Saturday, December 5, 2009

শিক্ষকসহ ১০ ছাত্রছাত্রীর মৃত্যু -তামিলনাড়ুতে স্কুলবাস পুকুরে

আজ বৃহস্পতিবার সকালে ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের নাগপট্টিনম জেলার ভেদ্রায়মে একটি স্কুলবাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের একটি পুকুরে পড়ে গেলে একজন শিক্ষকসহ নয়জন ছাত্রছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে আরও ১১ জন। আহতদের নিকটবর্তী হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে।
সকালে স্কুলপড়ুয়াদের নিয়ে বাসটি ওই প্রাথমিক স্কুলমুখে যাচ্ছিল। বাসটিতে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাসহ ৩০-৩৫ জন ছিলেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন ছাত্র ও পাঁচজন ছাত্রী রয়েছে। দমকল বাহিনী ও পুলিশ উদ্ধারকাজ শুরু করেছে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

নিদাল হাসানের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট হুড সেনাঘাঁটিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মার্কিন সেনা কর্মকর্তা মেজর নিদাল মালিক হাসানের বিরুদ্ধে ৩২ জনকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর তরফ থেকে গত বুধবার নিদালের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়। এর আগে মার্কিন সেনাবাহিনীর এই মনোরোগ চিকিত্সকের বিরুদ্ধে ১৩ ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত ৫ নভেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানোর মতো অবস্থা বর্তমানে নিদালের আছে কি না এবং সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর সময় তাঁর মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা পরীক্ষা করা হবে জানিয়ে বিবাদীর আইনজীবীকে নোটিশ দেওয়ার এক দিনের মধ্যে নিদালের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হলো।
নিদালের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

গঙ্গার দূষণ রোধে ১০০ কোটি ডলার সহায়তা

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নদীগুলোর অন্যতম গঙ্গা নদীকে পরিচ্ছন্ন করতে বিশ্বব্যাংক ভারতকে আগামী পাঁচ বছরে ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। গতকাল বুধবার নয়াদিল্লিতে বিশ্বব্যাংকের প্রধান রবার্ট জোয়েলিক বলেন ‘এ ঋণ নদীটিকেই পরিশোধনে ব্যয় করা হবে।’
বিবিসি অনলাইনের খবরে বলা হয়, আড়াই হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী শিল্পবর্জ্য ফেলাসহ নানা কারণে ব্যাপকভাবে দূষিত। গঙ্গায় ভারত সরকার বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পয়োনিষ্কাশনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে। এছাড়া এতে অন্যান্য নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলে এর পানির বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা হবে বলে জানা গেছে। বিশ্বব্যাংকের এই ঋণ ভারতের ২০২০ সালের মধ্যে গঙ্গা পরিশোধন প্রকল্পের একটি অংশ।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রায় ৪০ কোটি মানুষের জীবন-যাপন সরাসরি গঙ্গা নদীর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর দূষণ রোধ করা না গেলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। এর আগে এই নদীটি পরিশোধনের যাবতীয় তত্পরতা ও উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও এবার বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, তিনি এবারের উদ্যোগ বাস্তবায়নের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।

৪১ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে ভারত -কালোবাজারে অস্ত্র বিক্রি

রাজস্থান রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর কালোবাজারে ‘নন-সার্ভিস প্যাটার্ন’ (এনএসপি) অস্ত্র বিক্রি করার অভিযোগে ভারতের ৪১ জন সেনা কর্মকর্তা ও চারজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা খুব কম দামে অস্ত্র কারখানা থেকে নাইন এমএম পিস্তল কিংবা দশমিক ৩০ বোল্ট অ্যাকশন রাইফেলের মতো কিছু নিষিদ্ধ অস্ত্র কিনতে পারেন। এ অস্ত্রকে এনএসপি অস্ত্র বলা হয়ে থাকে।
জানা গেছে, বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কেনা অস্ত্র অস্ত্রব্যবসায়ীদের একটি চক্রের সহায়তায় কালোবাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন।
ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি গত বুধবার রাজ্যসভায় বলেন, বিদ্যমান বিধি ভঙ্গ করে এনএসপি অস্ত্র বিক্রি এবং জবলপুরের কেন্দ্রীয় অস্ত্রাগারে অস্ত্র ফেরত দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি অমান্যের দায়ে ৪১ জন সেনা কর্মকর্তা, একজন জেসিও এবং চারজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সুবিচারের প্রত্যাশায় ভুক্তভোগীরা -ভূপাল ট্র্যাজেডির ২৫ বছর

ভারতের ভূপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির ২৫ বছর পার হয়ে গেলেও এখনো ন্যায়বিচার পায়নি ভুক্তভোগীরা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তম শিল্প কারখানা দুর্ঘটনার ২৫তম বার্ষিকীতে ওই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচার দাবি করে বিক্ষোভ করেছে ভুক্তভোগীরা। সুবিচার ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের দাবিতে দুর্ঘটনাস্থল পর্যন্ত একটি পদযাত্রা কর্মসূচিও পালন করে তারা। পাশাপাশি ওই দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি পালন শুরু করেছে। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনাস্থলে জমে থাকা রাসায়নিক বর্জ্য থেকে এখনো আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দারা অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
১৯৮৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতের মধ্য প্রদেশের ভূপালে ‘ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া’ নামের একটি কীটনাশক তৈরির কারখানা থেকে ক্ষতিকর রাসায়নিক গ্যাস নির্গত হওয়ার কারণে ২০ হাজার মানুষ মারা যায় এবং প্রায় ছয় লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক মানুষ রাসায়নিক তেজস্ক্রিয়তার কারণে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে।
এদিকে ওই দুর্ঘটনায় মধ্য প্রদেশ হাইকোর্টের দেওয়া ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত একটি রায় হতাশ করে ভুক্তভোগীদের। ওই রায়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ১৯৮৯ সালের প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ পরিশোধের কথা বলা হয়। ১৯৮৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে, ভূপাল ট্র্যাজেডির ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হচ্ছে। এ জন্য সরকার এবং ওই দুর্ঘটনার জন্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন কার্বাইডের মধ্যকার একটি চুক্তি অনুমোদন করেন আদালত। ওই চুক্তি অনুযায়ী ইউনিয়ন কার্বাইড ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭১৩ কোটি রুপি দিতে রাজি হয়। এর বিনিময়ে ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সব ফৌজদারি মামলা তুলে নিতে রাজি হয় সরকার। কিন্তু জনতার চাপের মুখে সরকার ১৯৯১ সালে আবার মামলার কার্যক্রম শুরু করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ওই মামলার কোনো নিস্পত্তি এখনো হয়নি।
তাই সুবিচার পাওয়ার লড়াই আরও দীর্ঘায়িত হবে বলেই ধারণা করছে ভূপাল ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন।

অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে উটের মরদেহ পচে জলাধার দূষিত হচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে প্রচণ্ড খরায় পানি না পেয়ে হাজার হাজার উট মারা গেছে। এসব উটের মরদেহ পচে সেখানকার জলাধার ও নিরাপদ পানির উত্স দূষিত হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার বন্য জীবজন্তুর আবাসস্থল তত্ত্বাবধানকারী একটি প্রতিষ্ঠান গতকাল বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছে।
সেন্ট্রাল ল্যান্ড কাউন্সিল নামের ওই প্রতিষ্ঠান বলেছে, তৃষ্ণা মেটাতে অনেক উট অগভীর জলাধারে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। এগুলোকে সেখান থেকে উদ্ধার করা যায়নি। উটগুলোর মরদেহ পচে সেখানকার প্রধান প্রধান জলাধার দূষিত হচ্ছে।
সেন্ট্রাল ল্যান্ড কাউন্সিলের প্রধান ডেভিড আলেক্সান্ডার বলেন, অস্ট্রেলিয়ার মরুভূমি অঞ্চলে জীবন বাঁচাতে পানির জন্য হাজার হাজার উট ছোটাছুটি করছে। পানি নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যে রীতিমতো লড়াই শুরু হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার মরু অঞ্চলে আদিবাসীরা বসবাস করে। এসব আদিবাসী পানির জন্য সাধারণত বৃষ্টির ওপর নির্ভর করে থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অনাবৃষ্টির কারণে সেখানে প্রচণ্ড পানির সংকট দেখা দিয়েছে। সেখানকার হাজার হাজার ডোবা, নদীসহ পানির অন্যান্য উত্স প্রায় শুকিয়ে গেছে। পানির অভাবে সেখানকার লোকজনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দিয়েছে।
আলেক্সান্ডার বলেন, খরাপীড়িত এলাকায় আরও হাজার হাজার উটের প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এভারেস্টে আজ নেপালের মন্ত্রিসভার বৈঠক

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায় নেপালের মন্ত্রিসভার একটি বৈঠক আজ শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য এভারেস্ট অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শহরগুলোর একটি লুকলায় মন্ত্রিসভার সদস্যরা গতকাল বৃহস্পতিবার সমবেত হন। কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠেয় বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনের আগে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পাঁচ হাজার ২৬২ মিটার (১৭ হাজার ১৯২ ফুট) উচ্চতায় এভারেস্টের বেসক্যাম্পে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, হিমালয়ের হিমবাহ আশঙ্কাজনকহারে গলছে এবং সৃষ্টি হচ্ছে বিশালাকৃতির তুষারাচ্ছাদিত হ্রদের। এই হ্রদগুলো ফেটে পড়ার হুমকির মধ্যে রয়েছে। হ্রদগুলো ফেটে গেলে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী।
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কয়েক দশকের মধ্যেই হিমবাহগুলো উধাও হয়ে যাবে। এতে খরার মুখে পড়বে এশিয়ার বিশাল অংশ। কারণ এশিয়ার ওই অঞ্চলের ১৩০ কোটি মানুষ যেসব নদীর ওপর নির্ভরশীল সেগুলোর উত্সস্থল হিমালয়।
নেপালের মন্ত্রীরা গতকাল রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে হেলিকপ্টারযোগে লুকলায় যান। লুকলার তেনজিং-হিলারি বিমানবন্দরে তাঁদের স্বাগত জানান স্থানীয় অধিবাসীরা।
উচ্চতার সঙ্গে সামঞ্জস্যবিধানের জন্য মন্ত্রীরা প্রথমে লুকলায় সমুদ্রপৃষ্ঠের দুই হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থান করবেন। মন্ত্রীরা বৈঠকস্থলে যাওয়ার মতো শারীরিকভাবে সক্ষম কি না, সেটা নির্ধারণ করার জন্য প্রথমে তাঁদের ডাক্তারি পরীক্ষা করা হবে।
মন্ত্রীদের সঙ্গে থাকবেন একদল চিকিত্সক। সঙ্গে নেওয়া হবে ৪০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার। বৈঠকে কোপেনহেগেনের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী মাধব কুমার নেপাল যে ভাষণ দেবেন, সেটা নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের স্থায়িত্ব হবে মাত্র ২০ মিনিট।

সোমালিয়ায় আত্মঘাতী বোমা হামলা, তিন মন্ত্রীসহ নিহত ১৯

সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসুর শামো হোটেলে গতকাল বৃহস্পতিবার এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় তিনজন মন্ত্রীসহ কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছেন। হামলার সময় ওই হোটেলে স্থানীয় বানাদির বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক-উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি অনুষ্ঠান চলছিল। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন সাংবাদিক রয়েছেন বলে জানা গেছে।
নিহত মন্ত্রীরা হলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী কামার আদেন আলী, শিক্ষামন্ত্রী আহমেদ আবদুলাহি ওয়াইল ও উচ্চতর শিক্ষামন্ত্রী ইব্রাহিম হাসান আদ্দাউ। তিন মন্ত্রী নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে কেনিয়ায় নিযুক্ত সোমালি রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ আলী নূর সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনুষ্ঠানে উপস্থিত আমাদের ক্রীড়ামন্ত্রী সুলেমান ওলাদ রবলে আহত হয়েছেন। তাঁর অবস্থা সংকটাপন্ন।’ তিনি বলেন, এ হামলায় ১৯ জন শিক্ষার্থী ও আরও ৪০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে খবরের সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি।
কর্মকর্তারা জানান, গতকাল ওই হোটেলে বানাদির বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৩ জন শিক্ষার্থীর স্নাতক সনদ প্রদান অনুষ্ঠান চলাকালে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে। এ সময় হোটেলের সম্মেলন কক্ষে পাঁচজন মন্ত্রীসহ কয়েক শ লোক উপস্থিত ছিলেন। বিস্ফোরণের পর হোটেলের ভেতর ও বাইরে হতাহত লোকজনকে পড়ে থাকতে দেখা যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীর বরাত দিয়ে আল-জাজিরার সাংবাদিক মোহাম্মদ আদাউ জানান, নারীর বেশ ধরা এক ব্যক্তি নিরাপত্তারক্ষীদের নজর এড়িয়ে সম্মেলন কক্ষে ঢুকে এই আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়। এ সময় কয়েকজন সাংবাদিক নিহত হন বলে তিনি জানান। দুবাইভিত্তিক টেলিভিশন নেটওয়ার্ক আল-আরাবিয়ার কর্মকর্তারা জানান, এ ঘটনায় হাসান আল-জুবায়ের নামে তাঁদের একজন ক্যামেরাম্যান নিহত হয়েছেন। সাবেলে রেডিও ও অপর এক বার্তা সংস্থার সাংবাদিকও এ ঘটনায় নিহত হন।
মোহাম্মদ আলী নূর বলেন, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে এ হামলা চালানো হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই দুঃসময়ে আমাদের দেশকে সহায়তা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।’
এখনো কেউ এ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেনি। বর্তমানে সোমালিয়ার ক্ষমতায় রয়েছে জাতিসংঘ সমর্থিত সরকার, যা ট্রানজিশনাল ফেডারেল গভর্নমেন্ট নামে পরিচিত। ইসলামি গেরিলারা এখন তাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। দেশের কিছু ছোট এলাকা তারা দখলও করে নিয়েছে।

বিন লাদেন পাকিস্তানে আছেন বলে মনে করেন না গিলানি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নতুন আফগান কৌশল সম্পর্কে আরও স্পষ্টতা চায় পাকিস্তান। তিনি বলেন, আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের কোথাও লুকিয়ে আছেন বলে তিনি মনে করেন না। গতকাল বৃহস্পতিবার লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের সঙ্গে বৈঠক শেষে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আফগানিস্তানে অতিরিক্ত ৩০ হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ঘোষণার প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী গিলানি বলেন, ‘আমরা নতুন কৌশল পরীক্ষা করে দেখছি। আমাদের এ ব্যাপারে আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।’ উল্লেখ্য, তালেবান বিদ্রোহীদের দমনে আফগানিস্তানে অতিরিক্ত ৩০ হাজার সেনা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা।
যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা যখন আরও স্পষ্ট হব, তখন দেখব যে কীভাবে আমরা ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারব।’
প্রধানমন্ত্রী গিলানি জানান, সামরিক সহযোগিতা আরও বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনার জন্য আফগানিস্তানে মার্কিন সেনা কমান্ডার জেনারেল স্ট্যানলি ম্যাকক্রিস্টাল পাকিস্তান সফরে যেতে পারেন।
প্রেসিডেন্ট ওবামা আফগানিস্তানে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ঘোষণা দেওয়ার পর গত বুধবার পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু ওই বিবৃতিতে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর ঘোষণাকে স্বাগত জানানো হয়নি। অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, এটা পাকিস্তানের জন্য হিতে বিপরীত হতে পারে।
গিলানি বলেন, আফগান পরিকল্পনা নিয়ে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির সঙ্গে কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের আশঙ্কা, আফগানিস্তানে আরও সেনা পাঠানোর ফলে জঙ্গিরা আবারও সীমান্তবর্তী এলাকায় চলে আসতে পারে এবং পাকিস্তানের সংঘাতকবলিত এলাকাকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে গিলানি বলেন, ‘আপনি যে তথ্য দিয়েছেন সেটার সত্যতা নিয়ে আমার সন্দেহ রয়েছে। কারণ আমি মনে করি না যে ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানে রয়েছেন।’
আল-কায়েদার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার এবং আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন ও তাঁর ডেপুটি আইমান আল-জাওয়াহিরিকে ধরার প্রচেষ্টা জোরদার করার জন্য গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ব্রাউন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী ব্রাউন বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পাকিস্তানের কাছে অনেক কিছু আশা করে।

ঢেউটিনের কাঁচামাল আমদানিতে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

ঢেউটিন উত্পাদনের কাঁচামাল জিপি শিট, সিআই শিট ও প্লেন শিট আমদানিতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ সিআর কয়েল উত্পাদনকারী ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিসিআরসিএমইএ)।
এর ফলে দেশের ছয়টি বড় ঢেউটিন উত্পাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখন হুমকির মুখে বলেও উল্লেখ করেছে সমিতি।
প্রাক-জাহাজীকরণ পরিদর্শন (পিএসআই) কোম্পানি ও কাস্টমসের একটি অসাধু চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে এ ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছে বিসিআরসিএমইএ।
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে সিআর কয়েল সমিতির একটি প্রতিনিধিদল এসব অভিযোগের কথা জানায়। সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ আক্তার কামালের নেতৃত্বে এতে কেডিএস স্টিল, এস আলম স্টিল, এপোলো ইস্পাত এবং পিএইচপির প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ আক্তার কামাল সাংবাদিকদের জানান, অর্থমন্ত্রী বিষয়টিকে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

পিকেএসএফের নতুন সভাপতি কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) সভাপতি হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি এবং ২০০৭ নোবেল পিস প্রাইজ উইনিং ইউএন ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) দলের একজন সদস্য।
জনাব আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ এমএ ডিগ্রি লাভ করেন এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্স (এলএসই) থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি গবেষণা এবং দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে অবদানের জন্য স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৯ সালে একুশে পদক লাভ করেন।
বর্তমানে তিনি গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদ (বিইউপি) এবং সাউথ এশিয়া রিজিওনাল স্টিয়ারিং কমিটি অব ইমাজিন এ নিউ সাউথ এশিয়ার সভাপতি। তিনি বাংলাদেশ গবেষণা উন্নয়ন পরিষদের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন।

আতিউর রহমানের স্বাক্ষরে ২০ টাকার নোট আসছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমান স্বাক্ষরিত সম্মুখপৃষ্ঠে ছোট সোনামসজিদ ও পশ্চাত্পৃষ্ঠে ধানক্ষেতের পাশে পানিতে চারজন কৃষকের পাট ধোয়ার দৃশ্যসংবলিত ১২৭ মিমি × ৬০ মিমি পরিমাপের ২০ টাকা মূল্যমানের নতুন মুদ্রিত নোট ৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের মতিঝিল অফিস থেকে ইস্যু হবে।
পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যান্য অফিস থেকেও এই নোটটি ইস্যু করা হবে। নতুন নোটের পাশাপাশি বর্তমানে প্রচলিত ২০ টাকার নোটও বৈধ হিসেবে চালু থাকবে।

রুগ্ণ শিল্পের নীতিমালা করা হবে: অর্থমন্ত্রী

রুগ্ণ শিল্পের দীর্ঘদিনের সমস্যা মোকাবিলায় নতুন একটি নীতিমালা করার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী এও বলেছেন, ‘রুগ্ণদের ঘুরে দাঁড়ানোর দায়িত্ব তাদের নিজেদেরই। ১৫ বছরে যারা দাঁড়াতে পারেনি, তাদের টিকে থাকার দরকার নেই।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ রুগ্ণ শিল্প সমিতির এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দলটির নেতৃত্ব দেন সমিতির সভাপতি চৌধুরী মুহাম্মদ ইসহাক।
সমিতি অর্থমন্ত্রীর কাছে রুগ্ণ শিল্পকে আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে সমস্যা সমাধানে দ্রুত ‘বাংলাদেশ রুগ্ণ শিল্প আইন’ প্রণয়ন এবং মন্দা মোকাবিলায় ঘোষিত প্রণোদনা গুচ্ছ থেকে অর্থ সহায়তার দাবি জানায়।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের অসহযোগিতা, নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অগ্নিকাণ্ড, নদীভাঙন, সরকারি নীতিমালার ধারাবাহিকতা না থাকাসহ অসংখ্য কারণে এসব শিল্প রুগ্ণ হয়েছে বলে অর্থমন্ত্রীর কাছে লিখিত দাবি তুলে ধরে সমিতি।
এতে দেশের রুগ্ণ শিল্পগুলোকে পুনরায় চালু করার স্বার্থে যেসব শিল্প ব্যাংক ঋণ থেকে অব্যাহতি পেতে চায়. তাদের বকেয়া মূল ঋণ কিস্তিতে পরিশোধের ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, রুগ্ণ শিল্পে বিদ্যমান সংকট নিরসন করতে একটি নীতিমালা করা হবে। ইতিমধ্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। একটি ভালো দিক হলো, সমিতি দাবিগুলো তুলে ধরেছে। নীতিমালা প্রণয়নের সময় এ দাবিগুলো বিবেচনা করা হবে।
অন্যদিকে সমিতির সভাপতি চৌধুরী মুহাম্মদ ইসহাক বলেন, ‘রুগ্ণ শিল্পের মধ্যে এমন অনেক শিল্প আছে, যেগুলোকে নীতিগত সহায়তা দিলেই পুনরায় চালু করা সম্ভব। আর চালু হলেই ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে তারা সক্ষম হবে।’
এক প্রশ্নের জবাবে সমিতির সভাপতি বলেন, রুগ্ণ শিল্পের মালিকদের ঋণ খেলাপি বলা যায় না। অর্থঋণ আদালতে তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে, তাও অবৈধ।

ঘুরে দাঁড়ানো বিশ্ব অর্থনীতি থেকে ফল পেতে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটাতে হবে -মেট্রো চেম্বারের অর্থনৈতিক পর্যালোচনা

দুর্বল অবকাঠামো, বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা, ব্যাংক ঋণের অত্যধিক সুদ, দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দেশের অর্থনৈতিক নিম্ন প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রভাবশালী বাণিজ্য সংগঠন এমসিসিআই। মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স (এমসিসিআই) মনে করে, ‘মন্দা কাটিয়ে বিশ্ব অর্থনীতি যে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, তার সুফল পেতে হলে আমাদের এসব অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও পদক্ষেপ নিতে হবে।’
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অর্থনৈতিক অবস্থার পর্যালোচনা করে শীর্ষস্থানীয় এ বাণিজ্য সংগঠনটি গতকাল বৃহস্পতিবার এ মতামত জানিয়েছে।
এমসিসিআই বলেছে, চলতি অর্থবছর শুরু হয় বিশ্বমন্দার বিরূপ প্রভাব কিছুটা কাটিয়ে ওঠার লক্ষণ নিয়ে। আন্তর্জাতিক অর্থবাজার স্থিতিশীল হতে থাকে এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিও চাঙা হতে আরম্ভ করে।
অথচ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে কিছু অবনতি পরিলক্ষিত হয়, যা বিস্ময়কর। যদিও গত অর্থবছরে বিশ্বমন্দার প্রথম আঘাত দেশ বেশ সফলতার সঙ্গে উের গেছে, রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধিও হয়েছে।
কিন্তু চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বিনিয়োগ কমে গেছে, রপ্তানি আয়েও বড় আঘাত এসেছে। একই সময়ে সরকারি উন্নয়ন ব্যয় এডিপিতে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার নিচে ছিল। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমেছে ৩৭ শতাংশ। উত্পাদনমুখী খাতে প্রবৃদ্ধি না থাকায় বেকারত্ব বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে শুরু করেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোতে বিশালাকারের নগদ তারল্য জমা হয়েছে।
পর্যালোচনায় এমসিসিআই বলেছে, ‘বড় আকারের মূল্যস্ফীতি আগামী মাসগুলোতে প্রতিহত করা যাবে না, যদি না অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে এ বিশাল আকারের তারল্য ব্যবহার করা যায়।’ এ সমস্যা দেশের মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে বলে মত চেম্বার সংগঠনটির। তাদের পরামর্শ, সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উচিত এ ব্যাপারে আশু পদক্ষেপ নেওয়া।
এসব সত্ত্বেও মেট্রো চেম্বার মনে করে, অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক লক্ষণ বিদ্যমান। বিশেষ করে কিছু শিল্প খাতের উত্পাদন ও রপ্তানি, যেমন—চামড়া, জুতা, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত খাদ্য, পাটজাত দ্রব্য ইত্যাদি খুবই উত্সাহব্যঞ্জক। ইতিমধ্যেই যে সহায়ক আর্থিক ও অর্থনৈতিক বিধিবিধান নেওয়া হয়েছে, তা অব্যাহত রাখলে এসব শিল্প খাত ভালো করবে। এর সঙ্গে অন্যান্য শিল্প খাতকেও অনুরূপ সহায়তার আওতায় নিয়ে আসা উচিত বলে সংগঠনটি মত দিয়েছে।
এমসিসিআই বলেছে, অনুকূল বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির প্রধান পূর্বশর্ত হচ্ছে সুষ্ঠু সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ, সুশাসন এবং উন্নত অবকাঠামো। এর সবগুলোতেই অন্য অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে।
বাণিজ্য সংগঠনটি বলেছে, ‘যখন বিশ্ব অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে তখন আমরা আমাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য বাহ্যিক কোনো কারণকে দায়ী করলে চলবে না। বরং আমাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাই যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে অন্তরায় তা বুঝতে হবে।’
এমসিসিআই আগের মতোই কৃষি খাতের প্রতি সরকারের অব্যাহত নীতিগত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যাতে এ খাতটি শুধু টিকে না থেকে আরও বেশি প্রবৃদ্ধি করতে পারে। একইভাবে শিল্প ও সেবা খাতে সরকারের দৃষ্টি প্রত্যাশা করেছে। যাতে বিশ্বমন্দার প্রভাব কাটিয়ে আরও প্রসার ঘটানো যায়। অনুরূপভাবে রপ্তানিকারকদের সহায়ক বাণিজ্য নীতিমালা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে সংগঠনটি। যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পণ্য আরও প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রবেশ করতে পারে ও প্রসার ঘটে।
অবকাঠামো বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে পিপিপি দ্রুত বাস্তবায়ন এবং এ জন্য সরকারের প্রস্তুতির আহ্বান জানিয়েছে এমসিসিআই। তারা বলেছে, ‘আমরা সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধির প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করছি, যাতে বিশালাকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাধাগ্রস্ত না হয়।’
এমসিসিআই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, বিশ্ববাজারে খাদ্য ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে, যার প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারেও অবধারিতভাবে পড়বে। সবার ওপরে যেটি রয়েছে সেটি হলো ব্যাংকগুলোতে বড় আকারের উদ্বৃত্ত তারল্য, যা মূল্যস্ফীতির জন্য একটা হুমকি। তারা বলেছে, ‘আমরা এটাও আশা করছি যে বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে বাড়তি তারল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’

কারা পড়বে ‘গ্রুপ অব ডেথে’?

প্রতিবার বিশ্বকাপের ‘ড্র’ হয়, আর আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা হা-হুতাশ করেন। ‘আহা, আবারও গ্রুপ অব ডেথ!’ ম্যারাডোনার অন্ধ-অনুসারীদের কেউ কেউ এর মধ্যে ফিফার পরোক্ষ ‘ষড়যন্ত্র’ও খুঁজে পান। আজ কি আবারও আর্জেন্টাইন সমর্থকদের হা-হুতাশ করার দিন?
আজ যে ২০১০ বিশ্বকাপের গ্রুপ নির্ধারণী লটারির দিন। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে সেই ড্র। চারটি পাত্রে থাকবে আটটি করে দল। প্রত্যেক পাত্র থেকে একটি একটি করে দলের নাম তুলে রাখা হবে ‘এ’ থেকে ‘এইচ’ পর্যন্ত আট গ্রুপের আট পাত্রে। এভাবেই চূড়ান্ত হবে বিশ্বকাপের ৮টি গ্রুপ। গত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে আলো ছড়িয়েছিলেন জার্মান সুপার মডেল হেইডি কাম। এবার মঞ্চে থাকবেন দক্ষিণ আফ্রিকার অস্কারজয়ী অভিনেত্রী শার্লিজ থেরন।
শুধু শুধু মঞ্চের সৌন্দর্যবৃদ্ধির জন্য থেরনকে ডাকা হয়নি। তিনি আসলে পুরো অনুষ্ঠানের সহযোগী। অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন ফিফা মহাসচিব জেরোম ভালকে। কাজটার সঙ্গে তিনি ভালোমতোই পরিচিত। গত বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানটাও পরিচালনা করেছেন তিনিই। সহযোগী হিসেবে মঞ্চে থাকবেন ডেভিড বেকহামও।
ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারের এই অনুষ্ঠানে থাকছেন নোবেল বিজয়ী ডেসমন্ট টুটু আর ফ্রেডেরিক ডব্লু ডি ক্লার্ক। ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে শান্তিতে নোবেল জিতেছিলেন যিনি, দক্ষিণ আফ্রিকার সেই অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা সশরীরে না থাকলেও পাঠাবেন ভিডিও বার্তা। বয়সটা ৯১ না হলে ম্যান্ডেলাও হাজির হতেন নিশ্চয়ই। আফ্রিকায় প্রথম বিশ্বকাপের অন্যতম উদ্যোক্তাও যে তিনি।
শুধু রুপালি পর্দার তারকা কিংবা নোবেল বিজয়ী জ্ঞানী-গুণীজনেরাই নন; দূরপাল্লার কিংবদন্তি দৌড়বিদ হেইলে জেব্রেসেলাসি, দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট দলে খেলা প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ক্রিকেটার মাখায় এনটিনি, দক্ষিণ আফ্রিকা রাগবি দলের অধিনায়ক জন স্মিথও থাকছেন। অনুষ্ঠানটা ফুটবলেরই। কিন্তু সব গোত্রের মানুষের এই উপস্থিতিই বলে দেয়, বিশ্বকাপ ফুটবলটা যে সবার!
অবশ্য ফুটবল-সংশ্লিষ্টদের আধিপত্যই থাকবে বেশি। এক ডিয়েগো ম্যারাডোনা বাদে ফুটবলের প্রায় সব সাবেক তারকাও হাজির হচ্ছেন। মিশেল প্লাতিনি, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার, ইউসেবিও, রজার মিলা...। ম্যারাডোনাও আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা যে তাঁর মাথার ওপর।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা আর ফিফা প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটার সূচনা ঘোষণা করবেন অনুষ্ঠানের। এর পরই হবে ড্র। ৯০ মিনিটের যে অনুষ্ঠান চাক্ষুষ উপভোগ করবেন ৩ হাজার দর্শক। বিশ্বজুড়ে টিভি পর্দায় প্রায় ২৫ কোটি মানুষ। সবারই যে উত্কণ্ঠা, কোন গ্রুপে পড়ছে কে? ৩২ দলের মধ্যে র্যাঙ্কিংয়ের সবচেয়ে নিচুতে দক্ষিণ আফ্রিকাই। সহজ গ্রুপের জন্য রীতিমতো প্রার্থনা চলছে।

যুদ্ধ এবং ফুটবল

একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, যেখানে জাতীয় পতাকায় গৌরবেরও রং মাখানো যায়, তাতে ভালো করার প্রত্যাশা থাকেই। ইসরাফিল কোহিস্তানিরও তেমনই প্রত্যাশা। বঙ্গবন্ধু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দলের সর্বোচ্চ ভালোটা চান আফগানিস্তান ফুটবল দলের অধিনায়ক।
টুর্নামেন্টটা ঢাকায়—এটা বাড়তি একটা অনুপ্রেরণা। গৃহযুদ্ধের রক্ত, ধ্বংস আর বিভীষিকা মাড়িয়ে আফগানিস্তান আন্তর্জাতিক ফুটবলে পুনর্বাসনের সকালটা তো দেখেছিল এই ঢাকাতেই। ২০০৩ ঢাকা সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপই ছিল তাদের জন্য সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। আফগানিস্তানের ফুটবল-হূদয়ে তাই ঢাকার আছে একটা বড় জায়গা।
বাংলাদেশে আসতে পারার আনন্দও প্রকাশ করলেন ২২ বছর বয়সী উইঙ্গার। পশতু ভাষায় বাংলাদেশের আতিথ্যের যে প্রশংসাবচন থাকল কোচ ইউসুফ কারাগারের মুখে, সেটির ইংরেজি ভাষান্তর করলেন ইসরাফিল। দলগঠন, প্রস্তুতি—যাবতীয় তথ্য আদান-প্রদানের প্রধান বাহকই হলেন তিনি। ইংরেজিটা বেশ সাবলীল। গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী কাবুল আন্তর্জাতিক মানবতাবাদ চর্চার অন্যতম কেন্দ্র, সেখানে বিদেশিদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই শানিয়ে নিয়েছেন ইংরেজি বাচন।
তাঁর ইংরেজিটা সবল হলেও দেশের ফুটবল এখনো দুর্বল। সরল স্বীকারোক্তিই করলেন আফগানিস্তান পেশাদার ফুটবল লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কাবুল ব্যাংকের খেলোয়াড়, ‘আমরা তো এখনো একটা নবীন দল, যেকোনো টুর্নামেন্টই আমাদের অনেক শেখায়।’ ক্রমাগত এই শিক্ষাই তাঁর বিশ্বাস বাড়ায়, আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষণায় আফগানিস্তানের ফুটবল মাথা তুলে দাঁড়াবেই। জার্মানি সরকারের দানে পাওয়া জার্মান কোচ ক্লাউস স্টার্ক যেমন একটা ভিত পুঁতে দিয়ে গেছেন। আফগানিস্তান সরকারও অনেক যত্নশীল। বছর তিনেক আগেও যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছিল খেলার মাঠ। এখন নতুন জাতীয় স্টেডিয়াম পেয়েছে রাজধানী কাবুল। ওই স্টেডিয়ামকে ঘিরেই এগোচ্ছে তাদের পেশাদার লিগ, ফুটবল। লিগে বিদেশিরা খেলে। কাবুল ব্যাংক দলেই আছে চারজন রুশ। তাঁরা বেতনও পান ভালো, মাসে চার হাজার ডলারেরও বেশি। যদিও স্থানীয় খেলোয়াড়দের বেতন এখনো ৫০০ থেকে ৬০০ ডলারের বেশি নয়। তবে দিনবদলের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছেন ইসরাফিল।
ছোটবেলায় যখন বুলেট আর বারুদের হাত থেকে বাঁচতে পরিবারের সঙ্গে আশ্রয় বদলাতে হতো, তখন ইসরাফিল ভাবতেই পারেননি এই দেশ কোনো দিন ফুটবল-স্বপ্ন দেখাবে। বারুদের গন্ধ এখন সীমিত হয়ে পড়েছে দূরের প্রদেশগুলোয়। বোমার শব্দে এখন খুব একটা কাঁপতে হয় না, দেখতে হয় না রক্তও। তবে একটা ভয়ঙ্কর স্মৃতি ইসরাফিলকে এখনো বিষণ্ন করে তোলে। বছরখানেক আগে কাবুলের ভারতীয় দূতাবাসের সামনে বোমা বিস্ফোরণটা দেখেছিলেন স্বচক্ষে। রক্ত আর সারি সারি লাশ...ভয়ঙ্কর সেই ছবি। তবে ওসব এখন ফুটবলের নিচে চাপা দিতে চান চিরতরে। তাঁর বিশ্বাস, ঢাকা হবে তাঁর ক্যারিয়ারের একটা মাইলফলক!

সবই দেখেছে বাংলাদেশ

কখনো গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়। কখনো ফাইনালে ওঠা। আবার কখনো শিরোপা আলিঙ্গন। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল-শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সব ধরনের অভিজ্ঞতাই হয়েছে বাংলাদেশের।
সুখকর অভিজ্ঞতা একবারই। ২০০৩ সালে দেশের মাটিতে শিরোপা জয়। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম-ভর্তি দর্শকের সামনে ফাইনালে প্রতিপক্ষ ছিল মালদ্বীপ। জয় এসেছিল টাইব্রেকারে।
এই মাহেন্দ্রক্ষণটা আসতে পারত ১৯৯৯ গোয়া সাফ ফুটবলেই। আসেনি ফাইনালে ভারতের কাছে ০-২ হেরে যাওয়ায়। তৃতীয় আসরে অপেক্ষার পালা শেষ হলেও সেই অর্জনটা ধরে রাখা যায়নি পরের টুর্নামেন্টে। করাচিতে ফাইনালে আবার ভারতের কাছে ০-২ গোলে হার।
তবু তো দুবার আশাটা বেঁচে ছিল ফাইনাল পর্যন্ত। একবার তো আশাপূরণই হয়েছে। পাঁচটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের তিনটিতেই ফাইনালে খেলা বাংলাদেশ কিনা বাকি দুটি টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বই পেরোতে পারেনি!
সর্বশেষ গত বছর কলম্বো সাফ ফুটবলে বাংলাদেশ কী করল? গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়া এই দলটাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর বড় কারণ নয়। আসল কারণ, দলে ছিল নানা দ্বন্দ্ব। খেলোয়াড়দের মধ্যে গ্রুপিং, কোচের কাজে হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের অবস্থা হয়েছিল পথ হারানো পথিকের মতো।
টুর্নামেন্টের আগে তড়িঘড়ি করে কয়েক দিন অনুশীলন, দায়সারা দু-একটা প্রস্তুতি ম্যাচ, দলে শেষ মুহূর্তে কার না-কার পছন্দের খেলোয়াড় ঢুকিয়ে দেওয়া—এসবই ডেকে এনেছিল ব্যর্থতা। আর এই ব্যর্থতায় সবচেয়ে বেশি পুড়েছেন কোচ-অধিনায়ক। তবে ’৯৭-তে অটো ফিস্টার-মোনেম মুন্না, ’৯৯-তে সামির শাকির-জুয়েল রানা, ২০০৫-এ ত্রুদ্ধসিয়ানি-জয়, ২০০৮-এ আবু ইউসুফ-আমিনুল জুটির চেয়ে আলাদা হয়ে আছে জর্জ কোটান-রজনী জুটি। এই জুটিই ২০০৩ সালে বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে অধরা শিরোপা।
’৯৭-এ গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেওয়ার কারণ হিসেবে সব কটি সাফ ফুটবলেই খেলা সাবেক অধিনায়ক হাসান আল মামুন বলছেন, ‘প্রস্তুতির অভাবই মূল কারণ ছিল সেবার। দলবদলের কারণে খেলোয়াড়দের নিয়ে টানাটানি চলছিল। অনুশীলন ব্যাঘাত হয়েছে খুব। যার পরিণতিতে গ্রুপ থেকেই বাদ।’ এই ডিফেন্ডারের চোখে গতবারের ব্যর্থতার কারণ, ‘প্রস্তুতি ভালোই ছিল। কিন্তু শেষ সময়ে দলে তিনজন খেলোয়াড় যোগ করায় ছন্দপতন হয়েছে। এই পরিবর্তন না হলেই ভালো হতো।’
১৯৯৯ টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠেও বাংলাদেশ শিরোপা জিততে পারেনি কেন? মামুনের কাছে কারণটা পরিষ্কার, ‘তখন ভারত আমাদের চেয়ে এগিয়ে ছিল। ওই পরাজয়কে স্বাভাবিকই বলব।’ ২০০৫? ‘অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম আমরা। ফাইনালে তাই হেরে গেছি।’ ২০০৩? ‘এবার মূল টিম স্পিরিট ছিল তুঙ্গে। তখন বয়-বেয়ারা থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত দলের ভালো নিয়ে চিন্তা করত। সবদিক থেকেই সহযোগিতা পেয়ে আমরা জিতেছিলাম’—হাসান আল মামুন কি সবাইকে একাত্ম হওয়ার কথাই মনে করিয়ে দিলেন আবার?

এবার জুতো আক্রমণের শিকার হলেন জায়েদি নিজেই

গত বছরের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে জুতো ছুড়ে মেরে খবরের শিরোনাম হয়েছিলেন ইরাকি সাংবাদিক মুনতাজার আল জাইদি। এক বছর পর তিনি নিজেই জুতো আক্রমণের শিকার হলেন। এবার তাঁর দিকে জুতো ছুড়ে মেরেছেন তাঁরই স্বদেশি এক সাংবাদিক। খবর বিবিসি অনলাইনের।
গতকাল মঙ্গলবার প্যারিসে ইরাক যুদ্ধের শিকার সাধারণ মানুষ সম্পর্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন জাইদি। এ সময় তিনি হামলার শিকার হন। তবে বুশের মতোই মাথা নিচু করে আঘাত এড়ান তিনি। জুতোটি তার পিছনের দেওয়ালে লেগে পড়ে যায়।
হামলাকারী ইরাকি সাংবাদিক সাদ্দামের শাসনামলে নির্যাতিত হন এবং দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি জাইদির বিরুদ্ধে ইরাকে একনায়কত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করার অভিযোগ আনেন।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক সফরকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সময় মুনতাজার আল জাইদি তাঁর দিকে জুতো ছুড়ে মারেন। জুতো ছুড়ে মারার দায়ে তাঁর কয়েক মাস জেলও হয়। তবে এই ঘটনায় গোটা আরব বিশ্বের জনগণের কাছে মুনতাজার একজন জাতীয় বীরে পরিণত হন।

জারদারি কি কেবল রাষ্ট্রপ্রধান হয়েই থাকতে চান?

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি চাপের মুখে পড়ছেন। চারদিক থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমস্যা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। পাকিস্তানের গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা, মহাপরাক্রমশালী সামরিক বাহিনী ও পার্লামেন্টের সদস্যরা তাঁদের প্রেসিডেন্টকে চাপে রেখেছেন। এই চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট জারদারি সাময়িকভাবে হলেও নিজেই নিজের কিছু ক্ষমতা রদ করতে উদ্যত হয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগের ফলে তিনি হতে চলেছেন পাকিস্তানের ইতিহাসের সবচেয়ে কম ক্ষমতার অধিকারী একজন প্রেসিডেন্ট।
পাকিস্তানি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ও ভারতের প্রতি নরম মনোভাবের জন্য প্রেসিডেন্ট জারদারির ওপর কিছুটা অখুশি। তবে পাকিস্তানি সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যেহেতু পাকিস্তান সামরিক বাহিনী তাদের চলমান তালেবানবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক যন্ত্রপাতির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল, সেহেতু তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সম্পর্ককে মেনেই নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দিন আগে প্রেসিডেন্ট জারদারির কাছে বিশেষ দূত পাঠিয়ে পাকিস্তানের কাছে ‘বিশেষ কৌশলগত’ সম্পর্কের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে।
রাজনৈতিক দিক দিয়ে চাপের মুখে পড়তে পড়তেও বেঁচে গেছেন প্রেসিডেন্ট জারদারি। বেঁচে গেছেন না বলে বলা উচিত তাঁকে বাঁচিয়েছেন তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তান মুসলিম লিগ—নওয়াজপ্রধান ও পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। সম্প্রতি তিনি এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেছেন, পাকিস্তানের গণতন্ত্রের স্বার্থেই কোনো প্রকার মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঘোর বিরোধী তিনি। এমনকি তিনি ক্ষমতার ভাগাভাগিতেও যেতে রাজি নন। তবে অনেকে মনে করেন, মুখে নওয়াজ এ কথা বললেও তিনি জারদারিকে সময় দিয়ে দেখছেন। তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন, জারদারি নিজেই একদিন নিজের ধ্বংস ডেকে আনবেন। নওয়াজ শরিফ হয়তো সেই দিনটির অপেক্ষায়ই রয়েছেন।
নওয়াজ শরিফ তাঁর সেই টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে বলেছেন, গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তান অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। তিনি এ জন্য পাকিস্তানের স্বার্থান্বেষী রাজনীতিকে দায়ী করেছেন।
ওয়াশিংটন পোস্ট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের আরেক হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীকে। তবে বিচারপতি ইফতিখারও কেন যেন নিজেকে ‘জারদারি ঘায়েল’ কর্মকাণ্ড থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছেন। কারণ কিছুদিন আগেও তিনি জারদারির বিরুদ্ধে যতটা সোচ্চার ছিলেন, এখন তিনি ততটাই নরম।
এদিকে কিছু ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির সঙ্গেও জারদারির মতবিরোধ দানা বেঁধেছে। পাকিস্তান দেশটি আসলে কে চালাচ্ছে, জারদারি না গিলানি—এ নিয়েও নানা বিতর্ক নানা সময়ে উঠে এসেছে। গত শুক্রবার জারদারি নিজের ক্ষমতা কমানোর পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ প্রধানমন্ত্রীর হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। এরই মধ্যে তিনি পার্লামেন্ট বিলুপ্ত করার ক্ষমতাও ছেড়ে দিয়েছেন। জারদারি-গিলানি ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জার্মানি সফররত প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি বলেছেন, ‘জারদারি নন, দেশ আমিই চালাই।’ প্রেসিডেন্ট জারদারি অবশ্য একের পর এক নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রী গিলানির হাতে ছেড়ে দিয়ে নিজেদের ভঙ্গুর রাজনৈতিক সম্পর্ক জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। রাজনৈতিক চাপ থেকে বাঁচতে জারদারি হয়তো পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক প্রধান হয়েই থাকতে চান।

মাইডাসের সঙ্গে ইউবিআইসিওর চুক্তি স্বাক্ষর

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করা এবং নতুন শিল্পোদ্যোক্তাদের উত্সাহিত করতে মাইডাস ফাইন্যান্সিং লিমিটেড সম্প্রতি ইউএই-বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানির (ইউবিআইসিও) সঙ্গে একটি বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
বিনিয়োগ চুক্তি অনুযায়ী এসএমই খাতকে আরও উন্নত ও গতিশীল করতে ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যে ইউবিআইসিও মাইডাস ফাইন্যান্সিংকে নিয়মিত অর্থায়ন করবে।
মাইডাসের ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে মাইডাসের চেয়ারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান, ইউবিআইসিওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এস এম আকবর, মাইডাসের এমডি (চলতি দায়িত্ব) শফিক-উল-আজম, মহাব্যবস্থাপক মো. আতিয়ার রহমান আনছারী, কোম্পানি সচিব মো. দীন ইসলাম মিঞা, ইউবিআইসিওর ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক মামলুক হোসেন, উপব্যবস্থাপক ফয়সাল রশীদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ইউবিআইসিওর এমডি এস এম আকবর মাইডাসের এমডি শফিক-উল-আজমের কাছে দুই কোটি টাকার চেক হস্তান্তর করেন।

চট্টগ্রামের কেরানীহাটে পূবালী ব্যাংকের শাখা উদ্বোধন

পূবালী ব্যাংক লিমিটেডের ৩৭৫তম শাখা চট্টগ্রামের কেরানীহাটে সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে। পূবালী ব্যাংকের পরিচালক আহমদ শফি চৌধুরী প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শাখাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন পূবালী ব্যাংকের পরিচালক ফাহিম আহমদ ফারুক চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমদ চৌধুরী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্থানীয় সাংসদ, ইমাম গ্রুপের চেয়ারম্যান, এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ীসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পূবালী ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক শফিউল আলম খান চৌধুরী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. ফজলুল হক, চট্টগ্রাম দক্ষিণ অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক রওশন আক্তার, চট্টগ্রাম উত্তর অঞ্চলের উপমহাব্যবস্থাপক সিরাজুল ইসলাম মিয়া, সিডিএ করপোরেট শাখার উপমহাব্যবস্থাপক শহীদুল হক ও আগ্রাবাদ করপোরেট শাখার উপমহাব্যবস্থাপক প্রতীক করিম।

সিলেটের বিশ্বনাথে সাউথইস্ট ব্যাংকের এসএমই কেন্দ্র উদ্বোধন

সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেড সম্প্রতি সিলেটের বিশ্বনাথে পঞ্চম এসএমই সেবাকেন্দ্র উদ্বোধন করেছে। ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান রাগীব আলী আনুষ্ঠানিকভাবে সেবাকেন্দ্রটির উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পরিচালক মো. সৈয়দ সাহেদ আলী, এম এ আহাদ, সাবেক উদ্যোক্তা পরিচালক বিমলেন্দু দে, এসইভিপি মোহাম্মদ গোফরান, মুহাম্মদ শাহজাহান, সহিদ হোসেনসহ অন্যরা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, আমানতকারী এবং গ্রাহকদের বিশ্বনাথ এসএমই সেবাকেন্দ্র থেকে আধুনিক সুবিধাদি নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

মংলা বন্দরের উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই

মংলা বন্দরকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক করে তোলার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডেভিড উইগনাল অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে।
গতকাল বুধবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর এম ফারুক ও ডেভিড উইগনাল অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেভিড উইগনাল নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। এ সময় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, জাতীয় সংসদের হুইপ ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরী, খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করেছিল মংলা বন্দরের উন্নয়ন করা হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী এ বন্দরের উন্নয়নে অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনগণের কাছে এ বন্দরের গুরুত্ব অপরিসীম।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২০১০ সালের জুন মাসে ডেভিড উইগনাল অ্যাসোসিয়েট প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি সমঝোতা চুক্তি সই করবে। এই চুক্তি হলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করবে। উন্নয়নকাজের মধ্যে রয়েছে চ্যানেল সংরক্ষণ ও ড্রেজিং, স্থাপনা ও বাণিজ্যিকীকরণ, শিল্পপার্ক স্থাপন ও বন্দর এলাকা বাড়ানো।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার জন্য প্যাকেজ পুনর্বিবেচনার দাবি -অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বিকেএমইএর সাক্ষাত্

পোশাকশিল্প খাতের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোকে প্রণোদনা দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)।
বিকেএমইএর দাবি, মন্দা মোকাবিলায় গত মাসের শেষ সপ্তাহে যে দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, তাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলোর তেমন কোনো লাভ হবে না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানার জন্য কার্যকর হবে যদি এ বিষয়ে গঠিত বিশেষ ওয়ার্কিং কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যায়।
গতকাল বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে সাক্ষাত্ করে এসব দাবির কথা জানায় বিকেএমইএর একটি প্রতিনিধিদল। সংগঠনটির সভাপতি ফজলুল হকের নেতৃত্বে সহসভাপতি এম এ বাসেত ও জাহিদুল হক ভূঁইয়া এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
লিখিত বক্তব্যে বিকেএমইএ জানায়, মন্দা মোকাবিলায় গত ১৮ নভেম্বর একটি বিশেষ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি বস্ত্র খাতের জন্য যেসব সুপারিশ করেছে, চূড়ান্ত প্যাকেজে তা ঠিক রাখা হয়েছে। শুধু বদলে দেওয়া হয়েছে ছোট ও মাঝারি কারখানার ক্ষেত্রে। ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ছোট ও মাঝারি পোশাক কারখানার জন্য যে প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারবে না। এদের জন্য ঘোষিত সুপারিশগুলো বরং মূল সুপারিশের আদলে করতে হবে।
বিশেষ ওয়ার্কিং কমিটি গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ৩৫ লাখ ডলার পর্যন্ত রপ্তানি করেছে, তাদের চলতি অর্থবছরের বৈদ্যুতিক বিলের ওপর ১০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া ও এ সুবিধা ২০১০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বজায় রাখার এবং রপ্তানির অতিরিক্ত ১০ শতাংশ পর্যন্ত ৫ শতাংশ হারে রপ্তানি প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
বিকেএমইএর মতে, দ্বিতীয় প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর দেখা যায়, যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কেপটিভ জেনারেটর কিংবা ডিজেলচালিত জেনারেটর নেই, চলতি অর্থবছরে কেবল তাদের পরিশোধিত বিদ্যুত্ বিলের ওপর ১০ শতাংশ হারে অনুদান দেওয়া হবে। এ ছাড়া গত অর্থবছরের প্রকৃত রপ্তানি থেকে অতিরিক্ত রপ্তানি হলে এ রপ্তানির ওপর অতিরিক্ত ৫ শতাংশ হারে রপ্তানি প্রণোদনা সহায়তা দেওয়া হবে।
বিকেএমইএর সভাপতি ফজলুল হক প্রথম আলোকে জানান, বিকেএমইএর যুক্তির সঙ্গে অর্থমন্ত্রী একমত হয়েছেন। ভুল বোঝাবুঝির কারণে এমনটি হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। শিগগির বিষয়টির সুরাহা করারও আশ্বাস দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

সবচেয়ে বেশি অভিযুক্ত করা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে by শওকত হোসেন

মিডিয়া সেন্টারের ডিসপ্লে বোর্ডে প্রতিদিনকার সংবাদ সম্মেলনের সূচি দেওয়া থাকে। শেষদিন অর্থাত্ আজকের জন্য যে তালিকা দেওয়া আছে তাতে সবার আগে নাম যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি রোনাল্ড কার্কের। দুই দিন আগে থেকেই বলা হচ্ছে, তিনি একটি সংবাদ সম্মেলন করবেন। এখন (এই প্রতিবেদন লেখার সময়) জেনেভা সময় সকাল ১০টা। এখন পর্যন্ত বলা হলো না কার্কের সংবাদ সম্মেলনটা কখন হবে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মন্ত্রী পর্যায়ের সপ্তম সম্মেলনে তুলনামূলকভাবে সংবাদ সম্মেলন কম হচ্ছে। তার পরও প্রতি ঘণ্টায় কোনো না কোনো দেশ বা গ্রুপ সাংবাদিকদের অগ্রগতি জানিয়ে যাচ্ছে। তবে নিঃসন্দেহে সবার চোখ পড়ে আছে রন কার্কের দিকে।
এমনিতেই কিছু দেশ ডব্লিউটিওর আলোচনা বিশেষ করে দোহা উন্নয়ন আলোচনার ধীরগতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে। এর মধ্যে শীর্ষে আছে ব্রাজিলের নাম। দেশটির দলনেতা পররাষ্ট্রমন্ত্রী চেলসো অ্যামোরিম বলেছেন, আগের যেকোনো বাণিজ্য আলোচনায় উন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবদান ছিল অনেক বেশি। এখন যদি প্রত্যাশা করা হয়, আলোচনার সফল সমাপ্তির জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বাড়তি ছাড় দিতে হবে, তাহলে সেটি হবে অযৌক্তিক।
ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমরা সমস্যার মধ্যে আছি। স্থবির হয়ে যাওয়ার সমস্যায় সবাই। এই সমস্যা উত্তরণে যত দেরি হবে তত বেশি অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং মানুষ চাকরি হারাবে। আর গরিব দেশগুলোতে এর ফলে অনেক কম মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হয়ে আসতে পারবে।’
এদিকে গতকাল সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে দিনভর প্রতিনিধিরা ডব্লিউটিওর কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করেছেন। এ ছাড়া এ সময় দোহা উন্নয়ন পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
এই কর্ম-অধিবেশনের আলোচনায় একটি বড় অংশ ছিল আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি। অনেক দেশই বহুপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনা বাদ দিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য আলোচনা ও চুক্তি করছে। এর মধ্যে কিছু কিছু আলোচনা ও চুক্তি ডব্লিউটিওর মৌলিক নীতির বাইরে চলে যাচ্ছে।
সম্মেলনে সবাই একমত, এ ধরনের আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বহুপক্ষীয় বাণিজ্য আলোচনার জন্য ক্ষতিকর। সবাই মনে করেন, এমনভাবে আলোচনা করতে হবে, যা বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থার পরিপূরক হয়। এসব ক্ষেত্রে বাণিজ্য উদারীকরণের নীতিমালা যেন বজায় থাকে তাও নিশ্চিত করতে হবে।
এ সময় আরও আলোচনা হয়েছে, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বাজারসুবিধা দেওয়াই পর্যাপ্ত হবে না। কেননা, বাজারসুবিধা দেওয়া হলেও সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তা না হলে বাজারসুবিধা কাজে লাগানো যাবে না।
বিশেষ করে সরবরাহের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতে হবে। আর এ জন্য বাণিজ্যের জন্য সাহায্য বা এইড ফর ট্রেড-সুবিধা বাড়াতে হবে। অনেকগুলো দেশের প্রতিনিধি এ সময় বলেছেন, উন্নত দেশগুলো যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা যেন তারা রক্ষা করে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এমনিতেই অর্থায়ন সমস্যায় ভুগছে। বিশেষ করে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা তারল্য সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এর ফলে এইড ফর ট্রেড কতখানি সম্প্রসারিত হবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। ডব্লিউটিওর মহাপরিচালক প্যাসকাল লামি এই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। তিনি নিজেও এ সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন।
সবশেষে এই বৈঠকে নতুন সদস্যদের অন্তর্ভুক্তি দ্রুত করারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করে সদস্য হতে আগ্রহীদের নিয়ে সম্মেলনে বলা হয়, অনুন্নত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া হচ্ছে না।

ম্যারাডোনাকে ঢুকতেই দেবে না ফিফা

বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে শেষ পর্যন্ত না আবার একটা কেলেঙ্কারি হয়ে যায়। ফিফার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ডিয়েগো ম্যারাডোনা যদি ড্র অনুষ্ঠানে চলেই যান, সেখান থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হবে বলে জানিয়ে রেখেছেন ফিফা কর্তারা। একটা গুঞ্জন ভাসছে—ডিয়েগো ম্যারাডোনা বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে যেতে পারেন। এটা শুনেই ফিফা কর্তারা বলেছেন এমন কথা।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে উরুগুয়েকে হারিয়ে চূড়ান্ত পর্ব নিশ্চিত হওয়ার পর সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে যা-তা বলেছিলেন আর্জেন্টিনার কোচ। করেছিলেন ছাপার অযোগ্য গালাগালি। এর শাস্তিস্বরূপ ফিফা তাঁকে দুই মাসের জন্য ফুটবলসংশ্লিষ্ট সবকিছু থেকে নিষিদ্ধ করেছে। এ কারণেই আগামীকাল অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না ’৮৬ বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
কিন্তু খবর রটেছে, যেকোনোভাবে ম্যারাডোনা ওই অনুষ্ঠানে থাকবেন। কেপটাউনে যোগ দেবেন বিশ্বকাপে চূড়ান্ত পর্বে ওঠা অন্য ৩১ দলের কোচদের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত আজেন্টাইন বহরের সঙ্গে যাওয়ার অ্যাক্রেডিটেশন না পেলে কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক হিসেবে অ্যাক্রেডিটেশন নেওয়ার চেষ্টা করবেন।
তবে ফিফা বলে দিয়েছে, ম্যারাডোনাকে কোনোভাবেই অনুষ্ঠানের প্রবেশপত্র দেওয়া হবে না। ‘আমরা তাঁকে দক্ষিণ আফ্রিকা আসা থেকে বিরত রাখতে পারি না। কিন্তু তিনি ড্র অনুষ্ঠানে আসতে পারবেন না। তিনি যদি কোনো মিডিয়া কোম্পানির সাংবাদিক হিসেবেও আসতে চান, তাহলেও তাঁকে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড দেবে না ফিফা’—কাল জানিয়ে দিয়েছেন ফিফার মহাসচিব জেরোম ভালকে।
এরই মধ্যে আর্জেন্টিনার ফুটবল ফেডারেশনকেও এ ব্যাপারে চিঠি পাঠিয়েছে ফিফা—লক্ষ্য রাখবেন, ম্যারাডোনা কিন্তু নিষিদ্ধ।

আইসিএলের টাকা কি আর পাবেন ওঁরা?

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পথে প্রথম পদক্ষেপটা নিয়েই ফেলেছে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল)। আইসিসির ‘অপরাধ’—আইসিএলকে তারা মূল স্রোতের ক্রিকেট হিসেবে অনুমোদন দিচ্ছে না। তবে আইসিএলের আইনি লড়াই নিয়ে খুব কম লোকেরই এখন কৌতূহল আছে। জি নেটওয়ার্কের স্বত্বাধিকারী এসেল গ্রুপের সাড়া জাগানো এই টি-টোয়েন্টি লিগ এখন একটা মৃত ঘোড়ার বেশি কিছু তো নয়!
সমস্যা হলো, আইসিএলের মুমূর্ষু অবস্থা মুছে দিতে চাইছে আইসিএলের সঙ্গে ক্রিকেটারদের দেনা-পাওনার হিসাবগুলোও। অন্যদের কথা বাদ দিন—জ্যাসন গিলেস্পি, মাইকেল কাসপ্রোভিচ ও ডেমিয়েন মার্টিনের মতো সাবেক তারকারাও চুক্তি অনুযায়ী প্রতিশ্রুত অর্থ পাননি। এবার তাই কাঠগড়ায় ওঠার উপক্রম আইসিএলেরই। ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক সংস্থা ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ফিকা) আইসিএলের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ এনেছে। ফিকা-প্রধান টিম মের দাবি, আইসিএলের অনেক ক্রিকেটার, কর্মকর্তা এবং সাপোর্ট স্টাফ এক বছর ধরে আইসিএল থেকে কোনো টাকা পাচ্ছেন না, ‘সব মিলিয়ে টাকাটা কয়েক মিলিয়ন ডলার। আইসিএল এই টাকা দেওয়ার নানা তারিখ দিয়েছে ফিকাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই তারিখগুলো অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পর টাকা পাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।’ ফিকা-প্রধান জানিয়েছেন, সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ক্রিকেটাররা এখন আইনি পথে যাওয়ার কথাই ভাবছেন, ‘একটার পর একটা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ আর আইসিএল কর্মকর্তাদের ব্যাপারটা এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতায় খেলোয়াড়েরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তাঁরা মনে করছেন, ব্যাপারটা আর শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হওয়ার সুযোগ নেই। আইনি পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই তাঁদের হাতে।’
ফিকা আইনি পদক্ষেপ নিয়ে সফল হলে সেটার সুফল হয়তো বাংলাদেশের আইসিএল-ফেরত ক্রিকেটাররাও পাবেন। তবে নিজেরাই চুক্তি বাতিল করে আসায় বকেয়া টাকার জন্য তাঁদের দাবি অতটা জোরালো নয়। ঢাকা ওয়ারিয়র্স অধিনায়ক হাবিবুল বাশার যেমন বললেন, ‘আমাদের দ্বিতীয় কিস্তির টাকা দেওয়ার কথা ছিল এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু চুক্তি বাতিলের সময় আইসিএল থেকে আসা অনাপত্তিপত্রে লেখা ছিল—এতে সই করার পর ২০০৯-এর ১ জানুয়ারি থেকে আইসিএলের সঙ্গে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক, কোনো লেনদেন থাকবে না। সে হিসাবে আমাদের আর কোনো পাওনা থাকার কথা না। আমরাও আশা ছেড়ে দিয়েছি। তবে উইনিং মানি ও ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার বাবদ ঢাকা ওয়ারিয়র্সের অনেক টাকা পাওনা আছে আইসিএলের কাছে।’ হাবিবুল জানিয়েছেন, আইসিএলে জেতা পাঁচ ম্যাচে ২৫ লাখ ডলার করে মোট ১ কোটি ২৫ লাখ ডলার উইনিং মানি হিসেবে পাওয়ার কথা তাঁদের। এর সঙ্গে যোগ হবে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কারের টাকা। ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার পর অলক কাপালি, নাজিমউদ্দিনরা যে মোটরবাইকগুলোয় বসে ছবির জন্য পোজ দিতেন, সেগুলো আসলে ছিল শুধু ছবি তোলার জন্যই। পুরস্কার হিসেবে মোটরবাইকের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ দেওয়ার কথা থাকলেও সেটা আসেনি কারও পকেটেই।
আইসিএলের সঙ্গে ঢাকা ওয়ারিয়র্স ক্রিকেটারদের তিন বছরের চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বছরের টাকার অর্ধেক তাঁরা প্রথম কিস্তিতে পেলেও এর পর আর কোনো টাকা পাননি। বাকি টাকা সমান দুই কিস্তিতে পাওয়ার কথা ছিল। দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পাওয়ার কথা ছিল এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে, তৃতীয় কিস্তি তার দুই মাস পর। কিন্তু আইসিএল ছাড়ার অনাপত্তিপত্রটা ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়ায় কাগজে-কলমে বাকি অর্ধেক টাকা আর পাওয়ার কথা নয় কারও। শাহরিয়ার নাফীস এটা মেনে নিয়েও বলছেন, ‘যারা আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে, তারা দুই বছর খেলে এক বছরের টাকা পেয়েছে। আর আমরা ছয় মাস খেলে ছয় মাসেরই টাকা পেয়েছি। তার পরও ফিকা যদি কোনো উদ্যোগ নেয়, আশা করি, সেটার সুফল সবাই পাবে। অন্তত বকেয়া উইনিং মানির টাকাগুলো পাওয়া যেতে পারে।’ জানা গেছে, আইসিএল ক্রিকেটারদের ব্যাপারে ফিকা তাদের উদ্যোগ সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করছে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবকে।
ঢাকা ওয়ারিয়র্স ক্রিকেটারদের মধ্যে শাহরিয়ারের চুক্তিটাই ছিল সবচেয়ে বড় অঙ্কের। তিন বছরের চুক্তির প্রতিবছরে তাঁর পাওয়ার কথা ছিল ২ লাখ ২০ হাজার ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দেড় কোটি) করে। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী অন্যদের চুক্তির অঙ্ক ছিল বছরপ্রতি এ রকম—আফতাব আহমেদ ২ লাখ ডলার, অলক কাপালি ১ লাখ ৭০ হাজার, নাজিমউদ্দিন ১ লাখ ৫০ হাজার, ফরহাদ রেজা ১ লাখ ৩০ হাজার, হাবিবুল ও ধীমান ঘোষ ১ লাখ করে, মোশাররফ হোসেন ৯০ হাজার, মোহাম্মদ রফিক ৬০ হাজার, মোহাম্মদ শরীফ ও মঞ্জুরুল ইসলাম ৩০ হাজার করে, তাপস বৈশ্য ২৫ হাজার এবং গোলাম মাবুদ ও মাহবুবুর রহমান ২০ হাজার ডলার করে। আইসিএলের কাছ থেকে সবাই পেয়েছেন এর অর্ধেক।
আইসিএল যতই বলুক আগামী ফেব্রুয়ারিতে আবার তারা মাঠে নামাবে ক্রিকেট, বাংলাদেশের সাবেক আইসিএল ক্রিকেটাররা সেটা নিয়ে এখন আর মাথা ঘামাচ্ছেন না। পাওনা টাকাটাও সবাই যেন ছেড়েই দিয়েছেন। মোহাম্মদ শরীফ তো বলেই দিলেন, ‘টাকা নিয়ে আর ভাবছি না। আবার দেশের ক্রিকেটে ফিরেছি, দেশের মাঠে খেলতে পারছি—এটাই বড় কথা।’

কে পাকিস্তানের তিন নম্বর?

ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভে দ্বিতীয় টেস্ট শুরুর আগে সুসংবাদ এবং দুঃসংবাদ দুটোই ছিল পাকিস্তানের। সুসংবাদটা এসেছিল এক দিন আগেই—ইনজুরির কারণে খেলছেন না প্রথম টেস্টের ম্যান অব দ্য ম্যাচ শেন বন্ড। আর দুঃসংবাদ—তিন নম্বরে ব্যাটিং করতে রাজি নন তাদের কোনো ব্যাটসম্যান!
এ লেখা যখন পাঠকদের কাছে পৌঁছাবে, ততক্ষণে শুরু হয়ে যাবে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট। পাকিস্তান প্রথমে ব্যাটিং করলে হয়তো জেনেও গেছেন বাধ্য হয়ে কাকে নামতে হয়েছে তিন নম্বরে। তবে পাকিস্তানের পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, এই টেস্ট শুরুর আগে পাকিস্তান শিবিরে আলোচনা ছিল একটাই—‘কে ব্যাট করবেন তিনে?’
ডানেডিনে তিনে ব্যর্থ ফাওয়াদ আলম (২৯ ও ৫)। গুরুত্বপূর্ণ এই জায়গায় সিনিয়রদের কেউ দায়িত্ব নিলেই তো হয়। কিন্তু মোহাম্মদ ইউসুফ ও শোয়েব মালিকের কেউই তিনে ব্যাট করতে রাজি নন। রাজি নন ওয়েলিংটনে দলের সঙ্গে যোগ দেওয়া মিসবাহ-উল হকও। পাকিস্তান দলের এক সূত্র বলছে, তিনে ব্যাট করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল প্রথম টেস্টে বাইরে থাকা ফয়সাল ইকবালকেও। তাঁরও নাকি তিনে অনীহা!
ওয়েলিংটনে পাকিস্তানের বড় সমস্যা হতে পারে বেসিন রিজার্ভের পেস-বান্ধব উইকেট। নিউজিল্যান্ডে গ্রীষ্মের শুরু হতে না-হতেই মাঠে নামতে হচ্ছে বলে সিমিং উইকেট নিয়ে একটা শঙ্কা ছিল পাকিস্তানের। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ডানেডিন টেস্টে ব্যাটিংয়ে খুব ভালো করতে না পারলেও নিউজিল্যান্ডের চিরাচরিত সিমিং কন্ডিশনের মুখোমুখি হতে হয়নি পাকিস্তানকে। কিন্তু ওয়েলিংটনে হতে হবে। বন্ড না থাকার পরও তাই খুব বেশি স্বস্তিতে থাকতে পারছে না পাকিস্তান। বন্ডের জায়গায় দলে ফিরেছেন টিম সাউদি। তবে তাঁকে পেছনে ফেলে চূড়ান্ত একাদশে জায়গা করে নিতে পারেন ড্যারিল টাফি। ইনজুরি-ফর্মহীনতা-আইসিএল মিলিয়ে যিনি সর্বশেষ টেস্ট খেলেছেন ২০০৪ সালের জুনে।
১৯৮৪-৮৫ মৌসুমের পর পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ জেতেনি নিউজিল্যান্ড। এবার সিরিজ জয়ের দারুণ একটা সুযোগ তাদের সামনে। তবে সতীর্থদের সতর্ক করে দিয়েছেন অধিনায়ক ড্যানিয়েল ভেট্টোরি, ‘সিরিজটা ভালো খেলেই জিততে হবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১-০-তে এগিয়ে যাওয়ার আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে শুরু করায় সিরিজ হারতে হয়েছিল আমাদের।’
দুই দেশের টেস্ট লড়াইয়ে বেসিন রিজার্ভের ইতিহাস অবশ্য পাকিস্তানের পক্ষে। এখানে ছয় টেস্টের একটিতেও হারেনি পাকিস্তান। চারটি টেস্ট ড্র, দুটিতে জয় পাকিস্তানের। আর দুটি জয়ই এসেছে সর্বশেষ দুই টেস্টে।
এই ম্যাচ দিয়েই বেসিন রিজার্ভ ৫০তম টেস্ট আয়োজন করা টেস্টের ১১তম ভেন্যু হিসেবে নাম লেখাল রেকর্ডবুকে।

বাংলাদেশের ভাবনায় শুধুই শিরোপা

সংবাদ সম্মেলনে একটা কথাই ঘুরেফিরে বললেন আমিনুল, ‘সাফ ফুটবল জেতার ক্ষমতা আমাদের আছে। দায়িত্ব এখন খেলোয়াড়দের। সবাই মিলে চেষ্টা করলে অবশ্যই সাফ জিততে পারব।’
কোচ ও ম্যানেজারের পাশে বসে বাংলাদেশ অধিনায়ক বেশ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে গেলেন। সত্যিই কি বাংলাদেশ এই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পেতে তৈরি?
প্রশ্নটা ওঠা হয়তো উচিত ছিল না। সাফ ফুটবলে বাংলাদেশ তো বরাবরই ফেভারিট। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপটটা ভিন্ন। ডিডোকে ছাঁটাই করে সাহীদুর রহমান সান্টুর হাতে মাত্রই কয়েক দিন আগে কোচের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে বাফুফে। ডিডোর দল থেকে ১০ জনকে বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দের দল সাজানো হয়েছে। টুর্নামেন্ট শুরুর কেবলই আগে এই অনাহূত বিতর্কই বাংলাদেশ দলের সামনে এঁকেছে প্রশ্নচিহ্ন।
কিন্তু কাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে আমিনুলের কথা শুনলে আপনিও আশাবাদী হতে চাইবেন। তবে কাজটা যে তিনি সহজ মনে করেন না, সেটিও বুঝিয়ে দিয়েছেন, ‘ভুটানও এখন ভালো অবস্থায় আছে। কাজেই কাউকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের মাঠে লড়াই করতে হবে। সেরা ফুটবলটা খেলতে হবে। দেশের মাটিতে খেলা। আমাদের ভালো সুযোগ আছে।’
২০০৩ সালে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। সেবার পারলে এবার কেন নয়? এটাই বলতে চাইলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে বাংলাদেশ দল প্রচণ্ড চাপের মধ্যে আছে। হোটেল লবিতে অন্য দলগুলো যখন ফুরফুরে মেজাজে ঘুরছে, বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা তখন একটাই মন্ত্র জপে যান মনে মনে, ‘চ্যাম্পিয়ন আমাদের হতেই হবে।’ নাম প্রকাশ না করে অনেক খেলোয়াড়ই বললেন, চাপ আছে ঠিকই। কিন্তু এতসব ঘটনার ঘনঘটা তাঁদের একাট্টাও করে তুলেছে। একজন বললেন, ‘সবার মধ্যে একটা জেদ কাজ করছে, ভালো আমাদের করতেই হবে।’
তাঁর দলের স্ট্রাইকাররা কতটা তৈরি? এ প্রশ্নেও অবিচলিত আমিনুল, ‘তারা তৈরিই আছে।’ কোচ সান্টুকেও দিতে হলো অনেক প্রশ্নের উত্তর। প্রস্তুতি কম হলো কি না, ডিডোর হাত থেকে হঠাত্ই তাঁর হাতে দায়িত্ব চলে আসা, সব সমস্যা কাটিয়ে তিনি আসলে কতোটা প্রস্তুত? সান্টু ডিডো প্রসঙ্গে যেতেই চাইলেন না। বললেন, ‘ওই ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করব না।’ প্রস্তুতির ব্যাপারে অখুশি কি না, সেটা তাঁর কথায় বোঝা যায়নি। বরং আত্মবিশ্বাসীই মনে হচ্ছে তাঁকে, ‘দেশের মাটিতে সাফ। আমরা অবশ্যই ভালো কিছু করার ক্ষমতা রাখি।’

চাপটা যেন বাংলাদেশের ওপরই

সার্ক ফোয়ারার পাশেই সাফ ফুটবলের বিজ্ঞাপন। ওখান থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে যে পাঁচতারা হোটেল, সেই হোটেলটির একই ছাদের নিচে গোটা দক্ষিণ এশীয় ফুটবল পরিবারের অবস্থান। শুধু সার্ক ফোয়ারাই নয়, রাজধানীতে সাফ ফুটবলের বার্তা নিয়ে এমন বেশ কিছু বিলবোর্ড দাঁড়িয়ে গেছে। যেগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছে সাফ ফুটবলের উত্তাপ। দুয়ারে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল ‘যুদ্ধ’।
যুদ্ধ? গতবারের চ্যাম্পিয়ন মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা এবং পাকিস্তানের কাছ থেকে সমস্বরে প্রতিবাদ আসতে পারে। তাদের মধ্যে যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাবটাই নেই। মাঠে খেলা হবে, এক দল জিতবে, এক দল হারবে। সাপলুডুর মতো জিততে জিততে, কিংবা হারতে হারতে শেষ লড়াইয়ে পৌঁছানো দল দুটির একটি শেষ হাসি হাসবে। ব্যস, টুর্নামেন্ট শেষ!
বর্তমান চ্যাম্পিয়ন মালদ্বীপের কোচ বা অধিনায়কের মুখ দিয়ে যেমন এই কথাটা বলানোই গেল না যে, ‘শিরোপাটা ধরে রাখতেই এসেছি।’ অনেকেই যাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা ফুটবলার মানেন, সেই অধিনায়ক আশফাক আলী শুধু আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশকে ধন্যবাদ দিয়ে গেলেন। আপ্যায়নকারীকে ধন্যবাদ জানানোটা যেমন অতিথির সাধারণ ভদ্রতা আরকি!
লক্ষ্য কী—এটি জানতে চাইলে কোচ উরবানি ইস্তভান বেলা নিরুত্তর। প্রত্যাশার কথা জানতে চাওয়ায় বললেন, ‘প্রতিটি মানুষেরই তো প্রত্যাশা থাকে উঁচুতে।’ কিন্তু ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি যেন সেই পুসকাস-ককসিস-হিদেকুটির দেশ হাঙ্গেরির ফুটবল চেতনার ধারক, ‘আমার ফুটবল-দর্শন হলো খেলাটাকে উপভোগ করা। তাহলেই ভালো ফুটবলে ভালো ফল আসবে।’ ‘উপভোগ’ ‘ভালো ফুটবল’ ‘ভালো ফল’, কিন্তু শিরোপার কথাটা সরাসরি নয়! সংবাদ সম্মেলন শেষ হতে কোচ আর খেলোয়াড়েরা একসঙ্গে, কখনো হোটেলের এ-প্রান্তে কখনো ও-প্রান্তে—মালদ্বীপের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় যেন ওই ‘উপভোগ্যতা’রই বিজ্ঞাপন।
জর্জ কোটান পাকিস্তান দলের হয়ে সংবাদ সম্মেলন কেন্দ্রের কাছাকাছি আসতেই একটা আবেগময় দৃশ্য। একে জড়িয়ে ধরলেন আলিঙ্গনে, ওকে বললেন, ‘কেমন আছ?’ সংবাদ সম্মেলনেও বাংলাদেশের সাবেক কোচ, বাংলাদেশকে একমাত্র সাফ শিরোপা এনে দেওয়া অস্ট্রিয়ান কোচ আবেগে ভেসে গেলেন। এখনো কোটান ‘বাংলাদেশকে দ্বিতীয় বাড়ি’ মনে করেন। এ জন্যই কি না বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের দলটির তুলনাতেই গেলেন না। শুধু বললেন, ‘একটা কথাই বলতে পারি, শারীরিক দিক দিয়ে পাকিস্তানি খেলোয়াড়েরা অনেক শক্তিশালী।’
এটা অবশ্য না বললেও চলত। দীর্ঘদেহী পাকিস্তানি খেলোয়াড়েরা অন্যসব খেলোয়াড়দের ছাপিয়ে একেবারে ‘সব গাছ ছাড়িয়ে তালগাছ’। পেশিবহুল। মুখে কাঠিন্য। কোটানই জানালেন, এই দলের পাঁচজন খেলোয়াড় আছে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ইংলিশ যারা ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় বিভাগ এবং হাঙ্গেরি বা ওয়েলস লিগে খেলেন। ইংল্যান্ডের ব্র্যাডফোর্ড সিটিতে খেলা জেশ রহমানকে তো পাওয়াই যায়নি তাঁর ইংলিশ ফুটবলের ব্যস্ততার কারণে। এমন একটি দলের কোচও কোনো লক্ষ্যের কথা বলেননি, ‘রেজাল্টের কথা কেউই বলতে পারে না। ১৪ দিন পরে বলতে পারব। আমি একটা কথাই বলব, আমরা ভালো ফুটবল খেলব।’
যে চারটি দলের সংবাদ সম্মেলন হলো কাল, তাদের মধ্যে এক কাতারে দেখা গেল শুধু বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাকে। শ্রীলঙ্কার কোচ সাম্পাথ পেরেরা ও চাথুরা মাদুরাঙ্গা আগের দিনের কথারই প্রতিধ্বনি তুলে বললেন, শিরোপাই তাদের লক্ষ্য। তবে প্রকাশ পেল আয়োজক বাংলাদেশের প্রতি সমীহও।
আর বাংলাদেশ? সবার আগে এসে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আমিনুল হক, কোচ সাহীদুর রহমান সান্টু ও ম্যানেজার সত্যজিত্ দাশ কোনো ঘোরপ্যাঁচের ধার ধারেননি। তাদের লক্ষ্য-প্রত্যাশার সবকিছুই একই তারে বাঁধা—শিরোপা। কোচ সান্টু গন্তব্য নির্দেশ করলেন একেবারে শীর্ষে, ‘আমার তো ইচ্ছা একেবারে টপ পর্যন্ত যাওয়া।’ আমিনুল ছাঁটাই হওয়া কোচ ডিডোর প্রসঙ্গ তুললেন, ‘ডিডোর অধীনে এর আগে আমাদের দুই মাসের কন্ডিশনিং ক্যাম্প হয়েছে। সেরা দলটিকেই আমরা পেয়েছি। অবশ্যই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার ক্ষমতা রাখি আমরা।’
ডিডোর দেওয়া দলটা চ্যাম্পিয়ন হতে পারত না সিদ্ধান্তে পৌঁছে তাঁকে বরখাস্ত করে নতুন একজন কোচকে দায়িত্ব দিয়ে প্রায় আগাপাছতলা বদলে দেওয়া হলো দল। চ্যাম্পিয়ন তো এই দলকে হতেই হবে! এর নাম অনন্ত চাপ! সত্যজিত্ দাশ এটা মানতে চাইলেন না, ‘না, চাপ নয়। তবে দল এখন অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। অনেক বেশি দায়বদ্ধ, সব খেলোয়াড় তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন। তারা দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চায়।’
তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতের মূল দল আসেনি। তারুণ্যসমৃদ্ধ সেই দল শিরোপার কথা ভাবছে কি না, জানা যায়নি। তবে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে পাঁচ থেকে দশ ধাপ এগিয়ে-পিছিয়ে থাকা অন্য দলগুলো সরাসরি শিরোপার কথা বলছে না। তারা আপাত চাপহীন। সব চাপই যেন বাংলাদেশের ওপর। বাইরে সূর্যের আলোয় বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়দের ছায়াগুলো দীর্ঘতর হয়ে পড়ছে। তার মধ্যে আরেকটি ছায়া এসে মিশেছে অলক্ষ্যে। সেটি ডিডোর। বাংলাদেশের ছাঁটাই হওয়া কোচ!

শ্রীলঙ্কা-প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমবে এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে by জগ্লুল আহেমদ চৌধূরী

অবশেষে শ্রীলঙ্কায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২৬ জানুয়ারি এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দেশের বিরোধী দলগুলো বেশ কিছুদিন ধরে এই নির্বাচনের জন্য জোর দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সরকার এ নিয়ে কোনো স্পষ্ট অবস্থান ঘোষণা না করায় বিরোধী দলের সঙ্গে তিক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের সরকার মনে করেছে, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট আরও প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় থাকতে পারেন সংবিধানসম্মতভাবে এবং সে কারণে এত শিগগির নির্বাচনের প্রয়োজন নেই। এই মেয়াদকাল নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি বিরাজ করছে এবং সে কারণে বিরোধী দলগুলো আশু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দাবি নিয়ে সোচ্চার হওয়ায় সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। যদিও বলছে, মহিন্দা রাজাপক্ষে ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন। ‘তথাপি প্রেসিডেন্ট মনে করছেন, নতুন ম্যান্ডেট বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে বিভিন্ন কারণে সুবিধা দেবে এবং সে কারণেই ভোট হতে যাচ্ছে।’ একজন সরকারি মুখপাত্রের এই বক্তব্য নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ ও সন্দেহের অবসান ঘটাল।
দক্ষিণ এশীয় এই দ্বীপদেশটির জন্য আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচিত হচ্ছে একাধিক কারণে এবং অন্যান্যবারের নির্বাচন থেকে এবারের ভোটপর্বকে নতুন পটভূমিকায় বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ বলেই মনে করা যেতে পারে। মাত্র কয়েক মাস আগে শ্রীলঙ্কা দীর্ঘ ৩০ বছরের বেশি তামিলসংকট থেকে মুক্ত হয়েছে এক রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে। দেশটির দুই কোটির বেশি জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশ তামিলদের জন্য একটি স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে দেশটিতে অনেক বছর ধরে রক্তগঙ্গা বয়ে গেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তামিল বিদ্রোহীরা বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বীয় শাসন প্রবর্তিত করেছিল। অবশ্য, সম্প্রতি সরকারি সেনাদর সঙ্গে যুদ্ধে তাদের বিপর্যয় ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত মে মাসের শেষ দিকে বিদ্রোহীরা সম্পূর্ণভাবেই পর্যুদস্ত হয়। তাদের নেতা ভিল্লুপাই প্রভাকরণ যুদ্ধে নিহত হন এবং সরকারি বাহিনী তাদের বিজয় ঘোষণা করে। পুরো শ্রীলঙ্কা গত মে মাস থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে এবং তামিল বিদ্রোহীরা হয় নিহত হয়েছে, ধরা পড়েছে কিংবা পালিয়ে গেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কা সরকারের এই বিশাল সাফল্যের দুই বড় দাবিদারই ঘটনাচক্রে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরস্পরের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে নিঃসন্দেহে তামিল বিদ্রোহীদের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের অবসানের নায়ক। কেননা আগে অনেক প্রেসিডেন্টই এই সংকটের সমাধান দিতে পারেননি, যদিও যুদ্ধ ও আলোচনা উভয় পন্থায়ই সমস্যার নিরসনে প্রচেষ্টা হয়েছে। রাজাপক্ষের ফ্রিডম পার্টি এবং অন্যান্য দলীয় সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে বলেই মনে করা যেতে পারে। এই যুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ে তামিল ও সরকার পক্ষ, উভয়ই সফলতার পরিচয় দিয়েছিল এবং মাঝেমধ্যে এটাও মনে হয়েছিল যে শক্তিশালী গেরিলা বাহিনী তামিলদের পরাজিত করা সম্ভব হবে না। অনেকটা অসম্ভবকেই সম্ভব করে তুলেছেন এই প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে এবং স্বাভাবিকভাবেই শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলিদের কাছে তিনি অত্যন্ত সফল প্রেসিডেন্ট হিসেবেই বিবেচিত এবং রাজাপক্ষে সংগতভাবেই এই অভূতপূর্ব সাফল্যের দাবিদার। সুতরাং আরও একটি মেয়াদে যখন তিনি প্রার্থী হচ্ছেন, তাঁর এই সফলতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজাপক্ষে যে একজন বেশ শক্তিশালী প্রার্থী হয়েই আবির্ভূত হয়েছেন, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই।
তবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী যিনি, তিনিও একইভাবে এই সাফল্যের বড় নায়ক এবং সে কারণেই নির্বাচনের চালচিত্র উত্তপ্ত ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হবে বলেই মনে করা হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় যে জয় সরকার সাধন করতে সমর্থ হয়েছে, সেটা হয়েছে সামরিক পন্থায় এবং প্রচণ্ড যুদ্ধেরই মাধ্যমে। আর এই কঠিন সংঘর্ষে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনীকে দক্ষ নেতৃত্ব দিয়েছেন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল শরথ ফোরসেঙ্কা। তিনিই দেশের একমাত্র চার তারকাবিশিষ্ট জেনারেল, যেখানে আগে অনেক সেনাপ্রধান আকাঙ্ক্ষিত বিজয় আনতে পারেননি, এই জেনারেল সেটাই সম্ভব করেছেন। যদিও সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে এই সময়ে বিচরণ করেছেন প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষে, তথাপি সামরিক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন সেনাপ্রধান এবং তিনিই হতে যাচ্ছেন রাজাপক্ষের প্রতিদ্বন্দ্বী, যদি অপ্রত্যাশিতভাবে চালচিত্রের পরিবর্তন না ঘটে।
তামিলদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ের পর থেকেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সেনাপ্রধানের মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয় এবং এর মাঝে দুই সফলতার দাবিদারের মধ্যে সাফল্য নিয়ে ঈর্ষাও বড়ভাবে কাজ করেছে। পরে জেনারেল শরথকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তরের প্রধান করা হয়, যা কিনা মূলত একটি গুরুত্বহীন আনুষ্ঠানিক পদমাত্র।
জেনারেল শরথ সরকারি পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তাঁকে অতিমাত্রায় অবজ্ঞা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি নিয়ম অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না বলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এতেই এটা প্রতীয়মান হচ্ছে, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বিরোধী দলগুলো রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে একজন শক্তিশালী প্রার্থী খুঁজেছিল, যিনি তামিল যুদ্ধের সাফল্যের দাবি করতে পারেন। তারা জেনারেল শরথকে পেয়ে গেছেন এবং ভালো প্রার্থী পেয়েছেন বলেই মনে করছেন। প্রায় সব বিরোধী দলই এ বিষয়ে সম্মত বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এই কলাম লেখা পর্যন্ত আসেনি। এ বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতব্যবধান থাকলেও তা নিরসনের চেষ্টা চলছে। জেনারেল শরথ নির্বাচনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলেই সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন।
শ্রীলঙ্কার শাসনপদ্ধতিতে প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত ক্ষমতাবান এবং তাঁর ক্ষমতা হ্রাসের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় একমত পোষণ করলেও ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় এ লক্ষ্যে কোনো অগ্রগতিই হয়নি। জেনারেল শরথ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি নির্বাচিত হলে এ ক্ষেত্রে কার্যকরী ও ত্বরিত পদক্ষেপ নেবেন। প্রেসিডেন্ট জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে থাকেন এবং প্রধানমন্ত্রী হন নির্বাচিত পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বা মোর্চার নেতা। কিন্তু প্রেসিডেন্টের হাতে রয়েছে অসীম ক্ষমতা—তিনি নির্বাচিত সংসদ এবং প্রধানমন্ত্রীকেও বরখাস্ত করতে পারেন। সাবেক প্রেসিডেন্ট চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা, প্রেমাদাসাসহ অনেকেই সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন। অনেকেই মনে করেন, এই সাংবিধানিক ধারা সত্যিকারের গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক নয়।
মাহিন্দা রাজাপক্ষে ও শরথ ফোরসেঙ্কার কিছু সমস্যাও আছে। উভয়ই তামিল বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধের শেষপর্যায়ে অতিমাত্রায় নির্মমতার পরিচয় দিয়েছেন এবং মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা বিশ্ব এ বিষয়ে বক্তব্যও দিয়েছে। বিরাটসংখ্যক তামিল নাগরিককে যুদ্ধের পর বিভিন্ন শিবিরে রেখে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করার অভিযোগও তাঁদের, বিশেষ করে সরকারের বিরুদ্ধে রয়েছে। তবে যেহেতু হিন্দু তামিলদের পরাজিত করে বৌদ্ধ সিংহলিরা জয়ী হয়েছে এবং সিংহলিরাই দেশের প্রায় ৭৭ শতাংশ, তাই ভোটে দুজনেরই সুবিধা রয়েছে। গত নির্বাচনে রাজাপক্ষে তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে অপেক্ষাকৃত নমনীয় ইউএনপির রনিল বিক্রমাসিংকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেন। এবার দুই কট্টরপন্থী—যাঁরা যুদ্ধে সফলতা এনেছেন—চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতারই সম্মুখীন।
জগ্লুল আহেমদ চৌধূরী: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশ্লেষক।

জননেতা নূরুল ইসলাম -স্মরণ by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

কীভাবে, কবে নূরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয়েছিল মনে পড়ে না; তবে কোথায়, সেটি বলতে পারি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের যে ইউনিয়ন রয়েছে, যা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সমশ্রেণীর ইউনিয়ন থেকে অনেক বেশি নিয়মতান্ত্রিক এবং আদর্শনিষ্ঠ, তিনি তার সভাপতি ছিলেন। যে কমিউনিস্ট আদর্শে, ট্রেড ইউনিয়নমন্ত্রে আজীবন তিনি বিশ্বাসী ছিলেন, সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটিয়েছেন জীবনে ও কর্মে। যখন তাঁর বন্ধুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে লোভনীয় নানা চাকরি করছেন, ক্ষমতার অন্দরমহলে ঘোরাঘুরি করছেন, নূরুল ইসলাম তখন একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হয়ে এসব প্রান্তিক মানুষের জন্য লড়াইয়ে নেমেছেন। আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র এবং রাজনৈতিক সরকারও প্রান্তিক মানুষজনের পক্ষে থাকে না; তাদের প্রতিপক্ষ হয়েই থাকে বরং। নূরুল ইসলামকে তাই সারা জীবন সংগ্রাম করতে হয়েছে অনেক বড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। সেই সংগ্রামের অবশ্য অনেক মিত্রও পেয়েছেন তিনি—মিল কারখানার শ্রমিক, অনেক ছাত্র সংগঠন এবং অন্যান্য সচেতন মানুষের সঙ্গে, শিক্ষকদের একটি অংশও। কোনো এক সরকারি নীতি অথবা পদক্ষেপবিরোধী সভায় তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়, তারপর ঘনিষ্ঠতা।
স্পষ্টবাদী, ভরাকণ্ঠ এবং সুদর্শন নূরুল ইসলাম জনসভার মঞ্চে যেমন ছিলেন আকর্ষণীয় বক্তা, ব্যক্তিগত জীবনে তেমনি ছিলেন অমায়িক এবং সদাহাস্যময়। নূরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়টা আরও গাঢ় হলো রুবী রহমান—রুবী আপার কল্যাণে। কবি রুবী রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে এমএ পাস করেছিলেন। একবার এক মার্কিন কবি এলেন তাঁরসহ আরও কয়েকজন নারী কবির কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য। রুবী আপার কবিতা অনুবাদের অনুরোধ এলে আমি তা সানন্দে গ্রহণ করি। তাঁর জীবনসঙ্গী নূরুল ইসলাম; তাঁদের বাসায় যেতাম, কবিতার অনুবাদ থেকে আড্ডা হতো বেশি। ২০ বছর আগের ওই আড্ডাগুলোতে নূরুল ইসলাম থাকার চেষ্টা করতেন এবং আড্ডারছলে জানাতেন তাঁর অনেক স্বপ্নের কথা। তাঁর কাছে সংগ্রাম ও স্বপ্ন ছিল পরিপূরক দুই শক্তি। এখনো ভেবে অবাক হই, একজন মাঠের মানুষ কী অকাতরে বিশ্বাস করতেন স্বপ্নের শক্তিতে।
ছোট্ট সাজানো পরিবার ছিল রুবী রহমানের। তাঁর ঘরটিও থাকত পরিপাটি, ছবির মতো সাজানো। দুই সন্তান তমোহর আর মৌটুসী। মানুষের মতো মানুষ হয়েছে দুজনই। ওদের নিয়েও নূরুল ইসলাম ভাইয়ের হয়তো অনেক স্বপ্ন ছিল। সব পিতারই থাকে। পিতা হিসেবেও তাঁর তুলনা পাওয়া ছিল ভার।
সেই স্বপ্নগুলো ভেঙে দিল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা অথবা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—রাষ্ট্রযন্ত্রের গোয়েন্দাযন্ত্র এ সত্য উদ্ঘাটনে কোনো আগ্রহ দেখায়নি শুরু থেকে। আজ থেকে এক বছর আগে লালমাটিয়ায় তাঁর বাসায় আগুন লাগে। রহস্যময় আগুন—একেবারে গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত পরিকল্পিত অগ্নিকাণ্ডের পদচ্ছাপ সর্বত্র। সেই আগুনে পুড়ে প্রথমে গেল তমোহর, আর ৩৬ ঘণ্টা যুদ্ধ করে গেলেন নূরুল ইসলাম ভাই। তমোহর ছিল আলো-ঝলমলে এক তরুণ, সুন্দরে বিশ্বাসী, সংগীতে নিমগ্ন। তমসার রাক্ষসেরা তাকে নিয়ে গেল। নূরুল ইসলাম ভাইয়ের নামেও আলো ছিল। তাঁকেও প্রাণ দিতে হলো অন্ধকারের শক্তিদের কাছে। অথচ আর কটা সপ্তাহ পরই নির্বাচন ছিল, সেই নির্বাচনে তাঁর জেতাও নিশ্চিত ছিল এবং জিতে, সংসদে এসে প্রান্তিক মানুষজনের পক্ষে তাঁর কথা বলার কথা ছিল।
তাঁর ও তমোহরের মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত কি হতে পারে না? কেন হতে পারে না? এই দাবি আমরা করছি; এই দাবি কি রাষ্ট্রযন্ত্রের কানে পৌঁছাবে না?
নূরুল ইসলাম ভাইয়ের মৃত্যুর সময় রুবী আপা যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন, মৌটুসীও। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহেও টেলিফোনে কথা হয়েছে নূরুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে। রুবী আপার খবর জানিয়েছেন। নির্বাচনের বিষয়ে বলেছেন। তাঁকে ঋণখেলাপি করার চেষ্টা হচ্ছে, হাসতে হাসতে এ খবর দিয়েছেন। আমি তেমন আমলে নিইনি তাঁর পেছনে কিছু মানুষের এই লেগে পড়াকে। সংগ্রামে অভ্যস্ত মানুষ জানেন কীভাবে এসব প্রতিকূলতা সামাল দিতে হয়। কিন্তু প্রতিকূলতা যদি বীভত্সতার পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে কীভাবে তা সামাল দেবেন একজন মানুষ, যিনি স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসতেন, সুন্দরের পক্ষে ছিলেন এবং কিছু আদর্শে অবিচলিত ছিলেন, যেসব আদর্শ ছিল মানুষের মঙ্গল ও কল্যাণ নিয়ে?
আমার মোবাইল ফোনে তাঁর নম্বরটা এখনো আছে। এখনো মনে হয় কোনো দিন হয়তো তা বেজে উঠবে এবং তিনি বলবেন, ‘কেমন আছেন?’ তাঁর সেই ভরা গলায়, যেমন প্রতিবার ফোন করেই বলতেন।

এইডস প্রতিরোধে নৈতিকতার অনুশীলন -ধর্ম by ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

সম্প্রতি এইডস রোগ বিশ্বজুড়ে এক মহামারি সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। এইচআইভি নামের জীবাণুর আক্রমণে এইডস হয়। এটি এমন এক ঘাতক ব্যাধি, যাতে শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও এইডসের ঝুঁকি রয়েছে। এখন পর্যন্ত এইডস রোগের কোনো ফলপ্রসূ চিকিত্সা আবিষ্কৃত হয়নি। কাজেই এ রোগ হলে মৃত্যু অনিবার্য। ধর্মীয় মূল্যবোধ রক্ষার মাধ্যমে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি ও ইসলামের বিধিবিধান কঠোরভাবে মেনে চললে এইডস প্রতিরোধ করা সম্ভব। প্রতিষেধকহীন এ ব্যাধিকে কেবল ধর্মীয় অনুশাসনই রুখতে পারে।
এইচআইভি/এইডসসহ অনেক জটিল রোগ ও উচ্ছৃঙ্খলতার জন্য দায়ী ব্যভিচার নামের সামাজিক অনাচার। পক্ষান্তরে অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা থেকে দূরে থাকাই মরণঘাতী এইডস থেকে মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ পথ। অবৈধ যৌনাচার ও ব্যভিচারকে মহামারির কারণ হিসেবে উল্লেখ করে হাদিস শরিফে বলা হয়েছে, ‘যখন কোনো জাতির মধ্যে অশ্লীলতা প্রকাশ্যভাবে চলতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে প্লেগ ও এমন অভিনব দুরারোগ্য ব্যাধি দেওয়া হয়, যা তাদের পূর্বপুরুষেরা কখনো শোনেনি।’ (দায়লামী) নবী করিম (সা.) আরও বলেছেন, ‘যখনই কোনো জাতি বা সম্প্রদায় অশ্লীল ও ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হয়, তখন তাদের মধ্যে এমন এক ভয়ঙ্কর মহামারি দেখা দেয়, যা তারা অতীতে কখনো দেখেনি।’ (ইবনে মাজা)
ইসলাম বহু শতাব্দী আগে থেকে ব্যভিচারের কদর্যতা ও নোংরামির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে; এটিকে হীন ও মন্দ কর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং মানবসভ্যতার জন্য বড় ধরনের হুমকি সাব্যস্ত করেছে।
ইসলাম ব্যভিচারের অনৈতিক পথ চিরতরে বন্ধ করে পৃথিবীতে সুস্থ-সুন্দর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনযাপনে সমর্থ মানুষকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। বৈধ স্ত্রী ব্যতীত অন্য নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কারণেই এইডসের মতো প্রাণসংহারী ব্যাধির জন্ম হয়। কেননা এইডস রোগের ভাইরাস বহনকারী আক্রান্ত পুরুষের মাধ্যমে নিজেদের অজ্ঞতার কারণে নারীও এইচআইভি পজিটিভ হয়ে যায়। অথচ বিবাহিত নারী-পুরুষের মিলনে এইডসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই, যদি তাদের কেউ বিপথগামী না হয়। বৈবাহিক সম্পর্ক বহুগামিতার মূলে কুঠারাঘাত হেনেছে। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যাদের সামর্থ্য আছে, তারা যেন বিবাহ করে, কারণ বিবাহ পবিত্রতা রক্ষার এবং দৃষ্টিকে সংযত রাখতে সাহায্য করে। অপরদিকে যাদের সামর্থ্য নেই, তারা যেন রোজা রাখে। কারণ রোজা যৌন ক্ষুধা সংবরণে সহায়ক।’ (বুখারি ও মুসলিম)
যারা অবৈধ যৌনাচার, সমকামিতা, অনৈতিকতা, অশ্লীলতা ও ঘৃণ্য কাজে জড়িত, তাদের কঠোর শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করে আল্লাহ তাআলা সাবধানবাণী ঘোষণা করেছেন, ‘আমি লুতকে প্রেরণ করেছিলাম, যখন সে তার জাতিকে বলেছিল: তোমরা কী এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বে কেউ করেনি? তোমরা তো কামবশত নারীদের ছেড়ে পুরুষের কাছে গমন করো, তোমরা তো সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।’ (সূরা আল-আরাফ, আয়াত: ৮০-৮১)
ইসলামের শিক্ষা বাস্তবায়নে পবিত্র কোরআনের সতর্কবাণীকে বিভিন্ন গণমাধ্যম তথা রেডিও, টেলিভিশন ও সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রচার-প্রসার করে সচেতনতা সৃষ্টিতে এগিয়ে যেতে হবে। এইডসের মতো স্পর্শকাতর বিষয় প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। এইডস বিস্তারে বয়সের কোনো বাছবিচার নেই। বিপথগামী মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণী থেকে যেকোনো বয়সের ব্যক্তি এ মরণ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে। দেশের সব নাগরিক এইডস সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে এবং তা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এইচআইভির বিস্তার রোধে সাহায্য করতে পারে। এইডস শুধু স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাই সৃস্টি করে না, বরং এটা ধর্মীয়, সামাজিক, অথনৈতিক সব ক্ষেত্রকেই প্রভাবিত করে। এইচআইভি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে এইডস প্রতিরোধ করা যাবে না। এইডস প্রতিরোধে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। একমাত্র নৈতিকতার অনুশীলনই হতে পারে এ রোগ প্রতিরোধের প্রধানতম হাতিয়ার। ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে সমাজে ব্যাপকভাবে গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
এইচআইভি/এইডসের মতো মরণ ব্যাধি সম্পর্কে সাধারণ জনগণ পুরোপুরি সজাগ নয়। যদিও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষ করে এ ঘাতক ব্যাধির বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেশ কিছু কর্মসূচি চলছে এবং এইডসকে একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে জাতীয় এইডস কমিটিকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ কাজে আন্তধর্মীয় নেতা ও আলেম-সমাজকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। এইডস মোকাবিলায় তৃণমূল পর্যায়ের ধর্মীয় নেতাদের সহযোগিতা পেলে এ কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। তাই সমাজ থেকে এইচআইভি/এইডস বিষয়ে যাবতীয় কুসংস্কার দূর করতে হবে। অন্য যেকোনো রোগের মতো এইডসকেও একটি রোগ হিসেবে দেখতে হবে। পরিবার ও সমাজ-জীবনের সব ক্ষেত্রে এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধে খোলামেলা কথা বলা ও মুক্ত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করলে এইডসের ঝুঁকি কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেককে নিজ নিজ ধর্মের বিধান মেনে কর্মক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
নৈতিকতার অনুশীলন ও ধর্মীয় অনুশাসন যে সমাজে যত প্রবল, এইডস আক্রমণ সেখানে তত কম। বিভিন্ন ধর্মের ঐক্যবদ্ধ চেতনা থেকে একটি সুন্দর ও সুনির্মল পথ তৈরি হতে পারে; যা এইচআইভি/এইডসের মতো ব্যাধিকে রুখে দিয়ে জাতির জন্য সুন্দর একটি ভবিষ্যত্ বিনির্মাণ করবে। এইচআইভি সমস্যাকে প্রত্যেকের নিজ নিজ কাঁধে তুলে নিতে হবে, নিজেকে সচেতন রাখার পাশাপাশি অন্যকেও সচেতন করতে হবে। এইচআইভি সম্পর্কে অজ্ঞতা ও উদাসীনতাই এইডস বিস্তারের প্রধান কারণ, এটা মনে রেখে সমাজে ইসলামি অনুশাসন মেনে এইডস-সচেতনতা বৃদ্ধির সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ একান্ত বাঞ্ছনীয়।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমী, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

সংসদ কার্যকর হবে সাংসদদের কাজের মাধ্যমে by বদিউল আলম মজুমদার

সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র...।’ গণতন্ত্র মানে প্রশাসনের সকল স্তরে জনপ্রতিনিধিদের শাসন। অর্থাত্ সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মূলত নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে, যাঁরা একদল প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। তেমনিভাবে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরে—যেমন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, ছোট-বড় শহরে—নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন কায়েম করে তাঁদের অধীনে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাধ্যমে ‘স্থানীয় শাসন’ পরিচালিত হবে (অনুচ্ছেদ ৫৯)।
সংবিধানের ৬৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘জাতীয় সংসদ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে...।’ আইন প্রণয়ন মানে শুধু আইন পাস, বাতিল বা আইন পরিবর্তন-পরিবর্ধন করাই নয়। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে বিতর্ক অনুষ্ঠানও বোঝায়। তবে নেতানেত্রীর বন্দনা বা প্রতিপক্ষের নিন্দা-কুত্সা জাতীয় সংসদে স্থান পাওয়ার মতো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।
জাতীয় সংসদের আরেকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সংসদে পাস করা আইনগুলো যথাযথ ও পরিপূর্ণভাবে এবং সম্পূর্ণ সততা ও কৃচ্ছ্রতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করা। অর্থাত্ সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা তথা দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। সংসদের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সরকারের আয়-ব্যয়, বাজেট ও বিদেশি চুক্তি অনুমোদন করা।
এসব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে আমাদের সংসদ সদস্যদের নিবিষ্টতার ওপরই সংসদের কার্যকারিতা মূলত নির্ভর করে। কিন্তু কতটুকু সময় তাঁরা এসব কাজে ব্যয় করেন? সংসদীয় দায়িত্ব পালনে না হলে, কোন কাজে তাঁরা তাঁদের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন?
আমাদের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যাঁদের কিছু একান্ত সময় ব্যয় করার সুযোগ হয়েছে, তাঁরা জানেন সংসদ সদস্যদের কী কাজে বেশি ব্যস্ত থাকতে হয়। গত এপ্রিল মাসের শেষ দিকে একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে—একজন সত্ ও নিবেদিত জনপ্রতিনিধি বলে যাঁকে আমি শ্রদ্ধা করি—ঘণ্টাখানেক সময় কাটানোর সুযোগ হয়। এ সামান্য সময়ের মধ্যে সংসদ সদস্যদের কার্যক্রম সম্পর্কে আমি কিছু দুর্লভ অভিজ্ঞতা অর্জন করি: কী বিচিত্র ধরনের কাজ তাঁদের করতে হয়; কত অযৌক্তিক ধরনের অনুরোধ তাঁদের কাছে আসে।
আমরা যে ঘণ্টাখানেক সময় একত্রে কাটিয়েছি সে সময় তাঁর মোবাইল ফোনটি প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে বাজতে থাকে। তিনি আমার প্রতি যথার্থ ভদ্রতা প্রদর্শন করেই কয়েকটি ফোনের উত্তর দেন। পাশে বসা ছিলাম বলে সংসদ সদস্যের কথাগুলো না শুনে আমার উপায় ছিল না।
প্রথম কলটি ছিল দুটো মৃতদেহ সম্পর্কে। যানবাহন দুর্ঘটনায় সম্ভবত তাঁর নির্বাচনী এলাকার দুজন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। মৃতের আত্মীয় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসককে বলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মানবিক কারণে লাশ দুটি ছাড় করার ব্যবস্থা করে দেন। এরপর লাশের আপনজনের প্রশ্ন—কীভাবে তাদের গ্রামের বাড়িতে লাশ নেওয়া হবে? কে তা করবে? কে খরচ বহন করবে? একতরফা কথোপকথন শুনে আমার কাছে মনে হয়েছে যে মৃতের পরিজনেরা আশা করেছিল যে সংসদ সদস্য তাঁর নিজ খরচে লাশ দুটো তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।
আরেকটি কল ছিল কোনো একজনের বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ সংক্রান্ত। এক ব্যক্তির, সম্ভবত প্রভাবশালী ব্যক্তির, বিদ্যুতের দুটি সংযোগ ছিল। একটি ছিল তাঁর বাড়িতে, অন্যটি সেচকাজের জন্য মাঠে। দুটি সংযোগই ছিল অবৈধ। সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কর্মকর্তা অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার আগে সংসদ সদস্যের পরামর্শ নেন এবং তিনি কৃষি উত্পাদন যাতে ব্যাহত না হয় তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফসলের মাঠের সংযোগটি অব্যাহত রেখে বাড়ির সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করার পরামর্শ দেন। টেলিফোনের আলাপ থেকে বোঝা গেল, এতে সংশ্লিষ্ট গ্রাহক অসন্তুষ্ট হয়েছেন। সাংসদ প্রভাবশালী ব্যক্তিটির কাছে ব্যাখ্যা করলেন তিনি কী করেছেন, কেন করেছেন এবং এতে তাঁকে ভুল বোঝার কোনো অবকাশ নেই। প্রসঙ্গত, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অতি উত্সাহ লক্ষণীয়!
অন্য একটি কল আসে থানায় দায়ের করা একটি মামলা সম্পর্কে। সম্ভবত থানা মামলাটি নেয়নি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসী সাংসদকে এ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে অনুরোধ করেন, তাতে তিনি অস্বীকৃতি জানান। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, প্রদত্ত তথ্যের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া বা না নেওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব, এ ব্যাপারে তাঁর কিছুই করার নেই। এরপর তাঁকে বলতে শুনি, তিনি সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে সরাসরি আদালতে যাওয়ার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো দিকেই পরামর্শ দেবেন না, কারণ তিনি এ ব্যাপারে দায়িত্ব নেবেন না। বেশ কয়েকটি ফোন আসে তদবিরের অনুরোধে। একটি ছিল শিক্ষাবিভাগে নিয়োগ, বদলি বা পদোন্নতিসম্পর্কিত। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে এ ব্যাপারে বলবেন বলে কলারকে আশ্বাস দেন।
এসব ফোনালাপের সময় আমি লক্ষ করেছি, সাংসদ ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। গণমাধ্যমের সুবাদে তাঁর কিছু সহকর্মীর ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও হুমকিমূলক আচরণের কথা আমরা শুনলেও, তাঁর আচরণ ছিল অত্যন্ত শালীন। আমাদের আলাপকালেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তবে আমার দেখে ভালো লেগেছে যে তিনি যথাসম্ভব অন্যায় অনুরোধ থেকে কিংবা অনুরোধকারীকে মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। আমরা জানি না তাঁর অন্য সহকর্মীরা এ ধরনের অন্যায় আবদারের মুখে কী করছেন, তবে গণমাধ্যমে তাঁর সহকর্মীদের কারও কারও সম্পর্কে বিরূপ প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে।
আমাদের বৈঠকটি হয় এপ্রিল মাসে, এখন নিশ্চয়ই অন্যায় অনুরোধের ধরন বদলেছে, সংখ্যাও বেড়েছে এবং এগুলো রক্ষা করার জন্য চাপও তীব্র হয়েছে। জানি না সেই শ্রদ্ধেয় সাংসদ এগুলো কীভাবে সামলাচ্ছেন। তবে তাঁর সহকর্মীদের অনেকেই যে এগুলো যথাযথভাবে ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে প্রতিহত করতে পারছেন না তা গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে সুস্পষ্ট।
এটি সুস্পষ্ট যে আমাদের সাংসদরা ‘কনস্টিটুয়েন্সি সার্ভিস’ বা তাঁদের ভোটারদের সেবা দিতে অনেক সময় ব্যয় করছেন, ফলে তাঁদের পক্ষে সংসদীয় কার্যক্রমে সর্বশক্তি নিয়োগ করা সম্ভবপর হয় না। তাঁদের পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তি দেওয়া হয় যে ভোটারদের ব্যাপক চাহিদা পূরণ করতেই তাঁরা তা করেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ৮০ শতাংশ ভোটারই বিপদে-আপদে তাদের স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের কাছে যায়। সাংসদদের শরণাপন্ন হয় মাত্র তিন শতাংশ । অর্থাত্ নির্বাচকদের চাহিদা মেটাতেই সাংসদরা এ কাজে অনেক সময় ব্যয় করেন, এ দাবি অতিরঞ্জিত। এ ছাড়া সাংসদরা অনেক ক্ষেত্রে বাছবিচার না করেই সব অনুরোধে সাড়া দেন বলে আরও চাহিদার সৃষ্টি হয়। তাই এসব অনেকটা স্ব-সৃষ্ট চাহিদা। তদবিরের এ সংস্কৃতির কারণে আমাদের দেশে রাজনীতিক ও জনগণের মধ্যে এক ধরনের পেট্রোন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অর্থাত্ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের তদবির না হলে নাগরিকেরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্য সেবাও অনেক সময় পায় না। এ ধরনের ব্যবস্থা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং গণতান্ত্রিক শাসনকে কার্যকর করার ব্যাপারেও সহায়ক নয়। এর মাধ্যমে সময় ও সম্পদেরও অপব্যবহার হয়।
সাংসদদের সংসদীয় কার্যক্রমে সর্বশক্তি নিয়োগ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো তাঁদের স্থানীয় উন্নয়নকাজে যুক্ত হওয়া। বহু দিন থেকেই বাংলাদেশে সাংসদরা অনানুষ্ঠানিকভাবে স্থানীয় উন্নয়নে জড়িত ছিলেন এবং তার ফলাফল ইতিবাচক ছিল না। কিন্তু বর্তমান সরকার আইন করে তাঁদের এ দায়িত্ব দিয়েছে এবং উপজেলা পরিষদ এখন অনেকটা তাঁদের কর্তৃত্বেই পরিচালিত হওয়ার কথা। এ অসাংবিধানিক দায়িত্ব শুধু উপজেলাতে একটি দ্বন্দ্বাত্বক পরিস্থিতিরই সৃষ্টি করেনি, এর ফলে সংসদ সদস্যরা পুরোপুরিভাবে তাঁদের সংসদীয় দায়িত্বেও মনোনিবেশ করতে পারছেন না। ফলে উপজেলার সঙ্গে সঙ্গে সংসদও অকার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
আরেকটি কারণেও সাংসদরা সংসদীয় দায়িত্ব থেকে দূরে থাকছেন। নবম জাতীয় সংসদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবসায়ী এবং অনেকে তাঁদের সংসদীয় পদকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়িক সুবিধাও নিচ্ছেন, ‘কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করেই। অনেকে আবার ব্যবসায়ীর খাতায় নতুন করে নাম লেখাচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে সাংসদসহ সরকারের উচ্চপদস্থদের সম্পদের হিসাব দেওয়ার এবং তা প্রকাশ করার কথা থাকলেও এখনো তা করা হয়নি। এমনকি তাঁদের জন্য একটি আচরণবিধিও প্রণয়ন করা হয়নি, যদিও প্রতিবেশী ভারতসহ অনেক দেশেই এমন বিধি রয়েছে। ফলে কিছু কিছু সাংসদ ইতিমধ্যে সংসদীয় দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে স্বার্থের দ্বন্দ্ব উপেক্ষা করেই নিজস্ব ব্যবসায় বেশি সময় ব্যয় করছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও লিপ্ত হচ্ছেন। অনেকের সময়ই হয় না সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে। এ কারণে সংসদে মাঝেমধ্যে কোরাম-সংকটও দেখা দিচ্ছে। উল্লেখ্য যে সরকারের সঙ্গে যাঁরা ব্যবসায়িক সম্পর্কে লিপ্ত তাঁরা, সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, সংসদ সদস্য থাকার যোগ্যতাই হারিয়ে ফেলেন।
সংসদীয় দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত হলেও, আমাদের সাংসদদের পক্ষে তাতে পুরোপুরি মনোযোগী হওয়া সম্ভব হয় না। নির্বাচকদের সমস্যা সমাধান ও তাদের পক্ষে তদবির করা ছাড়াও, তাঁরা স্থানীয় উন্নয়ন এবং অনেকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক কাজে বেশি ব্যস্ত থাকেন। ফলে সংসদের কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ কাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা কি তা চাই? আমরা কি চাই না সংসদ সদস্যরা তাঁদের মূল দায়িত্বে নিবিষ্ট থাকুন? সংসদীয় কার্যক্রমে তাঁরা সম্পূর্ণরূপে মনোযোগী না হলে, সংসদ কার্য়কর হবে না। আর সংসদ কার্যকর না হলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও কার্যকর হওয়ার আশা করা যায় না। এর ভবিষ্যত্ পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। আমাদের নেতারা কি তা নিয়ে চিন্তিত? এ ছাড়া অনেক সরকারি কর্মকর্তা যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে সংসদ সদস্যদের দ্বারস্থ হচ্ছেন, এটাও শঙ্কার উদ্রেক না করে পারে না।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।