Saturday, December 28, 2013

যৌন জীবনে অতৃপ্ত তাই!

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের চেসনির বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী এক নারীকে তার ৭২ বছর বয়সী স্বামী নিজের বোনদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়তে বলেছেন। ওই দম্পতির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। জরুরি নম্বর ৯১১- এ ফোন করে শেষ পর্যন্ত পুলিশি সহায়তা চেয়েছেন ওই নারী। পুলিশের কাছে তিনি বলেছেন, গত ২ বছর তাদের যৌন জীবনে কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তেমন একটা ভালো সময় পার করছিলেন না তারা। ফলে, দাম্পত্য জীবনে সেটার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। দম্পতিদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা বা থেরাপি নেয়ার ব্যাপারে ওই নারী তার স্বামীকে প্রস্তাব দেন। তাতে রাজি না হয়ে উল্টো তার স্বামী তাকে বলেন তার বোনদের সঙ্গে রাত কাটাতে। এতে তাদের যৌন জীবন আরও উত্তেজনাময় হয়ে উঠবে বলেও মন্তব্য করেন স্বামী। স্বামীকে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি সে ধরনের মানুষ নন। ক্ষুব্ধ হয়ে ৯১১ নম্বরে ফোন করে পুলিশি সহায়তা চান তিনি। ওই দম্পতির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে স্বামীর বোনেরা যাতে কখনও তাদের বাড়িতে ঢুকতে না পারেন এবং তাদের পারিবারিক সম্পর্কে নাক না গলান, তা নিশ্চিতেও পুলিশি সহায়তা চান ওই নারী। 

সিইসি ও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন- প্লিজ, ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বন্ধ করুন by মাহফুজ আনাম

কেন ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত নয়? কারণ তা আমাদের সংবিধানে বর্ণিত নির্বাচন ধারণার পরিপন্থি, কারণ তা এখনও পর্যন্ত গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের যে আস্থা আছে তা ধ্বংস করে দেবে। কারণ, এ নির্বাচন সামনে দিনগুলোতে আরও মৃত্যু ও সহিংসতার কারণ হবে,
তা অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে, এরই মধ্যে এ নির্বাচনের কারণে অর্থনীতির অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তার বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে, বাংলাদেশের অস্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে উপস্থাপিত করবে। আরও সহিসংতা নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, গার্মেন্টের অর্ডার অন্য দেশে চলে যাবে। চলমান অস্থিরতা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করবে এবং আইনশৃঙ্খলা আরও ভেঙে পড়বে।

আমরা এখন যেসব সঙ্কট মোকাবিলা করছি ৫ই জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন কি তার কোনটির সমাধান করবে? এ নির্বাচন কি হরতাল-অবরোধ, রাজপথের সহিসংতা বন্ধ করবে? তা কি দারিদ্র কমাবে? এ নির্বাচন কি হত্যা এবং অগ্নিসংযোগ বন্ধ করবে? আমরা সবাই জানি তা বন্ধ হবে না। সুতরাং, কেন আমরা এমন কিছু করবো যা কোন সঙ্কটরেই সুরাহা করবে না। এবং তা শুধু জনগণের দুর্ভোগই বাড়াবে। অন্য অনেকের চেয়ে শেখ হাসিনা ভালো জানেন, যখন সামাজিক অস্থিরতা দেখা দেবে তখন জনগণ সরকারকেই দায়ী করবে। সুতরাং, অস্থিরতা অব্যাহত থাকলেও তিনি আরও কিছু হারাবেন। তিনি জনসাধারণের এ ধরনের আচরণ থেকে লাভবান হয়েছিলেন যখন তিনি বিরোধী দলে ছিলেন।
নির্বাচন বিষয়টি আসলে কি? এটি শুধু আনুষ্ঠানিকতা, যা প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ভোটাররা অংশ নেন অথবা না নেন? এটা কি শুধু সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। ভোটারদের অংশ নেয়া না নেয়ার ব্যাপারে কোন দায়িত্ব নেই। এটা কি ভোটারদের সঙ্গে খেলা শুধু লিগ্যাল গেইম, যাতে এমনকি ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ না দিয়েও কেউ নিজেদের এমপি হিসেবে নির্বাচিত করতে পারে? যদি এগুলো সত্য হয় তাহলে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি একটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে।


অন্যদিকে, নির্বাচন যদি জনগণের অভিপ্রায়ের প্রকাশ হয়, যদি তা একটি প্রক্রিয়া হয় যাতে জনগণ তাদের পছন্দের প্রকাশ ঘটান, যদি তা একটি ইভেন্ট হয় যার মাধ্যমে জনগণ নতুন সরকার পছন্দ করে, যদি তা একটি প্রক্রিয়া হয় যার মাধ্যমে জনগণ কিছু পলিসি অনুমোদন করেন যা তাদের নতুন সরকারের দ্বারা তারা কার্যকর দেখতে চান, যদি একটি প্রক্রিয়া হয় যার মাধ্যমে জনগণ যারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন অথবা যারা দুর্নীতিবাজ তাদের শাস্তি দিয়ে থাকেন। তাহলে কি ৫ই জানুয়ারি একটি হাস্যকর তামাশা হতে চলছে যা গণতন্ত্র থেকে একেবারেই দূরবর্তী। এটা অর্থগত, উদ্দেশ্যগত এবং চেতনাগত দিক থেকে সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তির পেছনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবচেয়ে বড় যুক্তি দেখান, বাংলাদেশ অনির্বাচিত ব্যক্তিদের দ্বারা শাসিত হতে পারে না। আমরা যদি প্রধানমন্ত্রীর এ যুক্তি মেনে নিই তাহলে স্বাভাবিকভাবেই নতুন সংসদ এবং সরকার গঠনের ক্ষেত্রে নির্বাচনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।
আমাদের সংবিধান অনুযায়ী নতুন সংসদ ও সরকার গঠিত হয় জনগণের রায়ের মাধ্যমে, প্রাপ্ত বয়স্করা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে এ রায় দিয়ে থাকেন। এটাই আমাদের সংবিধানের মূল চেতনা।
অন্যদিকে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোন ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হবেনÑ তা কখনও আমাদের সংবিধানের চেতনা নয়। এরই মধ্যে ৩০০ আসনের বিপরীতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৪ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে গেছেন। বাকি ১৪৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে নামমাত্র। শেখ হাসিনা ১৫তম সংশোধনী আনার ব্যাপারে বারবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের কথা বলে থাকেন। ওই রায়েই প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। একই রায়ে বিচারপতি এস কে সিনহা বলেন, জনগণের নির্বাচিত ছাড়া অন্য যে কোন ধরনের সরকার ব্যবস্থা সংবিধান ঘৃণা করে। বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা বলেন, গণতন্ত্র এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন একে অপরের পরিপূরক। গণতন্ত্রের মত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনও গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক কাঠামো। সত্যিকার অর্থে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রের প্র্যাকটিসের কোন সুযোগ নেই। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে সংসদের কোন আইনগন ভিত্তি থাকবে না। এ ধরনের সংসদ সার্বভৌমও নয় এবং এ ধরনের সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্বও নেই। বিচারপতি মিঞা আরও লিখেছেন, সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদে উল্লিখিত নির্বাচন বলতে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনকেই বুঝানো হয়েছে। যদি প্রার্থীরা শক্তি, অর্থ এবং সরকারি ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচিত হন, তবে ওইসব সংসদ সদস্যকে জনগণের প্রতিনিধি বলা যায় না এবং সংবিধানের ৬৫(১) অনুচ্ছেদের আলোকে এ ধরনের সংসদকে সংসদ বলা যায় না। এ ধরনের সংসদ আমাদের পূর্বপুরুষ এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আশা-আকাক্সক্ষারও পরিপন্থি।
সুতরাং, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের নিজেদের জিজ্ঞেস করা উচিত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে কি ধরনের সরকার এবং সংসদ প্রতিষ্ঠা হবে। কত সংখ্যক মানুষের সমর্থন তাদের প্রতি রয়েছে। এর বৈধতা কি? জনগণের কি ধরনের প্রতিনিধিত্ব এতে রয়েছে। শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের মাধ্যমে খুবই সামান্য কিছু অর্জন করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ যাই বলুক না কেন ১৫৪ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং ১৪৬ আসনে নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী সংসদ সদস্যদের জন্য গঠিত সংসদ কখনওই একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের মতো বৈধতা দাবি করতে পারে না। কথিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার শুধু তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা আর খ্যাতি হারাতে পারে। দশম সংসদ নির্বাচনের পর দ্রুত একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফর্মুলা শুধুমাত্র সময়ের অপচয় এবং তা মানুষের দুর্ভোগ ও অর্থনীতির ক্ষতির মাত্রাই শুধু বাড়াবে। আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প হচ্ছে সত্যিকার অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করা। এটা দেশ এবং দেশের বাইরে আওয়ামী লীগের মর্যাদা রক্ষা করতে পারে।
সুতরাং, আমরা দু’টি প্রধান দলকে গণতন্ত্র রক্ষায়, রক্তপাত ও অর্থনীতির ধবংস এড়াতে নিম্নের প্রস্তাবগুলো দিচ্ছি:
১. নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীন দলের ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করা উচিত। সত্য হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার এ নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। ১৫৪ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকাই দশম সংসদের বিশ্বাসযোগ্যতা ধবংস করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। নির্বাচন কমিশনের এটা ভাবনায় নেয়া প্রয়োজন যা হতে চলেছে তা বাংলাদেশের বেশিরভাগ জনগণের সঙ্গে গণতন্ত্রের নামে প্রতারণা।
২. শেখ হাসিনার উচিত নবম সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা খুঁজে বের করা। এটা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন হওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। এটা প্রধানমন্ত্রীর সর্বদলীয় সরকার ধারণার মধ্যেই হতে পারে। একমাত্র কঠিন বিষয়টি হলো কে হবেন ওই সরকারের প্রধান? আমরা মনে করি প্রেসিডেন্ট জাতিকে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে পারেন যদি সবাই তাকে অনুরোধ করেন। প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় যেমন- স্বরাষ্ট্র ও সংস্থাপনও প্রেসিডেন্টের কাছে থাকতে পারে। নবম সংসদ পরবর্তী নির্বাচন ও সরকার গঠনের জন্য ৯০ দিন সময় বেঁধে দিতে পারে।
৩. যদি নবম সংসদের অধিবেশন আহ্বান করা হয় তবে বিএনপির উচিত হবে কোন ধরনের পূর্বশর্ত ছাড়াই সংসদে যোগ দেয়া এবং সবধরনের কর্মসূচি প্রত্যাহার করা। একই সঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সমঝোতা প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়া উচিত।
৪. জামায়াতের অংশগ্রহণের ব্যাপারটি হাইকোর্টের রায় পূরণের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ, গণতন্ত্র এবং অর্থনীতি রক্ষায় রাজনৈতিক সমঝোতাই সবচেয়ে জরুরি। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে আমরা বলতে চাই, আমাদের ভোট দেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোন অধিকার আপনাদের নেই। বিরোধী দলকে আমরা বলতে চাই, আমাদের হত্যা, অগ্নিদগ্ধ এবং আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার কোন অধিকার আপনাদের নেই। আমাদের নিজেদের আমরা বলতে চাই, আমাদের রাজনীতিবিদরা যখন আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলছেন এবং দেশকে অজানা গন্তব্যে নিয়ে চলছেন তখন আমরা সাইড লাইনে বসে থাকতে পারি না। আপনার উদ্বেগ শোনা ও বিবেচনায় নেয়ার জন্য আপনার গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করুন।

 (ডেইলি স্টারে শুক্রবার প্রকাশিত পত্রিকাটির সম্পাদক মাহফুজ আনামের লেখা মন্তব্য প্রতিবেদন থেকে অনূদিত)

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বনাম মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ বৃদ্ধি by বিমল সরকার

রাজনীতিকদের একগুঁয়েমি, জেদাজেদি, রেষারেষি ও অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের ফলে ২০০৬ সালের শেষার্ধে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে দেশে এক ভয়াবহ নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়। দেশবাসী চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করে। মূলত রাজনীতিকদেরই সৃষ্ট দেশব্যাপী চরম নৈরাজ্য, বিশৃংখলা ও অনিশ্চয়তার মাঝে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতাসীন হয়। দেশে ও বিদেশে ওই সরকার এবং আমাদের সেনাবাহিনী দারুণভাবে প্রশংসিত হয়। অনেকে ফখরুদ্দীন সরকারকে ‘জাতির উদ্ধারকর্তা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন সে সময়। প্রায় ২৪ মাস স্থায়ী ওই তত্ত্বাবধায়ক সরকার শেষদিকে অবশ্য নানা কারণে সুনাম ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেনি।
সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের কর্মকাণ্ড ও সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে নানাজনের নানা মত থাকতে পারে। কিন্তু যেসব কারণে ওই সরকার মানুষের আস্থা অর্জন ও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল, সেগুলোর অন্যতম হল দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান। দুর্নীতি নামক বিষবৃক্ষটি রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দিন দিন এর শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে গোটা জাতিকে কী গভীর অতলে নিয়ে গেছে, তার কিছু দৃষ্টান্ত সবার সামনে উন্মোচিত হয় তৎকালীন সরকারের কর্মতৎপরতায়ই। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিক থেকে শুরু করে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা, ব্যবসায়ী এবং বিভিন্ন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত কিছু ব্যক্তির দুর্নীতির মাধ্যমে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল অর্থ ও বিত্তবৈভবের মালিক বনে যাওয়ার বিষয়টি দেশে-বিদেশে বহুল আলোচিত হয় তখন। ওই বঙ্গসন্তানদের লাগামহীন বিলাসিতা এবং দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে অঢেল সম্পদ-সম্পত্তির মালিক হওয়ার যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য পত্রপত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সুবাদে প্রতিদিন সর্বসাধারণের দৃষ্টিগোচরে আসে, তা যেন রূপকথার কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। এসব জেনে গোটা জাতি একেবারে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। রাজনীতি করে, রাষ্ট্রক্ষমতায় কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতার ছত্রছায়ায় থেকে কতিপয় ব্যক্তির অল্পদিনে শত শত, এমনকি হাজার হাজার কোটি টাকা এবং জমি ও প্লট-ফ্ল্যাটের মালিক বনে যাওয়ার ঘটনা উন্মোচিত হয়। এ পরিস্থিতিতে রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিষয়টি সচেতন সবার কাছে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পুনর্গঠন এবং কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরীর দায়িত্বভার গ্রহণের পর চুনোপুঁটি থেকে রাঘব-বোয়াল পর্যন্ত সবারই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতা বেড়ে যায়। বাড়ি-গাড়ি, সম্পদ-সম্পত্তি, এমনকি পরিবার-পরিজন ফেলে রেখে অনেকেই গা-ঢাকা দেন। কেউ কেউ তো একেবারে দেশই ছেড়ে যান। ওয়ান-ইলেভেনের অব্যবহিত পর এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, ঢাকা বা বড় বড় শহরে পরিত্যক্ত অবস্থায় গাড়ি পড়েছিল, এসবের মালিক পাওয়া যাচ্ছিল না!
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। দেখতে দেখতে এ সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হয়। এ সময়ে নির্বাচনী প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী সরকার অনেক কাজই সম্পন্ন করেছে। আবার সম্পন্ন না করতে পারলেও হাত দিয়েছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার থাকার পরও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা আয় এবং সম্পদ-সম্পত্তির সঠিক বিবরণ জমা না দেয়ায় এ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার কোনো সুযোগ হয়নি। ফলে সরকারের মেয়াদ শেষে একেকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের সম্পদ-সম্পত্তির পরিমাণ ও উৎসের যে বিবরণ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে, তাতে সচেতন যে কারোই স্তম্ভিত হয়ে পড়ার কথা। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের মতো ঘটনার পর গঠিত একটি সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কাছ থেকে এমনটি কেউ আশা করেনি।
কিছুটা পেছনে ফিরে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হতে পারে- ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার ঠিক এক সপ্তাহ পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের কাছে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমাদের দেশে অসম্ভব বিত্তশালী কিছু রাক্ষস’ সৃষ্টি হয়েছে। একই সময় এক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘নির্বাচনী ইশতেহারে প্রদত্ত অঙ্গীকার অনুযায়ী সরকারের স্বচ্ছতার স্বার্থে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব অবশ্যই জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। ফেব্র“য়ারি থেকেই সম্পদের হিসাব সরকারের কাছে জমা দিতে বলা হবে...’ (যুগান্তর, ১৪.০১.০৯)। এর পর সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাব বিবরণী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা স্পিকারের কাছে জমা দেয়ার জন্য দফায় দফায় নির্দেশনা দেয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ ব্যক্তিই এক্ষেত্রে নির্লিপ্ত থাকেন। ২০১১ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দেয়া সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। বিবরণীতে মন্ত্রীদের সম্পদ-সম্পত্তি বিষয়ক মোট ১৭টি তথ্য দিতে বলা হয়। এতেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয় সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। সরকারের সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ এবং অনেক ইতিবাচক কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের মনে প্রথমদিকে ব্যাপক আশা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু দিন দিন নানা কারণে তাতে ভাটা পড়তে শুরু করে। সবারই মনে থাকার কথা, সরকার গঠনের পর মন্ত্রিপরিষদের প্রথম বৈঠকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্যদের আয় ও সম্পত্তির হিসাব বিবরণী জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নিকটাত্মীয়দের সম্পদেরও হিসাব জমা দেয়ার তাগিদ দেন তিনি। এর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী সেদিন বলেছিলেন, কেউ ক্ষমতায় এসে দুর্নীতি করে যাতে সম্পদের পাহাড় গড়তে না পারে সেজন্য শুধু মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যেরই নয়, তাদের নিকটাত্মীয়দেরও সম্পদ-সম্পত্তির হিসাব জমা দিতে হবে। প্রতিবছর এই সম্পদ বিবরণী থেকেই প্রতীয়মান হবে কোনো মন্ত্রী-এমপি দুর্নীতি করেছেন কিনা। তিনি আরও বলেছিলেন, যদি মন্ত্রিপরিষদের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়, তাৎক্ষণিক ওই মন্ত্রীকে বাদ দেয়া হবে। সরকারের যাত্রা শুরু হতে না হতেই প্রধানমন্ত্রীর এহেন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তার সততা, জবাবদিহিতা ও সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু একা তিনি কী করবেন। সরকারের প্রথম বছরেই সম্পদ-সম্পত্তির হিসাব দাখিল করা নিয়ে নাকি মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের মাঝেই দেখা দেয় মতভেদ। ফলে বছরের পর বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানার আর কোনো সুযোগই হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদ শেষে কয়েক দিন ধরে একে একে মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের এবং তাদের স্ত্রীদের মালিকানার সম্পদ-সম্পত্তির বিবরণ প্রকাশিত হচ্ছে পত্রপত্রিকায়। লক্ষণীয় বিষয় হল, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা পাঁচ বছরে কী বিশাল সম্পদ-সম্পত্তির মালিক হয়েছেন, তা এখন সর্বসাধারণের গোচরে আসছে। এই চিত্র নির্বাচন কমিশনে স্বেচ্ছায় দেয়া তাদের হলফনামা থেকে বেরিয়ে এসেছে। তাদের মধ্যে অনেকেরই সম্পদের পরিমাণ নাকি এর চেয়েও অনেক অনেক গুণ বেশি। আরও চাঞ্চল্যকর খবর হচ্ছে, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কারও কারও স্ত্রী এ সময়ে সম্পদ-সম্পত্তির দিক থেকে স্বামীকেও ছাড়িয়ে গেছেন! নগদ অর্থ, ব্যাংক ব্যালেন্স, বাড়ি-গাড়ি, আবাদি জমি, প্লট, ফ্ল্যাট, বহুতল ভবন, মার্কেট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, শেয়ার বিনিয়োগ, বীমা, সঞ্চয়পত্র- কোন দিক দিয়ে তারা পিছিয়ে? মন্ত্রী-

লিবারেলিজম বা উদার রাজনীতি by ফরহাদ মজহার

আজ আমি কিছু তত্ত্বকথা বলব লিবারেলিজম নিয়ে। কারণ উদার রাজনীতি সম্পর্কে আমাদের অনেক ভুল ধারণা আছে। বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে কঠিন কিছু বলার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। তত্ত্বকথার মধ্য দিয়ে কিছু কথা বলার চেষ্টা করব। লিবারেলিজম বা উদার রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেতিবাচক। সে কারণে এই লেখা। ইংরেজিতে রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ‘লিবারেলিজম’ কথাটার খুব ভালো বাংলা অনুবাদ নেই। অবশ্য তা থাকার কথাও নয়। কারণ রাজনৈতিক দর্শন বা আদর্শ হিসেবে এর আবির্ভাব ও দানা বাঁধার জন্য একটি সমাজে কমপক্ষে তিনটা শর্ত পূরণের দরকার আছে : এক. পুরনো প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের জায়গায় গতিশীল পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদন সম্পর্কের আবির্ভাব ও বিকাশ; অর্থাৎ এমন এক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হওয়া দরকার, যার ফলে সামন্ততন্ত্র বলি কিংবা বলি জমিদারতন্ত্র, সব ধরনের প্রাচীন উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজির তোড়ের মুখে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়া। বাংলাদেশে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্ক গতিশীল নাকি প্রতিক্রিয়াশীল সে তর্ক করা যায়, কিন্তু এর যে সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য আমরা দেখছি, সেখানে ব্যক্তির অধিকার সম্পর্কে সচেতনতাকে ভালো দিকে নেয়ার সুযোগ রয়েছে। একটি গতিশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। প্রথম শর্ত খানিক পূরণ হয়েছে বলা যায়।
দুই. কোনো দৈব অধিকার কিংবা অভিজাত রক্তের দোহাই দিয়ে অপরকে নিজের অধীন রাখার প্রতি মানুষের প্রতিবাদী হয়ে ওঠা। ‘রাজা’র অধীনে জনগণকে ‘প্রজা গণ্য করার ধারণার ক্ষয় ও রাজা-প্রজা সম্পর্কের বিলুপ্তি। যে বিশ্বাসের বলে মানুষ দৈব ক্ষমতা কিংবা অভিজাত রক্তের সূত্রে কাউকে শাসনকর্তা হিসেবে স্বাভাবিক মেনে নিত, সেই বিশ্বাসেরও ক্ষয় ঘটা। বাংলাদেশে এই শর্তও কিছুটা পূরণ হয়েছে। তিন. চিন্তা ও দর্শনের ক্ষেত্রে বিপ্লব; ইউরোপে যে-বিপ্লব ‘এনলাইটমেন্ট’ বলে পরিচিত। এ বিষয়টি বড়সড় আলোচনা দাবি করে। কিন্তু লিবারেলিজম সম্পর্কে যে কথা বলতে চাইছি তার দরকারে দুই-একটি দিক একটু সংক্ষেপে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করব।
যে-সমাজে আদর্শ হিসেবে ‘লিবারেলিজম’ দানা বাঁধে সেই সমাজে মানুষ তার নানা জৈবিক ও মানসিক প্রবৃত্তির মধ্যে বিচারবুদ্ধিকেই সর্দার মেনে নেয়। নিদেন পক্ষে মানতে আপত্তি করে না। অন্যের সঙ্গে তর্কবিতর্কে বাস্তবতা ও যুক্তিকেই প্রাধান্য দেয়। সমাজে জ্ঞান-বিজ্ঞান বলি কী রাজনীতি বলি, ‘রিজন’ বা বুদ্ধির বিচারই ‘সত্য’ নির্ণয়ের পথ- এই চিন্তা সমাজে অন্যান্য অনুদার চিন্তার চেয়েও অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। নীতিনৈতিকতার ক্ষেত্রেও। মানুষের বাস্তব ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা কিংবা যুক্তি ও বুদ্ধির দ্বারা সত্য বিচারের পদ্ধতিকে নানা ধরনের অযৌক্তিক বা দৈব দোহাই দিয়ে অস্বীকার করার ইতিহাস আজকের নয়, বহু পুরনো। শুধু অস্বীকার নয়, যুগে যুগে যুক্তি, বুদ্ধি ও বিজ্ঞানচিন্তার জন্য মানুষকে মূল্য দিতে হয়েছে চরমভাবে। দমন-নিপীড়ন সহ্য করেছে মানুষ। বিজ্ঞানীরা পুড়ে মরেছে। সেই দিক থেকে দেখলে মানুষের অন্যান্য বৃত্তির অধীনস্থতা থেকে বুদ্ধির ‘মুক্তি’ গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক ঘটনা।
তবে বুদ্ধি যখন পাল্টা মানুষের অন্যান্য স্বভাব বা বৃত্তির ভূমিকা ও গুরুত্বকে অস্বীকার বা নাকচ করে বুদ্ধিই সত্য নির্ণয়ের একমাত্র পথ ও পদ্ধতি বলে দাবি করতে শুরু করে, তখন সেটা নতুন আপদ তৈরি করে। তখনই তার প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্রও ধরা পড়া শুরু হয়। বুদ্ধির দোহাই দিয়ে যখন মানুষের ধর্ম, বিশ্বাস, কল্পনা, আকাক্সক্ষা ইত্যাদি দমন করা হয়, তখন সেটাও মানুষের মুক্তির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে ওঠে। বুদ্ধি যখন একমাত্র নিজেকেই সব বৃত্তির সর্দার দাবি করে, তখন সেটা একরোখা বুদ্ধিহীনতা। এর হাত থেকেও মুক্তি পাওয়া দরকার। এই বুদ্ধিহীনতার নানা লক্ষণ আছে। কমন কিছু আবর্জনা সব সময়ই আমরা চারপাশে হাজির দেখি। যেমন ধর্মের বিপরীতে যুক্তি, আধুনিকতার বিপরীতে অনাধুনিকতা, প্রতিক্রিয়াশীলতার বিপরীতে প্রগতিশীলতা ইত্যাদি বদ্ধমূল বাইনারি ধারণা দিয়ে চিন্তা করার প্রাচীন পদ্ধতি বুদ্ধিহীনতার নানা লক্ষণের মধ্যে একটি। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তার এই পশ্চাৎপদ পদ্ধতির বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার হওয়া খুবই দরকার।
এক সময় দার্শনিকদের মধ্যে তাদের সংখ্যাই প্রবল ছিল, যারা মনে করতেন বুদ্ধি ছাড়া মানুষের অন্যান্য বৃত্তির ভূমিকা গৌণ। বিশেষত বিশ্বাস, ইনটুইশান বা মানুষের কোনো কিছু আগাম জানার স্বাভাবিক কিছু প্রবৃত্তি। যেমন ভালো-মন্দ বিচারের ক্ষমতা, দিব্য অভিজ্ঞতার মূল্য, ইত্যাদি। বলা হতো, সত্য নির্ণয়ে বা কোনো অভিজ্ঞতার স্বরূপ নির্ণয়ে তাদের কোনো ভূমিকা নেই।
যুক্তিই সত্য প্রতিষ্ঠার একমাত্র পথ, যুক্তিই সত্যের স্বরূপ। ‘এনলাইটমেন্ট’ যুগে যুক্তি ও বিজ্ঞানের জয়গান গাইতে গিয়ে মানুষের অপরাপর বৃত্তি খুবই তুচ্ছ ব্যাপারে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। আজকাল এদের সংখ্যা কমই বলা যাবে। একসময় বলা হতো বিশ্বাসের যুগ শেষ হয়ে গেছে, এসেছে যুক্তি, বিজ্ঞান ও ভোগের যুগ। আধুনিকতার প্রাবল্যে বিশ্বাসের শেষ তলানিটুকু শুকিয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু দেখা যাচ্ছে শুকিয়ে যাওয়া দূরের কথা, ধর্ম বা বিশ্বাসের রাজনীতি ফিরে আসছে প্রবলভাবে।
মানুষ কি আসলে কেবলি যুক্তিবাদী? বিজ্ঞান ও কৃৎকৌশলেই কি তার মুক্তি? ভোগেই কি তার জীবনের চরম অর্থ নিহিত? প্রাণ, পরিবেশ ও প্রকৃতি ধ্বংসের এই তাণ্ডব মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির কোনো সমন্বয় বা ভাবগত সম্পর্ক রচনা ছাড়া কীভাবে প্রতিরোধ সম্ভব? মানুষ যদি শুধু ‘ব্যক্তি’ হয়ে থাকে, তাহলে ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির সম্পর্ক রচনার ভিত্তি কী? কী ধরনের রাষ্ট্র ব্যক্তির ইচ্ছা, অভিপ্রায় ও সংকল্প ধারণ করতে সক্ষম? এই প্রশ্নগুলো নতুনভাবে প্রবল প্রতাপের সঙ্গে বিশ্বব্যাপী ফিরে এসেছে। লিবারেলিজমের জন্য এনলাইটমেন্ট দরকার। দর্শনের দিক থেকে দেখলে পাশ্চাত্যে তা এসে চলেও যাচ্ছে। রাজনীতিতে লিবারেলিজম নামে যা এসেছিল তা রূপ নিয়েছে নিউ লিবারেলিজম বা নব্য উদারবাদে।
জন লককে যদি রাজনৈতিক লিবারেলিজমের বীজদাতা গণ্য করি তাহলে তিনটি ব্যাপার মুখস্থ রাখলে আমাদের রাজনীতি পর্যালোচনার খুব সুবিধা হবে। লকের দাবি, তিনটি ব্যাপারে মানুষের অধিকার ‘প্রকৃতিদত্ত’। সেই তিনটি অধিকার হচ্ছে- ১. জীবনের অধিকার, ২. সম্পত্তির অধিকার এবং ৩. স্বাধীনতার অধিকার, যাকে আমরা নাগরিক অধিকার বলে থাকি। এগুলো এমন এক ‘অধিকার’ যা আইনেরও ঊর্ধ্বে কিংবা আইনের বাইরে। এই অর্থে যে কোনো আইন দিয়ে তা হরণ করা যাবে না। আর মানুষকে যদি সমাজে ও রাষ্ট্রে এক সূত্রে বাঁধতে হয়, তাহলে কোনো সরকার বা রাষ্ট্র কখনোই এই অধিকার ভঙ্গ করতে পারবে না। লিবারেলিজমের সঙ্গে পুরনো সংরক্ষণবাদীদের প্রধান বা মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে লিবারেলিজম স্বৈরতন্ত্র কিংবা একনায়কতান্ত্রিক সরকার চায় না। লিবারেলিজম চায় প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র ও আইনের শাসন।
পাঠক হয়তো একটু বিরক্ত হয়ে ভাববেন, এত তত্ত্বকথার দরকার কী? দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় কলামে তত্ত্বচর্চা খুবই বিব্রতকর, কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি দৈনিক যুগান্তর ও অন্যত্র কয়েকটি লেখায় আমি বেশ কয়েকবার জোর দিয়ে বলেছিলাম, পুঁজির প্রান্তের দেশগুলোতে ‘লিবারেল’ বা উদার রাজনীতির ভূমিকা রয়েছে। উপরে যে তিনটি শর্তের কথা বলেছি, আমার ধারণা প্রথম ও দ্বিতীয় শর্তের পূরণ ঘটলেও তৃতীয় শর্ত পূরণের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে রয়েছি।
লিবারেলিজম শক্তির জায়গাটা হচ্ছে এই শব্দ এবং শব্দের অন্তর্গত ধারণার মধ্যে মুক্তির ধারণা নিহিত রয়েছে। লিবারেলিজম দাবি করে মানুষ মাত্রই স্বাধীন, সে কারও দাস বা গোলাম নয়। তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কারও অধীনস্থ রাখা যাবে না। যে তাকে শাসন করবে, তাকে তার কাছ থেকে সম্মতি আদায় করতে হবে। নির্বাচন সম্মতি আদায়ের একটি পদ্ধতি। সম্মতি ছাড়া যে শাসন, সেটা অবৈধ শাসন। যে শাসক নৈতিক বৈধতা হারায়, তার পতন ঘটেই। ঘটতে বাধ্য। সেটা নিয়মতান্ত্রিক বা সাংবিধানিক পদ্ধতিতে ঘটবে সেটা জনগণই স্থির করে।
বাংলাদেশে লিবারেল বা উদার রাজনীতির যদি কোনো ভূমিকা থাকে তাহলে অবৈধ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত, এটা রাজনৈতিক ও দার্শনিকভাবে প্রমাণ করাই তার কাজ। বাংলাদেশে ব্যক্তির অধিকার হরণকারী সরকারের পক্ষাবলম্বনকারী ও গণবিরোধী ‘সুশীল’ রাজনীতির সঙ্গে লিবারেল বা উদার রাজনৈতিক চিন্তা ও মতাদর্শের প্রধান পার্থক্য এখানেই।

বাংলাদেশের নির্বাচন ও ভারতের দায় by ড. শরীফ মজুমদার

যুক্তরাষ্ট্রের আশপাশে কিছু দেশ আছে, যেখানকার সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তোলে। যদিও তাদের ভাবনা আসে কিছুটা ভিন্ন আঙ্গিকে। যেমন- যদি সেখানকার সরকার ব্যর্থ হয়; তাদের সঙ্গে সম্পূর্ণ সহযোগিতা না করে এবং তাতে যদি সমগ্র উত্তর আমেরিকার জীবনমান নিয়ে বিশ্বের অন্য প্রান্তের জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গির নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি ক্ষেত্রে। তারপরও ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, সে অঞ্চলে অনেক দেশ আছে যেখানে প্রায়ই এমন সরকার গঠিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের নয়। কিন্তু তাতে করে যুক্তরাষ্ট্র সেসব সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয় না বা পরে সেসব সরকার নিয়ে বিদ্রুপাত্মক প্রচারণাও খুব একটা চালায় না। এর কারণ কিছুটা হলেও এই যে, তারা গণতন্ত্রের মূলনীতিতে বিশ্বাস করে। অবশ্যই তারা চায় তাদের পছন্দের লোক ক্ষমতায় আসুক; কিন্তু সে চাওয়া বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিকভাবে দুর্বল ও চরম দুর্নীতিপরায়ণ দেশগুলোতে যতটা সহজে প্রয়োগ করা যায়, দুর্নীতিপরায়ণ নয় এবং গণতান্ত্রিকভাবে মজবুত দেশগুলোতে ততটা সহজে প্রয়োগ করার সুযোগ থাকে না। বস্তুত, তথাকথিত ‘ৎবমরসব পযধহমব’ নামের যে ডকট্রিন আজ কিছু স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা সেসব দেশ গণতান্ত্রিকভাবে দুর্বল ও চরম দুর্নীতিপরায়ণ বলেই সম্ভব হচ্ছে।
ভারতীয় উপমহাদেশের চিত্রটা একটু ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের পাশে বিশাল দেশ কানাডা হলেও রাজনৈতিক আধিপত্যবাদের দিক থেকে বিশ্বে কানাডার উপস্থিতি এতটা প্রকট নয়, যতটা প্রকট ভারতের পাশের দেশ চীনের উপস্থিতি। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দুটিই গণতান্ত্রিক দেশ; কিন্তু ভারত ও চীনের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয় এবং অগণতান্ত্রিক দেশ চীন যেভাবে ক্রমান্বয়ে তার প্রভাববলয় প্রসারিত করে চলছে তাতে গণতন্ত্র নামের ‘বড়িটি’ এ উপমহাদেশে আর কতদিন সর্বরোগ নিরাময়ের ওষুধ হিসেবে প্রেসক্রিপশনে উল্লেখ করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। গণতন্ত্র ‘বড়ি’ যদি এ উপমহাদেশে কার্যকারিতা হারায়, তাহলে তা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় ফেলবে ভারতকেই। কারণ ভারতে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যতটা তৎপর, চীনে বিচ্ছিন্নবাদীদের তৎপরতা ততটা প্রকট নয়। তাছাড়া চীন যেভাবে ভিন্ন গোত্র, ভিন্ন কালচার এবং ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, ভারত সে ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় উপমহাদেশে সত্যিকারের গণতন্ত্রের সুফল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ভারতের দায় উত্তর আমেরিকার দেশগুলোয় গণতন্ত্রের সুফল নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দায়ের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ হয়েও ভারত সে দায় মেটাতে অনেকটাই অক্ষম।
উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে ভারতীয় নীতির কথাই ধরা যাক। যে দেশটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছিল, পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল সর্বাÍক সহমর্মিতা নিয়ে, সে দেশটি আজ ৪৩ বছর পরও বাংলাদেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের মাঝে সত্যিকারের বন্ধুপ্রতিম হিসেবে জায়গা করে নিতে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। এ ব্যর্থতার মূলে রয়েছে তাদের একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থনের নীতি এবং অন্যসব রাজনৈতিক দলের প্রতি অসহিষ্ণুতা।
বিশ্বের সব উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেই সংখ্যালঘুরা সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করেই নিজেদের অধিকারের স্বীকৃতির ব্যাপারে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেয়। ভারতীয় সংখ্যালঘুদের দিকে তাকালেও তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। গণতন্ত্রকে গণতন্ত্রের মূলনীতির ওপর শ্রদ্ধা রেখেই টিকে থাকতে হবে; গণতন্ত্রের স্থানীয় কোনো সংজ্ঞা নেই। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, একমাত্র সত্যিকারের গণতন্ত্রই পারে সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সংখ্যালঘুর মধ্যকার মধ্যযুগীয় ব্যবধান কমিয়ে সাম্য ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দেশের সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে। এদেশের সংখ্যালঘুরা হয়তো বলবে, তারা বিশেষ রাজনৈতিক দল ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের আস্থায় আনতে পারেন না। এ সমস্যার একমাত্র সমাধান সংখ্যালঘুদের হাতেই। তাদেরই উদার মনে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে হবে এবং আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার পর, নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার পর সেসব রাজনৈতিক দলের সংখ্যালঘু সংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে হবে। এমনটিই পশ্চিমা দেশগুলোতে দেখেছি। ইংল্যান্ডে যে লাখ লাখ মুসলমান আছে, তাদের একটি অংশ ‘টোরি’ এবং অপর অংশ ‘লেবার’ দলের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পৃক্ত হয়ে তাদের অধিকারের ব্যাপারে গণতান্ত্রিকভাবে লড়াই করে যাচ্ছে এবং সে লড়াই করার সুযোগ পাওয়ার আগে তাদের প্রমাণ করতে হয়েছে, তারা ‘টোরি’ বা ‘লেবার’ দলের নীতির প্রতি সম্পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল।
আজ বাংলাদেশের যে অবস্থা তাতে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক বন্ধুপ্রতিম দেশ হলে ভারত সরকারের করণীয় হতো বাংলাদেশ সরকারকে বোঝানো যে, প্রধান বিরোধী দল ছাড়া একদলীয় নির্বাচন কখনোই প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক দেশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। ভারতের কোনো ক্ষমতাসীন দল অবশ্যই কোনো সুস্থ বিরোধীদলীয় নেতাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে প্রধান বিরোধী দলবিহীন প্রহসনের নির্বাচন করার মতো ধৃষ্টতা দেখাবে না। বস্তুত, এগুলোই বন্ধুপ্রতিম দেশকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে আস্থাহীন করে তোলে। প্রতিবেশী দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে অসহিষ্ণু করে তোলে এবং তারই ফলস্বরূপ সরকার পরিবর্তনের সময় সংখ্যালঘু নিপীড়নের মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম হয়। সরকার ইচ্ছা করলেও তা আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না, কারণ প্রতিবেশীদের কাছ থেকে তারা সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে কোনো সহায়তাই পায় না এবং সংখ্যালঘু নিপীড়নের মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা কেবল গণতন্ত্রহীনতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। অবশ্য গণতন্ত্রহীনতাই সংখ্যালঘু নির্যাতনের একমাত্র কারণ নয়; কেননা বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যেসব দৃষ্টান্ত রয়েছে তা বহু স্বৈরতান্ত্রিক দেশেও দেখা যায় না। যা হোক, বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নীতির প্রতিই শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই তাদের সত্যিকারভাবে সম্পৃক্ত হতে হবে, যাতে করে অদূর ভবিষ্যতে সংখ্যালঘু ইস্যুতে রাজনীতি করার সুযোগ এ দেশে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে। তাদের বুঝতে হবে, যখন ১০০ মূর্তি ভাঙার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রতিমন্ত্রীর ঠিক পেছনেই দেখা যায়, তখন সংখ্যালঘু ইস্যুতে রাজনীতি কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকতে পারে। প্রতিমন্ত্রী অবশ্যই একান্ত পরীক্ষিত দলীয় লোক ছাড়া কাউকে অতটা নিকটে আসার মতো আস্থাভাজন মনে করবেন না। জাতি রামুর ঘটনার প্রকৃত দোষীদের এখনও চিহ্নিতই করতে পারেনি, বিচারের কথা দূরে থাক।
ভারতের অখণ্ডতার প্রতি বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকই শ্রদ্ধাশীল। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতের অখণ্ডতাবিরোধী কোনো কাজে কাউকে প্রশ্রয় না দেয়ার ভারতীয় দাবি বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের কাছেই সমভাবে প্রযোজ্য। সুতরাং বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে গণতান্ত্রিক নির্বাচন নিশ্চিত করার দায় অগ্রাহ্য করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ভারতের থাকতে পারে না।
ড. শরীফ মজুমদার : সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে কি করতেন? by অমিত রহমান

প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে এখন কি করতেন। পাঠকরা হয়তো বলবেন এখন এই প্রশ্ন তুলছি কেন?
তিনি তো চলেই গেছেন। এখন তো তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে। চাইলেও তাকে পাওয়া যাবে না। তাই তাকে নিয়ে ভাববার কি আছে। আমি বলবো অবশ্যই ভাববার আছে। হিমুর হাতে কয়েকটি নীল পদ্ম কেন লিখেছিলেন সতেরো বছর আগে। তার ভাবনার মধ্যে কি ছিল? সমাজ, রাষ্ট্র নিয়ে কেন ভেবেছিলেন? লেখক হিসেবে সমাজ বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি ভাবতেই পারেন। দেশ যখন জ্বলছে তিনি তো নীরোর মতো বাঁশি বাজাতে পারেন না। সমাজের ছবি আঁকতে গিয়ে দীর্ঘ হোঁচট যে তিনি খেয়েছিলেন তা তো স্পষ্ট। তিনি ২০০৯ সালে দেশ নিয়ে রাজনীতি নিয়ে এবং দুই নেত্রীকে নিয়ে ভেবেছিলেন। ব্যক্তিগত মতামত তুলে ধরেছিলেন। লিখেছিলেন ‘আমার ধারণা নিম্নশ্রেণীর পশুপাখি মানুষের কথা বোঝে। অতি উচ্চশ্রেণীর প্রাণী মানুষই শুধু একে অন্যের কথা বোঝে না। বেগম খালেদা জিয়া কী বলছেন তা শেখ হাসিনা বুঝতে পারছেন না। আবার শেখ হাসিনা কী বলছেন তা বেগম খালেদা জিয়া বুঝতে পারছেন না। আমরা দেশের মানুষ কী বলছি সেটা তারা বুঝতে পারছে না। তারা কী বলছেন তাও আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।’ এখন দেশ জ্বলছে। মানুষ পুড়ছে। পতাকা রক্তে লাল হচ্ছে। সঙ্কটে পড়েছে গোটা দেশ। মানুষ উদ্বিগ্ন, দিশাহারা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বন্ধু রাষ্ট্রগুলো চিন্তিত। চোখের সামনে শিল্প কারখানা পুড়ে ছাই হচ্ছে- কেউ বলতে পারছে না কারা পোড়ালো। মানুষ তা জানে এবং বুঝে কিন্তু এক অজানা ভয়ে তারা মুখ খুলছে না। সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। জেদ আর অহমিকাকে পুঁজি করে দুই নেত্রী একে অপরকে মোকাবিলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষ? তারা কি ভাবছে। আসলে তারা কিছুই ভাবতে পারছে না। কারণ, হুমায়ূন আহমেদ যা লিখে গেছেন তাতো শতকরা একশ’ ভাগ সত্যি। দুই নেত্রী একে অপরকে বুঝেন না। তারা শুধু বুঝেন ক্ষমতা। দেশ গোল্লায় যাক, তাতে কি? আমার গাড়িতে তো পতাকা উঠবে। ক্ষমতায় না থাকলেও ক্ষতি নেই। মাঝে মধ্যে ব্যতিক্রম। এতো দেখছি হীরক রাজার দেশে আছি আমরা। জনগণ যা ভাবে আমাদের নেত্রীরা তা ভাবেন না। এ মুহূর্তে দেশের মানুষ ভাবছে একটা সমঝোতার কথা। আমাদের নেত্রীরা কি তা ভাবছেন! কেউ কি তাদের কাছে গিয়ে বলতে পারবে নেত্রী বা ম্যাডাম অনেক হয়েছে। এবার আসুন জনতার কথা ভাবা যাক। সর্বনাশ এ সাহস দেখাবে কে? মন্ত্রীত্ব যাবে, নেতৃত্ব যাবে, এমপি হওয়ার স্বপ্ন যাবে, জানও যেতে পারে। অজানা নয় জানা ভয়ে তারা তটস্থ। তাই তারা অসহায় আত্মসমর্পণ করে বসে আছেন। দেশ নয়, নিজের কথা ভাবতে ভাবতে তারা কোরাস সুরে গান গাইছেন। বলছেন- আমরা আছি, আমরা থাকবো। দেশ নিয়ে ভেবে কি লাভ। যারা ভাবে তারা বোকা। এ বোকাদের দলে আমরা নেই।
পাগলও জানে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন কোন নির্বাচনের সংজ্ঞায় পড়ে না। কিন্তু সরকার প্রধান এটাকে আটকে ধরে থাকতে চান। তাই তিনি বলছেন পৃথিবীর কোন শক্তি এ নির্বাচন বানচাল করতে পারবে না। পুলিশ, মিলিটিারি নামিয়ে দিয়েছেন জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। জনগণ কি চায় একবারও তা দেখার চেষ্টা করেননি। তারা যে ক্রমাগত একই বার্তা দিয়ে যাচ্ছে, এ ধরনের নির্বাচনে তাদের সায় নেই- এটা বুঝবার ক্ষমতা কি আছে গণতন্ত্রের মানস কন্যার। নাকি তিনি ক্ষমতার মোহে নিকষ কালো অন্ধকারকে আলিঙ্গন করেছেন। যেখান থেকে পৃথিবীর কোন স্বৈরশাসক ফিরে আসতে পারেননি। মিলিটারি পুলিশ দিয়ে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়। কিন্তু শান্তি পাওয়া যায় না। গাদ্দাফি কি ভাবতে পেরেছিলেন তার এ রকম পরিণতি হবে। হোসনি মোবারকের পরিণতি কি তাও আমরা দেখছি। সাদ্দাম তো জান দিয়ে প্রমাণ রেখে গেছেন বন্দুক দিয়ে জনগণের মন জয় করা যায় না। তাই যদি হতো তাহলে তাবৎ দুনিয়ায় বন্দুকের শাসন কায়েম হয়ে যেতো। যদিও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলে গেছেন বন্দুকের কোন সুনির্দিষ্ট দিক নেই। নিজের দিকেও ঘুরে যায় কখনও কখনও। একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের অন্যতম চালিকা শক্তি তার নাগরিক সমাজ। সরকার যখন বেপথে হাঁটার চেষ্টা করে তখন নাগরিকরা সোচ্চার হন। রাজপথে নেমে আসেন। জনগণকে কাছে টেনে এনে ব্যারিকেড তৈরি করেন। বাংলাদেশে এর বিপরীত চিত্র। দেশ ডুবছে, মানুষের স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে তখনও নাগরিক সমাজ মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে রসদ যোগাচ্ছেন। বিভাজনের স্রোতে শামিল হয়ে আওয়াজ তুলছেন- আসুন চেতনা রক্ষা করি। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নৈরাজ্য। কে না জানে নৈরাজ্য থেকে রাজনৈতিক-শূন্যতার সৃষ্টি হয়। আর শূন্যতার ফলে স্বৈরশাসকের জন্ম হয়। আমাদের নাগরিক নেতারা কি ভাবছেন। এখনও কি তারা ঘুমিয়ে থাকবেন।

এখন প্রয়োজন ফেইথ ইন ডেমোক্রেসি by একেএম শাহ নাওয়াজ

লালনের একটি বিখ্যাত লাইন ‘সময় গেলে সাধন হবে না’। প্রয়োজনের সময়ে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারায় বিএনপি এখন লক্ষ্য স্থির করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ কঠিন হয়ে পড়েছে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করা। এখন নানা জটিলতার পর অনেকটা হাবুডুবু খেয়ে আবারও নেতিবাচক পথে হাঁটার পরামর্শ পেয়েছেন বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়া। তাই গত ২৪ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলনের বক্তৃতায় তিনি ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ নামে একটি কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। ভয়াবহ লাগাতার সহিংসতার পর এই কর্মসূচিকে অহিংসই বলা যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের দশা এখন ঘরপোড়া গরুর মতো। তারা আশ্বস্ত হতে পারছে না। এর ভেতর নানা কূটচালের সম্ভাবনা খুঁজছে। কারণ বিএনপি প্রযোজিত এবং বিএনপি-জামায়াত পরিচালিত হরতাল-অবরোধের আগের দিন থেকেই জনমনে আতংক তৈরির জন্য সন্ত্রাস ছড়ানো হতো। কর্মসূচির সময় তো সন্ত্রাস চলতই। এখন আবার কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরও সহিংসতার ইতি টানা হয় না। এই তো ২৪ ডিসেম্বর অবরোধ অবসানের পর খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের রাতে পুলিশ বহন করা বাসে পেট্রল বোমা ছুড়ে আহত-নিহত করা হল দায়িত্ব পালনরত পুলিশের কয়েকজনকে। এসব কারণে বিরোধী দলের ডাকা যে কোনো কর্মসূচি মানুষ এখন আতংকের সঙ্গেই দেখছে। তাই বিএনপি ঘোষিত ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ জনকল্যাণ ও দেশকল্যাণের কোনো কাজে আসতে পারবে বলে মানুষ মনে করছে না। তার চেয়ে সচেতন মানুষ মনে করে, ‘ফেইথ ইন ডেমোক্রেসি’র পরিবেশ তৈরি করতে পারলে তা দেশের রাজনৈতিক সংকট মোচনে অনেক বেশি ভূমিকা রাখতে পারে।
গণতন্ত্র তো কোনো বক্তৃতার শব্দ নয়। এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। ১৯৫৪ থেকে বাঙালি ভোটাধিকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে ক্ষমতাপ্রিয় রাজনীতিকরা গণতন্ত্রের কাঠামোকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। গণরায়ের প্রতি বিশ্বাসী না থেকে সন্ত্রাস, কালো টাকা আর প্রভাববলয় ছড়িয়ে দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছেন নির্বাচন, যা এত প্রকট হয়ে পড়েছিল যে, শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ফর্মুলা তৈরি করতে হয়। গণতন্ত্রের পথ তারপরও মসৃণ হয়নি। নির্বাচন কমিশন আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কীভাবে প্রভাবিত করা যায়, আমাদের রাজনীতির বিধায়কদের উর্বর মাথায় সে ভাবনাও খেলতে থাকে। ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন সময় বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকতে পারেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদে আমরা বেশির ভাগ সময়ই মাননীয় বিচারপতিদেরই দেখেছি। বিচারকের সুমহান দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থাকায় নতুন দায়িত্বে তারা নিরপেক্ষভাবে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এমন প্রত্যাশা হয়তো ছিল মানুষের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের এ সত্যটিও মানতে হয়েছে যে, এ দেশে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বা বিচারপতি হাবিবুর রহমান যেমন আছেন, তেমনি বিচারপতি এমএ আজিজ এবং বিচারপতি ফজলুল হকদেরও অস্তিত্ব রয়েছে। তবে ১/১১-এর পরিবর্তনে সব দিক থেকেই একটি ভিন্ন চেহারার তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল। সেখানে বিচারপতিদের আধিপত্যের অবসান ঘটিয়ে বেসামরিক ও সামরিক আমলাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। গণতন্ত্রপ্রিয় এ দেশের মানুষ তবু সে সরকারকে মেনে নিয়েছিল। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর কপট গণতন্ত্র চর্চা ও স্বার্থবাদী রাজনীতি মানসিকভাবে রাজনীতিকদের অনেকটা গণবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল। তাই তিক্ত বিরক্ত মানুষ স্রোতের শ্যাওলাকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে। সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থাকে আমলে এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনপ্রিয় কর্মসূচি ঘোষণা করে। শনাক্ত করে মানুষের প্রধান চাওয়াকে। প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজদের কারারুদ্ধ করে। পুনরুজ্জীবিত দুদক অনেককাল পর দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের দৃঢ়তা দেখায়। সরকার নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করে। সাধারণ মানুষের চোখে ততদিনে স্পষ্ট হয়ে যাওয়া বিএনপির আমলে তৈরি ভুয়া ভোটার লিস্ট এই কমিশন বাতিল করে নতুন ভোটার লিস্ট প্রণয়ন এবং জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরির ব্যবস্থা করে অনেকটাই গ্রহণযোগ্যতা আদায় করতে পারে। মানুষ অচিরেই গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় এই আধা-স্বৈরাচারী সরকারকেই সমর্থন করে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মতো প্রধান দলগুলো মানুষের মনে আস্থার জায়গা তৈরি না করতে পারায় সাধারণ মানুষের আস্থা অনেকটাই ধরে রাখতে পেরেছিল ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
তারপরও গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার আকাক্সক্ষা মানুষকে ব্যাকুল করে তোলে। সাধারণ ও নতুন প্রজন্মের ভোটাররা চারদলীয় জোটের দুর্বল ও দুর্নীতি আকীর্ণ শাসনের জন্য যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা বিএনপিকে পরিত্যাগ করে ঐতিহ্যবাহী এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়া আওয়ামী লীগের ওপর ভরসা রেখেছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অতীত শাসন যে খুব সুখকর ছিল এমন নয়। তবে কার্যকারণ সূত্রেই আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র সুরক্ষা এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে- এ প্রত্যাশাটুকু করেছিল মানুষ। তবে পাঁচ বছরের শাসনে আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশ্র“তি পালন করে জনমনে স্বস্তি দিলেও দুর্নীতি ও শাসন দুর্বলতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। এ অবস্থা প্রায় ভেঙে পড়া বিএনপির জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়। বিএনপির উচিত ছিল এর সদ্ব্যবহার করা। গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে দলটির জন্য উত্তম ছিল মরচে ধরা রাজনৈতিক আবর্তন থেকে বেরিয়ে আসা। জনগণের ইচ্ছাকে ধারণ করা। আওয়ামী লীগের দুর্বলতা ও ব্যর্থতাগুলোকে যথাযথ প্রচারের মাধ্যমে জনগণের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা। গণতন্ত্রের পথে পদযাত্রার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল অনেক আগেই। জামায়াত সংসর্গ ত্যাগ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে সরব হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সে পথে হাঁটল না বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দল। ওয়ান লিডার শো পার্টি হিসেবে আওয়ামী লীগ আর বিএনপি এ দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
আমরা মনে করি, দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা না থাকায় বিএনপির সরকারবিরোধী আন্দোলন গতানুগতিকতার ছক থেকে বেরুতে পারেনি। রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার না করে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারকে দুর্বল করতে চেয়েছে। আমাদের ধারণা, বিএনপির নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে হাঁটতে না পারার পেছনে জামায়াত আর স্বয়ং খালেদা জিয়া উভয়েরই দায় রয়েছে। ১৮-দলীয় জোটের শাসনক্ষমতা লাভে বিলম্ব করার উপায় ছিল না উভয়েরই। কারণ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে জামায়াত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর ঠেকানো প্রয়োজন। আরেক টার্ম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিচার সম্পন্ন ও রায় কার্যকর হয়ে গেলে রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়বে জামায়াত। আর পারিবারিক সংকট থেকে বাঁচার জন্য বেগম জিয়ার হাতেও সময় ছিল না। তার দুই ছেলেকে মামলামুক্ত করে ফিরিয়ে আনার সময় বয়ে যাচ্ছিল। দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা না থাকলে এভাবেই দল বলি হয়ে যায় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে।
এই কঠিন বাস্তবতায় জামায়াতের পরিকল্পনা এবং বেগম জিয়ার একান্ত সমর্থনে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে না গিয়ে শক্তি প্রয়োগের পুরনো কৌশলেই ক্ষমতার পালাবদল করতে চেয়েছে বিএনপি। ১৮-দলীয় জোটের এ আচরণকে নির্বাচনের মাঠে অনেকটা দুর্বল হয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে- সরকারি শক্তি সুবিধাকে ব্যবহার করে নানা রাজনৈতিক কূটকৌশলে। ক্ষমতাসীন হওয়ার উদগ্র বাসনায় এ বিষয়টিকে আমলে নেয়নি বিএনপি। ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছিল সরকার পক্ষ বিএনপিকে ছাড়া নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিতে চায়। সে সুযোগটি দেয়া উচিত হয়নি। বিএনপির সঠিক পথে ঘুরে দাঁড়ানোর অনেক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু দূরদৃষ্টি দিয়ে তারা তা গ্রহণ করতে পারেনি। বিশেষ করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভার দিন নিজের কথা না রেখে বড় একটি সুযোগ হারিয়েছেন খালেদা জিয়া। প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে একটি ভিন্ন সমীকরণ দাঁড় করানোর সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কৌশলী হয়ে নানা ধরনের ছাড় দিয়ে হলেও নির্বাচনে আসা বিএনপির জন্য অলাভজনক ছিল না। তার বদলে পুরনো পন্থায় লাগাতার হরতাল-অবরোধের মধ্য দিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত করে, মানুষ খুন করে, আগুন লাগিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইল।
এক ধাক্কায় সরকারের পতন ঘটাতে না পারলে এসব পদক্ষেপ বুমেরাং হয়। বিএনপির ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। সন্ত্রাস-সহিংসতার রূপকার হিসেবে জনবিক্ষোভ তৈরি হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে। অযৌক্তিক, তামাশার ও হাস্যকর যাই বলি না কেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করার যে প্রস্তুতি আওয়ামী লীগ নিয়ে ফেলেছে তা শক্তি প্রয়োগে বন্ধ করা সম্ভব হবে না বলেই আমাদের ধারণা। আওয়ামী লীগের মতো সাধারণ মানুষও মনে করে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ বিএনপির শক্তি প্রয়োগের শেষ উপলক্ষ। বহুদিন থেকেই ঢাকা অবরুদ্ধ করার জন্য এ ধারার কর্মসূচি নিয়ে আসছে বিএনপি। কখনও নিজে জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে, কখনও হেফাজতকে দিয়ে। শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। তাই স্বাভাবিকভাবেই সরকার এবার আরও বেশি হুশিয়ার থাকবে।
যেহেতু গণতান্ত্রিক আচরণ কোনো পক্ষের ভেতরই নেই, তাহলে অযথা জনদুর্ভোগ বাড়ানোর পথে হাঁটা কেন? তার চেয়ে নির্বাচনকে আরও বেশি তামাশায় পরিণত করার উদ্দেশ্যে নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিতে পারত নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচন বর্জনের জন্য জনমত তৈরি করতে। বিএনপির রাজনৈতিক অর্জন হতো তাদের আমলের ১৫ ফেব্র“য়ারির নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগের দশম সংসদ নির্বাচনকে কলংকিত করে রাখা। অতঃপর পূর্ণ শক্তি নিয়ে রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে জনমত তৈরি করে যুক্তিগ্রাহ্য একাদশ সংসদের পথে হাঁটা। এতে গণতন্ত্র সংহার নয়, গণতন্ত্রকে পুনরুজ্জীবিত করার কৃতিত্ব পেতে পারত বিএনপি। এ জন্যই জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে সম্ভাব্য ব্যর্থ ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র পথ পরিহার করে গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে ‘ফেইথ ইন ডেমোক্রেসি’তে নিজ অবস্থান নিশ্চিত করা উচিত বিএনপির। এখনও সুযোগ আছে কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেয়ার। আমরা বিশ্বাস করি, এ পথে বিএনপি অনেক বেশি সাফল্য পাবে। জনগণের সামনে নিজেকে অনেক বেশি ইতিবাচকভাবে উপস্থিত করতে পারবে।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আশার পাশাপাশি আশংকার দোলাচলে দিল্লি

আম-আদমি নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল শনিবার (আগামীকাল) দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। রামলীলা ময়দান চত্বরে এখন সাজ সাজ রব। উৎসবের প্রস্তুতি চূড়ান্ত। কিন্তু এই আনন্দেও অনেকের মুখ কালো! আশার পাশাপাশি আশংকার দোলাচলে দুলছে তাদের প্রাপ্তির প্রত্যাশা। একটাই চিন্তা, এবার আবার কী হবে? অরবিন্দ ও তার সঙ্গীরা মিলে দুর্নীতিমুক্ত দিল্লি গড়তে পারবেন কিনা, তা সময় বলবে। কংগ্রেসের হাত ধরে তখতে বসে ক্ষমতার যাবতীয় বাহ্যিক আড়ম্বরের মুখে ‘ঝাঁটা’ মেরে অরবিন্দ নিজেকে ‘মুখ্যসেবক’ হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
যেমন পূর্ব দিল্লির মোটর ভেহিক্যালস অফিস-গাড়ির লাইসেন্স মেলে এখানে। কলকাতার বেলতলার মতো এখানেও দালাল তন্ত্রের রমরমার অভিযোগ। টাকা দিলে ঘরে বসেই পাওয়া যায় গাড়ি চালানোর ছাড়পত্র। দক্ষিণা দিলে চালানোর পরীক্ষা হয় নামমাত্র- আজ সেখানেও আশংকার চোরা স্রোত। একই ছবি দিল্লির সরকারি হাসপাতালগুলোতেও। উত্তর দিল্লির এক সরকারি হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডের আক্ষেপ এখানে সমস্যা প্রকট! চারপাশের জেলা থেকে তো বটেই, দিল্লির প্রান্তিক অনেক মানুষই এই হাসপাতালে আসেন সন্তান প্রসবের জন্য। প্রসবের পর মিষ্টি খাওয়ানোর জন্য টাকা দেয়াটা বাধ্যতামূলক। টাকার অংকও ধার্য রয়েছে ন্যূনতম তিন হাজার টাকা নাকি দিতেই হবে। দাবি মতো টাকা না পেলে শিশুকে না দেয়ার হুমকিও দেয়া হয় বলেও অভিযোগ অনেকের। আজ সেখানে হাওয়াটা একটু অন্য রকম। মিষ্টি খাওয়ার টাকাটা বন্ধ হয়ে যাবে নাতো? আশংকার বাতাস বইছে দিল্লির অভিজাত তন্ত্রের অন্দরমহলেও। আম-আদমির চাপে ধসে পড়েছে রেলস্টেশনে ভিভিআইপিদের জন্য বিশেষ গাড়ি পার্কিং ব্যবস্থার অলিখিত নিয়ম। অরবিন্দের ১৮ দফার ঘায়ে ঘাম ছুটছে উচ্চপদস্থ আমলাদেরও। যে দিল্লি এতদিন মন্ত্রী-আমলাদের দৌর্দণ্ড প্রতাপের লাল গাড়ি দেখে অভ্যস্ত,
যাদের যাতায়াতের সময় স্তব্ধ করে দেয়া হয় ‘আম-আদমির’ যানবাহন, সেখানেই কিনা উল্টোরথ! লাল বাতির গাড়ি, সরকারি বাংলো না নেয়ার প্রশ্নে অনড় অরবিন্দ ও তার দল। জাঁকজমক করে ছয়টি বিশাল বাংলো তৈরি হয়েছিল দিল্লি সরকারের মন্ত্রীদের জন্য। লেফটেন্যান্ট গভর্নরের অফিস থেকে কয়েকশ’ মিটার দূরে আতাতুর রেহমান লেন এবং রাজনিবাস মার্গ-এ ওই ছয়টি বাংলো ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। এএপি নেতা যোগেন্দ্র অবশ্য বলছেন, তাতে আশংকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে দিল্লি সরকারের উচ্চপদস্থ আমলাদের অনেকের আশংকার পেছনে যথেষ্ঠ কারন রয়েছে। যোগেন্দ্রর কথায়, ‘আমরা চেষ্টা করছি একটা উদাহরণ তৈরি করার। যদি আমাদের বিধায়ক-মন্ত্রীরা এই বিলাসবহুল বাংলোতে না যান, তাহলে এখানকার ভিআইপি-সংস্কৃতিও শুকিয়ে আসবে।’ বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা ভিআইপি সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে শেষ পর্যন্ত দিল্লি বদলাবে কিনা তা এখন সময়ের অপেক্ষা। দুর্নীতির পাঁক থেকে প্রশাসনকে তোলা যাবে কিনা সেটাও চিন্তার বিষয়। তবে আশা-নিরাশা-হতাশা যাই থাকুক না কেন, আম-আদমির আগমনী ধ্বনিতে যে অনেকেরই হাসিমুখটা শুকিয়ে গেছে- দিল্লি প্রশাসনের চেহারায় সে ছাপটাই তীব্র হয়ে উঠছে দিন দিন।

বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচন সম্ভব নয় : থাই নির্বাচন কমিশন

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের রাস্তায় বৃহস্পতিবার পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ফেব্র“য়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে প্রায় ৫০০ বিক্ষোভকারী দেশটির একটি স্টেডিয়ামে একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ চালায়। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। তবে এতে দু’জন পুলিশ,
একজন সাংবাদিক ও এক বিক্ষোভকারী আহত হলেও কোনো গুরুতর হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে নির্বাচন কমিশনের প্রার্থী নিবন্ধন কেন্দ্রে বিক্ষোভকারীদের এ হামলার পর পরই থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার অধীনে অনুষ্ঠিতব্য ২ ফেব্র“য়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন পেছানোর জন্য সরকারের পাশাপাশি বিরোধীদের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনোভাবেই নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার দিনের প্রথম ভাগে ঘটে যাওয়া ওই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দেয়া এক বিবৃতিতে নির্বাচন কমিশনের মহাসচিব সুপাচাই সচারয়েন বলেন, অপ্রত্যাশিত এ ঘটনার জন্য নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আন্দোলকারীদের কাছে আমি ক্ষমা চাই, চাইছি। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, জনমনে বিরাজমান সরকারবিরোধী এ ক্ষোভের সামনে সরকারের নতজানু হওয়া উচিত। না হলে, বর্তমান পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। এমনকি এই দর কষাকষির পরিণাম গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত গড়াতে পারে। সুপাচাই বলেন, দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনী কার্যক্রমে সুষ্ঠু অগ্রগতি সম্ভব নয়। থাই রাজনীতির ক্রমবর্ধমান অস্থিরতায় নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রধান প্রতিবন্ধক। এ অবস্থার উত্তরণে সরকার ও বিরোধীদের এক ছাতায় আনতে নির্বাচন কমিশন মধ্যবর্তী ভূমিকা পালনেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি। অন্যথায়, দেশের স্বার্থে কমিশন নিজেই কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন সুপাচাই। এদিকে, সরকারের একার সিদ্ধান্তে নির্বাচন সম্ভব নয়- নির্বাচন কমিশনের এ বিবৃতি ইংলাক সিনাওয়াত্রার দল পুয়ে থাই পার্টি তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। ইংলাক সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুয়ে থাই পার্টির শীর্ষ স্থানীয় নেতা চারুপঙ রুয়াংসুয়ান বলেন, নির্বাচন হবে, নাকি স্থগিত করা হবে তা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বের ভেতর পড়ে না। তাদের দায়িত্ব নির্বাচন পরিচালনা করা। থাই নির্বাচন পূর্বনির্ধারিত সময়েই হবে বলে সরকারের অনড় অবস্থানের কথা স্পষ্ট করেছেন চারুপঙ। রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন ঠেকাতে গেলে এদিন সকালে এ সংঘর্ষ শুরু হয়। আগামী ২ ফেব্র“য়ারিতে দেশটির নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যাংককের একটি স্টেডিয়ামে নিবন্ধন করাতে গিয়েছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বিক্ষোভকারীরা স্টেডিয়ামের দরজা ভেঙে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। স্টেডিয়ামের ভেতরে নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তারা কাজ করছেন। এ সময় বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাথরও নিক্ষেপ করে। প্রায় ৫০০ বিক্ষোভকারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগের দাবিতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটিতে বিক্ষোভ চলছে। বিরোধীদের বিক্ষোভের মুখে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের প্রতিশ্র“তি দেন ইংলাক। তবে বিক্ষোভকারীরা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। এদিকে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের উদ্দেশে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা বুধবার ‘জাতীয় সংস্কার কাউন্সিল’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন।ব্যাংকক পোস্ট।

শঙ্কা আসে ধেয়ে

পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই। কারণ, এই কলামে লিখেছিলাম, নির্বাচন নিয়ে দেশে কোনো অচলাবস্থা দেখা দেবে না, দিলেও সেটা ভয়ংকর কিছু হবে না। বাংলাদেশের মানুষের আছে সৃজনশীলতা, তারা এমন একটা উপায় বের করে নেবে, যা থেকে একটা সুন্দর নির্বাচন সম্পন্ন করা যাবে। আমার সেই ভবিষ্যদ্বাণী চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে, আমার আশা হয়ে গেছে গুড়ে বালি। আমরা পড়েছি ভয়াবহ সংকটে। এত মৃত্যু, এত ধ্বংস, এত আগুন! জীবন ও জীবিকার ওপরে এমন নিষ্ঠুর আঘাত। প্রত্যেক মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি, শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা, চাকরি—প্রতিটা ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; এবং সবচেয়ে বড় কথা, সংকট থেকে উত্তরণের কোনো সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না, বরং সামনে আরও হানাহানি, আরও আগুন, আরও প্রাণহানি, আরও সম্পদহানির আশঙ্কা ধেয়ে আসছে। এবং রাজনৈতিকভাবে দেশ একটা কানাগলিতে ঢুকে পড়তে যাচ্ছে, যেখান থেকে বেরোনোর উপায় আমাদের জানা নেই। সমস্যার মূলে অবশ্যই জেদ। এখন এ কথা সহজেই বলে ফেলা যায়, আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল, বিএনপিকে তারা নির্বাচনের বাইরে রাখবে। আমরা বলেছিলাম, আওয়ামী লীগ চায় না বিএনপি নির্বাচনে আসুক। আওয়ামী লীগের চাওয়া পূরণ করার দায়িত্ব তো বিএনপির নয়। তাই বিএনপির উচিত নির্বাচনে আসা। নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করলে একটা পক্ষে জোয়ার চলে আসবে, সেই জোয়ারে কারচুপির চক্রান্ত খড়কুটার মতো ভেসে যাবে।
অরণ্যে রোদন করলে তা কে শুনবে বনের পশু-পাখি-বৃক্ষলতা ছাড়া। কেউ শোনেনি। এখন এ কথাও বলে ফেলা যায় যে বিএনপির নেতৃত্বও আসলে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর চান না, তাঁরা চান ১৯৯৬ ও ২০০৭ সালে তাঁদের যেভাবে অপমানজনকভাবে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, সেই তেতো অভিজ্ঞতার স্বাদ শেখ হাসিনার সরকারকে পাইয়ে দেওয়া। দুই পক্ষের মনের ভেতরে মীমাংসা না করার জেদ প্রবল, আপনি-আমি কথা বলে কী করতে পারব? আর উভয় পক্ষই শুধু নিজেরটাই বুঝছে, দেশের মানুষের জীবন, দেশের মানুষের নিরাপত্তা, দেশের ভবিষ্যতের কথা ঘুণাক্ষরেও কেউ ভাবছে কি? তার চেয়েও ভয়াবহ কথা হলো, উভয় পক্ষ আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে যে তাদের ক্ষমতা গ্রহণ বা ক্ষমতা দখল করে রাখার মধ্যেই কেবল নিহিত রয়েছে দেশের মঙ্গল, এমনকি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ। যদি উভয় পক্ষই এটা ভাবতে থাকে যে আমি ক্ষমতায় না থাকলে দেশ শেষ হয়ে যাবে, তখন আপনি কী করতে পারেন। আমরা শুধু উভয় পক্ষকে বলতে পারি, এই চিন্তার নাম ফ্যাসিবাদী চিন্তা। আর আওয়ামী লীগ কেন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে ভয় পেল? কার পরামর্শে? বছর দুই আগে যখন সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রথা তুলে দেওয়া হয়, তখন তো শাসকদের জনপ্রিয়তায় এতটা ধস নামেনি। বরং সরকার জনপ্রিয়তা হারিয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপে যা বলা হচ্ছে, তার একটা অন্যতম কারণ মানুষের এক দিনের রাজা হওয়ার সুযোগটা রদ করে দেওয়া।
শেয়ার মার্কেট কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু কেলেঙ্কারি, দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাড়াবাড়ি—এসব তো আছেই। আছে সাংসদ-মন্ত্রী-নেতাদের অনেকের সম্পদ ফুলে-ফেঁপে ওঠা। যেটা এখন নির্বাচনী হলফনামায় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। একজন নেতা জানান, তিনি প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় করেছেন মাছের চাষ করে। মানে বছরে তিন কোটি টাকা। প্রতি কেজি মাছে তাঁর ১০ টাকা লাভ হলে বছরে ৩০ লাখ কেজি মাছ তাঁকে উৎপাদন করতে হয়েছে। তার মানে প্রতিদিন দুই ট্রাক করে মাছ তাঁর খামার থেকে বাজারে এসেছে। তাই তো বলি, দেশে মাছের অভাব দূর হলো কীভাবে? সব ঢাকায় বসে থাকা মন্ত্রী-সাংসদেরা উৎপাদন করেছেন। তবু আওয়ামী লীগ সরকার অনেক ভালো কাজও তো করেছিল। সেসবের কথা মানুষ যে বিবেচনা করবে, সেই অবকাশই তো তাকে দেওয়া হলো না। কল্পনা করুন, যদি উচ্চ আদালতের দেওয়া সুযোগ অনুসারে আরও দুই টার্ম তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রচলিত থাকত, তাহলে আজ বিএনপি আন্দোলন করত কী নিয়ে? আজ জামায়াতের আন্দোলন আর বিএনপির আন্দোলন একাকার হয়ে যেতে পারত না। এমনকি সরকার তো জাতীয় পার্টিকেও নির্বাচনে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। শেখ হাসিনার একসময়ের মন্ত্রী আ স ম আবদুর রবও এখন বিএনপি জোটের আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগ তো ‘পলিটিকস’টাও ঠিকভাবে করতে পারছে না। এবং পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক চালেও ব্যর্থ হচ্ছে।
কারণ, রাজনীতি রাজনীতিকদের হাতে নেই। অরাজনৈতিক গোষ্ঠী যখন রাজনীতি চালানোর চেষ্টা করে, তার ফল এ রকমই হয়ে থাকে। ১৮-দলীয় জোট খুবই কৌশলী একটা চাল দিয়েছে। দিনের পর দিন অবরোধে দেশের যখন নাভিশ্বাস উঠে গেছে, তখন তারা দিয়েছে ঢাকা চলো কর্মসূচি। এত দিন আমরা দেখলাম বিরোধী জোটের অবরোধ, এরপর দেখব, সরকারি অবরোধ। সরকার এবার ঢাকা আসার সব ধরনের পথ বন্ধ করে দেবে। আমাদের পরিত্রাণ নেই। কী হবে ২৯ ডিসেম্বর? কী হবে এরপর? হানাহানি হতেই থাকবে। এই নির্বাচন তো আসলে ঠেকানোরও কিছু নেই, যে নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বী থাকেন না, তার তো কোনো মানেও নেই আসলে। সরকার ক্ষমতা ছাড়তে চাইবে না, ৫ জানুয়ারিটা পার হয়ে গেলে শপথ গ্রহণ করে নতুন সরকার চেপে বসতে চাইবে জুতমতো। আর বিরোধী জোটই বা তা মেনে নেবে কেন? তারাও খালেদা জিয়ার ভাষায় ‘প্রাণক্ষয়ী’ আন্দোলন চালিয়ে যাবে। সরকার দমন-নিপীড়ন বাড়িয়ে দিতে থাকবে। জুলুম বাড়বে, গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো হরণ করা হতে থাকবে। উফ্, আমি কল্পনাও করতে পারছি না, সামনের দিনগুলোয় আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে? যে আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সাল থেকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে আসছে, তারা কি ক্ষমতায় থাকার জন্য বলপ্রয়োগকেই একমাত্র উপায় হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে?
বলা হয়ে থাকে, আওয়ামী লীগ সরকার সামনের দিনগুলোয় অনেক ভালো কাজ করবে, জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে, তখন নির্বাচন দেবে। জনপ্রিয়তা ফিরে পাবে কী করে? আরও আরও মৎস্য চাষ করে? ভালো কাজ করলে যদি জনপ্রিয়তা পাওয়া যায়, তাহলে গত পাঁচ বছর তারা তা না করে একপক্ষীয় নির্বাচনের পরে করার কথা কেন ভাবল? আচ্ছা, আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তা ফিরে পেল, নির্বাচন দিলেই তারা জয়লাভ করবে, তখন নির্বাচনটা হবে কোন পদ্ধতিতে? আবারও সেই বিষচক্র। তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া অন্য কিছু বিরোধীরা কেন মানবে? আর কোনো একটা পক্ষ কোনো একটা ছাড় যদি দেয়ই, তাহলে তা তারা এখন দিচ্ছে না কেন? আর কতজন মারা গেলে আমরা বলব, মানুষ মারা গেছে? আর কজন পুড়লে আমরা বলব, এটা বর্বরতা ছাড়া আর কিছু নয়? একটা জাতির ইতিহাসকে এক দিন, দুই দিন, এক বছর, দুই বছরের পাল্লায় মাপতে হয় না। তাই আমি আবারও বলব, আজ থেকে ২০ বছর পরের বাংলাদেশটা নিশ্চয়ই একটা উন্নত-আলোকিত স্বদেশই হবে। কিন্তু নিকট ভবিষ্যতের কথা যদি আমাকে বলতে বলেন, আমি ভালো কিছু দেখছি না। ‘এখন প্রকৃত আশাবাদীর পক্ষে আর কিছুই করার নেই, কেবল হতাশ হওয়া ছাড়া।’
অরণ্যে রোদন হলেও আমাদের কথা আমাদের বলে যেতেই হবে। সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন চাই। নির্বাচনে জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন চাই। এবং নির্বাচন করতে হলে বিবদমান জোটগুলোর মধ্যে একটা ন্যূনতম মতৈক্য চাই, সমঝোতা চাই, মীমাংসা চাই। বাংলাদেশে তা-ই হয়, যা বিএনপি আর আওয়ামী লীগ একযোগে চায়। দেশে শান্তি আসুক, এটা বিএনপি আর আওয়ামী লীগকে একযোগে চাইতে হবে। তা না হলে আমাদের কারোরই স্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো গ্যারান্টি থাকবে না। আমরা কতটা বর্বর হয়েছি যে কেবল মানুষ হত্যা করছি, তা নয়, আমরা বৃক্ষ নিধন করে চলেছি; আমরা কেবল মানুষ পুড়িয়ে মারছি, তা নয়, আমরা এখন গরু পোড়াতে শুরু করেছি। আমরা কি মানুষ পদবাচ্য নই?
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

কে এই ইমরান খান?

বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর সাজা বিষয়ে ইমরান খানের অবস্থানে বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা যাচ্ছে কিছু লোককে। পাকিস্তানি জামায়াত, পাকিস্তানি মুসলিম লিগের কথাবার্তা যেমন-তেমন। কিন্তু ইমরান খানের অবস্থানে তাঁরা নাকি আসমান থেকে পড়ে যাচ্ছেন। কিংবা মাথায় আসমান ভেঙে পড়ার উপক্রম হচ্ছে বলে তাঁরা জানাচ্ছেন। ইমরান খানের রাজনীতির ব্যাপারে আগে থেকে খোঁজখবরে থাকলে অবশ্য আসমান নিয়ে টানাটানি পড়ার কথা নয়। পাকিস্তানকে সমর্থন জানানোর বাসনা থেকে যাঁরা খেলার মধ্যে রাজনীতি আনা ঠিক না বলে থাকেন, তাঁদের আগেই বলে রাখা যাক যে খেলোয়াড় ইমরান খান নয়, রাজনীতিক ইমরান খান নিয়ে এখানে কথা হচ্ছে। আর এ কারণেই ছাত্রজীবন ও খেলোয়াড়ি জীবনে ইমরান খানের নানা কীর্তিকলাপ, যেগুলো বিশেষত ভারতীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে বাংলার ঘরে ঘরে ঢুকে আছে, সেগুলোর উল্লেখ বাংলাদেশি যুদ্ধাপরাধীর শাস্তির বিরুদ্ধে তাঁর আস্পর্ধার আলোচনায় জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে এই ব্যক্তির রাজনীতির ধরনটা বোঝা। জেনেও না-জানার ভানকারীদের কথা আলাদা।
কিন্তু যাঁরা ইমরান খানের খবরাখবর রাখার প্রয়োজন মনে করেন না, তাঁদের জানানো যাক যে দেড় দশকের বেশি আগে তেহরিক-ই-ইনসাফ নামক দল নিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে নামা ইমরান খানের বর্তমান বাজার বেশ ভালো। মে মাসের জাতীয় নির্বাচনে ভালোই ফল করেছে তেহরিক। আর প্রাদেশিক পরিষদে বেশি আসন পাওয়ার সুবাদে ধর্মীয় উগ্রবাদী-অধ্যুষিত খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের কোয়ালিশন সরকারের প্রধান শরিক হয়েছে তেহরিক। ইমরানের দলের নেতৃত্বাধীন সরকারের আরেক প্রভাবশালী শরিক হচ্ছে পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামি। চোখ কচলানোর কিছু নেই—পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামি। আরও আছে, ইমরান খান মনে করেন যে তালেবানরা একটি ‘ধর্মযুদ্ধ’ করছে। গত বছরের অক্টোবর মাসের ১৪ তারিখে পেশোয়ার শহরে একটি হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইমরান খান সুস্পষ্ট ভাষায় এই মত দেন। তালেবানদের অবস্থানকে তিনি ‘বৈধ’ হিসেবেও চিহ্নিত করেন। উল্লেখ্য, খানসাহেবের পরিদর্শনের মাত্র কয়েক দিন আগে এই হাসপাতালটিতেই তালেবানের গুলিতে বিদ্ধ মালালা ইউসুফজাইকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তালেবানের প্রশংসা করার জন্য ঠিক এই হাসপাতালটিই কেন বেছে নিতে হয়েছিল?
এ জন্যই, সম্ভবত পাকিস্তানের উদারপন্থীরা ইমরান খানকে ‘তালেবান খান’ ডাকে। আরও স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০০৯ সালে সোয়াত অঞ্চলে তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের বিতর্কিত এক রফার প্রতি সর্বপ্রথম সমর্থন জানানো রাজনীতিক ছিলেন ইমরান খান। অবশ্য ইমরান খান মাঝেমধ্যে, বিশেষ করে পশ্চিমা মিডিয়ার সামনে কথা বলার সময় ধর্মীয় উগ্রবাদীদের ব্যাপারে কোমল থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। আবার ধর্মীয় উগ্রবাদীরাও খানসাহেবকে একজন ‘উদারনীতিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে মেরে ফেলার হুমকি-টুমকি দেয় মাঝেমধ্যে। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যায়? সর্বশেষ পার্লামেন্ট নির্বাচনের মৌসুমটির কথা ধরা যাক। পাকিস্তানজুড়ে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের টানা হামলার মুখে বলতে গেলে নির্বাচনী প্রচারণা করতেই পারেনি সে সময় ক্ষমতাসীন পিপিপি ছাড়াও আওয়ামী ন্যাশনালিস্ট পার্টি (এএনপি) কিংবা মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের (এমকিউএম) মতো খানিক উদারপন্থী দলগুলো। কোনো কোনো দলের গায়ে ফুলের টোকাও লাগেনি? শরিফের মুসলিম লিগ এবং অবশ্যই ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ। লক্ষণীয় ব্যাপার, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীর সাজা নিয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে আদবহীনতার সময় পক্ষ-বিপক্ষের দলগুলোর বিন্যাসও এভাবেই ছিল। সেনা এস্টাবলিশমেন্ট ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ইমরান খানের বিশেষ সম্পর্কের ব্যাপারটিও পাকিস্তানে ব্যাপকভাবে আলোচিত। বর্তমানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লিগ এ ব্যাপারে প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছিল একসময়।
সময়টা ২০১১ সালের একেবারে শেষের দিকে—পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) তখন ক্ষমতায়। হঠাৎ করেই দেড় দশক ধরে টিমটিম করতে থাকা ইমরান খানের দলের পক্ষে বেশ জোশ দেখা যেতে শুরু করে; তেহরিকের জনসভাগুলোতে এন্তার জনসমাগম শুরু হয়। এই ব্যাপারটি মধ্যপন্থী পিপিপির চেয়ে নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগকে বেশি ভাবিয়ে তোলে। কেননা, নতুন-ডান তেহরিক পুরোনো-ডান মুসলিম লিগের ঘাঁটিগুলো দখল করে ফেলার মতো একটা অবস্থা তৈরি করতে শুরু করেছিল। এমনকি মুসলিম লিগের মূল ঘাঁটি পাঞ্জাবেও বড় বড় অনুষ্ঠান করতে শুরু করে তেহরিক। লাহোরে, করাচিতে ইমরান খান সাহেবের জনসভায় প্রচুর মানুষ দেখা যেত তখন। এমন পরিস্থিতিতেই সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তেহরিকের সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে শুরু করে মুসলিম লিগ। একদিকে ভোটব্যাংক বেহাত হয়ে যাওয়ার ভয়, অন্যদিকে, সেনা এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে ‘ঐতিহাসিক’ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে মুখ খোলে মুসলিম লিগ। দলটি অভিযোগ আনে যে তহবিল জোগানো, জনসভায় লোক ভরানো থেকে শুরু করে সাবেক সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফের দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ (কিউ) থেকে লোক ভাগিয়ে তেহরিকে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজগুলো গোয়েন্দা সংস্থা করে চলেছে। শরিফের দল এই আক্ষেপও করে যে প্রধান সেনাপতি জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানিকে এ ব্যাপারে একাধিকবার জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি।
ইমরান খানের দলের জন্য সেনা কর্তৃপক্ষের সাহায্য-সহযোগিতার ব্যাপারে শরিফের দল এতটাই তেতে ওঠে যে তারা কেবল ব্যক্তি রাজনীতিক নয় বরং দলের আয়-ব্যয়, দলের নেতাদের স্থানে স্থানে ভ্রমণ ব্যয়ের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা প্রতিষ্ঠায় জাতীয় পরিষদে একটি বিল উত্থাপন করার হুমকিও দেয়। ইমরান খান ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে একবার গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। কিন্তু তাতে কাজ হয়নি—পাকিস্তানি রাজনীতি ও পাকিস্তানি মিডিয়ার উদারনীতিক অংশটির কাছে তিনি এস্টাবলিশমেন্টের পেয়ারের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত। এবং তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো কখনো কখনো সরকারকে আঘাত করলেও এস্টাবলিশমেন্টকে কখনোই নয়। এই তো মাত্র মে মাসে আহমদিয়াদের অমুসলিম হিসেবে ঘোষিত হয়ে থাকার পক্ষে শক্ত শক্ত কথা বলে এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষের আরেক দফা অবস্থান নিয়েছেন ইমরান খান। জামায়াতের সঙ্গে প্রদেশে সরকার গঠন, তালেবানদের ব্যাপারে উদারতা, সেনা-ঘনিষ্ঠতা—এত সব ‘বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত’ ব্যাপক ডানপন্থী ইমরান খানের বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ প্রসঙ্গে সঠিক অবস্থানে দাঁড়ানোটাই হতো আশ্চর্যের। পাকিস্তান জানে যে,
আজ হোক কাল হোক, একাত্তরের অপরাধসমূহের জন্য পাকিস্তানি রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং সামরিক নেতৃত্বের বিচারের উদ্যোগ নেবে বাংলাদেশ। আর কাদের মোল্লার সাজার ব্যাপারে তাঁদের চুপ থাকার অর্থ হতো একাত্তরে যুদ্ধাপরাধ-মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারটি মেনে নেওয়া। দেয়ালের লিখন পড়তে না পারলে যে ভুল হয়, ইমরান খান তথা পাকিস্তানি কায়েমি স্বার্থবাদীরা সেই ভুলই করছে। কিন্তু বাংলাদেশে যাঁরা ইমরান খানের ভূমিকায় ব্যথা পেয়েছেন, তাঁদের তো ব্যথা পাওয়া চলবে না। জানা থাকতে হবে যে পাকিস্তানের ইমরানের তো এটাই করার কথা। ইমরানে ইমরানে কত তফাত। পাকিস্তানি ইমরান যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আর বাংলাদেশের ইমরানরা গণজাগরণ মঞ্চ বানায় যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শেষ না করে ঘরে না ফেরার কথা বলে।
শান্তনু মজুমদার: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

দুই পক্ষের কঠোর অবস্থান

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ঢাকা অভিমুখী ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ করতে দেওয়া হবে না বলে সরকার দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। ২৯ ডিসেম্বর বিরোধী দলের লোকজনকে কোথাও জড়ো হতে দেবে না সরকার। আগামী ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে অন্তত এক সপ্তাহ সরকার দেশে কোনো রাজনৈতিক গোলযোগ হতে দিতে চায় না। মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলামোটরে পেট্রলবোমায় পুলিশের সদস্য হত্যা মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিরোধীদলীয় জোটের ১৮ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের পেছনেও ওই একই উদ্দেশ্য। নাশকতা ও ককটেল-পেট্রলবোমার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা সরকারের মুখে সব সময় শোনা যাচ্ছে। এবার ২৯ ডিসেম্বর ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ঠেকাতেও কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সরকার কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আর বাকি রেখেছে কি? যেকোনো নাশকতায় দু-চারজনের নাম দিয়ে শত শত বা হাজার হাজার ‘অজ্ঞাত’ ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযানে জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সংঘর্ষে অনেকে মারা যাচ্ছেন। আর কত কঠোর হবে সরকার? অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন,
২৯ ডিসেম্বর তাঁদের কর্মসূচিতে বাধা দিলে পরিণতি হবে ভয়াবহ। তাঁদের ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ কর্মসূচি পালনে বাধা দিলে পরিণতি কঠিন ও করুণ হবে বলেও তিনি সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, বিরোধী দল যেভাবে বাসে পেট্রলবোমা মেরে, ককটেল ফাটিয়ে মানুষ হত্যা করছে, অবরোধের নামে রেলের ফিশপ্লেট খুলে যাত্রী হত্যা, গাছ কেটে ‘জলবায়ু-অপরাধ’ সাধন, এমনকি বোমা মেরে গরু পুড়িয়ে মারার মতো ঘৃণ্য অপরাধ করে চলেছে, এরপর আর কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে চায় ওরা? বিরোধী দল কি সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করছে? আর কত হত্যা, রেললাইন উপড়ে ফেলা, ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, বাসে পেট্রলবোমা মারার পর বিরোধী দল বলবে, যথেষ্ট কঠোর পরিণতি ডেকে আনা হয়েছে?  আর সরকারই বা আর কত জেল-জুলুম-নির্বিচার গুলি চালিয়ে বলবে, তারা যথেষ্ট কঠোর হয়েছে? স্বাভাবিক বিচার-বিবেচনা থাকলে কোনো দায়িত্বশীল দল রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে বা কোনো সরকার বিরোধী দলের কর্মসূচি দমনের নামে এত নির্মম আচরণ করতে পারে না। রাজনীতি মানুষের জন্যই। তাই রাজনীতির জন্য যেন একজন নাগরিকের প্রাণও বিপন্ন না হয়, তা দেখা প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কর্তব্য। যাঁরা সরকারের আছেন, তাঁদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ, সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনার জন্যই তাঁদের জনগণ নির্বাচিত করেছে। ২৯ ডিসেম্বর ঘিরে দেশে সৃষ্ট অনিশ্চিত পরিস্থিতির অবসান হোক। সরকার ও বিরোধী পক্ষ আরও দায়িত্বশীল আচরণ করুক। মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।