Friday, August 14, 2015

সৈয়দ আশরাফ ও মির্জা ফখরুলের মনোবেদনা by সোহরাব হাসান

ঘটনাটি কাকতালীয় হলেও তাৎপর্যপূর্ণ।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম যেদিন ‘দপ্তর’ হারালেন, তার কয়েক দিন পরই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কারাগার থেকে মুক্ত হলেন উচ্চ আদালতের নির্দেশে। দীর্ঘ ছয় মাসের বেশি সময় তিনি কারাগারে ছিলেন বোমাবাজি-গাড়ি ভাঙচুর-নাশকতার একগুচ্ছ মামলায়। হাইকোর্ট দুই দফায় তাঁকে জামিন দিলেও মির্জা ফখরুলকে সরকার আটক রাখে সেই জামিনের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে রিট করে। অবশেষে আপিল বিভাগও ছয় সপ্তাহের জামিন দিয়েছেন। এর আগে তাঁর চিকিৎসার বিষয়েও আদালত সরকারকে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার রিপোর্ট জমা দিতে বলেছিলেন। অর্থাৎ তাঁর মুক্তির ঘটনাটি প্রত্যাশিত হলেও সহজ ছিল না। যদিও আগের দিন ৪০টির বেশি মামলায় বিএনপির আরেক নেতা আমান উল্লাহ আমানের জামিন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বেশ গুঞ্জন রয়েছে। মির্জা ফখরুলের মামলায় সরকার আপিল করলেও আমানের মামলায় আপিল করেনি। আইন সব সময় এক গতিতে চলে না।
সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন ২০০৯ সালে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সাহসী ও কৌশলী ভূমিকার কারণে এটি ছিল তাঁর পুরস্কার। কেননা, সে সময়ের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলসহ দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা স্বেচ্ছায় হোক কিংবা সেনাসমর্থিত সরকারের চাপে হোক দলীয় সভানেত্রীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। সে জন্য তাঁদের কাফফারাও দিতে হয়েছে। হয়তো এখনো কেউ কেউ দিচ্ছেন। কিন্তু সাড়ে ছয় বছরের মাথায় এসে সৈয়দ আশরাফের দপ্তর হাতছাড়া হওয়ার কারণ কী? এটি শেষের শুরু না শুরুর শেষ সেটা জানতে আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে প্রথমেই যে কথাটি বলা প্রয়োজন তা হলো দলের সাধারণ সম্পাদক হলেই তাঁকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিতে হবে কেন? আশির দশকে সেনাশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এই রেওয়াজ চালু করলেও পরবর্তী প্রতিটি গণতান্ত্রিক সরকার তা অনুসরণ করে আসছিল। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, জিল্লুর রহমান কিংবা আবদুল মান্নান ভূঁইয়ার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী থাকার অভিন্ন লক্ষ্য ছিল সরকারের উন্নয়নকাজের ষোলো আনা সুফল ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের পাইয়ে দেওয়া। তৃণমূল পর্যায়ে প্রশাসন দুর্নীতির রাহুগ্রাসে পড়ার এটাও অন্যতম কারণ। কেননা, সরকারি কর্মকর্তারা যখন দলীয় লোকজনকে অন্যায় সুবিধা দিতে বাধ্য হন, তখন তাঁরা নিজেদের ‘হিস্যাটাও’ বুঝে নেন। অনেকের মতে, সৈয়দ আশরাফ দলীয় নেতা-কর্মী তথা সাংসদের তদবির-মোসাহেবিকে তেমন পাত্তা দিতেন না বলে আওয়ামী লীগের ভেতরেই তাঁর বিরুদ্ধে নীরব ‘অভ্যুত্থানের’ চেষ্টা চলছিল দীর্ঘদিন থেকে। একনেক বৈঠকটি ছিল উপলক্ষ মাত্র। একনেকের যে সভায় ৩৫০ জন সাংসদের জন্য ৬ হাজার ৭৬ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়, সেই সভায় তাঁর গরহাজির থাকা নীতিগত বলেও কেউ কেউ মনে করেন। কেননা, এর আগে একই ধরনের প্রকল্পে সাংসদদের জন্য থোক বরাদ্দ হিসেবে নগদ টাকা দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন তিনি।
কারণ যা-ই হোক, সৈয়দ আশরাফের দপ্তরবিহীন হওয়ার বিষয়টি খোদ আওয়ামী লীগের মধ্যে ব্যাপক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। যাঁরা এত দিন তাঁর কঠোর সমালোচনা করতেন, তাঁরাও এখন তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল। প্রধানমন্ত্রীর দুজন উপদেষ্টা ও মন্ত্রিসভার প্রবীণতম সদস্যসহ দলের অনেকেই দেখা করে সৈয়দ আশরাফকে সহমর্মিতা জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের একজন প্রবীণ নেতার মতে, ২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনা এত বড় চ্যালেঞ্জে পড়েননি। এখন কীভাবে তিনি এই চ্যালেঞ্জ সামাল দেন, সেটাই দেখার বিষয়। ঘটনার অব্যবহিত পর সৈয়দ আশরাফের মন্তব্যটিও প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, নিজের লাভের জন্য রাজনীতি করেন না। তাঁর এই মন্তব্যে দলীয় নেতা-কর্মী–সাংসদদের প্রতি একধরনের ইঙ্গিতও রয়েছে। তিনি লাভের জন্য রাজনীতি করেন না। অন্যরা করেন। যাঁরা লাভের জন্য রাজনীতি করেন, তঁারাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকেন। মন্ত্রিসভার যেসব সদস্যের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা ও অসততার বেশুমার অভিযোগ আছে, প্রধানমন্ত্রী তঁাদের কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি। কেবল সৈয়দ আশরাফই টার্গেট হলেন। তাঁর মন্ত্রণালয়ের পারফরম্যান্সও খারাপ নয়। তবে এ কথা সত্য যে তিনি দল ও সরকারকে যা দিতে পারতেন, তার সিকি ভাগও দেননি। তারপরও তিনি দল ও সরকারের জন্য বড় সম্পদ বলে মনে করেন সাধারণ কর্মীরা। শাপলা চত্বরের ঘটনাসহ বেশ কয়েকবার দুর্যোগ মুহূর্তে তিনি শক্ত অবস্থান নিয়ে দল ও সরকারকে স্বস্তি দিয়েছেন।
তাঁর কাজের ধরন বা পদ্ধতি ভিন্ন। তিনি সোজাসাপ্টা কথা বলেন। সেটাই কি তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল? প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান সরকারব্যবস্থায় সরকারপ্রধানের বাইরে কারও পক্ষে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব কি না। ১৯৯১ সালে আমরা সংসদীয় ব্যবস্থার নামে যা চালু করেছি, সেটি আসলে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থারই প্রতিচ্ছবি। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির জায়গায় ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটি বসিয়ে এরশাদীয় ব্যবস্থাই বহাল রয়েছে। পৃথিবীর কোনো সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নামে এভাবে ক্ষমতাকেন্দ্রীভূত করার নজির নেই। মন্ত্রীরা নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কাজ স্বাধীনভাবে করেন। প্রধানমন্ত্রী হবেন অন্যদের মধ্যে প্রথম বা ফার্স্ট অ্যামং আদারস। কিন্তু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা হলেন সবার ওপরে, অন্যদের থেকে আলাদা। যে দেশে উপসচিব থেকে থানার ওসির বদলি, পদায়নেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়, সে দেশে গণতন্ত্র বা সুশাসন আশা করা যায় না।
মঙ্গলবার রাতে টিভির খবরে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফের ১৫ জুলাইয়ের লন্ডন যাত্রা স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন। এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে আরও বড় পদ দিতে পারেন। কারও মতে, এসব নিছকই সান্ত্বনা।
...২...
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গ্রেপ্তার হওয়া এবং জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার মধ্যে দেশে অনেক কিছু ঘটে গেছে। তিন মাস ধরে বিএনপি জোটের লাগাতার অবরোধ–হরতালকে কেন্দ্র করে যেমন আগুনসন্ত্রাসে বহু নিরীহ মানুষ মারা গেছে, তেমনি বিরোধী দলের অনেক নেতা-কর্মীকে জেলজুলুম ও গুমের শিকার হতে হয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও মির্জা ফখরুল ‘ভারমুক্ত’ হতে পারেননি। বিএনপির কোনো কোনো নেতা এই যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেন যে সম্মেলন না হওয়ার কারণে তাঁকে পুরোপুরি মহাসচিব করা যাচ্ছে না। কিন্তু বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, দলীয় চেয়ারপারসন সাংগঠনিক বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং পরবর্তী কাউন্সিলে সেটি অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে। তিনি যদি একক সিদ্ধান্তে স্থায়ী কমিটিতে নতুন সদস্য নিতে পারেন, কিংবা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করতে পারেন, তাহলে মির্জা ফখরুলকে ভারমুক্ত করতে পারবেন না কেন? কথা হচ্ছে দল সেটি করতে চায় কি না? তিনি যখন সাদেক হোসেন খোকাকে সরিয়ে মির্জা আব্বাসকে ঢাকা মহানগরের আহ্বায়ক করলেন, তখন তো কোনো সম্মেলন ডাকার প্রয়োজন পড়েনি। মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রে সেটি হলো না কেন? যে ব্যক্তি গত সাড়ে ছয় বছরে বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন বা জেল খেটেছেন, তাঁর বিষয়ে দলীয় হাইকমান্ডের এই ঔদাসীন্য নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে পড়ে। বিএনপি মহলে গুঞ্জন রয়েছে যে দলের চেয়ারপারসন নয়, তাঁর চেয়েও ক্ষমতাধর কোনো ব্যক্তির অসন্তুষ্টির কারণেই মির্জা সাহেব ভারমুক্ত হতে পারছেন না।
গত ৬ জানুয়ারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন জাতীয় প্রেসক্লাব অঙ্গন থেকে গ্রেপ্তার হন, তখন তিনি ছিলেন সুস্থ ও সবল মানুষ। কিন্তু গত মঙ্গলবার তিনি যখন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালের প্রিজন সেল খেকে বের হয়ে এলেন, তখন ভয়ানক অসুস্থ ও দুর্বল।  হুইলচেয়ারে করে তাঁকে গাড়িতে ওঠাতে হয়েছে। এমন দৃশ্য আমরা দেখেছি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক আমলে। যাঁকে গ্রেপ্তার করা হতো তিনিই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। মনে হচ্ছে কেবল ব্যক্তিবিশেষ নন, দেশের গণতন্ত্রও এখন হুইলচেয়ারে কাতরাচ্ছে।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতিতে চরম বৈরিতা ও বিশৃঙ্খলা সত্ত্বেও একটি বিষয়ে ন্যূনতম শৃঙ্খলা ছিল বা আছে যে, গত দেড় দশকে দুই দলে যাঁরা সাধারণ সম্পাদক বা মহাসচিব পদে আসীন হয়েছেন, তাঁরা অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিত। পেশিশক্তির দাপটে ন্যুব্জ ও ভঙ্গুর রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাঁরা কিছুটা হলেও ক্লিন ইমেজ বা পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে পেরেছেন। এর সঙ্গে তাঁদের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সীমিত ক্ষমতা থাকলেও হয়তো রাজনীতির অঙ্গনটিও কিছুটা পরিচ্ছন্ন রাখা যেত।
কারামুক্তির পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া এবং ফিরে এসে দেশ ও জনগণের সেবায় আরও বেশি আত্মনিয়োগ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন; সৈয়দ আশরাফুল ইসলামও দপ্তর হারানোর পর বাবার আদর্শের পতাকা সমুন্নত রাখার এবং তাঁর এলাকার ভোটারদের পাশে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।
দুজনের কণ্ঠেই হতাশা ও বেদনার সুর লক্ষ করা গেছে। এটি ব্যক্তিবিশেষের হতাশা বা বেদনা নয়। সমগ্র রাজনীতিরই।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

দুই গল্প by আশান উজ জামান

 সারা জীবন কালো ছিল। কিছুক্ষণ আগে নীল হয়ে গেছে আশ্রাফালি। আতঙ্কে। আশ্রাফালির নাম আশরাফ আলি। স্থায়ী ঠিকানা নয়াবাড়ি, বেলাবো। বসবাস কামরাঙ্গীরচর, ঢাকায়। রিকশা চালায়। মহজনের রিকশা। পেছনে আর্ট করে লেখা ‘মায়ের দোয়া’। যদিও মায়ের খোঁজ সে নেয় না। নেওয়া উচিত বলেও মনে করে না। এক রাতে পড়া ফেলে আলিফ লায়লা দেখতে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে দরজায় তালা। অনেক ডাকাডাকির পর মা জানায়, তার জায়গা নেই ঘরে। যেখানে টিভি দেখতে গিয়েছিল সেখানে থাকতে হবে। মাথায় রক্ত উঠে গিয়েছিল। রাগটা জ্বলে উঠেছিল দেশলাইয়ের কাঠিতে। খড়ের চাল। চৈতমাসের বেলা। দাউ দাউ করে পুড়ছিল ঘরটা।
কিন্তু পেছন ফিরে তাকায়নি সে। সেই যে বেরিয়েছে, আর ওমুখো হয়নি। মা কি এখনো আছে? থাকতেও পারে। না-ও পারে। না থাকলে তার আপন বলতেও কেউ নেই। বউয়ের কথা বলা যায়। তবে বউকে সে আপন মনে করে না। বউ হলো পরের মেয়ে। ভাতকাপড়ের অভাব হলেই চম্পট দেবে। পরশু যেমন দিয়েছিল।গিয়েছিল আশ্রাফালি। বউয়ের জন্য এত ভাবার লোক সে না। কষ্ট হচ্ছিল তার ছেলের কথা ভেবে। রেসমিনার পেটে বাচ্চা। মাস তিনেক হলো বোধ হয় ছেলেটার বয়স। হ্যাঁ তার বিশ্বাস, ছেলেই হবে। কিন্তু জন্মানোর আগেই কি চলে যাবে ছেলেটা? মানতে পারছিল না। বিকেলে তাই মানত করেছিল একটা। মানতে কাজ হয়েছে। সন্ধ্যায় ফিরে এসেছে রেসি। দেখতে পেয়েই খানিক পিটিয়েছে আশ্রাফালি। তারপর বের হয়ে গেছে। মোড়ের মাথায় মিলনের ইস্টিশনের দোকান। বাকিতে একটা আরসি কিনেছে। রেসমিনার খুব পছন্দ এটা। কিছু একটা হলেই সে আরসি খেতে চায়। খেতে খেতে নানান গল্প করে। সেদিন করল তার নিরুদ্দেশ হওয়ার গল্প। রাহেলা বেগমের বাড়ি কাজ করে রেসমিনা। রাহেলা শপিংয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর সঙ্গী হয় কাজের ছেলেটা। কিন্তু হাত ভেঙে বসে আছে সে। জিনিসপত্র টানবে কীভাবে? নিরুপায় হয়ে রেসমিনাকেই যেতে হলো। বিকেলের মধ্যেই ফেরার কথা। কিন্তু শুক্রবারের চাঁদনি চক! নিজের শরীরের ঠিক রাখতে দেয় না, তা কাজের মেয়ে! রাহেলা হারিয়ে ফেললেন রেসমিনাকে। মোবাইল-টোবাইল নেই। ঢাকা শহরের কিছু চেনেও না সে। রাত কাটল ওভারব্রিজে। সকাল থেকে ঘোরাঘুরি। যেদিকে যায়, সব একরকম লাগে। মাথা ঘুরে যায়, তবু সে থামে না। ঘুরতে ঘুরতেই তো খোরশেদ ভাইর সঙ্গে দেখা। সে-ই নিয়ে এল তাকে। যাক, তা-ও ভালো। এদিকে কি-না-কি আকাশ-পাতাল ভাবছিল আশ্রাফালি!
ছেলেকে ফিরে পেয়েছে। সুখের অন্ত নেই তার। একদিন তাই ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিল। এত কিছুর মাঝেও কিন্তু মানতের কথা ভোলেনি সে। মানত অনুসারে একটা দিন তার আল্লাহর ওয়াস্তে কাটানোর কথা। ঠিক করল সেটা সে জুম্মাবারে করবে। যে যেখানে যেতে বলবে যাবে। এক টাকাও ভাড়া নেবে না। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করবে না। আজ সেই জুম্মাবার। মানত পালনে বের হয়েছে আশ্রাফালি। কিন্তু পরিকল্পনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কোনো প্যাসেঞ্জারই কথা শুনছে না। ভাড়ার বদলে কিছু না কিছু দিচ্ছেই তারা। একজন বাদাম কিনে দিল। একজন ফুল! এই তো এক ছাত্রকে নিয়ে এল নিউমার্কেটে। ছেলেটা ভাত খাইয়ে ছাড়ল তাকে! এভাবেই চলছিল। বলা যায়, ভালোই চলছিল। ঝামেলাটা বাধল জুম্মার পর। খাওয়ার পর পান চিবুনো অভ্যাস তার। পানটা কেবল গুঁজেছে, এমন সময় একটা ছেলে এল। হাতে বিশাল ব্যাগ। ইরাকি মাঠ যাবে। কিছুদূর গিয়েই থামতে বলল ছেলেটা। ‘একটু আসছি’ বলে চন্দ্রিমা মার্কেটে ঢুকল। আপন মনে পান চিবুচ্ছিল আশ্রাফালি। কিছুক্ষণ পর খেয়াল হলো, অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। ছেলেটার দেখা নেই। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর নিজেই খুঁজতে গেল সে। পই পই করে খুঁজল সারা মার্কেট। পাওয়া গেল না। ফিরে এল রিকশার কাছে। দেখা নেই। নেই তো নেই। ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। দাঁড়িয়েই আছে সে। প্রচণ্ড রোদ। রোদের গায়ে মনে হচ্ছে জ্বর। তাপ তাই একটু বেশি। টিয়ারঙের জামাটা লেপ্টে গেছে গায়।
কী দোষ করেছে সে? এমন আজাব খাটতে হচ্ছে কেন?
না, আর আজাব খাটবে না আশ্রাফালি। ব্যাগটা রেখেই এবার চলে যাবে। কিন্তু ধরতে গিয়েই চমকে উঠল সে। মনে হলো, বোমটোম যদি থাকে?
তখনই টিক টিক শব্দটা শুনল! হ্যাঁ, স্পষ্টই শুনল। টিক টিক টিক!
তখনই রং বদলে গেল তার। আতঙ্কে। নীল শরীরটা নাড়াতে পারছে না সে। এই সেদিনও তো ফার্মগেটে বোম ফুটেছে। প্যাসেঞ্জারের সঙ্গে ঝগড়া হচ্ছিল ভাড়া নিয়ে। একটু দূরেই ফুটল বোমটা। অল্পের জন্য রক্ষে। কিন্তু আজ? তার রিকশায়ই বোম! কাউকে বলতেও ভয় হচ্ছে। কী করবে সে?
একটা পুলিশের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। শাহনেওয়াজ হলের দিকে। ওদিকে গেল হাঁটতে হাঁটতে। একবার ফিরে এল। আবার গেল। সাহস হচ্ছে না। পুলিশ যদি ওকেই ধরে নিয়ে যায়? না, পুলিশকে বলা যাবে না। নিজে নিজেই সমাধা করতে হবে। একটা তামিল ছবি দেখেছিল। মনে পড়ল। নায়কের গাড়িতে বোম ফিট করেছিল হারামিরা। জানতে পেরে গাড়িটা সে ফেলে দিল নদীতে। বোমটাও ফাটল, আবার মানুষও মরল না। চারপাশে দেখল আশ্রাফালি। প্রচুর মানুষ। বাচ্চা-বুড়ো, ছেলে-মেয়ে। এখানে বোম ফাটলে ম্যাসাকার হয়ে যাবে! কী করা যায়? ঢাকা শহরে পানিরও তো অভাব। কিছু ভেবে পায় না সে। তবু কিছু একটা করতে হবে। ব্যাগের মুখটা বাঁধল সিটের সঙ্গে। তারপর চালানো শুরু করল। এখান থেকে কাঁটাবন। তারপর শাহবাগ। তারপর রমনা। রমনার পুকুরটাতে এখন অনেক পানি।
চিন্তা একটাই। ওই পর্যন্ত পৌঁছোনো যাবে তো? সময় দেবে তো বোমটা?
রিকশা দৌড়াচ্ছে। প্যাডেল মারছে আশ্রাফালি। অনবরত। তার মাথায় তখন রেসমিনা নেই। ছেলে নেই। মা নেই। আছে শুধু রমনার পুকুর। কিন্তু সে তো আশ্রাফালি। নায়ক না। রং সাইডে গেলে তাকে ডান্ডা খেতে হয়। খেতে হলো। জ্যামে পড়তে হয়। এলিফ্যান্ট রোডে পড়ে থাকল অনেকক্ষণ। শাহবাগ মোড়েও। সিগন্যাল ছাড়তেই দে ছুট। রাস্তা ক্রস করছিল একটা ১২ নম্বর। ধাক্কা দিল তাকে। উল্টে গেল আশ্রাফালি। আর তার রিকশা। আর তার বোমের ব্যাগ।
২. একসঙ্গে পড়ে রুমা আর আজিম। কিছুদিন হলো সম্পর্কে জড়িয়েছে। শুরুটা অবশ্য আগেই হয়েছিল। প্রথম বছরেই প্রস্তাব দিয়েছিল আজিম। রাজি হয়নি রুমা। কিন্তু আজিমও কি ছাড়ার পাত্র? লেগেই ছিল। প্রতিদিনই একবার করে বলত, ‘আরেকটু ভেবে দ্যাখো।’ এর ফাঁকে আরও তিনজনের সঙ্গে সম্পর্ক করেছে ও। দুটো ভেঙেও দিয়েছে। কিন্তু রুমার পিছু ছাড়েনি। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো, যা হওয়ার। সম্মতি জানাল রুমা। কিন্তু ওর পরিবারে কিছু সমস্যা আছে, শুনতে হবে। সব শুনেও যদি আজিম চায়, তবেই এগোবে সম্পর্কটা। কিসের এত শোনাশুনি! আজিম শুধু রুমাকে চায়। তারপর থেকেই ছুটছে সম্পর্কটা। সময়ের মতো। বাধাহীন। প্রায়ই দেখা করে ওরা। বেড়াতে যায়। বাদাম-আইসক্রিম-চানাচুর খায়। সব ঠিক আছে। তবু আর ভাল্লাগছে না আজিমের। চুপচাপ স্বভাবের এই মেয়েটা বড় বেশি মায়াবী। এক মাসও যায়নি। এর মধ্যেই কেমন একটা বউ বউ ভাব চলে এসেছে। মাতবরি ফলায়। ক্লাস ফাঁকি দেওয়া যাবে না। রাত জাগা যাবে না। সিগারেট খাওয়াও নিষিদ্ধ।
সে না হয় মানা গেল। কিন্তু চুমুও যে নিষিদ্ধ! মানবে কী করে?
এসব নিয়েই তর্ক বাধে। সেদিনও বেধেছিল। রোববারের ঘটনা। মেঘলা বিকেল। বাতাসে ঠান্ডা ভাব। বটমূলে বসে তর্কবিলাসে মেতে ছিল ওরা। হঠাৎ বৃষ্টি এল। আশ্রয় নিল কলাভবনের গেটে। এত মানুষ! দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়!
নাহ্, এখানে থাকা যাবে না। একটা রিকশা ডাকল আজিম। রুমাকে সুফিয়া কামাল হলে নামাতে হবে। তার আগে ঘুরবে একটু। বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় ঘুরতে ভালো লাগে খুব। ফুলার রোড দিয়ে ঢুকল ওরা। রাস্তায় পানি জমেছে। তাতে বৃষ্টি পড়ছে। পড়তেই ছলকে যাচ্ছে পানি। মনে হচ্ছে ফুল ফুটছে। পানির ফুল! বন্ধু স্বপনের কবিতাটা মনে করতে চেষ্টা করল আজিম, ‘ভালোবাসি এই জলের বুকে বৃষ্টি ফোঁটার ফুল...’। পরের লাইনটা যেন কী? মনে আসছে না। আসলেই চমকে দেবে রুমাকে। বলবে ওর জন্যই লেখা। জগন্নাথ হলের পাশ দিয়ে যাচ্ছে রিকশাটা। রুমার দিকে তাকালো ও। রুমাও ওর দিকেই চেয়ে আছে। কত কাছে ওরা! আরও একটু কাছে এলে ক্ষতি কী!
তারপর কতক্ষণ পার হয়েছে? খেয়াল করেনি। হঠাৎ থেমে গেল রিকশাটা। নামতে বলছে রিকশাওয়ালা। মানে কী? অবাক হয়ে গেল ও। বৃষ্টির মধ্যে নামবে কীভাবে? আর এই মাঝপথে নামবেই বা কেন?
নামতে হবে। রিকশাওয়ালার এক কথা।
কারণ কী?
গায়ের রক্ত পানি করে এই রিকশা কেনা। এতে কোনো ফালতু কাজ হতে দেবে না সে। লজ্জায় লাল হয়ে গেল রুমা। আর মাথায় রক্ত উঠে গেল আজিমের। একটা চড় বসিয়ে দিল লোকটার গালে, ‘শুয়োরের বাচ্চা! কুত্তা! তুই চিনস আমারে?’
হলের জুনিয়ররা চেনে। ক্যান্টিনবয়রা চেনে। যাদের সঙ্গে মিছিলে-মিটিংয়ে যায় তারা চেনে। কিন্তু আজিমকে চেনার কোনো কারণ নেই রিকশাওয়ালার। তা সে শুয়োরের বাচ্চাই হোক বা কুত্তা। কোনো উত্তর দেয় না ষাটোর্ধ্ব লোকটা। তাকিয়ে থাকে। নিষ্পলক। সে চোখে চোখ রাখা যায় না। আজিমও পারে না। সরিয়ে নেয়। তারপর নেমে যায়। তারপর চলে যায় রিকশাটা।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে ওরা। কথা নেই কারও মুখে। সোজা তাকিয়ে আছে রুমা। সামনেই দোয়েল চত্বর। তারপর বাঁয়ে শিশু একাডেমি। ডানে কার্জন হল। কিছুদূর এগিয়ে ডানে ঘুরলেই ওর হল। হেঁটেই যাওয়া যাবে। হাঁটা শুরু করে ওরা। বৃষ্টি বেড়েছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। হাজার হাজার ফুল ফুটছে কালো রাস্তায়। মিলিয়েও যাচ্ছে। সবই আগের মতো। কিন্তু সবই বদলে গেছে। রুমার দিকে তাকালো আজিম। মাথা নিচু করে হাঁটছে। কাঁদছে নাকি? হ্যাঁ, কাঁদছেই তো। না, বৃষ্টির পানি না। বৃষ্টি আর অশ্রুর পার্থক্য আজিম বোঝে। পরদিন থেকেই নিখোঁজ রুমা। সেদিন থেকেই এলোমেলো লাগছে আজিমের। ভুলে ভুলে যাচ্ছে সবকিছু। কিছু ব্যাপার আবছা মনে থাকছে, কিছু একদমই না। কদিন পর পরীক্ষা। থার্ড ইয়ার ফাইনাল। এটাও মনে থাকছে না। যখনই মনে পড়ছে, পড়তে বসছে ও। কিন্তু পড়া হচ্ছে না। ঘুম পাচ্ছে শুধু। ঘুম আসতে না আসতেই ভেঙেও যাচ্ছে। ছারপোকার কামড়। রুমমেটদের পাকামো। টি ট্যা প্যা পো রিং টোন। কারণের অভাব নেই। মাঝেমধ্যে পড়ার টেনশনেও ঘুম ভাঙে। আজ ভাঙল চিৎকারে। শত শত মানুষ যেন গলা ফাটাচ্ছে। কিসের এত চিৎকার আজ? খোঁজ নেওয়া দরকার। কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছে না। ভার ভার লাগছে। সারা গায়ে ব্যথা। কাঁচা ঘুম ভাঙলে ওর এমন হয়। বিরক্তি লাগছে। আড়মোড়া ভেঙে উঠল আজিম। বিছানার পাশেই জানালা। বাইরে তাকিয়েই খুশি হয়ে গেল ও। কী চমৎকার! এ গাছ সে গাছ ভরে রেখেছে আঙিনাটা। গাঢ় সবুজ চারদিক। শিউলি, বকুল, কৃষ্ণচূড়া—ফুলের গাছও অনেক। কোনো না কোনো ফুল ফুটেই থাকে। রঙিন করে রাখে হলটাকে। জানালার সামনেই বকুলগাছ। ঝাঁকড়া মাথাটার পাশ কাটিয়ে তাকালেই দূরে টিভিরুম। ওখান থেকেই আসছে চিৎকারটা। আরে, বাংলাদেশের খেলা নাকি? কাদের সঙ্গে?
আর একটা শোর উঠল। হাতমুখ ধুয়ে বের হলো আজিম। ডিমবন খেল একটা। আর চা। সিগারেট ধরাল। টিভিরুমে ঢুঁ মারল একটু। ভারত-পাকিস্তান খেলা হচ্ছে! ধুর! ও কি না ভেবেছে বাংলাদেশের!
ছয়টা বাজে। কাকে পড়ানোর কথা আজ? রাহিদকে? না না, আজ তো শুক্রবার। রুকসানাকে পড়াতে হবে। ইরাকি মাঠের পাশে। জায়গাটা খুব নোংরা। রুকসানাও গাধা টাইপের ছাত্রী। তবু ওকে পড়াতে যেতে ভালো লাগে। রুকসানার জন্য না, ওর ভাবির জন্য। ভাবিটা বেশ যত্ন করে আজিমকে। ভালো ভালো নাশতা দেয়। আচ্ছা, গত দুদিন ভাবিকে দেখল না যে! নিশ্চয় বাসায় নেই। তাই তো, ওদের বাসার সবাই যে এখন গ্রামে! একা থাকতে হচ্ছে রুকসানাকে। কেউ ডেকে দেয় না। অ্যালার্ম ঘড়িটাও নষ্ট। তাই ঘুম ভাঙে না সকালে। পড়া হচ্ছে না। আগেরবার তো টেনেটুনে পাস করেছিল। এবার তা-ও করবে না। তাহলেই টিউশনিটা যাবে। না, তা হতে দেওয়া যাবে না। কিছু একটা করতে হবে। জুম্মার নামাজের পরই তাই বের হয়েছিল আজিম। বিকট চিৎকার করা একটা অ্যালার্ম ঘড়ি কিনেছে। রিসিটটা পকেটেই আছে। ৭৯০ টাকা দাম। কিন্তু কোথায় রাখল সেটা? ভুলে গেছে। শুধু মনে আছে চন্দ্রিমায় ঢুকেছিল। একটা শোপিস কিনেছে। সেটা নিয়েই হলে ফিরেছে। তারপর ঘুমিয়ে গেছে।
শোপিসটা কার জন্য কিনেছে? কার যেন জন্মদিন আজ?
আরেকটু মনোযোগ দিয়ে ভাবার চেষ্টা করে ও। জিনস আর পাঞ্জাবির পকেটগুলো হাতড়ায়। কিছু টাকা পায়। আর একটা টুপি। আর একটা লিস্ট। মনে পড়েছে, রুকসানার নাকি খাওয়া বন্ধের উপক্রম। কাজের লোকটাও নেই। ওকে তাই অনুরোধ করেছিল একটু বাজার করে দিতে। বাজার করবে আজিম! তা-ও আবার ছাত্রীর জন্য! মুখের ওপর না বলে দিয়েছিল। কিন্তু মায়া লাগছিল আজ। ঘড়ি কিনতে গিয়ে তাই বাজারও করেছে। মাছ-মাংস-সবজি। ইয়াবড় এক প্যাকেট।
কিন্তু কোথায় রাখল প্যাকেটটা?
মনে পড়ছে না।

প্রকৌশলীকে বদির কিলঘুষি

বিতর্কিত সাংসদ আবদুর রহমান বদি এবার পেটালেন কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলীকে। তাঁর নাম মোস্তফা মিনহাজ। গত বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় উপজেলা পরিষদে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে নিজের সংসদীয় এলাকার মোট ১৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাকে মারধর করলেন বদি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী সরকারি কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানদের কয়েকজন বলেন, বেলা ১১টায় উপজেলা পরিষদের সম্মেলনকক্ষে মাসিক উন্নয়ন ও সমন্বয় সভা শুরু হয়। কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের আওয়ামী লীগের সাংসদ আবদুর রহমান বদি এই মাসিক উন্নয়ন ও সমন্বয় সভার উপদেষ্টা। উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছেনুয়ারা বেগমের সভাপতিত্বে এ সভায় অন্যান্যের সঙ্গে তিনিও সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী সাম্প্রতিক বন্যায় তাঁর এলাকার গ্রামীণ অবকাঠামো ভেঙে পড়ার চিত্র তুলে ধরেন। এ সময় আরও কয়েকজন চেয়ারম্যান তাঁদের এলাকার ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দেন। সাংসদ বদি তখন এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্য শুনতে চান। এ সময় ইউএনও হিল্লোল বিশ্বাস সাংসদকে জানান, উপজেলা প্রকৌশলী সভায় অনুপস্থিত। এই সভায় উপজেলা প্রকৌশলী এর আগেও অনুপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন কয়েকজন ইউপি চেয়ারম্যান। তখন সাংসদ সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে নিচতলায় উপজেলা প্রকৌশলী মোস্তফা মিনহাজের কার্যালয়ে যান। উপজেলা প্রকৌশলী নিজের কক্ষে কাজ করছিলেন। সাংসদ প্রকৌশলীর কাছে সমন্বয় সভায় না যাওয়ার কারণ জানতে চান। তিনি কিছু না বলতেই তাঁর শার্টের কলার ধরে কিলঘুষি মারতে থাকেন বদি। টানা-হেঁচড়ায় প্রকৌশলীর শার্ট ছিঁড়ে যায়। এরপর ক্ষুব্ধ বদি সভায় না গিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে কক্সবাজারের দিকে চলে যান। সভাও পণ্ড হয়ে যায়।
সমন্বয় সভায় অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিল্লোল বিশ্বাস, পাঁচ ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, নুরুল কবির চৌধুরী, আনোয়ার হোসেন চৌধুরী, গফুর উদ্দিন চৌধুরী, কামাল উদ্দিন এবং সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা।
উপজেলা প্রকৌশলী মোস্তফা মিনহাজ তাঁকে মারধরের বিষয়টি প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করে বলেন, ‘অন্য সভাগুলো বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয়। তাই অফিসে বসে দাপ্তরিক কাজ করছিলাম। কিন্তু এর আগেই সাংসদ উপস্থিত হয়ে সভায় না যাওয়ার অজুহাত তুলে আমাকে মারধর করেন। এতে আমার শার্ট ছিঁড়ে যায়। এ ঘটনা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’
জানতে চাইলে এলজিইডির কক্সবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম বলেন, ‘হামলার ঘটনাটি শুনেছি। কেন তাঁকে মারধর করা হয়েছে, সে ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে।’
জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, ‘যদি সাংসদ মারধর করে থাকেন, তা দুঃখজনক। প্রকৌশলীর সভায় না যাওয়াটাও দুঃখজনক।’
প্রকৌশলীর ওপর হামলার প্রসঙ্গ জানার জন্য একাধিকবার ফোন করেও সাংসদ আবদুর রহমান বদির বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর মুঠোফোনটি গতকাল রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত বন্ধ পাওয়া যায়।
এর আগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরমতে, এ নিয়ে সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী, মুক্তিযোদ্ধা, ম্যাজিস্ট্রেট, আইনজীবী, বন কর্মকর্তা, শিক্ষকসহ ১৯ জন সাংসদ বদির হামলার শিকার হলেন। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কক্সবাজারের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল হালিম, উখিয়া উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা গোলামুর রহমান, কক্সবাজারের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী হাকিম আবদুর রহমান, টেকনাফের মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা, টেকনাফের শামলাপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল মঞ্জুর, টেকনাফ পৌরসভার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল জলিল ও পুলিন দে, কক্সবাজারের আইনজীবী রাখাল মিত্র, ইসলামী ব্যাংকের টেকনাফের সহকারী ব্যবস্থাপক গিয়াস উদ্দিন, টেকনাফের বন বিট কর্মকর্তা মুজিবুল হক, সাবরাং উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মফিজ দৌল্লা, টেকনাফ স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার, মীর কামরুজ্জামান, কক্সবাজারের ঠিকাদার আতিকুল ইসলাম ও কক্সবাজার আদালত পুলিশের কনস্টেবল রতন অন্যতম।

বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতি: একার সিদ্ধান্তে ৬০০ কোটি টাকা দিয়েছেন হাই by মোর্শেদ নোমান

আবদুল হাই বাচ্চু
বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু একক সিদ্ধান্তে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছেন। এসব ঋণের ক্ষেত্রে যাচাই কমিটির প্রস্তাব ছিল না। কিছু ক্ষেত্রে আবার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঋণ যাচাই কমিটি আগেই প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছিল। তারপরেও সেগুলো আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু পরিচালনা পর্ষদের সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ করিয়ে ঋণ দিয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁর মৌখিক সিদ্ধান্তেও ঋণ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আর কখনোই শোনা যায়নি।
২০১২ ও ২০১৩ সালের বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পাঁচটি বোর্ডসভার নথি পর্যালোচনা করে শাখা ও যাচাই কমিটিকে পাশ কাটিয়ে ঋণ অনুমোদনের সুনির্দিষ্ট এসব তথ্য পাওয়া যায়। এ ধরনের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৭৫ কোটি টাকা। পাশাপাশি প্রস্তাব ছাড়াই পুনঃ তফসিল করা ঋণের পরিমাণ আরও প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুর এভাবে ঋণ দেওয়ার ওই সব নথি বেসিক ব্যাংকেই রয়েছে। এসব তথ্য পর্ষদের কার্যবিবরণীতেও উল্লেখ আছে। অথচ এসব কিছুই খুঁজে পায়নি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ফলে আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুকে ছাড়াই বেসিক ব্যাংকের অর্থ জালিয়াতির ঘটনায় অনুসন্ধান শেষ করেছে দুদক। ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুর নির্দেশে এসব ঋণ মঞ্জুর করেছেন, দুদক এখন কেবল তাঁদেরই চিহ্নিত করছে। অথচ মূল নির্দেশদাতা পাচ্ছেন দায়মুক্তি।
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, বেসিক ব্যাংকে যে ঘটনা ঘটেছে, তার দায় সাবেক চেয়ারম্যান কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। প্রথমত, তিনি যথাযথ ব্যাংকিং প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। দ্বিতীয়ত, যেসব বেআইনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেগুলোও অপরাধ। এ ক্ষেত্রে নথিগত প্রমাণ পায়নি এমন অজুহাতে দুদক তাঁকে ছাড় দিতে পারে না। দুদক যদি তাঁকে বাদ দিয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দেয়, সে ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো মহলের চাপে সেটা করছে কি না, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বেসিক ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, ব্যাংকের অধিকাংশ ঋণ মঞ্জুর, ঋণ নবায়ন এবং ঋণসংক্রান্ত অন্যান্য প্রস্তাবে সংশ্লিষ্ট শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের ঋণ যাচাই কমিটির কোনো সুপারিশ ছিল না। তারপরেও সেগুলো পর্ষদের সিদ্ধান্ত বা দিকনির্দেশনার জন্য সভায় উপস্থাপন করা হয়ে। আবার কোনো কোনো প্রস্তাবের ক্ষেত্রে প্রধান কার্যালয়ের ঋণ যাচাই কমিটি সুস্পষ্টভাবে নেতিবাচক মতামত দিলেও পর্ষদ ঋণগুলো অনুমোদন করেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবার ঋণ যাচাই প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে ঋণ প্রস্তাব পর্ষদে উপস্থাপনের কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে না পেলেও সেগুলো ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে। আবার সংশ্লিষ্ট শাখা আবদুল হাই বাচ্চুর মৌখিক নির্দেশেও ঋণ দিয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে দুদকের কর্মকর্তারা সেই প্রথাগত বক্তব্যই দিয়েছেন। দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) নাসির উদ্দীন আহমেদ গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেন, বোর্ডের অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-প্রমাণ পেলে কমিশন সেটা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে।
প্রাপ্ত নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু চেয়ারম্যান থাকাকালে ব্যাংকের ৩১০, ৩১১, ৩১৩, ৩১৪ ও ৩২৪ নম্বর বোর্ডসভায় ২৪ প্রতিষ্ঠানকে অনিয়ম করে ঋণ দেওয়া হয়। যেমন ২০১২ সালের ৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বোর্ডের ৩১০ নম্বর সভায় ব্যাংকের গুলশান শাখার গ্রাহক এশিয়ান শিপিং বিডি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ৫০ কোটি টাকার মেয়াদি ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই সভাতেই একই শাখার গ্রাহক ফারদিন ফিশকে ঋণ অনুমোদন করা হয় ১৫ কোটি টাকা। ওই বছরের ২৭ জুন বোর্ডের ৩২৪ নম্বর সভায় গুলশান শাখার গ্রাহক মেগা ট্রেডার্সকে ৮৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা মেয়াদি ঋণ এবং ৮ কোটি টাকার ক্যাশ ক্রেডিট (হাইপো) অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই সভাতেই মেসার্স আনান সক্স, ওয়েল সোয়েটার্স, ওয়েল টেক্স লিমিটেডের স্বল্পমেয়াদি ঋণকে (ডিমান্ড লোন) মেয়াদি ঋণে পরিবর্তন করার অনুমোদন দেওয়া হয়।
১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বোর্ডের ৩১১ নম্বর সভায় কারওয়ান বাজার শাখার গ্রাহক মনিকা ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনালের এসওডি (সিকিউরড ওভারড্রাফট) সীমা ৬৫ কোটি টাকা করার অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই সভাতেই গুলশান শাখার গ্রাহক এআরএসএস এন্টারপ্রাইজের এসওডি সীমা ৫০ কোটি, ঋণপত্র সীমা ১৫ কোটি এবং বিশ্বাসী ঋণ সীমা (এলটিআর লিমিট) ১০ কোটি করার অনুমোদন দেওয়া হয়।
২৩ মে অনুষ্ঠিত বোর্ডের ৩১৩ নম্বর সভায় বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের অনুকূলে ১৫ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দেয় পর্ষদ। সমন্বিত ঋণসুবিধা অনুমোদন দেওয়া হয় তারিফ অটো ফ্লোর মিলস (১০ কোটি), মিমকো কার্বন কোম্পানি (২৫ কোটি), বাংলাদেশ ইয়েলো পেইজেস লিমিটেডকে (১৪ কোটি ৭৫ লাখ)।
বেসিক ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটনের পর থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদনে আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুর সংশ্লিষ্টতার কথা তুলে ধরা হয়। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও ব্যাংকটিতে ‘হরিলুটের’ পেছনে আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু জড়িত বলে একাধিকবার উল্লেখ করেন। জাতীয় পার্টির নেতা হলেও উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের কারণেই আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এত তথ্য থাকার পরও দুদক কেন তাঁর বিরুদ্ধে নথিগত প্রমাণ পায়নি, সে বিষয়টি নিয়ে দুদকের দায়িত্বশীল কেউই মুখ খুলতে চান না। তবে না প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, বাচ্চুর বিষয়ে ‘উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের’ ওপরই নির্ভর করছে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হবে কি না।
তবে দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেন, ‘অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কমিশন কোনো অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী হয়ে কাজ করছে না—আমি এটাই বিশ্বাস করতে চাই। আমি আশা করি, নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে অনুসন্ধান করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করবে দুদক। কারণ, এর সঙ্গে অসংখ্য গ্রাহকের পাশাপাশি আমাদের জাতীয় স্বার্থ জড়িত।’
দীর্ঘদিন ‘কার্যত’ বন্ধ থাকা এবং বারবার অনুসন্ধান কর্মকর্তা বদলের পর ৪ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয় দুদকের অনুসন্ধান দল। সেখানে আবদুল হাই ওরফে বাচ্চুর বিরুদ্ধে ‘নথিগত প্রমাণ’ না পেয়ে তাঁকে ছাড়াই ৫৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বেসিক ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। ২০১৩ সালের মার্চে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংকটি ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়, যার প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

প্রতি বছর বাড়ছে চার লাখ শিক্ষিত বেকার: দায়ী পুঁথিগত শিক্ষা ব্যবস্থা by এম মামুন হোসেন

উচ্চ মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষা শেষে দেশে নতুন করে প্রতি বছর যুক্ত হচ্ছে চার লাখ শিক্ষিত বেকার। যারা ১০ বছরের মাধ্যমিক ও দুই বছরের উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে লেখাপড়া করেও সমাজে অনুৎপাদনশীল হয়ে দেশের অর্থনীতিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছেন না। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি দেশে শিক্ষিত বেকার তৈরি করছে। আর এজন্য দেশের পুঁথিগত শিক্ষা ব্যবস্থাকে দায়ী করছেন শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীর শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৃত্তিমূলক জ্ঞান অর্জন করতে পারে না। এতে করে বাস্তব জীবনে পুঁথিগত জ্ঞান কাজে আসে না। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে অষ্টম শ্রেণী শেষে দেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান।
লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) তথ্যমতে, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি ১০০ জন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৪৭ জন বেকার। ভারত ও পাকিস্তানে প্রতি ১০ জন শিক্ষিত তরুণের তিনজন বেকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, বেকারদের মধ্যে চিকিৎসক প্রকৌশলীদের হার ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। নারী চিকিৎসক প্রকৌশলীদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩১ শতাংশ। এর পরই আছেন উচ্চ মাধ্যমিক ডিগ্রিধারীরা। তাদের ক্ষেত্রে বেকারত্বের হার ১৩ দশমিক ৭৪ শতাংশ। ২০টি সর্বাধিক বেকারত্বের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বাদশ।
এ প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আসনসংখ্যার স্বল্পতার কারণে অনেকেই উচ্চ শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। তবে উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিতদের জন্য ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে কেবল সরকারি উদ্যোগ নয়, বেসরকারি উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। উচ্চশিক্ষার আরো সুযোগ সৃষ্টি করতে মান ধরে রেখে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি বলেন, বৃত্তিমূলক শিক্ষার মাধ্যমে এইচএসসির পরে ঝরে পড়াদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপ দেয়া যেতে পারে। বিদেশে যে ধরনের কাজের চাহিদা রয়েছে তা শেখানো এবং বিদেশি ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করে এইচএসসি পরীক্ষার পরে যারা আর লেখাপড়া করবে না কিংবা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে না তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তিনি মনে করেন, মাধ্যমিক স্তর থেকেই দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপরে জোর দেয়া উচিত।
গত রোববার প্রকাশিত আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম ও কারিগরি বোর্ডের এইচএসসি (বিএম) ও ডিআইবিএস পরীক্ষায় ১০ লাখ ৬১ হাজার ৬১৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৭ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭২ জন। যাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪২ হাজার ৮৯৪ জন। আর ফেল করেছে ৩ লাখ ২২ হাজার ৭৪২ জন। এ হিসাবে দেখা গেছে, উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করা শিক্ষার্থীর মধ্যে সিংহভাগ ঝরে পড়ে। আর পাস করা শিক্ষার্থীর মধ্যে একটি অংশ পারিবারিক ও সামাজিক বিভিন্ন কারণে উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কোনো কলেজে ভর্তি হয় না। এই পরিসংখ্যানে এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেয়া প্রায় চার লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসির পরপর উচ্চশিক্ষায় আর যুক্ত থাকে না। আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এইচএসসির পর কয়েক বছর বেকার থাকার পর ‘ছাত্র’ ভিসায় কিছু শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমায়। তবে তারা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে যাওয়ায় নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া অদক্ষ শ্রমিক হওয়ার দেশ অধিক হারে রেমিট্যান্স থেকে বঞ্চিত হয়। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের মতে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় পাঠ্যক্রম পুঁথিগত বিদ্যা নির্ভর। আর এ কারণেই ঝরে পড়া ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ না পাওয়ারা দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ করতে পারে না। বরং বেকার হয়ে দেশে নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, শিক্ষানীতিতে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা ও পরবর্তী ধাপে কর্মমুখী শিক্ষার কথা উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষিত বেকার তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কারিগরি শিক্ষায় ভালো ফোকাস দিয়েছে। তবে তা অপ্রতুল। তিনি মনে করেন, সরকারের পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিষয়ে আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। আমাদের মধ্যে একটি বদ্ধমূল ধারণা আছে সন্তানকে বিএ, এমএ পাস করাতে হবে। কিন্তু দেশে বৃত্তিমূলক শিক্ষার চাহিদা বাড়ছে। তবে শিক্ষা বাজেটে সবচেয়ে কম বরাদ্দ বৃত্তিমূলক শিক্ষায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থী থাকলেও শিক্ষক সংকটসহ নানাবিধ সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় জনশক্তি দেশে ও দেশের বাইর অদক্ষ হয়ে থাকছে। এরা দেশের জন্য শিক্ষিত বেকার হিসেবে বোঝা বাড়াচ্ছে বলে তিনি জানান।
এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, এ বছর কারিগরিতে পাসের হার বেড়েছে। ছয় বছর আগেও কারিগরি শিক্ষায় দেশের মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ১ শতাংশ লেখাপড়া করত। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে কারিগরি শিক্ষা জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

কোকেন পাচারের কেন্দ্র: আলোচনায় বাংলাদেশ by হাসান ফেরদৌস

ভয়াবহ মাদকদ্রব্য কোকেনের অবৈধ পাচারে এত দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অবস্থান ছিল না। কিন্তু সেটি বদলাতে পারে। জুনের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামে বলিভিয়া থেকে আমদানি করা সূর্যমুখী তেলের ব্যারেলে বিপুল পরিমাণ তরল কোকেন ধরা পড়ার পর তেমন লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এই অভিমত জাতিসংঘের মাদকবিরোধী সংস্থা অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইমের (ইউএন ওডিসি)। সংস্থাটি জানিয়েছে, এই পাচারের ব্যাপারে তদন্তে সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছে।
প্রথম আলোর কাছে এক লিখিত মন্তব্যে এই সংস্থার একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ১৯৯০-২০১৩ সালে কোকেন পাচারের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান ছিল ১৫৫। বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে এই সময়কালে বাংলাদেশে ধরা পড়েছে, এমন পাচার করা মোট কোকেনের পরিমাণ মাত্র ১৩ দশমিক ৮৬ কিলোগ্রাম।
জাতিসংঘ জানিয়েছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার পাচার করা কোকেনের কোনো হিসাব দেয়নি। তবে নিজস্ব সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, ২০১৪ সালের ২ জানুয়ারি দুবাই পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ঢাকার একটি হোটেল থেকে দক্ষিণ আমেরিকান এক নাগরিকের কাছ থেকে দুই কিলোগ্রাম পরিমাণ কোকেন জব্দ করে। বিশ্বের অন্যত্র ধৃত কোকেন পাচারের ঘটনায়ও বাংলাদেশের নাম এসেছে কয়েকবার। যেমন ২০১২ সালে ভেনেজুয়েলার পুলিশ ২ দশমিক ৫৫ কেজি কোকেন জব্দ করে। সে দেশের পুলিশের ভাষ্যমতে, এই কোকেন বাংলাদেশে পাচারের কথা ছিল। এর আগে ২০১১ সালে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার পুলিশ বাংলাদেশ থেকে ডাক মারফত পাঠানো শূন্য দশমিক ৮০৬ কেজি কোকেনের একটি প্যাকেট জব্দ করে। আরও আগে, ২০০৯ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচার করা ১ দশমিক ১৫ কেজির একটি চালান ব্যাংককের বিমানবন্দরে আটক করা হয়।
ইউএন ওডিসি মনে করে, এ বছরের জুনে চট্টগ্রামে ধরা পড়া কোকেনের পাচার থেকে মনে হয়, মাদক পাচারের মধ্যবর্তী ক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমশ বাড়ছে। এশিয়ার অন্যান্য দেশে ক্রমবর্ধমান হারে কোকেন পাচারের যে লক্ষণ, এই সম্ভাবনা তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ধরা পড়া কোকেনের পরিমাণ আশির দশকে যেখানে গড়পড়তা ছিল ২৮ কিলোগ্রাম, সেখানে নব্বইয়ের দশকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৪ কিলোগ্রাম। চলতি শতকের প্রথম ১০ বছর (২০০০-২০১৩ সাল নাগাদ) সেই পাচারের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৩৮ কিলোগ্রাম। অবশ্য এই সময়কালে বিশ্বে জব্দ হওয়া কোকেনের পরিমাণ ছিল বহুগুণ বেশি, প্রায় ৬ লাখ ৮৭ হাজার ৪১৭ কিলোগ্রাম।
৬ জুন ২০১৫-তে চট্টগ্রামে বলিভিয়া থেকে আমদানি করা সূর্যমুখী তেলের পিপায় যে তরল কোকেন ধরা পড়ে, তা পরিমাণের দিক দিয়ে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু প্রথম পিপা থেকেই ৬০ কেজি শুদ্ধ (পিওর) কোকেন ধরা পড়ে। মোট ১০৭টি পিপায় এই তেল আমদানি করা হয়, যার প্রতিটিতেই অল্প-বিস্তর কোকেন থাকতে পারে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে, যার পরিমাণ কমপক্ষে ১৮৫ কেজি। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে, এটি এশিয়ার কোনো দেশে আটক তরল কোকেনের দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ চালান। সর্ববৃহৎ পাচারটি ছিল ২০১০ সালে পাকিস্তানের করাচি বন্দরে ধরা পড়া সুরিনাম থেকে আসা ২২৬ কেজির একটি চালান।
ইউএন ওডিসি প্রথম আলোকে জানিয়েছে, চট্টগ্রামে আটক করা কোকেন চিহ্নিতকরণ ও পরিমাণ নির্ধারণের জন্য বাংলাদেশ সরকার এই সংস্থার সাহায্য চেয়েছে। এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে সংস্থাটি বাংলাদেশকে তাদের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উদ্যোগ (ইন্টারন্যাশনাল কোলাবরেটিভ এক্সারসাইজ) ও আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতকরণ কর্মসূচির (ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিটি এশিউরেন্স প্রোগ্রাম) সদস্যপদ গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশ ইউএন ওডিসির নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে আটক করা কোকেন পরীক্ষার জন্য যেকোনো সময়ে নমুনা পাঠাতে সক্ষম হবে।
প্রথম আলোকে এ তথ্য দিয়েছেন ইউএন ওডিসির দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অফিসের প্রধান ক্রিশ্চিনা আলবারতিনি। নয়াদিল্লিতে তাঁর দপ্তর থেকে এক লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও জানান, জাতিসংঘের মাদকবিরোধী এই সংস্থা ২০১৪ সাল থেকে বিশ্ব শুল্ক সংস্থার (ওয়ার্ল্ড কাস্টমস অর্গানাইজেশন) সঙ্গে যৌথভাবে তাদের কনটেইনার কন্ট্রোল কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশকে পাচার করা মাদকদ্রব্য চিহ্নিতকরণে সহায়তা করে আসছে। এই সহযোগিতার অধীনে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার কন্ট্রোল ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে। জাতিসংঘের এই অঙ্গ সংস্থা বাংলাদেশকে মাদক পাচারের বিরুদ্ধে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নজরদারিতেও সাহায্য করে আসছে বলে তিনি জানিয়েছেন।

দুই ছেলের কাকে কিডনি দেবেন মা?

নাড়ি ছেঁড়া ধন দুই ছেলে। দুজনেরই এমন এক সমস্যা, যা তাদের কিডনিগুলোকে একপর্যায়ে অকার্যকর করে দেবে। এ পরিস্থিতিতে মা পারেন তাঁর একটি কিডনি দিতে। কিন্তু দুই সন্তানের মধ্যে কাকে সে কিডনিটা দেবেন?
এমন জটিল পরিস্থিতিতে পড়েছেন চীনের লিয়ান রংহুয়া (৫১)। লিয়ানের দুই ছেলে লি হাইকিং (২৬) ও হাইসং (২৪)। দুজনই কিডনির জটিল রোগে ভুগছেন। বাঁচতে হলে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। মায়ের কাছ থেকে পাওয়া যাবে একটি মাত্র কিডনি। প্রয়োজন আরেকটি কিডনির। সে ক্ষেত্রে বাবার কিডনিও নিতে পারছেন না তাঁরা। তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী।
মা লিয়ান কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘জানি না কেন আমার দুই ছেলের এমন অসুখ হলো! ’
লি হাইকিং অবশ্য ছোট ভাইকে মায়ের কিডনি দেওয়ার পক্ষে। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছোট ভাইকে কিডনিটি দিতে চাই। ওর বয়স কম। তাই সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’
অসুস্থতার কারণে মেডিকেলের পড়া ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন লি হাইকিং। তিনি আশা করেন, খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই কারও না কারও কাছ থেকে তিনি কিডনি পেয়ে যাবেন। তিনি বলেন, ‘যদি না পাই, তাহলে আমাকে ডায়ালাইসিস করাতে হবে।’
চীন গত কয়েক বছর ধরে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে এ চাহিদা মেটানো হচ্ছিল। বিশ্বজুড়ে এর কঠোর নিন্দা শুরু হলে এ বছরের শুরুর দিকে এভাবে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন যারা স্বেচ্ছায় অঙ্গ দান করতে চায়, তাদের অঙ্গই কেবল নেওয়া হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে তৈরি করা হয়েছে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জাতীয় ব্যাংক। যাদের অঙ্গ অন্যদের সঙ্গে বেশি খাপ খাপে এবং যেসব অঙ্গ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, এসব অঙ্গ সংগ্রহের জন্য এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সমালোচকেরা বলছেন, এতে অঙ্গ দানে মানুষের ওপর জোরজুলুম বাড়বে।
সরকার জানায়, এ বছর দেশে ১২ হাজার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রয়োজন তিন লাখ মানুষের। এ চাহিদাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে কালোবাজার। কয়েক সপ্তাহ অনুসন্ধান চালিয়ে বিবিসি এর প্রমাণ পেয়েছে। দেখা গেছে, ২১ বছরের এক তরুণ জুয়া খেলতে গিয়ে ধার করা অর্থ পরিশোধে নিজের একটি কিডনি সাত হাজার মার্কিন ডলারে বিক্রি করে দিয়েছেন। ওই যুবক জানান, পাচারকারীরা অনলাইনে এই বেচাকেনার কাজটি সারে গোপনে। তাঁর তথ্যমতে, তাঁকে প্রথমে একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁর রক্তের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাঁকে কয়েক সপ্তাহ একটি হোটেলে রাখা হয়। এরপর একদিন তাঁর চোখ বেঁধে তাঁকে একটি গাড়িতে করে একটি খামারবাড়িতে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে, নিজেকে অন্য একটি খামারবাড়িতে আবিষ্কার করেন।

বিচার হয় না বলেই হত্যা করা হচ্ছে শিশুদের -সম্মিলিত নাগরিক সমাজের আলোচনায় বক্তারা

দেশে অপরাধের বিচার হয় না। সে জন্য অপরাধীরা একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এসব হত্যাকাণ্ড থেকে রাজন, রাকিব, রবিউলের মতো শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
সম্মিলিত নাগরিক সমাজ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় আলোচকেরা এসব কথা বলেছেন। ‘পৈশাচিকতা বন্ধে নাগরিক দায়িত্ব’ শিরোনামের এই আলোচনা গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ। তিনি বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর ভর করে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। রপ্তানি আয় ও প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। কিন্তু নেই জীবনের নিরাপত্তা। কিছু বর্বর পৈশাচিকভাবে একের পর এক হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। মুক্তমনা মানুষ ও শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। এর কারণ সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনে ঘাটতি ও অপরাধীদের বিচার না হওয়া।
মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। মেধার চেয়ে আনুগত্য প্রাধান্য পাচ্ছে। মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না। আইনের শাসন ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। সে জন্য মানুষ দিন দিন হিংস্র হয়ে উঠছে। এ জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্ব দায়ী। অপরাধ প্রমাণের পরও তাদের বিচারের আওতায় নেওয়া হচ্ছে না। এতে প্রমাণিত হয়, রাজনৈতিক আশ্রয় থাকলে কোনো অপরাধীকেই আইন স্পর্শ করতে পারবে না। কিন্তু অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। তা না হলে হত্যাকারীরা আরও উৎসাহী হয়ে উঠবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশিদ বলেন, দেশে যখন শিশুমৃত্যুর হার কমছে, তখন নরপিশাচেরা শিশুদের হত্যা করে যাচ্ছে। শিশুমৃত্যুর হার কমার বিষয়টি দেশের অর্জন। কিন্তু পিশাচেরা শিশুদের হত্যা করে সেই অর্জনে কালিমা মেখে দিচ্ছে। নাগরিক সমাজ দেশের গণতন্ত্র উদ্ধারে ব্যস্ত। কিন্তু দেশে যে মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয় ঘটেছে, সেই দিকে তাঁদের লক্ষ্য নেই। তাই এখন রাজনীতি বাদ দিয়ে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধকে জাগিয়ে তুলতে হবে।
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, বিদেশি অপশক্তির সাহায্য নিয়ে জঙ্গিরা ব্লগার ও মুক্তমনা মানুষকে হত্যা করে যাচ্ছে। কিন্তু বিচার হচ্ছে না। তাতে অপরাধীরা উৎসাহী হয়ে শিশুদের হত্যা করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতায় এসব ঘটে যাচ্ছে। এর জন্য সরকারও দায়ী। তারা অপরাধীদের আইনের আওতায় নিচ্ছে না।
জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি শফিকুর রহমান বলেন, দেশে সরকারি দলের জনপ্রতিনিধিদের একটি বড় অংশ জামায়াতে ইসলামীর হয়ে কাজ করছে। গত কয়েক বছরে চার হাজার মাদ্রাসাকে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র ৭০০টি। রাজধানীর ফকিরাপুল থেকে প্রতিদিন ছয়-সাত শ পত্রিকা বের হয়। আট-দশজন লোক মিলে অনলাইন থেকে সংবাদ নিয়ে রাতে এসব পত্রিকা বের করে। তারা এখন প্রেসক্লাবের সদস্য হতে চায়। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অপসংস্কৃতির বিকাশ ঘটছে।
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম হামিদের সঞ্চালনায় আলোচনায় আরও অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আজিজুর রহমান, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব নওয়াজেশ আলী খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান প্রমুখ।

বাড্ডায় আ.লীগ নেতাসহ দুজনকে গুলি করে হত্যা

রাজধানীর বাড্ডায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে আওয়ামী লীগের এক নেতাসহ দুজনকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাসহ দুজন।
১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে স্থানীয় বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করার সময় এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার নেপথ্যে কর্মসূচির আয়োজন এবং ঝুট ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল বলে জানা গেলেও কেউ এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারেননি। কে বা কারা কেন এ ঘটনা ঘটিয়েছে, সে ব্যাপারেও তাৎক্ষণিক কিছু জানা যায়নি।
গুলিতে নিহত ব্যক্তিরা হলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সহসভাপতি শামসুদ্দিন মোল্লা (৫৩) এবং উত্তর বাড্ডার হাফ জেনারেল হাসপাতাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক ফিরোজ আহমেদ ওরফে মানিক (৪০)।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান ওরফে গামার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ছাড়া পিঠে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আবদুস সালাম নামের এক ব্যক্তি। তিনি স্থানীয় একটি রিকশার গ্যারেজের মালিক। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের কাছে নিজেকে স্থানীয় যুবলীগ নেতা বলে দাবি করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল রাত নয়টার দিকে সাত-আটজন ব্যক্তি মধ্য বাড্ডার আদর্শনগর এলাকায় পানির পাম্পের সামনে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলাপ করছিলেন। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতা শামসুদ্দিন মোল্লা, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মাহবুবুর রহমান, হাসপাতালের কর্মকর্তা ফিরোজ, রিকশা গ্যারেজের মালিক আবদুস সালাম চেয়ারে বসে ছিলেন। বাকিরা তাঁদের আশপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় তিন যুবক অতর্কিতে দৌড়ে এসে চেয়ারে বসে থাকা চারজনকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। এতে চারজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়ে যান। কেউ কেউ গুলি থেকে রক্ষা পেতে মাটিতে শুয়ে পড়েন, কেউ দৌড়ে চলে যান। অন্যদিকে ওই তিন যুবক আরও কয়েকটি ফাঁকা গুলি করে বাড্ডার হোসেন মার্কেটের দিকে দৌড়ে চলে যান। পরে স্থানীয় লোকজন গুলিবিদ্ধ চারজনের তিনজনকে ইউনাইটেড হাসপাতালে ও একজনকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যান। ইউনাইটেড হাসপাতালে শামসুদ্দিন ও ফিরোজকে মৃত ঘোষণা করেন কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা।
খবর পেয়ে রাতে ইউনাইটেড হাসপাতালে ছুটে যান নিহত ও আহত ব্যক্তিদের স্বজন, পরিচিত লোকজন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা–কর্মীরা। তাঁদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাওসীর রহমান ইউনাইটেড হাসপাতালে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি মাহবুবুর ভাইয়ের সঙ্গে রাজনীতি করি। মাহবুবুর ভাইসহ চারজন চেয়ারে বসে কথা বলছিলেন। আমিসহ কয়েকজন চারপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ওই জায়গায় কিছুটা আলো–আঁধারী ছিল। হঠাৎ দেখি তিনটা ছেলে এসে প্রথমে চেয়ারে বসা চারজনকে গুলি করে। আমি মাটিতে শুয়ে পড়ি। দেখি দুজন অস্ত্র হাতে ফাঁকা গুলি করতে করতে চলে যাচ্ছে। আরেকজনের হাতে কোনো অস্ত্র দেখিনি। একজনের পরনে হলুদ ও আরেকজনের পরনে কালো জামা ছিল। অন্যজনেরটা খেয়াল করতে পারিনি।’
কী কারণে এ ঘটনা ঘটতে পারে, জানতে চাইলে তাওসীর বলেন, ‘আমি কিছু জানি না। তবে মধ্য বাড্ডায় একটা গার্মেন্টস নিয়ে আগে মাহবুবুর ভাইয়ের সঙ্গে কারও বাগ্বিতণ্ডা শুনেছি। কিন্তু কাদের সঙ্গে কেন এ বিতণ্ডা, তা আমি জানি না। মাহবুবুর ভাই উত্তর বাড্ডায় সোনার বাংলা কল্যাণ সংস্থা নামের একটি বেসরকারি সংস্থার চেয়ারম্যানও।’
ইউনাইটেড হাসপাতালে আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, পানির পাম্পের সামনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও তাঁদের বন্ধুবান্ধব প্রায় সময় আড্ডা দেন কিংবা বৈঠক করেন। গতকালও বৈঠকে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি যেমন খিচুড়ি রান্না করে বিভিন্নজনের কাছে বিতরণসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। বৈঠকে তিনিও (হারুনুর রশিদ) ছিলেন। কিন্তু কথাবার্তা প্রায় শেষ হলে তিনি বৈঠক থেকে চলে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি বৈঠকে গুলিবর্ষণের সংবাদ পান। কে বা কারা কেন গুলি করেছে, তা বুঝতে পারছেন না তিনি।
হাসপাতালে গিয়েছেন এমন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি জানান, নিহত ফিরোজ ও আহত আবদুস সালাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল। তাই এলাকায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সঙ্গেই তাঁরা আড্ডা দিতেন, কথাবার্তা বলতেন।
তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, আহত আবদুস সালামকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ নেওয়া হলে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি স্থানীয় যুবলীগের নেতা। তবে তিনি কোন পদে আছেন, তা জানাতে পারেননি।
ইউনাইটেড হাসপাতাল মর্গের সামনে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের আহাজারি করতে দেখা যায়। সেখানে কথা হয় নিহত ফিরোজ আহমেদের খালাতো ভাই জাকারিয়া চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে প্রথম আলোকে বলেন, ফিরোজ রাজনীতি করতেন না। তাঁর কোনো শত্রু নেই। হয়তো বৈঠকে থাকা অন্য রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গে কারও শত্রুতা ছিল। তিনি ঘটনার শিকার হয়েছেন।
নিহত ফিরোজ আহমেদ মধ্য বাড্ডার আদর্শনগর এলাকায় স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে থাকতেন। মধ্য বাড্ডার মোল্লাপাড়ায় পরিবার নিয়ে থাকতেন নিহত শামসুদ্দিন। তিনি এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা।
বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল জলিল প্রথম আলোকে বলেন, কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে এবং ঘটনার কারণ কী, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তারেক-মিশুক নিহত হওয়ার ৪ বছর পূর্তি: বিচারকাজে ধীরগতি

সড়ক দুর্ঘটনায় চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ, এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিশুক মুনীরসহ পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যুর চার বছর পূর্তি হলো আজ ১৩ আগস্ট। কিন্তু এত দিনেও এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। বাদী ও সাক্ষীদের অনেকেই আদালতে হাজির না হওয়ায় বিচারকাজ চলছে ধীরগতিতে।
মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার শালজানা গ্রামে কাগজের ফুল চলচ্চিত্রের শুটিং স্পট দেখে ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মাইক্রোবাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর ও সহযাত্রীরা। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসের সঙ্গে চুয়াডাঙ্গাগামী চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন নিহত হন।
নিহত অপর তিনজন হলেন মাইক্রোবাসের চালক মোস্তাফিজুর রহমান, প্রোডাকশন সহকারী মোতাহার হোসেন ও কর্মী জামাল হোসেন। এ দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শিল্পী ঢালী আল-মামুন ও তাঁর স্ত্রী দিলারা বেগম জলি এবং তারেক মাসুদের সহকারী মনীষ রফিক আহত হন।
পুলিশ ও আদালতসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ ঘটনায় ঘিওর থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) মো. লুৎফর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় বাসের চালক জামির হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু ঘটানোর অভিযোগ আনা হয়। পরে ঘিওর থানার তৎকালীন ওসি আশরাফ-উল ইসলামকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২১ মার্চ মানিকগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে বাসচালক জামিরের বিরুদ্ধে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, সাধারণ জখম, গুরুতর জখম, অবহেলাজনিত কারণে মৃত্যু ঘটানো এবং মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত করার অভিযোগ আনা হয়। একই বছরের ১০ অক্টোবর জেলা ও দায়রা জজ আদালত এই মামলায় অভিযোগ গঠন করেন। এর মধ্য দিয়ে মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। এরপর ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি মামলাটি মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু ওই দিন মামলার বাদী হাজির হননি। এরপর বিভিন্ন সময়ে সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করা হলেও তিনি গরহাজির থাকেন। তাঁকে হাজির হতে আদালত একাধিকবার সমন জারি করেন।
বাদী লুৎফর রহমান এই মামলার অন্যতম সাক্ষী। এ ছাড়াও ক্যাথরিন মাসুদ, ঢালী আল-মামুন, দিলারা বেগম, ইকবাল হোসেন, অনীল কুমার বিশ্বাস, বোমকেশ সরকার, ফারুক হোসেন ও সাথী সরকারসহ ৩৮ জনকে সাক্ষী করা হয়। ধার্য দিনে অনুপস্থিত থাকায় আদালত বেশ কয়েকজন সাক্ষীর বিরুদ্ধেও সমন জারি করেছেন। তিন বছর পর মামলাটির প্রথম সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর। ওই দিন বাসচালক জামিরের উপস্থিতিতে ক্যাথরিন মাসুদ, ঢালী আল-মামুন এবং তাঁর স্ত্রী দিলারা বেগম আদালতে সাক্ষ্য দেন। এতে দুর্ঘটনার জন্য তাঁরা বাসচালককে দায়ী করেন। ২০১১ সালের ১৪ আগস্ট জামির গ্রেপ্তার হন। পরে একই বছরের ১৭ নভেম্বর তিনি আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান।
মামলার বাদী লুৎফর রহমান বর্তমানে ঢাকা মহানগর সিআইডিতে মালিবাগে কর্তব্যরত আছেন। তিনি গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে প্রথম আলোকে জানান, এর আগে পেশাগত কারণে বিভিন্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনের কারণে সময়মতো সমন পাননি। যখন সমন পেয়েছেন, তখন আদালতে গিয়েছেন। সর্বশেষ তিন থেকে চার মাস আগে এই মামলায় আদালতে তিনি সাক্ষ্য দেন।
সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) আবদুস সালাম বলেন, আগামী ১ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে।
ফরিদপুরে স্মরণসভা: ফরিদপুরে আজ দিনব্যাপী কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে তারেক মাসুদকে স্মরণ করা হবে। তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে সকাল ১০টায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা সদরের নূরপুর গ্রামের বাড়িতে তারেক মাসুদের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। বিকেল তিনটায় স্মরণসভা ও সন্ধ্যা সাতটায় তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হবে। এ ছাড়া দিনব্যাপী শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
এতে তারেক মাসুদের ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের উপস্থিত থাকার জন্য তাঁর স্ত্রী ও তারেক মাসুদ মেমোরিয়াল ট্রাস্টের চেয়ারপারসন ক্যাথরিন মাসুদ বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন।

জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে সহানুভূতি আকর্ষণের চেষ্টা করছে সরকার -২০–দলীয় জোটের অভিযোগ

দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলমুক্ত বিশ্বের সহানুভূতি আকর্ষণের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট। তাদের দাবি, এ কারণেই গুম, খুন, শিশুহত্যা, নারী নির্যাতন, ব্লগার খুনের মতো ঘটনা নির্বিঘ্নে বেড়ে চলেছে।
গত বুধবার রাতে গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে জোটের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বৈঠক এবং গতকাল সকালে মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ আনা হয়।
ওই কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। তিনি জোটের পক্ষ থেকে শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশকে জঙ্গি কিংবা সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বানানোর সরকারি চক্রান্ত সম্পর্কে দেশবাসীকে সজাগ থাকার এবং তা প্রতিহত করার আহ্বান জানান।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট আবারও নির্দলীয় সরকারের অধীন সবার অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন চায় বলে সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করে। দেশের জনগণও এ দাবিতে ঐক্যবদ্ধ আছে বলে মনে করে জোট।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, বিএনপির আন্দোলন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। এই সংগ্রাম, এই আন্দোলনের সফলতা সময়ের ব্যাপার মাত্র। ২০-দলীয় জোট সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
এক প্রশ্নের জবাবে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘সরকার অস্ত্র দিয়ে বিরোধী জোটের আন্দোলন দমন করতে চাইছে। কিন্তু অপেক্ষা করুন, জনগণ অস্ত্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে।’
সরকার বিভিন্নভাবে জোট ভাঙার চেষ্টা করছে অভিযোগ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘গত প্রহসনের নির্বাচনে শত চেষ্টা করেও সরকার জোটের কোনো দলকে নিতে পারেনি। জোটের কোনো ব্যক্তিকেও তারা নির্বাচনে আনতে পারেনি। ২০-দলের ঐক্য অটুট-অক্ষুণ্ন আছে, শক্তিশালী আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।’
সংবাদ সম্মেলনে বেসিক ব্যাংকের শত শত কোটি টাকা লোপাটের ঘটনার উল্লেখ করে নজরুল ইসলাম খান বলেন, কে এই শেখ আবদুল হাই বাচ্চু, কার প্রশ্রয়ে তিনি নির্বিবাদে দীর্ঘদিন ধরে লুটপাট চালাতে পারলেন—তা জানতে চায় জনগণ। এর আগে শেয়ারবাজার এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যারা লুট করেছে, তাদেরও বিচার হয়নি। কারণ, তারা সরকারদলীয় লোক।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর আমিনুল ইসলাম, ইসলামী ঐক্যজোটের মুফতি ফয়জুল্লাহ, এলডিপির শাহাদাত হোসেন, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, ন্যাপের গোলাম মোস্তফা ভূঁইয়া, কল্যাণ পার্টির এম এম আমিনুর রহমান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহিউদ্দিন ইকরাম প্রমুখ।

নকল বন্ধ হওয়ায় ফলাফলে ধস?

বরগুনার আমতলী উপজেলায় এবার এইচএসসির ফলাফলে ধস নেমেছে। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ না থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে শিক্ষকেরা মনে করছেন।
বরিশাল শিক্ষা বোর্ড থেকে ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, আমতলী ডিগ্রি কলেজ থেকে গত বছর ১০৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেলেও এবার পেয়েছেন মাত্র আটজন। গত বছর এ কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে ৬০ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। এবার পেয়েছেন চারজন। গতবার ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৪০ জন ও মানবিক বিভাগে চারজন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এবার ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে চারজন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। মানবিক বিভাগে কেউ জিপিএ-৫ পাননি।
ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, আমতলী ডিগ্রি কলেজ বাদে অন্য চারটি কলেজে কোনো জিপিএ-৫ নেই। গত বছর ইউনুস আলী খান কলেজ থেকে চারজন, বকুল নেছা মহিলা কলেজ থেকে চারজন, উত্তর সোনাখালী স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে একজন জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। গত বছর এ উপজেলায় ১১৬ জন জিপিএ-৫ পেলেও এবার আটজন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এবার আমতলীতে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ৯৬৫ জন। গত বছর পরীক্ষার্থী ছিল ৯৮৭ জন। এবার বিজ্ঞান বিভাগে ১৪৭ জনে ৭৬ জন, মানবিকে ২০৬ জনে ১৪৩ জন, ব্যবসায় শিক্ষায় ১৯৯ জনে ১৫২ জন পাস করেন। গত বছর বিজ্ঞানে ১১৮ জনে ১১৬ জন, মানবিকে ২০৪ জনে ১৮৯ জন ও ব্যবসায় শিক্ষায় ১৬৫ জনে ১৫৭ জন পাস করেন।
শিক্ষকেরা বলেন, গত ১ এপ্রিল এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগে আমতলী উপজেলার পাঁচটি কলেজের শিক্ষকেরা সমঝোতা করেন। এরপর পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট আগে মুঠোফোনে নৈর্ব্যক্তিক ও রচনামূলক প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে বাইরে নিয়ে যেতেন একজন শিক্ষক। এরপর সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকদের একটি প্যানেল সেসব প্রশ্নের উত্তর লিখে পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিটের মাথায় পরীক্ষার্থীদের সরবরাহ করতেন বলে অভিযোগ ওঠে। ৪ এপ্রিল পদার্থবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ের প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া নিয়ে আমতলী ডিগ্রি কলেজ ও বকুল নেছা মহিলা কলেজের শিক্ষকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব হয়।
৯ মে প্রথম আলোয় ‘শিক্ষকদের সহযোগিতায় নকল’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বরিশাল শিক্ষা বোর্ড ও বরগুনা জেলা প্রশাসন দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ১০ মে বরিশাল বোর্ডের কমিটি সরেজমিন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায়। ১১ মে পরীক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচজন শিক্ষককে পাঁচ বছরের জন্য সব শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সব পরীক্ষার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি আমতলী কলেজ কেন্দ্রটি সাময়িক পটুয়াখালী মহিলা কলেজে স্থানান্তর করা হয়।
শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত কমিটির সদস্য ও কলেজ পরিদর্শক লিয়াকত জুয়েল বলেন, ‘গণমাধ্যমে আমতলীতে কতিপয় শিক্ষকের নেতৃত্বে পরীক্ষায় অসদুপায় ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর আমরা কঠোরভাবে এসব দমন করি এবং স্বচ্ছভাবে পরীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগ নিই। এ কারণে এবার ফলবিপর্যয় হতে পারে। আশা করি, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে পরীক্ষার হলে যাবে এবং এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেতে পারবে।’

বিজ্ঞানশিক্ষা পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে প্রয়োগ করতে হবে

বর্তমান যুগ বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির যুগ। দেশের শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে হবে। বিজ্ঞানশিক্ষা ব্যক্তি জীবনে প্রতিফলন ঘটিয়ে নিজের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে প্রয়োগ করতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার ফরিদপুরে দিনব্যাপী বিজ্ঞান জয়োৎসবের উদ্বোধনকালে কথাগুলো বলছিলেন ফরিদপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রবীণ গণিত শিক্ষক জগদীশ চন্দ্র ঘোষ। সিটি ব্যাংক ও প্রথম আলোর উদ্যোগে জেলা শহরের অম্বিকা মেমোরিয়াল হলে আয়োজিত জমজমাট ওই উৎসবে বিভিন্ন বিভাগে ৩৫১ জন প্রতিযোগী বিজ্ঞান কুইজ ও প্রকল্পে অংশ নেয়। বিজ্ঞান কুইজে ২৯ জন এবং বিজ্ঞান প্রকল্পে ১৬ জন বিজয়ী হয়।
ফরিদপুর অঞ্চলের এ উৎসবে রাজবাড়ী, মাগুরা, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরের ৩৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। পুরো উৎসবে সহযোগিতা করেন প্রথম আলোর ফরিদপুর বন্ধুসভার সদস্যরা।
সকাল সাড়ে আটটায় অম্বিকা মেমোরিয়াল হলের সামনে বেলুন ওড়ানো হয়। এরপর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে উদ্বোধনপর্ব শুরু হয়। উদ্বোধনের পর তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক এ তিনটি বিভাগে ৩৫১ জন শিক্ষার্থী ৩০ মিনিটের কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এরপর খুদে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের আনন্দপর্বে অংশ নেয়। এতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন ধরনের কৌশলী কারবার ও মজার মজার ভিডিও চিত্র দেখে আনন্দে উদ্বেল হয়ে পড়ে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে মিলনায়তনের দোতলায় প্রদর্শন করা হয় ৪২টি বিজ্ঞান প্রকল্প। ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ ও সরকারি ইয়াছিন কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের চারজন শিক্ষক প্রকল্পগুলো মূল্যায়ন করেন।
দুপুর সাড়ে ১২টায় সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণপর্বে অংশ নেন বিজ্ঞান জয়োৎসবের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী ও প্রথম আলোর যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক মুনির হাসান, সিটি ব্যাংকের ফরিদপুর শাখা ব্রাঞ্চের ব্যবস্থাপক মুনিবুর রহমান, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লক্ষ্মীরানী পোদ্দার, পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শিব শংকর সেন, রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. আলমগীর হোসেন এবং ইয়াছিন কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সুকুমার সান্যাল।
কুইজ প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ২৯ জনকে পদক ও সনদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিজ্ঞান প্রকল্পে প্রাথমিকে এককভাবে একজনকে, নিম্ন মাধ্যমিকে দলীয়ভাবে ছয়টি প্রকল্পে ১৮ জনকে এবং মাধ্যমিক বিভাগে পাঁচটি একক ও চারটি দলীয়ভাবেসহ মোট ১৭ জনকে পদক ও সনদ দেওয়া হয়।

রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে পরিবহনব্যবস্থা -ব্র্যাকের গবেষণা

গত বছরের তুলনায় এ বছর দেশে সড়ক দুর্ঘটনা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার জন্য গণমাধ্যমে চালকদের দায়ী করা হয়। কিন্তু চলাচলকারী যানবাহনের ফিটনেস না থাকা, সড়কগুলো মেরামত না হওয়া এবং মহাসড়কে চলাচলের পথে বাধা সৃষ্টিকারী অবকাঠামো থাকার কারণেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ডেইলি স্টার ভবনের মিলনায়তনে এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের অ্যাডভোকেসি ও সোশ্যাল চেঞ্জ বিভাগের একটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরতে ওই সেমিনারের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরার পর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দেশের পরিবহনব্যবস্থার মধ্যে যদি শুধু চাঁদাবাজির সমস্যা থাকত, তাহলে না হয় কিছুটা হলেও মানা যেত। কিন্তু এখন এমন অবস্থা হয়েছে, দেশের প্রতিটি জেলায় পরিবহনব্যবস্থা রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। অর্থাৎ, সেখানে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার পরিবেশ আর নেই। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, বিভিন্ন দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে যে ফিটনেস পাওয়ার যোগ্য নয় এমন যান তা পেয়ে রাস্তায় নামছে। এ কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এসব দুর্ঘটনা দূর করতে ফিটনেস সার্টিফিকেট থেকে শুরু করে সড়ক নিরাপত্তার প্রতিটি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে।
ব্র্যাকের ‘প্রোমোটিং সেফ রোড কোড’ প্রকল্পের আওতায় করা গবেষণাটিতে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে দেশে মোট ১ হাজার ৮১৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে মারা গেছে ২ হাজার ৩৫১ জন। এর আগের বছর ২০১৩ সালে ১ হাজার ৩১৩টি দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৮৪৫ জন মারা যায়।
২০১৪ সালের দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১ হাজার ৭০৫ জন পুরুষ, ৩১৪ জন নারী ও ৩৩২টি শিশু। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ৫ হাজার ৪০৮ জন। দেশের শীর্ষ তিনটি বাংলা ও একটি ইংরেজি পত্রিকার সংবাদ বিশ্লেষণ করে করা ওই গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন ব্র্যাকের প্রিসিলা রাজ ও এম এম মামুনুর রশিদ।
গবেষণাটিতে দেখা গেছে, ২০১৪ সালে ঘটা দুর্ঘটনাগুলোর ৮০টি মহাসড়কে ঘটেছে। সরকারি পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কোম্পানি দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে। সংস্থাটির বাস সর্বোচ্চ ১৯ বার দুর্ঘটনায় পড়েছে। এর পরেই রয়েছে শ্যামলী পরিবহন নয়বার; হানিফ পরিবহন সাতবার; এনা পরিবহন পাঁচবার; সোহাগ পরিবহন ও বলাকা পরিবহন চারবার করে; সাকুরা, ঈগল ও দিবানিশি পরিবহন তিনবার করে দুর্ঘটনায় পড়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পিকনিকের বাস ছয়বার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস দুবার, অন্যান্য শিক্ষার্থী পরিবহনকারী বাস দুবার, কর্মচারী পরিবহনকারী বাস দুবার ও পুলিশ বাহিনীর একটি বাস দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।
এ ছাড়া, ২০১৪ সালে ৩৩৮টি মোটরবাইক দুর্ঘটনায় ৪২১ জনের মৃত্যু হয়েছে ও ৩৩২ জন আহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার সবচেয়ে বেশি ঘটেছে আন্ত-উপজেলা সড়কে। ৫২৫ জন পথচারী দুর্ঘটনায় মারা গেছে। সাতটি অ্যাম্বুলেন্সও দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারাহ হোসেন, বারডেমের অধ্যাপক হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ শিল্প বণিক সমিতির সাবেক পরিচালক আবদুল হক, নিরাপদ সড়ক চাই-এর চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন। সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ নাজমুল হোসেন।

সওজের জায়গা দখল করে দোকান নির্মাণ by কামরান পারভেজ

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে কলতাপাড়া সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ের ফটকের পাশে সওজের জায়গায় দোকানঘর
নির্মাণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি তোলা ছবি l প্রথম আলো
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার কলতাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে সড়ক ও জনপথের (সওজ) জায়গা দখল করে দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ও গৌরীপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহ রফিকুল ইসলাম এ স্থাপনা তৈরি করাচ্ছেন।
রফিকুল স্থানীয় সাংসদ মজিবুর রহমান ফকিরের ভাতিজা। সাংসদের সম্মতি নিয়েই এ নির্মাণকাজ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে কলতাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের ফটক ঘেঁষে সওজের আনুমানিক ৪০ ফুট জায়গায় মোট আটটি দোকানঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ফটকের অপর পাশে বিদ্যালয় ভবনের সঙ্গে আরও একটি দোকান নির্মাণ করা হচ্ছে। দোকানঘর নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় দুজন বাসিন্দা বলেন, দোকানঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী বলে, সওজের জায়গাটি তারা মাঠ হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল। মাঠে পাকা দোকান নির্মাণের ফলে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা করার জায়গা অনেক কমে গেছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক কথা বলতে চাননি। একজন সহকারী শিক্ষক এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সভাপতিকে জিজ্ঞেস করতে বলেন। বিদ্যালয়ের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কিছুদিন আগে প্রধান শিক্ষক বদলি হয়ে যান। নতুন প্রধান শিক্ষক এখনো যোগ দেননি।
রফিকুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, বিদ্যালয়ের পাশে মহাসড়ক। সীমানাপ্রাচীর না থাকায় গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যালয় দোকান ঘেঁষে হলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হবে। তবে দোকান নির্মাণের জন্য সওজ বা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কোনো তথ্য দেননি। তিনি বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। এমপি স্যার (মজিবুর রহমান) সবকিছু জানেন। আপনি তাঁকে জিজ্ঞেস করেন।’
এ ব্যাপারে গতকাল বুধবার রাতে প্রথম আলোর ঢাকার প্রধান কার্যালয় থেকে ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের সাংসদ মজিবুর রহমান ফকিরকে ফোন করলে তিনি বলেন, অভিযোগ সঠিক নয়। আপনি (সাংবাদিক) এসে দেখেন। আর ওই জমি সওজের নয়। আমি তাদের এসে মাপজোখ করতে বলেছি।’ তাহলে এই জমি আপনার এবং আপনিই সেখানে দোকান নির্মাণ করাচ্ছেন—প্রশ্নের জবাবে সাংসদ বলেন, ‘জমি আমার না, দোকানও আমি বানাই না।’
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিদ্যালয়ের মাঠে দোকান তৈরি হচ্ছে জানতে পেরে আমি গৌরীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে খবর নিতে বলেছিলাম। তিনি জানিয়েছেন, ওই জায়গা সড়ক ও জনপথ বিভাগের।’
মহাসড়কের ওই অংশ কিশোরগঞ্জ সওজের অধীন। কিশোরগঞ্জ সওজের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কের পাশে কেউ কোনো বাণিজ্যিক স্থাপনা তৈরি করতে পারে না। ইতিমধ্যে ওই মহাসড়কে স্থাপনা তৈরির অভিযোগে আটটি মামলা করেছে সওজ। এ বিষয়ে তাঁর কাছে কেউ অভিযোগ করেনি।

ললিত বিতর্ক কংগ্রেস আমলেই তৈরি করা

গতকাল লোকসভায় সুষমা। আইএএনএস
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গতকাল বুধবার লোকসভায় বললেন, আইপিএলের সাবেক কমিশনার ললিত মোদির কাছ থেকে তিনি ও তাঁর পরিবার কোনো সাহায্য নেননি। ললিতকে নিয়ে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তা কংগ্রেস আমলেরই সৃষ্টি করা। সে জন্য প্রধানত দায়ী সাবেক কংগ্রেস অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। ললিত কেলেঙ্কারি নিয়ে সুষমা স্বরাজ ও রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে এবং ব্যপম কেলেঙ্কারিতে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের পদত্যাগের দাবিতে সংসদের অধিবেশন এত দিন স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়নি কংগ্রেস। কংগ্রেসের বক্তব্য ছিল, আগে পদত্যাগ, পরে আলোচনা। অথচ অধিবেশন শেষ হওয়ার আগের দিন গতকাল সেই দাবি থেকে সরে এসে কংগ্রেস মুলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনায় রাজি হলো। তা সত্ত্বেও অবশ্য সুষমার বক্তব্য না শুনে হইচই করে সভা বানচালের চেষ্টা করেন দলটির সাংসদেরা। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস সভা থেকে ওয়াক আউট করে। শুরুটা অবশ্য বেশ নাটকীয়। আলোচনা শুরুর কিছু পরেই বিজেপির এক সাংসদ কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীর বিরুদ্ধে কিছু ‘কু মন্তব্য’ করলে ক্ষুব্ধ সোনিয়া প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। সভাও মুলতবি হয়ে যায়। পরে সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ও স্পিকার জানান, কোনো কিছুই সভার কার্যবিবরণীতে নেই। থাকলে তা বাদ দেওয়া হবে।
এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ তাঁর বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগগুলোর জবাব দেন। তিনি আবারও বলেন, একজন অসুস্থ মহিলার চিকিৎসার জন্য তিনি সাহায্য করেছেন, যিনি কি না ভারতীয়। যিনি অপরাধী নন এবং যাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। এটা অপরাধ হয়ে থাকলে সেই অপরাধ তিনি বারবার করবেন। দ্বিতীয়ত সুষমা দাবি করেন, ললিত মোদিকে পর্তুগাল যাওয়ার সুযোগ করে দিতে তিনি যুক্তরাজ্যকে অনুরোধ করেননি। শুধু বলেছিলেন, তাঁরা যদি তা করেন তা হলে ভারত-যুক্তরাজ্য সম্পর্কে কোনো চিড় ধরবে না। তৃতীয়ত, ললিত মোদির হয়ে মামলায় লড়তে তাঁর স্বামী ও কন্যা কোনো টাকা নেননি। চতুর্থত, ললিতের সঙ্গে তাঁর দেওয়া-নেওয়ার কোনো সম্পর্ক কখনো ছিল না। সুষমা পাল্টা আক্রমণ করেন কংগ্রেসকে। বলেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বরং চার বছর ধরে কোনো ব্যবস্থা ললিত মোদির বিরুদ্ধে নেননি। ললিতকে ফেরত পেতে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী যুক্তরাজ্যের কাছে আবেদনও জানানো হয়নি। সাবেক আইপিএল কমিশনারের কাছ থেকে সুষমা কত টাকা পেয়েছেন জানতে চেয়েছিলেন কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। রাহুলের উদ্দেশে সুষমা বলেন, বরং তিনিই তাঁর মাকে জিজ্ঞেস করুন, বোফোর্স মামলায় কোয়াত্রোচির (ইতালীয় মধ্যস্থতাকারী) কাছ থেকে কত টাকা তিনি পেয়েছিলেন। সুষমার বক্তব্যের জবাবে রাহুল কটাক্ষ করে বলেন, ‘উনি এমন মানবিক, যিনি সব গোপনে করেন। সংসদ ভবনে মঙ্গলবার তিনি আমার হাত ধরে বলেছিলেন, বেটা আমি কী খারাপ করলাম? রাহুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, দুর্নীতি বরদাশত করবেন না। অথচ আমি তা নিয়ে বলতে গেলে ওঁর দল চুপ করিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু কংগ্রেস চুপ থাকবে না।’

অ্যাসাঞ্জের বিষয়ে সুইডেন ও ইকুয়েডরের সমঝোতা?

জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ
আলোচিত ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে ইকুয়েডরকে একটি প্রস্তাব দিয়েছে সুইডেন। এর আওতায় সুইডেনের কৌঁসুলিরা লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া অ্যাসাঞ্জকে সেখানেই জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারবেন। মনে করা হচ্ছে, এতে তাঁকে নিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘ টানাপোড়েনের অবসান ঘটতে পারে। খবর গার্ডিয়ানের। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সরকারের লাখ লাখ স্পর্শকাতর গোপন নথি ফাঁস করে বিশ্বব্যাপী হইচই ফেলা অস্ট্রেলীয় নাগরিক অ্যাসাঞ্জ ২০১২ সালের জুনে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সুইডেনে প্রত্যর্পণ এড়াতে এ কাজ করেন তিনি। একসময়ের দক্ষ হ্যাকার অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে স্টকহোমে দুই নারী যৌন হয়রানির মামলা করেছেন। এ মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় সুইডেন। তবে অ্যাসাঞ্জের দাবি, ওই যৌন হয়রানির অভিযোগগুলো সাজানো। তাঁর আশঙ্কা, সুইডেন তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিতে পারে। সুইডেনের বিচার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে,
ইকুয়েডরের সঙ্গে এ নিয়ে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে সুইডেনের সরকার রাজি হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হবে, অপরাধসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে আইনি সহযোগিতার জন্য ‘একটি সাধারণ সমঝোতা’র সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও অ্যাসাঞ্জের মামলার দায়িত্বে থাকা সিসিলিয়া রিড্ডেসেলিয়াস বলেন, ‘আসন্ন বৈঠকগুলোতেই দেখা যাবে, সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় কি না।’ এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সুইডেন অ্যাসাঞ্জ প্রশ্নে কিছুটা ছাড় দিল বলেই মনে করা হচ্ছে। অগ্রগতি আটকে দেওয়ার বিষয়ে দেশ দুটি একে অপরকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করার পর এই পদক্ষেপ এল। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে নিয়ে দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে যুক্তরাজ্যও ক্রমবর্ধমানভাবে বিরক্ত হচ্ছে। অ্যাসাঞ্জের ওপর কড়া নজরদারি অব্যাহত রাখতে লন্ডনে ইকুয়েডরের দূতাবাসের চারপাশে পুলিশি পাহারা বসিয়ে ব্রিটিশ সরকার এরই মধ্যে এক কোটি পাউন্ড খরচ করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুগো সয়্যার বলেন, ‘(অ্যাসাঞ্জের) জিজ্ঞাসাবাদ এখনো না হওয়ায় আমরা হতাশ। বিষয়টি এখনো খুব অসন্তোষজনক ও ব্যয়বহুল।’

‘ট্রাফিক ধরলে বইলেন মিটারে যাইতেছি’ by একরামুল হুদা

একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা আবদুল মালেক খন্দকার ও তাঁর বন্ধু মিরপুর পল্লবী থেকে শাহবাগ যাবেন। মিটারে যেতে রাজি না হওয়ায় ১৭০ টাকা ভাড়ায় একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশায় উঠেছেন তাঁরা দুজন। দর-কষাকষি করে ভাড়া ঠিক করা হলেও সিএনজিতে উঠেই চালক ভাড়ার মিটারটি চালু করে দিলেন। যাত্রীদের উদ্দেশে বললেন, ‘ট্রাফিক ধরলে বইলেন মিটারে যাইতেছি’।
ওপরের ঘটনা নতুন কিছু নয়। রাজধানী ঢাকায় সিএনজি অটোরিকশায় যাওয়া নিয়ে এমন তিক্ত অভিজ্ঞতা কমবেশি সবারই আছে। বিশেষ করে যাঁরা এই তিন চাকার যানে নিয়মিত যাতায়াত করেন। বর্তমানে মিটারে নির্ধারিত ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে এসব অটোরিকশা পাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। প্রায় সব যাত্রীকে পড়তে হয় এ ধরনের দুরবস্থায়। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অটোরিকশা সার্ভিস নীতিমালা ২০০৭ অনুযায়ী সরকার নির্ধারিত সড়কপথে যেকোনো দূরত্বে এ পরিবহনের চালক যেতে বাধ্য। কিন্তু রাস্তায় নামলে দেখা যায় এর উল্টো চিত্র। যাত্রীর নয়, বরং চালকের মর্জি ছাড়া কোথাও যান না অটোরিকশা চালকেরা। আর যাঁরা যান, তাঁরাও মিটারে নন, বরং দর-কষাকষি করে ভাড়া নির্ধারণ করে তারপর যান।
সরকার ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সিএনজি/পেট্রল চালিত ৪-স্ট্রোক তিন চাকার ভাড়া নির্ধারণ করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সে অনুযায়ী প্রথম দুই কিলোমিটারের ভাড়া ২৫ টাকা, পরবর্তী প্রতি কিমি সাত টাকা ৬৪ পয়সা এবং বিরতিকালের জন্য ভাড়ার হার নির্ধারণ করা হয় প্রতি মিনিট এক টাকা ৪০ পয়সা। এ ছাড়া দৈনিক জমার হার নির্ধারণ করা হয় ৬০০ টাকা।
সরকারের নির্ধারিত এ ভাড়া অনুযায়ী উল্লিখিত যাত্রী আবদুল মালেক খন্দকারের পল্লবী থেকে শাহবাগ পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার পথের ভাড়া আসে ১০০ টাকা। মিটারেও ভাড়া দেখায় ১০০ টাকা। কিন্তু তাঁকে পরিশোধ করতে হয় ১৭০ টাকা। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে প্রতি কিলোমিটারে তাঁকে ছয় টাকা ৮৬ পয়সা করে বেশি ভাড়া পরিশোধ করতে হয়েছে। এভাবে প্রতিদিন যাত্রীরা প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া বেশি দিয়ে অটোরিকশায় যাতায়াত করছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা শহরে বর্তমানে নিবন্ধিত অটোরিকশার সংখ্যা আট হাজার ২৯১ টি। কিন্তু ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির হিসেব অনুযায়ী বর্তমানে ঢাকার রাস্তায় চলছে ১৩ হাজার অটোরিকশা। এ সংস্থাটির তথ্যমতে, প্রতিটি অটোরিকশা দৈনিক কমপক্ষে ১৬০ কিলোমিটার চলে। প্রতি কিলোমিটারে ছয় টাকা ৮৬ পয়সা বেশি ধরে যাত্রীরা দৈনিক এক কোটি ৪২ লাখ ৬৮ হাজার ৮০০ টাকা বেশি ভাড়া দিচ্ছে। মাসে যে টাকার অঙ্কটি গিয়ে দাঁড়াচ্ছে ৪২ কোটি ৮০ লাখ ৬৪ হাজার টাকায়।
মিটারে না গিয়ে দর-কষাকষি করে বেশি ভাড়ায় কেন যাচ্ছেন?
এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল মালেক খন্দকার বলেন, ‘কী করব বলেন? কোনো উপায় নাই। আমরা তো তাঁদের কাছে জিম্মি। মিটারে কেউ যেতে রাজি না। হয় বেশি ভাড়া দিয়ে যাবেন। নয় তো গরমের মধ্যে ঝুলে ঝুলে লোকাল বাসে যাবেন।’
কয়েকজন অটোরিকশা চালকের ভাষ্য, বর্তমানে নির্দিষ্ট কোনো নির্ধারিত দৈনিক ভাড়া নেই। অনেকটা নিলামের মতো করে দৈনিক জমার হার নির্ধারিত হচ্ছে। অটোরিকশার তুলনায় চালকের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায় অটোরিকশা পেতে চালকেরা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়েও বেশি টাকা মালিকদের দিতে প্রস্তুত। মালিকেরাও যার কাছ থেকে বেশি টাকা পান, তাঁকেই ভাড়া দেন তাঁর অটোরিকশাটি।
চালকদের অভিযোগ, সরকার এক দিনের জন্য ৬০০ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও মালিকেরা আধা বেলাতেই ৬০০ টাকা নিচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৯০০ থেকে এক হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকে। চালকেরা এই টাকাটি তুলে নিচ্ছেন যাত্রীদের কাছ থেকেই।
এই অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি মো. বরকত উল্লাহ বলেন, ‘মালিক নির্দিষ্ট ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার জন্য তো চালকেরাই দায়ী। তারাই মালিকদের অভ্যাস খারাপ করেছে। সিএনজি অটোরিকশা আছে ১৩ হাজার, আর চালক আছে ৩৭ হাজারের মতো। যে যেভাবে পারে, মালিককে টাকা দিচ্ছে আর সিএনজি নিয়ে যাচ্ছে।’
মো. বরকত উল্লাহর ভাষ্য, সরকার ভাড়া নির্ধারণ করেছিল পাঁচ বছর আগে। এর মধ্যে তেল, গ্যাস ও যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একটি অটোরিকশার পেছনে দৈনিক খরচ হয় ৭৪৪ টাকা। সেখানে ৬০০ টাকা নেওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সরকার যদি নতুন করে ভাড়া নির্ধারণ করে, তবে প্রতিটি অটোরিকশা মিটারে চলবে—এটা নিশ্চিত করা যাবে।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘দৈনিক জমাসহ অটোরিকশার ভাড়া নতুন করে নির্ধারণ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। কিন্তু মালিক সমিতির কর্তারা মন্ত্রীকে অঙ্গীকার করেছিলেন, নতুন ভাড়া নির্ধারণ করার সময়টাতে অটোরিকশা মিটারে চলবে। এরপরও তারা মিটারে না যাওয়াটা অন্যায়।’

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময়: অনিয়ম জানাল ইউজিসি, ক্যাম্পাসের জন্য সময় বৃদ্ধির ইঙ্গিত মন্ত্রীর

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিক ও উপাচার্যদের সামনে এগুলোর অধিকাংশের নানা অনিয়মের বিবরণ দিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরল। দাবির প্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে চতুর্থ দফায় সময় বাড়ানোর ইঙ্গিত দিলেন।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউজিসিতে গতকাল বৃহস্পতিবার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব অনিয়ম ও দাবি তুলে ধরা হয়। ইউজিসি আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় প্রায় সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান ও উপাচার্যরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় সূচনা বক্তব্য দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এরপর বক্তব্য দেন ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম তুলে ধরে তিনি বলেন, অনুমোদনহীন ক্যাম্পাস চালাচ্ছে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক নেই, কনিষ্ঠ পর্যায়ের শিক্ষক দিয়ে বেশির ভাগ কোর্স চালানো হচ্ছে। পূর্ণকালীন শিক্ষকের চেয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক বেশি। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সংরক্ষিত তহবিলের সিংহভাগই তুলে নিয়েছে।
আবদুল মান্নান বলেন, ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয় নামমাত্র গবেষণা করেছে। ইউজিসি ও সরকার মনোনীত সদস্যদের সিন্ডিকেট সভায় আমন্ত্রণ জানায় না। আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতির নিয়োগ করা উপাচার্য, সহ-উপাচার্যদের কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড বরখাস্ত করছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত উপাচার্য নিয়োগ হয় না। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্যানেল প্রস্তাব পাঠায় না। বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। বছরের পর বছর নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেয় না।
ইউজিসির চেয়ারম্যান বলেন, আইনানুযায়ী অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ৬ শতাংশ শিক্ষার্থীকে (৩ শতাংশ দরিদ্র ও ৩ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা) বিনা বেতনে পড়ায় না। কয়েকটিতে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের মধ্যে দ্বন্দ্ব হচ্ছে। আবার বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষদের দ্বন্দ্বের কারণেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। ইউজিসির সীমিত ক্ষমতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন ‘পুলিশগিরি করা আমাদের কাজ নয়। তালা-চাবিও আমাদের কাছে নেই। এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পারে মন্ত্রণালয়।’
ইউজিসির চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে সময় বৃদ্ধি, আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি তুলে ধরা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষে বক্তব্য দেন মালিকদের সংগঠন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভের উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ, ঈশা খাঁ ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দূর্গাদাস ভট্টাচার্য, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অনুপম সেন প্রমুখ।
তাঁদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শর্ত মেনে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি, তাদের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবস্থা জানিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন ইউজিসির কাছে দিতে হবে। এরপর এই প্রতিবেদন দেখে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বিবেচনা করা হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা অবিবেচক হব না।’
তৃতীয় দফার সময় অনুযায়ী আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে ক্যাম্পাস করে কার্যক্রম চালানোর কথা। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পুরোনোগুলোর মধ্যে ১৭টি নিজস্ব ক্যাম্পাস করেছে। সাতটি ট্রাস্ট বা ফাউন্ডেশনের জমিতে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। নয়টি নির্মাণাধীন ভবনে আংশিক কার্যক্রম চালাচ্ছে। ১৭টির প্রক্রিয়াধীন। তিনটি এখনো জমি কেনেনি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করবেন।

পৌনে চার কোটি টাকা ব্যয়ে ভবন নির্মাণ: সাড়ে তিন মাসেই ছাদ চুইয়ে পড়ে পানি by সাইফুর রহমান

ছাদ চুইয়ে পানি পড়ায় নতুন কক্ষটি
যেন পুরোনো কক্ষে রূপ নিয়েছে
ঝকঝকে ভবনটি মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এখনই এর ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে। স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে অধিকাংশ কক্ষ। ভেঙে গেছে প্রবেশপথের সড়ক।
এই চিত্র বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের। ভবন নির্মাণে নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। অথচ এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছিল পৌনে চার কোটি টাকা।
সম্প্রতি নগরের নথুল্লাবাদে সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই কার্যালয়ে ঢোকার কংক্রিটের সড়কটি ভেঙে দেবে গেছে। মূল চত্বরের অনেক স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সীমানাপ্রাচীরের পাশের মাটি দেবে ফাঁকা হয়ে গেছে। দ্বিতীয় তলার সভাকক্ষ দেখে মনে হয়েছে, কয়েক যুগ আগে নির্মাণ করা হয়েছে। ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে পুরো ছাদ কালো হয়ে গেছে। তিনতলার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কক্ষে পানি ঢুকছে ছাদ চুইয়ে। একই অবস্থা তিনতলার অন্য সব কক্ষের।
গণপূর্ত বিভাগ বরিশাল কার্যালয় সূত্র জানায়, ৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনতলা ভবনটি নির্মাণ করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল ভবনটি হস্তান্তর করা হয়।
নির্বাচন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ভবন নির্মাণসংক্রান্ত কোনো বিষয় গণপূর্ত বিভাগ তাঁদের জানায়নি। এমনকি কাজ তদারকির দায়িত্বেও ছিল গণপূর্ত বিভাগ। ফলে নিম্নমানের কাজ করে তা যেনতেনভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। গত ১৩ জুলাই ভবন নির্মাণে ত্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে নির্বাচন কমিশন সচিব বরাবর চিঠি দেওয়া হয়েছে। তার অনুলিপি দেওয়া হয়েছে গণপূর্ত বিভাগকে।
ছাদের খোয়া নরম মাটির মতো উঠে যাচ্ছে
ভবন বুঝে নেওয়ার জন্য গঠন করা কমিটির প্রধান জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আবদুল হালিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভবন নির্মাণ হওয়ার পর এর নির্মাণ ত্রুটি সম্পর্কে বলা মুশকিল। তারপরও গুণগত মান নিয়ে কয়েকটি ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা বলেছি। কিন্তু ভবন বুঝে নেওয়ার পর ছাদ দিয়ে পানি পড়তে পারে এমন ধারণা আমাদের ছিল না। দরজা-জানালা ফিটিংস যথাযথ হয়নি, মাঠ দেবে যাওয়া ইত্যাদি বিষয় তুলে ধরেছি। সেগুলো ঠিক করে দেওয়ার কথাও বলেছে গণপূর্ত বিভাগ।’
গণপূর্ত বিভাগ, বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘নিম্নমানের কাজ হয়েছে, এটা ঠিক নয়। তবে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে, এ বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার পর বলা যাবে। অতি বৃষ্টিতে থাই গ্লাসের পাশ দিয়ে পানি চুইয়ে যেতে পারে।’
এদিকে গত মঙ্গলবার প্রকৌশলীসহ ওই কার্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, ছাদে ব্যবহার করা খোয়া নরম মাটির মতো পায়ের সঙ্গে উঠে যাচ্ছে। নির্মাণসামগ্রী নিম্নমানের ব্যবহার করায় এমন অবস্থা হয়েছে বলে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, ভবন নির্মাণের পর নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা বের করার প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি বরিশালে নেই। তবে ছাদের পানি অপসারণের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা উচিত। সেটা রাখা হয়নি। পানি পড়া বন্ধ করতে হলে কমপক্ষে আড়াই ইঞ্চি পুরু জলছাদ করতে হবে।
নিম্নমানের কাজ করায় বরিশাল আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের নতুন ভবনের সামনের রাস্তাটিও ভেঙে গেছে l প্রথম আলো

শোক আর প্রতিবাদে নাগাসাকি হামলা স্মরণ

নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্রের আণবিক বোমা হামলার
৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে শহরটির পিস পার্কে
স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখানে স্থাপিত
বিশাল মূর্তিটি আণবিক বোমার ভয়াবহতার প্রতি
সতর্কতা ও একই সঙ্গে শান্তির আশ্বাসের প্রতীক
জাপানিরা গত রোববার ভাবগম্ভীর ও শোকাবনত পরিবেশে নাগাসাকি শহরে মার্কিন বাহিনীর আণবিক বোমা হামলার ৭০ বছর পূর্তি পালন করেছে। এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের উপস্থিতির সমালোচনা করেন। আবে জাপানি সামরিক বাহিনীর বিদেশে সংঘাতে যোগ দেওয়ার পথ সুগম করতে চান বলে তাঁরা ক্ষুব্ধ। খবর রয়টার্স ও বিবিসির।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে জাপানের আরেক শহর হিরোশিমায় ভয়াবহ আণবিক বোমা ফেলার তিন দিনের মাথায় নাগাসাকিতে বোমা ফেলে মার্কিন বাহিনী। তাদের প্রকৃত লক্ষ্যবস্তু ছিল কোকুরা। কিন্তু মেঘের কারণে বিমান থেকে বোমা ফেলতে নাগাসাকিকে বেছে নেওয়া হয়। অবিশ্বাস্য রকম শক্তিশালী সেই বোমার আঘাতে সেখানকার কমপক্ষে ৭০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিই বিশ্বে আণবিক বোমার ভয়াবহ ক্ষমতার প্রথম শিকার।
বোমায় নাগাসাকির প্রায় ৩০ শতাংশ
ধ্বংস হয়ে যায়l ছবি: বিবিসির সৌজন্যে
শিশুদের দিয়ে একটি ঘোষণা পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে নাগাসাকির গতকালের স্মরণানুষ্ঠান শুরু হয়। অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে ৭৫টি দেশের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন টোকিওতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন কেনেডিও। এরপর বেলা ১১টা ২ মিনিটে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়। তা শেষ হলে বাজানো হয় ঘণ্টাধ্বনি। ১৯৪৫ সালের ৯ আগস্ট ঠিক বেলা ১১টা ২ মিনিটেই নাগাসাকিতে ফেলা বোমাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল। নাগাসাকির মেয়র তোমিহিসা তাউই অনুষ্ঠানে একটি শান্তি ঘোষণা পড়ে শোনান। তিনি বলেন, দেশের শান্তিবাদী সংবিধানে পরিবর্তন আনতে প্রধানমন্ত্রী আবের প্রচেষ্টা নিয়ে ‘বড় পরিসরে অস্বস্তি’ রয়েছে। আরও বক্তব্য দেন নাগাসাকি হামলায় গুরুতর আহত হওয়ার পরও প্রাণে বেঁচে যাওয়া সুমিতেরু তানিগুচি। বর্তমানে ৮৬ বছর বয়সী মানুষটি যে যন্ত্রণা নিয়ে আজও বেঁচে আছেন, তা বর্ণনা করে শোনান। সংবিধান পরিবর্তনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী আবের প্রচেষ্টা তিনি মানবেন না বলেও ঘোষণা দেন সুমিতেরু। বক্তব্য শেষে তিনি আবের কাছাকাছি একটি আসনেই বসেন। এ সময় সুমিতেরু আবেকে বলেন, ‘জাপানের শান্তিবাদী সংবিধানে হস্তক্ষেপ করবেন না।’
অনুষ্ঠানে দেওয়া ভাষণে আবে বলেন, জাপান একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ে তুলতে এখনো সংকল্পবদ্ধ। প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জাপানি সামরিক বাহিনী আক্রান্ত মিত্র দেশের পক্ষে লড়াইয়ে অংশ নিতে পারবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান একটি শান্তিবাদী সংবিধান প্রণয়নে বাধ্য হয়। তখন থেকে দেশটি বিদেশে যুদ্ধ-সংক্রান্ত বিষয়ে সেনা পাঠাতে পারে না।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের দেওয়া একটি বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়। এতে তিনি বলেছেন, ‘নাগাসাকিই সর্বশেষ, এটা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্রের কোনো ধরনের ব্যবহার হতে দিতে পারি না। এর মানবিক তাৎপর্য অনেক বেশি। আর কোনো নাগাসাকি নয়। আর কোনো হিরোশিমা নয়।’