Wednesday, February 17, 2010

ভাষাশহীদ বরকতের কথা -একুশে by দীপংকর চন্দ

জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে সদর অভিমুখী পথে খানিকক্ষণ হেঁটেই নলজানি পৌঁছলাম। হাতের বাঁ দিকে একতলা মার্কেটের সামনে চারপাশ ঘেরা একটি কবর। একটি সাইনবোর্ড সেই কবরের কাছেই। পরিচিতি-জ্ঞাপক কালো সাইনবোর্ডটির ওপর সাদা হরফে লেখা হাজি হাসিনা বিবির নাম। হ্যাঁ, হাজি হাসিনা বিবি ভাষাশহীদ আবুল বরকতের গর্ভধারিণী। ১৯৫২ সালে ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী আবুল বরকতের মা হাসিনা বিবি মারা যান ১৯৮২ সালের ২১ এপ্রিল। ‘তবে তাঁদের উত্তরসূরিরা এখনো বসবাস করেন বরকত মঞ্জিল নামের ওই বাড়িটিতে।’ আঙুল তুলে নির্মাণাধীন একটি বহুতল বাড়ি দেখাতে দেখাতে জানালেন জয়দেবপুরের স্থানীয় বাসিন্দা মাজেদুল ইসলাম।
বরকত মঞ্জিলে বর্তমানে বসবাস করেন ভাষাশহীদ আবুল বরকতের ছোট ভাই মরহুম আবুল হাসনাতের সন্তান-সন্ততিরা। মনোরম এক ছায়াঘেরা বিকেলে কথা হলো মরহুম আবুল হাসনাতের বড় ছেলে সঙ্গে। না, অকৃতদার বড় চাচার প্রত্যক্ষ কোনো স্মৃতি নেই তাঁর কাছে। তাঁর জন্ম বড় চাচা শহীদ হওয়ার আট বছর পর, অর্থাৎ ১৯৬০ সালে। তবে জন্মের পর থেকেই দাদিসহ সংসারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে মুখে চাচা আবুল বরকতের স্মৃতিবিজড়িত নানা কথা শুনেছেন তিনি। দেখেছেন বাড়িতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বেশ কিছু স্মৃতিস্মারকও। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বড় চাচা আবুল বরকত সম্পর্কে এক ধরনের পরোক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন আলাউদ্দিন বরকত। আমরা তাঁর অভিজ্ঞতার অংশ হওয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। আমাদের আন্তরিক অভিপ্রায় আলাউদ্দিন বরকতকে উদ্বুদ্ধ করে ভাষাশহীদ আবুল বরকতের জীবনচরিত বর্ণনায়।
‘ভাষাশহীদ আবুল বরকতের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৬ জুন। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম মৌলভি শামসুজ্জোহা ওরফে ভুলু মিয়া। তিন বোন, দুই ভাইয়ের মধ্যে আবুল বরকতের স্থান চতুর্থ।’
‘আবুল বরকতের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয় বাবলা বহড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি ভর্তি হন তালিবপুর উচ্চবিদ্যালয়ে। বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের এই বিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৫ সালে মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি অতিক্রম করেন তিনি। শিক্ষা গ্রহণের পরবর্তী ধাপে পা রাখতে বহরমপুর চলে যান আবুল বরকত। ভর্তি হন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে। এই কলেজ থেকেই ১৯৪৭ সালে আইএ পাস করেন তিনি। সে বছরের আগস্ট মাসেই ভাগ হয় দেশ। আকস্মিক দেশভাগ কিছুটা হলেও দ্বিধায় ফেলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে উন্মুখ আবুল বরকতকে। উচ্চশিক্ষার্থে কোথায় যাবেন তিনি? কলকাতায়, না ঢাকায়? সব দ্বিধার অবসান ঘটিয়ে ১৯৪৮ সালে ঢাকায় এলেন আবুল বরকত। ঢাকায় পুরানা পল্টন লেনের বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে তখন বসবাস করতেন তাঁর মামা আবদুল মালেক। তিনি চাকরি করতেন ওয়াপদায়, বেশ উঁচু পদে। ঢাকায় এসে মামা আবদুল মালেকের বাসায় উঠলেন আবুল বরকত। কয়েক দিনের মধ্যেই ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। লেখাপড়া শুরু হলো। অতিক্রান্ত হলো বেশ কিছু বছর। সম্মান চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান অর্জন করলেন আমার বড় চাচা।’ দীর্ঘ বক্তব্যের এ পর্যায়ে খানিকটা বিরতি নিলেন আলাউদ্দিন বরকত। চোখ বুজে স্মৃতির পাতা ওল্টালেন মনে মনে। এরপর কথা শুরু করলেন আবার। ‘১৯৫২ সালে আমার চাচা আবুল বরকত ছিলেন এমএ শেষ বর্ষের ছাত্র। তখন তিনি লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে অল্পবিস্তর রাজনীতি করছেন। ভাষা আন্দোলনের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের সঙ্গেই তিনি নিশ্চিত করছেন তাঁর সংযুক্তি।’
‘একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ১৪৪ ধারা জারি ছিল ঢাকায়। বেলা ১১টার দিকে মধুর ক্যান্টিনের সামনে অনুষ্ঠিত সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সদলবলে পথে নেমে এল ছাত্ররা। ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে শুরু হলো স্লোগান। শুরু হলো ছাত্র-জনতার সম্মিলিত মিছিল। শাসকগোষ্ঠীর কঠোর নির্দেশে পুলিশ পিছু হটল না মোটেই। কিছু ছাত্রকে গ্রেপ্তার তো করলই তারা, এগিয়ে এসে লাঠিচার্জ করল, নিক্ষেপ করল কাঁদানে গ্যাস। ছাত্র-জনতা ছত্রভঙ্গ হলো। কিন্তু তা অল্প সময়ের জন্য। আবার তারা সংগঠিত হলো দ্রুত মেডিকেল কলেজ হোস্টেল ব্যারাকের সামনে। দুপুরের পরপরই তীব্র হলো আন্দোলন। তীব্র হলো পুলিশের সহিংস মনোভাবও। বেলা তিনটার দিকে ছাত্র-জনতার সমাবেশ লক্ষ্য করে গুলি চালাল পুলিশ। সেই গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হলেন রফিক উদ্দিন আহমদ। গুলি লাগল গফরগাঁওয়ের আবদুল জব্বার, দাগনভূঞার আবদুস সালাম এবং আমার বড় চাচা আবুল বরকতের শরীরেও।’
তারপর? ঘটনা বর্ণনার এ পর্যায়ে কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারি না আমরা। জানতে চাই বহুবর্ণিত ঘটনাই রুদ্ধশ্বাসে আবার। আলাউদ্দিন বরকত একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে ধীরে ধীরে বলেন, ‘তারপর আর কী! জব্বার, সালাম আর বরকতকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত আটটার দিকে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন আমার বড় চাচা।’

মৌসুমি কথকতা -গদ্যকার্টুন by আনিসুল হক

ফেব্রুয়ারি মাস। বইমেলার মাস। ভাষার মাস। ফাল্গুনের ফাগ ছড়িয়ে দেওয়ারও মাস। আবার আজকাল ভ্যালেন্টাইনের দিন বলে একটা দিন আসে এই ফেব্রুয়ারিতে। এই সব কটা মিলিয়ে একটা গদ্য কার্টুন রচনা করা যায় কী করে?
আচ্ছা! একটা চিরপ্রেমিক কবির জীবনের দুটো ঘটনা বলে শুরু করি। রবার্ট ব্রাউনিং। তিনি আরেকজন কবির কবিতা দেখে তাঁর প্রেমে পড়ে যান। এলিজাবেথ বারেট সেই কবির নাম। তাঁরা বিয়ে করেন আর ইংল্যান্ড থেকে পালিয়ে চলে যান ইতালিতে। প্রেমে পড়লে পুরুষেরা বোকা হয়, অনেকে আবার ভাগ্য বা নিয়তিবিশ্বাসীও হয়ে ওঠে। অনেককেই দেখেছি, রাশিচক্রের বই কিনে নিজের প্রেম-বিয়ে-সংক্রান্ত পাতাটা আগ্রহ নিয়ে পড়ে থাকে। তো একবার ব্রাউনিং করলেন কী, তাঁর প্রেমের পরিণতি কী দাঁড়াবে, তা বোঝার জন্য নিজের ভাগ্যটাকে পরখ করে নিতে চাইলেন। তিনি ঠিক করলেন, চোখ বন্ধ করে একটা বই তুলে নেবেন, যেকোনো একটা লাইন পড়বেন, যে লাইনটা পড়বেন, সেটাই হবে তাঁর প্রেমবিষয়ক ভবিষ্যদ্বাণী।
তিনি একটা বই হাতে নিলেন। দুঃখের বিষয়, এটা একটা ইতালীয় ব্যাকরণ বই। অসুবিধা নেই! তিনি পাতা খুললেন। দৃষ্টি স্থির করলেন একটা বাক্যের ওপর। অনুবাদ করো। একটা অনুচ্ছেদ। অনুচ্ছেদটা শুরু হয়েছে, ‘আমরা যদি পরজগতেও এই জগতের মতোই ভালোবেসে যাই, আমি তোমাকে ভালোবেসে যাব অনন্তকাল।’
এটাকেই বোধ হয় বলা যায়, ভাগ্য!
রবার্ট ব্রাউনিংয়ের বই বেরোলো ১৮৪০ সালে। বইটিতে কিছু কিছু জায়গা ছিল খুবই দুর্বোধ্য। পাঠকেরা কবির কাছে জানতে চাইল, এর মানে কী! লন্ডন পোয়েট্রি সোসাইটি একটা সভার আয়োজন করল। কবিকে সেখানে ডাকা হলো। তারা কবির হাতে বইটা তুলে দিয়ে বলল, এই পাতাগুলোর অর্থ বলে দিন। কবি দাঁড়ালেন। অনুচ্ছেদগুলো একবার পড়লেন, দুবার পড়লেন। তারপর বললেন, ‘যখন আমি এসব লিখি, তখন আমি আর ঈশ্বর এসবের অর্থ জানতাম, কিন্তু এখন ঈশ্বর একাই কেবল এর অর্থ জানেন। আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না, দয়া করে।’
বেশি কঠিন কথা বলে ফেললাম? একটু সহজ কথা বলব। আচ্ছা, তাহলে চার্লি চাপলিন।
নাট্যকার চার্লস ম্যাক আর্থার একবার চার্লি চাপলিনকে বললেন, হাসির ছবির স্ক্রিপ্ট লেখার চেয়ে কঠিন কাজ আর নেই। ধরা যাক, একটা মোটা মহিলা একটা কলার খোসার ওপর পা ফেলে পিছলে পড়ে গেলেন। এটা কীভাবে সিনেমায় দেখানো হবে। আগে মোটা মহিলা, তারপর কলার খোসা। নাকি আগে কলার খোসা, তারপর মোটা মহিলা। তারপর কলার খোসায় পা এবং পপাতধরণিতল! কী দেখালে দর্শকেরা হাসবে।
চার্লি চাপলিন জবাব দিলেন, ‘আমরা প্রথমে দেখাব মহিলা আসছেন, তারপর দেখাব কলার খোসাটা। তারপর দেখাব মহিলা কলার খোসাটা থেকে বাঁচার জন্য একটু বড় পদক্ষেপ নিলেন। তারপর তিনি একটা ম্যানহোলের মধ্যে পড়ে হারিয়ে গেলেন।’ আমরা যারা টিভিতে হাসির নাটক লেখার চেষ্টা করি, তাদের জন্য এখানে একটা খুব বড় উপদেশ লুকিয়ে রয়েছে। আমি আর সেটা ভেঙে বলতে চাই না।
আপনাদের সবারই জানা যে একবার একটা প্রতিযোগিতা হয়েছিল। চার্লি চাপলিন লুক-এলাইক প্রতিযোগিতা। অর্থাৎ চার্লি চাপলিন সাজতে হবে। তাঁর মতো করে চলতে-বলতে হবে। চার্লি চাপলিন এই প্রতিযোগিতায় নিজেই অংশ নিয়েছিলেন। তিনি প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিলেন।
এখান থেকে আইজাক আসিমভের লেখা একটা সায়েন্স ফিকশনে যেতে পারি। এই ছোট্ট গল্পটা আমি একবার গদ্য কার্টুন কলামেই অনুবাদ করে দিয়েছিলাম। টাইম মেশিনে চড়ে একবার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার আজকের দুনিয়ায় ফিরে আসেন। তিনি আমেরিকার একটা বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের ক্লাসে ঢুকে পড়েন। দেখেন যে ক্লাসে শেক্সপিয়ার পড়ানো হচ্ছে। শেক্সপিয়ারও সেই ক্লাসে বসে লেকচার শুনলেন। এরপর পরীক্ষা। শেক্সপিয়ার এই নাটকে কী বোঝাতে চেয়েছেন, লেখো। শেক্সপিয়ার লিখলেন। এবং তিনি পরীক্ষায় ফেল করলেন।
আইজাক আসিমভ তাঁর নিজের জীবনের একটা কাহিনি লিখেছেন এক জায়গায়। এই বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন লেখকের বইয়ের সংখ্যা ৫০০-রও বেশি। তিনি বলছেন, একবার তিনি একটা লেখা নিয়ে গিয়েছিলেন এক সম্পাদকের কাছে। সম্পাদক তাঁর লেখাটা পড়ে তাঁকে একটা কঠিন অপ্রচলিত শব্দ বলেন। শব্দটার মানে হলো পতিতা। আসিমভ লিখছেন, সম্পাদক বলতে চাইছেন, আসিমভের খ্যাতি হয়েছে, তিনি যা লিখবেন, তা-ই বিক্রি হবে, এটা হলো পতিতার লক্ষণ, লেখাটা এতই খারাপ হয়েছে। আসিমভ লিখেছেন, ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। তাঁর এই লেখাটা অন্য সম্পাদক পরে ছেপেছেন, এটা বই হিসেবে বেরিয়েছে এবং প্রশংসিত হয়েছে। সম্পাদকের মুখে শব্দটা শুনে আসিমভ না বোঝার ভান করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী শব্দ ব্যবহার করলেন?
‘পতিতা’—দুর্বোধ্য শব্দটা আবার উচ্চারণ করলেন সম্পাদক।
আসিমভও না বোঝার ভান করে বললেন, আপনাকেও শুভ নববর্ষ। বলে তিনি ফিরে এলেন ওই সম্পাদকের কাছ থেকে।
সম্পাদক আর লেখকের প্রসঙ্গে আমরা আসতে পারি টি এস এলিয়টের কথায় (১৮৮৮—১৯৬৫)। একবার একজন প্রকাশক এলিয়টকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মনে করেন, লেখক হিসেবে যাঁরা ব্যর্থ হন, তাঁরাই সম্পাদক হন। এলিয়ট উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি মনে করি, সম্পাদকদের মধ্যে কেউ কেউ আছেন, যাঁরা ব্যর্থ লেখক। আর লেখকদের মধ্যে প্রায় সবাই ব্যর্থ লেখক।’
আমেরিকান রাজনীতিক ও বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিনকে (১৭০৬—৯০) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সবচেয়ে বড় করুণার পাত্র কে?
তিনি বলেছিলেন, একটা লোক, বৃষ্টির কারণে একাকী একটা ঘরে বসে আছে, অথচ লোকটা বই পড়তে জানে না।
এবার আমরা গদ্য কার্টুন শেষ করতে পারি। আমরা উপসংসহারে আসব, সেই মানুষই সবচেয়ে করুণার পাত্র, যে বই কেনে না, বই পড়ে না এবং সর্বশেষ কবে একটা বই পড়েছে, মনেও করতে পারে না।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

অযোগ্য ‘আওয়ামীদের’ নিয়োগ নয় by মিজানুর রহমান খা

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বাহাত্তরের সংবিধান সম্পর্কে কতিপয় ক্ষেত্রে ভিন্নমত দিয়েছিলেন। এই ভিন্নমত-সংবলিত চূড়ান্ত খসড়া ১২ অক্টোবর ১৯৭২ গেজেটে ছাপা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টে নতুন বিচারক নিয়োগের চলতি তোড়জোড় সামনে রেখে আমি আজ তাঁর সেই ভিন্নমত থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত লিখেছিলেন, ‘মি. চেয়ারম্যান স্যার, সংবিধানের ৯৫(২) অনুচ্ছেদের ক দফায় বর্ণিত বিচারক নিয়োগের যোগ্যতা সম্পর্কে যে বিধান রাখা হয়েছে, সে সম্পর্কে আমি দৃঢ়তার সঙ্গে আপত্তি জানাচ্ছি।’ ওই অনুচ্ছেদ বলেছে, বিচারক হতে হলে দুটো শর্তের একটি পূরণ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে, না হয় কোনো বিচার বিভাগীয় পদে অন্যূন ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। শ্রী সেনগুপ্তের যুক্তি ছিল, ‘কেউ ১০ বছর বা তার বেশি সময় ওকালতি করলেই তিনি বিচারক হতে পারেন না। কারণ সে ধরনের নিয়োগে রাজনৈতিক নিয়োগের সম্ভাবনা থাকবে। আর এর ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মৌলিকত্ব নিশ্চিতভাবেই লুপ্ত হবে।’ আমরা আজ বেদনার সঙ্গে লক্ষ করি যে শ্রী সেনগুপ্তর আশঙ্কা কী নিষ্ঠুরভাবে সত্যে পরিণত হয়েছে। বড় অবাক হয়ে ভাবি, তিনি কী করে এ রকম একটি বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যা অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হলো?
শ্রী সেনগুপ্ত কষ্ট চেপে স্বস্তি অনুভব করতে পারেন এটা লক্ষ করে যে, সেই সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান কামাল হোসেন ইতিমধ্যেই আক্ষেপ করেছেন যে সুপ্রিম কোর্টে একটি সুনামি আসা উচিত। আরেক বরেণ্য আইনবিদ মাহমুদুল ইসলাম ২০০৬ সালে লিখলেন, ‘কেবল অল্পসংখ্যক বিচারকই দক্ষ। এবং তাঁদের মধ্যে অতি কমসংখ্যক বিচারকই তাঁদের দক্ষতার জন্য গর্ব করতে পারেন। বিচারকদের নৈতিকতা ও সততা প্রশ্নবিদ্ধ।’ এই প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে আমরা জরুরি অবস্থায় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কমিশন পেলাম। এরপর আমরা সেই কমিশনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিলাম। অতঃপর হাইকোর্টের রায় এল। বিএনপি আমলে আওয়ামী হিসেবে বাদ পড়া ১০ বিচারকের পুনর্বহাল আমরা দেখলাম। হাইকোর্টের বৃহত্তর বেঞ্চকে বিচারক নিয়োগে গ্রহণযোগ্য নীতিমালা দিতে দেখলাম। আপিল বিভাগ তা অনেকটাই বিসর্জন দিলেন। তাঁরা যেন কার্যত প্রধান বিচারপতির সঙ্গে নিছক পরামর্শের বিধানটা টেকালেন। আপিল বিভাগের পরিমার্জিত নীতিমালার ৯ নম্বর দফাটি নির্দিষ্টভাবে বলেছে, ‘প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ কিংবা সংবিধানে বর্ণিত যোগ্যতার শর্ত পূরণের ঘাটতির প্রশ্ন ছাড়া অন্য কোনো কারণেই বিচারক নিয়োগের বৈধতা বিচার্য নয়।’ এমনকি ‘পক্ষপাত ও অসদুদ্দেশ্যে’ নিয়োগের যুক্তিতেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। হাইকোর্টের রায়ের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশটাও বাদ পড়ল। সেটি ছিল, নতুন বিচারক নিয়োগে প্রথম বাছাই তালিকাটা জন্ম নেবে মাতৃজঠরেই অর্থাৎ সুপ্রিমকোর্টেই।
ডেইলি স্টার-এ খবর এসেছে, ১৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে এ সপ্তাহেই। অথচ কীভাবে আগেই তালিকা তৈরি হলো, তার স্পন্দন টের পেলাম না। বিএনপির মাথাব্যথা না থাকাই স্বাভাবিক। কারণ তারা চাইবেই আওয়ামী লীগ যেন তাদের টেক্কা দিতে পারে!
প্রধান বিচারপতি সম্পদের বিবরণী প্রকাশে অভিপ্রেত মত দিয়েছেন। প্রথম আলোতে এ ব্যাপারে সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে সাধুবাদ জানানো হয়েছে। সম্পাদকীয়তে আশা প্রকাশ করে বলা হয়েছে ‘আমরা প্রধান বিচারপতির দিকে তাকিয়ে’। আইনবিদ শাহদীন মালিক এর প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোতে লিখলেন, যতক্ষণ খুশি তাকিয়ে থাকুন। খোঁচাটা হজম করতে না হলে আমরা সবাই খুব খুশি হব।
কিছুদিন আগে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এক সভায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। বিচারপতি চৌধুরীকে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ অপসারণ করেছিলেন। তাতে পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। পারভেজীয় সামরিক জমানার অবসানে বিচারপতি চৌধুরীর অবদান বিরাট। তিনি প্রধান বিচারপতি পদে পুনর্বহাল হন। বিশ্বের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন ঘটনা। ডন পত্রিকার এক প্রতিবেদনে গত রোববার পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি-রাষ্ট্রপতির মধ্যকার টানোপোড়েনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাসিত জীবনে বেনজির ও নওয়াজ শরিফ গণতন্ত্রের সনদ তৈরি করেছিলেন। তাতে তাঁরা বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গণশুনানি করে বিচারক নিয়োগের বিধানের কথা বলেছিলেন। এখন তা পিপিপি ও মুসলিম লীগ ভুলে গেছে। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ না করেই দুটি নিয়োগ দেন আসিফ জারদারি। লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি খাজা মোহাম্মদ শরিফকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক এবং বিচারপতি সাকিব নেসারকে লাহোর হাইকোর্টের ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি করা হয়। গত শনিবার তাঁদের নিয়োগ হয়। তাঁরা শপথ নিতে যাচ্ছিলেন। প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের একটি বেঞ্চ স্বতঃপ্রণোদিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন। তাঁরা ‘অসাংবিধানিক’ বলে দুটি নিয়োগ স্থগিত রেখেছেন। জারদারি যে কাণ্ড করলেন, তা রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৯৯৪ সালে করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ ‘মি. নোবডি’ বলাতে ঝড় উঠেছিল। নিয়োগ বাতিল করে নতুন করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার উদারতায় অল্পের ওপর দিয়ে ধকল যায়। এবার পাকিস্তানের ঘটনা দেখার মতো। বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরী শুধু ‘নো বডি’ বলার লোক নন। তিনি বিচারপতিদের নিয়োগ স্থগিত করে দুনিয়ার সব সাহসী প্রধান বিচারপতির জন্য অনুকরণীয় নজির তৈরি করলেন। পাকিস্তানের অন্তত ৬৬টি বার অ্যাসোসিয়েশন সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতির ওই নিয়োগকে অবৈধ বলে সিদ্ধান্ত প্রস্তাব পাস করেছে।
আমরা আমাদের আপিল বিভাগের কাছ থেকে বিচারক নিয়োগে একটি প্রশ্নবিদ্ধ বিচারক নিয়োগ নীতিমালা পেয়েছি। এই নীতিমালায় সরকারের সঙ্গে ভীষণ রকম আপস করা হয়েছে। সুতরাং নতুন করে এখন ১৫ জন হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের কথা জেনে আমরা উত্কণ্ঠিত। এরপর আরও নেওয়া হবে। শোনা যাচ্ছে, সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট বার একাট্টা হয়েছে, তারা আর ভুলেও বিএনপি আমলের বিতর্কিত বিচারকদের নিয়োগের বিরোধিতা করে নেওয়া রেজুলেশনের কথা মুখে আনবে না। তার চেয়ে বরং চাপে রেখে সংখ্যা দিয়ে তথাকথিত বিএনপিপন্থী বিচারপতিদের সংখ্যালঘু করবে।
আওয়ামী লীগের সমর্থক আইনজীবীরা আমাদের ইতিমধ্যে শিখিয়েছেন যে বিচারক নিয়োগ নিয়ে কী করে সংকীর্ণ রাজনীতি করতে হয়। জোট সরকারের আমলে উনিশজন বিচারক (যোগ্যতাসম্পন্নরাও এখানে আছেন) নিয়োগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বার নিদারুণ লম্ফঝম্ফ করেছিল। আইনের শাসনের জন্য মায়াকান্না করেছিল। তাঁরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষার স্লোগান তুলেছিল। এখনো তারা জোট সরকারের নানা কাণ্ডকীর্তির সমালোচনায় মুখর, কিন্তু ওই একটি বিষয় বাদে। অতি যত্নের সঙ্গে তারা সেই রেজুলেশন প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে উনিশজন বিচারকের নিয়োগ নিয়ে তবু প্রতিবাদের একটা আওয়াজ উঠেছিল। এবার সে ধরনের কোনো বিপর্যয় ঘটলে প্রতিবাদ করারও কেউ থাকবে না। কারণ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির বর্তমান নেতারা একান্তভাবে আওয়ামী লীগের অনুগত। তাঁদের কাছ থেকে অতীতের মতো রেজুলেশন পাস করা তো দূরের কথা, বরং তাঁরা অন্ধের মতো সাধুবাদ জানানোর জন্য প্রস্তুত থাকবেন। সুতরাং একটি সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রেহাই পেতে চাইলে নাগরিক সমাজকে কালবিলম্ব না করে প্রস্তুতি নিতে হবে।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের বক্তব্য আমরা স্মরণ করি। পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনাটা সহায়ক হবে। বাহাত্তরে তিনি ভিন্নমতে লেখেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে যাঁদের রাজনৈতিক যোগাযোগ রয়েছে, যাঁরা সব সময় ব্যক্তিস্বার্থচিন্তাতাড়িত এবং যাঁরা তোষামোদি কলা রপ্ত করেছেন, তাঁরাই বিচারক পদে নিয়োগ পেয়েছেন। সে কারণে আমি মনে করি, অতীতের অভিজ্ঞতা হওয়া উচিত আমাদের সংবিধান প্রণয়নের পাথেয়। বিচার বিভাগের মর্যাদাকে খাটো করে, তাঁর স্বাধীনতাকে বিপন্ন করে এমনভাবে বিচারক নিয়োগের সুযোগ থাকা উচিত নয়।’
হলফ করে বলতে পারি, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শতভাগ অভ্রান্ত। কিন্তু আমরা কেবল আফসোস করব না। এখন সময় এসেছে বিচারক নিয়োগে সংসদে একটি উপযুক্ত আইন তৈরি করা। এই রাষ্ট্রের জন্মলগ্নে আইনজীবীদের মধ্য থেকে বিচারক নিয়োগের ওই দফাটি বিলোপ করতে সেনগুপ্ত সুপারিশ করেছিলেন। বলেছিলেন অধস্তন আদালতে কর্মরত বিচারকদের মধ্য থেকে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে বিচারক নিয়োগ দিতে। কী আশ্চর্য, এম হাফিজ উদ্দীন খান ঠিক এমন একটি সুপারিশ করেছেন সমপ্রতি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে তাঁর ভিন্নমতের জন্য অভিবাদন জানাই। তবে জেলা জজ থেকে শতভাগ বিচারক হয়তো বাস্তব নয়, কিন্তু জেলা জজদের অচ্ছুত্ ভেবে বর্তমানে যেভাবে নিয়োগ চলছে, তা অবশ্যই বদলানো উচিত। দশজন নিলে দুজন জেলা জজ নিয়োগের চলতি রীতি অসাংবিধানিক।
আমরা গোপন বিচারের মতো গোপন বিচারক নিয়োগ চাই না। তবে আপাতত প্রার্থনা এই—আওয়ামী মনোভাবাপন্ন অনেক ভালো আইনজীবী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে দিন। অযোগ্য ‘আওয়ামীদের’ নিয়োগ দেবেন না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সেই মোসাহেবরা আজও সমান সক্রিয়।
পুনশ্চ: গত ২৫ জানুয়ারি ‘প্রধান বিচারপতি নিয়োগে সমীকরণ’ শীর্ষক লেখায় অনবধানতাবশত উল্লেখ করেছিলাম, বিচারপতি মো. ফজলুল করিম প্রধান বিচারপতি হলে বিচারপতি মো. আবদুল মতিনের প্রধান বিচারপতি হওয়ার সম্ভাবনা তিরোহিত হবে। এটি সঠিক নয়। প্রধান বিচারপতি অবসরে যাবেন আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর। এরপর বিচারপতি আবদুল মতিনই হবেন জ্যেষ্ঠতম। তিনি প্রধান বিচারপতি হলে সে পদে থাকবেন ২৫ ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত। অনিচ্ছাকৃত এই ভুলের জন্য আমি দুঃখিত।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।

ভাষা ও নারী: পুরুষের ভাষিক অবরোধ -আমার ভাষা আমার একুশ by সৌরভ সিকদার

মানুষ ভাষার মাধ্যমে শুধু তার মনের ভাব প্রকাশই করে না, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। আবার এই ভাষার দ্বারাই সে তার সৃজনশীল ক্ষমতার প্রকাশ ঘটায়। বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত। দেশে দেশে ভাষার যেমন পার্থক্য দেখা যায়, তেমনি নারী-পুরুষেও ভাষাগত পার্থক্য বিদ্যমান। ভাষা মানুষের অর্থ-সমাজ-বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়। সমাজে আমরা যেভাবে নারীকে মূল্যায়ন করে থাকি, আমাদের ভাষাতেও তার প্রতিচ্ছবি পরিলক্ষিত হয়। নারীর জন্য অবলা, কোমল, নরম, লজ্জাবতী—এসব শব্দ তৈরি করা হয়, অন্যদিকে পুরুষকে পৌরুষত্বের বীরগাথায় বীর বা শক্তিমানের কাতারে রেখে নারীকে রাঁধুনি, গৃহিণী আখ্যা দিয়ে গৃহবন্দী করে রাখি আমরা—আমাদের বাংলা ভাষায়।
আমাদের ভাষার ভাব, শব্দ, ধ্বনি, অর্থ প্রভৃতি গড়ে উঠেছে সমাজ, রাষ্ট্র ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা দ্বারা। আমাদের সমাজের প্রধান নিয়ন্ত্রক হচ্ছে পুরুষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে পুরুষ, আধিপত্য বিস্তার করে পুরুষ, উপভোগ করে পুরুষ, মালিকানা বা স্বত্ব পুরুষের—এ সমাজ পুরুষের ক্ষমতায়নকেই প্রাধান্য দেয়। নারী পায় শুধু অবহেলা-অমর্যাদা; তাই নারীর জন্য সমাজ যেন পৃথক ও দুর্বল ভাষাভঙ্গি তৈরি করে দিয়েছে। আবার আমাদের সমাজে নারীর পারিবারিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নেই বলেই তার ধ্বনিগত বা বাকস্বাধীনতাও নেই।
আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। শিক্ষার অভাব, ধর্মের প্রভাব, রক্ষণশীলতা, দৃষ্টিভঙ্গি প্রভৃতি কারণে নারী পিছিয়ে আছে। ভাষা যেমন ভাবপ্রকাশের মাধ্যম, তেমনি কখনো নির্যাতনের মাধ্যম হয়েও দাঁড়ায়। পুরুষ নারীকে নানাভাবে নির্যাতন করে থাকে, এমনকি শুধু ভাষা দিয়েও নির্যাতন করে থাকে। কবির ভাষায়—‘হাতে যদি না মারিত, শত মারিত ঠোঁটে’।
আজ নারীকে কেবল পেশিশক্তি দিয়েই নয়, ভাষাশক্তি দিয়েও অসম্মানিত এমনকি লাঞ্ছিতও করা হয়। পুরুষ তার পৌরুষত্বের প্রকাশ কেবল শারীরিক নির্যাতন দিয়েই নয়, ভাষাকে আশ্রয় করে মানসিক নির্যাতনও করে থাকে যা ‘ভারবাল এবিউজ’ বা মৌখিক নির্যাতন নামে পরিচিত। ‘ইভটিজিং’ নামে নারীকে ‘উত্ত্যক্ত’ করার এবং বিরক্ত করার পারিভাষিক শব্দ পর্যন্ত তৈরি হয়েছে। আমরা বাংলা ভাষায় পুরুষকে ‘উত্ত্যক্ত’ করতে দেখি, আর নারী ‘উত্ত্যক্ত’ হয়। বাংলা ভাষায় নারী কর্তৃক পুরুষকে বিরক্ত করার কোনো শব্দ নেই কিন্তু পুরুষ যে নারীকে বিরক্ত করে তার জন্য সমাজ তৈরি করেছে অসংখ্য শব্দ, খণ্ডবাক্য।
সম্ভবত বাংলাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা (ভারতীয় আর কয়েকটি ভাষা ছাড়া) যেখানে সীতার সতীত্ব পরীক্ষা থেকে নারীর জন্য জন্ম নিয়েছে সবচেয়ে অসম্মানকর শব্দ, শব্দসমূহ। অর্থাত্ আমাদের সমাজ সৃষ্টি করেছে ভাষায় এমন কিছু শব্দ যা নারীকে বেঁধে দিয়েছে লজ্জা আর অসম্মানের দড়িতে। পুরুষনিয়ন্ত্রিত সমাজে পুরুষ নারীর জন্য শুধু শব্দ তৈরিই করে না, তাকে মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিতও করে।
পুরুষ শুধু নারীকেই নয়, তার ভাষাও নিয়ন্ত্রিত করছে। শুধু কথাই বলে না, দেহভাষা বা অঙ্গভঙ্গি করে (সাইন ল্যাংগুয়েজ প্রয়োগ করে) কিছু একটা প্রকাশ করতে চায়। আমাদের সমাজে যেসব পুরুষ স্ত্রীর কথামতো চলে, তাদের বলে ‘স্ত্রৈণ’। এ শব্দটি প্রয়োগ হয় পুরুষের জন্য নেতিবাচক বা অসম্মানজনক হিসেবে। যেন নারীর কথা পুরুষের শুনতে মানা। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহূত বেশ কিছু শব্দ আলোচনা করলে দেখতে পাব চেয়ারম্যান, সভাপতি, রাষ্ট্রপতি, মেম্বার, লিডার, ক্যাডার—এগুলো সব পুরুষবাচক শব্দ। এর কোনো স্ত্রীবাচক প্রতিশব্দ নেই। জেন্ডার বৈষম্য নিরোধকল্পে একালে আমরা ‘চেয়ারপারসন’, ‘সভাপ্রধান’ প্রয়োগ করে থাকি। এভাবেই একটি সমাজের সম্মিলিত চেষ্টায় তার ভাষার শব্দাবলিও বদলে দেওয়া সম্ভব। সম্ভব নারীকে সম্মানিত করা।
বাংলা ভাষার গবেষক সুকুমার সেন তাঁর ‘বাংলায় নারীর ভাষা’ প্রবন্ধে কিছু শব্দের উল্লেখ করেছেন যা থেকে পুরুষ ও নারীর সামাজিক অবস্থান স্পষ্ট হয়—যেমন: অনাছিষ্টি, লক্ষ্মীছাড়া, আটকুঁড়ো, আড়ি, আদিখ্যেতা, কটুনী, খোঁটা, গাদী, গুমর, গা, ছিরি, ঠমক, ঢঙ, দেমাক, ন্যাকা, পোয়াতি, বিয়েন, বেহায়া, কুট্টি, মিনসে, রাঁড়, রাঁড়ী, সেয়ানা, সোমত্ত, সোহাগ, সই ইত্যাদি। নারীর ক্ষেত্রে বাংলায় বিশেষ্য বাক্যাংশ এবং ক্রিয়া বাক্যাংশ প্রয়োগে কিছু স্বতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। যেমন—
বিশেষ্য বাক্যাংশ—কাঁচা বয়েস, কচি খুকি, কোলের ছেলে, চোখের বালি, দাঁতে বিষ, ননীর পুতুল, নাড়ির টান, পেটের ছেলে, মাথার দিব্যি, রাঙা বৌ, হাঁড়ির খবর, পাতা কুড়নী, ঝগড়াটে, সাতে পাঁচে না থাকা, সাত পাঁচ ভাবা ইত্যাদি।
ক্রিয়া বাক্যাংশ—ঝেঁটিয়ে বিদেয় করা, বানের জলে ভেসে আসা, বিয়ের ফুল ফোটা, মুখে খই ফোটা, হাঁড়িতে স্থান দেয়া, কেঁদে হাট বসানো, সইপাতানো, পাকা চুলে সিঁদুর পরা, হাঁড়ি ঠেলা, পরের মুখে ঝাল খাওয়া, মাথা কোটা ইত্যাদি।
বাংলা ভাষা ও নারী বিষয়ে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন জানান, ‘বাংলা ভাষার শব্দ প্রয়োগে ও সম্বোধনে নারীকে সম্মানিত তো নয়ই বরং হেয় করা হয়েছে। বাংলা ভাষায় অজস্র শব্দ আছে, যা আবহমান কাল থেকে খুব অন্যায়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। অভিধান খুললেই দেখা যাবে সেখানে পুরুষবাচক আর স্ত্রীবাচক শব্দের অর্থ উপস্থাপনার মধ্যে কত পার্থক্য। নারীর প্রতি মানবিক সম্মানবোধের ধারণাটি পর্যন্ত আমরা সমাজে স্থাপন করতে পারিনি। তাই জেন্ডার সমতার ভিত্তিতে বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করার মানসিকতাও আমাদের তৈরি হয়নি। তবে ক্ষীণ ধারায় হলেও চেষ্টা চলছে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের একটা বড় ভূমিকা আছে। তারা যদি বিষয়টিকে সচেতনভাবে আমাদের দেশের মানুষের সামনে নিয়ে আসে তবে পরিবর্তন দ্রুত হওয়া সম্ভব।’
সুকুমার সেন বলেছিলেন—‘নারীর শব্দভান্ডার পুরুষের শব্দভান্ডার থেকে খুবই আলাদা। নারী পুরুষের তুলনায় অনেক কম শব্দ ব্যবহার করে।’ শ্রেণীবিভক্ত সমাজে নারীকে ঘরে পুরুষের সেবায় আবদ্ধ করে রাখলে সেটাই স্বাভাবিক। তার কর্মজগত্ যেমন বৃদ্ধিতে পুরুষের উদ্যোগ-উত্সাহ কম, তেমনি নারীর শব্দের সীমানাও হয়ে পড়ে অনেক ছোট। নারীর যত ক্ষমতায়ন ঘটবে, উত্পাদন ও অর্থ উপার্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে, পুরুষের মতো বাইরের জগেক নিজের ভাবতে পারবে—আমাদের ভাষায় তত দ্রুত নারী-পুরুষের বৈষম্য কমে যাবে।
বাংলা ভাষা এবং একুশের গৌরবময় বাংলাদেশ নামক মানচিত্রে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে, পুরুষ এবং নারী উভয়ই নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিলে সমাজের জন্য, দেশের জন্য যেমন মঙ্গল; তেমনি বাংলা ভাষারও শ্রীবৃদ্ধি।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভালোবাসা -মানুষ অমৃতেরই সন্তান

ভালোবাসার স্পর্শে পাথর-রাজকন্যার দেহে প্রাণ জাগে। ব্যাঙ-রাজকুমার সুদর্শন যুবক হয়ে যায়। প্রেমিক ফরহাদ তার শিরির জন্য পাহাড় কেটে নহর বানায়। আর রিকশাচালক নুরুল আবছার বাকহীন তরুণী হাছিনা বেগমের মুখে ফোটায় ভাষা। সত্যিকার ভালোবাসা জাদুর মতো, তা অসম্ভবকে সম্ভব করে, আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ অমৃতেরই সন্তান।
রোববারের প্রথম আলোয় এই ‘জাদুকরি’ ঘটনা সংবাদ হয়েছে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় এক গণভোজে দেখা হয় দুজনের। হাছিনার নির্বাক চাউনি আর ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটায় কী এক টান বোধ করেন রিকশাচালক আবছার! বোবা মেয়েটির সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে যান সেই সব কথা, প্রেমিকাকে দেখে যা প্রেমিকের মনে আসে। সেই আকর্ষণ থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে, বিয়ে থেকে কোল আলো করে আসা শিশু পর্যন্ত ঘটতে থাকে প্রেমের এক আধুনিক রূপকথা। বিয়ের পর স্ত্রীর কাপড়চোপড় পরিষ্কার থেকে শুরু করে তাঁর খাওয়াদাওয়া—সব করেছেন আবছার। ভালোবাসা আর যত্নে হাছিনা এখন কথা বলা শিখছেন, শিখছেন সাবলীলভাবে হাঁটতে। এখন রিকশা চালিয়ে সন্ধ্যাবেলায় ফিরে অষ্টম শ্রেণী পাস আবছার তাঁর নিরক্ষর স্ত্রীকে অ আ ক খ শেখান।
মানুষের ক্ষমতা আসলে ভালোবাসারই ক্ষমতা। যেদিন এই ক্ষমতা থাকবে না, সেদিন মানুষ আর মানুষ থাকবে না। বিজ্ঞান বলে, প্রেম আর কিছু নয়, মস্তিষ্কের এক ধরনের রাসায়নিক ক্রিয়া। কবি বলেন, মনের লীলাই প্রেম। কিন্তু আবছারের ভালোবাসায় হাছিনার মস্তিষ্কে কী রাসায়নিক ক্রিয়া ঘটেছে, কিংবা কোন লীলায় জেগেছে তাঁর মন, তা আমরা জানি না। কিন্তু ভালোবাসা যে বাস্তব পরিবর্তন ঘটাতে পারে, এর প্রমাণ তো হাছিনার কথা বলায়, হাঁটতে পারায়! নুরুল আবছার দুর্বল ও দরিদ্র নন, তিনি একজন শক্তিমান ও মানবিক মানুষ। হাছিনা বা আবছারদের জীবনে ঘটা ভালোবাসার দিবস আসে না, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা আসে। সেই ভালোবাসা না থাকলে মেকি রংদার আয়োজনে যতই চলুক ভালোবাসার মহড়া, ভালোবাসাবাসির জাদুকরি ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে মানুষ।
আর কিছু নয়, মানুষই যে পারে মানুষকে সুখী করতে, সার্থক করতে, হাছিনা ও আবছারের জীবন তার প্রমাণ।

মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব -ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে

আগামী জুনের মধ্যে মন্ত্রী ও সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দেওয়া হবে বলে আবারও আশার বাণী শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর এ বক্তব্য দেশবাসীকে কতটা আশ্বস্ত করবে, তা নির্ভর করছে এর বাস্তবায়নের ওপর। মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অনেকেই মন্ত্রী ও সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তারপর এ নিয়ে আর উচ্চবাচ্য নেই। মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দেওয়া অনুগ্রহের বিষয় নয়। এটি ছিল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অঙ্গীকার।
এর অবশ্য পটভূমিও আছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে চারবার ও পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগের আমলে একবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বহু রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির মামলা হয়েছিল, তাও ভিত্তিহীন বলা যাবে না। যদিও আইনগত ত্রুটি ও সুষ্ঠু তদন্তের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ছাড়া পেয়ে গেছেন। এ প্রেক্ষাপটে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। জনগণও এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তাদের প্রত্যাশা ছিল, সরকার গঠনের পরপরই মন্ত্রী-সাংসদেরা সম্পত্তির হিসাব দেবেন এবং জনসমক্ষে তা প্রকাশ করবেন। তাতে বোঝা যেত, ক্ষমতায় আসার আগে কার কী সম্পত্তি ছিল এবং গত এক বছরে সেই সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে, না কমেছে।
মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাব দিতে দেরি করার সমর্থনে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। নির্বাচনের আগে অধিকাংশ প্রার্থী কমিশনের হলফনামায় যে তথ্য দিয়েছেন, এর সত্যতা প্রশ্নাতীত নয়। কোটিপতি প্রার্থীও বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকা বলে চালিয়ে দিতে দ্বিধা করেন না। নির্বাচন কমিশনে তাঁদের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দেওয়া হিসাবের যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। আবার অনেক কিছু রাজস্ব বোর্ডের হিসাবেও গোপন রাখা হয়। সম্প্রতি প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সাবেক মন্ত্রী ও সাংসদ সম্পত্তির হিসাব গোপন করে রাজউকের প্লট বাগিয়ে নিয়েছেন। এটি কেবল অনৈতিক নয়, বেআইনিও। জনগণ আইন প্রণয়নের জন্য যাঁদের সংসদে পাঠিয়েছেন, তাঁরাই যদি বেআইনি কাজ করেন, এর চেয়ে লজ্জাজনক আর কিছু হতে পারে না।
নির্বাচনী অঙ্গীকার সত্ত্বেও শুরুতেই কেন তাঁরা সম্পত্তির হিসাব দিলেন না, সেটাই প্রশ্ন। দেরিতে হলেও অর্থমন্ত্রী আগামী জুনের মধ্যে মন্ত্রী ও সাংসদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, জনগণ তার বাস্তবায়ন দেখতে চাইবে। আর শুধু মন্ত্রী-সাংসদদের নয়, তাদের পোষ্যদের সম্পত্তির হিসাবও প্রকাশ করতে হবে। প্রতিবছর তা দিতে হবে, এতে জনগণ জানতে পারবে বছর বছর তাদের সম্পত্তি কী হারে বাড়ছে বা কমছে। স্বচ্ছতার স্বার্থে ও দুর্নীতি ঠেকাতে এটা করতে হবে। ফলে যদি নিছক লোক-দেখানো ও নিয়ম রক্ষার জন্য সম্পত্তির হিসাব দেওয়া হয়, তবে তা কোনো কাজে আসবে না। মন্ত্রী-সাংসদদের সম্পত্তির হিসাবের নামে কোনো ধরনের চালাকি জনগণের কাছে গহণযোগ্য হবে। হিসাবটি অবশ্যই জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে। সরকারের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে, যাতে তারা তা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারে। কেউ যদি মিথ্যা তথ্য দেন, তবে কী শাস্তি তিনি পাবেন, সেটাও পরিষ্কার করা জরুরি।

সম্পদের হিসাব দেননি ভারতের ১১০ সাংসদ

ভারতের লোকসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রায় নয় মাস অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও এখনো ভারতের ১১০ জন সাংসদ তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব দেননি। আইনে রয়েছে, নির্বাচনে জেতার ৯০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সাংসদদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির হিসাব জমা দিতে হবে। ভারতের লোকসভায় ৫৪৩ জন সাংসদ রয়েছেন।
সম্পত্তির হিসাব না দেওয়ার তালিকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাংসদ হলেন: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া, লালুপ্রসাদ যাদব, কল্যাণ সিং, শিবু শোরেন, নভজ্যোত্ সিং সিঁধু প্রমুখ।

ব্রিটিশ লেখক ডিক ফ্রান্সিস মারা গেছেন

প্রখ্যাত ব্রিটিশ লেখক ডিক ফ্রান্সিস মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। ফ্রান্সিসের পরিবারের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়। তাঁর কয়েকটি রোমাঞ্চ উপন্যাস কয়েক দশক ধরে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বইয়ের তালিকায় ছিল। তিনি পেশাদার ঘোড়সওয়ারও ছিলেন।
ফ্রান্সিসের বইয়ের প্রকাশকের মাধ্যমে প্রচারিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ফ্রান্সিস বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর ক্যারিবীয় বাড়িতে মারা গেছেন। তাঁর ছেলে ফেলিক্স গত রোববার তাঁর বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, বাবার মৃত্যুতে তিনি বিধ্বস্ত। তিনি এক অসাধারণ বাবাকে হারালেন।
ঘোড়দৌড়শিল্পের পটভূমিতে উপন্যাস রচনায় ফ্রান্সিস ছিলেন সিদ্ধহস্ত। পেশাদার ওই ঘোড়সওয়ার জীবনে ৩৫০টিরও বেশি ঘোড়দৌড়ে জিতেছেন।
৪২টি উপন্যাস রচনা করেছেন ফ্রান্সিস। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত লেখালেখি করে গেছেন তিনি। ফেলিক্সের সঙ্গে লেখা ইভেন মানি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়। চলতি বছরের আগস্টে তাঁর বই ক্রসফায়ার প্রকাশিত হবে।
ফেলিক্স বলেন, বাবার মৃত্যুতে ভাই মেরিক ও তিনি ভেঙে পড়েছেন। ওই ধরনের একজন ‘অসাধারণ’ ব্যক্তিত্বের সন্তান হতে পেরে তাঁরা গর্বিত।
১৯৫৭ সালে ঘোড়দৌড় থেকে অবসর নেওয়ার পর ডিক ফ্রান্সিস লেখালেখি শুরু করেন। প্রথমে তিনি সানডে এক্সপ্রেস পত্রিকায় লিখতেন। ১৯৬২ সালে তিনি উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। ২০০০ সালে তাঁর স্ত্রী ম্যারি মারা যান। লন্ডনে তাঁর স্মরণানুষ্ঠান হবে। ফ্রান্সিসের গ্রান্ড কেম্যানের বাড়িতে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

অগ্নিপরীক্ষার সামনে সুদানি প্রেসিডেন্ট বশির



সুদানের প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের ২১ বছরের শাসনামল দ্বন্দ্বমুখর ও ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ। ওই সময় তাঁকে টানা গৃহযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানার প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু এসব তাঁকে মোটেও দমাতে পারেনি। বরং সবকিছু ছাপিয়ে এবারকার নির্বাচনই তাঁর জন্য তৈরি করেছে অনিশ্চয়তার কঠোর এক ঘেরাটোপ। এএফপি।
বশির গত শনিবার জাঁকজমকের সঙ্গে তাঁর নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন। এ প্রচারে নিজ শাসনামলের গুণকীর্তনের পাশাপাশি দেশের ঐক্যের ব্যাপারেও তাঁর অঙ্গীকার ধ্বনিত হয়েছে।
খার্তুমের টুইন সিটি কামদুরমানে হাজার হাজার সমর্থকের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন ক্ষমতায় আসি তখন সবকিছুই ছিল বিশৃঙ্খল। জনগণ রুটি ও পেট্রলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করত। কিন্তু এখন রুটিই মানুষের জন্য অপেক্ষা করে।’
বশিরকে আগামী এপ্রিলে প্রথম ও মূল নির্বাচনী পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। এ সময় তাঁকে বিরোধী ১১ জন প্রার্থীকে মোকাবিলা করতে হবে। তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাদিক আল মাহদি ও বিদ্রোহী নেতা ইয়াসির আরমানও রয়েছেন।
বৃহত্তম বিরোধী দল উম্মার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মাহদি। দেশের উত্তরাঞ্চলে রয়েছে তাঁর ব্যাপক জনসমর্থন। এ ছাড়া ১৯৮৯ সালে বশিরের সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ায় তিনি নিজেকে দেশের বৈধ নেতা হিসেবে মনে করেন।
আরমান উত্তরাঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক মুসলিম। তিনি দক্ষিণাঞ্চলের বিদ্রোহী গ্রুপ পিপলস লিবারেশন মুভমেন্টের হয়ে নির্বাচনে লড়াই করবেন। ধারণা করা হচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলের অধিকাংশ খ্রিষ্টানের ভোট পাবেন তিনি। এ এলাকাতেই মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে ২২ বছর ধরে গৃহযুদ্ধ চলে।
সুদানের বিদ্রোহকবলিত দারফুর অঞ্চলে কথিত যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা সত্ত্বেও বশির নিজের বিজয় সম্পর্কে নিরুদ্বিগ্ন রয়েছেন। বিরোধী কর্মকর্তারা বলছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর আতঙ্কিত সদস্যরা বশিরের প্রতি অনুগত। তাঁরা হস্তক্ষেপ করলে বশিরের জয় হবে সুনিশ্চিত।
জাতিসংঘ বলছে, দেশটি ব্যাপকভাবে দারিদ্র্য ও সহিংসপীড়িত। বিদ্রোহীরা ২০০৩ সালে হাতে অস্ত্র তুলে নেওয়ার পর দারফুরে এ পর্যন্ত তিন লাখ লোক নিহত হয়েছে। গৃহযুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশটিকে প্রত্যন্ত এলাকায় ভোটের সরঞ্জাম পৌঁছে দিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। আর এ জন্য তাদের জাতিসংঘ হেলিকপ্টার ব্যবহারের প্রয়োজন হবে।
গত সপ্তাহে সুদান সফরকালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও অভিজ্ঞ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক জিমি কার্টার আভাস দিয়েছেন, নির্বাচনের প্রথম পর্বেই বাশার হয়তো কুপোকাত হতে পারেন।

পাকিস্তানের জঙ্গিরা জড়িত কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে: ভারত

ভারত সরকার বলেছে, পুনেতে বিস্ফোরণের ঘটনায় পাকিস্তানের জঙ্গিরা জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকার এমন এক সময় এ কথা বলল, যার দুই সপ্তাহ পর অর্থাৎ আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের শান্তি আলোচনায় বসার কথা।
পুনেতে এ বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার পর প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির নেতারা দাবি করেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। তবে একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে নির্ধারিত এ বৈঠক হবে, এবং নির্ধারিত সময়েই অনুষ্ঠিত হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে এ বৈঠকের ব্যাপারে কিছু জটিলতা আছে। কিন্তু আমাদের বিষয়টি সার্বিকভাবে বিবেচনা করতে হবে। এ মুহূর্তে এ বৈঠক না হওয়ার কোনো কারণ দেখি না।’
পর্যটকদের কাছে প্রিয় মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে গত শনিবার জার্মান বেকারি রেস্তোরাঁয় বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে দুই বিদেশি নাগরিকসহ নয়জন নিহত হন। আহত হন অন্তত ৫৭ জন। এ ঘটনার পর ভারত সরকার দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করে। ঘটনার পরই দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও কারা এ জন্য দায়ী, এর হদিস পায়নি ভারত সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেন, ‘বোমা বিস্ফোরণের কারণ এখনো রহস্যময়। তবে এটা সন্ত্রাসীদের কাজ।’

পাকিস্তানে আইনজীবীদের আদালত বর্জন

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মাহমুদ চৌধুরীর মধ্যে আবার শুরু হওয়া বিরোধকে কেন্দ্র করে গতকাল সোমবার সে দেশের আইনজীবীরা আদালত বর্জন ও প্রেসিডেন্ট জারদারির বিরুদ্ধে সমাবেশ করেছেন। প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রধান বিচারপতির অনুমোদন ছাড়াই গত শনিবার বিকেলে দুজন বিচারক নিয়োগ দেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।
গতকাল কয়েক শ আইনজীবী আদালত বর্জন করে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। দেশটির সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের (এসসিবিএ) ঘোষিত ধর্মঘট কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেন আইনজীবীরা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর লাহোরে ৩০০ আইনজীবী মিছিল নিয়ে পাঞ্জাব আইনসভা ভবনের সামনে যান এবং সেখানে টায়ার জ্বালিয়ে স্লোগান দেন, ‘জারদারি নিপাত যাক’! এ ছাড়া পেশোয়ারে ১০০ জন আইনজীবী জারদারি-বিরোধী স্লোগান দেন এবং প্রধান বিচারপতির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। কোয়েটা শহরের আইনজীবীরাও গতকাল আদালত বর্জন করেন।
প্রেসিডেন্ট ও প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক এ বিরোধকে বড় করে দেখছেন না প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি। গত রোববার গিলানি সাংবাদিকদের বলেন, দেশে গণতন্ত্রের প্রতি কোনো হুমকি নেই। দেশ বা দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিও হুমকি নেই।
বিশ্লেষকেরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী গিলানির এ সংকট সমাধানের চেষ্টায় তেমন কোনো লাভ হবে বলে মনে হয় না। প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে বিচারপতিদের এ অবস্থান তালেবান ও আল-কায়েদা জঙ্গি নির্মূলে পাকিস্তানের চেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।
এর আগে শনিবার দুই বিচারক নিয়োগের প্রেসিডেন্টের নির্দেশ স্থগিত করে দেন সুপ্রিম কোর্ট। সুপ্রিম কোর্টের একটি প্যানেল এক আদেশে জানায়, এ নিয়োগ স্থগিত করা হলো। কারণ, প্রেসিডেন্ট জারদারি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ না করে দুই বিচারক নিয়োগ দিয়ে সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।
পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ ২০০৭ সালে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মাহমুদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করেন। ২০০৮ সালে জারদারি ক্ষমতা গ্রহণের পর ইফতেখারকে পুনর্বহালের দাবিতে বিচারকেরা আন্দোলন শুরু করলে দেশটির সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। অবশেষে গত বছর মার্চে ইফতেখারকে তাঁর পদে বহাল করতে বাধ্য হন জারদারি।

সামরিক একনায়কত্বের দিকে যাচ্ছে ইরান: হিলারি

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, ইরান সামরিক একনায়কত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে তাঁর আশঙ্কা। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের জায়গা কবজা করে নিচ্ছে। গতকাল সোমবার কাতারের দোহায় শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করছে কি না—এক শ্রোতার এমন প্রশ্নের জবাবে হিলারি ক্লিনটন বলেন, না। তিনি আরও বলেন, ইরানের পরমাণু উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ন্ত্রণে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেষ্টা করছে না যুক্তরাষ্ট্র। তার বদলে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করতে চায় তাঁর দেশ।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, বিশেষত ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে ওই ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হবে। তাঁদের বিশ্বাস ওই প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত ইরানি সরকারের কর্তৃত্বের দখল নিচ্ছে।
কার্নেগি-মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের দোহা ক্যাম্পাসে আরব ছাত্রদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে হিলারি ক্লিনটন আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি ইরান সরকার, তাদের সর্বোচ্চ নেতা, প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট—সবই দখলে চলে যাচ্ছে এবং ইরান সামরিক একনায়কতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
গত রোববার রাতে ইউএস ইসলামিক ওয়ার্ল্ড ফোরামে হিলারি ক্লিনটন বলেন, ‘আমি আশঙ্কা করছি, বিপ্লবী গার্ডের শক্তি ও প্রভাব বৃদ্ধি সবার প্রতি একেবারে সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করছে।’
গত সপ্তাহে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর ওপর নতুন দফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। ছাত্রদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় ইরান ও তার অভিপ্রায় সম্পর্কে গভীর উদ্বেগের বিষয়টি বেরিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, তাঁরা ইরানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। ইরান ভালো প্রতিবেশী হতে পারবে কি না, এ নিয়েও তাঁরা সন্দিহান।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মানুষের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কারণ রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবেশীদের উদ্বেগ নিরসনে ইরান কী করতে পারে। এবং এ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি দেখা যায়নি।
হিলারি বলেন, ‘চলতি বছর ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে অর্থপূর্ণ আলোচনা শুরু হতে পারে। আমি আশাবাদী যে চলতি বছর দুই পক্ষের মধ্যে অর্থপূর্ণ আলোচনা শুরু হতে দেখব আমরা।’
হিলারি ক্লিনটনের উদ্দেশে এক শ্রোতার প্রশ্ন ছিল, ইরাকের যদি কোনো তেলসম্পদ না থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে অবস্থান করবে কি না? জবাবে তিনি বলেন, ইরাকের প্রাকৃতিক সম্পদের কথা বিবেচনা না করেই দেশটির সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক চায় যুক্তরাষ্ট্র।

জার্মানিতে বিমান বিধ্বস্ত

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সাক্সোনিতে গত রোববার একটি ছোট বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে। ওই সময় বিমানে দুজন পাইলট ছিলেন।
পুলিশের এক মুখপাত্র বলেছেন, চেক সীমান্তের কাছে সেসনা সাইটেশন-৫৫০ নামের বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। দুর্ঘটনায় কতজন লোকের প্রাণহানি ঘটেছে, তিনি তা বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
জার্মানির বিমান নিরাপত্তা সংস্থার এক মুখপাত্র জানান, এ ধরনের একটি বাণিজ্যিক বিমান স্বাভাবিকভাবে আটজন যাত্রী বহন করতে পারে। বিমানটি চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগ থেকে সুইডেনের পশ্চিমাঞ্চলীয় কার্লস্টার্ডে যাচ্ছিল।
বিমানটি ড্রেসডেনের ৩৬ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে যাওয়ার পর স্থানীয় সময় রাত আটটা ২০ মিনিটে বেতারের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলে।

বেলজিয়ামে ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত ২০

বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে গতকাল সোমবার দুটি যাত্রীবাহী ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে কমপক্ষে ২০ জন নিহত ও বহু লোক আহত হয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে মৃতের সংখ্যা ২৫ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে আটটার দিকে ব্রাসেলস থেকে ১৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে হ্যালোতে ওই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ দুর্ঘটনার পর ব্রাসেলস, প্যারিস ও লন্ডনের মধ্যে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। একটি ট্রেনের চালক সিগন্যাল উপেক্ষা করে চলতে থাকলে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে কর্মকর্তারা জানান। ট্রেন দুটিতে ২৫০ থেকে ৩০০ যাত্রী ছিল বলে বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়।

গয়া চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতল সেলডা ২১১

স্পেনের চলচ্চিত্র- নির্মাতা দানিয়েল মনজন নির্মিত সেলডা ২১১ (কারাকক্ষ ২১১) ছবিটি এ বছরের গয়া চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছে। একটি কারাবিদ্রোহের ঘটনা কেন্দ্র করে এটি নির্মিত। স্পেনের সবচেয়ে সম্মানজনক এই চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান উত্সবে ১৬টি শাখায় মনোনয়ন পায় সেলডা ২১১। যার মধ্যে আটটি পুরস্কার জিতেছে চলচ্চিত্রটি।
চলচ্চিত্রটির জন্য সেরা পরিচালকের পুরস্কার জিতেছেন পরিচালক মনজন। এ ছাড়া এই ছবিতে অভিনয়ের সুবাদে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পেয়েছেন লুই তোজার, সেরা সহ-অভিনেত্রী হয়েছেন মার্তা এতুরা, সেরা নবাগত অভিনেতার পুরস্কার পান আলবের্তো আম্মান।
স্পেনের লেখক ফ্রান্সিসকো পেরেজ গানদুলের একটি উপন্যাস অবলম্বনে সেলডা ২১১ নির্মাণ করা হয়েছে।

লাতিন আমেরিকার দেড় কোটি মানুষ ফের দরিদ্র হয়ে পড়েছে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাবে লাতিন আমেরিকার কমপক্ষে দেড় কোটি লোক আবার দরিদ্র হয়ে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।
বলিভিয়া, ইকুয়েডর, পেরু ও ভেনিজুয়েলা অঞ্চলে বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর কার্লোস ফিলিপ স্থানীয় লা রাজোন পত্রিকাকে বলেন, ওই এলাকার দারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংক উদ্বিগ্ন।
লাতিন আমেরিকায় মোট জনসংখ্যা ৫৬ কোটি ৯০ লাখ। এ অঞ্চলের প্রায় ২৫ শতাংশ লোকের প্রতিদিনের ব্যয় করার ক্ষমতা দুই মার্কিন ডলারেরও কম।
বিশ্বব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, লাতিন আমেরিকায় দারিদ্র্য বিমোচন ধারা ২০০৯ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে থেমে গেছে। এর আগে গত আট বছর এ ধারা অব্যাহত ছিল।
কার্লোস আরও বলেন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির অক্ষমতার কারণে ২০০৯ সালে ওই এলাকার দারিদ্র্যের হার ২০০৭ সালের পর্যায়ে ফিরে আসে। যদিও মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের চেয়ে দক্ষিণ আমেরিকায় বেকারত্বের হার কম।
এ ব্যাপারে কার্লোস উল্লেখ করেন, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, বলিভিয়া, চিলি, কলোম্বিয়া ও পেরুতে সামাজিক কর্মসূচির মতো দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রদান করায় এ অঞ্চলে দরিদ্রের মাত্রা কম।
বর্তমান প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে কার্লোস বলেন, লাতিন আমেরিকার জন্য নতুন অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অর্থনীতির বহুমুখিতা এ অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।

মার্কসবাদী বিদ্রোহীরা গত রোববার কলম্বিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় গুয়াভিয়ারে অঞ্চলের গভর্নর প্রার্থীকে অপহরণের চেষ্টা করেছে। ওই সময় পাঁচজন নিহত হয়েছে। এ সময় ওই গভর্নর প্রার্থীও আহত হন।
সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, হোসে পেরেজ রেসত্রিপো মোটর শোভাযাত্রা-সহকারে একটি রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বামপন্থী রেভ্যুলিউশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া (ফার্ক) বিদ্রোহীদের আকস্মিক হামলার মুখে পড়েন।
ওই মুখপাত্র বলেন, বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে পেরেজের তিন দেহরক্ষী ও দুই পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। এ সময় পেরেজ পায়ে আঘাত পান এবং তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্থানীয় গণমাধ্যম জানায়, পেরেজের অবস্থা আশঙ্কাজনক নয়। মুখপাত্র আরও বলেন, গেরিলারা পেরেজকে অপহরণের চেষ্টা চালিয়েছিল। বন্দুকযুদ্ধের সময় কোনো বিদ্রোহীর প্রাণহানি হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্যাবরিয়েল সিলভা মার্চে কংগ্রেস নির্বাচন ও আগামী ৩০ মে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য বিদ্রোহী হামলা বাড়তে পারে বলে গত সপ্তাহে সতর্ক করে দেন।
পেরেজ আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির বিশেষ নির্বাচনে গুয়াভিয়ারের গভর্নর পদপ্রার্থী। অস্কার লোপেজ গত ডিসেম্বরে গভর্নর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোয় এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফার্ক বিদ্রোহীরা চার দশক ধরে কলম্বিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই নিয়ে বাইডেন চেনি পাল্টাপাল্টি আক্রমণ

সন্ত্রাস মোকাবিলা এবং ইরাক যুদ্ধ নিয়ে পরস্পরকে আক্রমণ করলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক এবং বর্তমান দুই ভাইস প্রেসিডেন্ট। বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, তাঁর পূর্বসূরিরা নিজের মতো করে ইতিহাস লেখার চেষ্টা করছেন। অপরদিকে সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি অভিযোগ তুলেছেন, ইরাক ও আল-কায়েদা বিষয়ে বর্তমান প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি ভুল।
গত রোববার টেলিভিশনের পৃথক অনুষ্ঠানে জমে উঠেছিল সাবেক ও বর্তমান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের বিতর্ক। এনবিসি টিভির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জো বাইডেন। আর সিবিএস টিভির ‘ফেস দ্য ন্যাশন’ ও এনবিসি টিভির ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে ওবামা প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন ডিক চেনি।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট চেনি ওবামা প্রশাসনের প্রকাশ্য সমালোচনা করে আসছেন গোড়া থেকেই। দিস উইক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা এমন ভাব করছেন যেন যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত নয়। এমন মনোভাব দেশের জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকির কারণ বলে তিনি মনে করেন। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বেসামরিক আদালতে বিচার করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন তিনি। খালিদ শেখ মোহাম্মদের মতো জঙ্গিদের বিচার প্রক্রিয়া সেনা তত্ত্বাবধানেই হওয়া উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। গুয়ান্তানামো বে কারাগার বন্ধ করে দেওয়ার সমালোচনা করে ডিক চেনি বলেন, জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত একেবারে ডাহা ভুল। অবশ্য তিনি আফগানিস্তান বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানান।
আফগানিস্তানে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পাঠাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আগ্রাসী আক্রমণের মধ্য দিয়ে তালেবান দমনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মার্কিন সেনাবাহিনীতে সমকামীদের জন্য নিয়ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানান ডিক চেনি। এর আগে মার্কিন সেনাবাহিনীতে সমকামীদের প্রকাশ্য অবস্থান স্বীকৃত ছিল না। ওবামা প্রশাসনের সময় এ নিয়মের পরিবর্তন ঘটেছে। সমকামী পরিচয় প্রকাশ করেই এখন থেকে মার্কিন সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া যাবে। এ সংক্রান্ত প্রশাসনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সমাজে পরিবর্তন ঘটেছে। সময়কে বিবেচনা করে নিয়মনীতিতেও পরিবর্তন ঘটে।
জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে ওবামা প্রশাসনের ‘উদাসীনতার’ সমালোচনা করে ডিক চেনি বলেন, নাইন ইলেভেনের মতো যুক্তরাষ্ট্রে আবার হামলা হতে পারে। তিনি মনে করেন, আল-কায়েদাসহ জঙ্গিগোষ্ঠী এখনো সক্রিয়। তারা যেকোনো সময় আবারও হামলা করতে পারে।
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের কড়া সব সমালোচনার জবাব দিয়েছেন জো বাইডেন। বাইডেন তাঁর টিভি সাক্ষাত্কারে বলেন, চেনি তাঁর নিজের মনোভাব পোষণের অধিকার রাখেন। তবে তিনি আরও বলেন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট নিজের মতো করে নতুন করে ইতিহাস রচনার প্রয়াস নিয়েছেন। বুশ প্রশাসনের সময়ও জঙ্গিদের বিচার করা হয়েছে বেসামরিক আদালতে। ‘জুতা বোমা’ খ্যাত মার্কিন জঙ্গি রিচার্ড রিড এর বিচারের উদাহরণ দেন। জো বাইডেন প্রশ্ন রাখেন, ‘ডিক চেনি সে সময় কোথায় ছিলেন?’
জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে মার্কিন অভিযান এখন জোরালো বলেও উল্লেখ করেন বাইডেন।

পিছু হটে গেছে তালেবান

আফগানিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে তালেবানবিরোধী অভিযানের তৃতীয় দিনে অভিযানের আওতাধীন বেশির ভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করেছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী। ওই এলাকা থেকে তালেবান যোদ্ধারা পিছু হটে গেছে। গতকাল সোমবার বাহিনীর একজন জেনারেল এ দাবি করেন।
গতকাল বিকেল পর্যন্ত একজন বিদেশি সেনার নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন ন্যাটো কর্মকর্তারা। এ নিয়ে অভিযানে মোট সাতজন বিদেশি সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হলো।
আফগান সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ অধিনায়ক জেনারেল আমিনুল্লাহ পাতিয়ানি বলেন, ‘মারজাহ ও নাদ আলি শহরের বেশির ভাগ এলাকা জোট বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। ওই দুই শহরের বেশির ভাগ এলাকা এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তালেবান যোদ্ধারা ওই সব এলাকা ছেড়ে গেছে। কিন্তু সেখানে পেতে রাখা বোমার হুমকি রয়ে গেছে।’
গত শনিবার তালেবান জঙ্গি ও মাদক পাচারকারী নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তানের মধ্যাঞ্চলীয় হেলমান্দ উপত্যকার মারজাহ শহরে এই ‘অপারেশন মুশতারাক’ নামের অভিযান শুরু হয়। এ অভিযান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নতুন আফগাননীতির প্রথম পরীক্ষা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও আফগানিস্তানের ১৫ হাজার সেনার সমন্বয়ে শুরু করা এ অভিযান ২০০১ সালে তালেবান শাসনের পতনের পর সে দেশে বৃহত্তম অভিযান।
অভিযানে অংশ নেওয়া সেনারা মারজাহ শহরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় তালেবান জঙ্গিদের গুলির মুখে পড়ে। প্রতিপক্ষরা সেনাদের বিরুদ্ধে পপিখেতের আড়াল থেকে গুলি ছোড়ে। সেনারাও পাল্টা গুলির ছোড়ে। কিছুক্ষণ পর তালেবান জঙ্গিরা পিছু হটে।
পশ্চিমা নেতা ও সামরিক অধিনায়কেরা দাবি করেছেন, অভিযান সঠিক পথেই এগোচ্ছে এবং অভিযানের লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। ওই এলাকায় আবার আফগান সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ন্যাটোর দাবি, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের এ এলাকাটি তালেবান জঙ্গিদের শেষ শক্ত ঘাঁটিগুলোর একটি।
জেনারেল আমিনুল্লাহ বলেন, ‘আশা করছি, আজই অভিযানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হবে।’ তিনি জানান, অভিযানে বেশ কয়েকজন তালেবান জঙ্গি নিহত হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা তিনি জানাতে পারেননি। সামরিক বাহিনীর অধিনায়কেরা জানিয়েছেন, সেনারা পেতে রাখা বোমা অপসারণ করছে।
গত রোববার ন্যাটো বাহিনীর রকেট হামলায় ১২ জন সাধারণ আফগান নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিরা সবাই একই পরিবারের সদস্য বলে জানিয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা। এই হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে ন্যাটো। এ বিষয়ে আফগান প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনাটি শোনার পর প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাই তাত্ক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

পশ্চিমবঙ্গে মাওবাদীদের হামলায় ২০ জওয়ান নিহত by অমর সাহা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যৌথ নিরাপত্তা বাহিনীর একটি ক্যাম্পে মাওবাদীদের হামলায় ২০ জওয়ান নিহত হয়েছে। এই ঘটনায় চারজন মাওবাদীও নিহত হয়। গতকাল সোমবার বিকেলে পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলের বেলপাহাড়ির শিলদার পুলিশ ফাঁড়িতে স্থাপিত যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ওই হামলা চালানো হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ৩০-৩৫ সদস্যের একটি মাওবাদী দল দুটি মোটরসাইকেল ও দুটি পিকআপ ভ্যানে করে ক্যাম্পে উপস্থিত হয়। ক্যাম্পে তখন ৫১ জন জওয়ান অবস্থান করছিলেন। অতর্কিত হামলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জওয়ানেরা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে মাওবাদীরা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্যাম্পে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় ক্যাম্পে বেশ কিছু জওয়ান আটকা পড়েন। গোলাগুলির মুখে বের হতে না পেরে তাদের মধ্যে ২০ জন অগ্নিদগ্ধ হন। এরপর মাওবাদীরা পুলিশ ও জওয়ানদের অস্ত্র নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ চারজন মাওবাদীর লাশ উদ্ধার করে। পুলিশের ধারণা, সন্ধ্যার পর মাওবাদীরা জঙ্গলের পথ ধরে ঝাড়খন্ডের দিকে গা ঢাকা দিয়েছে।
পুলিশ দাবি করেছে, মাওবাদীদের এই আক্রমণ পরিকল্পিত। আক্রমণ শুরুর আগেই তারা ক্যাম্পে ঢোকার বিভিন্ন সড়কে মাইন পেতে রাখে। গোলাগুলির সময় দুজন মাওবাদী গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলেও দাবি করেছে পুলিশ।
মাওবাদীদের হামলার সময় রাজধানী নয়াদিল্লিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিশেষ করে পুনেতে জঙ্গি হামলা ও মাওবাদীদের উত্থান বিষয়ে মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির বৈঠক চলছিল।
হামলার পর মাওবাদী নেতা কিষেনজি কলকাতার সংবাদমাধ্যমকে টেলিফোনে জানিয়ে দেন, তাঁরাই হামলা চালিয়েছেন শিলদা যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে শিক্ষা দিতেই তাঁরা এ হামলা চালান।
কিষেনজি আরও বলেন, আমেরিকার কথাতেই কেন্দ্রীয় সরকার মাওবাদীদের ওপর যৌথ অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছে। সে লক্ষ্যেই এবার পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল করা হয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা-উপদেষ্টা এম কে নারায়ণনকে।
সরকারকে হুঁশিয়ার করে কিষেনজি বলেন, ‘মাওবাদীদের ওপর যৌথ বাহিনীর অপারেশন গ্রিন হান্ট বন্ধ করার এখনো সময় আছে। নইলে ভবিষ্যতেও কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারকে শিক্ষা দিতে আমরা পিছপা হব না।’
এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গে এত বড় হামলা চালাল মাওবাদীরা। এর আগে ২০ অক্টোবর দুপুরে তারা হামলা চালিয়েছিল একই জেলার সাকরাইল থানায়। তাদের গুলিতে মৃত্যু হয়েছিল দুই পুলিশ কর্মকর্তার। মাওবাদীরা ওই সময় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকেও (ওসি) অপহরণ করেছিল। পরে অবশ্য কারারুদ্ধ মাওবাদীদের জামিনের বিনিময়ে ছেড়ে দিয়েছিল তাঁকে।

বিশ্বমন্দার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন-সাহায্য বিতর্ক by আসজাদুল কিবরিয়া

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পক্ষে ও বিপক্ষে যা-ই যুক্তি থাকুক, বাস্তবতা হলো বিদেশি সাহায্য বাংলাদেশ গ্রহণ করছে। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাহায্যের আর্থিক পরিমাণ অনেক কমে এসেছে। তবে কৌশলগত উন্নয়ন সহায়তার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি।
সে কারণেই বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামে (বিডিএফ) আর্থিক সাহায্যের পরিমাণগত প্রতিশ্রুতির বিষয়টি অনেক আগেই বাদ পড়েছে। সরকার আর এখন নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতির জন্য উদ্বিগ্ন নয়। অন্যদিকে কথিত উন্নয়ন সহযোগীরাও তাৎক্ষণিকভাবে সাহায্য নির্দিষ্ট না করে বৃহত্তর প্রেক্ষিতে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে আগ্রহী।
এই বাস্তবতার পাশাপাশি এবার বিডিএফের জন্য বৈশ্বিক প্রেক্ষিতটিও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণটি হলো বিশ্বমন্দা। ২০০৮ সালের শেষ ভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে আর্থিক সংকট দেখা দেয়, তার জের ধরে বিশ্বমন্দা তৈরি হয়। যদিও বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো এখন মন্দা থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।
আবার আন্তর্জাতিক পণ্যের বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়তে থাকা এবং মূল্যস্ফীতিজনিত চাপ সৃষ্টি হওয়ার মধ্য দিয়ে এটাও প্রতিফলিত হচ্ছে যে বিশ্ববাজারে চাহিদা বাড়ছে। তার মানে বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্বমন্দার বিষয়টি দুভাবে দেখার অবকাশ আছে। একটি হলো, মন্দায় রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। অন্যটি হলো, মন্দা কাটতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আমদানি ব্যয়বহুল হওয়ার আশঙ্কা।
কিন্তু এ দুই সীমিত পরিসর ছাড়িয়ে যেটা আরও বড় করে দেখার সুযোগ আছে, সেটা হলো বৈশ্বিক বা আন্তর্জাতিক সহায়তার পটপরিবর্তন। মন্দার অজুহাতে সহায়তা কমানো বা অন্তত না বাড়ানোর যে প্রয়াস উন্নত দেশগুলোর তরফ থেকে রয়েছে, তা বাংলাদেশের বিদেশি সাহায্য সমীকরণে সংগত কারণেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিডিএফকে আমরা সাহায্যের চাহিদা ও জোগানের সমঝোতা করার কাঠামোয় বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে।
বাংলাদেশকে যে সহায়তা দেওয়া হবে বা হতে পারে, তা অর্থনীতির পরিভাষায় বাড়তি সম্পদের স্থানান্তর। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ধনী বা উন্নত দেশগুলো যে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত সম্পদের অধিকারী হয়, তার কিছু সাহায্যের নামে পুনর্বণ্টন হয় অভাবি বা গরিব দেশগুলোতে।
সুতরাং, উদ্বৃত্ত সম্পদ যদি কম হয়, তাহলে তা স্থানান্তরের সুযোগও কমে যায়। ফলে যাদের প্রয়োজন, তারা তা পায় না। যা পায়, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বিশ্বমন্দার জের ধরে উদ্বৃত্ত সম্পদের ঘাটতির বিষয়টি উন্নত দেশগুলো সম্প্রতি বিভিন্নভাবেই বলে আসছে। বিডিএফেও তার ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সরাসরি না বলে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এটা বলা হবে।
প্রশ্ন হলো, এ দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত? একটু আগেই বিশ্বপণ্যের বাজারের দাম বাড়ার যে কথা বলা হয়েছে, তাতে কিন্তু এটা বোঝা যায় যে আবারও বাড়তি সম্পদ সৃষ্টির সুযোগটা চলে এসেছে। আর তাই সহায়তা সম্প্রসারণে যারা রক্ষণশীল মনোভাব পোষণ করবে, তা বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরির একটা কৌশল হিসেবেই আসবে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মোটামুটি স্পষ্টভাবেই চাহিদার দিকটি তুলে ধরা হচ্ছে। এটা একটা ইতিবাচক দিক। অর্থাৎ কোন কোন ক্ষেত্রে এবং কী কী কারণে আমরা সহায়তা চাইছি, তা অনেকটাই স্পষ্ট।
এখানে উল্লেখ্য, সরকার দারিদ্র্য হ্রাসের কৌশলপত্রের (পিআরএসপি) সঙ্গে সংগতি রেখে সহায়তার বিষয়ে আলোচনার টেবিলে বসলেও দ্বিতীয় এই পিআরএসপি কথিত দাতাগোষ্ঠী ও সংস্থার মন জুগিয়ে সেভাবে প্রণীত হয়নি, যেমনটা প্রথমটিতে হয়েছিল।
সুতরাং, চাহিদা উপস্থাপন করলেই যে মেনে নিয়ে তা পূরণের জন্য জোগান দেওয়ার জন্য কথিত উন্নয়ন সহযোগীরা এগিয়ে আসবে, এটা ভাবার কোনো যুক্তিসংগত কারণ নেই। তাই প্রয়োজন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দরকষাকষির দক্ষতা দেখানো।
মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বৃত্ত সম্পদ স্থানান্তরের তথা সহায়তা দেওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ার যুক্তি মেনে নিলেও বাংলাদেশের প্রয়োজন কিন্তু হ্রাস পাবে না। তার মানে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে যতটুকু পারা যায় সহায়তা আদায় করা। সে ক্ষেত্রে সমঝোতার কাজটি অন্য মাত্রা পাবে। আর তা হলো, ব্যয়বহুল সাহায্য নেওয়ার চিন্তা।
যেহেতু চূড়ান্ত বিচারে সাহায্য-সহায়তার নির্ণায়ক টাকার অঙ্কেই বিবেচনা করা হয়, সেহেতু তা ঋণ, না অনুদান সেটা গুরুত্বপূর্ণ। অনুদান যখন নানা ধরনের শর্তযুক্ত হয়ে আসে, তখন তাকে ব্যয়বহুল বিবেচনা করা হয়।
আবার অনুদান ও ঋণের মধ্যে ফেরতযোগ্যতার কারণে ঋণকেই ব্যয়বহুল বিবেচনা করা হয। আর ঋণের ক্ষেত্রেও শর্তের বিষয়টি প্রযোজ্য। এর পাশাপাশি চলে আসে সুদের বিষয়টি। যে ঋণে সুদের হার বেশি, সে ঋণ তত বেশি ব্যয়বহুল।
বস্তুত মন্দা-পরবর্তী সময়ে অপ্রতুলতার কারণে যখন সহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে অনীহা ভাব দেখানো হচ্ছে, তখন অনুদানের বদলে ঋণ দিতে আগ্রহী হলে তা বাংলাদেশের জন্য ব্যয়বহুল সহায়তা হিসেবেই পরিগণিত হবে। অনিবার্যভাবেই এখানে ঋণের সুদ হার একটি বড় বিবেচ্য বিষয়।
ইতিমধ্যে তুলনামূলক বেশি সুদে বিদেশি ঋণ নেওয়ার একটি ঝোঁক ইদানীং পরিলক্ষিত হচ্ছে। এটা ঋণদানে আগ্রহীদের নজর এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। বিডিএফ বৈঠকের মাধ্যমে ঝোঁক যদি জোরালো হয়ে ওঠে, তাহলে বুঝতে হবে, যারা মন্দার অজুহাতে সহায়তা বাড়াতে কুণ্ঠিত ছিল, তারা বাংলাদেশের প্রয়োজনীয়তার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের মন্দার ক্ষতি পূরণের আরেকটি ব্যবস্থা করে নিয়েছে।
চিত্রটি অবশ্য এখনোই পরিষ্কার হবে না। বরং আগামী কয়েক মাসে কোন কোন খাতে কী ধরণের ঋণ-অনুদান চুক্তি হয়, তা জানা গেলে বোঝা যাবে কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছি আমরা। বলা দরকার, অনুদানের বদলে ঋণ বা স্বল্প সুদের বদলে বেশি ঋণে বিষয়টির পেছনে অস্বচ্ছ বা গোপন লেনদেনের একটি বিষয় থেকে যায়।
চিন্তার আরেকটি দিক আছে। সরকার প্রয়োজনগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরলেও কোনো কোনোটিতে অধিক গুরুত্ব দিতে গিয়ে অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো গুরুত্ব হারাতে পারে। জলবায়ুর অভিঘাতের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি বা অভিযোজনের জন্য সহায়তা চাওয়া একটি উদাহরণ হতে পারে।
এটা ঠিক যে বাংলাদেশের সহায়তার জন্য প্রচারণার ক্ষেত্রে জলবায়ু একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু কথিত সাহায্যদাতারা এখনো এ বিষয়ে অর্থবহ ও কার্যকর সহায়তার জন্য মনস্থির করেছে বলে মনে হয় না। তাই এ হাতিয়ার ব্যবহারে সতর্কতাটাই কাম্য।
সর্বোপরি চাহিদা চিহ্নিত করার পর তা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কতটা নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় থেকেছে, তাও একটু খতিয়ে দেখা দরকার। উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের অনেক প্রয়োজনের সঙ্গেই একমত পোষণ করে। তবে প্রয়োজন মেটানোর পদ্ধতি-প্রক্রিয়ায় তাদের ভাবনা সব সময়ই বাংলাদেশের অনুকূল হয় না। আর প্রয়োজন বা চাহিদা উপস্থাপন যদি তাদের মনমতো করে হয়, তাহলে তা মেটানোর জন্য সহায়তার জোগানও তাদের মতো করে হবে। বাংলাদেশের এখন এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার সময় চলে এসেছে।

সামিট পাওয়ারের ভাইস চেয়ারম্যান হলেন লতিফ খান

মো. লতিফ খান সামিট পাওয়ার লিমিটেডের নতুন ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন। গত শনিবার অনুষ্ঠিত কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের এক সভায় এ পদে তাঁর নাম ঘোষণা করা হয়।
লতিফ খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর ১৯৮১ সালে উচ্চশিক্ষার্থে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানকার আর্থিক খাতে তিনি ১৫ বছরের বেশি সময় কাজ করেন। তিনি প্রুডেনশিয়াল ইনস্যুরেন্স কোম্পানি অব আমেরিকার একজন স্টক ব্রোকার ও আর্থিক বিশ্লেষক ছিলেন।
এ ছাড়া লতিফ খান যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ওয়েলস ফার্গো ব্যাংকে ফিন্যান্সিয়াল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৯৭ সালে লতিফ খান দেশে ফিরে আসেন এবং সামিট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান সামিট শিপিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও গ্রুপের পরিচালক হিসেবে যোগ দেন

উল্লাপাড়ায় উত্তরা ব্যাংকের কৃষিঋণ বিতরণ কর্মসূচি

উত্তরা ব্যাংক লিমিটেডের উল্লাপাড়া শাখায় গত রোববার ২০০৯-১০ অর্থবছরের কৃষিঋণ বিতরণ শুরু হয়েছে।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সামসুদ্দিন আহমেদ ঋণ বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ব্যাংকের বগুড়া আঞ্চলিক অফিসের উপ-মহাব্যবস্থাপক সুলতান আহমেদ, উল্লাপাড়া শাখার ব্যবস্থাপক আবদুস সালাম ও ব্যবসায়ী রুহুল আমিন বক্তব্য দেন।
সামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর, তাই কৃষি খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কৃষকদের সর্বাধিক ঋণ সুবিধা দিতে হবে। সে জন্য উত্তরা ব্যাংকও এখন দেশের অন্যান্য ব্যাংকের পাশাপাশি কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

বাংলাদেশ-জার্মানির বাণিজ্য ১৬ শতাংশ বেড়েছে

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে ২০০৯ সালের প্রথম ১১ মাসে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আগের বছরের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেড়েছে।
আলোচ্য ১১ মাসে বাংলাদেশ ও জার্মানির মধ্যে মোট ২১০ কোটি ইউরো বা ৩১৫ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যমানের বাণিজ্যিক লেনদেন হয়েছে।
ঢাকায় জার্মান দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সম্প্রতি এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের পক্ষে ১৬০ কোটি ইউরো বা ২৪০ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে।
জার্মান রাষ্ট্রদূত হোলগার মাইকেল এ প্রসঙ্গে বলেন, উভয় দেশের মধ্যে ক্রমাগতভাবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ছে। জার্মানি ইতিমধ্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি বাজারে পরিণত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের বাণিজ্যনির্ভর উন্নয়ন কৌশলেও জার্মানি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
হোলগার মাইকেল আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন-প্রক্রিয়ায় ও রপ্তানিমুখী শিল্পের বৈচিত্র্যকরণে জার্মানির শিল্প-বাণিজ্য খাত সহায়তা করতে পারে।’
২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে আগের ২০০৮ সালের তুলনায় জার্মানিতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ১৮৬ কোটি ইউরোর রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ থেকে জার্মানিতে মোট পণ্য রপ্তানির ৯০ শতাংশই হচ্ছে তৈরি পোশাক।
জার্মানি বাংলাদেশ থেকে ২৫ কোটি ইউরো মূল্যের ৩০টি জাহাজ কেনার তথা আমদানির আদেশ দিয়েছে। যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আলোচ্য ১১ মাসে বাংলাদেশে জার্মানির রপ্তানিও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ বেড়েছে। বাংলাদেশ সাধারণত জার্মানি থেকে শিল্পজ যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক সামগ্রী, ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি ইত্যাদি আমদানি করে থাকে।
বাংলাদেশ-জার্মান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিজিসিসিআই) সভাপতি সাইফুল ইসলাম জানান, উভয় দেশের মধ্যকার বিনিয়োগ-বাণিজ্য আরও বাড়ানোর লক্ষ্যে বিজিসিসিআই চলতি ২০০৯ সালে ‘জার্মান ট্রেড শো’ আয়োজনের পরিকল্পনা করছে।

ডিএসইর নির্বাচন হবে আগামী ২১ মার্চ

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। এ তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২১ মার্চ।
ডিএসইর নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন বৈঠকে বসে গতকাল সোমবার এ তফসিল ঘোষণা করে। আগের তফসিল অনুযায়ী আগামী ৩ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) একটি আদেশের কারণে গত রোববার রাতে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এসইসির ওই আদেশে বলা হয়, নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ন্যূনতম পাঁচ দিন আগে এসইসির কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের চেয়ারম্যান এ কে এম রফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, এসইসির নির্দেশনার সঙ্গে সংগতি রেখেই নির্বাচনের নতুন তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
আগের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার এক দিন আগে এসইসির এই নতুন আদেশ সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকেই ভালো মতো নেননি। তাঁরা মনে করেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকার এসইসিকে দিয়ে এমন একটি সিদ্ধান্ত ডিএসইর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে এসইসিকে রাজনৈতিক ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
জানা গেছে, ডিএসইর বিএনপিপন্থী কয়েকজন সদস্যকে লক্ষ্য করেই সরকারের পরামর্শে এসইসি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকেরা বলেন, এমন একটি ঘটনায় এসইসির কর্তাব্যক্তিরা নিজেদের যুক্ত করে সংস্থাটির নিরপেক্ষতা ও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এতে ভবিষ্যতে সংস্থাটির ইতিবাচক কর্মকাণ্ডকেও সবাই সন্দেহের চোখে দেখবে।
নতুন তফসিল অনুযায়ী আগামী ৪ থেকে ৭ মার্চের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ১১ মার্চ। তবে এর আগে ২২ ফেব্রুয়ারি এসইসির নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে ডিএসইর ইচ্ছাপত্র দাখিল করতে হবে। পরের দিন ডিএসই ২৩ ফেব্রুয়ারি এসব ইচ্ছাপত্র এসইসিতে পাঠাবে।
যেসব প্রার্থী এসইসি থেকে অনাপত্তিপত্র পাবে তাঁরাই কেবল চূড়ান্ত নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। নির্বাচনের ছয় দিন পর ২৭ মার্চ ডিএসইর বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হবে।
ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের মোট সদস্যসংখ্যা ২৪। এর মধ্যে নির্বাচিত সদস্য ১২ জন, আর বাকি সদস্যরা বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন, বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালক হিসেবে মনোনীত হন। ডিএসইর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর নির্বাচিত পরিচালকদের মধ্য থেকে চারটি পদ শূন্য হয়। সে অনুযায়ী এবার বর্তমান সভাপতি রকিবুর রহমান, পরিচালক আবদুল হক, আবু হানিফ ও এম এ কাইয়ুমের (প্রয়াত) পদ শূন্য হচ্ছে। মূলত এসব শূন্য পদেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির মূল্য সমন্বয় ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান চায় উন্নয়ন-সহযোগীরা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মতো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতায়ন চায় বাংলাদেশের উন্নয়ন-সহযোগীরা। তাদের এই চাওয়ার সঙ্গে সরকারও একমত পোষণ করছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরামের (বিডিএফ) সভায় গতকাল সোমবার অনুষ্ঠিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আলোচনায় উন্নয়ন-সহযোগীরা বলেছে, এই খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও টেকসই উন্নয়ন করতে হলে মূল্য সমন্বয় (ট্যারিফ রেশনালাইজেশন, প্রায় সব ক্ষেত্রেই যার অপর নাম মূল্যবৃদ্ধি) অপরিহার্য।
একই সঙ্গে, এ খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিইআরসির মতো নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা দরকার। এটা করা না হলে সরকার ও জনগণের মধ্যে এই খাতের নীতি ও কানুনের বিষয়ে যোগসূত্র স্থাপন করা কঠিন হবে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বর্তমান সরকারের পদক্ষেপগুলো উল্লেখ করে সরকারের অবস্থানপত্র উপস্থাপন করেন বিদ্যুৎসচিব আবুল কালাম আজাদ।
এতে বলা হয়, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা ২২০ কোটি ঘনফুট। আর উৎপাদিত হচ্ছে ১৯৭ কোটি ঘনফুট। সরকার জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাতে ২০১২ সালের মধ্যে ৩০ কোটি ঘনফুট উৎপাদন বাড়বে। এ ছাড়া সমুদ্রবক্ষের তেল-গ্যাস ক্ষেত্রে অনুসন্ধানসহ দীর্ঘমেয়াদি যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে গ্যাস উত্তোলন বাড়বে আরও ৩০ থেকে ৫০ কোটি ঘনফুট। ২০১৩ সালের মধ্যে একটি এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনাল স্থাপন করা হবে চট্টগ্রামে। জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন লাইনে তিনটি কমপ্রেসার বসানো হবে সারা দেশে গ্যাসের প্রয়োজনীয় চাপ ঠিক রাখার জন্য। সর্বোপরি, উপ-আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতা গড়ে তোলার জন্য ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সরকার আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে আনার জন্য জ্বালানি বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে কয়লা, তেল (ডিজের ও ফার্নেস) এবং পরমাণু শক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অবস্থানপত্রে বলা হয়, সরকারি, বেসরকারি এবং সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৮০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ব্যবধান অব্যাহত থাকবে। এই ব্যবধান ঘুচাতে আগামী পাঁচ বছরে নয় হাজার মেগাওয়াট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।
এই উদ্যোগের পাশাপাশি সরকার ভারতের সঙ্গে আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ কেনাবেচার একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এর অধীনে আগামী দুই বছরের মধ্যে ২৫০ থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আনা-নেওয়া যাবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়ন প্রসঙ্গে অবস্থানপত্রে বলা হয়, সৌর ও বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়নে গঠিত ‘সাসটেইনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এসইডিএ)’ সক্রিয় করা হচ্ছে। বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচিও অবস্থানপত্রে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া শিগগিরই সারা দেশে গ্রাহকদের মধ্যে জ্বালানিসাশ্রয়ী বাল্ব বিতরণ, সন্ধ্যার পর নির্দিষ্ট সময় দোকানপাট বন্ধ করা, বছরের একটা সময় দিনের আলো বেশি ব্যবহার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাপ্তাহিক ছুটি ভাগ করে দেওয়া প্রভৃতি কার্যক্রমের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস ও কয়লার উৎপাদন বাড়ানো; তরল জ্বালানি মজুদের ক্ষমতা বাড়ানো; জ্বালানির দামে অস্থিতিশীলতা প্রভৃতি।
সভায় উন্নয়ন-সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান, সমুদ্রসীমা নির্ধারণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির বিষয়ে সভায় বিভিন্ন প্রশ্ন করেন।
সভাশেষে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী দাবি করেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা ও পদক্ষেপকে উন্নয়ন-সহযোগীরা সামগ্রিকভাবে সমর্থন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমানও একই কথা বলেন।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী এনামুল হক বলেন, ‘আমরা নিজেদের করণীয় সম্পর্কে বলার পাশাপাশি উন্নয়ন-সহযোগীরা কীভাবে সহযোগিতা করতে পারে তা নির্ধারণের অনুরোধ করেছি।’
সংবাদ ব্রিফিংয়ে উপস্থিত বাংলাদেশে ডিএফআইডির কান্ট্রি ডিরেক্টর ক্রিস অস্টিন বলেন, ‘আমরা বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ক্ষমতায়ন চাই। আর একাধিক উন্নয়ন-সহযোগী মিল একটি ‘উন্নয়ন ব্যাংক বা তহবিল করার কথা ভাবছি, যেখান থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগের প্রকল্পসমূহে অর্থায়ন করা যায়।’

টেন্ডুলকার-পন্টিং এখানেও

নিজেদের এমন উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন শচীন টেন্ডুলকার এবং রিকি পন্টিং, রেকর্ড বুকের অনেকগুলো জায়গায় লড়াইটা এখন শুধুই দুজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বেশির ভাগ জায়গাতেই এগিয়ে অবশ্য টেন্ডুলকার। যে কয়েকটি জায়গায় পন্টিং এগিয়ে, তার একটিতে কাল ব্যবধানটা আরেকটু কমিয়েছেন ‘লিটল মাস্টার’। কালকের সেঞ্চুরির পর ভারতের মাটিতে ৭৪ টেস্টে টেন্ডুলকারের রান এখন ৬০১৮। এক দেশে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডে সবার আগে পন্টিং। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ৭৯ টেস্টে ‘পান্টারের’ রান ৬৭৯০। খেলোয়াড়ি জীবনের অনেকটা সময় শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে যাঁর সঙ্গে লড়াই হয়েছে টেন্ডুলকারের, সেই ব্রায়ান লারা আছেন পন্টিংয়ের পরেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে লারার রান ৬২১৭। এই তিনজনের সঙ্গে যোগ দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন আরেক ‘গ্রেট’ জ্যাক ক্যালিস। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে ৬ হাজার রান করতে ক্যালিসের প্রয়োজন আর মাত্র ৭৩। এর আগে ৬ হাজারের সবচেয়ে কাছে ছিলেন গ্রাহাম গুচ, ইংল্যান্ডের মাটিতে তাঁর রান ৫৯১৭।

প্রথম দুই ওয়ানডেতে নেই হরভজন

কলকাতা টেস্ট শেষে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলবে ভারত। তবে পারিবারিক কারণে প্রথম দুটি ওয়ানডে খেলা হচ্ছে না হরভজন সিংয়ের। তাঁর বোনের বিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি। যার কারণে এ মাসের ২১ ও ২৪ তারিখ জয়পুর ও গোয়ালিয়রে অনুষ্ঠেয় দুটি ওয়ানডেতে অনুপস্থিত থাকবেন ভারতীয় এই স্পিনার। এরই মধ্যে বোর্ডের কাছে ছুটি চেয়ে আবেদনও করেছেন হরভজন।
তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে খুব সম্ভব খেলা হচ্ছে না যুবরাজ সিংয়েরও। বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে পাওয়া চোট এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।

আবার ক্যারিবিয়ায় জিম্বাবুয়ে

প্রায় ১০ বছর পর আবারও ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যাচ্ছে জিম্বাবুয়ে। ২০০০ সালে সর্বশেষ সফরে দুটি টেস্ট খেলেছিল সেই সময়ের অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের দল। এবার কোনো টেস্ট নেই, শুধু একটি টি-টোয়েন্টি ও তিনটি ওয়ানডে। ২০০৫ সাল থেকেই টেস্ট থেকে নির্বাসিত জিম্বাবুয়ে। তবে টেস্টে ফেরার লক্ষ্য নিয়েই এবারের এই সফর। ২০১২ সালে টেস্টে ফিরতে চায় তারা, তার আগে প্রস্তুত করে নিতে চায় নিজেদের।
সেই সফরে খেলা অ্যালিস্টার ক্যাম্পবেল এখন নির্বাচকমণ্ডলীর আহ্বায়ক। সফরে নিজেদের লক্ষ্যটা জানিয়েছেন সাবেক জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক, ‘আমরা সিরিজ জেতার আশা করছি না, বাস্তব চিন্তাই করছি। আমাদের লক্ষ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলা। সেটা করতে না পারলে আমাদের ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা বড় একটা ধাক্কা খাবে।’ ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা মানে টেস্টে ফেরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পর জুনে ভারতের সঙ্গে ৫ ম্যাচের একটি ওয়ানডে সিরিজ খেলতে চায় তারা। পরিকল্পনায় আরও আছে টেস্ট খেলুড়ে দেশের ‘এ’ দলের বিপক্ষে নিয়মিত চার দিনের ম্যাচ খেলা। তবে এর আগে তারা খুঁজছে একজন কোচ। সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন চারজন—সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক, সাবেক অলরাউন্ডার গ্রান্ট ফ্লাওয়ার, ইংলিশ পেসার ক্রিস সিলভারউড ও সাবেক ইংলিশ ওপেনার মার্ক বুচারের বাবা অ্যালান বুচার।
ওয়েস্ট ইন্ডিজগামী দলে একদম নতুন মুখ দুটি, হ্যামিল্টন মাসাকাদজার ছোট ভাই শিঙ্গিরাই মাসাকাদজা ও গ্রেগ ল্যাম্ব। দুজনই অলরাউন্ডার। ক্ষোভে-হতাশায় জিম্বাবুয়ে ক্রিকেটকে ছেড়ে যাওয়া দুই অলরাউন্ডার শন আরভিন ও ডগ ম্যারিলিয়ার আবার ঘরোয়া ক্রিকেট খেলা শুরু করলেও দলে ডাক পাননি।