Wednesday, June 17, 2026

ট্রাম্প যেভাবে ইরানের স্বার্থে কাজ করছেন! by শ্লোমো বেন-আমি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতির খবর সামনে এসেছে, তা মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একধরনের হতাশার প্রতিফলন। তিনি যে জটিল সংঘাতে নিজেই জড়িয়ে পড়েছিলেন, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছেন এখন। যুদ্ধের শুরুতে যেসব লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা তিনি বলেছিলেন, সেগুলো এখন আর নেই বললেই চলে।

নতুন চুক্তিতে যা পাওয়া গেছে বলে জানা যাচ্ছে, তা হলো হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার প্রতিশ্রুতি (যা যুদ্ধের আগেই চালু ছিল) এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার পরিকল্পনা, যা আগেও চলছিল।

কিন্তু এই সীমিত লক্ষ্যগুলোও অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে, যদি ইসরায়েল লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত। ২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে করা পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহুই। সেই চুক্তিটি হয়েছিল প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় এবং ট্রাম্পকে তখন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, এর চেয়ে ভালো একটি চুক্তি তিনি করে দেখাবেন।

শুধু তা–ই নয়, নেতানিয়াহুই ট্রাম্পকে বর্তমান যুদ্ধে নামতে উৎসাহিত করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, বিশ্বের দুই শক্তিশালী বিমানবাহিনী খুব দ্রুত ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দেবে এবং সেই সঙ্গে বহুদিনের প্রতিপক্ষ সরকারকেও সরিয়ে দেবে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো। এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলে নেতানিয়াহুই হয়ে উঠেছেন ট্রাম্পের জন্য বড় বাধা।

আসলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর লক্ষ্য কখনোই পুরোপুরি এক ছিল না। ট্রাম্প হয়তো ইরানের ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’ শুনতে পছন্দ করতেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়ানোর ইচ্ছা তাঁর ছিল না। শেষ পর্যন্ত তিনি এমন একটি পারমাণবিক চুক্তি পেলেই সন্তুষ্ট থাকতেন, যা ওবামার চুক্তির চেয়ে ভালো বলে দেখানো যায়।

কিন্তু ইসরায়েলের জন্য বিষয়টি ভিন্ন। তাদের কাছে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি এবং ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি ইরানের সমর্থন—এই দুটি বিষয় একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। সমস্যা হলো, এই দুটি ক্ষেত্রে ইরান কোনো আপস করতে রাজি নয়। পারমাণবিক অস্ত্র না থাকলেও ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য অপরিহার্য মনে করে।

এ প্রেক্ষাপটে লেবানন হয়ে উঠেছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা। ইসরায়েল সেখানে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। গত তিন বছর ধরে উত্তর ইসরায়েল হিজবুল্লাহর হামলার মুখে রয়েছে। তাই ইসরায়েল ঘোষণা দিয়েছে, যত দিন প্রয়োজন তারা দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করবে। যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে, তা তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন যুদ্ধবিরতির চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখনই ইসরায়েল বৈরুতে বিমান হামলা চালায়।

এ হামলা পুরো চুক্তিকেই ভেস্তে দিতে পারত। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ না হলে কোনো যুদ্ধবিরতি বা চূড়ান্ত চুক্তি সম্ভব নয়। যদি ইসরায়েল আক্রমণ চালিয়ে যায়, তাহলে ইরানও পাল্টা আঘাত হানবে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের প্রধান সম্প্রতি বলেছেন, ‘লেবাননের প্রতিরোধকে সমর্থন করা আমাদের সবার দায়িত্ব এবং অঞ্চল থেকে ইসরায়েলকে সরিয়ে দেওয়া সম্ভব।’

তবে এমন কথায় নেতানিয়াহু পিছিয়ে যাবেন না। তিনি জানেন, ইরান এই যুদ্ধে কিছু কৌশলগত সুবিধা পেলেও তাদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সীমিত। ইসরায়েলের বিমানবাহিনী আবার বড় আকারে হামলা চালালে, বিশেষ করে বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালালে ইরানের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।

কিন্তু ইসরায়েলের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারেন ট্রাম্প নিজেই। ইরান নিয়ে এই জটিলতায় তাঁর জনপ্রিয়তা কমে গেছে, ব্যক্তিগত প্রদর্শনীমূলক আয়োজনগুলো থেকেও তিনি মনোযোগ হারিয়েছেন এবং দ্রুত কোনো ‘বিজয়’ দেখানোর সুযোগও পাচ্ছেন না। ফলে তিনি এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে ইসরায়েলের স্বার্থ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যেমন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনেক মিল থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে তাদের স্বার্থ আলাদা। আর যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র না পায়।

এই যুক্তিতে ট্রাম্প নিজেকে সফল চুক্তিকারক হিসেবে তুলে ধরতে পারেন। তবে এর জন্য ইসরায়েলকে তাঁর পথে চলতে হবে। তিনি এতটাই চাপ সৃষ্টি করছেন যে সাম্প্রতিক এক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে তিনি কঠোর ভাষায় তিরস্কারও করেছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, তাঁর সহায়তা না থাকলে নেতানিয়াহু জেলেও থাকতে পারতেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ট্রাম্প এখন ইরানের কর্মকর্তাদের প্রতিও নেতানিয়াহুর চেয়ে বেশি সম্মান দেখাচ্ছেন বলে মনে হয়।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের অবনতির চেয়ে বড় প্রমাণ আর কিছু হতে পারে না। ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিচ্ছেন—চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নেবেন, নেতানিয়াহুর সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই, তা ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য অনুকূল হোক বা না হোক। একসময়ের অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দুই দেশের সম্পর্ক এখন যেন পরিণত হয়েছে দুই নেতার স্বার্থসংশ্লিষ্ট সমঝোতায়, যেখানে একজন প্রভু আর অন্যজন অনুগত।

শেষ পর্যন্ত যা-ই ঘটুক, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইতিহাসের বিচারের হাত থেকে রেহাই পাবেন না। ইরানকে ঘিরে তাঁদের এই যুদ্ধ কৌশলগতভাবে এক বড় ব্যর্থতা হিসেবে বিবেচিত হবে। দুই সামরিক পরাশক্তি মিলেও একটি দুর্বল, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত দেশের কাছে কার্যত পরাস্ত হয়েছে।

বরং ইরানই এই যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। নতুন যুদ্ধবিরতিও সেই অবস্থানকে আরও মজবুত করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এখন লেবাননের রক্ষকের ভূমিকায়, আর তা পরোক্ষভাবে ইরানেরই স্বার্থ রক্ষা করছে।

* শ্লোমো বেন-আমি, ইসরায়েলের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট ইংরেজি থেকে অনূদিত

আসলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর লক্ষ্য কখনোই পুরোপুরি এক ছিল না
আসলে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর লক্ষ্য কখনোই পুরোপুরি এক ছিল না। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্র আরও ২৫০ বছর টিকে থাকবে কি না, সন্দিহান ৩৮ শতাংশ মার্কিন

রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপঃ স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ৪ জুলাই দেশটি এই ঐতিহাসিক মাইলফলক উদ্‌যাপন করতে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিজেদের দেশের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়ে ভুগছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ইপসোসের সম্প্রতি পরিচালিত এক যৌথ জরিপে অংশ নেওয়া ৩৮ শতাংশ মার্কিন উত্তরদাতা মনে করেন, আগামী ২৫০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র একক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে পারবে না। তাঁদের মধ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক ৪০ শতাংশ ও রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক ২৬ শতাংশ রয়েছেন।

তবে ৬২ শতাংশ বিশ্বাস করেন, ২৫০ বছর পরও যুক্তরাষ্ট্র অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে।

চার দিনব্যাপী এই জরিপ গত সোমবার শেষ হয়েছে। অনলাইনে পরিচালিত এই জরিপে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রান্তের ১ হাজার ৫৩৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক অংশ নেন। জরিপের ফলাফলে সম্ভাব্য ত্রুটির সীমা ছিল ৩ শতাংশ।

জরিপের ফলাফল এমন এক সময় প্রকাশিত হলো, যখন স্বাধীনতা দিবসের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে নানা আয়োজন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

আগামী ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি হবে। ১৭৭৬ সালের এদিনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা নেতারা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানের অনেক আয়োজনেই নিজেকে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রাখতে চাইছেন। গত রোববার নিজের ৮০তম জন্মদিনে হোয়াইট হাউসে একটি কেজ ম্যাচ বা খাঁচার লড়াইয়ের আয়োজন করেন তিনি।

পরদিন ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটনে ৪ জুলাইয়ের অনুষ্ঠানে তিনিই হবেন মূল আকর্ষণ। একই সঙ্গে অনুষ্ঠানটি তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক সমাবেশ হিসেবেও কাজ করবে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দলটি ব্যাপক চাপে রয়েছে।

ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাঁর প্রেসিডেন্সি (শাসনকাল) দেশকে রক্ষার একটি প্রচেষ্টা।

অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট নেতাদের অভিযোগ, ট্রাম্পই যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক সমালোচকদের নিশানা করতে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে ব্যবহার করছেন।

গণতন্ত্র নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

জরিপে অংশ নেওয়া দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ বলেছেন, মার্কিন গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট ও ৫০ শতাংশ রিপাবলিকান এ মতের সঙ্গে একমত হয়েছেন।

গত বছরের আগস্টে পরিচালিত একই ধরনের জরিপে ৫৭ শতাংশ মানুষ গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এবার সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশে। ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকানদের মধ্যে এ উদ্বেগ বেশি বেড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের কাছে হেরে যান। এই পরাজয়কে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ভোট জালিয়াতি বলে দাবি করে আসছেন। তবে এ দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো প্রমাণ দিতে পারেননি। ট্রাম্প দেশটির ভোটব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষেও প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জরিপে অংশ নেওয়া ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, আগামী পাঁচ বছর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।

‘বিশ্বের সেরা দেশ’ ভাবার প্রবণতা কমছে

জরিপে আরও দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সেরা দেশ হিসেবে দেখার প্রবণতাও মার্কিন নাগরিকদের মধ্যে কমেছে।

এবার ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তাঁদের মতে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের সেরা দেশ। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় পরিচালিত রয়টার্স/ইপসোস জরিপে এ হার ছিল ৩৮ শতাংশ।

ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সেরা দেশ মনে করেন মাত্র ১১ শতাংশ। ২০১৭ সালে এ হার ছিল ২৬ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজনও প্রকট আকার ধারণ করেছে। অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, উদ্‌যাপনগুলো অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এবং রিপাবলিকানদের প্রায় অর্ধেক এ মত দিয়েছেন।

স্বাধীনতা দিবস কীভাবে উদ্‌যাপন করা হবে, তা নিয়েও দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা গেছে। রিপাবলিকানদের ৫২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকার রং-লাল, সাদা ও নীল-রঙের পোশাক পরবেন। ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এ হার ২০ শতাংশ।

আতশবাজির অনুষ্ঠানেও অংশ নেওয়ার আগ্রহ রিপাবলিকানদের মধ্যে বেশি। ৪৬ শতাংশ রিপাবলিকান বলেছেন, তাঁরা এমন অনুষ্ঠানে যাবেন। ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘ইউএফসি ফ্রিডম ২৫০’ অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে হোয়াইট হাউসের আকাশে আতশবাজির ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। দেশটির স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। ১৫ জুন ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে ‘ইউএফসি ফ্রিডম ২৫০’ অনুষ্ঠানের সমাপ্তিতে হোয়াইট হাউসের আকাশে আতশবাজির ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। দেশটির স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠানটির আয়োজন করা হয়। ১৫ জুন ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

বড়রাও কেন হামে আক্রান্ত হন? কীভাবে বুঝবেন, চিকিৎসা কী? by ডা. শাহনুর শারমিন

দেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব। হাম যদিও মূলত শিশুদের রোগ, কিন্তু এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে। তবে শিশুকালে একবার হাম হয়ে গেলে কিংবা হামের টিকা নেওয়া থাকলে হামের সংক্রমণের আশঙ্কা কম থাকে। এ কারণে সহজে বড়রা হামে আক্রান্ত হন না। তবে এবার হাম পরিস্থিতি আলাদা। শিশুদের ক্ষেত্রেও যেমন বয়সের বাছবিচার মানছে না, তেমনি বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছেন।

কেন আক্রান্ত হন বড়রা

যাঁরা আগে টিকা নেননি বা অসমাপ্ত টিকার ডোজ নিয়েছেন, যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম, দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগে ভুগছেন, কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগী বা স্টেরয়েড-জাতীয় ওষুধ খাচ্ছেন, রেডিওথেরাপি বা কেমোথেরাপি নিচ্ছেন, তাঁরাই হামে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিককালে শিশুদের টিকাদানে ঘাটতি ছিল বলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’র কার্যকারিতা নষ্ট হয়েছে। তাই বর্তমানে যেকোনো বয়সী মানুষ হামে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে হাম শিশুদের ক্ষেত্রে যতটা মারাত্মক রূপ ধারণ করে বা জটিলতার সৃষ্টি করে, বড়দের বেলায় অতটা না-ও করতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড়রা তেমন কোনো জটিলতা ছাড়াই সেরে উঠতে পারেন।

কীভাবে বুঝবেন

হামের লক্ষণ সবার ক্ষেত্রেই প্রায় এক। তীব্র জ্বর, গায়ে ব্যথা, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীর বা গলা ব্যথার সঙ্গে থাকছে চামড়ায় ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ। কখনো কখনো বড়দের ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ শিশুদের চেয়েও মারাত্মক হতে পারে। হাম খুবই সংক্রামক বলেই শিশুদের কাছ থেকে বড়রা আক্রান্ত হতে পারেন। অসচেতনতার কারণে সময়মতো সাবধান না হলে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহসহ আরও কিছু জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

চিকিৎসা কী

বেশির ভাগ ভাইরাসজনিত রোগের মতোই হামেরও কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাহলে কী করবেন? চাই পূর্ণ বিশ্রাম এবং পানিশূন্যতা রোধের জন্য পর্যাপ্ত তরল খাবার। জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল-জাতীয় ওষুধ খেতে হবে।

ঠান্ডা-কাশির জন্য অ্যান্টিহিস্টামিন বা অ্যালার্জির ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। কখনো কখনো প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হতে পারে। ফুসফুসের প্রদাহের কারণে শ্বাসকষ্ট বা প্রচণ্ড কাশি বা বুকে ব্যথার মতো সমস্যা হলে প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে।

যেভাবে প্রতিরোধ

হামের মতো অতিসংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা হচ্ছে রোগীকে আলাদা রাখা বা আইসোলেশন করা। চামড়ায় ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ আসার আগে থেকেই রোগীর কাছ থেকে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারেন। তাই এই নাজুক সময়ে জ্বর, গায়ে ব্যথা, ঠান্ডা কাশি হলে হামের কথা মাথায় রাখতে হবে। হাম প্রতিরোধে টিকার বিকল্প নেই। আগে টিকা দেওয়া না থাকলে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশি বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে যেহেতু এটি ছড়ায়, তাই আক্রান্ত ব্যক্তির কাছ থেকে সাবধানে থাকতে হবে। মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ইত্যাদি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।

* ডা. শাহনুর শারমিন, অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ

দেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব
দেশে চলছে হামের প্রাদুর্ভাব। ছবি: ফ্রিপিক

আসল আম কেনার উপায়, জেনে নিন আম ক্যালেন্ডার by এম এ হান্নান

বাজারে নানা আমের মেলা বসেছে। কিন্তু এ মেলায় ক্রেতাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায় ভেজাল, রাসায়নিক দিয়ে পাকানো কিংবা সময়ের আগে বাজারে আসা স্বাদহীন অপরিপক্ব আম। একটু অসচেতন হলেই সুন্দর চকচকে রূপ দেখে আম কিনে বাড়িতে এনে ঠকতে হয়। আমের বাজারে এই ধোঁকা থেকে বাঁচতে এবং নিজের ও পরিবারের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভালো মানের আম চেনার কিছু কার্যকর ও বাস্তব উপায় নিচে তুলে ধরা হলো।

১. ভালো মানের আম চেনার সাধারণ ‘থাম্ব রুল’

বাজারে গিয়ে চটজলদি আমের মান ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের জন্য প্রধানত পাঁচটি বিষয়ের ওপর ভরসা রাখতে পারেন। এ বিষয়ে পরামর্শ দিলেন রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমবাগানি সাইফুর রহমান ইমন।

ঘ্রাণ বা সুবাস (সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য): আম কেনার সময় প্রথমেই এর বোঁটার চারপাশ থেকে ঘ্রাণ নিন। প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের বোঁটা থেকে একটি মিষ্টি, চেনা সুবাস বের হবে। কেমিক্যাল দিয়ে জোর করে পাকানো আমে এই চিরচেনা সুবাস থাকে না, অনেক সময় পুরোপুরি গন্ধহীন বা একটা কৃত্রিম ঝাঁজালো গন্ধ পাওয়া যায়।

ত্বকের ভাঁজ: আমের চামড়া যদি টানটান থাকে, তাহলে তা পরিপক্ব আম। বিপরীতে আমের চামড়া ঢিলা থাকলে, বিশেষ করে আমের নিচের দিকে, তাহলে তা অপরিপক্ব আম। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চামড়ায় যেমন ভাঁজ পড়ে, অপরিপক্ব আমের বেলায়ও এমন ভাঁজ দেখা যায়।

ত্বকের অবয়ব ও চেহারা: অতি চকচকে, নিখুঁত ও একদম দাগহীন হলুদ আম দেখলেই প্রলুব্ধ হবেন না। প্রাকৃতিকভাবে গাছপাকা আমের গায়ে ছোট ছোট কালো বা বাদামি ছোপ বা দাগ থাকা স্বাভাবিক। ত্বক সম্পূর্ণ মসৃণ ও কৃত্রিমভাবে উজ্জ্বল হলে তা রাসায়নিক প্রয়োগের লক্ষণ হতে পারে।

স্পর্শ ও নরম ভাব: আমের গায়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে হালকা চাপ দিয়ে দেখুন। আমটি সবদিকে সমানভাবে সামান্য স্পঞ্জি বা নরম মনে হলে তা স্বাভাবিক উপায়ে পেকেছে। কিন্তু আমের কোনো অংশ যদি খুব শক্ত আর কোনো অংশ অতিরিক্ত দেবে যাওয়া নরম হয়, তবে সেসব আম কিনবেন না।

রঙের ফাঁদ এড়ানো: জাতভেদে বহু আম পাকার পরও সম্পূর্ণ সবুজ থাকে, যেমন ল্যাংড়া, আম্রপালি। ক্রেতারা ভাবেন, সবুজ মানেই কাঁচা বা টক, যা একদম ভুল ধারণা। রঙের চেয়ে আমের পরিপক্বতা ও সুবাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

২. জনপ্রিয় জাত এবং এসবের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য

সব আমকে একপাল্লায় মাপা ভুল। কারণ, একেক জাতের আম কেনার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য খেয়াল করার বিষয় আছে—

হাঁড়িভাঙা আম: হাঁড়িভাঙা আম বেশি পাকলে স্বাদটাই মাটি। হাঁড়িভাঙা আম পুরোপুরি পাকার আগে বা কিছুটা ডাঁসা (শক্ত ও কাঁচা-পাকা) অবস্থায় কিনতে হয়। এই আম পেকে বেশি নরম হয়ে গেলে ভেতরের শাঁস পানসে হয়ে যায় এবং এর আসল ক্রাঞ্চি টেক্সচার নষ্ট হয়। তাই গায়ের রং কিছুটা সবুজাভ এবং হাত দিলে শক্ত মনে হলে তবেই কিনুন। অন্য সব আমের মতো পাকা ভেবে নরম হাঁড়িভাঙা আম কখনোই কেনা উচিত নয়।

ল্যাংড়া আম: পাকার পরও ল্যাংড়া আমের খোসা সবুজ বা হালকা শর্ষে রঙের ছোপযুক্ত থাকে। বাজারে যদি একদম টকটকে নিখুঁত হলুদ ল্যাংড়া আম দেখেন, তবে ধরে নিতে পারেন, তা প্রাকৃতিকভাবে পাকেনি। পাকা ল্যাংড়ার বোঁটার অংশটি ভেতরের দিকে একটু দেবে যায় এবং সেখান থেকে সুবাস ছড়ায়।

হিমসাগর/ক্ষীরসাপাতি: গাছপাকা হিমসাগর আমের গায়ে ছোট ছোট বাদামি ডট বা ফ্রিকলস দেখা যায়। এর খোসা কিছুটা মসৃণ ও সামান্য তৈলাক্ত হয়। হাত দিয়ে পুরো আমটি সমান নরম বা একই রকম শক্ত গড়নের মনে হলে তবেই কিনবেন।

আম্রপালি: আসল আম্রপালি আম আকারে মাঝারি থেকে কিছুটা ছোট হয় এবং এর নিচের দিকটা সামান্য সুচালো বা বাঁকানো থাকে। বাজারে অতিরিক্ত বড় আকারের যে আম্রপালি দেখা যায়, সেসবে রাসায়নিক বা অতিরিক্ত সারের প্রভাব থাকার ঝুঁকি বেশি। এ আমও পাকার পর সবুজ থেকে যায়।

৩. কেমিক্যালে পাকানো আম বর্জনের কৌশল

একই রকম রং বা ইউনিফরমিটি: ঝুড়ির মধ্যে থাকা সব কটি আম যদি একদম নিখুঁত একই রকম হলুদ রঙের হয়, তবে তা কেমিক্যালের ‘কামাল’ বলে ধরে নেওয়া যায়। প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের ঝুড়িতে রঙের তারতম্য থাকবেই—কোনোটি একটু বেশি হলুদ, কোনোটি আংশিক সবুজ। কোনটি হলুদ-সবুজের মিশেল।

পানির পরীক্ষা: আম কিনে বাড়িতে এনে বালতিভর্তি পানিতে ছেড়ে দিন। গাছপাকা রসালো আম ওজনে ভারী হওয়ায় পানিতে সম্পূর্ণ ডুবে যাবে। কিন্তু রাসায়নিক দিয়ে জোর করে পাকানো অপরিপক্ব আম সাধারণত পানির ওপর ভেসে থাকে।

স্বাদেই পরীক্ষা: কেমিক্যালযুক্ত আম মুখে দিলে প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের মতো দীর্ঘস্থায়ী কড়া মিষ্টি স্বাদ পাওয়া যায় না। বরং মুখে হালকা তিতকুটে বা ঝাঁজালো অনুভূতি হতে পারে এবং খাওয়ার পর গলায় সামান্য অস্বস্তি বা চুলকানি হতে পারে।

৪. অঞ্চলভিত্তিক ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ বা আম পাড়ার সময়সূচি মেনে আম কেনা

আম কেনার ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক অফিশিয়াল সময়সূচি বা আম ক্যালেন্ডার মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, ক্যালেন্ডারে উল্লেখিত নির্দিষ্ট দিন-তারিখের আগে বাজারে আসা আমগুলো অপরিপক্ব বা কাঁচা থাকার আশঙ্কা আছে। অনেক সময় বাড়তি লাভের আশায় নির্ধারিত সময়ের আগেই গাছ থেকে আম পেড়ে কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর চেষ্টা করা হতে পারে, যা আমের স্বাভাবিক স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা নষ্ট করে। তাই খাঁটি, সুস্বাদু ও প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের আসল স্বাদ পেতে এই সময়সীমা অনুসরণ করে আম কেনা উচিত।

আমের জাত ও জেলাভিত্তিক সঠিক সময়সূচি

গুটি বা স্থানীয় আম ও গোপালভোগ: মৌসুমের শুরুতেই বাজারে আসে স্থানীয় গুটি আম ও গোপালভোগ আম। চুয়াডাঙ্গা, রাজশাহী ও নওগাঁয় এই আম মে মাসের মাঝামাঝি থেকেই নামানো শুরু হয়।

ক্ষীরসাপাতি বা হিমসাগর: আমপ্রেমীদের পছন্দের জাতটি চুয়াডাঙ্গায় সবচেয়ে আগে পাবে। চুয়াডাঙ্গায় ১৩ মে, রাজশাহীতে ৩০ মে এবং নওগাঁয় ২ জুন থেকে ক্ষীরসাপাতি/হিমসাগর আম বাজারে আসতে শুরু করে।

ল্যাংড়া ও আম্রপালি: জনপ্রিয় জাত ল্যাংড়া চুয়াডাঙ্গায় ২৮ মে, নওগাঁ ও রাজশাহীতে ১০ জুন থেকে বাজারে আসে। অন্যদিকে আম্রপালি আম চুয়াডাঙ্গায় ৫ জুন, নওগাঁ ও রাজশাহীতে ১৫ জুন থেকে পাড়া শুরু হয়। এ সময়ের আগে বাজারে ল্যাংড়া বা আম্রপালি পাওয়া গেলে তা পরিপক্ব না-ও হতে পারে।

ফজলি, হাঁড়িভাঙা ও ব্যানানা ম্যাঙ্গো: ফজলি আম চুয়াডাঙ্গা ও রাজশাহীতে ১৫ জুন এবং নওগাঁয় ২৫ জুন থেকে বাজারে আসে। হাঁড়িভাঙ্গা আম রংপুরে ২০ জুন, নওগাঁ ও রাজশাহীতে ১০ জুন থেকে পাওয়া যাচ্ছে। ব্যানানা ম্যাঙ্গো রাজশাহীতে ১০ জুন, চুয়াডাঙ্গায় ২২ জুন এবং নওগাঁয় ২৫ জুন থেকে পাকতে শুরু করবে। প্রাকৃতিক নিয়মে পাকা আম পাওয়ার জন্য এই তারিখগুলো মেনে চলা জরুরি।

আশ্বিনা ও বারি-৪: নাবি বা লেট প্রজাতির এই আমগুলো জুনের শেষে ও জুলাইয়ে বাজারে আসে। চুয়াডাঙ্গায় এই জাত ৩০ জুন, নওগাঁয় ৫ জুলাই থেকে আশ্বিনা/বারি-৪ বাজারে আসবে। রাজশাহীতে বারি-৪ আম ৫ জুলাই ও আশ্বিনা আম ১০ জুলাই থেকে পাড়া শুরু হবে। ভালো মানের আম পেতে তত দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভালো।

গৌড়মতি: গৌড়মতি আম নওগাঁয় ৫ জুলাই, রাজশাহীতে ১৫ জুলাই ও চুয়াডাঙ্গায় সবচেয়ে দেরিতে, অর্থাৎ ৩১ জুলাই থেকে বাজারে আসবে। অন্যদিকে কাটিমন ও বারি ১১ বারোমাসি আম বলে সারা বছরই পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের প্রধান ৩টি আম উৎপাদনকারী অঞ্চলের আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে একই আম ভিন্ন ভিন্ন সময়ে পাড়া হয়। জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া এই সময়সূচির আগে বাজারে আসা আম কেনা থেকে বিরত থাকুন। আম কেনার সময় একটু সময় নিয়ে বিক্রেতাকে আমের উৎস বা অঞ্চল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন এবং ওপরের ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে নিন। তাড়াহুড়া না করে সঠিক সময়ে সঠিক আমটি কেনাই ঠকে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার অন্যতম উপায়।

খাঁটি, সুস্বাদু ও প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের আসল স্বাদ পেতে  সময়সীমা অনুসরণ করে আম কেনা উচিত
খাঁটি, সুস্বাদু ও প্রাকৃতিকভাবে পাকা আমের আসল স্বাদ পেতে সময়সীমা অনুসরণ করে আম কেনা উচিত। ছবি: সুপ্রিয় চাকমা

বুলিমিয়া নামের গুরুতর মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে কী হয়, জানেন?

বুলিমিয়া নার্ভোসা একটি গুরুতর খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি অল্প সময়ে পরিমাণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন, যাকে বলে ‘বিঞ্জ ইটিং’। তারপরই অতিরিক্ত খাওয়া নিয়ে তার ভেতরে খারাপ লাগা কাজ করতে শুরু করে। এই খারাপ লাগা মূলত মানসিক। সেখান থেকেই শুরু হয় অতিরিক্ত খাওয়ার ‘ক্ষতিপূরণমূলক আচরণ’। এরপর ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে বমি করা, অতিরিক্ত ব্যায়াম করা, দীর্ঘ সময় না খাওয়া বা জোলাপের অপব্যবহারের মতো কর্মকাণ্ডও করেন।

জোলাপের অপব্যবহার কী

জোলাপ (ল্যাক্সেটিভ) হলো এমন ওষুধ, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, মলত্যাগ সহজ করতে ব্যবহৃত হয়। বুলিমিয়া নার্ভোসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে বারবার বা অতিরিক্ত মাত্রায় জোলাপ গ্রহণ করেন।

অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করেন, জোলাপ খেলে খাবার শরীর থেকে বের হয়ে যাবে, ক্যালরি শোষিত হবে না, ফলে ওজন কমবে, যা একেবারেই ভুল ধারণা।

বাস্তবে অধিকাংশ ক্যালরি ও পুষ্টি উপাদান ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়ে যায়, আর জোলাপ মূলত বৃহদান্ত্রে কাজ করে। তাই জোলাপ খেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালরি কমানো যায় না।

বরং দীর্ঘদিন জোলাপের অপব্যবহারে পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন), শরীরে পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ঘাটতি, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন থেকে শুরু করে কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

কী হয় এই রোগে

এই রোগীরা মূলত একা খান। কারও সামনে সহজে খেতে পারেন না। বুলিমিয়া নার্ভোসার প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে—

- ওজন বেড়ে যাওয়ার তীব্র ভয়

- বারবার অতিরিক্ত খাবার খাওয়া

- খাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি

- একা প্রচুর খাবার খাওয়া

- খাওয়ার পর অপরাধবোধ

- ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা

- অতিরিক্ত ব্যায়াম

- দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা

- নিজের শরীর ও ওজন নিয়ে অতিরিক্ত অসন্তোষ

- মেজাজের চরম ওঠানামা ইত্যাদি

স্বাস্থ্যঝুঁকি

চিকিৎসা না হলে বুলিমিয়া থেকে—

- দাঁতক্ষয় ও মাড়ির রোগ

- পানিশূন্যতা

- কিডনির সমস্যা

- অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন

- হৃদ্‌যন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি

- গলাব্যথা বা দাঁতের এনামেল ক্ষয় (বমির অ্যাসিডের কারণে)

- শরীরে লবণ ও খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া

- খাদ্যনালির ক্ষত ও অপুষ্টি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে

এমনকি গুরুতর মানসিক সমস্যা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কেন হয় বুলিমিয়া নার্ভোসা

সঠিক কারণ জানা যায়নি, তবে কয়েকটি বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়—

- জিনগত বা পারিবারিক প্রভাব

- বিষণ্নতা ও উদ্বেগ

- আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধের অভাব

- শৈশবের মানসিক আঘাত

- ওজন ও সৌন্দর্য নিয়ে সামাজিক চাপ

- কঠোর ডায়েটিং বা বারবার ওজন কমানোর চেষ্টা

বাইরে থেকে বোঝা কঠিন

অ্যানোরেক্সিয়ার মতো বুলিমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ওজন সব সময় কম হয় না। অনেকের ওজন স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে। তাই শুধু শরীর দেখে রোগটি শনাক্ত করা যায় না।

মডেলদের মধ্যে কেন বেশি আলোচিত

ফ্যাশন ও মডেলিং জগতে শরীরের গঠন নিয়ে প্রচণ্ড চাপ, রোগা থাকার প্রত্যাশা ও ওজন নিয়ে ক্রমাগত মূল্যায়ন চলে। এসবের কারণে মডেল ও সেলিব্রিটির মধ্যে বুলিমিয়া ও অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্তের হার তুলনামূলক বেশি। তবে এটি কেবল মডেলদের রোগ নয়। যেকোনো লিঙ্গ, পেশা বা বয়সের মানুষের হতে পারে।

অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়ার মধ্যে পার্থক্য

অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়ার মধ্যে কিছু মিল আছে, তবে পার্থক্যও স্পষ্ট। অ্যানোরেক্সিয়ায় খাবার খুব কম খাওয়া হয়। ওজন সাধারণত খুব কম হয়। অপুষ্টি দ্রুত চোখে পড়ে।

অন্যদিকে বুলিমিয়ায় জোরপূর্বক কম খাওয়ার চাপের কারণেই অনেক সময় ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলা হয়। কম খাওয়ার চাপের বিপরীতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অতিরিক্ত খাবারের চাহিদা তৈরি হয়।

খাওয়ার পর অত্যন্ত অপরাধবোধ কাজ করে। তাই অস্বাস্থ্যকর উপায়ে তা ‘পুষিয়ে দেওয়ার’ চেষ্টা করা হয়। ওজন অনেক সময় স্বাভাবিক থাকে। ঠিক এ কারণেই বাইরে থেকে রোগটি দীর্ঘ সময় সুপ্ত থাকতে পারে।

বুলিমিয়া চিকিৎসাযোগ্য। সাধারণত মনোচিকিৎসা; বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি, পুষ্টি পরামর্শ, পরিবারভিত্তিক সহায়তা ও প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ওষুধ এর মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।

একটি ভুল ধারণা

কেউ কেউ মনে করেন, বমি করে ফেললে সব ক্যালরি শরীর থেকে বের হয়ে যায়। বাস্তবে তা হয় না। তাই বুলিমিয়া ওজন কমানোর কার্যকর বা নিরাপদ উপায় নয়। এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক

বুলিমিয়া নার্ভোসা একটি গুরুতর খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি অল্প সময়ে পরিমাণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন, যাকে বলে ‘বিঞ্জ ইটিং’
বুলিমিয়া নার্ভোসা একটি গুরুতর খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি অল্প সময়ে পরিমাণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন, যাকে বলে ‘বিঞ্জ ইটিং’। ছবি: পেক্সেলস

ভারত জোর করে মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে: এইচআরডব্লিউ

এইচআরডব্লিউ মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ছাড়া মানুষকে খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া ফেলে রাখাটা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

ভারতের কর্তৃপক্ষ পশ্চিমবঙ্গে বসবাসরত অনেক মুসলিম বাঙালিকে ন্যূনতম আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছে উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। তারা মনে করে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। গতকাল মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে মানবাধিকার সংস্থাটি এমন উদ্বেগ জানিয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে নির্মমভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিচ্ছে বা সীমান্তে আটকে রেখে দিচ্ছে, তাদের মৌলিক মানবাধিকারকে উপেক্ষা করছে। সরকারকে (ভারত) অবৈধভাবে মানুষকে বহিষ্কার বন্ধ করতে হবে, যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে এবং মুসলিমদের প্রতি এই উদ্বেগজনক বৈরিতার অবসান করতে হবে।’

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিবি) বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে এখন পর্যন্ত ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের চালানো এ ধরনের ২১টি চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। এই ২১ ঘটনায় শিশুসহ ২০০ জনের বেশি মানুষকে বাংলাদেশের সীমান্ত জেলাগুলোতে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, মার্চের নির্বাচনে তাঁর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জয় পাওয়ার পর তাঁর সরকারের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’ নীতির আওতায় শত শত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে আটক করা হয়েছে। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, তারা ৯ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাঁরা বলেছেন, বিএসএফের সদস্যরা রাতে দলে দলে মানুষকে সীমান্তে এনে কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে বিজিবি প্রবেশে বাধা দিলে পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা সেই মানুষদের আবার ফিরে যেতে দেয়।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা পঞ্চগড়ে ৫ জুন শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা হলে ৭৫ ঘণ্টার দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল হোসেন এইচআরডব্লিউকে বলেন, ওই দলটি বাংলাদেশের ভেতরে প্রায় ৫০ ফুট জায়গা পর্যন্ত ঢুকে পড়েছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বিষয়টি বিজিবিকে জানান। পরে বিজিবির সদস্যরা সেখানে পৌঁছালে তাঁরা পিছু হটে নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নেন।

আটকে পড়া ব্যক্তিদের অবস্থা বর্ণনা করে প্রত্যক্ষদর্শী রুবেল হোসেন বলেন, প্রথম রাতে ওই মানুষগুলো প্রচণ্ড বজ্রপাত ও ভারী বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নিচে ছিল। দ্বিতীয় দিনে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কিছু শুকনা খাবার সরবরাহ করে।

রুবেল বলেন, ‘আমি যা দেখেছি, তা ছিল যুদ্ধের মতো এক অচলাবস্থা। সেখানে বিএসএফ ও বিজিবি দুই পক্ষেরই বড় সংখ্যার সদস্য মোতায়েন ছিল।’

রুবেল হোসেন আরও বলেন, সীমান্তে দুই বাহিনীর মধ্যে বারবার স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার চেষ্টা করা হলেও কোনো সমাধান হয়নি। শেষ পর্যন্ত বিএসএফ দলটিকে আবার ভারতের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

৬ জুন ভোরে বিএসএফের সদস্যরা দুটি বাঙালি মুসলিম পরিবারের ছয় সদস্যকে বাংলাদেশের তেঁতুলবাড়িয়া সীমান্তের দিকে ঠেলে দেন। বিজিবি তাদের প্রবেশে বাধা দেয়। বিএসএফও তাদের ভারতে ফিরতে দেয়নি। এমন অবস্থায় পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হয়। পরদিন তাদের আবার ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

বিজিবির বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮ জুন ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রায় ৪৮ ঘণ্টা শূন্যরেখায় (সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডের সরু অংশে) আটকে থাকার পর বিএসএফ ১১ জনকে ভারতের দিকে ফিরিয়ে দেয়। তাঁদের মধ্যে এক গর্ভবতী নারীও ছিলেন।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মার্চে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ঠিক আগে ভারতের নির্বাচন কমিশন তাড়াহুড়া করে ভোটার তালিকায় নিবীড় সংশোধন (এসআইআর) আনে। এর মাধ্যমে ৯০ লাখের বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এতে অনেকের মধ্যে আটক ও বহিষ্কারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

২০১৯ সালে ভারতের আসাম রাজ্যে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের একটি ত্রুটিপূর্ণ ও বৈষম্যমূলক প্রক্রিয়ার কারণে ১৯ লাখের বেশি মানুষ রাষ্ট্রহীন অবস্থার মধ্যে পড়ে যান। এরপর হাজার হাজার বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে আটককেন্দ্রে রাখা হয় এবং অনেককে অবৈধভাবে বহিষ্কার করা হয়।

এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বারবার রাজ্যের বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের সীমান্তের কাছাকাছি একটি সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে যাই এবং সেখান থেকে সরাসরি সীমান্ত পার করে দিই। সেখানে এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে যে কিছু কথিত অবৈধ বাংলাদেশি নিজেরাই ফিরে যেতে শুরু করেছে।’

পঞ্চগড়ের বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম বলেন, পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাদের কাছে ভারতের আধার কার্ড ছিল, তবে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় পুলিশ তাদের আটক করে বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করেছিল। বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে।

হাসিবুল বলেন, পরিবারটির সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি চারবার ভোট দিয়েছেন। কিন্তু চলতি বছর তাঁদের কেউ ভোট দিতে পারেননি। কারণ, তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

তিন দিন সীমান্তে আটকে থাকার পর শেষ পর্যন্ত পরিবারটিকে আবার ভারতে ফিরে যেতে দেওয়া হয়।

ভারতীয় কর্মকর্তাদের দাবি, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি অবৈধভাবে ভারতে বসবাস করছেন এবং তাঁদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার জন্য সহায়তার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সে প্রসঙ্গ টেনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিকার অর্থে স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরতে চান, তাহলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী তাঁকে সহায়তা করা যেতে পারে, কিন্তু কাউকে জোর করে দেশে ফেরত পাঠানো বা বহিষ্কার করা উচিত নয়।

সংস্থাটি আরও বলেছে, সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া কয়েকজনের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের পরিচয়পত্র, অর্থ ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের কর্তৃপক্ষ শত শত কথিত অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে বিভিন্ন অস্থায়ী আটককেন্দ্রে আটকে রেখেছে। আটক ব্যক্তিদের বেশির ভাগ মুসলিম হলেও তাঁদের মধ্যে কিছু হিন্দুও আছেন।

এক ভারতীয় অধিকারকর্মী এইচআরডব্লিউকে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর আটককেন্দ্রে আনুমানিক ৪০০ ব্যক্তি আটক আছেন। তাঁদের অনেককেই ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার পর আটক করা হয়েছে।

ওই অধিকারকর্মী মনে করেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়াটা এখন গ্রেপ্তার, আটক ও বহিষ্কারের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষও বলেছে, আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো কাউকে গ্রহণ করা হবে না। তাদের মতে, কাউকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে যথাযথ পরিচয় যাচাই এবং বিদ্যমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ এবং সব ধরনের জাতিগত বৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী ভারত সবার অধিকার সুরক্ষিত রাখতে বাধ্য। একই সঙ্গে জাতি, বর্ণ, বংশপরিচয়, জাতীয়তা বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে যেন নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত না করা হয়, তা–ও ভারতকে নিশ্চিত করতে হবে।

সংস্থাটির মতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে আটক বা বহিষ্কার করাটা মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এ ছাড়া মানুষকে খাদ্য, পানি, আশ্রয় বা চিকিৎসাসেবা ছাড়া ফেলে রাখাটা নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের শামিল হতে পারে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, যাঁদের বহিষ্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে, তাঁদের জন্য ভারত সরকারের মৌলিক আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। এর মধ্যে বহিষ্কারের কারণ সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য জানার সুযোগ, আইনজীবীর সহায়তা পাওয়ার অধিকার এবং বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থাকতে হবে।

সংস্থাটি আরও বলেছে, শিশুদের বহিষ্কার করা বা সীমান্তে আটকে রাখাটা জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের লঙ্ঘন। এই সনদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো শিশুদের জাতীয়তার সুরক্ষা দিতে বাধ্য। সনদটি অন্যায়ভাবে শিশুদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া নিষিদ্ধ করেছে।।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নাগরিকত্ব যাচাই এবং নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফেরত পাঠানোর জন্য দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষ এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ না করায় অনেক মানুষ দুই দেশের সীমান্তরক্ষা বাহিনীর পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে আটকে পড়ছেন, যা তাঁদের মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘জাতীয়তা যা-ই হোক না কেন, কোনো মানুষকে দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাঝখানে খোলা মাঠে রাত কাটাতে বাধ্য করা উচিত নয়।’

এ ধরনের বহিষ্কার অভিযান বন্ধ করার জন্য মীনাক্ষী ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কারণে আর কখনো মানুষের মৌলিক মর্যাদা যেন ক্ষুণ্ন না হয়, তা দুই দেশের সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ছয়জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে ছয়জনকে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। ছবি: প্রথম আলো

মসজিদে আগুন দিয়ে হিব্রুতে স্লোগান লিখে গেলেন ইসরায়েলিরা

ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরের মধ্যাঞ্চলীয় শহর রামাল্লার উত্তরে অবস্থিত জিলজিলিয়া ও মাজরা আল-নুবানি গ্রামে দুটি মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বুধবার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা মসজিদ দুটির বিভিন্ন অংশে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং দেয়ালে হিব্রু ভাষায় স্লোগান লিখে যায়। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, ভোরে একদল বসতি স্থাপনকারী জিলজিলিয়া গ্রামে প্রবেশ করে স্থানীয় মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেয়। এতে মসজিদের নারীদের নামাজের অংশ পুড়ে যায় এবং ভবনের বাইরের দেয়ালেরও ক্ষতি হয়।

বাসিন্দাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জিলজিলিয়া গ্রামে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা বেড়েছে। গত মাসেও তারা গ্রামটিতে হামলা চালিয়ে একটি ভেড়ার পাল নিয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে পৃথক আরেক ঘটনায় মাজরা আল-নুবানি গ্রামেও একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এতে মসজিদের বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলাকারীরা দুই মসজিদের দেয়ালেই হিব্রু ভাষায় বিভিন্ন স্লোগান লিখে রেখে যায়।

স্থানীয় ও মানবাধিকার সূত্রগুলোর দাবি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক সময়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে হামলা, অগ্নিসংযোগ, জমি দখল এবং কৃষকদের নিজ জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনা বেড়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলি বসতিগুলোর আশপাশের এলাকায় এসব ঘটনা বেশি ঘটছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে পশ্চিম তীরে সহিংসতা বৃদ্ধির ফলে অন্তত ১,১৬৯ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১২,৬৬৬ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে প্রায় ২৩ হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে এবং প্রায় ৩৩ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। 

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

মার্কিন নৌ অবরোধ উপেক্ষা করে আরব সাগরে ইরানের ৩ জাহাজ

গত দুই মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের ৩টি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন নৌ অবরোধ অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটগুলো।

বুধবার (১৭ জুন) বিবিসি যাচাই করে দেখেছে, নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির এই তিনটি জাহাজ তেলভর্তি অবস্থায় অবরোধরেখা অতিক্রম করে আরব সাগরে প্রবেশ করেছে।

জাহাজগুলোর অবস্থান শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালু থাকলেও, সেগুলো কোথায় যাচ্ছে সে তথ্য প্রকাশ করেনি বিবিসি।

এদিকে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী ইরান কোনো ধরনের স্বয়ংক্রিয় সুবিধা পাবে না। চুক্তির সব শর্ত বাস্তবায়ন করলেই কেবল তেহরান এর সুফল ভোগ করতে পারবে।

মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, এ চুক্তি কাজের বিনিময়ে সুবিধা নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, ইরান প্রতিশ্রুতি পূরণ করলে তবেই তারা অর্থনৈতিক বা অন্য সুবিধা পাবে। 

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে নানান চিন্তা আসে কেন?

রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে পড়ার পর ২টা থেকে ৩টা নাগাদ হঠাৎ আপনার ঘুম ভেঙে যায়? কিংবা নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটলে এই উদ্বেগে ভোগেন যে প্রয়োজনমতো ঘুম হচ্ছে না?

কারো কারো মতে স্ট্রেস বা মানসিক চাপের কারণে এমনটা হতে পারে। আবার কারো ক্ষেত্রে এটা একটা গুরুতর সমস্যা। তবে এটা ঠিক যে হঠাৎ ঘুম কমে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যার ইঙ্গিত বহন করে।

ঘুম গভীর ও পর্যাপ্ত হওয়া এবং স্ট্রেসের পরিমাণ যতটা সম্ভব কম রাখা নয়া উদ্যমে পরের দিন শুরুর জন্যই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয়, সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্যও এটা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকরাও ভালো এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম ও বিশ্রামের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

ঘুম একটা নিরবিচ্ছিন্ন অবস্থা নয়। এর বিভিন্ন পর্যায় রয়েছে, যেমন লাইট স্লিপ বা পাতলা ঘুম, অর্থাৎ যে অবস্থায় ঘুমিয়ে থাকলেও আমরা সতর্ক থাকি।

তাছাড়া রয়েছে- গভীর ঘুম এবং স্বপ্ন (র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ বা আরইএম স্লিপ) দেখার পর্যায়।

এ চক্রটি প্রতি ৯০ মিনিট অন্তর পরিবর্তিত হয়। আরইএম পর্যায় বলতে বোঝায় ‘র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট স্লিপ’। অর্থাৎ যে সময় চোখের তারার ঘোরাফেরা লক্ষ্য করা যায়। এই পর্যায়ের সাথে আমাদের স্বপ্ন দেখার সম্পর্ক রয়েছে। স্মৃতির প্রক্রিয়াকরণ ও একত্রিত করার ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

সাধারণত, রাতের প্রথম দিকে গভীর ঘুম হয়, আর ভোরের দিকে ঘুমের মাঝেও আমরা সতর্ক অবস্থায় থাকি। ২টা থেকে ৩টা নাগাদ মূলত হাল্কা ঘুম হয় এবং ছোটখাটো কারণে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটার সম্ভাবনা থাকে।

অনেক সময় মানসিক চাপ, হরমোনের পরিবর্তন, লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রায় বদল কিংবা স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে ঘুম কমে যেতে পারে। অনেক সময় একবার ঘুম ভেঙে গেলে তারপর ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়ে।

এর কারণ কী, বিষয়টা কতটা উদ্বেগের এবং চিকিৎসকরা সে সম্পর্কে কী বলছেন জেনে নেয়া যাক।

২টা থেকে ৩টা নাগাদ ঘুম হারানোর কারণ

রাত ২টা থেকে ভোর ৩টার মধ্যে ঘুম হারানোর নেপথ্যে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়ি।

সার্কাডিয়ান ছন্দ বলতে শরীরের এমন এক প্রাকৃতিক ও অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে বোঝায়, যা ২৪ ঘণ্টায় আমাদের ঘুম ও সজাগ থাকার চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ভোরের দিক থেকে আমাদের শরীর ধীরে ধীরে পরের দিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে। কর্টিসল নামক যে হরমোন রয়েছে, সেটা আমাদের জেগে উঠতে সাহায্য করে।

অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হওয়া কর্টিসল এক প্রকার অত্যাবশ্যকীয় স্টেরয়েড হরমোন যা আমাদের মানসিক চাপ-সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া, বিপাক, রক্তচাপ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। এটা শরীরের সার্কাডিয়ান ছন্দ মেনে চলে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে কর্টিসলের মাত্রা এত ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় যে আমরা সেটা বুঝতে পারি না।

কিন্তু যদি আপনি ক্রমাগত মানসিক চাপের সম্মুখীন হন, উদ্বিগ্ন থাকেন বা ঘুমের সমস্যা দেখা দেয় তাহলে হতে পারে যে আপনার শরীরে কর্টিসলের মাত্রা ইতোমধ্যে বেশি।

কর্টিসলের মাত্রা বাড়লে সতর্ক হওয়ার জন্য মস্তিষ্কে একটা সঙ্কেত যায় যা ঘুমকে ব্যাহত করে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাতে হঠাৎ ঘুম থেকে ওঠাটাই কিন্তু একমাত্র সমস্যা নয়। একবার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটার পর আবার ঘুমিয়ে পড়তে না পারাটাও সমস্যার।

এর নেপথ্যে ক্রমাগত দুশ্চিন্তা, কাজ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়া বা ‘ঘুম না পাওয়া’ সম্পর্কে উদ্বেগের মতো বিষয়গুলো কাজ করতে পারে।

মুম্বাই লাগোয়া পানভেলের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা: ঋষভ ভার্মার বলেন, ‘এটা আপনার শরীরের জৈবিক ঘড়ির ওপর নির্ভর করে। আপনি যদি সাধারণত রাত ১০ থেকে ১১টায় ঘুমাতে যান, তবে ভোর ৩টা আপনার শরীরের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ ততক্ষণে ঘুমের বেশিভাগটাই সম্পন্ন হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রাত ২টা থেকে ৩টা নাগাদ আপনার শরীর ধীরে ধীরে পরের দিনের জন্য প্রস্তুত হতে শুরু করে। দেহের তাপমাত্রা সর্বনিম্ন স্তরে চলে যায়, ঘুম পাতলা হয়ে আসে এবং একইসাথে শরীরের অভ্যন্তরীণ সিস্টেম ধীরে ধীরে আবার সক্রিয় হতে থাকে। তাই সেই সময় আপনার পাশে শুয়ে থাকা ব্যক্তির একটু নড়াচড়া বা সামান্য শব্দ কিংবা আপনার মাথায় যে চিন্তা চলছে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।’

ঘুমে এরকম ব্যাঘাত স্বাভাবিক কি-না, এই প্রশ্নের জবাবে ডা: ভার্মা বলেন, ‘এটা খুবই স্বাভাবিক। লাখ লাখ বছর আগে, রাতে কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকা আমাদের পূর্বপুরুষদের আশপাশের বিপদ সম্পর্কে সচেতন হতে সাহায্য করত। ঘুম নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, একজন সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি রাতে দুই থেকে চারবার জাগেন।’

জেগে থাকার এই চক্র সাধারণত কয়েক সেকেন্ডের হয় এবং তারপর আবার আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে এটা মনে পড়ে না। কিন্তু যখন রাতে আমরা সম্পূর্ণ সজাগ থাকি, মস্তিষ্ক কাজ করে তখন আবার ঘুমিয়ে পড়া প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। সমস্যার সূত্রপাত এখান থেকেই।

সার্কাডিয়ান ছন্দ ও ঘুমের চক্র

মস্তিষ্কের সুপ্রাকিয়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াস নামক অংশ সার্কাডিয়ান ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করে। এটা আমাদের মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে অবস্থিত একটা ক্ষুদ্র অংশ। শরীরের এই অংশটা দিন-রাত চক্রের সাথে আমাদের বিভিন্ন কার্যকলাপের একটা সমন্বয় তৈরি করে।

ভোরের দিকে আমাদের শরীর ঘুম থেকে ওঠার প্রস্তুতি নেয়। সেই সময় কর্টিসলের মাত্রা কম থাকলেও ঘুম থেকে ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে তা বাড়তে থাকে।

এই সময় গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যায় এবং আরইএম স্লিপ বেড়ে যায়। আরইএম স্লিপ মস্তিষ্কের ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি করে। তাই এই পর্যায়ে জেগে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ঘুমের চক্র এবং জেগে ওঠার সাথে এর সম্পর্কের বিষয়ে ডা: ভার্মা বলেছেন, ‘আমাদের ঘুমের চক্র রয়েছে এবং প্রতিটা চক্র প্রায় ৯০ মিনিট দীর্ঘ। তবে রাত বাড়ার সাথে সাথে ঘুমের প্রকৃতি বদলায়।’

রাতের প্রথমার্ধে অর্থাৎ রাত ২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সাধারণত পাতলা ঘুম হয় এবং আরইএম স্লিপ দেখা যায়। ভোর ৩টার কাছাকাছি সময়টা হালকা ঘুম হয় বা আমরা স্বপ্ন দেখি। স্বপ্ন দেখার কারণে মস্তিষ্ক ইতোমধ্যে বেশ সক্রিয় থাকে। তাই সামান্যতম ব্যাঘাতও ঘুম কাড়তে পারে।

রাতে ঘুমানোর ক্ষেত্রে হরমোন ও মস্তিষ্কের ভূমিকা কী?

কর্টিসলের পাশাপাশি অন্যান্য হরমোনগুলোর ভূমিকাও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়ে আমরা মুম্বাইয়ের ওখার্ড হাসপাতালের কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট ডা: প্রশান্ত মাখিজার কাছে জানতে চেয়েছিলাম।

কর্টিসল ছাড়া অন্য কোনো হরমোন এর জন্য দায়ী জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেছিলেন, ‘ঘুম নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটা হরমোনের সম্মিলিত প্রভাব দেখা যায়। মেলাটোনিন, যা ঘুমের হরমোন হিসেবে পরিচিত, সেটা রাতের দিকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে নিঃসরণ হয়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা ধীরে ধীরে কমে। মেলাটোনিনের মাত্রা কমলে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।’

অন্যান্য হরমোনের ভূমিকা সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘কর্টিসল একটা হরমোন যা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে উৎপন্ন হয়। ঘুম থেকে ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে এর মাত্রা বেড়ে যায় এবং সেটা শরীরকে সজাগ রাখতে সাহায্য করে। অ্যাড্রেনালিন ও নোরড্রেনালিন হরমোন তীব্র সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে উদ্বেগ, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, প্যানিক ডিসঅর্ডার বা হঠাৎ জেগে ওঠার জন্য দায়ী হতে পারে।’

এছাড়া গ্রোথ হরমোন, ইনসুলিন ও প্রজনন হরমোনগুলোও ঘুমের গুণমানের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে।

ভোর ৩টায় ঘুম ভাঙার পর চিন্তা আসে কেন?

এই প্রশ্নের জবাবে ডা: প্রশান্ত মাখিজা বলেছেন, এর পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়বিক কারণ রয়েছে।

রাতের বেলা আমাদের আশপাশে কোলাহল কম, মন বিভ্রান্ত হওয়ার উপাদানও কম থাকে। তাই হঠাৎ ঘুম পাতলা হয়ে এলে আমাদের মস্তিষ্ক অসমাপ্ত কাজ, আর্থিক সমস্যা, কাজের চাপ বা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তার দিকে বেশি মনোনিবেশ করতে শুরু করে।

ডা: মাখিজা বলেন, ‘আরইএম স্লিপের সময় আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশটা সংবেদনশীল বিষয়গুলোর সাথে থাকে, সেটা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তুলনামূলকভাবে যুক্তি এবং সমস্যা সমাধানের সাথে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ কম সক্রিয় থাকে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এই কারণে উদ্বেগ ও সমস্যাগুলো দিনের চেয়ে রাতে আরো বেশি গুরুতর বলে মনে হতে পারে। উদ্বেগজনিত ব্যাধি, ডিপ্রেশন, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস ও বার্নআউটের সাথে যুঝছেন, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এরকম হওয়াটা স্বাভাবিক।’

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে আবার না ঘুমোতে পারার বিষয়টা ব্যক্তি বিশেষে আলাদা। এই প্রসঙ্গে ডা: মাখিজা জানিয়েছেন, এসব ক্ষেত্রে কেউ কেউ যেমন তৎক্ষণাৎ ঘুমিয়ে পড়েন, কেউ আবার এই অবস্থায় কয়েক ঘণ্টা জেগে থাকেন।

তিনি বলেন, ‘এটা মূলত আমাদের মানসিক ও শারীরিক উদ্দীপনার স্তরের ওপর নির্ভর করে। যারা ঘুম ভাঙার পর শান্ত থাকেন, তারা সহজেই আবার ঘুমিয়ে পড়তে সক্ষম হন। তবে যারা ভাবেন- আমাকে ঘুমাতে হবে বা আগামীকাল হয়ত খারাপ কাটতে পারে, তাদের মানসিক চাপ বেড়ে যায়। পুনরায় ঘুম আসতে তাদের সময় লাগে।’

ডা: মাখিজা আরো বলেন, ‘উদ্বেগ, বিষণ্নতা, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, স্লিপ অ্যাপনিয়া, রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম, থাইরয়েড, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা বা নির্দিষ্ট ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণেও কেউ কেউ পুরো রাত জেগে থাকেন।’

রেস্টলেস লেগ সিনড্রোম এক জাতীয় স্নায়ুজনিত সমস্যা যেখানে পায়ে অস্বস্তি বা যন্ত্রণা অনুভব হতে পারে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি ক্রমাগত পা ক্রমশ নাড়ান।

এ ক্ষেত্রে বয়স ও ঘুমের অভ্যাস কতটা প্রভাব ফেলে জানতে চাওয়ায় ওই বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘হ্যাঁ, এরা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। আমাদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাতলা ঘুমের পর্যায় আরো বিক্ষিপ্ত হতে থাকে। গভীর ঘুমের পরিমাণ কমে যাওয়ায় বয়স্ক ব্যক্তিদের রাতে ঘুম থেকে ওঠার সম্ভাবনা বেশি থাকে।’

ডা: মাখিজা বলেন, ‘কারো কারো অভ্যাস তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাওয়া। আবার অনেকের দেরি করে ওঠার অভ্যাস। তাদের দেহের প্রাকৃতিক জৈবিক ঘড়ির ওপর নির্ভর করে ঘুম এবং জেগে থাকার সময় পরিবর্তিত হতে পারে। অনিয়মিত কাজের সময়, শিফট ডিউটি বা অবিচ্ছিন্ন ভ্রমণ আমাদের সার্কাডিয়ান ছন্দের ব্যাঘাত ঘটাতে এবং রাতে ঘুমের ব্যাঘাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।’

যে সময় আমরা খাবার খাচ্ছি তা ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে কি-না জানতে চাওয়ায় তিনি বলেছেন, ‘ঘুমের সাথে এর কিছু সম্পর্ক রয়েছে। তাড়াতাড়ি খাবার খেলে মাঝরাতে খিদে পেতে পারে এবং রক্তে সুগারের মাত্রা কমে যাওয়ায় ঘুমও ভাঙতে পারে।’

ডা: মাখিজা আরো বলেন, ‘ঘুমাতে যাওয়ার আগে ভারী খাবার খেলে বদহজম, অ্যাসিডিটি, পেটে ফাঁপাভাব বা অস্বস্তির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটা ঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে। অত্যাধিক অ্যালকোহল সেবন করলে রাতের প্রথম দিকে ঘুম হলেও পরে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তা ছাড়া বিকেল বা সন্ধ্যায় অতিরিক্ত ক্যাফিন খাওয়াও ঘুমে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।’

হাইড্রেশন ও শরীরের তাপমাত্রা এই ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। জবাবে ডা: মাখিজা বলেছেন, ‘শরীরে পানির অভাব হলে ড্রাই মাউথ (মুখের ভেতর শুষ্ক অনুভব করা) হতে পারে। তৃষ্ণা, মাথা ব্যথা বা অস্থিরতাও অনুভূত হতে পারে। ঘুমের সময় স্বাভাবিকভাবেই শরীরের তাপমাত্রা কমে যায়। ঘর খুব গরম, আর্দ্র বা পরিবেশ অস্বস্তিকর হলেও ঘুম ব্যাহত হতে পারে। শব্দ হওয়া, আরামদায়ক গদি না হওয়া বা ঘরে ভালোভাবে বায়ু চলাচল না করলেও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘একজন চিকিৎসকের পক্ষেই স্বাভাবিক ঘুম আর অনিদ্রার মধ্যে পার্থক্য বোঝা সম্ভব। রাতে কিছু সময় ঘুম ভাঙা স্বাভাবিক এবং তাতে চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে যদি কোনো ব্যক্তি টানা জেগে থাকেন বা আবার ঘুমিয়ে পড়তে সমস্যা হয়, তাহলে তাকে মেইন্টেনেন্স ইনসোমিয়া বলে।’

স্ক্রিন টাইমের প্রভাব

ডা: ঋষভ ভার্মার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল যে স্ক্রিন টাইম, দেরি করে খাওয়া এবং অ্যালকোহল পান ঘুমের ধরণ বদলাতে পারে কি-না।

তিনি জানিয়েছেন যে এ তিনটি বিষয়ই ঘুমের ওপর প্রভাব ফেলে।

কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, ‘ভোর ৩টায় ঘুম ভাঙার একটা বড় কারণ অ্যালকোহল হতে পারে। অ্যালকোহল পান করলে প্রাথমিকভাবে ঘুম পেতে পারে, কিন্তু পরের তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে যখন যকৃৎ সেটাকে বিপাক করে, তখন তা উত্তেজক হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। এটা আপনার ঘুমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, বিশেষত যখন ভোরের দিকে লাইট স্লিপ সাইকেল চলে।’

বেশি রাতে খাওয়া বা ঘুমানোর আগে ভারী খাবার বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খেলে তা হজম করার জন্য শরীরকে কাজ চালিয়ে যেতে হয়। তাছাড়া উচ্চ মাত্রায় চিনি আছে এমন খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তার কয়েক ঘণ্টা পর হঠাৎ সেই মাত্রা কমে যায়। রক্তে শর্করার মাত্রা কম থাকলে শরীরকে স্থিতিশীল রাখতে স্ট্রেস হরমোন নিঃসরণ হয়।

অন্যদিকে, গভীর রাতে ফোন বা ট্যাব ব্যবহার করলে চোখের ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। কারণ ফোনের স্ক্রিন থেকে নীল আলো বের হয়। ফলে মস্তিষ্ক ভাবতে থাকে এটা দিন এবং ঘুমের সাথে সম্পর্কিত যে প্রাকৃতিক সঙ্কেত রয়েছে সেখানেও এর প্রভাব পড়ে। সব মিলিয়ে ঘুমে বিঘ্ন ঘটে।

ভালো ঘুমের জন্য কী করতে পারি?

রাতে মস্তিষ্ক ক্রমাগত জেগে না থেকে যাতে ঘুমিয়ে পড়ে তার জন্য আমরা মগজকে প্রশিক্ষণ দিতে পারি। এক্ষেত্রে সন্ধ্যা থেকে প্রস্তুতি নেয়া, নিজেকে শান্ত করা এবং মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাওয়া সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করা দরকার। এক্ষেত্রে আমরা যা করতে পারি-

১. ঘুমাতে যাওয়ার এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে মোবাইল ও টিভি ইত্যাদির স্ক্রিন থেকে দূরে থাকতে হবে।

২. ঘুমানোর কমপক্ষে এক ঘণ্টা আগে ফোন, ট্যাব ও কম্পিউটার বন্ধ করে দিতে পারি। তার পরিবর্তে খুব বেশি আলো নেই এমন ঘরে গিয়ে আমরা বই পড়তে বা মন ছুঁয়ে যায় এমন গান শুনতে পারি। এতে আমাদের মস্তিষ্কে এই সঙ্কেত যাবে যে দিন শেষ হয়ে গিয়েছে।

৩. ঘুমানোর তিন ঘণ্টা আগে কী খাচ্ছি, সেদিকে মনোযোগ দেয়াও দরকার।

৪. ঘুমানোর আগে অ্যালকোহল পান করা এবং গভীর রাতে ভারী বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। খিদে পেলে রক্তে শর্করাকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে এমন খাবার যেমন-প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া দরকার। যদি রাত ২টা থেকে ৩টার সময় ঘুম ভেঙে যায়, তাহলে ২০ মিনিটের এই নিয়ম মেনে চলা যেতে পারে।

৫. সেই সময় ফোন ঘাঁটা চলবে না। কারণ যখনই দেখবেন যে ভোর সাড়ে ৩টা বা সোয়া ৩টা বাজে, তখনই মগজ হিসেব করবে আর কত ঘণ্টা ঘুম বাকি। এটা স্ট্রেস বাড়িয়ে তোলে। ওই সময় ঘুম ভাঙার পর যদি ২০ মিনিটের মতো বিছানায় শুয়েও ঘুম না আসে- তাহলে উঠে বসা এবং নিজেকে ধীরে ধীরে শান্ত করা দরকার।

৬. অন্য ঘরে গিয়ে বা আবছা আলোতে আরামদায়ক চেয়ারে বসা যেতে পারে, যাতে মনে শান্তি এবং স্বাচ্ছন্দ্য আসে। একটা সহজ কিছু যেমন ম্যাগাজিন পড়া বা ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাস ফেলার ব্যায়াম করা যায়। চোখের পাতা ভারী না হওয়া পর্যন্ত বিছানায় ফিরে যাওয়া চলবে না। এটা মনকে জানান দেবে যে, বিছানাটা আসলে আরামে ঘুমের জন্য, চিন্তা করার জন্য নয়।

৭. জীবনযাত্রায় বড়-সড় পরিবর্তন আনতে, ডায়েট পরিবর্তন করতে, ওষুধ খেতে বা ব্যায়াম করতে হলে চিকিৎসক বা যোগ্য প্রশিক্ষকের পরামর্শ নেয়া দরকার।

৮. প্রয়োজনে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে শারীরিক পরীক্ষা করাতে হবে। যে লক্ষণ চোখে পড়েছে সে বিষয়ে ডাক্তারকে জানানো দরকার এবং তার পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাত্রায় বদল আনতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই নিজে নিজে ওষুধ খেলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

সূত্র: বিবিসি

ঘুমে ব্যাঘাতের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে
ঘুমে ব্যাঘাতের পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। সংগৃহীত

সময় বদলালেও যে খাবার এখনো হারিয়ে যায়নি

‘গরুর গোশতের শুঁটকি’- একসময় যে খাবারটি মূলত গ্রামের ঘরোয়া সংরক্ষণ পদ্ধতির অংশ ছিল, এখন সেটিই ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে অনলাইন ব্যবসা, ফুড ভ্লগ আর শহুরে খাবারের তালিকায়।

বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় কোরবানির গোশত সংরক্ষণের উপায় হিসেবে অনেক পরিবার গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরি করতো।

আগেকার দিনে আজকের মতো ধনী-গরীব নির্বিশেষে ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর ছিল না। তাই, মানুষ তখন গোশতে লবণ, হলুদ ও বিভিন্ন মসলা মাখিয়ে রোদে শুকাতো। এতে গোশত দীর্ঘদিন ভালো থাকতো এবং পরে রান্না করেও খাওয়া যেত।

উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় অঞ্চল ও কিছু গ্রামীণ এলাকায় যুগ যুগ ধরে এভাবেই মাছের পাশাপাশি গোশতের শুঁটকিও করা হতো এবং কোথাও কোথাও এখনো তা টিকে আছে।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রচলন আছে এবং রোদে বা কৃত্রিম উপায়ে শুকানো গোশতের বেশ কদরও রয়েছে বিশ্বজুড়ে।

রোদ, ধোঁয়া আর স্মৃতিতে টিকে থাকা এক খাবার

সময় বদলেছে। রেফ্রিজারেটরের বদৌলতে বদলেছে খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতিও। কোরবানির ঈদে গোশত রান্না ও বিতরণ করার পর এখন আর মানুষকে সেগুলো সংরক্ষণ করা নিয়ে ভাবতে হয় না।

কিন্তু কেউ কেউ আছেন, যাদের গরুর গোশতের শুঁটকির প্রতি আগ্রহ কমেনি। সেকারণেই এই রেফ্রিজারেটরের যুগেও তারা নিজেদের খাওয়ার জন্য গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরি করেন।

আর এটি বোঝা যায় অনলাইনে গরুর গোশতের শুঁটকি বিক্রির হিড়িক দেখে। এটি এখন হলফ করে বলা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন ব্যবসার কারণেও এটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। অনেকেই এখন এটিকে ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবেও তুলে ধরছেন।

বর্তমানে যশোরের বেনাপোলে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা মো: কাউসার আহমেদ, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের জামালপুর জেলায়। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ছোটবেলায় তিনি কোরবানির ঈদে তাদের গ্রামের প্রত্যেক ঘরে ঘরেই গরুর গোশতের শুঁটকি বানাতে দেখতেন। কারণ তখন ফ্রিজ ছিল না।

গরুর গোশতের শুঁটকি তৈরির জন্য সাধারণত গোশত পাতলা বা ছোট টুকরো করে কাটা হয়। এরপর লবণ, মরিচ, হলুদসহ বিভিন্ন মসলা মাখিয়ে কয়েকদিন রোদে শুকানো হয়।

কাউসার আহমেদ নিজেও নানা ধরনের খাবার রান্না করতে বা নতুন নতুন খাবার নিয়ে পড়াশোনা করতে পছন্দ করেন। তিনি তার স্মৃতি থেকে বলছিলেন, ‘সবসময় যে হলুদ-মরিচ মাখানো হতো, তা না। শুধু লবণ দিয়েও মেটালের চিকন তারের মাঝে ঝুলিয়ে কড়া রোদে দেয়া হতো।’

কোথাও কোথাও ধোঁয়ায় শুকানোর পদ্ধতিও ব্যবহার করা হয়। এতে গোশত বা মাছ সরাসরি আগুনে পোড়ানো হয় না। বরং, আগুনের একটু ওপরে বা পাশে ঝুলিয়ে রাখা হয়, যাতে আগুনের ধোঁয়া ও তাপে পানি কমে গিয়ে ধীরে ধীরে গোশত বা মাছ শুকিয়ে যায়।

বাংলাদেশের কিছু গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে দীর্ঘদিন খাবার সংরক্ষণের প্রয়োজন হতো, সেখানে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। এতে এক ধরনের আলাদা ধোঁয়ার স্বাদও যোগ হয়।

কাউসার আহমেদ এই প্রক্রিয়ায়ও শুঁটকি করতে দেখেছেন জানিয়ে বলেন, ‘গ্রামের মাটির চুলায় যখন রান্না হতো, সেই চুলার উপরে একইভাবে গোশত ঝুলিয়ে রাখা হতো। রান্নার যে তাপ, তাতে সেই রোদের কাজ হয়ে যেত। যারা স্মোকি ফ্লেভার চান, তারা এভাবে করতো।’

তিনি জানান, এভাবে গরুর গোশতের শুঁটকি করতে অনেক সময় দিতে হয় এবং সেই সময়টা দেয়া অনেকের জন্য এখন কঠিন।

তিনি হাসতে হাসতে বলেন, আগে এই শুঁটকি খেতে হলে এত কষ্ট করে সব নিজেরই করা লাগতো। এখন যেকোনো ঐতিহ্যবাহী খাবার অনলাইনে পাওয়া যায়।

চাঁদপুরের স্থানীয় সাংবাদিক কাদের পলাশ, যিনি সেখানকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কাজও করেছেন, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন যে তিনিও তার মা-চাচিদের কোরবানি এলেই গোশতের শুঁটকি তৈরি করতে দেখেছেন। কিন্তু গত ২০ বছর ধরে তার পরিবারের আর কেউ তা বানান না।

প্রয়োজন ফুরিয়েছে, টিকে আছে স্বাদ ও ঐতিহ্য

এটি স্পষ্ট যে গরুর গোশত সংরক্ষণের পুরোনো পদ্ধতি ‘শুঁটকি’ অনেকের কাছে শুধু একটি খাবার না; বরং, পারিবারিক ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যের অংশ।

দিনের পর দিন রোদে-ধোঁয়ায় গোশত শুকিয়ে আসছে দিনের জন্য সংরক্ষণ করার প্রয়োজনীয়তা এখন ফুরিয়েছে। তবুও এটি টিকে রয়েছে এর স্বাদ ও ঐতিহ্যের কারণে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো: নিজামুল হক ভূঁইয়া এ নিয়ে বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে ফ্রিজ অপ্রতুল ছিল। অনেক পরিবারের কেনার সামর্থ্যও ছিল না। তখন মানুষ মাছ-গোশত শুঁটকি করে রেখে দিতো।

তিনি বলেন, ‘অনেকে এখনো সেই আগের প্রসেসটাই ফলো করছে বা ওই খাদ্যসংস্কৃতিকে রক্ষা করছে, তা মূলত এর (গরুর গোশতের শুঁটকির) স্বাদের কারণে।’

তবে তিনি মনে করেন, যেকোনো খাবার আসলে মানুষের অভ্যাসের ব্যাপার।

‘বরিশাল অঞ্চলে সেভাবে শুঁটকি খায় না, চরাঞ্চলগুলোতে অনেকে খায়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট, নেত্রকোনা– এই বেল্টে শুঁটকি খায়। চট্টগ্রাম মানেই শুঁটকি। এর মূল কারণ, হয়তো তাদের পূর্ব-পুরুষরা শুঁটকি খেত। অথচ সেখানেও কিন্তু সামুদ্রিক মাছ পাওয়া যায়, সেখানকার মাছ রফতানি করা হচ্ছে। অর্থাৎ, যেখানে সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, সেখানেই মানুষ খায়।’

গরুর গোশতের শুঁটকি কিভাবে এসেছে, এর ‘আভিধানিক কোনো ব্যাপার নেই’।

তবে আগে মানুষ ‘গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে প্রসেস করে শুঁটকি নিয়ে যেত। শুধু গরুর গোশত না, মুরগির গোশত, মহিষের গোশতও নিয়ে যেত,’ যোগ করেন এই অধ্যাপক।

শুঁটকির পশ্চিমা সংস্করণ 'জার্কি'

এই অঞ্চলের পরিচিত গরুর গোশতের শুঁটকির সাথে মিল রয়েছে পশ্চিমা বিশ্বের জনপ্রিয় খাবার বিফ জার্কির। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এটি বেশ পরিচিত একটি খাবার।

বিফ জার্কি বলতে সাধারণত এমন শুকনো গরুর গোশতকে বোঝানো হয়, যা পাতলা করে কেটে মসলা বা সস মাখিয়ে মেরিনেট করে পরে শুকানো হয়, যাতে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়।

এটি সাধারণত স্ন্যাকস হিসেবে খাওয়া হয়। তবে এই খাবারের ধারণা অনেক পুরোনো।

যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটির একটি প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ‘জার্কি’ (শুকনো গোশত) মূলত উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের গোশত সংরক্ষণের ঐতিহ্য থেকে এসেছে। তারা স্থায়ীভাবে এক জায়গায় থাকতো না।

কখনো খাবারের সন্ধানে বা ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতো। সেসময় তাদের খাদ্যের বড় উৎস ছিল মহিষ, এল্ক ও হরিণের মতো প্রাণী।

এসব প্রাণী শিকার করে তারা গোশত খেত। এক সাথে এত গোশত খেয়ে শেষ করতে পারতো না, কিংবা শীতকাল বা দীর্ঘ ভ্রমণের প্রস্তুতি নিতো, তখন তারা সেই গোশত সংরক্ষণ করতো।

রেফ্রিজারেশন বা ফ্রিজিং পদ্ধতি আবিষ্কারের আগে গোশত সংরক্ষণের উপায়ই ছিল সেটি শুকিয়ে ফেলা।

সেখানেও গোশত পাতলা করে কেটে উঁচুতে বেঁধে ঝুলিয়ে রোদে শুকানো হতো। কখনো মাছি তাড়াতে ও ধোঁয়ার স্বাদ যোগ করতে সেগুলো ধোঁয়ার ওপরেও রাখা হতো।

মূলত, গোশত শুকানো ও স্বাদ তৈরির নিজস্ব পদ্ধতি প্রতিটি পরিবারেরই আলাদা ছিল।

তবে বর্তমানের এই ‘জার্কি’ শব্দটি এসেছে দক্ষিণ আমেরিকার কেচুয়া ভাষার “চ’আর্কি” শব্দ থেকে, যার অর্থ শুকনো গোশত, যেটিকে স্প্যানিশরা ‘চারকি’ হিসেবে উচ্চারণ করতো।

কেচুয়া ছিল ইনকা সভ্যতার ইনকাসহ বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভাষা। ঐতিহ্যগতভাবে চ’আর্কি তৈরি হতো লামা বা গরুর গোশতের পাতলা টুকরো রোদে শুকিয়ে ও ঠাণ্ডা রাতে জমিয়ে।

পরে স্প্যানিশরা যখন দক্ষিণ আমেরিকায় আসে, তখন সেখানকার আদিবাসীদের কাছ থেকে এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানে এবং পরে আমেরিকাসহ নানা জায়গায় এটি ছড়িয়ে যায়।

একসময় এই জার্কি কাউবয় (যারা গরু বা অন্যান্য গবাদিপশু চরানো, দেখাশোনা করা ও এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার কাজ করে) ও ভ্রমণকারীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কারণ খাবারটি সহজে বহন করা যেত এবং দ্রুত নষ্ট হতো না।

সুতরাং, মূল ধারণার দিক থেকে বিফ জার্কি আর বাংলাদেশের গরুর গোশতের শুঁটকি অনেকটাই একই ধরনের খাবার। দু’টিতেই গোশত শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে দীর্ঘদিন খাওয়া যায়।

তবে প্রস্তুত প্রণালী ও খাওয়ার ধরনে অঞ্চল ও সংস্কৃতিভেদে কিছু পার্থক্য রয়েছে।

গরুর গোশতের শুঁটকিতে পুষ্টিগুণ একই থাকে?

পুষ্টিবিদরা জানিয়েছেন, গরুর গোশতে রয়েছে আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিনস, মিনারেলস বা খনিজ উপাদান। যেমন- জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস, আয়রন। আবার ভিটামিনের মধ্যে রয়েছে ভিটামিন বি২ বি৩, বি৬, এবং বি১২।

আর এই পুষ্টিকর উপাদানগুলো-

১) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

২) পেশি, দাঁত ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখে।

৩) ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে।

৪) শরীরের বৃদ্ধি ও বুদ্ধি বাড়াতে ভূমিকা রাখে।

৫) ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে।

৬) দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে।

৭) অতিরিক্ত আলসেমি বা ক্লান্তি বা শরীরের অসাড়তা দূর করে কর্মোদ্যম রাখে।

৮) ডায়রিয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।

৯) রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ করে।

১০) খাবার থেকে দেহে শক্তি যোগান দেয়।

১১) স্মৃতিশক্তি বাড়ায়

১২) অবসাদ, মানসিক বিভ্রান্তি ও হতাশা দূর করে।

এ বিষয়ে অধ্যাপক মো: নিজামুল হক ভূঁইয়া বলছিলেন, ‘গরুর গোশতের শুঁটকিতেও প্রোটিন গুণাবলী প্রায় একইরকম থাকে, খুব একটা নষ্ট হয় না। কিন্তু এর সাথে আবার বিভিন্ন ফুড অ্যাডিটিভস (খাবারে ব্যবহৃত সংযোজক উপাদান) যোগ করা হয়, যেজন্য এটা সুস্বাদু হয়। যেমন- টেস্টিং সল্ট। নরমাল গোশতের স্বাদ একরকম, শুঁটকির স্বাদও ভিন্নরকম। এজন্যই অনেক মানুষ শুঁটকি খেতে পছন্দ করেন।’

এ প্রসঙ্গে পুষ্টিবিদ সামিয়া তাসনিম বলেন, গরুর গোশতের শুঁটকি করা হলে সেখান থেকে পানির পরিমাণ বের হয়ে যায়। অর্থাৎ, ‘একই ওজনের গরুর গোশতে যে ৬৫ শতাংশ পানি, সেটা বের হয়ে ওজন কমে যাচ্ছে এবং সাধারণ গোশতের তুলনায় পুষ্টিও তুলনামূলক বেড়ে যাচ্ছে।’

শুঁটকি করার সময় অতিরিক্ত লবণ দেয়া হলে সোডিয়ামের পরিমাণ তাতে বাড়বে। তাই, রান্নায় করার সময় বাড়তি লবণ ব্যবহার না করাটাই ভালো বলে জানান তিনি।

কারণ গরুর গোশতে এমনিতেই প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। আর উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।

আর গোশত ঠিকভাবে শুকানো বা সংরক্ষণ না হলে ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস জন্মাতে পারে।

সূত্র : বিবিসি

রোদে শুকিয়ে গোশত সংরক্ষণের পদ্ধতি বিভিন্ন দেশেই প্রচলিত আছে
রোদে শুকিয়ে গোশত সংরক্ষণের পদ্ধতি বিভিন্ন দেশেই প্রচলিত আছে। বিবিসি

কাঁচা কাঁঠাল শরীরের জন্য এত উপকারী!

অনেকের কাছেই খুব পছন্দের ফল কাঁঠাল। তবে তা পাকা অবস্থায়। মিষ্টি স্বাদ আর রসালো এ ফলে রয়েছে নানা পুষ্টি। তবে কাঁচা কাঁঠালেও কমতি নেই পুষ্টিগুণের। যা শরীরের জন্য খুবই উপকারী। এ কাঁচা কাঁঠালে রয়েছে বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, সি, বি-১, বি-২, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামসহ নানা রকমের পুষ্টি ও খনিজ উপাদান। যা শরীরকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি পূরণ করে ভিটামিনের চাহিদাও।

জানা যায়, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁঠালে খাদ্য-আঁশ থাকে দু’ গ্রাম, শর্করা ২৪ গ্রাম, চর্বি দশমিক তিন মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৩৪ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেশিয়াম ৩৭ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ৩০৩ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-এ ২৯৭ আইইউ ও ভিটামিন-সি ছয় দশমিক সাত মিলিগ্রাম।

জেনে নেয়া যাক কাঁচা কাঁঠালে যেসব উপকারিতা পাওয়া যায়-

হজমশক্তি বাড়ায় : পেটের নানা রকম সমস্যা কমাতে পারে কাঁচা কাঁঠাল। এ ফল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে এবং অন্ত্রের সক্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করে। এতে যে আঁশ থাকে, তা কোলন ক্যানসার প্রতিরোধ করে। পেটের অম্লতা ও আলসার ঠেকাতে কাঁচা কাঁঠাল খেতে পারেন। ফাইবারসমৃদ্ধ ফল হওয়ায় হজমশক্তি বাড়ায় এবং পেট পরিষ্কার রাখে কাঁচা কাঁঠাল।

বয়সের ছাপ দূর করে : কাঁচা কাঁঠাল বয়স ধরে রাখতে সাহায্য করবে। মুখে বলিরেখা পড়তে বাধা দেয় এটি, যা ত্বকের জন্য ভালো। এতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ সৃষ্টিকারী মুক্ত উপাদানের (ফ্রি র‍্যাডিক্যালস) বিরুদ্ধে লড়াই করে। প্রচুর ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম থাকায় হাড়ের ক্ষয় ঠেকাতে পারে কাঁঠাল। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে ও বলিরেখাও কমে।

ওজন কমায় : এতে চর্বির পরিমাণ খুব কম। তাই বেশি খেলেও ওজন বাড়ার শঙ্কা নেই বরং পেট ভরে রেখে ওজন কমাতে সাহায্য করে কাঁচা কাঁঠাল।

চোখ ভালো রাখে : কাঁচা কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ ও বিটা ক্যারোটিন, যা চোখ ভালো রাখে।

ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী রাখে : কাঁচা কাঁঠাল অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টসমৃদ্ধ। এতে থাকা ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া ক্যান্সার ও টিউমারের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। এতে থাকা সোডিয়াম ও পটাশিয়াম শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্সকে ঠিক রাখে, যা উচ্চরক্তচাপ ও হার্টও ভালো রাখে। পাইলস ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়ায় : কাঁচা কাঁঠালে প্রায় কোনো কোলেস্টরল নাই বললেই চলে। তাই কাঁচা কাঁঠাল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ। যেকোনো বয়সের মানুষ এটা খেতে পারেন। এটি শক্তির ভালো উৎস। এতে আয়রন থাকায় রক্তে লোহিত কণিকার পরিমাণ বাড়ায়। রক্তাল্পতায় রোগীদের জন্য কাঁচা কাঁঠাল খুবই উপকারী।

হাড় শক্ত করে : কাঁচা কাঠালে থাকা ক্যালসিয়াম হাড় শক্ত রাখে।

কাঁঠালের বিচির প্রোটিন

কাঁঠালের বিচি গুঁড়ো করে সকালের জুস হিসেবে খেতে পারেন। কাঁঠালের বিচি ফেলনা নয়। এটি চাইলে খেতে পারবেন হালকা নাশতায়, সালাদ, তরকারি, হালুয়া বা ভর্তা হিসেবে। কাঁঠালের বিচিতে থাকা প্রোটিন মাংসপেশি গঠনে ভূমিকা রাখে।

এদিকে ডায়াবেটিস রোগীদের কাঁঠাল খাওয়ায় কিছুটা বিধি-নিষেধ রয়েছে। এছাড়া কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বেশি তাদেরও কাঁঠাল না খাওয়াই ভালো বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কাঁচা কাঁঠাল
কাঁচা কাঁঠাল। সংগৃহীত

মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসন মাড়িয়ে মহাকাশে ইরানের নতুন ‘ছক্কা’

সব বাধা আর যুদ্ধ পরিস্থিতি মাড়িয়ে মহাকাশ গবেষণায় একের পর এক বড় সাফল্য পাচ্ছে ইরান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনকে অবজ্ঞা করে দেশটি এবার কক্ষপথে পাঠাচ্ছে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ইমেজিং স্যাটেলাইট ‘পার্স-টু’। একইসাথে চলতি বছরের মধ্যেই মহাকাশে স্থাপন করা হচ্ছে ‘শহীদ সোলেইমানি’ স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন বা কৃত্রিম উপগ্রহের জোট।

বুধবার (১৭ জুন) ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী সাত্তার হাশেমি এই ঘোষণা দিয়েছেন। আর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় ইংরেজি চ্যানেল প্রেসটিভি।

ইরানি মহাকাশ গবেষণা সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে এক বৈঠকে মন্ত্রী সাত্তার হাশেমি জানান, শত্রুদের চাপিয়ে দেয়া কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তাদের মহাকাশ কর্মসূচি এক মুহূর্তের জন্যও থমকে যায়নি। দেশের বিশেষজ্ঞদের দিনরাত পরিশ্রমের ফলেই এই অভাবনীয় অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।

উন্নত প্রযুক্তির ‘পার্স-টু’ স্যাটেলাইটটি মূলত নিখুঁতভাবে পৃথিবী পর্যবেক্ষণ, রিমোট সেন্সিং ও পরিবেশগত নজরদারির কাজ করবে। এটি ইরানের স্মার্ট কৃষি, পানিসম্পদ ও ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যভিত্তিক শাসনব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করবে।

মার্কিন ও ইসরাইলি আগ্রাসনের পর তৈরি হওয়া চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠে ইরান এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নতুন প্রযুক্তিগত কৌশল নিয়ে পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছে।

ইরানি মহাকাশ সংস্থার প্রধান হাসান সালারিয়েহ শত্রুপক্ষের সব অপপ্রচার উড়িয়ে দিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে ইরানের মহাকাশ খাতের কোনো ক্ষতি হয়নি। কারণ, তাদের মহাকাশ অবকাঠামো কোনো একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল নয় যে একটা জায়গায় আঘাত করলেই সব বন্ধ হয়ে যাবে। যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতেও স্যাটেলাইট যোগাযোগ, তথ্য গ্রহণ এবং ছবি তোলার মতো সব সেবা পুরোপুরি সচল ছিল।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের সব বড় প্রকল্প দারুণ গতিতে এগিয়ে চলছে। আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই ‘শহীদ সোলেইমানি’ স্যাটেলাইট জোট উৎক্ষেপণের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যাবে। স্বনির্ভরতার এই নতুন মাইলফলক বিশ্বমঞ্চে ইরানের মহাকাশ সক্ষমতারই এক বড় প্রমাণ।

সূত্র : প্রেসটিভি

ইরান এবার কক্ষপথে পাঠাচ্ছে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ইমেজিং স্যাটেলাইট ‘পার্স-টু’
ইরান এবার কক্ষপথে পাঠাচ্ছে তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি অত্যাধুনিক ইমেজিং স্যাটেলাইট ‘পার্স-টু’। সংগৃহীত

ইসরাইলের চুক্তি পর্যালোচনার দাবি পাত্তাই দিলো না যুক্তরাষ্ট্র

ইসরাইল তেহরান-ওয়াশিংটনের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনার অনুরোধ করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা প্রত্যাখ্যান করেছে। ফলে ইসরাইলি কর্মকর্তারা চুক্তির পূর্ণ বিবরণ জানতে পারেননি এবং তারা এ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

তেহরানের সাথে ওয়াশিংটনের সদ্য ঘোষিত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ পর্যালোচনা করে দেখার ইসরাইলের একটি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

বুধবার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে ইরানের ইংরেজি চ্যানেল প্রেসটিভি বুধবার এ খবর নিশ্চিত করেছে।

ইসরাইলি চ্যানেল ১২-এর সংবাদদাতা ইয়ারন আব্রাহাম জানিয়েছেন, ইসরাইল সরকার এই সমঝোতা স্মারকটি পর্যালোচনার জন্য ওয়াশিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছিল। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা নাকচ করে দেয়ায় ইসরাইলি কর্মকর্তারা এই চুক্তির ভেতরের খুঁটিনাটি বিস্তারিত তথ্য এখনো পুরোপুরি জানতে পারেননি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাখ্যানের ঘটনাটি এমন সময়ে ঘটলো যখন ইসরাইলি কর্মকর্তারা এই সমঝোতা স্মারকের তীব্র সমালোচনা করছেন। তারা জনসমক্ষে এই চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন এবং বলছেন যে এটি তেহরানের প্রতি তেল আবিবের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আনবে না।

এমনকি সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি এই সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত বিবরণ সম্পর্কে নিশ্চিত নন।

হিব্রু গণমাধ্যমগুলোও জানিয়েছে, এই সমঝোতা নিয়ে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের মধ্যে গভীর হতাশা এবং তীব্র বিরোধিতা তৈরি হয়েছে।

ইসরাইলের আই২৪ টেলিভিশন চ্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি কর্মকর্তারা এই চুক্তিকে বেশ নেতিবাচকভাবে দেখছেন, বিশেষ করে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং সেখানে হামলা বন্ধ করার শর্তগুলো তারা মেনে নিতে পারছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র আই২৪ চ্যানেলকে বলেছে, এই চুক্তিটি ইসরাইলের জন্য ভয়াবহ এক লজ্জার বিষয়।

এদিকে, ইসরাইলি কর্মকর্তারা নাকি ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা নিজেদের এই চুক্তির শর্তে দায়বদ্ধ মনে করেন না। নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের সাথে এই চুক্তিটি ট্রাম্প করেছেন এবং এটি তার সিদ্ধান্ত, আমাদের নিজেদের আলাদা স্বার্থ রয়েছে।

এর আগে গত ৭ এপ্রিল ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরাইলি উস্কানিমূলক আগ্রাসনের সর্বশেষ দফায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন।

অঞ্চলজুড়ে আগ্রাসী শক্তির স্বার্থের ওপর ইরানের চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক পাল্টা আঘাত এবং শত্রুদের ও তাদের মিত্রদের জন্য ইরানের কৌশলগত হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার পরই মূলত এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এসেছিল।

এই পাল্টা হামলা ছাড়াও লেবাননে যুদ্ধবিরতির চুক্তি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও কড়া জবাব দিয়েছে ইরান। ইরান সবসময়ই জোর দিয়ে বলে আসছে যে আগ্রাসন বন্ধের প্রক্রিয়াটি লেবাননসহ সব ফ্রন্টেই কার্যকর হতে হবে। তারা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে লেবাননে ভবিষ্যতের যেকোনো ইসরাইলি হামলা কিংবা দেশটির সদ্য দখল করা অঞ্চলগুলোতে অবৈধ দখলদারিত্ব বজায় রাখা হবে এই সমঝোতা স্মারকের লঙ্ঘন।

সূত্র : প্রেসটিভি

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালী খোলার ঘোষণা : ২০২৭ সালে বিশ্ব বাজারে ‘তেলবন্যা’র আভাস

হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাপকভাবে বাড়বে এবং ২০২৭ সাল নাগাদ বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের এক বিশাল উদ্বৃত্ত দেখা দেবে।

বুধবার (১৭ জুন) রয়টার্স জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের মাসিক প্রতিবেদনে এই পূর্বাভাস দিয়েছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। এই চুক্তি অনুযায়ী ইরান তার কৌশলগত হরমুজ প্রণালী খুলে দেবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে তাদের নৌ অবরোধ তুলে নেবে। এর মাধ্যমে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ সঙ্কটের অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

আইইএ-এর হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন অবরোধ ও যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিদিন ১৪ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল উৎপাদন আটকে ছিল।

সংস্থাটি জানিয়েছে, চুক্তিটি টিকে থাকলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল উৎপাদন ধাপে ধাপে আগের অবস্থায় ফিরবে। বিশেষ করে মার্কিন নৌ অবরোধ উঠে গেলে ইরানের তেল রফতানি আবারো পুরোদমে শুরু হতে পারবে।

২০২৭ সালে বাজারে ‘তেলের বন্যা’ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কারণ, সরবরাহ বাড়বে প্রতিদিন ৮ মিলিয়ন ব্যারেল, অথচ চাহিদা বাড়বে মাত্র ২ মিলিয়ন ব্যারেল।

ইতোমধ্যে জুনের শুরুর দিকেই ওমান সাগরে জাহাজে তেল যাতায়াত বৃদ্ধি পাওয়ায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের প্রবাহ মে মাসের দৈনিক ৯.৬ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে বেড়ে ১২ মিলিয়ন ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।

অবশ্য, মাইন অপসারণের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও কিছু রাজনৈতিক বাধার কারণে এই উত্তরণের পথে এখনো ঝুঁকি রয়েছে।

সূত্র : রয়টার্স

এখন থেকে যখন খুশি হরমুজ বন্ধ করে দিতে পারবে ইরান

এখন থেকে ইচ্ছামতো যখন খুশি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকার কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিতে পারবে ইরান। এর অর্থ হলো, এই যুদ্ধের ফলে দেশটির শাসকগোষ্ঠী বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার এক শক্তিশালী নতুন সক্ষমতা অর্জন করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক গোয়েন্দা পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এমন তথ্য।

পারমাণবিক আলোচনার সূচনা হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি খোলার জন্য শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে ইরান বর্তমান সংঘাতের সময় প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা প্রণালিটিতে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিতে পারে। মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এমনটা আবারও ঘটতে পারে।

মার্কিন গোয়েন্দা পর্যালোচনা সম্পর্কে জানেন এমন একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, ‘আমরা এখন ইরানের হাতে প্রণালিটির কার্যত নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছি, যা যেকোনো পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী একটি অস্ত্র।’ সূত্রটি জোর দিয়ে বলেছে যে, এই যুদ্ধ ভবিষ্যতে একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের বিষয়ে তেহরানের চিন্তাভাবনাকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দিয়েছে।

পর্যালোচনা সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে ইরান। এ থেকে তারা শিখেছে যে, একে একটি অপ্রতিসম সক্ষমতা হিসেবে কাজে লাগানো যায় এবং ভবিষ্যতে এটি তাদের সুবিধার্থে ব্যবহার করার মতো আরেকটি হাতিয়ার।

প্রণালিটি সম্পূর্ণরূপে পুনরায় খোলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে আলোচনা করতে হয়েছে, যা ইরানিদের অব্যাহত দর কষাকষির সক্ষমতাকেই তুলে ধরে।

এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য হোয়াইট হাউস ও ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সিএনএন।

একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, প্রণালিটি খোলা না থাকলে এবং চুক্তিতে সম্মত হওয়া অন্যান্য শর্ত মেনে না চললে ইরান চুক্তির কোনো সুবিধাই পাবে না। ওই কর্মকর্তা অবশ্য সুবিধাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি। তবে ব্যাখ্যা করেছেন যে প্রণালিতে নৌযান চলাচল পুনরুদ্ধারের অনুপাতে যুক্তরাষ্ট্র তার অবরোধ শিথিল করবে। তার দাবি, ‘যদি ইরান তার প্রতিশ্রুতি পালন করে, তাহলে স্বস্তি আসবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দর কষাকষির ক্ষমতা পুরোটা সময় ধরে বজায় থাকবে’।

চুক্তি সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্র সিএনএনের কাছে স্বীকার করেছে যে, ভবিষ্যতে প্রণালিটি কার্যকরভাবে বন্ধ করার যেকোনো প্রচেষ্টা আত্মঘাতী পরিণতি বয়ে আনবে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রণালিটি খুলে গেলে মিত্র দেশগুলো কোনোভাবে সেখানে পাহারার ব্যবস্থা করতে পারে কি না, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এই মুহূর্তে তা কীভাবে কাজ করবে তা স্পষ্ট নয়। সর্বশেষ গোয়েন্দা পর্যালোচনায় এই সম্ভাবনাকেও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

একাধিক সূত্র সিএনএনকে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে গেলে ইরান একটি অর্থনৈতিক ‘চরম পদক্ষেপ’ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। আর তা হলো, ইয়েমেনে ইরানের প্রধান প্রক্সি বাহিনী হুতিদের দিয়ে বাব-এল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। এই প্রণালি লোহিতসাগরকে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এটি আরেকটি বৈশ্বিক বাণিজ্যের সংকীর্ণ পথ, যা হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার সময় জাহাজ চলাচলের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করেছে।

সামগ্রিকভাবে সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই সিদ্ধান্তের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবকেই তুলে ধরে, যেখানে তিনি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি বিবেচনা না করেই সংঘাত শুরু করেছিলেন।

পর্যালোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্রের তথ্যমতে, ইরান প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ক্রমাগত পুনর্মূল্যায়ন করে চলেছে যে, ভবিষ্যতে তারা কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে সেই একই কৌশল ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে।

একাধিক সূত্র জানায়, উল্লেখযোগ্য সামরিক শক্তি ব্যয় না করেই প্রণালিটি বন্ধ করতে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে সক্ষম হওয়ায় ইরান আরো সাহসী হয়ে উঠেছে।

মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সক্ষমতা এখন প্রমাণিত। কাজেই ভবিষ্যতে তারা একই পদক্ষেপ নেবে এমন সম্ভাবনা অনেক বেশি।

সূত্র: সিএনএন

এখন থেকে যখন খুশি হরমুজ বন্ধ করে দিতে পারবে ইরান

ইরান কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে বিজয় হিসেবে দেখছে

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হতে যাওয়া সমঝোতা স্মারককে কোনো ধরনের পিছু হটা নয়, বরং প্রতিরোধ ও বিজয়ের ফলাফল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে ইরানের নেতৃত্ব। তবে, এই যুক্তি দাঁড় করানো সহজ নয়।

দেশটি সদ্য একটি যুদ্ধ পার করেছে, যার ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অর্থনীতি তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশ কয়েক মাস ধরেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো সমঝোতার বিরুদ্ধে কথা বলে আসছে।

দেশের ভেতরে ও বাইরে এমন ইরানিরাও রয়েছেন, যারা এই সংকটকে কূটনীতির মুহূর্ত নয়, বরং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখেন।

এই বিভক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেই তেহরান এখন এই চুক্তিটি গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করছে।

ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চুক্তিটিকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আলোচনায় প্রধান ইরানি ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এটিকে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই সমঝোতাকে 'সম্ভাব্য রূপান্তরকারী' হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে ইরানের বহু সমস্যা সমাধান হতে পারে এবং ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যে ‘এক ভিন্ন পৃথিবী তৈরি করতে পারে’।

গালিবাফের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাকে পেজেশকিয়ানের মধ্যপন্থি শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখা হয় না; তার প্রকাশ্য সমর্থন ইঙ্গিত দেয় যে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আরও শক্তিশালী অংশ, এমনকি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের ভেতরেও এই চুক্তির পক্ষে সমর্থন আছে।

তেহরানের নেতৃত্ব এই চুক্তিকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করছে আরেকটি কারণেও। তাদের যুক্তি হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেনি।

তারা ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পারেনি, ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারেনি, সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে পারেনি এবং হিজবুল্লার সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেনি।

বরং, ইরান এখনো আলোচনার টেবিলে রয়েছে, লেবাননকে কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

তবে সরকারের এই বর্ণনা ইরানের ভেতরেই বিতর্কের মুখে পড়েছে।

কট্টরপন্থি একজন সংসদ সদস্য, যিনি ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান, তিনি খসড়া চুক্তিটিকে এমন একটি নথি হিসেবে অভিহিত করেছেন বলে জানা যাচ্ছে, যা ইরানকে মার্কিন 'উপনিবেশে' পরিণত করবে।

এই সমালোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বাইরের কোনো উৎস থেকে আসেনি, বরং এটি এসেছে জাতীয় নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই।

গত কয়েক মাস ধরে পার্লামেন্টের কট্টরপন্থি সদস্যরা, রাষ্ট্র-সমর্থিত গণমাধ্যম এবং সরকারপন্থি নিয়মিত সমাবেশগুলোতে বারবার বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায় না।

তাদের যুক্তি, যুদ্ধ শুরুর অল্প আগে পর্যন্তও কূটনৈতিক আলোচনা চলছিল, আর ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি আড়াল করতে আলোচনাকে ব্যবহার করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি আপসকামিতার পরিচয় হিসেবে দেখা হতে পারে।

তবে এখন এসব কট্টরপন্থি কণ্ঠগুলোকে কিছুটা নীরব দেখা যাচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে যে চুক্তি এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদিত হয়েছে। তার মানে এই নয় যে পূর্ণ ঐক্য রয়েছে।

ইরানের নেতৃত্ব চুক্তিটিকে সামরিক চাপের ফলাফল হিসেবে তুলে ধরতে পারে—যেমন হরমুজ প্রণালি ঘিরে চাপ বা যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক জ্বালানি স্বার্থে হামলা।

কিন্তু অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও তেহরানকে বাধ্য করেছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ, তেলবাজার ও বৈদেশিক মুদ্রায় সীমিত প্রবেশাধিকার, এবং অত্যন্ত উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি—সব মিলিয়ে দেশ ও সাধারণ মানুষকে চাপে ফেলেছে।

ইরানের অনেক পরিবারের প্রশ্ন হলো- চুক্তিটি বিজয়ের মতো শোনাচ্ছে কি না, তা নয়; বরং এটি দাম কমাবে কি না এবং আরেক দফা যুদ্ধের আশঙ্কা কমাবে কি না সেটি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান সরাসরি করদাতাদের অর্থ পাবে না, তবে যদি তারা তাদের অঙ্গীকার পূরণ করে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তাহলে তারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের প্রবেশাধিকার পেতে পারে।

এতে তেহরান চুক্তিটিকে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা নয়, বরং বিনিয়োগ ও পুনর্গঠনের পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।

তবুও ঝুঁকি স্পষ্ট। সমঝোতা স্মারকের বিস্তারিত এখনও পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে কঠিন বিষয়গুলো- ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ, অনুমোদিত সমৃদ্ধির মাত্রা, যাচাই-বাছাই, নিষেধাজ্ঞা শিথিল, হরমুজ প্রণালি ও লেবানন- এগুলো এখনো আলোচনার বাকি। সেই সাথে ইসরায়েল নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েল প্রত্যাহার করবে—এমন প্রতিবেদনের বিরোধিতা করে বলেছেন, যতদিন প্রয়োজন, ততদিন ইসরায়েলি বাহিনী সেখানে থাকবে।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে লেবাননে ইসরায়েলের কার্যকলাপের সমালোচনা করে বলেছেন সেখানে অনেক মানুষ নিহত হয়েছে।

তিনি আরও বলেছেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার ঠিক আগে বৈরুতে ইসরায়েলি হামলায় তিনি অসন্তুষ্ট ছিলেন, তবে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সম্পর্ক "চমৎকার" বলেই দাবি করেছেন।

তেহরানের জন্য ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের এই দৃশ্যমান টানাপড়েন কাজে লাগে।

এটিকে এমন প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় যা ইরানের চাপ ইসরায়েলের কার্যক্রমের স্বাধীনতাকে জটিল করেছে। তবে এটিই চুক্তিটিকে ভঙ্গুরও করে তুলেছে।

যদি ইসরায়েল লেবাননে অভিযান চালিয়ে যেতে থাকে, তাহলে ইরানকে প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপের মুখে পড়তে হবে।

যদি ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তাহলে ইরানের ওপর পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখানোর চাপ বাড়বে। আর যদি ওয়াশিংটন ইসরায়েলকে সংযত রাখতে না পারে, তাহলে লেবানন এই সমঝোতার আওতায় রয়েছে, তেহরানের এই দাবি খুব দ্রুতই পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।

বিবিসি পার্সিয়ানের পাঠক-দর্শকদের প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, সরকার যে 'বিজয়ের' বর্ণনা তুলে ধরছে, তা সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।

সেখানে একজন বলেছেন, আরেকটি ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কায় তিনি খুবই উদ্বিগ্ন ছিলেন, কিন্তু চুক্তির কথা শোনার পরও তার "কোনো আস্থা নেই" এবং চুক্তি টিকে থাকলে দেশ সঠিকভাবে পরিচালিত হবে কি না তা নিয়ে তিনি চিন্তিত।

আরেকজন সরকারবিরোধী ইরানি, যিনি শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন, তিনি জানতে চান- যদি এতে ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন না আসে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় কী লাভ হলো।

"আমাদের আশা ছিল শাসনব্যবস্থা বদলাবে। কিন্তু কষ্ট, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনীতির আরও ক্ষতি ছাড়া মানুষের কী উপকার হয়েছে?"

তবে অনেকে আবার সরকারের অবস্থানের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল ছিলেন।

একজন দর্শক ইরানকে বিজয়ী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, "ভিক্ষা" নয়, বরং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সম্ভব- এটি এই যুদ্ধ দেখিয়েছে।

আরেকজন আরও সতর্কভাবে চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, এতে মানুষ কিছুটা স্বস্তি নিয়ে কাজে ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।

"আমার মনে হয় এটি অস্থায়ী। তবে কিন্তু আমাদের কয়েক মাসের জন্য দম নেওয়ার সুযোগ এবং শান্তি প্রয়োজন ছিল। সম্ভবত এটিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন"।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র চুক্তিটিকে বিজয় হিসেবে তুলে ধরছে, কারণ এটিকে সহজে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। কিন্তু অনেক ইরানির কাছে এর সাফল্য স্লোগানে নির্ধারিত হবে না।

বরং পরিমাপ হবে- যুদ্ধ থামে কি না, পণ্যমূল্য কমে কি না, নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয় কি না, এবং নেতৃত্ব আরেক দফা আকস্মিক উত্তেজনা ছাড়া পরবর্তী পর্যায় সামাল দিতে পারে কি না। -আমার দেশ থেকে নেওয়া বিবিসি বাংলার খবর

ইরান কেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিকে বিজয় হিসেবে দেখছে

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে বড় পরাজয় নেতানিয়াহুর

ইসরাইলের সংবাদমাধ্যম হারেৎজ মঙ্গলবার তাদের প্রথম পাতায় শিরোনামে লিখেছিল, ‘৭ অক্টোবরের পর ইরান সংকটই নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা’। এই শিরোনাম ইরান যুদ্ধ নিয়ে অনেকের মনোভাব তুলে ধরেছে।

ইরানের সঙ্গে সাড়ে তিন মাস ধরে চলা যুদ্ধের পর ইসরাইলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মধ্যস্থতা করেছে। দৃশ্যত এতে ইসরাইলের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।

বরং ইরান রাষ্ট্র, যাকে ইসরাইলের রাজনীতিবিদেরা কয়েক দশক ধরে নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন, তা এখনো টিকে আছে। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে দেশটি আগের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়েছে।

লেবাননেও নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে ইসরাইল। দেশটি দাবি করে আসছিল, ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর রকেট হামলা ঠেকাতে তাদের সামরিক অভিযান প্রয়োজন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি স্বাক্ষরের আগে লেবাননে ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা ওয়াশিংটন ও তেহরানের সম্পর্কে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

চুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা

ইসরাইলে এই চুক্তির বিরোধিতা আসছে মধ্যপন্থি ও কট্টর ডানপন্থি উভয় পক্ষ থেকেই।

এই বছরের শেষের দিকে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিপক্ষে লড়বেন মধ্যপন্থি গাদি আইজেনকোট। তিনি ইসরাইলি নেতা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির কঠোর সমালোচনা করেছেন।

আইজেনকোট এটিকে ‘একটি ব্যর্থ সরকারের হতাশাজনক পরিণত’ বলে অভিহিতে করেছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুর পূর্ণ বিজয়ের প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তব চুক্তির মধ্যে বিশাল ফারাক রয়েছে।

অন্যদিকে নেতানিয়াহুর জোট সরকারের কট্টর ডানপন্থি সদস্য জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচও চুক্তির বিরোধিতা করেছেন। বেন-গভির বলেন, ‘ট্রাম্প ও খামেনির চুক্তি অনুযায়ী আমাদের চলা উচিত নয়।’ এছাড়া স্মোত্রিচ একে ‘বাজে চুক্তি’ বলে অভিহিত করেছেন।

বছরের পর বছর ধরে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং ইসরাইলে এই যুদ্ধকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন নেতানিয়াহু। তাই তিনি এখন বুঝতে পারছেন, এই সংঘাতের অবসান ঘটানো দেশের অভ্যন্তরে জনপ্রিয় নয়। প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে তার কথিত ‘ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত’ থেকে নিজেকে যথাসম্ভব দূরে রাখতে যথেষ্ট চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনায় নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের সমান অংশীদার বলেও দাবি করছেন।

সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা বহু বছরের জন্য ইসরাইলের ওপর ঝুলে থাকা ধ্বংসের হুমকি দূর করেছি। আমরা ইসরাইল রাষ্ট্রকে নিশ্চিহ্ন হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছি।’ তবে সমালোচকদের মতে, ২০২৫ সালের ১২ দিনের ইরান যুদ্ধের পরও তিনি একই ধরনের ঐতিহাসিক বিজয় দাবি করেছিলেন, যার বাস্তব ফল এখন প্রশ্নের মুখে।

ইসরাইলের সাবেক সরকারি উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি বলেন, ইসরাইলের ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে ইরানকে সহজেই পরাজিত করা যাবে, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। তিনি বলেন, ‘ধারণাটি ছিল ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও ইসরাইলি অহমিকার প্রতিফলন। ইরান কৌশলগতভাবে এগিয়ে যেতে পারে—এমন সম্ভাবনা তাদের বিবেচনাতেই ছিল না।’

আঞ্চলিক শক্তিকে কে এগিয়ে

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন, ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করবে না। তবে, এমন একটি যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে রাজি করাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে, যে যুদ্ধে ইরানই জয়ী হয়েছে বলে বিশ্বাস করেন অনেকে।

কিংস কলেজ লন্ডনের যুদ্ধবিদ্যা বিভাগের সিনিয়র টিচিং ফেলো আরন ব্রেগম্যান বলেন, ‘নেতানিয়াহু ইসরাইলের ওপর কৌশলগত বিপর্যয় চাপিয়ে দিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু ইরানের সঙ্গে এমন একটি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল দেশটির শাসনব্যবস্থা উৎখাত করা। কিন্তু সেই শাসনব্যবস্থা এখনো টিকে আছে এবং আগের চেয়ে আরো বেশি উগ্রপন্থি হয়ে উঠেছে। ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার পুনর্গঠন করবে।’

এছাড়া লেবাননে ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযান নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে লেবাননে ইসরাইলি হামলা বন্ধকে যেকোনো সমঝোতার শর্ত হিসেবে তুলে ধরেছে। তবে নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি লেবাননে ইসরাইলের পদক্ষেপ সীমিত করবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিরতির পথে বাধা তৈরি করতে পারে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিতে পারে। মঙ্গলবার ট্রাম্প নিজেও বলেন, লেবাননে ইসরাইলের আচরণে তিনি খুশি নন এবং নেতানিয়াহুকে আরো দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ব্রেগম্যান বলেন, ‘ভূগোল ইরানের পক্ষে। এটি (হরমুজ প্রণালি) একটি অর্থনৈতিক পারমাণবিক বোমা, যা ইরানিরা আবারও বিনা দ্বিধায় ব্যবহার করবে।’

নেতানিয়াহুকে নির্বাচনের আগে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা, লেবানন সংকট এবং ইরান যুদ্ধ—সব মিলিয়ে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে।

সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক অ্যালন পিঙ্কাস বলেন, ‘নেতানিয়াহুকে এখন নির্বাচনে যেতে হচ্ছে ৭ অক্টোবরের বিপর্যয়, লেবাননে ব্যর্থতা এবং ইরানের সঙ্গে বিপর্যয়কর যুদ্ধের বোঝা নিয়ে।’

তিনি বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত, নেতানিয়াহুকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যিনি জীবনের সেরা সুযোগটি পেয়েছিলেন এবং তা নষ্ট করেছেন। সবকিছু তার অনুকূলে ছিল: একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, মিত্রহীন একা ইরান এবং সামরিক ও প্রযুক্তিগত সুবিধা। কিন্তু তিনি তা নষ্ট করেছেন।’

পিংকাস আরো বলেন, ‘৩০ বছর ধরে তিনি ইরান নিয়ে কথা বলে আসছেন এবং যখন সময় এলো, তিনি তা নষ্ট করলেন।’

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে বড় পরাজয় নেতানিয়াহুর

‘সেক্স আইকন’ জেমস রদ্রিগেজের বর্ণিল প্রেম, পর্নো তারকার সঙ্গে সম্পর্ক এবং...

জেমস রদ্রিগেজ হয়তো কখনো সেই কিংবদন্তি ফুটবলার হয়ে উঠতে পারেননি, যেভাবে তাকে নিয়ে একসময় ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল। তবে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আলোচিত প্রেম, বিচ্ছেদ এবং মডেলিং জগতের ঝলমলে উপস্থিতির কারণে কলম্বিয়ার অবিসংবাদিত ‘সেক্স আইকন’ হিসেবে তার পরিচিতি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী জেমস বৃহস্পতিবার উজবেকিস্তানের বিপক্ষে কলম্বিয়ার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামবেন। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার হয়ে গোল্ডেন বুট জিতে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। সে সময় মোনাকোর হয়ে খেলা এই প্লেমেকার রাতারাতি তারকাখ্যাতি অর্জন করেন।

বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ তাকে ৬ কোটি ৩০ লাখ পাউন্ডের চুক্তিতে দলে ভেড়ায়। এই দলবদলই তার জীবনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এরপর শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও নজর কাড়তে শুরু করেন জেমস রড্রিগেজ। নতুন খ্যাতিকে কাজে লাগিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার ফ্যাশন ব্র্যান্ড এক্সিতোর সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি করেন তিনি। একই বছরে স্প্যানিশ সংস্করণের পিপল ম্যাগাজিন তাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে আবেদনময় পুরুষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর এক বছর পর নিজের জে১০ জেমস অন্তর্বাস ব্র্যান্ড বাজারে আনার সময় একটি ফটোশুটেও অংশ নেন তিনি। এরপর একের পর এক বাণিজ্যিক চুক্তি আসতে থাকে তার ঝুলিতে।

সে সময় জেমসের স্ত্রী ছিলেন দানিয়েলা ওসপিনা। ২০১৬ সালে তিনি অন্তর্বাস ব্র্যান্ড কেলভিন ক্লেইনের বৈশ্বিক শুভেচ্ছাদূত হন। বিভিন্ন বিলবোর্ডে তাকে শুধু ওই ব্র্যান্ডের অন্তর্বাস পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়। কৈশোরেই দানিয়েলার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দানিয়েলা ছিলেন আর্সেনালের সাবেক তারকা এবং জেমসের কলম্বিয়ান সতীর্থ দাভিদ ওসপিনার বোন। পেশাদার ভলিবল খেলোয়াড় দানিয়েলাকে ২০১০ সালে বিয়ে করেন জেমস। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। তাদের সংসারে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। তার নাম রাখেন সালোমে। একসময় কলম্বিয়ার ক্রীড়াঙ্গনের অন্যতম জনপ্রিয় দম্পতি হিসেবে পরিচিত ছিলেন তারা।

কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়ার পর জেমসের ক্রমবর্ধমান খ্যাতি তাদের সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। জীবনের লক্ষ্য ও অগ্রাধিকার বদলে যেতে থাকায় দু’জনের দূরত্ব বাড়ে। অবশেষে ২০১৭ সালে ছয় বছরের বেশি সময়ের দাম্পত্য জীবনের ইতি টেনে বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন তারা। এর আগেই মডেল হেলগা লাভেকাতির সঙ্গে জেমসের সম্পর্কের গুঞ্জন শোনা যায়। পরে বায়ার্ন মিউনিখে ধারে খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্তও সম্পর্কে ভাঙনের একটি কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দানিয়েলা জার্মানিতে যেতে আগ্রহী ছিলেন না।

একাকী জীবনে ফেরার পর জেমসের নাম বিভিন্ন নারীর সঙ্গে জড়িয়ে আলোচনায় আসে। ইনস্টাগ্রামে পরস্পরকে অনুসরণ করায় মার্কিন পর্নো তারকা কেন্দ্রা লাস্টের সঙ্গেও তার সম্পর্কের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৮ সালে মায়ামি সফরে মডেল শ্যানন দে লিমার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা মিউনিখে একসঙ্গে বসবাস শুরু করেন। এক বছর পর গর্ভ ভাড়ার মাধ্যমে তাদের ছেলে স্যামুয়েলের জন্ম হয়। কিন্তু পরে জেমসের এভারটনে ধারে খেলা এবং পরবর্তীতে কাতারের আল-রাইয়ানে যোগ দেয়ার ফলে দূরত্ব তৈরি হয় তাদের সম্পর্কে। দীর্ঘ দূরত্বে সম্পর্কের চাপের কারণে ২০২১ সালে বিচ্ছেদ ঘটে তাদের।

পরবর্তীতে কলম্বিয়ান গায়িকা কারোল জি-এর সঙ্গে একটি ছবি প্রকাশের পর তাদের সম্পর্ক নিয়েও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ব্রাজিলিয়ান মডেল এরিকা শ্নাইডারের সঙ্গেও তার সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে অপরের পোস্টে প্রতিক্রিয়া জানানো এবং প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে একসঙ্গে উপস্থিত হওয়ার কারণে এই জল্পনা তৈরি হয়। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ব্রাজিলের বিপক্ষে কলম্বিয়ার একটি ম্যাচেও গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন শ্নাইডার। তবে গত বছরের শুরুতে কলম্বিয়ান মডেল লুইসা দুকের সঙ্গে জেমসের নতুন সম্পর্কের খবর প্রকাশিত হয়। মেজর লিগ সকারে যোগ দেয়ার পর মিনেসোটা টিম্বারউলভসের একটি এনবিএ ম্যাচে তাদের একসঙ্গে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। কলম্বিয়ার গণমাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, জেমস তার পরিবারের সঙ্গে লুইসার পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এমনকি সাম্প্রতিক কলম্বিয়া ম্যাচগুলোর ভিআইপি গ্যালারিতে জেমসের মেয়ে সালোমের সঙ্গেও লুইসাকে সময় কাটাতে দেখা গেছে।

এই গ্রীষ্মে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলতে নামার আগে জেমস হয়তো ফিরে তাকাবেন এক বর্ণিল কিন্তু অপূর্ণতার ছাপ থাকা ক্যারিয়ারের দিকে। তিনি কখনো ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম হৃদয়জয়ী তারকা হিসেবে নিজের আলাদা পরিচয় ঠিকই গড়ে তুলেছেন।
(সূত্র দ্য সান)

বিশ্বে ফের পরমাণু অস্ত্রের ‘গর্জন’ by হুমায়ূন কবির

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পারমাণবিক অস্ত্র আছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের কাছে। গত বছর তারা একাধিক আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালিয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী অন্যদের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে গত ২৬ অক্টোবর ২০২৫ পারমাণবিক শক্তিচালিত আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র ‘বুরেভেস্তনিক’র সফল পরীক্ষা চালায় রাশিয়া। এর দুদিন পর ২৯ অক্টোবর ২০২৫ তারা উৎক্ষেপণ করে পারমাণবিক সুপার টর্পেডো ‘পোসেইডন’। আর চীন তো ২০২০ সালের পর থেকে ভয়াবহ মাত্রায় অস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়েছে। এর মধ্যে ৫ নভেম্বর ওয়াশিংটন মিনিটম্যান থ্রি নামে পরমাণু ওয়ারহেড বহনে সক্ষম আইসিবিএম পরীক্ষা চালিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অস্ত্র বিস্তারবিরোধী বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তা বিস্তারে লাগাম টেনেছিল। তবে সম্প্রতি এসব দেশ চুক্তি উপেক্ষা করে আইসিবিএস পরীক্ষা শুরু করেছে। এতে বিশ্বের কৌশলগত ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। এর কারণগুলো নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন হুমায়ূন কবির

নিউইয়র্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিউজউইকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরই) বলছে, বর্তমানে ৯টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে—দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও উত্তর কোরিয়া; সবার কাছে মোট ১২ হাজার ২৪১টি পারমাণবিক ওয়ারহেড আছে। প্রায় ৯ হাজার ৬১৪টি সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য সামরিক মজুতে রয়েছে, যার মধ্যে ৩ হাজার ৯১২টি বতর্মানে মোতায়েন অবস্থায় আছে।

সম্প্রতি রাশিয়া পারমাণবিক শক্তিচালিত বুরেভেস্তনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালায়, যার ড্রোনটিকে বলা হচ্ছে ‘ডুমসে মেশিন বা কেয়ামতের হাতিয়ার’। আরেকটি পরমাণু শক্তিচালিত ‘পোসেইডন টর্পেডো’ পরীক্ষা চালায় তারা। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিপক্ষদের মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে অবিলম্বে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার শুরুর নির্দেশ দেন। এরই মধ্যে উদীয়মান পারমাণবিক শক্তিধর চীন তার নতুনতম আইসিবিএম শক্তি প্রদর্শন করেছে।

এরপরই যুক্তরাষ্ট্র মিনিটম্যান থ্রি আইসিবিএম পরীক্ষা চালায়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, সামরিক বাহিনীর এ পরীক্ষা বহু বছর আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। ট্রাম্প পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার নির্দেশ দিলেও বলেন, তিনি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য কাজ করতে পারেন। যারা আগামী চার বা পাঁচ বছরের মধ্যে এ অস্ত্রে তাদের ছাড়িয়ে যাবে বলে দাবি করেন তিনি।

সিএনএনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২০ সালের পর থেকে চীন যে মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন-সংক্রান্ত স্থাপনা বিস্তার করেছে, তা এখন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পুনঃসরবরাহ নিয়ে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার পুরো বিপরীতে চীন নিয়ন্ত্রিত গবেষণা কেন্দ্র, কারখানা ও পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। এমনই চিত্র ফুটে উঠেছে সর্বশেষ উপগ্রহচিত্র, খোলা নথি ও ভৌগোলিক বিশ্লেষণে।

এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও পিপলস লিবারেশন আর্মি রকেট ফোর্সের সঙ্গে যুক্ত ১৩৬টি স্থাপনার মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ গত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এ স্থাপনাগুলোর মোট নির্মিত ফ্লোর স্পেস বেড়েছে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ বর্গফুটেরও বেশি, যেখানে নতুন টাওয়ার, বাঙ্কার ও নিরাপত্তাবেষ্টনী স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশও চিহ্নিত করা গেছে।

এ বিষয়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক উইলিয়াম আলবার্গে বলেন, ‘চীন স্পষ্টতই সুপারপাওয়ারের অবস্থান দৃঢ় করছে। এটি নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার প্রাথমিক ধাপ।’

২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সামরিক আধুনিকায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন। উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর চীন ক্ষেপণাস্ত্র-সম্পৃক্ত নির্মাণকাজ প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়িয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার অভিজ্ঞতাকে চীন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে—বিশেষত সস্তা ড্রোনের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখে শক্তিশালী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের কৌশলটি। মূলত বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চুক্তি নবায়ন না হওয়ার মতো কারণে পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে ঝুঁকছে কিছু দেশ।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকিতে: এসআইপিআরই বলছে, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে। পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে যখন উদ্বেগ বাড়ছে, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ প্রযুক্তি প্রসারের ফলে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।

বর্তমানে অন্তত পাঁচটি দেশ পরমাণু কর্মসূচির আধুনিকায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এ আধুনিকায়নের মধ্যে রয়েছে, তাদের হাতে থাকা বর্তমান অস্ত্রগুলোর উন্নয়ন এবং এতে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা।

ইয়ারবুক ২০২৫ শীর্ষক প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বব্যাপী নিউক্লিয়ার ওয়্যারহেড, বোমা এবং শেলের সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা ১২ হাজার ২৪১। কমে আসার এ প্রবণতা এখন আবার উল্টো দিকে ঘুরছে বলে প্রতিবেদনটিতে আশঙ্কা করা হয়। সংস্থাটির পরিচালক ড্যান স্মিথ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, এ অস্ত্রের সংখ্যা কমিয়ে আনার পদক্ষেপের বিষয়টি আর থাকছে না।’

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং শীতল যুদ্ধ অবসানের পর থেকে পরমাণু অস্ত্র কমিয়ে আনার হারের চেয়ে নতুন করে তৈরি করার হার বেড়েছে। এদিকে পরমাণু অস্ত্রধারী দেশগুলোর মধ্যে এ অস্ত্রের আধুনিকায়নের বিষয়টি সাধারণ হলেও, স্মিথ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় মেয়াদের সময় থেকে এ প্রক্রিয়াটি তীব্রতর হয়েছে। এ ছাড়া এ সময়ে নতুন প্রযুক্তির মিসাইল এবং বোমা বহনের খাতেও বিনিয়োগ বাড়ছে।

গবেষকরা বলছেন, বিশ্বের অনেক দেশই এখন পারমাণবিক বোমা বানানোর কথা বিবেচনা করছে, বা বিধ্বংসী এ অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখতে চায় নিউক্লিয়ার শেয়ারিং চুক্তির মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকিতে

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে, চীনের কাছে বর্তমানে অন্তত ছয়শ পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে এবং অন্য যে কোনো দেশের তুলনায় চীন দ্রুত গতিতে তার পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার প্রসারিত করছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির অনুমান, ভারতও ২০২৪ সালে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার কিছুটা সমৃদ্ধ করেছে। একই কাজ করছে পাকিস্তানও। পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান জড়ো করছে দেশটি।

ইসরায়েল অবশ্য নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে কখনোই স্পষ্ট তথ্য দেয়নি। তবে পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার আধুনিকায়ন করছে দেশটি—এমন সন্দেহ গবেষকদের।

ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এআই: ইয়ারবুক ২০২৫-এর সূচনায় গবেষক স্মিথ নতুন পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতার বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, ‘এতে শীতল যুদ্ধের সময়ের চেয়েও আরও বেশি ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তা রয়েছে।’ এর কারণ হিসেবে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই), সাইবার সক্ষমতা এবং মহাকাশ প্রযুক্তির কথা বলেন।

কার কত পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে সে বিষয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হলে, তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি করা হবে—সেই প্রশ্ন উঠেছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেমন কিলার রোবটের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কিংবা রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় এবং আধা স্বয়ংক্রিয় ড্রোনের ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্রের সম্পর্কের বিষয়ে খুব একটা আলোচনা হচ্ছে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে তথ্য যাচাই-বাছাই করা যায়, যার ফলে সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ খুব দ্রুত নেওয়া যায়। কিন্তু এমন সফটওয়্যারে বা সিস্টেমে যেটি মেশিন লার্নিং, কিংবা এআইয়ের সঙ্গে জড়িত, সেখানে ছোট্ট ভুলেরও ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।

স্মিথ বলেন, ‘আমার মনে হয়, একটি সীমারেখা থাকা উচিত। এটি এমন হতে পারে যে, সব রাজনৈতিক নেতা, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা একমত হবেন যে, পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নেওয়া হবে না।’

এ বিষয়ে তিনি রাশিয়ার লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টানিসলাভ পেত্রোভের উদাহরণ তুলে ধরেন। ১৯৮৩ সালে মস্কো থেকে ৬২ মাইল দক্ষিণে রাশিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের দায়িত্বে ছিলেন। সে সময় সিস্টেম থেকে জানানো হয় যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে আইসিবিএম ছোঁড়া হয়েছে। জবাবে ওয়ার্নিং সিস্টেমের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত না নিয়ে পেত্রোভ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। এর ফলে ভয়ানক যুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাওয়া গিয়েছিল।

তবে গবেষক স্মিথ বলছেন, ‘আমি মনে করি, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এ যুগে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পেত্রোভের দায়িত্ব কে পালন করবে?’

বিশ্বে ফের পরমাণু অস্ত্রের ‘গর্জন’