Saturday, June 7, 2025

তখন কোরবানি ছিল একান্ত ঘরোয়া, আজ কোথাও কোথাও তা প্রতিযোগিতার by মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান

১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময়, মাত্র চার বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে ভারত থেকে খুলনায় এসেছিলাম। সেই থেকে এই মাটিতেই বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা, কর্মজীবন আর জীবনের সব আনন্দ-বেদনার গল্প। ঈদ এসেছে, ঈদ গেছে, কিন্তু রয়ে গেছে তার স্মৃতিগুলো, প্রতিটি সময়ের নিজস্ব রঙে রাঙানো। আজ ৮২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে বুঝি, ঈদ কেবল উৎসব নয়, এটা সময়ের আয়নায় বদলে যাওয়া সমাজ ও জীবনের এক নিঃশব্দ সাক্ষী।

এখনকার ঈদ মানে আলোকসজ্জা, তোরণ আর প্যান্ডেলের জৌলুশ; সেই সময়ের ঈদ ছিল অনেকটাই সাদামাটা, কিন্তু তার আন্তরিকতা ছিল গভীর। খুলনা সার্কিট হাউসে ঈদের প্রধান জামাত হতো, তবে এখনকার মতো উপচে পড়া ভিড় ছিল না। মানুষ নামাজ আদায় করতেন, কোলাকুলি করতেন, একে অপরের খোঁজখবর নিয়ে ঘরে ফিরে যেতেন পরিতৃপ্ত মন নিয়ে। বিশাল আয়োজন না থাকলেও ছিল নির্মল আনন্দ আর সহমর্মিতা। টাউন জামে মসজিদেও হতো বড় জামাত।

ঈদের আরেক চিরচেনা অনুষঙ্গ ছিল সিনেমা দেখা। ঈদের সময় হলে কলকাতা ও পাকিস্তানের নতুন সিনেমা মুক্তি পেত। হলের সামনে লম্বা লাইন পড়ত, টিকিট পাওয়া ছিল ভীষণ কষ্টসাধ্য। এমনকি টিকিট কালোবাজারিও হতো। এক শ্রেণির মানুষের কাছে ঈদটা যেন সিনেমা না দেখলে অপূর্ণই থেকে যেত। আজকের প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে যেখানে মুঠোফোনের এক স্পর্শে বিনোদন হাতের মুঠোয়, সেখানে টিকিট পাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করাটা হয়তো অবিশ্বাস্য মনে হবে।

কোরবানির পশুর হাটের স্মৃতিগুলোও বেশ স্বতন্ত্র। রূপসা নদীর অন্য পারে পূর্বরূপসায়, যেখানে খুলনা থেকে বাগেরহাট ট্রেন যাওয়ার স্টেশন ছিল, সেখানে বসত পশুর হাট। ডুমুরিয়ার শাহপুরের হাটও ছিল বেশ বড়। পাঁচ-ছয় দিন ধরে পশুর বেচাকেনা চলত, শেষ দুই দিন আগে কেনাকাটা জমে উঠত। অবাক করা বিষয় হলো, তখন খুলনা শহরের খুব বেশি মানুষ গরু কোরবানি দিত না, ছাগল কোরবানির চলটাই ছিল বেশি।

আজকাল যেমন বিশাল আকারের গরুগুলো গলায় মালা পরে প্রদর্শিত হয়, সে সময় এমনটা ছিল না। বড় গরু তখন সহজে পাওয়া যেত না, আর রাস্তাঘাটও এত ভালো ছিল না যে হাট থেকে গরু আনা সহজ হবে। তাই গ্রামের দিকে অবস্থাপন্নরা গরু কোরবানি দিলেও শহরে ছাগল কোরবানির চলই ছিল বেশি। আমাদের বাসাতেও ছাগল কোরবানি দেওয়া হতো। কসাইও এত ছিল না তখন, তাই অনেকেই ঈদের দ্বিতীয় দিনে কোরবানি দিতেন। তখন কোরবানির আয়োজন ছিল একান্ত ঘরোয়া। সেদিনের সেই সহজ জীবনযাত্রার সঙ্গে আজকের এই বৈচিত্র্যময় কোরবানি বাজারকে মেলাতে গেলে এক অন্য রকম অনুভূতি হয়।

পোশাক বা আপ্যায়নের ক্ষেত্রেও সে দিনের ঈদ ছিল ভিন্ন। এখনকার ছেলেমেয়েরা যেমন নিজেদের মতো করে বাইরে চলে যায়, আমাদের সময় সেই সাহস ছিল না। কোরবানির পর মাংস নিয়ে বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের বাসায় যেতাম, কখনো তারা জোর করে খাইয়ে দিতেন। আবার কখনো বাসায় কোরবানি দেওয়ার জায়গায় একটা ঝুড়িতে কিছু মাংস নিয়ে বসে থাকতাম, গরিব কেউ এলে সেখান থেকে কিছুটা দিতাম। এখন অনেক কিছুই রয়েছে, কিন্তু সেই আন্তরিকতার ঘনত্বটা যেন ফিকে হয়ে গেছে।

আজকের পয়সার আধিক্য আর জৌলুশ তখন ছিল না। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ছিল সীমিত, প্রতিটা ঘর কমবেশি এক রকম ছিল। সমাজব্যবস্থাটা ছিল অভিভাবকনির্ভর; অভিভাবকেরা যেটা দিতেন, তা-ই পরতে হতো। আবদার করার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। যেহেতু রোজার ঈদে সবাই নতুন পোশাক পেত, কোরবানির ঈদে নতুন পোশাক পাওয়ার সম্ভাবনা বেশ কমই থাকত। কোরবানির ঈদে নতুন জামা দেওয়া অভিভাবকদের কাছে অনেকটা বিলাসিতা মনে হতো। ঈদের দিন একটু বিশেষ রান্না হতো, তবে পদের বাহার ছিল না। সাধারণত পোলাও, মাংস। এই সরলতাই হয়তো তখনকার দিনগুলোকে আরও সুন্দর করে তুলেছিল।

ঈদের দিনে নদীতে নৌকাবাইচ হতো, লাঠিখেলা হতো, ষাঁড়ের লড়াই কিংবা দড়ি টানা খেলায় মাতত পাড়া-প্রতিবেশীরা। এখন সেসব আয়োজন হয় খুবই সীমিতভাবে। তখন ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে কার্ড পাঠানোর রীতি ছিল। ঈদের আগে দোকানগুলোয় বাহারি কার্ড বিক্রি হতো। ডাকযোগে পাঠানো হতো কার্ড। ডাকপিয়নের অপেক্ষা করতাম সবাই। মাঝেমধ্যে লোকমারফতও কার্ড আসত। আজ প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শুভেচ্ছা পৌঁছে যায় মুহূর্তে; কিন্তু কী যেন হারিয়ে গেছে, শুধু গতিই আছে, গভীরতা নেই।

তখন প্রাচুর্য ছিল না, কিন্তু তবু আনন্দ ছিল গভীর, আন্তরিক। ঈদের মেজাজ ছিল আত্মার, হৃদয়ের। আজ ঈদের আগে বাজারে হঠাৎ দ্রব্যমূল্যের উল্লম্ফন হয়, এক শ্রেণির ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার লোভে আজ পণ্যের দাম বাড়ায়, উৎসবকে ঘিরে এক শ্রেণির ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিপরায়ণদের দৌরাত্ম্য দেখা যায়। কোনো কোনো রাজনীতিক ঈদের নামে প্রচারে মেতে ওঠেন। অনেকেই পশু কোরবানির চেয়ে তার প্রদর্শনী নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকেন। একসময় যেখানে ঈদ ছিল আন্তরিকতার প্রতীক, আজ কোথাও কোথাও তা হয়ে উঠেছে প্রতিযোগিতার মাঠ।

আজ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে, ঈদের দিনে যাঁদের সঙ্গে হেসেছি, খেয়েছি, মিশেছি—তাঁরা অনেকেই আজ নেই। তাঁদের আত্মার শান্তি কামনা করি।

এই বয়সে এসে বুঝি, ঈদের প্রকৃত আনন্দ ছিল একে অন্যের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে, ছিল হৃদয়স্পর্শী আন্তরিকতার মধ্যে। সেই ঈদে ছিল না প্রাচুর্য, ছিল না মুঠোফোন, ফেসবুক বা টিভির ঝলমলে অনুষ্ঠান। কিন্তু ছিল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর অকৃত্রিম সম্পর্কের বন্ধন। আজও ঈদ আসে, আনন্দ বয়ে আনে। কিন্তু পুরোনো দিনের সরল ঈদগুলো থেকে যায়-মনোজগতে, অনুভবের গহিনে; অলক্ষ্যে জ্বলতে থাকা এক উজ্জ্বল আলো হয়ে।

(অনুলিখন: উত্তম মণ্ডল, খুলনা)
লেখক: সাবেক কোষাধ্যক্ষ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

ঈদের সেকাল–একাল
ঈদের সেকাল–একাল। এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

সমুদ্র সম্পর্কে মানুষ কতটা জানে by জাহিদ হোসাইন খান

সমুদ্রের তলদেশ নিয়ে জানার আগ্রহ অনেক বিজ্ঞানীদের। যদিও বলা হয় মাত্র ০.০০১ শতাংশ মোট সমুদ্র এলাকা এখন পর্যন্ত অন্বেষণ করা হয়েছে। পৃথিবীর বেশির ভাগ অংশজুড়ে থাকলেও গভীর সমুদ্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের জানার পরিধি বেশ কম। সায়েন্স অ্যাডভান্সেসে প্রকাশিত একটি সাম্প্রতিক গবেষণায় বলা হচ্ছে, মানবজাতি এখন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রতলের মাত্র ০.০০১ শতাংশ কম এলাকা সম্পর্কে জানে। এই এলাকার আকার রোড আইল্যান্ডের প্রায় সমান বা বেলজিয়ামের প্রায় এক-দশমাংশ। এই সীমিত অনুসন্ধান আমাদের গ্রহের বৃহত্তম বাস্তুতন্ত্রকে সঠিকভাবে বোঝা ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

২০০ মিটারের বেশি গভীরতা থেকে গভীর মহাসাগর শুরু হয়, যা পৃথিবীপৃষ্ঠের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশজুড়ে বিস্তৃত। বিশালতা সত্ত্বেও সমুদ্র সবচেয়ে কম অন্বেষণ করা অংশ। গভীর মহাসাগর বিভিন্ন ধরনের জীবের আবাসস্থল, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন উৎপাদন আর খাদ্য ও ওষুধের মতো মূল্যবান সম্পদ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমুদ্রপৃষ্ঠে বসবাসকারী ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন পৃথিবীর প্রায় ৮০ ভাগ অক্সিজেন উৎপন্ন করে। এসব জীব গভীর সমুদ্রস্রোত থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে। সামুদ্রিক জীব উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বায়ুমণ্ডলীয় কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণে সহায়তা করছে। জলবায়ু স্থিতিশীলতায় সমুদ্রের অবদান অনেক।

সমুদ্র সরাসরি মানুষকে সহায়তা করছে। প্রতিবছর ২০ কোটি টন সামুদ্রিক খাবার সরবরাহ করা হয় সমুদ্র থেকে। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬ কোটি মানুষকে কর্মসংস্থান দিচ্ছে সমুদ্র। এ ছাড়া স্পঞ্জ ও ব্যাকটেরিয়ার মতো সামুদ্রিক জীব এইচআইভি, স্তন ক্যানসার ও কোভিড-১৯ সহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ভূমিকা রাখছে। পাঁচ দশক ধরে বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য চিকিৎসার জন্য হাজার হাজার নতুন সামুদ্রিক যৌগ খুঁজে যাচ্ছেন।

সমুদ্রের অনেক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও মানুষ গভীর সমুদ্র সম্পর্কে কম জানে। ওশান ডিসকভারি লিগের একদল গবেষক ১৯৫৮ সাল থেকে পরিচালিত প্রায় ৪৪ হাজার গভীর সমুদ্র ডাইভ থেকে তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁদের অনুসন্ধান দৃশ্যমান অনুসন্ধানের তীব্র সীমাবদ্ধতাকে তুলে ধরছে। ওশান ডিসকভারি লিগের সভাপতি ও বিজ্ঞানী কেটি ক্রফ বেল বলেন, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য আমাদের গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও ভালোভাবে বোঝার প্রয়োজন। মানুষের কার্যকলাপ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গভীর সমুদ্রের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দূষণ, সম্পদ শোষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে সমুদ্রের ওপরে চাপ তৈরি হচ্ছে। গবেষকেরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, সমুদ্রে মানুষের বিভিন্ন কার্যকলাপ ও উষ্ণায়নের কারণে ভবিষ্যতে ক্ষতিকর প্রভাব প্রায় দ্বিগুণ হবে। মহাসাগর ইতিমধ্যে মানুষের কার্যকলাপ থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ অতিরিক্ত তাপ ও ৩০ শতাংশ কার্বন ডাই–অক্সাইড শোষণ করেছে। এর ফলে উষ্ণ তাপমাত্রা, অক্সিজেনের মাত্রা হ্রাস ও সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ধরনের পরিবর্তন গভীর সমুদ্রের আবাসস্থলকে অযোগ্য করে তুলছে। বিভিন্ন গভীরতায় সামুদ্রিক জীবনকে ব্যাহত করছে। বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য ও উৎপাদনশীলতাকে প্রভাবিত করছে।

সূত্র: সায়েন্স অ্যালার্ট

গভীর সমুদ্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের জানার পরিধি বেশ কম
গভীর সমুদ্র নিয়ে বিজ্ঞানীদের জানার পরিধি বেশ কম। রয়টার্স

ঈদের দিন গাজায় ৪ ইসরায়েলি সেনা নিহত: খাবার বিতরণে ইসরায়েলি বাগড়া, নিহত বেড়ে ৪২

ফিলিস্তিনের গাজায় একটি ভবনে বিস্ফোরণে চার ইসরায়েলি সৈনিক নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন। দখলদারদের সামরিক বাহিনী বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) বরাতে দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হামাসের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যে শুক্রবার সকালে দক্ষিণের খান ইউনিসে ওই ঘটনা ঘটে। এ দিন গাজায় ঈদুল আজহা পালিত হয়।

নিহত দুই সৈনিকের নাম হলো- মাগলান কমান্ডো ইউনিটের সার্জেন্ট মেজর (রিজার্ভ) চেন গ্রস ও স্টাফ সার্জেন্ট ইয়োভ রাভার। তিনি ইয়াহালোম কম্ব্যাট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটের সদস্য।

সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, অন্য দুই সৈনিকের নাম পরে প্রকাশ করা হবে।

আইডিএফ-এর প্রাথমিক তদন্ত অনুসারে, সৈনিকরা সম্ভাব্য সন্ত্রাসী অবকাঠামো যেমন সুড়ঙ্গ খুঁজতে ভবনটিতে প্রবেশ করেছিল। ভবনটি বোমা দিয়ে ফাঁদ পাতা ছিল এবং বিস্ফোরণের ফলে সৈনিকদের উপর কংক্রিট ধসে পড়ে। যার ফলে সৈনিকরা নিহত এবং অন্যরা আহত হয়। যার মধ্যে একজনের অবস্থা গুরুতর।

ঘটনাটি ঘটেছে খান ইউনিসের বানি সুহেইলা উপশহরে সকাল ৬টার কিছু পরে। ওই সময় আরও কয়েকটি স্থানে অভিযান চলছিল।

পৃথক ঘটনায় গাজা সিটির শেজাইয়া পাড়ায় মর্টার আঘাতে ৬৪৬তম প্যারাট্রুপার ব্রিগেডের একজন রিজার্ভিস্ট মাঝারি মাত্রায় আহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিক তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

চার সৈনিকের মৃত্যুর পর আইডিএফ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডেফ্রিন বলেছেন, কখনও কখনও গাজায় সম্ভাব্য সুড়ঙ্গ খুঁজতে ভবনগুলোতে প্রবেশ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। এটি করতে গিয়ে বিস্ফোরক দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ার জন্য আমরা বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করি। আমরা এই ঘটনার তদন্ত করব। 

ঈদের দিনের খাবার বিতরণে ইসরায়েলি বাগড়া, নিহত বেড়ে ৪২

ফিলিস্তিনের গাজায় ঈদুল আজহার দিনে ইসরায়েলি হামলায় কমপক্ষে ৪২ জন নিহত হয়েছেন। গাজার চিকিৎসা সূত্র আল জাজিরাকে এ তথ্য জানিয়েছে। এদিকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সাহায্য বিতরণের দায়িত্বে থাকা মার্কিন-সমর্থিত গ্রুপ ঈদের দিনের খাবার বিতরণ করতে পারেনি। তারা জানিয়েছে, তাদের সব কেন্দ্র পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার খান ইউনিসের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাসের হাসপাতালে ১৬টি মৃতদেহ পৌঁছে। উত্তর গাজার আল-শিফা হাসপাতালে আরও ১৬টি, গাজা শহরের আল-আহলি ব্যাপটিস্ট হাসপাতালে ৫টি এবং দেইর আল-বালাহ’র আল-আকসা মার্টিয়ার্স হাসপাতালে আরও ৫টি মৃতদেহ পৌঁছেছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু-আজৌম দেইর আল-বালাহ থেকে জানিয়েছেন, গাজায় ঈদ এভাবেই হচ্ছে। সাধারণত আনন্দের সঙ্গে পালিত এই মুসলিম উৎসব এ বছর তাদের হারানোর বেদনা এবং অকল্পনীয় পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার একটি মর্মান্তিক স্মারক হয়ে উঠেছে।

এদিকে বৃহস্পতিবার আহলি হাসপাতালে ইসরায়েলি হামলায় আহত একজন সাংবাদিক শুক্রবার মারা গেছেন। এর ফলে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা ২২৬-এ পৌঁছেছে বলে গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস জানিয়েছে।

শুক্রবার ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে গাজায় সাহায্য বিতরণের দায়িত্বে থাকা মার্কিন-সমর্থিত গ্রুপটি জানিয়েছে, ক্রমবর্ধমান খাদ্যের জন্য হাহাকার সত্ত্বেও তাদের কেন্দ্রগুলো পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

সাহায্য সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, মার্চ মাসে ইসরায়েল গাজায় খাদ্য, ওষুধ এবং জ্বালানি প্রবেশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় গাজার সব বাসিন্দা এখন দুর্ভিক্ষের হুমকির মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত মাসে ইসরায়েল গাজায় কিছু সাহায্য প্রবেশের অনুমতি দিলেও তা পরিমাণে অপ্রতুল।

গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) গত সপ্তাহে সেখানে খাদ্য সহায়তা বিতরণ শুরু করে। শুক্রবার এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছে, মানুষের নিরাপত্তার জন্য সাহায্য বিতরণ কেন্দ্রগুলো থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কারণ, ইসরায়েলি বাহিনী ত্রাণ সংগ্রহে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর বোমা ফেলছে। এ কারণে তারা ঈদের দিন খাদ্য বিতরণ করতে পারেনি। সংস্থাটি দ্রুত খাদ্য বিতরণ করতে আগ্রহী। কিন্তু পুনরায় সাহায্যকেন্দ্র খোলার বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি। তারা বলেছে, পরবর্তী বিতরণের বিষয়ে বিস্তারিত পরে ঘোষণা করা হবে। 

ইসরায়েলি সেনা। পুরোনো ছবি
ইসরায়েলি সেনা। পুরোনো ছবি

উটও আছে, ভেড়াও আছে- গাজার হাটে নেই শুধু ক্রেতা

ঈদের দিনের সকাল। গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর আল মাওয়াসিতে বসেছে একটি কোরবানির পশুর হাট। হাট বলতে যা বোঝায়, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক ফাঁকা ও নিঃস্তব্ধ কিছু। সেখানে দেখা গেল একটি উট, একটি গরু আর হাতে গোনা কয়েকটি ভেড়া ও ছাগল।

আশপাশে কিছু শিশু ও কৌতূহলী মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ দেখছে, কেউ ছবি তুলছে- কিন্তু কেউই এগিয়ে এসে বলছে না, ‘এইটা কত?’ কেননা, এখানে নেই কোনো ‘ক্রেতা’।

শুক্রবার (৬ জুন), মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতো অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকাতেও উদযাপিত হচ্ছে পবিত্র ঈদুল আজহা।

কাগজে-কলমে ‘উদযাপন’ বলা হলেও বাস্তবে সেখানে নেই কোনো ঈদের আমেজ। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও মানবিক বিপর্যয়ের মাঝে ঈদ যেন কেবল একটি স্মৃতি।

ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ কোরবানি। মুসলিমরা এদিন পশু জবাই করে তার একাংশ বিলিয়ে দেন দরিদ্রদের মাঝে। কোরবানির এই ঐতিহ্য একসঙ্গে আনন্দ, সংহতি ও ত্যাগের বার্তা বহন করে। কিন্তু গাজাবাসীর পক্ষে কোরবানি দেওয়া তো দূরের কথা-তাদের অনেকের পক্ষে একটুকরো রুটিও জোগাড় করা দায়।

বার্তাসংস্থা এপি জানায়, তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে গাজায় প্রবেশ করেনি কোনো তাজা মাংস। ইসরায়েলের অবরোধের কারণে বাইরে থেকে খাবার বা পশু ঢোকার সুযোগ নেই। গাজার ভেতরে যেসব পশু লালন-পালন করা হচ্ছিল, তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে মারা গেছে বিমান হামলায়, ক্ষুধায় কিংবা চিকিৎসার অভাবে।

বেঁচে থাকা যেসব পশু আছে, তাদের নিয়েই বসেছে আল মাওয়াসির হাট। সেখানে আব্দেল রহমান মাদি নামের এক মধ্যবয়স্ক বাবা এপিকে বলেন, আমার এমনকি রুটি কেনার সামর্থ্যও নেই। কোনো মাংস, কোনো সবজি কেনার সামর্থ নেই।

দূরের খান ইউনিস শহরে কিছু দোকানে দেখা গেছে খেলনা আর পুরোনো কাপড়। কিছু অভিভাবক ঈদের দিনে সন্তানদের মুখে একটুখানি হাসি ফেরাতে দরদাম করছেন। কিন্তু বেশিরভাগই দাম শুনেই চলে যাচ্ছেন চুপচাপ।

হালা আবু নাকিরা নামে এক নারী বলেন, আগে ঈদ ছিল আনন্দ আর নতুন জামার দিন। কিন্তু এখন ঈদ মানেই অনাহার আর নিরাশা। তার কণ্ঠে ভেসে আসে হাহাকার, আমরা এখন বাজারে যাই শুধুই আটা খুঁজতে। প্রতিদিন কমদামে আটা খুঁজে বেড়াই। কিন্তু যা পাই, তাও কিনতে হয় অবিশ্বাস্য দামে।

শিশুরা যদিও পশুগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে একটু আনন্দ পায়, কিন্তু সেগুলো যেন এক নিঃশব্দ প্রদর্শনী-যেখানে আনন্দ নেই, কেবল অভাব আর অবরোধের দীর্ঘ ছায়া।

গাজার ঈদ এখন আর উৎসব নয়। এখনকার ঈদ মানে- একটি উট, একটি গরু, কয়েকটি ভেড়া আর অসংখ্য শূন্য পকেট।

সূত্র : এপি

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় কোরবানির ঈদের বাজার। ছবি : সংগৃহীত
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় কোরবানির ঈদের বাজার। ছবি : সংগৃহীত


ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব রয়েছে: গুতেরেস

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বৃহস্পতিবার আরব নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের টেকসই সমাধানের জন্য দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান অপরিহার্য এবং এ লক্ষ্যে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায়িত্ব তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। তিনি বলেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে আমরা যেসব ভয়াবহ দৃশ্য দেখছি, সেই প্রেক্ষাপটে দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধান টিকে থাকা অত্যন্ত জরুরি। যারা এই সমাধান নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন, আমি তাদের জিজ্ঞেস করি — বিকল্প কী? একরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধান যেখানে ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেওয়া হবে, অথবা তাদের নিজ ভূমিতে অধিকারহীন অবস্থায় বাঁচতে বাধ্য করা হবে? এটা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।

জাতিসংঘ মহাসচিবের এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে, যখন সৌদি আরব ও ফ্রান্স এই জুন মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করতে যাচ্ছে। এর মূল লক্ষ্য হলো দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হওয়া এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান ঘটানো। ইতিমধ্যে এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক সমর্থন পেয়েছে, বিশেষ করে গাজায় মানবিক পরিস্থিতির ক্রমাবনতির কারণে। মার্চ মাসে হামাসের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ভেঙে যাওয়ার পর ইসরাইল যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে, তার ফলে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে, অসংখ্য ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

ওদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এক প্রস্তুতিমূলক সভায় সৌদি আরব বলেছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি কেবল প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। আঞ্চলিক শান্তির সূচনা হবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমেই। সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য ১৭ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারিত হয়েছে। সম্মেলনের লক্ষ্য হবে দ্বিরাষ্ট্র ভিত্তিক সমাধান বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং রাজনৈতিক ঘোষণার বাইরে গিয়ে বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করা।

২০১২ সাল থেকে জাতিসংঘে ফিলিস্তিন একটি পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত হলেও তারা এখনো পূর্ণ সদস্যপদ পায়নি। জাতিসংঘের বর্তমান ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪৭টি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী রাষ্ট্রের আপত্তির কারণে তাদের পূর্ণ সদস্যপদ থমকে রয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের এক হামলার পর ইসরাইল গাজায় অভিযান শুরু করে। হামাসের হামলায় ইসরাইলে ১,২০০ জন নিহত হয়। এরপর শুরু হওয়া সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৫৩,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গত বুধবার জাতিসংঘ প্রধান ২০২৪ সালে নিহত ১৬৮ জন জাতিসংঘ কর্মীর স্মরণে এক শোকসভায় অংশ নেন। তার ভাষায়, ২০২৪ সাল জাতিসংঘের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর।
এই ১৬৮ জনের মধ্যে ১২৬ জন গাজায় নিহত হন এবং তাদের প্রায় সবাই ছিলেন জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ’র কর্মী।  গুতেরেস বলেন, ৫০ জন কর্মীর মধ্যে একজনেরও বেশি নিহত হয়েছেন এই ভয়াবহ সংঘাতে। কেউ কেউ মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে গিয়ে নিহত হয়েছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে, আবার কেউ আশ্রয়হীনদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এই মানুষগুলো স্বীকৃতির জন্য কাজ করেন না। তারা পার্থক্য গড়তে চান। যখন সংঘাত শুরু হয়, তখন তারা শান্তির জন্য কাজ করেন। যখন অধিকার লঙ্ঘিত হয়, তখন তারা প্রতিবাদ করেন।

জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, আমরা মানবিক কর্মী, সাংবাদিক, চিকিৎসক এবং বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকে কোনোভাবেই ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে গ্রহণ করব না। এসব ক্ষেত্রে দায়মুক্তির কোনো জায়গা থাকতে পারে না। তিনি জাতিসংঘের মৌলিক নীতিতে অবিচল থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমরা আমাদের নীতিতে কখনো দুর্বল হব না। আমরা আমাদের মূল্যবোধ ত্যাগ করব না। আর আমরা কখনো, কখনোই হাল ছাড়ব না।

mzamin