Tuesday, April 21, 2015

বরগুনায় কুপিয়ে শিক্ষকের হাত-পা বিচ্ছিন্ন

বরগুনার আমতলী উপজেলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষককে কুপিয়ে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এলাকার একদল সন্ত্রাসী। এ ঘটনায় পুলিশ পাঁচজনকে আটক করেছে । মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে এ ঘটনাটি ঘটেছে।
আহত শহীদুল ইসলাম আমতলী উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের আ. খালেক মিয়ার ছেলে এবং গাজীপুর মাদ্রাসার সিনিয়র সহকারী শিক্ষক। এ ঘটনায় পুলিম পাচজনকে গ্রেফতার করেছেন। এরা হলেন ,ইয়াকুব, সাইদ, মজিবর, কাওছার ও বাবুল। এ ঘটনায় আমতলী থানায় একটি মামলা হয়েছে ।
আমতলী থানা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকালে মাদরাসা শিক্ষক শহীদুল বাড়ি থেকে চাওড়া কালিবাড়ী নামকস্থানে এলে পথিমধ্যে সন্ত্রাসী সাইদ (২৫), ইয়াকুব (৩০) ও তাদের সঙ্গে থাকা আরো কয়েকজন সন্ত্রাসী তাকে এলোপাথাড়ি কোপায়। এ সময় শহীদুলের বাম হাত ও বাম পা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এসময় তার চিৎকারে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরন করেন।
জমি-জমা নিয়ে পূর্ব বিরোধের জের ধরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে পুলিশ ও স্থানীয়দের ধারণা।
আমতলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সুকুমার রায় বলেন, এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। আহত শহিদুলের পরিবারের অভিযোগে একটি মামলা হয়েছে।

ভোটারদের মনে স্বস্তি দিতে সেনা মোতায়েন: সিইসি

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, তিনটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভোটারদের মনে স্বস্তি দিতে আগামী ২৬ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত চারদিনের জন্য সেনা মোতায়েন করা হচ্ছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। সিইসি বলেন, এখনো পর্যন্ত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার পরও ভোটারদের মনে স্বস্তি আনতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিচারিক ক্ষমতা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিচারিক ক্ষমতার বিষয়টি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আইনে যেভাবে আছে, সেভাবে নির্বাচনে সেনাবাহিনী কাজ করবে। আশা করি, সিটি নির্বাচনেও তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বিএনপি চেয়ারপার্সনের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, নির্বাচনে উৎসবমূখর পরিবেশে প্রচারণা চলছে। আমি নিজেও ঢাকা উত্তর সিটির কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখেছি, প্রচারণায় একটি গাড়ি ব্যবহার গ্রহণযোগ্য। তবে একাধিক গাড়ীর ব্যবহার আচরণবিধির লঙ্ঘন। আশা করি সংশ্লিষ্ট সকলে বিষয়টি মেনে চলবেন।
তিনি আরো বলেন, সোমবার খালেদা জিয়ার প্রচারণায় সময় অপ্রীতিকর ঘটনায় উভয় পক্ষে মামলা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। নিরপেক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কমিশন থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এর আগে দুপুরে নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ সিটি নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সাংবাদিকদের জানান।
এ বিষয়ে সন্ধ্যায় তিন ব্যাটালিয়ন সেনা চেয়ে সশস্ত্রবাহিনী বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সশস্ত্রবাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার বরাবর পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, সিটি নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শাস্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন আইনানুগ ও প্রশাসনিক সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভোটাররা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য ভোটগ্রহণের দিন, আগের দুইদিন এবং ভোটের পরের দিনসহ মোট চারদিনের জন্য নির্বাচনী ও ভোটকেন্দ্র সংশ্লিষ্ট এলাকায় আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে গত ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত হয়। ভোটার এবং ভোটগ্রহণ ব্যবস্থাপনার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করার বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, প্রতিটি সিটি এলাকায় ১ ব্যাটালিয়ন সেনা সদস্য আগামী ২৬ থেকে ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। রিটার্নিং অফিসার তলব করলেই তারা পরিস্থিতি মোকাবেলা করবেন। এতে আরো বলা হয়েছে, ফৌজদারী কার্যবিধির ৯ম ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জারিকৃত ইন্সট্রাকশন রিগার্ডিং এইড টু সিভিল পাওয়ার বিষয়ে ৭ম ও ৯ম অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ও নিয়মানুযায়ী সেনাবাহিনী পরিচালিত হবে। মোতায়েনকৃত সেনাবাহিনী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী বে-সামরিক প্রশাসনকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করবে। সেনাবাহিনীর প্রতিটি ব্যাটালিয়নের সঙ্গে নির্ধারিত সংখ্যক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

সিটি নির্বাচনে সহিংসতায় বৃটিশ হাইকমিশনার ও যুক্তরাষ্ট্রের নিন্দা, প্রচারণায় বাধা না দেয়ার আহবান

ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনি প্রচারণায় বাধা না দেয়ারও আহবান জানিয়েছে দেশটি। ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে এ আহবান জানানো হয়। নির্বাচনি প্রচারণায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরের ওপর হামলার পরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এ বিবৃতি এলো।
এতে বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থের জন্য সহিংসতার ব্যবহারকে আমরা তীব্র ভাষায় নিন্দা জানাই। নির্বাচনসমূহ যাতে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সহিংসতামুক্তভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তা নিশ্চিতে আমরা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সবাইকে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা নিরাপত্তা বাহিনীসমূহকে নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সম্পৃক্ততায় (নির্বাচনী সভা-সমাবেশ) বাধা সৃষ্টি না করতে, প্রার্থীদের রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা দিতে এবং যারা আইন লঙ্ঘন করবে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও আহ্বান জানাচ্ছি।
এদিকে, ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র মেরি হার্ফের প্রেস ব্রিফিং এও খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলার বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়-
প্রশ্ন: আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার ওপর হামলা হয়েছে। আপনার কাছে এ ঘটনার বিষয়ে নতুন কোন তথ্য আছে কি?
মুখপাত্র: আমি ওই রিপোর্টগুলো দেখিনি। আপনার জন্য আমি সেগুলো যাচাই করে দেখবো।
প্রশ্ন: তিনি সিটি নির্বাচনের প্রচারণা চালাচ্ছিলেন।
মুখপাত্র: ঠিক আছে। আমি বিষয়টি যাচাই (টিমের সঙ্গে) করে দেখবো।
প্রশ্ন: গত বৃহস্পতিবার আমি আপনার কাছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলাম--
মুখপাত্র: হ্যাঁ, আমি এ বিষয়ে আর কিছু শুনিনি। তাই আমি আপনার জন্য বিষয়টি আবারও যাচাই করে দেখবো।
প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘ উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানাচ্ছে এবং আমরা দেখেছি--
মুখপাত্র: হ্যাঁ। আমরা বেশ কিছুদিন সে আহ্বান জানিয়েছি।
প্রশ্ন: আমরা দেখেছি এরপর দৃশ্যপট কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু, এখন দৃশ্যপট কিছুটা শঙ্কার মধ্যে। কারণ, যেহেতু বিরোধী দলের গাড়ির শোভাযাত্রায় হামলা- সম্প্রতি বাংলাদেশের উত্তেজনা প্রশমনের ব্যাপারে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?
মুখপাত্র: এ বিষয়টা নিয়ে আমরা বেশ কয়েকবার কথা বলেছি। আমার কাছে আপনার জন্য এ ব্যাপারে নতুন কোন বিশ্লেষণ নেই। তবে আবারও বলতে হয়, আমাদের টিমের কাছ থেকে নতুন কোন তথ্য এর সঙ্গে সংযোজন করা যায় কিনা, সেটা আমি দেখবো।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আমি আরেকটি বিষয় যোগ করতে চাই। পুলিশ--
মুখপাত্র: হ্যাঁ।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুলিশি নিরাপত্তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। সরকার গতকালই তা করেছে। তাই তাদের ওপর হামলা হয় এবং তার কার্যালয় থেকে পুলিশ বাহিনী প্রত্যাহার করা হয়েছে। যদি আপনার কাছে এ ব্যাপারে কোন তথ্য থাকে
মুখপাত্র: ঠিক আছে। আমি আপনার প্রশ্নের সঙ্গে এটাও যোগ করবো।
নির্বাচনী সহিংসতায় বৃটিশ হাইকমিশনারের নিন্দা
বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাই কমিশনার এইচই রবার্ট ডব্লিউ গিবসন সিএমজি ঢাকা ও চট্টগ্রামে আসন্ন সিটি নির্বাচনের পূর্বে বিরাজমান সহিংস পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং একই সঙ্গে নিন্দা জানিয়েছেন। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তিনি সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পথ পরিহার করে গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রার্থী নির্বাচনের বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে আজ বৃটিশ হাই কমিশনের ওয়েবসাইটে একটি বিবৃতি দেয়া হয়েছে। বিবৃতিতে এখানে তুলে ধরা হলো:
বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাই কমিশনার এইচই রবার্ট ডব্লিউ গিবসন সিএমজি ঢাকা ও চট্টগ্রামের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য গত ২ সপ্তাহের প্রচারণালীন সহিংস ঘটনার রিপোর্টের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, সব রাজনৈতিক দল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নির্বাচন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ছিল যে, সহিংসতা বা ভয়ভীতি প্রদর্শন ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণা সম্পন্ন করার বিষয়টি নিশ্চিত করা। আগামী ২৮শে এপ্রিল নির্বাচকম-লী প্রকৃত গণতান্ত্রিক পন্থায় প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করছেন তিনি।
খালেদার কার্যালয়ে কূটনীতিকরা
বিকালে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠকে বসছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। এরইমধ্যে খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে বেশ কয়েকজন কূটনীকিকে প্রবেশ করতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন আমাদের স্টাফ রিপোর্টার নুর মোহাম্মদ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, জাপান, তুরস্ক, ফ্রান্স, কাতার এবং পাকিস্তানের কূটনীতিক এরই মধ্যে কার্যালয়ে প্রবেশ করেছেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদ এবং আবদুল কাইয়ুমও এরই মধ্যে সেখানে উপস্থিত হয়েছেন।
খালেদার গাড়িবহরে হামলার বিচার চান আনিসুল হক
নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন ঢাকা উত্তরে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী আনিসুল হক। তিনি বলেন, এগুলো বন্ধ করা উচিত। আমরা এর নিন্দা জানাই, আসুন সবাই এদের প্রতিহত করি। সকালে রাজধানীর কালাচাঁদপুর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় সংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন। আনিসুল হক বলেন, যারা হামলা করেছে তাদের চিহ্নিত করে বিচার করা উচিত। তবে যেহেতু বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে, তাই যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে তাদের বিচারের আওতায় আনা দরকার। এর আগে কালাচাঁদপুর রোডে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে পথসভায় বক্তব্য রাখেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন আনিসুল হকে নির্বাচন প্রচারণা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) ফারুক খান, আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১৮ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জাকির হোসেন (বাবুল), গুলশান থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়াকিল উদ্দিন প্রমুখ।

‘নকল করতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন সরকার প্রধান’ -ডা. জাফরুল্লাহ

২৮ এপ্রিল সরকার প্রধান ও নির্বাচন কমিশনের জন্য অগ্নিপরীক্ষা মন্তব্য করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ‘গতকাল বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলা করে সরকার প্রধান প্রথম পরীক্ষায় ফেল করেছে। নকল করতে গিয়ে ধরা খেয়েছেন তিনি।’
আজ মঙ্গলবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব আয়োজিত এক মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। নববর্ষের দিনে টিএসসিতে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ ও দোষীদের গ্রেফতারের দাবিতে এ মানববন্ধন পালিত হয়।
ডা. জাফরুল্লাহ আরো বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার তার সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে জনগণের কাছে ভোট প্রার্থনা করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু সরকার তার মুখ বন্ধ করে দিতে চায়। সরকার চায়না সুষ্ঠু ভোট হোক।
টিএসসিতে নারী নির্যাতনের ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এ ঘটনা ’৭১-এর পাকিস্তানি বাহিনীর নারী নির্যাতনের মতো। সরকার এখন ৭১ এর পুণারাবৃত্তি ঘটিয়েছে। তারা পাকিস্তানিদের ধারাবাহিকতা রক্ষা করছে।
মানববন্ধনে সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক রুহুল আমিন গাজী বলেন, টিএসসিতে কারা নারী নির্যাতন করেছে তা সচেতন দেশবাসী জানে। কিন্তু দেশের নারী সংগঠনগুলো এখন মুখে কুলুপ এটে রয়েছে। তাদের মুখে এখন কোনো কথা নেই। বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যার উদ্দেশে হামলা করা হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ২৮ এপ্রিল ব্যালটের মাধ্যমে জনগণ এর জবাব দেবে।
ড্যাক সভাপতি ডা. এ কে এম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে এতে আরো বক্তব্য রাখেন, ড্যাব মহাসচিব ডা. জাহিদ হোসেন, যুগ্ম-মহাসচিব ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, জাতীয় প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ প্রমুখ।

‘খালেদা জিয়াকে হত্যার উদ্দেশ্যেই হামলা’ বিদেশী কূটনীতিকদের ব্রিফ করবে বিএনপি, বিএনপির মামলা গ্রহণ করেছে পুলিশ

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে অজ্ঞাত ১০০ ব্যক্তিকে আসামি করে তেজগাঁও থানায় মামলা করেছেন চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবরসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ফজলে এলাহী আকবর। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল থানায় গিয়ে এ অভিযোগ দাখিল করেন। অন্যদের মধ্যে ছিলেন এডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া ও এডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদারসহ চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। পরে দুপুরের দিকে মামলাটি গ্রহণ করা হয়। তেঁজগাও থানার উপ-পরিদর্শক রমজান আলী মামলাটি গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলা নং ৪০। এতে ১০০ অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে। এদিকে  গতকাল রাত পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও থানায় একটি মামলা করেছেন ঢাকা মহানগরের ২৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল হক। ওই মামলায় বিএনপির অজ্ঞাত ১০০ জন নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। গতকাল বিকালে রাজধানীর কাওরান বাজারে খালেদা জিয়ার নির্বাচনী প্রচারণাকালে হামলা চালায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। এসময় তারা জয় বাংলাসহ বিভিন্ন ধরণের স্লোগান দেন। হামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা রক্ষীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
‘খালেদা জিয়াকে হত্যার উদ্দেশ্যেই হামলা’
আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ অভিযোগ করে বলেছেন, খালেদা জিয়াকে হত্যার উদ্দেশ্যেই সোমবার তার গাড়িবহরে হামলা ও গুলি করা হয়েছে। গাড়ি বুলেটপ্রুফ হওয়ায় তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন।
মঙ্গলবার সকালে পুরানা পল্টনে আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সাবেক এই ভিসি।
তিনি বলেন, গতকাল যে ঘটনা ঘটেছে তা পুরো জাতি দেখেছে। যারা হামলার সঙ্গে জড়িত তারা আওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং স্বেচ্ছাসেবকলীগের নেতাকর্মী।
নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা এমন সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, গতকাল যে হামলা হয়েছে তাতে আমরা সংশয় প্রকাশ করছি যে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা।
তিনি বলেন, এ ঘটনার পরেও সিইসি নীরব। এতেই বোঝা যায় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) শওকত মাহমুদ, কবি আব্দুল হাই শিকদার প্রমুখ।
বিদেশী কূটনীতিকদের ব্রিফ করবে বিএনপি
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে সশস্ত্র হামলা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের ব্রিফ করা হবে। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান অফিসে মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় অনুষ্ঠিত হবে এই ব্রিফিং। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এ এম বি সাবিহউদ্দিন আহমেদ এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানিয়েছেন। এদিকে কূটনীতিক সূত্রে জানা গেছে, সরকারের একাধিক মন্ত্রী উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের সাথে কথা বলেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার সহিংসতায় ব্রিটেনের উদ্বেগ
ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে সন্ত্রাস ও সহিংস ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিটেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সহিংসতামুক্ত ও ভয়ভীতিহীন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সবগুলো রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। ব্রিটেনের পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার রবার্ট ডব্লিউ গিবসন মঙ্গলবার দুপুরে গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে এমন তথ্য দেন।
গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তায় রবার্ট ডব্লিউ গিবসন বলেন, ‘গত দুই সপ্তাহে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারণা চলাকালে সংঘটিত সহিংস ঘটনাগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ব্রিটেন। নির্বাচনী প্রচারণায় সংঘটিত এমন সহিংসতা উদ্বেগজনক।’
বার্তায় রবার্ট ডব্লিউ গিবসন আরও বলেন, ‘সহিংসতামুক্ত ও ভয়ভীতিহীন নির্বাচনী প্রচারণার পরিবেশ নিশ্চিতে রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের যথাযথ দায়িত্ব পালনের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। যেন ভোটাররা তাদের ভোটাধিকার নির্বিঘ্নে প্রয়োগ করতে পারেন।’

খালেদার গাড়িবহরে হামলার কথা স্বীকার করে ছাত্রলীগের আল আমিন যা বললেন...

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাকারীদের একজন আল আমিন। রাজধানী তেজগাঁও থানা ছাত্রলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এই তরুণ। সোমবার বিকালে কাওরানবাজারে খালেদার গাড়িবহরে হামলার সময় এক ছবিতে আল আমিনকে সামনের কাতারে দেখা গেছে। পাশাপাশি তেজগাঁও স্টেশন রোডের মুখে থানা ছাত্রলীগের কার্যালয়েও বক্তব্য রাখা অবস্থায় তাকে দেখা গেছে অন্য এক ছবিতে। এ ছাড়া হামলাকারীদের মধ্যে আরেকজনের নাম জাকির। তিনি ২৬ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
বাংলা ট্রিবিউন এর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।
এসব বিষয়ে জানতে চেয়ে ফোন করা হলে সোমবার দিবাগত রাত ১২টা ৩৮ মিনিটে আল আমিন বাংলা ট্রিবিউনের কাছে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, আমার হাতে প্রথমে একটা ইটার টুকরা এসে পড়ে, এতে হাতে ব্যথা পাই। এর পরই আমি প্রতিবাদ করেছি।
কিন্তু কী কারণে হামলা করতে গেলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে আল আমিন জানান, কী কারণে তা সবাই জানে। আপনি সাংবাদিক, আপনি তো আরও আগে জানার কথা।
এরপর তিনি হামলার কারণ উল্লেখ করে বলেন, আমি বাজার করতে গেছিলাম। এরপর ইটার টুকরা এসে পড়ছে।
নিজের পড়াশোনা সম্পর্কে আল আমিন বলেন, আমি তেজগাঁও কলেজে অনার্সে পড়ি।
রাজনীতি করেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, না ভাই রাজনীতি করি না।
হামলা করার পর অনুভূতি কী জানতে চাইলে উত্তরে বলেন, অনুভূতি আর কি, হাতে ব্যথা পাইছি। এখনও হাত নাড়াতে পারছি না।
এর আগে রাত ১২টা ৩৬ মিনিটে ফোন করে পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, হুমম, আমিই আল আমিন। এরপর একটা ফোন আসছে বলে তিনি লাইনটি কেটে দেন।
তারও আগে ১২টা ৩৪ মিনিটে ফোন করা হয় হামলাকারীদের অারেকজন জাকিরকে। তিনি ২৬নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট।
তিনি ছাত্রলীগের বলে নিজেই স্বীকার করেন। বলেন, বাবা অসুস্থ। তারপর লাইনটি কেটে যায়।
এরপর রাত ১২টা ৪৭ মিনিটে জাকির নিজেই ফোন করেন। বলেন,  কী যেন জানতে চাইছিলেন ভাই। বলেন।
এরপর হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমরা তো করি নাই। কাওরানবাজারেই যাই নাই। শুনছি এটা এল রহমান ও নবী সুলেমান গ্রুপের গ্যাঞ্জাম হইছিল।
কিন্তু ছবিতে আপনাকে দেখা গেছে কাঠের টুকরো হাতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করছেন? উত্তরে জাকির বলেন, আমি ছিলাম না। ভালো করে ফলো করেন। যাই নাই, ছবি পাইবেন কী কইরা। এরপর সালাম দিয়ে লাইনটি কেটে দেন জাকির।
গতকাল সোমবার বিকালে রাজধানীর কাওরানবাজারে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর বিএনপি ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী অভিযোগ করে বলেন, হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন তেজগাঁও থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মাওলা চৌধুরী মালা এবং ছাত্রলীগ ঢাকা উত্তরের সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান।
এজন্য সরকারকে দায়ী করে বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপি। যদিও গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাওরানবাজারের ঘটনার জন্য খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করেছেন।
সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাঃ মুহুর্মুহু ইট নিক্ষেপ আহত ২৫, খালেদা জিয়ার গাড়ি ভাঙচুর, হামলার পরও খালেদা জিয়ার প্রচারণা অব্যাহত

খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলাঃ মুহুর্মুহু ইট-পাটকেল নিক্ষেপ,
২৫ জন গুরুতর আহত, খালেদা জিয়ার গাড়ি ভাঙচুর
খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা করতে এক যুবক
হাতুড়ি নিয়ে মাইক্রোবাসের দিকে এগিয়ে যায়।
হামলার পরও খালেদা জিয়ার প্রচারণা অব্যাহত
রাজধানীতে নির্বাচনী প্রচারণার তৃতীয় দিনে কারওয়ানবাজারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের সম্মিলিত এ হামলায় খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষীসহ কমপক্ষে ২৫ জন গুরুতর আহত হয়েছেন। ইট-পাটকেল-লাঠি ছুড়ে ভাঙচুর করা হয়েছে বহরে থাকা এক ডজনেরও বেশি গাড়ি। খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়িও হামলার শিকার হয়েছে। ঢিল ছুড়ে মারা হয়েছে খালেদা জিয়াকে লক্ষ্য করে। তবে তিনি অক্ষত অবস্থায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে পেরেছেন। এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ বিক্ষোভ ও আগামীকাল বুধবার ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি বাদে সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি।
গতকাল সোমবার বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটে খালেদা জিয়া গুলশানের বাসভবন ফিরোজা থেকে পুলিশি নিরাপত্তা ছাড়াই তৃতীয় দিনের মতো নির্বাচনী প্রচারণায় বের হন। সকাল ৯টায় খালেদা জিয়ার নিরাপত্তায় থাকা পুলিশ সদস্যদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। যদিও আগের দুই দিন পুলিশি নিরাপত্তা পেয়েছিলেন তিনি। গুলশান থেকে সরাসরি রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কারওয়ানবাজারে বিকেল সাড়ে ৫টায় এসে উপস্থিত হন। কাঁচাবাজারে গণসংযোগ শুরু করেন তিনি।
পৌঁনে ৬টায় কারওয়ানবাজার পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের উল্টো দিকে গাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে পূর্বমুখী হয়ে বক্তব্য রাখছিলেন খালেদা জিয়া। এ সময় উল্টো দিকে ‘জয়বাংলা’ স্লোগান দিয়ে বেশ কয়েকজন যুবক গাড়িবহরে হামলা শুরু করে। তাদের অনেকের হাতে ছিল লাঠি। তারা এলোপাতাড়ি ইট ও ডাবের খোল ছুড়তে থাকে। যানজটের কারণে খালেদা জিয়ার গাড়ি সামনের দিকে এগোতে পারছিল না। হামলাকারীদের অনেকে খালেদা জিয়ার গাড়ি ল্য করে ইট ছুড়তে থাকে। তার গাড়ির ছাদ ও কাচে বেশ কয়েকটি ইটের টুকরা পড়তে দেখা গেছে। এ সময় বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী ও খালেদা জিয়ার নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা তার গাড়ি ঘিরে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করার চেষ্টা করেন। হামলায় নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে কয়েকজনের মাথা ফেটে যায়। গাড়িতে খালেদা জিয়া সাধারণত বসেন দ্বিতীয় সারিতে। ওই বরাবর তার গাড়ির ডান কাচ ইটের আঘাতে ফেটে যায়। একই সময়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়ার গাড়ির ঠিক পেছনে তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত একাধিক মাইক্রোবাসে লাঠি, লোহার পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি ভাঙচুর চালাতে থাকে। খালেদা জিয়ার বহরে থাকা অতিরিক্ত গাড়িটিও ভাঙচুর করা হয়। ভাঙচুর করা হয় নিরাপত্তাবাহিনীর (সিএসএফ) কমপক্ষে পাঁচ-ছয়টি গাড়ি। খালেদা জিয়াকে লক্ষ্য করেও ঢিল মারতে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। তাকে হামলা থেকে রক্ষা করতে গিয়ে বেশ কয়েকজন সিএসএফ সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম হয়েছে। খালেদা জিয়ার গাড়িতে ছোপ ছোপ রক্ত লেগে থাকতে দেখা গেছে। আহতদের ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গাড়ি সামনের দিকে এগোতে থাকলে হামলাকারীরাও ধাওয়া দিয়ে ভাঙচুর চালাতে থাকে। একপর্যায়ে এফডিসি হয়ে মগবাজারের দিকে চলে আসে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর। কারওয়ানবাজারের পাইকারি মাছের আড়তের কাছাকাছি পর্যন্ত হামলাকারীরা তার গাড়িবহরকে ধাওয়া করে। পরে হামলাকারীরা কারওয়ানবাজারে মিছিল করে। এ সময় ‘কারওয়ানবাজারের মাটি, ছাত্রলীগের ঘাঁটি’- এমন স্লোগানও দেয়া হয়।
আহত যারা : হামলায় আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইউনাইটেড হাসপাতালে আহত অবস্থায় ভর্তি করা হয় খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, সিএসএফ (চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী) সদস্য ফজলুল করিম, ফারুক হোসেন ও খালেদা জিয়ার অতিরিক্ত গাড়ির ড্রাইভার শাহজাদা শাহেদকে।
পরিণতি ভালো হবে না : খালেদা জিয়া
নির্বাচনী প্রচারণায় কারওয়ানবাজার এলাকায় গাড়িবহরে হামলা
চালানোর সময় খালেদা জিয়া গাড়ির ভেতরে ঢুকছেন : নয়া দিগন্ত
নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের বাস প্রতীকে ভোট চাইতে গিয়ে রাজধানীর কাওরান বাজারে হামলার শিকার হন তিনি। হামলার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় খালেদা জিয়া বলেন, ‘এ ধরনের হামলার পরণতি হবে খুবই ভয়াবহ। কারা এগুলো করছে আমরা জানি। তাদের গুণ্ডামি দেখে নেয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘যারা এ দেশের মানুষের ভোটের ও ভাতের অধিকার কেড়ে নিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন চলবে। অবৈধ এ সরকার রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে সব জায়গায় চুরি করছে। এ চোরদের জনগণ ভোট দেবে না।’
হামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়ির (ঢাকা মেট্রো-গ-১৩২৬১২) গ্লাস ভেঙে গেছে। এছাড়া তার নিরাপত্তা টিম-সিএসএফের চারটি গাড়িসহ অন্তত ১০টি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। হামলায় সিএসএফ সদস্য ও সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।
হামলার পরও খালেদা জিয়ার প্রচারণা অব্যাহতঃ নেতাকর্মীদের ঢল, মগ প্রতীকে ভোট চেয়ে গণসংযোগ :
হামলার পর বাসায় না ফিরে মালিবাগ এলাকায় মির্জা আব্বাসের পে প্রচারণা শুরু করেন খালেদা জিয়া। সন্ধ্যা ৭টায় তিনি মালিবাগ এলাকায় গণসংযোগ করেন। সেখান থেকে যান রাজারবাগ এলাকায়। সেখানে জনগণের কাছে মির্জা আব্বাসের পে ‘মগ’ মার্কায় ভোট চান। মগের পে ভোট চেয়ে গণসংযোগ করেন শাজাহানপুরে মির্জা আব্বাসের বাসা সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী পরিবেষ্টিত হয়ে খালেদা জিয়া সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চান।
এরপর তিনি যান খিলগাঁও। খিলগাঁও এলাকা থেকে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে পুলিশি প্রটোকল দেয়া শুরু হয়। এরপর তার গাড়িবহর মালিবাগ রেলগেট, মালিবাগ চৌধুরীপাড়া হয়ে পশ্চিম হাজীপাড়া, রামপুরায় যায়।
বিএনপির হাজারো নেতাকর্মী এ সময় খালেদা জিয়ার গাড়িবহরকে ঘিরে রাখেন এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী স্লোগান দেন। তাদের মুখে শোনা যায়- ‘খালেদার ওপর হামলা কেন খুনি হাসিনা জবাব চাই’, ‘খালেদা জিয়ার কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে’।

সাক্ষাৎকার- আমি রাজনীতির বাইরের নই by কাফি কামাল

অনেকটা চমক দেখিয়েই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও দাখিল করেছিলেন তাবিথ আউয়াল। পিতা ব্যবসায়ী নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়ন বাতিল হওয়ার পর আলোচনায় আসেন তিনি। সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়ে তিনি আদায় করে নেন বিরোধী জোটের সমর্থন। হঠাৎ করেই যেন সব দৃশ্যপট পাল্টে গেল। প্রতীক পেলেন বাস। তারপর দুই সপ্তাহ ধরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটে চলছেন বিরামহীন। তরুণ ও মার্জিত রুচির তাবিথ। সতীর্থদের হিসেবে ব্যবসায়ী ও সংগঠক হিসেবে শতভাগ সফল। এবার দেখার পালা রাজনীতির মাঠে-অংকে তিনি কতটা সচেতন এবং সফল। নানা প্রশ্ন নিয়ে তাবিথ আউয়ালের মুখোমুখি মানবজমিন
প্রশ্ন: ক্লান্তিহীন গণসংযোগ চালাচ্ছেন। পায়ে হেঁটে হাসিমুখে দিনরাত ছুটছেন নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে তো, আপনার জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা। কেমন অনুভব করছেন?
তাবিথ: প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি সরকারের প্রতি মানুষের ক্ষোভ। তারা আমাকে কাছে পেয়ে নানা অভিযোগ করছেন, দাবি তুলছেন, প্রত্যাশা করছেন- যা জনপ্রতিনিধি ও সরকারের কাছে জানানোর কথা। এতে পরিষ্কার যে, তারা কোন জনপ্রতিনিধিকে কাছে পান না। এটা দুঃখজনক। জনপ্রতিনিধি না পেয়ে তারা আমাকে এবং অন্য প্রার্থীদেরও নিশ্চয়ই এসব কথা জানাচ্ছেন। প্রতিদিন নতুন নতুন বিষয় উপলব্ধি করছি। আরেকটি বিষয় বলি, বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়াটা আমার কাছে অনেক জটিল বলে মনে হয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক করা উচিত। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই। নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সে উদ্যোগ নিচ্ছেন না। আরেকটি উপলব্ধি হচ্ছে, বড় কোন সমর্থন ছাড়া নির্বাচন করা কঠিন। যে কোন সাধারণ একজন মানুষের পক্ষে নির্বাচন করা কঠিন বিষয়।
প্রশ্ন: প্রতিদিন ঢাকার অলিতে-গলিতে ঘুরছেন। নিশ্চয়ই নতুন করে ঢাকাকে আবিষ্কার করছেন। এমন কোন বিষয় চোখে পড়েছে যা দেখে আপনি অবাক হয়েছেন, বিব্রত কিংবা কষ্ট পেয়েছেন?
তাবিথ: আমি মোটেই ঢাকাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছি না। আমার হৃৎস্পন্দরের সঙ্গে ঢাকা জড়িয়ে আছে। ঢাকার প্রায় ৯৫ ভাগ এলাকা আমি চিনি। ঢাকার কোথাও আমার আত্মীয়ের বাসা, কোথাও বন্ধুদের বাসা, ফুটবল খেলেছি, স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছি। ফলে অলিগলি সব জায়গায় আমার যাতায়াত হয়েছে। অনেকেই হয়তো জানেন না আমি ঘুরে বেড়াতে খুব পছন্দ করি। যখন বিদেশীরা আসে তখন তাদের নিয়ে চিড়িয়াখানা, হাতিরঝিল, পুরান ঢাকা বা বনশ্রী ঘুরিয়ে দেখাই। দুঃখজনকভাবে ঢাকাকে দুইভাগ করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণে ইতিহাস-ঐতিহ্যের অনেক বিষয় আছে। আমি পুরান ঢাকা বেশি চিনতাম। এখন গণসংযোগ করতে মোহাম্মদপুর, লালমাটিয়া, মিরপুর, শ্যামলী, খিলগাঁও যেখানেই যাচ্ছি সবই তো আমার চেনাজানা। বলতে পারেন, উত্তরার দিকে আমি কিছুটা কম চিনি। সেখানে গেলে দেখি প্রতিদিনই একটি সেক্টর বেড়েছে। যদি বলেন, অবাক বা বিস্ময়ের কথা তবে আমি বলব, প্রতিকূলতার কথা। আমি অবাক হয়েছি যখন আমার পোস্টারগুলো রাতের আঁধারে চিড়ে যাচ্ছে। মাঠকর্মীরা আটক হচ্ছে। ভেবেছিলাম, হয়রানি যা ছিল তা ধীরে ধীরে কমবে। কিন্তু এখন দেখছি সেটা উল্টো বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের গাড়িবহরে হামলা মেনে নেয়া যায় না।
প্রশ্ন: নির্বাচনে সফলতা নিয়ে আপনি কতটা আত্মবিশ্বাসী?
তাবিথ: জয়ের ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। যদি নির্বাচন হয়, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে আমি নিশ্চিত বিজয়ী হবে। এই কদিনের গণসংযোগে আমার এ আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছে।
প্রশ্ন: নির্বাচিত হলে সবার আগে কোন তিনটি কাজে অগ্রাধিকার দেবেন?
তাবিথ: আমি প্রতিদিন সবার কাছে কিছু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। নির্বাচিত হলে প্রথমত, চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া ও হয়ে থাকা রাস্তাগুলোর সংস্কারে হাত দেব। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশনকে দুর্নীতিমুক্ত করার উদ্যোগ নেব। এ কাজটি প্রথমেই করতে না পারলে পরে কঠিন হতে থাকবে। তৃতীয়ত, যানজট নিরসন ও গণপরিবহনের সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেব।
প্রশ্ন: একজন সিটি মেয়রের যে ক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতা- এসব উতরে নিজের পরিকল্পনামাফিক কাজ করা কি সম্ভব? আপনি কি মনে করেন মেয়রের আরও বেশি ক্ষমতায়ন প্রয়োজন?
তাবিথ: আমি মনে করি, অবশ্যই সিটি মেয়রদের আরও বেশি ক্ষমতায়নের প্রয়োজন আছে। এটা সময়ের দাবি। সেটা একটি রূপরেখার মাধ্যমে হতে পারে। যেমন: নগর সরকার, মেট্রোপলিটন গভর্মেন্ট যে নামেই হোক। নগরবাসীর অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে মেয়রের ক্ষমতাগত যেসব সীমাবদ্ধতা আছে তা দূর করতে এটার কোন বিকল্প নেই। তবে আমার বিশ্বাস, এখন যে সীমিত ক্ষমতা আছে তার মধ্যে থেকেও আমার প্রতিশ্রুত কাজের বেশিরভাগই করতে পারবো। মানুষ একটু পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদে থাকতে চায়, সেবার মানোন্নয়ন চায়। এসব যাতে মানুষ চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়। এটা পূরণ করা অসম্ভব নয়।
প্রশ্ন: কাগজে-কলমে এটি অরাজনৈতিক নির্বাচন। বাস্তবে আপাদমস্তক রাজনৈতিক। এর একটা স্পষ্ট সুরাহা দরকার। আপনি কোনটা চান? রাজনৈতিক নাকি অরাজনৈতিক?
তাবিথ: এ ব্যাপারে আমি উন্মুক্ত মানসিকতা পোষণ করি। বাস্তবতা বিবেচনা করেই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। কখনই এমন করা উচিত নয় যে, একবার হয়ে গেছে বলে আর নিয়মের পরিবর্তন করা যাবে না। বাংলাদেশের মানুষ জেনে গেছে দেশে দুইটা প্রধান দল আছে। তাদের প্রতীক হল ধানের শীষ ও নৌকা। কথা হচ্ছে, যখন মানুষে এ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসবে তখন এসব অরাজনৈতিক নির্বাচনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হবে। যতদিন ওই মনমানসিকতা থাকবে ততদিন দলীয় সমর্থনও থাকবে।
প্রশ্ন: আপনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের শীর্ষ তিন ব্যবসায়ী সংগঠনের সমর্থন পেয়েছেন। এটা কি জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখবে যা আপনার ঘাটতি মনে করেন?
তাবিথ: জনগণের সমর্থন পাওয়ার জন্যই আমি নির্বাচন করছি। আমি জনগণের সমর্থন চাই। সেটা পাওয়ার জন্যই কাজ করছি। জনগণের সমর্থন পাওয়াটাই আসল কথা।
প্রশ্ন: আপনি বিএনপির রাজনীতিতে নতুন মুখ। নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে সহযোগিতা কেমন পাচ্ছেন। আসল চিত্র কি?
তাবিথ: বৃহত্তর অর্থে আমি রাজনীতির মাঠে নতুন মুখ। কিন্তু আমি রাজনীতির বাইরের নই। বিএনপি আমাকে সমর্থন দিয়েছে। ফলে বিএনপি নেতারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। যারা মামলার কারণে পলাতক অথবা আটক তারা ছাড়া সবাই সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। মামলার কারণে সিনিয়র নেতাদের হয়তো কম পাচ্ছি কিন্তু থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাদের অভাবনীয় সাড়া পেয়েছি। তাদের কাছে প্রচুর সহযোগিতা পাচ্ছি। আমাকে দেশে অনেক তৃণমূল নেতা আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা চান আমি তাদের এলাকায় আরও বেশি সময় থাকি। সবচেয়ে বড় পাওয়া হচ্ছে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিজেই আমার জন্য নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। 
প্রশ্ন: মেয়র নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আপনি বিস্তৃত ও জটিল রাজনৈতিক মাঠে ঢুকে পড়েছেন। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আপনি এখন বিরোধীদের চোখে একজন ‘বিএনপি’। কি বলবেন?
তাবিথ: রাজনীতি তো খারাপ জিনিস না। রাজনীতি আমরা করি মানুষের কল্যাণে। মানুষকে সেবা দেয়ার লক্ষ্যে। নীতিনির্ধারক হওয়ার উদ্দেশ্যে। এসব লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পূরণে রাজনীতি করলে তো খারাপ কিছু হয় না। রাজনীতি করা বা রাজনৈতিক পরিচয় আমার কাছে কোনভাবেই অস্বস্তির বিষয় নয়। বরং, এটা আমার জন্য স্বস্তির।
প্রশ্ন: ফেনী সকার ক্লাবের মাধ্যমে তরুণ ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে আপনি একটি অবস্থান তৈরি করেছেন। এখন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সহসভাপতি। মেয়র নির্বাচিত হলে খেলাধুলার উন্নতিতে আপনার বিশেষ কি ভূমিকা থাকবে।
তাবিথ: আমার আজকের এ অবস্থানের পেছনে আমার ফুটবলার সত্তা, ক্রীড়া সংগঠক সত্তার বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আমার নেশা এবং পেশা ফুটবল বলতে পারেন। মেয়র নির্বাচিত হলেও আমি ক্রীড়াঙ্গন থেকে সরব না। একটি কথা বলতে চাই, একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে ঢাকা শহরে আমার গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। ঢাকা শহরের জন্য শিশু-কিশোরদের খেলার মাঠ ও টুর্নামেন্টের ব্যবস্থা করা। যে কমিটমেন্ট নিয়ে বড় হয়েছি, সেটা যে কোন মূল্যেই পূরণ করবো।
প্রশ্ন: আপনি নিরাপদ ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কিভাবে সেটা বাস্তবে রূপ দেবেন?
তাবিথ: নিরাপত্তা প্রসঙ্গে আমার কিছু স্টাডি আছে। ক্রাইম ম্যাপিংয়ের আওতায় আমি বেআইনি কাজগুলোর ব্যাপারে তথ্য দিয়ে জনগণের সামনে তুলে ধরবো। জনমত গড়ার মাধ্যমে পরিস্থিতির উত্তরণের দিকে বেশি গুরুত্ব দেবো। মেয়র হয়তো আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন না। কিন্তু মেয়র জনগণকে নিয়ে থানায়, মন্ত্রীর বাসায়, পুলিশ কমিশনারের অফিসে যান নিশ্চয় তারা নিরাপত্তার ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে বাধ্য হবে।
প্রশ্ন: আপনি বিরোধী রাজনৈতিক জোটের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করছেন, নির্বাচিত হলে তাদের পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে কিভাবে সমন্বয় করবেন?
তাবিথ: যখন একজন জনপ্রতিনিধি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব নেবে। তখন তার ওপর অনেক দায়িত্ব ও কর্মভার চলে যাবে। তখন সরকার কিন্তু ভাববে একজন জনপ্রতিনিধিকে ছাড়া আমরা কিভাবে জনসেবা করব।
প্রশ্ন: তরুণ মেয়র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হলে তরুণদের জন্য বিশেষ কি পরিকল্পনা আছে?
তাবিথ: আমি তো তরুণদের বাইরে নই। আমি যে স্বপ্ন দেখি তা নিশ্চয়ই তরুণ সমাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। তরুণরা চায় একটি মুক্ত সমাজ, নিরাপত্তাপূর্ণ সমাজ ও বাসযোগ্য ঢাকা। আমি তরুণদের আলাদাভাবে দেখতে চাই না। কারণ তরুণরা অত্যন্ত সচেতন। তারাও ওই রকম একজন জনপ্রতিনিধি চাইছে। যিনি তাদের নয়-ছয় বুঝাতে পারবে না। এখন প্রযুক্তির যুগ, তরুণরা প্রযুক্তিগত সহায়তা চায়। এ প্রত্যাশাগুলো অযৌক্তিক নয়। তরুণ সমাজ আমার পরিকল্পিত উদ্যোগের অংশীদার হবে। 
প্রশ্ন: আপনি নেতাকর্মীদের গুমের আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নির্বাচনের আগে কি সেটা আরও প্রকট হতে পারে মনে করেন?
তাবিথ: এখানে আমার মনে করার কিছু নেই। প্রতিদিন কি ঘটছে তা সবাই দেখছে। পহেলা বৈশাখে যে দুঃখজনক ঘটনা দেখেছি, শুনেছি আর ওপর প্রশাসন থেকে যে ধরনের অস্বীকার এসেছে, শব্দটি খুঁজে পাচ্ছি না। এটা সবাইকে বুঝিয়ে দেয়, আইনশৃঙ্খলা এখন কোথায় আছে।
প্রশ্ন: আপনি গণপরিবহনের মানোন্নয়ন ও যানজট নিরসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, কিন্তু সেটা কিভাবে আপনি বাস্তবায়ন করবেন?
তাবিথ: ঢাকায় গণপরিবহন মাত্র ২০ ভাগ। তবে সব যানবাহন মিলিয়ে আমাদের সড়কের ৭০ ভাগ ব্যবহার করছে। বাকি ৩০ ভাগ কই। সেগুলো- ভাঙাচোরা, বর্জ্যের সআস্তূপ এবং ব্যবহার অনুপযোগী। যা মানুষ তা ব্যবহার করতে পারছে না। এগুলো ব্যবহার উপযোগী করতে পারলে যানজট নিরসনের জন্য ৩০ শতাংশ সড়ক বেড়ে যাবে। সেই সঙ্গে বাসের সংখ্যা ও মান বাড়াতে হবে। এছাড়া সময় এসেছে বাসের রুট পুনর্নিধারণ করার।
প্রশ্ন: নগরের বেশির ভাগ উন্নয়ন ও মেরামতের কাজ হয় সাধারণত বর্ষা মওসুমে। এতে নাগরিক ভোগান্তি বেড়ে যায়। আপনি নির্বাচিত হলে কি করবেন?
তাবিথ: গ্যাস-পানির লাইন মেরামত ও উন্নয়নের জন্য রোড কাটতে হয়। রোড কাটার অনুমতি দেয় ঢাকা সিটি করপোরেশন। বর্ষাকালে এসব কাটাকাটির জন্য অনুমতি দেব না। সহজ কথা। আর দেয়ার সময় সমন্বয় করেই দেব, কার কার কি কাজ অমুক তারিখে শুরু করবেন, অমুক তারিখে শেষ করবেন। প্রয়োজনে ওই সময় পুরো সড়কই বন্ধ থাকবে। সমন্বয় করার ক্ষমতা সিটি করপোরশনের থাকলেও সেটা করা হয়নি এতদিন। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে কাজ করলে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে অনেক কিছু করা যায়।
প্রশ্ন: সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে মেয়রের পাশাপাশি কাউন্সিলরদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, সেটা কিভাবে করবেন?
তাবিথ: নগরবাসী এখানেই আমার নেতৃত্বের পরিচয় পাবে। কিভাবে আমি অন্য জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সুশাসন নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করি। সেটাই তো আমার সাফল্য হবে।
প্রশ্ন: নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন, কেন এটাকে আপনি এত গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন?
তাবিথ: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে যতই ভাল দাবি করা হোক, মানুষ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। কমিশন বলছে সেনা লাগবে না, পুলিশকে দিয়েই তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের রাখতে পারবেন। আমি বলতে চাই না, পারবেন না। উনার যদি পারেনও তবু তো লাভ হচ্ছে না। মানুষের মাইন্ডসেট হয়ে আছে অন্যরকম। যখন একজন সেনা সদস্য একটি পুলিং বুথের সামনে দাঁড়ায়, বা রাস্তায় অবস্থান নেয়, মানুষের তখন আত্মবিশ্বাস জন্মে। আমি ভোটকেন্দ্রে যেতে পারব, আমার ভোটটি গণনা হবে এবং ভোট দেয়ার পর আমি আবার আমার বাসায় ফিরতে পারব। এই আত্মবিশ্বাসের দরকার আছে। সেনাবাহিনীকে নির্বাচনের ফিল্ডে না দেখলে মানুষের মধ্যে সে আত্মবিশ্বাস ফিরে আসবে না। অন্য যত পদক্ষেপই নেন।

সাক্ষাৎকার- রাজনীতি ছাড়া পরিবর্তন আসবে না by মাহমুদ মানজুর

ঢাকা উত্তরে সহস্র নাগরিক কমিটি ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়রপ্রার্থী আনিসুল হক। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই সরব নির্বাচনী প্রচারণায়। ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে পরিচিত হলেও নির্বাচন করছেন ক্ষমতাসীন দলের সমর্থন নিয়ে। মানবজমিনের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন নগর নিয়ে তার ভাবনার কথা। নির্বাচনী প্রস্তুতি আর প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেছেন তার ভাষায়।
নির্বাচনে একজন প্রার্থী হিসেবে প্রচার-প্রচারণায় কেমন অনুভব করছেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচনের অভিজ্ঞতা আমার জীবনে নতুন নয়। আগেও বহু কঠিন নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। তবে সেগুলো ছিলো ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচন। আর এটাতো জনপ্রতিনিধি হওয়ার নির্বাচন। অল্প সময়ের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের কাছে যেতে হচ্ছে। এই নির্বাচন অবশ্যই আলাদা কিছু, অন্যরকম অভিজ্ঞতা। পরিশ্রম নিয়ে কোন ভয় নেই, জীবনভর পরিশ্রমই করেছি। আমার চিন্তা হচ্ছে সময়মতো সব ভোটারের কাছে পৌঁছাতে পারবো কিনা? খুব সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আপ্রাণ সেই চেষ্টা করছি। মানুষ অকুণ্ঠ সমর্থন দিচ্ছে, উৎসাহ যোগাচ্ছে, সহানুভূতি, ভালোবাসা দেখাচ্ছে- ফলে কোন সমস্যা হচ্ছে না। বরং ভালোই লাগছে।
এতদিনের প্রচারণায় ভোটারদের প্রত্যাশার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভোটাররা মেয়র হিসেবে এমন কাউকে চাইছেন যে জনগণের হৃদয়ের ভাষা বুঝতে পারবে, জনগণের চাওয়াগুলোকে নিজের মনে করবে, জনগণের স্বপ্ন পূরণের সারথী হবে, বিপদে-আপদে পাশে থাকবে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে, পেছন থেকে সাহস দেবে, পাশে থেকে সামনে এগুনোর অনুপ্রেরণা জোগাবে। যে কারণে আমি শুরু থেকেই বলছি জনগণ জিতলে আমরা জিতবো। আমার স্বপ্ন তো জনগণেরই স্বপ্ন।
প্রায় প্রতিদিন ঢাকার অলিতে-গলিতে ঘুরছেন। নিশ্চয়ই নতুন করে ঢাকাকে আবিষ্কার করছেন। এমন কোন বিষয় চোখে পড়েছে যা দেখে আপনি অবাক হয়েছেন, এমন প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, প্রতিদিন অবাক হওয়ার মতো নানা বিষয় লক্ষ্য করছি। এতো মানুষ আমাকে চেনে, এতো ভালোবাসে নির্বাচনে অংশ না নিলে কোনদিন জানা হতো না। কত জায়গা থেকে কত রকমের মানুষ আসছে; সহযোগিতা করতে চাইছে, পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, প্রখর রোদ আর তীব্র গরমের মধ্যে আমার সঙ্গে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হাঁটছে। নিজেদের মতো করে টেবিল ঘড়ি মার্কায় ভোট চাইছে। অবিশ্বাস্য। তবে একটা জিনিস ভীষণ পীড়া দিচ্ছে, সেটা হলো দারিদ্র্য। দরিদ্র মানুষের কষ্ট। কত শত হাজার মানুষ সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় শহরে এসে যে এতো কষ্ট করে, বস্তিগুলোতে না গেলে বুঝতেই পারতাম না। অবশ্য নির্বাচনী ইশতেহারে স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য আমরা স্বাস্থ্যকর বসতি নির্মাণসহ নানা কর্মসূচি রেখেছি। শহরে এরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমি মনে করি এই মানুষগুলোর জীবনের উন্নতি ঘটাতে না পারলে শহরের উন্নতি হবে না। ফলে অতিদরিদ্র, দরিদ্র, বস্তিবাসী, ভাসমান মানুষদের জন্য সবাই মিলে অনেক কাজ করতে হবে। যদিও এই জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের অনেক কর্মসূচি আছে, এই মানুষগুলোর জন্য আমাদের অনেক কিছু করার সুযোগ আছে।
আপনি সফল একজন মানুষ। ব্যবসা, নেতৃত্বে, উপস্থাপনায়, সংসারে। সাফল্যের পেছনে কি কাজ করে- আমি সাধারণ মানুষ, মেহনত করি। আমি বিশ্বাস করি কঠোর পরিশ্রম ছাড়া সাফল্য অর্জনের কোন শর্টকার্ট রাস্তা নেই। তাই পরিশ্রম ছাড়া সাফল্যের আর কোন রহস্য নেই। জীবনভর পরিশ্রম করেছি, এখনও দিন-রাত কাজ করি, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কাজ করে যেতে চাই। কতটা সফল হয়েছি তা জানি না। শুধু মনে হয় অনেক কিছু করার ছিলো, কিন্তু করা হয়নি কোন কিছুই। তাছাড়া, সাফল্যের সংজ্ঞা এক একজনের কাছে এক একরকম। আমি যা করি, সততার সঙ্গে করি। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে পরিশ্রম করলে সাফল্য আসবেই। আমার যদি কোন অর্জন থাকে তার পেছনে আছে পরিশ্রম, সততা এবং আত্মবিশ্বাস।
নির্বাচনে সফলতা নিয়ে আপনি নিজে কতটা আশাবাদী জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, ঢাকা উত্তরের নাগরিকরা আমাকে টেবিল ঘড়ি মার্কায় ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে বলে আমার বিশ্বাস। কেননা, যেখানেই যাচ্ছি নাগরিকরা আমাকে উৎসাহ দিচ্ছে, পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। ফলে আমার তো মনে হচ্ছে মানুষ শেষ পর্যন্ত আমাকেই বেছে নেবে।
মেয়র নির্বাচিত হলে কোন তিনটি কাজে অগ্রাধিকার দেবেন- এমন প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, আমরা তো শুরু থেকেই বলে আসছি আমাদের অগ্রাধিকার হচ্ছে পরিচ্ছন্ন ঢাকা, সবুজ ঢাকা, মানবিক ঢাকা এবং আলোকিত ঢাকা। যদি জয়ী হই তবে প্রথম কাজ হবে নাগরিকদের মশার উৎপাত থেকে বাঁচানো এবং শহর পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করা।
একজন সিটি মেয়রের যে ক্ষমতা এবং সীমাবদ্ধতা- এসব উতরে নিজের পরিকল্পনামাফিক কাজ করা কি সম্ভব? আপনি কি মনে করেন মেয়রের আরও বেশি ক্ষমতায়ন প্রয়োজন? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আইনে মেয়রের ২৮ ধরনের কাজ নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে। জনগুরুত্বপূর্ণ এসব কাজ করার ক্ষেত্রে মেয়রের আইনি কর্তৃত্বের অভাব আছে- একথা সবাই বলে। আমিও আইনটি যতটা পড়েছি তাতে মনে হয়েছে সরকার চাইলে নির্বাচিত মেয়রদের আরেকটু ক্ষমতা দিতে পারে। কেননা, মেয়ররা যেসব কাজ করবেন তার সুফল শেষ পর্যন্ত জনগণের এবং ক্রেডিট সরকারের ঘরেই যাবে। তাই, আমার মনে হয় কাজ করার জন্য আইন কোন সমস্যা নয়। ইচ্ছে আর স্পৃহা হলো আসল বিষয়। আপনি কি করতে চান তা নির্ভর করে, আপনার ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব এবং ভিশনের ওপর। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি লক্ষ্য নির্দিষ্ট থাকলে অনেক কিছু করা সম্ভব। জনগণের জন্য কাজ করলে আপনাকে কেউ বাধা দেবে না। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে আপনি কোথাও আটকে যেতে পারেন, তাই বলে থেমে যেতে পারেন না। চেষ্টা করে চালিয়ে যেতে হবে।
আপনি বার বার বলে আসছেন দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের সমর্থন পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সমর্থনও আছে। এই সমর্থন আপনার জয়ে ভূমিকা রাখবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি সৌভাগ্যবান যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগসহ বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমইএ’র মতো শীর্ষ তিন ব্যবসায়ী সংগঠন আমাকে সমর্থন দিয়েছে। তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তাদের সমর্থন অবশ্যই ভোটারদের মধ্যে টেবিল ঘড়ি প্রতীক বা আমার সম্পর্কে একটা ইতিবাচক বার্তা দেবে।
আপনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। তার সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, তাবিথের বাবা আব্দুল আওয়াল মিন্টু আমার বন্ধু। তাবিথ ভালো ছেলে, কিন্তু তার বয়স অনেক কম। তার সামনে অনেক সময় পড়ে আছে। পাবলিক অফিসের দায়িত্ব নেয়ার জন্য এখনই সে যথেষ্ট প্রস্তুত নয় বলে আমার ধারণা। যদিও সে একটি বড় দলের সমর্থন পেয়েছে। অন্য প্রার্থীদের প্রসঙ্গে আনিসুল হক বলেন, জনগণ তো এমনই প্রত্যাশা করে। আমরা ভিন্ন মতপথের হতে পারি কিন্তু আমাদের সবার আকাঙ্ক্ষা একটি সুন্দর ঢাকা। বিশাল এ কাজটি তো একা কেউ করতে পারবে না, সবাই মিলে করতে হবে। ফলে সবার মধ্যে সুসম্পর্ক থাকাটাই তো ভালো।
সামপ্রতিক সময়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জোর প্রচারণা চালিয়েছে- ‘আনিসুল হকের পিতা রাজাকার ছিলেন’। এমন প্রচারণা বিষয়ে আপনার কোন বক্তব্য আছে কিনা জানতে চাইলে আনিসুল হক বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর তো বহুবার দেয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল থেকে এ বিষয়ে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। আমার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। যিনি ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ‘স্মৃতিতে অমলিন’ নামে বাবার একটি স্মৃতিচারণামূলক বই আছে। আপনারা পড়ে দেখতে পারেন। নির্বাচনের মাঠে হেয় করতেই এমন নিউজ করানো হয়েছিলো বলে আমার ধারণা।
প্রচারণায়ও আপনাকে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কাছ থেকে তীর্যক বক্তব্য আসছে- এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজন প্রার্থী আরেকজন প্রার্থী সম্পর্কে কুৎসা রটাবেন, এটাই বাংলাদেশের সংস্কৃতি বোধ হয়। এটাই এদেশে স্বাভাবিক ব্যাপার, তবে আমি সেটা করবো না। তারা যে রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে এসেছেন,  যে রাজনৈতিক শিক্ষা পেয়েছেন, তাতে কুৎসা প্রচারই তাদের জন্য স্বাভাবিক। কিন্তু আমি শুধু আমার কথাই বলবো, আমার নির্বাচনী ইশতেহার ও জনসেবার প্রস্তাবগুলো জনগণের কাছে নিয়ে যাবো, কুৎসা প্রচারের অপসংস্কৃতি চর্চা করবো না। কথা দিলাম। সিটি করপোরেশন এমন একটি প্রতিষ্ঠান যেখানে পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ির সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে জনগণের সেবা করা সম্ভব নয়।
আপনি একজন ব্যবসায়ী, অনেকে বলেন, মেয়র নির্বাচিত হলে সাধারণ মানুষের কথা ভুলে যাবেন? আনিসুল হককে এমন প্রশ্ন ছুড়লে তিনি বলেন, যারা এইসব বলে, তারা জানে না আমার জীবনের কষ্ট। তারা জানে না আমার মা কষ্ট করে আমার বাবার প্যান্ট রিফু করে দিতেন, একটা প্যান্ট কিনতেন না। তারা জানে না যে আমি বাবার ৬৪ হাজার টাকা নিয়ে জীবন শুরু করতে গিয়ে এক রাতে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিলাম। আমিতো সেই গরিব জীবনটাকে ভুলে যাইনি। বরং এখন যারা গরিব, যারা জীবনযুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন- তাদের মাঝেই আমি আমাকে খুঁজে পাই।
ব্যবসার মাঠ থেকে রাজনীতি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতি ছাড়া তো কোন পরিবর্তন আসবে না। রাজনীতিবিদরাই আমাদের নেতৃত্ব দেন। তারাই দেশ চালান। পরিকল্পনা করেন, সে অনুযায়ী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। তাদের অবদান তো অস্বীকার করা যাবে না। তাছাড়া, আপনি কোন সিস্টেম বদলাতে চাইলে আপনাকে সেই সিস্টেমের নেতা হতে হবে। আসলে কি, আমরা এভাবে ভাবি বলেই রাজনীতি বদলায় না। ইতিবাচক হন, দেখবেন সব বদলে যাবে।
নিজের সামাজিক উদ্যোগের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শারাফ আমাদের সন্তান। অনেক আগে মারা গেছে। তার স্মৃতি ধরে রাখতে আমরা আমাদের গার্মেন্টস কর্মীদের সন্তানদের জন্য ‘শারাফের পাঠশালা’ নামে প্রি স্কুল পরিচালনা করছি। এই স্কুলে আমরা বিনা বেতনে বা ফ্রি শিক্ষা দিয়ে থাকি। এ মুহূর্তে আমরা দুটি স্কুল করছি। ভবিষ্যতে আরো স্কুল করবো ইনশাআল্লাহ। এই মুহূর্তে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য স্বল্পমূল্যে বসতি নির্মাণ করার পরিকল্পনা করছি। এর বাইরেও আমরা আরো কিছু কাজ করি সেগুলো একান্তই আমাদের নিজস্ব, যা সবার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই না। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর মানুষ এই মূল্যায়ন করবে। যেভাবেই হোক মানুষের কল্যাণই আমার লক্ষ্য। সে কাজটাই জীবনভর করছি। কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে অতি নগণ্য হলেও ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছি। মেয়র নির্বাচিত হলে আরেকটু বড় পরিসরে কাজ করতে পারবো। এই যা।

বর্ষবরণে যৌন হয়রানি- পুলিশ ‘কেলাস’ বক্তব্য দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে

টিএসসিতে যৌন হয়রানির ঘটনার বিষয়ে পুলিশ ‘কেলাস’ বক্তব্য দিয়ে দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, বিবস্ত্র হয়েছে কি হয়নি সেটি মুখ্য বিষয় নয়, যৌন হয়রানি হওয়াটাই মুখ্য বিষয়। আমরা আশা করবো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনবে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেয়া দুই-তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করেন। মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না। তাদেরও এ ঘটনায় নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব রয়েছে। পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করে মিজানুর রহমান বলেন, ‘সেইদিনের ঘটনায় পুলিশ গতানুগতিক ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কয়েকজন ছাত্র সন্দেহভাজন দু’জনকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেছিল। বলা হচ্ছে, পুলিশের অবহেলায় তারা পালিয়ে গেছে। পুলিশের এই ধরনের ভূমিকা হতাশাজনক। এটি কর্তব্যে অবহেলার শামিল। এমনকি সিসি ক্যামেরা দেখে দোষীদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রেও পুলিশ অনাগ্রহ দেখিয়েছে বলে কমিশনে অভিযোগ এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি সহ আরো অনেক স্থানে নারীকে
বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন করা হয়। হরণ করা হয় নারীর সতীত্বকে।
বর্ষবরণের নামে যা করা হয়েছে তার দায়ভার কে নেবে? এভাবে
বাংলা উৎসব গুলি বা নববর্ষতে যদি নারীর শ্লীনতাহানি,
নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচার,নববর্ষ মানে যদি হয়
আমার দেশের ধর্ষিতা মা-বোনদের করুন আর্তনাদ!
পয়লা বৈশাখের সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) টিএসসি সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দুই নম্বর গেটে একদল সংঘবদ্ধ যুবক ভিড়ের মধ্যে নারীদের যৌন হয়রানি করে। এসময় বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবি সংসদের সম্পাদক লিটন নন্দীসহ কয়েকজন তরুণ নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে যৌন হয়রানির শিকার নারীদের উদ্ধার করেন। পাশে পুলিশ সদস্যরা থাকলেও তারা এগিয়ে যাননি। লিটন নন্দীর ভাষ্যমতে, একজন নারীকে প্রায় বিবস্ত্র করা হয়েছিল। এসময় তিনি নিজের পাঞ্জাবি খুলে ওই নারীর সম্ভ্রম রক্ষা করেন। এ ঘটনায় লিটন নন্দীসহ কয়েকজন আহত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ করার পর দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ঘটনার সত্যানুসন্ধান করতে একজন অতিরিক্ত কমিশনারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা ঘটনার সময় পুলিশের দায়িত্বে অবহেলার প্রসঙ্গটিও খতিয়ে দেখছেন। এছাড়া পুলিশ বাদী হয়ে ঘটনার পরদিন শাহবাগ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ দেখে বখাটেদের শনাক্ত করার চেষ্টা করছেন। তবে সিসিটিভির ফুটেজের বরাত দিয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, টিএসসিতে বস্ত্র হরণের কোন ঘটনা ঘটেনি। ভিড়ের মধ্যে ধাক্কাধাক্কিতে কেউ কেউ যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তারা এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বা ভিকটিমদের গোপনীয়ভাবে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গতকাল মগবাজারে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করে বক্তব্য তুলে ধরেন কমিশন চেয়ারম্যান। এসময় কমিশনের দুই সদস্য মাহফুজা খানম ও এ্যারোমা দত্তও উপস্থিত ছিলেন। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, আমরা জানতে পেরেছি, ১৬ নম্বর সিসিক্যামেরায় এ ধরনের ফুটেজ রয়েছে। তা প্রকাশ করতে হবে এমনটা আমরা আশা করছি না। এতে করে ভিকটিম আবার ভিকটিমাইজ হবে। তবে আমরা আশা করবো পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিবে। তিনি বলেন, সিসিটিভিতে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটেছে। এক প্রশ্নের জবাবে কমিশন চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে ভিকটিম খুঁজে বের করে তাদের যেচে সাহায্য করতে যাওয়াটা বিড়ম্বনার হতে পারে। তবে কেউ যদি সাহায্য চায় তাহলে আমরা সকল প্রকার সাহায্য করবো। যৌন নিপীড়নের ঘটনায় লজ্জা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘সকল নারীর কাছে’ ক্ষমা চেয়ে তিনি বলেন, নববর্ষের অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যৌন হয়রানি ও লাঞ্ছনার ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিস্মিত, মর্মাহত ও লজ্জিত। এ ঘটনা আবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে কী হিংস্রতা ও নগ্নতা আমাদের মনের গহিনে বাসা বেঁধেছে। কী ঘৃণ্য মানসিকতা আমাদের পেয়ে বসেছে। তিনি বলেন, একই এলাকায় ২০০১ সালে বাঁধনের ওপর বর্বরতা চালানো হয়েছিল। আমরা যুগপৎভাবে লক্ষ্য করছি জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পহেলা বৈশাখ উদযাপন প্রতিহত করার জন্য নানা ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। নারীদের হেনস্তা করা হয়েছে। এ ধরনের বর্বরতা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি বলেন, ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে যারা নানাভাবে সুবিধা নিতে চায় বিশেষ করে জঙ্গিবাদী ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান শক্তি। এরা জনপরিসরে নারীর উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছে না। তারা ধর্মকে পুঁজি করে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে যে পহেলা বৈশাখ উদযাপন ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইরানের যদি নওরোজ উদযাপন ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয় তাহলে বাংলাদেশে তা হবে কেন? আসলে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী সর্বজনীনতা মানতে পারছে না। তারা বিভক্তি তৈরি করতে চায়। সুদৃঢ় সাংস্কৃতিক ঐক্যে ফাটল ধরাতে চায়। তারা একে অনৈসলামিক সংস্কৃতি বলছে। ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে পহেলা বৈশাখের সর্বজনীন রূপকে ধ্বংস করতে চায়। তিনি বলেন, ন্যক্কারজনক এ ঘটনায় পুলিশের তৎপরতা যেন লোক দেখানো না হয়। অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে চিহ্নিত করতে হবে এবং তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে কালক্ষেপণ বা দীর্ঘসূত্রতা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কেবল অভিযুক্তদের বহিষ্কার বা পুলিশ সদস্য ক্লোজ করাই একমাত্র সমাধান নয়। বিচারের মাধ্যমে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যমের প্রশংসা করে তিনি বলেন, গণমাধ্যম একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে। গণমাধ্যমের এই ভূমিকাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কোন কারণেই যেন নারীর প্রতি যৌন হয়রানির এ প্রসঙ্গটি গণমাধ্যম থেকে হারিয়ে না যায়। আমরা অনুরোধ করবো এ অপরাধের চূড়ান্ত বিচার না হওয়া পর্যন্ত যেন গণমাধ্যমে বিষয়টির ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রচারের মাঠে থাকা প্রার্থীরা এই ঘটনার প্রতিবাদ কিংবা দুঃখপ্রকাশ না করায় তাদের সমালোচনা করেন মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, যারা আগামী দিনের নগরপিতা হবেন, এই বিষয়ে তাদের নীরবতা আমাদের বিচলিত করছে। আমরা আগামী দিনের জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে নারীর প্রতি যৌন হয়রানি বন্ধে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার চাই।
কমিশন সদস্য মাহফুজা খানম বলেন, পুলিশের দায়িত্বে চরম অবহেলা ছিল। প্রশাসন এখন যৌন হয়রানির মাত্রা নির্ধারণ করতে ব্যস্ত। শুধুমাত্র বস্ত্রহরণ হলেই যৌন হয়রানি হয় তা নয়। বরং কারো প্রতি কটূবাক্য বা অশালীন মন্তব্য যৌন হয়রানির অন্তর্ভুক্ত। পুলিশ এসব আমলে নিচ্ছে না।
বর্ষবরণে যৌন হয়রানি- শাস্তির দাবিতে উত্তাল ঢাবি
পহেলা বৈশাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) সংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে নারীদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় ৬ষ্ঠ দিনের মতো উত্তাল ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দাবি বখাটেদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করা এবং দায়িত্বে অবহেলা করায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও কর্তব্যরত পুলিশের পদত্যাগ। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে এবার এই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া টিএসসি কেন্দ্রিক বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোও একই দাবিতে আন্দোলন শুরু করছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে জোর প্রতিবাদ। কিন্তু দেশব্যাপী তোলপাড় করা এই ঘটনায় নীরব ভূমিকা পালন করছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগ ও সরকার সমর্থক বাম ছাত্রসংগঠনগুলো। ঘটনার দুই দিন পর গণমাধ্যমগুলোতে একটি প্রতিবাদ বার্তা পাঠিয়েই কাজ সেরেছে ছাত্রলীগ। সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে প্রতিবাদ জানিয়ে সরব থাকলেও আন্দোলনের মাঠে নেই তারা। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে শ্লীলতাহানির ঘটনাকে কোন রং না দিয়ে সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে আন্দোলনকারীরা।
বর্ষবরণের শ্লীলতাহানির ঘটনায় প্রথম প্রতিবাদ ও আন্দোলন শুরু করে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন। এ আন্দোলনে পরে একে একে ছাত্রদল, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্রফেডারেশন যোগ দেয়। বিভিন্ন পেশাজীবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা অপরাধীদের শাস্তির দাবীতে ফুঁসে উঠে। প্রতিবাদের ঝড় উঠে সারা দেশে। সরকারের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলো প্রথম থেকেই নিরবতা পালন করে আসছে। ঘটনার দুই দিন পর ছাত্রলীগ গণমাধ্যমে একটি প্রতিবাদলিপি পাঠিয়ে দায় সারে। দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে সরকার সমর্থক বাম ছাত্রসংগঠনগুলোকে নিয়ে ছাত্রলীগ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে আন্দোলন করলেও এবার তা দেখা যাচ্ছে না। সরকার সমর্থক বাম ছাত্রসংগঠন হিসেবে পরিচিত দলগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, জাসদ (ছাত্রলীগ), বাংলাদেশ ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র সমিতি। সূত্র জানায়, জাহাঙ্গীরনগর ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ষবরণে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা জড়িত ছিল। এজন্য তাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারও করা হয়। এ কারণে ছাত্রলীগ এই আন্দোলনে কোন কর্মসূচি ঘোষণা করছে না। এ ছাড়া এই ঘটনাকে পুঁজি করে আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিরোধী পক্ষ সুবিধা আদায় করতে পারে তাই সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি কোন নির্দেশ নাই বলে সূত্র জানায়। ক্যাম্পাসে প্রগতিশীল বাম সংগঠনগুলো আন্দোলন করলেও সরকার সমর্থক বাম সংগঠনগুলো কোন কর্মসূচি ঘোষণা করেনি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাসুদ বলেন, ছাত্র ইউনিয়নের আন্দোলনে একত্মতা ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২১ ও ২২শে এপ্রিল কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী হাসান মোল্লা বলেন, সভ্য সমাজে এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিচার হওয়া উচিত। সিটি নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত থাকায় কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারছি না। তবে তিনি কর্মসূচির বিষয় মাথায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
ঢাবি শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন: এদিকে ঘটনার ৬ষ্ঠ দিনে সকাল সাড়ে ১১টায় অপরাজেয় বাংলায় মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে আরও বক্তৃতা করেন সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এস এম মাকসুদ কামাল, অধ্যাপক এম এম আকাশ, ক্রিমিনোলোজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়াউর রহমান, টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শফিউল আলম ভূঁইয়া, সমিতির সাবেক সহসভাপতি আখতার হোসাইন খান, নীল দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. নাজমা শাহীন, এফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ড. কামাল উদ্দিন প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের কোন কালক্ষেপণ করা যাবে না। ভিডিও ফুটেজ দেখে শনাক্ত করে তাদেরকে দ্রুত বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। এ সময় তিনি অপরাধীদের খুঁজে বের করতে সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম দেন। ক্রিমিনোলোজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়াউর রহমান বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। আইনের শাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু আবেগ দিয়ে কথা বললে চলবে না। সাবেক সহসভাপতি আখতার হোসেন খানে বলেন, নির্দিষ্ট কোন সংগঠনকে দায়ী না করে মূলত কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিল সিসি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে এবং এ জাতীয় ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাবে। সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে দুপুর ১টায় অপর একটি মানববন্ধনে অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, অপরাধীদের চিহ্নিত করে রং নির্বিশেষে কেন শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। ঘটনার সময় কোন থানার ওসি দায়িত্বে ছিল যিনি অপরাধ দমন করতে এগিয়ে আসেন নি এবং কোন প্রক্টর খেলছিলেন তাদেরও বিচার করতে হবে। অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেন, ঘটনাকে হালকা করার জন্য এর উপর এখন রং লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে। এসব রং ছড়ানো বন্ধ করে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করুন। একই মানববন্ধন থেকে অধ্যাপক মশিউর রহমান ৭২ ঘন্টার আলটিমেটাম ঘোষণা করেন। সকাল ১১টায় ছাত্র ইউনিয়নের উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলা থেকে কার্জন হল পর্যন্ত একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদ নয়, এবার হবে প্রতিরোধ স্লোগানে এ মানববন্ধনে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের হাজারও মানুষ অংশ নেয়। মানববন্ধনে অংশ নেয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনসহ চলচ্চিত্র শিল্পের কর্মীরা। মানববন্ধন শেষে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এক সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তৃতা করেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি হাসান তারেক, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি লিটন নন্দী, অভিনেত্রী জ্যোতিকা জ্যোতি, শারমিন লাকী, বন্যা মির্জা।
৫জন বখাটেকে শনাক্ত করা হলেও এখনও কাউকে আটক করতে না পারায় হাসান তারেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অপরাধীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। দায়িত্ব অবহেলা করার জন্য ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক এ এম আমজাদ ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অপসারণের জোর দাবি জানান তিনি। ছয় দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য তিনি সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান। প্রক্টরকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অপসারণ করা  না হলে ভিসির পদত্যাগের আন্দোলনে যাবেন বলে হাসান তারেক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তবে এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক এ এম আমজাদ কোন চাপ অনুভব করছে না বলে জানান। তিনি বলেন, দায়িত্বে অবহেলা ছিল না। তাদের দাবি অযৌক্তিক। তদন্ত কমিটি কাজ করছে। দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পেলে পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। এ ছাড়া দুপুর আড়াইটায় রাজু ভাস্কর্যে টিএসসিকেন্দ্রিক সংগঠনগুলো মানববন্ধন করে।

ঢাবিতে যৌন হয়রানির নেপথ্যে বিচারহীনতা by মাহমুদুল হাসান নয়ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে ঘটে যাওয়া যৌন হয়রানির ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বারবার একই ঘটনা ঘটছে। পহেলা বৈশাখসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজনরা। সর্বশেষ গেল পহেলা বৈশাখে টিএসসিতে ঘটে তরুণীদের বস্ত্রহরণের মতো ঘটনা। বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে ব্যর্থতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতিই এ ধরনের ঘটনার জন্য প্রধানত দায়ী।
১৪ এপ্রিল বর্ষবরণে এসে যৌন সন্ত্রাসের শিকার হন বেশ কয়েকজন নারী। বখাটের হাতে বিবস্ত্র হয়ে সম্ভ্রমহানি হয়েছে এমন সংখ্যা অর্ধডজন বলে জানিয়েছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে আরও অর্ধশত নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। এর আগে ১৯৯৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করতে এসে শ্লীলতাহানির শিকার হন শাওন আকতার বাঁধন। ২০১০ সালে বর্ষবরণে টিএসসিতে ৮-১০ জান নারী শ্লীলতাহানির শিকার হন। সেই সময়ের রেকর্ড ও প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুলিশের উদাসীনতার কারণেই ওইসব দিনে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই সময়ে ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বিভিন্ন বক্তব্য দিলেও পরবর্তীকালে তা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেনি।
আগের ঘটনার বিচার কি হয়েছিল? এবারের ঘটনার বিচার ও কি হবে?
বস্ত্রহরণরত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হল ছাত্রলীগ নেতা রাসেল ও
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিত বিভাগের ছাত্র ছাত্রলীগ নেতা আলম
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গাফিলতি : ১৯৯৯ সালের ঘটনায় অনুসন্ধানে জানা যায়, উচ্ছৃঙ্খল যুবকরা পুলিশ ভ্যানের সামনে দিয়ে টেনেহিঁচড়ে ওই বাঁধনকে চারুকলার দিকে নিয়ে যায়। তরুণীর আত্মীয়স্বজন এবং উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের মেয়েটিকে উদ্ধারের অনুরোধের পরও তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি।
শ্লীলতাহানির ঘটনায় ৪৮ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও সে সময় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অথচ ঘটনায় জড়িতদের বেশ কয়েকটি ছবি সে সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। পরে অবশ্য ৩ দিন পর ৪ জানুয়ারি মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। শনাক্ত করা হয় আরও নয়জনকে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক পুলিশ সদস্যের রহস্যময় ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ঘটনার ৪ দিন পর ৫ জানুয়ারি কালু নামের একজনকে বহিষ্কার করা হয় বলেও অভিযোগ ওঠে। ৬ জানুয়ারি শাওন আকতার বাঁধন বাদী হয়ে ১০-১৫ জনকে আসামি করে শাহবাগ থানায় মামলা করেন। যার মাত্র ৩ জনকে আটক করা হয়। ১৬ জানুয়ারি ঘটনায় জড়িত অভিযোগে টুটুল নামের একজনকে বহিষ্কার করা হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে। এ সময় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে মেসবাহউল আলম টুটুলকে ছাড়িয়ে নেয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী ১ বছরের মধ্যে ক্যাম্পাস নিরাপদ হবে বলে ঘোষণা দেন। এছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে দেয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেন ভিসি। যদিও এরপর বেশ কয়েকবার ঢাবি এলাকায় যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর বাঁধন পুলিশ ও লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, টিএসসি সহ আরো অনেক স্থানে নারীকে
বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন করা হয়। হরণ করা হয় নারীর সতীত্বকে।
বর্ষবরণের নামে যা করা হয়েছে তার দায়ভার কে নেবে? এভাবে
বাংলা উৎসব গুলি বা নববর্ষতে যদি নারীর শ্লীনতাহানি,
নারীর প্রতি পাশবিক অত্যাচার,নববর্ষ মানে যদি হয়
আমার দেশের ধর্ষিতা মা-বোনদের করুন আর্তনাদ!
২০১০ সালের বর্ষবরণেও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। বছরটিতে পহেলা বৈশাখে বোমা হামলার হুমকি দেয় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন হিজবুত তাহরির। পুলিশের পক্ষ থেকে সে সময়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা নেয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। সতর্কতার অংশ হিসেবে রাজধানীর যেসব স্থানে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হবে সেসব স্থানে দমকল বাহিনীর প্রস্তাব অনুযায়ী ধূমপানও নিষেধ করা হয়।
অথচ পুলিশের এত নিরাপত্তার মধ্যেই সেদিন রাজু ভাস্কর্যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে আয়োজিত কনসার্টে অনেক নারী লাঞ্ছনা ও যৌন হয়রানির শিকার হন। ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তবান সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ-এর উদ্যোগে কনসার্টের আয়োজন করেছিল। ওই সময়ে প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায়, ভিড়ের মধ্যে ৮-১০ জন যুবক নারীদের শাড়ি ধরে টান দিচ্ছে, অনেককে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে কাপড় ধরে টানাটানি করছে, ওই ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ওই ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে শাহবাগ থানার তৎকালীন ওসি রেজাউল করিম জানিয়েছিলেন, নারীদের লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করার অভিযোগ আসেনি।
সর্বশেষ ঘটনায় ১৪ এপ্রিলে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, মাত্র ২ জন পুলিশ বস্ত্রহরণের সময়ে ছিলেন। তারাও জড়িতদের ঠেকাতে এগিয়ে আসেননি। বিভিন্ন সময়ে বখাটেদের লাঠিচার্জ করা হলেও তাদের আটক করা হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজেও এমন তথ্য রয়েছে।
বিশিষ্টজনদের বিশ্লেষণ : পূর্ববর্তী এসব ঘটনার ধরন এবং তার ফল বিশ্লেষণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের স্বনামধন্য শিক্ষকরা মনে করছেন বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদাসীনতাই এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তির জন্য দায়ী। কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এমএম আকাশের সঙ্গে। তিনি বলেন, সর্বশেষ ঘটনায় আমার কাছে মনে হয়েছে এটি পরিকল্পিত। কিন্তু কথা হল জড়িত যেই হোক না কেন, তাদের বিচার হচ্ছে কিনা? পূর্ববর্তী ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়েছে কিনা? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনার সময়ে ওই স্থানে গিয়েছে কিনা? পুলিশ যদি তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেই থাকে তাহলে সিসিটিভির দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য তখনই কেন ব্যবস্থা নিতে বললেন না?
সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. ফরিদউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, সঠিকভাবে বিচার না হওয়ায় একটি গোষ্ঠী বিশেষ দিবসে এ ধরনের ঘটনায় লিপ্ত হচ্ছে। তিনি এসব ঘটনায় সরকারকে শক্ত অবস্থানে গিয়ে জড়িতদের বিচারের দাবি জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. এজেডএম শফিউল আলম ভূঁইয়া মনে করেন, যৌন হয়রানির ঘটনাকালে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের আইনের আওতায় আনা গেলে এ ধরনের ঘটনা কমবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক শান্তনু মজুমদার বলেন, দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা আসতে পারে। তা স্বীকার করার মানসিকতা নিয়ে কাজ করলে এ ধরনের ঘটনা লোপ পাবে। সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. মশিউর রহমানের মতে, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এবং পূর্ববর্তী ঘটনার বিচার না হওয়ায় এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের শিক্ষক সামিনা লুৎফা মনে করেন, আগে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও বিচার না হওয়ায় যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো বাড়ছে। পুলিশের ঘটনার শিকারদের যোগাযোগের আহ্বান বিষয়ে শিক্ষকরা বলেন, যে তরুণী ওই ঘটনার শিকার হন তিনি কোনোভাবেই পরবর্তীকালে আর যোগাযোগ করতে পারেন না। কারণ অতীতে রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাঁধনের শ্লীলতাহানির ঘটনার ১৭ দিন পর ১৮ তারিখ তিনি পুলিশ ও লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান।

বর্বরতা: ভারতে চলন্ত ট্রেনে ধর্ষণের পর বাংলাদেশী নার্গিসকে হত্যা

ভারতে বেড়াতে গিয়েছিলেন নার্গিস বেগম (৩৪)। সঙ্গে অন্ধ মা ও কন্যা। আজমীর শরীফ যাওয়ার পথে দিল্লিতে চলন্ত ট্রেনে ধর্ষিত হন তিনি। শুধু ধর্ষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি ধর্ষকরা তাকে হত্যা করে। গতকাল সকালে নার্গিস লাশ দেশে এসে পৌঁছে। বাদযোহর খুলনা মহানগরীর কেডিএ জামে মসজিদে জানাজা শেষে বসুপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এর আগে জন্মান্ধ আনোয়ারা বেগমের একমাত্র মেয়ে নার্গিস বেগমের লাশ খুলনার  সোনাডাঙ্গা থানার ৩/১, কেডিএ অ্যাপ্রোচ রোডের বাড়িতে এসে পৌঁছালে আত্মীয়-স্বজনের আহাজারীতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। নার্গিস বেগমের মৃত্যুতে গোটা এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতের একমাত্র মেয়ে জাগরণী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী কাকলী আক্তার কাকন কাউকে দেখলেই শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে আর চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। সে এখন কাকে মা বলে ডাকবে। এদিকে নার্গিসের নিথর লাশ হাত বুলিয়ে নির্বাক হয়ে পড়েছে তার মা। নার্গিসের অন্ধ মা বার বার বলছিলেন, একমাত্র মেয়ের নির্যাতনের বিচার কি পাবো কোন দিন? আমি আমার মায়ের হত্যার বিচার চাই। আর্তনাদ করে অন্ধ মা বলেন, কি দোষ ছিল আমার মেয়ের। তাকে কেন ভারতে গিয়ে লাশ হয়ে ফিরতে হলো। তিনি মানবাধিকার সংগঠনসহ সরকারের কাছে এর বিচার দাবি করেন।
এলাকাবাসী জানায়, গত ৯ই মার্চ যশোর বেনাপোল বন্দর দিয়ে পাসপোর্টযোগে ভারতের খাজা বাবা মঈনুদ্দিন চিশতী (রঃ) রওজা আজমীর শরীফের উদ্দেশ্যে আনোয়ারা বেগম ও তার মেয়ে নার্গিস বেগম ও নার্গিসের একমাত্র মেয়ে কাকন রওনা হয়। কলকাতা হাওড়া থেকে তারা ট্রেনে ওঠে। ১০ই মার্চ রাত সাড়ে তিনটার দিকে কানপুর স্টেশনে নেমে পড়ে তারা তিনজন। ট্রেনে থাকা লাগেজ নিতে গিয়ে নার্গিস আর ফিরতে পারেনি। লাল পতাকাবাহী ট্রেনের বগিতে থাকা গার্ডরা তাকে কাপড় দিয়ে মুখ চেপে বগিতে তুলে ট্রেনটি ছেড়ে দেয়। এ সময় তার মা ও কন্যা চিৎকার দেয় ‘ওকে বাঁচান’ ‘ওকে ছেড়ে দেন’- কেউ তাদের চিৎকারে এগিয়ে আসেনি। কয়েকদিন ধরে সেখানে বসে কাঁদতে থাকে আর মানুষের কাছে তার মেয়ের খোঁজ-খবর নেয়। অনেকে বলে তোমার মেয়ে বাংলাদেশে চলে গেছে। ১৬ই মার্চ নার্গিসের মা ও দশ বছর বয়সের নাতনীকে বাংলাদেশে পাঠায় সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা। ছয়দিন পর হঠাৎ করে খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ওসি মারুফ আহমেদ জানান, আনোয়ারা বেগমের মেয়ে ভারতে মারা গেছে। লাশের সাথে তিনটি পাসপোর্ট পাওয়া গেছে।
নিহত নার্গিসের মামাতো ভাই মিলন হোসেন খান জানান, ডাক্তার দেখানোর জন্য ধার-দেনা করে তার ফুফু আনোয়ারা বেগম, আনোয়ারার মেয়ে নার্গিস বেগম ও তার মেয়ে কাকন তিনটি পাসপোর্ট করেন। পরে ভিসা লাগিয়ে গত ৯ মার্চ তারা ভারতে যান। হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হন। রাত সাড়ে ৩ টার দিকে ৪/৫ জন যুবক তাদের বলেন দিল্লি এসে গেছি, সবাই নামেন। এ সময় সবাই ট্রেন থেকে নেমে যায়। পরে নার্গিস বেগম তার মাকে বলল ট্রেনে ব্যাগ ফেলে এসেছি। ব্যাগটি আনতে যাওয়ার সময় কারা যেন নার্গিসের মুখ চেপে ট্রেনে উঠিয়ে নিয়ে যায়। তার মা আনোয়ারা বেগম বলেন, আমি একজন অন্ধ মানুষ, চোখে দেখি না। কেবল মেয়ের গোঙানোর চিৎকার শুনতে পেয়ে হাঁউমাউ করে কাঁদতে থাকি। ততক্ষণে ট্রেন ছেড়ে চলে যায়। সকাল হলে আমি কোথায় আছি তা স্টেশন এলাকায় জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারি কানপুর স্টেশনে আছি। আমাদের তিনটি পাসপোর্টই ছিল নার্গিসের কাছে। বলতে বলতে হতভাগি মা কাঁদতে কাঁদতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। তিনি বললেন, মৃত্যুর সংবাদ শুনে দীর্ঘদিন ধরে দেশের বড় বড় অফিসে আবেদন করেছি আমার মেয়ের লাশটি ফেরত এনে দেয়ার জন্য। অবশেষে এক মাস ১০দিন পর দু’দেশের অনুমতিতে লাশটি দেশে আনা হলো। এ সময় তিনি আরো বলেন, আমার মেয়েকে ভারতের দুর্বৃত্তরা ধর্ষণের পর মেরে ফেলেছে। আমি এ হত্যার বিচার চাই। ১৯শে মার্চ খুলনার সোনাডাঙ্গা থানায় ক্ষতিপূরণসহ লাশ ফেরতের দাবিতে জিডি করেন আনোয়ারা বেগম। সেদিন খুলনা মেট্রোপলিটন বিশেষ শাখার পুলিশ সুপারের দপ্তর-৪৬/৯৩ স্মারকে জানায়, নতুন দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে বাংলাদেশী নারীর লাশের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। ৩০শে মার্চ বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, হাইকমিশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে কপির অনুলিপি পাঠানো হয়। খুলনা বিশেষ পুলিশ সুপার বরাবরও আবেদন করা হয়। আগ্রা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে ফোনে নিহতের পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তরের ৫ লাখ টাকা চাওয়া হয় বলে জানান নিহতের মামী রাহেলা বেগম।
নার্গিস বেগম খুলনা মহানগরীর ৩/১ কেডিএ অ্যাপ্রোচ রোডে বিধবা মা আনোয়ারা বেগম ও তার একমাত্র মেয়ে কাকনকে নিয়ে বসবাস করতেন। আর নার্গিস বেগমের রাজমিস্ত্রি স্বামী আবুল কালাম একই এলাকার ইব্রাহিম মিয়া সড়কের খলিল শেখের বাড়ির ভাড়াটিয়া।
অ্যাপ্রোচ রোডের বাসিন্দা নিহতের মামী রাহেলা বেগম জানান, মায়ের চোখ ভাল হওয়ার আশায় নার্গিসের প্রথমে আজমীর শরীফ যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। পরে ডাক্তারের কাছে যেতে চেয়েছিল। ৯ই মার্চ তারা তিনজন খুলনা থেকে রওনা হন। বেনাপোল দিয়ে কলকাতা পৌঁছে সেদিনই। শিয়ালদা স্টেশন ঘুরে হাওড়া পৌঁছায় রাতে। দিল্লির টিকেট নিতে গেলে স্টেশন থেকে জানানো হয়, পরদিন সকাল ১০টায় ট্রেন। তারা স্টেশনেই রাত কাটান। সকালের ট্রেনে দিল্লি রওনা হন। সন্ধ্যার পর নার্গিস ট্রেনের অন্য যাত্রীদের দিল্লি স্টেশন এলে তাদের জানানোর অনুরোধ করেন। রাত ৩টার দিকে কয়েকজন ঘুমন্ত নার্গিসকে ডেকে বলে আপনাদের স্টেশন এসে গেছে নামেন। নার্গিস তার মা ও মেয়েকে নিচে নামান। তারপর ব্যাগপত্র নেয়ার জন্য আবার ট্রেনে উঠলে কয়েকজন তার মুখ চেপে ধরে ফেলে দেয়। ছোট্ট কাকলী এ দৃশ্য দেখে চিৎকার করে, নানী মাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কারো সাহায্য চাওয়ার আগেই ট্রেন স্টেশন ছেড়ে চলে যায়। তারা সেখানে একদিন কান্নাকাটি করে কাটায়। ভাষা সমস্যায় কিছু বোঝাতেও পারে না কাউকে। ফলে স্টেশন মাস্টারসহ লোকজন তাদের পাগল সাব্যস্ত করে কলকাতা অভিমুখী ট্রেনে তুলে দেয়। শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছে তারা প্রায় অনাহারে ২/৩ দিন কাটান। অন্ধ আনোয়ারা মেয়ের খোঁজ জানতে চান সবার কাছে। একপর্যায়ে লোকজন তাকে ট্রেনে বনগাঁ পাঠায়। সেখান থেকে তারা কিভাবে খুলনা আসেন তা বলতে পারেন না। রাহেলা বেগম জানান, আমরা তাদের প্রায় উন্মাদ অবস্থায় ফিরে পাই। এরপর ১৯শে মার্চ সোনাডাঙ্গা থানার ওসি আমাদের ডেকে ভারতে নার্গিসের লাশ পাওয়ার খবর জানান এবং সেখানেই তার দাফন করা হবে কিনা জানতে চান। আমরা সরকারিভাবে তার লাশ ফেরত আনা এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আবেদন করি। সে অনুযায়ী সোমবার সকাল সাড়ে আটটায় বেনাপোলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নার্গিসের লাশ হস্তান্তর করে।
নার্গিসের মৃত্যুর খবর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দিল্লি হাইকমিশন ফ্যাক্স দিয়ে জানায় ১৬ই মার্চ। তাতে এবং ভারতের উত্তর প্রদেশের ফিরোজাবাদ জেলার পুলিশ সুপারের রিপোর্টে দেখা যায় ১৩ মার্চ আনুমানিক ১৪.৪৫ মিনিটে ভদান রেলস্টেশন থেকে ৩ কিলোমিটার পশ্চিমে ১১৯৬/০৩ রেলওয়ে পোলের কাছে রেল ট্রাকের ওপর থেকে নার্গিসের লাশ উদ্ধার করা হয়। লাশের সাথে পাওয়া যায় নার্গিসের নিজের, তার মা ও মেয়ে কাকন আক্তার কাকলীর পাসপোর্ট। তারপর থেকে লাশ আগ্রা মেডিক্যাল হাসপাতালে রক্ষিত ছিল।
 সোমবার লাশ দেখে বোঝা যায় যে, ভারতে পোস্টমর্টেম করা হয়েছে। লাশের ডান হাত মোচড়ানো এবং বাম পা হাঁটুর খানিকটা নিচে থেকে বিচ্ছিন্ন। দুই পায়ের উরুতে ধারালো অস্ত্রের চিহ্ন। আর শরীর থেকে কিডনি বের করে নেয়ার চিহ্ন রয়েছে।
নার্গিসের একমাত্র ১০ বছর বয়সী মেয়ে, কাকন বলছিল, নানী ছাড়া  এ দুনিয়ায় আমার আর কেউ নেই। আমি এখন কার কাছে থাকব? কাকলীর এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে? নার্গিসের ফুফু রাহেলা পাশে বসে চোখের পানি ফেলেছেন। আমরা দুই দেশের সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই। ভারতীয় ভিসা নিয়ে তারা সেখানে গিয়েছিল। তাই ভারত সরকারের দায়িত্ব ছিল তাদের নিরাপত্তা দেয়া। তিনি খুনি দুর্বৃত্তদের বিচারও দাবি করেন।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, নার্গিসকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয় রেল কর্মচারীরা। আগ্রা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয় লাশটি। দীর্ঘ ৪০ দিন পর সোমবার সকালে হতভাগ্য নারীর লাশ বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় ভারত সরকার। নিহতের ফুফাতো ভাই খুলনার মিলন হোসেন বলেন, ‘তাকে দিল্লিতে ট্রেনের মধ্যেই শারীরিক নির্যাতন করে মেরে ফেলেছে ট্রেন শ্রমিকরা। আমরা এর বিচার চাই।’
ভারতীয় হাইকমিশনের নতুন দিল্লি দপ্তর থেকে লিখিত পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, উত্তর প্রদেশের আগ্রা এসএন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ১৩ই মার্চ থেকে লাশটি রাখা হয়। ওইদিন ভদান রেল স্টেশন থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ফিরোজাবাদ নামক স্থান থেকে লাশটি পুলিশ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায় বলে উল্লেখ আছে।
বেনাপোল বন্দর থানার ওসি অপূর্ব হাসান বলেন, রোববার রাত ১২টার দিকে নিহতের লাশ বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে হস্তান্তর করে ভারতীয় পুলিশ। ওপারের পেট্রাপোল ইমিগ্রেশন পুলিশ এবং বিএসএফ সদস্যরা বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন পুলিশ ও বিজিবির কাছে লাশ হস্তান্তর করেন। ইমিগ্রেশন উপ-পুলিশ পরিদর্শক আনিস ও হাসানুজ্জামান লাশটি গ্রহণ করে আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন।
পোর্ট থানার ওসি অপূর্ব হাসান ও বেনাপোল চেকপোস্ট ইমিগ্রেশন ওসি আসলাম খান জানান, দুই দেশের স্বরাষ্ট্র, হাইকমিশনার ও সংশিষ্ট দপ্তরের চিঠি চালাচালির একপর্যায়ে ৪১ দিন পর বাংলাদেশে এসেছে নার্গিসের লাশটি। সোমবার সকালে তাকে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ আমাদর কাছে হস্তান্তর করেছেন। আমরা তাদের অভিভাবকের কাছে লাশ হস্তান্তর করেছি।

শাবিতে প্রশাসনিক পদ ছাড়লেন ৩৫ শিক্ষক

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দফতরের ৩৭টি পদ ছাড়লেন ৩৫ শিক্ষক। এর মধ্যে তিন পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন জনপ্রিয় লেখক ও অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগে ভিসির পদত্যাগ দাবিতে সোমবার দুপুরে তারা প্রশাসনিক এসব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. ইশফাকুল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক পরিষদ’ আজ ভিসির পদত্যাগ দাবিতে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করবে। এমনটি জানিয়েছেন সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. মুস্তাবুর রহমান।
ভিসি অধ্যাপক ড. আমিনুল হক ভূঁইয়া বলেন, শিক্ষকদের পদত্যাগের বিষয়টি আমি শুনেছি। আমি তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চেষ্টা করব। অনুরোধ করব পদত্যাগপত্র ফিরিয়ে নিতে। তিনি দাবি করেন, শিক্ষকদের সঙ্গে কোনো ধরনের অসদাচারণ করা হয়নি ।
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী শিক্ষকরা বেলা ১১টায় ভিসির কার্যালয়ে যান। পদত্যাগপত্রগুলো রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেন শিক্ষক পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সামসুল আলম, যুগ্ম সম্পাদক মুস্তাবুর রহমান ও নাজিয়া চৌধুরী। পদত্যাগী শিক্ষকরা সবাই আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের প্যানেল ‘মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুব্ধ শিক্ষক পরিষদ’র সদস্য।
পদত্যাগী শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ইন্সটিটিউটর পরিচালক অধ্যাপক জাফর ইকবাল, সেন্টার অব অ্যাকসিলেন্সর পরিচালক অধ্যাপক মো. ইউনুছ, ছাত্র উপদেশ ও নির্দেশনা পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর মো. এমদাদুল হক, শাহপরান হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আশরাফুল আলম, প্রথম ছাত্রী হল প্রাধ্যক্ষ মারুবা শারমিন চৌধুরী, দ্বিতীয় ছাত্র হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল গণি, সৈয়দ মুজতবা আলী হলের প্রাধ্যক্ষ মো. ফারুক উদ্দিন প্রমুখ।
১৫ এপ্রিল শিক্ষক পরিষদের সভায় ভিসি অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়াকে রোববার বিকাল ৫টার মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে পদত্যাগ না করলে সোমবার সকালে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে দায়িত্বরত শিক্ষকরা পদত্যাগ করবেন বলে সভায় সিদ্ধান্ত হয়।
অধ্যাপক জাফর ইকবাল বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় ভালো একটি অবস্থানে পৌঁছেছে। শিক্ষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। কাজেই তারা যখন কোনো কারণে মনে কষ্ট পান, আমিও কষ্ট পাই। তারা বলেছেন, এ ভিসির সঙ্গে আর আর কাজ করতে চান না। তাই আমিও পদত্যাগ করেছি। তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্ডার এস্টিমেট করবেন না। আপনারা যদি মনে করেন ঢাকার চেয়ে এখানকার শিক্ষকরা কম মেধাবী তাহলে ভুল করবেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুব্ধ শিক্ষক পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সামসুল আলম বলেন, শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণের প্রতিবাদে আমরা ভিসিকে পদত্যাগ করার জন্য আলটিমেটাম দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি পদত্যাগ করেননি। তাই আমরা পদত্যাগ করেছি। যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মুস্তাবুর রহমান বলেন, বিভিন্ন সময়ে ভিসি কর্তৃক শিক্ষকদের অপমান ও প্রশাসন পরিচালনায় তার অযোগ্যতায় শিক্ষকরা আর তার সঙ্গে কাজ করতে চান না। তিনি পদত্যাগের বিষয়টিকে শিক্ষকদের ‘পুঞ্জিভূত ক্ষোভ’ বলেও চিহ্নিত করেন।
তবে ভিন্ন মত দিয়েছেন আওয়ামী-বাম সমর্থিত মুক্ত চিন্তা চর্চায় ঐক্যবদ্ধ শিক্ষক পরিষদের আহ্বায়ক আখতারুল ইসলাম। তিনি জানান, ৭ বছর ধরে যে ভিসিরা বিশ্ববিদ্যালয় চালিয়েছেন, তাদের সঙ্গেই এ শিক্ষকরা কাজ করেছেন। আজ এমন কী হল যে তারা গণপদত্যাগ করতে যাবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থিতিশীলতার স্বার্থে তারা যে কোনো চ্যালেঞ্জ নেবেন বলে জানান তিনি। একই মত সংগঠনটির সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. রাশেদ তালুকদারেরও।
হালুয়া-রুটির ভাগাভাগি নিয়ে ৩৫ শিক্ষক পদত্যাগ করেছে কিনা- বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ কথা বলেছেন জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধে শ্রদ্ধাশীল শিক্ষক পরিষদের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সাজেদুল করিম। তিনি বলেন, এ গণপদত্যাগের পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ রয়েছে। তবে তা কাক্সিক্ষত নয়।
অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম জানান, ভিসি স্যার আগেও আমার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেছিলাম। আবারও শিক্ষকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছেন তিনি।
১২ এপ্রিল সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম পদার্থ বিজ্ঞান ও জিওগ্রাফি বিভাগের প্রধানের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। বিষয়টি দুই বিভাগের শিক্ষকরা ভিসিকে অবহিত করতে গেলে তিনি তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।

৩০ সেকেন্ডে ৩ কোটি!

ভারতীয় উপমহাদেশের সংস্কৃতিতে অর্থ-কড়ির জন্য নর্তকীদের নাচ বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু এবার সেই নর্তকীর ভূমিকায় নামলেন ভারতের এক নারী এমপি। টাকাও বেশ ছিটালো জনগণ। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও জি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শনিবার আহমেদাবাদে গুজরাট বেরাবালের আয়োজিত ‘ভগবত কথা’ অনুষ্ঠানে নাচেন বিজেপির সংসদ সদস্য পুনমবেন মাদাম। মূলত ফান্ড বৃদ্ধির জন্যই নাচেন তিনি। দর্শকদের মন ভরিয়ে টাকাও পেলেন এক-দুই নয়, তিন কোটি রুপি। ৪১ বছর বয়সী ওই নারী সংসদ সদস্যের নাচের তালে উড়তে থাকে কড় কড়ে সব নোট।
মাত্র ৩০ সেকেন্ডেই প্রায় ৩ কোটি রুপি এমপির দিকে ছুড়ে মারেন উপস্থিত জনতা! উপস্থিত বেশ কয়েকজনের সঙ্গে নাচার পর পুনমবেন যখন অনুষ্ঠান শেষ করেন ততক্ষণে বেশ ভালো পরিমাণ অর্থ জমে গেছে। অনুষ্ঠানের পর সেখানে প্রচুর নোট পড়ে থাকতে দেখা যায়। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে জামনাগড় আসন থেকে জয়লাভ করেন পুনমবেন। এর আগে তিনি গুজরাট বিধানসভার সদস্য ছিলেন। তার বাবা ছিলেন গুজরাট বিধানসভার চারবারের সদস্য।

ইরাকের রামাদি থেকে পালিয়েছে ৯০ হাজার মানুষ : জাতিসংঘ

ইরাকের আল আনবার প্রদেশের নিকটবর্তী হয়েছে ইসলামিক স্টেট। আইএস আতংকে রামাদি শহরের বাস্তুভিটা ছেড়ে পালাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। সোমবার এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ৯০ হাজার মানুষ রামাদি ছেড়ে পালিয়েছে। ইসলামিক স্টেট নিকটবর্তী হয়ে গেছে জেনে রামাদির মানুষ ব্যক্তিগত ধনসম্পদের কিছুই সঙ্গে না নিয়ে শুধু প্রাণ হাতে করে বেরিয়ে পড়ে। রামাদির নিকটবর্তী শহর ফালুজাহ-এ ইসলামিক স্টেট প্রায় এক বছর ধরে অবস্থান করছে। এর আগে জাতিসংঘ জানায়,
গত দুই দিনে রামাদি থেকে অন্তত ৪০০০ পরিবার বাস্তুভিটা ত্যাগ করেছে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে। পুরো রামাদি শহর পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে নগরীতে। এ নিয়ে আরও এক দফা মানবতার সংকট পরিলক্ষিত হচ্ছে। এসব পরিবারের প্রায় শতাধিক নবজাতক শিশুর মৃত্যুসংবাদ শোনা যায়। প্রতিকূল পরিবেশ আর খাদ্যহীনতা সহ্য করে যারা বেঁচে থাকতে পারেনি। উদ্বাস্তুরা বাগদাদের দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলে তিনটি গ্রামে আশ্রয়ে নিতে চলেছে। জাতিসংঘ ও জাতীয় অর্থায়নে সেখানে প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবক দল। গত এক বছরে প্রায় ২৭ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

মুরসির মৃত্যুদণ্ড হতে পারে

মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বিচারের রায় ঘোষণার কথা রয়েছে মঙ্গলবার। বিক্ষোভকারীদের হত্যার দায়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতে পারে। মৃত্যুদণ্ড না হলেও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত দু’বছর পর এবারই প্রথম রায় ঘোষণা করতে চলেছে দেশটির আদালত। মিসরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মুরসি এই মামলা ছাড়া অন্য দুটি মামলায় মৃত্যুদণ্ড পেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। মামলা দুটির একটির অভিযোগ হল, বিদেশী শক্তির চর হিসেবে কাজ করা। আর অন্যটির অভিযোগ ২০১১ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকবিরোধী আন্দোলনের সময় জেল থেকে পলায়ন। আগামী ১৬ মে এ দুটি মামলার রায় দেয়ার কথা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মঙ্গলবার মুরসির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড রায় দেয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। কেননা বিচারকরা এর মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের কালো তালিকাভুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তি ঘোষণা করেছেন। ২০১৩ সালের ৩ জুলাই অব্যাহত বিক্ষোভের জের ধরে তৎকালীন সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির হাতে ক্ষমতাচ্যুত হন প্রেসিডেন্ট মুরসি। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে মুরসি সমর্থকরা। তখন নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ১৪শ’র বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। কারাবন্দি করা হয়েছিল আরও হাজার হাজার মানুষকে। দ্রুত বিচারের মাধ্যমে এর মধ্যে শত শত মুরসি সমর্থককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে মিসরের আদালত। এ ঘটনাকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছে জাতিসংঘ।

কৃষক মেরে শিল্পপতি বাঁচাচ্ছেন মোদি

ভারতে বিজেপি সরকারের জমি অধিগ্রহণ অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে কংগ্রেস। কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধীর সভাপতিত্বে দিল্লির রামলীলা ময়দানে মহাকিষাণ সভা বা দিনমজুর কৃষক সমাবেশে অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে উপস্থিত হন সোনিয়া ও রাহুল। মোদি সরকারকে ‘জনবিরোধী’ বলে আখ্যা দেন সোনিয়া। অন্যদিকে দু’মাস অজ্ঞাতবাসে থাকার পর জনসমক্ষে আসা রাহুল গান্ধী মোদিকে ‘গরিবের শত্রু’ ও ‘কৃষকবিরোধী বলে’ অভিহিত করেন।
এদিন কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী জমিগ্রহণ নিয়ে বিজেপি সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন। মোদি সরকারকে জনবিরোধী আখ্যায়িত করে সোনিয়া বলেন, ‘মোদি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে কৃষকবিরোধী। গরিব ও অসহায়দের শত্র“ তিনি।’ জমি অধ্যাদেশ বিল প্রত্যাহারের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। সোনিয়া বলেন, সরকারের গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে তার দল তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলবে। বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা কয়েক হাজার কৃষকদের সমাবেশে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘আমরা ক্ষমতা থেকে এখন বাইরে রয়েছি। কিন্তু কৃষকদের ন্যায্য দাবি নিয়ে লড়াই কখনো দুর্বল হতে দেব না। মোদি সরকারের কাজকর্ম সম্পূর্ণভাবে কৃষক, শ্রমিক এবং গরীবের বিরুদ্ধে। এই সরকারের কথা এবং কাজের মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। গত ১১ মাসে তারা গভীর সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষক ও দুর্বলদের অধিকারের জন্য লড়াই করব। সরকারের এই ধরনের জবরদস্তি আমরা সফল হতে দেব না।’ তিনি বলেন, ‘আজ সেসব লোক কোথায়, যারা বলেছিল, আমরা ক্ষমতায় এলে একজন কৃষকও আত্মহত্যা করবে না।’ অসময়ের বৃষ্টি কৃষকদের ক্ষতি করেছে। সরকার কিছুই করেনি। আজ কৃষক ঋণে জর্জরিত। অভাবে আত্মহত্যা করছে। গরিবের উন্নয়নের এত প্রতিশ্র“তি কই? কোথায় সেই পরিবর্তন?
জনগণ বুঝতে পেরেছে, মোদি ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।’ কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে কৃষকরা বঞ্চিত হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। সমাবেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘গরিবের শত্র“’ ও ‘কৃষকবিরোধী বলে’ অভিহিত করেছেন কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী। নরেন্দ্র মোদিকে বড়লোকের বন্ধু আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, মোদির মেইক ইন ইন্ডিয়া কৃষকদের জমি দখলের ফন্দি। গরিবের টাকা দিয়ে শিল্পপতিদের ঋণ শোধ করছেন মোদিজি। রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমি আপনাদের বলছি, মোদিজি কীভাবে ক্ষমতায় এসেছেন। বড় শিল্পপতিদের কাছ থেকে মোদি হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই টাকা দিয়ে নির্বাচনী প্রচারে চমক লাগিয়েছেন। এখন কীভাবে শোধ করবেন সেই ঋণ? তাই এখন আপনাদের জমি নিয়ে শিল্পপতিদের দিতে চান। মোদি গরিব কৃষকদের মেরে বড়লোক বন্ধুদের বাঁচাতে চান।’ রাহুল আরও বলেন, গুজরাট মডেলের মাধ্যমে মোদি দেখিয়ে দিয়েছেন, কীভাবে কৃষকের জমি দখল করতে হয়। আর তা শিল্পপতিদের দিয়ে বড় বড় ভবন বানাতে হয়। এই কাজ তিনি সারা দেশে করতে চান। এটাই মোদি মডেল। ভিত্তি দুর্বল করো, তারপর মই লাগিয়ে ভবনে রঙ চঙ করে দেখাও যে, বিল্ডিং কেমন জ্বলজ্বল করছে। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং বলেন, সরকারের পদক্ষেপ কৃষকদের আঘাত করেছে। অথচ মোদি গরিব ও তরুণদের কাছে ‘স্বপ্ন বিক্রি’ করে ক্ষমতায় এসেছেন। মনমোহনের সরকার গরিবদের উন্নয়নে কাজ করেছেন বলে জানান তিনি। মনমোহন বলেন, ‘আমাদের সরকার কৃষকদের ৭০ হাজার কোটি রুপি ঋণ মওকুফ করে দিয়েছে। আমরা গমের জন্য মূল্য নির্ধারণ বাড়িয়ে কৃষকদের উপকার করেছি। গমের এমএসপি (মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস) ৫৪০ রুপি থেকে বাড়িয়ে ১৪০০ রুপি করেছি। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন, মোদি সরকার রাষ্ট্রীয় কৃষি বিকাশ যোজনা ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। আবার এখন কৃষকদের জমি কেড়ে নিতে চাচ্ছেন। ইন্ডিয়া টুডে।