Monday, March 31, 2014

যশোবন্তকে বিজেপি থেকে আবার বহিষ্কার

যশোবন্ত সিং
ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জ্যেষ্ঠ নেতা যশোবন্ত সিং (৭৬) আবার দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন। এবার তাঁকে ছয় বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে রাজ্যস্থান রাজ্যের বারমার আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ব্যাপারে অনঢ় থাকায় গত শনিবার তাঁকে বহিষ্কার করে বিজেপি। এর আগে ২০০৯ সালে বিজেপি যশোবন্তকে একবার দল থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।
নিজের একটি বইয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর গুণকীর্তন করায় সেবার তিনি দলের বিরাগভাজন হন। অবশ্য, ১০ মাসের মাথায় যশোবন্তকে আবার দলে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ভারতের সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে যশোবন্ত পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং থেকে নির্বাচিত হন। জীবনের শেষ নির্বাচন বলে এবার তিনি নিজের জন্মস্থান বারমার থেকে লড়তে চেয়েছিলেন। তবে বিজেপি তাঁর আবেদন প্রত্যাখ্যান করে সোনারাম চৌধুরীকে ওই আসনে মনোনয়ন দেয়। এনডিটিভি।

প্রতিবেশীর প্রতি কঠোর হবেন মোদি

নরেন্দ্র মোদি
ভারতে আসন্ন লোকসভা নির্বাচন নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হতে পারে বলে আভাস মিলছে। বিজেপি জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হবেন হিন্দু জাতীয়তাবাদী কট্টরপন্থী নেতা ও গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। আর তিনি প্রধানমন্ত্রী হলে পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে?
বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশ পাকিস্তান ও চীনের প্রতি তাঁর নীতি কী হবে—এসব নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। মোদি অবশ্য নির্বাচনী প্রচারণায় দেওয়া বিভিন্ন ভাষণে পররাষ্ট্রনীতিতে কট্টর হওয়ার আভাস দিয়েছেন। ইতিমধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই বড় প্রতিবেশীর প্রতি আক্রমণাত্মক কথাও বলেছেন তিনি। চীনকে সতর্ক করে মোদি বলেছেন, চীনকে ‘সম্প্রসারণবাদী নীতি’ থেকে সরে আসতে হবে। আর ভারতে বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলার জন্য বরাবরই পাকিস্তানকে দায়ী করছেন। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে গত মাসে নির্বাচনী সমাবেশে মোদি বলেন, ‘আমি এই মাটির নামে শপথ নিচ্ছি, এই দেশকে অবশ্যই রক্ষা করব।’ চীন ওই অঞ্চলকে নিজের দাবি করে আসছে। অবশ্য নিজের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সুস্পষ্টভাবে কখনোই কিছু বলেননি মোদি। তবে বিজেপির সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ির পররাষ্ট্রনীতির প্রশংসা করেন তিনি। বাজপেয়ির আমলে ১৯৯৮ সালে কয়েক দফায় পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষা চালায় ভারত। ভারত, পাকিস্তান ও চীন—তিন দেশই পারমাণবিক শক্তিধর। ভারত ইতিমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে তিনটি যুদ্ধ করেছে। চীনের সঙ্গে ১৯৬২ সালে বিচ্ছিন্ন লড়াই হয়েছে।
২০০১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল ভারত। এর পর থেকে নয়াদিল্লির পররাষ্ট্রনীতি কিছুটা শান্ত বলা যায়। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ৬৭ বছরের মধ্যে ৫০ বছরই ক্ষমতায় ছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কংগ্রেস। মোদি কংগ্রেসের পররাষ্ট্রনীতিকে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য দুর্বল বলে মনে করেন। যদিও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, ২০০৭ থেকে ২০১১ সালের মধ্যেই ভারত এক হাজার ২৭০ কোটি মার্কিন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম কিনেছে। মোদির ঘনিষ্ঠ দুই সহযোগী বলছেন, মোদি প্রধানমন্ত্রী হলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতি আরও শক্তিশালী ও গঠনমূলক হবে, যা আঞ্চলিক উত্তেজনা না বাড়িয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে গুরুত্ব দেবে। বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একজন নেতা বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হবে অর্থনীতিতে গতিশীল ধারা সৃষ্টি করা। পররাষ্ট্রনীতির পুরো ধারণাই হবে দেশের অর্থনীতিকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে অন্য দেশের সঙ্গে সমঝোতার সময় নিজের স্বার্থের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া যায়।’ মোদির একজন উপদেষ্টা না প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোদির পররাষ্ট্রনীতি হবে অনেক বেশি জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শের। বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক রাজিব ডোগরা বলেন, অভ্যন্তরীণ চাপ ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার জন্যই বিজেপির পররাষ্ট্রনীতি আগের চেয়ে কঠোর হতে পারে বলেই মনে হচ্ছে। রয়টার্স।

কে জিতেছে উপজেলা নির্বাচনে? by বদিউল আলম মজুমদার

২৩ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল চতুর্থ দফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। প্রথম আলোর (২৪ মার্চ ২০১৪) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৭৭ উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ ১৬৮টিতে, বিএনপি ১৪৪টিতে, জামায়াতে ইসলামী ৩৩টিতে, জাতীয় পার্টি তিনটিতে এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সমর্থিত প্রার্থীরা ২৯টিতে জয়ী হয়েছেন; যদিও বিধিবিধান অনুযায়ী এ নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ার কথা নয়। আর প্রাপ্ত ৩৭৪ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ২৫৫ জন, বিএনপির ২৭১ জন, জামায়াতের ১২৯ জন, জাতীয় পার্টির নয়জন এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের সমর্থিত ৭৭ জন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। অর্থাৎ, চার পর্বের নির্বাচনের পর সার্বিকভাবে অধিকসংখ্যক চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা বেশিসংখ্যক ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়ী হয়েছেন।

বাংলাদেশ নিজের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম by মইনুল ইসলাম

১১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় একটি সত্য কথা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছেন। ‘বাংলাদেশ এখন আর ফকিরের দেশ নয়। বাংলাদেশ এখন নিজের পায়ে দাঁড়াচ্ছে।’

এক আত্মপ্রত্যয়ী নারী-নুরুননাহার ফয়জননেসা by লতিফা আকন্দ

নুরুননাহার ফয়জননেসা এখন নেই, কোথাও নেই। তাঁর আত্মা অমরত্ব পেয়েছে নীল গগনে নীহারিকা হয়ে। তিনি এখন স্মৃতিতে ঠাঁই পেয়েছেন। কত কথা আমরা ভুলে যাই, হারিয়ে ফেলি কত স্মৃতি। তারই মাঝে কিছু কিছু স্থায়িত্ব পায় আমাদের চেতনায়। এই নিজের চেতনা, নিজ নিজ উপলব্ধিনির্ভর এবং একটি সরলরেখায় গ্রন্থিত করা যায় না।

‘রক্তস্নান’ চেয়েছিলেন কিসিঞ্জার? by মিজানুর রহমান খান

যুক্তরাষ্ট্রের লেখক, বুদ্ধিজীবী, জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান ছিল বিপরীত। মার্কিন দলিল থেকেই একাত্তরের মার্চের একটি অজানা অধ্যায় এখানে তুলে ধরা হলো প্রথম আলোর সংগ্রহ করা একটি মার্কিন দলিল একাত্তরের গণহত্যায় হেনরি কিসিঞ্জারের ভূমিকাকে নতুন করে নির্দিষ্টভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতি হেনরি কিসিঞ্জারের ব্যক্তিগত সমর্থনের সপক্ষে একাত্তরের ৬ মার্চে প্রস্তুত এই দলিলটিকে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কারণ তিনি সুপরিকল্পিতভাবে ইয়াহিয়ার সম্ভাব্য রক্তস্নান নীতির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি এমনকি বলেছিলেন, ‘আমাকে শয়তানের পক্ষে ওকালতি (ডেভিলস অ্যাডভোকেট) করতে দাও।’

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছাড়েননি মমতা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিঞ্চিৎ উচ্চাভিলাষী। ৩৪ বছরের বাম জমানার অবসান ঘটানোর পর দেশে ও বিদেশে প্রশংসা কুড়িয়ে এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। সেই আশাতেই তিনি ভোটের মুখে আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে একটি জোট গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর সেই সাধের ফেডারেল ফ্রন্ট শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়েছে। কারণ, জয়ললিতা, চন্দ্রবাবু নাইডু, নবীন পট্টনায়েক, নীতিশ কুমারের মতো আঞ্চলিক দলের নেতারা ভোটের ফল না দেখে আগেভাগে এ রকম কোনো জোটে নাম লেখাতে রাজি হননি। ফলে, এক পা এগিয়ে দুই পা পিছিয়ে এসে মমতা এখন বলছেন, প্রিপেইড নয়, খেলাটা পোস্টপেইড ধাঁচে হবে। একের পর এক দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের ভাবমূর্তি অনেকটাই কালিমালিপ্ত। বিপরীতে নিজের ভাবমূর্তিতে সাদা রং চড়াতে মমতা এর পরেই আন্না হাজারের শরণ নেন। একদা দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বিখ্যাত এই আন্না হাজারে এখন তাঁর ভাবশিষ্য এবং আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল দ্বারা পরিত্যক্ত। ফলে তাঁরও একটা মঞ্চ দরকার ছিল। সম্ভবত সে কারণেই আন্না হাজারেও মমতাকে পাশে বসিয়ে তড়িঘড়ি ঘোষণা করেন, মমতাই প্রধানমন্ত্রী পদের যোগ্যতম দাবিদার।
তিনি মমতার প্রার্থীদের হয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রচারে যোগ দেবেন। সেই মতো মমতাও ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, অসমসহ বিভিন্ন রাজ্যে কিছু প্রার্থী দাঁড় করানোর কথা ঘোষণা করলেন। ঠিক হলো, দিল্লির রামলীলা ময়দানে আন্না ও মমতার যৌথ জনসভার মধ্য দিয়ে তূণমূল দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করবে। কিন্তু এর পরেই মমতা আবারও ধাক্কা খেলেন। রামলীলা ময়দানে একেবারেই লোক হাজির হয়নি খবর পেয়েই আন্না হাজারে সেই জনসভায় হাজির হতে রাজি হলেন না। অপ্রস্তুত মমতা ও তাঁর সঙ্গী নেতারা ফাঁকা মাঠে কয়েক শ কৌতূহলী দর্শকের সামনে কিছুক্ষণ মঞ্চে হাজির থেকে শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দেন। আন্না সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন, তাঁর দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে দিল্লিতে যে লোকসমাগম হতো, তাঁরা এখন তাঁকে ছেড়ে আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের সঙ্গে ভিড়েছেন। আর সেই সঙ্গে এটাও দেখতে পেলেন, পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মমতার না আছে কোনো মজবুত সংগঠন, না আছে জনভিত্তি। এই অবস্থায় আন্না জানিয়ে দিলেন যে মমতার হয়ে তিনি প্রচারে নামবেন না। মাত্র কদিন আগেই মমতাকে সততার প্রতিমূর্তি এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্যতম প্রার্থী বলে দরাজ সার্টিফিকেট দেওয়ার পরে আন্নার এ ডিগবাজি ভোট রাজনীতিতে কিঞ্চিৎ কৌতুকের জোগান দিয়েছে। আন্নাকে পাশে না পেয়ে মমতা এখন রাজনীতির সর্বভারতীয় আঙিনা ছেড়ে নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে মনোনিবেশ করেছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য, পশ্চিমবঙ্গ থেকে যত বেশি আসন নিয়ে ভোট পরবর্তী দর-কষাকষিতে অংশ নেওয়া। মমতার ঘনিষ্ঠ মহল, বিশেষ করে দলে মমতার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন নেতা মুকুল রায়।
মুকুল রায়ের হিসাবে দল এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মোট ৪২টি আসনের মধ্যে অন্তত ৩৩ থেকে ৩৫টি আসন জিতবে। এর সঙ্গে ঝাড়খন্ড ও অসম প্রভৃতি রাজ্য থেকে যদি একটি বা দুটি আসন পাওয়া যায়, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস ৩৫টি আসন হাতে নিয়ে ভোটের পরে যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে। মমতা শিবিরের এ অঙ্কের পেছনে হিসাবটা হলো, নির্বাচনের ফলে যে দল বা জোটই এগিয়ে থাকুক না কেন, মোট ৫৪৩ আসনের লোকসভায় ন্যূনতম প্রয়োজন যে ২৭২টি আসন, তা কোনো দলই পাবে না। এ ক্ষেত্রে দুটি সম্ভাবনার কথা তাঁরা মাথায় রেখেছেন। প্রথমত, বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ জোট যদি ভোটের ফলে সবচেয়ে এগিয়ে থাকে, তাহলেও ২০০ বা তার কাছাকাছি আসন পাবে। ২৭২ থেকে বেশ কমই থাকবে। তখন কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য তাদের নির্ভর করতে হবে অন্য দলগুলোর ওপর। তখন ৩০ থেকে ৩৫ আসন যার হাতে থাকবে, দর-কষাকষিতে তার গুরুত্বও সবচেয়ে বেশি হবে। দ্বিতীয়ত, এটাও হতে পারে যে বিজেপির জোট ১৫০ থেকে ১৬০ সংখ্যার মধ্যেই আটকে থাকল এবং আঞ্চলিক দলগুলো ভালো ফল করল। তখন শুরু হবে আসল দরাদরি। তামিলনাড়ুর জয়ললিতা, ওডিশার নবীন পট্টনায়েক, বিহারের নীতিশ কুমার, উত্তর প্রদেশের মায়াবতী, অন্ধ্র প্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু, জগমোহন রেড্ডি, প্রস্তাবিত নতুন রাজ্য তেলেঙ্গানার চন্দ্রশেখর রাও প্রমুখকে নিয়ে তখন শুরু হবে একদিকে বিজেপির টানাটানি, অন্যদিকে একটি তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার চেষ্টা।
কিন্তু তাতেও পেছন থেকে কংগ্রেসের সমর্থন লাগবে। ১৯৯৬ সালে যেমন ভোটের পর এ রকমভাবেই কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে দেবগৌড়া যুক্তফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। যদি সত্যিই বিজেপি জোট ভোটের ফলে সরকার গড়ার দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে, তখন এই আঞ্চলিক দলগুলোর একটা জোট সরকার গড়ার চেষ্টা গতি পাবে। আর তখন মমতা (ঝুলিতে যদি ৩৫ আসন থাকে) চেষ্টা করবেন সেই জোটের নেত্রী হওয়ার জন্য। জয়ললিতা, মায়াবতী, নবীনেরা যে সহজে জায়গা ছেড়ে দেবেন, তা নয়। কিন্তু সম্ভাবনাটা থেকেই যাচ্ছে। আর সেই সম্ভাবনাটা জোরালো করতেই মমতা এখন পশ্চিমবঙ্গের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত প্রচারে ব্যস্ত। আর প্রচারে নেমে বুঝতে পারছেন, এবার লড়াইটা বেশ জটিল। ২০০৯ সালে মমতার জনপ্রিয়তা যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে লড়ে মমতা পেয়েছিলেন ১৯টি, কংগ্রেস ছয়টি আসন। সঙ্গে ছোট বাম দল এসইউসি ছিল, তারাও পেয়েছিল একটি আসন। কিন্তু এবার কংগ্রেস সঙ্গে নেই, এসইউসিও নেই। যদিও গত পাঁচ বছরে কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে আরও দুর্বল হয়েছে। কেন্দ্রে মনমোহন সিংহ সরকারের ব্যর্থতাও কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা আরও কমিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মুর্শিদাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি ও নদীয়া জেলার একাংশে তাদের এখনো কিছুটা প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে বামপন্থীরাও এখন যথেষ্ট দুর্বল।
সিপিএমের একাংশ গত তিন বছরে ক্ষমতাসীন তৃণমূলে যোগ দিয়েছে। কিন্তু চিন্তায় ফেলে দিয়েছে বিজেপি। এই প্রথম বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনেই প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে। ফলে খাতা-কলমে ৪২টি আসনেই লড়াই হতে চলেছে চতুর্মুখী। এবার যেহেতু নরেন্দ্র মোদিকে সামনে তুলে ধরে বিজেপি প্রচারে অনেকটাই এগিয়ে গেছে, তাই বিজেপির ভোট কিছুটা হলেও পশ্চিমবঙ্গে বাড়বে বৈকি। মমতার চিন্তার কারণ এটাই। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীয়া, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলায় বিজেপির এমনিতেই নিজস্ব একটা ভোটব্যাংক রয়েছে। এবার সেটা আরও বাড়লে ভোট কাটাকুটিতে একাধিক আসনের ফলই অপ্রত্যাশিত মোড় নিতে পারে। এমনিতেই দার্জিলিংয়ে গোর্খা জনমোর্চাকে ভয় দেখিয়ে ও বুঝিয়ে কোনো লাভ হয়নি। তারা বিজেপির প্রার্থীকে সমর্থন করার কথা ঘোষণা করেছে। ফলে আসনটি এবারও বিজেপির হাতে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তার ওপর বিজেপির বাড়বাড়ন্ত উত্তর কলকাতা, কৃষ্ণনগর, জঙ্গিপুর, রায়গঞ্জ, আলিপুরদুয়ার প্রভৃতি আসনের ফল উল্টে দিতে পারে। অর্থাৎ বিজেপি নিজে না জিতলেও অন্যের পরাজয়ের কারণ হতে পারে। কোথায় বিজেপি কোন দলের ভোট কতটা কাটতে পারে, সেই হিসাব কষতেই ব্যস্ত এখন তৃণমূলের নেতারা। এই হিসাবের কথা মাথায় রেখেই মমতার কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়ছে।
রজত রায়: সাংবাদিক, পশ্চিমবঙ্গ।

তরুণদের প্রাণের আকুতি শুনুন

আমাদের তরুণদের আকাঙ্ক্ষা আছে, আনন্দ আছে, বেদনাবোধ আছে, অনুভূতি আছে, দুর্দমনীয় সাহস আছে—নেই শুধু সেসব কাজে লাগানোর সুযোগ ও সামর্থ্য। এ সমাজ তরুণদের সঠিক মূল্যায়ন করতে অক্ষম। ক্ষমতাবানেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এতটাই মশগুল যে সাধারণ মানুষ তথা তরুণদের নিয়ে ভাবার ফুরসত পান না। আমাদের তরুণেরা দেশে কাজ পান না। তাই জায়গা-জমি বিক্রি করে, ধার-দেনা করে বহু কষ্টে বিদেশে পাড়ি জমান ভাগ্যান্বেষণে। কিন্তু সেখানেও নানা রকম হয়রানির শিকার হন। ধারদেনা শোধ করে যখনই ভবিষ্যতের কথা ভাবেন, তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো ঘোষণা আসে, চাকরি নবায়ন করা হবে না, দেশে ফিরে যেতে হবে। জানতে পারলাম, কূটনৈতিক তৎপরতার অভাবেই এই দুর্ভোগ। হায়, দুর্ভাগা দেশ! লাখ লাখ প্রবাসী তরুণ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। পরিতাপের বিষয় হলো, সেই অর্থেরও সদ্ব্যবহার করা হচ্ছে না।
সেটি হলে তাঁদের প্রবাসজীবনের কষ্টকে কষ্ট বলে মনে হতো না। তাঁরা ভাবতেন, দেশের জন্য কিছু করতে পারছি। প্রবাসীদের কষ্টে অর্জিত টাকা দিয়ে বিদেশ থেকে উৎপাদিত পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং সঞ্চয়ের পরিমাণ কমছে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না, নতুন কলকারখানা গড়ে উঠছে না, কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এভাবে বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় হলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের দেশের কী অবস্থা হবে, তা সহজেই অনুমেয়। নিজ দেশে পুঁজি বিনিয়োগ করে কলকারখানা গড়ে তুলে উৎপাদিত দ্রব্য নিজ দেশে ভোগ এবং বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে দেশে বেকারত্ব কমত। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবর পড়ে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়, আবেগে আপ্লুত হতে হয়। এই সংবাদটুকু থেকে আমাদের কিছুই শেখার নেই? গতানুগতিক ভাবধারার পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। রাজনীতিকদের জীবনধারণের প্রণালি দেখলে মনে হয়, তাঁরা সম্পদের প্রতিনিধি, জনগণের নন। দেশ যদি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারত, তাহলে তরুণদের চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে বঙ্গোপসাগরে আত্মাহুতি দিতে হতো না। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ায় চাকরির জন্য যেতে হতো না। রোদ-বৃষ্টি, ঝড়-তুফান, উত্তাল তরঙ্গ, কালো মেঘে ছাওয়া আকাশ, অথই জলরাশি—সে এক ভয়াবহ অবস্থা! ভাবতে পারেন সেই অবর্ণনীয় কষ্টের কথা? যাঁরা আরামে আছেন, আয়েসে আছেন—তরুণদের সেই দুঃসহ কষ্টের বাষ্প এসব সুখী মানুষকে স্পর্শ করে না।
এই তরুণদের অনেক সময় ধরা পড়লে শাস্তি পেতে হচ্ছে অথবা সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে সলিলসমাধি হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট লাগে, যখন কোনো প্রতিকার খুঁজে পাই না। প্রসঙ্গক্রমে আমি শুধু একটি বছরের বেকারত্বের চিত্র তুলে ধরব। ১৯৯৬-৯৭ সালে শ্রমশক্তি ছিল ৪২ দশমিক ৯৭, সেখানে অভ্যন্তরে নিয়োগ পায় ২১ দশমিক ৬২ এবং বিদেশে কর্মসংস্থান হয় ১ দশমিক ৩৪, মোট কর্মসংস্থানপ্রাপ্তির সংখ্যা ৩০ দশমিক ৯৬ এবং বেকারত্বের হার হয় ২৭ দশমিক ৯৫। এই যখন আমাদের দেশের চিত্র, তখন বেঙ্গালুরুভিত্তিক সিলিকন ইন্ডিয়া ম্যাগাজিন এক তথ্য প্রকাশ করেছে: ৩ দশমিক ৭১৬ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশের মতো গরিব দেশ থেকে ভারত নিয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন ভারতের পঞ্চম বৃহত্তম প্রবাসী আয়ের উৎস। এখন পাঁচ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে বসবাস করছে বলে উল্লেখ রয়েছে। বেশির ভাগই তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে কর্মরত। হতে পারে ভারতের শ্রমিকেরা আমাদের তুলনায় দক্ষ। তাহলে আমরা কেন আমাদের তরুণদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি না, তাঁদের উপযুক্ত করে গড়ে তুলছি না? দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকলে সবকিছুই করা সম্ভব। তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্প—এই দুই সেক্টরে শ্রমশক্তি বিদেশ থেকে আমদানি কোনোক্রমেই দেশের স্বার্থের অনুকূলে নয়। স্বাধীনতার লক্ষ্য যে ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, তা আমরা কতটা অর্জন করতে পেরেছি?
স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরও রাজনৈতিক অঙ্গন যুদ্ধের ময়দানে পরিণত হচ্ছে। তার পরও আমরা আশাহত হতে চাই না। আমরা স্মরণ করি আমাদের প্রেমে ও রণে সততজয়ী কাজী নজরুল ইসলামের তারুণ্যের জয়গান। ১৯৩২ সালে সিরাজগঞ্জের একটি সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার একমাত্র সম্বল আপনাদের তরুণদের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা প্রাণের টান।’ তাই আমাদের সত্য উপলব্ধি করার সময় এসেছে। আমরা কি কেবল পুরোনোকে আঁকড়ে পেছনের দিকে যাব, নাকি সব তরুণকে একতাবদ্ধ করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব? সিদ্ধান্ত নিতে ভুল হলে পুরো জাতিকে তার মাশুল দিতে হবে। বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য সাধনে তরুণেরা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহূত হবেন না। তারুণ্যের রঙে উদ্ভাসিত কবি সুকান্তের একটি কবিতা যেন আমাদেরই মনের কথা বলে: ‘আমরা সিঁড়ি,/ তোমরা আমাদের মাড়িয়ে/ প্রতিদিন অনেক উঁচুতে উঠে যাও,/ তারপর ফিরেও তাকাও না (আমাদের) পিছনের দিকে;’। পরিশেষে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য সম্ভাবনাময় আলোর দ্বার খুলে যাবে—এ প্রত্যাশাই ব্যক্ত করছি।
সৈয়দা নীলুফার: কলেজশিক্ষক।