Showing posts with label থাইল্যান্ড. Show all posts
Showing posts with label থাইল্যান্ড. Show all posts

Sunday, April 5, 2026

থাইল্যান্ডের ডাবের পানি মাত করল চীনের বাজার

থাইল্যান্ডে বেড়ে ওঠা পংসাকর্ন পংসাকের প্রিয় পানীয় ছিল কচি নারকেলের পানি। দেশজুড়ে রাস্তার দোকানে সহজলভ্য এ পানীয় আসে সেখানকার উর্বর মাটিতে ফলানো সবুজ কচি নারকেল থেকে। কিন্তু বিদেশে গিয়ে তিনি এ স্বাদ খুঁজে পাননি। সেই শূন্যতার বোধ থেকে তাঁর মধ্যে এক ব্যবসায়িক ধারণা তৈরি হয়। সেটা হলো থাই নারকেলের পানি বোতলজাত করে বিদেশের বাজারে পৌঁছে দেওয়া।

৪৫ বছর বয়সী পংসাকর্ন ব্যাংকক থেকে অনলাইন সাক্ষাৎকারে ফোর্বস ম্যাগাজিনকে বলেন, ‘আমাদের নারকেলের ঘ্রাণ দারুণ। তাই ভাবলাম, কেন এই ভালো জিনিসটা আমরা দুনিয়ার সামনে তুলে ধরব না?’ তাঁর প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি জেনারেল বেভারেজ ১২ বছর আগে আইএফ ব্র্যান্ডের নামে বোতলজাত নারকেলের পানি বাজারে নিয়ে আসে। বর্তমানে তাঁর কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফবিএইচের মাধ্যমে এই ব্র্যান্ড বিদেশে বিক্রি হচ্ছে।

চীনের মূল ভূখণ্ডে এখন আইএফ সর্বাধিক বিক্রীত নারকেলের পানির ব্র্যান্ড। সাংহাইভিত্তিক চায়না ইনসাইটস ইন্ডাস্ট্রি কনসালট্যান্সির তথ্য অনুযায়ী, বাজারে তাদের অংশীদারত্ব এক-তৃতীয়াংশের বেশি—আইএফ একাই ২৮ শতাংশ এবং তাদের আরেক পণ্য ইনোসোকো ৬ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আছে আরও অনেক ব্র্যান্ড, যেমন স্থানীয় ডেলগার্ডেন (যার বাজার হিস্যা ৫ শতাংশের কম), দেশীয় চিংশাং ড্রিংক, মার্কিন ভিটা কোকো ও থাইল্যান্ডের মালি গ্রুপের মালি কোকো।

পংসাকর্ন আত্মবিশ্বাসী, এ অবস্থান টেকসই হবে। তিনি বলেন, ‘নারকেলের পানি বললেই আইএফের নাম আসে।’ ২০২৪ সালে কোম্পানির বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় ১৫৮ মিলিয়ন বা ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার; আগের বছরের চেয়ে যা ৮০ শতাংশ বেশি। নিট মুনাফা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ৩৩ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এই আয়ের ৯৭ শতাংশই আসে চীন থেকে।

চীনের বাজারে এ সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে পংসাকর্ন এবার আরও বিস্তৃত বাজারে চোখ রাখছেন। চলতি বছরের জুন মাসে হংকং শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় আইএফবিএইচ। এর মাধ্যমে ১৪৫ মিলিয়ন বা ১৪ কোটি ৫০ ডলার তোলা হয়। এই কোম্পানির শেয়ারের প্রতি আকৃষ্ট হয় বড় বিনিয়োগকারীরা—যেমন চারোয়েন পকফান্ড গ্রুপ, ইউবিএস ও চীনের হংশান ভিসি ফার্মের সহযোগী তহবিল এই কোম্পানির শেয়ার কেনে।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরও পংসাকর্ন পংসাকের হিস্যা ৬০ শতাংশ। বর্তমানে তাঁর শেয়ারমূল্য দাঁড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়ন বা ৭০ কোটি ডলার। ফলে তিনি এখন থাইল্যান্ডের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তা। এখানেই থেমে থাকতে চান না তিনি; আইপিও থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ ব্যয় করবেন চীনের বাইরের বাজার সম্প্রসারণে।

বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির কারণে নারকেলের পানি ও উদ্ভিদভিত্তিক পানীয় জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যুক্তরাজ্যের ইউরোমনিটরের হিসাবে, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিশ্ববাজারে এ ধরনের পানীয়র বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ শতাংশ। সফট ড্রিংকস শিল্পের গড় প্রবৃদ্ধির (৬.৬%) চেয়ে যা অনেক বেশি।

পংসাকর্নের লক্ষ্য এখন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বাজারে অবস্থান শক্তিশালী করা। বর্তমানে এ দুই দেশ থেকে রাজস্ব আসে অতি সামান্যই। অথচ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে বড় নারকেলের পানির বাজার, যেখানে ২০২৪ সালে বিক্রি হয়েছে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১৪০ কোটি ডলারের পানীয়। তবে সেখানে প্রবেশ সহজ নয়। কেননা, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে ভিটা কোকোর অবস্থান শক্তিশালী।

পংসাকর্ন জানাচ্ছেন, তিনি এখনো থাইল্যান্ডকেই মূল সরবরাহকেন্দ্র হিসেবে ধরে রাখতে চান। এর মধ্য দিয়ে ‘থাই স্বাদকে’ বিশ্বদরবারে তুলে ধরা সম্ভব। তবে প্রয়োজনে অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশ থেকেও সরবরাহ নেওয়ার পরিকল্পনা আছে।

চীনে কৌশলগত সময়োপযোগী পদক্ষেপ থেকে তারা সফলতা অর্জন করেছে। ২০১৫ সালে প্রথমে হংকংয়ে এই পণ্য বিক্রি শুরু হয়, এরপর ২০১৭ সালে চীনের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করে এই পানীয়—প্রথমে আলিবাবার টিমল ও জেডি ডটকমে অনলাইন বিক্রির মাধ্যমে। পরে যোগ হয় নতুন স্বাদের ভ্যারিয়েশন—যেমন জেসমিন চালের স্বাদযুক্ত নারকেলের পানি কিংবা আম-নারকেলের দুধ। তরুণ ভোক্তাদের টার্গেট করে জনপ্রিয় তারকা শিয়াও ঝানকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করা হয়।

কোম্পানির মডেল হলো অ্যাসেট–লাইট—অর্থাৎ উৎপাদন থেকে বিতরণ পর্যন্ত অনেক কাজ আউটসোর্সে করা হয়, যদিও কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আগামী দুই বছরে তারা সরবরাহের উৎস আরও বহুমুখী করতে চায়।

পংসাকর্নের পথচলা শুরু হয়েছিল পারিবারিক ব্যবসা থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতক শেষে পরিবারের মালিকানাধীন সুয়ান গ্রুপে কাজ করেন। ২০১১ সালে দেশে ফিরে তিনি গড়ে তোলেন জেনারেল বেভারেজ, প্রথমে বিভিন্ন ফলের জুস দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ২০১৫ সালে তিনি নারকেলের পানিতে পুরোপুরি মনোনিবেশ করেন। তাঁর নিজের ভাষায়, ‘আমি যখন কোনো কিছুর মধ্যে ডুবে যাই, তখন কোনো পিছুটান থাকে না; পেছনে ফিরে তাকানোর অবকাশ নেই আমার।’

কোভিড মহামারিতে স্বাস্থ্যকর পানীয়র চাহিদা বেড়ে গেলে কোম্পানিটি চাহিদা মেটাতে হিমশিম খায়। তখন আন্তর্জাতিক ব্যবসাকে আলাদা করে আইএফবিএইচ গড়ে তোলা হয়। এখন রাজস্বের প্রায় ৯৮ শতাংশ আসে নারকেলের পানি থেকে। ভবিষ্যতে তিনি ফলের রস, থাই মিল্ক টি, স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস ও বিকল্প প্রোটিন পণ্যে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন।

পংসাকর্ন বলেন, নারকেলের পানি আজ হয়তো ছোট একটি খাত, কিন্তু এর সম্ভাবনা কমলার রসের মতো। সেই সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণের চিন্তাও করছেন তিনি। নতুন পানীয় বাজারে আনার পাশাপাশি পংসাকর্ন স্বাস্থ্যকর পানীয়, উদ্ভিদভিত্তিক স্ন্যাকস ও বিকল্প প্রোটিনে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছেন তিনি। এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন কোম্পানি অধিগ্রহণের জন্য ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার বরাদ্দ রেখেছেন।

ডাব

Wednesday, March 25, 2026

ইরানের সম্মতির পর হরমুজ প্রণালি পার হলো থাই তেলবাহী ট্যাংকার

থাইল্যান্ড ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের পর একটি থাই তেলবাহী ট্যাংকার নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। ব্যাংচাক করপোরেশন এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটকেও সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি অনুরোধ করেছিলাম যে থাই জাহাজগুলোর যদি এই প্রণালি দিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে তারা নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করতে সহায়তা করতে পারে কি না?’

থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘তারা (ইরান) ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে তারা বিষয়টি দেখবে। পাশাপাশি কোন কোন জাহাজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করবে, আমাদের কাছে সেগুলোর নাম চেয়েছে।’

বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ রয়েছে। তবে ইরানের সম্মতি নিয়ে কিছু তেলবাহী ট্যাংকার চলাচলের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর জ্বালানি-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ১১ মার্চ, ২০২৬
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর জ্বালানি-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ১১ মার্চ, ২০২৬ ছবি: রয়টার্স


Monday, December 1, 2025

বন্যা ও ভূমিধসে এশিয়ার তিন দেশে মৃতের সংখ্যা ছয় শতাধিক

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিরল এক ট্রপিক্যাল ঝড়ে সৃষ্ট প্রবল বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। সপ্তাহজুড়ে চলা দুর্যোগে ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রোববার প্রকাশিত সরকারি হিসাব বলছে- ইন্দোনেশিয়ায় ৪৩৫, থাইল্যান্ডে ১৭০ এবং মালয়েশিয়ায় ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত তিন দেশের বহু অঞ্চলে পানি নামতে শুরু করলেও এখনো বিপুল সংখ্যক মানুষ গৃহহীন। তিন দেশে মোট ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। এর মধ্যে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে প্রায় ৩০ লাখ এবং পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ায় ১১ লাখ মানুষ মারাত্মকভাবে দুর্ভোগে রয়েছে।

অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের ওপারে শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড়ে ২০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন আরও ১৯১ জন। দেশটিতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি।

ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়ায় মৃতের সংখ্যা একদিনে ৩০৩ থেকে বেড়ে ৪৩৫ জনে পৌঁছেছে। পশ্চিম সুমাত্রার তিন প্রদেশে টানা বৃষ্টি ও ভূমিধসে বহু এলাকা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ায় কোথাও কোথাও বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পালেমবায়ান শহরের উপর দিয়ে নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার উড়ে যাওয়ার সময় দেখা গেছে- বড় বড় এলাকা এখনও পানির নিচে, সেখানে ঘরবাড়ি ভেসে গেছে। হেলিকপ্টার নামতেই খাদ্যের অপেক্ষায় থাকা ভিড় জমায় স্থানীয়রা। ক্ষতিগ্রস্তদের হতাশা থেকে কোথাও কোথাও ত্রাণবাহী লাইন লুটের ঘটনাও ঘটেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে এখনো ৪০৬ জন নিখোঁজ এবং অন্তত ২ লাখ ১৩ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত।

থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া
থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৭০ হয়েছে। শুধু সংখলা প্রদেশেই ১৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার একদিনে হাট ইয়াই শহরে ৩৩৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। যা গত ৩০০ বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। এদিকে মালয়েশিয়ায় দুর্যোগ কিছুটা কমলেও এখনও ১৮ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে। দেশটির আবহাওয়া দপ্তর ঝড় ও অবিরাম বৃষ্টির সতর্কতা তুলে নিয়েছে এবং বেশির ভাগ এলাকায় আকাশ পরিষ্কার থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে। প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে মালয়েশিয়ার কিছু অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। থাইল্যান্ডে আটকা পড়া ৬২০০ এর বেশি মালয়েশিয়ান নাগরিককে উদ্ধার করা হয়েছে। রোববার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম সুমাত্রায় বসবাসরত নাগরিকদের দূতাবাসে নিবন্ধনের আহ্বান জানায়। একই সঙ্গে জানানো হয়- এলাকার একটি ভূমিধসে ৩০ বছর বয়সী এক মালয়েশিয়ান নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।

mzamin

Tuesday, November 25, 2025

কফিন থেকে ভেসে এল সাহায্যের আকুতি, দেখা গেল তিনি বেঁচে আছেন

৬৫ বছর বয়সী একজন নারী প্রায় দুই বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। রোববার হঠাৎ অচেতন হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা ধরে নেন তিনি মারা গেছেন। পরে তাঁকে কফিনে ঢোকানো হয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য চার ঘণ্টা দূরত্বের একটি মন্দিরে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর কফিনের ভেতর থেকে শব্দ শোনা যায়। খুলে দেখা যায়, তিনি মারা যাননি। বেঁচে আছেন।

বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটেছে থাইল্যান্ডে। ওই নারীর নাম চনথিরোট। তিনি ফিটসানুলোক প্রদেশের বাসিন্দা। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য তাঁর কফিন আনা হয় ব্যাংককের কাছে একটি মন্দিরে। সেখানে বিনা মূল্যে দরিদ্রদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্তু সৎকারের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কফিনের ভেতর থেকে ক্ষীণ শব্দ শোনা যায়। পরিবারের সদস্যরা কফিন খুলে বিস্মিত হয়ে যান। দেখেন ওই নারী থরথর করে কাঁপছেন আর মুখের সামনে থাকা মাছি তাড়াচ্ছেন। অবিশ্বাস্য দৃশ্যটি একটি ভিডিওতেও ধরা পড়েছে। ভিডিওতে হতবাক আত্মীয়দের ওই নারীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ওই নারীর ভাই মঙ্গকোল (৫৭) বলেন, তাঁরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার আগেই বোনের মৃত্যু-সম্পর্কিত কাগজপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। তবে বোনকে জীবিত দেখতে পেয়ে তিনি খুব খুশি হয়েছেন।

মন্দিরের কর্মী থম্মানুন কফিনটি প্রধান হলের দিকে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় হঠাৎ ভেতর থেকে ক্ষীণকণ্ঠে সাহায্যের আকুতি শুনতে পান।

এরপর চনথিরোটকে চিকিৎসকদের কাছে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা বলেন, ওই নারীর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়নি। তাঁর রক্তে শর্করার মাত্রা এতটাই কমে গিয়েছিল যে পরিবার তাঁকে মৃত ধরে নিয়েছিল।

সৎকারের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কফিনের ভেতর থেকে নারীর ক্ষীণ শব্দ শোনা যায়
সৎকারের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কফিনের ভেতর থেকে নারীর ক্ষীণ শব্দ শোনা যায়। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

Friday, August 29, 2025

ফোনালাপ ফাঁস, পদচ্যুত হতে পারেন থাইল্যান্ডের বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা

থাইল্যান্ডের সাময়িকভাবে বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে পদচ্যুত করার বিষয়ে আজ শুক্রবার সিদ্ধান্ত নেবেন দেশটির সাংবিধানিক আদালত। কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনায় তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

আদালতের রায়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা পদচ্যুত হলে সেটি হবে সিনাওয়াত্রা পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা। এ রায় থাইল্যান্ডকে নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আদালতের রায় পেতংতার্নের বিরুদ্ধে গেলে ২০০৮ সালের পর তিনি হবেন আদালতের রায়ে পদচ্যুত হওয়া থাইল্যান্ডের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী। সমালোচকেরা বলছেন, দেশটির বিচারকেরা মূলত রাজতন্ত্র-সামরিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন।

এ রায়ের মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ডে আগাম নির্বাচনের পথ খুলে যেতে পারে।

আদালতে পেতংতার্ন ও তাঁর বাবা সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে চলা গুরুত্বপূর্ণ তিনটির মামলার দ্বিতীয়টির রায় হবে আজ।

৭৬ বছর বয়সী থাকসিন সিনাওয়াত্রা ছিলেন থাইল্যান্ডের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নায়ক। ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। গত সপ্তাহে রাজতন্ত্র অবমাননার অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। তবে ১৬ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে ২০২৩ সালে দেশে ফেরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি মামলায় আবার তাঁকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।

পেতংতার্ন শেষ পর্যন্ত পদচ্যুত না হলেও খুব বেশি লাভ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ধাক্কা এবং তাঁর ফেউ থাই পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বড় সংকটের মুখে আছে।

আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের থাইল্যান্ড স্টাডিজ প্রোগ্রামের ভিজিটিং ফেলো ও ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক নাপন জাতুস্রিপিতাক বলেন, ‘আমার মনে হয়, সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা একেবারেই শেষ হয়ে গেছে।’

গত মে মাসে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে সেনা বিরোধকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে পেতংতার্নকে কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে খুব আনুগত্যের সুরে কথা বলতে শোনা যায়। ওই সময় হুন সেনকে আঙ্কেল বলে সম্বোধন করেন পেতংতার্ন। তিনি একপর্যায়ে এক জ্যেষ্ঠ থাই সেনা কর্মকর্তার সমালোচনা করে তাঁকে নিজের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বলে উল্লেখ করেন।

এই ফোনালাপ থাইল্যান্ডে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কেউ কেউ পেতংতার্নের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ করেন। তিনি ওই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেও সাংবিধানিক আদালত নৈতিক অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা পিটিশন আমলে নেন এবং তাঁকে সাময়িকভাবে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করেন।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

Monday, July 28, 2025

থাই-কম্বোডিয়ার সামরিক শক্তি পরীক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র-চীন যেভাবে যুক্ত by ব্রাড লেনডন

থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে যে প্রাণঘাতী সংঘাত চলছে, তাতে একপাশে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ও কয়েক দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী। আর অপরপাশে রয়েছে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা কম্বোডিয়ার তুলনামূলকভাবে কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সামরিক শক্তি।

ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্স এক শতাব্দীরও আগে যখন তাদের সীমান্ত ভাগ করে দিয়েছিল, তখন থেকেই ব্যাংকক ও নমপেন নিজেদের সীমান্তে একটি বিতর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে লড়াই করে আসছে।

গত বৃহস্পতিবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এক ডজনের বেশি মানুষ নিহত, কয়েক ডজন আহত এবং দেড় লাখেরও বেশি বেসামরিক নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই সংঘাতের পেছনে দুই পক্ষের সামরিক ইতিহাস ও সক্ষমতার দিকে নজর দেওয়া যাক।

সামরিক শক্তিতে থাইল্যান্ড

থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী প্রতিবেশী কম্বোডিয়ার চেয়ে জনবল ও অস্ত্রশস্ত্রে অনেক বড়। থাইল্যান্ডের মোট ৩ লাখ ৬১ হাজার সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছে, যা কম্বোডিয়ার তিন গুণ। আর এই সেনাদের হাতে এমন সব অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে যা কম্বোডিয়ার সেনারা কেবল স্বপ্নই দেখতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস) ২০২৫ সালে তাদের এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ‘থাইল্যান্ডের বিপুল অর্থ বরাদ্দপ্রাপ্ত একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রয়েছে এবং এর বিমানবাহিনী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে সজ্জিত ও প্রশিক্ষিত বিমানবাহিনীগুলোর মধ্যে অন্যতম।’

অন্যদিকে, লোয়ি ইনস্টিটিউটের ২০২৪ সালের ২৭টি আঞ্চলিক দেশের সামরিক সক্ষমতার র‍্যাঙ্কিংয়ে থাইল্যান্ড ১৪তম স্থানে রয়েছে, যেখানে কম্বোডিয়া ২৩তম স্থানে। এই বৈষম্য হয়তো স্বাভাবিক, কারণ থাইল্যান্ডের জনসংখ্যা কম্বোডিয়ার চার গুণ এবং জিডিপি ১০ গুণেরও বেশি বড়। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আঞ্চলিক যুদ্ধ যেভাবে কম্বোডিয়া, লাওস এবং ভিয়েতনামকে গ্রাস করেছিল, থাইল্যান্ড সেখান থেকে মুক্ত ছিল। এমনকি পূর্বের ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের ধ্বংসযজ্ঞ থেকেও রেহাই পেয়েছিল দেশটি।

সামগ্রিকভাবে সামরিক, অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষমতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে লোয়ি এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্সে থাইল্যান্ড ১০ম স্থানে রয়েছে, যেটি মধ্যম মানের শক্তি হিসেবে বিবেচিত, ইন্দোনেশিয়ার ঠিক পেছনে কিন্তু মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে। লোয়ির র‍্যাঙ্কিংয়ে কম্বোডিয়াকে বিবেচনা করা হয়েছে এশিয়ায় একটি ক্ষুদ্র শক্তি হিসেবে। বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এবং লাওসের মতো দেশগুলোর সঙ্গে একই গ্রুপে অবস্থান কম্বোডিয়ার।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে থাইল্যান্ডের শক্তিশালী সম্পর্ক

থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে একটি প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে। দেশটির ওপর বহু বছর ধরে সামরিক বাহিনী, রাজতন্ত্র এবং অভিজাত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত একটি রক্ষণশীল শক্তিশালী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করে আছে।

সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে, ১৯৩২ সাল থেকে জেনারেলরা ২০টি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে, প্রায়শই গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে এবং সামরিক বাহিনী নিজেদের রাজতন্ত্রের একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর অনুসারে, একটি চুক্তির মাধ্যমে থাইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ।

১৯৫৪ সালে দুই দেশের মধ্যে সেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যেটি ম্যানিলা চুক্তি নামে পরিচিত। তখন থেকে দুই দেশের মধ্যে মিত্রতার সম্পর্ক। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় থাইল্যান্ড তাদের বিমান ঘাঁটিতে বি-৫২ বোমারু বিমানসহ মার্কিন বিমানবাহিনীর সরঞ্জামের জায়গা দিয়েছিল। হাজার হাজার থাই সেনা মার্কিন সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনামের পক্ষে যুদ্ধও করেছিল।

ওয়াশিংটন ও ব্যাংককের মধ্যে যে সম্পর্ক বজায় আছে, সেটি বেশ শক্তিশালী। থাইল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটোর বাইরে প্রধানতম মিত্র হিসেবে দেখে। এর ফলে থাইল্যান্ড বিশেষ সুবিধা পায়, যেটির মাধ্যমে কয়েক দশক ধরে তাদের অস্ত্র কর্মসূচির জন্য মার্কিন সমর্থন পেয়ে আসছে।

থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে কোবরা গোল্ড নামে একটি বাৎসরিক যৌথ সামরিক মহড়া চালিয়ে থাকে। ১৯৮২ সাল থেকে এ যৌথ মহড়া শুরু হয়েছিল, যদিও পরবর্তীতে আরও অনেকে এ মহড়ায় যুক্ত হয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী অনুসারে, এটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক সামরিক মহড়া।

কোবরা গোল্ড ছাড়াও থাই এবং মার্কিন বাহিনী একসঙ্গে ৬০টিরও বেশি মহড়া পরিচালনা করে এবং প্রতি বছর ৯০০টিরও বেশি মার্কিন বিমান এবং ৪০টি নৌ জাহাজ থাইল্যান্ডে আসে বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘ সামরিক ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও, সম্প্রতি থাই সামরিক বাহিনী তাদের সামরিক নীতিতে আরও নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। গত দশকে তারা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে। মিলিটারি ব্যালেন্সের প্রতিবেদন অনুসারে, কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে না থাকতে ইসরায়েল, ইতালি, রাশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইডেনের মতো দেশগুলোর সাহায্যে একটি শক্তিশালী দেশীয় অস্ত্র শিল্পও গড়ে তুলেছে তারা।

কম্বোডিয়ার চীনা সমর্থন

কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনী থাইল্যান্ডের তুলনায় একেবারে নবীন। আইআইএসএস অনুসারে, ১৯৯৩ সালে কমিউনিস্ট সরকারের বাহিনীর সঙ্গে দুটি অ-কমিউনিস্ট প্রতিরোধ বাহিনীর একত্রিত হয়ে এই সেনাবাহিনী গঠিত হয়।

আইআইএসএস বলে, ‘আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষায় চীন ও ভিয়েতনামের সঙ্গে কম্বোডিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য রাশিয়ার ওপর ঐতিহ্যগতভাবে নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও, কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের একটি প্রধান সরবরাহকারী দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে চীন।’ বেইজিং কম্বোডিয়ায় একটি নৌঘাঁটিও তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, থাইল্যান্ড উপসাগরে অবস্থিত রিম নৌঘাঁটি চীনা বিমানবাহী রণতরীগুলোকে আশ্রয় দিতে সক্ষম হবে।

কম্বোডিয়া ও চীন মে মাসে গোল্ডেন ড্রাগন নামে তাদের বাৎসরিক যৌথ সামরিক মহড়া সপ্তমবারের মতো সম্পন্ন করেছে, যা এ যাবৎকালের বৃহত্তম মহড়া হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল এবং এতে তাজা গোলাবারুদ নিক্ষেপের প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত ছিল। চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির ওয়েবসাইট অনুসারে, দুই দেশের মধ্যে এই প্রতিরক্ষাসম্পর্কটি এ বছর ‘একটি নতুন স্তরে পৌঁছাবে এবং একটি নতুন উন্নয়ন ঘটাবে’ বলে আশা করা হচ্ছে।

চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সিনিয়র কর্নেল উ কিয়ান ফেব্রুয়ারিতে এক সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে বলেছিলেন, ‘চীন ও কম্বোডিয়ার বন্ধুত্ব লোহার মতো শক্তিশালী। তারা সর্বদা একে অপরকে সমর্থন করে। দুই সামরিক বাহিনীর মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক এবং পাথরসম দৃঢ় ভ্রাতৃত্ব বিদ্যমান।’
কম্বোডিয়ার সামরিক বাহিনীর এই সমর্থন প্রয়োজন। আইআইএসএস রিপোর্ট অনুসারে, ‘কম্বোডিয়ার বর্তমানে তার সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আধুনিক সরঞ্জাম তৈরি করার ক্ষমতা নেই।’

উভয় পক্ষের অস্ত্রশস্ত্র

কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে শক্তিশালী হয়ে রয়্যাল থাই এয়ার ফোর্স ভালোভাবে সজ্জিত। আইআইএসএস অনুসারে অন্তত ১১টি আধুনিক সুইডিশ গ্রিপেন যুদ্ধবিমান এবং কয়েক ডজন পুরোনো মার্কিন এফ-১৬ ও এফ-৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার যুদ্ধ করতে সক্ষম কোনো বিমানবাহিনী নেই।

আর স্থলে থাইল্যান্ডের কয়েক শ মার্কিন ট্যাংক রয়েছে, যার মধ্যে ৬০টি আধুনিক। অন্যদিকে কম্বোডিয়ার প্রায় ২০০টি পুরোনো চীনা-ও সোভিয়েত নির্মিত ট্যাংক রয়েছে।
থাই সেনাবাহিনীর ৬০০টিরও বেশি আর্টিলারি রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৫৬টি শক্তিশালী ১৫৫ মি.মি যুদ্ধাস্ত্র এবং ৫৫০টিরও বেশি ১০৫ মি.মি টোয়েড গান রয়েছে। আইআইএসএস-এর তথ্য অনুসারে, কম্বোডিয়ার মাত্র এক ডজন ১৫৫ মি.মি যুদ্ধাস্ত্র রয়েছে, যার সঙ্গে প্রায় ৪০০টি ছোট টোয়েড আর্টিলারি রয়েছে।

থাইল্যান্ডের কাছে আছে মার্কিন কোবরা অ্যাটাক হেলিকপ্টার ও ১৮টি মার্কিন ব্ল্যাক হক যুদ্ধযান। কম্বোডিয়ার কাছে আছে মাত্র কয়েক ডজন পুরোনো সোভিয়েত এবং চীনা হেলিকপ্টার।

এরপর কী?

ইউএস প্যাসিফিক কমান্ডের সাবেক ডিরেক্টর ও হাওয়াই-ভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক কার্ল শুস্টার বলেছেন, পরিসংখ্যান ও মানের দিক থেকে সামরিকভাবে থাইল্যান্ড এগিয়ে থাকলেও কম্বোডিয়া অন্তত একটি দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে, সেটি হচ্ছে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় তাদের ভূগত অবস্থান। শুস্টার সিএনএনকে বলেছেন, কম্বোডিয়ার দিক থেকে বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় প্রবেশে সুবিধা বেশি।

তিনি আরও বলেন, কম্বোডিয়ার বাহিনী বিতর্কিত সীমান্ত এলাকায় ল্যান্ডমাইন ও বিভিন্ন ফাঁদ স্থাপন করায় থাইল্যান্ডকে দূরপাল্লার অস্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হবে। শুস্টার বলেছেন, ‘থাইল্যান্ডের বিমানবাহিনী বেশ শক্তিশালী এবং তাদের বিশেষ ফোর্সটি লড়াইয়ে শ্রেষ্ঠ। আমি মনে করি থাইরা সংঘাতে বিমান শক্তি এবং দূর-পাল্লার অস্ত্রের ওপর জোর দিতে পছন্দ করবে।’

* ব্রাড লেনডন, দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক সাংবাদিক। সিএনএন ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র নিউজ ডেস্ক রিপোর্টার
- সিএনএন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় থাই সামরিক বাহিনী।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ মহড়ায় থাই সামরিক বাহিনী। ফাইল ছবি: এএফপি

Wednesday, April 23, 2025

ব্যাংককের রাস্তায় সন্তান প্রসব, ফেলে গেলেন মা

ব্যাংককের রাস্তায় সন্তান প্রসব করলেন এক মা। সেই সন্তানকে ফেলে রেখেই তিনি যোগ দিলেন স্ট্রিট পার্টিতে। ওদিকে রাস্তায় পড়ে তার সন্তান চিৎকার করতে থাকে। হতাশাজনক এই কাহিনী উঠে এসেছে অনলাইন ডেইলি মেইলের এক রিপোর্টে। সিসিটিভিতে ধারণ করা ফুটেজে দেখা যায়, ব্যাংককে সংক্রান ফেস্টিভ্যাল উদযাপন করছিলেন ২৭ বছর বয়সী পিয়াথিদা। এক পর্যায়ে তিনি গর্ভস্থ সন্তানের প্রসব যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে পড়েন। তাকে দেখা যায় কোমরে চাপ দিয়ে একটি কার পার্কিংয়ে ছুটে যাচ্ছেন। এক পর্যায়ে তাকে ট্রাউজার খুলে ফেলতে দেখা যায়। সেখানে কার পার্কিংয়ের আড়ালে কিছু একটা করেন। এর কয়েক মিনিট পর সেখান থেকে কোঁকাতে কোঁকাতে চলে যান। ওই স্থানে দেখা যায় কিছু একটা পড়ে আছে। পিয়াথিদা ছুটে যান ব্যাংককের ডন মুয়াং এলাকার রোটসারিন গ্রামের বাইরের ওই উৎসবে।

ঘটনাটি ঘটে ১৪ই এপ্রিল। ৬ মিনিটের ওই ভিডিও ফুটেজে দেখা যায় একদল পথচারী ওই এলাকায় একটি বাচ্চার সন্ধান পান। নবজাতকটি তখনও জীবিত। তারা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য। তাকে বাঁচানো যায়নি। অন্যদিকে পিয়াথিদাকে দেখা যায়, উৎসবে বন্ধুদের দিকে পানীয় ছিটাচ্ছেন। কিন্তু এ সময় তার দু’পা দিয়ে রক্তক্ষরণ দৃশ্যমান ছিল। তার মুখোমুখি হলে প্রথমে সন্তান জন্মদানের কথা অস্বীকার করেন। পরে স্বীকার করেন। ফলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হয়। যেখানে তিনি সন্তান প্রসব করেছে তাকে ফেলে এসেছিলেন তার দেয়ালে এবং বিভিন্ন জিনিসে তখনও রক্তের দাগ। এসব বিষয়ে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জানা যায়, ঘটনার সময় তিনি ছিলেন মদ্যপ।

তার আরও দুটি সন্তান আছে। দু’জন স্বামী ছিল। ওই সন্তানরা বর্তমানে তার সাবেক পার্টনারদের আত্মীয়দের যত্নে বড় হচ্ছে। তিনি হাসপাতালে থাকায় পুলিশ তাকে আর জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেনি। ডন মুয়াং পলিশ স্টেশনের এসপি ফুওয়াডন আউনফো বলেন, এই নারীর নাম পিয়াথিদা। বয়স ২৭ বছর। তার বেশ রক্তক্ষরণ হয়েছে। এ জন্য চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। তার এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে জবাবদিহিতায় আনা হবে। ওদিকে তার ২০ বছর বয়সী বন্ধু অ্যাম বলেছেন, পিয়াথিদার এই নিষ্ঠুরতার জন্য তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানতেন পিয়াথিদা অন্তঃসত্ত্বা।

mzamin

Saturday, April 5, 2025

বিমসটেক সম্মেলনে আলোচিত যত বিষয়

বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (বিমসটেক) শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। দুই দিনের সম্মেলন শেষ করে তিনি দেশের উদ্দেশেও রওনা হয়েছেন।

শুক্রবার (৪ এপ্রিল) স্থানীয় সময় রাত পৌনে ৯টায় প্রধান উপদেষ্টা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ব্যাংকক ত্যাগ করেন বলে নিশ্চিত করেছেন প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার।

ব্যাংকক বিমানবন্দরে প্রধান উপদেষ্টাকে বিদায় জানান থাইল্যান্ড সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত মন্ত্রী জিরাপর্ন সিন্ধুপ্রাই।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দুই দিনের সফরে প্রধান উপদেষ্টা ব্যাংককে পৌঁছান। সেখানে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং প্রতিবেশী দেশের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন।

বিমসটেক দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃআঞ্চলিক জোট। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত বিমসটেক আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য বিশেষ করে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পরিবহন, জ্বালানি ও সন্ত্রাসবাদ দমনের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমানভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জোট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই জোটের ষষ্ঠ শীর্ষ সম্মেলনে একসঙ্গে বসেছেন জোটের সব দেশের সরকারপ্রধানরা। দুই দিনের এই সম্মেলনে কী কী ঘটেছে, আলোচিত সেসব বিষয় তুলে ধরা হলো।

নৈশভোজে ইউনূস-মোদি

গতকাল সন্ধ্যায় থাইল্যান্ডের ব্যাংককের একটি অভিজাত হোটেলে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। বিমসটেক সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে যোগ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। একই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে তাদের দুজনকে এক টেবিলে পাশাপাশি বসতে দেখা গেছে।

নৈশভোজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট, নেপালের প্রধানমন্ত্রী এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

ইউনূস-মোদির বৈঠক

এই সফরে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণের বিষয় ছিল প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক।

অনেক জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষ আজ শুক্রবার (৪ এপ্রিল) দুই নেতা একসঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। শুক্রবার বিমসটেক সম্মেলনের ফাঁকে স্থানীয় সময় ১২টায় তাদের বৈঠক শুরু হয়।

গত বছর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার শাসনের পতন হয়। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করলে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে গড়ায়। তবে অনেক আলোচনার পর প্রথমবারের মতো ড. ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির বৈঠক এটি।

শেখ হাসিনাকে নিয়ে আলোচনা

মোদির সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চুক্তি নিয়ে কথা বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পাশাপাশি শেখ হাসিনার ভারতে বসে দেওয়া বক্তব্য, সীমান্ত হত্যা ও গঙ্গা চুক্তি নবায়নসহ তিস্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করে উসকানিমূলক বক্তব্য যেন আর না দেয়, নরেন্দ্র মোদিকে সেই অনুরোধ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

ব্যাংককের হোটেল সাংগ্রিলা ব্যাংককে ৪০ মিনিটের বৈঠক শেষে এ কথা জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। পরে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরে।

ইউনূসকে মোদির পরামর্শ

প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে ‘বাস্তবতার নিরীখে ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকে ‘পরিবেশ নষ্ট’ করে, এমন বক্তব্য পরিহার করার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

মোদি-ইউনূসের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদদের সঙ্গে কথা বলেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। এ সময় তিনি মোদির এই অবস্থানের কথা তুলে ধরেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘এই মনোভাব থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ার বিষয়ে ভারতের আকাঙ্ক্ষার কথা আবারও অধ্যাপক ইউনূসের কাছে তুলে ধরেছেন তিনি (মোদি)। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী আরও আহ্বান জানিয়েছেন, পরিবেশ নষ্ট করে এমন কোনো বক্তব্য পরিহার করাই সর্বোত্তম।’

ব্যাংকক ঘোষণাপত্র

বিমসটেক সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেতারা (সরকারপ্রধানরা) সর্বসম্মতিক্রমে ব্যাংকক ঘোষণাপত্র এবং বিমসটেক ব্যাংকক ভিশন গ্রহণ করেছেন, যা একটি কৌশলগত রোডম্যাপ। এটি সংগঠনটিকে টেকসই উন্নয়ন এবং গভীর অর্থনৈতিক একত্রীকরণের দিকে পরিচালিত করবে।

সামুদ্রিক পরিবহনে সহযোগিতা চুক্তি

বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্য ও ভ্রমণ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সামুদ্রিক পরিবহন সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে বিমসটেক সদস্য দেশগুলো। বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোট বিমসটেকের মন্ত্রী পর্যায়ের ২০তম বৈঠকের আগে এই চুক্তি সই হয়।

ঢাকার পক্ষে চুক্তিতে সই করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। পরে মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন তিনি।

বিমসটেক সচিবালয় বলেছে, পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বাণিজ্য ও ভ্রমণ বাড়ানোর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক পরিবহনকে বিস্তৃত করা এই চুক্তির উদ্দেশ্য।

বিমসটেকের সভাপতি বাংলাদেশ

এ ছাড়া আগামী দুই বছরের জন্য বিমসটেকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংটার্ন সিনাওয়াত্রার কাছ থেকে সভাপতিত্ব গ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কর্মমুখী বিমসটেকের প্রতি স্বীকৃতির বিবৃতি দেন।

বিমসটেক ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা তার বক্তব্যে বিমসটেকের জন্য বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেন। তার সরকারের অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি আশ্বস্ত করেন, বাংলাদেশ তার সব নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে অবিচল।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস মুক্ত বাজার এলাকা চুক্তি এফটিএ-সংক্রান্ত বিমসটেক ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি বাস্তবায়নের জরুরি প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং পরিবহন সংযোগ সম্পর্কিত বিমসটেক মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি রাখাইন রাজ্যে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় মিয়ানমারকে সম্পৃক্ত করার জন্য বিমসটেককে আরও দৃশ্যমান ও সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান, যাতে জোর করে বাস্তুচ্যূত রোহিঙ্গাদের তাদের ভূমিতে প্রত্যাবর্তনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। 

বিমসটেক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি : সংগৃহীত
বিমসটেক সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ছবি : সংগৃহীত

Sunday, March 30, 2025

ভূমিকম্পে মিয়ানমারে ধ্বংসযজ্ঞ: মৃত্যু ১০০০ ছাড়ালো

ভূমিকম্পে মিয়ানমার যেন মৃত্যুপুরী। শুক্রবারের প্রলয় সৃষ্টিকারী এই ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে এক হাজার। হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। শুধু মিয়ানমারই নয়, থাইল্যান্ডসহ প্রতিবেশী বেশ কয়েকটি দেশেও এই কম্পন বড় রকম প্রভাব ফেলেছে। প্রতিবেশী থাইল্যান্ডে নিহতের সংখ্যা দেড় শতাধিক। সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছেন মিয়ানমারের দ্বিতীয় বৃহৎ শহর মান্দালয়ে। এই শহরটি ভূমিকম্পের উৎসস্থলের একেবারে কাছে। ঘটনার পর থেকে উদ্ধারকর্মীরা অবিরাম মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে জীবিতদের সন্ধান করছেন। অসংখ্য মানুষ এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। তাদের পরিণতি কী হয়েছে- তা কেউ জানেন না। একজন উদ্ধারকর্মী মান্দালয় থেকে বিবিসিকে বলেছেন, তারা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে লোকজনকে উদ্ধারের চেষ্টা করছেন। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে একটি হাইরাইজ ভবন ধসে পড়েছে। ভবনটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়নি। সেখানেও উদ্ধার অভিযান চলছে। সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে প্রায় ১০০ শ্রমিক আটকা পড়ে আছেন। তাদের কোনো খোঁজ মিলছে না। সেখানে মারা গেছেন কমপক্ষে ৬ জন। পরিস্থিতির শিকার হয়ে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর একের পর এক নিষেধাজ্ঞায় ন্যূব্জ দেশটির অর্থনীতি এবং শাসকরা দৃশ্যত একঘরে হয়ে আছেন। এমন অবস্থায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শাসকদের পক্ষ থেকে সহায়তা চাওয়ার ঘটনাও বিরল। দেশটি সেনাবাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাছাড়া আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন নাগরিক সমাজের মধ্যে অক্ষমতার কারণে সেখানে আসলে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা বোঝা খুবই কঠিন। বিভিন্ন দেশ থেকে এরই মধ্যে ত্রাণ সহায়তা পাঠানো শুরু হয়েছে।

নিরাপদ আছেন সুচি
ভয়াবহ ভূমিকম্প মিয়ানমারকে তছনছ করে দিয়েছে। ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে সেখানে শুক্রবার নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০০২ জন। এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে। কারণ, যেসব মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন, তাদের অনেককে উদ্ধার করা হচ্ছে মৃত অবস্থায়। তবে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থি নেত্রী বলে পরিচিত অং সান সুচি নিরাপদে আছেন। জেল কর্তৃপক্ষের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র বিবিসিকে বলেছেন, সুচি অক্ষত আছেন। রাজধানী  নেপিড’তে অবস্থিত একই জেলের অন্যরাও নিরাপদে আছেন। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের শুরুতে ১লা ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন অং সান সুচি। তারপর থেকেই তিনি জেলে আছেন। ২০২৩ সালে তাকে জেল থেকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে আবার রাজধানীতে একটি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়।

বুকফাটা আর্তনাদ নারুয়েমোলের
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। সেখানে ধসে পড়েছে বহুতল একটি ভবন। তার কয়েক মিটার দূরেই একটানা কেঁদে চলেছেন এক নারী। তিনি বলছেন, তাকে আমি একবার দেখতে চাই। সে কি অবস্থায় আছে আমি জানতে চাই। এই নারীর নাম নারুয়েমোল। তার ৪৫ বছর বয়সী স্বামী ওই ভবনটির নির্মাণকাজে যোগ দিয়েছিলেন। শুক্রবারের ভূমিকম্পে ভবনটি ধসে পড়েছে। তার নিচে চাপা পড়েছেন নারুয়েমোলের স্বামী। এ খবর জানার পর তিনি বুকফাটা আর্তনাদে চিৎকার করছেন। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার স্বামীর কোনো খোঁজ মেলেনি। তবু তিনি আশা ছাড়েননি। মনে করছেন, এখনও তার স্বামী বেঁচে আছেন এমন অন্তত একটি খবর পাবেন। চিৎকার করে তিনি বলছেন, সে ছিল পুরো পরিবারের আয়ের উৎস। তার আর্তনাদের সঙ্গে সমানতালে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছিল মেশিন। উদ্ধারকর্মীরা ইট-লোহার বিশাল বিশাল চাঁই সরাচ্ছিলেন।

‘মুহূর্তেই পুরো বাড়ি ধসে পড়লো আমার ওপর’
ভূমিকম্পের সময় মিয়ানমারের মান্দালয়ের একজন অধিবাসী অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছেন। তিনি বর্ণনা করেছেন কী ঘটেছিল শুক্রবার। তার ভাষায়- ভূমিকম্পের সময় বাথরুমে ছিলাম। আকস্মিক পায়ের তলায় সবকিছু ভয়াবহভাবে দুলতে থাকে। কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড দুলতে থাকে। পুরো বাড়িটা আমার চোখের সামনে ধসে পড়ে। বাড়িটা ধসে পড়ার আগে আমি পিঠের ওপর ভর করে শুয়ে পড়লাম। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পরে সাহায্যের জন্য আর্তনাদ করি। আমার পিতা ও এক চাচা এসে উদ্ধার করেন আমাকে। ৫ থেকে ৬ জন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধারের কয়েক সেকেন্ড পরেই আরেকটি ভূমিকম্প আঘাত করে। আমাদের ভবনটি আরও ধসে যেতে লাগলো। ভয়ে শুকিয়ে গেলাম। বেদনায় মুষড়ে পড়লাম। হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। আমার পিতা আমাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেলেন। আমাদের বাড়িতে সাতজনের বসবাস। তার মধ্যে আমার দুই আন্টিকে উদ্ধার করা হয়েছে আমার সঙ্গে। তার একজন মারা গেছেন। অন্যজন হাসপাতালে। আমার দাদা, চাচি ও চাচাদের এখনও পাওয়া যায়নি। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন তারা। তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা শতকরা শূন্য ভাগ। এ সবই ঘটে গেছে আমার চোখের সামনে। 

mzamin

Saturday, March 29, 2025

থাইল্যান্ডের মতো ভূমিকম্পে ঢাকার কী পরিণতি হতে পারে by রাফসান গালিব

ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় যেভাবে গাজার বহুতল ভবনগুলো মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়, তেমনটিই যেন দেখা গেল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। তবে এটি কারও কোনো হামলা নয়, নয় কোনো বিস্ফোরণের ঘটনাও। এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে মাটির সঙ্গে মিশে গেল ব্যাংককের ৩০ তলা একটি ভবন। প্রায় একই উচ্চতার একটি ভবনের ছাদের সুইমিংপুল থেকে যেভাবে পানি ছিটকে নিচে পড়ল, তাতেও শঙ্কিত না হয়ে পারা যায় না।

শুক্রবার থাইল্যান্ডের প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের শহর ব্যাংকক কাঁপিয়ে দেওয়া এ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল মিয়ানমারের মান্দালয়ে। ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৭ দশমিক ৭।  ব্যাংককে ভবনধসে চাপা পড়েছেন শতাধিক মানুষ।

মিয়ানমারে কয়েকটি শহরে ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশটিতে মৃত্যুর সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। সেখানেও অনেক বহুতল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

মিয়ানমারের এ ভূমিকম্প থাইল্যান্ড ছাড়াও বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনামের বিভিন্ন দেশে ও শহরে অনুভূত হয়েছে। এ থেকেই স্পষ্ট হয়, ভূমিকম্পটির প্রভাব কী বিস্তৃত ছিল।

এ ভূমিকম্পের ধাক্কা বাংলাদেশে অনুভূত হয় শুক্রবার দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে। উৎপত্তিস্থল ৫৯৭ কিলোমিটার দূরে হলেও রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান ভূমিকম্পে কেঁপে উঠে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এর বেশ ‘কম্পন’ দেখি আমরা। কে ভূমিকম্প টের পেল আর কে টের পেল না, এ নিয়ে হাস্যরস তো আছেই। কিন্তু এই দুশ্চিন্তা বা আশঙ্কাও উঠে এসেছে, থাইল্যান্ডের মতো ভূমিকম্পের ধাক্কায় ঢাকার কী পরিণত হতে পারে?

ভূমিকম্প-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের ওই অঞ্চলে ভূমিকম্প বাড়লেও গত ২০ বছরে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, এমন নজির নেই। তাই এবারের এ ভূমিকম্প বেশ বড় ভূমিকম্প। যে কারণে এর প্রভাব বিস্তীর্ণ এলাকায় পড়েছে। ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের সিলেট থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকা এবং হিমালয়ের পাদদেশের এলাকাগুলো ভূমিকম্পপ্রবণ। দেখা যাচ্ছে, এসব স্থানে ভূমিকম্প বেড়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশে।

এখন আরও বড় ভূমিকম্প হলে তার প্রভাবও নিশ্চয়ই আরও জোরালোভাবেই প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। অথবা একই মাত্রার ভূমিকম্প যদি আরও কম দূরত্বে উৎপত্তি হয়, তখন ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর কী অবস্থা হতে পারে, একবার ভাবুন তো? যত ধরনের অপরিকল্পনা আছে, সবকিছু নিয়েই রাজধানী ঢাকা গড়ে উঠেছে। ফলে এটি হয়ে উঠেছে দুই কোটির অধিক মানুষ নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী শহর।

ঢাকায় বড় ভূমিকম্প হলে কী করুণ পরিস্থিতি হতে পারে, তা উঠে আসে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) নেওয়া এক গবেষণামূলক প্রকল্পে। ২০২৪ সালের ৩১ মে এ প্রকল্পের আওতায় ভূমিকম্প সহনশীল নগরায়ণ বিষয়ে দুই দিনের আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজন করে রাজউক। সেখানে গবেষণা ও জরিপের ফলাফল উপস্থাপন করেন গবেষকেরা। সেখান থেকে আমরা জানতে পারছি, মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের আজকের ভূমিকম্প থেকেও আরও অনেক কম মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার মোট ভবনের ৪০ শতাংশই ধসে পড়বে।

গবেষকেরা বলেছেন, দেশে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল ১৮৮৫ সালে। এই ভূমিকম্প হয়েছিল টাঙ্গাইলের মধুপুরের ভূগর্ভস্থ চ্যুতি বা ফাটল রেখায় (ফল্ট)। এরপর ১৩৯ বছর হতে চললেও এত বড় ভূমিকম্প ওই ফাটল রেখায় আর হয়নি। মধুপুরের ওই ফাটল রেখায় যদি রিখটার স্কেলে (ভূমিকম্পের মাত্রা পরিমাপক) এখন ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পও হয়, তাহলে ঢাকায় কমপক্ষে ৮ লাখ ৬৪ হাজার ভবন ধসে পড়বে, যা ঢাকার মোট ভবনের ৪০ শতাংশ। ওই মাত্রার ভূমিকম্প দিনে হলে কমপক্ষে ২ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু হবে। আর রাতে হলে কমপক্ষে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যাবে।

বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা তখন বিস্ফোরণের শহর হয়ে উঠবে, তা অবধারিত। কারণ, এখানকার পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা এতই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে, বড় মাত্রার ভূমিকম্পে যে বিপর্যয় নেমে আসবে, তা আসলে কল্পনাতীত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বঙ্গবাজার মার্কেটের আগুন, মগবাজারের বিস্ফোরণ, সিদ্দিকবাজারের মার্কেটে বিস্ফোরণ, বেইলি রোডের রেস্তোরাঁ মার্কেটে বিস্ফোরণে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা তো আমরা দেখলামই।

বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ড ও সিদ্দিকবাজারের বিস্ফোরণের পর ঢাকায় ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস নিয়ে কথা বলি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। নগরব্যবস্থা, পানি, স্যানিটেশন, পরিবেশ বিষয়ে এই বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে উঠে আসে সে সময়ের তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্পের বিষয়টিও। ২০২৩ সালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার সেই ভূমিকম্পে তুরস্কে অর্ধলক্ষাধিক ও সিরিয়ায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষ মারা যান। সেই ভূমিকম্পের ভয়াবহতা গোটা পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘তুরস্ক-সিরিয়ার মতো ভূমিকম্প যদি এখানে ঘটে, কয়েক গুণ মানুষ মারা যেতে পারে। কারণ হচ্ছে, আমাদের ভূমিকম্প-সহনীয় ভবন হাতে গোনা। অথচ এখানে হাজার হাজার বহুতল ভবন আছে। সেগুলোর কাঠামোগত সামর্থ্য বাড়ানো এখনই সময়। অনেকভাবেই সেটি করা যায়। শুধু ইচ্ছা আর পদক্ষেপটা জরুরি। এখন যে অপরিকল্পিতভাবে নগরগুলো গড়ে উঠছে, সেখানে বড় কোনো ভূমিকম্প ঘটে গেলে, উদ্ধার কার্যক্রম চালানোও তো খুব কঠিন হয়ে যাবে। অনেক সুযোগ-সুবিধাও তো আমাদের নেই। ফলে ভবনের কাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। তুরস্কে অনেক ভবন পুরোপুরি ধসে পড়েছে, পাশেই আবার অনেক ভবন দাঁড়িয়ে আছে বা কম ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার মানে সেগুলো ওই মাত্রার ভূমিকম্প-সহনীয় ছিল। এখন খরচ বাঁচানোর জন্য বা আর্থিক লাভের জন্য ভবনগুলো এভাবে নির্মাণ করা সমীচীন হবে না। এর মাধ্যমে মানুষকে বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হবে। আমরা তো শিল্পোন্নত দেশের দিকে যাচ্ছি, কিন্তু আমাদের শিল্পকারখানাগুলো কী করে? শুধু টাকা বাঁচানোর জন্য বা মুনাফা বেশি করার জন্য ইটিপি চালু রাখা হয় না। এতে মানুষ ও পরিবেশের বিপর্যয় আমরা ডেকে আনছি।’

গুলশানের মতো এলাকায় নতুন ও আধুনিক ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসকে কাজ করতে বেগ পেতে হয়েছে। তাদের কাছে ৪০ তলা পর্যন্ত সিঁড়ি থাকলেও সরু রাস্তার হওয়ার কারণে ঠিক সময়ে পৌঁছাতেই পারেনি তারা। এবার ভাবুন তো ঢাকায় বড় কোনো ভূমিকম্পে যখন অনেক ভবন ধসে পড়বে, কীভাবে উদ্ধার কার্যক্রম চালানো সম্ভব? এই শহরের অলিগলি দিয়ে কীভাবে ঢুকবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। যে যেভাবে পেরেছে বা পারছে ঢাকা শহরে স্থাপনা গড়ে তুলছেন, কোনো নিয়মের বালাই নেই।

মুজিবুর রহমান সে প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘সবকিছুর পেছনে আছে একটাই শব্দ—দুর্নীতি। দুর্নীতির রকমের শেষ নেই। আমরা সেসবে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে গেছি। আমরা সেখান থেকে বের হতে পারছি না। আমি মনে করি, এভাবে অপরিকল্পিতভাবে নগর গড়ে ওঠা বন্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘাটতি আছে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, সমন্বিত প্রচেষ্টা ও সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

কথা হচ্ছে, কবে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা হবে? রাজনৈতিক সদিচ্ছা জাগবে কবে? পরিকল্পিতভাবে রাজধানী ও বড় শহরগুলোকে সাজানোর জন্য এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি আদৌ আছে আমাদের? তাঁরা কথায় কথায় বাংলাদেশকে ‘সিঙ্গাপুর’ বা ‘থাইল্যান্ড’ বানাতে চান। কিন্তু যে ভূমিকম্পে থাইল্যান্ডেই যে অবস্থা দেখা গেল, এমন ভূমিকম্পে ঢাকার কী হবে, তা কি তাঁদের ভাবনায় আছে? ঢাকা আসলে এখন মৃত্যুকূপে পরিণত হয়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে মরে পড়ে থাকা ছাড়া আমাদের বোধ হয় ‘মুক্তি’ নেই।

* রাফসান গালিব প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী। ই–মেইল: rafsangalib1990@gmail.com

শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে মুহুর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বহুতল ভবন। ব্যাংকক, থাইল্যান্ড। শুক্রবার, ২৮ মার্চ
শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতে মুহুর্তেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বহুতল ভবন। ব্যাংকক, থাইল্যান্ড। শুক্রবার, ২৮ মার্চ। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত

শক্তিশালী ভূমিকম্পে কাঁপল আট দেশ, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি

দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে শুক্রবার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। এতে মিয়ানমারের পাশাপাশি ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে থাইল্যান্ডে। দক্ষিণ-পশ্চিম চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।

শুক্রবার রাত পৌনে একটার দিকে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মিয়ানমারের জান্তা সরকারের হিসাব অনুযায়ী দেশটিতে অন্তত ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৭৩২ জনের বেশি। থাইল্যান্ডে অন্তত নয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন বহু মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএসের তথ্যমতে, শুক্রবার স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। এর কেন্দ্র ছিল মিয়ানমারের মান্দালয় শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে। ভূমিকম্পের ১২ মিনিট পর ৬ দশমিক ৪ মাত্রার একটি পরাঘাত (আফটার শক) হয়।

ভূমিকম্পের পর রাজধানী নেপিডো, মান্দালয়, সাইগাইংসহ ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। দেশটির সামরিক বাহিনী পরিচালিত সম্প্রচারমাধ্যম এমআরটিভি জানিয়েছে, নিহত ১৪৪ জনের মধ্যে নেপিডোয় ৯৬ জন, সাইগাইংয়ে ১৮ জন ও মান্দালয়ে ৩০ জন রয়েছেন। নিহত ব্যক্তির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শক্তিশালী কম্পনে নেপিডো, সাইগাইং, মান্দালয়সহ পাঁচটি শহরে ভবন ধসে পড়েছে। এ ছাড়া একটি সেতু ও একটি রেলসেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, ইরাবতী নদীর ওপর আভা সেতু ধসে পড়েছে। সেতুটি ভেঙে পানির মধ্যে হেলে পড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছে মিয়ানমারের জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ‘সব দেশ’কে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

মিয়ানমারের এ আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় শোক প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের জনগণের পাশে দাঁড়াতে এরই মধ্যে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দল কার্যক্রম শুরু করেছে।

শহরজুড়ে ধ্বংসস্তূপ

ভূমিকম্পে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমারের মান্দালয় শহর। শহরটির এক বাসিন্দা রয়টার্সকে বলেন, ‘সবকিছু কাঁপতে শুরু করলে আমরা সবাই বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। আমার চোখের সামনে পাঁচতলা একটি ভবন ধসে পড়ে। আমাদের শহরের সবাই এখন রাস্তার ওপর রয়েছেন। ভয়ে কেউ ভবনের ভেতরে যাচ্ছেন না।’

ইন্টারনেটে প্রকাশিত ছবিতে মান্দালয় শহরজুড়ে ধ্বংসস্তূপ দেখা গেছে। শহরের বহু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত। মিয়ানমারের শেষ রাজার বাসভবন ‘মান্দালয় প্রাসাদের’ দেয়ালের একাংশও ভেঙে পড়েছে। ভূমিকম্পে মিয়ানমারের আরেক শহর তাউনগোয় একটি মসজিদের একাংশ ধসে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া শান প্রদেশের আউং বান শহরে একটি হোটেল ভবনের নিচে ২০ জন চাপা পড়েছেন। নিহত হয়েছেন দুজন।

রাজধানী নেপিডোতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই শহরেই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষের (৯৬) মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। সেখানে অনেক ভবন ধসে পড়েছে। অনেক গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে আছে। ধ্বংসস্তূপের কারণে অনেক জায়গায় সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির মিয়ানমার অঞ্চলের পরিচালক মোহামেদ রিয়াস বলেন, মিয়ানমারে জরুরি ভিত্তিতে আশ্রয়, খাবার ও চিকিৎসাসহায়তা প্রয়োজন।

মিয়ানমারের শোচনীয় একসময়ে এই ভূমিকম্প হলো বলে মন্তব্য করেছেন মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মিয়ানমারবিষয়ক গবেষক জো ফ্রিম্যান। তিনি বলেন, দেশটিতে চলমান সংঘাতের কারণে এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সেখানে আগে থেকেই ত্রাণসহায়তার প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে ভূমিকম্পের কারণে সেই সংকট আরও তীব্র হলো।

মিয়ানমারে ২০২১ সালে নির্বাচিত অং সান সু চি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক জান্তা। এর পর থেকে দেশটিতে বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সংঘাত চলছে। বর্তমানে দেশটির বড় অংশ বিদ্রোহীদের দখলে রয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের ৩০ লাখের বেশি মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত। দেশটির এক–তৃতীয়াংশের বেশি মানুষের ত্রাণসহায়তা প্রয়োজন।

থাইল্যান্ডে ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ১১৭ জন আটকা

৭ থেকে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে শক্তিশালী ভূমিকম্প বলা হয়। বিশ্বজুড়ে বছরে আনুমানিক ১৮টি এমন ভূমিকম্প হয়। এর চেয়ে তীব্র ৮ থেকে ৮ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পকে বলা হয় প্রলংকরী, এ ধরনের ভূমিকম্প বছরে আনুমানিক একটি হয়ে থাকে।

গতকালের ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি এত শক্তিশালী ছিল যে উৎপত্তিস্থল থেকে ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দূরত্বের ব্যাংককে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ব্যাংককে ৩৩ তলা একটি নির্মাণাধীন ভবন ধসে পড়েছে। ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ১১৭ জন চাপা পড়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। সেখানে অন্তত ৪০৯ জন উদ্ধারকাজে নেমেছেন।

ব্যাংককে হতাহতের বিষয়ে শহরের ডেপুটি গভর্নর তাভিদা কামোলভেজ বলেন, নির্মাণাধীন ওই ভবনের নিচে চাপা পড়ে এ পর্যন্ত আটজনের মৃত্যু হয়েছে। শহরের আরেক এলাকায় নিহত হয়েছেন একজন। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংককের গভর্নর চাদচার্ট সিত্তিপান্ত।

ব্যাংকক একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র। ভূমিকম্পে গতকাল বিকেল পর্যন্ত শহরটিতে ১৬৯টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল ভূমিকম্পের সময় লোকজন ভয়ে রাস্তায় ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকেই ছিলেন পর্যটক। কম্পনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে একটি অভিজাত হোটেলের ছাদের সুইমিংপুল থেকে পানি উপচে নিচে পড়তে থাকে।

ভূমিকম্পের পর গতকাল থাইল্যান্ডের শেয়ারবাজারের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ৩১ মার্চ শেয়ারবাজারের লেনদেন আবার শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে ব্যাংকককে দুর্যোগ উপদ্রুত এলাকা ঘোষণা করেছে শহর কর্তৃপক্ষ।

ভূমিকম্পের সময় ব্যাংককে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন শহরটির বাসিন্দা বুই থু। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ দেখতে পেলাম দেয়াল ফেটে যাচ্ছে। সুইমিংপুল থেকে পানি উপচে পড়ছে। চারদিক থেকে শুধু মানুষের চিৎকার ভেসে আসছিল। আমি ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।’

ভূম্পিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন এক মা ও তাঁর শিশুসন্তান।  গতকাল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয়
ভূম্পিকম্পে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছেন এক মা ও তাঁর শিশুসন্তান। গতকাল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোয়। ছবি: এএফপি

ভূমিকম্পে ব্যাংককে ভবন ধস: সাত শ কোটি টাকার ৩৩তলা ভবন মুহূর্তে ৩ তলার সমান ধ্বংসস্তূপ by পানিসা আমোচো

ব্যাংককের আকাশে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। অস্তরাগের আলো ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। এই আবহে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ভূমিকম্পে ধসে পড়া একটি নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন কয়েক শ উদ্ধারকর্মী।

আকাশের কমলা রঙের আভার নিচে এই দৃশ্যের অদূরে একটি সেতুতে দাঁড়িয়ে আছি আমি। সঙ্গে রয়েছেন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিকদের একটি দল। একটি নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবন মুহূর্তে তিনতলার সমান একটি কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হয়েছে, এটা আমরা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

কিন্তু সামান্য দূরে চোখের সামনেই তো বাঁকানো তার ও ধাতুর উপাদান বের হয়ে আছে।

এরই মধ্যে আরও বেশি পেশাদার উদ্ধারকারী ও সামরিক বাহিনীর দল এসেছে। জ্বালানো হয়েছে ফ্লাডলাইট। কিন্তু জীবিত কোনো ব্যক্তিকে উদ্ধারের সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ বলে মনে হচ্ছে।

মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলের মান্দালয়ে শুক্রবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। ১১ মিনিটের মাথায় সেখানে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্প হয়। ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে ভূমিকম্পের উৎপত্তি। উৎপত্তিস্থল অগভীর হওয়ায় কম্পনের তীব্রতা বেশি ছিল। প্রতিবেশী থাইল্যান্ড, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, চীন ও ভারতেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবর অনুযায়ী, ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত মিয়ানমারে ১৪৪ জন নিহত এবং ৭৩২ জন আহত হয়েছে বলে দেশটির জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইং জানিয়েছেন। তিনি যে কোনো দেশ ও সংগঠনের সহায়তা চেয়েছেন। রাজধানী নেপিডোসহ মিয়ানমারের ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

মিয়ানমারের ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে অনেক ভবন ধসে গেছে, রাস্তাঘাট চৌচির হয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল থেকে প্রায় ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দূরের ব্যাংককে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়েছে। ব্যাংককের ধসে পড়া এই ৩৩তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে অন্তত ১১৭ জন শ্রমিক চাপা পড়েছেন। এত ব্যাপক মাত্রার প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে থাইল্যান্ডবাসী পরিচিত নয়। তাই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ভূমিকম্পের সময় আমি আমার বাসায় ছিলাম। এই রকম কোনো কিছু আমি আগে অনুভব করিনি।

ধসে পড়া ভবনটি জাতীয় নিরীক্ষা অফিসের। তিন বছর ধরে ভবনটি নির্মাণ করা হচ্ছিল। এতে ব্যয় হয়েছে দুই শ কোটি থাই বাথ বা সাড়ে চার কোটি পাউন্ডের বেশি অর্থ, বাংলাদেশি মুদ্রায় সাত শ কোটি টাকার বেশি।

ধসে পড়া ভবনের আশপাশের এলাকায় অনেকগুলো তাঁবু খাটানো হয়েছে। উজ্জ্বল হলুদ হ্যাট পরা উদ্ধারকর্মীরা হন্তদন্তভাবে ছোটাছুটি করছেন। আকাশচুম্বী ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাঁরা ১১৭ ব্যক্তিকে উদ্ধারের জোর চেষ্টা করছেন।

থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফুমথাম ওয়েচায়াচাই সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত তিন ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। প্রায় এক ঘণ্টা আগে দুটি মরদেহ তাঁবুতে আনতে দেখেছি আমি।’

ধসে পড়া ভবনের পাশের সড়ক অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স এবং উদ্ধার কাজে ব্যবহৃত অন্যান্য গাড়িতে ভরা। সেতুতে আমাদের সঙ্গে কিছু উৎসুক মানুষও যুক্ত হয়েছেন। কী ঘটছে, তা তাঁরাও বুঝতে চেষ্টা করছেন।

একটি বড় ক্রেনসহ অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি আনা শুরু হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অনুসন্ধান শুরু করার আগে ধ্বংসস্তূপের জঞ্জাল সরাতে হবে।

এই ভবন ধসে পড়ার এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে আমি ঘটনাস্থলে আসি। এসে দেখি, নির্মাণশ্রমিকেরা ধুলায় জবুথবু হয়ে আছেন। বেঁচে যাওয়ায় তাঁরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেছেন।

বেঁচে যাওয়া একজন শ্রমিকের নাম অ্যাডিসর্ন কামফাসর্ন। ভূমিকম্পের সময় তিনি ছয়তলা থেকে নিচে জিনিসপত্র নামাচ্ছিলেন। হঠাৎ কম্পন অনুভব করে ১৮ বছর বয়সী এই শ্রমিক সিঁড়ির দিকে তাকান এবং একটি ক্রেন কাঁপতে দেখেন।

অ্যাডিসর্ন আমাকে বলেন, “আমি বুঝতে পারলাম খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমি দৌড় দিলাম। এক মিনিটের মধ্যে ভবনটি ধসে পড়ল। মুহূর্তেই সব কিছু ঘটে গেছে। সবখানে ধোঁয়া, সব কিছু অন্ধকার হয়ে গেল। আশি নিশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আমার কোনো মাস্ক ছিল না।”

মুঠোফোন হারিয়ে ফেলায় তিনি এখনো তাঁর পরিবারের সদস্যের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি। তিনি এর আগে জীবনে এমন ভয়াবহ কোনো অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাননি। তাঁর মনে হয়েছিল, তিনি মারা যাচ্ছেন।

ওই নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করেন করেন এমন কয়েকজন শ্রমিক আমাকে বলেছেন, শ্রমিকদের মধ্যে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের নাগরিক রয়েছে।

ভূমিকম্পের সময়ে নুকুল খেমুথা (৩০) নামের এক শ্রমিক ওই ভবনের পঞ্চম তলায় কাজ করছিলেন। হঠাৎ ধাক্কা অনুভব করে তিনি তাকিয়ে দেখেন, পুরো ভবন ডুবে যাচ্ছে, অনেকগুলো গর্ত হয়ে যাচ্ছে।

নুকুল খেমুথা বলেন, কিছুক্ষণ আগে তাঁর এক সহকর্মী দশম তলায় বাথরুমে গিয়েছিলেন। তাঁরা তাঁর খবরের অপেক্ষায় আছেন। নুকুল খেমুথা আরও বলেন, ‘আমরা সবাই চিৎকার করে বলতে শুরু করি “দৌড়াও”। সবাইকে একে অপরের হাত ধরতে বলি এবং একসঙ্গে দৌড়াতে বলি।’

আমি যখন তাঁদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন তাঁরা ধূমপান করে নিজেদের শান্ত করতে চেষ্টা করছিলেন। তাঁদের বিষণ্ন দেখাচ্ছিল। বেঁচে যাওয়াদের কেউ কোনো চিকিৎসা সহায়তা নেননি। কারণ, আটকা পড়া মানুষদের দিকেই তাঁদের পুরো মনোযোগ নিবদ্ধ রয়েছে।

এদিকে ড্রিলিংয়ের শব্দ তীব্রতর হচ্ছে। উদ্ধারকর্মীদের সামনে পড়ে আছে একটি দীর্ঘ রাত।

* পানিসা আমোচো থাইল্যান্ডে বিবিসি নিউজের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

ধসে পড়া নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের পাশে উদ্ধারকর্মীরা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে, ২৮ মার্চ ২০২৫
ধসে পড়া নির্মাণাধীন ৩৩ তলা ভবনের ধ্বংসস্তূপের পাশে উদ্ধারকর্মীরা। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে, ২৮ মার্চ ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

Friday, February 28, 2025

চাপে নতি স্বীকার , উইঘুরদের চীনে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করলো থাইল্যান্ড

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ৪০ জন উইঘুরকে  চীনে নির্বাসিত করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে থাই কর্তৃপক্ষ। তাদের উপর সম্ভাব্য নির্যাতন এমনকি মৃত্যুরও আশঙ্কা রয়েছে।ব্যাংককের একটি আটক কেন্দ্রে ১০ বছর আটক থাকার পর বৃহস্পতিবার এই দলটিকে চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে ফেরত পাঠানো  হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।চীনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং  জিনজিয়াংয়ের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উইঘুর জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য মুসলিম জাতিগত গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ রয়েছে। যদিও বেইজিং সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। বিবিসিতে প্রকাশিত খবর জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের পর এ বারই তাইল্যান্ড প্রথম উইঘুর অভিবাসীদের চিনে ফেরত পাঠাল।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং জাতিসংঘের গুরুতর উদ্বেগ উত্থাপনের পর, গোটা নির্বাসন প্রক্রিয়াকে গোপনীয়তার মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে।থাই মিডিয়া জানিয়েছে যে বৃহস্পতিবার ভোরে ব্যাংককের প্রধান অভিবাসন আটক কেন্দ্র থেকে বেশ কয়েকটি ট্রাক বেরিয়ে গেছে,   যেগুলোর জানালা কালো প্লাস্টিক দিয়ে বন্ধ করা ছিল ।কয়েক ঘন্টা পরে, ট্র্যাকার Flightrader24 ব্যাংকক থেকে ছেড়ে আসা চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের একটি অনির্ধারিত ফ্লাইট দেখায়, যা  জিনজিয়াংয়ে পৌঁছায়। কতজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না।থাই সরকার পরে বলেছে যে তারা ৪০ জন উইঘুরকে চীনে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারণ তাদের এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা ঠিক হচ্ছে না। তবে অন্য কোনও তৃতীয় দেশ তাদের গ্রহণের প্রস্তাব দেয়নি। এর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, যারা  অতীতে উইঘুরদের আশ্রয় দিয়েছে।আটজন উইঘুর থাইল্যান্ডে রয়ে গেছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজন আটক থাকাকালীন অপরাধের জন্য জেল খাটছেন। সরকার আরও জানিয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী পায়েটোংটার্ন সিনাওয়াত্রাকে তার সাম্প্রতিক চীন সফরের সময় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে উইঘুরদের চীনে ফিরিয়ে আনা হলে তাদের যথাযথ দেখাশোনা করা হবে।বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি ।সিনাওয়াত্রা বলেন, '"বিশ্বের যেকোনো দেশকেই  আইন, আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া এবং মানবাধিকারের নীতি মেনে চলতে হবে। 'বেইজিং জানিয়েছে যে ৪০ জন চীনা অবৈধ অভিবাসীকে থাইল্যান্ড থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, কিন্তু তারা যে উইঘুর ছিল তা নিশ্চিত করেনি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে ,' চীন ও থাইল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ আইন ও  আন্তর্জাতিক আইন মেনেই  প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। 'ফিরে আসা দলটিতে  ৩০০ জনেরও বেশি উইঘুর ছিল   যারা ২০১৪ সালে জিনজিয়াংয়ে দমন-পীড়নের শিকার হয়ে পালিয়ে আসার পর থাই সীমান্তে আটক করা হয়েছিল।অনেককে তুরস্কে পাঠানো হয়েছিল, আবার অনেককে ২০১৫ সালে চীনে ফেরত পাঠানো হয়েছিল - যার ফলে সরকার এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলির মধ্যে তীব্র প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা কান্নাভি সুয়েবসাং প্রশ্ন তোলেন - '"থাই সরকার কী করছে?উইঘুরদের নির্বাসনের মাধ্যমে নির্যাতনের মুখোমুখি করা উচিত নয়। তাদের ১১ বছর জেল খাটতে হয়েছিল। আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছি।'যে আটক কেন্দ্রে উইঘুরদের রাখা হয়েছিল   তা অস্বাস্থ্যকর এবং জনাকীর্ণ ছিল বলে জানা গেছে। পাঁচজন উইঘুর হেফাজতেই  মারা গেছেন।বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে এই গোষ্ঠীটি এখন নির্যাতন, জোরপূর্বক অন্তর্ধান এবং দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ডের উচ্চ ঝুঁকির মুখোমুখি। সংস্থার এশিয়া পরিচালক, এলেন পিয়ারসন বলেছেন - ' থাইল্যান্ডের উইঘুর বন্দীদের চীনে স্থানান্তর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে থাইল্যান্ডের বাধ্যবাধকতার স্পষ্ট লঙ্ঘন।  ঊর্ধ্বতন থাই কর্মকর্তারা একাধিকবার প্রকাশ্যে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এই ব্যক্তিদের হস্তান্তর করা হবে না।' এদিকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও থাইল্যান্ডের এই নির্বাসন প্রক্রিয়ার  নিন্দা জানিয়ে বলেছেন -' যেসব দেশে উইঘুররা সুরক্ষা চান, সেইসব দেশের সরকারকে জোরপূর্বক জাতিগত উইঘুরদের চীনে ফেরত না পাঠানোর আহ্বান জানাতে হবে। "অনলাইনে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তিনি চীনকে জিনজিয়াংয়ে প্রধানত মুসলিম উইঘুর এবং অন্যান্য জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগ করেছেন।জাতিসংঘ বলেছে যে তারা এই নির্বাসনের জন্য "গভীরভাবে অনুতপ্ত" ।যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন যে তারা  থাইল্যান্ডের সিদ্ধান্তের সাথে একমত নয়।জিনজিয়াংয়ে প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ উইঘুর বাস করেন, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম। এই অঞ্চলটি আনুষ্ঠানিকভাবে জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল (Xinjiang Uyghur Autonomous Region বা XUAR) নামে পরিচিত।

উইঘুররা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে, যার সাথে  তুর্কি ভাষার  সাদৃশ্য রয়েছে।  সাংস্কৃতিক ও জাতিগতভাবে মধ্য এশীয় দেশগুলির সঙ্গে এদের সাযুজ্য রয়েছে। চীনের বিরুদ্ধে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং এই অঞ্চলে ধর্মীয় অনুশীলন নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি মসজিদ ও সমাধি ধ্বংস করার অভিযোগ  রয়েছে।

সূত্র : বিবিসি

mzamin

Monday, February 24, 2025

মুসলিম ‘গণহত্যায়’ প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইলেন সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী

দক্ষিণ থাইল্যান্ডে দুই দশক আগে মুসলিম বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়েছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা।

২০০৪ সালে সংঘটিত এই ভয়াবহ ঘটনায় সামরিক বাহিনীর ট্রাকে শ্বাসরোধ হয়ে ৭৮ জন মুসলিম বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ড ‘তাক বাই গণহত্যা’ নামে পরিচিত এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ডের মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণাঞ্চলে রাষ্ট্রীয় দায়মুক্তির প্রতীক হয়ে রয়েছে।

রোববার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এই অঞ্চল সফরকালে ক্ষমা চেয়েছেন দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। খবর এএফপি।

থাকসিন, যিনি গণহত্যার সময় থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ১৯ বছর পর এই অঞ্চলে সফরকালে সাংবাদিকদের বলেন, আমি যখন প্রধানমন্ত্রী ছিলাম, তখন আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা। যদি আমার কোনো ভুল হয়ে থাকে বা কারও মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি, তাহলে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাই।

কী ঘটেছিল তাক বাই হত্যাকাণ্ডে?

২০০৪ সালের ২৫ অক্টোবর, নারাথিওয়াত প্রদেশের তাক বাই শহরের একটি পুলিশ স্টেশনের সামনে কয়েকশ মুসলিম বিক্ষোভ করছিলেন। তখন নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালিয়ে সাতজনকে হত্যা করে।

পরে প্রায় ১,৩০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয় এবং তাদের হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় সামরিক ট্রাকে একটির ওপর আরেকটি স্তূপ করে তোলা হয়। এই অবস্থায় দীর্ঘ সময় তাদের ফেলে রাখার ফলে শ্বাসরোধ হয়ে ৭৮ জন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। মানবাধিকার কর্মীরা এ ঘটনাকে ‘রাষ্ট্রীয় হত্যা’ বলে অভিহিত করেছেন।

বিচারের অভাবে ক্ষোভ

গত বছরের আগস্টে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা মামলায় সাতজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। তবে অভিযুক্তরা আদালতে হাজির না হওয়ায় মামলার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং থাকসিনের কন্যা পেতোংতার্ন সিনাওয়াত্রা ঘোষণা দেন যে, মামলার সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে, তাই এটি পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব নয়।

থাই মানবাধিকার সংস্থা ‘দুয়াই জায়’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আঞ্চনা হিমমিনা এএফপিকে জানান, এটি প্রথমবারের মতো থাকসিন সরাসরি ক্ষমা চাইলেন। তবে যদি তিনি সত্যিই আন্তরিক হন, তাহলে তার উচিত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে ক্ষমা চাওয়া।

দক্ষিণ থাইল্যান্ডের বিদ্রোহ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন

থাইল্যান্ডের মুসলিম-প্রধান দক্ষিণাঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘাত চলছে। এই অঞ্চলের জনগণ সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ থাই সমাজ থেকে আলাদা। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করছে।

২০০৪ সাল থেকে এ সংঘাতে ৭,০০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তবে তাক বাই হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো সামরিক কর্মকর্তা বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো শাস্তি হয়নি।

থাইল্যান্ড সরকার বারবার দক্ষিণাঞ্চলে শান্তি স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিলেও, সেখানে জরুরি আইন বলবৎ রয়েছে এবং ব্যাপক সেনা মোতায়েনের কারণে সাধারণ জনগণ এখনো নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে।

থাইল্যান্ডের মুসলিম-প্রধান দক্ষিণাঞ্চলে ঘটে যাওয়া ‘রাষ্ট্রীয় হত্যা’র ন্যায়বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ করে আসছে। ছবি : সংগৃহীত।
থাইল্যান্ডের মুসলিম-প্রধান দক্ষিণাঞ্চলে ঘটে যাওয়া ‘রাষ্ট্রীয় হত্যা’র ন্যায়বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ করে আসছে। ছবি : সংগৃহীত।



Tuesday, February 4, 2025

অপরূপ থাইল্যান্ড ও পাশেই ‘মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ’ by মো. বায়েজিদ সরোয়ার

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের বিখ্যাত লুম্বিনী (লুম্ফিনি) পার্কে এলাম সকাল এগারটায়। সেটি ছিল ২০২৩ এর ২৯ জুন। বৃহৎ সব বৃক্ষে ছায়াময় পার্কে প্রজাপতির উড্ডীন বর্নময়তা। বর্ণাঢ্য উদ্যানে হাঁটছে সবুজ ময়ূরী, কৃত্রিম পরিখায় রঙিন মাছ। সু্ন্দর ফুল, বৃক্ষলতা, স্নিগ্ধ লেক মিলে অপরূপ এক পরিবেশে বেড়াতে থাকি। এই অদ্ভুত সময়ে পার্কে এসে অবশ্য একটা লাভ হলো-পার্কের প্রায় জনতাহীন এক ধরনের নির্জনতা। এমন পরিবেশে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, রোহিঙ্গা সমস্যা ও আরাকান আর্মির মতো বিষণ্ন বিষয় নিয়ে ভাবা এক অর্থে প্রায় অপ্রাসঙ্গিক। তবুও ভাবনায় তা এলো।

এবার সপরিবারে থাইল্যান্ডে বেড়ানোর সঙ্গে একটি ব্যক্তিগত ও অর্ধ একাডেমিক মিশনও অবশ্য ছিল। মিয়ানমার বিষয়ক ইস্যুগুলো মোকাবেলায় থাইল্যান্ড কি কি পলিসি ও কৌশল নিয়ে থাকে এবং তা বাস্তবায়ন করে থাকে-সে বিষয়টি বোঝা ও কিছু তথ্য সংগ্রহ করা। লুম্বিনী পার্ক ও অন্যান্য স্থানে এসে ভ্রমণের সঙ্গে সেই মিশনটাও বেশ কিছু মিলে গেল। কেন যেন অপরূপ থাইল্যান্ডে আমার ভ্রমণ জুড়ে ছিল নীরব মিয়ানমার ভাবনা।

থাইল্যান্ডের বার্মা বিষয়ক পলিসি, কৌশল ও অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে- এই ধারণাটা আমি প্রথম পেয়েছিলাম তৎকালীন লে. কর্ণেল মো. তোফায়েল আহমেদ (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) এর থেকে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এই অসাধারণ মেধাবী ও প্রফেশনাল কর্মকর্তা ব্যাংককস্থ ‘রয়েল থাই আর্মি কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজে’ প্রথম বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তা হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন (১৯৯৯-২০০০)। সেই কোর্সে জেনারেল তোফায়েল অনন্য মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন।

ব্যাংককে বিরল এক সম্মেলন

এর প্রায় ১৭ মাস পরের ঘটনা। ১৯ ডিসেম্বর ২০২৪। ততোদিনে মিয়ানমারের পরিস্থিতির অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষত রাখাইনে দিক বদলকারী বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে। আরাকান আর্মি রাখাইনের প্রায় ৯০% এলাকা দখলের দাবী করছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পুরো অঞ্চলই আরাকান আর্মির দখলে চলে গেছে। রাখাইনে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি এখন বাংলাদেশ। অন্যদিকে, কোন কোন স্থানে কয়েকটি সশস্ত্র রোহিঙ্গা সংগঠন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করছে। আবারও কি ইতিহাসের বিপক্ষে হাঁটলেন রোহিঙ্গা নেতৃবৃন্দ?

মিয়ানমারের চরম অশান্ত পরিস্থিতি এবং সীমান্ত প্রতিবেশী দেশগুলোর করনীয় ঠিক করতে মিয়ানমারের আশেপাশের দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি অনানুষ্ঠানিক বৈঠক গত ১৯ ডিসেম্বর ব্যাংককে বসেছিল। এর উদ্যোক্তা ছিল থাই সরকার। মূলত মিয়ানমারের বর্তমান আইন শৃংখলা পরিস্থিতি, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে মিয়ানমারের প্রতিবেশী চীন, বাংলাদেশ, ভারত, থাইল্যান্ড এবং লাওসকে নিয়ে ওই সভায় আয়োজন করে থাইল্যান্ড। ২০ ডিসেম্বর আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ আবার মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। সেই অনানুষ্ঠানিক পরামর্শ সভায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মোঃ তৌহিদ হোসেন মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন।

ধীরে বহে নাফ

ব্যাংকক সম্মেলনের বিশেষ স্টোরিটি ‘ফ্রনটিয়ার মিয়ানমার’ অফিসে পাঠিয়ে ল্যাপটপ অফ করলেন তরুন নিউজ-ক্রেজি আমেরিকান সাংবাদিক। চাও ফ্রায়া নদীর পাশেই হোটেল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন নির্ঘুম মহানগরীর মধ্য রাতের নদীর দিকে...। ব্যাংককের প্রায় ১২০০ কিলোমিটার পশ্চিমে কক্সবাজারের (টেকনাফ) অঞ্চলের নাফ নদীতে তখন অন্য পরিস্থিতি। গভীর রাতে ও পারের রাখাইনের (মংডু) অঞ্চল থেকে নৌকা যোগে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে হতভাগ্য শত শত রোহিঙ্গা। নাফ নদীর এপারে রোহিঙ্গা ঢল থামাতে দিন রাত ডিউটি করছে টেকনাফস্থ সীমান্ত রক্ষী বিজিবি ব্যাটালিয়ন ও কোস্ট গার্ডের সৈনিকরা। এই সীমান্ত রক্ষীদের চ্যালেঞ্চের কথা আমি কিছুটা বুঝতে পারি। প্রায় ১৭ বছর আগে আমিও এ অঞ্চলে সীমান্ত রক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলাম।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন রোহিঙ্গা সংকটের এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে। ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের (বর্ষা বিপ্লব) পর, আগষ্টে ক্ষমতা গ্রহণ করে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থণ নিয়ে বিশেষ প্রচেষ্টা নিয়েছে বর্তমান অন্তবর্তী সরকার। রাখাইনের নতুন পরিস্থিতি উদ্ভব হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরী হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘কৌশলগত হাই গ্রাউন্ড দখলই হতে পারে বাংলাদেশের মূল চাবিকাঠি।’

গত ২ মাসে বাংলাদেশে নতুন করে প্রায় ৬০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ (৪র্থ রোহিঙ্গা ঢল) করার ঘটনাটি মারাত্মক উদ্বেগ তৈরী করেছে। দক্ষিণ পূর্ব দিকে প্রতিবেশী পাল্টে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে আমাদের আগাম প্রস্তূতি ও সতর্কতা জরুরী। আশ্চর্য বিষয় হলো, এত বড় একটি ঘটনা কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে তেমন আলোচিত হচ্ছে না। ‘নিস্ক্রিয়তা’ ও ‘হতবিহ্বলতা’ নয়, ঢাকাকে এখন দ্রুত আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ (কন্সট্রাকটিভ এনগেজমেন্ট) স্থাপন করতে হবে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অর্থনৈতিক অধিকারসহ পুনর্বাসনের বিষয়ে আরাকান আর্মির স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। রাখাইনে রোহিঙ্গা ও রাখাইনদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান তৈরীতে অবদান রাখতে হবে। রাখাইনের দুর্ভিক্ষ ঠেকাতে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য (মানবিক করিডোর) পাঠানো যেতে পারে। সংকটের সঙ্গে এখানে সম্ভাবনাও রয়েছে। তা ঢাকাকে সাহসীভাবে দ্রুত কাজে লাগাতে হবে। আমরা যেন এবার আরাকান ট্রেন মিস না করি।

উল ইয়ন-সাংবাদিকতা থেকে প্রতিরোধ যুদ্ধ

আবার ফিরি ব্যাংককের লুম্বিনী পার্কে...। স্নায়ু-যুদ্ধের সময়কালে বিশেষত ১৯৫০-৬০ দশকে, থাইল্যান্ড ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জোটবদ্ধ। অন্যদিকে, বার্মা সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এই সময়কালে, সীমান্ত এলাকার বার্মিজ জাতিগত গেরিলা সংগঠন ও রেঙ্গুন সরকার-বিরোধী শক্তিগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করে ‍ও তাদের ‘বাফারে’ পরিনত করে থাই সরকার। লুম্বিনী পার্ক এই ধরণের ঘটনার নীরব স্বাক্ষী। এতে বার্মার বিষয়ে ঐ সময়ের থাই-নীতি বোঝার বিষয়টি সহজ হবে।

এক পর্যায়ে হাঁটতে হাঁটতে বিখ্যাত লুম্বিনী লেকের ধারে বসি। ১৯৬৮-১৯৭০ সালে এর কাছাকাছি একটি বাড়ি বার্মিজ প্রতিরোধের কেন্দ্রে পরিনত হয়েছিল। মনে হলো, পার্কের পূর্ব দিকের সেই বাড়িটি আমি দিব্যি দেখতে পাচ্ছি। এর পেছনে ছিল সিআইএ ও থাই গোয়েন্দা বাহিনী। বিখ্যাত বার্মিজ ইতিহাসবিদ ও লেখক থান্ট মিন্ট ইউ-এর লেখা ‘দি রিভার্স অব লস্ট ফুট ষ্টেপস- ‘এ পারসনাল হিস্ট্রি অব বার্মা’-বইতে এর কিছু বিবরণ রয়েছে। তরুন থান্ট মিন্ট ইউ কম্বোডিয়ার (আনটাক) শান্তি মিশনে (১৯৯২-১৯৯৩) নমপেনে আমার একধরণের দূরবর্তী-সহকর্মী ছিলেন। তিনি আনটাকের মানবাধিকার বিভাগে কাজ করতেন। তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থে (হিডেন হিস্টি অব বার্মা) থান্ট মিন্ট ইউ ‘রোহিঙ্গা গণহত্যার’ (২০১৭) কথা প্রায় নির্মোহভাবে তুলে ধরেছেন। দুঃখজনকভাবে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের মতো এই বার্মিজ লেখককেও পরে দেশ ছাড়তে হয়েছে।

বার্মায় সামরিক বাহিনী ক্ষমতা (১৯৬২) দখলের পর তৎকালীন বিখ্যাত বার্মিজ সাংবাদিক-সম্পাদক (দি নেশান) ‘এডওয়ার্ড উল ইয়ন’ থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেন। লুম্বিনী পার্কের পাশের একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন এই ‘ম্যাগসেসে’ অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত সাহসী সম্পাদক। এটি তখন জেনারেল নে উইন-সরকার বিরোধীদের অলিখিত ‘হেডকোয়ার্টারে’ পরিনত হয়। এই সময় আমাদের বিখ্যাত সাংবাদিক এস এম আলী (সৈয়দ মাহমুদ আলী) ‘ব্যাংকক পোষ্টের’ ম্যানেজিং এডিটর (১৯৬৬-১৯৭০) ছিলেন। প্রায় এই সময়ই ব্যাংককে এসেছিলেন আমাদের প্রথম নারী ভাস্কর ‘নভেরা আহমেদ’। নিজের কাল ও সময়ের চেয়ে প্রাগ্রসর এই বাঙালি নারী, তার বন্ধু (ফরাসী যুদ্ধ-ফটোগ্রাফার) পোলানস্কির সঙ্গে ভিয়েতনাম রণাঙ্গনে গিয়েছিলেন। নভেরা ১৯৫৮ সালে রেঙ্গুন যান। আইনজীবি-রাজনীতিক কামরুদ্দীন আহমদ তখন বার্মায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত। রেঙ্গুনে সেই সময় নভেরার একটি প্রদর্শনীও হয়েছিল। নভেরা আহমেদ রেঙ্গুনের কূটনৈতিক সার্কেলে অনেককে ইমপ্রেস করেছিলেন।

‘মিশন ব্যাংকক’ ও অতপর...

বিখ্যাত বার্মিজ রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্রনায়ক ‘উ নু’ ছিলেন বার্মার প্রথম (১৯৪৮) প্রধানমন্ত্রী। উ নু’কে ক্ষমতাচ্যুত করেই বার্মায় সামরিক শাসন এসেছিল। বার্মায় পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রদূত ছিলেন মোহাম্মদ আলী (বগুড়া)। এই বাঙালি রাজনীতিক পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এর পরই কামরুদ্দীন আহমদ বার্মার রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন (১৯৫৭-১৯৬১) । এই দুজন বাঙালি রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রী উ নু’র প্রায় ব্যক্তিগত বন্ধুতে পরিনত হয়েছিলেন। বিদায়ী সাক্ষাৎকারে (১৯৬১) উ নু’র রাষ্ট্রদূত কামরুদ্দীন আহমেদকে বলেছিলেন- ‘পাকিস্তানে কি বার্মায় সেনাবাহিনী কোনদ্নি ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী উ নু ১৯৬৯ সালে (ভারত-বৃটেন হয়ে) থাইল্যান্ড আসেন। সাংবাদিক উল ইয়ন এর বাড়িটি কেন্দ্র করে উ নু, প্রেসিডেন্ট নে উইন এর সরকার-বিরোধি কর্মকান্ড শুরু করেন। সম্পাদক উল ইয়ন হয়ে পড়েন উ নু’র প্রধান উপদেষ্টা ও উৎসাহদাতা।

১৯৬৪ সালে এস এম আলী, হংকং এ করাচীর ‘ডন’ পত্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষ প্রতিনিধি। রীতিমতো ‘ষ্টার’ সাংবাদিক। সেই সময় চীনা নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার বিদেশী সাংবাদিকদের জন্য ছিল বিরল সৌভাগ্য। মার্শাল চেন ই তখন চীনের জেষ্ঠ্য নেতাদের অন্যতম। চীনের বিপ্লবে মার্শাল চেন ই এর চরম সাহসিকতাপূর্ণ ভূমিকা সর্বজনবিদিত। একবার এস এম আলী, মার্শাল চেন ই এর সাক্ষাৎকার মর্যাদাপূর্ণ পত্রিকা ‘ফার ইষ্ট্রার্ন ইকোনোমিক রিভিউ’ এ ছাপিয়ে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি করেছিলেন।

এ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের কয়েকজন সাংবাদিক-গবেষকের চমৎকার একটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। গত ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১ তারিখে বাংলাদেশের ৩ জন সাংবাদিক-গবেষক জুমে আরাকান আর্মির প্রধান মেজর জেনারেল তোয়াং ম্রা নায়িঙ (কাচিন স্টেটে অবস্থানকারী) এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। এঁরা হলেন: শফিকুল আলম (বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব), আলতাফ পারভেজ ও আশফাক রনি। সাক্ষাৎকারটি ২ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে ‘দৈনিক প্রথম আলো’য় প্রকাশিত হয়।

উ নু-উল ইয়নদের উদ্দেশ্য ছিল থাইল্যান্ড একটি প্রতিরোধ ঘাঁটি তৈরী করা। যেখান থেকে মার্কিন ও পশ্চিমা দেশের সাহায্য নিয়ে বার্মার অভ্যন্তরে সরকার বিরোধি বিদ্রোহ সংঘটিত করা। ততোদিনে, বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা বার্মিজ প্রেসিডেন্ট নে উইন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। ব্যাংককে তখন একত্রিত হয়েছিলেন ১৯৫০-দশকের অনেক নেতৃস্থানীয় বার্মিজ রাজনৈতিক-সামরিক ব্যক্তিত্ব। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বার্মার প্রথম প্রেসিডেন্ট সাও শোয়ে থাইক (শান প্রধান) এর স্ত্রী বিখ্যাত ‘মহাদেবী অব ইয়ানঘি’। একসময়ের আলোচিত রাজনীতিবিদ ‘মহাদেবী’ (মহারানী) তখন ‘শান স্টেট আর্মি’র প্রধান’।

এয়ার রেইড ওভার রেঙ্গুন ও লিফলেট বিতরণ!

থাই গোয়েন্দা বাহিনী নির্বাসিত বার্মিজ গ্রুপগুলোকে সংগঠিত করেছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বড় ধরণের সাহায্য আসেনি। উ নু সিআইএর সাবেক কর্মকর্তা বিল ইয়াংকে ‘ইউনাইটেড ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট’ প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল সংগ্রহ সহায়তা করার জন্য ব্যবহার করেছিলেন। তখন উ নু ‘পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেটিক পার্টি’ (পিডিপি) গঠন করেন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন। তবে প্রতিরোধ গোষ্ঠির মধ্যে মাত্র কয়েকশো বা সর্বোচ্চ কয়েক হাজারের বেশী সৈন্য ছিল না।

শুধুমাত্র একটি কানাডিও তেল কোম্পানী কয়েক মিলিয়ন ডলার দিয়েছিল। একটি বিমান রেঙ্গুন পর্যন্ত (এয়ার রেইড ওভার রেঙ্গুন) উড়ে গিয়েছিল। বোমার বদলে ফেলেছিল কয়েক হাজার লিফলেট! নবগঠিত গেরিলা বাহিনী মাত্র কয়েক মাইল ভেতরে যেতে পেরেছিল। থাই সীমান্ত থেকে নে উইন সরকারকে যুদ্ধ করে উৎখাতের করার জন্য তার ঘোষণা চরম ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়েছিল।

এ ডটার্স মেমোয়ার অব বার্মা

এই লুম্বিনী পার্কে এক সময় হাঁটতেন বার্মার প্রতিরোধ গোষ্ঠির নেতৃবৃন্দ। তারা আজ কোথায়? সাংবাদিক উল ইয়ন এর মেয়ে ‘ওয়েনডি উল ইয়ন’ পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে লেখক হিসেবে পরিচিত পান। ওয়েনডি উল ইয়ন এর মেয়ে ‘জোসিলিন সিগ্রেড’ একজন হলিউড-অভিনেত্রী। উল ইয়ন ১৯৮০ সালে (আমেরিকার) মেরিল্যান্ডের সিলভার স্প্রিং এ মৃত্যু বরণ করেন। ওয়েনডি উল ইয়ন তার গ্রন্থে (এ ডটার্স মেমোয়ার অব বার্মা) পিতা উল ইয়নের বার্মার গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম ও থাইল্যান্ডে বার্মার প্রতিরোধ গোষ্টির কার্যকলাপের কথা সবিস্তারে লিখেছেন। উ নু ও উল ইয়ন এর প্রতিরোধ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও তারাই অবশ্য প্রথম (১৯৬৯-৭০) বার্মার প্রায় সকল বিরোধি গোষ্ঠি/দলকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন। পরবর্তীতে এই কাজটি অবশ্য করেছিলেন অং সান সুচি।

লুম্বিনী পার্কে অন্য ধরণের কুমির!

এক সময় আমি অপরূপ লুম্বিনী লেকের পাশে এসে বসি। লুম্বিনী পার্কের অসাধারন সৌন্দর্য্যের মাঝেও একমাত্র অস্বস্তি ছিল লেকে ভেসে বেড়ানো বিশাল আকারের (ওয়াটার মনিটর লিজার্ড) ‘গিরগিটি’। প্রথমে আমি ওদের ‘কুমীর’ ভেবে ভুল করেছিলাম। হঠাৎ করে মিয়ানমারের অন্য ধরণের ‘কুমিরের’ কথা মনে এলো। কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চলে বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) এ চাকুরী ও পরবর্তীতে রোহিঙ্গা-মিয়ানমার বিষয়ক গবেষণা-লেখালেখির কাজে বেশ কিছু রোহিঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। এই হতভাগ্য অত্যাচারিত একদল রোহিঙ্গা নিষ্ঠুর মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে ‘কুমিরের’ সঙ্গে তুলনা করেছিল।

১৯৮০ দশকে ব্যাংককে বাংলাদেশীদের মিলন মেলা

১৯৮০ দশকে ব্যাংকক একঝাঁক মেধাবী বাংলাদেশীর মিলন মেলায় পরিনত হয়। মেধাবী কূটনীতিক শাহ্ এএমএস কিবরিয়া জাতিসংঘের আঞ্চলিক কমিশন (এসকাপ) এর ‘নির্বাহী সচিব’ (১৯৮১-১৯৯২) হিসেবে ব্যাংককে কর্মরত ছিলেন। এটি ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পদ (জাতিসংঘের উপমহাসচিব পদমর্যাদা সম্পন্ন)। এসকাপ সচিবালয়ে সেই সময়ে ড. রহমতুল্লাহ, এএসএইচকে সাদেক (পরে সচিব, মন্ত্রী), এনাম আহমেদ চৌধুরীসহ (সচিব) অনেক উচ্চ পদস্থ বাংলাদেশী কর্মরত ছিলেন। হেদায়েত আহমেদ ছিলেন ইউনেস্কোর আঞ্চলিক পরিচালক। ফাও এর আঞ্চলিক পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ওবায়েদুল্লাহ খান (কবি, সচিব, মন্ত্রী)।

ইউনেস্কোতে প্রচারের দায়িত্বে ছিলেন মাহফুজ আনাম (সম্পাদক, ডেইলী স্টার)। এই সময় ‘পূরবী সাংস্কৃতি চক্র’ নামে একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। চিত্র শিল্পী আসমা কিবরিয়া (শাহ এ এম এস কিবরিয়ার সহধর্মিনী) ছিলেন ‘পূরবী সাংস্কৃতি চক্র’ এর সভাপতি ও প্রধান চালিকা শক্তি। সাংবাদিক এস এম আলী তখন কুয়ালালামপুরস্থ ইউনেস্কোর প্রধান আঞ্চলিক প্রচার কর্মকর্তা (রিজিওনাল কমিউনিকেশন এডভাইজার)।

১৯৮০-১৯৯০ দশকে থাইল্যান্ডে ৩ জন খ্যাতিমান ও পেশাদার সেনাকর্মকর্তা/জেনারেল বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁরা হলেনঃ মেজর জেনারেল কাজী গোলাম দস্তগীর (১৯৭৮-১৯৮২), মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, বীর বিক্রম (১৯৮৯-১৯৯৩) ও মেজর জেনারেল আব্দুল মান্নাফ (১৯৯৩-১৯৯৫)।

ব্যাংকক এশিয়ার অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ফাও, ইউনেস্কো, ইউনিসেফ ইত্যাদি সংস্থাও তাদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর ব্যাংককে স্থাপন করে। ব্যাংককের সকল বাঙালি পরিবার নিয়ে সেখানে তারা সক্রিয় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল তৈরী করেছিলেন।

ব্যাংককে কম্বোডিয়া শান্তি মিশনের অফিস

কম্বোডিয়ায় জাতিসংঘ শান্তিমিশন ‘আনটাক’ (১৯৯২-১৯৯৩) চালু হলে, ব্যাংককে এর ‘চিফ লিয়াজোঁ অফিসার’ এর কার্যালয় স্থাপিত হয় ‘এসকাপ’ এর ১৫ তলা সচিবালয়ের বিল্ডিং এ (রাজডামনার্ন নক এভিনিউ, ব্যাংকক)। গুরুত্বপূর্ণ এই ‘চিফ লিয়াঁজো অফিসার’ পদে প্রথমে নিয়োজিত ছিলেন কর্ণেল ইকরামুল হক (পরে মেজর জেনারেল)। ১৯৯৩ এর মার্চে তার স্থালাভিষিক্ত হন কর্ণেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান (পরে মেজর জেনারেল)। উল্লেখ্য, মেজর জেনারেল মুনীরুজ্জামান বর্তমানে ‘বিআইপিএসএস’ নামক থিংক ট্যাংকের সভাপতি ও ‘গ্লোবাল মিলিটারি এডভাইসোরি কাউন্সিল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ’ এর চেয়ারম্যান। একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক হিসেবে তিনি দেশে বিদেশে অত্যান্ত পরিচিতি ব্যক্তিত্ব।

২০২১- পরবর্তী মিয়ানমার

মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী (তাতমাদো) বর্তমানে দুই ধরণের গৃহযুদ্ধে লড়ছে। একদিকে তাদের প্রতিপক্ষ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগুলোর বিভিন্ন সশস্ত্র গেরিলা দল (ইএও)। এরা মূলত স্বায়ত্তশাসন চায়। অন্যদিকে তাতমাদোর বিরুদ্ধে লড়ছে গণতন্ত্রপন্থী মানুষেরা। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মূলত আং সান সূচীর ক্ষমতাচ্যুত ‘ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসী’ (এনএলডি) পার্টির সংসদ সদস্যদের নিয়ে ‘জাতীয় ঐক্য সরকার’ বা ‘ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্মেন্ট’ (এনইউজি) গড়ে উঠেছে। এই সরকার ২০২১ এর এপ্রিলে ‘পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ) গঠন করেছে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ‘প্রতিরক্ষা যুদ্ধ’ শুরু করেছে। নব গঠিত পিডিএফকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বার্মার কয়েকটি জাতিগত গেরিলা গোষ্ঠি। আগে এমন ঘটনা ঘটেনি।

এনইউজি সরকার অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা না করলেও বর্তমানে (জুন, ২০২৩) থাইল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে কাজ করছে। মূলত এনএলডি পার্টির সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত হলেও এনইউজিতে জাতিগত সংখ্যালঘু বিদ্রোহী গোষ্ঠি এবং রোহিঙ্গাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র দলগুলোর প্রতিনিধিত্বও রয়েছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ‘অং কাও মো’ এনইউজি সরকারের মানবাধিকার বিষয়ক ‘উপমন্ত্রী’ (ডেপুটি মিনিস্টার) হিসেবে কাজ করছেন। জাতিগত গেরিলা গোষ্ঠিগুলো (বিশেষত রাখাইন চিন, কাচিন, কারেন ও শানে) মিয়ানমার বাহিনীর বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য, সফলতা লাভ করেছে। থাইল্যান্ডে এনইউজির খুব ভালো সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। যতদূর জানা যায়, থাইল্যান্ডে আরাকান আর্মিরও ভালো নেটওয়ার্ক রয়েছে।

অর্থনীতি যখন রাজনীতি থেকে দূরে-থাইল্যান্ডের বাস্তবমুখী বার্মা-পলিসি

বার্মার সঙ্গে থাইল্যান্ডের এক ধরণের ‘জটিল’ সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এক সময়ের ‘শত্রুদেশ’ মিয়ানমার কিন্তু এখন থাইল্যান্ডের সীমান্ত বাণিজ্য, মাইগ্রেন্ট লেবার ও প্রাকৃতিক গ্যাসের চমৎকার উৎস দেশ। দুই দেশের সামরিক বাহিনী ও ব্যবসায়ীদের (অলিগার্ক) মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশেই এখন রয়েছে সামরিক সরকার বা সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার (জুন, ২০২৩)। মিয়ানমারে থাইল্যান্ডের বেশ লাভজনক বিনিয়োগ (তৃতীয় সর্বোচ্চ বিদেশী বিনিয়োগ) রয়েছে। বিশেষত জ্বালানী সেক্টরে থাই বিনিয়োগ সর্বোচ্চ। থাইল্যান্ডে এই ‘বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা’ অর্থাৎ মিয়ানমারের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রেখে আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় দেশটির চমৎকার কৌশল বলে বিবেচিত।

২০০১ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ক্ষমতা গ্রহণ করলে থাইল্যান্ড ‘মৃদু সমালোচনা’ করে ও সামরিক সরকারের সঙ্গে পূর্বের সম্পর্ক (বিজনেস এজ ইউজুয়্যাল) বজায় রাখে। থাইল্যান্ডের সেনাবাহিনী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তি/দল মনে করে যে, সেনাবাহিনীই মিয়ানমারে একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা দেশটিতে স্থিতিশীলতা আনতে পারে। থাই সেনাবাহিনী ও ট্রাডিশনাল রাজনীতিকরা, মিয়ানমারের সরকার ছাড়া সেখানকার কোন বিদ্রোহি গোষ্ঠির সঙ্গে আলোচনায় যেতে চায়না। তবে এথনিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো রনাঙ্গণে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করলে এ ধারনা অবশ্য বদলে যেতে পারে।

তবে থাইল্যান্ড জান্তা সরকারের সঙ্গে খুব বেশি এনগেজমেন্ট বৃদ্ধি করেনি। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে ব্যাংকক মূলত এক ধরণের ‘সতর্ক’ অবস্থান বজায় রেখেছে, যেন তারা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান থাকতে পারে। আবার আন্তর্জাতিক সমালোচনাও যেন না হয়।

থাইল্যান্ডে মানবিক কূটনীতি

মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধ ও সরকারের নির্যাতনের কারণে বর্তমানে প্রায় লক্ষাধিক মিয়ানমার নাগরিক থাইল্যান্ডের ৯টি ক্যাম্পে ‘উদ্ধাস্তু’ হিসেবে দীর্ঘদিন (মূলত ১৯৮৪ সাল থেকে) ধরে বসবাস করছে। চিয়াং মাই ও তাক প্রদেশে এই ক্যাম্পগুলো অবস্থিত (থাইল্যান্ডের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে)। এই শরণার্থীদের সহযোগিতার জন্য থাই সরকার ‘মানবিক কূটনীতি’ অবলম্বন করেছেন। শরণার্থীদের জন্য খাদ্য বাসস্থান এবং চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। বার্মার শান (তাই) সম্প্রদায়ের সঙ্গে থাইল্যান্ডের ‍মূল তাই/থাই জনগোষ্ঠির সম্প্রীতিমূলক সম্পর্ক রয়েছে। ভালো কাজের সুযোগ থাকায়, বর্তমানে প্রায় ১৮ লক্ষ বার্মিজ নাগরিক (শ্রমিক) থাইল্যান্ডে কাজ করছে। বাস্তববাদী থাইল্যান্ড সরকার, অর্থনীতির বিষয়টি ‘রাজনীতি-সামরিক’ বিষয়টি থেকে আলাদা করে দেখে।

মিয়ানমার বিষয়ে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র নীতি-ভিশনারী নেতৃত্বের প্রতিফলন

স্নায়ু-যুদ্ধের সময়কালে (বিশেষত ১৯৫০-৬০ দশক) থাই সরকার মিয়ানমারের কয়েকটি অ-কম্যুনিষ্ট গেরিলা দলকে সাহায্য করতো। এটি ছিল সেই সময়ের থাইল্যান্ডের ‘বাফার’ নীতির প্রতিফলন। মিয়ানমারের শান প্রদেশে মার্কিন মদদপুষ্ট অকম্যুনিস্ট গেরিলা দল (মূলত চীনের কুওমিনটাং বাহিনী) শান প্রদেশের কম্যুনিস্ট গেরিলাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতো।

১৯৭০ এর পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে উন্নত হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রী প্রেম তিনসুলানন্দ ১৯৮০ এর প্রথম দিকে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র নীতির দীর্ঘ দিনের ‘বাফার পলিসির’ পরিবর্তন করেন। ১৯৮৮ সাল থেকে থাই সরকার মিয়ানমারের আভ্যন্তরিন বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করে। এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। থাই প্রধানমন্ত্রী তাতিচাই চুনহাভেন এর সময়ে ‘টার্ন দি ব্যাটেল ফিল্ড টু মার্কেট প্লেস’ নীতি গ্রহণ করা হয়। এতে মিয়ানমারসহ ইন্দোচীনের দেশগুলোর সঙ্গে থাইল্যান্ডের বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও দুই দেশের অধিকাংশ জনগণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হওয়ায় সম্পর্কে উষ্ণতা রয়েছে। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীগণ তাদের দূরদর্শিতা ও গতিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

তবে ১৮শ শতাব্দিতে, থাইল্যান্ড ও বার্মার মধ্যে কোন কোন সময় তীব্র উত্তেজনাকর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। বার্মিজ বাহিনী বেশ কয়েকবার থাইল্যান্ড আক্রমণ করেছে। ১৭৬৭ সালে বার্মিজ বাহিনী, থাইল্যান্ড আক্রমন করে রাজধানী আয়াথুয়া শহরকে বিধ্বস্ত করে। সেই সময় থেকে মিয়ানমারকে একটি ‘বৈরী’ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বর্তমানে থাই জনগণ পূর্বের শত্রুতাপূর্ণ অতীতকে তেমনভাবে আলোচনায় আনে না। বাস্তববাদী থাই জনগণ বর্তমানকে গুরুত্ব দেয়।

মিয়ানমারের সংকটে থাইল্যান্ডের অনন্য অবস্থান।

মিয়ানমারের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের অবস্থান একেবারেই অনন্য। ব্যাংকক মিয়ানমারের জান্তা সরকারকে অর্থনৈতিক ও কূটনীতিক ক্ষেত্রে সমর্থন করে থাকে। যা জান্তা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে, ব্যাংককের মিয়ানমারের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠনের উপরেও প্রভাব আছে। তবে এই গেরিলা দলগুলোর সঙ্গে থাইল্যান্ড (চীনের মতো) গভীরভাবে জড়িত নয়।

থাইল্যান্ড হলো মিয়ানমারের বিপ্লবী গোষ্ঠির লাইফলাইন। এ ক্ষেত্রে লেখক হেট হ্লাং উইন লিখেছেন-Thailand is not aiding the Junta-it also serves as a life line of Mynmar's people and anti- junta resistant movement. ২০২১ এর পর অনেক মিয়ানমার নাগরিক থাইল্যান্ডে তাদের সম্পদ স্থানান্তর করেছেন। সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদান এড়াতে হাজার হাজার তরুন থাইল্যান্ডে পালিয়েছে। অনেক মিয়ানমার রাজনীতিক, এক্টটিভিস্ট, বুদ্ধিজীবি থাইল্যান্ডে অবস্থান করে কর্মকান্ড চালান। অনেক থিংক ট্যাঙ্ক, মিডিয়া আউটলেট ও এনজিও থাইল্যান্ডে অবস্থিত।

মিয়ানমারের কয়েকটি জাতিগত গেরিলা সংগঠন তাদের অস্ত্র, খাদ্য, ওষুধ ও লজিস্টিক বিষয়ে থাইল্যান্ডের উপর নির্ভর করে থাকে। যা বহুল আলোচিত। বিভিন্ন বিদ্রোহী সংগঠনের মধ্যে ও বিদ্রোহী সংগঠন ও মিয়ানমারের সরকারের মধ্যে আলোচনার (মিটিং) নিরপেক্ষ স্থান হিসেবে থাইল্যান্ড ব্যবহৃত হয়। এসব কারণে মিয়ানমার সংকটে থাইল্যান্ডের অবস্থান অনন্য ও দেশটি একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় (কি প্লেয়ার)। আশ্চর্যজনকভাবে এ বিষয়টি তেমন আলোচিত হয় না, যেমনটা চীনের বিষয়ে হয়।

থাইল্যান্ড মিয়ানমারের আভ্যন্তরিন রাজনৈতিক সমস্যাগুলোতে সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে বরং একধরণের ‘নিরপেক্ষ অবস্থান’ নিয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধাণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল এর কাছে-শান্তির ফুল (পপি) নিয়ে যত অশান্তি

গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল বা সোনালি ত্রিভূজ (বার্মা-লাওস-থাইল্যান্ড এর সীমান্তবর্তী) এলাকা হলো ড্রাগ ও অস্ত্র ব্যবসায়িদের স্বর্গ রাজ্য। এই সব অঞ্চলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ওয়ার লর্ড, জেনারেল, ড্রাগ-লর্ডদের অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী প্রচলিত আছে। মিয়ানমারের শান রাজ্য (গোল্ডেন ট্রাঙ্গেলের অংশ) হলো যুদ্ধবাজ নেতা, চোরাচালনাকারী এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় কেন্দ্র। শান রাজ্যের পাহাড়ী ঢালে চাষ হয় পপি, যার আঞ্চলিক নাম পিস ফ্লাওয়ার বা শান্তির ফুল। এই শান্তির ফুল নিয়েই যতো অশান্তি। এই পপি ফুল থেকেই প্রস্তূত হয় হেরোইন। এছাড়াও শান রাজ্যে গড়ে উঠেছে শত শত ইয়াবা ও আইস কারখানা। শান রাজ্যের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠনগুলো ব্যাপকভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িত। বাংলাদেশে ইয়াবার সবচেয়ে বড় চালানও আসে এই শান রাজ্য থেকে। শান সীমান্ত সামাল দেওয়াই এখন থাইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় মাথা ব্যাথা।

সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা

মিয়ানমারের সঙ্গে থাইল্যান্ডের দীর্ঘ সীমান্তে (২৪ কি. মি.) শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে থাই সরকার। থাই সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর নাম- ‘বর্ডার পেট্রল পুলিশ’। সাধারণত অশান্ত সীমান্ত অঞ্চল, যেখানে ইনসারজেন্সী বা বিদ্রোহ চলে, সেখানে (বর্তমানে দক্ষিণ থাইল্যান্ডে) ‘থাহান পারান (রেঞ্জার)’ নামে প্যারা মিলিটারি ফোর্স মোতায়েন করা হয়। এই বাহিনী সেনাবাহিনীর অধীনে কাজ করে থাকে। বর্তমানে সীমান্তে চোরাচালান ও মানবপাচার প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করছে থাই কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় ভ্রমন-লেখক মইনুস সুলতান ‘গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল’ এলাকা ভ্রমণের কথা তার গ্রন্থ ‘সুকথাই চিয়াংমাই থাইল্যান্ড ঘুরে বেড়ানো’ গ্রন্থে চমৎকারভাবে উল্লেখ করেছেন। থাইল্যান্ডের উত্তর সীমান্ত (বার্মা-লাওস) দেখভালের জন্য (চোরাচালান বিরোধী দায়িত্ব) দায়িত্বপ্রাপ্ত হলো, ফা মুয়াং টাস্কফোর্স। অন্যদিকে, নারসুয়ান টাস্কফোর্স এর দায়িত্ব দক্ষিণের বার্মা সীমান্ত। তবে দুটি টাস্কফোর্সই থাই সেনাবাহিনীর ‘৩য় আর্মি রিজিওনের’ অধীনে কাজ করে। সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সেনাবাহিনীর গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বলা হয়, সীমান্ত বিষয়ে সেনাবাহিনীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

আলোচিত ‘বার্মা অ্যাক্ট’ ও অতপর...

এবার থাইল্যান্ডে এসে পরিচিত ব্যক্তি-বন্ধুদের (একাডেমিয়া-মিডিয়া-উদ্যোক্তা) মিথষ্ক্রিয়ায় ‘বার্মা’ পরিস্থিতি জানার চেষ্টা ছিল। আগ্রহের একটা বিষয় ছিল-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা অ্যাক্টের’ বাস্তব প্রতিফলন জানা। উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ‘বার্মা অ্যাক্ট’ বিল পাশ হয়। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন বিষয়ে আরো সরাসরি যুক্ত হয়ে গেলো। এই বিলে আছে যে, মিয়ানমারের ভিতরে গণতন্ত্রের সংগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা দেবে। বিল পাশের পর গণতন্ত্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলো বিশেষত ‘এনইউজি’ দারুন উজ্জীবিত হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের চার্চগুলো এই বিল পাশের জন্য লাগাতার তদবির করে যাচ্ছিল। এই সময়ে মিয়ানমারের ভিতর যে ৩টি অঞ্চলে গৃহযুদ্ধের ভয়াবহতা বেশী ছিল সেগুলো হলোঃ কাচিন, চিন ও কারেন অঞ্চল। এই অঞ্চলে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খৃষ্টান জনগোষ্ঠি রয়েছে। ভূ-রাজনীতির মূল আলো পড়বে হয়তো ঔই ৩ টি রাজ্যে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টা তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বার্মা অ্যাক্টের’ পর বার্মার সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো বাড়তি সহায়তা আশা করেছিল। তবে বার্মা অ্যাক্ট এর আওতায় এই দলগুলোকে ‘টেকনিক্যাল ও নন-লিথাল সহায়তা’ দেওয়ার কথা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো মিয়ানমারে সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যম ও সিভিক একটিভিজমে কিছুটা সাহায্য করছে। মানবিক সহায়তায় তারা আছে। এছাড়াও মানবাধিকার, ক্রাইম ডকুমেন্টেশন ও রাজনৈতিক-সংলাপে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশসমূহ সক্রিয় রয়েছে। পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলো যুদ্ধরত বিদ্রোহি গোষ্ঠিগুলোকে সিভিল সোসাইটি পরিচালনা, ক্রাইম ডকুমেন্টেশনে সহায়তা করছে। অন্যদিকে ভারতসহ এক নায়কতান্ত্রিক দেশগুলো (চীন, রাশিয়া) মিয়ানমার সরকারকে ‘যু্দ্ধ পরিচালনায়’ সাহায্য করছে। পশ্চিমা দেশসমূহ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন বিশেষত অস্ত্র সরঞ্জামাদি না পাওয়ায় এনইউজিসহ মিয়ানমারের বিদ্রোহি গোষ্ঠিগুলো কিছুটা হতাশ।

বার্মায় যতো মার্কিন ও ওয়েস্টার্ন কানেকশন!

মিয়ানমারের পার্বত্য অঞ্চলে বিশেষত কারেন, কাচিন, চিন ও কারেনি ও শান অঞ্চলে (মূলত খ্রিস্টান অধ্যুষিত অঞ্চলে) রিলিফ সংস্থা ও খ্রিস্টান মিশনারী-যুক্ত এনজিওগুলো তৎপর। থাইল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে থাইল্যান্ড-বার্মা বর্ডার ‘কনসোটিয়াম’। এরা রিফিউজি ক্যাম্পে খাদ্য ও ঔষুধ সরবরাহ করে থাকে। রবার্ট ডি কাপলানের আলোচিত বই ‘মনসুন’ এ বর্ণিত হয়েছে কিভাবে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশের সাবেক কিছু সেনা সদস্য এই ধরণের প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থেকে ইনটেলিজেন্সের (গোয়েন্দা) কাজও করে থাকেন। মিয়ানমারের দুর্গম যুদ্ধ কবলিত অঞ্চলে মানবতা সেবায় অনেক মিশনারী (বিশেষত পশ্চিমা দেশের) নিয়োজিত রয়েছেন। মানবিক সহায়তা দানকারী এই সব এনজিও/সংস্থা নিয়ে কিছু বিতর্ক অবশ্য আছে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি মিয়ানমার বিষয়ে ‘রনাঙ্গণ পর্যায়ে’ প্রকাশ্যে জড়িত হতে চায়-তাহলে তাকে থাইল্যান্ডের মাধ্যমেই করতে হবে। কিন্তু থাইল্যান্ড এভাবে নিজেকে জড়াতে চায় না। কারণ মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা সীমান্ত উপচে থাইল্যান্ডে এসে পড়বে। এছাড়াও থাইল্যান্ড মিয়ানমারের প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। তাই কোন বিদ্রোহী এথনিক গোষ্ঠিকে ব্যাপকভাবে অস্ত্র দিয়ে তারা মিয়ানমার জেনারেলদের ক্ষ্যাপাতে চায়না।

যতোদূর জানা যায়, থাইল্যান্ডের মাটি থেকে (সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করে) ন্যাশনাল ইউনিটি গভমেন্ট এবং কয়েকটি এথনিক গোষ্ঠি (সংখ্যায় অল্প) মিয়ানমারের অভ্যন্তরে কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি হলো- থাই সরকারকে চাপ দেওয়া, যেন থাইল্যান্ড এ বিষয়টি উপক্ষা করে।

ব্যাংককে এই মর্মে, একটা আলোচনা শুনেছি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের কয়েকটি গেরিলা সংগঠনকে (থাই সেনাবাহিনীর ঘনিষ্ঠ) গোপনে অস্ত্র পাঠিয়ে থাকে। তবে তা, মোটেই বড় আকারের নয়। যাইহোক, এ বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মিয়ানমারের ‘নিউজরুম’ যখন থাইল্যান্ডে

যুদ্ধ হচ্ছে মিয়ানমারের বিস্তৃীর্ণ রনাঙ্গণে। অথচ মিয়ানমার যুদ্ধের ‘সংবাদের ঘাঁটি’ হলো থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও চিয়াং মাই। ইরাওয়াদী (ইরাবতী), নারিনজারা, মিজ্জিমা ইত্যাদি সরকার বিরোধী পত্রিকা থাইল্যান্ড (চিয়াং মাই, ব্যাংকক) থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। চিয়াং মাই শহর থেকে একদল নির্বাসিত বার্মিজ সাংবাদিক ‘ইরাওয়ার্দী’ (ইরাবতি) পত্রিকা বের করেন। এখানেই থাকেন বিখ্যাত সুইডিস সাংবাদিক ‘বার্টিল লিন্টনার’, যিনি একজন সাংবাদিক ও কৌশলগত কনসালটেন্ট। এই দূধর্ষ ‘বার্মা বিশেষজ্ঞ’ উত্তর পূর্ব ভারত-বার্মা-থাইল্যান্ড অঞ্চলের উপর রির্পোটিং করে সাংবাদিকতা জগতে ‘লিজেন্ডে’ পরিনত হয়েছেন। তার অন্যতম বিখ্যাত বই হলো- ‘ল্যান্ড অব জেড-এ জার্নি ফ্রেম ইন্ডিয়া থ্রু নদার্ন বার্মা টু চায়না’। আশা করি, একদিন বাংলাদেশেও বার্টিল লিন্টার এর মতো সাংবাদিক আমরা দেখতে পাবো।

উল্লেখ্য, প্রায় ৪৭ বছর আগে ‘ব্যাংকক পোস্ট’ রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি স্মরণীয় নিউজ করেছিল। ১৯৭৮ সালে বার্মিজ বাহিনীর নির্যাতনের মুখে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজার এলাকায় অনুপ্রবেশ করেছিল। ঢাকায় প্রত্যাবাসন আলোচনার একপর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তারা বার্মার প্রতিনিধি দলকে বেশ কড়া কথা শুনিয়েছিলেন। এ বিষয়ে ‘ব্যাংকক পোস্ট’ একটি নিবন্ধন ছেপেছিল। ‘বাংলাদেশ ওয়ার্নস বার্মা’ ‘বাংলাদেশ বার্মাকে সতর্ক করলো’ (১৭ মে ১৯৭৮)। উল্লেখ্য, সেই সময়ে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি মোকাবেলায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক কৌশল ও দৃঢ়তা দেশে ও বিদেশে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। সাপ্তাহিক ‘দি ইকোনমিস্ট’ ১২ আগষ্ট ১৯৭৮ প্রকাশিত প্রতিবেদনে মন্তব্য করে ‘‘এক মাস আগে বার্মা ও বাংলাদেশ যে তাদের শরণার্থী সমস্যার একটি সুশৃঙ্খল ও তাৎক্ষণিক সমঝোতায় পৌঁছেছে, তা কি কোন অলৌকিক ঘটনা, নাকি মরীচিকা? ”

যখন ব্যাংককের গ্রান্ড প্যালেসে

আমরা এখন ব্যাংককের অপরূপ রাজপ্রাসাদ বা গ্রান্ড প্যালেসে। ৩০ জুনের দুপুর প্রায় বারোটার দিকে রাজকীয় চত্বরে পৌছেছি। রাজকীয় চত্বরটি যেমন বিপুল, তেমনি নানা প্রকারের ভবনসমূহের বর্নাঢ্যময় উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমরা ফনা তোলা নাগের প্রতীক বিশিষ্ট ‘চৌদেওয়ার’ পার হয়ে মূল আঙ্গিনায় ঢুকি। এখানে অবশ্য রাজা থাকেন না। আমাদের চোখের সামনে চেদি ও বৌদ্ধ স্তূপসমূহের গোলাকার উর্ধ্বমুখী স্পাইরাল স্থাপত্য ও তার পাশাপাশি বহুতল ছাদ বিশিষ্ট ভবনরাজি এক ধরনের গোলক ধাঁধার সৃষ্টি করে। এখানে এসে আমার নমপেনের অপরূপ রাজপ্রাসাদের কথা মনে পড়ে।

বিশাল রাজপ্রাসাদ কমপ্লেক্সে ঘুরতে ঘুরতে ‘চকরি মহাপ্রাসাৎ’ নামক বড় একটি অট্টালিকার সামনে এসে দাঁড়াই। প্রখর সূর্যালোকে প্রাসাদের স্বর্ণালী মন্ডপ আমাদের চোখে বর্নীল ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করে। সিংহাসন রাখা দরবার হলের পাশ দিয়ে হেঁটে ছায়াচ্ছন্ন খোলা এক মন্ডপে বসে পড়ি। এখানে একটি স্টল থেকে চা কেনা হয়। এখানে দেখা হয় কয়েকজন বিদেশী পর্যটকের সঙ্গে। সবাইকে খুব ক্লান্ত মনে হয়। এক পর্যায়ে, পরিচয় হয় একজন মধ্যবয়সী বার্মিজ নাগরিকের সঙ্গে, যিনি কুয়ালালামপুরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। মনে করা যাক, অধ্যাপকের নাম-খিন মঙ।

বার্মিজরা (মঙ্গলয়েডদের মতো) সাধারনত নিজেদের দুঃখ কষ্ট বা মনের ভাব সহজে অন্যের কাছে প্রকাশ করেন না। অর্থাৎ বাঙালিদের বিপরিত! যাই হোক, কিছু পরে অবশ্য চশমা পরা এই অধ্যাপক দীর্ঘ প্রবাস জীবনের কথা বলেন। তাঁর দীর্ঘ নিঃশ্বাসে দৃশ্যমান হয় ছেড়ে আশা মাতৃভূমির জন্য বেদনা। খিন মঙ বলেন- ‘তার প্রিয় শহর রেঙ্গুন এর অর্থ- যুদ্ধের পরিসমাপ্তি। অথচ ১৯৪৮ থেকেই সেই অঞ্চলে এক ধরণের যুদ্ধ চলছে। বার্মিজ ভাষায় নে ইউন অর্থ ‘উজ্জল আলো’। কিন্তু লোকটা মিয়ানমারকে অন্ধকারে নিয়ে গেলেন।’ মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিয়ে বলেন- ‘‘এটা সত্যি তাতমাদোই মিয়ানমারকে ধরে রেখেছিল। আজ ওরাই দেশটাকে ধ্বংস করছে’’।

১৭৬৭ সালে, বার্মিজ বাহিনী তৎকালীন থাই রাজধানী ‘আয়ুধায়ায়’ (অযোধ্যা) আক্রমণ করেছিল। এতে নগরটি প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। থাই-বার্মা সম্পর্ক প্রসঙ্গে, বার্মিজ বাহিনীর আক্রমণ ও ধ্বংসের কথা এই অধ্যাপককে জিজ্ঞাসা করি। তিনি কৌতুক করে বলেন- ‘‘ঐ আক্রমণ না হলে তো এই ব্যাংকক শহর ও এই রাজপ্রাসাদ হয়তো হতো না’’ জানতে চাইলাম, এনইউজি সরকার, পশ্চিমা সাহায্য, বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে...। চশমা টেনে অধ্যাপক কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বললেন- ‘‘চীনের তুলনায় এগুলো হলো- পেপার টাইগার বুঝলেন? শোনেন বার্মার মানুষকে নিয়ে কেউ ভাবেনা। সবার দৃষ্টি বার্মার সম্পদের দিকে”। একপর্যায়ে খিন মঙ বলেন- ‘‘আগামী বছর কিছু পরিবর্তন হয়তো দেখবেন’’!

জমিদার বাড়ি থেকে পলিথিনের ঝুঁপড়িতে-একজন রোহিঙ্গা সেনা কর্মকর্তার ভাগ্য

বিকেলে এসেছিলাম ব্যাংককের চাও ফ্রায়া নদীর ধারে গড়ে ওঠা অপরূপ পর্যটন এলাকা ‘এশিয়াটিক দ্যা রিভার ফ্রন্টে’। হাজার পর্যটকের ভিড়ে একসময় ব্যাংককে থাকা একজন হতভাগ্য রোহিঙ্গা সেনা কর্মকর্তা-‘জেনারেল ওমর হাকিম’ এর কথা মনে পড়লো। রাখাইনের মংডুতে জন্মগ্রহণকারী ওমর হাকিম বার্মা সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেছিলেন। পরে কর্তপক্ষের হয়ে লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। তবে সেনাবাহিনীতে একপর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তিনি পালিয়ে থাইল্যান্ড চলে যান। সেখান থেকে মালয়েশিয়া। ২০০০ সালে গোপনে দেশে (মংডু) ফিরেছিলেন। ২০১৭ সালে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে শরণার্থী হয়ে বাংলাদেশে আসেন। কুতু পালং ক্যাম্পে এখন তিনি পলিথিনের ঝুপড়িতে থাকেন। মংডুর জমিদারের ছেলে এখন বিপন্ন শরণার্থী। জীবন কি বিচিত্র! (এই তথ্যটা কক্সবাজারের সাংবাদিক-লেখক মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের বই- ‘রক্তাক্ত আরাকান বিপন্ন রোয়াইঙ্গা’ থেকে নেওয়া। সাবেক এই রোহিঙ্গা সেনা কর্মকর্তার সঠিক র‌্যাংক বা পদ যাচাই করা যায়নি)।

পাতায়া সমুদ্র সৈকতে চিয়াং মাই ‘লিসেনিং পোস্টের’ গল্প

২৬ জুন, ২০২৩। পাতায়া শহরে এখন সকাল। হোটেল থেকে বীচ রোড পেরিয়েই সমুদ্র। গালফ অব থাইল্যান্ড এর নীল জল। সৈকতে আমরা হাঁটতে থাকি। উঁড়ছে একদল সাদা সী গাল। কিছু দূরে সমুদ্রে একটা প্লাটফর্ম থেকে প্যারা সেলিং শুরু করেছে একদল টুরিস্ট। বীচ রোডের ধারে বসার ব্যবস্থা। ওখানে পরিচয় হয় একজন বেশ বয়ষ্ক আমেরিকান-পর্যটকের সঙ্গে। কর্ণেল জনসন (আসল নাম নয়), একজন ভিয়েতনাম-ভ্যাটরান। আমার পরিচয় পেয়ে প্রাণ খুলে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, থাইল্যান্ড, বার্মা নিয়ে কথা বলেন...।

বিচে একদল বিদেশী নারী পুরুষ উৎসাহ নিয়ে আবর্জনা কুড়াচ্ছে। জনসন বলেন- ওরা ইউএস ওয়ার ভেটেরান্স (ভেটারান্স ওয়াইভস ক্লাব) এর একটি দল। ‘ট্রাশ পিক আপ ডিটেইল-চলছে।

বিশাল দেহের কর্ণেল বলেন- ‘‘শোন ১৯৬৯ সালে যখন (আরএন্ডআর এ) সায়গন থেকে পাতায়ায় প্রথম আসি... সামরিক বিমানে সায়গণ থেকে পাতায়ার নিকটবর্তী ইউ-থাপাও এয়ার বেজে। এখানে তখন ছোট্ট ছোট্ট কয়েকটি কটেজ ছিল মাত্র...। বড় হোটেল একটি-নিপা লজ। আমি জংলি হাতিও দেখেছি...’’।

কর্ণেল একসময় পর্যটন ব্যবসায় জড়িত ছিলেন। আমার সঙ্গে চিয়াং মাই এর গল্প বলেন। ‘‘চিয়াং মাই হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ‘লিসেনিং পোস্ট’। একসময় এখান থেকে দক্ষিণ চীন, লাওস, কম্বোডিয়া থেকে সিগনাল ইন্টেলিজেন্স সংগ্রহ করা হতো। ওখানে আমেরিকান কনসুলেটটি এখন বড় আকারে তৈরী হচ্ছে। বার্মা ঘিরে নতুন কোল্ড ওয়্যার শুরু হচ্ছে। এবার চীন-রাশিয়া একদিকে, অন্যদিকে ইউএসএ। এর প্রভাব তোমাদের বাংলাদেশের উপরও কিন্তু পড়বে। থাই-বার্মা বিষয়াদি বুঝতে তোমাকে চিয়াং মাই অঞ্চলে কিছুদিন থাকতে হবে। তাহলে গুরুত্বপূর্ণ শান প্রদেশের রাজনৈতিক-সামরিক ডেভলেপমেন্ট বুঝতে পারবে। ’’ আর অবশ্যই যেতে হবে তাক প্রদেশের মায় সট শহরে-বার্মার গেটওয়ে। সীমান্ত বাণিজ্য, চোরাচালান, এনইউজি-কারেনদের কর্মকান্ড, কল ও স্ক্যাম সেন্টার...।

কর্ণেল জনসন সম্ভবত এ অঞ্চলে ইন্টেলিজেন্সও (গোয়েন্দা বিভাগে) কাজ করেছেন। এই অঞ্চল তার নখদর্পনে। বাংলাদেশের মিয়ানমার নীতি নিয়ে একটু খোঁচা মারলেন- ‘‘তোমরা কেন যেন এসার্টিভ না...’’। বার্মা অ্যাক্ট নিয়ে কিছু কথা হয়। আমার দিকে কিছুটা হেঁসে বললেন- ‘‘শোন, আমেরিকানরা হুট হাট করে কিছু করে না...। সব কিছুর একটা সময় আছে’’। বার্মা সম্পর্কে আমেরিকার অবস্থান কিছুটা বুঝতে পারলাম। কর্ণেল জনসন তাঁর চিয়াং মাই এর রিসোর্টের ছবি দেখালেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এবার চিয়াং মাই আর যাওয়া হলো না।

চিয়াং মাই প্রসঙ্গে সুইডিশ সাংবাদিক ‘বার্টিল লিনটার’ এর প্রসঙ্গ আসে। ‘‘বার্টিল লিনটার কিন্তু আমার ভালো বন্ধু। ও ওখানে বিয়ে টিয়ে করে একেবারে এই সমাজের সঙ্গে মিশে গেছে’’-বলেন কর্ণেল। এরপর আইফোনের স্ক্রিণে বার্মার উপর একটি লেখা পড়তে বলেন। ‘‘হোয়াট এ নিউ থাই গভারমেন্ট কুড মিন ফর মিয়ানমার’’-বার্টিল লিটনার (দি ইরাওয়ার্দী, ২৯ মে ২০২৩)।

মিয়ানমারের সংঘাত প্রশমন প্রচেষ্টা ও আসিয়ানের ভূমিকা

মিয়ানমার সংকটে থাইল্যান্ডের ‘সংঘাত প্রশমন প্রচেষ্টা’ ও আসিয়ানের ভূমিকা নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। কর্ণেল জনসন বলেন- ‘‘মিয়ানমারের শান্তি পুনরুদ্ধারের জন্য ২০২১ এর এপ্রিলে আসিয়ান দেশসমূহ ‘৫ দফা ঐক্যমত্য’ পরিকল্পনায় সম্মত হয়। বর্তমানে আসিয়ান (বিশেষত মালয়েশিয়ায়) সেই ৫-দফা শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে চায়। ওখানে থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের মাঝে ‘হিউমেনিটারিয়ান করিডোর’ চালু করার কথা। তবে সমস্যা কিন্তু অন্যখানে...। ‘থাইল্যান্ডের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার এটি চাইলেও হয়তো হবেনা। এর কারণ মিয়ানমার সীমান্তের স্পর্শকাতর এলাকায় থাই সেনাবাহিনীর কথাই শেষ কথা। ব্যাংককস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নয়। তবে ভবিষ্যতে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার মিয়ানমারের বিষয়ে থাইল্যান্ডের বর্তমান পলিসি পরিবর্তন করতে চাইতে পারে। মিয়ানমারের যুদ্ধ বন্ধে সক্রিয় উদ্যোগও গ্রহণ করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে থাই সেনাবাহিনীকে আস্থায় না নিলে তাদের মধ্যে দ্বন্দ তৈরি হতে পারে’- বললেন কর্ণেল।

মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ‘গলফ ডিপলোমেসি’

কর্ণেল জনসন এর সাথে কথা বলে, থাই-মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জেনারেল সম্পর্কে নতুন তথ্য পেলাম। ‘‘বার্মায় জেনারেলগণ ব্যক্তিগত সম্পর্ককে (ক্যাজুয়াল এন্ড পারসনাল) খুব গুরুত্ব দেয়। বার্মার অনেক প্রভাবশালী জেনারেলের সঙ্গে থাই জেনারেল ও রাজনীতিকদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে।’’ সামরিক কূটনীতির আলোকে দুই সেনাবাহিনীর মধ্যে উচ্চ পর্যায়ের ভিজিট প্রায়ই হয়ে থাকে। এই সময়ে, চোখ ধাধানো সুন্দর গলফ ক্লাবগুলো দুই সেনাবাহিনীর প্রীতিময় সম্পর্কের প্রতীক হয়ে পড়ে। গলফের প্রাণবন্ত পার্টিগুলো দেখে তখন মনে হয়না-মিয়ানমার থাইল্যান্ডের প্রায় ২৪০০ কিঃ মিঃ ব্যাপী সীমান্তে ড্রাগ, অস্ত্র চোরাচালান, ইনসারজেন্সী, শরণার্থী সমস্যা, সীমান্ত সংঘর্ষ, অনুপ্রবেশ, ও প্রক্সি ওয়্যার আছে বা একসময় ছিল।

মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তা ও ধনী ব্যবসায়ীদের মধ্যে গলফ খেলা বেশ জনপ্রিয়। একই ঘটনা থাইল্যান্ডেও। লেখক-বিশ্লেষক মেজর মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম (অবসরপ্রাপ্ত) মিয়ানমারের সিথওয়েতে কনসুলেট প্রধান হিসেবে (১৯৯৯-২০০২) চাকুরী করার বিরল অভিজ্ঞতার অধিকারী। ২০০০ সালে টেকনাফ সীমান্তের একটি ঘটনা কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সীমান্তে বেশ উত্তেজনা দেখা দেয়। দুই দেশের বাহিনী তখন প্রায় মুখোমুখি অবস্থানে। সীমান্তে এমন বৈরীতার মধ্যেও বাংলাদেশের কনসাল (মেজর এমদাদ) ও মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় সেনাকমান্ডার জেনারেল অং টোয়ে সিথওয়ের (আকিয়াব) গলফ ক্লাবে একসঙ্গে গলফ খেলছিলেন। সেদিন অত্যন্ত স্মার্ট ও দক্ষ সেনা কর্মকর্তা মেজর এমদাদ গলফের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে মিয়ানমারের জেনারেলকে সীমান্ত পরিস্থিতি সুন্দরভাবে বোঝাতে সক্ষম হন। গলফ-ডিপলোমেসি সেদিন সীমান্ত যুদ্ধকে থামিয়ে দিতে সহায়ক হয়েছিল।

অদ্ভুত বিষয় হলো, শুধুমাত্র মিয়ানমার আর্মি বা সশস্ত্র বাহিনী নয়; এমন কি কোন কোন গেরিলা আর্মির অফিসারগণও গলফ খেলে থাকে। কাচিন ইনডিপেন্ডেন্স আর্মির (কেআইএ) সদরদপ্তর ‘লাইজাতে’ তাদের নিজস্ব গলফ কোর্স রয়েছে। কেআইএর কর্ণেল মারান জ টাংয়ং বলেন- ‘‘গলফ খেললে অফিসারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ে’’। উল্লেখ্য, আরাকান আর্মির জন্ম হয়েছিল কাচিনের এই লাইজাতে। দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব প্রাচ্যেও গলফ জনপ্রিয়। গলফ খেলার সময়, রিলাক্সড ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে অন্যপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়ে থাকে।

ঈদের নামাজে একজন মজলুম রোহিঙ্গার মোনাজাত

২৯ জুন ২০২৩, ঈদ উল আজহা। ঈদের নামাজ পড়তে এসেছি ব্যাংককের সেন্ট্রাল মসজিদে। অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা। এদেশে প্রায় ৫% নাগরিক ইসলাম ধর্মের অনুসারী। নামাজে এসে শাহনেওয়াজ আহমদ নামে একজন রোহিঙ্গা যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয়। আবেগে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরি। বহু বছর আগে কাঠের নৌকায় চড়ে বঙ্গোপসাগর, আন্দামান সাগর পেরিয়ে পরিবারের সঙ্গে ‘শিশু শাহনেওয়াজ’ মালয়েশিয়া এসেছিল। এখন ব্যাংককে একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকুরী করছে। কক্সবাজারে দেখা হত দরিদ্র, বিপন্ন রোহিঙ্গাদের বিপরীতে শিক্ষিত ও সুবেশিত এই যুবকটিকে দেখে খুব ভালো লাগলো।

শাহনেওয়াজ আহমদ থাইল্যান্ডের ‘রোহিঙ্গা এসোসিয়েশন’ ও ‘আরাকান প্রজেক্ট’ নিয়ে কথা বলে। ব্যাংককে রোহিঙ্গাদের ক্ষুদ্র একটি কমিউনিটি আছে। শাহনেওয়াজ আমাকে সেখানে দাওয়াত দিলেন। মোনাজাতের সময় লক্ষ্য করি যুবকটির চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির সাধারণ মানুষেরা তাদের উপর নেমে আসা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে জানেনা। চোখের জলই তাদের প্রতিবাদের ভাষা। মোনাজাতে আমিও অত্যাচারিত, বিপন্ন, দরিদ্র হতভাগ্য, মজলুম রোহিঙ্গাদের মঙ্গল ও মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি...। কেন তাদের প্রতি এতো অত্যাচার, অবিচার...? কেন তাদের এতো কষ্ট, এতো দুঃখ...? জনম দুখী রোহিঙ্গাদের দুঃখ কি শেষ হবে না?

অথৈ সমুদ্রে ভাসা ‘রোহিঙ্গা বোট ‍রিফিউজিদের’ করুন কাহিনী

শাহনেওয়াজের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর হতভাগ্য ‘রোহিঙ্গা বোট রিফিউজিদের’ কথা ভাবছিলাম! বছরের পর বছর ধরে রাখাইন থেকে (এমনকি বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকেও) হাজার হাজার রোহিঙ্গা ঝুঁকি নিয়ে অভিবাসনের আশায় সমুদ্র পথে কাঠের নৌকায় ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছে। সাধারণত অক্টোবর থেকে এপ্রিলের মধ্যে রোহিঙ্গারা সমুদ্র পথে যাওয়ার চেষ্টা করে-তখন বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান সাগর শান্ত থাকে। টেকনাফ অঞ্চলে বিডিআর এ দায়িত্ব পালনকালে এসব ঘটনা জানার সুযোগ হয়েছিল। এই হতভাগ্যদের উল্লেখযোগ্য অংশই মৃত্যুবরণ করেছে বলে মনে করা হয়।

২০১২ সালে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের উপর চরম নির্যাতন নেমে এলে এবং নিজ জন্মভূমিতে অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার সব আশা হারিয়ে-রোহিঙ্গারা ব্যাপকহারে (২০১২-২০১৫) সাগর পথে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিল। এই সময় এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল সংঘবদ্ধ মানবপাচারকারীদের দল। একটি গবেষণায় প্রকাশ-২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত, প্রায় এক লাখ সত্তুর হাজার মানুষ মানাবপাচারকারীদের হাতে পড়ে পাচার হয়েছে। কিছু বাংলাদেশী নাগরিক ছাড়া পাচারকৃত এসব মানুষ সবাই রোহিঙ্গা। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের সংঘবদ্ধ এইসব মানবপাচারকারী মানুষ পাচারের মাধ্যমে বছরে ৫০ থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে। যাত্রাপথে এইসব নারী, পুরুষ আর শিশুদের উপর চালানো হয় জঘন্য অত্যাচার ও নিপীড়ন। এই রোহিঙ্গাদের অনেকে মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ায় থাকা তাদের আত্মীয়দের কাছে যাওয়ার জন্য নিজেরাই ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পথে বের হয়েছিল। আবার অনেকে মানবপাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে অবৈধভাবে সমুদ্র পথে সফর করতে বাধ্য হয়। অনেক সময় আটকে রাখা পাচারকৃত রোহিঙ্গাদের আত্মীয়স্বজন থেকে অর্থ আদায় করা হতো।

রোহিঙ্গাদের মালয়েশিয়া যাওয়ার ‘ট্রানজিট’ যখন থাইল্যান্ড

২০১৫ সালের মে মাসে আন্দামান সমুদ্রে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীর্ণ নৌকায় চড়ে সমুদ্রে ভাসছিল। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া এই অসহায় মানুষদের গ্রহণ করছিল না। এই বিষয়টি নিয়ে মিডিয়ায় ব্যাপক আলোচনা হলে-সারা বিশ্বে হৈ চৈ পড়েছিল। মানবপাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার সময় থাইল্যান্ডকে ‘ট্রানজিট’ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। ২০১৫ সালের মে মাসে থাইল্যান্ডের দুর্গম পাহাড়ে ৩২ টি অগভীর কবরের সন্ধান পাওয়া যায়। এটি থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত একটি স্থান। যেখানে পাচারের পূর্বে রোহিঙ্গাদের অপেক্ষায় রাখা হতো ধারনা করা হয়। পরে মালয়েশিয়ার পুলিশ দেশটির সীমান্ত অঞ্চলে ১৩৯ টি কবরের সন্ধান পায়। উল্লেখ্য, মে মাসের প্রথম দিকে থাই কর্তৃপক্ষ মানবপাচারকারি চক্রগুলোর কর্মকান্ড কঠোরভাবে দমনের উদ্যোগ নেওয়ার পর আন্দামান সাগরে ভাসমান হাজার হাজার অভিবাসন প্রত্যাশির সংকটের চিহ্ন প্রকাশ পায়।

সমুদ্র পথে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে থাইল্যান্ড ‘পুশ ব্যাক টু সী’ (রিফাউলমেন্ট) নীতি অনুসরণ করে। উপকুল রক্ষী বাহিনী সাধারণত এইসব শরণার্থী বহনকারী নৌকাগুলো ফিরিয়ে দেয়। কখনো এইসব অভিবাসিদের নৌকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করে আবার সমুদ্রে ঠেলে দেওয়া হয়।

দুর্ধষ্য মানবপাচারকারী চক্র পালিয়ে আসা অসহায় রোহিঙ্গাদের থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় স্লেভ লেবার বা ‘দাস শ্রমিক’ হিসেবে ব্যবহার করে। বিশেষত থাইল্যান্ডের ‘চিংড়ি মাছের শিল্পে’ এই দাস শ্রমিকদের ব্যবহার করানো হয়। মাছের মতো রোহিঙ্গাদের বিক্রি করা হয়েছে হাত বদল হয়েছে। থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ‘রোহিঙ্গা দাস শ্রমিক’ গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিনত হয়েছিল। এ নিয়ে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা থাই সরকারের সমালোচনা করেছে। থাই কর্তৃপক্ষের একাংশ কিভাবে রোহিঙ্গাদের দুর্গম অঞ্চলে ‘ক্যাম্পে’ আটকে রেখে পরে মানবপাচারকারীদের কাছে বিক্রি করতো-এই মর্মে ‘রয়টার’ একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ৫ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে প্রকাশ করেছিল (থাইল্যান্ড’স ক্লেনডেনস্টাইন রোহিঙ্গা পলিসি আনকাভারর্ড)

থাইল্যান্ডে মানবপাচারের এই জঘন্য কাজে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যাপক যোগসাজস ছিল। পরবর্তীতে এ জন্য, থাই সেনাবাহিনীর একজন জেনারেল ও কয়েকজন পুলিশ অফিসারের কঠোর শাস্তি হয়েছিল। তবে আশ্চর্য বিষয়, এতো বড় ঘটনায় খোদ মিয়ানমার সরকারের টিকিটাও স্পর্শ করা যায়নি। এই পৃথিবীতে রোহিঙ্গাদের দেখার কি কেউ নেই? সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবনতা এখনও চলছে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে থাইল্যান্ডে আলোচনা

লক্ষ্য করি, থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলোচনা খুব কম। এর প্রধান কারণ হলো রাখাইনের সঙ্গে থাইল্যান্ডের কোন সীমান্ত নেই। মিয়ানমারের কায়িন (কারেন), কায়াহ (কারেন্নি), মন ও শান স্টেটের বিষয়গুলো থাইল্যান্ডে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়। রোহিঙ্গাদের ধর্মের (ইসলাম) বিষয়টিও হয়তো এ ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে।

তবে ২০১৫ সালের মে মাসে ‘রোহিঙ্গা নৌকা শরণার্থী সমস্যা’ এবং বিশেষত দক্ষিণ থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গাদের নিয়ে থাই মানবপাচারকারীদের জঘন্য সংশ্লিষ্ঠতা বিশ্বজুড়ে হৈ চৈ ফেলে। তখন থাইল্যান্ডে রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। থাই সমাজে রোহিঙ্গাদের প্রতি উল্লেখ করার মতো সমবেদনা নেই। আবার তীব্র অপছন্দও নেই। বর্তমানে বিভিন্নভাবে থাইল্যান্ডে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

মিয়ানমার বাহিনী (তাতমাদো) সামলানোর মূলমন্ত্র জানে থাই আর্মি

থাইল্যান্ড সশস্ত্রবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ থাই সেনাবাহিনী (রয়াল থাই আর্মি) একটি শক্তিশালী বাহিনী। এরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাহীন থাইল্যান্ডে অনেকবার অভ্যূত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে তাদের ব্যাপক প্রভাব আছে। থাই সেনাবাহিনী (স্পেশাল ওয়ারফেয়ার কমান্ড, টাস্কফোর্স-৯০) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের পিএসএফ/এসএসএফ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছিল। কম্বোডিয়ার শান্তি মিশনে থাই সেনাবাহিনীর একটি ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে কাজ করতো। সেই অঞ্চলে দায়িত্বপালন কালে বন্ধু সূলভ থাই সেনাবাহিনী সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। সেনানিবাস, বাসস্থান, যানবাহন, অবকাঠামো ইত্যাদি বিবেচনায় আপত দৃষ্টিতে থাই বাহিনী হয়তো ঝঁলমলে নয়। তবে তারা পেশাদার বাহিনী, আধুনিক অস্ত্র সরঞ্জামে সজ্জিত (আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ড) এবং আভিযানিকভাবে খুব দ্ক্ষ।

দূধর্ষ তাতমাদোকে কিভাবে মোকাবেলা করে থাকে থাই আর্মি? থাই সেনাবাহিনী মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে (তাতমাদো) সামলানোর মূল মন্ত্রটা ভালোভাবে জানে- ‘‘মিয়ানমার সেনাবাহিনী শুধু অস্ত্র বা শক্তির ভাষাই বোঝে...। তাতমাদোর এটাই একমাত্র ওষুধ। তাই আন্তরিকতা, বন্ধুত্ব দেখালেও প্রয়োজনে থাই সেনাবাহিনী অস্ত্রের ভাষায় বা শক্তির মাধ্যমে জবাব দেয়’’। পাতায়ায় কর্ণেল জনসন এমন একটা কথা বলেছিলেন।

ভূ-রাজনৈতিক জ্ঞান-বোঝাপড়া, বাস্তবতা-উপলদ্বি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত সংঘাত মোকাবেলা, ড্রাগ ও অস্ত্র চোরাচালান বিরোধী কর্মকান্ড, প্রক্সি যুদ্ধ পরিচালনা, সীমান্ত বাণিজ্য, ইত্যাদি পরিচালনা-ব্যবস্থাপনায়থাই সেনাকর্মকর্তা/জেনারেলদের গতিশীলতা, দক্ষতা, গভীর বোঝাপড়া ও দুর্দান্ত সামর্থ আছে। কর্ণেল জনসন বলেছিলেন- ‘‘দিস গাইস আর ব্লাডি কেপাবল। দে আন্ডারস্ট্যান্ড দ্যা গেম’’।

থাই সেনাবাহিনীর ৫ টি সামরিক এলাকা (কমান্ড) রয়েছে। একেক সীমান্তে একেক ধরণের দায়িত্ব। চিয়াং মাইয়ের পাহাড়ি অঞ্চলে (গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল) ‘ফুট আর্মি’ বা ‘বাইসাইকেল আর্মি’। সেখানে যুদ্ধ মূলত ড্রাগ ব্যবসায়িদের সঙ্গে। থাইল্যান্ডের দক্ষিণ অঞ্চলে বিশেষ করে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী এলাকায় একধরণের মৃদু (লো-ইনটেনসিটি) ইনসারজেন্সি বা বিদ্রোহ চলছে। উল্লেখ্য, থাইল্যান্ডের দক্ষিণে ৩ টি প্রদেশ মালয়-মুসলিম অধ্যুষিত। বিদ্রোহীরা এই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন চায়। সেখানে থাই সেনাবাহিনী নিয়োজিত রয়েছে। তবে বর্তমানে সেখানকার পরিস্থিতি শান্ত।

থাইল্যান্ডের ‘চিকেন নেক’ অঞ্চলে ভ্রমণ!

থাই সেনাবাহিনী থিউরি থেকে ভূমি পর্যায়ে ব্যবহারিক বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাদের আভিযানিক দক্ষতা অত্যন্ত প্রসংশনীয়। ব্যাংকক থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার রেললাইন ও সড়ক তৈরী হয়েছে অরণ্যময় টেনাসারিম পার্বত্য অঞ্চলের মধ্য দিয়ে। মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের ম্যাপের দক্ষিণ দিকে তাকালে দেখা যায় যে, একটি সংকীর্ণ অঞ্চলে দু’টি দেশের সীমানা চলে গেছে। এটি মূলত মালয় পেনিনসূলার উত্তর অংশ। পশ্চিমে আন্দামান সাগর (মিয়ানমার), পূর্ব দিকে গালফ অফ সিয়াম (থাইল্যান্ড)। থাইল্যান্ডের এই এলাকার ‘খোলং ওয়ান’ (প্রাচুক খিরি খান রাজ্য) অঞ্চলটি হলো থাইল্যান্ডের ‘সবচেয়ে সংকীর্ণ পয়েন্ট’ বা ‘ন্যারোয়েস্ট পয়েন্ট’। এখানে থাইল্যান্ডের সীমানা বা এলাকা মাত্র ১১ কিমি বা ৬ মাইল বিস্তৃত। এর কাছেই সিংখোন পাস ও মিয়ানমারের ডান সিংকন বর্ডার পোস্ট অবস্থিত। এটাকে সাধারণভাবে থাইল্যান্ডের ‘চিকেন নেক’ বলা যায়। এই অঞ্চলটি থাইল্যান্ডের জন্য রণকৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর।

থাই সেনাবাহিনী আভিযানিক প্রস্তূতির ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। রয়েল থাই আর্মি কমান্ড এন্ড স্টাফ কলেজ প্রতি বছর সামরিক-ছাত্রদের নিয়ে বিভিন্ন সামরিক এলাকা সফর করে এবং ঐ অঞ্চলের আভিযানিক পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্লান পর্যালোচনা করে। তৎকালীন মেজর তোফায়েল আহমেদ (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) থাইল্যান্ডে স্টাফ কলেজ করা কালিন সময়ে, তাদের ‘ফাইনাল এক্সারসাইজ’ পরিচালিত হয়েছিল এই চিকেন নেক ‘খোলং ওয়ান’ এলাকায়। এটি ছিল বিদেশী ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত মজার একটি অভিজ্ঞতা।

১৯৯৩ সালের মার্চ। কম্বোডিয়ায় শান্তি মিশন থেকে আমি ব্যাংকক থেকে ট্রেনে মালয়েশিয়ার কুয়ালামপুরের দিকে যাচ্ছি...। প্রায় মধ্য রাত। ট্রেনটি থাই-বার্মা সীমান্ত এলাকা (চিকেন নেক) দিয়ে অরণ্যময় টেনাসারিম পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমার কম্পার্টমেন্টে ব্রিটেনের একজন সাহসী তরুন পর্যটক। ট্রেনটি ততক্ষণে মিয়ানমার সীমান্ত অতিক্রম করে আরো দক্ষিণে মালয়েশিয়ার দিকে চলমান। তখন ব্রিটিশ তরুনটি আমাকে জানালো যে, ‘‘আগামী কয়েক ঘন্টা ধরে ট্রেনটি দক্ষিণ থাইল্যান্ডের একটি সংঘাতপ্রবন এলাকার মধ্য দিয়ে যাবে। স্থানীয় গেরিলারা ট্রেনে আক্রমণ করতে পারে, বোমাও ফেলতে পারে। সাবধান”। তার সতর্কতা পাত্তা না দিয়ে আমি রাত্রিকালীন দক্ষিণ থাইল্যান্ড দেখতে থাকি।

তখন আমি জানতাম না, আমি যে অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে ট্রেনে মালয়েশিয়া যাচ্ছিলাম সেটি পরবর্তীতে রোহিঙ্গা পাচারকারীদের মূল রুটে পরিনত হবে। রাখাইন থেকে হাজার হাজার ‘রোহিঙ্গা নৌকা শরণার্থীদের’ নিয়ে দূধর্ষ মানবপাচারকারীরা থাইল্যান্ডের অরণ্যময় রেনং-ফাং না-বান ক্লোং টর-সাডাও-পাদাং বাসার এলাকার ক্যাম্পে আটকে রাখতো এবং পরে মালয়েশিয়া পাচার করতো। কি অদ্ভূত জীবন রোহিঙ্গাদের।

থাইল্যান্ডের কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কিছু সেনা, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোল্ডেন ট্রাঙ্গেল, কারেন প্রদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল ও মায় সটের কাছে ড্রাগ পাচার, ক্যাসিনো এনক্লেভ ও কল সেন্টার, স্ক্যাম সেন্টার এ জড়িত আছে বলে জানা যায়। গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে ‘দৈনিক মানবজমিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে (মিয়ানমারে আটক ১৮ বাংলাদেশীর ফেরার আকুতি) জানা যায়, কারেণ অঞ্চলের একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠির নিয়ন্ত্রণে থাকা স্ক্যাম সেন্টারে কিছু বাংলাদেশীও জিম্মি অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। ঐ স্ক্যাম সেন্টারগুলোর নিয়ন্ত্রক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকেন্দ্রিক একটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধী চক্র।

থাইল্যান্ডে যত ভ্রমণ

কম্বোডিয়া শান্তিমিশনে (১৯৯২-৯৩) শান্তিরক্ষীদের কাছে থাইল্যান্ড (বিশেষত সীমান্তবর্তী এলাকা) অনেকটা ‘মিশন এরিয়ার’ মতোই ছিল। উল্লেখ্য, কম্বোডিয়ায় মিশনে যোগদানের জন্য ৩য় ইস্ট বেঙ্গল (বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন) ঢাকা থেকে ১৯৯২ সালের এপ্রিলে বিমানে থাইল্যান্ডের উথাপা বিমানবন্দর হয়ে পাতায়া আসে। এর পর পাতায়া থেকে সড়ক পথে বিশাল কনভয় যোগে এই কন্টিনজেন্ট অরন প্রথেট হয়ে কম্বোডিয়ায় পৌঁছেছিল। উল্লেখ্য, কম্বোডিয়া শান্তিমিশনে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ছিলেন লেঃ কর্ণেল খোন্দকার কামালুজ্জামান (পরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল)।

কম্বোডিয়ার উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে (থাইল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল) দায়িত্ব পালনকালে থাইল্যান্ডের ‘অরণ প্রথেট’ অঞ্চলে যাওয়া হয়েছিল। মূলত অরণ প্রথেট এলাকায় কম্বোডিয় শরণার্থীদের ক্যাম্প ছিল। কম্বোডিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় (১৯৭০-১৯৮০ দশকে) প্রায় ৩৭০০০০ কম্বোডিয় শরণার্থী থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৯৯২ এর মার্চে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে শরণার্থীরা দেশে ফেরা শুরু করে। শান্তিরক্ষী হিসেবে এই প্রত্যাবাসন কর্মকান্ডের সঙ্গে আমি কিছুটা জড়িত ছিলাম।

পরে ব্যাংকক থেকে উত্তর পূর্বাঞ্চলের শহর নংখাই হয়ে লাওস ভ্রমন করেছি। ব্যাংকক থেকে ট্রেনে মালয়েশিয়া (হাট ইয়াই-পাদাং বাশার) যাওয়ার সময় মুসলমান-প্রধান দক্ষিণ থাইল্যান্ডের কিছুটা দেখা হয়েছিল।

এবার বার্মা সীমান্তে বিশেষত থাইল্যান্ডের পশ্চিমাঞ্চল (বার্মার পূর্বাঞ্চল) ভ্রমণের পরিকল্পনা ও তথ্য সংগ্রহ করি। ‘মিশন মায় সট’! মায় সট শহরটি মিয়ানমার-থাইল্যান্ডের প্রধান সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র ও বার্মা যাওয়ার গেটওয়ে। এর প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত কাঞ্চনবুরি। এখানে গেলেই বিখ্যাত ‘ব্রীজ অন রিভার কাওয়াই’ দেখা যায়।

থাইল্যান্ডের আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার ভূমিকা

আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারক ও বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন যে, মিয়ানমারের সংকট সমাধানে থাইল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘতম সীমান্ত, দুই দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ ও আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায় থাইল্যান্ড মিয়ানমারের ‘শান্তি বিনির্মাণে’ (পিস বিল্ডিং) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সামর্থ্য রয়েছে থাইল্যান্ডের। মিয়ানমারের সংঘাত-উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য থাইল্যান্ড একটি শক্তিশালী স্পেশাল টাস্কফোর্সও গঠন করেছে। এই টাস্কফোর্স যুদ্ধাক্রান্ত অঞ্চলের মানুষের সাহায্যে পাঠানোর বিবেচনা করছে। অনেক বিশেষজ্ঞ আশাবাদী যে, থাই সরকার মিয়ানমারের সকল অংশিজনের মধ্যে একজন মধ্যস্থতাকারী এর ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে।

থাইল্যান্ড আসিয়ান প্লাটফর্ম ব্যবহার করেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরিন সংকট সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। জান্তা সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতা করার চেষ্টা করছে। এছাড়াও থাইল্যান্ড আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ‘আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর’ চেষ্টা করছে। যেমন- মিয়ানমারসহ আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা চুক্তি করেছে।

থাইল্যন্ড ভ্রমণে কি শিখলাম?

থাইল্যান্ড থেকে এবার কি কি শিখলাম? থাইল্যান্ড অর্থনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছে। থাইল্যান্ডের সাফল্যের অন্যতম প্রধান একটি কারণ হচ্ছে, সে দেশের নাগরিকরা তাদের রাজনৈতিক স্থিতিহীনতাকে সামাজিক অরাজকতায় রূপান্তরিত হতে দেয়নি (যেটা আমরা চমৎকারভাবে করেছি!)। তাদের সাফল্যের আরেকটি কারণ- শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদনের বিকাশ আর তার রফতানিতে অভূতপূর্ব সাফল্য। ব্যবসা বান্ধব থাইল্যান্ড হলো বিদেশী বিনিয়োগের সুবর্ণভূমি।

রাষ্ট্রিয় কর্মকান্ড, পররাষ্ট্র নীতি এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে থাইল্যান্ডের মানুষের বাস্তবধর্মিতা আছে। থাইল্যান্ডের শাসকগণ অত্যন্ত বিচক্ষণ। কয়েক শতাব্দী আগে বিদেশীদের আগমন হয়েছিল সেই দেশে। কিন্তু বিচক্ষণতার সঙ্গে (কিংস ডিপ্লোমেসি) থাই শাসকগণ তাদের সঙ্গে বাণিজ্য করেছে। কিন্তু বিদেশীদের মানদন্ডকে রাজদন্ডে পরিনত হতে দেয়নি। সব সময় স্বাধীন থেকেছে এই অঞ্চলের একমাত্র দেশ থাইল্যান্ড।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর থেকেই থাইল্যান্ডের প্রতিবেশী সকল দেশ (লাওস, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া) দীর্ঘ যুদ্ধের আগুনে পুড়েছে। কিন্তু থাইল্যান্ডের নেতারা কূটনৈতিক পারদর্শিতা ও বিচক্ষনতা দিয়ে দেশকে যুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছে। এম্বেসেডর শাহেদ আকতার দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে থাইল্যান্ডে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তিনি বলেন- ‘‘বলা হয়, থাইল্যান্ডে প্রত্যেক সমস্যার একটা স্থানীয় ‘থাই সলিউশান’ (সমাধান) আছে। থাইল্যান্ডের এক সময়ের প্রধানমন্ত্রী আনন্দ পানইয়াচুন বলেছিলেন- ‘‘আমাদের ম্যানেজমেন্টের ধরণ আলাদা’’। থাইল্যান্ড থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।

থাইল্যান্ডের ‘মিয়ানমার পলিসি’ থেকে শিক্ষণীয়

থাইল্যান্ড ভ্রমণকালে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র-সামরিক-কৌশলগত বিষয়াদি বিশেষত ‘মিয়ানমার পলিসি বা নীতি’ থেকে টেকএওয়ে বা শিক্ষণীয় বিষয়গুলো আবার মনে পড়লো...। (ক) থাইল্যান্ডের নেতৃত্বের বিচক্ষণতা, (খ) কূটনীতিতে পারদর্শীতা ও বাস্তব সম্মত সাহসী পদক্ষেপ, (গ) সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় থাই সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, (ঘ) বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে নিজস্ব ‘থাই সলুশান’, (ঙ) সীমান্ত পরিস্থিতি ও ভূকৌশলগত বিষয়ে থাই সেনাবাহিনীর মতামতে গুরুত্ব, (চ) রাষ্ট্রীয় কর্মকান্ড ও অর্থনৈতিক বিষয়াদিতে বাস্তব ধর্মিতা, (ছ) মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যাপক সীমান্ত-বাণিজ্যের সুবিধা নেয়া (ইনফরমাল ট্রেড), (জ) মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও এথনিক সশস্ত্র গোষ্ঠি সামলানোর মূল মন্ত্র-অস্ত্র/শক্তির ভাষায় কথা বলা, (ঝ) রাজনীতি-সামরিক-কৌশলগত বিষয় থেকে অর্থনীতিকে আলাদা রাখা..., (ঞ) অন্য দেশের বিষয়ে না জড়ানো।

রাখাইন ট্রেন মিস করা যাবেনা

জানুয়ারী ২০২৫। ১৮ মাস পরের কথা। বর্তমানে থাইল্যান্ডের নতুন গণতান্ত্রিক সরকার (প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা, ফেউ থাই পার্টি) মিয়ানমার-বিষয়ক নীতির কিছুটা পরিবর্তন এনেছে। সে দেশে যুদ্ধবন্ধে উদ্যোগী ভূমিকা নিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায়, গত ১৯ ডিসেম্বর মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলো নিয়ে থাইল্যান্ডের উদ্যোগে ব্যাংককে পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় আসিয়ান দেশসমূহের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক। আসিয়ান নেতারাও মিয়ানমারের জান্তা সরকার ও তার বিরোধী পক্ষকে দেশটির গৃহযুদ্ধে রক্তপাত বন্ধ করতে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে চাপ দিয়েছে (অক্টোবর ২০২৪) । রাখাইনের বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকাকে দ্রুত সাহসী ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের কিন্তু রাখাইন ট্রেন মিস করা যাবে না।

এখন ঢাকার সক্রিয় হওয়ার সময়। আমাদের মনে রাখতে হবে, নেকড়ে অধ্যুষিত অরণ্যে পূর্বের মতো লুম্বিনী পার্ক বা শান্তি নিকেতন সূলভ ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ আধুনিক রাষ্ট্রে উপযোগী নয়।

ঈদের দিন সেন্ট্রাল মসজিদে দেখা রোহিঙ্গা যুবক শাহনেওয়াজ আহমদের কথা মনে পড়লো। বাংলাদেশের কাছে রোহিঙ্গাদের অনেক প্রত্যাশা। বলা যায়, এখন রাখাইন থেকে বাংলাদেশে ৪র্থ রোহিঙ্গা ঢল’ নামছে। এটা বন্ধ করতেই হবে। দক্ষিণ পূর্ব সীমান্ত নতুন প্রতিবেশীর (রাখাইন) জন্ম হতে চলেছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল। কিন্তু অসাধারণ সুযোগও তৈরী হয়েছে।

আমি যখন থাইল্যান্ড বেড়াচ্ছিলাম, (জুন ২০২৩) তখন শান রাজ্যে তিনটি গেরিলা দল (আরাকান আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স আর্মি ও তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি) একত্রে যুদ্ধ করা নিয়ে আলোচনা করছিল। এই তিনটি গেরিলা দল পরে ‘থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্স’ গড়ে তুলেছে। ‘আরাকান আর্মি’ রাখাইন অঞ্চলে নতুন ভাবে যুদ্ধ শুরু করেছে ও প্রায় ৯০ ভাগ অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। অন্য অঞ্চলেও বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলো ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে।

অপরূপ থাইল্যান্ড ভ্রমনকালে বিভিন্ন ব্যক্তির মিথস্ক্রিয়া ও আলাপচারিতায় পাওয়া মিয়ানমার বিষয়ক ইঙ্গিত ও সম্ভাবনাগুলোকে এখন মিলিয়ে দেখছি। কিছু ইঙ্গিত অবশ্য তখন পরিস্কারভাবে বুঝতে পারিনি। তবে ধারণা হয়েছে। কর্ণেল জনসন মিয়ানমারের ‘শান’ রাজ্যের কথা অনেকবার বলেছিলেন।‘‘ সামথিং ইজ কুকিং আপ দেয়ার?’’ এই সাবেক দূঁদে-গোয়েন্দা কর্ণেল কি ‘থ্রি ব্রাদারহুড এ্যালায়েন্স’ এর কথা বলেছিলেন? অধ্যাপক খিন মঙ বলেছিলেন- ‘‘২০২৪ সালে কিছু পরিবর্তন হয়তো দেখতে পাবেন’’।

রাখাইনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কৌশলের যে পরীক্ষা

মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটের পরিস্থিতি বর্তমানে একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের পতন বা পরিবর্তন খুব অল্প সময়ের মধ্যে কাবুল বা দামাস্কাস স্টাইলে হয়তো হবে না। তবে পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশ, ভারত ও চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত সম্পর্ক এবং উপস্থিতি গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ যে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে, তার কূটনৈতিক নীতি কীভাবে এই পরিস্থিতিতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে এবং কীভাবে রাখাইন স্টেটের স্বাধীনতা বা কনফেডারেশনের প্রশ্নে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্র কৌশলকে সামঞ্জস্য করতে পারে, তা নিয়ে একটি সুষম বিশ্লেষণ ও আলোচনা দরকার।

রাখাইন স্টেটের পরিস্থিতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতি এবং নিরাপত্তা কৌশলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড় করিয়েছে। যা আগামীতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির অন্যতম বড় পরীক্ষা হতে পারে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকারের পতনের ইঙ্গিত এবং রাখাইনে আঞ্চলিক শক্তির পালাবদল, বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য সুযোগও তৈরি করেছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি তার পররাষ্ট্র নীতি এবং নিরাপত্তা কৌশলকে দক্ষতার সাথে প্রয়োগ করতে পারে, তবে শুধু রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনই সম্ভব হবে না, বরং রাখাইন রাজ্যের স্বাধীনতা বা কনফেডারেশনের প্রশ্নেও বাংলাদেশে অবস্থান পরিষ্কার হবে।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন রাজধানীতে অনেক ব্যস্ততা। মিয়ানমারের বিশাল একটা অংশ এথনিক সশস্ত্র গোষ্ঠি ও এনইউজি এর নিয়ন্ত্রণে আসায় থাইল্যান্ডও তাদের মিয়ানমার নীতির কিছুটা পরিবর্তন করেছে। আসিয়ানও এগিয়ে আসছে। ঢাকার এখন যথাযথ কূটনীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োগের সময়।

প্রায় ৬০০ শত বছর আগে মধ্যযুগে, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা (বেঙ্গল বা বঙ্গের অধিবাসীরা) আরাকান বা রাখাইনে একধরণের ‘হিতৈষী অভিভাবক সুলভ’ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। যখন রাখাইন (বৌদ্ধ)-রোহিঙ্গা ও অন্যান্য মুসলমান জাতিগোষ্ঠি একত্রে ম্রাউক-উ (পাত্থুরিকিল্লা) ভিত্তিক এক প্রাণবন্ত ‘নগর সভ্যতা’ গোড়াপত্তন (১৪২৯ সাল) করেছিল। আশাকরি, এর প্রায় ৬০০ বছর পর, নতুন পরিবেশে ‘নুতন বাংলাদেশ’ এর সরকার, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকগণ এই অসাধারণ সুযোগ সুন্দরভাবে কাজে লাগাবে। এতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে ও বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও রক্ষিত হবে।

রাখাইনে একটি বাংলাদেশী সল্যুশনের (সমাধান) সন্ধানে

এই লেখায় থাইল্যান্ডের আলোচিত পলিসি ও কৌশলগুলো বাংলাদেশের মিয়ানমার বিষয়ক সমস্যা/চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি মডেল হতে পারে। মিয়ানমার বিষয়ে, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার পার্থক্য রয়েছে। তবুও থাইল্যান্ডের পলিসি ও কৌশলগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুকরণীয় হতে পারে। বিশেষ করে, রোহিঙ্গা ইস্যু, সীমান্ত নিরাপত্তা, সীমান্ত বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের অনুসৃত পদক্ষেপগুলো অনুসরণযোগ্য। রাখাইনের বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ‘থাই সল্যুশনের’ মতো একটি ‘বাংলাদেশী সল্যুশান বা সমাধান’। আশা করি, ‘নতুন বাংলাদেশের’ ঢাকা এ ক্ষেত্রে সফল ভূমিকা রাখবে।

মো. বায়েজিদ সরোয়ার: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, গবেষক ও বিশ্লেষক

ছবি : সংগৃহীত