Thursday, January 29, 2015

রাজধানীতে ৪ বাসে আগুন

রাজধানীর পৃথক পৃথক স্থানে চারটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। তবে এসব ঘটনায় কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। আগুন দেয়ার ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। আজ বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে মিরপুর ১ নম্বরে প্রজাপতি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের প্রধান কার্যালয়ের ডিউটি অফিসার ফরাহাদুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, রাত সাড়ে ৮ টার দিকে মিরপুর ১ নম্বরের ফুটওভার ব্রিজের নীচে প্রজাপতি পরিবহনের ওই বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুইট ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ভাটারা থানার ডিউটি অফিসার এসআই শাহেদ এ আগুনের ঘটনা নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তুরাগ পরিবহনের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা। এর আগে বিকাল পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কার্জন হলের সামনে একটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। অন্যদিকে দুপুর সোয়া ২টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদুল্লাহ হলের পাশের একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এতে বাসের ৪টি সিট পুড়ে গেছে। শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া রাজধানীর নিউমার্কেট এবং গুলশান মাকের্ট এলাকায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। এতে ৮ জন আহত হয়েছেন।

একটি জানাজা এবং... by সাজেদুল হক

জানাজার কোন রাজনীতি নেই। তবে বাংলাদেশের ইতিহাস আলাদা। এ ভূমে কখনও কখনও কোন কোন জানাজাও রাজনীতির ইতিহাস বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের অভিষেক হয়েছিল অনেকটাই আকস্মিক। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তার উচ্চারণও পূর্বপরিকল্পিত নয়। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান তিনি। শাসক হিসেবে জিয়াউর রহমানের সমালোচনা থাকলেও ঢাকায় তার জানাজায় সে সময়কার বৃহত্তম জমায়েত বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের ভূমিকা নিশ্চিত করে ফেলেছিল। মূলত জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তার ওপর ভিত্তি করেই তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এগিয়ে গেছেন। কখনও তিনি প্রধানমন্ত্রী, কখনওবা বিরোধী দলীয় নেতার আসনে বসেছেন। যদিও এখন তার জীবনে ঘোর অমানিষা। ৩৩ বছর পর ঢাকায় আরেকটি জানাজা নিয়েও বিপুল আলোচনা চলছে। অবাক হলেও সত্য, জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর জানাজা নিয়েই এ আলোচনা। বিপুল জনগোষ্ঠী এ জমায়েতে হাজির হয়েছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের প্রায় সবাই বলছেন, লক্ষাধিক মানুষ এ জানাজায় অংশ নেন । রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এ সত্য অস্বীকার করার জো নেই বাংলাদেশ এখন এক সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে। তবে এই মহাসঙ্কটের সময় জনগণের আসলে তেমন কোন ভূমিকা নেই। তারা নিষ্পেষিত, নির্যাতিত। তারা মারা যাচ্ছেন। কখনও পেট্রলবোমায়, কখনও ‘বন্দুকযুদ্ধে’। জ্বলছে বাংলাদেশ, আগুনে পুড়ছে মানুষ। জনগণ রাজপথে নামলে শিকার হচ্ছেন নির্বিচার গুলির। আবার নিশ্চিত করেই পেট্রলবোমা আর ককটেলের সঙ্গেও সাধারণ জনগণের সম্পৃক্ততার সুযোগ নেই। এ দুঃসহ সময়ে আরাফাত রহমান কোকোর জানাজা সুযোগ হয়ে আসে তাদের সামনে। বিরোধী গোষ্ঠীর নিষ্পেষিত, অসহায় মানুষরা সুযোগ পান রাজপথে উপস্থিতির। যে সুযোগ তারা কাজে লাগান পুরোদমেই। এ যেন এক নীরব প্রতিবাদও। জিয়া পরিবারের প্রতি তাদের ভালবাসার প্রকাশও ঘটে এতে। যদিও আরাফাত রহমান কোকোর কোন রাজনীতি ছিল না। এ জানাজা কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন ভূমিকা রাখবে? পর্যবেক্ষকরা বলছেন, প্রত্যক্ষ কোন ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা কম। তবে এ জানাজায় বিপুল উপস্থিতি ক্ষমতাসীনসহ সব মহলেই বিপুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এত কিছুর পরও বিএনপি জোটের প্রতি জনগণের সমর্থনের বহিঃপ্রকাশও ঘটেছে এর মাধ্যমে। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহার মনে করেন, এ জানাজায় জনগণের উপস্থিতি এক ধরনের নিঃশব্দ প্রতিবাদ। তিনি বলেন, কোকোর জানাজায় জনগণ তাদের সংবাদটা পৌঁছে দিয়েছে, তারা মূলত চায় বর্তমান ফ্যাসিস্ট যে রাষ্ট্রব্যবস্থা, এখন যে অগণতান্ত্রিক সরকার, যেভাবেই হোক না কেন তাকে চলে যেতে হবে। জনগণের এ শক্তিকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য বিএনপি নেতৃত্বেরও সমালোচনা করেন তিনি। গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ রাজনীতিকে গঠিত করার যে প্রয়োজনটা ছিল, সে কথাগুলো আমরা বুদ্ধিজীবীরা বিএনপি নেতাদের পরিষ্কার করে বোঝাতে পারিনি। তবে জনগণ কিন্তু আমাদের সঙ্গে আছে।’

শিক্ষাই দ্বীপবাসীর প্রধান অবলম্বন হতে হবে -কুতুবদিয়া হাই স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তারা

সহায়-সম্পদ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস রত দ্বীপের পৌনে দু’লাখ মানুষের জন্য শিক্ষাই প্রধান অবলম্বন হওয়া দরকার। এ জন্য শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়ালেখার প্রতি অধিক মনযোগী হতে হবে। দ্বীপটি সমুদ্রে বিলীন হলেও দ্বীপের শিক্ষিত মানুষ দেশ-বিদেশের যে কোন স্থানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। কুতুবদিয়া হাই স্কুলের ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা-দোয়া মাহফিল ও নবাগত শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানে বক্তাগণ এ কথা বলেন। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জেলার প্রবীণ আ’লীগ নেতা এড.ফরিদুল ইসলাম চৌধূরীর সভাপতিত্বে স্কুল ময়দানে বুধবার এক বর্নাঢ্য অনুষ্ঠানে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জেলা বিএনপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এ.টি.এম.নুরুল বশর চৌধূরী প্রধান অতিথি ছিলেন। এতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মমিনুর রশিদ, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ছৈয়দা মেহেরুন্ নেছা, থানা অফিসার ইনচার্জ অংসা থোয়াই, বড়ঘোপ ইউপি চেয়ারম্যান শাকের উল্লাহ, প্রবীণ আ.লীগ নেতা শফিউল আলম, বড়ঘোপ ফাজিল মাদরাসার সহকারী অধ্যাপক হাফেজ মাওলানা হাছান, সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক, কুতুবদিয়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হাছান কুতুবী, জসিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আনিসুর রহমান, হাজী কবির হোছাইন, হাজী মুহাম্মদ তাহের, স্কুল পরিচালনা কমিটির সদস্য হাজী রেজা খাঁন, মেম্বার জাহাঙ্গীর সিকদার, মুহাম্মদ ইসলাম, মৌলভী জাকের আহমদ, সেলিনা আখতার, শ্রীমন্ত দাশসহ বহু গন্যমান্য ব্যক্তি ও অভিভাবকগণ বিশেষ অতিথি ছিলেন। স্কুলের প্রবীণ প্রধান শিক্ষক আক্কাস উদ্দিন (ভা.প্রা.) স্বাগত বক্তব্য ও শিক্ষক বদরুল আনামের সঞ্চালনায় অনুষ্টিত সভায় মাষ্টার মুজিবুর রহমান, মাষ্টার সিরাজুল ইসলাম মধু, সাবেক শিক্ষক মুহাম্মদ জাকারিয়াসহ অন্যরা এতে বক্তব্য রাখেন। বিদায়ী ও অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিজবাহ উদ্দিন রিজভী, মুহাম্মদ ইউনুছ, নাসরিন সোলতানা ও ইয়াসমিন আখতার বক্তব্য রাখেন। পরে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্টানে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন গান পরিবেশন করেন।
(হাছান কুতুবী, ২৮-জানুয়ারী)

সিটিজেন মুভমেন্ট ইউকের সমাবেশে ৪ ব্রিটিশ এমপির একাত্মতা- ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের ‘অগণতান্ত্রিক, অসংবিধানিক ও অমানবিক’ কার্যকলাপের প্রতিবাদে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে সিটিজেন মুভমেন্ট ইউকে। ২৭ জানুয়ারি স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এই বিক্ষোভ-সমাবেশে উপস্থিত হয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন কয়েকজন লর্ড ও ব্রিটিশ এমপি। তারা হলেন ব্রিটিশ লর্ড সভার সদস্য লর্ড কোরবান আলী, সায়মন ডানসাক এমপি, লর্লি বাট এমপি ও টিম ইয়ো এমপি। তারা বিক্ষোভ-সমাবেশে বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। সভায় ব্রিটিশ লর্ড ও এমপিরা বলেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র হুমকির সম্মুখীন। পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে লর্ড ও এমপিরা বলেন, ৫ জানুয়ারির ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের ফলে বাংলাদেশে বর্তমানে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। এ থেকে উত্তরণের জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প নেই। তারা আরো বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ব্রিটেন, আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। ভোটারবিহীন এই নির্বাচনে জনগণের আশা-আকাক্সার প্রতিফলন ঘটেনি। উন্নয়ন সহযোগী দেশ হিসেবে ব্রিটেন বালাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেখতে চায়। তাই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বার্থে বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচন অতীব জরুরি। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ রাখা, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতাদের নির্যাতনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জরুরি বলে তারা মত দেন।
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন ইউরোপভিত্তিক প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগঠন সিটিজেন মুভমেন্ট ইউকের আহ্বায়ক এম এ মালেক। বিক্ষোভ-সমাবেশে সংগঠনের নেতাকর্মীরা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনে চাপ প্রয়োগের জন্য ব্রিটিশ সরকারের প্রতি দাবি জানান।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন প্রফেসর সালেহ আহমেদ, ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা, তারেক রহমানের মানবাধিকারবিষয়ক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার এম এ সালাম, যুক্তরাজ্য বিএনপির সহসভাপতি আখতার হোসেন, আনোয়ার হোসেন খোকন, শরীফুজ্জামান চৌধুরী তপন, প্রফেসর ফরিদ উদ্দিন, নাসিম আহমেদ চৌধুরী, শামসুর রহমান মাতাব, আতিকুর রহমান চৌধুরী, জাভেদ ইকবাল, কামাল উদ্দিন, খসরুজ্জামান খসরু প্রমুখ।

চট্টগ্রামে আহত চবি ছাত্র সাকিবের মৃত্যু- পুলিশি নির্যাতনের অভিযোগ পরিবারের

চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালি থানার কদমতলী এলাকায় দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেলে আহত ইসলামী ছাত্রশিবিরকর্মী সাকিবুল ইসলাম সাত দিন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে অবশেষে গত সোমবার রাত ৩টায় ঢাকা অ্যাপোলো হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তবে পরিবারের দাবি দুর্বৃত্তদের ককটেল বিস্ফোরণে আহত সাকিবকে উল্টো ককটেল বহনকারী সাজিয়ে গ্রেফতারের পর নির্যাতন করা হয়। এ ছাড়া তাকে পুলিশ দেরিতে মেডিক্যালে ভর্তি করে এবং দ্রুত উন্নত চিকিৎসা দিতে বাধা দেয়। যার কারণে মেধাবী ছাত্র সাকিবের মৃত্যু হয়েছে।
নিহত সাকিবুল ইসলাম চট্টগ্রাম লোহাগাড়া উপজেলার পুটিবিলা গ্রামের মৃত ওসমানুল হকের ছোট ছেলে। তিনি সাত বোনের একমাত্র ভাই ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
গত ২০ জানুয়ারি রাত ৮টায় নগরীর কদমতলী এলাকায় দুর্বৃত্তরা ককটেল ছুড়ে মারলে পথচারী সাকিবুল ইসলামসহ কয়েকজন আহত হন। এরপর পুলিশ আহতাবস্থায় সাকিবুল ইসলামকে আটক করে।
পুলিশের দাবি, তিনি ককটেল বহন করছিলেন এবং নিজের ককটেলে তিনি আহত হয়েছে। কিন্তু তার পরিবারের দাবি সে টিউশনি থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেল বিস্ফোরণে সে আহত হয়। আহতাবস্থায় তাকে পুলিশ ছয় ঘণ্টা আটকে রেখে অকথ্য নির্যাতন চালায়। এতে তার প্রচুর রক্তরণ হয়। পরে ২১ জানুয়ারি রাত ৪টায় পুলিশ তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তার অবস্থার অবনতি হলে গত ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল সেন্টারে তাকে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তাকে দুই দিন লাইফ সাপোর্টে রাখার পর ২৬ জানুয়ারি রাতে ঢাকা অ্যাপোলো হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।
আহত সাকিবের মামা শাহেদুল ইসলাম জানান, তার মৃত্যুর জন্য পুলিশ দায়ী। কারণ পুলিশি বাধার কারণে আমরা তাকে উন্নত চিকিৎসা দিতে পারিনি। সর্বশেষ তাকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় নেয়ার অনুমতি দিলেও, তা নিয়ে অনেক টালবাহানা ও দেরি করেছে পুলিশ। উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার প্রশাসনের কাছে আমরা গিয়েছি; কিন্তু তাদের অবহেলায় আজ আমার ভাগিনা মারা গেছে।
কর্মী নিহতের প্রতিবাদে ছাত্রশিবিরের নিন্দা ও ক্ষোভ
দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেলে আহত ছাত্রশিবিরকর্মী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাকিবুল ইসলামকে আহতাবস্থায় আটকের পর পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির চট্টগ্রাম মহানগরী দেিণর সভাপতি এম এইচ সোহেল ও মহানগরী উত্তরের সভাপতি নুরুল আমিন।
প্রতিবাদ বার্তায় নেতৃদ্বয় বলেন, ২০ জানুয়ারি রাত সাড়ে ৮টায় রিকশায় টিউশনি থেকে ফেরার পথে কদমতলীর একটু আগে সিএনজি ফিলিং স্টেশনের সামনে এলে দুর্বৃত্তদের ছোড়া ককটেলের আঘাতে সে ও রিকশা চালক মারাত্মক আহত হন। আহত হওয়ার পর প্রায় সাত ঘণ্টা সে নিখোঁজ থাকে। তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে বিভিন্ন থানায় যোগাযোগ করা হয়েছিল; কিন্তু পুলিশ তাকে আটকের কথা স্বীকার করেনি। অবশেষে রাত ৪টায় তার বড় বোনের ফোনে একজন ব্যক্তি ফোন করে জানান সে চট্টগ্রাম মেডিক্যালের পঞ্চম তলার ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসাধীন আছেন।
হাসপাতালে এসে দেখা যায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন বিশেষ করে তার মাথা, হাত ও মুখে প্রচণ্ড আঘাত। পরে খবর নিয়ে জানা যায় আহতাবস্থায় পুলিশ তাকে আটক করে থানায় রেখে ব্যাপক নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের একপর্যায়ে সে রক্তবমি করলে পুলিশ তাকে চট্টগ্রাম মেডিক্যালে নিয়ে যায়।
নির্যাতনের শিকার সাকিব
লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, এ দিকে নিহত সাকিবের ফুফাতো ভাই শাহেদুল হক কাতেবী অ্যাপোলো হাসপাতালের চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, ঘটনার পরপরই যথাযথ চিকিৎসা দেয়া গেলে হয়তো সাকিবকে বাঁচানো সম্ভব হতো। বুধবার সন্ধ্যায় সাকিবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় তার মা সালেহা বেগম। পুটিবিলা ইউনিয়নের তাঁতিপাড়া গ্রামের মরহুম মাওলানা ওসমানের সাত মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে সাকিব সর্বকনিষ্ঠ। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন তার সাত বোন।
সাকিবুলের মায়ের বিবৃতি : গত ২০ জানুয়ারি রাতে চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানার কদমতলীতে দুর্বৃত্তদের আঘাতে মারাত্মক আহত সাকিবুল ইসলামকে নির্মম নির্যাতন ও চিকিৎসা করতে না দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন নিহতের মা সালেহা বেগম।
গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, আমার সন্তান সাকিবুল ইসলাম প্রতিদিনে মতো টিউশনি করে বাড়ি ফেরার সময় দুর্বৃত্তদের হামলায় মারাত্মক আহত হয়। এ সময় পুলিশ তাকে আহত অবস্থায় গ্রেফতার করে। কিন্তু গ্রেফতারের পর চিকিৎসা না করে উল্টো ৬ ঘণ্টা তাকে নির্যাতন করে। এই বর্বর নির্যাতনে আমার ছেলের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু তারা উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। আমরা বারবার তার জীবন বাঁচাতে উন্নত চিকিৎসার জন্য আবেদন জানালেও পুলিশ কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করেনি। পুলিশের ভয়াবহ নির্যাতন ও চিকিৎসা করতে না দেয়ায় আমার ছেলে মারা যায়।
তিনি বলেন, যদিও আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেনি তবুও পুলিশের হেফাজতে থাকায় সে মানবিক সাহায্যটুকু পাবে এমনটি আমরা আশা করে ছিলাম। কিন্তু পুলিশের এই অমানবিক নির্মম হত্যাযজ্ঞ আমাদের বাকহীন করে দিয়েছে। আমার জানা মতে, সে কোনো অন্যায় করেনি। আর যদি আমার ছেলে কোনো অন্যায় করেই থাকে তাহলে আইনের মাধ্যমে তার বিহিত করার কথা ছিল। কিন্তু আইনের রক্ষক হয়ে পুলিশ যেভাবে আমার ছেলেকে নির্যাতন ও অমানবিক অবহেলা করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে তাতে পুলিশের প্রতি আমাদের আস্থা হারিয়ে গেছে। আর যেন কোনো মায়ের বুক খালি না হয় তার জন্য আমি অবিলম্বে নির্যাতন ও অবহেলাকারী পুলিশ সদস্যদের বিচার দাবি করছি। একইভাবে এমন ঘটনা যেন আর না ঘটে সে জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। বিজ্ঞপ্তি।

বাংলাদেশ পরিস্থিতি: জাতিসংঘের ফের উদ্বেগ- ব্রিফিংয়ে শান্তিরক্ষী প্রসঙ্গ

বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে ফের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে একাধিক প্রশ্নের জবাবে মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক এ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তা স্বাভাবিক অবস্থাকে বিঘ্ন করছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের কাছে প্রশ্ন করা হয়-বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা বেড়ে চলেছে, বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের আহ্বান জানানো হচ্ছে এবং গণমাধ্যমের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। যদিও মহাসচিব বান কি মুন এর আগে এ বিষয়ে কথা বলেছেন এমনকি তিনি এ ব্যাপারে কিছু আলোচনা করারও চেষ্টা করেছেন। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ দেশ। সেক্ষেত্রে ডিপিএ (ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স) বা মহাসচিব কি করছেন?
জবাবে মুখপাত্র বলেন, আমার মনে হয় আমরাও এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। এর আগে হিউম্যান রাইটস হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল  হাইকমিশনারের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেপ্তার ও বন্দি রাখার প্রক্রিয়া যাতে বিধিবহির্ভূত না হয় ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সব পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের মানদ-ে সেগুলো পরিচালিত হয়, তা নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। অবশ্যই আপনি জানেন, এ পরিস্থিতি যা আমরা দেখেছি, যা দেখছি তা স্বাভাবিক অবস্থাকে  বিঘ্ন করছে।
মুখপাত্রের কাছে পরবর্তী প্রশ্ন ছিল- আমি একটি সুনির্দিষ্ট বিষয় সম্পর্কে জানতে চাই। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অবদান রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন এক নম্বরে অবস্থান করছে এবং কয়েকটি হয়রানির ঘটনায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী দায়ী, শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা মোতায়েনে পুনর্বিবেচনায় তা কি কোন ধরনের ভূমিকা রাখবে?
জবাবে মুখপাত্র বলেন, আমি মনে করি, সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আদর্শ মানদন্ডে মানবাধিকার পর্যালোচনা নীতি প্রয়োগের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রশ্নোত্তরগুলো নিচে দেয়া হলো-
Question:  Sure.  I wanted to ask you about Bangladesh.  There’s been mounting political conflict and violence, several dozen dead.  There’s calls for the arrest of the former Prime Minister and there’s also been some censorship of media.  I’m wondering, I know the Secretary General has previously spoken about it and even, I believe, tried to have some talks.  It’s also a major peacekeeping contributing country.  What does DPA [Department of Political Affairs] or the Secretary General doing?
Spokesman:  I think we share the concerns that were expressed by the Office of the High Commissioner for Human Rights, which appealed for calm.  And also that the Government should ensure that any arrests and detention of key opposition leaders by law enforcement is not arbitrary and that all measures are taken to restore law and order, and conducted in line with the parameters set by international human rights law.  You know, obviously, I think this situation that we’re seeing, we’ve seen, is rather disturbing, indeed.
Question:  But given… I guess I want to ask one particular part of it, which is, given that Bangladesh is, I believe, now the number one peacekeeping contributing country and some of the abuses are very much laid at the foot of the security forces, how does this play into the UN’s review of deployments?
Spokesman:  I think the standard human rights screening policy continues to apply.

হামলার জন্যে হিজবুল্লাহকে চড়া মূল্য দিতে হবে : নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি

ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জরুরি নিরাপত্তা বৈঠকে হিজবুল্লাহ’র প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, লেবানন সীমান্তে ভয়াবহ হামলার জন্যে তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। বুধবার লেবানন সীমান্তে হিজবুল্লাহর হামলায় দুই ইসরাইলী সৈন্য নিহত হওয়ার পর নেতানিয়াহু দিনের শেষে এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। এদিকে হিজবুল্লাহর সাথে ইসরাইলি বাহিনীর সংঘর্ষে জাতিসংঘের স্প্যানিশ এক শান্তিরক্ষীও নিহত হয়েছে। শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে জরুরি বেঠকে নেতানিয়াহু বলেন, ‘হামলার সঙ্গে জড়িতদের চরম মূল্য দিতে হবে।’ এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র জেন সাকি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা ইসরাইলের আত্মরক্ষার বৈধ অধিকারকে সমর্থন করছি। একইসঙ্গে সকল পক্ষের প্রতি ইসরাইল ও লেবানন সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ রেখা মেনে চলারও আহ্বান জানাচ্ছি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান ফেদেরিকা মগেরিনি অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। লেবাননের নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, ইসরাইলী বাহিনী সীমান্ত সংলগ্ন কয়েকটি গ্রামে হামলা চালিয়েছে।
হিজবুল্লাহ লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরাইলী বাহিনীর ওপর ক্ষেপনাস্ত্র হামলার কথা স্বীকার করে বলেছে, তারা ইসরাইলী সৈন্য বহনকারী সামরিক কনভয়ে হামলা চালিয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়। এ ঘটনার পর ইসরাইল হিজবুল্লাহ অবস্থান লক্ষ্য করেও পাল্টা হামলা চালায়।
ফিলিস্তিনের ইসলামপন্থী গ্রুপ হামাস ও ইসলামিক জিহাদ হিজবুল্লাহ’র এ হামলার প্রশংসা করেছে। হামাস মুখপাত্র সামি আবু জুহরি বলেন, ইসরাইলি দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া জানানোর অধিকার হিজবুল্লাহর রয়েছে। ইসলামিক জিহাদ একে বীরোচিত কাজ বলে বর্ণনা করেছে। এদিকে এ ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ফ্রান্সের আহ্বানে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ জরুরি বৈঠক ডেকেছে।
উল্লেখ্য, ইসরাইল ২০০০ সাল পর্যন্ত ২২ বছর ধরে লেবাননের কিছু অংশ দখলে রেখেছিল। দু’দেশ এখনও কার্যত যুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে।

আগুন জ্বালাচ্ছে, দুই দলকে না বলুন: এরশাদ

(সহিংসতা, জ্বালাও, পোড়াও এবং দমনপীড়নের প্রতিবাদে আজ প্রতীকী অনশন করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এ অনশনের আয়োজন করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা) জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে ‘না’ বলতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এ দুই দল শুধুমাত্র আগুন জ্বালিয়েছে, এখনও জ্বালাচ্ছে। তারা আগুন নেভাতে পারেনি, পারবেও না। এদের ওপর আস্থা রাখা যায় না।’ দেশের মানুষকে তাই জাতীয় পার্টির পতাকাতলে আসার আহ্বান জানান তিনি। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সহিংসতা, জ্বালাও, পোড়াও, দমনপীড়নের প্রতিবাদে আয়োজিত প্রতীকী অনশনে এরশাদ এসব কথা বলেন। জাতীয় পার্টি কার্যালয়ের সামনে এ অনশনের আয়োজন করা হয়।
এরশাদ বলেন, এ দুই দলের মধ্যে গণতন্ত্র নেই। জাতীয় সংসদকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, শেরেবাংলা নগরের মধ্যেই তাদের গণতন্ত্র সীমাবদ্ধ। দেশের অন্য কোথাও গণতন্ত্র নেই। তিনি বলেন, একমাত্র জাতীয় পার্টিই সারা দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
জ্বালাও পোড়াওর জন্য বিএনপির সমালোচনা করেন এরশাদ। তিনি বলেন, এটি ভুল রাজনীতি। যারা ক্ষমতার উৎস, তাদের জ্বালিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় যাওয়া যায় না।
খালেদা জিয়াকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘একজনের ছেলে হারানোর কান্না আমরা টেলিভিশনে দেখেছি। কিন্তু এমন অনেকেই কাঁদছেন, যাঁদের আমরা টেলিভিশনে দেখি না।’ তিনি বলেন, ধ্বংসের রাজনীতি থেকে সরে আসুন। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য গণবিরোধী আন্দোলন মানুষ পছন্দ করবে না।
অনশন কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জি এম কাদের, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু, সভাপতিত্ব করেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাংসদ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে এরশাদের নেতৃত্বে এই গণ–অনশন শুরু হয়। বিকেল চারটা পর্যন্ত অনশন চলে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং বরখাস্ত

নাটকীয়ভাবে বুধবার রাতে এক ঘোষণার মাধ্যমে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় বসানো হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতের রাষ্ট্রদূত সুব্রহ্মণ্যম জয়শঙ্করকে। বৃহস্পতিবারই নতুন পররাষ্ট্র সচিব তার নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। সাউথব্লক সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের সম্পর্ক ভাল ছিল না। সুজাতা সিংয়ের কাজ নিয়েও অসন্তুষ্ট ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এত তাড়াতাড়ি সুজাতা সিংকে সরানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। সুজাতার কার্যকালের মেয়াদ ছিল আর মাত্র সাত মাস। ২০১৩-র আগস্টে সুজাতা সিংকে পররাষ্ট্রসচিব পদে নিয়োগ করেছিল মনমোহন সরকার। তবে নরেন্দ্র মোদি সরকারে আসার পর থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সঙ্গে সুজাতার সম্পর্ক ভাল ছিল না। শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতার কথাবার্তাই প্রায় বন্ধ ছিল। প্রেসিডেন্ট ভবনে ওবামার সম্মানে আয়োজিত নৈশ ভোজে সুজাতাকে কোন ভূমিকাতেই রাখা হয়নি। তিনি ছিলেন নিছক দর্শক মাত্র। অথচ বিশ্বে ভারতের উপস্থিতি ও অবস্থান মজবুত করতে পররাষ্ট্র সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বিশেষ নির্ভরযোগ্য কাউকে বসাতে চাইছিলেন মোদি। চীন-সহ এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক বাড়ানোর কাজে দ্রুত গতিতে করার তাগিদেই জয়শঙ্করকে এনে সেই প্রয়োজন পূরণ করলেন তিনি। ২০১৩-র সেপ্টেম্বর থেকে আমেরিকায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে অন্য সব বিষয়ের সঙ্গে ওবামার ভারত সফরের প্রস্তুতি-পর্ব ভালই সামলেছেন জয়শঙ্কর। এর আগে বছর চারেক চীনেও রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি। জাপান, সিঙ্গাপুর, চেক প্রজাতন্ত্র-সহ বহু দেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। তবে জয়শঙ্করকে নতুন পদে বসানো হয়েছে অবসরের ঠিক মুখে। ৯ জানুয়ারি ৬০ বছর হয়েছে জয়শঙ্করের। আইএফএস অফিসার হিসেবে চলতি মাসের ৩১ তারিখ তার অবসর নেয়ার কথা ছিল। তার মাত্র তিন দিন আগে তাকে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দু’বছরের জন্য।

কোকোর মৃত্যুর দায় কে নেবে? by সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া

প্রতিহিংসার রাজনীতির শেষ কোথায়? শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর দায় অনাকাক্সিত, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওপর চাপানোর প্রচেষ্টা নতুন নয়। কথিত আছে, জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পর একজন বিশেষ ব্যক্তি বোরকা পরিহিত অবস্থায় কসবা সীমান্ত থেকে বিএসএফ, বিডিআরের হাতে ধৃত হয়েছিল। জে. মঞ্জুরের হত্যারহস্য রহস্যই থেকে গেছেÑ মামলা দিয়ে সব রহস্যের কিনারা খুঁজে পাওয়া দুরূহ। যারা মঞ্জুরকে দিয়ে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদত বরণ করার পর বেগম খালেদা জিয়া সাদা কাপড়ে মোড়া কফিনের ভেতর রাখা রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত লাশটি ছুঁয়ে শপথ নিয়েছিলেন প্রতিশোধ নেবেন তিনি শহীদ জিয়ার অসমাপ্ত কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে। সেদিন বিএনপির অনেক যোগ্য ও গুণধর রথী মহারথীরা বেগম জিয়াকে নেত্রী হিসেবে প্রথমে মেনে নিতে কষ্ট পেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজ যোগ্যতায় তাদের ভ্রান্ত ধারণার বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। স্বীকার করতেই হবে, খালেদা জিয়া নিজস্বতা, ব্যক্তিত্ব¡, মেধা, যোগ্যতাসম্পন্ন। নিছক উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা আরোহণ নয় বরং নিজের আলোতে নিজেই আলোকিত হয়ে নিজস্ব পদটিকে অধ্যবসায় ও আত্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে মহিমান্বিত করেছেন। বর্তমানে যে বয়সে মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে ৩০-৩২, সেই বয়সে বেগম জিয়াকে স্বামী হারাতে হয়েছে। পিতাহারা দুই ছেলেকে রেখে বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গেছেন। টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ সবকিছু সহ্য করে আপসহীনতা, দৃঢ়তা, চিন্তাচেতনার সুনিপুণতা দিয়ে সব বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছেছেন। ক্ষমতার মোহ তাকে প্রলুব্ধ করতে পারেনি। এ জন্যই তত্ত্বাবধায়ক বিল পাস করে জনগণের ভোটাধিকার অব্যাহত রেখেছেন এবং গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে রুদ্ধ হতে দেননি।
‘গণতন্ত্র’ নামের বিষয়টিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে গিয়ে জীবন বাজি রেখে অপরিসীম ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন। গণতন্ত্র যখন সীমাহীন প্রতিহিংসার কবলে পতিত, তখন কার্যত গণতন্ত্র থাকে না। বেগম খালেদা জিয়া নয় বছর স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শুধু আন্দোলন নয়, ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর শাসনকালের প্রতিটি বছর যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে সফলতার সাথে অতিক্রম করেছেন। শেখ মুজিবের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার কোনো মানসিকতা কোনো দিনও পোষণ করেননি। ক্ষমতা পেয়েও এই পরিছন্ন মানসিকতার কথা অকপটে আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের স্বীকার করা উচিত। ২১ আগস্টের ন্যক্কারজনক বর্বরোচিত ঘটনা একটি আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। এ সম্পর্কে বেগম জিয়া ঘুণাক্ষরেও জানতেন না। প্রশ্ন আসতে পারে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে না জানাটা কি যথার্থ। এ  প্রশ্ন করাটাও স্বাভাবিক। বাস্তব সত্য কথা হচ্ছে, তৎকালীন সরকারের কোনো গোয়েন্দা সংস্থাই এরকম কোনো পূর্বাভাস দেয়নি। পরবর্তী-পর্যায়ে ৬৪ জেলায় একসাথে বোমা হামলাই ছিল এ চক্রান্তের দ্বিতীয় পদক্ষেপ।

বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলকে বিতর্কিত এবং রাষ্ট্রকে অকার্যকর করতে জঙ্গিবাদের উত্থান সম্পর্কিত আলামত জাহির করতে আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে ২১ আগস্টের ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। ২১ আগস্টের ঘটনার আগে দুই নেত্রীর মধ্যে এমন কী বিরোধ ছিল, যাতে শেখ হাসিনাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলার ষড়যন্ত্র করতে হবে। চক্রান্তকারীরা সফল হয়েছে,  দু’জনের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং বাংলাদেশে জঙ্গিদের উত্থান কোনো কোনো দেশকে বিশ্বাস করিয়েছে। সেই দূরত্ব নিয়ে আরো অমানবিক আচরণ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ঘটেছে। রেজিস্ট্রি ডিড দিয়ে বরাদ্দ করা বাড়ি থেকে প্রথমে মন্ত্রিপরিষদের মিটিংয়ে উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত, পরে আদালতের মাধ্যমে বাড়ি থেকে বের করে দখল নেয়া হয়েছে।

জিয়াউর রহমানের বাড়ির বসবাসের স্থানটুকু স্মৃতি চিহ্নরূপে ঘিরে রেখে বাকি জায়গাটুকুতেও যদি ভবন নির্মাণ করা হতো, তাও বলার কিছু থাকত না। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দেশপ্রেমিক, সৎ শাসক, স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে স্মৃতি হিসেবে বসবাসের জায়গাটুকু রেখে দেয়া যেত। ন্যূনতম সৌজন্য বোধটুকু দেখানো হয়নি।
২১ আগস্ট ও ৬৪ জেলায় বোমা হামলা, কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের যে অংশ তা বুঝতে দেশবাসীর সময় লাগেনি। ১/১১-এর মাধ্যমে পর্দার অন্তরালের ষড়যন্ত্রকারীরা আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসতে শুরু করল।
বেগম খালেদা জিয়া এই মাটিকে ভালোবাসেন। তার দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে বিদেশে জোর করে পাঠানোর সব ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত তিনি উপড়ে ফেলে দেশে থেকেই ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছেন। সপরিবারে জেলে গেছেন, তবুও নতি স্বীকার করেননি। বেগম জিয়া, তার পরিবার ও দলের নেতাদের নামে মামলা হয়েছে। শেখ হাসিনা ও তার দলের নেতাদের নামেও মামলা হয়েছিল। একই রকম ভুক্তভোগী দুই দলকেই হতে হয়েছিল।
অবুঝ জাতি আমরা, নিরাশায় বাঁধি খেলা ঘরÑ বুক ভরে আশা করেছিল হয়তো উভয় দলই একই ধরনের দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হওয়ার কারণে ব্যবধান কমবে, হয়তো রাজনৈতিক সহমর্মিতা প্রদর্শিত হবে। দানবীয় বেশে প্রতিহিংসাবশত অত্যাচারের খড়গ নেমে আসে জিয়া পরিবার ও বিএনপির ওপর। ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে বেগম খালেদা জিয়া আরাফাত রহমান কোকোসহ গ্রেফতার হন। ১৭ মার্চ ২০০৯ কাফরুল থানায় দায়েরকৃত মামলা নম্বর ৩০। মামলাটি বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় হয়নি। বর্তমান সরকারের সময়ে হয়েছে, যখন কোকো বিদেশে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং এই মামলায় তাকে সাজা দেয়া হয়। মামলাটিতে বলা হয়, আরাফাত রহমান কোকো আমেরিকার এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মাধ্যমে ওয়ার ট্রান্সফারের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরের জাজ ট্রেডিং কোম্পানির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ২০ লাখ মার্কিন ডলার স্থানান্তর করেছেন। অথচ আমেরিকার ওই দু’টি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টহোল্ডার কোকো নন এবং সিঙ্গাপুরিয়ান ট্রেডিং কোম্পানির তিনি ডাইরেক্টর, শেয়ারহোল্ডার ও কর্মকর্তাও নন। ৩ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সালে বেগম জিয়া ও কোকো গ্রেফতার হন অথচ ২০০৭ সালের ১৬ নভেম্বর সিঙ্গাপুর ওভারসিস ব্যাংকে টাকা জমা হয়। এজাহারে বর্ণিত ২০ লাখ মার্কিন ডলার বাংলাদেশ থেকে আমেরিকা কিংবা সিঙ্গাপুরের কোনো ব্যাংকে ট্রান্সফার হয়নি। আমেরিকা থেকে সিঙ্গাপুরে, এই দুই দেশে যে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ট্রান্সফার হয়েছে, সে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ওপেনের সাথে কোকোর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এতে প্রমাণিত হয়েছে এখানে মানিলন্ডারিংয়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। অথচ ২০০৯ সালের মানিলন্ডারিং আইন দ্বারা বিচার করা হয়েছে ২০০৭ সালের ঘটনা। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, তাতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে পূর্বের ঘটনা পরের আইনে বিচার করা হবে না। ঘটনা সংঘটিত হওয়ার সময় যে আইনটি বলবৎ থাকবে, সে আইনেই বিচার করতে হবে। বেগম জিয়ার মনোবলকে দুর্বল করার লক্ষ্যে অসুস্থ আরাফাত রহমান কোকোর প্যারোল বাতিল করতে নিয়মনীতির পরোয়া না করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নি¤œ আদালতে যান এবং প্যারোল বাতিল করান। ১/১১-এর যেসব মামলা এককভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল, সেগুলো তুলে নেয়া হলো। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া ও তার পরিবার এবং দলের অন্য নেতাদের মামলা বহাল রাখা হয়। একই আদালতে শেখ হাসিনা ও তার দলের লোকজন এক রকম আচরণ পেয়েছে এবং খালেদা জিয়া তার দলের ব্যাপারে একই আদালতে ভিন্ন রকম পাওয়া গেছে।
তারেক রহমানের মামলায় তাকে খালাস দেয়ার কারণে বিচারককে দেশান্তরী হতে হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা বিরল ঘটনা। আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুর দায় কি এড়াতে পারবে সরকার? মিথ্যা মামলায় জেল, দীর্ঘ দিন মায়ের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন; দেখা সাক্ষাৎবিহীন জীবন। তারপর নিঃসঙ্গ মাকে মরিচের গুঁড়া দিয়ে অসুস্থ করে অবরোধ করে রাখাÑ প্রতিদিন পার্লামেন্টে ও মঞ্চে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারের হুমকি মায়ের থেকে দূরে থাকা অসহায়, নিরুপায়, নির্বাসনে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ, মায়ের বিপদে সন্তান হিসেবে পাশে না থাকার যন্ত্রণা, প্রতিনিয়ত উৎকণ্ঠা তার মৃত্যুর কারণ।
এই দায় কি বর্তমান সরকার এড়াতে পারবে? ড. ওয়াজেদের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর বেগম খালেদা জিয়া ধানমন্ডির বাড়িতে ছুটে যাওয়ার পর কি প্রতিপক্ষের প্রতিহিংসার আগুন নিভে গেছে? কোকোর লাশ আসার আগেই শোকে মূর্ছা যাওয়া এবং জ্ঞান ফিরে এলেও ‘কোকো কোকো’ বলে ডেকে আবার অজ্ঞান হয়ে গেছেন ‘মা’ খালেদা জিয়া। দুই ছেলেকে মালয়েশিয়ায় এবং লন্ডল থেকে ‘যেকোনো মূল্যে’ ফেরত আনার, বিচারের সম্মুখীন করার হুঙ্কার ক্ষমতাসীন দলের নেতা-নেত্রীরা  দিচ্ছেন। প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ে, রাজনীতিতে জড়িত না থাকার পরও যাকে জেল দিয়ে দেশান্তর হতে বাধ্য করা হলো, কত কথা পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কোকোর বিরুদ্ধে বলা হয়েছে। কারো সাথে সাক্ষাতের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মোপলব্ধি। কুকথা বলার জন্য অনুশোচনা হলেই দেশ জাতি জনগণ উপকৃত হবে।
পুত্রের শোকে শোকাহত বেগম খালেদা জিয়া প্রায় আট বছর জীবিত ছেলের মুখ দেখতে পারেননি। কফিনে সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ দেখা গর্ভধারিণী মায়ের জন্য কত বেশি হৃদয়বিদারক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বারবার হুমকি এসেছে ধরে আনার জন্য, বেগম জিয়াকে সর্বহারা করার জন্য। ২৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে গৃহহারা করা হলো। কলিজার টুকরো দুই সন্তানকে মায়ের বুক থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে নির্বাসনে পাঠিয়ে এবং মিথ্যা মামলায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোকোকে দণ্ড দেয়া হয়েছে। মরিচের গুঁড়া দিয়ে অবরুদ্ধ, মিছিল করলে দেখামাত্রই গুলি করার নির্দেশ। একই সাথে হওয়া মামলাগুলো প্রক্রিয়া করে ক্ষমতায় আসার পর কোর্টের মাধ্যমে ফায়সালা। আর বেগম জিয়াকে প্রতিদিনই হাজিরা দিতে হচ্ছে। পার্লামেন্টে বেগম জিয়ার জন্মবৃত্তান্ত এবং আরাফাত রহমানের জন্ম নিয়ে জঘন্য নোংরা কথা বলা হলো। আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ২২ আগস্ট, ১৯৭১ নয়। ‘শিষ্টাচার’ নিয়ে যারা কথা বলছেন, তারা এমন কোনো শিষ্টাচার দেখিয়েছেন কি যে, শিষ্টাচার পাওয়ার আশা করেন? ২১ আগস্ট বোমা হামলার ঘটনার দিন বেগম খালেদা জিয়া বারবার শেখ হাসিনাকে দেখতে চেয়েছেন। বারবার টেলিফোনে যোগাযোগ করার পর ‘না’ উত্তর শুধু আসেনি, যুবলীগ লেলিয়ে দিয়ে প্রতিশোধের হুমকি দেয়া হয়েছিল। কে লুকোচুরি খেলেছে আমরা জানি না। শিমুল বিশ্বাস না শেখর, সেটা আমরা বলতে পারব না। আমি যেটা প্রত্যক্ষ করেছি, বেগম জিয়া ঘরে বারবার অজ্ঞান হওয়ার কারণে বোন এবং ভাইয়ের বউরা ছিল, প্রধানমন্ত্রী সেখানে যাবেন তাদের জানানো হয়নি এবং আমরাও অবহিত ছিলাম না। বেগম খালেদা জিয়া অল্প বয়সে স্বামী হারিয়েছেন, কারাবন্দী থাকা অবস্থায় মা হারিয়েছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলনরত অবস্থায় সরকারের গ্রেফতারের হুমকি ধমকি এবং মরিচের গুঁড়া মেরে অসুস্থ হয়ে যাওয়া অবস্থায় পুত্র কোকোকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ায় আকস্মিক তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে, অবশেষে হার্ট অ্যাটাক হয়ে অকাল মৃত্যু হয়। ছেলে হারানোর এই বেদনায়, দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা ও শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করতে হবে। সরকার বেগম জিয়ার সবকিছু কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করার চেষ্টা করছে। কিন্তু জনগণ পরপর তিনবার নিরপেক্ষ নির্বাচনে তাকেই বিজয়ী করেছে। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জনগণ, গণতন্ত্র এবং দেশকে সন্তানের চেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। বারবার সেটা প্রমাণ হয়েছে। তার পুত্রের শোক শক্তিতে রূপান্তরিত হোক। মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে এই দোয়া করি।
লেখক :অ্যাডভোকেট ও সাবেক সংসদ সদস্য

যমুনায় নাব্যতা–সংকট জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন

(মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলায় যমুনা নদীতে নাব্যতা–সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারণে পণ্যবোঝাই জাহাজগুলো নোঙর করে রাখা হয়েছে। গত রোববার বিকেলে পাটুরিয়া ফেরিঘাটের বরুরিয়া এলাকা থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো) মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার পাটুরিয়ায় যমুনা নদীতে নাব্যতা–সংকটের কারণে আটকা পড়েছে প্রায় অর্ধশত মালবাহী জাহাজ। দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে এগুলো সেখানে নোঙর করে রাখা হয়েছে। আটকে পড়া জাহাজগুলোর বেশির ভাগই সারবোঝাই। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় এই সার যাওয়ার কথা। এখন অতিরিক্ত খরচ করে জাহাজগুলোর সার ছোট ছোট নৌযানে করে গন্তব্যে নেওয়া হচ্ছে। একাধিক জাহাজের চালক ও শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে তাঁরা সার বোঝাই করে চট্টগ্রাম নৌবন্দর ছেড়ে আসেন। কিন্তু যমুনায় নাব্যতা–সংকটের কারণে তাঁরা পাবনার নগরবাড়ী ও সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী গন্তব্যে যেতে পারছেন না। তাঁরা বলেন, নদীতে এসব জাহাজ চলাচলে কমপক্ষে ১২ ফুট গভীর পানির প্রয়োজন। কিন্তু শিবালয়ের বরুরিয়া এলাকায় যমুনা নদীতে বর্তমানে এই পরিমাণ পানি নেই। এ কারণে সেখানে আটকে পড়ার আশঙ্কায় পাটুরিয়া এলাকায় জাহাজগুলো নোঙর করা হয়েছে। ৭ জানুয়ারি থেকে নোঙর করে থাকায় জাহাজের চালক ও শ্রমিকদের খাওয়াসহ আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে গেছে। কেউ কেউ ফিরে গেছেন বাড়িতে।
গত রোববার বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, পাটুরিয়া ফেরিঘাটের পূর্ব পাশে বরুরিয়া এলাকায় জাহাজগুলো সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে রাখা হয়েছে। ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও বাল্কহেডে করে কয়েকটি জাহাজের সার পাঠানো হচ্ছে বাঘাবাড়ী ও নগরবাড়ীতে। ৭৭০ টন সার নিয়ে নোঙর করে ছিল এমভি আরিওল-১। জাহাজটির চালক সেলিম হোসেন বলেন, ৪ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নৌবন্দর থেকে তিনি বাঘাবাড়ীর উদ্দেশে ছেড়ে আসেন। ৭ জানুয়ারি এখানে পৌঁছান। কিন্তু নদীতে নাব্যতাসংকটের কারণে গন্তব্যে যেতে পারছেন না।
একই কারণে বরুরিয়া এলাকায় নোঙর করে আছে এমভি লাভলী-২, এমভি তানজিদ-১, এমভি তানজিদ-২, এমভি দুই বন্ধু, এমভি সানজিদ, এমভি ফাহিম হোসাইন, এমভি মা-বাবার দোয়া-৫, এমভি প্রিন্স অব পশ্চিম নারিশা, এমভি মুগনী-১, এমভি আমিশা, এমভি আল-ইনসান, এমভি চাকলাদার-৩, এমভি সেতু-২, এমভি শিহাব খান, এমভি বসুন্ধরা-৩৬সহ অর্ধশত জাহাজ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা কার্যালয় সূত্র জানায়, শুষ্ক মৌসুমে সাধারণত নদীতে পানির গভীরতা কমে যায়। কিন্তু এ বছর মৌসুমের আগেই পানি কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচলে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এমভি রুমাইছা হক জাহাজের তত্ত্বাবধায়ক রুহুল আমিন জানান, তাঁর জাহাজে ৮০০ টন সার রয়েছে। এখন বাল্কহেডে করে প্রতি বস্তা সার পাঁচ টাকা হারে বরুরিয়া থেকে নগরবাড়ী পাঠানো হচ্ছে। প্রতি বস্তায় ৫০ কেজি সার রয়েছে। সেই হিসাবে মোট ১৬ হাজার বস্তা সার গন্তব্যে পৌঁছাতে এখন তাঁদের বাড়তি ৮০ হাজার টাকা লাগছে। এমভি তানজিদ-২-এর শ্রমিক ফেরদৌস হোসেন বলেন, ‘দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আটকে আছি। প্রচণ্ড শীতে কষ্ট হচ্ছে।’
বিআইডব্লিউটিএর আরিচা কার্যালয়ের নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক শাজাহান হোসেন বলেন, বর্তমানে যমুনা নদীর ওই অংশে নয় ফুট পানি রয়েছে। অতিরিক্ত পণ্যবোঝাইয়ের কারণে জাহাজগুলো আটকা পড়েছে।

মত প্রকাশে বাধা ও বিপন্ন গণতন্ত্র by হারুন-আর-রশিদ

ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে গণগ্রেফতার শুরু হয় দেশব্যাপী। বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। গণতন্ত্র নিয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিরা চিন্তিত। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, অতি সত্বর দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রয়োজন। না হলে সঙ্কটের সুরাহা ঘটবে না। সেনাশাসক আইয়ুব, ইয়াহিয়া ও এরশাদের শাসনামলÑ কোনোটিই জনগণের দুর্বার গণ-আন্দোলনে টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনে প্রতিষ্ঠিত সরকার ৪২ দিনের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। ওই নির্বাচনে মাত্র ৪৯ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন। প্রার্থীর সংখ্যা ছিল এক হাজার ৪৫০ জন।এরশাদের অধীনে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনও  বৈধতা পায়নি। ’৯০-এর ৬ ডিসেম্বর দুর্বার গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদের পতন ঘটে। বাংলার মানুষ যথার্থ সময়ই সমুচিত জবাব দেয় স্বৈরাচারী ও একতরফা নির্বাচনে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে। ভয় দেখিয়ে দেশ শাসন করার দিন ফুরিয়ে গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মানুষের মনের কথা শুনুন, এখনো সময় আছে সংলাপে বসে গরমিল শোধরানোর। জনগণের হৃদয়ের স্পন্দন উপলব্ধি করুন এবং  বিবেক দ্বারা পরিচালিত হোন- চাটুকারেরা অসময়ের বন্ধু নয়, সময়ের বন্ধু। দুর্দিনে ওরা কাছে থাকবে না। মুখে তালা ঝুলিয়ে দেশ শাসন করা যায় না। ’৫২, ’৬২, ’৬৯, ’৭১ ও ’৯০-এর দিকে তাকানÑ। ৬৫ বছরের একটি ঐতিহ্যবাহী দল, যার কাণ্ডারি আপনি, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার আলোকে ভূমিকা নিতে হবে আপনাকেই।  বলেছিলেন, ৫ জানুয়ারি নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। শিগগির একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য সংলাপ শুরু হবে।’ এক বছর পেরিয়ে গেছে অথচ নতুন নির্বাচনের জন্য সংলাপ  শুরুই হয়নি। উল্টো দলের পক্ষ থেকে ‘শব্দবোমা’ ফাটানো হচ্ছে। বিগত ১০টি নির্বাচনের নিরিখে দেখা গেছেÑ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটিই সবচেয়ে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত। কোনো মানদণ্ডেই টেকে না।  বিরোধী দলও যে মন্ত্রিত্ব পায়Ñ সেটা প্রথম দেখা গেল এ দেশে। ১৫৪ জনের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। পার্লামেন্টে অর্ধেকের বেশি আসনে বিনাভোটে ‘জয়যুক্ত’Ñ এটাও নজিরবিহীন। অতীতের রেকর্ড (১৯৯৬) ছিল ৪৯ জন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার। ওই নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যাও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৪৫০, অন্য দিকে ২০১৪ সালে প্রার্থী মাত্র ৫৪৩ জন এবং ১২টি দল অংশ নিয়েছে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলের সংখ্যা ছিল ৪১। ২০০৮ সালের নির্বাচনে দলের সংখ্যা ছিল ৩৮। ’৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সংখ্যা কম ছিল। এ দুই সময়েই আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দুই বছর দেশ শাসন করে, যা সংবিধানবহির্ভূত। ওই সরকারকে আওয়ামী লীগ বৈধতা দিয়ে বলে, আপনারা আমাদের আন্দোলনের ফসল। আমরা ক্ষমতায় এলে আপনাদের বৈধতা প্রদান করা হবে।’ সেটা হয়েছেও। সেহেতু ২০০৮ সালের নির্বাচনও কলঙ্কমুক্ত নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বিএনপিসহ অনেক দল অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগ থেকেই কথিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন এবং হারজিতকে কেন্দ্র করে খুনোখুনি পর্যন্ত হয়েছে। এক পরিবারেই কয়েকজন নৃশংসতায় প্রাণ হারান।
গত ২ জানুয়ারির জাতীয় দৈনিকে শিরোনাম ছিলÑ সামনে রক্ত ও বারুদের গন্ধ দেখছি, স্বস্তিতে সরকারের বছর পার, শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কূটকৌশলে ঘায়েল প্রতিপক্ষ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি কিছুটা মিলেছে, নেতাকর্মীদের দুর্নীতি ও অপকর্মে মলিন সরকারের অর্জন, খালেদা জিয়া রাজনীতি থেকে মাইনাস হতে পারেন (সরকারি দলের নেতার ভাষ্য)। দুই ডিসিসির ভাগফল শূন্য। সাত দফা কেন, ৭০০ দফা দিয়েও কাজ হবে নাÑ বলেছে সরকারি দল। আওয়ামী লীগের পরিকল্পনায় অন্তত ২০১৯ পর্যন্ত কার্যকর বিরোধী দলের স্থান নেই। ৪ জানুয়ারি আরেকটি জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিলÑ খালেদা জিয়া কার্যত অবরুদ্ধ।  পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের তালা। বিএনপির মিছিলে ছাত্রলীগের হামলা, বিপন্ন গণতন্ত্র। ৫ জেলায় বিএনপি-জামায়াতের ১৩৯ নেতাকর্মী আটক। ওই দিনের আরেকটি জাতীয় দৈনিকের হেডলাইন ছিলÑ ৫ জানুয়ারি শুধু আমাদের, অন্য কাউকে মাঠে নামতে দেবো নাÑ খাদ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশে একদলীয় শাসন চলছেÑ বিবিসি সংলাপে আইরিন খান। সংলাপ ও নির্বাচনের সম্ভাবনা নেইÑ বাণিজ্যমন্ত্রী। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সরকার পাগলের স্বর্গে বসবাস করছে। বিএনপিকে কোথাও সমাবেশ করতে দেয়া হবে নাÑ ছাত্রলীগের ঘোষণা। খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনকÑ ইনু। জনমনে প্রশ্নÑ  এসব খবর মোতাবেক ক্ষমতাসীন দল ও সরকারের ভূমিকা কি গণতন্ত্র ও সংবিধানকে সমুন্নত করবে? প্রধানমন্ত্রী  ছাত্রলীগ নেতাদের বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করা হয়নি, উনি ইচ্ছা করলে বাসায় চলে যেতে পারেন। উনি অফিসে বসে নাটক করছেন।’ যদি তা-ই হয়, তাহলে সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী  কেন বেগম জিয়ার সাথে দেখা করতে এসে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হলেন? পানিকামান, রায়টকার ও শত শত পুলিশ, ডিবি, র‌্যাব তার গুলশান কার্যালয়ে কেন মোতায়েন করা হলো! ভিন্ন মতের দলের অফিস বন্ধ এবং দলের চেয়ারপারসনকে অবরুদ্ধ করে গণতন্ত্র রক্ষা করা যায় না, এটা সচেতন মানুষমাত্রই বোঝে। ক্ষমতাসীন দলই গণতন্ত্রকে অবরুদ্ধ করে সহিংসতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রশাসন তাদের নিয়ন্ত্রণেÑ  সহিংসতার ব্যাপকতার জন্য তাই তারাই দায়ী। ৪ জানুয়ারি বিবিসি বাংলাকে  বেগম জিয়া বলেছেন, আমাকে বন্দী করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়েছে। গণতন্ত্রের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে শাসক দল। তারা স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ পরিচালনা করতে চায়। জনগণের স্বার্থে কথা বলার জন্য  পার্টি অফিসেও বক্তব্য দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনগণের সেবক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও নিজের দলের লোক বানিয়ে জনগণের কথা বলার অধিকার হরণ করছেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে বিএনপির সাতটি সভায় কোথাও সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেনি। তাহলে ৫ জানুয়ারিতে কেন ঘটবে? আসলে সরকার নিজেই গণতন্ত্রকে হুমকির মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দিয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের কালচার প্রসারিত করা হচ্ছে। গণতন্ত্র চর্চার পথে প্রতিবন্ধক সৃষ্টি হলে সহিংসতা ঘটবে। উন্মুক্ত গণতন্ত্রে উন্নয়ন এগিয়ে যায়। তিনটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের আগে ও পরে সহিংসতা এমন দেখা যায়নি। গণতন্ত্রের পথ অবরুদ্ধ করলে গণতন্ত্র তখন আর গণতন্ত্র থাকে না, ভাঙচুর থেকে শুরু করে সব ধরনের বিশৃঙ্খলার সূত্রপাত ঘটে এবং সে জন্য দায়ী মূলত ক্ষমতাসীন মহল। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে জনগণের প্রত্যাশা ছিল শিগগিরই আরেকটি নির্বাচন হবেÑ সরকার সে কথা বলেছিলও। এর প্রত্যাশার পেছনে সবচেয়ে বড় যুক্তি ও দৃষ্টান্ত ছিল, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। ওই সময় বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে ছাড়াই একতরফা নির্বাচন করে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় এবং বিজয়ী হয়ে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করেছিল আওয়ামী লীগ। যদি বিএনপি ক্ষমতায় আর আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকত, তাহলে কি আওয়ামী লীগ বেগম জিয়ার অধীনে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিত? বিবেকের কাছে এই প্রশ্নটি রাখার জন্য বিনয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাব। খালেদা জিয়ার অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার জন্যই কিন্তু জামায়াত ও জাতীয় পার্টিকে সাথে নিয়ে আওয়ামী লীগ দুই বছর আন্দোলনে ছিল। জ্বালাও-পোড়াও এবং  সচিবকে দিগম্বর করা, রূপসী বাংলা হোটেলের সামনে বিআরটিসি বাসে অগ্নিসংযোগ করে ১২ জন জীবন্ত দগ্ধ  করাসহ চট্টগ্রাম বন্দরকে মাসের পর মাস অচল করে রাখা হয়েছিল তখন। ১৭৩টি হরতাল-অবরোধ পালন করা হয়েছিল।  ‘জনতার মঞ্চ’ বানিয়ে জাতীয় প্রেস কাবের সামনে মহীউদ্দীন খান আলমগীর সচিবালয়ে চাকরিরত অবস্থায়ই ‘আমলা বিদ্রোহ’ ঘটিয়েছিলেন। সরকারি বিধিমালায়। কাজটি সম্পূর্ণ বেআইনি। মাসাধিককাল ধরে রাস্তাঘাট অবরোধ করে জনগণকে কষ্টে ফেলা হয়েছিল। সেটা যদি অন্যায় না হয়, তাহলে ৫ জানুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রতিবাদে বিএনপি যেটা করছে, সেটা কেন অন্যায় হবে? ক্ষমতায় থাকলে তত্ত্বাবধায়ক ভালো লাগে না; আর ক্ষমতার বাইরে থাকলে তত্ত্বাবধায়ক জরুরিÑ এটা আওয়ামী লীগ শিখিয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের চেয়ে নিন্মমানের। তা কিভাবে জাতি মেনে নেবে? স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে  নির্বাচনই পারে বর্তমান পরিস্থিতিকে শান্ত করতে। আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো। গত এক বছরে নির্বাচনের এই আনন্দময় সংস্কৃতি বিদায় নিয়ে গেছে। ফিরে এসেছে কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারার তাণ্ডব। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের ওপর মানুষের মোটেও আস্থা নেই। ১৯৯১ থেকে ধীরে ধীরে সুষ্ঠু নির্বাচনের যে ধারা সৃষ্টি হয়েছিল, তা ফিরে পেতে হবে। ৩, ৪, ৫ জানুয়ারি বেগম জিয়ার কার্যালয়ে পুলিশি কর্মকাণ্ডে প্রমাণ হয়Ñ উন্মুক্ত গণতন্ত্র নয়, অবরুদ্ধ গণতন্ত্রই ক্ষমতাসীন দলের পছন্দ।
লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক
harunrashid1952@yahoo.com

জনগণ কী বার্তা দিচ্ছে by মাসুদ মজুমদার

প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলেনÑ শোকাহত খালেদা জিয়াকে সান্ত্বনা দিতে যাবেন। এক পক্ষ প্রস্তুত ছিলÑ রাজনৈতিক ফায়দা তুলবেন। তাৎক্ষণিক শুরু হলো ফায়দা তোলার অনৈতিক ফন্দিফিকির। অন্য পক্ষ রাজনীতি বোঝার চেষ্টাও করল না। প্রশ্ন, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতাকেও বিষয়টি আগাম জানানো হলো না কেন! কার্যত গৃহবন্দী একজন মানুষকে এভাবে সান্ত্বনা দিতে যাওয়ার চিন্তা কোন ধরনের প্রটোকলের মধ্যে পড়ে? তা ছাড়া আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে দুর্যোগের ঘনঘটা। যেকোনো সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। রটে যেতে পারে নতুন কিছু ঘটে যাওয়ার গুজব। ঘোষণা না দিয়েই আবার বাকশালে প্রত্যাবর্তনের আয়োজন সম্পন্ন হলো। তাই বিনা ঘোষণায় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে যাওয়াও বিচিত্র কিছু নয়। মানুষ কিছু ভাবতে পারছে না। কাল-পরশু কী ঘটবে সে সম্পর্কে আগাম অনুমান করাও কঠিন। এ ধরনের অনিশ্চিত কিন্তু গুমোট পরিস্থিতিতে সব কিছু ঘটে যাওয়া সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে সব অতীত-বর্তমান ভুলে সান্ত্বনার সৌজন্যবোধ কতটা রক্তমূল্যে শোধ হবে সেটাও তো ছোট প্রশ্ন নয়। কোকোর লাশ আসা থেকে কবর দেয়া পর্যন্ত কোনো কাজে সরকারের বাড়তি সহমর্মিতা দেখা গেল না। সেনাবাহিনীর পরিবারের জন্য রীতিসিদ্ধ কবরস্থানে সাড়ে তিন হাত জায়গা কোকোর জন্য বরাদ্দ হলো না। অথচ জনতা তার জানাজায় জানিয়ে দিলো ‘নিরপরাধ’ কোকোর নামাজে জায়গা তাদের হৃদয়জুড়ে। সরকারকে শুধু জনভীতি তাড়া করছে। সামাজিক যোগাযোগ থেকে মিডিয়াÑ সর্বত্র অঘোষিত নিয়ন্ত্রণই প্রত্যক্ষ করা গেল। তবু সাধুবাদ এ জন্য যে, তারা জনস্রোত রুদ্ধ করতে বালুর ট্রাক ও জলকামানের ব্যবস্থা করেনি। এ নামাজে জানাজায় জনগণ একটি নীরব বার্তা দিলো। শাসকদের উচিত এ বার্তা বুঝতে চেষ্টা করা। তাই রাজনীতির পাঠ বন্ধ রেখে আজ হিন্দি ছবির জায়গা করে দেয়া নিয়ে কথা হোক।
হিন্দি চলচ্চিত্রের আগ্রাসন ঠেকাতে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পী এবং কলাকুশলীরা মাঠে নামলেন। এর আগে তারা কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে প্রতিবাদ করেছেন। তাদের প্রতিবাদের ভাষা যৌক্তিক। ভাষাও ঋজু। প্রতিবাদের ধরনও পরিমিতিবোধসম্পন্ন। তবে তারা সোচ্চার হলেন উদোম হওয়ার পর। যদিও তাদের প্রতিবাদের কারণেই এত দিন ভারতীয় ছবি আগ্রাসন ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। অবশ্য এর আগে আমাদের ইজ্জত-আব্রু সবই খুলে নিয়েছে। লেংটিটা ধরে টান দিতেই তাদের বোধোদয় ঘটল। তা-ও নীতিগত কারণে নয়, বাণিজ্যিক কারণে। হিন্দি ছবি বাংলা ছবির বাজার নষ্ট করবে, তাই সংশ্লিষ্ট শিল্পী ও কলাকুশলীরা রিজিকের ওপর হামলা ঠেকাতে মাঠে নামলেন। যখন আমাদের গায়ের চাদর, শার্ট-লুঙ্গি খুলে নিয়ে গেছে তখন তারা টুঁ শব্দটিও করলেন না। আগ্রাসন তো শুধু ছবি দিয়ে হয় না, আগ্রাসন হয় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে। যার পরিণতিতে আমাদের কপাল পুড়ল। তাই মানসিক দাসত্ব লালনকারীরা এই বাঙ্গাল জাতিকে হিন্দি ছবি দেখিয়েই ছাড়বে। ইতোমধ্যে চারটি ছবির অনুমোদন দিয়ে দেয়া হয়েছে। একটা বিষয় লক্ষণীয়, শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রতিপক্ষ ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। প্রদর্শক সমিতি জানিয়ে দিলো, হিন্দি ছবি প্রদর্শনে বাধা দিলে যারা বাধা দিচ্ছে তাদের ছবি তারা দেখাবে না। এখানেও গাদ্দার, মীরজাফর ও লেন্দুপ দর্জির ভূমিকা স্পষ্ট। নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে জবাব পাই নাÑ আসলে আমরা সামগ্রিক অর্থে স্বাধীন থাকতে চাই কি না! হিন্দি ছবির বাজার অনেক বড়। ভারত দুনিয়াজুড়ে বিনোদন ও সেক্স বাণিজ্য করে। তাদের বাজার মধ্যপ্রাচ্য-দূরপ্রাচ্য ও পাশ্চাত্য পর্যন্ত বিস্তৃত। এটা মেনে নিয়েই আমাদের অবস্থান ঠিক করা উচিত। আমাদের আলু-পটোল থেকে স্বর্ণবাজার সবটা কার্যত ভারতের দখলে। গরু থেকে মুরগির বাচ্চা, ডিম থেকে ভিম কোনোটাই ভারতীয় না হয়ে উপায় নেই। ভারতীয়দের এখানে কাজ করতে ওয়ার্ক পারমিট লাগে না। কনসালটেন্সি ফি নিতে কৈফিয়ত দিতে হয় না। বাংলাদেশ এখন ভারতীয় অর্থলগ্নির লাভজনক ক্ষেত্র। ভারতীয় বণিকেরা নব্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। আমাদের নাব্য নদী ভরাট করে রাস্তা বানিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় যাতায়াত করতেও তাদের কোনো পারমিশন লাগে না। ট্রানজিট ফি চাইতেও নাকি আমাদের ছোটলোকি ঠাওর করা উচিত। সরকারের উপদেষ্টারা এমনই মনে করেন। বাংলাদেশ এখন ভারতের পঞ্চম রেমিট্যান্স প্রবাহের জোগানদার। দেশের একটা অঞ্চলের বিদ্যুতের চাবি ভারতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। আমাদের সীমান্তরক্ষীরা অসহায়, ফোলানীর লাশ ঝুলে থাকে কাঁটাতারের ওপর। পাখি শিকারের মতো গুলি ছুড়ে ভারতের সীমান্ত রক্ষীরা বাংলাদেশী হত্যা করে। মাদক পাচার হয় তারা দেখে না। বাংলাদেশ ভারত থেকে পাচার হয়ে আসা মাদকে ভাসছে। চোরাই পথে আসা অস্ত্রে সন্ত্রাসীরা দেশের ও জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। সব স্বর্ণ চোরাচালানির গন্তব্য ভারত। জনগণ দর্শক। সরকার নতজানু। আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী পানি দেয় না ভারত। ছিটমহল সমস্যা ঝুলিয়ে রাখে দিনের পর দিন। সীমান্ত সমস্যার সমাধান করে না ঠাণ্ডা মাথায়। ফারাক্কার কারণে আমাদের উত্তর জনপদ আজ মরুভূমি। ভারতের টিপাইমুখে বাঁধ পড়লে মেঘনা ও পদ্মা অববাহিকায়ও মরুভূমি দেখা যাবে। আমরা সমুদ্র জয়ে উৎফুল্ল, হাঁড়িয়াভাঙ্গা দক্ষিণ তালপট্টি নিয়ে কোনো দুঃখবোধও নেই। আমরা কোনোকালে ভারতবিদ্বেষী কিংবা বিরোধী ছিলাম না। আজো নই। তা ছাড়া মানুষ নিজে পাল্টে যেতে পারে কিন্তু প্রতিবেশী পাল্টাতে পারে না। তাই প্রতিবেশীর সাথে বোঝাপড়ার ভিত্তিতে সহাবস্থানই শান্তিতে বাস করার এক মাত্র উপায়। প্রতিবেশী যত ক্ষমতাধরই হোক দাদাগিরি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক শোষণের প্রক্রিয়া অবলম্বন কোনোভাবে মানা যায় না। তাতে আমাদের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যায়। সার্বভৌমত্বের অহম বলে অবশিষ্ট কিছু থাকে না। একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশের মানুষ হিসেবে আমরা ট্রানজিট নিয়ে নেপাল যেতে চাই, ভুটানের সাথে বাণিজ্য করতে চাই, চীনের সাথে কানেকশন চাই, ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান হয়ে ইরান, তুরস্ক যেতে চাই। ভারতের সাফ জবাব ‘না’ বলে না, কিন্তু পাত্তাও দেয় না। অথচ তারা আমাদের আকাশ-বাতাস, জল-স্থল সবটা তাদের মতো করে ‘উপভোগ’ করতে চায়। সার্কের পরিসর বড় হোক, ভারত চায় না। আমাদের সমস্যা সার্কে আলোচনার সুযোগ দেয় না, দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ললিপপ দেখিয়ে কালক্ষেপণ করে চলেছে। চলচ্চিত্র শিল্পীরা আজ মাঠে নামার দায় বোধ করলেন। অথচ ভারতের জন্য আমাদের আকাশ অনেক আগেই উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে। ঘরে ঘরে ভারতীয় চ্যানেলের উপস্থিতি। আমাদের একটা চ্যানেলও তারা জায়গা করে দেয় না। তাই আমাদের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বাতন্ত্র্য আজ হুমকির মুখে। উর্দু তাড়াতে আমরা রক্ত ঢাললামÑ আর হিন্দিকে অভ্যর্থনা করে আনলাম। কলকাতার ককটেল বাংলা এখন নতুন প্রজন্মের মুখে। ডি জুইস ভাষার সাথে ওপারের ভাষার মিশ্রণে এবং হিন্দির কুপ্রভাবে অনেকেই ধরাশায়ী। এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখা ভালো, কোনো ভাষাই খারাপ বা মন্দ নয়। কোনো ভাষার প্রতি বিদ্বিষ্ট হওয়াও সমীচীন মনে করি না। সব ভাষা আল্লাহর দান। বেদ-বেদান্তনির্ভর সংস্কৃতিঘেঁষা বাংলার চেয়ে হিন্দির কূপমণ্ডূকতা কম বরং ধ্বনিতত্ত্বের কারণে উর্দু-হিন্দি অনেকটা যমজ। যদিও হিন্দি মূলত উত্তর ভারতের ভাষা। দেবনাগরি অক্ষরে হিন্দি লেখার রেওয়াজ চালু না করলে উর্দু-আরবি-ফারসির মতো হিন্দিও আরবি বর্ণমালায় লেখা হতো। ধ্বনিও হতো প্রায় উর্দুর মতো। হিন্দি এখন ভারতের রাষ্ট্রভাষা। কোনোভাবেই ভারতের সংখ্যাগুরু মানুষের ভাষা নয়। ভারতের বাঙালিরা নাকি আসল বাঙালি। আমরা মুসলমানি বাঙাল। আজব ব্যাপার যে, আমরা করলাম রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, ঢাকা বাংলা ভাষার রাজধানী হলো। মুক্তিযুদ্ধ করে বাংলাদেশ বানালাম। মুক্তিযুদ্ধে তারা আমাদের সাহায্যও করল। অথচ তারা করল হিন্দির কাছে আত্মসমর্পণ।
এখনো উর্দু-হিন্দির উচ্চারণগত কোনো সমস্যা নেই। যা আছে তা কিছু শব্দগত ও ব্যাকরণগত। অনেকেই হিন্দির ভেতর মুসলিম সংস্কৃতির গন্ধ পান। প্রচুর উর্দু-ফারসি ও আরবি শব্দ আত্মস্থ করার কারণেই এটা হয়েছে। আরো কারণ হিন্দিকে হিন্দুয়ানি করেছে কিছু সংস্কৃতি শব্দের আধিক্য। মূলত হিন্দি একধরনের সমন্বিত ভাষা। সব দেশের ভাষার মতো এটিও ধর্মনিরপেক্ষ ভাষা। যেমন উর্দুকে ফৌজি ভাষা বা অবিভক্ত ভারতের ক্যান্টনমেন্টের ভাষা মনে করা হয়, এর অংশত সত্যও। কোনো ভাষাকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা আমাদের কাজ নয়। আমরা আমাদের ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও জাতিগত স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করে চলতে চাই। তাই বলে দরজা-জানালা বন্ধ করার প্রশ্ন ওঠে না। হিন্দির সাথে কিছু মুসলিম সংস্কৃতি বিধৌত শব্দ আছে। সেটা একেবারে গৌণ বিষয়। আমাদের আপত্তিটা হিন্দি সিনেমা নিয়েও নয়, আপত্তিটা তাদের যৌন, ভোগবাদী, অনৈতিক ও বৈদিক সংস্কৃতির মাধ্যমে আমাদের নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দেউলে করে দেয়ার প্রবণতার বিরুদ্ধে। হিন্দিতে অনেক ভালো চলচ্চিত্র রয়েছে। সেসব ছবি আমাদের দেশে কম দেখা হয় না। কিন্তু অসম বাণিজ্যিক ধারায় অবাধে হিন্দি ছবি আসা শুরু হলে আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প হারিয়ে যাবে। সেই সাথে হারিয়ে যাবে আমাদের স্বাতন্ত্র্যটুকু। তখন আমরা সব কিছু দেখব তাদের চোখ দিয়ে। মগজ দিয়ে। অথচ আমরা তাদেরও আমাদের চোখ-মন ও মগজ দিয়ে দেখতে চাই। তাতে কারো কোনো ক্ষতি নেই। এ সরকার চলচ্চিত্র শিল্পীদের নন্দিত ও গণদাবি পূরণের ভান করবে। আশ্বাস দেবে কিন্তু দাবি মানবে না। কারণ তারা এ জাতির স্বার্থ সংরক্ষণের দায়িত্ব পায়নি। তারা পেয়েছে জোরজবরদস্তি করে সরকার পরিচালনার ঠিকাদারি। তাই তাদের কাছে দাবি না জানিয়ে জনগণকে জানান। একাট্টা হয়ে সব ধরনের আগ্রাসন রুখে দিন।

প্রকৃতি- গোলাপ, গাঁদা, কুয়াশার দিন by আশীষ-উর-রহমান

(কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে দিগন্ত। ভোরে খেজুরের রস নিয়ে পথে নেমেছেন বিক্রেতা। শীতকালে গ্রামাঞ্চলের চেনা দৃশ্য। যশোরের মনিরামপুরের হাজরাইল গ্রাম থেকে সম্প্রতি ছবিটি তুলেছেন এহসান-উদ-দৌলা) শীত বিদায় নিচ্ছে। তবে মাঘের শীত সত্যি এবার কাঁপিয়ে দিয়েছে। রাজধানীতে গত কয়েক বছরই শীত এমন দাপুটে মেজাজে দেখা দেয়নি। সচরাচর ঢাকায় শীতের আগমন ঘটে যেমন বিলম্বে, তেমিন মেজাজ-মর্জিতেও থাকে খানিকটা কুণ্ঠিত। এ বছর সেই কুণ্ঠার খোলস ছেড়ে স্বরূপে আবির্ভূত। তার এ দাপটই বুঝিয়ে দিচ্ছে দেশের অন্যত্র অবস্থা কতটা কম্পমান। গরম আবহাওয়ার এই দেশে শীত ক্ষণিকের অতিথির মতো। দেশের উত্তরাঞ্চলেই সাধারণত এর প্রভাব তুলনামূলক প্রবল ও প্রলম্বিত। কোনো কোনো বছর প্রাণহানির মতো বেদনাদায়ক ঘটনাও ঘটে। এখন অবশ্য ফি বছর শীতার্ত মানুষের জন্য শীতবস্ত্র বিতরণ করে থাকেন সামর্থ্যবান লোকেরা ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া গড়পড়তা সারা দেশে শীতে উৎসবের আমেজই প্রধান। কার্তিকের পর থেকেই উষ্ণতা কমতে থাকে। ছোট হয়ে আসে দিন। আকাশে কুয়াশার মলিন আঁচল ভাসতে চোখে পড়ে সকাল-সন্ধ্যায়। পৌষে সেই কুয়াশার হালকা স্তর গভীর ও ধূমায়িত হয়ে আচ্ছন্ন করে তোলে দিকচক্রবাল। শুরু হয় গায়ে কাঁটা দেওয়া কনকনে উত্তুরে হাওয়ার প্রবাহ। রাতভর ঝরে পড়া শিশিরে ভিজে ওঠে ঘাস, লতাপাতা, ঘরবাড়ির টিনের ছাউিন। ঘাসের ডগায়, পাতার কিনারে জমে থাকা স্বচ্ছ শিশিরবিন্দুতে ভোরের সোনািল রোদের স্পর্শ ছড়িয়ে দেয় বড়ই মনোহর দ্যুতি। মুক্তোদানা বা হীরার কুচির সঙ্গে লোকে তার শোভার তুলনা করে আসছে বহুকাল থেকে। আর শীতের এই রোদ কতই না আদরণীয়—‘মিঠে রোদ’, ‘সোনা রোদ’ ভালোবেসে দেওয়া এমন সব তার নাম। লেপ-কাঁথার ওম থেকে বেরিয়ে এসে সকালে সেই মিঠে রোদে পিঠ দিয়ে বসার যে আরাম, শীত ছাড়া তা আর মেলে না কখনো। মেলে না কিছুতে।
শীতের সঙ্গে উৎসবের সংযোগ অর্থনৈতিক সচ্ছলতার কারণে। কৃষিনির্ভর এ জনপদে ধান ও রকমারি সবজি উঠতে থাকে এ মৌসুমে। হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসল বিক্রি করে নগদ টাকা হাতে পান কৃষকেরা। পিঠাপুলি, অতিথি আপ্যায়ন, যাত্রাপালায় গ্রামীণ জনপদে নির্ভার আনন্দের তরঙ্গ বয়ে যায়। অঢেল শাক-সবজি। মাঠের পর মাঠ ভরা শিম, কপি, গাজর, টমেটো, মটরশুঁটি, বরবটি, বেগুন, টমেটো প্রভৃতির আবাদ। আর সরিষার কথা বলতে হবে আলাদা করেই। আঁকাবাঁকা নদীর তীর বরাবর কুয়াশায় আবছা হয়ে থাকা দিগন্তের কাছাকাছি গ্রামের আভাস অবধি, কাঁচা হলুদে ভরিতে তোলা সরিষাখেতের যে চোখজুড়ানো সৌন্দর্য, তা একবার যার চোখে পড়ছে, তার স্মৃতির অ্যালবামে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে সেই ছবি। ঝলমলে সকাল বা পড়ন্ত বিকেলের কবোষ্ণ রোদ গায়ে মেখে ওই সরিষাখেতের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে রাশিরাশি ফুলের ঝাঁজালো মধুর ঘ্রাণমাখা হিমেল হাওয়া ঝাপটা দিয়ে যায় নাকে। একটু কান পাতলেই ভেসে আসে মৌমাছির গুঞ্জন। আলপথে চলতে চলতে শিশিরে ভিজে যায় পায়ের পাতা। হয়তো চোখে পড়ে পোকামাকড় খুঁজতে থাকা লম্বা গলার সাদা বক। খেজুরগাছের মাথা থেকে রসের হাঁড়ি পেড়ে আনা বা হাঁড়ি বাঁধার দৃশ্য। বাড়ি উঠান বা ধান কেটে নেওয়া রিক্ত মাঠে গোল হয়ে বসে রোদ পোহানোর দৃশ্য। খুবই আটপৌরে, খুবই চেনা সবকিছু। তবুও কোথায় যেন তার মধ্যেই মিশে আছে গভীর আনন্দে মন পুলকিত করে তোলার মতো অনির্বচনীয় কিছু।
আমাদের দেশে তুষার পড়ে না। তবু শীতের শুষ্ক রুক্ষতা মৃত্যুর সঙ্গে তুলনীয়। গাছে গাছে মলিন, বিবর্ণ হয়ে আসে পাতা। ফেটে ঝরে পড়ে বাকল। অথচ এই রুক্ষ প্রকৃতিই ফুটিয়ে তোলে রক্তলাল গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, মল্লিকাদের। এত রঙিন ফুলে ভরা মালঞ্চ শীত ছাড়া কার আছে আর! শহরে শীতের শোভা গজ-ফুটে মাপা ফ্ল্যাট বাড়ির ছাদে, এক চিলতে ঝুলবারান্দার টবে যত্নে ফোটানো এই ফুলগুলোই। চারপাশে এত ফুল ফোটাল শীত, তবু এ বছর শেষটা ভালো যাচ্ছে না তার। বোমায়, আগুনে ঝলসে যাচ্ছে মানুষের মুখ। কে আর না জানেন—মানুষের মুখের হাসির চেয়ে সুন্দরতম আর কিছু নেই। যাওয়ার আগে মানুষের মন থেকে হিংসা-ক্রুদ্ধতা মুছে ফেলে তার হৃদয়কুসুমকে আবার ফুটিয়ে তুলতে পারবে কি এই শীত? আহ্, কতই না মধুর হতো, যদি তা পারত সে!

পৃথিবীর সম্পদ ও এর ভোগব্যবস্থা by এবনে গোলাম সামাদ

পত্রিকায় অক্সফাম প্রদত্ত বর্তমান বিশ্বের সম্পত্তির হিসাবসংক্রান্ত বিবরণ পড়ছিলাম। অক্সফামের হিসাব অনুসারে বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ শতকরা ১ ভাগ মানুষের হাতে গিয়ে পড়েছে। অন্য দিকে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের কাছে আছে মাত্র ৫.৫ শতাংশ সম্পদ। অক্সফাম সম্পদ বলতে ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। সাধারণ অর্থনীতির বইতে প্রাকৃতিক সম্পদ আর সম্পদকে (Wealth) এক করে দেখা হয় না। সম্পদ বলতে বোঝায়, প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে মানুষ যা তৈরি করে তাকে; যেমন- কলকারখানা। বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ শতকরা ১ ভাগ লোকের হাতে, এ কথায় ঠিক কী বুঝতে হবে সেটা স্বচ্ছ নয় অনেকেরই কাছে। পত্রিকার খবর পড়ে এ বিষয়ে কিছু অনুমান করা যাচ্ছে না। আমাদের হাতে এর বিস্তারিত প্রতিবেদন এসে পৌঁছায়নি। এই সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনায় রেখেই বর্তমান আলোচনার অবতারণা। মানুষের ভোগের সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ হলো, মানুষের শরীর এমনভাবে তৈরি যে, সে মানতে বাধ্য হয় তার দেহের ভোগ করার সীমানাকে। আমার ঘরে যথেষ্ট চাল থাকার অর্থ এই নয় যে, প্রতিদিন ১০ থালা ভাত খেতে পারব। আমার খাদ্য গ্রহণের একটা বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে। বেশি ভোগ করতে গেলে ভোগ দুর্ভোগে পরিণত হতে পারে। কথায় বলে ‘গরিব মরে না খেয়ে, আর বড়লোক মরে বেশি খেয়ে’। সব মানুষই মরে। মানুষ মরণশীল। মৃত্যুর সীমানা দিয়ে ঘেরা মানুষের জীবন। এর বাইরে সে যেতে পারে না। প্রশ্ন উঠছে, শতকরা এই ১ ভাগ লোক আসলে কতটা ভোগ করছেন। তারা যদি বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের সবটুকুই ভোগ করতে চান এবং অন্যদের কিছুই না দিতে চান, তবে বিশ্বে এত লোক বাঁচছে কী করে। তাদের জন্য স্বাভাবিক ছিল না খেয়ে মরে যাওয়া। তাই বলা চলে না যে, বিশ্বের শতকরা ১ ভাগ মানুষের হাতে অর্ধেক সম্পদ চলে যাওয়ার মানে হচ্ছে, এই সম্পদের আয় থেকে আর সবাই হচ্ছে বঞ্চিত। এটা কখনোই হতে পারে না। কিন্তু অক্সফামের হিসাব থেকে এই রকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারছে। কোনো ব্যক্তি যখন তার ব্যক্তিমালিকানায় একটি কারখানা স্থাপন করেন, তখন তাকে নিয়োগ করতে হয় শ্রমিক। নিয়োগ করতে হয় নানা পর্যায়ে কর্মকর্তা যারা কারখানার প্রশাসন পরিচালনা করে। কোনো ব্যক্তি একা কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারে না। তাই একটি কারখানার আয় কেবল যে একজন ভোগ করেন, তা নয়। তিনি যখন কোনো কারখানা স্থাপন করেন, তখন হতে পারে বহু লোকের কর্মসংস্থান। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশিত, অক্সফামের প্রতিবেদন পড়ে মনে হচ্ছেÑ ‘বিশ্বের শতকরা ১ ভাগ লোকই কেবল ভোগ করছেন বিশ্বের শতকরা ৫০ ভাগ সম্পদের আয়। আর এ জন্যই ঘুচছে না বিশ্বের অভাব অনটন।’ গরিবেরা গরিব, কারণ তাদের হাতে কোনো সম্পদ নেই। পৃথিবীর শতকরা ৫০ ভাগ সম্পদ নাকি চলে গেছে শতকরা মাত্র ১ ভাগ মানুষের হাতে। অক্সফামের প্রতিবেদন পড়ে বোঝা যাচ্ছে না, বিশ্বের আর শতকরা ৫০ ভাগ সম্পদ কাদের হাতে কী পরিমাণ আছে। প্রতিবেদন অনুসারে এই সম্পদের শতকরা ৫ দশমিক ৫ ভাগ আছে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষের হাতে। অক্সফাম বলছে, দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে ধনিক শ্রেণীর ওপর বাড়াতে হবে আয়কর। বন্ধ করতে হবে আয়কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা। কিন্তু সব দেশেই দেখা যায়, আয়কর বাড়ালে বাড়ে কর ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা। সাদা টাকা পরিণত হয় কালো টাকায়। ‘কালো’ টাকা বলতে বোঝায় কর ফাঁকি দেয়া টাকা। তা দিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য চলে সরকারি হিসাবের বাইরে। আয়কর অতিরিক্ত বাড়ালে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হতে চায়। আর তাই হতে দেখা যায় বেকারত্বের বৃদ্ধি। বেকার বাড়ার অর্থ দাঁড়ায়, ক্রেতার সংখ্যা কমা। ক্রেতার সংখ্যা কমার অর্থ দাঁড়ায় উৎপাদিত পণ্যের বাজার সঙ্কুচিত হয়ে পড়া। আর বাজার সঙ্কোচনের ফলে দেখা দেয় বাণিজ্যের মন্দা। অর্থনৈতিক সমস্যা তাই হয়ে উঠতে পারে খুবই জটিল।
এক সময় সমাজতন্ত্রীরা বলতেন, ‘ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ঘটাতে হবে। রাষ্ট্রকে নিতে হবে অর্থনীতি পরিচালনার ভার। রাষ্ট্রিক পরিকল্পনা অনুসারে চলবে একটা দেশের অর্থনৈতিক জীবন।’ কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সমাজতন্ত্রের যুক্তিটা আর জোরালো শোনাচ্ছে না। রাষ্ট্রকে পরিণত করা যায় না একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে। অন্য দিকে চীন সমাজতন্ত্রের পথ ছেড়ে গ্রহণ করেছে বাজার অর্থনীতির পথ। চীন বলছে না সমাজতান্ত্রিক সমাজ জীবন গড়ার কথা। বলছে না, সমাজতন্ত্রের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব। তাই আজ নতুন করে দেখা দিয়েছে ব্যক্তি উদ্যোগে ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনার উপযোগিতা। কেউ বলছে না, ব্যক্তিগত মালিকানায় ব্যবসাবাণিজ্য করা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, ‘আমরা আরো অঙ্গীকার করছি যে, আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল ল্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা- যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।’ আমাদের সংবিধানে যখন সমাজতন্ত্রের প নিয়ে এই কথাগুলো লিখিত হয়, তখন কেউ ভাবতে পারেনি, সমাজতন্ত্রের ধ্বজাধারী সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়বে। আর চীন মাও জে দং-এর নীতি পরিত্যাগ করে গ্রহণ করবে মুক্তবাজার অর্থনীতির পথ। বিশ্বের পরিস্থিতি এখন ব্যাপকভাবেই বদলে গেছে। আমাদের সংবিধানের ওই অংশটি তাই পরিত্যক্ত হওয়া উচিত। কেননা সমাজতন্ত্রে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা বলে কিছু থাকে না। সমাজতন্ত্র বাস্তব েেত্র হয়ে দাঁড়ায় বিশেষভাবেই আমলাতন্ত্র। মানুষ হয়ে পড়ে আমলাতন্ত্রের শাসন ও শোষণের অধীন। সম্পত্তি জাতীয়করণ মানুষকে করে তোলে বিশেষভাবে রাষ্ট্রনির্ভর। সমাজতন্ত্রে অর্থনৈতিক উৎপাদন কমে যায়, মানুষ হারায় তার স্বাবলম্বিতা।
অক্সফাম যেভাবে অর্থনীতিকে গড়ে তুলতে চাচ্ছে, তা কিছুটা হলো সমাজতন্ত্রেরই অনুরূপ। এর ফলে অর্থনীতি হয়ে উঠবে আমলাতান্ত্রিক। কমে যাবে ব্যক্তিউদ্যোগের সুযোগ; আর সেই সাথে অর্থনৈতিক বিকাশ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে ব্যক্তির উদ্যোগে। এটা বন্ধ করলে অর্থনীতির হবে সমূহ তি, যেটা আমরা করতে পারি না। আমরা আমাদের দেশের ইতিহাসের পর্যালোচনা করলে দেখতে পাই, ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ আওয়ামী লীগ সরকার গ্রহণ করেছিল এক ব্যাপক জাতীয়করণ অর্থাৎ রাষ্ট্রীয়করণ কর্মসূচি। এই নীতি অনুসারে সব চটকল, বস্ত্র ও সুতাকল, চিনিকল, বিমান ও জাহাজ চলাচল জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি মালিকানায় আসে। এগুলো আর ব্যক্তিমালিকানায় থাকেনি। সরকারি মালিকানায় আসে অভ্যন্তরীণ ও উপকূলীয় নৌযান। বহির্বাণিজ্যের বৃহদংশও জাতীয়করণের ফলে সরকারি প্রচেষ্টার অন্তর্ভুক্ত হয়। এ ছাড়া ১৫ লাখ টাকা ও তার বেশি মূল্যের সব পরিত্যক্ত এবং অনুপস্থিত মালিকের সম্পত্তিও রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়। বিদেশী ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি ছাড়া সব দেশী ব্যাংক ও বীমা কোম্পানি আনা হয় সরকারি নিয়ন্ত্রণে। এর ফলে অর্থনীতিতে নেমে আসে বিরাট বিপর্যয়। দেখা দেয় পরিচালনার সঙ্কট। আমাদের পাটশিল্প হয়ে যায় ধ্বংস। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলজুড়ে সৃষ্টি হয় এক বিরাট দুর্ভি। এতে কম করে হলেও মারা যায় ৬৫ হাজার লোক। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে এ রকম ভায়বহ দুর্ভি ইতঃপূর্বে হয়েছে বলে জানা নেই। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চেয়েছিলেন অর্থনীতিকে ব্যক্তিমালিকানায় ফিরিয়ে আনতে। তার সময় ব্যক্তিমালিকানায় শুরু হয় তৈরী পোশাক শিল্প, যা আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের েেত্র বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। এতে কাজ করছে প্রায় ১৬ লাখ শ্রমজীবী। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে আরম্ভ হয় বিদেশে শ্রমশক্তি রফতানি। শুরু হয় ব্যক্তিমালিকানায় চিংড়ি ঘের তৈরি, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করে তোলে। আওয়ামী লীগ এখনো বলেছে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কথা। বলছে আগে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরে গণতন্ত্রের কথা। কিন্তু বিএনপি তা বলছে না। বিএনপি বলছে না, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন একে অপরের পরিপন্থী। কেননা, গণতন্ত্র উন্নয়নের পরিপন্থী হলে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড অর্থনৈতিক দিক থেকে সমৃদ্ধি পেতে পারত না। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের লড়াই কেবল মতার লড়াই নয়; এর গোড়ায় আছে আদর্শিক পার্থক্য। আওয়ামী লীগ চাচ্ছে সমাজতন্ত্র কিন্তু বিএনপি চাচ্ছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাজার অর্থনীতি, যা পরিচালিত হবে দাম, লাভ ও উৎপাদনের খরচ নির্ভর করে; সরকারি আমলাদের পরিকল্পনা অনুসারে নয়। আমাদের অর্থনীতি এখনো হয়ে আছে মূলত কৃষি অর্থনীতি। এ অর্থনীতি হয়ে আছে দণি-পশ্চিম মওসুমি বায়ুনির্ভর। যে বছর কোনো কারণে দেখা দেয় খরার সমস্যা, অর্থাৎ বৃষ্টি হয় কম অথবা হলেও ঠিক সময় হয় না, সে বছর ফসল মার খায়। আবার যে বছর মওসুমি বায়ুর কারণে অতিবৃষ্টি হয় (বাতাসে আসে সমুদ্র থেকে অধিক পরিমাণে জলীয়বাষ্প), সে বছর সৃষ্টি হয় বন্যার সঙ্কট। বন্যার ফলেও ঘটে ফসলের বিরাট তি। আমাদের দেশের কৃষি এমন যে, শতকরা ১০ ভাগ ফসল কম হলেই দেখা দিতে পারে দুর্ভিরে পরিস্থিতি। মানুষ মরতে পারে অনাহারে। আমাদের দারিদ্র্যের কারণ কেবলই ধনিক শ্রেণীর শোষণের ফল নয়। এর মূলে আছে প্রাকৃতিক কারণও। তবে দুর্ভিরে পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ব্যবসায়ীরা খাদ্যশস্য কিনে মজুদ করে পরে বেশি দামে বেচে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে দুর্ভি নিতে চায় ভয়াবহ রূপ। এটা যাতে না হতে পারে, তার জন্য সরকারি প্রচেষ্টার অবশ্যই প্রয়োজন।
আমাদের অর্থনীতির মূল সমস্যা এখনো হয়ে আছে, দুর্ভি প্রতিরোধের সমস্যা। কিন্তু কৃষি অর্থনীতিতে উন্নতি ঘটছে। আমরা আগের চেয়ে অনেক বেশি ধান উৎপাদন করতে পারছি। আমাদের কৃষিক্ষেত্রে তেমজুরের অবস্থার ঘটেছে বিরাট উন্নতি। তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আয় করছে। এটাকে উপো করা চলে না আমাদের দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির ক্ষেত্রে। এসবই ঘটতে পারছে ব্যক্তিগত মালিকানায়; সরকারি মালিকানায় নয়। আমরা আমাদের দেশে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গড়ে তুলছি না সরকারি যৌথ খামার। সেটা যদি করতে চাই, তবে আমাদের কৃষি অর্থনীতিতেও আসবে বিরাট বিপর্যয়। এ বিষয়ে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। রাশিয়ায় যত কারণে কৃষি উৎপাদন কমেছিল, তার একটি বড় কারণ হলো সরকারি যৌথ খামার গড়া। এ েেত্র আমলাতান্ত্রিক গাফিলতি পৌঁছেছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে। অক্সফাম বলছে, দরিদ্র মানুষকে দিতে হবে আর্থিক সহায়তা। কিন্তু এ েেত্র মনে রাখতে হবে, অক্সফাম যেভাবে দরিদ্র মানুষকে রাষ্ট্রিক সহায়তা দিতে বলছে, এতে সৃষ্টি হতে পারে একদল পেশাদার ভিখারি। যারা রাষ্ট্রের ওপর হয়ে উঠতে চাইবে একটা বিরাট অর্থনৈতিক বোঝা; যেটা কাম্য নয়। এসব কথা বলছি, কেননা সমাজতন্ত্র গড়ার হুজুগে আমাদের দেশের অর্থনীতি হয়েছিল ভয়ঙ্করভাবে তিগ্রস্ত। আবার যদি সেই হুজুগ ওঠে, তবে অর্থনীতি অচল হয়েই পড়বে। পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ শতকরা ১ ভাগ মানুষের হাতে গিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের সম্পদ এখন শতকরা কত ভাগ মানুষের হাতে আছে, তার হিসাব আমরা জ্ঞাত নই। কিন্তু আমাদের দেশে ছোট ছোট কৃষিজীবী অনেক। তারা যেভাবে কৃষিকাজ করছেন, তা না করে যদি সমবায় কৃষি পদ্ধতিতে নিজেরা স্বেচ্ছায় চাষাবাদ করেন, তবে ফসলের উৎপাদন আরো বৃদ্ধি পাবে। ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়া মানেই মানুষ খেতে পাওয়া নয়। কারণ বেকাররা খাদ্য কিনতে পারে না। তাই থাকতে হবে কর্মসংস্থান। আমাদের রাজশাহী অঞ্চলে আলুর ফলন যথেষ্ট হচ্ছে। আলু রাখা হচ্ছে হিমঘরে। কিন্তু অনেক সময় ক্রেতার অভাবে আলু থেকে যাচ্ছে হিমঘরেই। আর পচে নষ্ট হচ্ছে সেখানেই। একইসাথে আমরা কিনছি বিদেশ থেকে আমদানি করা পটেটো চিপ্স। অথচ এটা আমরা আমাদের দেশে উৎপাদিত আলুকে ভেজেও অবাধে করতে পারি। এ েেত্র কেউ অর্থ যদি বিনিয়োগ করেন, আমার মনে হয়, তিনি লাভবান হবেন। কারণ, দেশে পটেটো চিপ্স কেনার মতো যথেষ্ট ক্রেতা আছে। অভাব মানুষের নিত্যদিনের সাথী। অভাব ছিল এবং আছে। অভাবের সমস্যা সর্বতোভাবে বোধহয় মানুষ কখনোই সমাধান করতে পারবে না। আমরা যা করতে পারি, তা হলো অভাবের সমস্যাকে সহনশীল সীমানার মধ্যে বজায় রাখা।
পাদটিকা : প্রকাশ থাকে যে, ১৯৪২ সালে বিলাতে অক্সফাম নামের সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সদর দফতর হলো অক্সফোর্ড। অক্সফামের লক্ষ্য হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের গরিবদের আর্থিক সাহায্য দেয়া, বিভিন্ন দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আর্থিক সাহায্য প্রদান এবং আর্থসামাজিক সমস্যার সমাধানে নীতি নির্ধারণের জন্য গবেষণা করা। এবার পত্রপত্রিকায় যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে, তা অক্সফামের গবেষণার ফল। তবে এক সময় অক্সফামের গবেষণার যে কদর ছিল, বর্তমানে তা আর নেই। এর একটা কারণ হলো, বিলাত বা ব্রিটেন আর এখন বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রস্থল নয় এবং বর্তমানে আর পারছে না অন্য দেশকে আগের মতো আর্থিক সাহায্য প্রদান করতে।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

৮২ বছরের বিলিয়নিয়ারের ঘরে ২৫ বছরের স্ত্রী

একে একে চারটি বিয়ে করেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিলিয়নিয়ার রিচার্ড লুগনার (৮২)। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকেন নি তিনি। নতুন করে প্রেমে পড়েছেন জার্মানির এক টেলিভিশন উপস্থাপিকা ও প্লেবয় ম্যাগাজিনের সাবেক মডেল ক্যাথি শমিটজের। সাত মাস চুটিয়ে প্রেম করে অবশেষে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। ফলে এ নিয়ে ৫ নম্বর স্ত্রীকে ঘরে তুলেছেন রিচার্ড। তবে তিনি বা তাদের বিয়ের প্রসঙ্গ মিডিয়ায় উঠে এসেছে অন্য কারণে। তাহলো- রিচার্ড লুগনারের বয়স ৮২ বছর। আর তার স্ত্রীর বয়স ২৫ বছর। অর্থাৎ তাদের বয়সের ব্যবধান ৫৭ বছর। এত বেশি বয়সের ব্যবধানের একজন পুরুষকে কেন ২৫ বছর বয়সী একজন টগবগে যুবতী বিয়ে করতে গেলেন! এ নিয়ে চলছে নানা রকম বিশ্লেষণ। রিচার্ড লুগনার অস্ট্রেলিয়ার সফল এক ব্যবসায়ী। তার অর্থের কোন অভাব নেই। চতুর্থ স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আর কোনদিন বিয়ে করবেন না। কিন্তু নারীর প্রতি দুর্বলতা তার সেই প্রতিশ্রুতিতে ছেদ ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্যাথির সঙ্গে তার সাক্ষাৎ। তারপর থেকে ক্যাথিই তার মনকে পাল্টে দিয়েছেন। তারা চুটিয়ে ডেটিং করেছেন। একপর্যায়ে দু’জনের মধ্যে প্রচ- ভাব বিনিময় হয়। ফলে তারা গত আগস্টে বাকদান সম্পন্ন করেন। এর পরের মাসেই অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এ খবরটি এতদিন মিডিয়ার সামনে আসে নি। গতকালই বিলম্বে এ খবরটি প্রকাশ করেছে অনলাইন ডেইলি মেইল। এই পত্রিকাটির কাছে রিচার্ড লুগনার বলেছেন, আমি চারবার বিয়ে করেছি। সাত বছর আগে চতুর্থ স্ত্রীর সঙ্গে আমার বিচ্ছেদ হয়। তখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কোনদিন বিয়ে করব না। এর পরই ক্যাথির সঙ্গে আমার পরিচয়। তারপর বিয়ে। রিচার্ড স্বীকার করেছেন, ক্যাথি তার মনকে পাল্টে দিয়েছে। তবে তার আশঙ্কা- ব্যক্তি রিচার্ডকে ক্যাথি যতটা ভালবাসে তার চেয়ে হয়তো তার ব্যাংক একাউন্টগুলোর দিকে নতুন এ স্ত্রীর নজর বেশি। সব সময় আমার মাঝে ভীতি কাজ করে। আমার মনে হয় নারীরা অত্যন্ত  বিপদজনক। তাদেরকে বিয়ে করা আরও বিপদজনক। রিচার্ডের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন ক্যাথি। তিনি স্বীকার করেন, টাকা পয়সার প্রতি তার কোন লোভ নেই। তবে তিনি বিলাসী জীবন ভালবাসেন। রিচার্ডের সঙ্গেই ক্যাথির মাখামাখি এমন নয়। তিনি নিজে স্বীকার করেছেন, আমি অনেক যুবকের সঙ্গে ডেটিং করেছি। তবে তারা বেশির ভাগই পছন্দ করে ফুটবল এবং বহু নারী। আমার রয়েছে ৬ বছর বয়সী একটি মেয়ে। তাকে দেখাশোনা করার জন্য একজন পুরুষ প্রয়োজন আমার জীবনে। তাই রিচার্ডের মাঝে আমি সেই পুরুষকে খুঁজে পেয়েছি।

‘এবার একটু থামুন’ -চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১৪ দলের সমাবেশ

(চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে গতকাল ১৪ দল আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতা করেন নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দি​ন চৌধুরী l ছবি: প্রথম আলো) অনেক মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই বর্বরতা বন্ধ করতে হবে। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চরম ব্যবস্থা নেবে। গতকাল বুধবার চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে ১৪ দল আয়োজিত জনসভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অবরোধ ও হরতালের নামে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের নাশকতা ও নৈরাজ্যের প্রতিবাদে এ জনসভার আয়োজন করা হয়। জনসভার প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাংসদ ও আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ বলেন, যারা প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান দেয় না, রাজনীতির নামে মানুষ পুড়িয়ে মারে, তাদের সঙ্গে কোনো সংলাপ নেই। সভায় বক্তব্য দেন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি ও সাংসদ মঈন উদ্দীন খান বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরউদ্দিন, জাসদ চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক জসীম উদ্দিন, ওয়াকার্স পার্টির চট্টগ্রাম জেলার সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।
হাছান মাহমুদ বলেন, ফ্রান্সে পত্রিকা অফিসে ঢুকে যারা হামলা করেছে, সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী তাদের গুলি করে মেরেছে। বেলজিয়ামে দুজন বন্দুকধারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমেরিকায়ও সন্ত্রাসীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এসব করা হয়েছে জননিরাপত্তার স্বার্থে। বাংলাদেশেও যদি কোনো গোষ্ঠী জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে, মানুষকে বোমা মেরে হত্যা করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণকে রক্ষায় চরম ব্যবস্থা নেবে। খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে হাছান মাহমুদ বলেন, খালেদা জিয়াকে নাকি ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। এটি কোন ইনজেকশন যে প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার আগে খালেদা জিয়ার ঘুম ধরে আর প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর ঘুম ভাঙে। দেশে যে অবস্থা শুরু হয়েছে, জনগণ বিএনপিকে এখন ইনজেকশন দেবে। ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেন, বিএনপির নেত্রীর আন্দোলন গণতন্ত্রের পক্ষে নয়, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এসব বর্বরতা এখনই রুখে দেওয়া হবে।
মঈন উদ্দীন খান বাদল বলেন, ‘পেট্রলবোমায় হতাহতদের আহাজারি আপনাদের গায়ে লাগে না। ওদের মা-বাবা ও স্বজনেরা কারও কাছে বিচার না দিয়ে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করছেন। আপনারা অনেক মানুষ পুড়িয়ে মেরেছেন। এবার একটু থামুন। মানুষ মারার কারণে আল্লাহ কী নিষ্ঠুর বিচার করেছেন জনগণ তা দেখেছে। আপনারা যদি নাশকতা বন্ধ না করেন, তাহলে ১৪ দল জনগণের কাছে যাবে। তখন অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিএনপিকে জাল গোটাতে হবে।’
মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘নাশকতাকারীদের কারা নির্দেশ দিচ্ছেন এবং কারা অর্থ দিচ্ছেন, তাঁদের নাম আমরা জানি। আমি সাবধান করে দিচ্ছি, পর্দার আড়ালে থেকে আর খেলবেন না। আমাদের ছেলেরা ওত পেতে রয়েছে। বোমাবাজি বন্ধ না করলে আমরা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে ধরে রাখতে পারব না। তারা লাঠি নিয়ে প্রস্তুত আছে।’
মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিএনপি জোট হরতাল-অবরোধ দিয়ে জাতিকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এসএসসি পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। পরীক্ষার সময় কোনো বোমাবাজ ও জঙ্গিবাদকে সহ্য করা হবে না। সহ্যেরও সীমা আছে।

গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে বার্ন ইউনিট বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার প্রতিশ্রুতি

আগে টাকা নয়, সেবা এবং দরিদ্রদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে উদ্বোধন করা হলো পূর্ণাঙ্গ একটি বার্ন ইউনিট। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালে সীমিত আসনে পোড়া রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে ব্যয় বেশি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসা থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি সামপ্রতিক সময়ে অগ্নিদগ্ধের ঘটনা বেড়ে যাওয়া ও তাদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত না হওয়ায় এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নতুন এ উদ্যোগ নিয়েছে। গতকাল ধানমন্ডীতে হাসপাতালের সেমিনার হলে এ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। জানানো হয়, ৬টি সাধারণ সিট এবং আইসিইউ, সিসিইউ ও জরুরি  সেবার একাধিক সিট নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট গঠন করা হয়েছে। এটি প্রাথমিক উদ্যোগ। প্রয়োজনে পরিসর বাড়ানো হবে। এমনকি খুব শিগগির ঢাকার বাইরে প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য শাখা হাসপাতালেও স্বতন্ত্র বার্ন ইউনিট চালু করা হবে। এ সময় পোড়া রোগীদের অন্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালগুলোকে অতি মানবিক এই সেবায় এগিয়ে আসতে উৎসাহ যোগাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়। বক্তৃতা করেন গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রো-ভিসি প্রফেসর ডা. রেজাউল ইসলাম, চক্ষু বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ডা. একে খান এবং সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোবাশ্বের মল্লিক। বক্তারা চিকিৎসা সেবার এ খাতে আরও সরকারি সহায়তা বাড়ানোর তাগিদ দেন। বলেন, বর্তমানে এসিড নিক্ষেপ ও অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনা যেভাবে বেড়েছে তা বন্ধ করা যেমন জরুরি  তেমনি এর চিকিৎসা আরও সহজ করাও প্রয়োজন। কিন্তু এরকম উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। এজন্য বেসরকারি পর্যায় থেকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিত্তবান ও সুহৃদ ব্যক্তিরা এ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটকে সহায়তা করতে চাইলে তাকে স্বাগত জানানো হবে। অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সন্ত্রাসের কারণে দগ্ধরোগীদের হার বেড়েছে। অথচ তাদের জন্য জরুরি সেবার সুযোগ কম। কয়েকটি নির্দিষ্ট হাসপাতাল ছাড়া প্রকৃত সেবা পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করে মানুষকে শান্তি দেয়া সরকারের যেমন দায়িত্ব তেমনি পোড়া রোগীদের সেবা নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব। সরকারের পাশাপাশি আমরা সেই দায়িত্ব পালনে অংশীদার হতে চাই। তিনি পোড়া রোগীদের বেশিরভাগ দরিদ্র উল্লেখ করে তাদের চিকিৎসা সেবা দ্রুত নিশ্চিত করার স্বার্থে কয়েকটি প্রস্তাব তুলে ধরেন। বলেন, সরকারকে অতি দ্রুত সব এমবিবিএস চিকিৎসককে পোড়া রোগের বিষয়ে শর্ট ট্রেনিং দিতে হবে। এটি মাত্র এক সপ্তাহে করা সম্ভব। পাশাপাশি কমাতে হবে ওষুধের দাম। একই সঙ্গে গণশিক্ষা বাড়ানো দরকার। এর মাধ্যমে আগুন থেকে রক্ষা এবং দগ্ধদের শুশ্রূষায় সচেতনতা বাড়ানো ও প্রাথমিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এজন্য গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

অবরুদ্ধ গণতন্ত্র, অসহায় মানুষ by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

নির্বিঘ্নে তিনি মতামত দিতে পারছেন এ কারণে যে, বিদেশে অবস্থান করেন। তথ্যপ্রযুক্তি- ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার তাকে এ সুযোগ দিলেও বাংলাদেশে এটি বিপজ্জনক হতে পারে। অনেককে সামান্যতম সমালোচনার জন্যও জেলে যেতে হচ্ছে। সম্প্রচার নীতিমালার সুবাদে প্রতিটি শব্দের জন্য যে কেউ অভিযুক্ত হতে পারেন। তার পরও মানুষ ‘হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’। তার কারণ তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। গণতন্ত্রের বিপরীতে আইয়ুব, ইয়াহিয়া আর এরশাদের আমলে ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়েছে মানুষ। পিষ্ট হয়েছে গণতন্ত্র। একটি কথিত গণতান্ত্রিক শাসনামলে আবার ট্রাক ফিরে আসতে দেখে বিচলিত সাধারণ মানুষ। 
১. স্থান বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়। বাড়ি-৬, সড়ক-৮৬, গুলশান-২। তারিখ : ৩ জানুয়ারি ২০১৫। সময় রাত পৌনে ১২টা। দেখা যাচ্ছে, অনেক ট্রাক এনে রেখে দেয়া হচ্ছে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে। কোনো কোনো ট্রাকে ইট ও বালু ভর্তি। টিভি চ্যানেলগুলো বলছে, বেগম জিয়ার অফিসের সামনের রাস্তার পুরোটিই এ ধরনের যানবাহনে ভর্তি। এ ছাড়াও রাস্তার দু’ধারে পুলিশের চারটি লরি আড়াআড়িভাবে রেখে দেয়া হয়েছে। রয়েছে ১৯ প্লাটুন পুলিশ। মোতায়েন করা হয়েছে জলকামান ও রায়টকার। যেন এক অঘোষিত যুদ্ধক্ষেত্র। কার্যালয়ের ভেতরে কাউকে প্রবেশ কিংবা বের হতে দিচ্ছে না পুলিশ। তারা সব গেটে তালা লাগিয়ে দিয়েছে।
২. রাত পৌনে ১২টার দিকে বেগম খালেদা জিয়া অফিস থেকে বের হওয়ার উদ্যোগ নেন। কিন্তু তালাবদ্ধ গেট খুলে দেয়নি পুলিশ। বেগম জিয়া গাড়িতে উঠলেও বের হতে দেয়া হয়নি। অনন্যোপায় হয়ে নিজ অফিসে ফিরে যান বেগম জিয়া। ৫ জানুয়ারি বিকেলে তিনি আবারো গেটে আসেন। উদ্দেশ্য, ২০ দলীয় জোট আহূত জনসমাবেশে যোগদান। অবরুদ্ধ নেতাকর্মীরা বের হওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করলে পুলিশ তাদের ওপর পেপার ¯স্প্রে নিক্ষেপ করে। এতে বেগম জিয়াসহ উপস্থিত সাংবাদিক ও নেতাকর্মীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। বেগম জিয়ার চিকিৎসার জন্য ডাক্তার ডাকা হয়। উল্লেখ্য, এই মরিচের গুঁড়া বিষাক্ত হওয়ায় ব্যবহারে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত রয়েছে। এ ধরনের অমানবিক দৃশ্য ৩ জানুয়ারি থেকে এ লেখার দিন পর্যন্ত (২১.০১.১৫) দেখা গেছে। বিগত পনের দিন ধরে অবরুদ্ধ ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন এখনো।
৩. বেগম খালেদা জিয়াকে এভাবে দৃশ্যত ‘গৃহবন্দী’ করার কারণ, তাকে ২০ দলীয় জোট আহূত জনসভায় যেতে না দেয়া। সবারই জানা কথা, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘অবৈধ’ নির্বাচনের প্রতিবাদে এবার ৫ জানুয়ারি ২০ দলীয় জোট এক প্রতিবাদ সমাবেশ এবং ৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। অপর দিকে শাসক আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের বিজয় দিবস পালনের কর্মসূচি দেয়। কথিত সঙ্ঘাতের অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ওই সময়ের জন্য সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। এভাবে বিএনপির জনসভা বেআইনি ঘোষণা করলেও পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ করে আওয়ামী লীগ।
৪. ৫ জানুয়ারি ঘোষিত কর্মসূচির অনুমতি না পেয়ে বিএনপি নয়া পল্টনের কার্যালয়ের সামনে জনসভার ঘোষণা দেয়। পুলিশ সেখানেও হানা দেয়। গোটা এলাকায় যুদ্ধ যুদ্ধ সাজ পরিলক্ষিত হয়। বিএনপি অফিস তালাবদ্ধ করা হয়। ওই রাস্তায় শত শত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

৫. জানুয়ারির ৩ তারিখে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে নাটকীয়ভাবে আটক করে পুলিশ। নির্বাচনপূর্ব এরশাদীয় স্টাইলে জোরপূর্বক তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়। পরে তিনি কৌশলে হাসপাতাল ত্যাগ করেন। একই সময়ে পিএনপির বৈদেশিক সম্পর্কের দায়িত্বশীল নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা শমসের মবিন চৌধুরী বীর বিক্রমকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদুকে গ্রেফতার করা হয়। আরো গ্রেফতার করা হয় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহানকে। সারা দেশ থেকে হাজার হাজার বিএনপি-জামায়াত কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
৬. ইতোমধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি একটি অনুষ্ঠানে যোগদান করার জন্য তিনি প্রেস কাবে যান। সভা শেষে দৃশ্যত আওয়ামী সাংবাদিকদের প্ররোচনায় প্রজন্ম লীগ নামে ছাত্রলীগের একটি অপভ্রংশ মহাসচিবকে লক্ষ্য করে প্রেস কাবে হামলা চালায়। আলমগীর বের হতে না পেরে প্রেস কাবে ফিরে যান। রাতে নিরাপত্তার কারণে তিনি প্রেস কাব থেকে বের হতে পারেননি। পরদিন বিকেলে বের হওয়ার সময় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
৭. এ সময় আরেকটি ঘটনা ঘটে। বেসরকারি টিভি চ্যানেল ইটিভির চেয়ারম্যান আবদুস সালামকে পুলিশ গ্রেফতার করে। কায়দা করে ইটিভির প্রচারণাও বন্ধ করে দেয়া হয় অনেক স্থানে। গ্রেফতারের সময় একটি পর্নোগ্রাফি মামলার কথা বলা হয়েছে। অথচ ওই মামলায় দায়ের করা এজাহারে সালামের নাম পর্যন্ত ছিল না। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, লন্ডনে দেয়া তারেক রহমানের বক্তব্য সরাসরি প্রচার করার দায়েই তাকে গ্রেফতার করা হলো। এর পরদিন ৭ জানুয়ারি তারেকের বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন হাইকোর্ট। ৮ জানুয়ারি লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান এবং ইটিভি চেয়ারম্যান আবদুস সালামের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করা হয়।
৮. ১৩ জানুয়ারি একটি হামলার ঘটনা ঘটে। এ দিন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিব রিয়াজ রহমানের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার শরীরে চারটি স্থানে গুলির ক্ষত পাওয়া যায়। গুলিবর্ষণ প্রাক্কালে তার গাড়িতে অগ্নিসংযোগও করা হয়। তিনি হামাগুড়ি দিয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলে লোকজন তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেন।

৯. সরকারি ষড়যন্ত্র এবং গ্রেফতারের পাশাপাশি বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ভয় দেখানোর জন্য তাদের বাসাবাড়িতে ককটেল ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ড. আবদুল মঈন খান, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার ও অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনের বাসায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। 
১০. মধ্য জানুয়ারিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিন প্রধানের রাজনৈতিক বক্তব্য সবাইকে হকচকিত করেছে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড প্রধান মেজর জেনারেল আজিজ আহম্মেদ ১৫ জানুয়ারি পিলখানার দরবার হলে বিজিবি কর্তৃক সরাসরি গুলিবর্ষণের কথা বলেন। পরদিনই রংপুর জেলার মিঠাপুকুরে পুলিশের নতুন আইজি শহিদুল হক ও র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ এক জনসভায় ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের অভিন্ন ভাষায় কথা বলেন। তারা বিরোধী দল ও জনগণকে কঠোর ভাষায় হুমকি দিয়েছেন। দেশে জাতীয় নির্বাচন কখন হবে কি হবে না সে ব্যাপারেও তারা মন্তব্য করেন। বিরোধী দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের সম্পর্কেও তারা কটূক্তি করেছেন।
১১. পক্ষকালের এ রাজনৈতিক ঘনঘটার আগে বছরের প্রথম দিনে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছিল আইন ও সালিশকেন্দ্র (আসক)। ২০১৪ সালের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মন্তব্য করা হয় যে, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। প্রদত্ত তথ্যে জানা যায়, গত বছর (২০১৪) বন্দুকযুদ্ধের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ১২৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। এ সময় ৭৪ জনকে গুপ্তহত্যা বা গুম করা হয়েছে।
১২. বেগম খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারি দেশে অবরোধের ঘোষণা দেন। এ সময় তিনি বের হতে চেয়েও যখন বের হতে পারলেন না, তখন উপস্থিত সাংবাদিকদের মাধ্যমে এ ঘোষণা দেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ঘোষিত রাজপথ, রেলপথ ও নৌপথ অবরোধের কার্যক্রমে সারা দেশ দৃশ্যত অচল হয়ে পড়েছে।
১৩. ঘোষিত অবরোধের পর সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটাচ্ছে। নানাভাবে প্রাণহানি ঘটেছে। পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে কথিত কম্বিং অপারেশন তথা যৌথবাহিনীর আক্রমণ। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মীকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে। অসংখ্য নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে। হামলা ও মামলায় বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীরা দিশেহারা। অযাচিতভাবে বেশ কিছু সাধারণ মানুষ ভায়োলেন্সের শিকার হয়েছেন। বিরোধী দল বলছে, সরকারি কারসাজি। আর সরকার বলছে, বিরোধীদলীয় নীলনকশা। মরছে মানুষ। বাঘে-মহিষের লড়াইয়ে উলুখাগড়ার মতো জনগণ পিষ্ট হচ্ছে।

এসব বর্ণনার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দেশ পরিচালনার একটি স্বচ্ছ চিত্র পাওয়া যাবে। ঘটনাবলির মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিকতা বা আইনের শাসনের বদলে কূটকৌশল, শঠতা, মিথ্যাচার, প্রতারণা এবং নগ্ন শক্তি প্রয়োগের ইতিবৃত্ত উদ্ভাসিত হয়েছে। প্রচলিত সাধারণ ভদ্রতা-সভ্যতা, সৌজন্য-সংস্কৃতি, রীতি-রেওয়াজ ও আইনকানুনের যে তোয়াক্কা তারা করেন না, তা তাদের আচরণের মাধ্যমে দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছেন। সবাই অবহিত আছেন, বিএনপি ৫ জানুয়ারি ঢাকায় জনসভা করার অনুমতি চায়। কিন্তু সরকার অনুমতি দিতে অস্বীকার করে। বিএনপি যখন নিজ উদ্যোগে অফিস প্রাঙ্গণে জনসভা করার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সরকার দুটো ন্যক্কারজনক সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমত, তারা ইতঃপূর্বে অনুসৃত বেআইনি ধারায় বিএনপি আহূত জনসভাকে ভণ্ডুল করতে সর্বাত্মক ‘সরকারি হরতাল’ নিশ্চিত করে। তারা আগের মতোই সব ধরনের যানবহন বন্ধ করে দেয়। রাজধানীর সব প্রবেশপথে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। জনগণকে হয়রানি করে। দ্বিতীয় কাজটি খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করা। বাংলাদেশের বিগত ৪৪ বছরের ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা। নির্বাচনের আগে তারা একই ঘটনার অবতরণা করেছিল। বরাবরের মতো তারা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করেছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৌলিক অধিকার তারা কেড়ে নিয়েছে। তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আটকে রাখে; মতামত প্রকাশ এবং স্বচ্ছন্দে যাতায়াতের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে। শুধু তাই নয়, ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব মিথ্যাচার ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি তো বন্দী নন। ইচ্ছা করলে এখনই যেতে পারেন। ত্রাণমন্ত্রী বলছেন, খালেদা জিয়া স্বেচ্ছায় অবরুদ্ধ। তথ্যমন্ত্রী বলছেন, উনাকে উসকানি থেকে বিরত করেছি। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সদর্পে বলেন, যত দিন প্রয়োজন, খালেদা জিয়া বেষ্টনীতে থাকবেন। পেপার স্প্রেতে অসুস্থতা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডাক্তার না হয়েও বলেন, তিনি অসুস্থতার ভান করছেন। গত কয়েক দিনে আওয়ামী লীগের নেতা-পাতিনেতা, মন্ত্রী-হাফমন্ত্রী মিলে যেসব নোংরা, কটুবাক্য বর্ষণ করেছেন তা কেবল ভদ্রদের মানায় না। এসব আচরণের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীনতা প্রমাণিত হয়েছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে, আওয়ামী লীগের এই নৈতিক দেউলিয়াত্বের সুযোগে আমলাতন্ত্র তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীপ্রধানদের অবাঞ্ছিত অবস্থান গ্রহণ। কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। তিন বাহিনীপ্রধানের মন্তব্যে কি তারই প্রমাণ মিলছে না? বিরোধীদলীয় নেতারা খুব জোর দিয়েই বলে আসছিলেন, সরকার সম্মতির বদলে শক্তি প্রয়োগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এখন তিন বাহিনীপ্রধানের আচরণে প্রমাণ হলো রাজনৈতিকভাবে রাজনৈতিক ইস্যুগুলোর জবাব দেয়ার সক্ষমতা ও জনসম্পৃক্ততা আওয়ামী লীগের নেই। দেশকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হচ্ছে। কার্যত জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার নেই। একজন পর্যবেক্ষক সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলেছেন : সারা দেশে ভীতির রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ফাদার ফিগার জেফারসনের একটি মন্তব্য উল্লেখ করা যায় : হোয়েন গভর্নমেন্ট ফিয়ার্স দ্য পিপল, দেয়ার ইজ ডেমোক্র্যাসি। বাট হোয়েন পিপল ফিয়ার্স দ্য গভর্নমেন্ট, দেন দেয়ার ইজ টিরানি। অর্থাৎ যখন সরকার জনগণকে ভয় করে চলে, তখন বুঝতে হবে দেশে গণতন্ত্র রয়েছে। আবার যখন দেখা যাবেÑ জনগণ সরকারকে ভয় করছে, তখন বুঝতে হবে, দেশে স্বৈরতন্ত্র কায়েম হয়েছে। বাংলাদেশে কোন তন্ত্র কায়েম রয়েছে, প্রত্যেক নাগরিক বুকে হাত দিলেই তা বুঝতে পারবেন। বাংলাদেশের মানুষ সতত এবং সাধারণভাবে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন প্রমাণ করে তারা গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিতেও কুণ্ঠিত নয়। গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বৈরতন্ত্রের যেকোনো ট্রাক তা হোক আইয়ুব, ইয়াহিয়া, এরশাদ অথবা অন্য কারো, তা রুখে দিতে বাংলাদেশের মানুষ আজো প্রতিজ্ঞ। ট্রাক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনে কবি আল মাহমুদের সেই সাহসী উচ্চারণ মানুষ ভোলেনি : ‘ট্রাক ট্রাক ট্রাক/মতিউরকে ডাক/ শুয়োরমুখো গোঁয়ার এলো/ দুয়ার বেঁধে রাখ।’
লেখক : প্রফেসর, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

বিরোধী দলের প্রশংসা, বাধাহীন বিল পাস by হারুন আল রশীদ

‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত দশম জাতীয় সংসদের এক বছর কেটে গেছে। এ সংসদে বিরোধী দল সরকারের যতটা না সমালোচনা করেছে, তার চেয়ে বেশি করেছে প্রশংসা। বরং সরকারের বেশি সমালোচনা করেছেন কয়েকজন স্বতন্ত্র সাংসদ। বিল পাসের ক্ষেত্রেও কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয়নি। এক বছরে সরকারি ও বিরোধী দলকে বড় ধরনের কোনো বিতর্কে জড়াতে দেখা যায়নি। দুটি দলই বরং সংসদের বাইরে থাকা দল বিএনপির সমালোচনায় ব্যস্ত ছিল। ৩৫০ সাংসদের মধ্যে প্রশ্নোত্তর পর্ব, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও সিদ্ধান্ত প্রস্তাব-সম্পর্কিত বিষয়ে নোটিশ দিয়ে সংসদকে প্রাণবন্ত রেখেছেন দেড় শ জনের মতো সাংসদ। মন্ত্রী ও কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংসদ ছাড়া অন্যরা সংসদীয় কর্মকাণ্ডে ছিলেন নিষ্ক্রিয়। এক বছরের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে চাইলে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এবারের সংসদ গত কয়েকটি সংসদের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়। কারণ, বিরোধী দল নিয়মিত অংশ নিচ্ছে এবং সংসদীয় কাজে ভূমিকাও রাখছে। বিল পাসের ক্ষেত্রে তাঁরা নিয়মিত নোটিশ দিচ্ছেন। ফলে এবারের সংসদে যথেষ্ট সময় নিয়ে বিল পাস হচ্ছে।
প্রশ্নবিদ্ধ বিরোধী দল: জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। মন্ত্রিসভায় আছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মসিউর রহমান ও মুজিবুল হক। বিরোধী দল সরকারে কেন? এ প্রশ্ন একাধিকবার তুলেছেন স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজী, হাজি সেলিমসহ আরও কয়েকজন। তাঁরা জাপাকে কাগুজে বিরোধী দল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এ ধরনের বিতর্কে বিরোধী দলের পক্ষে কথা বলেছেন সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সাংসদেরা।
এই সংসদে সরকারি দলের কর্মকাণ্ডে বিরোধী দল কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। চলতি অধিবেশনে বিএনপির কর্মকাণ্ডের সমালোচনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। তিনি দেশজুড়ে বিএনপির কর্মসূচিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড আখ্যায়িত করে তা শক্ত হাতে দমনের আহ্বান জানান। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারি দল ও বিরোধী দলের একাধিক নেতা একই সুরে কথা বলেছেন।
বাধাহীন আইন পাস: বর্তমান সংসদে এখন পর্যন্ত ২২টি বিল পাস হয়েছে। বিল পাস নিয়ে সরকারি দলকে প্রধান বিরোধী দলের চেয়ে বেশি বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে স্বতন্ত্র সাংসদদের। এমনকি বিলের ওপর সংশোধনী নোটিশও বেশি দিয়েছেন স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজী ও হাজি সেলিম।
গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর সংসদে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নিয়ে আসা হয়। বাতিল হয়ে যায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল। সংসদের বাইরের বিরোধী দল ও আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই সংশোধনীর সমালোচনা করেছেন। বিরোধী দল তাদের সংসদীয় দলের বৈঠকে সংবিধান সংশোধনী বিলের বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নিলেও শেষ পর্যন্ত সমর্থনই জানিয়েছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের নীতি সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা এবং মন্দ কাজের নিন্দা করা। অযথা সংসদ বর্জন করে সংসদকে আমরা অকার্যকর করতে চাই না।’
তবে সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমান সংসদে কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। কারণ, সংসদীয় গণতন্ত্রে মন্ত্রিসভায় থেকে বিরোধী দল সাজা যায় না; বরং আওয়ামী লীগ ঘরানার নেতা হওয়া সত্ত্বেও স্বতন্ত্র সাংসদেরা সত্যিকার বিরোধী দলের মতো কাজ করছেন।
কমিটিতে মন্ত্রীদের দাপট: সংসদ সচিবালয় কমিটি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এবারের সংসদীয় কমিটিগুলোর বেশির ভাগ সভাপতি মন্ত্রীদের ব্যক্তিত্বের সামনে জোরালো কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০টি সংসদীয় কমিটির ২৯৭টি বৈঠক হয়েছে। সর্বাধিক ১৬টি বৈঠক করেছে সরকারি হিসাব কমিটি। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটি ১১টি বৈঠক করেছে। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিগুলোর মধ্যে সর্বাধিক ১০টি বৈঠক করেছে আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি এবং নয়টি করে বৈঠক করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক-গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি। একটি বৈঠকও করেনি পিটিশন কমিটি, বিশেষ অধিকার, কার্যপ্রণালিবিধি ও বেসরকারি সদস্যদের বিল-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি।
এবারের সংসদের অন্যতম আলোচিত বিষয় কয়েকটি কমিটির বৈঠকে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি। এ নিয়ে কমিটির বৈঠকে সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সংসদ সচিবালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির আটটি বৈঠকের মধ্যে মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন চার দিন। শিল্প মন্ত্রণালয় কমিটির ছয়টি বৈঠকের মধ্যে মন্ত্রী আমির হোসেন আমু উপস্থিত ছিলেন তিন দিন। এ ছাড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী ছয়টি বৈঠকের মধ্যে ছিলেন তিনটিতে।
বর্তমান মন্ত্রিসভায় স্থান না পাওয়া বিগত সরকারের নয়জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে একই মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আছে।
বিশেষজ্ঞ ও সংসদ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সাবেক মন্ত্রীরা তাঁদের বিরুদ্ধে কমিটিতে কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে সভাপতি হিসেবে তাঁরা সে-সম্পর্কিত তদন্তকাজকে প্রভাবিত করতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত এই আশঙ্কাই সত্য হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বিদেশি বন্ধুদের দেওয়া ক্রেস্ট নিয়ে জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে সংসদীয় কমিটি অভিযুক্ত সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পায়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদস্যদের কেউ কেউ বলছেন, তিনি কমিটির সভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধে কীভাবে অভিযোগ আনা যায়।