Monday, January 6, 2025

চীনের পাখির চোখ 'গণতন্ত্র' by অ্যাডাম নেলসন ও মে বুটয়

২০২৪ সালের এপ্রিলে ফিলিপাইনের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তে-এর একজন মুখপাত্র পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, ফিলিপাইন এবং চীন ২০১৬ থেকে  ২০২২ এর মধ্যে গোপনে একটি চুক্তি করেছে। যেখানে বলা ছিল চীন পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে স্থিতাবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করবে না এবং ফিলিপাইন আয়ুঙ্গিন শোলে তার কর্মীদের জন্য শুধুমাত্র মৌলিক সরবরাহ পাঠাবে। কিন্তু এখন ফিলিপাইন এই অঞ্চলে চীনের কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রতিহত করার জন্য একটি অপরিহার্য খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়রের প্রশাসন নৌ-সংঘাত এবং নতুন আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ফিলিপাইনের সামুদ্রিক দাবির ওপর জোর দিচ্ছে। এটি এমন একটি সময়ে ঘটছে যখন দেশটি নীরবে গুরুতর, হুমকির মুখোমুখি। ফিলিপাইনের একজন প্রাক্তন মেয়র অ্যালিস গুও যিনি দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত- প্রমাণ করে যে কীভাবে দেশীয় দুর্নীতি ফিলিপাইনকে চীনা অনুপ্রবেশ এবং অপসারণের ঝুঁকিতে ফেলেছে। ফিলিপাইন কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ নেভিগেট করে তা কেবল তার ভবিষ্যতই নয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হবে।

আশেপাশের সমুদ্রে আক্রমণাত্মক সামরিক কৌশল পরিচালনার পাশাপাশি, চীন ফিলিপাইনের নেতাদের (সরকারের সব স্তরে) আরও চীন-বান্ধব অবস্থানে ফেলতে কৌশলগত বিনিয়োগ করছে।  চীনের এই কৌশল অন্যান্য দেশের অভিজাত, গোপন ব্যবসায়িক জোট এবং অর্থনৈতিক প্রণোদনাকে লক্ষ্য করে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব তৈরির বৈশ্বিক কৌশলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফিলিপাইন ২০২৫ এবং ২০২৮ সালের সমালোচনামূলক নির্বাচনের কাছাকাছি আসার সাথে সাথে, চীন তার বন্ধুত্বর হাত বাড়ানোর চেষ্টা করবে। এই প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে, অনেকেই মনে করছেন ভবিষ্যত ফিলিপাইন সরকার চীনের নিজস্ব শাসন, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ এবং গণ নজরদারির মডেল গ্রহণ করতে পারে। এই ধরনের সরকার ভিন্নমত প্রশমনের জন্য চীনের কর্তৃত্ববাদী শাসকের পরামর্শে চলার পাশাপাশি জবাবদিহিতা এড়াতে চীনের সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন লাভ করতে পারেন।

ফিলিপাইনের জনগণের সেবা করার জন্য গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলি বিরোধী এবং সমালোচকদের গতিবিধি সীমিত করার  হাতিয়ার হয়ে উঠবে এবং চীন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজের  অবস্থান সুরক্ষিত করতে সক্ষম হবে। ফিলিপাইনকে আমেরিকা-বিরোধী আখ্যান প্রচার এবং চীন-পন্থী মনোভাব গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পিত কৌশলের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে চীন বিশ্বব্যাপী তার  তথ্য প্রচারের কার্যক্রম জোরদার করছে। ফেসবুক এবং টিকটকের এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে, (যেগুলির ওপর  অনেক ফিলিপিনো খবরের জন্য নির্ভর করে) চীনা অ্যাকাউন্টগুলি এমন বিষয়বস্তুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে  যা ফিলিপাইন-মার্কিন সম্পর্কের উপর সন্দেহের জায়গা তৈরী করছে  এবং ফিলিপাইন সমাজের মধ্যে সামাজিক আস্থা নষ্ট করছে।

অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে, চীনের  লক্ষ্য হল পার্শ্ববর্তী সমুদ্রে  নিজস্ব আগ্রাসন সম্পর্কে ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করা। অস্থিতিশীলতা তৈরি করে মুসলিম মিন্দানাও (বারম) এর বাংসামোরো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলকে নির্বাচনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। । সেখানে একটি চলমান শান্তি প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়লে, এই অঞ্চলটি অবশ্যম্ভাবীভাবে জাতীয় সরকারের মনোযোগ এবং সম্পদের অনেক বেশি দাবি করবে।

এক্ষেত্রে কী করা যায়? মার্কিন বিনিয়োগ ফিলিপাইনে চীনের অবকাঠামো প্রকল্পের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলেও পশ্চিমের কৌশলগত সহায়তা চীনের ঋণ-চালিত মডেলের একটি স্পষ্ট বিকল্প হতে পারে। এই ধরনের কৌশল শুধুমাত্র ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্বকে সমর্থন করবে না বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকার জোটের নেটওয়ার্ককেও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে, চীনা হস্তক্ষেপ মোকাবেলা করার জন্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের উচিত পাঁচটি   অগ্রাধিকারকে মাথায় রেখে বিনিয়োগ ও সহায়তার নির্দেশনা দেওয়া।

প্রথমত, যেহেতু দুর্নীতি ফিলিপাইনের জন্য একটি জাতীয় নিরাপত্তা হুমকি, তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের উচিত ‘সুবিধাপূর্ণ মালিকানা’ (যারা ব্যক্তিগত ব্যবসার মালিক), ঋণের স্বচ্ছতা ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট এবং টেন্ডারিং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রোগ্রামগুলিতে অর্থায়ন করা। এটি শুধুমাত্র সমস্ত ব্যবসার ক্ষেত্রেই সুবিধা দেবে না বরং এটি ফিলিপাইনের প্রতিষ্ঠান ও  রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে গোপন বিদেশী কারসাজি থেকে রক্ষা করতেও সাহায্য করবে।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের অখণ্ডতা জোরদার করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গোপন বিদেশী প্রভাব এবং সম্পদের অপব্যবহার প্রতিরোধে সহায়তা করতে পারে। যদি যথাযথভাবে সমর্থন করা হয়, তাহলে নাগরিক-নেতৃত্বাধীন পর্যবেক্ষণ প্রচেষ্টা এই প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতে পারে। নির্বাচনী প্রতিষ্ঠানগুলিকে বাহ্যিক চাপের বিরুদ্ধে আরও স্থিতিশীল করে তুলতেও সাহায্য করবে।

তৃতীয়ত, স্থানীয় শাসন ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে এমন উদ্যোগে অর্থায়নের মাধ্যমে ফিলিপাইনের মিত্রদের বারম শান্তি প্রক্রিয়াকে রক্ষা করতে হবে।  শান্তি প্রক্রিয়াকে স্থিতিশীল করতে হলে তথ্য নিরাপত্তাকে জোরদার করতে হবে। স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণের কাছে যথার্থ ডিজিটাল সংবাদ পৌঁছে দিতে হবে।

শেষে বলতে হয় , ফিলিপাইনের নাগরিক এবং সরকারি  কর্মকর্তাদের চীনা নজরদারি মোকাবেলায় পারস্পরিক সহায়তা প্রয়োজন। সাইবার সিকিউরিটি এবং ডিজিটাল অধিকার রক্ষায় মার্কিন সমর্থন চীনা কৌশলগুলিকে প্রতিহত করতে পারে এবং প্রধান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলিতে আরও স্বচ্ছতা প্রদান করতে পারে।

একটি স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ফিলিপাইন মার্কিন স্বার্থ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।আমেরিকা, তার ইন্দো-প্যাসিফিক অংশীদার এবং মিত্রদের অবশ্যই চীনের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনকে শুধু তার আঞ্চলিক জলসীমাতেই নয়, বরং রাজনীতিতেও স্থিতিস্থাপকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করতে হবে।

লেখক : অ্যাডাম নেলসন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটের এশিয়া-প্যাসিফিকের সিনিয়র প্রোগ্রাম ডিরেক্টর। মে বুটয় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউটে ফিলিপাইনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ।

mzamin

‘বাঘের মুখ থেকি লাশ কাড়ি আনছি, এখন আর ভয়ে বনে যাই না’ by নাজনীন আখতার

‘হায় রে সুন্দরবন/ সে যে মায়েরই মতন/ বিধাতা করেছে নিজেই সৃষ্টি রে!’ ষাটোর্ধ্ব দেবেন মণ্ডলকে একটি গান গাইতে বললে তিনি দরদ দিয়ে এই গান গাইলেন।

গানটির প্রতিটি লাইনে সুন্দরবনের প্রতি ভালোবাসা, জীবিকার কথা। দেবেন মণ্ডল একসময় কাঠুরিয়া ছিলেন। সুন্দরবনের গভীরে ছিল তাঁর নিত্য আনাগোনা। তবে ১৩ বছর ধরে সুন্দরবনের ভেতরে আর যান না দেবেন মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘এখন গান-বাদ্য করি, কাজ করি, মাছ ধরি।’

২৫ বছরের বনজীবী জীবনে চারবার খুব কাছ থেকে বাঘ দেখেছেন বলে জানালেন দেবেন মণ্ডল। একবার বাঘের মুখ থেকে লাশ কেড়ে এনেছিলেন বলে দাবি তাঁর। দেবেন মণ্ডল বলেন, ‘বাঘের মুখ থেকি লাশ কাড়ি আনছি, এখন আর ভয়ে বনে যাই না।’

দেবেন মণ্ডলের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের দেখা হয় গত ২২ ডিসেম্বর খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের খেজুরিয়া গ্রামে।

সুন্দরবনের একদম কাছঘেঁষা গ্রাম খেজুরিয়া। গ্রামবাসীই খোঁজ দিলেন ৬৩ বছর বয়সী দেবেন মণ্ডলের।

সরু রাস্তা ধরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে যেতে যেতে এর-ওর সঙ্গে কথা বলার পর সন্ধ্যা নামার মুখে দেবেন মণ্ডলকে পাওয়া গেল।

গ্রামের বাজারে একটি বন্ধ দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে ছিলেন দেবেন মণ্ডল। পরিচয় দেওয়ার পর তিনি কথা বলতে বেশ আগ্রহ দেখালেন।

অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুললেন দেবেন মণ্ডল। আলাপে সুন্দরবন, বাঘ, নিজের জীবন-জীবিকাসহ নানা প্রসঙ্গ উঠে এল। তবে বাঘের কথা এল একটু বেশিই।

সুন্দরবনকে ‘অন্নদাতা’ হিসেবে বারবার তুলে ধরেন দেবেন মণ্ডল। জীবিকার উৎস হিসেবে সুন্দরবনের মর্যাদা তাঁর কাছে ‘মাতৃতুল্য’। তিনি বলেন, এই জীবনে যা কিছু যতটুকু পেয়েছেন, তা সুন্দরবনই তাঁকে দিয়েছে।

পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন দেবেন মণ্ডল। স্ত্রী, ছেলে আর পুত্রবধূ নিয়ে এখন তাঁর সংসার। আলাপের শুরুতে একটি বাঘের মুখ থেকে এক অপরিচিত যুবকের লাশ কেড়ে আনার গল্প বললেন তিনি।

‘বাঘটি সরছিল না’

দেবেন মণ্ডলের বাবা গৃহস্থালির কাজ করতেন। আর তিনি নিজে কাঠুরে হিসেবে জীবিকা শুরু করেন ২৫ বছর বয়সে। তখন বিবাহিত ছিলেন। তিনি বললেন, ২৫-৩০ জনের দল নিয়ে কাঠ কাটতে যেতেন। দলের নেতা ছিলেন তিনি। ৩৫ বছর বয়সে একবার বনে কাঠ কাটতে যান তিনি। দলে ছিলেন ৭ জন। একই সময়ে দুটি নৌকায় করে আরও দুটি দল এসেছিল।

দেবেন মণ্ডল বলেন, বেলা তিনটার দিকে বন থেকে কাঠ নিয়ে নৌকার কাছে আসেন। দেখেন, অন্য একটি নৌকার কাঠুরেরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন। দেবেন মণ্ডলের দলটির কাছে এসে তাঁরা বলেন, তাঁদের দলের এক কাঠুরেকে বাঘ টেনে নিয়ে গেছে। টেনে নেওয়া কাঠুরেকে বাঘ এতক্ষণে মেরে ফেলেছে, তা নিশ্চিত। কিন্তু তাঁর লাশ ফেলে তাঁরা কীভাবে চলে যাবেন! পরিবারটির জন্য শেষ চিহ্ন হিসেবে লাশ তো নেওয়া দরকার। লাশ উদ্ধারে দেবেন মণ্ডলরা কোনো সাহায্য করতে পারেন কি না?

তখন দেবেন মণ্ডল বলেছিলেন, বাঘ সামনে দেখার পর যদি দলের কেউ পিছু না হটেন, তাহলে তিনি চেষ্টা করতে রাজি আছেন। সবাই সম্মতি জানানোর পর তাঁরা অগ্রসর হন। সবাইকে বলা হলো, ‘হইহই’ শব্দ করে ‘জাকদ’ (চিৎকার) দিতে। তাঁরা সুন্দরীগাছের পাতায় বাড়ি দিয়ে শব্দ করতে করতে এগোচ্ছিলেন, যাতে বাঘ ভয় পেয়ে লাশ ছেড়ে পালায়। মাটিতে পায়ের ছাপ দেখে দেবেন নিশ্চিত হয়েছিলেন, বাঘ দক্ষিণ দিকে গেছে। কিছুটা এগোতে রক্ত, গাছের গোড়ায় আটকে থাকা গেঞ্জির অংশ দেখে নিশ্চিত হন, ঠিক পথেই এগোচ্ছেন। আরও কিছুটা এগোতে দেখতে পান, বাঘটি লাশ খাচ্ছে। শব্দ পেয়ে বাঘটি তাকায়। তিনি ‘মন্তর’ পড়া শুরু করেন।

কী মন্ত্র পড়েছিলেন, কেন পড়েছিলেন—এই প্রশ্নে দেবেন মণ্ডল বলেন, ‘চাখান, খিলান বহু মন্তর আছে। মন্তর না পড়লে তো বাঘ উঠবে না। আমি মন্তর পড়ি, বাঘ একবার উঠে, আবার বইসে যায়। আমার গা দিয়ে পানি পড়ছিল (ঘাম)। তিনবারের বার বাঘ লাশ ছেড়ে চলে গেল।’

লাশের কাছে যাওয়ার পর দলের অন্যদের সতর্ক করেছিলেন বলে জানান দেবেন মণ্ডল। বলেছিলেন, ‘বাঘ কিন্তু বেশি দূর যাবে না। লাশ বেঁধে (কাঠের তক্তার সঙ্গে) তোমরা সামনে যেতে থাকো (নদীর দিকে)। আমরা কয়েকজন পিছন ফিরি (বনের দিকে মুখ করে) হাঁটব।’

লাশ নিয়ে বারবার পেছন ফিরে ‘হইহই’ শব্দ করে হাঁটছিলেন বলে জানান দেবেন মণ্ডল। সেই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে দেবেন বলেন, লাশ নৌকায় তোলা হয়েছে, এই সংকেত পেয়ে তাঁরা নৌকার দিকে ছুটতে ছুটতে দেখলেন, মুখের গ্রাস হারিয়ে ক্ষুধার্ত বাঘটি তাঁদের দিকেই আসছে। তাঁরা নৌকায় ওঠার পর বাঘটি পিছু পিছু নদীতে নেমে এসেছিল। কিন্তু গলাপানি অবধি এসে বাঘটি থেমে যেতে বাধ্য হয়। বাঘটি তাকিয়ে ছিল তাঁদের নৌকার দিকে।

‘বাঘের কবলে’

সুন্দরবনে কয়বার বাঘ দেখেছেন—এ প্রশ্নের উত্তরে দেবেন মণ্ডল বললেন, ‘চারবার।’

সরু রাস্তার ওপারে একটি গাছ দেখিয়ে দেবেন মণ্ডল বললেন, একবার এতটুকু দূরত্বে একটি বাঘ দেখেছিলেন তিনি। শেষবার তিনি নিজে বাঘের হামলার শিকার হয়েছিলেন। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। সেই ভয় এখনো তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তার পর থেকে তিনি আর বনে যান না।

দেবেন মণ্ডল যখন তাঁর বাঘের কবলে পড়ার গল্প শুরু করলেন, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। দোকান ঘিরে বেশ জটলা। সবাই গল্প শুনতে আগ্রহী।

বাংলা-ইংরেজি সাল-তারিখের মিশেলে সময়কাল ধরে বাঘের কবলে পড়ার গল্প বলতে থাকেন দেবেন মণ্ডল: তখন তাঁর বয়স ৫০ বছর। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাস। দিনটি বাংলা ৬ পৌষ। মঙ্গলবার। বেলা ১১টা।

সকালে বাড়ি থেকে বের হন। উত্তুরে বাতাস। বেশ ঠান্ডা, কুয়াশা। এখন বনের যে প্রান্তগুলো ঘেঁষে ইকো রিসোর্ট তৈরি হয়েছে, সেই বরাবর কুলতলীর খালের ভেতরে নৌকায় দলবল নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। খালের ভেতর দুই দিকে দুটি বাঁক। এর মধ্যে ডানদিকের বাঁকে উঠলেন তাঁরা। অন্যদের কাজে লাগিয়ে তিনি একটু ভেতরের দিকে যান।

বেলা ১১টার দিকে ফিরে এসে দেবেন মণ্ডল দেখেন বেশ অনেকখানি কাঠ কাটা হয়ে গেছে। তিনি আরেকটি গাছের গোড়ায় কুড়াল দিয়ে কোপ দিতেই বাঘ তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

দেবেন মণ্ডলের ডান চোখে থাবা মারে বাঘ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তাঁর ঘাড়ে কামড় দিয়ে বাঘ তাঁকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। সে সময় তাঁর দলের একজন সর্বশক্তি দিয়ে বাঘের মাথায় কুড়াল দিয়ে আঘাত করেন।

ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় দেবেন মণ্ডলের চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছিল। তিনি বলেন, ‘বাড়ি খেয়ে বাঘ আমাকে ছাড়ি দিল। আমাকে ওরা নৌকায় করে আনল। গ্রাম্য ডাক্তার অশোক বৈদ্য ট্রিটমেন্ট (চিকিৎসা) দিল। ঘাড়-গলা ভাগ হয়ে গেছিল। চোখ ঝুলে গেছিল। ৫১টা সেলাই লাগছিল। মুখ বাঁকা হয়ে গেছিল।’

তারপর প্রায় দুই মাস ভারতে চিকিৎসা নেন বলে জানান দেবেন মণ্ডল। বলেন, দেশে-বিদেশে চার মাসের চিকিৎসায় তাঁর প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছিল।

দেবেন মণ্ডল বলেন, বাঘের ঝপ করে লাফ দেওয়ার শব্দটা এখনো তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। একদিন একটা গুইসাপ গাছ থেকে লাফিয়ে পড়েছিল। তিনি আঁতকে উঠেছিলেন। নিজে বাঘের কবলে পড়ার পর থেকে তিনি আর বনে যান না।

দেবেন মণ্ডল বলেন, ‘ওই সাবজেক্ট (প্রসঙ্গ) বাদ। সেই থেকে জঙ্গলে যাই না। গান-বাদ্য করি।’

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২৫ বছর ধরে কেন সুন্দরবনে গিয়েছিলেন, জানতে চাইলে দেবেন মণ্ডল বলেন, বনের কাজে দ্বিগুণ আয়। ভালো খাওয়া-পরার জন্যই বনে যেতেন তিনি।

২০০৭ সাল থেকে সুন্দরবনে সব ধরনের কাঠ সংগ্রহ নিষিদ্ধ। তবে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গোপনে অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহের অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো আজ প্রথম আলোকে বলেন, এখন সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহ বলতে গেলে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কেউ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাঁরা আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।

দেবেন মণ্ডল তাঁর ছেলেকে বনজীবী বানাননি। তিনি বলেন, ‘ছেলে রিসোর্টে কাজ করে। ওকে পড়াশোনা শিখাইছি। ওদিক (বনে) দিতাম না। জমি নাই, জমা নাই। জঙ্গলে খাটিয়া মানুষ করেছি।’

নিজের জীবনে যা ঘটেছে, তাকে ‘ভাগ্যের লিখন’ বলে বিশ্বাস করেন দেবেন মণ্ডল। তিনি বলেন, ২৫ বছর বয়সে তাঁকে এক জ্যোতিষী বলেছিলেন, ৫০ বছর বয়সে দন্তাঘাতে তাঁর মৃত্যু হবে। জ্যোতিষীর এই ভবিষ্যদ্বাণী তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। সাপ বা বাঘের কামড়ে তাঁর মৃত্যু লেখা ভেবে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপেছিলেন।

সুন্দরবনের ভেতরে যাওয়া ছাড়লেও বন নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই দেবেন মণ্ডলের। তাঁর ভাষায়, ‘আমার পরিবার জঙ্গলের পরেই বাঁচিয়াছি’ (জঙ্গলই তাঁর পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছে)। তাই সুন্দরবনের গুণকীর্তন করে কণ্ঠে গান তোলেন দেবেন মণ্ডল, ‘গাছে গাছে নানান পাখি দেখিতে যে পাই/বাঘ, হরিণ, জাতিসর্প রয়েছে সেথায়। হায় রে সুন্দরবন/সে যে মায়েরই মতন...।’

ষাটোর্ধ্ব দেবেন মণ্ডল এখন গান গেয়ে দিন পার করেন
ষাটোর্ধ্ব দেবেন মণ্ডল এখন গান গেয়ে দিন পার করেন। ছবি: প্রথম আলো

মিসাইলও রুখে দেবে চীনের নতুন মেশিন গান

চীন সামরিক খাতে বিপ্লব ঘটিয়েছে। যা কেউ কখনো কল্পনাই করতে পারেনি, সে কাজটাই করে দেখিয়েছে রেড ড্রাগনরা। এবার দেশটির বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়াররা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী মেশিন গান তৈরি করেছে। এই মেশিন গান এতটাই শক্তিশালী যে, প্রতি মিনিটে সাড়ে ৪ লাখ রাউন্ড গুলি ছুড়তে সক্ষম।

তাবে চাঞ্চল্যকর খবর হলো এই মেশিন গান শব্দের চেয়ে দ্রুতগামী হাইপারসনিক মিসাইলকেও রুখে দেবে। চীনের তৈরি এই মেশিন গানে পাঁচটি বা তার চেয়ে বেশি ব্যারেল রয়েছে বলে জানিয়েছে চীনের সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

খবরে বলা হয়, এই মেশিন গানের প্রতিটি ব্যারেল থেকে প্রতি মিনিটে সাড়ে চার লাখ রাউন্ড গুলি ছোড়া সম্ভব। পরীক্ষার সময় দেখা যায়, ব্যারেজের ঘনত্ব নজিরবিহীন। এর ফলে, মাক ৭ গতির চেয়েও দ্রুতগামী হাইপারসনিক মিসাইলকে ভূপাতিত করতে সক্ষম এই মেশিন গান। অথচ মার্কিন সেনাবাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী ফালানস্ক সিস্টেম প্রতি মিনিটে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে।

প্রচলিত মেশিন গানে মেকানিক্যাল ট্রিগার রয়েছে। এটা চীনের সেনাবাহিনীর চাহিদা মেটাতে সক্ষম হচ্ছে না। সেই ভাবনা থেকেই ইলেকট্রনিক ট্রিগার সংবলিত এই মেশিন গান তৈরি করেছেন নর্থ ইউনিভার্সিটি অব চায়নার একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর লু শুতাও। ইলেকট্রনিক টিগার থাকায় নজিরবিহীন দক্ষতার সঙ্গে মাত্র ১৭.৫ মাইক্রোসেকেন্ডে গুলি করতে পারে এই মেশিন।

প্রতি মিনিটে ১০ লাখ রাউন্ড গুলি ছুড়তে সক্ষম অস্ত্র বানানোর প্রজেক্ট ১৯৯০-এর দশকে হাতে নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার একজন উদ্ভাক। তার নাম মাইক ও’ডইয়ার। এজন্য তিনি একটি কোম্পানিও খুলেছিলেন। সেটির নাম দেন মেটাল স্টর্ম ইনক.। ৩৬ ব্যারেলের এই টেস্টিং সিস্টেম মিনিটে ১০ লাখ রাউন্ড গুলি ছুড়তে সক্ষম হয়। তাই ওই অস্ত্রের নামও হয়ে গিয়েছিল মেটাল স্টর্ম বা ধাতুর ঝড়।

২০০৬ সালে ও’ডইয়ার গণমাধ্যমকে জানান, চীনের সেনাবাহিনী তার কাছে এই প্রযু্ক্তি কিনতে চেয়ে অর্থ প্রস্তাব করেছে। এরপরই টনক নড়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের। তখন তারা ও’ডইয়ারের সঙ্গে মিলে নতুন একটি অস্ত্র তৈরির প্রজেক্ট হাতে নেয়। কিন্তু কারিগরি এবং অন্যান্য চ্যালেঞ্জের কারণে সেই প্রজেক্ট শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়।

পরবর্তীতে ২০১২ সালে দেউলিয়া হয় মেটাল স্টর্ম ইনক.। ও’ডইয়ারের সহায়তা না পেলেও এবার চীন নিজেই তাদের মেটাল স্টর্ম তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত

মাহিয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় পরিবার by সুদীপ অধিকারী

মাহিয়ান ইবনে সরোয়ার (১৮)। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন বড় ইঞ্জিনিয়ার হবেন। পড়ালেখাতেও অন্যদের থেকে ছিলেন বেশ এগিয়ে। মাধ্যমিকের পর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাতেও আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল থেকে গোল্ডেন-এ প্লাস পেয়েছেন। তবে গত জুলাই-আগস্টে দেশব্যাপী চলা আন্দোলনে যোগ দিয়ে গত ৪ঠা আগস্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গুলি কেড়ে নিয়েছে তার সব স্বপ্ন। হাত এফোঁড়-ওফোঁড় করে পিঠে লাগা পুলিশের গুলিতে শিরা ছিঁড়ে অবস হয়ে গেছে মাহিয়ানের ডান হাত। নিজে হাতে ভাত খাওয়া তো দূরের কথা কলমও ধরতে পারছেন না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের শরণাপন্ন হলে তারা বিদেশে নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে বাবার বেসরকারি চাকরির সামান্য বেতনের টাকা দিয়ে ছেলের উন্নত চিকিৎসা ও তার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দিন পার করছে মাহিয়ানের পরিবার।

সেদিনের স্মৃতি টেনে ১৮ বছরের এই যুবক মাহিয়ান মানবজমিনকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রথম থেকেই যুক্ত ছিলাম। বাসার কাছে হওয়ায় বেশির ভাগ সময় মিরপুর-১০ নম্বর, ২ নম্বর, ১২ নম্বর, ১৪ নম্বর, ইসিবি চত্বর এলাকার আন্দোলনে যোগ দিতাম। পুরো আন্দোলনে তেমন কিছু না হলেও সরকার পতনের ঠিক আগের দিন সন্ধ্যায় মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকায় আমার ডান হাতের কনুইয়ের নিচে গুলি লাগে। তিনি বলেন, আমরা সেদিন ১৪ নম্বরের দিক থেকে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে যাচ্ছিলাম। বিআরটিএ অফিসটা পার করে সামনের দিকে এগুতেই সামনের দিক থেকে পুলিশ গুলি শুরু করে। পুলিশের গুলির মুখেই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ও আমাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলছিল। এরইমধ্যে কোথা থেকে হঠাৎ আমার ডান হাতে এসে একটা গুলি লাগে। গুলিটি আমার ডান হাতের কনুইয়ের নিচের একপাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বের হয়ে পিঠে গিয়ে লাগে। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় পড়ে যাই। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। আমার সঙ্গীরা আমাকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী আলোক হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরিস্থিতি এমন ছিল যে- হাসপাতালে যেতেও ভয় লাগছিলো। যদি পুলিশ অ্যারেস্ট করে? তাই সেদিন আলোক থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় চলে যাই। পুলিশের ভয়ে সেদিন গুলি লাগার পরও কাছের কোনো আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবকে জানাতে পারিনি। সারা রাত পরিবারের সকলে এক ফোটা ঘুমাইনি। পরদিন যখন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়- তখন বুকে কিছুটা বল পাই। বাবা সরোয়ার হোসেন আগে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) কাজ করায় তার রেফারেন্স দিয়ে ৭ই আগস্ট সেখানে ভর্তি হই। সেখান থেকে জানা যায়, গুলি আমার ডান হাতের একপাশ দিয়ে ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে পিঠে লাগলেও শরীরের ভেতরে প্রবেশ করেনি। তবে আমার ডান হাতের দুইটা নার্ভ ছিঁড়ে গেছে। আমি আগের মতো আর হাত দিয়ে কাজ করতে পারবো না। ৭ই আগস্ট থেকে ১৩ দিনের চিকিৎসা শেষে ১৯শে আগস্ট আমাকে সিএমএইচ থেকে রিলিজ দেয়া হয়। আমি বাড়ি ফিরে এলেও এখনো ডান হাত দিয়ে কিছু করতে পারি না। খাবারটা পর্যন্ত বাবা-মা খাইয়ে দেয়। পুরো হাতটা বাঁকা হয়ে রয়েছে। ছাড়পত্র দেয়ার পরও বেশ কয়েকবার সিএমএইচে ও স্কয়ার হাসপাতালে দেখিয়েছি। সিএমএইচ’র চিকিৎসকরা বলেছেন- দুইটা নার্ভের একটি রিপিয়ার করা হয়েছে। ফিজিওথেরাপি করলে হাতের কিছুটা উন্নতি হবে। তবে সময় লাগবে।

এদিকে মাহিয়ানের বাবা সাবেক সেনা সদস্য সরোয়ার হোসেন বলেন, আমার দুই ছেলে। মাহিয়ান বড়। আর নাহিয়ান ইবনে সরোয়ার ছোট। মাহিয়ান আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল থেকে এবার এইচএসসি পাস করেছে আর নাহিয়ান মাদ্রাসার ছাত্র। আমরা ইসিবি চত্বরের কাছে মানিকদি থাকি। সবকিছু ঠিকই চলছিল। সেদিনের একটা গুলি আমার পুরো পরিবারকে এলোমেলো করে দিয়েছে। তিনি বলেন, মাহিয়ানের ছোট বেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ও বড় হয়ে ইঞ্জিনিয়ার হবে। পড়ালেখাতেও অনেক ভালো। ডাবল এ প্লাস। কিন্তু এখন সে ডান হাতে কলমটাও ধরতে পারে না। ওকে রেটিনায় কোচিং করিয়েছি। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছে। কিন্তু পাস করবে কী করে ওতো কিছুই লিখতে পারেনি। ডান হাতে বল পায় না। হাতটা বাঁকা হয়ে থাকে। বাবা হয়ে ছেলের এই অবস্থা আমি দেখতে পারি না। তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় আমাদের সকলকে লুকিয়ে বেড়াতে হতো। এই একজন এসে বলতো- আপনার ছেলের নামে লিস্ট হয়েছে। ওকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কতো সব কথা। কিসের মধ্য দিয়ে যে আমরা দিন পার করেছি তা শুধু আমরাই জানি। জুলাই অভ্যুত্থানের এই যোদ্ধার বাবা বলেন, সিএমএইচ-এ চিকিৎসার পরে সেখান থেকে বলা হয়- মাহিয়ানের ডান হাতের দুটি নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি নার্ভের কাজ আমরা করিয়েছি। এরপর আমি মাহিয়ানকে স্কয়ার হাসপাতালের একজন চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। সেখান থেকে বলা হয়- গুলি লাগার পর ওর হাতের ভাঙা হাড়ের অংশ বিশেষ ভেতরে আটকে আছে। তাই ও হাত সোজা করতে পারছে না। একইসঙ্গে ডান হাতের নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাহিয়ানের হাতে এখনো সার্জারি প্রয়োজন। দেশের বাইরে নিয়ে গেলে এই অস্ত্রোপচার আরও ভালো হবে। তাই ওই চিকিৎসক ছাড়পত্রে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত মাহিয়ানের চিকিৎসা বাবদ দেড় লাখের বেশি টাকা খরচ হয়ে গেলেও কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি। এর ওপর সংসারের খরচ রয়েছেই। তাই আমার ছাপোষা চাকরির বেতনে ওকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না। আমি এই বিষয়ে জুলাই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখান থেকে আরেকজনের নম্বর দেয়া হয়। সেই নম্বরে অনেকবার যোগাযোগের পরও কাজ না হওয়ায় ওদের হটলাইন নম্বরে কল করি। সেখান থেকে আমাকে বলা হয়- মাহিয়ানের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হলে বা বিদেশ নিতে হলে পঙ্গু হাসপাতাল বা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) ছাড়পত্রে চিকিৎসকদের মন্তব্য উল্লেখ থাকতে হবে। তা না হলে আমরা কিছু করতে পারবো না। তিনি বলেন, আজ আমার সামর্থ্য থাকলে আমি কাউকেই আমার ছেলের বিষয়ে বলতাম না। কিন্তু আমার নিজেরই অবস্থা ভালো না। আমার এই ছেলে ভবিষ্যতে কী করবে? কী করে ওর পুরো জীবন পার করবে এসব ভেবে রাতে ঘুম আসে না। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের একটাই দাবি- আমার ছেলেকে সরকার বা জুলাই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বিদেশে নিয়ে যেন উন্নত চিকিৎসা করানো হয়। ওর ভবিষ্যৎ যেন ও নিজেই গড়তে পারে। ও যেন কারোর ওপর বোঝা না হয়।

এসব বিষয়ে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মিডিয়া অ্যান্ড পিআর এক্সিকিউটিভ জাহিদ হোসেন মানবজমিনকে বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আমাদের অনেক ভাই আহত হয়েছেন। আমরা আমাদের সেই আহত যোদ্ধাদের জন্য দিনে রাতে কাজ করে চলেছি। তবে আহত যোদ্ধাদের বিদেশে নিয়ে চিকিৎসার বিষয়ে কিছু পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে আমাদের এগুতে হয়। যেমন আহত ব্যক্তির ক্ষেত্রে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে একটি ফরম নিয়ে তা পূরণ করে যে হাসপাতালের চিকিৎসা নিয়েছেন সেই চিকিৎসক কর্তৃক সত্যায়িত করতে হবে। যেখানে ওই চিকিৎসকের স্বাক্ষর এবং সিলমোহর থাকবে। এ ছাড়া যেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন সেই হাসপাতালে ভর্তির ফরম কিংবা ছাড়পত্র প্রয়োজন হবে সেখানেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক সত্যায়িত করবে। এর সঙ্গে যেই হাসপাতাল থেকে আহত যোদ্ধা চিকিৎসা নিয়েছেন সেই হাসপাতালে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের মেডিকেল টিমের দিয়ে কাগজ ভেরিফাই করাতে হবে। এসব প্রসেসিং শেষে ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাই মাহিয়ানের পরিবারের সদস্যদের ফর্ম নিয়ে আগে সিএমএইচ হাসপাতালের চিকিৎসক ও মেডিকেল টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তারা যদি সব ভেরিফাই করে দেয় তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারবো।

mzamin

ঢাকার শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে by ফরিদুর রেজা সাগর

সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের মেকআপ রুমে হঠাৎ করে একদল শিল্পী প্রবেশ করতেন। এই শিল্পীরা নাচের শিল্পী। তারা কখনোই একজন আসতেন না। দলবেঁধে তারা আসতেন এবং পুরো মেকআপ রুমটা দখল করে নিতেন। তাহলে কি দাঁড়ায়! তখন যাদের লাইভ অনুষ্ঠান থাকতে পারে, একক অনুষ্ঠান থাকতে পারে, আউটডোর থাকতে পারে তাদের আর বসার কোনো উপায় থাকতো না। এই নাচের শিল্পীরা যখন প্রবেশ করতেন তখন মেকআপ রুমটা অন্যরকম হয়ে যেতো তাদের ঝলমলে পোশাকের কারণে, হইচইয়ের কারণে। তারা যেমন একসঙ্গে প্রবেশ করতেন ঠিক তেমনই মেকআপ শেষে একসঙ্গে বেরিয়ে যেতেন। এই নাচের গ্রুপে এমন দু’একজন শিল্পী ছিলেন যাদের হাসিভরা মুখ সবাইকে মোহিত করতো। সে রকম একটি মুখ অঞ্জনা সুলতানা। তিনি বুঝতে পারতেন শিল্পীদের অসুবিধা হচ্ছে। খুব বিনয়ের সঙ্গে সিনিয়র শিল্পীদের বলতেন, ভাই আপনারা কিছু মনে করবেন না। বুঝতে পারছি আপনাদের অসুবিধে হচ্ছে, কিন্তু কি করবো বলুন আমাদের তো স্টেজ শো, এখনই আমাদের চলে যেতে হবে। আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। কিংবা কেউ মেকআপ নিচ্ছেন তাকে অনুরোধ করছেন তার নাচের শিল্পীদেরকে সুযোগ করে দেয়ার জন্য। সব মিলিয়ে অন্য ১০ জন শিল্পীদের থেকে অঞ্জনা সুলতানাকে একটু আলাদা মনে হয়েছে। আরেকটু আলাদা মনে হলো যখন দেখলাম তিনি বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। টেলিভিশনে তখন নানারকম আড্ডা হতো অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হতো। তাদের দু’জনকে দেখেছি এক রুমে বসে গল্প করছেন, আড্ডা দিচ্ছেন, আবার হাসতে হাসতে একসঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছেন। সাবিনা ইয়াসমিন এবং অঞ্জনা রহমানের বন্ধুত্বের কথা সেসময় টেলিভিশনের সবার কাছে একটা আলোচনার বিষয় ছিল। সাবিনা ইয়াসমিনের গান এবং অঞ্জনার নাচ নিয়ে অনেকেই অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করেছিলেন।

তখন নাচের শিল্পীদের রিহার্সেল হতো টেলিভিশনের দোতলায়। কোনার দিকে একটি রিহার্সেল রুম ছিল সেখানে। নাচের শিল্পীদের রিহার্সেল মানেই শিল্পী মোস্তফা মনোয়ারের উপস্থিতি। মোস্তফা মনোয়ারকে অনেক অনুষ্ঠানে দেখা যেতো বিশেষ করে নাটক, বিশেষ গানের অনুষ্ঠানে, ছোটদের অনুষ্ঠানে তো বটেই। আমরা দেখেছি মোস্তফা মনোয়ার নিজে থেকে এসে বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিতেন। নাচের রিহার্সেল চলতো দীর্ঘসময় ধরে। মোস্তফা মনোয়ার আটকে যেতেন। বিশেষ করে ছোটদের অনুষ্ঠানের সময়। ছোটদের অনুষ্ঠানের সঙ্গে আমিও জড়িত ছিলাম, ফলে অনুষ্ঠানের ব্যাপারে কথা বলার জন্য অনেক সময় ধরে অপেক্ষা করতে হতো। তারপর এক সময় অপেক্ষা করতে করতে রিহার্সেল রুমে ঢুকে যেতাম। সবার দিকে তাকিয়ে বলতামÑ স্যার, একটু সময় লাগবে, এই এক মিনিট পরামর্শ ছিল। সবাই কেমন তাকিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে আমিই এই কাণ্ডটা করতাম। আমার সঙ্গে কখনো কখনো কাজী কাইয়ুমও রিহার্সেল রুমে চলে যেতেন।

একদিন অঞ্জনা সুলতানা বললেন, সাগর তোমার সব কাজই কি আমাদের এই নাচের রিহার্সেলের সময় পড়ে?
আমি বললাম, ঠিক তা নয়, আপনারা তো দীর্ঘ সময় ধরে রিহার্সেল করেন, আমরা আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য একটু কথা বলা বা পরামর্শের জন্য আটকে যাই। তিনি বললেন, তোমাকে এমনিতেই বললাম, আমরা তো অনুষ্ঠানের জন্য মন্টু মামার (মোস্তফা মনোয়ার) পরামর্শ নিই। সুতরাং কি আর করার আছে তোমাদের লাগলে চলে আসবে। আমাদের রিহার্সেল যতক্ষণ করার ততক্ষণই করবো।

একজন শিল্পীর এই কথা আমরা রিহার্সেল অনেকক্ষণ ধরেই করবো। এটা আজকাল হারিয়ে গেছে। অনুষ্ঠান করা মানেই শো-এর আয়োজন করো, স্টেজে দেখিয়ে দেবো। কিন্তু অঞ্জনার মতো শিল্পীরা ভালো কিছু করার জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন। রিহার্সেল করেছেন দীর্ঘক্ষণ ধরে। ভালো কিছু দর্শকদের উপহার দেয়ার জন্য অঞ্জনাদের চেষ্টা অব্যাহত থেকেছে। সেই সময় নাচের বিভিন্ন দল দেশের বাইরে অনুষ্ঠানে যেতো। সেই সমস্ত দলে অঞ্জনা ছিলেন নিয়মিত শিল্পী। ফিরে এসে তিনি প্রচুর ছোট ছোট উপহার দিতেন আমাদের। যে দেশে যেতেন সে দেশের গল্প শোনাতেন। তার এই গল্প বলার অভ্যাস যখন যেখানে যে অনুষ্ঠান হয়েছে অঞ্জনাকে দেখেছিÑ এফডিসিতে বা চ্যানেল আইয়ের যেকোনো অনুষ্ঠানে বেশ আগেই চলে আসতেন তিনি। বিশেষ করে চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে আমি বলতে পারি- তিনি এসেই গল্প করতেন, নানা রকম পরামর্শ দিতেন। যেতেনও বেশ দেরি করে। অর্থাৎ শিল্পের সঙ্গে শিল্পীদের সম্পৃক্ত থাকতে তিনি পছন্দ করতেন।

তখন তিনি সিনেমায় নাম লিখিয়েছেন। তার অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সেতু’ হলেও প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘দস্যু বনহুর’। ‘দস্যু বনহুর’ সিরিজ তখন তুমুল জনপ্রিয়। ১৯৭৬ সালে শামসুদ্দিন টগর পরিচালিত ‘দস্যু বনহুর’ সিনেমায় তিনি নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তার বিপরীতে ছিলেন নায়ক সোহেল রানা। তিনি যখন টেলিভিশনে আসতেন আমরা অবাক বিস্ময়ে তাকে দেখতাম নায়িকা হিসেবে। তখন তাকে নায়িকা আপা বলে ডাকতাম।

তিনি বলতেন, আমি নৃত্যশিল্পী হিসেবেই সব সময় পরিচিত থাকতে চাই।
তারপরও ঘটনাযজ্ঞে তিনি খ্যাতিমান নায়িকা হয়েছেন। প্রায় শতাধিক বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এর বাইরে যৌথ প্রযোজনার সবচেয়ে বেশি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। ৬০টি দেশের সিনেমায় তিনি অভিনয় করেছেন নায়িকা হিসেবে। যার সাফল্যের এত বড় একটি তালিকা রয়েছে। সাফল্যের মুকুট হিসেবে তিনি তিনবার নৃত্যশিল্পী হিসেবে এবং দুইবার অভিনয়শিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। তালিকাটা এত দীর্ঘ তবুও তাকে দীর্ঘ সময় অসহায়ের মতো থাকতে হয়েছে। হাসপাতালে যে ক’দিন ছিলেন, শিল্পীরা কেউ কেউ তাকে দেখতে গিয়েছেন। তারপরও হাসপাতালের জীবন তো সুখকর নয়। নানান হিসাব-নিকাশ করতে হয়। অঞ্জনার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শুনেছি প্রথম তিনি যে হাসপাতালে ছিলেন সেই হাসপাতালের বিল দিতে হয়েছে তার সমস্ত গয়না বিক্রি করে। অঞ্জনা বেশ কয়েকটি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করেছিলেন। প্রথম যে নাটকটিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন, সেই নাটকটি ছিল আমার লেখা। কাজী কাইয়ুম ছিলেন সেই নাটকের প্রযোজক। তখন তিনি নায়িকা হয়ে গেছেন। আমরা চিন্তা করলাম অঞ্জনা সুলতানাকে দিয়ে অভিনয় করানোর। এই নাটকে তাকে ভালো মানাবে। গল্পটা হলো- একটি পাহাড়ি এলাকায় কয়েকজন পর্যটক আটকে গেছে, তারপর তারা সেখান থেকে কিভাবে উদ্ধার পেলেন, সেই গল্পের নায়ক ছিলেন বুলবুল আহমেদ। প্রযোজক কাজী কাইয়ুম। কাজী কাইয়ুমের সঙ্গে ছিলেন শেখ রিয়াজউদ্দিন বাদশা। রিয়াজউদ্দিন বাদশা, অঞ্জনা সুলতানাকে রাজি করিয়েছিলেন। অঞ্জনা সুলতানা সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন এবং খুব সুন্দর অভিনয় করেছিলেন তিনি। তারপর তিনি আরও বেশ কয়েকটা নাটকে অভিনয় করেছিলেন। কিন্তু আমার গর্ব তিনি আমার লেখা নাটকে প্রথম অভিনয় করেছিলেন। তারচেয়ে বড় অহংকার এই নায়িকার ‘ঢাকার শহর আইসা আমার আশা পুরাইছে’ গানে অথবা ‘দস্যু বনহুর’ সিনেমায় অভিনয় দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি। তিনি পরবর্তী জীবনে আমাদের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে আমাদের সঙ্গে ছিলেন। তিনি চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে ছিলেন। অঞ্জনা’র সবচেয়ে কাছের বন্ধু প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন এসেছেন চ্যানেল আইতে। সাবিনা ইয়াসমিন এবং অঞ্জনা ছিলেন হরিহর আত্মা। সাবিনা ইয়াসমিন তার প্রিয় বন্ধুটিকে দেখতে এসেছেন। অঞ্জনাও এসেছেন কিন্তু তিনি নিথর, স্থির দেহ তার। তার সেই প্রিয় বন্ধুটিকে দেখে বুকে জড়িয়ে নিতে পারছেন না। চোখ বুজে আছে লাশবাহী গাড়িতে। সাবিনার চোখ ছলছল। অঞ্জনা কোনো কথা বলছেন না। কোনো সাড়া নেই নীরবে শুয়ে আছেন।
তার মতো শিল্পীবান্ধব মানুষ আমাদের চলচ্চিত্র বা টেলিভিশন জগতে খুব কম শিল্পীই ছিলেন। অঞ্জনা আপনি যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

mzamin

বৃটেনে ক্রমবর্ধমান চাপে হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ

বাংলাদেশের পতিত সরকারের ঘনিষ্ঠজনদের থেকে ফ্ল্যাট উপহার পাওয়ার খবর প্রকাশের পর ক্রমবর্ধমান তদন্তের চাপে পড়েছেন বৃটেনের সিটি মিনিস্টার টিউলিপ সিদ্দিক। কোনো রকম অর্থ খরচ করা ছাড়াই ওই ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন টিউলিপ। এ তথ্য সামনে আসার পর তার ওপর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে এ রিপোর্ট করেছে অনলাইন ব্লুমবার্গ। খবরে বলা হয়েছে, বৃটেনে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছ থেকে সম্পত্তি উপহার নেয়ার বিষয়টি সামনে আসায় টিউলিপ বেশ বেকায়দায় পড়তে পারেন। ব্লুমবার্গ লিখেছে, শুক্রবার ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে- টিউলিপ ২০০৪ সালে কোনোরকম অর্থ প্রদান ছাড়াই দুই শয়নকক্ষবিশিষ্ট একটি অ্যাপার্টমেন্ট পেয়েছিলেন। এর অবস্থান বৃটেনের কিংস ক্রসের কাছে। বৃটেনের ভূমি নিবন্ধন সংক্রান্ত নথিপত্রের বরাতে ওই তথ্য প্রকাশ করা হয়। তথ্যানুযায়ী অ্যাপার্টমেন্টটি টিউলিপকে উপহার দিয়েছিলেন আব্দুল মোতালিফ নামের এক ব্যক্তি। তিনি টিউলিপের খালা বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার  নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত একজন ডেভেলপার। গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিতর্কিত এসব সম্পত্তির কথা সামনে এসেছে। এসব তথ্য প্রকাশ্যে আসায় টিউলিপের ওপর তদন্তের চাপ বাড়ছে। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাতের দায়েও টিউলিপের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ক্রমাগতভাবে বৃটেনের একজন এমপি’র বিরুদ্ধে এমন বিতর্কিত সম্পদের তথ্য সামনে আসাটা বৃটিশ সরকারের জন্যও বেশ বিব্রতকর। কেননা, সিটি মিনিস্টার হিসেবে টিউলিপ সিদ্দিকের ভূমিকা দেশটিতে আর্থিক দুর্নীতি মোকাবিলা করা। কিন্তু তার বিরুদ্ধেই এসব দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসায় তার দায়িত্ব নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ব্লুমবার্গ বলছে, এই অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেন নি টিউলিপ। তবে তার একজন মুখপাত্র ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের কাছে দাবি করেছেন, টিউলিপ সিদ্দিকের এই সম্পত্তি বা অন্য যেকোনো সম্পত্তির মালিকানার সঙ্গে আওয়ামী লীগকে সমর্থনের ধারণাটি স্পষ্টতই ভুল হবে।
mzamin

যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে ইলন মাস্কের হস্তক্ষেপের নিন্দা করেছেন বৃটিশ মন্ত্রী

বৃটিশ সরকারের একজন সিনিয়র মন্ত্রী দেশের রাজনীতিতে ইলন মাস্কের হস্তক্ষেপকে "ভুল " বলে সমালোচনা করেছেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর ‘পছন্দের প্রার্থী’ ডনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের পর থেকেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আচমকা সক্রিয় হয়ে উঠেছেন ধনকুবের ইলন মাস্ক। প্রথমে জার্মানি এবং তার পরে বৃটেনের রাজনীতিতে তিনি অতি-দক্ষিণপন্থী অংশকে মদত দিয়ে ওই দুই দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বৃটেনের অতি-দক্ষিণপন্থীদের হয়ে গলা ফাটিয়ে মাস্ক তোপ দাগছেন বর্তমান সরকারকে। মাস্কের বক্তব্য, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়র স্টার্মার ফৌজদারি বিচার সংক্রান্ত দফতরের ডিরেক্টর থাকাকালীন ধর্ষকদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ওল্ডহ্যামে শিশুদের যৌন নিপীড়নের তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রী জেস ফিলিপসের জেলে থাকা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি। যার উত্তরে বৃটিশ সরকার জানিয়ে দিলো না জেনে না বুঝে মন্তব্য করা উচিত নয়।  বৃটেনের  স্বাস্থ্য সচিব ওয়েস স্ট্রিটিং আইটিভি নিউজ টেলিভিশনকে বলেছেন - 'ইলন মাস্কের কিছু সমালোচনা, আমি মনে করি ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে তিনি করেছেন।  তিনি ভুল তথ্য দিয়েছেন।  তা সত্ত্বেও  আমরা ইলন মাস্কের সাথে কাজ করতে ইচ্ছুক।  আমার মনে হয় আমাদের এবং অন্যদের সাহায্য করার জন্য তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে । আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার  মোকাবেলা নিজেরাই করতে পারবো। সুতরাং তিনি যদি আমাদের সাথে কাজ করতে চান এবং নিজের হাতা গুটিয়ে রাখতে  চান তবে আমরা  স্বাগত জানাব। 'এক দশকেরও বেশি আগে আবির্ভূত রচডেল, রদারহ্যাম এবং ওল্ডহ্যাম সহ বেশ কয়েকটি   শহরে মেয়েদের উপর ব্যাপক নির্যাতন বিতর্কের সূত্রপাত করে। একের পর এক আদালত মামলার ফলে কয়েক ডজন পুরুষকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, যাদের বেশিরভাগই দক্ষিণ এশীয় মুসলিম বংশোদ্ভূত। নির্যাতনের শিকার ছিল দুর্বল, শ্বেতাঙ্গ  মেয়েরা। পুলিশ এবং সমাজকর্মীরা কীভাবে অপব্যবহার বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে সে সম্পর্কে একাধিক অফিসিয়াল অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে কিছু ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা বর্ণবাদের বশবর্তী হয়ে কোনো পদক্ষেপ করেননি। যৌন নিপীড়নের তদন্ত ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ তুলে বৃটিশ সরকারের বিরাগভাজন হলেন মাস্ক।

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

সৌদি আরবের আরামকো তিনবার এসেছিল, বাংলাদেশে স্বাগত জানানো হয়নি: সৌদি রাষ্ট্রদূত

বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের জন্য চেষ্টা করেও পারেনি সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরামকো। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদল ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিন দফায় বাংলাদেশে এলেও স্বাগত জানানো হয়নি। এরপরও বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আরামকো বাংলাদেশে তেল শোধনাগার নির্মাণে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।

আজ রোববার ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসুফ ঈসা আলদুহাইলান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক আলোচনায় এমন অভিযোগ করেছেন। একই অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তৃতায় পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছি, আমাদের দেশ সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগবান্ধব, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি সব সময় সত্যি নয়। বর্তমান সরকার অবস্থার পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আমরা ব্যবসা সহজ করার ব্যবস্থা নিচ্ছি।’ এখন যদি সৌদি বিনিয়োগকারীরা আসেন তবে ভালো একটি পরিবেশ দেখতে পাবেন বলে উল্লেখ করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা।

সৌদি রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আজ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ‘সৌদি-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি: প্রবণতা, মূল চ্যালেঞ্জ এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন। সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনার বিষয়ে নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের সহায়তায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে মন্ত্রণালয় এবারই প্রথম কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো।

সৌদি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আরামকোর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনবার বাংলাদেশে এসেছিল, কিন্তু তাদের কেউ স্বাগত জানায়নি। যখন তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রী, সচিব ও আমলাদের কাছে যায়— তাদের পথ আটকে দেওয়া হয়। কারণ, কিছু লোক ছিলেন যাঁরা শুধু নিজেদের স্বার্থটাই দেখেছেন। কিন্তু আমরা অতীত নিয়ে কথা বলব না। আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলব।’ তিনি বলেন, আরামকো বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী। সংস্থাটির বঙ্গোপসাগরে একটি তেল শোধনাগার স্থাপন করতে চায়। এখানে একটি তেল শোধনাগার থাকলে এবং তেলজাতীয় পণ্য উৎপাদন করলে সেখান থেকে বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলে পণ্য সরবরাহ করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, ‘যদি আমরা চট্টগ্রাম থেকে জেদ্দা বা দাম্মামের মধ্যে একটি সুমদ্রপথ তৈরি করতে পারি, তবে সেটি বাংলাদেশ ও এই অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। এই তেল শোধনাগারের পণ্য চীন, ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে পাঠানো সম্ভব।’

আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দুর্নীতি ও অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি অতীতে অনেক ভুল নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল। এ জন্য মূল্য দিতে হচ্ছে। বিগত সরকারের সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান স্যামসাং কোম্পানিকে বিমানবন্দর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সৌদি কোম্পানি আরামকোকেও বিমানবন্দর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা সংস্কারের লক্ষ্যে এক থেকে দেড় বছরের জন্য এসেছি। আমরা বেশি দিন থাকব না। কিছু ভালো কাজের উদাহরণ রেখে যেতে চাই। আমরা পদচিহ্ন রেখে যাব, অন্যরা যেন সে পথে এগিয়ে যেতে পারেন।’

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। আমাদের জন্য ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক বিবেচনায় সৌদি আরবের গুরত্ব অনেক। অনেক দেশ আমাদের মুক্ত বাণিজ্য করার কথা বলছে। আমরা মুক্ত বাণিজ্য করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। সরকারের একার পক্ষে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের সহায়তা দরকার।’

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য অনেক কিছু করতে হবে বলে মন্তব্য করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে। বর্তমান সরকার অবস্থার পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে। এখন সৌদি বিনিয়োগকারীরা এলে ভালো পরিবেশ দেখতে পাবেন।

পররাষ্ট্রসচিব রাষ্ট্রদূত মো. জসীম উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব) নজরুল ইসলাম এবং পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ও নির্বাহী পরিচালক এম মাসরুর রিয়াজ।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসুফ ঈসা আলদুহাইলান আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন। ঢাকা, ৫ জানুয়ারি
সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত ঈসা ইউসুফ ঈসা আলদুহাইলান আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন। ঢাকা, ৫ জানুয়ারি। ছবি: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

কেন তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে? by হাসান পিন্টু

১৮ বছরের কিশোর মো. আরিফ। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে একমাত্র ছেলে। বাবা পেশায় দিনমজুর। একমাত্র ছেলেকে নিয়েই বহু স্বপ্ন ছিল বাবা-মায়ের। আরিফ ভোলার লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদপুর এলাকার সেকান্তর মুন্সি বাড়ির মো. ইউসুফের ছেলে। একই ইউনিয়নের লর্ডহার্ডিঞ্জ ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলিম ২য় বর্ষে পড়ালেখা করতো আরিফ। তবে পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে সে আর বেশি পড়তে পারেনি। কিশোর বয়সেই পাড়ি দেয় ঢাকায়। গত বছরের জুলাই মাসে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে খাবার হোটেলে কাজ শুরু করে।

জুলাই মাসের ১৯ তারিখে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে যাত্রাবাড়ী এলাকায় নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। পুলিশের ছোড়া একটি গুলি আরিফের ডান চোখের সামনে দিয়ে ঢুকে বেরিয়ে যায় মাথার পেছন দিয়ে। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আরিফকে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতাল নেয়া এবং তার লাশ বাড়িতে পাঠানো পর্যন্ত সঙ্গে ছিলেন তার মামাতো ভাই মো. শাহাবুদ্দিন। তিনি জানান, ১৯শে জুলাই হোটেলের জন্য বাজার করতে গিয়ে যাত্রাবাড়ীতে আন্দোলনকারী ও পুলিশের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে আরিফ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। একটি গুলি তার চোখের সামনে দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে যায়। সেখানে থাকা লোকজনের মাধ্যমে জানতে পারি আরিফ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। এরপর দ্রুত সেখানে গিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা আরিফকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা না পেয়ে পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আরিফকে মৃত ঘোষণা করেন। পরদিন রাত ৯টার দিকে আরিফের মরদেহ ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহন উপজেলায় নেয়া হয়।
আরিফের মা ফরিদা বেগম বলেন, মারা যাওয়ার আগের রাতেও তার সঙ্গে কথা বলেছি। ওই রাতে আমার ছেলে আরিফ ফোন দিয়ে আমি এবং তার বাবাসহ পরিবারের অন্যদের খোঁজ নিয়েছে। পরদিন খবর আসে আরিফ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। সন্তান হারানোর ৫ মাস পেরিয়েছে। আজও তার কথা মনে করে ক্ষণে ক্ষণে কাঁদছি। আমার ছেলের দোষটা কী ছিল? কেন তাকে এমন নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে? যাদের নির্দেশে এবং যারা আমার ছেলেকে হত্যা করেছে আমি তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
বাবা মো. ইউসুফ বলেন, আমার ৬ সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে ছিল আরিফ। তার চিন্তায় একেবারে ভেঙে পড়েছি। ওর মা সারাক্ষণ কাঁদতে থাকে। অভাবের সংসারে পরিবারের হাল ধরতে সে ঢাকায় গিয়েছিল। সেখানে যাওয়ার ১৭-১৮ দিনের মাথায় পুলিশের গুলিতে মারা যায়। আমি কখনো ভাবিনি আমার ছেলেটা এত নির্মমভাবে চিরতরে হারিয়ে যাবে। এমনটা জানলে তাকে ঢাকায় যেতে দিতাম না। তিনি বলেন, আরিফের মাকে কোনোভাবেই বোঝাতে পারছি না। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায় সে। ভবিষ্যতে সংসারের উপার্জন করার মতো ছেলেই ছিল আমাদের একমাত্র ভরসা। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহ আজিজ বলেন, এই উপজেলায় আন্দোলনে যারা নিহত এবং আহত হয়েছেন তাদের তালিকা প্রস্তুত করে এরইমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকারিভাবে নিহত পরিবারকে ৫ লাখ টাকা এবং আহতদের ১ লাখ টাকা করে অনুদান প্রদান করা হবে।

mzamin