Friday, November 13, 2009

শহীদের স্মৃতি সংরক্ষণ

১৯৭১ সালে আমরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করে অর্জন করেছি স্বাধীনতা। লাখো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ। রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার ঝাড়ুয়ার বিল পদ্মপুকুর পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনী প্রায় ৭০০ নারী-পুরুষকে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর থেকে ঝাড়ুয়ার বিল পদ্মপুকুর পাড়ে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় লোকজন। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছর পরও এখানে কোনো স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়নি।
সম্প্রতি ঝাড়ুয়ার বিল পদ্মপুকুরের মাটি কিছু প্রভাবশালী মহল ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছে। এ মাটিতেই শহীদদের হাড়-মাংস মিশে আছে। তাই পদ্মপুকুরের এ মাটি আমাদের রক্ষা করা উচিত।
সরকারের কাছে অনুরোধ, একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে ঝাড়ুয়ার বিল পদ্মপুকুর এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি বাস্তবায়ন করা হোক।
মো. সোহেল রানা
বদরগঞ্জ, রংপুর।

মাদক ব্যবসা

কটিয়াদীর বাগরাইট, ভোগপাড়া, চড়িয়াকোনা গ্রাম ও নিকটবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে চলছে মাদকের জমজমাট ব্যবসা এবং নেশাখোরদের উত্পাত। অথচ এ গ্রামগুলো মডেল থানা থেকে বেশি দূরে নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতা নাকি অন্য কোনো কারণে মাদক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য দূর করা সম্ভব হচ্ছে না তা আমরা বুঝতে পারছি না। বরং দেখতে পাচ্ছি মাদক ব্যবসার নিত্যনতুন কৌশল যোগ হচ্ছে।
প্রকাশ্যে না হলেও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গাঁজা, হেরোইন, নেশাজাতীয় ইনজেকশন ও ফেনসিডিলের জমজমাট ব্যবসা চলছে। কটিয়াদী ও এর আশপাশে নেশাদ্রব্যের ব্যবহার বৃদ্ধি এ মুহূর্তে রোধ করতে না পারলে এলাকার যুবসমাজ ধ্বংস হবে, তাতে সন্দেহ নেই। মাদকাসক্তরা সংখ্যায় অল্প হলেও সমাজে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তরুণ-যুবকের সংখ্যাই বেশি। অন্যদিকে তরুণ-যুবকেরাই হলো একটি দেশ ও সমাজের সবচেয়ে কর্মক্ষম এবং প্রতিশ্রুতিশীল অংশ। কাজেই তারা যদি মাদকের মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে—তাহলে ভবিষ্যতে অনাগত দিনগুলোয় তারা নিজেরাই বা কতটুকু যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে—এ ব্যাপারে সমাজের প্রগতিশীল ও সচেতন মানুষেরা উদ্বিগ্ন।
এ অবস্থায় কটিয়াদীকে মাদকমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সুমিত বণিক
কটিয়াদী, কিশোরগঞ্জ।

আইনজীবীবিহীন আইনের শাসন by শাহ্দীন মালিক

৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে একটা টিভি চ্যানেলে আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম সাহেবের আলোচনা শুনেছি জেলহত্যা মামলা নিয়ে। এ লেখার জন্য তাঁর বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক অংশটা ছিল এ রকম—গত আওয়ামী লীগের সরকারের শেষ দিকে নিম্ন আদালতে জেলহত্যা মামলা শুরু হয়—হত্যাকাণ্ডের কম-বেশি দুই যুগ পরে। মামলা পরিচালনার জন্য সরকার-পক্ষের প্রধান কৌঁসুলি নিয়োজিত হন প্রয়াত সিরাজুল হক। আইন অঙ্গনে আমরা সবাই জানি, জনাব সিরাজুল হক ছিলেন ফৌজদারি মামলার ডাকসাঁইটে, অত্যন্ত বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ সিনিয়র অ্যাডভোকেট। ওই মামলায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, এখন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আনিসুল হকসহ আরও দু-একজন। মামলা শুরু হলো কিন্তু মামলার মাঝপথে ২০০১ সালের নির্বাচন। সরকার বদল, জনাব মওদুদ আহমেদের আইনমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ।
জেলহত্যা মামলার উপরোল্লিখিত অ্যাডভোকেট সাহেবরা নতুন আইনমন্ত্রীর চিঠি পেলেন—আপনারা জেলহত্যা মামলা চালিয়ে যান। তার দুই দিন পর নতুন চিঠি। নতুন জোট সরকারের নতুন পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) এখন থেকে জেলহত্যা মামলার প্রধান সরকারি কৌঁসুলি। আপনারা তাঁকে সাহায্য করবেন।
জেলহত্যা মামলার আসামিদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির প্রয়াত নেতা ওবায়দুর রহমান, বিএনপিপন্থী নেতা প্রয়াত শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন। বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগ—বিএনপির পিপির নেতৃত্বে মামলা পরিচালনা গতি হারাল। সাক্ষী ও সাক্ষ্যের উলট-পালট হলো। মামলা নষ্ট হলো। আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা, অর্থাত্ কামরুল ইসলাম, সাহারা খাতুন ও অন্যরা সংবাদ সম্মেলন করে তাঁদের ক্ষোভ প্রকাশ করলেন, শেষতক মামলার কৌঁসুলি হিসেবে পদত্যাগ করলেন।
শেষ পর্যন্ত জেলহত্যা মামলায় বিএনপিপন্থী নেতারা বেকসুর খালাস পেলেন। অবশ্য কিছু আসামির দোষী সাব্যস্ত হয়ে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাবাসের আদেশ হলো। হাইকোর্টে এসে একজন পলাতক দোষী বাদে সবাই খালাস। সরকার আপিল বিভাগে আপিল করেছে। পুনর্বিচার চাইবে।
ধরে নিচ্ছি, বর্তমান সরকারের বাঘা-বাঘা অ্যাডভোকেটদের আইনি যুক্তিতর্কের অকাট্যতায় পুনঃতদন্ত-পুনর্বিচারের আদেশ হবে। বিচারিক আদালত অর্থাত্ জেলা জজ কোর্টে আবার বিচার শুরু হলো। ওই বিচারে জেলা কোর্ট, হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ পর্যন্ত গড়াতে গড়াতে যদি বর্তমান সরকার ক্ষমতায় না থাকে—আর আমাদের গত নয়টি সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের আলোকে এটা ধরে নেওয়া নিশ্চয় অস্বাভাবিক হবে না যে তত দিন বর্তমান সরকারি দল তখন থাকবে বিরোধী দলের ভূমিকায় আর মওদুদ সাহেব না হলেও বিএনপির কোনো আইনি নেতা তখন হবেন আইনমন্ত্রী। আর নতুন আইনমন্ত্রী যদি আবার আওয়ামী আইনজীবীদের বাদ দিয়ে আবার বিএনপি-আইনজীবীদের মামলার দায়িত্ব দেন তাহলে ফলাফল অনুমেয়। অবশ্য এই পরের কথাগুলো বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী বলেননি। এসব তর্কের খাতিরে আমার ধরে নেওয়া বা কল্পনা করা ঘটনাপ্রবাহ। আশা করছি, সুহূদ পাঠক এসব ‘কল্পনা’কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবেন না।

আমাদের সুষ্ঠু বিচার না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এটাই। অর্থাত্ দলের আইনজীবী আছেন, কিন্তু বেচারা সরকারের সত্যিকার অর্থে আইনজীবী অ্যাডভোকেট নেই। জেলহত্যা মামলার আইনজীবীরা যদি সরকারের আইনজীবী হতেন—অর্থাত্ পাক্কা সরকারি কর্মকর্তা আইনজীবী হতেন, তাহলে সরকারি দল বদলালেও তাঁরাই ওই জেলহত্যা মামলা পরিচালনার দায়িত্বে থেকে যেতেন। আর তাহলে এটা ধারণা বা কল্পনা করা নিশ্চয় ভীষণ অবাস্তব হতো না যে সে ক্ষেত্রে মামলার ফলাফল ভিন্নরূপ হতো।
দু-একটা উদাহরণ না টানলেই নয়। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল মারফত যাঁরা খবরাখবর রাখেন, তাঁরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে আজকাল নদী দখল নিয়ে বেশ মামলা হচ্ছে, মাননীয় হাইকোর্ট বেশ কয়েকটি রায়-আদেশ দিয়েছেন। পরিবেশরক্ষার জন্য সরকারের একটা প্রতিষ্ঠান আছে—পরিবেশ অধিদপ্তর। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ নামে একটা জাঁদরেল আইন আছে, আইনটির অধীনে কিছু বিধি ও প্রবিধান আছে। অর্থাত্ আইন আছে, আইনের বাচ্চা-কাচ্চাও আছে। এসব পরিবেশসংক্রান্ত আইনি পরিবারের দায়িত্বে আছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ আইনটি না দেখেও পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারবেন যে কেউ যদি পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পরিবেশ অধিদপ্তর। অথবা কোথাও পরিবেশ দূষিত হলে নাগরিকরাও পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে পারবে। বলা বাহুল্য, পরিবেশদূষণের জন্য বিচার এবং বিচারান্তে শাস্তি ও জরিমানা করবেন আদালত। সে জন্য পরিবেশ আদালত নামে পরিবেশ আইনের মামলা-মোকাদ্দমা নেওয়ার ও বিচার করার জন্য পৃথক আদালতও আছেন। আইন বলছে, পরিবেশদূষণের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। ভালো।
কিন্তু ছোট্ট একটা সমস্যা আছে। আদালতে গিয়ে মামলা করতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন হলেও তো অ্যাডভোকেট প্রয়োজন। পরিবেশ অধিদপ্তরের বয়স দুই দশক হয়ে গেছে সম্ভবত। ‘কিন্তু’টা হলো, পরিবেশ অধিদপ্তরের জনবল কাঠামোতে ‘অ্যাডভোকেট’ বলে কোনো পদ নেই। পরিবেশ অধিদপ্তরের ইঞ্জিনিয়ার, রসায়নবিদ বা অন্য বিশেষজ্ঞরা কোন অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করছেন, তাঁরাই মামলা করছেন আর প্রতিপক্ষ শরণাপন্ন হচ্ছেন আসল অ্যাডভোকেটের। ফলাফল—পরিবেশ আদালতে মামলা নেই, দু-দশটা যাও আছে, তাতে প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাডভোকেটের যুক্তিতর্কের তোড়ে অধিদপ্তর কুপোকাত।
প্রয়াত প্রিয় বন্ধু মহিউদ্দীন ফারুক নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর তাগিদে পরিবেশ মামলা শুরু করেছিল। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ‘বেলা’ এখনো জোরেশোরে চালিয়ে যাচ্ছে। বেশির ভাগ পরিবেশ মামলায় বিবাদী করা হয় পরিবেশ অধিদপ্তরকে—তারা কেন ব্যবস্থা নিচ্ছে না, সেই অভিযোগে। কোনো পরিবেশদূষণকারীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হলে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিজস্ব অ্যাডভোকেট তো লাগবে। নেই।
৩.
আশা করি, পাঠক ভাববেন না যে আমি পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতি বিষোদগার করছি। এই চিত্রটা সরকারের প্রায় সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর বা সরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বেলায় প্রায় সমানভাবেই প্রযোজ্য।
অল্প কিছু সরকারি অফিসে—মন্ত্রণালয়, বিভাগ, ইত্যাদি—প্রেষণে নিম্ন আদালতের বিচারকেরা দু-চার বছরের জন্য আইন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু তাঁরা তো অ্যাডভোকেট হিসেবে আর কোর্টে যাবেন না বা যেতে পারেন না। তা ছাড়া সিভিল ইঞ্জিনিয়ারকে দিয়ে যেমন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের কাজ চলে না বা মেডিসিনের চিকিত্সক-অধ্যাপক দিয়ে যেমন সার্জারির অধ্যাপকের অস্ত্রোপচারের কাজটি চলে না, তেমনি নিম্ন আদালতের বিচারক দিয়ে তো আর তাঁর প্রতিষ্ঠানের অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ চালানো যায় না। তা ছাড়া দু-চার বছর প্রেষণে ‘সরকারি কর্মকর্তা’ হওয়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথকীকরণের জন্য বিরাট হুমকি। মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা হয়ে নিম্ন আদালতের একজন বিচারক যদি ফাইল নিয়ে বছরের পর বছর সরকারের উপ-সচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার বা ডিসি-এসপির পেছনে পেছনে ঘোরেন বা তার চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় অর্থাত্ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা হিসেবে সব ‘ক্রসফায়ার’ জায়েজ করার জন্য আইনি মতামত দিতে দিতে প্রেষণ শেষ করে আবার বিচারক পদে ফিরে যান, তাহলে অন্তত মানসিক ও দৃষ্টিভঙ্গিগতভাবে তাঁর বিচারিক স্বাধীনতা কতটা বজায় থাকবে, সেটা বহুকাল ধরেই একটা বিরাট আশঙ্কাজনক প্রশ্ন।

রাষ্ট্রের মামলা করার জন্য দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশেই সরকারি আইনজীবী কর্মকর্তা থাকেন। অন্য ১০টার মতো এটাও সরকারের একটা ক্যাডার সার্ভিস। পাঠক সহজেই অনুমান করতে পারবেন—আইন পাস করে সরকারি পরীক্ষা দিয়ে আপনি সরকারের কনিষ্ঠ পর্যায়ের আইনজীবী হিসেবে চাকরি করবেন অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের মতো আপনার দায়িত্ব ও সুযোগ-সুবিধা, চাকরির নিশ্চয়তাসহ। প্রথম প্রথম ছোটখাটো মুরগি, ছাগল, ডিম চুরি বা পকেট মারের মামলায় লড়বেন রাষ্ট্রের পক্ষ হয়ে। আসামির দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করবেন। অভিজ্ঞতা-সিনিয়রিটি বাড়লে ডাকাতি, তারপর অস্ত্র, ফেনসিডিল এবং শেষতক খুনের মামলার আপনি রাষ্ট্রের তুখোড় আইনজীবী। মামলা কোর্টে ওঠাবার আগে পুলিশ, তদন্তকারী কর্মকর্তারা অহরহ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের ঘাটতি থাকলে আপনার নির্দেশ-অনুরোধ তামিল করবেন তদন্তকারী ও অন্য রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ব্যক্তিরা।
আর এখন কী হয়। ক্ষমতাসীন দল বদলের সঙ্গে সঙ্গে নতুন একদল পিপি-এপিপি-জিপি নিয়োগ পান। সরকার পক্ষের মামলা কীভাবে পরিচালনা করতে হয় তা বুঝতে বুঝতেই অনেক ক্ষেত্রে সময় শেষ। আমরা আইনজীবীরা আসামির পক্ষে লড়ি। সেই লড়াইয়ে দক্ষতা-অভিজ্ঞতা নিশ্চয় হয়। কিন্তু রাতারাতি দল বদলানো বা পজিশন বদলানো সহজ নয়। তুখোড় ফরোয়ার্ডকে কালকে বানালেন গোলকিপার বা আশরাফুলকে দিলেন ইনিংসের শুরুতে নতুন বল হাতে পেস-অ্যাটাক শুরু করতে। কাজ হয়তো চলবে। আর রাষ্ট্রের কাজ এভাবেই চলছে।
আমাদের যত ফৌজদারি মামলা কোর্টে ওঠে তার শতকরা ১০ ভাগেরও অনেক কম মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির দোষ প্রমাণিত হয়, শাস্তি হয়। বাকি ৯০ ভাগ খালাস। নতুন বল হাতে পেস বোলিংয়ের দায়িত্ব আশরাফুলকে দিলে দু-একজন ব্যাটসম্যানকে হয়তো ঘায়েল করতে পারবে, তবে ততক্ষণে প্রতিপক্ষের স্কোর যদি গিয়ে দাঁড়ায় এক উইকেটে ২০০ রান তাহলে দোষ কি আশরাফুলের, নাকি ক্যাপ্টেন সাকিবের?
৫.
বছর দুয়েক আগে সরকারি আইনজীবী ক্যাডার তৈরির জন্য একটা অধ্যাদেশ হয়েছিল। অধ্যাদেশটি মৃত্যুবরণ করেছে। যেকোনো ক্যাডার সার্ভিস তৈরি করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়। বিশেষত, ক্যাডার সার্ভিস হবে আইনজীবীদের নিয়ে। পিপি-জিপি থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের সহকারী ডেপুটিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি আইনজীবী নিয়োগ নিজের দলীয় আইনজীবীদের দক্ষিণা বিতরণের একটা ব্যবস্থা হিসেবে এতকাল চলে আসছে, তা বদলাতে উচ্চ পর্যায়ের দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। রাষ্ট্রকে, দেশকে দলীয় বা দলবাজ আইনজীবীদের স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। এতটা রাজনৈতিক দৃঢ়তা বা বলিষ্ঠতা কেমনে আশা করি?
আইনমন্ত্রী-অর্থমন্ত্রীসহ অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন—হাইকোর্টে হাজার হাজার কর মামলায় সরকারি শত শত কোটি টাকা রাজস্ব আয় আটকে আছে। কেউ যদি মনে করে যে এনবিআর তার ওপর অন্যায়ভাবে করারোপ করেছে, তাহলে সে তো কোর্টে যাবেই। তাকে ঠেকাতে তো এনবিআরের নিজস্ব, দক্ষ আইনজীবী-ক্যাডার থাকতে হবে। ঠিকমতো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে ভ্যাট কাস্টমস আয়কর আইনে পারদর্শী দক্ষ আইনজীবী ক্যাডার গড়ে তুলতে কয় দিনই বা লাগবে? দূরদর্শিতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহস থাকলে রাষ্ট্রের আইনজীবী ক্যাডার সহজেই গড়ে তোলা যায়। বলা বাহুল্য প্রথম প্রথম কিছু হোঁচট তো খেতেই হবে; ভুল হবে; প্রচণ্ড বাধা আসবে। সে জন্যই দরকার সরকারের সিদ্ধান্ত।
যত দিন এটা না হবে, তত দিন আইনের শাসনের কথা রাজনৈতিক বুলিই থেকে যাবে। চিকিত্সক ছাড়া যেমন হাসপাতালের বিল্ডিং তৈরি বা যন্ত্রপাতি জোগাড় করা যায় কিন্তু চিকিত্সাসেবা দেওয়া যায় না; তেমনি রাষ্ট্রের নিজস্ব ক্যাডার বা অন্যান্য পেশার মতো পেশাদারি আইনজীবী ছাড়া আইনের শাসন রাজনৈতিক বুলিই থেকে যাবে আর দেশে চালু থাকবে ‘ক্রসফায়ার’ সমাধান।
শাহ্দীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট। ডাইরেক্টর, স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

অবিলম্বে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করুন -হাসপাতাল পরিচালকের ওপর হামলা

নয় দিন পার হয়ে গেল, কিন্তু জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম মুহিবুল্লাহর ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে যে সন্ত্রাসীরা হামলা করেছিল, তাদের গ্রেপ্তার ও আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো না। এ ব্যর্থতা যদি পুলিশ বা প্রশাসনের হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন জাগে, এদের ওপর ভরসা করে কি আইনশৃঙ্খলার উন্নতি আশা করা যায়? অভিযুক্ত কয়েকজন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা কি এতই দুঃসাধ্য?
৩ নভেম্বর হাসপাতালের পরিচালকের ঘরে ঢুকে সন্ত্রাসীরা ভাঙচুর ও পরিচালককে লাঞ্ছিত করে তাঁর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। তাদের কথামতো চলার হুমকি দেওয়ার দুঃসাহসও তারা দেখায়। এ ঘটনায় চারজনকে আসামি করে মামলা হয়। পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করলেও সে এই ঘটনায় অভিযুক্ত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া এ ব্যাপারে আর কোনো অগ্রগতিও নেই। সন্ত্রাসীদের খুঁটির জোর কি এতই বেশি যে তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার সাধ্য কারও নেই? এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকৃষ্ট হোক। কারণ স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, সন্ত্রাসীরা যে-ই হোক, তারা কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। এখন সে কথার বাস্তবায়ন দরকার।
জানা গেছে, একদল সন্ত্রাসী হাসপাতালে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে চিকিত্সাসেবার কাজে বাধা দেয়। তাদের কাজ হলো রোগী ভাগিয়ে বাইরে নিয়ে যাওয়া। তারা হাসপাতালের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে ব্যবসা করতে চায়। বিভিন্ন সময় দরপত্র কার্যক্রমে সন্ত্রাসীদের হস্তক্ষেপ করার অভিযোগও রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব অনৈতিক কাজে সব সময় বাধা দেয়। ফলে ক্ষিপ্ত হয়ে সন্ত্রাসীরা পরিচালকের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে ধারণা করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যদি নিয়ম অনুযায়ী সেবা কার্যক্রম চালাতে না পারে, তাহলে তো সরকারেরই সেটা দেখা দরকার। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, থানার পুলিশের যেন কোনো গরজ নেই।
এটা সত্যি দুঃখজনক যে সরকারি হাসপাতালগুলো বহিরাগত সন্ত্রাসীদের উত্পাতে বিপর্যস্ত। এর আগে আমরা দেখেছি, পঙ্গু হাসপাতালে একশ্রেণীর দালাল রোগীদের হাসপাতালে যেতে বাধা দেয়। তারা নানাভাবে সরল রোগীদের প্রভাবিত করে। তাদের বাধা দিলে ভাঙচুর করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালেও দেখা যায়, রোগীদের ওষুধ-পথ্য নিয়ে একশ্রেণীর সন্ত্রাসী ব্যবসা করে। উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা সরকার সব সময় বলে আসছে। কিন্তু সেটা করতে হলে হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী চক্রের অপতত্পরতা বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে পুলিশ ও প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
হূদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিত্সক ও কর্মচারীরা হামলার প্রতিবাদ ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তাঁরা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছেন। আমরা আশা করব, থানা-পুলিশ অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রদানের উদ্যোগ নেবে।