Tuesday, January 5, 2016

সংলাপে বসে দ্রুত নির্বাচন দিন -নয়া পল্টনে বিশাল সমাবেশে খালেদা জিয়া

গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সংলাপ সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা নেয়ার আহবান জানিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
মঙ্গলবার নয়া পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবসের’ বিশাল সমাবেশ থেকে তিনি সরকারের প্রতি এ আহবান জানান।
খালেদা জিয়া বলেন, ‘আমরা ভিনদেশী লোক নই। এদেশেরই মানুষ। আর জ্বালাও-পোড়াও-ভাংচুর নয়, আমরা চাই, আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে একসাথে মিলে কাজ করতে।’
সরকারের উদ্দেশ্যে তিনি এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে বলেন, ‘কারো বিরুদ্ধে আমাদের রাগ ক্ষোভ নেই। আমরা কষ্ট করেছি, বুঝেছি। ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। আসুন, সংলাপ করে আলোচনা করে সমাধান বের করে আনি। গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনি।’ জোর করে ক্ষমতায় থাকলেও এই উদ্যোগ বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এসময় হুঁশিয়ারির সুরে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, সঠিক পথে আসুন, গণতন্ত্রের পথে আসুন। না হলে কিন্তু জনগণ কখন জেগে উঠবে বলা যায় না। জনগণকে বেশিদিন ঠেকিয়ে রাখা যাবে না। কারণ আর কতো মায়ের অশ্রু ঝরবে।
দীর্ঘ সময় পরে উন্মুক্ত জনসভায় এসে প্রায় সোয়া এক ঘন্টা বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসন। সরকারের নানা অনিয়মের সমালোচনা করলেও বিএনপি প্রধান চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণে ইতিবাচক ও গঠনমূলক বক্তব্যের উপর জোর দেন।
৫ জানুয়ারিকে গণতন্ত্র হত্যা দিবস উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, ৫ জানুয়ারি কোন ভোট হয়নি। আওয়ামী লীগ ও তাদের জোটের কিছু পরগাছা দল ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে মানুষ ছিল না, প্রিজাইডিং অফিসাররা ঘুমিয়েছে, কেন্দ্র পাহারা দিয়েছে কুকুর। তিনি বলেন, ভোট দিলেও বোধহয় কুকুর দিয়েছে, মানুষ দেয়নি। তাই এই সরকার অবৈধ, সংসদও বৈধ নয়।
নির্বাচন কমিশনকে অথর্ব, মেরুদন্ডহীন আখ্যা দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, এদের কথা বলার সাহসও নেই। তারা লাটসাহেব হয়ে গেছে, আমাদের নেতারা গেলে কথা বলে না, দেখাও করে না। তারা এতো অসহায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সাহায্য চায়। ইসির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কিছু করতে না পারলে কেন পদ আঁকড়ে আছেন, পদত্যাগ করুন। খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ ও ইসি মিলে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে।
আওয়ামী লীগের অধীনে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সম্ভব নয় উল্লেখ করে ২০০৯ সাল থেকে বেশ কয়েকটি নির্বাচনের কথা উল্লেখ করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে বেশ কয়েকটি উপ-নির্বাচনে এরা কারচুপি করেছে। উপজেলা নির্বাচনে প্রথম দুই দফায় আমরা এগিয়ে ছিলাম, পরের দুই দফা তারা ভোট ডাকাতি করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটিতে আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে। সম্প্রতি পৌর নির্বাচনে তারা কিভাবে সিল মেরেছে, সবাই দেখেছে। ব্যালট পেপার পাওয়া গেছে কেন্দ্রের বাইরে। সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। ভোটারদের ভয় দেখিয়েছে। আমরা সেনা মোতায়েনের দাবি করেছিলাম, তা মানা হয়নি। জনপ্রিয়তা দেখানোর জন্য সরকার এসব করেছে।
খালেদা জিয়া বলেন, জনপ্রিয়তা দেখানোর জন্য নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত।
খালেদা জিয়া বলেন, অনেকে বলেন, ২০১৪ সালে বিএনপি কেন নির্বাচনে গেল না। আমরা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চেয়েছিলাম। অথচ এই দাবিতে আওয়ামী লীগ ১৯৯৫ সালে বহু জ্বালাও পোড়া করেছে। ১৭৩ দিন হরতাল করেছে। আমরা সংবিধান সংশোধন করে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা করেছিলাম। ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকতে চাইলে আমরা ২০০১ সালে সংবিধান পরিবর্তন করতে পারতাম। কিন্তু ক্ষমতালোভী নই বলে করিনি। অথচ এই সরকার ২০০৮ সালে কারচুপির নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে গায়ের জোরে সংবিধান পরিবর্তন করেছে।
গণতন্ত্র না থাকলে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটে মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের সাথে জঙ্গীদের সম্পর্ক রয়েছে। জঙ্গি বাংলা ভাই, আব্দুর রহমানদের তারা ধরেনি। তাদের সময় উদীচী, রমনার বটমূলে জঙ্গি হামলা হয়েছে। জঙ্গিবাদের কথা বলে তারা এতোদিন বিদেশিদের ভয় দেখিয়েছে, নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ বলেছে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই জঙ্গিবাদের উত্থান হয়। মসজিদ, মন্দির গীর্জায় হামলা হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, জঙ্গিবাদ আওয়ামী লীগের তৈরি। তারা কিছু দিন পর পর নেশাগ্রস্ত লোকদের ধরে আনে, তারপর তাদের আটকে রেখে খেতে দেয় না, শুকিয়ে গেলে, দাড়ি বড় হলে সবার সামনে এনে জঙ্গি ধরা হয়েছে বলে চালিয়ে দেয়।
খালেদা জিয়া বলেন, জঙ্গিবাদ নয়, আমরা বলতে চাই যারাই এর সাথে জড়িত হবে তাদের কঠোরহস্তে দমন করা হবে। শুধু তাই নয়, অন্য দেশকে হামলা করার জন্য বাংলাদেশের মাটি আমরা ব্যবহার করতে দেব না।
সম্প্রতি গুলশানে ইটালির নাগরিকসহ কয়েকজন বিদেশি হত্যাকারীদের কেন ধরা হচ্ছে না জানতে চান খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, ইটালির নাগরিক হত্যার সময় কেন বিদ্যুৎ বন্ধ ছিল, কেন সিসিটিভি বন্ধ ছিল, জানতে চাই। এসবের জবাব কেবল হাসিনার কাছে আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। শেখ হাসিনার হাত রক্তে রঞ্জিত মন্তব্য করে খালেদা জিয়া বলেন, বিডিআর হত্যাকান্ডের সাথে শেখ হাসিনা ও তৎকালীন সেনা প্রধান মঈন জড়িত।
খালেদা জিয়া বলেন, বিরোধী দলকে ধ্বংস করা এখন এই সরকারের একমাত্র কাজ। গ্রেফতার, নির্যাতন, গুম, খুন চলছেই। এসব বন্ধ না করলে পরিণতি করুণ ও ভয়াবহ বলে হুশিয়ারি দেন বিএনপি প্রধান।
তিনি বলেন, খুন গুম করে জোরজবরদস্তি যে রাজতন্ত্র কায়েম করেছেন, তা ভালো ফল বয়ে আনবে না। রাজতন্ত্র বন্ধ করুন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশ্যে খালেদা জিয়া বলেন, আপনাদের দিয়ে অন্যায় কাজ করানো হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করুন। আমরা একসাথে থাকতে চাই। সকল ধর্মের মানুষ একসাথে থাকলে সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে পারবো।
সরকার কথায় কথায় বিরোধী দলকে ফাঁদে ফেলতে আইন করছে বলে উল্লেখ করেন বিএনপি প্রধান।
সরকার দেশকে ফোকলা করে দিচ্ছে উল্লেখ করে খালেদা জিয়া বলেন, দেশে কেউ শান্তিতে নেই। কয়েকটি ফ্লাইওভার করলেই উন্নয়ন হয় না। দ্রব্যমুল্য সন্ত্রাস দারিদ্রতা বাড়ছে। লুটপাট চলছে। সম্পদ বিদেশে পাচার করা হচ্ছে। বড় প্রজেক্ট নেয়া হচ্ছে বড় লুটপাটের জন্য। কৃষকরা ভালো নেই। ধানের ন্যায্যমূল্য তারা পাচ্ছে না। কৃষি উপকরণের দাম বাড়ছে। শিল্প কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। পাট, গার্মেন্ট, আবাসন শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংক লুটপাট করা হচ্ছে। শেয়ার মার্কেটের কতো লোক পথে বসেছে। কুইক রেন্টালের নামে লুটপাট চলছে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে ছাত্রলীগ-গুন্ডালীগদের রাজত্ব। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বহিরাগতদের বের করে দেয়ার আহবান জানান।
নতুন পে স্কেলের মাধ্যমে বিভিন্ন সার্ভিসের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, শিক্ষকদের কোনো অবহেলা, অপমান করা যাবে না। তাদের দাবি মেনে নেয়ার আহবান জানান তিনি।
খালেদা জিয়া বলেন, আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, বৈষম্য সৃষ্টির জন্য নয়, ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশ এগিয়ে নেয়ার জন্য।
বিশ্ববাজারে দাম কমলেও জ্বালানি তেলের দাম কেন কমানো হচ্ছে না জানতে চান খালেদা জিয়া। তিনি গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম কমানোর দাবি জানান।
জাতীয় প্রেসক্লাব দখল করা হয়েছে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, বহু সাংবাদিক আজ বেকার। সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের কোনো বিচার হচ্ছে না। টকশো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। মাহমুদুর রহমানকে জেলে রাখা হয়েছে অন্যায়ভাবে। মাহমুদুর রহমান মান্নারও মুক্তি দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশে কোন মানবাধিকার নেই। আন্তর্জাতিক সংস্থা এ বিষয়ে বারবার কথা বললেও সরকারের কানে বাতাস ঢুকছে না। এমন সময় ঢুকবে যখন সময় থাকবে না।
তিনি বলেন, দেশে মহিলাদের উপর এখন নির্যাতন চলছে। পুলিশ পর্যন্ত তাদের গায়ে হাত উঠাচ্ছে। এসব আওয়ামী লীগের অভ্যাস। মতিয়া চৌধুরীর কথা উল্লেখ করে তিনি এসময় বলেন, পুলিশ বাধা দিলে মতিয়া চৌধুরী রাস্তায় শুয়ে পরতো। ধরলে হাতে কামড় দিতো।
পুলিশ প্রশাসনের উদ্দেশ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্যায় আদেশ আপনারা মানবেন না। জুলুম করবেন না। সিভিল প্রশাসনকে বলেন, আমরা কারো চাকরি খাবো না। মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী পদন্নোতি হবে।
খালেদা জিয়া বলেন, জ্বালাও পোড়াও নয়। সত্যিকার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে চাই। সকলকে শান্তিপূর্ণভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কর্মসূচি এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তিনি ছাত্রসমাজকে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান। যেমনটা তারা সোচ্চার হয়েছিলেন ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনের সময়।
তিনি বলেন, বিএনপি সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। জালেম এই সরকারের বিদায় হবে। গণতন্ত্র ফিরে আসবে।
সমাবেশ উপলক্ষে বেলা ১২টা থেকেই নয়া পল্টন কার্যালয় অভিমুখে হাজার মানুষের ঢল নামে। জনসভাটি বিকালে পরিণত হয় জনসমুদ্রে। ফকিরেরপুল মোড় থেকে কাকরাইলের নাইটেঙ্গল রেঁস্তোরা পর্যন্ত জনসভা পরিসীমা মহানগর পুলিশ বেঁধে দিলেও বিকাল তিনটায় এটি পূর্বে আরামবাগ এবং পশ্চিমে কাকরাইল মোড়, বিজয়নগর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়।
জনসভার মঞ্চের চারিদিকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের পাশাশাশি ‘নিখোঁজ’ নেতা ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলম, কারাগারে বন্দি অবস্থায় মারা যাওয়া নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু, মামলার কারণে আত্মগোপনে থাকা মির্জা আব্বাস ও হাবিবউন নবী খান সোহেল, কারাবন্দি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ ও ছাত্র দল সভাপতি রাজিব আহসানের প্রতিকৃতি সম্বলিত পোস্টার টানানো হয়।
গণতন্ত্র হত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। আরো বক্তব্য রাখেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ড. আব্দুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আব্দুল্লাহ আল নোমান, বেগম সেলিমা রহমান, মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদিন, যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, যুব বিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ, মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাস, মুক্তিযোদ্ধা দলের ইশতিয়াক আজিজ উলফাৎ, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইন, মহিলা দলের শিরিন সুলতানা, ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আবুল বাশার, আবু সাঈদ খোকন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মুনির হোসেন, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান প্রমুখ।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু ও সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন।
সভামঞ্চে কেন্দ্রীয় ও অঙ্গ সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- মীর মোহাম্মাদ নাছির, আহমেদ আজম খান, আব্দুল মান্নান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, আ ন হ আক্তার হোসেন, খায়রুল কবির খোকন, নূরে আরা সাফা, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, আব্দুল লতিফ জনি, আসাদুল করিম শাহীন, শামীমুর রহমান শামীম, তাইফুল ইসলাম টিপু, শফিউল বারী বাবু, হাবিবুর রহমান হাবিব, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, সাইফুল আলম নীরব, আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, শহিদুল ইসলাম বাবুলম, রফিক শিকদার, ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন, আক্তারুজ্জামান বাচ্চু, জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে বহুদলীয় রাজনীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্র উদ্ধার করেছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। অথচ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকাসের শাসনামলে গণতন্ত্র পুরোপুরি নিহত এবং কারাগারে রুদ্ধ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি একতরফা এবং ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে।
তিনি বলেন, সরকার বিএনপি এবং খালেদা জিয়াকে যত ভয় পায়। এ জন্য তাকে বের হতে এবং জনসভা করতে দিতে চায় না।
বিগত আন্দোলনে বিএনপির ওপর নির্যাতনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ১ বছরে তাদের নিহত হয়েছেন ৪৪০ জন, গুম এবং নিখোঁজ রয়েছেন ২৬৭ জন এবং আহত ও পঙ্গু হয়েছে ৩৩৭ জন নেতাকর্মী। এ ছাড়া কারাগারে বন্দি রয়েছেন অসংখ্য নেতাকর্মী। দেশের ক্রান্তিলগ্নে নেতাকর্মী সহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে শরিক হওয়ার আহ্বান জানান বিনএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে ভীতি কেন? by আমীর খসরু

আইন যেখানে শাসন করে না সেখানে কোনো শাসন ব্যবস্থার অস্তিত্ব থাকে না  এ্যারিস্টেটল (পলিটিকস্ ৪:৪) গণতন্ত্র কোনো খণ্ডিত বিষয় নয়, এটি পুরোপুরিভাবেই একটি শাসন ব্যবস্থা। শুধুমাত্র একটি অংশ বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে গণতন্ত্র পুরোটা কায়েম হয়ে যাবে এমনটা কখনই হয় না। কিংবা মনের গভীরে স্বৈরতন্ত্র লালন করে উপরে উপরে গণতন্ত্র বলে জিকির করলেও গণতন্ত্র কায়েম হয়ে গেছে এমনটি মনে করারও কোনো যুক্তিগ্রাহ্য উপায় বা ক্ষেত্র নেই। শাসন ব্যবস্থায় জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে গেলে তাই গণতন্ত্রের সবটুকুই বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, শাসক শ্রেণী সব সময়ই সূক্ষ্মভাবে অথবা স্থুলভাবে, নানা কৌশলে গণতন্ত্র এবং নির্বাচনকে একাকার ও সমার্থক বানিয়ে ফেলেছে। নির্বাচন গণতন্ত্র বাস্তবায়নে প্রথম ধাপ মাত্র। এ কারণে বর্তমানের অনেক দেশেই রাষ্ট্রটি গণতান্ত্রিক বলে শাসকদের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও বা এমনটা আপাত প্রতীয়মান হলেও আসলে ওই রাষ্ট্রটি বা রাষ্ট্রসমূহ পূর্ণ মাত্রার গণতান্ত্রিক নয়। প্রতিনিধিত্বশীল শাসনে নির্বাচনকেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উত্থান এ কারণেই সংকটের সৃষ্টি করেছে। সংকটটি এখানে যে, প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থায় অধিকাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্বশীলতা পুরো মাত্রায় নিশ্চিত করে না। তবে এ ব্যবস্থাটির একটি ভালো দিক হচ্ছে অন্তত নির্দিষ্ট সময়ান্তে জনগণ তার ভোটের অধিকারকে প্রয়োগের মধ্য দিয়ে নিদেনপক্ষে না বলার ক্ষমতাটুকু রাখে।
তারপরেও আমাদের মতো দেশে যাদের পূর্ণ মাত্রার গণতন্ত্র বিদ্যমান থাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য নেই, রয়েছে নির্বাচনের ইতিহাস ও স্মৃতি  তাদের জন্য অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন একেবারে কম কথা নয়। অন্তত মন্দের ভালো খুঁজে ফেরার একটা সুযোগ তৈরি হয় মাঝে মাঝে। তাও এখন নির্ভর করছে শাসকদের উপরে।
বেসামরিক কিংবা সামরিক শাসনামলে বাংলাদেশের নির্বাচনী গণতন্ত্রের ইতিহাস সুখকর তো নয়ই, বরং খুবই বেদনার, কষ্টের এবং নিদারুণ যন্ত্রণার। বেদনা, কষ্ট এবং যন্ত্রণার কারণ হচ্ছে সংবিধানে ভোটাধিকারের কথা লিপিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে হয় এর অনুপস্থিতি অথবা ভোট লুণ্ঠন। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টির আগের ইতিহাস যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাওয়া যাবে, পাকিস্তান আমলে নির্বাচনের ইতিহাস যাই বা রয়েছে তাও ১৯৫৪ সালের নির্বাচনেই। ১৯৭০-এর নির্বাচনটি একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হলেও এ কথাটি বলতেই হবে যে, ওই নির্বাচনটি যতোটা না ছিল নির্বাচন তার চেয়েও ঢের বেশি ছিল মানুষের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির একটি হাতিয়ার। ওই সময় এই নির্বাচনী বিষয়টিকে মানুষ ভিন্ন দৃষ্টিতেই দেখছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতাপ্রাপ্তির অতি স্বল্পকালেই শাসকদের মনোজগৎ অতীতের আচ্ছন্নতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ১৯৭৩-এর নির্বাচনে ভোট কারচুপি, নির্বাচনের ফলাফল বদলের ধারাটির সূত্রপাত। যার পুনরাবৃত্তি পরবর্তীকালে ঘটেছে নব্বইয়ের স্বৈরাচারী এরশাদের পতন পর্যন্ত।
এদেশের মানুষের গণতন্ত্র প্রাপ্তি এবং এর সুফল ভোগ করার ইতিহাস না থাকলেও, এক্ষেত্রে বড় বড় হোঁচট খেয়ে কোমর ভাঙার ইতিহাস রয়েছে বেশুমার। ১৯৭৩ থেকে অসংখ্যবার এসব হোঁচটের ঘটনা ঘটেছে। এসব হোঁচটের ঘটনা ঘটেছে সামরিক শাসনামলে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট কিংবা বেসামরিক শাসনামলের ভোটারবিহীন একদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে। অথচ মুক্তিযুদ্ধের মর্মার্থ ছিল এর বিপরীত। স্বাধীনতার আগে মানুষের মনে, চিন্তা-চেতনায় অসংখ্য আকাক্সক্ষার জন্ম নিয়েছিল, প্রত্যাশার জাল তারা বুনতে শুরু করেছিলেন দেশটি হবে পূর্ণমাত্রার গণতন্ত্র চর্চার এবং প্রাপ্তির, এই আকাক্সক্ষাটিই ছিল সবচেয়ে উজ্জ্বলতম।
এরপরে দীর্ঘ বিরতি। ১৯৯০-এর পরেও জনগণের মনে আবার সেই প্রত্যাশার বুনন এবং বীজ বপনের উৎসব শুরু হয়। তবে এবারেও পূর্ণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না এসে তার স্থান দখল করে নির্বাচনী গণতন্ত্র। এতেও মানুষ খুশি ছিল। ১৯৯১ থেকে নির্বাচনী গণতন্ত্র কিছুটা সচল হলেও সজীব, সতেজ, ফলবান এবং দীর্ঘজীবী হতে পারেনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে। আবারও হোঁচট খেতে শুরু করে মানুষ। কতো আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আর যাতনা সহ্য করা যায়। তারপরেও মানুষের নিরন্তর প্রত্যাশার বীজ বপন বন্ধ হয়নি, তারা ক্ষান্ত দেননি, আশাবাদ পরিত্যাগ করেননি।
১৯৯০-এর পরে যে নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু হয়েছিল তাতে ঘুণ ধরতে বেশি সময় লাগেনি। একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, একটি দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে ওই ’৯০-এর পরেই। দ্বিদলীয় ব্যবস্থা ভালো সেই সমাজের জন্য যেখানে কি-না গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটি সুদৃঢ়। কিন্তু বাংলাদেশে হয়েছে এর উল্টোটি। দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে এখানে দ্বিদলীয় ব্যবস্থাটি অনেকটা জাতিগত সংঘাতের মতোই রূপ নিয়েছে। অনেকেই বলে থাকেন যে, বাংলাদেশের রাজনীতি রুয়ান্ডার হুতু এবং টুটসিদের জাতিগত সংঘাতের মতোই হয়ে পড়েছে। দুর্বল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পন্ন সমাজ অগণতান্ত্রিক শক্তিকে উত্থানের পথ সুগম করে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতা দখলে উদ্বুদ্ধ করে।
বিএনপি’র ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করলে এ কথাটি স্পষ্ট হয় যে, ওই সময়কালের শাসনে ক্ষমতাসীন বিএনপির ভেতরে জন্ম নেয় ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র। ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্রই যেখানে শক্তিশালী হওয়ার কথা সেখানে ওই অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র পুরো শাসন ব্যবস্থায় চূড়ান্ত পর্যায়ে ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টিও উত্থাপিত হয়। ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্রের যৌথ তত্ত্বাবধানে ধর্মীয় উগ্রবাদী শক্তিকেও মদত দেয়া হয়েছে। অপারেশন ক্লিনহার্টসহ নানা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতে থাকে।
বিএনপির শাসনামলে ১৯৯৬ সালের ২০শে মার্চ ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলেও ২০০১-২০০৬ সময়কালে তাদের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রচেষ্টাটি এমন ছিল যে, ওই ব্যবস্থার প্রতি তারা আর আস্থাশীল থাকতে পারেনি ক্ষমতার অসীম লিপ্সার কারণে। ২০০৬ সালে এসে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটি নিয়ে এমন কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়, যা বিশাল রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়। ওই সময়কালের দু’দলের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির কারণেই সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পথকে উন্মুক্ত করে। ওই সময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এমন ছিল যে, প্রধান দুই দল পারস্পরিকভাবে নিজেদের মধ্যে কেউ ক্ষমতায় না এসে তৃতীয় কোনো পক্ষ ক্ষমতায় আসুক এমনটাই মনে-প্রাণে চেয়েছে। এখানে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন, ওই সময়কালে যে রক্তক্ষয়ী পালটাপালটি লড়াই-সংগ্রাম হয়েছে রাজপথে তা পরবর্তীকালের সম্ভাবনাময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে সুদূর পরাহত করেছে। বিএনপির বিরুদ্ধে ১৯৯৬-এ একটি ভোটারবিহীন এবং প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টিও রয়েছে। তবে বিএনপি বলছে, ওই নির্বাচনটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজনের জন্য সংবিধান সংশোধনী আনার লক্ষ্যে।
১৯৯০’র পরে মানুষের পুঞ্জীভূত আশাভঙ্গের যে বেদনা তাকে অবৈধ পুঁজি করে জনআকাক্সক্ষাকে বাদ দিয়ে দু’বছরের জন্য সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। কিন্তু ওই যে মানুষের আকাক্সক্ষার কমতি নেই, প্রত্যাশার যে ঘাটতি নেই, সে সম্বলে বলিয়ান মানুষ অগণতান্ত্রিক শাসনকে ‘না’ বলে দিয়ে পুনর্বার গণতান্ত্রিক শাসনের প্রত্যাশা করেছে, কামনা করেছে পূর্ণ একটি গণতান্ত্রিক সমাজের। মানুষ ধারণা করেছিল, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। ২০০৮-এর নির্বাচনটিতে এ কারণেই প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে আগের তুলনায় অনেক অনেক গুণে বেশি আশাবাদের কথা শোনাতে হয়েছে, জানান দিতে হয়েছে নানা অঙ্গীকারের। কিন্তু সাধারণ মানুষ বুঝতেও পারেনি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হোঁচট খাওয়ার সময়কালে তারা প্রবেশ করছে।
২০০৯-এর শাসন ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই এই দফায় ক্ষমতাসীনরা দুটো কারণে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকারগুলোকে প্রথম দিন থেকেই অগ্রাহ্য, অস্বীকার করতে শুরু করে। এর একটি কারণ বহির্দেশীয় সম্পর্ক উন্নয়ন এবং দ্বিতীয় কারণ ক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে আঁকড়ে থাকার অদম্য বাসনা। এ কারণে তারা প্রথমদিন থেকেই একদিকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, হত্যাসহ এ জাতীয় নানা কর্মকা- বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভিন্ন আরেকটি বিষয় তারা বাস্তবায়ন করতে শুরু করে। আর এটি হচ্ছে, বিরোধী দল, মত, পথ, পক্ষ ও ব্যক্তিবর্গকে নির্মূল ও নিশ্চিহ্ন করার যাবতীয় প্রচেষ্টা গ্রহণ করা। রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহণের প্রচেষ্টাটি শুরু হয় ক্ষমতা গ্রহণের পরমুহূর্ত থেকেই। আর এটা করা হয়েছে পরিকল্পনামাফিক এবং এখনও তা চলছে। বলা প্রয়োজন যে, এখানেই ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সময়কালের সঙ্গে বর্তমান আওয়ামী লীগ শাসনামলের পার্থক্য। আর অমিল ও পার্থক্যটি যোজন যোজন দূরত্বের হলেও এটাই হচ্ছে বাস্তবতা।
আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই চায় না প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের অপেক্ষা করতে এবং জনগণের রায়ের উপরে নির্ভরশীল হতে। এ কারণেই বর্তমানে নানা কর্মকাণ্ড চলছে। এ কাজগুলো যে একদিনে ঘটেছে বা ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটানো হয়েছে তা নয়, পরিকল্পনামাফিক তারা অগ্রসর হয়েছে  এটি জনঅঙ্গীকার ও জনআকাংক্ষাকে অগ্রাহ্য করা হোক কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, অপহরণ, খুন, কথিত গণপিটুনিসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডই হোক। দেশের রাজনৈতিক প্রথা-প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতিসহ সামগ্রিকভাবে সমাজের সর্বক্ষেত্রে কি কি ক্ষতি হয়েছে তা আর বিচার-বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না।
তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকে যে ভয়ের চোখে দেখে তার প্রমাণ এই সময়কালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো  এসব নির্বাচন জাতীয় হোক কিংবা স্থানীয় পর্যায়েরই হোক। ২০১৪’র ৫ই জানুয়ারির ভোটারহীন, নজিরবিহীন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এর চূড়ান্ত সূচনা। আগেই বলা হয়েছে আওয়ামী লীগ সূক্ষ্মভাবে এবং কৌশলে এ কাজটি করেছে।
এ কথাটি সবারই মনে থাকার কথা যে, ক্ষমতা গ্রহণের স্বল্পকালের মধ্যেই আওয়ামী লীগ ১৯৭২-এর মূল সংবিধানে ফিরে যাবে বলে বেশ জোরেশোরে প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিল। তাদের দল ও দলের বাইরের বিবেকহীন বুদ্ধিজীবী শ্রেণীও একই সুরে গান গাইতে থাকে। ২০১১’র ৩০শে জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয় বিভিন্ন পক্ষের আপত্তি সত্ত্বেও। কিন্তু ’৭২-এর সংবিধানে তারা ফিরে না গিয়ে বেশকিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়ে তাদের মনের একান্ত বাসনাটি তারা পূরণ করে ফেলে। আর তা হচ্ছে  তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকে বাতিল করে দেয়া। এই সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২-এর মূল সংবিধানের সঙ্গে বৈপরীত্যমূলক ও সাংঘর্ষিক যে সব বিধান আনা হয়েছে সে সব বিষয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয় বিধায় তা আলোচনা করা হলো না।
অথচ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের তীব্র আন্দোলনের কারণেই সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংযুক্ত করা হয়েছিল। জনগণ এর প্রতি সমর্থনও জানিয়েছিল। বর্তমানেও এর প্রতি সমর্থন আছে বলে আন্দাজ করা যায়। ২০১৩ সালের মে মাসে প্রথম আলো’র উদ্যোগে ওআরজি-কোয়েস্ট পরিচালিত জনমত জরিপে দেখা যায় যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চান ৯০ শতাংশ মানুষ। একই বছরের ১০ই অক্টোবর প্রকাশিত অপর এক জরিপে দেখা গেছে, শতকরা ৮২ শতাংশ মানুষ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চাচ্ছে। পরবর্তীকালের জরিপগুলোতেও সাধারণ মানুষের একই আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে বলে দেখা যায়।
২০১৪’র ৫ই জানুয়ারি দেশি এবং ভারত বাদে অপরাপর বিদেশি বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর পরামর্শ, অনুরোধ উপেক্ষা করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয়। এ নির্বাচনের পরিকল্পনাটি যে হুট করে নেয়া হয়নি তা আগেই বলা হয়েছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনটির আগে জাতিসংঘ বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোসহ বিদেশিরা সমঝোতার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। দেশের বিশিষ্টজনরাসহ সবাই চেয়েছিলেন সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। ২০১৩’র ১০ই অক্টোবর প্রথম আলো এক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল, ৭৩ শতাংশ মানুষ শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, সমঝোতা না হলে দেশে নৈরাজ্য শুরু হবে।
কিন্তু ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পরে যতো সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, এমন কি সদ্য অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনকেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে সেই একই ধারায়। এই ধারাকে শক্তিশালীকরণে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকেও করা হয়েছে দলীয় মনোনয়ন এবং প্রতীকনির্ভর।
কিন্তু নির্বাচনকে প্রত্যাখ্যান, অগ্রাহ্য বা অস্বীকার করার কারণ কি সে বিষয়টি সংক্ষেপে বিশ্লেষণ করা জরুরি। নির্বাচনে অনাস্থা ও অবিশ্বাস স্থাপনের কারণগুলো হচ্ছে  শাসকদের মনোজগতে যখন এই বিশ্বাস দৃঢ় ও বদ্ধমূল হয় যে, জনগণের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, আশা-আকাক্সক্ষা মুখ্য নয়, তাদের সর্বময় কর্তৃত্ব বিস্তারই মুখ্য তখন এ ধরনের ঘটনাবলী ঘটে থাকে।
গণতন্ত্র কোনো খ-িত বিষয় যেমন নয়, তেমনি এ শাসন ব্যবস্থাকে শাসকদের লালন-পালন ও পরিচর্যা করতে হয় পরম মমতায় এবং সার্বক্ষণিকভাবে। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী শাসকদের মনোস্তত্ত্ব হচ্ছে, এক এবং এককের শাসনই মুখ্য। এখানে জনগণ মুখ্য নয়, প্রধান বিষয় হচ্ছে ক্ষমতা। তবে এই মনোস্তত্ত্ব ভিন্ন কারণ যেমন, ভীতি থেকেও সৃষ্টি হতে পারে। শাসকদের এই মনোস্তাত্ত্বিক ও মনোজগতের বিষয়-আশয় তাকে ক্রমাগত বিচ্ছিন্ন করে ফেলে জনগণ থেকে। আর যতোই বিচ্ছিন্নতা বাড়বে ততোই নিজকে ছাড়িয়েও ভীতির সংস্কৃতিটি সমাজে বিস্তারিত হবে। জনগণের জীবনমান এবং উন্নয়নের কথা বলা হলেও এতে জনবিচ্ছিন্নতা যেমন কাটে না, তেমনি ভীতিও দূর হয় না। বরং ভীতির সংস্কৃতি সৃষ্টি করে নানা অনিবার্য সংকটের। এই সংকট থেকে জন্ম নেয় ভারসাম্যহীনতা। ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করে রাজনৈতিক শূন্যতা। এটি চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। এই দুষ্ট চক্রের মধ্যে পড়ে গেলে তা থেকে বের হওয়া খুবই কঠিন। ব্যক্তি যতোই জনবিচ্ছিন্ন হবে ততোই তাকে বেছে নিতে হবে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার লক্ষ্যে নানা পথ এবং পন্থা  তা যতো ভয়ঙ্করই হোক না কেন। এ এক ভয়ঙ্কর পথ। তারপরেও আশাবাদ রইলো নির্বাচনী আতঙ্ক কেটে যাবে, উন্মুক্ত হবে গণতন্ত্রের পথ। আর এটাই হচ্ছে ওই ভয়ঙ্কর পথ থেকে ফিরে আসার একমাত্র উপায়। (আমীর খসরু, সম্পাদক, আমাদের বুধবার ডটকম)।

নিজের নগ্ন ছবি বিক্রি করে গ্রেপ্তার কিশোরী

কারণ কি দারিদ্র? না, স্রেফ পকেট মানি জোগাড়ের তাগিদ? কারণ নিয়ে এখনও ধন্দে পুলিশ। মিশিগানের কিশোরীর কাণ্ড দেখে পুলিশেরই তাক লেগে গিয়েছে।
অনলাইনে নিজের নগ্ন ছবি বিক্রি করেছিল সে। পুলিশ জেনেছে, বছর পনেরোর ওই কিশোরী ধরা পড়ার আগে হাজার ডলারেরও বেশি আয় করে ফেলেছিল। একটি ওয়েব অ্যাপের মাধ্যমে অন্তত কুড়িটি লেনদেন করেছে সে। ছদ্মনাম নিয়েছিল ‘‘ইয়োর ফেভারিট বানবান’’।
নিজের ছবি দিয়ে ‘‘সেলিং স্টাফ’’ লিখে বিজ্ঞাপন দিত ওই কিশোরী। পুরুষরা যোগাযোগ করলে বলে দিত, অর্থের বিনিময়ে নগ্ন ছবি এবং ভিডিও পাঠাবে সে। পাঠাত ভিডিও ক্লিপিংসও। ইন্টারনেটের মাধ্যমে চলে আসত অর্থ। তবে কোথাও এই কিশোরী নিজের মুখ দেখাত না।

সর্বস্তরে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন by মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ

আমি ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধারপর্ব নিয়ে কিছু বলব। ইতিমধ্যে অবশ্য আমাদের প্রতিষ্ঠান ও সরকারি পর্যায় থেকে ভূমিকম্প-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য যেসব যন্ত্রপাতি দরকার, সেগুলো ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসকে ইতিমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ৬০-৬৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি কিনে দেয়া হয়েছে। আরও ১৬৫ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি পাইপ লাইনে আছে।
কমিউনিটি ভলান্টিয়ারও তৈরি করা হয়েছে ৩০ হাজার। ডিভিশন ওয়াইজ ফায়ার সার্ভিসের টিম গঠন করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে জরুরি যা, তা হল ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রশিক্ষণ। এ প্রশিক্ষণ হতে হবে ব্যাপক। আমরা ইতিমধ্যে স্কুল পর্যায়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। কলেজ পর্যায়েও ট্রেনিং দেয়া হচ্ছে। আমি মনে করি, সমাজের প্রতিটি স্তরে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। সিটি কর্পোরেশনগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে যদি পর্যাপ্ত ভলান্টিয়ার এবং তাদের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণ থাকে, তাহলে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সহজ হয়ে পড়বে।
আমি মনে করি, কমিউনিটি ভলান্টিয়ারদের গ্রাউন্ড লেভেলে প্র্যাকটিসের যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। এককথায়, সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে যদি সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ থাকে, তাহলে পরিস্থিতি মোকাবেলায় কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যেমন ধরা যাক, ভূমিকম্পের ফলে যে ধ্বংসস্তূপ দেখা দেবে, রাস্তাঘাটসহ সর্বত্র সেই ধ্বংসস্তূপ প্রাথমিকভাবে কে সরাবে? কমিউনিটির লোকজনকেই প্রাথমিক কাজটা করতে হবে। সুতরাং তাদের প্রশিক্ষণের দরকার আছে অবশ্যই।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্যতম শর্ত হচ্ছে ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোড মেনে চলা। ফায়ার সার্ভিস, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের ভবন অধিকতর শক্তপোক্তভাবে নির্মাণ করা দরকার। ভূমিকম্প বিষয়ে মিডিয়া ক্যাম্পেইনেরও প্রয়োজন রয়েছে।
মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ : পরিচালক, ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স

ভূমিকম্পের বিপদ ও আমাদের প্রস্তুতি by ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল

গতকাল ভোররাতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল দেশ। এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ভারতের মণিপুর রাজ্যে বলে জানা গেছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৭। এ ঘটনা আবারও আমাদের স্মরণ করিয়ে দিল, দেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। কতটা ঝুঁকিতে আছে বাংলাদেশ, এ বিষয়েই আজ আলোচনা করব। ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার শুরুতে এর আপদ ও বিপদ সম্পর্কে আলোচনা করা শ্রেয়। কারণ এ দুটি বিষয়ের সমন্বিত ফলাফলই হল ঝুঁকি।
ভূমিকম্পের আপদ (Hazard): দু’ধরনের ভূতাত্ত্বিক কাঠামোতে বেশিরভাগ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। একটি ভূতাত্ত্বিক ফাটল রেখা, অন্যটি ভূতাত্ত্বিক প্লেট বাউন্ডারি। বাংলাদেশের উত্তরে নেপাল-ভুটানের দক্ষিণ সীমান্তে পূর্ব-পশ্চিমে ২৭০০ কিলোমিটার বিস্তৃত ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেট বাউন্ডারি, যেখানে নেপাল সেগমেন্টে গত ২৫ এপ্রিল ও ১২ মে বিধ্বংসী ভূমিকম্প হয়েছে। ১৯৩৪ সালেও এ প্লেট বাউন্ডারিতে ৮.২ মাত্রার নেপাল-বিহার ভূমিকম্প হয়েছিল। এ প্লেট বাউন্ডারির ভুটান সেগমেন্টে দীর্ঘ সময় কোনো বড় ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়নি। তাই ভুটান সেগমেন্টে ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্প হওয়ার আশংকা রয়েছে। এ সেগমেন্টটি সিলেট-ময়মনসিংহ সীমান্ত থেকে ২০০ কিলোমিটার উত্তরে; কিন্তু রংপুর-দিনাজপুর থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে। ওই সেগমেন্টে ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষতির আশংকা আছে। ইন্ডিয়ান-ইউরেশিয়ান প্লেট বাউন্ডারির দক্ষিণে ভারতের শিলিং মালভূমি তথা মেঘালয় রাজ্য অবস্থিত। মেঘালয়ের দক্ষিণে সিলেট অঞ্চলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বরাবর উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত ২৭০ কিলোমিটার লম্বালম্বি অত্যন্ত সক্রিয় একটি ফাটল রেখা আছে, যা ডাউকি ফাটল বলে পরিচিত। এ ফাটল রেখা ৮ মাত্রারও বেশি ভূমিকম্প সৃষ্টির ক্ষমতা রাখে।
বাংলাদেশের পূর্ব প্রান্তে ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ প্লেট বাউন্ডারি। এ বাউন্ডারিটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত টেকনাফ থেকে উত্তরে আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। ওই প্লেট বাউন্ডারির পশ্চিম প্রান্তে বাংলাদেশ সীমানার ভেতরে কয়েকটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক ফাটল রেখা আছে। যেগুলো অতীতে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম-মিয়ানমার উপকূলে উত্তর-দক্ষিণে প্রলম্বিত রাখাইন ফাটল রেখা বেশ সক্রিয়। এ ফাটলে দুটি পরস্পর সংঘটিত ভূমিকম্পের মধ্যবর্তী সময়কাল (রেফারেন্স পিরিয়ড) ৩০০-৯০০ বছর। ১৭৬২ সালে রাখাইন ফাটল সর্বশেষ বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। সেই হিসাবে এ ফাটল রেখাটি যে কোনো সময় বড় ভূমিকম্পের জন্ম দিতে পারে। ওই প্লেট বাউন্ডারির ত্রিপুরা সেগমেন্ট দীর্ঘ সময় বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি করেনি। তাই এ সেগমেন্টটিও পরবর্তী যে কোনো সময় বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে।
ডাউকি ফাটল রেখায় পরস্পর সংঘটিত দুটি ভূমিকম্পের মধ্যবর্তী সময়কাল ৩৫০ বছর। ১৮৯৭ সালে এ ফাটল রেখায় সর্বশেষ বড় ভূমিকম্প হয়। তাই পরবর্তী ৮ মাত্রার ভূমিকম্প হতে আরও প্রায় ২৩০ বছর সময় লাগবে। কিন্তু ডাউকি ফাটল রেখার পূর্বাংশ বেশি সক্রিয়। এ অংশ যে কোনো সময় মাঝারি থেকে শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে পারে। দেশের মধ্যবর্তী মধুপুর ফাটল রেখা সর্বশেষ ১৮৮৫ সালে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প জন্ম দেয়। এ ফাটল রেখায় পরবর্তী ভূমিকম্প হতেও অনেক দিন বাকি।
চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা পাহাড়ি অঞ্চলে ২০-৬০ কিলোমিটার লম্বা প্রায় ১৩টি ফাটল রেখা আছে। এ ফাটল রেখাগুলোর দুটি ১৮২২ ও ১৯১৮ সালে শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্ম দিয়েছে। এ ধরনের ভূমিকম্পকে ভাসমান ভূমিকম্প বলে। যে কোনো সময় এ ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। এ ফাটল রেখাগুলোকে কেন্দ্র করে ৬.৬-৭.২ মাত্রার ভূমিকম্প যে কোনো সময় হওয়ার আশংকা আছে। এ ধরনের ভাসমান ভূমিকম্পের রেকারেন্স পিরিয়ড ১০০ বছর।
অবকাঠামোর বিপদাপন্নতা (Vulnerability) : দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ দুর্যোগঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। ১৯৫৪ সালে ঢাকা শহরের আয়তন ছিল ৩৬ বর্গকিলোমিটার। ২০১০ সালে তা ২৬০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ ৫৬ বছরে ৭ গুণেরও বেশি বেড়েছে শহর এলাকা। ১৯৭১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১২ লাখ, এখন তা দেড় কোটি। ৪৫ বছরে জনসংখ্যা বেড়েছে সাড়ে ১২ গুণ। বাকি বড় শহরগুলোর অবস্থাও অনেকটা একই রকম। নগরমুখী জনসংখ্যার গড় বৃদ্ধির অনুপাতে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশের বেশি মানুষ হবে নগরবাসী। এসব এলাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত বাড়ছে। এতে নগরীর দুর্যোগ বিপদাপন্নতাও বাড়ছে। আমাদের অবকাঠামো ভূমি ব্যবহার নীতিমালা অনুযায়ী দুর্যোগ সহনীয় করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। উপরন্তু দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস সন্নিবেশিত ভূমি ব্যবহার মানচিত্রও আমাদের নেই।
অবকাঠামোর বিপদাপন্নতা বলতে দালান-কোঠাসহ শহরের গ্যাস, ইলেকট্রিসিটি, পানি ও রাস্তাঘাটের গুণগত অবস্থাকে বোঝানো হয়। সাধারণত Masonry দালান (ইট-সুরকির দালান), Soft storey (নিচতলা খালি ও পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত), Heavy overhang দালান (উপরের তলা অপরিকল্পিভাবে ভারি করে তৈরি করা) এবং Short Column দালান ভূমিকম্পে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ২০০৯-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকায় ১৪০ হাজার Masonry building রয়েছে। ৯০ হাজার Soft storey, ৬৯ হাজার Heavy overhang, ৫৮ হাজার Short colum দালান ঢাকায় আছে। চট্টগ্রাম ও সিলেটের চিত্র অনেকটা একই রকম। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে প্রায় ২৩শ’ কিলোমিটার রাস্তা আছে। যার মধ্যে ৭৬ শতাংশের প্রশস্ততা কম হওয়ায় ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি যাতায়াতের যোগ্য নয়। এর মধ্যে ৫১ শতাংশের বেশি রাস্তা বেশ দুর্বল মাটিতে তৈরি করা হয়েছে। গ্যাস লাইনের অবকাঠামোও বেশ দুর্বল। ঢাকায় ৫৬ শতাংশ গ্যাস লাইন দুর্বল liquefiable মাটিতে টানা হয়েছে। পানির লাইনের ক্ষেত্রেও তাই।
উপরন্তু বর্তমান নগরায়ণ হচ্ছে নরম মাটিতে। ঢাকার ক্ষেত্রে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, টঙ্গীখাল ও বালু নদের মাঝে ৩০৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার ৬৫ শতাংশ এলাকার মাটি নরম। সাধারণত নরম মাটিতে ভূমিকম্প তরঙ্গের স্থায়িত্বকাল বেশি এবং নরম মাটি তরঙ্গের বিশেষ অংশের শক্তি বাড়িয়ে দেয়। তাই নরম মাটিতে গড়ে ওঠা স্থাপনার ঝুঁকিও বেশি। অন্যদিকে পুরান ঢাকায় দালানকোঠার বয়স বেশি হওয়ায় সেগুলোও ঝুঁকিতে আছে। অন্যান্য শহরের চিত্রও কমবেশি একই রকম। তাই আপদ ও বিপদের বিচারে বাংলাদেশের শহরগুলো ভূমিকম্পের তীব্র ঝুঁকিতে আছে।
অবকাঠামোগুলোর এ বিপদাপন্ন অবস্থায় এবং শক্তিশালী ভূমিকম্প আপদের সম্ভাবনার কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ছাড়াও দেশের অন্যান্য শহর যেমন- ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর ও রাজশাহীরও ঝুঁকি কম নয়।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মধুপুর ফাটল রেখায় ৭.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে ঢাকার ৭২ হাজার বিল্ডিং সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে, যা ঢাকার দালান-কোঠার প্রায় ২৩ শতাংশ। রাখাইন ফাটল রেখায় ৮.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে চট্টগ্রামে ১ লাখ ৪২ হাজার বিল্ডিং ভেঙে পড়তে পারে, যা চট্টগ্রামের দালান-কোঠার প্রায় ৯০ শতাংশ। ডাউকি ফাটল রেখায় ৮.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হলে সিলেটে ৪১ হাজার দালান-কোঠা ভেঙে পড়তে পারে, যা সিলেটের দালান-কোঠার প্রায় ৭৯ শতাংশ।
প্রস্তুতি : কাঠামোগত বিপদাপন্নতা ভূমিকম্প দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিল্ডিং কোডের সঠিক ব্যবহার এ দুর্যোগের ঝুঁকি প্রশমন করে। ১৯৯৩ সালে বিল্ডিং কোড প্রণীত হয়। ২০০৬ সালে গেজেটভুক্ত হয়। বর্তমানে এ কোড আবার pdated-এর পথে। যদিও ঢাকায় রাজউককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে কোড বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু দেশব্যাপী একই কোড বাস্তবায়নের কোনো নীতিমালা নেই। তাই এখনই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সংস্থা গঠনের।
ভূমিকম্প ঝুঁকি হ্রাসের জন্য প্রয়োজন আপদপ্রবণ শহরগুলোর ঝুঁকি সন্নিবেশিত ভূমি ব্যবহার মানচিত্র প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। Urban Developments Directorate (UDD) ময়মনসিংহ শহর নিয়ে এ কাজটি শুরু করেছে। প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও আইন প্রণয়ন করে কাজটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া জরুরি।
Command and Coordination, উদ্ধার-অনুসন্ধান ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর অবকাঠামোগুলো ভূমিকম্পের তীব্রতার বিপরীতে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। চঁনষরপ Public Works Department (PWD) ইতিমধ্যে জাইকার সহযোগিতায় এ বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ পেয়েছে। এখন দ্রুতগতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো retrofitting করার কাজে হাত দেয়া প্রয়োজন। জরুরি সাড়া প্রদানকারী ১৩টি সংস্থার জন্য Scenario-ভিত্তিক Contingency পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজন সেগুলো বাস্তবায়ন করা এবং নিয়মিত মহড়া দিয়ে পরিকল্পনাকে সতেজ রাখা।
Fire Service & Civil Defense, Armed force Division এবং City Corporation-এর জন্য সরকার ইতিপূর্বে ৬৯ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ক্রয় করেছে। আরও ১৫৯ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ক্রয় করার পথে। উদ্ধার ও অনুসন্ধান কাজের জন্য বাংলাদেশ-উপযোগী ক্ষুদ্র ও মাঝারি যন্ত্রপাতি ক্রয় করাকে এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে।
৩০ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে ইতিমধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় অনুসন্ধান, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আরও ৩২ হাজারকে একই প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সরকারি অর্থায়নে Urban Disaster Preparedness Volunteer কার্যক্রমকে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
School Safety & Evacuation drill চালু করার জন্য ঈউগচ উদ্যোগ নিয়েছে। ১০০ স্কুলে drill করার যন্ত্রাংশ দেয়া হয়েছে। এ rill নিয়মিতভাবে দেশব্যাপী কার্যকর করার উদ্যোগ অবিলম্বে নিতে হবে। এর মধ্য দিয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভূমিকম্প দুর্যোগ বিষয়ে সচেতন হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বন্যা ও সাইক্লোন দুর্যোগের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। সুদীর্ঘ সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প দেশটিতে হানা না দেয়ার কারণে এ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের সক্ষমতা সীমিত। তবে ইতিমধ্যে এ দুর্যোগের ঝুঁকি প্রশমনের জন্য সঠিক পদ্ধতিতে এডহক-ভিত্তিক বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এখন প্রয়োজন এ কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়ন করা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন ২০১২-এর বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা সম্ভব।
অধ্যাপক ড. এএসএম মাকসুদ কামাল : চেয়ারম্যান, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

দেশে ঝুঁকির শীর্ষে ঢাকা by ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার

সোমবার ভোর ৫টা ৫ মিনিটে ৬.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প হয়ে গেল (উৎপত্তিস্থল ভারতের মণিপুর), তা বাংলাদেশের সবাই কমবেশি অনুভব করেছে এবং যেহেতু এটা ভোরবেলায় সংঘটিত হয়েছে, তাই এ কম্পনের ফলে ঘুম ভেঙে আতংকিত হয়ে অনেকেই বাড়ির বাইরে চলে আসে। এর ফলে বেশকিছু হতাহতের খবর পাওয়া যায়। তিনজনের মৃত্যু ও অর্ধশতাধিক আহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সিলেট ও ঢাকা অঞ্চলের কিছু বিল্ডিংয়েও ফাটল দেখা দিয়েছে।
এই ৬.৭ মাত্রার যে ভূমিকম্প, তা ভারত ও বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে ৩৫ কিলোমিটার গভীরতায় সংঘটিত হয়। আমাদের গবেষণায় এ প্লেট বাউন্ডারিতে গত ১০০০ বছরে উল্লেখযোগ্য বড় ভূমিকম্প হয়নি। ফলে ভূ-অভ্যন্তরে প্রচুর পরিমাণে শক্তি সঞ্চিত হয়ে রয়েছে। তারই খুব সামান্য অংশ সোমবার ভোরে ছেড়ে দিয়েছে প্রকৃতি। বেশিরভাগ শক্তি এখনও সঞ্চিত রয়েছে। আমাদের জন্য এটা এক বড় বিপদের কথা। যে কোনো সময় এই শক্তি ৮ মাত্রার অধিক ভূকম্পন ঘটাতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) গবেষণার উপাত্ত থেকে দেখতে পাই, এই দুটো প্লেট প্রতি ১০০ বছরে দেড় মিটার করে সংকুচিত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ বছরে এ অঞ্চলের ভূ-অভ্যন্তরের শিলারাশির মধ্যে দেড় মিটারের চ্যুতি সংঘটন করার মতো শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। যেহেতু গত ১০০০ বছরে বড় ভূমিকম্প হয়নি, তাই এ অঞ্চলে ১৫ মিটার চ্যুতি ঘটানোর মতো শক্তি সঞ্চিত হয়ে রয়েছে, যা ৮ মাত্রার অধিক ভূকম্পন সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে ঢাকার উত্তরে মেঘালয় ও বাংলাদেশের সীমান্তরেখা বরাবর ৩৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত ডাউকি ফল্টের অবস্থান। এই ডাউকি ফল্টের পশ্চিম প্রান্তে গত ৩০০ বছরে ৮ মাত্রার বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প সংঘটিত হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৮৯৭ সালে ৮.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, যা গ্রেট ইন্ডিয়ান আর্থকোয়াক নামে পরিচিত। তারও আগে ১৭৮৭ সালে ওই অঞ্চলে আরেকটা বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়, যা ওই অঞ্চলের ভূ-পৃষ্ঠের ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে এবং ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। এই ডাউকি ফল্টের পূর্ব প্রান্তে অর্থাৎ সিলেট অঞ্চলে গত ৫০০-৭০০ বছরে উল্লেখযোগ্য বড় ভূমিকম্প হয়নি। অর্থাৎ এ অঞ্চলে বড় ধরনের শক্তি ভূ-অভ্যন্তরে সঞ্চিত হয়ে রয়েছে। এই ডাউকি ফল্টে প্রতি ১০০ বছরে এক মিটার চ্যুতি ঘটানোর শক্তি সঞ্চয় হচ্ছে। এখানে যে পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত রয়েছে, তাতে ৫ থেকে ৭ মিটার চ্যুতি ঘটানোর মতো শক্তি এখানে রয়েছে এবং যে কোনো সময় তা ৮ মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে পারে।
অর্থাৎ আমরা গবেষণায় যা দেখতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের সিলেট অঞ্চলের ডাউকি ফল্ট ও পূর্বে ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চলের প্লেট বাউন্ডারি ফল্টে ভূমিকম্প আমাদের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে। যে কোনো সময় বড় আকারের ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে, যার পূর্বাভাস গত সোমবার ভোরের ভূমিকম্প।
আমাদের গ্যাস-ফিল্ডগুলো সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী অঞ্চলে অবস্থিত। আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজারসহ ভারি শিল্প-কারখানার অবস্থানও এখানে। ফলে এ অঞ্চলে ভূমিকম্প হলে এসব শিল্প-কারখানা, গ্যাস ফিল্ড ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিরই বিপদ ডেকে আনবে। অন্যদিকে জনবহুল ঢাকা অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকির প্রশ্নে শীর্ষে অবস্থান করছে এ নগরী। বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়তো কল্পনারও অতীত হবে।
সুতরাং এখনই সরকার ও সব বেসরকারি সংস্থার-প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে জানমালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসার।
প্রফেসর সৈয়দ হুমায়ুন আখতার : চেয়ারম্যান, স্ট্রাকচারাল জিওলজি অ্যান্ড সিসমোলজি, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় ঐক্যই স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ by ড. মাহবুব উল্লাহ্

বাংলাদেশে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কথাটি কার্যত রাজনৈতিক বুলিতে পরিণত হয়েছে। অথচ এই চেতনার তাৎপর্য অনেক গভীর। এটা নিছক অন্তঃসারশূন্য বুলি হতে পারে না। কিংবা রাজনীতিতে দ্বিমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারও হতে পারে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা, বাংলাদেশের স্বাধীন ও সার্বভৌম অস্তিত্ব নিশ্চিত করা এবং বিশ্বের জাতিগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মর্যাদা সমুন্নত রাখা। মনে রাখতে হবে, ১৯৭১ সালে এদেশের কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষ, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তসহ সব শ্রেণীর মানুষ অস্ত্র হাতে জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল অন্য কোনো রাষ্ট্র বা দেশের তাঁবেদারি করার জন্য নয় এবং কারও প্রতি নতজানু থাকার জন্য নয়। এ প্রসঙ্গে আমাদের স্বাধীন অস্তিত্ব নিরূপণের কষ্টিপাথরটি হল ভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে জাতীয় স্বার্থকে কতটা যত্নশীলতার সঙ্গে আমরা সংরক্ষণ করছি? মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্য দিকগুলো হল, মানবিক মর্যাদা রক্ষায় আমরা কতটা মনোযোগী, মানুষে মানুষে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য নিরসনে আমরা কতটা আন্তরিক। তবে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সমুন্নত রাখতে না পারলে অন্য বিষয়গুলো অনেকটাই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। ইংল্যান্ডের একসময়কার প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোন বলেছিলেন, জাতিগুলোর কোনো চিরন্তন বন্ধু নেই, যা আছে তা হল চিরন্তন স্বার্থ। এই স্বার্থের নিরিখেই একটি দেশ তার বন্ধু বা মিত্র বিবেচনা করে এবং এ কারণেই অন্য কোনো দেশ হয়ে উঠতে পারে অ-বন্ধু কিংবা শত্রু।
একটি রাষ্ট্র যখন স্বাধীনভাবে দাঁড়ায় তখন সে অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এ বিচারে প্রত্যেকটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে পৃথক সত্তা নিয়ে দাঁড়ায়। এমনকি যদি কোনো রাষ্ট্র অপর একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তির বন্ধনে জড়ায় তাহলেও সে রাষ্ট্রকে প্রতি মুহূর্তে মিত্র রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির ধারা ও এর ব্যাখ্যা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে হয়। এটুকু না করলে স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে।
দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশ শ্রীলংকা ও নেপাল সাম্প্রতিককালে তাদের সার্বভৌম সত্তা বজায় রাখার জন্য কী অবস্থান নিয়েছে তা বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রণিধানযোগ্য, যদিও বাংলাদেশ জনসংখ্যাসহ প্রায় সব দিক থেকেই এ দুটি দেশের চেয়ে বড়।
শ্রীলংকায় সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লৌহমানব বলে পরিচিত রাজাপাকসে তারই দলের একসময়ের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সিরিসেনার সঙ্গে পরাজিত হন। সিরিসেনা রাজাপাকসের অধীনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। রাজাপাকসের আমলে শ্রীলংকায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পায়। তার কারণও ছিল। চীন তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধে শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় সরকারকে মূল্যবান সমর্থন জোগায়। চীনের এই সহযোগিতা অন্যান্য ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হয়। চীন হাম্বান টোটায় একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে শ্রীলংকার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। শ্রীলংকার নিকটতম প্রতিবেশী ভারত এতে খুব বিচলিত বোধ করে। বলা যায়, রুষ্ট হয়। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কলকাঠি নাড়তে শুরু করে রাজাপাকসেকে নির্বাচনে পরাস্ত করার জন্য। ‘র’ রাজাপাকসের প্রতি অসন্তুষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীকে জড়ো করতে সক্ষম হয়। রাজাপাকসে তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত যুদ্ধে জয়ী হলে তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় এবং জাত্যাভিমান থেকে নিঃসৃত অহংবোধ রাজাপাকসেকে প্রায় ঈশ্বরতুল্য করে তোলে। তিনি স্বজনপ্রীতিতেও জড়িয়ে পড়েন। এসব কারণে তার জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়ে। এসব সত্ত্বেও নির্বাচনে তার পরাজয় হবে এমনটি ভাবা যায়নি। নির্বাচনে রাজাপাকসে ব্যক্তিগতভাবে জয়লাভ করলেও তার দল পরাজিত হয়। রাজাপাকসে যখন টের পেলেন ‘র’ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে ততক্ষণে পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। তার আর কিছুই করার ছিল না। নতুন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার সরকার চীনের সঙ্গে মাখামাখি একেবারেই কমিয়ে দিল। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের প্রকল্পটি স্থগিত হয়ে গেল। চীনের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিল। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় হতে থাকল।
সম্প্রতি শ্রীলংকা ভারতের উদ্যোগে প্রণীত ভারত ও শ্রীলংকাকে সংযুক্ত করার জন্য পক্ প্রণালীর ওপর দিকে সেতু নির্মাণের প্রকল্প থেকে সরে এসেছে। সরকারটি মনের দিক থেকে ভারতঘেঁষা হওয়া সত্ত্বেও এবং ভারতের কলকাঠি নাড়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা সত্ত্বেও বলা যায় এক রকম বাধ্য হয়েই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ শ্রীলংকার জাতীয়তাবাদীরা এই সেতু নির্মাণের বিরুদ্ধে। তারা মনে করে, এই সেতু নির্মিত হলে বানের জলের মতো ভারতীয়রা শ্রীলংকায় প্রবেশ করবে এবং শ্রীলংকার ওপর কর্তৃত্ব করবে। ভারত ও শ্রীলংকা উভয়ই এই সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। হঠাৎ করে শ্রীলংকা সরকারের ‘অ্যাবাউট টার্ন’ দিল্লিকে বিস্মিত করে। এক সপ্তাহেরও কিছু বেশি সময় আগে ভারতের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক সংক্রান্ত মন্ত্রী নিতিন গাডকারী ভারতীয় পার্লামেন্টে বলেছিলেন, সেতুটির নির্মাণ কাজ সহসাই এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় হতে যাচ্ছে। তিনি জানান, এই সেতু নির্মাণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক পুরো ব্যয়ের ৫.১৯ বিলিয়ন ডলারই সহায়তা হিসেবে দেবে। ঠিক এর দু’দিন পর শ্রীলংকার মহাসড়ক বিষয়কমন্ত্রী লক্সমন কিরিয়েলা অস্বীকার করে বসলেন, শ্রীলংকান সরকার এ ব্যাপারে জড়িত নয়। এর ফলে গাডকারী বিস্মিত হন এবং ভারত সরকার অস্বস্তিতে পড়ে। অথচ শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী রণিল বিক্রম সিংহে ২০০২ সালে ভারতের কাছে সড়কের পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন। এই প্রকল্পের ফলে ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু তামিলনাড়ুর ধানুসকড়ির সঙ্গে শ্রীলংকার তালাইমানারকে সংযুক্ত করত। বলা হয়েছিল- এই সেতু দু’দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং দু’দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকরা এমন একটি সংযোগ সড়কের কথা ভেবেছিল, কিন্তু কখনোই বাস্তবায়ন করেনি। শ্রীলংকার প্রধানমন্ত্রী রণিল বিক্রম সিংহে দিল্লি সফরের সময় ২০০৯ সালে আবারও একই প্রস্তাব তুলে ধরেন। ভারত তখন এ ব্যাপারে খুব আগ্রহ দেখায়নি। ভারতের প্রস্তাব ছিল পক্ প্রণালীর অগভীর অংশগুলো জাহাজ চলাচলের জন্য উপযোগী করতে ড্রেজিং করা। এর ফলে ভারতীয় অভ্যন্তরীণ জাহাজগুলো শ্রীলংকা যেতে ৪০০ নটিক্যাল মাইল জলপথ সংকুচিত করতে পারত। কিন্তু ভারত নিজে থেকেই এ প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে। কারণ এর ফলে রামের সেতুর চিহ্ন বিলীন হয়ে যাবে। কারণ হিন্দুরা বিশ্বাস করে ভগবান রাম সীতাকে রাবনের কাছ থেকে উদ্ধার করতে যে সেতু নির্মাণ করেছিলেন এবং যার অবশেষগুলো অগভীর পানির নিচে ছোট ছোট কোরাল দ্বীপ হিসেবে বিরাজ করছে, সেগুলো ড্রেজিংয়ের ফলে বিলীন হয়ে যাবে। সুতরাং ধর্মীয় অনুভূতির বিবেচনায় ড্রেজিং প্রকল্পটি গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সেতু প্রকল্পের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে শ্রীলংকান প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনাও হয়। কিন্তু শ্রীলংকার জাতীয়তাবাদীরা এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে তীব্র সোচ্চার হলে শ্রীলংকার বর্তমান সরকার প্রকল্পটির সঙ্গে কোনো যোগাযোগের বিষয় অস্বীকার করে।
শ্রীলংকা ও ভারতের মধ্যে সেতু যোগাযোগটি হলে দু’দেশের কার কত ভালো কি মন্দ হতো সেই হিসাব-নিকাশ নিয়ে আমরা চুল ছিঁড়তে পারি। অন্যরা কে কী ভাবল সেটা বড় কথা নয়। একটি দেশের বেশিরভাগ মানুষ কী ভাবে, কী দৃষ্টিতে একটি বিষয়কে বিবেচনা করে সেটাই বড় কথা। শ্রীলংকার জনগণ ভারত থেকে আসা লোকের জোয়ারে ডুবে মরার আশংকা করেছে বলেই তারা এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। জনমতের চাপের কাছে ভারতবান্ধব সরকারও নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। নেপালে মাধেসীদের নিয়ে সম্প্রতি নেপালের যে অভিজ্ঞতা হয়েছে সেই অভিজ্ঞতাও শ্রীলংকার জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক জনগণের অবস্থান নির্ণয়ে সাহায্য করেছে।
ভারতের সঙ্গে সেতু যোগাযোগের প্রকল্পটির যখন এই অবস্থা তখন শ্রীলংকার অর্থমন্ত্রী রবি করুন নায়েক সম্প্রতি বলেছেন, ‘আমরা বন্দরনগরী প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সব ছাড়পত্র দিয়েছি। এখন বিনিয়োগকারীরা খুঁটিনাটি দিকগুলো পরিষ্কার করবে।’ এই সংক্রান্ত সংবাদ হংকং থেকে প্রকাশিত প্রভাবশালী দৈনিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’-এ প্রকাশিত হয়েছে। বিনিয়োগকারী চীনা কোম্পানির কর্মকর্তারা বলেছেন, আগামী ফেব্র“য়ারিতেই খুঁটিনাটি দিকগুলো পরীক্ষার পর বন্দরনগরী নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এর আগে রাজাপাকসের আমলে চীনা সাবমেরিন পানি ও খাবার-দাবারের জন্য শ্রীলংকার বন্দরে এসেছিল। এতে ভারত খুবই অসন্তুষ্ট হয়। তারাই পরিণতিতে নির্বাচনকে ঘিরে ‘র’-এর কলকাঠি নাড়া। কিন্তু ঘড়ির কাঁটাটি ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে এসেছে। সব দিক বিবেচনা করেই হয়তো সিরিসেনার সরকার চীনের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার পথে এগোচ্ছে। একটি দেশের সরকার তার জনগণকে ক্ষেপিয়ে তুলে পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যে নিতে পারে না সেটি শ্রীলংকা কাহিনীতে স্পষ্ট হল। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দেশের বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত এসব দেশের জনগণের মনে আস্থা সৃষ্টি করতে পারেনি সেটা আবারও প্রমাণিত হল।
নেপালে ভারতের অবরোধ শিথিলের কোনো সম্ভাবনা না দেখে নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী কমল থাপা গত ২৩-২৮ ডিসেম্বর চীন সফর করেছেন। চীন বলেছে, নেপালের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং ভূখণ্ডগত সংহতি রক্ষায় চীন নেপালের পাশে দাঁড়াবে। এই আশ্বাস দিয়েছেন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট লি ইউওয়ান চাও। চীন নেপালের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ, জ্বালানি উৎপাদন ক্ষমতা, দুর্যোগ-উত্তর পুনর্গঠন, পর্যটন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে পারস্পরিক সুবিধা ও উভয়পক্ষের জন্য বিজয় সূচক ফলাফলের ভিত্তিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী থাপা ৭টি বিষয়ে একমত হয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন। এগুলো হল :
১. চীনের সঙ্গে সীমান্তে ট্রানজিট বাণিজ্যের জন্য আরও পয়েন্ট খোলা; ২. চীন থেকে পেট্রোলিয়াম রফতানির জন্য একটি স্থায়ী ব্যবস্থা। ৩. চীনের বন্দর ব্যবহারের একটি ট্রানজিট চুক্তি। ৪. বাণিজ্য বৃদ্ধি। ৫. দুর্যোগ-উত্তর পুনর্গঠন শুরু করা এবং এর জন্য নেপালের গৃহীত প্রকল্পে চীনের ৫০০ মিলিয়ন ডলার সাহায্য। ৬. মহাসড়ক মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৪০ মিলিয়ন ডলার চীনা অনুদান এবং ৭. নেপালে চীনা পর্যটকদের জন্য ভিসা তুলে দেয়া।
বোঝাই যাচ্ছে নেপালের গণতন্ত্র নির্মাণের পথে ভারতের খবরদারি বুমেরাং হয়ে গেছে। নেপাল প্রমাণ করেছে দুঃসময়ে সে বন্ধু খুঁজে নিতে পারে। নেপালের রাজনৈতিক দল এবং জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে, ভারতের রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছে। শেষ বিচারে জনগণের ঐক্যই একটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ।
ড. মাহবুব উল্লাহ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক

সব জয় জয় নয়, সব পরাজয় পরাজয় নয় by বিমল সরকার

সব জয় জয় নয়। সব পরাজয়ও পরাজয় নয়। এমন অনেক জয় আছে যা কিনা পরাজয়েরই শামিল, এমনকি পরাজয়ের চেয়েও গ্লানিকর। আবার এমনও পরাজয় আছে যা জয়ের চেয়েও অধিকতর আনন্দ ও স্বস্তিদায়ক। এজন্যই বোধকরি কবি বলেছেন, ‘... একচ্ছত্র জয় নেই নেই কোনো জয়ী/বিজয়ী বিজিত কভু বিজিত বিজয়ী।’ আজ থেকে আনুমানিক দুই দশক আগে প্রখ্যাত সাংবাদিক প্রয়াত সন্তোষ গুপ্ত তৎকালীন বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক ‘সংবাদে’ অনিরুদ্ধ ছদ্মনামে তার নিয়মিত লেখা কলামের শিরোনাম দিয়েছিলেন ‘বর্তমান ইতিহাসের শেষ মিছিল নয়।’ শ্রদ্ধাভাজন সন্তোষদার লেখার শিরোনামটির কথা আমার প্রায়ই মনে পড়ে। যে কোনো উপায়ে বিজয়ী হতে হবে কিংবা নিজেকে বিজয়ী করতে হবে এ প্রবণতা যে মানুষের জীবনে কত দুঃখ-দুর্দশা, অস্বস্তি-অশান্তি এবং বিড়ম্বনার কারণ তা বোধকরি সমাজবিজ্ঞানীরাও সহজে বলে শেষ করতে পারবেন না। বিজয়ের আনন্দ বরাবরই ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু অস্বস্তির যাতনা কি মন থেকে ইচ্ছা করলেই সরানো যায়, নাকি সরে? উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী কিশোর কুমারের গাওয়া গানটির কথা এ মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে- গায়ের জোরে সবই কিছু কেড়ে নেয়া যায়। পয়সা-কড়ি, গয়নাগাঁটি; কিন্তু ভালবাসা?
মহাসমারোহে, বলতে গেলে ধুমধামের সঙ্গেই ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দেশব্যাপী ২৩৪টি পৌরসভা নির্বাচন। অবশ্য শুরুটা যেভাবে হয়েছিল শেষটা তেমন হয়নি। সুষ্ঠু, সুশৃংখল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সহিংসতা, আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ, জাল-জালিয়াতি এসব কিছুও হয়েছে কম-বেশি। সারা দেশেই সংঘটিত কিছু কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নির্বাচনকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মেয়র, সংরক্ষিত (মহিলা) কাউন্সিলর এবং সাধারণ কাউন্সিলর প্রত্যেকটি পদের বিপরীতে দুইজন, তিন-চারজন, পাঁচ-ছয়জন, এমনকি পৌরসভা কিংবা ওয়ার্ড বিশেষে আরও বেশি সংখ্যক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। প্রায় মাসব্যাপী চালানো প্রচার-প্রচারণা, সভা-সমাবেশ এবং মিছিল-স্লোগান কোনো কিছুরই কমতি ছিল না নির্বাচনে। পৌর নির্বাচন ঘিরে উৎসাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে আবেগ-উত্তেজনা ছিল না একথা বলা যাবে না। তা সত্ত্বেও স্বাভাবিকভাবেই বেশিরভাগ প্রার্থীকে পরাজয়কেই বরণ করে নিতে হয়েছে। অনেক পৌরসভায় সুন্দর, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব স্থানে পরাজিত সব প্রার্থী নির্বাচনের ফলাফল এবং নিজেদের পরাজয়কে সহজে মেনে নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন বলে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু যেখানে জোরজবরদস্তি, জাল-জালিয়াতি, অনিয়ম, অব্যবস্থা এবং কৌশল করে প্রার্থীকে হারানো হয়েছে তারা সেটাকে মেনে নেবেন এটি কী করে আশা করা যায় বিপত্তির বড় কারণ সেখানেই। এখানে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি নেই। দলীয় আর বিদ্রোহীতেও ব্যবধান নেই। যে যেখানে পেরেছেন, ‘কাজ’ সেরে নিয়েছেন। প্রশাসন এবং আইনশৃংখলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা সবাই সমান দক্ষ, সাহসী, সৎ ও দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত নন। তাদের দুর্বলতার ফাঁক দিয়ে এ সুযোগটি মতলববাজরা গ্রহণ করেছেন। এতকিছুর পরও মোটামুটি ভালোয় ভালোয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এটাই বড় কথা। অন্যান্য নির্বাচনের মতো বুধবার অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো সহিংসতা ঘটেনি।
দেশে প্রথমবারের মতো এবার পৌরসভার মেয়র পদটিকে আইনগতভাবে দলীয়করণ করা হল। রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন এবং প্রতীক নিয়ে এবার মেয়র প্রার্থীদের লড়তে হয়েছে। মাঠে লড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও। এক একজন প্রার্থী দলের মনোনয়ন ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচনযুদ্ধে বিজয়ী হয়ে দলের ভাবমূর্তি যেমন উজ্জ্বল করেছেন, পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী দলীয় প্রার্থীর কাছে গো-হারা হেরে সবার কাছে সম্মানহানিও ঘটিয়েছেন। কেবল প্রার্থী নয়, দলগুলোর ভাবমূর্তিরও মোটামুটি বিচার হয়ে গেছে নির্বাচনী জনআদালতে। আর মনোনীত প্রার্থী যেমন-তেমন, বড় দল দুটি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যে শিক্ষা পেয়েছে এ নির্বাচন থেকে তা-ও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। দলের মনোনীত নয়, বরং বিদ্রোহী ও দল থেকে বহিষ্কৃত প্রার্থী কতল করেছে প্রতিপক্ষীয় প্রার্থীর দম্ভ! বেশ কয়েকটি পৌরসভায় উভয় দলের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটেছে। দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান চরম অন্তর্বিরোধ, মনোনয়ন দেয়ার বেলায় জেদ, তৃণমূল নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্ব, কোনো কোনো কেন্দ্রীয় নেতার অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত এবং স্বার্থপরতাই প্রধানত এসব কিছুর জন্য দায়ী। বিদ্রোহী প্রার্থীদের এহেন সাফল্যকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ তো নেই-ই, উপরন্তু এতে বড় দলগুলোর ভেতরকার অন্তঃসারশূন্যতার চিত্রটিই সর্বসমক্ষে নতুন করে ফুটে উঠেছে।
যে করেই হোক, পৌর নির্বাচন হয়ে গেছে। আরও নির্বাচন বাকি আছে। যিনি আজ হেরে গেছেন, হেরে একেবারে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বলে ভাবছেন; একবার চিন্তা করুন তো, আপনি যদি বিজয়ী হতেন তাহলে প্রতিপক্ষের কী অবস্থা হতো। আপনার আস্ফালনে বিজিত পক্ষ সারাক্ষণ তটস্থ থাকত না কি? অতএব বিজয়ী ও বিজিত আসুন সবাই এবার আমরা সামনের দিকে তাকাই। পরস্পরের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি, মামলা-মোকদ্দমা এবং প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবণতা পরিহার করি। আবারও বলি, সব আনন্দ আনন্দ নয়। সব জয় জয় নয়। ক্ষমতা যেমন কারোরই চিরস্থায়ী কিছু নয়, তেমনি মনে রাখতে হবে বর্তমানও ইতিহাসের শেষ মিছিল নয়। সদ্যসমাপ্ত পৌর নির্বাচন থেকে আশা করি সরকার, নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলসহ প্রত্যেকেই নতুন করে শিক্ষালাভ করে ভবিষ্যতে সুন্দর, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে তা কাজে লাগাবেন। যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রত্যেকেরই মেরুদণ্ড শক্ত রাখা উচিত। বর্তমান মন্ত্রিসভায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম একজনই। তার বাবা মুক্তিযুদ্ধকালীন দেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর বলে বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম দেশের উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। সৈয়দ নজরুল ইসলামের সংসদীয় আসন ১৬৬ ময়মনসিংহ ২৮ (কিশোরগঞ্জ সদর) শূন্য হলে এ আসনে ২০ এপ্রিল, ১৯৭৫ যথারীতি উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী তিনজন প্রার্থীর একজন ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছোট ভাই সৈয়দ ওয়াহিদুল ইসলাম পট্টু মিয়া। উপনির্বাচনে পট্টু মিয়ার অংশগ্রহণের আগ্রহ ব্যক্ত করাটাই সৈয়দ নজরুলের জন্য ছিল এক বিড়ম্বনার কারণ। নানাভাবে তিনি চেষ্টা করেন তাকে নির্বাচন থেকে বিরত রাখতে। কিন্তু অতি উৎসাহী কিছু নেতাকর্মীর তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত তিনি সফলকাম হতে পারেননি। সুন্দর, সুষ্ঠু ও সুশৃংখল পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। ফলাফল ঘোষণার সময় দেখা যায়, কাস্ট হওয়া বৈধ মোট ২৮ হাজার ৮২টি ভোটের মধ্যে ওয়াহিদুল ইসলাম পট্টু মিয়া ৪০২ ভোট কম পেয়ে আশরাফউদ্দিন মাস্টারের কাছে হেরে যান। আশরাফউদ্দিন পান ১২ হাজার ৭২ ভোট আর পট্টু মিয়া পান ১১ হাজার ৬৭০ ভোট। তৃতীয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বাক্সে পড়ে বাকি ৪ হাজার ৩৪০ ভোট। মহকুমা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গেই নির্বাচনের ফলাফলটি ঘোষণা করেন। কোনোরূপ গোলযোগ হয়নি কোথাও।
এর চার বছর পর ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. এম ওসমান গণি। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে গড়া দল বিএনপি সারা দেশে ২০৭টি আসনে জয়লাভ করলেও কিশোরগঞ্জ-৩ আসনে ড. ওসমান গণি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় প্রার্থীদের বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয়মুকুট ধারণ করেন। এক্ষেত্রেও কোথাও কোনো গোলযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের আমলে অনুষ্ঠিত দুটি পৃথক নির্বাচন সবার জন্যই অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে।
বিমল সরকার : সহকারী অধ্যাপক

পারিবারিক দ্বন্দ্বের নির্মম বলি, শৈলকুপায় তিন শিশুকে পুড়িয়ে হত্যা by আজাদ রহমান

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া
তিন শিশুর দুজন সাফিন ও আমিনের মা শিউলী খাতুনের
মাতম, তাঁদের বাড়ি থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
ঘরের ভেতরে আগুনে পুড়ছে শিশুরা। আর তাদের বাঁচাতে বাইরে স্থানীয় লোকজনের আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু শক্ত দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে পেরিয়ে যায় অনেক সময়। ততক্ষণে পুড়ে মারা গেছে দুই শিশু। আরেক শিশু ভয়াবহ দগ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছে যন্ত্রণায়। উদ্ধার করে ঝিনাইদহ হাসপাতালে নেওয়ার পর সেও মারা যায়।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কবিরপুর মসজিদপাড়া এলাকার গোলাম নবীর বাড়িতে গত রোববার সন্ধ্যায় তিন শিশুকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার এই বিবরণ দিয়েছেন পাশের বাড়ির শাহিনুর রহমান। তিনি বলেন, তিন শিশু যখন পুড়ছিল, তখন বাড়ির আরেক পাশ থেকে ইকবাল হোসেন চিৎকার করে বলছিলেন, ‘সব শেষ করে দিয়েছি।’
পরে ইকবাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় ইকবালকে আসামি করে মামলা করেছেন তাঁর ভাই দেলোয়ার হোসেন। ইকবাল পুলিশকে বলেছেন, ডেকে নেওয়ার পর ঘরে ঢুকিয়ে হাতুড়ি দিয়ে আঘাতের পর শিশু তিনটিকে রশি দিয়ে বাঁধেন। পরে সিলিন্ডারের গ্যাস ছেড়ে আগুন ধরিয়ে দেন। এরপর তিনি বাড়ির ছাদ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ততক্ষণে বাইরে অনেক মানুষ জড়ো হওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
পুলিশ জানায়, গোলাম নবীর দুই ছেলে ইকবাল ও দেলোয়ারের মধ্যে বিবাদ ছিল। এরই জের ধরে বড় ভাই ইকবাল দুই ভাতিজা মোস্তফা সাফিন শিবলু (৭) ও মোস্তফা আমিন (১০) এবং তাদের ফুপাতো ভাই মাহিন হাসানকে (১৩) ঘরে আটকে আগুন ধরিয়ে দেন। মাহিন ওই বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। ঘটনার আগের দিন ইকবাল নিজের স্ত্রীকে দুই সন্তানসহ তাঁর বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেন।
তিনটি শিশুর লাশ গতকাল সোমবার বিকেলে শৈলকুপার মনোহরপুর গ্রামে পাশাপাশি কবরে দাফন করা হয়েছে। এর আগে তাদের জানাজা হয়। রোমহর্ষক ওই হত্যাকাণ্ডের পর কবিরপুর আর মনোহরপুর এলাকায় গতকাল সকাল থেকেই হাজারো মানুষ ভিড় করে হত্যাকারীর বিচার দাবি করে। পাশাপাশি শৈলকুপার সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে হত্যাকারীর শাস্তির দাবিতে শহরে শোক র্যা লি, বিক্ষোভ মিছিল, থানা ঘেরাও ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।
শিশু মাহিনের বাবা রাশেদ আলীর আহাজারি।
তাঁদের বাড়ি থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত দুই শিশুর বাবা দেলোয়ার হোসেন শৈলকুপা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তাঁর বড় ভাই ইকবাল হোসেন থাকতেন সিঙ্গাপুরে। সেখান থেকে টাকা পাঠাতেন বাড়িতে। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। প্রায় ছয় মাস আগে ইকবাল দেশে ফিরে বাবা গোলাম নবীর কাছে গত কয়েক বছরে তাঁর পাঠানো টাকার হিসাব চান। বিষয়টি নিয়ে বাবা ও ছোট ভাই দেলোয়ারের সঙ্গে ইকবালের বিরোধ শুরু হয়। তবে তিন শিশুকে এই পারিবারিক দ্বন্দ্বের নির্মম বলি হতে হবে, এমনটা কেউ আন্দাজ করেননি।
মাহিনের বাবা রাশেদ আলী বলেন, শৈলকুপা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুই দিন আগে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল মাহিন। আর সাফিন ও আমিনকে হারিয়ে দেলোয়ার ও তাঁর স্ত্রী নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।
যশোরে মানববন্ধন: যশোর অফিস জানায়, শৈলকুপায় তিন শিশুকে পুড়িয়ে হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বিকেলে যশোর শহরের চিত্রা মোড়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। ‘আসুন, সবাই শিশুকে বাঁচাই’—এ স্লোগানে শিশু অধিকার সংরক্ষণ কমিটি এ বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। এতে যশোরের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের অন্তত ৫০০ মানুষ অংশ নেন।

কোন পথে ভারত? by আরাফাত হোছাইন বিপ্লব

অতি সম্প্রতি ভারতে বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনা ঘটে গেল। বাড়িতে গরুর মাংস রাখার অভিযোগ তুলে মোহাম্মদ আখলাক নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে আর পাথর ছুড়ে হত্যা করা হয়। উত্তর প্রদেশের দাদরি গ্রামের এ ঘটনায় আহত হন আখলাকের ২২ বছর বয়সী ছেলেও। পরে প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদের ফ্রিজে খাসির গোশত ছিল, গরুর নয়। এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে লিখতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন লেখকরা।
এ ধরনের অসহিষ্ণু অবস্থার প্রতিবাদ জানিয়ে ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার জোয়ার নেমেছে। পুরস্কার ফেরত দেয়ার প্রথম ইচ্ছা প্রকাশ করেন স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর ভাইঝি নয়নতারা সেহগাল। তারপর একে একে এখন পর্যন্ত ২৬ জন বিশিষ্ট সাহিত্যিক অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া কন্নড় সাহিত্য পরিষদের পুরস্কার ফিরিয়ে দেন ছয়জন কন্নড় সাহিত্যিক, বীরান্না মাদিওয়ালার, টি সতীশ জাভারে গৌড়া, সঙ্গমেশ মীনাসিনাকাই, হনুমন্ত হালিগেরি, শ্রীদেবী ভি আলুর এবং চিদানন্দ। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণের প্রতিবাদে অধ্যাপক চন্দ্রশেখর পাতিল ফিরিয়ে দেন কর্নাটক সরকারের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান পদ্ম পুরস্কার। এখন প্রতিদিন বাড়ছে পুরস্কার ও অর্থ ফিরিয়ে দেয়া বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংখ্যা। প্রতিদিন ভারতের সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় শিরোনাম হচ্ছেন তারা। টেলিভিশন চ্যানেলের টকশোতে পাচ্ছেন আমন্ত্রণ। প্রতিবাদ এখন একসুরে। হিন্দি, ইংরেজি, পাঞ্জাবি, কন্নড়, কোঙ্কানি, বাংলা, মৈথিলি, মারাঠি, উর্দুÑ সব ভাষা থেকেই হচ্ছে প্রতিবাদ। ভারতের সেরা প্রতিভারা তাদের পুরস্কার ফিরিয়ে দিচ্ছেন অথবা অ্যাকাডেমি থেকে পদত্যাগ করছেন। এখন পর্যন্ত অ্যাকাডেমির সাধারণ পরিষদের ২০ জন সদস্যের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন চার জন। দাদরি ও মৈনপুরির ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে তাদের।
সর্বপ্রথম সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া নয়নতারা সেহগাল বলেছেন, কোনো ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার পাওয়া যাচ্ছে না। এ ধরনের সন্ত্রাস নিয়ে প্রধানমন্ত্রীও আশ্চর্যজনকভাবে চুপ রয়েছেন। এই সরকার ফ্যাসিবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী। তাদের এই মনোভাবে আমি উদ্বিগ্ন। সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে কবি এবং লেখিকা মন্দাক্রান্তা সেন বললেন, সমাজের সর্বস্তরে যেভাবে সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়ে পড়ছে, তা মোটেই কাম্য নয়। মানুষের পক্ষে কথা বলাটা কবি, লেখক, শিল্পীদের একটা সামাজিক দায়িত্ব। অথচ এ দেশে সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তারা খুন হচ্ছেন। অত্যাচারিত হচ্ছেন। এর জোরালো প্রতিবাদ জানানোটা খুব দরকার বলে অনেক দিন ধরেই মনে করছিলাম। পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এখন নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে। লেখক এবং গবেষক অরবিন্দ মালাগাত্তি বিশিষ্ট কন্নড় যুক্তিবাদী এম এম কালবার্গির হত্যার ঘটনায় সাহিত্য অ্যাকাডেমির চুপ করে থাকার নিন্দা করে সাধারণ পরিষদ থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জানান। পাঞ্জাবি লেখক ভুল্লার বলেন, যেভাবে মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে, তা নিয়ে আমি প্রচণ্ড বিরক্ত। অন্য দিকে, দেশের সম্প্রীতি রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় সরকার কিছুই করছে না বলে মনে করেন প্রখ্যাত পাঞ্জাবি নাট্যকার ঔলাখ। আরেকজন লেখক অমর মিত্র বলেন, দাদরি কাণ্ডের জন্য প্রতিবাদ হওয়া দরকার। কিন্তু পুরস্কার ফিরিয়ে দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। দাদরির ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কেবল বলেছেন, ‘দুঃখজনক এবং অবাঞ্ছিত, তবে কেন্দ্রীয় সরকারের কিছুই করার নেই।’
১০ অক্টোবর সাহিত্য অ্যাকাডেমিকে দেয়া এক চিঠিতে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও কবি সারা জোসেফ বলেন, এই সরকারের সময় মানুষের ভেতর ভয় জাগ্রত হচ্ছে, সঙ্কুচিত হচ্ছে স্বাধীনতা। এর প্রতিবাদে আমি আমার পদক ফিরিয়ে দিলাম। মালায়লাম ভাষায় লেখা তার ‘আলাহায়ুরে পেনকামাল’ উপন্যাসের জন্য ২০০৩ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান তিনি। ৭ অক্টোবর পুরস্কার ফিরিয়ে দেয়া প্রথিতযশা লেখক অশোক বাজপেয়ী দাদরি হত্যাকাণ্ড ও একাধিক বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের পর নরেন্দ্র মোদি সরকারের চুপ থাকার সমালোচনা করেছেন।
সরকারের ভূমিকা রহস্যজনক হলেও রাইসিনা হিলসে ভিন্নমত দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, বহুত্ববাদের সাথে সহাবস্থান আমাদের সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ। তা নষ্ট করে দেয়াকে আমরা প্রশ্রয় দিতে পারি না। ইতিহাস পড়লেই দেখা যাবে, সময়ের সাথে সাথে বহু সভ্যতার পতন ঘটেছে। কিন্তু বহিঃশত্রুর আক্রমণ সত্ত্বেও ভারতীয় সভ্যতার মৌলিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়নি। সেটা মাথায় রেখে চললে ভারতীয় গণতন্ত্রের অগ্রগতি কেউই ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না।
দাদরি হত্যা এবং গরুর গোশত নিয়ে একের পর এক ঘটনায় অস্বস্তি বাড়িয়েছে শাসক দল বিজেপির। কোনো রকম বিতর্কিত মন্তব্য না করতে দলটি তাদের নেতা ও মন্ত্রীদের সতর্ক করেছে। এ প্রসঙ্গে ভারতের প্রখ্যাত কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার লিখেছেন, মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ (আরএসএস) বুঝতে পেরেছে, তারা যদি গরুর মাংস খাওয়ার বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান বজায় রাখে, তাহলে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার অজানা বিপদের মুখে পড়তে পারে। এর ফলে মুসলমানেরা আরো নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়বে। আরএসএস সেটা বুঝতে পেরে মুখ বন্ধ করেছে। বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা এল কে আদভানি বলেছিলেন, বিজেপি হিন্দুদের সমর্থন নিয়ে লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারে, কিন্তু মুসলমানদের সহযোগিতা ছাড়া দেশ পরিচালনা করা কঠিন। তার পরও ব্যাপারটা শুধু কাগজে-কলমে রয়ে গেছে। সংঘ পরিবার মুসলমানদের সমর্থন লাভের ব্যাপারটা যদি সত্যিই তীব্রভাবে অনুভব করত, তাহলে তারা তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিতো। তারা মনে করে, প্রকৃত অর্থে দেশ পরিচালনায় মুসলমানদের ভূমিকা নেই। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার দিকেই লক্ষ করুন, সেখানে শুধু একজন মুসলমান মন্ত্রী রয়েছেন, তা-ও আবার অগুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে।
আনন্দবাজার পত্রিকার নয়া দিল্লি ব্যুরো চিফ প্রবীণ সাংবাদিক জয়ন্ত ঘোষাল লিখেছেন, বিজেপি চাইছে বিতর্কটা হোক। নেহরুর সময় থেকে তৈরি হওয়া এই যে বহুত্ববাদী ভারতীয় জাতীয়তাবাদের নামে সংখ্যালঘু তোষণের বদলে এক বিকল্প হিন্দু জাতীয়তাবাদকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ এসেছে, তাকে এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে বিজেপি এগোতে চাইছে। এই মতাদর্শগত সঙ্ঘাত এবার ভারতকে কোন পথে নিয়ে যাবে, তা নিয়ে আমাদের শঙ্কা আছে। শেষের সেদিন ভয়ঙ্কর কি না, তা আমরা জানি না।
সম্প্রতি ‘ভারতীয় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়ছে’ বলে উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য অ্যাকাডেমিপ্রাপ্ত লেখক-সাহিত্যিকেরা রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন। এ চিঠিতে লেখা হয়েছে, ভারতে হত্যা ও অসহিষ্ণুতার আবহ তৈরি হয়েছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত পড়ছে ক্রমাগত। নিরপরাধ সাধারণ নাগরিক অহেতুক হত্যালীলার শিকার হচ্ছেন। নরেন্দ্র ধাবলকর, গোবিন্দ পানসারে, এম এম কালবার্গির মতো স্বাধীন চিন্তা ও শুভবুদ্ধির উৎস ব্যক্তিত্বরা নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। অথচ প্রশাসনিক অকর্মণ্যতা ও সরকারি ঔদাসীন্য পদে পদে আমাদের মানবিক অধিকার খণ্ডিত করছে।
এত কিছুর পরও থেমে নেই উগ্রপন্থীরা। গরু জবাইয়ের অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা ও ভাঙচুর এবং মুম্বাইতে পাকিস্তানি গায়ক গুলাম আলীর কনসার্ট বাতিলের মতো বিষয়গুলো শেষে শিবসেনারা গত ১২ অক্টোবর কালি মাখিয়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিজেপির সাবেক উপদেষ্টা সুধীন্দ্র কুলকার্নির মুখে। তার দোষ ছিল পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুরশিদ মাহমুদ কাসুরির একটি বই প্রকাশ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন তিনি। এখন প্রশ্নœ হচ্ছেÑ সুধীন্দ্র কুলকার্নির মুখে কালি ছিটিয়ে শিবসেনার কর্মী সমর্থকরা আসলে কাকে কালিমালিপ্ত করেছে? এই ন্যক্কারজনক ঘটনার দ্বারা শিবসেনা সুধীন্দ্রকে নয়, খোদ ভারতকেই কালিমালিপ্ত করে দিয়েছে!
শুধু আকার-আয়তনে ও জনসংখ্যার বিচারেই বড় হওয়া যায় না। মন-মানসিকতার ক্ষেত্রেও বড় হওয়া দরকার। এজন্য মানবিকতা ও বিশ্বজনীনতার চর্চা বাড়াতে হবে। এ নির্মম সত্যটা ভারতীয় নেতাদের গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে। মোদির ভারতে বর্তমানে উগ্রবাদী হিন্দুরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর বিপরীতে প্রতিবাদের মাত্রাটাও বাড়ছে সেভাবে। একটি জাতির বড় একটি অংশ যদি হতাশায় থাকে আর একটি অংশ যদি ধর্মীয় উগ্রবাদকে আদর্শ মেনে নেয় তাহলে সেই জাতির কি পরিণতি হয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ আফগানিস্তান ও সিরিয়া। শেষ পর্যন্ত ভারত কি সে পথেই হাঁটবে? নাকি বদলে যাবে? মোদিরা কি ভারতকে বদলে দিতে পারবেন? সেটা কি সম্ভব? এমন সব প্রশ্ন আজ অসংখ্য ভারতীয়ের!
arfat.biplob09@gmail.com

তেহরানে সৌদি দূতাবাসে আগুন, বিক্ষোভ অব্যাহত

সৌদি আরব শিয়া নেতা শেখ নিমর আল নিমরের মৃত্যুদণ্ড
কার্যকর করার ঘোষণা দেওয়ার পর শনিবার রাতে তেহরানে
বিক্ষোভকারীরা সৌদি দূতাবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। এএফপি
সৌদি আরবে শিয়া নেতা শেখ নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করায় ফুঁসে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশের শিয়া সম্প্রদায়। শনিবার নিমরসহ ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দেওয়ার পরপরই সৌদি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দেশে তীব্র বিক্ষোভ হয়। নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শনিবার দিবাগত রাতেই ইরানে সৌদি আরবের দূতাবাস ও কনস্যুলেট ভবনে আগুন দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এ ছাড়া ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ইয়েমেন, পাকিস্তান, ভারতের কাশ্মীরসহ বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। গতকাল রোববার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বলেছেন, শেখ নিমরকে ‘হত্যা করার’ ফল হিসেবে অচিরেই সৌদি রাজনীতিকদের ওপর ‘খোদায়ী গজব’ নেমে আসবে। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র সব সহিংস পরিস্থিতি এড়িয়ে ধৈর্য ধারণ করার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। খবর এএফপির। গতকাল রাজধানী তেহরানে ধর্মীয় নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে খামেনি শেখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টিকে সৌদি কর্তৃপক্ষের ‘রাজনৈতিক ভুল’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবে না। এটা তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে।’ এর আগে এক টুইট বার্তায় খামেনি বলেন, ‘এই শহীদের (শেখ নিমর) বেইনসাফি রক্তপাতের ফল শিগগিরই দেখা যাবে। সৌদি রাজনীতিকদের ওপর অচিরেই খোদায়ী গজব নেমে আসবে।’ শনিবার দিবাগত রাতে তেহরানে সৌদি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়।
একপর্যায়ে তারা হামলা চালায়। পেট্রলবোমা ছুড়ে ভবনের ভেতর আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া, ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর মাশাদে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটেও আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা। ইরান বলেছে, সৌদি দূতাবাস ও কনস্যুলেটে হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ৪০ জনকে আটক করেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মনসুর আল তুর্কি ইরানের প্রতিক্রিয়াকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া রিয়াদে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূতকেও তলব করে প্রতিবাদ জানিয়েছে সৌদি সরকার। সৌদির ভাষ্য, তার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে ইরান বিশ্বজুড়ে সৌদি বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা করছে। এদিকে, গতকাল ইরাক ও লেবাননে সৌদিবিরোধী প্রচণ্ড বিক্ষোভ হয়েছে। দুই দেশেই সৌদি দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করে দূতাবাস বন্ধ করে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। লেবাননের শিয়া সংগঠন হিজবুল্লাহ সৌদি শাসকদের ‘বৈশ্বিক অপরাধী’ এবং নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাকে ‘জঘন্য অপরাধ’ বলে আখ্যায়িত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ বলেছে, এ ঘটনায় জাতিগত উত্তেজনা ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে এই উত্তেজনা কমিয়ে আনতে হবে। যে ৪৭ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে তাঁদের মধ্যে একজন চাদ ও একজন মিসরের; বাকি সবাই সৌদি নাগরিক। সৌদি কর্তৃপক্ষ বলেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সৌদি সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, এঁদের বেশির ভাগের মৃত্যুদণ্ড শিরশ্ছেদ করে এবং কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডে কার্যকর করা হয়।

শেখ নিমর: সংগ্রামী জীবন

শেখ নিমর
সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় আওয়ামিয়াহ প্রদেশের কাতিফ গ্রামে ১৯৫৯ মতান্তরে ১৯৬০ সালে শেখ নিমর আল নিমরের জন্ম। এক যুগের বেশি সময় ইরান ও সিরিয়ায় পড়াশোনা শেষে ১৯৯৪ সালে তিনি সৌদি আরবে ফেরেন। দেশে ফিরে তিনি শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতার ডাক দেন। তাঁর সাহসী বক্তব্য শিয়া তরুণদের উজ্জীবিত করে। শেখ নিমর খুব কম সময়ের মধ্যেই সৌদি আরব ও বাহরাইনের শিয়া তরুণদের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে সৌদি গোয়েন্দা নজরদারিতে পড়ে যান তিনি। ২০০৪ ও ২০০৬ সালে শেখ নিমরকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছাড়া পাওয়ার পর তিনি অভিযোগ করেন, ওই সময় তাঁর ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়।
২০১১ সালে ‘আরব বসন্ত’ শুরু হওয়ার পর শেখ নিমর প্রকাশ্যে সৌদি আরবের রাজতন্ত্রের সমালোচনা শুরু করেন এবং জাতিগত বৈষম্য দূর করার জন্য দেশটিতে নির্বাচন দেওয়ার দাবি তোলেন। তবে সব সময়ই তিনি সশস্ত্র আন্দোলনের বিপক্ষে কথা বলতেন। ২০১২ সালে নিজ এলাকা কাতিফে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় নিরাপত্তাকর্মীরা গুলি চালায়। শেখ নিমরের পায়ে চারটি গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে কারাগারে রাখা হয় এবং কারাগারে তাঁকে সুচিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না বলে ২০১২ সালের জুলাই মাসে অভিযোগ ওঠে। ২০১৩ সালের মার্চ মাসে তাঁর বিচার শুরু হয়। ২০১৪ সালের অক্টোবরে সরকার উৎখাতের চক্রান্তের দায়ে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা সৌদি সরকারের প্রতি দণ্ড কার্যকর না করার আহ্বান জানালেও গত শনিবার সৌদি সরকার শেখ নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা দেয়। সূত্র: বিবিসি।

দায়িত্ব নেওয়ার ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই মেয়র খুন

গিসেলা মোতা
মেক্সিকোয় দায়িত্ব গ্রহণের ২৪ ঘণ্টা না পেরোতেই দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়েছেন এক নারী মেয়র। তাঁর নাম গিসেলা মোতা। রাজধানী মেক্সিকো সিটি থেকে ৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত টেমিক্সকো শহরে গত শনিবার নিজ বাড়িতে খুন হন তিনি। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের। মেক্সিকো সিটির সংবাদপত্র এল ইউনির্ভাসাল জানায়, শুক্রবার নতুন বছরের প্রথম দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন গিসেলা মোতা। শনিবার নিজ বাড়িতে চার বন্দুকধারীর হামলায় নিহত হন তিনি। স্থানীয় মোরেলোস রাজ্যের প্রধান আইন কর্মকর্তার দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে,
হামলায় চারজন বন্দুকধারী অংশ নেয়। পুলিশ কথিত দুই হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করেছে। পরে পুলিশের গুলিতে সন্দেহভাজন দুই হামলাকারী নিহত হয়। বাকি দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিহত মেয়র মোতা বামপন্থী ডেমোক্রেটিক রেভল্যুশন পার্টির নেতা এবং মেক্সিকোর কেন্দ্রীয় কংগ্রেসের সাবেক সদস্য ছিলেন। মেক্সিকো সিটি থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের এই টেমিক্সকো শহরে প্রায় এক লাখ লোকের বাস। গত বছর মেক্সিকোয় বেশ কয়েকজন মেয়রকে খুন করা হয়। দেশটিতে মাদক ব্যবসার অর্থে পুষ্ট সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীগুলো অনেক এলাকায় সমাজ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে।

আরএসএসের শক্তির মহড়া

দেড় লাখের বেশি মানুষ। তাঁদের প্রায় সবাই পুরুষ। পরনে খাকি শর্ট প্যান্ট, সাদা শার্ট এবং কালো টুপি। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় মহারাষ্ট্র রাজ্যের পুনে শহরে গতকাল রোববার এভাবেই সমবেত হয়ে নিজেদের শক্তির মহড়া দেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সদস্যরা। খবর এএফপির। সমাবেশস্থলে দুর্গের আদলে নির্মিত একটি মঞ্চে বক্তব্য দেন আরএসএসের প্রধান মোহন ভগবৎ। এ সময় ওড়ানো হয় গেরুয়া পতাকা। ভগবৎ বলেন, ‘নির্ভীক হতে চাইলে শুধু শারীরিক সামর্থ্য থাকলে চলে না, নম্রতার শক্তির প্রয়োজন হয়। ভারতের প্রকৃত শক্তি হলো এর সংস্কৃতি। আমাদের দেশের সব ধর্ম সত্য ও অহিংসার পথ বেছে নেওয়ার শিক্ষা দেয়। তরুণদের নৈতিক শিক্ষা নিতে হবে।’ কট্টরপন্থার কারণে বিতর্কিত সংগঠন আরএসএসের সঙ্গে মতাদর্শের মিল রয়েছে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির।
তিনি নিজেও এক সময় আরএসএসের সেবক ছিলেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলেন, ২০১৪ সালের মে মাসে মোদি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে আরএসএসের প্রভাব বাড়েনি। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস হচ্ছে ভারতের তৃণমূল পর্যায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় সংগঠন। এর ‘স্বয়ংসেবক’ বা কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। তাঁরা নিজেদের ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতির রক্ষক বলে দাবি করলেও সমালোচকদের অভিযোগ, আরএসএস মূলত মুসলিমবিরোধী উগ্র সংগঠন এবং বিভিন্ন সময় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়েছে। পুনের গতকালের সমাবেশটিই সম্ভবত আরএসএসের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় সমাবেশ। ২০১০ সালে কেরালায় সংগঠনটির এক অনুষ্ঠানে ৯০ হাজার মানুষ সমবেত হয়েছিল।

‘একতরফা’ নির্বাচনের দিন- আলোচিত সমালোচিত ৫ জানুয়ারি আজ

বিভিন্ন আলোচনা ও সমালোচনার ৫ জানুয়ারি আজ। দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক ঘটনাবহুল দিন। ২০১৪ সালের এই দিনে দেশী-বিদেশী নানা ধরনের অনুরোধ ও চাপ আমলে না নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটকে বাইরে রেখেই দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নব্বই সালে স্বৈরতন্ত্রের পতনের পর এই প্রথমবার দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে ‘একতরফা’ এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ জোট। তার আগেই ১৫৩টি আসনে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন নিশ্চিত করা হয়, যা দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এর আগে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিবাদে টানা হরতাল-অবরোধসহ নানা কর্মসূচি পালন করে বিএনপি জোট। এতে দেশব্যাপী সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। পরে জাতিসঙ্ঘের মধ্যস্থতায় সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে নির্বাচন ইস্যুতে সংলাপ হলেও কোনো ধরনের সমঝোতায় আসতে পারেনি। তবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় এ নির্বাচনের বাধ্যবাধকতার কথা তুলে ধরে ছয় মাসের মধ্যে অংশগ্রহণমূলক আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবেÑ এমন আশ্বাস দেয় সরকারপক্ষ। জাতিসঙ্ঘের অনুরোধে বিএনপি জোটও সেই আশ্বাসে কিছুটা সম্মতি দেয়। ফলে ‘ভোটারবিহীন’ এ নির্বাচনের পরও বিএনপি জোট আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করে দল গোছানোর কাজে মনোযোগ দেয়। তবে নির্বাচনের দুই বছর পার হলেও সরকার নতুন কোনো নির্বাচনের ব্যবস্থা করেনি। উল্টো তারা এ নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ দাবি করে পাঁচ বছর সাংবিধানিক মেয়াদের অজুহাত দেখিয়ে বিরোধীদের দমন-পীড়নে মনোযোগ দেয়। এখন তাদের টার্গেট পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করা।
দিনটিকে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ আখ্যা দিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট বিক্ষোভ সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছে। অন্য দিকে এ দিনকে গণতন্ত্রের বিজয় দিবস দাবি করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জোটও আনন্দর‌্যালি, সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে থাকার ঘোষণা দিয়েছে।
নব্বইয়ের পর নির্দলীয়, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়। এ ব্যবস্থায় পরপর চারটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের গত মেয়াদে আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বিলুপ্তির আদেশ দেন। তবে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে পরবর্তী দুই মেয়াদে এ তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বহাল রাখা যেতে পারে বলেও পর্যবেক্ষণ দেন আদালত। কিন্তু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সেই পর্যবেক্ষণের তোয়াক্কা না করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সরকারের এ সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে নির্দলীয় সরকার বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সরকারপক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিরোধীপক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অনড় থাকলে দেশব্যাপী চরম অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। সরকারের দমন-পীড়নসহ রাজনৈতিক হানাহানিতে কয়েক শ’ মানুষ প্রাণ হারায়। জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর আহ্বান ও নানা চাপ সত্ত্বেও কোনো পক্ষই সিদ্ধান্ত ও আন্দোলন থেকে সরে আসেনি। পরে জাতিসঙ্ঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মধ্যস্থতায় সংলাপে সম্মত হয় উভয়পক্ষ। সেখানেও কেউ কাউকে ছাড় না দিলে কোনো ধরনের সমঝোতা সম্ভব হয়নি। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন প্রতিহতের সিদ্ধান্তে অটল থাকলে ওই দিন হরতাল আর সহিংসতার মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
ভোটারবিহীন ও সহিংসতার নির্বাচন
সহিংসতা, কেন্দ্র পোড়ানো, কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপার ও বাক্স ছিনতাই, ভাঙচুর, নির্বাচনী কর্মকর্তা হত্যা, মারধর এবং পুলিশের ওপর হামলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয় ৫ জানুয়ারির ওই একতরফা নির্বাচন। এতে ভোটার উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। ফাঁকা কেন্দ্রে ছিল জালভোটের মহোৎসব। ওই দিন সারা দেশে প্রায় সাড়ে চার লাখ নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যের উপস্থিতিতে ১১ জেলায় সহিংসতায় নিহত হয় ১৯ জন। এর মধ্যে ১৫ জনই মারা গেছে পুলিশের গুলিতে। নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার দিক থেকেও ওই নির্বাচন অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। এর আগে ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর থেকে ভোটের আগের দিন পর্যন্ত ৪১ দিনে মারা গেছে ১২৩ জন। ভোটকে কেন্দ্র করে এতসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি এর আগে দেখা যায়নি।
ভোটের আগের দিন আগুনে পুড়েছে ১১১টি ভোটকেন্দ্র। নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে নির্বাচনী সরঞ্জাম ছিনতাই হয়েছে, কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে নির্বাচনী কর্মকর্তাকে। ভোটের দিনও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন নির্বাচনী কর্মকর্তা। ব্যাপক সহিংসতা ও নাশকতা হয়েছে ৬৯৭ কেন্দ্রে। ৩৬টি আসনের ৫৩৯টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়।
এর আগেই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যান ১৫৩ জন। ৫৯ জেলায় বাকি ১৪৭ আসনে যে চার কোটি ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ৯৩৮ জন ভোট দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের বেশির ভাগই ভোট দিতে যাননি। দেশের ৩৯টি কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। আবার ১৬টি কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ১ থেকে ৬৩টি। আবার কোনো কোনো কেন্দ্র বেলা ২টা পর্যন্ত কোনো ভোট না পড়লেও পরবর্তী ২ ঘণ্টার মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ ভাগ ভোট পড়ে।
নির্বাচনে কত ভোটার ভোট দিয়েছেন, তার হিসাব ওই রাত ১টা পর্যন্ত দেয়নি নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের দুই দিন পর নির্বাচন কমিশন ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে দাবি করে। তবে বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা জানায়, নির্বাচনে ১৫ থেকে ২০ ভাগের বেশি ভোট পড়েনি। অন্য দিকে বিএনপি দাবি করে নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে মাত্র। এমন একটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন নিয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থাও বিস্ময় প্রকাশ করে।

গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব সবার by হারুন-আর-রশিদ

মাঝে মধ্যে আমার এলাকার একটি মুদির দোকান থেকে কেনাকাটা করি। দোকানদার বললেন- আজকের পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার একটা খবর দেখুন। রাজশাহীর চারঘাটে বেশ ঘটা করে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন কৃষক দলের বড়মাপের স্থানীয় এক নেতা। তার সাথে শতাধিক লোক আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন। দোকানদার বললেন, এ রকম যোগদানের খবর প্রায় সময়ই কাগজে ওঠে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগেই যোগ দিচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে নাকি কয়েক ডজন আগুন বোমার মামলা। জান বাঁচানো ফরজ- তাই তারা কাজটি করছেন। দোকানদার এক নিঃশ্বাসে এসব কথা যখন বলছিলেন, তখন আমরা কয়েকজন নিশ্চুপ।
একজন বললেন, অপজিশনে যারা রয়েছেন, সবার বিরুদ্ধেই মামলা। তারা মাঠে-ময়দানে কথা বলতে পারছেন না। রাস্তায় মিটিং-মিছিল করলে সরকারি দল হামলা চালিয়ে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে মামলার নিত্যনতুন নাটক সৃষ্টি করছে। সহযোগিতায় থাকছে বিভিন্ন বাহিনী। আরেকজন বললেন, এ রকম কথা এখন রাস্তাঘাটে চলার পথে আমরা সবাই শুনছি। কিন্তু এর সমাধান কোথায়? গণতন্ত্রকে উদ্ধারের জন্য শুধু যে বিএনপিকে একাই কাজ করতে হবে- এটা সঠিক নয়। গণতন্ত্র কোনো একটি দলের জন্য নয়, এর সুফল ভোগ করতে চাইলে সবাইকে প্রতিবাদমুখর হতে হবে। গণতন্ত্র রক্ষায় তৃণমূল পর্যায়ে সব গণমানুষকেই সক্রিয় হতে হবে। মুখে স্কচটেপ লাগিয়ে কত দিন চলা যাবে? অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা না বললে পাপ। এ জন্য দায়ী তো আমরা সবাই কম-বেশি। ঘুষ, দুর্নীতি, গুম, খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, বিএসএফের হত্যাকাণ্ড, মাদক পাচার এসবের বিরুদ্ধে কথা বলা নৈতিক দায়িত্ব; অন্যথায় নিরীহ মানুষের অভিশাপ থেকে কেউ নিষ্কৃতি পাবে না। সব ধর্মেই এ কথা জোরালোভাবে উচ্চারিত হয়েছে। যা হোক, অনেকেই ভাবছেন, জানমাল রক্ষায় এখন আওয়ামী লীগে যোগদান ছাড়া বিকল্প নেই।
যেভাবে কথায় কথায় মামলা-হামলা গণহারে চলছে, তাতে সত্য কথা বলা মনে হয় সম্ভব নয়। অথচ সত্য কথা না বলাও পাপ বলে বিবেচিত। এখন আমরা দেশবাসী কোনটা বেছে নেব? সত্য পথ, না অন্যায় পথ- সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় এসে গেছে। যত বিলম্ব হবে দেশের ক্ষতি তত বাড়বে। গণতন্ত্রের মালিক তো শুধু ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল নয়, গণতন্ত্রের মূল মালিক দেশের জনগণ। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে। জনগণ ভোট দিতে না পারলে গণতন্ত্র মৃত্যুবরণ করে। ৫ জানুয়ারি ২০১৪ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। সেহেতু গণতন্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব বর্তায় জনগণের ওপর। দেশ পরিচালনায় সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য গণতন্ত্র জনগণের কাছে আমানতস্বরূপ। সুতরাং গণতন্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দলের নয়; মূল দায়িত্ব হলো জনগণের। সিল-ছাপ্পর মেরে ভুয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার অর্থই হলো, মূল গণতন্ত্রের জীবন্ত কবর দেয়া। দেশবাসীর দায়িত্ব এখন আসল গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করা, অন্যথায় ভুয়া গণতন্ত্রের ম্যাকিয়াভেলির মাধ্যমে দেশে ভুয়া প্রার্থীরা জনগণের কথিত প্রতিনিধি হয়ে সংসদে বসে ইচ্ছামতো আইন প্রণয়ন করবেন, আর তা জনগণ মেনে চলতে বাধ্য হবে। এটা কোনো সভ্য দেশে আছে বলে জানা নেই। উত্তরাধিকারতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সামরিক একনায়কতন্ত্র, এসবের সাথে গণতন্ত্রের কোনো সাদৃশ্য নেই। গণতন্ত্রের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে শুধু জনগণের। জনগণই গণতন্ত্রের মালিক। দেশের মালিকও তারা। প্রকৃত ভোটের মাধ্যমেই জনগণের প্রতিনিধিরা দেশ পরিচালনার অধিকার পেয়ে থাকেন। সেই অধিকার যদি দেয়া না হয়- তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জবাব দেয়াই হলো গণতন্ত্রের প্রতি সুবিচার। এই নিয়ম বিশ্বের উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোর দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাবো। কিন্তু বাংলাদেশে বিগত ৪৪ বছর ধরে যে শাসনব্যবস্থা চলে আসছে, সে ক্ষেত্রে শুধু সেই নির্বাচন, যা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল- সেগুলো নিরপেক্ষ বলে স্বীকৃতি পেয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহলেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। অন্য সব নির্বাচনই ছিল ভুয়া কিংবা বিতর্কিত।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণতন্ত্রের যে ব্যবস্থার কথা আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, সেটা বর্তমানে অনেকটা নেই বললেই চলে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে দীর্ঘ ৬৬ বছর পর এখন বলছে, গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়নই বেশি জরুরি এবং উন্নয়ন যেভাবে হবে, রাষ্ট্রযন্ত্র সেভাবেই পরিচালিত হবে। এ কথা তো পাকিস্তান আমলের একনায়ক জেনারেল আইয়ুবের উক্তি। কথিত উন্নয়ন দশক (১৯৫৮-১৯৬৮) পালনকালে পত্রিকায় দেখেছিলাম, তিনি বলেছিলেন, “পাকিস্তানের জন্য গণতন্ত্র উপযুক্ত বিধান নয়, ‘মৌলিক’ গণতন্ত্রই পাকিস্তানের জন্য প্রযোজ্য।” জনগণ নয়, ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার দ্বারা প্রতিনিধি নির্বাচিত করে স্বৈরাচারী আইয়ুব ১০ বছর দেশ শাসন করেছিলেন। তার এই দীর্ঘ সময় শাসনকালে দেশের দুই অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নের ব্যাপকতা জাতি দেখতে পেয়েছিল। এরশাদের ৯ বছর স্বৈরশাসনকালেও বাংলাদেশে প্রচুর উন্নয়ন হয়েছে। গণতন্ত্র ছাড়াই সাবেক এ দুই জেনারেল দেশের প্রচুর উন্নয়ন করেছিলেন। বর্তমান সরকারও নিজ দলের মূল আদর্শ গণতন্ত্রকে কাটছাঁট করে দেশ পরিচালনা করছে বলে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরাও বলছেন। এখন প্রশ্ন- ব্রিটেন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত রাষ্ট্রগুলো, অস্ট্রেলিয়া, পার্শ্ববর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশ তাহলে কিভাবে গণতন্ত্রের মাধ্যমে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করল? তারা যদি গণতান্ত্রিক ধারাকে অনুসরণ করে দেশে সার্বিক উন্নয়ন সাধনে সক্ষম হয়, তাহলে বাংলাদেশ গণতন্ত্র কায়েম করে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে নিজেকে কেন শামিল করতে পারবে না?
সততা ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করে গণতন্ত্রের বিকাশ সাধন করা বাংলাদেশেও সম্ভব। তখন গণতন্ত্র যেমন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে, তেমনি দেশও উন্নতির দিকে ধাবিত হবে। এখন গণতন্ত্রের নামে লুটপাট চলছে। বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন অনেকটা স্বেচ্ছাচারী কায়দায় চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে কারাগারে বিরোধী দলের বড় মাপের দুই নেতা মৃত্যুবরণ করেছেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আছেন বিএনপির একডজনেরও বেশি কেন্দ্রীয় নেতা। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং রাজনীতিক মাহমুদুর রহমান মান্নার শারীরিক অবস্থাও আশঙ্কাজনক বলে জাতীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছে। দেশের আইন নিজস্ব গতিতে চলছে না বলে স্পষ্ট। গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চার মাধ্যমে যদি দেশ চলতে দেয়া না হয়, কথা বললেই ধরপাকড়, মামলা-হামলার জালে আটকে দেয়া হয়; সেটাকে কখনোই গণতান্ত্রিক শাসন বলা যায় না। কেউ যদি মনে করে, সারাজীবন এভাবেই চালিয়ে যাবেন, তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘ সময় ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনের পরও এর চরম করুণ পরিণতি ঘটেছে বারবার। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা মহাদেশেও এর নজির রয়েছে। অনিয়মের মাত্রা সহ্যসীমার বাইরে চলে গেলে এ অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে। আল্লাহ পাক কুরআনে বহু জায়গায় বলেছেন, ‘সীমা লঙ্ঘন কোরো না, তিনি সীমা লঙ্ঘনকারীদের কঠিনভাবে পাকড়াও করেন।’
প্রথম আলো ৫-৭-১৫ তারিখে লিখেছে, একদলীয় রাজনীতি প্রতিষ্ঠা চেয়েছিল আওয়ামী লীগ- উইকিলিকসে সৌদি আরবের গোপন নথিতে এ কথা বলা হয়েছে। পত্রিকার সম্পাদকীয় মন্তব্য : মামলা থেকে বাঁচতে আওয়ামী লীগে যোগদান, তাহলে আইনের শাসন কোথায়। প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী (পররাষ্ট্র), আইনের চোখে পলাতক এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলেও গ্রেফতার না করে কিভাবে ফুল দিয়ে বরণ করে দলে টেনে নিলেন- সেই অনুষ্ঠানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ছিল। এ রকম আরেকটি নিউজ (৭-৭-১৫) পুলিশ ছেড়ে দেয়ার পরই আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন চট্টগ্রামে এক রাজনৈতিক নেতা। তাহলে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেয়ার অর্থ কি আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া? আওয়ামী লীগ তাহলে কি আইনের নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছে- প্রশ্নটি ওঠা স্বাভাবিক। এ দিকে, আমরা নিত্যদিন মিথ্যা মামলা ও গ্রেফতারবাণিজ্য দেখে আসছি। এখন দেখছি দলীয় স্বার্থে মামলার আসামিকে সাদরে দলে নেয়ার মহড়াও।
লেখক : গ্রন্থকার ও কলামিস্ট
harunrashidar@gmail.com

নাসা বিশেষজ্ঞের করুণ জীবন

কম্পিউটার টেকনিশিয়ান হিসেবে তিনি কাজ করেছেন বিশ্বখ্যাত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায়। চাঁদে মানুষের যাত্রার জন্য নাসার এ্যাপোলো অভিযানেও কাজ করেছেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে নিজের পায়ের রোগ নিয়ে এক দুর্বিষহ জীবন কাটাতে হচ্ছে তাকে। নাসার সাবেক এই বিশেষজ্ঞের নাম মাইকেল কার্ল (৬৭)। বছর দশেক আগে লন্ডনের রাস্তায় এক গাড়ি দুর্ঘটনার পর থেকেই তার বাম পা ফুলতে শুরু করে। স্কটল্যান্ডের এনএইচএস গ্র্যামপিয়ানে তার চিকিৎসা চললেও অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। বরং ফুলতে ফুলতে তার পায়ের ওজন এখন দাঁড়িয়েছে ২৫ কেজিরও বেশি। ফলে কার্লের পক্ষে দৈনন্দিন কাজকর্ম করা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়ছে। রাস্তায় বের হলে মানুষের টিটকিরিও হয়েছে তার নিত্যসঙ্গী। এদিকে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বচসা চলছে মাইকেল কার্লের। তার দাবি, তার সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারছে না স্কটল্যান্ডের আঞ্চলিক স্বাস্থ্য  সেবাকেন্দ্র এনএইচএস। একই সঙ্গে সঠিক পরামর্শটিও তারা তাকে দিতে পারছেন না বলেই অভিযোগ তার। মাইকেল কার্ল বলছেন তার রোগটি আসলে পরজীবীবাহিত লিফ্যানটিয়াসিস। এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে পা কেটে ফেলে তার জায়গায় কৃত্রিম পা ব্যবহারের পক্ষে কথা বলছেন তিনি। বছরখানেক আগে ডান্ডিতে একজন চিকিৎসক তাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানিয়েছিলেন যে, তার এই রোগ হয়েছে। এনএইচএসের পক্ষ থেকে একবারই এই রোগের পরীক্ষা করেই রোগটি হয়নি বলে জানানো হয় কার্লকে। তার বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও এই রোগ নির্ণয়ের জন্য কার্যকরী পরীক্ষাগুলো সম্পাদন করেনি এনএইচএস। এদিকে এনএইচএসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে মাইকেল কার্ল লিমফোডিমাতে ভুগছেন। এই রোগে আক্রান্ত হলে শরীরের কোনো অঙ্গ ফুলে যেতে থাকে। তারা আরও বলছে, এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে কার্ল যদি তার পা কেটে ফেলেন, তবে তাকে বাকি জীবন হুইল চেয়ারে বসেই কাটাতে হবে। কার্ল বলছেন, নিরাপদ হলেই কেবল তিনি পা কাটার কথা বলেছেন। তাছাড়া, কৃত্রিম অঙ্গ সংযোজনের বিষয়টি নিয়েও এনএইচএস কোনো মন্তব্য করেনি বলে বলছেন কার্ল। মাইকেল কার্ল বলেন, ‘আমি বাকি জীবন হুইল চেয়ারে কাটাতে চাই না। তবে আমার চাইতেও তো আরও খারাপ অবস্থায় অনেক সৈন্য হাসপাতালে আসেন। তারা দিব্যি কৃত্রিম পা লাগিয়ে সুস্থ জীবন কাটাচ্ছেন। আমি পারবো না কেন?’ নিজের অবস্থার কথা জানাতে গিয়ে কার্ল বলেন, ‘আমি প্রকৃতপক্ষে জানিও না আমার পুরো পা না কি অর্ধেকটা নষ্ট হয়েছে, না কী হয়েছে।’ এনএইচএস গ্র্যামপিয়ানের পক্ষ থেকে অবশ্য রোগীর তথ্যের গোপনীয়তার কারণ দেখিয়ে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে তাদের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, রোগীর সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য তারা কাজ করে থাকেন এবং প্রতিটি রোগীই যাতে সবচেয়ে ভালো চিকিৎসাটি পান তার চেষ্টা করা হয়।