Friday, May 15, 2015

দেশে বিচারহীনতা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে -ত্বকী মঞ্চের গোলটেবিল বৈঠকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা।
ছবিটি আজ জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে তোলা। ছবি: ফোকাস বাংলা
শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিকভাবে এই দুই গোষ্ঠীর বিভক্তির কারণে সাধারণ মানুষের দাঁড়ানোর মতো কোনো স্থান থাকছে না। এই সুযোগে ত্বকীর মতো নিষ্পাপ শিশুরা খুন হচ্ছে। দেশে বিচারহীনতা এখন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
আজ শুক্রবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ আয়োজিত ‘ত্বকী হত্যার বিচারে রাষ্ট্রের অনীহা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এসব কথা বলেন। তিনি ত্বকী হত্যার বিচার না হওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে দায়ী করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই শিক্ষক বলেন, বুদ্ধিজীবীরা দেশকে পেছনে নিয়ে যাচ্ছেন, মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন। বুদ্ধিজীবীদের এক পক্ষ ‘শত’ গঠন করছেন। অন্য পক্ষ দশ গুন বাড়িয়ে ‘সহস্র’ গঠন করছেন। তাঁদের লক্ষ্য নিজ নিজ রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় বসানো, অন্য কিছু নিয়ে চিন্তা করার সময় তাঁদের নেই। ত্বকীর হত্যা নিয়ে কথা বলার সময় তাঁদের নেই। তিনি বলেন, সাংবাদিকেরাও একই দোষে দুষ্ট। তাঁরাও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিভক্ত। অথচ অতীতে দেশের প্রয়োজনে সব সময় সাংবাদিকেরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন শোনা যাচ্ছে জাতীয় প্রেসক্লাবও না কি দুই ভাগ হচ্ছে। গণমাধ্যমের সমালোচনা করে বিশিষ্ট এই শিক্ষাবিদ বলেন, রিপোর্টাররা পরিশ্রম করে, নির্যাতন সহ্য করে তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে। কিন্তু গণমাধ্যমের মালিকেরা তা প্রকাশ করেন না। কেননা গণমাধ্যম এখন আর সাংবাদিক দ্বারা পরিচালিত নয়, মালিকেরা নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য গণমাধ্যম গড়ে তোলেন।
সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, একটি চিঠি আদালত থেকে জেলে পৌঁছাতে সাত দিন লেগে যাচ্ছে। এর অর্থ সাধারণ মানুষ বোঝে। সরকার তলে তলে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করছে। সরকার সমর্থক ছাত্রলীগ সব হিংসার মূলে থাকছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনবাহিনীকে তুষ্ট করতে টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়িয়ে নিজের জায়গা ঠিক রাখছে সরকার।
অজয় রায় বলেন, ত্বকীর হত্যার বিচার রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের কারণে হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী এমন একটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন যাদের অতীত ইতিহাস ও বর্তমান কর্মকাণ্ড মোটেই ভালো না।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, রাষ্ট্র খুনিদের রক্ষার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলঙ্কিত করেছে, আর এদের কারণেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দীর্ঘ মেয়াদে বাধার সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান বলেন, মঞ্জুর হত্যা মামলার তারিখ নির্ধারণ হয় স্বৈরাচারী এরশাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সম্পর্কের ভিত্তিতে। সম্পর্ক খারাপ হলে তারিখ পড়ে। আবার ভালো হলে তারিখের কোনো খবর থাকে না। তিনি বলেন, দেশে এখন এক ব্যক্তির স্বৈরাচারী শাসন চলছে।
সিপিবির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সরকার অপরাধীদের প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে বিচার হচ্ছে না। তিনি বলেন, ঢাকা উত্তরের মেয়র আনিসুল হককে তিনি কলম প্রস্তুত রাখতে বলেছেন, কেন না তাঁকে প্রচুর টেন্ডারে স্বাক্ষর করতে হবে। তিনি জনগণের ভোটে নয় বরং টেন্ডারবাজ ও সন্ত্রাসীদের ক্ষমতার জোরে নির্বাচনে জিতেছেন।
গোলটেবিলে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ত্বকী মঞ্চের সদস্যসচিব হালিম আজাদ। তিনি বলেন, তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে দুই বছর আগে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে অপহরণ করা হয়। এর দুই দিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীতে তাঁর লাশ পাওয়া যায়। গত বছর এই হত্যার অভিযোগপত্র তৈরি করে র‌্যাব। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তা আদালতে দাখিল করা হয়নি।
ত্বকীর বাবা ও মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিলে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ডা. সারওয়ার আলী প্রমুখ।

‘মনোবল ফিরেছে’ সালাহউদ্দিনের

শিলংয়ের এ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ
তুলে নেয়ার টানা দুই মাস পর সীমান্তের ওপারে ‘মুক্ত’ সালাহউদ্দিন আহমেদের মনোবল ফিরতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসা স্বজনরা। দীর্ঘ দিন আটকে রাখা ও মেঘালয়ে ‘চোখ বাধা’ অবস্থায় ছেড়ে দেয়ার পর শারিরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন বিএনপির এ যুগ্ম মহাসচিব। এ কারণে তাকে প্রথমে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেছিল মেঘালয় পুলিশ। পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে কয়েকজন আত্মীয় সাক্ষাৎ করেছেন। তারা জানিয়েছেন ধীরে ধীরে তিনি মনোবল ফিরে পাচ্ছেন। তুলে নেয়ার পর থেকে তিনি কোথায় কিভাবে ছিলেন এ বিষয়েও তিনি কথা বলেছেন। হাসপাতালে তার পরীক্ষা নীরিক্ষা হচ্ছে। পরীক্ষার পর তার চর্ম ও গলব্লাডারে সমস্যা ধরা পড়েছে। এর জন্য ওষুধও দেয়া হয়েছে। আজ দুপুরে চিকিৎসকের দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ি সালাহউদ্দিন আহমেদের আত্মীয় আয়ুব আলী বাইরে থেকে ওষুধ কিনে দিয়ে যান। তিনি মানবজিমনকে জানান, হাসপাতাল থেকেই বেশিরভাগ ওষুধ দেয়া হচ্ছে। সেখানে যে ওষুধ নেই তা বাইরে থেকে কিনে দিতে হচ্ছে। আজ সালাহউদ্দিন আহমেদকে দেখতে আরও কয়েকজন আত্মীয় এসেছেন। তারা তাকে থালা-বাসনসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে দিয়ে গেছেন। তবে তাদের কেউই গণমাধ্যমের সামনে নাম পরিচয় প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি।

বাংলাদেশিসহ ৭৫০ জন অভিবাসী উদ্ধার

ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের পূর্ব উপকূল থেকে আজ শুক্রবার ৬১ শিশুসহ ৭৫০ জনের বেশি অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব অভিবাসী রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি। তাঁদের আচেহ প্রদেশের লাংসা শহরে রাখা হয়েছে। খবর এএফপির।
পুলিশ জানায়, মালয়েশিয়া থেকে বিতাড়িত হয়ে ফেরার পথে সুমাত্রা দ্বীপের পূর্ব উপকূলে এসব অভিবাসীকে বহনকারী নৌকাটি ডুবতে বসেছিল। স্থানীয় জেলেরা তাঁদের উদ্ধার করে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানব-পাচার সংকটে সহযোগিতার জন্য মিয়ানমারের কাছে অনুরোধ জানিয়ে আশাব্যঞ্জক সাড়া পাওয়া যায়নি। বরং তারা একটি পরিকল্পিত শীর্ষ সম্মেলন বর্জনের হুমকি দিয়েছে।
ইন্দোনে ​শিয়ার লাংসা শহরে অস্থায়ী শরণার্থীশিবিরে রাখা হয়েছে উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের। আজ সকালে সুমাত্রা দ্বীপের উপকূল থেকে উদ্ধার করা হয় সাত শতাধিক অভিবাসীকে। ছবি: রয়টার্স
লাংসার পুলিশ প্রধান সুনারয়া বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা তাঁদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি তাঁরা মালয়েশিয়ায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু সে দেশের নৌবাহিনী তাঁদের ইন্দোনেশিয়ার জলসীমায় ঠেলে দেয়।’
উপকূলের কাছাকাছি অন্য আরেকটি নৌকায় ছিল ৪৭ জন অভিবাসী। ক্ষুধার্ত এসব মানুষ পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্ধার মিনতি জানায়। স্থানীয় জেলেরা তাঁদের উদ্ধার করে।
মানবাধিকার কর্মীরা জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাগর থেকে এখন পর্যন্ত আট হাজারের বেশি অভিবাসীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে গত কয়েক দিনে উদ্ধার করা হওয়া অভিবাসীদের ১৩ জনকে আচেহ প্রদেশে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।
থাইল্যান্ডের কোহ লাইপ দ্বীপের উপকূলে ৩০০ অভিবাসীকে নিয়ে একটি নৌকা। নৌযা​নটির ইঞ্জিন সারাতে অভিবাসীরা এ দ্বীপে ভেড়ে। ছবি: রয়টার্স
থাইল্যান্ডের একজন কর্মকর্তা জানান, আজ ভোরে থাইল্যান্ড থেকে ৩০০ রোহিঙ্গা নিয়ে একটি নৌকা ছেড়ে গেছে। সেখানে অনেক নারী ও শিশু রয়েছে। তাদের বহনকারী নৌযানের ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা গেলে গতকাল বৃহস্পতিবার তারা তা ঠিক করতে থাইল্যান্ডের কোহ লাইপ দ্বীপে পৌঁছান। পরে নৌযানের ইঞ্জিন সারিয়ে তাঁদের সঙ্গে কিছু খাবার দিয়ে দেওয়া হয়।
নৌকার যাত্রীরা সাংবাদিকদের বলেন, দুই মাস ধরে তাঁরা সাগরে। এরই মধ্যে ক্ষুধা ও অসুস্থতায় ১০ জন মারা গেছেন। পরে তাঁদের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।
নৌকার থাকা সাজিদা নামের এক নারী বলেন, এক সপ্তাহ ধরে তাঁদের খাবার নেই। চোখে ঘুম নেই। তাঁর সঙ্গে থাকা চার সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
থাইল্যান্ডের সাতুন প্রদেশের গভর্নর দেজরাট লিমসিরি এএফপিকে বলেন, নৌকাটি মালয়েশিয়ার দিকে আসছিল। তবে এখন এটি ইন্দোনেশিয়ার পথে।
থাই জেলেরা তাঁদের নৌকা ​থেকে অভিবাসীদের বহনকারী নৌ​কায় বস্তায় করে কিছু খাবার ছুড়ে দেন। অভিবাসীদের একজন জানিয়েছেন, তাঁরা এক সপ্তাহ ধরেনা খেয়ে আছেন। ছবিটি গতকাল বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের কোহ লাপ দ্ব​িপের উপকূল থেকে তোলা। ছবি: রয়টার্স
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এ পরিস্থিতিকে মানুষের জন্য প্রাণঘাতী ‘পিং পং খেলা’ বলে মন্তব্য করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন দুর্গত মানুষের সাহায্যের জন্য দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে নিজ নিজ দেশের সীমান্ত ও বন্দর খোলা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি এসব দেশগুলোকে মনে করিয়ে দেন যে বিপদগ্রস্ত নৌকাগুলো উদ্ধার করতে তারা বাধ্য। সম্ভাব্য শরণার্থীদের বহিষ্কারের ওপর যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তার প্রতিও তাদের সম্মান দেখানো উচিত।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সাগরের ভাসমান মানুষের জীবন বাঁচাতে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

সেশনজটে পিষ্ট জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা by মোশতাক আহমেদ

অধ্যয়নরত ২০ লাখ শিক্ষার্থীই সেশনজটের জাঁতাকলে পিষ্ট। এখানে চার বছরের সম্মান ও এক বছরের মাস্টার্স শেষ করতে সময় লাগছে কমপক্ষে সাত বছর
তানভীর মাহমুদ ২০১০ সালে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস করে ২০১১-১২ সেশনে সম্মানে ভর্তি হয়েছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন রাজধানীর তিতুমীর কলেজে কমার্সের একটি বিভাগে। এইচএসসি পাসের পাঁচ বছর পর ২০১৫ সালে এসে তিনি এখন মাত্র দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা দিচ্ছেন। অথচ একই বছর এইচএসসি পাস করা তাঁর এক বন্ধু একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করে এমবিএতে পড়ছেন। হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলছিলেন, কবে অনার্স পাস করতে পারব জানি না, চাকরি তো দূরের কথা।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অধ্যয়নরত ২০ লাখশিক্ষার্থীই সেশনজটের জাঁতাকলে পিষ্ট। এখানে চার বছরের সম্মান ও এক বছরের মাস্টার্স শেষ করতে সময় লাগছে কমপক্ষে সাত বছর। গত বছর প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজটকে ‘গুরুতর’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের সমস্যা মেটাতে অধিভুক্ত স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পড়ানো হয়, এমন সরকারি কলেজগুলোকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ঢিলেমি করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি।
গত বছরের ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী ওই নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গত ৭ ডিসেম্বর ইউজিসিতে উপাচার্যদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সভায় পক্ষে মত এলে তা বাস্তবায়নে একটি কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মাদ মোহাব্বত খানকে। কমিটিকে এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ মাস পরও দিতে পারেনি।
জানতে চাইলে কমিটির প্রধান মোহাম্মদ মোহাব্বত খান স্বীকার করে বলেন, তাঁরা খুব এগোতে পারেননি। তবে প্রাথমিক কাজ করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ জন্য যে সময় ও যাদের দরকার তাদের পাওয়া যাচ্ছে না।
ইউজিসির সূত্র জানায়, ওই সভার পর থেকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সেশনজট কমানোর লক্ষ্যে ‘ক্র্যাশ’ প্রোগ্রামসহ বেশ কিছু উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন। পাশাপাশি কলেজগুলো যাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে না যায়, সে জন্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্নাতক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক (৪৮ শতাংশ) জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে পড়ছেন। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সরকারি-বেসরকারি কলেজ আছে ২ হাজার ১৫৪টি। এর মধ্যে ২৭৯টি সরকারি কলেজ। স্নাতক (সম্মান) পড়ানো ১৮১টি সরকারি কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ২৬ হাজার। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে সম্মান পড়ানো কলেজের সংখ্যা ৫৫৭টি। উপাচার্য হারুন–অর রশিদ জানান, সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২০ লাখ।
সেশনজটই যেন স্বাভাবিক: জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা, ঢাকা কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ, ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মিলিয়ে অন্তত ১০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষেই সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত সেশনজটের কবলে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। এতে করে তাঁরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশসহ নানাভাবেই পিছিয়ে পড়ছেন। দেশের অন্যান্য স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট কমলেও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে না কমায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দিন দিন বাড়ছে।
১১ মে ঢাকা কলেজে গিয়ে কথা হয় হিসাবরক্ষণ বিভাগের শিক্ষার্থী সৌরভ সাহার সঙ্গে। তিনি জানান, ২০০৯ সালে এইচএসসি পাস করে ২০০৯-১০ সেশনে ওই কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে চললে ২০১৩ সালে তাঁর অনার্স পরীক্ষা হওয়ার কথা, কিন্তু তাঁর এখনো পরীক্ষাই হয়নি।
অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত নাজমুল হাসান বলেন, এখানে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিতে অন্তত ১৮ মাস লেগে যায়। পরে আরও কয়েক মাস যুক্ত হয়। নাজমুল বলেন, এখানে কোনো কারণ ছাড়াই পরীক্ষা পিছিয়ে যায়।
ময়মনসিংহে অবস্থিত আনন্দ মোহন কলেজের ইংরেজি বিষয়ে অধ্যয়নরত একজন শিক্ষার্থী জানান, তিনি ২০০৭ সালে এইচএসসি পাস করে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে সম্মান প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁরা এখনো মাস্টার্স শেষ করতে পারেননি।
জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন-অর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, দুই বছর ধরে তারা বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করেছেন। ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ নেওয়ার পর তাঁরা এর সুফল পেতে শুরু করেছেন। এখন দুই-তিন মাসের মধ্যেই ফল প্রকাশ করা হচ্ছে। ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ বাস্তবায়ন হলে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আর সেশনজট থাকবে না।
সমস্যার শেষ নেই: কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে জানান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজগুলোতে বছরের অর্ধেক সময়ই ক্লাস হয় না। এইচএসসির মতো পরীক্ষার সময় অনেক কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে কোনো কোনো কলেজে পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে ক্লাস নেওয়া হয়। অন্যান্য পরীক্ষার সময়ও ঠিকমতো ক্লাস হয় না।
ঠিকমতো ক্লাস না হওয়ায় কমার্স ও বিজ্ঞানের কিছু বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ‘বাধ্যতামূলকভাবে’ প্রাইভেট পড়তে হয়। ঢাকা কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষার্থী বলেন, তিনি তিনটি কোর্সে প্রাইভেট পড়েন।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, অনুমোদিত পদের চেয়ে প্রায় তিন হাজার শিক্ষক কম আছে কেবল সরকারি কলেজগুলোতেই। আবার শিক্ষা কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও শিক্ষকদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। নিয়ন্ত্রণের কাজটি করে মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর।
ইউজিসির সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত দুই হাজারের বেশি কলেজ সম্পর্কে খোঁজখবর রাখাও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ‘দুরূহ’ কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তাও স্বীকার করেন, তাঁরা কলেজগুলোকে ঠিকমতো তদারক করতে পারছেন না।

রাজশাহীতে একের পর এক পুকুর ভরাট

রাজশাহী নগরের দেবিশিংপাড়া এলাকার এই পুকুরটিও
গতকাল থেকে ভরাট করা শুরু হয়েছে l ছবি: প্রথম আলো
আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাজশাহী নগরে একের পর এক পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। অতীতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মামলাও করা হয়েছে। সম্প্রতি আর সেই উদ্যোগও নেই। ফলে অবৈধভাবে পুকুর ভরাট চলছেই।
গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে নগরের দেবিশিংপাড়া এলাকায় একটি পুকুর ভরাটের কাজ চলছে। দুটি বড় ট্রলিতে করে মাটি এনে পুকুরে ফেলা হচ্ছে। বেশ আগে থেকেই পুকুরটির চারদিক থেকে দখল করে বাড়িঘর করা হয়েছে। পশ্চিম ও পূর্ব পাশে খানিকটা জায়গা ফাঁকা ছিল। গতকাল সকালে পুকুরটির পশ্চিম পাড়ের ওই ফাঁকা জায়গাটি দিয়ে মাটি ফেলতে দেখা যায়। বিকেলে পূর্ব পাশেও মাটি ফেলা শুরু হয়।
ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিক ছাড়া পুকুরটির মালিক পক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। একজন শ্রমিকের কাছ থেকে যতটুকু জানা গেছে, করিম নামের এক ব্যক্তি তাঁদের মাটি ভরাটের কাজে নিয়োগ করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুকুর ভরাট করছেন আব্দুস সালাম ও তাঁর অংশীদারেরা। অংশীদারদের মধ্যে শুধু আব্দুস সালামকে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, তাঁদের শরিকদের চলাচলের সুবিধার্থে পুকুরের মাঝখান দিয়ে একটি রাস্তা তৈরি করার জন্য ভরাট করছেন। পরিবেশ আইনে পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ—বিষয়টি তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, তিনি সেটা জানেন। তিনি স্বীকার করেন, তাঁদের পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবে তাঁরা রাস্তাটি করলে সিটি করপোরেশনও ব্যবহার করতে পারবে।
পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজশাহীর সহকারী পরিচালক নূর আলম বলেন, তাঁরা পুকুরটি পরিদর্শন করবেন। নোটিশ দেওয়া বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁরা পরিদর্শন করবেন, আপাতত এইটুকুই বলতে পারেন। পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ (সংশোধন) আইন ২০১০-এর ২-এর (ক) এবং ৬ ঙ ধারা মোতাবেক অপরিহার্য জাতীয় স্বার্থে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র গ্রহণ ব্যতিরেকে জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গা ভরাট বা অন্য কোনোভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না। পুকুর ভরাটের কাজ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া রাজশাহী মহানগরের ভেতরে পুকুর ভরাট বিষয়ে হাইকোর্টে একটি রিট মামলায় রুল জারি রয়েছে। মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের জলাশয় ভরাট বন্ধ রাখার জন্য আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।
বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তার পরও রাজশাহীতে বেপরোয়াভাবে পুকুর ভরাট চলছেই। গত মাসে নগরের বিসিক এলাকায় একটি পুকুরের অংশবিশেষ ভরাট করে ভবন সম্প্রসারণের কাজ করা হয়েছে। বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তর ও রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নজরে নিয়ে এলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
গত জানুয়ারিতে নগরের গৌরহাঙ্গা এলাকায় একটি পুকুর ভরাট করা হয়। এই পুকুরটির উত্তর পাশে গৌরহাঙ্গা গোরস্থান। দক্ষিণ পাড়ে একটি মাদ্রাসা। কবরস্থানে আসা মানুষ যাতে পুকুরের পানি ব্যবহার করতে পারে, সে জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে ১৯৯৮ সালে উত্তর পাশে একটি পাকা ঘাট করে দেওয়া হয়েছে। ঘাটের নাম দেওয়া হয় গৌরহাঙ্গা গোরস্থান ঘাট।
গত নভেম্বরে নগরের রামচন্দ্রপুর এলাকায় একটি পুকুরের অংশবিশেষ ভরাট করে ফেলা হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রথম আলোতে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পুকুর ভরাট নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একটি নোটিশ টাঙিয়ে দেওয়া হয়। অধিদপ্তরের লোকজন চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ভরাটকাজের সঙ্গে জড়িত লোকজন নোটিশটি তুলে ফেলে দেয়। এর এক দিন পরেই ওই এলাকায় আরও একটি পুকুর ভরাট করা হয়। পুকুর ভরাট নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে রাজশাহীতে তিনটি মামলা করা হয়েছে। গত বছরের জুলাইয়ে নগরের মুন্সিডাঙ্গা এলাকার ফাহিম মুন্সীকে বিবাদী করে সর্বশেষ মামলাটি করা হয়েছে। এর আগে নগরের সাগরপাড়া মৌজার সাগরপাড়া মাইক্রোবাস স্ট্যান্ডসংলগ্ন পুকুরটি ভরাট করার অভিযোগে এর মালিক মঞ্জুর ফারুক চৌধুরীর নামে নগরের বোয়ালিয়া থানায় অপর একটি মামলা হয়েছে।
প্রথম মামলাটি করা হয় গত বছরের এপ্রিলে। মামলায় নগরের রেশমপট্টি এলাকার রামপুর মৌজার একটি পুকুর ভরাটের অভিযোগে বোয়ালিয়াপাড়ার গোলাম কিবরিয়াসহ সাতজনকে বিবাদী করা হয়।

মেধার বিপরীতে কোটা—যৌক্তিক পর্যায়ে হ্রাস করুন by আলী ইমাম মজুমদার

সরকারের নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জনপ্রশাসন অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই আমাদের এ প্রতিষ্ঠানটি একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উত্তরোত্তর দক্ষ হবে, এটা সবারই প্রত্যাশা। কোনো সরকারেরই এর ভিন্ন কিছু চাওয়ার কথা নয়। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের সুশীল সমাজ এবং উন্নয়ন–সহযোগীরা মনে করছে, প্রতিষ্ঠানটির গুণগতমান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। উন্নয়ন–সহযোগীরা মনে করেই থেমে থাকছে না, প্রতিকারের জন্য বিভিন্ন সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসছে। এতে কাজ কিছুটা হলেও তা প্রান্তিক পর্যায়ে থেকে যাচ্ছে। এ অবক্ষয়ের কারণ বহুবিধ। তার মধ্যে নিয়োগ-প্রক্রিয়া একটি বড় নিয়ামক, এমনটি বলা অসংগত হবে না। এমনিতেই অপ্রতুল বেতন-ভাতা, যুগবাহিত মর্যাদা লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস আর ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে অধিকতর সুযোগ সৃষ্টি মেধাবীদের সরকারের বেসামরিক চাকরিতে কমই আকর্ষণ করছে। আর যাঁরা আসতে চাইছেন, তাঁদের মধ্য থেকে আমরা মেধার ভিত্তিতে নিচ্ছি মোটে ৪৫ শতাংশ। অবশিষ্ট ৫৫ শতাংশ যাচ্ছে প্রাধিকার কোটায়। এ প্রক্রিয়ায় প্রাধিকারের বরাতে মেধাতালিকায় অনেক নিচে থাকা প্রার্থীরাও গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় চাকরিগুলোয় এসে পড়ছেন। সুতরাং, গোড়াতেই যেখানে গলদ, সেখানে পরবর্তী সময়ে এর মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা তেমন সফল হওয়ার কথা নয়। যেমন বীজ, ফলন হবে তেমনই।
প্রশ্ন আসে কেন এমনটা হচ্ছে। আমাদের সংবিধানপ্রণেতারা তো প্রজাতন্ত্রের চাকরিতে নিয়োগ লাভের জন্য সব নাগরিকের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছেন। অবশ্য সংবিধানে কোনো অনগ্রসর শ্রেণি বা অঞ্চলের জন্য বিশেষ সুবিধার বিধানও রয়েছে। আর তা যৌক্তিকভাবে থাকলে তেমন কথা ছিল না। এমনকি সমস্যাটি ইতিবাচকভাবে পর্যালোচনাও করা হয় না। কোটা ছিল ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষ ও পাকিস্তান আমলেও। তবে সেগুলো ছিল অনগ্রসর শ্রেণি আর অঞ্চলের জন্য। সেটা করতে গিয়ে মেধাবীদের চাকরিতে আসার বড় বিঘ্ন সৃষ্টি করা হয়নি। অথচ আমরা তা-ই করে চলছি। অনগ্রসর শ্রেণি, যেমন নারী ও উপজাতির জন্য যথাক্রমে ১০ ও ৫ শতাংশ চাকরি সংরক্ষিত রয়েছে। অনগ্রসর অঞ্চলের কোটাটি রয়েছে জেলার হিসাবে। এ ২৫ শতাংশ বাদে আরও ৩০ শতাংশ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। আগে এ কোটা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের। দীর্ঘদিন থেকে প্রশ্ন এসেছে, এঁরা সমাজের অনগ্রসর শ্রেণি কি না। কেউ কেউ তা হলেও সবাই নন, এ বিষয়ে দ্বিমত করার সুযোগ খুব কম। তার চেয়ে বড় কথা, এখন পর্যন্ত রেজিস্ট্রিকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমবেশি তিন লাখ। তাঁদের পোষ্য সংখ্যা কত হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। এ ধরনের ক্ষুদ্র জনসমষ্টির জন্য ৩০ শতাংশ চাকরি বরাদ্দ রাখার যৌক্তিকতাও প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্রে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই অংশ। এ ধরনের কোটাব্যবস্থা সে চেতনার বিপরীত অবস্থানে যায় কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন করা চলে। চলমান কোটাব্যবস্থার যৌক্তিকতা নিয়ে অনেক কমিশন-কমিটি কাজ করেছে। এসব কমিশন-কমিটির কোনো একটি এ ব্যবস্থা সমর্থন করেছে, এমনটি দেখা যায় না। তবু তা রয়ে গেছে। এমনকি হয়েছে জোরদার।
কোটা নিয়ে কয়েকটি কমিশন-কমিটির মতামত আলোচনার দাবি রাখে। স্বাধীনতার পরপরই বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত চাকরি পুনর্গঠন কমিশন ১৯৭৩ সালে আর ১৯৭৭-এ বেতন ও চাকরিসংক্রান্ত রশিদ কমিশন কোটাপদ্ধতির সুস্পষ্ট বিরোধিতা করে। তাদের মতে, কোটাপদ্ধতি একটি শীর্ষ মানের জনপ্রশাসন গড়ার প্রতিবন্ধক হবে। আর দক্ষ জনপ্রশাসন গঠনের সূচনাটা হতে পারে একটি সুষ্ঠু নিয়োগ-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত উঁচু মানের জনপ্রশাসন দুর্বল নিয়োগ-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হতে পারে না। কোটাব্যবস্থাকে জাতীয় সংহতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও এ প্রতিবেদনগুলোয় আলোচিত হয়েছে। ঠিক তেমনি দীর্ঘ পাঁচ বছর কাজ করে ২০০০ সালে প্রতিবেদন দেয় এ টি এম শামসুল হকের নেতৃত্বাধীন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। সে প্রতিবেদনে কোটাব্যবস্থাকে সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ রয়েছে। তাদের মতে, চলমান কোটাব্যবস্থা কোনো যৌক্তিক ভিত্তির দ্বারা সমর্থিত নয়; বরং এটা জনপ্রশাসনের গুণগত মান হ্রাসে প্রভাব ফেলছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনও তাদের বিভিন্ন বার্ষিক প্রতিবেদনে এ কোটাব্যবস্থা মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন গড়তে বিরূপ প্রভাব ফেলছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সুপারিশ করেছে ক্রমান্বয়ে এ ব্যবস্থা বিলুপ্তির। ১৯৯৩ সালে তদানীন্তন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. আইয়ুবুর রহমানের নেতৃত্বে চারজন সচিবের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি এ কোটাপদ্ধতি নিয়োগ-প্রক্রিয়ায় মেধাকে অস্বীকারের নামান্তর বলে মন্তব্য করেছে। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে মেধাভিত্তিক নিয়োগের পক্ষে তারা মত দিয়েছে।
কোটাব্যবস্থার ভিন্ন একটি দিকও পর্যালোচনার দাবি রাখে। জেলাভিত্তিক কোটা দেওয়া হয়েছিল মূলত অনগ্রসর জেলাগুলোকে কিছুটা বিশেষ সুবিধা দিতে। কিন্তু বাস্তবে এ জেলা কোটা উন্নত-অনুন্নত সব জেলার জনসংখ্যা অনুপাতে ভাগ হচ্ছে। অনুন্নত জেলাগুলোর জন্য একটি থোক কোটা একত্রে রেখে শুধু সেই জেলাগুলোর প্রার্থীদের থেকে মেধা অনুসারে নিয়োগ দেওয়া হলে কিছুটা যুক্তিসংগত হতো। উপজাতি কোটার সুফল মূলত ভোগ করছে পাহাড় ও সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতির মধ্যে আর্থসামাজিক বিবেচনায় অগ্রসর এক-দুটি গোত্র। অন্যরা সেই তিমিরেই থাকছে। ভর্তুকির সুফল যেমন প্রায় ক্ষেত্রে বৃহত্তর বিবেচনায় ধনিক শ্রেণির কাছেই যায়, এসব ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটে চলছে।
আশার কথা, চলমান কোটাপদ্ধতি নিয়ে হাল আমলে নীতিনির্ধারণী মহলেও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। অতি সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়বিষয়ক সংসদীয় কমিটির এক সভায় একজন সদস্য মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা তৃতীয় প্রজন্মের জন্যও সংরক্ষিত রাখার বিষয়ে তীব্র আপত্তি করেছেন। অবশ্য সভাটিতে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে মতামতটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ; এটা যুগের দাবির সঙ্গে সংগতিপূর্ণও বটে। সরকারের বর্তমান অবস্থানও কোটাপদ্ধতিকে একটি যৌক্তিক পর্যায়ে নেওয়ার পক্ষে বলেই মনে হচ্ছে। দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয় নিয়ে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশলপত্রটি অনুমোদিত হয়। এ কৌশলপত্রে করণীয় কর্মপরিকল্পনার মধ্যে কোটাপদ্ধতি যৌক্তিকীকরণের মাধ্যমে মেধা কোটা বৃদ্ধির প্রত্যয়ও ঘোষিত হয়েছে। তবে এ প্রত্যয় বাস্তবায়নের কোনো কার্যকর উদ্যোগ এখনো লক্ষণীয় হয় না।
উল্লেখ করা সংগত, কোটাপদ্ধতি রয়েছে জনপ্রশাসনের প্রতিটি অঙ্গের নিয়োগ পর্যায়ে। বিসিএসের অঙ্গ হিসেবে বাদ যাননি কলেজশিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষিবিজ্ঞানী কিংবা এমন কেউ। এমনকি জনপ্রশাসনের অঙ্গ না হলেও এটা কার্যকর করা হয়েছে অধস্তন বিচার বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে। সুতরাং নিম্ন আদালতের বিচারক, প্রশাসক, কূটনীতিক, চিকিৎসক, শিক্ষকসহ সব নিয়োগের ক্ষেত্রেই আমরা মেধাকে গৌণ বিবেচনায় নিচ্ছি। দীর্ঘকাল এ ব্যবস্থা চলতে থাকায় এসব চাকরির মান যে নেমে যাওয়াই স্বাভাবিক, তা আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা পদে নিয়োগে নেই কোনো কোটার বালাই। তাই তাঁরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের মান ধরে রাখতে সক্ষম হবেন এবং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবেন, এটাই স্বাভাবিক।
এটা অনস্বীকার্য, কোটাপদ্ধতি রাতারাতি রদ করা যাবে না। আর সমাজের অনগ্রসর অংশের জন্য কোটা সংরক্ষণের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাও রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্যও তাঁদের সংখ্যার অনুপাতকে বিবেচনায় নিয়ে আরও কিছুকাল এ কোটা চালু রাখার প্রয়োজন থাকবে। তবে সবকিছু মিলিয়ে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে ২০ শতাংশের ওপর প্রাধিকার কোটা রাখা অসংগত হবে। এখন নিয়োগ পর্যায়ে সরকার মেধাকে প্রাধান্য দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আর অবশ্যই এ অঙ্গীকার তাদের সুস্পষ্ট উপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ। সোনার বাংলা গড়তে একটি দক্ষ জনপ্রশাসন আবশ্যক। এটা কারও না বোঝার কথা নয়। তাহলে আমরা সে অঙ্গীকারের আশু বাস্তবায়নও চাইতে পারি।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

সালাহ উদ্দিন সুস্থ, তবু আদালতে নিতে বিলম্ব by রাহীদ এজাজ

চিকিৎসকদের মতামতের পর ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রাজধানী শিলংয়ের সিভিল হাসপাতাল থেকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আদালতে হাজির করা হবে। রাজ্যের পুলিশ কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে এ কথা বলেছেন।
পুলিশের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সালাহ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে দেখা করা তাঁর এক আত্মীয় গতকাল বৃহস্পতিবার বলেছেন, সালাউদ্দিন আহমেদ সুস্থ আছেন।
এদিকে মেঘালয় রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালক রাজীব মেহতা প্রথম আলোকে বলেছেন, বাংলাদেশের বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোল গত বুধবার ভারতের সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (সিবিআই) মাধ্যমে সতর্ক করেছে। ঢাকার অনুরোধে সিবিআই মেঘালয় রাজ্য সরকারের কাছে এ অনুরোধ জানায়।
সুস্থ থাকার পরও কেন তাঁকে এখনো হাসপাতালে রাখা হয়েছে, তা নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় মেঘালয় রাজ্য পুলিশের কর্মকর্তারা প্রথম আলোর কাছে স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি। এর আগে বিকেলে সালাহ উদ্দিনের স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোঁজ নিতে এই প্রতিবেদক সিভিল হাসপাতালে গেলে সেখানকার চিকিৎসকেরা কোনো মন্তব্য করেননি। তাঁরা সালাহ উদ্দিন সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
গত সোমবার আটকের পর সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে প্রথম বাবের মতো দেখা করার সুযোগ পান আইয়ুব আলী নামে তাঁর এক আত্মীয়। শিলংয়ের পুলিশ সুপার এন খার্কাং এ তথ্য জানিয়েছেন। কলকাতা থেকে আসা আতাহার আলীর বরাত নিয়ে খার্কাং বলেন, সালাহ উদ্দিন সুস্থ আছেন। তাঁর জন্য হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পোশাক ও ফলমূল নেওয়া হয়েছে।
সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমেদের দেখা করার সুযোগ করে দিতে স্থানীয় মানবাধিকার কর্মীরা রাজ্য সরকারের সঙ্গে গতকাল আলোচনা করেছেন। যদিও হাসিনার এখনো ভিসা হয়নি।
ইমপালস্ এনজিও নেটওয়ার্কের হাসিনা খারবিহ তাঁর দপ্তরে প্রথম আলোকে বলেন, হাসিনা আহমেদকে কথা বলার সুযোগ দিতে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। সেখানকার কর্মকর্তারা সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছেন।
ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের নজর এড়িয়ে সালাহ উদ্দিন কীভাবে শিলংয়ে এলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মেঘালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৪০ কিলোমিটার সীমান্ত আছে। এর মধ্যে ৬০ কিলোমিটারে কোনো কাঁটাতারের বেড়া নেই।
গত সোমবার শিলং পুলিশ সালাহ উদ্দিনকে অবৈধ প্রবেশের অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। এর আগে গত ১০ মার্চ থেকে সালাহ উদ্দিন নিখোঁজ ছিলেন। তাঁর পরিবার ও দল অভিযোগ করে আসছিল, সালাহ উদ্দিনকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উত্তরার একটি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে।

সংসদীয় গণতন্ত্রে ছোট দলের ভূমিকা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি, দুটি বা তিনটি প্রধান দল জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দেয়। ঘুরেফিরে তারাই সরকার গঠন করে, এককভাবে অথবা কোনো ছোট দল বা দলসমূহের সঙ্গে কোয়ালিশন করে। সে কারণে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে ছোট দলের ভূমিকা কম নয়। অন্যদিকে বহু দেশে বহু বড় দল একসময় জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিলেও কোনো একপর্যায়ে গিয়ে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পাকিস্তানে মুসলিম লীগ। দর্শনতত্ত্ব সম্পর্কে বলা হয়, কোনো তত্ত্ব পুরোনো হয়ে গেলে আপনা–আপনি বাতিল হয়ে যায়, স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে, কাউকে তা ধ্বংস করার প্রয়োজন হয় না। রাজনৈতিক দল সম্পর্কেও সে কথা প্রযোজ্য। কোনো দল পুরোনো হয়ে গেলে তার স্বাভাবিক মৃত্যু অনিবার্য। তার স্থান পূরণ করে নতুন নীতি-আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে আসা আর একটি দল। বাংলাদেশে কার্যকর গণতন্ত্র থাকুক বা না থাকুক, আক্ষরিক অর্থেই বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে। দলের সংখ্যা শ খানেকের কম নয়। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত দলের সংখ্যাই গোটা চল্লিশ। আন্ডারগ্রাউন্ডে যে কত বাম ও ডানপন্থী উগ্র সংগঠন আছে, তার হিসাব আমাদের গোয়েন্দারা নন, একমাত্র বিধাতা জানেন। যা হোক, শ খানেক দলের মধ্যে বড় চারটি দল ছাড়া আর সাত-আটটি সংগঠনের নাম ও সেগুলোর একজন করে নেতার নাম মানুষ জানে। ওই সব দলের কার্যনির্বাহী পরিষদ বলে যদি কিছু থেকে থাকে, তার সদস্যদের নাম দেশের কেউ জানে না।
যখনই জাতীয় সংসদ অথবা অন্য কোনো নির্বাচনের ঘোষণা আসে, তখনই বেশ কিছু দলের তৎপরতা মানুষ দেখতে পায়। ওই দলগুলোর অবস্থা এ রকম: আমরা এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর একটি দিনও দেরি সইল না। ঘণ্টা খানেকের মধ্যেই কয়েকটি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেয়। তাদের প্রার্থীদের তড়াক করে দাঁড়িয়ে যাওয়ার আগে সাত-পাঁচ ভাবা উচিত ছিল। কারণ, তাদের দল ছোট হতে পারে, কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ছোট দলের ভূমিকা ছোট নয়। প্রধান দুটি দলের সঙ্গে ছোট কয়েকটি দল প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনটি একটি জাতীয় নির্বাচনের গুরুত্ব পায়। সরকারের আকস্মিক নির্বাচনের পরিকল্পনায় ছোট দলের নেতারা যোগ দেওয়ায় তা গ্রহণযোগ্যতা পায়। শুধু দেশে নয়, বিদেশে উন্নয়ন–সহযোগী দেশগুলো ও জাতিসংঘ নির্বাচনটিকে পর্যবেক্ষণ করে। কোনো পৌর কর্তৃপক্ষের নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববাসীর এমন নজিরবিহীন উৎসুক্য পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম। ৫/১-এর নির্বাচনটি দাতা দেশগুলো দেখেছে বলেই এই নির্বাচনটি ছিল তাদের কাছে টেস্ট কেস।
কিছুকাল যাবৎ জাতীয় পার্টির নেতা অব্যাহতভাবে বলছেন যে আওয়ামী লীগ-বিএনপি শেষ, তাদের ওপর জনগণের আস্থা নেই, তাঁর দলই একমাত্র ভরসা। ভবিষ্যতে তাঁরাই সরকার গঠন করবেন। অতি সম্প্রতি কোটি কোটি টাকা খরচ করে জাতীয় পার্টি দু-একটি সমাবেশ বা সম্মেলন করেছে। ব্যানার হাতে মানুষ এবং বড় বড় বাসে ভরে গিয়েছিল ঢাকার রাস্তাঘাট। আমি নিজে ওই দিন যানজটে আটকা ছিলাম আড়াই ঘণ্টা। সরকারের এবং প্রশাসনের পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায় ওই সম্মেলন অনুষ্ঠানের এন্তেজামে। সেটা জনগণের খোলা চোখেই ধরা পড়ে। ঘোষণা দেওয়া হয়, ১০ লাখ লোকের সমাবেশ হবে। সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির এক প্রার্থী পেয়েছেন ২ হাজার ৯৫০ ভোট। গত সম্মেলনে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে যে লোক জড়ো করা হয়েছিল, তার সংখ্যা নিশ্চয়ই তিন হাজারের বেশি ছিল।
সিকি শতাব্দী যাবৎ বিরামহীন বলা হচ্ছে, বুর্জোয়া গণতন্ত্র দিয়ে কিছু হবে না, দুই দলের শাসন মানুষ দেখেছে, বাম বিকল্পই পারে দেশকে উদ্ধার করতে। সেই বাম বিকল্পধারায় দলের সংখ্যা একটি বা দুটি নয়, বহু—১১, ২১ বা ৩১। যে দেশে ৫০ শতাংশ মানুষ ভালো রকম গরিব, সেখানে বাম দলগুলোর প্রতি সমর্থন উল্লেখযোগ্য হওয়াই স্বাভাবিক। দুই ঢাকার একটিতে বাম এক প্রার্থী পেয়েছেন ১ হাজার ২৯ ভোট, অন্যটিতে ২ হাজার ৪৭৫ ভোট। সিটি নির্বাচনের পর বামপন্থীদের পাড়াপড়শিদের মুখ দেখানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নেতাদের আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত ঘর থেকে বের হতে পারেননি তিন দিন। হাটবাজার বন্ধ। দেশের কোনো ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানই তিন হাজারের কম ভোট পেয়ে নির্বাচিত নন।
সবাই জানে কোনো নির্বাচনে কোনো দলের সব প্রার্থীই বিজয়ী হন না। অনেক প্রার্থীই জানেন তাঁরা বিজয়ী হতে পারবেন না। তবে কেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন? পরাজয় নিশ্চিত জেনেও প্রতিযোগিতারও একটি মূল্য আছে। তিনি যে দলের প্রার্থী, সেই দলের জনপ্রিয়তা যাচাই হয়। ব্যক্তিপ্রার্থী সে ক্ষেত্রে মুখ্য নন। সে জন্যই আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার মতো জনপ্রিয় নেতা ও ভালো মানুষ ২০০৮-এর নির্বাচনে পরাজিত হন। যে বিপুলসংখ্যক ভোট তিনি পেয়েছিলেন, তা তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার জন্য। খালেদা জিয়া তাঁকে মনোনয়ন দিলে তাঁকে পরাজিত করার শক্তি তাঁর এলাকায় আর কারও ছিল না। কোনো দলের প্রার্থী যখন পরাজিত হন, তা তাঁর নিজের কারণে কিছুটা, পরাজয়ের দায় প্রধানত দলীয় নেতৃত্বের।
কার্ল মার্ক্স যে বয়সে মারা গেছেন, ঠিক তত বছর যাবৎ উপমহাদেশের, বিশেষ করে বাংলার কমিউনিস্টরা থিসিস নিয়ে বিতর্ক করে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশের বাম সংগঠনগুলোর অফিসে কার্ল মার্ক্স, ফ্রেডরিক অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, মাও সেতুং, হো চি মিন এমনকি মহা বিপ্লবী চে’র ছবি পর্যন্ত শোভা পায়। গত ৪০ বছরে মার্ক্সবাদ দূরের কথা, মার্ক্সের নামটা উচ্চারণ করেছেন এমন কোনো বাম নেতাকে আমি দেখিনি। এমন একটি দিন নেই, যে দিন তারা বাংলার মাটি থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত না করেন।
প্রগতিশীল সমাজবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার এক জিনিস, সে জন্য শক্তিশালী বাম সংগঠন গড়ে তোলা এক জিনিস, আর সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী প্রচার সংঘ আর এক বস্তু। প্রগতিশীল রাজনীতি সাবলীল থাকলে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ মাথা তুলতে পারে না। সমাজে নারীর জীবন নিরাপদ থাকে। উন্নত জাতীয় সংস্কৃতি বিকশিত হয়। অর্থনীতি স্থিতিশীল ও ভালো থাকে। সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে সাম্প্রদায়িক বলে অপবাদ দিলে জনসমর্থন শূন্যের কোঠায় না নেমে পারে না। সংখ্যালঘুরাও আস্থা রাখে না। তখন নির্বাচনী রাজনীতিতে না থেকে বরং সশস্ত্র অথবা শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের পথে যাওয়াই ভালো।
সিটি নির্বাচনে কী হয়েছে, কী কারণে হয়েছে, তা পথে পথে পিঠে ছালা ঝুলিয়ে কাগজ ও শিশি বোতল কুড়ানো কিশোর পর্যন্ত জানে। দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীদের সঙ্গে বৈঠকের সঙ্গে সঙ্গে ধা করে তারিখ ঘোষণার পর বাম নেতাদের তৎপরতায় আমার ভেতরে একধরনের রক্তক্ষরণ হয়। দেশের মানুষ জেনে গেল বাম নেতারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত শুধু নন, অত্যন্ত ব্যাকুল আওয়ামী লীগের নেতাদের মতোই। সেই সঙ্গে তারা আরও জেনে গেল বাম নেতাদের মধ্যে ঐক্য ও সমঝোতা নেই। বাম নেতাদের এই অনৈক্য দুটি বড় দলেরই উপভোগ্য। যাদের মানি নেই, মাসলম্যান নেই, আছে নীতি ও আদর্শ, তাদের মধ্যে যদি ঐক্যটাও না থাকে, তাদের যারা নীতিগতভাবে সমর্থক, তাদের দুঃখের আর সীমা থাকে না। আমিও দুঃখিত।
ছোট দলগুলোর উচিত ছিল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য প্রয়োজনে মধ্য-ডান ও ডানদের সঙ্গেও ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন গড়ে তোলা। যাঁরা বাম বলে দাবি করেন, তাঁদের মিলিট্যান্ট হতে হবে। মিলিট্যান্ট হওয়ার অর্থ জঙ্গিবাদী হওয়া নয়, আপসহীন লড়াইয়ের মানসিকতা থাকা। ডান-বাম সব ছোট দলেরই ক্ষমতাসীনদের লেজুড়বৃত্তি করার অভ্যাস বহু দিনের। সেটা দেখেছি মোশতাকের পৌনে তিন মাসে, জিয়ার সময়, এরশাদের আমলে এবং ’৯১-এর পরেও। অতীতে করলেও চিরকালই তাঁরা তা করবেন—প্রকাশ্যে অথবা অপ্রকাশ্যে—তা ভাবতে কষ্ট হয়। তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে রাতারাতি অংশগ্রহণের জন্য যাঁরা রাস্তায় নেমে পড়েন, নির্বাচন ও ফলাফল ঘোষণার ২১ দিন আগেই নির্বাচনটি লেজিটিমেসি বা বৈধতা তাঁরাই দিয়ে দেন। ফল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিক হাহাকার অর্থহীন ও হাস্যকর।
ভারতে সংসদীয় গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত। তা শুধু বড় বড় ও জাতীয় দলগুলোর কল্যাণে নয়, সেখানে ছোট ও আঞ্চলিক দলগুলোর ভূমিকা অসামান্য। লোকসভায় ৪০টির বেশি দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। তেলেগু দেশম পার্টি, শিরোমণি আকালি দল, দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাগাম, বহুজন সমাজ পার্টি, তামিল মানিলা কংগ্রেস, কেরালা কংগ্রেস (এম), সিকিম ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, পিজ্যান্টস অ্যান্ড ওয়ার্কার্স পার্টি, মণিপুর স্টেট কংগ্রেস পার্টি, ভারতীয় জাতীয় লোক দল, ন্যাশনাল কনফারেন্স, হিমাচল বিকাশ কংগ্রেস, রাষ্ট্রীয় লোক দল, মুসলিম লীগ প্রভৃতি। বহু রকমের কংগ্রেস ও নানা রকম সমাজবাদী দল রয়েছে। শ্রীলঙ্কার সংসদেও বিভিন্ন ভাষাভাষী, জাতিসত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। নেপালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে আমি একজন বিদেশি পর্যবেক্ষক ছিলাম। মার্ক্সবাদী বিপ্লবী প্রচণ্ডদের প্রাধান্য ছিল, কিন্তু বিভিন্ন ছোট দল থেকেও নির্বাচিত হন। কমিউনিস্টই আছে বিভিন্ন রকম। বাংলাদেশে কেন ও রকম হলো না এবং কারা তার জন্য দায়ী? সব দোষ বড় দুই দলের ঘাড়ে চাপালে তা হবে আত্মপ্রতারণা।
রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাজ তাঁদের নীতি ও কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাওয়া। যেমন দেখেছি পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও নিষিদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টিকে শহর, বন্দর, শিল্পাঞ্চল ও গ্রাম থেকে গ্রামান্তর নেতারা চষে বেড়িয়েছেন। মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে মিশেছেন। মুসলিম লীগ মানুষের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি, তাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে শেষ হয়ে যায়।
বড় দুই দলের কাছে দেশের সব দল ও পেশাজীবী সংগঠন যদি আত্মসমর্পণ করে এবং দেশকে বন্ধক দেয় একখণ্ড জমির মতো, দেশে আপনা–আপনি বিরাজনীতিকরণ হয়ে যায়। গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্রটি যদি প্রতারণায় পূর্ণ হয়, তখন জাতি বিপর্যয়ে পড়ে। সেই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী শুধু বড় দল নয়; ছোট-মাঝারি দল ও পেশাজীবী সংগঠনগুলো আরও বেশি দায়ী।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আপনারে দীপ করে জ্বালো by এম এম আকাশ

ছাত্র ইউনিয়নের নারী কর্মীর ওপর পুলিশের হামলা
১০ মে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে পয়লা বৈশােখ নারী লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে একটি ঘেরাও কর্মসূচির ওপর পুলিশ বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। এই হামলার যে সচিত্র বিবরণ প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়েছে, তা দেখে যেকোনো মানুষ বিচলিত ও বিক্ষুব্ধ না হয়ে পারবে না। দুর্বৃত্তদের হামলার বিচার চাইতে এসে শিক্ষার্থীরা পুলিশের দ্বারা আক্রান্ত হলেন।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’। পুলিশের আচরণ এ ক্ষেত্রে অনেকটাই সে রকম। পয়লা বৈশাখে যখন দুর্বৃত্তরা নারীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, তখন সেখানে পুলিশ এগিয়ে আসেনি। কিন্তু বিচারপ্রার্থীদের লাঠিপেটা করতে তাদের উৎসাহের কমতি নেই।
সেদিন পুলিশ এগিয়ে না এলেও লিটন নন্দী নামের ছাত্র ইউনিয়নের এক নেতা প্রতিরোধ করেছিলেন। তাঁর সাক্ষাৎকার থেকে আমরা জানতে পারি যে একজন নারীকে যখন প্রায় বিবস্ত্র করার চেষ্টা হচ্ছিল, তখন তিনি দুর্বৃত্তদের বাধা দিতে এগিয়ে যান। এতে তাঁর একটি হাতও ভেঙে দেওয়া হয়। কিন্তু অদূরে দণ্ডায়মান পুলিশ তখন চুপচাপ দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টরের কাছে খবরটা জানানো হয়, তখন তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি তৎক্ষণাৎ পুলিশকে ফোন করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়েও পুলিশ প্রথমে সম্পূর্ণ ঘটনা অস্বীকারের চেষ্টা করে। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে ১২৬টি সিসি ক্যামেরা এবারও ঘটনার ছবি প্রকাশ করে দেয়। যেমন, অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডটির ছবিও সিসি ক্যামেরার কারণে অনেকখানি আমরা দেখতে পেয়েছিলাম।
ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা জানিয়েছেন, পুলিশের কাছে অন্তত একজন দুর্বৃত্তকে তাঁরা ধরে সোপর্দ করেছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই তাঁকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। প্রথম আলোতেই প্রকাশিত কাবেরী গায়েনের লেখায় এর বিস্তৃত প্রামাণ্য বিবরণ রয়েছে। কিন্তু পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন শুরু থেকেই বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে সচেষ্ট ছিল। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি আয়োজিত অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এক সভায় শিক্ষক সমিতির সভাপতি ‘সাত দিনের মধ্যে, ১০ দিনের মধ্যে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে’ ইত্যাদি হুমকি দিয়ে পুলিশকে আসামি শনাক্ত করে ধরে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানিয়ে বেশ জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপর তাঁরা আর কোনো কর্মসূচি দেননি।
আশ্চর্যের বিষয়, এমন একটি মনুষ৵ত্ববিরোধী লজ্জাকর ঘটনাকে আস্তে আস্তে ভুলিয়ে দেওয়ার, সহনীয় করার, চাপা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহতই রয়েছে। এমনকি বিশেষ একটি প্রতিক্রিয়াশীল মহল এ রকম কথাও বলতে থাকে, পয়লা বৈশাখে ‘ইসলামি পোশাক’বর্জিত এই নারীদের ওপর হামলার জন্য তাঁরা নিজেরাই দায়ী। আবার আরেকটি মহল মনে করে, ‘ছাত্রলীগের কর্মীরাই’ এসব ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থেকেছে।
কোনটি সত্য—প্রথমটি, না দ্বিতীয়টি? সরকারকে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে, শাস্তি দিতে হবে, নাহলে উপরিউক্ত দুটি অভিযোগের একটিকে মানুষ সত্য বলে ধরে নেবে।
পয়লা বৈশাখের ঘটনায় পুলিশ প্রথম থেকেই সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করে আসছে। তাদের বক্তব্য ‘কেউ তো অভিযোগ করতে এগিয়ে আসেনি’, ‘আমরা সাক্ষী পাব কোথা থেকে’, ‘একমাত্র লিটন নন্দীই তো সাক্ষী দিয়েছে’ ইত্যাদি। কিন্তু এ কথা নিশ্চয়ই সবাই স্বীকার করবেন যে ছবিগুলো ভূতের ছবি নয়। আর এসব ক্ষেত্রে সেই হামলার শিকার মেয়েটি যদি সাহস করে আজ অভিযোগ করতে এগিয়ে না আসেন, আমরা সেটাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে পারি না।
আশার দিক হচ্ছে, বিভিন্ন নারী সংগঠন, সংস্কৃতিকর্মীরা নারী লাঞ্ছনার বিষয়টি ভুলতে দেয়নি। ছাত্র ইউনিয়নের তরুণ বন্ধুরা সরকার ও প্রশাসনের নিশ্চুপ ভূমিকার প্রতিবাদ জানাতে মিছিল বের করেছেন রাজপথে। ডিএমপি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছেন এবং ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সেখানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে যথার্থই বলেছেন, ‘এখানে যতসংখ্যক পুলিশ আমাদের বাধা দিচ্ছে, বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে তারা থাকলে নারী লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটত না’ (প্রথম আলো, ১১ মে, ২০১৫)।
তাদের এই কর্মসূচির নামকরণ ছিল ‘পাল্টা আঘাত’। ছাত্র ইউনিয়নের তরুণ কর্মীরা বিচার না পেয়ে বিক্ষুব্ধ হয়েই এই কর্মসূচি নিয়েছেন। অনেক দিন তাঁরা অপেক্ষা করেছেন। কিন্তু পুলিশ অপরাধীদের ধরার ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। কতখানি ছাত্র ইউনিয়ন এই কর্মসূচি নিতে বাধ্য হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী যখন জনগণকে আহ্বান জানান যে ‘জ্বালাও-পোড়াওয়ের সংঘটকদের’ হাতেনাতে ধরে শাস্তি দিতে, তখন এই আহ্বানও সমান যুক্তিসংগত যে ‘নারীর বস্ত্রহরণকারীদের’ ধরে জনগণই শাস্তি দিক। ছাত্রসমাজকে আন্দোলনে শামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে এ ক্ষেত্রে তাই ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা কোনো অন্যায় করেননি।
পুলিশ দাবি করেছে যে ছাত্র ইউনিয়নের প্রায় ২০০ কর্মী রাস্তা বন্ধ করে রেখেছিলেন। সুতরাং, লাঠিপেটা করে তাঁদের সরিয়ে রাস্তা উন্মুক্ত করার দায়িত্বই তারা পালন করেছে মাত্র। যদি সেটুকু করে তারা ক্ষান্ত হতো, তাহলে হয়তো বলা যেত যে তারা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছে। কিন্তু এখানেও ছবি অন্য কথা বলে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ছাত্র ইউনিয়নের এক ছাত্রী কর্মী গাছের আড়ালে লুকিয়ে আছেন, আক্রান্ত হওয়ার পর রাস্তা থেকে সব ছাত্রছাত্রী ছত্রভঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন, রাস্তা পরিষ্কারও হয়ে গেছে। তার পরও পুলিশ ওই ছাত্রীকে টেনেহিঁচড়ে সামনে এনে পেটাচ্ছে। এই চিত্র একধরনের পশুশক্তিকেই তুলে ধরে, মনুষ্যত্বকে নয়। প্রথম আলোর সাংবাদিক তাই বিস্ময়সহকারে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘নারী লাঞ্ছনাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের দমনে পুলিশ এত মারমুখী হলো কেন?’ সংগত কারণেই তিনি হয়তো নিশ্চুপ থেকে বলেছেন, ‘রমনা বিভাগের উপকমিশনারের’ সঙ্গে যোগাযোগ করতে।
বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস খুবই উজ্জ্বল। কিন্তু বর্তমানে ছাত্ররাজনীতির একটি বড় অংশ ‘হন্ডা-গুন্ডা-অর্থবাণিজ্য’ ইত্যাদির পঙ্কে ডুবে গেছে বা তাদের ডোবানো হয়েছে। আরেকটি বড় অংশ ‘রগকাটা শিবিরের’ ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছে। এসবের মধ্যেও যে ক্ষীণ বামপন্থী ছাত্ররাজনীতির ধারাটি এখনো সুস্থ ও সুন্দর আগামীর জন্য লড়াই করে চলেছে, তাদেরই অন্যতম প্রতিনিধি হচ্ছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। আমি তাদের মানবিক অনুভূতি ও নারী লাঞ্ছনার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়াসকে অভিনন্দন জানাই। তাদের এই আঘাতে দমে না যাওয়ার আহ্বান জানাব। রবীন্দ্রনাথের সেই ‘স্ফুলিঙ্গটি’ তাদের উদ্দেশে পুনরায় নিবেদন করব।
‘আপনারে দীপ করি জ্বালো,
আপনার যাত্রাপথে
আপনিই দিতে হবে আলো।’
এম এম আকাশ: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
akash92@hotmail.com

ছিটমহলে সূর্যোদয় by অমর সাহা

কোচবিহারের মশালডাঙ্গা ছিটমহলের বাসিন্দারা
ধীরে ধীরে মেঘ কাটছে। সূর্যের রঙিন আলো এসে পড়েছে ছিটমহলে। আর সেই আলোয় স্নাত হচ্ছে ছিটমহলের হাজারো মানুষ।
কত দিন মেঘে ঢাকা ছিল এই ছিটমহলগুলো। সেই ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি আর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকা ১১১টি ছিটমহল। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অবশেষে এই ছিটমহলবাসীর দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে ভারতের আইনসভার দুটি কক্ষ রাজ্যসভা ও লোকসভায় ৬ ও ৭ মে পাস হয়ে যায় ছিটমহল বিনিময়ের লক্ষ্যে ভারতীয় সংবিধান সংশোধনী বিল।
এই বিল পাস হওয়ার পর নব জন্মলাভ করেন ছিটমহলের বাসিন্দারা। এখন তাঁরা নতুন করে জীবন উপভোগের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন, যা ছিল তাঁদের কাছে একসময় স্বপ্ন; এবার তা বাস্তবের পথে। তাঁরা পাবেন নাগরিকত্ব। ভোটার পরিচয়পত্র, রেশন কার্ড। আর তাঁদের অন্য দেশের বেষ্টনীর মধ্যে পরগাছা হয়ে থাকতে হবে না। পাবেন মুক্ত আকাশ, মুক্ত বিহঙ্গের মতো স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকে এক মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দারা নাগরিকত্ব অধিকারহীন একটি স্বাধীন দেশেই বাস করে আসছেন। ইতিমধ্যে ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া ৩ হাজার ৮ কোটি রুপির প্যাকেজ মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে সত্যিই কি দুই দেশের ছিটমহলের সব বাসিন্দা ফিরে যাবেন নিজ নিজ দেশে? কথা হচ্ছিল ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সহসম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্তর সঙ্গে। তাঁর দাবি, ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দারা কেউই আর ফিরে যাবেন না বাংলাদেশে। এই ৫১টি ছিটমহলে রয়েছে ১৪ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশি মানুষের বাস। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলে রয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৯ জন ভারতীয় নাগরিকের বাস। তাঁদের মধ্য থেকে মাত্র ১৪৯টি পরিবারের ৭৪৩ জন বাসিন্দা ভারতে এসে বসবাস করতে চান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে সব ছিটমহলবাসীও যদি ভারতে এসে থাকতে চান, তবে তাঁদের পুনর্বাসন করবে ভারত সরকার। কিন্তু তাঁরা সম্ভবত আসবেন না। দীর্ঘদিন ধরে ওখানকার মাটির সঙ্গে তাঁদের যে ভালোবাসা গড়ে উঠেছে, সেই মাটির টান ত্যাগ করে এখনই ফিরতে নাও পারেন তাঁরা। তবু ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসা ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১০০ একর জমি চিহ্নিত করে রেখেছে। সরকার চাইলে এখানেই পুনর্বাসনের জন্য আবাস তৈরি করে দিতে পারবে।
কথা বলছিলাম, ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলের বাসিন্দা সাহেব আলী, গোবিন্দ বর্মণ, আলাউদ্দিন মিয়া ও অরুণ কুমার রায়ের সঙ্গে। তাঁরা সবাই এক বাক্যে জানালেন, তাঁরা কাগজ-কলমে বাংলাদেশের নাগরিক হলেও বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেননি। এই মাটিতেই থাকতে চান তাঁরা। তাঁদের এটুকু শান্তি যে তাঁরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। ভোটার পরিচয়পত্র পাবেন। রেশন কার্ড পাবেন। এবার তাঁরা আর গোপনে নয়, জাল কাগজপত্র দিয়েও নয়, এবার তাঁরা প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক হিসেবে এখানকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে পারবেন। বাড়িতে বিদ্যুৎ–সংযোগ নিতে পারবেন। এই আনন্দই তাঁদের নতুন জীবনের স্বপ্নকে আরও উজ্জীবিত করেছে। নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
মূলত ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায়। এসব ছিটমহলের বাসিন্দাদের যন্ত্রণার কথা স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে ছিটমহলবাসী নিজেদের হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে রাখলেও এই ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবিতে মূলত আন্দোলন জোরদার হয় ১৯৯৪ সাল থেকে।
তৎকালীন বিধায়ক প্রয়াত দীপক সেনগুপ্ত ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি গড়ে আন্দোলন জোরদার করেন। ছিটমহলবাসীর কাছ থেকে দাবি ওঠে, দিতে হবে তাঁদের নাগরিকত্ব। যেহেতু এই ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দারা হয়তো বাংলাদেশের, নয়তো ভারতের নাগরিক। কিন্তু কোনো দেশের সরকারই ছিটমহলবাসীর এই দাবির প্রতি সদয় ছিল না। কিন্তু সমন্বয় কমিটির আন্দোলনের জেরে দুই দেশের সরকার উভয় দেশের ছিটমহলে জরিপ করে। সেই জরিপে উঠে আসে ছিটমহলে উভয় দেশের বাসিন্দাদের তালিকা, তাঁদের চাওয়া-পাওয়া। ভারতের ভূখণ্ডের বেষ্টনীতে থাকা ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দা বাংলাদেশের হলেও তাঁরা যেতে পারেন না তাঁদের নিজ দেশ বাংলাদেশে। একই চিত্র কিন্তু বাংলাদেশের বেষ্টনীর মধ্যে থাকা ভারতীয় ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদেরও। ফলে দুই দেশের ছিটমহলবাসী অন্য দেশে পরগাছা হিসেবেই বাস করছেন দীর্ঘকাল ধরে।
এসব কথা মাথায় রেখেই উভয় দেশ ছিটমহল বিনিময়ের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এই ডাকে কতজন সাড়া দেবেন, সে ব্যাপারে শঙ্কায় আছেন ছিটমহল আন্দোলনের কর্মকর্তারা। তাঁরাই বলেছেন, এখন ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দারা বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইছেন না। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকা ভারতীয়রাও ফিরে আসতে চাইছেন অল্পসংখ্যক।
কিন্তু এই পরিস্থিতিও বদলে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে পুনর্বাসনের প্যাকেজ যদি লোভনীয় হয়, আয়ের পথ যদি সুগম হয়, বেঁচে থাকার গ্যারান্টি যদি জোরালো হয়, চাকরিবাকরি এবং আবাসনের সুযোগ-সুবিধা যদি আকর্ষণীয় হয়, তবে সমন্বয় কমিটির এই হিসাব পাল্টে যেতে পারে। আর পাল্টে যাবে এই ধারণা নিয়ে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের প্যাকেজের জন্য খরচ ধরেছে সর্বমোট ৩ হাজার ৮ কোটি ৮৯ লাখ রুপি। এর মধ্যে ৭৭৫ কোটি রুপি ধরা ধরেছে স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য। আর বাকি ২ হাজার ২৩৩ কোটি ৮৯ লাখ রুপি ধরা হয়েছে পরিবর্তনশীল খরচের জন্য।
অর্থাৎ ওপার থেকে মানুষ কম এলে খরচ কম হবে। আর বেশি এলে বেশি খরচ। এখন শুধু অপেক্ষা করে থাকা, কত মানুষ আসছে ওপার থেকে আর কত মানুষ যাচ্ছে এপার থেকে?
অমর সাহা, প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

শিগগিরই নির্বাচনের নতুন ফর্মুলা আসবে -সাক্ষাৎকার: এমাজউদ্দীন আহমদ by ​​মিজানুর রহমান খান

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের নেতৃত্বে সহস্র নাগরিক কমিটি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আদর্শ ঢাকা আন্দোলন কমিটি গঠিত হয়। কমিটি দুটি দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে সক্রিয় ছিল। এখানে দুই কমিটির দুই নেতা সিটি নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
প্রথম আলো : আপনি বলেছিলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অনিবার্য অংশ হচ্ছে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। একটা বিরাট আশাবাদ জাগিয়ে আপনারা নির্বাচনে গেলেন। কিন্তু যা ঘটে গেল, তা কতটা আপনি আশা করেছিলেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : নির্বাচন কমিশন যে নিজেই একটি নির্বাচন এভাবে নষ্ট করতে পারে, সেটা আমি আশা করিনি। আশা করেছিলাম, আমরা একটু একটু করে সামনের দিকে এগিয়ে যাব। একটা পর্যায়ে গিয়ে আমরা ঠিকই গন্তব্যে পৌঁছাব। কিন্তু সিটি নির্বাচনে যে ব্যাপক কারচুপি হলো, বিশেষ করে ইসি যেভাবে তা সমর্থন করল, তা একেবারেই আশা করিনি। আমি খুবই হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।
প্রথম আলো : এই নির্বাচন কমিশনের কাছে কেন আপনি ভালো কিছু আশা করেছিলেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : ভদ্রলোক (সিইসি) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমার থেকে তিনি প্রায় নয় বছরের কনিষ্ঠ। তাঁকে বলেছিলাম, আমরা বেশি কিছু চাই না, দুটো জিনিস চাই। প্রথমত, প্রত্যেক ভোটার যাতে তাঁদের মনমতো প্রার্থীদের ভোট দিতে পারেন। দ্বিতীয়ত, প্রত্যেক প্রার্থী যেন ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে পারেন। বললাম, এটুকু না পারলে এখানে আপনারা আছেন কেন? পরে দেখা গেল তাঁর অফিসের পাশে বসেই লোকজন সিল মারছে। পরে বলেছেন, নিয়মমাফিক হয়েছে। এই বয়সের মানুষ যদি এটা বলতে পারেন, তাহলে আমরা কোথায় যাব?
প্রথম আলো : বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে সাধারণ নির্বাচন করার যে অবস্থান আপনি নিয়েছিলেন, তাতে কি চিড় ধরল? নাকি আপনি অটল থাকবেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : না, আর অটল থাকতে পারছি না। যখন আমি ওই কথাটা বলেছিলাম, তখনো কতগুলো শর্তসাপেক্ষে বলেছিলাম। সেগুলো ছিল ইসিকে সর্বতোভাবে শক্তিশালী করা। রিটার্নিং অফিসারসহ যাঁরা নির্বাচনী ব্যবস্থাটা চালু রাখবেন, তাঁদের নিরপেক্ষ হতে হবে; দলীয় লোক যাতে না থাকে। যেমন, একটা নির্বাচন ব্রিটেনে দেখলাম। ভারতেও তা-ই চলছে। ভারতে পাঁচজন কমিশনার নেই, একজন সিইসি সুষ্ঠু নির্বাচন করছেন।
প্রথম আলো : তার মানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে রেখে আর নির্বাচন নয়?
এমাজউদ্দীন আহমদ : না, শর্তগুলো তো মানাই হলো না। আমি তো এর আগে ওদের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু লোকের সঙ্গে কিছু কথা হয়েছিল। আমি চাই, সারা বিশ্বে যেটা চলছে, প্রধানমন্ত্রীকে রেখে নির্বাচন করতে। ২০৩টি রাষ্ট্রের মধ্যে প্রায় ১৬৬টি রাষ্ট্রে সংসদীয় ব্যবস্থা চালু আছে। কিন্তু কোথাও সংসদ অক্ষত রেখে নির্বাচন হয় না। আমাদের সংবিধানে ১২৩ ক অনুচ্ছেদে যেভাবে পুরোনো সংসদ রেখে নতুন সংসদ করার বিধান আছে, এমনটা কোথাও নেই।
প্রথম আলো : সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে নির্বাচন করার যে ধারা ছিল, সেটা তো আমরা শেষ করেছি। বিএনপিও মনে হয় এই বিধানের পুনরুজ্জীবন চাইছে না। তাহলে একটি বিকল্প রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করা আপনাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না?
এমাজউদ্দীন আহমদ : পড়ে। একজন নির্ভরযোগ্য মানুষের নেতৃত্ব দরকার।
প্রথম আলো : এই নির্ভরযোগ্য কে কীভাবে হবেন, সেটা বিএনপির তরফ থেকে নির্দিষ্টভাবে না বলার কারণে রাজনীতিতে একটা বিভ্রান্তি চলছে। সরকারি দল নাকচ করতে পারে কিন্তু একটা ফর্মুলা তো চাই।
এমাজউদ্দীন আহমদ : হ্যাঁ, আমি কিন্তু এখন সেই ফর্মুলাটা প্রস্তুত করার চেষ্টা করছি। আসলে এই ফর্মুলা প্রস্তুত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েই আমি খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে রাজি করিয়েছিলাম।
প্রথম আলো : কবে নাগাদ এই ফর্মুলা জাতির সামনে পেশ করা সম্ভব হতে পারে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এটা খুব বেশি দিন নয়। দিন সাত-আটেক।
প্রথম আলো : সাত দিনের মধ্যে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : না, সময়-সুযোগ বুঝে। পরিস্থিতিটা একটু অনুকূল হোক।
প্রথম আলো : আগামী ৯০ দিনের মধ্যে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : তা নিশ্চয় হতে পারে। একটা সম্ভাবনা থাকবে। আগে আমি একটি খসড়া তৈরি করব, এরপর আলোচনা করব। এ জন্য একটি সংবাদ সম্মেলন করব।  
প্রথম আলো : কিন্তু নির্বাচন ছাড়া বিএনপির মুখে শাসনগত সংস্কারের বিষয়ে কথা নেই। আপনার ভাবনা কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ : সুশাসন প্রশ্নে আমি নিজের লেখায়ও বলেছি যে বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনীতি চলছে, তাকে ব্রিটেনের সাময়িকী দি ইকোনমিস্ট নামকরণ করেছে যে টক্সিক পলিটিক্স বা বিষাক্ত রাজনীতি। আর এই বিষাক্ত রাজনীতির কারণে যেসব রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থাকে, সেগুলো তখন অকার্যকর হয়ে পড়ে। সেগুলো আর স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না, বিকৃত হয়ে যায়। সিটি নির্বাচনে আমরা তারই নমুনা দেখলাম। এখন চ্যালেঞ্জ হলো বিষাক্ত রাজনীতিকে ঝেড়ে ফেলা। সবকিছু দলীয়করণ হওয়া ঠিক নয়।
প্রথম আলো : আপনি কি তাবিথ আউয়াল বা মির্জা আব্বাসকে নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করার সুপারিশ করছেন? মানুষকে ট্রাইব্যুনালের রায় মূল্যায়ন করার সুযোগ দেবেন না?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এখনো ভাবিনি। তবে ভাবব। এটা দাখিল করার পরে এ দেশের কিছু জ্যেষ্ঠ নাগরিককে নিয়েও আমি কথা বলব।
প্রথম আলো : বর্জন সত্ত্বেও বিএনপি যে এত ভোট পেল, সেটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ : এটা জনমতকে বিভ্রান্ত করার একটা কৌশল হতে পারে। ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরে এত ভোট পাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। ভোট বর্জনের পরে ইচ্ছা করে কিছু বেশি ভোট দেখিয়ে এ দেশের মানুষ ও বিদেশিদের সন্তুষ্ট করতে চেয়েছে।
প্রথম আলো : কেমব্রিজ থেকে সদ্য প্রকাশিত একটি বইয়ে ‘জামায়াত বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে আখ্যায়িত মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেছেন, ‘বিএনপি যখন দুর্বল হবে, তখন জামায়াত সাফল্যের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশকে সংগঠিত করতে পারবে। দীর্ঘ মেয়াদে এটা প্রকৃত সম্ভাবনা। কারণ, খালেদা জিয়ার পরে বিএনপি ভেঙে যাবে।’ আপনার মন্তব্য?
এমাজউদ্দীন আহমদ : আমি এ কথার সঙ্গে একমত নই। তার কারণ হলো, বিএনপি এমন একটি দল, যার তৃণমূল পর্যন্ত সমর্থন ও ভিত্তি রয়েছে। এবং কোথাও কোথাও একটু শিথিল হচ্ছে বটে কিন্তু এখন পর্যন্ত দলটি এই পর্যায়ে যায়নি যে খালেদা জিয়ার পরে দলটি ভেঙে যাবে।
প্রথম আলো : সিটি নির্বাচন থেকে জামায়াতের প্রাপ্তি কী? প্রশ্নটি এ কারণে যে আপনাদের বর্জন সত্ত্বেও তারা কিছু জায়গায় জিতেছে?
এমাজউদ্দীন আহমদ : জিতেছে, তবে আমি বলব ২০-দলীয় জোটভুক্ত দল হিসেবে এর ফলে তাদের দিক থেকে একটা অনৈতিক কাজও হয়েছে। কারণ, সবাই যখন বর্জন করছে, তারা তাদের প্রার্থী রেখে দিয়েছে। এটা ঠিক হয়নি।
প্রথম আলো : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
এমাজউদ্দীন আহমদ : ধন্যবাদ।

মেয়রদের প্রতি আমাদের নজরদারি থাকবে -সাক্ষাৎকারে : সৈয়দ শামসুল হক by এ কে এম জাকারিয়া

বিশেষ সাক্ষাৎকার: ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের নেতৃত্বে সহস্র নাগরিক কমিটি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এমাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে আদর্শ ঢাকা আন্দোলন কমিটি গঠিত হয়। কমিটি দুটি দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে সক্রিয় ছিল। এখানে দুই কমিটির দুই নেতা সিটি নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।
প্রথম আলো : কেমন হলো তিন সিটির নির্বাচন?
সৈয়দ শামসুল হক : এই নির্বাচনটি জরুরি ছিল। টানা ৯৩ দিন দেশে যে পরিস্থিতি বিরাজ করেছে, তা থেকে মুক্তির একটি পথ করে দিয়েছে এই সিটি নির্বাচন। এ সময় মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়েছে, মানুষের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়েছে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নষ্ট হয়েছে, চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের অর্থনীতি। এসব কারণে মানুষ শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য উদ্‌গ্রীব ছিল। এই অবস্থায় সিটি নির্বাচনকে আমি ইতিবাচক ও দিক পরিবর্তনকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছি। নির্বাচনে নাগরিকেরা ভোট দিয়েছেন। ঢাকা মহানগরের দুই অংশে দুজন মেয়র, চট্টগ্রামে একজন মেয়র ও ওয়ার্ডগুলোতে কাউন্সিলররা নির্বাচিত হয়েছেন।
প্রথম আলো : কিন্তু নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে ও বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে যেসব ঘটনা ঘটেছে...
সৈয়দ শামসুল হক : মোটা দাগে বলছি, ঢাকায় মোট ভোটকেন্দ্র ছিল দুই হাজার বা তারচেয়ে কিছু বেশি। এত কেন্দ্রের মধ্যে যদি ৫০-৫৫টি কেন্দ্রে গোলযোগ, অনিয়ম ও উচ্ছৃঙ্খলা হয়ে থাকে, তাহলে সেটাকে এতটা বড় করে দেখা ঠিক হবে বলে আমি মনে করি না। যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, তার জন্য আমি দুঃখিত ও বিচলিত। অভিযোগ দাখিলের ভিত্তিতে আমি এর তদন্ত দাবি করি এবং তদন্তের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করি। তবে একই সঙ্গে নির্বাচনের সময়ের এই দুই ভাগ উচ্ছৃঙ্খলাতাকে মিডিয়ায় এতটা প্রাধান্য দেওয়া দেখেও বিচলিত বোধ করছি। বাকি কেন্দ্রগুলোতে যে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন হলো, তার কোনো প্রতিফলন গণমাধ্যমে না দেখে আমি হতাশ হয়েছি। মানুষ শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়, নির্বাচনের আগে ও পরে সেটাই আমি অনুভব করেছি।
প্রথম আলো : নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল বা জাল ভোট দেওয়ার ঘটনা অতীতে বাংলাদেশে ঘটেছে, কিন্তু সেসব দিন তো আমরা অনেকটাই পার করে এসেছি। নির্বাচনের সময় রাজধানীর মতো জায়গায় ভোটকেন্দ্র বা বুথ দখল, জাল ভোট ও ব্যালট পেপারে গণসিল দেওয়ার ঘটনা কি গ্রহণযোগ্য?
সৈয়দ শামসুল হক : এ ধরনের যেসব ঘটনা কিছু ঘটেছে তা কোনোভাবেই প্রত্যাশিত ছিল না। আসলে আমাদের দেশ বা আমাদের মতো দেশগুলোর নির্বাচনে এ ধরনের কিছু ঘটা নতুন নয়। আমি অবশ্যই এর নিন্দা করি এবং ঘটনাগুলোর তদন্ত দাবি করি। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটতে না পারে, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাই।
প্রথম আলো : বিভিন্ন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে যে আচরণ করা হলো?
সৈয়দ শামসুল হক : এসব ঘটনা খুবই দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। ভবিষ্যতে কোনো নির্বাচনের সময় যেন এমন না ঘটে, সে জন্য সবার সতর্ক থাকা উচিত বলে আমি মনে করি।
প্রথম আলো : আপনি বলেছেন, দেশে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই নির্বাচন জরুরি ছিল। নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর ছাড়া এই নির্বাচন থেকে আর কোনো প্রাপ্তি কি এসেছে?
সৈয়দ শামসুল হক : যে দিকটি বিশেষভাবে লক্ষ করা দরকার তা হচ্ছে, নির্বাচনের প্রাক্কালে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্যমূলক আচরণ। প্রতিপক্ষকে কেউ বাক্যবাণে জর্জরিত করেননি। আমি মনে করি, এটা ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। আরেকটি বিষয় আমাকে আশান্বিত করেছে, তা হচ্ছে তারুণ্যের জাগরণ। এই নির্বাচনের অধিকাংশ প্রার্থীই ছিলেন তরুণ ও মধ্য তরুণ বয়সের। ঢাকার নির্বাচিত দুই মেয়রসহ সব প্রার্থীর কথা বিবেচনায় নিয়েই বলছি, তাঁদের পূর্ব অভিজ্ঞতা হয়তো নেই। কিন্তু তাঁদের মধ্যে যে বিশ্বাস, সংকল্প ও প্রাণশক্তি দেখেছি, তাতে আমার মনে হয়েছে অচিরেই একটি শুভ ও সুস্থ পরিবেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে কাজ করার প্রত্যাশা জোরদার হয়েছে।
প্রথম আলো : নির্বাচন শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিএনপি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিল। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ শামসুল হক : আমি মনে করি কাজটি করে বিএনপি দূরদর্শিতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নি।
প্রথম আলো : আপনি কি মনে করেন বিএনপির এই নির্বাচন বর্জন পূর্বপরিকল্পিত ছিল?
সৈয়দ শামসুল হক : এতটা অনুমান করতে চাই না। তবে নির্বাচন শুরুর তিন ঘণ্টার মধ্যে চট্টগ্রামে এবং চার ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিএনপির নির্বাচন বর্জনে আমি অত্যন্ত হতাশ হয়েছি। কারণ, ভোটের আগের দিন পর্যন্ত তারা নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিয়েছে।
প্রথম আলো : তিন সিটি নির্বাচনের আগে হঠাৎ করে সহস্র নাগরিক কমিটির উদ্যোগ নিলেন কেন? শত নাগরিক কমিটির পাল্টা হিসেবেই কি এটা করা হয়েছে?
সৈয়দ শামসুল হক : এটা হঠাৎ নয়। আমি রাজনীতি করি না, সাহিত্য করি। দেশের নাগরিক হিসেবে একটা উত্তরণ চেয়েছি, স্থিতিশীলতা চেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধজাত এই দেশে একটি সুস্থ, সুন্দর ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ চেয়েছি। নির্বাচনে জয়-পরাজয় আছে, আদর্শে-আদর্শে সংঘাত আছে, কিন্তু দেশ বড়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরেই আমাদের চলতে হবে, এগোতে হবে। এই নির্বাচনকে আমরা একটি সুযোগ হিসেবে নিয়েছি। আর সব দায়িত্ব তো সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সেই হিসেবেই আমরা উদ্যোগ নিয়েছি এবং দুজন প্রার্থীকে আমরা সমর্থন দিয়েছি। তাঁদের ব্যাপারে আমাদের আস্থা রয়েছে যে তাঁরা ভালো কাজ করবেন। সেই ১৯৪৮ সালের মার্চ থেকে ঢাকায় আছি, দীর্ঘদিনে অনেক কিছু দেখেছি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে নির্বিঘ্ন করতে দীর্ঘদিনের নাগরিক হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছি।
প্রথম আলো : আপনারা যে প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেছেন, সরকারি দলও তাঁদের সমর্থন দিয়েছে। আপনারা কি সরকারের হয়ে কাজ করলেন?
সৈয়দ শামসুল হক : সবকিছুকে এভাবে দেখলে তো হবে না। আমরা যে প্রার্থীদের পক্ষে কাজ করেছি, তাঁরা আমাদের বিবেচনায় যোগ্য, কর্মঠ ও আদর্শে উন্নত। সরকার বা সরকারি দল তাঁদের সমর্থন দিল কি দেয়নি, তা বড় নয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বললে বা বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানালেই কেউ আওয়ামী লীগ হয়ে যাবেন, ব্যাপারটি তা নয়। তেমনি সরকার সমর্থন দিল বলেই আমি সরকারের লোক হয়ে গেলাম, এমন ভাবনা ভুল। এটা অবৈধ চিন্তা। দেশ, মুক্তিযুদ্ধ—এসব সব সময়েই আমার কাছে বড় বিষয়।
প্রথম আলো : যাঁরা নির্বাচিত হলেন, তাঁরা সামনে কী কাজ করেন বা তাঁদের কাজকর্মে ভবিষ্যতে সহস্র নাগরিক কমিটির পক্ষ থেকে আপনাদের কোনো নজরদারি থাকবে কি?
সৈয়দ শামসুল হক : আমরা যাঁদের সমর্থন দিয়েছি, তাঁরা বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচিত মেয়ররা নাগরিকদের অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এসব যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কি না, সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের নজরদারি থাকবে। কী করলে ও কীভাবে করলে ভালো হয়, সেই পরামর্শও থাকবে। নির্বাচনের সময় তাঁদের পক্ষ নিলাম আর পরে বসে পড়লাম, তা তো হয় না। আমরা নগরের প্রশাসন ও নাগরিকদের মধ্যে একটি সাঁকো হিসেবে কাজ করতে চাই।
প্রথম আলো : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
সৈয়দ শামসুল হক : ধন্যবাদ।

আওয়ামী লীগের লক্ষ্য ২০৪১ by মাহবুব তালুকদার

জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের দৌড়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া থেমে যাওয়ায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফোন করে তিনি তার এই দুঃখের কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এই দুঃখ প্রকাশের বার্তাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এত বড় একটি বিষয় বান কি মুন কেন সরাসরি বেগম খালেদা জিয়াকে জানালেন না, এটা আমার প্রশ্ন। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ জাতিসংঘ মহাসচিবের মন্তব্য বা বক্তব্যটিকে কেন তুলে ধরলেন না, সেটাও আমার জিজ্ঞাসা।
চাচাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেই চাচা বললেন, এতে অসুবিধা কি হয়েছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের একান্ত সচিবও বিষয়টি প্রকাশ করলে কোন অসুবিধা ছিল না। চাচা আরও বললেন, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে খুবই দুর্বল। নিজেদের অবস্থা বুঝতে পেরে তারা নির্বাচনে পিঠটান দিয়েছে। সফরকারী মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শ্যারমেন পর্যন্ত বিএনপির নির্বাচন বয়কটে হতাশা ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। জনগণ যে বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে, মার্কিনিরা ব্যাপারটা বুঝতে পারছে না।
কিন্তু তারা তো নির্বাচনে অনিয়মের কথাও তুলে ধরেছেন।
কিছু অনিয়ম তো হতেই পারে। সহস্র নাগরিক কমিটি বলেছে নির্বাচন ছিল উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ। নির্বাচন যে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারও তা বলেছেন।
চাচা! এত কিছুর পর এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল?
অবশ্যই ছিল। তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে একজন লোকও মারা যায়নি।
লোকের মৃত্যু বা মৃত্যুর সংখ্যা দিয়েই কি নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ছিল কিনা, তা বিচার করা যায়?
কেন যাবে না? এছাড়া শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আর কি মাপকাঠি আছে বলো? মাত্র দু-তিনশ’ কেন্দ্রে যে গোলযোগের কথা উঠেছে, সেটা কোনো ব্যাপারই না।
নির্বাচন কমিশন তো বিরোধী দলের কোন অভিযোগ আমলেই নেয়নি।
কে বলেছে? চাচা সরোষে বলে উঠলেন, নির্বাচন কমিশন সবার অভিযোগই আমলে নিয়ে ডব্লিউপিবি-তে জমা করে রেখেছে।
ডব্লিউপিবি মানে?
মানে, ওয়েস্ট পেপার বাস্কেট। পরদিন ঝাড়ুদার তুলে না নেয়া পর্যন্ত সেগুলো সেখানেই ছিল।
আমি বললাম, মিডিয়া বলছে, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।
মিডিয়ার কথা আর বলো না। আমাদের দেশে মিডিয়া হচ্ছে বেইমান। সরকারের টাকা খেয়ে তারা সরকারের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে।
সরকারের টাকা খেল কীভাবে?
কেন? ওরা সরকারের বিজ্ঞাপন পায় না? চাচা হতাশ কণ্ঠে আরও বললেন, যেসব টিভি চ্যানেলকে বর্তমান সরকার লাইসেন্স দিয়েছিল, যেসব আওয়ামী চ্যানেল মালিকের পকেট ভারি করে দিয়েছিল, তাদের চ্যানেলে পর্যন্ত নির্বাচনে কারচুপি ও অনিয়মনের ঘটনা প্রকাশ করেছে। নইলে বিদেশীরা আমাদের নির্বাচনের অনিয়মের এত খবর পেল কীভাবে?
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যান সিটি নির্বাচনে অনিয়মের স্বচ্ছ তদন্তের তাগিদ দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশও একই কথা বলেছে। এটা কী করা হবে? আমার জিজ্ঞাস্য।
চাচা বললেন, আমরা বিদেশীদের কথায় চলি না। আমরা ওদেরকে থোড়াই কেয়ার করি। আমাদের প্রাণপ্রিয় মন্ত্রী শাজাহান খান খালেদা জিয়াকে পেশাদার খুনি বলেছেন। খুবই সত্য কথা। ওইসব বিদেশী একজন খুনির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তার বাসায় যায় কেন? তিনি তো সংসদে বিরোধী দলের নেতাও নন। মিডিয়ার আচরণও বড় অদ্ভুত। আসল বিরোধী দলের সঙ্গে, মানে বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গে বিদেশীদের সাক্ষাতের কোনো গুরুত্ব না দিয়ে তারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাতের গুরুত্ব বেশি দেয়।
তারা হয়তো খবরের গুরুত্ব বেশি বিবেচনা করে, ব্যক্তির গুরুত্ব তেমন বিবেচনা করে না।
ঠিক বলেছ। চাচা এবার উদ্দীপ্ত হয়ে বললেন, আজ পর্যন্ত মিডিয়ার কাউকে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে দেখলাম না। তুমি কি বলতে পার, এই নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি লাভ কার হয়েছে?
আওয়ামী লীগ। আমি জানালাম।
মোটেই না।
তাহলে বিএনপি?
না। চাচা বললেন, সবচেয়ে বেশি লাভ হয়েছে জাতীয় পার্টির।
কীভাবে হলো? তাদের সব প্রার্থীর তো জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
তুমি আমার কথা ঠিক বুঝতে পার না। আমি প্রার্থীর লাভের কথা বলিনি। পার্টির লাভের কথা বলেছি। জাতীয় পার্টির লাভ হয়েছে বলেই অন্যদের মতো তারা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়নি। তাদের নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন নিয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেননি।
তাতে জাতীয় পার্টির কি উপকার হয়েছে?
তুমি রাজনীতি বোঝ না বলে এসব কথা বলছ। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টি তাকিয়ে দেখছিল বিএনপি নির্বাচনের আগেই সরে দাঁড়ায় কিনা! জাতীয় নির্বাচনের মতো তখন তারা সামনে এগিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু হটকারি বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়ে তাদের প্রোগ্রামটা ভণ্ডুল করে দিল।
কিন্তু এখন জাতীয় পার্টির কি লাভ হয়েছে?
ধৈর্য ধর। বলছি। ২৮শে এপ্রিলের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির একাত্মতা আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। সেজন্য নির্বাচন সম্পর্কে তাদের কোন সাড়াশব্দ নেই। জাতীয় পার্টি জাতীয় সংসদের বিরোধী দল। সিটি করপোরেশন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাদের লক্ষ্য আগামী জাতীয় নির্বাচন। মাননীয় মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনও আওয়ামী লীগের অধীনে হবে। আশা করি গতবারের মতো সেই নির্বাচনেও বিএনপিকে ভোটের বাইরে রাখা সম্ভব হবে। জাতীয় পার্টি তখনও হবে আবার সংসদে বিরোধী দল। অর্থাৎ এবারের মতো কয়েকজন মন্ত্রীও থাকবে তাদের। রাজনীতিটা বুঝলে?
চাচা! বিএনপির লাভক্ষতির বিষয়ে কিছু বলুন।
আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতো দূরদর্শী নেত্রী ইতিহাসে বিরল। তিনি-
আমি বিএনপি সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাচ্ছিলাম।
সে কথাই তো বলছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিএনপিকে কৌশলে মানুষ পোড়ানোর রাজনীতি থেকে নির্বাচনে নিয়ে এসেছেন। এতে বিএনপির লাভ হয়েছে না ক্ষতি হয়েছে, তারা আত্মজিজ্ঞাসা করলে বুঝতে পারবে। তবে তোমাকে একটি কথা বলতে চাই। বিএনপির মনস্তত্ত্ব প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে আর কেউ ভালোভাবে বুঝতে পারে না। তিনি বিএনপিকে হাড়ে হাড়ে চেনেন।
হাড়ে হাড়ে চেনার সঙ্গে মনস্তত্ত্বের কোন সম্পর্ক আছে কি?
অবশ্যই আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে সেদিন বলেছেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন নস্যাৎ করার লক্ষ্যে লাশ ফেলার আরও খারাপ পরিকল্পনা ছিল বিএনপির। হত্যার মাধ্যমে লাশ ফেলে বিএনপি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে যেতে চেয়েছিল।
বিএনপির এমন পরিকল্পনার কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানলেন কি করে?
ওই যে তোমাকে বললাম, তিনি বিএনপির মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারেন। আমাদের ভাগ্য ভাল যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতার কারণে বিএনপির কু-অভিসন্ধি থেকে দেশকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
তাহলে নির্বাচনে বিএনপির কি কোনো অর্জন নেই?
আছে। দেশের মানুষ যে বিএনপিকে বর্জন করেছে, এটাই তাদের অর্জন।
সেটা কি বিএনপি বুঝতে পেরেছে?
হয়তো পেরেছে। সেজন্যই নির্বাচনের পর তারা আর কোন হুমকি-ধমকি দিতে সাহস করছে না। আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারার দুঃসাহস আর তারা দেখাতে পারবে না।
চাচা! এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অর্জন কি?
আওয়ামী লীগের অর্জন বহুমাত্রিক। না, আমি নির্বাচনে জেতাকে অর্জন বলব না। এটা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য সহজাত ও স্বাভাবিক একটা বিষয়। তবে এবারের নির্বাচনে সাময়িক আনসাররা একটা ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে।
সাময়িক আনসার মানে?
মানে, আনসার বাহিনীর জ্যাকেট পরিয়ে যেসব স্কুলের বাচ্চাদের নির্বাচনের দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া হয়েছে। আগামীতে ওদের বয়স বাড়িয়ে নিয়োগ করা হলে ওরা নির্বাচনে আরও ভালো অবদান রাখতে পারবে। তবে জাতীয় নির্বাচনের জন্য হাজার হাজার সাময়িক আনসার নিয়োগ জরুরি। তাদের বাছাই প্রক্রিয়া আনসার কর্তৃপক্ষের হাতে না থেকে পুলিশের কাছে ন্যস্ত করা উচিত। তারা জানে কারা কারা সাময়িক আনসার হওয়ার যোগ্য। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের কি করতে হবে, সে বিষয়ে প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।
চাচা! আমার প্রশ্ন ছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অর্জন কী? সেটা তো সরকারের অর্জন নয়।
চাচা বিরক্ত হয়ে বললেন, আওয়ামী লীগ আর সরকার কি আলাদা? জনগণের সরকার ও জনগণের আওয়ামী লীগের এমন মেলবন্ধন তুমি বিশ্বের আর কোন দেশে দেখতে পাবে না। এবারের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আগামী জাতীয় নির্বাচনের জন্য সরকার ও আওয়ামী লীগের একটি যৌথ মহড়া হয়ে গেল। দেশবাসীকে আশ্বাস দিতে পারি যে, আগামী জাতীয় নির্বাচন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মতোই অবাধ নিরপেক্ষ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে।
কিন্তু বিদেশীরা যে নির্বাচনের মান আরও উন্নত করতে বলেছে?
হুঁ! চাচা গম্ভীর হয়ে বললেন, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে বিদেশীদের চাপের কাছে অবনত না হওয়া। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে থোড়াই কেয়ার করে বাংলাদেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক মহলের সামনে মাথা উঁচু রাখার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, দেশবাসীও তার সঙ্গে একাট্টা।
তাহলে ২০১৯ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগই আসছে?
শোনো! আগামী পঁচিশ ছাব্বিশ বছর দেশকে স্বাধীনতা বিরোধীদের হাতে তুলে দেয়ার কারণ নেই। ২০১৯ সালের নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ মোটেই ভাবছে না। তাদের দৃষ্টি অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। আগামী ২০৪১ পর্যন্ত।
২০৪১ সাল পর্যন্ত কেন?
ওই সময় পর্যন্ত দেশকে উন্নত দেশের সারিতে নিয়ে যেতে চায় আওয়ামী লীগ। মধ্যম আয়ের দেশ নয়, উচ্চ আয়ের দেশ হবে বাংলাদেশ। এটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের ভিশন। তুমি কি দেশের উন্নয়ন চাও না?
অবশ্যই চাই।
তাহলে মনে রেখ ২০৪১। আপাতত: ওই ফিগারটা আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। চাচা হেসে বললেন।

মূত্র পান করে বেঁচে আছে ওরা

থাইল্যান্ডের উপকূলে আন্দামান সাগরে নৌকায় ভাসতে থাকা রোহিঙ্গা মুসলিমরা খাদ্য ও পানির অভাবে এখন এমনই ভয়ঙ্কর দুর্দশার মধ্যে আছে যে, তাদের বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের মূত্র পান করতে হচ্ছে। অবৈধভাবে সমুদ্রপথে এদের থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হচ্ছিল। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ এই অবৈধ অভিবাসীদের ঠেকাতে যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তার ফলে এরা এখন মারাত্মক দুর্দশায় পড়েছেন। বিবিসির একজন সংবাদদাতা জোনাথন হেড এদের অবস্থা সরজমিন দেখতে গিয়েছিলেন। থাইল্যান্ড উপকূলের অদূরে আন্দামান সাগরে মাছ ধরার একটি ট্রলারে তিনি দেখেছেন প্রায় সাড়ে তিন শ রোহিঙ্গা এক সপ্তাহ ধরে খাদ্য ও পানীয়ের অভাবে নিজেদের মূত্র পান করে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছেন। ওই নৌকায় ১০ জন মারা গেছেন বলে জানা যাচ্ছে। নারী, পুরুষ, শিশু গাদাগাদি করে সেটিতে আছেন। অধিকাংশই রোহিঙ্গা মুসলিম। তারা জানিয়েছেন, দুই মাস ধরে তারা এ ট্রলারে রয়েছেন। কিন্তু কয়েক দিন আগে নৌকার চালক ও কর্মচারীরা ইঞ্জিন অকেজো করে পালিয়ে গেলে পরিস্থিতি সঙ্গিন হয়ে পড়েন। বিবিসির সংবাদদাতা জোনাথন হেড যখন একটি ইঞ্জিনের জলযানে করে ট্রলারটির কাছাকাছি যান, তখন ট্রলারটি থেকে খাবার ও পানি চেয়ে লোকজন আকুতি করছিলেন। সংবাদদাতা বলছেন, তিনি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন লোকজন বোতলে ভরা নিজেদের মূত্র পান করছিলেন। জোনাথন হেডের নিজের জন্য যে পানির বোতল ছিল তিনি সেগুলো ট্রলারটিতে ছুড়ে মারেন। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার উপকূলরক্ষীরা সমপ্রতি শক্ত অবস্থান নেয়ায় মানব পাচারকারীরা উপকূলের কাছাকাছি গিয়ে নৌকা থেকে সটকে পড়ছে। ফলে অনেকগুলো নৌকায় কয়েক হাজার মানুষ দিনের পর দিন সাগরে ভাসছেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে এ সংখ্যা আট হাজার। যাত্রীদের বেশির ভাগ রোহিঙ্গা, তবে অনেক বাংলাদেশীও এগুলোতে রয়েছেন।
দুই নৌকা ফিরিয়ে দিয়েছে মালয়েশিয়া: গতকাল ৮ শতাধিক বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা অভিবাসী বহনকারী দুটি নৌকা ফিরিয়ে দিয়েছে মালয়েশিয়া। থাই কর্তৃপক্ষ ফিরিয়ে দেয়ায় এক সপ্তাহ ধরে আন্দামান সাগরে ভাসছে ৩৫০ আরোহীসহ আরেকটি নৌকা। খাবার ও পানি না থাকায় মারা গেছেন অন্তত ১০ জন। বোতলে রাখা নিজেদের মূত্র খেয়ে বেঁচে আছেন বাকিরা। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি ও বিবিসি অনলাইন। ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর), আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা সংগঠন এবং মানবাধিকার সংগঠনের অনুরোধ সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড অসহায় অভিবাসীদের আশ্রয় দিতে ইচ্ছুক নয়। মালয়েশিয়ার উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ান জুনাইদি জানিয়েছেন, আপনি আমাদের কাছে কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রত্যাশা করেন? যারা আমাদের সীমান্তে অনুপ্রবেশ করেছে, তাদের সঙ্গে আমরা ভাল ব্যবহার করে এসেছি। আমরা তাদের সঙ্গে সদয় আচরণ করেছি। কিন্তু, তারা আমাদের সমুদ্র সৈকতে এভাবে দলে দলে আসতে পারেন না। তিনি আরও বলেন, আমাদের সঠিক বার্তা পাঠাতে হবে, তাদের এখানে স্বাগত জানানো হবে না। এদিকে গ্রেপ্তার এড়াতে বহু আগেই মানব পাচার চক্রের সদস্যরা নৌকা পরিত্যাগ করেছে। ফলে, নাবিকবিহীন অবস্থায় সমুদ্রে ঘুরপাক খাচ্ছে নৌকাগুলো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সামান্য কিছু খাবার ও পানি ছিল নৌকাগুলোতে। এখন খাবার ও পানির সব মজুত শেষ কিংবা প্রায় শেষের দিকে। এখনও সেসব নৌকায় আছেন হাজার হাজার অভিবাসী।
ইউএনএইচসিআরের উদ্বেগ: ৮০০ রোহিঙ্গা বহনকারী দুটি নৌকা মালয়েশিয়া ফিরিয়ে দেয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, নৌকা ফিরিয়ে দিলেই অন্য দেশ থেকে নিরাপদ জীবনের খোঁজে মানুষের গমন বন্ধ হবে না। মালয়েশিয়ায় ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি রিচার্ড টাওলে বলেন, মালয়েশিয়ার এমন সিদ্ধান্তে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। শরণার্থীরা অনেকে বহুদিন ধরে খাবার ও পানি ছাড়া সাগরে ছিলেন। তাদের এখন জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন। এ ছাড়া সেখানে অনেক নারী ও শিশু থাকতে পারে। কিন্তু অনড় মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, অভিবাসী বোঝাই যে কোন নৌকা ফিরিয়ে দেয়া হবে।
আটক অভিবাসীদের বিচার করবে থাইল্যান্ড: থাইল্যান্ডে অভিবাসীদের বন্দিশিবির ও গণকবরের খোঁজ পাওয়ার পর মানব পাচারবিরোধী অভিযান জোরদার করেছিল দেশটির কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে প্রায় মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী ২৫০ জনেরও অধিক নাগরিককে আটক করা হয়। এখন কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে থাইল্যান্ডে অনুপ্রবেশের দায়ে অভিযোগ আনা হবে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। থাই পুলিশের উপ-প্রধান আএক আংসানানোন্ট বলেন, পুলিশ ইতিমধ্যে ১৮৭ জনকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশের দায়ে অভিযুক্ত করেছে। ওই মামলাগুলো এখন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আবেদন জানিয়ে আসছে থাই সরকারের কাছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ এ আবেদন মানতে রাজি নয়। এমনকি নতুন যেসব নৌকা থাই উপকূলে আসছে সেগুলোকে ফিরিয়ে দিচ্ছে থাইল্যান্ড।

পুলিশ টিএসসির নরপশুদের চেয়ে কম নয় -ইসমত জাহানের অভিমত

পহেলা বৈশাখে নারীদের লাঞ্ছিত করা ও যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার প্রতিবাদে ১০ মে ডিএমপি কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন ইসমত জাহান জোঁ। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ২য় বর্ষের ছাত্রী। শহরের দেওভোগ শুক্কুর কারী মসজিদ গলির একটি বাড়িতে থাকেন তিনি। কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, ‘ভালো নেই। শরীরে ব্যথার যন্ত্রণা আর ফুলের টব দিয়ে চোখে আঘাত করায় ডান চোখে ঝাপসা দেখছি। গরম পানির ফোস্কা পড়েছে শরীরের বিভিন্ন অংশে।’
পুলিশের শাস্তি হয়েছে- এ বিষয় ক্ষোভের সঙ্গে ইসমত বললেন, ‘তাকে তো সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এটা কি কোনো বড় শাস্তি হল। একটা সময় দেখবেন তার প্রমোশন হয়ে গেছে। তাছাড়া সেখানে কি একজন পুলিশই ছিল? অন্যরা তো বহাল তবিয়তে আছে। পুলিশ টিএসসির নরপশুদেও চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।’
১০ মে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী বেলা পৌনে ১২টায় প্রায় ৩ শতাধিক কর্মী টিএসসি থেকে একটি মিছিল নিয়ে শাহবাগে আসলে পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এরপর আমরা সেই বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গেলে কার্জন হল এবং দোয়েল চত্বরেও পুলিশ বাধা দেয়। একপর্যায়ে পুলিশ মাইক্রোফোনের তার কেটে দেয় এবং সভাপতি হাসান তারেকের সঙ্গে কথা বলার নাম করে তাকে রাস্তার একপাশে নিয়ে বেধড়ক পেটাতে থাকে। এ সময় কর্মীরা বাধা দিতে গেলে পুলিশ তাদের ওপর লাঠিচার্জ, হেলমেট দিয়ে আঘাত, ফুলের টব ছুড়ে মারা এবং রাস্তায় ফেলে লাথি মারতে থাকে।’ ইসমত জাহান জানান, ‘পুলিশ আমাকে ধর ধর বলে এসে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। দৌড়ে পালাতে গেলে পেছন থেকে খোঁপায় ধরে ফেলে দিয়ে আমাকে পেটাতে শুরু করে। এ সময় একজন সাংবাদিক না মারার জন্য অনুরোধ করলে অবশেষে তারা আমাকে ছেড়ে দেয়।’

সাগরে অমানুষিক নির্যাতন চালায় দালালরা by আবদুল মাবুদ ও নুরুল করিম রাসেল

উত্তর আচেহর একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশ ও
মিয়ানমারের উদ্ধার হওয়া অভিবাসীরা
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার জালাল মল্লিকের ছেলে আহমদ (২৩)। ৭০ দিন সাগরে ভাসার পর অবশেষে মঙ্গলবার বিকালে সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি এলাকা থেকে কোস্টগার্ড তাকে উদ্ধার করে। তিনি জানান, যখন থাইল্যান্ডের বড় ট্রলারটিতে তিনি উঠেন তখন সেখানে মাত্র ১২ জন যাত্রী ছিলেন। এরপর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার উপকূলের বিভিন্ন পয়েন্টে দালালরা ছোট ছোট ট্রলারে করে যাত্রী এনে বড় ট্রলারটিতে উঠাতে থাকে। এভাবে প্রায় ১৭০ জন যাত্রীর ঠাঁই হয় ট্রলারে। এরমধ্যে মিয়ানমারের ১৮ রোহিঙ্গা নারীও ছিলেন। কিন্তু পর্যাপ্ত যাত্রী না হওয়ায় সেটি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হচ্ছিল না। তারা ভাসতে থাকেন সাগরে। সকালে তাদের চিড়া-মুড়ি দেয়া হতো আর রাতে দেয়া হতো ওষুধ মেশানো ভাত- যা খেয়ে অনেকেই বমি করে ফেলত। আর দালালদের বিরুদ্ধে কথা বলা তো দূরে থাক, মাথা ঘুরালেই অমানুুষিক নির্যাতন চালাত তারা।
মঙ্গলবার টেকনাফ উপকূল থেকে কোস্টগার্ড যে ১১৬ যাত্রীকে উদ্ধার করেছে, আহমদ তাদেরই একজন। বুধবার তাদেরকে টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশনে আনার পর যুগান্তরকে এসব কথা জানান আহমদ। তিনি বলেন, এলাকায় টেক্সটাইল মিলে কাজ করতেন তিনি। ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় দালাল মিন্টুর সঙ্গে আড়াই লাখ টাকার চুক্তিতে তিনি মালয়েশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান। অগ্রিম ১ লাখ টাকা দেয়া হয়েছিল মিন্টুকে। অবশিষ্ট টাকা মালয়েশিয়া পৌঁছলে তার পরিবার থেকে দেয়া হতো। এদিন মঙ্গলবার উদ্ধার ১১৬ এবং বিজিবির হাতে আটক ১১ জনকে থানায় সোপর্দ করা হয়েছে।
ফরিদপুরের আহমদ, সিরাজগঞ্জের রিপন, নরসিংদীর মঙ্গল মিয়া, কক্সবাজারের মহেশখালীর তানভীরসহ ট্রলার থেকে উদ্ধার হওয়া আরও অনেকে জানান, মালয়েশিয়াগামী ট্রলারটির অবস্থান ছিল সেন্টমার্টিন থেকে প্রায় ২০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার সীমান্তের কাছে সীতা পাহাড় নামক স্থানে। সেখানে আরও ৮টি মানব পাচারের ট্রলার এভাবে অপেক্ষমাণ ছিল। থাইল্যান্ডে গণকবর আবিষ্কৃত হওয়া এবং টেকনাফে বন্দুকযুদ্ধে ৩ শীর্ষ মানব পাচারকারী নিহত হওয়ার পর বেকায়দায় পড়ে যায় ট্রলারে থাকা দালাল ও ক্রুরা। তারা না পারছিল থাইল্যান্ডের দিকে যেতে, না পারছিল টেকনাফ উপকূলে ভিড়তে। এই অবস্থায় সোমবার ট্রলারটি সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি চলে আসে। এ সময় দালালরা মোবাইল যোগাযোগে টেকনাফ থেকে ছোট ট্রলার এনে যাত্রীদের উপকূলে নেমে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এভাবে দুটি ট্রলারে ৪৮ জন রোববার রাতে থাইল্যান্ডের ট্রলার থেকে নেমে আসে। এর মধ্যে চকরিয়ার নুরুল ইসলাম ভুট্টোসহ ৩০ জন একটি ট্রলারে টেকনাফ উপকূলে নেমে পালানোর সময় ১১ জন বিজিবির হাতে ধরা পড়ে। এই ১১ জনের দলটিকে টেকনাফ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। এছাড়া অপর একটি ট্রলারে ১৮ রোহিঙ্গা নারী মিয়ানমারে ফিরে যায়।
ট্রলারে থাকা অবশিষ্ট ১১৬ যাত্রীকে কূলে নামিয়ে দিতে না পেরে ট্রলারটি আবারও মিয়ানমার সীমান্তের দিকে ফিরে যাচ্ছিল। এ সময় অবস্থা বেগতিক দেখে যাত্রীরা সবাই মিলে ট্রলারের ৫ ক্রুকে সাগরে ফেলে দিয়ে ট্রলারটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরে রিপন নামে এক যাত্রী কোনো মতে ট্রলারটি এলোমেলো চালিয়ে সেন্টমার্টিনের পশ্চিমে চলে আসে। এ অবস্থায় সোমবার বিকালে কোস্টগার্ড নৌবাহিনী জাহাজ বিএনএস রুহুল আমিনের সহায়তায় তাদেরকে উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার হওয়া সবাই বাংলাদেশী নাগরিক। এরমধ্যে রয়েছে কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, পাবনা, যশোর ও ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা।
সোমবার সন্ধ্যায় কোস্টগার্ড ট্রলারসহ উদ্ধার যাত্রীদের নিয়ে টেকনাফের দিকে রওনা হলেও রাতে শাহপরীর দ্বীপ ঘোলার চরে ট্রলারটি আটকা পড়ে। পরে সেন্টমার্টিন থেকে দুটি ট্রলার এনে যাত্রীদের টেকনাফে নিয়ে আসে। মঙ্গলবার সকালে উদ্ধার যাত্রীরা টেকনাফে পৌঁছলে মেডিকেল টিম তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে। পরে তাদেরকে টেকনাফ থানায় সোপর্দ করা হয়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মেডিকেল দল উদ্ধার ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেন। মেডিকেল অফিসার ডা. সোমেন পালিত বলেন, উদ্ধার অভিবাসীরা তাদেরকে শরীরের ক্ষতস্থান দেখিয়েছে। তাদেরকে পাচারকারীরা বেদম প্রহার করেছিল।
সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার লে. ডিকশন চৌধুরী জানান, আটককৃত মালয়েশিয়াগামীদের থানায় হস্তান্তর করে জড়িত দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।
যেভাবে পাচার করা হয়েছিল : ফিরে আসা সিরাজগঞ্জ জেলার রতনকান্দি উপজেলার একডালা এলাকার মো. রিপন জানান, মো. জাকির নামে এক বন্ধু টেকনাফ ভ্রমণের কথা বলে নিয়ে আসে। টেকনাফে পৌঁছলে ওই বন্ধু তাকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়। দালালরা তাকে জোরপূর্বক একটি সিএনজিতে তুলে নিয়ে রাতেই সাগরে অপেক্ষামাণ ট্রলারে নিয়ে যায়।
নরসিংদী জেলার মুরাদনগরের হোসেন মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর জানান, সেসহ আরও ২১ জন ৪৫ দিন ধরে ট্রলারে ছিলেন। চট্টগ্রামের ইউসুফ নামক এক দালালের হাত ধরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে টেকনাফের সাবরাং থেকে ট্রলারে উঠেছিলেন তিনি। তিনি বলেন, সকালের খাদ্য হিসেবে চিড়া ও গুড় এবং রাতের বেলা ওষুধ মিশানো ভাত খেতে দিত তারা। যা খেলে বমি আসত। তাছাড়া লবণ পানি পান করতে হতো।
কক্সবাজার জেলার উখিয়ার উপজেলার নতুন বাজারের আবদুল হাফিজের ছেলে নুরুল হাকিম জানান, পানি চাওয়া হলে এবং বেশি নড়াচড়া করলে শারীরিক নির্যাতন করত ট্রলারে থাকা দালালরা। তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারত না। ঘাড় ঘুরালেই তারা মারধর করত।
মাদারীপুর জেলার মো. গাউজ বেপারীর ছেলে মো. মাসুম জানায়, টেকনাফের নবী হোছন ও বাবুল নামক দু’জন দালাল সার্বক্ষণিক তাদের ওপর নির্যাতন চালাত।
এদিকে আরও কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ স্ব-ইচ্ছায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশে এলেও অনেককে জোরপূর্বক ট্রলারে উঠানো হয়েছে। তারা আরও জানায়, ট্রলারে খাবার দেয়া হতো সকালে চিড়া-মুড়ি, বিকালে শুকনো মরিচের সঙ্গে ভাত। অল্প পরিমাণ পানি পান করতে দেয়া হতো।
কক্সবাজার সৈকতের ৪ ফটোগ্রাফার : ফিরে আসা যাত্রীদের মধ্যে কক্সবাজার সৈকতের ৪ ফটোগ্রাফার রয়েছেন। তারা টেকনাফে ভ্রমণে এলে টেকনাফের সাবরাং জিপ স্টেশন থেকে সন্ধ্যা বেলায় ৪/৫ জন লোক একটি সিএনজিতে করে ট্রলারে উঠিয়ে দেয় তাদের। এ সময় তাদের কাছ থেকে দুটি ক্যামরা ও ৪টি মোবাইল ছিনিয়ে নেয়া হয়। এরা হচ্ছে- কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার আবুল কালামের ছেলে মো. রফিক, আবদুল মজিদের ছেলে আবুল কাশেম, নুর মোহাম্মদের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম ও মোহাম্মদ হোছনের ছেলে মো. হাসেম। তারা সবাই জনি নামক একটি স্টুডিওর তত্ত্বাবধানে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করত।
আইওএম’র সংস্থার ডা. সৌমেন জানান, যাত্রীদের মধ্যে আশংকাজনক কেউ নেই। তবে খাদ্যজনিত অভাবে দুর্বলতা রয়েছে।
বিজিবির হাতে আটক ১১ : রোববার রাতে ট্রলারটি থেকে নেমে আসা ৩০ যাত্রীর মধ্যে ১১ জনকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে আটক করেছে বিজিবি। এরা কোস্টগার্ডের হাতে আটক ১১৬ যাত্রীর ট্রলারেরই যাত্রী ছিল। ৪২ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের শাহপরীর দ্বীপ বিওপিতে কর্মরত নায়েক কলাপ্র“ মার্মার নেতৃত্বে একটি নিয়মিত টহল দল মঙ্গলবার রাত ১১টার সময় গোলাপাড়া চর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।
আঞ্চলিক সহযোগিতার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের : দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভয়াবহ অভিবাসী সংকটে সহযোগিতার জন্য পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সাগরে ভাসমান এবং উদ্ধার হওয়া অভিবাসীদের নিয়ে আশংকা প্রকাশ করেছে দেশটি।
দারিদ্র্যতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমানের বিশেষ করে রোহিঙ্গা যুবকরা পাচারকারী চক্রের দালালদের হাত ধরে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছে। কিছুদিন আগে হাজার হাজার অভিবাসীকে সাগরে এবং থাইল্যান্ডের জঙ্গলে ফেলে চলে যায় পাচারকারীরা।
মার্কিন দূতাবাসের একজন মুখপাত্র এএফপিকে বলেন, শুধু দারিদ্র্যতা নয়, জাতিগত ও ধর্মীয় সহিংসতার ভয়েও অনেকে দেশ ছেড়ে সাগর পাড়ি দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, এটি একটি আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ। সামুদ্রিক আইন ও নিয়মাবলী অনুযায়ী একে আঞ্চলিকভাবে সুরাহা করতে হবে। এজন্য থাইল্যান্ড চলতি মাসের শেষ দিকে একটি আঞ্চলিক সম্মেলনের ডাক দিয়েছে।
এদিকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ইতিমধ্যে বলেছে, তারা উপকূলে ভিড়তে চাইলে কোনো নৌকাকে বাধা দেবে না। যদিও মঙ্গলবার শত শত অভিবাসীকে তীর থেকে ফিরিয়ে দিয়েছিল ইন্দোনেশিয়া কর্তৃপক্ষ।
উদ্ধার ৬০০ অভিবাসী ইন্দোনেশিয়ার আচেহ ক্যাম্পে : ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের উত্তরে মাছ ধরার শহর কুয়ালা ক্যানকইয়ের বড় একটি আশ্রয় কেন্দ্রে প্রায় ৬০০ বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের অভিবাসীকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখানে আছে তিনটি ভবন এবং ছোট একটি মসজিদ। সুনামির পর এখানে এই আশ্রয় কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও জাতিসংঘের শরণার্থী কমিশনের (ইউএনএইচসিআর) কর্মীরা বুধবার বিকালে দেশটির লোকসুকন শহরের স্পোর্টস সেন্টার থেকে তাদের সরিয়ে নিয়ে যায়।
ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম)-এর কর্মকর্তা স্টেভ হ্যামিল্টন এএফপিকে বলেন, এসব অভিবাসী এখানে প্রায় এক মাস অবস্থান করতে পারবেন। দেশটির কর্তৃপক্ষ ও আইওএম কর্মীরা তাদের দেখভাল করছেন এবং তাদের পরিচয়, ছবি ও অন্যান্য তথ্য সংগ্রহ করছেন। উদ্ধার এ ছয়শ’ ছাড়াও সাগরে আরও প্রায় দেড় হাজার অভিবাসী ভাসছে। তারা খাদ্য ও পানীয় সংকটে আছে।
এদিকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া উপকূলে সাগরে ভাসছেন এখন প্রায় কয়েক হাজার অভিবাসী। বুধবার ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের আশ্রয় কেন্দ্রে বাংলাদেশের সাইফুল ইসলাম ও হাবিবুর রহমান নামে দু’বন্ধু সংবাদ মাধ্যমকে জানান, সাগরে তাদের ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। অনেক দিন না খেয়ে দু’জনই খুব ক্লান্ত-শ্রান্ত ছিলেন। তারা জানান, দাললরা তাদের ঠিকমতো খাবার দিত না। সব সময় চালাত অমানুষিক নির্যাতন।
জাতিসংঘের উদ্বেগ : মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সমুদ্রে ভাসমান অসহায় অভিবাসীদের বহনকারী নৌকা দেশগুলোর উপকূলে ভিড়তে না দেয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। সোমবার ইন্দোনেশিয়া উপকূল থেকে একটি অভিবাসী নৌকাকে সমুদ্রের দিকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। এর আগে মালয়েশিয়ার সামুদ্রিক এজেন্সি ঘোষণা দেয়, তারা কোনো বিদেশী জাহাজকে তীরে ভিড়তে দেবে না। ইউএনএইচসিআর’র অ্যাসিসট্যান্ট হাইকমিশনার ভলকার টার্ক বলেন, ‘জীবন বাঁচানোকেই আমাদের সবার আগে বিবেচনা করতে হবে। তাদের রক্ষা করা অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, তাদের জীবনকে পাচারকারীদের হাতে ফিরিয়ে দেয়া কখনই উচিত হবে না।