Saturday, December 26, 2015

বাগমারায় বোমা হামলার দায়ও স্বীকার আইএসের!

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার মচমইল সৈয়দপুর চকপাড়ায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার দায়ও স্বীকার করেছে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে গবেষণা করে এমন একটি সংস্থার বরাত দিয়ে আজ শনিবার বিবিসি বাংলা অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন জঙ্গি গোষ্ঠীর ইন্টারনেটভিত্তিক তৎপরতা নজরদারি করা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের ওয়েবসাইটেও একই তথ্য জানানো হয়েছে।
বিবিসি বাংলা অনলাইনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, 'ট্র্যাক টেররিজম' নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থার টুইটে বলা হয়, আইএস তাদের তাদের বার্তায় আবুল ফিদা আল বাঙালি নামে একজন এ হামলা চালায় বলে জানিয়েছে। টুইটে আইএসের এই দাবি সংক্রান্ত বার্তাটির একটি স্ক্রিনশটও দেওয়া হয়। আরবিতে লেখা ওই স্ক্রিনশটের ওপর ক্লিক করলে অন্য পাতায় ইংরেজি অনুবাদ দেখা যায়। এতে লেখা, ‘ইস্তিশহাদি আল ফিদা আল বাঙালি বিস্ফোরক বেল্ট পরে রাজশাহীর বাগমারায় ধর্মচ্যুত কাদিয়ানিদের এক মন্দিরে ঢুকেছিলেন। সেখানে বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তিনি ৩০ জনকে আহত করেছেন।’
এদিকে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের রাজশাহীতে আহমদিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলার দায় স্বীকার করেছে আইএস।’
গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদে ওই হামলায় একজন নিহত এবং তিনজন আহত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, নিহত ব্যক্তি বোমা বহনকারী ছিলেন।

মির জাফর বংশের তরবারি দিলেন মোদিকে পুতিন

রাশিয়া সফরকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলার নবাব মির জাফরের বংশধরদের ব্যবহৃত তরবারি দিয়েছেন ভ্লাদিমির পুতিন। এ নিয়ে ভারতের মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে কলকাতাভিত্তিক একটি নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত খবরটি তুলে ধরা হলো।
নরেন্দ্র মোদির দু'দিনের রাশিয়া সফর কূটনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে৷ তবে, নানাবিধ আন্তর্জাতিক চুক্তির অবশ্যম্ভাবী গাম্ভীর্য এবং সুদূরপ্রসারী অভিঘাত ছাপিয়ে ভারতবাসীর মনে যে বিষয়টি দাগ কাটতে বাধ্য তা হলো, মৈত্রী এবং সৌহার্দ্যের চিহ্নস্বরূপ পুতিন মোদিজিকে বাংলার নাজাফি বংশের--- এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা মীর জাফর--- একখানি তরোয়াল উপহার দিলেন৷ ভালোবাসার প্রতীক কী এবং কাহাকে বলে ইত্যাদি সাবেক প্রশ্নের চিরাচরিত উত্তরে বড়সড় বদল যে ঘটেছে তা বলাই বাহুল্য, এবং চিরপরবর্তনশীলতাকে যদি মানব সভ্যতার আবশ্যিক শর্ত হিসেবে মেনে নিতেই হয়, তবে সাধারণ মানুষের কৌম চেতনায় সে বিষয়টি সম্পর্কে কোনও আগাম খবর ছিল না ইত্যাদি অজুহাতও নেহাতই তাত্‍‌পর্যহীন৷
গদি আঁটা রাজনৈতিক পালঙ্কে সমমনস্ক দু'টি প্রাণ নিজেদের মাঝে নাঙ্গা তরোয়াল শুইয়ে যতই প্রেমালাপে মাতুন না কেন, সর্বসাধারণের পক্ষে --- তা তেনারা যতই দুনিয়াজোড়া বাজার বাণিজ্য বিষয়ে জাহেল হন না কেন--- ব্যাপারটি সুখকর নয় মোটেই এবং যুগলের মিলন-কল্পনায় শিরদাঁড়া বেয়ে হিমশীতল ভয়ের স্রোত বই অন্য কোনও অনুভূতি আশা করাও অন্যায়৷
আঠেরো শতকের তরোয়ালটির গায়ে নাকি সেই সময়কার শৈল্পিক রীতি-রেওয়াজ অনুযায়ী অপূর্ব রূপোর কারুকাজ৷ কোপানোর অস্তর হুনুরি লাগিয়ে কারুকার্যখচিত শিল্পবস্ত্ততে রূপান্তরিত করতে হবে এহেন তামাশা সে যুগের জায়েজ ধরন ছিল বটে, তবে আর একটি ব্যাপার এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সে সূত্র ধরেই৷ তরোয়ালের সঙ্গে পুতিন মোদীজিকে মহাত্মা গান্ধীর রোজনামচা লেখা একখানি ডাইরির পাতাও উপহার দিয়েছেন৷ তরোয়ালের গায়ে রূপোর কারুকাজ আঘাতের চোট খানিক প্রশমিত করত কিনা জানার উপায় নেই বটে, তবে তরোয়াল দ্বারা যে শান্তি প্রক্রিয়ার শুরুয়াত হল, তার ওপর ডাইরির পাতা অহিংস মতাদর্শের একখানি প্রলেপ চড়ালো সন্দেহ নেই৷
নাজাফি বংশের সঙ্গে মীর জাফরের প্রত্যক্ষ যোগ নিয়ে নিন্দুকেরা নানা তির্যক ইঙ্গিতে মাতবেন নিশ্চই, তবে সে সবই অদরকারি এবং নিঃসার প্রলাপ মাত্র৷ বরং সন্দেহের বিষয় হিসেবে ওই অহিংস মতাদর্শের অন্তরালে খোলা তরোয়াল আস্ফালনের গুরুত্ব অসীম৷ গান্ধীজির সহিষ্ণু ভারত গড়াই মোদীজির লক্ষ--- কারই বা নয়--- তবে, সে মোকামে পৌঁছতে যদি রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার দরকার পড়ে, তা হলে রুশ প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন নিয়ে হয়তো মোদীজিকে ভাবতে হবে না--- আর এ ক্ষেত্রে শুধু বাংলা, বিহার, ওডিশা নয়, গোটা ভারতের ঝুঁটি ধরে নাড়ানোর তথা দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সুতোয় ঝোলানো পুতুলের দোল খাওয়ার সনদ তো মিলেই গেছে যদি মীর জাফরের প্রসঙ্গ টানা নিন্দুকদের এক ছটাকও পাত্তা দিতে হয়৷
সত্যি বলে কী, ওই ঢাকা চাপা দেওয়া, এই বার্তার আবডালে সেই অর্থ নির্মাণই হয়তো একমাত্র পথ৷ রুশ বিমান সিরিয়ায় বোমা ফেলেছে কারুর তোয়াক্কা না করে, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে কি না সে নিয়ে জোরগলায় এই মুহূর্তে কিছু বলা না গেলেও, বিকল্প ব্যবস্থার খোঁজ কেউই দিতে পারেননি৷ তলিয়ে দেখলে, ওই সামরিক অভিযানটিও গান্ধীজির রোজনামচার পাতায় আচ্ছাদিত ছিল৷
বিদেশি রাষ্ট্রের অতিথিদের দেশজ শিল্পবস্ত্ত উপহার দেওয়ার ধরন নতুন নয়৷ এ ক্ষেত্রে তরোয়াল এবং চিঠি দুটোই মোদীজির দেশের সামগ্রী৷ তা হলে তরোয়ালটার সঙ্গে, অর্থাত্‍‌, শিল্পকলার নিদর্শনটি আইনমাফিক জায়েজ মালিকের হাতে তুলে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে কি একটি বিশেষ যুগের স্মৃতিও ফেরানো হল? সে সময়ের ন্যায় অন্যায়ের যুক্তি, শাসন শোষণের কাঠামো, রাজধর্ম ও প্রজাপালনের আদলও কি বহন করে ওই তরোয়াল? প্রশ্নটিকে একেবারে বাদ দেওয়া যাবে না, কারণ মৈত্রী এবং শান্তি বিষয়গুলি বহুমাত্রিক সে নিয়ে সন্দেহের অবকাশ না থাকলেও, প্রান্ত অর্থগুলি যে দ্ব্যর্থবোধক নয় সে নিয়েও সন্দেহ নেই৷
পুতিন এবং মোদীর রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক আদানপ্রদানের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা এই দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের আলোচনা থেকেই হতে পারে৷ পুতিন অন্তত গোড়াতেই নিজের অবস্থানটি পরিষ্কার করে রাখলেন৷ তরোয়ালও আছে, অহিংস রাজনীতির বাণীও আছে৷ মোদীজি দুটোই হাত পেতে নিয়েছেন৷ এর পর উনি কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন সেটি তাঁর ব্যাপার৷ ওই তরোয়ালে রক্তের দাগ লাগলে ক্ষতি নেই, সেটাই ভবিতব্য , অমনটাই হয়ে এসেছে বরাবর --- তরোয়াল বলে কি সধর্ম থেকে বিচ্যুত হতে হবে নাকি?
তবে ওই ডায়েরির ছেঁড়া পাতা দিয়ে যাতে সে রক্তের দাগ সাফ না করা হয় সে দিকে আড়চোখে হলেও এ দেশের মানুষ কড়া নজর রাখবেন৷ রাখবেনই৷ বড় মানুষদের আন্তর্জাতিক মস্করায় তাঁদের খুব একটা আপত্তি নেই, ও খেলার বেশিরভাগটাই তাঁদের জীবনের অদৃশ্য একটি অংশ৷ অদ্ভুত শোনাবে ঠিকই, তবে গান্ধীজি ডায়েরির ছেঁড়া পাতা এই জাহেল , আধপেটা খাওয়া , না -খাওয়াদের অনেকেরই জীবনে লেপটে থাকা অংশ৷ তা নিয়ে ঠাট্টা তামাশায় খেপে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল৷

সন্ত্রাসী ও অপরাধীর মধ্যে পার্থক্য কী? by রবার্ট ফিস্ক

পুলিশ ও সাংবাদিকদের মধ্যে অনেক মিল আছে। তাঁরা উভয়ই মানবীয় ভুলের শিকার হন। তাঁদের মধ্যকার সম্পর্ক যেন অনেকটা মূল গাছ ও পরজীবী উদ্ভিদের সম্পর্কের মতো। আর আমি মনে করি, এটা একরকম স্বাভাবিক যে অপরাধের ব্যাপারে তাঁদের উভয়ের অবস্থানও এক।
কয়েক বছর ধরে দেখছি, অপরাধ দুই ধরনের হয়, একটি সাধারণ অপরাধ, আরেকটি ‘সন্ত্রাসী অপরাধ’। ধরুন, কোনো বন্দুকধারী যদি হঠাৎ করে গুলি করে মানুষ মেরে ফেলে, তাহলে সেটা সাধারণ অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। আর ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হচ্ছে সেই প্রকৃতির হামলা, যেখানে হামলাকারীদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষুব্ধ ও কোনো ধর্মের দলছুট গোষ্ঠীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক থাকতে হয়। সন্ত্রাসী অপরাধীদের ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়, তাদের নিপীড়ক, অসুস্থ বা কোনো ‘মৃত প্রথার’ মধ্যযুগীয় সদস্য হতে হয়। এটা বলার প্রয়োজন নেই যে এই দ্বিতীয় প্রকৃতির মানুষেরা ‘ঘরেই বেড়ে ওঠা চরমপন্থী’, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তি হস্তক্ষেপ করেছে বলে যারা যেকোনো ধর্মের মানুষকে কতল করতে প্রস্তুত।
বাস্তবে এই বিভাজনের কারণে মনে হয়, ‘সাধারণ’ অপরাধ একরকম স্বাভাবিক ব্যাপার, মানুষ পয়সা, লোভ, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ও মাদকের কারণে মানুষকে হত্যা করে। কিন্তু ‘সন্ত্রাসী’ অপরাধের মাজেজা হচ্ছে, মুসলমানরা সব সময় অপরাধী। অন্য কথায়, অপরাধীরা তো আমাদের ভাই-ব্রাদার, যেখানে সন্ত্রাসীরা হচ্ছে অশ্বেতাঙ্গ মুসলমান, যারা আমাদের মূল্যবোধ ঘৃণা করে, ওরা আমাদের মাথা কাটতে চায়, যারা দৃশ্যতই পাগলাটে।
ক্যালিফোর্নিয়াতে ১৪ জন নিরপরাধ মার্কিনকে হত্যা করার পর আমরা এই অর্থহীন ধারণার নড়বড়ে প্রকৃতিটা দেখলাম। প্রথমত, মার্কিন পুলিশ বলল যে তারা জানে না, এটা ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সম্পর্কিত’ অপরাধ কি না। তারা এটার নাম দিল গণ-গুলিবর্ষণ। বিভিন্ন তরফ থেকে আমাদের বলা হলো, এই হত্যাকাণ্ডটি একটি বাদবিসংবাদের ফল হিসেবে ঘটেছে। বন্দুকধারী এই ১৪ জন খুন হওয়া মানুষের একজনের হাতে নিগৃহীত হয়ে এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন। কিন্তু এরপর দেখা গেল, নামে তিনি মুসলমান, আর স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িতে এক অস্ত্রভান্ডারও গড়ে তুলেছিলেন। আর দৃশ্যত তিনি আইএসের প্রতি ‘আনুগত্যও’ প্রদর্শন করেছেন। এই গণ-গুলিবর্ষণের ঘটনা তখন ‘সন্ত্রাসী কাণ্ডের’ আখ্যা পেল। এই নতুন সংজ্ঞাকে আরও বিভ্রান্ত করে দিতে পুলিশ বলল, তারা বিশ্বাস করে না যে এই দম্পতির সঙ্গে আইএসের কোনো যোগাযোগ আছে, যদিও গোষ্ঠীটি সেই দায় স্বীকার করেছে। এরপর দেখা গেল, এই দম্পতি হত্যাকাণ্ডের কয়েক বছর আগে ‘চরমপন্থায়’ দীক্ষিত হয়েছিল, মাফিয়াদের বেলায় যেটা ঘটে না।
কয়েক সপ্তাহ আগে লন্ডনের টিউব স্টেশনে যে ছুরিকাঘাতের ঘটনা সংঘটিত হলো, তখন যে কথা বলা হলো তা-ও একইভাবে বিভ্রান্তিকর। প্রথমত, পুলিশ লেটনস্টোনে একটি ‘ছুরিকাঘাতের ঘটনার’ তদন্ত করছিল, কিন্তু তারা যখন একটি ভিডিওতে শুনতে পেল যে একজন মানুষ জোরে জোরে বলছে, ‘এটা সিরিয়ার জন্য’ এবং একজন বেসামরিক নাগরিক বলছেন, ‘ভাই, তুমি মুসলমানও নও’, তখন পুলিশ বলে বসল, এটা ‘সন্ত্রাসী ঘটনা’। এরপর একজন মানুষের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।
কিন্তু এসবই কিছুটা উদ্ভট ব্যাপার। সেই ১৯৮০-এর দশকে যখন ব্রিটিশ সেনা ও আইআরএ উত্তর আয়ারল্যান্ডে প্রাণপণ যুদ্ধ করছিল, তখন যুক্তরাজ্য সরকার আইআরএকে অপরাধী, মারাত্মক সন্ত্রাসী, বেপরোয়া সন্ত্রাসী ও এমনকি সন্ত্রাসী অপরাধী হিসেবে আখ্যা দিতে তৎপর ছিল। কিন্তু সর্বোপরি সাধারণ অপরাধীদের তো আইনের মুখোমুখি করে বহু বছরের জন্য জেলে পুরতে হবে, সে তাদের সহিংস প্রচারণার কারণ যা-ই হোক না কেন। তখন আইআরএ সিদ্ধান্ত নিল, তারা নিজেদের ‘রাজনৈতিক বন্দী’ হিসেবে আখ্যা দেবে, যেটা কিনা ‘সন্ত্রাসীর’ ভদ্রোচিত রূপ। কারণ, তারা চেয়েছিল নিজেদের ডাকাতি, খুন, ভীতি প্রদর্শন—প্রভৃতি অপরাধ সাধারণ অপরাধের বাইরে ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাক।
আইআরএ ‘রাজনৈতিক’ মর্যাদা লাভ করতে এতটা উৎসাহী ছিল যে তারা আমরণ অনশন শুরু করে। কিন্তু থ্যাচারের শীতল মনোভাবের কারণে তাদের ১০ জন সহযোদ্ধা মারা যায়। কিন্তু তখন ব্রিটিশ সরকার আইআরএর প্রায় সব দাবিই মেনে নেয়। ফলে আইআরএর বন্দীরা ‘রাজনৈতিক’ তকমা পেয়ে যায়, আর যখন ‘শান্তি’ ঘোষিত হলো, তারা তখন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হলো। তবে খুনি ও অসৎ মানুষেরা রানির আতিথ্যেই থাকল।
তাহলে ‘সন্ত্রাসী’ বা সাধারণ অপরাধী হলে কি কোনো লাভ আছে? আমার মনে হয়, এটা নির্ভর করে আপনার জীবনের মূল্য কতটা। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত আইএস যোদ্ধা রেয়াদ খান ও রুহুল আমিন যে ড্রোন হামলায় নিহত হলেন, তাঁদের যে সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল, তা মারাত্মক প্রমাণিত হয়েছে। তাঁদের মৃত্যু আসলে মৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড, যেটা ডেভিড ক্যামেরনের মতে, ‘যুক্তরাজ্যের ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ও যথাযথ’ ছিল। তাঁরা ব্রিটেনে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছিলেন। অন্য কথায় বললে, ডেভ তো আর লেস্টারে স্কুলছাত্রদের খুনিকে মারার জন্য ড্রোন হামলার আদেশ দিতেন না, বা লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের কাউকে মারার জন্য তিনি হামলার নির্দেশ দিতেন না, এমনকি তাঁরা যদি ব্রিটেনে হামলার পরিকল্পনা করেও থাকেন।
তারপরও এই অপরাধী/সন্ত্রাসী দ্বি-বিভাজন চলছেই। সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরোধীরা সর্বশেষ দাবি করেছেন, বাশার আইএসের চেয়েও বড় সন্ত্রাসী। কারণ, তিনি এই ইসলামি গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি মানুষ হত্যা করেছেন (চ্যানেল ফোর–এর ভাষ্য অনুসারে, আইএসের চেয়ে ছয় গুণ বেশি মানুষ)। এতে বোঝা যায়, আপনার হাতে কত মানুষ মরল, তার সংখ্যা দিয়েই নির্ধারণ করা হবে আপনি সন্ত্রাসী নাকি অপরাধী। অথবা এর মাজেজা এ রকম হতে পারে যেকোনো ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর খুনের আকাঙ্ক্ষা যদি ‘পরিমিত’ হয়, তাহলে তারা অত ভয়ংকর নয়, যাদের বন্দুকের নলে বেশি খাঁজ আছে, তাদের তুলনায়।
কিন্তু পাঠক, ক্ষণিকের জন্য দাঁড়ান। বাশারের বিরোধীদের কথার যৌক্তিক সারসংক্ষেপ দাঁড় করালে আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে বুশ ও ব্লেয়ার আইএস ও বাশারের চেয়ে বেশি বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছেন। ২০০৩ সালে অবৈধভাবে ইরাক আগ্রাসন করে তাঁরা এ কাজ করেছেন। তাহলে বুশ ও ব্লেয়ারকে কি অতি-সন্ত্রাসী আখ্যা দেবেন, নাকি শুধু অপরাধী হিসেবে? যদিও তাঁরা যুদ্ধাপরাধী হিসেবেও আখ্যায়িত হতে পারেন, যাঁদের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে তোলা যেতে পারে। তাঁরা কিন্তু ড্রোন হামলার আশঙ্কা থেকে একেবারেই মুক্ত, আর তাঁদের কখনোই ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেওয়া হবে না।
দ্য ইনডিপেনডেন্ট থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দ্য ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।

জমি নিয়ে বিরোধ: গুলিতে কিশোরীসহ নিহত ২

ফেনীর মহিপাল চাড়িপুরে জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে বৃহস্পতিবার রাতে প্রতিপক্ষের গুলিতে এক স্কুল শিক্ষার্থী কিশোরীসহ দুই জন নিহত হয়েছে। এসময় এক শিশুসহ তিন জন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
নিহতদের স্বজন আলাউদ্দিন, নাসির উদ্দিন ও মো. হানিফ জানান, ফেনীর মহিপাল উত্তর চাড়িপুরে চৌধুরী বাড়ির ৬২ শতাংশ জায়গা নিয়ে চৌধুরী বাড়ির লোকজনদের সাথে পাশবর্তী মাঈন উদ্দিনের বিরোধ চলে আসছে। পূর্ব বিরোধের এই জের ধরে বৃহস্পতিবার রাতে চৌধুরী বাড়ির স্বপন চৌধুরী, সাহেদ চৌধুরী, মিঠু চৌধুরী, মান্না ও তাদের সন্ত্রাসীরা অতর্কিতভাবে মাঈন উদ্দিনের বাড়িতে হামলা চালায়। এসময় প্রায় অর্ধশতাধিক রাউন্ড গুলি ও বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ করে। এতে ওই বাড়ির মালিক মাঈন উদ্দিন (৫০), তার ভাগ্নী স্থানীয় তৈয়বিয়া মাদ্রাসার নবম শ্রেণীর ছাত্রী আকলিমা আক্তার (১৫), আলা উদ্দিন (৩৫), মারুফ (৬) ও মো. সাইফুল ইসলাম (৩৬) গুলিবিদ্ধ হয়। স্থানীয়রা দ্রুত গুলিবিদ্ধদের উদ্ধার করে ফেনী জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।
ফেনী সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎিসক (মেডিকেল অফিসার) মুহাম্মদ আবু তাহের জানান, গুলিবিদ্ধ মাঈন উদ্দিন ও আকলিমা আক্তার ঘটনাস্থলে মারা যায়। গুলিবিদ্ধ শিশু ফারুফসহ বাকিদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রাতে তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
ফেনী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাহবুব মোরশেদ জানান, পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে চার জনকে আটক করেছে। এঘটনার মামলার প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। হামলার সাথে জড়িত সকলকে আটক করতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

লাহোরে শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেন মোদি

আকস্মিক লাহোরে নেমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালের ভারতের নরেন্দ্র মোদি। কাবুল থেকে ভারত ফেরার আগে এই ঘটনা ঘটিয়ে গোটা বিশ্বকে চমকে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি। নওয়াজের লাহোরের বাসভবনে দুই নেতা বৈঠকও করেছেন। এতে করে উপমহাদেশের রাজনীতিতে নতুন কিছু ঘটতে যাচ্ছে বলেও অনেকে মনে করছেন।
শুক্রবার কাবুল থেকেই আচমকা ঘোষণা করলেন, সরাসরি দিল্লি নয়, ফিরবেন লাহোর হয়ে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন শুক্রবার। শরিফকে এই বিশেষ দিনের শুভেচ্ছা জানাতেই লাহোর বিমানবন্দরের রানওয়ে ছোঁয় মোদির বিমান।
নওয়াজ শরিফের এ দিন ৬৬ বছর বয়স হলো। সকালেই মোদি ফোন করে নওয়াজকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান। তার পর কাবুলে ঠাসা কর্মসূচি ছিল তার। আফগান পার্লামেন্টের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় পাকিস্তানের উদ্দেশে নাম না করে কড়া বার্তাও দেন মোদি। আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক অনেকে চায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। ভাষণ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই নরেন্দ্র মোদর টুইট, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে কথা বললাম, তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালাম।’’ এই টুইটের এক মিনিট পরই আবার টুইট করেন মোদি। লেখেন, ‘‘আজ বিকেলে লাহোরে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দিল্লি ফেরার পথে আমি সেখানে নামব।’’
জন্মদিন উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গেই রয়েছেন নওয়াজ। ইসলামাবাদ ছেড়ে তিনি এ দিন পৈতৃক বাড়ি লাহোরে ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদির এটাই প্রথম পাকিস্তান সফর। শুধু তাই নয়, ১২ বছর পর কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী পা রাখছেন পাকিস্তানের মাটিতে। ২০১৬-তে মোদির পাকিস্তান সফর নির্ধারিত হয়েছিল আগেই। তবে তার আগেই ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বিমান পাক বিমানবন্দরের রানওয়েতে নামলেন।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। টুইটারে সুষমা লেখেন, ‘‘এই হলো প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক। প্রতিবেশীদের সঙ্গে এই রকমই সম্পর্ক হওয়া উচিত।’’
তবে কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। মোদি ভারতের পররাষ্টনীতিকে হাস্যকর করে তুলছেন বলে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মণীশ তিওয়ারি মন্তব্য করেন।

এরদোগান বাঁচার সুযোগ করে দিলেন আত্মহত্যায় উদ্যত যুবককে

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে একটি ব্রিজ থেকে নদীতে পড়ে আত্মহত্যায় উদ্যত এক যুবককে নতুন করে বাঁচার সুযোগ করে দিলেন দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েফ এরদোগান।
শুক্রবার ইউরোপ ও এশিয়া সংযোগকারী বসফরাস ব্রিজের রেলিংয়ে উঠে লোকটি আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছিল। এরদোগানের গাড়ি বহর তখন সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় তিনি লোকটিকে ঘিরে মানুষের ভীড় দেখে তার ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে নির্দেশ দেন এবং লোকটিকে তার কাছে ডেকে আনতে বলেন।
টেলিভিশনের ছবিতে দেখা যায়, এরদোগানের স্টাফরা তাকে প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলতে বলেন। এরপর তাকে রেলিং থেকে নিরাপদে নামিয়ে আনা হয়।
লোকটি পারিবারিক সমস্যার কারণে হতাশায় ভুগছিলেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম দোগান নিউজ এজেন্সি।
টেলিভিশনের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় প্রেসিডেন্টের স্টাফরা তাকে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট আপনার সাথে কথা বলতে চান। এতে প্রথমে তিনি কিছুটা বিভ্রান্ত হলেও পরে গাড়িতে বসা প্রেসিডেন্টকে দেখে নীচে নেমে আসেন।
জানা যায়, প্রেসিডেন্টের সাথে কথা বলে লোকটি বাড়ি ফিরে যায়। প্রেসিডেন্ট এ সময় তাকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে খবরে প্রকাশ।

স্পেনে অভিবাসীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় নগরীতে শুক্রবার এক আফ্রিকান অভিবাসীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। গিনি-বিসাউ থেকে আগত ওই ব্যক্তিকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়। স্থানীয় কর্মকর্তারা একথা জানান।
আলমেরিয়া প্রদেশের রোকিতাস ডেল মার নগরীর কাউন্সিলর মানোলো গ্রাসিয়া জানান, ৪১ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে হত্যা করায় নগরীতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভটি পরে কোরতিজোস ডি ম্যারিন এলাকায় সহিংসতায় রূপ নেয়। এই এলাকায় শ্রমিক শ্রেণীর লোক বাস করে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র।
তিনি রেডিও নিউজ ক্যাডেনা সেরকে বলেন, ‘রাস্তার ডাস্টবিন ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে এবং জানালার কাঁচ ভাঙ্গচুর করা হয়েছে।’
স্থানীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, শুক্রবার ভোরে পুলিশ রোকুয়েতাস ডের মারের রাস্তায় ওই ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে।
সড়ক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিবাদের জের ধরে ওই ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে বলে পুলিশ ধারণা করছে।
আলমেরিয়ায় জাতীয় সরকারের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডেপুটি অ্যাড্রেস গার্সিয়া লোপেজ ক্যাডেনা সেরকে জানান, বিক্ষোভে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন অংশ নেয়। তবে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে সেখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।’

মিয়ানমারে ভূমিধস : অর্ধশত নিহতের আশঙ্কা

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের জেড খনি এলাকায় ভয়াবহ ভূমিধস হয়েছে। এতে কমপক্ষে অর্ধশত নিহতের আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেলে কাচিন রাজ্যের পাকান্তে এ ঘটনা ঘটে। ডেইলি মেইল ও ডয়চে ভেলে এ খবর জানিয়েছে।
গত নভেম্বরে এই অঞ্চলে একই ধরণের একটি ঘটনা ঘটে। এতে শতাধিক নিহত হন। একই ধরণের আরো কয়েকটি ঘটনায় বছরজুড়ে দেশটিতে অনেকে নিহত হয়েছেন।
পাকান্তের প্রশাসনিক এক কর্মকর্তা নিলার মিন্ত এএফপিকে জানান, 'উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার কাজ শুরু করেছে। আমরা মৃতদেহের জন্য অনুসন্ধান চালাচ্ছি। পাঁচজনের মৃতদেহের সন্ধান পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রায় ৫০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তবে কতজন নিহত হয়েছেন এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছি না।'

বিচারকদের পক্ষপাতহীন হয়ে বিচার করতে হবে -রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ বলেছেন, মানুষের শেষ ভরসার স্থল বিচার বিভাগ। তাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য বিচারকদের পক্ষপাতহীন হয়ে বিচার করতে হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা মোকাদ্দমার যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করা উচিৎ। জনগণের প্রত্যাশা বিচার বিভাগের কাছে বেশি। তাই বিচার কাজের মাধ্যেমে বিচারককে জনগণের সে প্রত্যাশা সমুন্নত রাখতে হবে। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার প্রাপ্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু নানা কারণে আমাদের জনগণ সে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকে।
আজ শনিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলন-২০১৫ এর উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন- প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহা। অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন- অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম, প্রশাসনিক আপিল ট্রাইবুনালের সদস্য সিনিয়র জেলা জজ মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদার।
দিনব্যাপী এ সম্মেলনে সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিবৃন্দ এবং দেশের সকল অধস্তন আদালতের সব পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন।
সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিচার বিভাগ শাসন বিভাগের অপরিহার্য কাঠামো। বিচারকার্যের মাধ্যমে বিচার বিভাগ গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিচ্ছে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের দুটি বড় সমস্যা হচ্ছে বিলম্বে বিচার ও মামলা জট। আমাদের এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। জাস্টিস ডিলেট, জাস্টিস ডিনাইড -আমরা চাই না এ নীতি বাক্য আমাদের বিচার ব্যবস্থায় প্রচলিত থাকুক। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণে শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা ভূমিকা রাখে।
অনুষ্ঠানে ২০০৫ সালে ১৪ নভেম্বর বোমা হামলায় নিহত ঝালকাঠি জেলা জজ ও দায়রা আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ জগন্নাথ পাঁড়ে এবং মো. সোহেল আহমেদের পরিবারকে সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে অনুদান দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ওই দুই বিচারকের স্ত্রীর হাতে দুই লাখ টাকার পারিবারিক সঞ্চয়পত্র তুলে দেন।

অসংগতি রেখেই নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন! by আলী ইমাম মজুমদার

নতুন বেতন স্কেল-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। জেনে ভালো লাগে, সরকারি কর্মচারীরা অধিকতর উচ্চ বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পেতে যাচ্ছেন। এতে রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়বে। তবে কাজের গতিও বাড়ার কথা। ভালোভাবে জীবনধারণের নিশ্চয়তা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের দায়িত্বের প্রতি অখণ্ড মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করবে। তাই স্বাগত জানাতে হয়।
তবে এটাও জানা যায়, কিছু স্পর্শকাতর বিষয় অমীমাংসিত রয়ে গেল। সেগুলো মাথাচাড়া দিয়ে এ বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছাকে ম্লান করে দেয় কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড থাকবে না। এ বিষয়ে বিতর্ক রয়েছে প্রবল। চাকরির সূচনা স্তরে ক্যাডার পদের চেয়ে নন-ক্যাডারধারীদের একধাপ নিচে বেতন নির্ধারণের ব্যবস্থা হচ্ছে। নন-ক্যাডার পদে বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদসহ অনেক মেধাবী কর্মকর্তা আছেন। এ ধরনের সিদ্ধান্তের আবশ্যকতা ও এর প্রভাব ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছিল কি না, তা বোধগম্য নয়।
আরেকটি সিদ্ধান্ত হয়েছে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নিয়ে। তা হলো এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের নতুন স্কেল নির্ধারিত হবে। বিষয়টি আসে জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদন থেকে; যাতে প্রস্তাব করা হয়েছে, সব স্কুল-কলেজছাত্র বেতন থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন স্কেলে বেতন দেওয়া হবে। যুক্তি হচ্ছে, যেহেতু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকার শতভাগ বেতন দেয়, তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয় সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকলে প্রস্তাবটিকে যৌক্তিকই মনে হবে। কমিশনের এ প্রতিবেদন যৌক্তিক মনে করলে এত দিনেও তা পর্যালোচনা করা হয়নি কেন, তা বোধগম্য নয়। এ বেতন স্কেল কার্যকর করতে অনেক সময় নেওয়া হয়েছে। এরপরও বিষয়টি অমীমাংসিত রাখা যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। উল্লেখ্য, ২০০৫ ও ২০০৯ বেতন স্কেল ঘোষণার সময়ই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন চূড়ান্ত হয়ে যায়।
এখন হয়তো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয় পর্যালোচনা করে এবং আয়ের অর্থ সরকারি কোষাগারে দেওয়ার পথ বের করতে সরকার একটি কমিটি গঠন করবে। এই কমিটির সুপারিশ কার্যকর হওয়ার পর শিক্ষকেরা নতুন প্রস্তাবিত কাঠামোতে বেতন পাবেন। এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মচারীদের ‘শতভাগ’ বেতন-ভাতা সরকার দেয়, এটা বহুল প্রচলিত একটি কথা। সুতরাং তাঁরা সরকারি কর্মচারীদের মতোই আর্থিক অবস্থানে আছেন—এমনটাও অনেকে ধারণা করেন। কিন্তু অনেকেই জানেন না, সেই বেতন হলো স্কেলের সূচনা স্তরে। আর সারা জীবনে একটি বেতন বৃদ্ধি পান চাকরির আট বছর পূর্তির পর। বাড়িভাড়া, স্কুল-কলেজ আর অধ্যক্ষ থেকে সহকারী শিক্ষক—সবার জন্য মাসে পাঁচ শ টাকা। আর চিকিৎসা ভাতা তিন শ টাকা। শিক্ষকেরা উৎসব ভাতা পান মূল বেতনের ২৫ শতাংশ আর কর্মচারীরা ৫০ শতাংশ। অবশ্য বছরে দুবার। এগুলো আগের স্কেলেও সরকারি দপ্তরের সর্বনিম্ন স্তরের একজন কর্মচারীর বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও ক্ষেত্রবিশেষে উৎসব ভাতার চেয়েও কম। জাতির ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগরদের আমরা এ অবস্থায় রেখে কীভাবে মানসম্মত শিক্ষার চিন্তা করছি?
কেন জানি এমনটা মনে হচ্ছে, সরকারের ভেতরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে নেই সুস্পষ্ট ধারণা। কিছুদিন আগে হঠাৎ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বেতনের ওপর ভ্যাট চাপল। আবার প্রবল দাবির মুখে তা উঠেও গেল। এসব প্রতিষ্ঠানের দোষত্রুটি নেই, এমন নয়। তবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা সরকার নিশ্চয়ই উপলব্ধি করে। আর সে জন্যই তো এমপিওর মাধ্যমে তাদের কিছুটা বেতন-ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে।
বেসরকারি স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন বেতন স্কেল দেওয়া যে যুক্তিতে আটকে রাখা হচ্ছে, সেই বাস্তবতা তো আগেও ছিল। এ কারণে আগেরবারের বেতন স্কেল আটকে রাখা হয়েছিল, এমন তো নয়। এবার এটা করতে গিয়ে সরকার অকারণ সমালোচনার সম্মুখীন হবে। উল্লেখ্য, বেসরকারি পর্যায়ে স্কুল ও কলেজের সংখ্যা সরকারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি। আর মাদ্রাসারও একই অবস্থা। এই প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক ও ক্ষেত্রবিশেষে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার অবকাঠামো নির্মাণ বা সম্প্রসারণে সহায়তা দিয়েছে এবং দিচ্ছে। ছাত্র বেতন থেকে তাদের কিছু আয় হয় বটে। তবে এটা গুটি কয়েক নামীদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অন্যগুলোকে একই বিবেচনায় নিলে চলবে না। সিংহভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরই ছাত্র বেতন থেকে আয় যথেষ্ট কম। আর সেই আয় থেকে ক্ষেত্রবিশেষে শিক্ষকদের কিছু টাকাও দেওয়া হয় বাড়িভাড়া ও ভাতা হিসেবে। এটাকে অনৈতিক বলবেন? আর অনেক প্রতিষ্ঠান তাও দিতে পারে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত চাহিদার তুলনায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা কম। সেখানে স্থানীয় পরিচালনা কমিটি দু-চারজনকে নিয়োগ দিয়ে প্রতিষ্ঠানের তহবিলের টাকায় বেতনও দেয়। এটাকেও কি অনৈতিক বলবেন?
এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের আসবাব ক্রয় ও মেরামত, কাগজ-কলম, খাতাপত্র, বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবস্থা করতেও টাকা লাগে। সরকারি স্কুল-কলেজে যেখানে প্রায় বিনা বেতনে পড়ার ব্যবস্থা, সেখানে মফস্বলের বেসরকারি স্কুল-কলেজ, ছাত্র বেতন কতই বা ধরতে পারে? আর অভিভাবকদের সামর্থ্য তো বিবেচনায় নিতে হয়। এটা সত্য, ঢাকা ও এর বাইরের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অতি মাত্রায় সচ্ছল। তাদের তো এমপিও দরকারই হওয়ার কথা নয়। অবশ্য কেউ কেউ এটা ছেড়েও দিয়েছে। অবশিষ্টগুলোর অধিকাংশই কিন্তু নাজুক আর্থিক অবস্থায় আছে। ছাত্র বেতন থেকে তেমন কিছু আসে না।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। কোথাও খেলার মাঠে বসানো হয় গরুর হাট বা পাইকারি সবজি বাজার। আবার ক্ষেত্রবিশেষে যাত্রাপালার ব্যবস্থা। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন মূল্যবান বৃক্ষ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি হয়ে যায়। কোথাও বা প্রতিষ্ঠানের জমির অংশবিশেষে দোকানপাটও করতে দেওয়া হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান খণ্ডকালীন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবেও ভাড়া দেওয়া হয়। দূরে যেতে হবে না, খোদ রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে বিশাল এলাকা নিয়ে থাকা বেসরকারি স্কুলটি গাড়ির হাটসহ অন্য প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দেওয়া হয়। এটা কোন নিয়মে আর টাকা যায় কোথায়? এই কাজগুলোতে শিক্ষকদের ভূমিকা থাকলেও খুব কম। কমিটি কিংবা স্থানীয় কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি এরূপ করে থাকেন। যাঁরা বাধা দিতে পারেন বা দেখার কথা, তাঁরা দেখেও না দেখার ভান করেন। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কমিটিও কিছু ক্ষেত্রে এমনভাবে সম্পদের অপচয় ঘটাচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের জমিজমা বা সম্পদাদি নিয়েও কিন্তু এরূপ কিছু ঘটে চলেছে। এই আলোচনাগুলো প্রসঙ্গবহির্ভূত মনে হতে পারে। তবে বেসরকারি স্কুল-কলেজশিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রশ্নে সরকারের নীতি পর্যালোচনা করতে প্রয়োজনীয় বটে।
বেসরকারি স্কুল-কলেজের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নতুন বেতন স্কেল দেওয়া যে যুক্তিতে আটকে রাখা হচ্ছে, সেই বাস্তবতা তো আগেও ছিল। এ কারণে আগেরবারের বেতন স্কেল আটকে রাখা হয়েছিল, এমন তো নয়। এবার এটা করতে গিয়ে সরকার অকারণ সমালোচনার সম্মুখীন হবে। তাদের ‘শতভাগ’ বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা হলে আক্ষরিক অর্থেই শতভাগ দিন। আর তা দেবেন সরকারি কর্মচারীদের মতো একই নিয়মে ও হারে। আর প্রতিষ্ঠান পরিচালনার খরচাদি বাদে বাকি আয় সরকারি কোষাগারে নিয়ে আসুন। এতে শিক্ষকেরা উৎসাহী হয়ে সহায়তাই করবেন। শতভাগের নামে শুভংকরের ফাঁকি চলতে থাকলে তাঁদের নিজস্ব আয়ের উৎসটি নিয়ে টানাহেঁচড়া না করাই ভালো। বরং নিরপেক্ষ শক্তিশালী অডিটের মাধ্যমে প্রকৃত অনিয়ম ও তার দায়দায়িত্ব নির্ধারণ এবং আইনি প্রক্রিয়া নেওয়া যেতে পারে।
বেতন স্কেলটি চালুর মুহূর্তে ভয় হচ্ছে সরকারের এই উদারতা থেকে যাঁরা অন্যায্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তাঁদের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কথা ভেবে। আমরা তো হরিষে বিষাদ চাই না।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

মিয়ানমারে খনি ধসে অর্ধশতাধিক নিহত

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে স্বর্ণ ও জেড খনিতে ভূমিধসে অর্ধশতাধিক নিহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এদের মধ্যে পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিখোঁজ রয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। শনিবার কাচিন রাজ্যের একটি সোনা ও জেড খনিতে এ ধসের ঘটনা ঘটে। হপাকান্ত শহরের প্রশাসক তিন্ত সুই মাইন্ট বলেছেন, নিহতরা মাটির নিচে চাপা পড়েছেন।
নিখোঁজদের খোঁজে কাজ করছে উদ্ধারকারী বাহিনী। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এখনও অর্ধশতাধিক নিখোঁজ রয়েছেন। এর আগে গত নভেম্বরে একই এলাকায় একটি মূলবান পাথরের খনিতে ভূমিধসে অন্তত ১১৫ জনের মৃত্যু হয়। দেশটির কাচিন প্রদেশে এ ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। বিবিসি জানায়, কাচিন প্রদেশের খনিগুলোতে বিশ্বের সবচেয়ে সেরা জেড রত্ন পাথর পাওয়া যায়। তবে এসব খনিতে প্রায়শই ভূমিধসের ঘটনা ঘটে থাকে।

বাংলাদেশের তড়িঘড়ি যোগদান কেন? by এ কে এম জাকারিয়া

সৌদি আরব গত মঙ্গলবার (১৫ ডিসেম্বর) মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি ‘সামরিক জোট’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ থেকে ‘যৌথ অপারেশন সেন্টারের’ মাধ্যমে এই জোটের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলা হয়েছে, ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে’ লড়াই করবে এই জোট। জোটের ৩৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। আছে লিবিয়াও। তবে বাদ পড়েছে তিনটি দেশ—ইরাক, ইরান ও সিরিয়া। শিয়া-সুন্নি বিষয়টি বিবেচনায় নিলে পরিষ্কারভাবেই এটা একটি ‘সুন্নি’ জোট। আর জোটের লক্ষ্য হিসেবে সাধারণভাবে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে’ লড়াই বা এটা ‘শুধু ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকবে না’ বলা হলেও এর শুরুটা আসলে আইএসবিরোধী লড়াই না হয়ে উপায় নেই। সংগঠন হিসেবে আইএস সুন্নিপন্থী ও শিয়াবিরোধী হিসেবে বিবেচিত। বিশ্ব কি তবে সামনের দিনগুলোতে সুন্নি সামরিক জোট ও সুন্নি আইএসের মধ্যে লড়াই দেখতে যাচ্ছে? যদিও এই ‘সামরিক’ জোট কীভাবে তাদের কাজ চালাবে বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
এমন একটি জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ খুব স্বাভাবিক কারণেই আমাদের জন্য আগ্রহ ও কৌতূহলের বিষয়। এ ধরনের জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের বিপদ বাড়বে কি না বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হুমকির মুখে পড়বে কি না, সেটা এক বাস্তব প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে এমনই একটি প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিকেরা। তিনি বলেছেন, সৌদি জোটে যোগ দেওয়ার কারণে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকির আশঙ্কা সৃষ্টি হবে না। তিনি বলেছেন, ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’ (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫)
সাধারণ যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে এটা আমরা বুঝতে পারি যে আইএস বা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনো দেশ যখন কোনো জোটভুক্ত হবে, তখন সেই দেশগুলো জঙ্গিদের বাড়তি টার্গেটে পরিণত হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হুমকির আশঙ্কার মধ্যে পড়বে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে তাই যৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। তবে এই জোটে যোগ না দিলে বা যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে নিরাপদ ছিল, বিষয়টি এমনও নয়। প্রশ্নটি হচ্ছে, এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শক্তি বা সক্ষমতা আমাদের আছে কি না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘অনেক দেশই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা বা তাদের মোকাবিলা করতে পারেনি, কিন্তু আমরা পেরেছি।’
সৌদি আরবের উদ্যোগে এ ধরনের একটি জোট গঠনে যে পশ্চিমা দেশগুলোর সায় রয়েছে, তা পরিষ্কার। এই জোট গঠনকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের মাত্রাটি বিবেচনায় নিলে এটা ধরে নেওয়া যায় যে পশ্চিমাদের বুদ্ধি-পরামর্শ ছাড়া সৌদি আরব এ কাজ করেনি। আগেই বলেছি, মুসলিম দেশগুলোর এই সামরিক জোট কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সৌদি আরবের ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহামেদ বিন সালমান এই জোটের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে এই জোট অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সঙ্গে কীভাবে কাজ করবে, তা সামনে ঠিক করা হবে।
সৌদি নেতৃত্বের এই জোটের অন্য শক্তিধর মুসলিম দেশগুলো হচ্ছে মিসর ও ন্যাটো জোটভুক্ত একমাত্র মুসলিম দেশ তুরস্ক। আইএসের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত। তুরস্ক আইএসের কাছ থেকে কম দামে তেল কেনে, কুর্দি বিদ্রোহীদের দমনে তাদের কাজে লাগায় এবং নানাভাবে সহযোগিতা করে—এসব অভিযোগের জোরালো ভিত্তির কথা বিভিন্ন মহল থেকে স্বীকৃত। এই জোটে তুরস্কের অংশগ্রহণ তাই এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। অন্যদিকে আইএস ইরাকের তিন ভাগের এক ভাগ ভূখণ্ড দখল করে রয়েছে অথচ জোটে রাখা হয়নি ইরাককে। অনেক সমালোচকই বলতে শুরু করেছেন যে সৌদি নেতৃত্বাধীন এই ‘সুন্নি জোটের’ মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-নিয়ন্ত্রিত ইরানের প্রভাবকে চাপের মধ্যে রাখা। সন্ত্রাস দমন বা সুন্নিপন্থী আইএসের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি জোট গঠনের কথা বলা হলেও এ ধরনের একটি জোট কার্যত মুসলিম দুনিয়ায় শিয়া-সুন্নি বিরোধকে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে।
তুরস্কের ইংরেজি ভাষার দৈনিক টুডে’জ জামান–এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের প্রবীণ রাজনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক লোঘুঘলু বলেছেন, এই জোটে তুরস্কের যোগদান এ অঞ্চলে গোষ্ঠিগত সহিংসতাকে বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, এই জোট সুন্নিপ্রাধান দেশ বা সুন্নি শাসকদের দ্বারা শাসিত দেশগুলোর জোট, এই জোট আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যকর কিছু হবে না।
সৌদি উদ্যোগ প্রথমেই হোঁচট খেয়েছিল পাকিস্তানের বক্তব্যে। সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৪টি মুসলিম দেশের জোট ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তান বলেছে যে এ ধরনের একটি জোটের ব্যাপারে তারা কিছু জানে না। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পাকিস্তানি পত্রিকা দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে (ডিসেম্বর ১৬) বলেছেন, ‘আমরা গণমাধ্যমের খবরে বিষয়টি দেখেছি। আমরা সৌদি আরবে আমাদের দূতাবাসকে বিস্তারিত জানতে বলেছি।’ তিনি বলেছেন, সৌদি ঘোষণা ছিল পাকিস্তানের কাছে অপ্রত্যাশিত। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন তথ্যই পেয়েছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে বলেছে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই কেন্দ্রে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন (১৬ ডিসেম্বর, ২০১৫) বলছে, এই আলোচনার পর সৌদি আরব ই-মেইল করে বাংলাদেশকে প্রস্তাবটি পাঠিয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কি তবে সৌদি আরব ভিন্ন আচরণ করেছে?
দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে পাকিস্তান সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, নীতিগতভাবে পাকিস্তান কখনো জাতিসংঘের সমর্থনের বাইরে কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। যে কারণে ইয়েমেনে সৌদি অভিযানের সময় পাকিস্তান এতে যোগ দেয়নি। তিনি বলেছেন, নতুন কোয়ালিশনে যোগ দিলেও পাকিস্তান কখনো বিদেশের মাটিতে তাদের সৈন্য পাঠাবে না। এই পাকিস্তানি কর্মকর্তা অবশ্য তাঁর নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। মুসলিম দেশগুলোর সামরিক জোটে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে বিভ্রান্তি ও রাখঢাকের এক দিন পর অবশ্য পাকিস্তান নিশ্চিত করেছে যে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’ তারা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে। বোঝা যায়, সৌদি কোনো উদ্যেগকে চূড়ান্ত বিচারে না করা পাকিস্তান তো বটেই, যেকোনো মুসলিম দেশের জন্যই কঠিন। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক ঘোষণায় বলেছে, কীভাবে পাকিস্তান এতে অংশ নেবে, তা নির্ভর করবে রিয়াদ কীভাবে এই জোটের গঠনকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সে ব্যাপারে তথ্য পাওয়ার পর। (ডন, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫)।
পাকিস্তানের এই অবস্থান ও প্রতিক্রিয়ায় বোঝা গেল যে এ ধরনের একটি জোটে অংশগ্রহণ নিয়ে দেশটির অন্তত আগ-পিছ বিবেচনার একটি ব্যাপার রয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশ নিয়ে গঠিত এই সামরিক জোটে না থাকার কথা বলেছে সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। সৌদি ঘোষাণায় দেশটির নাম থাকলেও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, এই জোটের ব্যাপারে তাঁরা বিস্তারিত কিছু জানেন না এবং সে কারণে তাঁরা জোটে নেই। (জাকার্তা পোস্ট, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৫)। ইন্দোনেশিয়া বলেছে, নীতিগতভাবে দেশটি জাতিসংঘের বাইরে অন্য কিছুর অধীনে কোনো সামরিক মিশনে যোগ দেয় না।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই বাইরে থাকতে পারবে না, কিন্তু এর আগ-পিছ বিবেচনা করে দেখা বা কিছু প্রশ্নের উত্তর খুবই জরুরি। শুরুতেই যেটা জানা প্রয়োজন তা হচ্ছে, এটা যেহেতু একটি ‘সামরিক জোট’, তাই সদস্যদেশগুলোকে কি দরকার পড়লে ইরাক বা সিরিয়ার মতো দেশে বা আইএস-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে হবে? জোটের সদস্যদেশ হিসেবে বাংলাদেশের এটা জানা জরুরি যে কোন ধরনের সামরিক ভূমিকা দেশটিকে পালন করতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন ও মেইল করে ‘প্রস্তাব’ পাঠানোর পরই বাংলাদেশ রাজি হয়ে গেল! একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তা খুবই তড়িঘড়ি হয়ে গেল না? বাংলাদেশ সরকার যতই বলুক কোনো সামরিক জোট নয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি কেন্দ্রে যুক্ত হয়েছে মাত্র—কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সৌদি ঘোষণায় একে পরিষ্কারভাবেই একটি ‘সামরিক জোট’ বলা হয়েছে। এই জোট ঘোষণার দুই দিন পরই আইএসের তরফে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে এবং তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে।
ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া সংবিধানের পরিপন্থী। তিনি বলেছেন, এটা সংবিধানের ২৫ ধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। (প্রথম আলো, ২০ ডিসেম্বর ২০১৫) কী বলছে আমাদের সংবিধানের ২৫ ধারা? ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা—এই সকল নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র (ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা করিবেন; (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সংগত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।’ ফজলে হোসেন বাদশা তাঁর ব্যাখ্যায় বলেছেন, সংবিধানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতির কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বা অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি আমাদের নেই।
সরকারের শরিক দলের এই ভিন্ন অবস্থানকে ব্যাখ্যার দায়টি সরকার নেবে কি?
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

সীমান্ত হত্যা বন্ধ হোক

বাংলাদেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য ও গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরের মধ্যে এ বছর সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে নিহত হয়েছে। এ বছর বিএসএফের হাতে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা ৪৫, যা গত বছর ছিল ৩৩। দুই দেশের সরকারপ্রধানদের মধ্যে সীমান্তে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে আলোচনা হয়েছে, এমনকি ভারত এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। কিন্তু সে প্রতিশ্রুতি যে তারা কার্যকর করেনি বা আমরা তা কার্যকর করতে পারেনি, তা এ বছরের হত্যাকাণ্ডে দৃশ্যমান হয়েছে।
একমাত্র কুড়িগ্রাম সীমান্তে নিহত বাংলাদেশি ফেলানী খাতুন হত্যার বিচারকাজ আন্তর্জাতিক চাপের কারণে বিএসএফের নিজস্ব আদালতে গড়ায়। তবে আদালত অভিযুক্ত বিএসএফ হাবিলদার অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। আর এ ধরনের বিচারহীনতা থেকেই সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা নিহতের সংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। দুই দেশের মধ্যে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের গ্রেপ্তার ও হস্তান্তরের সমঝোতা ও চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ভারত সেটি লঙ্ঘন করে সীমান্তে বাংলাদেশিদের গুলি করছে। দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে হলে ভারতকে সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে হবে। আর উপর্যুক্ত চুক্তিটি কার্যকর করতে বাংলাদেশ সরকারকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।

সম্প্রীতির বন্ধন সুদৃঢ় হোক

শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়ে সারা বিশ্বের খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ব্যক্তিরা আজ এক মহিমান্বিত ধর্মীয় উৎসবে যোগ দিচ্ছেন। তবে এর কল্যাণময় আনন্দ সর্বজনীন। সব জাতি ও ধর্মাবলম্বী এটি ভাগাভাগি করে নেবে। ভ্রাতৃত্ব, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও উদারতার মতো অমোঘ শান্তির বাণী যিশুর মহান শিক্ষা। হিংসা-দ্বেষ পরিহার করে উন্নততর মানবিক সম্পর্ক ও সুসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তোলার আহ্বান নিয়ে আবার এসেছে বড়দিন। বাংলাদেশেও বড়দিন উদ্যাপনের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কারণ, ধর্মবর্ণ–নির্বিশেষে সবার কাছেই যিশুখ্রিষ্ট মহামানব হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার পাত্র। বাংলাদেশের উন্নয়ন- অগ্রগতিতে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। বিশেষভাবে সেবাধর্মী কাজে তারা মানবিকতার উজ্জ্বল স্বাক্ষর বজায় রেখে চলেছেন। তবে এবারে বড়দিনের প্রাক্কালে বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে। কয়েকজন যাজককে হুমকিও দেওয়া হয়েছে; যা খুবই উদ্বেগজনক। সরকারের কর্তব্য হবে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় যাতে আনন্দময় ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বড়দিনটি উদ্যাপন করতে পারে,
সে জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে তাঁদের ওপর হামলা ও হুমকি প্রদানকারীদের খুঁজে বের করে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সংযম-সহিষ্ণুতা, ভালোবাসা ও সেবার পথ ধরে মানুষকে সত্য ও কল্যাণের পথে আনার প্রয়াসে যিশুকে অবর্ণনীয় নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল। কিন্তু সত্য ও কল্যাণের পথ থেকে কোনো কিছুই তাঁকে বিচ্যুত করতে পারেনি। নিপীড়কের বিরুদ্ধে তিনি পাল্টা আঘাতের কথা বলেননি; তিনি অকাতরে ক্ষমা করেছেন, আর সমগ্র মানবজাতির হয়ে সব দুঃখ-যন্ত্রণা যেন একাই আত্মস্থ করতে চেয়েছেন। আজ সবকিছু ছাপিয়ে সর্বত্র এই অঙ্গীকারই ফুটে উঠুক—আর বিভেদ নয়, সম্প্রীতির বন্ধনে আমরা পরস্পরকে বেঁধে রাখব। সেবাধর্মে নিজেকে উৎসর্গ করব। আর সেটা সম্ভব হলে এই ভূখণ্ডে যিশুর শিক্ষা সত্যিকার মহিমায় উদ্ভাসিত হবে। আমরা আমাদের ভ্রাতৃপ্রতিম খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের অকৃত্রিম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাই।

গণতান্ত্রিক উত্তরণের ২৫ বছর by রওনক জাহান

গণতান্ত্রিক উত্তরণ: ১৯৯০–৯১
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যখন সামরিক শাসক এরশাদের পতন হলো, তখন বাংলাদেশ ‘তৃতীয় পর্যায়ের’ গণতন্ত্রে প্রবেশ করে—এই ‘তৃতীয় পর্যায়’ শব্দবন্ধটি বেশ জনপ্রিয় ছিল। বিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন গণতান্ত্রিক দেশের ঐতিহাসিক বিবর্তনকে এভাবে তিন পর্যায়ে ভাগ করেছিলেন। তৃতীয় পর্যায়ের এই নতুন ধাঁচের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাও মসৃণ হয়নি। গণতন্ত্র সংহতকরণ তো করতে পারেইনি, বরং বাংলাদেশ গণতন্ত্রের মৌলিক ভিতগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ প্রায় প্রায়ই গণতান্ত্রিক পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে এবং তখন আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো দেশটিকে গণতান্ত্রিক বলে চিহ্নিত করতে সম্মত হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সংগঠন ও বৈশ্বিক জরিপগুলো যখন আমাদের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করে, তখন আমাদের অনেকেই উল্টো এই সমালোচকদের দেশের গণতন্ত্রের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু আমি মনে করি, সমালোচকদের যুক্তির বিরোধিতা না করে এবং অন্যান্য দেশের গণতন্ত্রের ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন না তুলে আমাদের প্রথমে এটা মূল্যায়ন করা উচিত, ১৯৯০ সালে আমরা নিজেরাই যে মানদণ্ড নির্ধারণ করেছিলাম, সেটা আমরা বজায় রাখতে পারছি কি না। ১৯৯০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক জোট সামরিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে। এই তিনটি জোটের একটির নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ, আরেকটির নেতৃত্বে ছিল বিএনপি ও তৃতীয়টির নেতৃত্বে ছিল বামপন্থী দলগুলো। আমাদের প্রথমেই মূল্যায়ন করতে হবে, ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখায় সই করে আমাদের রাজনীতিকেরা জাতির কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেটা তাঁরা কতটা রেখেছেন।
১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক নেতারা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের প্রতি অঙ্গীকার করেছিলেন। প্রথমত, তাঁরা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেছিলেন, যার মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধিরা দেশ শাসন করার ম্যান্ডেট লাভ করবেন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা সার্বভৌম সংসদ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যার কাছে নির্বাহী বিভাগ জবাবদিহি করবে। তৃতীয়ত, তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, জনগণের মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য আইনের শাসন বজায় রাখা হবে। আর শেষমেশ, তাঁরা গণতান্ত্রিক বিধান ও মূল্যবোধ অনুসারে নিজেদের কাজকর্ম পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বিশেষ করে একে অপরের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
ফলে আজ ২৫ বছর পর এই প্রশ্ন তোলা প্রাসঙ্গিক, যে নেতারা এই রূপরেখায় সই করেছিলেন, তাঁরা সেটা কতটা পরিপালন করেছেন? ১৯৯১ সাল থেকে এক জোটের নেত্রী খালেদা জিয়া ও অন্য জোটের নেত্রী শেখ হাসিনা পালাবদল করে কয়েকবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা কি নিজেদের প্রতিশ্রুতি রেখেছেন?
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন
১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখায় বলা হয়েছিল, যেহেতু সামরিক শাসকেরা নির্বাচনী ব্যবস্থায় অনেক অগণতান্ত্রিক নিয়মকানুনকে চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছে এবং সরকার সব সময়ই নির্বাচনী ফলাফল নিজের পক্ষে নিয়ে যেতে সচেষ্ট, তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অধিকতর যথাযথ ব্যবস্থা। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচন এই নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম সবচেয়ে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এই নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার গঠন করে। কিন্তু আক্ষেপ করার বিষয় হচ্ছে, বিএনপি তিন জোটের রূপরেখায় প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়ে পরবর্তী নির্বাচন নিজের অধীনেই করার সিদ্ধান্ত নেয়। মিরপুর ও মাগুরার ত্রুটিপূর্ণ উপনির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী জোট নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য ১৯৯৪ সাল থেকে গণ-আন্দোলন শুরু করে। এরপর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এক সংবিধান সংশোধনীর মধ্য দিয়ে এই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
তারপর তিনটি সংসদ নির্বাচন হয়েছে, প্রথমটি হয়েছে ১৯৯৬ সালের জুন মাসে, দ্বিতীয়টি হয়েছে ২০০১ সালের অক্টোবর মাসে আর তৃতীয়টি হয়েছে ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একরকম শান্তিপূর্ণভাবেই ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীন দল প্রতিবারই ব্যতিক্রমহীনভাবে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু এ রকম স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতার ব্যাটন এক দলের হাত থেকে আরেক দলের হাতে গেলেও দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারেনি। প্রতিটি নির্বাচনের পর পরাজিত দল নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে, কিন্তু পরবর্তীকালে তা গ্রহণ করে সংসদে বসেছে। তা ছাড়া, প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে প্রভাবিত করে সুবিধা নিতে চেয়েছে। আর শেষমেশ আওয়ামী লীগ সরকার নিজের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ২০১১ সালে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। ব্যাপারটা বৈপরীত্যমূলক, কারণ আওয়ামী লীগ ১৯৯৪-৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য দুই বছরব্যাপী গণ-আন্দোলন করেছে।
২০১১ সাল থেকেই এই দুই প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা নিয়ে ঐকমত্যে আসতে পারছে না। আমরা ২০১৪ সালে একটি একপক্ষীয় সংসদ নির্বাচন দেখলাম, যেখানে অধিকাংশ সাংসদই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হয়েছেন। একই সঙ্গে আমরা ‘গণতন্ত্র রক্ষার’ নামে বিরোধী দলের আন্দোলনের ফলে নজিরবিহীন সহিংসতাও দেখলাম। যদিও আওয়ামী লীগ ও বিরোধী জোট—এই দুই রাজনৈতিক শক্তি গণতান্ত্রিক উত্তরণকে মসৃণ করার জন্য ১৯৯০ সালের তিন জোটের রূপরেখায় সই করেছিল, কিন্তু এখন তারা এক অনমনীয় ও আপসহীন মনোভাব অর্থাৎ ‘হয় আমার কথা শোনো, নাহয় গোল্লায় যাও’—এমন অবস্থান নিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কী উপায়ে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ল।
সার্বভৌম সংসদ
যেহেতু তিন জোট সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের ব্যাপারে একমত হতে পারেনি, তাই তারা একটি ‘সার্বভৌম’ সংসদের ব্যাপারে একমত হয়েছিল, যার কাছে সরকার দায়বদ্ধ থাকবে। যদিও পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এক বিরল ঐকমত্যের মধ্য দিয়ে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। আমাদের এখন একটি ‘সার্বভৌম’ সংসদ আছে, কিন্তু এটি কার্যকরভাবে একটি দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে না—১৯৯০ সালের রূপরেখায় আমাদের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল। ১৯৯৪ সাল থেকে বিরোধী দল (যে দলই হোক না কেন) সংসদ বয়কট শুরু করে, সংসদের বদলে তারা রাজপথেই নিজেদের দাবিদাওয়ার কথা বলতে শুরু করে। প্রতিবাদ জানানোর জায়গা হিসেবে রাজপথকেই বেছে নেয় তারা। ফলে সংসদে ক্ষমতাসীন দল ও জোটের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়—সংসদের কার্যকর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই। সরকারের নির্বাহী বিভাগের হাতে সব ক্ষমতা চলে আসে। এর ফলে সব সরকারই সংসদে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা ব্যতীত আইন পাস ও সংবিধান সংশোধন করেছে।
বর্তমান সংসদে একটি বিরোধী দল আছে তা ঠিক, যারা রাস্তায় বিক্ষোভ বা সংসদ বয়কট করে না। কিন্তু এই বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য সরকারের অংশীদার। তাই তাদের ঠিক বিরোধী দল বলে মনে হয় না। এ ছাড়া সরকারকে গভীরভাবে সমালোচনা করা বা নীতিগত বিকল্প পেশ করার মতো সক্ষমতাও তাদের নেই। অর্থাৎ আমাদের রাজনৈতিক নেতারা ‘সার্বভৌম’ সংসদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এমন এক নিষ্ফলা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করেছেন, যেটা কখনোই কার্যকর প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি।
আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা
১৯৯১ সালের পর থেকে সব নির্বাচিত সরকার সবচেয়ে গুরুতর যে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, সেটি হলো তারা কেউই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বিভিন্ন বৈশ্বিক মূল্যায়নে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে খারাপ করেছে। গণমাধ্যমে সব সময়ই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের (যারাই ক্ষমতায় থাকুক না কেন) আইন ভঙ্গের খবর প্রকাশিত হয়েছে, একই সঙ্গে ব্যাপক মাত্রায় তাঁদের দায়মুক্তির খবরও এসেছে। যদিও সংবিধানে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সেই অধিকার লঙ্ঘনের সঠিক প্রতিকার পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যম প্রায়ই নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘনের খবর দিয়েছে, রাষ্ট্র ও অরাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ উভয়ই নাগরিকদের অধিকার হরণ করেছে। নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মতো গোষ্ঠীগুলো সব সময় ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এখনো আমাদের দেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি উঠছে, যাতে বোঝা যায়, কোনো সরকারই এ ব্যাপারে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করেনি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার যে অঙ্গীকার ১৯৯০ সালে রাজনীতিকেরা করেছিলেন, সেটা তাঁরা বাস্তবায়ন করেননি। যদিও বেসরকারি গণমাধ্যমের উত্থান ও তাদের মধ্যে কারও কারও সাহসী ও স্বাধীন ভূমিকার কারণে নাগরিকেরা এখন সামরিক শাসনামলের তুলনায় কিছুটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছেন। গণতন্ত্রের বিভিন্ন মানদণ্ড মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, নাগরিকদের কথা বলার জায়গাটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের উজ্জ্বল ও ইতিবাচক একটি জায়গা। অনেক নেতিবাচক দিকের মধ্যে এটি একটি ইতিবাচক দিক।
আচরণবিধি
অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিন জোটের নেতারা আট দফা আচরণবিধিতে জাতির কাছে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আজ সেটা পুনঃপাঠ করলে দুটি বিষয় আমাদের তৎক্ষণাৎ ধাক্কা দেয়—প্রথমত, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই আচরণবিধি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক, আর দ্বিতীয়ত, আমাদের নেতারা ওই প্রতিশ্রুতি থেকে কতটা দূরে সরে গেছেন।
আট দফা আচরণবিধিতে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে রাজনৈতিক দলগুলো একে অপরের ভিন্নতাগুলো সহ্য ও শ্রদ্ধা করবে, শান্তিপূর্ণভাবে দলের ও প্রচারণা কার্যক্রম চালাতে দেবে, বেসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনীতিকীকরণ করার চেষ্টা করবে না, প্রচারণা কার্যক্রমে অনৈতিক কৌশল ব্যবহার করবে না, যেমন বিরোধী পক্ষের দেশপ্রেম ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন করবে না বা সাম্প্রদায়িক জিকির তুলবে না, নির্বাচনী ব্যয়ের সীমাসহ নির্বাচনী দিকনির্দেশনা মেনে চলবে, আর শেষমেশ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবে।
এখন আমরা জানি যে এই তিন জোটের রূপরেখায় যাঁরা সই করেছিলেন, তাঁরা ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকেই এই আচরণবিধি ভাঙা শুরু করেন। পরবর্তী বছরগুলোতে এই লঙ্ঘনের রূপ ছিল আরও অমার্জিত ও অপছন্দনীয়।
আরেকটি ঐকমত্য?
২০১১ সালের পর থেকে আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নতুন একটি কাঠামো তৈরি করার জন্য প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরেকটি ঐকমত্য হওয়া দরকার কি না, সে বিষয়ে গণপরিসরে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এই প্রয়োজনীয়তা সার্বিকভাবে স্বীকৃত হলেও এটা মোটেও পরিষ্কার নয়, আমরা কখন তেমন একটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারব। ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আপেক্ষিক শক্তির মধ্যে বেশ পার্থক্য সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৯০ সালে দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের ওপর চাপ প্রয়োগ করার মতো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল। বাম দলগুলোর জোট মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ছাত্রসংগঠনগুলো দল ও জোটগুলোর ওপর ঐকমত্যের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। কিন্তু এখন ছাত্রসংগঠনগুলো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সব ছাত্রসংগঠনই এখন মূল দলগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই। বাম দলগুলো শক্তি হারিয়ে ফেলেছে এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে। গত কয়েক বছরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। তারা আর এমন অবস্থায় নেই যে আওয়ামী লীগকে চাপ দিয়ে একটা অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারবে। এই পরিস্থিতিতে স্রেফ আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনা যদি মনে করেন, বিএনপির কিছু দাবি মেনে নিলে তাঁর আলোকিত স্বার্থ সংরক্ষিত হবে, তাহলেই কোনো ঐকমত্য হতে পারে। এ পর্যায়ে তুরুপের তাস তাঁর হাতেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চান? গণতন্ত্রকে টেকসই করার জন্য তিনি কি ১৯৯০ সালের মতো আবার একটি ঐকমত্য প্রচেষ্টার উদ্যোগ নেবেন, যাতে করে সব গণতান্ত্রিক দল আর একবার নতুন করে আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হবে?
রওনক জাহান: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। সম্মানীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ।

গণতান্ত্রিক আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ কেন? by সোহরাব হাসান

স্বৈরাচারের পতনের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১০ ডিসেম্বর (প্রকৃত তারিখ ৬ ডিসেম্বর) প্রথম আলো আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এসেছিলেন নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানের কয়েকজন ছাত্রনেতা। তাঁদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী হলেও সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তাঁরা এক কাতারে ছিলেন। এর সূচনা হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলবাদী ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে চাকসু নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ প্যানেলের জয়ী হওয়ার মধ্য দিয়ে।
এখানে উল্লেখ করা অত্যুক্তি হবে না যে গোটা আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রমৈত্রীসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের সশস্ত্র ঘাঁটি স্থাপন এবং অব্যাহত সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠলেও অন্যান্য জায়গায় সেটি সম্ভব হয়নি। ফলে ছাত্রশিবির যেখানে যাকে প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করেছে, সেখানে তার ওপরই আক্রমণ করেছে। বিএনপির নেতারা স্বীকার করবেন কি না জানি না, তবে পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যাবে, শিবিরের হাতে এককভাবে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীই বেশি খুন হয়েছেন। আবার একইভাবে আট বছরব্যাপী আন্দোলনে স্বৈরাচারী এরশাদের হাতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই বেশি জীবন দিয়েছেন। ১৯৮৮ সালের ২৪ মার্চ চট্টগ্রামে শেখ হাসিনার মিছিলে গুলি চালিয়ে এক দিনে ২৪ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। আজ ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হলো, সেই ইসলামী ছাত্রশিবির ও তার অভিভাবক জামায়াতে ইসলামী বিএনপির দোসর এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সহযোগী।
জাতীয় রাজনীতি অনেক সময় আপসের চোরাগলিতে প্রবেশ করলেও সেদিন ছাত্রসংগঠনগুলো আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুতে যে আওয়ামী-সমর্থক ছাত্রসংগঠনটি একবার ভিপি পদে নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করে, তাও এই ঐক্যের কারণে। সেটাই প্রথম এবং শেষ। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর ইসলামী ছাত্রশিবির ছাড়া আন্দোলনকারী সব কটি ছাত্রসংগঠন মিলে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য গড়ে তোলার পরই এরশাদবিরোধী আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।
সেদিনের গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানকারীদের মধ্যে ছিলেন অসীম কুমার উকিল, নাজমুল হক প্রধান, শামসুজ্জামান দুদু, জহিরউদ্দিন স্বপন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, আবদুল্লাহ আল কাফী রতন, বজলুর রশীদ ও মোশরেফা মিশু। নব্বইয়ের ছাত্রনেতাদের মধ্যে আরও অনেকে ছিলেন। তাঁদের কেউ বিদেশে, কেউ নিষ্ক্রিয়, কেউবা এখন সেই সময়ের রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীতে অবস্থান করছেন। তাই বলে ইতিহাসে তাঁদের যে উজ্জ্বল ভূমিকা, তা অস্বীকার করা যাবে না। একই কথা প্রযোজ্য একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কেও। তাঁরাও এখন বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে গেলেও যদি ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ পরিহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতেন, তাহলে স্বৈরাচার কিংবা রাজাকার—কারও সঙ্গে আপসরফা করার প্রয়োজন হতো না। ৪৪ বছর পর দেশের রাজনীতিও এমন ঘূর্ণিপাকে পড়ত না।
গোলটেবিল বৈঠকে ছাত্রনেতারা যা বলেছিলেন, তার সারকথা হলো, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শাসকের পতন হলেও স্বৈরাচার রাজনীতিতে যে দুষ্টক্ষত রেখে গেছে, সেগুলো মুছে ফেলা যায়নি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা স্বৈরাচারের তৈরি পথেই হাঁটছি। তাঁরা আরও বলেছেন, সেদিন আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী প্রধান দুই দলের একটি স্বৈরাচারকে এবং অপরটি রাজাকারকে পুনর্বাসিত করেছে। ছাত্রনেতারা এও স্বীকার করেছেন যে আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁরা সেদিন আন্দোলন করেছিলেন, তার অনেক কিছুই পূরণ হয়নি।
আলোচনা প্রসঙ্গে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বিষয়টিও আসে। নব্বইয়ের কিংবা তার আগের ছাত্র আন্দোলনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন বিভিন্ন ছাত্র সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, সামরিক স্বৈরাচারের আমলে ডাকসুসহ দেশের ছাত্রসংগঠনগুলোর নির্বাচন হলেও নব্বই-পরবর্তী গণতান্ত্রিক আমলে সেই পথ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত ২৫ বছরে কোথাও কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়নি।
কেন এমনটি ঘটল, গণতান্ত্রিক নেতারা কেন ছাত্র সংসদের নির্বাচন দিতে ভয় পান, সেটি মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন। দখলবাজি-চাঁদাবাজির থেকে বের করে এনে ছাত্ররাজনীতিকে সঠিক ও সুস্থ পথে নিয়ে আসার এটি একটি উপায় হতে পারত। আমাদের নেতা-নেত্রীরা ছাত্রদের জাতির ভবিষ্যৎ বলে প্রচার করতে ভালোবাসেন। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ গড়ার বিষয়টি পুরোপুরি অবজ্ঞা করে চলেছেন।
পাকিস্তান আমলে দেশে গণতন্ত্র ছিল—এ দাবি কেউ করবেন না। বাংলাদেশেও দুই সামরিক শাসনামলে গণতন্ত্র ছিল, সে কথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। তারপরও কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদগুলোতে নির্বাচন হতো। নির্বাচন হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগ ও ছাত্রাবাসগুলোতেও। পাকিস্তান আমলে ছাত্রসংগঠনগুলো নিজেদের নামে নির্বাচন করতে পারত না। তারা নির্বাচন করত অগ্রগামী, যাত্রিক প্রভৃতি নাম দিয়ে। এসব নামের মধ্য দিয়ে সংগঠনের চরিত্রও বোঝা যেত।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে কিংবা তার আগে ও পরের ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র সংসদগুলো অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। ষাটের দশকের শুরুতে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে যে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তারও মূলেও ছিল নির্বাচিত ছাত্র সংসদ। সেখানে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছে। উনসত্তরের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানও ঘটতে পেরেছিল নির্বাচিত ছাত্র সংসদ এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যৌথ নেতৃত্বের কারণে। ছাত্রসমাজের ১১ দফা কর্মসূচি সে সময়ে ব্যাপকভাবে অভিনন্দিত হয়েছিল। একাত্তরের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনকে এগিয়ে নিতেও সারা দেশের নির্বাচিত ছাত্র সংসদগুলো অগ্রণী ভূমিকা রাখে।
এমনকি স্বাধীনতার পরও যাত্রাটা ভালো ছিল। বাহাত্তরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংগঠনগুলোর নির্বাচন হয়। ডাকসু, ইউকসুসহ বেশ কিছু ছাত্রসংগঠন যেমন ছাত্র ইউনিয়নের হাতে চলে যায়, তেমনি চাকসুসহ অনেকটিতে নেতৃত্ব ভাগাভাগিও হয়ে যায়। বাহাত্তরে ছাত্রলীগ বিভক্ত না হলে হয়তো অধিকাংশ ছাত্র সংসদের ফল ভিন্ন হতো। আজ যাঁরা সরকারি ও বিরোধী দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই ছাত্রজীবনে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করে ভিপি-জিএস হয়েছেন।
স্বীকার করতে হবে, বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতির দুর্গতিটা শুরু হয় শফিউল আলম প্রধানের হাত ধরে। তিনি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক থাকতে যেমন ডাকসুর নির্বাচনটি বানচাল করা হয়, তেমনি কয়েক মাসের মাথায় মুহসীন হলে ঘটানো হয় সাত খুনের ঘটনা। সাত খুনের দায়ে প্রধানের সাত বছর জেল হলেও জিয়াউর রহমান আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতিকে চাঙা করতেই তাঁকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনেন। এখনো তিনি বিএনপি জোটের অন্যতম শরিক।
জিয়াউর রহমান পৃথিবীর দীর্ঘতম কারফিউ জারি করলেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিয়েছিলেন। তাঁর সময়ে মাহমুদুর রহমান মান্না দুবার ডাকসুর ভিপি ও আখতারুজ্জামান জিএস হন। পরের নির্বাচনে আখতারুজ্জামান ভিপি ও জিয়াউদ্দিন বাবলু জিএস হন। ইতিমধ্যে বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে এরশাদ বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করেন। তিরাশিতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আখতারুজ্জামান নেতৃত্ব দিলেও বাবলু এরশাদের সঙ্গে হাত মেলান। এরশাদের আমলে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা ডাকসু নির্বাচনে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও দ্বিতীয় দফা ডাকসু নির্বাচনে আমান উল্লাহ আমান ভিপি নির্বাচিত হন।
কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদের পর একানব্বইয়ে আমরা যে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করলাম, সেই সরকার কোনো ছাত্র সংসদের নির্বাচন দেয়নি। বিএনপির পাঁচ বছর এভাবেই কেটে গেল। তারপর বিএনপিকে হটিয়ে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এল। কিন্তু সেই সরকারও ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না। কে বলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কোনো মিল নেই? আরও অনেক বিষয়ের মধ্য ছাত্র সংসদ নির্বাচন না দেওয়াটা তাদের অন্যতম মিল। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তিন-চতুর্থাংশ বেশি আসন পেয়ে ক্ষমতায় আসে। দুই সরকারের আমলেই বিরোধী দল ছিল ন্যুব্জ ও ভঙ্গুর। তারপরও ক্ষমতাসীনেরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে সাহস পাননি। এমনকি ২০০৯ সালে দিনবদলের সনদ নিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ ওরফে মহাজোটও ছাত্ররাজনীতিতে নতুন ধারা আনতে যারপরনাই ব্যর্থ হয়।
বর্তমানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে মন্ত্রিসভা আছে, সেই মন্ত্রিসভায় অনেকেই ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। শেখ হাসিনা ইডেন কলেজের ইন্টারমিডিয়েট শাখার ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে রাশেদ খান মেনন ও তোফায়েল আহমেদ ডাকসুর ভিপি ছিলেন, মতিয়া চৌধুরী ডাকসুর জিএস ছিলেন। ইয়াফেস ওসমান ইউকসুর ভিপি ছিলেন। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের ভিপি, আমির হোসেন আমু বরিশাল বিএম কলেজের ছাত্র সংসদের ভিপি ছিলেন। নুরুল ইসলাম নাহিদ ও হাসানুল হক ইনুও নিজ নিজ ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন। বর্তমান সাংসদদের মধ্যে যাঁরা ছাত্র সংসদ নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন তাঁদের মধ্যে ফজলে হোসেন বাদশা রাকসুর ভিপি ছিলেন; পঙ্কজ দেবনাথ প্রমুখ। হয়তো আরও অনেকে আছেন। সবার নাম এখানে উল্লেখ করা গেল না বলে দুঃখিত।
কিন্তু মন্ত্রিসভায় ও সংসদে এসে দেশের ছাত্র আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনকারী নেতা-নেত্রীরা ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কথা কেন ভুলে গেলেন? পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে তিনটি সামরিক সরকারের আমলে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলেও ২৫ বছরের গণতান্ত্রিক শাসনামলে সেই নির্বাচন বন্ধ থাকা একটি জটিল ধাঁধাও বটে। মাঝখানে দুই বছরের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব আপনারা না নিলেও, বাকি ২৩ বছরের দায় এড়াবেন কীভাবে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে দু’দেশেরই সংবাদমাধ্যম

কূটনৈতিক অভিধান তন্নতন্ন করেও এহেন অপ্রত্যাশিত দৌত্য খুঁজে পাচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা। শুক্রবার যেমনটার সাক্ষী থাকল এই উপমহাদেশ। আজ সকালে ফোনে নওয়াজ শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তার আমন্ত্রণে দিল্লি ফেরার পথে সটান লাহোরে পৌঁছে গেলেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। নওয়াজের বাসভবন রাইওয়ান্দ প্যালেসে প্রায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে ফিরলেন তিনি। তারই মধ্যে সারলেন পাক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে একান্ত বৈঠক। যার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ বলেছেন, ‘‘শোরগোলের বাইরে এ এক ব্যক্তিগত যোগাযোগ।’’ কিন্তু এই ‘ব্যক্তিগত যোগাযোগের’ আবহটি ছিল এতই অপ্রত্যাশিত যে তার ধাক্কায় বিশেষণ হারিয়ে ফেলেছেন উপস্থিত ধারাভাষ্যকাররা। আকস্মিকতা কাটিয়ে উঠতে সময় নিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। গাছে ওঠা গল্পের গরু-সম চিত্রনাট্যও হার মেনে গিয়েছে মোদির এই চূড়ান্ত ‘আউট অব দ্য বক্স’ চালে। আজ দিনটিও তো বড় সামান্য নয়। একে শীতার্ত বড়দিনের বেলা। তায় পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন। আর এই শরিফের সঙ্গে, এই লাহোরেই মৈত্রীর চাকা গড়িয়েছিলেন যিনি, সেই অটলবিহারী বাজপেয়ীরও জন্মদিন বটে। পাশাপাশি আজই কাবুলে প্রাতরাশ সেরেছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী (যা ছিল প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মনমোহন সিংহের স্বপ্ন, লাহোর এবং কাবুলে যথাক্রমে প্রাতরাশ এবং মধ্যাহ্নভোজের)। এমন দুর্লভ সন্ধিক্ষণে যেন খোদ সান্টাক্লজ হয়ে পাকিস্তানের মাটিতে পা রাখলেন মোদি! বৈকালিক নাশতাটি প্রধানমন্ত্রী সারলেন লাহোরে! আর আজ বেলা পর্যন্ত কাবুল-দিল্লি-ইসলামাবাদের কাক-চিড়িয়াও টের পেল না গত ৬৭ বছর ধরে সংঘর্ষক্লান্ত দু’টি দেশের রাষ্ট্রনায়ক কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খাওয়ার টেবিলে মুখোমুখি হচ্ছেন। টের পেল না যে বহু কূটনৈতিক প্রয়াস ও অভিপ্রায় থাকা সত্ত্বেও যে দেশে গত দশ বছরে পৌঁছতে পারেননি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ, সেখানে একটি ফোন-আমন্ত্রণে অক্লেশে পৌঁছে যাবেন মোদি। লাহোর বিমানবন্দর থেকে সটান চলে যাবেন নওয়াজের বাসভবন রাইউইন্দ প্যালেসে। ভারত-পাক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অবশ্য গত কয়েক সপ্তাহ সাক্ষী থাকছে নানা রকম আকস্মিকতার। প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে হঠাৎ করেই লাউঞ্জে নওয়াজের সঙ্গে একান্তে প্রায় দশ মিনিট কথা বলেন মোদি। এর কোনো পূর্বাভাস ছিল না। আর তার পরেই চূড়ান্ত গোপনে ব্যাঙ্ককের মতো একটি শহরে দু’দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টারা থমকে যাওয়া আলোচনা শুরু করলেন. এটাও ছিল কিছুটা অপ্রত্যাশিত। কিন্তু সে সবকে ছাপিয়ে গিয়েছে শুক্রবারের এই ঘটনা। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়া এই সফর অসম্ভব। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ‘ব্যাকরুম চ্যানেলে’ শুরু হয়ে গিয়েছিল এই মহাবৈঠকের প্রস্তুতি। কিন্তু সে তো পর্দার আড়ালে। শুক্রবার দুপুর থেকে প্রকাশ্যে যা দেখা গেল তা যেন দুই যুযুধান রাষ্ট্রনায়ক নয়, পাশাপাশি পাড়ায় থাকা দুই বন্ধুর স্বচ্ছন্দ আচরণ। মোদি এবং নওয়াজের টুইট অনুযায়ী, শুক্রবার সকালে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে প্রধানমন্ত্রী কাবুল থেকে ফোন করেন পাক রাষ্ট্রপ্রধানকে। ধন্যবাদ জানিয়ে নওয়াজ শরিফ বলেন যে তিনি তো লাহোরে নিজের বাড়িতেই রয়েছেন। ফেরার পথে একবার ঘুরে যান না কেন মোদি! সঙ্গে সঙ্গেই আমন্ত্রণ স্বীকার করে মোদি জানান তিনি আসছেন! এরপর ফের টুইটে মোদি লেখেন, ‘‘আজ বিকেলে নওয়াজের সঙ্গে সাক্ষাৎ হচ্ছে। দিল্লি ফেরার পথে যাচ্ছি সেখানে।’’ প্রাথমিক বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে দু’দেশেরই সংবাদমাধ্যম। শুক্রবার জন্মদিনের নানাবিধ অনুষ্ঠান ছিল নওয়াজের। তাছাড়া রাইউইন্দ প্যালেসে আগামীকাল থেকে শুরু হচ্ছে নওয়াজের নাতনি মেহেরুন্নিসার বিয়ের উৎসব। সমস্ত কাটছাঁট করে সাদা পাঠান স্যুট পরে বিমানবন্দরে লোকলস্কর নিয়ে হাজির হয়ে যান পাকিস্তানের উজির-এ-আজম। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে প্রায় আধঘণ্টা অপেক্ষাও করেন তিনি। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এয়ার ইন্ডিয়া-১৩৪ বিমানটি টারম্যাক ছুঁতেই শুরু হয়ে যায় যুদ্ধকালীন তৎপরতা। কিন্তু নাটকের তখনও কিছু বাকি ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী পাকিস্তানে আসছেন, এই খবরটি প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই নওয়াজ শরিফের অফিস সূত্রে জানানো হয়েছিল বিমানবন্দরেই কিছুক্ষণ থাকবেন তিনি। সেখানেই খাওয়াদাওয়া সেরে কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে যাবেন দিল্লি। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল, গেরুয়া কুর্তা-পাজামা পরিহিত সহাস্য মোদি একাই তরতর করে নেমে আসছেন বিমানের সিঁড়ি দিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে, যেখানে কার্যত উদ্বাহু হয়ে অপেক্ষায় শরিফ। দু’জনে আলিঙ্গনাবদ্ধ হলেন, উপস্থিত কর্তাদের সঙ্গে করমর্দনও হলো। এরপর দুই নেতা হাত ধরাধরি করে লাল কার্পেট মাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন অদূরে অপেক্ষারত হেলিকপ্টারের দিকে! তখন জানা গেল, বিমানবন্দরে বন্দি হয়ে থাকতে আসেননি মোদি। তাকে নিয়ে নিজের বাসভবনে পৌঁছলেন শরিফ। মোদি নিরামিষাশী, তাই তার জন্য আয়োজন করা হয়েছিল মখমলি পনির, বেসনের বড়া, গাজরের হালুয়া-সহ বিভিন্ন পদের। ব্যাগে শুধু নওয়াজের জন্মদিনের উপহারই আনেননি, জানা গিয়েছে নাতনি মেহেরুন্নিসার জন্যও তিনি নিয়ে এসেছেন শাড়ি শাদির-তোফা হিসাবে।   ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের খবর, গত বছর শুরু হয়েও পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার পর, পাক প্রশ্নে এ বার যথেষ্ট কৌশলী এবং সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছে মোদি সরকার। প্রথমত, শুধুমাত্র রাজনৈতিক নেতৃত্বই নয়, একটি সমান্তরাল আলোচনার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গেও। এই মুহূর্তে যিনি সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সেই নাসির খান জানুজা এসেছেন সেনাবাহিনী থেকেই। তিনি ছিলেন পাক সেনার লেফটেন্যান্ট জেনারেল। এই মুহূর্তে পাক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফের সঙ্গে তার যোগাযোগ যথেষ্ট ভালো। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ব্যাঙ্ককে এই জানুজার সঙ্গেই দীর্ঘ আলোচনা করেছেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। সেই আলোচনা যথেষ্ট ফলপ্রসূ হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। এক কূটনীতিকের কথায়, ‘‘মোদি যে পাকিস্তানের সঙ্গে এত দ্রুত আলোচনার গতি বাড়িয়ে চলেছেন তার পিছনে পাক সেনার প্রচ্ছন্ন সমর্থন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে পাক সেনা কিছুটা কৌশলগত ভাবে স্থিতিস্থাপকতা (স্ট্র্যাটেজিক্যালি স্ট্রেচড) দেখাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।’’   পাশাপাশি, বর্ষশেষে তার এই কৌশলী চালের ফলে দেশের অভ্যন্তরেও একটি বার্তা মোদি পৌঁছতে চেয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে তার সরকারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। চলছে তুমুল বিতর্ক। এমন সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি গিয়ে, সেখানে খানা খেয়ে আসার এই পদক্ষেপ দেশের ধর্মনিরপেক্ষ অংশকে খুশি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে। তার এই আচরণ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাছেও একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দেবে বলেই মনে করছেন বিজেপি নেতৃত্ব।   পাশাপাশি, এই সফরের মধ্যে একটি বন্ধুত্বের বাতাবরণ তৈরি করলেও, সেটি করা হয়েছে এতটাই আকস্মিক ভাবে যেকোনো প্রত্যাশার চাপ তৈরি হওয়ার সুযোগই দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া, রাষ্ট্রীয় সফরে যেমন দ্বিপাক্ষিক দেনাপাওনার হিসাব ও প্রত্যাশা থাকে, যৌথ বিবৃতির শব্দচয়ন নিয়ে বিবৃতির ঝড় ওঠে, এই ধরনের সৌজন্য সফরে তেমনটা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। এখানে কাশ্মির নিয়ে একটি শব্দও প্রকাশ্যে উচ্চারণ করার প্রয়োজন পড়ে না, অথবা সাংবাদিক সম্মেলনও হয় না। ফলে মোদির এহেন সফরে আরএসএস তথা সঙ্ঘ পরিবারেরও অখুশি হওয়ার কোনো কারণ থাকছে না।   কটূক্তি কংগ্রেসের বিজেপির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর লাহোর যাওয়ার পরিণাম হয়েছিল কার্গিল। এবার কী হবে? শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির লাহোর সফর নিয়ে এই ভাষাতেই কটূক্তি করলেন কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়াড়ি।   যদিও পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতেই এই লাহোর গমন বলে দাবি জানিয়েছেন মোদি। কিন্তু বিরোধীরা এর তীব্র সমালোচনা করেন। মোতির লাহোর সফরের খবর প্রকাশ্যে আসতেই ব্যাঙ্গাত্মক ভাষায় ট্যুইট করেন প্রবীণ কংগ্রেস নেতা মণীশ তিওয়াড়ি। ট্যুইটারে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর দুঃসাহসিক কূটনীতির সবচেয়ে খারাপ অভিব্যক্তি হলো লাহোর। গতবার বাজপেয়ী লাহোরে যাওয়ার পর কার্গিল হয়েছিল! এবার কী হবে?’’ প্রধানমন্ত্রী বা তার দলের তরফে এই বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে মোদির এই সফরকে সঠিক পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন জম্মু-কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী মুফ্‌তি মুহম্মদ সাঈদ।  - সংবাদমাধ্যম

আর বন্দুক নয়, বাড়ি ফিরে বললেন অনুপ চেটিয়া

ঠিক ১৮ বছর আগে এমনই এক ডিসেম্বরে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তিরিশ বছর বয়সী এক যুবক জেলের দিকে পা বাড়িয়েছিল। তখন সে কট্টর জঙ্গি নেতা। বিভিন্ন দেশ ঘুরে ভারতের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য সে অস্ত্র আর অর্থ সংগ্রহ করছিল। তার পর ব্রহ্মপুত্র আর যমুনায় অনেক পানি বয়ে গিয়েছে। ভিনদেশের কারাগারে কেটে গিয়েছে সময়। কারাবাসের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও প্রাণভয়ে স্বভূমে ফিরতে চাননি উলফার সাধারণ সম্পাদক গোলাপ বড়ুয়া ওরফে অনুপ চেটিয়া। অবশেষে এই বছর ভারতে ফেরা। চারটি মামলায় জামিন মেলার পরে গতকাল বিকেলেই জেল থেকে বেরিয়েছেন তিনি। দুর্দম সেই বিপ্লবী যুবক এখন চুলে পাক ধরা, দাঁত পড়ে যাওয়া, মিতভাষী প্রবীণ। গলায় মাফলার জড়ানো। গৌহাটির আদালতে প্রথম দিন দেখা করতে আসার সময় নিজের স্ত্রীকেই চিনতে পারেননি। ভুলে গিয়েছেন সন্তানদের চেহারাও। কিন্তু উলফার সংগ্রাম বা ভারত-আসাম সমস্যা নিয়ে আবেগটা ঠিক একই রকম রয়েছে। উলফার আলোচনাপন্থী সভাপতি অরবিন্দ রাজখোয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে ভারতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেও খোলাখুলি পরেশ বড়ুয়ার প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানান চেটিয়া। একই সঙ্গে আশ্বস্ত করেন, আগের বারের মতো আর সশস্ত্র সংগ্রামের পথে ফিরবেন না। বরং কথা বলবেন পরেশের সঙ্গে। গৌহাটি থেকে তিনসুকিয়ার জেরাই গাঁওতে যাওয়ার পথে রাস্তায় সোনাপুর-সহ বিভিন্ন স্থানে সংবর্ধনা পেলেন চেটিয়া। ঘরে ফেরার পথেই প্রথম বার সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিলেন উলফার সাধারণ সম্পাদক। মুক্তি পেয়ে কেমন লাগছে? এত দিন ধরে বিদেশের মাটিতে থেকে কি হতাশ হয়ে পড়েছিলেন? বাংলাদেশের কারাগার থেকে বেরোবার পরেই মুক্তির স্বাদ পেয়ে গিয়েছিলাম। বাংলাদেশ পেরিয়ে যখন মেঘালয়ের দাউকিতে ঢুকি, তখন প্রাণভরে স্বদেশের গন্ধ নিয়েছি। ভেবেছিলাম, ওখান থেকে সোজা গৌহাটি আসব। কিন্তু পথে মত বদল করে সিবিআই আমায় দিল্লি নিয়ে যায়। তবু হতাশ হইনি। জানতাম, ফাঁসির সাজা যখন হয়নি, তখন মুক্তি এক দিন পাবই। শুধু আমার আর বাবুলের (চেটিয়ার কারাবাসের সঙ্গী, উলফা সদস্য মনোজ গোস্বামী) চিন্তা ছিল লক্ষ্মীকে (লক্ষ্মীপ্রসাদ গোস্বামী, কারাবাসের আর এক সঙ্গী) নিয়ে। ও অসুস্থ ছিল, মানসিক অবসাদে ভুগছিল। দিল্লি থেকে গৌহাটির কারাগারে এসে আসামিয়া ভাষায় কথা বলে বাঁচলাম। তবে, বাংলাদেশের কারাগারের কর্মী, মানবাধিকার কর্মী, আইনজীবীরাও আমার সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করেছেন। স্ত্রী মণিকাকে প্রথম দর্শনে চিনতে পারেননি? সত্যি, খুবই লজ্জিত ওই ঘটনার জন্য। আসলে ১৯৯৫ সালে স্ত্রীকে নিয়ে আসাম ত্যাগ করি। আমি গ্রেফতার হই ১৯৯৭ সালে। তখন মেয়ে বুলবুলির দু’বছর বয়স, ছেলে জুমনের সাত বছর। বউয়ের মাথায় একঢাল চুল, স্বাস্থ্যও ভাল। কিন্তু গৌহাটির আদালতে আসা মণিকার চুল কাটা, রোগা। তাই প্রথমে একেবারে চিনতে পারিনি। আমার ছেলে আর মেয়ে তো আমায় একেবারেই চেনে না। মণিকা একা হাতে ওদের মানুষ করেছে। আমার লড়াইতে ও যে ভাবে পাশে দাঁড়িয়েছে, তাতে ধন্যবাদ দিয়ে ঋণ শোধ হওয়ার নয়। ভারতে ফিরতে দেরি হওয়ার জন্য আপনিই তো দায়ী। নিজেই ফিরতে চাননি। হ্যাঁ। আসলে তখন পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। অনেক সতীর্থ জাতির জন্য প্রাণ দিচ্ছেন। অনেকে দাঁত চেপে লড়াই চালাচ্ছেন। এমন সময় আমি যদি ভারতের কাছে আত্মসমর্পণ করতাম, তাহলে ওদের মনোবল ভেঙে যেত। আরও বিভিন্ন সমস্যা ছিল। বাংলাদেশ সরকারও জানায়, আমি দোষ স্বীকার করে নিলে ওরা সে দেশের জেলে আমায় রেখে দিতে পারবে। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠনগুলির কর্মী ও আইনজীবীরাও আমায় অনেক সাহায্য করেন। ভারতীয় দূতাবাসের কর্মীরা ১৯৯৮ সালে কারাগারে আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। কিন্তু আমি তাদের সঙ্গে দেখা না করে কারা কর্তৃপক্ষকে লিখিত আবেদন জানাই, আমি ভারতের নয়, আসামের নাগরিক। ভারতের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। এখন মনে হয়, ওই পদক্ষেপটাই ভুল ছিল। পরেশ বড়ুয়া জানিয়েছেন, আপনি বাংলাদেশের কারাগারে বন্দি থাকায় সময়ও তিনি আপনাকে দেখেছেন। অথচ আপনি জানিয়েছেন, এত বছর ধরে আপনাদের কোনো কথা হয়নি। আসলে আমায় যখন আদালতে হাজিরার জন্য প্রিজন ভ্যানে নিয়ে যাওয়া হতো, তখন দেখতাম রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে পরেশ। আমিও হাত নাড়াতাম। কিন্ত পরে পুলিশ তা বুঝতে পেরে আমায় বড় বাসে পাঠাত, যাতে পরেশ আমায় দেখতে না পারে। পরবর্তীকালে, দাঁতের চিকিৎসার জন্য যখন আমায় শেখ মুজিব চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হত, তখনও একই ভাবে পরেশ আমার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু কথা বলার সুযোগ ছিল না। এখন তো আপনাদের পথ পৃথক হয়ে গেল। পরেশ বড়ুয়াকে শান্তি আলোচনা বা মূল স্রোতে ফেরার জন্য কোনো বার্তা দিতে চান? দেখুন, গ্রেফতার না হলে পরেশ এখন যেখানে যে অবস্থায় আছে, আমিও তাই থাকতাম। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে আর পরেশের মতো সশস্ত্র সংগ্রামের পথে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। ১৯৯২ সালে আমি এক বার শান্তি আলোচনায় যোগ দেব বলেও, জামিনে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিলাম। সেই কারণে সরকার ও মানুষ সম্ভবত এখনও আমায় পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না। ৩৬ বছরের সংগ্রামে উলফার তরফেও অনেক ভুল-ত্রুটি হয়েছে। আমাদের সদস্যদের পাশাপাশি অনেক সাধারণ মানুষের প্রাণ গিয়েছে। তাই আমি এবার কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে কথা বলে শান্তি আলোচনার মাধ্যমেই আসাম-সমস্যার রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সমাধান চাইছি। সংবাদ মাধ্যমে পরেশকে কোনো বার্তা দেওয়া ঠিক হবে না। এতে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। বরং ভারত সরকার অনুমতি দিলে আমি সরাসরি পরেশের সঙ্গে কথা বলতে চাই। মূল স্রোতে ফিরে আসতে হলে পরেশ নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নেবে। ও যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও বুদ্ধিমান।– সংবাদমাধ্যম

আমদানিনির্ভর হতে চলেছে দেশ by বদরূল ইমাম

বাংলাদেশ একক জ্বালানির দেশ হিসেবে দীর্ঘদিন নিজস্ব গ্যাসের ওপর ভর করে কাটিয়েছে। আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা ছিল গৌণ। কিন্তু দেশের গ্যাস মজুত ক্রমাগত কমে যাওয়া ও তা নিঃশেষ হওয়ার বাস্তবতায় সেই সুদিনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। নীতিনির্ধারণী মহলের হিসাব ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশ ক্রমাগতভাবে বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল হতে থাকবে। বিদেশ থেকে আসবে বিপুল পরিমাণ কয়লা, আসবে ব্যয়বহুল জ্বালানি এলএনজি, আসবে জ্বালানি তেল এবং আসবে ইউরেনিয়াম, যা দিয়ে তৈরি হবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ।
২০১০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেখানে বিদেশ থেকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা ছিল ১০ শতাংশের কম, ২০৩০ সালে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেড়ে হবে ৭০ শতাংশ। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে পরিমাণ জ্বালানি (মূলত গ্যাস, কয়লা ও বিদেশি তেল) ব্যবহৃত হয়, তার অর্থমূল্য প্রতিবছর প্রায় ২০০ কোটি ডলার (১৬ হাজার কোটি টাকা)। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা, তার জন্য জ্বালানি (মূলত বিদেশি কয়লা, বিদেশি তেল, বিদেশি এলএনজি ও গ্যাস) খরচ বেড়ে দাঁড়াবে বর্তমান অর্থমূল্যে প্রতিবছর ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
দেশের জ্বালানি দৃশ্যপটে অবকাঠামোগত বিরাট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি কর্মকাণ্ডে দেখা দেবে বিরাট পরিবর্তন। বিরাট বিরাট কয়লাভর্তি জাহাজ ভিড়বে একাধিক বন্দরে, এলএনজি ব্যবহারের জন্য নির্মিত বিশেষ ধরনের সামুদ্রিক ও স্থলভূমির টার্মিনালগুলোতে কর্মচাঞ্চল্য দেখা দেবে, যা এ দেশে কেউ দেখেনি, আর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে সঞ্চালিত বিদ্যুৎ যেন বাংলার কোমল মাটিকে স্পর্শ করে রহস্যই ছড়াবে। আর এসব বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ উঠে আসবে উন্নয়নের আরও কয়েক ধাপ ওপরে। নিঃসন্দেহে এ পথ পাড়ি দেওয়া বড় রকমের চ্যালেঞ্জ। এই বিশাল পরিবর্তনকে মোকাবিলা এবং ধরে রাখতে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত থাকবে?
মূলত দুটি সমস্যা বাংলাদেশকে সামাল দিতে হবে। প্রথমত, এই বিরাট ও বহুবিধ কর্মযজ্ঞ তদারকিতে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞ জনশক্তির অভাব। অপর চ্যালেঞ্জ আর্থিক। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির ব্যয়ভার বহন করতে বাংলাদেশ কতটা সক্ষম? গ্যাসভিত্তিক একক জ্বালানির সাশ্রয়ী বৃত্ত থেকে বের হয়ে এসে বহুবিধ জ্বালানির প্রবর্তন ও তাতে জ্বালানি মিশ্রণের ধরন কী হবে, তা মূল বিবেচ্য বিষয় বটে। নিচের আলোচনায় বাংলাদেশে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত সম্ভাব্য জ্বালানি ও উপায়গুলোর ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
ফুরিয়ে যাওয়ার পথে গ্যাসের মজুত
দেশের বর্তমান অবশিষ্ট গ্যাস মজুত ১৪ টিসিএফ ধরে নিয়ে গড়ে প্রতিবছর প্রয়োজনীয় উৎপাদনের ধারা হিসাব করলে বর্তমান গ্যাস মজুত আগামী ১০ বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালে নিঃশেষ হয়ে যায়। তবে সরকারি ও পরামর্শক সংস্থার সূত্রমতে, গ্যাসের উৎপাদন হার ২০১৭ সালের পর থেকে কমে যেতে থাকবে ও জ্বালানি হিসেবে গ্যাস তার প্রাধান্য হারিয়ে ক্রমান্বয়ে স্বল্প থেকে স্বল্পতর ভূমিকা রেখে চলবে। তাই ২০২৫ সালে বর্তমান গ্যাস নিঃশেষ হবে না বটে, তবে তা স্বল্প ও নগণ্য হারে ২০৩০ সাল বা তার পরও কিছু সময় সরবরাহ হবে। দেশে নতুন গ্যাস আবিষ্কার না হলে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব যে গ্যাসের ওপর ভর করে অর্থনীতিকে আয়াসের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে এসেছে, তার পরিসমাপ্তি ঘটবে। উদ্বেগের বিষয় এটিই যে গ্যাসের বিকল্প অন্য জ্বালানি ব্যবহার করতে ব্যয় হবে বেশি এবং সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি ব্যবহারে অভ্যস্ত বাংলাদেশকে কঠিনতর আর্থিক চ্যালেঞ্জ সামলাতে হবে।
বিদেশি কয়লার ওপরই প্রধান নির্ভরতা
সরকারি পরিকল্পনায় ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৪০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ৫০ শতাংশ উৎপাদিত হবে কয়লা দিয়ে। এই ২০ হাজার মেগাওয়াট কয়লা উৎপাদন করতে প্রতিবছর প্রয়োজন হবে ৬ কোটি টন কয়লা। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিবছর ১০ লাখ টন কয়লা উৎপাদিত হয় দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ভূগর্ভস্থ খনি থেকে। দেশে আবিষ্কৃত তিনটি কয়লাখনির মজুত থেকে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে এই একই হারে কয়লা উত্তোলিত হতে পারে। উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে এর চেয়ে বেশি কয়লা আহরণ সম্ভব হলেও বিষয়টি নিয়ে জোরালো বিতর্ক রয়েছে। যদি ধরে নেওয়া হয় মোট চারটি কয়লাখনিই ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে চালু করা হলো, তাতে বছরে ৪০ লাখ টন কয়লা পাওয়া সম্ভব। ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি করে উত্তোলনের হার কিছু বাড়ানো যেতে পারে বটে, যাতে বছরে সর্বোচ্চ মোট ৮০ লাখ টন কয়লা পাওয়া যেতে পারে। ২০৩০ সালে প্রয়োজনীয় বাকি ৫ কোটি ২০ লাখ টন কয়লা আনতে হবে বিদেশ থেকে আমদানি প্রক্রিয়ায়। আর এর জন্য খরচ হবে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার, যা কিনা বর্তমান টাকার মূল্যে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা।
ব্যয়বহুল জ্বালানি এলএনজি
তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিষ্কার জ্বালানি হিসেবে সমাদৃত এবং দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ পেতে বিশ্ববাজার থেকে তা জোগান দেওয়ার ব্যবসা করা সহজতর। তবে এই জ্বালানি অতি ব্যয়বহুল। বাংলাদেশ প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি আমদানি করার জন্য কাতারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে যাচ্ছে। এ জন্য বর্তমানে সমুদ্রে ভাসমান টার্মিনাল তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে লক্ষ্যভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মিত হলে আমদানির পরিমাণ প্রতিদিন ১৫০ কোটি ঘনফুট হবে। এলএনজি তরল অবস্থায় পরিবহন করা হয় ও গন্তব্যে পৌঁছে তা পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশের গ্যাস অদূর ভবিষ্যতে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এলএনজি আমদানির মাধ্যমে তা পূরণের লক্ষ্য থেকেই এ উদ্যোগ। ২০১৭ সাল থেকে এলএনজি ব্যবহার শুরু করতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস এলএনজি হিসেবে আনার খরচ দাঁড়াবে ৮০০ কোটি ডলার বা বর্তমান টাকার মূল্যে ৬৪ হাজার কোটি টাকা।
সর্বোচ্চ ব্যয়ের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
বাংলাদেশে আর্থিক বিচারে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার (পদ্মা সেতুর নির্মাণ খরচ ৪০০ কোটি ডলারের কম)। নির্মাণ খরচ অতিরিক্ত হলেও এতে ব্যবহৃত জ্বালানি ইউরেনিয়ামের জন্য খরচ কত হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শেষ হলে তার পরবর্তী পর্যায়ে ব্যয় কম হয়ে থাকে।
সৌর বা বায়ুশক্তির সীমিত সম্ভাবনা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটিয়ে দেশের জ্বালানি সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজতে অনেকেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। কিছু দেশে অদূর ভবিষ্যতে সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুৎ বা জলবিদ্যুৎ বৃহৎ পরিমাণে প্রবর্তনের কোনো সম্ভাবনা নেই। বর্তমানে সৌর ও বায়ুশক্তির সাহায্যে উৎপাদিত বিদ্যুতের পরিমাণ ১৭৫ মেগাওয়াট এবং জলবিদ্যুতের পরিমাণ ২৩০ মেগাওয়াট, যা কিনা সম্মিলিতভাবে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার (১১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট) মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। সরকার ২০২০ সাল নাগাদ এই মাত্রাকে ১০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদার প্রেক্ষাপটে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান আগামী ২০ বছর অল্পই থেকে যাবে।
বিদ্যুৎ আমদানির প্রশস্ত পথ
ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের বিকল্প বাণিজ্য চালু করে। ভারত, ভুটান ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে বাংলাদেশ তার ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ জোগান দিতে পারে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের এই তিনটি প্রতিবেশী দেশ জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনাময় দেশ। ভারত ইতিমধ্যেই ভুটান ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে এই সম্ভাবনাকে তার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর অংশ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে তার বিদ্যুৎ সমস্যার বড় অংশ সমাধান করতে পারে।
গ্যাস আমদানির সুযোগ ও সম্ভাবনা
২০০৫ সালের দিকে মিয়ানমার-ভারত-বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে মিয়ানমারের সমুদ্রের গ্যাস ভারতে নেওয়ার প্রস্তাবে বাংলাদেশের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত ছিল ভুল ও অদূরদর্শী। ওই পাইপলাইনে সঞ্চালিত গ্যাসের একটি অংশ বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করতে হবে—এ ধরনের শর্ত দিয়ে চুক্তি করলে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ গ্যাস সরবরাহের একটি মোক্ষম ব্যবসা হতে পারত। বাংলাদেশকে বর্তমানে এ ধরনের আন্তদেশীয় গ্যাস সরবরাহ সম্ভাবনার দিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। বর্তমানে পরিকল্পনাহীন তুর্কমেনিস্তান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান-ভারত (তাপি) গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সে গ্যাস বাংলাদেশ পর্যন্ত আনার ব্যবস্থা করতে হলে বাংলাদেশকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া অপর নির্মাণাধীন আন্তদেশীয় গ্যাস পাইপলাইনে (ইরান-পাকিস্তান–ভারত বা ইপি) যুক্ত হওয়া যায় কি না, তা-ও বিচার করা প্রয়োজন। এসব গ্যাসের মূল্য কত হবে, তা একটি বিবেচ্য বিষয় বটে, তবে একটি বিষয় সবাই অনুধাবন করেন, বাংলাদেশের জন্য পূর্বেকার মতো সস্তা গ্যাস বা জ্বালানির দিন সম্ভবত শেষ। বাংলাদেশকে নতুন বাস্তবতায় জ্বালানি জোগানের আর্থিক চ্যালেঞ্জটা মোকাবিলা করতে হবে।
বদরূল ইমাম: অধ্যাপক, ভূতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।