Tuesday, March 6, 2018

ব্যাংকিং খাতের ওপর দুদকের কড়া নজর

ব্যাংকিং খাতের ওপর কড়া নজর রাখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তারই অংশ হিসেবে দুর্নীতির অভিযোগে বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ শীর্ষস্থানীয় ১৬ ব্যাংকারকে তলব করা হয়েছে। আত্মসাৎকৃত অর্থ উদ্ধার ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের আইনের কাছে সোপর্দ করতে অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজ করছেন কমিশনের একদল দক্ষ, চৌকস কর্মকর্তা
 নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক পরিচালক সমকালকে বলেন, জনগণের অর্জিত অর্থ আমানত হিসেবে ব্যাংকে রাখা হয়। সেই ব্যাংকের ভেতরের ও বাইরের সংগঠিত দুর্নীতিবাজ একটি চক্র যোগসাজশে প্রতারণা, জালিয়াতির মাধ্যমে সে অর্থ নিজেদের ইচ্ছামতো লুটেপুটে নিচ্ছে। এ অবস্থা চলতে পারে না। দেশের অর্থনীতির রক্ত সঞ্চালনের সংবেদনশীল এ খাতকে রক্ষা করতে দুদকের যা যা করণীয় আছে তা করা হবে। দুদক সূত্র জানায়, বেসিক, এবি, এনআরবিসি, ফারমার্স ব্যাংকে সংঘটিত দুর্নীতি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। সংশ্নিষ্টদের দুর্নীতির যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্য জানার জন্য এরই মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের ১৬ ব্যাংকারকে তলব করা হয়েছে। আগামীকাল বুধবার থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত তাদের পর্যায়ক্রমে ঢাকার সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
বেসিক ব্যাংক :  এর মধ্যে আগামী ৮ মার্চ তৃতীয়বারের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আলোচিত শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে। এর আগে তাকে দু'বার জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার বিরুদ্ধে ৫৬ মামলায় প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা মো. সামছুল আলম ৪৯ নম্বর মামলায় তাকে তলব করেছেন। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে ঋণের নামে ৪৯ কোটি ৯৯ লাখ ১৫ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এবি ব্যাংক বিদেশে ব্যবসার নামে পাচার করে এবি ব্যাংকের ১৬৫ কোটি টাকা (২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা মামলা তদন্ত পর্যায়ে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হকসহ সাতজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধান। এর মধ্যে আগামী ১১ মার্চ ডাকা হয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হক, সাবেক এমডি মো. ফজলুর রহমান, শামীম আহমেদ চৌধুরী ও ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্যান্ড ট্রেজারি শাখার প্রধান আবু হেনা মোস্তফা কামালকে। আগামী ১৩ মার্চ ডাকা হয়েছে ব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. নুরুল আজিম, হেড অব করপোরেট মোহাম্মদ মাহফুজ উল ইসলাম ও হেড অব অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের (ওবিইউ) মোহাম্মদ লোকমানকে। তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট পেশ করা হবে।
এনআরবিসি ব্যাংক
দুদকের উপপরিচালক মো. সামছুল আলম এনআরবিসি ব্যাংকের সাত পরিচালকসহ আটজনকে অনুসন্ধান পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছেন আগামী ৭ মার্চ ও ১৪ মার্চ। তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকের ৩০১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আগামী ৭ মার্চ পরিচালক আ. মান্নান, মো. ওয়ালিউর রহমান, মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন ও ভাইস চেয়ারম্যান ডা. তৌফিক রহমান চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আগামী ১৪ মার্চ পরিচালক মো. আমির হোসেন, এমএ তুষার ইকবাল রহমান, ফিরোজ হায়দার খান ও মিসেস কামরুন নাহার সাথীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
ফারমার্স ব্যাংক
ঋণ জালিয়াতি, ঋণের কমিশন নেওয়া, গ্রাহকের হিসাব থেকে নিজের হিসাবে অর্থ স্থানান্তর ও অনিয়ম, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শিগগির ফারমার্স ব্যাংকের পদত্যাগী চেয়ারম্যান মহীউদ্দীন খান আলমগীর ও অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুল হক চিশতীকে ডাকা হবে।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের স্বার্থে সম্প্রতি মাহবুবুল হক চিশতীর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। দুদকের এক চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের ইমিগ্রেশন শাখা থেকে ওই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। অনুসন্ধান শেষে দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

আশা জাগানিয়া পাট

ব্রিটেনের সার্লস ফাউন্ডেশন একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। মর্যাদাপূর্ণ এ প্রতিষ্ঠানের বাগান পরিচর্যায় ব্যবহূত হয় বাংলাদেশের পাটপণ্য। উচ্চমূল্যের এক পিস গার্ডেনিং পণ্যের দাম ২০০ পাউন্ডের মতো। পাঁচ বছর ধরে এ পণ্য রফতানি করছে ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেড। উচ্চমূল্যের পাটপণ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ড গাড়ির অভ্যন্তরীণ সজ্জায়ও ব্যবহার হয় বাংলাদেশের পাট। এভাবে বৈচিত্র্য এনে পাটে নতুন করে আশা জাগাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। সরকারও সোনালি আঁশের সুদিন ফেরাতে সচেষ্ট। সরকারি পাটকলে লোকসানসহ কিছু সংকট থাকলেও সার্বিকভাবে উৎপাদন বাড়ছে পাটের। বাড়ছে অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও রফতানি। ভালো দামও পাচ্ছেন কৃষক। নতুন করে আশা জাগাচ্ছে পাট। গ্রামের ক্ষেতের পাট গত কয়েক দিন উঠে এসেছে রাজপথে। রাজধানীর রোদ্দুর গায়ে লাগিয়ে সটান দাঁড়িয়ে আঁটি আঁটি পাটখড়ি। সপ্তাহজুড়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কদ্বীপ ও সড়ক বিভাজন পাটের সজ্জায় বর্ণিল। এ আয়োজন জাতীয় পাট দিবসকে ঘিরে। আজ ৬ মার্চ, জাতীয় পাট দিবস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ জাতীয় পাট দিবসের মূল অনুষ্ঠানে তিন দিনের পাটপণ্যের মেলা উদ্বোধন করবেন। ইপিবির তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) কাঁচা পাট, পাটের সুতা, পাটের বস্তাসহ সব ধরনের পাটপণ্যের রফতানি বেড়েছে আগের একই সময়ের তুলনায় ২২ শতাংশ। রফতানি আয় হয়েছে ৫৮ কোটি ডলারের পণ্য। বর্তমানে ১১৮টি দেশে বহুমুখী পাটপণ্য রফতানি হচ্ছে। হস্তশিল্প হিসেবেও অনেক পণ্যে ব্যবহূত হচ্ছে পাট, যা পাটের রফতানি আয়ের মধ্যে স্বীকৃতি পায় না। দেশেও বাড়ছে পাটপণ্যের চাহিদা।
বছরে ৭০০ কোটি টাকার পাটের চট বা জিও টেক্সটাইলের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের শাসনামলে পূর্ব বাংলায় পাট ছিল বৃহত্তম শিল্প। পাট দিয়েই বাংলাদেশকে চিনত বিশ্ব। স্বাধীনতার পরও পাট ছিল প্রধান অর্থকরী ফসল ও রফতানি পণ্য। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে মোট রফতানি আয়ের ৯০ শতাংশই ছিল পাট থেকে। আশির দশকে সিনথেটিক পণ্যের ব্যবহার শুরু হওয়ায় পাট খাতের পতন শুরু হয়। কয়েক বছর ধরে আবারও বিশ্বব্যাপী পাটের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশও ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে বিশ্ববাজারে। পাট ও পাটপণ্যের মোট রফতানি আয়ের ২০ শতাংশ জেগান দেয় সরকারি পাটকল। বাকি ৮০ শতাংশ আসে বেরকারি খাত থেকে। জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে ৭৬টি পাটকল ছিল এক সময়। এখন ৩টি নন জুটসহ সরকারি পাটকলের সংখ্যা ২৬। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের পাটকলের সংখ্যা ১৭০টি। সরকারি পাটকলে লোকসান থাকলেও বেসরকারি খাতে মুনাফা বাড়ায় নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে। নতুন পণ্য উদ্ভাবনে গবেষণাও চলছে। পাটের পলিথিন ব্যাগ, পোশাক উৎপাদন উপযোগী সুতার কাঁচামাল, পাটকাঠির ছাই থেকে প্রসাধনীর কাঁচামাল ও পাট পাতার চা উৎপাদন হচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে। সাধারণ খেলনা থেকে অত্যাধুনিক জেট বিমানে পর্যন্ত পাটের ব্যবহার হচ্ছে। অন্তত এক হাজার বহুমুখী পণ্য তৈরি হচ্ছে পাট দিয়ে। বিশ্বব্যাপী বাজার বাড়ছে পাটপণ্যের। ২০১৯ সালের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশ একই পথে যাচ্ছে। এর অর্থ, বিশ্বব্যাপী বাজার বাড়ছে পাটপণ্যের। গত তিন বছর ধরে পাটের ভালো দাম পাচ্ছেন কৃষক। গত মৌসুমে এক মণ ভালো মানের পাটের দর বেড়ে হয়েছে দুই হাজার ১০০ টাকা। আগের মৌসুমের দর ছিল দুই হাজার টাকা। গত তিন বছর ধরেই ভালো দর পেয়েছেন কৃষক। কিন্তু কয়েক বছর আগেও পরিস্থিতি এমন ছিল না। এখন দর ভালো পাওয়ায় কৃষক আবার পাট চাষে ঝুঁকেছেন। উৎপাদনও বেড়েছে। ২০১৫ সালে পাটের উৎপাদন ছিল ৬৮ লাখ বেল।
২০১৬ সালে তা ৮৫ লাখ বেলে উন্নীত হয়। ২০১৭ সালে উৎপাদন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১ লাখ বেল। আগামী ১০ বছরে পাটের উৎপাদন ২ কোটি বেলে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে সরকারের। বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন বিজেএমএর সহসভাপতি এবং খুলনার আফিল জুট মিলের এমডি এসকে আকরাম হোসেন সমকালকে বলেন, পাটে সরকারের মনোযোগ বাড়ায় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এখন ভালো আছেন। প্রণোদনা বাড়িয়ে দেওয়ায় ভালো মুনাফা হচ্ছে তাদের। পুরনো বাজারে আরও মনোযোগ দিচ্ছেন তারা। নতুন বাজার তৈরিতেও কাজ চলছে। দুবাইভিত্তিক বাজার তৈরি হয়েছে গত বছর। চীনেও রফতানি হচ্ছে। ইইউতে আগামী বছর থেকে পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে নতুন করে বাড়তি যে চাহিদা তৈরি হবে, তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন তারা। তার মতে, একটি পাটনীতি প্রণয়ন, মানব সম্পদ উন্নয়ন, আধুনিক মেশিনারিজ আমদানিতে সহযোগিতা পাওয়া গেলে এক বছরেই রফতানি আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব। গবেষণা সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম সমকালকে বলেন, রফতানির পাশপাশি পাটের অভ্যন্তরীণভাবে সংরক্ষিত বাজার ধরে রাখতে হবে। সরকারি ক্রয়নীতিতে সড়ক নির্মাণে পাটের চট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলে সড়ক যেমন মজবুত হবে, পাটের বাজারও বাড়বে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিজেএমসি থেকে নগদে পাট কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে বিজেএমসির লোকসান কিছুটা কমবে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাপী প্রাকৃতিক তন্তু ব্যবহারের যে ঝোঁক তৈরি হয়েছে, পণ্যের মান উন্নয়নের মাধ্যমে তা কাজে লাগাতে হবে। এ জন্য গবেষণা বাড়াতে হবে। ভারত সরকার বাংলাদেশি পাটপণ্যে বিভিন্ন হারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক্ক আরোপ করায় দেশটিতে রফতানি প্রায় ৬০ শতাংশ কম হয়েছে। এ বিষয়ে উদ্যোগ প্রয়োজন।বহুমুখী পাটপণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ক্রিয়েশন প্রাইভেট লিমিটেডের এমডি রাশেদুল করিম মুন্না বলেন, এ খাতে বিপণন কৌশল ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিংয়ে ঘাটতি রয়েছে। সেই সঙ্গে রয়েছে দক্ষ শ্রমিকের অভাব। পাট চাষে বীজের সংকটও প্রকট। ৯০ শতাংশ বীজের জন্য ভারতের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ নিয়ে আছে নানান জটিলতা। মানসম্পন্ন কাঁচামালের সংকট প্রকট। দেশে বিশেষায়িত জুট মিল নেই। নীতি সহায়তা বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক পণ্য রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ পায়। কিন্তু পাটপণ্য এ সুবিধা পায় না। সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হলে আগামী ৭ বছর পর পাটপণ্য থেকে বছরে ৭ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
সরকারি উদ্যোগ : পাটের উন্নয়নে সরকার নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। ফলে আবার অর্থকরী হয়ে উঠছে পাট। পুনরুদ্ধার হচ্ছে রফতানি বাজার। লাভের মুখে চাষে ফিরেছেন কৃষক। আবাদ ও উৎপাদন বেড়েছে, দামও বেড়েছে। পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম সমকালকে বলেন, পাটের অর্থকরী মূল্য এমন হতে চলেছে যে, রাত জেগে ক্ষেত পাহারা দিতে বাধ্য হবেন কৃষক। পাটের উন্নয়নে সরকার বহুমুখী পাটজাত পণ্য রফতানিতে ২০ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন, রেল, সড়কসহ সরকারি বিভিন্ন বিভাগের টেন্ডারে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে জিও টেক্সটাইলের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সরকারি কাজে ব্যবহারে পাটপণ্য ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠান এখন পাটের তৈরি কাগজ, ফাইলসহ বিভিন্ন পণ্য ব্যবহার করছে। সরকার ১৭ পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের বস্তার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। সরকারি পাটকলগুলোর আধুনিকায়নে চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠান সিটিইএক্সআইসির কারিগরি সহায়তায় সরকারি ২৬টি কারখানার আধুনিকায়নের কাজ চলছে। পাটকলগুলোতে জরিপ চালিয়ে সমস্যা চিহ্নিত করে আধুনিক ও উন্নতমানের বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে সক্ষম করে তোলা হবে। বাজার বহুমুখী করার অংশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তি করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী কৌশলগত বাণিজ্যিক অংশীদার হয়েছে গোল্ডেন ফাইবার অস্ট্রেলিয়া প্রাইভেট লিমিটেড (জিএফএপিএল) নামে একটি প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ আরও ৬টি দেশে বাংলাদেশের পাটপণ্যের বাজার বাড়াতে সহায়তা দেবে প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী, দুই বছরে ৪৫৪ কোটি টাকা মূল্যের পাটপণ্য নেবে অস্ট্রেলিয়া।
লোকসানে সরকারি পাটকল : বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান ড. মাহমুদুল হাসান সমকালকে বলেন, নানা কারণে দীর্ঘ দিন ধরে বিজেএমসির অধীনে কারখানাগুলো লোকসান গুনছে। গত অর্থবছরে লোকসান কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আগের বছরের ৬৫৬ কোটি টাকা থেকে গত বছর ৪৮১ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা গেছে। লোকসানের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, অর্থ সংকটে মৌসুমের শুরুতে কৃষকের কাছে থেকে ন্যায্য দামে পাট কেনা যায় না। পরে অপর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ ও ব্যাংক থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বেশি দামে ফড়িয়াদের কাছ থেকে পাট কিনতে হয়।
কৃষিপণ্য ঘোষণা কার্যকর হয়নি : বেসরকারি পাটকল মালিকদের সংগঠন জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশেনের (বিজেএমএ) সচিব আবদুল বারিক খান সমকালকে বলেন, উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণ, ভারতীয় বাজারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক্কারোপসহ বিভিন্ন কারণে উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় কিছুটা সংকটে আছেন তারাও। তিনি বলেন, পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে গত ২ বছরেও তা কার্যকর হয়নি। কৃষিপণ্যের মর্যাদা পেলে পাটপণ্যও সব ধরনের কৃষিপণ্যের মতো ২০ শতাংশ রফতানি প্রণোদনা পেত। বর্তমানে বহুমুখী পাটপণ্য রফতানিতে প্রণোদনা রয়েছে ২০ শতাংশ। পাটের বাকি সব পণ্য যেমন- হোসিয়ান, সেকিং ও সিবিসি পণ্যে সাড়ে ৭ শতাংশ এবং পাটের সুতা রফতানিতে প্রণোদনা মাত্র ৫ শতাংশ। এ বছর পাট দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে- 'সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ'। পাট দিবসে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ানোর জন্য ব্যাপক প্রচার চালানো হবে। থাকবে দেশব্যাপী বিভিন্ন ধরনের আয়োজন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাট দিবসের মূল আয়োজন উদ্বোধন করবেন। এ দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেছেন, কৃত্রিম তন্তুর পরিবর্তে পাটের ব্যবহার পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণীতে বলেছেন, পাট থেকে পলিথিনসদৃশ পচনশীল ও পরিবেশবান্ধব যে সোনালি ব্যাগ তৈরি হচ্ছে তা একদিন পৃথিবীজুড়ে সম্প্রসারিত হবে। পাট দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ৬ থেকে ৮ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনের পাটপণ্য মেলা। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এ মেলা অনুষ্ঠিত হবে। ৭ মার্চ ঢাকা চেম্বার মিলনায়তনে সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের লুঙ্গির সুনাম এখন বিশ্বজুড়ে

বাংলাদেশের বৃহত্তর পাবনাসহ কয়েকটি জেলার তাঁতীদের তৈরি লুঙ্গির সুনাম ও কদর দেশের গন্ডি পেড়িয়ে এখন বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবছর বিশ্বের ২৫টি দেশে প্রায় দুই কোটি পিস লুঙ্গি রফতানি হচ্ছে। এ খাত থেকে বছরে প্রায় এক হাজার ২০০ কোটি টাকা আয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা জানান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিশ্বের ২৫টি দেশে লুঙ্গি রফতানি হচ্ছে। এসব দেশে বসবাসকারী বাঙালিরাই মূলত এই লুঙ্গির ক্রেতা। এছাড়াও ইন্দোনেশিয়াসহ অনেক দেশের লোকজন শখ করে বাংলাদেশি লুঙ্গি কিনেন। ব্যবসায়ীরা জানান, পাবনা জেলার হাতিগাড়া, বনগ্রাম, সান্যালপাড়া, ছেঁচানিয়া, দোগাছি, সুজানগর, ড়েমরা, ঢহরজানি, সোনাতলা, বিলসলঙ্গী, চাঁচকিয়া, কুলোনিয়া, হাটুরিয়া, রাকশা, মৈত্রবাধা, সাঁথিয়া, বাটিয়াখড়া, পেঁচাকোলা, ঈশ্বরদী, সিরাজগঞ্জের পুকুরপাড়, নগরডালা, ডায়া, খুকনী, শিবপুর গাছপাড়া, তালতলা, এনায়েতপুর, বেতিল, উল্লাপাড়া, মনিরামপুর, খঞ্জনদিয়ার, রামবাড়ি, পুকুরপাড়, মনিরামপুর, প্রাণনাথপুর, শক্তিপুর, ঘাটপাড়া, পোতাজিয়া, আন্ধারকোঠাপাড়া, রূপপুর, উড়িয়ারচর, নগরডালা, ডায়া, হামলাকোলা, জুগ্নিদহ, খুকনী, শিবপুর, গাছপাড়া, কামালপুর, রূপসী, ছোট চাঁনতারা ও নরসিংদী জেলার চরসুবুদ্ধি, হাইরমারা, নিলক্ষা, আমিরগঞ্জ, কাট্রাখালি, মনিপুরা, মুদাফত, হাজীপুর, ঘোড়াদিয়া, করিমপুর, নজরপুর, বাবুরহাট, মাধবদী, পৌলানপুর, ভাটপাড়া ভাগীরথপুর, ঘোড়াশাল, পাইকশা, সনেরবাড়ী টাংগাইল জেলার পাথরাইল, চন্ডি, নলসুধা, চিনাখোলা, দেওজান, নলুয়া, হিঙ্গানগর, এলাসিন, বাতুলি, বাজিদপুর, বল্লা, রামপুরসহ তাঁত প্রধান এলাকার তাঁতে তৈরি লুঙ্গির সুনাম ও  কদর এখন দেশের গন্ডি পেড়িয়ে বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। জানা যায়, দেশে ১৯৯৮ সালে বিদ্যুৎচালিত পাওয়ারলুমে লুঙ্গি তৈরি শুরু হয়। বার্তমানে এ ধরনের তাঁতেই ৯০ ভাগ লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া চিত্তরঞ্জন ও পিটলুমে লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। আর উৎপাদিত লুঙ্গির বেশির ভাগই বিদেশে রফতানি হচ্ছে। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাংগাইল ও নরসিংদী জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে লুঙ্গি প্রস্তুতকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার। এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু স্থানীয়ভাবে লুঙ্গি তৈরি ও বিক্রি করে থাকে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই তাঁত মালিকদের কাছে অর্ডার দিয়ে লুঙ্গি তৈরি করিয়ে আনে। পরে এসব প্রতিষ্ঠান এতে নিজেদের প্রতীক বা স্টিকার লাগিয়ে ওই লুঙ্গি বাজারজাত করেন।
তাঁতীরা জানান, এক সময় নামে-বেনামে বিক্রি হওয়া লুঙ্গি এখন পরিচিতি পাচ্ছে নিজস্ব ব্রান্ডে। দেশে প্রথম লুঙ্গি ব্রান্ডিং শুরু করে নরসিংদীর হেলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স। বাজারে সোনার বাংলা টেক্সটাইল, ডিসেন্ট, ইউনিক, স্ট্যান্ডার্ড, আমানত শাহ, রূহিতপুরী, স্মার্ট, অমর, পাকিজা, এটিএম, বোখারী, ফজর আলী, অনুসন্ধান, জেএম, স্কাই, ওয়েষ্ট, রংধনুসহ ১২৫ ব্রান্ডের লুঙ্গি বাজারে বিক্রি হচ্ছে। ৮০/৮০, ৬২/৮০, ৬২/৬২, ৪০/৬২, ৪০/৪০ কাউন্ট সুতাতে এ সব লুঙ্গি তৈরি হচ্ছে। মান ভেদে প্রতি পিস লুঙ্গি ৩৫০ টাকা থেকে ৭০০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে লুঙ্গি বাজারে। রং ও ডিজাইনে বৈচিত্র্যের মাধ্যমে লুঙ্গি সবার কাছে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে কাজ করে যাচ্ছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। লুঙ্গি এখন শুধু বাঙালি পুরুষের পোষাকই নয়, গুণ-মান এবং ভালো ডিজাইনের কারণে বাংলাদেশের লুঙ্গির দিকে নজর এখন বিদেশিদেরও। তবে বাংলাদেশি লুঙ্গির বড় ক্রেতা ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। তারা বাংলাদেশ থেকে লুঙ্গি ভারতে নিয়ে সেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে। এসব লুঙ্গি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে প্রতি পিস এক হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভারতের মালদাহ জেলার আমদানি ও রফতানিকারক এমএম ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী অজিত দত্ত সমকাল’কে জানান, ভারতে বিভিন্ন রাজ্যের ১২ জন আমদানি-রফতানিকারক বাংলাদেশের আতাইকুলা, শাহজাদপুর, এনায়েতপুর, করোটিয়া ও বাবুরহাট থেকে লুঙ্গি কিনে সড়ক পথে ট্রাকে করে ভারতের পশ্চিমবাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, বিহার ও দিল্লীতে মজুদ করে। এরপর সেখানে ভারতের বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানে স্টিকার লাগিয়ে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, কাতার, লেবানন, ওমান, বাহারাইন, দুবাই, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি করছে। ভারতীয় আমদানিকারকরা বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর প্রায় এক কোটি ২৫ লাখ পিস লুঙ্গি ক্রয় করে বলে তিনি জানান। শাহজাদপুরের পাইকারী কাপড় ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ আল মাসুদ সমকাল’কে জানান, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ও এনায়েতপুরহাট, পাবনার আতাইকুলাহাট, টাংগাইলের করটিয়াহাট ও নরসিংদীর বাবুরহাট থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২৫ কোটি টাকার কাপড় কিনেন। এতে এ অঞ্চলের তাঁতশিল্প প্রাণ ফিরে পেয়েছে। ভারতের কলকাতার কাপড় ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র সেন জানান, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে কাপড়ের দাম তুলনামূলক কম এবং উন্নতমানের হওয়ায় তারা এখান থেকে লুঙ্গি ও শাড়ী কাপড় কিনছেন। সোনার বাংলা টেক্সটাইলের মালিক রফিকুল ইসলাম  বলেন, এখন ক্রেতারা লুঙ্গি কেনার ক্ষেত্রে ব্রান্ডকে প্রাধান্য দেয়। আর এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছে সোনার বাংলা টেক্সটাইল লুঙ্গি। ডিজাইন ও মানের কারণে সব বয়সী মানুষের দৃষ্টি কাড়ছে।  একারণে প্রতিবছর তাদের ৭০ থেকে ৭৫ কোটি টাকার লুঙ্গি বিক্রি হচ্ছে। পাবনা জেলা তাঁতী দলের সভাপতি মোঃ শাহজাহান আলী আশরাফী সমকাল’কে বলেন, কয়েক বছর ধরে সুতার অস্থিতিশীল বাজার, রং ও কেমিক্যালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে লুঙ্গি তৈরির খরচ বেড়েছে। কিন্তু এত প্রতিকুল পরিবেশের মধ্যেও কয়েক বছরে লুঙ্গি খাতের ব্যাপক প্রসার হয়েছে। বাংলাদেশ লুঙ্গি ম্যানুফ্যাকচারার্স, এক্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েসনের সভাপতি ও আমানত শাহ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোঃ হেলাল মিয়া জানান, গত বছর তার প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৫ লাখ ডলারের লুঙ্গি রফতানি করেছে। প্রতি বছরই রফতানির পরিমাণ বাড়ছে। বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের লুঙ্গির মান সবচেয়ে ভালো। রফতানিতেও অনেক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এসময় সরকারি সহযোগীতা পেলে তৈরি পোষাকের পর লুঙ্গি দিয়েই বিশ্ববাজারে নতুন জায়গা করে নেয়া যাবে বলে দাবি করেন তিনি।

ত্বকীর কাছে আমাদের দায় by মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী নামটা এখন সারাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত। তার নির্মম-নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে দেশবাসী গত ৫ বছর ধরে সংগ্রাম করছে। দেশের ক্ষমতাসীন শক্তির ঘনিষ্ঠ ও মদদপুষ্ট খুবই প্রভাবশালী একটি মহল এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে সুস্পষ্ট অভিযোগ রয়েছে। সে কারণেই হত্যাকাণ্ডের বিচার বিলম্বিত হচ্ছে বলে দেশবাসীর বিশ্বাস। এসব কারণে ত্বকী হত্যাকাণ্ড একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা হিসেবে সবাইকে আলোড়িত করে চলেছে। সাড়া জাগানো এই আন্দোলনকে জাগিয়ে রাখতে হবে ততদিন পর্যন্ত, যতদিন না ত্বকী হত্যাকাণ্ডের বিচার সুসম্পন্ন হয়। মেধাবী ও স্বপ্নবান কিশোর ত্বকীর মৃত্যুর চেয়ে তার স্বল্পকালের জীবন কম চাঞ্চল্যকর ও সম্ভাবনাময় ছিল না। ধারণা করা অমূলক নয় যে, তার চাঞ্চল্যকর অকালমৃত্যুর মধ্য দিয়ে নয়, তার জীবনের জন্যই একসময় সে সারাদেশে অবশ্যই পরিচিতি পেত। কিন্তু প্রস্টম্ফুটিত হওয়ার আগেই ফুলটা ঝরে গেল! একটা সম্ভাবনাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। ১৭ বছরের এই দুর্দান্ত কিশোর সমাজ ও রাষ্ট্রকে কতক গুরুতর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তার এভাবে চলে যাওয়ার দায় আমরা কিছুতেই এড়াতে পারি না। প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কর্মী ত্বকীর জীবন-ভাবনা ছিল বেশ স্পষ্ট। তার লেখায়, কবিতায় তার প্রগতিশীল চিন্তা ফুটে ওঠে। সাম্যের সমাজের স্বপ্ন দেখত সে। 'সাম্য' কবিতায় সে লিখেছে, 'ঘরে ঘরে জ্বলে উঠবে/ জ্ঞান-প্রীতির আলো,/ থাকবে না হিংসা বিদ্বেষ/ মানুষে সাম্য হবে/ সকলেই এক হবে/সকলের জ্ঞান হবে/ আকাশ চূড়ায়।' শান্ত ও অনেকটা অন্তর্মুখী স্বভাবের ত্বকী ছবি আঁকত, গান গাইত। বই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। মৃত্যুর পর মেধাবী এই তরুণের 'এ' লেভেল পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়। পদার্থবিদ্যায় বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর ও রসায়নে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পায় সে। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে ডুব দিয়ে থাকেনি সে, প্রগতিশীল সাহিত্যের সঙ্গে ছিল তার দৈনন্দিন যোগাযোগ। সত্যিকারের মানুষ হতে চেয়েছিল সে। আত্মসর্বস্ব প্রতিষ্ঠা নয়, সবাইকে নিয়ে উন্নত, মানবিক সমাজ গড়তে চেয়েছে। সে তার কবিতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর কথা বলেছে। সত্যিকারের মানুষ হতে সে নিয়মিত নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগারে যেত। সন্ত্রাসীরা যখন তাকে অপহরণ করে, তখন সে সুধীজন পাঠাগারে যাচ্ছিল। ত্বকীর হত্যাকাণ্ড ছিল নির্মম, বীভৎস। তার সুন্দর চোখ দুটি থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল, আঘাত করা হয়েছিল মাথায়। শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। তারপর তার দেহ ফেলে দেওয়া হয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীতে।
দু'দিন পর ত্বকীর দেহ পাওয়া গিয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীতে। ১৭ বছরের এক কিশোরকে হত্যা করতে ঘাতকরা তাদের আয়োজনে কোনো ফাঁক রাখেনি। নিষ্পাপ এই কিশোরের কথা মনে পড়লেই তার নিষ্পাপ চোখ দুটি ভেসে ওঠে। ত্বকীকে কেন ঘাতকদের টার্গেট হতে হলো? কারণ হয়তো এই যে, স্পর্ধাকে ঘাতকরা সহ্য করতে পারে না, স্পর্ধাকে ওরা ভয় পায়। কবি সুকান্ত লিখেছিলেন, 'এ দেশের বুকে আঠারো আসুক নেমে।' ত্বকী যেন তার মায়াবী মুখ আর দুর্দান্ত সাহস নিয়ে নেমে এসেছিল নারায়ণগঞ্জের বুকে- এ দেশের বুকে। ঘাতকরা তাকে ছিনিয়ে নিয়ে সেই সাহসী আগমনকে রুখতে চেয়েছিল। কিন্তু মৃত্যুর পর সে এখন অনেক বেশি জীবন্ত। ত্বকী এক দ্বিধাহীন কিশোর। সে লিখেছে, 'ভয় কিসের? দ্বিধা কেন মৃত্যুতে'। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে যে, সে কতটা দ্বিধাহীন ও ভয়মুক্ত। ত্বকী চলে গেছে; কিন্তু মানুষকে জাগিয়ে দিয়ে গেছে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ত্বকী এখন ঐক্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে। ত্বকী যেন একালের প্রমিথিউস। গ্রিক পুরাণের দেবতা প্রমিথিউস স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে মানুষকে দিয়েছিল। আগুন পেয়ে মানুষের সভ্যতা অনেক অগ্রসর হয়েছিল। এর জন্য প্রমিথিউসকে নির্মম শাস্তি পেতে হয়েছিল। ত্বকী যেন ঠিক তেমনি নারায়ণগঞ্জকে মানুষের বাসযোগ্য করার জন্য সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মশাল জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। আর তার বিনিময়ে তাকে আলিঙ্গন করতে হয়েছে মৃত্যুকে। নারায়ণগঞ্জ সন্ত্রাসের জনপদ হিসেবে পরিচিত। নারায়ণগঞ্জবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে একটি পরিবার এখানে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এই পরিবার একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের 'টর্চার সেল' এক মহাআতঙ্কের নাম। কত মানুষকে যে এই 'টর্চার সেলে'র মুখোমুখি হতে হয়েছে তার হিসাব নেই। সরকার এই পরিবারকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছে। ত্বকীর খুনিরা চিহ্নিত। সবাই তাদের চেনে, জানে। আদালতে আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করা আছে। সে কথা প্রকাশিতও হয়েছে। এমন জবানবন্দির পরেও পাঁচ বছর অতিবাহিত হলো; কিন্তু ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না। সরকার খুনিদের রক্ষা করে চলছে। ত্বকীর কথা বলতে গেলে তার বাবা রফিউর রাব্বির কথা বলতেই হয়। ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা রাব্বি নারায়ণগঞ্জের প্রগতিশীল আন্দোলনের পরিচিত মুখ। জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে, নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে, নাগরিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার এই সাহসীপনা সন্ত্রাসী-গডফাদারদের কায়েমি স্বার্থে আঘাত করেছে। পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ অনেক ভারী। তাঁর পুত্রকে হত্যা করে সেই বীর পিতার ঔদ্ধত্যকে স্তব্ধ করা যাবে- এ কথা মনে করে রফিউর রাব্বির পুত্র ত্বকীকে ঘাতকরা হত্যা করেছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডের ফলাফল হয়েছিল উল্টো। কিশোর পুত্রের হত্যায় রফিউর রাব্বি মুষড়ে পড়েননি। শোককে তিনি শক্তিতে পরিণত করেছেন। 'সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ' গঠন করে অন্ধকারের শক্তির প্রতি তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। সব বাধা, সব ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার রয়েছেন। এমন ত্বকী, এমন বাবার সংখ্যা যত বেশি হবে, সমাজ ততই অগ্রসর হবে। ত্বকীকে আমরা বাঁচাতে পারিনি। ত্বকীদের আমরা নিরাপদ আশ্রয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারিনি। বর্তমানের এবং আগামী দিনের ত্বকীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় আমাদের তৈরি করতে হবে। তার জন্য চলমান লড়াইকে জোরদার করতে হবে। ত্বকীর কাছে এ হলো আমার-আপনার দায়।
সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)

সবুজ প্রবৃদ্ধির জন্য পাট by ড. আতিউর রহমান

এক অভাবনীয় যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এ বছর পাট দিবস পালন করছে। আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাদেই জাতিসংঘ বাংলাদেশকে তার এতদিনের স্বল্পোন্নত দেশের শিরোপা থেকে উন্নয়নশীল দেশের ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করার ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। নতুন এই পরিচয়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা যদি চলমান জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার কথাটি মনে রেখে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে সবুজায়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমাদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যগুলো পূরণে অনেকটাই সফল হবো। নিঃসন্দেহে বস্ত্রশিল্পই এখন বাংলাদেশের প্রধান শিল্প। এই শিল্পকে সবুজ করার নানা উদ্যোগ এরই মধ্যে উদ্যোক্তারা নিজেদের স্বার্থেই হাতে নিতে শুরু করেছেন। পৃথিবীর দশটি উত্তম সবুজ গার্মেন্ট কারখানার মধ্যে সাতটিই বাংলাদেশে। আরও অসংখ্য কারখানা সবুজায়নের প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। আশা করি, উপযুক্ত নীতি-কৌশল ও অর্থায়ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শিল্পের সবুজায়নের পথটি থেকে আমরা বিচ্যুত হবো না। বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ রূপান্তর তহবিল গঠন করে বস্ত্র ও চামড়া শিল্প সবুজ করার একটা উদ্যোগ চালু করেছে। তবে বস্ত্র ও চামড়া শিল্পের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ এখনও বেশ প্রবল। সেই তুলনায় আমাদের ঐতিহ্যবাহী পাটের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং শিল্পায়ন অনেকটা সহজাতভাবেই সবুজ বলা চলে। একটু কৌশুলি হলেই পাটপণ্যের উপযুক্ত বহুমুখীকরণ এবং নয়া অবয়বে সাজাতে পারলে পাটশিল্পকে সবুজ শিল্প হিসেবে সারা পৃথিবীতে তুলে ধরা খুব কঠিন হবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া বস্ত্রশিল্পের উপকরণ হিসেবেও পাটতন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাকৃতিক উপকরণ হিসেবে পাটতন্তুর ব্যবহার বাড়লে বস্ত্র খাতের সবুজায়নও ত্বরান্বিত করা যাবে। সম্প্রতি পাটচাষ ও শিল্পায়নের দিকে সরকারের নীতি সহায়তা বেশ বেড়েছে।
২০১১ সালে যে পাটনীতি গ্রহণ করা হয়, তা ২০১৬ সালে সংশোধিত করে পাট খাতের উন্নয়নে বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পাটের চাষ আধুনিক করা, কৃষককে উন্নত বীজ প্রদান এবং পাট গবেষণা ও উদ্যোক্তাদের সংযোগ বৃদ্ধির তাগিদ এই নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীকালে ওই নীতির বলেই ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার, চিনি সংরক্ষণ ও পরিবহনে বাধ্যতামূলকভাবে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের নির্দেশনা দেয় সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়। পেঁয়াজ, আদা, রসুন, ডাল, আলু, আটা, ময়দা, মরিচ, হলুদ, ধনে ও তুষ-খুদকুঁড়ার মতো ১১টি পণ্য এই নির্দেশনায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে পাট ব্যবসায়ে আর্থিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু প্রণোদনামূলক নীতি সহায়তা দিতেও এগিয়ে এসেছে। পাটচাষিদের জন্যও উপযুক্ত দাম, ঋণ ও বীজ সরবরাহে সরকারের সংশ্নিষ্ট বিভাগগুলো বেশ কিছু সহায়ক নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে পাট চাষে কৃষকের আগ্রহ বেড়েছে। পাটের মোকামগুলো সেই আগের মতো ফের সরগরম হয়ে উঠেছে। তাছাড়া পাটের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন হার ২০১১-এর পর ব্যাপকভাবে বেড়েছে। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক হিসাব মতে, পাটের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১০ সালে সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ হেক্টর জমিতে পাটচাষ হতো। পাট চাষাধীন সেই জমি ২০১৭ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.১৯ লাখ হেক্টর। সাত বছরের ব্যবধানে উৎপাদিত পাটের পরিমাণ বেড়েছে ৭০-৮০ লাখ বেল থেকে প্রায় ৯২ লাখ বেলে। স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই ছিল সর্বোচ্চ পাটের উৎপাদন। এর পেছনে নতুন বীজ সরবরাহ, আধুনিক চাষের জন্য সম্প্রসারণ সহযোগিতা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পাটের দাম। পাট গবেষণাতেও মনোযোগী হয়েছেন আমাদের গবেষকরা। পাটের 'জিনম' আবিস্কারে সহযোগিতা প্রদানের পাশাপাশি পাশের দেশ থেকে উন্নত জাতের বীজ আনুষ্ঠানিকভাবে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকার পাটচাষিদের বড় রকমের নীতি সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে পাটতন্তু থেকে নানা রকমের ব্যবহারিক পণ্য তৈরিতে উদ্যোক্তারা এগিয়ে এসেছেন। সেদিন কাগজে দেখলাম, একদল মেয়ে পাটের শাড়ি পরে বের হয়েছেন।
পোশাক শিল্পে পাটের সুতা ব্যবহারে আমাদের শিল্পোদ্যোক্তারা ভালোভাবেই এগিয়ে এসেছেন। তাছাড়া ঘরের আসবাবপত্র, মেয়েদের ব্যবহূত ব্যাগ, নরম কাপড়ের পোশাক, ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী তৈরি করার সময় ব্যাপকভাবে পাটতন্তু ব্যবহূত হচ্ছে। ক'দিন আগে 'তরঙ্গ' নামের একটি এনজিওর সদর দপ্তরে গিয়েছিলাম। প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহার করে এই প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষিত কর্মীরা পাটের পোশাক, ব্যাগ ও খেলনা তৈরি করে 'তরঙ্গ' ইউরোপ ও আমেরিকার বিলাসী বাজারে ঢুকতে সক্ষম হয়েছে। 'হ্যারডসের' মতো নামিদামি দোকানেও এই পাটপণ্য যাচ্ছে। ব্রিটেন ও ইউরোপের অনেক রাজবাড়িতেও আমাদের দেশের আকর্ষণীয় পাটপণ্য এখন রফতানি করা হচ্ছে। শুধু এসব পণ্য কেন, উড়োজাহাজের বডি, বিএমডব্লিউ বা ভক্সওয়াগন, নিশান ও টয়োটা গাড়ির বডি ও অন্যান্য উপকরণ তৈরিতেও কাঁচামাল হিসেবে আজকাল পাটতন্তু ব্যবহূত হচ্ছে। পাট থেকে প্রাকৃতিক তন্তু তৈরি করা যায় বলেই আগামী দিনগুলোতে পাটের চাহিদা বিশ্বব্যাপীই বাড়ার লক্ষণ বেশ স্পষ্ট। যুদ্ধের সময় পাটের বস্তার চাহিদা বাড়ত। কোরীয় যুদ্ধের আগেও দ্বিতীয় ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পাটের চাহিদা বেড়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়াও শান্তির সময়েও যে পাটের চাহিদা বাড়তে পারে, তার উদাহরণ হালেই দেখতে পাচ্ছি। সম্প্রতি একটি দৈনিকে তার লেখায় বিশিষ্ট গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ জানিয়েছেন যে, ২০১৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এক লাফে ৫০০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রাকৃতিক পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। এই চাহিদার দশ শতাংশও যদি আমরা ধরতে পারি, তাহলে বছরে পাঁচ বিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়তি পাটপণ্য রফতানি করতে সক্ষম হবো। সে জন্য আমাদের পাটের পরিবেশগত গুণাগুণ, পাটপণ্যের দৃষ্টিনন্দন ডিজাইন, যথাযথ অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় আগ্রাসী মার্কেটিং কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি গুছিয়ে বলতে পারি যে, পাটচাষ শতভাগ পরিবেশবান্ধব, গ্রাহকদের যদি জানাতে পারি যে এক হেক্টর পাট গাছ উৎপাদনের সময় ১৫ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ এবং ১১ টন অক্সিজেন ছাড়া হয়, পাট চাষের সময় কোনো বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয় না, মাটি বরং উর্বর হয়, তাহলে প্রাকৃতিক সেই পাট গাছের তন্তুর তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্য কিনতে বিদেশি ক্রেতারা কেন এগিয়ে আসবেন না? একই সঙ্গে পাটপণ্যের বহুমুখী ব্যবহারে আমাদের আরও উদ্যোগী হতে হবে।
পাটের সোনালি আঁশ সিল্ক্কের সুতার সঙ্গে মিশিয়ে চমৎকার উজ্জ্বল বস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। দেয়ালের কার্টেন, চেয়ারের কভার, কার্পেটের সুতা ও তার তলদেশে বাড়তি ঢাকনি হিসেবে পাট তন্তুর ব্যবহার এরই মধ্যে চোখে পড়ছে। এর সঙ্গে গাব, নীল, কচুরিপানাসহ প্রাকৃতিক অন্যান্য উপাদান যুক্ত করে চোখ ধাঁধানো রঙিন বস্ত্র সামগ্রী উৎপাদন খুবই সম্ভব। বিশেষ করে আমাদের ডেনিম জিনস তৈরির সময় পাট তন্তুর বহুল ব্যবহার এই বস্ত্র উপখাতটিকে নয়া সবুজ ব্রান্ডিং করতে দারুণ সহযোগিতা করতে পারে। শাইখ সিরাজ তাঁর ওই লেখাতেই একটি ব্যক্তি খাতের পাটকল পাটপণ্যের বহুমুখীকরণের মাধ্যমে কী বিরাট সাফল্য বয়ে এনেছে তার উদাহরণ টেনেছেন। তিনি জানিয়েছেন, নরসিংদীর ঘোড়াশালে অবস্থিত জনতা জুট মিলস পাটপণ্যের আধুনিকীকরণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়েছে। ৭০ থেকে ৮০ রকমের পাটপণ্য প্রস্তুত করে এই মিলটি। প্রতিদিন গড়ে ১১৫ টন পাটপণ্য রফতানি করে এবং সে জন্য বছরে ১৪ লাখ মণ কাঁচা পাট কেনে তারা। ৬ হাজার লোকবল নিয়োগ দিয়েছে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মিলটি। আমার বিশ্বাস, এমন আরও অনেক পাটকল প্রতিদিন আমাদের জন্য রফতানি বাজার বাড়িয়ে চলেছে। সবার কথা হয়তো আমরা জানি না। পরিশ্রমী এই উদ্যোক্তারা নিজেদের সবটুকু ঢেলে বাংলাদেশের সোনালি আঁশের কদর বাড়িয়ে চলেছেন। আমাদের সরকারি মিলগুলোও উপযুক্ত সুশাসন, অর্থায়ন ও নীতি সমর্থন পেলে পাটশিল্পের প্রসারে এ ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা তারাও পালন করতে পারত। আরও আশার কথা এই যে, পাটপণ্যের তালিকা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাটখড়ি পুড়ে যে ছাই হয় তা দিয়ে কম্পিউটার প্রিন্টারের কালি তৈরি করা হচ্ছে। কসমেটিক্‌স উৎপাদনেও পাটের পাতা ও তন্তু ব্যবহূত হচ্ছে। জামালপুরে 'পাটের চা' উৎপাদন পাটশিল্পে এক নব সংযোজন। কৃষি মন্ত্রণালয় বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় মিলেমিশে পাটপণ্যের প্রচার ও বিপণনে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। তারা বিভিন্ন স্থানে মেলার আয়োজন করছে এবং জনগণকে পাটপণ্যের ব্যবহারে উৎসাহিত করছে। বিদেশেও আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ করে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও ইপিবি বিরাট জাতীয় দায়িত্ব পালন করছে। পাট দিবস উপলক্ষে দেশের খ্যাতিমান চারুশিল্পীরা পাটের ক্যানভাসে তাদের শিল্পকর্ম এঁকে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ঢাকার রাস্তায় পাটপণ্যের নজরকাড়া বিলবোর্ড প্রদর্শনী দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। পাট খাতকে এভাবে আমাদের শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়ানোর এই উদ্যোগ সত্যি অভিনব এবং ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। আমাদের ঐতিহ্যের অংশ এবং প্রিয় বাংলাদেশের টেকসই অস্তিত্বের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় কাঙ্ক্ষিত সবুজ প্রবৃদ্ধির আশা-জাগানিয়া এই পাট খাতের উন্নয়নে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন। তাকে অনুসরণ করে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং আমাদের ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তারা, সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত 'সেলিব্রেটি' মানুষরা সোনালি এই আঁশের প্রসার ও প্রচারে আরও বেশি করে এগিয়ে আসবেন- সেই প্রত্যাশাই করছি। এবারের জাতীয় পাট দিবস আমাদের উন্নত বাংলাদেশ গড়ার সোনালি স্বপ্নকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে, মনেপ্রাণেই তাই চাইছি।
dratiur@gmail.com
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক

ত্বকী হত্যার বিচার হতেই হবে by আনু মুহাম্মদ

আমি প্রস্তর হয়ে মরলাম উদ্ভিদ হতে
উদ্ভিদ হয়ে মরি, তো উত্থিত প্রাণে
মানুষ হয়ে উঠলাম পরে, যখন সত্য উদ্ভাসিত হলো
ভয় কিসের? দ্বিধা কেন মৃত্যুতে?
-তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী
চার দশক আগে নির্মল সেন দাবি জানিয়েছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই।’ এত বছর পরেও এই দাবি পূরণ হয়নি। সড়ক-নৌপথে ‘দুর্ঘটনায়’, কারখানায়-বস্তিতে আগুন লেগে, দখল করা জমিতে ভবন ধসে, দূষিত পানি বা খাবার খেয়ে, কাজের খোঁজে বেপরোয়া হয়ে বিদেশে যাওয়ার পথে, হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায়, নিরাপত্তাহীন নির্মাণকাজে মানুষ মরছে, ফিটনেস ছাড়া বাস-ট্রাক দুর্ঘটনায় অকালমৃত্যু তো চলছেই। আর ধর্ষণ-হত্যারও বিরতি নেই। পোশাক শ্রমিকদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। পাচার হওয়া হাজার হাজার নারী-পুরুষ সমুদ্রে ভয়ংকর নির্যাতন আর গণহত্যার শিকার। গরিব, প্রান্তিক, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ আসছে বারবার। কিশোর বয়সেই তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী (৫ অক্টোবর ১৯৯৫-৬ মার্চ ২০১৩) এই বাংলাদেশকে পরিবর্তন করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল তার কবিতা, ছবি আঁকা, গদ্যে। ঘাতক রাজত্বে ও টিকতে পারেনি। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জে লাইব্রেরিতে পড়তে যাওয়ার সময় স্কুলছাত্র, কবি, শিল্পী এই ত্বকীকে অপহরণ করা হয়। পরে শীতলক্ষ্যা নদীতে তার লাশ পাওয়া যায়। একজন মেধাবী কিশোর, যে নিজের দিবারাত্রির মনোযোগী পাঠ, সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা, দেশ ও দশের প্রতি অসাধারণ সংবেদনশীলতা আর দায়িত্ববোধ দিয়ে বড় হচ্ছিল, সে শুধু তার মা-বাবার জন্য গৌরব ছিল না, সে হয়ে উঠছিল দেশের জন্য, সর্বজনের জন্য ভরসার মানুষ। এই ত্বকীকে যারা খুন করেছে, তাদের কাছে এই অসাধারণ হয়ে ওঠার কোনো মূল্য নেই, বরং তারা বাংলাদেশের মধ্যে মানুষের এই সৃজনশীল মেধাবী বিকাশে ভীতসন্ত্রস্ত থাকে। সে জন্য সব সময়ই এ ধরনের প্রাণের বিকাশ তারা কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো আইনি মারপ্যাঁচে, কখনো পাহাড়সমান প্রতিবন্ধকতা দিয়ে ঠেকাতে চেষ্টা করে। না পারলে চেষ্টা করে হিংস্রভাবে নির্মূল করতে। যাদের মধ্যে সর্বজনের প্রতি দায় থাকে, সৃজনশীলতার শক্তি থাকে, তারাই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে।
ত্বকী বেড়ে উঠেছিল সে রকম একটি পরিবেশে। তার পিতা সক্রিয় ছিলেন এবং এখনো আছেন সব ধরনের অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করতে, অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে। পিতার এই সাহসী ভূমিকায় দানবেরা প্রতিহিংসা দেখিয়েছে তাঁর সন্তানকে হত্যা করে। তাদের ধারণা, এ রকম নৃশংসতা করে ভয় দেখিয়ে তারা মানুষকে থামাতে পারবে, মানুষের অগ্রযাত্রাকে থামাতে পারবে। তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ত্বকীর পিতা রফিউর রাব্বিসহ নারায়ণগঞ্জের সজাগ মানুষেরা তাঁদের দায়িত্ব পালনে অনড় আছেন। তাঁদের কর্মসূচিতে এখন যোগ হয়েছে ত্বকীসহ বহু মানুষ হত্যাকারীদের বিচার আন্দোলন। এই বিচার আন্দোলন এই জনপদে মানুষের জীবন ও সম্পদের শত্রুদের বিরুদ্ধে সর্বজনের লড়াই। মাফিয়াদের ওপর ভর করে দেশ চালালে সরকারের কাছে মানুষের গুরুত্ব থাকবে কেন? ত্বকী হত্যার বিচার আটকে আছে। মানুষের চোখে খুনি আর তার পৃষ্ঠপোষকদের নাম-ঠিকানা নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা নেই। রাষ্ট্রের বিধি অনুযায়ী তদন্তপ্রক্রিয়াতেও খুনিদের শনাক্ত করা হয়েছে। এই শনাক্ত করার পরই আটকে গেছে বিচার। পাঁচ বছর পার হচ্ছে, আটকে থাকা বিচারের মুক্তির লক্ষণ নেই। কেন, এই প্রশ্ন সবার। উত্তরও হয়তো অনেকের জানা। আমরা যখন ত্বকীর কথা ভাবি, তখন সারি বেঁধে আসে আরও অনেকের মুখ। মেধাবী সংস্কৃতিকর্মী তনু, সাংবাদিক লেখক সাগর-রুনি দম্পতি। আসে অভিজিৎ, দীপনসহ আরও অনেকের নাম। কেউ লেখার জন্য, কেউ অন্যায়ের প্রতিবাদের জন্য, কেউ সৃজনশীলতার জন্য, কেউ নারী হওয়ার কারণে খুন হয়েছে। এগুলোর কার্যকর তদন্তকাজে, খুনিদের শনাক্ত করার ব্যাপারে, বিচার শেষ করার কাজে সরকারের অনাগ্রহ বা শৈথিল্য নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দেশে খুনের বিচার একদম হয় না, তা নয়। হয়। তবে দৃষ্টান্ত বলে, আইন ও আইনের প্রয়োগ ভয়াবহভাবে অসম এবং ক্ষমতাবানদের ইচ্ছা ও ক্ষমতাধীন। খুনি যদি ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে সেখানে আইন অচল। তবে ক্ষমতাবানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও বিচারকাজ অনেক দূর যেতে পারে। যেমন বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডের পর সরকারপক্ষ থেকে দায় অস্বীকারের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু ভিডিও চিত্রে সরকারি ছাত্র সংগঠনের চেহারা স্পষ্ট ছিল যে এ চেষ্টা সফল হয়নি। তারপরও খুনে অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন এখনো পলাতক। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনার সঙ্গে মন্ত্রীর জামাই ও র‍্যাবের কর্মকর্তারা জড়িত থাকার পরও বিচারকাজ চলেছে।
এর প্রধান কারণ ওই ব্যক্তিদের লাশ ভেসে ওঠা এবং তা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে যাওয়া। তবে কোর্টে শুনানির সময় খুনের আসামি পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। খুনের অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার পরও রাষ্ট্রপতির ক্ষমার ঘটনা ঘটে! ক্ষমতার এত ক্ষমতা!! বাংলাদেশে সবকিছুর মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষ ত্রস্ত, সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করে সব জিনিসের দাম বৃদ্ধিতে আরও গতি দিচ্ছে। এগুলোর মাধ্যমে সর্বজনের বোঝা তৈরি হলেও কিছু দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর পকেট ভারী হওয়ার পথ তৈরিতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সুন্দরবন বিনাশ করে হলেও রামপাল প্রকল্প, দেশকে বিপদের মধ্যে ফেলে হলেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প করতে সরকার বেপরোয়া। অথচ প্রতিদিন মানুষের অকাল, অস্বাভাবিক মৃত্যু নিয়ে তার নমনীয়তার শেষ নেই। সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে পিটিয়ে হত্যা-এসব অনাচার রোধে সরকার অকার্যকর। তাই শুধু মানুষের জীবনের দাম ক্রমাগত কমছে। অনেক কম বয়সেই ত্বকী এই অমানবিক জগৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল, তার স্বপ্নে এক মানবিক সৃষ্টিশীল জগৎ বাসা বেঁধেছিল। মানুষ সেখানে প্রাণে প্রাণে অনেক বড়, প্রাণ প্রকৃতির উদার সেই জগতে দানবদের স্থান নেই। সেই প্রশ্ন আর স্বপ্ন থেকে অযুত তরুণ তৈরি হচ্ছে, হবে। ত্বকী তাই ফিরে ফিরে আসবে। ত্বকীর ঘাতক আর তার পৃষ্ঠপোষকদের বিচার হবেই, হতেই হবে।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক

নতুন ইতিহাস গড়তে চান উত্তর কোরীয় নেতা

প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে পুনরেকত্রীকরণের ক্ষেত্রে ‘এক নতুন ইতিহাস’ গড়তে চান উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং-উন। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ নেতার এই ইচ্ছের কথা জানিয়েছে। কিম তাঁর দেশে সফররত দক্ষিণ কোরীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এ কথা বলেন।
গতকাল সোমবার দক্ষিণের প্রতিনিধিদলটির সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন কিম। সেখানে দুই বৈরী প্রতিবেশীর মধ্যে আরও নৈকট্য বাড়ানোর জন্য তাঁর ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞার’ কথা জানান। কিম ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম দক্ষিণ কোরীয় কোনো প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নিজ দেশে সাক্ষাৎ করলেন। গত মাস থেকেই দুই কোরিয়ার মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ হওয়া শুরু হয়। গত মাসে দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচাংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকে দল পাঠায় উত্তর কোরিয়া। ওই দলের সঙ্গে দেশের শীর্ষ কর্মকর্তারা যান। দক্ষিণ কোরিয়ার যে প্রতিনিধিদলটি উত্তর কোরিয়ায় এসেছে, এতে মন্ত্রীপর্যায়ের দুজন ব্যক্তি আছেন। তাঁদের মধ্যে একজন দেশটির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান সু হুন এবং আরেকজন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা চাং উই ইয়ং। উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কেসিএনএ জানায়, গতকালের নৈশভোজে দক্ষিণের প্রতিনিধিদলকে উষ্ণ ও আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান কিম। তিনি দলের সদস্যদের সঙ্গে ‘মন খুলে’ কথা বলেন। দুই দিনের সফরে দক্ষিণ কোরিয়ার দলটি উত্তর কোরিয়ায় গেছে। তারা সেখানে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র সংবরণে আলোচনার শর্ত নিয়ে আলোচনা করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়েও কথা বলবে।

দক্ষিণ এশিয়া বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এগিয়ে

বিশ্বব্যাপী বাল্যবিবাহের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমেছে। জাতিসংঘের জরুরি শিশুবিষয়ক তহবিল ইউনিসেফ বলছে, গত এক দশকে প্রায় আড়াই কোটি বাল্যবিবাহ ঠেকানো গেছে। আজ মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিশু ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এক দশক আগে প্রতি চারজনের একজনকে বাল্যবিবাহ দেওয়া হতো। এখন এ হার কমে প্রতি পাঁচজনে একজন হয়েছে। বাল্যবিবাহের হার কমাতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি সাফল্য পেয়েছে। বিশেষ করে ভারত। মেয়েদের উন্নততর শিক্ষা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে প্রচারণা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই সাফল্য পেয়েছে দেশটি।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাল্যবিবাহের হার কমলেও আফ্রিকায় এখনো ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। এ সমস্যা এ অঞ্চলে প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাল্যবিবাহের বোঝা সাবসাহারান আফ্রিকায় স্থানান্তরিত হচ্ছে। ওই অঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরও অগ্রগতির প্রয়োজন ছিল। এখানে এক দশক আগে প্রতি পাঁচজনে একজন বাল্যবিবাহের শিকার হলেও এখন সে হার বেড়ে প্রতি তিনজনে একজন হয়েছে। কেবল ইথিওপিয়া বাল্যবিবাহের হার এক-তৃতীয়াংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে। ইউনিসেফের লিঙ্গবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা অঞ্জু মালহোত্রা বলেন, ‘বাল্যবিবাহ কমেছে। এটা স্বাগত জানানোর মতো খবর, তবে আমাদের এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যখন কোনো মেয়েকে ছোটবেলায় বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়, সে সারা জীবন কষ্ট ভোগ করে।’ জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাল্যবিয়ের অবসানের অঙ্গীকার করেছেন বিশ্ব নেতারা।

দুর্নীতির আলোচনায় ভারতীয় সংসদের অধিবেশন ভন্ডুল

বিষয় দুর্নীতি। সরকার ও বিরোধী দুই পক্ষই দুর্নীতি নিয়ে আলোচনায় এতটাই সরব যে ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষের অধিবেশনই ভন্ডুল হয়ে গেল। গতকাল ছিল বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিন। বিকেলে অনড় বিরোধীদের চাপে লোকসভার স্পিকার সুমিত্রা মহাজন শেষ পর্যন্ত আলোচনার দাবি মেনে নেন। আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে চার ঘণ্টার জন্য ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে রাজ্যসভার চেয়ারম্যান ভেঙ্কাইয়া নাইডু ভোটাভুটিসহ আলোচনায় রাজি হননি। ফলে লোকসভায় বিতর্ক হলেও রাজ্যসভার অধিবেশন চলা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। বিরোধীরা যে ব্যাংক কেলেঙ্কারির ঘটনা এবং এর খলনায়ক নীরব মোদি ও মেহুল চোকসিদের দেশান্তরি হওয়ার বিষয়টি তুলবে তা প্রত্যাশিতই ছিল। লোকসভা ও রাজ্যসভা দুই কক্ষেই কংগ্রেস ও অন্য বিরোধীরা এই বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য মুলতবি প্রস্তাব জমা দেয়। পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বিজেপি সরব হয় সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদম্বরমের পুত্র কার্তির দুর্নীতি নিয়ে। তাঁদের দাবি, বাবার সাহায্যে পুত্রের দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে ওঠা নিয়ে বিতর্ক হোক। এই পাল্টাপাল্টি দাবির ফলে একটা সময় দুই কক্ষের অধিবেশনই সারা দিনের জন্য মুলতবি করে দেওয়া হয়। তার আগে রাজ্যসভায় বিজেপির মন্ত্রী পীযূষ গোয়েল অভিযোগ করেন, হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদি ও মেহুল চোকসিরা পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংকের টাকা তছরুপ শুরু করেছিলেন কংগ্রেস আমল থেকে।
দেশকে তাঁরা বিভ্রান্ত করতে চাইছেন। কংগ্রেসের আনন্দ শর্মা এই অভিযোগের জবাব দেন। মুলতবি প্রস্তাব তোলার সময় তিনি বলেন, ব্যাংক জালিয়াতির জবাব বিজেপি সরকারকে দিতেই হবে। প্রধানমন্ত্রীকে জানাতে হবে, কী করে তাঁর নাকের ডগা দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা জালিয়াতি করে মোদি-চোকসিরা দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারেন। ভারতের রাজনীতি যেভাবে তেতে রয়েছে, তাতে সংসদের অধিবেশন কদিন সুষ্ঠুভাবে চলবে তা নিয়ে সংশয় প্রবল। গুজরাট, রাজস্থান ও মধ্য প্রদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে বিজেপিকে কোণঠাসা করে কংগ্রেস উজ্জীবিত ছিল। কিছুটা থমকে ছিল বিজেপি। কিন্তু ত্রিপুরা, মেঘালয় ও নাগাল্যান্ড জয় বিজেপিকে চনমনে করে তুলেছে। দলগতভাবে ঠিক হয়েছে, বিরোধীরা দুর্নীতি নিয়ে গলা চড়ালে সরকারপক্ষও কংগ্রেসের দুর্নীতি নিয়ে স্বর জোরালো করবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভোটে কংগ্রেস সেভাবে শক্তি ও অর্থ খরচ করেনি। দোলের সময় কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীও চলে যান ইতালি, অসুস্থ নানির সঙ্গে সময় কাটাতে। ভোটে বিপর্যয়ের পর রাহুল এই প্রথম প্রতিক্রিয়া জানালেন। টুইট করে তিনি বলেন, জনগণের রায় তাঁরা মাথা পেতে নিয়েছেন। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দলের শক্তি বাড়াতে তাঁরা নতুন উদ্যমে নামবেন।

গুলির ভয়ে বিদ্যালয়ে রণসজ্জা

স্কুলশিক্ষক লিন্ডা ব্র্যাগ। শ্রেণিকক্ষের ছোট সাদা রঙের বোর্ডটিতে দিনের উক্তি লিখলেন। বোর্ডটি যে তাঁকে প্রতিদিন শুধু লেখালেখির কাজেই সহায়তা করছে তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্কুলে যেভাবে আচমকা গুলিবর্ষণ, আর তাতে প্রাণহানি ঘটছে, সে রকম আশঙ্কার ক্ষেত্রে তাঁর আত্মরক্ষার জুতসই ঢালও হয়ে উঠতে পারে এটি। লিন্ডার শ্রেণিকক্ষের এই হোয়াইট বোর্ড বিশেষ পলিথিন ফাইবারে তৈরি। ওজন মাত্র তিন পাউন্ড (দেড় কিলোগ্রাম)। এটি বুলেটপ্রুফ। যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের ঐতিহাসিক বার্লিনে ওরচেস্টার প্রিপারেটরি স্কুলের শ্রেণিকক্ষগুলোতে ২০১৩ সাল থেকেই শোভা পাচ্ছে এসব বোর্ড। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শান্ত-নিবিড় ছোট শহরের পরিচিতি পাওয়া বার্লিনে ৫ হাজার লোকের বসবাস। এর অবস্থান আটলান্টিকের কিছু জনপ্রিয় সৈকত থেকে মাত্র কয়েক মাইল দূরে। এ শহরের প্রিপারেটরি স্কুলের যে হোয়াইট বোর্ডের কথা বলা হলো তা প্রায় ২০ / ১৮ ইঞ্চির। দেখলে মনে হবে, এ তো বিশ্বজুড়েই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনেক শ্রেণিকক্ষে দেখা যায়। কিন্তু এই স্কুলের বিশেষ হাতলযুক্ত বোর্ডগুলোর বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা লিন্ডার মতো শিক্ষকদের কোনো আততায়ীর ছোড়া গুলি থেকে বাঁচতে সহায়তা করতে পারে। হোয়াইট বোর্ডগুলো ছোট শহর বার্লিন থেকে খুব যে দূরে তৈরি, তা-ও নয়। ছোট কোম্পানি ‘হার্ডওয়্যার’ এর নির্মাতা। আকারে ছোট হলেও গুলিপ্রতিরোধী সরঞ্জাম ও সাঁজোয়া উপকরণ তৈরিতে বিশ্বে নেতৃত্বস্থানীয় আসনটি এই কোম্পানির দখলে। এর প্রধান ক্রেতা মার্কিন পুলিশ বিভাগ ও সেনাবাহিনী। ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাটের নিউটাউনে স্যান্ডি হুক এলিমেন্টারি স্কুলে এক তরুণ গুলি করে ২০ শিশু শিক্ষার্থীসহ ২৬ জনকে মেরে ফেলে। এই ঘটনা খুবই নাড়া দিয়েছিল হার্ডওয়্যারের প্রধান জর্জ টিউনিসকে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের গুলি থেকে কীভাবে রক্ষা করা যায়, সেই উপায় বের করার চিন্তা তখন থেকেই শুরু তাঁর।
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ফ্লোরিডার পার্কল্যান্ডের এক উচ্চবিদ্যালয়ে সে ঘটনারই যেন পুনরাবৃত্তি। এক বন্দুকধারী স্কুলে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে মারল ১৭ জনকে। সবার আগে প্রাণ দিয়েছেন স্কুলটির সহকারী ফুটবল কোচ অ্যারন ফেইস। টিউনিস বলেন, তিনি মনে করেন, স্কুলটিতে তাঁর কোম্পানির ওই ঢাল ব্যবহার করা হলে সেদিন ভিন্ন রকম কিছু ঘটতেও পারত।শ্রেণিকক্ষে আত্মরক্ষার কাজে ব্যবহার উপযোগী এই হোয়াইট বোর্ড ছাড়াও হার্ডওয়্যার কোম্পানি বিশেষ ক্লিপবোর্ড, ট্যাবলেট ও নোটবুক তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি নোটবুক সাইজের শিক্ষার্থীদের ব্যাগের ভেতরে ব্যবহার উপযোগী এক ধরনের উপকরণও তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি এখন এসব নানা উপকরণ দিয়ে মেরিল্যান্ড, মিনেসোটা ও ডেলাওয়ারের বিদ্যালয়গুলোকে সাজিয়ে তুলছে। এসব উপকরণ রপ্তানি করছে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও।যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয়গুলো আত্মরক্ষামূলক এসব উপকরণে সাজানো থেকে নিজের আয়ের বিষয়ে নির্দিষ্ট করে তথ্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জানালেও প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, তাদের বিক্রি ‘আকাশচুম্বী’। শিক্ষার্থীদের ব্যাগের ভেতর ব্যবহার উপযোগী উপকরণের দামের শুরু ৭৫ মার্কিন ডলার থেকে। আর অ্যাসল্ট রাইফেলের মতো আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিরোধক হোয়াইট বোর্ডের দাম ১ হাজার মার্কিন ডলার।যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয়গুলোতে এসব উপকরণের ব্যবহারের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে টিউনিস বলেন, ‘এটি ব্যক্তিগত সুরক্ষায় একেবারে শেষ অবলম্বন।’ অরচেষ্টার প্রিপারেটরি স্কুলের ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক বলেছেন, তাঁরা এই হোয়াইট বোর্ডের ভক্ত। বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক ব্যারি টুল বলেন, ‘হোয়াইট বোর্ড আমাদের শিক্ষকদের প্রকৃতপক্ষেই এক স্বস্তি এনে দিয়েছে।’

মুহূর্তে ভাইরাল যে ছবি!

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে প্রদর্শিত সাবেক
ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামার নতুন
প্রতিকৃতির সামনে এমন বিস্ময় নিয়ে
তাকিয়ে থাকে শিশুটি। বেন হাইনস
নামের এক ব্যক্তি ছবিটি তোলেন।
ছবি: টুইটার থেকে নেওয়া
দুই বছর বয়সী পার্কার কারিকে কিছুতেই বাগে আনতে পারছিলেন না মা। ছবি প্রদর্শনের গ্যালারিতে ছুটে বেড়াতে চাইছিল সে। হঠাৎ এক নারীর বিশালকায় প্রতিকৃতির সামনে থমকে দাঁড়াল সে। একেবারে নট নড়নচড়ন। মা তার হাত ধরে টেনেও সরাতে পারছিলেন না। সে মায়ের হাত সরিয়ে দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। মোহাবিষ্টের মতো তাকিয়ে রইল সেই ছবির দিকে। অভিব্যক্তিতে ফুটে ছিল বিস্ময়, শ্রদ্ধা, ভয়। কাল রোববার ওয়াশিংটন পোস্টের এক খবরে বলা হয়, এমন এক দৃশ্য দেখে মুঠোফোনে তা বন্দী না করে পারলেন না গ্যালারিতে আগত এক দর্শক। সেই ছবিই এখন ভাইরাল হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। যে নারী প্রতিকৃতির সামনে দুই বছরের শিশুটি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে ছিল, তিনি আর কেউ নন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা। পার্কারের মা জেসিকা কারি বলেন, ‘সে এমনভাবে দাঁড়িয়ে পড়েছিল যে আমি টেনেও সরাতে পারছিলাম না।’
পার্কার ছবির সামনে এমন মোহাবিষ্টের মতো দাঁড়িয়ে ছিল যে ওই সময় পাশ থেকে এক ব্যক্তি ছবি তুলে নিলেও সে টের পায়নি। আলেকজান্দ্রিয়ার বাসিন্দা বেন হাইনস (৩৭) নামের ওই ব্যক্তি পরে ছবিটি ফেসবুকে পোস্ট করেন এবং তা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল পোর্ট্রেট গ্যালারিতে তিনি ছবিটি মুঠোফোনে তোলেন। ছবিটি পরে বিশ্বজুড়ে অজস্রবার শেয়ার, লাইক, টুইট ও রিটুইট হয়। এমনকি মিশেল ওবামাও ছবিতে প্রতিক্রিয়া জানাতে ভুল করেননি। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি চোখে হৃদয়ের ছবি আঁকা ইমোজি একটি নয়, তিনটি ব্যবহার করেন। অনেকেই লেখেন, তাঁরা পার্কারের প্রতিক্রিয়া দেখে মিশেল ওবামার ওই প্রতিকৃতি দেখতে আগ্রহী হচ্ছেন। এক ব্যক্তি টুইট করেন, ‘এটাই আমেরিকা। এই ছোট্ট মেয়েটি এখন মিশেল ওবামার মতো কারও মতো হতে স্বপ্ন দেখতে পারে।’ আরেকজন টুইট করেন, ‘হতাশার খবরের চেয়ে এমন সুন্দর কিছু দেখেই আমি কাঁদতে চাই।’ মিশেল ওবামা তাঁর এই ছবি আঁকানোর জন্য পছন্দ করে নেন বাল্টিমোরের শিল্পী অ্যামি শেরাল্ডকে। এই প্রতিকৃতি প্রকাশের সময় মিশেল ওবামা বলেন, শিল্পী যখন ছবিটি আঁকছিলেন, তখন তিনি ছোট ছোট মেয়ের কথা ভাবছিলেন, মেয়েদের রঙিন জীবনের কথা ভাবছিলেন। এদিকে শিশুপার্কারের মা তাঁর মেয়ের ছবি ভাইরাল হয়ে যাওয়ার ঘটনায় অভিভূত। তিনি জানান, তিনি ভাবতেই পারেননি ছবিটি লোকজন এত পছন্দ করবে। তিনি বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য!’
বারাক ওবামা বা মিশেল ওবামার বিষয়ে পার্কার কিছু জানে কি না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন তার মা। প্রতিকৃতিটা দেখার সময় পার্কার ভেবেছিল, এটা গল্পের কোনো রানি। এমন একটি ছবি তুলতে পেরে দারুণ খুশি হাইনস। তিনি বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান যে ওই সময় সেখানে ছিলাম।’ তবে ছবিটি তোলার পর লোকের ভিড়ে পরে পার্কার ও তার মাকে আর খুঁজে পাননি তিনি। পরে ছবিটি তিনি ফেসবুকে পোস্ট করেন এই আশায়—হয়তো শিশুটির মা ছবিটি এক সময় দেখতে পাবে। ছবিটি বিশ্বজুড়ে এত দ্রুত ‘ভ্রমণ’ শুরু করে যে তা ঠিকই পৌঁছে যায় পার্কারের মায়ের কাছে। পার্কারের মা খুব কমই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেন। বন্ধুদের মাধ্যমে ছবির খবর পেয়ে বেন হাইনসের সঙ্গে পরে যোগাযোগ হয় পার্কারের মায়ের। রাতারাতি খ্যাতি পাওয়া পার্কারের মনোভাব কী? তা জানলে যে-কেউ হতাশ হবেন! তার নানি তাঁকে এখন আদর করে ‘স্টার (তারকা)’ বলে ডাকতে শুরু করেছেন এবং এতে প্রবল আপত্তি জানাচ্ছে পার্কার। তার ধারণা, তার আকৃতি নিয়ে কিছু বলা হচ্ছে। তাই যতবার স্টার নামে ডাকা হয়, ততবার সে বলে ওঠে, ‘আমি স্টার নই, আমি বড় মেয়ে।’

রাশিয়ায় নির্বাচন: জনপ্রিয়তায় কে এগিয়ে?

এ সময় কোনো এক রোববার যদি রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়, প্রায় ৭০ শতাংশ রুশ ভোটার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ভোট দেবেন। ভোটকেন্দ্রে যাবেন ৮০ শতাংশ ভোটার। রাশিয়ান পাবলিক ওপিনিয়ন রিসার্চ সেন্টারের (ভিছেইওএম) প্রকাশিত সর্বশেষ এক জরিপে এ তথ্য উঠে আসে। ভিছেইওএম হচ্ছে রাশিয়ার একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থা। ১৯৮৭ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি সে দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক খাতসহ নানা বিষয় নিয়ে জরিপ করে আসছে। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সামনে রেখে গত ১৯ থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টেলিফোনে ভোটারদের মতামত নেয় ভিছেইওএম। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে সাত হাজার রুশ ওই জরিপে অংশ নেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীদের নিয়ে ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ভিছেইওএমের প্রকাশিত নতুন জরিপে দেখা যায়, ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ রুশরা ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে ভোট দেবেন। তাঁর নিকটবর্তী প্রার্থী কমিউনিস্ট পার্টির পাভেল গ্রুদিনিইন। তাঁকে সমর্থন করছেন ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ। তালিকায় তৃতীয় স্থানে থাকা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা ভ্লাদিমির ঝিরিনোভস্কিকে সমর্থন করছেন ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার। ভোটের লড়াইয়ে অংশ নেওয়া একমাত্র নারী প্রার্থী নাগরিক উদ্যোগ দলের কেসেনিইয়া সাবচাক যিনি কিনা রাশিয়ায় ‘প্যারিস হিলটন’ নামে পরিচিত,
তাঁকে ১ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ ভোট দেবেন। জরিপে অন্য প্রার্থীদের অবস্থান হচ্ছে গ্রিগোরি ইয়াভিলিনস্কি (দশমিক ৯ শতাংশ), বরিস তিতোভ (দশমিক ৩ শতাংশ), সেরগেই বাবুরিন (দশমিক ৩ শতাংশ) ও মাক্সিম সুরাইকিন (দশমিক ১ শতাংশ)। জরিপের ফলাফল উল্লেখ করে বার্তা সংস্থা রিয়া নোভাসতি জানায়, নাগরিক উদ্যোগ পার্টির প্রার্থী কেসেনিইয়া সাবচাকের জনপ্রিয়তা গত কয়েক সপ্তাহে বেড়েছে। তাঁর সমর্থকের হার দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। প্রার্থীদেরও জনপ্রিয়তা অন্তত ১ শতাংশ করে বেড়েছে। ভিছেইওএমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ১৮ মার্চ অন্তত ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। তবে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না যে ভোটকেন্দ্রে তাঁরা যাবেন কি না। ১৮ মার্চ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিনক্ষণ ঠিক করা হয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম এই দেশে এখন বইছে ভোটের হাওয়া। আটজন প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র পুতিন নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিচ্ছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় এখন ব্যস্ত আছেন প্রার্থীরা। অংশ নিচ্ছেন টেলিভিশন বিতর্কে। গত শনিবার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ‘ক্ষমতাধর রাশিয়া’ শিরোনামে বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন পুতিন।

সংকটে অ্যালুমিনিয়াম শিল্প by মাসুদ মিলাদ

মির্জাপুল ব্রিজ পেরিয়ে অ্যালুমিনিয়াম গলিতে ঢোকার মুখে কানে বাজল পাতিলের টুংটাং শব্দ। গলিতে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই রাস্তার পাশে দেখা গেল সারি সারি অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের ছোট ছোট কারখানা। অ্যালুমিনিয়ামের গোলাকার পাত ঘূর্ণমান ছাঁচে ফেলে তৈরি করা হচ্ছে হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, কড়াইসহ বহু ধরনের তৈজসপত্র। সদ্য তৈরি করা এসব হাঁড়ি-পাতিল রাখা হয়েছে কারখানার সামনে। কোথাও রাস্তার পাশে। কারখানাগুলো যেখানে, সেটি মোহাম্মদপুর এলাকা। অ্যালুমিনিয়াম শিল্পের কারণে এই এলাকার পরিচিতি এখন অ্যালুমিনিয়াম গলি নামে। এখান থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ক্ষুদ্র শিল্পের। যাত্রা শুরুর তিন দশকের মাথায় সারা দেশে অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের বাজারের বড় অংশের জোগান দিত এখানকার কারখানাগুলো। তবে এখন সেই অবস্থা নেই। দিনে দিনে এখানে কমছে কারখানার সংখ্যা। কমছে উৎপাদনও। যেখান থেকে একসময় এই তৈজসপত্রের বাজার নিয়ন্ত্রণ হতো, সেখানে এখনকার অবস্থা জানতে কথা হয় পুরোনো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে। অ্যালুমিনিয়াম গলির মুখে দোতলায় চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির কার্যালয়ে পাওয়া গেল কারখানা ও উৎপাদন-সংক্রান্ত হিসাব।
সমিতির নেতারা বলেন, ২০১০ সালে চট্টগ্রামে এই খাতের কারখানার সংখ্যা ছিল ১৪২। তখন দিনে ২০ থেকে ২২ হাজার কেজি তৈজসপত্র উৎপাদন হতো। সাত বছরের ব্যবধানে এখন কারখানা কমে দাঁড়িয়েছে ১২০ টিতে। তৈজসপত্র উৎপাদন হচ্ছে বড়জোর ১৫ থেকে ১৬ হাজার কেজি। এই হিসাবে বছরে ৬০ লাখ কেজি হাঁড়ি-পাতিল, কলসিসহ তৈজসপত্র উৎপাদন হয়। সংখ্যার হিসাবে বছরে ১৮০ কোটি টাকার অন্তত ২ কোটি পিস ছোট-বড় হাঁড়ি-পাতিল, কলসি, কড়াই, সসপ্যান, বড় ডেকচি উৎপাদন হচ্ছে চট্টগ্রামে। সমিতির নেতা এবং কয়েকজন উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলায় বছরে ২০০ কোটি টাকার অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র বেচাকেনা হয়, যার ৯০ শতাংশ উৎপাদন হয় চট্টগ্রামের কারখানাগুলোতে। এসব কারখানার ১১০টিই অ্যালুমিনিয়াম গলিতে। এই গলির বাইরে দুটি বড় কারখানা আছে চট্টগ্রামে। এর একটি নাছিরাবাদ শিল্প এলাকায় দিল্লি অ্যালুমিনিয়াম, আরেকটি আতুরার ডিপোতে ভূঁইয়া অ্যালুমিনিয়াম। উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রতিদিন অন্তত ১ হাজার কেজি অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্র ঢাকার উৎপাদকেরা সরবরাহ করেন। তবে বড় ডেকচির মতো কিছু মানসম্মত তৈজসপত্র এখনো চট্টগ্রাম থেকে দেশের নানা স্থানে সরবরাহ করা হয়। চট্টগ্রামে কারখানার সংখ্যা কমে যাওয়ার বড় কারণ হচ্ছে, জমি মালিকেরা শহরের মূল্যবান জায়গায় এই কারখানা রাখতে চান না। বহুতল ভবন নির্মাণের দিকে ঝুঁকছেন জমির মালিকেরা। গত ডিসেম্বরেও অ্যালুমিনিয়াম গলির মুখে বহুতল ভবন নির্মাণের জন্য ২০টি কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজন উদ্যোক্তা নতুন করে জায়গা খুঁজলেও স্বল্প পুঁজির উদ্যোক্তাদের কারখানার বেশির ভাগই আর চালু হচ্ছে না। এমনই একজন রহমান মেটাল ওয়ার্কসের কর্ণধার আবদুর রহমান। গত বুধবার গলির মুখে দাঁড়িয়ে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এই জায়গায় প্রায় ৪২ বছর ধরে ছিলাম। এখন জমির মালিক কারখানার জন্য জমি ভাড়া দিতে চাইছেন না। তাই আমাদেরও কারখানা বন্ধ করা ছাড়া উপায় নেই। নতুন করে বিনিয়োগ করে কারখানা চালানো সম্ভব নয়। এখন যন্ত্রপাতি লোহার দরে বিক্রি করতে হবে।’ চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি মো. হারুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, অ্যালুমিনিয়াম গলিতে যাঁরা কারখানা ভাড়া দিয়েছেন, তাঁরা এখন বহুতল ভবন নির্মাণে ঝুঁকছেন। স্বল্প পুঁজির কারখানার উদ্যোক্তাদের নতুন জায়গায় ভাড়া নিয়ে কারখানা চালানো সম্ভব নয়। শহরের কাছাকাছি কোনো খাসজমি বরাদ্দ দিলে এই শিল্প রক্ষা পাবে। জমির পাশাপাশি দেশের অন্য এলাকার চেয়ে এক দশক ধরে চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্র উৎপাদনে বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানালেন কয়েকজন কারখানামালিক। তাঁরা জানান, এই শিল্পের কাঁচামাল ‘অ্যালুমিনিয়াম ইনগট’ চুল্লিতে গলিয়ে পাত তৈরির জন্য দরকার গ্যাস। চট্টগ্রামে গ্যাসের সংকট দীর্ঘদিন ধরে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অ্যালুমিনিয়াম পাত তৈরিতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। এই খাতে নতুন শ্রমিকও যোগ হচ্ছেন না। আবার পুরোনো শ্রমিকদের মজুরি ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় এখানে বেশি। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের কারখানাগুলো প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে। চট্টগ্রাম অ্যালুমিনিয়াম শিল্প মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মো. খোরশেদ আলম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, দেশের অন্যান্য স্থানের তুলনায় চট্টগ্রামে অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের উৎপাদন খরচ বেশি।
এখন বিদ্যুতের সমস্যা কাটলেও গ্যাসের সমস্যা কাটেনি। দেশের অন্যান্য স্থানের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় চট্টগ্রামে এই কারখানা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেক উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তাদের মতে, তৈজসপত্রের বাজারে অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের পাশাপাশি স্টেইনলেস স্টিল, মেলামিন, সিরামিক, কাচ কিংবা প্লাস্টিক পণ্যের প্রতিযোগিতা চলছে। এরপরও রান্নাঘরে পাতিল, কড়াই, কলসসহ অন্তত ২০ ধরনের অ্যালুমিনিয়াম পণ্যের চাহিদা আছে। উদ্যোক্তারা জানান, স্বল্প পুঁজিতে অর্থাৎ ৩-৪ লাখ টাকায় ছোট কারখানা গড়ে তোলার সুযোগ থাকায় ২০০০ সাল পর্যন্ত অনেক উদ্যোক্তা এই খাতে যুক্ত হয়েছিলেন। ২০১০ সালের পর থেকে স্টেইনলেস স্টিল, প্লাস্টিক, সিরামিকসহ গৃহস্থালি পণ্যে বৈচিত্র্য বাড়তে থাকায় অ্যালুমিনিয়াম তৈজসপত্রের ব্যবহার কমে যায়। উদ্যোক্তারা জানান, পাকিস্তানের পাঞ্জাবের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শফি সিন্ধু ‘খলিল মেটাল’ নামে চট্টগ্রামের মোহাম্মদপুরে প্রথম অ্যালুমিনিয়াম কারখানা গড়ে তোলেন ১৯৫৮ সালের দিকে। আবার অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন, মির্জাপুলের গোড়ায় হক অ্যালুমিনিয়াম কারখানা প্রথম চালু হয়, যেটির উদ্যোক্তা ছিলেন ফেনীর হক সাহেব। এরপর সিরাজ অ্যালুমিনিয়াম এবং পরে ভূঁইয়া অ্যালুমিনিয়াম ওয়ার্কস চালু হয়। এসব কারখানা কাছাকাছি সময়ে চালু হয়। ১৯৬৩ সালে শফি সিন্ধুর কারখানা কিনে নেন খলিলুর রহমান নামে এক উদ্যোক্তা। নাম দেন ‘সেকান্দর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ’। শুরুর দিকে কারখানার সংখ্যা গুটি কয়েক থাকলেও এই শিল্পে জোয়ার আসে ১৯৮৪-৮৫ সালের দিকে। অ্যালুমিনিয়ামের তৈজসপত্রের চাহিদা বাড়তে থাকায় অনেক উদ্যোক্তাই কারখানা গড়ে তুলেছিলেন তখন। এখন কমছে।

পাট দিয়ে ভিসকস, সাশ্রয় হাজার কোটি টাকা!

পাটের সেলুলোজ থেকে তৈরি নরম তুলতুলে
ভিসকস। এ থেকেই তৈরি হয় উন্নত
মানের সুতা। বাংলাদেশ পাটকল
করপোরেশনে রয়েছে ভিসকসের এই
নমুনা। ছবি: নাজনীন আখতার
দেশের পাট থেকে উন্নত মানের ভিসকস সুতা তৈরি ও বাজারজাতের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ফিনল্যান্ডে আড়াই শ কেজি শুকানো পাট পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ফল ইতিবাচক হলে প্রতিবছর প্রায় হাজার কোটি টাকা আমদানি সাশ্রয় হবে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ছয় কোটি টাকা ব্যয় করছে সরকার। ২০ সপ্তাহের মধ্যে ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের তিনটি প্রতিষ্ঠানের পাট দিয়ে ভিসকস সুতা তৈরির রাসায়নিক পরীক্ষা, গুণগতমান নির্ধারণ, বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া, কারখানায় উৎপাদনের জন্য নকশা তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান মো. মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোর কাছে সমীক্ষার বিষয়ে শতভাগ সাফল্যের আশা প্রকাশ করেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বিশ্বব্যাপী কাঠ থেকে ভিসকস সুতা তৈরি হয়।
ভিসকস অত্যন্ত উন্নত মানের সুতা। এই সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক অনেক আরামদায়ক হয়। দামও সুতি কাপড়ের চেয়ে ক্ষেত্র বিশেষে দেড়গুণ বেশি হয়। আখ থেকেও ভিসকস তৈরি হয় স্বল্প আকারে। তবে পাট থেকে বাণিজ্যিকভাবে ভিসকস তৈরি করতে পারলে তা হবে মাইলফলক। বাংলাদেশে এ ক্ষেত্রে এককভাবে সাফল্যের দাবি করতে পারবে। কাঠের মধ্যে যে সেলুলোজ রয়েছে তা পাটেও রয়েছে। পাটের সবুজ বাকলে সেলুলোজ নামক রাসায়নিক উপাদান থাকে। এই সেলুলোজই ভিসকস তৈরির মূল উপাদান। লিগনিন থাকার কারণে পাটের আঁশ শক্ত হয়। ওই পাটের আঁশকে লিগনিনমুক্ত করে ফেলা হয়। অন্যান্য ক্ষুদ্র রাসায়নিক উপাদানও একটি বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বের করে নিয়ে আসা হয়। এতে পাটের আঁশ পেজা তুলার মতো নরম হয়ে যায়। তা থেকে যে সুতা তৈরি হয়, সেটাই ভিসকস সুতা। দেশে ২০১৫ সালে পাট থেকে ভিসকস তৈরির ব্যাপারে প্রথম আলোচনা হয়। এর পরের বছর ২০১৬ সালে বিজেএমসির ওই সময়ের পরিচালক বাবুল চন্দ্র রায়কে প্রধান করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন বিশেষজ্ঞকে নিয়ে পাট থেকে ভিসকস সুতা তৈরির সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটি গঠন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে। এর মধ্যে ফিনল্যান্ডের ভিশন হান্টার লিমিটেড, সাইটেক সার্ভিস কোম্পানি লিমিটেড ও সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুইডেনের এ এফ ইন্ডাস্ট্রিজকে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দেওয়া হয়। ফিনল্যান্ডের দুটি প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল হিসেবে ল্যাবরেটরিতে পাট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে এবং এর গুণগত মান নির্ধারণ, পরামর্শ দেওয়া, কীভাবে কারখানায় উৎপাদন করা যায়, তা দেখবে।
ইডেনের প্রতিষ্ঠানটি ভিসকস উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপনের নকশা কেমন হবে, কী ধরনের যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণ করবে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারে কীভাবে তা লাভজনক হতে পারে সেটার গবেষণা তথ্যও জানাবে। দেশে পোশাক শিল্প কারখানা ও বস্ত্র উৎপাদন কারখানা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুতার (স্পিনিং) কারখানা বাড়ছে। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভিসকসের চাহিদা। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান ড. মো. মাহমুদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বস্ত্র উৎপাদন কারখানাগুলো বছরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ভিসকস আমদানি করে। এর মূল্য ৭০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকা। এই ভিসকস আমরা নিজেরা উৎপাদন শুরু করলে আমদানি করার প্রয়োজন হবে না।’ সমীক্ষার বিষয়ে শতভাগ সাফল্যের আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এর আগে ১৯৯৬ সালে চীনে পাট থেকে ভিসকস সুতা তৈরি শুরু হয় পরীক্ষামূলকভাবে। তবে চীনে পাটের স্বল্পতা থাকায় ব্যয়বহুল হয়ে পড়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ পাট থাকায় এ খাতে সাফল্য আশার ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাই আশাবাদী। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে কাজ দ্রুত শুরু করলে বাণিজ্যিকভাবে পাট থেকে ভিসকস সুতা উৎপাদন দেড় বছরের মধ্যে শুরু করা সম্ভব হবে। বিজেএমসি বলছে, দেশে সুতা তৈরির কারখানা বাড়ছে। কাপড় উৎপাদনও বাড়ছে। পাট দিয়ে ভিসকস তৈরি ও বাজারজাতকরণ সফল হলে প্রতি বছর আমদানি সাশ্রয় হবে প্রায় হাজার কোটি টাকা। কমিটি প্রধান এবং এখন বিজেএমসির উপদেষ্টা বাবুল চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে বলেন, গত অর্থ বছরে দেশে ৯১ লাখ বেল (২০/২২ লাখ মেট্রিক টন) পাট উৎপাদন হয়েছে। পাট উৎপাদনে ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। এ ছাড়া চীন, মিয়ানমার ও পাকিস্তানে স্বল্প পরিসরে পাট উৎপাদন হয়।
তাই পাট থেকে ভিসকস সুতা তৈরি শুরু হলে এ খাতে বাংলাদেশ রাজত্ব করবে কোনো সন্দেহ নেই। ভারত পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও ভিসকসের ক্ষেত্রে বাংলাদেশই কাজ শুরু করেছে। তিনি বলেন, বিশ্বে যত বস্ত্র তৈরি হয় তার ৩১ ভাগ হয় কটন থেকে। আর ৬৭ ভাগ ভিসকস, সিনথেটিকের মতো সুতা থেকে। কটনের উৎপাদন দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিজেএমসির কারিগরি উপদেষ্টা ও সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির অন্যতম সদস্য প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ভিসকস তৈরির জন্য ব্যাপক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে গত মাসে। এপ্রিল মাসের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের ল্যাবরেটরির টেস্ট শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পুরো প্রক্রিয়া ২০ সপ্তাহের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে। এরপরই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের বিষয়টি আসবে। তিনি বলেন, দেশে যে পাট উৎপাদন হয়, তার ১০ ভাগ দিয়েই বাণিজ্যিকভাবে ভিসকস সুতা তৈরি করা সম্ভব। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুসারে, প্রতিবছর দেশে ভিসকস আমদানি বাড়ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে প্রায় ২৯২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ১৪ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন ভিসকস আমদানি হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ১৯ হাজার ৪০৯ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। টাকার অঙ্কে যা প্রায় ৩৫৪ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ৬৩৭ কোটি ৮২ লাখ টাকার বেশি মূল্যের ৩৩ হাজার ৭৩৭ মেট্রিক টন ভিসকস আমদানি করা হয়।

ভোট উধাও ব্যবসায়ী সংগঠন থেকেও by রাজীব আহমেদ ও শুভংকর কর্মকার

ভোট কার্যত উধাও হয়ে গেছে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো থেকেও। ব্যবসায়ীরা এখন আর নিজ নিজ সংগঠনের নেতা নির্বাচন করার সুযোগ পান না। জেলা পর্যায়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠন জেলা চেম্বারগুলোর সিংহভাগ কমিটি হয়েছে ভোটাভুটি ছাড়া। পণ্যভিত্তিক সংগঠনগুলোতেও কমিটি হচ্ছে চাপিয়ে দেওয়া সমঝোতার মাধ্যমে। সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ নির্বাচনের মতো ব্যবসায়ীদের সংগঠনের নির্বাচনেও প্রতিযোগিতা বিদায় নিয়েছে। সারা দেশে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৬৪টি জেলা চেম্বারের মধ্যে ৪৭ টিতেই সর্বশেষ কমিটি হয়েছে কোনো রকমের ভোটাভুটি ছাড়া। ৫ টিতে আংশিকভাবে ভোট হয়েছে। ১ টিতে ভোটাভুটি নিয়ে দ্বন্দ্বে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে। পূর্ণ ভোটাভুটি হয়েছে মাত্র ১১টি চেম্বারে। পণ্যভিত্তিক বড় সংগঠনগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ), বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ), বাংলাদেশ রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (রিহ্যাব) কিছু সংগঠনে এখন আর ভোট হচ্ছে না। এমনকি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) কমিটিও হয়েছে আংশিক ভোটাভুটির মাধ্যমে। ভোট না হওয়ার মূল কারণ সংগঠন দখলে রাখার চেষ্টা। ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হতে পারলে নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া, রাজনৈতিক দলের পদ পাওয়া,
এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরে যাওয়ার সুযোগ হয়। পাশাপাশি নিজ নিজ ব্যবসার ক্ষেত্রেও সুবিধা হয়। এসব কারণে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মধ্যে যেকোনোভাবে নেতা হওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক দলের নেতারাও ব্যবসায়ী সংগঠনের পদ দখলে রাখতে উদ্যোগী হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে সরকারও সমাজের প্রভাবশালী পক্ষ ব্যবসায়ীদের নিজের পক্ষে রাখতে চায়। এ জন্য প্রধান সংগঠনগুলোতে দলীয় অথবা অনুগত ব্যবসায়ীদের নেতা বানানো নিশ্চিত করা হচ্ছে। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাণিজ্য সংগঠনগুলো নামে ব্যবসায়ীদের সংগঠন হলেও তারা রাজনৈতিক অঙ্গনের ছায়া হিসেবে কাজ করছে। তারা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সহায়তাকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন প্রতিযোগিতার অনুপস্থিতি শুরু হয়, তখন তার অবশ্যম্ভাবী উপসর্গ হয় জবাবদিহির অভাব। আমাদের দেশে সেটাই হচ্ছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সুশাসনের ঘাটতি সামাজিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে।’ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোতে শুধু ভোট বিদায় নিয়েছে তা নয়, বিনা ভোটের কমিটিতে ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পদধারীরা। এফবিসিসিআইয়ের দুজন সহসভাপতিই সরকারি দলের নেতা। জেলার ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর কমপক্ষে ২০ টির সভাপতি পদে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারা স্থান পেয়েছেন। অনেক কমিটির শীর্ষ পদটিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের স্বজনেরা আসীন হয়েছেন।
সরকারের ব্যবসায়ী শাখা এফবিসিসিআই
এফবিসিসিআইতে কে সভাপতি ও সহসভাপতি হবেন, তা ঠিক করে দেয় সরকার। ফলে বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে সভাপতি পদে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীর বিপরীতে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। এমনকি সহসভাপতির দুটি পদেও নেতা ঠিক হয়েছে সরকারের আশীর্বাদে। ব্যবসায়ী মহলের আলোচনাই হচ্ছে এফবিসিসিআই কার্যত সরকারের ব্যবসায়ী শাখা। সংগঠনটির সর্বশেষ নির্বাচনে বর্তমান কমিটির সভাপতি মো. সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনের বিপরীতে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন না। এমনকি বরাবরের মতোই সংগঠনটির সভাপতি ও দুজন সহসভাপতি হয়েছেন সরকারের আশীর্বাদ পেয়ে। তাঁদের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি। বর্তমান দুই সহসভাপতির একজন যুবলীগের নেতা শেখ ফজলে ফাহিম। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ছেলে। অন্যজন সাবেক ডেপুটি স্পিকার আলী আশরাফের ছেলে মুনতাকিম আশরাফ। তিনি কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। এফবিসিসিআইয়ের সর্বশেষ সাতজন সভাপতির ছয়জনই সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সাবেক সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, প্রয়াত আনিসুল হক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। আগে থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন আওয়ামী লীগের সাংসদ। আরেক সাবেক সভাপতি সালমান এফ রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত উন্নয়নবিষয়ক উপদেষ্টা। অন্যদিকে আবদুল আউয়াল মিন্টু বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। দেখা গেছে, স্থগিত হওয়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কেনা প্রায় সবাই ছিলেন ব্যবসায়ী। বিএনপির প্রার্থীও ব্যবসায়ী। হলফনামা বিশ্লেষণ করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ২০১৪ সালে জানায়, দশম সংসদের সাংসদ হওয়া ১৭৫ জনের পেশা ব্যবসা। ফলে সংসদে ব্যবসায়ীদের হার এখন ৫০ শতাংশ।
জেলা চেম্বার ভোটহীন, কমিটিতে দলীয়রা
এফবিসিসিআই ও বড় বড় পণ্যভিত্তিক সংগঠনের নির্বাচনে নেতা হতে যেমন সরকারের আশীর্বাদ লাগে, তেমনি জেলা চেম্বারের নেতা হতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতার সুদৃষ্টির প্রয়োজন হচ্ছে। অবশ্য নিজে আওয়ামী লীগের নেতা হলে ভোট ছাড়াই সভাপতি হওয়া যাচ্ছে। বরিশাল চেম্বারের সাইদুর রহমান মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি ভোট ছাড়াই সভাপতি হয়েছেন। ভোলা চেম্বারের আবদুল মমিন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। তিনিও ভোট ছাড়া কমিটিতে এসেছেন। কুমিল্লা চেম্বারের মাসুদ পারভেজ খান জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক। এই চেম্বারে দীর্ঘদিন ভোট হয় না। ঝিনাইদহ চেম্বারের সাইদুল করিম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনিও ভোট ছাড়া সভাপতি। কুষ্টিয়া চেম্বারের রবিউল ইসলাম জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনি আবার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। দুবার ভোট ছাড়া সভাপতি হয়েছেন। সুনামগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি খায়রুল হুদা জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক। তাঁর কমিটিতেও ভোট হয়নি। আওয়ামী লীগের বাইরে জেলা চেম্বারের সভাপতি পদে সংসদে বিরোধী দল ও সরকারের অংশ জাতীয় পার্টির নেতা আছেন পাঁচটি চেম্বারের সভাপতি পদে। বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা আছেন পাঁচটি চেম্বারের প্রধান হিসেবে। ভোটাভুটি না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ভোটের মাধ্যমে সবকিছু হওয়া সব সময় ভালো জিনিস। কিন্তু অনেক সময় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ করে অন্যকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না দেয়, সেটা সঠিক নয়।
পণ্যভিত্তিক সংগঠনেও ভোট হয় না
সাড়ে সাত বছর ধরে বিকেএমইএর সভাপতি পদ আঁকড়ে আছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাংসদ এ কে এম সেলিম ওসমান। ২০১২ সালের পর থেকে ব্যবসায়িক সংগঠনটির পরিচালনা পর্ষদের নির্বাচন হচ্ছে না। বিকেএমইএর কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। তখন সভাপতি পদ ধরে রাখতে কৌশলের আশ্রয় নেন সেলিম ওসমান। নারায়ণগঞ্জে সংগঠনের প্রধান কার্যালয় বিকেএমইএ কমপ্লেক্স নির্মাণের অজুহাত দেখিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে কমিটির মেয়াদ ছয় মাস করে দুই দফা বাড়িয়ে নেন সেলিম ওসমান। এরপর সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বরে নতুন করে দুই বছরের জন্য সভাপতি হয়েছেন সেলিম ওসমান। দেশের শীর্ষ রপ্তানি খাত পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএতে সর্বশেষ ২০১৩ সালে ভোট হয়েছিল। তারপরই সমঝোতার ভিত্তিতে সংগঠনটির দুই পক্ষ-সম্মিলিত পরিষদ ও ফোরাম বিজিএমইএর নেতৃত্ব ভাগাভাগির বিষয়ে চুক্তি করেন। ফলে এখানেও আর ভোট হয় না। সংগঠনটির বর্তমান কমিটির মেয়াদ ছয় মাস বাড়ানোর পর চলতি মাসে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান কমিটির মেয়াদই এক বছর বাড়িয়ে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ফলে দুই বছরের জন্য গঠিত কমিটি শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালন করবে। আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবে আগে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাভুটি হতো। ২০১৪ সাল থেকে রিহ্যাবে ভোটাভুটি হয় না। সমঝোতার মাধ্যমেই দ্বিতীয় মেয়াদে সভাপতি পদে আছেন আলমগীর শামসুল আলামিন। বর্তমান কমিটির মেয়াদ নতুন করে ছয় মাস বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানালেন একজন নেতা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন পরিচালকের (ডিটিও) কার্যালয় অর্থাৎ ডিটিও অনুবিভাগ বিদ্যমান ১৯৬১ সালের বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশে দেওয়া ক্ষমতাবলে সংগঠনগুলোর মেয়াদ একের পর এক বাড়াচ্ছে। জানতে চাইলে ডিটিও মো. ওবায়দুল আজম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোটাভুটির পরিবর্তে সমঝোতার বিষয়ে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে কোনো দরখাস্ত এলে মন্ত্রণালয় যাচাই করে তার অনুমোদন দেয়। মেয়াদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তাই করা হয়। এখানে মন্ত্রণালয়ের নিজের স্বার্থের কিছু নেই।’ ভোট উধাও হওয়ায় মূলত ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ ব্যবসায়ীদেরই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের আশীর্বাদে নেতা হওয়া ব্যবসায়ীদের কাজ সরকারকে কাজে সমর্থন দেওয়া। ব্যবসায় পরিবেশের উন্নতি রাজনৈতিক মদদপুষ্ট অথবা সমর্থনপুষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনের অগ্রাধিকারে থাকে না। তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। ফলে এসব সংগঠন নীতিনির্ধারণে প্রভাব ও গুরুত্ব ক্রমেই হারিয়ে ফেলছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ প্রথম আলোকে বলেন, দেশে বৈষম্যের সুযোগে সমাজের একটি অংশ এখন অর্থবিত্তের মালিক হয়েছে। এর কিছু অংশ ব্যবসায়ী, কিছু অংশ রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছে, যার উদ্দেশ্য রাজনীতিকে প্রভাবিত করা। তিনি আরও বলেন, দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জনগণের প্রতি আগের মতো অঙ্গীকার নেই। এ কারণে অর্থশালী রাজনৈতিক পক্ষ ও ব্যবসায়ী পক্ষের মধ্যে এই ঐক্য সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো থেকে ভোট বিদায় রাজনৈতিকীকরণের অংশ কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা যেভাবে শক্তি অর্জন করা যায়, সেভাবেই করবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানিই সুলভ বিকল্প by মওদুদ রহমান

বিদ্যুতের দাম বাড়ানোই যেখানে সরকারের পরিকল্পনা, জনগণের থেকে আরো বেশি অর্থ আদায়ই যখন উদ্দেশ্য তখন সাশ্রয়ী বিদ্যুতের পথ বন্ধ হবে। তাই দফায় দফায় ব্যয় বৃদ্ধির কয়লা কিংবা পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো অগ্রাধিকার তালিকায় থাকলেও দাম কমতে থাকা সৌর, বায়ু আর বর্জ্যবিদ্যুতের প্রকল্প উন্নয়নের বেলায় নীতিনির্ধারণী মহল যেন কেবলই বিদেশি তহবিলের আশায় থাকা চাতক পাখি। ভারতের নবায়নযোগ্য জ্বালানিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে ঝুলছে রেকর্ড সর্বনিম্ন মূল্যে সৌর আর বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিজ্ঞাপন। সেখানে এই বিদ্যুৎ বাংলাদেশি মুদ্রায় সাড়ে তিন টাকারও কম মূল্যে উৎপাদিত হচ্ছে। (http://mnre.gov.in/)। বাঁধভিত্তিক জলবিদ্যুৎ ছাড়াই ভারতে এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ক্ষমতা মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১৫ শতাংশ। (গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যানুয়াল রিপোর্ট ২০১৬-১৭)।
বিপরীতে বাংলাদেশে তা মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। (http://www.sreda.gov.bd/)। ভারতে ২০২২ সালের মধ্যেই সৌর, বায়ু আর বর্জ্যবিদ্যুৎ মিলিয়ে ১ লাখ ৭৫ হাজার মেগাওয়াটের উৎপাদনী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের কারণ শুধু কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন করাই নয়, বরং এর মাধ্যমে দেশটি নতুন শিল্প প্রসারেরও ছক কাটছে। ভারতের উইন্ড টারবাইন প্রস্তুতকারক কোম্পানি ‘সুযলোন’ ইতিমধ্যেই বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং রপ্তানিকারক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে এই খাত বর্তমানে পুরোটাই আমদানিনির্ভর, ভবিষ্যতেও এই খাত উন্নয়নে নিজস্ব গবেষণা, উদ্ভাবন আর শিল্প প্রসারের কোনো পরিকল্পনা নেই। বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ হিসেবে সৌরবিদ্যুতের পরিচিতিই বেশি। এই সৌরবিদ্যুৎ ছড়িয়েছে প্রধানত গ্রাম, মফস্বল ও চরাঞ্চলে। সোলার সিস্টেমের ওয়াটপ্রতি দাম যখন ৪৫০ কিংবা ৫০০ ছিল, তখন থেকেই এটি ব্যবহারে সাধারণ মানুষের আগ্রহ সামাজিক গ্রহণযোগ্যতারই সাক্ষ্য দেয়। এর ফলে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গেই বাংলাদেশে প্রায় ৫০ লাখ সোলার হোম সিস্টেমের ব্যবহার শুরু হয়েছে। অথচ গত সাত বছরের ব্যবধানে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুতের দাম বিশ্বব্যাপী ৭২ শতাংশ কমে গেলেও বাংলাদেশে এই বিদ্যুৎ নীতিনির্ধারণী মহলে মূল ধারার ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনী মাধ্যমে হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। (আইআরইএনএ রিপোর্ট, ২০১৭)। আর ঠিক এ কারণেই ২০১৫ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূর্বঘোষিত ৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়নি। অন্যদিকে প্রযুক্তি আর চিন্তার অভিনবত্বে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিদ্যুৎ দিনকে দিন পরিণত হচ্ছে, অতিক্রম করছে সব বাধা। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার জন্য এখন রয়েছে ভাসমান সৌরপ্রযুক্তি, কৃষিজমিতে ফলন আর সৌরবিদ্যুৎ একসঙ্গে করার জন্য ‘সোলার শেয়ারিং’ আর বিকেন্দ্রীভূত গ্রিড ব্যবস্থাপনার মতো সমাধান। অন্য সব বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো সৌর কিংবা বায়ুবিদ্যুৎ করতে বিশাল এলাকা অধিগ্রহণের কোনো প্রয়োজন নেই। পতিত অকৃষিজমি, দখল হয়ে যাওয়া নদীর পাড় এবং বাড়ির ছাদের মতো স্থানে সোলার প্যানেল আর বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী আর অগভীর সমুদ্র এলাকা বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য খুবই উপযোগী। সেই সঙ্গে সৌর আর বায়ুবিদ্যুতের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য রয়েছে দাম কমতে থাকা ব্যাটারির সুবিধা। এভাবে শিল্প, কৃষি আর ব্যবসা-বাণিজ্যে এই বিদ্যুৎ ক্রমেই নিজের দখল বাড়াচ্ছে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মাত্র তিন বছরে ভারতে ১ লাখ ১০ হাজার সৌরবিদ্যুৎ চালিত পানির পাম্প চালু হয়েছে। ২০১৬ সালে জার্মানিতে একক উৎস হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল শীর্ষে। সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ নির্ভরশীলতা দিয়েই ওই বছর জার্মানি ইউরোপে শীর্ষ বিদ্যুৎ রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। (ডব্লিউএনআইএসআর ২০১৭)। অন্যদিকে, ভারতের চতুর্থ ব্যস্ততম কোচিন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পুরোটাই চলছে সৌরবিদ্যুতে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুবিধা মূলধারার অর্থনীতিতে আত্তীকরণ করতে দেশে দেশে ঘোষিত হচ্ছে নিত্যনতুন লক্ষ্যমাত্রা। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যেই ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ অজীবাশ্ম জ্বালানি থেকে উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। (দ্য গার্ডিয়ান, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৬) আর জার্মানির ক্ষেত্রে এই লক্ষ্যমাত্রা ২০৩৫ সালের মধ্যে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ। (ইনডিপেনডেন্ট, ৫ মে, ২০১৭)। বিপরীতে বাংলাদেশের সদ্য প্রণীত পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (পিএসএমপি-২০১৬) অনুসারে ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আমদানি করা বিদ্যুৎ মিলিয়ে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা মোট উৎপাদনের মাত্র ১৫ শতাংশ। বিপরীতে কয়লা এবং পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ৩৫ এবং ১০ শতাংশ। অথচ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মহলের গবেষণাগুলোয় হিসাব কষে দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কোন উৎস থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ কত টাকা বিনিয়োগে উৎপাদন সম্ভব। সদ্য প্রকাশিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যাচ্ছে যে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকেই মেটানো সম্ভব; আর তাতে করে প্রতিবছর মাথাপিছু সাশ্রয় হবে দুই হাজার টাকা (Jacobson et al., 2017)।
কিন্তু এই সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সর্বব্যাপী উদ্যোগ আর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। প্রচলিত কোম্পানিভিত্তিক মডেলে অধিক ব্যবসায়িক মুনাফার নিশ্চয়তা আসতে পারে, কিন্তু তাতে কখনোই সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না। আর ঠিক এ কারণেই কমতে থাকা সৌরবিদ্যুতের কালে এসেও বাংলাদেশের কোথাও কোথাও গ্রাহককে ইউনিটপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। (ডেইলি স্টার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৭)। আর বর্তমানে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ১২ টাকা ইউনিটে বিদ্যুৎ কিনতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি হচ্ছে, যার কারণে সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধা সাধারণ মানুষ পাবে না, এই খাত পরিণত হবে শুধুই একচেটিয়া মুনাফার কারবারিতে। (ডেইলি স্টার, ২৮ আগস্ট, ২০১৭)। কমতে থাকা দাম, সাধারণ মানুষের আগ্রহ আর চলতে থাকা বিদ্যুৎ-সংকট বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার প্রসারে উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করেছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণী মহলে উদ্ভাবনী চিন্তার বন্ধ্যাত্বকালে এই খাত উন্নয়নে আপাতত কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। তবে ভবিষ্যতে সুলভে বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে গবেষণা বরাদ্দ, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ আর প্রণোদনা বাড়িয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনী মূল অবকাঠামোয় বড় আকারে যুক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: প্রকৌশলী, জ্বালানিপ্রযুক্তি-বিষয়ক গবেষক।
mowdudur@gmail.com

তথ্য হাতানোর দৌড়ে নেমেছে চীনও? by কেন্ট হ্যারিংটন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের খবর চাউর হওয়ার পর ইউরোপীয় নেতারা নড়েচড়ে বসেছেন। তাঁদের নির্বাচনে যেন রাশিয়া একই কায়দায় সামাজিক যোগাযোগ ও ইন্টারনেটের অন্যান্য মাধ্যম ব্যবহার করে নাক গলাতে না পারে, সে জন্য তাঁরা সতর্কতা অবলম্বন করছেন। অন্যদিকে, চীনের নেতারাই শুধু সতর্ক হচ্ছেন তা নয়, বরং রাশিয়ার এই কায়দা রপ্ত করতে তাঁরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করে দিয়েছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। দেশের অভ্যন্তরের সম্ভাব্য অসন্তোষ, চক্রান্ত বা অস্থিতিশীলতা ঠেকাতে গত বাজেটে চীন নিরাপত্তা ব্যয়ের বরাদ্দ ধরেছে ১০ হাজার কোটি ডলার। এটি আনুষ্ঠানিক ঘোষিত বাজেট। প্রকৃত ব্যয় এর চেয়ে অনেক বেশি হবে। অভ্যন্তরীণ নজরদারি, গোয়েন্দা তৎপরতা, গবেষণা ও উন্নয়নমূলক কাজে এই বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের তথ্য থেকে সামাজিক যোগাযোগের যাবতীয় তথ্য নজরদারিতে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সংক্ষেপে এআই) এবং উপাত্ত সম্ভার কাজে লাগানো যায় সেটি নিয়ে চীন কাজ করছে। তাদের লক্ষ্য শুধু অভ্যন্তরীণ তথ্য-উপাত্তের প্রতি নজরদারি নয়, বরং বাইরের দেশ থেকে কীভাবে তথ্য ঢুকছে এবং দেশের বাইরে কীভাবে কোন কোন তথ্য পাচার হচ্ছে, তার নাড়ি-নক্ষত্র জানতে চায় চিন পিংয়ের সরকার। এর বাইরে সরকার নতুন নতুন কঠোর আইন এবং সাইবার সিকিউরিটি তদন্তের মাধ্যমে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে তার রাস্তায় আনার চেষ্টা করছে।
ক্রেমলিন যে কায়দায় ফেসবুক ও টুইটারকে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছিল, সেভাবে তারা যাতে চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে জন্য সি চিন পিং আগে নিজের দেশের সাইবার সিস্টেম হাতের মুঠোয় রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। চীনের সরকার সে দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘উইচ্যাট’, ‘উইবো’ ও ‘টেনসেন্ট’-এর পর্ষদে এখন নিজেদের প্রতিনিধি বসানোর দাবি করেছে এবং এসব মাধ্যম ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য-উপাত্ত সরকারের হাতে দেওয়ারও অনুরোধ জানিয়েছে। চীনের সাইবার গোয়েন্দারা রাশিয়ার সাফল্য নিয়েও গবেষণা করছেন। এটা প্রায় নিশ্চিত যে চীনের হ্যাকাররা প্রযুক্তিগত জ্ঞানে কোনো অংশে পিছিয়ে নেই। তারাও রাশিয়ার মতো মার্কিন নির্বাচনের প্রচারশিবির, চীনের বাইরে থাকা তিব্বতি আন্দোলন ও উইঘুর আন্দোলন শিবিরের ওয়েবসাইটে সফলভাবে সাইবার হামলা চালিয়েছে। যেসব পশ্চিমা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় চীন নিয়ে গবেষণা করে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে তারা হামলা চালিয়েছে। এমনকি চীনের নেতাদের সহায়-সম্পত্তির হিসাব ফাঁস করে দিয়ে সরকারকে যেসব বিদেশি গণমাধ্যম বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল, তাদের ওয়েবসাইটও তারা হ্যাক করেছে। তবে এত সাফল্যের পরও চীন মনে করে, ক্রেমলিনের কাছ থেকে এখনো তাদের অনেক কিছু শেখার আছে। দেশের সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি সি চিন পিং অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমের পদক্ষেপের মাধ্যমে চীনের ‘সফট পাওয়ার’ বাড়াতে চাইছেন। অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাপকভাবে চীনের গোয়েন্দা তৎপরতার কথা সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় অধ্যয়নরত চীনা শিক্ষার্থী, সে দেশে থাকা চীনা ব্যবসায়ী কিংবা কূটনীতিকেরা চীনা স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কিছু করছেন কি না, কিংবা কোনো তথ্য পাচার করছেন কি না, তা নজরদারির জন্য জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। চীনের একজন কোটিপতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখার কথা ফাঁস হওয়ার পর গত বছর অস্ট্রেলিয়ার একজন সিনেটরকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। বিশ্ব গণমাধ্যম জগতেও চীন তার উপস্থিতি ক্রমেই বাড়াচ্ছে। কিছু সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর ডিজিটাল মিডিয়া ও সম্প্রচারের পেছনে চীন সরকার ৭০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ঢালছে। সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার বিশ্বজুড়ে ১৭০টি ব্যুরো আছে এবং এটি আটটি ভাষায় সংবাদ সরবরাহ করে। চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনের (সিসিটিভি) ৭০ টির বেশি ব্যুরো থেকে ৬টি ভাষায় ১৭১টি দেশে সংবাদ সম্প্রচার করা হয়। বিবিসির পরই বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেডিও ব্রডকাস্টার হচ্ছে চায়না রেডিও ইন্টারন্যাশনাল। সারা বিশ্বে এর ৯০টি রেডিও স্টেশন ও ৩২টি ব্যুরো আছে। ৬৪টি ভাষায় এই রেডিও থেকে খবর পড়া হয়। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা খুব দৃঢ় নয়, তারপরও মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার মতো যেসব অঞ্চল এখনো তথ্যের দিক থেকে পিছিয়ে আছে, সেখানে তাঁরা চীনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে এবং চীনের প্রতি সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, অচিরেই সাইবার জগতের এক মহাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে চীন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
কেন্ট হ্যারিংটন সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক

মহাদুর্ভোগের মহাসড়ক

৩ মার্চ প্রথম আলোর প্রথম পাতার প্রধান প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘মহাসড়ক মানেই মহাদুর্ভোগ’। চলাচলের পথে দুর্ভোগ নিশ্চয়ই পীড়াদায়ক সমস্যা; কিন্তু সারা বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর যে দুর্দশা হয়েছে, তা শুধু মানুষের দুর্ভোগেরই কারণ হচ্ছে না, জাতীয় অর্থনীতির বিরাট ক্ষতিরও কারণ হচ্ছে। ৬ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করতে ১২ ঘণ্টা, কখনো কখনো ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যয় হলে শুধু মানুষের যাতায়াত নয়, পণ্য পরিবহন তথা ব্যবসা-বাণিজ্যেও শ্লথগতি সৃষ্টি হয়। সুতরাং, দেশের সড়ক-মহাসড়কের দুর্দশা জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথেও একটা অন্তরায়। এবং এই দুরবস্থা সাময়িক নয়, বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে; একধরনের স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) প্রতিযোগিতা-সক্ষমতাবিষয়ক সমীক্ষায় সড়কের মান একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত; কেননা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় কোন দেশের সক্ষমতা কেমন, তা অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সড়ক অবকাঠামোর গুণগত মানের ওপরও নির্ভরশীল। ডব্লিউইএফের ২০১৭ সালের প্রতিবেদন বলছে, এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর মান নিকৃষ্টতম থেকে মাত্র এক ধাপ ওপরে। এক নেপাল ছাড়া আর সব দেশের সড়ক আমাদের চেয়ে উৎকৃষ্ট। অথচ আমাদের দেশে সড়ক নির্মাণের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আমাদের সড়ক নির্মাণব্যয় সবচেয়ে বেশি। গত বছরের জুনে বিশ্বব্যাংকের এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণের পেছনে প্রতি কিলোমিটারে খরচ করা হয়েছে ২৫ লাখ মার্কিন ডলার।
ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণেও একই ব্যয় হয়েছে। কিন্তু রংপুর-হাটিকুমরুল, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-মাওয়া—এই তিনটি চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণে অবিশ্বাস্য মাত্রায় বেশি ব্যয় করা হয়েছে। এই তিন মহাসড়ক নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় করা হয়েছে যথাক্রমে ৬৬ লাখ, ৭০ লাখ ও ১ কোটি ১৯ লাখ মার্কিন ডলার। সড়ক নির্মাণে এত বিপুল ব্যয় শুধু এশিয়ায় কেন, সারা বিশ্বের কোথাও হয় না। যেমন বিশ্বব্যাংকের সূত্রেই জানা গেছে, ভারতে চার লেনের এক কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় হয় ১১ লাখ থেকে ১৩ লাখ ডলার; চীনে ১৩ লাখ থেকে ১৬ লাখ ডলার এবং ইউরোপীয় দেশগুলোতে ৩৫ লাখ ডলার। প্রথম আলোর ৩ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীন দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-সেতু মেরামত ও নির্মাণের পেছনে গত আট বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ অর্ধেকের বেশি সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা শোচনীয়। একটি সড়ক নির্মাণ করার পর কোনো রকম মেরামত ছাড়াই তা টানা ১৫ বছর ভালো থাকবে—এটা ধরে নিয়েই সড়কের নকশা ও নির্মাণকাজ করার রীতি। অথচ নির্মাণের পর এক বছর না পেরোতেই সড়ক-মহাসড়কের স্থানে স্থানে ভেঙে যায়, খানাখন্দ সৃষ্টি হয়। ফলে বছর না ঘুরতেই সেগুলো মেরামতের প্রয়োজন দেখা দেয়। মেরামতের কাজও ভালোভাবে করা হয় না, ফলে সেগুলো টেকসই হয় না, অবিরাম মেরামতি লেগেই থাকে, অবিরাম কোটি কোটি টাকা ব্যয় হতে থাকে। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও মেরামত নিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থের অপচয় একটা স্থায়ী ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের সড়ক-মহাসড়কগুলোর এই চিরদুরবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ নির্মাণ ও মেরামতে গলদ। অতিরিক্ত পরিমাণে মালামাল বোঝাই করে যানবাহন চলাচল এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার দুর্বলতাও সড়ক নষ্ট হওয়ার কারণ বটে; তবে প্রথম কারণটিই প্রধান। নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা হয় না এ কারণে যে এ ক্ষেত্রে ব্যাপক মাত্রার দুর্নীতি চলে। আমাদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর এই যে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার চর্চা চলছে, এর কি কোনো জবাবদিহি নেই?

সড়ক নির্মাণে দুর্নীতি

সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাজে আর্থিক অনিয়মের উৎস খুঁজে বের করতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক দল যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে, তাতে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী (ইট, বালু, বিটুমিন, সিমেন্ট) দিয়ে সড়ক নির্মাণ, কাজ শেষ হওয়ার আগে বিল প্রদান, টেন্ডার নিয়ে কারসাজি, ঘুষ গ্রহণ ও নজরদারির দুর্বলতা বিশেষভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। তবে এতে আর্থিক অনিয়মের পুরো চিত্র উঠে এসেছে বলা যাবে না। প্রতিবেদনে ঠিকাদার ও উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি তথা প্রকৌশলীদের যোগসাজশের কথা বললেও কারা ঠিকাদারি পায়, সে কথা উল্লেখ করা হয়নি। ঠিকাদার ও উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অলিখিত আঁতাতের কথা সবার জানা। আর সেই ঠিকাদার রাজনৈতিক ক্ষমতাবলয়ের লোক হলে তো তিনি আইনকানুন মানার প্রয়োজন বোধ করেন না। কেবল সড়ক নয়, জল–স্থলের যেখানেই উন্নয়নকাজ হচ্ছে, সেসবের ঠিকাদারি পাচ্ছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। সব সরকারের আমলেই এটি হয়ে আসছে। কাজের অভিজ্ঞতা থাকুক বা না-থাকুক, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের কাজটি পাইয়ে দিতে হয়। এ অবস্থায় উন্নয়নকাজে ন্যূনতম সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি আশা করা যায় না।
প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক টিম বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা, অধিদপ্তরের নথি পর্যালোচনা, সরেজমিন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিদর্শন, গণমাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং কমিশনের গোয়েন্দা উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। এতে দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন না করা, প্রভাবশালীদের/ঠিকাদারের চাপে এবং পরস্পর যোগসাজশে একশ্রেণির প্রকৌশলী/কর্মকর্তা সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, সিন্ডিকেট পদ্ধতিতে ঠিকাদার নিয়োগ, কাজ পাওয়ার জন্য প্রভাবশালী ব্যক্তি, পরামর্শক সংস্থা, সরকারি কর্মকর্তাদের উৎকোচ দেওয়ার মতো যে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি প্রতিকারে ২১ দফা সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু দুদকের প্রতিবেদনের ঘাটতি হলো তারা সড়ক বিভাগের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরলেও এর কুশীলবদের নাম-ঠিকানা ঊহ্য রেখেছে। দুদক যদি দুর্নীতিবাজদের শনাক্তই করতে না পারে, তাহলে এসব প্রতিবেদন বা সুপারিশ কোনো কাজে আসবে না। আর পাঁচটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো তারা প্রতিবেদন তৈরি কিংবা সুপারিশ পেশ করে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। প্রতিবেদনের আলোকে সড়ক বিভাগে যেসব দুর্নীতি হয়েছে, সেসব নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই হবে। উন্নয়নের নামে সরকারি তথা জনগণের অর্থের অপচয় বন্ধ করতেই হবে। কেবল সড়ক নয়, সরকারের প্রতিটি বিভাগের উন্নয়নকাজেই এ রকম আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি রয়েছে। অন্যান্য বিভাগ সম্পর্কেও প্রতিবেদন তৈরি এবং তা জনগণের সামনে প্রকাশ করা হোক।

নতুন লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ত্রিপুরা জয়ের পর কিংবা ঘুরিয়েও বলা যায়, ত্রিপুরায় বাম-বধ পর্ব শেষে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইট করলেন-এই হলো শূন্য থেকে শিখরে ওঠার কাহিনি। তাঁর পরের টুইটটি ছিল-এই জয় আদর্শের। যে রাজ্যটিতে লোকসভার আসনসংখ্যা মাত্রই দুটি, যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মোট আটটি রাজ্য মাত্র পঁচিশ জনকে লোকসভায় পাঠায়, সেখানে মৌরসি পাট্টা গাড়তে, সিকি শতকের বাম শাসনের অবসান ঘটাতে বিজেপি কেন এমন ব্যাকুল ছিল? কারণটা লুকিয়ে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী মোদির ওই টুইটে। সরকার-রাজের অবসান ঘটিয়ে দেশকে তিনি এই বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে ভারতে কমিউনিস্ট আদর্শ অচল আধুলি। সচল ও সত্য শুধু তাঁরাই। নামে বামফ্রন্ট হলেও ত্রিপুরার লড়াই ছিল সিপিএমের সঙ্গে বিজেপির। ভারতের এই প্রান্তিক রাজ্যটির এই মহারণ এভাবেই চিহ্নিত হয়ে এসেছে। অথচ ত্রিপুরায় গৈরিকরাজের কোনো ইতিহাস কখনো ছিল না। এই রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক অধ্যায় বরাবরই আবদ্ধ থেকেছে উপজাতিদের সঙ্গে সমতলের বাঙালির টানাপোড়েনে। একটা সময় পর্যন্ত নিরন্তর সংঘর্ষে রক্তাক্ত হয়েছে রাজ্যটি। সিপিএম সেই দুশ্চিন্তার দিনগুলোর মোকাবিলা করেছে শক্ত হাতে। উপজাতিদের মধ্যে গড়ে তুলেছে সংগঠন। তখন থেকেই রাজ্যে বামপন্থীদের প্রতিপক্ষ কংগ্রেস। উপজাতিদের নিজস্ব কিছু দল ছাড়া তৃতীয় কোনো শক্তির উপস্থিতি সেখানে ছিল না। বিজেপি সেই অর্থে ত্রিপুরায় নিতান্তই আনকোরা। তিন বছর আগে আরএসএসের প্রচারক সুনীল দেওধরকে বিজেপি যখন ‘মিশন ত্রিপুরা’ সফল করতে আগরতলায় পাঠায়, তখনো কেউ তাঁর অভিযানকে নেক নজরে নেয়নি। কেনই বা নেবে? পাঁচ বছর আগে তাদের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল দেড় শতাংশ! একজন ছাড়া সব প্রার্থীর জামানত জব্দ হয়েছিল! কোন ভরসায় তাহলে কোমর বেঁধেছিলেন সুনীল দেওধরেরা? তাঁদের ভরসা ছিল রাজ্যের ৫০ শতাংশ বামবিরোধী ভোট এবং উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত কুড়িটি আসন। এই বামবিরোধী ভোট, যা কিনা প্রধানত ঘোরাফেরা করত কংগ্রেসের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে, যে দলটা সর্বভারতীয় বাধ্যবাধকতার দরুন বামপন্থীদের কখনো প্রতিপক্ষ বলে ভাবতে পারেনি, বরং তাদের সাহায্য নিয়ে বিজেপিকে তফাতে রাখতে চেয়েছে, বিজেপি তাদের দিকেই প্রথম হাত বাড়ায়। রাজ্য কংগ্রেসিরা তত দিনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শরণাপন্ন হয়ে আশাহত। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে তাদের সরিয়ে বিজেপির দিকে টেনে আনার কাজটা সুনীল দেওধরেরা করে ফেলেন আসামের সাবেক কংগ্রেসি ও বিজেপির মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে দিয়ে। দেড় শতাংশ থেকে এক লাফে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের হার এই যে ৪৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারল, তা কংগ্রেসেরই দান। এই প্রথম রাজ্যের বামবিরোধী ভোটকে বিজেপি তার বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়ে একজোট করতে পারল, যা কংগ্রেস তার সর্বভারতীয় বাধ্যবাধকতার দরুন কখনো করতে পারেনি। উপজাতিদের মধ্যে আরএসএস কাজ করছে বহুদিন। আর্যাবর্তের রাজ্যে রাজ্যে রয়েছে সেই নিদর্শন।
সুনীল দেওধরদের কাছে তাই ত্রিপুরার উপজাতিদের মধ্যে মিশে যাওয়াটা ছিল পানির মধ্যে মাছের সাঁতার কাটার মতো সহজ। তিন বছরের মধ্যেই তিনি উপজাতিদের ‘ককবরক’ ভাষা যেমন রপ্ত করে ফেললেন, তেমনি শিখে ফেললেন সমতলের ভাষা বাংলা। সেই সঙ্গে তাঁরা খেলে ফেললেন চমৎকার এক ফাটকা। ত্রিপুরার উপজাতিদের স্বাধীন রাজ্য গঠনের আকাঙ্ক্ষা এখন নিবু নিবু। বিজেপির ফাটকা সেই মানসিকতা নিয়ে। ‘ইনডিজেনাস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরা’ বা সংক্ষেপে ‘আইপিএফটি’র সঙ্গে বিজেপি নির্বাচনী জোট করে ফেলে এটা জেনেই যে তারা স্বাধীন ‘তুইপ্রাল্যান্ড’-এর দাবি থেকে এখনো সরেনি। এটা ছিল মারাত্মক একটা ঝুঁকি। কেননা, সমতলের বাঙালিদের সঙ্গে উপজাতিদের বিরোধের মূল কারণই রাজ্যভাগের ওই দাবি। সিপিএমও একটা সময় ধরেই নিয়েছিল, ওই জোটই তাদের আরও একবার তরিয়ে দেবে। সমতলের বাঙালিদের ভোটে জিতে তারা গড়বে ষষ্ঠ বামফ্রন্ট সরকার। কিন্তু দেশবাসী অবাক হয়ে দেখল, মোদির বিজেপি বাঘ-গরুকে এক ঘাটে পানি খাওয়াল। দেখা গেল এক অসাধারণ ব্যালান্সের খেলা! বিজেপির প্রচারে বড়ভাবে উঠে এসেছিল ‘এক ত্রিপুরা, ঐক্যবদ্ধ ত্রিপুরা’র স্লোগান। রাজ্যভাগ না করার কথাও তারা বারবার বলে এসেছে। অথচ এ কথা তারা কখনো বলেনি যে শরিক দলের এই দাবি তারা অগ্রাহ্য করছে। আইপিএফটির পতাকা, টুপি, টি-শার্ট বা ব্যাজে স্বাধীন তুইপ্রাল্যান্ডের ম্যাপ জ্বলজ্বল করলেও বিজেপি তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেনি। এই অনুচ্চার অবস্থান উপজাতিদের জন্য সংরক্ষিত আসনগুলোতে সমর্থনের বান বইয়েছে। ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়েছে সিপিএমের এত দিনের আধিপত্য ও অহংকার। পাশাপাশি আদায় করেছে সমতলের বিপুল সমর্থন। ব্যালান্সের এমন চমৎকার খেলা ত্রিপুরাবাসী আগে দেখেনি। কী করে এই অসম্ভব সম্ভব হলো? অনেক কারণের একটা হলো সিপিএমের ঢঙেই তাদের মোকাবিলা। দুটিই ক্যাডার ও সংগঠনভিত্তিক দল। সুনীল দেওধর রাজ্যে এসে গড়ে তোলেন যুব, ছাত্র, নারী, আদিবাসীদের বিভিন্ন সংগঠন। সিপিএমের ‘হোলটাইমার’দের মতোই গোটা রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সংঘের প্রচারকদের। এমনকি রেল প্রচারকও নিয়োগ করে তারা, যাদের কাজ ছিল ট্রেনে ট্রেনে প্রচারের মাধ্যমে ভোটারদের ‘ডেটাবেইস’ তৈরি করা। এভাবে ভোটের এক মাস আগে বিজেপি রাজ্যের সর্বত্র ‘বুথ কমিটি’ গড়ে ফেলে। একটা দিনও এই তিন বছরে কাটেনি, যেদিন রাজ্যের কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ বিজেপি ও মোদি-মাহাত্ম্য প্রচার করেনি। দ্বিতীয় কারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি ও দরিদ্রদের দুটো স্বপ্ন দেখানো। সোয়া দুই লাখ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য সপ্তম বেতন কমিশন চালু এবং দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষের জন্য ১০০ দিনের কাজের মজুরি দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি। চতুর্থ বেতন কমিশন অনুযায়ী মাইনে পাওয়া রাজ্য সরকারি কর্মীরা এই এক প্রতিশ্রুতিতেই যে বাম শিবির ছেড়ে বিজেপিকে বরণ করে নিয়েছে, ভোটের ফল বেরোনোর পর তা স্পষ্ট। তৃতীয় কারণ, তিরিশের নিচে যাঁদের বয়স, তাঁদের জন্য কর্মসংস্থানের উদ্যোগ। গোটা রাজ্যে বিজেপির সভা-সমাবেশ ও মিছিলে তারুণ্যের যে জোয়ার দেখেছি, তাতে স্পষ্ট, মানিক সরকারেরা এই প্রজন্মের চাহিদা ও স্বপ্নকে ধরতে পারেননি।
দল ও সরকার চালানোর বস্তাপচা ধ্যান-ধারণার বাইরে এসে নিজেদের আধুনিক করে গড়ে তুলতে পারেননি। গেল নির্বচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৬ শতাংশ ভোট। আসন পেয়েছিল ১০ টি। বাকি ৫০টি ছিল বামদের। সেই বামেরা এবার চাতক পাখির দৃষ্টিতে চেয়ে ছিল কংগ্রেসের দিকে। অবস্থা যে কী করুণ, তা মালুম হয়েছিল ভোটের চার দিন আগে। আগরতলায় সিপিএমের পার্টি অফিসে বসে দলের শীর্ষ নেতা গৌতম দাস বলেছিলেন, ‘কংগ্রেস কি চার-পাঁচ পার্সেন্ট ভোটও পাবে না? এ-ও হয় নাকি? ওটুকু পেলেই যথেষ্ট।’ সেদিনই বোঝা গিয়েছিল লাল পার্টির হাল কতটা করুণ। কংগ্রেস পেয়েছে ঠিক ততটা, পাঁচ বছর আগে যা ছিল বিজেপির ভোট শেয়ার। দেড় শতাংশ! ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী কিংবা চট্টগ্রামের মানুষজনকে বলতে শুনেছি, আগরতলায় উঁচু মানের সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল থাকলে তাঁদের কলকাতা বা দিল্লি কিংবা ভেলোরে যেতে হতো না। ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের এই সহজ কথাটা সিপিএম বুঝতে চায়নি। এত চমৎকার এক রাজ্যকে পর্যটন ম্যাপে নিয়ে আসার তেমন চেষ্টাও তারা করেনি। রাজ্য থেকে প্রতিবছর যে মেয়েরা নার্সিং পাস করে, তাদের ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয় বেঙ্গালুরুতে। কেন ত্রিপুরাতেই সেই প্রশিক্ষণের বন্দোবস্ত করা যায় না, তার সদুত্তর সিপিএমের নেতারা দিতে পারেননি। কেমন যেন গয়ংগচ্ছ মনোভাবে গা এলিয়ে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল তাঁদের। অথচ সুনীল দেওধরদের দেখেছিলাম টগবগে! গুজরাট, রাজস্থান ও সদ্য মধ্যপ্রদেশের উপনির্বাচনের পর চনমনে কংগ্রেস ত্রিপুরা, নাগাল্যান্ড ও মেঘালয়ের ফলে যতটা হতাশ, ঠিক ততটাই উজ্জীবিত বিজেপি। অমিত শাহ জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের রেডারে এখন জ্বলজ্বল করছে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। দুশ্চিন্তার কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পূর্ব প্রান্তে বিজেপির বিজয়রথ ঠেকানোর বড় দায় এখন তাঁরই। সুনীল দেওধর বলেছেন, ‘ত্রিপুরা আজ থেকে অতীত। নেতাদের বলব, এবার আমাকে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব দেওয়া হোক।’
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

বইমেলা, লেখক ও প্রকাশনাশিল্প by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বাংলা একাডেমি চত্বরে, এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত প্রসারিত, একুশের বইমেলা বাংলাদেশের সংবাৎসরিক বৃহত্তম সাংস্কৃতিক ঘটনা। আয়োজনের দিক থেকে এবং স্থায়িত্বের দিক থেকেও। মাসব্যাপী আয়োজন এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার দিক থেকেও। একুশের বইমেলার আয়োজক সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলা একাডেমি, সহযোগিতা দিয়ে থাকে ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রকাশনা সংস্থাগুলো। তবে ৪৫০ প্রকাশকের মধ্যে এমনও অনেকে আছেন, যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু তাঁদের আগ্রহ-উৎসাহ অসামান্য। স্রেফ ব্যবসা তাঁদের লক্ষ্য নয়। সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অংশগ্রহণ করাই তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য। এই সবকিছু বিবেচনায় একুশের বইমেলাকে যে প্রাণের মেলা বলা হয়, তা অর্থহীন নয়। এই বইমেলা লেখক, প্রকাশক ও পাঠকের গণ্ডি পেরিয়ে একটি সামাজিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। বই একটি জড়বস্তু হলেও তা প্রাণহীন নয়। সে হিসেবে বইয়ের মেলাকে প্রাণের মেলা বললে ভুল হয় না। লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মিলনের উপলক্ষ হওয়ায় তা যে মিলনমেলা, তা বলাই বাহুল্য। গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্রাণের মেলা-মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই মেলা জাতীয় জীবনে, বিশেষ করে সাহিত্য-সংস্কৃতির অগ্রগতিতে কী ভূমিকা রাখছে, তার মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন। গত তিরিশ বছরে মেলা উপলক্ষে বা মেলার সময় বিপুলসংখ্যক নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে।
বইমেলাকে কেন্দ্র করে কোথাও এত সংখ্যক বই বের হয় কি না, আমার জানা নেই। এই সময়ে গ্রন্থকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। বাংলা একাডেমির দেওয়া তথ্য হিসাবে, এবার মেলায় নতুন বই এসেছে ৪ হাজার ৫৯১ টি। গতবারের মেলায় নতুন বই এসেছিল ৩ হাজার ৬৪৬ টি। অর্থাৎ এবার ৯৪৫টি বই বেশি প্রকাশিত হয়েছে। আমার পরিচিত কয়েকজনের বই, যেগুলোর মলাটে আমার মন্তব্য থাকার কথা ছিল, ছাপা হয়েছে কিন্তু বাঁধাই না হওয়ায় মেলায় প্রকাশিত হতে পারেনি। আরও অনেক লেখক-লেখিকাকে মেলা শেষ হওয়ার এক দিন আগেও মাথা চাপড়াতে দেখেছি শেষ মুহূর্তে তাঁদের বই আলোর মুখ দেখতে পারেনি বলে। অন্যান্য বারের মতো নতুন বইয়ের মধ্যে কবিতার বই-ই শীর্ষে-১ হাজার ৪৭২ টি। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে গল্পগ্রন্থ ৭০১টি এবং তৃতীয় স্থানে উপন্যাস ৬৪৩ টি। বাংলা একাডেমির নিজস্ব জরিপে এবারের মেলায় প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে ৪৮৮টি মানসম্পন্ন। সংখ্যার দিক থেকে এটিও ছোট নয়। মননশীল বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ যথেষ্ট, তা বড় প্রকাশকেরা জানিয়েছেন। একশ্রেণির শৌখিন লেখক-প্রকাশক বিষয়টি অনুধাবন করতে না পারলেও, পর্যবেক্ষণ থেকে দেখা যায় গুণমানসম্পন্ন বইয়ের পাঠক বাড়ছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু ও গুণমানসম্পন্ন সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রথমা প্রকাশন পুরস্কৃত হয়েছে। তা ছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে সেরা প্রকাশক হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছে বেঙ্গল পাবলিকেশনস, জার্নিম্যান বুকস, সময় প্রকাশন, চন্দ্রাবতী একাডেমি এবং কথা প্রকাশ। তাদের অভিনন্দন। এক মাসে প্রকাশিত নতুন বইয়ের মধ্যে চার হাজারের মতো বই মানসম্মত নয় বলে বিবেচিত হওয়া-এই তথ্য অবহেলা করার মতো নয়। যা মানসম্মত নয়, তা শ্রম দিয়ে টাকা খরচা করে বের করার প্রয়োজন কী? পাঠকসমাজে অপরিচিত বা নতুন লেখকের বই প্রকাশ এক কথা আর মানহীন বই প্রকাশ আরেক কথা। নতুন লেখক হলেই বই মানহীন হবে, এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেক নতুন লেখক তাঁর প্রথমটিতেই খ্যাতিমান হন। দ্য গড অব স্মল থিংস প্রকাশের আগে অরুন্ধতী রায় লেখিকা হিসেবে অপরিচিত ছিলেন। ঝুম্পা লাহিড়ী তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থেই কিস্তিমাত করেন। এবার যে সাত শতাধিক ছোটগল্পের বই বেরিয়েছে মেলার সময় তার লেখকদের মধ্যে সাতজন যদি বাংলা সাহিত্যে টিকে যান, সেটা খুবই আনন্দের কথা।
কবিতা ও গল্প-উপন্যাসের বই প্রচুর বেরিয়েছে, তা খুশির কথা সন্দেহ নেই। তবে মেলায় যদি নতুন তত্ত্বমূলক দু-চারখানা দর্শনের বই বের হতো, তা হতো অতি বড় প্রাপ্তি। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম, জার্মানি ও পশ্চিম ইউরোপের কোনো কোনো দেশে গল্প-উপন্যাস-কবিতার বই যত বেরোয়, দর্শনের বই তার চেয়ে কম প্রকাশিত হয় না। দর্শন বলতে শুধু মেটাফিজিকস বা অধিবিদ্যা নয়, বিভিন্ন বিষয়ের দার্শনিক তত্ত্বমূলক বই। বই শুধু পাঠককে আনন্দ দেয় না, পাঠকের জীবন বদলানোর ক্ষমতা রাখে। সমাজ বদলে বইয়ের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। প্লেটো, অ্যারিস্টটল, ভলতেয়ার, রুশো, কান্ট, হেগেল, মার্ক্সের বই সমাজ পরিবর্তনে কী ভূমিকা রেখেছে, তা মানুষ জানে। তাঁরা ছাড়া আরও অগণিত লেখক ও দার্শনিকের বই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমাজ পরিবর্তনে অবদান রেখেছে। সে ধরনের বই রোজ রোজ সব ভাষাভাষীর মধ্যে ভূরি ভূরি প্রকাশিত হয় না বটে, তবে অনেক ভাষাতেই কমবেশি প্রকাশিত হয়। গত ১০ বছরে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দার্শনিক বইয়ের সংখ্যা কত, আমার ধারণা নেই। বই রচনা প্রতিভাবান মানুষের কাজ। বই সুসম্পাদিত করে রুচিসম্মতভাবে প্রকাশ করা আরেক ধরনের করিতকর্মা মানুষের কাজ। যদিও বইয়ের বিষয়বস্তুই আসল, কিন্তু এই যুগে অঙ্গসজ্জা উপেক্ষা করার উপায় নেই। কারণ, বই একটি বস্তু বা পণ্য, তা দৃষ্টিনন্দন না হলে ক্রেতাকে আকর্ষণ করবে না। বইয়ের প্রকাশনা ও বইমেলা একটি অর্থনৈতিক বিষয়। ‘মেলায় ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশনা সংস্থার প্রতিনিধিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, এবার মেলায় মোট ৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকার বই বিক্রি হয়েছে, যা গতবারের তুলনায় ৫ কোটি টাকা বেশি।’ [প্রথম আলো, ১ মার্চ] এতে প্রমাণিত হয়, হয় পাঠকের সংখ্যা বেড়েছে, অথবা ভালো মানসম্মত বইয়ের প্রকাশনা বেড়েছে। জ্ঞানভিত্তিক জাতি গঠনের জন্য প্রকাশনাশিল্প রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা দাবি করে। কিন্তু প্রকাশনাশিল্পকে যতটা গুরুত্ব দেওয়ার কথা, সরকার তা দিচ্ছে না। এখানে পুঁজি খাটাতে হয়। লাখ লাখ শ্রমিক এই শিল্পে নিয়োজিত। মানসম্মত বইয়ের মতো তাদের জীবনযাত্রার মানের দিকেও দৃষ্টি রাখা দরকার। প্রতিষ্ঠিত লেখকদের সমস্যা নেই, কিন্তু প্রতিভাবান নতুন লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। মূল্যবান গবেষণাগ্রন্থের লেখক-প্রকাশকদের সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া টিকে থাকা কঠিন এই জন্য যে ওই সব বইয়ের পাঠক সীমিত। নতুন প্রতিভাবান লেখকদের বই প্রকাশে কাগজে ভর্তুকিসহ বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়া প্রয়োজন। বইমেলায় ছোটকাগজ বা লিটল ম্যাগাজিনকে পৃথক জায়গা দেওয়া হয়।
সেটা খুব প্রয়োজনীয় ও ভালো উদ্যোগ। ছোটকাগজগুলোর স্টলে ঘুরে অনিয়মিত সাময়িকীগুলোর পাতা উল্টে মনে হয়েছে, বহু সম্ভাবনাময় লেখক তৈরি হচ্ছেন। অবহেলায় প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটে। লিটল ম্যাগাজিনের প্রথাবিরোধী লেখকদের আনুকূল্য ও প্রণোদনা দিতে হবে। আজ আমরা যারা প্রতিষ্ঠিত, তারা একদিন অনেকেই লিটল ম্যাগাজিন দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিলাম। একুশের বইমেলার অনেক বছর হয়ে গেল। যখন বইমেলা হতো না, তখনো বই প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলামের সময় বইমেলা ছিল না। কিন্তু এ যুগে বইমেলার প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা যায় না। বইমেলা শুধু বই বেচাকেনার ব্যাপার নয়। সেখানে পাঠক বই নির্বাচন করার সুযোগ পান, যে বইটি ভবিষ্যতে তিনি কখনো কিনবেন। বই সমগ্র জাতির চেতনা ধারণ করে। জাতির সৃষ্টিশীলতা ও মননশীলতার পরিচয় বইতে। গত ২০-২৫ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে এখন প্রধান লেখক, প্রকাশক, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের একত্রে বসে বিচার-বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে বইমেলার মান ও মর্যাদা বাড়াতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন জাতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির স্বার্থে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক