Showing posts with label জঙ্গি. Show all posts
Showing posts with label জঙ্গি. Show all posts

Thursday, February 4, 2010

দলত্যাগী জঙ্গিদের নিরাপত্তা -এই হত্যাকাণ্ড চোখ খুলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট

জঙ্গি তত্পরতা রোধে সরকার কথায় যতটা কঠোর, কাজেও সে রকম হলে রাজধানীর উত্তরায় রাশিদুল ইসলাম প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হতেন না। স্ত্রীর দাবি অনুযায়ী রাশিদুলের ‘অপরাধ’, তিনি উগ্র ধর্মীয় সংগঠন নিষিদ্ধঘোষিত জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সংস্রব ত্যাগ করে ধর্মের নামে মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এ কারণে তাঁকে ডেকে নিয়ে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। মানুষ তাঁর সাহায্যে ছুটে এলে হত্যাকারীরা বোমা ফাটিয়ে চলে যায়।
নিহত রাশিদুল জেএমবির সদস্য ছিলেন এবং জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত থাকার কারণে একবার গ্রেপ্তারও হন। তিনি পুলিশের অস্ত্র লুট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি। তাঁর স্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নিজের ভুল বুঝতে পেরে এক বছর আগে জেএমবি ছেড়ে দেন এবং মসজিদে খুতবায় ও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে জেএমবির বিরুদ্ধে কথা বলতেন—এমনকি দলের অন্যদেরও সুপথে ফিরে আসার আহ্বান জানাতেন। এতে জেএমবির সদস্যরা রাশিদুলের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল বলে তাঁর স্ত্রী জানিয়েছেন। এ বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে, দেশের বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থাটিকে রক্ষা করবে কে? প্রথমত, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে যাচ্ছেন, পুলিশ তাঁর খবরও রাখে না, তাদের ভাষায় তিনি ‘পলাতক’। দ্বিতীয়ত, তিনি যে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, গোয়েন্দারা সেই খবরটুকু রাখলেও তো তাঁর নিরাপত্তার উদ্যোগ এবং এখনো কারা এই তত্পরতার সঙ্গে জড়িত, সে খবর বের করতে পারতেন। আর তৃতীয়ত, প্রকাশ্যে রাজপথে যদি এভাবে হামলা চালিয়ে খুনিরা সদম্ভে চলে যেতে পারে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা কোথায় রইল?
সোমবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তত্পরতা দমনে র্যাব ও পুলিশকে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় প্রশিক্ষণ ও অত্যাধুনিক অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে। মহানগর পুলিশের অধীনে গঠিত হয়েছে ‘সোয়াত’ (স্পেশাল ওয়েপন্স অ্যান্ড ট্যাকটিক্স) নামে বিশেষায়িত বাহিনী। প্রচলিত প্রথায় যথাযথ চুক্তির আওতায় এ ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু এর সুফল পেতে যদি দেরি হয়, তাহলে লাভ কী? এটা ঠিক যে উন্নত প্রশিক্ষণ সবেমাত্র শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় অস্ত্রশস্ত্রও অপ্রতুল। কিন্তু প্রাথমিক তত্পরতা শুরু করতে বাধা কোথায়? জঙ্গিদের হাতে দলত্যাগী জঙ্গি খুন হওয়ার পর পুলিশের চোখ খুলে যাওয়া উচিত।
শুধু বক্তৃতা-বিবৃতিতে জঙ্গি তত্পরতা বন্ধ করা যাবে না। পুলিশ যেমন এদের সহিংস তত্পরতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, তেমনি যারা জঙ্গিবাদ ত্যাগ করে সুস্থ জীবনধারায় ফিরে আসতে চায় তাদের প্রতিও যত্নবান হতে হবে। বিশেষত, তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সংগঠিত অপরাধ দমনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাক্ষীদের নিরাপত্তা কর্মসূচি (উইটনেস প্রোটেকশন প্রোগ্রাম) থাকে, আইন থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে সুপথে ফিরে আসা অপরাধীদের পুনর্বাসনের বিশেষ সুযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশে এ আইনের প্রয়োগ এত দুর্বল যে, নেই বললেই চলে। জঙ্গিদের বিষয়টি একটু ভিন্ন হলেও, যারা জঙ্গিবাদী তত্পরতা থেকে ফিরে আসতে চায়, তাদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা দরকার।
যে জঙ্গিরা রাশিদুলকে হত্যা করেছে, তাদের গ্রেপ্তার, বিচার ও আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। কাজটি বিলম্বিত না হওয়াই বাঞ্ছনীয়।

Thursday, November 26, 2009

সক্রিয় আন্তর্জাতিক জঙ্গিরা -আঞ্চলিকভাবে সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন

জঙ্গি সমস্যার নতুন এক পর্বে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। এত দিন সরকারিভাবে বলা হতো, বাংলাদেশের জঙ্গি তত্পরতা নিতান্তই স্থানীয় বিষয়, আন্তর্জাতিক জঙ্গি তত্পরতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াও তাঁর আমলে জঙ্গি দমন অনেকটা সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। গত রোববারের প্রথম আলোর সংবাদ জানাচ্ছে, একাধিক বিদেশি জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশে অবস্থান করে দেশ-বিদেশে নাশকতার পরিকল্পনায় লিপ্ত রয়েছে। সম্প্রতি ভারতীয় ও পাকিস্তানি কয়েকজন জঙ্গি নিরাপত্তা সংস্থার হাতে আটকও হয়েছে। এরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী নেটওয়ার্কের অংশ। সুতরাং আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের সদস্য সংগ্রহের পশ্চাদ্ভূমি হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, কিংবা উপমহাদেশে তাদের প্রভাব বিস্তারের মঞ্চ হিসেবে বাংলাদেশের খোলামেলা পরিবেশকে তারা কাজে লাগাচ্ছে কি না, সেটা ভাবার বিষয়।
দুজন শীর্ষ জঙ্গিনেতার ফাঁসি কার্যকর এবং অনেকের আটক হওয়ার পর ভাবা হয়েছিল, বাংলাদেশ জঙ্গিবাদী তত্পরতার হুমকি থেকে রেহাই পেয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধান বলছে, কেবল ডুবো পাহাড়ের ডগাটুকুই দৃশ্যমান, মূল দেহ রয়ে গেছে আড়ালে। সেই আড়ালের জগতে নানা জায়গায় তারা তাদের ঘাঁটি, প্রশিক্ষণের কেন্দ্র, যোগাযোগের কেন্দ্র, জাল মুদ্রার কারখানা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে যাচ্ছে। দেশ থেকে প্রায় ২০০ জন জঙ্গি কর্মী ইরাক ও আফগানিস্তানে প্রেরিত হয়েছে বলে প্রথম আলোয় সংবাদ এসেছে। গত মঙ্গলবার ভারতের কলকাতায় তিন বাংলাদেশি জঙ্গি জাল টাকাসহ আটক হয়েছে। এর আগে ভারতের হায়দরাবাদ ও মুম্বাই শহরে নাশকতার ঘটনায় বাংলাদেশি জঙ্গিদের যোগসাজশ থাকার অভিযোগও উঠেছিল। সম্প্রতি ঢাকায় দুটি বিদেশি দূতাবাসে এদের হামলার পরিকল্পনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুসন্ধানে ধরা পড়ে এবং তা ঠেকানো হয়। সর্বশেষ পাকিস্তানি ও ভারতীয় জঙ্গিদের বাংলাদেশে সক্রিয় থাকার কথাও জানা গেল।
বাংলাদেশে ভারতীয় ও পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠকদের আনাগোনার একটি কারণ, সেসব দেশের চলমান জঙ্গিবিরোধী অভিযান। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে তারা তাদের আশ্রয়কেন্দ্র ও ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে থাকতে পারে। দ্বন্দ্বমুখর গণতন্ত্র এবং সমাজজীবনে নানা ভাঙাগড়া ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আবহে বাংলাদেশের মতো দেশে চরমপন্থী মনোভাব দানা বাঁধার সুযোগ রয়েছে। তবে সংঘবদ্ধ চক্র ছাড়া শক্তিশালী তত্পরতা চালানো কঠিন। বিশেষ করে ব্যাংক, হুন্ডি ইত্যাদির মাধ্যমে এরা বিদেশ থেকেও তহবিল পেয়ে থাকে। এ জন্য বিদেশ থেকে আসা অর্থের লেনদেনে সরকারি নজরদারি প্রয়োজন।
এ অবস্থায় সরকারসহ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সামগ্রিক পরিস্থিতি নতুন করে ভাবা দরকার। আন্তসীমান্ত জঙ্গি সমস্যা মোকাবিলায় প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ ও তথ্য আদান-প্রদানও জরুরি। জঙ্গি তত্পরতার বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়াভিত্তিক সমন্বিত কার্যক্রম এ ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। রাষ্ট্রীয় কোনো স্তর থেকে জঙ্গিরা যাতে সহায়তা না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তবে এসব ব্যবস্থা যাতে মানবাধিকার খর্ব না করে, সেই বিবেচনাও রাখা শ্রেয়।

Thursday, November 12, 2009

জাতীয় নিরাপত্তা ও বহির্বিশ্বে ভাবমূর্তি যেন ক্ষুণ্ন না হয় -বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি

বাংলাদেশে তত্পর বিভিন্ন ইসলামি জঙ্গিবাদী সংগঠনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের নিবিড় সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে, এমন খবর দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই প্রকাশিত হয়। প্রথম আলোর নিজস্ব অনুসন্ধানেও এমন তথ্য বেরিয়ে এসেছে: বাংলাদেশের জঙ্গিদের অনেকেই আফগানিস্তানে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, অনেক জঙ্গি সংগঠনের অর্থের জোগান আসে বিদেশ থেকে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য ও বিপজ্জনক তথ্য হচ্ছে, বিদেশি জঙ্গিরাও এ দেশে অবস্থান করে স্থানীয় জঙ্গিদের জিহাদি শিক্ষা ও অস্ত্রচালনা এবং শারীরিক প্রশিক্ষণ দেয়, নাশকতামূলক তত্পরতার ষড়যন্ত্র করে। সম্প্রতি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা ফাঁস হওয়া এবং সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি আটকের পর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য থেকে এ দেশে বিদেশি জঙ্গিদের অবস্থান ও তত্পরতার আরও একটি প্রমাণ মিলল।
এর আগে গত মে মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মাফিয়া নেতা দাউদ ইব্রাহিমের দুবাইভিত্তিক অপরাধচক্রের দুই সদস্য দাউদ মার্চেন্ট ও জাহিদ শেখ, যাঁদের সঙ্গে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের যোগাযোগ ধরা পড়ে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে পুলিশ প্রায় দেড় মাস অনুসন্ধান চালিয়ে জুলাই মাসে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় দুর্ধর্ষ ভারতীয় জঙ্গি ওবায়দুল্লাহকে। তিনি ভারতীয় নাগরিক। আফগানিস্তানে গিয়ে ভারী মেশিনগান, বিমানবিধ্বংসী কামান, রকেট লঞ্চার, মর্টারশেল নিক্ষেপসহ নানা ধরনের সমরাস্ত্র পরিচালনায় প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের মাদারীপুরের শিবচরে একটি মাদ্রাসায় ‘জিহাদি ভাই’ গড়ে তোলার কাজে লিপ্ত ছিলেন কয়েক বছর ধরে। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবা ও ভারতীয় জঙ্গি সংগঠন আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্সের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। একই সংগঠনের আরেক জঙ্গি মনসুর আলী ওরফে হাবিবুল্লাহও জুলাই মাসেই ঢাকায় গ্রেপ্তার হন। এমদাদুল্লাহ নামে আরেক ভারতীয় জঙ্গি ঢাকায় গ্রেপ্তার হন সেপ্টেম্বরের শেষে।
বাংলাদেশে বিদেশি জঙ্গিদের তত্পরতার বিষয়টির দুটি তাত্পর্য আছে, যা অনুধাবন করা আমাদের জন্য খুব জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত উপাদানগুলো বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতর অবস্থান নিয়ে তত্পর হলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখোমুখি হতে পারে, জনজীবনের স্বাভাবিক শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে, জনমনে সৃষ্টি হতে পারে নিরাপত্তার অভাববোধ; মুক্তভাবে চলাফেরা ও জীবন-জীবিকা আহরণের জন্য যে স্বাভাবিক শান্তিপূর্ণ নিরুদ্বেগ পরিবেশ অপরিহার্য, তা ক্ষুণ্ন হতে পারে। এসব বিবেচনায় এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয় নয়, জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদী তত্পরতা চলছে—এমন নেতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ইতিমধ্যে ছড়িয়েছে বহির্বিশ্বে। এর সঙ্গে যদি এটা যুক্ত হয় যে শুধু স্থানীয় জঙ্গিরাই এখানে তত্পর নয়, বিভিন্ন দেশের জঙ্গিরাও এ দেশে আশ্রয় নিতে এবং তত্পরতা চালাতে পারছে—তাহলে আমাদের ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ: ব্যবসা-বাণিজ্য, জনশক্তি রপ্তানি, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভ্রমণ, প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংশ্লিষ্ট দেশে মর্যাদা—সবকিছুর ওপরই দেশের ভাবমূর্তির প্রভাব পড়ে। আফগানিস্তান বা পাকিস্তানের মতো ভাবমূর্তি বাংলাদেশের প্রাপ্য নয়, প্রত্যাশিতও নয়।
যদিও জঙ্গিবাদ দমনের ব্যাপারে সরকারের তত্পরতা লক্ষণীয়, তবু পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত হওয়া যায় না। কারণ, জঙ্গিবাদী তত্পরতায় লিপ্ত সংগঠন ও তাদের সদস্যদের ব্যাপকতার যে আভাস গোয়েন্দা সূত্রেই পাওয়া যায়, গ্রেপ্তারের সংখ্যা সে তুলনায় বেশ কম। এ ছাড়া, গোয়েন্দা-পুলিশের জানার বাইরেও তো গোপন জঙ্গি আস্তানা থেকে থাকতে পারে। জঙ্গি দমন তত্পরতা তাই আরও ব্যাপক ও কঠোর উদ্যোগ দাবি করে।

Saturday, August 8, 2009

দেশে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতা বন্ধ করতে হবে -জঙ্গি তৎপরতার আন্তর্জাতিক জাল

‘ইসলামি জঙ্গি তৎপরতার ব্যাধিটির জন্ম পাকিস্তানের করাচি ও আফগানিস্তানের খোস্তে। এখন তা পাচার হয়েছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের পরিস্থিতি একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই সর্বত্র পাকিস্তানি আদল পরিলক্ষিত হবে।’ এ কথাগুলো লেখা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার বছর আগে ২০০৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে, পাকিস্তানের ইংরেজি দৈনিক ডেইলি টাইমস-এর সম্পাদকীয় নিবন্ধে।
ইসলাম ধর্মের নামে জঙ্গিবাদী তৎপরতার ‘পাকিস্তানি আদল’-এর স্বরূপটা ঠিক কেমন তা স্পষ্ট নয়, তবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে এ সম্পর্কে প্রকাশিত নানা তথ্য থেকে এটা প্রতীয়মান হয়, ইসলামি জঙ্গিবাদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, যা সে দেশের একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান।
বুধবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত এ-সম্পর্কিত এক বিশদ প্রতিবেদনে বাংলাদেশে পাকিস্তান, ভারত, আফগানিস্তানসহ সাতটি দেশের জঙ্গিদের তৎপরতা আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটির তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হয়: ১. বিভিন্ন দেশভিত্তিক এই সংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ রয়েছে, তারা কাজ করছে একটি আন্তর্জাতিক জালের মতো। ২. তারা এদেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলোকে অর্থ জোগাচ্ছে এবং জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এ ছাড়া এদেশীয় জঙ্গিদের অনেকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে গিয়েও প্রশিক্ষণ নিয়ে আসে। ৩. বিদেশি জঙ্গি নেতাদের অনেকে বাংলাদেশে যাতায়াত করেন, এদেশীয় জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেতাদের আশ্রয়ে বছরের পর বছর বাস করেন। ৪. অনেক বিদেশি জঙ্গি নেতা এ দেশে এনজিও, মাদ্রাসা স্থাপন করেন, অনেকে দেশীয় অনেক মাদ্রাসায় শিক্ষকের চাকরি করেন। অর্থাৎ সেবা সংস্থা ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আড়ালে তাঁরা তৎপর থেকেছেন। ৫. জঙ্গিদের সঙ্গে পেশাদার অপরাধীচক্রের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছে; দুবাইভিত্তিক ভারতীয় মাফিয়া দাউদ ইব্রাহিমের চক্রের সঙ্গে এরা যুক্ত। ৬. পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এ দেশে তৎপর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর স্বার্থ দেখভাল করে আসছে; জঙ্গিদের সঙ্গে মাফিয়াচক্রের সমন্বয়ের কাজটিও করে আসছে তারা। ৭. বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় জঙ্গি সংগঠনগুলো অনেকটা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পেরেছে; দেশের আইনপ্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও জঙ্গি তৎপরতা দমনে যথেষ্ট তৎপর ছিল না। দেশি-বিদেশি অনেক জঙ্গি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে আটক হয়েছে, কিন্তু তাদের অনেককে আইনগতভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি। পরে তাদের অনেকেই ছাড়া পেয়েছে, কিন্তু সেসব জঙ্গির আটক বা মুক্তির অনেক খবরই প্রকাশ করা হয়নি। অর্থাৎ বিগত সরকার বা তাদের নিয়ন্ত্রিত গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলার রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এসব বিষয়ে জনগণের সঙ্গে স্বচ্ছ আচরণ করেনি।
বর্তমান সরকার জঙ্গি তৎপরতা দমনের অঙ্গীকার করেছে, তারা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ ব্যাপারে পুলিশ-র‌্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সক্রিয়তা বেড়েছে। ইতিমধ্যে অনেক জঙ্গি নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছে, আস্তানার খোঁজ মিলেছে। গ্রেপ্তার ও জিজ্ঞাসাবাদের মধ্য দিয়ে এ দেশে জঙ্গি তৎপরতা সম্পর্কে অনেক তথ্য বেরিয়ে আসছে এবং সরকারি সূত্রগুলো সেসব তথ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রকাশ করছে। ফলে জনগণ অনেক কিছু জানতে পারছে, জঙ্গিবাদ সম্পর্কে তাদের সচেতনতা বাড়ছে এবং এতে জঙ্গিবাদী তৎপরতার বিস্তার আগের চেয়ে কঠিন হয়ে উঠবে। জঙ্গিবাদ দমনের অভিযান আরও গতিশীলভাবে চালিয়ে যাওয়া এবং জনগণকে তা সম্পর্কে সব সময় ওয়াকিবহাল রাখার পাশাপাশি এ দেশে তৎপর আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের জালটি ছিন্ন করার সক্রিয় উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাকিস্তান সরকারকে তথ্য-প্রমাণসহ আইএসআইয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানিয়ে দিয়ে এ দেশ থেকে তাদের গোপন তৎপরতা গুটিয়ে নিতে বলতে হবে। সেই সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা এনজিওর নামে জঙ্গি তৎপরতা এবং বিদেশ থেকে তাদের অর্থের জোগান আসা বন্ধ করতে হবে; মাদ্রাসাগুলোকে যেন দেশি-বিদেশি জঙ্গিরা ব্যবহার করতে না পারেন সেটাও নিশ্চিত করা দরকার।