Monday, May 25, 2026

নিউমোনিয়া ঠেকাতে যা করবেন by ডা. সাইফ হোসেন খান

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী প্রতিবছর ২৫ লাখের বেশি মানুষ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, যার অর্ধেকের বেশি পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। বাংলাদেশে এখনো শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া।

নিউমোনিয়া ফুসফুসের প্রদাহজনিত একটি সংক্রমণ। এটি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা ছত্রাকের মাধ্যমে হয়। সংক্রমণের ফলে ফুসফুসের ছোট বায়ুথলিগুলো তরল বা পুঁজে ভরে যায়, ফলে অক্সিজেন গ্রহণে বাধার সৃষ্টি হয়। নিউমোনিয়া শুধু একটি রোগ নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতিফলন। টিকাদান, সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও সচেতনতা—এই তিনটি উপায়ে রয়েছে প্রতিরোধের চাবিকাঠি।

কীভাবে ছড়ায়, কারা ঝুঁকিতে

বাতাসে থাকা জীবাণু নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে প্রবেশ করলে এর সংক্রমণ ছড়ায়। সংক্রমিত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। আর দূষিত বস্তু বা হাতের মাধ্যমে মুখ-নাক স্পর্শ করলেও হয়।

পাঁচ বছরের কম বয়সী ও ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে প্রবীণেরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকে। এ ছাড়া দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ব্যক্তি, ধূমপায়ী ও অপুষ্টিতে ভোগা ব্যক্তি, দূষিত পরিবেশে বসবাসকারী মানুষদেরও নিউমোনিয়া বেশি হতে পারে।

উপসর্গ ও চিকিৎসা

নিউমোনিয়ার উপসর্গ বয়স ও সংক্রমণের ধরনভেদে ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত হঠাৎ জ্বর ও কাঁপুনি, কাশি, বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, ক্ষুধামন্দা বা শিশুদের ক্ষেত্রে খাওয়ায় অনীহা, বয়স্কদের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি বা মানসিক অস্থিরতা পর্যন্ত হতে পারে।

নিউমোনিয়ায় গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয়, বিশেষত শিশু ও প্রবীণদের। চিকিৎসা নির্ভর করে সংক্রমণের কারণের ওপর। ব্যাকটেরিয়াল নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়।

রোগের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে সেটি মুখে খাওয়ার বা ইনজেকশন হতে পারে। ভাইরাল নিউমোনিয়ায় অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না। বিশ্রাম, তরল খাবার ও উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা করলে এটি ভালো হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। পর্যাপ্ত পানীয় গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনে পানিশূন্যতা থাকলে শিরায় স্যালাইন দিতে হতে পারে।

প্রতিরোধের উপায়

নিউমোনিয়া প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ। এটি প্রতিরোধে কিছু কার্যকর পদক্ষেপের একটি টিকা গ্রহণ। নিউমোকোক্কাল টিকা ও ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নিউমোনিয়া প্রতিরোধে কার্যকর। বিশেষত, যাঁরা ঝুঁকিতে আছেন, তাঁদের অবশ্যই নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সুষম খাদ্য গ্রহণে নিউমোনিয়াসহ সব রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ে। হাত নিয়মিত ধোয়ার অভ্যাস করতে হবে, যেসব স্থানে জনসমাগম বেশি, সেখানে মাস্ক পরে যেতে হবে। করতে হবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকার অভ্যাস। ধূমপান পরিহার করতে হবে।

শীত এলেই নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ে
শীত এলেই নিউমোনিয়ার প্রকোপ বাড়ে। ছবি: পেক্সেলস

ল্যাবএইডে জটিল অস্ত্রোপচার শেষে হাঁটতে পারছেন জান্নাতুল

গাজীপুরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসের বয়স তখন ২২ বছর। এক সন্তানের মা। সন্তানের বয়স সবে দুই বছর পেরিয়েছে, সে সময়ই হঠাৎ তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। নন-হজকিন লিম্ফোমা। দেশেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন। কেমোথেরাপির অসহ্য যন্ত্রণা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত জিতলেনও সেই লড়াই।

কিন্তু দুই বছর পর ২০১২ সালে আবার নতুন এক যুদ্ধে নামতে হলো। দুপাশের হিপ জয়েন্টেই প্রচণ্ড ব্যথা। ব্যথা এতটাই তীব্র যে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হতো। ক্যানসারের বিরুদ্ধে অত বড় লড়াইটা শেষ করেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলেন না জান্নাতুল।

নতুন যুদ্ধ

অসহ্য যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে দ্রুতই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন জান্নাতুল। তবে অবস্থার উন্নতি হলো না। চিকিৎসার জন্য নানা জায়গায় গেলেন। তবে ফলাফল আশানুরূপ হলো না। পরে দেশের একটি স্বনামধন্য হাসপাতালে বড় ধরনের শল্যচিকিৎসা করা হলো। তাতেও ভোগান্তি থেকে মুক্তি মিলল না। চিকিৎসার পরও হিপ জয়েন্টের (ঊরুসন্ধি) ব্যথা রয়ে গেল। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতেও পারছিলেন না। সেই শল্যচিকিৎসার পর যন্ত্রণার মধ্যেই পেরিয়ে গেল দেড় বছর।

কষ্টের দিন পেরিয়ে

২০১৪ সালে এক চিকিৎসক বন্ধুর কাছে অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেনের খোঁজ পান জান্নাতুল। তিনি ল্যাবএইড হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারির প্রধান। তিনিই নতুনভাবে জান্নাতুলের শল্যচিকিৎসা করলেন। একই দিনে দুপাশের হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপন করা হলো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই শল্যচিকিৎসার নাম টোটাল হিপ রিপ্লেসমেন্ট। তারপর? জান্নাতুলের মুখেই শুনুন, ‘এক মাস পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হয়েছিল। তারপর আবার হাঁটতে শুরু করি। ধীরে ধীরে একদম স্বাভাবিক হয়ে যায় আমার হাঁটাচলা।’

ল্যাবএইডে শল্যচিকিৎসার পরের বছরই আবার মা হন জান্নাতুল। সে–ও আজ ১০ বছর। সংসার আর দুই সন্তান নিয়ে এখন দারুণ ব্যস্ত জান্নাতুল। বড় সন্তান এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোটটিরও পড়ালেখা চলছে। জান্নাতুল এখনো মাঝেমধ্যে ফলোআপে যান অধ্যাপক ডা. এম আমজাদ হোসেনের কাছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-06%2Fp5kqkemg%2F8feb503f-e37e-4662-96dd-6fc822347365-1.jpg?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
গাজীপুরের মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস এখন স্বাভাবিকভাবে হাঁটছেন। ছবি: জান্নাতুল ফেরদৌসের সৌজন্যে