Thursday, June 12, 2014

গোঁসা করে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেনিফার লোপেজ থাকছেন না

ব্রাজিল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে থাকছেন না বিশ্বকাপের থিম সংয়ের অন্যতম গায়িকা জেনিফার লোপেজ। ১২ জুন টুর্নামেন্টের কিকঅফের আগে এক মঞ্চে গাওয়ার কথা ছিল ক্লদিয়া লেইতে, পিটবুল ও লোপেজের। যারা ব্রাজিল বিশ্বকাপের থিম সং 'উই আর ওয়ান'-এর যৌথ তিন গায়ক-গায়িকা।

কিন্তু লোপেজের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় বিশেষ কারণে ব্রাজিলে বিশ্বকাপের উদ্বোধনের দিন তিনি উপস্থিত থাকতে পারছেন না। কারণটা মুখে না বললেও জোলোর অনুপস্থিতির কারণটা বোঝাই যাচ্ছে। শাকিরার ওয়াকা ওয়াকার সঙ্গে পাল্লা দিতে ময়দানে নেমেছিলেন তিনি। কিন্তু শাকিরা টেক্কা দিতে পারেননি লোপেজ।

কারণ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে শাকিরার ওয়াকা ওয়াকার জবাবে লোপেজের তাস ছিল `উই আর ওয়ান`। উই আর ওয়ান তো জনপ্রিয় হয়ইনি, বরং গানের বেশ কিছু অংশ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। লোপেজ-পিট বুলের থিম সং সেভাবে আলোড়ন না তোলায় ফিফা শাকিরাকেই ফের থিম সংয়ে ফিরিয়ে আনে। আর এতেই বেশ চটে যান লোপেজ।

তাঁকে পাত্তা না দিয়ে শাকিরাকে যেভাবে গুরুত্ব দিতে শুরু করে ফিফা, তাতেই অভিমান হয় লোপেজের। আর তাতেই...

মোদির সঙ্গে বৈঠকে আমি খুশি : নওয়াজ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদির সঙ্গে বৈঠক নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে লেখা এক চিঠিতে তিনি এই অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন বলে টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে। নয়াদিল্লিতে গত ২৭ মে দুই নেতার মধ্যে ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে বৈঠকটি নিয়ে নওয়াজ অসন্তুষ্ট হয়েছেন বলে গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
বৈঠক সম্পর্কে নওয়াজ তার চিঠিতে বলেন, আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাতে চাই, মোদির সঙ্গে বৈঠক করতে পেরে আমি সত্যিকার অর্থেই ভীষণ আনন্দিত। বৈঠকে আমরা দ্বিপাক্ষিক এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে অর্থপূর্ণ চিন্তা বিনিময় করেছি। মঙ্গলবার পাকিস্তানের হাইকমিশন মোদির কাছে লেখা নওয়াজের ওই চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে হস্তান্তর করেন।

শান্তি, সমৃদ্ধি ও মৈত্রীর সন্ধানে চীন

পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর ফ্রেন্ডশিপ
অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
গত মে মাসের মাঝামাঝিতে চীনা কর্তৃপক্ষ একটি সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের লক্ষ্য ছিল, চীনের পিপলস অ্যাসোসিয়েশন ফর ফ্রেন্ডশিপ উইথ ফরেন কান্ট্রিসের ষষ্ঠ দশক পূর্তি উদ্‌যাপন করা। প্রতিটি দশক পূর্তিতে এই সংস্থাটি এই উৎসবের আয়োজন করে থাকে। এই বছরের এই উদ্‌যাপন উৎসবে বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশ অংশ নিয়েছিল। সম্মেলনে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনওয়ারুল আমিন আর আমি আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। আনওয়ারুল আমিন প্রায় সাত বছর একজন ব্যাংকার হিসেবে চীনে অবস্থান করেন এবং তার পর থেকেই চীন বাংলাদেশ মৈত্রীর উন্নয়নে পরিশ্রম করছেন। আমার ৩৬ বছরের কর্মজীবনের একটি বিরাট অংশ কেটেছে চীনে এবং চীন-সম্পর্কিত বিষয়াদিতে৷ সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আমি চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বকে প্রসারতর করার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রয়েছি। তাই আমরা দুজনই এই আমন্ত্রণটি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলাম। বিদেশি প্রতিনিধিদের মধ্যে ভারতীয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা একটি বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখেন। ভারতীয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে ছিল ইতিহাসখ্যাত ভারতীয় চিকিৎ​সক কুটনিসের পরিবারের অর্থাৎ পরবর্তী প্রজন্মের ছয়জন সদস্য। তাঁদের মধ্যে একজন ডা. কুটনিসের ভাতিজা, ৯১ বছর বয়সে আমাকে বয়োজ্যেষ্ঠতার প্রতিযোগিতায় অনায়াসে পরাজিত করেন। শুধু তা-ই নয়। চীনের ‘গ্রেট হল অব ফি পিপলসের’ সুদীর্ঘ বারান্দা ও করিডর অতিক্রম করতে তাঁর জন্য রক্ষিত হুইলচেয়ারটি আমার সুবিধার্থে আমার জন্য ছেড়ে দেন! বয়স্ক পাঠকদের কাছে ভারতীয় চিকিৎ​সক কুটনিস সুপরিচিত হওয়ার কথা। চীন-জাপান যুদ্ধে তিনি চীনের পক্ষে বিশেষ অবদান রাখেন এবং চীনাদের সেবারত অবস্থায় সেখানেই চল্লিশের দশকে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর জীবনের ওপর ভি. শান্তারাম ডা. কুটনিসকি অমর কাহানি শীর্ষক একটি জনপ্রিয় হিন্দি চলচ্চিত্র তৈরি করেন। অতএব ভারতীয় প্রতিনিধিদলে ছিলেন কুটনিস পরিবারেরই ছয়জন সদস্য।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিনিধিদলের নেতা ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নাতি, ক্রিস্টোফার কক্স নিক্সন। বলাই বাহুল্য যে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কোন্নয়নে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিশাল অবদানের স্বীকৃতি ছিল অনুষ্ঠানটিতে তাঁর নাতির উপস্থিতি। এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, তাঁর অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ১৫ মিনিটের ভাষণ। ২০১৪ সালের ১৫ মে এই ভাষণটি এই অর্থে গুরুত্বপূর্ণ যে বিশ্বসম্পর্ক, বিশ্বশান্তি ও চীনের উন্নয়ন নিয়ে চীনের বর্তমান চিন্তাধারা তাতে প্রতিফলিত হয়েছে। চীনের নেতাদের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে, শব্দের বিন্যাস এবং চয়ন কোনো বিষয় তুলে ধরতে উপমার প্রয়োগ এবং ভাবনার অলংকরণ চিত্তাকর্ষক। এই ভাষণটি তার ব্যতিক্রম ছিল না। চীনের দুই হাজার বছরের দার্শনিক গুরু কনফুসিয়াসের (যদিও ষাট ও সত্তরের দশকের কট্টর কমিউনিস্ট শাসনের সময়ে তাঁর নাম উচ্চারিত হতো না) উদ্ধৃতি দিয়েই শুরু হয় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভাষণ। দুই হাজার বছর আগে কনফুসিয়াস বলেছিলেন, ‘সুদূরের বন্ধুদের আগমন সদাই আনন্দদায়ক।’ এই কথাটি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্মরণ করলেন। তারপর বললেন, ‘জাতি হিসেবে চীন একফোঁটা পরিমাণ পানির দয়ারও প্রতিদান দিতে চায় কৃতজ্ঞতার ঝরনাধারায়। চীনারা তাদের বন্ধুদের কখনো ভুলবে না।’ তিনি কৃতজ্ঞতা জানালেন সেসব আন্তর্জাতিক বন্ধুকে, যারা চীনের সঙ্গে ‘বন্ধুত্বের মূল্য প্রদানে চীনের বিপ্লব, সংস্কার আর উন্নয়নের প্রতি সহানুভূতি এবং সমর্থন জানিয়েছে৷’ তিনি বললেন, ‘বিশ্বাস ও সমতাই হচ্ছে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্কের পূর্বশর্ত।’ তাঁর কথায় আমরা যতই ‘বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব, অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন ও তথ্যবিপ্লবের প্রয়োগের পানে ধাবিত হচ্ছি; জাতীয় স্বার্থ, ভাগ্য ও নিরাপত্তার নিরিখে পৃথিবীর দেশগুলো পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা এবং একে অন্যের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
তারা আজ সম্মিলিত ভাগ্যোন্নয়নে একটি সুসংঘবদ্ধ পরিবারের সদস্য’। চীনের কথা বলতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বললেন, চীন এখন ‘উন্নয়ন সংস্কার ও প্রগতির’ সংগ্রামে লিপ্ত। চীনের শতাব্দীর লক্ষ্য দুটি—যথা একটি উন্নয়নশীল সমাজ নির্মাণের সম্পূর্ণকরণ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ২০১০ সালের তুলনায় চীনের শহর ও গ্রামাঞ্চলে মানুষের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করা৷ এভাবেই চীন এই শতাব্দীর মাঝামাঝিতে একটি আধুনিক সমাজবাদী দেশে পরিণত হবে; যা বিত্তশীল, ক্ষমতাবান, গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আগুয়ান দেশ হিসেবে চীনের জাতীয় নবায়নের স্বপ্ন সার্থক করবে। এই স্বপ্ন শুধু চীনাদের নয়, অন্যান্য দেশের মানুষের স্বপ্নেরই প্রতিফলন। তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়নে চীন তাদের হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাবে। চীনের স্বপ্নের বাস্তবায়ন পৃথিবীতে একটি বিশাল সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। শি জিনপিং বলেন, ‘শত শত নদনদী বরণ করেই সাগর বিশাল আকার ধারণ করে।’ চীন নিজেকে বহির্বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করবে, পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে এবং ‘সিল্ক রোডের’ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং একবিংশ শতাব্দীর জলপথের ‘সিল্ক রোডের’ উন্নয়ন করবে, যাতে দেশগুলো তাদের উন্নয়ন সম্ভাবনা ভাগ করে নিতে পারে। অধিকতর উন্মুক্ততা নিয়ে চীন সাংস্কৃতিক দেওয়া-নেওয়া করবে, যাতে বিশ্বসভ্যতা পারস্পরিক শিক্ষালাভের ভিত্তিতে এগিয়ে যায়। তারপর শি জিনপিংয়ের কথা হলো চীনের সাম্প্রতিক দ্রুত অগ্রগতিতে কিছু মানুষ চীনের আধিপত্য বিস্তারের ভীতি পোষণ করছেন। তাঁদের এই মনোভাব ভ্রান্ত ধারণা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনের প্রতি বিরূপ মনোভাবেরই প্রতিফলন। কিন্তু চীন মনে করে, শান্তি হচ্ছে সবচেয়ে মূল্যবান এবং অন্যদের প্রতি প্রীতি ও বন্ধুত্ব প্রদর্শন করা এবং ‘কারও বিরুদ্ধে এমন কিছু না করা, যা চীনারা চাইবে না যে তারা চীনের বিরুদ্ধে করুক। এই ধারণাটি চীনের মানুষের এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে বিদ্যমান রয়েছে এবং চীনের ব্যবহার আর মানসিকতায় তারই প্রতিফলন ঘটে। চীনের পূর্ববর্তী প্রজন্ম বিশ্বাস করত যে যুদ্ধভাবাপন্ন রাষ্ট্রগুলো ক্রমে ক্রমে বিলীন হয়ে যাবে, তা যত বড় রাষ্ট্রই হোক না কেন। আদিকাল থেকেই চীন বাণিজ্য আর যোগাযোগ বাড়ানোতে বিশ্বাসী, আক্রমণ আর আধিপত্য বিস্তারে নয়। চীন নিজের দেশকে দেশপ্রেমের মাধ্যমে রক্ষা করার প্রয়াস নিয়েছে, সাম্রাজ্যবাদ বিস্তার করতে চায়নি।
দুই হাজার ১০০ বছর আগে চীনারা সিল্ক রোড সৃষ্টি করেছিল, যার মাধ্যমে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতার লেনদেন হয়েছে এবং যা সেই অঞ্চলের মানুষকে গভীরভাবে লাভবান করেছে। ৬০০ বছর আগে চীনের নাবিক জেংহি প্রশান্ত মহাসাগর আর পশ্চিম ভারত সাগরে একটি শক্তিশালী নৌবহর নিয়ে সাতবার সমুদ্রযাত্রা করেছিলেন। তিনি যে ৩০টি দেশ সফর করেছিলেন, তার এক ইঞ্চি পরিমাণ জায়গাও তিনি দখল করেননি। তাঁরা শান্তি ও বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে সেখানে গিয়েছিলেন এবং সেসব দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েরই বীজ বপন করে এসেছিলেন। শি জিনপিংয়ের কথায় গণচীন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত চীনের আধুনিক কালের ইতিহাস ছিল অবমাননা, পরাজয় আর বিপর্যয়ের। কিন্তু তা চীনের মানুষের বিদেশি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং জাতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামেরও মহান ইতিহাস। চীনের মানুষ, যারা বহু বাধাবিপত্তির অভিজ্ঞতা অতিক্রম করেছে, তারা শান্তির কামনা করে এবং তাদের দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা তারা কোনো দেশের ওপর চাপিয়ে দেবে না। শি জিনপিং তাঁর ভাষণের সমাপনী অংশে বললেন যে চীন শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের প্রচেষ্টায় লিপ্ত রইবে এবং অন্যান্য দেশকেও সেই পথ অনুসরণ করতে উৎসাহিত করবে। চীন অধিকতর আন্তর্জাতিক দায়িত্ব গ্রহণ করবে, মানবতা ও আন্তর্জাতিক সুবিচারের জন্য অন্যদের সঙ্গে কাজ করে যাবে, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়াদিতে ন্যায়বিচার সমুন্নত রাখবে এবং বিরোধ সমাধানে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা নেবে। বিশ্বশান্তি বজায় রেখে চীন উন্নয়নে লিপ্ত রইবে এবং উন্নয়নের মাধ্যমেই বিশ্বশান্তি আনয়নের পক্ষে রইবে। চীন সমতার ভিত্তিতে, আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা ও মতানৈক্য সমাধানে সচেষ্টা রইবে এবং তাতে আন্তরিকতা ও ধৈর্যের পরিচয় দেবে। শি জিনপিং বলেন, চীনে একটি কথা আছে যে মানুষের মধ্যে সম্পর্কই আন্তরাষ্ট্র সম্পর্কের চাবিকাঠি এবং পারস্পরিক সমঝোতাই হলো মানুষের মধ্যে সম্পর্কের চালিকাশক্তি। তিনি বলেন, ইউনেসকোর সদর দপ্তরে বিভিন্ন ভাষায় লিখিত একটি বাণী তিনি পাঠ করেছেন। তা হলো, যেহেতু সংঘাতের সূচনা মানুষের মনে ঘটে, মানুষের মনেই নির্মাণ করতে হবে শান্তিরক্ষার কবচ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের এই ভাষণটি প্রাসঙ্গিক মনে হলো। এখানে অবশ্য বলার প্রয়োজন রয়েছে, চীনা ভাষা থেকে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে বাংলায় আমার ভাষান্তরের প্রচেষ্টায় অনেক ভুলভ্রান্তি ও অসম্পূর্ণতা নিশ্চয় রয়েছে—তবে এই ভাষণটি থেকে যেকোনো দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কে চীনের চিন্তাধারার একটি আভাস পাওয়া যায়। আমার এই দুর্বল প্রচেষ্টার কৈফিয়ত সেখানেই।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব। কলাম লেখক।
zaaf@bdmail.net

মোদির পথে আমাদের নেতারাও হাঁটতে পারেন

শিরোনামটি সেনাপতি ও সম্রাট নেপোলিয়নের একটি উক্তির অংশবিশেষ। ফরাসি বিপ্লবোত্তর যুগে সেনাপতি থেকে সম্রাট পদে আসীন নেপোলিয়ন খ্যাতির শীর্ষে উঠেছিলেন। তিনি সমানভাবে ছিলেন নন্দিত ও সমালোচিত। বহু যুদ্ধ করেছেন। বিজয়ী হয়েছেন। হয়েছেন পরাজিতও। এমনি একটি যুদ্ধে বিপর্যয়ের পর তাঁর অধীনস্থ সেনানায়কদের সঙ্গে এক বৈঠকে এর কারণ বিশ্লেষণ করা হয়। সেনানায়কেরা বলছিলেন, নিম্নমানের সৈনিকদের জন্যই তাঁরা নির্দেশিত লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হননি। নেপোলিয়ন সে আলোচনা বৈঠকটির সমাপ্তি টানতে গিয়ে উল্লেখ করেন, ‘জেন্টলম্যান, দেয়ার আর নো ব্যাড সোলজার্স। অনলি ব্যাড অফিসার্স।’ এ উক্তিটির মধ্যে বার্তা ছিল, নেতৃত্বের ভূমিকাই লক্ষ্য অর্জনে প্রধান নিয়ামক। ব্যর্থতার জন্য নেতার অনুসারীরা দায়ী নন। নেপোলিয়নের এ উক্তিটি অতিসম্প্রতি উচ্চারিত হলো ভারতের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে। কলকাতার আনন্দবাজার সূত্রে জানা গেল, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কথাটি বলেছেন তাঁর সতীর্থ মন্ত্রী আর আমলাদের কাছে। নরেন্দ্র মোদির এ উক্তি উচ্চারণের পটভূমিকা আলোচনার দাবি রাখে। বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে সাবেক সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদের বহাল রাখা হয়। এখানে তড়িঘড়ি পরিবর্তন চান না নরেন্দ্র মোদি। ভারতে সিভিল সার্ভিস মূলত অরাজনৈতিক। রাজনৈতিক পরিবর্তন এখানে তেমন ঢেউ তোলে না। তা সত্ত্বেও কিছু স্পর্শকাতর পদে পরিবর্তন আনা হয় দ্রুতই।
এমনকি ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই তখনকার মন্ত্রিপরিষদ সচিব কমল পান্ডের স্থলে নিয়োগ দেওয়া হয় বিকে চতুর্বেদীকে। মনে করা হয়েছিল, কমল পান্ডে বিদায়ী উপপ্রধানমন্ত্রী আদভানির কাছের লোক। মোদি কিন্তু ভিন্ন পথই ধরলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব অজিত শেঠের চাকরির বর্ধিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল মধ্য জুনে। মোদি তা ছয় মাস বাড়িয়ে দিলেন। অবশ্য নিয়োগসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন নিয়েই। নিজেদের পদে বহাল রয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব ও পররাষ্ট্রসচিব। যে সরকারের নীতিপঙ্গুত্ব এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে আক্রমণ করে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় এলেন, সে সরকারের শীর্ষ আমলাদের তিনি সঙ্গে রাখতে চাইছেন কেন? এসব প্রশ্নের জবাবেই মোদি ওই উক্তি করেছিলেন বলে জানা যায়। তাঁর মতে, সরকারের কাজকর্মের জন্য আমলাতন্ত্রকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। সমস্যাটা নেতৃত্বের, আমলাদের নয়। এ প্রসঙ্গে টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ বলেছেন, মোদি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। বলির পাঁঠা খোঁজায় বিশ্বাস করেন না। এরই মধ্যে নরেন্দ্র মোদি সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি সভা করেছেন। রাজনীতি-নিরপেক্ষ একটি শক্ত প্রশাসনব্যবস্থা তিনি গড়ে তুলতে চান বলে সে বৈঠকে বলেছেন। সরকার বদলে তাঁদের ভীত হওয়ার কারণ নেই বলেও আশ্বস্ত করেছেন। এমনকি প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতেও তিনি তাঁদের নির্দেশ দিয়েছেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, এর আগে দীর্ঘ ১০ বছর কেন্দ্রীয় সরকারে ছিল কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউপিএ জোট। সুতরাং পদস্থ কর্মকর্তারা সে সময়কার নেতাদের কিছু ঘনিষ্ঠ হওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
সরকার পরিবর্তনে নিজেদের পদ-পদ​িব হারানোর শঙ্কায় থাকতে পারেন তাঁরা। তবে ভারতের শাসনব্যবস্থার সংস্কৃতিতে সীমিত ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে সরকারি কর্মকর্তাদের পদায়ন-পদোন্নতি রাজনৈতিক বিবেচনায় হয় না। নিয়োগ তো নয়ই। তার পরও নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর এ আশ্বাস ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আরও প্রত্যয়ী করল। দূর করে দিল সব শঙ্কা আর ভয়। তাঁরা দ্রুত নিবেদিত হতে পারবেন নিজেদের দায়িত্ব পালনে। বিরোধী কংগ্রেস দল অবশ্য আমলাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের সম্পর্ক স্থাপনকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে। এর ফলে প্রশাসনে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাসের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন তাদের একজন মুখপাত্র। তাঁর মতে, এতে জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্ব কমে যাবে। এর জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এমন ভাবনার কোনো কারণ নেই। প্রশাসনে স্বচ্ছন্দ গতি আনতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এ কার্যকর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে বিস্মিত হচ্ছেন তাঁরা নিজেরাই। তাঁদের একজন তো এমনও বললেন, ‘অধস্তন কর্মীরা “বস”কে নিয়ে আগে হোমওয়ার্ক করে থাকেন। “বস” যে কর্মীদের ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করেন, এই প্রথম দেখলাম।’ ভারতের প্রশাসনিক সংস্কৃতি সম্পর্কে ওপরে যে আলোচনা হয়েছে তা কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার পর্যায়ে চিড় ধরেছে। ব্যর্থতার দায়ভার চাপানো হয় শুধু আমলাদের ঘাড়ে। কথায় কথায় তাঁদের দোষ ধরা হয়। মুহূর্তেই করা হয় বদলি। এমন ব্যবস্থা উত্তর প্রদেশে অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। অতিসম্প্রতি দুটি গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় গোটা দেশে তোলপাড় হলো। বিস্ময়করভাবে এর ফলে অপসারিত হলেন রাজ্যের মুখ্য সচিব। ভারতীয় গণমাধ্যম এ সিদ্ধান্তটির বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।
এ সংস্কৃতি অন্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গ অনেকটা উত্তর প্রদেশের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। প্রকৃতপক্ষে অকারণে এমনটা হলে শুধু বিশেষ দু-একজন কর্মকর্তা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, আঘাত পড়ে গোটা প্রশাসনব্যবস্থায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মনোবলে পড়ে ভাটা। এমনটা যাতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারে না হয়, তার জন্য সূচনা থেকেই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছেন নরেন্দ্র মোদি। তাঁর প্রত্যাশা, একটি অরাজনৈতিক শক্তিশালী প্রশাসনব্যবস্থা। আর এটা গড়ে তোলার জন্য আগের সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের দ্রুততার সঙ্গে পাল্টানোর আবশ্যকতা নেই; এমনটাই তাঁর কার্যক্রমে সুস্পষ্ট। এ উপমহাদেশ একই প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশীদার। ব্রিটিশদের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থাটিকেই ভারত সফলভাবে জনমুখী ও জোরদার করেছে। দলীয়করণের অভিযোগ সেখানে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে। আর আমরা? দলীয় বিবেচনার নামে গোটা শাসনব্যবস্থাটিকে আজ বিপন্ন করে ফেলা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে উপজেলা সর্বত্রই এর কালো হাত। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি। এ ছাড়া, প্রভাবশালী মহলের বিরাগভাজন হলে দ্রুততার সঙ্গে সে কর্মকর্তাকে করা হয় বদলি কিংবা ওএসডি। চারদলীয় জোট সরকারের সময় বাধ্যতামূলক অবসরও দেওয়া হতো। ব্যর্থতার দায়ভার শুধু আমলার। এভাবে গোটা ব্যবস্থাটিকে আমরা বিপন্ন করছি। এ ব্যবস্থায় সে কর্মকর্তাদেরই কেউ বনে গেছেন দলের নেতা-কর্মী আর অনেকেই হতোদ্যম। শেষোক্তরা যতটুকু সম্ভব হাত গুটিয়ে রাখেন। অনেক রুটিন দায়িত্বকে তাঁরা ধরে নেন স্পর্শকাতর বলে। আর বাস্তবতাও তাই। বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর মামলায়ও বিশেষ কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না, এ সিদ্ধান্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা দূরে থাকুক, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এমনকি জেলার এসপিও নিতে পারেন না।
নির্দেশনা চাওয়া হয় ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’। এভাবে একটি দেশের পরীক্ষিত ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। আর দলীয়করণ? সরকার পরম্পরা ক্রমবর্ধমান হারে তা ঘটে চলছে। সব ক্ষেত্রেই ব্যবস্থাটির সদম্ভ অবস্থান। তা ছাড়া রয়েছে বিবেচনাহীন অনুপাতে কোটা ব্যবস্থায় নিয়োগ। ফলে মেধা কার্যত উপেক্ষিত। শুধু গত সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন এমন দায়ে ওএসডি ও পদোন্নতিবঞ্চিত আছেন ডজন ডজন কর্মকর্তা। তাঁদের কারও কারও ওএসডি থাকার মেয়াদ পাঁচ বছরের ঊর্ধ্বে। তবে তাঁরা ‘ভাগ্যবান’ এ অর্থে যে বর্তমান সরকার বাধ্যতামূলক অবসরের অস্ত্রটি প্রয়োগ করেননি, সীমিত ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে। এসব কর্মকর্তার মধ্যে আছেন প্রতিশ্রুতিশীল নিষ্ঠাবান অনেক কর্মকর্তা। উপকৃত হতো দেশ ও সরকার, তাঁদের সেবা নিতে পারলে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা সে সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। বরং সৃষ্টি করছি একটি কদর্য পরিস্থিতি। আমাদের এখানে ব্যর্থতার দায়ভার চাপানো হয় মূলত নিচের দিকেই। নেপোলিয়ন যুগের সে সৈনিকদের মতো আমাদের প্রশাসনের সৈনিকেরা সবাই দক্ষ ও উপযুক্ত, এমন দাবি এখন হয়তো করা যাবে না। আবার অনেকেই আছেন, যাঁদের সুনাম ও সততা বিতর্কিত। দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ। তেমনি বলা যায় না, সব নেতাই মন্দ। তবে এটুকু তো বলা যায় যে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব তাঁদেরই। অদক্ষ আর বিতর্কিত সৈনিকদের তাঁরা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ঝেড়ে ফেলতে পারেন। তা না করে তাঁরা ব্যর্থতার দায়ভার নেওয়ার জন্য বলির পাঁঠা খোঁজেন কেন অধীনস্থদের মধ্যে? নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য তো আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দৃশ্যমানভাবে সক্রিয়। তারা প্রশাসন পরিচালনায় মোদির সূচনার নজিরটি তো অনুসরণ করতে পারে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

পাকিস্তানে জঙ্গি হামলা

পাকিস্তানের করাচি বিমানবন্দরে হামলার পর সরকারি ও জঙ্গিবাহিনী উভয়ই সাফল্য দাবি করলেও এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে পরাস্ত হয়েছে খোদ পাকিস্তান৷ সন্ত্রাস-নাশকতার কবল থেকে পাকিস্তানের মানুষের মুক্তি যে এখনো দূরে, এ ঘটনা সেটিই জানিয়ে গেল৷ গত রোববার রাত থেকে ভোর পর্যন্ত করাচি বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী আক্রমণ প্রতিরোধের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩৬  জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে৷ এদের মধ্যে ১০ জন জঙ্গিবাহিনীর সদস্য বলে জানিয়েছে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ৷ জ​িঙ্গদের হত্যার মাধ্যমে অধিকতর ক্ষয়ক্ষতি বন্ধ করাকে সাফল্য হিসেবে দাবি করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী৷ পাশাপাশি পাকিস্তানের তালেবান সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) সুরক্ষিত বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর অংশে হানা দেওয়াকে তাদের সাফল্য বলে দাবি করেছে৷ বলার অপেক্ষা রাখে না, একসময় তালেবানদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আফগানিস্তানের সোভিয়েত-সমর্থক সরকারকে উচ্ছেদ করার সাফল্যে গর্বিত ছিল পাকিস্তানের সেনা এস্টাবলিশমেন্ট৷ আবার তারাই বিভিন্ন সময়ে তালেবানদের হত্যা​ ও দম​নকে সফলতা বলে বর্ণনা করে৷ একে বলা হয় বিল্ড-অপারেট-ডেস্ট্রয় পদ্ধতির ‘সাফল্য’৷ পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সঙ্গে মিলে তালেবান তৈরি ও নিজেদের স্বার্থে পরিচালিত করেছে৷ কিন্তু ৯/১১–এর পর যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান সম্মিলিতভাবে তালেবান-আল–কায়েদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন থেকেই তারা পাকিস্তান এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী অভিযান ও গুপ্ত হামলা চালাতে থাকে৷ করাচির এই সন্ত্রাসী হামলা ঘটল তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার সময়৷ পাকিস্তানি সমাজের একটা অংশ মনে করে,
তালেবানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমেই শক্তিটিকে বশে রাখা সম্ভব৷ করাচির হামলার পরে এই আলোচনার সুযোগ আরও সংকীর্ণ হয়ে গেল৷ তাই সেনাবাহিনী করাচির জঙ্গিদের হত্যায় যতই সাফল্য দাবি করুক, পাকিস্তান সরকারের জন্য এটি ব্যর্থতাও বটে৷ একদিকে জঙ্গিবাদ দমনের ব্যর্থতার দায়ভার সরকারের ওপর বর্তাচ্ছে, অন্যদিকে চাইলেও তালেবান প্রশ্নে সেনাবাহিনীর হিসাব-নিকাশের বাইরে যাওয়ার অবস্থা সরকারের নেই৷ পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশের শেখার আছে এটাই যে, আগুন নিয়ে খেলতে নেই৷ রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে বা যেকোনো কারণেই জ​িঙ্গবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া আত্মধ্বংসী পরিণতি পেতে বাধ্য৷ পাশাপাশি বিমানবন্দর, তথা এ ধরনের স্পর্শকাতর স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন৷ ভারতে ক্ষমতার পালাবদল, আফগানিস্তা​ন থেকে মার্কিন সেনাদের প্রস্থানের পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এ দেশেও জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ এ ব্যাপারে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি রাজনৈতিক দূরদর্শিতাও প্রয়োজন৷ প্রথমত, কোনো ধ​রনের স্থানীয় চরমপন্থী কার্যকলাপকে হালকাভাবে নেওয়া চলবে না৷ দ্বিতীয়ত, সমাজের কোনো অংশকে এমনভাবে অসন্তুষ্ট ও কোণঠাসা করে তোলা যাবে না, যাতে তারা উপায়ান্তর না পেয়ে জঙ্গিবাদী পথ গ্রহণ করে৷ তৃতীয়ত, অন্য কোনো দেশের জঙ্গিগোষ্ঠীর বাংলাদেশকে বেছে নেওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকতে হবে৷ বাংলাদেশের সমাজের জঙ্গিবাদবিরোধী সহিষ্ণু ধারাকে সবল করার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে৷