Showing posts with label কালের খেয়া. Show all posts
Showing posts with label কালের খেয়া. Show all posts
Saturday, July 6, 2024
গল্প- সুরতারিণীর ধারণকৃত কণ্ঠস্বর by মঈনুস সুলতান

মোটরবাইকের
একজস্ট পাইপ দিয়ে বেরুচ্ছে প্রচুর ধোঁয়া। কাদা বাঁচিয়ে মেঠোপথে চালাতে
গেলে বিচিত্র আওয়াজ হয়। উল্টা দিকের বাতাস বয়ে আনে পোড়া ধোঁয়ার গন্ধ।
অনেকদিনের হোন্ডা বাইকখানা বেজায় লজজড়। আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের গ্রাম
বহরগুলে যাওয়ার জন্য সরোজ মোহাইমিন বাইকখানা তার সহকর্মীর কাছ থেকে ধার করে
এনেছে। এবড়ো-খেবড়ো সড়কে দু-চাকার বাহনটিকে সামলাতে তার সমস্যা হয়। কাছেই
জাফলংয়ের দিকে ছুটে চলা পিচঢালা হাইওয়ের পাশে তাদের এনজিও, ভিলেজ
ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সংক্ষেপে ভিডিআই। বছর দুয়েক হলো সরোজ ওখানে কাজ
করছে। কর্মরত হওয়ার আগে সে পাক্কা দশ বছর কাটিয়েছে ঢাকা শহরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ছাড়াও ওখানে সে দেদার সময় ব্যয় করেছে ছোটগল্প
লেখায়। গল্প সে লিখেছে প্রচুর, কিন্তু রচনাগুলোর ছেপেছে কেবলমাত্র লিটল
ম্যাগাজিনে, তা-ও কাজা-কচ্ছিৎ। গল্পগুলোর বিষয়বস্তু অপ্রথাগত, তাই
সম্পাদকরা আগ্রহ দেখাননি। রচনাশৈলীতে নিরীক্ষা থাকায় পাঠকরাও তার সৃষ্টির
কদর করেনি।
ঢাকাতে সরোজের কোন গতি হচ্ছিলো না, এক ধরনের ব্যর্থতাবোধ কাঁচা বাঁশে ঘুণের মতো তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো। ভিডিআইতে কাজ পাওয়ায় বেকার বদনাম যেমন ঘুচেছে, তেমনি প্রতি মাসে হাতে আসছে সামান্য কিছু উপার্জন। এতে দিনযাপনে সচ্ছলতা এসেছে বটে, তবে সহকর্মীদের সংস্থাভিত্তিক সংস্কৃতিতে সে নিজেকে মিশ খাওয়াতে পারছে না। তার দুর্বলমাপের লেখক পরিচিতি ও পাঠাভ্যাস আড়াল-আবডালে উপহাসের বিষয় হয়েছে। নিশিরাতে নিরিবিলিতে বসে ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনার হবিও হয়েছে সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায়।
এনজিওর পেশাগত কাজে সে প্রচুর দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু সংস্থার এজেন্ডানুযায়ী চলতে পারেনি। আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের গ্রামে উন্নয়নমূলক কাজের সূচনায় খানা-জরিপের দায়িত্ব পড়েছিলো তার ওপর। জরিপ করতে গিয়ে সে ছোট্ট নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। সিলেটের সংলগ্ন শহরতলি ছাড়িয়ে চা-বাগানগুলোর ফাঁকফোকরে টিলাশোভিত বনভূমির প্রান্ত-ছোঁয়া মাত্র কয়েকটি গ্রামে এ সম্প্রদায়ের বাস। জনসংখ্যার নিরিখে অত্যন্ত ক্ষুদ্র; তবে এদের ভাষা ও সংস্কৃতি মূলধারার হিন্দু-মুসলমানদের চেয়ে ভিন্ন। এদের সম্পর্কে বইপত্রে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য সরোজ খুঁজে পায়নি। তো এক পর্যায়ে সে নিজে থেকে তাদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মরীতি, বিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে এসবের ভিত্তিতে লিখেছে একটি প্রবন্ধ। রচনাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। এতে বিরাগভাজন হন কর্মক্ষেত্রে তার সুপারভাইজার। উনার অভিমত হলো, সরোজের দায়িত্ব হচ্ছে পাত্র গ্রামে এনজিওর নির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়িত করা। কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কহীন তথ্য সংগ্রহ সম্পর্কে তার আপত্তি। তিনি চাচ্ছেন না- সরোজ ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্য সংস্থার সময় ব্যয় করুক। পাত্র গ্রামের কিছু পরিবারের সঙ্গে তার গড়ে উঠেছে সুন্দর সম্পর্ক; এ বিষয়টাও সুপারভাইজার পছন্দ করেননি। মাঠে অনেক বছর ধরে কাজ করা অত্যন্ত সিজনড্ ভদ্রলোক তাকে গ্রাম পর্যায়ে কেবলমাত্র পেশাদারি সম্পর্ক রক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সরোজ চরিত্রের দিক থেকে গহন-বিচারি একজন প্যাশনেট প্রকৃতির পুরুষ। যা তার ভালো লাগে, যে বিষয়ে তার মধ্যে তৈরি হয় প্যাশন, তা অবজ্ঞা করে নৈর্ব্যক্তিক আচরণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তো সে সুপারভাইজারের পরামর্শ উপেক্ষা করেছে। পরিণতিতে মাঠ পর্যায়ে দারুণ পরফরমেন্সের পরও বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট পায়নি সরোজ।
বালুকাময় পথে হোন্ডাটি ফটফটিয়ে থেমে যায়। ঠেলা-ধাক্কা করে সে বাহনটিকে নিয়ে আসে একটি পাখিয়ারা গাছের তলায়, কিন্তু স্টার্ট করতে পারে না। ভারি উদ্বেগ হয়, কলকব্জা কিছু যদি গড়বড় হয়, তাহলে যে সহকর্মীর কাছ থেকে বাইকটি ধার করে এনেছে, তার কাছে সে লজ্জা পাবে। এ বাইকের সহায়তা ছাড়া অফিস-কর্মের চাপের ভেতর এক ফাঁকে হুট করে পাত্র গ্রাম ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা মুশকিল হয়ে পড়বে।
বেশ খানিকটা সময় বাইকটি সারাই করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে সিগ্রেট ধরায়। স্মোক করতে করতে দেখে, কাছের একটি আমগাছের তিডালার গোড়া থেকে বেরিয়ে এসেছে গোলাপিতে ছোপ ছোপ শুভ্রতা ছড়ানো আমকুড়ালির ফুল। সে ব্যাকপ্যাক থেকে ক্যামেরা বের করতে যায়। তখনই খেয়াল করে, আমকুড়ালির অর্কিড গুচ্ছটি ঘিরে উড়ে উড়ে সুচালো ঠোঁটে মধু চয়ন করছে অত্যন্ত ছোট্ট একটি মৌটুসি পাখি। দৃশ্যটি থেকে ছড়াচ্ছে এমন এক ধরনের মায়া, সে সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। ক্যামেরার শাটার টিপতে তার আগ্রহ হয় না। এ অলিম্পিয়া ক্যামেরাটিও সরোজ ধার করে নিয়েছে ভিডিআইর একজন সহকর্মীর কাছ থেকে। বয়সের কারণে অলিম্পিয়া হালফিল তেমন একটা কার্যকর না। এতে ছবি ওঠে বটে, কিন্তু কীভাবে যেন ফিল্মের সর্বত্র আঁকা হয়ে যায় আলোর বেজায় উজ্জ্বল দাগ। এতে আলোকচিত্রের বিষয়বস্তুর ডিটেলস্ ঝাপসা হয়ে পড়ে।
এ ক্যামেরা দিয়ে কয়েক মাস আগে পাত্র সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণের দারুণ কিছু দৃশ্য ধারণ করেছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আলোকচিত্রগুলো এমনভাবে ঝাপসা হয়েছে যে, এগুলো কোন লেখার সাথে ব্যবহার করার কোন উপায়ই থাকেনি। পাত্রদের পূজার রীতি-রেওয়াজ মূলধারার হিন্দুদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিন্দু দেব-দেবীর আরাধনা তারাও করে থাকে, তবে তাদের অর্চনায় কোন মূর্তি বা বিগ্রহের ব্যবহার নেই। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বহরগুল গ্রামের এক মহিলা- সুরতারিণীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চার সন্তানের জননী বিধবা সুরতারিণী সরোজকে ভাই ডাকেন। গ্রামে গেলে তিনি তাকে তার দাওয়ায় বসিয়ে শসা খেতে দেন। সরোজও তার জন্য কখনো-সখনো নিয়ে যায় গ্লুকোজ বিস্কিটের প্যাকেট। পাত্ররা জংগলের অনেক পত্রলতা ও শিকড়-বাকড়ের রস জারিত করে তৈরি করে 'খর' নামে পরিচিত পানীয়। সুরতারিণী তার ঘরের পেছনে মাটির তলায় শিয়ালের গর্তের মতো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খর প্রক্রিয়াজাত করেন। মাঝেমধ্যে সরোজের ভাগেও জোটে যৎসামান্য ঝাঁঝালো পানীয়। বস্তুটি পান করে সে একবার অফিস ফিরলে, উৎকট গন্ধে তার সুপারভাইজার জোড়া ভুরু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
সুরতারিণী তাকে পূজার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মাস চারেক আগে চৈত্র মাসের অপরাহেপ্ত সরোজ বহরগুলে ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলো। অই দিন সুরতারিণী খর পানে দারুণভাবে মাতেলা ছিলেন। তিনি ক্রমাগত নাসির বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে পাতানো ভাই সরোজকে নিয়ে গিয়েছিলেন পাকুড় গাছের তলায় পূজার থানে। পাত্রদের পূজা-পার্বণে পূজারি ব্রাহ্মণের কোন চল নেই। সুরতারিণীর জেঠা, বহরগুলের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি সুরেশ পাত্র পূজা পরিচালনা করছিলেন। লাঠি ভর দেয়া থুরথুরে মানুষটি প্রচুর পানে এমনভাবে বিভোর হয়েছিলেন যে, তিনি ক্যামেরা ব্যবহারে কোন আপত্তি তোলেননি। গাছের গোড়ায় ভারি স্নিগ্ধ চেহারার এক পাত্র-কিশোরী কুলায় করে নিয়ে এসেছিলো পান, সুপারি, নারিকেল, গুড়, কলা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো উপাচার।
মেয়েটির নাম রত্নামণি। সে হাসি হাসি মুখে উপাচারের ডালাটি হাতে ছবির জন্য ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছিলো। পূজাতে এক জোড়া কবুতর ও গজার মাছ বলি দেয়া হয়। রত্নামণি আধলা ইট দিয়ে বানানো খোলা চুলায় রান্না করে ভোগ। গ্রামবাসীর সাথে সরোজেরও জুটেছিলো কলাপাতায় প্রসাদ। এ ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর বহরগুলে এসে সে ঝাপসা হয়ে ওঠা ফটোগ্রাফের একটি প্রিন্ট মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো। তাতে রত্নামণি এমন খুশি হয় যে, সে কেবলই সরোজকে জোড়-হাতে প্রণাম জানাতে থাকে।
আজ সুরতারিণীর তালাশে সরোজ বহরগুলে গিয়েছিলো। কিন্তু তিনি বাড়িতে ছিলেন না। প্রতিবেশীদের সাথে বাতচিত করে সে জানতে পারে, সকালবেলা সুরতারিণী গ্রামের দুটো ছেলের কান কাঁটা দিয়ে ফুঁড়ে দেন। কৈশোর অতিক্রান্ত পাত্র ছেলেদের মধ্যে কান ফোঁড়ার রেওয়াজ আছে। এ আচার সম্পাদন করতে গিয়ে সুরতারিণী নাকি পান করেছেন প্রচুর পরিমাণে খর। তারপর হেঁটে গেছেন পিচঢালা রাজসড়কের দিকে। সরোজ ভেবেছিলো, সুরতারিণীকে নিয়ে সে যাবে সুরেশ পাত্রের কাছে। তিনি 'সিটকই' বলে সমাজে পরিচিত, জোর করে পাত্র যুবতীদের অনভিপ্রেতভাবে বিবাহ করা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে রাজি হয়েছিলেন। তো সুরতারিণীকে না পেয়ে সে একাই চলে গিয়েছিলো সুরেশ পাত্রের ঘরে।
সরোজ ভাবতেও পারেনি, সুরেশ পাত্রের স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়ে এত দ্রুত তিনি মরণাপন্ন হয়ে উঠবেন! ঘরের দাওয়ায় বাতাবি লেবু গাছের ছায়াতলে তাকে চাটাইতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার গলা দিয়ে বেরুচ্ছে ঘড়-ঘড়ে আওয়াজ। কোন ডাক্তার-কবিরাজের ব্যবস্থা নেই। পাশে বসে রত্নামণি বাটি থেকে কেরাইয়া পাতার রস ত্যানা দিয়ে তুলে লেপে দিচ্ছে মরণাপন্ন বৃদ্ধের কপালে। তাকে দেখতে পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয় রত্নামণি। তার হলুদাভ আভা ছড়ানো ত্বক যেন জ্বলে-পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। রাহুগ্রাসে বিলুপ্ত হওয়া জ্যোৎস্নার মতো মেয়েটির অবয়ব থেকে মুছে গেছে স্নিগ্ধ শ্রী।
রত্নামণির হাতে ঝাপসা ফটোগ্রাফটি তুলে দেয়ার ঠিক চার দিন পর মেয়েটি কলসি কাঁখে পানি আনতে যায়। সেনানিবাসের সংলগ্ন হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের জংলা ভূমিতে হামেশা সৈনিকদের মহড়া চলে। যতটা জানা যায়, জল নিয়ে ফেরার পথে দু'জন সৈনিক বিন্নাঝোপের আড়ালে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ভায়োলেন্টভাবে ধর্ষণ করে। এতে তার জননেন্দ্রিয় জখম হয় মারাত্মকভাবে। ভিডিআইর এক মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে এ তথ্য পেয়ে সরোজ চেষ্টা করেছিলো রত্নামণির নাম উল্লেখ না করে স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদটি ছাপানোর। কিন্তু দেশে চলছে জেনারেল এরশাদের কড়া মার্শাল-ল। যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কোন পত্রিকা এ ধরনের সংবাদ ছাপতে রাজি হয় না।
রত্নামণির প্রসঙ্গ মনে আসতেই তার মধ্যে বিচিত্র এক অনুভূতি হয়। কিশোরীটি সুদর্শনা; আকর্ষণ বলতে যা বোঝায়, সরোজ কখনো তা ফিল করেনি, বরং স্নেহটাই তার সংবেদনে প্রধান হয়ে উঠেছে। শরীরে নারীত্ব ফুটে ওঠার কারণে একটি মেয়েকে দৈহিকভাবে বিক্ষত হতে হবে, আঘাত ও অপমানের বোঝা জনমভর বয়ে বেড়াতে হবে- এ ব্যাপারটা সরোজ মেনে নিতে পারে না। কিন্তু বিহিত কিছু করার মতো সামাজিক শক্তিও তার নেই। এ অসহায়বোধ থেকে তার মধ্যে জন্ম নেয় ক্রোধ। সে তেড়িয়া হয়ে বাইকের স্টার্টারে কিক কষায়। স্রেফ কপালগুণে তা চালু হয়। বাহনটি ম্যানেজ করতে করতে ফের সে সুরেশ পাত্রের কথা ভাবে। কথাবার্তায় সরোজ জেনেছে যে, কিছু পাত্র মেয়ে শরীরীভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে মূলধারার জনগোষ্ঠীর যুবকদের হাতে। পরিণতিতে কোন কোন যুবক জোর করে পাত্র মেয়েকে বিয়েও করেছে। এ বিষয়টা পাত্র ভাষায় 'সিটকই' বলে পরিচিত। সিটকই-এর শিকার মেয়েদের পাত্র সমাজে সহানুভূতির চোখে দেখা হয় না। সুরেশ বুড়ো তাকে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। দোষ তারই, সময়মতো সে ফলোআপ করেনি। কারণ সুপারভাইজারের নির্দেশে প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য তাকে যেতে হয়েছিলো কুষ্টিয়া, বরিশাল ও খুলনায় তিন-তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ট্রিপে। কোনভাবেই সুরেশ পাত্রের ফের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য সময় করে উঠতে পারছিলো না। ভাবতে ভাবতে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, সুরেশ পাত্রের পরলোকপ্রাপ্তির ভেতর দিয়ে সামাজিকভাবে কিছু অন্যায় সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য হারিয়ে যাবে।
মলই পাড়ার কাছে বাঁক নিতে গিয়ে সে দেখে, গ্লাবেত বনের ঝোপটির আড়ালে বসে নকুল পাত্র কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করছেন অঙ্গার। মনে হয়, শতাব্দীকাল থেকে পাত্র পুরুষরা অঙ্গার তৈরি করে তা চায়ের দোকান প্রভৃতিতে সরবরাহ করার ব্যবসা করে আসছেন। সরোজ বাইকের স্টার্ট চালু রেখে মাটিতে পা ঠেকিয়ে তা থামায়। সে নকুলের কাছে জানতে চায়- কোথায় সুরতারিণী দিদি? জবাবে জানা যায়- তার শরীর খারাপ, জ্বর-জারি ও কফ-কাশিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তো তিনি সরোজের তালাশে তার অফিসের দিকে গিয়েছেন। শুনতে পেয়ে প্রমাদ গুনে ফের সে তোড়ে বাইক হাঁকায়। যেতে যেতে মন থেকে নকুল পাত্রের সম্প্রতি নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি এড়াতে পারে না। পাত্র পুরুষদের সনাতনী ব্যবসা অঙ্গার তৈরির জন্য কাঠ কুড়াতে গিয়ে তিনি বন বিভাগের কর্মীর হাতে ধৃত হয়েছিলেন মাস খানেক আগে। ফরেস্ট গার্ডরা তাকে গাছের সাথে বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটায়। এতে তার পায়ে মারাত্মকভাবে জখম হয়। বর্তমানে নকুল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। ভিডিআই অফিসের কাছাকাছি এসে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, হাল জামানার রিজার্ভ ফরেস্ট তো এক যুগে পাত্র সম্প্রদায়ের খাসভূমি ছিলো। ব্রিটিশ প্রশাসকরা জোর করে পত্তনি দিয়ে অনায্যভাবে রিজার্ভ ফরেস্ট গড়ে তোলে। তো নকুল- হলেনই বা তিনি বনতস্কর, তাই বলে তাকে বেঁধে পেটাবে? অন্যান্য আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মতো পাত্রদের একটি কল্যাণ সমিতি থাকলে এ বাবদে প্রতিবাদ করা যেত।
অফিসের বারান্দায় দেখা হয় সুপারভাইজারের সঙ্গে। অবাক হয় সরোজ! তিনি না সকালে ব্রাঞ্চ অফিস পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন! তার তো এত তাড়াতাড়ি ফেরার কথা না? প্রৌঢ় ভদ্রলোকের চুল উসকোখুসকো হয়ে আছে, কলপের কালিমালিপ্ত কেশগুচ্ছের তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে ছোপ ছোপ ধূসরাভা। তিনি বিদ্রূপাত্মকভাবে বলেন, 'তোমার পাত্র রিলেটিভ বসে আছেন রিসেপশন লাউঞ্জে; যাও, মেহমানদারি করো।'
বেতের চেয়ারে বসে চুপচাপ ঝিমাচ্ছিলেন সুরতারিণী। রোদে পুড়ে তার চোখমুখ এত কালো হয়েছে যে; মনে হয়, মহিলা পোড়া অঙ্গার ছেনে এসেছেন। তার কাঁধ থেকে খসে পড়েছে আঁচল, চতুর্দিকে ছড়াচ্ছে খরের ঝাঁঝালো গন্ধ। সরোজকে দেখতে পেয়ে আধপোড়া বিড়িটি মুখে দিয়ে ফস করে দেশলাইয়ের কাঠি ঘষেন। বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সরোজ বুঝতে পারে, তার দিদি ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন। ঘটনা হলো, মাস দুয়েক আগে সরোজ অনানুষ্ঠানিকভাবে সুরতারিণীর সাক্ষাৎকার একটি ক্যাসেটে ধারণ করে। এতে টেপ করা আছে পাত্র সম্প্রদায়ের জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু সংক্রান্ত খুঁটিনাটি তথ্য। তিনি কেন ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন- তা জানতে গিয়ে তার তাজ্জব হওয়ার দশা হয়! সুরতারিণীর জেঠা সুরেশ পাত্র মশাইয়ের জ্যোতিষ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি আছে। তিনি গ্রহ-নক্ষত্র বিচরিয়ে অনেক দিন আগে নাকি বলেছিলেন, তার ভাই এর কন্যার মৃত্যু হবে তার মৃত্যুর ঠিক সাত দিন পর। গ্রহ-নক্ষত্রের ফের তো খণ্ডানোর কোন উপায় নেই। এখন সমস্যা হচ্ছে- পরলোকপ্রাপ্তির পরপরই মরদেহ দাহ করার বিধান, কিন্তু দেহটি ভস্ম হলেও তার ধারণকৃত বক্তব্য থেকে যাবে পৃথিবীতে। তো সুরতারিণী দেহে প্রাণ থাকাবস্থায় ক্যাসেটটি পুড়িয়ে ফেলতে চান। অনেক কথাবার্তা বলেও সরোজ ক্যাসেটটি না পোড়ানোর ব্যাপারে সুরতারিণীকে কনভিন্স করতে পারে না।
ক্যাসেটটি থেকে জরুরি উপাত্ত ট্রান্সক্রিপ্ট করে নোটবুকে টুকে ফেলা হয়নি। তো সরোজের করোটিতে একটি ধূর্ত আইডিয়া খেলে যায়। অন্য একটি ক্যাসেটে উপাত্ত রিরেকর্ড করে সুরতারিণীকে তা ফেরত দেয়া যেতে পারে। কিন্তু অফিসে এম্পটি কোন ক্যাসেট নেই। সিলেট শহরে গিয়ে এ মুহূর্তে তা কিনে আনারও কোন উপায় নেই। কারণ সামরিক সরকারের নির্দেশে ছাত্রমিছিলের ওপর ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করার প্রতিবাদে হরতাল চলছে। তাই বাইক হাঁকিয়ে শহরে গিয়ে ক্যাসেট কিনে আনা অসম্ভব।
তো বিষয়টি আদ্যোপান্ত ভেবে সে সুরতারিণীর কাছে ক্যাসেট ফেরত দেয়ার জন্য তিন দিন সময় চেয়ে নেয়। মহিলা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে থেকে বিড়িতে দীর্ঘ দম দিয়ে আস্তে আস্তে অফিস থেকে বেরিয়ে যান। সরোজও তার সাথে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। বিদায় দিতে গিয়ে মনে হয়, মহিলা হচ্ছেন গবেষণার পরিভাষায় একজন ইনফরম্যান্ট। তিনি যে তথ্য সরবরাহ করেছেন, তার অধিকার আছে তা ফিরিয়ে নেয়ার। তবে কি সে ক্যাসেটটি ফেরত দেবে? কিন্তু এ উপাত্তকে ভিত্তি করে সে লিখতে চাচ্ছে আরেকটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ। হামেশা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগার সমস্যা আছে তার। কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। খুক-খুকিয়ে কাশতে কাশতে সুরতারিণী সিঁড়ির কাছে থুক করে এক দলা কাশ ফেলেন। তারপর তার পাতানো দিদিটি হেঁটে যান দূরের জংগলশোভিত পল্লীর দিকে। অফিসের কামরায় ফেরার আগে নোংরা থুথুর দিকে সরোজের চোখ পড়ে। ওখানে রক্তের ছিটা দেখতে পেয়ে ভারি উদ্বেগ হয়। কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তার দারুণ অসহায় লাগে।
ঢাকাতে সরোজের কোন গতি হচ্ছিলো না, এক ধরনের ব্যর্থতাবোধ কাঁচা বাঁশে ঘুণের মতো তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিলো। ভিডিআইতে কাজ পাওয়ায় বেকার বদনাম যেমন ঘুচেছে, তেমনি প্রতি মাসে হাতে আসছে সামান্য কিছু উপার্জন। এতে দিনযাপনে সচ্ছলতা এসেছে বটে, তবে সহকর্মীদের সংস্থাভিত্তিক সংস্কৃতিতে সে নিজেকে মিশ খাওয়াতে পারছে না। তার দুর্বলমাপের লেখক পরিচিতি ও পাঠাভ্যাস আড়াল-আবডালে উপহাসের বিষয় হয়েছে। নিশিরাতে নিরিবিলিতে বসে ধ্রুপদী সঙ্গীত শোনার হবিও হয়েছে সহকর্মীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্তরায়।
এনজিওর পেশাগত কাজে সে প্রচুর দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু সংস্থার এজেন্ডানুযায়ী চলতে পারেনি। আদিবাসী পাত্র সম্প্রদায়ের গ্রামে উন্নয়নমূলক কাজের সূচনায় খানা-জরিপের দায়িত্ব পড়েছিলো তার ওপর। জরিপ করতে গিয়ে সে ছোট্ট নৃগোষ্ঠী সম্পর্কে অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। সিলেটের সংলগ্ন শহরতলি ছাড়িয়ে চা-বাগানগুলোর ফাঁকফোকরে টিলাশোভিত বনভূমির প্রান্ত-ছোঁয়া মাত্র কয়েকটি গ্রামে এ সম্প্রদায়ের বাস। জনসংখ্যার নিরিখে অত্যন্ত ক্ষুদ্র; তবে এদের ভাষা ও সংস্কৃতি মূলধারার হিন্দু-মুসলমানদের চেয়ে ভিন্ন। এদের সম্পর্কে বইপত্রে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য তথ্য সরোজ খুঁজে পায়নি। তো এক পর্যায়ে সে নিজে থেকে তাদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মরীতি, বিবাহ প্রভৃতি বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে এসবের ভিত্তিতে লিখেছে একটি প্রবন্ধ। রচনাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়। এতে বিরাগভাজন হন কর্মক্ষেত্রে তার সুপারভাইজার। উনার অভিমত হলো, সরোজের দায়িত্ব হচ্ছে পাত্র গ্রামে এনজিওর নির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়িত করা। কর্মসূচির সঙ্গে সম্পর্কহীন তথ্য সংগ্রহ সম্পর্কে তার আপত্তি। তিনি চাচ্ছেন না- সরোজ ব্যক্তিগত আগ্রহের জন্য সংস্থার সময় ব্যয় করুক। পাত্র গ্রামের কিছু পরিবারের সঙ্গে তার গড়ে উঠেছে সুন্দর সম্পর্ক; এ বিষয়টাও সুপারভাইজার পছন্দ করেননি। মাঠে অনেক বছর ধরে কাজ করা অত্যন্ত সিজনড্ ভদ্রলোক তাকে গ্রাম পর্যায়ে কেবলমাত্র পেশাদারি সম্পর্ক রক্ষা করতে পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু সরোজ চরিত্রের দিক থেকে গহন-বিচারি একজন প্যাশনেট প্রকৃতির পুরুষ। যা তার ভালো লাগে, যে বিষয়ে তার মধ্যে তৈরি হয় প্যাশন, তা অবজ্ঞা করে নৈর্ব্যক্তিক আচরণ করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তো সে সুপারভাইজারের পরামর্শ উপেক্ষা করেছে। পরিণতিতে মাঠ পর্যায়ে দারুণ পরফরমেন্সের পরও বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট পায়নি সরোজ।
বালুকাময় পথে হোন্ডাটি ফটফটিয়ে থেমে যায়। ঠেলা-ধাক্কা করে সে বাহনটিকে নিয়ে আসে একটি পাখিয়ারা গাছের তলায়, কিন্তু স্টার্ট করতে পারে না। ভারি উদ্বেগ হয়, কলকব্জা কিছু যদি গড়বড় হয়, তাহলে যে সহকর্মীর কাছ থেকে বাইকটি ধার করে এনেছে, তার কাছে সে লজ্জা পাবে। এ বাইকের সহায়তা ছাড়া অফিস-কর্মের চাপের ভেতর এক ফাঁকে হুট করে পাত্র গ্রাম ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা মুশকিল হয়ে পড়বে।
বেশ খানিকটা সময় বাইকটি সারাই করার ব্যর্থ চেষ্টা করে সে সিগ্রেট ধরায়। স্মোক করতে করতে দেখে, কাছের একটি আমগাছের তিডালার গোড়া থেকে বেরিয়ে এসেছে গোলাপিতে ছোপ ছোপ শুভ্রতা ছড়ানো আমকুড়ালির ফুল। সে ব্যাকপ্যাক থেকে ক্যামেরা বের করতে যায়। তখনই খেয়াল করে, আমকুড়ালির অর্কিড গুচ্ছটি ঘিরে উড়ে উড়ে সুচালো ঠোঁটে মধু চয়ন করছে অত্যন্ত ছোট্ট একটি মৌটুসি পাখি। দৃশ্যটি থেকে ছড়াচ্ছে এমন এক ধরনের মায়া, সে সম্মোহিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। ক্যামেরার শাটার টিপতে তার আগ্রহ হয় না। এ অলিম্পিয়া ক্যামেরাটিও সরোজ ধার করে নিয়েছে ভিডিআইর একজন সহকর্মীর কাছ থেকে। বয়সের কারণে অলিম্পিয়া হালফিল তেমন একটা কার্যকর না। এতে ছবি ওঠে বটে, কিন্তু কীভাবে যেন ফিল্মের সর্বত্র আঁকা হয়ে যায় আলোর বেজায় উজ্জ্বল দাগ। এতে আলোকচিত্রের বিষয়বস্তুর ডিটেলস্ ঝাপসা হয়ে পড়ে।
এ ক্যামেরা দিয়ে কয়েক মাস আগে পাত্র সম্প্রদায়ের পূজা-পার্বণের দারুণ কিছু দৃশ্য ধারণ করেছিলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আলোকচিত্রগুলো এমনভাবে ঝাপসা হয়েছে যে, এগুলো কোন লেখার সাথে ব্যবহার করার কোন উপায়ই থাকেনি। পাত্রদের পূজার রীতি-রেওয়াজ মূলধারার হিন্দুদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হিন্দু দেব-দেবীর আরাধনা তারাও করে থাকে, তবে তাদের অর্চনায় কোন মূর্তি বা বিগ্রহের ব্যবহার নেই। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে বহরগুল গ্রামের এক মহিলা- সুরতারিণীর সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। চার সন্তানের জননী বিধবা সুরতারিণী সরোজকে ভাই ডাকেন। গ্রামে গেলে তিনি তাকে তার দাওয়ায় বসিয়ে শসা খেতে দেন। সরোজও তার জন্য কখনো-সখনো নিয়ে যায় গ্লুকোজ বিস্কিটের প্যাকেট। পাত্ররা জংগলের অনেক পত্রলতা ও শিকড়-বাকড়ের রস জারিত করে তৈরি করে 'খর' নামে পরিচিত পানীয়। সুরতারিণী তার ঘরের পেছনে মাটির তলায় শিয়ালের গর্তের মতো সুড়ঙ্গ খুঁড়ে খর প্রক্রিয়াজাত করেন। মাঝেমধ্যে সরোজের ভাগেও জোটে যৎসামান্য ঝাঁঝালো পানীয়। বস্তুটি পান করে সে একবার অফিস ফিরলে, উৎকট গন্ধে তার সুপারভাইজার জোড়া ভুরু কুঁচকে বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন।
সুরতারিণী তাকে পূজার দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। মাস চারেক আগে চৈত্র মাসের অপরাহেপ্ত সরোজ বহরগুলে ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলো। অই দিন সুরতারিণী খর পানে দারুণভাবে মাতেলা ছিলেন। তিনি ক্রমাগত নাসির বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে পাতানো ভাই সরোজকে নিয়ে গিয়েছিলেন পাকুড় গাছের তলায় পূজার থানে। পাত্রদের পূজা-পার্বণে পূজারি ব্রাহ্মণের কোন চল নেই। সুরতারিণীর জেঠা, বহরগুলের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি সুরেশ পাত্র পূজা পরিচালনা করছিলেন। লাঠি ভর দেয়া থুরথুরে মানুষটি প্রচুর পানে এমনভাবে বিভোর হয়েছিলেন যে, তিনি ক্যামেরা ব্যবহারে কোন আপত্তি তোলেননি। গাছের গোড়ায় ভারি স্নিগ্ধ চেহারার এক পাত্র-কিশোরী কুলায় করে নিয়ে এসেছিলো পান, সুপারি, নারিকেল, গুড়, কলা প্রভৃতি দিয়ে সাজানো উপাচার।
মেয়েটির নাম রত্নামণি। সে হাসি হাসি মুখে উপাচারের ডালাটি হাতে ছবির জন্য ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়েছিলো। পূজাতে এক জোড়া কবুতর ও গজার মাছ বলি দেয়া হয়। রত্নামণি আধলা ইট দিয়ে বানানো খোলা চুলায় রান্না করে ভোগ। গ্রামবাসীর সাথে সরোজেরও জুটেছিলো কলাপাতায় প্রসাদ। এ ঘটনার সপ্তাহ খানেক পর বহরগুলে এসে সে ঝাপসা হয়ে ওঠা ফটোগ্রাফের একটি প্রিন্ট মেয়েটির হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলো। তাতে রত্নামণি এমন খুশি হয় যে, সে কেবলই সরোজকে জোড়-হাতে প্রণাম জানাতে থাকে।
আজ সুরতারিণীর তালাশে সরোজ বহরগুলে গিয়েছিলো। কিন্তু তিনি বাড়িতে ছিলেন না। প্রতিবেশীদের সাথে বাতচিত করে সে জানতে পারে, সকালবেলা সুরতারিণী গ্রামের দুটো ছেলের কান কাঁটা দিয়ে ফুঁড়ে দেন। কৈশোর অতিক্রান্ত পাত্র ছেলেদের মধ্যে কান ফোঁড়ার রেওয়াজ আছে। এ আচার সম্পাদন করতে গিয়ে সুরতারিণী নাকি পান করেছেন প্রচুর পরিমাণে খর। তারপর হেঁটে গেছেন পিচঢালা রাজসড়কের দিকে। সরোজ ভেবেছিলো, সুরতারিণীকে নিয়ে সে যাবে সুরেশ পাত্রের কাছে। তিনি 'সিটকই' বলে সমাজে পরিচিত, জোর করে পাত্র যুবতীদের অনভিপ্রেতভাবে বিবাহ করা সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে রাজি হয়েছিলেন। তো সুরতারিণীকে না পেয়ে সে একাই চলে গিয়েছিলো সুরেশ পাত্রের ঘরে।
সরোজ ভাবতেও পারেনি, সুরেশ পাত্রের স্বাস্থ্য ভেঙে গিয়ে এত দ্রুত তিনি মরণাপন্ন হয়ে উঠবেন! ঘরের দাওয়ায় বাতাবি লেবু গাছের ছায়াতলে তাকে চাটাইতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার গলা দিয়ে বেরুচ্ছে ঘড়-ঘড়ে আওয়াজ। কোন ডাক্তার-কবিরাজের ব্যবস্থা নেই। পাশে বসে রত্নামণি বাটি থেকে কেরাইয়া পাতার রস ত্যানা দিয়ে তুলে লেপে দিচ্ছে মরণাপন্ন বৃদ্ধের কপালে। তাকে দেখতে পেয়ে চোখ নামিয়ে নেয় রত্নামণি। তার হলুদাভ আভা ছড়ানো ত্বক যেন জ্বলে-পুড়ে তামাটে হয়ে গেছে। রাহুগ্রাসে বিলুপ্ত হওয়া জ্যোৎস্নার মতো মেয়েটির অবয়ব থেকে মুছে গেছে স্নিগ্ধ শ্রী।
রত্নামণির হাতে ঝাপসা ফটোগ্রাফটি তুলে দেয়ার ঠিক চার দিন পর মেয়েটি কলসি কাঁখে পানি আনতে যায়। সেনানিবাসের সংলগ্ন হওয়ার কারণে এ অঞ্চলের জংলা ভূমিতে হামেশা সৈনিকদের মহড়া চলে। যতটা জানা যায়, জল নিয়ে ফেরার পথে দু'জন সৈনিক বিন্নাঝোপের আড়ালে তাকে টেনে নিয়ে গিয়ে ভায়োলেন্টভাবে ধর্ষণ করে। এতে তার জননেন্দ্রিয় জখম হয় মারাত্মকভাবে। ভিডিআইর এক মহিলা স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে এ তথ্য পেয়ে সরোজ চেষ্টা করেছিলো রত্নামণির নাম উল্লেখ না করে স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদটি ছাপানোর। কিন্তু দেশে চলছে জেনারেল এরশাদের কড়া মার্শাল-ল। যথেষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া কোন পত্রিকা এ ধরনের সংবাদ ছাপতে রাজি হয় না।
রত্নামণির প্রসঙ্গ মনে আসতেই তার মধ্যে বিচিত্র এক অনুভূতি হয়। কিশোরীটি সুদর্শনা; আকর্ষণ বলতে যা বোঝায়, সরোজ কখনো তা ফিল করেনি, বরং স্নেহটাই তার সংবেদনে প্রধান হয়ে উঠেছে। শরীরে নারীত্ব ফুটে ওঠার কারণে একটি মেয়েকে দৈহিকভাবে বিক্ষত হতে হবে, আঘাত ও অপমানের বোঝা জনমভর বয়ে বেড়াতে হবে- এ ব্যাপারটা সরোজ মেনে নিতে পারে না। কিন্তু বিহিত কিছু করার মতো সামাজিক শক্তিও তার নেই। এ অসহায়বোধ থেকে তার মধ্যে জন্ম নেয় ক্রোধ। সে তেড়িয়া হয়ে বাইকের স্টার্টারে কিক কষায়। স্রেফ কপালগুণে তা চালু হয়। বাহনটি ম্যানেজ করতে করতে ফের সে সুরেশ পাত্রের কথা ভাবে। কথাবার্তায় সরোজ জেনেছে যে, কিছু পাত্র মেয়ে শরীরীভাবে হয়রানির শিকার হয়েছে মূলধারার জনগোষ্ঠীর যুবকদের হাতে। পরিণতিতে কোন কোন যুবক জোর করে পাত্র মেয়েকে বিয়েও করেছে। এ বিষয়টা পাত্র ভাষায় 'সিটকই' বলে পরিচিত। সিটকই-এর শিকার মেয়েদের পাত্র সমাজে সহানুভূতির চোখে দেখা হয় না। সুরেশ বুড়ো তাকে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। দোষ তারই, সময়মতো সে ফলোআপ করেনি। কারণ সুপারভাইজারের নির্দেশে প্রশিক্ষণ পরিচালনার জন্য তাকে যেতে হয়েছিলো কুষ্টিয়া, বরিশাল ও খুলনায় তিন-তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ট্রিপে। কোনভাবেই সুরেশ পাত্রের ফের সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য সময় করে উঠতে পারছিলো না। ভাবতে ভাবতে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, সুরেশ পাত্রের পরলোকপ্রাপ্তির ভেতর দিয়ে সামাজিকভাবে কিছু অন্যায় সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য হারিয়ে যাবে।
মলই পাড়ার কাছে বাঁক নিতে গিয়ে সে দেখে, গ্লাবেত বনের ঝোপটির আড়ালে বসে নকুল পাত্র কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করছেন অঙ্গার। মনে হয়, শতাব্দীকাল থেকে পাত্র পুরুষরা অঙ্গার তৈরি করে তা চায়ের দোকান প্রভৃতিতে সরবরাহ করার ব্যবসা করে আসছেন। সরোজ বাইকের স্টার্ট চালু রেখে মাটিতে পা ঠেকিয়ে তা থামায়। সে নকুলের কাছে জানতে চায়- কোথায় সুরতারিণী দিদি? জবাবে জানা যায়- তার শরীর খারাপ, জ্বর-জারি ও কফ-কাশিতে কষ্ট পাচ্ছেন, তো তিনি সরোজের তালাশে তার অফিসের দিকে গিয়েছেন। শুনতে পেয়ে প্রমাদ গুনে ফের সে তোড়ে বাইক হাঁকায়। যেতে যেতে মন থেকে নকুল পাত্রের সম্প্রতি নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি এড়াতে পারে না। পাত্র পুরুষদের সনাতনী ব্যবসা অঙ্গার তৈরির জন্য কাঠ কুড়াতে গিয়ে তিনি বন বিভাগের কর্মীর হাতে ধৃত হয়েছিলেন মাস খানেক আগে। ফরেস্ট গার্ডরা তাকে গাছের সাথে বেঁধে লাঠি দিয়ে পেটায়। এতে তার পায়ে মারাত্মকভাবে জখম হয়। বর্তমানে নকুল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। ভিডিআই অফিসের কাছাকাছি এসে সরোজের কেবলই মনে হতে থাকে, হাল জামানার রিজার্ভ ফরেস্ট তো এক যুগে পাত্র সম্প্রদায়ের খাসভূমি ছিলো। ব্রিটিশ প্রশাসকরা জোর করে পত্তনি দিয়ে অনায্যভাবে রিজার্ভ ফরেস্ট গড়ে তোলে। তো নকুল- হলেনই বা তিনি বনতস্কর, তাই বলে তাকে বেঁধে পেটাবে? অন্যান্য আদিবাসী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মতো পাত্রদের একটি কল্যাণ সমিতি থাকলে এ বাবদে প্রতিবাদ করা যেত।
অফিসের বারান্দায় দেখা হয় সুপারভাইজারের সঙ্গে। অবাক হয় সরোজ! তিনি না সকালে ব্রাঞ্চ অফিস পরিদর্শন করতে গিয়েছিলেন! তার তো এত তাড়াতাড়ি ফেরার কথা না? প্রৌঢ় ভদ্রলোকের চুল উসকোখুসকো হয়ে আছে, কলপের কালিমালিপ্ত কেশগুচ্ছের তলা থেকে বেরিয়ে এসেছে ছোপ ছোপ ধূসরাভা। তিনি বিদ্রূপাত্মকভাবে বলেন, 'তোমার পাত্র রিলেটিভ বসে আছেন রিসেপশন লাউঞ্জে; যাও, মেহমানদারি করো।'
বেতের চেয়ারে বসে চুপচাপ ঝিমাচ্ছিলেন সুরতারিণী। রোদে পুড়ে তার চোখমুখ এত কালো হয়েছে যে; মনে হয়, মহিলা পোড়া অঙ্গার ছেনে এসেছেন। তার কাঁধ থেকে খসে পড়েছে আঁচল, চতুর্দিকে ছড়াচ্ছে খরের ঝাঁঝালো গন্ধ। সরোজকে দেখতে পেয়ে আধপোড়া বিড়িটি মুখে দিয়ে ফস করে দেশলাইয়ের কাঠি ঘষেন। বেশ কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে সরোজ বুঝতে পারে, তার দিদি ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন। ঘটনা হলো, মাস দুয়েক আগে সরোজ অনানুষ্ঠানিকভাবে সুরতারিণীর সাক্ষাৎকার একটি ক্যাসেটে ধারণ করে। এতে টেপ করা আছে পাত্র সম্প্রদায়ের জন্ম, বিবাহ ও মৃত্যু সংক্রান্ত খুঁটিনাটি তথ্য। তিনি কেন ক্যাসেটটি ফেরত চাচ্ছেন- তা জানতে গিয়ে তার তাজ্জব হওয়ার দশা হয়! সুরতারিণীর জেঠা সুরেশ পাত্র মশাইয়ের জ্যোতিষ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি আছে। তিনি গ্রহ-নক্ষত্র বিচরিয়ে অনেক দিন আগে নাকি বলেছিলেন, তার ভাই এর কন্যার মৃত্যু হবে তার মৃত্যুর ঠিক সাত দিন পর। গ্রহ-নক্ষত্রের ফের তো খণ্ডানোর কোন উপায় নেই। এখন সমস্যা হচ্ছে- পরলোকপ্রাপ্তির পরপরই মরদেহ দাহ করার বিধান, কিন্তু দেহটি ভস্ম হলেও তার ধারণকৃত বক্তব্য থেকে যাবে পৃথিবীতে। তো সুরতারিণী দেহে প্রাণ থাকাবস্থায় ক্যাসেটটি পুড়িয়ে ফেলতে চান। অনেক কথাবার্তা বলেও সরোজ ক্যাসেটটি না পোড়ানোর ব্যাপারে সুরতারিণীকে কনভিন্স করতে পারে না।
ক্যাসেটটি থেকে জরুরি উপাত্ত ট্রান্সক্রিপ্ট করে নোটবুকে টুকে ফেলা হয়নি। তো সরোজের করোটিতে একটি ধূর্ত আইডিয়া খেলে যায়। অন্য একটি ক্যাসেটে উপাত্ত রিরেকর্ড করে সুরতারিণীকে তা ফেরত দেয়া যেতে পারে। কিন্তু অফিসে এম্পটি কোন ক্যাসেট নেই। সিলেট শহরে গিয়ে এ মুহূর্তে তা কিনে আনারও কোন উপায় নেই। কারণ সামরিক সরকারের নির্দেশে ছাত্রমিছিলের ওপর ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করার প্রতিবাদে হরতাল চলছে। তাই বাইক হাঁকিয়ে শহরে গিয়ে ক্যাসেট কিনে আনা অসম্ভব।
তো বিষয়টি আদ্যোপান্ত ভেবে সে সুরতারিণীর কাছে ক্যাসেট ফেরত দেয়ার জন্য তিন দিন সময় চেয়ে নেয়। মহিলা কিছুক্ষণ ফ্যাল ফ্যাল করে তার দিকে চেয়ে থেকে বিড়িতে দীর্ঘ দম দিয়ে আস্তে আস্তে অফিস থেকে বেরিয়ে যান। সরোজও তার সাথে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়ায়। বিদায় দিতে গিয়ে মনে হয়, মহিলা হচ্ছেন গবেষণার পরিভাষায় একজন ইনফরম্যান্ট। তিনি যে তথ্য সরবরাহ করেছেন, তার অধিকার আছে তা ফিরিয়ে নেয়ার। তবে কি সে ক্যাসেটটি ফেরত দেবে? কিন্তু এ উপাত্তকে ভিত্তি করে সে লিখতে চাচ্ছে আরেকটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ। হামেশা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগার সমস্যা আছে তার। কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারে না। খুক-খুকিয়ে কাশতে কাশতে সুরতারিণী সিঁড়ির কাছে থুক করে এক দলা কাশ ফেলেন। তারপর তার পাতানো দিদিটি হেঁটে যান দূরের জংগলশোভিত পল্লীর দিকে। অফিসের কামরায় ফেরার আগে নোংরা থুথুর দিকে সরোজের চোখ পড়ে। ওখানে রক্তের ছিটা দেখতে পেয়ে ভারি উদ্বেগ হয়। কী করবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। তার দারুণ অসহায় লাগে।
Sunday, February 15, 2015
দরজার বাইরে by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
দরজার
কড়া নাড়ার পর কিছুটা সময় যায়, ঘড়ির কাঁটায় হয়তো এক-দুই মিনিট, কিন্তু
রাশেদের কাছে একটা গোটা প্রহর। মিথিলা দরজা খোলে, মিষ্টি করে হাসে, একটু
সরে দাঁড়ায়। রাশেদের হাত থেকে বই থাকলে বই, বাজার থাকলে বাজার নিজের হাতে
নেয়, তারপর রাশেদ ঢুকলে, এবং দরজা বন্ধ হলে সেগুলো দরজার পাশের টেবিলটাতে
নামিয়ে রাখে। তারপর গলায় কিছুটা অভিমান ঢেলে বলে, 'এত দেরি হলো'?
দেরি? রাশেদ অবাক হয়, আবার হয়ও না। ঘড়ির কাঁটায় হয়তো ঘণ্টা দুয়েক; অথবা অফিসের সময়টা হিসাবে নিলে একটা আধা দিন, কিন্তু মিথিলার কাছে একটা পুরো মাস। অথবা, কে জানে, গোটা একটা বছর।
দু'জনের সময়ের হিসাবটা অবশ্য এরপর একটা বিন্দুতে এসে মিলে যায়। 'খুব দেরি হয়ে গেল?' রাশেদ বলে এবং দু'হাতে মিথিলাকে জড়িয়ে ধরে। খুব যে শক্ত করে, তা নয়, ইচ্ছা করলেই মিথিলা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। কিন্তু নেওয়ার ইচ্ছার কথাটা তার মনে আসে না। মিথিলা বরং নিজেকে রাশেদের দুই হাতে সঁপে দেয়, তারপর একটা তরল আনন্দ তাকে দোলা দিতে থাকে। এক সময়_ এবং এই সময়ের হিসাবটা কারও মাথাতে আসে না_ রাশেদের ঠোঁট নেমে আসে মিথিলার ঠোঁটে।
দিনে একবার অথবা দু'বার। নাহ্, রাশেদ সেই হিসাবেও যায় না। তার বরং মনে পড়ে এক অবাক সন্ধ্যার আলো-অন্ধকারের নক্সা-কাটা আকাশটাকে, যার নিচে বসে একটা ঝোপের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে প্রথম মিথিলার ঠোঁটে সে ঠোঁট রেখেছিল।
মিথিলার শরীর কাঁপছিল। তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এসেছিল। রাশেদের মনে হয়েছিল, যেন আকাশের দরজা খুলে ভেতরের জমানো সুখ ঝরে পড়ছিল। একটা মুহূর্ত এতটা সুগন্ধ ধরে রাখতে পারে, সে ভাবতে পারেনি।
রাশেদ মাত্র চাকরিতে ঢুকেছে তখন, মিথিলা পড়ছে ইডেনে। সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যেত। অফিসের ফাইলে মিথিলার ছবি, দেয়ালে মিথিলার ছবি, বড় সাহেবের মাথার ওপর টাঙানো প্রধানমন্ত্রীর ছবির ওপরও লেপ্টে বসত মিথিলার ছবি।
রাশেদ জিজ্ঞেস করত মিথিলাকে, 'একটা আস্ত দিন আমাকে ছাড়া পার করে দাও কীভাবে, মিথি?'
'পার করতে পারি কই?' ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে মিথিলা বলত। রাশেদের উড়ূক্কু ভাব আর উদাসীনতায় বিরক্ত বস তাকে টাঙ্গাইল পাঠিয়ে দেয় কয়েক দিন আগে।
অনেক চেষ্টা করেও টাঙ্গাইল যাওয়া আটকাতে পারেনি রাশেদ। আকুর টাকুরপাড়ায় দুই কামরার এই ঘরটা ভাড়া নিতে হয়েছিল। বাড়িওয়ালার হাত-পা ধরাটা বাকি ছিল। বলেছিল, এক মাসের মধ্যে বউকে নিয়ে আসবে।
সেই এক মাস গিয়ে তিন মাসে ঠেকেছিল।
মিথিলার পরীক্ষা যেদিন শেষ হলো, তার মামার সামনে দাঁড়িয়ে, অনেক ঘাম, ভয় আর তোতলামি মেশানো একটা বিকেলে সে বলেছিল, মিথিলাকে সে তার জীবনে চায়।
মিথিলার বাবা থাকেন মানামাতে। মা-ও। মানামা কোথায় রাশেদ মোটামুটি জানে। কিন্তু মামা যখন বলেছেন, পরীক্ষার পর মিথিলার মানামা যাওয়ার কথা, বিয়ের প্রশ্নই তাই ওঠে না, রাশেদের মনে হয়েছে, মানামা বোধ হয় চাঁদ অথবা নেপচুনের দূরত্বের কোনো শহর, যেখানে গেলে মিথিলা আর ফিরে আসবে না।
ফলে যা করার তা-ই তাদের করতে হয়েছে।
২. দরজার দিকে যেতে যেতে মিথিলা নিজের সঙ্গে একটা খেলা খেলত। রাশেদকে আজ বিরাট এক অপরাধী বানাতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে তিন মাসের এই সংসারে প্রথম দিনটার মতো এখন সে আর তাকে সময় দিচ্ছে না। মিথিলাকে সে ভুলে যাচ্ছে। অফিসটাকে সে মিথিলার ওপরে জায়গা দিতে শুরু করেছে। টাঙ্গাইলের ভূগোল রাঙিয়ে রাখে যে মিথিলা, তার চোখের আলোটা যেন তার কাছে কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। ইত্যাদি।
প্রতিদিন সে নতুন একটা অভিযোগ খাড়া করত। মিথিলা জানত, অভিযোগটা যত গুরুতর হবে, রাশেদের কাছে তা পেঁৗছাবে অনেক অভিমানের মোড়কে জড়িয়ে। এবং মোড়ক খুলতে খুলতে অভিযোগটা কী, তা বোঝার আগেই রাশেদ তাকে পেঁৗছে দেবে একটা বিন্দুতে। অপার্থিব একটা বিন্দুতে।
সারা ঘরজুড়ে সেই অবাক সন্ধ্যার জাফরি কাটা আকাশটা তখন বিছিয়ে থাকবে। মিথিলার মনে পড়ে, সেই সন্ধ্যায় রাশেদের গাল থেকে একটা অদ্ভুত সুগন্ধ এসে লাগছিল তার নাকে। নাকি তার নিঃশ্বাস থেকে? জিহ্বা থেকে? এমনি ঘোর লাগানো সেই সুগন্ধ, মিথিলা সুযোগ পেলেই তাতে ডুবে গেছে।
দরজা খুললে কোন রাশেদকে সে দেখবে, তারও একটা আন্দাজ সে করত, বিশেষ করে তার মামা যেদিন এসে জানিয়ে গেলেন, মিথিলার বাবা বিয়েটা মেনে নেননি তার পর থেকে। বাবা মেনে নেননি, তাতে কী, মিথিলা নিজেকে বুঝিয়েছে। কিন্তু রাশেদের চোখে একটা কষ্টের ছায়া যে জমেছে, কিছুটা দুর্ভাবনারও, সেটি টের পেয়ে তার অভিযোগের তালিকাটা সে লম্বা করেছে আর হেসেছে। যতই চোখে ছায়া জমুক রাশেদের, দরজা খুললে বেশিক্ষণ সেগুলো ধরে রাখতে পারত না সে। একটা বিন্দুতে এসে যখন দু'জনের সময়ের হিসাবটা মিলে যেত, তখন রাশেদের উদ্বিগ্নতা, তার ভয় অথবা কষ্ট তরল হয়ে মিলিয়ে যেত।
৩. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেকে উদ্বিগ্নই লাগছিল রাশেদের। তার মনে পড়ল, মামাবাড়ি থেকে বেরিয়ে মিথিলা চোখে জাদু ঢেলে তাকে বলেছিল, 'চল, কোর্টে চল।'
জাদুই বটে। তাদের প্রথম দেখাটা ছিল একটা জাদু, দ্বিতীয় দেখাটাও এবং অবাক, এরপর প্রতিটি দেখাও। রাশেদ অবাক হয়েছে, বাবার সিদ্ধান্তের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে, মামাকে একটা কথাও না বলে, মিথিলা যখন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখনও জাদুটা তার চোখ থেকে যায়নি।
কোর্ট থেকে বেরিয়ে রাশেদের হাতে একটা হাত রেখে সে আস্তে করে বলেছে, 'এখন টাঙ্গাইল চল। আমাদের সংসার অপেক্ষা করে আছে।'
মিথিলার মামা যেদিন টাঙ্গাইল আসেন, সংসারটায় সেদিন প্রথম কাঁপন ধরল। তিনি মিথিলাকে বলেছেন, কাজটা মোটেও ভালো হয়নি। এখন সে যদি বাবাকে ফোন করে মাফ-টাফ চেয়ে নেয়, তাহলে হয়তো বাবার সঙ্গে সম্পর্কটা থাকবে।
মিথিলা জানত, তার বাবা একটা পাত্র ঠিক করে রেখেছেন তার জন্য। পাত্র সেই মানামাতেই থাকে। ইঞ্জিনিয়ার। তিনি কথাও দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাবার অবাধ্য হওয়া আর তার সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানাটা একই জিনিস, এটি সে বিশ্বাস করতে পারেনি।
সে শুধু আস্তে করে বলেছে, 'ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় মামা। প্রশ্নই তো ওঠে না।'
মামা জানিয়ে দিলেন, কোর্টের বিয়ের কোনো মূল্য নেই। এখন ঢাকা ফিরে গেলে মানামা যাওয়ার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। ইঞ্জিনিয়ার পাত্র তার পাগলামির কথা কিছুই জানে না। ফলে সমস্যা হবে না।
মিথিলা হেসেছে। আবার বলেছে, 'সম্ভব নয়।' মামা এরপর উঠেছেন।
৪. দরজার দিকে যেতে যেতে মিথিলা একটা খেলার কথা ভাবত। কেমন হয়, যদি রাশেদের মনে একটু ঈর্ষা জাগানো যায়? তাকে বলা যায়, ভাবছি, ঢাকায় যাব, তারপর মানামাতে। একটা হ্যান্ডসাম পাত্র বসে আছে আমার জন্য।
একদিন দরজা খুলতে গিয়ে এটি ভাবতে ভাবতে সে জোরে হেসে উঠেছে। রাশেদ অবাক চোখে তাকালে সে লজ্জা পেয়েছে। তাতে ঈর্ষা জাগানোর খেলার কথাটা তার মন থেকে হাওয়া হয়ে গেছে।
কিন্তু মিথিলার হাসিটা একদিন বন্ধ করে দিতে স্বয়ং তার বাবা এসেছেন। ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। হিসাব বোঝেন। সাধ্য বোঝেন। তিনি বাড়িতে ঢুকেই নাক সিটকে বলেছেন, 'এই বস্তির ঘরে তুই উঠেছিস?'
মিথিলার রেগে যাওয়ার কথা ছিল। বাবাকে দুটো কথা শুনিয়ে দেওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সে রাগ ভুলে গেল। কেঁদেই ফেলল বরং। অনেক দিন পর সে বাবাকে দেখল। বাবার বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে। চুল শুধু মাথার ছাদটাকে ঢেকে রেখেছে। গোঁফ সাদা হয়েছে। কপালে অনেকগুলো ভাঁজ জমেছে।
'তোমার শরীর কি ভালো নেই, বাবা?'
'কী করে থাকে বল, মা?' বাবা বললেন, সেই ছোটবেলা যেমন বলতেন, তার সঙ্গে রাজা আর রাজকন্যার খেলাটা যখন খেলতেন।
মিথিলার চোখে বাষ্প জমে যেন একটা মেঘলা দিন নিয়ে এলো। চোখের মেঘ সরিয়ে সে বাবাকে দেখল, বাবা দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছেন। 'আয় মা,' তিনি বলছেন, 'এই বস্তির ঘর ছেড়ে আয়।'
মিথিলার মনে পড়ল, ভাইয়াটার বয়স যখন নয়, এবং তার সাত, তখন নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমে ভাইয়াটা আর উঠে এলো না, এমনি করে হাত বাড়িয়ে বাবা বলেছিলেন, 'আয় মা, এই নরকে আর এক মুহূর্তও না।'
এরপর বাবা আর নানাবাড়ি যাননি। মিথিলাও না। অনেকক্ষণ পর, ঢাকা থেকে ভাড়া করা মাইক্রোবাসে উঠে বসতে গিয়ে বাবা বললেন, 'হামীমটাকে হারালাম। তোকে হারাতে পারি না।'
৫. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ খুব অস্বস্তি হয় রাশেদের। এমন কী হলো যে একটা অনন্তকাল পার করে দিয়ে দরজাটা খুলতে হবে? হঠাৎ কেন দু'জনের হিসাব একটা বিন্দুতে এসে মিশে যাচ্ছে না? এই বাড়িটাতে যে নক্সা-কাটা আকাশ নামত প্রতি সন্ধ্যায়, সেটি হঠাৎ অনেক উঁচুতে উঠে কি হারিয়ে গেছে? মিথিলা কী আজ বলবে, যেমন সে একদিন কোনো কিছু না ভেবেই বলেছিল, 'একটা বড় বাসা দেখলে হয় না?'
'বড় বাসা? কার জন্য?' রাশেদ জিজ্ঞেস করেছিল, যেন সে অবাক হওয়ার সুযোগটাও পায়নি।
'কেন, আমাদের জন্য?'
'আমাদের জন্য?'
মিথিলা আর কথা বাড়ায়নি।
তার মনে পড়ে, মিথিলার বাবা মানামা ফিরে গেলে তার হাসিটাও যেন বিদায় নিয়েছিল। একদিন অনেকটা সময় নিয়ে সে হামীমের শেষ দিনটি নিয়ে কথা বলল। তাকে নিয়ে দু-এক কথার বেশি কোনো দিন কিছু বলেনি মিথিলা। অথচ আকুর টাকুরপাড়ার জাদুর ভূগোলে একটা কালো ছায়া বিছিয়ে মিথিলা তাকে বলতে থাকল, পুকুরে নামার আগে হামীম কী করেছিল, কী বলেছিল। ইত্যাদি।
আরেক দিন মিথিলা জানাল, তারপর থেকে বাবা তাকে কীভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। 'বাবা আমার দিকে দুটি হাত বাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। তার চোয়াল শক্ত, চোখে আগুন' ইত্যাদি।
তারপর গল্পটা সেইখানে ফেলে রেখে সে উঠে বিছানায় গেছে।
৬. দরজার দিকে যেতে যেতে একদিন মিথিলার মনে হয়েছিল, আজ তার অভিযোগের তালিকায় তিনটি নতুন বিষয় সে ঢুকিয়ে দেবে। আঙুলে এক দুই তিন হিসাব করতে গিয়ে সে দেখল, তার আঙ্গুল শক্ত হয়ে আছে, হাত শক্ত হয়ে গেছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে অবাক হলো, অথবা হলো না, কারণ তার অভিযোগগুলো স্পষ্ট। রাশেদ কেন তার একটা কথাও রাখছে না, এই বাড়িটা ছেড়ে একটা ভদ্র, বড় বাড়ি কেন নিচ্ছে না? কেন সে ঢাকায় একটা বড় চাকরি খুঁজছে না, এবং কিছু দিনের জন্য সে যে মানামায় বাবা-মার সঙ্গে থেকে আসতে চাইছে_ সেজন্য কিছু টাকার জোগাড় কেন রাশেদ করছে না?
অভিযোগগুলোর ভেতর দিয়ে আরেকবার যেতে গিয়ে সে দেখল, রাশেদ যদি এসব শুনে চুপ করে না থাকত, যদি তার চোখে গম্ভীর কিছু কষ্টের ছায়া জমে তাকে হতবাক করে না দিত এবং সে একটুখানি হেসে শুধু বলত, আমি চেষ্টা করছি, মিথি, খুবই চেষ্টা করছি, তাহলে এই অভিযোগের খেলাটা একটা বিন্দুতে গিয়ে মিশে যেত, তরল হয়ে যেত।
৭. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হলো, একটা দুই কামরার ভাড়া বাড়িতে তার এক জীবনের সব বিনিয়োগ ঢেলে দেওয়ার কোনো মানে হয়নি। সে নিজেকে প্রশ্ন করল, একবারও কেন সে মিথিলাকে বলেনি, চল, একটা বাড়ি তুমি আমি মিলেই বরং দেখি? কেন সে চুপ থেকে বরং এ রকমটি বুঝিয়েছে মিথিলাকে, এই বাড়িটা তার অনন্ত বাসর ঘর, তার সারা জীবনের ঠিকানা, যেখানে একটা পা রাখলেই সে অবাক করা সন্ধ্যার নক্সা-কাটা আলো-অন্ধকারে ঢুকে যাবে, আর তার চোখে জমবে একটার পর একটা স্বপ্ন?
৮. দরজাটা শেষ পর্যন্ত খুলল। একটা মুহূর্ত, রাশেদ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'আমার নাম রাশেদ আহমেদ' ইত্যাদি। 'দুই বছর আগে এই বাড়িটাতে আমি ছিলাম, বাড়িটা আমার জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।' ইত্যাদি।
যার সঙ্গে রাশেদ কথা বলছিল, মিথিলার থেকে তার বয়স বছর পাঁচেকের বেশি হবে না। শুক্রবার সকালের কাজ তার সারা হাতে, চেহারায়, শাড়িতে। খুব বিরক্ত হওয়ার কথা, কিন্তু মুখে একটা হাসি মাখিয়ে তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, ভেতরে আসুন।'
তারপর তিনি বললেন, তার নাম লায়লা।
ভেতরে একটা পা রাখতেই রাশেদের মনে হলো, মাত্র একবারের মতো, একটুক্ষণের জন্য কেউ তাকে সুযোগ করে দিয়েছে, তার সেই অবাক-সন্ধ্যার জীবনটা একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য। মাত্র একবার, তারপরই তার হাতটা গুটিয়ে নিতে হবে। এক ফালি একটা বারান্দা, একদিকে বসার ঘর, অন্যদিকে রান্নাঘর। বসার ঘরটা পার হয়ে শোবার ঘর। ব্যস। রান্নাঘরের পাশে আধখানা একটা ঘর অবশ্য আছে, যাতে রাশেদ তার পড়ার টেবিলটা রেখেছিল। বইয়ের একটা শেলফও ছিল। চোখ বুজে সে বাড়িটাকে অনুভব করল। চোখ বুজে, যেহেতু চোখ খুললেই তাকে আঘাত পেতে হবে, যেহেতু খোলসটা ছাড়া সব পাল্টে গেছে বাড়িটার। সবই অচেনা। একবার তার ইচ্ছা হলো দৌড়ে শোবার ঘরটা দেখে আসবে। কিন্তু ভাবল, দরজা-দেয়াল ছাড়া সবই তো অচেনা দেখতে হবে; তার ভয় হলো, মধুমাখা দুপুর-বিকেল-রাতগুলো তাহলে হারিয়ে যাবে, এমনকি স্মৃতি থেকেও। সে চুপ করে বসার ঘরের একটা বেতের সোফায় বসে থাকল। এবং নিজের অজান্তে লায়লাকে বলেই ফেলল, যে কথাগুলো এখনও কাউকে বলতে পারেনি সে।
লায়লা তাকে বললেন, 'একটু চা দেই?'
'জি না,' অস্থির হয়ে বলল রাশেদ। 'আমি এখন যাব।'
'যাবেন?' তিনি বললেন, তারপর নিজেই যেন উত্তর দিলেন, 'যাওয়াই ভালো, শুধু কষ্ট বাড়বে।'
রাশেদ ভেজা চোখে তাকাল।
'এই আকুর টাকুরপাড়ায় আমরাও প্রথম সংসার পেতেছিলাম,' একটুখানি দীর্ঘশ্বাস যেন তিনি ফেললেন। 'পাঁচটা বছর কেটেছে সেই বাড়িটাতে। পাঁচটা বছর। যেন স্বপ্ন দিয়ে বোনা। সেই স্বপ্নের মাঝখান থেকে অমিত এলো ... '
লায়লার আশপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকা বছর চারেকের ছেলেটির নাম তাহলে অমিত।
'অমিত আসার পর আস্তে আস্তে সব যেন বদলে গেল। মনে হলো ওর বাবা যেন একটু একটু করে অন্য একটা মানুষ হয়ে গেলেন। চিরদিনের চেনা, কিন্তু কেমন করে যেন অচেনাও। বাসাটার পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি, একবার ফিরেও তাকায়নি। কিন্তু এক রাতে হঠাৎ আমাকে হাত ধরে টেনে সে বলল, চল বাড়িটা একবার দেখে আসি।
সেদিন মনে হলো সবকিছুই আসলে ভেতরের ব্যাপার। কী বলেন?'
রাশেদ একটুখানি অপ্রস্তুত হলো। 'উনি কোথায়?' সে জিজ্ঞেস করল।
'চুল কাটতে গেছে। এক্ষুনি ফিরবে,' তিনি বললেন, তারপর গলায় আর্দ্রতা মাখিয়ে বললেন, 'চলেই গেলেন শেষ পর্যন্ত?'
রাশেদ মাথা নাড়ল। 'মানামা না কোথায় যেন বললেন, একেবারে সেইখানে?'
'হ্যাঁ' রাশেদ বলল, তারপর দরজার দিকে পা বাড়াল। পা বাড়াতে বাড়াতে সে শুনল, দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। কড়া নাড়ার শব্দে লায়লার চোখে নিত্যদিন আবার ফিরে এলো। 'ও এসেছে,' আস্তে করে তিনি বললেন।
৯. দরজার ভেতরে পা রেখেই চমকে গেলেন গৃহকর্তা। চোখে প্রথমে ভয় জমেছিল, পরে কৌতূহল, তারপর বিরক্তি। কী চাই? তিনি জানতে চাইলেন।
'বাড়িটা দেখতে এসেছিলেন,' লায়লা বললেন।
'বাড়ি তো আমি ছাড়ছি না যে ভাড়া হবে,' তার চোখের দৃষ্টিতে এবার সন্দেহ।
'এই বাড়িতে থাকতেন এক সময়, সেজন্য দেখতে এসেছেন।'
'আচ্ছা? তাহলে আমাকে এখন জাদুঘরের লোকজনের মতো ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখাতে হবে?'
'আহ্, এ রকম করে বলতে হয় না,' লায়লার ক্ষতি-মেরামতির চেষ্টা।
'তা ছাড়া আর কী,' ভদ্রলোকের মেরামতির কোনো চেষ্টা নেই। 'গত শনিবার বাড়ি দেখার আবদার নিয়ে হাজির এক মহিলা। আজ ইনি।'
'আচ্ছা?' অবাক হয়ে লায়লা জিজ্ঞেস করলেন।
'তুমি অমিতকে নিয়ে ছোট আপুর বাসায় গিয়েছিলে। তুমি ছিলে না বলে আমি ঢুকতে দেইনি।' ভদ্রলোক বললেন। তারপর যেন কিছুটা দয়া দেখা দিল তার ভেতর। তিনি রাশেদকে বললেন, 'দেখতে চাইলে আসুন।'
রাশেদের ভেতরে একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। 'যে মহিলা এসেছিলেন, দয়া করে তিনি কী রকম দেখতে একটু বলবেন?'
ভদ্রলোক এবার বিরক্ত হলেন। 'একজন মহিলার চেহারা কী করে মনে করে বসে থাকি, বলেন? তবে তিনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন। একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে। হাঃ।'
কেন জানি রাশেদের চোখ পড়ল লায়লার চোখে। সেখানে কি একটুখানি হাসি দেখল রাশেদ, নাকি আকুর টাকুরপাড়ার ভূগোলটা আবার মায়াময় হয়ে ছায়া ফেলল তার চোখে?
দুটি সিঁড়ি টপকে রাস্তায় নামতে নামতে সে দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনল। মায়াময় সেই শব্দে যেন দরজাটা কিছু একটা বলতে চেয়েছে রাশেদকে।
দেরি? রাশেদ অবাক হয়, আবার হয়ও না। ঘড়ির কাঁটায় হয়তো ঘণ্টা দুয়েক; অথবা অফিসের সময়টা হিসাবে নিলে একটা আধা দিন, কিন্তু মিথিলার কাছে একটা পুরো মাস। অথবা, কে জানে, গোটা একটা বছর।
দু'জনের সময়ের হিসাবটা অবশ্য এরপর একটা বিন্দুতে এসে মিলে যায়। 'খুব দেরি হয়ে গেল?' রাশেদ বলে এবং দু'হাতে মিথিলাকে জড়িয়ে ধরে। খুব যে শক্ত করে, তা নয়, ইচ্ছা করলেই মিথিলা নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে পারে। কিন্তু নেওয়ার ইচ্ছার কথাটা তার মনে আসে না। মিথিলা বরং নিজেকে রাশেদের দুই হাতে সঁপে দেয়, তারপর একটা তরল আনন্দ তাকে দোলা দিতে থাকে। এক সময়_ এবং এই সময়ের হিসাবটা কারও মাথাতে আসে না_ রাশেদের ঠোঁট নেমে আসে মিথিলার ঠোঁটে।
দিনে একবার অথবা দু'বার। নাহ্, রাশেদ সেই হিসাবেও যায় না। তার বরং মনে পড়ে এক অবাক সন্ধ্যার আলো-অন্ধকারের নক্সা-কাটা আকাশটাকে, যার নিচে বসে একটা ঝোপের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে প্রথম মিথিলার ঠোঁটে সে ঠোঁট রেখেছিল।
মিথিলার শরীর কাঁপছিল। তার নিঃশ্বাস ঘন হয়ে এসেছিল। রাশেদের মনে হয়েছিল, যেন আকাশের দরজা খুলে ভেতরের জমানো সুখ ঝরে পড়ছিল। একটা মুহূর্ত এতটা সুগন্ধ ধরে রাখতে পারে, সে ভাবতে পারেনি।
রাশেদ মাত্র চাকরিতে ঢুকেছে তখন, মিথিলা পড়ছে ইডেনে। সারাদিন একটা ঘোরের মধ্যে কেটে যেত। অফিসের ফাইলে মিথিলার ছবি, দেয়ালে মিথিলার ছবি, বড় সাহেবের মাথার ওপর টাঙানো প্রধানমন্ত্রীর ছবির ওপরও লেপ্টে বসত মিথিলার ছবি।
রাশেদ জিজ্ঞেস করত মিথিলাকে, 'একটা আস্ত দিন আমাকে ছাড়া পার করে দাও কীভাবে, মিথি?'
'পার করতে পারি কই?' ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে মিথিলা বলত। রাশেদের উড়ূক্কু ভাব আর উদাসীনতায় বিরক্ত বস তাকে টাঙ্গাইল পাঠিয়ে দেয় কয়েক দিন আগে।
অনেক চেষ্টা করেও টাঙ্গাইল যাওয়া আটকাতে পারেনি রাশেদ। আকুর টাকুরপাড়ায় দুই কামরার এই ঘরটা ভাড়া নিতে হয়েছিল। বাড়িওয়ালার হাত-পা ধরাটা বাকি ছিল। বলেছিল, এক মাসের মধ্যে বউকে নিয়ে আসবে।
সেই এক মাস গিয়ে তিন মাসে ঠেকেছিল।
মিথিলার পরীক্ষা যেদিন শেষ হলো, তার মামার সামনে দাঁড়িয়ে, অনেক ঘাম, ভয় আর তোতলামি মেশানো একটা বিকেলে সে বলেছিল, মিথিলাকে সে তার জীবনে চায়।
মিথিলার বাবা থাকেন মানামাতে। মা-ও। মানামা কোথায় রাশেদ মোটামুটি জানে। কিন্তু মামা যখন বলেছেন, পরীক্ষার পর মিথিলার মানামা যাওয়ার কথা, বিয়ের প্রশ্নই তাই ওঠে না, রাশেদের মনে হয়েছে, মানামা বোধ হয় চাঁদ অথবা নেপচুনের দূরত্বের কোনো শহর, যেখানে গেলে মিথিলা আর ফিরে আসবে না।
ফলে যা করার তা-ই তাদের করতে হয়েছে।
২. দরজার দিকে যেতে যেতে মিথিলা নিজের সঙ্গে একটা খেলা খেলত। রাশেদকে আজ বিরাট এক অপরাধী বানাতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে তিন মাসের এই সংসারে প্রথম দিনটার মতো এখন সে আর তাকে সময় দিচ্ছে না। মিথিলাকে সে ভুলে যাচ্ছে। অফিসটাকে সে মিথিলার ওপরে জায়গা দিতে শুরু করেছে। টাঙ্গাইলের ভূগোল রাঙিয়ে রাখে যে মিথিলা, তার চোখের আলোটা যেন তার কাছে কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে। ইত্যাদি।
প্রতিদিন সে নতুন একটা অভিযোগ খাড়া করত। মিথিলা জানত, অভিযোগটা যত গুরুতর হবে, রাশেদের কাছে তা পেঁৗছাবে অনেক অভিমানের মোড়কে জড়িয়ে। এবং মোড়ক খুলতে খুলতে অভিযোগটা কী, তা বোঝার আগেই রাশেদ তাকে পেঁৗছে দেবে একটা বিন্দুতে। অপার্থিব একটা বিন্দুতে।
সারা ঘরজুড়ে সেই অবাক সন্ধ্যার জাফরি কাটা আকাশটা তখন বিছিয়ে থাকবে। মিথিলার মনে পড়ে, সেই সন্ধ্যায় রাশেদের গাল থেকে একটা অদ্ভুত সুগন্ধ এসে লাগছিল তার নাকে। নাকি তার নিঃশ্বাস থেকে? জিহ্বা থেকে? এমনি ঘোর লাগানো সেই সুগন্ধ, মিথিলা সুযোগ পেলেই তাতে ডুবে গেছে।
দরজা খুললে কোন রাশেদকে সে দেখবে, তারও একটা আন্দাজ সে করত, বিশেষ করে তার মামা যেদিন এসে জানিয়ে গেলেন, মিথিলার বাবা বিয়েটা মেনে নেননি তার পর থেকে। বাবা মেনে নেননি, তাতে কী, মিথিলা নিজেকে বুঝিয়েছে। কিন্তু রাশেদের চোখে একটা কষ্টের ছায়া যে জমেছে, কিছুটা দুর্ভাবনারও, সেটি টের পেয়ে তার অভিযোগের তালিকাটা সে লম্বা করেছে আর হেসেছে। যতই চোখে ছায়া জমুক রাশেদের, দরজা খুললে বেশিক্ষণ সেগুলো ধরে রাখতে পারত না সে। একটা বিন্দুতে এসে যখন দু'জনের সময়ের হিসাবটা মিলে যেত, তখন রাশেদের উদ্বিগ্নতা, তার ভয় অথবা কষ্ট তরল হয়ে মিলিয়ে যেত।
৩. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নিজেকে উদ্বিগ্নই লাগছিল রাশেদের। তার মনে পড়ল, মামাবাড়ি থেকে বেরিয়ে মিথিলা চোখে জাদু ঢেলে তাকে বলেছিল, 'চল, কোর্টে চল।'
জাদুই বটে। তাদের প্রথম দেখাটা ছিল একটা জাদু, দ্বিতীয় দেখাটাও এবং অবাক, এরপর প্রতিটি দেখাও। রাশেদ অবাক হয়েছে, বাবার সিদ্ধান্তের উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে, মামাকে একটা কথাও না বলে, মিথিলা যখন একটা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তখনও জাদুটা তার চোখ থেকে যায়নি।
কোর্ট থেকে বেরিয়ে রাশেদের হাতে একটা হাত রেখে সে আস্তে করে বলেছে, 'এখন টাঙ্গাইল চল। আমাদের সংসার অপেক্ষা করে আছে।'
মিথিলার মামা যেদিন টাঙ্গাইল আসেন, সংসারটায় সেদিন প্রথম কাঁপন ধরল। তিনি মিথিলাকে বলেছেন, কাজটা মোটেও ভালো হয়নি। এখন সে যদি বাবাকে ফোন করে মাফ-টাফ চেয়ে নেয়, তাহলে হয়তো বাবার সঙ্গে সম্পর্কটা থাকবে।
মিথিলা জানত, তার বাবা একটা পাত্র ঠিক করে রেখেছেন তার জন্য। পাত্র সেই মানামাতেই থাকে। ইঞ্জিনিয়ার। তিনি কথাও দিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বাবার অবাধ্য হওয়া আর তার সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টানাটা একই জিনিস, এটি সে বিশ্বাস করতে পারেনি।
সে শুধু আস্তে করে বলেছে, 'ফিরে যাওয়া সম্ভব নয় মামা। প্রশ্নই তো ওঠে না।'
মামা জানিয়ে দিলেন, কোর্টের বিয়ের কোনো মূল্য নেই। এখন ঢাকা ফিরে গেলে মানামা যাওয়ার ব্যবস্থা তিনি করে দেবেন। ইঞ্জিনিয়ার পাত্র তার পাগলামির কথা কিছুই জানে না। ফলে সমস্যা হবে না।
মিথিলা হেসেছে। আবার বলেছে, 'সম্ভব নয়।' মামা এরপর উঠেছেন।
৪. দরজার দিকে যেতে যেতে মিথিলা একটা খেলার কথা ভাবত। কেমন হয়, যদি রাশেদের মনে একটু ঈর্ষা জাগানো যায়? তাকে বলা যায়, ভাবছি, ঢাকায় যাব, তারপর মানামাতে। একটা হ্যান্ডসাম পাত্র বসে আছে আমার জন্য।
একদিন দরজা খুলতে গিয়ে এটি ভাবতে ভাবতে সে জোরে হেসে উঠেছে। রাশেদ অবাক চোখে তাকালে সে লজ্জা পেয়েছে। তাতে ঈর্ষা জাগানোর খেলার কথাটা তার মন থেকে হাওয়া হয়ে গেছে।
কিন্তু মিথিলার হাসিটা একদিন বন্ধ করে দিতে স্বয়ং তার বাবা এসেছেন। ইঞ্জিনিয়ার মানুষ। হিসাব বোঝেন। সাধ্য বোঝেন। তিনি বাড়িতে ঢুকেই নাক সিটকে বলেছেন, 'এই বস্তির ঘরে তুই উঠেছিস?'
মিথিলার রেগে যাওয়ার কথা ছিল। বাবাকে দুটো কথা শুনিয়ে দেওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে সে রাগ ভুলে গেল। কেঁদেই ফেলল বরং। অনেক দিন পর সে বাবাকে দেখল। বাবার বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে। চুল শুধু মাথার ছাদটাকে ঢেকে রেখেছে। গোঁফ সাদা হয়েছে। কপালে অনেকগুলো ভাঁজ জমেছে।
'তোমার শরীর কি ভালো নেই, বাবা?'
'কী করে থাকে বল, মা?' বাবা বললেন, সেই ছোটবেলা যেমন বলতেন, তার সঙ্গে রাজা আর রাজকন্যার খেলাটা যখন খেলতেন।
মিথিলার চোখে বাষ্প জমে যেন একটা মেঘলা দিন নিয়ে এলো। চোখের মেঘ সরিয়ে সে বাবাকে দেখল, বাবা দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছেন। 'আয় মা,' তিনি বলছেন, 'এই বস্তির ঘর ছেড়ে আয়।'
মিথিলার মনে পড়ল, ভাইয়াটার বয়স যখন নয়, এবং তার সাত, তখন নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পুকুরে সাঁতার কাটতে নেমে ভাইয়াটা আর উঠে এলো না, এমনি করে হাত বাড়িয়ে বাবা বলেছিলেন, 'আয় মা, এই নরকে আর এক মুহূর্তও না।'
এরপর বাবা আর নানাবাড়ি যাননি। মিথিলাও না। অনেকক্ষণ পর, ঢাকা থেকে ভাড়া করা মাইক্রোবাসে উঠে বসতে গিয়ে বাবা বললেন, 'হামীমটাকে হারালাম। তোকে হারাতে পারি না।'
৫. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ খুব অস্বস্তি হয় রাশেদের। এমন কী হলো যে একটা অনন্তকাল পার করে দিয়ে দরজাটা খুলতে হবে? হঠাৎ কেন দু'জনের হিসাব একটা বিন্দুতে এসে মিশে যাচ্ছে না? এই বাড়িটাতে যে নক্সা-কাটা আকাশ নামত প্রতি সন্ধ্যায়, সেটি হঠাৎ অনেক উঁচুতে উঠে কি হারিয়ে গেছে? মিথিলা কী আজ বলবে, যেমন সে একদিন কোনো কিছু না ভেবেই বলেছিল, 'একটা বড় বাসা দেখলে হয় না?'
'বড় বাসা? কার জন্য?' রাশেদ জিজ্ঞেস করেছিল, যেন সে অবাক হওয়ার সুযোগটাও পায়নি।
'কেন, আমাদের জন্য?'
'আমাদের জন্য?'
মিথিলা আর কথা বাড়ায়নি।
তার মনে পড়ে, মিথিলার বাবা মানামা ফিরে গেলে তার হাসিটাও যেন বিদায় নিয়েছিল। একদিন অনেকটা সময় নিয়ে সে হামীমের শেষ দিনটি নিয়ে কথা বলল। তাকে নিয়ে দু-এক কথার বেশি কোনো দিন কিছু বলেনি মিথিলা। অথচ আকুর টাকুরপাড়ার জাদুর ভূগোলে একটা কালো ছায়া বিছিয়ে মিথিলা তাকে বলতে থাকল, পুকুরে নামার আগে হামীম কী করেছিল, কী বলেছিল। ইত্যাদি।
আরেক দিন মিথিলা জানাল, তারপর থেকে বাবা তাকে কীভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন। 'বাবা আমার দিকে দুটি হাত বাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়েছিলেন। তার চোয়াল শক্ত, চোখে আগুন' ইত্যাদি।
তারপর গল্পটা সেইখানে ফেলে রেখে সে উঠে বিছানায় গেছে।
৬. দরজার দিকে যেতে যেতে একদিন মিথিলার মনে হয়েছিল, আজ তার অভিযোগের তালিকায় তিনটি নতুন বিষয় সে ঢুকিয়ে দেবে। আঙুলে এক দুই তিন হিসাব করতে গিয়ে সে দেখল, তার আঙ্গুল শক্ত হয়ে আছে, হাত শক্ত হয়ে গেছে, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। সে অবাক হলো, অথবা হলো না, কারণ তার অভিযোগগুলো স্পষ্ট। রাশেদ কেন তার একটা কথাও রাখছে না, এই বাড়িটা ছেড়ে একটা ভদ্র, বড় বাড়ি কেন নিচ্ছে না? কেন সে ঢাকায় একটা বড় চাকরি খুঁজছে না, এবং কিছু দিনের জন্য সে যে মানামায় বাবা-মার সঙ্গে থেকে আসতে চাইছে_ সেজন্য কিছু টাকার জোগাড় কেন রাশেদ করছে না?
অভিযোগগুলোর ভেতর দিয়ে আরেকবার যেতে গিয়ে সে দেখল, রাশেদ যদি এসব শুনে চুপ করে না থাকত, যদি তার চোখে গম্ভীর কিছু কষ্টের ছায়া জমে তাকে হতবাক করে না দিত এবং সে একটুখানি হেসে শুধু বলত, আমি চেষ্টা করছি, মিথি, খুবই চেষ্টা করছি, তাহলে এই অভিযোগের খেলাটা একটা বিন্দুতে গিয়ে মিশে যেত, তরল হয়ে যেত।
৭. দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রাশেদের মনে হলো, একটা দুই কামরার ভাড়া বাড়িতে তার এক জীবনের সব বিনিয়োগ ঢেলে দেওয়ার কোনো মানে হয়নি। সে নিজেকে প্রশ্ন করল, একবারও কেন সে মিথিলাকে বলেনি, চল, একটা বাড়ি তুমি আমি মিলেই বরং দেখি? কেন সে চুপ থেকে বরং এ রকমটি বুঝিয়েছে মিথিলাকে, এই বাড়িটা তার অনন্ত বাসর ঘর, তার সারা জীবনের ঠিকানা, যেখানে একটা পা রাখলেই সে অবাক করা সন্ধ্যার নক্সা-কাটা আলো-অন্ধকারে ঢুকে যাবে, আর তার চোখে জমবে একটার পর একটা স্বপ্ন?
৮. দরজাটা শেষ পর্যন্ত খুলল। একটা মুহূর্ত, রাশেদ নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, 'আমার নাম রাশেদ আহমেদ' ইত্যাদি। 'দুই বছর আগে এই বাড়িটাতে আমি ছিলাম, বাড়িটা আমার জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।' ইত্যাদি।
যার সঙ্গে রাশেদ কথা বলছিল, মিথিলার থেকে তার বয়স বছর পাঁচেকের বেশি হবে না। শুক্রবার সকালের কাজ তার সারা হাতে, চেহারায়, শাড়িতে। খুব বিরক্ত হওয়ার কথা, কিন্তু মুখে একটা হাসি মাখিয়ে তিনি বললেন, 'ঠিক আছে, ভেতরে আসুন।'
তারপর তিনি বললেন, তার নাম লায়লা।
ভেতরে একটা পা রাখতেই রাশেদের মনে হলো, মাত্র একবারের মতো, একটুক্ষণের জন্য কেউ তাকে সুযোগ করে দিয়েছে, তার সেই অবাক-সন্ধ্যার জীবনটা একবার ছুঁয়ে দেখার জন্য। মাত্র একবার, তারপরই তার হাতটা গুটিয়ে নিতে হবে। এক ফালি একটা বারান্দা, একদিকে বসার ঘর, অন্যদিকে রান্নাঘর। বসার ঘরটা পার হয়ে শোবার ঘর। ব্যস। রান্নাঘরের পাশে আধখানা একটা ঘর অবশ্য আছে, যাতে রাশেদ তার পড়ার টেবিলটা রেখেছিল। বইয়ের একটা শেলফও ছিল। চোখ বুজে সে বাড়িটাকে অনুভব করল। চোখ বুজে, যেহেতু চোখ খুললেই তাকে আঘাত পেতে হবে, যেহেতু খোলসটা ছাড়া সব পাল্টে গেছে বাড়িটার। সবই অচেনা। একবার তার ইচ্ছা হলো দৌড়ে শোবার ঘরটা দেখে আসবে। কিন্তু ভাবল, দরজা-দেয়াল ছাড়া সবই তো অচেনা দেখতে হবে; তার ভয় হলো, মধুমাখা দুপুর-বিকেল-রাতগুলো তাহলে হারিয়ে যাবে, এমনকি স্মৃতি থেকেও। সে চুপ করে বসার ঘরের একটা বেতের সোফায় বসে থাকল। এবং নিজের অজান্তে লায়লাকে বলেই ফেলল, যে কথাগুলো এখনও কাউকে বলতে পারেনি সে।
লায়লা তাকে বললেন, 'একটু চা দেই?'
'জি না,' অস্থির হয়ে বলল রাশেদ। 'আমি এখন যাব।'
'যাবেন?' তিনি বললেন, তারপর নিজেই যেন উত্তর দিলেন, 'যাওয়াই ভালো, শুধু কষ্ট বাড়বে।'
রাশেদ ভেজা চোখে তাকাল।
'এই আকুর টাকুরপাড়ায় আমরাও প্রথম সংসার পেতেছিলাম,' একটুখানি দীর্ঘশ্বাস যেন তিনি ফেললেন। 'পাঁচটা বছর কেটেছে সেই বাড়িটাতে। পাঁচটা বছর। যেন স্বপ্ন দিয়ে বোনা। সেই স্বপ্নের মাঝখান থেকে অমিত এলো ... '
লায়লার আশপাশে ঘুর ঘুর করতে থাকা বছর চারেকের ছেলেটির নাম তাহলে অমিত।
'অমিত আসার পর আস্তে আস্তে সব যেন বদলে গেল। মনে হলো ওর বাবা যেন একটু একটু করে অন্য একটা মানুষ হয়ে গেলেন। চিরদিনের চেনা, কিন্তু কেমন করে যেন অচেনাও। বাসাটার পাশ দিয়ে যাওয়া-আসা করেছি, একবার ফিরেও তাকায়নি। কিন্তু এক রাতে হঠাৎ আমাকে হাত ধরে টেনে সে বলল, চল বাড়িটা একবার দেখে আসি।
সেদিন মনে হলো সবকিছুই আসলে ভেতরের ব্যাপার। কী বলেন?'
রাশেদ একটুখানি অপ্রস্তুত হলো। 'উনি কোথায়?' সে জিজ্ঞেস করল।
'চুল কাটতে গেছে। এক্ষুনি ফিরবে,' তিনি বললেন, তারপর গলায় আর্দ্রতা মাখিয়ে বললেন, 'চলেই গেলেন শেষ পর্যন্ত?'
রাশেদ মাথা নাড়ল। 'মানামা না কোথায় যেন বললেন, একেবারে সেইখানে?'
'হ্যাঁ' রাশেদ বলল, তারপর দরজার দিকে পা বাড়াল। পা বাড়াতে বাড়াতে সে শুনল, দরজায় কেউ কড়া নাড়ছে। কড়া নাড়ার শব্দে লায়লার চোখে নিত্যদিন আবার ফিরে এলো। 'ও এসেছে,' আস্তে করে তিনি বললেন।
৯. দরজার ভেতরে পা রেখেই চমকে গেলেন গৃহকর্তা। চোখে প্রথমে ভয় জমেছিল, পরে কৌতূহল, তারপর বিরক্তি। কী চাই? তিনি জানতে চাইলেন।
'বাড়িটা দেখতে এসেছিলেন,' লায়লা বললেন।
'বাড়ি তো আমি ছাড়ছি না যে ভাড়া হবে,' তার চোখের দৃষ্টিতে এবার সন্দেহ।
'এই বাড়িতে থাকতেন এক সময়, সেজন্য দেখতে এসেছেন।'
'আচ্ছা? তাহলে আমাকে এখন জাদুঘরের লোকজনের মতো ঘুরে ঘুরে বাড়ি দেখাতে হবে?'
'আহ্, এ রকম করে বলতে হয় না,' লায়লার ক্ষতি-মেরামতির চেষ্টা।
'তা ছাড়া আর কী,' ভদ্রলোকের মেরামতির কোনো চেষ্টা নেই। 'গত শনিবার বাড়ি দেখার আবদার নিয়ে হাজির এক মহিলা। আজ ইনি।'
'আচ্ছা?' অবাক হয়ে লায়লা জিজ্ঞেস করলেন।
'তুমি অমিতকে নিয়ে ছোট আপুর বাসায় গিয়েছিলে। তুমি ছিলে না বলে আমি ঢুকতে দেইনি।' ভদ্রলোক বললেন। তারপর যেন কিছুটা দয়া দেখা দিল তার ভেতর। তিনি রাশেদকে বললেন, 'দেখতে চাইলে আসুন।'
রাশেদের ভেতরে একটা তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। 'যে মহিলা এসেছিলেন, দয়া করে তিনি কী রকম দেখতে একটু বলবেন?'
ভদ্রলোক এবার বিরক্ত হলেন। 'একজন মহিলার চেহারা কী করে মনে করে বসে থাকি, বলেন? তবে তিনি ঢাকা থেকে এসেছিলেন। একটা মাইক্রোবাস ভাড়া করে। হাঃ।'
কেন জানি রাশেদের চোখ পড়ল লায়লার চোখে। সেখানে কি একটুখানি হাসি দেখল রাশেদ, নাকি আকুর টাকুরপাড়ার ভূগোলটা আবার মায়াময় হয়ে ছায়া ফেলল তার চোখে?
দুটি সিঁড়ি টপকে রাস্তায় নামতে নামতে সে দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ শুনল। মায়াময় সেই শব্দে যেন দরজাটা কিছু একটা বলতে চেয়েছে রাশেদকে।
বয়সকাল by শাহাবুদ্দীন নাগরী
সকাল
থেকে ভার্সিটির অবস্থা ভালো না। বেশ কয়েক জায়গায় ককটেল ফুটেছে। ছাত্ররা
মিছিল নিয়ে বেরিয়েছিল, অপর পক্ষ তাদের ওপর হামলা করছে। গুলি-টুলিও হয়েছে
বোধহয়। টেলিভিশনের স্ক্রলে গণ্ডগোলের খবর দেখাচ্ছে। মনে মনে ঠিক করে নিলাম,
আজ আর ভার্সিটি যাবো না। এমনিও ক্লাস হবে না। এমন পরিস্থিতিতে ছেলেমেয়েরা
ক্লাসে আসে না। শীতকালে ক্যাম্পাসের আবহাওয়া হঠাৎ করে এমন গরম হয়ে যাবে
ভাবতে পারিনি। মেয়েটাকে ফোন করা দরকার।
কিন্তু মেয়েটাই ফোন করলো। ওর নাম রিজওয়ানা চৌধুরী।
'আজ নিশ্চয়ই ডিপার্টমেন্টে যাবেন না?'
'তুমি কী করে বুঝলে?'
'টেলিভিশনে নিউজ দেখে।'
'ঠিকই ধরেছো। আজ বাদ দাও। তোমাকে যে অংশটা রি-টাইপ করতে বলেছি, ওটা বরং আজ লেখো। কাল পরিস্থিতি দেখে আসতে বলবো তোমাকে।'
রিজওয়ানা সালাম দিয়ে ফোনটা রেখে দিল।
রিজওয়ানা আমার তত্ত্বাবধানে মাস্টার্স ক্লাসের থিসিস করছে একটা। দুবাইয়ের একটা কলেজে গ্র্যাজুয়েশন করে বাংলাদেশে চলে এসেছে ও। ওর স্কুলিংটা লন্ডনে হয়েছে। মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই। রেজাল্ট ভালো। চমৎকার ইংরেজি বলে এবং লেখেও। ওর থিসিসের বিষয়টা ওরই ঠিক করা- 'The Partition of Bengal in 1947 : The Demographic Impact and Paradox of Bengali People..' বিষয়টা আমার পছন্দ হয়েছিল। ওর সঙ্গে আলাপ করেছিলাম বিষয়টা নিয়ে, কেন সে বিষয়টা বেছে নিল তা জানবার জন্য। ও এক পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা সারসংক্ষেপ দিয়েছিল আমাকে। ভালো লেগেছিল আমার। ও নতুন কিছু বলতে চায়। এ বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, তার পরও আমি ওর নতুন চিন্তা-ভাবনার জন্য বিষয়টা পছন্দ করি। ডিপার্টমেন্টের একাডেমিক কমিটি ওটা পাস করে দেয়।
রিজওয়ানাকে আমি ইন্টারনেট থেকে সব রিলেটেড লিটারেচার সংগ্রহ করতে বলেছিলাম। ওটা শেষ হলে ভার্সিটির লাইব্রেরি ঘেঁটে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ নিয়ে যা বই আছে তা পড়ে একটা সিনোপসিস তৈরি করতেও বলি। মেয়েটা ঠিক ঠিক সব করে। সব কথা শোনে। কিন্তু ওর দোষ বা গুণ যা-ই বলি না কেন, বড় চঞ্চল ও। আমি যখন ওর লেখা দেখি বা বই খুলে কিছু খুঁজি ও ভীষণ উসখুস করে। চবি্বশ-পঁচিশ বছর বয়সের একটা মেয়ে চঞ্চল হতেই পারে। কিন্তু গবেষণা এমন একটা বিষয়, যা খুব স্থিরভাবে স্থির চিন্তায় করতে হয়। রিজওয়ানার ওটা নেই।
কিন্তু কোনো বিষয়ে ও একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই হয়, মূল বিষয়টা ও ধরে নেয়, দ্বিতীয়বার সে ওটা আর পড়ে না। আমি তার এই বিষয়টা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি। কিন্তু দশ দিন আগে পড়া কোনো বিষয় নিয়ে যখন আলোচনা করি তখন ও ঠিক ঠিক রেফারেন্স ধরে সব বলে দিতে পারে। ফলে, ওর কাজের সততার নিচে ওর চঞ্চলতা চাপা পড়ে যায়। রিজওয়ানা অসম্ভব মেধাবী এটা আমি মেনে নিয়েছি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ও আমার রুমে চলে আসে। থিসিসের পার্টগুলো দেখায়। কখনও আমি সঙ্গে সঙ্গে দেখে দিই, কখনও রেখে দিই পরে দেখে দেবো বলে।
রিজওয়ানা একদিন বলেছিল,
'স্যার, ডিপার্টমেন্টে আপনি ব্যস্ত থাকেন। সময় পান না। আমিও ক্লাসে থাকি। বিকেলের পর বাসায় গেলে কি অসুবিধে আছে?'
বিদেশি কালচারে বড় হয়ে ওঠা একটা মেয়ে এমন কথা বলতেই পারে।
তবুও আমি বলি,
'না মানে, বাসায় যাবে কেন?'
'না স্যার, অন্য কিছু না। জাস্ট থিসিসটার কাজ নিয়ে যেতে চাচ্ছি।'
'ও আচ্ছা।' বলে আমি অনুমতি দিয়েছিলাম। রিজওয়ানার উদার ও খোলামেলা চরিত্রটিকে আমি নষ্ট করতে চাইনি। আসলে আমার বাসায় একটা কাজের ছেলে ছাড়া কেউ থাকে না। ইউনিভার্সিটির কোয়ার্টার। আমি সাধারণত ছাত্রীদের আমার বাসায় আসতে উৎসাহিত করি না। ছাত্ররা আসে। পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা ছাড়াও সিনিয়র স্টুডেন্টরা আড্ডাবাজিও করে। ওরাই আমার বন্ধু-সন্তান-ভাই, আমার বাসাটা আমার নয়, মাঝে মাঝে ওরাই দখল করে ফেলে। আমি যে আমার বাসায় ছাত্রীদের অ্যালাউ করি না, এই ছেলেগুলো জানে। কিন্তু রিজওয়ানার বিষয়টায় ওরা কেউ কিছু জানতে চায়নি আমার কাছে।
রিজওয়ানা কি আমাকে পছন্দ করে?
মেয়েটাকে আমারও পছন্দ প্রথম থেকেই। যেদিন প্রথম ও ডিপার্টমেন্টে আমার রুমে 'মে আই কাম ইন স্যার?' বলে ঢুকে পড়েছিল, সেদিন ভীষণ ভালো লেগে গিয়েছিল আমার। ঝকঝকে চেহারা, নাক-মুখ কাটা-কাটা, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চুলগুলোকে পনি-টেল করে ছেড়ে দেওয়া পিঠের ওপর। ভালো লেগে যাবার মতো মুখটা।
আমার ভেতরে কি তখন অন্য কিছু খেলা করছিল? অন্য কোনো চিন্তা অথবা আকাঙ্ক্ষা? অথবা সব পুরুষেরই যা হয়, তেমন কিছু? পুরুষ সবসময়ই পুরুষ, সত্তরেও সে থাকে ত্রিশের যুবকের মতো। যদিও বিয়ে-থা করিনি বলে আমার ভেতর এক ধরনের নীরবতা আছে। আমার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা সেই উদ্দাম পুরুষটাকে আমি সামলে রাখি সবসময়। কিন্তু রক্ত-মাংসের মানুষ তো, জ্বলন্ত চুলোর ওপর কড়াইয়ের দুধের মতো মাঝে মাঝে বলক দেয়। তখন চুলোর আগুনটা কমিয়ে দেই।
তার পরও সহকর্মীদের চোখ এড়ায়নি বোধ হয়। দুপুরে চায়ের আড্ডায় প্রফেসর আজম তো একদিন বলেই বসেন,
'কী ব্যাপার চিরকুমার? কী সব শুনছি?'
'কী শুনছেন?'
আমার তো চমকে ওঠারই কথা।
পাশ থেকে আরেক সহকর্মী ফিসফিস করে বলেন,
'মনে রাখবেন, বয়স কিন্তু পঞ্চাশ পেরিয়েছে।'
'পঞ্চাশ তো আপনারও।'
ওদের প্রশ্নের উদ্দেশ্য পরিষ্কার আমার কাছে।
'না মানে, আমরা তো ত্রিশেই মরেছি, আপনি কি পঞ্চাশে এসে মরতে চান?'
এ ধরনের উস্কানিমূলক কথা গ্রাহ্য করতে নেই। আমি বলি,
'ছাত্রী তো।'
'ছাত্রী তো মেয়ে। নাকি মেয়ে নয়?'
ওদের যুক্তির কাছে কথা বলা মুশকিল।
রিজওয়ানা মাঝে মাঝেই আমার বাসায় আসে এখন। ড্রয়িংরুমে বসে। কাগজপত্র বের করে, নোট দেখায়। আমরা ঘণ্টা ধরে কাজ করি একেক দিন। চা-বিস্কুট খায়। কিন্তু কখনও ভেতর ঘরে যায় না, যদিও মাঝে মাঝে দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে দেখতে চেষ্টা করে।
প্রথম যেদিন রিজওয়ানা এসেছিল আমার বাসায়, হাত থেকে থিসিসের কাগজপত্র নামিয়ে রাখতে রাখতে বলেছিল,
'স্যার, আপনার বাসাটা বেশ নিরিবিলি মনে হচ্ছে। পড়াশোনা করার চমৎকার জায়গা।'
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর একটা প্রবন্ধ লিখছিলাম আমি দৈনিক পত্রিকার জন্য।
আমি চোখ তুলে বলেছিলাম,
'তোমার পড়াশোনার জন্য আমার বাসা ফ্রি। পুরো বাসাটাই তোমার।'
কিন্তু তবুও ড্রয়িংরুম ছাড়া অন্য ঘরে যায়নি ও।
একদিন কী একটা জটিল বিষয় নিয়ে আমরা আলাপ করছিলাম, হঠাৎ আচমকা, বলা নেই কওয়া নেই, আমাকে প্রশ্ন করে বসেছিল,
'স্যার, আপনি বিয়ে করেননি কেন?'
আমি ঠিক ওই সময়ে বিয়ে নিয়ে চিন্তা করছিলাম না। ফলে, কী জবাব দিয়েছিলাম এখন আর মনে নেই। তবে হয়তো বলেছিলাম, 'বিয়ে করব না কে বলেছে?'
আমার এই কথায় কি-না জানি না, দিন পনেরো আগে আমার লেখা নোটটা পড়তে পড়তে হঠাৎ ও সোফা থেকে উঠে ভেতর ঘরের দিকে চলে গিয়েছিল।
ও ঘুরে ঘুরে দেখেছিল আমার বাসা। বইপত্র, ম্যাগাজিন, ফাইল, আরও কি সব খুলে খুলে চোখ বুলাচ্ছিল। একসময় ড্রয়ার খুলে অ্যালবাম বের করে বলেছিল,
'স্যার, ছবিগুলো দেখি?'
আমি না করতে পারিনি। যদিও ওই অ্যালবামে একটি মাত্র ছবি ছিল যেটি রিজওয়ানার করা একদিনের প্রশ্নের জবাব হয়ে যেতে পারে।
অ্যালবাম খুলে ছাত্রীটি আমার বোকাই হয়ে গিয়েছিল বোধ হয়।
'স্যার, এই এতো বড় অ্যালবামে একটি মাত্র ছবি রেখেছেন?'
'হ্যাঁ, ওটাই আমার ছবি। আর কোনো ছবি রাখার প্রয়োজন মনে করি না।'
সাদা-কালো একটা ছবি, আমার আর নীতুর। আমার বয়স তখন চবি্বশ, নীতুর বোধ হয় বাইশ।
'স্যার, মেয়েটি কে?'
'ওটা রেখে দাও রিজওয়ানা।'
আমি একটু গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলাম।
'আপনার পরিচিত?'
তারপর আরেকটা প্রশ্ন,
'আপনি ভালোবাসতেন?
তারপর একসঙ্গে অনেকগুলো,
'আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে? দোষটা কি ওই ছবির মহিলার? বিট্রে করেছে আপনাকে?'
আমি লক্ষ্য করেছিলাম রিজওয়ানা বার বার ছবিটার দিকে তাকাচ্ছিল। কিছু কী খুঁজছিল ছবিটার মধ্যে? আমি আবার ওটা রেখে দেওয়ার জন্য ধমকের মতো দিতেই ওটা ড্রয়ারে রেখে আমার সামনে এসে বসেছিল। ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছিল ওকে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
'কী খাবে? চা চলবে?'
ও কিছুই বলেনি, এমনকি মাথাও নাড়ায়নি। আমি কাজের ছেলেটাকে চা-বিস্কুট দিতে বলেছিলাম। আমি তখন ভাবছিলাম, মেয়েরা সত্যিই বড় অভিমানী হয়, নাকি পরশ্রীকাতর হয়? রিজওয়ানা কি আমাকে নিয়ে তেমন কিছু ভেবেছে, যেটা আমার সহকর্মীরা ইঙ্গিত করেছিলেন? এমন তরুণী একটা মেয়ে আমার মতো বয়সী মানুষকে নিয়ে ভাববে কেন? আমি যথাসময়ে বিয়ে করলে রিজওয়ানার মতো একটা মেয়ে থাকতে পারত আমার। তাছাড়া, রিজওয়ানার চরিত্রের সঙ্গে আমার চরিত্র মেলে না। ও চঞ্চল, প্রজাপতির মতো মেয়ে, আমি ঠিক তার বিপরীত, অন্তর্মুখী। সেই আমার সঙ্গে অন্য একটা মেয়ের ছবি দেখে রিজওয়ানা কি ক্ষুব্ধ হয়েছিল আমার ওপর?
রিজওয়ানা কয়েকদিন আর যোগাযোগ করেনি আমার সঙ্গে। ক্লাসেও আসেনি। প্রায় সপ্তাহ পার করে দিয়ে ও এলো। বেশ মলিন মনে হলো ওকে। বোঝাই যাচ্ছিল ঝড়-ঝাপটা পার করে সুস্থির হয়ে আবার পুরনো রূপে ফিরে এসেছে। ব্যাগ খুলে একটা টিফিন বক্স বের করে সেটা খুলে আমার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,
'আপনি খান।'
তখন সবেমাত্র একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম আমি। একটু ইতস্তত করাতে ও বলেছিল,
'সিগারেটটা ফেলে দিয়ে লুচি আর সুজি খান। আমার নিজ হাতে বানানো।'
'তুমি এসব আনতে গেলে কেন?'
'কেন, আমি কি আপনাকে খাওয়াতে পারি না? কেউ আপনাকে খাওয়াবার অঙ্গীকার করেছিল, খাওয়ায়নি, অথবা বলতে পারেন খাওয়াতে পারেনি। তাই বলে আমি পারব না তা আপনার মনে হলো কীভাবে?'
রিজওয়ানা এসব কী বলছে? ও কি নীতুর বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিয়েছে? আমি তো নীতুর সম্পর্কে কিছুই বলিনি ওকে। এমনকি নামটাও না। তবু আমার সঙ্গে নীতুর ছবি দেখে এমন ক্ষুব্ধ হলো কেন ও?
আমি ঘটনাটাকে আর দীর্ঘ করতে চাইনি। সিগারেটটা এসট্রেতে গুঁজে নির্বোধ বালকের মতো লুচি আর সুজি খেয়েছিলাম সরাসরি ওর টিফিন বক্স থেকে।
লুচি আর সুজি আমার খুব প্রিয় খাবার। রিজওয়ানার সেটা জানবার কথা নয়।
এরপর থেকে রিজওয়ানা কেমন যেন পাল্টে যেতে শুরু করেছিল। দেখা করবার আগে টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিয়ে আমার অফিস রুমে দেখা করতে আসত। আমি যখন ওর থিসিসের বিভিন্ন অংশ কাটাকুটি করতাম, ও কাগজপত্রের দিকে নয়, তাকিয়ে থাকত আমার মুখের দিকে। আমি দু'একবার হঠাৎ মুখ উঁচু করে ওর দিকে তাকালে দেখতাম, ও ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন একটা মায়াবী মুখ ওর, একটা ঘোরলাগা ভালোবাসা লেপ্টে থাকত ওর চোখের ভেতর। আমি অস্বস্তিতে পড়ে যেতে শুরু করি।
একদিন রিজওয়ানা খুব ইমোশনাল ছিল বোধ হয়। বলছিল,
'আপনি তো জানেন আমার বাবা বেঁচে নেই। আমার আর কোনো ভাইবোনও নেই। মা'ই আমার সব। আমার সব কথা মাকেই বলি। ভালোমন্দ সবকিছু শেয়ার করি তার সঙ্গে। বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, লন্ডনে একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। আমার জন্ম ওখানেই। স্কুল লেভেলের লেখাপড়াটা লন্ডনে করি। তারপর কোম্পানি বাবাকে দুবাইতে একটা প্রজেক্টে পাঠায়। কন্সট্রাকশনের কাজ। আমরা সবাই দুবাই চলে যাই। ব্যস, ওখানেই প্রজেক্টের একটা অ্যাক্সিডেন্টে বাবা মারা যান। আমার গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করি ওই অবস্থাতেই।' আমি কথার মাঝখানে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
'দুবাই থেকে তো লন্ডনে চলে যেতে পারতে। বাংলাদেশে এলে কেন?'
রিজওয়ানা মাথাটা নিচু করে নিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলেছিল,
'হয়তো আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে বলে।'
বুকের ভেতরটা আমার দুলে উঠেছিল হঠাৎ করে।
অবিবাহিত পুরুষের সামনে এ ধরনের কথা ইঙ্গিতপূর্ণ। আমার ভেতর রিজওয়ানা কী পেল যে, অমন করে বলতে পারল? ভালোবাসা জিনিসটা কেমন, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থ-উচ্চতায় কতটুকু হয়, কতটুকু আকার তার, বুকের কোথায় তার স্থায়ী আবাস, এসব বুঝে ওঠার আগেই আমি হারিয়ে ফেলেছি ভালোবাসার মোহ। নীতু যাবার সময় সবটুকু খাবলে-খুবলে তুলে নিয়ে চলে গেছে শিকড়সহ। রিজওয়ানা কি আবার কিছু পুঁতে দিল এই অবেলায়?
সেদিন বিকেলে আমি ক্যাম্পাস থেকে বাসায় না ফিরে চলে গিয়েছিলাম বসুন্ধরা শপিং মলে। আমি একবারই মাত্র গিয়েছিলাম মলটি চালু হওয়ার পর। তাও কেনাকাটা করতে নয়। সিনেপ্লেক্সে একটা ছবি দেখার জন্য আমার ছাত্রবন্ধুদের সঙ্গে। ওরাই জোর করে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।
এবার আমি একলাই যাই।
নানা দোকান ঘুরে ঘুরে আমি একটা গর্জিয়াস শাড়ি কিনি। আমি আসলে শাড়ি-টাড়ি কখনও কিনিনি। মা বেঁচে থাকতে বাড়িতে মায়ের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিতাম, মা কিনে নিতেন। নীতুর সঙ্গে সম্পর্কটা শাড়ি দেবার পর্যায়ে গেলেও তখন তা কিনে দেওয়া যায়নি আর্থিক কারণে। যখন কিনে দেওয়ার মতো অর্থকড়ি জমেছে তখন নীতু অনেক দূরে চলে গেছে।
মনে পড়ে, নীতু একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল,
'এবার পহেলা বৈশাখে তুমি আমাকে একটা শাড়ি কিনে দেবে। আমি ওটা পরে সারা শহর ঘুরে বেড়াব।'
খালি মানিব্যাগ উল্টে দেখিয়ে বলেছিলাম,
'এই মানিব্যাগে ভবিষ্যতে যত টাকা জমবে সব টাকা থাকবে শুধু তোমার শাড়ি কেনার জন্য।'
নীতু কি কষ্ট পেয়েছিল ওকে শাড়ি কিনে দিতে পারিনি বলে? হতে পারে। মেয়েরা কখন কিসে কখন কষ্ট পায় বোঝা মুশকিল।
শাড়িটা আমি রিজওয়ানার জন্য কিনেছিলাম। গিফট দেব শুনে সেলসম্যান চমৎকার র্যাপিং করে দিয়েছিল। টিএসসির মোড়ে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করেছিলাম। চমৎকার একটা আকাশ, আকাশভরা তারা, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমি পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম বাসার দিকে। কলাভবনের সামনের সড়কের ফুটপাথে আমি আনমনে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। কিছু কি দেখেছিলাম আমি? নাকি ভাবছিলাম জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে আমি কীভাবে জড়িয়ে যাচ্ছি ভালোবাসার মায়াজালে? ভালোবাসা কি তেমনই কিছু যে পৃথিবীর তাবত কিছুকে অগ্রাহ্য করে জায়গা করে নেয় সবার ওপরে?
রিজওয়ানাকে আমি ছোট্ট একটা মেসেজ দিয়েছিলাম পরদিন বাসায় আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্য।
ও ফিরতি মেসেজে জানিয়েছিল রিসার্চের লিটারেচার রিভিউ অংশটা প্রায় শেষ করে এনেছে। ওটা শেষ হলেই সে বাসায় সেগুলো নিয়ে আসবে আমাকে দেখাবার জন্য।
আমি শাড়িটা আলমারিতে উঠিয়ে রেখেছিলাম। রিজওয়ানা শাড়িটা পেয়ে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। চঞ্চল মেয়েরা অল্পতেই খুশি হয় বলে কোথায় জানি পড়েছিলাম।
আজ আসার কথা ছিল রিজওয়ানার। কিন্তু ভার্সিটিতে গণ্ডগোল সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল।
কাল যদি রিজওয়ানা আসে!
দিনটা ভালো গেল না। ছাত্রদের কয়েকজন এলো সন্ধ্যেবেলায়। ওরা আসায় কিছুটা স্বস্তি পেলাম বোধহয়। চানাচুর, মুড়িভাজা, পাকুড়া আর গরম চায়ে আড্ডাটা জমে উঠল। আড্ডাটা জমলো প্রধানত রাজনীতি নিয়ে। গণতন্ত্র, অবরোধ, হরতাল ইত্যাদি প্রসঙ্গই ঘুরে-ফিরে চলে এলো। রাজনীতিবিজ্ঞানের ছাত্রদের আড্ডাবাজি মানেই লেখাপড়া। বই খুলে পড়ার দরকার হয় না, চোখে যা দেখছো তা-ই তোমার বিষয়। যেন প্রশ্ন তৈরি, ব্যাখ্যা করো_ হোয়াট ইজ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হোয়াট ইজ অটোক্রেসি।
কিন্তু দেশ বিভাগ নিয়ে রিজওয়ানা যে গবেষণা শুরু করেছে তা যেন কোনোদিন শেষ না হয়। চলতেই থাক। একটা ঘোরের ভেতর কথাগুলো আমার মনে হয়। ডিপার্টমেন্টে দেখা করতে এলো ও। আমি বললাম, 'বাসায় চলো।'
'কেন?'
কেন বলল বটে, কিন্তু ওই কেন'র ভেতর লুকিয়েছিল ফুলের সৌরভ, যেন শব্দটা ধারণ করেছিল পৃথিবীর সব মায়া-মমতা আর ভালোবাসা।
কলাভবন থেকে বেরিয়ে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।
'গাড়ি নেবো না?'
'প্রয়োজন নেই। চলো হাঁটি। ভালোই লাগছে হাঁটতে।' আমি বলি।
বাসায় পেঁৗছে দেখি কাজের ছেলেটা মাগুর মাছের ঝোল আর ডিম ভাজি করেছে।
আমি রিজওয়ানাকে বললাম,
'এ তরকারি দিয়ে লাঞ্চ করতে আপত্তি নেই তো?'
ও কোনো জবাব দিল না। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পড়লো। আমি টেবিলে দুটো প্লেট লাগাতে বলে ওয়াশরুমে যাই। পানির ঝাঁপটা দিই চোখেমুখে। আয়নায় চোখ যায় আমার। কানের ওপরে সাদা চুলগুলোতে আঙুল যায়। চোখের নিচে গভীর কালি না থাকলেও কপালের ভাঁজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি এভাবে কেন দেখছি ভেবে নিজেরই হাসি পায়। পঞ্চাশ বছর বয়স পেরুনো মানুষ আমি, চাইলেই ত্রিশে নামতে পারব না। সময় সব মানুষকে ক্রমেই ঠেলে নিয়ে যায় না ফেরার সীমানায়।
শাড়িটা রিজওয়ানা নিল কোনো প্রতিবাদ না করেই। শুধু জিজ্ঞেস করল,
'শাড়িটা আপনি আমার জন্যই কিনেছেন?'
'হ্যাঁ, বলতে পারো শুধু তোমার জন্যই।'
কথাটা বলতে পেরে আমার বুকটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেল। শাড়িটা কেনার পর থেকে মুহূর্তগুলো জগদ্দল পাথরের মতো বুকের ভেতর একটু একটু করে ভারী হয়েছে, রিজওয়ানা যদি রি-অ্যাক্ট করে এই আশঙ্কায়। কিন্তু ও স্বাভাবিকভাবে নেওয়ায় হঠাৎ আমার ভেতর কী যে হলো, আমি দু'হাতে রিজওয়ানার কাঁধটা শক্ত করে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু দিতে চাইলাম। মেয়েটা এবারও রি-অ্যাক্ট করল না। শুধু কপালটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
'ঠোঁটে নয়, কপালে দিন।'
একটু থমকে গেলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে ওর কপালে আলতো করে আমার ঠোঁটের স্পর্শ বসিয়ে দিলাম। রিজওয়ানা কি কেঁপে উঠল ভেতরে ভেতরে? হয়তো কাঁপল না। কিন্তু আমি কাঁপতে থাকলাম, আনন্দে নাকি আশঙ্কায় বুঝতে পারলাম না। পুরো ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে, আমি নিজেকে সামাল দিতে পারলাম না। ভালো-মন্দ, সঠিক-বেঠিক কোনো চিন্তা করার আগেই সব সিদ্ধান্ত যেন গৃহীত হয়ে গেল এক চুম্বনে। আমি অপরাধীর মতো সোফায় গিয়ে বসলাম। রিজওয়ানার দিকে চোখ তুলে তাকাতে সংকোচ হতে লাগল, ভীষণ অপরাধী মনে হলো নিজেকে। শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রীর সম্পর্ক পিতা-কন্যার মতো, ছিঃ আমি এ কী করলাম?
শাড়িটা ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে থিসিসের টাইপ করা কাগজপত্রগুলো আমার সামনের সেন্টার টেবিলে গুছিয়ে রেখে রিজওয়ানা ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল দরজা ঠেলে।
আমি কতক্ষণ ওইভাবে বসেছিলাম মনে নেই।
হয়তো কিছুক্ষণ, অথবা অনেকটা সময়।
জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে চোখ গেল বাইরে, অন্ধকার নামছে। ক্যাম্পাসের ছোট-বড় বৃক্ষরাজিতে অনেক পাখির বাস, ওদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে এলো কানে।
হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটা মেসেজ আসার শব্দ হলো। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলাম।
রিজওয়ানার মেসেজ। লিখেছে আগামীকাল সন্ধ্যায় ওর বাসায় আমার দাওয়াত। গাড়ি পাঠিয়ে দেবে, আমি যেন সেজেগুজে যাই। না, রিজওয়ানা স্যার সম্বোধন করেনি আমাকে। ইদানীং ও আমাকে স্যার বলে ডাকছে না, সেটা লক্ষ্য করেছি। 'সেজেগুজে যাই' কথাটায় হাসি পেল আমার। ছাত্রীর বাসায় শিক্ষক যাবে, সেজেগুজে যাওয়ার কী আছে? নাকি রিজওয়ানা সত্যি সত্যি কোনো ডিসিশন নিতে যাচ্ছে? আজ রাতটায় ভালো ঘুম হবে ভেবেছিলাম, কিন্তু টেনশনে আমি প্রায় জেগেই থাকলাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠে খুব বিষণ্ন বোধ হতে লাগল। এটা অপরাধ না আনন্দের প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারলাম না। আমি আর ক্যাম্পাসে গেলাম না। একটা চিঠি পাঠিয়ে ছুটি নিয়ে নিলাম।
সকাল থেকে সন্ধ্যা অনেক দীর্ঘ সময় বোধহয়। অন্তত আমার কাছে আজ তাই মনে হচ্ছে। লেখার টেবিলে বসলাম, লেখা হলো না। এক কলমও লিখতে পারলাম না। টিভি খুলে বসলাম, আমি সাধারণত সিএনএস, বিবিসি, আলজাজিরা দেখি, আজকে সেখানেও মন বসাতে পারলাম না। ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়ালাম কিছুক্ষণ, কিন্তু টেনশন কাটছে না। হুমায়ূন আহমেদের 'নন্দিত নরকে'র লম্পট মাস্টারটার কথা ঘুরে-ফিরে মাথায় আসছে।
সন্ধ্যার পর পর দরজায় বেল দিল ড্রাইভার। আমি প্রায় প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেছি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অবলোকন করেছি নিজেকে। মন্দ লাগছে না। বহুদিন এভাবে নিজেকে দেখা হয়নি। আজ দেখলাম। রিজওয়ানা কেন আমাকে ডেকে নিচ্ছে ওর বাসায় আমি জানি না, জিজ্ঞেসও করিনি। তবে ও যদি আমাকে নিয়ে কিছু ভেবে থাকে, আমি আপত্তি করব না। ওর মাকে কি ও রাজি করাতে পেরেছে? বয়সের এমন বিস্তর ফারাক, কোনো অভিভাবকের রাজি হওয়ার কথা নয়।
আমি কেন এমন ভাবছি আজ? গত পঁচিশ বছরে যে আমি কখনও কোনো নারী, নারীর সংসর্গ বা বিয়ে নিয়ে ভাবিনি, সে আমি কোন্ মোহে নতুন করে জীবনের পাতা খোলার পরিকল্পনা করছি? রিজওয়ানা আমাকে কিছু বলেনি, কিন্তু ওর সব ইশারা-ইঙ্গিত আমাকে শেষ পর্যন্ত ওই দিকেই ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে তা আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম।
গাড়ির কাছে এসে দেখি, রিজওয়ানা গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ ওর আসবার কথা ছিল না। চমৎকার একটি শাড়ি পরেছে ও, কিন্তু গতকাল আমার দেওয়া শাড়িটা নয়। দুটো বিষয়ই আমাকে ভাবালো। কিন্তু ভাবনাটা মুহূর্তকালের মধ্যে উবে গেল, যখন রিজওয়ানা বলল,
'আপনাকে চমৎকার লাগছে, একেবারে আমার মনের মতো।'
রিজওয়ানা গাড়িতে আমার পাশে বসল।
গাড়ি গলি পেরিয়ে এসে উঠল রাজপথে। তারপর সোজা ছুটে চলল বারিধারার দিকে। আমি জানতাম রিজওয়ানা বারিধারায় ওদের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্টে থাকে।
রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। গাড়ির তেমন চাপ নেই রাস্তায়। রিজওয়ানা খুব সন্তর্পণে কিন্তু স্বাভাবিকভাবে ওর বাঁ হাতটা আমার ডান হাতের ওপর রাখলো। আমি দেখলাম, কিন্তু হাতটা সরালাম না। ও যদি এতে আনন্দ পায় পাক।
বিশাল ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে গাড়িটা থামল। রিজওয়ানা গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এসে আমার পাশের দরজা খুলে আমাকে নামাল। তারপর আমার হাত ধরে একরকম টানতে টানতে লিফটের গোড়ায় নিয়ে এলো। লিফটের দরজা খুলে গেলে আমাকে নিয়ে ঢুকল ভেতরে। আমি মেয়ের সাহস দেখে বাঙালিচোখে অবাকই হচ্ছিলাম। লন্ডনে-দুবাইয়ে বড় হওয়া মেয়ে, এসব হয়তো ওর কাছে কিছুই নয়।
লিফট থেকে নেমে কয়েক কদম এগোতেই চমৎকার ডিজাইন করা সেগুন কাঠের ভারী একটি দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। ও আঙুলে টিপ দিয়ে বেল বাজালো।
'এটাই তোমাদের বাসা?'
আমি পরিবেশটাকে হালকা করার জন্য জিজ্ঞেস করলাম।
'জি্ব।'
'চমৎকার দরজাটা।'
আমার কথা শেষ হবার আগেই খুলে গেল ওটা। আর দরজাটা খুলে যে আমার সামনে দাঁড়াল সে আর কেউ নয়, ফারজানা আহমেদ। আমি যাকে নীতু বলে ডাকতাম।
রিজওয়ানা আঙুল তুলে বললো_
'সি ইজ মাই মাদার, আমার মা।'
নীতুর পরনে সেই শাড়িটা, যেটা আমি রিজওয়ানাকে কাল দিয়েছিলাম।
আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। পা দুটো খুব ভারী মনে হলো।
নীতুর মুখটা ঠিক ওই রকমই আছে, শুধু ভারী হয়েছে শরীরটা, চুলগুলো একটু একটু সাদাটে হয়েছে, এই যা তফাত।
নীতু একটু হাসলো, সেই পরিচিত হাসি। তারপর বলল,
'ভেতরে এসো।'
রিজওয়ানা আমার ধরে রাখা হাতটা ছেড়ে দিল আলতোভাবে।
কিন্তু মেয়েটাই ফোন করলো। ওর নাম রিজওয়ানা চৌধুরী।
'আজ নিশ্চয়ই ডিপার্টমেন্টে যাবেন না?'
'তুমি কী করে বুঝলে?'
'টেলিভিশনে নিউজ দেখে।'
'ঠিকই ধরেছো। আজ বাদ দাও। তোমাকে যে অংশটা রি-টাইপ করতে বলেছি, ওটা বরং আজ লেখো। কাল পরিস্থিতি দেখে আসতে বলবো তোমাকে।'
রিজওয়ানা সালাম দিয়ে ফোনটা রেখে দিল।
রিজওয়ানা আমার তত্ত্বাবধানে মাস্টার্স ক্লাসের থিসিস করছে একটা। দুবাইয়ের একটা কলেজে গ্র্যাজুয়েশন করে বাংলাদেশে চলে এসেছে ও। ওর স্কুলিংটা লন্ডনে হয়েছে। মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই। রেজাল্ট ভালো। চমৎকার ইংরেজি বলে এবং লেখেও। ওর থিসিসের বিষয়টা ওরই ঠিক করা- 'The Partition of Bengal in 1947 : The Demographic Impact and Paradox of Bengali People..' বিষয়টা আমার পছন্দ হয়েছিল। ওর সঙ্গে আলাপ করেছিলাম বিষয়টা নিয়ে, কেন সে বিষয়টা বেছে নিল তা জানবার জন্য। ও এক পৃষ্ঠার ছোট্ট একটা সারসংক্ষেপ দিয়েছিল আমাকে। ভালো লেগেছিল আমার। ও নতুন কিছু বলতে চায়। এ বিষয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, তার পরও আমি ওর নতুন চিন্তা-ভাবনার জন্য বিষয়টা পছন্দ করি। ডিপার্টমেন্টের একাডেমিক কমিটি ওটা পাস করে দেয়।
রিজওয়ানাকে আমি ইন্টারনেট থেকে সব রিলেটেড লিটারেচার সংগ্রহ করতে বলেছিলাম। ওটা শেষ হলে ভার্সিটির লাইব্রেরি ঘেঁটে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগ নিয়ে যা বই আছে তা পড়ে একটা সিনোপসিস তৈরি করতেও বলি। মেয়েটা ঠিক ঠিক সব করে। সব কথা শোনে। কিন্তু ওর দোষ বা গুণ যা-ই বলি না কেন, বড় চঞ্চল ও। আমি যখন ওর লেখা দেখি বা বই খুলে কিছু খুঁজি ও ভীষণ উসখুস করে। চবি্বশ-পঁচিশ বছর বয়সের একটা মেয়ে চঞ্চল হতেই পারে। কিন্তু গবেষণা এমন একটা বিষয়, যা খুব স্থিরভাবে স্থির চিন্তায় করতে হয়। রিজওয়ানার ওটা নেই।
কিন্তু কোনো বিষয়ে ও একবার চোখ বুলিয়ে নিলেই হয়, মূল বিষয়টা ও ধরে নেয়, দ্বিতীয়বার সে ওটা আর পড়ে না। আমি তার এই বিষয়টা প্রথমে ঠিক বুঝতে পারিনি। কিন্তু দশ দিন আগে পড়া কোনো বিষয় নিয়ে যখন আলোচনা করি তখন ও ঠিক ঠিক রেফারেন্স ধরে সব বলে দিতে পারে। ফলে, ওর কাজের সততার নিচে ওর চঞ্চলতা চাপা পড়ে যায়। রিজওয়ানা অসম্ভব মেধাবী এটা আমি মেনে নিয়েছি। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ও আমার রুমে চলে আসে। থিসিসের পার্টগুলো দেখায়। কখনও আমি সঙ্গে সঙ্গে দেখে দিই, কখনও রেখে দিই পরে দেখে দেবো বলে।
রিজওয়ানা একদিন বলেছিল,
'স্যার, ডিপার্টমেন্টে আপনি ব্যস্ত থাকেন। সময় পান না। আমিও ক্লাসে থাকি। বিকেলের পর বাসায় গেলে কি অসুবিধে আছে?'
বিদেশি কালচারে বড় হয়ে ওঠা একটা মেয়ে এমন কথা বলতেই পারে।
তবুও আমি বলি,
'না মানে, বাসায় যাবে কেন?'
'না স্যার, অন্য কিছু না। জাস্ট থিসিসটার কাজ নিয়ে যেতে চাচ্ছি।'
'ও আচ্ছা।' বলে আমি অনুমতি দিয়েছিলাম। রিজওয়ানার উদার ও খোলামেলা চরিত্রটিকে আমি নষ্ট করতে চাইনি। আসলে আমার বাসায় একটা কাজের ছেলে ছাড়া কেউ থাকে না। ইউনিভার্সিটির কোয়ার্টার। আমি সাধারণত ছাত্রীদের আমার বাসায় আসতে উৎসাহিত করি না। ছাত্ররা আসে। পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা ছাড়াও সিনিয়র স্টুডেন্টরা আড্ডাবাজিও করে। ওরাই আমার বন্ধু-সন্তান-ভাই, আমার বাসাটা আমার নয়, মাঝে মাঝে ওরাই দখল করে ফেলে। আমি যে আমার বাসায় ছাত্রীদের অ্যালাউ করি না, এই ছেলেগুলো জানে। কিন্তু রিজওয়ানার বিষয়টায় ওরা কেউ কিছু জানতে চায়নি আমার কাছে।
রিজওয়ানা কি আমাকে পছন্দ করে?
মেয়েটাকে আমারও পছন্দ প্রথম থেকেই। যেদিন প্রথম ও ডিপার্টমেন্টে আমার রুমে 'মে আই কাম ইন স্যার?' বলে ঢুকে পড়েছিল, সেদিন ভীষণ ভালো লেগে গিয়েছিল আমার। ঝকঝকে চেহারা, নাক-মুখ কাটা-কাটা, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চুলগুলোকে পনি-টেল করে ছেড়ে দেওয়া পিঠের ওপর। ভালো লেগে যাবার মতো মুখটা।
আমার ভেতরে কি তখন অন্য কিছু খেলা করছিল? অন্য কোনো চিন্তা অথবা আকাঙ্ক্ষা? অথবা সব পুরুষেরই যা হয়, তেমন কিছু? পুরুষ সবসময়ই পুরুষ, সত্তরেও সে থাকে ত্রিশের যুবকের মতো। যদিও বিয়ে-থা করিনি বলে আমার ভেতর এক ধরনের নীরবতা আছে। আমার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা সেই উদ্দাম পুরুষটাকে আমি সামলে রাখি সবসময়। কিন্তু রক্ত-মাংসের মানুষ তো, জ্বলন্ত চুলোর ওপর কড়াইয়ের দুধের মতো মাঝে মাঝে বলক দেয়। তখন চুলোর আগুনটা কমিয়ে দেই।
তার পরও সহকর্মীদের চোখ এড়ায়নি বোধ হয়। দুপুরে চায়ের আড্ডায় প্রফেসর আজম তো একদিন বলেই বসেন,
'কী ব্যাপার চিরকুমার? কী সব শুনছি?'
'কী শুনছেন?'
আমার তো চমকে ওঠারই কথা।
পাশ থেকে আরেক সহকর্মী ফিসফিস করে বলেন,
'মনে রাখবেন, বয়স কিন্তু পঞ্চাশ পেরিয়েছে।'
'পঞ্চাশ তো আপনারও।'
ওদের প্রশ্নের উদ্দেশ্য পরিষ্কার আমার কাছে।
'না মানে, আমরা তো ত্রিশেই মরেছি, আপনি কি পঞ্চাশে এসে মরতে চান?'
এ ধরনের উস্কানিমূলক কথা গ্রাহ্য করতে নেই। আমি বলি,
'ছাত্রী তো।'
'ছাত্রী তো মেয়ে। নাকি মেয়ে নয়?'
ওদের যুক্তির কাছে কথা বলা মুশকিল।
রিজওয়ানা মাঝে মাঝেই আমার বাসায় আসে এখন। ড্রয়িংরুমে বসে। কাগজপত্র বের করে, নোট দেখায়। আমরা ঘণ্টা ধরে কাজ করি একেক দিন। চা-বিস্কুট খায়। কিন্তু কখনও ভেতর ঘরে যায় না, যদিও মাঝে মাঝে দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে দেখতে চেষ্টা করে।
প্রথম যেদিন রিজওয়ানা এসেছিল আমার বাসায়, হাত থেকে থিসিসের কাগজপত্র নামিয়ে রাখতে রাখতে বলেছিল,
'স্যার, আপনার বাসাটা বেশ নিরিবিলি মনে হচ্ছে। পড়াশোনা করার চমৎকার জায়গা।'
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর একটা প্রবন্ধ লিখছিলাম আমি দৈনিক পত্রিকার জন্য।
আমি চোখ তুলে বলেছিলাম,
'তোমার পড়াশোনার জন্য আমার বাসা ফ্রি। পুরো বাসাটাই তোমার।'
কিন্তু তবুও ড্রয়িংরুম ছাড়া অন্য ঘরে যায়নি ও।
একদিন কী একটা জটিল বিষয় নিয়ে আমরা আলাপ করছিলাম, হঠাৎ আচমকা, বলা নেই কওয়া নেই, আমাকে প্রশ্ন করে বসেছিল,
'স্যার, আপনি বিয়ে করেননি কেন?'
আমি ঠিক ওই সময়ে বিয়ে নিয়ে চিন্তা করছিলাম না। ফলে, কী জবাব দিয়েছিলাম এখন আর মনে নেই। তবে হয়তো বলেছিলাম, 'বিয়ে করব না কে বলেছে?'
আমার এই কথায় কি-না জানি না, দিন পনেরো আগে আমার লেখা নোটটা পড়তে পড়তে হঠাৎ ও সোফা থেকে উঠে ভেতর ঘরের দিকে চলে গিয়েছিল।
ও ঘুরে ঘুরে দেখেছিল আমার বাসা। বইপত্র, ম্যাগাজিন, ফাইল, আরও কি সব খুলে খুলে চোখ বুলাচ্ছিল। একসময় ড্রয়ার খুলে অ্যালবাম বের করে বলেছিল,
'স্যার, ছবিগুলো দেখি?'
আমি না করতে পারিনি। যদিও ওই অ্যালবামে একটি মাত্র ছবি ছিল যেটি রিজওয়ানার করা একদিনের প্রশ্নের জবাব হয়ে যেতে পারে।
অ্যালবাম খুলে ছাত্রীটি আমার বোকাই হয়ে গিয়েছিল বোধ হয়।
'স্যার, এই এতো বড় অ্যালবামে একটি মাত্র ছবি রেখেছেন?'
'হ্যাঁ, ওটাই আমার ছবি। আর কোনো ছবি রাখার প্রয়োজন মনে করি না।'
সাদা-কালো একটা ছবি, আমার আর নীতুর। আমার বয়স তখন চবি্বশ, নীতুর বোধ হয় বাইশ।
'স্যার, মেয়েটি কে?'
'ওটা রেখে দাও রিজওয়ানা।'
আমি একটু গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলাম।
'আপনার পরিচিত?'
তারপর আরেকটা প্রশ্ন,
'আপনি ভালোবাসতেন?
তারপর একসঙ্গে অনেকগুলো,
'আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে? দোষটা কি ওই ছবির মহিলার? বিট্রে করেছে আপনাকে?'
আমি লক্ষ্য করেছিলাম রিজওয়ানা বার বার ছবিটার দিকে তাকাচ্ছিল। কিছু কী খুঁজছিল ছবিটার মধ্যে? আমি আবার ওটা রেখে দেওয়ার জন্য ধমকের মতো দিতেই ওটা ড্রয়ারে রেখে আমার সামনে এসে বসেছিল। ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছিল ওকে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
'কী খাবে? চা চলবে?'
ও কিছুই বলেনি, এমনকি মাথাও নাড়ায়নি। আমি কাজের ছেলেটাকে চা-বিস্কুট দিতে বলেছিলাম। আমি তখন ভাবছিলাম, মেয়েরা সত্যিই বড় অভিমানী হয়, নাকি পরশ্রীকাতর হয়? রিজওয়ানা কি আমাকে নিয়ে তেমন কিছু ভেবেছে, যেটা আমার সহকর্মীরা ইঙ্গিত করেছিলেন? এমন তরুণী একটা মেয়ে আমার মতো বয়সী মানুষকে নিয়ে ভাববে কেন? আমি যথাসময়ে বিয়ে করলে রিজওয়ানার মতো একটা মেয়ে থাকতে পারত আমার। তাছাড়া, রিজওয়ানার চরিত্রের সঙ্গে আমার চরিত্র মেলে না। ও চঞ্চল, প্রজাপতির মতো মেয়ে, আমি ঠিক তার বিপরীত, অন্তর্মুখী। সেই আমার সঙ্গে অন্য একটা মেয়ের ছবি দেখে রিজওয়ানা কি ক্ষুব্ধ হয়েছিল আমার ওপর?
রিজওয়ানা কয়েকদিন আর যোগাযোগ করেনি আমার সঙ্গে। ক্লাসেও আসেনি। প্রায় সপ্তাহ পার করে দিয়ে ও এলো। বেশ মলিন মনে হলো ওকে। বোঝাই যাচ্ছিল ঝড়-ঝাপটা পার করে সুস্থির হয়ে আবার পুরনো রূপে ফিরে এসেছে। ব্যাগ খুলে একটা টিফিন বক্স বের করে সেটা খুলে আমার সামনে এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,
'আপনি খান।'
তখন সবেমাত্র একটা সিগারেট ধরিয়েছিলাম আমি। একটু ইতস্তত করাতে ও বলেছিল,
'সিগারেটটা ফেলে দিয়ে লুচি আর সুজি খান। আমার নিজ হাতে বানানো।'
'তুমি এসব আনতে গেলে কেন?'
'কেন, আমি কি আপনাকে খাওয়াতে পারি না? কেউ আপনাকে খাওয়াবার অঙ্গীকার করেছিল, খাওয়ায়নি, অথবা বলতে পারেন খাওয়াতে পারেনি। তাই বলে আমি পারব না তা আপনার মনে হলো কীভাবে?'
রিজওয়ানা এসব কী বলছে? ও কি নীতুর বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিয়েছে? আমি তো নীতুর সম্পর্কে কিছুই বলিনি ওকে। এমনকি নামটাও না। তবু আমার সঙ্গে নীতুর ছবি দেখে এমন ক্ষুব্ধ হলো কেন ও?
আমি ঘটনাটাকে আর দীর্ঘ করতে চাইনি। সিগারেটটা এসট্রেতে গুঁজে নির্বোধ বালকের মতো লুচি আর সুজি খেয়েছিলাম সরাসরি ওর টিফিন বক্স থেকে।
লুচি আর সুজি আমার খুব প্রিয় খাবার। রিজওয়ানার সেটা জানবার কথা নয়।
এরপর থেকে রিজওয়ানা কেমন যেন পাল্টে যেতে শুরু করেছিল। দেখা করবার আগে টেলিফোনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে নিয়ে আমার অফিস রুমে দেখা করতে আসত। আমি যখন ওর থিসিসের বিভিন্ন অংশ কাটাকুটি করতাম, ও কাগজপত্রের দিকে নয়, তাকিয়ে থাকত আমার মুখের দিকে। আমি দু'একবার হঠাৎ মুখ উঁচু করে ওর দিকে তাকালে দেখতাম, ও ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন একটা মায়াবী মুখ ওর, একটা ঘোরলাগা ভালোবাসা লেপ্টে থাকত ওর চোখের ভেতর। আমি অস্বস্তিতে পড়ে যেতে শুরু করি।
একদিন রিজওয়ানা খুব ইমোশনাল ছিল বোধ হয়। বলছিল,
'আপনি তো জানেন আমার বাবা বেঁচে নেই। আমার আর কোনো ভাইবোনও নেই। মা'ই আমার সব। আমার সব কথা মাকেই বলি। ভালোমন্দ সবকিছু শেয়ার করি তার সঙ্গে। বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, লন্ডনে একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। আমার জন্ম ওখানেই। স্কুল লেভেলের লেখাপড়াটা লন্ডনে করি। তারপর কোম্পানি বাবাকে দুবাইতে একটা প্রজেক্টে পাঠায়। কন্সট্রাকশনের কাজ। আমরা সবাই দুবাই চলে যাই। ব্যস, ওখানেই প্রজেক্টের একটা অ্যাক্সিডেন্টে বাবা মারা যান। আমার গ্র্যাজুয়েশনটা শেষ করি ওই অবস্থাতেই।' আমি কথার মাঝখানে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
'দুবাই থেকে তো লন্ডনে চলে যেতে পারতে। বাংলাদেশে এলে কেন?'
রিজওয়ানা মাথাটা নিচু করে নিয়ে স্বগতোক্তির মতো বলেছিল,
'হয়তো আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে বলে।'
বুকের ভেতরটা আমার দুলে উঠেছিল হঠাৎ করে।
অবিবাহিত পুরুষের সামনে এ ধরনের কথা ইঙ্গিতপূর্ণ। আমার ভেতর রিজওয়ানা কী পেল যে, অমন করে বলতে পারল? ভালোবাসা জিনিসটা কেমন, দৈর্ঘ্যে-প্রস্থ-উচ্চতায় কতটুকু হয়, কতটুকু আকার তার, বুকের কোথায় তার স্থায়ী আবাস, এসব বুঝে ওঠার আগেই আমি হারিয়ে ফেলেছি ভালোবাসার মোহ। নীতু যাবার সময় সবটুকু খাবলে-খুবলে তুলে নিয়ে চলে গেছে শিকড়সহ। রিজওয়ানা কি আবার কিছু পুঁতে দিল এই অবেলায়?
সেদিন বিকেলে আমি ক্যাম্পাস থেকে বাসায় না ফিরে চলে গিয়েছিলাম বসুন্ধরা শপিং মলে। আমি একবারই মাত্র গিয়েছিলাম মলটি চালু হওয়ার পর। তাও কেনাকাটা করতে নয়। সিনেপ্লেক্সে একটা ছবি দেখার জন্য আমার ছাত্রবন্ধুদের সঙ্গে। ওরাই জোর করে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।
এবার আমি একলাই যাই।
নানা দোকান ঘুরে ঘুরে আমি একটা গর্জিয়াস শাড়ি কিনি। আমি আসলে শাড়ি-টাড়ি কখনও কিনিনি। মা বেঁচে থাকতে বাড়িতে মায়ের কাছে টাকা পাঠিয়ে দিতাম, মা কিনে নিতেন। নীতুর সঙ্গে সম্পর্কটা শাড়ি দেবার পর্যায়ে গেলেও তখন তা কিনে দেওয়া যায়নি আর্থিক কারণে। যখন কিনে দেওয়ার মতো অর্থকড়ি জমেছে তখন নীতু অনেক দূরে চলে গেছে।
মনে পড়ে, নীতু একদিন হাসতে হাসতে বলেছিল,
'এবার পহেলা বৈশাখে তুমি আমাকে একটা শাড়ি কিনে দেবে। আমি ওটা পরে সারা শহর ঘুরে বেড়াব।'
খালি মানিব্যাগ উল্টে দেখিয়ে বলেছিলাম,
'এই মানিব্যাগে ভবিষ্যতে যত টাকা জমবে সব টাকা থাকবে শুধু তোমার শাড়ি কেনার জন্য।'
নীতু কি কষ্ট পেয়েছিল ওকে শাড়ি কিনে দিতে পারিনি বলে? হতে পারে। মেয়েরা কখন কিসে কখন কষ্ট পায় বোঝা মুশকিল।
শাড়িটা আমি রিজওয়ানার জন্য কিনেছিলাম। গিফট দেব শুনে সেলসম্যান চমৎকার র্যাপিং করে দিয়েছিল। টিএসসির মোড়ে ট্যাক্সিটা ছেড়ে দিয়ে আমি হাঁটতে শুরু করেছিলাম। চমৎকার একটা আকাশ, আকাশভরা তারা, রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোয় আমি পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছিলাম বাসার দিকে। কলাভবনের সামনের সড়কের ফুটপাথে আমি আনমনে দাঁড়িয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। কিছু কি দেখেছিলাম আমি? নাকি ভাবছিলাম জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে আমি কীভাবে জড়িয়ে যাচ্ছি ভালোবাসার মায়াজালে? ভালোবাসা কি তেমনই কিছু যে পৃথিবীর তাবত কিছুকে অগ্রাহ্য করে জায়গা করে নেয় সবার ওপরে?
রিজওয়ানাকে আমি ছোট্ট একটা মেসেজ দিয়েছিলাম পরদিন বাসায় আমার সঙ্গে দেখা করবার জন্য।
ও ফিরতি মেসেজে জানিয়েছিল রিসার্চের লিটারেচার রিভিউ অংশটা প্রায় শেষ করে এনেছে। ওটা শেষ হলেই সে বাসায় সেগুলো নিয়ে আসবে আমাকে দেখাবার জন্য।
আমি শাড়িটা আলমারিতে উঠিয়ে রেখেছিলাম। রিজওয়ানা শাড়িটা পেয়ে নিশ্চয়ই খুব খুশি হবে। চঞ্চল মেয়েরা অল্পতেই খুশি হয় বলে কোথায় জানি পড়েছিলাম।
আজ আসার কথা ছিল রিজওয়ানার। কিন্তু ভার্সিটিতে গণ্ডগোল সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিল।
কাল যদি রিজওয়ানা আসে!
দিনটা ভালো গেল না। ছাত্রদের কয়েকজন এলো সন্ধ্যেবেলায়। ওরা আসায় কিছুটা স্বস্তি পেলাম বোধহয়। চানাচুর, মুড়িভাজা, পাকুড়া আর গরম চায়ে আড্ডাটা জমে উঠল। আড্ডাটা জমলো প্রধানত রাজনীতি নিয়ে। গণতন্ত্র, অবরোধ, হরতাল ইত্যাদি প্রসঙ্গই ঘুরে-ফিরে চলে এলো। রাজনীতিবিজ্ঞানের ছাত্রদের আড্ডাবাজি মানেই লেখাপড়া। বই খুলে পড়ার দরকার হয় না, চোখে যা দেখছো তা-ই তোমার বিষয়। যেন প্রশ্ন তৈরি, ব্যাখ্যা করো_ হোয়াট ইজ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হোয়াট ইজ অটোক্রেসি।
কিন্তু দেশ বিভাগ নিয়ে রিজওয়ানা যে গবেষণা শুরু করেছে তা যেন কোনোদিন শেষ না হয়। চলতেই থাক। একটা ঘোরের ভেতর কথাগুলো আমার মনে হয়। ডিপার্টমেন্টে দেখা করতে এলো ও। আমি বললাম, 'বাসায় চলো।'
'কেন?'
কেন বলল বটে, কিন্তু ওই কেন'র ভেতর লুকিয়েছিল ফুলের সৌরভ, যেন শব্দটা ধারণ করেছিল পৃথিবীর সব মায়া-মমতা আর ভালোবাসা।
কলাভবন থেকে বেরিয়ে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম।
'গাড়ি নেবো না?'
'প্রয়োজন নেই। চলো হাঁটি। ভালোই লাগছে হাঁটতে।' আমি বলি।
বাসায় পেঁৗছে দেখি কাজের ছেলেটা মাগুর মাছের ঝোল আর ডিম ভাজি করেছে।
আমি রিজওয়ানাকে বললাম,
'এ তরকারি দিয়ে লাঞ্চ করতে আপত্তি নেই তো?'
ও কোনো জবাব দিল না। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পড়লো। আমি টেবিলে দুটো প্লেট লাগাতে বলে ওয়াশরুমে যাই। পানির ঝাঁপটা দিই চোখেমুখে। আয়নায় চোখ যায় আমার। কানের ওপরে সাদা চুলগুলোতে আঙুল যায়। চোখের নিচে গভীর কালি না থাকলেও কপালের ভাঁজটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আমি এভাবে কেন দেখছি ভেবে নিজেরই হাসি পায়। পঞ্চাশ বছর বয়স পেরুনো মানুষ আমি, চাইলেই ত্রিশে নামতে পারব না। সময় সব মানুষকে ক্রমেই ঠেলে নিয়ে যায় না ফেরার সীমানায়।
শাড়িটা রিজওয়ানা নিল কোনো প্রতিবাদ না করেই। শুধু জিজ্ঞেস করল,
'শাড়িটা আপনি আমার জন্যই কিনেছেন?'
'হ্যাঁ, বলতে পারো শুধু তোমার জন্যই।'
কথাটা বলতে পেরে আমার বুকটা অনেকটাই হালকা হয়ে গেল। শাড়িটা কেনার পর থেকে মুহূর্তগুলো জগদ্দল পাথরের মতো বুকের ভেতর একটু একটু করে ভারী হয়েছে, রিজওয়ানা যদি রি-অ্যাক্ট করে এই আশঙ্কায়। কিন্তু ও স্বাভাবিকভাবে নেওয়ায় হঠাৎ আমার ভেতর কী যে হলো, আমি দু'হাতে রিজওয়ানার কাঁধটা শক্ত করে ধরে ওর ঠোঁটে চুমু দিতে চাইলাম। মেয়েটা এবারও রি-অ্যাক্ট করল না। শুধু কপালটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
'ঠোঁটে নয়, কপালে দিন।'
একটু থমকে গেলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে ওর কপালে আলতো করে আমার ঠোঁটের স্পর্শ বসিয়ে দিলাম। রিজওয়ানা কি কেঁপে উঠল ভেতরে ভেতরে? হয়তো কাঁপল না। কিন্তু আমি কাঁপতে থাকলাম, আনন্দে নাকি আশঙ্কায় বুঝতে পারলাম না। পুরো ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে, আমি নিজেকে সামাল দিতে পারলাম না। ভালো-মন্দ, সঠিক-বেঠিক কোনো চিন্তা করার আগেই সব সিদ্ধান্ত যেন গৃহীত হয়ে গেল এক চুম্বনে। আমি অপরাধীর মতো সোফায় গিয়ে বসলাম। রিজওয়ানার দিকে চোখ তুলে তাকাতে সংকোচ হতে লাগল, ভীষণ অপরাধী মনে হলো নিজেকে। শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রীর সম্পর্ক পিতা-কন্যার মতো, ছিঃ আমি এ কী করলাম?
শাড়িটা ব্যাগের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে থিসিসের টাইপ করা কাগজপত্রগুলো আমার সামনের সেন্টার টেবিলে গুছিয়ে রেখে রিজওয়ানা ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল দরজা ঠেলে।
আমি কতক্ষণ ওইভাবে বসেছিলাম মনে নেই।
হয়তো কিছুক্ষণ, অথবা অনেকটা সময়।
জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে চোখ গেল বাইরে, অন্ধকার নামছে। ক্যাম্পাসের ছোট-বড় বৃক্ষরাজিতে অনেক পাখির বাস, ওদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে এলো কানে।
হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটা মেসেজ আসার শব্দ হলো। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিলাম।
রিজওয়ানার মেসেজ। লিখেছে আগামীকাল সন্ধ্যায় ওর বাসায় আমার দাওয়াত। গাড়ি পাঠিয়ে দেবে, আমি যেন সেজেগুজে যাই। না, রিজওয়ানা স্যার সম্বোধন করেনি আমাকে। ইদানীং ও আমাকে স্যার বলে ডাকছে না, সেটা লক্ষ্য করেছি। 'সেজেগুজে যাই' কথাটায় হাসি পেল আমার। ছাত্রীর বাসায় শিক্ষক যাবে, সেজেগুজে যাওয়ার কী আছে? নাকি রিজওয়ানা সত্যি সত্যি কোনো ডিসিশন নিতে যাচ্ছে? আজ রাতটায় ভালো ঘুম হবে ভেবেছিলাম, কিন্তু টেনশনে আমি প্রায় জেগেই থাকলাম।
সকালে ঘুম থেকে উঠে খুব বিষণ্ন বোধ হতে লাগল। এটা অপরাধ না আনন্দের প্রতিক্রিয়া বুঝতে পারলাম না। আমি আর ক্যাম্পাসে গেলাম না। একটা চিঠি পাঠিয়ে ছুটি নিয়ে নিলাম।
সকাল থেকে সন্ধ্যা অনেক দীর্ঘ সময় বোধহয়। অন্তত আমার কাছে আজ তাই মনে হচ্ছে। লেখার টেবিলে বসলাম, লেখা হলো না। এক কলমও লিখতে পারলাম না। টিভি খুলে বসলাম, আমি সাধারণত সিএনএস, বিবিসি, আলজাজিরা দেখি, আজকে সেখানেও মন বসাতে পারলাম না। ঘরের ভেতর হেঁটে বেড়ালাম কিছুক্ষণ, কিন্তু টেনশন কাটছে না। হুমায়ূন আহমেদের 'নন্দিত নরকে'র লম্পট মাস্টারটার কথা ঘুরে-ফিরে মাথায় আসছে।
সন্ধ্যার পর পর দরজায় বেল দিল ড্রাইভার। আমি প্রায় প্রস্তুত হয়েই ছিলাম। পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেছি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অবলোকন করেছি নিজেকে। মন্দ লাগছে না। বহুদিন এভাবে নিজেকে দেখা হয়নি। আজ দেখলাম। রিজওয়ানা কেন আমাকে ডেকে নিচ্ছে ওর বাসায় আমি জানি না, জিজ্ঞেসও করিনি। তবে ও যদি আমাকে নিয়ে কিছু ভেবে থাকে, আমি আপত্তি করব না। ওর মাকে কি ও রাজি করাতে পেরেছে? বয়সের এমন বিস্তর ফারাক, কোনো অভিভাবকের রাজি হওয়ার কথা নয়।
আমি কেন এমন ভাবছি আজ? গত পঁচিশ বছরে যে আমি কখনও কোনো নারী, নারীর সংসর্গ বা বিয়ে নিয়ে ভাবিনি, সে আমি কোন্ মোহে নতুন করে জীবনের পাতা খোলার পরিকল্পনা করছি? রিজওয়ানা আমাকে কিছু বলেনি, কিন্তু ওর সব ইশারা-ইঙ্গিত আমাকে শেষ পর্যন্ত ওই দিকেই ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে তা আমি আন্দাজ করতে পারছিলাম।
গাড়ির কাছে এসে দেখি, রিজওয়ানা গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ ওর আসবার কথা ছিল না। চমৎকার একটি শাড়ি পরেছে ও, কিন্তু গতকাল আমার দেওয়া শাড়িটা নয়। দুটো বিষয়ই আমাকে ভাবালো। কিন্তু ভাবনাটা মুহূর্তকালের মধ্যে উবে গেল, যখন রিজওয়ানা বলল,
'আপনাকে চমৎকার লাগছে, একেবারে আমার মনের মতো।'
রিজওয়ানা গাড়িতে আমার পাশে বসল।
গাড়ি গলি পেরিয়ে এসে উঠল রাজপথে। তারপর সোজা ছুটে চলল বারিধারার দিকে। আমি জানতাম রিজওয়ানা বারিধারায় ওদের নিজস্ব অ্যাপার্টমেন্টে থাকে।
রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে। গাড়ির তেমন চাপ নেই রাস্তায়। রিজওয়ানা খুব সন্তর্পণে কিন্তু স্বাভাবিকভাবে ওর বাঁ হাতটা আমার ডান হাতের ওপর রাখলো। আমি দেখলাম, কিন্তু হাতটা সরালাম না। ও যদি এতে আনন্দ পায় পাক।
বিশাল ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে গাড়িটা থামল। রিজওয়ানা গাড়ি থেকে দ্রুত নেমে এসে আমার পাশের দরজা খুলে আমাকে নামাল। তারপর আমার হাত ধরে একরকম টানতে টানতে লিফটের গোড়ায় নিয়ে এলো। লিফটের দরজা খুলে গেলে আমাকে নিয়ে ঢুকল ভেতরে। আমি মেয়ের সাহস দেখে বাঙালিচোখে অবাকই হচ্ছিলাম। লন্ডনে-দুবাইয়ে বড় হওয়া মেয়ে, এসব হয়তো ওর কাছে কিছুই নয়।
লিফট থেকে নেমে কয়েক কদম এগোতেই চমৎকার ডিজাইন করা সেগুন কাঠের ভারী একটি দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম আমরা। ও আঙুলে টিপ দিয়ে বেল বাজালো।
'এটাই তোমাদের বাসা?'
আমি পরিবেশটাকে হালকা করার জন্য জিজ্ঞেস করলাম।
'জি্ব।'
'চমৎকার দরজাটা।'
আমার কথা শেষ হবার আগেই খুলে গেল ওটা। আর দরজাটা খুলে যে আমার সামনে দাঁড়াল সে আর কেউ নয়, ফারজানা আহমেদ। আমি যাকে নীতু বলে ডাকতাম।
রিজওয়ানা আঙুল তুলে বললো_
'সি ইজ মাই মাদার, আমার মা।'
নীতুর পরনে সেই শাড়িটা, যেটা আমি রিজওয়ানাকে কাল দিয়েছিলাম।
আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। পা দুটো খুব ভারী মনে হলো।
নীতুর মুখটা ঠিক ওই রকমই আছে, শুধু ভারী হয়েছে শরীরটা, চুলগুলো একটু একটু সাদাটে হয়েছে, এই যা তফাত।
নীতু একটু হাসলো, সেই পরিচিত হাসি। তারপর বলল,
'ভেতরে এসো।'
রিজওয়ানা আমার ধরে রাখা হাতটা ছেড়ে দিল আলতোভাবে।
সেই ভস্মে ঢাকা পম্পেই by ফারুক মঈনউদ্দীন
রোমের
মূল রেল স্টেশনটার নাম কায়দা করে স্থানীয় উচ্চারণে বলতে হয় 'তেরমিনি,'
আমাদের সহজ ইংরেজিতে যাকে বলা যায় টার্মিনাস বা টার্মিনাল। ভিয়া পালেস্ত্রো
অর্থাৎ পালেস্ত্রো স্ট্রিটের কন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে তেরমিনির দূরত্ব
হাঁটাপথে পাঁচ মিনিট। হোটেলের নাম শুনে কারও ভাবা উচিত নয় এটি কোনো
তারকাখচিত হোটেল। আসলে এই ভিয়া পালেস্ত্রোর প্রাচীন ভবনগুলোর বিশাল দরজার
ওপাশে বিভিন্ন তলার প্রায় প্রত্যেকটিতে কয়েকটা করে ব্রেড অ্যান্ড
ব্রেকফাস্ট হোটেল রয়েছে। আমাদের হোটেলটি যে বিল্ডিংয়ে সেখানেও বিভিন্ন তলায়
কমপক্ষে চারটি হোটেল রমরমা ব্যবসা করছে, আরও বেশিও থাকতে পারে।
কন্টিনেন্টাল হোটেলে চেক ইন করার সময় কাউন্টারের মেয়েটি পাসপোর্ট রেখে
দিয়েছিল ফটোকপি করার জন্য। পরে যখন পাসপোর্ট ফেরত নিতে যাই মেয়েটি বলে,
আপনি প্রফেসর ইউনূসকে চেনেন?
আমি একটু চমকে যাই। বলি_ চিনি, তবে তিনি আমাকে চেনেন না। কেন বলো তো?
মেয়েটি বলে, পাসপোর্টে আপনার স্থায়ী ঠিকানা দেখলাম চিতাগং, প্রফেসর ইউনূসও চিতাগংয়ের লোক, তাই না? এবার বিষয়টা খোলাসা হয়। যাক, মেয়েটির কাছে আমাদের দামটা একটু বেড়ে গেল।
আমরা যখন রোম থেকে বারি হয়ে দক্ষিণ ইতালির মাতেরা যাই, পরিকল্পনা করেছিলাম ফেরার পথে পম্পেই ঘুরে আসব। কিন্তু আবার নেপলসে এক রাত থাকতে হবে, এসব সাত-পাঁচ ভেবে আর যাই না। তাই রোম থেকেই পম্পেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তেরমিনি স্টেশন থেকে নেপোলির (নেপলস) টিকিট কিনতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে পরীক্ষামূলকভাবে একপাশে সারি সারি বসানো সেলফ সার্ভিস টিকিট মেশিনগুলোর বুথে ঢুকে যখন টিকিট কাটার চেষ্টা করছিলাম, তখন এক তরুণ এসে বলে, কী পারছেন না? আমি হেল্প করছি। ওর নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন বোতাম টেপাটেপির পর নির্দিষ্ট তারিখের টিকিটগুলো যখন মেশিনের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে, তখন বুঝতে পারি ব্যাপারটা কত সোজা। খামোখা লাইনে দাঁড়িয়ে এত সময় নষ্ট হলো। তাই ছেলেটি যখন কিছু বকশিশ দাবি করে, তাকে ৫০ ইউরো দিতে কোনো দ্বিধা হয় না।
আমরা রোমের তেরমিনি থেকে নেপোলির উদ্দেশে যখন রওনা হই, তখন সকাল প্রায় সোয়া সাতটা, প্লাটফর্মে অপেক্ষমাণ ট্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে বিশাল ভুঁড়িওয়ালা ট্রেন ড্রাইভাররা হুশ হুশ করে সিগারেট টানছিল। তেরমিনি থেকে নেপোলির দূরত্ব সাধারণ ট্রেনে ঘণ্টা দুয়েকের। তবে দ্রুতযানও আছে, সময় লাগে ৭০ মিনিট। সকাল ৯টার ট্রেন ধরে নেপলস সেন্ট্রাল স্টেশনে পেঁৗছি ঠিক ১০টা ১০ মিনিটে। এখান থেকে ট্রেন বদল করে প্রাইভেট লাইন সারকামভিসুভিয়ানার পম্পেই_সরেন্তোর লোকাল ট্রেন ধরে নামতে হবে পম্পেই স্কাভি স্টেশনে। নেপোলি সেন্ট্রাল স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে একতলা নিচে নামলে লোকাল ট্রেনের প্লাটফর্ম। সেখানে গিজগিজ করছে মানুষ, সবাই যে পম্পেই যাচ্ছে তা নয়। অপেক্ষমাণ সেই সব যাত্রীর ফাঁকফোকর গলে ভিক্ষা করছিল জিন্স প্যান্ট এবং পরিষ্কার শার্ট পরা এক অপরূপ সুন্দরী ইতালীয় তরুণী, তার কোলে বছরখানেকের একটা বাচ্চা, পিঠে ঝোলানো র্যাকস্যাক। একটা গ্গ্নাস নিয়ে এর-ওর সামনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়াচ্ছিল হাত বাড়িয়ে, কিছু না দিলে পরক্ষণেই হাত সরিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল আরেকজনের সামনে, আমাদের দেশেরগুলোর মতো ঘ্যানঘেনে নাছোড়বান্দা টাইপ নয়। তাই তেমন কোনো উপার্জন হতে দেখি না মেয়েটির। এমন শরীরে শার্টের ওপরের দুটি বোতাম খোলা অবস্থায়ও সেই সুন্দরী ভিখারিণী কারও মন গলাতে পারে না দেখে মনে মনে ভাবি, ইউরোপীয় মন্দা ইতালিতে সত্যিই জেঁকে বসেছে।
নেপোলি থেকে পম্পেই স্কাভি লোকাল ট্রেনেই আধা ঘণ্টার পথ। ছোট্ট স্টেশনটি থেকে বের হয়ে অল্প কিছুদূর হাঁটলেই মৃত নগরী পম্পেইর গেট। টিকিট কাউন্টারের সামনে দর্শনার্থীর একটা মাঝারি লাইন, তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই ওখানকার সুপারভাইজার গোছের একজন এসে বলে, নমস্তে। আমি কিছু বলার আগে মিনা বলে ওঠে, জি-না, আমরা ইন্ডিয়ান নই, উই আর ফ্রম বাংলাদেশ। ওর দেশপ্রেম খুব প্রবল। লোকটি মোটেই বিব্রত হয় না, বলে, ওহ, দ্যাটস ফাইন। অ্যানিওয়ে, ওয়েলকাম টু পম্পেই।
জনপ্রতি ১১ ইউরোর টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর প্রথম দর্শনে পম্পেইর মৃত নগরীর যে চেহারা চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে ধূসর, আধপোড়া মতো দেখতে এক নগরীর ভগ্নস্তূপ। আসলে আধপোড়া নয়, আগ্নেয় ভস্মের নিচে প্রায় ১৭০০ বছর চাপা পড়ে ছিল বলে অবচেতনে মনে হয় আধপোড়া কালচে ছাই। পম্পেইর ধূসরতা এবং প্রায় বৃক্ষবিবর্জিত রুক্ষ পরিবেশ হাজার বছর ধরে ভস্মস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা নগরীর ভগ্নস্তূপটিকে দিয়েছে একধরনের কাঠিন্য। পরিকল্পিত ছোট্ট শহরটির পাথর বিছানো পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে হয় প্রথম শতাব্দীর সমৃদ্ধ এই নগরী যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল ৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্টের সকালে, তারপর থেকে আর সামনে এগোয়নি, কেবল ক্ষয়ে চলেছে নীরবে। অথচ নগরীটি খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই ছিল সমৃদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব ৮৯ অব্দে এটি রোমান সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর অবকাঠামোগতভাবে প্রভূত উন্নয়ন লাভ করে, যার বেশিরভাগই ঘটে সম্রাট অগাস্টাসের শাসনামলে। কৃষি জমির উর্বরতার কারণে জনসংখ্যার আপেক্ষিক ঘনত্ব ছিল এখানে বেশি এবং সমৃদ্ধিও আসে তার হাত ধরে। এখানে তৈরি করা হয়েছিল অ্যামফিথিয়েটার, জিমনেশিয়াম, এমনকি ইনডোর সুইমিং পুল। রাস্তার কলগুলোতে জলপ্রবাহ নিশ্চিত করতে তৈরি করা হয়েছিল যথার্থ সরবরাহ লাইন। তৈরি করা হয়েছিল চারটি গণহাম্মাম। ভূতত্ত্ববিদ ফিলিপ জেনির মতে আগ্নেয় পর্বতের বিপদের মধ্যেও একটা বৈপরীত্য রয়েছে, এসব পাহাড়ের মাটি থাকে উর্বর, তাই তার চারপাশে লোকজনের বসতিও বেশি। পম্পেইর বেলায়ও ঠিক তাই ঘটেছিল। বিসুভিয়াসের মাত্র আট কিলোমিটার দূরত্বের প্রাচীন পম্পেই নগরীর উপকণ্ঠে ছিল বহু ধনাঢ্য কৃষিজীবীর বাস। প্রাচীনকাল থেকেই এই শহরের সমৃদ্ধি এবং বহু ধরনের নাগরিক সুবিধা এবং আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল এই ধনাঢ্য শ্রেণীর লোকজন।
টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর নগরীর মূল ফটকটি ধনুকাকৃতি ছাদের নিচে, বেশ খাড়া একটা পাথুরে পথ বেয়ে উঠতে হয়। এই ফটকটির নাম 'পোর্তা মেরিনা' অর্থাৎ 'সাগরমুখী দরজা'। এখান থেকে প্রাচীন নগরীর মূল কেন্দ্র 'ফোরাম'-এ পেঁৗছে যাওয়া যায়। গেটটির ঠিক পাশেই অপেক্ষাকৃত সরু আরেকটি তোরণ, এটিতে পেঁৗছার জন্য ভাঙতে হয় বেশ কিছু সিঁড়ির ধাপ। প্রথম ফটকটি ছিল ঘোড়া এবং যান চলাচলের জন্য, আর দ্বিতীয়টি ব্যবহৃত হতো পথচারীদের জন্য। বলাবাহুল্য পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট ফটকটি খোলা নয়, দর্শনার্থীদের বড় ফটকটিই ব্যবহার করতে হয়। তবে এখান দিয়ে এখন আর গাড়িঘোড়া ঢোকে না। লাভার টালি বিছানো পথ ধরে এগিয়ে গেলে হাতের ডানে পড়বে 'ভেনাস মন্দির', তবে নামেই কেবল মন্দির, এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, একটা থামের ভগ্নাবশেষ, আর কিছু বড় বড় পাথরের চাঁই ছাড়া একসময় নগরীর রক্ষাকর্ত্রী দেবী ভেনাসের মন্দিরটি এখন একটা খোলা জায়গা ছাড়া আর কিছু নয়। চোর ছ্যাঁচোড়ের হাত থেকে ভগ্নাবশেষগুলো রক্ষা করার জন্যই নাকি গ্রিলের দেয়াল দিয়ে জায়গাটা ঘেরা। ওসবের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলে পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে বহুদূর অবধি নিচের লোকালয় দেখা যায়।
ভেনাস টেম্পল পেরিয়ে গেলে ব্যাসিলিকা। এটি ছিল পম্পেইর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণস্থাপনা, গির্জা এবং বিচারালয়। ভবনটি পুরোপুরি না হলেও আংশিক অক্ষত আছে ছাদসহ, তবে বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত, কেবল দাঁড়িয়ে রয়েছে লম্বালম্বি খাঁজকাটা গোল ইটের স্তম্ভগুলো। এটার পাশেই তৃতীয় শতাব্দীতে তৈরি দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির, এখন কেবল কিছু ভাঙা থামের সারির মাথায় খিলান আর কিছু সিঁড়ির ধাপের মাঝে ঘাসে ঢাকা খোলা জায়গা ছাড়া আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে সামনে কালো গ্রানাইটে দেবতা অ্যাপোলোর মূর্তিটা রয়েছে, দুই হাতের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় তীর-ধনুক বাগিয়ে ধরা ছিল, তবে ধনুকটি এখন আর না থাকায় মূর্তিটির দুই হাতের ভঙ্গিমাকে নাচের মুদ্রা বলে মনে হয়।
৭৯ খ্রিস্টাব্দের যে অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই নগরী ধ্বংস হয়েছিল, তার বেশ কিছু আগে থেকেই সেখানে মাঝে মাঝে মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হতো। তবে ৬২ খ্রিস্টাব্দে বেশ বড় একটা ভূমিকম্পে শহরটির যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। সেদিন ছিল সম্রাট অগাস্টাসের জাতির পিতা উপাধি প্রাপ্তির বার্ষিকী। তবে সেই উদযাপন উৎসব ভূমিকম্প-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা, এদিক সেদিক জ্বলন্ত বাতির তেল থেকে সৃষ্ট অগি্নকাণ্ড, বিধ্বস্ত ঘরবাড়িতে চুরি ও লুটপাট এবং বেঁচে থাকা মানুষের অনাহারের ফলে ম্লান হয়ে গিয়েছিল।
পম্পেইর বহু নিদর্শন ভস্মের নিচে ১৭০০ বছর চাপা পড়ে থেকেও অবিকৃত অবস্থায় রয়ে গেছে_ এই বিস্ময়ের জবাব মেলে যখন জানা যায় চাপাপড়া অবস্থায় বাতাসের সংস্পর্শে না আসাই এর মূল কারণ। ফলে খুঁড়ে আবিষ্কার করার পর একদিকে যেমন এসব অবিকৃত নিদর্শন প্রথম শতাব্দীর পম্পেইবাসীর জীবনপ্রণালি সম্পর্কে গবেষণার খোরাক জুগিয়েছে, আবার অন্যদিকে আলো, হাওয়া, জল এবং মানবস্পর্শের কারণে এসবের ক্ষয়প্রাপ্তির সম্ভাবনাও বেড়েছে।
বিসুভিয়াস আগ্নেয় পর্বত যেদিন বিস্টেম্ফারিত হয়, সেদিন নেপলস উপসাগরে অবস্থানরত নৌবাহিনীর জাহাজের অধিনায়ক প্লিনি দ্য এলডার চরম দুঃসাহস দেখিয়ে জাহাজ নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন উদগিরণরত বিসুভিয়াসের দিকে, যাতে আরও কাছ থেকে অগ্ন্যুপাতের দৃশ্য দেখা যায় এবং সেটির কাছাকাছি উপকূল থেকে উদ্ধার করা যায় তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং অন্যান্য উপদ্রুত মানুষজনকে। তবে তাঁর সেই উদ্যোগ সফল হয়নি, অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জাহাজেই মারা গিয়েছিলেন তিনি।
আমি একটু চমকে যাই। বলি_ চিনি, তবে তিনি আমাকে চেনেন না। কেন বলো তো?
মেয়েটি বলে, পাসপোর্টে আপনার স্থায়ী ঠিকানা দেখলাম চিতাগং, প্রফেসর ইউনূসও চিতাগংয়ের লোক, তাই না? এবার বিষয়টা খোলাসা হয়। যাক, মেয়েটির কাছে আমাদের দামটা একটু বেড়ে গেল।
আমরা যখন রোম থেকে বারি হয়ে দক্ষিণ ইতালির মাতেরা যাই, পরিকল্পনা করেছিলাম ফেরার পথে পম্পেই ঘুরে আসব। কিন্তু আবার নেপলসে এক রাত থাকতে হবে, এসব সাত-পাঁচ ভেবে আর যাই না। তাই রোম থেকেই পম্পেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তেরমিনি স্টেশন থেকে নেপোলির (নেপলস) টিকিট কিনতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে পরীক্ষামূলকভাবে একপাশে সারি সারি বসানো সেলফ সার্ভিস টিকিট মেশিনগুলোর বুথে ঢুকে যখন টিকিট কাটার চেষ্টা করছিলাম, তখন এক তরুণ এসে বলে, কী পারছেন না? আমি হেল্প করছি। ওর নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন বোতাম টেপাটেপির পর নির্দিষ্ট তারিখের টিকিটগুলো যখন মেশিনের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে, তখন বুঝতে পারি ব্যাপারটা কত সোজা। খামোখা লাইনে দাঁড়িয়ে এত সময় নষ্ট হলো। তাই ছেলেটি যখন কিছু বকশিশ দাবি করে, তাকে ৫০ ইউরো দিতে কোনো দ্বিধা হয় না।
আমরা রোমের তেরমিনি থেকে নেপোলির উদ্দেশে যখন রওনা হই, তখন সকাল প্রায় সোয়া সাতটা, প্লাটফর্মে অপেক্ষমাণ ট্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে বিশাল ভুঁড়িওয়ালা ট্রেন ড্রাইভাররা হুশ হুশ করে সিগারেট টানছিল। তেরমিনি থেকে নেপোলির দূরত্ব সাধারণ ট্রেনে ঘণ্টা দুয়েকের। তবে দ্রুতযানও আছে, সময় লাগে ৭০ মিনিট। সকাল ৯টার ট্রেন ধরে নেপলস সেন্ট্রাল স্টেশনে পেঁৗছি ঠিক ১০টা ১০ মিনিটে। এখান থেকে ট্রেন বদল করে প্রাইভেট লাইন সারকামভিসুভিয়ানার পম্পেই_সরেন্তোর লোকাল ট্রেন ধরে নামতে হবে পম্পেই স্কাভি স্টেশনে। নেপোলি সেন্ট্রাল স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে একতলা নিচে নামলে লোকাল ট্রেনের প্লাটফর্ম। সেখানে গিজগিজ করছে মানুষ, সবাই যে পম্পেই যাচ্ছে তা নয়। অপেক্ষমাণ সেই সব যাত্রীর ফাঁকফোকর গলে ভিক্ষা করছিল জিন্স প্যান্ট এবং পরিষ্কার শার্ট পরা এক অপরূপ সুন্দরী ইতালীয় তরুণী, তার কোলে বছরখানেকের একটা বাচ্চা, পিঠে ঝোলানো র্যাকস্যাক। একটা গ্গ্নাস নিয়ে এর-ওর সামনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়াচ্ছিল হাত বাড়িয়ে, কিছু না দিলে পরক্ষণেই হাত সরিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল আরেকজনের সামনে, আমাদের দেশেরগুলোর মতো ঘ্যানঘেনে নাছোড়বান্দা টাইপ নয়। তাই তেমন কোনো উপার্জন হতে দেখি না মেয়েটির। এমন শরীরে শার্টের ওপরের দুটি বোতাম খোলা অবস্থায়ও সেই সুন্দরী ভিখারিণী কারও মন গলাতে পারে না দেখে মনে মনে ভাবি, ইউরোপীয় মন্দা ইতালিতে সত্যিই জেঁকে বসেছে।
নেপোলি থেকে পম্পেই স্কাভি লোকাল ট্রেনেই আধা ঘণ্টার পথ। ছোট্ট স্টেশনটি থেকে বের হয়ে অল্প কিছুদূর হাঁটলেই মৃত নগরী পম্পেইর গেট। টিকিট কাউন্টারের সামনে দর্শনার্থীর একটা মাঝারি লাইন, তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই ওখানকার সুপারভাইজার গোছের একজন এসে বলে, নমস্তে। আমি কিছু বলার আগে মিনা বলে ওঠে, জি-না, আমরা ইন্ডিয়ান নই, উই আর ফ্রম বাংলাদেশ। ওর দেশপ্রেম খুব প্রবল। লোকটি মোটেই বিব্রত হয় না, বলে, ওহ, দ্যাটস ফাইন। অ্যানিওয়ে, ওয়েলকাম টু পম্পেই।
জনপ্রতি ১১ ইউরোর টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর প্রথম দর্শনে পম্পেইর মৃত নগরীর যে চেহারা চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে ধূসর, আধপোড়া মতো দেখতে এক নগরীর ভগ্নস্তূপ। আসলে আধপোড়া নয়, আগ্নেয় ভস্মের নিচে প্রায় ১৭০০ বছর চাপা পড়ে ছিল বলে অবচেতনে মনে হয় আধপোড়া কালচে ছাই। পম্পেইর ধূসরতা এবং প্রায় বৃক্ষবিবর্জিত রুক্ষ পরিবেশ হাজার বছর ধরে ভস্মস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা নগরীর ভগ্নস্তূপটিকে দিয়েছে একধরনের কাঠিন্য। পরিকল্পিত ছোট্ট শহরটির পাথর বিছানো পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে হয় প্রথম শতাব্দীর সমৃদ্ধ এই নগরী যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল ৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্টের সকালে, তারপর থেকে আর সামনে এগোয়নি, কেবল ক্ষয়ে চলেছে নীরবে। অথচ নগরীটি খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই ছিল সমৃদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব ৮৯ অব্দে এটি রোমান সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর অবকাঠামোগতভাবে প্রভূত উন্নয়ন লাভ করে, যার বেশিরভাগই ঘটে সম্রাট অগাস্টাসের শাসনামলে। কৃষি জমির উর্বরতার কারণে জনসংখ্যার আপেক্ষিক ঘনত্ব ছিল এখানে বেশি এবং সমৃদ্ধিও আসে তার হাত ধরে। এখানে তৈরি করা হয়েছিল অ্যামফিথিয়েটার, জিমনেশিয়াম, এমনকি ইনডোর সুইমিং পুল। রাস্তার কলগুলোতে জলপ্রবাহ নিশ্চিত করতে তৈরি করা হয়েছিল যথার্থ সরবরাহ লাইন। তৈরি করা হয়েছিল চারটি গণহাম্মাম। ভূতত্ত্ববিদ ফিলিপ জেনির মতে আগ্নেয় পর্বতের বিপদের মধ্যেও একটা বৈপরীত্য রয়েছে, এসব পাহাড়ের মাটি থাকে উর্বর, তাই তার চারপাশে লোকজনের বসতিও বেশি। পম্পেইর বেলায়ও ঠিক তাই ঘটেছিল। বিসুভিয়াসের মাত্র আট কিলোমিটার দূরত্বের প্রাচীন পম্পেই নগরীর উপকণ্ঠে ছিল বহু ধনাঢ্য কৃষিজীবীর বাস। প্রাচীনকাল থেকেই এই শহরের সমৃদ্ধি এবং বহু ধরনের নাগরিক সুবিধা এবং আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল এই ধনাঢ্য শ্রেণীর লোকজন।
টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর নগরীর মূল ফটকটি ধনুকাকৃতি ছাদের নিচে, বেশ খাড়া একটা পাথুরে পথ বেয়ে উঠতে হয়। এই ফটকটির নাম 'পোর্তা মেরিনা' অর্থাৎ 'সাগরমুখী দরজা'। এখান থেকে প্রাচীন নগরীর মূল কেন্দ্র 'ফোরাম'-এ পেঁৗছে যাওয়া যায়। গেটটির ঠিক পাশেই অপেক্ষাকৃত সরু আরেকটি তোরণ, এটিতে পেঁৗছার জন্য ভাঙতে হয় বেশ কিছু সিঁড়ির ধাপ। প্রথম ফটকটি ছিল ঘোড়া এবং যান চলাচলের জন্য, আর দ্বিতীয়টি ব্যবহৃত হতো পথচারীদের জন্য। বলাবাহুল্য পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট ফটকটি খোলা নয়, দর্শনার্থীদের বড় ফটকটিই ব্যবহার করতে হয়। তবে এখান দিয়ে এখন আর গাড়িঘোড়া ঢোকে না। লাভার টালি বিছানো পথ ধরে এগিয়ে গেলে হাতের ডানে পড়বে 'ভেনাস মন্দির', তবে নামেই কেবল মন্দির, এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, একটা থামের ভগ্নাবশেষ, আর কিছু বড় বড় পাথরের চাঁই ছাড়া একসময় নগরীর রক্ষাকর্ত্রী দেবী ভেনাসের মন্দিরটি এখন একটা খোলা জায়গা ছাড়া আর কিছু নয়। চোর ছ্যাঁচোড়ের হাত থেকে ভগ্নাবশেষগুলো রক্ষা করার জন্যই নাকি গ্রিলের দেয়াল দিয়ে জায়গাটা ঘেরা। ওসবের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলে পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে বহুদূর অবধি নিচের লোকালয় দেখা যায়।
ভেনাস টেম্পল পেরিয়ে গেলে ব্যাসিলিকা। এটি ছিল পম্পেইর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণস্থাপনা, গির্জা এবং বিচারালয়। ভবনটি পুরোপুরি না হলেও আংশিক অক্ষত আছে ছাদসহ, তবে বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত, কেবল দাঁড়িয়ে রয়েছে লম্বালম্বি খাঁজকাটা গোল ইটের স্তম্ভগুলো। এটার পাশেই তৃতীয় শতাব্দীতে তৈরি দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির, এখন কেবল কিছু ভাঙা থামের সারির মাথায় খিলান আর কিছু সিঁড়ির ধাপের মাঝে ঘাসে ঢাকা খোলা জায়গা ছাড়া আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে সামনে কালো গ্রানাইটে দেবতা অ্যাপোলোর মূর্তিটা রয়েছে, দুই হাতের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় তীর-ধনুক বাগিয়ে ধরা ছিল, তবে ধনুকটি এখন আর না থাকায় মূর্তিটির দুই হাতের ভঙ্গিমাকে নাচের মুদ্রা বলে মনে হয়।
৭৯ খ্রিস্টাব্দের যে অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই নগরী ধ্বংস হয়েছিল, তার বেশ কিছু আগে থেকেই সেখানে মাঝে মাঝে মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হতো। তবে ৬২ খ্রিস্টাব্দে বেশ বড় একটা ভূমিকম্পে শহরটির যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। সেদিন ছিল সম্রাট অগাস্টাসের জাতির পিতা উপাধি প্রাপ্তির বার্ষিকী। তবে সেই উদযাপন উৎসব ভূমিকম্প-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা, এদিক সেদিক জ্বলন্ত বাতির তেল থেকে সৃষ্ট অগি্নকাণ্ড, বিধ্বস্ত ঘরবাড়িতে চুরি ও লুটপাট এবং বেঁচে থাকা মানুষের অনাহারের ফলে ম্লান হয়ে গিয়েছিল।
পম্পেইর বহু নিদর্শন ভস্মের নিচে ১৭০০ বছর চাপা পড়ে থেকেও অবিকৃত অবস্থায় রয়ে গেছে_ এই বিস্ময়ের জবাব মেলে যখন জানা যায় চাপাপড়া অবস্থায় বাতাসের সংস্পর্শে না আসাই এর মূল কারণ। ফলে খুঁড়ে আবিষ্কার করার পর একদিকে যেমন এসব অবিকৃত নিদর্শন প্রথম শতাব্দীর পম্পেইবাসীর জীবনপ্রণালি সম্পর্কে গবেষণার খোরাক জুগিয়েছে, আবার অন্যদিকে আলো, হাওয়া, জল এবং মানবস্পর্শের কারণে এসবের ক্ষয়প্রাপ্তির সম্ভাবনাও বেড়েছে।
বিসুভিয়াস আগ্নেয় পর্বত যেদিন বিস্টেম্ফারিত হয়, সেদিন নেপলস উপসাগরে অবস্থানরত নৌবাহিনীর জাহাজের অধিনায়ক প্লিনি দ্য এলডার চরম দুঃসাহস দেখিয়ে জাহাজ নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন উদগিরণরত বিসুভিয়াসের দিকে, যাতে আরও কাছ থেকে অগ্ন্যুপাতের দৃশ্য দেখা যায় এবং সেটির কাছাকাছি উপকূল থেকে উদ্ধার করা যায় তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং অন্যান্য উপদ্রুত মানুষজনকে। তবে তাঁর সেই উদ্যোগ সফল হয়নি, অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জাহাজেই মারা গিয়েছিলেন তিনি।
Saturday, February 14, 2015
অমীমাংসিত by শাহ্নাজ মুন্নী
রাতের
বেলা ঘুমানোর আগে বিছানায় মাযহারের গা ঘেঁষে শুয়ে চোখ বুজে রাজিবের কথা
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একধরনের অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করে স্বর্ণা। মনে হয়, যদি
মাযহার এখন আমার মনের কথা পাঠ করতে পারত, যদি দেখতে বা শুনতে পেত, যদি
বুঝতে পারত আসলে আমি মনে মনে কার কথা ভাবছি, তাহলে?
ভাগ্যিস, আল্লাহতায়ালা মানুষকে সেই ক্ষমতা দেননি। সে ডান পাশে কাত হয়ে নিজেকে মাযহারের কাছ থেকে একটু দূরে সরিয়ে আনার চেষ্টা করলে, মাযহার ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে, 'কই যাও?'
স্বর্ণার মনে হয়, আসলেই তো কোথায় যাচ্ছে সে, মাযহারের কাছ থেকে দূরে, বহু দূরে কোনো পাতালপুরিতে? মুখে বলে, 'কই আবার যাব? এই তো তোমার পাশেই আছি।'
মাযহার চোখ বন্ধ করেই অন্ধের মতো হাত বাড়ায়। ঘুমের মধ্যেও স্বর্ণাকে চাই তার। 'হাতাপাতা' করার জন্য। 'হাতাপাতা' স্বর্ণার বানানো শব্দ, ঘুমের মধ্যেও মাযহারের ওর শরীর হাতড়ানোর অভ্যাসটাকে আদর করে এই নামেই ডাকে স্বর্ণা। পেটে, পিঠে, বুকে, পাছায় সবখানে মাযহারের হাত বুলানো চাই। স্বর্ণা বাধা দেয় না। সে গড়িয়ে এসে মাযহারের বুকের ওপর পড়ে।
রাত বাড়ছে, ঘুমাতে হবে, কালকে সকালে অফিস, তবু ঘুম আসে না স্বর্ণার। মাযহার তার 'হাতাপাতা' শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছে, মৃদু নাক ডাকছে তার। স্বর্ণার আবার রাজিবের কথা মনে পড়ে। সেও নিশ্চয়ই এখন ইলোরার পাশে শুয়ে আছে বা ঘুমিয়ে আছে বা স্বপ্ন দেখছে বা স্বর্ণার মতোই জেগে আছে, ভাবছে স্বর্ণার কথাই। আর ইলোরা ওর গা ঘেঁষে শুয়ে থেকেও সেটা টের পাচ্ছে না। রাজিবেরও কি স্বর্ণার মতো অপরাধবোধ হয়? মনে হয় সে কাউকে ঠকাচ্ছে?
'নাহ্্। অপরাধবোধ কেন হবে? ঠকানোরই বা কি আছে? বরং আমি মনে করি ও আমাদের সম্পর্কের বেনিফিট পায়।'
'কি রকম?'
'আমি যখন তোমার সঙ্গে থাকি, সময় কাটাই, গল্প করি, তখন আমার মন ভালো থাকে, আমি বাসায় গিয়ে ইলোরার সঙ্গেও তখন ভালো ব্যবহার করি। আবার কখনও কখনও ও যেন কোনো কিছু সন্দেহ না করে, সে জন্য বেশি বেশি ওর কেয়ার করি, ওর প্রতি বেশি ভালোবাসা দেখাই, মনোযোগ দেই, লাভটা কার হয় বলো?'
রাজিব দুষ্টুমির হাসি হাসে। স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বলে, 'খামোকা নিজেকে অপরাধী ভেবে কষ্ট পেয়ে না তো, কাম অন, উই ডিজার্ভ ইচ আদার।'
রাজিবের মতো এত নির্ভার থাকতে পারে না স্বর্ণা। বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা কাঁটা বিঁধে থাকে তার, একটু নড়াচড়া করলেই খচ খচ করে সেটা খোঁচাতে থাকে।
'আচ্ছা, ইলোরার সঙ্গে তোমার সমস্যাটা কোথায়?'
স্বর্ণা একদিন জিজ্ঞেস করলে চশমার ফ্রেমের ভেতর রাজিবের ভ্রু কুঁচকে যায়।
'সমস্যা? ... সমস্যা তো নাই।'
'তাহলে কনজুগাল লাইফে, মানে ফিজিক্যালি... তোমরা কি ওকে?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে?'
'তাহলে কি?'
রাজিব উল্টা প্রশ্ন করে, 'মাযহারের সঙ্গে তোমার সব ঠিক তো?'
একটু ভাবে স্বর্ণা। হয়তো, সাড়ে ছয় বছরের সংসার জীবনটা দ্রুত পাতা উল্টে দেখে নেয়। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলে, 'হুম, সব ঠিক। আসলে মাযহার খুব ভালো।'
'ইলোরাও ভালো মেয়ে। একটু কড়া টাইপের কিন্তু মনটা নরম।'
তারা দু'জন নিঃশব্দে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। রাস্তার পাশের মেহগনি গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে। তারপর কোনোদিন হয়তো দু'জনে একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে, দুই কাপ কফি নেয়, কফিশপের স্বচ্ছ কাচের দেয়াল ভেদ করে রাস্তায় শব্দ করে চলা গাড়ির শব্দ ওদের কানে আসে না, শুধু নির্বাক ছবির দৃশ্যের মতো চোখের সামনে ধূলি উড়িয়ে গাড়িগুলোর দ্রুত ছুটে যাওয়া দেখে। কফির কাপের সঙ্গে চামচের টুংটাং শব্দ হয়।
'তাহলে আমাদের সমস্যাটি কী?'
'মানে?'
'কোথাও নিশ্চয়ই কোনো শূন্যতা আছে আমাদের, কোনো হাহাকার, কোনো গোপন বেদনা, কোনো অপ্রাপ্তি ...'
তারা দু'জনেই নিজেদের যাপিত জীবনের পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখে। স্মৃতি হাতড়ায়। কিছুটা সময় চলে যায়। দু'জনেই এক সঙ্গে বলে উঠে,
'নাহ্ ... তেমন কিছু তো পাচ্ছি না।'
'তাহলে কেন তুমি আস আমার কাছে আর আমি যাই তোমার কাছে?'
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আছে তাদের দু'জনের কাছেই, অথবা কারও কাছেই নেই। এসব প্রশ্ন হয়তো তাদের মধ্যে কখনও উচ্চারিত হয়, আবার হয়তো কখনও হয়ও না।
'আচ্ছা, এই সম্পর্কের পরিণতি কি? বলতে পারো, কোথায় গিয়ে এটা শেষ হবে?'
'শুরুতেই শেষের কথা ভাবছ কেন স্বর্ণা? যা হওয়ার তা হবেই হবে, যা পাল্টানোর ঠিক পাল্টাবে, কে সারা রা রা ...'
স্বর্ণা পাশ ফিরে শোয়। আর তখনই রাজিবের শক্ত লোমশ হাত তাকে জড়িয়ে ধরে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, 'তোমার গায়ে অজানা মাছের গন্ধ পাই, মৎস্যগন্ধা, মীনকুমারী।'
স্বর্ণার গায়ে তখন রঙিন চকচকে রূপালি আঁশ গজায়। রক্ত শীতল হয়ে যায়, নিজের পাতলা পাখনা নাড়িয়ে সে সাঁতার কাটে, ফুলকা নাড়িয়ে শ্বাস নেয়, শরীর হালকা হয়ে যায় তার, জলের তোড়ে সে একবার ভাসে আর একবার ডোবে।
রাজিবকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'তোমার গায়ে পুরনো দীঘির ধূসর শ্যাওলার গন্ধ পাই, আমার কাজল কালো শান্ত দীঘি।'
রাজিবের গায়ে তখন পানি জমে, গাঢ় সবুজ ঘন পানি, তার উপরে দুধের সরের মতো পাতলা শ্যাওলা জমে, দিনে দিনে শ্যাওলাগুলো ঘন হয়, কালচে হয়, মায়াময় হয়। দীঘিটা বলে,
'আমাতে তুমি ইচ্ছে মতো সাঁতার কাটো রঙিন মাছ।'
স্বর্ণা সাঁতার কাটতে কাটতে পাশ বদলায়। আর মাযহার তাকে বুকে টেনে বলে, 'রঙিন মাছ, তুমি দীঘিতে কেন? মুক্ত সমুদ্রে সাঁতার কাটো, আমি তোমার নিরিবিলি বঙ্গোপসাগর, তোমার নীল ফেনিল ঢেউ ...'
'কিন্তু তুমি যে বড্ড লোনা, বড্ড উত্তাল! আমি ছোট মাছ, লবণ পানিতে আমার শরীর পচে যায়, আমার চোখ গলে যায়, আমার বাঁচার জন্য চাই মিঠা পানি, চাই শান্ত জল ...'
'তোমার জন্য আমি আমার সব জল বদলে ফেলব ছোট্ট মাছ, সব লবণ সরিয়ে দেব, জগতের সব মিঠা পানি নিজের দিকে টেনে আনব, আমি সমুদ্র, আমি সব পারি।'
সমুদ্রের কথা শুনে কল কল করে ওঠে দীঘির পানি। বলে, 'ও মিথ্যা বলছে ছোট মাছ, তুমি আমার কাছেই থাক!'
গর্জন করে ওঠে সমুদ্র 'বদ্ধ দীঘির কথা শুনো না, ওখানে যেও না রঙিন মাছ, তুমি আমার মধ্যে থাক!'
দীঘি আর সমুদ্রের রেষারেষিতে আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকায়। ঝুম বৃষ্টি নামে। স্বর্ণার শরীর থেকে মাছের আঁশ খসে যায়, রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠে, শরীর ভারী হয়ে যায়। তার মৎস্য শরীর ধীরে ধীরে মানবীর শরীরে রূপান্তরিত হলে স্বর্ণার ঘুম ভেঙে যায়। আর তখনও সেই একই প্রশ্ন তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে।
'কেন আমি রাজিবের কাছে যাই? আর রাজিবই-বা কেন আসে আমার কাছে? বিবাহিত জীবনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি কাটাতে? স্বাদ বদল করতে? বৈচিত্র্য খুঁজতে?'
'আচ্ছা, আমি বুঝি না, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কি খুব জরুরি?'
রাজিব খানিকটা অসহিষ্ণু ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করে। অভিমানী সুরে বলে,
'দেখ, মনের মধ্যে এত সংশয়, এত দ্বিধা নিয়ে তুমি আর এসো না, প্লিজ!'
স্বর্ণা রাজিবকে বোঝাতে পারে না যে, জগৎ সংসারের হাজারো কাজের ভিড়ে তার মনের ভেতরে কোনো এক উদাস বাউল অহোরাত্রি বাঁশি বাজায়। সেই করুণ বাঁশির সুর যেন কৌতূহল ভরে জানতে চায়, 'আসলে, তোমরা কি কেউ কাউকে সম্পূর্ণ করে পাও?'
স্বর্ণা পাল্টা প্রশ্ন করে, 'সম্পূর্ণ করে কি আসলে কেউ কাউকে পায়?'
বাঁশি এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। স্বর্ণা কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর বলে, ' না, সম্পূর্ণটা হয়তো পাই না।'
'তাহলে?'
'রাজিব তো প্রায়ই বলে, সম্পূর্ণ করে পাওয়া এক রকমের আনন্দ আবার টুকরো করে, ভাগ করে কিংবা ধরো চুরি করে পাওয়াটা অন্য রকমের আনন্দ।'
'আনন্দ না উত্তেজনা?'
বাঁশি অবিকল যেন মাযহারের গলার স্বর নকল করে জানতে চায়। স্বর্ণা চমকে উঠে। স্বর্ণা বিব্রত হয়। সে এক রকম চিৎকার করে উঠে,
'জানি না। জানতে চাইও না। বাঁশি তুমি থাম। তোমার এসব বোকা বোকা প্রশ্ন করা থামাও। অন্য কোনো সুর বাজাও। অন্য কোনো কথা বলো।'
বাঁশি তখন মাযহারের মতোই হাহ... হাহ করে গা দুলিয়ে হাসে। স্বর্ণার খুব ভয় করে। কোনো আঁধার অতল গহ্বরে পড়ে যাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর বাজে অনুভূতি হয় তার। দু'হাত বাড়িয়ে কোনো অবলম্বন খুঁজে সে, যেন কোনো কিছু ধরে নিজের পতন ঠেকাতে চায়।
বাঁশি তখন আশাবরি ঠাটের শুদ্ধ রে না বাজিয়ে কোমল রে বাজাতে থাকে, ফলে ঘরজুড়ে ভৈরবী ঠাটের শ্যামল নরম রঙ উৎপন্ন হয়। 'সকাল বেলার আলোয় বাজে বিদায় ব্যথার ভৈরবী। আন্্ বাঁশি তোর, আয় কবি।'
বাঁশির গাওয়া শেষের গানের রেশ, আর সুরের মায়া কানে নিয়ে অতল গহ্বর থেকে নাকি নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে আসে স্বর্ণা। সে টের পায় বিনম্র ভঙ্গিতে সূর্য উঠছে, শহরের উঁচু সব দালানের কারণে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার সি্নগ্ধ আলোর নীলাভ শুভ্রতা অনুভব করা যাচ্ছে। কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই, দুঃখ নেই, অশান্তি নেই। যত অশান্তি, যত অস্বস্তি সব যেন শুধু স্বর্ণার মনে।
মাযহার বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্বর্ণাও নিজের ব্যাগ গোছায়।
'কই যাও?' মাযহার ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করে।
'নিরুদ্দেশ যাত্রায়।'
মাযহার হাসে, 'ট্যুর আছে?'
'হুম!' স্বর্ণা সংক্ষেপে বলে।
মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। রাজিবের ফোন। ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেলে স্বর্ণা ফোনের সুইচ অফ করে দেয়।
নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার সময় কেউ সঙ্গে না থাকলেই ভালো।
ভাগ্যিস, আল্লাহতায়ালা মানুষকে সেই ক্ষমতা দেননি। সে ডান পাশে কাত হয়ে নিজেকে মাযহারের কাছ থেকে একটু দূরে সরিয়ে আনার চেষ্টা করলে, মাযহার ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে, 'কই যাও?'
স্বর্ণার মনে হয়, আসলেই তো কোথায় যাচ্ছে সে, মাযহারের কাছ থেকে দূরে, বহু দূরে কোনো পাতালপুরিতে? মুখে বলে, 'কই আবার যাব? এই তো তোমার পাশেই আছি।'
মাযহার চোখ বন্ধ করেই অন্ধের মতো হাত বাড়ায়। ঘুমের মধ্যেও স্বর্ণাকে চাই তার। 'হাতাপাতা' করার জন্য। 'হাতাপাতা' স্বর্ণার বানানো শব্দ, ঘুমের মধ্যেও মাযহারের ওর শরীর হাতড়ানোর অভ্যাসটাকে আদর করে এই নামেই ডাকে স্বর্ণা। পেটে, পিঠে, বুকে, পাছায় সবখানে মাযহারের হাত বুলানো চাই। স্বর্ণা বাধা দেয় না। সে গড়িয়ে এসে মাযহারের বুকের ওপর পড়ে।
রাত বাড়ছে, ঘুমাতে হবে, কালকে সকালে অফিস, তবু ঘুম আসে না স্বর্ণার। মাযহার তার 'হাতাপাতা' শেষ করে ঘুমিয়ে পড়েছে, মৃদু নাক ডাকছে তার। স্বর্ণার আবার রাজিবের কথা মনে পড়ে। সেও নিশ্চয়ই এখন ইলোরার পাশে শুয়ে আছে বা ঘুমিয়ে আছে বা স্বপ্ন দেখছে বা স্বর্ণার মতোই জেগে আছে, ভাবছে স্বর্ণার কথাই। আর ইলোরা ওর গা ঘেঁষে শুয়ে থেকেও সেটা টের পাচ্ছে না। রাজিবেরও কি স্বর্ণার মতো অপরাধবোধ হয়? মনে হয় সে কাউকে ঠকাচ্ছে?
'নাহ্্। অপরাধবোধ কেন হবে? ঠকানোরই বা কি আছে? বরং আমি মনে করি ও আমাদের সম্পর্কের বেনিফিট পায়।'
'কি রকম?'
'আমি যখন তোমার সঙ্গে থাকি, সময় কাটাই, গল্প করি, তখন আমার মন ভালো থাকে, আমি বাসায় গিয়ে ইলোরার সঙ্গেও তখন ভালো ব্যবহার করি। আবার কখনও কখনও ও যেন কোনো কিছু সন্দেহ না করে, সে জন্য বেশি বেশি ওর কেয়ার করি, ওর প্রতি বেশি ভালোবাসা দেখাই, মনোযোগ দেই, লাভটা কার হয় বলো?'
রাজিব দুষ্টুমির হাসি হাসে। স্বর্ণার চোখে চোখ রেখে বলে, 'খামোকা নিজেকে অপরাধী ভেবে কষ্ট পেয়ে না তো, কাম অন, উই ডিজার্ভ ইচ আদার।'
রাজিবের মতো এত নির্ভার থাকতে পারে না স্বর্ণা। বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা কাঁটা বিঁধে থাকে তার, একটু নড়াচড়া করলেই খচ খচ করে সেটা খোঁচাতে থাকে।
'আচ্ছা, ইলোরার সঙ্গে তোমার সমস্যাটা কোথায়?'
স্বর্ণা একদিন জিজ্ঞেস করলে চশমার ফ্রেমের ভেতর রাজিবের ভ্রু কুঁচকে যায়।
'সমস্যা? ... সমস্যা তো নাই।'
'তাহলে কনজুগাল লাইফে, মানে ফিজিক্যালি... তোমরা কি ওকে?'
'হ্যাঁ।'
'তাহলে?'
'তাহলে কি?'
রাজিব উল্টা প্রশ্ন করে, 'মাযহারের সঙ্গে তোমার সব ঠিক তো?'
একটু ভাবে স্বর্ণা। হয়তো, সাড়ে ছয় বছরের সংসার জীবনটা দ্রুত পাতা উল্টে দেখে নেয়। তারপর মাথা নাড়িয়ে বলে, 'হুম, সব ঠিক। আসলে মাযহার খুব ভালো।'
'ইলোরাও ভালো মেয়ে। একটু কড়া টাইপের কিন্তু মনটা নরম।'
তারা দু'জন নিঃশব্দে পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। রাস্তার পাশের মেহগনি গাছ থেকে পাতা ঝরে পড়ে। তারপর কোনোদিন হয়তো দু'জনে একটা রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে, দুই কাপ কফি নেয়, কফিশপের স্বচ্ছ কাচের দেয়াল ভেদ করে রাস্তায় শব্দ করে চলা গাড়ির শব্দ ওদের কানে আসে না, শুধু নির্বাক ছবির দৃশ্যের মতো চোখের সামনে ধূলি উড়িয়ে গাড়িগুলোর দ্রুত ছুটে যাওয়া দেখে। কফির কাপের সঙ্গে চামচের টুংটাং শব্দ হয়।
'তাহলে আমাদের সমস্যাটি কী?'
'মানে?'
'কোথাও নিশ্চয়ই কোনো শূন্যতা আছে আমাদের, কোনো হাহাকার, কোনো গোপন বেদনা, কোনো অপ্রাপ্তি ...'
তারা দু'জনেই নিজেদের যাপিত জীবনের পাতাগুলো উল্টেপাল্টে দেখে। স্মৃতি হাতড়ায়। কিছুটা সময় চলে যায়। দু'জনেই এক সঙ্গে বলে উঠে,
'নাহ্ ... তেমন কিছু তো পাচ্ছি না।'
'তাহলে কেন তুমি আস আমার কাছে আর আমি যাই তোমার কাছে?'
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আছে তাদের দু'জনের কাছেই, অথবা কারও কাছেই নেই। এসব প্রশ্ন হয়তো তাদের মধ্যে কখনও উচ্চারিত হয়, আবার হয়তো কখনও হয়ও না।
'আচ্ছা, এই সম্পর্কের পরিণতি কি? বলতে পারো, কোথায় গিয়ে এটা শেষ হবে?'
'শুরুতেই শেষের কথা ভাবছ কেন স্বর্ণা? যা হওয়ার তা হবেই হবে, যা পাল্টানোর ঠিক পাল্টাবে, কে সারা রা রা ...'
স্বর্ণা পাশ ফিরে শোয়। আর তখনই রাজিবের শক্ত লোমশ হাত তাকে জড়িয়ে ধরে। কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, 'তোমার গায়ে অজানা মাছের গন্ধ পাই, মৎস্যগন্ধা, মীনকুমারী।'
স্বর্ণার গায়ে তখন রঙিন চকচকে রূপালি আঁশ গজায়। রক্ত শীতল হয়ে যায়, নিজের পাতলা পাখনা নাড়িয়ে সে সাঁতার কাটে, ফুলকা নাড়িয়ে শ্বাস নেয়, শরীর হালকা হয়ে যায় তার, জলের তোড়ে সে একবার ভাসে আর একবার ডোবে।
রাজিবকে জড়িয়ে ধরে বলে, 'তোমার গায়ে পুরনো দীঘির ধূসর শ্যাওলার গন্ধ পাই, আমার কাজল কালো শান্ত দীঘি।'
রাজিবের গায়ে তখন পানি জমে, গাঢ় সবুজ ঘন পানি, তার উপরে দুধের সরের মতো পাতলা শ্যাওলা জমে, দিনে দিনে শ্যাওলাগুলো ঘন হয়, কালচে হয়, মায়াময় হয়। দীঘিটা বলে,
'আমাতে তুমি ইচ্ছে মতো সাঁতার কাটো রঙিন মাছ।'
স্বর্ণা সাঁতার কাটতে কাটতে পাশ বদলায়। আর মাযহার তাকে বুকে টেনে বলে, 'রঙিন মাছ, তুমি দীঘিতে কেন? মুক্ত সমুদ্রে সাঁতার কাটো, আমি তোমার নিরিবিলি বঙ্গোপসাগর, তোমার নীল ফেনিল ঢেউ ...'
'কিন্তু তুমি যে বড্ড লোনা, বড্ড উত্তাল! আমি ছোট মাছ, লবণ পানিতে আমার শরীর পচে যায়, আমার চোখ গলে যায়, আমার বাঁচার জন্য চাই মিঠা পানি, চাই শান্ত জল ...'
'তোমার জন্য আমি আমার সব জল বদলে ফেলব ছোট্ট মাছ, সব লবণ সরিয়ে দেব, জগতের সব মিঠা পানি নিজের দিকে টেনে আনব, আমি সমুদ্র, আমি সব পারি।'
সমুদ্রের কথা শুনে কল কল করে ওঠে দীঘির পানি। বলে, 'ও মিথ্যা বলছে ছোট মাছ, তুমি আমার কাছেই থাক!'
গর্জন করে ওঠে সমুদ্র 'বদ্ধ দীঘির কথা শুনো না, ওখানে যেও না রঙিন মাছ, তুমি আমার মধ্যে থাক!'
দীঘি আর সমুদ্রের রেষারেষিতে আকাশে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকায়। ঝুম বৃষ্টি নামে। স্বর্ণার শরীর থেকে মাছের আঁশ খসে যায়, রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠে, শরীর ভারী হয়ে যায়। তার মৎস্য শরীর ধীরে ধীরে মানবীর শরীরে রূপান্তরিত হলে স্বর্ণার ঘুম ভেঙে যায়। আর তখনও সেই একই প্রশ্ন তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে।
'কেন আমি রাজিবের কাছে যাই? আর রাজিবই-বা কেন আসে আমার কাছে? বিবাহিত জীবনের ক্লান্তি আর একঘেয়েমি কাটাতে? স্বাদ বদল করতে? বৈচিত্র্য খুঁজতে?'
'আচ্ছা, আমি বুঝি না, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কি খুব জরুরি?'
রাজিব খানিকটা অসহিষ্ণু ভঙ্গিতেই জিজ্ঞেস করে। অভিমানী সুরে বলে,
'দেখ, মনের মধ্যে এত সংশয়, এত দ্বিধা নিয়ে তুমি আর এসো না, প্লিজ!'
স্বর্ণা রাজিবকে বোঝাতে পারে না যে, জগৎ সংসারের হাজারো কাজের ভিড়ে তার মনের ভেতরে কোনো এক উদাস বাউল অহোরাত্রি বাঁশি বাজায়। সেই করুণ বাঁশির সুর যেন কৌতূহল ভরে জানতে চায়, 'আসলে, তোমরা কি কেউ কাউকে সম্পূর্ণ করে পাও?'
স্বর্ণা পাল্টা প্রশ্ন করে, 'সম্পূর্ণ করে কি আসলে কেউ কাউকে পায়?'
বাঁশি এই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। স্বর্ণা কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর বলে, ' না, সম্পূর্ণটা হয়তো পাই না।'
'তাহলে?'
'রাজিব তো প্রায়ই বলে, সম্পূর্ণ করে পাওয়া এক রকমের আনন্দ আবার টুকরো করে, ভাগ করে কিংবা ধরো চুরি করে পাওয়াটা অন্য রকমের আনন্দ।'
'আনন্দ না উত্তেজনা?'
বাঁশি অবিকল যেন মাযহারের গলার স্বর নকল করে জানতে চায়। স্বর্ণা চমকে উঠে। স্বর্ণা বিব্রত হয়। সে এক রকম চিৎকার করে উঠে,
'জানি না। জানতে চাইও না। বাঁশি তুমি থাম। তোমার এসব বোকা বোকা প্রশ্ন করা থামাও। অন্য কোনো সুর বাজাও। অন্য কোনো কথা বলো।'
বাঁশি তখন মাযহারের মতোই হাহ... হাহ করে গা দুলিয়ে হাসে। স্বর্ণার খুব ভয় করে। কোনো আঁধার অতল গহ্বরে পড়ে যাওয়ার মতো ভয়ঙ্কর বাজে অনুভূতি হয় তার। দু'হাত বাড়িয়ে কোনো অবলম্বন খুঁজে সে, যেন কোনো কিছু ধরে নিজের পতন ঠেকাতে চায়।
বাঁশি তখন আশাবরি ঠাটের শুদ্ধ রে না বাজিয়ে কোমল রে বাজাতে থাকে, ফলে ঘরজুড়ে ভৈরবী ঠাটের শ্যামল নরম রঙ উৎপন্ন হয়। 'সকাল বেলার আলোয় বাজে বিদায় ব্যথার ভৈরবী। আন্্ বাঁশি তোর, আয় কবি।'
বাঁশির গাওয়া শেষের গানের রেশ, আর সুরের মায়া কানে নিয়ে অতল গহ্বর থেকে নাকি নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে আসে স্বর্ণা। সে টের পায় বিনম্র ভঙ্গিতে সূর্য উঠছে, শহরের উঁচু সব দালানের কারণে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না, শুধু তার সি্নগ্ধ আলোর নীলাভ শুভ্রতা অনুভব করা যাচ্ছে। কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই, দুঃখ নেই, অশান্তি নেই। যত অশান্তি, যত অস্বস্তি সব যেন শুধু স্বর্ণার মনে।
মাযহার বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্বর্ণাও নিজের ব্যাগ গোছায়।
'কই যাও?' মাযহার ক্যাজুয়ালি জিজ্ঞেস করে।
'নিরুদ্দেশ যাত্রায়।'
মাযহার হাসে, 'ট্যুর আছে?'
'হুম!' স্বর্ণা সংক্ষেপে বলে।
মোবাইল ফোন বেজে ওঠে। রাজিবের ফোন। ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেলে স্বর্ণা ফোনের সুইচ অফ করে দেয়।
নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়ার সময় কেউ সঙ্গে না থাকলেই ভালো।
Thursday, February 12, 2015
মায়া-হরিণ by নির্মলেন্দু গুণ
![]() |
| নির্মলেন্দু গুণ |
কাল তো প্রায় তোমার প্রেমে
পড়েই গিয়েছিলাম।
অজানা এক নেশায় পাগল
রাত ছিল কাল রাতে।
পড়েই গিয়েছিলাম বলি কেন?
পড়ে গিয়েছিলাম বলাই শ্রেয়।
তোমার প্রেমে পড়েছিলাম যে,
বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই তাতে।
সদ্যকাটা চাকের মধুর মতো
কাল সেই মদিরঘন রাত,
শ্যালা নদীর তীরবর্তী বনে
কেঁপেছিল বাঘিনী-গর্জনে।
বৃদ্ধ হলেও বাঘ তো আমি বটে,
বাস্তবে না হলেও তোমার ডাকে
মনে-মনে দিয়েছিলাম সাড়া।
মায়া-হরিণ জড়াতে যাবো যেই,
দেখি তোমার আমার মাঝখানে
বন বাওয়ালী যমের মত খাড়া।
------------------------
অজানা এক নেশায় পাগল
রাত ছিল কাল রাতে।
পড়েই গিয়েছিলাম বলি কেন?
পড়ে গিয়েছিলাম বলাই শ্রেয়।
তোমার প্রেমে পড়েছিলাম যে,
বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই তাতে।
সদ্যকাটা চাকের মধুর মতো
কাল সেই মদিরঘন রাত,
শ্যালা নদীর তীরবর্তী বনে
কেঁপেছিল বাঘিনী-গর্জনে।
বৃদ্ধ হলেও বাঘ তো আমি বটে,
বাস্তবে না হলেও তোমার ডাকে
মনে-মনে দিয়েছিলাম সাড়া।
মায়া-হরিণ জড়াতে যাবো যেই,
দেখি তোমার আমার মাঝখানে
বন বাওয়ালী যমের মত খাড়া।
------------------------
নির্মলেন্দু গুণ
০৫.০১.২০১৫
০৫.০১.২০১৫
=====================================
প্রেমে পড়ার খবর -নয়া দিগন্ত
কিশোরীকে বিয়ের দাবীতে বৃদ্ধের অনশন
বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা
প্রবাদ
আছে প্রেম মানে না, জাতি,বর্ণ, ধর্ম ও বয়স। বিয়ের দাবীতে প্রেমিকারা
প্রেমিকের বাড়ীতে অনশনের ঘটনা ঘটলেও এবার তার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। এবার ৬০
বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ১৩ বছর বয়সী প্রেমিকার বাড়ীতে বিয়ের দাবীতে দুইদিন ধরে
অনশন করছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের
বনগ্রামে। ওই বৃদ্ধের নাম আলাউদ্দিন শেখ (৬০)। তার ৪ মেয়ে ১ ছেলে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বনগ্রামের ওই বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, আলাউদ্দিন শেখ তার ১৩বছর বয়সী প্রেমিকার বাড়ীতে বিয়ের দাবীতে অবস্থান করছে। খবর শুনে আশপাশের এলাকার লোকজন ভীড় জমিয়েছে। এলাকায় নানা ধরনের গুঞ্জন ও রম্য কথা বার্তা শোনা যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, অনশনের খবর শুনে আমরা দেখতে এসেছি। তবে এনিয়ে কেউ গ্রাম্য শালিসের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এতে এলাকার পরিবেশ ও সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।
ওই বাড়ীর মালিক জানান, তার কন্যার বয়স ১৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে পাশের বাড়ীর আলাউদ্দিন শেখ নানা ভাবে উত্যক্ত করে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বুধবার থেকে বিয়ের দাবী নিয়ে আলাউদ্দিন শেখ বাড়ীতে উঠেছে।
১৩ বছর বয়সী ওই তরুনী জানায়, তার সাথে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক চলে আসছে। সে তাকেই বিয়ে করতে কোন আপত্তি নেই।
আলাউদ্দিন শেখ জানান, আমি তাকে ভালোবাসি, তাকেই বিয়ে করব। কেউ বাধা দিয়ে ঠেকাতে পারবে না। কারন আমরা দু’জনই বিয়েতে রাজি আছি।
আলাউদ্দিনের স্ত্রী জানান, বাধা দিয়েও ঠেকাতে পারছি না, দুইদিন ধরে ওই বাড়ীতে উঠেছে। এনিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বনগ্রামের ওই বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, আলাউদ্দিন শেখ তার ১৩বছর বয়সী প্রেমিকার বাড়ীতে বিয়ের দাবীতে অবস্থান করছে। খবর শুনে আশপাশের এলাকার লোকজন ভীড় জমিয়েছে। এলাকায় নানা ধরনের গুঞ্জন ও রম্য কথা বার্তা শোনা যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, অনশনের খবর শুনে আমরা দেখতে এসেছি। তবে এনিয়ে কেউ গ্রাম্য শালিসের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এতে এলাকার পরিবেশ ও সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।
ওই বাড়ীর মালিক জানান, তার কন্যার বয়স ১৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে পাশের বাড়ীর আলাউদ্দিন শেখ নানা ভাবে উত্যক্ত করে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বুধবার থেকে বিয়ের দাবী নিয়ে আলাউদ্দিন শেখ বাড়ীতে উঠেছে।
১৩ বছর বয়সী ওই তরুনী জানায়, তার সাথে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক চলে আসছে। সে তাকেই বিয়ে করতে কোন আপত্তি নেই।
আলাউদ্দিন শেখ জানান, আমি তাকে ভালোবাসি, তাকেই বিয়ে করব। কেউ বাধা দিয়ে ঠেকাতে পারবে না। কারন আমরা দু’জনই বিয়েতে রাজি আছি।
আলাউদ্দিনের স্ত্রী জানান, বাধা দিয়েও ঠেকাতে পারছি না, দুইদিন ধরে ওই বাড়ীতে উঠেছে। এনিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
![]() |
| আলাউদ্দিন শেখ (৬০) |
শিল্পের ত্রিমুখী বর্তমান by শুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়
বেঙ্গল
গ্যালারিতে চলছে এ সময়ের তিন প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীর চিত্রকর্ম প্রদর্শনী_
'দ্য প্যারাডক্সিক্যাল নাউ'। আনিসুজ্জামান সোহেল, ফিরোজ মাহমুদ ও ইয়াসমিন
জাহান নুপুর_ এ শিল্পীত্রয়ী তাদের কাজের ধরন ও সৌকর্যে আলাদা। অঙ্কনরীতির
সরলীকরণ, বিচিত্র প্রতীকের ব্যবহার, ইতিহাস চেতনা, সত্যের সুদৃঢ় প্রকাশ,
বর্তমানকে অঙ্গীকার করবার প্রচেষ্টা_ এমন নানাভাবেই এই তিন শিল্পীর চিন্তার
জগৎ থেকে শুরু করে শিল্পচর্চা ও প্রয়োগভঙ্গিগত দিক থেকে তিন রকম। কিন্তু
সেই তিন রকমের শিল্প বাস্তবতাকে একটি বর্তমানে এনে দাঁড় করিয়ে, আমাদের এই
বিচিত্র, বিপরীতধর্মী আর ওলটপালট বাস্তবতার এক শিল্পব্যঞ্জনাই যেন তৈরি
করেছে বেঙ্গলের এই নতুন আয়োজন। সমসাময়িক ত্রিমুখী বৈশিষ্ট্যে আলোকিত তিন
শিল্পীকে একটি পরিসরে উপস্থাপনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে, তাকে অনেকটাই নতুন
তাৎপর্যে মণ্ডিত করতে পেরেছে এই প্রদর্শনী। একই সময়বিন্দুতে দাঁড়িয়ে তিনজন
শিল্পীর শিল্পরচনার পার্থক্যকে যেমন এখানে উপজীব্য করা যায়_ তেমনি এখানে
স্পষ্ট হয় এই সময়ের অন্তর্গত বিপরীতধর্মিতাও। যে বৈপরীত্য নিয়ে আমরা ক্রমশ
ধাবিত হচ্ছি আসন্ন কোনো এক ধ্বংসের পথে।
আনিসুজ্জামান সোহেল রেখাপ্রধান কাজ করেন অনেক আগে থেকেই। তার রেখায় ধরা পড়ে সমাজবাস্তবতার প্রতি বিকট এক ধরনের কটাক্ষ, প্রতিবাদ। ক্রমশ নষ্ট হতে থাকা সময়ের একটা প্রামাণ্য উপলব্ধি বিস্তৃত হয় তার কাজে। এই ক্রমশ প্যাকেজনির্ভর হয়ে আসা পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রতিনিয়ত যে যন্ত্রণা_ শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল তার ক্যানভাসে সেই যন্ত্রণাকে রেখাবদ্ধ করেন । বিভিন্ন ফর্মে জীবনের বিচিত্র যন্ত্রণা এবং তাকে বয়ে চলার দৃশ্যাবলিকে তুলে ধরেন তার চিত্রকর্মে। সেখানে দেখা যায় সময়ের অন্তর্বর্তী নানান উপাদান। এসব উপাদান আমাদের খুবই পরিচিত এবং এই পরিচিত জিনিসপত্রের জঞ্জালের মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়ে, আমাদের সময়টা যেন কাতরাচ্ছে। সেই কাতরতা আর আর্তচিৎকারের অবয়ব থাকে আনিসুজ্জামানের ছবিতে। আর এ সবকিছুই তিনি প্রকাশ করেন রৈখিক এক গতিময়তার মাধ্যমে। সময়টাও যেমন বড্ড গতিশীল, আর শিল্পীর করণকৌশলের গতিও চিত্রকর্মে সেই আক্রান্ত গতিময়তারই অনুগামী। অস্তিত্ব সংকটের আধুনিক চিত্রায়ণ বেশ যত্ন ও কৌশলের সঙ্গে ঠাঁই করে নেয় তার কাজে। যুদ্ধ, অস্ত্র, বাজার, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ সবই উঠে আসে রাজনীতি সচেতনতায়। বক্তব্যে উচ্চকিত এবং সরাসরি হলেও রঙের ব্যবহারে তিনি উচ্চকিত নন, বরং সচেতনভাবে মিতব্যয়ী। ড্রইং ও পেইন্টিংয়ের যৌথতায় ঘরানা তৈরি হয় তার ছবির নিজস্ব।
কালোবাজার মানুষকে এবং শিল্পকে পণ্য করে, আনিসুজ্জামান সোহেল দাঁড়াতে চান এর বিরুদ্ধে। তার ক্যানভাসও সম্পূর্ণ কালো। প্রতিনিয়ত যে বাণিজ্যিক মনোভাব মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে, দুর্বিষহ করে তুলছে_ শিল্পের মাধ্যমে সরাসরি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে চান শিল্পী। পুরো কালো ক্যানভাসে কাজ করা সহজ কথা নয়, তার এই কাজগুলোকে খুব সহজেই মনে হতে পারে সমাজের এক্স-রে রিপোর্ট। শিল্পী বলেন, 'বিব্রত অবজারভেশনের সঙ্গে কুঁচকে যাওয়া ইনট্যুইশন মিলিয়ে আমি শুধু ম্যানিপুলেটেড মেটাফোরের আশ্রয় নিই, যারা নিজেরাই লড়ে চলে পরস্পর দ্বন্দে-দ্বন্দ্বে অশেষ সংঘাতে। একে একটা খেলার কান্নাও বলা চলে, আবার কান্নার খেলাও বটে! সৌন্দর্য আর পাশবিক কদর্যতাও এখানে পদে পদে যুদ্ধে লড়ে, অমোঘ অমীমাংসিত! রিয়্যাল আর সাররিয়্যালের অনামা অচেনা কোনো মাঝখানে ওভাবেই ঝুলে থাকি আমি আর আমার চেষ্টা!' প্রদর্শনীতে 'কিপ স্ক্রিমিং' শিরোনামের বিশাল ক্যানভাসে তার এই সময় চেতনাকে দেখতে পাবেন দর্শক।
শিল্পী ফিরোজ মাহমুদের যাত্রাটা আবার বর্ণিল। তবে সেই বর্ণময়তার ভেতরে ভ্রমণ আছে ইতিহাসের, আমাদের বিগত পরাজয়ের, শোষিত হয়ে পড়ে থাকা হাজার বছরের।
উপনিবেশকালীন সময়ের যুদ্ধ-বিদ্রোহ, সংঘাত এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের প্রতীকায়িত উপস্থাপনা দেখা যায় তার চিত্রকর্মে। বাংলার নবাবদের দুর্ভাগ্য আর স্বাধীনতা হারানো শিল্পীর চিন্তার বিষয়বস্তু। এবং ইতিহাসের সেই কালপর্বের নানা চরিত্র, মোটিফ, প্রতীক শিল্পীর ক্যানভাসে স্থান পায়। দক্ষ ড্রইংয়ের মাধ্যমে উজ্জ্বল রঙ এবং নানামাত্রিক মোটিফের ব্যবহার ফিরোজ মাহমুদের কাজকে ইতিহাস আর শিল্পীর চেতনাকে ছাড়িয়ে নান্দনিক এক মাত্রাও দান করে। তার ছবিতে রহস্যময় কিংবা ঐতিহাসিক কোনো অশনিসংকেতের প্রতীক হিসেবে প্যাঁচার উপস্থিতি রয়েছে। সঙ্গে এসেছে তরবারি, ঘোড়া, তীর, ধনুক। স্টেনসিলের এই কাজগুলো শিল্পী ফিরোজ মাহমুদের মিশ্র করণকৌশলের দক্ষতারই পরিচায়ক। শিল্পী তার 'সিনারিও' সিরিজের ছয়টি কাজের মাধ্যমে সেই প্রমাণ রেখেছেন।
শিল্পী ইয়াসমিন জাহান নুপুরের কাজের বিষয়বস্তু প্রাচীন স্থাপনার নির্মাণশৈলী। বিশেষ করে মোগল আমলের স্থাপত্যকর্মের বিভিন্ন নমুনা_ যেমন, সে সময়ের দরজা, জানালা, স্তম্ভ, গম্বুজ। এসব জিনিসের নির্মাণশৈলী শিল্পী নুপুর লক্ষ্য করেন তার রূপান্তর চেতনার অনুষঙ্গ হিসেবে। তার শিল্পচর্চায় সময় খননের যে প্রচেষ্টা_ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসীম মহাকাশের নানা রহস্যময়তা। জলরঙে 'মেমোরি অব দ্য আর্থ' শিরোনামে তার যে কাজটি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, তা চিরাচরিত জলরঙের ছবির ধারণাকে ভেঙে দেয় একেবারেই। শুধু তাই নয়, জলরঙের স্বাভাবিক প্রয়োগকে শিল্পী তার সূক্ষ্ম প্রয়োগদক্ষতায় নতুন এক মাত্রা প্রদান করেছেন।
'গোল্ডেন ডোরস', 'লুসিড ড্রিম', 'মেমোরি অব দ্য আর্থ'_ এ চিত্রকর্মগুলো শিল্পপিপাসুদের নতুনত্বের সঙ্গে বিচিত্র শিল্পচিন্তার সন্ধান দিতে পারে। আর এ তিন শিল্পীর তিন ধরনের কাজকে একই প্রদর্শনীতে নতুন এক দৃষ্টি নিয়ে উপভোগ করবার সুযোগ তো থাকছেই। প্রদর্শনীতে তিন শিল্পীর ২৬টি ড্রইং এবং ১০টি স্থাপনাকর্মসহ মোট শিল্পকর্মের সংখ্যা ৩৬টি। প্রদর্শনী আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
আনিসুজ্জামান সোহেল রেখাপ্রধান কাজ করেন অনেক আগে থেকেই। তার রেখায় ধরা পড়ে সমাজবাস্তবতার প্রতি বিকট এক ধরনের কটাক্ষ, প্রতিবাদ। ক্রমশ নষ্ট হতে থাকা সময়ের একটা প্রামাণ্য উপলব্ধি বিস্তৃত হয় তার কাজে। এই ক্রমশ প্যাকেজনির্ভর হয়ে আসা পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রতিনিয়ত যে যন্ত্রণা_ শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল তার ক্যানভাসে সেই যন্ত্রণাকে রেখাবদ্ধ করেন । বিভিন্ন ফর্মে জীবনের বিচিত্র যন্ত্রণা এবং তাকে বয়ে চলার দৃশ্যাবলিকে তুলে ধরেন তার চিত্রকর্মে। সেখানে দেখা যায় সময়ের অন্তর্বর্তী নানান উপাদান। এসব উপাদান আমাদের খুবই পরিচিত এবং এই পরিচিত জিনিসপত্রের জঞ্জালের মধ্যে আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়ে, আমাদের সময়টা যেন কাতরাচ্ছে। সেই কাতরতা আর আর্তচিৎকারের অবয়ব থাকে আনিসুজ্জামানের ছবিতে। আর এ সবকিছুই তিনি প্রকাশ করেন রৈখিক এক গতিময়তার মাধ্যমে। সময়টাও যেমন বড্ড গতিশীল, আর শিল্পীর করণকৌশলের গতিও চিত্রকর্মে সেই আক্রান্ত গতিময়তারই অনুগামী। অস্তিত্ব সংকটের আধুনিক চিত্রায়ণ বেশ যত্ন ও কৌশলের সঙ্গে ঠাঁই করে নেয় তার কাজে। যুদ্ধ, অস্ত্র, বাজার, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ সবই উঠে আসে রাজনীতি সচেতনতায়। বক্তব্যে উচ্চকিত এবং সরাসরি হলেও রঙের ব্যবহারে তিনি উচ্চকিত নন, বরং সচেতনভাবে মিতব্যয়ী। ড্রইং ও পেইন্টিংয়ের যৌথতায় ঘরানা তৈরি হয় তার ছবির নিজস্ব।
কালোবাজার মানুষকে এবং শিল্পকে পণ্য করে, আনিসুজ্জামান সোহেল দাঁড়াতে চান এর বিরুদ্ধে। তার ক্যানভাসও সম্পূর্ণ কালো। প্রতিনিয়ত যে বাণিজ্যিক মনোভাব মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে, দুর্বিষহ করে তুলছে_ শিল্পের মাধ্যমে সরাসরি তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে চান শিল্পী। পুরো কালো ক্যানভাসে কাজ করা সহজ কথা নয়, তার এই কাজগুলোকে খুব সহজেই মনে হতে পারে সমাজের এক্স-রে রিপোর্ট। শিল্পী বলেন, 'বিব্রত অবজারভেশনের সঙ্গে কুঁচকে যাওয়া ইনট্যুইশন মিলিয়ে আমি শুধু ম্যানিপুলেটেড মেটাফোরের আশ্রয় নিই, যারা নিজেরাই লড়ে চলে পরস্পর দ্বন্দে-দ্বন্দ্বে অশেষ সংঘাতে। একে একটা খেলার কান্নাও বলা চলে, আবার কান্নার খেলাও বটে! সৌন্দর্য আর পাশবিক কদর্যতাও এখানে পদে পদে যুদ্ধে লড়ে, অমোঘ অমীমাংসিত! রিয়্যাল আর সাররিয়্যালের অনামা অচেনা কোনো মাঝখানে ওভাবেই ঝুলে থাকি আমি আর আমার চেষ্টা!' প্রদর্শনীতে 'কিপ স্ক্রিমিং' শিরোনামের বিশাল ক্যানভাসে তার এই সময় চেতনাকে দেখতে পাবেন দর্শক।
শিল্পী ফিরোজ মাহমুদের যাত্রাটা আবার বর্ণিল। তবে সেই বর্ণময়তার ভেতরে ভ্রমণ আছে ইতিহাসের, আমাদের বিগত পরাজয়ের, শোষিত হয়ে পড়ে থাকা হাজার বছরের।
উপনিবেশকালীন সময়ের যুদ্ধ-বিদ্রোহ, সংঘাত এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের প্রতীকায়িত উপস্থাপনা দেখা যায় তার চিত্রকর্মে। বাংলার নবাবদের দুর্ভাগ্য আর স্বাধীনতা হারানো শিল্পীর চিন্তার বিষয়বস্তু। এবং ইতিহাসের সেই কালপর্বের নানা চরিত্র, মোটিফ, প্রতীক শিল্পীর ক্যানভাসে স্থান পায়। দক্ষ ড্রইংয়ের মাধ্যমে উজ্জ্বল রঙ এবং নানামাত্রিক মোটিফের ব্যবহার ফিরোজ মাহমুদের কাজকে ইতিহাস আর শিল্পীর চেতনাকে ছাড়িয়ে নান্দনিক এক মাত্রাও দান করে। তার ছবিতে রহস্যময় কিংবা ঐতিহাসিক কোনো অশনিসংকেতের প্রতীক হিসেবে প্যাঁচার উপস্থিতি রয়েছে। সঙ্গে এসেছে তরবারি, ঘোড়া, তীর, ধনুক। স্টেনসিলের এই কাজগুলো শিল্পী ফিরোজ মাহমুদের মিশ্র করণকৌশলের দক্ষতারই পরিচায়ক। শিল্পী তার 'সিনারিও' সিরিজের ছয়টি কাজের মাধ্যমে সেই প্রমাণ রেখেছেন।
শিল্পী ইয়াসমিন জাহান নুপুরের কাজের বিষয়বস্তু প্রাচীন স্থাপনার নির্মাণশৈলী। বিশেষ করে মোগল আমলের স্থাপত্যকর্মের বিভিন্ন নমুনা_ যেমন, সে সময়ের দরজা, জানালা, স্তম্ভ, গম্বুজ। এসব জিনিসের নির্মাণশৈলী শিল্পী নুপুর লক্ষ্য করেন তার রূপান্তর চেতনার অনুষঙ্গ হিসেবে। তার শিল্পচর্চায় সময় খননের যে প্রচেষ্টা_ তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসীম মহাকাশের নানা রহস্যময়তা। জলরঙে 'মেমোরি অব দ্য আর্থ' শিরোনামে তার যে কাজটি প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে, তা চিরাচরিত জলরঙের ছবির ধারণাকে ভেঙে দেয় একেবারেই। শুধু তাই নয়, জলরঙের স্বাভাবিক প্রয়োগকে শিল্পী তার সূক্ষ্ম প্রয়োগদক্ষতায় নতুন এক মাত্রা প্রদান করেছেন।
'গোল্ডেন ডোরস', 'লুসিড ড্রিম', 'মেমোরি অব দ্য আর্থ'_ এ চিত্রকর্মগুলো শিল্পপিপাসুদের নতুনত্বের সঙ্গে বিচিত্র শিল্পচিন্তার সন্ধান দিতে পারে। আর এ তিন শিল্পীর তিন ধরনের কাজকে একই প্রদর্শনীতে নতুন এক দৃষ্টি নিয়ে উপভোগ করবার সুযোগ তো থাকছেই। প্রদর্শনীতে তিন শিল্পীর ২৬টি ড্রইং এবং ১০টি স্থাপনাকর্মসহ মোট শিল্পকর্মের সংখ্যা ৩৬টি। প্রদর্শনী আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।
Friday, January 17, 2014
সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের উত্তরাধুনিক ছোটগল্প by তুষার তালুকদার
![]() |
| সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম [জন্ম :১৮ জানুয়ারি ১৯৫১] |
সমকালীন
বাংলা সাহিত্যে ভাষা-দুর্বলতা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও গবেষণার অভাব মাড়িয়ে যে
ক'জন ছোটগল্পকার পাঠকহৃদয়ে বিশেষভাবে স্থান করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে
কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অন্যতম। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে জানান,
গল্প বলায় ও লেখায় একটা সূক্ষ্ম তফাত আছে। আমাদের বাংলা সাহিত্যে রয়েছে
গল্প বলার ঐতিহ্য; লেখার নয়। আর পাশ্চাত্যে রয়েছে গল্প লেখার ঐতিহ্য। গল্প
বলতে গেলে ভাষার মৌখিকতাকে প্রাধান্য দিতে হয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি লাতিন
আমেরিকার সাহিত্যের কথা বলেছেন। বাংলা সাহিত্যের মতো লাতিন আমেরিকার
সাহিত্য-সংস্কৃতিতে রয়েছে গল্প বলার ঐতিহ্য। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বাংলা
সংস্কৃতিতে হাজার বছর ধরে বিদ্যমান ওই গল্প বলার ঐতিহ্যকে ধারণ করেছেন। তাই
তার অধিকাংশ গল্পে আছে গল্প বলা ও লেখা উভয় ঐতিহ্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ,
যেমনটি আমরা পেয়ে থাকি উত্তরাধুনিক গল্পকথক মার্কেজ কিংবা বোর্হেসের মাঝে।
তাই তাকে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে উত্তরাধুনিকতার অন্যতম প্রবর্তক বললে
অত্যুক্তি হবে না।
২. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রতিটি গল্পই সমাজে বিদ্যমান মানুষের সমস্যার সফল রূপায়ণ। সমকালীন সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি_ সবকিছু লেখকের বর্ণনার পরিসরভুক্ত। এ যাবত তার প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন সংখ্যা ৮। তবে এ আলোচনায় তার রচিত 'প্রেম ও প্রার্থনার গল্প' এবং 'সুখদুঃখের গল্প'_ এ দটো সংকলন থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে আলোচনা করব। উপর্যুক্ত সংকলনদ্বয়ের গল্পে লেখকের চরিত্র নির্মাণে এক ধরনের বিচিত্রতা ও ব্যাপ্তি বিদ্যমান। প্রেম ও প্রার্থনার গল্প সংকলনের গল্পে আমরা নানা শ্রেণী-পেশা মানুষের বর্ণনা পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে মজুর পর্যন্ত। এ থেকে তার শ্রেণী-বৈষম্যহীনতা ও মানব সচেতনতার পরিচয় প্রতীয়মান। আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতা, সুখ ও অসুখের মননশীল প্রকাশ এই সংকলনের প্রতিটি গল্প। এসব সংবেদী গল্পে জীবন ও জীবনহীনতা একইভাবে মূর্ত হয়। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, হতাশা আর সমস্যা দিয়ে লেখকের প্রায় অধিকাংশ গল্পের শুরু। আবার এসব সমস্যা সমাধানে লেখক নিজেই সচেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তার গল্পের প্রায় চরিত্রই গল্প শেষে এক ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করে। অতীত ও বর্তমানের মিশেলে বর্তমান বাস্তবতাকে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন সৈয়দ ইসলাম। মানব-মনের চেতন ও অবচেতন দিক উন্মোচনেও তিনি অত্যন্ত পারদর্শী। নগর জীবনের দ্বান্দ্বিকতা তার গল্পে সব সময় খুব প্রাসঙ্গিক।
গল্পগুলো কেমন_ তার উদাহরণ হিসেবে প্রেম ও প্রার্থনার গল্প ও সুখদুঃখের গল্প গ্রন্থ দুটি থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করা যাক।
৩. প্রেম ও প্রার্থনার গল্প ছোটগল্প সংকলনের 'ডিডেলাসে ঘুড়ি' গল্পে হোসেন মিয়ার গ্যারেজের কর্মচারী ইনাম লুকিয়ে ঘুড়ি ওড়ায়। যদিও ইনাম জানে, তার বাবা সেতু মিয়া ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে মারা গেছেন। হোসেন মিয়া নিজেও অপছন্দ করেন ঘুড়ি ওড়ানো। কারণ ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে তার বড় ভাই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। সাংবাদিক আবদুল মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজে তার ভেস্পা ঠিক করতে দেন। হোসেন মিয়া ছুটির দিন থাকা সত্ত্বেও মুয়ীদ ভাইয়ের ভেস্পা রেভ দিয়ে দেন। কারণ সাংবাদিক মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজ মেয়র সাহেবের লোকজনের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। এভাবেই শুরু গল্প। লেখক ঢাল্কা বাজারের ঘুড়ি তৈরির অন্যতম স্রষ্টা সেতু মিয়াকে গ্রিক পুরাণের ডিডেলাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইনাম গ্যারেজে তার হাতের কাজ সেরে আবার ঘুড়ি ওড়াতে চলে যায়। কিন্তু হায়! ঘুড়ি কানি্নর অভাবে শুধু ডান দিকে কানাচ্ছে। ইনাম এই ত্রুটি পূর্বে লক্ষ্য করেনি। ঘুড়ি মাঠের পার্শ্ববর্তী পাঁচ তলা ফ্ল্যাটের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছে আটকে যায়। ঘুড়ি আনতে গিয়ে ইনাম একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পায়। সে দেখতে পায় ঢাল্কা বাজারের সবার চেনা দারোগা সাহেব উলঙ্গ মেয়েটিকে জাপটে ধরেছে। জাপটে ধরার পূর্বে মেয়েটি সাহায্য চেয়েছিল ইনামের কাছে। পরক্ষণেই সে ব্যালকনিতে দারোগা ও তার স্ত্রীকে দেখল। তারা দু'জনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে মেয়েটিকে। ইনাম মুয়ীদ ভাইকে সব জানাল। মুয়ীদ ভাই কণ্ঠে ও লেখায় তীব্র প্রতিবাদ জানাল। এবং আছমা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করল। গ্রেফতার হলো অবসরপ্রাপ্ত দারোগা কলিমুল্লাহ্ ও তদীয় স্ত্রী আলেফা বেগম। তবে সত্যধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন দেখল রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট দারোগা ও তার স্ত্রী দ্রুত ছাড়া পেল। বরং মামলার নতুন চার্জশিট হলো। এতে ইনামকে দারোগা সাহেবের ঘরের মূল্যবান সামগ্রী চুরির দায়ে অভিযুক্ত করা হলো। বলা হলো, 'ছেলেটা গাছ বেয়ে উঠত, আর আছমা পুঁটলা চালান দিত।' লেখক এ গল্পে সমকালীন রাজনীতির একটি অন্তঃসারশূন্য চিত্র অংকন করেছেন। আবার 'তারা ভাবে তারা সাপ, আসলে তারা রজ্জু' গল্পে লেখক দর্শনের শিক্ষক ওয়াকিলুর রহমানকে দাঁড় করান সমকালীন রাজনীতিতে নৈতিক স্খলনের বিপক্ষে একজন আদর্শনির্ভর মানুষ হিসেবে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বর্তমান রাজনৈতিক দর্শন ও নৈতিকতার অধঃপতন লক্ষ্য করে দর্শনশাস্ত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন। লেখক তার নিজস্ব দর্শনচিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন ওয়াকিলুর রহমানের দর্শন-ভাবনার মধ্য দিয়ে। গল্পে ওয়াকিলুর রহমানের শ্যালক একজন রাজনীতিবিদ। দেশে অপারেশন ক্লিনহার্ট শুরু হওয়ার পর তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। সহজে বোঝা যায়, রাজনৈতিক কোনো দৃঢ় আদর্শ ও নীতিবোধ তার ছিল না। তা না হলে পালানোর কী দরকার ছিল! লেখক এ প্রসঙ্গে ওয়াকিলুর রহমানের মাধ্যমে বলেছেন, 'বাংলাদেশের মানুষ যদি দর্শনশাস্ত্রকে জননী শাস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করত, তাহলে এই অপারেশনের প্রয়োজন হতো না।' লেখকের এই গল্পটি খুবই সিম্বলিক। তবে গল্পটির মূল প্রসঙ্গ ছিল একটাই_ রাজনীতিবিদরা নিজেদের সাপ ভাবলেও আসলে তারা রজ্জুবৎ, অর্থাৎ দড়ি।
৪. এবার বলি সুখদুঃখের গল্প সংকলনের কথা। যেহেতু সুখ-দুঃখ নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় অবধারিত উপাদান, তাই নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা দুঃখ কোনোটিই মানুষের জীবনে সম্ভব না। সুখ ও দুঃখের দোলাচলে মানবজীবনে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় নানা উত্থান-পতন। সুখদুঃখে আছে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন। আছে পাওয়ার সুখ, না পাওয়ার বেদনা। আছে কাম-ভোগ-বাসনা। রয়েছে রহস্যে ঘেরা মানব-মন। উত্তর-আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য সংবলিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রায় প্রতিটি গল্পের ভিত্তি শোনা বা দেখা ঘটনা। বলার অপেক্ষা রাখে না, শহীদুল জহিরের পর, সমকালীনদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা সফল উত্তরাধুনিক গল্প তৈরিতে। সুখদুঃখের গল্প সংকলনটির গল্পগুলো বাস্তব-অবাস্তব আর জাদুবাস্তবতার মিশেলে পরিবেশিত। নগর আর প্রান্ত বাংলার মানুষ গল্পগুলোর কুশীলব। সুখদুঃখের মনস্তাত্তি্বক বিশ্লেষণও গল্পগুলোতে পাওয়া যায়। মনজুরুল ইসলাম চেষ্টা করেছেন কারণের অন্তরালে যে কারণ তা খুঁজে বর্ণনা করতে। গল্পের চরিত্রগুলো সত্য-অসত্য, নৈতিকতা-অনৈতিকতা দিয়ে ঘেরা। উত্তর-আধুনিকতাবাদের যে বিষয়গুলো গল্পগুলোতে স্পষ্ট তা হলো, চরিত্র নির্মাণে গবেষণা, গতানুগতিক গল্পকাঠামো ও চরিত্র নির্মাণে অনাগ্রহ, গল্প কথনে নতুন ধারা সৃষ্টি, যরনৎরফরঃু ড়ভ পঁষঃঁৎব, মেদহীন বাক্যবিন্যাস এবং শব্দশক্তি উদ্ঘাটন।
৫. পাঠকের আগ্রহ নিবৃত্তায়নে সুখদুঃখের গল্প সংকলন থেকে দু'একটি গল্পের কিছু দিক নিয়ে আলাপ করা যাক । প্রথমেই বলি 'এক জীবন' গল্পটির কথা। গল্পটি বিভিন্ন চরিত্রের বিরতিহীন চৈতন্যপ্রসূ অভিজ্ঞতা ও ভাবনাচিন্তা নিয়ে তৈরি। মূলত এটি একটি কৌশল, যাকে ইংরেজি সাহিত্যে বলে ংঃৎবধস ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং ঃবপযহরয়ঁব. ইংরেজি সাহিত্যে এ কৌশল জেমস্ জয়েস ও ভার্জিনিয়া উলফ্ সফলভাবে ব্যবহার করেছেন । সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম 'এক জীবন' গল্পে এই কৌশলটি ব্যবহার করেছেন। গল্পে খুব একটা বহির্মুখী কর্মস্পৃৃহা চোখে পড়ে না। যা ঘটে তার সবটুকুই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মনোরাজ্যে ঘটে যাওয়া চেতন চিন্তার সম্মিলন। এ ধরনের গল্পে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । পুরো গল্পের সময়সীমা ভোর ৫টা থেকে রাত ১২.৩০-এর মধ্যে। গল্পকার অতি দ্রুত এক চরিত্রের ারবঢ়িড়রহঃ থেকে অন্য চরিত্রে যান। সময় ও চরিত্রগেিলার মনোরাজ্যে চেতন-চিন্তার মধ্যে এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরি করেন। এ ধরনের ছোটগল্প লেখার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি লেখকের নেই। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে রশীদ করিমের নাম, যিনি প্রাগুক্ত ধারায় গল্প-উপন্যাস তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন। যেমন তার উপন্যাস 'উত্তম পুরুষ' উক্ত কৌশল অবলম্বনে লেখা। যা হোক, সুখদুঃখের গল্প সংকলনের আরেকটি অসামান্য গল্প 'মেয়ে'। লেখক এখানে সমকালীন সমাজে নারী স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার চিত্র দেখিয়েছেন। এবং একই সঙ্গে গল্প শেষে নারীর স্বাধীনচেতা রূপটিও দেখিয়েছেন। সামাজিক ভীতি, কুসংস্কার আর জড়তার ঊধর্ে্ব উঠে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তার দৃপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এককথায়, সুখদুঃখের গল্প সংকলনে আছে বাবা-মা, ছেলেমেয়ের পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আছে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অসহায়ত্ব। রয়েছে মানব-মানবীর শারীরিক ও অশরীরী প্রেম, আছে শুদ্ধ প্রেমাখ্যান। রয়েছে ভালোবাসা না থাকা সত্ত্বেও নারী-পুরুষের একত্রে দিনাতিপাতের কথা এবং আছে আশা-নিরাশার মাঝে বেঁচে থাকা একগুচ্ছ মানব-মানবীর গল্প।
৬. ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সাহিত্য সমালোচনা ইত্যাদি বহুমাত্রিক সাহিত্য শাখায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পদচারণা সমানভাবে বিস্তৃত। যদিও তিনি নিজেকে বহুমাত্রিক বলতে নারাজ। নিজেকে তিনি এমনকি কথাসাহিত্যিক হিসেবে মানতেও রাজি নন। তিনি নিজেকে কেবল গল্পকথক বলেন। পাঠক মহলে তিনি একজন অনবদ্য ছোটগল্পকার। লেখকের লেখা প্রতিটি ছোটগল্পেই তাই রয়েছে এক ধরনের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের ছাপ। তার গল্পের প্রতিটি কাহিনীই প্রতীকাশ্রয়ী ও রূপক বর্ণনা। চলমান প্রতীকায়নে পাঠক কখনও গল্পের মূল কাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হন না। প্রতিটি গল্পে লেখকের উপস্থিতি আমাদের তার আপন বাস্তবতায় নিয়ে যায়। ফলে আমরাও তার গল্পের পাত্রপাত্রী বনে যাই। সর্বোপরি, অনেকটা নিদ্বর্ির্ধায় বলা যায়, বহুকাল পরেও ভাষাশৈলী, গল্প বলার ধরন, নির্মাণ কৌশল এবং থিমের অনন্যতার জন্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।
২. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রতিটি গল্পই সমাজে বিদ্যমান মানুষের সমস্যার সফল রূপায়ণ। সমকালীন সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি_ সবকিছু লেখকের বর্ণনার পরিসরভুক্ত। এ যাবত তার প্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন সংখ্যা ৮। তবে এ আলোচনায় তার রচিত 'প্রেম ও প্রার্থনার গল্প' এবং 'সুখদুঃখের গল্প'_ এ দটো সংকলন থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে আলোচনা করব। উপর্যুক্ত সংকলনদ্বয়ের গল্পে লেখকের চরিত্র নির্মাণে এক ধরনের বিচিত্রতা ও ব্যাপ্তি বিদ্যমান। প্রেম ও প্রার্থনার গল্প সংকলনের গল্পে আমরা নানা শ্রেণী-পেশা মানুষের বর্ণনা পাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থেকে মজুর পর্যন্ত। এ থেকে তার শ্রেণী-বৈষম্যহীনতা ও মানব সচেতনতার পরিচয় প্রতীয়মান। আধুনিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা আর নিঃসঙ্গতা, সুখ ও অসুখের মননশীল প্রকাশ এই সংকলনের প্রতিটি গল্প। এসব সংবেদী গল্পে জীবন ও জীবনহীনতা একইভাবে মূর্ত হয়। আধুনিক মানুষের বিচ্ছিন্নতা, হতাশা আর সমস্যা দিয়ে লেখকের প্রায় অধিকাংশ গল্পের শুরু। আবার এসব সমস্যা সমাধানে লেখক নিজেই সচেষ্ট ভূমিকা রাখেন। তার গল্পের প্রায় চরিত্রই গল্প শেষে এক ধরনের আশাবাদ ব্যক্ত করে। অতীত ও বর্তমানের মিশেলে বর্তমান বাস্তবতাকে উত্তরাধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করে থাকেন সৈয়দ ইসলাম। মানব-মনের চেতন ও অবচেতন দিক উন্মোচনেও তিনি অত্যন্ত পারদর্শী। নগর জীবনের দ্বান্দ্বিকতা তার গল্পে সব সময় খুব প্রাসঙ্গিক।
গল্পগুলো কেমন_ তার উদাহরণ হিসেবে প্রেম ও প্রার্থনার গল্প ও সুখদুঃখের গল্প গ্রন্থ দুটি থেকে কয়েকটি গল্প নিয়ে একটু বিস্তারিত আলাপ করা যাক।
৩. প্রেম ও প্রার্থনার গল্প ছোটগল্প সংকলনের 'ডিডেলাসে ঘুড়ি' গল্পে হোসেন মিয়ার গ্যারেজের কর্মচারী ইনাম লুকিয়ে ঘুড়ি ওড়ায়। যদিও ইনাম জানে, তার বাবা সেতু মিয়া ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে মারা গেছেন। হোসেন মিয়া নিজেও অপছন্দ করেন ঘুড়ি ওড়ানো। কারণ ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে তার বড় ভাই মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। সাংবাদিক আবদুল মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজে তার ভেস্পা ঠিক করতে দেন। হোসেন মিয়া ছুটির দিন থাকা সত্ত্বেও মুয়ীদ ভাইয়ের ভেস্পা রেভ দিয়ে দেন। কারণ সাংবাদিক মুয়ীদ তালুকদার হোসেন মিয়ার গ্যারেজ মেয়র সাহেবের লোকজনের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। এভাবেই শুরু গল্প। লেখক ঢাল্কা বাজারের ঘুড়ি তৈরির অন্যতম স্রষ্টা সেতু মিয়াকে গ্রিক পুরাণের ডিডেলাসের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইনাম গ্যারেজে তার হাতের কাজ সেরে আবার ঘুড়ি ওড়াতে চলে যায়। কিন্তু হায়! ঘুড়ি কানি্নর অভাবে শুধু ডান দিকে কানাচ্ছে। ইনাম এই ত্রুটি পূর্বে লক্ষ্য করেনি। ঘুড়ি মাঠের পার্শ্ববর্তী পাঁচ তলা ফ্ল্যাটের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা নারিকেল গাছে আটকে যায়। ঘুড়ি আনতে গিয়ে ইনাম একটি মেয়ের চিৎকার শুনতে পায়। সে দেখতে পায় ঢাল্কা বাজারের সবার চেনা দারোগা সাহেব উলঙ্গ মেয়েটিকে জাপটে ধরেছে। জাপটে ধরার পূর্বে মেয়েটি সাহায্য চেয়েছিল ইনামের কাছে। পরক্ষণেই সে ব্যালকনিতে দারোগা ও তার স্ত্রীকে দেখল। তারা দু'জনে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে মেয়েটিকে। ইনাম মুয়ীদ ভাইকে সব জানাল। মুয়ীদ ভাই কণ্ঠে ও লেখায় তীব্র প্রতিবাদ জানাল। এবং আছমা হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করল। গ্রেফতার হলো অবসরপ্রাপ্ত দারোগা কলিমুল্লাহ্ ও তদীয় স্ত্রী আলেফা বেগম। তবে সত্যধর্মে বিশ্বাসী মানুষজন দেখল রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট দারোগা ও তার স্ত্রী দ্রুত ছাড়া পেল। বরং মামলার নতুন চার্জশিট হলো। এতে ইনামকে দারোগা সাহেবের ঘরের মূল্যবান সামগ্রী চুরির দায়ে অভিযুক্ত করা হলো। বলা হলো, 'ছেলেটা গাছ বেয়ে উঠত, আর আছমা পুঁটলা চালান দিত।' লেখক এ গল্পে সমকালীন রাজনীতির একটি অন্তঃসারশূন্য চিত্র অংকন করেছেন। আবার 'তারা ভাবে তারা সাপ, আসলে তারা রজ্জু' গল্পে লেখক দর্শনের শিক্ষক ওয়াকিলুর রহমানকে দাঁড় করান সমকালীন রাজনীতিতে নৈতিক স্খলনের বিপক্ষে একজন আদর্শনির্ভর মানুষ হিসেবে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বর্তমান রাজনৈতিক দর্শন ও নৈতিকতার অধঃপতন লক্ষ্য করে দর্শনশাস্ত্র পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেছেন। লেখক তার নিজস্ব দর্শনচিন্তার প্রকাশ ঘটিয়েছেন ওয়াকিলুর রহমানের দর্শন-ভাবনার মধ্য দিয়ে। গল্পে ওয়াকিলুর রহমানের শ্যালক একজন রাজনীতিবিদ। দেশে অপারেশন ক্লিনহার্ট শুরু হওয়ার পর তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। সহজে বোঝা যায়, রাজনৈতিক কোনো দৃঢ় আদর্শ ও নীতিবোধ তার ছিল না। তা না হলে পালানোর কী দরকার ছিল! লেখক এ প্রসঙ্গে ওয়াকিলুর রহমানের মাধ্যমে বলেছেন, 'বাংলাদেশের মানুষ যদি দর্শনশাস্ত্রকে জননী শাস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করত, তাহলে এই অপারেশনের প্রয়োজন হতো না।' লেখকের এই গল্পটি খুবই সিম্বলিক। তবে গল্পটির মূল প্রসঙ্গ ছিল একটাই_ রাজনীতিবিদরা নিজেদের সাপ ভাবলেও আসলে তারা রজ্জুবৎ, অর্থাৎ দড়ি।
৪. এবার বলি সুখদুঃখের গল্প সংকলনের কথা। যেহেতু সুখ-দুঃখ নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় অবধারিত উপাদান, তাই নিরবচ্ছিন্ন সুখ কিংবা দুঃখ কোনোটিই মানুষের জীবনে সম্ভব না। সুখ ও দুঃখের দোলাচলে মানবজীবনে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হয় নানা উত্থান-পতন। সুখদুঃখে আছে স্বপ্ন-দুঃস্বপ্ন। আছে পাওয়ার সুখ, না পাওয়ার বেদনা। আছে কাম-ভোগ-বাসনা। রয়েছে রহস্যে ঘেরা মানব-মন। উত্তর-আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য সংবলিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রায় প্রতিটি গল্পের ভিত্তি শোনা বা দেখা ঘটনা। বলার অপেক্ষা রাখে না, শহীদুল জহিরের পর, সমকালীনদের মধ্যে তিনিই সর্বাপেক্ষা সফল উত্তরাধুনিক গল্প তৈরিতে। সুখদুঃখের গল্প সংকলনটির গল্পগুলো বাস্তব-অবাস্তব আর জাদুবাস্তবতার মিশেলে পরিবেশিত। নগর আর প্রান্ত বাংলার মানুষ গল্পগুলোর কুশীলব। সুখদুঃখের মনস্তাত্তি্বক বিশ্লেষণও গল্পগুলোতে পাওয়া যায়। মনজুরুল ইসলাম চেষ্টা করেছেন কারণের অন্তরালে যে কারণ তা খুঁজে বর্ণনা করতে। গল্পের চরিত্রগুলো সত্য-অসত্য, নৈতিকতা-অনৈতিকতা দিয়ে ঘেরা। উত্তর-আধুনিকতাবাদের যে বিষয়গুলো গল্পগুলোতে স্পষ্ট তা হলো, চরিত্র নির্মাণে গবেষণা, গতানুগতিক গল্পকাঠামো ও চরিত্র নির্মাণে অনাগ্রহ, গল্প কথনে নতুন ধারা সৃষ্টি, যরনৎরফরঃু ড়ভ পঁষঃঁৎব, মেদহীন বাক্যবিন্যাস এবং শব্দশক্তি উদ্ঘাটন।
৫. পাঠকের আগ্রহ নিবৃত্তায়নে সুখদুঃখের গল্প সংকলন থেকে দু'একটি গল্পের কিছু দিক নিয়ে আলাপ করা যাক । প্রথমেই বলি 'এক জীবন' গল্পটির কথা। গল্পটি বিভিন্ন চরিত্রের বিরতিহীন চৈতন্যপ্রসূ অভিজ্ঞতা ও ভাবনাচিন্তা নিয়ে তৈরি। মূলত এটি একটি কৌশল, যাকে ইংরেজি সাহিত্যে বলে ংঃৎবধস ড়ভ পড়হংপরড়ঁংহবংং ঃবপযহরয়ঁব. ইংরেজি সাহিত্যে এ কৌশল জেমস্ জয়েস ও ভার্জিনিয়া উলফ্ সফলভাবে ব্যবহার করেছেন । সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম 'এক জীবন' গল্পে এই কৌশলটি ব্যবহার করেছেন। গল্পে খুব একটা বহির্মুখী কর্মস্পৃৃহা চোখে পড়ে না। যা ঘটে তার সবটুকুই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মনোরাজ্যে ঘটে যাওয়া চেতন চিন্তার সম্মিলন। এ ধরনের গল্পে সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে । পুরো গল্পের সময়সীমা ভোর ৫টা থেকে রাত ১২.৩০-এর মধ্যে। গল্পকার অতি দ্রুত এক চরিত্রের ারবঢ়িড়রহঃ থেকে অন্য চরিত্রে যান। সময় ও চরিত্রগেিলার মনোরাজ্যে চেতন-চিন্তার মধ্যে এক ধরনের মেলবন্ধন তৈরি করেন। এ ধরনের ছোটগল্প লেখার অভিজ্ঞতা বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি লেখকের নেই। এ মুহূর্তে মনে পড়ছে রশীদ করিমের নাম, যিনি প্রাগুক্ত ধারায় গল্প-উপন্যাস তৈরিতে পারদর্শী ছিলেন। যেমন তার উপন্যাস 'উত্তম পুরুষ' উক্ত কৌশল অবলম্বনে লেখা। যা হোক, সুখদুঃখের গল্প সংকলনের আরেকটি অসামান্য গল্প 'মেয়ে'। লেখক এখানে সমকালীন সমাজে নারী স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতার চিত্র দেখিয়েছেন। এবং একই সঙ্গে গল্প শেষে নারীর স্বাধীনচেতা রূপটিও দেখিয়েছেন। সামাজিক ভীতি, কুসংস্কার আর জড়তার ঊধর্ে্ব উঠে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তার দৃপ্ত প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এককথায়, সুখদুঃখের গল্প সংকলনে আছে বাবা-মা, ছেলেমেয়ের পারিবারিক দ্বন্দ্ব, আছে বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের অসহায়ত্ব। রয়েছে মানব-মানবীর শারীরিক ও অশরীরী প্রেম, আছে শুদ্ধ প্রেমাখ্যান। রয়েছে ভালোবাসা না থাকা সত্ত্বেও নারী-পুরুষের একত্রে দিনাতিপাতের কথা এবং আছে আশা-নিরাশার মাঝে বেঁচে থাকা একগুচ্ছ মানব-মানবীর গল্প।
৬. ছোটগল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস, সাহিত্য সমালোচনা ইত্যাদি বহুমাত্রিক সাহিত্য শাখায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের পদচারণা সমানভাবে বিস্তৃত। যদিও তিনি নিজেকে বহুমাত্রিক বলতে নারাজ। নিজেকে তিনি এমনকি কথাসাহিত্যিক হিসেবে মানতেও রাজি নন। তিনি নিজেকে কেবল গল্পকথক বলেন। পাঠক মহলে তিনি একজন অনবদ্য ছোটগল্পকার। লেখকের লেখা প্রতিটি ছোটগল্পেই তাই রয়েছে এক ধরনের স্বাচ্ছন্দ্যবোধের ছাপ। তার গল্পের প্রতিটি কাহিনীই প্রতীকাশ্রয়ী ও রূপক বর্ণনা। চলমান প্রতীকায়নে পাঠক কখনও গল্পের মূল কাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হন না। প্রতিটি গল্পে লেখকের উপস্থিতি আমাদের তার আপন বাস্তবতায় নিয়ে যায়। ফলে আমরাও তার গল্পের পাত্রপাত্রী বনে যাই। সর্বোপরি, অনেকটা নিদ্বর্ির্ধায় বলা যায়, বহুকাল পরেও ভাষাশৈলী, গল্প বলার ধরন, নির্মাণ কৌশল এবং থিমের অনন্যতার জন্য সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের গল্পগুলো প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে।
Friday, July 12, 2013
ভালো থাকো ভালো চাই পত্রের যেন উত্তর পাই by সালেহা চৌধুরী
কবে কখন এমন করে চিঠির শেষে লিখতাম মনে
করতে গেলে মনে পড়ে_ ছোটবেলায় এমন সব কথা চিঠিতে লেখা হতো_ যাও পাখি বলো
তারে/সে যেন ভোলে না মোরে। তারপর ইদায়। এবং এবার ৮০।
ভালো থাকো ভালো চাই পত্রের যেন উত্তর পাই by সালেহা চৌধুরী
কবে কখন এমন করে চিঠির শেষে লিখতাম মনে
করতে গেলে মনে পড়ে_ ছোটবেলায় এমন সব কথা চিঠিতে লেখা হতো_ যাও পাখি বলো
তারে/সে যেন ভোলে না মোরে। তারপর ইদায়। এবং এবার ৮০।
ভালো থাকো ভালো চাই পত্রের যেন উত্তর পাই by সালেহা চৌধুরী
কবে কখন এমন করে চিঠির শেষে লিখতাম মনে
করতে গেলে মনে পড়ে_ ছোটবেলায় এমন সব কথা চিঠিতে লেখা হতো_ যাও পাখি বলো
তারে/সে যেন ভোলে না মোরে। তারপর ইদায়। এবং এবার ৮০।
বোরহেস ও আক্ষরিক অনুবাদের সৌন্দর্য \ দ্বিতীয় পর্ব by মাসরুর আরেফিন
দুই সপ্তাহ আগে এ লেখার প্রথম পর্বে বিশদ
করতে চেয়েছিলাম আক্ষরিক অনুবাদ প্রসঙ্গে বোরহেসের চিন্তাভাবনা। হোর্হে লুইস
বোরহেস, বিশ শতকের বিশ্ব সাহিত্যের প্রধান তিন স্তম্ভের একটি [অন্য দু'জন
ফ্রানৎস কাফকা ও জেমস জয়েস], সাহিত্যে অনুবাদের ক্ষেত্রে 'আক্ষরিক'
অনুবাদকেই বেশি পছন্দ করতেন।
বোরহেস ও আক্ষরিক অনুবাদের সৌন্দর্য \ দ্বিতীয় পর্ব by মাসরুর আরেফিন
দুই সপ্তাহ আগে এ লেখার প্রথম পর্বে বিশদ
করতে চেয়েছিলাম আক্ষরিক অনুবাদ প্রসঙ্গে বোরহেসের চিন্তাভাবনা। হোর্হে লুইস
বোরহেস, বিশ শতকের বিশ্ব সাহিত্যের প্রধান তিন স্তম্ভের একটি [অন্য দু'জন
ফ্রানৎস কাফকা ও জেমস জয়েস], সাহিত্যে অনুবাদের ক্ষেত্রে 'আক্ষরিক'
অনুবাদকেই বেশি পছন্দ করতেন।
আহসান হাবীব- তিরিশি কাব্যতত্ত্বের প্রথম বিদ্রোহী by আবিদ আনোয়ার
কবি আহসান হাবীবের কবিতা নিয়ে আমার পাঁচটি
লেখা ইতিপূর্বে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোর শিরোনাম : ১.
আহসান হাবীব-এর কবিতা : খালেক নিকিরির স্বজন-পরিজন, ২. কবি ও সম্পাদক আহসান
হাবীব,
Friday, June 21, 2013
পাওয়েল স্ট্রিটে পথ হারিয়ে by শিহাব সরকার
শৈশব থেকেই রাজপথ আমার জীবনে ওতপ্রোত
জড়িয়ে আছে। ঢাকায় জন্মেছি। সেই থেকে আজ অবধি এই নগরীতেই_ মাঝেমধ্যে শহর বা
দেশের বাইরে যাওয়ার সময় ছাড়া। সেই ষাট দশকে আমার শৈশব-কৈশোর থেকে ঢাকার
ছোট-বড় রাজপথের বেড়ে ওঠা দেখে এসেছি।
পাওয়েল স্ট্রিটে পথ হারিয়ে by শিহাব সরকার
শৈশব থেকেই রাজপথ আমার জীবনে ওতপ্রোত
জড়িয়ে আছে। ঢাকায় জন্মেছি। সেই থেকে আজ অবধি এই নগরীতেই_ মাঝেমধ্যে শহর বা
দেশের বাইরে যাওয়ার সময় ছাড়া। সেই ষাট দশকে আমার শৈশব-কৈশোর থেকে ঢাকার
ছোট-বড় রাজপথের বেড়ে ওঠা দেখে এসেছি।
পাওয়েল স্ট্রিটে পথ হারিয়ে by শিহাব সরকার
শৈশব থেকেই রাজপথ আমার জীবনে ওতপ্রোত
জড়িয়ে আছে। ঢাকায় জন্মেছি। সেই থেকে আজ অবধি এই নগরীতেই_ মাঝেমধ্যে শহর বা
দেশের বাইরে যাওয়ার সময় ছাড়া। সেই ষাট দশকে আমার শৈশব-কৈশোর থেকে ঢাকার
ছোট-বড় রাজপথের বেড়ে ওঠা দেখে এসেছি।
পাওয়েল স্ট্রিটে পথ হারিয়ে by শিহাব সরকার
শৈশব থেকেই রাজপথ আমার জীবনে ওতপ্রোত
জড়িয়ে আছে। ঢাকায় জন্মেছি। সেই থেকে আজ অবধি এই নগরীতেই_ মাঝেমধ্যে শহর বা
দেশের বাইরে যাওয়ার সময় ছাড়া। সেই ষাট দশকে আমার শৈশব-কৈশোর থেকে ঢাকার
ছোট-বড় রাজপথের বেড়ে ওঠা দেখে এসেছি।
ব্যক্তির অধিক এক জীবন by সঞ্জয় ঘোষ
টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে যতবারই তার
কণ্ঠ শুনতে পাই, এক অদ্ভুত সি্নগ্ধতায় যেন ভরে ওঠে মন। এবারও তার ব্যতিক্রম
ঘটল না। বেশ কিছুদিন বাদে সাক্ষাৎ প্রার্থনায় তিনি না করলেন না। বললেন,
'কখন আসতে চাও?'।
অদ্ভুত সব সড়ক
সড়কপথ, রাস্তা যা-ই বলি না কেন তা আসলে
সভ্যতার প্রতীক। আবিষ্কারের, আধুনিক সভ্যতার এক মেটাফর। সেই প্রাচীনকাল
থেকেই এভাবেই বিবেচিত হয়ে আসছে। কেউ কেউ বলে থাকেন সড়ক তো আসলে জীবনেরই
নামান্তর।
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2002)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
বিনোদন
শেষের পাতা
ক্রিকেট খেলা
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
দেশে দেশে
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
আমার দেশ
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
ইরান
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
কালবেলা
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
মুসলিম
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
জাতিসংঘ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
রাশিয়া
মুক্তিযুদ্ধ
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
ইউরোপ
খেলা ধুলা
সৌদি আরব
ছাত্রলীগ
ইতিহাস
প্রতিবেদন
জামায়াতে ইসলামী
সোহরাব হাসান
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
জাতীয় সংসদ
নারী ধর্ষণ
আনন্দ
খেলাধুলা
বিজ্ঞান ও গবেষণা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
আফ্রিকা
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
সংখ্যালঘু
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সৈয়দ আবুল মকসুদ
তুরস্ক
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
আফগানিস্তান
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
ইউক্রেন
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
স্বাস্থ্য
ফূটবল খেলা
হিন্দু
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
শিল্প ও সাহিত্য
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
Exclusive
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
গবেষণা
বাংলাদেশ
মিসর
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
ইয়েমেন
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
জীবনযাপন
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
লেবানন
আবদুল মান্নান
জাপান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
কুমিল্লা
শিল্প
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
চিকিৎসা
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
তথ্য প্রযুক্তি
বরগুনা
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
ব্রাজিল
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
মসজিদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
রোকনুজ্জামান পিয়াস
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
উত্তর কোরিয়া
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
তুহিন ওয়াদুদ
কালি ও কলম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জনস্বাস্থ্য
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
নিবন্ধ
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
প্রযুক্তি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কাতার
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জার্মানি
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
লাতিন আমেরিকা
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
আরব আমিরাত বা দুবাই
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
দক্ষিণ কোরিয়া
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
লিবিয়া
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
ইসলাম
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
মহাকাশচারী
জোহরান মামদানি
নিয়ন আলোয়
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
ইতালি
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
নরসিংদী
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
কিশোর আলো
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
ইহুদি
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
চুয়াডাঙ্গা
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গণমাধ্যম
গদ্যকার্টুন
পিরোজপুর
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
প্রবাসী শ্রমিক
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
সোমালিয়া
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কুয়েত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুজন সুপান্থ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
ওমান
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
জঙ্গি
জর্দান
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সিঙ্গাপুর
সুইডেন
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আলজেরিয়া
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রিস
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নীহারুল ইসলাম
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রকিব হাসান
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট







