Sunday, April 26, 2015

মাহীর ওপর দুর্বৃত্ত​দের হামলা

হাসপাতালের বিছানায় মাহী। পাশে আহত স্ত্রী
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী মাহী বি চৌধুরীর গাড়িতে দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়েছে। এতে তিনি, তাঁর স্ত্রী আশফাহ্‌ হক লোপা ও তাঁর গাড়ির চালক আহত হয়েছেন। গতকাল দিবাগত রাত দুইটার দিকে রাজধানীর সাত রাস্তা মোড়ে বিজি প্রেসের সামনে হামলার এ ঘটনা ঘটে।
ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎ​সাধীন অবস্থায়গত কাল রাত তিনটায় মাহী সাংবাদিকদের বলেন, তিনি বেসরকারি একটি ​টেলি​ভিশন চ্যানেলে অনুষ্ঠানে যোগদান শেষে বারিধারার বাসায় ফিরছিলেন। বিজি প্রেসের সামনে সিটি ফিলিং স্টেশন থেকে তেল নিয়ে গাড়িটি কিছু দূর এগিয়ে গেলে ৮-১০ জন দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা নিয়ে গাড়ির ওপর হামলা চালায়। তারা গাড়ির সামনের কাচ ভেঙে ফেলে। এরপর এক দুর্বৃত্ত তাঁকে (মাহী) লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকে ও তাঁর চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামানোর চেষ্টা করে। এ সময় তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছিল। তাঁকে উদ্দেশ্য করে এক দুর্বৃত্ত বলে ‘তোর নির্বাচন করার সখ কেনো’?
এ সময় দুর্বৃত্তদের কয়েকজন গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙে তাঁর স্ত্রীকে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। দুর্বৃত্তরা তাঁর বাম হাত ও চোখে এবং চালক শহীদ মণ্ডলকে ডান কাঁধে আঘাত করে। ঘটনার পরপরই তাঁদের ইউনা​ইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
মাহী জানান, ঘটনা কারা ঘটিয়েছে সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। তবে ষড়যন্ত্র চলছে। আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আমি নিরাপত্তা চাই নাই, কারণ সব সাবেক রাষ্ট্রপতির বাসায় সরকার পুলিশি নিরাপত্তা দিলেও বি. চৌধুরীর বাড়িতে কোনো পুলিশ দেওয়া হয় নাই।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহী বলেন, ‘ঘটনার সাথে আনিসুল হক, না তাবিথ আউয়াল জড়িত তা সময়ই বলে দিবে। এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করব না। তবে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াব না, নির্বাচনে আছি, থাকব, ইনশা আল্লাহ।’ সাংবাদিকদের অপর এক প্রশ্নের জবাবে মাহী বলেন, ‘শনিবার সারা দিন তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বলা হয়েছে।’
মাহীর নির্বাচনী প্রচার সেলের প্রধান সমন্বয়কারী জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, চিকিৎ​সা নিয়ে তাঁরা বাড়ি ফিরে গেছেন।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার দায়িত্বরত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) শাহিদা প্রথম আলোকে জানান, গাড়িতে মাহী, তাঁর স্ত্রী, তাঁর ছোট ভাই, গাড়ির চালক ও আরও একজন ছিলেন। এ বিষয়ে মাহী থানায় একটি অভিযোগ করেছেন। তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

খালেদার কান্না, নীরব প্রতিশোধের আহবান- খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য

ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট বিপ্লবের আহবান জানিয়েছেন দলটির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ভোটের মাধ্যমে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিশোধ নিতেও বলেছেন তিনি। ২৮শে এপ্রিলের নির্বাচনকে প্রতিবাদের ভোট হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেছেন, ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে সবাইকে ভোট দিতে হবে। ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পাহারা দিতে হবে কেন্দ্র। দুপুরে গুলশান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া এ আহবান জানান। এ সময় ২০ দলীয় জোট ও আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এক ঘন্টার বক্তব্যে তিনি দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। সংলাপ ও সমঝোতার আহবান জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি। ক্ষমতা ত্যাগ করলেও প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কোন ধরনের প্রতিশোধ নেয়া হবে না বলেও জানান তিনি। সিটি নির্বাচনে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের জন্য আবারও দাবি জানান বেগম খালেদা জিয়া।  সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে প্রয়াত ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর কথা স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। এই সময় তাকে চোখ মুছতেও দেখা যায়। বেগম জিয়া বলেন, সন্ত্রাস নির্ভর নষ্ট রাজনীতির ধারক আওয়ামী লীগ। যে সরকার ও প্রশাসন সামাজিক উৎসবে নারীদের নিরাপত্তা দিতে জানে না, নারীদের সম্মান জানাতে পারে না তাদের ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া উচিৎ। বেগম জিয়া বলেন, দেশের পরিস্থিতি এমন যে ক্ষমতাসীন ছাড়া কারও কোন সুবিধা পাওয়ার অধিকার নেই। তার ওপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী যেভাবে নাটক বলেছেন ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তাতে আমি মর্মাহত। হতাশা প্রকাশ করে খালেদা জিয়া বলেন, জানি এ হামলার বিচার হবে না। এ হামলায় ছাত্রলীগ অংশ নিয়েছে এবং এতে সহযোগিতা করেছে পুলিশ। এ হামলার ঘটনায় পক্ষপাতদূষ্ট নির্বাচন কমিশন কোন ব্যবস্থা নেয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সেনা মোতায়েন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রতারণামূলক। নির্বাচনী এলাকায় আবারও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানান তিনি। খালেদা বলেন, জনগণের প্রতি আস্থা থাকার কারনেই বিএনপি এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বিএনপি সর্মথিত প্রার্থীদের হয়রানী করারও অভিযোগ আনেন বেগম জিয়া।
খালেদা জিয়ার পুরো বক্তব্য
উপস্থিতি প্রিয় সাংবাদিক ভাই-বোনেরা,  আস্সালামু আলাইকুম।  প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে প্রতিবেশী নেপাল ও ভারতে বহু মানুষের প্রাণহানি এবং আমাদের দেশের আহত ও নিহতের ঘটনায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। বেদনার্ত মন নিয়ে অনেক দিন পর সরাসরি আপনাদের মুখোমুখি হয়েছি।  আপনাদের স্বাগত: জানাচ্ছি। আমি কেমন ছিলাম এবং এখনো কেমন আছি, আপনারা ভালো জানেন। দীর্ঘদিন আপনারা আমার সঙ্গে কষ্ট করেছেন। এখনো করছেন। এরজন্য আমি আপনাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।  সাংবাদিকতা হচ্ছে সত্য অনুসন্ধান এবং তা মানুষের সামনে তুলে ধরার এক কষ্টকর মহান পেশা। এই পেশায় যারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নিয়োজিত, আমরা তাদেরকে বরাবর সম্মান করি। আমি আশা করি, দেশ-জাতির বর্তমান ক্রান্তিলগ্নে সত্যের প্রতি এই অবিচল নিষ্ঠা আপনারা সাহসের সঙ্গে অব্যাহত রাখবেন। কারণ, দেশের মানুষ আপনাদের ওপর অনেক বেশি ভরসা করে।  প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,  আজ আমি আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে চলমান পরিস্থিতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরবো। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন উপলক্ষে আমাদের বক্তব্য রাখবো। শুরুতেই আমি গত পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষবরণ উৎসবে যোগ দিতে গিয়ে রাজধানীতে দেশের ঐতিহ্যবাহী সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ও দেশের বিভিন্ন স্থানে আমাদের যে বোনেরা ও মেয়েরা ন্যক্কারজনকভাবে নির্যাতিত ও সম্মানহানির শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সহানুভূতি জানাচ্ছি। এসব ঘৃণ্য অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি। যাদের দায়িত্বপালনে শৈথিল্য ও কর্তব্যে অবহেলার কারণে কিংবা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়ে এ ধরণের জঘণ্য ঘটনা ঘটেছে, তাদেরও কঠিন শাস্তি হওয়া উচিত। যে-সরকার ও প্রশাসন কোনো সামাজিক উৎসবে মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারেনা, মেয়েদের সম্মান রক্ষা করতে পারেনা এবং এমন ঘৃণ্য ঘটনার প্রতিকার করতে পারেনা, তাদের লজ্জিত হওয়া উচিৎ। ক্ষমা চেয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো উচিৎ। বিএনপি’র অন্যতম যুগ্ম-মহাসচিব, সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক সংগঠনিক সম্পাদক আনিসুর রহমান খোকনকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ধরে নিয়ে গিয়েছে। এক মাসেরও বেশি সময় হয়ে গেলো। এখনো তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছেনা। সালাহউদ্দিনকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিষ্ঠুর বিদ্রুপ করেছেন। আমরা উৎকণ্ঠিত। আমরা তাদের সন্ধান চাই। তাদেরকে অবিলম্বে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হোক। প্রকৃতপক্ষে দেশে এখন কোনো মানুষের সামান্যতম নিরাপত্তাও নেই। যে-ভাবেই ক্ষমতা কব্জা করে থাকুক না কেন, দেশে তো একটা সরকার আছে। কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা ও নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় তাদের কোনো ভাবনা কিংবা দায়-দায়িত্ব আছে বলে মনে হয়না। কেননা তারা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসেনি। কাজেই জনগণের প্রতি তাদের কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ নেই। তাদের ভাবনা কেবল ক্ষমতাকে কিভাবে পাকাপোক্ত রাখা যায়। এ লক্ষ্যেই তারা বিরোধীদল ও ভিন্নমত দমন এবং জনগণের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ স্তব্ধ করার একমাত্র কাজে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে নিয়োজিত করে রেখেছে। যার ফলে তারা অন্যায় কাজে উৎসাহিত হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের লোকদেরকে তারা আইনের উর্ধ্বে রেখেছে। ফলে দেশে কোনো শান্তি-শৃঙ্খলা নেই। সৃষ্টি হয়েছে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি। ঢাকার কাছে আশুলিয়ায় দুর্ধর্ষ ব্যাংক ডাকাতির সময় ৮ জন নিহত হবার ঘটনা এই পরিস্থিতির সাম্প্রতিকতম উদাহরণ।  সাংবাদিক বন্ধুরা,  দেশে কোনো অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নেই। সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে দলীয় স্বার্থে ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীতে। আপনারা নিজেরাও সেটা ভালো জানেন। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনীর নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক হত্যাকা-ের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চেয়ে আপনারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। কিন্তু তার সবই অরণ্যে রোদন হয়েছে। দেশে এমন সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন ছাড়া আর কারো যেনো সুবিচার পাওয়ার কোনো অধিকার নেই। সিভিল শাসন ও রাজনীতির একটা শোভন-সুন্দর কালচার থাকে। রাজনীতির ভাষা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের সঙ্গে আচরণ সেই কালচারেরই অংশ। বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা সেই কালচার শেখেনি। কাউকেই তারা সম্মান করতে জানেনা। ফলে তাদেরকেও কেউ সম্মান করেনা। তাদের আচরণ ও ভাষা পরিবেশকে কলুষিত ও পরিস্থিতিকে কেবল উত্তপ্তই করতে পারে। রাজনীতিতে কৌশল থাকে। কিন্তু নি¤œরুচির মানুষেরা অপকৌশলকে কৌশল ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। জনগণের সমর্থন নয়, সন্ত্রাস ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং অপপ্রচারকেই তারা জেতার পথ বলে ধরে নিয়েছে। যুক্তি, সংযম, সহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সংলাপের পথ তারা এড়িয়ে চলতে চায়। দেশে সকল সংকটের সূত্র সেখানেই। এখান থেকে বেরিয়ে মতামতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুস্থ রাজনীতির ধারায় ফিরতে না পারলে আমাদের সমাজ ক্রমাগত পিছিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রপ্রিয়। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম আকাঙ্খা ছিল একটি গণতান্ত্রিক স্বদেশের। এই গণতন্ত্রের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে বার বার রক্ত দিয়ে সংগ্রামে জয়ী হতে হয়েছে। সেই গণতন্ত্রকে আজ আবার হত্যা করা হয়েছে। বাংলাদেশকে আজ সন্ত্রাসী রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। এই সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে আবার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। আসুন, সবাই মিলে সেই পথে অগ্রসর হই। দেশ ও জনগণকে বাঁচাই।   প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,  সকলেই জানেন যে, ক্ষমতাসীন ছাড়া দেশের প্রায় সকল রাজনৈতিক দল এবং বেশিরভাগ মানুষের দাবি হচ্ছে, নিরপেক্ষ ও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সরকারের অধীনে অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন। আলোচনার মাধ্যমে সেই সমঝোতা প্রতিষ্ঠা হয়নি বলেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটসহ অধিকাংশ দল সেই নির্বাচন বর্জন করে। ফলে নির্বাচনের নামে যে-প্রহসন হয়েছে তা কোনো গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। কথা ছিল, এরপর আলোচনার মাধ্যমে একটা সমঝোতার ভিত্তিতে সংসদ ভেঙ্গে নতুন নির্বাচন হবে। সেই আলোচনার জন্য আমরা এক বছর অপেক্ষা করেছি। এরপর প্রহসনের নির্বাচনের বার্ষিকী উপলক্ষে আমরা ঢাকায় সমাবেশের কর্মসূচি দিলে ক্ষমতাসীনেরা কী ধরণের সন্ত্রাসী পথ বেছে নেয়, তা সকলেরই জানা।এর প্রতিবাদে এবং সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি ঘোষণা করলে তারা আরো বেশি সন্ত্রাসী হয়ে উঠে। বেছে নেয় নাশকতা ও অন্তর্ঘাতের পথ। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কর্মসূচি মোকাবিলায় ক্ষমতাসীনেরা ঘৃণ্য অপকৌশল অবলম্বন করেছে। আমাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। আমাদের দল-জোটের সিনিয়র নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করে। কোনো নেতা বিএনপি’র পক্ষ থেকে কথা বললেই তাকে আটক অথবা গুম করে ফেলে।  আমাদেরকে সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। রাজপথে নামার চেষ্টা করলেই গুলি চালিয়েছে কিংবা ধরে নিয়ে গিয়ে দৈহিক নির্যাতন করেছে। দলীয় সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে আমাদের কর্মসূচি ভঙ্গ করতে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিপির পাহারায় রাজপথে ও মহাসড়কে জোর করে যানবাহন নামিয়েছে। সে-সব যানবাহনে রহস্যজনক বোমা হামলায় অনেক নিরাপরাধ মানুষ নিহত ও দগ্ধ হয়েছে। সশস্ত্র প্রহরায় চলাচলরত যানবাহনে কিভাবে এমন হামলা হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে কেন অপরাধীরা ধরা পড়েনি তা আজও রহস্যে ঢাকা। তবে প্রতিটি ঘটনায় মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের তাদের বাড়ি-ঘর থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অনেককে বিনাবিচারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। নৃশংস নির্যাতন চালিয়ে পঙ্গু করা হয়েছে অনেক তরুণকে। বিরোধী দলের কর্মীদের ধরে পুলিশে দিয়ে মিথ্যা মামলা সাজানোর সুযোগ করে দিয়ে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের আর্থিক পুরস্কারও দেয়া হয়েছে। অথচ অস্ত্র, গুলি, বোমাসহ ক্ষমতাসীন দলের অনেকে ঘটনাস্থল থেকে ধরা পড়ার পর উপরের নির্দেশে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আর আমাদেরকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে একতরফা অসত্য প্রচারণা।  সাংবাদিক ভাই-বোনেরা,  আমরা বোমা হামলায় নিহত ও আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছি। এ ধরণের হত্যার তীব্র নিন্দা করেছি। বোমা হামলায় এবং বিনা বিচারে প্রায় সমান সংখ্যক মানুষকে হত্যার ঘটনার ব্যাপারে আমরা আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছি। আমি আজ আবার তার পুনরুল্লেখ করে বলছি, হত্যা, নাশকতা, সন্ত্রাস ও লাশের রাজনীতি আমরা করিনা। সন্ত্রাস-নির্ভর নষ্ট রাজনীতির চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে আওয়ামী লীগ। অতীত ও নিকট ইতিহাস তার সাক্ষ্য বহন করে। এবারেও তারা জনগণের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে ভীত হয়ে দু’ধারা ছুরির মতো অপকৌশল নিয়েছিল। আমাদের কর্মসূচি ভ-ুল করতে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে সশস্ত্র প্রহরায় একদিকে পথে যানবাহন নামিয়েছে।  অপরদিকে সেই যানবাহনে বোমা হামলায় মানুষ হত্যা করে তার দায় বিরোধী দলের উপর চাপিয়ে হত্যা, নির্যাতন, গুম, গণগ্রেফতার ও একতরফা অপপ্রচারের পথ উন্মুক্ত করেছে। সৌভাগ্যের বিষয় এই অপরাজনীতি এবং একতরফা অপপ্রচার দেশের বেশির ভাগ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারেনি। কারণ, তারা জানে এবং দেখে আসছে যে, সন্ত্রাস-নির্ভর নষ্ট রাজনীতি ও অপপ্রচারে আওয়ামী লীগ কতোটা পারদর্শী। এ প্রসঙ্গে আমি আওয়ামী লীগের সাবেক একজন নেতা, বর্তমানে কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের একটি উক্তির কথা উল্লেখ করতে চাই। তিনি আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সাম্প্রতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন: ‘শেখ হাসিনা মেরেও জিতেছেন, কেঁদেও জিতেছেন।’ মুক্তিযোদ্ধা-রাজনীতিক জনাব সিদ্দিকীর সঙ্গে আমি একটু দ্বিমত পোষণ করতে চাই। মানুষ মারায় যদি জেতার প্রশ্ন আসে শেখ হাসিনা তাতে অবশ্যই জিতেছেন। তবে কেঁদে তিনি জিততে পারেননি। শেখ হাসিনার পরিকল্পিত নৃশংসতার শিকার হয়ে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের জন্য তার কান্নাকে এদেশের বেশির ভাগ মানুষ ‘কান্নার অভিনয়’ হিসেবেই মনে করেন। তাই তিনি যত কাঁদেন এবং যত অপপ্রচার করেন, মানুষ ততো বেশি মুখ ফিরিয়ে নেয় তার দিক থেকে। আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি। মানুষের মনের অব্যক্ত ভাষা পাঠ করতে পারি। দেশের মানুষ কী চায় তা আমরা জানি ও বুঝি। মানুষ যে সীমাহীন অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়নি তার প্রমাণ আমরা পাচ্ছি, আপনারাও দেখছেন।  সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন উপলক্ষে আমাদের সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে এই নগরীতে ক’দিন জনসংযোগে নেমে জনগণের যে আবেগ ও উচ্ছ্বাস দেখেছি, তাতে আমি অভিভূত। মানুষ উদ্বেলিত। পরিবর্তন কামনায় অধীর। আমি যে-দিকেই গিয়েছি, বাঁধভাঙ্গা ¯্রােতের মতো মানুষ নেমে এসেছে উচ্ছ্বসিত হয়ে, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে।  এই গণজোয়ার দেখে আওয়ামী লীগ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। তাদের সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। আমার হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই। কামান-বন্দুক নেই।  পুলিশ, র‌্যাব, বিজিপি, আনসার নেই। কোনো বাহিনী নেই। সশস্ত্র সন্ত্রাসী নেই। আমার আছে শুধু আল্লাহ্র ওপর ভরসা আর দেশবাসীর সমর্থন ও দোয়া। এর উপর নির্ভর করেই আমি রাজপথে নেমেছি। জনগণের কাছে যাচ্ছি। এতে এতো ভয় পাবার কী আছে? কিন্তু তারা ভয় পেয়েছে। এতোদিন তারা প্রচার করতো যে, আমি নাকি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের কোনো জনসমর্থন নেই। কিন্তু আমি জনসংযোগে নামতেই যে-দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে, তাতে তাদের এতো দিনকার সব প্রচারণা মিথ্যে হয়ে গেছে। তাই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে আমার বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য রেখেছেন। তাদের নেতা-কর্মী, সমর্থক ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আমার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছেন। তারা প্রকাশ্যে হাজার হাজার মানুষের সামনে এবং সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে উত্তরা, কারওয়ান বাজার, ফকিরেরপুলের কাছে ও বাংলামোটরে আমার গাড়িবহরে পরপর চারদিন হামলা করেছে। বাংলামোটরে আমাকে বহনকারী গাড়ির উপর সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। গাড়িটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহরের অন্যান্য যানবাহনও ভাঙচুর করা হয়। হামলায় আমার অন্যতম উপদেষ্টা, প্রাক্তণ সচিব ও পুলিশের সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুম আহত হন। মারাত্মক জখম করা হয় আমার দুজন নিরাপত্তা রক্ষীসহ বেশ কয়েকজন সাংবাদিক ও নেতা-কর্মীকে। হামলায় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অংশ নেয় এবং  হামলাকারীদের পুলিশ পুরোপুরি সহযোগিতা করে। সবচেয়ে মারাত্মক হামলার ঘটনা ঘটেছে কারওয়ানবাজারে। সেখানে আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে হামলা চালায়। বহরের অনেকগুলো গাড়ি ভেঙ্গে ফেলে।  বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমানসহ কয়েকজন নিরাপত্তা রক্ষী, কর্তব্যরত সাংবাদিক ও নেতা-কর্মী আহত হন। পুলিশ ছিল নীরব দর্শক।  সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা আমাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। আমি তখন সবেমাত্র গাড়িতে উঠে বসেছি। আমি যে-পাশে বসা ছিলাম, সেই পাশেই গাড়ির জানালার কাঁচে গুলি লাগে। এতে গ্লাস ভেদ না করলেও তা ফেটে যায়। আল্লাহর রহ্মতে অল্পের জন্য আমার জীবন রক্ষা পায়। কতটা মারাত্মক আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি করলে বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাঁচ ফেটে যায়, তা সবাই বোঝে। এটা যে আমাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সুপরিকল্পিত হামলা ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।  প্রতিটি হামলার ঘটনাই প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সরাসরি উস্কানির ফল এবং সুপরিকল্পিত। এসব হামলায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা অংশ নেয়। সংবাদপত্রে ও টেলিভিশনের সচিত্র প্রতিবেদনে হামলাকারীদের অনেকের চেহারা স্পষ্ট। অনেকের নামধাম ও সাংগঠনিক পরিচয় আপনাদের রিপোর্টেই তুলে ধরা হয়েছে। টিভি ফুটেজেও হামলাকারীদের স্পষ্ট চেনা গেছে। সন্ত্রাসীরা কেউ কেউ সাংবাদিকদের কাছে হামলায় অংশ নেয়ার কথা প্রকাশ্যে স্বীকারও করেছে। ফকিরেরপুলের কাছে আমার গাড়ি বহরে হামলার সময় ঢাকা দক্ষিণে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী নিজে উপস্থিত ছিলেন। সে ছবি সংবাদপত্রে এসেছে। কারওয়ানবাজারে আমার প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সশস্ত্র হামলায় অংশগ্রহণকারীদের কয়েকজনকে ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পাশে থেকে তার পক্ষে প্রচার চালাতে দেখা গেছে। এই হামলাকারীদের কাউকে কাউকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পুলিশের বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পাশে ছবিতে দেখা গেছে। কাজেই এইসব পরিকল্পিত হামলার উৎস ও যোগসূত্র বুঝতে কারো কষ্ট হয় না। আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে বারবার হামলা চালানো সত্বেও একজন সন্ত্রাসীকেও এখন পর্যন্ত ধরা হয়নি। বরং যারা আক্রান্ত ও আহত হয়েছে তাদের বিরুদ্ধেই মামলা নেয়া হয়েছে। আর গ্রেফতার করা হচ্ছে আমাদের সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের। আটক করা এবং হুমকি দেয়া হচ্ছে বিএনপি’র নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের। আমার প্রাণনাশের লক্ষ্যে দলীয় সন্ত্রাসীদের হামলার পর প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনাকে যেভাবে ‘নাটক’ আখ্যা দিয়েছেন এবং স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। আমি বুঝতে পারছি, এর কোনো বিচার হবে না। সন্ত্রাসীরা ক্ষমতার খুঁটির জোরে ও আস্কারা পেয়ে একের পর এক নির্বিঘেœ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।  কিন্তু এতে আমি ভয় পাইনা। জীবন-মৃত্যুর মালিক আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন। তিনি রক্ষা করলে আমাকে কেউ হত্যা করতে পারবেনা। আমি এ কথাও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্ একদিন এই অন্যায়-অবিচার, এই সন্ত্রাস, এই মিথ্যাচার এবং এই হত্যাচেষ্টার ন্যায্যবিচার করবেন। আমি আমার প্রিয় দেশবাসী, বিশেষ করে ঢাকাবাসীকে বলবো, আপনারা দেখছেন, ক্ষমতার দম্ভে আমার সঙ্গে কী ধরণের আচরণ করা হচ্ছে! আমার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশকে ভালোবেসে এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। অল্প কিছুদিন আগে আমি আমার আদরের ছোট ছেলেটিকে চিরকালের জন্য হারিয়েছি। আমার একমাত্র জীবিত সন্তানটি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দীর্ঘদিন ধরে দূরদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছে। জীবনের এই প্রান্তে এসে প্রিয় মাতৃভূমিতে স্বজনহীন পরিবেশে চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে এখনো আমি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সাধ্যমতো সংগ্রাম করে যাচ্ছি। এখন আপনারাই আমার স্বজন, আপনারাই আমার আত্মীয়। আমার সকল তৎপরতা আপনাদেরকেই ঘিরে। তাই সব অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিকার ও উপযুক্ত জবাব দেয়ার ভার আজ আমি আপনাদের উপরেই অর্পণ করলাম। আমার প্রাণনাশের জন্য উপর্যুপরি হামলার ঘটনায় দেশবাসী ও বিদেশী বন্ধুরা যারা উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন আমি তাদের সকলের প্রতি অপরিসীম কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু ধারাবাহিক এসব হামলা ও নির্বাচনী প্রচার কাজে বাধা দেয়ার বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়া দূরে থাকুক; টু-শব্দটি পর্যন্ত করেনি।  উপস্থিত সাংবাদিক বন্ধুরা,  আপনারা জানেন, গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক অধিকার হরণের প্রতিবাদে আমাদের আন্দোলন চলাকালে আকস্মিকভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিনটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়। নির্বাচনটি নির্দলীয় ভিত্তিতে হবার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ৩টি সিটিতে তার মনোনীত মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন। তারা হয়তো ভেবেছিলেন, তাদের সর্বব্যাপী আক্রমণে পর্যুদস্ত বিএনপি সিটি নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে। কিন্তু আমরা সিনিয়র সিটিজেন ও পেশাজীবীদের মনোনীত প্রার্থীদেরকে ৩টি সিটি কর্পোরেশনে সমর্থন দিয়ে এই নির্বাচনে যুক্ত হবার সিদ্ধান্ত নিই। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেই সরকারের অধীনে, যারা ভোটারবিহীন নির্বাচনী প্রহসনে রাষ্ট্রক্ষমতা কব্জা করেছে। এই নির্বাচন হচ্ছে, চরম পক্ষপাতদুষ্ট ঠুঁটো জগন্নাথ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায়। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে রয়েছে চরমভাবে দলীয়করণ করা প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কাজেই এ নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে সে-সন্দেহ দেশবাসীর মতো আমাদেরও ছিল এবং আছে। তা সত্বেও আমরা কয়েকটি কারণে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের সমর্থন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই।  ১. আমরা শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠানের দাবি করেছি। স্থানীয় নির্বাচনের ব্যাপারে আমাদের ওই দাবি নেই।   ২.  দেশের অন্যান্য সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দলীয় জোট অংশ নিয়েছে। সবগুলো সিটিতে আমরা বিপুল ভোটে জিতেছি। উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনগুলোতে প্রথম পর্বেও আমাদের সমর্থিত প্রার্থীরা বিপুলভাবে জয়লাভ করে।  এই পরিস্থিতি দেখে আওয়ামী লীগ কেন্দ্র দখল, সন্ত্রাস, ভোট ডাকাতি ও কারচুপি করে অনেক জায়গায় আমাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়।  তবে জনগণের বিপুল সমর্থন যে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের প্রতি রয়েছে, তা সবগুলো নির্বাচনেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।  ৩. সভা-সমাবেশসহ সকল গণতান্ত্রিক অধিকার ও জনগণের কাছে যাবার সুযোগ আমাদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সীমিত আকারে হলেও সে সুযোগ আমরা নিতে চেয়েছি।  ৪. একটি গণতান্ত্রিক দল হিসাবে সকল পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থায় আমরা বিশ্বাস করি। তাই আমরা নির্বাচনমুখী একটি দল হিসাবে প্রশাসনিক ও আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের জায়গায় জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচনের এ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেছি।  ৫. একদলীয় শাসন থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিজয়ের পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়ে আমরাই সংসদীয় পদ্ধতি প্রবর্তন করি। জনগণের সরাসরি ভোটে সিটি কর্পোরেশনে মেয়র নির্বাচনের ব্যবস্থাও আমরাই করি। যে গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি, সেই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকাটাই বিএনপি যুক্তিসঙ্গত মনে করেছে।  ৬. সর্বোপরি, জনগণের ওপর আমাদের রয়েছে অটুট আস্থা। আমরা মনে করি, দেশের মানুষ সুযোগ পেলেই আমাদেরকে সমর্থন করবে এবং আমাদের সমর্থিত প্রার্থীদের বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।  ৭. এই নির্বাচনকে আমরা সরকার, শাসক দল, নির্বাচন কমিশন, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি টেস্ট কেস হিসাবেও নিয়েছি।  এটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কোনো পরিবর্তন হবেনা।  এমন একটি নির্বাচনেও যদি তারা যথাযথ আচরণ না করে, যদি সকল পক্ষের জন্য সুযোগের সমতা সৃষ্টি না করে, যদি নিরাপদ, সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে না পারে এবং যদি সন্ত্রাস, ডাকাতি, কারচুপির মাধ্যমে তারা জনগণের রায়কে বদলে ফেলে, তাহলে সকলের কাছে আবারো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে যে, এদের অধীনে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের চিন্তা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অবান্তর।  প্রিয় সাংবাদিকবৃন্দ,  এ পর্যন্ত আপনারা যা দেখছেন তাতে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন যে, এই টেস্ট কেসে সরকার, ক্ষমতাসীন দল, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শোচনীয়ভাবে ফেইল করে চলেছে, প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং প্রতিটি পদক্ষেপে। এই পরিস্থিতিতে একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের নির্বিঘেœ ভোটদান নিশ্চিত করতে আমরা নির্বাচনী এলাকায় বিচারিক ক্ষমতাসহ সশস্ত্র বাহিনীর পর্যাপ্ত পরিমাণ সদস্য মোতায়েনের দাবি করেছিলাম। যাতে  ভোট দেয়া, ভোট গণনা, ফল প্রকাশ এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ের সম্ভাব্য সহিংসতাও রোধ করা যায়। কারণ, জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে সশস্ত্র বাহিনীর ওপর সকলের আস্থা রয়েছে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে সাহসিকতার সাথে পালনের ব্যাপারে এই বাহিনী গৌরবোজ্জল ঐতিহ্য স্থাপন করেছে। নিজের দেশেও তারা সফলভাবে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনও করতে পারবেন বলে আমরা মনে করি। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ক্ষমতাসীনদের ইংগীতে তাদের ভোট ডাকাতির পরিকল্পনার দোসর হয়ে আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন সেনা মোতায়েনের কথা বলে এক ধূর্ত অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।  তারা প্রথমে বলেছিলো, স্ট্রাইকিং  ফোর্স হিসেবে নির্বাচনের সময়ে ও আগে-পরে মোট চার দিন নির্বাচনী এলাকায় সেনা মোতায়েন থাকবে। পরে তারা তাদের চিঠি বদল করে নতুন সংশোধিত চিঠি পাঠিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সেনা ছাউনিতেই থাকবেন রির্জাভ ফোর্স হিসাবে। রিটার্নিং অফিসার প্রয়োজনবোধে ডাকলেই কেবল তারা  কোথাও যেতে পারবেন এবং ম্যাজিস্টেটের নির্দেশে কাজ করবেন। এটা অর্থহীন এবং পুরোই প্রতারণামূলক। সশস্ত্রবাহিনীর ওপর যে তাদের কোনো আস্থা নেই এতে তা আবার প্রমাণিত হলো। প্রমাণিত হলো যে, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাস, ভোট ডাকাতি ও কারসাজির মাধ্যমে নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে ফেলার এবং ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখানোর যে পরিকল্পনা এঁটেছে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীকে তারা বাধা বলে মনে করছে। আর ক্ষমতাসীনদের সন্ত্রাস ও কারচুপির পরিকল্পনায় সহায়তা দিতেই নির্বাচন কমিশন এ পদক্ষেপ নিয়েছে। আমরা বিচারিক ক্ষমতাসহ সশস্ত্রবাহিনীকে নির্বাচনী এলাকাজুড়ে ভোটের দিন এবং আগে-পরে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোতায়েন করতে আবারো দাবি জানাচ্ছি।    উপস্থিত সাংবাদিকবৃন্দ,  ক্ষমতাসীনদের ভোটার ভীতি ও পরাজয়ের আলামত সব দিক দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই তারা আমাদের প্রচার কাজে বাধা দিচ্ছে ও হামলা চালাচ্ছে। ভোটাররা যাতে ভয় পেয়ে ভোটকেন্দ্রে না যায় তেমন ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করতেই তারা সর্বমুখী সন্ত্রাস চালাচ্ছে। নজীরবিহীন ভাবে পুলিশ বাহিনীকে তারা আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের অবস্থা যাচাইয়ে সরেজমিনে জরিপের কাজে নামিয়েছে। বিরোধী প্রার্থী ও ভোটারদের হয়রানির দায়িত্বও পুলিশকে দেয়া হয়েছে। পুলিশ ও সরকারি দলের সন্ত্রাসীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদেরকে হুমকি দিচ্ছে। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্বশাসিত সংস্থার কর্মচারী ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরকে মন্ত্রী-এমপিরা সরকার সমর্থক প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণায় নামতে বাধ্য করছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা অবাধে টাকা ছড়াচ্ছে। নি¤œবিত্ত ও বস্তি এলাকায় গরিব মানুষের ভোট কেনার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া যাচ্ছে। এই ধরনের চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আমরা সন্ত্রাস ও অপকৌশলের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণভাবে লড়ে যেতে চাই। কারণ, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষ একটুখানি সুযোগ পেলেই নীরব ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে এসব অপতৎপরতা ও অত্যাচারের বদলা নেবে, উপযুক্ত জবাব দেবে। আমি তাই ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসীর উদ্দেশে বলতে চাই:  ক্স    এই ক্ষমতাসীনেরা গত ৫ জানুয়ারি আপনাদের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আপনারা ভোট কেন্দ্রে যাননি। তবু শতকরা ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে মিথ্যা হিসাব দিয়ে আপনাদের অপমান করেছে।  -    ভোট ছাড়াই এরা জনগণের ভুয়া প্রতিনিধি সেজেছে। এদের ভোট চাওয়ার কোনো অধিকার নেই।  -    এরা শেয়ার বাজার লুট করে আপনাদের ফতুর করেছে।  -    কুইক রেন্টালের নামে বিদ্যুৎখাত থেকে বেশুমার অর্থ লুটেছে।  -    পদ্মা সেতুর টাকা চুরি করে বড় গলায় কথা বলছে।  -    এরা দফায় দফায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে।  -   এরা ব্যাংকগুলো থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে খেয়েছে।  -   মানুষের রক্ত শুষে দেশে-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছে।  -    এরা আপনার সন্তান ও ভাইদের গুম, খুন, অপহরণ করেছে। পথে ঘাটে লাশ ফেলে রেখেছে।  -    এরা বহু মায়ের কোল খালি করেছে। অনেক বধুকে স্বামীহারা, অনেক মাকে সন্তানহারা, অনেক বোনকে ভাইহারা করেছে।  -    রক্তপিপাসু এই শাসকদের হত্যা-নির্যাতনে ঘরে ঘরে আজ কান্নার রোল।  -   ঢাকা নগরীকে এরা দ্বিখন্ডিত করেছে কিন্তু সেবাখাতে সমন্বয়ের কোনো ব্যবস্থা করেনি।  -    নির্বাচন ছাড়াই ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে এরা প্রশাসক বসিয়ে বছরের পর বছর আপনাদেরকে শাসন, শোষণ ও দুর্নীতি করেছে।  -    জনগণের ভোটে নির্বাচিত  মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের মিথ্যা মামলায় আটক এবং তাদেরকে সাসপেন্ড করে এরা সারা দেশের ভোটারদের অপমান করেছে।  -    ঢাকা মহানগরীকে এরা ময়লা, আবর্জনা, দুর্গন্ধ, মশা ও যানজটের শহর বানিয়েছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল করে ফেলেছে। বসবাসের অনুপযোগী করে ফেলেছে এই রাজধানীকে।  -    নাগরিক সেবার কোনো ব্যবস্থা না করে এরা বড় বড় প্রকল্পের নামে নিজেদের পকেট ভারী করেছে কমিশনের টাকায়।  -   মাদকের ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়ে তরুণ সমাজকে এরা বিপথগামী করছে।   -    রানা প্লাজা বিপর্যয়ে এরা বহু শ্রমজীবী মানুষের জীবন নিয়েছে। ক্ষতিপূরণের নামে টাকা সংগ্রহ করেও সে টাকা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে এরা দেয়নি।  -    ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকারী অনেক গার্মেন্টস শ্রমিককে এরা হত্যা ও নির্যাতন করেছে।  -   রাজধানী ঢাকায় হেফাজতের সমাবেশে রাতের অন্ধকারে হামলা করে এরা এতিম ও আলেমদের রক্ত নিয়েছে।  -    এরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন করেছে। তাদের মন্দিরের প্রতিমার স্বর্ণালংকার ও অর্থ লুট করেছে।  -    পরিকল্পিত পন্থায় দাঙ্গা বাঁধিয়ে রামুতে এরা বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মন্দির ধ্বংস করেছে।  -    আওয়ামী লীগ ছাড়া সারা দেশের মানুষকে এরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করেছে।   -    সম্মানিত নাগরিকদের এরা অপমান করেছে।  -    গ্রামীণ ব্যাংক দখল করে নিয়ে গেছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।  -    নিত্যপণ্যের দামের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনকে এরা দুর্বিসহ করেছে।  -    জনগণকে দেয়া প্রতিটি ওয়াদা এরা ভঙ্গ করেছে।  -  দখল, চাঁদাবাজী, সন্ত্রাস, জুলুম ও দলীয়করণে প্রতিটি স্তরের মানুষকে এরা অতীষ্ঠ করে তুলেছে।  -    নারীর সম্ভ্রমহানী ও লাঞ্ছনায় এরা অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।  -   সিটি কর্পোরেশনসহ সকল ঠিকাদারী কাজে এরা টেন্ডার ডাকাতির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।  -    পিলখানা হত্যাকা-ে নিহত সেনা কর্মকর্তাদের পরিবার সমূহকে এরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করেছে। আড়াল করেছে প্রকৃত অপরাধীদের।  -   এদের মদতে নারায়ণগঞ্জে র‌্যাব কর্মকর্তারা ১১ খুনের পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়েছে।  -    বিদেশী অতিথিদের দেয়া স্বর্ণপদকের সোনাও এরা চুরি করে সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশকে কলংকিত করেছে।   এরকম কত অপকর্ম যে এরা করে চলেছে তার ইয়ত্ত্বা নেই। এতসব অপরাধের বিরুদ্ধে আমি ঢাকা ও চট্টগ্রামবাসীকে আগামী ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার নীরব প্রতিশোধ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। আপনাদের ভোট অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বিরাট শক্তি। ভোট হচ্ছে জনগণের এক বিরাট ক্ষমতা। সঠিকভাবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করুন। নীরব বিপ্লব ঘটান। আপনারা কেউ ভয় পাবেন না। মা-বোন, মুরুব্বী, তরুণসহ সব বয়স ও শ্রেণী-পেশার ভোটার সকাল সকাল ভোট কেন্দ্রে যাবেন। লাইন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেবেন। অনিয়ম ও কারচুপি দেখলে সবাই মিলে প্রতিবাদ করবেন। মনে রাখবেন, দেশের সম্পদ লুটপাট করে এবং আপনাদের রক্ত শুষে এরা টাকার পাহাড় গড়েছে। কাজেই এরা যে টাকা বিলাচ্ছে, সেটা আপনাদেরই টাকা। ওদের কাছ থেকে এ টাকা নিলেও ভোট বিক্রি করবেন না। টাকা নেবেন কিন্তু বিবেক অনুযায়ী ভোট দেবেন। কারণ, ভোট বিক্রি আর ঈমান বিক্রি একই কথা। বর্তমানে আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসরেরা যেভাবে উগ্র-সন্ত্রাসী ও দাম্ভিক হয়ে উঠেছে কোনোভাবে এই তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফল কেড়ে নিতে পারলে তারা আপনাদেরকে আর মানুষ বলেই গণ্য করবে না। জোর করে বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে গেলে মা-বোনেরা নিরাপদে থাকতে পারবেন না। ব্যবসায়ীরা ঠিক মতো ব্যবসা করতে পারবেন না। প্রবীণ ও সম্মানিত নাগরিকদের সম্মান থাকবে না। তরুণদের ভবিষ্যত ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা আরো বিপথগামী হবে। শিক্ষাঙ্গণ আরো কলুষিত ও সন্ত্রাস কবলিত হবে।  তাই এবার নিজেদের স্বার্থেই বুঝে-শুনে ভোট দিতে হবে এবং ভোটের ফল বুঝে নিতে হবে। আমি নগরবাসীর প্রতি আবেদন করছি, আপনরা দয়া করে ঢাকা দক্ষিণে আমাদের সমর্থিত প্রার্থী  মীর্জা আব্বাসকে মগ মার্কায়, ঢাকা উত্তরে তাবিদ আউয়ালকে বাস মার্কায় এবং চট্টগ্রামে মনজুর আলমকে কমলালেবু মার্কায় ভোট দিন। কাউন্সিলর ও মহিলা কাউন্সিলার পদেও আমাদের সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিন। আপনার ভোট হোক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভোট। আপনারা ভোট হোক বাসযোগ্য, পরিচ্ছন্ন, উন্নত, আধুনিক, যানজটমুক্ত, পরিকল্পিত ও নিরাপদ নগরী গড়ার পক্ষের ভোট। আমরা নবীন ও প্রবীণ এবং অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয় করে প্রার্থী বাছাই করেছি। আমরা মিথ্যা ও অসম্ভব প্রতিশ্রুতি দেয়ার পক্ষে নই।  শুধু বলবো, আপনি দয়া করে পরিবর্তনের পক্ষে, স্বস্তির পক্ষে, শান্তির পক্ষে আপনার ভোটটি দিন। গুন্ডামী, সন্ত্রাস, অপমানের বিরুদ্ধে ভোট দিন।   মা-বোনের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য ভোট দিন। ভোট শেষে বিকাল থেকে ভোট কেন্দ্রে পাহারা বসাবার জন্য আমি নগরবাসীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। গণনা শেষে ফলাফল বুঝে নিয়ে আপনারা কেন্দ্র ত্যাগ করবেন। যাতে আপনাদের দেয়া রায় ওরা বদলে ফেলতে না পারে। ভোটের দিন এবং এর পরে কেনো উস্কানির ফাঁদে পা না দেয়ার এবং কোনো গুজবে কান না দেয়ার জন্য আমি অনুরোধ করছি। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তার ফলাফল মেনে নেয়ার জন্যও আমি সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। আর সন্ত্রাস ও কারচুপি হলে প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে প্রতিটি কেন্দ্র ও এলাকা থেকে।  ভোট গ্রহণ, গণনা, ফল ঘোষণা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় যারা নির্বাচনী দায়িত্বে থাকবেন তাদের সকলের প্রতি আমার অনুরোধ, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব পালন করবেন। কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবেন না। আমার শেষ কথা শেখ হাসিনার উদ্দেশে।  আপনি বিনা ভোটে রাজকীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। এই দম্ভ ত্যাগ করুন। মনে রাখবেন, সব দিন সমান যায় না। এ পর্যন্ত যাই করেছেন, ৩টি সিটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হতে দিন। এতে আপনার ক্ষমতা যাচ্ছে না।  ক্ষমতায় বসতে এবং বসার পর আপনি অনেক অপরাধ-অপকর্ম-অপকৌশল করেছেন। এখন রাষ্ট্রক্ষমতা আপনার কাছে বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়ার মতো বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। আপনি নামতে ভয় পাচ্ছেন। আপনি ভয় পাবেন না। আমরা আপনার মতো প্রতিশোধপ্রবণ নই। আপনি নম্র, ভদ্র, সংযমী হোন। উগ্র স্বভাব ও জিঘাংসার মনোবৃত্তি বদলান। গণতন্ত্র ও সংলাপের পথে আসুন। আমরা আপনাকে সহি সালামতে নিরাপদে নামতে সাহায্য করবো এবং একই সমতলে দাঁড়িয়ে নির্বাচন করবো। মানুষ যাকে খুশি বেছে নেবে। আসুন, সেই পথটা অন্তত খুলে দেই।  অনেক দিনের জমে থাকা কথা একটু দীর্ঘ হয়ে গেল। আজ এ পর্যন্তই। আগামীতে আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।  আমার কথা ধৈর্য্য ধরে শোনার জন্য ধন্যবাদ।  আল্লাহ হাফেজ। বাংলাদেশ-জিন্দাবাদ।

ভারতীয়-ইউরেশীয় প্লেটের ফাটলে হিমালয় বিপর্যয়

দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয় অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা সহস্রের ঘর ছুঁতে যাচ্ছে। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নেপালের কাঠমান্ডু। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৮১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। এর গভীরতা ছিল ১৫ কিলোমিটার। রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ৯। এই বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে হিমালয় অঞ্চলের দুটি বড় টেকটোনিক প্লেটের হঠাৎ পতন হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। ভূকম্পবিদ্যা বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের পতনে এই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূস্তরের এই দুই প্লেটের ফাটলকে বিজ্ঞানীরা প্রধান সম্মুখস্থ ফুটো (এমএফটি) হিসেবে আগেই চিহ্নিত করেছিলেন। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি গবেষকরা জানিয়েছিলেন, হিমালয়-সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। জিওফিজিক্যাল রিসার্চের এক জার্নালে এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিন বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে ভূ-পদার্থবিদদের এক বার্ষিক সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, হিমালয় ও প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্পের আশংকা বাড়ছে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, কাছাকাছি সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ওই সম্মেলনে সারা বিশ্বের প্রায় ২০ হাজার ভূ-পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানী অংশ নিয়েছিলেন।
বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগর ও এশিয়ায় দুটি সিসমিক প্লেট রয়েছে।
একটির নাম ইউরেশিয়া প্লেট, আরেকটি ইন্ডিয়া প্লেট। হিমালয় এ দুটি প্লেটকে আলাদা করেছে। প্লেট দুটির মিলনস্থলের নামকরণ করা হয়েছে ক্যাসকেডিয়ান সাবডাকশন জোন। দুই প্লেটের মধ্যবর্তী অংশে হিমালয়ের অবস্থান। বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীরা প্লেট দুটির সংঘর্ষ এবং এর ফলে ঘটা ফাটল নিয়ে কাজ করছেন। পুরনো গবেষণায় জানা গিয়েছিল, প্লেট দুটির ঘর্ষণে সৃষ্ট ফাটলটি সংযোগস্থলের কয়েক ডিগ্রি উত্তরে অবস্থিত। তবে নতুন তথ্য অনুযায়ী, আগের চেয়ে কিছুটা দূরে এ ফাটলের অবস্থান। ইন্ডিয়া প্লেট ও ইউরেশিয়া প্লেটের সংযোগস্থলের ২-৪ ডিগ্রি উত্তরেই এ ফাটলের অবস্থান। তবে বিজ্ঞানীরা অবাক হয়েছেন এ ফাটলের গভীরতা দেখে। দুটি শক্তিশালী প্লেটের এ ঘর্ষণের ফলে নিচের দিকে প্রায় ১৫ ডিগ্রি গভীরতা সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। দৈর্ঘ্যরে ব্যাপ্তিতে এই ক্ষতের অবস্থান নিচে প্রায় ২০ কিলোমিটারের মতো। ক্ষত তৈরি হওয়ার কারণে এরই মধ্যে প্লেট দুটি তাদের স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে সংযোগস্থল-সংশ্লিষ্ট এলাকাজুড়ে বড় আকারের ভূকম্পনের আশংকা বাড়ছে। সপ্তদশ শতকের পর থেকে এ অঞ্চলে বড় আকারের কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানেনি।
কয়েক বছর ধরেই ভূ-গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ মারাত্মক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। সিসমিক প্লেটের ঘূর্ণন সাইকেলের কারণে সব অঞ্চলেই দেড়শ বছরের নিয়মিত বিরতিতে ৮ থেকে ১০ মাত্রার ন্যূনতম একটি ভূমিকস্প আঘাত হানে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ্যায় উচ্চতর গবেষণার ছাত্র ওয়ারেন ক্যাল্ডওয়েল বলেছেন, ভূমিকম্প সম্পর্কে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। কিন্তু সিসমোগ্রাফের তথ্য জানাচ্ছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকির পরিমাণ বেশ বিস্তৃত। যেহেতু, এ অঞ্চল তুলনামূলক বেশি ঘনবসতিপূর্ণ, তাই আগাম সতর্ক বার্তা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
এদিকে ইউএসজিএস বলছে, পৃথিবীব্যাপী মাটি খনন বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূমিকম্পের আশংকা বাড়ছে। তেল গ্যাস ও সম্পদের অনুসন্ধানে ভূমি খনন ও ভূ-অভ্যন্তরে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার মতো কাজে ভূগর্ভের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্য হিন্দু, গার্ডিয়ান।

সেনা মোতায়েন নিয়ে টালবাহানায় শঙ্কা বাড়ছে

আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শেষ হওয়ার একদিন আগে দিনভর ব্যস্ত ছিলেন আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়রপ্রার্থী ২০ দল সমর্থিত তাবিথ আউয়াল। গতকাল মালিবাগ, মগবাজার, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও গুলশান-১ এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালান তিনি। এ সময় তার সঙ্গে এলাকার ওইসব এলাকার  হাজার হাজার ভোটার যোগ দেন। এদিকে তাবিথ আউয়ালের সঙ্গে প্রচারণায় যোগ দিয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি বলেন, জনগণ ভোট দিয়ে তাদের কাঙ্ক্ষিত প্রার্থী নির্বাচিত করবেন। এজন্য যে পরিবেশ দরকার সরকার তা নানাভাবে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করছে। তবে যা কিছুই করা হোক না কেন তাদের প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে আসবেন না বলেও জানান তিনি। নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে প্রার্থীদের মেরে ফেলার এবং তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ারও হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে মওদুদ অভিযোগ করেন। এ সময় তাবিথ আউয়াল বলেন, সর্বশেষ সেনা মোতায়েন নিয়ে যে টালবাহানা করা হলো, তাতে আমাদের শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গতকাল সকালে উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরের বস্তি ও কলোনিতে গণসংযোগ করেন তাবিথ আউয়াল। এরপর সকাল সাড়ে আটটায় বাসে করে উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরের সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজ-সংলগ্ন ৮ নম্বর বস্তিতে যান। তিনি বস্তির ঘরে ঘরে গিয়ে বাস মার্কায় ভোট চান। এরপর সেখান থেকে তাবিথ রেললাইন-সংলগ্ন সেলিমের বস্তিসহ আশপাশের বিভিন্ন বস্তি এলাকায় ঘুরে ঘুরে ভোট ও দোয়া চান। এ সময় গণসংযোগকালে তিনি বলেন, আমরা জনগণের কাছ থেকে বিপুল সাড়া পাচ্ছি। জনগণ আমাদের চাচ্ছে। তাই শেষ পর্যন্ত আমরা নির্বাচনের মাঠে লড়াই চালিয়ে যাবো। নির্বাচিত না হলে ফলাফল মেনে নেবেন কি না-সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তাবিথ আউয়াল বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে ফলাফল যা-ই হোক, মেনে নেবো। এসব এলাকায় গণসংযোগ শেষে তাবিথ আউয়াল মেয়র প্রার্থীদের নিয়ে আয়োজিত দুটি নির্বাচনী মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। সকাল ১০টায় দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন এবং বেলা ১১টায় তিনি দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টেলিভিশন আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তৃতা করেন।
মতমিনিময় শেষে দুপুর সাড়ে ১২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের এ মেয়র প্রার্থী ‘বাস’ মার্কায় ভোট চাইতে বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগ করেন। মালিবাগ চৌধুরীপাড়া, পূর্ব খিলগাঁও, পশ্চিম খিলগাঁও, হাজীপাড়া, মগবাজার ওয়ারলেস গেট, ফার্মগেটের গ্রিন সুপার মার্কেট, আনন্দ সিনেমা হল এলাকা, ফার্ম ভিউ সুপার মার্কেট ও মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প ও গুলশান-১ এলাকায় গণসংযোগ করেন তাবিথ আউয়াল। প্রত্যেক এলাকায় ভোট চাইতে গেলে সেসব এলাকার বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীরা এসে যোগ দেন। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় গণসংযোগকালে ওইসব এলাকার হাজার হাজার কর্মী-সমর্থক তার সঙ্গে অংশ নেন। গণসংযোগকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) চেয়ারম্যান খন্দকার গোলাম মোর্ত্তজা, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব সাবেক এমপি মাওলানা শাহীনুর পাশা, স্থানীয় কাউন্সিলর প্রার্থী ও দলের নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিকালে গণসংযোগ কর্মসূচির বাইরে ব্যক্তিগতভাবে তেজগাঁও ক্যাথোলিক চার্চ পরিদর্শন করেন। ফার্মগেট এলাকায় গণসংযোগকালে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, আমরা চাই সুষ্ঠু নির্বাচন। কিন্তু আমাদের প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণা চালাতে দেয়া হচ্ছে না। তাদের নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে। ৩৬ কমিশনার প্রার্থী হুমকি ও গ্রেপ্তারের ভয়ে আত্মগোপন করে আছেন। তারা ভোটও চাইতে পারছেন না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাসেরও একই অবস্থা। তিনি বলেন, র‌্যাব-পুলিশ দিয়ে কেন্দ্র দখলের পাঁয়তারা হচ্ছে। এ নির্বাচন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের জন্য অগ্নিপরীক্ষা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে নতুন করে আন্দোলন হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন। তাবিথ আউয়াল বলেন, আমরা এখনও অপেক্ষায় আছি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ ফিরে আসবে। আমরা জনগণের জন্য নির্বাচন করছি, জনগণের জন্য নির্বাচনের মাঠে থাকবো। তারা যে ভোট দিতে চায় তার দরকার উপযুক্ত পরিবেশ।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের দাবি: রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির দ্বিতীয় বছর পূর্তিতে শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি এ দাবি করেন। তাবিথ আউয়াল বলেন, ট্র্যাজেডির দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণের অর্থ পায়নি ভুক্তভোগী পরিবার। মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে নিহতের পরিবার এবং হাত-পা হারানো পঙ্গু হওয়া হাজারো খেটে খাওয়া মানুষকে। তাবিথ আউয়াল সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, সরকারের তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও ক্ষতিপূরণের অর্থ সঠিকভাবে বণ্টন না করায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আন্তরিকতা নিয়ে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থা কড়া সমালোচনা করেছে।
ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি শোক ও সমবেদনা: রাজধানীসহ সারা দেশে ভূমিকম্পের ঘটনায় হতাহতদের প্রতি শোক ও সমবেদনা জানিয়েছেন তাবিথ আউয়াল। এক বিবৃতিতে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্তদের সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায় থেকে দ্রুত আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাবিথ আউয়াল আরও বলেন, আমি ঢাকা উত্তরের মেয়র নির্বাচিত হলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) সঙ্গে নিয়ে এমন পরিকল্পিত শহর গড়ে তুলতে চেষ্টা চালাবো, যাতে ভূমিকম্পসহ যে কোন আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।

রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভোট চাই না আমি -আনিসুল হক

ভোটারদের কাছে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভোট চান না আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক। গতকাল তেজগাঁও কলেজ প্রাঙ্গণে এক সভায় এমনটাই জানান তিনি। এ সময় আনিসুল হকের বক্তৃতার ফাঁকে স্থানীয় ও কলেজ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা দলীয় স্লোগান তুলতেই তাদের থামিয়ে দিয়ে আনিসুল হক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এ নির্বাচন কোনও রাজনৈতিক আদর্শের মেন্ডেট নয়। এটা কোনও পলিটিক্যাল স্লোগানের নির্বাচন নয়। এটা ঢাকার মেয়র নির্বাচন। মাননীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ আমাকে সমর্থন দিয়েছেন। তাই বলে আমি শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ভোট চাই না। মানুষের মধ্যে নানা রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। আমার আবেদন যে  পক্ষেরই হোক, যে মতাদর্শেরই হোক- আপনারা বিবেচনা করুন কে পারবে এই শহর চালাতে। আপনার যদি মন চায় আমাকে ভোট দিবেন। এ সময় স্লোগানধারি আওয়ামী লীগ কর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, শুধু আদর্শের তীর ধরে সামনের দিকে এগুনো যাবে না। যার মধ্যে আদর্শ আছে, যোগ্যতা আছে, স্পৃহা আছে, সততার রেকর্ড আছে, অভিজ্ঞতার ঝুলি আছে- এমন একজন মেয়র প্রয়োজন। ৫ বছরের জন্য আপনারা আমাকে নির্বাচিত করুন। কারণ আমার পেছনে কোন ব্যাগেজ নেই, সামনেও কোনও ব্যাগেজ থাকবেও না ইনশাআল্লাহ। গতকাল দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁও কলেজে নির্বাচনী প্রচারণা সভা শেষে তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, এখন কিসের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি? সবাই ঘুরছি, ভোট চাচ্ছি। এখানে আপনারা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি কোথায় দেখছেন? এরপর তিনি বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা ও ইসি থেকে চিঠি প্রদান প্রসঙ্গে বলেন, বেগম জিয়া একজন বড় নেত্রী। তিনবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার গাড়িবহরে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আসছি প্রতিদিন। আমি তাকে সম্মান করেই বলছি, যদি আইন বলে উনার গাড়িবহর নির্বাচনী আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে তাহলে মাননীয় নেত্রীর কাছে আশা করতেই পারি আইন মেনে চলার। অন্য আরেক প্রশ্নের জবাবে আনিসুল বলেন, দেখুন সেনাবাহিনী সম্পর্কে আমার বক্তব্য স্পষ্ট। সবাই যদি চায় তাহলে সেটা করা উচিত। এটা ইসির দায়িত্ব। এ নিয়ে আমার কোনও মত অথবা দ্বিমত নেই। আমি চাই সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। গতকালের এ সভায় আনিসুল হকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ফারুক খান, তেজগাঁও কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রশিদ, সংসদ সদস্য শাহজাহান কামাল, আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, ঢাকা উত্তরের যুবলীগ সভাপতি মাইনুল হোসেন নিখিল, ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম প্রমুখ। তেজগাঁও কলেজের সভা শেষে এদিন তিনি কচুক্ষেত বাজার, কাফরুল, দামালকোট হয়ে ভাষানটেকে জনসংযোগ শেষে একটি পথসভায় যোগ দেন। এরপর তিনি মাটিকাটা, মানিকদি হয়ে মিরপুরের পল্লবী থানার সামনে হারুন মোল্ল্লা মাঠে ‘ভোট ফর সমাধানযাত্রা, ভোট ফর আনিসুল হক’ শীর্ষক কনসার্টে যোগ দেন। কনসার্ট মঞ্চে আনিসুল হকের সঙ্গে ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এখলাস উদ্দিন মোল্লা, চলচ্চিত্র প্রযোজক ও অভিনেতা ডিপজল, কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম এমপি প্রমুখ। কনসার্ট মঞ্চ নির্বাচনী বক্তব্য ছাড়াও আনিসুল হকের পক্ষে মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে ঘড়ি মার্কায় স্লোগান দেয়া হয়। কনসার্টে মমতাজ ছাড়াও গান পরিবেশন করেন জয় শাহরিয়ার, কিশোর, পারভেজ প্রমুখ।

ভোটের আগে হামলা ধরপাকড়

সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানীর পরিবেশ। গতকালই পৃথক ৩টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বিএনপির এক ওয়ার্ড নেতা। এছাড়াও আহত হয়েছেন কৃষক লীগের সাবেক এক নেতাসহ প্রায় ৩৫ জন। এসব হামলার ঘটনায় সরকারি দলের কর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে। এদিকে নির্বাচনের আগমুহূর্তে রাজধানীতে ধরপাকড়ের অভিযোগ উঠেছে বিরোধী প্রার্থীদের পক্ষ থেকে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গতকাল খিলগাঁও এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে ২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি নাজমুল হুদা আরজু (৪০) আহত হয়েছেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আরজুর অভিযোগ, নিজ দলের প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগের প্রস্তুতিকালে যুবলীগের নেতাকর্মীরা তাকে গুলি করেছে। সূত্র জানায়, গতকাল বিকাল ৪টায় খিলগাঁও থানাধীন উত্তর গোড়ানের টেম্পো স্ট্যান্ডের সামনে দুই নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপির মনোনীত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী হাবিবা চৌধুরী বীথির পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। ওই ওয়ার্ডের বিএনপির নির্বাচনী কমিটির পরিচালক ছিলেন আরজু। গণসংযোগের প্রস্তুতিকালে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এতে আরজুর বাম পায়ে এক রাউন্ড গুলি বিদ্ধ হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান দলের নেতাকর্মীরা। আরজু সাংবাদিকদের জানান, স্থানীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুলের লোকজন তাকে গুলি করেছে। তার আগে নির্বাচনী তৎপরতা শুরুর পর থেকেই স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দিচ্ছিলো তাকে। খিলগাঁও থানার এসআই ইফতেখার হোসেন জানান, গুলিবর্ষণের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। গুলিবর্ষণকারীকে চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। উত্তর গোড়ানের ৩৯৮/বি নম্বর বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে থাকেন নাজমুল হুদা আরজু।
এদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০ নম্বর ওয়ার্ডের এক কাউন্সিলর প্রার্থীর গণসংযোগে হামলা চালিয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন। হামলায় কাউন্সিলর প্রার্থী সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরীসহ প্রায় ২০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বিকাল ৩টায় সেগুনবাগিচা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে ওই এলাকায় তখন গণসংযোগ করছিলেন কাউন্সিলর প্রার্থী সারোয়ার ওয়াদুদ চৌধুরী। গণসংযোগ চলাকালে ১৫-২০ জন দুর্বৃত্ত তাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়। সারোয়ার চৌধুরীর ভাই ইকবাল চৌধুরী জানান, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন রতনের লোকজন এই হামলা চালায়। আওয়ামী লীগের ওয়ার্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক আল রাজুর নেতৃত্বে এই হামলা চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। হামলায় সারোয়ার চৌধুরীসহ প্রায় ২০ আহত হয়েছেন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সারোয়ার চৌধুরীকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জানা গেছে, এই ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সমর্থন না পেলেও স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনী কার্যক্রম চালাচ্ছিলেন কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক সারোয়ার চৌধুরী। এতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ফরিদ উদ্দিন রতন ও তার লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। শুরু থেকেই নানাভাবে সারোয়ার চৌধুরীকে বাধা দিচ্ছিলেন তারা। এ বিষয়ে ফরিদ উদ্দিন রতন বলেন, আল রাজুর ওপর হামলা করেছে সারোয়ারের লোকজন। অফিস থেকে বাসায় যাওয়ার পথে সেগুনবাগিচায় রাজুর ওপর হামলা চালানো হয়। নিজে হামলা করে এখন নাটক করছেন সারোয়ার।
এছাড়া, শান্তিনগর মোড়ে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আঞ্জুমান আরা বেগমের নির্বাচনী গণসংযোগে হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। আঞ্জুমান আরার নির্বাচন পরিচালক আমিনুর রহমান অভিযোগ করেন, শান্তিনগর এলাকায় কাউন্সিলর প্রার্থী আঞ্জুমান আরার পক্ষে গণসংযোগের সময় ছাত্রলীগ অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এতে ওই কাউন্সিলর প্রার্থীসহ ১৫ জন সমর্থক আহত হয়েছেন।

পাকিস্তানে নারী মানবাধিকার কর্মীকে হত্যা

পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার কর্মী সাবিন মেহমুদ করাচিতে বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। শুক্রবার রাতে বেলুচিস্তানে একটি অনুষ্ঠানে থেকে ফেরার সময় অজ্ঞাত পরিচয় বন্দুকধারীদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান তিনি। সাবিন মেহমুদ দ্য সেকেন্ড ফ্লোর নামের একটি মুক্ত আলোচনার স্থল ও ক্যাফের পরিচালক। শুক্রবার রাতে তিনি বেলুচিস্তানে একটি অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা শেষে করাচিতে ফিরছিলেন।
বিভিন্ন সময়ে বেলুচিস্তানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিয়ে ‘আনসাইলেন্সিং বেলুচিস্তান’ নামের ওই অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময়ে সাবিনের মাও ছিলেন তার সঙ্গে। রাত ৯টার দিকে দুটি মোটরসাইকেলে করে বন্দুকধারীরা সাবিনের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এ সময় তার মাও গুরুতর আহত হন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। দেশটির বার্তা সংস্থাগুলো জানায়, সাবিন সম্প্রতি বেশ কয়েকবার মানবাধিকারবিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য হুমকি পেয়ে আসছিলেন।

নেপালের পাশে আছি

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নেপালকে সব রকমের সহযোগিতা দিয়ে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। শনিবার সকাল থেকে হওয়া ব্যাপক ভূমিকম্পের জেরে দিল্লিতে জরুরি বৈঠক করেন নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দেশের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি,
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল, মুখ্য সচিব শ্রী নৃপেন্দ্র মিশ্রা, উপমুখ্য সচিব পি কে মিশ্রা, আইএমডি ও এনডিআরএফের সদস্যরা। সূত্রের খবর, বৈঠকে ঠিক হয়েছে নেপাল ও বাংলাদেশের পাশে থাকছে ভারত। এমনকি বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রী ফোনে কথা বলেছেন নেপালের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। মোদির তরফে নেপালকে চিকিৎসা ও উদ্ধার কাজে সাহায্য দেয়ারও আশ্বাস দেয়া হয়েছে। এদিকে নেপালে জারি করা হয়েছে জরুরি অবস্থা। নেপালের প্রায় সব পুরনো বাড়ি বা মন্দিরগুলো এই কম্পনে ভেঙে পড়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন এ মারাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয় মোকাবেলা করতে নেপালকে ভারত সরকার সব ধরনের সহায়তা করবে।
নেপালে ভারতীয় উদ্ধারকারী বিমান : এর মধ্যে ভারতীয় নৌসেনার সি-১৩০ সুপার হাউকিউলিস এয়ারক্র্যাফট ত্রাণকার্যে কাঠমান্ডুর উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। পাঠানো হচ্ছে মেডিকেল টিমও। ভারতীয় বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ন্যাশনাল ডিজাসটর রেসপন্স টিমের (এনডিআরএফ) ৯১ সদস্যকে বিমানঘাঁটিতে নামিয়ে দিয়ে ভূমিকম্পে আটকেপড়া মানুষদের উদ্ধার কাজে সাহায্য করবে হারকিউলিস সি-১৩০। এর পর পোখরায় ফিরে আসবে বিমানটি। এছাড়া এদিনই ভাটিন্ডা থেকে আইএল ৭৬ বিমান ও এমআই ১৭ হেলিকপ্টার উড়ে যায় নেপালের উদ্দেশে। নেপালের পাশাপাশি ভারতে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ৫০ ছুঁতে যাচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি ফোনে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম ও মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। নেপালের পাশাপাশি ভারতে মৃতের সংখ্যা ৩৪ জন (শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত)। নরেন্দ্র মোদি ফোনে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম ও মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।

নেপালে ভূমিকম্পের কবলে বাংলাদেশী তারকারা

নেপালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে আতংতিত হয়ে পড়েছেন নেপালে অবস্থানরত বাংলাদেশী শুটিং ইউনিটের সদস্যরা। এ সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় নাটকের শুটিং করতে নেপাল যান। সেখানে তার সঙ্গে ইউনিটে রয়েছেন অভিনেত্রী রুনা খান, অভিনেতা কল্যাণ ও শাহাদাত। ভূমিকম্পের সময় তারা নেপালের নাগরকোট নামের একটি স্পটে শুটিং করছিলেন। তাদের শুটিং স্থলের কাছাকাছি একটি পাহাড় ধসে পড়ে বলে জানা গেছে। এতে নাটকের ইউনিট আতংকিত হয়ে শুটিং বন্ধ করে দেয়। এদিকে ভূমিকম্পে রুনা খান আহত হয়েছেন বলে ঢাকা মিডিয়ায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ ব্যাপারে ঢাকায় তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে রুনার স্বামী জানান, বিষয়টি সম্পূর্ণ গুজব।
রুনা খান ও পুরো ইউনিট সুস্থই আছে। নেপালে এ মুহূর্তে নির্মাতা চয়নিকা চৌধুরী নাটকের শুটিং করতে ইউনিট নিয়ে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে রয়েছেন অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ, আনিসুর রহমান মিলন, অভিনেত্রী শমী কায়সার, সহকারী পরিচালক অমিতাভ রানা ও সুব্রত মিত্র। ঢাকার সূত্র জানিয়েছে, তারাও সুস্থ ও নিরাপদে আছেন। তবে আপাতত শুটিং বন্ধ আছে। একটি বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ ইউনিটও এ মুহূর্তে নেপাল অবস্থান করছে। তবে তাদের ব্যাপারে কোনো তথ্য জানা যায়নি। এদিকে, প্রাকৃতিক এ দুর্যোগ নিয়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তারকারাও নিজেদের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তাদের কেউ নিজেরাই হয়েছেন ভূমিকম্পের শিকার। কেউ আবার তৎক্ষণাৎ কিছু না বুঝলেও পরে অনুভূতি প্রকাশ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তেমন কিছু নির্বাচিত স্ট্যাটাস-
কনকচাঁপা, কণ্ঠশিল্পী
আলহামদুলিল্লাহ ... এখনও বেঁচে আছি...
নিপুণ, অভিনেত্রী
শুটিং, শুটিং, শুটিং। হঠাৎ দেখলাম আমার গাড়ি নাচানাচি করছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম ব্যাপার কি? পরে বুঝলাম সারা দেশে ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে।
ইরেশ যাকের, অভিনেতা
সাকিবরা, সাব্বির কালকে এমন মারা মেরেছে যে আজকেও ভূমিকম্প হচ্ছে
মৌসুমি হামিদ, অভিনেত্রী
মেকআপ নিচ্ছি। হঠাৎ করে মাথাটা ঘুরছে মনে হচ্ছে। এরপর অনুভব করলাম পুরো ঘরটা নড়ছে। সামনে পুকুর ছিল।
পানি যেভাবে উথাল-পাতাল শুরু করল তা দেখে আসলেই ভয় পেয়েছি।
বিদ্যা সিনহা মিম, অভিনেত্রী
এইমাত্র ভূমিকম্প অনুভব করছি। আমাদের বাসার সবকিছু কেঁপে উঠছে।
আরিফিন শুভ, অভিনেতা
দেহ মন পৃথিবী সবই নড়ে ওঠলো...
নাজনীন আক্তার হ্যাপি, অভিনেত্রী
ভূমিকম্প কখন হল? তাও নাকি অনেক বেশি! ধুর আমি টের পেলাম না কেন?? মিস হয়ে গেল!
পান্থ কানাই, কণ্ঠশিল্পী
আমাকে ভালোই ঝাঁকাচ্ছে। ওরে বাবা একটু আগে আরেকবার ফিডব্যাক ঝাঁকানি দিল...
আমি আগেই বলছিলাম, পাকিস্তানরে এভাবে চুবানি খাওয়ানোটা ঠিক হয়নি... বর্ডা লাগসে... দুরু বদদোয়া লাগছে!
আনজাম মাসুদ, নির্মাতা
মহান আল্লাহর প্রতি অশেষ শোকরিয়া বাংলাদেশের কোনো ক্ষতি হয়নি।
নুসরাত ফারিয়া, অভিনেত্রী
সারা দেশে ভূমিকম্প হচ্ছে। দয়া করে নিরাপদে থাকুন।
প্রসূন আজাদ, অভিনেত্রী
জীবনে প্রথমবার এত বেশিক্ষণ ভূমিকম্প অনুভব করলাম। আজকেই হয়তো কেউ ফতোয়া দিয়ে বসবে এই ভূমিকম্প মেয়েদের দোষের জন্য হয়েছে! তারা পর্দাসীন হয়ে চলে না বলে দেশে ভূমিকম্প হচ্ছে!
সাজু খাদেম, অভিনেতা
অলস বিবাহিত লোকদের জন্য সুখবর, মাত্রই বিশাল ভূমিকম্প হয়ে গেল!

ভারতীয়-ইউরেশীয় প্লেটের ফাটলে হিমালয় বিপর্যয়

দক্ষিণ এশিয়ার হিমালয় অঞ্চলে স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা সহস্রের ঘর ছুঁতে যাচ্ছে। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল নেপালের কাঠমান্ডু। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্য অনুযায়ী ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে ৮১ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। এর গভীরতা ছিল ১৫ কিলোমিটার। রিখটার স্কেলে এর তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ৯।
এই বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণ হিসেবে হিমালয় অঞ্চলের দুটি বড় টেকটোনিক প্লেটের হঠাৎ পতন হিসেবে বিবেচনা করছেন বিজ্ঞানীরা। ভূকম্পবিদ্যা বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে দ্য হিন্দু প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের পতনে এই ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূস্তরের এই দুই প্লেটের ফাটলকে বিজ্ঞানীরা প্রধান সম্মুখস্থ ফুটো (এমএফটি) হিসেবে আগেই চিহ্নিত করেছিলেন। চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি গবেষকরা জানিয়েছিলেন, হিমালয়-সংশ্লিষ্ট অঞ্চল বড় ধরনের ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। জিওফিজিক্যাল রিসার্চের এক জার্নালে এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এছাড়া তিন বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকোতে ভূ-পদার্থবিদদের এক বার্ষিক সম্মেলনে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেন, হিমালয় ও প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ ভূমিকম্পের আশংকা বাড়ছে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, কাছাকাছি সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলে ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে। ওই সম্মেলনে সারা বিশ্বের প্রায় ২০ হাজার ভূ-পদার্থবিদ ও বিজ্ঞানী অংশ নিয়েছিলেন। বিজ্ঞানীদের গবেষণা অনুযায়ী, প্রশান্ত মহাসাগর ও এশিয়ায় দুটি সিসমিক প্লেট রয়েছে। একটির নাম ইউরেশিয়া প্লেট, আরেকটি ইন্ডিয়া প্লেট। হিমালয় এ দুটি প্লেটকে আলাদা করেছে।
প্লেট দুটির মিলনস্থলের নামকরণ করা হয়েছে ক্যাসকেডিয়ান সাবডাকশন জোন। দুই প্লেটের মধ্যবর্তী অংশে হিমালয়ের অবস্থান। বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীরা প্লেট দুটির সংঘর্ষ এবং এর ফলে ঘটা ফাটল নিয়ে কাজ করছেন। পুরনো গবেষণায় জানা গিয়েছিল, প্লেট দুটির ঘর্ষণে সৃষ্ট ফাটলটি সংযোগস্থলের কয়েক ডিগ্রি উত্তরে অবস্থিত। তবে নতুন তথ্য অনুযায়ী, আগের চেয়ে কিছুটা দূরে এ ফাটলের অবস্থান। ইন্ডিয়া প্লেট ও ইউরেশিয়া প্লেটের সংযোগস্থলের ২-৪ ডিগ্রি উত্তরেই এ ফাটলের অবস্থান। তবে বিজ্ঞানীরা অবাক হয়েছেন এ ফাটলের গভীরতা দেখে। দুটি শক্তিশালী প্লেটের এ ঘর্ষণের ফলে নিচের দিকে প্রায় ১৫ ডিগ্রি গভীরতা সৃষ্টি হয়েছে সেখানে। দৈর্ঘ্যরে ব্যাপ্তিতে এই ক্ষতের অবস্থান নিচে প্রায় ২০ কিলোমিটারের মতো। ক্ষত তৈরি হওয়ার কারণে এরই মধ্যে প্লেট দুটি তাদের স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।
এ কারণে সংযোগস্থল-সংশ্লিষ্ট এলাকাজুড়ে বড় আকারের ভূকম্পনের আশংকা বাড়ছে। সপ্তদশ শতকের পর থেকে এ অঞ্চলে বড় আকারের কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানেনি। কয়েক বছর ধরেই ভূ-গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ মারাত্মক ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। সিসমিক প্লেটের ঘূর্ণন সাইকেলের কারণে সব অঞ্চলেই দেড়শ বছরের নিয়মিত বিরতিতে ৮ থেকে ১০ মাত্রার ন্যূনতম একটি ভূমিকস্প আঘাত হানে। স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ্যায় উচ্চতর গবেষণার ছাত্র ওয়ারেন ক্যাল্ডওয়েল বলেছেন, ‘ভূমিকম্প সম্পর্কে আগাম ভবিষ্যদ্বাণী করা সম্ভব নয়। কিন্তু সিসমোগ্রাফের তথ্য জানাচ্ছে, ভূমিকম্পের ঝুঁকির পরিমাণ বেশ বিস্তৃত। যেহেতু, এ অঞ্চল তুলনামূলক বেশি ঘনবসতিপূর্ণ, তাই আগাম সতর্ক বার্তা ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।’ এদিকে ইউএসজিএস বলছে, পৃথিবীব্যাপী মাটি খনন বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূমিকম্পের আশংকা বাড়ছে। তেল গ্যাস ও সম্পদের অনুসন্ধানে ভূমি খনন ও ভূ-অভ্যন্তরে গভীর সমুদ্রবন্দর প্রতিষ্ঠার মতো কাজে ভূগর্ভের গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্য হিন্দু, গার্ডিয়ান।

‘নির্বাচন কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে’

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর হামলার দায় সরকার এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন বিবিসি বাংলাদেশ সংলাপের আলোচকরা। একইসঙ্গে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিন পর সেটা পরিবর্তনের ফলে নির্বাচন কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বলে মতপ্রকাশ করেছেন তারা। এ ছাড়া তিন সিটিতেই সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন রয়েছে বলে দাবি জানান তারা। গতকাল চট্টগ্রাম নগরীর কে স্কোয়ার মিলনায়তনে আয়োজিত বিবিসি সংলাপে এসব কথা বলেন আলোচকরা। সংলাপে অতিথি হিসেবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক হাসান মাহমুদ, চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আইরিন হাসান ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রওশন সোমা অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিবিসির সাংবাদিক আকবর হোসেন। অনুষ্ঠানের শুরুতেই এক দর্শক প্রশ্ন করেন- বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ওপর হামলার দায় কি সরকার এড়াতে পারে? এর জবাবে রওশন সোমা বলেন, আমাকে যেমন নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের, তেমনি খালেদা জিয়ারও নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। তবে তিনি নির্বাচনী প্রচারণায় বেরিয়ে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন কিনা সেটাও দেখতে হবে। এ বিষয়ে আইরিন সুলতানা বলেন, সরকার কোনভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। তিনি সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী। তাকে নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। এ প্রশ্নের জবাবে হাসান মাহমুদ বলেন, গত তিন মাসের আন্দোলনে পেট্রলবোমা দিয়ে খালেদা জিয়া সারা দেশে ১৭০ জন লোককে হত্যা করেছেন। বহু মানুষকে আহত করেছেন। তিনি জঙ্গি নেত্রী। খালেদা জিয়া এখন আতঙ্কের নাম। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মহল্লায় ডাকাত পড়লে তাদের আক্রমণকে প্রতিহত করার অধিকার যেমন মহল্লাবাসীর রয়েছে, ঠিক তেমনি খালেদা জিয়ার নিরাপত্তারক্ষীর গুলির পরিপ্রেক্ষিতে কাওরান বাজারে বিক্ষুব্ধ জনতা হামলা চালিয়েছে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে তার বাড়ি ও গাড়িতে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। এ সময় এক দর্শক বলেন, এ হামলার দৃশ্য টেলিভিশনে যারা দেখেছে তাদের ৯০ ভাগ লোক ন্যক্কারজনক ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। পেট্রলবোমা হামলার বিচার তো আর ইটপাটকেল নিক্ষেপ হতে পারে না। এ বিষয়ে আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, খালেদা জিয়ার ওপর আক্রমণের পর সারা দেশের মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। তারা এখন নিজের বাড়িতেও নিরাপদবোধ করছেন না। খালেদা জিয়ার কি হয়- এ নিয়েও তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর যেদিন হামলার ঘটনা ঘটে সেদিন সকালে তার বাড়ি থেকে প্রটোকলের পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়। পরিকল্পিতভাবে ছাত্রলীগের ছেলেরা তার ওপর হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে হাসান মাহমুদ বলেন, খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সারা দেশের সাধারণ মানুষেরও নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। এ সময় হাসান মাহমুদের উদ্দেশে এক দর্শক প্রশ্ন রাখেন- সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা যেখানে সরকার দিতে পানে না, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেবে কিভাবে। একদিন পর নির্বাচন কমিশনের সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের প্রশ্ন করলে হাসান মাহমুদ বলেন, এটা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত। এখানে সরকারের কোন ভূমিকা নেই। তবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিন পর সেটা পরিবর্তনের ফলে নির্বাচন কমিশন বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে বলে মত দেন অন্য আলোচক ও দর্শকরা। এ মুহূর্তে তিন সিটিতে সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন রয়েছে বলে দাবি জানান তারা।

ভোটারের মন কে বুঝিতে পারে? by ফারুক ওয়াসিফ

সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহর সঙ্গে মিরপুরে প্রচারাভিযানে আনিসুল হক
দেশে গণতন্ত্র আছে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত না, তবে ভোটাররা হারিয়ে যাননি। তাঁরা দেখা দেওয়া শুরু করেছেন। হণ্টনক্লান্ত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক আর মিরপুরের সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ রিকশায় বসা। দুপুর সাড়ে ১২টা। কথা বলছেন সাংবাদিক ও কর্মীদের সঙ্গে। যেমন প্রশ্নই আসুক, হাসতে হাসতে উত্তর দিয়ে যাচ্ছেন। বোঝা যায়, এ কাজে তিনি অভ্যস্ত ও দক্ষ। কিন্তু সেই হাসি কেড়ে নিল তৃতীয় পক্ষের উড়ে আসা এক প্রশ্ন, ‘বছরের পর বছর ধরে পল্লবীর রাস্তা খারাপ, এগুলা ঠিক করবেন কবে?’
উত্তরের মালিক প্রশ্নের মালিককে খুঁজে পেলেন না। প্রশ্নকারী তখনো বলে চলেছেন, ‘আপনারা ভোটের সময় ছাড়া আমাদের খোঁজ নেন কখনো?’ আওয়াজ শুনে সবাই এবার একসঙ্গে ওপরে তাকাল। রাস্তার পাশের বাড়ির দোতলার জানালায় দাঁড়িয়ে আছেন এক মধ্যবয়সী নারী। জবাবের আশায় তিনি তাকিয়ে আছেন আনিসুল হকের দিকে।
ঢাকা উত্তরে টেবিল ঘড়ি মার্কার প্রার্থী হক সাহেব হঠাৎ থতমত। বললেন, ‘এর উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব এমপি সাহেবের।’ এমপি সাহেব ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘দাঁড়ান দাঁড়ান, কোন রাস্তার কথা কইতাছেন।’ উত্তরে ওই নারী আবারও বললেন, ‘এই যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছেন, সেটাও তো ভালো না। পল্লবী থেকে বের হওয়ার রাস্তাটাও সাত বছর ধরে মেরামত হচ্ছে না।’ ইলিয়াস মোল্লাহ এবার হাসতে হাসতে উত্তর দিলেন, ‘নির্বাচনের আগে দিয়া রাস্তার কাজ ধরুমনে।’
দোতলার নারী আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। কর্মীরা স্লোগান তুললেন, এমপি ও মেয়র প্রার্থীকে নিয়ে রিকশা এগিয়ে চলল। এই রাস্তা ভাঙাচোরা হলেও পাকা। কিন্তু আমরা মোল্লা বস্তিতে ঢুকেছিলাম মোল্লা মার্কেটের পাশের যে রাস্তা দিয়ে, সেটায় খোয়া ঢালা চলছে। দু-এক দিনের মধ্যেই পিচঢালাই হবে। এক শ্রমিককে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, কাজ শুরু হয়েছে ১৫-২০ দিন আগে। মেয়র নির্বাচন উপলক্ষে ঢাকার অনেক রাস্তাই মেরামত চলছে। যে কাজ মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পরে সিটি করপোরেশন ভুলে যাবে বলে সবার ধারণা, নির্বাচনী হাওয়ায় সরকার সেটি আগেই করে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠবেই, কার জন্য এত আয়োজন, সরকার–সমর্থিত প্রার্থীর জন্য, নাকি ভুক্তভোগী নাগরিকদের জন্য?
গত বুধবার সকাল সোয়া ১০টা। মিরপুরের পল্লবী থানা পেরিয়ে মুসলিম বাজার আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াল ১০-১২টি গাড়ির বহর। জমায়েত সমর্থকেরা স্লোগান তুলল। আনিসুল হক উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের সাফল্যের কথা বললেন, ভোটারদের প্রভাবিত না হওয়ার অনুরোধ করে বক্তৃতা দিলেন। কেবল খেয়াল করলেন না, তিনি যেখানে দাঁড়িয়ে, সেই আওয়ামী লীগ কার্যালয়টি পার্কের জমির ওপর নির্মিত!
ঘুরে ঘুরে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে দেখে এক যুবক এগিয়ে এলেন। বললেন, আপনারা কি আনিসুল হকের সঙ্গে এসেছেন? সাংবাদিক পরিচয় দিলে বললেন, ‘উনি তো ভালো প্রার্থী, কিন্তু এ এলাকায় যারা ওনার ইলেকশন করতেছে, তারা তো ভালো না।’ যুবকটি নিজের পরিচয় দিলেন ওই এলাকার ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগের এক কেন্দ্রীয় নেতার ভাতিজা হিসেবে। এখন চাকরি করছেন। ঠিক একই কথা শুনি পল্লবীর পেছনের মোল্লা বস্তিতে।
দুপুর ১২টার দিকে বস্তির তিন ফুট চওড়া গলি দিয়ে হক ও মোল্লাহর প্রচার মিছিলের পেছন পেছন হাঁটছি। টিনের ঘরের দরজায় দাঁড়ানো এক নারী গলা চড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘গার্মেন্টস বন্ধ সেই কোরবানির টাইমে, খামু, না ভোট দিমু?’ বাচ্চা কোলে গজগজ করতে করতে তিনি চলে গেলেন বস্তির আরও ভেতরে। সরু রাস্তার সরু মিছিলের এক যুবক বললেন অন্য কথা। তাঁর বিচারে মোল্লা বস্তির বেশির ভাগ ভোট আনিসুল হকই পাবেন। মোল্লা মার্কেটের মাছের ব্যবসায়ী হামিদ পাশে পাশে হাঁটছিলেন। ‘কারে ভোট দিবেন’ জানতে চাইলে বলেন, ‘ঠিক করি নাই।’ ভোটের আগে মানুষ সত্যটা বলতে চায় না। বলে, ‘কী জানি’ কিংবা ‘আল্লায় জানে’ অথবা ‘দেখি’। অভিজ্ঞ মানুষ মাত্রই বুঝবে, এই ভাষা নিজেকে লুকানোর ভাষা। এবারে ঢাকার ভোটাররা অনেক সাবধানি। তা হলেও অনেক চাপাচাপির পর মুখ খুললেন হামিদ। তাঁর হিসাবে ওই বস্তির বেশি ভোট বিএনপির প্রার্থীর দিকেই যাবে। ভোট কে বেশি পাবেন, সেটা দেখার জন্য ২৮ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তবে পরিচিতি ও লোকবলে আনিসুল হকই যে এগিয়ে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
তাঁর কাছ থেকে সরে অন্য এক পুরুষকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনাদের বস্তিতে টেবিল ঘড়ি মার্কার ভবিষ্যৎ কেমন?’ উত্তর এল, ‘আল্লায় জানে, তবে চোরের হাতে দিছে সব মাতব্বরি।’ এই সব অভিজ্ঞতা থেকে ভোলা বস্তির সামনের রাস্তায় পথসভার আগে আনিসুল হককে জিজ্ঞাসা করি, ‘কারওয়ান বাজারে খালেদা জিয়ার গাড়িতে হামলাকারীদের একজন আপনার পাশে দাঁড়িয়ে টেবিল ঘড়ি মার্কার প্রচার করছে, এমন ছবি গণমাধ্যমে এসেছে। আজ যাদের নিয়ে আপনি ঘুরলেন, এলাকায় তাদের ভাবমূর্তি বিষয়ে কি আপনি সতর্ক?’
উনি বললেন, ‘এত লোক আমার সঙ্গে ঘোরে। এদের সবার ব্যাপারে তো খোঁজ নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। আমার নজর সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের দিকে। ’
প্রশ্ন: আপনি তো অনেকগুলো জরিপের ভিত্তিতে প্রচার চালাচ্ছেন, তাহলে এ ব্যাপারে কেন জরিপ করেননি?
উত্তর: আমি ঢাকার সমস্যার ওপর জরিপ করেছি, প্রতিদিন ১০ হাজার মানুষের কথা রেকর্ড করছে আমার লোকেরা। তবে সন্ত্রাসীদের ওপরে কোনো জরিপ করিনি।
প্রশ্ন: মুসলিম বাজারের যে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের দরজায় দাঁড়িয়ে আপনি বক্তব্য দিয়েছেন, সেই জমিটা তো পার্কের। মেয়র নির্বাচিত হলে কি আপনি মাঠঘাট-জলাশয় দখলমুক্ত করতে পারবেন? তখন কি দখলদার-সন্ত্রাসীদের আপনার পাশ থেকে সরাতে পারবেন?
উত্তর: আমার ওপর ভরসা রাখেন।
তাঁর এক পাশে তখনো মিরপুরের প্রতাপশালী সাংসদ ইলিয়াস মোল্লাহ, অন্য পাশে যুবলীগ নেতা নিখিল। এলাকায় এই দুজনকে নিয়েই অনেক বিতর্ক আছে।
সব কাজেরই ভালো ও মন্দ দুই দিকই আছে। আনিসুল হক যে উদ্যম আর স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন, তারও ভালো-মন্দ আছে। মুসলিম বাজার থেকে মিছিল নিয়ে আধা কিলোমিটার এগোতেই ডান দিকে পড়ল ঈদগাহ মাঠ। বাচ্চারা সেখানে ক্রিকেট খেলছিল। আনিসুল হক হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে ব্যাট হাতে নিলেন। জটলা তাঁকে ঘিরে হাততালি দিতে থাকল। কেউ একজন বল করল। তিনি সপাটে ব্যাট চালালেন। বল উড়ে চলে গেল অনেক দূরে। সবাই খুব খুশি। খেলা ছেড়ে আবার তিনি মিছিল নিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। হঠাৎ কিশোর বয়সী একটি ছেলে চিৎকার করে বলল, ‘বল হারাই গেছে।’
সেই মাঠের পাশেরই একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল কাইয়ুম। তিনি পরিষ্কার কণ্ঠে বললেন, ‘আনিসুল হক উপস্থাপক ছিলেন। মানুষ হিসেবে ভালো। আমার ভোট আমি তাঁরেই দিব।’ রূপনগরের কাছের এক সবজি বিক্রেতাকে টেবিল ঘড়ি মার্কার পোস্টার দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করি, ‘কেমন করবেন এই প্রার্থী?’ হাসতে হাসতে বললেন, ‘ভালো ভালো।’
মোল্লা বস্তি ও ভোলা বস্তি পেরোলে উর্দুভাষী বিহারিদের সেই কালশী বস্তি। গত বছর শবে বরাতের রাতে এক পরিবারের সাতজনসহ ১০ জন মানুষকে সেখানে পুড়িয়ে মারা হয়। অভিযোগের আঙুল ওঠে স্থানীয় প্রভাবশালীদের দিকে। কালশী পেরোলেই নতুন সুন্দর-শোভন বিলাসী আবাসন ডিওএইচএস। আরেক দিকে নতুন ফ্লাইওভার চলে গেছে বনানী-গুলশান ও উত্তরার দিকে। একদিকে বস্তি, ভূমি-জলা দখল, সন্ত্রাস এবং নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কষ্টের চলাফেরা; অন্যদিকে তিলোত্তমা ঢাকা। যিনিই মেয়র নির্বাচিত হবেন, কষ্টের ঢাকাকে তিনি কি সুখের ঢাকার কাছে নিতে পারবেন? নাকি যে জীবন স্বস্তির, সামর্থ্যের, তার সঙ্গে কষ্টের জীবনের কখনো হবে নাকো দেখা? অনেক ভোটারের মনে এই প্রশ্নই আজ জাগ্রত।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

‘ভোটের সাথে চাওয়া–পাওয়ার সম্পর্ক নাই’ by মশিউল আলম

এলাকায় প্রচারাভিযানে আফরোজা আব্বাস
পরনে নরম ঘিয়ে রঙের খদ্দরের সালোয়ার-কামিজ, মাথা ও গলায় জড়ানো বর্ণিল স্কার্ফ, চোখে আয়ত কালো ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। বৈশাখের ঝলমলে রোদে তিনি হেঁটে চলেছেন পুরান ঢাকার বকশীবাজার, উর্দু রোড, চকবাজারের খাজে দেওয়ান ইত্যাদি এলাকার অলিগলি, তস্য গলি। তাঁর হাতে লিফলেট, সামনে যাকে পাচ্ছেন হাসিমুখে সালাম দিয়ে তার হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন একটা করে লিফলেট। সচিত্র সে লিফলেটে লেখা রয়েছে: ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন ২০১৫, “আদর্শ ঢাকা আন্দোলন” মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী জননেতা মির্জা আব্বাসকে মগ মার্কায় ভোট দিন।’
তিনি মির্জা আব্বাসের সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাস, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চলমান প্রচারাভিযানে এক ব্যতিক্রমী প্রচার নেত্রী। ব্যতিক্রমী এই কারণে যে তাঁর স্বামী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস একমাত্র মেয়র পদপ্রার্থী, যিনি আত্মগোপনে বলে নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অংশ নিতে পারছেন না এবং সে কারণে তাঁর সহধর্মিণীকেই নামতে হয়েছে এই কষ্টকর ও ঝক্কিপূর্ণ কাজে।
আফরোজা আব্বাস তাঁর স্বামীর জন্য প্রচারাভিযান শুরু করেছেন ৮ এপ্রিল সকাল থেকে। প্রতিদিন সকাল সাড়ে আটটা থেকে শুরু করে রাত সাড়ে নয়টা পর্যন্ত তিনি হেঁটে চলেন ঢাকা দক্ষিণের পাড়া-মহল্লার অলিগলি। সিটি নির্বাচনে মেয়র পদের জন্য কোনো নারী প্রার্থী হননি, মির্জা আব্বাসের প্রতিনিধি হিসেবে আফরোজা আব্বাসই একমাত্র নারী, যাঁকে প্রায়-মেয়র পদপ্রার্থী বলে মনে হচ্ছে। কোনো কোনো সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞাসা করছেন ‘মেয়র নির্বাচিত হলে আপনি ঢাকা দক্ষিণের জন্য কী করবেন?’
মঙ্গলবার বেলা ১১টায় তাঁর জনসংযোগ মিছিলের পিছু নিই পুরান ঢাকার বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসার পাশের এক কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে। এটি সিটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ড। এর আগে তিনি সকাল নয়টা থেকে জনসংযোগ করেছেন পার্শ্ববর্তী ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে।
বকশীবাজারের ওই গলিতে দেখলাম, জনা পঞ্চাশেক কর্মী-সমর্থক রয়েছেন তাঁর সঙ্গে, শক্ত-সমর্থ কয়েকজন হাতে হাত ধরে তাঁকে ঘিরে ধরে চলেছেন, তাঁদের পিছু পিছু স্লোগান দিতে দিতে চলেছেন অন্য নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। তাঁদের হাতে হাতে লিফলেট, একজনের হাতে ধবধবে সাদা সোলার বোর্ডে কালো কালিতে আঁকা একটা মগের ছবি। একজন বহন করে চলেছেন পানিভর্তি একটা জেরিক্যান। প্রচণ্ড রোদে দরদর করে ঘামছেন প্রত্যেকে, ঘামে চকচক করছে তাদের কপাল। চোখে-মুখে দারুণ উত্তেজনা।
স্টিল ফটো ক্যামেরা ও ভিডিও ক্যামেরাসহ আছেন বেশ কিছুসংখ্যক সাংবাদিক। সেই ভিড়ে দেখলাম, ভিডিও ক্যামেরা হাতে বিটিভির একজন সাংবাদিকও আছেন। মির্জা আব্বাসের কর্মীদের মধ্য থেকে কেউ কেউ পেছন থেকে ডাকছিলেন, ‘ওই বিটিভি, ওই বিটিভি, ছবি যে নিতাছেন, প্রচার তো করবেন না!’
অবশ্য তাঁদের এই তির্যক কথাগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছিল কর্মীদের স্লোগানের নিচে: ঢাকার ছেলে আব্বাস ভাই/ মগ মার্কায় ভোট চাই; ভোট চাই ভোটারের/ দোয়া চাই সকলের ইত্যাদি। গলির দুই পাশে সারি সারি দোকানের লোকজন উৎসুক চোখে তাকাচ্ছেন, কেউ কেউ হাসিমুখে হাত নাড়ছেন, মাথা দোলাচ্ছেন। আফরোজা আব্বাস কোনো কোনো দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ে সালাম দিয়ে লিফলেট এগিয়ে দিচ্ছেন, দোয়া চাইছেন, তারপর হাসিমুখে বেরিয়ে এসে আবার হেঁটে চলেছেন।
উর্দু রোডের এক জায়গায় পৌঁছে তিনি ঢুকে পড়লেন বেশ চিকন একটা গলির ভেতরে, কর্মীদের সবাই সেখানে ঢুকতে পারলেন না, তাঁরা গলিতে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে লাগলেন। আমি কষ্ট করে গলিটির ভেতরে ঢুকে একটু এগোতেই দেখতে পেলাম একটা মন্দির। আফরোজা আব্বাস মন্দিরের ভেতরে ঢুকে সেখানকার লোকজনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন, লিফলেট দিলেন, তারপর বেরিয়ে এলেন। ফুরসত পেয়ে কজন সাংবাদিক তাঁকে ঘিরে ধরে প্রশ্ন করতে লাগলেন। একজন জানতে চাইলেন, ‘প্রচার করতে নেমে আপনি কেমন সাড়া পাচ্ছেন?’ উত্তরে আফরোজা আব্বাস বললেন, ‘ভালো সাড়া পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের কর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে। প্রতিদিনই মিছিলের পর তিন-চারজন কর্মীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমি কোনো বাসায় ঢুকলে পরে পুলিশের লোকেরা সেই বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে। সব রকম উপায়ে আমাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে।’
সেখান থেকে বেরিয়ে আবার শুরু হলো হাঁটা। মিছিলের ভিড়ে প্রচণ্ড ঠেলাঠেলিতে পথচলা দায়। কর্মীরা কেন নিজেদের মধ্যে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি করছিলেন, তা আমার বোধগম্য হলো না। একজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, এমন ধাক্কাধাক্কির কারণ কী। তিনি আমার সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে মৃদু হেসে বললেন, ‘আপনি সামনে আগায়া যান, আপার আগে আগে থাকেন। পিছে এই ঠেলাধাক্কা সামলাইতে পারবেন না।’
কিন্তু কেন এই ‘ঠেলাধাক্কা’? আমি জানতে চাইলাম, পেছন থেকে মিছিলের ওপর আক্রমণের আশঙ্কা আছে কি না?
‘কিছুই বলা যায় না।’
‘এর আগে কি সে রকম কিছু ঘটেছে? ’
‘মিছিলে অ্যাটাক করে নাই। কিন্তু যেসব নেতা-কর্মী প্রচারে একটু বেশি অ্যাকটিভ, তাদেরকে হয়রানি করা হইতেছে। রাত্রেবেলা তারা বাসায় থাকতে পারে না। তাদের বাসায় তল্লাশি করা হইতেছে। আর দ্যাখেন, মির্জা আব্বাসের পোস্টার কম। আমরা পোস্টার লাগাই, আর আওয়ামী লীগের লোকজন আমাদের পোস্টার ছিড়্যা ফেলে।’
বকশীবাজারের সেই কমিউনিটি সেন্টারের পাশ থেকে আসার সময় অলিগলিতে টানা দড়িতে ঝোলানো অজস্র পোস্টার দেখতে পেয়েছি, সেগুলোর অধিকাংশই ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থীদের পোস্টার। মেয়র পদপ্রার্থীদের পোস্টার চোখে পড়েছে কদাচিৎ। যেমন বিরল মির্জা আব্বাসের পোস্টার, তেমনি আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী সাঈদ খোকনের পোস্টারও চোখে পড়েছে কম।
মিছিলটা সামনে এগিয়ে গেলে আমি একটু থামি। আশপাশের দোকানগুলোতে ঢুঁ মারি, যেখানে যেখানে আফরোজা আব্বাস এইমাত্র তাঁর স্বামীর হয়ে লিফলেট দিয়ে গেছেন। এক বয়স্ক দোকানিকে জিজ্ঞাসা করি, ‘ভোট দিতে যাবেন?’
তিনি হেসে বললেন, ‘কত দিন পর ভোট হইতেছে, যাব না কেন?’
‘যাঁকে মেয়র পদে ভোট দেবেন, তাঁর কাছে আপনি কী চান?’
তিনি হেসে বললেন, ‘শোনেন, ভোটের সাথে চাওয়া-পাওয়ার সম্পর্ক নাই।’
‘কিছুই চান না? তাহলে রোদের মধ্যে কষ্ট করে ভোট দিতে যাবেন কেন?’
এবার তিনি বললেন, ‘চাই তো অনেক কিছুই। কিন্তু চাইয়া তো লাভ নাই। পাবলিকের চাওয়ায় কিছু আসে যায় না।’
‘আপনার যে অনেক কিছু চাওয়ার আছে, এটা কি মির্জা আব্বাস সাহেবের ওয়াইফকে বললেন?’
‘তাই কি বলা যায়?’
এক সুযোগে আফরোজা আব্বাসকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি যে লোকজনের কাছে আপনার স্বামীর জন্য ভোট চাচ্ছেন, তো ভোটাররা আপনার কাছে কী চাচ্ছে?’
উত্তরে তিনি বললেন, আমার প্রশ্নটা অত্যন্ত ভালো একটা প্রশ্ন। তারপর বললেন, ‘কোনো ভোটার এ পর্যন্ত কিছু চায়নি। কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেনি, আপনি ভোট চাচ্ছেন, তার বিনিময়ে আপনার স্বামী আমাদের জন্য কী করবেন। সবাই আমাকে বলেছেন, আমরা ভোট দিতে চাই। গুম-খুনের রাজত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমরা ভোট দিতে চাই। পরিবর্তনের জন্য আমরা ভোট দিতে চাই।’
মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এটা যেন নগরবাসীর সুখ-দুঃখ দেখভালকারী নির্বাচনের লড়াই নয়, আমি যেন প্রত্যক্ষ করছি জাতীয় রাজনীতির ভোটযুদ্ধ, যেখানে সরকারবিরোধী পক্ষটি মনে করছে জনগণ যে সরকারের পাশে নেই, তা দেখিয়ে দেওয়ার একটা বিকল্প সুযোগ তাদের সামনে এসে গেছে। সেই সুযোগ তারা ছাড়তে রাজি নয়, এটা বোঝা গেল আফরোজা আব্বাসের পরের কথাগুলো শুনে: ‘মির্জা আব্বাসকে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার আসামি করে, তাঁকে জামিন না দিয়ে, তাঁকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে, আমাদের ওপর হয়রানি করে, নানা পন্থায় সরকার আমাদের নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চাচ্ছে। সরকার চাচ্ছে আমরা যেন নির্বাচন বর্জন করি। কিন্তু আমরা সেটা কোনোভাবেই করব না।’
তিনি শেষের বাক্যটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে কর্মীরা জোরে স্লোগান দিয়ে উঠলেন।
মিছিলের পেছনে ঘুরে ঘুরে, সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, মির্জা আব্বাস ও সাঈদ খোকনের মধ্যে ভোটযুদ্ধ সম্পর্কে ভোটারদের মনোভাব কী। সমর্থনের পাল্লা কোন দিকে ভারী। কিন্তু মাত্র ঘণ্টা দুয়েক ঘুরে ও কথাবার্তা বলে সেটা অনুমান করা প্রায় অসম্ভব। সমর্থনের ঢেউ বা জোয়ার বলে যে একটা কথা শোনা যায়, সেটা এখনো কোনো পক্ষেই স্পষ্ট হয়ে জেগে ওঠেনি। আফরোজা আব্বাসের দিকে হাসিমুখে হাত নাড়া কিংবা সায় দিয়ে মাথা দোলানো দেখে সম্ভবত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে এই ভোটারদের সবাই মির্জা আব্বাসের মগ মার্কায় ভোট দেবেন। জানি না, সাঈদ খোকনের নির্বাচনী প্রচার মিছিলের সময়ও এই ভোটাররা একইভাবে হাসিমুখে হাত নাড়েন কি না, একইভাবে সায় দিয়ে মাথা দোলান কি না।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul. alam@gmail. com

বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সরকারই দায়ী -সাক্ষাৎকারে নজরুল ইসলাম খান by শরিফুজ্জামান

গত তিন মাসের মধ্যে প্রায় দেড় মাস গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার সঙ্গে অবস্থান করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। ৫ এপ্রিল খালেদা জিয়ার সঙ্গে গুলশান কার্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে ভর্তি হন। দলীয় কার্যালয়ে তাঁর অবস্থানের দিনগুলো, আন্দোলনের প্রাপ্তি, সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে হাসপাতালে বসেই তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে।. সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শরিফুজ্জামান
প্রথম আলো . তিন মাসের এই আন্দোলন সফল না ব্যর্থ?
নজরুল ইসলাম খান . তিন মাসের আন্দোলনে সফলতা ও ব্যর্থতা দুই-ই আছে। এই সময়ে দলটি দেশে-বিদেশে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পেরেছে। তা ছাড়া, এই আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা নিজ দলের শক্তি ও সামর্থ্য বুঝতে পেরেছি। সরকারের মনোভাব ও অবস্থান সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে আমি এই আন্দোলনকে ব্যর্থ বলব না।
প্রথম আলো . প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের একাধিক মন্ত্রী বলছেন, আপনাদের এই আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। আপনাদের মূল্যায়ন কী?
নজরুল ইসলাম খান . সফলতা বলতে তাঁরা কী বোঝান, জানি না। আমরা তো আর এখনই সরকার ফেলে দেওয়ার আন্দোলন করিনি। দেশে-বিদেশে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি প্রতিষ্ঠিত ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আমরা সরকারের মধ্যে বড় ধরনের ভীতি লক্ষ করেছি। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হলে তাদের এমন ভয় থাকত না।
প্রথম আলো . প্রায় দেড় মাস বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের ভেতর কেমন ছিলেন?
নজরুল ইসলাম খান . চেয়ারপারসনসহ আমরা ৬২ জন নেতা-কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী সেখানে থেকেছি। একটি কার্যালয়ে এত দিন ধরে এতগুলো মানুষের খাওয়া, গোসল, ঘুমানোর বিষয়টি কতটা কষ্টকর ছিল, তা বলে বোঝানো যাবে না। ব্যাকপেইনসহ কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ায় আমাকে চেয়ারপারসন হাসপাতালে যেতে বলেন। আরও কয়েকজন অসুস্থ হন। কিন্তু আমরা কেউই ওনাকে ফেলে যেতে চাইনি। শেষ পর্যন্ত তিনি আমার উপযোগী একটি ক্যাম্প খাট জোগাড় করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
প্রথম আলো . বাসা ছেড়ে চেয়ারপারসন ও আপনারা দলীয় কার্যালয়ে থাকতে গেলেন কেন? বাসায় থেকে কি আন্দোলন করা যেত না?
নজরুল ইসলাম খান . চেয়ারপারসন তো আর ইচ্ছা করে সেখানে থাকেননি। নিশ্চয়ই সবার মনে আছে, তাঁকে বের হতে দেওয়া হয়নি। তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে কার্যালয়ের ভেতরে রেখে ফটক আটকে দেওয়া হয়েছিল। সেই তালা যখন ভিন্ন উদ্দেশ্যে খুলে দেওয়া হয়, তখন তিনি আর বের হননি। এ ছাড়া দলের নেতা-কর্মীদের ওপর অন্যায়ভাবে যে নিপীড়ন চালানো হচ্ছিল, যেভাবে তাদের বাড়িঘর ছেড়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল, তাদের সঙ্গে সহমর্মিতা প্রকাশ করার জন্যই তিনি তিনটি মাস একটিমাত্র কক্ষে অবস্থান করেছিলেন।
প্রথম আলো . আপনাদের আন্দোলন চলার সময় এতগুলো নিরীহ মানুষ মারা গেল। এর দায় কি আপনাদের নয়?
নজরুল ইসলাম খান . এতগুলো মানুষের মৃত্যু দুঃখজনক। কিন্তু বিএনপির আন্দোলন চলাকালে তারা মারা গেছে বলে এই দায় বিএনপির ওপর চাপানো ঠিক নয়। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার অন্যায় আগ্রহ গোটা ঘটনার জন্য দায়ী। বিএনপির পক্ষ থেকে এসব সহিংসতার নিন্দা ও দায়ীদের গ্রেপ্তারের দাবি করা হয়েছে। কিন্তু তা না করে বিএনপি ও ২০ দলের নেতা-কর্মীদের আটক করে ক্রসফায়ারের নামে খুন করেছে, পায়ে গুলি করে পঙ্গু করেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও একই কায়দায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার হয়নি, বিচারও করা হয়নি। কেন? তাহলে প্রমাণ হতো সরকারি দলের লোকজনই এসব ঘটিয়েছে।
প্রথম আলো . নাশকতার সময় বিএনপি, যুবদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী আটক হয়েছেন। দায় এড়াবেন কীভাবে?
নজরুল ইসলাম খান . সারা দেশে এতগুলো পেট্রলবোমা মারা হলো, কিন্তু হাতেনাতে বিএনপির কেউ ধরা পড়ল না। র্যাব-পুলিশের হাতে ধরা পড়লে তারা যেভাবে ঘটনা সাজাতে চায়, সেভাবেই হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর থেকে পেট্রলবোমাসহ বোমা বানানোর জিনিস, বেআইনি অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের যেসব খবর বের হয়েছে, তার কি কোনো বিচার হয়েছে। আমরা কাউকে বোমা মারতে বলিনি, এর দায় আমরা কেন নেব?
প্রথম আলো . কিন্তু মীর নেওয়াজ আলীর বাড়ি থেকে তো পেট্রলবোমাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
নজরুল ইসলাম খান . ওই বাড়িতে তাঁদের কেউ থাকতেন না। ওটা ছিল তাঁদের মালিকানাধীন ভাড়া বাড়ি। নিজের বাড়িতে কেউ এমন শক্তিশালী বিস্ফোরক রাখবে না। তা ছাড়া, এ ধরনের শূন্য ফ্ল্যাটে অভিযানের সময় শনাক্ত করার জন্য বাড়ির মালিক বা তাঁর প্রতিনিধি অথবা প্রতিবেশী কাউকে সঙ্গে নেওয়া হয়নি। কিন্তু টিভি ক্যামেরা ছিল। কারণ, ঘটনাটি ছিল সাজানো। এবং উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো।
প্রথম আলো . বিএনপির চেয়ারপারসন হরতাল-অবরোধ ডাকলেন। একটি বড় বিক্ষোভ-সমাবেশ করার ক্ষমতা কি দলের নেই?
নজরুল ইসলাম খান . আসলে বিএনপির নেতা-কর্মীরা শান্তিপ্রিয়। বিএনপি একটি সমাবেশ করলে প্রচুর লোকসমাগম হয়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমাবেশেও এত মানুষ হয় না। কিন্তু বিএনপির সমাবেশে বোমা-ককটেল ফুটলে অর্ধেক সমর্থক চলে যায়, পুলিশ গুলি করলে সমাবেশ ফাঁকা হয়ে যায়। তাই বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও আইনি অস্ত্রের বেআইনি প্রয়োগের মুখে দলটি মাঠ দখলে রাখার রাজনীতির ক্ষেত্রে একটু পিছিয়ে। বিএনপি কিংবা ২০ দলের দু–চারজন কর্মী কোথাও এক হলেই সেখানে গুলি করা হয়। এ অবস্থায় বিক্ষোভ সমাবেশ করা কঠিন হলেও আমাদের কর্মীরা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে, গুলি খেয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছে।
প্রথম আলো . বিএনপির অবস্থান কিছুটা নমনীয় বলে মনে করেন কি? তৃতীয় পক্ষ এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে বলে গুঞ্জন আছে।
নজরুল ইসলাম খান . তৃতীয় কোনো পক্ষের এমন উদ্যোগ নেওয়ার কথা আমি জানি না। তবে শান্তি ও স্থিতিশীলতা সবার জন্য, বিশেষ করে সরকারের জন্য খুবই প্রয়োজন। কিন্তু এ জন্য যে ধরনের আচরণ ও যৌক্তিক কার্যক্রম থাকা দরকার, তা সরকারের ছিল না। সরকার দেরিতে হলেও এটা হয়তো কিছুটা বুঝতে পেরেছে।
প্রথম আলো . তিন মাসে খালেদা জিয়া না লন্ডন থেকে তারেক রহমান আন্দোলন পরিচালনা করেছেন?
নজরুল ইসলাম খান . তারেক রহমানের সঙ্গে তৃণমূলের যোগাযোগ বেশ ভালো। এমনকি আমাদের অনেক নেতার চেয়েও তিনি বেশি যোগাযোগ রাখতেন। তাই বলে তিনি বিদেশে থেকে আন্দোলন পরিচালনা করেছেন, এটা ঠিক নয়। বিএনপির চেয়ারপারসন সবার সঙ্গে আলোচনা করেই কর্মসূচি ঠিক করেছেন এবং আন্দোলন পরিচালনা করেছেন। তারেক রহমানকে যারা ভয় পায়, তারা এসব কথা ছড়ায়।
প্রথম আলো . আন্দোলন থেকে হঠাৎ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণ কী?
নজরুল ইসলাম খান . বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে এই নির্বাচনে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত। এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি তাদের দাবি, যুক্তি ও গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরতে চায়।
প্রথম আলো . তিন সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে মনে করেন?
নজরুল ইসলাম খান . নির্বাচন কমিশন যে ধরনের অনুগত প্রতিষ্ঠান, তাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে সংশয় থেকে যায়। তা ছাড়া, প্রধানমন্ত্রী যেভাবে চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন চৌধুরী ও ঢাকায় হাজি সেলিমকে বসিয়ে দিলেন, তাতে বোঝা যায়, দলটি এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। যেকোনো উপায়ে তাদের জেতার চেষ্টা থাকবে। তবে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি, ভোটারদের সচেতনতা ও গণমাধ্যমের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন হবে। তার পরও দুশ্চিন্তা হলো, এই সরকার সমালোচনার পরোয়ানা করে না। ভোটারবিহীন ও প্রার্থীবিহীন নির্বাচন করেও তারা দাবি করে যে জনগণের রায় নিয়ে তারা ক্ষমতায় আছে। এই নির্বাচনেও ভোট না পেয়ে তারা আবার জনগণের রায় পেয়েছে বলে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে এটা তাদের জন্য বেশ বড় ঝুঁকি হবে।
প্রথম আলো . ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে একাদশ নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা বা সমঝোতা কি হয়েছিল? তারানকোর উপস্থিতিতে দুই দলের মধ্যে কী কথা হয়েছিল?
নজরুল ইসলাম খান . অস্কার ফার্নান্দো তারানকোর উপস্থিতিতে দশম নির্বাচনের আলোচনা সফল হয়নি। সরকার বলেছিল, সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য নির্বাচন পেছানো সম্ভব নয়, যদিও সুযোগ ছিল। তবে সর্বশেষ কথা ছিল, পরবর্তী নির্বাচনের জন্য আলোচনা অব্যাহত থাকবে। কিন্তু গত সোয়া বছরে সরকার আলোচনায় বসতে চায়নি। এমনকি ওই নির্বাচনের আগে-পরে সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রীগণ শিগগিরই একাদশ নির্বাচনের কথা বললেও এখন দেখিয়ে দেওয়া হচ্ছে ২০১৯ সাল। সরকারি দলের এই অবস্থান পরিবর্তন জনগণকে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে।
প্রথম আলো . বিএনপি মানবতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে, সোজা কথায় জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে কি? একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই গাঁটছড়া কি আপনাকে পীড়া দেয় না?
নজরুল ইসলাম খান . এটা করতে হলে তো আলোচনা করতে হবে। শুধু যুদ্ধাপরাধী কেন, দুর্নীতি, অনাচার রোধ, সন্ত্রাস, বেকারত্ব, কৃষি ও শিল্প উন্নয়ন, পরীক্ষার সময় কেউ হরতাল করতে পারবে না, যারা সরকারে থাকবে, তাদের আচরণ কেমন হবে, বিরোধীদের প্রতি সরকারের বা সরকারের প্রতি বিরোধীদের আচরণ কেমন হবে—এসব বিষয়েও আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজন। কিন্তু তার আগে প্রয়োজন এই বিষয়ে একমত হওয়া যে দেশের সরকার নির্বাচিত হবে জনগণের সমর্থনে। আর এ জন্য সব দলের অংশগ্রহণে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিকল্প নেই। একজন সক্রিয় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি অবশ্যই মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী, গণতন্ত্র হত্যাকারী, স্বৈরাচারী এবং ক্ষমতায় থাকা বা যাওয়ার জন্য মানুষ খুনের বিপক্ষে। এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই তো আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। এসব পাওয়ার জন্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিকল্প নেই। এ জন্য সরকার আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি না করার সুযোগ খুঁজলে তো কিছুই হবে না।
প্রথম আলো . আপনাকে ধন্যবাদ।
নজরুল ইসলাম খান . ধন্যবাদ।

জার্মান সুন্দরীর সঙ্গে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রোমান্স

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা সলমন খুরশিদের জার্মান সুন্দরীর সঙ্গে রোমান্সের খবরে নেটদুনিয়ায় ঝড় উঠেছে। তুখোড় রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত সলমন খুরশিদের মনে যে এত রস ছিল তা জানা সম্ভব হয়েছে  ভারতের জার্মান দূতাবাসের সৌজন্যে। খুরশিদের  রোমান্সের নেপথ্য নায়ক শাহরুখ খান। করণ জোহর পরিচালিত ও শাহরুখ ও সাইফ আলী খান অভিনীত ’কাল হো না হো’-র জনপ্রিয় এই গানটির ভিডিও  তৈরি করেছেন জার্মান রাষ্ট্রদূত মাইকেল স্টেইনার। আর এতেই সাইফ আলী খানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন খুরশিদ। ভিডিওতে প্রীতি জিনতা-রূপী মাইকেলের স্ত্রী অ্যালিসের সঙ্গে ‘কাল হো না হো’র ছন্দে পা মিলিয়েছেন খুরশিদ। স্টেইনার স্বয়ং রয়েছেন শাহরুখ খানের চরিত্রে। গত শুক্রবারই নয়াদিল্লির  জার্মান দূতাবাসে ভিডিওটির মোড়ক উন্মোচন হয়েছে সাইফ আলী খান, তার মা শর্মীলা ঠাকুর ও জাভেদ আকতারের উপস্থিতিতে। করণ জোহর ও শাহরুখ ভিডিও বার্তায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। জার্মান রাষ্ট্রদূত মাইকেল  স্টেইনারের বলিউড-প্রীতি দীর্ঘদিনের। তাই সস্ত্রীক অভিনয়ের ডেব্যুতেও থাকল জাভেদ আখতারের কথায় সোনু নিগমের সুরের ‘কাল হো না হো’ গানটি। সাইফ আলী খানের মতো ‘রিল লাইফ’-এর ঘনিষ্ঠতা ভিডিও শ্যুটে তুলে ধরা সলমন খুরশিদের কাছেও ছিল বেশ চ্যালেঞ্জের। রাজনীতির ময়দানের মতোই রিল লাইফের রোমান্সেও খুরশিদ যে ছক্কা হাঁকাতে পেরেছেন তাই নিয়েই যত আলোচনা। আর সেই আলোচনার খবর কানে পৌঁছুতেই ৬২ বছরের পক্ককেশ সলমনও লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছেন। তবে ভিডিও দেখে জাভেদ আকতারের সরস মন্তব্য: ভিডিওটি আমার ভয়ঙ্কর সন্দেহ সত্যি বলে প্রমাণ করেছে। আমি সবসময় সন্দেহ করতাম যে, রাজনীতি ও কূটনীতিকরা হলেন এক একজন অভিনেতা। আর এই মিউজিক ভিডিও হলো তারই ডকুমেন্টারি প্রমাণ।

অসমাপ্ত এক সংলাপ by দ্বিজেন শর্মা

রেইনট্রির নিচে লেখক দ্বিজেন শর্মা
ঢাকা শহরের গাছপালা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ফিল্ম ইনস্টিটিউটের কিছু তরুণের সঙ্গে কথা বলতে দিন কয়েক আগে পুরোনো পাবলিক লাইব্রেরির পেছনের চত্বরে হাজির হই এবং সেখানকার বিশাল এক রেইনট্রির তলায় তাদের খুঁজে পাই। বহুদিন এদিকে আসিনি, তাই সবই বড় অচেনা লাগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ছাত্র ছিলাম (১৯৫৬-৫৮) তখন এই লাইব্রেরির নির্মাণ সবে শুরু হয়েছে এবং চারুকলা ইনস্টিটিউট ছাড়া শাহবাগ পর্যন্ত কোনো দালানকোঠা ছিল না। সম্ভবত এলাকাটি ছিল গাছগাছালি ভরা। গোটা দৃশ্যপট এখন পাল্টে গেছে, ছেলেমেয়েরা ঘুরে বেড়াচ্ছে, অথচ আমাদের সময় কার্জন হলের চত্বরই দিনমান প্রায় শূন্য থাকত।
গাছের নিচে রাখা একটি বেঞ্চিতে বসলাম, সামনে স্ট্যান্ডে বসান ঢাউস ক্যামেরা আমার দিকে তাক করা। তার দিয়ে আমাকে একটি মাইক্রোফোনের সঙ্গে যুক্ত করে সেটি আমার পকেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। আকাশে মেঘের ঘনঘটা। তাড়া দিলাম এবং একটি ছেলে এসে আমার পাশে বসল। শুরু হলো সংলাপ।
বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরের গাছপালা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলুন।
আমাদের তাহলে ফিরতে হবে ১৯০৫ সালে, যখন পূর্ববঙ্গ ও আসাম একত্র করে ঢাকায় নবগঠিত এই প্রদেশের রাজধানী নির্মাণ হতে চলেছে রমনা এলাকায়, আর তাতে ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর গোটা রমনা গ্রিন, বর্তমান সচিবালয় ও নীলক্ষেত। ১৯১১ সালে নতুন এই প্রদেশ গঠনের পরিকল্পনা পরিত্যক্ত হয় এবং পরিকল্পিত রাজধানীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১)। মন্ত্রীদের যে বাড়িগুলো দেখ, সেগুলোতে একসময় থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। গোটা রাজধানী হস্তান্তরিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। রাজধানীর বৃক্ষসজ্জার দায়িত্ব পান লন্ডনের কিউ বোটানিক গার্ডেনের এক কর্মকর্তা আর. এল প্রাউডলক। তিনি ১৯০৮ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত এখানে কর্মরত ছিলেন। তিনি দেশি-বিদেশি গাছপালা দিয়ে শহরের পথগুলো সাজান, যার সামান্য অবশিষ্টই শুধু আজ টিকে আছে মিন্টো রোড ও হেয়ার রোডে। তাই এই এলাকার বড় বড় গাছগুলোর বয়স জানার জন্য তাঁর থাকাকালীন সময়কে ভিত্তি হিসেবে ধরা যেতে পারে, যদিও তার আগেও এখানে কিছু গাছ ছিল এবং পরেও অনেক গাছ লাগানো হয়েছে। রমনা পার্কের গাছগুলো অনেক পরে লাগানো একমাত্র কুসুমগাছের সারি এবং একটি মহুয়া ও দু–তিনটি রেইনট্রি ছাড়া। ১৯১৮ সালে প্রাউডলক দেশে ফেরেন, আমাদের জন্য রেখে যান উদ্যান-নগর নির্মাণের একটি প্রত্নকাঠামো বা আর্কিটাইপ।
—বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকা নির্মাণের সময় কি গাছপালা কাটা পড়েছিল?
—আমি তখন ঢাকায় ছিলাম না। অবশ্যই কাটা পড়েছে, শুনেছি একমাত্র বাওবাব গাছটিও রেহাই পায়নি।
—বিশ্ববিদ্যালয় ও সংলগ্ন এলাকায় গাছের সঙ্গে আপনার ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িত থাকলে সেগুলোর কথা বলুন।
—এদের কোনোটিই আর নেই। ঢাকা হলের তৃতীয় তলায় পূর্ব দিকের শেষ কক্ষে থাকতাম। কোনো কোনো রাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে মেডিকেল কলেজের সামনের গগন-শিরীষগাছের সারিগুলো দেখতাম। নিঃশব্দ চরাচর। মনে হতো ওরা গাছ নয়, অনৈসর্গিক কোনো সত্তা ক্ষণিকের জন্য সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে, উড়ে যাবে যেকেনো মুহূর্তে। ওদের থেকে চোখ ফেরাতে পারতাম না। কার্জন হল চত্বরে উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বোটানিক গার্ডেনের সীমানায় ছিল দুটি গ্লিরিসিডিয়ার গাছ, সেগুলো বসন্তের শুরুতে হালকা বেগুনি সাদা ফুলে ভরে উঠত। একটি কোকিল গাছে বসে সারা দিন অবিরাম ডেকে চলত। আমি ও আমার এক সহপাঠী প্রায়ই বিকেলে ওই গাছের নিচে বসে গল্প করতাম। একসময় গোটা এলাকা নির্জন হতো, সন্ধ্যা নামত, আমরা বসেই থাকতাম। হঠাৎ করেই মনে হতো কার্জন হলের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন এক মোগল রাজকন্যা, অপরূপ সজ্জা, পিঠে দীর্ঘ বেণি, যেন এখনই নেমে আসবেন নিচের সবুজ তৃণাঙ্গনে। প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তার সামান্য পশ্চিমে গোলচত্বরে ছিল একটি পাকুড়গাছ, তাতে পেঁচিয়ে উঠেছিল স্পেক্টাবিলিস জাতের একটি বাগানবিলাস, বেগুনি রঙের ফুলে ভরে উঠে আমাদের বসন্তের আগমনী বার্তা জানাত। এক আশ্চর্য দৃশ্য। তখন এত যানজট, মানুষজন ছিল না। লোকে দাঁড়িয়ে থেকে সেই অপূর্ব শোভা দেখত। মিন্টো ও হেয়ার রোডের মিলনস্থলের গোলচত্বরের সুগন্ধি ফুলের বিশাল নাগলিঙ্গমগাছটিও আর নেই। পার্কে বেড়াতে আসা সবাই ওই গাছটি অন্তত একবার দেখে যেতেন।
—ঢাকা এখন কংক্রিটের শহর, হারিয়ে ফেলেছে বাসযোগ্যতা। কীভাবে এই শহরের পুনরুদ্ধার সম্ভব?
—আমার জানা নেই। টিভির টক শোতে নাগরিকদের বিষণ্ন² আলাপন শুনি। মনে পড়ে ছাত্রজীবনের কথা। আমরা প্রায়ই বেড়াতে যেতাম বুড়িগঙ্গার পাড়ে এবং স্বপ্ন দেখতাম ঢাকা একদিন উদ্যান-নগর হবে। নদীর দুই পাড়ে থাকবে রয়েল পামের সারি ও নিওন বাতিশোভিত বুলেভার, জিঞ্জিরার মাঠ হবে খোলা ময়দান, সারা শহরে থাকবে প্রাউডলকের রমনা গ্রিন আদলের বৃক্ষসজ্জা—ছায়াময় মায়াময়। বর্তমান ঢাকা আজ আমাদের দুঃস্বপ্নের অতীত। ষাটের দশকের গোড়া থেকে আমি ঢাকার উন্নয়নের ধারা লক্ষ করে আসছি। যেসব উপাত্ত একটি মানবিক শহর নির্মাণকে পরাস্ত করে, সেগুলো ক্রমান্নয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে, শক্তিধর হয়ে উঠেছে। এগুলো থামানো আমাদের সাধ্যাতীত।
—তাহলে আমাদের কোনো আশা নেই?
মাথা নাড়ি, কোনো সদুত্তর খুঁজে পাই না। তখনই বৃষ্টি নামে এবং আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু হয়। বাড়ি ফেরার পথে এই আলাপন আমাকেও বিষণ্ন করে। ভাবি, বলা উচিত ছিল—আশা আছে একটিই এবং সেটি তোমরা, দেশের নতুন প্রজন্ম।
দ্বিজেন শর্মা: লেখক, নিসর্গবিদ।