Thursday, April 14, 2022

ইলিশপ্রীতি বাঙ্গালীর একার নয়, ইরাক থেকে বার্মার খাবারের রেসিপি তার প্রমাণ

বাংঙ্গালীর অতি প্রিয় ইলিশ কিছু দিন আগে জিওগ্রাফিক্যাল ইন্টিকেশন বা ভৌগলিক লক্ষণসূচক হওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে। এর স্বীকৃতির মানে হলে মাছটি একান্তই বাংলাদেশের। আন্তর্জাতিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ফিস’র তথ্য মতে,  বিশ্বের ৬৫% ইলিশের সরবরাহ আসে শুধু বাংলাদেশ থেকে। এরপর আছে ভারত ও মিয়ানমার। তাই বলে ইলিশের প্রতি ভালোবাসা শুধু বাঙ্গালীর একার নয়।
ইলিশের স্বাদ মুখে নিয়ে বেশিরভাগ বাঙ্গালী বেড়ে ওঠে। ইলিশের গন্ধে ভূত-পেত্নি ছুটে আসার গল্পও কম নেই। রূপালী ইলিশের ঝিলিক বাংলার জেলেদের যেমন মাতোয়ারা করে তেমনি পদ্মার ইলিশ ভালো না মেঘনার ইলিশ ভালো – সেই বিতর্কও ফুরায় না। অবশ্য এখন বিতর্ক মোড় নিয়েছে অন্যদিকে – ফুরিয়ে যাচ্ছে ইলিশের ভান্ডার। খাবার বেলায় অসংযম, আর ধরার বেলায় বেপরোয়া – এর জন্য দায়ি।
বাঙ্গালীরা হয়তো পদ্মা বা গঙ্গায় ইলিশ ধরার গল্প শুনতেই ভালোবাসে। কিন্তু ইরান, ইরাক থেকে শুরু করে পশ্চিম এশিয়া পর্যন্ত এবং পূর্বে মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার নদীগুলোতেও এই নোনা পানির মাছটির দেখা মেলে। এসব দেশেও অসাধারণ স্বাদের মাছ হিসেবে ইলিশের কদর রয়েছে।
ইলিশ রান্না
বাঙ্গালীর রসুই ঘরে ইলিশ রান্নার প্রক্রিয়া খুবই সাধারণ। সরিষার তেল থাকবেই। ইলিশের সহজাত গুণ ও স্বাদ নষ্ট হতে দিতে তারা নারাজ। তাই এ নিয়ে কোন পরীক্ষা বা উদ্ভাবন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। একবার এক রোমাঞ্চপ্রিয় রাধুনীকে স্ট্রবেরি দিয়ে ইলিশ রান্না করতে দেখে এক বয়স্ক ব্যক্তি এই বলে চেচিয়ে উঠেছিলেন: ইলিশ বিলুপ্ত হতে বাকি নেই।
কিন্তু মালয়েশিয়ায় ইলিশকে বলে তেরুবাক। মালয়েশিয়ার সবেচেয়ে ভালো রান্নার রেসিপি বই বেত্তি বাও-এ ইলিশ সয়াবিন স্প্রাউট নিয়ে রান্নার কথা বলা আছে। এনকোভিস মাছের গুড়া, হলুদের পাতা ও গাজানো ডুরিয়ান ফল এতে মেশানো হয়। লবন ইলিশও রান্না হয় অনেক কিছু মিশিয়ে। তবে, সবগুলো ডিশই অনেক দামি।
চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইয়াংশি নদীতে একটি মওসুমে ইলিশ পাওয়া যায়। সেখানে এই মাছের নাম শি ইউ। যার মানে টাইম ফিস বা ‘সময় মাছ’। একাদশ শতকে সং রাজবংশের শাসনামলে চীনা কবি ওয়াং আনসাই শি ইউ’র প্রশংসা করে কবিতা লিখেছেন। তিনি বলেছেন এর স্বাদ দুধের চেয়েও মধুর।
বার্মায় পুরণো একটি প্রবাদ আছে – তুমি যদি মাছ খেতে চাও, তাহলে ইলিশ বেছে নাও। তুমি যখন বিয়ের কথা ভাববে, তখন কোন তরুণীকে পছন্দ করো।
মিয়ানমারে একেবারে সাদা মাটাভাবে ইলিশ রান্না করা হয়। এমনকি সরিষার তেলও ব্যবহার করা হয় না। দেশটির অধিকাংশ ইলিশ ধরা পড়ে ইরাবতী নদীতে। সকালে ইলিশ ভাজা দিয়ে গরম ভাত খাওয়ার মাজাই আলাদা। তবে, টমেটোসহ আরো কিছু সবজি দিয়ে ইলিশ রান্নার চল আছে মিয়ানমারে।
ইলিশের প্রজাতি
ভারতে নর্মাদা, তাপ্তি, মহানদী, কৃষ্ণা ও গোদাবরি নদীতে ইলিশ ধরা পড়ে। অন্ধ্র প্রদেশের এই মাছের নাম পুলাসা। তবে, এর স্বাদের খ্যাতি সেখানেও। ইলিশের লোভে ঘরের বউকে বিক্রি করার গল্প আছে সেখানে।
তবে, নদীগুলোতে ইলিশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠায় সাম্প্রতিক সময়ে এর দামও বেড়ে গেছে বেশ। বেঙ্গালুরুর জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট কারিঙ্গা’র এক মালিক জানান, এক কেজি ইলিশ কারি ৯ হাজার রুপি পর্যন্ত দাম উঠতে পারে। রান্নার প্রণালির ওপর ভিত্তি করে ইলিশ কারির দাম কম বেশি হয়।
পার্সিরা ইলিশকে বলে ভিং। ভিং মাছের ডিস তাদের কাছে আইকনিক। অনেকভাবে রান্না, পুড়িয়ে ও ভাজি করে ইলিশ খাওয়া হয়।
ক্যাভিয়ারের সঙ্গে তুলনীয়
শুধু মাছ নয়, ইলিশের ডিমও কম স্বাদের নয়। অনেকের কাছে মাছের চেয়ে ডিম পছন্দের। মাছের মতো সাধারণ উপায়ে রান্না করে বা ভেজে এ ডিম খাওয়া যায়। অনেক জায়গায় ডিম সেদ্ধ করে তার সঙ্গে বিভিন্ন মসল্লা ও সবজি মিশিয়ে আলাদা পদ তৈরি হয়।
সিন্ধিরা ইলিশের ডিমকে ক্যাভিয়ারের সঙ্গে তুলনা করে। সেখানে সবজির সঙ্গে মিশিয়ে ইলিশের ডিম খাওয়ার রেওয়াজ আছে। পিয়াজ, টমেটো, কাঁচা লঙ্কা ও অন্যান্য মসলা দিয়ে ইলিশের ডিম ভুনা করা হয়।
ইলিশের স্বাদের খ্যাতি দুনিয়া জোড়া। কিন্তু মানুষের অবিমৃষ্যকারিতা ইলিশকে বিলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়েছে। ইলিশ বাঁচানো না গেলে বাঙ্গালী তার একটি ভৌগলিক লক্ষণসূচক চিহ্ন হারিয়ে ফেলবে।

আয়োডিনের অভাব কেন আপনার জন্য মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে

শরীরের জন্য আয়োডিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ
আয়োডিন আমাদের শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যদিও বিষয়টিকে আমরা কমই গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
থাইরয়েড হরমোন এবং হজমের কর্মকাণ্ডের জন্য এটি বিশেষ ভূমিকা রাখে।
আয়োডিনের অভাব হলে শারীরিক বৃদ্ধি বা গঠনে বড় ধরণের প্রভাব পড়ে।
কিন্তু আমাদের অনেকেরই জানা নেই, কতটা আয়োডিন আমাদের দরকার বা কোন খাবারে সেটি পাওয়া যাবে?
এ নিয়ে গবেষণার পর সারে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্গারেট রেম্যান দেখতে পেয়েছেন যে, আধুনিক অনেক স্বাস্থ্যকর খাবারেই আয়োডিনের ঘাটতি রয়েছে। যা বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝূঁকি তৈরি করতে পারে।

আমাদের আয়োডিন কেন দরকার?

শরীরের বৃদ্ধি আর খাবার হজমে প্রধান ভূমিকা রাখে থাইরয়েড হরমোন আর সেই হরমোনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ আয়োডিন।
''মানুষের বুদ্ধি বা শেখার ক্ষমতার অভাবের পেছনে আয়োডিনের অভাবই প্রধান কারণ, যা প্রতিরোধ করা সম্ভব,'' বলছেন অধ্যাপক রেম্যান।
''যদি গর্ভবতী নারীরা যথেষ্ট পরিমাণ আয়োডিন না পান, তাহলে তাদের সন্তান বুদ্ধি প্রতিবন্ধী অথবা হরমোন সমস্যা নিয়ে জন্ম হতে পারে।'' তিনি বলছেন।
আল্পসের কাছাকাছি এলাকায় অনেকের মধ্যে আয়োডিনের সমস্যা প্রকট ভাবে আছে। সেখানে অনেকের গলায় থাইরয়েড গ্লান্ড ফুলে বড় হয়ে থাকতেও দেখা যায়।
অধ্যাপক রেম্যান বলছেন, এখন আমরা জানি এটা আয়োডিনের অভাবের একটি দৃশ্যমান নমুনা। থাইরয়েড গ্লান্ড অতিরিক্ত ফুলে যায়, কারণ এটি রক্ত থেকে আয়োডিন নিয়ে জমা করে রাখার চেষ্টা করে।

'স্বাস্থ্যকর খাবারের ঝুঁকি'

সারা বিশ্বেই খাবারের মধ্যে সম্ভবত আয়োডিনের সবচেয়ে উৎস সাদা মাছ এবং ডিম।
বেশিরভাগ দেশে খাবারের লবণেও আয়োডিন যুক্ত থাকে।
যুক্তরাজ্যের মতো অনেক দেশে মানুষ দুধ এবং দুগ্ধজাত খাবার থেকে সরাসরি আয়োডিন পেয়ে থাকে, কারণ গরুর খাবারে আয়োডিন যোগ করা হয়।
কিন্তু শিল্পোন্নত দেশেও অনেক মানুষের মধ্যে আয়োডিনের ঘাটতি দেখা যায়। খাবারে আয়োডিনের অভাব রয়েছে, সেটা এ কারণে নয়। এর প্রধান কারণ, তারা এসব খাবার খেতে চান না।
এই দলে সবচেয়ে বেশি রয়েছেন নিরামিষ আহারীরা, যাদের খাবারের তালিকায় মাংস থাকে না। দিনে দিনে এই দলের সংখ্যাও বাড়ছে।
নরওয়েজিয়ান ইন্সটিটিউট অফ পাবলিক হেলথ বিভিন্ন বয়সের মানুষজনের উপর সম্প্রতি একটি গবেষণা করেছে, যার মধ্যে গর্ভবতী নারীরাও রয়েছে।
সংস্থাটি দেখতে পেয়েছে, নিরামিষ আহারীদের মধ্যে আয়োডিন গ্রহণের হার খুবই কম।
অধ্যাপক রেম্যানও দেখতে পেয়েছেন, নিরামিষ আহারী আর যারা মাংস খান না, এরকম গর্ভবতী নারীদের আয়োডিন সমস্যা তাদের শিশুদের মধ্যেও পড়ে।
নব্বুইয়ের দশকে ১৪ হাজারের বেশি গর্ভবতী নারীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন অধ্যাপক রেম্যান। এরপর তিনি তাদের ও তাদের সন্তানদের স্বাস্থ্য ও বেড়ে ওঠার বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখেন।
বিশেষ করে সন্তানদের পড়াশোনার ক্ষমতা এবং বুদ্ধিমত্তার দিকটি তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নজরে রাখেন। তাদের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করেন।
তারা দেখতে পেয়েছেন, যে নারীদের আয়োডিনের সমস্যা ছিল, তাদের সন্তানরা আট বছর বয়সে মৌখিক বুদ্ধিমত্তা পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছে। নয় বছর বয়সেও তাদের পড়াশুনায় কম সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
এই পরীক্ষা তারা দেখতে পেয়েছে, মায়ের সমস্যার প্রভাব পড়েছে তাদের সন্তানদের ওপর।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগের ব্যাপার হলো, যাদের সামান্য আয়োডিন ঘাটতি রয়েছে,এই সমস্যা তাদের মধ্যেও প্রবলভাবে রয়েছে।

কোথায় পাওয়া যায় আয়োডিন?

বিশ্বে আয়োডিনের সবচেয়ে বড় উৎস সমুদ্র।
সমুদ্র থেকে আকাশ, পরিবেশ, বৃষ্টি ইত্যাদির মাধ্যমে খাদ্য চক্রের মাধ্যম গাছপালা বা প্রাণীর মাংস খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে আসে।
কিন্তু ভূমি বেষ্টিত এলাকায় সব সময়ে সমুদ্র ছুঁয়ে আসা বৃষ্টি হয় না। আবার যারা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, তারাও সব খাবারে আয়োডিন পাননা। যা ঘটনা ঘটে আল্পসে, পাকিস্তানের প্রত্যন্ত এলাকাগুলো বা ইটালি, রাশিয়া, মধ্য আফ্রিকার পাহাড়ি এলাকাগুলোয় দেখা যায়।
আবার বাংলাদেশের মতো বন্যা প্রবণ এলাকায়ও আয়োডিনের ঘাটতি দেখা যায়। কারণ বন্যার পানি মাটি থেকে আয়োডিন ধুয়ে নিয়ে যায়।

প্রতিদিন কতটা আয়োডিন দরকার?

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন যে,একজন নারীর খাবারে প্রতিদিন ১৫০ মাইক্রোগ্রাম থেকে ৩০০ মাইক্রোগ্রাম আয়োডিন থাকা উচিত।
কিন্তু একেকটি খাবারে আয়োডিনের মাত্রা একেক রকম। তাই কোন খাবার কতটুকু খেলে পরিমাণ মতো আয়োডিন পাওয়া যাবে বলা কঠিন।
তবে সাদা মাছে যতটা আয়োডিন থাকে, তৈলাক্ত মাছে ততটা থাকে না।
ঠাণ্ডা দুধে বেশি আয়োডিন থাকে।
অর্গানিক নয়, এমন দুধেও যথেষ্ট আয়োডিন থাকে। কারণ খামারের গরুকে কি খাওয়ানো হবে, এসব বিধিবিধানের কারণে এসব দুধ আয়োডিন সম্পন্ন হয়।
সবচেয়ে ভালো হলো, নানা ধরণের খাবার খাওয়া। মাংসের মতো কোন একটি খাবারের ধরণ একেবারে বাদ না দেয়া, যদি না চিকিৎসকের নিষেধাজ্ঞা থাকে।