Friday, August 8, 2014

অদৃশ্য জলের দাগ by মোসাদ্দেক আহমেদ

চল্লিশোর্ধ্ব বয়সে গর্ভধারণের বাসনা ঝুঁকিপূর্ণ ফলে চামেলির কথা শুনে দম ধরে থাকলেও অবাক হয়নি রিয়াজ, বরং সম্মতিসূচক সমবেদনাই জানিয়েছিল; সেই সঙ্গে স্বস্তিবোধও কম হয়নি। প্রকাণ্ড শোকের কবল থেকে বেরিয়ে আসার হয়তো এটাই হতে পারে শেষ রাস্তা; চামেলির চিন্তার সক্ষমতা দেখে মনে মনে কৃতজ্ঞবোধও করেছে রিয়াজ। কিন্তু কথাটা অধিক বয়সে সন্তানধারণ, স্বাস্থ্যঝুঁকির পরিণতিও ভাবাচ্ছে তলে তলে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চামেলির মাতৃত্বই জয়ী হতে চলেছে, ভালোয় ভালোয় ছয় মাস অতিক্রান্ত হতে চামেলি ভাবে, এবার তবে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে দেখা যাক। যাকে হারিয়েছে চিরতরে, তাকে যদি ফিরে পাওয়া যায় আরেক রূপে, এই তার আশা। কল্পনাতেও কি কখনো ভেবেছিল এমন বাজি ধরতে হবে এই আইবুড়ি বয়সে। একমাত্র কন্যা লাবণ্যার হত্যাকাণ্ড যখন তাকে আত্মহননের পথে ঠেলে দিচ্ছিল, সমস্ত কিছু অর্থহীন হয়ে পড়েছিল, এমনকি স্বামীর সান্নিধ্যও, তখন গর্ভাধারণের স্বপ্নই নবতর অবলম্বন হয়ে আসে।
কাজেই গর্ভলক্ষণ ফুটে ওঠামাত্র অন্যরা এবার ছেলে হবে বলে রব তুললেও চামেলি কামনা করেছে লাবণ্যাকেই, লাবণ্যার প্রতিরূপ আরেক কন্যাকেই। অন্যদের দলে খোদ শাশুড়ির ভোট পড়ায় বেশ বিপাকেই সে; যদিও রিয়াজের সমর্থন তার দিকে আর সেটাই বল-ভরসা জোগাতে যথেষ্ট। এই দ্বৈরথে মহিলামহলের ভূমিকায় সে বিস্মিত; অধিকাংশ ক্ষেত্রে মহিলামহল থাকে ছেলেসন্তানের পক্ষে; এটা ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের ফল কি না তা ভেবে দেখার বিষয়; তবে এখানে অর্থনৈতিক বিষয়ও যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, তাও সমান সত্য।
আলগোছে উঠে এসে চামেলি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই দেখে। লাবণ্যা তো খুন হলো এই যৌবনের তাপে পুড়েই! বিয়ের পরও একটা কী দুটো ছেলে লাবণ্যার পিছু ছাড়ল না; নিরপেক্ষভাবে বিচার করতে গেলে তার মেয়েটারও দোষ ছিল; একটু পুরুষঘেঁষাই ছিল মেয়েটা। এসব তার স্বামীকে গোপনে গোপনে ঈর্ষান্বিত করেছিল; পরিণাম ভালো হয়নি। বিয়ের বছর গড়ানোর আগেই স্বামীর হাতে খুন হয় তার অপরূপা মেয়েটি। ফলে লাবণ্যার মতোই আরেকটি ফুটফুটে কন্যাসন্তান যদি সত্য সত্যই এবার তার পেটে এসে থাকে, তখন? বিশেষত প্রশ্নটা যেখানে লালনপালনের এবং বিয়ের পর মেয়ের নির্বিঘ্নতার! মাথা ঝিমঝিম করে উঠতে বিছানায় এসে গা এলিয়ে দিয়ে হাঁপাতে থাকে; চোখের কোনা ভারী হয়ে জ্বালাতে থাকলে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে কিছু সময়।
শুয়ে আছ যে, রেডি হয়ে নাও, ডাক্তারের কাছে যেতে হবে তো। বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে রিয়াজ তাগাদা দেয়।
জানো, আমার না কেমন ভয় ভয় করছে। অদ্ভুত দোটানায় ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি। ভাবছি যে আসবে, সে যদি মেয়ে হয়, তখন নতুন কোনো দুর্যোগ ঘনিয়ে আসবে না তো?
রিয়াজ বাকরুদ্ধ হয়ে উদাস হয়ে পড়ে, নিজেকে সামলে নিয়ে বউয়ের নিকট এগিয়ে আসে, এ সময় নির্ভার থাকতে হয়। ডাক্তার তো তেমনই বলেছেন। সামান্য অপেক্ষা করে যোগ করে, তবে কি মনোভাব বদলে ফেলতে বলছ?
কক্ষনো না, আমার লাবণ্যাকেই চাই, নইলে কিছুই চাই না; নতুন লাবণ্যাকে আমি আগলে রাখব চোখে চোখে, আমার রক্তদামে তাকে বাঁচিয়ে রাখব।
স্ত্রীকে কাছে টেনে শাবাশ জানায় রিয়াজ, ভেরি গুড। কে বলে তোমার গার্ডস নেই, প্রতিকূল পরিস্থিতি তোমাকে বদলে দিয়েছে। তুমি শুধু নবজন্ম দিচ্ছো না, তোমার নিজেরও নবজন্ম হয়েছে।
স্বামীর প্রশংসাসূচক জবাবের বিপরীতে চট করে রা করতে পারল না চামেলি, কেননা এতে যে কেবল স্তুতির ছোঁয়া রয়েছে, তা নয়, সারবত্তাও কম নেই। শক্ত জাতের মহিলা সে কোনোকালেও ছিল না, বরং রিয়াজের প্রখর ব্যক্তিত্বের নিচে ইট-চাপা ঘাসের ন্যায় বিবর্ণই ছিল; শক্ত হাতে মেয়েকে প্রতিপালন করতে পারলে হয়তো সর্বনাশ এড়ানো যেত; পুরুষমানুষের ঈর্ষাবোধের পরিণাম এইভাবে চূড়ান্ততায় গড়াবে তা ছিল ভাবনার অতীত। না, কথাটা একতরফা হচ্ছে বোধহয়; এটা কেবল ঈর্ষাবোধের ব্যাপার নয়, এই ভয়ংকর জিঘাংসার পেছনে ঘাতক জামাইটার খুনি-সত্তাই নিরঙ্কুশ দায়ী। প্ল্যানমাফিক মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে মেয়েটাকে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল ফুপুর বাড়িতে, যাওয়ার আগে লাল জামদানিও কিনে দিয়েছিল ঘাতকটা; ফলে স্বামীর দুরভিসন্ধির বিন্দুবিসর্গ টের পায়নি হতভাগী, উপরন্তু প্রসাধনীর নিপুণ টানে নিজেকে সেজেছিল মহারানি; নিঃসঙ্গ বোকাসোকা বৃদ্ধা ফুপুশাশুড়িও খুশিমনেই আপ্যায়িত করে নববধূকে, কিন্তু হায়, সবই বৃথা, নববধূর ডগডগে লাল জামদানি রক্তলাল হয়ে উঠলে রুপালি চাঁদটাও পাল্লা দিয়ে রক্তিম হয়ে ওঠে; লাবণ্যার রক্তাক্ত মুখখানি তাকে দেখতে দেওয়া হয়নি, তবে চামেলির কল্পনা করে নিতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হয় না কী অমানুষিক কষ্ট পেয়েই না তার বুকের মানিক কতল হয়েছিল! না, এবার যেন একই ভুলের পুনরুক্তি না হয়; এর জন্য সম্ভাব্য যা যা করার দরকার তা করতে সে পিছপা হবে না; সন্তান মানুষ করতে হলে মাত্রাতিরিক্ত বাৎসল্য ক্ষতির হেতু হতে পারে, কোমলতার পাশাপাশি কঠোরতাও লাগে বই কি। কিন্তু সেটাই কি সব? একটা পর্যায়ে গিয়ে জীবনেচ্ছার কতটুকুই-বা তার নিয়ন্ত্রণাধীন, বিষাদে মুখ ঢেকে যায় আবার।
দেরি করো না লক্ষ্মীটি, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফেল হয়ে যাবে।
না, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফেল তো হয়ইনি, উলটো আরাধ্য সুসংবাদ জানতে পেরে সনোগ্রাফির টেবিলেই খুশিতে কেঁদে ফেলল চামেলি, খুশিতে রিয়াজের চোখ দুটোও চিকচিক করছে। মেয়েসন্তানই আসছে রক্তরঞ্জিত শূন্যতাকে কিছুটা হলেও ঢেকে দিতে। মায়েরা সুন্দর হয়ে উঠলে নাকি মেয়েসন্তান পেটে আসে, এবারকার গর্ভকালীন পেলবমসৃণ মনোহারিতা তো তেমন আভাসই দিচ্ছিল; কিন্তু তার পরেও অনিশ্চয়তা থেকে যায়; লোকবিশ্বাস গণ্ডায় গণ্ডায় ভেস্তে যাওয়ার নজিরই বেশি, তদুপরি গোটা ঘটনার পশ্চাতে রয়ে গেছে চরম বিভীষিকাময় ক্ষতচিহ্ন।
রোগিণীর আনন্দোচ্ছ্বাস ছুঁয়ে গেলে মহিলা ডাক্তারের কণ্ঠস্বর সচল হয়, এত খুশি হচ্ছেন, আগে ছেলে বুঝি।
না, আগেও মেয়ে ছিল, আমাদের বংশে ছেলের সংখ্যা বরাবর কম।
তা হলে আপনারা অন্যরকম; সাধারণত যা দেখি, মেয়ের কথা শুনতে মায়েদের মুখ পাংশু, বলতে কি, অনেক মায়ের সংসারই ভেঙে যায় ছেলে না হওয়ায়; যেন ছেলে না হওয়ার সমস্ত দায় মায়েদের, চাই কি তালাকনামাও নেমে আসতে দেরি হয় না। মহিলা ডাক্তার এভাবে অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন।
আপনি দোয়া করবেন, আমাদের মেয়েটি যেন দীর্ঘজীবী হয়, বেঁচে থাকে পূর্ণ পরমায়ু পর্যন্ত।
বাড়ি ফিরে আসার পর সেই খুশির আবহ আরেকধাপ বিস্তৃত হয়। প্রথমদিকে ছেলের দিকে পক্ষপাত থাকলেও চামেলির শাশুড়ির মতামত দ্রুত পালটে যায়, বল কি বউমা, এমন মেয়ে তো ছেলের অধিক, তোমার খালি কোল এবার উপচে পড়–ক।
ননদরাও কম যায় না, তোমাকে আর পায় কে ভাবি, যাকে চেয়েছ সে-ই আসছে। চাওয়ার মতো চাইতে জানলে এমনই হয়।
দেখতে দেখতে কটা দিন বাড়ির নিরুত্তাপ পরিবেশে রং লাগে। লাবণ্যা পেটে থাকার সময় যতটা যত্নবতী ছিল, তার চেয়ে বেশি ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলতে লাগল চামেলি; ওষুধ খাওয়ার কথা আগেরবার তেমন মনে না থাকলেও এক্ষণে তা হচ্ছে না; শাকসবজিও খাচ্ছে তিনবেলা। স্ত্রীর এই ইতিবাচক পরিবর্তন রিয়াজকেও সুখী করে, তুমি দেখছি গুড গার্ল হয়ে গেছ। অক্ষরে অক্ষরে সব মেনে চলছ, কোথাও অনিয়ম হচ্ছে না।
স্বামীর উৎসাহব্যঞ্জক বাক্যে চামেলি উৎফুল্ল হলেও সবটা প্রকাশ করে না, আহা, আগেই এত সব বলো না। বুড়ি বয়সে পেটে ধরা, কখন কী হয় বলা যায়। জানো, কিছুতে স্বস্তি পাচ্ছি না, তার ওপর ঈশান কোণের সেই কালো মেঘটার ভয়।
স্ত্রীর মুখপানে চেয়ে রিয়াজ স্তব্ধ হয়ে যায়। চামেলির জীবনে ঝড়-তুফান তো কম গেল না। লাবণ্যা পেটে আসার আগেও একটি সন্তান ধরেছিল সে। কিন্তু তা ছিল জরায়ুর বাইরে, টিউবে; ডাক্তারি পরিভাষায় একটোপিক প্রেগন্যান্সি। ৯ সপ্তাহের মাথায় টিউব ফেটে বউ তার মরণাপন্ন হওয়ার জোগাড়, জরুরি অপারেশন আর ৪ ব্যাগ রক্ত সে যাত্রায় প্রাণ বাঁচিয়েছিল। এসব ক্ষেত্রে অনেক মায়ের সন্তানধারণ ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে যায়। ভাগ্য সহায়, তাদের বেলায় তেমন হয়নি।
দশ দিন পর ডাক্তার দেখানোর কথা, চামেলি একাকী গিয়েছিল। একবেলা অপেক্ষা করলে রিয়াজও সঙ্গী হতে পারত, কিন্তু তার তর সয়নি। কারণ পেটের কন্যাসন্তানই; মনোভার ভেঙে বেরিয়ে আসার যে সুবর্ণ মওকা উপস্থিত, সেখানে অত অপেক্ষার ধার ধারলে চলে? বাচ্চার প্রতিটি কোমল নড়াচড়াই উপভোগ্য, বলতে কি তা ব্রহ্মস্বাদের তুল্য, তা হলে বিলম্ব সইবে কেন! দেখেশুনে রোগিণীর পরিস্থিতি অনুকূল পেয়ে মহিলা ডাক্তারের মুখে প্রশান্তির চিহ্ন, বেবি ইজ ফাইন। গ্রোথ স্যাটিসফ্যাক্টরি। পানিও ভালো। মনে হচ্ছে পরামর্শ সুন্দর মেনে চলছেন। সবসময় হাশিখুশি থাকবেন, এটাও বাচ্চাকে ভালো রাখে। হ্যাঁ, বিজ্ঞান তেমনি বলে, আপনার আনন্দ বাচ্চাকেও আনন্দিত করে।
তাই, জানেন, আমি না মিউজিক শুনি, আমি বুঝতে পারি বাচ্চাটি তখন রিল্যাক্স করে। ফিস মিটিয়ে ডাক্তারের চেম্বার থেকে চামেলি যখন বেরিয়ে এলো, তখনো হাতে অনেকটা সময়; ভাবল ফিরতিপথে একবার কুমুর ওখানে নামলে মন্দ হয় না। কুমু তার স্কুলজীবনের বন্ধু, বাল্যের বন্ধুবান্ধবরা মধুর হয় সবসময়। পরবর্তী জীবনে অনেকে বন্ধু হয় বটে, কিন্তু বাল্যের মতো তা মধুরতর হয় কী! বাল্যবান্ধবীর সঙ্গে প্রফুল্লতা ভাগ করে নিতে পারলে চক্রবৃদ্ধি হারে তা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু যে উৎফুল্লতা নিয়ে প্রাণের সখার কাছে গেল, কুমুকে দেখার পর, তার কথা শোনার পর, একফুৎকারে মিইয়ে গেল। সমস্যা হয়েছে কুমুর মেয়ে কলেজ-পড়ুয়া তনিমাকে নিয়ে; কুমুর মেয়েটিই বড় আর ছেলে ছোট, স্কুলে পড়ে। কলেজের একটা ছেলের সঙ্গে তনিমার যে প্রেম এবং মাত্র কদিন আগে বিয়ে হয়ে গিয়েছে, ঘুণাক্ষরেও তা জানতে পারেনি কুমু। জানলো কবে? ঠিক দুদিন আগে আর তা এমনভাবে যে, তাতে কেলেঙ্কারির একশেষ। এসব বিয়েতে যেভাবে ছেলেমেয়েরা বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়, কটা দিন খোঁজখবর পাওয়া যায় না, এখানে তেমন ঘটেনি; বরং সন্ধ্যা নাগাদ বাড়ি ফিরে এসে তনিমা বলেছিল, সারাদিন বান্ধবীর বাসায় ছিলাম, মেলা নোটস, কী করব মা, নোটসগুলো বুঝে নিতেই দিন কাবার। এই বিয়ের আরেক ব্যতিক্রম এই, বিয়ের অব্যবহিত পরেই ওদের মধ্যে মনোমালিন্য হয়; মনোমালিন্যের জের ধরে হোক কী ছেলেটার মনের বদমায়েশি হোক, ছেলেটি তাদের ঘনিষ্ঠ ভিডিওদৃশ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়েছে; ব্যস, আর কী, ডাউনলোডের যুগে তা বাতাসের আগে ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র, এমনকি তা পাড়ার কিশোরদের মোবাইল ফোনে- ফোনেও। ভগ্নহৃদয় তনিমা তার পড়ার ঘরের দরজা বন্ধ করে নিশ্চুপ বসে আছে আর কুমুর মুখমণ্ডলে রাজ্যের দুঃখ, হতাশা এবং ক্ষোভ, বল চামেলি এখন আমি কী করি? তোর মেয়ে তো তবু একঅর্থে মরে বেঁচেছে, কিন্তু তনিমা? পোড়ামুখী তো বেঁচে থেকেও মরা, সাথে আমরাও।
দুটো আলাদা ঘটনাবলির মধ্যে একটা মূল ঐক্য দেখতে পেয়ে চামেলি স্তম্ভিত যেন; কুমুকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাটুকুও হারিয়ে ফেলে। যখন সে বাড়ির পথ ধরে, তখনো বুকের অস্থিরতা চরমে; দুটো ঘটনার সঙ্গে আরও দুর্ঘটনা যে ভবিষ্যতে যুক্ত হবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়। গর্ভস্থিত মেয়েটিও তো বড় হয়ে হাঁটতে পারে একই পথে আর সেই আশঙ্কাই প্রবল; সত্যের খাতিরে এটা তো সত্য, রিয়াজের সঙ্গে বিয়ের আগে সে নিজেও কি মেয়েলি ছলাকলায় কম পারদর্শী ছিল; অন্য স্তাবক ছেলে বন্ধুদের কথা বাদই যাক, তার কলেজের সবচেয়ে মেধাবী যুবকটি কেন সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মঘাতী হয়েছিল, সেটার কারণ দর্শাতে বললে তা কি সে সত্যিই দিতে পারবে এই মধ্যবয়সে? জিনবাহিত এসব কার্যকারণ সূত্র যদি রক্তে থাকে, তবে এর দুরন্ত গতি রুখবে কে? তা ছাড়া পুরুষবান্ধব সমাজব্যবস্থার উসকানিও এখানে বিবেচ্য। কথাটা ঘূর্ণাবর্তই, তা হলে এই কি ভালো নয়, পেটের সন্তানকে চিরকাল পেটেই রেখে দেওয়া, মাতৃজঠরের মতোন নিরাপত্তার আশ্বাস জগৎজুড়ে আর কোথাও আছে কী! কোথায় যেন পড়েছিল, অমিয়ভূষণেই, আমরা কেউ জন্মাতে চাই না, জন্মের সময় নবজাতকের তীব্র চিৎকারই তেমন প্রমাণ।
দুপুরের তপ্ত রোদ মাথায় করে যখন বাসায় ফিরে এলো, চামেলির কাহিল অবস্থা। আগের বার ডাক্তার দেখিয়ে আসার পর তার মধ্যে যে ইতিকর্তব্যতা দেখা গিয়েছিল, ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠার দুরন্ত সাহস দেখা গিয়েছিল, তাতে সূক্ষ্ম ধস নামে যেন-বা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে, সবকিছুই চলছে যথাবিহিত, ওষুধ খাওয়া থেকে ডাক্তার দেখানো, এমনকি মিউজিক শোনাটাও, কিন্তু কোথায় যেন সেই স্বতঃস্ফূর্ততার অভাব, ভাঙাহাটের আর্তনাদ; বিনিদ্র বউকে পরপর কদিন পূর্বেকার ন্যায় জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হতবিহ্বল রিয়াজ সহসা বুঝতে পারে- সেই অভেদ্য পূর্ববৎ খোলসই তবে, যা প্রথম ফুটে উঠেছিল লাবণ্যাকে হারানোর পর; মাঝের কিছুদিন ব্যতিক্রম, সকলের অগোচরে ফের সেই ব্যাপার, পুনরপি লুকিয়ে স্ত্রীর বিনিদ্র রাত্রিযাপন আর খোলা জানালার গ্রিলে নিজেকে সঁপে দেওয়া; বোঝাই যাচ্ছে এমন সঁপে দেওয়ায় কোনো বৃদ্ধি নেই। নাছোড় বিপন্নতা তবে পিছু হটেনি; চোরাবালিতে ডুবে যাওয়ার মতোই চোরাটানে তলিয়ে যাচ্ছে চামেলি!

নবারুণের চলে যাওয়া by টোকন ঠাকুর

সাহিত্যিক-কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের পরলোক যাত্রার পর আমি ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস লিখি- ‘গোল পার্কের রামকৃষ্ণ মিশন আবাসিকী থেকে, সেই মে মাসের পোড়া পোড়া দুপুরে ট্যাক্সিতে গেলাম গলফ গ্রিন, তখনকার সময়ে মহাশ্বেতা দেবীর বাসায়। আমি আর শাহনাজ মুন্নী। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আকাদেমীর আরুণি দা এবং বাপ্পা দা। অবশ্য ট্যাক্সিতে তিনি বলেননি যে, তিনি নবারুণ ভট্টাচার্য।’ মৃত্যু উপত্যকাকে যিনি নিজের দেশ বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তো মহাশ্বেতা দেবীর সামনেই তিনি সিগারেট ধরালেন এবং সিগারেটের প্যাকেটটা তিনি আমার দিকে বাড়ালেন। আমি জড়তা ফিল করছিলাম, ২০০২ সালে, মহাশ্বেতা দেবীর সামনে, তারই বাসার ড্রইংরুমে কীভাবে সিগারেট টানি! হাজার চুরাশির মা তা টের পেয়ে বললেন, ‘শোনো, তুমি তো আমার নাতির বয়সী। বাপ্পা যদি টানে, ও তো আমার ছেলে, তুমিও টানো।’ বাপ্পা দা বলতে নবারুণ ভট্টাচার্য। বললাম, ‘নবারুণ দা, বাংলাদেশের বিপ্লবী স্বপ্নের বারান্দায় বসা ছেলেমেয়েদের সম্ভবত সব্বারই মুখস্থ, এই জল্লাদের ভূমি আমার দেশ না...’
মাঝে-মধ্যে আমি সিদ্ধেশ্বরীতে, প্রতীতি দেবীর সঙ্গে আড্ডা দিতে যাই। ভবির বয়স এখন ৮৯। ভবি, ভবার যমজ। ভবা হচ্ছেন ঋত্বিক ঘটক। সঙ্গত কারণেই কথা হয় খুকু ওরফে মহাশ্বেতা দেবীকে নিয়ে, তিনি প্রতীতি দেবীর তিন মাসের ছোট। ঋত্বিক-প্রতীতির বড় ভাই মনীশ ঘটকের মেয়ে খুকু। খুকুর ছেলেই, বিজন (ভট্টাচার্য)-পুত্র নবারুণ। নবারুণ ভট্টাচার্য চলে গেলেন। কয়েক মাস আগে, প্রতীতি দি’ই একদিন বাপ্পা দার চিকিৎসা সংক্রান্ত কারণে আমাকে ফোন করে এমনভাবে বললেন, যেন এ ব্যাপারে আমার কিছু করার ছিল! দিদি বললেন, ‘শোনো, খোকনকে মুম্বাই না নিয়ে দিল্লি নেয়া কি ভালো হলো?’
চলে গেলেন। তো গেলেনই। তবু মৃত্যু উপত্যকায়, জল্লাদভূমিতে, হার্বাট-এর হারু... নবারুণ দা, এত সহজে আপনার মৃত্যু হয় না।
দুই বাংলার কাগজেই বেশ লেখালেখি হচ্ছে তাকে নিয়ে। পড়ছি। এই রচনায় আমি কলকাতার দুটো কাগজের নবারুণ মূল্যায়ন তুলে ধরলাম। সঙ্গে উইকিপিডিয়ার রিপোর্ট। লক্ষ করার বিষয়, কলকাতার একটি কাগজ তাদের চিরাচরিত প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গিতে নবারুণের জীবন সত্তার মূল্যায়নে বলেছে ‘দ্রোহাভ্যাস’। দাদা আনন্দবাজার। এই দাদারা বলছেন, ‘বাংলা সাহিত্যে এক সময়ে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার প্রবল কৌলীন্য ছিল। প্রকৃত সাহিত্যিককে প্রতিষ্ঠানবিরোধীই হইতে হইবে- এই বাধ্যতায় অনেকে বিশ্বাস করিতেন। যে লেখকগণ কোনো প্রতিষ্ঠানের মদদে খ্যাত বা ধনী হইতেন, সাধারণ মানুষ তাহাদের লইয়া উত্তেজিত ও আপ্লুত থাকিলেও, চর্চাবান মহলে তাহাদের নিতান্ত মেরুদণ্ডহীন, লোভী ও আত্মবিক্রয়কারী জীব হিসেবে ধরা হইত। পাশাপাশি ইহাও ধরিয়া লওয়া হইত : তাহারা লেখক হিসাবেও ব্যর্থ। বিশ্বাস করা হইত, লেখকের কাম্য কেবল নিজ সাধনায় সিদ্ধি। ‘সিদ্ধাই’য়ের দাপটে বিচ্যুত হইলে, বাড়ি-গাড়ির ফাঁদে জড়াইয়া পড়িলে, নিষ্কলুষ সংস্কৃতিযাপন সম্ভব নহে, আজ নহিলে কাল এই বস্তুগত স্বাচ্ছন্দ্যের খাজনা দিতে হইবে, আপন কাজটিকে তরল ও সরল করিয়া। জনপ্রিয়তার দায় ও সম্পদের আমোদ, লেখককে উৎকর্ষ ও স্বাতন্ত্র্যের পথ হইতে ছিন্ন করিয়া বাজার-বশ্যতার দরবারে আনিয়া ফেলিবে। রাজাকে তুষ্ট করিতে অভ্যস্ত ও ব্যস্ত সভাকবি, নিজের মতানুযায়ী কবিতা না লিখিয়া, রাজার রুচিমাফিক কাব্যরচনায় অভ্যস্ত হইয়া যাইবেন। জনপ্রিয়তায় প্রকৃত শিল্পের ক্ষতি হয়, জ্যা শিথিল হইয়া পড়ে, ইহাও অনেকেরই মতো ছিল। যদিও এই মতামতের নেপথ্যে বহু সময় কাজ করিত ঈর্ষা, দ্বেষ, নিজে প্রতিষ্ঠানসিদ্ধ হইয়া উঠিতে না পারিবার আক্ষেপ, কিন্তু অনেক লেখকই এই উগ্র মতাবলম্বনের অগ্নি হইতে নিজ উত্তাপ ও অস্ত্র খুঁজিয়া পাইয়াছিলেন। সহজ প্রতিষ্ঠার পথে, স্থূল জনপ্রিয়তার পথে কিছুতে হাঁটিব না- এই প্রতিজ্ঞা বাংলা সাহিত্যের কিছু লেখককে অতি মৌলিক ও স্পর্ধিত সাহিত্য রচনায় প্রণোদিত করিয়াছে। বৈপ্লবিক ভাবনা ও আশ্চর্য আঙ্গিক লইয়া ইহারা সাহিত্য প্রয়াস লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। কেহ ‘কাল্ট’ হইয়াছেন, কেহ হন নাই, কিন্তু এই প্রকল্পগুলোই একটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে আগাইয়া লইয়া যায়, কিছু লোক পাঁচিল ভাঙিতে গিয়া আহত হয় বলিয়াই বহু লোক উন্মুক্ত প্রান্তরে পদচারণার স্বাদ পাইয়া থাকে। সদ্যপ্রয়াত নবারুণ ভট্টাচার্য তাহার ঘোরতর প্রতিষ্ঠানবিরোধী স্বকীয়তায় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করিয়াছেন।
নবারুণের মতো শক্তিশালী লেখকের প্রয়াণ বাংলার দ্রোহসংস্কৃতিকে আরও স্তিমিত করিবে।’
আরেকটি কাগজ, আজকাল লিখেছে, ‘ফ্যাতাড়ু’র স ষ্টা, স্বতন্ত্র ভাবনার সাহিত্যিক নবারুণ ভট্টাচার্য প্রয়াত। বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। বেশ কিছু দিন ধরেই অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে অসুস্থ ছিলেন। বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা ২০ মিনিট নাগাদ ঠাকুরপুকুর ক্যান্সার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এদিন তার মরদেহ রাখা হয় পিস হাভেনে। আজ, শুক্রবার সকাল ৯টায় তার মরদেহ নিয়ে যাওয়া হবে ক্রিক রো-তে গণসংস্কৃতি পরিষদের দফতরে। এখান থেকে কলেজ স্ট্রিট বইপাড়া ঘুরে শোকযাত্রা তার গলফ গ্রিনের বাসভবন হয়ে যাবে কেওড়াতলা শ্মশানে। ওখানেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। তার বাবা বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব প্রয়াত বিজন ভট্টাচার্য, মা মহাশ্বেতা দেবী। নবারুণ ভট্টাচার্য রেখে গেলেন মা, স্ত্রী প্রণতি ভট্টাচার্য, পুত্র তথাগত ও অসংখ্য অনুরাগীকে। তার মৃত্যুতে বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে শোকের ছায়া। ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন বহরমপুরে তার জন্ম। ছোট থেকেই নাটক, সিনেমা, সাহিত্যের প্রতি তার টান ছিল তীব্র। ছোটবেলায় ঋত্বিক ঘটকের শুটিংয়ে একবার যে রিফ্লে’র ধরার সুযোগ পেয়েছিলেন, এ কথা বলতে তিনি গর্ব অনুভব করতেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন। কলেজ স্ট্রিটের স্টুডেন্টস হলে অঙ্গন নাট্যে একসময় অভিনয় করেছেন নিয়মিত। ’৭৩ থেকে ’৯১ পর্যন্ত ‘সোভিয়েত দেশ’ পত্রিকার সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন। কবিতা দিয়েই তার সাহিত্যজীবন শুরু। পরবর্তীকালে গদ্যেই তার মনোযোগ ছিল বেশি। তার সৃষ্ট ‘ফ্যাতাড়ু’র তুল্য নজির বাংলা সাহিত্যে নেই। ‘হারবার্ট’ তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস, যার জন্য তিনি সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পান ১৯৯৭ সালে। এই উপন্যাসের জন্যই পেয়েছেন বঙ্কিম ও নরসিংহ দাস পুরস্কারও। তার কবিতা লেখার ভাষাও ছিল স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ তার বিখ্যাত কবিতার বই। তার গদ্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক’, ‘ফ্যাতাড়ুর কুম্ভীপাক’, ‘হারবার্ট’, ‘কাঙাল মালসাট’, ‘হালালঝাণ্ডা ও অন্যান্য’ উল্লেখযোগ্য। এ বছর বইমেলায় প্রকাশিত হয় তার নতুন গল্পগ্রন্থ ‘আংশিক চন্দ্রগ্রহণ’। তার প্রবন্ধের বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘আনাড়ির নাড়িজ্ঞান’ ও ‘অ্যাকোয়ারিয়াম’। তার ফ্যাতাড়ু প্রথম মঞ্চে আসে সংস্কৃতির প্রযোজনায় দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালনায় ২০০৪ সালে। তার পর সুমন মুখোপাধ্যায় তার ‘কাঙাল মালসাট’কে মঞ্চস্থ করেন। এই কাহিনী নিয়ে সুমন চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন। ‘হারবার্ট’ও চলচ্চিত্রায়িত করেছেন সুমন। তারই পরিচালনায় সদ্য মঞ্চে এসেছে নবারুণ ভট্টাচার্যের নাটক ‘যারা আগুন লাগায়’। তার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘ভাষাবন্ধন’ পত্রিকা। দশ বছর মাসিক পত্রিকা হিসেবে প্রকাশের পর কিছু দিন আগে ‘ভাষাবন্ধন’কে তিনি ত্রৈমাসিক হিসেবে প্রকাশ করা শুরু করেন। তার লেখালেখির শুরু লিটল ম্যাগাজিনেই। প্রধানত তিনি লিটল ম্যাগাজিনেরই লেখক ছিলেন। সব সময়েই অন্য ভাষার সন্ধান করেছেন। বিকল্প লেখালেখিকে জায়গা করে দিতেই তার ‘ভাষাবন্ধন’ পত্রিকার সূচনা। পাঠক-ভোলানো ফর্মুলার লেখা থেকে সততই শতহস্ত দূরে থেকেছেন তিনি। নিজস্ব ভাবনা এবং ভাষাই তাকে স্বাতন্ত্র্য দিয়েছে, যা থেকে তিনি কখনও নিজেকে সরিয়ে নেননি।

রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে একদিন by খান মাহবুব

রবীন্দ্রনাথের বাড়িতে যাব এ উত্তেজনায় কলকাতার পার্কস্ট্রিটের হোটেলে রাতে ঘুম হচ্ছিল না। কৈশোরে পড়া রবীন্দ্র স্মৃতিকথা ‘আমার ছেলেবেলার’ নানা লাইন, নানা উপমা বারবার মনের কুঠিরে উঁকি দিচ্ছিল। কলকাতার কাকডাকা ভোরে ট্যাক্সিচালকের সঙ্গে দরদাম মিটিয়ে রওনা। আমি বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কবি আসাদ চৌধুরীর সহযাত্রী হয়েছি। ট্যাক্সি সরু রাস্তা, বড় রাস্তা, অলিগলি পেরিয়ে একসময় হাজির হল জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির প্রবেশ তোরণে। মদন চ্যাটার্জি লেনের শুরুতে বাড়ির প্রধান তোরণ পেরুনোর পর আমাদের দু’জনের অপলক দৃষ্টি। রাস্তার পাশের বাড়িগুলো গভীর দৃষ্টিতে কবি আসাদ ভাই দেখছেন, আর অনুমান করার চেষ্টা করছেন কোন বাড়িটা রবীন্দ্রনাথের আমলের। আমরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির আঙ্গিনায় পা দিতেই জড়সড় এক বৃদ্ধ জানালেন রবীন্দ্রনাথের গাড়ি বাঁ দিকে। গাড়িটা যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করা আছে। কালো রঙের বড় জিপ। সাবেকি, তবে বনেদী।
বাড়ির আঙ্গিনাজুড়ে এক ধরনের ছায়াস্নিগ্ধ পরিবেশ। শান্ত ও মগ্নতার ঘোর বাড়ির সর্বত্র। নাগরিক সভ্যতার ব্যস্ততার ছাপ একটুও নেই। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকথা ‘আমার ছেলেবেলায়’ লেখা- তখন কাজের এত বেশি হাঁস-ফাঁসানি ছিল না, বসে বসে দিন চলত, রবীন্দ্র আবাসে এখনও বোধকরি দিন বসে বসে, আস্তে আস্তে চলে। রবীন্দ্রনাথের বাড়িকে প্রাসাদ বললে ভুল হবে, অনেকগুলো প্রাসাদ। যাকে বলা যায় প্রাসাদমালা। বাড়ির প্রবেশপথে রবীন্দ্রনাথ ও বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ মূর্তি। এই বাড়ির বড় একটা অংশে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম চললেও বাড়ির আঙ্গিক, বিন্যাস ও মৌলিকত্বে সাবেকি রূপ লালন করা আছে যত্নের সঙ্গে আজও।
বাড়ির বহিঃরাঙ্গন দেখার সময় মনটা উসখুস করছিল ভেতরে ঢুকে রবীন্দ্রস্মৃতির ‘ছেলেবেলার’ গল্পের সঙ্গে নানা অনুষঙ্গের মিল-অমিল মিলিয়ে দেখতে। পনের রুপির টিকিট কেটে মোবাইল, ক্যামেরা, ব্যাগ নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মায় রেখে ত্রিতল রবীন্দ্রস্মৃতি জাদুঘরে প্রবেশ করলাম।
বিশাল বিশাল বড় ও উঁচু কক্ষ। বিভিন্ন স্মৃতির স্মারক থরে থরে সাজানো। নানা স্মৃতি স্মারকের অনুষঙ্গের উপস্থিতি যেন আজও শত বছরের পুরনো রবীন্দ্রনাথকে হাজির করে। মনে হয় এখনও এ বাড়িতে উঠানে হাঁটছে রবীন্দ্র আমলের চাকর ব্রজেশ্বর কিংবা প্যারীদাসী।
রবীন্দ্রনাথের যাপিত জীবনের প্রায় সব স্মারক এখানে রক্ষিত। স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর রান্নাঘর, মাটির উনান থেকে শুরু করে পদ্মা বোটের ডেমো। সালওয়ারী রবীন্দ্রনাথকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৯১৬-এ বার্মায় রবীন্দ্রনাথ, ১৯১৬ সালে জাপানে, ১৯২১-এ বার্লিনে, ১৯৩০-এ প্যারিসে রবীন্দ্রনাথ, ১৯৩২-এ ইরানে, ১৯৩২-এ আরবের বেদুইনের সঙ্গে- এ রকম নানা শিরোনামে। বিভিন্ন সময়ে রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও এ পরিবারে অনেক বিখ্যাত কবি, চিত্রকর জন্ম নিয়েছিল। তাদের কর্মের স্মারক বিশেষত রবীন্দ্রনাথের ভাতিজা অবনীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম, চিত্রকর্মের ব্যবহৃত সাজ-সরঞ্জাম এখনও দর্শনার্থীরা কৌতূহলভরা দৃষ্টিতে দেখে।
রবীন্দ্র পরিবারের সদস্য গোলাপলাল ঠাকুর, সতীন্দ্র ঠাকুর, রাজা রামনাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অনেকের তৈলচিত্র সংগৃহীত আছে।
রবীন্দ্রনাথের চার বছরের ছবি থেকে শুরু করে, খাবার ঘর, বসার ঘর, সঙ্গীত কক্ষ, লেখার ঘর- এমনকি যে ঘরে ১৩৪৮ বাং ২২ শ্রাবণ দ্বি-প্রহরে কবিগুরু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন এখনও সেখানে শঙ্খ দিয়ে পিদিমের আলোকে ঘিরে এক আবহ তৈরি করা আছে। রবীন্দ্রনাথের বসার ঘর, পড়ার ঘর ইত্যাদির আসবাবপত্র শুধু রবীন্দ্র আমলের নয়, এর সাজানোর ঢংও ওই আমলেরই রাখা হয়েছে। দেখলে মনে হয় এই পড়ার ঘরেই বুঝি এই চেয়ারে বসে হেলান দিয়ে পড়ছিলেন একটু আগে রবীন্দ্রনাথ।
বাড়িতে দর্শনার্থীদের জন্য সব সময় চলতে থাকে মৃদুলয়ে আদিসূরে রবীন্দ্র সঙ্গীত। দর্শনার্থীরা এই সঙ্গীতের মোহনীতে দুলতে থাকে, আর ঘুরতে থাকে নানা কক্ষে।
রবীন্দ্রনাথের প্রচুর পোশাক এখনও রবীন্দ্র স্মৃতি জাদুঘরে আছে। ফাল্গুনী নাট্যাভিনয়ে বাউলের ভূমিকায় পরার জন্য প্রতিমা দেবী যে-আলখাল্লা রবীন্দ্রনাথকে দিয়েছিলেন আজও তা পলিথিন দিয়ে মুড়ে সংরক্ষণ করা আছে।
বাড়ির কয়েকটা কক্ষজুড়ে সংরক্ষণ করা আছে ঊনবিংশ শতাব্দীর স্মারক জিনিসপত্র। এখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। বিদ্যাসাগরের বই-পুস্তক, কাগজপত্র, চাদর, ধুতি, কৃত্রিম দাঁত, শকুন্তলার প্রথম সংস্করণের কপি ইত্যাদি।
রবীন্দ্র আঙ্গিনায় ঘুরতে ঘুরতে আসাদ ভাই বললেন, বুঝলে মাহবুব কেন রবীন্দ্রনাথের ডায়াবেটিস ছিল না!
এখন বুঝলাম। এত বড় বাড়ি প্রতিদিন এক চক্কর দিলেই ডায়াবেটিস বাপ বাপ করে পালাবে। পুরো বাড়ি ঘুরে এবার বাড়ির ছাদে গেলাম, ছাদে খানিকটা কাঠের শেড দেয়া আছে। অযতেœ ভেঙেচুরে গেছে। এখন আর আশপাশের উঁচু ভবনের কারণে দূরে দেখা যায় না। তবে ছাদের প্রশস্ত লনের নান্দনিক সৌন্দর্য এখনও মিয়ম্রাণ হয়নি।
বাড়িটা দেখতে দেখতে সময় গড়িয়ে দুপুর। রবীন্দ্রনাথের কথায় ‘বেলা বেড়ে যায়, রোদ্দুর ওঠে কড়া হয়ে, দেউরিতে ঘণ্টা বেজে ওঠে।’ ঘণ্টা না বাজলেও পেট কিন্তু ঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছে দুপুরের খাবারের জন্য। আমরা ধীর পায়ে রবীন্দ্র আঙ্গিনার এক স্বপ্নিল ঘোর থেকে বেরিয়ে এলাম। আস্তে আস্তে নগরের প্রশস্ত রাস্তা, গাড়ির আওয়াজ, কোলাহল আমাদের আলিঙ্গন করল যান্ত্রিক সভ্যতার ব্যস্ততার গহিনে। কিন্তু মনটা এখনও বারবার ফিরে যেতে চায় রবীন্দ্রস্মৃতির বৈভবে ভরা জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির স্বর্গ-আঙ্গিনায়।

জাপানে রবীন্দ্রচিহ্নের খোঁজে by প্রবীর বিকাশ সরকার

১৯৬১ সাল। শতবর্ষ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী। ভারত ছাড়াও বিশ্বের একাধিক দেশে উদযাপন করা হবে বিশ্বকবির এই দিবসটি। তাই নানা ধরনের আয়োজন। জাপানও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর আহ্বানে জাপানি ভক্তরা সাড়া দিয়েছেন। রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ ক্ষিতীশ রায় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান চিঠিতে লিখে পাঠালেন জাপানে। অবশ্য এর আগে ১৯৫৭ সালেই কতিপয় প্রবীণ জাপানি ভক্ত রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে একটি সভা আহ্বান করলেন তাদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন জাপানের মর্যাদাসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা হেইবোনশা পাবলিশারের কর্ণধার এবং শিক্ষাবিদ শিমোনাকা ইয়াসাবুরোও। এই সভায় সৌভাগ্যক্রমে ইন্দিরা গান্ধী উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি বিশ্বভারতীর ছাত্রী ছিলেন একদা। ১৯৫৭ সালের সেই সময়ে তিনি পিতা প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে জাপান সফর করছিলেন।
পরের বছর ১৮৫৮ সালে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হল জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে, এর চেয়ারম্যান হলেন বিশিষ্ট কাগজ ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি গবেষক এবং রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের বন্ধু ড. ওওকুরা কুনিহিকো। ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ শেষবার জাপানে এলে তার বাড়িতে প্রায় তিন সপ্তাহ আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। কুনিহিকো বিশাল পরিকল্পনা করলেন এবং সাড়ে তিন বছর লাগিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ১৯৬১ সালে প্রধান অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করলেন ড. কুনিহিকো, ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে। এ উপলক্ষে বিস্তর প্রকাশনা এবং পত্রপত্রিকা-সাময়িকীর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল শুধু টোকিওতেই নয়, ওসাকা, নাগাসাকি, কোবে প্রভৃতি শহরেও। সংরক্ষণের অভাবে কত যে প্রকাশনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার হিসাব নেই। তারপরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
০১. আপোরোন
তেমনি একটি সাড়া জাগানো ঋতুভিত্তিক ম্যাগাজিন ছিল ‘আপোরোন’ নামে। আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি ও সাহিত্যভিত্তিক এ ম্যাগাজিনটির সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন কাতোও শোওজিরোও। ‘আপোরোন শা’ প্রকাশনা সংস্থা গঠন করে এ ম্যাগাজিনটি প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগও নেন। তিনি নিজেই রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে ম্যাগাজিনটির উদ্বোধনী সংখ্যা প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রসংখ্যা হিসেবে। তাতে জাপানখ্যাত সাহিত্যিক, কবি ও অধ্যাপক-গবেষক রবীন্দ্রভক্ত যেমন কাতায়ামা তোশিহিকো / রবীন্দ্রনাথ টেগোর, নাকামুরা হাজিমে / টেগোর এবং রাধাকৃষ্ণান, ওওতা সাবুরোও / জাপানে টেগোরের গ্রন্থসমূহ, তাছাড়া রোমান রোলান / টেগোর সম্পর্কে, উইরিয়াম বাটলার ইয়েটস / গীতাঞ্জলির ভূমিকা, আঁন্দ্রে জিইদ / গীতাঞ্জলির যৌক্তিক ব্যাখ্যা, জাঁন এরবের / প্রেমের ভবিষ্যবক্তা, বি.জি. রাই / রবীন্দ্রদর্শনের সামাজিক তাৎপর্য প্রমুখের রচনাও জাপানিতে অনুবাদ করা হয়েছে। গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা অনুবাদ করেছেন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক ও অনুবাদক ইয়ামামুরো শিজুকা।
‘আপোরন’ ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথকে বিস্তৃতাকারে তুলে ধরেছে। রবীন্দ্রনাথের লেখাও অনুবাদ করা হয়েছে ইংরেজি থেকে জাপানিতে। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মোৎসবে ৮ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলির জাপানি অনুবাদ প্রকাশ করে মাইলফলকের কাজ করেছে, সে সময় পর্যন্ত এ রকম প্রকাশনা বিদেশের অন্য কোনো দেশে হয়েছে বলে জানা নেই। সুতরাং রবীন্দ্রভক্ত কাতোও শোওজিরোওই প্রথম কৃতীত্বের অধিকারী।
০২. টেগোর সেন্টেনারি ফেস্টিভেল
১৯৬১ সালের জন্মজয়ন্তীর প্রধান অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় মে মাসের ৬ তারিখে সদ্য নির্মিত বুনকিয়োও কোওকাইদোও মিলনায়তনে প্রভাবশালী দৈনিক সংবাদপত্র আসাহিশিম্বুনের সহযোগিতায়। এ উপলক্ষে একটি চমৎকার বৃহদাকারে অনুষ্ঠান সূচিপত্র প্রকাশ করা হয়। মোটা আর্ট পেপারে সিলভার কালারের ওপর গাঢ়ো নীল রঙে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি এবং শিরোনাম। ভেতরে অনুষ্ঠান সূচি রয়েছে দুই পর্বে। প্রথম পর্বে প্রথমেই ভারতের জাতীয়সঙ্গীত ‘জনগণমন; ও পরে জাপানের জাতীয়সঙ্গীত ‘কিমিগায়ো’ তামাগাওয়া গাকুয়েন কয়ারের শিল্পীরা গেয়েছেন। এরপর চেয়ারম্যান ওওকুরা কুনিহিকোর শুভেচ্ছা বক্তৃতা। বাণী পড়ে শোনানো হয় জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেনতারোও কোসাকা, বৌদ্ধপণ্ডিত রেভারেন্ড রোজেন তাকাহিসা, প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও সমালোচক নিয়োজেন হাসেগাওয়া’র। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত লালজি মেহরোত্রা। রেকর্ডকৃত রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বর বাজিয়ে শোনানো হয়। স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতা দেন খ্যাতিমান কবি কুসানো শিনপেই। তামাগাওয়া গাকুয়েন কোয়ার ‘গ্লোরিয়া’ নামে সমস্বরে একটি গান পরিবেশ করে।
দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ সঙ্গীতের জাপানি ভাষায় কোরাস। এতে কণ্ঠ দেন ৎসুকুজি বৌদ্ধ কোয়ারের শিল্পীরা। অকেস্ট্রা পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রভক্ত সাদাও ইতোও। এরপর অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’র একাংশ, নৃত্যাভিনয়ে অংশ নেন সাকাকিবারা নৃত্য দল, পরিচালনা করেন সাকাকিবারা কিইৎসু। সাকাকিবারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি শান্তিনিকেতনে ভারতীয় ধ্র“পদী নৃত্যের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সূচিপত্রের প্রথমেই মুদ্রিত আছে ‘জনগণমন’-এর স্বরলিপি এবং নিচে গানটির জাপানি অনুবাদ, অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক ওওরুই জুন। অন্যান্য পৃষ্ঠাগুলোতে আছে : ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাহিনীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, অভিনয়শিল্পীদের নাম। অধ্যাপক ও সমালোচক সাকামোতো তোকুমাৎসুর জন্মোৎসব উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। অধ্যাপক কাতায়ামা তোশিহিকো কর্তৃক মাকে নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের ‘মনেপড়া’ কবিতাটির জাপানি অনুবাদ। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণের সময়কার একটি ছবি, সংবাদপত্রে সংবাদের টুকরো, ১৯২৪ সালে জাপানে অবস্থানকালে স্বহস্তে লিখিত একটি বাণী ‘এনেছিনু সাথে লয়ে আশা / চলে গেনু রেখে ভালোবাসা’র আলোকচিত্র এবং জাপানি অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরযুক্ত একটি আলোকচিত্র। রবীন্দ্র জীবনের বর্ষপঞ্জি। ‘ভারততীর্থ’ সঙ্গীতের সংক্ষিপ্ত পটভূমি মূল বাংলা থেকে জাপানিতে ভাষান্তর করেছেন স্বনামধন্য বহুভাষাবিদ টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারততত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ওয়াতানাবে শোওকো এবং জাপানি ভাষায় গীত সঙ্গীতটির সুর করেছেন সাদাও ইতোও। শেষদিকে রয়েছে ইয়ামামুরো শিজুকার অনূদিত একটি কবিতা যেটা অনুবাদক বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে কানাডার নাগরিকদের উদ্দেশে আবেদনকৃত এবং ১৯৩৮ সালের মে মাসে অটোয়া বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত কিন্তু কোন কবিতা বাংলা নাকি ইংরেজি তার হদিস খুঁজে পেলাম না। শেষ প্রচ্ছদে রবীন্দ্রনাথের অংকিত একটি চিত্র মুদ্রিত আছে।
০৩. টেগোর
টোকিওর মতো জাপানের দক্ষিণ অঞ্চলের বাণিজ্য মহানগর ওসাকা প্রিফেকচারেও রবীন্দ্র জন্মোৎসব উদযাপনের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে গঠিত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ব্যবসায়ী ও ওসাকা চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান মিচিসুকে সুগি। কবে কমিটিটি গঠিত হয়েছে এবং অনুষ্ঠানাদি কি কি হয়েছে তার তথ্য আপাতত মিলছে না। ওসাকাতে জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান হয়েছিল নিশিতেননোওজি কাইকান মিলনায়তনে অক্টোবর মাসের ৭ তারিখে। এ উপলক্ষে সুশোভন একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছে ‘টেগোর’ নামে। তাতে দেখা যায় সভাপতির নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রয়েছে, তিনি রবীন্দ্রনাথকে জানতেন। অনুষ্ঠান সূচিতে ছিল : দু’দেশের জাতীয়সঙ্গীত পরিবেশন। স্লাইডে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি প্রদর্শন ও কণ্ঠস্বরের রেকর্ড বাজিয়ে শোনানো। কমিটির সভাপতির শুভেচ্ছা বক্তব্য, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত লালজি মেহরোত্রার শুভেচ্ছা বক্তব্য, জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লিয়াজন অফিস প্রধান তাৎসুউচি কোওনো এবং দৈনিক আসাহিশিম্বুন পত্রিকার মালিক নাগাতাকা মুরায়ামা’র বাণী। উল্লেখ্য, নাগাতাকা মুরায়ামার পিতা আসাহিশিম্বুন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা রিউহেই মুরায়ামার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল ১৯১৬ সালে জাপানে। মুরায়ামা রবীন্দ্রনাথের সম্মানার্থে একটি জাঁকজমকপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী চা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক মোরিমোতো তাৎসুও এবং অধ্যাপক মিয়ামোতো মাসাকিয়ো।
এ অনুষ্ঠানের দুটি বড় আকর্ষণ ছিল ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ তথ্যচলচ্চিত্র এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তোকু গোতা রচিত ও পরিচালিত ভগবান বুদ্ধের জীবনীভিত্তিক নাটক ‘বসন্তের প্রাণ’। রবীন্দ্রনাথের একটি দুর্লভ ছবি মুদ্রিত হয়েছে তার স্বাক্ষরসহ সুজুকি নামক একজন রবীন্দ্রভক্তের সংগ্রহ থেকে। এরপর রবীন্দ্র জীবনের বর্ষপঞ্জি। নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন ওসাকা শিরিৎসু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসাও মিয়ামোতো ‘রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে’। রবীন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ডে গভীর আধ্যাত্মিকতা কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন। কৃষি নিয়ে যে কাজ তিনি করেছেন সেটা সেই সময়কার জন্য এক বিপ্লব এবং অগ্রণী এক উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছেন। এ রচনার পাশেই মুদ্রিত হয়েছে ইংরেজিতে লেখক, সমালোচক, সাহিত্য বিশেষজ্ঞ দার্শনিক এবং ভারতীয় লেখক সমিতির কর্মসচিব মুলক রাজ আনন্দের একটি বাণী। আরও একটি প্রবন্ধ লিখেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবিহারা তোকুও ‘এখনো প্রাণবন্ত চিন্তা’ নামে। লেখক এক স্থানে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের চিন্তাদর্শন কোনোভাবেই পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট স্থানের পুরনো ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ব্যাপকভাবে সমগ্র মানব জাতির স্বাভাবিক অনুরাগ হিসেবে যথার্থ আধুনিকত্বে নির্ভর করা যায়, আবার রবীন্দ্রনাথের চারিত্রিক স্বাতন্ত্র্য যুগের ভিন্ন চিন্তা নয়, বরং আধুনিক মানব হিসেবে বিপুল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয়কেই নির্দেশ করে। এর পাশে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার অনুবাদ, করেছেন মিয়ামোতো মাসাকিয়ো। তারপর রবীন্দ্রনাথের তথ্যচলচ্চিত্রটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা লিখেছেন অধ্যাপক ওওরুই জুন। আছে ‘বসন্তের প্রাণ’ নাটকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। টোকিওতে রবীন্দ্র জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে বিগত সাড়ে তিন বছরের সব কর্মকাণ্ডের দলিলপত্রের প্রদর্শনীর বিবরণ। রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ, করেছেন অধ্যাপক মিয়ামোতো মাসাকিয়ো। আপোরোন শা প্রকাশনা সংস্থার রবীন্দ্রনাথবিষয়ক বিজ্ঞাপন। শেষে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কবিতাটির জাপানি অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক কাতায়ামা তোশিহিকো। রবীন্দ্রনাথের দুটি চিত্রকর্মও মুদ্রিত আছে।
০৪. কুরিয়ে
ঋতু এবং কর্মজীবনভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘কুরিয়ে’ ১৯৫৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ম্যাগাজিনটি ১৯৬১ সালের আগস্ট সংখ্যায় খ্যাতিমান ভারত গবেষক, ভারতীয় ধ্র“পদী সাহিত্য বিশ্লেষক তানাকা ওতোয়া একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন ‘টেগোর এবং জাপান’ শিরোনামে। তিনি প্রবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে লিখেছেন, সুপুরুষ, সুকণ্ঠের অধিকারী রবীন্দ্রনাথকে তার তরুণকালে গান্ধী প্লেবয় বলে প্রশংসা করেছিলেন এমন কথা শুনেছি। সেটা সত্যি না মিথ্যে জানা নেই, কিন্তু ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ ছিলেন। মানব রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরও গবেষণা করা আবশ্যক বলে মনে হয়। লেখাটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছবি ও চিত্রকর্ম মুদ্রণ করেছে।

যে কারণে ওবামার আফ্রিকা সম্মেলন

ওয়াশিংটনে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্র-আফ্রিকান নেতাদের শীর্ষ
সম্মেলনের একটি অধিবেশনে আফ্রিকার কয়েকটি দেশের
নেতাদের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ছবি: এএফপি
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আয়োজনে গত বুধবার ওয়াশিংটনে শেষ হয়ে গেল তিন দিনব্যাপী আফ্রিকা সম্মেলন। যার আনুষ্ঠানিক নাম ছিল যুক্তরাষ্ট্র-আফ্রিকান নেতাদের সম্মেলন। মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্টের আয়োজনে এ ধরনের সম্মেলন এটাই প্রথম। সম্মেলনে আফ্রিকার ৫০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান যোগ দেন। সম্মেলনে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তা ইস্যু। খবর আল-জাজিরা ও এপির। প্রশ্ন হলো, আফ্রিকার নেতাদের নিয়ে ওবামার এই সম্মেলনের আয়োজন কেন? এই সম্মেলনের কয়েক দিন আগেই আফ্রিকার ৫০০ মেধাবী তরুণকে নিয়েও এ ধরনের আয়োজন করেছিলেন ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিবেচনা করলে ওবামার এই আয়োজন ‘অত্যন্ত গুরুত্ববহ’, বিশেষ করে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বিবেচনায়। সম্মেলনের প্রথম দিন কংগ্রেস বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের প্রধানদের জন্য ক্যাপিটল হিলে অভ্যর্থনার আয়োজন করে। আফ্রিকার নেতারা সম্মেলনে অংশ নিতে ওয়াশিংটনে যাওয়া শুরু করলে ওবামা বলেন,
‘আমরা সম্মেলনের দিকে তাকিয়ে আছি, আমি আশাবাদী, এই আয়োজন দারুণ সফল হবে।’ সম্মেলন শেষে হোয়াইট হাউসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সম্মেলনে ভবিষ্যৎ আফ্রিকায় বিনিয়োগ, শান্তি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ, নারীদের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ, তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরি ও তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। যে বিষয়গুলো বিবেচনা করে ওবামা এই আয়োজন করেন, তার অন্যতম হলো নিরাপত্তা সহযোগিতা। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আরেকটি কারণ হতে পারে অর্থনীতি। বিশ্ব অর্থনীতিতে এখন প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেকে বেড়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোতে বিনিয়োগ করা ছাড়াও আফ্রিকার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির বিষয়টি হয়তো বিবেচনা করেছে ওয়াশিংটন। বিশ্বের ১০টি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশের মধ্যে ছয়টিই আফ্রিকায়। আবার সম্মেলন আয়োজনের পেছনে চীনের প্রভাব থেকে আফ্রিকাকে বের করে আনার বিষয়টিও কাজ করতে পারে। কারণ, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এখন চীন ব্যাপক হারে বিনিয়োগ করছে। ওবামার আফ্রিকা সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন আফ্রিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে।

আমৃত্যু সঙ্গী

ডন সিম্পসন ও স্ত্রী ম্যাক্সিন সিম্পসন
ডন সিম্পসন (৯০) ও স্ত্রী ম্যাক্সিন সিম্পসন (৮৭) প্রায় ৬২ বছরের বিবাহিত জীবন কাটিয়েছেন। পৃথিবী ছেড়ে চলেও গেছেন একসঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় নিজেদের নাতনির বাড়িতে তাঁদের মৃত্যু হয়। খবর ইনডিপেনডেন্টের। সিম্পসন দম্পতি কয়েক বছর ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন।
তাঁদের নাতনি মেলিসা স্লোয়ান বলেন, বেকার-সফিল্ড শহরের এক বিনোদনকেন্দ্রে প্রথম দেখা হয়েছিল ডন ও মেক্সিনের। ডন তখনই মনে মনে ঠিক করেন, মেক্সিনকে জীবনসঙ্গিনী করবেন। মেলিসা বলেন, পরিচয়ের ছয় মাসের মধ্যেই মেক্সিনকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন ডন। ১৯৫২ সালে বিয়ে হয়। গত ২১ জুলাই দুজনই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আরও তিন বছর

এডওয়ার্ড স্নোডেন
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএর সাবেক চুক্তিভিত্তিক কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন রাশিয়ায় আরও তিন বছর থাকার অনুমতি পেয়েছেন। তাঁর রুশ আইনজীবী আনাতোলি কুচেরেনা গতকাল বৃহস্পতিবার মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নজরদারিসংক্রান্ত নথি ফাঁস করে আলোড়ন সৃষ্টিকারী স্নোডেনের আইনজীবী বলেন,
তাঁর মক্কেলের রাশিয়ায় মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে। তাঁকে আরও তিন বছর রাশিয়ায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৩ জুন রাশিয়ায় আশ্রয় নেন স্নোডেন। গত ৩১ জুলাই রাশিয়ায় তাঁর থাকার মেয়াদ শেষ হয়। এএফপি