Tuesday, November 26, 2019

কখনো কখনো শুধু কেঁদেছি

ধর্ষণকে যেখানেই যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, সেখানকার নির্যাতিত নারীর পাশে দাঁড়াতে চান রাজিয়া সুলতানা। মিয়ানমারের ধর্ষিত, যৌন নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মিয়ানমারের মংডুতে জন্ম হলেও রাজিয়া সুলতানা বড় হয়েছেন বাংলাদেশে। রোহিঙ্গা নারীদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের বিষয়ে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে। সাহসিকতার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে অভিজাত ইন্টারন্যাশনাল ওমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার দিয়েছে। তিনি একজন আইনজীবী ও অধিকারকর্মী। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে যখন স্রোতের মতো নির্যাতিত রোহিঙ্গারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে থাকেন, নারীরা যে ভয়াবহ যৌন নির্যাতনের শিকারে পরিণত হন- তাদের সামনে তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন। বাংলাদেশে তিনি রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য একজন শিক্ষাবিদ, অধিকারবিষয়ক প্রচারক ও দোভাষী।
মিয়ানমারে ধর্ষিত হয়ে বেঁচে থাকা যেসব নারী পালিয়ে বাংলাদেশের এসেছেন, এমন কয়েক শত নারীর সাক্ষাৎকার নেয়ার পর তিনি তাদের কাউন্সিলিং ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য পরামর্শ দেয়ার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন রোহিঙ্গা ওমেনস ওয়েলফেয়ার সোসাইটি। যুক্তরাষ্ট্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে সাহসিকতার জন্য ইন্টারন্যাশনাল ওমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার দেয়ার পর যখন তিনি ওয়াশিংটনে অবস্থান করছিলেন, তখন টেলিফোনে তার একটি সাক্ষাৎকার নেন বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের সাংবাদিক লাইগনি ব্যারন। এখানে তার অনুবাদ তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: রোহিঙ্গা নারী ও বালিকাদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা কিভাবে প্রামাণ্য আকারে ধারণ করা শুরু করলেন?
উত্তর: ২০১৬-২০১৭ সালে ঢলের মতো বাংলাদেশে শরণার্থী অনুপ্রবেশের পর বিষয়টি এলোমেলো মনে হয়েছিল। আমাকে নারীদের সাহায্য করতে হয়েছিল। ধর্ষিত হওয়া, অঙ্গছেদ করা ও প্রিয়জনদের হত্যা অথবা প্রহৃত হওয়ার দৃশ্য তারা প্রত্যক্ষ করেছেন। যারা এসব অপরাধ করেছে তাদের সামনে কথা বলতে স্বস্তিকর অবস্থানে ছিলেন না এসব নারী। সেসব ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা তারা আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন।
প্রশ্ন: কিসের জন্য আপনি এর ওপর রিপোর্ট লেখা শুরু করলেন?
উত্তর: ২০১৪ সালে আমার এক বন্ধু আমাকে একটি রিপোর্ট দিয়েছিলেন। এটা ছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সহিংসতা নিয়ে, যেখানে যৌনতাকে তারা অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে বর্ণনা করেছে ‘লাইসেন্স অব রেপ’ অর্থাৎ ধর্ষণের লাইসেন্স। তারপর ২০১৬ সালে যখন রোহিঙ্গা শরণার্থী পালিয়ে বাংলাদেশে আসছিলেন, তখন তারা কি রকম সহিংসতার শিকার হয়েছেন তা শুনে আমি বিস্মিত হয়েছি। কালাদান প্রেসের (রোহিঙ্গাদের মিডিয়া বিষয়ক সংগঠন) জন্য কিছু সাক্ষাৎকারকে ভাষান্তরে সহায়তা করছিলাম। এমন কয়েকটি সাক্ষাৎকারের পর আমার কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। তা হলো, বেশির ভাগ নারী যৌন সহিংসতা, নির্যাতন, হয়রান ও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আমার সম্পাদককে বললাম, ‘লাইসেন্স অব রেপ’-এর মতো রিপোর্ট করা দরকার আমাদের। তিনি আমাকে বললেন, ওকে আপনি এটা করতে পারবেন?
প্রশ্ন: নারীরা কি এসব যৌন নির্যাতনের ঘটনা প্রামাণ্য আকারে ধারণ করা হোক এমনটা চেয়েছেন?
উত্তর: অনেক নারী ভীষণ ক্ষুব্ধ। ক্ষোভ থেকে তারা বলেছেন, আমরা কেন আর এখন এসব কথা লুকিয়ে রাখবো? অনেকেই সাহসী। আবার কিছু আছেন, যারা নীরব থাকতেই পছন্দ করেছেন।
বিষয়টি আমার কাছে জটিলও। বেশ কয়েকটি সাক্ষাৎকার নেয়ার পর আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। কখনো কখনো শুধু কেঁদেছি। জানি না কেন কেঁদেছিলাম। কখনো কক্সবাজার থেকে বাইরে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। কারণ, সেখানে আমি ভীষণ বেদনাবোধ করছিলাম। আমি চিকিৎসকের কাছে গেলাম। তিনি আমার কাছে জানতে চাইলেন, আপনি কি করতে চান?
তাকে আমি বললাম, আমার মানুষদের সাহায্য করতে চাই।
আমার কথা শুনে তিনি বললেন, ঠিক আছে। তাহলে আপনাকে অনেক দৃঢ় মানসিকতার হতে হবে।
প্রশ্ন: রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ইস্যুটি কতটা উন্মুক্তভাবে আলোচনা করা হয়?
উত্তর: তাদের মধ্যে ভীষণ রকম লজ্জাবোধ। নারীরা তাদের পরিবারের সুনাম নিয়ে সচেতন। একজন চিকিৎসকের কাছে যেতেও তারা ভয় পান। একজন ডাক্তার দেখলেও তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। ২০১৬ সালে আমি একজন নারীর সঙ্গে কথা বলি। তিনি ছিলেন অবিবাহিত যুবতী। তিনি নড়তে পর্যন্ত পারছিলেন না। তার সমস্ত শরীর থেকে রক্ত ঝরছিল। আমাকে যে সূত্র এ বিষয়ে খবর দিয়েছে তার কাছে জানতে চাইলাম, এই যুবতীকে একজন ডাক্তারের কাছে না নিয়ে আপনি আমাকে কেন এখানে এনেছেন?
প্রশ্ন: পরিবারগুলো কেমন সাপোর্ট দেয়?
উত্তর: কিছু নারীর স্বামী ও তাদের পরিবার ভালো। আবার কিছু পরিবার আছে, যারা ধর্ষিত স্ত্রী বা অবিবাহিত মেয়েদের আর গ্রহণ করতে চায় না। এক্ষেত্রে আপনি বিষয়টিকে ৫০-৫০ বলতে পারেন। তাই অনেক নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার পরও এমন পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থা প্রকাশ করেন না। আমরা ডাস্টবিন থেকে উদ্ধার করেছি ৫ অথবা ৬টি শিশুকে।
প্রশ্ন: যৌন সহিংসতা যে পদ্ধতিগত অথবা আপনার রিপোর্ট যেমনটা বলেছে, কমান্ড থেকেই ধর্ষণ হচ্ছে- এ বিষয়গুলো আপনি কিভাবে স্থির হলেন?
উত্তর: জাতিগত এলাকাগুলোতে এটা হলো মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর একটি পুরনো কৌশল। প্রথমেই তারা টার্গেট করে নারীদের। এমনটা করা হলেই মানুষ পালাতে থাকে। যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ধর্ষণের অর্থ হলো আতঙ্ক সৃষ্টি করা। মানুষ যখন দেখে তাদের মেয়েদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী, তখন তারা ভাবেন আমাদের আর বাড়িঘরের দরকার নেই। আমাদের মেয়েদের বাঁচাতে হবে। রক্ষা করতে হবে পরিবারের সুনাম। তাই তারা বাড়িঘর ছেড়ে যান। তাদের ভূমি ছেড়ে যান। দেশ ছেড়ে যান।
এই যৌন সহিংসতা সুস্পষ্টতই কোনো ব্যক্তিবিশেষের যৌনতা সংক্রান্ত বাসনা থেকে ঘটেনি। দল বেঁধে চালানো হয়েছে এ সহিংসতা। তারা যুবতী নারী ও বয়স্ক নারীদের লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়েছে। তারপর তাদের ধর্ষণ করেছে। ২০১৬ সালে যখন ‘উইটনেস টু হরর’ শিরোনামে আমার রিপোর্টগুলো সংকলন করছিলাম তখন মাত্র ১৪ বছর বয়সী একটি বালিকার সাক্ষাৎ পাই আমি। তাকে কমপক্ষে ৩০ জন সেনাসদস্য ধর্ষণ করেছে। সেনাবাহিনী নারীদের স্তন কেটে ফেলেছে। উপড়ে ফেলেছে তাদের চোখ। তারা শুধু ধর্ষণ করেই থেমে থাকেনি। এটা হলো এই সম্প্রদায়কে শাস্তি দেয়ার অস্ত্র।
প্রশ্ন: যুদ্ধাপরাধে ধর্ষণ হলো সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিয়ে রিপোর্ট করা হয় যেসব বিষয়ে তার একটি। রোহিঙ্গা নারীদের ক্ষেত্রে দৃষ্টি আকৃষ্ট করার জন্য আপনি কি পরিবর্তন আনার আশা করেন?
উত্তর: শুধু মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, বসনিয়া, ঘানা বা অন্য জায়গাগুলোই নয়, বিশ্বের যেখানেই ধর্ষণকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে আমি তার প্রতিটি স্থানের জন্যই কাজ করছি। আমরা ন্যায়বিচার চাই। একটি আন্তর্জাতিক আইন থাকা উচিত অবশ্যই। তা হলো সেনাবাহিনীকে অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই পর্যায়ে সহিংসতার মুখোমুখি কিভাবে হচ্ছেন নারীরা?
প্রশ্ন: নৃশংসতার নিন্দা না জানিয়ে সেনাবাহিনীর সঙ্গে অব্যাহত অবস্থান নিয়েছেন মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি। এতে অনেক পশ্চিমা দেশ হতাশ। আপনি এ বিষয়ে কি বলবেন?
উত্তর: আমার জন্য এটা অত্যন্ত জটিল বিষয়। কারণ, আমরা তার (সুচি) জন্য লড়াই করেছি। তাহলে কেন তিনি আমাদের দুর্ভোগের বিষয়ে নীরব? যা ঘটেছে তার দায়দায়িত্ব তারও আছে। এটা সত্যি যে, তার কোনো ক্ষমতা নেই। তিনি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারের হাতের পুতুল। কিন্তু তবুও, তিনি হলেন গণতান্ত্রিক নেত্রী। তাই তার দেশের ভিতর কি ঘটছে সে বিষয়ে জানা তার দায়িত্ব। সেনাবাহিনী নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করছে। আর তিনি বলছেন, তিনি কিছুই জানেন না! হয়তো এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ, তিনি জেলে ছিলেন। এখন তিনি মুক্তি পেয়েছেন। তাই তিনি ক্ষমতা হারাতে চান না।
প্রশ্ন: যেসব রোহিঙ্গা নারী পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন এবং বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছেন তাদের কাছে জীবনের অর্থ কি?
উত্তর: এটা হলো এক জেলজীবন। নারীরা মুক্তভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা অথবা শিক্ষা পান না তারা। এটা তো কোনো জীবন হলো না। এমনকি তারা তাদের তাঁবুর বাইরেও যেতে পারেন না, যা বাস্তবেও তাঁবু নয়। এগুলো হলো অস্থায়ী আশ্রয়স্থল। রোহিঙ্গা সমাজ অত্যন্ত রক্ষণশীল। তাই যখন কোনো বেড়া, কোনো গোপনীয়তা থাকে না, তখন নারীরা শুধুই ঘরের ভিতর অবস্থান করেন। তারা রান্না করেন। ফেলে আসা জীবনের স্বপ্ন দেখেন।
রাতে টয়লেটে যাওয়ার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা নারীরা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করেন। তারা একা একা টয়লেটে যেতে পারেন না। প্রচুর হয়রান হতে হয় তাদের, যা মানসিক নির্যাতনের চেয়েও বেশি কিছু।
আশ্রয় শিবিরে করার মতো কিছু নেই তাদের। তাদের কাছে একটি দিন যেন একটি বছর। এই আশ্রয় শিবিরে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তারা শুধু বসবাস করছেন জীবজন্তুর মতো। বিশেষ করে যুবসমাজ হতাশায় মগ্ন। কারণ, তাদের কোনো কাজ নেই। শিক্ষা নেই। পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে তারা ঝুঁকিতে। এসব পাচারকারী তাদের ভালো চাকরি, বিয়ে ও অন্য যেকোনো কিছুর প্রলোভন দেখায়। প্রতিশ্রুতি দেয়।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এক্ষেত্রে কি করতে পারে?
উত্তর: নৃশংসতা বন্ধের জন্য মিয়ানমার সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তদন্ত করা উচিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) এবং তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা উচিত। পুরো একটি সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রহীন করে দেয়ার কোনো অধিকার নেই মিয়ানমারের। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গারা শুধু বাংলাদেশের বোঝা নন। এ সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেয়া উচিত পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যা ঘটছে, নারীদের বিরুদ্ধে যে যৌন সহিংসতা ঘটছে তা যে গণহত্যার অংশ তা এখনও মেনে নিচ্ছে না যুক্তরাষ্ট্র। শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবরোধ এক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ, মিয়ানমারের বড় সব কোম্পানির মালিক হলো সেনাবাহিনী। এই অবরোধ আরোপের কাজটি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী ও এ বাহিনীতে নিয়োজিতদের সন্তানদের অধিকার কেড়ে নিতে পারে। 
প্রশ্ন: এরপর আপনি কি করবেন?
উত্তর: আমাদের উচিত আমাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা ও রাজনৈতিক দাবি পুনর্গঠন করা। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সব সময়ই প্রস্তাব দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত রোহিঙ্গাদের দ্বারাই। এই সম্প্রদায়টি জানে, তাদের জন্য উত্তম কি। আমাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব গড়ে তোলা উচিত। একটি স্পষ্ট কূটনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলা উচিত। এর আগে আমি রাজনীতিক হতে চাইনি। কিন্তু এখন দেখছি এটা প্রয়োজনীয়। আমাদের অনেক যোগ্য নেতা আছেন, যারা আমাদের এজেন্ডার প্রকাশ ঘটাতে পারেন। আমি তাদের সাহায্য করতে পারি। এমন রাজনৈতিক গ্রুপের অংশ হতে পারি আমিও।

মরক্কোর অর্ধেক মানুষই কেন দেশ ছেড়ে চলে যেতে চায়

মরক্কোর বাদশা ষষ্ঠ মোহাম্মদ
বিবিসির এক জরিপ বলছে, মরক্কোর প্রায় অর্ধেক মানুষই অন্য দেশে পাড়ি জমাতে চায়, অথবা অবিলম্বে মরক্কোয় একটা রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়।
তাহলে, সুদান এবং আলজেরিয়ার পর মরক্কোতেই কি ঘটতে যাচ্ছে ক্ষমতার পরবর্তী পটপরিবর্তন?
ক্যাসাব্লাঙ্কা শহরে বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিলেন সালেহ আল-মনসুরি। তার বয়েস মাত্র বিশের কোঠায়, কিন্তু ইতিমধ্যেই কঠিন জীবনের অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে তার।
তিনি নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে গিয়েছিলেন। কয়েক বছর থেকেছেন জার্মানিতে। কিন্তু তার রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আবার ফিরে এসেছেন দেশে।
"লোকে ইউরোপে যায় এমন কিছু পাবার জন্য যা তারা এখানে পায় না" - বলছিলেন মি. মনসুরি।
তিনি কিছু অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কথা বললেন, উন্নত জীবনের কথা বললেন। কিন্তু আরো কিছু প্রয়োজন আছে - যা বিমূর্ত।
"যেমন স্বাধীনতা, যেমন সম্মান - এরকম অনেক কিছু আছে। মরক্কোতে জনগণকে কেউ পাত্তা দেয় না। এর অভাবই মানুষকে অভিবাসী হতে উদ্বুদ্ধ করে" - বলছিলেন তিনি।
বিবিসির আরবি বিভাগের চালানো এক জরিপ অনুযায়ী মরক্কোর প্রায় অর্ধেক লোক দেশ ছাড়ার কথা ভাবছে।
এই জরিপের বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করলে এ প্রশ্নও মনে আসে: মরক্কোতেই কি এর পর গণ-অসন্তোষ দেখা দেবে?
সম্প্রতি সুদান এবং আলজেরিয়ায় যে গণবিক্ষোভ এবং তার পর আকস্মিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে গেল তাকে অনেকেই বলছেন আরব বসন্ত ২.০।
সুদানের ওমর আল-বশির এবং আলজেরিয়ার আবদেলআজিজ বুতেফ্লিকার ক্ষমতাচ্যুতি অনেককে অবাক করেছে - কিন্তু বিবিসির জরিপটিতে এরকম কিছু ঘটার ইঙ্গিত ছিল। দেশ দুটির লোকজনের কথাবার্তায় ফুটে উঠেছিল তারা ক্রুদ্ধ, আতঙ্কিত এবং বেপরোয়া। দেশ দুটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই বলছিলেন, তারা নির্বাচন এবং একনায়কতন্ত্র, বাকস্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো নিয়ে অসন্তুষ্ট।
এরকম উপাত্ত মিলেছে আরেকটি দেশ থেকে - মরক্কো।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্খা
বিবিসির জরিপে মরক্কোর উত্তরদাতাদের অর্ধেকই বলেছেন, তারা অবিলম্বে রাজনৈতিক পরিবর্তন চান।
দেশটির ৪৫ শতাংশ মানুষের বয়সই ২৪এর নিচে, এবং অনুর্ধ-৩০ বছর বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের ৭০ শতাংশই দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে চান। ষাট বছরের বেশি বয়স্কদের অর্ধেকই সরকারের ব্যাপারে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, কিন্তু ১৮-২৯ বছর বয়স্কদের মধ্যে এ হার মাত্র ১৮ শতাংশ।
২০১১ সালের আরব বসন্তের পর মরক্কোর বাদশাহ ষষ্ঠ মোহাম্মদ বেশ কিছু সংস্কার কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেন। নতুন সংবিধান হয়, পার্লামেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা বাড়ানো হয়, তবে রাজার ব্যাপক কর্তৃত্ব এখনো বহাল আছে। অনেক সংস্কারই পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয় নি - বলছেন সাংবাদিক ও বিরোধীদলীয় কর্মী আবদেললতিফ ফাদুয়াশ।
তিনি বলছেন, নানা কারণে এখানে পুরোপুরি বাজার অর্থনীতি চালু হতে পারছে না। ট্যাক্সি চালানো বা মাছ ধরার পারমিটের জন্যও রাজনীতিবিদ বা রাজপ্রাসাদের আনুকুল্য লাগে।
"আলজেরিয়া, সুদান, বা তার আগে সিরিয়া-মিশর-লিবিয়া-তিউনিসিয়ায় যা ঘটেছে তা যে কোন সময় মরক্কোতে ঘটতে পারে" - বলেন তিনি।
আরেকজন সাংবাদিক আবদেররহিম স্মুগেনি বলছেন, লোকে সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ, কারণ তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই না করে শুধু কর বাড়াচ্ছে। কিন্তু মরক্কোর বাদশাকে লোকে দেখে রাজনীতির উর্দ্ধে। সুদান বা আলজেরিয়ার সাথে এটা একটা বড় পার্থক্য, কারণ ওই দেশগুলো মরক্কোর মতো রাজতন্ত্র নয়।
কিন্তু বাদশার ব্যাপারে এ অনুভুতি কি এখনো আছে? এটা বলা কঠিন। মি স্মুগেনি বলেন, অনেকেই মনে করছেন রাজতন্ত্র হয়তো নাও টিকতে পারে।
মরক্কোর সেনাবাহিনীকেও রাজার প্রতি অনুগত বলে মনে করা হয়। দেশটিতে এখনো সেরকম কোন গণআন্দোলন বা বিক্ষোভ নেই।
কিন্তু বিবিসি জরিপ পরিচালনাকারী আরব ব্যারোমিটারের মাইকেল রবিন্স বলছেন, মরক্কোয় এখনো কোন আরব বসন্ত মুহুর্ত আসে নি, ২০১১ সালের বিক্ষোভ সেরকম কোন মৌলিক পরিবর্তন আনে নি। কিন্তু তাদের জরিপের উপাত্ত থেকে একটা সতর্ক সংকেত পাওয়া যায়। তরুণ প্রজন্ম হয়তো একটা স্ফুলিঙ্গের কাছাকাছি, যা একটা বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে।
মরক্কো এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।
সবকিছু নির্ভর করে দেশটির তরুণরা তাদের বাদশা এবং তার অজনপ্রিয় সরকারের কাছে কি প্রত্যাশা করে - তার ওপর।
সালেহ আল মনসুরি ইউরোপে আশ্রয় না পেয়ে আবার দেশে ফিরেছেন

ভ্যাজাইনিসমাস: যে ব্যাধি যৌনমিলনে নারীদের শুধুই যন্ত্রণা দেয়

"আমার শরীর আমাকে সেক্স করতে দেয় না এবং আমি যখন সেক্স করি, তখন এমন মনে হয় যে কেউ আমাকে ছুরিকাঘাত করছে।"
এই কথাগুলো বলছিলেন হ্যানা ভ্যান ডি পিয়ার, যার যৌনমিলনের সময় যন্ত্রণা হওয়ার এক রোগ রয়েছে। ভ্যাজাইনিজমাস নামের এই ব্যাধি সারা বিশ্বের নারীদের জীবনকে প্রভাবিত করে থাকে।
তবে এই বিষয়টি সম্পর্কে খুব অল্প মানুষই জানেন।
মূলত এই ব্যাধিতে আক্রান্তদের শরীর যৌনমিলনের ভয়ে এ ধরণের প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে।
"আমি এমন অনেক নারীর সাথে কথা বলেছি যারা এই সমস্যায় ভুগেছেন। তাদের প্রায় সবার থেকে একটি অভিজ্ঞতার কথা জানতে পেরেছি, আর তা হল তারা খুব একাকীত্বে ভোগেন," হ্যানা বলেন।
যাদের ভ্যাজাইনিসমাস আছে, তাদের যোনিপথের পেশিগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং এর ওপর ওই নারীদের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না।
এতে কিছু ভুক্তভোগীদের যৌনমিলনের জন্য অনেক কষ্ট পেতে হয়। এসময় তাদের জ্বালাপোড়া এবং কাটা দেয়ার মতো যন্ত্রণা হয়।
অনেকের পক্ষে ট্যাম্পন প্রবেশ করানোও বেশ কঠিন হয়ে যায়।
হ্যানার বয়স এখন ২১ বছর। তিনি তার প্রথম যৌনমিলনের অভিজ্ঞতার কথা মনে করতে গিয়ে বলেন: "আমাকে সবসময় শেখানো হয়েছিল যে কুমারীত্ব হারানো যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে। কিন্তু প্রথম যৌনমিলনের সময় আমার মনে হয়েছিল কেউ আমার ভেতরে ছুরি ঢুকিয়ে চারপাশে মোচড়াচ্ছে।"
কিছু নারী এটিকে শরীর কেটে যাওয়া বা ত্বকে সূঁচ ফোটানোর মতো অনুভূতি হিসাবে ব্যাখ্যা করেন।
যুক্তরাজ্যের কনসালট্যান্ট গাইনোকোলজিস্ট লেয়লা ফ্রডশাম বলেছেন যে এটি যৌনতার ব্যাপারে সর্বশেষ ট্যাবুগুলোর একটি।
"প্রথমবারের যৌনমিলন নিয়ে চিন্তিত হওয়াই স্বাভাবিক, এবং সম্ভবত আমরা সবাই এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। তবে ভ্যাজাইনিসমাসে আক্রান্ত নারীরা আজীবন এই জাতীয় অনুভূতি নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।"
আমিনার বয়স কুড়ি বছরের কিছু বেশি এবং তিনি ভ্যাজাইনিজমাসে আক্রান্ত। তিনি বলেছেন যে এই বিষয়টি তার জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে।
"ভ্যাজাইনিসমাস আমার বিবাহিত জীবনের আনন্দকে গ্রাস করেছে। আমি কখন সন্তান নিতে চাইব সেটা বেছে নেয়ার ক্ষমতাও আমার নেই।"
এই অবস্থা নারীর জীবনের যে কোন সময় ঘটতে পারে। যৌন রোগ থেকে শুরু করে সন্তান প্রসব বা যৌনতা নিয়ে কোন মানসিক আঘাত কিংবা মেনোপজ - এই সময়গুলোতে যে কোন অভিজ্ঞতার কারণে এই ব্যাধি নারীর জীবনে দেখা দিতে পারে।
কিছু ভুক্তভোগী তাদের এই রোগটি তখনই আবিস্কার করেন, যখন তারা প্রথমবার সেক্স করার চেষ্টা করতে গিয়ে ব্যর্থ হন।
তবে ডাঃ লেয়লা ফ্রডশাম বলছেন যে ধর্মীয় কঠোর অনুশাসনও এক্ষেত্রে দায়ী হতে পারে।
"কিছু লোক আছেন যারা ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। কিন্তু তাদের একেবারেই কোনও সমস্যা থাকে না। তবে এমনও অনেকে আছেন যারা অনেকটা স্পঞ্জের মতো - তারা সব ইঙ্গিত এবং মন্তব্যগুলো টেনে নেন," বিবিসিকে বলেন তিনি।
"এসব মন্তব্যের একটি হল, আপনার বিয়ের রাতে যৌনমিলন খুব যন্ত্রণাদায়ক হবে এবং কুমারীত্ব প্রমাণের জন্য আমরা দেখতে চাই যে মিলনের পর কিছু রক্ত বয়ে গেছে"
যদিও আমিনাকে কুমারীত্ব প্রমাণের জন্য এমন কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়নি, তবে এই নিয়ে চিন্তা সবসময় তার মাথায় ঘুরঘুর করতো।
"এটি সম্ভবত এমন একটি বিষয় ছিল যা আমাকে যৌন সম্পর্কের ব্যাপারে খুব ভয় দেখিয়েছে," তিনি জানান।
"আমার বিয়ের রাতে আমার মনে হয়েছিল যে আমার শরীর বন্ধ হয়ে গেছে। এ সম্পর্কে কথা বলা কঠিন, কারণ মানুষ তা বুঝতে পারবে না। তারা ভাববেন যে আমি বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করছি বা পুরো বিষয়টি আমার মনগড়া।"
হ্যানা ভ্যান ডি পিয়ারকে এক সময় বলা হয়েছিল যে সেক্স একজন নারীর জন্য কখনোই সুখকর হয় না -"আমি একটি গির্জার স্কুলে গিয়েছিলাম এবং আমাকে বলা হয়েছিল যে যৌনতার ফলে রক্তাক্ত যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, গর্ভধারণ হতে পারে অথবা এসটিডি হতে পারে।"
ইসলে লিনের মতো আরও কিছু নারীর ক্ষেত্রেও এই ব্যাধিটি তাদের সম্পর্কের উপর বড় ধরণের সংবেদনশীল প্রভাব ফেলেছে।
তিনি বলেন, "আমার মনে আছে, আমি সত্যিই ভয় পেয়েছিলাম যে আমার সঙ্গী হয়তো ভাববে যে তার প্রতি হয়তো আমার কোন ভালবাসা নেই বা শারীরিকভাবে আমি তার প্রতি আকৃষ্ট নই।"
লজ্জা এবং ট্যাবু প্রায়শই নারীদের এই বিষয়ে সাহায্য চাওয়া থেকে বিরত রাখে। অথচ ভ্যাজাইনিসমাস নামের এই ব্যাধিটি চাইলেই নিরাময় করা সম্ভব।
হ্যানা এবং আমিনা উভয়েই যৌন প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে চিকিৎসা নিতে উদ্যোগী হয়েছেন। একই সঙ্গে সুস্থ স্বাভাবিক যৌনমিলনের বিষয়ে তাদের সাইকো সেক্সুয়াল থেরাপিও দেয়া হবে।
আমিনা জানান, এটি একটি পর্যায় পর্যন্ত অনেক সহায়তা করেছে। "আমি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিবাহিত জীবন যাপন করছি এবং আমার মনে হয় আমি আরও ভাল হওয়ার পথে যাচ্ছি।
এই চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় নারীদের মানসিক দিকটির প্রতিও গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে।
এজন্য মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ বা সাইকো সেক্সুয়াল কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে যৌনমিলনের মানসিক ভয় দূর করার চেষ্টা করা হয়।
গ্লাসগো'র কুইন এলিজাবেথ বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ ভেনেসা ম্যাককে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে - "এটি একধরণের কথা বলার থেরাপি, যা আপনার শরীরের ব্যাপারে আপনার অনুভূতিগুলো আরও বেশি করে বুঝতে এবং কিছু নেতিবাচক চিন্তা পরিবর্তন করতে সহায়তা করে।"
হ্যানা জানাচ্ছেন যে তার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তবে যৌনমিলন এখনও তার কাছে কঠিন মনে হয়।
তবে তিনি বিষয়গুলিকে আরও উন্নত করতে, আরও পরিবর্তন করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
তিনি বলেন, "আমি এমন যৌনমিলন করতে চাই যা আমি উপভোগ করবো। আমি চাই আমার মাসিক চলার সময়ে আমি যেন ট্যাম্পন পরে হাটতে পারি।"
"আমি নিজের জন্য ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি এবং আমি ভবিষ্যতের জন্য সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে কাজ করে যাচ্ছি।"
অনেক নারীর কাছে যৌন সম্পর্ক ধারালো বস্তুর আঘাতের মতো

হৃদরোগী বাড়ছে বাদ যাচ্ছে না শিশু ও তরুণরা by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

গত পাঁচ মাসে আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হন মোহাম্মদ হোসেন। তার বয়স ৪২ বছর। হৃদরোগের চিকিৎসার পর তিনি এখন কিছুটা সুস্থ আছেন। তিনি ধূমপান করতেন না। কিন্তু তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি তার খাদ্যাভাস ও জীবন-যাপনে কিছু পরিবর্তন এনেছেন। অপর মধ্য বয়সী সারোয়ারকে হার্ট অ্যাটাকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাসপাতালে নেয়ার পথে তিনি মারা যান। তার স্বজনরা জানিয়েছেন, তার উচ্চরক্ত চাপ ছিল। ধূমপাানেরও অভ্যাস ছিল। মাত্র ৪০ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

শুধু মোহাম্মদ হোসেন বা সরোওয়ার নন,বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশ ঘটছে অসংক্রামক ব্যাধি থেকে। অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে আবার শীর্ষে রয়েছে হৃদরোগ। হৃদরোগকে খাদ্যবাহিতও রোগ বলা হয়। তারা বলেন, দুশ্চিন্ত ও অত্যাধিক মানসিক চাপ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই পরিবার ও সমাজে সবার সঙ্গে হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। বর্তমান বিশ্বে হৃদরোগকে একনম্বর ঘাতকব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবছর ১ কোটি ৭৩ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এই রোগে। আশঙ্কা করা হচ্ছে ২০৩০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ২ কোটি ৩০ লাখে। অথচ হৃদরোগের ভয়াবহতার ব্যাপারে সেইভাবে প্রচারণা নেই। ওয়ার্ল্ড হার্ট ফেডারেশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং ধূমপানমুক্ত পরিবেশ ছাড়া একজন ব্যক্তির পক্ষে হৃদরোগের ব্যাপারে ঝুঁকিমুক্ত থাকা কঠিন। তাই সকলে মিলেই সুস্থ হার্টবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। হৃৎপিণ্ড হচ্ছে মানুষের  শরীরের একমাত্র অঙ্গ, যেটা আমাদেরকে সত্যিকার অর্থে বাঁচিয়ে রাখে, কেননা মানুষের মস্তিষ্কের মৃত্যু হলেও আমরা তাকে জীবিত বলতে পারি যতক্ষণ পর্যন্ত হৃৎপিণ্ডের কার্য ক্ষমতা সচল থাকবে। বর্তমানে, মানুষে মৃত্যুর যত কারণ আছে, হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালি জনিত রোগের কারণে মৃত্যু হলো সবচেয়ে বেশি। এক সমীক্ষা অনুযায়ী দেখা যায়, ২০০০ সালের শুরু থেকে প্রতিবছর ১৭ মিলিয়ন লোক মারা যায় এই হৃৎপিণ্ড ও রক্তনালিজনিত রোগের কারণে। দেখা যায়, হৃৎপিণ্ডে রক্তনালির ও মস্তিষ্কের স্ট্রোক জনিত কারণে মৃত্যুর হার ক্যানসার, এইচআইভি-এইডস্‌ এবং ম্যালেরিয়া থেকেও বেশি। বর্তমানে ৩১ শতাংশ মৃত্যুর কারণ ধরা হয় এই হৃদরোগ ও রক্তনালি জনিত রোগের কারণে এবং অল্প বয়সে মৃত্যুর ৮০ শতাংশ  কারণও এ হৃদরোগকে দায়ী করা হয়।

হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণ হলো এনজাইনা, শ্বাসকষ্ট হওয়া, অনিয়ন্ত্রিত হৃদস্পন্দন হওয়া ইত্যাদি। এনজাইনা হচ্ছে, রোগীর সাধারণত বুকে ব্যথা, বুকে চাপ অনুভব করা, বুক ভার ভার হওয়া, দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হওয়া ইত্যাদি। কারো করোনারি আর্টারি বা হার্টের রক্তনালির ৭০ শতাংশ ব্লক হয়ে গেলে তখনই এনজাইনা হয়ে থাকে। কখনো কখনো এনজাইনা থেকে হা্‌র্ট অ্যাটাক হয়। আবার করোনারি ধমনি যখন ১০০ শতাংশ ব্লক হয়, তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়। অনিয়মিত হৃদস্পন্দনের ফলেও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। হার্ট অ্যাটাক একটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা, যেখানে জীবন ও মৃত্যু খুব কাছাকাছি চলে আসে। এটি সাধারণত বয়স্কদের রোগ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী মানুষের এটি হয়ে থাকে। আমাদের এদেশে ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের এটি হয়ে থাকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের থেকে আমাদের দেশের লোকের ১০ বছর আগেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে বলে বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেছেন। এখন ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী, এমনকি ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীরাও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছে। যার অন্যতম কারণ হলো- স্বাস্থ্য সম্মত খাবার না খাওয়া, ধূমপান ও তামাক জাতীয়  দ্রব্য সেবন, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা ও অ্যালকোহল পান করা। দেশের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এস এম  মোস্তফা জামান তার এক প্রবন্ধে বলেন, দেশে বয়স্কদের মধ্যে ১৭ শতাংশ লোক হৃদরোগে ভুগছেন। ছোটদের মধ্যে হাজারে ৮ থেকে ১০ জন এই রোগের দেখা মিলছে। বাংলাদেশে এখন বড়দের সঙ্গে ছোটদেরও হৃদরোগ হচ্ছে। যা চিকিৎসকদের ভাবিয়ে তুলছে। তিনি আরো জানান, আমাদের দেশে ৫০ থেকে ৬০ বছরের বয়সীদের হৃদরোগ বেশি হচ্ছে। তবে ২০ থেকে ২২ বছরের তরুণ রোগীও আমরা পাচ্ছি। বহু শিশু জন্মগত হার্টের সমস্যা নিয়ে জন্ম গ্রহণ করে। অথচ বিশ্বের অন্যান্য দেশে ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের হৃদরোগ বেশি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সবাই মনে করেন এটি ধনীদের রোগ। বিষয়টি সঠিক নয়। এটা গরীব মানুষেরও হয়ে থাকে।

খাদ্যাভাস বাজে হওয়ার কারণে গরীবদের মধ্যে এই রোগ দেখা যাচ্ছে।  চিকিৎসকদের গবেষণার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ভৌগোলিক কারণে আমাদের দেশেও র্হাট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেশি। নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য মেনে এ দেশের মানুষের উচ্চতা কম। এ কারণে আমাদের করোনারি ধমনীর ভেতরকার পরিসর বেশ ছোট। করোনারি ধমনীর পরিসর ছোট হতে হতে একবারে বন্ধ হয়ে গেলেই সমস্যাটা হয়।এ দেশে হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের সংখ্যাটা বেশি। ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের সংখ্যাটাও ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী। শিশুদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। এর কারণ, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং জাঙ্ক ফ্রুড খাওয়ার অভ্যাস। শিশুদের এ অভ্যাস পাল্টাতে না পারলে দেশে হৃদরোগীর সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে। ধূমপান করার কারণে ঝুঁকি বাড়ছে এবং যেসব পরিবারে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, সেই পরিবারে হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার উপায় হলো- ধূমপান ত্যাগ করা, হাঁটাহাঁটি করা, সাইকেলিং, সাঁতার কাটা, খাদ্যাভাসের পরিবর্তন করা, বেশি বেশি সাক-সবজি খাওয়া, চর্বিযুক্ত খাবার কম খাওয়া, আঁশযুক্ত খাবার বেশি খাওয়া। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শিশু এবং নারীরাই বেশি হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকে। সে কারণেই বারবার শিশু ও নারীর ওপর বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার কথা বলে থাকেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ। তাদের মতে, এই রোগ থেকে বাঁচতে হলে গোটা জীবন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। হার্ট সুস্থ রাখার জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উগ্যোগে ২০১৭ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্য বুলেটিনের পরিসংখ্যান মতে, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটন ও হাসপাতালে হৃদরোগীর সংখ্যা বছর বছর বাড়ছেই। ২০০৯ থেকে ২০১৬ এই আট বছরে হাসপাতালটির বহির্বিভাগ থেকে সেবা নেয়া ও ভর্তির ক্ষেত্রে রোগীর সংখ্যা  বাড়ার চিত্র তুলে ধরা হয়। ২০০৯ সালে বহির্বিভাগ থেকে সেবা নিয়েছিল এক লাখ ৬০ হাজার ৮ জন এবং ভর্তি হয়েছিল ৪১ হাজার ৫৫৪ জন, ২০১০ সালে বহির্বিভাগ থেকে সেবা নেয়ার সংখ্যা ছিল  এক লাখ ৬১ হাজার ৯৫৮ জন এবং ভর্তি হন ৪২ হাজার ৭৭৯ জন। ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল  এক লাখ ৬৩ হাজার ৮১৩ জন ও ৪৩ হাজার ২৭৫ জন। ২০১২ সালে বহির্বিভাগ  থেকে চিকিৎসা নিয়েছিল এক লাখ ৭৪ হাজার ৩৬৬ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন ৪৪ হাজার ৫৫৯ জন। ২০১৩ সালে বহির্বিভাগ থেকে সেবা নেয়ার সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭২ হাজার ২৬৯ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৪৩ হাজার ৩৪১ জন, ২০১৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়ায় দুই লাখ ৫৩৩ এবং ৪৯ হাজার ২৮৩ জনে। ২০১৫ সালে বহির্বিভাগ দিয়ে চিকিৎসা নিয়েছিল দুই লাখ ২২ হাজার ১৮৬ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন ৬৩ হাজার ৩৯০ জন হৃদরোগী। ২০১৬ সালে বহির্বিভাগ দিয়ে চিকিৎসা নিয়েছিল দুই লাখ ২৬ হাজার ১৩৮ জন এবং হাসপাতালে ভর্তি হন ৬৪ হাজার ৯০৬ জন হৃদরোগী। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি নানা উদ্যোগে ২৯শে সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস পালন করা হচ্ছে। এবছর দিবসটির প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে-‘আমার হার্ট, তোমার হার্ট সুস্থ  রাখতে অঙ্গীকার করি এক সাথে’।

জাতিসংঘকে অবজ্ঞা করে সেনাবাহিনীর সুরক্ষায় আফিম চাষ বাড়ছে মিয়ানমারে by লাউয়ি ওয়েং

সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাসহ মিয়ানমারের কচিন রাজ্যে আফিম উৎপাদন বেড়েছে। কচিন ইন্ডিপেডেন্স অর্গ্যানাইজেশনের (কেআইও) এক সমীক্ষায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে আফিমের সার্বিক উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে বলে ২০১৮ সালের জাতিসংঘ সমীক্ষার দাবি নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে।
কেআইও ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের মার্চ পর্যন্ত কচিন ও উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্যের ১০,১১০ হেক্টরের বেশি এলাকায় সমীক্ষা চালায়।
গত ২৬ জুন ইস্যু করা প্রতিবেদনে কেআইও উল্লেখ করে যে জাতিসংঘ মাদকবিষয়ক অফিসের প্রতিবেদন তৈরীর সময় যত এলাকায় সমীক্ষা চালানো হয়েছিল, তারা চালিয়েছে তার চেয়ে বেশি এলাকায়।
সংস্থাটি ১৯টি গবেষণা দল পাঠিয়ে ৯,৯৫৩ জনের সাক্ষাতকার নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরী করেছে বলে জানিয়েছে।
কচিনে কমিশন ৬,৯৮.২৩ হেক্টর এলাকায় আফিম চাষ দেখতে পেয়েছে। ২০১৮ সালে ইউএনওডিসি যত পরিমাণ এলাকার কথা উল্লেখ করেছিল, তার চেয়ে এটি প্রায় দ্বিগুণ। এতে বলা হয়, উত্তর শান রাজ্যের ৫টি টাউনশিপে ৩,১৯২.৪ হেক্টর এলাকায় আফিম চাষ হচ্ছে।
কেআইওর মুখপাত্র কর্নেল নাও বো বলেন, আমাদের সমীক্ষার লক্ষ্য ছিল কচিন ও উত্তরাঞ্চলীয় শান রাজ্য অবৈধ মাদক সমস্যার ব্যাপ্তি খুঁজে বের করা। আমরা অবৈধ মাদক সমস্যার সর্বোত্তম সমাধান চাচ্ছি।
ইউএনওসিডিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, কচিন রাজ্যে ২০১৮ সালে মোট ৩,৪০০ হেক্টর জমিতে আফিম উৎপাদিত হয়।
এতে কচিন রাজ্যের দানাই টাউনশিপকে বড় ধরনের আফিম কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এখানে প্রায়ই কেআইওর সশস্ত্র শাখা কচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মির (কেআইএ) সাথে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর লড়াই হয়ে থাকে। তবে কেআইওর সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দানাই ছাড়াও শিনবুইয়াং, সাদং ও কানপাতাই টাউনশিপগুলোতেও বিপুল পরিমাণে আফিম উৎপাদিত হয়ে থাকে। কেআইও জানায়, ইউএনওডিসির সমীক্ষায় পুতাও ও সুমপ্রাবানের মতো আফিম-বর্ধিষ্ণু এলাকার নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি।
কেআইও দাবি করে, মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা কানপাতাই ও সাদং টাউনশিপের সবচেয়ে বেশি এলাকায় আফিম চাষ হয়ে থাকে। এতে ওই দুই এলাকায় ৪,৬৫১,৬৭ হেক্টর জমিতে আফিম চাষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কেআইও সমীক্ষায় শান রাজ্যের নামখাম, কুতকাই, কুনরঙ, তানজিয়ান ও লাশিও এলাকায় আফিম উৎপাদনের কথা বলা হয়েছে। এসব শহর এখন সাতটি স্থানীয় সশস্ত্র গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর হাত থেকে তারা এসব এলাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।
কেআইও দাবি করেছে, উত্তর শান রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অধীনে মিলিশিয়া নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতেই রয়েছে হেরোইন ও মেথামফেটামিনের বেশির ভাগ শোধনাগার। বেশির ভাগ অবৈধ মাদক মুসা বা নামখাম থেকে কচিন রাজ্যে প্রবেশ করে।
কেআইও জানিয়েছে, মিলিশিয়া গ্রুপগুলো অবৈধ মাদক উৎপাদনকে সুরক্ষা দেয়। গ্রুপটি অভিযোগ করেছে, সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী কেবল ব্যবহারকারী ও খুচরা বিক্রেতাদের গ্রেফতার করে। তারা চীনা ড্রাগ সম্রাটদের অবাধে কার্যক্রম চালাতে দেয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
কেআইও মাদক ব্যবসা কার্যক্রমে সুরক্ষা প্রদান বন্ধ করার জন্য মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রতি আহবান জানিয়েছে।
কেআইও আফিম চাষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইউএনওডিসির প্রতিও আহ্বান জানিয়েছে।

কোয়েটাগামী রেলপথ by সালমান রাশিদ

আধুনিক ট্রেন বোলন পাসের ঢালু দিয়ে কষ্টসাধ্য পথে কোয়েটা পৌঁছে। তবে খুব কম মুসাফিরই জানেন, নগরীতে এই পথে প্রথম ট্রেনটি আসেনি। ১৮৮৭ সালের মার্চে কোয়েটায় পৌঁছেছিল যে ট্রেনটি সেটিকে উত্তর দিকে সিবিতে মোড় ঘুরতে হয়েছিল, নারি নদী অতিক্রম করে হারনাই পাহাড়ের শীতল এলাকা পাড়ি দিয়ে তারপর দক্ষিণ দিক দিকে বোস্তন গিয়েছিল। তারপর তার কোয়েটা যাওয়ার যাত্রার অবসান ঘটেছিল।
চ্যাপার হিলটি আসলে সুইস রোলের মতো। অর্ধ গোলাকার কাঠামো রয়েছে এর পশ্চিম প্রান্তে। পূর্ব দিকে আছে পাথরের ব্যাপক স্তুপ। পশ্চিম দিকের কাছে একটি ফাটল রয়েছে। অনেক অনেক আগে ভূমিকম্পে এমনটা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। এর তলদেশ নদীর মতো। কখনো তীব্রবেগে স্রোতধারা বয়ে চলে, কখনো আবার তা স্রেফ গর্ত হিসেবেই থেকে যায়।
দক্ষিণ প্রান্তে থাকা একটি মনিটরিং স্টেশনের ধ্বংসাবশেষ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একসময় এখানকার পানি পরিমাপের জন্য সরকারি ব্যবস্থা ছিলো।
ব্রিটিশরা রেললাইন স্থাপনের অনেক অনেক আগে থেকেই এই পথে কাফেলা চলত। তারা কখনো বর্ষায়, কখনো শুষ্ক মওসুমে এলাকাটি পাড়ি দিত।
আর কোয়েটাকে দ্রুত নির্মিত হতে থাকা রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করার সময় সার্ভেয়ররা নানা হিসাব কষে এই এলাকার মধ্য দিয়েই রেললাইন স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। রেললাইন নির্মাণের কাজটি কঠিন ছিল, তবে অন্যান্য সম্ভাব্য পথের চেয়ে এটিই তাদের কাছে তুলনামূলকভাবে পছন্দের ছিল।
তা করতে গিয়ে প্রকৌশলীদের বেশ দক্ষতার পরিচয় দিতে হয়েছে। এমন জটিল পরিবেশের মধ্য দিয়ে রেললাইন স্থাপন করার কাজটি সহজ ছিল না। এই জটিল কাজটিই তারা করেছেন দুর্দান্ত ভঙ্গিতে। ফলে এই রেললাইনটি একটি দর্শনীয় স্থানেও পরিণত হয়েছে।
নির্মাণের পর থেকে ৫৫ বছর ধরে এই পথেই ট্রেন চলাচল করেছে। ওই আমলের কথা ভাবলে এখনো শিহরণ জাগে।
এই পথে রেললাইন নির্মাণকাজে শুরু থেকেই জটিলতা ছিল। কেবল চড়াই আর উতরাই নয়, বৃষ্টির পানিতে ভূমিধসের সৃষ্টি হতো। ফলে যেখানে লাইন স্থাপনের কাজ চলছিল, সেটি ধসে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু প্রকৌশলীরা হাল না ছেড়ে অসাধ্য সাধনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
আবার নির্মাণের সময়কার জটিলতাই শেষ নয়। নির্মাণের পরও অনেকবার লাইনের কিছু অংশ ধসে গেছে। ১৯৪২ সালের ১১ জুলাইয়ের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। প্রবল বৃষ্টিতে লাইন ভেসে গিয়েছিল। বেরিজের কথায়, রেলগুলো ৯০ ফুট উঁচুতে ফেস্টুনের মতো ঝুলে রয়েছে।
রেলওয়ে প্রকৌশলীরা বোলন পাস দিয়ে কোয়েটা পর্যন্ত সরাসরি লাইন নির্মাণ করতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। ১৯৪২ সালের গ্রীষ্মে তাদের কাজ সমাধা হয়। এর মাধ্যমে কোয়েটা যুক্ত হয় ব্রিটিশ ভারতের অবশিষ্ট রেল নেটওয়ার্কের সাথে।
আর তখনই আগের লাইনটির গুরুত্ব কমে যায়। ব্রিটিশ সরকার ১৯৪৩ সালের মে মাসে খোস্তের কাছে জারদালু ও খানাইয়ের মধ্যকার লাইনটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রচুর স্টিলের প্রয়োজন পড়ে। তারা যতটা সম্ভব স্টিল সংগ্রহ করতে থাকে। ফলে এখানকার রেললাইনের সব সামগ্রী তুলে নেয়ার কাজ শুরু হয়ে যায়।
অনেক কিছুই এখন আর নেই। কিন্তু তারপরও যা রয়ে গেছে, সেটিও আকর্ষণীয়। বিশেষ করে চ্যাপার রিফট এখনো পর্যটক আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে। আবার মাড গর্জ স্টেশন হতে পারে একটি সরাইখানা। জারদাল ও খোস্ত স্টেশন হতে পারে টি-হাউস। এমনকি জাদুঘরেও রূপান্তরিত করা যেতে পারে।

শিশু ধর্ষণ: ছেলেরা কেন বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে? by তাসলিমা ইয়াসমীন

কন্যা শিশু ধর্ষণের পাশাপাশি গত কয়েক বছর জাতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনাও নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। শিশুর প্রতি সহিংসতা রোধে 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন' নামে একটি আলাদা কঠোর আইন থাকলেও বর্তমানে ছেলে শিশুর ধর্ষণের বিচার অনেক ক্ষেত্রেই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে না হয়ে প্রচলিত ফৌজদারি আইনের অধীনেই হচ্ছে।
আইনের ব্যাখ্যা সম্বন্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা আর বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অস্পষ্ট ধারনা এর একটি বড় কারণ।
আর তাতে করে প্রাপ্য বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে যৌন সহিংসতার শিকার ছেলে শিশুরা।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

বেসরকারি তথ্য সূত্র মতে, এই বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রায় ২৩৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৬টি ছেলে শিশু (সূত্র: মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন)।
তবে ধর্ষণের শিকার শিশুদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে ধারনা করা যায়, ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা প্রাপ্ত তথ্য থেকে বাস্তবে আরও অনেক বেশি হওয়ার কথা।
তবে সেই পরিসংখ্যানটি কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্যে পুরোপুরি উঠে আসাটা হয়তো কঠিন। কেননা শিশুরা, বিশেষ করে ছেলে শিশুরা খুব কম ক্ষেত্রেই তার বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া যৌন অপরাধের কথা প্রকাশ করতে পারে।
যৌনতা সম্বন্ধে ধারনা না থাকায়, অথবা অনেক ক্ষেত্রেই অপরাধীর মাধ্যমে বিভিন্ন ভয়-ভীতি বা হুমকির শিকার হয়ে ছেলে শিশুরা যৌন হয়রানি বা নির্যাতনের অভিযোগ গোপন করে।
তাছাড়া, পরিবার বা এলাকার প্রাপ্তবয়স্কদের কাছেও একজন ছেলে শিশুর বিরুদ্ধে হওয়া যৌন অপরাধও যে আইনত ধর্ষণ হবে, বা এর বিরুদ্ধে যে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যাবে, এই ব্যাপারটিই স্পষ্ট নয়।

'ধর্ষণ নয়' বলাৎকার কেন?

অভিধানগুলোতে সাধারণত 'ধর্ষণ'-এর সমার্থক শব্দ হিসেবে 'বলাৎকার'-কে ব্যবহার করা হলেও, প্রচলিত ধারণাটি হল একজন পুরুষ যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন তাকে বলাৎকার বলা হবে - ধর্ষণ নয়।
লক্ষণীয় যে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জাতীয় পত্রিকাগুলোতে ছেলে শিশু ধর্ষণের খবর প্রচার করার সময় 'বলাৎকার' শব্দটিই ব্যবহার করা হয়।
এমনকি পুলিশসহ বিচার ব্যবস্থায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাছেও ছেলে শিশুর ক্ষেত্রে আইনত ধর্ষণ হবে কিনা, এই বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই পরিষ্কার নয়।
এই ধারণার পিছনে প্রচলিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করে, যা ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি হিসেবে শুধু নারীকেই কল্পনা করে। ঠিক একই কারণে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে বুঝাতে অভিধানগুলোতে 'ধর্ষিতা'র মত স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
শুধু তাই নয়, খোদ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেই 'ধর্ষিতা' শব্দটি স্থান পেয়েছে।

প্রচলিত আইনে অস্পষ্টতা

ধর্ষণকে সাধারণভাবে শুধুমাত্র নারীর বিরুদ্ধে হওয়া যৌন অপরাধ মনে করার পিছনে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি বর্তমান আইনের অস্পষ্টতাও অনেকাংশে দায়ী।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ধর্ষণকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে তাতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, ধর্ষণের শিকার হতে পারে শুধু একজন 'নারী', একজন পুরুষের মাধ্যমে (দণ্ডবিধি ধারা-৩৭৫)। শুধু তাই নয়, দণ্ডবিধির সংজ্ঞাটি বলছে, ধর্ষণের ক্ষেত্রে যৌন সঙ্গম বিবেচনা করার জন্য 'পেনেট্রেশন'-ই (প্রবিষ্ট করা) যথেষ্ট।
অথচ সংজ্ঞাটিতে কোথাও 'পেনেট্রেশন'-এর ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি।
স্বভাবতই তাই বিচার প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট অনেকেই ধর্ষণকে নারী-পুরুষের মধ্যে স্বাভাবিক যৌন সঙ্গমের প্রচলিত ধারনাকেই বুঝে থাকেন। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত দণ্ডবিধির ধর্ষণের এই সংজ্ঞাটি তাই ছেলে শিশুর ধর্ষণকে ধর্ষণ না বলার পিছনে একটি অন্যতম কারণ।
তবে দণ্ডবিধি থাকা সত্ত্বেও নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনা কঠোরভাবে দমন করতে ২০০০ সালে প্রণয়ন করা হয়েছিল 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন'। এই আইনটিতে 'শিশু'র যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, তাতে কোন লিঙ্গ বিশেষে নয় বরং ১৬ বছরের কম বয়সী যে কোন শিশুই এই আইনে বিচার পাওয়ার কথা।
যেহেতু বর্তমানে প্রায় সব ধর্ষণের মামলাই নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার হচ্ছে, তাই স্বাভাবিকভাবে একজন সহিংসতার শিকার ছেলে শিশুর বিচারও আইনত এই আইনটির অধীনেই হওয়া উচিৎ।
'ধর্ষণ'-এর সংজ্ঞার ক্ষেত্রে 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন' বলছে, দণ্ডবিধির ৩৭৫ -এ দেয়া ধর্ষণের সংজ্ঞাটিই বলবৎ থাকবে, তবে তা হবে এই আইনের ধারা ৯-এর বিধান সাপেক্ষে।
ধারা ৯-এ ধর্ষণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত না করলেও ধারার শুরুতেই বলা হয়েছে, "যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন ......." অর্থাৎ, দণ্ডবিধির সংজ্ঞায় শুধু নারী ধর্ষণের শিকার হতে পারে বলা থাকলেও ধারা ৯-এর অধীনে 'শিশু'কেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আবার যেহেতু আইনে শিশু বলতে যে কোন লিঙ্গের শিশুকেই বোঝানো হচ্ছে, তাই সঠিক আইনি ব্যাখ্যা অনুযায়ী ছেলে শিশু ধর্ষণকেও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনেই বিচার করতে হবে।
তবে, গুরুত্বপূর্ণ হল 'পেনেট্রেশন' বলতে আসলে কী কী ধরনের যৌন সঙ্গমকে বুঝাবে, তা কোন আইনেই নির্দিষ্ট করা নেই। তাই পুলিশের কাছে যখন ধর্ষণের শিকার ছেলে শিশুর পক্ষ হয়ে বিচার চাওয়া হয়, তখন তার মামলাটি অনেক সময়ই 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে'র ধারা ৯-এ নেয়া হয় না।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মামলার এফআইআর রুজু হয় বরং দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৭-এ। ব্রিটিশ আমল থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই ৩৭৭ ধারা, আসলে সমকামিতাসহ 'প্রাকৃতিক' নিয়মের বিরুদ্ধে করা কোন যৌন সঙ্গমকে দণ্ডনীয় করছে।
সমলিঙ্গের মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার ছেলে শিশুকেও তাই ৩৭৭-এর অধীনেই বিচার চাইতে হয়।
এই ধারায় (৩৭৭-এ) অপরাধী বা অপরাধের শিকার ব্যক্তির বয়স, সম্মতি বা অসম্মতির প্রশ্নও অপ্রাসঙ্গিক। আবার, 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে'র ৯ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেও, ৩৭৭-এ সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং তাতে কোন সর্বনিম্ন শাস্তির বিধান নির্দিষ্ট করা নেই।
অর্থাৎ, আইন প্রয়োগকারীদের আইন সম্বন্ধে অস্পষ্ট ধারণা থাকার কারণে ধর্ষণের শিকার বেশিরভাগ ছেলে শিশুই 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে'র কঠোরতম শাস্তির বিধান আর দ্রুত বিচার ব্যবস্থার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত

ধারা ৯-এর পাশাপাশি বাংলাদেশের উচ্চ আদালত থেকেও এই ব্যাখ্যাটিকে সমর্থন করে ২০১৩ সালের একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে।
আবদুস সামাদ বনাম রাষ্ট্র (৯ বিএলসি, ২০১৪, পাতা-১৭১) - এই মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেন যে, ১৬ বছরের নিচে যে কোন ছেলে শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে'র ধারা ৯-এর অধীনেই বিচার্য হবে, দণ্ডবিধিতে নয় - এমনকি যদি যৌন সঙ্গমে শিশুর সম্মতিও থেকে থাকে। কেননা ধারা ৯ বলছে, ১৬ বছরের নীচে যে কোন শিশুর সাথে যৌন সঙ্গমকেই ধর্ষণ বলা হবে এবং শিশুর সম্মতি ছিল কিনা, তা বিচার্য হবে না।
সম্পূর্ণ রায়ে আদালত ছেলে শিশুর ধর্ষণের ব্যাপারে বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অস্পষ্ট ধারনা থাকার বিষয়টিও ইঙ্গিত করেন।

কী করনীয়?

প্রথমত, আইনি ব্যাখ্যায় ছেলে শিশুর ধর্ষণকে ধারা ৯-এ অন্তর্ভুক্ত করা গেলেও প্রচলিত আইনে যে অস্পষ্টতা রয়েছে তা দূর করা প্রয়োজন। দণ্ডবিধির ধারা ৩৭৫-এ ধর্ষণের সংজ্ঞায় ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে বুঝাতে নারীর পাশাপাশি 'শিশু' শব্দটি যুক্ত করতে হবে।
একই সাথে দণ্ডবিধির ৩৭৫-এর সংজ্ঞায় 'পেনেট্রেশন' বা 'প্রবিষ্ট করা' এই শব্দটির একটি যথাযথ ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে সমলিঙ্গের মাধ্যমে যৌন সঙ্গমকেও 'পেনেট্রেশন' বলা যায়।
পাশাপাশি 'নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে' 'শিশু'র সংজ্ঞায় ছেলে, মেয়ে বা অন্য কোন লিঙ্গ পরিচয়ের অনধিক ১৬ বছর বয়সী শিশুর কথা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা যেতে পারে, যেকোন ধরনের অস্পষ্টতা দূর করার জন্য।
যেহেতু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে বিচার ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট ধারনা রাখেন না, তাই থানা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে আইনজীবী, বিচারক এবং পাবলিক প্রসিকিউটারদেরকেও এই বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া প্রয়োজন।
একই সাথে জাতীয় পর্যায়েও সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নেয়া জরুরী, যাতে করে ছেলে শিশুও যে ধর্ষণের বিচারের বাইরে নয়, সেটি সাধারণের কাছে স্পষ্ট হয়।
সর্বোপরি ধর্ষণকে ধর্ষণই বলতে হবে, 'বলাৎকার' নামকরণ করে এই অপরাধের মাত্রা কমানোর কোন সুযোগ নেই।
(তাসলিমা ইয়াসমীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক এবং একজন গবেষক)
শিশু ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ: কিন্তু আইনের জটিলতার কারণে ছেলে শিশুরা বিচার পাচ্ছে না।

নতুন চুল গজাবে ভিটামিন ই অয়েলে

ভিটামিন ই ক্যাপসুল কিনতে পাওয়া যায় ফার্মেসিগুলোতে। প্রসাধনীর দোকানে ভিটামিন ই অয়েলও পাওয়া যায়। এই তেল চুলের যত্নে অনন্য। সরাসরি যেমন ব্যবহার করতে পারেন চুলে, তেমনি বিভিন্ন হেয়ার প্যাকে মিশিয়েও ব্যবহার করা যায় ভিটামিন ই অয়েল।

কেন ব্যবহার করবেন?
*চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়। ফলে দ্রুত বাড়ে চুল।
*নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। মাথার যে অংশে চুল কমে যাচ্ছে, সে অংশে ম্যাসাজ করুন এই তেল।
*চুলের আগায় ম্যাসাজ করুন নিয়মিত। আগা ফাটবে না।
*চুলের গোড়া মজবুত করে চুল পড়া বন্ধ করে।
*চুল উজ্জ্বল ও ঝলমলে করে।
যেভাবে ব্যবহার করবেন 
*নারকেল তেলের সঙ্গে কয়েকটি ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি রাতে ঘুমানোর আগে চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগান। চুলের গোড়ায় ৫ মিনিট ম্যাসাজ করুন। পরিদিন সকালে ভেষজ শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন চুল।
*একটি কলা চটকে নিন। ৩টি ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল ও ১ টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে চুলের লাগান। ১ ঘণ্টা পর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
*অ্যালোভেরা জেল ব্লেন্ড করে ভিটামিন ই ক্যাপসুল মিশিয়ে চুলের গোড়ায় ম্যাসাজ করুন। কিছুক্ষণ পর ধুয়ে শ্যাম্পু করে নিন।
*সরাসরি ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মযাসাজ করতে পারেন চুলের গোড়ায়। সারারাত রেখে পরদিন সকালে শ্যাম্পু করে ফেলুন।
*২ টেবিল চামচ টক দইয়ের সঙ্গে কয়েকটি ভিটামিন ই ক্যাপসুলের তেল মেশান। মিশ্রণটি চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগিয়ে রাখুন ৪০ মিনিট। মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করে পরিষ্কার করে ফেলুন চুল। 
>>>তথ্য: ফেমিনা

মা কোনো কাজ করেন না by সুহাদা আফরিন

ইংলিশ মাধ্যম স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আইমান খৈয়াম জানাল, তার বাবা ব্যাংকার। আর মা? প্রশ্নের উত্তরে বলল, ‘মা কোনো কাজ করেন না, মা বাসায় থাকেন।’ বাসায় কিছু করেন কি না, পাল্টা প্রশ্নের উত্তরে সে বলে, রান্নাবান্নাসহ বাসার সবকিছু মা-ই করেন। রাজধানীর চিত্র এটি। মায়ের মজুরিবিহীন কাজগুলোর স্বীকৃতিতে এখনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে।
আর যে নারী বাইরে চাকরি করেন, আবার ঘরও সামলান, সে ক্ষেত্রেও পরিবার ঘরের কাজের স্বীকৃতিটুকু দিতে কুণ্ঠাবোধ করছে। ফলে বেশির ভাগ শিশু ছোটবেলা থেকেই ‘মা কোনো কাজ করেন না’—এ ধরনের মনোভাব নিয়ে বড় হচ্ছে। এই শিশু বড় হয়ে নিজের সংসারেও মনে করেন, স্ত্রী তো কোনো কাজ করেন না।
গত বছর বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ম্যান অ্যান্ড ম্যাসকুলিনিটিস স্টাডিজ (সিএমএমএস) পরিচালিত ‘ব্রেভম্যান ক্যাম্পেইন’–এর প্রতিবেদন বলছে, মায়ের কাজ সম্পর্কে ১২ শতাংশ ছেলে জানিয়েছিল, তাদের মা কাজ করেন। তবে ক্যাম্পেইন শেষে এই শিশুদেরই সচেতন করার পর ৯৬ শতাংশ একবাক্যে বলতে পারে, তাদের মা কাজ করেন।
সিএমএমএস ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ‘ব্রেভম্যান’ ক্যাম্পেইনের একটি কার্যক্রমে ছেলে শিক্ষার্থীদের ডায়েরি দেওয়া হচ্ছে। ডায়েরির একটি অংশে লেখা, আমার মা। ছেলে শিশুরা সেখানে মা, মায়ের কাজসহ বিভিন্ন বিষয়ে লিখে। একসময় তারা বুঝতে পারে, সংসারে মায়ের ভূমিকা কতটুকু। ডায়েরিতে মায়ের বক্তব্যও থাকে।
২০১৩ সালে ডায়েরিতে জামালপুরের এক শিক্ষার্থী লিখেছে, ঘরের কাজ করার পর মা বিশ্রাম নেওয়ার সময় খুব কম পান। তাই এ কাজে সন্তানদের সাহায্য করা প্রয়োজন। আর মা লিখেছেন, ছেলে মায়ের কষ্ট বুঝতে পারায় তিনি খুব খুশি হয়েছেন।
চলতি বছর দেশের ৫০টি স্কুলে ‘ব্রেভম্যান’ ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে। ক্যাম্পেইনে অংশ নেওয়া গাইবান্ধা জেলার পিয়ারাপুর আই জি এম স্কুল অ্যান্ড কলেজের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়নাল আবেদিন বলল, ‘ মা রাতদিন সব সময়ই কাজ করেন।’ এখন জয়নাল তার মায়ের কাজে সহায়তা করে । প্রতিষ্ঠানটির বাংলা বিভাগের শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানালেন, ব্রেভম্যান ক্যাম্পেইনটি মাত্র তিন মাস ধরে শুরু হয়েছে। তবে এ সময়েই যে অগ্রগতি, ভবিষ্যতে তা অনেক কাজে দেবে।
সিএমএমএসের চেয়ারপারসন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ শাইখ ইমতিয়াজ বললেন, পরিবারের সদস্যদের নারীর কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে। এ ক্যাম্পেইনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে, মা কাজ করেন, সন্তানদের এটা বোঝানো। আর এ উপলব্ধি যখন হবে, তখনই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে। এ বিষয়টিকে অভ্যাসে পরিণত করলে নারীদের প্রতি সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বললেন, নারীর কাজের স্বীকৃতি দিতে রাষ্ট্রের নীতি, শিক্ষাসহ সমাজের সিস্টেমে পরিবর্তন আনতে হবে। শিশুরা যখন দেখবে, বাবা বা পরিবারের অন্যরা তার মায়ের কাজকে সম্মান করছে, তখন সে–ও সম্মান করবে। একটি শিশুর মানসিকতা গঠনে পারিবারিক শিক্ষাটা জরুরি। শিক্ষা পাঠক্রমেও নারীর কাজের স্বীকৃতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বললেন, নারীর মজুরিবিহীন শ্রমের স্বীকৃতির পথে বড় বাধা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। তবে শিশুদের সচেতনতামূলক কার্যক্রমে নারী মানেই ঘরের কাজ করবে, এ ধারণা যাতে বাচ্চাদের মাথায় ঢুকে না যায়, তা মনে রাখতে হবে।

বাঙালোরে দেবী শেঠির হাসপাতালে by সারোয়ার হোসেন টুটুল

কার্ডিও সার্জন দেবী শেঠির প্রতিষ্ঠিত বাঙালোরে নারায়না হেলথ সেন্টার আমার জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায়। গত ২২শে জানুয়ারি দেবী শেঠি প্রতিষ্ঠিত নারায়না হেলথ সেন্টারে চেকআপের জন্য গিয়েছিলাম। এর আগে ২০১৫ সালের নভেম্বরে এখানেই আমার বাইপাস সার্জারি বা সিএবিজি (করোনারি আর্টারি বাইপাস গ্রাফটিং) অপারেশন হয়েছিল। নারায়নায় নানা অভিজ্ঞতা আমাকে আন্দোলিত করেছে। বিষ্ময়ের বিষয় হচ্ছে সেখানকার ৫০ ভাগ রোগীই  বাংলাদেশের। তাই যারা রোগ সমস্যায় যেতে চান নারায়নায় তাদের সুবিধার্থে কিছু বিষয় এবারের লেখাতে উল্লেখ করতে চাই।
দুবার ছাড়াও ২০১৬ সালের অক্টোবরে এখানেই যেতে হয়েছিল আমার স্ত্রীর ম্যানিনজিওমা ব্রেইন টিউমার সার্জারি করাতে। এ নিয়ে মোট তিনবার যাওয়া হলো বাঙালোরে? আমি দেখেছি কিছু তথ্য জানা থাকলে খুবই কম খরচে চিকিৎসা করানো যায় এবং নানাবিধ ঝামেলা এড়ানো যায়? প্রথমেই এই হাসপাতাল সম্বন্ধে কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি পাঠকদের? নারায়না হেলথ সিটি একটি নন প্রফিটেবল অর্গানাইজেশন বা সংস্থা? নারায়না হেলথ সিটি ২০০০ সালে ডা. দেবী প্রাসাদ শেঠি ফাউন্ডার চেয়ারম্যান হিসেবে বাঙালোরের বামমাসন্ড্র ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকায় চেইন হাসপাতালের হেড অফিস দিয়ে যাত্রা শুরু করেন? এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পেছনে যে লক্ষ্য ছিল সেটা হলো কম খরচে উন্নত বিশ্বের মতো চিকিৎসাসেবা দেয়া? চিকিৎসা সেবা যেন তাদের কাছে কোন ধর্মীয় কাজ।
ইনিস্টিটিউট অব কার্ডিয়াক সায়েন্স-এর গেট (ইনসেটে দেবী শেঠির ছবি)
এই মানসিকতা নিয়ে তারা কাজ করেন।
কর্নাটক রাজ্যের মানুষগুলোকেও মনে হয় অন্যান্য প্রদেশ থেকে বেশ ধার্মিক। তারা সব ধরনের কাজকেই ধর্মীয় সেবা বলেই বিবেচনা করেন? যারা ক্লিনার তাদেরকে দেখেছি বেলচা, ঝাড়–সহ সবকিছুর পূজা করতে। তাদের দেখে মনে হয় যেন তারা পরিচ্ছন্নতা নয় কোন ধর্মীয় কাজ করছেন। ইলেকট্রিক মিস্ত্রিকে দেখেছি স্ক্রু ডাইভার, টেস্টার, হাতুড়ি এগুলোকে পরম শ্রদ্ধাভরে পূজা করছে।
দেবী শেঠি নারায়না হেলথ সেন্টার বাঙালোরে প্রথমে ২২৫টি অপারেশনাল বেড দিয়ে শুরু করেছিল যা বর্তমানে ৬০০০ অপারেশনাল বেডে উন্নীত হয়েছে। ভারত জুড়ে ২৪টি অত্যাধুনিক হাসপাতাল, ৭টি অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত বিশেষায়িত হৃদরোগ কেন্দ্র, ১৯টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রয়েছে? বাঙালোরের নারায়না হেলথ সেন্টার হাসপাতালে ১৪ হাজারেরও বেশি ডাক্তার, নার্স, ম্যানেজমেন্ট কর্মকর্তা রয়েছেন। এটি এখন সমগ্র ভারতজুড়ে আধুনিক মেশিনে সজ্জিত হাসপাতাল এবং অত্যাধুনিক হৃদরোগ কেন্দ্র পরিচালনা করের্  দ্বিতীয় বৃহত্তম হাসপাতাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। ২০১৩ সালের ৬ই জানুয়ারি বিএসই ও এনএসইতে নারায়না প্রথমবার তালিকাভুক্ত কোম্পানি হয়েছিল। প্রথমবারের মতো কোম্পানির মূল্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি ছিল। ডা. দেবী শেঠি ২০০০ সালে এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পর তিনি কর্নাটক সরকারের সঙ্গে মাইক্রো হেলথ ইন্স্যুরেন্স স্কিমের আওতায় হেলথ ইন্স্যুরেন্স শুরু করেন। যেসব গরিব কৃৃষিজীবী পরিবার আছে তাদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দেয়ার জন্য মাসিক ১০ টাকা জমা করে মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স স্কিম শুরু করেন। এই স্কিমের আওতায় সব ধরনের জটিল অপারেশনসহ ওষুধ এই স্কিমের আওতায় ফ্রি দেয়া হয়। দেবী শেঠির এই ইন্স্যুরেন্স পলিসি সর্বত্রই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

আর এ সবই সম্ভব হয়েছে দেবী শেঠির পরম মমতা ও যতœ দিয়ে মানুষের সেবা করার ফলে। সত্যিকারের সেবা ওখানেই দেখেছি। তাই দেবী শেঠি ইন্ডিয়াতে গরিব মানুষদের কাছে দ্বিতীয় ভগবান হিসেবেই পরিচিত? কর্নাটক রাজ্যের খুবই গরিব মানুষ যাদের পায়ে স্যান্ডল নেই শরীরে ঠিকমতো কাপড় নেই ধুলোবালি সারা শরীরে তাদেরও পরম মমতায় গায়ে হাত দিয়ে সব কথা জিজ্ঞেস করেন তিনি। আমি যখন দেবী শেঠির রুমে বসা ঠিক তার আগেই একজন কৃষককে দেখছিলাম। সেই কৃষকেরও শরীরে কাপড় নেই, পায়ে স্যান্ডেল নেই তাকেও গায়ে হাত দিয়ে হাসিমাখা মুখে বাবা বলে সম্বোধন করছিলেন আর বলছিলেন অনিয়ম করা চলবে না আর অপারেশন ও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে কোনো টেনশন না করতে। চিকিৎসাসহ আনুষঙ্গিক খরচের সবই দেবী শেঠি দেখবেন। টাকা-পয়সা নিয়ে ভাবতে হবে না। তারপর আমার পালা। আমার রিপোর্টগুলো দেখেই বললেন, এক মাসের মধ্যে বাইপাস করতে হবে নইলে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বেন। হার্ট অ্যাটাক করবে যা থেকে রিকভারি করানো যাবে না। আমি ও আমার স্ত্রী দু’জনেই বললাম আমার অপারেশন আপনাকেই করতে হবে। আপনাকে ছাড়া আমি অপারেশন করব না।

উনি বললেন, আমি এখন ছোট বাচ্চাদের ক্রিটিক্যাল অপারেশন করি। যখন বলছো আমি তোমার অপারেশনের সময় থাকব। তারপর আমি কি করি কাকে নিয়ে এসেছি বাঙালোরে সব জিজ্ঞেস করলেন। পত্রিকায় চাকরি মানে মাসিক বেতনের চাকরি দেখে নিজে থেকেই ৮০,০০০/- টাকা কমিয়ে দিলেন এবং আমার স্ত্রীকে কেবিনে আমার সঙ্গে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। আমার পাশের কেবিনেই ছিলেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ম্যানেজার ইদ্রিস সাহেব। একই কেবিনের ভাড়া নিয়েছিল ভারতীয় মুদ্রায় ইদ্রিস সাহেবের কাছ থেকে ২,৬০,০০০/- আর আমার থেকে রেখেছিল ১,৮০,০০০/-। সত্যিই আমার অপারেশনের দিন দেবী শেঠি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার স্ত্রীকেও ডেকে নিয়েছিলেন অপারেশন রুমে। আমার অ্যানেসথেসিয়া দেয়ার সময় দেবী শেঠির হাত ধরে শুয়েছিলাম আর আমিও নিশ্চিন্ত মনে আস্তে আস্তে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যাই। আমার বাইপাস অপারেশন করেছিলেন প্রভীন কুমার। বিশাল দেহের অধিকারী প্রভীন কুমার পরশ পাথরের ছোঁয়ায় উনিও হয়ে উঠেছেন আরেকজন দেবী শেঠি। দেবী শেঠির মহানুভবতা দেখে অবাক বিষ্ময়ে অনেকটা নির্বাক হয়ে পড়েছিলাম। আমার অপারেশনের পর প্রথম জ্ঞান ফিরে রাত ৩টা ৫০ মিনিটে। আমি বাম পাশে ফিরে তাকিয়েই দেখি রঞ্জন ব্যানার্জি। রঞ্জন ব্যানার্জিসহ আমাদের পরিচিত মোট ৪ জন একসঙ্গে অপারেশন হয়েছিল। নারায়না কার্ডিয়াক সেন্টারে একসঙ্গে ৬ জনের অপারেশন করা হয়। রঞ্জন ব্যানার্জি ভারতের, বাবা কলকাতার মা বাঙালোরের। উগান্ডার কাম্পালায় থাকেন, পেশায় গার্মেন্টস ব্যবসায়ী। সেই থেকে আজ অবধি আমাদের সম্পর্ক রয়েছে।

জ্ঞান ফেরার পর খুবই পানির পিপাসা পেয়েছিল। অনেকবার বলার পর একজন নার্স অল্প একটু পানি দিল। আল্লাহর এই পৃথিবীতে পানির তৃষ্ণা এবং পানি যে কত বড় নেয়ামত সেদিন বুঝেছিলাম। আমার জ্ঞান ফেরার পর আমার খুব পিঠ ব্যথা করেছিল। প্রথমে মনে করেছিলাম বিছানাটা ঠিক করে দিলে বোধহয় ব্যথা করবে না। আমি নার্সকে বললাম, বিছানা ঠিক করে দিতে। কিন্তু নার্স বলল আপনার বিছানা এমনভাবে তৈরি যেন আপনার পিঠে ব্যথা অনুভব করেন। এই ব্যথাই আপনার হার্টের ব্যথা ভুলিয়ে দেবে। আমাকে পোস্ট অপারেটিভ কেয়ার থেকে আইসিইউতে ভোর পাঁচটায় নিয়ে গেল। তখন কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস যন্ত্র সব খুলে ফেলেছে। আইসিইউতে পিঠের ব্যথাটা অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে ছিল। এমন সময় দেবদূতের মত অরুণ নামের এক ব্রাদার এসে আমার সামনে উপস্থিত। আমি ব্রাদারকে পানির পিপাসার কথা বললাম আর পিঠের ব্যথার কথা বললাম। অরুণ অর্ধেক গ্লাস পানি দিল পান করার জন্য। আহা কি অমৃতসুধার মতো মনে হয়েছিল সেই পানির স্বাদ। তারপর এক এক করে অরুণ আমাকে মুখ ব্রাশ করে দিল, মেডিকেটেড শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে দিল, সম্পূর্ণ শরীর ধুয়ে দিল। মনেপ্রাণে সতেজ হয়ে উঠেছিলাম। সবশেষে অরুণ আমার পিঠে ঝান্ডুবাম জাতীয় একটি ক্রিম মেখে দিল। আমি পরম শান্তিতে, নিশ্চিন্তে ঘুম দিয়ে উঠে দেখি সকাল ১০:৩০ বাজে। আমি এবারও বাঙালোরে গিয়ে ব্রাদার অরুণের সঙ্গে দেখা করে এসেছি। আমি ছাড়া আর কেউ এই সেবা পেয়েছে দেখিনি। আমি এটাকে খোদার অপার মহিমাই মনে করি।

আমার যেদিন অপারেশন হয় তার পরদিন সকাল বেলাতেই আমাকে হাঁটতে বলে। আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছিলাম না হাঁটতে গিয়ে। যদিও প্রথমে মনে করেছিলাম হয়তো হাঁটতে পারব না। আমার টেনশন হচ্ছিল যেহেতু ডায়াবেটিকসের রোগী আমি তাই কোনো অসুবিধা হয় কিনা। হাসপাতাল থেকে চারদিনের দিন আমাকে রিলিজ করে দেয়। হাসপাতাল থেকে রিলিজ হওয়ার পরেও অনলাইন গেস্ট হাউসে আমি আরো সাতদিন থেকেছি। যে সাতদিন হোটেলে ছিলাম প্রতিদিন হাসপাতালে গিয়ে ইয়োগা করতে হতো। মোট দশদিনের মাথায় আমি বাংলাদেশে ফিরে আসি।
আসলেই দেবী শেঠি শুধু বাচ্চাদের কঠিন অপারেশনগুলো করে থাকেন? আমার হোটেলে ছিল নাইজেরিয়ার ছোট শিশু এমিলি? ওর মাকে বললাম কি হয়েছে উনি বললেন, এমিলির হার্টে ৪টা ফুটো ও ২টা ভাল্ব নষ্ট ছিল। এজন্য ছোটবেলা থেকে কথা বলতে পারত না ? হার্ট অপারেশন করে হার্টের ফুটো ঠিক করার পর এখন কথা বলতে পারছে? আরেকটা ছোট বাবু যার নাম মেঘা, এসেছে আসাম থেকে? ওর হার্ট ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন করেছে গত বছর? চেকআপের জন্য এসেছে এ বছর? এখন পুরোপুরি সুস্থ আছে? ওর বাবা-মা দেখালো সম্পূর্ণ বুকটা কাটা? ওর অপারেশনে লেগেছিল ১৪ ঘণ্টা? আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবছিলাম দেবী শেঠিকে ভগবান মনে করার ভারতে যথেষ্ট কারণ আছে?

এখানে একটা কথা উল্লেখ না করে পারছি না যে দেবী শেঠি আমাকে দেখবেন বলে আমি প্রথমে মনে করিনি। এর পেছনে কারণ আছে আর তা হচ্ছে উনাকে নিয়ে বিরূপ এক রিপোর্ট করেছিলাম যার কারণে উনি আমাকে দেখবে মনে করিনি। আমরা বাঙালোরে গিয়ে দেখি দেবী শেঠি এক সপ্তাহের জন্য আমেরিকা চলে গেছেন। এই এক সপ্তাহে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি হার্টের রোগী শুধুু দেবী শেঠিকে দেখানোর জন্য ভিড় করেছে। দেবী শেঠি আসার পর দেখলাম সারাদিন কর্নাটকের মানুষদের দেখছে ৯০ জন আর বাংলাদেশিদের দেখছে মাত্র ১০ জন। সারাদিন বসে থাকছে দেবী শেঠিকে দেখানোর জন্য এমনকি দুপুরের খাবার খেতে যাচ্ছি না কোন সময় ডাক পড়ে এই চিন্তায়। দেবী শেঠি আসার পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেছে বাংলাদেশিদের দেখছে না তাই যারা সীমিত টাকা-পয়সা নিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছে তাদের এই অবর্ণনীয় কষ্ট দেখে কারণ বের করার জন্য অনুসন্ধান শুরু করলাম। যা দেখলাম তা দেখে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম দেখি ৯০ জন কর্নাটকের মানুষ দেখছে আর বাংলাদেশিদের দেখছে ১০ জন। আর দীপক নামের এক সহকারি মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে বলছে, এক ঘণ্টা পরে ডাকবে বলে সময় পার করছে। তখন আমাকে আর দেখবে না চিন্তা করেই একটা রিপোর্ট করেছিলাম। রিপোর্টের শিরোনাম ছিল ‘দেবী শেঠির হাসপাতালে বাংলাদেশিদের অমানবিক অবর্ণনীয় কষ্ট’।
রিপোর্টের ভিতরে ছিল যে বাঙালি জাতির জন্য আজকের এই দেবী শেঠি, সেই বাঙালিদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ। সত্যিকার অর্থেই পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব বাংলার বাঙালি জাতি দেবী শেঠি বলতে অজ্ঞান দেখেছি প্রথম থেকেই। এই রিপোর্টটা আমি ট্যাগ করে দিয়েছিলাম হাসপাতালের ওয়েব সাইডে, কর্মকর্তাদের জি-মেইলে এবং বিশেষ করে দেবী শেঠির সব মেইল, ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ার এ্যাপলিকেশনগুলোতে। এই রিপোর্টটা ছাপানোর পরদিন থেকে মনে হলো ম্যাজিকের মতো কাজ করেছে। পরদিন থেকে দেখি ১০০ জন রোগীর মধ্যে ৫০ জন রোগী দেখছেন বাংলাদেশিদের। আমি ভাবিনি আমাকে দেখবে আমার সিরিয়াল ছিল অনেক পরে। আমাকেও পরের দিনই আলাদাভাবে ডেকে নিয়ে গেলেন। বাংলাদেশিদের কাছ থেকে যে দোয়া ও ভালোবাসা পেয়েছিলাম তা মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমার মনে থাকবে।

যাই হোক আজকে আমার লেখার অবতারণা এই কারণেই যে নারায়না হেলথ সেন্টারের ৫০ ভাগ রোগীই হচ্ছে বাংলাদেশি। তাই বিভিন্ন সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে আজকের এই লেখা। ২০১৫ সালে এনজিওগ্রাম করে ধরা পড়লো আমার মোট ৪টি ব্লক? ২টি ব্লক ৪০% করে আর ২টি ব্লক ১০০% ? আমার বেঁচে থাকারই কথা না? আমার একটা সরু রগ আপনা আপনিই নিজে থেকেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল যার কারণে আমি বেঁচে ছিলাম। এটা কোটি মানুষের একটা হয়ে থাকে? ওই সরু রগ দিয়ে রক্ত চলাচল করছিল বলেই বেঁচেছিলাম? এনজিওগ্রাম করার পর বাংলাদেশের কিছু ডাক্তার বললেন ওপেন হার্ট সাজারি লাগবে? নামকরা একটি হাসপাতালের হার্ট সার্জন বলল, না লাগবে না? এতে আমি ভয় পেয়ে দেবী শেঠীর হাসপাতালে যোগাযোগ শুরু করি ?
দেবী শেঠির হাসপাতালে সরাসরি যোগাযোগ করেও যাওয়া যায় আবার দেবী শেঠির হাসপাতালের বাংলাদেশ প্রতিনিধি নাহিদ আলমের অফিসের মাধ্যমেও খুব সহজেই যাওয়া যায়। অল্প টাকার কনসালটিং ফি দিলেই হাসপাতালের ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ইনভাইটেশন লেটারসহ ভিসার জন্য সমস্ত কাগজপত্র উনারাই রেডি করে দেন? এখানে বলে রাখা ভালো ভারতে ট্রিটমেন্টের জন্য গেলে অবশ্যই মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে যেতে হবে? টুরিস্ট ভিসা নিয়ে গেলে ভালো কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা করানো যাবে না? এই বিষয়ে খুবই কড়াকড়ি নিয়ম? যেকোনো হাসপাতালে গেলে প্রথমেই দেখতে চাইবে কোন ধরণের ভিসা নিয়ে এসেছেন? টুরিস্ট ভিসা নিয়ে ক্যান্সারের রোগীকেও দেখেছি চিকিৎসা না নিয়ে ফেরত আসতে? নাহিদা আলমের অফিস ১ সপ্তাহের মধ্যে কাগজপত্র রেডি করে ভিসার জন্য দাঁড়াতে বলল এবং সময়মতো ভিসা পেয়ে গেলাম? সবার সুবিধার্থে এখানে নাহিদা আলমের ঠিকানাটা দিয়ে দিচ্ছি, NAHIDA HEALTH CARE SERVICE, H2/1ST FLOOR, ROAD: 13/A, DHANMONDI, DHAKA-1215. MOBILE: 01711524961।
আগে যেমন ভারতীয় হাইকমিশন গুলশানে বিশাল লাইনে ভিসার জন্য অপেক্ষা করতে হতো বর্তমানে যমুনা ফিউচার পার্কে বিশাল ভিসা সেন্টার করেছে যেখানে মেডিক্যাল ভিসা ও টুরিস্ট ভিসার জন্য আলাদা আলাদা ৪০টি বুথ আছে? ভিসা হওয়ার পর টিকিট কাটতে গেলাম? ঢাকা থেকে সরাসরি বাঙালোর কোনো ফ্লাইট নেই তাই ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের কানেকটিং ফ্লাইট প্রথমে ঢাকা টু কলকাতা ও কলকাতা থেকে ৯ ঘণ্টা পর বাঙালোরে যাওয়ার টিকিট কাটি। টিকিটের মোট মূল্য পড়েছিল ২২,০০০/- টাকা? ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে সময় লাগে ৩৫ মিনিট আর কলকাতা থেকে বাঙালোর যেতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা ? পরে জেনেছি একই এয়ারলাইনসের টিকিট না কেটে যদি কলকাতা পর্যন্ত এক এয়ারলাইনস, তারপর কলকাতা পৌঁছানোর পর অন্য এয়ারলাইনসে কলকাতা থেকে ২ ঘণ্টা পর পর ফ্লাইট আছে ?তাতে যেমন সময়ও বাঁচানো যায় আবার টিকিটেও কম খরচ পড়ে। এবার যেমন রিজেন্ট এয়ারলাইনে ১১:১৫ মিনিটে কলকাতা পৌঁছি আবার কলকাতা থেকে ১:৪৫ মিনিটে এয়ার ইন্ডিয়াতে বাঙালোর রওনা হই? আমার টিকিটের মূল্য পড়েছিল ৯,০০০ টাকা?
যদি এই টিকিটই ১০ দিন আগে কিনতে পারতাম তাহলে এর মূল্য হতো ৭,৫০০ টাকা? কলকাতা থেকে ২ ঘণ্টা পর পর এয়ার ইন্ডিগো, স্পাইস জেট, জেট এয়ারলাইনস, এয়ার ইন্ডিয়া বাঙালোরে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে? প্রথমবার এয়ার ইন্ডিয়াতে সকাল ৮:৩০ টায় কলকাতা পৌঁছাই তার ৯ ঘণ্টা পর বাঙালোর ফ্লাইট? প্রচ- অস্বস্তিকর এই অপেক্ষা করা? কলকাতা এয়ারপোর্ট নতুন করেছে তাই অনেক বড় ও অনেক শপিং করার ব্যবস্থা ও বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকান? ঘুরেফিরে কোনো রকমে কাটিয়ে দিলাম এই ৯ ঘণ্টা? যাই হোক ৯ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর সন্ধ্যা ৬.৩০টায় কলকাতা থেকে রওনা হলাম? বাঙালোরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় রাত ৯.৩০টা বেজে গেল। এয়ারপোর্ট থেকে বের হতে ১০টা বেজে গেল।
আমি যেই হোটেলে উঠব সেটা হলো অনলাইন গেস্ট হাউজ। এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। বের হয়েই ১,৫০০ টাকায় ট্যাক্সি ভাড়া নিয়ে হোটেলে রওনা হলাম। হোটেলে যেতে যেতে প্রায় ১২টা বেজে গেল। ড্রাইভার বলল, রাতের খাবার যদি খেতে চাই রাস্তা থেকেই খাবার কিনে নিয়ে যেতে। কারন, হোটেলে হয়তো ক্যান্টিন খোলা থাকবে না। তাই রাস্তা থেকে খাবার নিয়ে নিলাম। এখানে বলে রাখি এই পর্যন্ত মোট ৩ বার যাওয়া হলো বাঙালোর কোনবারই কোনো ড্রাইভারকে চোখে পড়েনি যে চালাকি করে ভাড়া বেশি নিয়ে নিয়েছে বা যার ব্যবহার খারাপ বা সাহায্য করার মানসিকতা নেই। আসলেই আমাদের হোটেলের ক্যান্টিন বা খাবার দোকান বন্ধ হয়ে গেছে তাই খেয়েই রুমে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমি যে হোটেলে উঠেছিলাম তার নাম হলো অনলাইন গেস্ট হাউস। পাশে একই মালিকের আরেকটি আবাসিক হোটেল আছে যেটার নাম শান্তি নিকেতন নিবাস। অনলাইন গেস্ট হাউসে ডাবল রুমের ভাড়া ছিল ১,২০০ রুপি আবার শান্তি নিকেতনে রুমের সঙ্গে রান্নাঘরসহ ভাড়া ৪০০ রুপি। তবে অনেক অপরিষ্কার মনে হলো আমার কাছে তাই ১,২০০ রুপি দিয়ে অনলাইন গেস্ট হাউসের ডাবল একটা রুম ভাড়া নিলাম।
আমাদের গেস্ট হাউসের পাশে অনেক ফ্ল্যাট ভাড়াও পাওয়া যায় যেগুলোতে টিভি ফ্রিজ রান্নার সুবিধাসহ ৫০০ রুপির মধ্যে ভাড়া নেয়া যায়। আমাদের গেস্ট হাউসের মালিকের সঙ্গে দেবী শেঠি একসঙ্গে স্কুলে পড়েছে। তাই উনার সঙ্গে কথা বলেও দেবী শেঠি সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। হোটেলের উদ্বোধনও করেছিলেন দেবী শেঠি। অনলাইন গেস্ট হাউসের যে ক্যান্টিন তার নাম ছিল মেগাবাইট। ভারতের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষেরা টক পছন্দ করে বেশি তাই ওদের টক তরকারিগুলো খুব ভালো লাগত আমার কাছে। যাই হোক সকালে উঠেই নারায়না হাসপাতালে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়ে নিলাম। হোটেলের ক্যান্টিনে নাস্তা করেই রওনা হলাম হাসপাতালে। দেবী শেঠির হাসপাতালের আশপাশে যত থাকার হোটেল আছে সবগুলোতেই হাসপাতালে যাতায়াতের জন্য ফ্রি গাড়ির সার্ভিস দেয়া হয়। ২৪ ঘণ্টাই এই সার্ভিস পাওয়া যায়।

ই-সিগারেট নিষিদ্ধকরণ: বিধিবিধান নিয়ে দ্বিধায় ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় by চন্দন নন্দী

ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ই-সিগারেটসহ ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইএনডিএস-এন্ডস) বিক্রি, উৎপাদন, বিতরণ, বাণিজ্য আমদানি ও বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করার তিন মাস পর দেশের শুল্ক কর্তৃপক্ষ গত বছরের নভেম্বরে নড়েচড়ে বসে। সব মূখ্য চিফ কমিশনার ও রাজস্ব গোয়েন্দা অধিদফতরকে এসব পণ্যের পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়া হয়।
কেন্দ্রীয় পরোক্ষ শুল্ক বিভাগের চোরাচালন দমন ইউনিট ভারতের তামাক ও এন্ডস লবির মধ্যকার দ্বন্দ্ব তীব্র করেছে। এই দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে এন্ডস লবিগুলোর বৈষম্যের শিকার হওয়ার বক্তব্য জোরালোভাবে উপস্থাপনের ফলে। তাদের দাবি, সিগারেট, জর্দার মতো (দেশীয় ও আমদানি করা উভয় ধরনের) তামাকজাত পণ্য কোনো ধরনের বিধিনিষেধ ছাড়াই বিক্রি অব্যাহত থাকার পরও তাদেরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এই দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে, প্রমাণহীন এই ধারণা যে বড় বড় সিগারেট প্রস্তুকারী কোম্পানি (এন্ডস ভারতের বড় বাজারে প্রবেশ করলে তারা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বে) কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে দিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারি করাতে সক্ষম হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায় (২৮ আগস্ট, ২০১৮) নিষেধাজ্ঞার পক্ষে কিছু যুক্তি দেখিয়ে বলা হয়েছে যে ই-সিগারেট, উত্তাপ সৃষ্টি না হওয়া সরঞ্জাম, ভেপ, ই-শিসা, ই-নিকোটিন গন্ধী হুক্কাসহ এন্ডস এবং যে নামেই এ ধরনের সরঞ্জাম ও পণ্য পাওয়া যাক না কেন, সবই সাধারণভাবে সবার জন্য ও বিশেষভাবে শিশু, কিশোর, গর্ভবতী নারী, প্রজনন বয়সী নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করে। আরো প্রমাণ পাওয়া গেছে যে এন্ডস ড্রাগস অ্যান্ড কসমেটিক্স অ্যাক্টের আওতাধীন নিকোটিন প্রতিস্থাপন থেরাপির মতো অনুমোদিত নয়। আর এ কারণে এই বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে।
ঘোষণায় এন্ডস নিষিদ্ধ করার আরো কিছু প্রস্তাব তুলে ধরার হয়েছে। বিশেষ করে তামাকবিরোধী অ্যাক্টিভিস্ট সীমা সেগাল গত বছরের জানুয়ারিতে হাইকোর্টে জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে নিষিদ্ধ করার যেসব যুক্তি পেশ করেছিলেন, তা সামনে আনা হয়েছে। মামলাটি হাইকোর্টে চলতে থাকলেও কেন্দ্রীয় সরকার তোতা পাখির মতো বলে চলেছে, এন্ডস প্রচলিত তামাক পণ্যের মতোই মানুষের জন্য ক্ষতিকর এবং এর কোনো স্বাস্থ্যগত উপকারিতা নেই।
সেগাল বিক্রি ও বিতরণের ওপর কিছু বিধিনিষেধ কামনা করলেও অতি-উৎসাহী সরকার এক পা এগিয়ে নিষেধাজ্ঞা জারির পথ ধরেছে, যদিও তারা স্বীকার করেছে যে ই-তরলযুক্ত নিকোটিন ধারাবাহিক গ্রহণের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা/ক্ষতি এখন পর্যন্ত জানা নেই। এর ফলে এন্ডসের ওপর নিষিষেধাজ্ঞা আরোপের অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত ছাড়াও ই-সিগারেট ও সিগারেট কোম্পানিগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছে।
বৈশ্বিক ই-সিগারেট ও হিটস্টিক কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা (তাদের একজন ভবিষ্যতে ধুমপানমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছন) স্বীকার করেছেন যে তাদের পণ্যরাজি ‘ক্ষতিকর।’ কয়েকজন প্রতিনিধি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন যে স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ভালো বা খারাপের মধ্যে আপস করা যায় না। তবে তারা আরো বলেন, ভোক্তা-তাড়িত বাজারে লোকজনের কাছে খারাপ ও আরো খারাপের মধ্যে কিছু বিকল্প বেছে নেয়ার সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
ভারতের বাজারে বিক্রি হওয়া এন্ডস ও সিগারেট ও অন্যান্য তামাকভিত্তিক পণ্যরাজি ‘সমানভাবে ক্ষতিকর’- উল্লেখ করে কলকাতাভিত্তিক ক্যান্সার ফাউন্ডেশন অব ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ড. এম সিদ্দিকি (তিনি তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে কিছু গবেষণা করেছেন) বলেন, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত আগে সিগারেট ও জর্দার মতো সমান পর্যায়ে সব ধরনের এন্ডস পণ্যের সাথে সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করা। কেবল তখনই সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, এন্ডসের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কেবল সিগারেট প্রস্তুতকারী কোম্পানিগুলোকে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়া তাদের পণ্যরাজি বিক্রি অব্যাহত রাখতেই সহায়তা করবে। এক হিসাব অনুযায়ী, ভারতে ১০০ মিলিয়নের বেশির ধূমপায়ী রয়েছে, যদিও সবার জানা আছে যে ভারতে প্রতিরোধযোগ্য আগাম মৃত্যু ও রোগের অন্যতম কারণ হলো ধূমপান।
এন্ডস নিষিদ্ধ করার যুক্তি উপস্থাপন করতে গিয়ে গত আগস্টে দিল্লি হাইকোর্টে দাখিল করা এক হলফনামায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ই-সিগারেট ও অন্যান্য ভেপিং পণ্য বিক্রি ও বিতরণ অনুমোদন করার ফলে ভোক্তারা প্রচলিত তামাক পণ্য চেষ্টা করতে পারে। এর ফলে এগুলো ধূমপানের পথ তৈরি করতে পারে। তবে হলফনামায় পরস্পর সাঙ্ঘর্ষিক যুক্তি ছিল। বলা হয়েছে, তামাক ও সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় সরকার সিগারেট ও অন্যান্য তামাক পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করে ২০০৩ সালে আইন প্রণয়ন করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল তামাক ব্যবহার ও ভোগ নিরুৎসাহিত করা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় ২০১৪ সালের জুলাই মাসে একটি জাতীয় পরামর্শ/সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্বাস্থ্য ও মাদক বিভাগের চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞানী, কর্মকর্তারা উপসংহার টানেন যে প্রাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণে দেখা যাচ্ছে, এন্ডস প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবহারকারীদের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ কারণে এর উৎপাদন ও বিক্রি হ্রাস করার জন্য গঠনমূলক প্রয়াস গ্রহণ প্রয়োজন। এরপরপরই ভারতে এন্ডস নিষিদ্ধ/নিয়ন্ত্রিত করার ইস্যুটি বিবেচনার করার বিষয়টি সামনে আসে। এন্ডস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মুম্বাইভিত্তিক শেখসারিয়া ইনস্টটিউট ফর পাবলিক হেলথের পরিচালক ড. পি সি গুপ্ত বলেন, এসব পণ্য বিস্ফোরকে পরিণত হয়ে তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্প্রদায়কে বিভক্ত করে ফেলেছে।
সরকার তার হলফনামায় এন্ডসের মতো নতুন সৃষ্ট হুমকি মোকাবিলায় কোনো নির্দেশিকা নেই জানিয়ে স্বীকার করে যে হরিয়ানা, পাঞ্জাব, কেরালা, কর্নাটক, উত্তর প্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, মিজোরাম, জম্মু ও কাশ্মিরের মতো কোনো কোনো রাজ্য এন্ডস বা ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র টেকনিক্যাল উপদেষ্টা ড. রানা জে সিং বলেন, কেন্দ্রীয় সরকার ই-সিগারেট ও এন্ডসের বিপণন, সচেতনতা ও ব্যবহার দ্রুত বাড়ায় উদ্বিগ্ন, যদি নিরাপত্তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রদর্শিত হয়নি এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এখনো শনাক্তহীনই রয়ে গেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিহারের মতো কোনো কোনো রাজ্যে এন্ডস বন্ধে তড়িঘড়ি করে আইন করা হয়েছে। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে সাউথ এশিয়ান মনিটর’র কাছে বিহারের স্বাস্থ্য দফতরের এক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বীকার করেন যে রাজ্য প্রশাসন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করার কথা। কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনায় কিন্তু এন্ডস নিষিদ্ধ করার কোনো কথা ছিল না। রাজ্য সরকার কেবল এন্ডস বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারত।
কিন্তু এন্ডস নিষিদ্ধ করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করে, ফরমালডিহাইডের মতো রাসায়নিক ছাড়াও সীসা, ক্রোমিয়াম, নিকেলের মতো অনেক ধাতু এতে পাওয়া গেছে। আর এন্ডসে যে পরিমাণ ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে, তা প্রচলিত সিগারেটেও নেই।
কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করিডোরে কার্যক্রম পরিচালনাকারী শক্তিশালী তামাক লবির বিরুদ্ধে থাকার ব্যাপারে পূর্ণ সচেতন থেকে বহুজাতিক একটি এন্ডস কোম্পানির এক প্রতিনিধি ইউকে রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ান্সের একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছেন। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ই-সিগারেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ঝুঁকি যথাযথভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তবে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এসব পণ্য ধোঁয়া সৃষ্টিকারী তামাক পণ্যের সৃষ্ট ক্ষতির চেয়ে ৫ ভাগের চেয়ে বেশি হবে না এবং তা এই সংখ্যার চেয়ে বেশ কমও হতে পারে। মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ দফতরও (২০১৬ সালে) স্বীকার করেছে যে ই-সিগারেট ধোঁয়া সৃষ্টিকারী যেসব তামাক পণ্য বর্তমানে যেসব রোগ সৃষ্টি করে, ই-সিগারেট সেগুলোর প্রকোপ কমাতে পারে।
ই-সিগারেট ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সাঙ্ঘর্ষিক দাবি (এন্ডস প্রচলিত সিগারেটের চেয়ে অনেক কম ঝুঁকিপূর্ণ কিনা) অব্যাহত থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে তা অনেকটাই নির্ভর করবে ই-সিগারেটের তথাকথিত স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে বিচার বিভাগের রায়ের ওপর। দিল্লি হাইকোর্টের প্রধান আবেদনকারী সীমা সেগালের আইনজীবী ভুবনেশ সেগালের মতে, এন্ডস নিষিদ্ধ করা কোনো সমাধান নয়। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণলয়কে দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসতে হবে (মামলাটি আগামী মার্চে শুনানি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে) কিছু সুনির্দিষ্ট, সময়োচিত নির্দেশিকা নিয়ে। কারণ এসব পণ্য অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিক্রি হচ্ছে, কিশোরেরা এগুলো গ্রহণ করছে।

বিশ্বের এক নম্বর ভাষা হিসেবে ইংরেজির দিন কি ফুরিয়ে এসেছে

বিশ্বজুড়ে ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন কোটি কোটি মানুষ। আজকের দুনিয়ায় ইংরেজি ভাষা হচ্ছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের এক নম্বর ভাষা। কিন্তু 'ট্রান্সলেশন টেকনোলজি' বা অনুবাদ প্রযুক্তির উদ্ভাবন এবং 'হাইব্রীড' বা নতুন শংকর ভাষা তৈরি হওয়ার ফলে ইংরেজি ভাষার এই অবস্থান কি হুমকির মুখে? বিবিসি'র রবিন লাস্টিগের বিশ্লেষণ:
বিশ্বের কোন দেশটিতে ইংরেজিভাষী মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি? বা কোন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি ইংরেজি ভাষা শেখেন?
অনুমান করার চেষ্টা করুন তো!
এই দেশটি হচ্ছে চীন।
কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, চীনের ৩৫ কোটি মানুষের ইংরেজি ভাষায় কিছুটা হলেও জ্ঞান আছে। আর ভারতে আছে আরও ১০ কোটি মানুষের।
যুক্তরাষ্ট্রে যত মানুষের প্রথম ভাষা (মাতৃভাষা) ইংরেজি, তার চেয়ে সম্ভবত অনেক বেশি চীনা নাগরিকের দ্বিতীয় ভাষা এটি। (যুক্তরাষ্ট্রের এক পঞ্চমাংশ মানুষ তাদের বাড়িতে ইংরেজি ছাড়া ভিন্ন একটি ভাষায় কথা বলেন)।
কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ভাষা হিসেবে ইংরেজি কতদিন তার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে?
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসেবে পৃথিবীতে এখন ইংরেজি ভাষায় কথা বলেন ১৫০ কোটি মানুষ। কিন্তু এদের মধ্যে ৪০ কোটিরও কম মানুষের মাতৃভাষা এটি।
এটা সত্যি যে নানা রকমের ইংরেজি ভাষা চালু আছে পৃথিবীতে। এমনকি খোদ ইংল্যান্ডেরও সব মানুষ একই ধরনের ইংরেজিতে কথা বলেন না। যেমন ধরা যাক ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক বন্দর নগরী পোর্টসমাউথে এখনো আঞ্চলিক ভাষা 'পম্পেই' চালু আছে। এটি অনলাইনে তৈরি হওয়া নতুন ধরনের ইংরেজি ভাষা বা আমেরিকান ইংরেজির চ‍্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এখনো টিকে আছে।
ইংরেজি হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় যোগাযোগের ভাষা। যখন দুটি মানুষের মাতৃভাষা ভিন্ন হয়, তখন তারা সাধারণত ইংরেজি ভাষাতেই পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন।
ধরা যাক চীনের কোন মানুষের সঙ্গে ফ্রান্সের কোন মানুষের দেখা হয়েছে। একজন ফরাসী ভাষা বলতে পারেন না। আরেকজন চীনা বলতে পারেন না। এদের দুজন তাহলে কোন ভাষায় কথা বলবেন। সম্ভাবনা খুবই প্রবল যে তারা ইংরেজি ভাষাই বেছে নেবেন। পাঁচ বছর আগে হলে হয়তো এমনটাই হতো।
কিন্তু এখন অবস্থা বদলে গেছে। কম্পিউটারে অনুবাদ প্রযুক্তি এবং 'ভয়েস রিকগনিজশন টেকনোলজি' বা 'কন্ঠ সনাক্তকরণ প্রযুক্তির' উদ্ভাবনের ফলে এর দুজনেই এখন কিন্তু তাদের নিজেদের ভাষাতেই কথা বলতে পারেন। যন্ত্র বা প্রযুক্তি সেটা সাথে সাথে অন্যজনকে অনুবাদ করে বলে দেবে।
কাজেই বিশ্ব যোগাযোগের ভাষা হিসেবে ইংরেজির দিন ফুরিয়ে এসেছে। খুব নাটকীয়ভাবে বলতে গেলে: কম্পিউটার আসছে এবং তারাই এই প্রতিযোগিতায় জিতে যাচ্ছে!
ধরা যাক আপনি এই লেখাটাই হয়তো ইংরেজিতে পড়ছেন। আপনার কম্পিউটারে কয়েকটি ক্লিক কিংবা আপনার ট্যাবে আঙ্গুল চেপে এই লেখাটিই হয়তো জার্মান বা জাপানি ভাষাতেও পড়তে পারেন।
কম্পিউটারই যখন আপনার অনুবাদের কাজটি এত সহজে করে দিচ্ছে, তখন কষ্ট করে আর ইংরেজি শেখার কি কোন দরকার আছে?
আপনি যদি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন, কিংবা সর্বশেষ ভিডিও গেম খেলেন বা সর্বশেষ জনপ্রিয় পপ সঙ্গীত শুনতে চান, তাহলে ইংরেজি না জানলে আপনার বিপদ। ইংরেজির ওপর যথেষ্ট দখল ছাড়া এই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই আপনাকে খাবি খেতে হবে।
কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে যাচ্ছে বেশ দ্রুত।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী ওনকিউম লী একটি গবেষণা করছেন। তার লক্ষ্য এমন এক ভয়েস রিকগনিশন এবং ট্রান্সলেশন প্রযুক্তি তৈরি করা, লোকে যখন কোন কাস্টমার সার্ভিস হেল্পলাইনে এই প্রযুক্তির সঙ্গে কথা বলবে, তারা বুঝতেই পারবে না এটি মানুষ নাকি কম্পিউটার!
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐ একই বিভাগের 'মেশিন লার্নিং, লিঙ্গুইস্টিকস এন্ড কম্পিউটার সায়েন্সে'র অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ম্যানিং। তিনি দাবি করছেন, খুব নিকট ভবিষ্যতেই এই প্রযুক্তি আমরা ব্যবহার করবো। তাঁর মতে, কম্পিউটার ট্রান্সলেশন টেকনোলজি এতটাই ভালো হবে যে, এটি আসলে মানুষের চেয়েও ভালো অনুবাদকের কাজ করবে।
ইংরেজি ভাষার জন্য চ্যালেঞ্জটা কেবল এদিক থেকে নয়। বিপদ ঘটছে অন্যদিক থেকেও। এতবেশি সংখ্যক মানুষ দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ইংরেজিতে কথা বলেন যে নানা রকম 'হাইব্রীড' বা জগাখিচুড়ি ইংরেজি ভাষার বিস্তার ঘটছে বিশ্বে। 'স্ট্যান্ডার্ড' বা সত্যিকারের ইংরেজি ভাষার কিছু কিছু অংশের সঙ্গে স্থানীয় ভাষা মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এসব ভাষা। যেমন ভারতেই আপনি শুনতে পাবেন হিংলিশ (হিন্দি-ইংলিশ), বেংলিশ (বেঙ্গলি-ইংলিশ) এবং তাংলিশ (তামিল-ইংলিশ)।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেক হিস্পানিক আমেরিকান তাদের মধ্য এবং দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্য ধরে রাখতে চায়। তারা ইংরেজি এবং তাদের বাবা-মা বা তারও আগের প্রজন্মের অভিবাসী পিতামহদের ভাষা মিলিয়ে তৈরি করেছে এক নতুন ভাষা, স্প্যাংলিশ।
ভাষা আসলে শুধু যোগাযোগের কোন মাধ্যম নয়, তারচেয়েও বেশি কিছু। এটি মানুষের আত্মপরিচয় প্রকাশের হাতিয়ার। ভাষা শুনে আমরা একজন মানুষ আসলে কী, তা বুঝতে পারি। সানফ্রান্সিসকোর কবি জোসিয়াহ লুইস অলডারেট কবিতার লেখেন 'স্প্যাংলিশে'। তিনি এটিকে বর্ণনা করেন 'প্রতিরোধের ভাষা' হিসেবে। তার মতে, এই ভাষার মাধ্যমে হিস্পানিক আমেরিকানরা তাদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখে, সেটা নিয়ে গর্ব অনুভব করে। যদিও তাদের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে, বেড়েও উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রে।
বিশ্বজুড়ে ইংরেজি ভাষার যে আধিপত্য আমরা আজকে দেখি, তার মূলে কিন্তু রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন, এই সেদিনও যারা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি দেশ। কিন্তু এখন নতুন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের উত্থানের ফলে ইংরেজির আধিপত্য এখন চ্যালেঞ্জের মুখে।
আফ্রিকার সাহারা অঞ্চলের কোন দেশে একজন কর্মপ্রত্যাশী বেকার তরুণ ইংরেজি বা ম্যান্ডারিন চাইনিজ- এই দুই ভাষার কোনটি শিখতে বেশি আগ্রহী হবে? ক্যারিয়ারের বিবেচনায় ইংরেজি শিখে যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনে গিয়ে কাজ খোঁজার চেয়ে তার কাছে ম্যান্ডারিন শিখে চীনে যাওয়া কিন্তু অনেক বেশি আকর্ষণীয়।
শুধু আফ্রিকায় নয়, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেও চীনা ভাষা শেখাটা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। ২০১৫ সালের এক খবরে বলা হচ্ছিল সেখানে স্কুলপর্যায়ে ম্যান্ডারিন শিখছে এমন ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা দু বছরের মধ্যেই দ্বিগুণ হয়েছে। আর কলেজ পর্যায়ে তা দশ বছরে বেড়েছে পঞ্চাশ শতাংশ।
তবে উগান্ডায় সব মাধ্যমিক স্কুলে লেখাপড়ার মাধ্যম কিন্তু পুরোপুরি ইংরেজি। অনেক বাবা-মা তো ইংরেজিকেই প্রথম ভাষা হিসেবে শেখান তাদের ছেলে-মেয়েদের। বিশ্বের অনেক জায়গাতেই এখনো ইংরেজিকে সাফল্যের চাবিকাঠি বলে গণ্য করা হয়।
তাহলে ইংরেজির ভবিষ্যৎ কি হুমকির মুখে? না, আমার মতে সামনের দশকগুলিতে বিশ্বজুড়ে এটির প্রাধান্য হয়তো কমতে থাকবে। তবে আর সব ভাষার মতো ইংরেজি বদলাতে থাকবে এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে থাকবে।
একটা উদাহারণ দেয়া যাক। এই সেদিনও কিন্তু ইংরেজিতে 'টেক্সট' এবং 'ফ্রেন্ড' ছিল সিম্পল নাউন, বা বিশেষ্য। এখন কিন্তু আমরা দুটি শব্দকেই 'ভার্ব' বা ক্রিয়াপদ হিসেবে ব্যবহার করছি। যেমন, 'আই উইল টেক্সট ইউ' বা 'হোয়াই ডোন্ট য়্যু ফ্রেন্ড মি'?
কম্পিউটারে ট্রান্সলেশন প্রযুক্তি, হাইব্রীড বা শংকর ভাষার বিস্তার এবং চীনের উত্থান- এসব ইংরেজির জন্য সত্যিকারের হুমকি, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবান মনে করি এ কারণে যে, এমন এক দেশে আমার জন্ম, আমি শেক্সপীয়ার, চসার, মিল্টন বা ডিকেন্সের ভাষাকে নিজের ভাষা বলে গণ্য করতে পারি। যদিও এখন যাকে আমি ইংরেজি ভাষা বলছি, সেটি তাদের আমলের ইংরেজি থেকে অনেক আলাদা।