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিধিবিধান নেই। বিদায়ী নির্বাচন কমিশনার মো. আবদুল মোবারকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হলো। আমি তাঁর সঙ্গে একমত যে ‘পারপিচুয়াল সাকসেশনের’ (বিরতিহীন উত্তরাধিকার) বিধান করে এই শূন্যতা রোধ করা দরকার। বহু ক্ষেত্রে এ রকমই, দায়িত্বশীলদের মধ্যে আমরা সুচিন্তিতভাবে আইন ভাঙার ঐক্য দেখি। এর অবসান হোক।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

জাহানারা জামানের সেই ঝড়ের দিনগুলো

জাহানারা জামান ছিলেন জমিদারবাড়ির বড় বউ। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তাঁর আকাশে ঝড় উঠল। ছিলেন সরকারি বাসায়। ছাড়ার নোটিশ দেওয়ার আগেই ছেড়ে দিলেন। উঠলেন ভূতের গলির একটা ছোট বাসায়। এবার ৩ নভেম্বর। মাথার ওপরে আকাশ ভেঙে পড়ল। স্বামীর দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ছিল মাত্র ১৭ হাজার টাকা। তাই নিয়ে চলে এলেন রাজশাহীতে। যে বাড়ি মানুষে গমগম করত, এসে দেখলেন সে বাড়ি ফাঁকা—কেউ আসেন না। পথেঘাটে চেনা মানুষও অচেনার মতো হেঁটে যায়। দেখেশুনে কষ্ট পেলেও হতাশ হলেন না জাহানারা জামান। শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরলেন। তিনি  নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী—জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এ এইচ এম কামারুজ্জামানের স্ত্রী। ৫ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে এই সংগ্রামী নারীর জীবনাবসান ঘটে। জাহানারা জামান ছিলেন ছয় সন্তানের জননী।
দুই ছেলে—এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন ও এ এইচ এম এহ্সানুজ্জামান। চার মেয়ে—ফেরদৌস মমতাজ, রওশন আক্তার, দিলারা জামান ও কবিতা জামান। জাহানারার মৃত্যুর সময় এহ্সানুজ্জামান জিম্বাবুয়ে ছিলেন। আসতে পেরেছেন। কিন্তু কবিতা জামান ছিলেন আমেরিকায়। তিনি আসতে পারেননি। তাই মাকে শেষ দেখা তাঁর হয়নি। একইভাবে পঁচাত্তরে দুই ছেলে বাবাকে শেষবারের মতো দেখতে পাননি। তার দুই বছর আগে তাঁদের ভারতের নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পড়াশোনার জন্য পাঠানো হয়েছিল। তখন খায়রুজ্জামান সপ্তম শ্রেণিতে আর এহ্সানুজ্জামান ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়তেন। বয়সে তাঁরা দেড় বছরের ছোট-বড়। মা-বাবার চাওয়া ছিল ছোট থেকেই তাঁরা মন্ত্রীর ছেলে নয়, সাধারণ মানুষের মতো বেড়ে উঠুক। মিশনের আর পাঁচটা সাধারণ ঘরের ছেলের মতো তাঁদের দুই ভাইকে সব কাজ করতে হয়েছে। কষ্ট করে থাকতে হয়েছে। ৩ নভেম্বর বাবাকে জেলখানার ভেতরে হত্যা করা হয়েছে, সেদিন এ খবর দুই ভাইয়ের কেউ জানতেন না। পরের দিন মিশনের স্বামীজি দুই ভাইকে গাড়িতে করে তাঁর অফিসে নিয়ে যান। সেখানে দুই ভাইয়ের সামনে আনন্দবাজার, যুগান্তরসহ চারটি দৈনিক পত্রিকা রেখে তিনি বাইরে চলে গেলেন। তাঁরা দুই ভাই দেখলেন চারটি পত্রিকাতেই জেলহত্যার ঘটনাকে প্রধান শিরোনাম করা হয়েছে। আনন্দবাজার-এর শিরোনাম ছিল ‘ওদেরকে কাঁদতে দিন’।
দুই ভাই শুধুই কাঁদলেন। কারও সঙ্গে কথা বলতে পারলেন না। এ সময় মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য তাঁরা ব্যাকুল ছিলেন। কিন্তু অনিশ্চয়তার কারণে মা চাননি ছেলেরা দেশে ফিরে আসুক। মা তাঁদের চিঠি লিখলেন, তাঁদের বড় হতে হবে, মানুষ হতে হবে। বাবার মতো যোগ্য হতে হবে। এ জন্য নিজের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এ ঘটনার দুই বছর পর মা জাহানারা জামান দুই ছেলের সঙ্গে দেখা করতে ভারতে যান।  স্বামী মারা যাওয়ার পর জাহানারা জামান চার মেয়েকে নিয়ে রাজশাহীর কাদিরগঞ্জের বাসায় এসে যখন উঠলেন, তখন সে বাসা আর বাসযোগ্য ছিল না। এমনিতেই বাড়িটা পুরোনো ছিল। তার ওপর অনেক দিন ধরে পড়ে ছিল। ইউনুস আলী নামের একজন ঠিকাদারের সঙ্গে তাঁদের পরিবারের সখ্য ছিল। তিনি এসে মিস্ত্রি লাগিয়ে বাসাটা একটু ঠিকঠাক করে দিলেন। দোতলার যে ঘরে কামারুজ্জামান থাকতেন, সেই ঘরটি অবিকল রাখা হলো। কিন্তু সমস্যা হতে লাগল বর্ষার সময়। টানা দু–তিন দিন বৃষ্টি লেগে থাকত। তখন পুরোনো বাড়ির টাইলস চুইয়ে পানি পড়ত। এ অবস্থায় ঝড় উঠলে মনে হতো ছাদ ভেঙে পড়বে। কত দিন যে জাহানারা জামান চার মেয়েকে সঙ্গে করে নিচের ঘরে বসে রাত কাটিয়েছেন তার হিসাব নেই। ঢাকার বাসায় একটি গরু ছিল।
আসার সময় গরুটিও আনা হয়েছিল। রাখা হয়েছিল রাজশাহীর বাড়িতে। এই গরুর খাবার দেওয়ার কোনো লোক ছিল না। জাহানারা জামান নিজ হাতে বাসার পেছনে বসে গরুর জন্য খড় কাটতেন। কিন্তু এটা নিয়ে তাঁকে কেউ কোথাও বলতে শোনেনি, তিনি জমিদারবাড়ির বড় বউ, তিনি এ কাজ করবেন কেন। সে সময় সংসারে আয় বলতে বাসার সামনে ২২০ টাকা ভাড়ার দুটি দোকান ছিল। আর অ্যাডকো নামের একটি ওষুধ কারখানার এমডি ছিলেন কামারুজ্জামান। কিন্তু কখনো ওই প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো সম্মানী নেননি। সেই দুঃসময়ে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি মাসে তাঁর পরিবারকে ৫০০ টাকা দেওয়া হতো। সে টাকা আবার গিয়ে নিয়ে আসতে হতো। চার বছর পর এহ্সানুজ্জামানকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তারও এক বছর পরে আসেন খায়রুজ্জামান। প্রতি মাসে অ্যাডকোতে গিয়ে ৫০০ টাকা নিয়ে আসার দায়িত্ব পড়ে খায়রুজ্জামানের ওপরে। প্রতিষ্ঠানে গিয়ে এই টাকা আনতে তিনি খুবই অস্বস্তিবোধ করতেন। কিন্তু কোনো উপায় ছিল না। কারণ, এই আয়ের সঙ্গে তাঁদের দাদাবাড়ি ও নানাবাড়ি থেকে আসা চাল-ডালের সহযোগিতা নিয়েই তাঁদের চলতে হতো।
তাঁদের বাবা পাকিস্তান আমলে যখন সাংসদ ছিলেন তখন সম্মানী পেতেন ৫০০ টাকা। তাঁদের মায়ের হাতে ওই ৫০০ টাকা দিয়ে বলতেন এই দিয়েই সংসার চালাও। আবার দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে যখন মন্ত্রী হয়েছিলেন, তখন সম্মানী পেতেন দুই হাজার টাকা। ওই দুই হাজার টাকাই হাতে দিয়ে বলতেন এই দিয়ে সংসার চালাও। এ নিয়ে তাঁরা তাঁদের মাকে কোনো দিন আপত্তি করতে শোনেননি। আবার ঢাকায় তাদের বাসাতে যে মানের আসবাব, তাও একজন মন্ত্রীর বাসার সঙ্গে যায় না। এসব নিয়ে সন্তানেরা কেউ কোনো দিন মাকে হীনম্মন্যতায় ভুগতে দেখেননি। ছেলে খায়রুজ্জামান রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়ে রাজশাহীর যে উন্নয়ন করেছেন, তা নিয়ে মা খুবই গর্বিত ছিলেন। তাঁর বড় মেয়ের স্বামী এ এস এম সাঈদ লালমনিরহাট-৩ আসনের সাংসদ। ছোট ছেলে এ এইচ এম এহ্সানুজ্জামান বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে এখন জিম্বাবুয়ে বাটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক। মেয়েরাও প্রতিষ্ঠিত। জাহানারা জামানের বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। সংগ্রামী এই নারীকে অন্তরের অন্তস্তল থেকে শ্রদ্ধা। আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ: প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিনিধি।