Sunday, June 7, 2015

১৯টি চুক্তিই ভারতের প্রয়োজনে হয়েছে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বন্টন নিয়ে আলোচনা না হওয়ায় জনগন হতাশ বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মকবুল আহমাদ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পাদিত ১৯টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা সারক কার্যত ভারতের প্রয়োজনেই হয়েছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে দেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ দুই দেশের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হবে বলে বুকভরা আশা নিয়ে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু দ্বিপাক্ষীক বাণিজ্য, উপকূলীয় জাহাজ চলাচল ও দুই রুটে বাস চলাচলের ৪টি সহ বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৯টি চুক্তি, প্রটোকল ও সমঝোতা সারক সাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা সামুদ্রিক বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পাবে ভারত। বাংলাদেশের ওপর দিয়ে উত্তর ভারতে যাওয়ার ট্রানজিট সুবিধা পাবে উত্তর-পূর্ব ভারত। এ সবই কার্যত ভারতের প্রয়োজনেই সম্পাদিত হয়েছে। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর বলেন, নরেন্দ্র মোদী দেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের তার সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়ে আসায় সঙ্গত কারণেই জনগণ আশা করেছিল এ সফরে তিস্তা নদী ও ফেনী  নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাবে বাংলাদেশ। কিন্তু এ দুটি নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়ার বিষয়ে কোন আলোচনা না হওয়ায় জনগণ হতাশ হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন নদীসমূহের পানি বন্টনের কোন সমস্যার সমাধান না হওয়ায় বাংলাদেশ মরুভূমি হতে চলেছে।দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এছাড়া বাংলাদেশের জন্য এক গুরুতর সমস্যা হচ্ছে ভারতীয় বিএসএফ কর্তৃক সীমান্তে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশীদের হত্যা। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ সকল সমস্যার সমাধান হবে বলে জনগণ আশা করেছিল। কিন্তু তারও কার্যকর কোন পদক্ষেপ জনগণ দেখতে পায়নি।
তিনি বলেন,দেশের জনগণ, বিশ্ববাসীর এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের নিকট এটা স্পষ্ট যে, বর্তমান সরকার ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারী  নির্বাচনের নামে একটি প্রহসনের আয়োজন করে ক্ষমতা দখল করেছে। শতকরা ৫ ভাগ ভোটার ওই নির্বাচনে ভোট দেয়নি। এই নির্বাচনের বিষয়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সকল দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের দ্রুত আয়োজনের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এদেশের জনগণ আশা করেছিল জনগণের প্রত্যাশা ও গণতান্ত্রিক দেশসমূহের আহ্বানের পাশাপাশি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সফর বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় জনগণের প্রত্যাশা পুরণ করবে। কিন্তু দেশের জনগণের নিকট গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কার্যকর কোন সহায়ক পদক্ষেপ দৃশ্যমান হয়নি। সার্বিকভাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফর থেকে দেশের জনগণের প্রত্যাশা পুরণ না হওয়ায় জনগণ হতাশ হয়েছে।

‘আবার আসিব ফিরে’

ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ-ভারত
সম্পর্ক নিয়ে জনবক্তৃতা দিচ্ছেন নরেন্দ মোদি।
‘আবার আসিব ফিরে/ধানসিঁড়িটির তীরে/এই বাংলায়’—জীবনানন্দ দাশের এই কবিতা উচ্চারণ করে বাংলাদেশে আবার ফিরে আসার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
আজ রোববার সন্ধ্যায় ঢাকার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে জনবক্তৃতায় এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মোদি। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বক্তৃতার শুরুতে মোদি পরিষ্কার বাংলায় বলেন, ‘কেমন আছ? আমরা তোমার সাথে আছি। আমরা তোমাদের সাথে নিয়ে চলব।’ এ কথা বলার পর তিনি অতিথিদের কাছে জানতে চান ‘আমার বাংলা কেমন? ’
জনবক্তৃতা বাংলায় শুরু করলেও হিন্দিতে বক্তব্য দেন মোদি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে ক্রিকেটে সাকিব আল হাসান ও সালমা খাতুনের নাম। উঠে আসে পোশাকশিল্পে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থানের কথা। এ দেশে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার কথা বলতে গিয়ে এভারেস্ট জয়ী দুই নারী নিশাত মজুমদার ও ওয়াসফিয়া নাজরিনের নাম উল্লেখ করেন তিনি। বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা ও স্পিকার পদে নারীর আসীন থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। এ ছাড়াও সীমান্তে হত্যা, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, পানি চুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন মোদি।
দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মোদি প্রথমবারের মতো গতকাল শনিবার সকালে বাংলাদেশে আসেন।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘আমাদের দুদিনের যাত্রা সফলভাবে শেষ হচ্ছে। এটি আমার এই সফরের শেষ কর্মসূচি। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে আমি সফর শুরু করতে চলেছি। আমার এই দুই দিনের সফরে বাংলাদেশের নাগরিকেরা, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা যেভাবে আমাকে স্বাগত ও সম্মান জানিয়েছেন; এটা নরেন্দ্র মোদি নামের এক ব্যক্তির নয়, সোয়া শ কোটি ভারতবাসীর সম্মান।’
ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই দুদিনের সফরের পর শুধু এশিয়া নয়, সমগ্র বিশ্ব খুব সূক্ষ্মভাবে ময়নাতদন্ত করবে। কেউ মাপকাঠি নিয়ে দেখবে কী পেলাম আর কী দিলাম। কিন্তু যদি একটি বাক্য আমাকে বলতে হয় আমি বলব, লোকেরা মনে করতেন আমরা খুব পাশাপাশি আছি। বিশ্বকে বলতে চাই, পাশাপাশি ও একই সঙ্গেই আছি।’
নরেন্দ্র মোদি বলেন, ‘সূর্য এখানে আগে ওঠে, এরপর আলো আমাদের (ভারত) এখানে যায়। এখানে যত আলোই হোক আলো আমাদের ওখানেও যায়। আমাদের রাজ্যগুলোকে বাংলাদেশের কাছ থেকে শিখতে হবে। বাল্যবিবাহ, শিশুমৃত্যু এসব বিষয়ে শিখতে হবে। আমাদের দেশের কেউ সৈন্য ছিল যিনি বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়েছিলেন। আমার দেশের সৈন্যরা তাদের রক্ত দিয়েছেন, এর চেয়ে বেশি গৌরব আর থাকতে পারে না।’ মোদি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাব, তিনি একটিই লক্ষ্য বানিয়েছেন সেটি, প্রবৃদ্ধি। আর ধারাবাহিকভাবে ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছোট ব্যাপার নয়।’
মোদি বলেন, ‘খুব কম লোক এটি চিন্তা করেছে যে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি হবে। এটি জমির সমাধান নয়, এটি সেই চুক্তি যা মনকে যুক্ত করেছে। বিশ্বে সব যুদ্ধই জমির জন্য হয়েছে। আজ পর্যটনমন্ত্রীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, বুদ্ধ (গৌতম বুদ্ধ) ছাড়া ভারতও অসম্ভব। যেখানে বুদ্ধ রয়েছেন সেখানে যুদ্ধ হতে পারে না। তাঁরা জমির জন্য যুদ্ধ করতে পারে, আমরা না।’ স্থলসীমান্ত নিয়ে বাংলাদেশের একটি পত্রিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনি আজ এখানকার একটি পত্রিকায় পড়ছিলেন। হেডলাইন পড়েছেন। পুরোটা নয়। লেখাটিতে লেখক স্থলসীমান্ত চুক্তিকে বার্লিনের দেয়াল ভেঙে ফেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

রোহিঙ্গা মুসলমানদের উদ্ধার করায় বৌদ্ধদের বিক্ষোভ!

সাগর থেকে উদ্ধার করা অভিবাসীদের মিয়ানমারের রাখাইন
রাজ্যের আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ছবি: এএফপি
মিয়ানমারে সাগরে ভাসা অভিবাসী প্রত্যাশী রোহিঙ্গা মুসলমানদের উদ্ধারের প্রতিবাদে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করতে যাচ্ছে রাখাইন রাজ্যের কয়েকটি কট্টরপন্থী বৌদ্ধ গোষ্ঠী। আজ রোববার বার্তা সংস্থা এএফপির এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, মিয়ানমারের সবচেয়ে গরিব রাজ্য রাখাইনে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হচ্ছে। ২০১২ সালে বৌদ্ধদের আক্রমণে অনেক রোহিঙ্গাকে বাড়ি-ঘর ছেড়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে হয়েছে।
আক্রমণ থেকে বাঁচতে লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে পালাতে হয়েছে। তাঁদের অনেকে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি বঙ্গোপসাগর থেকে প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে মিয়ানমারের নৌবাহিনী। পরে তাঁদের রাখাইন রাজ্যে ফিরিয়ে আনা হয়।
সাগরভাসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে আনায় বেজায় চটেছে বৌদ্ধ গোষ্ঠী ও রাখাইনেরা। তারা রোহিঙ্গাদের উদ্ধার কাজ বন্ধ করতে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে।
স্থানীয় কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো গতকাল শনিবার রাখাইন রাজ্যের সিত্তেতে এক বৈঠকে বসে। পরবর্তী বন্ধের দিনে এ বিষয়ে বিক্ষোভের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রাখাইনদের সামাজিক অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক ও ওই বৈঠকে অংশগ্রহণকারী সিও ন্যানিং বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা বাঙালিদের রাখাইন রাজ্যে আনার প্রতিবাদে আগামী ১৪ জুন বিক্ষোভ হবে। বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিক্ষোভে যেন রাজ্যের অন্যান্য শহরের রাখাইনরা অংশগ্রহণ করে, এ জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে।’
ন্যানিং আরও বলেন, ‘আমরা তাঁদের ফেরত পাঠাতে বলব। বাংলাদেশ সরকারকে অবশ্যই তাঁদের গ্রহণ করতে হবে। এ ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সরকারকে চাপ দিতে হবে।’
এদিকে, পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ওই ৯০০ জনের ১৫০ জনকে বাংলাদেশে আগামীকাল ফেরত আনা হতে পারে। সীমান্ত দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত হয়।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হলে বাণিজ্য বাড়বে by মোস্তাফিজুর রহমান

বাংলাদেশ–ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নানা দিক থেকেই দেখা যেতে পারে। এর যেমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক আছে, তেমনি ভূরাজনৈতিক দিক থেকেও এটি দেখা যেতে পারে। একুশ শতকে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বহুমাত্রিক ঘনিষ্ঠতার ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ আছে, এটা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিচার্য বিষয়।
আমি মনে করি, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কৌশলের বড় দিক হচ্ছে একুশ শতকে দুনিয়ার দুই প্রধান শক্তি চীন ও ভারতের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় করা। আর বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশলে সেটা যথাযথভাবে ব্যবহার করা। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। ভারত বাংলাদেশসহ সার্কের অন্যান্য দেশের পণ্য বিনা শুল্কে তাদের দেশে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ভারতের বিশাল বাজারে ঢুকতে পারে।
ভারত বর্তমানে বিশ্ববাজার থেকে বছরে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। আর এ মুহূর্তে ভারত বাংলাদেশ থেকে এক বিলিয়ন ডলারের অর্ধেকের সমপরিমাণ পণ্য আমদানি করে। এটা ভারতের মোট আমদানির ১ শতাংশের ১০ ভাগের ১ ভাগ। সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, ভারত যেসব পণ্য আমদানি করে, তার অনেকগুলোই বাংলাদেশ তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সেসব পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি করার সক্ষমতা আছে। কিন্তু সেটা বাস্তবে হচ্ছে না। এসব পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশের পক্ষে ভারতে বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব। এ পরিপ্রেক্ষিতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ, অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ—এসব খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ নিবিড়করণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয়, উপ-আঞ্চলিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার লক্ষ্যে নানা পদক্ষেপ ও চুক্তির প্রসঙ্গ বিবেচনাধীন রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মোটর ভেহিকেল অ্যাগ্রিমেন্টের প্রস্তাব আছে। আবার বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে উপ-আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগের কথা আলোচিত হচ্ছে। সার্কের দেশগুলোর মধ্যে মোটর ভেহিকেল অ্যাগ্রিমেন্টের বিষয়টি অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিন-পাঁচ বছরের জন্য নৌ প্রটোকল হয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পানিপথের যোগাযোগ নিবিড়করণের কথাবার্তা চলছে। এর বাইরে বিসিআইএম ইকোনমিক করিডরের অধীনে ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা নিবিড়করণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে দ্বিপক্ষীয়, উপ–আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ চলমান রয়েছে। এসব আলোচনায় যদি সমন্বিত ও বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের মাধ্যমে এগোনো যায়, তাহলে সম্প্রসারণশীল ভারতীয় ও আঞ্চলিক বাজারে বাংলাদেশ শক্তিশালী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অংশগ্রহণ করতে পারবে।
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার বাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় স্থলবন্দর দিয়ে। কিন্তু বর্তমানে স্থল যোগাযোগব্যবস্থার অপ্রতুলতা, স্থলবন্দরের দুর্বল অবকাঠামো, ওয়ান স্টপ সার্ভিস, ইলেকট্রনিক ডেটা এক্সচেঞ্জ ও সিঙ্গেল উইন্ডোর অনুপস্থিতিতে ব্যবসার খরচ বেশ বেড়ে গেছে। ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অন্যদিকে আমদানি খরচ বাড়ার কারণে ভোক্তা পর্যায়ের মূল্য এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদকের ব্যয় বাড়ে। মনে রাখতে হবে, ভারত বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান আমদানি সূত্র। সেখান থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর সাড়ে ছয় বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। ফলে আমদানি খরচ কমানো দরকার। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হলে আমদানি ও রপ্তানি উভয় খাতের জন্য তা ভালো।
কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হলে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বড় ধরনের বিনিয়োগ দরকার। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের সড়ক নির্মাণ ও নদীর নাব্যতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে রেল যোগাযোগব্যবস্থাও হতে পারে আমদানি ও রপ্তানির সুলভ মাধ্যম। ভারতের এক বিলিয়ন ডলারের লাইন অব ক্রেডিটের বড় অংশ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। এর থেকে ভারত ২০০ মিলিয়ন ডলার পদ্মা সেতুর জন্য অনুদান হিসেবে দিয়েছে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোও দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় এ লাইন অব ক্রেডিট সম্প্রসারণের কথা শোনা যাচ্ছে। সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ভারতীয় ঋণসহায়তা বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, যানবাহন ও পণ্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক ও সারচার্জ নির্ধারণ। এদিকে ভারতের ভূমির ওপর দিয়ে নেপাল ও ভুটান বাংলাদেশের মাধ্যমে তৃতীয় দেশে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশও এ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে শুল্ক নির্ধারণ করতে হবে। অন্যদিকে ভারত তার পশ্চিম ও উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে পণ্য সরবরাহে অত্যন্ত আগ্রহী।
এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ একটি প্রস্তাব দিতে পারে, সড়কব্যবস্থার প্রয়োজনীয় উন্নতি যত দিন না হচ্ছে, তত দিন বাংলাদেশের রেল ও ট্রাক ভারতের পণ্য আনা-নেওয়া করতে পারে। এর ফলে বর্তমানে ব্যবহৃত ‘চিকেন নেকের’ মাধ্যমে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে সরবরাহ ব্যয় কমানো সম্ভব। আর বাংলাদেশ ভারতের কাছ থেকে সারচার্জ, পরিষেবা চার্জ ইত্যাদির মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা আয় করতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশেই এটা আছে।
আমাদের নিকটবর্তী জিএমএসভুক্ত দেশগুলোতেও এটি আছে। বাংলাদেশ ও ভারত উইন-উইন পদ্ধতিতে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। এই যোগাযোগ ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বিসিআইএম ইকোনমিক করিডর ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। মোটর ভেহিকেল চুক্তিগুলোকে বাস্তবায়ন করতে হলে পণ্য ও মানুষের সীমান্ত অতিক্রম-সংক্রান্ত নানা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রটোকল, ভিসা সহজীকরণ ও বিভিন্ন নিয়মনীতির প্রমিতকরণ করতে হবে। আর এসব বিষয়ে আলোচনা করতে হবে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে।
যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি হলে তা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় প্রণোদনা হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ভারতের শূন্য শুল্কের সুযোগ নিয়ে তার রপ্তানির তুলনামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। একইভাবে অন্য দেশগুলোও এ সুবিধা নিতে পারে। তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে যে পণ্য উৎপাদন করবে, তা এখান থেকে বিনা শুল্কে ভারতে রপ্তানি করতে পারবে। এতে দুদিক থেকেই বাংলাদেশের লাভ হবে। এদিকে বাংলাদেশের বিএসটিআই ও ভারতের বিআইএসের মধ্যে মিউচুয়াল রিকগনিশন অ্যাগ্রিমেন্ট হওয়ার কথা। সেটা হলে বাংলাদেশি পণ্যের ভারতে প্রবেশের সুযোগ অবারিত হবে।
অর্থাৎ সবদিক থেকেই বাংলাদেশ উপ-আঞ্চলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে পণ্য ও সেবা খাতের রপ্তানি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে পারে। যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ও সহজীকরণ এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান: অর্থনীতিবিদ, নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

মোদির প্রিয় পাঁচ খাবার

রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই আলোচনা-সমালোচনার মধ্যমণি হিসেবে তার সুখ্যাতি-কুখ্যাতির জুড়ি নেই। তার ওপর এখন আবার প্রধানমন্ত্রী। সে সুবাদে এতদিনে ঘরের বাইরে দাঁড়ানো নজরদাররা এবার অন্দরমহল ডিঙিয়ে ভেতর বাড়ির রান্নাঘর পর্যন্ত সিঁধ কাটবেন- এ আর এমন কি! ঐতিহাসিক বিজয়ের পর থেকেই সবার মুখে মুখে রয়েছেন মোদি। আলোচনা থেকে বাদ পড়েনি ব্যক্তিগত জীবন, পছন্দ-অপছন্দ ও খাদ্যাভ্যাস।
পাঠকের আগ্রহ কৌতুহলকে প্রাধান্য দিয়ে মোদির পাঁচটি পছন্দের খাবারের তালিকা নিচে দেয়া হল : মোদির পছন্দের খাবারের মধ্যে অন্যতম খিচুড়ি। গুজরাটের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘ধোকলা’ খেতেও দারুণ পছন্দ করেন তিনি। সরিষা দিয়েছে তৈরি ‘খান্দভি’ নামের আরেক ধনের খাবারের প্রতিও মোদির দুর্বলতা আছে। এছাড়া তার পছন্দ আমের চাটনি এবং কাঠবাদাম ও পেস্তার মিশ্রণে তৈরি মিষ্টিজাতীয় খাবার।

শিখ ছদ্মবেশে ফেরারি জীবন

গ্রেফতার এড়াতে একসময় ‘শিখ ছদ্মবেশে’ ফেরারি জীবন-যাপন করতেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পুলিশের নাকের ডগায় ঘুরে বেড়াতেন অথচ পুলিশ চিনতে পারত না। ভারতে তখন চলছে ইন্দিরা গান্ধীর রাজত্ব। বিরোধী দল বিজেপি উত্থান ঠেকাতে, বিশেষ করে বিজেপির অঙ্গসংগঠন আরএসএস দমনে ভারতে জরুরি অধ্যাদেশ জারি করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। শুরু হয় বিজেপি বিরোধী অভিযান। গণহারে চলে আরএসএসদের ধরপাকড়। ‘জরুরি অবস্থার’ প্রতিবাদে আন্দোলনে সোচ্চার হয়ে ওঠেন বিজেপির সব বাঘা বাঘা নেতারা।
কেউই ধোপে টেকেনি। জর্জ ফার্নান্দেজ, অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদভানির মতো নেতাদের জায়গা হয় সেন্ট্রাল জেলে। সে সময় নেতৃত্বশূন্য দলের ভার পড়ে নরেন্দ্র মোদির ওপর। চরম সংকটপূর্ণ সে মুহূর্তে প্রশাসনের হাত থেকে বাঁচতে ছদ্মবেশ নেন মোদি। শিখ ছদ্মবেশে দলের কাজ কর্ম পরিচালনা করতেন। ইন্দিরা সরকারের আমলে সেই জরুরি অবস্থা রদ আন্দোলন এবং দল বাঁচানোর সে ত্যাগ-তিতিক্ষায় আজ তাকে দেশের প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে বলেই মনে করেন বিজেপির অনেকেই।

১৬ কোটি মানুষের মনের ভাষা পড়বেন কি মোদি? by সোহরাব হাসান

নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি, নিম্নবর্গ থেকে উঠে আসা মানুষটি ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কতটা পরিবর্তন এনেছেন, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু বৈদেশিক নীতিতে যে বাঁক বদল করেছেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রতিবেশী সাত দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের (শেখ হাসিনা জাপান সফরে ছিলেন বলে বাংলাদেশ থেকে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রতিনিধিত্ব করেন) হাজির করার ঘটনাকে কেবল ব্যক্তি মহিমা প্রচারের সোপান ভাবা ঠিক হবে না। ৬৫ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্যারিশমা প্রতিদ্বন্দ্বী মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। গুজরাটের দাঙ্গার কারণে একদা তারা মোদিকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানালেও বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁকে সাদরে বরণ করে নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে পয়লা সফরেই মাত করে দিয়েছিলেন মোদি। রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া—মোদি যেখানেই গিয়েছেন, নিজের উজ্জ্বল ভাবমূর্তিই তুলে ধরেছেন। সেই তুলনায় চীনে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের অর্জন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিশাল অঙ্কের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি সত্ত্বেও সীমান্ত বিরোধ ও পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে চীনের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে রেষারেষি রয়েই গেছে।
নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশকে ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী’ হিসেবে অভিহিত করলেও দেশটি তাঁর সফর তালিকায় এল ১৯ নম্বরে। বাংলাদেশ সফরের আগেই তিনি নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ঘুরে এসেছেন। বাংলাদেশ কি তাঁর সফর তালিকার শীর্ষে থাকতে পারত না? হ্যাঁ, পারত, যদি না ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্থলসীমান্ত চুক্তি ও তিস্তার পানি বণ্টনে বাদ সাধতেন; যদি না মোদির নিজের দল বিজেপিও সীমান্ত চুক্তিটিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। মোদির বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ যতই বলুন না কেন, তাঁরা ‘দাদাগিরি’ ছেড়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে জ্যেষ্ঠ ভাই হিসেবে সম্পর্ক গড়ে তুলতে চান, ভেতরে ভেতরে দাদাগিরিটা পুরো ছাড়তে পারেননি দেশটির কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেরা।
ঢাকা সফরের আগমুহূর্তে নরেন্দ্র মোদি টুইটারে জানিয়ে দিয়েছেন: ‘আমি অত্যন্ত উৎসাহ ও আনন্দের সঙ্গে বলতে চাই, আমি এমন এক দেশ সফরে যাচ্ছি, যার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক অত্যন্ত জোরদার।’ তাঁর সফর দুই দেশের জনগণের কল্যাণের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ায় সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। অামরাও চাই, অতীতের সব সংশয়-সন্দেহ পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক সুদৃঢ় হোক, প্রসারিত হোক বন্ধুত্বের হাত। কিন্তু দুই দেশেই অতি উগ্র রাজনীতি সেই পথ আগলে থাকে। ৪৪ বছর ধরে আমরা এক পা এগোই, দুই পা পিছিয়ে যাই।
মোদি বাংলাদেশ ও ভারতের স্থলসীমান্ত চুক্তিকে বার্লিন ওয়ালের পতনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি নিশ্চয়ই জানেন, বার্লিন দেয়াল দিয়ে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের জনগণের যাতায়াত বন্ধ করার চেষ্টা করেছিল তৎকালীন পূর্ব জার্মানি। সেই দেয়াল পেরিয়ে যাঁরাই সীমান্ত পার হতেন, তাঁদেরই গুলি খেয়ে মরতে হতো। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তেও একই ঘটনা ঘটছে। বার্লিনে দেয়াল ছিল, এখানে আছে কাঁটাতারের বেড়া।
ভারতের নিরাপত্তাঝুঁকি কমাতে যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে ভারতীয় জনগণের প্রশংসা কুড়িয়ে থাকেন; স্থলসীমান্ত চুক্তি ভারতীয় পার্লামেন্টে অনুমোদন করিয়ে নরেন্দ্র মোদিও বাংলাদেশের মানুষের সমীহ পাওয়ার দাবিদার। নিজ দলের বিরোধিতাকেও আমলে নেননি তিনি। ট্র্যাজেডি হলো, কংগ্রেস নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই চুক্তি সই করলেও তিনি বা তাঁর উত্তরসূরি কোনো কংগ্রেস সরকার এটি পার্লামেন্টে অনুমোদন করাতে পারেনি। করলেন কংগ্রেসের কট্টর বিরোধী বলে পরিচিত মোদির সরকার। তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহ ও সদিচ্ছার কারণেই ৬৭ বছরের পুরোনো ছিটমহল ও সীমান্ত সমস্যার সমাধান হতে যাচ্ছে। কেউ আর ‘রাষ্ট্রবিহীন নাগরিক’ থাকবেন না।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতি যে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনাগুলোকে খাটো করে দেখেছিল, মোদির এই সফর সেই ভ্রান্তি সংশোধন করবে
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়; ঔপনিবেশিক শক্তি বাংলাকে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত করলেও আত্মিক ও সাংস্কৃতিকভাবে ভাগ করতে পারেনি; ওপারে গঙ্গা, এপারে পদ্মার তীরের মানুষগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি, রুচি, খাদ্যাভ্যাস প্রায় অভিন্ন। পয়লা বৈশাখে, ঈদ কিংবা দুর্গোৎসবে দুই দেশের মানুষ কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে স্বজনদের কাছে ছুটে যায়; যদি সশস্ত্র সান্ত্রিরা বাধা দেয়; কাঁটাতারের ভেতর থেকে পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানায়। এই আবেগ ও ভালোবাসা রাষ্ট্রীয় কোনো আচার দিয়ে রুদ্ধ করা যায় না। মোদির ঢাকা সফর অতীতের সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন পেছনে ফেলে সময়ের দাবি মেটাতে সক্ষম হবে বলে বাংলাদেশের প্রত্যাশা।
আমরা যদি আরেকটু পেছনে ফিরে তাকাই দেখব, ১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশ ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশে বিভক্ত হলেও দুই দেশের মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, ভাবের ও মনের আদান-প্রদান যথারীতি চলছিল ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। ’৬৫-তে ১৭ দিনের যুদ্ধ কেবল দুটি দেশকে দূরে সরিয়ে দেয়নি; দেশের ভেতরের মানুষগুলোকেও পরস্পরের শত্রুতে পরিণত করেছে। জারি হয়েছিল শত্রু সম্পত্তি আইন, যা ভিন্ন নামে এখনো রয়েছে। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হওয়ার ৪৪ বছর পরও অনেকে সেই মনস্তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি—না ভারতে, না বাংলাদেশে। তাই রাজনীতি চিহ্নিত হয় ভারতপন্থী কিংবা পাকিস্তানপন্থী হিসেবে। এমনকি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইসলামি মৌলবাদীদের মদদদাতা আখ্যায়িত করে তাঁকে যেন মোদির সফরসঙ্গী করা না হয়, সেই ফতোয়া দেন কেউ কেউ। সাম্প্রদায়িকতা দুই তরফেই আছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলের খবর অনুযায়ী এবার মোদির সফরে নিরাপত্তা ও কানেকটিভিটি বা সংযোগ গুরুত্ব পাবে। যেকোনো রাষ্ট্রের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। দুই প্রতিবেশী দেশ নিরাপত্তা বিধানে একযোগে কাজ করবে, নিরাপত্তার বাধাগুলো সরিয়ে দিতে একে অপরকে সহায়তা করবে, এটাই প্রত্যাশিত। তারা কেউ কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না। মোদি দুই দেশের জনগণের কল্যাণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে উচ্চমাত্রায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন সত্য; কিন্তু সহযোগিতার বর্তমান চিত্রটি মোটেই উজ্জ্বল নয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে সুখের সময়ে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি রেকর্ড পরিমাণ। বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি যেখানে ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে ২০১৪–১৪ অর্থবছরে বেড়েছে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ভারতীয় সাংবাদিক অগ্নি রায়ের ভাষায়, এই অবস্থায় বাংলাদেশের চাহিদার তালিকা স্থলসীমান্ত চুক্তির মধ্যে আটকে থাকবে না। তিস্তার জল থেকে বাণিজ্যবৈষম্য, রপ্তানি থেকে বিদ্যুৎ আমদানির চাহিদাটিও মাথায় রাখতে হবে। বাংলাদেশে ভারতের সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ যুক্তরাজ্য ও জাপান তো বটেই, এমনকি পাকিস্তানের চেয়ে কম হওয়াটাকে কীভাবে মেনে নেওয়া যায়?
টাইমস অব ইন্ডিয়ায় সৈয়দ মুনির খসরু প্রশ্ন তুলেছেন, ভারতের নিরাপত্তাঝুঁকি কমাতে যেখানে বাংলাদেশ সম্ভাব্য সবকিছু করেছে, সেখানে সীমান্তে হত্যা বন্ধে তাদের দাবির যৌক্তিকতা অস্বীকার করা যায় না।
ভারতের প্রখ্যাত গবেষক সি রাজা মোহন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ লিখেছেন, ভারতের পররাষ্ট্রনীতি যে দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের সম্ভাবনাগুলোকে খাটো করে দেখেছিল, মোদির এই সফর সেই ভ্রান্তি সংশোধন করবে। আশা করি, সাউথ ব্লকের কর্তাব্যক্তিরা তাঁর বার্তাটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবেন না।
আমরা মনে করি, মোদির প্রস্তাবিত কানেকটিভিটি কেবল বাসযাত্রায় সীমিত থাকবে না, এই অঞ্চলের যেকোনো দেশের নাগরিকদের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে যেকোনো পথে অন্য দেশে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের আগে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে ট্রেন যোগাযোগ চালু ছিল, সেটিকে আমরা কেন ফের পুনরুজ্জীবিত করব না? ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দিল্লিতে প্রাতরাশ করে লাহোরে মধ্যাহ্নভোজের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
আমরাও চাই, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মানচিত্র অক্ষুণ্ন থাকবে, স্বার্থ নিয়ে দর–কষাকষিও চলবে। কিন্তু সেটি শত্রুতায় রূপ নেবে না। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করবে না। বাংলাদেশ বা ভারত থেকে কেউ পাকিস্তানে গেলে কাছাকাছি থানায় নিজের অবস্থান জানাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিক ভারতে কিংবা ভারতের নাগরিক বাংলাদেশে এলেও একই ব্যবস্থা কেন চালু থাকবে? হোক সেটি ভ্রমণ বা চিকিৎসার জন্য যাওয়া। মনে সন্দেহ রেখে বন্ধুত্ব হয় না।
মোদির সফরটি সংক্ষিপ্ত হলেও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি এমন এক সময়ে বাংলাদেশে এসেছেন, যখন সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে, যখন কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং ঢাকা-গুয়াহাটি-শিলং বাস সার্ভিস চালু হওয়ার পথে, তখন বাংলাদেশ তিস্তার বিষয়েও সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার পেতে চাইবে। তাঁর সফরকালে যোগােযাগ, নিরাপত্তা, জ্বালানিসহ দ্বিপক্ষীয় বহু বিষয়ে আলোচনা ও চুক্তি সই হবে। দুই প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। কূটনীতিকেরা সহযোগিতার নানা দিক তুলে ধরবেন। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার মোড়ক থেকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে হৃদয়ের গভীরে কী করে স্থান দেওয়া যায়, সেই বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি।
ঢাকায় অবস্থানকালে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের রাজনীতিক, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা, নাগরিক ও তরুণ সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করবেন, কথা বলবেন, তাঁদের কথা শুনবেন। এমনকি সেলফিও তুলতে পারেন। তাঁর আগমন উপলক্ষে রাজধানী শহরকে নানা রঙের ব্যানারে-ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে। এসবের মাধ্যমে তাঁর প্রতি সরকার ও জনগণের আন্তরিকতাই
প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মনের ভাষা পড়তে পারবেন কি? তাদের চাওয়া সামান্যই—সমমর্যাদার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব। তাঁরা চায় ভিসা পাওয়ার পথটি যেন সহজ হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com