Monday, August 24, 2026
রংপুরে এক পরিবারের চারজনকে হত্যা: খুনের কারণ নিয়ে প্রশ্ন, সন্দেহ
গত শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার একটি তিনতলা বাড়ি থেকে চারটি লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। উদ্ধার করা লাশ চারটি হলো রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১৩)।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গতকাল ভোরে দুজনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামের ওই দুই তরুণের বাড়ি গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির কাছে। এরপর গতকাল বেলা দেড়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশ বিস্তারিত তথ্য জানায়।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে জানান, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরে জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করেন।
হত্যার কারণ নিয়ে পুলিশের ভাষ্য
পুলিশ বলছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে পাশের একটি ভবন দিয়ে গণপতির নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা ইয়াবা সেবন করছিলেন। দেখতে পেয়ে গণপতি বাধা দিলে তাঁকে হত্যা করা হয়। গণপতির চিৎকার শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে হত্যা করা হয় তাঁদেরও। এরপর ঘরে ঘুমিয়ে থাকা আয়ুশকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
গণপতির পরিবারের সঙ্গে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের আগে থেকেই পরিচয় ছিল উল্লেখ করে পুলিশ কমিশনার বলেন, পরিচয় ফাঁস হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দুজন মিলে একে একে পরিবারটির চার সদস্যকেই হত্যা করেন।
মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ সংবাদ সম্মেলনে আরও জানান, হত্যার পরও ওই বাড়িতেই অবস্থান করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তাঁরা গোসল করেন, ফ্রিজ (রেফ্রিজারেটর) থেকে খেজুর ও শসা বের করে খান এবং আবার ইয়াবা সেবন করেন। পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তাঁরা ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। আর যাওয়ার আগে আলমারি-ড্রয়ার খুলে কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে দেন।
গণপতি চক্রবর্তীর ঘরে ইয়াবা সেবন করার সরঞ্জাম পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি একটি সোনার চুড়ি আগুনে পরীক্ষা করার চেষ্টার আলামতও পাওয়া যায়। পুলিশ বলছে, এসব আলামতের সূত্র ধরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে শনাক্ত করে আটক করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ আরও জানায়, মুগ্ধ দাস নগরের সিটি বাজারে একটি মাছের দোকানে কাজ করেন। সিদ্ধার্থ দাস নগরের একটি গয়নার দোকানে প্রায় আট বছর কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।
‘পুলিশ যা বলছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়’
তবে হত্যার কারণ সম্পর্কে পুলিশের দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে গণপতি চক্রবর্তীর পরিবার। প্রীতিলতার ছোট বোন পূজা চক্রবর্তী গতকাল সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুই বুঝতে পারছি না। পুলিশ যে কী করছে, কী হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ইয়াবাখোর দুজন নাকি এক এক করে চারজনকে মারছে।’
এ ঘটনায় গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন নিহত গণপতির বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। মামলার পর এর আগে আটক সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গোপীনাথ চক্রবর্তীর জামাতা বিশ্বজিৎ রায় বলেন, ‘পুলিশ যা বলছে, তা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। দুইটা কম বয়সী ছেলে চারটা মানুষকে মেরে ফেলতে পারে না। আর ওই দুই ছেলের ফিজিক্যাল (শরীরের) যে অবস্থা, তাতে তারা চারজনকে মারার ক্ষমতা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে অনেক প্রশ্ন আমাদের মধ্যেই আছে।’
দুই তরুণ যে হত্যা করেছে, তা বিশ্বাস করতে চাইছে না তাঁদের পরিবারও। গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের বাবা কানু দাস বলেন, ‘আমার ছেলে কিছুটা নেশা করে। তাই বলে কাউকে খুন করবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ মুগ্ধ দাসের মা সেনা দাস বলেন, ‘ছেলেটা কিছু ছেলের পাল্লায় পড়ে নেশা করে। তবে মানুষ খুন করা তো সহজ নয়।’
জানতে চাইলে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল কাদের বলেন, ‘এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে আজ (গতকাল) ভোরে আটক করা হয়। পরে তাঁরা হত্যায় জড়িত থাকার কথা পুলিশের কাছে স্বীকার করেন। এ কারণে মামলায় তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।’
একেক জায়গায় পড়ে ছিল লাশ
পূজা চক্রবর্তী জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বড় বোন প্রীতিলতা চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হয় তাঁর। এরপর শনিবার ফোন দিলে বোন, জামাতা ও বোনের মেয়ে—সবার নম্বর বন্ধ পান। কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বামীকে নিয়ে রাত পৌনে ৯টার দিকে ওই বাসায় যান। কারও সাড়া না পেয়ে পাশের একটি ভবনে উঠে জানালার কাচ ভেঙে ঘরের জিনিসপত্র অগোছাল দেখতে পান। এরপরই খবর দেন পুলিশকে। পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে রাত ১১টার দিকে। দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে পুলিশ লাশ চারটি উদ্ধার করে বাড়িটি থেকে নিয়ে যায়।
রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন গণপতি চক্রবর্তী। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
নির্মাণাধীন তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণপতির পরিবার থাকত। প্রথম ও তৃতীয় তলার কাজ চলছে। দ্বিতীয় তলার একটি শোবার ঘরের খাটের পাশে আয়ুশের লাশ পাওয়া যায়। তার গলায় কাপড় প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলায় ওঠার সিঁড়িতে পাওয়া যায় প্রীতিলতা ও আগামীর লাশ। তাঁদের গলায় দড়ি প্যাঁচানো ছিল। তৃতীয় তলার ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর লাশ। গামছা প্যাঁচানো ছিল তাঁর গলায়।
হত্যার প্রতিবাদ, বিক্ষোভ
পরিবারসহ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষককে হত্যার ঘটনায় গতকাল দুপুরে রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। মানববন্ধন থেকে হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীরা শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।
হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে রংপুর মহানগর জামায়াত। গতকাল বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে রংপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দেন রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাহবুবুর রহমান। মিছিল নিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রেসক্লাবের সামনে এসে হয় সমাবেশ।
সমাবেশে মাহবুবুর রহমান বলেন, একটি পরিবারের চারজন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার এমন ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এ ঘটনায় নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মাদকের বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মাত্র দুজন মাদকসেবী কীভাবে একটি পরিবারের চার সদস্যকে হত্যা করলেন, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
‘কোথায় বাস করছি আমরা’
গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গণপতি আগে রংপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন। ২০১০ সালে কামালকাছনার মাছুয়াপাড়ায় ৬ শতাংশ জমি কেনেন। তিন বছর আগে তিনতলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন সেখানে।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িটির পাশে লোকজনের ভিড়। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি তিনতলা ভবনেরও নির্মাণকাজ চলছে। ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন হিমাংশু রায় নামের অবসরপ্রাপ্ত এক কলেজশিক্ষক। হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি বলেন, কিছুই বুঝতে পারেননি।
বোন, জামাতা ও বোনের ছেলে–মেয়ের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না পূজা চক্রবর্তী। বাড়িতেও একজন মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কেন নেই—সে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘কে মারল আমার দিদি, দাদা ও আদরের দুই সন্তানকে? তারা তো কোনো অপরাধ করেনি। তাদের তো শত্রুও নেই। এটা কোন দেশ? কোথায় বাস করছি আমরা? বাড়িতেও নিরাপত্তা নেই!’
| রংপুরে হত্যার শিকার একই পরিবারের চারজন। গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। পারিবারিক ছবিটি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি: সংগৃহীত |
Saturday, August 15, 2026
অন্তরালের রহস্যও খুঁজছে নগর পুলিশ
আর আলমারি তছনছ করার বিষয়টি হচ্ছে, বাবুল যখন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে হাত ধুয়ে ড্রয়ারগুলো খোলা দেখেছে, সেখান থেকে সে কিছু টাকা নিয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, ওই টাকাগুলো সে দীর্ঘদিনের জমানো বাসা ভাড়া পরিশোধ করেছে।’ বুধবার সকালে সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলায় গলা কেটে খুন করা হয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আব্দুল সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও কাজের মেয়ে তাহমিনাকে। ঘটনার পর বিকালে পুলিশ এ ঘটনায় বাবুল মিয়া নামের এক রংমিস্ত্রিকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাকালীন সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতি ছিল। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানায়, কাজের মেয়ে তাহমিনার সঙ্গে প্রেমের সূত্র ধরে সে ওই বাসায় যায়। এরপর একেক করে তিনজনকে ধারালো ছুরি দিয়ে খুন করে পালিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনায় ছুরিও উদ্ধার করেছে। আলোচিত এ ঘটনার লোমহর্ষক দৃশ্য উঠে এসেছে ময়নাতদন্তে। নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী ও কাজের মেয়েকে।
এর মধ্যে কাজের মেয়ে তাহমিনার শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রায় ১৬-১৭টি ছুরিকাঘাত ছিল তার দেহে। আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়ার শরীরেও ছিল আঘাতের পর আঘাত। এসব আঘাতে রক্তক্ষরণে তারা ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। ময়নাতদন্ত শেষে নিহতের আমেরিকান প্রবাসী ছেলে আসিফ ইফতেখারের কাছে লাশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। পিতা-মাতার মৃত্যু সংবাদ শুনে আসিফ ইফতেহার বৃহস্পতিবার বিকালেই সিলেট এসে পৌঁছান। সঙ্গে তার বোনরাও আসেন। গতকাল বিকালে সিলেটের শাহী ঈদগাহ ময়দানে জানাজা শেষে তাদের মরদেহ মানিকপীর (র.) গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। নামাজে জানাজায় উপস্থিত ছিলেন- রাষ্ট্রদূত ও সিনিয়র সচিব মুশফিকুল ফজল আনসারী, সিলেট নগর প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, নগর বিএনপি’র সভাপতি নাসিম হোসাইনসহ সর্বস্তরের মানুষ। জানাজার নামাজের পূর্বে বক্তৃতায় সিটি প্রশাসক বলেন, এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে কিনা সেটি পুলিশ খতিয়ে দেখবে। এ ছাড়া তিনি মামলার দ্রুত বিচার কামনা করেন।
এর আগে গতকাল বাদ জুমা বৃহত্তর মিতালী, টিবি গেট এলাকাবাসীর উদ্যোগে টিবি গেট এলাকায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধনে বক্তব্যে মওদুদুল হক মওদুদ বলেন, বাবুলের প্রেমের ঘটনায় এ ঘটনা ঘটতে পারে- সেটি বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। সত্য উদ্ঘাটনে ভিন্নখাতে ডাইভার্ট করা হচ্ছে কিনা, তা দেখা দরকার। এলাকার মুরুব্বি আলিমুস সাদাত বলেন, ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা- সে প্রশ্নের উত্তর বের করতে হবে। ভালো করে বিষয়টি তদন্ত প্রয়োজন। তাঁতীদলের জেলার সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বেলাল বলেন, এলাকার লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমরা মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে নামবো। আরেকজনের উপস্থিতি: সিলেটের ওই বাসায় ঘটনার সময় আরও এক ব্যক্তির উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এলাকার মানুষ। ২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। এতে দেখা গেছে, খুনের ঘটনার সময় এক ব্যক্তি সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে। তবে আদৌও ওই ভিডিওটি ঘটনার সময়ের কিনা, তা নিশ্চিত করতে পারেননি কেউ। নগর পুলিশের ডিসি (উত্তর) সাইফুল ইসলাম গতকালও বলেছেন, ঘটনার সময় ওই বাসায় বাবুল ছাড়া আর কারও উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মোবাইল ট্র্যাকিং করে তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।
ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল: ঘটনার পর বাগানে চলে যায় বাবুল মিয়া। সেখানে গিয়ে মাদকসেবন করেন। তার বাসার কেয়ারটেকার রিয়াজ এ নিয়ে গণমাধ্যমকেও বিষয়টি জানান। তিনি বলেন, বাবুলের কাছে টাকা পাবেন- এজন্য তাকে বার বার ফোন দেয়া হচ্ছে। প্রথমে জানায় শাহী ঈদগাহে যাবে। পরে বলে বাগানে। এরপর এসে টাকা দেয়। ওই সময় তার হাতের আঙ্গুলে ব্যান্ডেজ দেখেছেন বলে জানান তিনি।

Thursday, June 25, 2026
দরজা খুলতে দেরি, বেডরুমে ঢুকে ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যা
নিহতের চাচা ইয়াসিন আল-খাতিবের মতে, দখলদার বাহিনীর অভিযান চলাকালে মুস্তফা তাহা মুস্তফা আল-খাতিবের বুকে, মাথায় ও হাতে বেশ কয়েকবার গুলি করা হয়।
ইয়াসিন আল-খাতিব বলেন, ঘুমিয়ে থাকায় মুস্তাফা দরজা খুলতে কিছুটা দেরি করেছিলেন। তিনি বলেন, ঘুম থেকে উঠে পোশাক পরার চেষ্টা করছিলেন তিনি। এ সময় ইসরাইলি সেনারা বাড়ির প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে তার শোবার ঘরে প্রবেশ করে এবং তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
তিনি জানান, গুলিবিদ্ধ মুস্তাফাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের এগিয়ে যেতে বাধা দেয় ইসরাইলি বাহিনী। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি মারা যান। সেনারা এলাকা ছেড়ে যাওয়ার পর চিকিৎসাকর্মীরা সেখানে পৌঁছে তার মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে যান।
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর এ ধরনের অভিযান প্রায়ই গভীর রাতে পরিচালিত হয় এবং এসব অভিযানে নিয়মিত প্রাণহানির পাশাপাশি বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়।
ফিলিস্তিনি বন্দিদের অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইসরাইলের কারাগারে প্রায় ৯ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি বন্দি রয়েছেন। তাদের প্রায় অর্ধেকই কোনো অভিযোগ গঠন বা বিচার ছাড়াই আটক রয়েছেন।
![]() |
| নিহত পশ্চিম তীরের অধিবাসী মুস্তাফা তাহা মুস্তাফা আল-খাতিব। ছবি: সংগৃহীত। |
Wednesday, February 4, 2026
৯ বছর প্রেমের পর বিয়ে, দুই মাসের মধ্যেই মা-বাবার সহযোগিতায় স্বামীকে হত্যা করল স্ত্রী
হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালাতে, একটি মাফলার দিয়ে দেহ জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জিতেন্দ্রর শ্যালকের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে। পুলিশ জানায়, জ্যোতি ও জিতেন্দ্র কুমার যাদব গত বছরের ২৫ নভেম্বর বিয়ে করেন। তাদের প্রেমের সম্পর্কের বয়স ছিল প্রায় নয় বছর, যা শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবনে। হিন্দু রীতি অনুযায়ী এবং দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটি হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে মূলত টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে। পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, জ্যোতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ হাজার টাকা তুলে অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন জিতেন্দ্র। এই ক্ষতি থেকেই দাম্পত্য কলহ শুরু হয় এবং তা ক্রমেই তীব্র আকার নেয়।
২৬ জানুয়ারি জ্যোতি স্বামীর কাছে ওই টাকার হিসাব চাইলে দু’জনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। যা একপর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। তখন জ্যোতি তার মা-বাবা ও ভাইকে ফোন করে ভাড়া বাড়িতে ডেকে আনেন। এই দম্পতি বিয়ের পর থেকে ইজ্জতনগরের গির্জা শঙ্কর কলোনির ওই ভাড়া বাড়িতেই থাকতেন। জিতেন্দ্রের বাড়ি ছিল ইটাওয়া জেলার ভাবুপুরা গ্রামে।
পুলিশ জানায়, জ্যোতির বাবা কালিচরণ, মা চামেলি এবং ভাই দীপক ফোন পেয়ে ওই বাড়িতে আসেন। এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে পুলিশ দাবি করছে- বাবা, মা ও ভাই মিলে জিতেন্দ্রের হাত-পা চেপে ধরে রাখেন। সেই সুযোগে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। জিতেন্দ্র নিস্তেজ হয়ে পড়ার পর, হত্যার আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পুলিশ বলছে, একটি মাফলার দিয়ে দেহ বেঁধে জানালা বা ভেন্টিলেটরের গ্রিলে ঝুলিয়ে দেয়া হয়, যেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হয়। এরপর প্রতিবেশীদের ডেকে বলা হয়, জামাই আত্মহত্যা করেছে।
২৬ জানুয়ারি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিষয়টি প্রথমে সন্দেহজনক আত্মহত্যা হিসেবেই দেখা হয়। ভাড়া বাড়ির ভেতরেই জিতেন্দ্রর ঝুলন্ত দেহ পাওয়া যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে আত্মহত্যার দাবি খণ্ডন করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে জিতেন্দ্রর ভাই অজয় কুমার পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ জ্যোতি ও আরও তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করে এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট হয় জিতেন্দ্রর মৃত্যু ঝুলে পড়ার কারণে নয়, শ্বাসরোধের কারণে হয়েছে। এর ফলে আত্মহত্যার সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায়।
এরপর পুলিশ মামলার ধারা পরিবর্তন করে হত্যা মামলা রুজু করে এবং তদন্ত জোরদার করে। জ্যোতির ভাই দীপককেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা জ্যোতি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি তদন্তকারীদের জানান, ছাত্রজীবন থেকেই তার ও জিতেন্দ্রর পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল। পুলিশ জানায়, জিতেন্দ্র বেরেলিতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। জ্যোতি কাজ করতেন উত্তরপ্রদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনে চুক্তিভিত্তিক বাস কন্ডাক্টর হিসেবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই আর্থিক বিষয় নিয়ে ঘনঘন ঝগড়া হচ্ছিল, যা সম্পর্ককে তিক্ত করে তোলে। ঘটনার দিন সেই ঝগড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তিনি পরিবারকে ফোন করেন।
পুলিশের অভিযোগ এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে তার মা-বাবা ও ভাই জিতেন্দ্রকে ধরে রাখেন এবং রাগের বশে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। মৃত্যুর পর সবাই মিলে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করে।

Thursday, January 1, 2026
অপ্রকাশযোগ্য শোকের মৃত্যুগুলোর জন্য মেকি শোক by রাফসান গালিব
কোনো কোনো সমাজতাত্ত্বিকের মতে, সমাজ নির্দিষ্ট কিছু জীবনকে ‘শোকযোগ্য’ হিসেবে ফ্রেমিং করে থাকে এবং অন্যদের ‘অ-শোকযোগ্য’ হিসেবে। কার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সমাজ কীভাবে প্রকাশ করছে, তাতেই শ্রেণি রাজনীতি বোঝাটা খুবই সহজ বলা যায়। সিয়াম মজুমদারের নামটা এখনো এ দেশের অধিকাংশ মানুষই জানে না। যে কয়জন জানে, তাদেরও এ কয় দিনে ভুলে যাওয়ার কথা বা অল্প কয়েক দিনেই ভুলে যাবে। সিয়াম মগবাজার এলাকায় একটি দোকানের কর্মচারী ছিলেন।
২৪ ডিসেম্বর চা আনতে গিয়ে উড়ালসড়কের ওপর থেকে ছোড়া ককটেলে প্রাণটা হারালেন। তাঁর শরীরের রক্ত-মাংস চায়ের দোকানের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গিয়েছিল। মানুষের মৃত্যু তো নিশ্চিত একটা ঘটনা। তাই বলে এতটা বীভৎস মৃত্যু, কল্পনা করা যায়! কারা ককটেল ছুড়ল, কারা একটা তরতাজা তরুণের প্রাণ কেড়ে নিল, তা হয়তো আমাদের কখনো জানা হবে না। ঘাতকেরা ঠিকই আরও মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকবে।
খুলনার গ্রাম থেকে সিয়ামের পরিবারটি ঋণগ্রস্ত হয়ে ঢাকায় এসেছিল। তাঁর বাবা রিকশা চালানো শুরু করেন। মা হয়ে যান আমাদের ভাষায় বাসাবাড়ির ‘কাজের বুয়া’। সিয়াম হয়েছিলেন দোকানের কর্মচারী। পরিবারের সবাই মিলে চেষ্টা করছিলেন ঋণমুক্ত হওয়ার। ছেলেকে হারিয়ে মা সিজু বেগমের বিলাপ, ‘আমি আর ঢাকায় থাকমু না। ঢাকায় আইস্যা সব শেষ হইয়্যা গেল।’ এই ‘জাদুর শহর’ ঢাকায় কেনই–বা তাঁরা আর থাকবেন!
এবার রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় আরেক হতভাগা ভ্যানচালক ওমর ফারুকের মৃত্যুর ঘটনার বর্ণনা করা যাক। চুরির অভিযোগে তাঁকে নির্যাতন করে মারা হয়েছে। শুনে নিশ্চয় ‘স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া’ কোনো গণপিটুনির মৃত্যুর কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এ হত্যার ঘটনা চরম নিষ্ঠুরতাকেও হার মানায়।
ভবানীগঞ্জের সিএনজি মালিক সমিতির সদস্যরা ওমর ফারুককে প্রথমে লোহার রড দিয়ে পেটাতে থাকেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তাঁকে একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে উভয় হাত ও পায়ে হাতুড়ি দিয়ে কয়েকটি লোহার পেরেক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তখনো মারধর চলতে থাকে। পানি পান করতে চাইলে নদীতে নিয়ে ওমর ফারুককে বিবস্ত্র করে চুবানো হয়। এরপর তাঁর পায়ুপথে শুকনা মরিচের গুঁড়া ঢেলে দেওয়া হয়।
নির্যাতনের একপর্যায়ে ওমর ফারুকের অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। পরে ওমর ফারুকের কাছ থেকে গাঁজা উদ্ধারের নাটক সাজিয়ে প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ওমর ফারুককে ১০০ টাকা অর্থদণ্ড ও ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
এরপর ওমর ফারুককে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাজশাহী কারাগারে পাঠায় পুলিশ। সেখান থেকে তাঁকে পরদিন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ২০ ডিসেম্বর ওমর ফারুকের মৃত্যু হয়।
ডার্ক কমেডি হিসেবে একটি কৌতুক আমরা প্রায় সবাই শুনেছি। কৌতুকটি হলো: পৃথিবীর সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী কী? উত্তর: মানুষ। ওমর ফারুককে যেভাবে ধাপে ধাপে বিবিধ নির্যাতন করে মারা হলো, তাতে ডার্ক কমেডিটা নিশ্চয়ই নিছক কোনো কৌতুক থাকে না, চরম বাস্তব হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়।
ওমর ফারুকের মতো কত কত মানুষের গণপিটুনি, মব ভায়োলেন্স বা সহিংসতায় বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়ে বীভৎস মৃত্যু ঘটেছে বা ঘটছে—তা ভদ্র শ্রেণির বিবেকের দরজায় সামান্য টোকাও দেয় না।
সিয়াম মজুমদার, ওমর ফারুকের মতো আরও অনেকের মৃত্যু—আমাদের শোকের ব্যাকরণে তাঁদের জন্য কোনো অধ্যায় তো দূরের কথা, একটা ছোট অনুচ্ছেদই নেই। যেহেতু তাঁরা সমাজের সুবিধাভোগী অংশের অন্তর্ভুক্ত নন, ফলে তাঁদের মৃত্যু ‘অশোকযোগ্যই’ থেকে যায় আমাদের কাছে। আর মৃত্যুর সঙ্গে যদি কোনো ‘রাজনীতি’ যুক্ত না থাকে, তাহলে আরও বেশিই ‘অশোকযোগ্য’।
এসব মানুষের জন্য রাষ্ট্র নেই, সরকার নেই, নাগরিক সমাজ নেই, বুদ্ধিজীবী নেই, মানবাধিকারকর্মী নেই, রাজনৈতিক মহল নেই—কেউ নেই। মার্ক্সীয় তত্ত্বের আলাপ থেকে বলতে হয়, একটি কারখানার যন্ত্র নষ্ট হলে যেমন সমাজ শোক প্রকাশ করে না, কেবল সেটি মেরামতের কথা ভাবে, শ্রমিক বা কর্মজীবী এসব মানুষের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সমাজ একই আচরণ করে। সিয়াম বা ওমর ফারুকদের মৃত্যুতে এমনটিই তো দেখতে পাই। ‘সব শেষ হইয়্যা গেল’ মানুষগুলোর জন্য ‘প্রকাশযোগ্য শোক’ করতে না পারার ব্যর্থতা আমরা কোথায় লুকাব?
* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
- rafsangalib1990@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ককটেল বিস্ফোরণে নিহত যুবকের বাবা আলী আকবর মজুমদার ঘটনাস্থলে আহাজারি করছেন। গত বুধবার রাতে রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে। ছবি: প্রথম আলো |
Wednesday, December 31, 2025
এবার চীনের নাগরিক সন্দেহে উত্তরাখন্ডে ত্রিপুরার ছাত্রকে ছুরিকাঘাতে হত্যা
এই ছাত্র খুনকে কেন্দ্র করে ভারতের ত্রিপুরায় সাধারণ মানুষ যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা গতকাল রোববার এই বিষয়ে কথা বলেন উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামির সঙ্গে। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী ধামি দোষীদের গ্রেপ্তার করে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন।
ত্রিপুরা ও উত্তরাখন্ড দুই রাজ্যই বিজেপিশাসিত।
ত্রিপুরার নিহত তরুণের নাম অ্যাঞ্জেল চাকমা। ত্রিপুরার ঊনকোটির বাসিন্দা অ্যাঞ্জেল দেরাদুনের এক প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় বর্ষের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্র ছিলেন।
অভিযোগ, গত ৯ ডিসেম্বর অ্যাঞ্জেল ও তাঁর ছোট ভাই মাইকেল দেরাদুনের এক বাজারে গিয়েছিলেন দৈনন্দিন জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে। সেখানে স্থানীয় ছয় তরুণ তাঁদের ‘চীনা’ ও ‘মোমো’ বলে টিটকিরি দেয়। উত্ত্যক্ত করতে থাকে।
এ অবস্থায় অ্যাঞ্জেল ও মাইকেল তাঁদের বলেন, তাঁরা আদৌ চীনের নাগরিক নন। পুরোপুরি ভারতীয়। ত্রিপুরার অধিবাসী। পড়াশোনার জন্য এসেছেন। ভারতীয় পরিচয় পর্যন্ত তাঁরা দিতে চান। বিষয়টি নিয়ে এক পর্বে তর্ক শুরু হলে অ্যাঞ্জেলকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তাঁকে মাথা ও পিঠে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত শুক্রবার অ্যাঞ্জেলের মৃত্যু হয়। তাঁর মরদেহ ত্রিপুরায় নিয়ে যাওয়ার পর আগরতলায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। ব্যবস্থা গ্রহণে উদ্যোগী হতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। সেই চাপের মুখেই মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা ফোন করেন উত্তরাখন্ডের বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামিকে।
অ্যাঞ্জেলের বাবা তরুণ প্রসাদ চাকমা বিএসএফের হেড কনস্টেবল। মণিপুরে পোস্টিং। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অ্যাঞ্জেল দেরাদুনে গিয়েছিলেন এমবিএ পড়তে। তৃতীয় বর্ষের পরীক্ষায় বসার আগেই তিনি এক সংস্থায় চাকরিও পেয়েছিলেন। পরীক্ষা শুরুর আগের দিনই তিনি আক্রান্ত হলেন।
মানিক সাহা জানান, মুখ্যমন্ত্রী ধামি তাঁকে বলেছেন, ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি একজন অভিযুক্ত নেপালে পালিয়ে গেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ধামি জানিয়েছেন, অভিযুক্তকে ধরতে পুলিশের একটি দল নেপালে গেছে।
এ খুনের ঘটনায় উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমা। ত্রিপুরার তিপ্রা মথা পার্টির নেতা প্রদ্যোৎ বিক্রম মানিক্য দেববর্মার সঙ্গে কনরাড সাংমা সম্প্রতি ‘ওয়ান নর্থইস্ট পার্টি’ নামে একটি মঞ্চ গঠন করেছেন।
নিহত ব্যক্তির পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে এই দুই নেতা বলেন, উত্তর–পূর্বাঞ্চলের মানুষও আর পাঁচজনের মতো ভারতীয়। এই আঘাত কোনো ব্যক্তিবিশেষকে নয়, গোটা অঞ্চলকে করা হয়েছে।
উত্তর–পূর্বাঞ্চলের যুব সম্প্রদায়কে দিল্লিসহ বিভিন্ন প্রদেশে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। ইদানীং সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছিল বলে মনে হচ্ছিল; কিন্তু অ্যাঞ্জেলের মৃত্যু সেই ধারণা ভুল প্রতিপন্ন করল।
সম্প্রতি বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে ঘৃণা অপরাধের ঘটনা বেড়ে গেছে। চলতি মাসেই দুজন পরিযায়ী শ্রমিক ঘৃণা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। নির্মাণশ্রমিক হিসেবে ওডিশার সম্বলপুরে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের জুয়েল রানাকে (১৯) বাংলাদেশি সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তাঁর সঙ্গে যাওয়া দুই সহকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন।
ছত্তিশগড় থেকে কেরালার পালাক্কাড়ে কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন ৩১ বছরের রামনারায়ণ বাঘেল। তাঁকে চোর সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়। মারধরের সময় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছিল বাংলাদেশি কি না।
ওডিশাতেই ঝাড়সুগুদা জেলায় নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে যাওয়া চার শ্রমিক। গত বুধবার তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ দাগিয়ে মারধর করে আটকে রাখা হয়। পরে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে। ওই ঘটনার পর তাঁরা সবাই পশ্চিমবঙ্গে ফিরে এসেছেন।
চলতি বছর বড়দিন উদ্যাপন উপলক্ষে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) ও আরএসএসের কর্মীরা তাণ্ডব চালিয়েছে। গোরক্ষকদের হাতে দলিত ও মুসলিমদের নিহত বা আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে চলেছে; কিন্তু এবারই প্রথম ‘চীনা’ সন্দেহে কাউকে আক্রান্ত হতে দেখা গেল।
ওডিশায় জুয়েল রানাকে পিটিয়ে মারার পর জম্মু–কাশ্মীরের পিডিপি নেত্রী ইলতিজা মুফতি ‘এক্স’ হ্যান্ডলে লেখেন, ‘ইন্ডিয়া, ভারত বা হিন্দুস্তান নয়, তোমার নাম এখন লিঞ্চিস্তান (গণপিটুনির দেশ)।’
![]() |
| ত্রিপুরাসহ উত্তর–পূর্ব ভারতে অ্যাঞ্জেল চাকমা হত্যার বিচারের দাবি উঠেছে। ছবি: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স থেকে নেওয়া |
Friday, December 12, 2025
বিতণ্ডার মধ্যে মাকে ছুরিকাঘাত, চিৎকারে ঘুম থেকে উঠে এলে মেয়ের ঘাড়ে কোপ -গৃহকর্মীর বরাতে পুলিশ
গত সোমবার মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি ভবনের সপ্তম তলার বাসায় লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার একমাত্র সন্তান নাফিসা নাওয়াল বিনতে আজিজকে (১৫) গলা কেটে হত্যা করা হয়। চার দিন আগে ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিলেন আয়েশা (২০)। গতকাল বুধবার দুপুরে ঝালকাঠির নলছিটি থেকে আয়েশা ও তাঁর স্বামী রাব্বীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আয়েশা হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।
কেন এই হত্যাকাণ্ড, সে বিষয়ে আয়েশার দেওয়া বক্তব্যের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত থেকে চুরি করার অভ্যাস তাঁর আগ থেকেই ছিল। এই বাসায় কাজে যোগ দেওয়ার দ্বিতীয় দিন আয়েশা গৃহকর্তার মানিব্যাগ থেকে দুই হাজার টাকা চুরি করেন। এ নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে গৃহকর্ত্রী লায়লা আফরোজের সঙ্গে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। গৃহকর্ত্রী আয়েশাকে পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখান। এ নিয়ে কাজের তৃতীয় দিনেও দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়।
নজরুল ইসলাম বলেন, চতুর্থ দিনে কাজে যাওয়ার সময় আয়েশা পরিকল্পনা করেন, তাঁর সঙ্গে আবার বিতণ্ডা হলে তিনি লায়লাকে ছুরিকাঘাত করবেন। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বাসা থেকে সুইচ গিয়ার ছুরি সঙ্গে করে নিয়ে যান। সেদিন লায়লার সঙ্গে আয়েশার আবার কথা–কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে লায়লা তাঁর স্বামীকে মোবাইলে কল দিতে গেলে আয়েশা পেছন থেকে তাঁর ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করেন। তখন তাঁদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। এরপর আয়েশা ছুরি দিয়ে লায়লাকে একের পর এক আঘাত করেন। তখন পাশের ঘুরে ঘুমিয়ে ছিল লায়লার মেয়ে নবম শ্রেণিপড়ুয়া নাফিসা। চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে এসে মাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে সে বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীকে ফোন করতে যায়। তখন তার ঘাড়ে ছুরিকাঘাত করেন গৃহকর্মী আয়েশা।
নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন আয়েশা নিজেও আহত হন। এরপর তিনি নিজের রক্তমাখা পোশাক পাল্টে নাফিসার স্কুলড্রেস পরে একটি ল্যাপটপ ও মোবাইল নিয়ে চলে যান।
মা–মেয়েকে হত্যার পর বাসা থেকে বেরিয়ে আয়েশা কীভাবে চলে যান, তার বর্ণনা সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান ও অতিরিক্ত উপকমিশনার জুয়েল রানা। তাঁরা জানান, আয়েশা ওই বাসা থেকে বেরিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভেতরে যান। সেখানে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে সাভারের দিকে চলে যান। তাঁদের বাসা সাভারের হেমায়েতপুরে। স্বামী রাব্বীর সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তাঁরা ওই বাসা থেকে চুরি করে নেওয়া মোবাইল ও তাঁর নিজের রক্তমাখা কাপড় সিঙ্গাইর সেতু থেকে নদীতে ফেলে দেন। পরে তাঁরা আত্মগোপনে থাকার জন্য ঝালকাঠির নলছিটিতে রাব্বীর দাদাবাড়ি চলে যান।
চুরির এক জিডির সূত্র ধরে আয়েশাকে শনাক্ত
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, ওই বাসায় কাজে যোগ দেওয়ার সময় আয়েশার কোনো মোবাইল নম্বর, ঠিকানা রাখা হয়নি। গত জুলাইয়ে মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের হওয়া চুরির ঘটনাসংক্রান্ত একটি জিডির সূত্র ধরে তাঁকে শনাক্ত করে পুলিশ। ওই জিডিতে বলা হয়, বাবর রোডের একটি বাসা থেকে আয়েশা আট হাজার টাকা ও একটি সোনার আংটি চুরি করেছিলেন।
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ওই জিডির তদন্ত কর্মকর্তা আয়েশার কাছ থেকে চুরি হওয়া টাকা ও সোনার আংটি উদ্ধার করেছিলেন। মা–মেয়ে খুনের ঘটনা উদ্ঘাটনে বসা বৈঠকে ওই কর্মকর্তার কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, বাবর রোডের বাসা থেকে সোনার আংটি চুরি করা আয়েশার গলার একপাশে পোড়া দাগ রয়েছে। আয়েশার দেওয়া একটি মুঠোফোন নম্বর রয়েছে বলে জানান তিনি। মা–মেয়ে খুনের রহস্য উদ্ঘাটনে এটাই ছিল একমাত্র ক্লু (সূত্র)। ওই মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করলে মহসিন নামের একজন ফোন ধরে জানান, একটি ঘটনায় তিনি জেলে গিয়েছিলেন। সেই সময় নম্বরটি তাঁর বন্ধু রাব্বী ব্যবহার করতেন। মোবাইলের ডিসপ্লে নষ্ট থাকায় তা ঠিক করতে কিছুদিন আগে রাব্বী সেটি তাঁকে দিয়েছিলেন। মহসিন জানান, রাব্বীর স্ত্রীর নাম আয়েশা, গৃহকর্মীর কাজ করেন এবং সাভারের হেমায়েতপুরে থাকেন। এভাবে রাব্বীকে শনাক্ত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, আয়েশার খোঁজে হেমায়েতপুরে তাঁদের ভাড়া বাসায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে রাব্বী ও তাঁর স্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। ওই বাসায় আয়েশার সঙ্গে তাঁর শাশুড়ি ও মা থাকতেন। তাঁদের কাছ থেকে আয়েশা বরিশালে যেতে পারেন এমন ধারণা পেয়ে পুলিশ পটুয়াখালীর দুমকিতে এবং পরে বুধবার দুপুরে ঝালকাঠির নলছিটিতে রাব্বীর দাদার বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখান থেকে রাব্বী ও আয়েশাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে মা–মেয়েকে খুন করার পর ওই বাসা থেকে খোয়া যাওয়া একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করা হয়েছে।
শুধু দুই হাজার টাকা চুরির জন্যই এ জোড়া খুন—এমন প্রশ্নের জবাবে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘যদি দুই হাজার টাকার জন্য বিতণ্ডা না হতো, তাহলে সে কাজে না–ও আসতে পারত। কিন্তু পরদিন সে ওই বাসায় ছুরি নিয়ে ঢুকেছে, ক্রাইম করার জন্যই ঢুকছে। সে কোনো মোবাইল ব্যবহার করেনি। মুখ ঢেকে আসছে, কাজটা করার পরে কীভাবে সেফ এক্সিট হবে, মেয়ের স্কুলড্রেস পরে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেছে। তার ক্লিয়ার ক্রিমিনাল ইনটেনশন আছে। এর পাশাপাশি পুলিশে দেওয়ার ভয়, রাগারাগির ক্ষোভ কাজ করেছে আয়েশার।’
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হয়তো আরও তথ্য পাওয়া যাবে। তাঁর সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না বা এর পেছনে কোনো সিন্ডিকেট আছে কি না, তা জানা যাবে।
রিমান্ড মঞ্জুর
মা–মেয়েকে হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সহিদুল ইসলাম আয়েশা ও তাঁর স্বামী রাব্বীকে আজ ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন জানান। শুনানি শেষে আদালত আয়েশার ছয় দিন ও রাব্বির তিন দিন রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
![]() |
| রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে হত্যায় গ্রেপ্তার গৃহকর্মী আয়েশা আক্তার। আজ বৃহস্পতিবার ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে। ছবি: ডিএমপির সৌজন্যে |
Tuesday, December 9, 2025
মা-মেয়ে হত্যার পর স্কুল ড্রেস পরে পালায় ঘাতক
নিহত নাফিসার বাবা উত্তরার সানবিমস স্কুলের পদার্থ বিজ্ঞানের শিক্ষক আজিজুল ইসলাম বলেন, বাসায় একজন কাজের মহিলা দরকার ছিল। সাধারণত গেটে অনেকে কাজের সন্ধানে আসেন। চারদিন আগে একটি মেয়ে আসে। বোরকা পরিহিত মেয়েটি বাসার দারোয়ান খালেকের কাছে কাজের সন্ধান করলে সে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর আমার স্ত্রী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কাজে রেখে দেয়। পরে স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মেয়েটার নাম আয়েশা। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর। জেনেভা ক্যাম্পে চাচা-চাচির সঙ্গে থাকে। বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার শরীরেও আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে। তিনি বলেন, মেয়েটা কাজ শুরুর পর প্রথম দু’দিন সময়মতো এসেছে। গতকাল সে সাড়ে ৯টার দিকে আসে। আজ কী হয়েছে, এটা তো আর বলার অবস্থায় নেই।
ভবনের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশ জানিয়েছে, নাফিসার বাবা স্কুলের উদ্দেশ্যে সকাল ৭টার দিকে বের হয়ে যান। সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে বোরখা পরে ওই বাসার লিফটে ওঠে সাত তলায় যায় গৃহকর্মী আয়েশা। সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কাঁধে স্কুল ব্যাগ নিয়ে ড্রেস পরে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বের হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নাফিসার বাবা বাসায় ফিরে স্ত্রী ও মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মাকে হত্যার পর ওই মেয়েটি দৌড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় হয়তো ইন্টারকমে সিকিউরিটি গার্ডকে ফোন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেখানে গিয়ে ইন্টারকমের লাইনটি খোলা পাওয়া যায়। মেয়েটি খুব সুন্দরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে বাথরুমে গিয়ে গোসল করে শরীরের রক্ত পরিষ্কার করে নাফিসার স্কুলের ড্রেস পরে নির্দ্বিধায় গেট দিয়ে বেরিয়ে যায়। ফ্ল্যাটের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ। বাসার আলমারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা। পুলিশ জানায়, তল্লাশি করে বাথরুমে একটি সুইচ গিয়ার ও একটি ধারালো অস্ত্র পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ছুরি দু’টি দিয়ে মা-মেয়েকে হত্যা করে গৃহকর্মী আয়েশা। এ ঘটনায় ওই বাসার দারোয়ান মালেককে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে, মেঝেতে এবং দেয়ালে রক্তের দাগ রয়েছে। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ অবস্থায় রয়েছে। যা মনে করছি, প্রাথমিকভাবে কিছু খোয়া যেতে পারে। সিসি ক্যামেরা ফুটেজে আমরা একজনকেই দেখেছি, পরে দেখবো আশপাশে আরও কেউ ছিল কিনা। পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার ইবনে মিজান জানান, পুলিশ সকাল সাড়ে ১১টার দিকে খবর পায়। মেয়েটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সেখানে নেয়ার পর মারা যায়। পরে লাশ দু’টি সুরতহালের পর ময়নাতদন্তের জন্য সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি, সেসব যাচাই-বাছাই চলছে। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি, হত্যার আগে-পরে তার উপস্থিতি ও অ্যাকটিভিটিজ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবো।

Saturday, September 27, 2025
চার্লি কার্ক হত্যাকাণ্ড: ট্রাম্প কি দাঙ্গা–ফ্যাসাদকেই নীতি হিসেবে নিয়েছেন by জ্যঁ ভার্নার ম্যুলার
ট্রাম্প প্রায় এক দশক ধরে ইঙ্গিত দিয়ে আসছেন, তাঁর সমর্থকদের রাজনৈতিক সহিংসতা মেনে নেওয়া যায় এবং কখনো কখনো এমন সহিংসতা পুরস্কৃতও হতে পারে। এর অনেক উদাহরণ আছে।
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস ভবনে হামলার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত বহু সহিংস অপরাধীকে ট্রাম্প ক্ষমা করে দিয়েছেন। শুধু তা–ই নয়, ট্রাম্প ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা এসব কর্মকাণ্ডকে সহিংসতা না বলে এগুলোকে বৈধ, এমনকি দেশপ্রেমিকদের আত্মরক্ষার কাজ হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের এমনভাবে ভুক্তভোগী হিসেবে তুলে ধরে আসছেন, ঠিক যেমন অন্য ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদীরাও নিজেদের সব সময় ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করেন।
চার্লি কার্ক হত্যার পর কিছু বামপন্থী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশোভন মন্তব্য করেছেন। তাঁরা বিদ্রূপ করে বলেছেন, কার্ক নিজেই বলেছিলেন, বন্দুক হামলায় মৃত্যু মানা যেতে পারে। কারণ, এটি অস্ত্র রাখার অধিকার নিশ্চিত করার মূল্য। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখা গেছে, উদারপন্থী লেখক ও সমালোচকেরা শুধু সহিংসতাকে নিন্দা করেননি; বরং কার্ককে একজন সৎ বিতর্ককারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। বিপরীতে ডানপন্থী অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি দমননীতির ডাক দিয়েছেন। কেউ কেউ সরাসরি ‘যুদ্ধের’ কথাও বলেছেন। এমনকি এফবিআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা জে এডগার হুভারের বেআইনি কৌশল অনুসরণ করতে হবে, এমন বক্তব্যও দিয়েছেন।
আরও উদ্বেগজনক হলো ট্রাম্প নিজেই এ হত্যাকাণ্ডকে নিজের অপছন্দের সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলোর ওপর আক্রমণের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর প্রশাসনের কয়েকজন সদস্য আগেই ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ‘দেশীয় সন্ত্রাসী সংগঠন’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। ট্রাম্প আগেও দেখিয়েছেন, তিনি ফেডারেল সরকারের ক্ষমতা ব্যবহার করে যেকোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে যেতে দ্বিধা করেন না। তাই বিরোধীদের বিচারের হুমকি শুধুই ডেমোক্র্যাটদের জন্য নয়, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী সবার জন্যই ভয়ংকর সংকেত।
ট্রাম্প শুধু আইন অমান্য করেননি, বারবার রাজনৈতিক সহিংসতাকে উসকিয়েছেন। ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে কাউকে গুলি করার কল্পনা করা, সমর্থকদের বিরোধীদের মারধর করানোর আহ্বান, ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে সহিংস শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের ‘ভালো মানুষ’ বলা, এমনকি ৬ জানুয়ারি ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সকে ফাঁসিতে ঝোলানোর হুমকি দেখেও আপত্তি না করা—সবই এর প্রমাণ। এসব উসকানি দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকাই তাঁর লক্ষ্য ছিল।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ ছিল নিষ্ঠুরতার বড় প্রদর্শনী। এবার তাঁর প্রশাসন সরাসরি সহিংসতার বন্দনা করছে। ভেনেজুয়েলার উপকূলে ১১ জনকে কোনো আইনি কারণ ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে এবং সে খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনন্দের সঙ্গে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি নিয়মিতভাবে এমন ছবি ছড়াচ্ছে, যেখানে প্রিয়জনদের জোর করে তুলে নেওয়ার পর তাঁদের পরিবারের মানুষদের কষ্ট দেখানো হচ্ছে। এক পোস্টে দেখা গেছে, আইসিইয়ের কর্মীরা নাৎসি হেলমেট পরে ছবি তুলছেন। ট্রাম্প হয়তো এবার তাঁর অনুসারীদের জন্য সব বাঁধন খুলে দিচ্ছেন। কারণ, তিনি নিজেই আইন ও নিয়মকে অগ্রাহ্য করে চলেছেন।
দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প নিজেকে অপরাধী না বলে ভুক্তভোগী হিসেবে দেখাচ্ছেন। তাঁর পেছনে পুরো এক ‘অভিযোগ ইন্ডাস্ট্রি’ কাজ করছে। ফক্স নিউজ থেকে শুরু করে টক-রেডিও—সব জায়গায় প্রচারকেরা বলছেন, ট্রাম্পপন্থীদের রাগ হওয়া স্বাভাবিক। এই ভুক্তভোগিতাকেই এখন সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে এর মানে এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। কিছু লোক হয়তো তা চাইছে বা তার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু জরিপ দেখাচ্ছে, অধিকাংশ মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতার বিপক্ষে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ট্রাম্পের ওপর হামলার পরও সহিংসতার প্রতি সমর্থন কমেছে।
অনেকে আশা করেন, ট্রাম্প একদিন রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ঐক্যের পথ ধরবেন। কিন্তু কার্ক হত্যার রাতের ঘটনা দেখাচ্ছে, ট্রাম্পের বিভাজনমূলক কৌশল চলতে থাকবে। দুর্ভাগ্য হলো, এখন তাঁর প্রশাসন ‘মতবিরোধের স্বাদ’ নয়; বরং ‘নিষ্ঠুরতার স্বাদ’ প্রচলিত করছে। আর কিছু মানুষ সেটিকেই গ্রহণ করছে।
● জ্যঁ ভার্নার ম্যুলার, প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত
![]() |
| ২০২৪ সালে একটি নির্বাচনী প্রচারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চার্লি কার্ক। ছবি: এএফপি |
Thursday, July 17, 2025
গোপালগঞ্জে নিহত ইমনের মা: ‘আমার সংসার বাঁচাবার মতো আর কেউ নাই’
নিহত ইমন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ভেড়ার বাজার গ্রামের আজাদ তালুকদারের ছেলে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছেলে হারানোর শোকে বাক্রুদ্ধ মা। কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কেউ সান্ত্বনা দিতে এসে নিজেই কাঁদছেন। তবুও ইমনের মা রোকসানার মুখে একটি শব্দও নেই।
নিহত ইমনের মামাতো ভাই রানা ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার ভাইডারে প্রাণে মাইরে ফ্যালতে হলো। ও তো প্রাণভিক্ষা চাইছেল। তার পরেও কেন মারতে হলো? কীভাবে মারল, আমরা তো ভিডিওতে দেখলাম। কীভাবে সহ্য করব? গুলি করে ফেলে পাড়ায় ধরে মাইরা ফেলল।’
প্রতিবেশী রাজু তালুকদার বলেন, ওরা দুই বোন ও তিন ভাই। বড় ভাই অসুস্থ। একটা বোনের বিয়ে হয়েছে। ছোট বোন আর ভাইটা পড়াশোনা করে, সেই খরচ ইমনই চালাত। ওর বাবা অসুস্থ। এ নিয়েই কখনো কখনো ভ্যান চালান। ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বাবা একদম পাগল হয়ে গেছেন। ছেলের জানাজায় পর্যন্ত থাকেননি। বাড়ি থেকে কোথায় যেন চলে গেছেন, কেউ জানে না।
একপর্যায়ে ইমনের মা রোকসানা বেগম বলে ওঠেন, ‘এখন আমার সংসার বাঁচাবার মতো আর কেউ নাই। ছাওয়াল মরসে শুইনা ওর বাপ পাগল হইয়া চইলা গেছে। আমার বাপে সংসারটা টানত। এখন আমার চারটে–পাঁচটা ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকার কোনো পথ নাই, বাঁচার পথ নাই। আমার ছেলেরে যেমন পাড়ায় মারছে, গুলি করে মারছে, আমি এর বিচার চাই।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, নিহত ইমন তালুকদার গোপালগঞ্জ শহরে মুন্সি ক্রোকারিজ দোকানের কর্মচারী ছিল। গতকাল সকালে সে অন্য দিনের মতো দোকানে যায়। দোকানের মালিক তাকে দেড় শ টাকা দিয়ে বেলা ১১টার দিকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। ইমন বাড়ি না গিয়ে সংঘর্ষস্থলে যায়। স্থানীয় লোকজন তাকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ সকাল সাড়ে সাতটায় গোপালগঞ্জ গেটপাড়ার পৌর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
![]() |
| গোপালগঞ্জে গতকাল বুধবার এনসিপির সমাবেশ ঘিরে হামলা–সংঘর্ষের ঘটনায় নিহত ইমন তালুকদার। ছবি: পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া |
গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান: ইউরোপীয় অস্ত্র সহায়তায় গাজায় শিশু হত্যা
এই কারখানার লাভ এমবিডিএ ইউকে’র মাধ্যমে ফ্রান্সে অবস্থিত মূল এমবিডিএ গ্রুপে স্থানান্তর হয়। ২০২৩ সালে এমবিডিএ প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড লভ্যাংশ দিয়েছে এর তিন মালিক— বিএই সিজস্টেমস (ইউকে), এয়ারবাস (ফ্রান্স ও লিওনার্দো’কে (ইতালি)। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে জিবিইউ-৩৯ বোমা ইসরাইলে পাঠানো হয়েছে প্রায় ৪৮০০টি। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে পাঠানো হয়েছে সর্বশেষ ২১৬৬টি বোমা। দ্য গার্ডিয়ানের তদন্তে দেখা গেছে, অন্তত ২৪টি হামলায় জিবিইউ-৩৯ বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। এতে শিশু সহ বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। বেশির ভাগ হামলা হয়েছে রাতে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই। যেমন—বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেয়া পরিবার কিংবা তাঁবুর শিবিরে এই হামলা চালানো হয়েছে।
২৬ মে রাত ২টার দিকে গাজা সিটির ফাহমি আল-জারজাবি স্কুলে বোমা হামলায় ৩৬ জন নিহত জন। এর অর্ধেকই শিশু। সেখানে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলো ঘুমিয়ে ছিল হামলার সময়। সেই আগুনের মধ্যে একটি ছোট্ট মেয়ে— হানিন আল-ওয়াদি— জ্বলন্ত ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল। বেঁচে গেলেও তার মুখ ও হাত পুড়ে যায় এবং সে গভীর মানসিক আঘাত পায়। তার মা, বাবা ও একমাত্র বোন নিহত হয়। তার চাচা আহমেদ বলেন, ও বলে হাঁটতে ভয় লাগে— ভয় হয় মৃতদেহের ওপর না পা পড়ে।
জাতিসংঘ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই হামলাগুলোকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ডোনোটেলা রোভেরা বলেন, জিবিইউ-৩৯ বোমার ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে ইসরাইলের ওপর আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে বেসামরিক প্রাণহানির দায় এড়ানো সম্ভব নয়। বিভিন্ন স্কুল, তাঁবুর শিবির, মসজিদ ও বাসস্থান লক্ষ্য করে এই বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। যদিও ইসরাইলি বাহিনী বলেছে তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করেছে। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, কোনো সতর্কতা দেয়া হয়নি। উল্লেখযোগ্য হামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে ২রা নভেম্বর বুরেইজ ক্যাম্পে হামলায় ১৫ জন নিহত হন। যার মধ্যে ৯ জন শিশু। ২৬ মে কুয়েতি শান্তি শিবির ১-এ হামলায় ৪৫ জন নিহত হন। শিশুর মাথা ও নারীর দেহ খণ্ডিত হয়।
জিবিইউ-৩৯ বোমায় ব্যবহৃত ডায়মন্ড ব্যাক উইং সিস্টেমের একমাত্র উৎপাদক এমবিডিএ। যদিও এমবিডিএ ইউকের কোনো পাবলিক আর্থিক প্রতিবেদন নেই। তবে এমবিডিএ ইউকের রাজস্বের শতকরা ৪০ ভাগের বেশি আসে এই মার্কিন শাখা থেকে। বৃটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি গত সেপ্টেম্বরে ২৯টি অস্ত্র রপ্তানির লাইসেন্স স্থগিত করেন। তবে এতে এমবিডিএ ইনকরপোরেশনের কার্যক্রমে কোনো প্রভাব পড়েনি। কারণ এটি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত এবং ভিন্ন বোর্ড দ্বারা পরিচালিত।
ইসরাইলি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট গাজায় মানবিক নগরী স্থাপনের পরিকল্পনাকে গভীরভাবে অপরাধপ্রবণ এবং দায়িত্বহীন বলে অভিহিত করেছেন। ক্যাম্পেইন এগেইনস্ট দ্য আর্মস ট্রেডের গবেষণা সমন্বয়কারী স্যাম পারলো-ফ্রিম্যান বলেন, এমবিডিএ চাইলে তারা তাদের মার্কিন শাখা বিক্রি করে দিতে পারে। তাহলে অন্তত তারা এই গাজা গণহত্যায় আর্থিক সহায়তাকারী হিসেবে থাকত না। জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রানচেস্কা আলবানিজ এক প্রতিবেদনে লিখেছেন, গাজায় গণহত্যা চলছে। কারণ এতে অনেকের লাভ হচ্ছে। এমবিডিএ নিজস্ব নৈতিক আচরণবিধিতে বলেছে, তারা মানবাধিকারের উপর নেতিবাচক প্রভাব রোধে সচেষ্ট। তবে তারা এই বিষয়ে জানায়নি যে তারা তাদের মার্কিন শাখা বিক্রি বা ইসরাইলে সরবরাহ বন্ধ করার কথা বিবেচনা করেছে কিনা।
![]() |
| গাজায় ২৪ ঘন্টায় আরও কমপক্ষে ৯৩ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। এর মধ্যে ৩০ জন খাবার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসরাইলি আগ্রাসনে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৫৮,৫৭৩। ১,৩৯,৬০৭ জন আহত হয়েছেন। গাজার ওপর ইসরাইলি সামরিক হামলা রাতভর চলতে থাকে। সর্বশেষ পাওয়া খবরে জানা গেছে, বুরেইজ শরনার্থী শিবিরে আবু হালু স্কুলে হামলায় কমপক্ষে ৪ জন নিহত হয়েছেন। গাজা সিটির জয়তুন এলাকায় ইমাম শাফি স্কুলের কাছে একটি আবাসিক ভবনে হামলায় ৩ জন নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। |
Monday, July 14, 2025
সোহাগ কিলিং মিশন: রজনী বোস লেনে হত্যা, হাসপাতালের সামনে নিয়ে চলে বর্বরতা ভিডিও by শুভ্র দেব ও আফজাল হোসেন
ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্তব্ধ পুরো দেশ। নিন্দা প্রতিবাদ ও দোষীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ, মানববন্ধন সর্বত্র। রাজনৈতিক দলও এ নিয়ে সরব হয়েছে। সব দলের তরফে বিবৃতি, মন্তব্য করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ইতিমধ্যে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে বেশ কিছু বিষয় সামনে এসেছে। রজনী বোস লেনে ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই নিশ্চিত করেছেন সোহাগকে ‘ধর ধর’ বলে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। মব সৃষ্টি করে তাকে এমনভাবে মারধর করা হয়েছে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু মরদেহ হাসপাতালে নিয়ে কেন নির্মমতা চালানো হয়েছে তার সঠিক কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশের ভাষ্যমতে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে সোহাগকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু পরিবার বলছে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদা না দিয়ে প্রতিবাদ করায় সোহাগের ওপর এত নৃশংসতা।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের মোটিভ বলছে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। যেভাবে তার ওপর নৃশংসতা চালানো হয়েছে সেটি দীর্ঘদিনের ক্ষোভ থেকে করা হয়েছে। না হলে মরদেহের উপর কেউ এভাবে পাশবিকতা চালাতে পারে না। শুধুমাত্র চাঁদাবাজি, দোকান দখল বা ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের জন্য এভাবে কারও ওপর নৃশংসতা চালানো যায় না। এদিকে সোহাগকে মিটফোর্ড হাসপাতালের তিন নম্বর গেটের যে স্থানে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে তার কয়েকহাত দূরে হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার ক্যাম্প। ঘটনার সময় অনেক আনসার সদস্য ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। পাশাপাশি ওইদিন ঘটনাস্থলের আশেপাশে বিভিন্ন ব্যবসায়ীসহ শতাধিক লোক দাঁড়িয়ে নির্মমতা দেখেছে। কিন্তু তারাও কেউ আসেনি। এই সুযোগে সোহাগের মৃতদেহের ওপর বিভিন্নভাবে নৃশংসতা করেছে। নৃশংসতার ভিডিও দেখে আঁতকে উঠেছে মানুষ। তবে ঘটনার দুইদিন পর্যন্ত এই নির্মমতা জানতে পারেনি কেউ। দু’দিন পর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর আসল চিত্র সামনে আসে।
সরজমিন দেখা যায়, মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনের মিটফোর্ড সড়কটি ডান দিকে ইসলামপুর, সদরঘাটের দিকে চলে গেছে। সামনের দিকের সড়কটি আরমানিটোলা ও বামপাশের সড়কটি লালবাগ মিটফোর্ড সড়ক নামে পরিচিত। এদিকেই রজনী বোস লেন। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। চোখের সামনে নির্মমতার পর কেন কোনো আনসার সদস্য এগিয়ে আসেনি এনিয়ে কথা হয় একাধিক আনসার সদস্যদের সঙ্গে। কিন্তু আনসার সদস্যরা জানিয়েছেন, ওই সময় এদিকে কারও ডিউটি ছিল না। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কিছু প্রত্যক্ষদর্শীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, যারা সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে তারা এই এলাকার পরিচিত মুখ। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কারও নাই। কারণ ওই সময় কেউ এগিয়ে গিয়ে বাধা দিতে গেলে তার ওপরও নির্যাতন চালাতো খুনিরা।
নিহত সোহাগকে নিয়েও নানা সমালোচনা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন সোহাগ আওয়ামী লীগের আমলে যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সাবেক এমপি হাজী সেলিমের চাঁদা তুলতেন তিনি। বেশ কিছু ছবিতে হাজী সেলিমের সঙ্গেও তাকে দেখা গেছে। এ ছাড়া মিটফোর্ড এলাকার ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা বলেছেন, পট পরিবর্তনের পরেও সোহাগ যুবদলের হয়ে চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছিলেন। সোহাগ মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙাড়ি ব্যবসার সঙ্গে পুরনো বৈদ্যুতিক সাদা তার কেনাবেচার ব্যবসা করতেন। সোহানা মেটাল নামে মিটফোর্ড এলাকার চায়নাপট্টি ও রজনী বোস লেনে তার দুটি দোকান রয়েছে। সোহাগ এবং মহিন পূর্বপরিচিত ছিলেন। ওই এলাকায় বিদ্যুতের তামার তার ও সাদা তারের ব্যবসার একটা সিন্ডিকেট রয়েছে। তামার তার ও সাদা তারের অবৈধ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া ছিল মহিন, অপু, টিটু, যুবদলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সহ-জলবায়ু বিষয়ক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক রজ্জব আলী পিন্টুসহ মিটফোর্ড হাসপাতালের একটি চক্র। তারা অবৈধ বাণিজ্যের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল। তা না হলে নিয়মিত মাসে ২ লাখ টাকা চাঁদা দেয়ার দাবি জানিয়েছিল তারা। এই দ্বন্দ্বের জেরে সোহাগের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলিও করে দুর্বৃত্তরা। এরপরে তিনদিন সোহাগ দোকান খুলেনি। পাশাপাশি সোহাগ হত্যায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সোহাগকে নৃশংসভাবে হত্যার নেতৃত্বদানকারী যুবদলের বহিষ্কৃত নেতা মাহমুদুল হাসান মহিন এবং একই থানা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত নেতা অপু দাসের ছত্রছায়ায় মিটফোর্ড এলাকায় চাঁদাবাজির ভয়ঙ্কর এক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। স্থানীয় ওষুধ ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী, ফুটপাথ, সব জায়গায় চাঁদাবাজি চলতো। তারা দু’জনের নেতৃত্বে ৫ই আগস্টের পর থেকে মিটফোর্ড ও পাশের এলাকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করতো।
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মূল আসামিদের অদ্যাবধি গ্রেপ্তার না করা এবং মামলার এজাহার থেকে মূল তিন আসামিকে বাদ দেয়া রহস্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি এম মোনায়েম মুন্না। বলেছেন, এই ঘটনায় যারা সরাসরি জড়িত যাদের সংশ্লিষ্ট ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে আশ্বর্যজনক তাদের মামলার প্রধান আসামি করা হয়নি। যারা প্রাণঘাতী আঘাতগুলো করেছে তারা অদ্যাবধি গ্রেপ্তারও হয়নি। এর কারণ আমাদের বোধগম্য নয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মামলার এজাহারে খুনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত তিন খুনিকে পুলিশ কৌশলে বাদ দিয়ে নিরপরাধ তিনজনকে আসামি করেছে।
নিহত সোহাগের মেয়ে মিম বলেন, এজাহার লেখার সময় পুলিশ তিনজন প্রকৃত আসামির (১৭, ১৮ ও ১৯ নম্বর) নাম বাদ দেয়। মামলার খসড়া দেখার সুযোগ পেলে তিনি ছবিও তুলে রাখেন এবং অসঙ্গতি তুলে ধরেন। তিনি পুলিশকে প্রশ্ন করেন, সোহাগকে যেহেতু অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে, সেটি কেন এজাহারে উল্লেখ করা হয়নি। পুলিশ তখন তাকে আশ্বস্ত করে, সংশোধন করা হবে। তবে শেষ পর্যন্ত বাদীর অজান্তেই পূর্বে ঠিক থাকা খসড়া বাদ দিয়ে একটি নতুন নথিতে স্বাক্ষর নেয়া হয়, যেখানে প্রকৃত অপরাধীদের নাম বাদ দেয়া হয়। মিমের দাবি, পরে তার মাকে (মামলার বাদী) একা রেখে ওসি মনিরুজ্জামান মনির ও অন্য এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কক্ষে কথা বলেন এবং মূল অভিযুক্তদের বাদ দিয়ে অন্য একটি নথিতে স্বাক্ষর করিয়ে নেন। বাদী মঞ্জুয়ারা বেগম বলেন, ভাই মারা যাওয়ার কারণে আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিলাম। আমার মেয়েকে দেখিয়ে কপি চেক করিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, যেটায় দেখেছি, সেটাতেই সই করছি। কিন্তু পরে বুঝি, অন্য কাগজে সই করানো হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এতে রাজনীতি হয়েছে। যারা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তাদের বাদ দেয়া হয়েছে। পুলিশ বলেছে, বিষয়টি তারা ঠিক করে দেবে। আমি ঢাকা গিয়েও সরাসরি কথা বলে এসেছি। স্বজনদের অভিযোগ, মামলাটিকে ‘হালকা’ করার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং শুরুতে পুলিশ মামলাও নিতে চাইছিল না। এজাহারে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিবর্তন এনে প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা ও নির্দোষদের জড়ানো হয়েছে বলে তাদের দাবি। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘এজাহার তো তারা দিয়েছে, এজাহার কি আমরা করছি? এজাহার চেঞ্জ করার কোনো সুযোগই নেই। তারা যেটা এজাহার দিয়েছে, আমরা সেটাই মামলায় রেকর্ড করেছি। তারা কি অশিক্ষিত? তারা কি মুর্খ? কিছুই নয়। আন্দাজে একটা কথা বলে। তারা শিক্ষিত, তারা ১০ জন, ২০ জন আসে একসঙ্গে দেখতে। এখন এটা বললে হবে? এমনতো নয় যে, তারা অশিক্ষিত মানুষ, পড়েনি, দেখেনি। তারা পড়ছে, দেখছে, সব জেনেশুনে তাদের বক্তব্য মতো সেটা এজাহার করছে। এখানে আমাদের কিছু বলার নাই।
এদিকে, নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ৪ দিন পেরিয়ে গেলেও আতঙ্ক কমেনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের। সে বীভৎস ঘটনার ট্রমা থেকে তারা এখনো বের হতে পারেনি। হামলার ভয় আতঙ্কে কেউ মুখ খুলছেন না। অনেকে বলতে চাইলেও পরিবারের কথা বিবেচনা করে তথ্য দেয়ার সাহস পাচ্ছে না। গতকাল পুলিশের পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কথা জানানো হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা তা মানতে নারাজ। মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর ফটকের ঠিক সামনেই রয়েছে শাহিদা মেডিকেল ফার্মেসি, নেওয়াজ ফার্মেসি ও মনোয়ারা ম্যানশন। তাদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড ঘটলেও কেউ এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলছেন না। ওইদিন ডক্টরস ক্লিনিক অ্যান্ড হাসপাতাল ভবন থেকে অনেকে ভিডিও করলেও ভয়ে এ নিয়ে কেউ মুখ খুলছেন না। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন এ ঘটনা ঠিক আনসার ক্যম্পের সঙ্গে হলেও আনসার সদস্যরা এগিয়ে আসেননি। গতকাল সকাল ১১টার দিকে পুলিশ এসে মিটফোর্ড এলাকায় রাস্তা দখল করে থাকা অবৈধ দোকান উচ্ছেদ করে দেয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মিটফোর্ড এলাকার রজনী বোস লেনে ভাঙাড়ি ব্যবসার কেন্দ্র। সারা দেশ থেকে প্লাস্টিক, তামা, দস্তার পণ্য আসে এখানে। এ ছাড়া রয়েছে অবৈধ চোরাই তারের ব্যবসা। এ চোরাই তারের ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই সোহাগকে হত্যা করা হয়। একজন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী বলেন, এ হত্যাকাণ্ড সবার সামনেই ঘটেছে। যারা ঘটিয়েছে সবাই সবাইকে চিনে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণে কেউ মুখ খুলবে না। আমরা ব্যবসা করি, এখানে পুরো ঢাকা শহর থেকে ভাঙাড়ি মাল আসে আবার অন্য জায়গায় আমরা বিক্রি করে দেই। লাশ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছি। দেশের পরিস্থিতি এখনো ভালো হয়নি আমরা সবসময় আতঙ্কে থাকি। আরেক ব্যবসায়ী জানান, অস্ত্রসহ ২০-২৫ জনের একটি দল তাকে রজনী বোস লেন থেকে মারতে মারতে নিয়ে যায়। এখানে অনেক বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে সেগুলোর ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করুন। এখানে যারা জড়িত সবাইকেই এলাকাবাসী চিনে কিন্তু কেউ বলবে না, কারণ সবারই জীবনের মায়া আছে।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, বুধবার বিকাল বেলায় চিৎকার শুনে আমি এগিয়ে গিয়ে দেখি সোহাগকে কয়েকজন বেধড়ক মারধর করছে। সবার চোখের সামনেই নৃশংসভাবে তারা নরপিশাচের মতো হত্যা করে। এখন শুনেছি তারা একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত এবং সবাই সোহাগের পূর্বপরিচিত। শুনেছি এখানে রাস্তার উপর থাকা প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ২৫০-৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। প্রশাসন এর সবই জানে এতদিন ধরে এগুলো চলে আসছে তারা চুপ ছিল কেন এতদিন? হঠাৎ আজকে কেন উচ্ছেদ অভিযান চালালো। প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কি এসব দোকান বসে? কেউ প্রকাশ্যে কোনো তথ্য দিবে না কারণ প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে পারবে না। সাংবাদিক, প্রশাসনকে দু’দিন পর এ এলাকায় খুঁজে পাওয়া যাবে না কিন্তু আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একজন জানান, এরা সবাই প্রভাবশালী তাই কারও সাহস হয়নি এগিয়ে আসার। আমরা এ এলাকার বাসিন্দা আমাদের এ এলাকায় থাকতে হবে। প্রশাসন সবকিছুই জানে কে বা কারা এ সকল ঘটনায় জড়িত। প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড হয়েছে। অবুঝ শিশুও এ কথা বিশ্বাস করবে না। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব নিয়ে যদি এটি হতো তাহলে এত মানুষ কীভাবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত হয়।
এদিকে, সোহাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে বেলা ২টার দিকে মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে প্রতিবাদ জানান। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি শুরু থেকেই চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতো তাহলে এমন নৃশংস ঘটনা ঘটতো না। অপরাধী যেই হোক তার পরিচয় সে অপরাধীই, দেশের প্রচলিত আইনে তার বিচার হওয়ার জরুরি। আমরা দেখতে পেয়েছি অপরাধী যদি কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয় তাহলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধের ব্যবস্থা নিতে চায় না ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তৃণমূল পর্যায়ে যারা রাজনীতি করেন তারা বহিষ্কারকে ভয় পায় না। সাংগঠনিক অ্যাকশন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ না। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এ আশায় থাকেন যে যখন তারা ক্ষমতায় আসবেন তারা পেশিশক্তি ব্যবহার করে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিবে। এ ধরনের মনমানসিকতা ঢালাওভাবে চর্চা হয়েছে বিধায় আজকে এ ধরনের নৃশংস ঘটনা ঘটছে।

Sunday, July 13, 2025
পুরান ঢাকায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড: বিএনপির ১৬ বছরের ‘ত্যাগ’ কি ধুলায় মিশছে by সেলিম জাহিদ
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হামলা, খুন, দখল, অর্থ দাবি, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত, দলীয় পদপদবি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় এমনিতেই বিব্রত দলটির নেতারা।
এরই মধ্যে গত বুধবার সন্ধ্যায় পুরান ঢাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লাল চাঁদ ওরফে সোহাগকে হত্যা করা হয়। বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগামী জাতীয় নির্বাচন, গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার, জুলাই ঘোষণাপত্রসহ কয়েকটি বিষয়ে যখন অন্য দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির মতবিরোধ চলছিল; সে সময়ে পুরান ঢাকার এ হত্যাকাণ্ড বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বেশ বেকায়দায় ফেলেছে। এ হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনার নিন্দা জানিয়ে ইতিমধ্যে জামায়াতে ইসলামী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইসলামী আন্দোলনের ছাত্র ও যুব সংগঠন রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে। তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন দল ও সংগঠন।
বিএনপি নিজেও এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চেয়েছে। শুক্রবার রাতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিবৃতিতে বলেছেন, জুলাই-আগস্টের গণ-আন্দোলনে পতিত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এই নির্মম ঘটনাটি (লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ড) দেশের মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এর দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজকে আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে।
দুষ্কৃতকারীদের অপরাধের দায় দল নেবে না—বিএনপির নেতারা আগে এ কথা বলে এলেও একশ্রেণির নেতা–কর্মীর বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দলটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। যার কারণে লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর বিএনপিকে লক্ষ্য করে ক্ষোভ–বিক্ষোভ ও নিন্দা–প্রতিবাদ বাড়ছে। এর আগে ৩ জুলাই আসামি ছিনিয়ে নিতে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থানায় হামলা চালান বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। হামলায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ (ওসি) পুলিশের আটজন আহত হয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
৭ হাজার নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, তবু থামছে না
এত বহিষ্কার, অব্যাহতি, পদাবনতি ও কমিটি বাতিল করার মতো কঠোর ব্যবস্থা নিয়েও কেন নেতা–কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না বিএনপি—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, হয়তো অনেক অপরাধী, সন্ত্রাসী নানা ছিদ্রপথে সংগঠনে ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু তাদের দুষ্কর্মের দায় তো বিএনপি নেবে না। বরং এ ব্যাপারে দল খড়্গহস্ত। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত জেলা, মহানগর, থানা এবং কেন্দ্র মিলে প্রায় সাত হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে বিএনপি শাস্তিমূলক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। অপরাধ যে-ই করবে, তাঁকে চরম শাস্তি দিতে দল বদ্ধপরিকর।
বিএনপির একটি সূত্র জানায়, লাল চাঁদ হত্যাকাণ্ডের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে তাঁদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন। মূল দল বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে শুদ্ধি অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়েছে। যেসব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অতীতে খারাপ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে বা যাঁদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি তো দায় এড়াচ্ছে না; বরং দায়িত্ব পালন করছে। অভিযোগ পাওয়ামাত্র বহিষ্কার করছে, প্রশাসনকে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করছে। এরপরও বিভিন্ন মহল এটা নিয়ে হীন রাজনীতির চেষ্টা করছে। তা না হলে তারেক রহমান জবাব দাও, এই মিছিল কেন। তারেক রহমান কি রাষ্ট্রক্ষমতায় আছেন? বিএনপি যদি অপরাধীদের রক্ষা করার চেষ্টা করত, সাংগঠনিক ব্যবস্থা না নিত, তাহলে দোষ দিতে পারত।’
চাঁদাবাজির আরেক ধরন
বিএনপির নেতারা বলছেন, আল ইবাদত নামের এক ব্যক্তি ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ব্যবসায়ী দল’ নামের একটি ভুঁইফোড় সংগঠন গড়ে তোলেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের পাশে হোটেল ভিক্টোরিতে তিনি কার্যালয় খোলেন। বিএনপির অঙ্গসংগঠন পরিচয় দিয়ে এই ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে অনৈতিক সুযোগ-সুবিধা নেওয়াসহ চাঁদা দাবি করেন। এ খবর জানতে পেরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য (দপ্তরে সংযুক্ত) আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী গতকাল শনিবার পল্টন থানায় মামলা করেন।
জানা গেছে, এ ব্যাপারে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর দলীয় প্যাডে একটি চিঠিও দেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে আল ইবাদতকে গ্রেপ্তার করে।
নেতা-কর্মীরা কেন এত বেপরোয়া
একশ্রেণির নেতা-কর্মী বেপরোয়া হয়ে ওঠার বিষয়ে বিএনপির নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যন্ত দলের বড় একটি অংশ রাতারাতি টাকা বানানোর ধান্দায় অস্থির হয়ে পড়েছেন। বিগত আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলের সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট থেকে অনেকে উৎসাহী। তাই যার যেখানে প্রভাব আছে, সে সেখানে অবৈধ অর্থের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এ জন্য এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ—এমন কর্মকাণ্ড চলছে। যেখানেই এসব কাজে বাধা আসছে, সেখানেই অঘটন ঘটছে এবং ঘটনাক্রমে কিছু কিছু প্রকাশ পাচ্ছে।
এ বিষয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের দীর্ঘ অপশাসন ও দুর্বৃত্তায়ন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। এগুলোর রেশ এখনো কাটছে না। এর জন্য মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম এবং শুদ্ধি অভিযানের বিকল্প নেই।’
তবে বিএনপির নেতাদের কারও কারও অভিমত হচ্ছে, যেসব এলাকায় দলের ভালো নেতৃত্ব নেই, বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে অস্পষ্টতা আছে, সেসব এলাকায় নেতা-কর্মীরা বেশি বেপরোয়া। কারণ, ওই সব এলাকায় মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। তাঁরা দল ভারী করতে যাচাই–বাছাই না করে অনেককে দলে ভেড়াচ্ছেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যাঁরা বিএনপির নামে নানা অপরাধ করছেন, তাঁরা দলের উল্লেখযোগ্য কেউ নন। হয়তো কোনো একটা কমিটিতে কোনো পদে আছেন বা ছিলেন। কিন্তু তাঁদের দায় পুরো দলকে নিতে হচ্ছে। তাঁদের কারণে বিএনপির ১৬ বছরের ত্যাগ, লড়াই–সংগ্রাম সবকিছু ধুলায় মিশে যাচ্ছে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।’
Saturday, July 12, 2025
এ কেমন হত্যাকাণ্ড? এ কেমন বীভৎসতা? by রাফসান গালিব
রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় এক ভাঙারি ব্যবসায়ীতে চাঁদার দাবিতে হত্যা করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যার দিকের ঘটনা। ‘স্বাভাবিক চাঁদাবাজির ঘটনায় হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনও হয়েছে। কিন্তু ঘটনার প্রায় দুই দিন পর আজকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর কারও অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটি কোনো ‘স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড’ ছিল না। এটা ভয়ংকর এক মৃত্যু। বর্বরোচিত এক হত্যাকাণ্ড।
ঢাকার জনবহুল একটা এলাকায় এক রকম উল্লাস করে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে ওই ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে। পিটিয়ে, কুপিয়ে, নির্যাতন করে পরনের কাপড় খুলে ফেলে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হয় ওই ব্যবসায়ীকে। এরপর বড় একটা পাথর দিয়ে একের পর এক আঘাত করে মাথা থেঁতলে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতক। এই দৃশ্য কি কোনোভাবে নেওয়া যায়? এ কেমন নৃশংসতা? এ কেমন বীভৎসতা?
এখন পর্যন্ত জানা যাচ্ছে, লাল চাঁদ মিয়া ওরফে ওরফে মো. সোহাগ নামে ওই ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে রজনী ঘোষ লেনে ভাঙারি ব্যবসা করতেন। ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে পুরোনো বৈদ্যুতিক কেবল কেনাবেচার ব্যবসা করতেন তিনি। ওই তার বেচাকেনার সিন্ডিকেট নিয়ে বিরোধ এবং চাঁদার দাবি জানিয়ে আরেকটা গ্রুপ কয়েক মাস ধরে সোহাগকে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছিল। এর প্রেক্ষিতে বুধবার সন্ধ্যায় সোহাগকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সোহাগ ও তাঁকে হত্যাকারী পক্ষ সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
হত্যাকারীদের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত মাহমুদুল হাসান মহিন সম্পর্কে জানা যাচ্ছে, তিনি যুবদলের চকবাজার থানার সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী। তাঁর বিরুদ্ধে মিটফোর্ড হাসপাতালের ফুটপাত ও কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি হাসপাতালের কর্মচারী নিয়োগেও মোটা অঙ্কের ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব রাব্বিও স্বীকার করেছেন, তিনি মহিনকে চিনেন। মঈন যুবদলের সক্রিয় কর্মী। (দৈনিক যুগান্তর)
সোহাগকে শুধু হত্যা করেই থেমে থাকেনি সন্ত্রাসীরা। সোহাগের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পরও লাশের ওপর চলতে থাকে নৃশংসতা। রক্তাক্ত নিথর দেহটি রাস্তার মাঝখানে ফেলে লাশের ওপর দাঁড়িয়ে চলে ভয়াবহ উন্মত্ত উল্লাস।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, এই হত্যাকাণ্ডের সময় সেখানে অসংখ্য মানুষ ছিল। এত মানুষের সামনে পাথর দিয়ে একের পর এক আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে সোহাগকে। তাঁকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। স্থানীয়রা বলছেন, মঈন যুবদল নেতা। এলাকায় সে প্রভাবশালী। তাঁর ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। যদিও হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত মঈনসহ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে যেভাবে মানুষ বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়েছিল স্বৈরাচারের সশস্ত্র গুন্ডা বাহিনীর বিরুদ্ধে, গুলির মুখে দাঁড়িয়ে যেতে ভয় করেনি; এক বছর পর সেই মানুষই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একটা নৃশংস হত্যাকাণ্ড ‘উপভোগ’ করল! জুলাই নাকি মানুষকে সাহসী করেছে, মানুষকে প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছে, অপশক্তির সামনে মাথা না করতে শিখিয়েছে—এটিই কি তার নমুনা!
এ রকম ভয়ংকর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড আমাদের পুরান ঢাকার দরজি বিশ্বজিতের কথা মনে করিয়ে দেয়। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা কীভাবে তাঁকে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছিল, সেই দৃশ্য এখনো আমরা ভুলতে পারি না। যুবদলের এই সন্ত্রাসী চাঁদাবাজের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার সোহাগের কথাও কি আমরা কখনো ভুলতে পারব?
জুলাই গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকার যে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে সেই ট্রমাই মানুষ এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর মধ্যে এমন হত্যাকাণ্ড আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? এই মানসিক বিপর্যস্ততা নিয়ে এই জাতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
খুলনার দৌলতপুরে আজকে শুক্রবার আরেক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সেখানে থানা যুবদলের সাবেক এক নেতাকে গুলি করে ও রগ কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। নিহত সাবেক যুবদল নেতা কয়েক মাস আগে নিজেই রামদা হাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) সেই সংঘর্ষের ঘটনার পর যুবদল থেকে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। আজকে তিনি নিজেই খুন হলেন। স্থানীয় পুলিশ প্রাথমিকভাবে বলছে, এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সন্দেহভাজন হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা চলছে।
আজকে আরেকটি হত্যাকাণ্ড আমাদের হতবাক করে দেয়। চাঁদপুরে জুমার নামাজের পর এক ইমাম ও খতিবকে মসজিদের ভেতরেই কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছেন এক ব্যক্তি। খতিব সাহেব স্থানীয়ভাবে স্বনামধন্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানাচ্ছে, ওই ঘাতক ব্যক্তির নাকি ইমাম সাহেবের জুমার খুতবা পছন্দ না। এ জন্য আজকে আগ থেকে খতিব সাহেবকে হত্যার উদ্দেশে চাপাতি নিয়ে মসজিদে ঢুকেছিলেন ওই ব্যক্তি। তাঁর দাবি, ইমাম সাহেব ইসলামের নবী (সা.)-কে অবহেলা করে কথা বলেছেন।
কাউকে ‘শাতিম’ আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ডের আহ্বান আমরা কয়েক মাস আগে দেখেছি। যেখানে রাষ্ট্রের আইন ও বিচারকে তোয়াক্কাই করা হয়নি। তার জ্বলন্ত নমুনা আজকে চাঁদপুরে দেখা গেল। যত্রতত্র যেভাবে শাতিম আখ্যা দিয়ে মানুষকে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, মানুষের ওপর আঘাত হানা হচ্ছে, তা আমাদের ধর্মীয় সমাজের ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্নই করছে না, ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপজ্জনক পরিস্থিতিও কি ডেকে আনছে না? সরকার কি এসব ব্যাপারে চুপই থাকবে?
একটার পর একটা নৃশংস ঘটনা ঘটছে। বিএনপির কেউ জড়িত থাকলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ উঠছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকার কী করছে? কোনো ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিক ছুটে যেতে প্রশাসন কোথায়? থানা-পুলিশ কোথায়? সরকারের ব্যক্তিবর্গ কোথায়? এক বছরেও কেন দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছেন না তারা? পুলিশ সংস্কারের বিষয়টি কেন সবচেয়ে ‘গুরুত্বহীন’ করে ফেলা হলো? দেশের মানুষকে এইভাবে নিরাপত্তাহীনতার মধ্য ছেড়ে দিয়ে কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন তারা? রাজধানীতে বসে শুধু ‘হুঁশিয়ারি বার্তা’ দিয়ে কি প্রশাসন চালানো যায়?
বিএনপিই কেন বা শুধু বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে নিজের সাংগঠনিক দায়িত্ব শেষ করছে? দলীয় বিরোধে চট্টগ্রামের শুধু এক থানায় রাউজানেই ১৫ জনের বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে গেছে। উপজেলাটিতে ঢাকা থেকে বিএনপির কোনো প্রতিনিধি দল গিয়েছিল কি?
কতভাবেই দলীয় শৃঙ্খলার পদক্ষেপ নেওয়া যায়। শুধু দূর থেকে সতর্কবাণী দিয়ে বা বহিষ্কার করে কি দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব? সাংগঠনিক দক্ষতা বলতে যে একটি বিষয় আছে, সেটি যে একেবারেই দলটির নেতৃত্ববৃন্দের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না, তা কি তারা নিজেরা বুঝতে পারছেন?
দেশজুড়ে দলটির অপকর্মের শেষ নেই। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দল হিসেবে আগামী নির্বাচনে বিএনপিই ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে বলে অধিকাংশ মানুষ মনে করে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার আগেই এও আশঙ্কা করছে এক ফ্যাসিবাদী শাসনের পর আরেক ফ্যাসিবাদী শাসনের পাল্লায় পড়তে যাচ্ছে কি দেশ? এমন আশঙ্কা কীভাবে দূর করবে বিএনপি? জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনীতি ও শাসনব্যবস্থার স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম, তা কি অধরাই থেকে যাবে?
* রাফসান গালিব, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: rafsangalib1990@gmail.com
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
![]() |
| গত বুধবার বিকেলে মিটফোর্ড হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটের সামনে রাস্তার ওপর ব্যবসায়ী লাল চাঁদকে নৃশংসভাবে হত্যার একটি ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া |
Tuesday, July 8, 2025
ময়নার জন্য কাঁদছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া by জাবেদ রহিম বিজন ও মাহবুব খান বাবুল
ঘটনা রোববারের। এদিন সকালে ভয়ঙ্কর খবরে ঘুম ভাঙে শাহবাজপুরের মানুষের। নয় বছর বয়সী শিশু ময়নার লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পাশের মসজিদের দ্বিতীয় তলায়। শনিবার বিকাল থেকেই সে ছিল নিখোঁজ। ময়না শাহবাজপুরের ছন্দু মিয়া পাড়ার বাহরাইন প্রবাসী আবদুর রাজ্জাকের মেয়ে। সে লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। এ ছাড়াও স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় নূরানী বিভাগে পড়তো। নিহতের পরিবার জানায়, শনিবার দুপুরে ময়না বাড়ি থেকে খেলাধুলা করার জন্য বের হয়। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
ময়নাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল তার মায়ের। সেই স্বপ্ন এমন নৃশংস বর্বরতম কাণ্ডের মাধ্যমে মিইয়ে যাবে তা ভাবেননি কখনো। ঘটনার পর থেকে ময়নার মা ও পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে কাঁপছে আকাশ বাতাস। এমন নিষ্ঠুর ঘটনায় স্তব্ধ তার নিজ গ্রাম সরাইলের শাহবাজপুরসহ গোটা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা। সহমর্মিতা ও সান্ত্বনা জানাতে ময়নাদের বাড়িতে ছুটে যাচ্ছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক দলের লোকজন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সেনাবাহিনী, পুলিশ বিভাগসহ প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের লোকজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ন্যক্কারজনক এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ বিচারের দাবি জানাচ্ছেন স্থানীয় ও প্রবাসীরা। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে গেছেন মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনকে। গতকাল ময়নার মা লিপি আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে সরাইল থানায় হত্যা মামলা করেছেন।
সরজমিন অনুসন্ধানে পুলিশ, পরিবার ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, শাহবাজপুর গ্রামের ৮ নম্বর ওয়ার্ড ছন্দু মিয়া পাড়ার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক মিয়া। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাহরাইন প্রবাসী। ৩ মেয়ে ও ১ ছেলের মধ্যে ময়না তৃতীয়। সন্তানদের সুখ-শান্তির জন্যই পরিবার ফেলে প্রবাসে জীবনযাপন করছেন রাজ্জাক। সুশ্রী সদা হাস্যোজ্জ্বল মায়মুনা জাহান ময়নাকে ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল পরিবারের। পড়ালেখায় মেধাবী হওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছে খুবই আদরের ছিল ময়না। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ময়না বাড়ির পাশের মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগেও পড়াশুনা করতো। শনিবার বিকালে ময়না খেলতে বেরিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত আর বাড়ি ফিরেনি। যেখানে সন্ধ্যার পরই প্রাইভেট পড়তে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। সেখানে সন্ধ্যা গড়িয়ে যাচ্ছে বাড়ি ফিরছে না। ময়নার মা সহ পরিবারের সকলেই চারদিকে খুঁজতে থাকে। আশপাশসহ দূর-দূরান্তের স্বজনদের বাড়িতেও সন্ধান মিলেনি ময়নার। অস্থিরতা বাড়তে থাকে ময়নার মা’র। গভীর রাত পর্যন্ত ময়নার কোনো সন্ধান না পাওয়ায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। রাত ১টার দিকে সরাইল থানায় গিয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন ময়নার মা। রাতে ঠিকমতো ঘুমাননি কেউই। পরের দিন রোববার ভোরে তাদের বাড়ি থেকে ১০ গজ দূরে হাবলীপাড়া মসজিদের মক্তবে পড়তে যায় শিশুরা। তারা মসজিদের দ্বিতীয়তলায় ময়নাকে পড়ে থাকতে দেখে ভয় পায়। বিষয়টি হুজুরকে জানায়। ইমাম সাহেব ময়নাদের বাড়িতে গিয়ে ময়নার মাকে বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকা লাশের খবর দেন। সকলে মসজিদে এসে দেখেন দ্বিতীয়তলায় খাটিয়ার সঙ্গে বাঁধা ও গলায় পরনের সেলোয়ার দিয়ে ফাঁস লাগানো অবস্থায় উপুর হয়ে পড়ে আছে শিশু ময়নার নিথর দেহ। রক্তাক্ত মুখসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লালচে ও কালো দাগ। বাম পাশের গালের মাংস দেখা যায়। ময়নার মা পরিবার ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে সেখানকার পরিবেশ। শোকে কষ্টে নির্বাক ও স্তব্ধ হয়ে পড়ে গোটা গ্রাম। সকলেই ধারণা করতে থাকেন শিশু ময়নার ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের পর গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। ময়নার লাশ এক নজর দেখার জন্য গ্রাম, উপজেলা ও জেলা থেকে হাজার হাজার লোক ওই বাড়িতে ভিড় করেন। তারা এই ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। যাতে আর কেউ কোনোদিন শিশুর স্বপ্ন নষ্ট করার সাহস না পায়।’ পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ওই মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ থানায় নিয়ে যান। ময়নার মা লিপি আক্তারসহ পরিবারের ধারণা, শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলায় সেলোয়ার পেছিয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। ময়না হত্যার বিচার দাবি করে মামলাটিতে শেষ পর্যন্ত বিনা ফিতে আইনি সহায়তা দিয়ে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন সরাইল উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট নুরুজ্জামান লস্কর তপু।
থামছে না আহাজারি: নিহত ময়নার মা পরিবার ও স্বজনদের আহাজারি থামছে না। বুক ছাপড়িয়ে সর্বক্ষণ বিলাপ করছেন ময়নার মা লিপি আক্তার। সন্তানের অগণিত স্মৃতিচারণ করে চিৎকার করছেন। পৈশাচিক নির্যাতন ও হত্যার সময় সন্তানের কষ্টের কথা বলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ছেন। হত্যা ও নির্যাতনকারীকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে উনার চোখের সামনে ফাঁসি দেয়ার দাবি করছেন প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে।
সর্বমহলে বিচারের দাবি: স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সহমর্মিতা জানাতে আসছেন ময়নাদের বাড়িতে। সকলেই এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ বিচারের দাবি করছেন। ফেসবুকে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ময়নার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বিচার দাবি করছেন।
কাঁদছে শিক্ষক ও সহপাঠীরা: ময়নার নির্মম মৃত্যুতে কাঁদছেন লতিফ মোস্তারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী ময়নার এমন মৃত্যু তারা কখনো কল্পনাও করেননি। প্রতিদিনের ক্লাসের সাথীর আকস্মিক বর্বর মৃত্যুতে শোকে কাতর হয়ে পড়েছে সহপাঠীরা। ময়নার কথা জিজ্ঞেস করতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে হোজাইফ মিয়া, আসিফা নুজহাত ও মো. নিশাত মিয়া। তারা বলেন, কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
মাদকের বিস্তৃতিকেই দায়ী করছেন অনেকে: ময়না হত্যাসহ গ্রাম এলাকায় চুরি, ছিনতাই আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয় উল্লেখ করেন অনেকেই। শাহবাজপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান রাজিব আহমেদ রাজ্জি বলেন, ময়নার বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তার পিতা- মাতাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষাই খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের চারদিকে মাদক বিস্তৃতির ভয়াবহতা এমন সব কাণ্ডের জন্য অনেকটা দায়ী। আমার সন্তান দিনে রাতে কখন কোথায় যায়? কি করে? বাড়ি থেকে বেরিয়ে স্কুলে গেল কিনা? সন্ধ্যার পর বাইরে কেন? এসব বিষয়ের জবাবদিহিতা নেয়া সকল অভিভাবকের দায়িত্ব। আমরা কি সেটা করছি?
জানাজায় মানুষের ঢল: ময়নার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। পিতার জন্য ১২ ঘণ্টা বিলম্বে ময়নার জানাজা হয়েছে। পিতা আব্দুর রাজ্জাক বাহরাইন থেকে আসছেন। এরপর জানাজা হয়েছে। গতকাল সোমবার বাদ আসর শাহবাজপুর খেলার মাঠে ময়নার জানাজায় মানুষের ঢল নেমেছিল। জানাজায় অংশগ্রহণকারী সহস্রাধিক লোকের চোখেই ছিল অশ্রু।
ময়নার পিতা আব্দুর রাজ্জাক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার কলিজার টুকরা বুকের ধন যারা কেড়ে নিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ বিচার চাই। পুলিশসহ সকল বাহিনীর কাছে আমার অনুরোধ দ্রুত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করুন। এমন জঘন্য অপরাধীরা যেন কোনো ভাবেই রেহাই না পায়। তাদের ফাঁসি হলে আমার ময়নার আত্মা কিছুটা হলেও স্বস্তি পাবে।
ময়নার স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোসা. লায়লা বেগম বলেন, ময়না অত্যন্ত মেধাবী ছিল। আগামীতে বৃত্তির জন্য তাকে প্রস্তুত করতে ছিলাম। একজন মেধাবী শিশু শিক্ষার্থী যদি এমন পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়। তবে আর মেধাবী বের হবে না। দেশ হয়ে যাবে মেধাশূন্য। পরিবার হারিয়েছে তাদের সন্তান। আর দেশ হারিয়েছেন ভবিষ্যৎ অমূল্য সম্পদ। এভাবে আর কতো ময়নাকে ইজ্জত ও প্রাণ দিতে হবে। আমরা দ্রুত ময়না হত্যার সর্বোচ্চ বিচার চাই। সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোরশেদুল আলম চৌধুরী বলেন, ইমাম- মুয়াজ্জিনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তও চলছে। মামলাটির তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা যাবে না। সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোশারফ হোসাইন বলেন, বিষয়টি লোমহর্ষক, মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। পুলিশ বিভাগসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি নিয়ে খুবই গুরুত্বসহকারে কাজ করছেন। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অপরাধীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসবেন।

Thursday, June 12, 2025
রেইনকোট, খুকরি আর রক্তমাখা ষড়যন্ত্র
প্রমাণের পাহাড়
তদন্তে যে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক ও ডিজিটাল প্রমাণ মিলেছে, তা হলো- অভিযুক্ত আকাশের একটি রক্তমাখা শার্ট, ফরেনসিকে নিশ্চিত হয়েছে তাতে যে রক্ত লেগে আছে তা রাজার। সোনমের রেইনকোটেও মিলেছে রক্তের দাগ। হত্যায় ব্যবহৃত ‘খুকরি’ নামের বাঁকা ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। অভিযুক্ত আনন্দের পরনে থাকা রক্তমাখা জামাকাপড়। হত্যাযন্ত্র এবং রাজার ব্যবহৃত জিনিসে অভিযুক্তদের আঙুলের ছাপ। অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস। মোট ৪২টি লোকেশনের সিসিটিভি ফুটেজ, যাতে অভিযুক্তদের গতিবিধি ধরা পড়েছে। হোটেল মালিকদের বক্তব্য, যেখানে অভিযুক্তরা নিজেদের আসল নামেই বুকিং দিয়েছিল। স্কুটার ভাড়ার কাগজ, যেখানে নবদম্পতির সই রয়েছে। খুকরি বিক্রেতার সাক্ষ্য। আধার কার্ড ও অন্যান্য পরিচয়পত্রের ফটোকপি, যা অভিযুক্তরা লজে জমা দিয়েছিল। ট্রেন ও ফ্লাইট টিকিট, যা অভিযুক্তদের যাত্রাপথের সঙ্গে মিলে যায়। কল ডিটেইল রেকর্ড: সোনম, রাজ এবং তিন খুনির সক্রিয় যোগাযোগ। মোবাইল লোকেশন ডেটা: হত্যার দিন, ২৩ মে, সকলেই ঘটনাস্থলের আশপাশে। তিন অভিযুক্তের প্রাথমিক স্বীকারোক্তি। অনেক ডিজিটাল প্রমাণ ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে।
যেসব প্রমাণ এখনো অধরা
তদন্তকারীরা এখনো খুঁজে পাননি সোনমের মোবাইল ফোন। তাতে থাকতে পারে ফাঁস হওয়ার মতো চ্যাট, ছবি বা কল লগ। একইসঙ্গে অন্য অভিযুক্তদের মোবাইল ও ঘটনার সময়কার পোশাকও এখনো উদ্ধার হয়নি। আরো একটি বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়েছে রুপির লেনদেন ঘিরে। পুলিশ বলছে, ২০ লক্ষ রুপির বিনিময়ে এই খুন করা হয়েছে। কিন্তু সেই রুপির উৎস ও লেনদেনের পথ এখনো স্পষ্ট নয়।
ঘটনার কালানুক্রম
মে ১১: রাজা ও সোনমের বিয়ে হয় ইন্দোরে।
মে ২১: তাদের শিলং আগমন, বালাজি গেস্ট হাউজে থাকা।
মে ২২: স্কুটার ভাড়া নিয়ে চেরাপুঞ্জির উদ্দেশে রওনা।
মে ২৩: ‘হানিমুন ট্রেক’ শুরু, রাজাকে খুন করা হয়।
মে ২৪: ফেলে যাওয়া স্কুটার উদ্ধার, সোহরারিম এলাকা।
জুন ২: রাজার দেহ উদ্ধার।
জুন ৭: অভিযুক্ত তিন খুনি গ্রেফতার, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ থেকে।
জুন ৮: সোনম আত্মসমর্পণ করেন উত্তরপ্রদেশের গাজিপুরের নন্দগঞ্জ থানায়।
খুনের ছক ও ঘটনার পুনর্গঠন
সোনম ও রাজের সম্পর্ক: রাজা কিছুই জানতেন না। রাজ ছিলেন সোনমের পারিবারিক ব্যবসায় কর্মরত। তিন খুনি (আকাশ, আনন্দ, বিকাশ) ইন্দোর থেকে শিলং পৌঁছান বিভিন্ন যানবাহনে চেপে, যাতে কারো নজরে না আসেন।
মে ২৩: চেরাপুঞ্জির কম চেনা মাওলিংখিয়াত ট্রেইল দিয়ে ট্রেক শুরু করেন পাঁচজন।
১০টা নাগাদ: স্থানীয় গাইড আলবার্ট দেখেন যে তারা গাইড নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ট্রেইলে একান্তে যাওয়ার পর: সোনম পিছিয়ে পড়েন এবং চিৎকার করেন ‘মেরে দো!’
তারপর: বিকাশ প্রথম আঘাত করে, বাকিরা মিলে রাজাকে মাথা ও বুকে কোপায়।
দেহ গিরিখাতে ফেলে দেওয়া হয়: যেখানে সোনম নিজেও সহায়তা করেন বলে অভিযোগ।
পলায়নের রাস্তায়
খুনের পর সোনম মাওকাডক থেকে ট্যাক্সিতে শিলং যান। এরপর গুয়াহাটি হয়ে ট্রেনে ইন্দোর ফেরেন বলে অনুমান। তিন খুনি আলাদা আলাদা ট্রেনে করে গিয়েছেন মধ্যপ্রদেশ।
কীভাবে ফাঁস হলো ষড়যন্ত্র
প্রথমে সোনম নিজেকে নিখোঁজ দেখানোর চেষ্টা করেন, যেন মনে হয় তিনিও অপহৃত। কিন্তু পরবর্তীতে ৮ জুন গাজিপুরে আত্মসমর্পণ করেন। তদন্তে নেতৃত্ব দেন মেঘালয় পুলিশের এসপি বিবেক সিয়েম। তার ভাষায়, উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল, ফরেনসিক ও সাক্ষ্য-প্রমাণ রয়েছে সোনম ও রাজ কুশওহার বিরুদ্ধে।

হানিমুনে স্বামী হত্যা, ২০ লাখ রুপির চুক্তি, হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেন সোনম
২৪ বছর বয়সী সোনম ও ২৯ বছর বয়সী রাজা ১১ই মে মধ্যপ্রদেশের ইন্দোরে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরে হানিমুনের জন্য সোনম মেঘালয় ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন। তারা ২১শে মে শিলং পৌঁছান। এরপর তারা পূর্ব খাসি হিল জেলার চেরাপুঞ্জি বা সোহরা অঞ্চলে যান। কিন্তু রাজার পরিবার জানত না যে, সোনম প্রেমে পড়েছেন তাদের পারিবারিক ব্যবসায় কাজ করা ২১ বছর বয়সী কর্মচারী রাজ কুশওয়াহার সঙ্গে। অভিযোগ আছে, কুশওয়াহা তার তিন বন্ধুকে রাজাকে হত্যা করার জন্য নিয়োগ দেন এবং সোনম তাদের ২০ লাখ রুপি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২৩শে মে সোনম ও রাজা জলপ্রপাত দেখতে একটি পাহাড়ের চূড়ায় ট্রেকিংয়ে যান। সেই সময়ই হত্যাকারীরা তাদের পিছু নেয় এবং নির্জন স্থানে পৌঁছালে সোনমই রাজাকে হত্যার নির্দেশ দেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোনম এরপর নিজেই তার স্বামীর দেহ গিরিখাদে ফেলে দিতে সাহায্য করেন।
পূর্ব খাসি হিল জেলার পুলিশ সুপার বিবেক সিয়েম জানান, হত্যার পর সোনম প্রথমে মাওকাদক থেকে ট্যাক্সিতে শিলং যান। সেখান থেকে গৌহাটি পৌঁছান একটি পর্যটক ট্যাক্সিতে। এরপর গৌহাটি থেকে একটি ট্রেনে চেপে পালিয়ে যান। তার দাবি অনুযায়ী, তিনি ইন্দোরে গিয়েছিলেন। কিন্তু অন্যান্য অভিযুক্তদের জবানবন্দি পাওয়ার পরই তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। অপরদিকে তিন হত্যাকারী সোহরা থেকে ট্যাক্সিতে গৌহাটি যায় এবং সেখান থেকে ট্রেনে করে ইন্দোরে ফিরে যায়। একজন তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, তাদের আলাদা ও সমন্বিত পালানোর পদ্ধতি দেখে বোঝা যায়, হত্যার পর পালানোর পরিকল্পনাও আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল।
পুলিশ জানিয়েছে, মৃতদেহ উদ্ধারের সাত দিনের মধ্যেই তারা সোনমের বিরুদ্ধে যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করে তাকে গ্রেফতার করে। যদিও সোনমের মোবাইল এখনও উদ্ধার হয়নি, তবে পুলিশ নিশ্চিত যে হত্যার দিন সে কুশওয়াহার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং কুশওয়াহা আবার তার ঘাতক বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। তবে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি সোনম আগে কখনও মেঘালয়ে এসেছিলেন কিনা অথবা হত্যার নির্দিষ্ট স্থানটি তিনি আগে থেকেই ঠিক করেছিলেন কিনা।
এসপি বিবেক সিয়েম বলেন, তিনি হয়তো গুগল সার্স করে নির্জন জায়গা খুঁজে বের করেছিলেন। এখানে প্রচুর বন আছে। হয়তো সুযোগ বুঝে এটাই করেছে। এটা অন্য যেকোনো জায়গায়ও হতে পারত। আমরা নিশ্চিত নই। কারণ তিনি বলছেন আগে কখনও শিলং আসেননি।
সোনম মঙ্গলবার রাতে শিলং পৌঁছানোর কথা। কুশওয়াহা ও বাকি তিন ঘাতক বুধবার সকালে পৌঁছানোর কথা। পুলিশ সুপার বলেন, আমরা তাদের আদালতে হাজির করবো এবং এরপর পুলিশ রিমান্ডে নেব। তখনই ঠিক করবো কবে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে পুরো হত্যাকাণ্ডের পুনর্গঠন করা হবে। তিনি আরও বলেন, তারা একসঙ্গে উপরে উঠেছিল। তারা একটি দর্শনীয় স্থানে মিলিত হয় এবং সেখান থেকে হেঁটে যায়। তাদের স্কুটারগুলো নিচে ছিল। ঘাতকদের মতে, সোনমই তাদের ‘ওয়েই সাওডং’ ঝরনায় নিয়ে যায় এবং সেখানেই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
এই ঘটনায় গোটা দেশজুড়ে আলোড়ন তৈরি হয়েছে। সদ্য বিবাহিত এক নারী কীভাবে এমন নির্মম পরিকল্পনায় জড়িয়ে পড়লেন, তা নিয়ে সমাজে বিস্তর প্রশ্ন উঠছে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে পুলিশ জানতে পারবে হত্যার পুরো পরিকল্পনা কার মাথা থেকে এসেছিল এবং আসল উদ্দেশ্য কী ছিল।

Tuesday, May 27, 2025
নারীর নেশাতেই পতন: যেভাবে দিনমজুর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী
নাম শুনতে যেমন ভয়ঙ্কর, কাজ ছিল আরও ভয়ঙ্কর। হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, গুলি ছোড়া, অস্ত্রের ঝনঝনানি, আগুন দিয়ে বাড়ি-দোকান জ্বালিয়ে দেয়া তার কাছে ছিল মামুলি ব্যাপার। প্রায় ১ যুগ আগে সাজ্জাদ আলী খানের হাত ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে পা রাখলেও ধীর ধীরে এই জগতে আলোচিত হয়ে ওঠে ঢাকাইয়া আকবর। সিএমপিও তাকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। তবে শেষমেশ নারীতেই পতন হলো এই সন্ত্রাসীর। রোববার চমেক হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে শুক্রবার রাত আটটার দিকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়। তার শরীরে অন্তত ১০-১২টি গুলি লাগে। এসময় গুলিবিদ্ধ হন ৮ বছরের শিশু রাতুলসহ আরও এক দর্শনার্থী। তবে অনেকে মনে করছেন, ঢাকাইয়া আকবরের মৃত্যু আন্ডারওয়ার্ল্ডে আরও অশান্তি সৃষ্টি করবে নতুন করে।
সূত্র মতে, ফেসবুকে বেশ সক্রিয় আকবর। তার আইডিও ভেরিফাইড। প্রায় সময় সে নানারকম ভিডিওর পাশাপাশি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্নাকে কটূক্তি করে ভিডিও পোস্ট করতো। নগরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই ডন সরোয়ার বাবলা ও বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খানের সঙ্গে চাঁদাবাজি ও ব্যবসাকে ঘিরে দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঝামেলা চলছিল। সেই বিরোধে জড়িয়ে ছিল তাদের শিষ্যরা। ঢাকাইয়া আকবর একসময় সাজ্জাদ আলী খানের শিষ্য থাকলেও ৩ বছর আগে থেকে তার দল ছাড়ে। পরে যোগ দেয় তারই প্রতিপক্ষ সরোয়ার বাবলার সঙ্গে। গত ১৫ই মার্চ ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হলে এই দু’গ্রপের উত্তেজনা আরও বাড়ে। ২৯শে মার্চ নগরের বাকলিয়ায় ব্যাপক গোলাগুলিতে ডাবল মার্ডার হয়। এরপরই ঘটে ঢাকাইয়া আকবরের ঘটনা। সরোয়ার বাবলার গ্রুপের লোকজন বলছে, এসব ঘটাচ্ছে ছোট সাজ্জাদের বাহিনী। একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে তারা হত্যা করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ‘সন্ত্রাসী’ আকবরের পরনারীর প্রতি দুর্বলতা ছিল আগে থেকেই। তাই তাকে ‘হত্যাচেষ্টা মিশনে’ পাতা হয়েছিল তরুণীর ফাঁদ। যার সঙ্গে মাত্র পাঁচদিনের পরিচয়ে ‘ডেটিংয়ে’ গিয়েছিলেন আকবর। এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র বলছে, এই হামলার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন বড় সাজ্জাদ। ২০২৩ সালের দিকে কারাবন্দি অবস্থায় আকবরকে জামিন না করানোয় সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয় গুরু ও শিষ্যের। সেই থেকেই আকবরের ওপর ক্ষোভ থাকলেও সামপ্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তা আরও বেড়ে যায়। পতেঙ্গা সৈকতে গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল সেই দ্বন্দ্ব। প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যবসায়ী বলেন, আকবরের সঙ্গে থাকা চারজন ছেলেসহ তারা ৬-৭ জন সৈকতের ২৮ নম্বর দোকানে বসেছিলেন। মোটরসাইকেলে করে ৪ জন যুবক ঘটনাস্থলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। এরপর আকবরের সঙ্গে থাকা ৪ জন সেখান থেকে দৌড়ে পালায়। আর যে তরুণী ছিলেন তিনি গুলিবর্ষণকারীদের সঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। আকবরকে গুলির পরপরই স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এরপর তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার আগে আকবর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এই হামলার পেছনে রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান দায়ী। তারাই তাকে গুলি করেছে। ওই তরুণীর সঙ্গেও তার প্রথম দেখা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চারজন ছাড়াও সেগুন এবং মোহাম্মদ নামে আরও দু’জন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন। বাকি চারজনসহ এই ছয়জন চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী। গুলিবিদ্ধ আকবরের বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময় এসব মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। ঢাকাইয়া আকবর ২০২৩ সালে গুরু সাজ্জাদ আলী খানের ভাইয়ের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। পরে না পেয়ে সাজ্জাদ আলী খানের বাড়ি গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তার সঙ্গে থাকতে ঢাকাইয়া আকবর চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘নিয়মিত চাঁদাবাজি’ করতেন। সাজ্জাদের ‘ সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ হিসেবে কাজ করতেন ঢাকাইয়া আকবর। ২০১৭ সালে আকবরকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সে সময় ছয় রাউন্ড কার্তুজসহ একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয় তার কাছ থেকে। এরপর দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন আকবর। দু’বছর কারাভোগের পর ২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর জামিনে ছাড়া পান তিনি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর থেকে দু’টি অস্ত্রসহ তাকে আবারো গ্রেপ্তার করে বায়েজিদ থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভবন মালিককে ফোন করে চাঁদা দাবির অভিযোগ ছিল সে সময়।
আকবরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর জেলে থাকা অবস্থায় আকবর ভেবেছিলেন ‘গুরু’ সাজ্জাদ আলী খান তার জামিনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু ‘গুরুর’ সেই ‘আশীর্বাদের হাত’ পায়নি সে। তার পরিবারই অনেক কষ্টে জোগাড় করেছে মামলা পরিচালনার ব্যয়। তখন থেকেই গুরুর ওপর ক্ষোভ জন্মে তার। জামিনে বেরিয়ে আকবর গুরুকে টেক্কা দিতে নিজেই গড়ে তোলেন বাহিনী। এরপর থেকেই বড় সাজ্জাদের চাঁদাবাজিসহ নানা কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সে। পুলিশকে সাজ্জাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়েও সাহায্য করতো সে। তাই আকবরের প্রতি সমপ্রতি বেশ ক্ষুব্ধ হয় বড় সাজ্জাদ। আকবরের ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, কারাবন্দি ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে নিয়ে প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও পোস্ট করতো সে। এ ছাড়া পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান এবং বিএনপি’র এক শীর্ষ নেতাকে হুমকি দিয়েও ভিডিও পোস্ট করতে দেখা গেছে। সমপ্রতি গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ এই সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন আকবর- এমন গুঞ্জন আছে। হাসপাতালে আকবরের স্বজনদেরও দাবি, এই ঘটনায় কারাগারে বন্দি ‘সন্ত্রাসী’ ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা জড়িত।

Monday, May 26, 2025
সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুন
সূত্র বলছে, সম্প্রতি ঢাকা থেকে আটক হওয়া সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের লোকজন এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। আর ঘটনার কলকাঠি নেড়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। যিনি ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের ‘গুরু’। গুলিবিদ্ধ ঢাকাইয়া আকবরও একসময় বড় সাজ্জাদের শিষ্য ছিল। কিন্তু বছরখানেক আগে কারাবন্দি অবস্থায় আকবরকে জামিন না করানোয় সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়। সেই থেকেই আকবরের ওপর ক্ষোভ থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তা আরও বেড়ে যায়। পতেঙ্গা সৈকতে গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল সেই দ্বন্দ্ব। ঘটনার শুরু থেকেই আকবরের সঙ্গে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবকের বর্ণনা অনুযায়ী, নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণীর সঙ্গে আকবরের ফেসবুকে পরিচয় হয় মাত্র পাঁচদিন আগে। কথাবার্তার একপর্যায়ে দেখা করার প্রস্তাব দেয় আকবর। ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পতেঙ্গা সৈকতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সে অনুযায়ী নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন মোড় এলাকায় এক ছোট ভাইকে দিয়ে প্রাইভেটকার পাঠায় আকবর। কিন্তু সেদিন ওই তরুণী আসেনি। পরদিন বিকালে তরুণীকে নিয়ে বেড়াতে যেতে আবারো একইস্থানে গাড়ি পাঠানো হয়। শুক্রবার বিকাল ৩টার পর অক্সিজেন মোড় জামান হোটেলের বিপরীতের প্রাইম ব্যাংকের সামনে দাঁড়ায় প্রাইভেটকারটি। কিছুক্ষণ পর নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণী ঘটনাস্থলে যান বোরকা ও মাস্ক পরে। গাড়িতে ওঠার আগে তরুণী জানান, তার এক বান্ধবী ও বয়ফ্রেন্ডও সঙ্গে যাবে। পাঁচ মিনিটের মাথায় ওই তরুণী মুঠোফোনে ওই দু’জনকে সরাসরি পতেঙ্গা সৈকতে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে প্রাইভেটকারে চড়ে। তরুণীকে নিয়ে এরপর যাওয়া হয় একই থানাধীন চালতাতলী পূর্ব মসজিদ এলাকায় আকবরের বাড়ির সামনে। সেখান থেকেই আকবর গাড়িতে চড়ে। গাড়ি গিয়ে থামে জিইসি মোড় এলাকায়। একটি কাপড়ের শো-রুম থেকে কয়েকটি শার্ট কেনে আকবর।
এরপর গাড়িটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সরাসরি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে রওয়ানা হয়। গাড়িতে থাকা অবস্থায় আকবর পতেঙ্গা এলাকার কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে। বিকাল আনুমানিক পাঁচটায় গাড়ি পতেঙ্গায় পৌঁছায়। আকবর তার বন্ধুদের ফোন করলে তারা আসতে দেরি হবে বলে জানায়। তখন ওই তরুণীসহ কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারা পারকির সমুদ্র সৈকতে যায়। সেখানে প্রায় আধাঘণ্টা তরুণীর সঙ্গে সময় কাটায় আকবর। একপর্যায়ে অচেনা কয়েকজন ছেলে আকবরকে সালাম দিয়ে জানায়, ফেসবুকে আকবরের ভিডিও তারা দেখে। আকবর তাদের চিনতে না পেরে সন্দেহবশত তড়িঘড়ি করে আবারো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ফেরে। পতেঙ্গা সৈকতে ফেরার পর আকবরের পূর্বপরিচিত পতেঙ্গা এলাকার বন্ধুরা কল দেয় এবং সৈকতে তাদের দেখা হয়। যাদের মধ্যে তিনজন আকবরের সমবয়সী ছিল, বাকি একজন বড় ভাই। এরপর প্রাইভেটকার পার্কিং করে তারা সবাই মিলে সৈকতের ২৮ নম্বর দোকানে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ তারা গল্প করে দোকানিকে ডেকে নাশতা অর্ডার করে। এরই মধ্যে দোকানি পিয়াজু নিয়ে আসেন। আকবর এক প্লেট পিয়াজুসহ ওই তরুণীকে নিয়ে একটু দূরে আরেকটি টেবিলে গিয়ে বসে। প্রায় ১০ মিনিট পর হঠাৎ চার যুবক এসে আকবরকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। চারদিক ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ আকবর প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রের দিকে দৌড়াতে থাকে এবং একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আকবরের সঙ্গে থাকা সবাই এ সময় ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালায়।
আকবরকে গুলির পরপরই স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার আগে আকবর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এই হামলার পেছনে রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান দায়ী। তারাই আকবরকে গুলি করেছে। ওই তরুণীর সঙ্গেও তার প্রথম দেখা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চারজন ছাড়াও সেগুন এবং মোহাম্মদ নামে আরও ২ জন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল। বাকি চারজনসহ এই ছয়জন চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







