Showing posts with label বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস. Show all posts
Showing posts with label বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস. Show all posts

Tuesday, July 12, 2011

জনঘনত্ব ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্য জিয়া উদ্দিন আহমেদ

আমাদের অত্যুচ্চ জনঘনত্ব ধরিত্রীর ইতিহাসে কেবল এক নজিরবিহীন ঘটনাই নয়, জীবতাত্ত্বিক বিস্ময়ও। বিশ্বের ১৯৫টি দেশের মধ্যে জনঘনত্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম, জনসংখ্যায় সপ্তম এবং আয়তনে চুরানব্বইতম। কৃষিকাজে নিয়োজিত মোট জনগোষ্ঠীর আকার হিসেবে মাথাপিছু জমির পরিমাণ আমাদের অতি নগণ্য—০.১ হেক্টর, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন। তবে দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ হিসেবে বিশ্বে আমাদের স্থান ৩৪তম। দেশের বেশির ভাগ এলাকা বিস্তীর্ণ বদ্বীপের অংশ এবং প্রাকৃতিকভাবে উর্বর আর নিবিড় চাষযোগ্য। দিনে দিনে আমাদের জনসংখ্যা বাড়ছে। কমছে চাষের জমি। বাঁচার প্রয়োজনে চাই রাস্তাঘাট, হাটবাজার, বাড়িঘর, স্কুল-কলেজ, দোকানপাট, ক্লিনিক-হাসপাতাল, কলকারখানা ইত্যাদি। এসব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পর্যাপ্ত পতিত জমি আমাদের নেই, সবকিছুই গড়ে উঠবে কৃষিজমি উদরস্থ করে।
নতুন জমি সৃষ্টির পথও আমাদের সীমিত। কিছু পরিমাণ জমি হাওর-বিল ভরাট হয়ে তৈরি হচ্ছে আর সামান্য পরিমাণ উপকূলীয় জমি ধীরে ধীরে আবাদযোগ্য করা যাবে সীমিত ফসলাদির জন্য। দেশে আবাদি জমির পরিমাণ ও জমিতে ফলনের হিসাব নিয়ে তথ্য অপ্রতুল, অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের উপস্থাপনাও সহজবোধ্য হয় না। জাতিসংঘের (UNDP/FAO) ১৯৮৮ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, আমাদের দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ ১.৩৮ কোটি হেক্টর বলা হয়েছে, যা থেকে খাদ্যশস্য উৎ পাদনে ব্যবহূত জমির পরিমাণ প্রায় এক কোটি হেক্টর—অভ্যন্তরীণ ৭০ লাখ এবং উপকূলীয় আবাদযোগ্য ৩০ লাখ হেক্টর। এই তথ্য নিট জমির সূত্ররেখা হিসেবে ধরে ভবিষ্যতে জমির পরিমাণ এবং খাদ্যশস্য উৎ পাদনের মাত্রা সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। ২০০৮ সালের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৭৭ লাখ হেক্টর আর নিট ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে বাৎ সরিক গড়ে দুটি ধান চাষ করে হেক্টরপ্রতি উৎ পাদন ২.৮ টন হিসাবে মোট চাল উৎ পাদন হয় বাৎ সরিক ২.৯ কোটি টন। ২০০০ সালে দেশে নিট আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৮০ লাখ হেক্টর, ২০০৮ সালে ৭৬ লাখ হেক্টর—অর্থাৎ ০.৫ লাখ হেক্টর নিট আবাদি জমি (বছরে জমিতে গড়ে দুটি ফসল করা হলে এক লাখ হেক্টর আবাদকৃত জমি) প্রতিবছর আবাদকক্ষ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এটি হচ্ছে অতিঘন জনবসতির নিবিড় উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের চাপের ফল।
ফলে ২০৫০ সালের চিত্রটি হবে ভিন্ন। তখন দেশে জনসংখ্যা হবে ৩০ কোটি এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রয়োজনে আমাদের বছরে প্রায় ৫.৩ কোটি টন চাল উৎ পাদন করতে হবে। তখন সর্বোচ্চ নিট ৩০ লাখ হেক্টর জমি ধান চাষের জন্য পাওয়া যেতে পারে। সেখানে বছরে দুটি ফসলের মাধ্যমে হেক্টরপ্রতি ৮.৫ টন খাদ্যশস্য উৎ পাদন সম্ভব হলে মোট বাৎ সরিক উৎ পাদন হবে ৫.১ কোটি টন। আর জনসংখ্যা ২০৫০ সালে ২৫ কোটিতে স্থিতিশীল হলে এবং একই পরিমাণ জমি ধান চাষের জন্য পাওয়া গেলে আমাদের প্রয়োজন হবে ৪.৪ কোটি টন খাদ্যশস্য এবং উৎ পাদন হতে হবে হেক্টরপ্রতি বছরে সাত টন। বর্তমানে বোরো, আমন, আউশ—এসব জাতের ধান দেশের বিভিন্ন ইকোসিস্টেমে বিভিন্ন পদ্ধতিতে চাষ করে গড় বার্ষিক চাল উৎ পাদন হচ্ছে হেক্টরপ্রতি সর্বোচ্চ ৩.৫ টন। এই মাত্রা থেকে আমাদের হেক্টরপ্রতি বছরে ৮.৫ টনে পৌঁছাতে হবে। কারিগরি দিক থেকে এটি অসম্ভব না হলেও এটি অর্জনের জন্য নানা বিষয়ে ব্যাপক গবেষণা প্রয়োজন। আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতে বর্তমানে চালের গড় উৎ পাদন টন হিসাবে হেক্টরপ্রতি থাইল্যান্ডে ৩.০, শ্রীলঙ্কা ৪.০, ভারত ৪.০। এ প্রসঙ্গে আমাদের অতিঘন জনবসতির জানা-অজানা নানাবিধ জৈবিক চাপের কথাও খাদ্য উৎ পাদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনায় রাখতে হবে।
আমাদের দেশে কৃষি হচ্ছে বেঁচে থাকার একটি বিশেষ ক্ষেত্র। জমির তীব্র সংকটের কারণে কৃষি আমাদের বাজারভিত্তিক বাণিজ্যিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে আমরা উৎ পাদনের মাত্রাজনিত সুবিধা থেকে সর্বদা বঞ্চিত এবং এ কারণেই কৃষিক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী। আমাদের জনসংখ্যা কবে কোন মাত্রায় স্থিতিশীল হবে, তখন আবাদি জমির পরিমাণ কী থাকবে, একরপ্রতি খাদ্যশস্যের ফলন বৃদ্ধি কী পরিমাণ সম্ভব হবে—এসব বিষয়ে সঠিক তথ্য আবশ্যক। বর্তমানে অধিক অর্থকরী ফসলে জমি পুনর্বণ্টন হচ্ছে, ধানচাষকক্ষ থেকে অনেক জমি অধিক মূল্যসংযোজিত ফসলের আবাদে হারিয়ে যাচ্ছে। মূল খাদ্য উৎ পাদনের জন্য সর্বোচ্চ কারিগরি প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমাদের ৭৫ শতাংশ জমি ব্যবহূত হলে ফসল বহুমুখীকরণের স্বরূপ কেমন হবে, তা-ও একটি ভাবনার বিষয়।
আমাদের খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য যে পরিমাণ জমি প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করে ‘আবদ্ধীকরণ’ সম্ভব কি না, সেই বিষয়টিও বিবেচ্য বটে। জমি আবদ্ধীকরণ দুইভাবে হতে পারে—ফসলের উচ্চমূল্য নিশ্চিত করতে পারলে কৃষক ধান উৎ পাদনে উৎ সাহিত হবেন। আর আইন করেও তা করা যেতে পারে, তবে সেখানেও দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—কৃষকের স্বার্থরক্ষা এবং দরিদ্র মানুষের চাল পাওয়ার নিশ্চয়তা। তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির ব্যবস্থাও রাখতে হতে পারে।
ফসল বহুমুখীকরণও উপেক্ষার বিষয় নয়, তবে তা আবদ্ধিকৃত জমির বাইরে হতে হবে। খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রয়োজনে ধানি জমির পরিমাণ ২০৫০ সাল নাগাদ অবশ্যই নিট ৩০ লাখ হেক্টরে টিকিয়ে রাখতে হবে। নতুন জমি সৃষ্টির সম্ভাবনার কথাও চিন্তা করতে হবে। জনসংখ্যার প্রচণ্ড চাপের কারণে প্রচুর রাস্তাঘাট তৈরি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়াবে। সীমিত ভূমিতে ঘন জনবসতির পরিস্থিতিতে রাস্তাঘাট নির্মাণের পরিকল্পনায় নানা সীমাবদ্ধতা থাকবে। নদীভাঙন নিয়ন্ত্রণে রেখে যদি এভাবে কিছু কৃষিজমি সৃষ্টি সম্ভব হয়, তবে তা আমাদের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে। এ ছাড়া দেশে প্রায় তিন লাখ হেক্টর সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা রয়েছে, যা উপযুক্ত জাতের ফসল উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষি উপযোগী করে তোলা সম্ভব।
আর্থিক উন্নতির সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও কিছু পরিবর্তন আসবে এবং মাথাপিছু চালের প্রয়োজন কমে যাবে। পরিবর্তে মাংস, দুগ্ধজাত খাদ্য, ফলমূল ও সবজি ইত্যাদির ব্যবহার বাড়তে থাকে। জমির অভাবে গৃহপালিত পশুপালন অসম্ভব হলে পশুজাত মাংসাহারের পরিবর্তে হাঁস-মুরগি ও মাছের চাষ হতে পারে, তাও সম্ভব না হলে আমিষসমৃদ্ধ শাকসবজি ও ফলমূল আহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনীয় খাদ্য নিজ দেশে উৎ পাদন হচ্ছে খাদ্যনিরাপত্তার সর্বোত্তম পথ।
জিয়া উদ্দিন আহমেদ: ভিজিটিং প্রফেসর, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Monday, July 12, 2010

সব মানুষ গুনতে হবে, কিন্তু কার জন্য by ফরিদা আখতার

বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত, এ তথ্য সবার কাছে ঠিকমতো আছে কি না, আমার ঘোরতর সন্দেহ হয়। মন্ত্রীদের বক্তব্যে ১৫ কোটি থেকে ১৬ কোটি হতে সময় লাগে না। এক দিন এদিক-ওদিক হলেই এক কোটি বেড়ে যায় বা কমে যায়। বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোও একেক কথা বলে। কারও কথার সঙ্গে কারও কথার মিল নেই। সাধারণ মানুষ এসব কথার মধ্যে বিভ্রান্ত হয়ে থাকে। ১৫ কোটি হোক কি ১৬ কোটি, এই গুনতির মধ্যে তারা আছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
যেদিন বিশ্বের জনসংখ্যা ৫০০ কোটিতে দাঁড়াল, সে তারিখ ছিল ১৯৮৭ সালের ১১ জুলাই। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) এই দিনটিকে দ্য ডে অব ফাইভ বিলিয়ন হিসেবে পালন করেছিল। এরপর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ১৯৮৯ সাল থেকে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে; জনসংখ্যা বৃদ্ধির ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য। এই হলো সহজভাবে দিবসটি পালনের কথা। বাংলাদেশেও আমরা ভালোই টের পাই।
এসব দিবস পালনের জন্য একটি রীতি দাঁড়িয়েছে, তা হচ্ছে, প্রতিপাদ্য বিষয় থাকা। সে অনুযায়ী এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে এভরিওয়ান কাউন্টস বা প্রত্যেকেই গণনার মধ্যে থাকবে। গণনা ছাড়া নিশ্চয়ই মানুষের সংখ্যা এত দিন জানা যায়নি, তবে এবার একটু বিস্তারিত জানার দিকে গুরুত্ব দিতে চাইছে জাতিসংঘ। নারী-পুরুষ ভাগ তো থাকবেই; তা ছাড়া জাতি, বর্ণ, ধনী, গরিব কত আছে, তা জানার প্রয়োজন আছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গৃহসংস্থান করতে হলে জানতে হবে কত মানুষ কী অবস্থায় আছে। অবশ্য আমি একটু অবাক হচ্ছি, এমন একটি বিষয়ের গুরুত্ব বুঝতে জাতিসংঘ এত দেরি কেন করল। তবে তারা এবার নির্ভরযোগ্য তথ্যের কথা বলছে। এর ফলে সঠিকভাবে জানা যাবে এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে কারা বাদ পড়ল। তাহলে এত দিনের তথ্য কি নির্ভরযোগ্য ছিল না?
এ বছর জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের উদ্যোগে ৬০টি দেশে ২০১০ সালের মানুষ গণনা বা আদমশুমারি করা হচ্ছে। আদমশুমারি করতে হলে ঘরে ঘরে গিয়ে একেবারে মাথা গোনা ছাড়া পথ নেই। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের এই উদ্যোগে বাংলাদেশ আছে কি না, জানা যায়নি। তবে গত ডিসেম্বর (২০০৯) মাসে জলবায়ু সম্মেলন চলাকালে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই বাংলাদেশে অবস্থিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের কার্যালয় থেকে একটি জনসংখ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, যা কোনো আদমশুমারির মাধ্যমে হয়নি। এবং সেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে জনসংখ্যা বেশি হওয়ার বিষয়টি যুক্ত করে দিয়ে একধরনের দোষারোপের কাজই করা হয়েছে। এগুলো অতি পুরোনো কৌশল, এখন আর কাজ হয় না। বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের এই দিনে আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশে সবাইকে গণনা করা হয়নি। যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ করেই আমরা ১৬ কোটি!
বাংলাদেশের জনসংখ্যার অবস্থা হয়েছে ‘গরিবের বউ’ সবার ভাবির মতো। দেশি-বিদেশি সব সংগঠন এসে আমাদের মানুষ গুনে বসে। আমার জানামতে, ২০০১ সালে সর্বশেষ আদমশুমারি হয়েছে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের উদ্যোগে (সেটাও তাদের করার কথা নয়, এটা সরকারের কাজ)। তার প্রাথমিক ফলাফল দেওয়া হয়েছে ১৩ কোটি, কিন্তু চূড়ান্ত ফলাফল জানা যায়নি। প্রশ্ন জাগে, এই ফলাফল কি তাদের মনঃপূত হয়নি? অন্য সংস্থার ফলাফল ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৪ জন (২০০২) http://www.discoverybangladesh.com/ meetbangladesh/statistic.html।
বিশ্বব্যাংক ২০০৮ সালে হিসাব করে বলেছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ১২৮ (World Bank, World Development Indicators; Last updated June 16, 2010)। অর্থাৎ, ছয় বছরে তিন কোটিরও বেশি মানুষ বেড়েছে। এই একই সময়ে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি কিছুটা কমে গেলেও বন্ধ ছিল বলা যাবে না। জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও সাধারণ মানুষের পর্যায়ে অনেকটাই এসে গেছে। কাজেই এত বেশি বাড়ার কথা নয়। সারকথা হচ্ছে, কোনোরকম গণনা না করে যে কেউ আমাদের মানুষের সংখ্যা বলে দেবে, তা ঠিক কাজ বলে মনে হয় না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জনসংখ্যা সম্পর্কে খবরদারি করার দায়িত্ব আরও একটি সংস্থা নিয়েছে, সেটা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি বা সিআইএ। তারা দি ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক (ISSN 1553-8133) নামের প্রতিবেদনে তাদের তালিকাভুক্ত দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, সরকার ও সামরিক তথ্য নেয়। আমরা জানি না, তাদের খাতায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত।
যারা জনসংখ্যা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন, তারা হিসাব কষে দেখেছে, বিশ্বের জনসংখ্যা ২০০৯ সালে ছিল ৬.৮ বিলিয়ন এবং ২০৫০ সালের মধ্যে হবে ৯.১ বিলিয়ন। ভারতের জনসংখ্যা হবে ১.৭ বিলিয়ন আর চীনে ১.৪ বিলিয়ন, অর্থাৎ ভারতে চীন থেকে বেশি মানুষ হবে। আবার আফ্রিকাতেও জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে দুই বিলিয়নে। সর্বনাশ! যদিও বিশ্বে সার্বিকভাবে জন্মহার দম্পতি প্রতি ছয় সন্তান থেকে নেমে হয়েছে ২.১। ধনী দেশের জন্য জন্মহার কমছে, বৃদ্ধ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, আর গরিব দেশে কম বয়সী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে! স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে (৪৯টি দেশ) ৪০ শতাংশ মানুষের বয়স ১৫ বছরের কম, আর তার বিপরীতে ধনী দেশে বেশির ভাগ মানুষের বয়স ৬০ বছরের বেশি!
গরিব দেশে মানুষ বেশি বলেই যে তারা পৃথিবী ধ্বংসের জন্য দায়ী, তা বলা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংগঠন World Watch Institute তাদের State of the World 2010 প্রতিবেদনে বলেছে, ৫০০ মিলিয়ন ধনী মানুষ (৫০ কোটি, পৃথিবীর জনসংখ্যার মাত্র সাত শতাংশ) বিশ্বের ৫০ শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য দায়ী। অন্যদিকে গরিব তিন বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি মানুষ মাত্র ছয় শতাংশ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন করে। এই তথ্যে কেউ চিন্তিত হয় না?
মানুষের সংখ্যা বেশি বলে বলপ্রয়োগকারী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি ১৯৬৫ সাল থেকে আমরা অনেক দেখেছি। এর ফল হয়েছে নারীর শরীরের ওপর অত্যাচার। চীনে ১৯৭৯ সাল থেকে এক সন্তান নীতি গ্রহণ করে ৪০ কোটি জন্ম রোধ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়, কিন্তু কিসের বিনিময়ে? গর্ভে থাকা অবস্থায় কন্যাসন্তান সম্পর্কে জানতে পারলেই গর্ভপাত ঘটানো হয়েছে। অর্থাৎ, মেয়েদের জন্মাতে দেওয়া হয়নি। বর্তমানে চীনে ২০ বছরের নিচের বয়সের পুরুষের সংখ্যা নারীর তুলনায় তিন কোটিরও বেশি। তারা বিয়ে করার জন্য মেয়ে পাচ্ছে না। ভারতেও একই ঘটনা ঘটছে। কন্যাভ্রূণ হত্যা এখন একটি বড় সমস্যা।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতির ব্যবহার হয়েছে, কোনো প্রকার বাছ-বিচার ছাড়াই। দাতা বলেছে, সরকার বলেছে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তাই বিদেশ থেকে আমদানি করা পদ্ধতি নারীর শরীরে প্রয়োগ হয়েছে। গরিব নারীদের ওপর চালানো হয়েছে গবেষণা। পরিণাম এখন উল্টো, বাংলাদেশে বন্ধ্যত্ব মোচনের সঙ্গে জড়িত ক্লিনিকগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নারী ও পুরুষের মধ্যে বন্ধ্যত্ব বেড়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে। এর কুফলও নারীকেই ভোগ করতে হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি বা টেস্ট টিউব বেবির নামে কিছু ডাক্তার বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন, সন্তানের মুখ দেখছে মাত্র ২০ শতাংশ দম্পতি। তারা একটি সন্তানের জন্য আসছে, জন্মাচ্ছে একসঙ্গে তিনটি বা চারটি। হাসপাতাল থেকে যাওয়ার পর কত টেস্ট টিউব শিশু বেঁচে থাকছে, তার খোঁজ কয়জন রাখে? এ বিষয়গুলো ঠিক হচ্ছে কি না, তা দেখার কোনো সংস্থা নেই।
আমি ইদানীং দেখছি, সরকারের কিছু প্রতিষ্ঠান এবং মন্ত্রী জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। দুটি সন্তান যথেষ্ট, একটি হলে আরও ভালো স্লোগান আবার দেখা যাচ্ছে। কিন্তু নারী ও গরিব মানুষকে জিম্মি করে কোনো কর্মসূচি এ দেশের মানুষ আর গ্রহণ করবে না—এ কথা যেন মনে থাকে।
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী।