Showing posts with label লেবানন. Show all posts
Showing posts with label লেবানন. Show all posts

Saturday, August 8, 2026

ধ্বংসস্তূপ থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে হিজবুল্লাহ, কীভাবে বদলে যাচ্ছে তাদের যুদ্ধকৌশল

হিজবুল্লাহ—লেবাননের সশস্ত্র একটি গোষ্ঠী। ইরানপন্থী হিসেবে পরিচিত। একসময় হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এ গোষ্ঠী আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু সেসব দিন পেছনে ফেলে নিজেদের নতুন করে সংগঠিত করেছে হিজবুল্লাহ।

সময়টা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিক। হিজবুল্লাহ তখন চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি পার করছে। হিজবুল্লাহ সদর দপ্তরে বোমা ফেলে ইসরায়েল। একটি, দুটি, তিনটি নয়; পরপর ৮০টি। ধ্বংস হয়ে যায় কার্যালয়। হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের অনেকে নিহত হন। তাঁদের মধ্যে সংগঠনের প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ ছিলেন।

ধারণা করা হয়, ইসরায়েলিরা হাসান নাসরুল্লাহর অবস্থান শনাক্ত করে ফেলেছিল। মাটির ৬০ ফুট নিচেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের সন্দেহ ছিল, ইসরায়েল তাঁদের মুঠোফোনে আড়ি পাতছে। তাঁরা কী বলছেন এবং কী করছেন—সবই জেনে যাচ্ছে। এমনকি হাজারো পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক বসানো হয়েছিল। এতে হিজবুল্লাহর মারাত্মক ক্ষতি হয়েছিল।

এমন পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর বেঁচে থাকা কমান্ডারেরা মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধ করে দেন। তাঁরা মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চলাচল শুরু করেন। তাঁরা লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলের হারেত হরেইক ও শিয়াহসহ বিভিন্ন এলাকায় জড়ো হন। সম্মিলিতভাবে এই এলাকা ‘দাহিয়েহ’ নামে পরিচিত।

হিজবুল্লাহর কমান্ডারেরা মনে করছিলেন, সবকিছুই ফাঁস হয়ে গেছে। হাসান নাসরুল্লাহর মতো সর্বোচ্চ নেতা যদি নিরাপদ না থাকেন, তাহলে তাঁদের আর কেউ নিরাপদ নন।

এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ তাদের সর্বশেষ বিকল্প পরিকল্পনাটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি এমন একটি পরিকল্পনা, যা বাস্তবায়ন করতে হবে—এমনটা হিজবুল্লাহ কমান্ডারেরা ভাবেননি। দাহিয়েহ এলাকায় কমান্ডারেরা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা শুরু করেন। বেকারি, ব্যাংকের কোনো শাখা, এমনকি মুঠোফোনের দোকান—কোথায় দেখা করেননি তাঁরা।

ওই সময় হিজবুল্লাহর কমান্ডারদের যোগাযোগের একমাত্র উপায় ছিল এভাবে সামনাসামনি দেখা করা। কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়নি। সম্ভবও ছিল না। তাঁদের এভাবে দেখা করার মূল্য উদ্দেশ্য দুটি। এক, সংকটময় সময় কাটিয়ে হিজবুল্লাহকে আবারও সক্রিয় করার পরিকল্পনা করা। দুই, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য স্থল অভিযান মোকাবিলার প্রস্তুতি শুরু করা।

আর এভাবেই শুরু হয় হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। ধ্বংসের মুখ থেকে উঠে আসে হিজবুল্লাহ। সংগঠনের কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়।

হিজবুল্লাহর এই ঘুরে দাঁড়ানোর যাত্রা সম্পর্কে ভালোভাবে জানেন এমন সাতজনের সঙ্গে কথা বলেছে মিডল ইস্ট আই। সংবাদমাধ্যমটি কথা বলেছে হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সূত্র, লেবাননের রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও কয়েকজন আরব কূটনীতিকের সঙ্গেও। তাঁদের প্রায় সবাই নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

তাঁদের ভাষ্য, শুরুর দিকে বড় ধরনের সংশয় থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে হিজবুল্লাহ। সামরিকভাবে বড় ধাক্কা খাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যে হিজবুল্লাহ কীভাবে নিজেদের বাহিনীকে পুনর্গঠন করেছে, সেই বিষয়ে তাঁরা বিস্তারিত জানিয়েছেন। এমনকি হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ নিয়ে অভ্যন্তরীণ আলোচনা নিয়েও তাঁরা কথা বলেছেন।

২০২৩ সালের পর থেকে লেবাননে ইসরায়েলিদের দুটি যুদ্ধে ইরানের ভূমিকা, হিজবুল্লাহর অর্থনৈতিক সংকট, শিয়াদের একটি অংশের অসন্তোষসহ নানা বিষয় উঠে এসেছে এসব ব্যক্তির কথায়, মতামতে।

ইসরায়েলে হামলা ‘ভুল’ ছিল

পর্দার অন্তরালে থাকা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানোটা বড় আর ঐতিহাসিক ভুল ছিল। সংশ্লিষ্ট তিনটি সূত্র জানায়, হামলার সিদ্ধান্ত সরাসরি হাসান নাসরুল্লাহর কাছ থেকে এসেছিল। এমনকি হিজবুল্লাহর সর্বোচ্চ নির্বাহী পরিষদ শুরা কাউন্সিলের ভেতরেও এ নিয়ে ভিন্নমত ছিল।

চলতি মাসের শুরুর দিকে এ বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের আর্মি রেডিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে কয়েক মাস, এমনকি কয়েক বছর ধরে হামাস আর হিজবুল্লাহর মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর উদ্ধার করা বলে দাবি করা কিছু অভ্যন্তরীণ নথির উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে সমন্বিত ও আকস্মিক হামলায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, সীমান্ত ও সম্পদ বিভাগের প্রধান এবং সাবেক সংসদ সদস্য নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘এসবই কেবল প্রচার। বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।’

তবে নাম–পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা হিজবুল্লাহর কয়েকজন যোদ্ধার মতে, ইসরায়েলের ওই প্রতিবেদনে কিছুটা সত্যতা থাকলেও থাকতে পারে।

বছরের পর বছর ধরে ইরান এবং তাদের নেতৃত্বাধীন ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট একটি কৌশল গড়ে তুলেছে। এ জোটে রয়েছে কয়েকটি রাষ্ট্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠী। এই কৌশলের নাম ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’। এর লক্ষ্য চারদিক থেকে হুমকি সৃষ্টির মাধ্যমে ইসরায়েলকে ঘিরে ফেলা।

সোলাইমানি–নাসরুল্লাহর ভূমিকা

এই কৌশলের মূলে ছিলেন দুজন ব্যক্তি। দুজনই এখন প্রয়াত। তাঁদের একজন ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। অন্যজন হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ। নিজের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, সামরিক সাফল্য এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নাসরুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছিলেন। আরবিতে সাবলীল কাসেম সোলাইমানি বহু যুদ্ধের অভিজ্ঞ ছিলেন। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অভিজাত কুদস ফোর্সের প্রধান ছিলেন তিনি।

সোলাইমানি ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রম তদারকি করতেন। প্রয়োজনে সরাসরি নির্দেশনাও দিতেন। এর মধ্যে ছিল ইরাকের শিয়া আধাসামরিক বাহিনী, ইয়েমেনের হুতিরাও। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কাছেও তাঁর যথেষ্ট প্রভাব ছিল।

সোলাইমানি আর নাসরুল্লাহর কর্মতৎপরতার মিল বোঝাতে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরে। সূত্রটির দাবি, ওই সময় নাসরুল্লাহকে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছিলেন সোলাইমানি। উদ্দেশ্য ছিল, সিরিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে সমর্থন দেওয়া।

সূত্রটি জানায়, সোলাইমানির এমন প্রস্তাবের জবাবে নাসরুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। আমাদের সিরিয়ায় যাওয়া উচিত। তবে আমাদের আরও আগেই যাওয়া উচিত ছিল।’

বাঁকবদলের মুহূর্ত

২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানি নিহত হন। এ ঘটনাকে বড় বাঁকবদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হয়। এর ফলে ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোট তাদের অন্যতম প্রধান কৌশলগত নেতৃত্বকে হারায়। ‘ইউনিটি অব ফ্রন্টস’ কৌশলও ধীরে ধীরে গতি হারাতে শুরু করে।

হিজবুল্লাহর অন্তত তিনটি সূত্রের দাবি, মূলত এ কারণে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস এককভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দুটি সূত্র জানায়, ওই হামলার পর ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দোল্লাহিয়ান বৈরুতে যান। ওই সফরের সময় তিনি নাসরুল্লাহকে জানান, তেহরান যুদ্ধে (গাজা যুদ্ধ) শুধু নৈতিক সমর্থন দিতে প্রস্তুত।

ইরানের নেতাদের মতো নাসরুল্লাহ নিজেও আশঙ্কা করছিলেন, বড় ধরনের হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। এ কারণে তিনি সীমিত পরিসরে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তাই তিনি ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ইসরায়েলের দিকে সীমিত পরিসরে রকেট হামলার নির্দেশ দেন। ওই সময়ে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চলছিল।

তবে হাসান নাসরুল্লাহর বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রাদওয়ান ফোর্সের বিশেষ অভিযান ইউনিটের প্রধান ইব্রাহিম আকিল। বিরোধিতাকারীদের ভাষ্য ছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে নামলে পুরো শক্তি নিয়েই নামতে হবে। আর সেটা সম্ভব না হলে যুদ্ধে জড়ানো একেবারে উচিত হবে না।

বড় সংঘর্ষ এড়ানো

এরপর বছরখানেক ধরে লেবানন–ইসরায়েল সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চালায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল। এ সময়ে দুপক্ষের মধ্যে ৭ হাজার রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন হামলা এবং বিমান ও কামানের গোলাবর্ষণ হয়।

এসব হামলা চলে পুরো ‘ব্লু লাইনে’। জাতিসংঘ নির্ধারিত এ সীমানা কার্যত লেবানন-ইসরায়েলের সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে প্রাণহানির দিক থেকে বড় ক্ষতি হয় লেবাননের। দেশটিতে ২ হাজার মানুষ নিহত হন। ইসরায়েলের সীমান্তের দক্ষিণে নিহত হন ৭০ জন।

যদিও হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা ইসরায়েলের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনাকে উত্তর সীমান্তে আটকে রাখতে সক্ষম হয়। এতে গাজার পাশাপাশি আরেকটি ফ্রন্টে মনোযোগ দিতে হয় ইসরায়েলকে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চল থেকে প্রায় ৬০ হাজার ইসরায়েলি বাসিন্দাকে সরিয়ে নিতে হয়।

দুপক্ষ শুরুর দিকে বেশকিছু অলিখিত সীমার মধ্যে থেকে হামলা চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে এমন এক ধরনের বোঝাপড়া ছিল, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জবাব একই ধরনের হামলায় দেওয়া হবে। হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ সতর্ক করে বলেছিলেন, বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে তেল আবিবে হামলা চালিয়ে।

ধীরে ধীরে সেই সীমা অতিক্রম করতে শুরু করে ইসরায়েল। সেই সঙ্গে হিজবুল্লাহর প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে, সেটিও পরীক্ষা করতে থাকে ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরি নিহত হন।

এর প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের মাউন্ট মেরনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক রকেট হামলা চালায়। হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র বলেছে, তেল আবিবের বদলে ওই ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার কারণ, আরুরি ছিলেন ফিলিস্তিনি, লেবাননের নাগরিক নন। কাজেই এর জবাবও সীমিত রাখা হয়েছিল।

ছয় মাস পর হিজবুল্লাহর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকুর ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন। এর জবাবে ইসরায়েলের দিকে এক হাজার রকেট ছোড়ার পরিকল্পনা করেছিল হিজবুল্লাহ। কিন্তু ইসরায়েল আগে হামলা চালিয়ে হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ রকেট উৎক্ষেপণকেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়।

পেজার–ওয়াকিটকি বিস্ফোরণ

হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের দাবি, পাল্টা জবাবের পরিকল্পনার পুরোটা সময় আড়ি পেতে শুনেছিল ইসরায়েল। তাই আগেই হামলা চালাতে পেরেছিল দেশটি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এসে হিজবুল্লাহর নিরাপত্তা আর গোয়েন্দা ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশের ব্যাপকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজারো পেজার ও শত শত ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরণ ঘটায়।

ইসরায়েলের সমর্থকেরা এ অভিযানকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে আখ্যা দেন। অনেকেই একে জেমস বন্ড চলচ্চিত্রের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেন। হিজবুল্লাহর সরবরাহ ব্যবস্থায় ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করে যোগাযোগযন্ত্রে বিস্ফোরক বসিয়েছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ।

এসব বিস্ফোরণে প্রায় ৪০ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েক হাজার মানুষ। মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়া এই অভিযানকে ‘আমাদের মিশন বাস্তবায়নের একটি স্পষ্ট উদাহরণ’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। হামলার স্মরণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সোনার তৈরি একটি পেজার উপহার দেন।

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো স্বীকার করে নিয়েছে, এটি ছিল তাদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা। তবে তাদের দাবি, শেষ পর্যন্ত এই অভিযান সফল হয়নি।

১৭ সেপ্টেম্বর বিস্ফোরিত পেজারগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর মতে, প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকি। এগুলো আকারে বড় ছিল। বেশি বিস্ফোরক রাখা হয়েছিল। মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা এগুলো ব্যবহার করতেন। অন্যদিকে পেজার মূলত বার্তা পাঠানো বা সদস্যদের ডেকে পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। এগুলোর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অযোদ্ধা কর্মকর্তাদের কাছে ছিল।

সূত্রগুলোর দাবি, ২০২২ সাল থেকে হিজবুল্লাহর কাছে ত্রুটিযুক্ত পেজার সরবরাহ করতে শুরু করে ইসরায়েল–সমর্থিত কোম্পানি। হামলার সময় এমন প্রায় ২ হাজার ৫০০টি পেজার ছিল। ওয়াকিটকি নিয়ে অভিযানটি এক দশক ধরে অত্যন্ত গোপনে চলছিল। দুটি সূত্রের দাবি, ১৮ সেপ্টেম্বরের অভিযানের সময় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি গুদামে সংরক্ষিত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেগুলো তখন বন্ধ অবস্থায় ছিল।

এ সংখ্যাগুলো মোসাদের একজন এজেন্টের আগে দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে মিলে যায়। তিনি দাবি করেছিলেন, ইসরায়েলের একটি গোপন ছদ্মবেশী কোম্পানি হিজবুল্লাহকে প্রায় ১৬ হাজার ওয়াকিটকি সরবরাহ করেছে। ওই সময় হামলায় হাজারো পেজার ধ্বংসের পরদিন চালানো অভিযানে মাত্র কয়েক শ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়েছিল। যদিও ওয়াকিটকির বিস্ফোরণের ক্ষতি ছিল বেশি।

দ্বিতীয় দিনের হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত হন। আর প্রথম দিনের হামলায় নিহত হয়েছিলেন ১২ জন।

হিজবুল্লাহর দুটি সূত্রের দাবি, তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় ইসরায়েল। কারণ, মোসাদ হিজবুল্লাহর অভ্যন্তরীণ আলোচনা আড়ি পেতে শুনছিল। তাদের ধারণা ছিল, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে, যুদ্ধ আর সীমিত রাখা সম্ভব হবে না। এরপর বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯ সেপ্টেম্বর এ নিয়ে শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেই বৈঠকে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনায় আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে স্থল অভিযানও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এর আগে হিজবুল্লাহর একটি পরিদর্শন দল তাদের পেজারগুলো নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করছিল। এগুলো নিরাপত্তাসংক্রান্ত অন্তত দুটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারপরও সন্দেহ কাটেনি। তাই আরও পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য কয়েকটি নমুনা ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এ সিদ্ধান্ত ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। আর দেশটি আগেই হিজবুল্লাহর ওপর আক্রমণ করে বসে।

হিজবুল্লাহর বিপর্যয়ের শুরু

টানা ৬৬ দিন ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে জোরালো বিমান ও স্থল অভিযান চালায় ইসরায়েল। একের পর এক আঘাতে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে হিজবুল্লাহ। এ অভিযানে শুধু হাসান নাসরুল্লাহ নন, তাঁর চাচাতো ভাই ও উত্তরসূরি হাশেম সাফিউদ্দিন নিহত হন। ইব্রাহিম আকিল ও তাঁর নেতৃত্বাধীন রাদওয়ান ফোর্সের কয়েকজন কমান্ডারসহ হিজবুল্লাহর সামরিক নেতৃত্বের অনেকে নিহত হন।

ইসরায়েলের হামলায় হিজবুল্লাহর প্রায় পুরো ইউনিট ধ্বংস হয়ে যায়। ধ্বংস করা হয় গোলাবারুদের গুদামও। হামলায় হিজবুল্লাহর যেসব কমান্ডার বেঁচে গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই মুঠোফোন ব্যবহার করেননি। এ কারণে তাঁরা ইসরায়েলের নজরদারি এড়াতে সক্ষম হন।

এ পরিস্থিতিতে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন ইউনিটে লড়াই চালিয়ে যান হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। তাঁরা ইসরায়েলিদের অগ্রযাত্রা ধীর করে দেন। উত্তরাঞ্চলে হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের ওপর কতটা ভয়াবহ আঘাত নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে তাঁদের অনেকেরই ধারণা ছিল না।

দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা যখন ইসরায়েলি বাহিনীকে ব্যস্ত রাখছিলেন, তখন ঘনিষ্ঠ এই মিত্রকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসে তেহরান।

হিজবুল্লাহর অন্তত দুটি সূত্রের ভাষ্য, তাদের সামরিক কাঠামো ইরানের আইআরজিসির আদলে গড়ে তোলা। এ কাঠামোয় হিজবুল্লাহর একেকজন কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে সমকক্ষের ইরানি কর্মকর্তা থাকেন। হিজবুল্লাহর বিভিন্ন ইউনিট ও বিভাগের প্রধান এবং তাঁদের উপপ্রধানেরা নিহত হওয়ার পর সেসব ইরানি কর্মকর্তারা শূন্যতা পূরণে লেবাননে আসেন।

একটি সূত্র জানায়, তাঁদের মধ্যে ছিলেন কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানির উত্তরসূরি ইসমাইল কানি। কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশান হিজবুল্লাহর সদর দপ্তরে হামলার সময় হাসান নাসরুল্লাহর সঙ্গে নিহত হন।

হিজবুল্লাহর বিশ্বাস, তাদের টিকে থাকার সক্ষমতা ইসরায়েলকে বিস্মিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত এ কারণে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় বলে সংগঠনের সূত্রগুলোর দাবি। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে এবার রাজনৈতিকভাবে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা যাবে। এর ফলে সেনাদের জীবন আর ঝুঁকিতে ফেলতে হবে না।

লেবানন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি ধারণা জোরালো হতে থাকে। সেটি হলো, হিজবুল্লাহ কার্যত ‘ধ্বংস’ হয়ে গেছে। অনেকে মনে করেন, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে, কার্যত তারও কম রয়েছে। একই সঙ্গে এই মতও জোরালো হয়, লেবাননকে পুরোপুরি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে হিজবুল্লাহর অধ্যায়ের অবসান ঘটাতে হবে।

আরব এক কূটনীতিকের ভাষ্য, হিজবুল্লাহর এমন দুর্বল অবস্থানে সৌদি আরব খুশি ছিল। ওই কূটনীতিকের দাবি, মিসর ও ফ্রান্স হিজবুল্লাহকে বোঝানোর চেষ্টা করে, সবচেয়ে শক্তিশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে তাদের সময় শেষ হয়ে এসেছে। এই দুই দেশ মনে করত, হিজবুল্লাহর নেতৃত্বের উচিত সম্মানজনকভাবে সরে যাওয়ার সুযোগ নেওয়া।

টিকে থাকার লড়াই

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ভাষ্য, ওই সময় তাঁদের প্রধান লক্ষ্য ছিল টিকে থাকা। এ কারণে তাঁরা বড় ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। এর মধ্যে সিরিয়ায় বাশার আল–আসাদের সরকারের পতন হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল করে দেয়। আল–আসাদের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে এক দশক ধরে লড়েছে হিজবুল্লাহ। এতে হিজবুল্লাহ জনবল, অর্থ ও আরব বিশ্বের মানুষের সমর্থনের অনেকটা হারিয়েছে।

যাই হোক, লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার দিনই সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়। তখন আসাদকে আবারও রক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিল না হিজবুল্লাহ। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে বলা হয়েছিল, লিতানি নদীর দক্ষিণ থেকে হিজবুল্লাহর বাহিনী সরিয়ে নেওয়া হবে। পরে বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের রাজনৈতিক দলগুলো দাবি তোলে, হিজবুল্লাহকে আরও উত্তরে সরে যেতে হবে।

একজন আরব কূটনীতিক মিডল ইস্ট আইকে বলেন, ‘আসাদের পতনের পর অবস্থান বদলে যায়। দাবি ওঠে, শুধু লিতানির দক্ষিণ নয়, উত্তর দিক থেকেও হিজবুল্লাহকে সরে যেতে হবে। অথচ আমরা সবাই জানতাম, এটি মূল চুক্তির অংশ ছিল না।’ এই কঠোর অবস্থান হিজবুল্লাহকে আরও অনড় করে তোলে।

হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য, ‘২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ সমঝোতার ইঙ্গিত দিয়েছিল। এমনকি জুনে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধেও তারা অংশ নেয়নি। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের অব্যাহত হামলা এবং লেবাননের পক্ষ থেকে গ্রহণযোগ্য কোনো রাজনৈতিক পথ না দেওয়ায় হিজবুল্লাহ আর নমনীয় অবস্থানে থাকতে পারেনি।

আত্মরক্ষা থেকে আক্রমণ

খোলা চোখে দেখে মনে হতে পারে, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময় হিজবুল্লাহর সামরিক শাখা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, পড়ছে। যদিও ইসরায়েল একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছিল। এ সময়ে প্রায় ৩ হাজার বিমান ও ড্রোন হামলা এবং গোলাবর্ষণ করা হয়। হিজবুল্লাহর বেশির ভাগ কমান্ডার এবং তাঁদের উত্তরসূরিদের হত্যার পর ইসরায়েল পরবর্তী স্তরের নেতৃত্বকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে।

এদিকে ইসরায়েলি সেনা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সীমান্তে পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি শক্তিশালী করে এবং সেগুলোর পরিসর বাড়ায়। সীমান্তঘেঁষা শিয়া-অধ্যুষিত শহর ও গ্রামগুলো প্রায় পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকা এখন ফুটবল মাঠের মতো সমতল। সেখানে একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই। নেই কোনো বাড়ি কিংবা মসজিদ।

এত কিছুর পরও হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো পাল্টা জবাব দেখা যায়নি। এতে অনেকের ধারণা হয়, দলটি হয় অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে, নয়তো প্রতিরোধ গড়ে তোলার সাহস নেই। তবে বাস্তবে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পুনর্গঠন চালাচ্ছিল। লক্ষ্য ছিল, আবারও ইসরায়েলকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা অর্জন করা।

হিজবুল্লাহর দুটি সূত্র মিডল ইস্ট আইকে বলে, তাদের সামরিক শাখা আগের তুলনায় অতিরিক্ত বড় ও জটিল হয়ে পড়েছিল। এটি ছিল ধীরগতির। কার্যকরভাবে পরিচালনা করাটাও কঠিন ছিল। যুদ্ধ সেই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তোলে। এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় ধাপে ধাপে পুরো সামরিক কাঠামো পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় হিজবুল্লাহ।

যুদ্ধে গেরিলা কৌশল

হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো জানিয়েছে, পুনর্গঠনের সময় প্রতিটি ইউনিট ও বিভাগকে একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়াত হিজবুল্লাহ কমান্ডার ইমাদ মুগনিয়াহর গেরিলা যুদ্ধকৌশল অনুসরণ করা হয়। প্রতিটি ইউনিটকেই আগেভাগে নির্ধারিত বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

যুদ্ধের সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ ছাড়াই যাতে এসব ইউনিট কার্যকরভাবে অভিযান চালাতে পারে, সে লক্ষ্যে এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ছিল—গুলি শেষ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা আর থাকবে না। প্রয়োজন হলে যোদ্ধারা নিজেদের অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে পারবেন।

এ বছরের মার্চে এই নতুন কৌশলের প্রথম বড় পরীক্ষা হয়। সবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু করেছে। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলো বলে, যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয়। খামেনি হিজবুল্লাহর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় নেতা ছিলেন। লেবাননের অনেক শিয়া মুসলিম তাঁকে অনুসরণ করতেন। খামেনি নিহত হওয়ার জবাবে সীমান্ত পেরিয়ে ছয়টি রকেট ছোড়া হয়।

হিজবুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধের আড়ালে লেবাননে নতুন করে বড় ধরনের হামলা চালাতে যাচ্ছে ইসরায়েল—তাঁদের ধারণা ছিল এটা। তাই আগাম পদক্ষেপ হিসেবে ওই রকেট হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একটি সূত্রের ভাষ্য, মার্চে রকেট ছোড়ার সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাঈম কাসেমের ছিল।

এ সিদ্ধান্তে ইরানের সমর্থন ছিল বলেও সূত্রটি দাবি করেছে। আরেকটি সূত্রের দাবি, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার জবাব হিজবুল্লাহর আরও আগেই দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছিল ইরান। তবে হিজবুল্লাহ সে সময় ভিন্ন হিসাব কষেছিল বলে সূত্রটি জানায়।

ভিডিও গেম ও ড্রোন

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখন ‘গেমিং ক্যাফের’ ছড়াছড়ি। জেরুজালেম, তেহরান কিংবা কায়রো—সবখানেই দেখা যায় এমন দৃশ্য। অন্ধকার ঘরে তামাকের ধোঁয়ার মধ্যে বসে তরুণেরা ফিফা বা ফার্স্ট-পারসন ভিউ (এফপিভি) শুটিং গেমের প্রতিযোগিতায় মত্ত।

বৈরুতের দাহিয়ায় হিজবুল্লাহর অভিজ্ঞ সদস্যরা এসব দেখে হতাশ হতেন। তাঁদের ধারণা ছিল, মার্কিন প্রোগ্রামারদের বানানো কাল্পনিক যুদ্ধের খেলায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নষ্ট করছে নতুন প্রজন্ম। ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করা প্রবীণ যোদ্ধাদের কাছে মনে হতো, তরুণেরা আগের মতো কঠোর নেই।

তবে তাঁরা হয়তো তখনো জানতেন না, এ তরুণেরাই পরের যুদ্ধে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবেন।

২০২৬ সালের মার্চে আবার যুদ্ধ শুরু হয়। ইসরায়েলি সেনারা লিতানি নদীর দক্ষিণে এবং এর বাইরের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। তাঁরা প্রায় ৩০০টি অবস্থান গড়ে তোলেন। এর মধ্যে ছিল ব্যক্তিগত বাড়ি, পরিত্যক্ত সামরিক ঘাঁটি, এমনকি ক্রুসেডের আমলের একটি দুর্গও।

আগের যুদ্ধগুলোয় তীব্র লড়াইয়ের কেন্দ্র ছিল বিনতে জুবাইলের মতো শহর। কিন্তু নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ সেসব এলাকা ছেড়ে দেয়। তবু নিরাপদ ছিল না ইসরায়েলি বাহিনী। ২ মার্চের পর থেকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর ধারাবাহিক হামলা চালানো হচ্ছে। লক্ষ্যভিত্তিক আক্রমণে প্রায় ২০ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

হিজবুল্লাহর লক্ষ্য ছিল, ইসরায়েল যেন কোনো অবস্থান স্থায়ী ঘাঁটিতে পরিণত করতে না পারে। ২০২৪ সালে সীমান্তের পাঁচটি ঘাঁটির ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছিল। এ কৌশল বাস্তবায়নে হিজবুল্লাহ এখন ড্রোনের ওপর বেশি নির্ভর করছে। ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি বড় বড় সংঘাতে নতুন কোনো অস্ত্র সামনে আনার প্রবণতা রয়েছে হিজবুল্লাহর। এর মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের কৌশলগত উদ্ভাবনী সক্ষমতার বার্তা দিতে চায়।

২০০৬ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ ব্যবহার করেছিল করনেট অ্যান্টি-ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র। এটি ইসরায়েলের সাঁজোয়া যান ভেদ করতে সক্ষম হয়েছিল। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে বড় ধরনের কৌশলগত চমক তৈরি হয়। এবার তারা ব্যবহার করছে এফপিভি (ফার্স্ট পারসন ভিউ) ড্রোন। এই ড্রোন ফাইবার-অপটিক কেব্‌লের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে ইলেকট্রনিক জ্যামিং বা সংকেত ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমে আসে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্বল্পমূল্যের কিন্তু প্রাণঘাতী এই ড্রোনকে ‘বড় হুমকি’ বলে উল্লেখ করেছেন। এই ড্রোন লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে হামলা চালায়। একই সঙ্গে পুরো হামলার ভিডিও ধারণ করে।

ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের মতো লেবাননেও ভিডিও গেম সংস্কৃতি থেকে দক্ষ ড্রোনচালক তৈরি হয়েছে। অন্তত দুটি সূত্র জানিয়েছে, এখন হিজবুল্লাহর ড্রোনচালকদের বড় অংশই লেবাননের গেমাররা।

অস্ত্রের আধুনিকায়ন

প্রযুক্তিটি একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ এ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করেছিল। তবে এরপর এর উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ড্রোনগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন এগুলো আরও বেশি বিস্ফোরক বহন করতে পারে। ফলে ইসরায়েলের মারকাভা ট্যাংকের জন্য এগুলো আরও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

হিজবুল্লাহর সুবিধা হলো, ড্রোন তৈরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ তাদের কাছে আগে থেকেই ছিল। ২০২৪ সালের যুদ্ধে হিজবুল্লাহ প্রথমবারের মতো আলমাস-১ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। এটি ফাইবার-অপটিক প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র। এতে টেলিভিশন ও তাপচিত্রনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থা রয়েছে।

হিজবুল্লাহর দাবি, এটি ইসরায়েলের একটি স্পাইক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রটি আগেই তাদের হাতে এসেছিল। তবে একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। এতে ব্যবহৃত ফাইবার-অপটিক কেব্‌লের দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার। কাজেই আন্তসীমান্ত সংঘর্ষে ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যকারিতা কিছুটা সীমিত ছিল।

চলতি বছরের যুদ্ধের বেশির ভাগই লেবাননের সীমান্তের ভেতরে হয়েছে। তাই আলমাস ক্ষেপণাস্ত্রের স্বল্পপাল্লা নিয়ে বড় কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। আলমাসের জন্য মজুত রাখা বিপুল পরিমাণ ফাইবার-অপটিক কেব্‌ল পরে এফপিভি ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

হিজবুল্লাহর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গুণগত সামরিক সুবিধা পেতে নিজেদের সশস্ত্র শাখাকে শক্তিশালী করেছিল হিজবুল্লাহ। এখন কৌশল বদলেছে। প্রযুক্তির ওপর বেশি নির্ভর করা হচ্ছে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ড্রোন।

বর্তমানে কাগজে-কলমে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে। ১৬ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। যদিও দুপক্ষের মধ্যে হামলা, পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। লেবাননের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সংঘাত থেকে লেবাননকে আলাদা রাখা।

যদিও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে স্বাভাবিক জীবন দ্রুত ফিরবে, এমন কোনো ইঙ্গিত এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। হিজবুল্লাহর সূত্র ও লেবাননের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি যুদ্ধের শেষ নয়, সাময়িক বিরতি মাত্র।

আগের সেই হিজবুল্লাহ নেই

২০২৬ সালের আগস্টে এসে হিজবুল্লাহর অবস্থান কী?

এটা নিশ্চিত, হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তবে ছোট ইউনিটভিত্তিক গেরিলা কৌশলে ঝুঁকে যাওয়ার কারণে তারা কিছুটা কার্যকারিতা ধরে রাখতে পেরেছে।

সর্বশেষ দুটি যুদ্ধে হিজবুল্লাহর কতজন যোদ্ধা নিহত হয়েছেন, তার কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই। হিজবুল্লাহর সূত্রগুলোর ধারণা, নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৪ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে হতে পারে। তাঁদের বেশির ভাগই ২০২৪ সালের যুদ্ধে নিহত হন।

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, ২০২৩ সালে যে হিজবুল্লাহ ছিল, এখন আর সেই হিজবুল্লাহ নেই। সূত্রটি বলে, একসময় হিজবুল্লাহর বিশাল রকেট ভান্ডার ছিল। সীমান্তজুড়ে শক্ত অবস্থান ছিল। তারা ইসরায়েলের জন্য বাস্তব ও বড় হুমকি ছিল। অঞ্চলজুড়ে, এমনকি আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত সরবরাহ ও সাহায্য পাওয়ার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তাদের ছিল।

একসময় গ্যালিলি অঞ্চলে ঢোকার যে পরিকল্পনা বা আকাঙ্ক্ষা হিজবুল্লাহর ছিল, এখন আর তা নেই। হিজবুল্লাহর একটি সূত্র বলছে, এখন তাদের উদ্দেশ্য জেরুজালেমকে নয়, বরং লেবাননকে রক্ষা করা।

ঘনিষ্ঠ সূত্রটি আরও বলে, নাঈম কাসেমের বিষয়ে অনেকেই বলেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু রূপান্তরের সময়টাতে তিনি ধীরে ধীরে সংগঠনকে আবার গড়ে তুলছেন।

নাঈম কাসেমের অবদান

নানামুখী তীব্র চাপের মধ্যেও হিজবুল্লাহর নেতৃত্ব টিকে আছে। একই সঙ্গে পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও দেখাতে পেরেছে। নাঈম কাসেমকে মহাসচিব করার সিদ্ধান্তটি শুরুতে অনেকের বিদ্রূপের মুখে পড়েছিল।

হাসান নাসরুল্লাহর মতো ব্যক্তিগত ক্যারিশমা নাঈম কাসেমের নেই। আবার হাশেম সাফিউদ্দিনের মতো ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বও তাঁর নেই। নাসরুল্লাহ ও সাফিউদ্দিন দুজনই ‘সাইয়্যেদ’ ছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর বংশধর বলে দাবি করতেন।

তবু নাঈম কাসেম কঠিন সময়ে হিজবুল্লাহকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি নিজেও ইসরায়েলের হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু। এ বছরের শুরুর দিকে নাঈম কাসেম সংগঠনে বড় ধরনের পুনর্গঠন করেন। নিজের নেতৃত্বের ধরন অনুযায়ী দলকে সাজান। প্রভাবশালী কয়েকজনকে পেছনের সারিতে সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে পুরো প্রক্রিয়া বড় কোনো সংকট ছাড়াই শেষ হয়।

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, নাঈম কাসেম প্রমাণ করেছেন, তিনি সংগঠনকে ধরে রাখতে জানেন। পুরো দলকে পুনর্গঠন ও ঐক্যবদ্ধ করতেও সক্ষম তিনি।

হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন সময় নিহত হয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন প্রজন্মের কয়েকজন নেতা এখনো দায়িত্বে আছেন। তাঁদের মধ্যে নাঈম কাসেম ও হিজবুল্লাহর সংসদীয় ব্লকের প্রধান মোহাম্মদ রাদ আছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এখন সামনে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে হাসান ফাদলাল্লাহ অন্যতম। সময়ের সঙ্গে সংগঠনে তাঁর প্রভাব বেড়েছে।

এ বিষয়ে নাওয়াফ মুসাওয়ি বলেন, ‘আমরা একটি প্রতিরোধ আন্দোলন। আমাদের নেতারা সব সময় নিহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাই প্রতিটি দায়িত্বশীল নেতার বিকল্প হিসেবে আরেকজনকে প্রস্তুত রাখা হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম প্রজন্মের নেতারা নিহত হয়েছেন। দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতারাও নিহত হয়েছেন। তৃতীয় প্রজন্মের অনেক নেতা আর নেই। তবু প্রতিরোধ চলবে।’

মুসাভির ভাষ্য, ইসরায়েলের গোয়েন্দাদের কাছে হিজবুল্লাহর প্রথম, দ্বিতীয় আর তৃতীয় প্রজন্মের নেতাদের সম্পর্কে বিশদ তথ্য ছিল। কিন্তু এখন তাঁরা এমন একটি নতুন প্রজন্মের মুখোমুখি, যাঁদের সম্পর্কে ইসরায়েলিদের কাছে তেমন কোনো তথ্য নেই।

ইরানের ভূমিকা

এমন দুর্বল অবস্থায় অনেকের মনে হতে পারে, হাসান নাসরুল্লাহর সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহকে পরিচালনায় ইরানের ভূমিকা বেড়েছে। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন হিজবুল্লাহর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে ইরানি উপদেষ্টার সংখ্যা কম।

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, এই সময়ে ইরানের উপস্থিতি সবচেয়ে কম। এর কারণ মূলত সরবরাহ–সংক্রান্ত জটিলতা। সিরিয়া এখন আর ইরানিদের জন্য উন্মুক্ত নয়। আকাশপথেও যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে।’

রাজনৈতিক ও কৌশলগত পর্যায়ে সমন্বয় রয়েছে উল্লেখ করে সূত্র আরও জানায়, এই সমন্বয় এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে। সূত্রটির মতে, এ অঞ্চলের এবং হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ইরানের ওপর। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের আলোচনা ও সংঘাতের গতিপ্রকৃতির ওপর।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ তেহরান ও হিজবুল্লাহর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান এমন কোনো সমঝোতায় যেতে রাজি নয়, যেখানে লেবাননের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে না—এমনটাই মনে করছে হিজবুল্লাহ–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো।

বদলাচ্ছে রাজনৈতিক বাস্তবতা

লেবানন রাষ্ট্রের সঙ্গে হিজবুল্লাহর সম্পর্ক এখন সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। গত ২ মার্চ ইসরায়েলের ভূখণ্ডে হিজবুল্লাহর হামলার পর পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। এরপর লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম হিজবুল্লাহর সামরিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করেন। একই সময়ে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নেন। এতে রাষ্ট্র ও হিজবুল্লাহর দূরত্ব বেড়ে যায়।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, ২০২৪ সালে ইসরায়েলের আগ্রাসনের পর হিজবুল্লাহর ভেতরে ভবিষ্যৎ নিয়ে জোরালো আলোচনা হয়েছে। সশস্ত্র আন্দোলন থেকে শুধু রাজনৈতিক দলে রূপ নেওয়া যায় কি না, সেটিও আলোচনায় ছিল।

হিজবুল্লাহ এরই মধ্যে লেবাননের পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় দল। বহু বছর ধরে তারা দেশটির রাষ্ট্রীয় কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিষ্ঠার সময় হিজবুল্লাহ ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরোধী। লেবাননের সাম্প্রদায়িক ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থায় গড়ে ওঠা গোষ্ঠীভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান ছিল।

সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা ও শক্তি ধরে রাখতে হিজবুল্লাহ সেই রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মতোই আচরণ করতে শুরু করেছে, যাদের একসময় তারা ঘৃণা করত। ২০১৯ সালের সরকারবিরোধী গণ–আন্দোলনের সময়ও হিজবুল্লাহ বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষ নেয়। তারা আন্দোলনকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যা দেয়। এমনকি আন্দোলনকারীদের অবস্থানস্থল ভেঙে দিতে নিজেদের সমর্থকদেরও পাঠায়।

নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে চাপ

হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলেছে, সংগঠনের ভেতরে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এটি কীভাবে হতে পারে বা এর ফলাফল কী—এসব নিয়েও কথা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ চলাকালে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নাঈম কাসেমের জন্য কোনো বিষয়ই একেবারে নিষিদ্ধ নয়।’

যদিও হিজবুল্লাহর ভেতরে এমন একটি অংশ আছে, যারা মনে করে, নিরস্ত্রীকরণ কিংবা রাষ্ট্র বা পশ্চিমাদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত হবে না। এমনই একটি সূত্র বলে, ‘আমার মনে হয়, হিজবুল্লাহর আবার আশির দশকের মতো হয়ে ওঠা উচিত। ব্যাপক বোমা হামলা ও হত্যার পথে ফিরে যাওয়া উচিত। তবে এটা মোটেও সহজ নয়।’

ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক মহলের একটি অংশ লেবাননের সেনাবাহিনীর ওপর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। এটা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লেবাননে অনেকের শঙ্কা, এমন হলে দেশে আবার গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে।

এমনকি দ্য ইকোনমিস্ট সাময়িকী গত মাসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে লেবাননের সেনাবাহিনীর প্রতি আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। লেখা হয়েছে, ‘ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু তা কোনোভাবেই নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হতে পারে না। সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিতে হবে।’

এ বিষয়ে মুসাওয়ি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, লেবাননে কেউ দখলদারত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে থাকা শক্তির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবে। কারণ, তা হলে লেবানন ধ্বংস হওয়ার আগেই তাদের নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনতে হবে।’

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া সমঝোতাকে অনেকে আত্মসমর্পণের শামিল মনে করছেন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপ করেছেন। তবু এই সমঝোতা হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিকভাবে আরও কিছুটা সময়–সুযোগ করে দিয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

** মিডল ইস্ট আইয়ে ৫ আগস্ট প্রকাশিত নিবন্ধটি লিখেছেন সংবাদমাধ্যমটির মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি দানিয়েল হিলটন এবং বৈরুতভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক আদম শামসেদ্দিন
- অনুবাদ করেছেন অনিন্দ্য সাইমুম

সংগঠনের পতাকা হাতে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা
সংগঠনের পতাকা হাতে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা। ফাইল ছবি: এএফপি

Monday, June 29, 2026

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল প্রস্তাবিত চুক্তি প্রত্যাখ্যান করল লেবানন

লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার ও হিজবুল্লাহর মিত্র নাবিহ বেরি যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও লেবাননকে নিয়ে প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় কাঠামো চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, এই চুক্তিতে লেবাননের অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি, তাই এটি বর্তমান রূপে কার্যকর হবে না।

সোমবার (২৯ জুন) ভোরে নিজের দল আমাল মুভমেন্টের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বেরি বলেন, এই চুক্তি পাস হবে না এবং বর্তমান রূপে বাস্তবায়নও হবে না।

তিনি আরও বলেন, এটি লেবাননের অধিকার সংরক্ষণের চুক্তি নয়, বরং চাপিয়ে দেওয়া শর্তের একটি চুক্তি। এতে লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তাদের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। যতদিন না ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সরে যাবে এবং হামলা বন্ধ না করবে ততদিন এই চুক্তির কোনো অর্থ নেই।

লেবাননের সাধারণ জনগণও এই চুক্তি পক্ষে নন। আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা আল জাজিরা জানিয়েছে, লেবানন-ইসরায়েল-মার্কিন কাঠামো চুক্তির অন্যতম কঠোর সমালোচক হলেন তারাই, যারা দেশটিতে ইসরায়েলের হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।

তাদের অনেকেই বলছেন, এই চুক্তিটি অসম্পূর্ণ, কারণ এতে লেবাননে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে তাদের দখলকৃত এলাকাগুলো থেকে সরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েহর বাসিন্দা আলী যায়তুন আলজাজিরাকে বলেন, এই চুক্তিটি মেনে নেওয়া তার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

যায়তুন বলেন, আমার পরিবার, আমার গ্রাম, দক্ষিণাঞ্চল এবং দাহিয়েহ যা কিছু সহ্য করেছে তার পর সেই একই রাষ্ট্রের সাথে একটি চুক্তি মেনে নেওয়া আমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন, যারা আমাদের জনপদগুলোকে ধ্বংস করে দিতে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। 

লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি। ছবি : সংগৃহীত
লেবাননের পার্লামেন্টের স্পিকার নাবিহ বেরি। ছবি : সংগৃহীত

Saturday, June 27, 2026

ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে বিক্ষোভ

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল–লেবানন সরকারের মধ্যে স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির প্রতিবাদে বৈরুতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। চুক্তিটি লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং সরকারকে সতর্ক করে বলেছে, এ চুক্তি কার্যকর করার চেষ্টা দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

শুক্রবার ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিতে ইসরায়েল ও লেবানন উভয় দেশ ‘শান্তিপূর্ণভাবে একে অপরের অস্তিত্বের অধিকার’ স্বীকার করেছে। পাশাপাশি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

তবে হিজবুল্লাহর দাবি, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইসরায়েলকে সম্পূর্ণভাবে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। এই শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা চুক্তি মেনে নেবে না।

চুক্তির প্রতিবাদে শুক্রবার মধ্যরাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন, আগুন ধরিয়ে দেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে হিজবুল্লাহ ও ইরানের পতাকা দেখা যায়। একই সময়ে অস্ত্রধারী হিজবুল্লাহ-সমর্থকেরা মোটরযানের বহর নিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শহরের বিভিন্ন স্থানে সেনা মোতায়েন করা হয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী একাধিক তল্লাশিচৌকি স্থাপন করে।

হিজবুল্লাহর সংসদ সদস্য হাসান ফাদলাল্লাহ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে গৃহযুদ্ধের পথ বেছে না নিলে ওয়াশিংটনে স্বাক্ষরিত এই চুক্তি বাস্তবায়ন করা লেবানন সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে না।

বৈরুত থেকে আরটির প্রতিবেদক আলী রিদা সেবেইতি জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ ও তাদের মিত্ররা এই চুক্তিকে অপমানজনক বলে মনে করছে। তাঁদের বিশ্বাস, এর ফলে লেবাননের যেসব অঞ্চল এখনো ইসরায়েলের দখলে রয়েছে, সেখানে সামরিক তৎপরতা চালানোর ক্ষেত্রে ইসরায়েল আরও বেশি স্বাধীনতা পাবে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল একযোগে ইরানে আগ্রাসন শুরু করে। দুই দিন পর ২ মার্চ লেবাননে আগ্রাসন শুরু করে ইসরায়েল। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বিমান হামলার পাশাপাশি স্থল অভিযান চালিয়ে বিশাল অংশ দখল করে নিয়েছেন ইসরায়েলের সেনারা। তাঁদের আগ্রাসনের মুখে লেবাননের ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

চুক্তির প্রতিবাদে শুক্রবার মধ্যরাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন, আগুন ধরিয়ে দেন
চুক্তির প্রতিবাদে শুক্রবার মধ্যরাতে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন, আগুন ধরিয়ে দেন। ছবি: আরটির ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট

Saturday, June 20, 2026

ইসরাইলকে এক হাত নিলেন জেডি ভ্যান্স: ‘সব সমস্যার সমাধান শুধু হত্যা করেই করা যায় না’

ইসরাইলকে এক হাত নিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি ইরানের সাথে করা চুক্তিকে অবজ্ঞা করার জন্য নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানানো ইসরাইলি মন্ত্রীদের তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন। ইসরাইলি কর্মকর্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের ইসরাইল পন্থী দলগুলোর সমালোচনার জবাবে তিনি কঠোর বার্তা দেন।

ইসরাইলকে এক হাত নিয়ে তিনি বলেন, ‘সব সমস্যার সমাধান শুধু হত্যা করেই করা যায় না’। একই সাথে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চূড়ান্ত চুক্তি ছাড়া ইরান কোনো ছাড় পাবে না। হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে নতুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার সময় তিনি উগ্র-ডানপন্থী মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে আমেরিকার সমর্থনের প্রতি কৃতজ্ঞতা না থাকার অভিযোগ তোলেন।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একটি ডাকনাম ব্যবহার করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আপনারা বিবির মন্ত্রিসভার কিছু মানুষকে দেখেছেন, যারা সামনে এসে এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে খুব ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের ওপর আক্রমণ চালিয়েছেন। তবে নেতানিয়াহুকে তিনি তার এই প্রকাশ্য ক্ষোভ থেকে ছাড় দিয়েছেন।

ইসরাইলকে কঠোর বার্তা দিয়ে ভ্যান্স বলেন, প্রথমত, ডনাল্ড ট্রাম্পই বর্তমান সময়ে সমগ্র বিশ্বের একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতি সহানুভূতিশীল। এবং তিনি বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির রাষ্ট্রপ্রধান। আমি যদি ইসরাইল সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র শক্তিশালী যে মিত্র অবশিষ্ট আছে, আমি হয়তো তার ওপর আক্রমণ করতাম না। তিনি আরও বলেন, অন্য যে বিষয়টি আমি বলব তা হলো, গত তিন মাসে আপনাদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের তিন ভাগের দুই ভাগই তৈরি হয়েছে আমেরিকানদের হাতে এবং সেগুলোর খরচ জোগানো হয়েছে আমেরিকান করদাতাদের ডলারে।

ভ্যান্স উপসংহার টেনে বলেন, ইসরাইলের সমস্যা ডনাল্ড ট্রাম্প নন। ইসরাইলের কেউ যদি মনে করে থাকেন যে তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তবে তাদের বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়া এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতি অনুধাবন করা উচিত। ভ্যান্সের এই মন্তব্যগুলো মূলত ইসরাইলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভিরকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে। নেতানিয়াহুর এই উগ্র-ডানপন্থী সহযোগীরা উভয়েই ইসরাইলকে এই চুক্তির শর্তগুলো উপেক্ষা করার আহ্বান জানান এবং এটিকে দেশের নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেন।

লেবাননে উভয় পক্ষকেই তাদের চুক্তির শর্ত মেনে চলতে হবে: লেবানন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে ভ্যান্স বলেন যে, তিনি এখনো সেখানে ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে কিছু সংঘর্ষের আশঙ্কা করছেন, তবে তিনি আশা করেন উভয় পক্ষই চুক্তিটি মেনে চলবে। তিনি বলেন, আমরা আশা করি হিজবুল্লাহ ইসরাইলিদের লক্ষ্য করে রকেট এবং ড্রোন হামলা চালাবে না। তবে আমরা এটাও আশা করি যে, ইসরাইলিরাও লেবাননে বেপরোয়া আচরণ করবে না। উভয় পক্ষকেই তাদের চুক্তির শর্ত মেনে চলতে হবে। পরে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, আমরা লেবানন, হিজবুল্লাহ এবং ইসরাইলসহ সব ফ্রন্টে একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি আশা করি।
সূত্র: টাইমস অব ইসরাইল

দক্ষিণ লেবাননে চার ইসরাইলি সেনা নিহত
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে লড়াইয়ের সময় তাদের ৪ সেনা নিহত হয়েছে। সেনাবাহিনী নিহত চারজনের মধ্যে একজনের পরিচয় প্রকাশ করেছে। তিনি হলেন লেফটেন্যান্ট ডর গেদালিয়া বেন সিমহন (৩২), যিনি ৫২তম ব্যাটালিয়ন এবং ৪১তম ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকে হামলা বন্ধের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ সদস্য এবং তাদের অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানায় ইসরাইলের সেনাবাহিনী। এক বিবৃতিতে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বিভাগ (আইডিএফ) রাতভর দক্ষিণ লেবাননে অসংখ্য হামলা চালানোর কথা স্বীকার করেছে এবং বলেছে, হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জবাবেই তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এতে তাদের নিজেদের সেনাও হারাতে হচ্ছে যুদ্ধের ময়দানে।

Friday, June 19, 2026

লেবাননে হামলা নিয়ে ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি ভ্যান্সের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সই করা ইরান চুক্তি (সমঝোতা স্মারক) মেনে নেওয়ার জন্য ইসরায়েল সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।

একই সঙ্গে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্র হিসেবে অবশিষ্ট আছে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী এক ব্রিফিংয়ের শেষভাগে ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য হতাম, তবে পুরো বিশ্বে আমার একমাত্র যে শক্তিশালী মিত্রটি টিকে আছে, অন্তত তাকে আক্রমণ করতাম না।’

প্রায় চার মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরায়েলি নেতৃত্বের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক যে কতটা তিক্ত হয়ে উঠেছে, ভ্যান্সের এই মন্তব্য তারই সবচেয়ে বড় প্রকাশ্য প্রমাণ।

ভ্যান্স তাঁর ব্রিফিংয়ের বেশির ভাগ সময়জুড়ে ইরানের সঙ্গে করা চুক্তির পক্ষে সাফাই গান। এ চুক্তিতে ইসরায়েল সরাসরি কোনো পক্ষ ছিল না। তবে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইসরায়েলকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে হবে।

চুক্তির বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে দেশটির অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করবে যুক্তরাষ্ট্র। বিপরীতে ইরান বন্ধ করে দেওয়া হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে রাজি হয়েছে এবং কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) ডলারের একটি পুনর্বাসন তহবিল গঠনের দিকে যেতে পারে।

মার্কিন সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট এক্সিওস জানায়, ইসরায়েলের কর্মকর্তারা এই চুক্তি নিয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একজন উপদেষ্টা বলেছেন, সমঝোতা স্মারকের লেবানন–সংক্রান্ত অংশটি মেনে চলতে ইসরায়েল কোনোভাবেই বাধ্য নয়।

সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর থেকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজে এ পর্যন্ত চুক্তিটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তাঁর অনুগত ও সমমনা ইসরায়েলি গণমাধ্যমগুলো ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর দলের তীব্র সমালোচনা করছে। তারা ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে ইসরায়েলকে ‘বিক্রি’ করে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

এসব আক্রমণের জবাবে জে ডি ভ্যান্স মনে করিয়ে দেন যে ইসরায়েলের ব্যবহৃত প্রতিরক্ষা অস্ত্রের তিন-চতুর্থাংশই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এবং এর খরচও তারাই জুগিয়েছে। ফলে ইসরায়েলের সমস্যাটি ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প নন’।

ভ্যান্স আরও বলেন, ‘ইসরায়েলের যাঁরা মনে করছেন, তাঁদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তাঁদের এবার ঘুম থেকে ওঠা উচিত এবং বাস্তব পরিস্থিতিটা বোঝা দরকার।’

ভ্যান্স জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েল সরকারের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গেও ‘প্রায় প্রতিদিনই’ কথা বলছে। তবে ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর নিজের যে আলাপ হয়েছে, সেখানে তিনি এমন কোনো উদ্বেগের কথা শোনেননি।

ইরান চুক্তির আলোচনায় যখন যুক্তরাষ্ট্র এক বড় ধরনের সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে লেবাননের বৈরুতে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলা চালানোর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন ভ্যান্স। তিনি বলেন, ওই হামলায় নিহত হওয়া বহু মানুষের সঙ্গে হিজবুল্লাহর কোনো সম্পর্কই ছিল না। অথচ ইসরায়েল দাবি করেছিল, তারা এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটির আস্তানা লক্ষ্য করেই হামলাটি চালিয়েছে।

ভ্যান্স বলেন, ‘ইসরায়েলিদের প্রতি আমাদের মূল বার্তাটি হলো, যেমনটা আমরা অন্য সবার ক্ষেত্রেও বলছি—মূলত আমরা চাই এই শান্তিপ্রক্রিয়া আপনাদের জন্য কল্যাণকর হোক। আমরা চাই না, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালাক। কিন্তু সেটি নিশ্চিত করতে হলে আমাদের আসলে এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা হিজবুল্লাহর প্রতি ইরানের সমর্থন বন্ধ করতে পারে এবং একই সঙ্গে সব পক্ষ যাতে লেবাননের ভূখণ্ডগত সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা দেখায়, তা নিশ্চিত করতে পারে।’

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ছবি: এএফপি ও রয়টার্স

লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়ায়-ই কি আলোচনা স্থগিত করেছে ইরান

যুদ্ধবিরতি চুক্তির কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সুইজারল্যান্ডে যে বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, তা স্থগিত করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আজ শুক্রবার ভোরে নিশ্চিত করেছে, দেশটিতে বার্গেনস্টক নামের পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে নির্ধারিত ওই বৈঠক হচ্ছে না। আলোচনা স্থগিত হওয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান অভিযানকে কেন্দ্র করে ইরান তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানোর সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছে। দুই দেশ গত বুধবার ভার্চ্যুয়ালি যে যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করেছিল, তার কারিগরি বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য এই প্রতিনিধিদলের সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল।

খবরে আরও বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত হয়েছেন। একই সময়ে লেবাননে ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ওই এলাকায় ব্যাপক সংঘর্ষের কথা জানিয়েছে।

ইরান যুদ্ধের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্রমাগত সমর্থন হারাচ্ছেন ট্রাম্প। এমন অবস্থায় ইরান বুঝতে পেরেছে, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ বাড়ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তেহরান কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং বলেছে, পরিকল্পনায় সম্মতি জানালেও তাদের কিছু আপত্তি আছে।

ইরানের আলোচক দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ আজ শুক্রবার বলেন, যেকোনো আলোচনা তেহরানের সীমার মধ্যে থাকতে হবে। তিনি বলেন, এই চুক্তিসংক্রান্ত আলোচনায় ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি হলো লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ করা।

গালিবাফ আরও বলেন, ‘আমরা প্রমাণ করেছি, শত্রু যদি বাড়াবাড়ি করে তাহলে আমাদের আঙুল ট্রিগারে থাকে এবং শত্রুকে কঠিন জবাব দিতে আমরা কোনো দ্বিধা করি না।’

চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক আগামী রোববার মিসরের আলামিন শহরে বৈঠকে বসতে সম্মত হয়েছে। কায়রো ও ইসলামাবাদ কর্তৃপক্ষ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সুইজারল্যান্ডের মধ্যাঞ্চলে লুসার্ন শহরের কাছে অবস্থিত বার্গেনস্টক অবকাশকেন্দ্রে একটি আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিনিধিদলগুলোর মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। এই অবকাশকেন্দ্রটি কাতারের সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের অন্তর্ভুক্ত কোম্পানি কাতারা হসপিটালিটির মালিকানাধীন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে এ প্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা আছে।

আজ বার্তা সংস্থা এএফপিকে পাঠানো এক বার্তায় সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যকার নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত করা হয়েছে।

সুইজারল্যান্ড আরও বলেছে, তারা এখনো এ আলোচনাকে এগিয়ে নিতে প্রস্তুত আছে। বার্গেনস্টকে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতিমূলক কাজ চলমান। তবে আলোচনার জন্য নতুন কোনো তারিখ জানানো হয়নি।

লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে ইরান সুইজারল্যান্ডে তাদের প্রতিনিধিদল পাঠাতে দেরি করছে বলে সংবাদমাধ্যম আল মায়াদিনে খবর প্রকাশের পর এ ঘোষণা এসেছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত ‘ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রয়োজন’ থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত ইসরায়েলের সেনাবাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একটি ‘নিরাপদ অঞ্চলে’ অবস্থান করবে।

ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ এ চুক্তির সঙ্গে নেই। তবে ইরান জোর দিয়ে বলছে, লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে দখল করে রাখা একটা বড় অংশ থেকে ইসরায়েলকে সরে যেতে হবে।

ক্রমবর্ধমান বিভাজন

১৪ দফার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করার মাত্র দুই দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু করার উদ্যোগটি ধাক্কা খেয়েছে।

জেডি ভ্যান্স সুইজারল্যান্ডের পার্বত্য অবকাশকেন্দ্রে ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্দেশ্যে রওনা করার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। তাঁর সহকর্মী এবং কয়েকজন সাংবাদিক ওয়াশিংটনের কাছে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সে সফরের অপেক্ষায় জড়োও হয়েছিলেন।

একই সময়ে হোয়াইট হাউসের কয়েক ডজন কর্মকর্তা, অগ্রবর্তী প্রস্তুতি দল এবং সাংবাদিকেরা ভ্যান্সকে স্বাগত জানাতে আগে থেকে সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছিলেন।

তবে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই সফরটি বাতিল করা হয়।

হোয়াইট হাউস বলেছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য যাঁকে মনোনীত করেছেন—সেই ভ্যান্স ও তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকলেও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটনেই থাকবেন।

লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে ইসরায়েলের অস্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, এটি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

ইসরায়েলের কট্টরপন্থী মন্ত্রীরা বলেছেন, তাঁদের সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য নয়। এমন বক্তব্যের পর ভ্যান্স গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান। শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নির্ধারিত আলোচনা স্থগিত হওয়ার আগের ঘটনা এটি।

ভ্যান্স বলেন, ‘আমি যদি ইসরায়েলি সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তাহলে হয়তো আমি বিশ্বের মধ্যে আমার একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকে আঘাত করতাম না।’

ইরানের তেহরান শহরের একটি সড়ক
ইরানের তেহরান শহরের একটি সড়ক। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত: ইসরাইলি মন্ত্রী

ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গভির বলেছেন, পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত। শুক্রবার রাতে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর হামলায় চারজন ইসরাইলি সেনা নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি মন্তব্য করেন।

সামাজিকমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে গভির বলেন, ‘একজন ইসরাইলি মায়ের প্রতিটি অশ্রুবিন্দুর জন্য, হাজারো লেবাননি মায়ের কাঁদা উচিত। পুরো লেবানন পুড়ে যাওয়া উচিত।’

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরাইলকে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানালেও বেন গভির বারবার লেবাননে আরো তীব্র হামলা হামলার জন্য চাপ দিয়ে আসছেন।

বেন গভির বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, ইসরাইলকে সমগ্র বিশ্বের কাছে এটা স্পষ্ট করে দিতে হবে যে আমাদের সন্তানদের রক্ত ​​এবং আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা কোনো বলিদানের বিষয় নয়।’

কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচও লেবাননে কঠোর হামলার আহ্বান জানিয়েছেন। এক্সে তিনি লেখেন, ‘এখন আগুন জ্বালিয়ে কথা বলার সময়। নরকের দরজা খুলে দেওয়ার সময়।’

ইসরাইলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের একটি বিশাল ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, সেখান থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছা তার নেই।

সূত্র: সিএনএন

পুরো লেবানন পুড়িয়ে দেওয়া উচিত: ইসরাইলি মন্ত্রী
ছবি: সিএনএন

এক আঘাতেই দুটি শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে চান নেতানিয়াহু by ত্রিতা পার্সি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার ইসরায়েলি সাংবাদিক বারাক রাভিদকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ‘কোনো আক্কেলজ্ঞান নেই’। তবে এটি বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আসলে খুব ভালো করেই জানেন, তিনি কী করছেন।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় এক গুচ্ছ বিমান হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু মূলত দুটি শান্তিচুক্তি একসঙ্গে নস্যাৎ করার চেষ্টা করছেন। এর একটি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তিচুক্তি (গত বুধবার ট্রাম্প ও ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেছেন)। অন্যটি হলো, এ চুক্তির হাত ধরে ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে হতে যাওয়া ভঙ্গুর শান্তিপ্রক্রিয়া (সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি)।

এ হামলার পেছনে নেতানিয়াহুর আরও একটি কৌশলগত সুদূরপ্রসারী লাভ রয়েছে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন ‘প্রতিরোধ সমীকরণ’ তৈরি করতে চাইছে। এ সমীকরণ অনুযায়ী, বৈরুত বা লেবাননের যেকোনো জায়গায় ইসরায়েল হামলা চালালে ইরান সরাসরি দেশটির ওপর পাল্টা আঘাত হানবে। নেতানিয়াহু মূলত ইরানের এ চেষ্টাকে শুরুতেই রুখে দিতে চাইছেন।

এখনই এ হামলা চালিয়ে নেতানিয়াহু শুধু তাঁর এক শত্রুকে নিশানা করছেন না; বরং তিনি মধ্যপ্রাচ্যে এমন একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করছেন, যা ভবিষ্যতে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের স্বাধীনতাকে সংকুচিত বা সীমাবদ্ধ করে দেবে।

এমনকি নেতানিয়াহু নিজের এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে এ হামলার বড়াই করে একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন।

গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন বিনিময় শুধু প্রতিশোধ নেওয়ার লড়াই ছিল না, এর পেছনে ছিল গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইসরায়েল যখন বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় হামলা চালায়, তখন ইরান সরাসরি ইসরায়েলে আঘাত হেনে এর জবাব দেয়।

লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলের ভেতরেই আঘাত হানল, এমন ঘটনা এটিই প্রথম। এরপর ইসরায়েল আবারও ট্রাম্পের নির্দেশ উপেক্ষা করে ইরানের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এর জবাবে ইরানও আবার আক্রমণ করে।

ইরান এ দফায় পাল্টা আঘাত করার পর ইসরায়েল কিছুটা পিছু হটে। তারা তাদের পরের হামলাটি বৈরুতের মূল শহরতলিতে না করে দক্ষিণ লেবাননে সীমাবদ্ধ রাখে।

এ সংঘাতের চক্র মূলত মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের একটি নতুন সমীকরণ তৈরি করার চেষ্টাকেই ফুটিয়ে তোলে। এই সমীকরণ অনুযায়ী, লেবাননে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল আর পার পাবে না; বরং সেখানে আঘাত করলেই ইরানের সরাসরি পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি হবে।

গত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম এ অঞ্চলের কোনো বড় শক্তি (ইরান) ইসরায়েলের নিজ সীমানার বাইরে তার সামরিক অভিযান চালানোর স্বাধীনতার ওপর বলপ্রয়োগে লাগাম টানার চেষ্টা করছে।

নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পর তেহরান এখন তার সহযোগী দেশ ও গোষ্ঠীগুলোর জন্যও এ নিরাপত্তাবলয় বিস্তার করতে চাইছে। এটি মূলত ইরানের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষানীতিকে শক্তিশালী করার একটি বড় প্রচেষ্টা। তবে ইসরায়েল স্বভাবতই একে তাদের দীর্ঘদিনের অবাধ সামরিক অভিযানের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। তাই এ নতুন নীতি যেন প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে, সে জন্য তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।

অবশ্য শুধু একবারের পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে এমন দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা যায় না। নতুন এ পরিস্থিতিকে উভয় পক্ষ মেনে নেওয়ার আগে কমপক্ষে আরও কয়েক দফা সংঘাত ও পাল্টা সংঘাতের প্রয়োজন হবে। আর তা হলেও এটি যে শতভাগ সুনির্দিষ্টভাবে কাজ করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তেহরান খুব ভালো করেই বোঝে যে তাদের উদ্দেশ্য শুধু লেবাননে ইসরায়েলি হামলা পুরোপুরি বন্ধ করা নয়; বরং এমন একটি চড়া মূল্য নির্ধারণ করা, যেন লেবাননে হামলার নির্দেশ দেওয়ার আগে ইসরায়েলি নেতারা দুবার ভাবতে বাধ্য হন। আর সেই মূল্যটি হলো, ইরানের সরাসরি পাল্টা আঘাতের আশঙ্কা।

তাই এটি স্পষ্ট ছিল যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই লড়াই থেকে পিছু হটেননি। তবে লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর সঙ্গে কয়েক দিন ধরে মুহুর্মুহু গোলাগুলি চললেও নেতানিয়াহু বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরতলিতে হামলা চালানো থেকে বিরত ছিলেন। তিনি মূলত ইরানের নতুন ওই ‘লাল দাগ’ বা সতর্কবার্তা পরীক্ষা করে দেখা থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের একটি সমঝোতা স্মারকে সই করার কথা ছিল শুক্রবার (নানা বাধা পেরিয়ে এরই মধ্যে সই হয়েছে)। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় ছিলেন, ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগেই তেহরান ও ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ‘রেডলাইন’ বা চূড়ান্ত সীমানা পার হলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এই রেডলাইনটি ছিল চলমান সংঘাত থেকে লেবাননের রাজধানী বৈরুতকে মুক্ত রাখা।

নেতানিয়াহু খুবই হিসাব-নিকাশ করে এ হামলার সময় বেছে নিয়েছেন, যেন এর প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। এক আঘাতেই তিনি একসঙ্গে দুটি লক্ষ্য পূরণ করতে চেয়েছেন। প্রথমত, ট্রাম্পের বহুল প্রতীক্ষিত শান্তিচুক্তিটি ভন্ডুল করা। দ্বিতীয়ত, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের ওপর লাগাম টানতে ইরান যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে চেয়েছিল, তা শুরুতেই রুখে দেওয়া।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনার সঙ্গে যুক্ত একজন কূটনীতিক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘এটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চুক্তি নস্যাৎ করার জন্য ইসরায়েলের একটি স্পষ্ট চেষ্টা। তারা মূলত যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও যুদ্ধের মধ্যে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে চায়।’

এদিকে এ ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে জানা গেছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন, বৈরুতে এ হামলা ‘হওয়া উচিত হয়নি’। হিজবুল্লাহর সাম্প্রতিক হামলার জবাবে ইসরায়েলের এ পদক্ষেপ কতটুকু যৌক্তিক ছিল, তা নিয়েও তিনি সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের নিজের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু হিজবুল্লাহর যে হামলার জবাবে ইসরায়েল এটি করল, সেটি ছিল অত্যন্ত ছোট ও অর্থহীন। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। তাই এত বড় একটি শান্তি প্রক্রিয়াকে এ হামলার মাধ্যমে ব্যাহত করা ঠিক হয়নি।’

ট্রাম্পের এ বক্তব্য শুধু নেতানিয়াহুর সমালোচনার কারণেই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং এর ভেতরে একটি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতও রয়েছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, ইরানের সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির যখন একদম দ্বারপ্রান্তে বিশ্ব, তখন ইসরায়েলের এ হামলা সামরিক বা কূটনৈতিক—কোনো দিক থেকেই বুদ্ধিমানের মতো কাজ হয়নি।

ওয়াশিংটন এখন দুই দিক (ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেহরানের চাপ ও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি নস্যাৎ করতে তেল আবিরের অপচেষ্টা) থেকেই চরম অস্বস্তিতে রয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা মনে করছেন, ইরান নিজে হিজবুল্লাহকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলেও ট্রাম্প যেন ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তেহরান ক্রমাগত সেই দাবিই করে যাচ্ছে। ওয়াশিংটনের বড় ক্ষোভের জায়গা হলো, ইরানের সঙ্গে তারা যে চুক্তি করতে মরিয়া চেষ্টা করেছে, সেটি ইসরায়েলের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ইসরায়েলকে থামানোর জন্য খোদ ইরানই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করেছে। কারণ, তেহরান শুরু থেকে জোর দিয়ে আসছে, যেকোনো যুদ্ধবিরতি হতে হবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এবং সেখানে এমন ব্যবস্থা থাকবে যেন ইসরায়েল নতুন করে আর যুদ্ধ শুরু করতে না পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ কূটনৈতিক হতাশা পুরোপুরি যৌক্তিক। তবে ওয়াশিংটনকে একটি মৌলিক বাস্তবতা অবশ্যই মেনে নিতে হবে। তা হলো, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের হাত থেকে রক্ষা করা। এটির একমাত্র উপায়, ইসরায়েলের বারবার সামরিক উত্তেজনা তৈরির প্রবণতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে নিতে হবে। যত দিন পর্যন্ত ইসরায়েলের হাতে যুক্তরাষ্ট্রকে আবার যুদ্ধে টেনে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে, তত দিন তেহরানের কাছে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার কূটনৈতিক আলোচনাকে আলাদা বিষয় মনে করার কারণ থাকবে না। ইসরায়েল নিজের ইচ্ছেমতো যুদ্ধ শুরু করবে আর সেখানে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে নেবে—এটি ইরান মেনে নেবে না।

প্রকৃতপক্ষে, তেহরান যে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতির জন্য এতটা জোর দিচ্ছে, তার মূল কারণও এটিই। তারা চায় না যে ইসরায়েল এমন কোনো সুযোগ পাক, যার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে খোদ ইরানের বিরুদ্ধে আরও একটি নতুন যুদ্ধে নামিয়ে দিতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এখন পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেন, ইসরায়েলের কোনো অযৌক্তিক সামরিক উত্তেজনায় যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে না ও তাদের রক্ষাও করবে না, তবে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তখন তেহরানও হয়তো একটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে ইসরায়েল-লেবানন সংঘাতের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখবে না।

ইসরায়েলের কাছ থেকে হিসাব-নিকাশ করে এমন দূরত্ব বজায় রাখা যেকোনো বিচারে মার্কিন স্বার্থই রক্ষা করবে। আর এ দূরত্বের প্রয়োজনীয়তা আজকের মতো এত স্পষ্ট আর কখনো ছিল না।

* অনুবাদ: মো. আবু হুরাইরাহ্
- {নিবন্ধের লেখক ত্রিতা পার্সি মার্কিন গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘কুইন্সি ইনস্টিটিউট’-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং একজন পুরস্কারজয়ী লেখক। ‘ওয়াশিংটনিয়ান ম্যাগাজিন’ তাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপর সবচেয়ে প্রভাবশালী ২৫ কণ্ঠস্বরের একজন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বখ্যাত ভাষাবিদ ও চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি তাঁকে ‘ইরানবিষয়ক সবচেয়ে বিশিষ্ট গবেষকদের একজন’ বলে অভিহিত করেছেন।}

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ফাইল ছবি

Thursday, June 18, 2026

চুক্তির ১৪ দফা প্রকাশ করল যুক্তরাষ্ট্র, তেহরান-ওয়াশিংটনের কে বেশি সুবিধা পেল

যুদ্ধ বন্ধে ইরানের সঙ্গে করা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) নথি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার মার্কিন প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ১৪ দফার এই নথি পড়ে শোনান।

সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার কথা বলা রয়েছে। পাশাপাশি ইরানের ওপর থেকে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ভবিষ্যতে আলোচনার সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়টি নিয়ে কাজ করা হবে বলে প্রত্যাশার কথা তুলে ধরা হয়েছে এতে।

এর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যকার ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’। জনসমক্ষে চুক্তি প্রকাশ না করা নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতেই যুক্তরাষ্ট্র এটি প্রকাশ করল।

ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি মূলত এমন একটি চুক্তি, যেটা আমাদের অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। পাশাপাশি ইরানিদের পারমাণবিক বর্জ্য ধ্বংস করার প্রতিশ্রুতি থাকছে। এরপর আমাদের হাতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকছে। ইরান যদি ভালো আচরণ করে, তবে আমরাও ইতিবাচক সাড়া দেব। তাদের অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হবে, যাতে তারা আরও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ৬০ দিনের একটি সময়সীমা শুরু হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সদিচ্ছার ভিত্তিতে যৌথভাবে নিচের বিষয়গুলোতে সম্মত হয়েছে:

১. যুক্তরাষ্ট্র, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান এবং চলমান যুদ্ধে তাদের মিত্ররা এই এমওইউতে স্বাক্ষর করছে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ ঘোষণা করতে। এখন থেকে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ বা সামরিক অভিযান শুরু করবে না। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা হুমকি দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। পাশাপাশি তারা লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করবে। লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তির বিষয়টি চূড়ান্ত চুক্তিতে নিশ্চিত করা হবে। এই অনুচ্ছেদের অন্যান্য বিধানও সেখানে নিশ্চিত করা হবে।

২. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান একে অপরের সার্বভৌমত্ব ও ভোগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান জানাবে। তারা একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে।

৩. যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে আলোচনা করে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর অঙ্গীকার করছে। উভয় পক্ষের সম্মতিতে এ সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে।

৪. এই এমওইউ সই হওয়ার পরপরই যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নিতে শুরু করবে এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে থাকা যেকোনো বাধা বা বিপত্তিও দূর করা শুরু করবে। ৩০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ পুরোপুরি তুলে নেবে। এ সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধ–পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার পরিবেশ তৈরি করবে ইরান। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিকটবর্তী এলাকা থেকে নিজেদের সামরিক বাহিনী সরিয়ে নেবে।

৫. এই এমওইউ সই হওয়ার পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বিনা মাশুলে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে চলাচলের ব্যবস্থা করবে। পারস্য উপসাগর থেকে ওমান সাগর এবং বিপরীত দিক থেকে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা করার জন্য তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে এটি শুধু ৬০ দিনের জন্য প্রযোজ্য হবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল অবিলম্বে শুরু হবে এবং কারিগরি ও সামরিক বাধা অপসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ইরান ৩০ দিনের মধ্যে মাইন অপসারণ করবে। আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এবং হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় দেশগুলোর সার্বভৌম অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি কীভাবে পরিচালনা করা হবে এবং সেখানে নৌ পরিষেবা কীভাবে দেওয়া হবে, তা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করবে ইরান। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের সঙ্গেও তারা কথা বলবে।

৬. যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়ে অন্তত ৩০ হাজার কোটি (৩০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলার ব্যয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও উভয় পক্ষের সম্মতিপূর্ণ পরিকল্পনা তৈরি করবে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে ৬০ দিনের মধ্যে এবং সেটা করা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের লাইসেন্স, ছাড় ও অনুমতি দেবে যুক্তরাষ্ট্র।

৭. চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে দুই পক্ষের মতৈক্যের সময়সূচি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে। এর মধ্যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ও আইএইএ বোর্ড অব গভর্নরসের প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের একতরফাভাবে দেওয়া সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেওয়া হবে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত গুরুত্ব স্বীকার করে। এ বিষয়ে পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে এসব সমস্যা সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

৮. ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান আবার নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র সংগ্রহ বা তৈরি করবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্পরিক সম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের নিষ্পত্তির বিষয়ে একমত হয়েছে। তা করা হবে ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লিখিত সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে। আইএইএর তত্ত্বাবধানে ন্যূনতম পদ্ধতি ব্যবহার করে এগুলো নির্ধারিত স্থানেই নিষ্ক্রিয় (ডাউন ব্লেন্ড) করা হবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে সম্মত হওয়া একটি সন্তোষজনক কাঠামোর ভিত্তিতে দুই পক্ষ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের পারমাণবিক চাহিদার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয় নিয়েও তারা আলোচনা করবে। চূড়ান্ত চুক্তিতে এই অনুচ্ছেদের বিধানগুলো নিশ্চিত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উল্লিখিত পারমাণবিক বিষয়গুলোর চূড়ান্ত গুরুত্ব স্বীকার করছে। পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছাতে তারা আলোচনার মাধ্যমে অবিলম্বে এসব ইস্যু সমাধানের ইচ্ছা প্রকাশ করেছে।

৯. চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান বর্তমান পরিস্থিতি (স্ট্যাটাস কো) বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে। ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা ধরে রাখবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না। এ ছাড়া তারা এই অঞ্চলে অতিরিক্ত সামরিক বাহিনীও মোতায়েন করবে না।

১০. যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে এই এমওইউ সই হওয়ার পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য রপ্তানিতে ছাড় দেবে। এই ছাড়পত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এর আওতায় ব্যাংকিং লেনদেন, বিমা, পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক সব সেবাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

১১. এই এমওইউ বাস্তবায়ন সাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের জব্দ থাকা বা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তহবিল ও সম্পদ ব্যবহারের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেবে। চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে সমঝোতা আলোচনার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পারস্পরিকভাবে এই তহবিল ছাড়ের প্রক্রিয়া নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছাবে। এই তহবিলগুলো মূল অ্যাকাউন্টে ফিরিয়ে দেওয়া বা অন্য অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর যেটাই করা হোক না কেন, সেগুলো ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেকোনো সুবিধাভোগীকে দিতে পারবে সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব লাইসেন্স ও অনুমোদন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

১২. এই এমওইউর সফল বাস্তবায়ন এবং চূড়ান্ত চুক্তির ভবিষ্যৎ শর্তাবলি মানার বিষয়টি তদারকির জন্য একটি নির্বাহী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।

১৩. এই এমওইউ সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই সমঝোতা স্মারকের ১, ৪, ৫, ১০ ও ১১ নম্বর অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন শুরু করা এবং তা অব্যাহত রাখতে বাধ্য থাকবে। সেই সঙ্গে দুই পক্ষ চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু করবে, যা এই এমওইউর অন্য অনুচ্ছেদগুলোর ওপর ভিত্তি করেই হবে।

১৪. চূড়ান্ত চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) একটি বাধ্যতামূলক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদন করা হবে।

‘ধন্যবাদ ইরান’ লেখা একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি বিজয়সূচক চিহ্ন দেখাচ্ছেন। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি, লেবানন। ১৫ জুন ২০২৬
‘ধন্যবাদ ইরান’ লেখা একটি ব্যানারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক ব্যক্তি বিজয়সূচক চিহ্ন দেখাচ্ছেন। বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলি, লেবানন। ১৫ জুন ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Thursday, June 11, 2026

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর ভেতরের গল্প by হাদি মাসুমি জারে

গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও লেবানন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে একটি চুক্তির ঘোষণা দেয়, যার লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান ‘যুদ্ধবিরতি’ নবায়ন করা এবং একটি ‘সমন্বিত’ সমাধানের পথে এগোনো। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও সামরিক অভিযান চলতে থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শুধু হিজবুল্লাহকেই তাদের হামলা বন্ধ করতে হবে। লেবাননের প্রতিরোধ সংগঠনটি দ্রুতই এ আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং একে ‘অযৌক্তিক, অপমানজনক ও অবমাননাকর’ বলে আখ্যা দেয়।

১০ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহ দক্ষিণে ইসরায়েলের নতুন আক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর ক্ষয়যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধে তারা ড্রোন ও ছোট বিশেষায়িত ইউনিটের ওপর নির্ভর করে ইসরায়েলি বাহিনীকে ক্রমাগত ক্ষয় করছে, একই সঙ্গে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোও অক্ষুণ্ন রাখছে।

২০২৬ সালের মার্চে শুরু হওয়া সর্বশেষ সংঘাতের প্রায় ৭০ দিন পর এখন সতর্কতার সঙ্গে হলেও বলা যায়, বর্তমান হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালে যুদ্ধ করা হিজবুল্লাহ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। অন্তত তাদের সামরিক সংগঠন, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি এবং অভিযানের নমনীয়তার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্ট।

এই মূল্যায়ন বর্তমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও সংগঠনটির পারফরম্যান্স, ২০২৩ সালের ‘সমর্থন যুদ্ধ’ (হারব আল-ইসনাদ) এবং ২০২৪ সালের ৬৬ দিনের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা, পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কমান্ডার ও যোদ্ধাদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম বা যুদ্ধকৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কমান্ড কাঠামো, যুদ্ধনীতি, বাহিনী মোতায়েনের ধরন এবং এমনকি যুদ্ধের বিজয় ও পরাজয়ের সংজ্ঞা নিয়েও গভীর পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে যা ঘটছে, তা অনেকটা ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত টানা ৩০ মাসের ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতার পর ধীরে ধীরে পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক অভিযোজনের একটি প্রক্রিয়া। তবে লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে, যা প্রতিরোধশক্তিকে নিরস্ত্র করতে চায়, কিন্তু দখলদার শক্তির কাছ থেকে কোনো ছাড় দাবি করছে না, তখন হিজবুল্লাহর টিকে থাকা যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতার ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।

পুনর্গঠিত একটি বাহিনী

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়। ৬৬ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান দুর্বলতা ছিল তাদের যোগাযোগব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড ও মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করার জটিলতা। যুদ্ধের কিছু পর্যায়ে এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিঘ্ন, প্রতিক্রিয়ায় বিলম্ব এবং যুদ্ধক্ষমতার ক্ষয় দেখা দিয়েছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধে একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে অভিযান অব্যাহত রয়েছে, ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়নি এবং যুদ্ধক্ষেত্র ও সদর দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগও বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, হিজবুল্লাহ তাদের যোগাযোগ ও কমান্ড ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।

তীব্র চাপ ও ভারী হামলার মধ্যেও—যেমন ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিলের হামলার সময়—তাদের সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি এবং কমান্ড চেইন তার সংহতি ধরে রাখতে পেরেছে। এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো কার্যকর ফায়ার কন্ট্রোল, নিয়মিত বাহিনী রদবদল, সামনের সারিতে অস্ত্র সরবরাহ এবং এমনকি অফলাইনে যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও সংগ্রহ ও নিয়মিত প্রকাশ।

পূর্ববর্তী সময়ে যুদ্ধের চাপে সেনা চলাচল প্রায়ই বিঘ্নিত হতো। এখন এসব কার্যক্রম পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে হয়। নতুন মডেলে মূল লক্ষ্য যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা মোতায়েন করা নয়; বরং নির্দিষ্ট মাত্রার যুদ্ধক্ষমতা বজায় রাখা এবং কার্যকর বাহিনীর ক্ষয় কমিয়ে আনা।

এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে নতুন নেতৃত্বের অধিক কেন্দ্রীয়কৃত সামরিক কমান্ডনীতি। এতে বহুস্তরীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কমানো হয়েছে, অপেক্ষাকৃত তরুণ ও উদ্যমী কমান্ডারদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ‘সমর্থন যুদ্ধ’ ও ৬৬ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক সংগঠনের কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। আগে প্রত্যেক কমান্ডারের নির্দিষ্ট মাত্রার স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ছিল। এর কিছু সুবিধা থাকলেও সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বাধা হয়ে দাঁড়াত। এখন সংগঠনটি একটি ঐক্যবদ্ধ কমান্ড কাঠামোর অধীনে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে এবং কমান্ডের সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

একই সময়ে, আপাতদৃষ্টে এর বিপরীতধর্মী হলেও হিজবুল্লাহ মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে এবং মধ্যম পর্যায়ের কমান্ডারদের আরও বেশি অপারেশনাল স্বাধীনতা দিয়েছে, যাতে তারা যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি শুধু একটি কৌশলগত সমন্বয় নয়; বরং সমকালীন যুদ্ধ সম্পর্কে একটি নতুন উপলব্ধির প্রতিফলন।

সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার

যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষের আকাশসীমায় পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে এবং যেখানে বাহিনী ও অবকাঠামো সব সময় হামলার লক্ষ্যবস্তু, সেখানে সফল সংগঠন হলো সেই সংগঠন, যা কেন্দ্রীয় কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজের যুদ্ধক্ষমতা বজায় রাখতে এবং আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারে।

বর্তমান হিজবুল্লাহ এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হয়, যেখানে নমনীয়তা, টিকে থাকার সক্ষমতা এবং অভিযানের ধারাবাহিকতা কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এটি এমন একটি কাঠামো, যেখানে সংগঠনগত কাঠামোর চেয়ে মিশন বা দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। ফলে কিছু ইউনিট সরাসরি নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে, পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার মধ্যে থেকেই তীব্র চাপের মধ্যেও অভিযান চালিয়ে যেতে ও হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

পূর্ববর্তী যুদ্ধ থেকে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো জনবল ও অস্ত্র ব্যবহারের পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন। প্রতিরোধ আন্দোলনটি সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা সমাবেশ, বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রজুড়ে উপস্থিতি বজায় রাখা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক অগ্নিশক্তি প্রয়োগের কৌশল শুধু অকার্যকরই নয়, বরং প্রাণহানির দিক থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুলও হতে পারে। ফলে এখন তারা সংখ্যার পরিবর্তে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে অর্থাৎ সীমিত কিন্তু বিশেষায়িত বাহিনী, যাদের হাতে রয়েছে নির্ভুল ও কার্যকর অস্ত্র।

এই যুক্তিতে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সহনশীলতা ও অপারেশনাল কার্যকারিতা এখন নিছক সংখ্যাগত শক্তির চেয়ে বেশি মূল্য পাচ্ছে। এ কারণেই বর্তমান যুদ্ধে প্রধান দায়িত্ব বহন করছে ড্রোন ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, অ্যান্টি-আর্মার ইউনিট এবং দ্রুত বিকাশমান ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোন ইউনিটগুলো।

আগের মতো এখন আর হিজবুল্লাহ বৃহৎ পরিসরে যোদ্ধা মোতায়েনকে অগ্রাধিকার দেয় না। বরং তারা তাদের অধিকাংশ বাহিনী—বিশেষ করে পদাতিক ও অ-বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকে—রিজার্ভ হিসেবে ধরে রাখতে পছন্দ করে। এর মাধ্যমে একদিকে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়, অন্যদিকে শত্রুর গভীর অভ্যন্তরে আরও কার্যকর আঘাত হানার সুযোগ তৈরি হয়।

যুদ্ধের কৌশল

তবে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সম্ভবত তাদের যুদ্ধনীতিতেই ঘটেছে। ২০২৪ সালের যুদ্ধে মূলনীতি ছিল যেকোনো মূল্যে ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং শত্রুর অগ্রযাত্রা ঠেকানো, এমনকি এর জন্য ব্যাপক প্রাণহানিও মেনে নেওয়া। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন লক্ষণ থেকে বোঝা যায়, হিজবুল্লাহ ভিন্ন এক কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে—যার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য সব উপায়ে শত্রুর ওপর ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়া।

ক্রমাগত ক্ষয় সৃষ্টি এবং শত্রুপক্ষের হতাহতের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই কৌশল যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় ও পরাজয়ের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখন শত্রুকে কোনো এলাকায় স্থায়ীভাবে অবস্থান গড়ে তুলতে না দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ; সাময়িকভাবে কোনো ভূখণ্ড দখল ঠেকানো নয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে হিজবুল্লাহ মনে করে, কোনো এলাকার কিছু অংশ হারানো মানেই পরাজয় বা অপমান নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শত্রু যেন সেখানে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে এবং তাকে যেন অব্যাহত ক্ষয়ক্ষতির মুখে থাকতে হয়। এই যুক্তি অনুসারে, লিতানি নদীর দক্ষিণের পুরো অঞ্চল হারিয়ে গেলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত কৌশলগত পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে না।

নিঃসন্দেহে এমন পরিস্থিতি হিজবুল্লাহর জন্য মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে বেদনাদায়ক এবং ব্যয়বহুল হবে। কিন্তু ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের অভিজ্ঞতার মতোই, এটি একই সঙ্গে দখলবিরোধী প্রতিরোধের সামাজিক বৈধতা বাড়াতে পারে, সংগঠনের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ কমাতে পারে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যা গড়ে উঠবে এফপিভি ড্রোনভিত্তিক মডেলের ওপর। এ ধরনের যুদ্ধনীতিতে এফপিভি ড্রোনগুলো সেই ভূমিকা পালন করবে, যা ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে আত্মোৎসর্গমূলক (শহীদি) অভিযানগুলো করত।

এই কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি চলমান যুদ্ধ মাঠপর্যায়ের যোদ্ধা এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তির মনোবলেও দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধার ঘটিয়েছে। ৬৬ দিনের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে হিজবুল্লাহর যোদ্ধা ও তাদের সমর্থকগোষ্ঠী নানা ধরনের মানসিক ও সুনামগত চাপের মুখে পড়ে। এর মধ্যে ছিল ‘সমর্থন যুদ্ধে’ ব্যর্থতার অনুভূতি, ৬৬ দিনের যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময় শত শত হিজবুল্লাহ সদস্যের নিহত হওয়া এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট ক্ষোভ ও হতাশা।

তবে এসব ঘটনাই এখন হিজবুল্লাহর সমর্থক ও কর্মীদের জন্য নতুন প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। একই সঙ্গে এগুলো নেতৃত্বের ওপর নিচু স্তর থেকে চাপ সৃষ্টি করেছে, যাতে সংগঠনটি আবারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সংগঠনের পুনর্গঠনের দৃশ্যমান ফলাফল—বিশেষত হিজবুল্লাহ প্রকাশিত এফপিভি ড্রোনের ভিডিও চিত্র—সংগঠনের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে এবং তাদের সামাজিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোর মনোবল ও স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করেছে।

তবে এসব সাফল্য সত্ত্বেও বর্তমানে হিজবুল্লাহর সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; বরং লেবাননের ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। শরণার্থী সংকট এবং এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, পাশাপাশি বর্তমান লেবানন সরকারসহ কিছু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তির সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিজবুল্লাহর যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যকারিতা এবং সফল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর অভিযোজন ও পুনর্গঠনের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হলেও এ পরিস্থিতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের গতিশীলতার ওপর; এটা এমন একটি পরিবেশ, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধফ্রন্টের চেয়েও বেশি নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে।

* হাদি মাসুমি জারে, একজন ইরানি গবেষক ও লেখক। তিনি ইরান, ইরাক ও লেভান্ত অঞ্চলের রাজনীতি, ইসলামপন্থী আন্দোলন এবং ইরানের আঞ্চলিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা শত্রুর বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা প্রতিহত করতে প্রস্তুত
হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা শত্রুর বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা প্রতিহত করতে প্রস্তুত ফাইল। ছবি: রয়টার্স

Wednesday, June 10, 2026

লেবাননের গভীরে ঢুকে কোন ফাঁদে ইসরায়েল by এমোস হারেল

ইসরায়েলের সরকার ও গণমাধ্যম বেশ উচ্ছ্বসিত। কারণ, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) লেবাননের বেশ ভেতরে প্রবেশ করে প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে নিয়েছে। [কালাত-আল-শাফিক নামে পরিচিত এই দুর্গটি ১২ শতকে ক্রসেডররা নির্মাণ করেছিল।]

গত রোববার সকালে ইসরায়েলি পত্রপত্রিকায় একটি মাত্র ছবিই যেন সবকিছু বলে দিচ্ছিল—দক্ষিণ লেবাননে বিউফোর্ট দুর্গের ওপর ইসরায়েলি পতাকার পাশাপাশি গোলানি ব্রিগেডের পতাকা উড়ছে। কিন্তু এই প্রতীকী দখলদারত্ব লেবানন অভিযানের কঠিন প্রশ্নগুলোকে ঢেকে রাখার এক প্রয়াস বলেই মনে হয়।

এই অভিযান থেকে এখন পর্যন্ত কৌশলগতভাবে কী অর্জিত হলো? অতীতের অভিযানগুলো থেকে কী শিক্ষা নেওয়া হয়েছে? এবং কীভাবে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলার হুমকি ইসরায়েলি সেনাদের আহত করে যাচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজায় কারও মন নেই বলেই প্রতীয়মান হয়।

ইসরায়েলি গণমাধ্যমে যাঁরা আছেন, তাঁদের বেশির ভাগই আসলে অতীত থেকে কিছুই শেখেননি, আবার কিছুই ভোলেননি। তা না হলে ফাইবার অপটিক কেব্‌লের সহায়তায় পরিচালিত হিজবুল্লাহর ড্রোনগুলো ডজনে ডজনে কীভাবে প্রতিদিন ধেয়ে আসছে, তা জানার ও মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পেত। উত্তর সীমান্তের যুদ্ধ কৌশল নিয়ে সন্দিহান হওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকায় তা নিয়ে প্রশ্ন অবশ্যই উত্থাপন করা হতো। এই সবকিছু বাদ দিয়ে আমরা এক ঐতিহাসিক দুর্গ দখলের রোমাঞ্চকর অভিযান নিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছি।

প্রায় কেউই এ পর্যন্ত যা ঘটেছে, এবং সর্বশেষ অভিযানে আমরা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, তা নিয়ে কোনো কথা বলছে না। এখনকার টেলিভিশন দর্শকদের অর্ধেকের বেশিই তো ১৯৮২ সালে জন্ম নেয়নি। সে কারণে তাদেরসহ সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে ওই বছর বিউফোর্ট দুর্গ দখল করতে গিয়ে গোলানি ইউনিটের কমান্ডার মেজর গিয়োরা হারনিকসহ ছয়জন সেনা প্রাণ হারিয়েছিল। এখনকার বেশির ভাগ টিভি দর্শকদের এটাও জানা নেই যে ’৯০–এর দশকে ইসরায়েলের দখলে থাকা নিরাপত্তা অঞ্চলে হিজবুল্লাহর পাতা বোমা কীভাবে আইডিএফের সাঁজোয়া যানগুলো উড়িয়ে দিয়েছিল।

কিন্তু মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সাংবাদিকেরা গত রোববার যেভাবে বিউফোর্ট দুর্গ দখল নিয়ে কথা বলেছেন, তাতে মনে হচ্ছে এবার সবকিছু ভিন্ন রকম হবে এবং ক্রসেডারদের প্রাচীন এই দুর্গ দখলের মধ্য দিয়ে হিজবুল্লাহর সমস্যা চিরতরে শেষ হয়ে যাবে।

গণমাধ্যমে যে কৃত্রিম উত্তেজনা তৈরি করা হয়েছে, তা দাঁড়িয়ে আছে এক করুণ বাস্তবতার ওপর। উগ্র ধর্মীয় ডানপন্থীরা এখন কল্পনার জাল বুনছে যে দক্ষিণ লেবাননে ইহুদি বসতি গড়ে তোলা হবে, যার মাধ্যমে দেশটিতে ইসরায়েলের স্থায়ী দখলদারি শুরু হবে। অথচ রাজনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত ইসরায়েলের সরকার এখন নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে।

আবার সেনাবাহিনী এক বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে পড়েছে। কেননা, ২০২৪ সালে হিজবুল্লাহকে নাস্তানাবুদ করার পরও তারা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

ইসরায়েলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত রোববার সকালে সদম্ভে ঘোষণা করেছেন, ‘আমরা আগের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী, প্রত্যয়ী ও একতাবদ্ধ হয়ে বিউফোর্টে ফিরে এসেছি।… এই যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আট হাজার হিজবুল্লাহ সন্ত্রাসীকে শেষ করে দিয়েছি, যার মধ্যে গত মাসেই শেষ করা হয়েছে ৭০০ জনকে।’ মন্ত্রীবর্গ ও সংসদ সদস্যরাও তোতা পাখির মতো নেতানিয়াহুর দাবি পুনরাবৃত্ত করে চলেছেন।

আর নেতানিয়াহু তো যুদ্ধের মূল্য নিয়ে মোটেও চিন্তিত নন, তাঁর কাছে মুখ্য হলো সাফল্য অর্জন। সে কারণে লেবাননে যুক্তরাষ্ট্রঘোষিত যুদ্ধবিরতি (যা কখনোই বাস্তবায়িত হয়নি) সত্ত্বেও ১৩ জন ইসরায়েলি নিহত হওয়ার সংখ্যা কোনো গুরুত্ব পায়নি, যেমন পায়নি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি ইসরায়েলি নিহত হওয়া।

আইডিএফও এই অভিযানগত ও কৌশলগত ব্যর্থতায় জড়িত, যা নেতানিয়াহু ইসরায়েলের জনগণের কাছে সর্বশক্তি দিয়ে এক সাফল্য হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করছেন। এটা ঠিক যে ২০২৪ সালে নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছিল, হিজবুল্লাহর সক্ষমতার বেশির ভাগটাই নস্যাৎ করে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

কিন্তু এবারের পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। হিজবুল্লাহ একটি সংগঠিত সশস্ত্র সন্ত্রাসী সেনাবাহিনী হিসেবে কাজ করা বাদ দিয়ে তার শিকড় সেই গেরিলা সংগঠনে ফিরে গেছে। এর নেতৃত্বে বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের নেতাদের স্বাধীনভাবে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দিয়েছে। তারা এখন গ্যালিলি জয়ের পরিকল্পনা বাদ দিয়েছে। এর বদলে বেছে বেছে এমন সব দুর্বল এলাকা আঘাত হানার জন্য বেছে নিচ্ছে, যেখানে ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। লেবাননের গভীরে ইসরায়েলি সেনারা প্রবেশ করায় এই কৌশল জোরদার হয়েছে।

বিউফোর্ট দখলের একটি কৌশলগত ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কেননা এর নিকটবর্তী নাবাতিয়েহ শৈলশিরায় নজর রেখে হিজবুল্লাহর বদর ইউনিটসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার ওপর হামলা চালানো সহজ হবে। কিন্তু চলমান অভিযান হিজবুল্লাহর ড্রোন হুমকি থামাতে পারবে না। এসব ড্রোনের পরিধি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

প্রথম অবস্থায় লেবাননকে একটি কৌশলগত সমস্যা মনে করা হয়েছে। কারণ, ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর সময় হিজবুল্লাহ যত হুমকি ছিল, সে তুলনায় এখন তা অনেক কম। আর পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তো বিশাল ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ লেবানন সীমান্তের কাছে ইসরায়েলের ব্যাপক অংশে জীবনযাপন পুরোপুরি বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। আর প্রতি সপ্তাহে ইসরায়েলি বাহিনীর গুটিকয় সেনা প্রাণ দিচ্ছে, ডজন ডজন আহত হচ্ছে।

উল্টো পিঠে যখন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাৎজ ভূখণ্ড দখল করে লেবাননের কাছ থেকে মূল্য আদায় করতে চাচ্ছেন, তখন হিজবুল্লাহর এই দাবিই জোরালো সমর্থন পাচ্ছে যে তারা ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষার জন্য লড়ছে।

এমতাবস্থায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, নেতানিয়াহু কি আশা করছেন যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ দ্রুত শেষ করে লেবানন সীমান্তে একটা চুক্তি হবে? নাকি তিনি চান যে নির্বাচন পর্যন্ত ট্রাম্প তাঁকে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে দেবেন? নেতানিয়াহুর প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রয়েছে। তাই এসব প্রশ্নেরও কোনো উত্তর নেই।

* এমোস হারেল, ইসরায়েলি সাংবাদিক
- হারেৎজে প্রকাশিত। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত বাংলা রূপান্তর করেছেন আসজাদুল কিবরিয়া

লেবাননের প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী
লেবাননের প্রায় ৯০০ বছরের পুরোনো বিউফোর্ট দুর্গ দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ছবি: রয়টার্স

Thursday, May 7, 2026

লেবাননে যিশুর পর এবার মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা ইসরায়েলি সেনার, ছবি ভাইরাল, ক্ষোভ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ইসরায়েলি সেনা লেবাননে মাতা মেরির একটি মূর্তির পাশে বসে ‘অবমাননাকর’ আচরণ করছেন। ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়েছে।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের খ্রিস্টান শহর দেবলে ছবিটি তোলা। ছবিতে মুখে সিগারেট নিয়ে একজন ইসরায়েলি সেনাকে মাতা মেরির মূর্তির পাশে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তাঁর হাতে আরেকটি সিগারেট। ওই সেনা সেটি মাতা মেরির মূর্তির মুখের কাছে ধরে আছেন।

গত মাসে লেবাননের একই শহরে অভিযানের সময় ইসরায়েলি সেনারা যিশুর একটি মূর্তি ভাঙচুর করেছিলেন। ওই ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরে ক্ষোভের মুখে দুজন ইসরায়েলি সেনাকে শাস্তি দেওয়া হয়।

ওই ঘটনায় ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, যে সেনা মূর্তি ভাঙচুর করেছেন ও যিনি ছবি তুলেছেন—উভয়কে ৩০ দিনের সামরিক আটকাদেশ দেওয়া হয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননে মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা করে তোলা ইসরায়েলি সেনার এই ছবিটি। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে ছবিটির অংশবিশেষ অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে লেবাননে মাতা মেরির মূর্তি অবমাননা করে তোলা ইসরায়েলি সেনার এই ছবিটি। ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা করে ছবিটির অংশবিশেষ অস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। ছবি: রয়টার্স

লেবাননে ইসরায়েলি সেনার যিশুর মূর্তি ভাঙচুর, স্বীকার করল নেতানিয়াহু সরকার

দক্ষিণ লেবাননে এক ইসরায়েলি সেনা যিশুখ্রিষ্টের মূর্তি ভাঙচুর করছে—এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পরে ছবিটি সত্য কি না, তা যাচাইয়ে ইসরায়েল সেনাবাহিনী তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তদন্ত শেষে ইসরায়েল সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ছবিটি আসল। ছবিতে তাদেরই একজন সেনাকে দেখা যাচ্ছে।

ওই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন ইসরায়েলি সেনা বড় আকারের একটি ভারী হাতুড়ি দিয়ে ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তির মাথায় আঘাত করছে। মূর্তিটি ক্রুশ থেকে খুলে পড়ে গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আজ সোমবার একটি পোস্টে ইসরায়েল সেনাবাহিনী বলেছে, তারা ঘটনাটিকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে’ দেখছে।

পোস্টে আরও বলা হয়, ‘ওই সেনার আচরণ তাদের সৈন্যদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সেনাবাহিনীর নর্দান কমান্ড ঘটনাটি তদন্ত করেছে। বর্তমানে সামরিক বাহিনীর নিজস্ব প্রক্রিয়ায় বিষয়টি সমাধান করা হচ্ছে।

আরব সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে এনডিটিভি বলেছে, যিশুর মূর্তি ভাঙার ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল সীমান্তবর্তী গ্রাম দেবলে। গ্রামটি খ্রিষ্টান–অধ্যুষিত।

দেবল পৌরসভা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলা হয়েছিল, যিশুর মূর্তিটি তাদের গ্রামেই অবস্থিত। তবে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তা তারা নিশ্চিত করেনি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আগ্রাসন শুরুর পর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে আবারও সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।

ইরানের সমর্থনে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালানোর পর ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে সামরিক অভিযান শুরু করে। সেখানে এখন ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলছে।

তবে গত শুক্রবার যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরায়েলি সেনারা এখনো দক্ষিণ লেবাননে অবস্থান করছে এবং সেখানে তারা প্রচুর বাড়িঘর গুড়িয়ে দিচ্ছে।

বড় একটি হাতুড়ি দিয়ে যিশুর মূর্তির মাথায় আঘাত করা হচ্ছে
বড় একটি হাতুড়ি দিয়ে যিশুর মূর্তির মাথায় আঘাত করা হচ্ছে। ছবি: ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিস তিরাভির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

Sunday, March 8, 2026

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৯৪

লেবাননে ইসরায়েলি হামলা নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৯৪ জনে দাঁড়িয়েছে। গত সোমবার থেকে দেশটিতে টানা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। ইরান–সমর্থিত সশস্ত্রগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এই হামলা চলছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ন্যাশনাল নিউজ এজেন্সি (এনএনএ) জানিয়েছে, গত সোমবার থেকে হামলায় ২৯৪ জন নিহত ও ১ হাজার ২৩ জন আহত হয়েছে।

সূত্র: আল জাজিরা

লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় শহর টায়ারে হামলার পরের দৃশ্য। লেবানন, ৭ মার্চ
লেবাননে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় শহর টায়ারে হামলার পরের দৃশ্য। লেবানন, ৭ মার্চ। ছবি: এএফপি

Saturday, March 7, 2026

লেবাননে রাতভর হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল

লেবাননে গত সোমবার থেকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, লেবাননের বিভিন্ন স্থানে গতকাল রাতভর হামলা চালানো হয়েছে। লেবাননে হিজবুল্লাহকে দুর্বল করতে হামলা অব্যাহত রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে আইডিএফ বলেছে, গতকাল রাতভর লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল এবং বেকা উপত্যকায় হিজবুল্লাহর রকেট লঞ্চার, অস্ত্র সংরক্ষণাগার এবং সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।

আইডিএফ বলেছে যে হিজবুল্লাহর রাদওয়ান ফোর্সের কমান্ডারদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের মাজদাল সেল এলাকায় দুটি রাদওয়ান কমান্ড সেন্টারেও আঘাত করা হয়েছে।

হিজবুল্লাহর এলিট কমান্ডো ইউনিট রাদওয়ান ফোর্স নামে পরিচিত।

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত সোমবার থেকে দেশটিতে টানা হামলা চলছে
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। গত সোমবার থেকে দেশটিতে টানা হামলা চলছে। ছবি: রয়টার্স

Saturday, February 21, 2026

লেবাননে ইসরায়েলের হামলা: হিজবুল্লাহর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ নিহত ১০, আহত অর্ধশত

লেবাননের বেকা উপত্যকায় গতকাল শুক্রবার ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১০ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়েছেন। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর দুটি সূত্র রয়টার্সকে এ খবর নিশ্চিত করেছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দাবি, তারা বালবেক এলাকায় হিজবুল্লাহর বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে এ হামলা চালিয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর মধ্যে পূর্ব লেবাননে এটি অন্যতম রক্তক্ষয়ী ইসরায়েলি হামলার ঘটনা। এই হামলার ফলে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ল। এর আগে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে আসছিল।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা বালবেক এলাকায় হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টারগুলোতে নির্ভুল হামলা চালিয়েছে।

লেবাননের নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে হিজবুল্লাহর একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে এ হামলার বিষয়ে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা সীমান্ত সংঘাত নিরসনে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে। চুক্তিটির মূল লক্ষ্য ছিল ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সক্ষমতা কমিয়ে সংঘাত থামানো। তবে চুক্তির পর থেকেই দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করে আসছে।

মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহর অস্ত্রভান্ডার নিয়ন্ত্রণে লেবানন সরকারের ওপর অব্যাহত চাপ বাড়াচ্ছেন। তবে লেবাননের রাজনৈতিক নেতারা সতর্ক করেছেন, ইসরায়েলের এ ধরনের ব্যাপক হামলা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

একই দিনে পৃথক এক অভিযানে দক্ষিণ লেবাননের সিডন শহরের নিকটবর্তী আইন আল-হিলওয়েহ শরণার্থীশিবিরে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, সেখানে হামাসের একটি কমান্ড সেন্টার ছিল। তবে হামাস এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, যেখানে হামলা হয়েছে, সেটি শরণার্থী শিবিরের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা যৌথ নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দপ্তর।

লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ও লেবানন সেনাবাহিনীর তল্লাশিচৌকি
লেবানন-ইসরায়েল সীমান্তে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী ও লেবানন সেনাবাহিনীর তল্লাশিচৌকি। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

Sunday, November 23, 2025

ইসরায়েলের স্বার্থে আইএসের জন্য ট্রাম্প দরজা খুলে দিচ্ছেন by আলি রিজক

লেবাননবিষয়ক ওয়াশিংটনের কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যেন নতুন একটি নীতিগত বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টের (জো বাইডেন) একজন উপদেষ্টা আমোস হকস্টাইন হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত জোর দেওয়ার নীতিকে পরোক্ষভাবে সমালোচনা করেছেন।

হকস্টাইন বলেন, ‘আমরা বাস্তবতা বুঝে এগোই। শুধু হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে জোর দিলে হবে না। দ্বিমুখী পথেই এগোতে হবে—অর্থনীতি গড়ে তুলে বিনিয়োগ আনা এবং লেবানিজ সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করা।’

বাইডেন প্রশাসনের এই সাবেক কূটনীতিক সতর্ক করেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের জন্য লেবানন সরকারের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করলে গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে লেবাননের পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় সহায়তার আহ্বান জানান।

ওই কূটনীতিকের এই বক্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন তুরস্কে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক লেবাননকে ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ আখ্যা দেন। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থ হওয়া দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের তিনি ‘ডাইনোসর’ মনে করেন।

পক্ষপাতহীন অবস্থান থেকেই হকস্টাইনের এই মন্তব্য এসেছে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য হকস্টাইন ছিলেন বাইডেন প্রশাসনের লেবানন-সম্পর্কিত মুখ্য ব্যক্তি। তাঁর মধ্যস্থতায় লেবানন-ইসরায়েলের সামুদ্রিক সীমান্ত নির্ধারণে ঐতিহাসিক চুক্তি হয়, হিজবুল্লাহও যা সমর্থন করেছিল।

হকস্টাইনের মন্তব্য ইঙ্গিত করে যে দ্রুত হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণে ট্রাম্প প্রশাসনের বাড়াবাড়ি আসলে লেবাননকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দেশটি হয়তো ‘দুর্বল রাষ্ট্র’। কিন্তু বর্তমান পদ্ধতি সবকিছু অরাজকতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি

এদিকে হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে লেবানন-ইসরায়েল আলোচনার প্রতি কঠোর আপত্তি জানিয়েছে। তবে গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন যখন বলেন, সংঘাত বন্ধের একমাত্র পথ হলো আলোচনায় বসা। তাঁর পরিপ্রেক্ষিতে হিজবুল্লাহর বিবৃতি পুরোপুরি আলোচনার অস্বীকৃতি নয়।

এক কর্মকর্তা পরে গবেষক ও সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা ‘রাজনৈতিক’ আলোচনার কথা বলেছিলেন, অর্থাৎ ‘অরাজনৈতিক’ আলোচনার পথ খোলা থাকতে পারে। তিনি এটিও বলেন, যেকোনো আলোচনার একটি স্পষ্ট চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকা উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, হিজবুল্লাহ তাদের বিবৃতিতে ২০২৪ সালের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি ধারার উল্লেখ করে, যা লেবাননের যেকোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে বলে। ইসরায়েলের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হামলার অভিযোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এটি দেওয়া হয়েছে।
এই অবস্থান টেলিভিশন ভাষণে দলটির নেতা শেখ নাঈম কাসেমও পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল লেবাননে হামলা চালিয়ে গেলে হিজবুল্লাহ বাধ্য হবে প্রতিক্রিয়া জানাতে, তবে তারা নিজেরা হামলা শুরু করতে চায় না।

হিজবুল্লাহর এই ব্যবহারিক অবস্থান বিবেচনায় ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত হবে হকস্টাইনের পরামর্শ গ্রহণ করে নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে আরও নমনীয় হওয়া এবং একই সঙ্গে ইসরায়েলকে লেবাননে চলমান হামলা বন্ধে চাপ দেওয়া।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় একধরনের স্থায়ী ‘শীতল শান্তি’ প্রতিষ্ঠা হতে পারে, যা লেবানন-ইসরায়েলের দীর্ঘ সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প প্রশাসনের আঞ্চলিক অবস্থানকে শক্তিশালী করবে। এই সাফল্যের গুরুত্ব হয়তো ট্রাম্প প্রশাসনের আরেক বড় লক্ষ্য, যা সৌদি আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সমতুল্য হবে, যদিও সৌদি ও ইসরায়েলের মধ্যে কখনো যুদ্ধ হয়নি।

এ ধরনের ‘শীতল শান্তি’ বৃহত্তর কৌশলগত স্বার্থেও যুক্তরাষ্ট্রকে সুবিধা দেবে। ওয়াশিংটন বৈরুতে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মার্কিন দূতাবাস কমপ্লেক্স নির্মাণ করছে (বাগদাদের পর)। ফলে লেবানন ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হবে, দেশটির স্থিতিশীলতা তাই যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি স্বার্থের বিষয়।

আইএসের জন্য দরজা খুলে দেওয়া

এর বিপরীতে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে অতিরিক্ত চাপাচাপিতে লেবাননকে যদি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক পরিকল্পনাকে দুর্বল করবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সেই অন্ধকার রেকর্ডে আরেকটি সংযোজন হবে, যেখানে তারা ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া কিংবা অন্যত্র ব্যর্থ রাষ্ট্র তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

এর ফলে ট্রাম্পের উত্তরাধিকারের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে, বিশেষত আইএস হুমকির ক্ষেত্রে। এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ব্যর্থ রাষ্ট্রে ভালোভাবে টিকে থাকে এবং লেভান্ত অঞ্চলে তাদের আগ্রহ বিশেষভাবে গভীর, যা ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের পুনরুত্থানের চেষ্টায় প্রমাণিত। লেবাননে বিশৃঙ্খলা আইএসের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।

এই বাস্তবায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লেবানন বিষয়ে ইসরায়েলের এজেন্ডা থেকে দূরত্ব বজায় রাখা যুক্তিযুক্ত। হিজবুল্লাহ নিরস্ত্রীকরণের ওপর একমাত্র জোর দেওয়া ইসরায়েলের জন্য কাঙ্ক্ষিত। কারণ, এতে তাদের ভূখণ্ড বিস্তারের নীতির পথ সুগম হয়। কিন্তু এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে নয়, ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্যই নয়।

* আলি রিজক, বৈরুতভিত্তিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। রেসপনসিবল স্টেটক্রাফট ও দ্য আমেরিকান কনজারভেটিভসহ বিভিন্ন মাধ্যমে লেখেন।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া
- ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রয়টার্স