Wednesday, April 29, 2026

নারীকেন্দ্রিক সিনেমা বাড়ছে, কী বলছেন বাঁধন, মেহজাবীন by পৃথা পারমিতা নাগ

নারীকেন্দ্রিক সিনেমার বাজার নেই, নারীকে কেন্দ্র করে সিনেমা বানালে সাধারণ দর্শক দেখতে চান না—কেবল বাংলাদেশ নয়, পুরো উপমহাদেশের সব সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতে কান পাতলেই এমন কথা শোনা যায়। এরপরও গত এক বছরে মুক্তি পাওয়া উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে অর্ধেকের বেশি সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন নারী! এসব সিনেমায় কখনো উঠে এসেছে নারীদের উদ্‌যাপনের গল্প, কখনো নারীর লড়াই, কখনোবা নারী নির্মাতা নিজেই বলেছেন নারীর গল্প।

বাস্তবঘেঁষা গল্প, নির্মাণে মুনশিয়ানা
২০২৪ সালের ২০ ডিসেম্বর মুক্তি পায় ‘প্রিয় মালতী’। শঙ্খ দাশগুপ্তের সিনেমাটি দেখে মনে হবে এ যেন সিনেমা নয়, বাস্তবের নিখুঁত রূপান্তর। কেবল গল্প নয়, অভিনয়, কারিগরি দিক, সিনেমাটোগ্রাফি আর নির্মাণ মিলিয়ে সিনেমা হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ প্রিয় মালতী। এ সিনেমাই নয়, গত এক বছরে মুক্তি পাওয়া নারীকেন্দ্রিক সব সিনেমাতেই কমবেশি এই চিত্র পাওয়া গেছে। অতি মেলোড্রামা, দুঃখ-কষ্ট আর হাহাকার থেকে নারীকেন্দ্রিক সিনেমাকে ‘মুক্তি’ দিয়েছেন নির্মাতারা।
মাকসুদ হোসাইনের ‘সাবা’র কথাই ধরা যাক। মা ও মেয়ের সম্পর্ক, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব যেভাবে এ সিনেমায় ফুটে উঠেছে, দেশের সিনেমায় অনেক দিন তা দেখা যায়নি। এটি যে দেশে মুক্তি পাওয়া গড়পড়তা সিনেমার চেয়ে সব বিচারেই অনেক এগিয়ে, এ কথা বললে ভুল বলা হবে না।

আবার লীসা গাজীর ‘বাড়ির নাম শাহানা’য় যেভাবে নারীর সংগ্রাম, উদ্‌যাপন তুলে ধরা হয়েছে, সেটাও তারিফ করার মতো। নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য সব প্রতিকূলতাকে পাশে রেখে একজন নারী যেভাবে তাঁর যোগ্যতর স্থানে পৌঁছান, এ যাত্রা নারী–পুরুষনির্বিশেষে যে কাউকেই অনুপ্রাণিত করবে।

করোনার সময়ের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প ‘জয়া আর শারমীন’। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যখন ধনী-দরিদ্রের সব বিভেদ ঘুচে যায়, সেই সময়ের দুজন মানুষের অকপট প্রকাশই এ সিনেমার মূল ভাব।
ঈদুল আজহার সিনেমার ভিড়ে ব্যতিক্রম ছিল ‘এশা মার্ডার: কর্মফল’। অন্য নারীকেন্দ্রিক সিনেমাগুলোর চেয়ে সানী সানোয়ারের সিনেমাটি মেজাজে পুরোমাত্রায় বাণিজ্যিক। তবে সেখানেও পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা কীভাবে নানাভাবে পুরুষদের অনাচার ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তা উঠে এসেছে। দেশে মার্ডার-মিস্ট্রি ঘরানার সিনেমা, খুনের ঘটনার তদন্ত নিয়ে সিনেমা নতুন নয়। তবে এ সিনেমায় গল্প যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, নিঃসন্দেহে তা ঢাকাই সিনেমায় মার্ডার-মিস্ট্রি ঘরানার উদাহরণ হয়ে থাকবে।

গত মাসেই ওটিটিতে এসেছে আকরাম খানের ‘নকশীকাঁথার জমিন’। সিনেমাটি মুক্তিযুদ্ধে নারীর সংগ্রামকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে। এখনো প্রাসঙ্গিক এ গল্প, কেননা এখনো চলমান নারীর যুদ্ধ।

এ ছাড়া চলতি বছর মুক্তি পেয়েছে অমিতাভ রেজা চৌধুরীর সিনেমা ‘রিকশা গার্ল’, সিরিজ ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’ ও মুর্তজা অতাশ জমজমের ‘ফেরেশতে’। দুই সিনেমায়ই প্রধান চরিত্র নারী, ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’ সিরিজেও রয়েছে বৈচিত্র্যময় আট নারী চরিত্র।

কেন নারীকেন্দ্রিক সিনেমা
প্রশ্ন শুনেই কিছুটা প্রতিবাদ করে উঠলেন আলোচিত দুই সিনেমার (‘প্রিয় মালতী’ ও ‘সাবা’) প্রধান চরিত্রের অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। বললেন, ‘নারীকেন্দ্রিক সিনেমা’ তকমা থেকে মুক্ত হওয়া দরকার সবার আগে। এই তকমা মানেই একটা সিনেমাকে আলাদা করে ফেলা। এতে দর্শকদের মধ্যেও বিভেদ সৃষ্টি হয়, সিনেমা দেখার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়।

এ প্রসঙ্গে মেহজাবীনের সঙ্গে একমত ‘বাড়ির নাম শাহানা’র নির্মাতা লীসা গাজী। নারীকেন্দ্রিক সিনেমা মানেই কান্নাকাটি, মেলোড্রামা, কিংবা শুধুই নারীর সংগ্রাম—এটাই প্রচলিত ধারণা। ‘সতী’ কিংবা ‘সর্বংসহা’ হিসেবে এত দিন যেভাবে নারীদের তুলে ধরা হয়েছে, এ ধারণা থেকেও বের হয়ে আসা দরকার বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, নারীদের মনেও রয়েছে অনেক স্তর, তারাও জটিল। তারা স্বপ্নচারী, অনুভূতিপ্রবণ ও সাহসী। একজন সাধারণ নারীও যখন নিজের চেষ্টায় অসাধারণ হয়ে ওঠেন, সেই গল্পই পর্দায় তুলে ধরতে চেয়েছেন তিনি।

নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত মনে করেন, ‘একজন নির্মাতার কাজ শুধু বিনোদন নয়, সময়ের মনস্তত্ত্বকে তুলে ধরা।’ প্রিয় মালতী তাঁর কাছে কোনো সাহসী পদক্ষেপ মনে হয়নি, বরং মনে হয়েছে গল্প বলার একটি স্বাভাবিক ধারা, ইন্ডাস্ট্রিতে যা এত দিন উপেক্ষিত ছিল। তাঁর মতে, ‘চলচ্চিত্রকে সমৃদ্ধ করার জন্য নারীকেন্দ্রিক সিনেমা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’
‘জয়া আর শারমীন’ নির্মাতা পিপলু আর খান ও সাবা নির্মাতা মাকসুদ হোসাইন নিজের জীবনসঙ্গীকে দেখেই পেয়েছেন গল্পের প্রেরণা।

ইতিবাচক সংস্কৃতি
এক বছরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীকেন্দ্রিক সিনেমা যেমন মুক্তি পেয়েছে, তেমনই দেখা গেছে এসব সিনেমার নির্মাতা, অভিনয়শিল্পীদের একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে। ‘সাবা’ সিনেমার ভূয়সী প্রশংসা করলেন ‘এশা’ অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। এ ছাড়া তাঁর ভালো লেগেছে ‘প্রিয় মালতী’ ও ‘বাড়ির নাম শাহানা’। মেহজাবীনের ভালো লেগেছে ‘জয়া আর শারমীন’ ও ‘এশা মার্ডার: কর্মফল’।

নির্মাতারাও নিয়মিত দেখছেন একে অন্যের কাজ। শঙ্খ বললেন, ‘নির্মাণ, অভিনয় ও গল্প বলার সংযমী ধরন—সাবার সবকিছুই পরিপক্ব।’ মাকসুদ হোসেনের কথায় এল বেশ কয়েক বছর আগে মুক্তি পাওয়া রেহানা মারিয়ম নূর-এর প্রশংসা। দেশের বাইরে থাকার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি সিনেমা দেখা সম্ভব হয় না, তবু ‘প্রিয় মালতী’ ও ‘সাবা’ দেখেছেন, জানালেন লীসা গাজী। করলেন নির্মাণের প্রশংসা।

মেহজাবীনের প্রশংসায় ভাসলেন পিপলু আর খান। বললেন, ‘প্রিয় মালতী’ ও ‘সাবা’য় দুই বিপরীতধর্মী চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন মেহজাবীন। ‘প্রিয় মালতী’ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একদম নতুন ধরনের কাজ। ঢাকা শহরের অনিশ্চয়তা ও সংখ্যালঘু নারীর সংগ্রামকে খুব সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন শঙ্খ। সাবার জগৎ হয়তো সচরাচর দেখা যায় না, কিন্তু আমাদের সমাজে এই জগৎটাও আছে। মাকসুদ হোসেনের পরিণত কাজ।’

বৈশ্বিক স্বীকৃতি
চলতি বছর বাংলাদেশ থেকে অস্কারে পাঠানো হয়েছে ‘বাড়ির নাম শাহানা’। নারীকেন্দ্রিক সিনেমা দেশ থেকে অস্কারের প্রাথমিক মনোনয়নের জন্য পাঠানো হয়েছে, এটাও কি কম বড় ঘটনা। অস্কারের প্রাথমিক মনোনয়নের লড়াইয়ে সাবাও ছিল। দুই সিনেমাই দেশ-বিদেশের বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে। টরন্টো উৎসবে মনোনীত হওয়ার পর আরও গুরুত্বপূর্ণ ১০টি উৎসবে জায়গা করে নিয়েছে ‘সাবা’। একইভাবে ‘ফেরেশতে’ও ইরানের ফজর উৎসবে প্রদর্শিত হয়।

দর্শকখরা, তবু প্রত্যাশা
ঈদ মানেই যেন হলভর্তি দর্শক, আর অন্য সময় গড়ের মাঠ। একটা দীর্ঘ সময় দেশে ভালো মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ না হওয়ার কারণে হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শক। তবে এ ধারা ভাঙতে চাইছেন নির্মাতারা। বাঁধন মনে করেন, এ ধারা ভাঙতে প্রযোজকদের এগিয়ে আসতে হবে। নারী প্রযোজকদেরও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি। নারী নির্মাতাদের চোখে নারীর গল্প, নারীর চোখে পুরুষের গল্পও দেখতে চান। ‘সিনেমাই হতে পারে সমাজের বৈষম্য দূর করার একটা উল্লেখযোগ্য মাধ্যম,’ বলেন তিনি। সমাজের বহুমাত্রিকতাকে প্রতিফলিত করে, এমন গল্প আরও দেখতে চান মেহজাবীন। ভালো গল্প ও সিনেমায় সেটা ভালোভাবে উপস্থাপনের ওপর জোর দিলেন নির্মাতা মাকসুদ হোসেন।
নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত বলেন, নারীপ্রধান গল্প মানেই এখন আর ‘সামাজিক বার্তা’ বা ‘অতিরিক্ত সাহসী’ কাজ নয়; বরং এগুলো আমাদের সময়, সমাজ, সম্পর্ক এবং মানসিক বাস্তবতার স্বাভাবিক প্রতিফলন।
বাণিজ্যিক ধারার ছবি যাঁরা করছেন, তাঁদের আরও গভীরভাবে সমব্যথী হয়ে নারী চরিত্র নির্মাণ করা উচিত বলে মনে করেন নির্মাতা পিপলু খান।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-07%2Fwdnhejfl%2FIMG-20251107-WA0002.jpg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নারীকেন্দ্রিক সিনেমা বাড়ছে। কোলাজ

ভারতের মথ ডাল এ দেশে এসে মুগ ডাল হয়ে যাচ্ছে কেন by মাসুদ মিলাদ

বাজারে খুবই অপরিচিত ‘মথ’ ডাল নিয়ে এখন অনেকের কৌতূহল। এই ডালে ক্ষতিকর রং মিশিয়ে মুগ ডাল নামে বিক্রি হচ্ছিল। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বাজার থেকে নমুনা পরীক্ষা করে তার প্রমাণও পেয়েছে। এরপরই ক্রেতাদের সচেতন করতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে সংস্থাটি। সংস্থাটির সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হয় প্রতিটি সরকারি ওয়েবসাইটে।

সরকারি সতর্কবার্তার আগে নাম না–জানা এই ডাল কোথায় থেকে আমদানি হয়, কীভাবে বাংলাদেশে এল, কারা আমদানি করে, কেনই–বা মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি হয়, তা নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানা গেল নানা তথ্য।

শুরুতে জেনে নেওয়া যাক, এই ডাল কোথায় পাওয়া যায়। বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানে দেশে এই ডাল উৎপাদনের কোনো তথ্য নেই। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ভারতের কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, মথ ডাল খরা সহনশীল ডাল–জাতীয় ফসল। এটি ভারতের স্থানীয় ডাল। বিশ্বে মথ ডালের সিংহভাগ উৎপাদন হয় ভারতে।

ভারতের বাইরে দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রে মথ ডাল উৎপাদন হয়। যুক্তরাষ্ট্রে এটি পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। ভারতের মথ ডালের ৯৫ শতাংশের বেশি উৎপাদন হয় রাজস্থানে মরু এলাকায়। রাজস্থান সরকারের কৃষি পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানে গত ২০২৩–২৪ মৌসুমে ৪ লাখ ১৯ হাজার টন মথ ডাল উৎপাদিত হয়। রাজস্থানে এই ডাল বেশ জনপ্রিয়। এই ডাল দিয়ে পাঁপড় বানানো হয়।

বাংলাদেশে কখন আমদানি শুরু

বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি হচ্ছে শুধু ভারত থেকেই। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে মথ ডাল আমদানি শুরু হয়েছে। এর আগে গত পাঁচ বছরে এনবিআরের তথ্যে মথ ডাল আমদানির কোনো রেকর্ড নেই।

এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি রাজশাহীর বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিল হিলি স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে মথ ডালের প্রথম চালান আমদানি করে। প্রথম চালানে ৬২ টন মথ ডাল আমদানি হয়। ২০২৪ সালে সব মিলিয়ে ৮ হাজার ৫১৬ টন মথ ডাল আমদানি হয়। তবে হঠাৎ এ বছর মথ ডালের আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। যেমন চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে মথ ডাল আমদানি হয়েছে ২০ হাজার ৬৯১ টন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০৮ শতাংশ বেশি।

বিসমিল্লাহ ফ্লাওয়ার মিলের হাত ধরে আমদানি শুরু হওয়া এ পণ্যটি এখন আমদানি করছে ৫৯টি প্রতিষ্ঠান। ভোমরা, হিলি ও সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে মূলত ভারত থেকে এই ডাল আমদানি হচ্ছে।

মথ ডাল কেন মুগ ডাল হিসেবে বিক্রি

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানান, মুগ ডাল কিছুটা গোলাকার। আর মথ ডাল কিছুটা লম্বা আকৃতির। এরপরও হলুদ রং মেশানো মথ ডাল ও মুগ ডাল পাশাপাশি রাখা হলে তা শনাক্ত করা কঠিন। ব্যবসায়ীরা জানান, মুগ ডালের চেয়ে মথ ডালের আমদানির মূল্য কম। এ কারণে বেশি দামের জন্য মথ ডালকে মুগ ডাল হিসেবে খুচরায় বিক্রি হয়।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানিতে কেজিপ্রতি দাম পড়েছে ১ ডলার ৯ সেন্ট বা ১৩৩ টাকা। অন্যদিকে মথ ডাল আমদানি হয়েছে কেজিপ্রতি ৮৫ সেন্ট বা ১০৪ টাকায়। অর্থাৎ মুগ ডালের চেয়ে মথ ডাল আমদানিতে কেজিতে ২৯ টাকা কম পড়ছে। খুচরা বাজারে মুগ ডাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। অন্যদিকে মুগ ডাল হিসেবে মথ ডাল বিক্রি হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা। দামের পার্থক্যের কারণে তাই মথ ডালই বেশি বিক্রি হচ্ছে।

জানতে চাইলে মথ ডালের আমদানিকারক নিউ মাতৃভান্ডারের কর্ণধার বাদল তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, ভারতের রাজস্থানে উৎপাদন হওয়া এই ডাল দিল্লিতে বড় কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এরপরই আমদানি হয়। আগের কিছু চালানে রং মেশানো থাকলেও এখন যেসব মথ ডাল আমদানি হচ্ছে, সেগুলোয় কোনো রং নেই। মুগ ডালের চেয়ে দাম কম থাকায় মথ ডালের চাহিদা বেশি বলে জানান তিনি।

মুগ ডাল আমদানি কমছে, বাড়ছে মথ ডাল

পরিসংখ্যান ব্যুরো ও এনবিআরের হিসাবে দেখা যায়, দেশে বছরে গড়ে ৪৫ হাজার টন মুগ ডাল উৎপাদন হয় এবং বছরে গড়ে ৩০ হাজার টন মুগ ডাল আমদানি হয়। তবে মথ ডাল আমদানি শুরুর পর মুগ ডাল আমদানি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এ থেকে ধারণা পাওয়া যায়, বাজারে মুগ ডালের চাহিদা মেটাচ্ছে মূলত মথ ডাল। যেমন ২০২২–২৩ অর্থবছরে ২১ হাজার টন মুগ ডাল আমদানি হয়। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৩–২৪–এ মুগ ডাল আমদানি কমতে শুরু করে। ওই বছরে মথ ডাল আমদানি শুরু হয়। তাতে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি হয় প্রায় ১৮ হাজার টন। আর মথ ডাল আমদানি হয় ৯৯৬ টন।

গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মুগ ডাল আমদানি আরও কমে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৯১৩ টনে। এ সময়ে ২১ হাজার ৪১৪ টন মথ ডাল আমদানি হয়। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে আমদানির তালিকা থেকে কার্যত উধাও হয়ে গেছে মুগ ডাল। এ সময় পাঁচটি চালানে মুগ ডাল আমদানি হয়েছে ২১৩ টন। অন্যদিকে মথ ডাল আমদানি হয়েছে ৬ হাজার ৭৯৯ টন।

রং মেশানো ডাল বিক্রি বন্ধে অভিযান

রং মিশিয়ে বাজারে ডাল বিক্রির অভিযোগে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি নমুনা সংগ্রহের পর পরীক্ষা করে। গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, মুগ ডাল নামে বিক্রি হওয়া ৩৩টি নমুনার ১৮টিতে টারটাজিন নামের একধরনের হলুদ রঙের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরপরই অভিযান শুরু হয়। এখন প্রায় প্রতিদিন কোথাও না কোথাও এ ধরনের অভিযান পরিচালনা হচ্ছে। যেমন গত বুধবার (৫ নভেম্বর) মথ ডালে রং মিশিয়ে মুগ ডাল বলে বিক্রির দায়ে টাঙ্গাইল শহরের ছয়আনী বাজারে দুই ব্যবসায়ীকে লাখ টাকা জরিমানা করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ডাল বা যেকোনো শস্যদানায় রং মেশানোর অনুমোদন নেই। টারটাজিন রং ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। এ কারণে আমদানির সময় মুগ ও মথ ডালে রং পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং রং মেশানো ডাল যাতে আমদানি না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাজস্ব বোর্ডকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মথ ডাল
মথ ডাল। ছবি প্রথম আলো