Tuesday, September 3, 2024

আন্দোলন দমনে ‘গরম জল’ ঢালতে বলেছিলেন অরুণা বিশ্বাস

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শিল্পীদের মধ্যে দুটি দল দেখা গিয়েছিল। কেউ ছিলেন শিক্ষার্থীদের পক্ষে। অন্যদল বিপক্ষে। নেটমাধ্যমে সরব ছিল দুদলই।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিপক্ষ দলে ছিলেন ঢাকা-১০ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও চিত্রনায়ক ফেরদৌস আহমেদ, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত ও চিত্রনায়ক রিয়াজ। এ দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ছিলেন—অভিনেত্রী শামীমা তুষ্টি, তানভীন সুইটি, সোহানা সাবা, অরুণা বিশ্বাস, অভিনেতা সাজু খাদেমসহ অনেকে। ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে সক্রিয় দেখা গেছে এ দলকে। এমনকি ‘আলো আসবেই’ নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলেছিলেন তারা। আন্দোলনকালীন সেখানে নিজেদের মধ্যে নানা বিষয়ে কথা বলতেন তারা।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলো আসবেই নামে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের কিছু স্ক্রিনশট ফাঁস হয়েছে। তাতে দেখা গেছে আন্দোলন চলাকালীন শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা বলছেন শোবিজের কজন অভিনয়শিল্পী। শুধু তাই নয়, তখন ফেরদৌস, আরাফাত ও রিয়াজের কিছু চাঞ্চল্যকর কথোপকথনও হয়, যা দেখে শিউরে উঠেছে সাধারণ জনতা।

তাদের মধ্যে অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাসকে আন্দোলনকারীদের ওপর গরম পানি ঢেলে দেওয়ার কথা বলতেও দেখা গেছে যায়। স্ক্রিনশটগুলো ফাঁস হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ঝড় উঠেছে নেটদুনিয়ায়। অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে নির্মাতারাও এ ঘটনায় সরব হয়েছেন। পাশাপাশি শাস্তিরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ওই গ্রুপের কথোপকথনের কিছু স্ক্রিনশট নিজের ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। পাশাপাশি আন্দোলনকে ঘিরে কারা মানবতার বিপক্ষ শক্তি ছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন নির্মাতা।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকালীন ওই গ্রুপের কথোপকথনের বিষয়ে জানতে ফেরদৌস ও রিয়াজের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে গণমাধ্যম। তবে তাদের বক্তব্য মেলেনি।

লেবাননে নয়, তুষার পাড়ি জমাল অনন্তলোকে by মাহফুজ রহমান

জুবায়ের কবির তুষারকে মাত্র একটি বিশেষণে পরিচয় করিয়ে দিতে হলে ‘খাঁটি দেশপ্রেমিক’ শব্দযুগলই জুতসই। প্রথম আলো বন্ধুসভার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন তুষার। গড়ে তুলেছিলেন ‘হিমু পরিবহন’ নামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ২০১৬ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাসে। গতকাল ২ সেপ্টেম্বর তিনি অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে। রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালে তাঁর আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে। বন্ধুদের পক্ষ থেকে এই লেখার মাধ্যমে তুষারের জন্য ভালোবাসা... 

দিনক্ষণ ঠিক মনে নেই, সম্ভবত ২০০৯ সালের কথা। প্রথম আলোর ঠিকানা তখন সিএ ভবন, ১০০ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ, কারওয়ান বাজার, ঢাকা। সিএ ভবনের লিফটে ওঠার সারিতে দাঁড়িয়ে আছি। লিফট নেমে এল। দরজা খুলল। নজর কাড়ল একটা হাসিমুখ। ছেলেটার বাঁ গালে টোল। দেখে মনে হলো, সদ্য কৈশোর পেরিয়েছে। অচেনা ছেলেটার হাসিমুখের উত্তরে ভদ্রতার খাতিরে হাসলাম। আর সে হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমি জুবায়ের কবির তুষার, বন্ধুসভার হয়ে গাছ লাগাতে যাচ্ছি, ভাই। দোয়া রাখবেন।’

সেই যে তুষারের হাসিমুখটা দেখলাম, তার পর থেকে খেয়াল করলাম, এই ছেলের মুখে হাসি লেগে থাকে নিশিদিন। শুধু হাসিই নয়, ওর সঙ্গে ‘উদ্যম’ শব্দটাও সেঁটে থাকে সারাক্ষণ। ধীরে ধীরে পরিচয়, খাতির, ঘোরাঘুরি, আড্ডার ফাঁকে বুঝে ফেললাম, এই ছেলে সাংঘাতিক! কারও রক্ত লাগবে, তুষারকে ফোন করো। ঝড়ে আর্ত মানুষের দোরে ত্রাণ পৌঁছাতে হবে, কে কে যাবে? তুষার যাবে। দেশের উত্তরাঞ্চলে শীতার্তদের গরম কাপড় দিতে হবে? তুষার আছে না! ও যাবে। কারও মন খারাপ? তুষার বলবে, ‘চলো, ঘুরে আসি।’

এই করে করে প্রথম আলো বন্ধুসভার সবচেয়ে আন্তরিক বন্ধুদের অন্যতম হয়ে উঠল তুষার। বয়স, পেশা, সামাজিক অবস্থান—সব ওর কাছে তুচ্ছ। সবাইকে বন্ধু বানিয়ে ফেলার এক আশ্চর্য গুণ ওর সহজাত।

এক সন্ধ্যায় তুষার বলল, ‘ভাই, কোথায় যান?’ বললাম, ‘কাঁটাবন।’

‘একা যাবেন?’

‘হ্যাঁ, একাই তো।’

‘চলেন, আমিও যাব।’

কাঁঠালবাগান ঢাল থেকে রিকশা নিলাম। তুষার বলল, ‘আপনার সঙ্গে আসলাম বলে বিরক্ত হন নাই তো?’

তুষারের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আরে, ধুর! বিরক্ত হব কেন?’

‘আপনার সঙ্গে কেন আসলাম, জানেন?’

‘কেন?’

‘মানুষের সঙ্গে মিশতে আমার ভালো লাগে, ভাই। আশপাশে মানুষ না থাকলে কেমন যেন খালি খালি লাগে।’

ওটা যে তুষারের মুখের কথা ছিল না, তা খেয়াল করেছি সব সময়। তুষার মানুষের সঙ্গে ছিল আজীবন। তুষার থাকবে আর ওকে ঘিরে একটা জটলা থাকবে না, তা হওয়ার নয়। আর এই গুণে ও বন্ধুসভার নিবেদিতপ্রাণ কর্মী থেকে হয়ে উঠেছিল দারুণ সংগঠক। দলবল নিয়ে ও ছুটে যেত মানুষের উপকারে। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বন্ধুসভার হয়ে ও যায়নি, এমন জেলা সম্ভবত নেই। ফলে দেশের আনাচকানাচে ওর বন্ধু আর দিকে দিকে সুনাম।

‘বাংলাদেশ জিতবে’

আরেকটা সুনাম ছিল তুষারের—অসম্ভব আশাবাদী। বাংলাদেশ ক্রিকেট ওর ‘জানের টুকরা’–জাতীয় কিছু একটা ছিল। বাংলাদেশের হয়তো ৮টা উইকেট পড়ে গেছে, হাতে আছে ১০টা বল, রান লাগবে ৬০। তারপরও তুষার আশাবাদী, ‘বাংলাদেশ জিতবে!’

আমরা ওর অতি বাড়াবাড়ি আশাবাদ নিয়ে ঠাট্টা করতাম। ক্রিকেট বাদেও অন্য কোনো ক্ষেত্রে কাউকে অসম্ভব আশাবাদী হতে দেখলেই টিপ্পনী কেটে বলতাম, ‘তুমিও দেখি তুষার হয়ে যাচ্ছ!’

অবশ্য আক্ষরিক অর্থে অনেকেই তুষার হয়ে উঠেছিল। ক্রিকেটের মতো হুমায়ূন আহমেদও ছিলেন তুষারের অতি আপন। অন্ধভক্ত যাকে বলে। হুমায়ূন আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নুহাশপল্লীতে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিল তুষার ও তার বন্ধুরা। ছেলেদের কেউ কেউ হলুদ পাঞ্জাবিতে হয়ে উঠেছিল হিমু, মেয়েদের কেউ কেউ নীল শাড়িতে রূপা। ২০১৩ সালের সেদিন বাসে চেপে যেতে যেতেই তুষাররা ঠিক করেছিল, ‘হিমু পরিবহন’ নামে একটা সংগঠন করবে ওরা। তুষার কিছু বলবে আর তা বাস্তব রূপ পাবে না, তা হওয়ার নয়। ঠিকই হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে চালু হলো হিমু পরিবহন।

আর তখন থেকেই তুষার ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ওরা একটা ক্যানসার হাসপাতাল বানাবে। প্রিয় লেখক ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করেছেন বলেই তুষার একেবারে মরিয়া, যে করেই হোক ক্যানসার হাসপাতাল করতেই হবে। পাগলের মতো নানা প্রতিষ্ঠান, গুণীজনের কাছে ছুটে গেল ও। সবার সহযোগিতা চায়। প্রায় সবাই পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে শুধু প্রতিশ্রুতি পেলেই যে হয় না, তাই তুষার উদ্যোগটার পেছনে লেগে থাকল রাতদিন ২৪ ঘণ্টা! হ্যাঁ, রাতদিন ২৪ ঘণ্টাই। কারণ, তখন ও ক্যানসার হাসপাতাল ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছে না। কাছের মানুষেরা শঙ্কিত, ‘ছেলেটা তো পাগল হয়ে যাবে!’
‘হয়ে যাবে, ভাই’

অনেকেই ওকে বোঝাতে লাগল, ‘দেখো, ক্যানসার হাসপাতাল অনেক বড় একটা ব্যাপার, একটু দম নাও।’

কিন্তু কে শোনে কার কথা। তুষার যে ছোট স্বপ্ন দেখার মানুষ না। তাই ওর ‘পাগলামি’ চলতেই লাগল। শেষমেশ না পেরে একদিন ওকে বাসায় নিয়ে বোঝালাম, ও সব শুনে শুধু হাসে আর বলে, ‘জি, ভাই। জি, ভাই।’ কথা যখন শেষ, তখন বলে, ‘কিন্তু ভাই, আমরা ক্যানসার হাসপাতাল করবই! হয়ে যাবে, ভাই!’

এই ‘হয়ে যাবে’ কথাটাও ছিল তুষারের চিরসঙ্গী। ওর কাছে যেন কিছুই অসম্ভব ছিল না। কিছু একটা বললেই বলত, ‘হয়ে যাবে, ভাই!’

লেগে থাকার এই গুণ তুষারের মজ্জাগতই ছিল। আমরা বন্ধুবান্ধবেরা ‘ঝাঁকের কই’ নামে পরিচিত। একবার আমরা ঝাঁকের কইয়েরা গেলাম ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে। পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাতই হয়ে গেল। সঙ্গে মুরগি, মসলা, তেল, লবণ নিয়েছি। বারবিকিউ হবে। কিন্তু আগুন তো আর জ্বলে না! কাঠ একেবারে ভেজা। এদিকে পেটের তর সইছে না। আগুন জ্বালানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল তুষার। বিএনসিসি (বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর) করা তুষার এসবে সিদ্ধহস্ত। আমরা এদিক–ওদিক ঘুরি আর বারবার উঁকি মারি, আগুন কি জ্বলল? তুষার ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে ঠিকই একসময় আগুন জ্বালিয়ে ফেলল।

ওর একই রকম উদ্যম দেখেছি বন্ধুসভার বার্ষিক আয়োজন বন্ধু উৎসবে। দেশের হাজার হাজার বন্ধুর সমাবেশ হতো মৌচাকের জাতীয় স্কাউট প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাঠে। আয়োজনের সব কাজে তুষার সদা তৎপর। গণিত অলিম্পিয়াড, ভাষা প্রতিযোগ, ইন্টারনেট উৎসব, বিতর্ক উৎসব, জিপিএ–৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানসহ প্রথম আলোর যেকোনো উদ্যোগে ওকে আমরা পাশে পেয়েছি সব সময়। সাভারের রানা প্লাজা ধসে আহত ব্যক্তিদের সেবায়ও নিবেদিত ছিল তুষার। হিমু পরিবহন যে কেবল ক্যানসার হাসপাতালের স্বপ্ন দেখেছিল, তা নয়; তুষারের নেতৃত্বে একাধিক মেডিকেল ক্যাম্প হয়েছে। ত্রাণ সংগ্রহ করে তুলে দিয়েছে বন্যার্তদের হাতে। এমন আরও কত যে নিঃস্বার্থ উদ্যোগের সঙ্গে তুষারের নাম জড়িয়ে আছে, তা বলে শেষ করা কঠিন! এর চেয়ে ঢের ঢের কঠিন তুষারের অকালপ্রয়াণ মেনে নেওয়া।
তুষারের ‘প্রিয় বাংলাদেশ’

২০১৬ সালে তুষার চলে গেল লেবানন। ছয় মাসের জন্যই গিয়েছিল সেবার। ওর চাকরিটা হয়েছিল লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাসে। তবে বরাবরই যা হয়েছে, তুষার যেখানেই গেছে, মায়ার বাঁধনে জড়িয়েছে সবাইকে। ফলে অবধারিতভাবে দূতাবাস ওকে ছাড়ল না। চাকরির মেয়াদ বাড়ল। মৃত্যুর আগপর্যন্ত ও দায়িত্ব পালন করেছে লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাসে কনস্যুলার অ্যাসিসটেন্ট হিসেবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও পরম আপনজন হয়ে উঠেছিল তুষার। রাতদিন সবার পাশে থাকার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ নিয়ে নানা আয়োজনের মধ্যমণিও ছিল।

লেবাননে থাকলেও তুষারের মনটা যে পড়ে থাকত বাংলাদেশেই, তা দিব্যি টের পাওয়া যেত ফেসবুকে ওর উপস্থিতি দেখলে। বাংলাদেশে কারও কোনো সাহায্য দরকার, তুষার আওয়াজ দিচ্ছে। পরিচিতদের পাঠিয়ে দিচ্ছে সহযোগিতা করতে। এমনকি গাঁটের পয়সা খরচ করতেও বিন্দুমাত্র ভাবেনি। কখনো কখনো এমনও হয়েছে, বাংলাদেশে থেকেও আমরা যে খবর পাইনি, তুষার তা জেনে বসে আছে!

অথচ আমরা জানতেও পারিনি তুষারের কী অসুখ! সবার খোঁজখবর ঠিকঠাক রাখলেও নিজের ডায়াবেটিস যে এতটা মাথাচাড়া দিয়েছে, তা জানায়নি কাউকে! ও লেবানন থেকে ছুটিতে দেশে এসেছিল সপ্তাহ দুয়েক আগে। এসেই নানাভাবে যুক্ত হয়ে পড়েছিল বন্যার্তদের সহযোগিতায়। এর মধ্যে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করেছে, আড্ডা দিয়েছে হাসিমুখে।

গতকাল ২ সেপ্টেম্বর লেবাননে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল ওর। অথচ পাড়ি জমাল অনন্তলোকে! তুষার সারাক্ষণ ‘বাংলাদেশ! বাংলাদেশ’ করত। ওর সব চিন্তা–কাজে দেশ আর দেশের মানুষ ছিল আগে। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে ওর মৃত্যু হলো প্রিয় বাংলাদেশেই। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে, এটাই হয়তো আমাদের একমাত্র সান্ত্বনা। আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে, তুষার চলে গেছে, এর মধ্যে আবার সান্ত্বনা হয় নাকি!

ইসরায়েলে এত বড় বিক্ষোভ-ধর্মঘটের কারণ কী

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা থেকে গত শনিবার ছয় জিম্মির মৃতদেহ উদ্ধারের পর ইসরায়েলজুড়ে নতুন করে বিক্ষোভ শুরু হয়। ডাকা হয় দেশজুড়ে ধর্মঘট।

প্রায় ১১ মাস আগে গাজা যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলে এত বড় ও ব্যাপক বিক্ষোভ আগে কখনো হয়নি।

গত শনিবার দক্ষিণ গাজার রাফা এলাকায় একটি সুড়ঙ্গ থেকে ছয় জিম্মির মরদেহ উদ্ধার করেন ইসরায়েলি সেনারা। তাঁদের মধ্যে একজন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বৈত নাগরিক ছিলেন। তাঁরা হলেন কারমেল গ্যাট, অ্যাডেন ইয়েরুশালমি, হার্শ গোল্ডবার্গ-পলিন, আলেকসান্দার লোভানভ, ওরি ড্যানিনো ও আলমগ সারুসি।

ছয় জিম্মির মরদেহ উদ্ধারের পর সাধারণ ইসরায়েলিদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। ইসরায়েলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ।

গত রোববার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন। তাঁরা জিম্মিদের মুক্তির জন্য অবিলম্বে চুক্তির দাবি জানান।

গতকাল সোমবার ইসরায়েলের প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন হিস্ট্রাড্রট দেশজুড়ে ধর্মঘট পালন করে। ধর্মঘটে তেল আবিবসহ ইসরায়েলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহর কার্যত অচল হয়ে পড়ে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় গাজাভিত্তিক ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সে সময় ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়।

গত বছরের নভেম্বরে এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মধ্যে বেশ কয়েকজন জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় জীবিত ও মৃত অবস্থায় বেশ কিছু জিম্মিকে উদ্ধার করেন ইসরায়েলি সেনারা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলছে, গাজায় হামাসের হাতে এখনো ৯৭ জিম্মি আছেন। আর মোট মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জিম্মির।

ইসরায়েলি বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, গাজা থেকে জিম্মিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে একটি চুক্তিতে উপনীত হতে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন নেতানিয়াহু। এখনো যাঁরা জিম্মি আছেন, তাঁদের মুক্ত করতে তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।

বিক্ষোভকারীদের দাবি, গাজায় থাকা বাকি জিম্মিদের প্রাণ রক্ষায়, তাঁদের নিরাপদে ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনার জন্য নেতানিয়াহু সরকার তার বর্তমান অবস্থান বদল করুক। সরকার দ্রুত একটি চুক্তি করুক।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ছয় জিম্মিকে উদ্ধারে কাছাকাছি পৌঁছানোর কিছু আগে তাঁদের হত্যা করে হামাস।

জিম্মি মৃত্যুর ঘটনায় ‘কড়া’ জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন নেতানিয়াহু।

তবে এসব কথায় উল্টো নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ ইসরায়েলিদের ক্ষোভ আরও বেড়ে গেছে।

গত রোববার ইসরায়েলে অভূতপূর্ব বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণে হওয়া বিক্ষোভে অনেক সড়ক বন্ধ হয়ে যায়।

ইসরায়েলের সর্ববৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন হিস্ট্রাড্রট গতকাল সোমবার দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দেয়। এই ট্রেড ইউনিয়নের সদস্যসংখ্যা প্রায় আট লাখ। ধর্মঘটে ইসরায়েলের অর্থনৈতিক কার্যক্রম অনেকাংশে অচল হয়ে যায়। পরে ইসরায়েলের একটি শ্রম আদালত শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

ধর্মঘট নিয়ে ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের মধ্যে বিভক্ত দেখা গেছে। ধর্মঘট বন্ধ করতে দেশটির চরম ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ অ্যাটর্নি জেনারেলের কাছে একটি জরুরি আবেদন জমা দেন।

স্মোট্রিচ গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তির বিরোধী। তিনি হিস্ট্রাড্রটের ধর্মঘটে যাঁরা অংশ নিয়েছেন, তাঁদের বেতন না দেওয়ারও নির্দেশনা দেন।

স্মোট্রিচের ভাষ্য, হিস্ট্রাড্রটের প্রধান আরনন বার-ডেভিড ইসরায়েলের অর্থনীতিকে দুর্বল করার মাধ্যমে মূলত হামাসের পক্ষই বেছে নিয়েছেন।

ইসরায়েলের বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ সরকারকে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ধর্মঘটেও সমর্থন দেন।

ইয়ার লাপিদের অভিযোগ, নেতানিয়াহু সরকার ইসরায়েলকে একটি গভীর নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

নেতানিয়াহু সরকারের চরম বিশৃঙ্খল কর্মকাণ্ডের মধ্যেও জনগণ অবিশ্বাস্য ধৈর্য দেখিয়ে চলছে বলে মনে করেন ইয়ার লাপিদ।

গাজায় মানবিক সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতায় গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু এই আলোচনায় কোনো অগ্রগতি নেই।

ইসরায়েলের ভেতর ও বাইরে থেকে এখন বলা হচ্ছে, নেতানিয়াহুর কারণেই চুক্তি হচ্ছে না। চুক্তির ক্ষেত্রে তিনি অপ্রাসঙ্গিক ও উদ্ভট সব দাবি যুক্ত করছেন। এই দাবিগুলো তাঁর রাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

হামাসের রাজনৈতিক শাখার জ্যেষ্ঠ নেতা খলিল আল-হাইয়া গতকাল সোমবার আল জাজিরাকে বলেন, নেতানিয়াহু জিম্মিদের বিনিময়ে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা কয়েকজন বয়স্ক ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিতেও রাজি হচ্ছেন না।

হামাসের দিক থেকে তোলা এই অভিযোগটি এখন পর্যন্ত স্বীকার বা অস্বীকার করেনি ইসরায়েলের নেতানিয়াহু সরকার।

‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ গান গেয়ে আসামে গ্রেপ্তার সংগীতশিল্পী

বাংলাদেশে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলন চলাকালে যে গান প্রবল জনপ্রিয় হয়েছিল, সেই ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’ ভালোভাবেই ছড়িয়েছে ভারতে; বিশেষ করে পূর্ব ভারতে। পশ্চিমবঙ্গে যে গণ-আন্দোলন চলছে, সেখানে গানটি গাইছেন সাধারণ মানুষ, গানটি বাজানো হচ্ছে লাউডস্পিকারে। অনেক সময় প্রথম লাইনটি অবিকৃত রেখে কথা বা সুর পরিবর্তন করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে সরকার এ গান গাওয়ার জন্য এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করেনি।

তবে আসামে গানটির প্রথম লাইন অবিকৃত রেখে গাওয়ার জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজ্যের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আলতাপ হুসেনকে। অভিযোগ, তাঁর গান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে আঘাত হেনেছে। গানটির কারণে রাজ্যে হিন্দু-মুসলমান বিবাদ বাড়বে।

‘অহম তোমার বাপের নাকি, মিয়া খেদিব খুজা’—হলো গানের প্রথম দুই লাইন। বাংলা করলে এমন হয়—আসাম কারও বাপের নাকি, খুঁজে খুঁজে মিয়া বা বাঙালি মুসলমানকে চিহ্নিত করে তাদের বিদায় করার এই প্রক্রিয়া আর কত দিন চলবে।

স্পষ্টভাবেই এ গানে নাম না করে সমালোচনা করা হয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার বাঙালি মুসলমান নীতির। তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে বাঙালি মুসলমানবিরোধী তাঁর যে রাজনৈতিক বয়ান, তা আবার সামনে এনেছেন।

বাঙালি মুসলমানবিরোধী অবস্থান বিশ্বশর্মার


বিধানসভায় দিন কয়েক আগে মুখ্যমন্ত্রী মন্তব্য করেন, বাঙালি মুসলমানের সংখ্যা আসামে দ্রুত বাড়ছে। এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যাবে না। আসামকে তিনি মুসলমানপ্রধান রাজ্য হতে দেবেন না।

বিধানসভায় বিশ্বশর্মার করা মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসসহ একাধিক বিরোধী দল থানায় অভিযোগ করে। অতীতে কংগ্রেস মুসলমানদের সমর্থনে বিশ্বশর্মার বিরুদ্ধে মামলা করেনি এই ভয়ে যে তাদের হিন্দু ভোট ভাগ হয়ে যাবে। এবার তারা সেটা করল।

ধারণা করা হচ্ছে, আসামে বাঙালি মুসলমানপ্রধান দল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের জনপ্রিয়তা মুসলমান সমাজে কমার সঙ্গে সঙ্গে আবার নতুন করে কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করেছে। সেটা মাথায় রেখে মুসলমান সমাজের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে মুসলমানের পক্ষ নিয়ে বিশ্বশর্মা আসামে ধীরে ধীরে মাঠে নামছে কংগ্রেস।

শুধু এ ঘটনা নয়, মুসলমানদের বিরুদ্ধে কয়েক দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে কথা বলছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। দিন কয়েক আগে তিনি মন্তব্য করেন, এখনই ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে আসাম মুসলমানপ্রধান রাজ্যে পরিণত হবে।

বাঙালি মুসলমানরা মূলত আসামের দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশে বসবাস করেন। কাজের জন্য তাঁরা ‘আপার’ বা উজান আসামেও যান। মুখ্যমন্ত্রী তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বাঙালি মুসলমানরা কেন দলে দলে উজান আসামে কাজ করতে যাবেন? এই কাজের সুযোগে তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এ ছাড়া আসাম বিধানসভায় সম্প্রতি নামাজের বিরতি প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চলছে।

তবে শুধু আসাম নয়, পাশের রাজ্য মেঘালয়ের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (ইউএসটিএম) প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাহবুবুল হককেও বিপদে ফেলেছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। বেশ কিছুদিন ধরেই মাহবুবুল হক সম্পর্কে মন্তব্য করার পরে জনপ্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও সরাসরি মন্তব্য করেছেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা।

অধ্যাপক মাহবুবুল হক সংবাদমাধ্যমকে জানান, ইউএসটিএমের ছাত্রদের আসামে সরকারি চাকরি থেকে নিষিদ্ধ করা হতে পারে বলে হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্যের পরে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি ব্যাপক পরিমাণে কমে গেছে।

আসামে প্রায় ৩৫ শতাংশ মুসলমান, যাঁদের মধ্যে বড় সংখ্যায় বাঙালি মুসলমান। আসামে মুসলমান জনসংখ্যার বিষয়টি স্বাধীনতার সময় থেকে এমন একটি ইস্যু, যা নিয়ে কথা বললেই রাজ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং অন্যান্য বিষয় চাপা পড়ে যায়। সেটা মাথায় রেখেই বাঙালি মুসলমান ইস্যু নিয়ে মাঝেমধ্যেই সরব হন আসামের মুখ্যমন্ত্রী।

আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতে হিমন্ত বিশ্বশর্মা বাঙালি মুসলমান সমাজের বিরুদ্ধে নতুন করে যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, সে পরিপ্রেক্ষিতেই আলতাপ হুসেন তাঁর গান বেঁধেছেন। আসামের নিজস্ব বিহুনাচের সঙ্গে গানটি বেঁধেছেন তিনি। গানটি কয়েক দিনে প্রবল জনপ্রিয় হয়। এরপরই তাঁকে স্বতঃপ্রণোদিতভাবে গ্রেপ্তার করে আসাম পুলিশ।

আলতাপকে গ্রেপ্তারের সমর্থনে মুখ্যমন্ত্রী গানের সঙ্গে বিহুনাচ নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাঁর আপত্তির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আসামে কোনো অবস্থাতেই ‘মিয়া বিহু’ চালু করতে দেওয়া হবে না।

বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে সোহেল তাজকে হাসিনা: আমেরিকায় বসে তুমি বেশি বুইঝো না আমি দেখতেছি by শুভ্র দেব

দেশের ইতিহাসের এক ন্যক্কারজনক ঘটনা ঢাকার পিলখানা ট্র্যাজেডি বা বিডিআর বিদ্রোহ। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬শে ফেব্রুয়ারি সংঘটিত নারকীয়, নৃশংস ও মর্মান্তিক ওই ঘটনায় ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। মর্মান্তিক ওই ঘটনার পেছনে অন্যদের সঙ্গে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ঘটনার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা সোহেল তাজের দিকে অভিযোগের তীরও ছোড়েন অনেকে। এসব প্রশ্ন আর অভিযোগের বিষয়ে তার মুখোমুখি হয়েছিল মানবজমিন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে বসে যখন ঘটনার খবর পান তখনই তিনি পুলিশের আইজি’র সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের সঙ্গে কথা বলেন। একপর্যায়ে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তার পরামর্শ না শুনে তাকে ধমক দিয়ে বলেছিলেন আমেরিকায় বসে তুমি বেশি বুইঝো না। আমি দেখতেছি।

মানবজমিনের সঙ্গে আলাপে সোহেল তাজ ওই সময়ে ঘটনা প্রবাহের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে কিছু মহল আমাকে জড়াতে চেষ্টা করেছে। এরকম নিকৃষ্ট একিউজিশন খুবই দুঃখজনক। একজন নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে এমন একটা কালিমা দেয়া ঠিক না।

আপনার দিকে কেন সন্দেহের তীর এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি তখন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ছিলাম। কিন্তু ঘটনার সময় আমি আমেরিকা ছিলাম। আমার মেয়ের জন্মদিনও ছিল আর আমার ঘনিষ্ঠ একজন আত্মীয়ের হার্ট সার্জারি হচ্ছিল নিউ ইয়র্কে। পিলখানার পাশেই আমার এক আত্মীয়ের অফিস। আমেরিকা ও বাংলাদেশের মধ্যে সময় ব্যবধান ছিল ১১ ঘণ্টা। রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমার ওই আত্মীয় কল করে বলেন, সোহেল এখানে তো অনেক গোলাগুলি হচ্ছে। তখন আমি বলি গোলাগুলি মানে? তখন তিনি বলেন, গোলাগুলি মানে অনেক গোলাগুলি। তখন সঙ্গে সঙ্গে আমি ফোন দিলাম তৎকালীন আইজিপি নূর মোহাম্মদকে। ওনাকে বললাম আইজি সাহেব পরিস্থিতি কী? কি হচ্ছে সেখানে। ওনি বললেন, গোলাগুলি হচ্ছে পিলখানায়। আমি বললাম গোলাগুলি হচ্ছে তো আপনারা কি করছেন? তিনি বললেন আমরা তো আছি। এ কথা শুনে আমি বলেছিলাম পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, এপিবিএন সব ডাকেন। সবাইকে দিয়ে পুরো পিলখানা ঘেরাও দেন। মুভিং করতে হবে। ওনি বললেন, আমরা তো মুভিং করছি। প্রয়োজনে সেনবাহিনীকে ডাকার কথাও বলি। আমার কথা শুনে তখন আইজি আমাকে বললেন, স্যার মন্ত্রী মহোদয় সঙ্গে আছেন। তার মানে ওনি আমাকে বলতে চাচ্ছেন আপনার কথা আমি মানতে পারবো না কারণ সিনিয়র আছেন। তখন আমি বুঝে গেলাম তিনি আমার কথা শুনবেন না কারণ আমার সিনিয়র (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) আছেন। সোহেল তাজ বলেন, আমার মাথা তখন গরম হয়ে গেছে। এরকম ক্রাইসিস হলে পুরো এলাকা ঘেরাও করতে হয়। যাতে ভেতরে যারা আছে তারা যেন বুঝতে পারে তাদের পালাবার কোনো পথ নাই। পালানোর পথ যদি না থাকে তবে তারা যা করতে চাচ্ছে সেটা নাও করতে পারে। সেজন্য বলেছিলাম পুরো এলাকা সবদিক দিয়ে ঘেরাও করতে হবে। আইজি’র কথা শুনে আমি থেমে যাইনি। ফোন রেখে আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনকে ফোন করলাম। ওনাকেও আমি একই কথা বললাম। ঘেরাও দেয়ার জন্য। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে কল করার কথাও বলি। ওনি তখন আমাকে বললেন বাবা এটা তো আপা (শেখ হাসিনা) দেখছেন। আমি তখনও থামি নাই। প্রধানমন্ত্রীকে কল করে একই কথা বলেছি। যা ফোর্স আছে তা দিয়ে ঘেরাও করে রাখতে হবে। আর্মি আসার আগ পর্যন্ত এটা করতে হবে। ওনি আমাকে বললেন, তুমি আমেরিকায় বসে বসে বেশি বুইঝো না। আমি দেখতেছি। তখন আমার আর কিছু করার ছিল না। তিনি বলেন, দেশে এসে আমি যা দেখলাম সেটাতেও অবাক হয়েছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল বিডিআর। কিন্তু অলৌকিকভাবে সব কাজ হয়ে যাচ্ছে। আমি দেখতে পারছি না কি হচ্ছে। কো-অর্ডিনেটর করে দেয়া হয়েছে কর্নেল ফারুক খানকে। ওনি তখন বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। বাণিজ্যমন্ত্রীকে কেন এই ঘটনার কো-অর্ডিনেটর করতে হবে? তারপর থেকে সবকিছু অদৃশ্য হয়ে গেল। আমাদের হাতে আর কিছুই ছিল না। বিডিআরের ‘ব’ পর্যন্ত আমরা বলতাম না। কারণ আমাদের কাছে কেউ জানতেও চায়নি, বলেওনি। এভরিথিং ওয়াজ ডান বাই দ্য কো-অর্ডিনেটর। আমার কাছে সবই উদ্ভট লেগেছে। কিন্তু প্রমাণ তো নাই। প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের এটাও একটা কারণ ছিল। তাই বিডিআর বিদ্রোহের পরপরই আমি পদত্যাগ করেছি।

বিডিআর বিদ্রোহের নেপথ্য কী ছিল? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, মন্ত্রী থাকাকালীনই আমি কিছু দেখিনি, কিছুই টের পেতাম না। কোথা দিয়ে কি চলে যাচ্ছে, কী হয়ে যাচ্ছে কিছুই জানতাম না। আর দায়িত্ব ছাড়ার পর আর কিছু দেখার বা জানার সুযোগ ছিল না।

এর আগে সোহেল তাজ ১৫ই আগস্ট এক ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, সত্য বলার সময় এসেছে। সত্যই হচ্ছে সবচেয়ে বড় শক্তি। পিলখানা হত্যাযজ্ঞের সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্বল হচ্ছে তার আত্মসম্মান আর মর্যাদা এবং সত্যই হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার আর ঢাল। তিনি লিখেছেন, ‘আপনারা যারা জেনে না জেনে বা বুঝে না বুঝে কোনো প্রমাণ ছাড়াই আমাকে নিয়ে পিলখানা হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত থাকার মিথ্যা অপপ্রচার করছেন, তাদের উদ্দেশ্যে বলবো- এই কাজটা ঠিক না। আমিও বাংলাদেশের সব বিবেকবান মানুষের মতো হতভম্ব হয়েছিলাম, স্তম্ভিত হয়েছিলাম। আমিও মানসিকভাবে মর্মাহত হয়েছিলাম। আমিও সত্য জানতে চাই এবং সুষ্ঠু তদন্ত চাই। ভবিষ্যতে পুনঃতদন্ত হলে আমার অভিজ্ঞতা এবং পর্যবেক্ষণগুলো বলতে চাই।

প্রায় ১৫ বছর আগের ওই ঘটনা ৫ই আগস্ট সরকার পতনের পর থেকে আলোচনায় এসেছে। বিডিআর কল্যাণ পরিষদও এই ঘটনা পুনঃতদন্ত ও ৯ দফা দাবি জানিয়েছে। এ ছাড়া পিলখানায় বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি বিডিআরের উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুর রহিমের কারাগারে মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়েছে। ২৫শে আগস্ট ঢাকার মহানগর হাকিম মো. আখতারুজ্জামানের আদালতে আব্দুর রহিমের ছেলে এডভোকেট আব্দুল আজিজ এই মামলা করেন। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক বিজিবি মহাপরিচালক ও সাবেক সেনাপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং পিলখানা বিদ্রোহ মামলার আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজলসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে এ মামলা হয়। মামলায় অন্য আসামিরা হলো- সাবেক কারা-মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আশরাফুল ইসলাম খান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, সংসদ সদস্য শেখ সেলিম, নুর আলম চৌধুরী লিটন, শেখ হেলাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম ও হাসানুল হক ইনু। এ ছাড়া ২০১০ সালের জুলাইয়ে দায়িত্বরত কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার এবং কারাগারের চিকিৎসকদেরও আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও চাকরিচ্যুত বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) সদস্যদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে বিডিআর কল্যাণ পরিষদ। গত সপ্তাহে জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিডিআর কল্যাণ পরিষদের উপদেষ্টা ফখরুল ইসলাম বলেন, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার একটি দেশকে সন্তুষ্ট করতে, সেনাবাহিনীর সামর্থ্য ক্ষুণ্ন ও বাংলাদেশ রাইফেলসকে (বিডিআর) ধ্বংস করে নিজেদের ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করতে সুপরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড’ ঘটিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকেও বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার পুনরায় তদন্তের কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিয়ে দোটানায় পড়েছে ভারত -দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ

অগাস্ট মাসের শুরুতে, যখন বাংলাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি দমনপীড়নের জেরে বাড়তে থাকে লাশের সংখ্যা তখন পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দ্রুত হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার সাথে কোনো রাজনৈতিক সহযোগী ছিলেন না এবং তিনি তার সিনিয়র মন্ত্রীদের কাউকে বলেননি যে, তিনি চলে যাচ্ছেন। ৫ই অগাস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি প্রতিবেশী ভারতে চলে যান। তখন থেকে সেখানেই আছেন হাসিনা। যে ছাত্র বিক্ষোভ হাসিনার পতন ত্বরান্বিত করেছিল তা ক্যাম্পাস থেকে দ্রুত দেশব্যাপী গণবিপ্লবে রূপান্তরিত হয়েছিল, দেশের কয়েক হাজার মানুষ হাসিনার অপসারণ এবং গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তনের আহ্বান জানিয়েছিল। হাসিনার সরকার সহিংসতা ও গুলির মাধ্যমে বিক্ষোভের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল। যার জেরে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার আহত হয়েছিল।

৫ইআগস্ট হাসিনার দেশত্যাগের পর বিক্ষোভকারীরা তার সরকারি বাসভবনে আক্রমণ করে। সারা বাংলাদেশ আনন্দের সাথে দিনটি উদযাপন করে। কিন্তু নয়া দিলিতে ক্ষমতার করিডোরে, হাসিনার শাসনের পতনকে একটি বিপর্যয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। ভারত দীর্ঘদিন ধরে হাসিনাকে সবচেয়ে বড় মিত্র হিসেবে দেখে এসেছে।

১৯৭৫ সালে তার পিতা মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর একবার হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেয়া হয়েছিল এবং ১৯৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার আগে পর্যন্ত তিনি তার স্বামী ও সন্তানসহ ছয় বছরেরও বেশি সময় ভারতে নির্বাসনে ছিলেন।

নয়া দিল্লিতে বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয় দলের সঙ্গে হাসিনার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক বাংলাদেশকে ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং সবচেয়ে বিশ্বস্ত আঞ্চলিক মিত্র হতে সাহায্য করেছে। একই সাথে বাংলাদেশকে চীনের খপ্পর থেকে দূরে রাখতে সাহায্য করেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত তার প্রথম মেয়াদে এবং তারপরে ২০০৯তে পুনঃনির্বাচিত হওয়ার পর, হাসিনা পানিপথে অ্যাক্সেস এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সাথে লাভজনক চুক্তি করার মাধ্যমে ভারতের দিকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার হাত প্রসারিত করেন।

বিনিময়ে, তার শাসনব্যবস্থা ক্রমবর্ধমানভাবে নিপীড়ক ও কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠলেও ভারত সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখে। বরং ভারতীয় কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে বিরোধীরা বাংলাদেশের বিষয়ে সক্রিয়ভাবে হস্তক্ষেপ করে হাসিনাকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করার অভিযোগ তোলে। পাশাপাশি অন্যান্য দেশকে একটি কারচুপিপূর্ণ নির্বাচন মেনে নেয়ার জন্য চাপ দিতেও দ্বিধাবোধ করেনি ভারত। জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় ফিরে আসার পর বিদেশি কোনো সরকার প্রধান হিসেবে হাসিনাই প্রথম ভারত সফর করেন। গত ১৫ বছরে দুই দেশের সম্পর্কের প্রকৃতি ধীরে ধীরে বাংলাদেশে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখার ফল

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের একজন সিনিয়র ফেলো শাফকাত মুনির বলেছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি মূলত একজন ব্যক্তি এবং একটি দলের সাথে সম্পর্ক হয়ে উঠেছে। বেশ কয়েকজন বিশ্লেষকের মতো মুনিরও জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পর্যালোচনা করার জন্য নয়া দিল্লিকে আহ্বান জানিয়েছেন। শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ এবং নোবেল পুরস্কার বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ব্যাপক সংস্কার এবং হাসিনা সরকারের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদিও ইউনূস মনে করেন এটি একটি বিশাল চ্যালেঞ্জের কাজ। মুনির বলছেন- ‘এখন ভারতকে মেনে নিতে হবে যে শেখ হাসিনা চলে গেছেন, তিনি এখন ইতিহাস। দু’দেশের সম্পর্ককে সম্পূর্ণরূপে পুনঃস্থাপন করতে হবে। সরকার পরিবর্তনের ওপর কোনো সম্পর্ক নির্ভর করতে পারে না।’

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সামনে আরো একটি হুমকির বিষয় হলো- ভারতে হাসিনার উপস্থিতি। যদিও তার পরিবার বলছে, হাসিনা ভারতে স্থায়ীভাবে থাকবেন না এবং তার প্রত্যাবর্তনের জন্য বাংলাদেশ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের অনুরোধ করা হয়নি, তবে তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য অধিকার কর্মী এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান কল আসছে ভারতের কাছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা ও অপহরণে ভূমিকা রাখার অভিযোগে ১০০টিরও বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাম্প্রতিক বিক্ষোভের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের সাথে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ তুলে তার বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। যদিও হাসিনার সরকার এর আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। হাসিনা ভারত সফরে যে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন তাও বাতিল করেছে বাংলাদেশ সরকার।

এই সপ্তাহে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের কাছে সরাসরি আবেদন করেন। অভিযোগ করেন, হাসিনা বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকার ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য ভারতকে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আলমগীর বলেন, ‘আপনাদের (ভারত) কাছে আমাদের আহ্বান যে- আপনারা তাকে আইনি উপায়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করুন। তার বিচারের সিদ্ধান্ত এদেশের মানুষ নিয়েছে। তাকে সেই বিচারের মুখোমুখি হতে দিন।’

ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ তথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. আলী রীয়াজ বলেছেন- ‘হাসিনার আকস্মিক পতনে ভারতকে একটি ‘গুরুতর গোয়েন্দা ব্যর্থতার’ মুখোমুখি হতে হয়েছিল। যার অর্থ উল্লেখযোগ্য আঞ্চলিক বিপর্যয়ের জন্য ভারত অপ্রস্তুত ছিল। ক্রমবর্ধমান ভারত-বিরোধী মনোভাব এখন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।’ ড. আলী রীয়াজ মনে করেন- ‘ভারত রাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে গুরুত্ব না দিয়ে হাসিনা ও তার দলের সাথে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করে সব ডিম এক ঝুড়িতে রেখেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অলীক নীতি অনুসরণ করেছে। ফলস্বরূপ, ভারত এখন নিজেই একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে।’

হাসিনা সরকারের পতনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভারতের মোদি সরকারের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের নতুন শাসনের দ্বারা গণতান্ত্রিক সংস্কারের উল্লেখ সেভাবে পাওয়া যায়নি। পরিবর্তে প্রতিবেশী দেশে অস্থিরতা এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের হুমকির বিষয়ে ‘গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছেন মোদি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সাথে ফোনালাপের পর মোদির প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টিতে আবারও জোর দেয়া হয়েছিল। মার্কিন বিবৃতিতে বাংলাদেশের বিষয়ে কোনো উল্লেখ না থাকলেও ভারতীয় পক্ষ বলেছে যে- ‘দুই দেশের নেতা স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার এবং আইনশৃঙ্খলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা করেছেন’। মোদির মন্তব্যগুলি সীমান্তের ওপারে সমালোচিত হয়েছে। একজন বাংলাদেশী ভাষ্যকার বলেন, ‘আমরা স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি না। আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করছি।’

ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা ভারতের কূটনৈতিক মাথাব্যথা হয়ে উঠেছেন -এএফপি’র রিপোর্ট

ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে ভারতে গিয়ে ভারত সরকারের কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছেন শেখ হাসিনা। ছাত্রদের নেতৃত্বে বাংলাদেশে যে বিপ্লব হয়েছে তাতে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আকাশপথে পালিয়ে নয়াদিল্লি চলে যান। তা নিয়ে বিস্তর সমালোচনা চারদিকে। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশে ভারতের অবস্থান নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেয়ার কারণে তিনি এখন ভারতের  জন্য কূটনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছেন। বার্তা সংস্থা এএফপি’র এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ১৫ বছর ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিরোধীদের ওপর দমনপীড়নের পর গত মাসে শেখ হাসিনার কঠোর শাসনের অবসান ঘটে। বাংলাদেশে গণআন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্ররা এখন শেখ হাসিনাকে ভারতের কাছে ফেরত চাইছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে পর্যন্ত তাকে ক্ষমতায় রেখে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী এই ভারত। আন্দোলনের সময় যেসব প্রতিবাদীকে হত্যা করা হয়েছে তার জন্য শেখ হাসিনার বিচার দাবি করছেন ছাত্ররা।

কিন্তু ৭৬ বছর বয়সী এই নেত্রীকে বাংলাদেশের কাছে ফেরত পাঠালে তাতে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে। এই অঞ্চলে চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে ভারত এমনিতেই তীব্র লড়াই করছে। যুদ্ধ বিষয়ক থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, এটা স্পষ্ট যে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে না ভারত। যদি তাকে ফেরত পাঠানো হয় তাহলে এ অঞ্চলে অন্য দেশগুলোর যেসব নেতার সঙ্গে নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে, তা খুব ইতিবাচক হবে না। তা হলো- ভারত তোমাকে রক্ষা করবে না।  
গত বছর মালদ্বীপে পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বী মোহাম্মদ মুইজুর কাছে পরাজিত হতে দেখছে নয়াদিল্লি। পর্যটনের গন্তব্য মালদ্বীপ বেইজিংয়ের দিকে খুব বেশি ঝুঁকে পড়েছে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় এই অঞ্চলে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রকে হারিয়েছে ভারত। শেখ হাসিনার সময়ে তার সরকার যাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিল, তারা প্রকাশ্যে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মেগাফোন কূটনীতি চালু করেছেন এবং পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের দিকে। শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ৮৪ বছর বয়সী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তার সরকারকে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। কিন্তু মোদি তার ক্ষমতার মেয়াদে হিন্দুত্ববাদের বিশ্বাসকে শক্তিশালীভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি বার বার ড. ইউনূসের প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে ধর্মীয় হিন্দু সংখ্যালঘুদের সুরক্ষিত রাখতে।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র চেয়ে বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুদের জন্য আওয়ামী লীগকে বেশি সুরক্ষাকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর রেডফোর্টে বার্ষিক স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে মোদি বলেছেন, বাংলাদেশের হিন্দুরা বিপদে আছেন। পরে তিনি এই ইস্যু উত্থাপন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে। শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে কিছু হিন্দু ও তাদের মন্দির টার্গেট হয়েছে। কিন্তু তাকে অতিরঞ্জিত করে ভারতের সরকারপন্থি নিউজ চ্যানেলগুলো প্রচার করে। তাতে মোদির দলের সঙ্গে যুক্ত এমন হিন্দুত্ববাদী অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো প্রতিবাদ বিক্ষোভ করে।
বিএনপি’র শীর্ষস্থানীয় নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শেখ হাসিনাকে সমর্থন করে ভারত তার সব ফল এক ঝুড়িতে রেখেছে। তারা জানতো কীভাবে এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া হয়। তিনি এএফপিকে বলেন, ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায় বাংলাদেশের জনগণ। তবে সেটা তাদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে নয়। দুর্ভাগ্যজনক হলো ভারতের মনোভাব আস্থা সৃষ্টির মতো নয়।
এমনই যখন অবিশ্বাসের পরিবেশ তখন আগস্টে ভয়াবহ বন্যা উভয় দেশের বিপুল অংশকে ডুবিয়ে দেয়। এর জন্য অনেক বাংলাদেশি ভারতকে দায়ী করেন। তারা বলেন, তাদের কারণে অনেক মৃত্যু হয়েছে। শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি নয়াদিল্লির কাছে সরকারিভাবে তুলে ধরেনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। শেখ হাসিনা নয়াদিল্লির কাছে একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে সুরক্ষিত অবস্থায় আছেন। তার বিষয় তুলে না ধরলেও এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করেছেন। এর মধ্যদিয়ে তার সফরের ক্ষেত্রে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বন্দি প্রত্যার্পণের চুক্তিতে ২০১৩ সালে প্রথম স্বাক্ষর করে দুই দেশ। ফলে ফৌজদারি অপরাধের বিচারের জন্য শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো অনুমোদন করে। চুক্তির একটি ধারা বলে যে, যদি অপরাধটি ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ হয় তাহলে প্রত্যার্পণ নাও করা হতে পারে। বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ঢাকার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে চাপ সৃষ্টি করলে তিক্ত হয়ে উঠতে পারে। তিনি আরও বলেন,  যেকোনো পরিণত সরকার এটা বুঝতে পারবে যে, ভারতে হাসিনার অবস্থানকে ইস্যু করা হলে তা কারও জন্য সুবিধা দেবে না।

যুদ্ধবিরতির দাবিতে ফুঁসছে ইসরাইল

গাজায় যুদ্ধবিরতির চুক্তি স্বাক্ষরের দাবিতে ক্ষোভে ফুঁসছে ইসরাইলের জনতা। দেশটির প্রধান শ্রম ইউনিয়ন সোমবার এ দাবিতে বৃহৎ ধর্মঘট আহ্বান করে। এতে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো ইসরাইল। হাজার হাজার মানুষ একই দাবিতে রাজপথে নেমে আসেন। গাজায় ৬ জিম্মির লাশ উদ্ধারের পর এই বিক্ষোভ নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে রোববার রাতে নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ধস্তাধস্তি হয়েছে। গাজায় যুদ্ধ শুরু হয় প্রায় ১১ মাস আগে। তারপর সরকারবিরোধী যেসব প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম বৃহৎ আন্দোলন এটা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। ফিলিস্তিনের যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাসের কাছে যেসব জিম্মি এখনো আছেন তাদেরকে উদ্ধারের জন্য একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছার জন্য ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি আহ্বান জানান তারা। পশ্চিম জেরুজালেমে নেতানিয়াহুর অফিস। এর বাইরে এবং তেল আবিবে অসংখ্য ইসরাইলি জমায়েত হয়ে সব সড়ক বন্ধ করে দেয়। এ জন্য গঠন করা হয়েছে ‘হোস্টেজেস অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম’।

গাজায় জিম্মিদের পরিবারের প্রতিনিধিরা এই ফোরাম থেকে বিবৃতিতে বলেছেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং জীবিত জিম্মিদের ফিরিয়ে আনতে চুক্তি করতে নেতানিয়াহু ব্যর্থ হয়েছেন। এ জন্য সর্বশেষ ৬ জিম্মিকে হত্যা করা হয়েছে। এসব জিম্মিকে গত প্রায় ১১ মাস জীবিত রেখেছিল হামাস সদস্যরা। অবশেষে কয়েকদিন আগে তাদের সবাইকে হত্যা করেছে তারা। এ জিম্মিদের অন্যতম কারমেল গাট। তার কাজিন গিল ডিকম্যান ইসরাইলি সরকারের ওপর আরও কঠোর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, সব জিম্মিকে ফেরত না আনা পর্যন্ত রাজপথে নেমে আসুন এবং দেশ অচল করে দিন। বাকি জিম্মিদের এখনো রক্ষা করা সম্ভব। ইসরাইলের হারেটজ পত্রিকার কলামনিস্ট গিডিওন লেভি আল জাজিরাকে বলেছেন, সরকারে থাকা তার ডানপন্থি দলগুলোর পক্ষ নিয়েছেন নেতানিয়াহু। এই দলগুলো হামাসের সঙ্গে কোনো রকম ছাড় দেয়ার বিরোধী। ফলে জিম্মিদের বিষয়ে কতো চিন্তা করে। লেভি আরও বলেন, ইসরাইলে বর্তমান জোট সরকারে সবচেয়ে বড় দল নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। তিনি নিজে বিপুল ক্ষমতার অধিকারী। দল তাকে সমর্থন করে। ফলে সরকারের ভেতর থেকে যেসব চ্যালেঞ্জ আছে তা খুবই সীমিত। বাস্তবে, একমাত্র চ্যালেঞ্জ হতে পারে রাজপথ। তবে তাতে কী পরিণতি হবে তা বলার মতো সময় আসেনি। গত বছর ৭ই অক্টোবরের পরে প্রথমবারের মতো ইসরাইলের সবচেয়ে বড় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন ‘হিস্তাদ্রুট’ যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য আহ্বান করে সাধারণ ধর্মঘট। ইউনিয়ন বলেছে, সোমবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা থেকে ইসরাইলের প্রধান বিমান পরিবহনের প্রাণকেন্দ্র বেন গুরিয়ন এয়ারপোর্ট বন্ধ থাকবে। ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা খাত সহ ইসরাইলের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক খাতকে বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ হিসেবে এ কর্মসূচি নিয়েছে তারা। হিস্তাদ্রুটের প্রধান কর্মকর্তা আরনন বার-ডেভিড বলেন, একটি চুক্তিপত্র না পেয়ে আমরা পাচ্ছি শুধু মৃতদেহের ব্যাগ। ইসরাইলের উচ্চ প্রযুক্তি খাতের প্রধান ম্যানুফ্যাকচারার এবং উদ্যোক্তারা তাকে সমর্থন করেছেন বলে তার দাবি। ৬ জন জিম্মির সর্বশেষ মৃত্যুতে ইসরাইলে জনগণের মধ্যে ভয়াবহ ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। তাই ইসরাইলের অর্থনীতিতে আঘাত করার জন্য সবচেয়ে শক্তিধর কণ্ঠস্বর এক হয়েছে। সোমবার ইসরাইলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র তেল আবিবও শাটডাউন ঘোষণা করা হয়। এই ধর্মঘটকে সমর্থন দিয়েছে ম্যানুফ্যাকচারারস এসোসিয়েশন অব ইসরাইল। জিম্মিদের জীবিত ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে নৈতিক দায়িত্ব পালনে সরকার ব্যর্থ বলে তারা অভিযোগ করছে। এই এসোসিয়েশনের প্রধান রন তোমার বলেন, জিম্মিদের ফেরত আনা ছাড়া আমরা যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্ষম হবো না। আমরা আমাদেরকে সমাজে পুনর্বাসন করতে সক্ষম হবো না। এমনকি ইসরাইলের অর্থনীতিকে পুনর্বাসন করতে সক্ষম হবো না। ধর্মঘটে সমর্থন দেয়ার কথা জানিয়েছেন ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ।

তবে দেশ জুড়ে এই ধর্মঘটকে বন্ধ করতে আদালতের কাছে আর্জেন্ট আবেদন জমা দিতে অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারাকে অনুরোধ করেছেন অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। চিঠিতে তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে রাজনীতিকরা সিদ্ধান্ত নেন। সে বিষয়ে অন্যায়ভাবে যেহেতু প্রভাব খাটানো হচ্ছে তাই এই ধর্মঘটের কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। তিনি আরও বলেন, ব্যাপক আকারে ধর্মঘটে বহির্গামী ফ্লাইট বন্ধ হওয়ার ফলে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেছেন, হামাস এবং ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনেক মাস ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু চুক্তিতে না পৌঁছার জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন অনেকে। ওদিকে যুদ্ধ শুরুর পর কমপক্ষে ৪০,৭৩৮ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। পক্ষান্তরে তাদের পক্ষে নিহত হয়েছে ১১৩৯ জন। হামাস জিম্মি করে প্রায় আড়াইশ’ মানুষকে।

জেনিনে পানি-বিদ্যুৎ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের জেনিনে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গতকাল রোববার দখল করা ওই এলাকায় টানা পঞ্চম দিনের মতো অভিযান চালানো হয়। এদিকে অভিযানের অংশ হিসেবে জেনিনে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল।

কোনো ধরনের ঘোষণা ছাড়াই জেনিনে বড় ধরনের অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। সাঁজোয়া যান, ড্রোন ও স্নাইপারদের সহায়তায় শত শত ইসরায়েলি সেনা এ অভিযান শুরু করে। স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসসহ ফিলিস্তিনি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ হচ্ছে।

বর্তমানে জেনিন শহরের বেশি ভাগ অংশে পানি ও বিদ্যুৎ নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় বিপাকে পড়েছে জেনিনের বাসিন্দারা। তারা পানি ও খাদ্যসংকটে ভুগছেন।

গত পাঁচ দিনের অভিযানে জেনিনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানকার শরণার্থীশিবির। সেখানকার গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। এই শরণার্থীশিবিরে ২০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির বসবাস।

জেনিন শহর থেকে এই অভিযানের সংবাদ সংগ্রহ করছেন আল-জাজিরার সাংবাদিক নিদা ইব্রাহিম। তিনি বলেন, ‘সেখানে আমার দেখা এটি সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অভিযান।’

এদিকে পশ্চিম তীরের পাশাপাশি গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গতকাল রোববার জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় ২৪ ঘণ্টায় গাজায় আরও ৪৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় ৪০ হাজার ৭৩৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৯৪ হাজার ১৫৪ জন।
ছয় জিম্মির মরদেহ উদ্ধার

দক্ষিণ গাজায় টানেল থেকে ছয় জিম্মির মরদেহ উদ্ধার করার কথা জানিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। গত শনিবার তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর গতকাল রোববার দেওয়া এক বিবৃতির বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, রাফা এলাকায় ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের ভেতর গত শনিবার ওই সব মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার দুই দ্বৈত নাগরিক রয়েছেন।

মরদেহ উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের নাম প্রকাশ করেছে ইসরায়েল। তাঁরা হলেন কারমেল গ্যাট, অ্যাডেন ইয়েরুশালমি, হার্শ গোল্ডবার্গ-পলিন, আলেকসান্দার লোভানভ, আলমগ সারুসি ও মাস্টার সার্জেন্ট ওরি ড্যানিনো।

ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র রিয়ার অ্যাডমিরাল দানিয়েল হাগারি বলেছেন, ‘প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, আমরা সেখানে পৌঁছানোর অল্প সময় আগে হামাস সন্ত্রাসীরা তাঁদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে।’

গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের নজিরবিহীন হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়। ওই সময় জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় আরও ২৫১ জনকে। গত বছরের নভেম্বরে গাজায় সাত দিনের যুদ্ধবিরতির সময় হামাস শতাধিক জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছিল।

এদিকে জিম্মিদের মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকার পদক্ষেপ না নেওয়ায় দেশজুড়ে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে, স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যায় জনগণকে রাজপথে নেমে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গাজায় পোলিও টিকাদান শুরু

গাজায় আনুষ্ঠানিকভাবে গতকাল পোলিও টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৯টা থেকে তিন দিনের এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। টিকাদানের সুযোগ দিতে গাজায় তিন দিন হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের জেনিন শহরে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের পর সড়কের পাশে পড়ে আছে একটি গাড়ির ধ্বংসস্তূপ

আরজি করে ধর্ষণ-হত্যা : অবশেষে গ্রেফতার সাবেক অধ্যক্ষ সন্দ্বীপ

নয়া দিগন্তঃ অবশেষে গ্রেফতারই করা হলো ভারতের আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষকে। গত ১৬ আগস্ট থেকে টানা ১৫ দিন সিবিআই জেরার মুখোমুখি হতে হয়েছিল সন্দীপকে।

গত শনি এবং রোববার শুধু তাকে জেরা করা হয়নি। সোমবার আবার তাকে তলব করা হয় সিজিও কমপ্লেক্সে। সন্ধ্যায় সেখান থেকে বের করে সিবিআই কর্মকর্তারা সন্দীপকে নিয়ে যান নিজাম প্যালেসে।

তারপরেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তরফে জানানো হয়, গ্রেফতার করা হয়েছে সন্দীপকে।

সিবিআই সূত্রে জানা গেছে। আর্থিক দুর্নীতি মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন আরজি করের সাবেক অধ্যক্ষ।

গত ৯ আগস্ট আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনার পর থেকেই তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে নানা মহলে। তদন্তভার হাতে পাওয়ার পর গত ১৫ আগস্ট তাকে প্রথমবার তলব করে সিবিআই।

সেই দিন হাজিরা দেননি সন্দীপ। পর দিন অবশ্য সল্টলেকের রাস্তা থেকে সিবিআইয়ের গাড়িতে ওঠেন তিনি। সেই গাড়িতে সিবিআইয়ের এক কর্মকর্তাও ছিলেন। সন্দীপ যান সিজিও কমপ্লেক্সের সিবিআই দফতরে। তারপর থেকে ২৪ আগস্ট পর্যন্ত টানা নয় দিন তাকে তলব করা হয় সিজিওতে। দৈনিক ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সিবিআই দফতরে থাকতে হয়েছিল সন্দীপকে।

গত ২৫ আগস্ট সকালে সন্দীপের বেলেঘাটার বাড়িতে হানা দেয় সিবিআইয়ের একটি দল। ৭৫ মিনিট তাদের বাড়ির বাইরে অপেক্ষা করিয়ে রাখার পর দরজা খোলেন সন্দীপ। ভেতরে ঢোকেন সিবিআই কর্মকর্তারা। ওই দিন সিবিআই তার বাড়িতেই সন্দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে আরজি করে নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্ত করছে সিবিআই। এছাড়া ওই হাসপাতালে আর্থিক অনিয়মের মামলার তদন্তভারও সিবিআইয়ের হাতে দিয়েছে আদালত। দু’টি মামলাতেই কেন্দ্রীয় সংস্থার জোড়া আতশকাচের নিচে ছিলেন আরজি করের সাবেক অধ্যক্ষ।

আর্থিক অনিয়মের মামলায় ২৪ আগস্ট এফআইআরও করেছে সিবিআই। সূত্রের খবর, সেই এফআইআরের ভিত্তিতেই সন্দীপের বাড়িতে পৌঁছেছিল সিবিআইয়ের দল। তার মাঝে আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে সন্দীপসহ মোট সাতজনের পলিগ্রাফ পরীক্ষাও করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা।

নারী চিকিৎসকের লাশ উদ্ধারের পর থেকে আরজি করে যে আন্দোলন শুরু হয়, তাতে আবাসিক চিকিৎসক থেকে শিক্ষার্থী- সকলেরই অন্যতম দাবি ছিল সন্দীপের অপসারণ কিংবা পদত্যাগ।
আন্দোলনের চাপে পড়ে গত ১২ আগস্ট পদত্যাগ করেন সন্দীপ। স্বাস্থ্য দফতরে গিয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমাও দেন। কিন্তু তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্দীপকে কলকাতার অন্য একটি সরকারি হাসপাতালে অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ করে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর। সেখান থেকেও তার অপসারণের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। এর মাঝেই কলকাতা হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় সন্দীপকে ছুটিতে যেতে। সেই থেকে ছুটিতেই ছিলেন সন্দীপ। পরে অবশ্য আন্দোলনের চাপে তাকে সেই পদ থেকেও সরিয়ে দেয়া হয়।

আরজি করে নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককের লাশ উদ্ধারের পর পরই সেই সেমিনার হলের পাশের একটি ঘরের দেয়াল ভেঙে ফেলা হয় সংস্কারের নামে। অভিযোগ, এক্ষেত্রেও সন্দীপের নির্দেশ থাকতে পারে। কেন তড়িঘড়ি সংস্কারের কাজ শুরু করা হলো তা নিয়ে সন্দেহপ্রকাশ করেন অনেকে। সে বিষয়েও সন্দীপকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন সিবিআইয়ের গোয়েন্দারা।

এই আবহেই আরো অভিযোগ ওঠে, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে আরজি কর হাসপাতালে আর্থিক দুর্নীতি চলেছে। সে বিষয়ে তদন্তের জন্য গত ১৬ আগস্ট রাজ্য সরকারের তরফে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়। এক দিন পরেই উচ্চ আদালতের নির্দেশে রাজ্য পুলিশের পরিবর্তে মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় সিবিআইয়ের হাতে। আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে একাধিক বেনিয়মের তত্ত্ব উঠে এসেছে। মর্গ থেকে লাশ উধাও হওয়া থেকে শুরু করে রয়েছে হাসপাতালের জৈব বর্জ্য নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগও।

এ বিষয়ে পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন হাসপাতালের সাবেক অতিরিক্ত সুপার আখতার আলি। সেই অভিযোগে সন্দীপ ছাড়াও ছিল আরজি করের ফরেন্সিক মেডিসিন বিভাগের কর্মকর্তা দেবাশিস সোম, হাসপাতালের সাবেক সুপার সঞ্জয় বশিষ্ঠ এবং হাসপাতালের চিকিৎসা সামগ্রী সরবরাহকারী বিপ্লব সিংহের নাম।
সূত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা


বন্দীবিনিময় চুক্তিতে আন্তরিক নন নেতানিয়াহু : বাইডেন

নয়া দিগন্তঃ ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসের সাথে বন্দী বিনিময় চুক্তিতে আন্তরিক নন বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

তিনি বলেন, আমি এ কথা বিশ্বাস করি না যে নেতানিয়াহু হামাসের সাথে বন্দী বিনিময় চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে কোনো কাজ করছেন। বরং তিনি বন্দী বিনিময় চুক্তিতে আন্তরিকই নন।

নেতানিয়াহু নেটজারিম এবং ফিলাডেলফি করিডোরে থাকার জন্য জোর দিয়েছেন। এতে বন্দী বিনিময় চুক্তির আলোচনার অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

বাইডেন বলেন, তিনি গাজায় বন্দীদের মুক্তির জন্য একটি চুক্তির চূড়ান্ত প্রস্তাব উপস্থাপনের কাছাকাছি ছিলেন।

ইসরাইলি বাহিনী সপ্তাহান্তে গাজা থেকে ২৩ বছর বয়সী আমেরিকান-ইসরাইলি হার্শ গোল্ডবার্গ-পোলি সহ ছয় বন্দীর লাশ উদ্ধার করেছে। এতে বাইডেন প্রশাসনের গাজা যুদ্ধবিরতি কৌশল সমালোচনার মুখে পড়েছে। এছাড়া অবশিষ্ট বন্দীদের ফিরিয়ে আনতে ইসরাইলিদের পক্ষ থেকেও নেতানিয়াহুর উপর জোরদার চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

এই সপ্তাহে বাইডেন প্রশাসন গাজা যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য চূড়ান্ত কোনো চুক্তি উপস্থাপনের পরিকল্পনা করছেন কিনা জানতে চাইলে বাইডেন বলেন, আমরা চূড়ান্ত চুক্তি উপস্থাপনের খুব কাছাকাছি রয়েছি। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।

উল্লেখ্য, চলমান গাজা যুদ্ধে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪০ হাজার ৭৮৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এছাড়া আরো ৯৪ হাজার ২২৪ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছে

সূত্র : আল জাজিরা

অনলাইন জুয়ার দুর্গে যৌথ বাহিনীর হানা

মেহেরপুরের মুজিবনগরে অনলাইন ক্যাসিনোর মাস্টার এজেন্ট মোরশেদ আলম লিপুর বাগানবাড়িতে অভিযান চালিয়েছে সেনাবাহিনী ও র‍্যাবের একটি যৌথ দল।

সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৫ টার সময় মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার শিবপুর-বিশ্বনাথপুর গ্রামের মধ্যবর্তী সড়কে অবস্থিত বাগানবাড়ীটিতে অভিযান চালায় যৌথবাহিনী। মেহেরপুরের র‍্যাব-১২ সিপিসি ৩ এর কমান্ডার এএসপি মনিরুজ্জামান কালবেলাকে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

জানা গেছে, লিপু বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্ট হিসেবে স্বীকৃত। অভিযানকালে লিপুর অনুপস্থিতিতে সেখানে ৮ জনকে আটক করে যৌথবাহিনী। অবশ্য জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আটকৃতদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযান সম্পর্কিত বিষয়ে জানতে সেনাবাহিনীর মেহেরপুর জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ২৭ রেজিমেন্ট আর্টিলারির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাবিল আহমেদের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মেহেরপুরের র‍্যাব-১২ সিপিসি-৩ ক্যাম্পের কমান্ডার অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেন।

সিপিসি-৩ ক্যাম্পের কমান্ডার এএসপি মনিরুজ্জামান কালবেলাকে বলেন, ‘শিবপুরে লিপুর বাগানবাড়িতে অভিযানটি মূলত ছিল সেনাবাহিনীর। আমরা তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছি মাত্র। এর বেশি আমি কিছু বলতে পারব না ‘

সূত্র জানিয়েছে, বিট কয়েন বা ডিজিটাল মুদ্রার (ক্রিপ্টোকারেনসি) মাধ্যমে অনলাইনে জুয়া খেলা হয়। প্রায় ২৩০টি সাইটের মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় ডিজিটাল মুদ্রা কেনাবেচার লেনদেনে গত আড়াই বছরে প্রায় ১২ থেকে ১৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। রাশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশে এই টাকা পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন সময় জানিয়েছে কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থা।

রাশিয়া থেকে পরিচালিত এসব অনলাইন জুয়ার সাইট ও অ্যাপস তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে মেহেরপুর জেলা শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায়ে পর্যন্ত। এসব জুয়ার সাইট ও অ্যাপস ভার্চুয়ালি জুয়া খেলায় একেকটি এজেন্টের মাধ্যমে মাসে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। মেহেরপুরে জেলা শহরসহ গাংনী এবং মুজিবনগর এলাকার তরুণদের বড় অংশই এখন জুয়ার সাইট পরিচালনায় যুক্ত।

জানা গেছে, একজন জুয়ড়ি মোবাইল নম্বর এবং ইমেইলের মাধ্যমে এই বেটিং সাইট ওপেন করেন। অ্যাকাউন্টের বিপরীতে একটি ই-ওয়ালেট তৈরি হয়, যাকে জুয়াড়িরা ইউএসডিটি বলে। শুরুতে এর ব্যালান্স শূন্য থাকে। ওয়ালেটে ব্যালান্স যোগ করার জন্য নানা মাধ্যম রয়েছে। এর মধ্যে বিকাশ, নগদ, রকেট, উপায় এবং ট্রাস্ট এজিয়াটা অন্যতম। এগুলোর যে কোনো একটি বেছে নিলে সেখানে একটি এজেন্ট নম্বর দেখায় যেখানে ন্যূনতম ৫০০ টাকা দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে ই-ওয়ালেট বা ইউএসডিটি ব্যালান্স যুক্ত হয়ে যায়। এ টাকা অথবা ব্যালান্স দিয়ে তিনি পরবর্তীতে জুয়া খেলতে পারেন। প্রতিটি এজেন্ট অনলাইন জুয়ার প্রতি ট্রানজেকশনে ৯ শতাংশ করে কমিশন পান।

এর আগে জেলার শীর্ষ ৩২ জন অনলাইন জুয়াড়িকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। তাদের মধ্যে রয়েছেন মুজিবনগর উপজেলার কোমরপুর গ্রামের বাদল হালদারের ছেলে নিমাই হালদার ও গোপালপুর দক্ষিণপাড়া এলাকার খলিলুর রহমানের ছেলে বদরুদ্দোজা ওরফে রয়েল (৩৬), কোমরপুর গ্রামের মধু হালদারের ছেলে প্রসেনজিৎ হালদার (২৫), নজরুল ইসলামের ছেলে সুমন আলী (৪০), মাহফুজুর রহমান ওরফে নবাব (২৮), শিবপুরের মৃত শাহাজুলের ছেলে বিজয় ওরফে বিজয় শেখ, আব্দুর রশিদের ছেলে সাদ্দাম হোসেন (৩০), কোমরপুর গ্রামের মোস্তাফিজুর রহমান সুমন, নিমাই হালদার, নুরুজ্জামান ওরফে জামান মাস্টার, মুকুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম ওরফে লালন মাস্টার, মাদার আলী ওরফে মাদার মাস্টার, গোপালপুর গ্রামের পলাশ, কোমরপুর গ্রামের বিলু সর্দারের ছেলে শামীম রেজা, গাংনী উপজেলা শহরের উত্তপাড়া এলাকার মৃত আব্দুল কুদ্দুছের ছেলে মেহেরপুর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি শাহিদুজ্জামান শিপু, বঙ্গবন্ধু সৈনিকলীগের গাংনী উপজেলা শাখার সভাপতি ও গাংনী সরকারি ডিগ্রি কলেজের ক্লার্ক রবিউল ইসলাম, সাবেক ছাত্র নেতা জুবায়ের হোসেন উজ্জ্বল, বিপুল হোসেন চঞ্চল হোসেন ও জিয়াউর রহমান। কিন্তু যথোপযুক্ত আইন না থাকাতে এ সকল আসামিরা আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। আবারো চালাতে থাকে অনলাইন জুয়ার তৎপরতা।

এরও আগে ২০২১ সালের ১৪ নভেম্বর মোবাইল ফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের এজেন্ট সিম ব্যবহার করে অনলাইনে জুয়ার কারবারের সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গ্রেপ্তার হয়েছিলেন অনলাইন জুয়ার এজেন্ট মাহফুজুর রহমান নবাব (২৬), নবাবের স্ত্রী মনিরা আক্তার মিলি (২৪), মুরশিদ আলম লিপু (২৫), স্বপন মাহমুদ (২৭), নাজমুল হক (২১), আসলাম উদ্দিন (৩৫), শিশির মোল্লা (২১), সাদিক (২২) ও মাসুম রানা (২০)। এরপরই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়া এবং অনলাইন জুয়ার এজেন্ট সম্পর্কিত তথ্য সামনে আসে।

তৎকালীন সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক কামরুল আহসান সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সিআইডির নজরদারির ভিত্তিতে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। বিভিন্ন খেলাকে কেন্দ্র করে তারা রাশিয়াভিত্তিক বেটিং ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে জুয়ার কারবার করত। আর লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করত বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট সিম।

প্রথমবার গ্রপ্তারের সময় স্বপনের সিম থেকে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আট লাখ টাকা, লিপুর সিম থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকা ও নবাবের সিম থেকে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা লেনদেন হতো বলে জানিয়েছিল সিআইডি। মেহেরপুরের একাধিক মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন এসআর ও সেখানকার ডিপোর ম্যানেজার এ কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে জানিয়েছিলেন সিআইডির ঐ কর্মকর্তা।

মেহেরপুর জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি মামলার আসামি বদরুদ্দোজা ওরফে রয়েল কে জিজ্ঞাসাবাদে বের হয়ে আসে মেহেরপুরসহ বাংলাদেশে অনলাইন জুয়ার মাস্টার এজেন্ট কোমরপুর গ্রামের সোনা গাইনের ছেলে মাহফুজুর রহমান ওরফে নবাবের কথা। তার নেতৃত্বে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন আরও ১৫ জন সাব-এজেন্ট। পরবর্তীতে তারা সকলেই বিভিন্ন সাইটের মাস্টার এজেন্ট হয়েছেন। এদের মধ্যে অন্যতম গোপালপুর গ্রামের আমিরুল ইসলামের ছেলে শিশির বিশ্বাস, বিল্লাল গড়াইয়ের ছেলে দেলোয়ার হোসেন দিপু, কোমরপুর গ্রামের বিলু সর্দারের ছেলে শামীম, একই গ্রামের আনারুল মিয়ার ছেলে রুবেল, টুঙ্গীর শরিফের ছেলে পলাশ, মুজিবনগর শিবপুরের মৃত শাহাজুলের ছেলে বিজয় শেখ, একই গ্রামের জিনারুলের ছেলে লিপু গাজী, মোনাখালী গ্রামের আজহারুলের ছেলে মিলন, সাইদুর রহমান খোকনের ছেলে সাগর, কোমরপুর গ্রামের বাশার বিশ্বাসের ছেলে সজীব, ভাটপাড়া গ্রামের মৃত সিরাজের ছেলে বাবু, মেহেরপুর শহরের স্টেডিয়াম পাড়ার বখতিয়ার মাস্টারের ছেলে রুবেল, গাংনীর গাড়াডোব গ্রামের মৃত কিয়াম উদ্দিনের ছেলে আনেয়ার।

জেলা পুলিশের ঐ কর্মকর্তা আরও জানান, রয়েল নামের ওই অনলাইন জুয়াড়িকে গ্রেফতারের পর মামলা করা হয়। মামলাটি তদন্তের একপর্যায়ে এ চক্রের সদস্যদের অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়। জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ২৩০টি জুয়ার সাইটের মালিক ও এজেন্ট সম্পর্কে নানা তথ্য।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা বিভাগের এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, ‘মূলত অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সঠিক আইন না থাকাতে আটককৃতরা সব সময় প্রবেশনে মুক্তি পেয়ে যায়। এজন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে এক সময় অনলাইন জুয়ারদের ধরতে যথেষ্ট অভিযান পরিচালিত হলেও পরবর্তীতে অভিযানের গতি মন্থর হয়ে যায়।’

মেহেরপুর জেলা পুলিশ সুপার এস এম নাজমুল হক সম্প্রতি কালবেলাকে বলেন ,‘অনলাইন জুয়াড়িরা প্রযুক্তিতে অনেক এগিয়ে রয়েছে। ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করে চালানো হয় অনলাইন জুয়ার অ্যাপ। অনলাইন ক্যাসিনোর সাইটগুলোর ডোমেইন দেশের বাইরের। নির্ধারিত সময় পরপর এসব সাইটের আইপি পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণকারীরা। অনলাইন জুয়াড়িরা প্রতিনিয়ত কৌশল বদলে তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। অনলাইন জুয়া খেলা বন্ধে আমরা জিরো টলারেন্স প্রদর্শন করছি। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে এটি বন্ধ করা কষ্টসাধ্য। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।’

ডিবি কর্মকর্তা আরাফাতকাণ্ডে লজ্জিত এলাকাবাসী

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও নিয়ে সারা দেশের ন্যায় বরিশালেও ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় রাস্তায় পরে থাকা লাশ একটি ভ্যানে স্তূপ করছে পুলিশ সদস্য।

লাশের স্তূপ করতে ব্যস্ত পুলিশ সদস্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি হলেন ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক (তদন্ত) আরাফাত হোসেন। তিনি বরিশালের হিজলা উপজেলার হরিনাথপুর ইউনিয়নের পূর্বকান্দি গ্রামের মুন্সি বাড়ির বাসিন্দা আরিফ সিকদারের বড় ছেলে।

প্রায় দুই বছর আগে ঢাকা জেলার গোয়েন্দা বিভাগে যোগ দেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগে পড়াশোনা করেন।

তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আরাফাত সবার বড়। আরাফাত হোসেন গ্রামের সবার কাছে আরজু নামে বেশি পরিচিত। আরাফাতের বাবা আরিফ সিকদার বদরটুনি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনি হিজলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি।

গণমাধ্যম সূত্রে মানুষ জানতে পারেন, ঢাকার সাভারের আশুলিয়া থানায় গত ৫ আগস্ট এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং ভ্যানে তোলা ওই লাশগুলোর পরিচয় যেন নিশ্চিত না যায়, সে কারণে লাশগুলো পুড়িয়ে বীভৎস করে দেওয়া হয়েছে। এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও লাশ পোড়ানোর ঘটনায় পুলিশ সদস্য আরাফাত হোসেনের জড়িত থাকায় বিস্মিত ও লজ্জিত তার (আরাফাত) উপজেলা ও গ্রাম থেকে শুরু করে পুরো জেলার বাসিন্দারা।

আরাফাতের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, টিনশেডের দোতলা ঘরটি তালাবদ্ধ। তালাবদ্ধ ঘরের বিষয়ে একই বাড়ির বাসিন্দা ও আরাফাতের মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী সানজিদা বেগম বলেন, আরাফাতের ভাইয়ের স্ত্রী এক সঙ্গে তিন কন্যাসন্তান প্রসব করেছেন। তাদের দেখাশোনার জন্য প্রায় চারমাস আগে থেকে পরিবারের সবাই ঢাকায় আছেন।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওর বিষয়ে তিনি বলেন, ভিডিওটি আমি দেখেছি। হেলমেট হাতে পুলিশের ভেস্ট পরা লোকটি হলেন আমাদের আরজু (আরাফাত) ভাই। এই বাড়িতে বউ হয়ে এসেছি ১৬ বছর। এর মধ্যে আরজু ভাইকে হাতেগোনা কয়েকবার বাড়িতে আসতে দেখেছি। গত বছরও তিনি বাড়িতে এসেছিলেন। তার সম্পর্কে এলাকার কেউ খারাপ মন্তব্য করতে পারবেন না। তবে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে যা দেখলাম, তাতে পুরো বিষয়টিতে আরও মানবিক হওয়া যেত।

আরাফাতের গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন মেমনিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের দপ্তরি আব্বাস উদ্দিন বলেন, আরাফাত হোসেন আমাদের সিনিয়র বড় ভাই। এইচএসসি পাসের পরে তিনি ঢাকায় পড়াশোনা করেছেন। তাই এলাকায় যাতায়াত অনেকটা কম ছিল। তিনি কোনোদিন এলাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তবে তার বাবা আরিফ উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে।

তিনি বলেন, ভিডিও দেখার পর মন ভেঙে গেছে। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যাই হোক না কেন, মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে এভাবে তাচ্ছিল্য করা ঠিক হয়নি। এ ঘটনা দেখে তার ওপর এলাকাবাসীর শ্রদ্ধাবোধ কমে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুর মোহম্মদ সরদার বলেন, পুলিশের চাকরি নেওয়ার পর আরাফাত গ্রামের বাড়িতে কম আসত। আরাফাতকে জড়িয়ে আশুলিয়া থানায় এলাকায় ভ্যানে লাশ উঠানো নিয়ে নানা কথাশুনে প্রথমে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। পরে ভিডিও দেখে নিজের কাছেই খুব খারাপ লেগেছে।

তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের ছেলে হয়ে এমন কাজটি সে করতে পারেন না। তার এ কর্মকাণ্ডে শুধু হরিনাথপুর কিংবা হিজলা উপজেলার মানুষই নয় পুরো বরিশালবাসী এ ঘটনায় লজ্জিত।

বায়তুল মোকাররম ব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ ধর্ম উপদেষ্টার

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম পরিদর্শন করে সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন।

সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) বিকালে তিনি আকস্মিক জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম পরিদর্শনে যান। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

জানা গেছে, বায়তুল মোকাররম মসজিদের ওযুখানা, ওয়াশরুম, প্রস্রাবখানা, মসজিদের পার্কিংসহ চতুর্দিক ঘুরে দেখেন ধর্ম উপদেষ্টা। এ সময় তিনি মসজিদের সিঁড়িতে যত্রতত্র ঘুমন্ত অবস্থায়ও বেশ কিছু মানুষকে দেখতে পান। পরে তিনি উপস্থিত মুসল্লিদের সাথে কথা বলেন। এ সময় জাতীয় মসজিদের বিভিন্ন কার্যক্রমসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন ধর্ম উপদেষ্টা।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি পরিদর্শন করে তিনি বলেন, লাইব্রেরি পর্যায়ক্রমে ডিজিটালাইজড এবং জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া বই নির্বাচন ও ক্রয় প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহি করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনা প্রদান করেন তিনি।

পরিদর্শনে জাতীয় মসজিদের শৌচাগার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে কথা বলে ধর্ম উপদেষ্টা মসজিদের দোকান ভাড়া হতে প্রাপ্ত অর্থ থেকে আপাতত মসজিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করার নির্দেশনা প্রদান করেন। সবশেষ গণমাধ্যমের কাছে জাতীয় মসজিদে ইবাদতের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ধর্ম উপদেষ্টা।

উল্লেখ্য, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের স্থায়ীভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ইতোমধ্যে ২২ কোটি টাকার একটি টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। জাতীয় মসজিদ পরিদর্শনকালে ধর্ম উপদেষ্টার একান্ত সচিব ছাদেক আহমদ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় ছিল দুই সরকারের মাঝে, জনগণের মাঝে এই সম্পর্ক চাই: উপদেষ্টা

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে সোনালি অধ্যায় ছিল দুই দেশের সরকারের মাঝে, জনগণের মাঝে নয়। তাঁরা চাইছেন, দুই দেশের জনসাধারণের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে উঠুক। দুই দেশের মানুষের মাঝে এই বিশ্বাস তৈরি হোক যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খুব ভালো আছে। আজ সোমবার বিকেলে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

শেখ হাসিনার শাসনামালে দুই দেশের সম্পর্কের সোনালি অধ্যায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় ছিল দুই সরকারের মাঝে। আমরা চাই, সুসম্পর্ক থাকুক জনসাধারণের পর্যায়ে, মানুষ সেটাতে যুক্ত হোক। মানুষ মনে করুক, আসলে খুব ভালো সম্পর্ক। সেটা যে ছিল না, এটা স্বীকার করা ভালো। মানুষের মাঝে ক্ষোভ ছিল, সেগুলো প্রশমন করা সম্ভব।’

বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে বর্তমানে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এ দুটোর একটাকেও আমি ঠিক মানছি না। আমি মনে করি, কোনো এক পর্যায়ে, কোনো এক কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে একটু টানাপোড়েন ছিল। স্বাভাবিক একটা সম্পর্কে যদি উন্নীত হয়, আমাদের সবার খুশি হওয়া উচিত। আমরা তো সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব চাই। পাকিস্তানের সঙ্গে তো এখন আমাদের শত্রুতা করে কোনো ফায়দা নেই।’

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে একটু টানাপোড়েন চলছে, সেটা দ্বিপক্ষীয়ভাবে আমাদের সমাধানের চেষ্টা করতে হবে। তবে আমরা একটা কথা মনে করি, সম্পর্ক মানুষকেন্দ্রিক হতে হবে। আসলে এমন হতে হবে যেন মানুষও মনে করে যে সম্পর্কটা ভালো।’

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এটা তো বিচার করবেন আরও অনেক পরে। তখন দেখবেন যে আমাদের কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না। এই মুহূর্তে আমরা একটা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এখন আপনি বিচার করতে পারবেন না, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি কি না। তাৎক্ষণিক আমি কোনো সমস্যা দেখছি না।’

বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ভারতীয় গণমাধ্যমে যেটা হয়েছে, সেটা একেবারে ‘মিথ্যার বেসাতি, বাড়াবাড়ি’। এই বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, ‘বিপ্লব সাধিত হওয়ার পর কিছু বিশৃঙ্খলা থাকে। এখানে একটা বিপ্লব হয়েছে। এটা মেনে নিতে হবে। কিছু বিশৃঙ্খলা ছিল, সেখানে কিছু দুর্ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। সেটা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম যেভাবে লেগে পড়েছিল…বিশ্ব গণমাধ্যমে যারা নিরপেক্ষ, তারা কেউ কিন্তু ভারতীয় লাইনটাকে গ্রহণ করেনি।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো দিল্লিতে আছেন কি না বা তিনি অন্য কোথাও চলে গেলে জানতে পারবেন কি না, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ওনার সঙ্গে তো আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। উনি ভারতের আশ্রয়ে আছেন। যদি উনি অন্য কোনো দেশে চলে যান, সেটা তো আপনাদের আমার কাছ থেকে জানতে হবে না। আপনারা নিজেরাই জানতে পারবেন। আপনারা যেভাবে জানবেন, আমিও হয়তো সেভাবে জানব। কারণ, এটা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পত্রপত্রিকায়, গণমাধ্যমে চলে আসবে। এটা নিয়ে আমরা চিন্তা করছি না।’

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর টানাপোড়েন চলছিল বলে অভিমত ব্যক্ত করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘এটা স্বীকার করে নেওয়া ভালো। যেসব ইস্যুতে টানাপোড়েন চলছিল, সেগুলো কিন্তু এই সরকারের যে এজেন্ডা আছে বা ছাত্র-জনতার যে এজেন্ডা এসেছে, তার সঙ্গে কিন্তু সংগতিপূর্ণ। আমি চূড়ান্তভাবে কোনো দ্বন্দ্বের সুযোগ দেখি না। তারা (পশ্চিমাদের সঙ্গে) যেসব ইস্যুতে উদ্বিগ্ন ছিল, আমাদের ছাত্ররা যেসব ইস্যুতে উদ্বিগ্ন ছিল।’

কারও হঠকারিতায় বিএনপির ক্ষতি সহ্য করা হবে না: তারেক রহমান

দলের নেতা-কর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ, বঞ্চনা সহ্য করে বিএনপি জনগণের যে আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করেছে, তা দলের কিছু বিপথগামীর হঠকারিতায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না, তিনি যে–ই হোন না কেন। তিনি বলেন, ‘আপনারা দলের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারীদের চিহ্নিত করুন, প্রতিরোধ করুন, দল তাঁদের শুধু বহিষ্কারের অঙ্গীকারই নয়, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দিচ্ছে।’

তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের অংশ হিসেবে সোমবার খুলনা বিভাগের সভায় তারেক রহমান কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে এ কথা বলেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ওপর তাঁর অগাধ আস্থার কথা জানিয়ে এ বিষয়ে এক-এগারোর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দলের সব সংকটে তৃণমূলই ছিল বিএনপির শক্তি। তারা শত প্রলোভন আর নির্যাতন উপেক্ষা করে ইস্পাতকঠিন ঐক্য দিয়ে দলকে ধরে রেখেছে। তৃণমূল সঙ্গে থাকলে দল যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে যেমন সক্ষম হবে, তেমনি দল পরিচালনা করা তাঁর পক্ষেও অনেক সহজ হবে।

তারেক রহমান জনগণের প্রত্যাশা পূরণ ও আগামীর আধুনিক বাংলাদেশ গড়তে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের ৩১ দফা কর্মসূচির মূল বিষয়গুলো তুলে ধরে এই বার্তা দেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর নির্দেশ দেন।

এ সময় তারেক রহমান ক্ষমতায় গেলে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘জনগণের ভোটাধিকার নির্বিঘ্ন করতে ১৯৯৬ সালে বিএনপি দলীয় সরকারের পরিবর্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত করেছিল। কিন্তু ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার তা সংবিধান থেকে মুছে দিয়ে তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে। আমরা জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে আবারও সংযুক্ত করতে চাই।’

শেষ বৈঠকে হাসিনা এবং কোটি কোটি টাকা

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগের দিনও গণভবনে কোটি কোটি টাকা ছিল। কয়েকজন কর্মকর্তা এই টাকার দায়িত্বে ছিলেন। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র মানবজমিনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। ৪ঠা আগস্ট রাতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিক নেতা ও নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। এই সময় টাকা বিলি-বণ্টন করা হয় । সর্বশেষ বৈঠকটি হয় তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পাঁচজন নেতা ও কর্মকর্তার সঙ্গে। এর মধ্যে ছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, জুনাইদ আহমেদ পলক ও মোহাম্মদ আলী আরাফাত। এছাড়া ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান ও একজন লেফটেনেন্ট জেনারেল। সেই বৈঠকে হাসিনা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। বলেন, আর অপেক্ষা নয়। আর আপস নয়। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে হবে। বৈঠকে যোগ দেন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন।

মানবজমিন জানতে পেরেছে, বৈঠকে আইজিপি জানান, পুলিশের পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না। একদিকে গুলির সংকট, অন্যদিকে জন-উপস্থিতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গুলি করেও থামানো যাচ্ছে না। যদিও এ সময় শেখ হাসিনা আইজিপির প্রশংসা করেন। তবে সবার কথা শেষে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, তোমাদের দিয়ে কিছু হবে না। আমি সেনাবাহিনীকে বলবো গুলি করতে। কারফিউ আরও কঠিন করতে। সেনাবাহিনীর তরফে আগেই জানানো হয়েছে কোনো অবস্থাতেই তারা গুলি করবে না। হাসিনা এটা শোনার পর কোনো একজন কর্মকর্তাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি তোমাদের জন্য কী না করেছি! তোমরা এখন সবাই গা বাঁচানোর চেষ্টা করছো। যা করার আমিই করবো। হাসিনা তখন আরও বলেন, সেনাবাহিনী মার্শাল ল’ দিচ্ছে না কেন। তাহলেই তো পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হয়ে যাবে।

মানবজমিন এটাও জানতে পেরেছে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন  মার্শাল ল’র পক্ষে তাদের সায় নেই। মার্শাল ল’ দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা সম্ভব নাও হতে পারে। তাছাড়া  বিশ্ব পরিস্থিতিও মার্শাল ল’র অনুকূলে নয়। এখানেই বৈঠক শেষ হয়ে যায়। একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, আন্দোলনকে বিপথগামী করতে টাকা ছড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়। তখন গণভবনে গচ্ছিত টাকা দেয়া হয় নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে। পরদিন পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এই সময় গণভবনে লুট হয়। লুটকারীরা টাকাও নিয়ে যায়। তবে কত কোটি টাকা ছিল জানা সম্ভব হয়নি। পঞ্চান্ন লাখ টাকা উদ্ধার করে সেনাবাহিনীর হাতে দেয় জনতা।

কঠোর অবস্থানে বিএনপি’র হাইকমান্ড তবুও চলছে দখল-চাঁদাবাজি by কিরণ শেখ

দখল-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে বিএনপি’র হাইকমান্ড। দফায় দফায়  দেয়া হচ্ছে সতর্কবার্তা। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দখল-চাঁদাবাজির বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন। হুঁশিয়ারির পরও বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নামে দখল-চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, হাট-বাজার, ফুটপাথ, বস্তি, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে নিয়ন্ত্রণ নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন হুমকি-ধামকি। আবার কেউ চাইছেন ঠিকাদারি, কেউ দাবি করছেন চাঁদা, কেউ ব্যস্ত চেয়ার দখল নিয়ে। দখল করছেন ব্যাংক, খাসজমি এবং পুকুরও।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে এস আলমের একটি কারখানা থেকে বিলাসবহুল অন্তত ১৪টি গাড়ি বিএনপি নেতাদের তত্ত্বাবধানে সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগে গত রোববার রাতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ইউনিট কমিটির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক ও সদস্য মামুন মিয়ার প্রাথমিক সদস্য পদ স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে  চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ইউনিট বিলুপ্তও ঘোষণা করা হয়েছে।

পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক দল চট্টগ্রাম মহানগর শাখার সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আলী মুর্তজা খানকে দলের প্রাথমিক সদস্য পদসহ সকল পর্যায়ের পদ থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছে। এই ঘটনায় কক্সবাজারে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের গ্রুপের গাড়ি ব্যবহারের জন্য দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে ব্যাখ্যা দিতে বলেছে বিএনপি। একই সঙ্গে যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে দলটি । খোকনের বিরুদ্ধে বিতর্কিত ডায়মন্ড ব্যবসায়ী দিলিপ কুমার আগারওয়ালার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ উঠেছে। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, কক্সবাজারে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের গ্রুপের গাড়ি ব্যবহারের জন্য সালাহউদ্দিন আহমেদকে এবং বিতর্কিত ডায়মন্ড ব্যবসায়ী দিলীপ কুমার আগারওয়ালার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগে খোকনকে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

নিজ নির্বাচনী এলাকা কক্সবাজারে সংবর্ধনা নিতে যাওয়ার সময় ব্যবহৃত গাড়িটি এস আলম গ্রুপের ছিল তা জানতেন না বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তারপরও এই ‘অসাবধানতা ও অনিচ্ছাকৃত’ ভুলের জন্য দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এই বিএনপি নেতা। তিনি বলেন, যদি দেশবাসীর মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি, অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকি সেজন্য আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

খায়রুল কবির খোকন বলেন, ৩১শে আগস্ট আনুমানিক রাত ৮টায় আমি গুলশানের একটি রেস্তরাঁয় (অবশ্যই কোনো পাঁচ তারকা হোটেল নয়) আমাদের ২০০১-২০০৬ শাসনামলে প্রধানমন্ত্রীর তৎকালীন প্রটোকল অফিসার ফরিদুল ইসলামের (যিনি দীর্ঘবছর ধরে পদবঞ্চিত হয়েছিলেন) সঙ্গে দলের গুলশান কার্যালয়ে যাওয়ার পথে সাক্ষাৎ করতে যাই আমার জেলা নরসিংদীর জন্য একজন যোগ্য, সৎ জেলা প্রশাসক নিয়োগের স্বার্থে কথা বলতে। ওখানে স্বাভাবিকভাবেই অবস্থানকালে পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে আমরা একত্রে চা পান করি ও  পারস্পরিক কুশলাদি বিনিময় করি। এসময়ে এনামুল হক দোলন নামে আমার এক আত্মীয় আমাকে ফোন করে আমি কোথায় আছি, জানতে আগ্রহ প্রকাশ করে জানালে সে ক্রাউন প্লাজার রেস্টুরেন্টে এসে আমার সঙ্গে দেখা করে।  আমার আদৌ জানা ছিল না দোলন আমার সঙ্গে দেখা করতে আসার নামে তার সঙ্গে অন্য কাউকে নিয়ে আসবে কিনা, কিন্তু ঘটনাস্থলে এসে দোলন তাদের সমিতি সংক্রান্ত সমস্যার কথা তুলতে গিয়ে দিলীপ আগারওয়াল নামক জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। আগারওয়ালা নামের ব্যক্তিকে আমি কখনোই চিনতাম না। তার সঙ্গে আমার পূর্ব পরিচয়ও ছিল না। ঘটনাটি একেবারেই  আকস্মিক, যা আমাকে রীতিমতো বিব্রত ও অপ্রস্তুত করেছে।

এ ছাড়া মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার শিমুলিয়া ফেরিঘাট, মাছঘাট ও ট্রলার ঘাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে বিএনপি’র দুই নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠন পরিপন্থি কাজের জন্যই দলটির লৌহজংয়ের কুমারভোগ ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি কাউসার তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন জনিকে দল থেকে বহিষ্কারের এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওদিকে ঢাকা মহানগরের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজদের শেল্টার দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম নয়নের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক দখলের চেষ্টায়ও জড়িত হওয়ার অভিযোগ উঠে।

এস আলম গ্রুপের হয়ে মোটা টাকার বিনিময়ে নয়ন ও তার অনুসারীরা ব্যাংক দখলে ভাড়াটে হিসেবে কাজ করেন বলে অভিযোগ উঠে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আলহাজ মোশাররফ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধেও সাবেক এমপি হাজী মোহাম্মদ সেলিম এবং তার ছেলে মোহাম্মদ সোলায়মান সেলিমকে শেল্টার দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগে খোকনকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, যেহেতু আপনার বিরুদ্ধে পতিত স্বৈরাচার, ছাত্র-জনতার খুনি হাসিনার অপকর্মের সহযোগী, অসংখ্য চাঁদাবাজি, হত্যা, বিএনপিদলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী সাবেক এমপি হাজী সেলিম এবং তার পুত্র বিনা ভোটের সংসদ সদস্য সোলায়মান সেলিমকে আশ্রয়, প্রশ্রয় এবং পুনর্বাসন চেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগসমূহ দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। সেহেতু আপনার বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, এজন্য তিন দিনের মধ্যে সশরীরে লিখিতভাবে দলীয় কার্যালয়ে এসে জবাব দেয়ার জন্য বলা হয়। এই নোটিশের জবাব তিনি দিয়েছেন তা জানা যায়নি।এদিকে ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ জামাল চৌধুরী আদিত্যের বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহজাহানপুরে বিভিন্ন দোকানে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে রাজধানীর শাহজাহানপুরে বিভিন্ন দোকানে চাঁদাবাজি ও দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই অভিযোগে গত ৮ই আগস্ট কেন্দ্রীয় ছাত্রদল থেকে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। নোটিশে বলা হয়, ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা ছাত্রদলের দায়িত্বশীল পদে আসীন থেকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আপনার বিরুদ্ধে কেন স্থায়ী সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, এই মর্মে দুইদিনের মধ্যে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে ব্যাখ্যা প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়।

ওদিকে গত ৫ই আগস্টের পর আজিজুর রহমান মুসাব্বির কাওরান বাজারে প্রায় ৫০০ দোকান দখল করেছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিনি জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। এই অভিযোগে গত ১২ই আগস্ট তার পদ স্থগিত করা হয়। এদিন তাকে পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের দলীয় পদ স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তার রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থগিত থাকবে। একই সঙ্গে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক শরীফ উদ্দিন জুয়েলের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজি এবং দখলের অভিযোগ উঠেছে। তার নেতৃত্বেই ঢাকা উত্তরে বিভিন্ন দোকানে চাঁদাবাজি ও স্থাপনা দখলের অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া লুটপাট, চাঁদাবাজি এবং দখলের অভিযোগে ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রদলের সভাপতি শাহিনুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক জুলহাস মৃধা, সরকারি বাঙলা কলেজ ছাত্রদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোকলেছুর রহমান এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক বি এম আলমগীর কবিরসহ বিএনপি’র এবং এর অঙ্গসংগঠনের বেশ কয়েকজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী মানবজমিনকে বলেন, গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপি’র কর্মীদের অনেক জায়গা-জমি দখল করেছে। এজন্য ক্ষোভের তীব্রতা অনেক বেশি। আর এসব কাজ বেশির ভাগই করছে দুষ্কৃতকারীরা। আপনারা দেখেছেন, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা যুবদলের নামে চাঁদাবাজি ও দখল করছেন। আর বিএনপি’র যারা এসব কাজ করছেন তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। পদ স্থগিত এবং বহিষ্কারও হয়েছে। বিএনপি এসব প্রশ্রয় দেয় না এবং ভবিষ্যতেও দেবে না।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের সাক্ষাৎ: বাংলাদেশের পাশে থাকবে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন করবে এবং ঢাকার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্ক আরও জোরদার করবে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হেলেন লাফেভ। গতকাল ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় হেলেন লাফেভ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এসময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এমন মনোভাবের কথা তুলে ধরেন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। সাক্ষাৎকালে হেলেন লাফেভ বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে অভিনন্দন জানাতে পেরে যুক্তরাষ্ট্র আনন্দিত। আগামী দিনগুলোতে ঢাকা ও ওয়াশিংটন আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি। হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভিসা প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস চলতি সপ্তাহে কনস্যুলার সেবা পুনরায় চালু করবে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শ্রম, আইনের শাসন এবং রোহিঙ্গা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে ঘনিষ্ঠভাবে সহায়তা করবে। ওয়াশিংটন যুক্তরাষ্ট্রে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন ইতিমধ্যে শুরু করেছে এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুততর হবে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় দাতা যুক্তরাষ্ট্র। এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর ফলে রোহিঙ্গাদের মাসিক খাদ্য সহায়তার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র পাশে থাকায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বহুমাত্রিক সহায়তার ক্ষেত্রে কক্সবাজারের ক্যাম্পে বসবাসরত দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।
অন্তর্বর্তী সরকার আমূল সংস্কার কার্যক্রম সম্পাদনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা যুক্তরাষ্ট্রের এই কূটনীতিককে বলেন, একটি যৌক্তিক সময় পরে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশে বন্যাদুগর্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে দাতাগোষ্ঠীকে একটি ‘কমন প্ল্যাটফরম’ গঠন এবং সমন্বিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। সাক্ষাৎকালে যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হেলেন লাফেভ বাংলাদেশের শ্রম পরিস্থিতি এবং সংখ্যালঘুদের বিষয় নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিক ‘সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত’ এবং অন্তর্বর্তী সরকার সকল নাগরিকের মানবাধিকার সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সাক্ষাৎকালে মানবাধিকার ইস্যু, সাইবার সিকিউরিটি আইন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) ও বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জানান, ন্যায়বিচার নিশ্চিতের লক্ষ্যে তার সরকার বাংলাদেশে একটি প্রসিকিউটোরিয়াল সার্ভিস স্থাপনে সহায়তা করার চেষ্টা করছে।
ড. ইউনূসকে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের অভিনন্দন
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সোমবার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি ফোন করে ড. ইউনূসকে এ অভিনন্দন জানান। ফোনালাপে ইউএনএইচসিআর প্রধান নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য তিনি ‘অবিশ্বাস্য দায়িত্ব’ গ্রহণ করেছেন। ফোনালাপে উভয় নেতা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে চলমান সংঘাতের কারণে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষের বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে। অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত দশ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সম্মানজনক এবং স্বেচ্ছায় নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য তার সহায়তা কামনা করেন। তিনি বাংলাদেশের ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা তরুণ রোহিঙ্গা সন্তানদের একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গঠনে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার সহায়তা কামনা করেন।
ইউএনএইচসিআর হাইকমিশনার নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে একটি সাইডলাইন বৈঠকের জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে আমন্ত্রণ জানান। ফিলিপ্পো গ্রান্ডি প্রধান উপদেষ্টাকে জানান, এ বছর অক্টোবর মাসে তার বাংলাদেশ সফরের পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও আশার আলো জাগাচ্ছে by জে. মনোজ মুকুন্দ নারাভানে

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে যে, কোনো বিপ্লব সমাজ, সরকার এবং বিশ্বকে পুনঃনির্মাণ করেছে।   অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক স্তরে অবিচার থেকে উদ্ভূত হয় বিপ্লব। অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন- এসবের থেকেই জন্ম নেয় ক্ষোভ-যা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। বিপ্লবগুলোও সাধারণত অদ্ভুত মোড় নেয়। একটি প্রতিবাদ সীমিত লক্ষ্য মাথায় রেখে শুরু হতে পারে কিন্তু এর ফলাফল হতে পারে অপ্রত্যাশিত। অনেক সময় বিভিন্ন এজেন্ডা এবং গোপন স্বার্থ  প্রায়শই মূল প্রতিবাদকে   হাইজ্যাক করে নেয়।   দ্য প্রিন্টে একথা লিখেছেন ভারতীয় সেনার  একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মনোজ মুকুন্দ নারাভানে।

ইতিবাচক ফল: সফল বিপ্লবগুলো বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের দিকে নিয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকান বিপ্লব (১৭৭৫) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার দিকে পরিচালিত করেছিল।
মিশ্র ফল: ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯) রাজতন্ত্রকে উৎখাত করে, দেশে একটি প্রজাতন্ত্র গঠনের  দিকে পরিচালিত করেছিল, কিন্তু এর ফলে সন্ত্রাসের রাজত্ব এবং শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উত্থান ঘটে। একইভাবে,  জর্জিয়া (২০০৩), ইউক্রেন (২০০৪) এবং কিরগিজস্তানে (২০০৫) বিপ্লবগুলো উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং গণতান্ত্রিক লাভ অর্জন করেছে, টেকসই সংস্কার এবং স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য তুলে ধরেছে।
নেতিবাচক ফল: কিছু বিপ্লব  উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়,  যা থেকে জন্ম নেয় ব্যাপক বিশৃঙ্খলা। উদাহরণস্বরূপ, আরব বসন্ত (২০১০-১২) সিরিয়া এবং লিবিয়ার মতো দেশে গৃহযুদ্ধের দিকে পরিচালিত করেছিল।
বাংলাদেশের বিপ্লব
৫ই আগস্ট, বাংলাদেশে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ফলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ বহু বছর ধরে জমে থাকা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলোর দ্বারা উদ্দীপিত হয়েছিল। যা ক্রমেই একটি পূর্ণ মাত্রার বিপ্লবের রূপ নেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের বংশধরদের জন্য সরকারি চাকরিতে একটি বিতর্কিত কোটা পদ্ধতির  পুনঃস্থাপন,  বিক্ষোভের একটি প্রধান কারণ ছিল। এই ব্যবস্থাটিকে অনেক শিক্ষার্থী অন্যায্য বলে মনে করেন,  বিশেষ করে যখন বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব বিদ্যমান। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে সরকারের কঠোর প্রতিক্রিয়া, যার মধ্যে বলপ্রয়োগ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত ছিল পরিস্থিতিকে আরও জটিল  করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, ছাত্রনেতা আবু সাঈদের মৃত্যু আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে অর্থবহ সংলাপের উল্লেখযোগ্য অভাব ছিল। গঠনমূলক সম্পৃক্ততা এবং সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ মোকাবিলা করা হয়তো এই গণবিক্ষোভ  রোধ করতে পারতো। বিপ্লব শুধু কোটা পদ্ধতি নিয়ে নয়, দুর্নীতি, স্বচ্ছতার অভাব এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিস্তৃত বিষয় নিয়েও ছিল। এই পদ্ধতিগত সমস্যাগুলোকে সক্রিয়ভাবে মোকাবিলা করলে অস্থিরতা প্রশমিত হতে পারতো। একটি সরকার যা  ক্রমবর্ধমানভাবে  কর্তৃত্ববাদী এবং  বাস্তবতা থেকে দূরে, বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছিল।
ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা
যদিও বিপ্লবের তাৎক্ষণিক দাবিগুলো উন্নত শাসন এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে, গভীরভাবে বসে থাকা সমস্যাগুলোর জন্য ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। বিক্ষোভের পুনরুত্থান রোধ করতে বর্তমান ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগুলোকে মোকাবিলা করতে হবে। আসলে এই বিক্ষোভের পেছনে ছিল দীর্ঘস্থায়ী হতাশা,  যা সব সীমা অতিক্রম করে যায়। বাংলাদেশে ছাত্র বিপ্লবের ভবিষ্যৎ আশাপ্রদ, যা উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে, অনেকটা পোল্যান্ডে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মতো (১৯৮০)। বাংলাদেশ এবং পোল্যান্ড উভয় ছাত্র বিক্ষোভে, বিশ্ববিদ্যালয় এবং হোস্টেলগুলো কার্যকলাপ এবং পরিকল্পনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দুই দেশের সরকারও কড়া হাতে বিক্ষোভ দমানোর চেষ্টা করেছিল, ফলে বিপুল সংখ্যক হতাহতের ঘটনা ঘটে এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। সামনের দিকে এগোতে হলে বাংলাদেশে সতর্ক নেতৃত্ব এবং প্রতিবাদ উদ্রেককারী অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলোর সমাধানের  প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। ইতিমধ্যে এই প্রতিবাদ উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনেছে যা দেশের ভবিষ্যৎকে ভালোভাবে গঠন করতে পারে। নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে একটি অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এবং এতে সিনিয়র পদে ছাত্র নেতাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সরকার দেশকে স্থিতিশীল করার জন্য কাজ করছে এবং আন্দোলনকারীদের দাবির সমাধান করছে। নতুন যে   অশান্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে  পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। ছাত্র আন্দোলনকারীরা তাদের আন্দোলনকে টিকিয়ে রাখতে এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের কথা ভাবছে, অবশ্যই  ‘বেগমদের যুদ্ধ’-এর বাইরে গিয়ে। এই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিবাদ থেকে সক্রিয় রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার রূপান্তরকে প্রতিফলিত করে। অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক ব্যবস্থার  পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও, ভবিষ্যৎ আশার আলো জাগাচ্ছে জনগণের মনে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এমন একটি চ্যালেঞ্জ যা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মোকাবিলা করতে হবে। তরুণ নেতাদের সম্পৃক্ততা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারের জন্ম দেয়। বিপ্লব আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলোকে তুলে ধরেছে।
ভারতের ওপর  প্রভাব
ভারতের যেকোনো প্রতিবেশী দেশে, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে দেশটি  স্থল সীমান্ত ভাগ করে, যেমন পাকিস্তান বা মিয়ানমার, সবসময় ভারতকে    প্রভাবিত করে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশের ছাত্র বিপ্লব ভারতের জন্য বেশ কিছু প্রভাব ফেলে:
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক: এই উত্থান ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অবনতির দিকে নিয়ে গেছে, যা আগে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। ভারত তার দীর্ঘস্থায়ী মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ না করে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণ করেছে। যদিও ভারত জোর দিয়েছিল যে এই অস্থিরতা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়, তবুও  সহিংসতার মধ্যে ছাত্র সহ হাজার হাজার ভারতীয় নাগরিকের নিরাপদে  প্রত্যাবর্তনের সুবিধাও করে দিয়েছে দেশটি।
অর্থনৈতিক প্রভাব: এই বিক্ষোভ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাণিজ্য ব্যাহত করেছে, ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। বিশেষ করে সেইসব ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন যাদের  বাংলাদেশে কোম্পানি রয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগ: ভারতে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে বিক্ষোভের সম্ভাব্য  প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তৃতীয় ফ্রন্টের হুমকি সহ যেকোনো আন্তঃসীমান্ত প্রভাব ঠেকাতে ভারতকে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিশেষ করে দু’ দেশের সামরিক পর্যায়ে সম্পৃক্ততা  প্রয়োজন, কারণ ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
মানবিক এবং সামাজিক প্রভাব: সহিংসতা এবং অস্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রবাসীরা উদ্বিগ্ন, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা মেডিকেল প্রোগ্রামে ভর্তি হয়েও ভারতে ফিরে আসছে। এর আগে ইউক্রেন (২০২২) এবং সুদান (২০২৩) থেকেও ভারতীয় নাগরিকদের সরিয়ে আনা হয়েছে। এই পরিস্থিতি বিদেশে ভারতীয় নাগরিকদের জন্য আরও ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার দিকটি  তুলে ধরে। বাংলাদেশে ছাত্র বিপ্লব প্রাথমিকভাবে একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও এর প্রভাব ভারতে অনুভূত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্যদের কাছ থেকে ভারত-বাংলাদেশের সকল চুক্তি  পর্যালোচনা করার আহ্বান সহ বাংলাদেশে ভারত বিরোধী মনোভাব ভালো লক্ষণ নয়।এই পরিস্থিতির জন্য ভারত সরকারের কাছ থেকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন, সমস্ত স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে যোগাযোগের চ্যানেলগুলো উন্মুক্ত রাখা আবশ্যক।
লেখক: ভারতীয় সেনার  একজন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল। যিনি ২৮তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারত পালিয়েছেন কয়েকশ’ নেতাকর্মী by ওয়েছ খছরু

প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়েছেন কয়েকশ’ নেতাকর্মী। গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে তারা ভারতে প্রবেশ করেন। পালিয়ে যাওয়া নেতাকর্মীরা ভারতের গৌহাটি, শিলং, ডাউকি, জোয়াইসহ কয়েকটি এলাকায় বসবাস করছেন। ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানা মাধ্যমে তাদের অবস্থানের বিষয়টি জানা গেছে। তবে ভারত পাড়ি দেয়া এসব নেতাকর্মীর অবস্থানের বিষয়টির চেয়ে আলোচিত হচ্ছে সীমান্ত পাড়ি দেয়ার ঘটনাটি। ইতিমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক আটক ও সীমান্তের ওপারে ছাত্রলীগের এক সময়ের সাধারণ সম্পাদক ইসহাক আলী খান পান্না নিহত হওয়ার খবরটি বেশ আলোচিত হয়েছে। এরপর থেকে সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানোর কারণে বর্তমানে পালিয়ে যাওয়ার সংখ্যা কমে এসেছে। সীমান্ত এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- বৃহত্তর সিলেটের কয়েকশ’ নেতাকর্মী ৫ই আগস্ট প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পরপরই ভারত পালিয়েছেন। এরমধ্যে সবচেয়ে আগে সিলেট ছাড়েন ছাত্রলীগের ৫০-৬০ জন নেতাকর্মী। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে তারা দেশ ত্যাগ করেন বলে জানিয়েছেন।

পরবর্তীতে সিলেটের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন খান, সাবেক এমপি এডভোকেট রঞ্জিত সরকার, আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদসহ বহু নেতা সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। শিলংয়ে অবস্থান করা কয়েকজন যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতার পারিবারিক সূত্র জানিয়েছেন- ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলংসহ কয়েকটি এলাকায় ওখানকার পুলিশের কাছ থেকে অস্থায়ী পাসকার্ড নিয়ে অনেকেই অবস্থান করছেন। আবার অনেকেই আছেন অবৈধভাবে। রাজ্য কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে তেমন কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে না। ফলে বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে তারা নিরাপদেই বসবাস করতে পারছেন। তবে কতোদিন পর্যন্ত তারা অবস্থান করতে পারবেন, সেটি নিয়ে চিন্তিত দেশে থাকা নেতাকর্মীরা। ইতিমধ্যে সিলেটে দায়ের করা একাধিক মামলায়ও তারা আসামি হয়েছেন। আলোচনায় চোরাকারবারিরা: সীমান্ত এলাকার লোকজন জানিয়েছেন- সিলেট সীমান্তের কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে বিজিবি’র চোখ ফাঁকি দিয়ে নেতারা ভারতে প্রবেশ করেন। এসব সীমান্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেতাকর্মী ঢুকেছেন কানাইঘাটের ডোনা ও সুরইঘাটে সনাতনপুঞ্জি সীমান্ত দিয়ে। ডোনা সীমান্তে দিয়ে ভারতে প্রবেশের সময় বিজিবি’র হাতে আটক হয়েছিলেন সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন মানিক। গ্রেপ্তারের পর বহুল আলোচিত এ সাবেক বিচারপতি নিজেও জানিয়েছিলেন; সীমান্তে দালাল ধরে তিনি ভারতে প্রবেশের চেষ্টা চালান। পরে ওই দালালরাই তাকে মারধর করে সঙ্গে থাকা ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকা নিয়ে গেছে। লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের মেম্বার নাজিম উদ্দিনের মতে; সীমান্তের চোরাকারবারি সাদ্দাম, রাজু, রহিমসহ কয়েকজন ডোনা সীমান্ত এলাকা দিয়ে নেতাকর্মীদের পাচার করে ভারতে পাঠিয়েছে। বিচারপতি আটকের পর ঘটনাটি জানাজানি হলে তারা বর্তমানে আত্মগোপনে রয়েছে। আলোচনায় আসা সাদ্দাম হোসেন কুখ্যাত চোরাকারবারি। তার বিরুদ্ধে চোরাচালানের ঘটনায় ১৩টি মামলা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান তমিজ উদ্দিন মানবজমিনকে জানিয়েছেন; সাবেক বিচারপতি আটকের পর সীমান্ত দিয়ে নেতাকর্মীদের পাচারের খবরটি তার কাছে এসেছে। সাদ্দাম ও রহিম ওই সীমান্ত এলাকার সব অপরাধের মূল হোতা। সাবেক এমপি রঞ্জিত সরকার ও আওয়ামী লীগ নেতা আজাদ এ সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছেন বলে তিনি শুনেছেন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন- আওয়ামী লীগ নেতা ইসহাক আলী পান্নাও ওই সীমান্তের আরেকটি পয়েন্ট দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। ডোনা সীমান্তের ওপারে ভারতের অংশে একটি টিলার পাদদেশে তার মরদেহ পাওয়া যায়। সীমান্তের দালালরাই তাকে হত্যা করে সঙ্গে থাকা সব টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে- ডোনা, সোনাতনসহ কয়েকটি সীমান্তে নেতাকর্মীদের পাচারে সাবেক চেয়ারম্যান সোলেমান আহমদ, মেম্বার মোস্তাক আহমদের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে তারা দু’জনই বিষয়টি অস্বীকার করেছেন অভিযোগটি। সাবেক চেয়ারম্যান সোলেমান আহমদ জানিয়েছেন; তিনি জেলা বিএনপি নেতা। তার কর্তব্য হচ্ছে দুর্বৃত্তদের ধরিয়ে দেয়া। যেটি তিনি করেছেনও। কারা এই সীমান্ত এলাকায় মানুষ পাচার করে সবাই জানে বলে জানান তিনি। একই কথা মেম্বার মোস্তাক আহমদেরও। তিনি তথ্য দিয়ে জানান- সীমান্তে দালাল হিসেবে রাজু, শামীম, সাব্বির, সিরাজ, কাইয়ুম, সাজু, সাদ্দাম, কালামসহ কয়েকজন জড়িত রয়েছেন। এলাকার লোকজন তাদের সবাইকে চেনেন। এখানে আমার নাম উত্থাপন করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে। এদিকে গোয়াইনঘাটের মাতুরতল সীমান্ত এলাকা দিয়ে শতাধিক নেতাকর্মীদের ভারতে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হয়েছে। গোয়াইনঘাট ছাত্রলীগের সভাপতি সুফিয়ান ও সাধারণ সম্পাদক রাজীবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী এ সীমান্ত দিয়ে পাড়ি জমান। তারা নিজেরাও বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। সীমান্ত চোরাকারবারি দুলালসহ কয়েকজন তাদের পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে বলে জানিয়েছেন হাজীপুর, মাতুরতল এলাকার বাসিন্দারা। তারা জানিয়েছেন; ওই এলাকায় বিজিবি ক্যাম্প আক্রান্ত হওয়ার পর সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা কম ছিল। এই সুযোগে ওই এলাকা দিয়ে নেতাকর্মীরা ভারতে পালায়। এ ছাড়া আসামপাড়া, সোনাটিলা দিয়েও নেতাকর্মীরা ভারতে প্রবেশ করে। স্থানীয় দালালদের মারফতে তারা ভারতে পাড়ি জমান বলে জানান এলাকার লোকজন।

বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা আবারো সংবিধানে ফিরিয়ে আনবে: তারেক রহমান

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে আবারো বিএনপি ফিরিয়ে আনবে বলে জানিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সোমবার খুলনা বিভাগীয় তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভায় তিনি এ কথা বলেন। বিএনপি’র মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের মালিকানা এদেশের মানুষের, আর স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন তার ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার। দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে ১৯৯৬ সালে বিএনপি জনগণের ভোটাধিকার নির্বিঘ্ন করতে দলীয় সরকারের পরিবর্তে  তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে সংযুক্ত করেছিল। কিন্তু ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে, জনগণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত করার লক্ষ্যে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার সেটা সংবিধান থেকে মুছে দিয়ে তিন তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত রেখেছে। আমরা জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে আবারো সংযুক্ত করতে চাই।

তিনি বলেন, বিএনপি দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করে। মানুষের নিরাপত্তা, বাক-স্বাধীনতা, শান্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার, তরুণ ও যুবকের কর্মসংস্থান, নারীর মর্যাদা, নিরাপত্তা, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র-গোষ্ঠী, সমতল পাহাড়ি নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান রাষ্ট্রীয় অধিকার নিশ্চিত করা, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করা, বিচার, আইন ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, সকলের জন্য স্বাস্থ্য সুবিধা নিশ্চিত করা, কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি এবং সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করাই বিএনপি রাজনীতির অগ্রাধিকার।

তারেক রহমান বলেন, যে বাড়িতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাস করেছেন, যে বাড়িতে তার এবং তার ভাইয়ের শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, যে বাড়ি তার মায়ের সংসারের সূচনা, আর বেদনার সাক্ষী- সেই বাড়ি থেকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কতোটা অসম্মানজনক ও অন্যায়ভাবে উচ্ছেদ করা হয়েছে, সেটা দেশবাসী দেখেছে। বিনা চিকিৎসায় আমার একমাত্র ভাইকে নিদারুণ অবহেলায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে, ঠিক তেমনিভাবে দলের তৃণমূলের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে মামলা ও হামলায় জর্জরিত হয়ে পরিবার-পরিজন বিসর্জন দিয়ে, ব্যবসা ও চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে, হয় কারাগারে নয়তো আত্মগোপনে। অগণিত নেতাকর্মী অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন দেশকে ভালোবেসে এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে।
তিনি বলেন, বিএনপি যেমন অতীতের মতো প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করেন না তেমনি তিনি এবং দলের প্রধান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জানেন যে, দেশের মানুষও গত ১৭ বছর বাংলাদেশ নামের এক বৃহত্তর কারাগারে বন্দি জীবনযাপন করেছেন। সুতরাং আজ হিংসা নয় বরং দেশের মানুষের প্রত্যাশা পূরণের মাধ্যমে অতীতের সকল অন্যায়ের জবাব দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বছরের পর বছর ধরে আন্দোলন, সংগ্রাম, ত্যাগ বঞ্চনা সহ্য করে বিএনপি আজ জনগণের যে আস্থা আর ভালোবাসা অর্জন করেছে, দলের কিছু বিপথগামীদের হঠকারিতায় মানুষের সেই আস্থা আর প্রত্যাশার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হবে- সেটা কোনো ভাবেই সহ্য করা হবে না, সেটা তিনি যেই হোন না কেন।
তিনি বলেন, আপনারা দলের ভাবমূর্তি বিনষ্টকারীদের চিহ্নিত করুন, প্রতিরোধ করুন, দল তাদের শুধু বহিষ্কারের অঙ্গীকারই নয়, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও নির্দেশ দিচ্ছে।

দলের সকল সংকটকালে তৃণমূলই ছিল বিএনপি’র শক্তি, এরা শত প্রলোভন আর নির্যাতন উপেক্ষা করে ইস্পাত কঠিন ঐক্য দিয়ে দলকে ধরে রেখেছে। তৃণমূল সঙ্গে থাকলে দল যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে যেমন সক্ষম হবে তেমনি তার পক্ষেও অনেক সহজ হবে দল পরিচালনা।

দৃশ্যমান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের পাশাপাশি অসংখ্য অদৃশ্য প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, স্বৈরাচারের পতন শুধুমাত্র প্রাথমিক বিজয়, সামনে রয়েছে প্রকৃত পরীক্ষা ফলে আত্মতুষ্টি আর সকল শিথিলতা কাটিয়ে আগামীর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বাংলাদেশের আপামর জনগণের দলের প্রতি সমর্থন আর ভালোবাসার প্রতিদান দিতে হবে।

হাসপাতালে-হাসপাতালে দিনভর ভোগান্তির পর বহির্বিভাগ চালুর ঘোষণা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনায় ডাকা কর্মবিরোতির পর গতকাল সকাল থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের পাহারায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা চালু করা হয়েছে। তবে ঢামেকসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে দিনভর বন্ধ ছিল আউটডোর বা বাহির্বিভাগ সেবা। বহির্বিভাগের কিছু রোগীকে জরুরি বিভাগে সেবা দেয়া হলেও বেশিরভাগ মানুষই চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে গিয়েছেন। বন্ধ ছিল দীর্ঘদিন ঘুরে পাওয়া নির্ধারিত দিনের অস্ত্রোপচারও। এতে দেশের বিভন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা পড়েন চরম বিপাকে। দিনভর রোগীদের ভোগান্তির পর গতকাল বিকালে আন্দোলনরত চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়- মঙ্গলবার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত সীমিত পরিসরে বহির্বিভাগ সেবা চালু করা হবে। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সকাল ৮টা থেকে ১০টা স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে চলবে অবস্থান কর্মসূচি।

গতকাল সরজমিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই হাসপাতালটির বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা বন্ধ রয়েছে। তবে নিজেদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সেখানে ভিড় করছেন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেবা নিতে আসা মানুষেরা। কেউ আসছেন চিকিৎসকের কাছে রোগের ব্যবস্থাপত্র নিতে, কেউ আবার আসছে ঘুরে ঘুরে পাওয়া নির্ধারিত দিনের অস্ত্রোপচার করাতে। এমনই একজন নীলফামারীর আব্দুল মাজেদ মিয়া।

গতকাল তিনি ছোট ছেলেকে নিয়ে ঢামেকের আউটডোরে এসেছিলেন নিজের শরীরের অপারেশন করাতে। মাজেদ মিয়া বলেন, আমি সারারাত জেগে গাড়িতে করে নীলফামারী থেকে ঢাকায় এসেছি শুধু ডাক্তার দেখানোর জন্য। ভোরবেলা এই ঢাকা মেডিকেলে এসেছি। আজ আমার অপারেশনের ডেট ছিল। দুই-তিন মাস ঘুরে অনেক কষ্টে আজকের এই ডেট পেয়েছিলাম। কিন্তু এখানে এসে দেখি ডাক্তারা কেউ নেই। আউটডোরে চিকিৎসা দেয়া বন্ধ রয়েছে। অনেক অপেক্ষার পরে একজন বললো ইমার্জেন্সিতে যেতে। সেখানে গেলে বলা হয়-পরে আসতে। এখন আমি কী করবো, কোথায় যাবো কিছুই বুঝতে পারছি না। আত্মীয়-স্বজনের বাসাও নেই যে সেখানে গিয়ে উঠবো। এভাবে রোগীদের বিপদে ফেলা উচিত হয়নি। রফিক বিশ্বাস নামে আরেক রোগী বলেন, আমি ময়মনসিংহ থেকে ভোর সকালে এখানে এসেছি। এসে দেখি মেডিকেল বন্ধ। আমি সাধারণ একজন রিকশাচালক। আমাকে গত মাসে ডাক্তার একটা এমআরআই করে আসতে বলেছিল। আমি অনেক কষ্ট করে ৬ হাজার টাকা খরচ করে এই এমআরআইটা করিয়ে নিয়ে এসেছি। আজকে আমার অপারেশনের ডেট দেয়ার কথা। এখন দেখছি ডাক্তারই নেই। আমি এখন কী করবো। প্রাইভেটে গিয়ে তো আমার মতো লোকের চিকিৎসা নেয়া সম্ভব নয়। এ বিষয়ে বহির্বিভাগের ওয়ার্ড মাস্টার কাজী আবু সাঈদ বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনার জেরেই  গতকাল বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা রাখা হয়। বহির্বিভাগের গাইনি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. রাজিব বলেন, আমাদের চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনায় কমপ্লিট শাটডাউনের ঘোষণা দিয়েছিলাম আমরা। পরে নিরাপত্তা এবং দোষীদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের আশ্বাসে বহির্বিভাগ বন্ধ থাকলেও জরুরি বিভাগ সেবা চালু করা হয়েছে।
এদিকে হাসপাতালটির জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই সেখানে আগত রোগীদেরকে নির্দিষ্ট টিকিটের মাধ্যমে সেবা দেয়া হচ্ছে। এদের মধ্যে নারী, শিশু, হৃদরোগে আক্রান্তদেরকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। অনান্য  রোগীদেরকে পরে আসতে বলা হচ্ছে। আর যাদের অবস্থা একদই মুমূর্ষু শুধু তাদেরকেই ভর্তি নেয়া হচ্ছে হাসপাতালে। আর বহির্বিভাগের চিকিৎসাসেবা পুরোপুরি বন্ধ থাকায় সেখানকার রোগীদেরকে জরুরি বিভাগ থেকে সেবা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এতে উপচেপড়া রোগীদের ভিড়ে জরুরি বিভাগে সেবা দিতে হিমশিম খায় চিকিৎসকরা। এ সময় জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের মধ্যে অনেকেই মানসম্মত চিকিৎসা সেবার পরিবর্তে দায় এড়ানোর অভিযোগ তোলেন। জন্ডিসে আক্রান্ত  মায়সা নামে আড়াই বছরের মেয়েকে নিয়ে গতকাল ঢামেকে আসা বাবা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, গত তিনদিন ধরে আমি আমার মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরছি। কিন্তু কোনো চিকিৎসা পাচ্ছি না। তিনি বলেন, আমার মেয়ে অনেক অসুস্থ। গত পরশুদিন আমি ওকে নিয়ে নরসিংদী হাসপতালে যাই। সেখান থেকে মাতুয়াইল হাসপাতালে যায়। সেখান থেকে আবার গতকাল আমাদেরকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠানো হয়। এখানে এসে দেখি ডাক্তাররা কর্মবিরতীতে । পরে চলে যায়। আজ সকালে হাসপাতালের সেবা চালু হয়েছে বলে আবারো এখানে আসি। কিন্ত আমার মেয়েকে তেমন কোনো চিকিৎসা দেয়া হলো না। শুধু কয়েকটা ওষুধ দিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে বলা হয়েছে। ভর্তিও করা হলো না। এখন আমার মেয়ের কিছু হয়ে গেলে কে দায় নিবে।  হাসপাতালে ভর্তি রোগীরাও আগের মতো চিকিৎসা সেবা পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তাদের স্বজনরা। মিরাজ নামে ১১১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হওয়া এক রোগীর স্বজন বলেন, আগে তিনজন ডাক্তার আসলে এখন আসছে একজন। নার্সরাও তেমন দেখে না। আর অপারেশন বরাও বন্ধ রয়েছে। এই দুইদিনের নির্ধারিত অপারেশন কবে হবে তারও ঠিক নেই।
অপরদিকে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আউটডোর থেকেও প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১২শ’ রোগী চিকিৎসা নেন। তবে চিকিৎসকদের আন্দোলনে গতকাল সকাল থেকে চালু থাকলেও দুপুর ১২টা থেকে সেখানেই আউটডোর সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়। হঠাৎ করে বহির্বিভাগের সেবা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন দূর-দুরান্ত থেকে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা। সাভার থেকে গতকাল সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা সোহানুর রহমান বলেন, সকাল থেকে আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ১২টার দিকে হঠাৎ আউটডোর বন্ধ করে দিয়ে ডাক্তাররা চলে যায়। সবক’টি কাউন্টার বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন এই অসুস্থ শরীর নিয়ে আমি কোথায় যাবো। আমাদের মতো রোগীদের জিম্মি করে এমন আন্দোলন মোটেও উচিত নয় বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। মো. মাসুদ নামে আরেক রোগী বলেন, পায়ে ব্যথা নিয়ে হাঁটতে পারছি না। এরপর চিকিৎসা বন্ধ করে দেয়া হলো। আমার মতো শত শত মানুষ আজ এই আন্দোলনের কারণে ভোগান্তির শিকার। হাসপাতালটির সহকারী প্রধান পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এসএএম কামরুজ্জামান সূবর্ণ বলেন, মূলত ডাক্তারদের ধর্মঘটের কারণেই আউটডোর সেবা ১২টার পর বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে জরুরি বিভাগে রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
এদিকে দিনভর রোগীদের ভোগান্তির পর বিকাল ৪টার দিকে ঢাকা মেডিকেলের প্রশাসনিক ব্লকে এক সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনরত চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে নিউরো সার্জারি বিভাবের চিকিৎসক ডা. মো. আব্দুল আহাদ বলেন, জরুরি বিভাগ চালুর পর সীমিত পরিসরে ইনডোরে সেবাদান করছি। এ ছাড়া, আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রম চালু রেখেছি, এগুলো চালু থাকবে। তিনি বলেন, আমাদের সঙ্গে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা দীর্ঘক্ষণ বৈঠক করেছিলেন। সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন যে, চিকিৎসকদের ওপর যারা হামলা করেছে তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা হবে। এ ছাড়া, হাসপাতালে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। এরই মধ্যে আমরা দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখেছি। ইতিমধ্যে ঘটনায় জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাসপাতালে হামলার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি যারা আছে তাদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্বাস্থ্য উপদেষ্টার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঢামেক হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল হাসপাতালের ডেন্টাল কলেজে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে, আমাদের নিরাপত্তার আশ্বাস পেয়ে রোববার সন্ধ্যা থেকে সব হাসপাতালে জরুরি বিভাগ চালু হয়েছিল, সেগুলো চালুই থাকবে। ডা. আব্দুল আহাদ বলেন, আমাদের দুই দফা দাবির মধ্যে রয়েছে- ঘটনায় জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদেরও দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে। আরেকটি দাবি হলো- হাসপাতালে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রোগীর সুরক্ষা নিশ্চিত করে আইন প্রণয়ন এবং স্বাস্থ্য পুলিশ নিয়োগে আইন প্রণয়ন করতে হবে।  তিনি বলেন, আগামীকাল থেকে সীমিত পরিসরে অর্থাৎ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত বহির্বিভাগে সেবাদান চালু থাকবে। সকাল ৮টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে আমাদের অবস্থান কর্মসূচি চলবে।