Saturday, April 7, 2018

কবি সাযযাদ কাদির এবং আমার চিত্র সাংবাদিকতা by প্রণব মজুমদার

পড়াশোনা, সাহিত্য চর্চা এবং মফঃস্বল সাংবাদিকতা একসঙ্গে করেছি। তারপর উচ্চতর শিক্ষায় ঢাকায় আসা। আমার জীবনের উল্লিখিত ৩টি কাজ এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে এখন মফঃস্বল সাংবাদিকতা নয়! করছি জাতীয় সাংবাদিকতা। মনে পড়ছে ঢাকায় আমার সাংবাদিকতা শুরু চিত্রসাংবাদিকতার মাধ্যমে। কবি ও সাংবাদিক সাযযাদ কাদির তখন রাজধানীর নীলক্ষেত বাবুপুরায় তারকালোক এ সম্ভবত নির্বাহী সম্পাদক। সম্পাদক কথাশিল্পী আরেফিন বাদল। আমি প্রদায়ক। প্রথম লেখা একটি সাক্ষাৎকার। তারকালোক এ প্রকাশিত প্রথম প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিলো- একজন দীবার কথা। ‘বাবা বলে গেলো আর কোনোদিন গান করো না’ খ্যাত দেশের চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাক শিশুশিল্পী শামীমা ইয়াসমিন দীবা। স্পষ্ট মনে আছে রাজধানীর মগবাজার মধুবাগে নিজেদের বাড়িতে থাকেন দীবা। পড়েন তখন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে এম.বি.বি.এস প্রথম বর্ষে। লেখাটা ছাপার পর সাযযাদ ভাই ৫০ টাকা বিল করেছিলেন। সেই টাকা দিয়ে ৫ জন সহপাঠী মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় ৫ টাকা মূল্যমানের বিরিয়ানি খেয়েছিলাম। পরে রোকেয়া হলের সামনে হাকিম ভাইয়ের দোকানে চা পান।
পড়াশুনার সুবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে থাকি। হলের সন্নিকটে নীলক্ষেত। তাই তারকালোক, কিশোর তারকালোক এবং আগামীতে লিখতাম। সম্মানীও পেতাম। তা যৎসামান্য হলেও আরেফিন ভাইয়ের ছোট ভাই আবদুল্লাহ আল বকর, প্রতিবেদক তারেক মাহমুদ, ইয়াহিয়া মীর্জা, বাম নেতা প্রবীণ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, গীতিকার জীবন চৌধুরী এবং সাযযাদ কাদিরের আন্তরিকতা ও জম্পেশ আড্ডার টানে যেতাম। এর মধ্যে সাযযাদ ভাই ছিলেন সত্যিকারের সাংবাদিকতা পেশার শিক্ষক। কাছে টেনে নিতেন তরুণদের। অনুবাদ শিখেছি উনার কাছে। জীবনদার কাছে জানলাম তিনি বাংলা সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। টাঙ্গাইল করটিয়া সাদাত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন তিনি এবং জীবন চৌধুরীর সহধর্মিণী মৈত্রী সাহা ওনার ছাত্রী ছিলেন। সেই সুবাদে জীবনদাকে সাযযাদ ভাই জামাই বলে সম্বোধন করতেন। সাযযাদ ভাই সম্পর্কে এসব তথ্য জানার পর ব্যাকরণসম্মতভাবে লেখার অভিপ্রায়ে ওনার পিছু ছাড়িনি। সাহিত্য ও সাংবাদিকতা যা হোক না কেন লেখালেখিতে অনেক পরামর্শ ও সহযোগিতা পেয়েছি। আমার জানা মতে এদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির একজন বিদগ্ধ প্রাজ্ঞজন ছিলেন কবি সাযযাদ কাদির। দৈনিক সংবাদ পত্রিকায়ও ওনাকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছি। শিক্ষকতা থেকে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় তাঁর সুষম সমন্বয়। সংবাদ ও অন্যান্য দৈনিকে প্রকাশিত আমার লেখাগুলোর ব্যাকরণগত ত্রুটি শুধরে দিতেন। শেখার জন্য ওনার কাছে তার সাংবাদিকতা কর্মস্থল তারকালোক, দৈনিক দিনকাল, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট ও মানবজমিন এ গিয়েছি। সাহিত্যের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে আড্ডা হয়েছে আমাদের। বিতর্কও হয়েছে কিন্তু কোনোদিন মনোমালিন্য হয়নি!
গতবার অমর একুশে গ্রন্থমেলার শেষ সময়ে বাংলা একাডেমিতে দেখা। সেবার কানাডা প্রবাসী বন্ধু কবি মৌ মধুবন্তী এবং অন্য বন্ধুদের সঙ্গে সাযযাদ ভাইয়ের ছবিও ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছিল! অনেকের সেলফোন সেটের ক্যামেরা দিয়ে ওনার সঙ্গে ওনার অনেক ভক্তের দলবদ্ধ ছবি তুলে দিয়েছি। তখন কি জানতাম তিনি ক’মাস পর দৈহিকভাবে বিশ্বভুবন থেকে মুক্তি নেবেন ?
এবারের বই মেলায় আমি বেশ সরব ছিলাম। তার বড় কারণও ছিল। অন্যতম প্রধান কারণ ৩০ বছর পর আমার পুনঃজন্ম লাভ! বইয়ের লেখক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। যার কারণে মেলাতে গিয়েছি বেশির ভাগ সময়। আগের বারের চেয়ে এবার আনন্দে বেশ বই কিনেছি। অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে গিয়ে দুর্বল রচনাও কিনেছি! তবে আরেকটি প্রাপ্তির মধ্যে ছিল বহু বছর পর পুরানো লেখক বন্ধুদের সান্নিধ্য লাভ। এত সরব থাকার পরও আমার কাছের মানুষ সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রথম শিক্ষক কবি সাযযাদ কাদির ভাইকে প্রায় প্রতিদিনই মনে পড়েছে। সাহিত্য, সাংবাদিকতা, সমাজসেবাসহ নানা শাখায় একুশে পদক বা বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাবার ক্ষেত্রে স্বকর্ম নয় বরং নিজের লোক বলে বিবেচিত যোগ্যতাকেই বেশি অগ্রাধিকার ও বিবেচনা করা হয় ! তা না হলে কবি সাযযাদ কাদির পণ্ডিত হয়েও কেন পেলেন না জীবদ্দশায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ? বিষয়টি আমাকে এখনও যন্ত্রণা দিচ্ছে ! লেখালেখির জগতে অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন কবিতায় তিনি একুশে পদক পাবেন! গত বছর আমিও আশা করেছিলাম তিনি পাবেন কবিতায় রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ! কিন্তু ভিন্ন মতের ব্যক্তি হওয়ায় জীবদ্দশায় মূল্যহীন কি থেকে গেলেন জীবনবাদী কবি সাযযাদ কাদির ?
সহকর্মী সাংবাদিক এবং সৃজনশীল কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিপ্রিয় এবং রসবোধসম্পন্ন মানুষ কবি সাযযাদ কাদিরের আজ জন্মদিবস। বেশ ঠোঁটকাটা এবং অসীম সাহসী এই ব্যক্তির জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: সাহিত্যিক, দৈনিক শিরোনাম (কুমিল্লা) এর ঢাকা ব্যুরো প্রধান এবং পাক্ষিক অর্থকাগজ এর সম্পাদক
reporterpranab@gmail.com

ডাকাতি আর ধর্ষণই ছিল যার নেশা

ডাকাত সর্দার মোস্তাক আহমদ (৪০), যাকে এক নামে মৌলভীবাজার জেলার সকলেই চেনে। রাজনগর উপজেলার মৌলভীরচক গ্রামে তার বাড়ি। ডাকাতিতে তার কুখ্যাতি থাকলেও নারীদের জন্য সে ছিল এক ভয়ঙ্কর দানব। ডাকাতির পাশাপাশি নারীদের ধর্ষণই ছিল তার নেশা। ডাকাতিকালে ধর্ষণ করা অনেকটা নেশায় পরিণত হয়েছিল। লোকলজ্জার ভয়ে ধর্ষণের শিকার নারী বা তাদের পরিবার কেউ কোনদিন অভিযোগ করেনি। আতঙ্কিত পরিবার অনেক সময় মামলাও করতো না। ১৪-১৫ বছর বয়সে ডাকাতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া ডাকাত সর্দার মোস্তাক আহমদের বিরুদ্ধে কামারচাক ইউনিয়নের চানখারহাবেলী গ্রামে ২০০৮ সালে ডাকাতির সময় ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ওই মামলা এখনো বিচারাধীন। এরপরও অবশ্য জেলার বেশ কয়েকটি থানায় ডাকাতির ছাড়াও তার বিরুদ্ধে পৃথক ধর্ষণ মামলা রয়েছে। ডাকাত সর্দার মোস্তাক আহমেদ বর্তমানে পুলিশের জালে বন্দি হয়ে হাজতবাস করছেন। কুলাউড়া থানা পুলিশ তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদকালে গত বুধবার এসব ভয়ংকর তথ্য দেয়। ডাকাতির নতুন নতুন কৌশল নিয়ে মাঠে নামতো ডাকাত সর্দার মোস্তাক। জেলার পুলিশ যখন তার বিরুদ্ধে মাঠে নামনো তখন সে চলে যেত ঢাকায়। নির্ধারিত সময়ে ডাকাত গ্যাংদের সংঘটিত করে রাখতো। ঢাকাতে নেমে কাজ সেরে ভোরেই চলে যেত ঢাকায়। তার কারণে অতিষ্ঠ রাজনগর থানার পুলিশ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে তার গতিবিধি শনাক্ত করে। ২০১৫ সালে রাজনগর থানার তৎকালীন ওসি শামসুদ্দোহা পিপিএম ঢাকা থেকে আসার পথে বাসস্ট্যান্ডেই তাকে আটক করেন। এর পর সে বিভিন্ন মামলায় জেলে ছিল। জেল থেকে বের হয়ে সে আবারো নেমে পড়ে তার পেশায়। পরে ২০১৭ সালের ২৭শে নভেম্বর কমলগঞ্জ উপজেলার একটি বাড়িতে ডাকাতিকালে এলাকাবাসী মোস্তাককে আটক করে গণপিটুনি দেয়। পরে আহত অবস্থায় সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সুস্থ হয়ে ওঠার পর আদালতের মাধ্যমে তাকে মৌলভীবাজারের জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়। পুলিশ জানায়, মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন থানায় ডাকাত সর্দার মোস্তাক আহমদের বিরুদ্ধে ৬টি ডাকাতির ও একটি ধর্ষণ মামলা রয়েছে। ডাকাতি করতে গিয়ে মোস্তাক নারী ধর্ষণ করতো বলে লোকমুখে জানা যায়। কিন্তু ধর্ষণের বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ ছিল না।
কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের একটি ডাকাতির ঘটনায় করা মামলায় মোস্তাককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আদালতের কাছে রিমান্ড আবেদন করে। এ প্রেক্ষিতে আদালত গত ২ থেকে ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এদিকে ৩রা এপ্রিল দিবাগত রাতে কুলাউড়া থানা পুলিশকে মোস্তাকের দেয়া তথ্যমতে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি দেশীয় পাইপগান এবং দুটি গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নাজমুল হক সেলিম জানান, মোস্তাক একজন ভয়ঙ্কর প্রকৃতির ডাকাত। ২০০৮ সালে চানখারবিল গ্রামের এক গৃহবধূকে ধর্ষণের দায়ে করা একটি মামলা বিচারাধীন আছে। তার কারণে এলাকার মানুষও অতিষ্ঠ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কুলাউড়া থানার এসআই আনোয়ার হোসেন জানান, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে মোস্তাক ডাকাতিতে গিয়ে প্রায়ই নারীদের ধর্ষণ করতেন বলে স্বীকার করেছেন। আগে বিষয়টি জনশ্রুতি ছিল। অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারের ঘটনায় রাজনগর থানায় মোস্তাকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

ভোটের আগে লেজেগোবরে বাংলাদেশের রাজনীতি by ফয়সাল মাহমুদ

নির্বাচনের বছরে বাংলাদেশ। আর এ বছরটা রাজনৈতিক হাঙ্গামার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনা। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ফেব্রুয়ারি মাসে তাকে কারাদণ্ড দেন আদালত। খালেদা জিয়ার জন্য একমাত্র আশার কিরণ ছিল মার্চে হাইকোর্টের দেয়া চার মাসের জামিন। কিন্তু এক সপ্তাহ বাদেই আপিল বিভাগ ওই আদেশ স্থগিত করে দেন।
এ পরিস্থিতিতে খালেদার বিপর্যস্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রধানমন্ত্রী ও তার আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান নিপীড়নের অভিযোগ এনেছে। এ দুজন বাংলাদেশের ‘ব্যাটল অব দ্য বেগমস’-এ একে অপরের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী।
এশিয়া টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, রায়ের পর বিএনপি খালেদা জিয়ার নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেগুলো সবই দমন করা হয়েছে। রিজভী আরো বলেন, ‘আমরা সভা করার অনুমতি চেয়েছি, কিন্তু কয়েকবার তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এরপর আমরা যখন নিজেদের দলীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি পালন করতে গেছি, পুলিশ আমাদের ওপর জলকামান ও লাঠিসোটা নিয়ে চড়াও হয়েছে।’ রিজভী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, বেশ ক’জন বিএনপি নেতা ও কর্মীকে গত পাঁচ বছর ধরে মিথ্যা অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বিএনপির গবেষণা শাখার দাবি, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর দলের বহু সদস্যের বিরুদ্ধে হাজারো মামলা করা হয়েছে। হত্যা করা হয়েছে ৫ শতাধিক সমর্থককে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তুলে নিয়ে গেছে ৭ শতাধিক ব্যক্তিকে। অভিযোগ করা হচ্ছে, এদের কেউ কেউ এখনও নিখোঁজ। তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বলপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছে দলটি। রিজভী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার বিএনপিকে একটি দল হিসেবে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে।’
বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছে যে, খালেদা জিয়ার জামিন স্থগিত করে দেয়া সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়েছে’ যে, তারা খালেদাকে কারাগারে রাখতে চায়। যেন তিনি ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন।
আদালতের আদেশের কয়েক ঘণ্টা পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘খালেদা জিয়া ও আমরা (বিএনপি) দেশের সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে ন্যায়বিচার বঞ্চিত হয়েছি, যেটা মানুষের সর্বশেষ ভরসার জায়গা।’
চার সদস্যের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ নিম্ন আদালতের দেয়া খালেদার জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও সরকারকে আপিল করার অনুমতি দিয়েছেন। আর এ শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন ৮ই মে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদার আইনজীবীদের দাবি, এটা ‘নজিরবিহীন ও ‘অপ্রত্যাশিত’ কেননা সর্বোচ্চ আদালত এর পেছনে কারণও দেখান নি।
যাই হোক, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী মোট ৩৪টি মামলায় লড়ছেন যার একটি হলো জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা। সুপ্রিম কোর্ট যদি খালেদার জামিনের অনুমতি দেনও, তারপরও দলটির নেতাদের শঙ্কা তিনি আইনি জটিলতার কারণে কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারবেন না কেননা তার বিরুদ্ধে এতগুলো মামলা রয়েছে।
বিএনপি ‘নিজেদের আইনজীবী টিমকে সমৃদ্ধ করার জন্য এবং খালেদার মামলাটি বিশ্বমহলে তুলে ধরার জন্য’ খ্যাতনামা বৃটিশ আইনজীবী লর্ড কার্লাইলকে নিয়োগ দিয়েছে। বৃটেনের রাণীর কাউন্সেল (রাষ্ট্রনিযুক্ত ব্যারিস্টার) লর্ড কার্লাইল এশিয়া টাইমসকে বলেন, এখনও ওই মামলার সব নথিপত্র তার পড়া বাকি।
বিচারবিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে বিএনপির অভিযোগগুলো জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করছি বিচারকরা সম্পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করবেন এবং বিচারপ্রক্রিয়া পক্ষপাতহীন রাখবেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘তারা যদি সেটা না করেন, তাহলে বাংলাদেশের সুনামের ক্ষেত্রে তা হবে বিপর্যয়। বাংলাদেশসহ আমাদের অভিন্ন আইনি সংস্কৃতির যেকোনো দেশের জন্য ক্ষমতার পৃথককরণ মৌলিক একটি নীতি।
‘কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা’ (অথরিটারিয়ান রেজিম)
এদিকে, জার্মান থিংক ট্যাংক বার্টেলসম্যান স্টিফটুং গত মাসে বলেছে, বাংলাদেশ এখন স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অধীনে। এবং দেশটিতে গণতন্ত্রের মৌলিক মানদণ্ডগুলোও মানা হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, যে দেশটি একসময় বিশ্বের পঞ্চম বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ ছিল, এখন সেটা নির্বাচনের মানে অবনতি হওয়ার কারণে ‘স্বৈরতন্ত্র হিসেবে শ্রেণিভুক্ত’।
কিন্তু বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ওই থিংক ট্যাংকের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন। এশিয়া টাইমসকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে স্বৈরতান্ত্রিক বলাটা ‘উদ্দেশ্যমূলক’ এবং এর কোনো ভিত্তি নেই। তিনি আরো বলেন, ‘বিচারবিভাগ ও গণমাধ্যমসহ সত্যিকারের গণতন্ত্রের সকল অঙ্গ এখানে সম্পূর্ণ স্বাধীন।’
বিএনপির দমন পীড়নের শিকার হওয়ার দাবির জবাবে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় দলটির পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে- ‘কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কর্মকাণ্ডগুলো খতিয়ে দেখবে না যেখানে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়।’
বিএনপির শক্তিমত্তার ঘাটতি (বিএনপি’স ল্যাক অব স্ট্রেন্থ)
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঘাটতি রয়েছে বিএনপির যা বিগত বছরগুলোতে আওয়ামী লীগকে সামনে ঠেলে দিয়েছে।
ঢাকাস্থ একটি বিদেশি দূতাবাসের রাজনৈতিক পরামর্শক ফারুক হাসান এশিয়া টাইমসকে বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পরপরই তিনি বিএনপির একটি ব্রিফিংয়ে যোগ দিয়েছিলেন যেটা ‘বিএনপির জন্য তাদের কারান্তরীণ নেতার প্রতি জনগণের সহানুভূতি কাজে লাগানোর সুবর্ণ সুযোগ হতে পারতো।’
তিনি বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম, দেশের মানুষের সমর্থন ফিরে পেতে তারা তাদের ভবিষ্যৎ কৌশল ব্যাখ্যা করবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, পুরো ঘণ্টাটা ব্যয় করা হয় কারাগারের ভয়াবহ পরিস্থিতির ব্যাখ্য দিতে আর খালেদা জিয়া কতটা কষ্টে আছেন সে প্রসঙ্গে।’
ঢাকাভিত্তিক বিশ্লেষক এবং কলামিস্ট আফসান চৌধুরী বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দলীয় প্রধান হিসেবে খালেদার বড় ছেলে তারেক রহমানকে বেছে নেয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তারেক রহমান বৃটেনে আশ্রয় নিয়েছেন কেননা তিনিও নানা আইনি মামলায় অভিযোগের মুখোমুখি।
তিনি বলেন, ‘একজন পলাতক কিভাবে বিএনপির মতো বড় একটি দলকে নেতৃত্ব দিতে পারে? সত্য কথা হলো খালেদা জিয়াকে ছাড়া বিএনপি নেতৃত্ব সংকটে থাকা একটি দল।’
তবে, একথা প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপি নেতা রিজভী। তিনি দাবি করেন, দল ‘আরো শক্তিশালী হয়েছে’ কেননা সাধারণ মানুষ দেখেছে, ‘কিভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির ওপর তাদের নগ্ন, বেআইনি আগ্রাসন চালায়।’
আওয়ামী লীগ এদিকে, বছরের শুরু থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সফরকালে ভোট চেয়েছেন।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান বলেন, ‘তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জেলাগুলোতে উন্নয়নমূলক প্রকল্প উদ্বোধনের জন্য করা সফরে নিজ দলের জন্য ভোট চাইছেন। অন্যদিকে, আমাদের নেত্রীকে পরিকল্পিতভাবে কারাগারে রাখা হয়েছে। তাহলে এখানে ন্যায়বিচারটা কোথায়?’
[লেখাটি হংকংভিত্তিক ইংরেজি সংবাদ ওয়েবসাইট এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের অনুবাদ। ‘বাংলাদেশি পলিটিক্স ইন আ মেস এহেড অব পোল ইন ডিসেম্বর’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি লিখেছেন ফয়সাল মাহমুদ। তিনি এশিয়া টাইমস ছাড়াও আল জাজিরা ও দ্য ওয়ারে লিখে থাকেন।]

পঙ্গু হাসপাতালে এত দালাল, তাড়াবে কে? by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

দালালের ভারে ডুবছে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানটি। পঙ্গু হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত এ প্রতিষ্ঠানে দুর্ঘটনায় হাত-পা ভাঙা, অঙ্গহানি ও স্পাইনাল কডে আঘাতসহ বিভিন্ন ঘটনায় আহতদের চিকিৎসা দেয়া হয়। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত হাত-পা ভাঙাসহ বিভিন্ন ধরনের আঘাতপ্রাপ্ত রোগী চিকিৎসার জন্য আসেন। এখানে চিকিৎসাসেবায় বড় বাধা দালাল। ভবঘুরে দালাল ছাড়াও হাসপাতালের কিছু চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী দালালির সঙ্গে জড়িত। পঙ্গু হাসপাতাল ঘিরে একাধিক দালাল চক্র এখন বেপরোয়া। তাই এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা মানুষের একটি কমন প্রশ্ন, পঙ্গু হাসপাতালে এত দালাল তাড়াবে কে।
এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা প্রতিনিয়ত পড়ছেন দালালদের খপ্পরে। সর্বস্ব খোয়ানোর পাশাপাশি সারাজীবনের জন্য পঙ্গুও হচ্ছেন কেউ কেউ। অভিযানেও থামে না তৎপরতা। গত এক সপ্তাহ আগে বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত ভোলার চুন্নু বেপারী থেঁতলানো পা নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলেন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে। আসতে না আসতেই পড়েন দালালদের খপ্পরে, যারা তাকে উন্নত চিকিৎসার কথা বলে নিয়ে যান পাশের বেসরকারি একটি হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে অবহেলায় দুদিন থাকার পর গত ২৯শে মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তিনি। গ্রামাঞ্চলের সহজ সরল রোগীরা দালালদের টার্গেট। এমন পরিস্থিতিতে পুরা হাসপাতাল দালাল সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। কর্মচারীদের বেশির ভাগ বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকের দালাল। এখানে টাকা না দিলে এক্স রে করার সিরিয়াল পাওয়া যায় না। অনেকেই বাইরে থেকে করিয়ে আনেন বেশি টাকা দিয়ে। এক্স-রে খরচ ৫৫ টাকা হলেও সিরিয়াল এগিয়ে নিয়ে আসতে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। ১০৭ নম্বর কক্ষটি এক্স-রে বিভাগ। ৪ঠা এপ্রিল দুপুর ১২টায় এক্স-রে এক ও তিন নম্বর দরজার সামনে দেখা যায় প্রচণ্ড ভিড় ও বিশৃঙ্খলা। ইব্রাহিম নামের এক রোগী অভিযোগ করে বলেন, সকাল ১০টা থেকে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তার এক্স-রে হচ্ছে না। যারা অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছেন তাদেরটাই করা হচ্ছে । ৩২ বছর বয়সী আরেক রোগী হানিফ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় তার ডান পা ভেঙে গেছে। এই রোগীর স্বজনরা জানান, ১০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি এক্স-রে করাবো। লাইন দিতে হবে না। এখানের কর্মচারীরা টাকা না দিলে কাজ করে না বলে তারা অভিযোগ করেন। এই হাসপাতালে রোগীদের জন্যে ড্রেসিং একটি নিয়মিত বিষয়। রোগীরা জানিয়েছেন, ড্রেসিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এমআরআই, সিটিস্ক্যান, আল্ট্রাসনোগ্রাফি ইত্যাদিতেও বাড়তি অর্থ না দিলে কাজ হয় না। আবার জরুরি বিভাগের রোগীদের কাছ থেকে প্যাথলজির রসিদ না দিয়ে বাড়তি অর্থ আদায়ের অভিযোগও করেন রোগীরা।
র‌্যাব-এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম মানবজমিনকে বলেন, প্রায়ই অভিযান চালিয়ে দালালদের সাজা দেয়া হয়। সম্প্রতি পঙ্গু হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ ভুয়া ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা করানো হয় রাজধানীর ক্রিসেন্ট হাসপাতালে। অভিযানের সময় অপারেশন থিয়েটারে প্রচুর রক্ত দেখতে পাই। এসময়ে হাসান ও আনোয়ার নামে দুজনকে দুই বছরের সাজা দেয়া হয়। এছাড়া আর পাঁচজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়। তিনি আরো জানান, সেদিন অভিযানে চুন্নু ছাড়াও আরও ২২ রোগীকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে রাতে চুন্নুর অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে ঢামেকে হাসপাতালে করা হলেও তার প্রাণ রক্ষা হয়নি। তিনি জানান, গত এক বছরের পঙ্গু হাসপাতালে শতাধিক দালাল গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে চারজন হাসপাতালটির কর্মচারী ছিলেন।
সূত্র জানায়, ১৫ থেকে ২০টি সিন্ডিকেটে ২ শতাধিক দালাল হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের কাছে নেতিবাচক নানাকথা বলে তাদের ভাগানোর চেষ্টা করে। ৮ থেকে ১০ জন দালাল একেকটি গ্রুপে ভাগ হয়ে তাদের অপতৎপরতা চালায়। রোগীর স্বজনদের এখানকার চিকিৎসা সম্পর্কে নেতিবাচক নানান কথা বলে ভীতসন্ত্রন্ত করে তোলে। একপর্যায়ে রোগীকে হাসপাতাল থেকে বাগিয়ে আশপাশের প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। ওই রোগীর কাছ থেকে প্রাইভেট ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ যে টাকা আয় করে তার শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগ কমিশন তারা পায়। এ চক্রের সঙ্গে হাসপাতালের কতিপয় কর্মচারী ও নার্সের যোগসাজশ রয়েছে বলেও অভিযোগ আছে। আর এ কারণেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালিয়েও দমাতে পারছে না দালাল চক্রকে। সূত্র জানায়, ওয়ার্ড মাস্টার সবুর, দৌলত ও নজরুল অনেক দালালদের সঙ্গে শখ্য বজায় রাখেন। তারা বহির্বিভাগ থেকে প্রতিমাসে নির্দিষ্ট একটা চাঁদা তুলেন। একই পরিস্থিতি জরুরি বিভাগেও। দালাল চক্রে রয়েছে বাবু, শওকত, জাহিদ, নাহিদ, মজনু, হাজেরা, আল-আমীন, রেজাউল, শাহানা, মোকারম, আলী, রুবেল, বাশার, শহিদুল, জহির মামুন, কল্পনা ও মরজিনা। তাদের কেউ হাসপাতালের কোনো কর্মচারীর আত্মীয়, কেউ স্থানীয় প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট, আবার কারও আছে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পরিচয়। ফলে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টরা এদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পান না। আর এ সুবাদে রোগী ভাগাচ্ছে দালালরা।
শেরেবাংলানগর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠেছে। বাসা-বাড়িতে নামে বেনামে গড়ে তোলা হয়েছে এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। দালালদের কেউ কেউ কোনো কোনো ক্লিনিকের মালিক বনে গেছেন। আবার কারও কারও অংশীদারি আছে বিভিন্ন ক্লিনিকে। হাসপাতালের সূত্র জানায়, দালালদের সহযোগিতা নিয়েই ওই এলাকায় কতিপয় প্রভাবশালী হাসপাতাল ব্যবসা চালিয়ে আসছে। মূলত সরকারি হাসপাতাল থেকে ভাগিয়ে নেয়া রোগীই তাদের হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে যাচ্ছে। আর স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে দালালদের সুসম্পর্ক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পায় না।
এ প্রসঙ্গে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল গনি মোল্লা মানবজমিনকে বলেন, গভীর রাতে হাসপাতালে দালালদের অনুপ্রবেশ ঘটে। এখন টুকটাক হয় এটা স্বীকার করি। গেটের বাইরে হতে পারে। শতভাগ মুক্ত করতে পেরেছি, এটা দাবি করছি না। তবে দালালদের তৎপরতা আগের চেয়ে কমেছে।

সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে অসন্তোষ: বাস্তবায়নে ধীরগতি by নূর মোহাম্মদ

১৫টি প্রকল্পের বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে মাত্র ৪২ শতাংশ বাস্তবায়ন হওয়ায় এ অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে চলতি অর্থবছর প্রকল্প থেকে কোনো অর্থ ফেরত না দেয়ার জন্য স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে প্রকল্প পরিচালকদের। তবে গত বছরের চেয়ে এবার একই সময় অগ্রগতির হার ১৩ ভাগ বেশি হওয়ার পরও এ অসন্তোষ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রকল্প পরিচালকরা। তারা বলছেন, নির্বাচনী বছর হওয়ায় প্রকল্প থেকে টাকা বের করে নিতেই এ চাপ দেয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯শে মার্চ মাউশির অধীনে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে একটি সভা হয়েছে। সভায় মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. মাহাবুবুর রহমান সভাপতিত্ব করেন। সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. মহিউদ্দিন খান। এছাড়া মাউশির পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নধীন ১৫টি প্রকল্পে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মোট বরাদ্দ ৩,৪৯২ কোটি ৮৯ কোটি টাকা। তার মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের ৩,১৮৮ কোটি ৬৯ লাখ টাকা আর দাতাদের কাছ থেকে নেয়া ৩০৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এডিবিতে বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থ ছাড়া হয়েছে ১,৮৮১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা মোট বরাদ্দের ৫৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং ব্যয় হয়েছে ১,৪৯৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা; যা মোট বরাদ্দের ৪২ দশমিক ৯১ শতাংশ। বিগত বছরের একই সময় এর অগ্রগতির হার ছিল ২৯ দশমিক। বৈঠকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মহিউদ্দিন খান বলেন, বিগত অর্থ বছরের মাউশির আওতাধীন প্রকল্পগুলোয় এডিটির বরাদ্দের চেয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি আনা যায়নি। তিনি প্রকল্প পরিচালকদের প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও গতি বাড়ানোর কথা জানান।
চলতি বছর সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) বরাদ্দ ব্যয় শতভাগ করার জন্য প্রকল্প পরিচালকদের অনুরোধ করেন। প্রকল্পের শতভাগ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যত ধরনের সহযোগিতা দরকার পুরোটাই করা হবে। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী বছর হওয়ায় প্রকল্পের শতভাগ বাস্তবায়ন দেখতে চাওয়া হয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে। কোনো প্রকল্পের টাকা ফেরত যাতে না যায় সেজন্য সর্ব্বোচ সর্তক থাকতে বলা হয়েছে পিডিদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৪টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে মোট ১৫টি প্রকল্প চলমান।
সভার কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে এডিপিতে মাউশির অধীন ১৫টি প্রকল্পে তিন হাজার ৪২৯ কোটি ৮৯ লাখ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। এর মধ্যে জিওবির তিন হাজার ১৮৮ কোটি ৬৯ লাখ ও প্রকল্প সাহায্য ৩০৪ কোটি ২০ লাখ ২৮ হাজার টাকা। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অর্থ ছাড় হয়েছে এক হাজার ৮৮১ কোটি ৭৫ লাখ ২৮ হাজার টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ৮৫ লাখ ৯ হাজার টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৪২ দশমিক ৯১ শতাংশ। বাকি সময়ে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। গত বছরও এডিপি বাস্তবায়নে সক্ষম হয়নি মাউশি। এজন্য শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রকল্প পরিচালকদের নিয়ে সভা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। অর্থ খরচ করতে না পারার অন্যতম কারণ হচ্ছে কর্মকর্তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের চেয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের নামে ঘন ঘন বিদেশ ভ্রমণ। সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ) প্রকল্পটি গত ডিসেম্বর মাসে শেষ হলেও বরাদ্দকৃত শত ভাগ অর্থ খরচ করতে পারেনি। চলতি অর্থবছরে ৩০৮ কোটি ১৭ লাখ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২৮৮ কোটি ৭৯ লাখ ১০ হাজার টাকা। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ টাকা খরচ করতে পারেনি। প্রকল্প শেষ হওয়ার তিন মাস পরেও প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) তৈরি করতে পারেনি কর্মকর্তারা। ঢাকা মহানগরীতে ১১টি স্কুল ৬টি কলেজ (সরকারি) নির্মাণ প্রকল্প: প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের কাজেও গতি নেই। চলতি অর্থবছরে ৫৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরিতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৮ কোটি ৫১ লাখ ১৫ হাজার টাকার খরচ হয়েছে। শতাংশ হারে অগ্রগতি ৩২ দশমিক ৫৮ ভাগ। কয়েক মাস ধরে প্রকল্পের পরিচালক ও উপপরিচালক পদ শূন্য থাকায় কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। দুই দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর পরে আরও এক দফা মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। দ্রুত প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ না দিলে চলতি অর্থ বছরের সংশোধিত এডিপির বরাদ্দ শেষ করা যাবে না। শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প: চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ২৪৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১০৫ কোটি ৯৫ লাখ ২৫ টাকা খরচ হয়েছে। শতাংশ হিসেবে ৪২ দশমিক ৭৮ ভাগ অর্থ খরচ হয়েছে। গত বছর একই সময়ে ৭১ দশমিক ৫৯ শতাংশ খরচ হয়েছিল। সংশোধিত এডিপিতে আরও ১৮৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রকল্পভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষা ও নকশা চূড়ান্ত না হওয়ায় দরপত্র আহ্বান আটকে আছে। ফলে বাকি সময়ে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। টিচিং কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট ইন সেকেন্ডারি অ্যাডুকেশন প্রকল্প: এডিপিতে ৫৯ কোটি ৩৬ লাখ ও আরডিপিতে ১৫ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ কোটি ৭৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে; যা মোট বরাদ্দের ২৬ দশমিক ৫১ ভাগ। গত বছর একই সময়ে খরচ হয়েছে ২৮ দশমিক ৯১ ভাগ। প্রকল্প পরিচালক মো. জহির উদ্দিন বাবর সভায় বলেন, এডিপির কনকুয়ারেন্স পেতে তিন-চার মাস লেগে যায়। এতে করে সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। সিলেট, বরিশাল ও খুলনা শহরে সাতটি সরকারি বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প: এডিপিতে ৩৫ কোটি ৪১ লাখ ও আরডিপিতে ১৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরিতে ১১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। যা মোট বরাদ্দের ৩২ দশমিক ১৮ ভাগ। গত বছর একই সময়ে ৩৭ দশমিক ২ ভাগ টাকা খরচ হয়েছিল। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নির্বাচিত বেসরকারি কলেজসমূহের উন্নয়ন প্রকল্প: চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ১৫০০ কোটি ও আরডিপিতে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে খরচ হয়েছে ৬৫৮ কোটি ৯১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। মোট বরাদ্দের ৪৩ দশমিক ৯৩ ভাগ টাকা খরচ হয়েছে। গত বছর এ হার ছিল ৫৮ দশমিক ৯৪ ভাগ। দীর্ঘদিন প্রকল্পের পরিচালক না থাকায় প্রকল্পের প্রকিউরমেন্ট কাজসহ সব কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। সেকেন্ডারি অ্যাডুকেশন সেক্টর ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেসিপ) প্রকল্প: এডিডিতে ১ হাজার কোটি ও আরডিপিতে ৭৬১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এরমধ্যে ৩৯৪ কোটি ৩২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে; যা মোট বরাদ্দের ৩৯ দশমিক ৪৩ ভাগ। শুধু চলতি অর্থবছরে মোট বরাদ্দের অর্থ খরচ নয়, প্রকল্পের মেয়াদ আছে মাত্র ১০ মাস। এই সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষা উপবৃত্তি প্রকল্প, পর্যায়-২এ ১০৯ কোটি তিন লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র এক কোটি ২১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। যা মোট বরাদ্দের এক দশমিক ১২ শতাংশ। এর পরেও সংশোধিত এডিপিতে আরও ২৮৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বাকি সময়ের মধ্যে এই অর্থ খরচ নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) সভায় শঙ্কা প্রকাশ করছেন। আইসিটির মাধ্যমে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার প্রচলন প্রকল্প পর্যায়-২: চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ২০ কোটি ও আডিপিতে ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তবে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৭৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। যা মোট বরাদ্দের তিন দশমিক ৭৯ শতাংশ। ঢাকা শহর সন্নিকটবর্তী এলাকায় ১০টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্প: এডিপিতে দুই কোটি ২৬ লাখ ও আরডিপিতে দুই কোটি ২৬ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। আর খরচ হয়েছে দুই কোটি ৩২ লাখ টাকা। যা মোট বরাদ্দের ১ দশমিক ০৩ ভাগ। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়সমূহের উন্নয় প্রকল্প ও সরকারি কলেজসমূহের বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্প: আরডিপিতে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। প্রকল্পে পরিচালক নিয়োগ ছাড় কোনো কাজ শুরু হয়নি। জেনারেশন ব্রেকথ্রু প্রকল্প এডিপিতে ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা ও আরডিপিতে ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে অডিট আপত্তির কারণে ১১ মাস ধরে কোনো টাকা খরচ করতে পারেনি প্রকল্পের কর্মকর্তারা।
ন্যাশনাল একাডেমিক ফর অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজাঅ্যাবিলিটিস প্রকল্প: এডিপিতে ৬০ কোটি ও আরডিপিতে ৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে দুই কোটি ২৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে; যা মোট বরাদ্দের তিন দশমিক ৭৩ ভাগ। গত বছর একই সময়ে বরাদ্দের হার ছিল পাঁচ দশমিক ৯১ ভাগ। উচ্চমাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্প: এডিপিতে ৪৯ কোটি ৮৭ লাখ ও আরডিপিতে ১৮৮ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে মাত্র ৯৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে; যা মোট বরাদ্দের ১ দশমিক ৯৬ ভাগ।
এ ব্যাপারে মাউশির পরিচালক (উন্নয়ন) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার বাস্তবায়নের হার বেশি যেমন তেমনি এবার এডিবিতে বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে। তবে এ অগ্রগতি আরও দ্রুত করার জন্য প্রকল্প পরিচালকদের তাগিদ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনী বছরের বিষয়টি বাস্তবায়ন সেটা মানতে হবে। কারণ নির্বাচনী বছরের অন্যান্য বছরের চেয়ে প্রকল্পের কাজ দৃশ্যমান করার একটা চ্যালেঞ্জ সরকারের থাকে, সেভাবে একটা প্রস্তুতি আমাদের আছে।

ভেজালের চেয়ে ভয়াবহ খাবারে দূষণ

রাজধানীর হাতিরঝিল সংলগ্ন গাবতলা গলি। গত বুধবার মধ্য দুপুর। দমকা হাওয়া। উড়ছিল ধুলোবালি। ঘর্মাক্ত চার বছরের সন্তান রাকিবুল ইসলামকে নিয়ে থামলেন মা শিরিন আক্তার। আখের রস বিক্রেতা সাইদুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। গরমে সন্তানকে স্বস্তি দিতে একগ্লাস আখের রস চাইলেন শিরিন। সাইদুল এক বালতির জমানো ময়লা পানিতে গ্লাস চুবিয়ে ধোয়েন। তাতে আখের রস দিলেন। রাকিব এক চুমুকেই শেষ করলো গ্লাস। পর পর অপর ক্রেতা বৃদ্ধা ছকিনা বেগমকেও দিলেন একই পানিতে গ্লাস ধুয়ে। একইভাবে দিলেন রমিজ উদ্দিন নামে অপর এক ক্রেতাকে। এভাবে প্রতিদিন সাইদুলের বিক্রি ২০০ থেকে ২৫০ গ্লাস আখের রস। একই ময়লা পানিতে ধোয়া। খোলা পরিবেশে ধুলায় মাখামাখি। মাছির ভোঁ ভোঁ। বরফের পানির সঙ্গে মিশছে তার শরীরের ঘামও। কিন্তু একটু স্বস্তির জন্য ওই দূষিত পানীয় পান করে যাচ্ছে একে একে অনেকে।
এভাবে দূষণের সঙ্গে কেন রস তৈরি ও পরিবেশন করছেন জানতে চাইলে সাইদুল বলেন, বাসা দূরে হওয়ায় একই পানিতে ধুয়ে দিতে হচ্ছে। তাছাড়া সবাই তো ধুলাবালির মধ্যেই আখ চিবিয়ে রস বিক্রি করছে। তবে নানা দিক থেকে দূষণের কথা স্বীকার করলেন তিনি। কিছুটা এগিয়ে কাওরান বাজারের কাছে বিজিএমই ভবন। ভবনের সামনে তিন বছর ধরে ফুটপাতে বসে রাত-দিন খাবার বিক্রি করেন মো. সুজন। ফুটপাতে ৮ রকমের রান্না করা মাছ-মাংস-সবজির পসরা। এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনা। খাবারে ভ্যান ভ্যান করছে মাছি। পানির ড্রামে চিক চিক করছে ভাসমান তেল। খাবার পাত্র, চারপাশে টাঙানো কাপড় ও বসার বেঞ্চ অপরিষ্কার। ওই অবস্থায় সুজনের খাবারের পসরা ঘিরে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন ৫ ব্যক্তি। বিজিএমইএ’র কর্মচারী কবির হোসেন, মতিঝিলের এক অফিসে কর্মরত আবদুল গফুর বাদশা, মহাখালীতে চাকরিরত নাছের উদ্দিন, গাড়ির হেলপার আবদুল আমিন ও পথচারী রফিক। এই প্রতিবেদক কাছে যেতেই একটি বাসন ধুয়ে এগিয়ে দেন। খাবার পানি চাইলেও দেয়া হয় একটি ড্রামের পানি।
বিক্রেতা সুজন বলেন, ফুটপাথে রান্না। ফুটপাথেই বিক্রি। একবার রান্না করলে ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা পরও পরিবেশন করা হয়। রয়ে গেলে নতুন রান্না করা খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়। পাশের একটি নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করি। তাতে চলে সীমিত ধোয়া-মোছা। আমরা তো ফুটপাথে দূষণের সঙ্গে খাবার পরিবেশন করি। কিন্তু বিভিন্ন হোটেলেও তো এভাবে প্রতিনিয়ত ভেজাল খাবার খাওয়ানো হচ্ছে।
ক্রেতা কবির, বাদশা, নাছের, আমিন ও রফিক বলেন, কর্তৃপক্ষের সামনেই এভাবে অহরহ ভেজাল ও দূষিত খাবার বিক্রি হচ্ছে এবং আমরা নিরুপায় হয়ে খাচ্ছি। এতেই তো আমরা নানা অসুখ-বিসুখে ভুগছি।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সূত্র জানায়, শুধু ফুটপাথের খাবার নয়। রাজধানীতে সব ধরনের খাবারের লক্ষাধিক উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন, সংরক্ষণ, বিপণন ও পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান নানাভাবে খাবারে দূষণ ছড়াচ্ছে। সারা দেশে এসবের সঙ্গে জড়িত অন্তত ১৫ লাখ খাদ্য ব্যবসায়ীর অধিকাংশের পরিবেশন করা দূষিত খাবার মানুষ খাচ্ছে। শুধু তাই নয়। বাসা-বাড়িতেও যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও উৎপাদনের প্রক্রিয়া না জানার কারণে জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে দূষিত খাবার গ্রহণ করছে অনেকেই। এতে ছড়াচ্ছে জীবাণুর সংক্রমণ। দূষণের শিকার অনিরাপদ খাদ্যের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে ২০০ রকম রোগ। শুধু দূষিত খাবার গ্রহণের ফলে প্রতিবছর প্রতি ১০ জনে ১ জন লোক অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এতে বছরে মারা যাচ্ছে ৪ লাখ ২০ হাজার মানুষ। খাদ্যে ভেজালের চেয়েও দূষণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটির।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মাহফুজুল হক মানবজমিনকে বলেন, খাবারে ভেজালের চেয়ে দূষণটা অনেক বেশি। আমাদের পরীক্ষায় ২৮টি খাদ্যপণ্যের অধিকাংশেই ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কম। অর্থাৎ খাবার যত না ফরমালিন, রং ইত্যাদি মেশানোর মাধ্যমে ভেজাল করা হচ্ছে তার চেয়ে বেশি হচ্ছে দূষণ। বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিচার্স কাউন্সিলের এক গবেষণায় উঠে এসেছে ৯৭ ভাগ জারের পানি দূষিত। আমাদের এক চলমান গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদন এবং জবাই ও একই পানিতে চুবানোর কারণে মুরগির মাংসে জীবাণুর সংক্রমণ গেছে। ভারি ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পানি দূষিত হওয়ায় মিঠা পানির মাছেও ভারি ধাতু পাওয়া যাচ্ছে। এমনকি রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে কোরবানির পশুর মাংসেও দূষণ পাওয়া যাচ্ছে। কাঁচাবাজারসহ ভোগ্যপণ্য যথাযথভাবে উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ, বিপণন ও পরিবেশন না হওয়ায় দূষণটা বাড়ছে। এতে নানা অসুখ-বিসুখে ভুগছে ভোক্তারা।
রাষ্ট্রীয় সংস্থাটি আরো জানায়, বিভিন্ন কারণে খাদ্যে দূষণ ক্রমেই বাড়ছে। খাবার উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য (যেমন, ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট), কীটনাশক (যেমন, ডিডিটি, পিসিবি তেল ইত্যাদি), রঞ্জক বা সুগন্ধি, তেজস্ক্রিয় বা ভারি ধাতুর ব্যবহার, ভেজাল মিশ্রণ, নিম্নমানের খাবার উৎপাদন, ক্ষতিকর প্রক্রিয়ায় উৎপাদন, ক্ষতিকর কীটনাশক বা অনুজীবের ব্যবহার, খাবারে পচন, ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্তদের দ্বারা পরিবহন ও পরিবেশন, কাঁচা-পচা ও রান্না করা খাবার এক স্থানে রাখা, খোলা খাবারে মাছি ও কীটপতঙ্গ দ্বারা জীবাণুর বিস্তার, হাঁচি-কাশি-অপরিচ্ছন্ন হাতের ছোঁয়া, নির্ধারিত তাপমাত্রায় না রাখা ইত্যাদি কারণে খাবার দূষিত হচ্ছে। এই দূষণ থেকে সৃষ্টি হচ্ছে বিভিন্ন রোগ-জীবাণুর সংক্রমণ। এসব দূষণের সিংহভাগই হচ্ছে অসচেতনতা ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে। মানুষের সচেতনতার মাধ্যমে তা অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায় বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পরিচালক এস.এম আমিরুল ইসলাম বলেন, আমাদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে রয়েছে অন্তত ২ হাজার রকম খাবার। দূষণ ও ফুড পয়জনিংসহ বিভিন্নভাবে বহু খাবার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। না জেনে সেই খাবার আমরা গ্রহণ করি। অথচ সবাই সচেতন হলে খাবার দূষণ অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব। অবশ্য দূষিত ও ভেজাল খাবার বিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

সিলেটে জোড়াখুন: রহস্যময়ী তান্নিকে ঘিরে যত আলোচনা by ওয়েছ খছরু

ছদ্ম নাম তানিয়া। ‘তান্নি’ নামেও চিনে অনেকেই। একাধিক নাম ব্যবহার করে সিলেটে আলোচিত তান্নি। সিলেটের মিরাবাজারে মা ও ছেলে খুনের ঘটনার পর থেকে লাপাত্তা। ইতিমধ্যে পুলিশ বেশ কয়েকজন নারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিন্তু তান্নিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তার খোঁজে ঘুম হারাম পুলিশের। ইতিমধ্যে পুলিশি রিমান্ডে থাকা নিহত রোকেয়া বেগমের প্রেমিক নাজমুলের কাছ থেকে তান্নি সম্পর্কে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এক তান্নির খোঁজে সিলেটের অজানা ইয়াবা সিন্ডিকেটের সন্ধান পেয়েছে। তবে পুলিশ এসব তথ্যের ভিড়ে সবার আগে আলোচিত জোড়া খুনের রহস্য উদঘাটনে খুঁজে ফিরছে তান্নিকে। কে এই তান্নি? এ প্রশ্নের অনেক উত্তর ইতিমধ্যে পুলিশ পেয়েছে। তান্নি বহুরূপী। একেক সময় একেক নাম ব্যবহার করে। সিলেটে তার সিন্ডিকেটের বেশির ভাগ নারীর কাছে সে তানিয়া নামেই পরিচিত। ঘনিষ্ঠ কয়েকজন নারীর কাছে সে তান্নি নামেই পরিচিত। এটিই তার প্রকৃত নাম বলে তার সহযোগীরা নিশ্চিত করেছে। সিলেটে বাসায় নারী দিয়ে অসামাজিক কাজ করানোর মতো মহিলার সংখ্যা কম নয়। অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীও এই কাজের সঙ্গে জড়িত। নগরীর অভিজাত এলাকা থেকে শুরু করে প্রায় সব এলাকাই তারা বসবাস করে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিউটি পার্লার, কেউ আবার রাজনীতির আড়ালে এসব কাজ করে বেড়ান। অনেকেই আছেন প্রবাসীর স্ত্রীর পরিচয়ে বিলাস বহুল জীবনযাপন করেন। সিলেটের তান্নি তাদেরই একজন। সিলেটে ইয়াবা নেটওয়ার্কের শীর্ষ পর্যায়ে তান্নির অবস্থান। তার মূল বাড়ি সুনামগঞ্জ। চার বছর আগে মিনারা নামের এক মহিলার হাত ধরে সিলেট নগরে প্রবেশ করে। বেশ সুন্দরী। মর্ডান স্টাইলে চলাফেরা করে। শহরতলীর ইসলামপুর এলাকায় বসবাসকারী মিনারার মাধ্যমে সিলেটে এসে হাইপ্রোপাইল পতিতা হিসেবে পরিচিতি পায়। এরপর জড়িয়ে পড়ে ইয়াবা ব্যবসায়। ইয়াবার বিশাল বিশাল চালান তার হাত ধরে এসেছে সিলেটে। এই চালানগুলো মহিলাদের মাধ্যমে অসামাজিক কাজের আড়ালে ব্যবসার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। উচ্চবিলাসী তান্নির সঙ্গে মিনারার সম্পর্ক বেশি দিন টিকেনি। এরই মধ্যে সে সিলেট নগরীতে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। সঙ্গ পায় নয়া সড়ক এলাকায় বসবাসকারী দিলারা নামের আরেক মহিলার। তার আগে মিনারার বদান্যতায় জাকির নামের একজনের সঙ্গে বিয়েও হয় তান্নির। দিলারাও নগরীর আরেক পরিচিত মুখ। মধ্যবয়সী দিলারার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার পর তান্নি সিলেটে বিভিন্ন হাইপ্রোপাইল মানুষের ছোঁয়া পায়। একই সঙ্গে ইয়াবা ব্যবসাও চালিয়ে যেতে থাকে। প্রায় দুই বছর দিলারার সঙ্গে একত্রে ব্যবসা করে তান্নি। এর মধ্যে তান্নির নেটওয়ার্ক আরো বিস্তৃতি লাভ করে। এক সময় দিলারার সঙ্গেও তার বিরোধ দেখা দেয়। এই বিরোধের অন্যতম কারণ হচ্ছে ইয়াবার চালানের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা। ব্যবসার টাকা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ায় তান্নি কয়েক মাস আগে সম্পর্ক গড়ে সিলেটের মিরাবাজারে নিহত রোকেয়ার সঙ্গে। রোকেয়ার সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ ছিল তার। রোকেয়ার বাসায় সে তানিয়া নামে পরিচিতি পায় এবং সবাই তাকে তানিয়া বলেই ডাকে। পুলিশসহ এলাকা সূত্রে জানা গেছে, তানিয়া ওরফে তান্নি প্রায় ৭-৮ মাস ধরে রোকেয়ার বাসাতেই বেশির ভাগ সময় থাকতো। রোকেয়া স্থানীয়দের কাছে তান্নিকে পরিচয় দিত কাজের মহিলা হিসেবে। কিন্তু তান্নি ছিল নিহত রোকেয়ার ব্যবসায়িক পার্টনার। একই সঙ্গে তান্নির নেটওয়ার্ক বেশি থাকায় সে খদ্দের ধরে নিয়ে যেত নিহত রোকেয়ার বাসায়। ওখানে তারা ইয়াবা বিক্রি করতো। এমনকি ইয়াবার চালানও আনা-নেয়া হতো ওখান থেকেও। মিরাবাজারের খারপাড়া এলাকাবাসী জানিয়েছে, রোকেয়া বেগমের বাসা থেকে প্রায় সময় বোরকাপরা এক মহিলা বের হয়ে যেতেন। তিনি রোকেয়ার বাসাতেই থাকতেন। মুখ ঢেকে থাকার কারণে কখনোই তার মুখ কেউ দেখেনি। তবে রোকেয়ার বাসার লোকজন তাকে দেখেছে। নিহত রোকেয়ার প্রেমিক নাজমুলের সঙ্গে তান্নির সম্পর্ক ছিল গভীর। নাজমুল তার প্রেমিকা রোকেয়া ও তান্নিকে স্ত্রীর মতো ব্যবহার করতো। ফলে তান্নির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল নাজমুলের। রোকেয়ার বাসায় ইয়াবার ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটাতে নাজমুলও সেখানে অংশীদার হয়েছিল বলে ইতিমধ্যে পুলিশ জেনেছে। নাজমুলের টাকা দিয়ে তারা ইয়াবা নেটওয়ার্ক আরো শক্তিশালী করে। এ কারণে প্রায় এক বছরের ব্যবধানে রোকেয়া প্রচুর টাকার মালিক হয়েছিল। তান্নিও একইভাবে টাকা আয় করেছে। পুলিশ জানায়, রিমান্ডে থাকা নাজমুলের কাছ থেকে রোকেয়া ও তান্নির অজানা অধ্যায়ের অনেক ঘটনা এখন তাদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। প্রেমিকা রোকেয়ার হাত ধরে সেও ইয়াবা নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়েছিল। এতে করে লাখ লাখ টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে তাদের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ ছিল। খুনের কয়েক দিন আগে থেকে নাজমুল ও তান্নি নিহত রোকেয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। ইয়াবার টাকা ভাগ-বাটোয়ারার দ্বন্দ্বের জের ধরে তান্নি এলাকার যুবক কাঞ্চা সুমনসহ কয়েকজনকে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। পরবর্তীকালে এলাকার ওই যুবকরা নিহত রোকেয়ার বাসায় আস্তানা গড়ে তুলেছিল। ওদিকে বিয়ে নিয়ে নাজমুলের সঙ্গেও নিহত রোকেয়ার বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছিল। সিলেটের কোতোয়ালি থানার ওসি মো. গৌসুল হোসেন গতকাল বিকালে মানবজমিনকে জানিয়েছেন, তানিয়া ওরফে তান্নিকে গতকাল পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে। পাশাপাশি রিমান্ডে থাকা নাজমুলকেও জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাইবাছাই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

চাঁদা তুলে ভুয়া চিকিৎসকের খরচ জোগান শাহানা by এনা হাসান

উন্নত চিকিৎসার জন্য শাহানা দালালের মাধ্যমে সরকারি হাসপাতাল থেকে গিয়েছিলেন বেসরকারি হাসপাতালে। ডাক্তার পরিচয়ে হাসপাতালের ম্যানেজার জানিয়েছেন, দ্রুত অপারেশন করতে হবে। নতুবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হবে। অপারেশন করতে প্রয়োজন তিন লাখ টাকা। মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এতো টাকা পাবেন কোথায়। তবে যে কোনোভাবেই একমাত্র শিশু সন্তান সামিয়াকে বাঁচাতে চান মা-বাবা। ঋণ করেন। পথে পথে মানুষের কাছে আর্থিক সাহায্যের জন্য হাত পাতেন। তারপর অপারেশন হয়েছে ছোট্ট মেয়েটির পায়ে। টাকাও গেছে। কিন্তু সুস্থ হয়নি মেয়েটি। ভুল চিকিৎসায় এখন পা হারাতে বসেছে ছয় বছরের সুমাইয়া।
সুমাইয়ার বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায়। একবছর আগে বিছানা থেকে নামতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পায় সুমাইয়া। ব্যথা বাড়তে থাকলে চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এনে ভর্তি করা হয় জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালে (পঙ্গু হাসপাতাল)। জরুরি বিভাগে সুমাইয়াকে দেখাতে নিয়ে গেলে সামিয়ার বাবা মায়ের সঙ্গে পরিচয় হয় দিতি নামের এক মহিলার সঙ্গে। নিজেকে পঙ্গু হাসপাতালে কর্মরত পরিচয় দেন তিনি। পঙ্গুতে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো হবে না বলে সামিয়াকে ভালো ও দ্রুত চিকিৎসার জন্য পাশের ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যান দিতি। ক্রিসেন্ট হাসপাতালে কর্মরত ম্যানেজার হাসান নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে সামিয়ার বাবা-মা’কে বলেন, আপানারাতো দেরি করে ফেলছেন। এই মেয়ের পায়ে তো ক্যান্সার হয়ে যাবে। দ্রুত অপারেশন না করলে এই পা কেটে ফেলতে হবে। অপারেশন করাতে নগদ তিন লাখ টাকা দাবি করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। মেয়ের এই করুণ অবস্থা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়েন মা শাহানা আক্তার। ডাক্তারের কাছে অনুরোধ করেন টাকার পরিমাণ কমানোর জন্য। তখন তাকে বলা হয় এখন এক লাখ টাকা জমা করতে বাকিটা অপারেশনের আগে পরিশোধ করতে। শাহানা বলেন, আমার আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় মা’কে বলে ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ উত্তোলন করি এক লাখ টাকা। এরপর বাকি দুই লাখ টাকা গ্রামের বাজারে মানুষের কাছ থেকে চাঁদা তুলে, বিভিন্নভাবে ধার-দেনা করে যোগাড় করি। আমার সংসার জীবনের তের বছর পর আমি মেয়েটারে পাইছি। সেই মেয়ের এমন অবস্থা হবে তা ভাবতেই পারি নাই। মেয়ের জন্য পথে পথে ঘুরছি। ঢাকায় আমার থাকার জায়গা ছিলো না। কোনো মতে এক জায়গায় রাত পার করে ডাক্তার দেখাইছি।
মাত্র ২১ দিনের মধ্যেই সামিয়া দৌড়ে বেড়াবে এমন আশ্বাস দেয় ক্রিসেন্ট হাসপাতালের চিকিৎসকরা। ছোট্ট সামিয়া আবার আগের মতো ঘরজুড়ে দৌড়ে বেড়াবে। মেতে উঠবে খেলায়। স্বপ্ন দেখেন বাবা-মা। কিন্তু অপারেশনের ২১ দিন পর পায়ের রড খোলার জন্য সামিয়াকে হাসপাতালে নিয়ে এলে সেই স্বপ্নে ফাটল ধরে। পায়ের ভিতরের রড ছুটে গেছে বলে সামিয়াকে আবার অপারেশনের কথা বলেন ডাক্তার। এরপর কখনো দুই সপ্তাহ, কখনো এক মাস আবার কখনো তিন মাস পরপর পা দেখার অজুহাতে হাতিয়ে নেয় আরও লাখ দেড়েক টাকা। এ রকম করেই দেড় বছর। এর মাঝে অন্য জায়গায় ডাক্তার দেখাতে গেলেও ফিরে আসতে হয় তাদের।
এবার দেখা করতে চান ক্রিসেন্ট হাসপাতালের মালিক নুরুন্নবীর সঙ্গে। দেখা করেও আশার আলো দেখতে পাননি তারা। বরং নানাভাবে অপদস্তের শিকার হন। বেশি বাড়াবাড়ি করলে পুলিশে দেবেন এমন হুমকিও শুনতে হয়। শাহানারা আক্তার যোগাযোগ করেন র‌্যাব’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের সঙ্গে। জানান পুরো ঘটনাটি। ঘটনার সত্যতা যাচাই করে ২৮শে মার্চ র‌্যাব’র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের নেতৃত্ব ক্রিসেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালানো হয়। উদ্ধার করা হয় ২২ রোগীকে। যাদের সবাই ভুল চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালে ভর্তি। চিকিৎসাধীন এইসব রোগীর মধ্যে সুমাইয়া আক্তার সামিয়া একজন। ভুল চিকিৎসার ফলে বর্তমানে সামিয়ার পায়ে পচনের সৃষ্টি হয়েছে। সামিয়া এখন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন অব ট্রমালজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন-নিটোর (পঙ্গু হাসপাতাল) এর পরিচালক ডা. আবদুল গণী মোল্লার তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন।

ঢামেকে বিনা বেতনে কর্মী চাঁদাবাজি by শুভ্র দেব

ওরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিনা বেতনের কর্মী। ভালো চিকিৎসার জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ছুটে আসেন রোগীরা। চিকিৎসা সেবা যেমন হোক না কেন ঢামেকে আসার পর জরুরি বিভাগ থেকে শুরু হয় রোগী ও রোগীর স্বজনদের ভোগান্তি। জরুরি বিভাগে ভর্তি থেকে শুরু করে রোগীর ছাড়পত্র পাওয়া পর্যন্ত সময়ে রোগীর স্বজনদের গুনতে হয় বিভিন্ন ঘাটে বকশিশের নামে টাকা। আর রোগী জিম্মি করে বকশিশ নেয়ার কাজে বড় ধরনের সিন্ডিকেট কাজ করে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন হাসপাতালের কয়েকজন সরদার ও ওয়ার্ড মাস্টার। তাদের সহযোগিতা করে আসছেন স্পেশাল বয় নামের একটি গ্রুপ। যাদের কর্তৃপক্ষ বিনা বেতনে নিয়োগ দিয়েছেন। মূলত তারা রোগীকে ট্রলি-হুইল চেয়ার দিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে গিয়ে বকশিশ আদায় করে। এই বকশিশ ট্রলিতে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। সুযোগ সুবিধা ও ব্যক্তি বিশেষে সেই বকশিশ ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা হয়ে যায়। প্রতিদিন গড়ে ৭৭ জন স্পেশাল বয় এই বকশিশ আদায় করে। চাহিদামতো বকশিশ দিতে না পারলে অনেক সময় রোগীর স্বজনদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এর বাইরে বহিরাগত ২৫ জন নারী হুইল চেয়ার দিয়ে রোগীকে বহন করে টাকা আদায় করছে। তারাও রোগীদের জিম্মি করে টাকা নেয়। অভিযোগ আছে হাসপাতালের বাইরে থেকে হুইল চেয়ার কিনে এনে তারা এই কাজ করছে। আর এই গ্রুপে কাজ করছে শান্তা, রীণা, শিলা, রওশন, শারমিন, নাজমা, জেসমিন, লুৎফা, রহিমা ছাড়াও আরও কয়েকজন। তাদের বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতালের রোগী প্রাইভেট হাসপাতালে ভাগানোর অভিযোগও রয়েছে। প্রশাসনের সামনে এসব ঘটনা ঘটলে বেশির ভাগ সময় প্রশাসন দেখে না দেখার ভান করে। বহিরাগতদের দিয়ে রোগী বহনের ব্যবস্থা করা; প্রয়োজনের তুলনায় কম ট্রলি থাকা; এবং স্পেশাল বয়দের কোনো নিয়মনীতি ও মনিটরিং না করায় দিন দিন রোগী হয়রানি বাড়ছে। কোনো নিয়মনীতি না থাকাতে স্পেশাল বয়রা নিজেদের মতো করে কাজ করছে। মঙ্গলবারের ঘটনা। পেটে ব্যথা নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে যান সংবাদকর্মী আবু মূসা। নতুন ভবনের ছয়তলায় প্রাথমিক চিকিৎসার পর সেখানকার চিকিৎসকরা তাকে পুরাতন ভবনের সার্জারি ২২০ নম্বর ওয়ার্ডে স্থানান্তর করেন। অসুস্থ এই রোগীকে নিয়ে সার্জারি ওয়ার্ডে যাওয়ার জন্য প্রয়োজন হয় ট্রলির। কিন্তু প্রায় দেড় থেকে দুই ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর তার স্বজনরা কোনো ট্রলি খোঁজে পাচ্ছিলেন না। যে কয়টা ট্রলি পাওয়া যায় তার কোনোটাই এই রোগীকে নিয়ে যেতে চায়নি। বেশি টাকা দিয়ে বুকিং করা রোগীদের বহন করতেই ব্যস্ত স্পেশাল বয়রা। অবশেষে হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় ও অন্যদের সহযোগীতায় ৩০০ টাকা দিয়ে একটি ট্রলি দিয়ে এই রোগীকে সার্জারি ওয়ার্ডে নেয়া হয়। এ চিত্র এখন ঢামেকে হরহামেশাই দেখা যায়। চিকিৎসার চেয়ে রোগী স্থানান্তরের জন্য ট্রলি-হুইল চেয়ার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য সিরিয়াল, রোগীর জন্য একটি সিটের ব্যবস্থা করা এখন বড় কাজ। যদিও চাহিদামতো টাকা দিতে পারলে সবকিছুই হাতের নাগালে পাওয়া যায়। কিন্তু ঢামেকে চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগ রোগীই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত। চিকিৎসার খরচের বাইরে ঘাটে ঘাটে বকশিশ দেয়াটা অনেকের কাছে কঠিন হয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটেছে এরকমই আরেক ঘটনা। নতুন ভবনের মেডিসিন বিভাগ থেকে আব্দুল মতিন নামের এক মুমূর্ষু রোগীকে তার স্বজনরা নিয়ে যাবে প্রাইভেট হাসপাতালে। একটি ট্রলি করে দুজন স্পেশাল বয় তাকে নতুন ভবন থেকে জরুরি বিভাগের সামনে নিয়ে এসে বকশিশ দাবি করে। রোগীর স্বজন তাদেরকে ১০০ টাকা দিলে তারা ক্ষেপে যায়। এসময় তারা ৫০০ টাকা দাবি করে। স্বজনরা এই টাকা দিতে অপারগতা দেখান। পরে বাধ্য হয়ে রোগীর স্বজনরা ৩৫০ টাকা দিয়ে পার পান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ঢামেক হাসপাতালে রোগীদের জিম্মি করে বকশিশ বাণিজ্যর সঙ্গে জড়িত ছিলেন চতুর্থ শ্রেণীর ক’জন প্রভাবশালী কর্মী। তারা হলেন, সরদার দেলোয়ার, সরদার ফুল মিয়া, সরদার আইয়ুব মিয়া, সরদার দেলোয়ার, সরদার আলী ও মোহাম্মদ আলম। এই ছয় সরদার ও স্পেশাল বয়দের যোগসাজশে রোগীর স্বজনদের কাছ থেকে বকশিশের নামে চাঁদা তোলা হচ্ছে। মূলত তিন শিফটে ট্রলি বাণিজ্য হয়। প্রতি শিফটে দুজন করে সরদার দায়িত্ব পালন করতেন। জানা যায়, শুধু ট্রলির জন্য স্পেশাল বয়দের কাছ থেকে সরদাররা প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা করে নিতেন। কাগজপত্রে স্পেশাল বয়দের কোনো পরিচয়ও খোঁজে পাওয়া যায় না। তবে সরদাররা কারণে-অকারণে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতেন। গত মাসে এই ছয় সর্দারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। পরে এই ছয় সর্দারকে অন্যত্র সরিয়ে দিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু জবাব দিতে না পারায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ সিদ্ধান্ত নেয়। ২৯শে মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এখন তাদের স্থানে নতুন করে আরো কয়েকজন সর্দার নিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু এসব সরদারদের অন্যত্র সরিয়ে নিলেও তাদের প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। যেসব অভিযোগের জন্য আগের সর্দারদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে বর্তমানে হাসপাতালের চিত্র প্রায় একই। জরুরি বিভাগসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জিম্মি করে টাকা নেয়ার সত্যতা পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্পেশাল বয় জানান, বিনা বেতনে তারা কাজ করে। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে রোগীর স্বজনরা খুশি হয়ে যা দেয় তা নিতে। কিন্তু দাবি না করলে স্বজনরা কম টাকা দেয়। এছাড়া আমাদের তদারকি যারা করেন তাদের অনেক টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে এখানে কাজ করার কোনো উপায় নেই। ছুটিতে থাকলেও টাকা দিতে হয়। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তা অফিসিয়ালি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানালে তারা ব্যবস্থা নেবেন।

চোরাই মোটরসাইকেল উদ্ধারের নামে প্রতারণা by মহিউদ্দিন অদুল

মোফাজ্জেল হোসেন মৃধা একজন স্কুল শিক্ষক। খিলগাঁওয়ের শান্তিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলা পড়ান। ব্যস্ততম রাজধানীতে সময় বাঁচিয়ে সহজ পরিবহনের জন্য ব্যবহার করেন মোটরসাইকেল। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি মোটরসাইকেলে চড়ে যান জোড়পুকুর পাড় মাঠের কাছে নিজের ফার্নিচার কারখানায়। রাত আটটার দিকে গাড়িটি ওই মাঠ সংলগ্ন ২১৭/সি নাবিল লন্ড্রির সামনে রেখে নিজের প্রতিষ্ঠানে ঢুকেন। কিছুক্ষণ পরই রাত ৮টা ১৮ মিনিটে গাড়িটি নিয়ে চম্পট দেয় চোরাই চক্রের সদস্যরা। কিছুক্ষণ পর তিনি গাড়ি রাখার স্থানে ফেরেন। কিন্তু তার প্রিয় বাহনটি আর নেই। পরে জানা যায় ওই গাড়ি চুরি করে নিয়ে যায় রাজিব মুন্সী। সঙ্গে ছিল অপর সহযোগী। মোটরসাইকেল চুরিতে তার মুন্সিয়ানাও অন্যান্য চক্রগুলোর কাছে বেশ পরিচিত। চুরির পরই ওই গাড়ি চলে যায় শরীয়তপুরে।
মোটরসাইকেল চুরির পর এবার রাজীব নামে উদ্ধারের নামে নতুন প্রতারণায়। দু’দিন পর গাড়ির মালিক মোফাজ্জেল হোসেনকে ০১৬৪২-২১৮৮৩৭ মোবাইল নম্বর থেকে ফোন করে। জানতে চায়, আপনার কী কোনো মোটরসাইকেল চুরি হয়েছে? হ্যাঁ, বলে জবাব দিতেই গাড়ির বিস্তারিত বিবরণ জানিয়ে জানতে চায় তার গাড়ি সেই রকম কিনা। এরপর বলে আপনার গাড়ি অ্যাপাচি আরটিআর লাল-কালো ঢাকা মেট্রো ল-১৮-০৬৯৩ নম্বরের গাড়ি কিনা। সবই মিলে যাওয়ার পর রাজীব ০১৯০৮-৪৭৬৭৭৬ নম্বর থেকে ইমোতে ওই গাড়ির ৪টা ছবি পাঠায় মোফাজ্জেলকে। নিশ্চিত ও আশ্বস্ত করে যে সেটিই তার হারিয়ে যাওয়া মোটরসাইকেল। তারপর বলে গাড়িটি চুরির পর বেনাপোলে আমার বাড়ির কাছে এক ব্যক্তির কাছে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। গাড়িটি কেনার নামে আটকানোর জন্য ১০ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে আমি আটকাচ্ছি। আপনি ১০ হাজার টাকা ব্যক্তিগত বিকাশে নম্বরে পাঠিয়ে দেন। বিকাশের এজেন্ট নম্বর দিতে রাজি না হওয়ায় তার বিভিন্ন চাতুর্য্যে সন্দেহ ঘনিভূত হয়।
কিন্তু টাকা না পাঠিয়ে মামলা দায়ের ও খিলগাঁও থানা পুলিশের সহায়তা নেন মোফাজ্জেল। পুলিশ মোবাইল ট্র্যাকিং করে জানতে পারে মোবাইল ব্যবহারকারী বেনাপোলে নয়, অন্য স্থান থেকে কথা বলছে। এরপর দুর্বৃত্তদের নানা নাটকীয়তা অতিক্রম করে খিলগাঁও থানা ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সেই চোরাইচক্রকে গ্রেপ্তার করে। উদ্ধার করে মোটরসাইকেলটিও। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগ গত কয়েকদিনে রাজধানী ঢাকা থেকে এমন নানা অভিনব কায়দায় চুরি ও চুরির পর বিভিন্ন জেলায় পাচার হওয়া ১৮টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে। ডিবি পশ্চিম ৪ জন ও পূর্ব বিভাগ ৫ জন করে মোট ৯ মোটরসাইকেল চোরকে আটক করেছে।
শুধু এ দু’চোরাই চক্র নয়। তাদের হাত ধরে পুলিশ আরো অন্তত ৬ মোটরসাইকেল চোর চক্রের সন্ধান পেয়েছে। চুরির পর প্রতারণাই নয়। চুরির সময়ও তারা নেয় অভিনব কৌশল। প্রথমে কোন একটি মোটরসাইকেলকে টার্গেট করে। আরোহী মোটরসাইকেল রেখে কিছুটা আড়াল হলেই আচার-আচরণে নিজেই মালিক বনে যায়। সঙ্গে থাকে সহযোগী। এরপর টার্গেট করা মোটরসাইকেল নিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা ব্যাপক সংখ্যায় পার্ক করা মোটরসাইকেলের সারি থেকেই টার্গেট করে। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সামনে পার্ক করা মোটর মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের মোটরসাইকেল বেশি শিকারে পরিণত হচ্ছে। এর কারণ বেশি সংখ্যায় থাকা মোটরসাইকেলের ভিড়ে নিজে চালক বনে চুরি করতে সহজ।
তেমনই এক ভুক্তভোগী আবদুল কাদের। তার বাড়ি চট্টগ্রামে। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী হলেও গত ২রা জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক আত্মীয়কে দেখতে গিয়ে মোটরসাইকেল রাখেন আরো কয়েক মেডিকেল এসিস্ট্যান্টের গাড়ির সঙ্গে। স্বজনকে দেখে নিচে নেমে দেখেন তার গাড়ি নেই। প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন তাকে বলেন যে, আমাদের সামনেই দু’লোক একটা মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে। আমরা তো স্বাভাবিক আচার-আচরণ দেখে তাদেরকেই মালিক মনে করেছি। তখনই তিনি জানতে পারেন যে, সেভাবে আরো বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্য সহকারীর মোটরসাইকেল চুরির কথা।
মোফাজ্জেল বলেন, আমার মোটরসাইকেল চুরির পর আবার উদ্ধারের ফাঁদ পেতে টাকা হাতিয়ে নিতে চেয়েছিল প্রতারকরা। পরে জানতে পারি তারা ওই মোটরসাইকেল ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে পার্টস ইত্যাদি পরিবর্তন করে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে বিক্রি করে দেয়।
এদিকে গত মঙ্গলবার রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ডিবি পশ্চিম বিভাগ একে একে গ্রেপ্তার করে মো. রাজীব মুন্সী, আবদুুর রহমান, জাকির হোসেন ও মোক্তার হোসেনকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করে ১২টি মোটরসাইকেল। প্রায় একই সময়ে ডিবি পূর্ব-বিভাগ আটক করে আরো ৫ মোটরসাইকেল চোরকে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় আরো ৬ টি মোটরসাইকেল। তারা মোটরসাইকেলগুলো চুরি করে বিভিন্ন জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের মেরামত কারখানায় নিয়ে পার্টস পরিবর্তন করে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে আবার বিক্রি করে দেয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মো. আবদুল বাতেন বলেন, বেশি করে পার্ক করা মোটরসাইকেলের মাঝখান থেকে তারা কাউকে বুঝতে না দিয়ে দ্রুত মোটরসাইকেল নিয়ে পালায়। সেখানে স্বয়ং মালিক উপস্থিত থাকলেই হয়তো তা বুঝবেন। চুরির পর তা নিয়ে চলে যায় মাদারীপুর, শিবচরসহ বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকার প্রত্যন্ত গ্রামের কারখানায়। সেখানে চোরাই মোটরসাইকেলগুলোর একটার পার্টস অন্যটাতে উলট-পালট করে লাগায়। তারপর সেভাবে আবার কাগজপত্রও তৈরি করে। বিক্রি করে দেয়। রাজধানীতে এমন বেশ কয়েকটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের পুরো চোরাই প্রক্রিয়া নিয়ে অনুসন্ধান চলছে।

রথীশ হত্যা: স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্নিগ্ধা যা বলেছে...

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে স্বামী রথীশ চন্দ্র ভৌমিককে হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন স্নিগ্ধা ভৌমিক। পরকীয়া প্রেমিক কামরুলের সঙ্গে মিলে হত্যার নির্মম বর্ণনা দিয়েছেন ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে। স্নিগ্ধা বলেন, রথীশকে হত্যা করলে সবাই ভাববে জঙ্গিরাই তাকে মেরেছে- এ ভাবনা নিয়েই তাকে হত্যা করা হয়। এর কারণ হিসাবে জানায়, রথীশ ছিল জেএমবির হামলায় নিহত জাপানি নাগরিক ও মাজার খাদেম হত্যা মামলার সরকার পক্ষের আইনজীবী। আর এ কারণেই জঙ্গিরা তাকে হত্যা করেছে- এমনটা বিশ্বাসযোগ্য হবে। বৃহস্পতিবার রাতে রংপুর অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আরিফা ইয়াসমিন মুক্তার খাস কামরায় স্নিগ্ধা ১৬৪ ধারায় এ জবানবন্দি দেন। সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে দেয়া জবানবন্দিতে স্নিগ্ধা জানায়, ২৫ বছরের দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি।
ওদিকে স্নিগ্ধা ভৌমিকের পরকীয়া প্রেমিক কামরুল ইসলামের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় অতিরিক্ত চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আরিফা ইয়াসমিন মুক্তা তার এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অপরদিকে স্নিগ্ধা ভৌমিকের পাশাপাশি দুই স্কুলছাত্র সবুজ ইসলাম (১৭) ও রোকনুজ্জামানের (১৭) আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। জবানবন্দি শেষে স্কুলের দুই ছাত্রকে গতকাল সকালে যশোর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বিচারক আরিফা ইয়াসমিন মুক্তার কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির সূত্র ধরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রংপুর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক আল আমীন সাংবাদিকদের বলেন, ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে দীপা তার স্বামীকে হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং কামরুলের ইসলামের পরকীয়ার কথাও স্বীকার করেন। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, দুই কিশোর তাদের জবানবন্দিতে শিক্ষক কামরুলের নির্দেশে তার নির্মাণাধীন পরিত্যক্ত বাড়ির একটি কক্ষে গর্ত খোঁড়ার কথা স্বীকার করে। ওই গর্তেই রথীশের মাটিচাপা দেয়া লাশ পাওয়া গিয়েছিল। আলাদাভাবে জবানবন্দি নেয়ার পর স্নিগ্ধা ও দুই কিশোরকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন বিচারক মুক্তা। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, অ্যাডভোকেট রথীশ ভৌমিককে হত্যা করার পর লাশ ঘরের মেঝেতে রেখে তার স্ত্রী স্নিগ্ধা ও কামরুল শারীরিক মেলামেশা করে রাতভর। তাদের পরকীয়া প্রেমের কাহিনী জানতো অ্যাডভোকেট রথীশের ব্যক্তিগত সহকারী মিলন মোহন্ত। আর এ কারনে খুনের সঙ্গে জড়িত বাবু সোনার সহকারী মিলন মোহন্তকে এই মামলায় বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। পরে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়। ওদিকে সূত্র জানায়, স্নিগ্ধা ও কামরুল গোপনে দেশ ছাড়তে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর বিভিন্ন সংগঠনের আন্দোলন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তারা পালাতে পারেননি।
উল্লেখ্য, আইনজীবী রথীশ ভৌমিক বাবু সোনা ৩০শে মার্চ সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বাসা থেকে নিখোঁজ হন। পাঁচ দিন তদন্ত শেষে র‌্যাব-পুলিশ তার রহস্য উদঘাটন করে। ২৯শে মার্চ রাত ১০টার দিকে নগরীর তাজহাট বাবুপাড়ার নিজ বাসাতেই ঘুমের বড়ি খাইয়ে অচেতন করে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় তাকে। ৪ঠা এপ্রিল দিনগত রাতে তার তাজহাট মোল্লাপাড়ার কামরুলের নির্মাণাধীন পরিত্যক্ত বাসা থেকে বাবু সোনার লাশ উদ্ধার করে র‌্যাব। বাবু সোনা জাপানি নাগরিক ও খাদেম হত্যা মামলার বিশেষ পিপি, যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামী নেতা এটিএম আজাহারুল ইসলামের সাক্ষী ছিলেন। এছাড়া তিনি জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক, আইনজীবী সমিতির যুগ্ম সম্পাদক জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কল্যাণ ট্র্যাস্টেও ট্র্যাস্টি, জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি ও তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ছিলেন। এদিকে অ্যাডভোকেট রথীশের হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী স্নিগ্ধা ভৌমিকের প্রেম কাহিনী মানুষের মুখে মুখে। রথীশ ও স্নিগ্ধার বিয়ে প্রায় ২ যুগ পার হলেও স্নিগ্ধার স্বামী অ্যাডভোকেট রথীশ এখনও বেশ সুদর্শন। পাশাপাশি কামরুল ইসলাম বিয়ের প্রায় দেড় যুগ হলেও তার ঘরে রয়েছে সুন্দরী স্ত্রী রোজ।

অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মাদক উদ্ধার ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে গতি আনতে নিজস্ব জনবলের মাধ্যমে অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি না থাকায় মাদকদ্রব্য উদ্ধার ও আসামিদের ধরতে নানামুখী অসুবিধার শিকার হতে হচ্ছে ড্রাগ দমনে নিয়োজিত এই প্রতিষ্ঠানটির অভিযান পরিচালনাকারী দলকে। নিজস্ব  লোকবলের মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির অভিযান পরিচালনাকারী টিম ঘটনাস্থলে দ্রুত যেতে পারে না। অভিযানের বিষয়টি তারা আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা একক অভিযান চালানোর সময় দেশের বিভিন্নস্থানে মাদক ব্যবসায়ীদের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছেন। অনেকেই শারীরিকভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এর প্রধান কারণ নিজস্ব জনবলের কাছে অস্ত্র না থাকা। বড় অভিযানের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজিবি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে অভিযান চালায়। অভিযানের দুইদিন বা এক সপ্তাহ আগে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করে। অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। অভিযানের আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সোর্স এর মাধ্যমে অভিযানের খবর পেয়ে তারা ঘাপটি মেরে যায়। মাদকদ্রব্যগুলো গোপনস্থানে রেখে দেয়। এতে প্রতিষ্ঠানটি মাদক উদ্ধার ও আসামিদের ধরার ক্ষেত্রে গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লোকবলকে অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছে। আশা করছি দ্রুত এ বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত আসবে। তিনি জানান, অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি পেলে মাদকদমন ও আসামি ধরার ক্ষেত্রে গতি আসবে। এতে মাদক ব্যবসায়ী এবং এর সঙ্গে জড়িত সকলকে নির্মূলে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করবে।’
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশকে ৪টি অঞ্চল, ২৫টি উপ-অঞ্চল, ২৫টি রেঞ্জ, ১০৯টি সার্কেল ও ৪টি গোয়েন্দা অঞ্চলে ভাগ করে মাদকদ্রব্য দমনে নিরন্তর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি। এ ছাড়াও দেশের সীমান্তবর্তী ৩২টি জেলায় তাদের বিশেষ নজরদারি রয়েছে। ঢাকাসহ সারা দেশে এর জনবল মাত্র প্রায় ১৮০০ জন। এই জনবলের মধ্যে রয়েছে নিজস্ব গোয়েন্দা সদস্য। তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের নিজিস্ব সোর্স এর মাধ্যমে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালায়। অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর যৌথবাহিনী ছাড়াও ভ্রাম্যমাণ আদালতকে ব্যবহার করে থাকে। সূত্র জানায়, ছোট অভিযানগুলোতে তারা নিজেরাই ঘটনাস্থলে যান। কখনও কখনও তাদের সঙ্গে থানা পুলিশও থাকে না। সাদা পোশাকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মাদক উদ্ধার ও আসামি ধরতে যান। ওই সময় তাদের কাছে কোনো অস্ত্র থাকে না। নিরস্ত্র অবস্থায় সাদা পোশাকে ঘটনাস্থলে যাওয়া মাত্রই তারা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছে প্রশ্নের শিকার হতে হয়। অনেক সময় মাদক ব্যবসায়ী ও তাদের লোকজন কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায়। অনেকেই লাঞ্ছনার শিকার হন। তাদের কাছ থেকে আসামি ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়া মাত্রই আসামি ও তাদের লোকজন সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এতে মাদক উদ্ধার ও আসামি ধরার ক্ষেত্রে গতি আসে না।
সূত্র জানায়, দেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদক চোরাচালানের অনেক তথ্য আসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কাছে। বিশেষ করে কক্সবাজার ও খাগড়াছড়ির দুর্গম এলাকায় ইয়াবা পাচারের তথ্য পায় তারা। কিন্তু, নিজস্ব জনবলের অস্ত্র না থাকার কারণে এবং মাদক ব্যবসায়ীদের হামলার শিকারের ভয়ে অনেক সময় তারা অভিযান চালাতে পারে না। অভিযানের আগে তারা সেখানে দায়িত্ব পালনকারী বর্ডার গার্ড বাংলাদেরে (বিজিবি) সহযোগিতার জন্য অবহিত করেন। এরপর তারা সেখানে যান। কিন্তু, অনেক অভিযানের আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের মাদক নিয়ে সেখান থেকে সটকে পড়ে।
সূত্র জানায়, এ বিষয়টি অবহিত করার জন্য প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। অস্ত্র ছাড়া নিজস্ব জনবলের যেন নির্দিষ্ট পোশাক দেয়া হয় সেই বিষয়টিও অবহিত করা হয়েছে। অস্ত্র ও পোশাক হলে দেশের জনগণ প্রতিষ্ঠানটি সম্বন্ধে পরিচিত হবেন। তথ্য পাওয়া মাত্রই দ্রুত ঘটনাস্থলে অভিযান চালানো যাবে। এতে মাদক উদ্ধার ও মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে পারবেন তারা। তাদের নিজস্ব অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অন্য সংস্থাগুলো ওই সময় তাদের নিজস্ব কাজেও অধিক মনোযোগ দিতে পারবে।

গাজায় আবারও ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ নিহত ৩ আহত ২৫০

অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার পশ্চিম সীমান্তে পুনরায় বিক্ষোভ করেছে ফিলিস্তিনিরা। ইসরাইলি সেনারা বিক্ষোভকারীদের ওপর উন্মুক্তভাবে গুলি চালানোর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শুক্রবার সেখানে বিক্ষোভ করেছে তারা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে ৩ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ২৫০ জন। অঞ্চলটিতে প্রথম বিক্ষোভ হয়, ৩০শে মার্চ। ইসরাইল-বিরোধী ওই বিক্ষোভে অংশ নেয় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি। বিক্ষোভকারীদের ওপর খোলা গুলি চালায় ইসরাইলি সেনারা। এতে নিহত হন ১৬ ফিলিস্তিনি। আহত হন ১৬ হাজারেরও বেশি। ২০১৪ সালের পর গাজায় সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন ছিল ওই শুক্রবার। এছাড়া, পুরো সপ্তাহজুড়ে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছে আরো কয়েকজন ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারী। গাজা’র স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অনুসারে, নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ২১ জন হয়েছে। এ খবর দিয়েছে আল-জাজিরা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
খবরে বলা হয়, ভূমি দিবস উপলক্ষে ৩০শে মার্চ, শুক্রবার শুরু হওয়া বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে গতকালও গাজার ইসরাইল সংলগ্ন পশ্চিম সীমান্তে বিক্ষোভ করেছে ফিলিস্তিনিরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মোহসেন আবু রামাদান বলেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের টার্গেট করা ইসরাইলের নতুন-পুরনো নীতিমালা। বিশেষ করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর উগ্র-ডানপন্থি সরকারের আমলে। তিনি বলেন, আমার ধারণা যে, ইসরাইল তাদের এই উত্রাসন নীতিমালার অংশ হিসেবে, যত বেশি সম্ভব ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের টার্গেট করা অব্যাহত রাখবে। যাতে করে তাদেরকে বিক্ষোভে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করা যায়। এদিকে, ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিয়েবারম্যান জানান যে, ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের সামলানোর ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর নিয়ম পরিবর্তনের কোনো ইচ্ছাই নেই। তিনি বলেন, যদি উস্কানি থাকে, তাহলে গত সপ্তাহের মতো কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো হবে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা, ফিলিস্তিনিদের এই বিক্ষোভের পেছনে হামাস জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ এনেছে। তারা বলেছে, এই পদক্ষেপ ফিলিস্তিনি নারী, পুরুষ ও শিশুদের ব্যবহার করে চালানো হচ্ছে ও তাদেরকে সীমান্তের নিকটে বিপদের সম্মুখীন করে তুলছে। তবে বিক্ষোভের আয়োজনকারীরা এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। ‘গ্রেট মার্চ অফ রিটার্ন’- শীর্ষক এই বিক্ষোভের মুখপাত্র আসাদ আবু শারেখ বলেন, এই পদযাত্রার আয়োজক হচ্ছেন, শরণার্থী, চিকিৎসক, আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ফিলিস্তিনি বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, বেসামরিক নাগরিক সমাজ সংগঠন ও ফিলিস্তিনি পরিবার। তিনি আরো বলেন, এই বিক্ষোভের পেছনে হামাস রয়েছে, ইসরাইলের এমন দাবির পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে পদযাত্রাটির ধারণায় নাশকতা নিয়ে আসার একটি পদ্ধতি। যাতে করে তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর তাদের আক্রমণ ন্যায্য প্রমাণ করতে পারে। রামাদান জানান, ইসরাইল বিক্ষোভকারীদের একটি সামরিক সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা করছে।

ছাত্রলীগ নেতা রনির হুমকির আরো দুটি অডিও রেকর্ড ফাঁস

চট্টগ্রাম বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ জাহিদ খানকে মারধরের ভিডিও ফুটেজ ফাঁস হওয়ার পর ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনির হুমকির আরো দুটি অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে।
অধ্যক্ষ জাহিদ খান নিজের ফেসবুক ওয়ালে অডিও রেকর্ড দুটি ফাঁস করেন। এর আগে ছাত্রলীগ নেতা নুরুল আজিম রনিসহ ছয় ছাত্রলীগ নেতার নাম এবং অজ্ঞাতনামা আরো ৩০ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা করেন তিনি।
গত শনিবার চকবাজার এলাকার বেসরকারি বিজ্ঞান কলেজের অধ্যক্ষ জাহিদ খানকে মারধর করে তুমুল সমালোচনার মুখে পড়েন রনি। এই কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা নিয়ে সেদিন অধ্যক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।
অধ্যক্ষকে মারধরের বিষয়টি রনি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে কলেজের সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। আর এই ভিডিও ফুটেজটি ফেসবুকে শেয়ার করেন অধ্যক্ষ জাহিদ খান। ফেসবুকের মাধ্যমে এ ঘটনা সারা দেশে আলোচনার ঝড় তুলে।
ফুটেজ দেখে মিডিয়ার কাছে তিনি দাবি করেন, তখন সেন্স ঠিক রাখতে পারেননি।
মামলার এজাহারে রনির বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করা হয়। মামলার পর অধ্যক্ষ জাহিদ খান রনির সঙ্গে দুই মাস আগে তার মোবাইল ফোনে কথোপকথনের দুটি অডিও রেকর্ড ফাঁস করে দেন বৃহসপতিবার বিকালে।
রেকর্ডে শোনা যায়, জাহিদ খানের সঙ্গে রনি কথা বলার সময় চলিত ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাও ব্যবহার করেন। ২১ সেকেন্ডের একটি অডিও রেকর্ডে রনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জাহিদ খানকে বলেন, তুঁই ক্যানে.. (প্রকাশযোগ্য নয়) শান্তিত থাহ আঁই চাইয়্যুম, আঁই অশান্তিত থাইক্কুম তো, কেউরে শান্তিত থাইকতে ন দিইয়্যুম। তোঁয়ার তুনো বড় মাইনসেরে শান্তি ন দির আঁই। আঁই কিছু পারি ন পারি অশান্তি হরি দিইয়ুম (তুমি কেমনে শান্তিতে থাকো, আমি দেখবো, আমি অশান্তিতে থাকবো তো, আমি কাউকে শান্তিতে থাকতে দেবো না। তোমার চেয়ে বড় মানুষদের আমি শান্তি দিই না। আমি কিছু পারি আর না পারি, অশান্তি করে দিই)। জাহিদ সাব (প্রকাশযোগ্য নয়) দুই মাসে দেখা গরিত ন পার (দুই মাসে দেখা করতে পারেন নাই)।
চার মিনিট ২৩ সেকেন্ডের আরেকটি অডিও রেকর্ডে রনি ফোনের অপর প্রান্ত থেকে জাহিদ খানকে বলেন, ধানমণ্ডিতে জায়গা কিনছেন, বিল্ডিং করছেন, ভুয়া ডিগ্রি একটা আমেরিকা থেকে আনছেন.. আঁই প্রকাশ গইল্যে (আমি প্রকাশ করলে) অসুবিধা নাই তো?
তখন এ প্রান্ত থেকে জাহিদ খান রনিকে বলেন, আমি প্রাইভেট মানুষ। আমার ডিগ্রি ১০০টা ভুয়া হলেও অসুবিধা নাই। আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ পাস করেছি। আমার এই ডিগ্রিও ভুয়া না কি তখন দেখবো। এরপর রনি বলেন, ঠিক আছে, ওয়েট অ্যান্ড সি, হালিয়ে পেপারত দিইয়্যুম (আগামীকাল পত্রিকায় দিয়ে দেবো), বিজ্ঞাপন আকারে।
কথোপকথনের একপর্যায়ে রনি বলেন, আঁই অনেরে হইলাম দে, আঁই অনের লয় ব্যক্তিগত সমস্যাত যাইতাম ন চাই (আমি আপনাকে বললাম যে, আমি আপনার সঙ্গে ব্যক্তিগত সমস্যায় জড়াতে চাই না)। এতাল্লাই বলি অনের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড লইনেও প্রশ্ন ন গরির..অনে ইয়েন সমঝোতা গইয্যন দে নইনে এদিইন্যে (এজন্য আপনার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলছি না) ইয়া আবার ফেসবুকত এগিন কি দিয়্যুন দে (এখন আবার ফেসুবকে এসব কি দিয়েছেন)।
এ সময় জাহিদ খান ফোনের এ প্রান্ত থেকে বলেন, যারা টাকা পয়সা দিতে চায় তাদের আমরা ওভাবে সেটেল করি। তখন অপর প্রান্ত থেকে রনি বলেন, যারা টাকা পয়সার দিকে যেতে চায়, তারা তো যাবে, আসবে। যারা যেতে চায় না তারা নেবে না। আর আপনি কোনো স্টুডেন্টদের হাতে টাকা দেবেন না। টাকা দেবেন অভিভাবকদের হাতে। মাঝখানে এসব আবার কি ঢুকাইলেন? আমি কিন্তু আজকেও শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করেছি। দেখেন, আমি কিন্তু আপনার প্রতিষ্ঠানের বারোটাই বাজামু।
নিয়ম লাগবে না, মন্ত্রণালয়ের নিয়ম লাইগদো ন্য (লাগবে না), বয় তাইক্যুম নিছদি, ঢুইকতে পাইত্তোনি কেউ (নিচে বসে থাকবো, কেউ ঢুকতে পারবে না)। এ সময় অপর প্রান্ত থেকে জাহিদ খান বলেন, আপনি যদি মনে করেন যে ওইটা ভালো হবে তাহলে ওটা করে দিবো। রনির সঙ্গে যখন জাহিদ খান ফোনে এসব কথা বলেন, তখন তিনি ঢাকায় ছিলেন। ফোনে কথোপকথনের একপর্যায়ে রনি জাহিদ খানকে বলেন, আপনি কলেজে আসবেন কবে? অপর প্রান্ত থেকে জাহিদ খান বলেন, আমি ঢাকায়। তখন রনি তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আসবেন কবে? দেখা করা বেশি ইমপর্টেন্ট। এ সময় জাহিদ খান বলেন, আমি আসলে আপনাকে ফোন দেবো।

কেসিসি নির্বাচন: আওয়ামী লীগের প্রথম পছন্দ খালেক, বিএনপির মঞ্জু by রাশিদুল ইসলাম

খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে মহানগর আওয়ামী লীগের প্রথম পছন্দ নগর সভাপতি সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি। বিকল্প হিসেবে আরো চার প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠানো হবে। অপরদিকে মহানগর বিএনপির বর্ধিত সভায় নেতাকর্মীরা নগর সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর পক্ষে বেশির ভাগ মতো দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের দাবি তালুকদার আব্দুল খালেকের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীর মোকাবিলা করতে হলে নজরুল ইসলাম মঞ্জুর মতো জনপ্রিয় নেতা দিয়েই সম্ভব। শুরুতে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র মনিরুজ্জামান মনিরের কথা শোনা গেলেও এখন নজরুল ইসলাম মঞ্জুই সম্ভাবনায় এগিয়ে রয়েছেন। বিএনপির নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তিনি ইতিমধ্যে ঢাকায় এসেছেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, তালুকদার আব্দুল খালেক নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দেয়ায় বিকল্প হিসেবে তিন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। তারা হলেন- সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম, দৌলতপুর থানা সভাপতি শেখ সৈয়দ আলী ও মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সরদার আনিছুর রহমান পপলু। গতকাল তারা ঢাকা থেকে মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন। মনোনয়নপত্র পূরণ করে তা কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের কাছে জমা দিতে হবে। আগামী ৮ই এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। মনোনয়ন বোর্ডও আগ্রহী প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেবেন। একই দিন চূড়ান্তভাবে কেসিসির মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হবে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে মহানগর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় আসন্ন কেসিসি নির্বাচন উপলক্ষে একাধিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। নগর সভাপতি আলহাজ তালুকদার আব্দুল খালেকের সভাপতিত্বে সভাটি পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মিজানুর রহমান মিজান।
নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি বলেন, বর্তমানে আমার সংসদীয় এলাকা রামপাল-মংলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েই ব্যস্ত রয়েছি। আগামীতেও এ এলাকা থেকেই নির্বাচন করার ইচ্ছা রয়েছে। মেয়র নির্বাচন করার আমার কোনো ইচ্ছা নেই। নগর কমিটির বর্ধিত সভায় তা আমি জানিয়ে দিয়েছি। এ ছাড়া বিগত মেয়র নির্বাচনে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলীয় সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
অপরদিকে গত ৪ঠা এপ্রিল খুলনা মহানগর বিএনপির বর্ধিত সভা নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বর্তমান মেয়রকে প্রার্থী করলে যেসব প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে তা তুলে ধরেন। বিশেষ করে মেয়র দায়িত্ব পালনকালে নেতাকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতি হওয়ার কথা উঠে আসে। বিজয় নিশ্চিত করতে হলে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকেই মেয়র পদে প্রার্থী করার মত দেন। এ সময় মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি শফিকুল আলম তুহিন বলেন, দেশের এই সংকট মুহূর্তে খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মেয়র পদে জয়ের কোনো বিকল্প নেই। তাই মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মতামত ও সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতার কথা চিন্তা করে নজরুল ইসলাম মঞ্জুকেই প্রার্থী হবার দাবি জানান। তার দাবির প্রতি অধিকাংশ নেতাকর্মী সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন।
এদিকে কেন্দ্রীয় মনোনয়ন বোর্ডের কাছ থেকে নগর সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান মেয়র মনিরুজ্জামান মনি এবং জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনা মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।
এ ব্যাপারে নগর সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, মেয়র পদে নির্বাচন করার জন্য নেতাকর্মীদের দাবি আছে এটা যেরকম সত্য, ঠিক একইভাবে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথাও ভাবতে হবে। আমার ইচ্ছা আগামীতে খুলনা-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচন করা। তবে, মেয়র প্রার্থীর ব্যাপারে দলীয় হাই কমান্ডের সিদ্ধাতই চূড়ান্ত।

আওয়ামী লীগে নতুন মুখের কাফেলা by কাজী সোহাগ

আগামী নির্বাচনে ‘বিতর্কিত’ নেতাদের বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। জনসম্পৃক্ত ও ভাবমূর্তি ভালো এমন নেতাদের সামনে আনতে চায় দলটি। এজন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে রাজনীতিতে আসা নতুন মুখকে। দলের এ মনোভাবের কথা এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী অনেকে। নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসছে তাদের প্রচারনা ততই বাড়ছে। মিটিং, মিছিল, সমাবেশসহ দলীয় কর্মসূচিতে তারা থাকছেন সক্রিয়ভাবে। এভাবে নির্বাচনকেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের নতুন মুখের কাফেলা দীর্ঘ হচ্ছে। আওয়ামী লীগের বেশ ক’জন নীতি-নির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা জানান, আগামী নির্বাচনে অন্তত ৪২ জেলার ৮৫ আসনে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। যদিও শেষ মুহূর্তে দলীয় প্রার্থিতা অনেকাংশে নির্ভর করে প্রতিপক্ষের প্রার্থী মনোনয়নের উপর। নেতাকর্মীদের কাছে স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে, এলাকায় সুপরিচিত, মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, দক্ষ সংগঠক, সৎ, নিষ্ঠাবান ও শিক্ষিত, এমন ব্যক্তিরাই দলীয় প্রতীক পাবেন। সাংগঠনিক কাজে সংশ্লিষ্ট না থাকলেও দলীয় আদর্শকে ধারণ করেন এমন ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কাউকে কাউকে মনোনয়ন দেয়ার সম্ভাবনাও আছে। দলের হাইকমান্ড এসব যোগ্যতাসম্পন্ন নেতাদের সারা দেশ থেকে বাছাই করছে। এবার প্রায় দুইশ’ আসনে এমন প্রার্থী দেয়া হবে যারা লড়াই করে বিজয় নিশ্চিত করতে পারবেন। আবার ক্ষেত্রবিশেষে বিএনপি’র প্রার্থীর প্রভাব, গ্রহণযোগ্যতার বিপরীতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়ন নির্ভর করবে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় এক নেতা শুধু ঢাকার আসনগুলো নিয়ে মানবজমিনকে বলেন, ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৬টি আওয়ামী লীগের। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির একটি, ওয়ার্কার্স পার্টির একটি, স্বতন্ত্র একটি ও বিএনএফ’র একটি। সূত্র মতে, আওয়ামী লীগের ১৬টির মধ্যে চারটিতে নতুন মুখ দেখা যেতে পারে। গাজীপুরে বদল হতে পারে দু’টি আসনের প্রার্থী। নরসিংদীতে বদল হতে পারে দু’টিতে। সম্প্রতি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দলের সাংগঠনিক সফর শেষ করে আসা কেন্দ্রীয় এক নেতা মানবজমিনকে জানান, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ায় দু’টি আসনে পরিবর্তন হতে পারে। চুয়াডাঙ্গায় বদল হচ্ছে একটি আসন। ঝিনাইদহ জেলায় নতুন প্রার্থী আসছেন তিনটি আসনে। যশোরে চরমভাবে এলাকায় বিতর্কিত হয়ে পড়েছেন তিন এমপি। মাগুরায় পরিবর্তন হচ্ছে একটি আসনে। খুলনায় নতুন মুখ আসছেন তিনটি আসনে। নতুনদের গুরুত্ব দেয়া প্রসঙ্গে দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি যেমন দেশ গঠনের তেমনি নেতৃত্ব গঠনেরও। নতুনদের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সবসময় উদার। নতুনদের অগ্রাধিকার দেয়া হলে প্রজন্ম রাজনীতির বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি সিনিয়রদের গুরুত্বও কম না। কারণ তাদের ঝুলিতে রয়েছে অনেক অভিজ্ঞতা ও অর্জন। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী তালিকার বেশ বড় একটা অংশ থাকবে তরুণদের দখলে। নতুন মুখগুলোর বেশির ভাগই সাবেক ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারাও রয়েছেন মনোনয়ন দৌড়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এলাকায় মাঠপর্যায়ে তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। নতুনদের এ তালিকায় রয়েছেন, শরীয়তপুর-২ আসনে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, রাজবাড়ী-২ আসনে ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা শেখ সোহেল রানা টিপু, ঢাকা-১৫ আসনে স্বেচ্ছাসেবকলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, মাগুরা-১ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহকারী একান্ত সচিব এডভোকেট সাইফুজ্জামান শিখর, ফেনী-৩ আসন (সোনাগাজী-দাগনভূঞা) অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল (নেত্রকোনা-৩), আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন, সচিব আবদুল মালেক (পটুয়াখালী-১), কৃষি ও সমবায়বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলী (লক্ষ্মীপুর-৪) ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী (চাঁদপুর-৩), উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম (চট্টগ্রাম-১৫), চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি), কেন্দ্রীয় নেতা মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাংবাদিক ও পেশাজীবী নেতা রিয়াজ হায়দার চৌধুরী, কক্সবাজার ৩ আসনে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয়, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার (নরসিংদী-৫), নেত্রকোনা-৫ আসন থেকে আাওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমেদ হোসেন, সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহউদ্দিন সিরাজ, মুন্সীগঞ্জ-২ আসনে প্রচারণায় নেমেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ফরিদপুর-১ আসনে সাবেক ছাত্রনেতা এবং ঢাকাটাইমস ও সাপ্তাহিক ‘এই সময়’ সম্পাদক আরিফুর রহমান দোলন, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, বাগেরহাট-৪ আসনে সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি এইচএম. বদিউজ্জামান সোহাগ, চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন, আলোচিত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন কেন্দ্রীয় সদস্য মারুফা আক্তার পপি (জামালপুর-৫), নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, হাসান আলী (সিরাজগঞ্জ-১), হাবিবুর রহমান স্বপন, চয়ন ইসলাম (সিরাজগঞ্জ-৫), গাইবান্ধার-৫ সাঘাটা ফুলছড়িতে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন। নতুন মুখ হিসেবে মনোনয়ন প্রত্যাশা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম মানবজমিনকে বলেন, আমার নির্বাচনী এলাকায় পারিবারিকভাবে আমাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে। বলা যায়, জন্মগতভাবে আমরা মানুষের সঙ্গেই আছি। দলের দুঃসময় থেকে শুরু করে সব সময় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আওয়ামী লীগের একজন পরীক্ষিত নেতা হিসেবে আগামী নির্বাচনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছি। একই প্রসঙ্গে অপর মনোনয়ন প্রত্যাশী ও আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, স্বাভাবিকভাবে এলাকার মানুষ রাজনীতিবিদদের কাছে অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। বিশেষ করে বিপদে-আপদে নেতাদের পাশে পেতে চায়। রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে উন্নত জীবন পাওয়ায় তাদের প্রত্যাশা। আমি নির্বাচনী এলাকার মানুষদের এ ধরনের প্রত্যাশা উপলব্ধি করে তাদের পাশে থেকে কাজ করছি। আরও কাজ করতে চাই। এদিকে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় দফায় দফায় সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক জরিপ পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব জরিপ প্রতিবেদনে বর্তমান এমপিদের ভালো ও মন্দ কাজের পর্যালোচনা করেই আগামী নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হবে। ইতিমধ্যে পরিচালিত একাধিক জরিপ রিপোর্ট দলের হাইকমান্ডের হাতে রয়েছে। প্রতিটি রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে এলাকায় জনপ্রিয় এমপিরা যাতে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বাদ না পড়েন সেটিও হাইকমান্ডের বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি ওই এলাকার অবস্থা, অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, এলাকায় তাদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিতর্কিত এমপিদের স্থলে এবার নতুন মুখ দেখা যেতে পারে বলে জানা গেছে। ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সভা-সমাবেশে আগামী নির্বাচনে কোন ধরনের প্রার্থী দলের পছন্দ সেটা বারবার বলে আসছেন। কোনো ধরনের বিতর্কিত ভাবমূর্তির কোনো জনপ্রতিনিধিকে এবার মনোনয়ন দেয়া হবে না সেটাও প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড গত এক বছর ধরে প্রার্থী বাছাই নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তারই অংশ হিসেবে বিতর্কিত অনেককে ডেকে এনে সংশোধন হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকমান্ড। এরপরেও যারা সংশোধন হননি তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানায়।

খালেদার স্বাস্থ্য ভালো নয়, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন না -সাক্ষাৎ শেষে ফখরুল

কারারুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল দুপুরে পুরান ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাৎ শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো নয়। তিনি বলেন, বেগম জিয়ার আরথ্রাইটিসের সমস্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে। তবে তার মনোবল অত্যন্ত শক্ত আছে বলেও ফখরুল জানিয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন তার জন্য দুশ্চিন্তা না করতে বলেছেন নেতাকর্মীদের। মির্জা ফখরুল অবিলম্বে বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অনুমতি দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘ম্যাডামের স্বাস্থ্য খুব ভালো নয়। আমরা সেই সংবাদ পাওয়ার পর থেকেই অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তার আরথ্রাইটিসের সমস্যাটা বেশ বেড়ে গেছে। তার এখন হাঁটতেও কষ্ট হয়। এ ছাড়া স্নায়ুবিক সমস্যা অর্থাৎ নিউরো প্রবলেমও দেখা দিয়েছে। এজন্য প্রয়োজনীয় যে চিকিৎসা দরকার, দুঃখজনকভাবে তিনি সেটা এখনও পাচ্ছেন না। তার চিকিৎসা যারা করতেন, সেই ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের এখনও দেখা করতে দেয়া হয়নি বা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে দেয়া হয়নি। এটা আমরা বার বার বলেছি। আবারো বলছি। অবিলম্বে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের তার সঙ্গে দেখা করতে দেয়াটা অত্যন্ত জরুরি। কারণ তিনি এখন সত্যিকার অর্থেই স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েছেন।’
মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘যদিও এর মধ্যে সরকারের তরফ থেকে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এসেছিলেন। তারা দেখে গেছেন। কিছু কিছু পরীক্ষার কথাও তারা বলে গেছেন। আমরা মনে করি, যারা নিয়মিত তার চিকিৎসা করেন তাদেরকে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে দেয়া এবং প্রয়োজনীয় যেসব চিকিৎসা দেয়া দরকার অবিলম্বে তাকে সেটা দেয়া উচিত।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, স্বাস্থ্য সমস্যা থাকলেও খালেদা জিয়ার মনোবল শক্ত আছে। এটা স্বাভাবিক ব্যাপার যে মানুষ বন্দি জীবনে অভ্যস্ত নন, তাকে যখন বন্দি করে রাখা হয়, তখন তার চেহারার ওপর একটু ছাপ পড়েই। কিন্তু তার মনোবল অত্যন্ত শক্ত। তিনি আমাদের চেয়েও শক্ত মনের মানুষ। তিনি বারবার এ কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন, আমার জন্য আপনারা ভাববেন না। আমি ভালো আছি, আমি শক্ত আছি। এইসব ছোটখাটো সমস্যাগুলো আমাকে সমস্যা করবে না।
বিএনপি চেয়ারপারসন বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে চাইলে সরকার ব্যবস্থা করবে, এ বিষয়ে কথা হয়েছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, এ বিষয়গুলো পুরোনো হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে আলোচনার কোনো প্রয়োজনই নেই। কেননা সরকারি চিকিৎসকরা তাকে দেখেছেন। আর যারা তার নিয়মিত চিকিৎসক তাদের দেখা করার অনুমতির জন্য আমরা চিঠি দিয়ে রেখেছি। আবারো আমরা বলবো অবিলম্বে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার অনুমতি দেয়া উচিত এবং সেই ব্যবস্থা করা উচিত।’
বিএনপি চেয়ারপারসন দলের আন্দোলন নিয়ে কোনো নির্দেশনা দিয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, ‘দেশে যে সংকট বিরাজ করছে, একমাত্র গণতন্ত্র দিয়েই সেই সংকট উত্তরণ সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। সেজন্য যে চলমান আন্দোলন আছে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সেই আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছেন এবং আন্দোলনের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে নিয়ে আসার একমাত্র পথ বলে তিনি মনে করেন।’

থোকায় থোকায় ‘হাঁড়িভাঙা’ স্বপ্ন দেখছেন বাগান মালিকরা by জাভেদ ইকবাল ও রেজাউল করিম পান্না

রংপুরের মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জসহ আট উপজেলায় থোকায় থোকায় হাঁড়িভাঙা আমের মুকুল ধরেছে। এখন বাতাসে দোল খাচ্ছে হাঁড়িভাঙ্গার গুটি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে আম উৎপাদনে অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন ব্যবসায়ী, কৃষি বিভাগ ও বাগান মালিকেরা। সে হিসেবে এবারে শুধুমাত্র রংপুরেই একশ’ ৫ কোটি টাকার আম উৎপাদন সম্ভব বলে জানান স্থানীয় কৃষি বিভাগ। বাগান মালিকদের অভিযোগ শুধুমাত্র ধান বা অন্যান্য ফসলের ক্ষেত্রে কৃষি বিভাগ তৎপর থাকলেও আমের মতো এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মাঠ পর্যায়ে কৃষি বিভাগের কোনো দিক-নির্দেশনা বা তদারকি চোখে পড়ে না। তবে কৃষকদের এ অভিযোগ মানতে নারাজ কৃষি বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা। তারা জানান, কৃষকদের পাশে থেকেই সঠিক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। যার কারণে হাঁড়িভাঙার বিপ্লব ঘটছে রংপুর অঞ্চলে।
সরজমিন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ, বালুয়া মাসিমপুর, ময়েনপুর, রাণীপুকুর, ছড়ান, বড়বালা, লতীবপুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর, গোপালপুর, লোহানীপাড়া, কালুপাড়া, বিষ্ণুপুরসহ রংপুর সদর উপজেলার সদ্যপুষ্করনী ও চন্দনপাঠ ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায় হাঁড়িভাঙা আম চাষের বিপ্লব। এসব এলাকায় এখন বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা আমের পরিচর্যা করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আমের গুটি আটকাতে তারা গাছে ছিটাচ্ছে ওষুধ। মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জে এখন যেদিকেই চোখ যায়, সেই দিকেই শুধু হাঁড়িভাঙ্গার বাগান আর বাগান। হাঁড়িভাঙা আমের গুটি দেখে এখন মন কাঁড়ছে পথচারীদের। রংপুর কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে শুধু রংপুর জেলায় বাগান পর্যায়ে ১ হাজার ৫৫২ হেক্টর এবং বাসাবাড়ি ও ক্ষুদ্র পরিসরে তিন হাজার ১১৪ হেক্টর জমিতে আমের বাগান হয়েছে। রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় এই আম বাগানের পরিমাণ প্রায় ৪৫ হাজার ৫০০ হেক্টর। এই পরিমাণ জমিতে প্রায় ৪১ লাখ ৭৪ হাজার গাছ রয়েছে। যা থেকে গড়ে ৫ মণ করে আম উৎপাদনের মাধ্যমে দুই লাখ ২৫ হাজার মণ আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। আর রংপুরের বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও সদর উপজেলাসহ আট উপজেলায় এবারে ১৭ হাজার ৫০০ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আমের ভরা মৌসুমে প্রতিকেজি আম ৬০ টাকা দর হলে যার পরিমাণ দাঁড়ায় একশ’ ৫ কোটি টাকা। তবে কৃষি বিভাগ বলছে প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হলে এ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।    
বাগান মালিক ও আমের মৌসুমী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমের মুকুল আসার আগ মুহূর্ত গুটি হওয়ার সময়ে নানা রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এতে আম পচে ঝরে পড়ে। এই মুহূর্তে আমের যে কোনো ধরনের পচন রোগ ঠেকাতে ও গুটি নিশ্চিত করতে নিজেদের অভিজ্ঞতা এবং ওষুধ কোম্পানির ওপর ভর করে ছিটানো হচ্ছে ওষুধ। তবে চাষিদের অভিযোগ কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এখন পর্যন্ত বাগানে বাগানে গিয়ে তাদের সঠিক পরামর্শ দিচ্ছেন না। তবে এ  অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, গাছের গোড়ায় সেচ দেয়ার পরামর্শ দিলে এতে চাষিরা রাজি হচ্ছে না। কিন্তু তারা গাছে গাছে আম আটকানোর জন্য নিজেদের সনাতন পদ্ধতিই ব্যবহার করছেন। এতে আমাদের সঙ্গে তাদের মতের মিল হচ্ছে না। এ কারণে তারা অযথাই কৃষি বিভাগকে দোষারোপ করছেন।  হাঁড়িভাঙা আমের মাতৃগাছের জনক মৃত নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে খোড়াগাছা ইউনিয়নের তেকানী গ্রামের আমচাষি আমজাদ হোসেন পাইকার (৫৫) ক্ষোভ প্রকাশ করে উল্টো কথা বলেন। তিনি জানান, ‘এবার বাহে গাছোত স্মরণকালের মুকুল ধরছে। কিন্তু আম আটকানো যাওচে না। আর কৃষি বিভাগের কোনো লোক (বিএস) আসি কোন পরামর্শ দেয় নাই। হামার নিজের অভিজ্ঞতা কাজে নাগেয়া আমের যত্ন করুচি। এখন ঝড়-বৃষ্টিতে আমের যে কি হইবে আগাম বলা যাচ্ছে না।’ মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খোরশেদ আলম বলেন, এবারে শুধুমাত্র মিঠাপুকুরে ১ হাজার হেক্টর জমিতে হাঁড়িভাঙ্গার বাগান করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১৩ থেকে ১৫ টন আম উৎপাদন সম্ভব হবে। তিনি বলেন, চাষিদের পাশে থেকেই সঠিক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। আমের এ বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে কৃষি বিভাগ তৎপর রয়েছে। 
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. সরওয়ারুল হক বলেন, ‘এবারে রংপুরে আমের রেকর্ড পরিমাণ মুকুল ধরেছিল। বিশেষ করে হাঁড়িভাঙা আম উৎপাদনে অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছি। এবারে একশ’ কোটি টাকার উপরে আম উৎপাদন হবে। আমের পরিচর্যা করতে দল গঠন করে দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তারা উঠান বৈঠক করে চাষিদের পরামর্শ দিচ্ছেন এবং পাশে আছেন।’

দুর্নীতির মামলায় আদালতে জ্যাকব জুমা

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। গতকাল তার বিরুদ্ধে ’৯০ এর দশকে এক অস্ত্র চুক্তিতে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ডারবান শহরে অবস্থিত উচ্চ আদালতে গতকাল সকালে তার ১৫ মিনিট হাজিরা শেষে মামলার শুনানি ৮ই জুন পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।
খবরে বলা হয়, বর্তমানে জুমা’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, কালোবাজারি, অর্থ পাচারসহ ১৬টি অভিযোগ রয়েছে। তবে জুমা তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। উল্লেখ্য, এই বছরের শুরুর দিকে দলের ভেতর থেকে চাপ আসায় প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন জুমা। তার সমালোচকরা বলছেন, আদালতের কার্যপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত সময় লাগছে। তবে শুক্রবার তার সমর্থকরা ডারবানজুড়ে সমাবেশ করেছে। শুনানি শেষে জুমা তার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি বলেন, আমি এমনটা কখনো দেখেনি যে, কারো বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের ভিত্তিতে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, সে অভিযোগ পরবর্তীতে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে এবং কয়েক বছর পরে আবার একই অপরাধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।
যে অস্ত্র চুক্তিতে জুমা’ দুর্নীতি করার অভিযোগ গঠিত হয়েছে, সেই চুক্তি হয় ১৯৯৯ সালে। ওই বছর জুমা একজন প্রাদেশিক মন্ত্রী থেকে ডেপুটি প্রেসিডেন্টের পদে উন্নীত হন। তার বিরুদ্ধে ফরাসি আগ্নেয়াস্ত্র সংস্থা থালেস- এর কাছ থেকে তার অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মাধ্যমে ঘুষ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তার উপদেষ্টা শকাবির শাইখ এই মামলায় দোষী প্রমাণিত হয়েছেন ও ২০০৫ সালে তাকে কারাদণ্ড দেয়া হয়। অন্যদিকে ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার আগ দিয়ে জুমা’র বিরুদ্ধে গঠিত মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। তবে প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে রাষ্ট্রের অর্থ লুন্ঠনসহ বেশ কিছু কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ২০১৬ সালে একটি আদালত রায় দেন যে, তিনি ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণে সরকারি অর্থ ব্যবহার করে শপথ ভঙ্গ করেছেন। জুমা অবশ্য পরবর্তীতে ওই অর্থ পরিশোধ করেন।

সুবর্ণচরে তরমুজের বাম্পার ফলন by নাসির উদ্দিন বাদল

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এবার তরমুজ চাষে বাম্পার ফলন হয়েছে। ইতিমধ্যে ক্ষেত থেকে তরমুজ তুলে বিক্রি শুরু করেছেন চাষিরা। নোয়াখালী জেলার পাশাপাশি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে চালান হচ্ছে এসব তরমুজ। আবহাওয়া ভালো থাকায় প্রচুর ফলন ও ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় চাষিদের আনন্দের অন্ত নেই। উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে সরজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুবর্ণচর উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন ও চর ক্লার্ক ইউনিয়নের বিস্তৃত এলাকাজুড়ে তরমুজের বিশাল ক্ষেত। উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মেঘনা মার্কেটের পাশে চর আকরাম গ্রামের চাষি আমির মিয়া তরমুজ তুলছেন। তোলা তরমুজের এক বিশাল স্তূপ সেখানে দেখা যায়। আমির মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমরা এবার তিন মাস আগে থেকেই ২২ কানি জমিতে আগাম তরমুজ চাষ করি। পরে ক্ষেতে পরিচর্যার পাশাপাশি নিয়মিত সার, পানি বিভিন্ন ভিটামিন প্রয়োগ ও আবহাওয়া ভালো থাকায় এবার তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। আমির মিয়া জানান, আমাদের এবার খরচ হয়েছে প্রায় বিশ লাখ টাকা। আমরা ইতিমধ্যে পনের লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি এবং মোট পঞ্চাশ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পারবো ইনশাআল্লাহ। পার্শ্ববর্তী আরেক তরমুজ চাষি মো. নাছির জানান, সাড়ে তিন কানি জমিতে প্রায় খরচ হয়েছে তিন লাখ টাকা। আমরা এবার ৯ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছি এবং আমরা প্রচুর লাভবান হয়েছি। একই গ্রামের সিরাজ মিয়া জানান, আমরা নিজস্ব উদ্যোগে এবার দুই কানি জমিতে তরমুজ চাষ করি। প্রথমে বীজ বপন করলে এতে কিছুদিন পরে একটা অসুখে চারাগুলো মরে যায়, পরে আমরা আবার বীজ বপন করি এবং ফসল পাওয়া পর্যন্ত আমার খরচ হয় এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা এবং আমি মোট তরমুজ বিক্রি করেছি তিন লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকার। উপজেলার চরক্লার্ক ইউনিয়নের তরমুজ চাষি মো. মোস্তফা মিয়া জানান, আমি এবার চার কানি জমিতে তরমুজ চাষ করি। আমার মোট খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। আমি এবার তরমুজ বিক্রি করেছি আট লাখ টাকার। প্রথম বারেই আমি ভালো লাভবান হয়েছি বলেও জানান তিনি। তার পার্শ্ববর্তী চাষি মো. বেলাল মিয়া জানান, আমিও প্রথমবারের মতো আড়াই কানি জমিতে তরমুজ চাষে এক লাখ আশি হাজার টাকা বিনিয়োগ করি এবং আমার তরমুজ বিক্রি হয় প্রায় চার লাখ পঞ্চাশ হাজার টাকা। এ ছাড়াও সুবর্ণচর উপজেলার চর ওয়াপদা, চরবাটা, চর আমান উল্যাহ ও চর জব্বারসহ প্রতিটি ইউনিয়নেও আগাম তরমুজ চাষ করে কৃষকরা। এতে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলন ও ন্যায্য দাম পেয়ে কৃষকের মুখে আনন্দের অন্ত নেই। কৃষকরা জানান, কৃষি কর্মকর্তার কোনো সহযোগিতা বা পরামর্শ আমরা পাইনি। আমদের এবার সম্পূর্ণ নিজস্ব ধারণায় চাষাবাদ করতে হয়েছে। তবে, ভালো ফলন পাওয়ার তেমন অভিযোগের চাপ ছিল না কৃষকদের মুখে। এদিকে সুবর্ণচর উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুর রহমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি মানবজমিনকে বলেন, এবার আমাদের লক্ষমাত্রা হলো ৩,০০০ হেক্টর। তবে, লক্ষমাত্রা ছাড়িয়ে তরমুজ চাষ হয়েছে ৪.২৫০ হেক্টর জমিতে এবং ইতিমধ্যে কৃষকরা আগাম ফলন তুলছে প্রায় ২.০০০ হেক্টর জমি থেকে।
আর বাকি চাষিরা জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার অসম্ভব ফলন হবে এবং আমরাও এবার প্রচুর পরিমাণ লাভবান হতে পারবো বলে আশাবাদ করেন তারা। নোয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায় চলতি মৌসুমে জেলায় চার হাজার ৩৭৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ  আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সুবর্ণচর উপজেলায় চার হাজার ২শ’ হেক্টর, সদর উপজেলায় ১০৫ হেক্টর, হাতিয়া উপজেলায় ১১ হেক্টর, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় ৩ হেক্টর, জমিতে কবিরহাট উপজেলায় ৫ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. আবুল হোসেন মানবজমিনকে জানান, তরমুজ এ বছর নোয়াখালীর চরাঞ্চলে অন্য বছরের চেয়ে ভালোই হয়েছে। কৃষি বিভাগ নিয়মিত নজর রাখছে। শুরুতে আবহাওয়ার কারণে চাষিদের কিছুটা অসুবিধা থাকলেও এখন তরমুজের ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকরাও স্বস্তিতে আছেন।