Saturday, May 23, 2015

সিরাজগঞ্জে বাস ও ট্রাকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে নিহত ১০

বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম সংযোগ মহাসড়কে দুটি বাস ও একটি ট্রাকের ত্রিমুখী সংঘর্ষে ১০ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো ৪৭ জন। শনিবার বিকাল সোয়া ৩টার দিকে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার সীমান্ত বাজারে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানা গেছে। হতাহতদের বয়স ২৫-৫০ এর মধ্যে হবে। এরা সকলেই পুরুষ এবং বাসটি যাত্রী।
মহাসড়কের দায়িত্বরত সার্জেন্ট রাকিব হাসান জানান, ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী একটি ট্রাকের চাকা পাংচার হয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা অন্তর পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখী সংঘর্ষ হয়। এ সময় নাবিল পরিবহনের অপর একটি বাস অন্তর পরিবহনের বাসকে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই ট্রাকের ড্রাইভারসহ দুইজন মারা যায় এবং আহত হয় অর্ধশতাধিক। হাসপাতালে নেয়ার পথে আরও ৬ জন মারা যায় এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় আরো দুইজন।
তাৎক্ষনিক নিহতদের নাম পরিচয় জানা যায়নি। আহতদের অনেকের অবস্থা গুরুতর। নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। নিহতের মধ্যে দুজনের লাশ ঘটনাস্থলেই রয়েছে।
সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা.ফয়সাল আহমেদ জানান, হাসপাতাল মর্গে সাতজনের লাশ রয়েছে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর। নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে তিনি জানান।
এদিকে দুর্ঘটনার পরপরই সিরাজগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. হাবিবে মিল্লাত মুন্না, জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেন, পুলিশ সুপার এস.এম. এমরান হোসেন ও সিভিল সার্জন ডা. শামসুদ্দিনসহ প্রশাসনের উর্দ্ধতন কর্মর্তারা হাসপাতাল পরিদর্শন করেন এবং হতাহতদের খোঁজ খবর নেন।
জেলা প্রশাসক বিল্লাল হোসেন জানান, আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিহতদের আত্মীয় স্বজনদের সংবাদ দেয়া হচ্ছে। নিহতের লাশ পরিবারের বাড়ীতে পৌছানো পর্যন্ত সব ধরনের খরচ জেলা প্রশাসন বহন করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

মুসলমান বলে চাকরি দিতে অস্বীকৃতি

হরি কৃষ্ণ এক্সপোর্ট থেকে পাঠানো ই-মেইল
ভারতের মুম্বাইয়ে মুসলমান বলে এক যুবককে চাকরি দিতে অস্বীকার করেছে একটি অলংকার বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। আজ শনিবার বিবিসিতে প্রকাশিত এক সংবাদে এ তথ্য জানা গেছে।
জিশান খান নামে ওই যুবক বলেন, তিনি হরি কৃষ্ণ এক্সপোর্ট নামের ওই প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাঁকে সাক্ষাৎকারের জন্য ডাকা হয়নি। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি থেকে তৎক্ষণাৎ পাঠানো ফিরতি এক ই-মেইলে বলা হয়, ‘আমরা দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আমরা শুধুমাত্র অমুসলিম লোকদের নিয়ে থাকি।’ জিশান এ ঘটনায় হতবাক হয়েছেন বলে জানান।
২৩ বছর বয়স্ক জিশান সদ্য বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তিনি বিবিসিকে বলেন, ‘ফার্মটির পক্ষ থেকে পাঠানো দ্রুত ফিরতি ই-মেইল পাঠানোর ফলে এটি আঁচ করা যায় যে, মুসলমান বলে তারা আমার জীবনবৃত্তান্তটি খোলারও প্রয়োজনবোধ করেনি।’
জিশান খান ইতিমধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্থানীয় পুলিশের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করেছেন। মহারাষ্ট্র সরকারও বিষয়টি তদন্ত করে দেখার আশ্বাস দিয়েছে।
তবে হরি কৃষ্ণ এক্সপোর্টের একজন কর্মকর্তা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে বলেন, তাদের মানবসম্পদ বিভাগের একজন প্রশিক্ষণার্থী ভুলবশত ই-মেইলটি পাঠিয়েছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে ফার্মটি পরিচালিত হয়। আমাদের এখানে বর্তমানে ৫০ জনেরও বেশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক এবং ২৮ টির রাজ্যের বাসিন্দারা কাজ করছেন।’
তবে তাদের এ বক্তব্য নিয়ে অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। দেশটির প্রভাবশালী দ্য হিন্দু তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে ‘এটি ভুল? ফার্মটির এ আচরণ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।’
কয়েকজন লেখক বলেছেন, ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার পর দেশটি পরিবেশ অনেকখানি বদলে গেছে। হাসান সারোর নামের একজন ‘ফার্স্ট পোস্ট’ নামের এক ওয়েবসাইটে লিখেছেন, ‘এটি বিস্ময়কর এবং নৈরাজ্যকর’। ঐতিহাসিক সলিম কিদওয়ারির মতে, গত এক বছরে ভারতে সংখ্যালঘু বিদ্বেষ চরমে পৌঁছেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতেও এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সেখানে অনেকেই একে ‘ধর্মীয় বৈষম্য’ বলার পাশাপাশি ফার্মটির সমালোচনা করছেন।

এবার সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি

তিন দফা দাবিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সড়ক পরিবহন মালিক
শ্রমিক ঐক্য পরিষদের ডাকা ধর্মঘটে যাত্রীশূন্য রাজধানীর
গাবতলী বাসস্ট্যান্ড। এবার সংগঠনটি দাবি আদায়ে সারা দেশে
পরিবহন ধর্মঘট ডাকার হুমকি দিচ্ছে। ছবি: সাজিদ হোসেন
ঢাকা-আরিচা-খুলনা রুটে দূরপাল্লার বাস চলাচলে ধর্মঘটের চতুর্থ দিনে সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল সড়ক পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। আজ শনিবার দুপুরে যশোর শ্রমিক ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ হুমকি দেওয়া হয়।
১৯ মে সকালে ফরিদপুরের মধুখালীতে ঢাকা থেকে বেনাপোলগামী সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ওই বাসের ২২ জন যাত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই বাসের চালক ও সহকারীকে আটক করে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ডাকাতির মামলা হয়। এরপর গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তিসহ তিন দফা দাবিতে ২০ মে থেকে খুলনা অঞ্চলের পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকেন।
সংবাদ সম্মেলনে ঐক্য পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক আজিজুল আলম বলেন, দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিকদের মুক্তি না দিলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবহন ধর্মঘট সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। ইতিমধ্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সে ব্যাপারে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাচ্ছি। কারণ, পুলিশের ওপর আমাদের আস্থা নেই। পুলিশ দিয়ে ওই ঘটনার তদন্ত করা হলে আমরা ন্যায়বিচার পাব না বলে আশঙ্কা করছি।’
সংগঠনের আহ্বায়ক আলী আকবর লিখিত বক্তব্যে দাবি করেন, ১৮ মে রাতে ঢাকা থেকে সোহাগ পরিবহনের একটি বাস বেনাপোলের উদ্দেশে রওনা হয়। পথে ফরিদপুরের মধুখালীতে বাসটি ডাকাতের কবলে পড়ে। ডাকাতি করে ডাকাতেরা নেমে যাওয়ার পর চালক আয়নাল হোসেন বাসটি নিয়ে থানায় হাজির হন। এ সময় তিনি ডাকাতির বিষয়টি উল্লেখ করে মামলার নেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু মধুখালী থানার ওসি ১৯ মে ফরিদপুরের এসপির নির্দেশে চালককে সকাল পর্যন্ত বসিয়ে রাখেন। এরপর চালক আয়নাল, হেলপার অপু ও চেকার রবিউলকে আসামি করে ডাকাতির মামলা করে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে খুলনা ও বরিশাল রুটে পরিবহনের ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়নি। এ কারণে গত ২২ মে থেকে পরিবহনের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৮ রুটে ভাড়ায় চালিত সব ধরনের যানবাহন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ২৩ মে পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাঁরা ধর্মঘট অব্যাহত রাখেন। এ দাবি আদায় না হলে, মালিক-শ্রমিক মিলে সারা দেশে পরিবহন ধর্মঘট ও বাস ধর্মঘট ডাকা হবে।
এদিকে গতকাল শুক্রবার বিকেলে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার জামিল হাসান এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ১৯ মে ভোরে ডাকাতি সংঘটিত হওয়া বাসের ২২ জন যাত্রীর অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ওই বাসের চালক ও সহকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সুপারের ভাষ্য, যাত্রীবেশী সাত ডাকাত আশুলিয়া থেকে বাসে ওঠে। ফরিদপুর শহরের রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকা পার হওয়ার পরপরই ওই ডাকাতেরা বিনা বাধায় চালকের কাছ থেকে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডাকাতি করে। ডাকাতির পর যাত্রীদের দাবির মুখে বাধ্য হয়ে চালক বাসটি ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে মধুখালী রেলগেট এলাকায় থামালে যাত্রীরাই মধুখালী থানায় ফোন করে ঘটনাটি জানান।

এই এফবিসিসিআই লইয়া আমরা কী করিব? by শওকত হোসেন

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতিসমূহের ফেডারেশন বা এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচন ২৩ মে। এই নির্বাচনের সংবাদ গণমাধ্যমে আসছে সামান্যই। রিপোর্টাররা আগ্রহী হয়ে এই নির্বাচন নিয়ে সংবাদ তেমন লিখছেনও না। কারণ, এই নির্বাচনের ‘নিউজ ভ্যালু’ সামান্যই।
অথচ একটা সময় ছিল, এফবিসিসিআই নির্বাচন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় স্থান পেত। ব্যবসায়ী মহলের মূল আলোচনাই থাকত এফবিসিসিআই নির্বাচন নিয়ে। মনে আছে, সভাপতি প্রার্থীদের দিনের পর দিন আমরা অনুসরণ করতাম, সব পরিচিতি সভায় যেতাম, সাক্ষাৎকার ছাপা হতো প্রথম পাতায়। খারাপ কিছুও ঘটত সে সময়। যেমন, কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা ছিলেন, যাঁদের বড় ব্যবসা ছিল নির্বাচনের সময় ভোট বিক্রি করা। বিশেষ করে একজন সাবেক সভাপতি ও দুই সাবেক সহসভাপতির বড় ব্যবসাই ছিল নিজের দখলে থাকা ভোট বিক্রি করা।
এফবিসিসিআই নির্বাচনের সেই জৌলুশ আর নেই। এখন নির্বাচনের আগেই সবাই জানেন কে হতে যাচ্ছেন সভাপতি। আগে থেকেই সব ঠিকঠাক করা। নির্বাচনটা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে কার আর আগ্রহ থাকে?
আসলে এফবিসিসিআই নিজেই গুরুত্ব হারিয়েছে। যে সংস্থাটিরই গুরুত্ব কম, তার নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বও কমই থাকবে। সংগঠনটির কাজ হচ্ছে বিদেশ থেকে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল এলে বৈঠক করা। এটি একটি রুটিন কাজ। আরেকটি বড় কাজ হচ্ছে বিদেশ সফর করা। এ ছাড়া বাজেটের আগে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও এফবিসিসিআই যৌথভাবে একটি পরামর্শ সভার আয়োজন করে। সেখানে বাজেটের রাজস্ব প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। এখন এফবিসিসিআইকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তাদের কয়টি প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী বা সরকার গ্রহণ করে? তারা তা বলতে পারবে না। এ নিয়ে কোনো গবেষণাও নেই সংগঠনটির। আগে তাও এই বৈঠকে অন্তত অর্থমন্ত্রীরা পুরোটা সময় থাকতেন, ব্যবসায়ীদের কথা শুনতেন। এখন তো তাও হয় না। অর্থমন্ত্রী বক্তব্য দিয়েই চলে যান।
প্রতিটি দেশেই ব্যবসায়ীদের একটি শীর্ষ সংগঠন থাকে। এটাই নিয়ম। সেই নিয়ম মেনে বাংলাদেশেও এফবিসিসিআই আছে। পাশের দেশ ভারতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটির নাম ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা ফিকি। ফিকির কার্যালয়ে গিয়ে দেখেছি সেখানকার কর্মযজ্ঞ। ফিকির ওয়েবসাইটে গেলেই পাওয়া যাবে তাদের কাজের বিশাল বিবরণ। অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিতভাবে গবেষণা ও জরিপ করে থাকে ফিকি। প্রতিটি নতুন আইন বা চুক্তির প্রভাব বিশ্লেষণ করে ফিকি। আর এফবিসিসিআইয়ের ওয়েবসাইটে এখন ঢুকলে দেখা যাবে প্রকাশনা বলতে আছে ২০১১ সালের একটি বুলেটিন। এফবিসিসিআই শেষ কবে গবেষণা করেছিল, সেটিই বরং গবেষণার বিষয়। গবেষণা সেল একটা আছে বটে, তবে তাদের কাজ হচ্ছে এফবিসিসিআই সভাপতির বক্তব্য লিখে দেওয়া।
এফবিসিসিআইয়ের গবেষণা সেলের দৈন্য টের পাওয়া যায় হরতাল-অবরোধ বা বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ নিয়ে। কিন্তু প্রকৃত ক্ষতি যে কত, সে হিসাব করার যোগ্যতা ব্যবসায়ীদের এই শীর্ষ সংগঠনটির নেই। ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির হাস্যকর একটি হিসাব পাওয়া যায়। যেমন, এফবিসিসিআই বলে দিল হরতাল-অবরোধের ৪৪ দিনে অর্থনীতির ক্ষতি ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। অথচ বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) হিসাবে এ সময় উৎপাদন ক্ষতি ৪ হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। আর বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ক্ষতি অবশ্য তার তিন গুণ, ১৭ হাজার কোটি টাকা। সুতরাং দেখা যাচ্ছে এফবিসিসিআই আর অন্য দুই সংস্থার মধ্যে হিসাবের পার্থক্য বিশাল। যদিও এফবিসিসিআই উৎপাদনের পাশাপাশি সম্পদের ক্ষতির তথ্য দিচ্ছে। তাহলেও এত বড় পার্থক্য হবে না। কারণ, উৎপাদন ক্ষতিই সবচেয়ে বেশি।
এফবিসিসিআইয়ের গবেষণার প্রক্রিয়াটি কিন্তু অত্যন্ত সহজ। সদস্য সমিতিগুলো জানায়, তাদের ক্ষতির পরিমাণ আর এফবিসিসিআই সেগুলো যোগ দিয়ে বিশাল একটা সংখ্যা বের করে। এ জন্য গবেষণা সেল লাগে না, একটি ক্যালকুলেটরই যথেষ্ট। এ রকম অবিশ্বাস্য হিসাব দেয় বলেই এফবিসিসিআইয়ের কথা এখন আর কেউ তেমন গুরুত্ব দেয় না।
অবশ্য এফবিসিসিআইয়ের এই হিসাব একদমই কাজে লাগে না তা নয়। বড় অঙ্কের ক্ষতির কথা বললে ব্যাংক থেকে ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধা পেতে সহজ হয়। আসলে এটি হচ্ছে অর্থনীতি নিয়ে এফবিসিসিআইয়ের একধরনের রাজনীতি। এর মাধ্যমে বিশেষ বিশেষ খেলাপিরা বিশেষ সুবিধা পান। গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ক্ষয়-ক্ষতির বিশাল বিবরণ দিয়ে ঋণখেলাপিরা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বিশেষ সুবিধা আদায় করেছিলেন।
এফবিসিসিআই যে কতটা গুরুত্ব হারিয়েছে তা দেখা যায় নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়। রাজনৈতিক
সংকট দেখা দিলেই এফবিসিসিআই প্রতিবারই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার আগ্রহ প্রকাশ করে। সেই ১৯৯৫ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের সময় থেকেই। প্রতিবারই দেখা গেছে, এফবিসিসিআই দুই নেত্রীর সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। কারণ, শেষ পর্যন্ত কেউই তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করতে আগ্রহী হন না। বিশেষ করে বিরোধী দল একদমই পাত্তা দেয় না এফবিসিসিআইকে। গুরুত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা—দুটোই নেই এফবিসিসিআইয়ের।
এফবিসিসিআইকে এখন সরকারি দলের ব্যবসায়ী শাখা বলা হয়। সভাপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়া থেকেই তা শুরু হয়ে যায়। দেখা গেছে, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের পছন্দের ব্যক্তিই হন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি। আবার ক্ষমতাসীনদের অর্থ দিয়ে সভাপতি হওয়ারও উদাহরণ আছে।
এফবিসিসিআইয়ের এখনকার সভাপতি কাজী আকরামউদ্দিন আহ্মদ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। এর আগের সভাপতি এ কে আজাদ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি একবার মনোনয়নও চেয়েছিলেন। তারও আগের সভাপতি আনিসুল হক এখন আওয়ামী লীগের সমর্থন পাওয়া ঢাকা উত্তর সিটির নির্বাচিত মেয়র। তবে এফবিসিসিআই সভাপতি হয়েছিলেন সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থনেই।
এরও আগে এফবিসিসিআইয়ের দুবারের নির্বাচিত সভাপতি ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন আওয়ামী লীগের হয়ে দুই দফায় কুমিল্লার মুরাদনগর থেকে সংসদ নির্বাচন করেছিলেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি এখন সাংসদ। আরেক সভাপতি সালমান এফ রহমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা।
দুই দফায় সভাপতি ছিলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু। তবে তখন তিনি পরিচিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে। এখন তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। আর গত বিএনপি সরকারের সময় সভাপতি ছিলেন মীর নাসির হোসেন। বলা হয়, তিনি সভাপতি হয়েছিলেন হাওয়া ভবনের সমর্থনেই।
এফবিসিসিআইয়ের নতুন সভাপতি হওয়ার কয়েকটি প্রক্রিয়া আছে। প্রথম প্রক্রিয়াটি হচ্ছে, ব্যবসায়ীদের মধ্যে একটি বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। বলতে হবে যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন পেয়েছেন। এটা হচ্ছে নির্বাচনে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বিদায় করার প্রথম ধাপ। ঠিক এই প্রক্রিয়াতেই সবাই এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি হচ্ছেন। এবারও কোনো ব্যতিক্রম ঘটার কারণ নেই।
সরাসরি নির্বাচন হয় না বলেই সরকারের আস্থাভাজনকে সভাপতি করা এখন অনেক সহজ। এফবিসিসিআইয়ের ৫২ জন পরিচালক থাকেন। তাঁদের মধ্য থেকেই নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হন সভাপতি ও দুই সহসভাপতি। এই ৫২ জনের ২০ জনই সরকার মনোনীত সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি পরিচালক হন। বাকিদের নির্বাচনে জয়ী হতে হয়।
কারসাজিটা হয় মনোনীত পরিচালক পদেই। সরকারের আস্থাভাজন ব্যবসায়ী প্রথমে মনোনীত সংগঠনের প্রতিনিধি করে সরাসরি পরিচালক পদে মনোনয়ন হন। সেখান থেকে পরে তিনি হন সভাপতি। অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কোনো ঝুঁকিতেই যেতে হচ্ছে না। বর্তমান সভাপতি কাজী আকরাম বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের প্রতিনিধি হিসেবে সরাসরি পরিচালক হন। সেখান থেকে হয়েছেন সভাপতি।
গুরুত্বপূর্ণ চেম্বার ও সমিতির প্রতিনিধিরা যাতে এফবিসিসিআইয়ে আসতে পারেন, এ জন্যই ১৮ জন মনোনীত পরিচালকের বিধান রাখা হয়েছিল। আর এখন সেই বিধানটি ব্যবহৃত হচ্ছে সরকার-সমর্থিত সভাপতি হওয়ার জন্য। আবদুল মাতলুব আহমাদ এবার মনোনীত পরিচালক হয়েছেন রাজশাহী চেম্বার থেকে। অথচ এর আগে তিনি পরিচালক হয়েছিলেন বিমা সমিতি থেকে। কিন্তু যাতে নির্বাচন করতে না হয়, এ জন্য রাজশাহী চেম্বারের প্রতিনিধি হয়েছেন।
এত কাণ্ড করে সভাপতি হতে হয় বলেই তিনি হয়ে যান সরকারি দলের ব্যবসায়ী শাখার সভাপতি। আর এই এফবিসিসিআইয়ের কাজ হয় সরকারকে সব কাজে সমর্থন দেওয়া। এ কারণে সরকারের কোনো অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানেও যেতে পারে না। ফলে বিরোধী দলও গুরুত্ব দেয় না এই এফবিসিসিআইকে। তাহলে ‘সোশ্যাল মিডিয়া’র ভাষায় বলতে হয়, ‘এই এফবিসিসিআই লইয়া আমরা কী করিব?’
শওকত হোসেন: সাংবাদিক।
massum99@gmail.com

চেতনানাশক ছাড়াই চেতনানাশের দেশে by আনিসুল হক

বাংলাদেশ লাতিন আমেরিকার মতো জাদুবাস্তবতার দেশ হয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং তাঁর মতো লেখকদের লেখায়। যেমন, গার্সিয়া মার্কেসের নিঃসঙ্গতার একশ বছর উপন্যাসে কত বিস্ময়কর ঘটনাই না ঘটে। মাকান্দো নামের জনপদটিতে হঠাৎ অনিদ্রা দেখা দিল। ওই জনপদের প্রতিষ্ঠাতা হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বলেন, ‘কখনো আর যদি না ঘুম আসে তো খুবই ভালো হয়। জীবনের কাছ থেকে আরও অনেক কিছু পাওয়া যাবে।’ কিন্তু তাতে যেটা হলো, ওই জনপদের সবাই ঘুম হারানোর সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিও হারিয়ে ফেলতে লাগল। সবকিছুর নাম ও ব্যবহার তারা ভুলে যাচ্ছে। তা ঠেকাতে তারা জিনিসপাতির গায়ে নাম ও সেসবের ব্যবহার লিখে রাখতে শুরু করল। যেমন, গরুর গায়ে তারা লিখে রাখল, ‘এটা হলো গরু। যাতে সে দুধ উৎপাদন করতে পারে, সে জন্য রোজ সকালে তাকে অবশ্যই দোহাতে হবে। আর সেই দুধ অবশ্যই জ্বাল দিতে হবে, যাতে করে কফির সঙ্গে মিশিয়ে কফি ও দুধ বানানো যায়।’
আমাদের দেশেও এই রকম উদ্ভট ঘটনা চলেছে। আমরাও চলেছি স্মৃতিহীনতার মধ্য দিয়ে। আমরা সবকিছু ভুলে যাচ্ছি। আমাদেরও লিখে রাখা উচিত, এটা হচ্ছে ট্রাফিক বাতি। এটা লাল হলে সব গাড়ি থামবে, সবুজ হলে সব বাতি চলতে শুরু করবে। এটা হলো সংবিধান। দেশে কী করা যাবে, কী করা যাবে না, সবকিছু চলবে এই বই অনুসারে।
মার্কেসের একটা বিখ্যাত গল্প আছে—‘আমি শুধু টেলিফোনটি ব্যবহার করতে এসেছিলাম’। বাংলাদেশে গোটা তিনেক টিভি নাটক হয়েছে এই গল্প অবলম্বনে। ওই গল্পে দেখা যায়, একজন ভদ্রমহিলা একটা টেলিফোন করতে বেরিয়েছেন। টেলিফোন সেরে তিনি বাসের জন্য রাস্তায় দাঁড়ান। একটা বাস এসে তাঁর পাশে থামে। তিনি বাসে উঠে পড়েন। বাসটি ছিল মানসিক রোগিণীদের বহনকারী একটা যান। একটা হাসপাতাল থেকে রোগিণীদের নিয়ে তা আরেকটা হাসপাতালে যাচ্ছিল। ওই মহিলাকেও তারা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়। ভদ্রমহিলা বারবার করে বলছিলেন, আমি শুধু টেলিফোনটা ব্যবহার করতে এসেছিলাম। কিন্তু কে শোনে কার কথা। তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। অনেক কষ্টে, একজন ম্যাট্রনের অবৈধ প্রস্তাবে রাজি হওয়ার মাধ্যমে তিনি নিজের স্বামীকে ফোন করার সুযোগ পান। স্বামীকে জানান, তিনি আছেন অমুক মানসিক চিকিৎসালয়ে। স্বামী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এসে খোঁজখবর নেন। তারপর বলেন, ওরা বলছে, তোমার সুস্থ হতে আরও সময় লাগবে। তুমি থাকো, আমি আসি...
গল্পটা আমি স্মৃতি থেকে লিখছি। একটু উনিশ-বিশ হতে পারে।
বাংলাদেশও যেন মার্কেসের গল্পের পটভূমি হয়ে গেছে। যত দূর জানা গেল, মেঘালয়ের পুলিশ একজন বাংলাদেশিকে উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় ঘোরাফেরা করতে দেখে। তারা তাঁকে পরিচয় জিজ্ঞেস করে। তিনি জানান, তিনি বাংলাদেশের মন্ত্রী ছিলেন।
সব পাগলই নিজেকে মন্ত্রী দাবি করে থাকে, সব মন্ত্রী যদিও নিজেকে পাগল দাবি করবেন না।
নিশ্চয়ই মেঘালয়ের পুলিশ হেসেছিল।
তারপর? মন্ত্রী ছাড়া আর কী পরিচয় আছে আপনার?
আমি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব। আমাদের কিন্তু কোনো মহাসচিব নেই, আমরা চলিই ভারপ্রাপ্ত দিয়ে।
বটে। ওকে একটা মানসিক চিকিৎসালয়ে নাও।
ভাগ্য ভালো, মেঘালয়ের ওই হাসপাতাল তাঁকে ফোন করার সুযোগ দিয়েছিল। আর ভাগ্যিস, সালাহ উদ্দিন আহমদের নিজের বাড়ির ফোন নম্বর মুখস্থ ছিল। আমি হলে, হাতে মোবাইল ফোন না থাকলে কোনো নম্বরই মুখস্থ বলতে পারতাম না।
ভাববেন না, আমি রসিকতা করছি। লাতিন আমেরিকার জাদুবাস্তবতার জগৎ কেবল আশ্চর্য সব ঘটনার জগৎ নয়, সে জগৎ বড় নিষ্ঠুরও। মার্কেসের একশ বছরের নিঃসঙ্গতা বইয়েই রেমেদিওস নামের এক সুন্দরী আকাশে উড়ে যায়। একজন দেখতে পায়, সে আকাশে উড়ে গেল, আর কোনো দিনও ফিরে এল না। তারও চেয়েও বড় ঘটনা, প্রতি ১৭ জন আরলিয়ানোর ১৬ জনই খুন হতে থাকে।
মার্কেসের বইয়ে আমরা পাই, কলাশ্রমিকেরা ধর্মঘটে গেলে পুলিশ গুলি করে, আর কলাবহনকারী ট্রেনে কলার বদলে বোঝাই করা হয় মানুষের লাশ!
লাতিন আমেরিকায় খুব গুম হয়, খুন হয়। মার্কেসের একটা সত্য ঘটনার বই আছে—নিউজ অব আ কিডন্যাপিং।
মার্কেস অবশ্য বলেন, যাকে বলা হয় ম্যাজিক রিয়ালিজম বা জাদুবাস্তবতা, তা তাদের মহাদেশের বাস্তবতা থেকেই ঘটে। যেমন: একটা এলাকায় এত বেশি সোনা ছিল যে মুরগির পেট কাটলে সোনার খুদ পাওয়া যেত, সেই দেশে যখন রেললাইন বানানোর প্রস্তাব করা হলো, তখন স্থানীয়রা বলল, লোহা দিয়ে রেললাইন বানালে খরচ বেশি পড়বে, সোনা দিয়ে কি রেললাইন বানানো যায় না?
আমাদের দেশের বাস্তবতাও এখন জাদুবাস্তবতা হয়ে উঠছে। এখানে নদীতে জাল ফেললে মাছের বদলে উঠে আসে মানুষের লাশ। এখানে প্রতি মাসে একজন করে ব্লগার খুন হচ্ছেন। আবারও মার্কেসের গল্প এসে যায়। তাঁর একটা বই আছে—পূর্বঘোষিত মৃত্যুর দিনপঞ্জি। একটা জনপদের সবাই জানে, সান্তিয়াগো নাসারকে খুন করা হবে, যারা খুন করবে, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে বেড়াচ্ছে তারা সান্তিয়াগোকে খুন করার জন্য খুঁজছে, একেবারে পূর্বঘোষিত খুন, কিন্তু কেউ ব্যাপারটায় গা করে না, এবং সান্তিয়াগোকে পেটে ছুরি চালিয়ে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশে একের পর এক পূর্বঘোষিত মৃত্যু ঘটানো হচ্ছে, এত মৃত্যুর বিবরণ লেখার মতো লেখকও তো আর অবশিষ্ট থাকছে না।
মার্কেসের লেখার একটা প্রধান উপজীব্য একনায়কদের নিঃসঙ্গতা। তাঁর একটা গল্পে পড়েছি, একজন ক্ষমতাচ্যুত জেনারেল, যিনি দেশের সর্বেসর্বা ছিলেন, ইউরোপের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন কপর্দকহীন মুসাফিরের মতো। আমাদের দেশেও এ রকমটা ঘটছে। আমাদের একনায়কেরাও বড়ই নিঃসঙ্গ, একনায়কেরা নিঃসঙ্গই হয়ে থাকেন, কিন্তু তাঁদের নিঃসঙ্গতার কাহিনি লেখার মতো কলমই বা রইল কই।
আমাদের দেশে জাদুবাস্তবতা সাহিত্যে আসেনি তা নয়। পুতুলনাচের ইতিকথায় একজন নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করার জন্য তাঁর মৃত্যুর তারিখ ঘোষণা করেন এবং ওই দিনই তিনি মারা যান। জাদুবাস্তবতা শব্দটা জানার আগেই আমাদের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখাতেও আমরা জাদুবাস্তবতার মতো ঘটনা ঘটতে দেখি।
এবং অবশ্যই স্মর্তব্য সৈয়দ শামসুল হকের অনবদ্য সৃষ্টি ‘পরানের গহীন ভিতর’ নামের কবিতাগুলো। এই বইয়ের প্রথম কবিতায় কবি লিখেছেন, ‘এ বড় দারুণ বাজি তারে কই বড় বাজিকর/ যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর।’ এই কবিতায় কবি বর্ণনা দিয়েছেন, কীভাবে জাদুকর জামার ভেতর থেকে জাদুমন্ত্রে ডাহুক বের করে, জ্যাবের ভেতর থেকে বের করে আকবর বাদশার মোহর।
কিন্তু ভোটারবিহীন স্বচ্ছ ভোট বাক্সে কী করে চমৎকার ভারসাম্য বজায় রেখে ব্যালট ভরে যায়, সেটা কি বলা যায়? এ বড় দারুণ বাজি তারে কই বড় বাজিকর—এই পঙ্ক্তি যিনি লিখতে পারতেন, তিনি কই?
মার্কেসের ‘ওয়ান অব দিজ ডেজ’ গল্পটা আমি চতুর্থবারের মতো আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিই। শহরের মেয়র গেছেন দাঁতের ডাক্তারের কাছে। পোকায় খাওয়া দাঁত তুলতে। ডাক্তার তাঁর দাঁত তুললেন কোনো রকমের চেতনানাশক ছাড়াই।
মেয়র অতিকষ্টে সেই ব্যথা সহ্য করলেন। তাঁর চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগল।
ডাক্তার বললেন, আমাদের শহরে যেসব মানুষ গুম হয়ে যাচ্ছে, তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য আপনার দাঁত তোলার সময় অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হলো না।
অ্যানেসথেসিয়া বা চেতনানাশক ব্যবহার করতে হবে না। এই দেশের মানুষের চেতনা এমনিতেই নাশ হয়ে আছে। তা নাহলে যে মেয়েটি ফুলের সঙ্গে টব ছুড়ে মেরেছিল পুলিশের ট্যাংকসদৃশ যানটিতে, তাকে চুলের মুঠি ধরে টানাহেঁচড়া করা এবং কোমরে বুটসমেত লাথি মারার পর আমরা তর্কে ব্যাপৃত হব কেন যে, মেয়েটি শুধু ফুল না মেরে টব ছুড়তে গিয়েছিল কেন? আমরা কেউ এই কথা বলছি না যে, মেয়েটি কেন রাজপথে গেল। মেয়েটির মনে কী দুঃখ?
মেয়েটির মনে যে দুঃখ, তার কারণ এই দেশের পুরুষপুঙ্গবেরা যেকোনো ভিড়ে নারীশরীর দেখলেই ঘটিয়ে থাকে, তাতে সাদা-কালো, বৃদ্ধ-তরুণ, ছাত্রলীগ-ছাত্রদল ইতরবিশেষ করতে হয় না। অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া বড় অপরাধ, কিন্তু প্রত্যেক ঘরে নিজের ছেলেসন্তানটিকে মানুষ করার দায়িত্ব এবং নিজের ভেতরের পুরুষ-পশুটাকে বেঁধে রাখার দায়িত্বও আমাদের সবার।
না, কেবল লাতিন আমেরিকা থেকে ধার করে লিখলে চলবে কেন। রবীন্দ্রনাথ থেকে বলি, ‘অন্যায় যে করে অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে’। নজরুল ইসলাম থেকে বলি, ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে।’
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

শরণার্থীদের অধিকাংশই ‘অবৈধ বাংলাদেশী শ্রমিক’ । থাইল্যান্ডের পুরো সমাজ মানব পাচারে জড়িত: বিবিসি

থাইল্যান্ডে সম্প্রতি উদ্ধার হওয়া অভিবাসন-প্রত্যাশীরা। ছবি: রয়টার্স
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যে মারাত্মক অবৈধ অভিবাসী সঙ্কট দেখা দিয়েছে, শেষ পর্যন্ত তা নিরসনে এগিয়ে এসেছে সংশ্লিষ্ট দেশসমূহ। সমুদ্রে ভাসমান প্রায় ৭,০০০ বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অভিবাসীদের উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলমান। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়ার কর্মকর্তারা বলছেন, শরণার্থী সঙ্কটে পড়া এ মানুষদের অধিকাংশই অবৈধ বাংলাদেশী শ্রমিক। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রী জুলি বিশপ বলেছেন, ইন্দোনেশিয়া ধারণা করছে, সমুদ্রে যে ৭,০০০ অভিবাসী ভাসমান অবস্থায় রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ রোহিঙ্গা। তিনি বলেন, বাকিদের অধিকাংশই বাংলাদেশী। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য অস্ট্রেলিয়ান। গতকাল দক্ষিণ কোরিয়া সফরে দেশটির রাজধানী সিউলে বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকের পর এ মন্তব্য করেন। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইন্দোনেশিয়ার ভাষায় তারা আশ্রয়প্রার্থী নন, তারা শরণার্থী নন, তারা অবৈধ শ্রমিক।
থাইল্যান্ডের পুরো সমাজ মানব পাচারে জড়িত: বিবিসি
থাইল্যান্ডের পুরো সমাজ মানব পাচারে জড়িত। বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমনটাই দাবি করা হয়েছে। মানব পাচার নিয়ে অনুসন্ধান করেছেন বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংবাদদাতা জোনাথন হেড। তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি গতকাল শুক্রবার বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে। হেডের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, থাইল্যান্ডের পুরো সমাজ মানব পাচারকারীদের সহায়তা করছে।
বিবিসির এই সংবাদদাতার ভাষ্য, থাইল্যান্ডের তাকুয়া পা জেলার প্রধান মনিত পিয়ানথং তাঁর কাছে দাবি করেছেন, অভিবাসন-প্রত্যাশীদের নৌকা থেকে ট্রাকে স্থানান্তরের স্থান হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর জেলাকে ব্যবহার করছে মানব পাচারকারীরা। এটা বন্ধ করতে চাইলেও দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার বা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকে তেমন সহায়তা পাচ্ছেন না তিনি।
হেডের দাবি, তিনি বেশ কয়েক দিন ধরে মনিতকে সরকারি ও পুলিশের ক্ষুব্ধ কর্মকর্তাদের ফোন ধরায় ব্যস্ত থাকতে দেখেছেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলায় তাঁরা মনিতকে ধমকাচ্ছিলেন।
হেড লিখেছেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বাংলাদেশিদের আগমন বাড়তে থাকা এটাই প্রমাণ করে, আদম ব্যবসা বিস্তৃত হচ্ছে। আর এটা অত্যন্ত লাভজনক ব্যবসা।
হেড তাঁর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মানব পাচার ব্যবসার মডেল তুলে ধরেছেন। তাঁর বিবরণ মতে, থাই পাচারকারীচক্র অভিবাসন-প্রত্যাশীদের নৌকাবোঝাই করে আনে। থাই পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ৩০০ মানুষ বোঝাই একটা কার্গোর দাম ২০ হাজার ডলার বা তার বেশি। পরিবারের কাছ থেকে জনপ্রতি দুই থেকে তিন হাজার ডলার মুক্তিপণ আদায় করা পর্যন্ত ওই অভিবাসন-প্রত্যাশীদের জঙ্গলে আটকে রাখা হয়।
থাই গ্রামবাসীর সামনে পাচারকারীরা কীভাবে এই ব্যবসা চালাচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে হেড জানিয়েছেন, পাচারকারীরা তাদের ব্যবসার সঙ্গে স্থানীয় লোকদের যুক্ত করেছে।
থাইল্যান্ডে হেডের দেখা একটি মানব পাচার ক্যাম্পের কাছের একটি গ্রামের এক মুসলিম যুবকের ভাষ্য, অর্থের জন্য পুরো গ্রামবাসী মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত। পাচারকারীরা সবাইকে ভাড়া করে। ক্যাম্পের ওপর নজরদারি এবং খাবার সরবরাহের জন্য পাচারকারীরা লোক ভাড়া করে। লোক ভাড়া করতে তারা গ্রামের ঘরে ঘরে যায়।

টিপ টিপ বৃষ্টি by সৈয়দ ইকবাল

ঝুলন্ত হেলপার কিশোর চিৎকার করে উঠল—মৎস্য ভবন! মৎস্য ভবন! ডান পা! ঠিক তখনি বিরান মাহমুদের পাছায় হাত বোলাল কেউ। মাথা ঘুরিয়ে সে দেখল খোঁচা খোঁচা দাড়ি-মুখের একজন মানুষ।
—জায়গা দেন নামুম!
বিরানের মেজাজ তেমন খারাপ হয় না। বাসেই চলাচল করে, অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তা ছাড়া রাগ করার নার্ভগুলো তার ভোঁতা হয়ে গেছে অনেকটা। বন্ধুবান্ধব, অফিস কলিগ—সবখানেই তাকে ভেঙায় সবাই। অথচ তার করার কিছু নেই, সৃষ্টিকর্তা হয়তো তাকে তৈরি করেছেন মানুষের হাসির পাত্র হতে। তা না হলে তার শরীর এত লম্বা ডাইনোসরের মতো হাড্ডিসার কেন? মানুষ ছোটবেলায় ডাকত হাড়গিল, উটপাখিজাতীয় কিছু।
এখন সে ঢাকার নামী অ্যাড এজেন্সিতে ক্লায়েন্ট সার্ভিসে কাজ করে। ভালো কাজ করে বলেই টিকে আছে এই অবয়ব নিয়ে। তবু মাঝেমধ্যে অসুবিধা হয়। ক্লায়েন্ট ফোন করে বলে অন্য কাউকে পাঠাতে, তবে তা কখনো-সখনো।
এবার একজন তার পিঠ চাপড়ে বলল, কিরে ভাই, কাঁদেন ক্যান! চোখ দিয়া তো পানির ঝরনা বইতাছ্যা! বিরান লজ্জা পেয়ে রুমাল বের করে চোখ মুছল। অফিসে এসেই ছুটল মিটিং রুমে, ক্লায়েন্ট অপেক্ষা করছে!
—হোয়াটস হ্যাপেন বিরান? কাঁদছ কেন?
সরি বলে বিরান এবার ছুটল ওয়াশ রুমে। আয়নায় দেখল, ঠিকই জল বেরোচ্ছে অনর্গল।
ওয়াশ রুম থেকে বেরোতেই ক্লায়েন্ট সুপারভাইজার মফিজ ভাই ধরলেন, পুরান ঢাকার লোক, নিজেদের একসেন্টেই বাংলা বলেন।
—কী হইলো আবার বিমার সাব? অফিসের মধ্যে কাইন্দা চোক্ষের পানি ফেলতাছেন? মনের দুঃখে পাবলিকগো সামনে কাইন্দেন না!
—মফিজ ভাই, সব সময় ফাজলামি ভালো লাগে না!
—কয় কী মাইরে-বাপ! পাবলিকের সামনে কাঁদবো আর বলা যাইবো না।
অফিস শেষে ফুটপাতে দ্রুত হাঁটছে বিরান। চোখ থেকে পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেছে আপনাতেই। তার মনে খুব দুঃখ। প্রতিদিন কে যেন হতাশার চাদরে ঢেকে দিচ্ছে তাকে। তাই বলে তো চোখ দিয়ে এভাবে পানি বেরোনোর কথা নয়।
তার মতো কুৎসিত-দর্শন, বীভৎসপ্রায় মানুষকে তীব্র প্রেম দিয়ে কাছে টেনে নিয়েছিল টিপ টিপ সামদানী। অপার্থিব এই মেয়ের তার মতো মানুষকে ভালোবাসার কারণ অনেক ভেবেও বের করতে পারেনি সে। টিপ টিপ সামদানীর রং কালো হলেও আলোতে ভরা। শরীরের গঠনও কালজয়ী নারী মডেলের মতো অতুলনীয়। জগৎজুড়ে এ রকম নারীর পেছনেই অভিভূত হয়ে লাইন দেয় পুরুষেরা।
অন্যদিকে বিরান মাহমুদের জীবন সত্যিই যেন বিরান, খাঁ খাঁ—মেয়েরা ঘুরেও দেখে না। প্রেম, ভালোবাসা তো দূরের কথা, ভালোবাসা কী জিনিস, টিপ টিপ সামদানী তার জীবনে আসার আগে জানাই ছিল না বিরানের।
টিপ টিপ সামদানী এলিসের মতো তাকে হাত ধরে এনে দাঁড়া করিয়ে দিল এক ওয়ান্ডারল্যান্ডে।
টিপ টিপ সামদানীকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, কেন তুমি আমার মতো বীভৎসপ্রায় মানুষকে ভালোবাসলে? কাছে টানলে?
—এ আবার কেমন কথা! তুমি আমার কাছে তুমি। বড়-ছোট সুন্দর-অসুন্দর কিছু না! তোমার মতো অনুভূতিপ্রবণ মানুষ আমি জীবনে আর পাইনি বলেই ভালোবাসি।
বিরান মাহমুদের বিরান অন্তর্জগতে লক্ষ ফায়ার ওয়ার্ডের ফুলঝুরি জ্বলে উঠেছিল। তিন-তিনটি বছর বিরান সামনে-পেছনে, আকাশে-মাটিতে ডানে-বামে শুধু টিপ টিপ সামদানীকেই দেখেছে। তার মগজের শিরায় শিরায় নেচে চলেছে টিপ টিপ সামদানীর মাধুরী। সে ভেবেছিল, এ এক আত্মিক সম্পর্ক।
তবে এক ঝটকায় তাকে টিপ টিপ সামদানী ছুড়ে ফেলতেই বুঝল, আত্মিক-ফাত্মিক কিচ্ছু নয়! যেভাবে টেনে নিয়েছিল, সেভাবেই ছুড়ে দিল। লন্ডন থেকে তার বয়ফ্রেন্ড প্রিন্স জামান পিএইচডি শেষ করে দেশে ফিরতেই টিপ টিপ সামদানী বিয়ের সিদ্ধান্ত নিল তাকে। বিরান মাহমুদকে সামলে ওঠার সময়টুকুও দিল না।
সামলে ওঠার সময় দিলে নাকি সম্পর্ক ঘেনঘেনে হয়ে যায়। ফোনে চট্টগ্রাম থেকে বলল টিপ টিপ সামদানী, আগামী সপ্তায় আমার হলুদ, তার এক দিন পর বিয়ে। দুদিন পর কিং অব চিটাগাংয়ে বউভাত।
বিরান তোতলাতে শুরু করেছিল, কিছু বলার আগেই লাইন কেটে গেল।
বিরানের চাকরি প্রায় নট। সিও রেজা আলী নিজের রুমে ডেকে বললেন, ক্লায়েন্টদের থেকে কমপ্লেইন আসছে বারবার। আপনার লোক সার্ভিস দেবে কী, সে তো চোখের পানি ফেলছে! যাও, ১৫ দিনের ছুটি বেতনসহ দিলাম। ভালো আই স্পেশালিস্ট দেখাও।
আই স্পেশালিস্ট বিরানের চোখ দেখে টেস্টের পর টেস্ট দিলেন। তবে আসল সমস্যা খুঁজে পেলেন না। ঘাবড়ে গিয়ে হাই ডোজের অ্যান্টিবায়োটিক খেতে দিলেন। তাতে কিছু হলো না। দেশে গিয়ে মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে পড়ে রইল বিরান। মাথায় হাত বুলিয়ে মা বললেন, বাবা, নামাজ পড়ো, ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সে জামাতে নামাজে দাঁড়ালে লোক নামাজ শেষে বলতে লাগল, এভাবে ভাই চোখের পানি নামাজে দাঁড়াইয়া ফেইলেন না, ডর লাগে। মনে হয় আইজক্যা আপনের শেষ দিন। এরপর অগত্যা জামাত ছেড়ে একা মসজিদে এসে সিজদা দিল বিরান, আল্লাহকে ডাকল ভীষণভাবে। তবে চোখ থেকে পানি পড়া আটকানো গেল না—বরং তা বেড়েই চলল। পথে হাঁটতে হাঁটতে মুখ নাড়লে বিরানের চোখের পানির ছিটা গিয়ে পড়তে লাগল অন্যের শরীরে। তো, এরপর কী? মানুষের ধমক খেতে শুরু করল বিরান মাহমুদ।
হঠাৎ টিপ টিপ সামদানীর ফোন এল, কী অবস্থা তোমার? এই জানো, আমি পারলারে এসেছি বিয়ের মেহেদি লাগাতে।
কোনো কারণ ছাড়াই মেহেদির রং এমনকি মেহেদি শব্দটি বাল্যকাল থেকে ঘেন্না লাগে বিরানের। তবু সে বলল, বাহ্! ভালো তো, কোন ডিজাইন লাগাবে—প্রিয়াঙ্কা, নাকি কারিনা?
—ধ্যাৎ! গাধা, সত্যি বিরান কিচ্ছু জানে না। কুট করে লাইন কেটে দিল টিপ টিপ সামদানী।
বাসে আশপাশের মানুষের ধমক নেই, কারও গায়ে তার চোখের পানির ছিটা গড়িয়ে পড়ছে না। ফোন আসার পর হঠাৎ পানি পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। রাস্তার পাশে সেলুনে ঢুকে আয়নায় দেখল। ঠিকই তো পানি বন্ধ। বাসার কাছে রিকশা থেকে নেমে দৌড়ে চায়ের টংয়ের নবা ভাইয়ের কাছে গেল। তাকে দেখেই নবা ভাই বলে উঠলেন, বন্ধ হইছেরে ভাই! বন্ধ হইছে।
একটা রাত একটা দিন পানি পড়া বন্ধ! বিরান মাহমুদ বুঝল, টিপ টিপ সামদানীর ফোন এলে পানি পড়া বন্ধ
হয়ে যায়। আবার হালকা-পাতলা পানি পড়া শুরু হতেই পুনরায় এল ফোন!
—পারলারে বিয়ের সাজ সাজতে এসেছি। জানো লাল, সবুজ ব্লাউজ আর নাকে বড় নথ কী যে মানিয়েছে!
হঠাৎ লাইন কাট। দুঃখ পাওয়ার জায়গায় খুশি হয়ে উঠল বিরান মাহমুদ! দুই দিন তাহলে চোখের পানি পড়া বন্ধ থাকবে!
টিপ টিপ সামদানীর ফোনই তাহলে চোখের পানি বন্ধের বড় ওষুধ।
দুই দিন পর বিকেলবেলা বৃষ্টির মধ্যে ভিড়ের বাসে যাচ্ছে বিরান। শাহবাগ মোড় ঘুরবে মিরপুর থেকে আসা বাসটি। আবারও টিপ টিপের ফোন।
—কী অবস্থা? বিরান, এই যে আমি পারলারে এসেছি বউভাতের সাজ সাজতে। এক পাড়ের শাড়ি পরব, খোঁপায় সাদা বড় ফুল। একেবারে দেবীর মতো লাগবে আমাকে।
—ভালো, খুব ভালো! ফাঁক পেলে প্রায়ই ফোন করো। তোমার ফোন আমার চোখের পানি পড়া থামিয়ে দিতে পারে। বিয়ের সাজের সময় যে ফোন করেছিলে, তারপর এ দুই দিন চোখের পানি পড়া বন্ধ রয়েছে। চোখের এই বজ্জাত পানি পড়া বন্ধ থাকলে আমি অফিসে জয়েন করব। আমার সব ঠিক হয়ে যাবে।
—আর তো সহসা আসব না পারলারে! ফোনও করা হবে না তোমাকে। ওহ্! না! পারলারে আসব বিয়েবার্ষিকীর সাজ সাজতে এই মাত্র বছর খানেক পরে। অবশ্যই ফোন করব তখন।
বিরান মাহমুদের সবকিছু বিষাদে ছেয়ে যায় আবার। সে ভাবে, টিপ টিপরা কেন এ রকম করে! কে জানে!
বারবার হাতল থেকে হাত ছুটে যাচ্ছিল বিরানের। পাশের লোক বলল, কী রে ভাই, হইলো কী?
—ভাইজান, একটু দেখবেন আমার চোখ দিয়া পানি বেরোচ্ছে কি না?
—না, ঠিক আছে।
আসলে বিরানের ভেতরে তখনো টলটল করছিল বিন্দু বিন্দু পানি, যা দেখা যায় না।
আচমকা সবাইকে ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে নামতে চাইল বিরান।
হেলপার চিৎকার করে উঠল, হেই মিঞা! চলতি গাড়ি থ্যাইক্যা নামবেন নাকি? আগে বাঁ পা দেন।
বাসের গতি বেশ বেড়েছে তখন। চারদিকে হট্টগোল—এই, করে কী লোকটা!
পেছনের বাসের ড্রাইভারের রাগ বাড়ছে। তার ব্রেকের অবস্থা ভালো নয়। লোকটা চলতি গাড়ি থেকে এভাবে দাপিয়ে নামলে তাকে হিট করা ছাড়া উপায় নেই। হাইড্রলিক ব্রেক হলে হয়তো থামাতে পারত।
এদিকে সুগন্ধি সাবান হুইলের বিলবোর্ডের ওপরে বসা ভেজা কাক সিচুয়েশন দেখে ভাবল, এই আউলা-ঝাউলা মানুষেরা মরা ঘনালে শুধু ঝামেলা বাড়ায়।
ঠিক তখনি টিপ টিপ সামদানীর মতো নামল টিপ টিপ বৃষ্টি। দ্রুত বৃষ্টি বাড়ছে। ঝাপসা হয়ে আসছে শাহবাগ মোড়। একটা লোক বাস থেকে নামতে গিয়ে অন্য বাসে চ্যাপটা হলে কারও কিছু আসে-যায় না। বোঝাই গেল না বিরানের কিসের এত তাড়া ছিল যে এভাবে চলতি বাস থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। কে জানে।

আকবর আলি খানের সংস্কার প্যাকেজ by মিজানুর রহমান খান

Gresham's Law Syndrome and Beyond By Akbar Ali Khan
সাড়ে চার শ বছর আগের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী স্যার টমাস গ্রেশাম, রানি এলিজাবেথ স্বয়ং যাঁর অতিথি হয়েছিলেন দুবার, তাঁর দেওয়া এই তত্ত্বটি অনেকেরই জানা যে খারাপ টাকা ভালো টাকাকে বাজার থেকে তাড়িয়ে দেয়। এটা আংশিক সত্য। পুরো সত্য হলো, খারাপ টাকা ভালো টাকাকে তাড়ায় তখনই, যখন দুইয়ের বিনিময়মূল্য একই হয়।
এখন ৪৭ বছরের গবেষণা আর ২৯ বছর ধরে লেখা সাবেক উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার সচিব আকবর আলি খান তাঁর সদ্য ইউপিএল প্রকাশিত বইয়ের নামকরণ করেছেন গ্রেশাম’স ল সিনড্রোম অ্যান্ড বিয়ন্ড, এন অ্যানালাইসিস অব দ্য বাংলাদেশ ব্যুরোক্রেসি।
বাস্তবে আমরা গ্রেশামতত্ত্বের প্রায় দুই হাজার বছর আগের এথেন্সে ফিরে গেছি। কারণ, তখনই সক্রেটিসীয় চিন্তায় প্রভাবিত গ্রিক হাস্যরসাত্মক নাট্যকার অ্যারিস্টোফেনস তাঁর ব্যঙ্গ নাটকে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গ্রেশামতত্ত্ব দেখিয়েছিলেন। সেই নাটকের নির্যাস ছিল, এথেন্সে আর যোগ্য লোকের কদর নেই, সর্বত্র অযোগ্য লোকে ভরে গেছে।
এটা ঘটে যে সমাজে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ব্যর্থ হয়।
ড. খানের সুচিন্তিত মত হলো, ‘রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের হাতেই এখন জনপ্রশাসনে পদোন্নতি ও বদলি বলি হচ্ছে। সিভিল সার্ভেন্টদের নিরপেক্ষতা ধ্বংসপ্রাপ্ত, উৎকৃষ্ট জনসেবা দিতে তারা আর কার্যকর নয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানে তারা আর নিরপেক্ষ আম্পায়ার হিসেবে বিশ্বস্ত নয়।’ আমাদের সন্দেহ যে গ্রেশাম জিন্দাবাদ আরও অনেক বছর ধ্বনিত হলে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলেও প্রশাসন আর আগের মতো আদৌ নিরপেক্ষ আম্পায়ার হতে পারবে কি না। সচিব, ডিসি, এসপি বদল কাজ দেবে না। আর তা দিলেও নির্বাচিত ব্যক্তিরা সুশাসন দিতে পারবেন না।
ড. খানের গবেষণা নিশ্চিত করেছে যে দ্রুত অবাধ নির্বাচন হোক বা না হোক, মানুষকে সামাজিক সুবিচার দিতে হলে কতিপয় প্রতিষ্ঠানকে আর বর্তমান অবয়বে রাখা যাবে না। কতিপয় প্রতিষ্ঠানের ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে।
বিএনপি রাজনৈতিক বিবেচনায় ১ হাজার ৪০২ জন কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে ২ হাজার ৩৭৯ জনকে, আওয়ামী লীগ গত আমলের প্রথম দুই বছরেই ৬৪১ জনকে ডিঙিয়ে ৬৭১ জনকে পদোন্নতি দিয়েছিল। রাজনীতিবিমুখরা ওএসডি বা গুরুত্বহীন পদে বছরের পর বছর পচনের শিকার। সচিব মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত সচিব দ্বারা হেনস্তা হন। অতিরিক্ত সচিব কোনো নীতিনির্ধারণী স্তর নয়, সচিবকে সহায়তা দিতে মাত্র কয়েকটি মন্ত্রণালয়ে সৃষ্টি করা হয়েছিল। অথচ পদোন্নতির সুনামির কারণে অতিরিক্ত সচিবের ২৩টি পদ এখন ২৯৫-এ উন্নীত হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধাপ বাড়ায় বিলম্ব ঘটছে। উদ্বৃত্ত উপসচিব ও যুগ্ম সচিবরাও গতিরোধক!
সচিবালয়ের রাজনৈতিক উদ্বাস্তুরা (উদ্বৃত্ত লোকবল) বছরে ৫০ কোটি টাকা খাচ্ছে। তুঘলকি কায়দায় ১ হাজার ৪২০টি পদ সৃষ্টির পরেও তার বিপরীতে ১ হাজার ৭৬৮ জনের পদোন্নতি ঘটেছে, এতেই বছরে অপচয় ৬৪ কোটি টাকা। নিম্ন স্তরে সৃষ্টি করা কৃত্রিম শূন্য পদে নতুন নিয়োগে অপচয় ১০০ কোটি টাকা ছাড়াবে।
কিন্তু নীতিনির্ধারণে বাড়তি স্তর সৃষ্টির কারণে ব্যয় যে অনেক বাড়বে, তা ড. খান নির্দেশ করেছেন, এখন এর পরিমাণটা জানতে টিআইবিকে একটি সমীক্ষা চালাতে অনুরোধ জানাই। জাতীয় মাথাপিছু শাসন ব্যয় ও শাসন অপচয়টাও জানা জরুরি।
ড. আকবর আলি খান বলেছেন, ‘এখনো একটি ভারসাম্য টিকে থাকছে। কারণ প্রথমত, সংবিধান ও বিধিবিধান যেখানে যা কিছু আছে তা সবই নির্দলীয় নিরপেক্ষ জনপ্রশাসনের পক্ষে আছে। দ্বিতীয়ত, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে নির্বাচন হচ্ছে। তাই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সরকারে এসে বিদায়ী আমলের ভুক্তভোগীদের কড়ায়-গন্ডায় (বিএনপি দ্বারাÿ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা চাকরিসহ মাথাপিছু ৪৫ লাখ টাকা পেয়েছেন) পুষিয়ে দিচ্ছে।’ এটা রাজনীতিবাজ কর্মকর্তা তৈরিতে উৎসাহ বটিকা হিসেবে কাজ করছে। ‘মেয়াদ’ শেষে সরকার বদলের সম্ভাবনা কমে যাওয়ায় ওই ভারসাম্যও আর থাকছে না। আমলাদের মধ্যে আইনকানুন তোয়াক্কা না করার প্রবণতা বাড়ছে। আমলা ও নেতার ফারাক লোপ পাচ্ছে।
ড. খানের মতে, বিশেষ করে চারটি ক্ষেত্র—বিচার বিভাগ, পুলিশ, ভূমি রেকর্ড ও আমলাতন্ত্র ‘আইসোমরফিক মিমিক্রি’-এর শিকার। এ কথার সরল অর্থ হলো, এই চারটি ক্ষেত্রে ধস নেমেছে, একে শোধরাতে বড় ধরনের সংস্কার লাগবে।
ধরে নিই ‘আইসোমরফিক মিমিক্রি’ একটা সংক্রামক জীবাণুর নাম। এখনো শনাক্ত হয়নি। তবে আগে স্বীকার করতে হবে যে রাষ্ট্রের দেহে ব্যথা বোধ হচ্ছে। এরপর চিকিৎসার প্রশ্ন। কোনো বড় দল নয়, শত নাগরিক নয়, সহস্র নাগরিক নয়, কেউ তো বলছে না কতিপয় প্রতিষ্ঠান অসুস্থ হয়ে গেছে। কতিপয় কোমায় যাই-যাই করছে।
নাগরিক সমাজ, মিডিয়া ও বিএনপিকে তাই বলি, দেশে নির্বাচন নেই, তো এ কাজে সময় ব্যয় করুন। ২৯ বছর ধরে ভেবেচিন্তে ৭১ বছরে দাঁড়িয়ে ড. খান কী লিখলেন, সেই কাজে সময় ব্যয় করুন। সমাজের স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে বৃহত্তর বোঝাপড়া, ব্যাপক তর্ক–বিতর্ক আগে। এ ছাড়া কোনো আমূল পরিবর্তন ঘটানো স্বপ্ন হয়ে থাকবে।
বাংলাদেশ তার চার দশক পার করা প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েই প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি ধরে রেখেছে, কিন্তু সেটা আজ বড় বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। ড. খান তাই সংস্কারবিমুখ থেকে উন্নয়নকে প্রাধান্য দেওয়ার ক্ষমতাসীন দলীয় দর্শন নাকচ করেছেন।
যখন আমরা কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না, আকবর আলি খান তখন একটি শ্বেতপত্র কি সবুজপত্রতুল্য শ্রেষ্ঠ সংস্কারপত্র হাজির করেছেন। কোনো দল বা মহলবিশেষকে বিব্রত করা তাঁর উদ্দেশ্য নয়, সে জন্য তিনি এটিকে স্মৃতিকথা হতে দেননি।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে সংস্কারবিমুখ। তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া ছাড়া সংস্কার চাইলে তারা কোনো দেবদূতকেও নাস্তানাবুদ করে দিতে পারে। কারণ, আমলাতন্ত্র এখন নিজেই যেন একটি কালোটাকার পাহাড় হয়ে উঠেছে। ওই পাহাড়ে হাতুড়ি-শাবল চালাতে হলে সাচ্চা জনপ্রতিনিধিত্ব লাগবে।
এখন নির্বাচন চান? চাই। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানরাই তো আসবেন? ভয় করে না? করে। তবে তাঁরা ভোট পেলে কী করব? বেশি উন্নয়নের জন্য বেশি দীর্ঘকাল ভোটাভুটি–শূন্যতা আবার দুকুল খোয়াতে পারে।
বিএনপি-জামায়াত জোট ড. খান বর্ণিত গ্রেশাম সিনড্রোম উল্টে দেবে? আলবৎ না। অবস্থা আরও নিকৃষ্ট হতে পারে।
এখন আমাদের মূল কাজ হলো ড. খান বর্ণিত ‘আইসোমরফিক মিমিক্রি’ দশা থেকে মুক্তির কৌশল রপ্ত করা। কতিপয় প্রতিষ্ঠানকে তার বর্তমান অবয়বে রেখে আর ঠিক করা যাবে না। ড. খানের বইটি যদি সমাজে অন্তত এই বিশ্বাসের সলতেটা নতুন প্রজন্মের প্রাণে জ্বালিয়ে দিতে পারে, তাহলে সেটাই হবে আমাদের এই চৌকস পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালের কঠিন পরিশ্রমের কিছুটা সার্থকতা।
ইদানীং নাগরিক সমাজের চিন্তা–চেতনায় একটা পরিবর্তন লক্ষ করছি। বেগম খালেদা জিয়ার সুরে (এর আগে বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার) তাদের একটি অংশ সব সময় তথাকথিত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং কতিপয় বায়বীয় মতাদর্শগত বিষয় নিয়ে মাতামাতি করেছে। অথচ অবাধ নির্বাচনের অভাবই সুশাসনের প্রতি একমাত্র হুমকি নয়। তাই শামসুল হুদারা যখন সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিন্যাস বদলানোর রূপকল্প দিলেন, তা থেকে আশ্বস্ত হয়েছি। সংখ্যানুপাতিক ভোটব্যবস্থা, গণভোট প্রথা চালুসহ ড. খান তাঁর পাঁচ দফা সুপারিশে তা-ই বলেছেন।
দিন-রাত ভোটের জিগির যাঁদের তোলার, তাঁদের তুলতে দিন। আমরা সুপারিশ করি, ড. আকবর আলি খান যেভাবে বলেছেন তা নিয়ে নাগরিক সমাজকে সভা–সেমিনার, বিশেষ করে তাঁর সংস্কার ভাবনা থেকে কয়েকটি বাছাই করে নিয়ে দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিজ নিজ দলের অভ্যন্তরে সংলাপে উৎসাহী করা। ২০১৯ সালের আগে শাসক দল সংলাপ মানে ভোট চায় না। এটা নিশ্চয়ই বিএনপি বুঝবে। তার যদি নাগরিক সমাজ লাগে, তাহলে বিএনপিকে ড. খানের মানে নাগরিক শর্ত মানতে হবে। ভালো নির্বাচন না দিয়েই কেবল নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বিমুখ থেকেও তারা গণতন্ত্রের ওপর আঘাত হানছে। দাতাদের টাকায় যে সংস্কার চলছে তা অকাজের।
‘আইসোমরফিক মিমিক্রি’ কথাটি আরও খুলে বলি। ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে কথাটি জীববিদ্যায় ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। এটা একটি প্রক্রিয়া, যা বিবর্তনমূলক ধারায় কোনো একটি সুবিধা লাভের জন্য একটি অঙ্গ আরেকটি অঙ্গকে অনুকরণ করে। সত্তর ও আশির দশকে সংগঠনগত সমাজবিদ্যায় এর প্রয়োগ দেখা যায়। কিন্তু মাত্র কয়েক বছর হলো হার্ভার্ড অধ্যাপক ল্যান্ট প্রিচেট, ম্যাট অ্যান্ড্রুজ পাবলিক পলিসি, বিশেষ করে আফ্রিকার জনপ্রশাসন সংস্থার প্রসঙ্গে আইসোমরফিক মিমিক্রি কথাটি অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁরা বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দাতাদের সহযোগিতায় আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ফল অত্যন্ত বেশি ক্ষতিকর হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানগুলো জানে না কী করে নতুন চ্যালেঞ্জ রুখতে হবে, তখন তারা নকল করে, যা সর্বদা সুফল দেয় না। আমরা রাষ্ট্র বটে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সংস্কার আনতে আমরা একক ভূমিকা রাখতে পারি না।
হরতাল ও পেট্রলবোমার রাজনীতির আড়ালে বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফএর পরামর্শে সুফলহীন সংস্কার চলে আসছে। ড. খান বলেছেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে গড়ে ওঠা মিমিক্রি ভেঙে দিয়ে সম্পূর্ণ নতুন করে প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য তিনি কার্যত একটি সংস্কার প্যাকেজ দিয়েছেন।
রাজার সবগুলো ঘোড়া হাম্পটি ডাম্পটিকে টেনে তুলতে পারেনি। ড. খানের যুক্তি অকাট্য: ‘একটা ডিম ভেঙে মাটিতে পড়ে গেলে রাজার সবগুলো ঘোড়াও তা পুনরায় একত্র করতে পারবে না।’
ইতিমধ্যেই আমাদের কয়েকটি ডিম ভেঙে গেছে কিংবা আদৌ ভেঙেছে বলে আমরা স্বীকার করি কি না, তা শনাক্ত করতে নিরন্তর নাগরিক সংলাপ চাই। কারণ, এখনো আমরা সংস্কার বলতে যে করে হোক, ব্যক্তি অদলবদল করে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখাকেই বুঝতে অভ্যস্ত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

টানা সাড়ে ১০ ঘণ্টা বক্তব্য রাখলেন মার্কিন সিনেটর

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে টানা ১০ ঘণ্টা ৩০ মিনিট বক্তব্য রেখেছেন রিপাবলিকান সিনেটর রান্ড পল। ভাষণের পুরোটা সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি সংক্রান্ত আইনের নৈতিকতার বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা দেশীয় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার উপায় হিসেবে নাগরিক ও কূটনীতিকদের ওপর নজরদারি ও ফোনে আড়াপাতা বৈধ করার যে আইনকে বিতর্কের মুখে আরও দু’মাস দীর্ঘায়িত করতে চেয়েছে, রান্ড পল তার বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি বেলা ০১:১৮ মিনিটে ভাষণ আরম্ভ করে রাত ১১:৪৯ মিনিটে তা সমাপ্ত করেন। মার্কিন সিনেটে তার দীর্ঘ সময় ভাষণ প্রদান নতুন নয়। এর আগে ২০১৩ সালের মার্চ মাসে রাষ্ট্রপ্রধান বারাত ওবামার ড্রোন সংক্রান্ত নীতির সমালোচনা করে তিনি টানা ১৩ ঘণ্টা বক্তব্য রেখেছিলেন। তবে রান্ড পল কিন্তু সিনেটের দীর্ঘতম বক্তা নন। একই বছর রিপাবলিকান টেড ক্রুজ ওবামার স্বাস্থ্যনীতির সমালোচনা করে সিনেটে টানা ২১ ঘণ্টা বক্তব্য রেখেছেন।
পলের বক্তব্যের প্রশংসা করেন রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট দলের দায়িত্বশীল সংসদ সদস্যরা। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, টানা দশ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পলের বক্তব্য শুনতে গিয়ে একবারও তাদের মনে হয়নি একটা বিরতি প্রয়োজন। প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট দুই মাসের জন্য দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা বাতিল করে অবিলম্বে এটিকে বাতিল করার আবেদন জানান পল। তার ভাষ্যমতে, এ আইন চালু থাকলে পৃথিবী দ্রুত এমন এক সময়ের দিকে এগোবে যেখানে ভীতি প্রদর্শন আর স্বার্থপরতা হয়ে উঠবে ক্ষমতার চাবিকাঠি, অপরদিকে স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা পরিণত হবে নিষ্পেষণের উপায়ে। পলের মত, এ আইনের নাম ‘দেশপ্রেমী আইন’ হলেও এর চেয়ে দেশবিদ্বেষী আইন আর হতে পারে না; এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়। পলের ভাষ্য চলাকালে মার্কিন সিনেটে আর সব ক্রিয়াকর্ম স্থগিত হয়ে থাকে। পলের ভাষ্যের বিরোধিতা করেছেন ডেমোক্রেট সিনেটর মিচ ম্যাককনেল। তিনি প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট আরও দীর্ঘায়িত করার পক্ষে মত ব্যক্ত করেন। দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এখনও অনেকের টেলিফোন-সংক্রান্ত তথ্য রাষ্ট্রের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস দেখতে চেয়েছিলেন লাদেন

আল কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংসই’ দেখতে চেয়েছিলেন, যা উঠে এসেছে তার লাইব্রেরিতে পাওয়া বেশকিছু নথিপত্রে। যে বছর যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোদের গুলিতে লাদেন প্রাণ হারান, সেই বছরই তিনি নিজের অনুসারীদের আমেরিকার বিরুদ্ধে ‘জীবনের শেষ পর্যন্ত’ লড়াই চালানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন। ২০১১ সালের ১ মে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের এক বাড়িতে হানা দিয়ে বিন লাদেনকে গুলি করে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোরা। অভিযানের সময় ওই বাড়িতে লাদেনের একটি লাইব্রেরির খোঁজ পাওয়া যায়। সেখানে ডেপুটিদের কাছে লাদেনের লেখা আরবি ভাষার নির্দেশনা, চিঠিসহ ১০৩টি নথি এবং কিছু ভিডিও ফুটেজ মেলে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা অধিদফতরের পরিচালকের কার্যালয় (ওডিএনআই) সম্প্রতি ১০৩ পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ করেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, লাদেনের লাইব্রেরির এসব নথিপত্রে আল কায়দার বিভিন্ন অভিযানের তথ্য পাওয়া গেছে। ইংরেজিতে লেখা কিছু নথিও এর মধ্যে রয়েছে। প্রকাশিত নথিগুলোর মধ্যে একটি চিঠিতে বিন লাদেন তার ডেপুটিদের ‘আমাদের ভাই’ সম্বোধন করে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মনোযোগী হওয়ার নির্দেশনা দেন। চিঠিতে লাদেন লেখেন, ‘আমেরিকা নামের বিষাক্ত গাছটি উপরে ফেলাই হবে মূল কাজ।’ আরেকটি চিঠিতে সে সময়ের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইকে উপহাস করে বলা হয়, ‘এই লড়াই ইরাক কিংবা আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে।’ কয়েকজন স্ত্রীর মধ্যে একজনকে উদ্দেশ করে আল কায়দা প্রধানের একটি ভিডিও বার্তাও পাওয়া গেছে, যেখানে তিনি নিজের অস্থির জীবনে পাশে থাকার জন্য স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। লাদেনের বাড়ি থেকে পাওয়া কিছু নথিপত্র এর আগে তদন্তের কাজে ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের মিলিটারি একাডেমির গবেষণা বিভাগও ২০১২ সালে কিছু নথিপত্র প্রকাশ করেছিল। বিন লাদেনের পাঠাগার
আল কায়দার সাবেক প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে সবাই জিহাদি হিসেবেই চেনেন। অনেকেই হয়তো জানেন না, তিনি একজন ‘বড় মাপের’ পাঠকও। অন্তত তার গোপন আস্তানায় পাওয়া বিশাল বইয়ের ভাণ্ডার এ তথ্যই দেয়। নথিপত্রে বিন লাদেনের ব্যক্তিগত পাঠাগারে থাকা বইয়ের বিশাল তালিকা দেয়া হয়েছে। সঙ্গে রয়েছে বইয়ের তাকের ছবিও। পাঠাগারটিতে কোরআন, হাদিস, তাফসির, ইসলামি পণ্ডিতদের লেখা ছাড়াও ছিল পশ্চিমা লেখকদের লেখা ইংরেজি বই। ইংরেজি ভাষায় লেখা বইয়ের মধ্যে আমেরিকান ও ফরাসি লেখকদের বই-ই বেশি। পশ্চিমা লেখকদের তালিকায় মার্কিন সাংবাদিক বব উডওয়ার্ড এবং ভাষাবিদ, দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক নোয়াম চমস্কি রয়েছেন। ফরাসি লেখকদেরও অনেক বই পাওয়া যায় বিন লাদেনের বইয়ের তাকে। এগুলোর বেশিরভাগই অর্থনীতি সংক্রান্ত। সিআইএ’র দাবি, ফরাসি অর্থনীতির ওপর আঘাত হানতেই ওই বইগুলো পড়েছিলেন বিন লাদেন। বইয়ের তালিকায় রয়েছে ডেভিড গ্রে গ্রিফিনের ‘দ্য নিউ পার্ল হার্বার : ডিস্ট্রিবিউটিং কোশ্চেনস অ্যাবাউট দ্য বুশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড ৯/১১’ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইহুদি গণহত্যার ঘটনা অস্বীকার করা এস্টাস মুলিনসের লেখা ‘দ্য সিক্রেটস অব দ্য ফেডারেল রিজার্ভ’ বই দুটিও। বিন লাদেনের সংগ্রহে থাকা ইংরেজিতে লেখা বইগুলোর বেশিরভাগই যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতিবিষয়ক।
‘তুমি আমার নয়নমণি’
আল কায়দার প্রয়াত নেতা ওসামা বিন লাদেন তার এক স্ত্রীর কাছে পাঠানো ভিডিওতে তাকে বলেন, ‘তুমি আমার নয়নের মণি। পৃথিবীতে আমি যা কিছু পেয়েছি, তার মধ্যে তুমিই সবচেয়ে মূল্যবান।’ বিন লাদেন আরও বলেন, ‘আমার মৃত্যুর পরে তুমি যদি দ্বিতীয় বিয়ে করও, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু আমি সত্যিই বলছি, স্বর্গে আমার স্ত্রী হিসেবে তোমাকেই পেতে চাই।’ অবশ্য বিন লাদেন তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘দুই বিবাহের কোনো নারীকে স্বামী বেছে নেয়ার সুযোগ দেয়া হবে স্বর্গে।’ উল্লেখ্য, পাঁচ থেকে ছয়জন বিবাহিত স্ত্রী ছিল বিন লাদেনের। টাইমস অব ইন্ডিয়া অনলাইন।

ইসলামিক স্টেট এখন সিরিয়ার চেয়েও বড়

বাশার আল আসাদ কর্তৃত্বাধীন সিরিয়ার চেয়ে বৃহৎ এলাকার অধিকারী এখন ‘ইসলামিক স্টেট’। মধ্যপ্রাচ্যে ইরাক ও সিরিয়ার মাঝখানে যেন আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রসীমা দখলে নিল ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। বুধবার সিরিয়ার প্রাচীন নগরী পামিরায় হামলা চালিয়ে বৃহস্পতিবার তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিজেদের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে সংগঠনটি। হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের এ শহরে এখন ধ্বংসের তাণ্ডবলীলা চলবে বলেই আশংকা করছে সংশ্লিষ্ট সবাই। ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট এক প্রতিবেদনে এ ভবিষ্যদ্বাণী করেছে। ব্রিটেনভিত্তিক সিরিয়ার মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থা (এসওএইচআর) জানিয়েছে, প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট বাশার বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা পামিরা শহরের দখলের মাধ্যমে সিরিয়ার ৫০ শতাংশের বেশি ভূমি আইএসের দখলে চলে গেছে। সংস্থাটির পরিচালক রামি আবদুর রহমান বলেন, সিরিয়ার ৯৫ হাজার বর্গকিমি. জায়গা এখন আইএসের নিয়ন্ত্রণে। দেশটির হমস, রাকা, দেইর ইজর, হাসাকা, হামা, আলেপ্পো, দামেস্ক, রিফ দিমাস্ক ও সুয়াদা শহরগুলোতে আইএসের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার রাতে সিরিয়ার প্রাচীন সভ্যতার সমৃদ্ধ নগরী পামিরা আইএসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তাদমুর নামেও পরিচিত কেন্দ্রীয় অঞ্চলের শহর পামিরার প্রাচীন অংশটি দুই হাজার বছরের পুরনো।
এখানকার ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো গত দুই হাজার বছর ধরে টিকে আছে। সিরিয়ার প্রতিবেশী ইরাকে আইএস ঐতিহাসিক অনেক প্রাচীন নিদর্শন ধ্বংস করেছে। পামিরাও জঙ্গিগোষ্ঠীটির বর্বরতার শিকার হতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আইএসের যোদ্ধারা শহরটির প্রাচীন অংশে প্রবেশের চেষ্টা করছিল বলে এর আগে জানিয়েছিল সিরীয় টেলিভিশন। সিরিয়ার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান মামুন আবদুল করিম শহরটির ঐতিহাসিক অংশটির স্থাপনাগুলো রক্ষার পদক্ষেপ নিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। শহরটি থেকে কয়েকশ’ প্রাচীন মূর্তি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে বলে বুধবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছিলেন তিনি। সিরিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর সঙ্গে রাজধানী দামেস্ককে সংযুক্তকারী প্রধান সড়কের মধ্যেই পামিরার অবস্থান। আধুনিক সামরিক স্থাপনা সমৃদ্ধ শহরটি তাই সমর কৌশলগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর অধিকাংশই বিদ্রোহীদের দখলে আছে। পামিরা এলাকা থেকে ইন্টারনেটে আইএসের এক যোদ্ধা বলেছেন, ‘আল্লাহর রহমতে এটি স্বাধীন হয়েছে।’ তিনি জানিয়েছেন, শহরের যে হাসপাতালটি সিরীয় বাহিনীগুলো ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতো তা এখন আইএসের নিয়ন্ত্রণে আছে। শহরটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ওমার হামজা নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘প্রশাসন সব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। শহরের পশ্চিমে হাসপাতালের নিয়ন্ত্রণ এখন আইএসের হাতে।’ তিনি জানান, ‘আইএস যোদ্ধারা পামিরার উত্তরাঞ্চল পুরোপুরি দখলে নিয়েছে। রাস্তায় কোনো সাধারণ মানুষের দেখা নেই। অনেকেই স্কুল ঘরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়- দুই হলের শতাধিক কক্ষ ভাঙচুর, লুটপাট

হামলায় তছনছ স্যার এ এফ রহমান হলের একটি কক্ষ
হামলার সময় এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট
কার্যালয়ের নামফলক ভাঙচুর করা হয়
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই পক্ষের নেতা-কর্মী, সাধারণ শিক্ষার্থীসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
গতকাল শুক্রবার বিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নিয়ন্ত্রিত স্যার এ এফ রহমান হল এবং আলাওল হলে এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় দুটি হলের শতাধিক কক্ষের জানালা ও দরজার কাচ ভাঙচুর করা হয়। এ সময় বিভিন্ন কক্ষ থেকে ছাত্রলীগের কিছু কর্মী ল্যাপটপ, মুঠোফোনসহ নানা আসবাব লুট করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের হলেন ছাত্রলীগ কর্মী হাসান, মাসুম খান ও সানি; শিবিরের হাফিজুল্লাহ ও শাহ জালাল এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে রয়েছেন মির্জা, জাবেদ, রায়হান বকুল, রুকন, সাক্তার খান, সাইফুল ইসলাম, শামীম চৌধুরী।
বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রের চিকিৎসক জহির আহমদ জানান, আহত ১৫ জনকে চিকিৎসাকেন্দ্রে আনা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ১২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র জানায়, বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ছাত্রলীগের শাটল ট্রেনের বগিভিত্তিক সংগঠন সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগ পক্ষের (বর্তমানে বিজয়) কয়েকজন কর্মী আলাওল হলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে যান। তাঁরা খেলার স্কোর লেখার জন্য খাতা আনতে আলাওল হলে গেলে শিবিরের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে বিজয়পক্ষের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে হলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এ সময় শিবিরের নেতা-কর্মীরাও হলের ওপর থেকে পাথর ছুড়তে থাকেন। দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়লে শাহ আমানত ও শাহজালাল হলে অবস্থান করা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা এসে আলাওল হলের সামনে জড়ো হন। এ সময় শিবিরের নেতা-কর্মীরা হলের পেছন দিকে সরে যায়। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হলের ভেতরে ঢুকে ভাঙচুর চালান। এ সময় বিভিন্ন কক্ষ থেকে কিছু কর্মী আসবাব লুট করেন। পরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পাশের এ এফ রহমান হলে যান। এ সময় ওই হলে অবস্থান করা শিবিরের নেতা-কর্মীরা হলের পেছন দিক দিয়ে সরে যান। এরপর ছাত্রলীগের কর্মীরা হলে ঢুকে বিভিন্ন কক্ষে ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এ সময় কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থীকেও মারধর করা হয়।
গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে এ এফ রহমান হলে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু কক্ষের দরজা ও জানালা ভাঙা। প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকদের নামফলক মেঝেতে পড়ে আছে।
পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের এএসপি আ ফ ম মিজান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর ছিল। কিছু কিছু জিনিস লুটপাট হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা আমাদের জানিয়েছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’
এ এফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। তারপরেও বেশ কিছু কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে কয়টি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে, এখনো হিসাব করিনি। আমার সামনে দিয়ে বেশ কিছু ল্যাপটপ নিয়ে যেতে দেখেছি। আমি তাদের কাছ থেকে তিনটি ল্যাপটপ নিজের হেফাজতে নিয়েছি।’
আলাওল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ জহির আহমেদ বলেন, ‘দুটি হলেই ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে কয়টি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে, সেটি আমরা এখনো দেখতে পারিনি।’
এদিকে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে এ এফ রহমান হলের সামনে শিবির সন্দেহে দুই শিক্ষার্থীকে মারধর করেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। পরে বিজয়পক্ষের নেতা-কর্মীরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
এদিকে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে আচমকা হামলার ঘটনায় লুটপাটের শিকার সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাতে এ এফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এঁদেরই একজন যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রেদোয়ান হাসনাত বলেন, ‘আমি হলের ১২৪ নম্বর কক্ষে থাকি। হামলার একপর্যায়ে কক্ষ ভাঙচুর করে আমার ট্যাব, ব্যাগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র লুট করা হয়। আমি কি আমার জিনিসপত্র আর ফেরত পাব?’
একই হলের ৩৩১ কক্ষের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী শওকত ওসমান জানান, হামলার সময় তাঁর ল্যাপটপ লুট হয়েছে।
ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, সম্পূর্ণ বিনা উসকানিতে দুটি হলে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছেন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
তবে ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সুমন মামুন দাবি করেন, শিবিরই প্রথম নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে ছাত্রলীগ তাদের প্রতিহত করে। লুটপাটের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের জানা নেই। তবে কেউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারুল আজিম আরিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনার সূত্রপাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। তারা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে তালা ভেঙে শিক্ষার্থীদের বেশ কিছু জিনিসপত্র নিয়ে গেছে বলে শুনেছি। আমি হল দুটির প্রাধ্যক্ষের সঙ্গে ও পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’

প্রত্যাশিত মৈত্রী গঠনের অভিপ্রায় by শিনজো আবে

প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর আমরা জাপানিরা গভীর অনুশোচনা নিয়ে নিজ দেশের পুনর্নির্মাণ শুরু করি, নতুন পথে যাত্রা শুরু করি। আমাদের পূর্বসূরিদের কাজের কারণে এশিয়ার মানুষকে প্রভূত কষ্ট পেতে হয়েছে। সে সত্য থেকে আমাদের মুখ ফিরিয়ে থাকলে চলবে না। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীরা এ প্রসঙ্গে যা বলেছেন, আমি তার সঙ্গে একমত পোষণ করি।
এই স্বীকৃতি ও অনুশোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা জাপানিরা বহুদিন ধরে ভেবেছি, এশিয়ার উন্নতিতে আমাদের যা যা করা দরকার, আমরা তা করব। এ অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিতকরণে আমাদের যা করণীয়, সেটা আমরা করব।
আমরা যে পথ নিয়েছি, তার জন্য আমি গর্ব বোধ করি, কিন্তু সে পথে শুধু আমরা একাই হাঁটিনি। আজ থেকে ৭০ বছর আগে জাপান পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, আর প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা আমাদের শিশুদের জন্য দুধ, গরম সোয়েটার, এমনকি ছাগলও পাঠিয়েছে। যুদ্ধের পরের কয়েকটি বছরেই যুক্তরাষ্ট্র জাপানে ২ হাজার ৩৬টি মার্কিন ছাগল পাঠায়। আগের শত্রুরা ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়।
আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রথম উপকারভোগী হচ্ছে জাপান। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র নিজের বাজার খুলে দেয়, উদার বিশ্ব অর্থনীতি প্রবর্তনের আহ্বান জানায়। ১৯৮০-এর দশকের পর থেকে আমরা গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া, তাইওয়ান ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর উত্থান দেখেছি, আর সম্প্রতি আমরা চীনকেও দেখলাম। আর এসবই সম্ভব হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবর্তিত উন্মুক্ত বিশ্বব্যবস্থার কারণে।
আর জাপানও নিশ্চিতভাবে চুপচাপ বসে থাকেনি, সে এসব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে পুঁজি ও প্রযুক্তি সহায়তা দিয়েছে। জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই এ অঞ্চলে সমৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেছিল, যেটা আসলে শান্তির বীজতলা। আজ জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে, তাদের নিয়মনীতিভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা লালনে নেতৃত্ব দিতে হবে। একক কোনো জাতিরাষ্ট্রের স্বেচ্ছাচারিতামুক্ত ন্যায্য, গতিশীল ও টেকসই ব্যবস্থা, যার আওতায় সব দেশেরই সমৃদ্ধি ঘটতে পারে।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাজার দুনিয়ার অন্যতম বিশাল প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র, আমরা সেখানকার পরিবেশগত চাপ উপেক্ষা করতে পারি না। এখন আমরা শুধু মুক্ত সওয়ারিদের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ বিনষ্ট করতে দিতে পারি। তার বদলে আমাদের অভিন্ন মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে হবে, তা লালন করতে হবে: আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা।
ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপে এ-ই আছে, এর বেশি কিছু নয়। এর কৌশলগত মূল্য অর্থনৈতিক মূল্যের চেয়েও বেশি। এর লক্ষ্য হচ্ছে, বিশ্বের ৪০ শতাংশ অর্থনীতি ও এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্যের কেন্দ্রকে আমাদের সন্তান ও তাদের সন্তানদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধির কেন্দ্রে পরিণত করা। মার্কিন-জাপান আপসের ক্ষেত্রে লক্ষ্য একদম পরিষ্কার। আসুন, যৌথ নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে এটাকে সফল পরিণতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাই।
আমি জানি, এ পথ কতটা বন্ধুর। ২০ বছর আগে আমি নিজেই জাপানের কৃষিবাজার উন্মুক্ত করার বিপক্ষে মত দিয়েছিলাম। এমনকি জাপানে ডায়েটের সামনে কৃষক প্রতিনিধিদের এক সমাবেশেও যোগ দিয়েছিলাম।
কিন্তু জাপানের কৃষি খাত বিগত দুই দশকে ছোট হয়ে গেছে। আমাদের কৃষকদের গড় বয়স ১০ বছর বেড়ে ৬৬ হয়েছে। আমাদের কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এর ব্যাপক সংস্কার করতে হবে, আমাদের কৃষি সমবায়কেও এর বাইরে রাখা যাবে না, গত ৬০ বছরে যে সমবায়ের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
জাপানের ব্যবসায়ও পরিবর্তন আসবে। জাপানের করপোরেট সুশাসন বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ আমরা এটাকে শক্তিশালী করেছি। আর ওষুধ ও জ্বালানি খাতে যে সংস্কার চলছে, তাতেও আমি নেতৃত্ব দিচ্ছি।
তার পরও জাপানের শ্রমশক্তির কমে যাওয়া রোধে যা করা দরকার, আমি তা করতে রাজি। আমরা নিজেদের পুরোনো অভ্যাসগুলো পাল্টানোর চেষ্টা করছি। বিশেষ করে, আমরা নারীদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করছি, যাতে তাঁরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে অংশ নিতে পারেন।
সংক্ষেপে বললে, জাপান আরও উন্মুক্ত ভবিষ্যতের লক্ষ্যপানে দীর্ঘমেয়াদি পালাবদলের মধ্যে রয়েছে। সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার কর্মসূচি চালিয়ে যেতে আমরা বদ্ধপরিকর।
কিন্তু সংস্কার করতে গেলে শান্তি ও নিরাপত্তা অটুট রাখতে হবে, যেটা আসলে মার্কিন নেতৃত্বের উত্তরাধিকার। আমার পিতামহ নোবুসুকে কিসি ১৯৫০-এর দশকে প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ে গণতন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বের পথ বেছে নিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য সমমনা গণতন্ত্রীদের সঙ্গে আমরা শীতল যুদ্ধে জিতেছিলাম। আমি সেই পথে থাকতে চাই, আর এর বিকল্প আছে বলেও মনে হয় না।
আমাদের বন্ধন মজবুত করতে সব চেষ্টাই করতে হবে। সে কারণে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ‘পুনঃ ভারসাম্য’ নীতি সমর্থন করি। জাপান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই প্রচেষ্টায় সমর্থন দিয়ে যাবে।
জাপান অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন করে সেটা করে যাচ্ছে, আবার আসিয়ানভুক্ত দেশ ও গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়ার সঙ্গে সহযোগিতার পরিসর বাড়িয়েছে। মার্কিন-জাপান মৈত্রীতে এদের যুক্ত করা হলে এ অঞ্চলের স্থিতাবস্থা আরও পাকাপোক্ত হবে। আর জাপান এখন ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার দিয়ে গুয়ামের মার্কিন ঘাঁটির উন্নয়ন ঘটাবে, ভবিষ্যতে যার আরও বৃহৎ কৌশলগত তাৎপর্য পরিলক্ষিত হবে।
এশিয়ার সমুদ্রসীমাবিষয়ক বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে আমার সরকারের তিনটি নীতির গুরুত্ব উল্লেখ করা দরকার। প্রথমত, সব রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে ভূখণ্ড দাবি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বল প্রয়োগ করে দাবি আদায় করা যাবে না। তৃতীয়ত, শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে।
প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিপুল সমুদ্র অঞ্চলকে শান্তি ও স্বাধীনতার অঞ্চলে রূপান্তরিত করতে হবে, যেখানে সবাই আইনের শাসন মেনে চলবে। এই কারণেও মার্কিন-জাপান মৈত্রীকে আরও সংহত করা আমাদের দায়িত্ব।
সে কারণে আমরা আমাদের নিরাপত্তার আইনি ভিত্তিকে দৃঢ় করার চেষ্টা করছি। এই দৃঢ়তর ভিত্তি মার্কিন সেনাবাহিনী ও জাপানি আত্মরক্ষা বাহিনীর সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করবে, মৈত্রীকে আরও সংহত করবে। এটা এই অঞ্চলের শান্তি সুরক্ষায় বিশ্বাসযোগ্য নিরোধক হিসেবে কাজ করবে। এসব আইনি পরিবর্তন এই গ্রীষ্মের মধ্যেই হয়ে গেলে জাপান সংকটের সর্বক্ষেত্রেই নির্ভুল অবস্থান নিতে পারবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই হবে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী আইনি পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের মধ্যকার নতুন প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নির্দেশিকার উদ্দেশ্যও একই, আগামী বছরগুলোতে তা এ অঞ্চলের শান্তি সুরক্ষিত করতে সহায়তা করবে।
শেষমেশ জাপান তার বৈশ্বিক দায়িত্ব পালনে এখন আরও বেশি আগ্রহী। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে জাপানের আত্মরক্ষা বাহিনী পারস্য উপসাগর অঞ্চল থেকে মাইন অপসারণ করেছে। ভারত মহাসাগরে আমরা ১০ বছর ধরে সন্ত্রাসবাদ ও অস্ত্র সরবরাহ রুখতে মার্কিন অভিযানে সহায়তা করেছি। কম্বোডিয়া, গোলানের চূড়া, ইরাক, হাইতি ও দক্ষিণ সুদানে আমাদের আত্মরক্ষা বাহিনীর সেনারা মানবিক সহায়তা দিয়েছে, শান্তিরক্ষা মিশনে অংশ নিয়েছে। এসব তৎপরতায় পর্যন্ত ৫০ হাজার কর্মী অংশ নিয়েছে।
শিনজো আবে
জাপানের এজেন্ডা খুব সাদামাটা ও সোজাসাপটা: ঘরে সংস্কার করা আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় নিজ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করা। এই কার্যক্রম জাপান ও এশিয়াকে আরও স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে, এটাই তার প্রতিশ্রুতি।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শিনজো আবে: জাপানের প্রধানমন্ত্রী।

ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবির সংঘর্ষের পর ছাত্রলীগের লুটপাট

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় এ এফ রহমান হলের ভাঙচুর
হওয়া একটি কক্ষ। ছবিটি আজ বিকেলে তোলা। ছবি: জুয়েল শীল
এ এফ রহমান হলের একজন শিক্ষার্থী ভাঙচুর ও লুটপাট হওয়া
কক্ষে নিজের জিনিসপত্র খুঁজছেন। ছবি: জুয়েল শীল, চট্টগ্রাম
মাটিতে পড়ে আছে এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট ও আবাসিক
শিক্ষার্থীদের নামফলক। ছবি: জুয়েল শীল, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হল ও আলাওল হলে এই সংঘর্ষ হয়। ঘটনার পর ওই দুই হলে ব্যাপক লুটপাট চালায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা।
সংঘর্ষে আহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১২ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকি তিনজন বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বিকেল সাড়ে চারটার সময় ছাত্রলীগের শাটল ট্রেনভিত্তিক সংগঠন সিএফসি ও ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের (বর্তমানে বিজয়) কয়েকজন কর্মী আলাওল হলের মাঠে ক্রিকেট খেলতে যান। এ সময় তাঁদের কয়েকজন স্কোর লেখার জন্য খাতা আনতে আলাওল হলের নিচতলায় যান। এ সময় ছাত্রশিবিরের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে তাঁদের কথা-কাটাকাটি হয়। পরে বিজয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা এসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরাও হলের ওপর থেকে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে।
এ খবর জানাজানি হলে শাহ আমানত ও শাহজালাল হলের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা আলাওল হলের সামনে আসলে ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা হলের পেছন দিকে সরে যায়। এ সময় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হলের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। আলাওল হলে ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে তাঁরা পাশের এ এফ রহমান হলে যান। এ সময় ওই হলের ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরাও হলের পেছন দিক দিয়ে চলে যান। এর পরপরই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হলে ঢুকে হামলা ভাঙচুর ও লুটপাট করে।
বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে এ এফ রহমান হলে গিয়ে দেখা যায়, হলের বেশির ভাগ কক্ষের দরজা ও জানালা ভাঙা। এমনকি হলের প্রাধ্যক্ষ ও আবাসিক শিক্ষকদের ভাঙা নামফলক মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হারানো বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে কাঁদতে দেখা যায়।
রাত আটটার দিকে লুটপাটের শিকার সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ এফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁদের একজন যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রেদোয়ান হাসনাত বলেন, ‘আমার রুম থেকে ট্যাব, ব্যাগসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র লুট হয়েছে। আমি কি আমার জিনিসপত্র ফেরত পাব? ’ একই হলের আরেক আবাসিক শিক্ষার্থী শওকত ওসমানের ল্যাপটপও নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। এ ছাড়া নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রথম আলোর কাছে তাঁদের জিনিসপত্র লুটের কথা বলেন।
এ ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা বিনা উসকানিতে দুটি হলের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়ে ভাঙচুর এবং লুটপাট করেছে। আপনারা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললেই জানবেন তাঁদের কী কী লুট হয়েছে।’ তবে ছাত্রলীগের বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম সম্পাদক সুমন মামুন বলেন, ‘ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরাই প্রথমে আমাদের ওপর হামলা করেছে। পরে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিরোধ করি।’
লুটপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের জানা নেই। তবে কেউ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ দিতে পারলে আমরা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব।’
তবে এ এফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন তাঁর সামনে দিয়েই বেশ কিছু ল্যাপটপ নিয়ে গেছে হামলাকারীরা। তিনি বলেন, ‘আমার সামনে দিয়ে বেশ কিছু ল্যাপটপ নিয়ে যেতে দেখেছি বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে। আমি তাঁদের কাছ থেকে তিনটি ল্যাপটপ নিজের হেফাজতে নিয়েছি। আর আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও বেশ কিছু কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে।’ আলাওল হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক শেখ জহির আহমেদ বলেন, ‘দুটি হলেই ভাঙচুর করা হয়েছে। তবে কয়টি কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে সেটি আমরা এখনও দেখতে পারিনি।’
পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের এএসপি আ ফ ম মিজান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর ছিল। কিছু কিছু জিনিস লুটপাট হয়েছে বলে শিক্ষার্থীরা আমাদের জানিয়েছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেব।’

মানব পাচার- ‘ওরা তখন ফুঁপিয়ে কাঁদছিল’

থাইল্যান্ডে মানব পাচারের ইতিবৃত্ত খুঁজে বের করতে দেশটির তিনটি প্রদেশে সরেজমিন অনুসন্ধান চালান বিবিসির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া প্রতিনিধি জনাথন হেড। এতে উঠে এসেছে লোমহর্ষক সব চিত্র। বের করার চেষ্টা করেছেন পাচারের পেছনের রাঘব বোয়ালদের। প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে দেখেছেন পাচারকারীদের ব্যবহার করা স্থানগুলো। সেখানে এখনও যত্রতত্র পড়ে আছে মৃত মানুষের হাড়গোড়। পাচারকারীদের হাত থেকে প্রাণে বেঁচে আসা উদ্ধারকৃতদের চোখে মুখে আতঙ্ক আর বিভীষিকার চিত্র তুলে ধরেছেন প্রতিবেদনে। তিনি লিখেছেন- এ মাসের শুরুর দিকে আন্দামান উপকূলে একটি দ্বীপের ম্যানগ্রোভ বনে প্রবেশ করি। সঙ্গে ছিল কয়েকজন থাই স্বেচ্ছাসেবী। ওই দ্বীপে বেশ কয়েকটি কবরের খবর পেয়েছিল তারা। ধারণা করা হচ্ছিল, ওই দ্বীপ মানব পাচারকারীরা ব্যবহার করতো। সেখানে মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক অভিবাসীদের রাখতো পাচারকারীরা। এক দ্বীপের একটি স্থানে কিছু হাড়গোড়ের সন্ধান পাওয়া গেল। সঙ্গে সঙ্গে মাটি খোঁড়া শুরু হয়ে গেল। কিছুটা গভীরে খোঁড়ার পরই আর্দ্র জামার অস্তিত্ব টের পাওয়া গেল। সেটার ভেতরেই এক মহিলার হলদে হাড় দেখা গেল। এ মহিলা কে বা কীভাবেই তিনি মারা গেলেন, আমরা এখনও জানি না। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে, তিনি অভিবাসীদের একজন। এখানে আসতে তাকে নিশ্চয়ই বিশাল পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। মালয়েশিয়ায় আরেকটু ভাল জীবন বুনার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু তার আগেই মারা গেলেন তিনি। কে জানে! হয়তো মারা না গেলে আরও খারাপ ভাগ্য অপেক্ষা করছিল তার জন্য।
মানব-বাণিজ্য: গত অক্টোবরে আমি প্রায় একই এলাকায় ছিলাম। তাকুয়া পা জেলায় বেশ কয়েকজন অভিবাসীকে সরকারি কর্মকর্তারা উদ্ধার করেছেন। এ খবর পেয়ে আমরা ব্যাংকক থেকে সেখানে ছুটে যাই। কমিউনিটি হলে আমরা ৮১ জন মানুষকে দেখতে পাই। তাদের চেহারায় ভয়াবহ চাপের ছাপ ছিল স্পষ্ট। আমরা তাদের প্রার্থনারত অবস্থায় দেখতে পাই। এ সময় তাদের প্রায় প্রত্যেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।
বেশ কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর মিয়ানমারে নির্যাতন চলছে। কিন্তু এরা কেউই রোহিঙ্গা ছিল না। এরা ছিল বাংলাদেশী। এদের কেউ কেউ আমাদের বলেছেন, তাদেরকে জোর করে নৌকায় তুলে এখানে নিয়ে আসা হয়। জেলা প্রধান মানিত পিয়ানথং আমাদের নিয়ে যান এ অভিবাসীদের উদ্ধার স্থলের দিকে। জায়গাটি ছিল জঙ্গলে পরিপূর্ণ। বেশ কয়েকদিন আগে আমরা যে মহিলার কবরের সন্ধান পেয়েছিলাম, এ জায়গাটি তার চেয়ে বেশি দূরে নয়। এ জঙ্গলে অভিবাসীদের বহুদিন না খাইয়ে রাখা হয়েছে। তাদেরকে পেটানো হয়েছে। মানিত আমাদের জানালেন, তার জেলাকে অনেকদিন ধরে মানব পাচারকারীরা ব্যবহার করছে। তিনি এটা বন্ধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার বা স্থানীয় আইনি প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে তিনি তেমন সাহায্য পাননি। এর পরের কয়েকদিন ধরে আমি মানিতের দিকে নজর রাখছিলাম। আমি তাকে সরকারি কর্মকর্তা ও পুলিশের কড়া মেজাজের ফোন কলগুলো সামলাতে দেখেছি। কেন মানিত গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললো, তা নিয়ে বেচারা বেশ হেনস্থা হয়েছে। মানিতকে উদ্ধারকৃত বাংলাদেশীদের ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টারে পাঠাতে বলা হলো। কিন্তু এটা একটি ওপেন সিক্রেট যে, ওই সরকারি বন্দি-কেন্দ্রে আটক অভিবাসীদের প্রায়ই আবার মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়।
মানিত নিজের লোকদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কাজে লাগালেন। যাতে করে এমন আরও বন্দিশিবিরের খোঁজ পাওয়া যায়। তিনি প্রধান সড়কে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির ব্যবস্থা করলেন। এ ছাড়া স্থানীয় জেলে সমপ্রদায়ের কাছে অনুরোধ জানালেন যাতে কোন নৌকা আসতে দেখলে তাকে জানানো হয়। বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গারা যে বর্ধিষ্ণু হারে থাই উপকূলের দিকে যাচ্ছিল, তাতে মনে হয় মানব-ব্যবসা বিস্তৃত হচ্ছিল। অবাক হবার কিছু নেই, এটি ছিল মারাত্মক লাভজনক!
ব্যবসায়িক কাঠামো: রাবার গাছগুলোর নিচের বাষ্প শ্বাস আটকে দেয়। হঠাৎ দেখলাম, উজ্জ্বল কমলা রঙের শার্ট পরা এক তরুণ আমার পাশ দিয়ে দ্রুত চলে গেল। তার সঙ্গে কথা বললাম। খুব দ্রুতই সে কথা বলতে লাগলো। ৬ মাস আগে সেসহ আরও প্রায় ৬০০ মানুষ এখানে থাকতো। কোন ধরনের আশ্রয় ছাড়াই এখানে থাকতে হতো। ঝরে পড়া পাতা ছিল তাদের বিছানা। সে বললো, এখানেরই একটি তাঁবুতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো। এরপর আমাদের পিতামাতাকে ফোন দেয়া হলো। তাদের কাছ থেকে টাকা চাইতে বাধ্য করা হলো আমাদের। তারা টাকা না দিতে পারলে, আমাদের পেটানো হতো। আরেক জায়গা সে দেখালো, যেখানে কিছু নারীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। অনেক মানুষ মারা গেল। তারা ট্রাকে করে ওই মৃতদেহগুলো কোথায় যেন নিয়ে গেল! এটাই হচ্ছে এ ব্যবসার কাঠামো। নৌকায় করে অভিবাসীদের এখানে নিয়ে আসে মানব পাচারকারীরা। পুলিশসহ বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ৩০০ জনকে নৌকায় করে থাইল্যান্ড নিয়ে আসার দাম ২০ হাজার ডলার। এরপর অভিবাসীদের জঙ্গলে আটকে রাখা হয়। মাথাপিছু ২-৩ হাজার ডলার করে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করে পাচারকারীরা। প্রশ্ন হলো, কিভাবে একটি থাই গ্রামে এ রমরমা ব্যবসা চলে? আমি যে বন্দিশিবির দেখেছি, সেটি হাত ইয়াই শহর থেকে গাড়ি দিয়ে ৩০ মিনিটের পথ। অর্থাৎ এ ব্যবসায় স্থানীয়দেরও জড়িয়েছে মানব পাচারকারীরা। বয় নামের স্থানীয় এক তরুণ জানিয়েছে, স্থানীয় প্রায় পুরো সমপ্রদায় এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কয়েক বছর আগে সে পাখি শিকার করতে গিয়ে কয়েকটি বন্দিশিবির দেখতে পায়। সেখানে বহু শিশুও ছিল। তাদের পেটাতেও দেখেছে বয়। এরপর থেকে ওই শিবির থেকে পালিয়ে যাওয়া মানুষদের আশ্রয় দেয়ার চেষ্টা করেছে সে। সে বলে, এখানকার স্থানীয় পুরো সমপ্রদায় এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এর কারণ, অর্থ! পাচারকারীরা প্রত্যেককে কিনে ফেলেছে। তারা কিছু মানুষকে বন্দিশিবির পাহারার কাজে লাগিয়েছে। স্থানীয়দের প্রধান আয়ের উৎস রাবারের দাম পড়তির দিকে। তাই এ ব্যবসা ছিল তাদের জন্য দারুণ এক বিকল্প! বয় আমাকে জানায়, স্থানীয় তরুণদের লোভ দেখানোর জন্য মাদকও ব্যবহার করে পাচারকারীরা। তাই অভিবাসীরা পালাতে পারলেও আসলে কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না তাদের। কেউ না কেউ তাদের ধরে ফেলতো! বন্দিশিবিরে ভয়াবহ শাস্তির ঝুঁকি তো ছিলই।
সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশ: কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া এসব করতে পারতো না মানব পাচারকারীরা। তবে ঠিক কোন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এসবে জড়িত ছিলেন, তা এখনও জানা যায়নি। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে, খুবই উঁচুপর্যায় থেকে এসবে সায় ছিল। গত বছরের শেষ দিকে, আমাকে একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা অনেক কিছু বলেন। ওই কর্মকর্তা মানব পাচারের ব্যবসা নিয়ে অনেক কিছুই জানেন। তিনি আমাকে বলেন, মালয়েশিয়ার সঙ্গে থাই সীমান্তেই অনেক বড় একটি বন্দিশিবির রয়েছে। সেখানে অন্তত ১ হাজার মানুষকে আটক রাখা হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কেন তারা পুলিশ নিয়ে সেসব বন্ধ করছে না? প্রশ্ন শুনে সে হেসে দিল। তিনি বলেন, আপনি তো জানেনই যে সীমান্ত হচ্ছে সামরিক এলাকা। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সেখানে সামরিক বাহিনীর অনুমতি ছাড়া আমি কিছুই করতে পারি না। এই অনুমোদন তিনি কখনই পাননি। আমি প্রশ্ন করলাম, তিনি কেন প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান প্রায়ুথ চ্যান-ওচা’র কাছে যাননি? তিনি গত বছর সামরিক অভ্যুত্থানে  নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর মানব পাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। ওই পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে উত্তরে বললেন, আমি যদি তা করি, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর দেখা পাওয়ার আগেই মানব পাচারকারীদের সতর্ক করে দেয়া হবে। ফলে তারা দ্রুত সেখান থেকে সরে যাবে। অর্থাৎ পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া তার কিছুই করার নেই। ছয় মাস পর ২৬ জনের মৃতদেহসহ প্রথম গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। এটিই ছিল সেই বন্দিশিবির যেটি ওই পুলিশ কর্মকর্তা অসহায়ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখেছিলেন।
এটি বের করা খুব কঠিন, কারা এসবে জড়িত; কারা জড়িত নয়। স্থানীয় এক পুলিশ প্রধান মানব পাচার বন্ধে তার প্রচেষ্টা সমপর্কে আমাদের জানান। এমনকি তিনি তার নৌকা নিয়ে আশেপাশে ঘুরে অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেন আমাদের। ঠিক একদিন পর আমরা সামরিক বাহিনীর একটি ইউনিটের সঙ্গে অনুসন্ধানে যাই। ওই ইউনিট আমাদের জানায়, ওই স্থানীয় পুলিশ প্রধানই মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু ওই সেনারাই বা কতটুকু মানব পাচারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ- তা নিয়েই আমরা সংশয়ে পড়ি কিছুক্ষণ পর। একটি গ্রামে অভিবাসীদের লুকিয়ে রাখা হতে পারে বলে আমাদের ধারণা ছিল। সে গ্রামটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা গ্রামে প্রবেশ করতে চাইলাম। কিন্তু আগে কথা দিলেও, এবার ওই গ্রামে আমাদের নামাতে রাজি হয়নি সেনারা!
এক কর্মকর্তা আমাদের তার তদন্তের বিস্তারিত দেখালেন। সেখানে রানোং প্রদেশের নামিদামি অনেক ব্যবসায়ীর কথা উল্লেখ আছে। রানোং প্রদেশ অনেকদিন ধরে মানব পাচারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তার কাছে নাম, ফোন নম্বর, ফোন কলের সময় ও বড় ধরনের নেটওয়ার্কের প্রমাণ আছে। এ তথ্যসমূহ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু গূঢ় রহস্য হচ্ছে, সরকার এসব জেনেও কিছুই করেনি। ওই কর্মকর্তাকে পরে বদলি করে দেয়া হয়।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বললেন, দেখুন, সবাই জানে যে ওখানে বন্দিশিবির আছে। এটা এমন নয় যে, কেবলমাত্র গ্রামবাসী বন্দিশিবিরে জড়িত ও পাহারার কাজ করে। অথচ থাই-মালয়েশিয়া সীমান্ত সমপূর্ণ সামরিকীকৃত। সেখানে পুলিশ ও সামরিক বাহিনী গিজগিজ করছে। কারো পক্ষেই ওই এলাকায় ‘প্যাকেট’ বিনিময় ব্যাতীত এত বড় আকারের বন্দিশিবির পরিচালনা করা সম্ভব নয়!
বন্ধ হবে কবে: এবার আরেকটি সরকারি হলে গেলাম। দুইদিন আগে সেখানে বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে রাখা হয়েছে। তাদের বন্দিশিবির যারা পাহারা দিচ্ছিল, তাদের পাশেই পুলিশ আটক করে রেখেছে। পুলিশ প্রধান তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন; জানতে চেষ্টা করছিলেন তাদের বস কে। রোহিঙ্গাদের জন্য আমার একটি প্রশ্ন ছিল। তাদের কতজন চিন্তিত ছিল যে, তাদের পরিবার হয়তো পাচারকারীদের চাহিদা মোতাবেক মুক্তিপণ দিতে পারবে না দালালদের? এ প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় সবাই-ই হাত তুললো! রাখাইন স্টেটের এক রোহিঙ্গা শিক্ষক মোহাম্মদ জানালেন, আমরা এখানে আসতে চাই না। আমাদের মাতৃভূমি ছাড়তে চাই না। কিন্তু আমাদের আসলে যাবার কোনো জায়গাই নেই। মিয়ানমার সরকার খুবই খারাপ। তারা আমাদের পেটায়, গুলি মেরে হত্যা করে। কিন্তু এসব শিবিরে কি হয়, তা জানতেনই না মোহাম্মদ। একপর্যায়ে তিনি পালাতে পেরেছিলেন; কিন্তু আবার ধরা পড়েন পাচারকারীদের হাতে। একটি সামরিক সূত্র আমাদের জানায় যে, রানোং-এ একটি সরকারি অভিবাসী বন্দি-কেন্দ্রে আটককৃত অনেক রোহিঙ্গাকে রাখার পর তাদের আবারও মানব পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়। এর আগেও এমন হয়েছে। তারা মূলত মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক ছিল। সেখানে চাকরি, পরিবার ও ভাল ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল তারা। কিন্তু বাংলাদেশীদের তবুও যাবার জায়গা আছে। তাদের অল্প কয়েকজনকে জোর করে পাচার করা হয়েছিল। কিন্তু অনেকে জেনে বুঝে সমুদ্র পথে পাড়ি জমাতে রাজি হয়। উচ্চ বেতনে চাকরির লোভ দেখিয়ে তাদের মুঠোয় আনে পাচারকারীরা। কিন্তু এ ব্যবসার নির্মম বাস্তবতা যখন উপলব্ধি করার পর তাদের অনেকেই বাড়ি যেতে চাইলো। এ ব্যবসা এতই জমজমাট যে, এখন থাই পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সেখানে আগে থেকেই দালালদের ভাল একটি নেটওয়ার্ক আছে। যদি ওই নেটওয়ার্কগুলো ভাঙ্গা যায়, তাহলে মুহূর্তেই সেখান থেকে অভিবাসী আসার হার কমে যাবে।
মানব পাচারবিরোধী অভিযান: আমরা বেশ কয়েক মাস ধরে সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। মনে হয়েছিল, তারা মনেপ্রাণেই চান এসব বন্ধ করতে। তারা জানালেন, তারা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি ঘটিয়েছেন। কিন্তু তাদের কাছে সোংখলা, সাতুন ও রানোং প্রদেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার বা প্রশ্ন করার প্রমাণ আছে বলে মনে হয়নি। ওই প্রভাবশালীরাই এ ব্যবসা চালায় বলে ধারণা করা হয়। সুতরাং, যেটির অভাব আমরা অনুভব করছি, তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
প্রথম গণকবরের সন্ধান পাওয়া যাবার পরই সরকার উঠেপড়ে লাগে। এ প্রতিবেদনটি লেখার সময়, ৮০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ৩০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতুনের খুব প্রভাবশালী এক ব্যবসায়ীও রয়েছেন। রয়েছেন কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা, তবে তারা বেসামরিক। ৫০ জনেরও বেশি পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। সরকারের এসব পদক্ষেপ কি বেশিদিন টিকবে? হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন জবাবে বললেন, পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে আরও অনেক প্রভাবশালী লোক অর্থ কামিয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। এখনও অনেক কিছুই করতে হবে। এখনও অনেক কিছুই খুঁজে বের করার বাকি।
২০৮ অভিবাসীকে উদ্ধার করলো মিয়ানমার: বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে সমুদ্রে ভাসমান দুটি নৌকা থেকে ২০৮ অভিবাসীকে উদ্ধার করেছে মিয়ানমার। আন্দামান সাগরে নৌকায় ভাসমান অভিবাসী সংকট নিয়ে মিয়ানমারের ওপর ক্রমাগত বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে এটাই দেশটির প্রথম উদ্ধার অভিযান। মিয়ানমারের নৌবাহিনী নৌকা থেকে আটকে পড়া অভিবাসীদের উদ্ধার করে তীরে নিয়ে যায়। জাতিসংঘের তরফ থেকে তাদের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যের এক সিনিয়র কর্মকর্তা টিন মং সোয়ে জানিয়েছেন, ২১শে মে টহলরত অবস্থায় নৌবাহিনীর একটি জাহাজ দুটি নৌকা উদ্ধার করে। পাচারকারীদের নৌকায় এখনও ৩ সহস্রাধিক অভিবাসী সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ ধরে খবর আসছিল, মিয়ানমার উপকূলের অদূরে সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে ৫টি নৌকা। নৌকা নিয়ে আন্দামান সাগর পার হতেও চাইছিল না পাচারকারীরা। আবার আরোহীদের কাছ থেকে অর্থ আদায় হওয়ার আগ পর্যন্ত ছেড়ে দিতেও তারা অনিচ্ছুক ছিল। এ পরিস্থিতিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর বাড়তে থাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ। পরশু মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এবং আমেরিকান পররাষ্ট্র উপমন্ত্রী টনি ব্লিঙ্কেন। এর পরই মিয়ানমার উদ্ধার অভিযান চালায় এবং দুটি নৌকা উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে। একই সঙ্গে দেশটি বিপর্যস্ত আরোহীদের মানবিক সহায়তা দিতে রাজি হয়েছে। তবে দেশটির একাধিক মন্ত্রী এটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, যাচাই সাপেক্ষে শুধু মিয়ানমারের নাগরিকদেরই সেখানে থাকতে দেয়া হবে। মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পাতায় উদ্ধার করা একটি নৌকার কয়েকটি ছবি পোস্ট করা হয়। এতে দেখা যায়, নৌকার খোলের ভেতর গাদাগাদি করে রয়েছে অনেক মানুষ। ফেসবুকের ওই পোস্টে তাদের ‘বাঙালি’ বলে উল্লেখ করা হয়। উল্লেখ্য, মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে চিহ্নিত করে থাকে। দেশটির কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্ধারকৃত নৌকা দুটি রাখাইন রাজ্যের অদূরে বাংলাদেশের জলসীমায় ছিল এবং আরও ছোট ছোট নৌকায় আসা অভিবাসন প্রত্যাশীদের নৌকায় তোলার জন্য অপেক্ষায় ছিল। এদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনপ্রণেতারা মিয়ানমার সরকারকে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে সংখ্যালঘু মুসলমানদের গণকবর পাওয়ার ঘটনায় তদন্ত শুরুর আহ্বান জানিয়েছেন তারা। পরশু ইউরোপীয় পার্লামেন্টে পাস হওয়া এক প্রস্তাবে এ আহ্বান জানান আইনপ্রণেতারা। থাইল্যান্ড সরকার ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য অবৈধ অভিবাসীকে থাইল্যান্ডে পাচারে জড়িত মানব পাচার চক্রের সদস্যদের সম্পৃক্ততা অবসানেরও আহ্বান জানায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন। জাতিসংঘের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত সম্প্রদায়ের একটি সংখ্যালঘু রোহিঙ্গারা। থাইল্যান্ড ও মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ইস্যুগুলো উত্থাপনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
অস্ট্রেলিয়ার না: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী সংকট মোকাবিলা করতে সহায়তা চেয়ে ইন্দোনেশিয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে অস্ট্রেলিয়া। দমন-পীড়ন ও দরিদ্রতা থেকে মুক্তির জন্য অভিবাসনপ্রার্থী কিছু রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীদের নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল ইন্দোনেশিয়া। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট জানিয়েছেন, যে পদক্ষেপ আরও মানুষকে নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় প্রবৃত্ত হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে সেটা হবে বিভ্রান্তিমূলক। অভিবাসন প্রত্যাশীদের অস্ট্রেলিয়ায় অস্থায়ী আশ্রয় দেয়া দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার মানব পাচার সমস্যায় সহায়তা করার পরিবর্তে আরও বাড়াতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।