Tuesday, June 24, 2014

স্বাগত সুষমা স্বরাজ by সাযযাদ কাদির

৫ই জানুয়ারির ‘নির্বাচন’ সম্পর্কে ভারতের মতামত যেন খুব বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে আমাদের জন্য। ওই মতামত যে একেবারে আমরা জানি না তা-ও নয়। ওই সময়ে ভারতে ক্ষমতাসীন ইউপিএ (পড়ুন কংগ্রেস) সরকার সমর্থন দিয়েছে এতে, ভারতের মিডিয়া-ও ‘বিকল্প কি?’ প্রশ্ন তুলে সমর্থন যুগিয়েছে প্রকারান্তরে। বর্তমান এনডিএ (পড়ুন আরএসএস) সরকার এখনও বলে নি কিছু, কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে তাঁরা কি বলে থাকেন তা তো আর অজানা নয় আমাদের। সে সব কথা শুনে তো কখনও মনে হয় নি যে কোনও ভাবে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় যাক তা তাঁরা চাইতে পারেন। কলকাতা থেকে প্রকাশিত আরএসএস-এর মুখপত্র সাপ্তাহিক স্বস্তিকা’র ভাষা তো আগের মতোই আছে এখনও। তারপর এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে ক্ষমতার হাতবদলে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে আছর পড়ে না তেমন। সাউথ ব্লকের আমলারাই ও সব দেখেশুনে যা কিছু করার করে থাকেন বিশ্বস্ততার সঙ্গে। এনডিএ সরকারের আমলে এর অন্যথা কিছু ঘটবে বলে মনে করার কোনও কারণ দেখি না। এ সরকার প্রশাসনে ‘পরিবর্তন কম, ধারাবাহিকতা অব্যাহত’ - এই নীতি নিয়েই চলছে আপাতত। এজন্যই পূর্বতন ইউপিএ সরকারের নিয়োগকৃত রাজ্য গভর্নর ও জাতীয় কমিশনের চেয়ারম্যানদের সরাবার উদ্যোগ নিলেও অন্য কোথাও নড়চড়ের আভাস মিলছে না তেমন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের দপ্তর পছন্দের ব্যক্তি ও আমলা দিয়ে সাজিয়ে নিয়েছেন এরই মধ্যে। তবে সবাই যে তাঁর নিজের পছন্দের তা নয়, আরএসএস-এর পরামর্শেও নিয়োগ হয়েছে কয়েকজনের। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এ কাজ এখনও করেন নি বলেই জানা যায়। তাঁর মন্ত্রণালয়ের সুজাতা সিং থেকে পঙ্কজ সরণ পর্যন্ত বহাল আছেন সবাই। এর কারণ একটি হতে পারে, সুষমা স্বরাজের জন্য পররাষ্ট্র নতুন মন্ত্রণালয়। তিনি মনে করেন, এখানে এই অভিজ্ঞ কূটনীতিকদেরই বেশি প্রয়োজন তাঁর। অন্য কারণ নর্থ ও সাউথ উভয় ব্লকের সঙ্গে সুষমার সম্পর্ক নতুন নয়, বলতে গেলে ৩৭ বছরের পুরনো। নয়া দিল্লির আমলা পরিম-লে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতাও রয়েছে তাঁর। সেই ১৯৭৭ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে হরিয়ানা রাজ্যের চার বারের মুখ্যমন্ত্রী ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বংশীলালকে তিনি হারিয়েছিলেন ৬৩% ভোট পেয়ে। সেই থেকে এ পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতির শীর্ষ পর্যায়ে ভূমিকা রেখে চলেছেন বিভিন্ন সময়ে সাংসদ ও মন্ত্রী হিসেবে। মন্ত্রিত্বের শুরু হরিয়ানার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে, তারপর কেন্দ্রীয় তথ্য, সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী (কয়েকবার), দিল্লি’র প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ ও পারলামেন্ট বিষয়ক মন্ত্রী, আর এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মাঝে দায়িত্ব পালন করেছেন লোকসভায় বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে। এছাড়া তাঁর স্বামী স্বরাজ কৌশল ছিলেন মিজোরামের গভর্নর। এ সব সূত্র তাঁকে দিয়েছে আমলা-প্রশাসনের সদরে অন্দরে সহজ প্রবেশ-সুবিধা।

মোদি সরকারে সুষমা’র স্থান পাওয়া ছিল জল্পনার বিষয়। কারণ গুজরাট-দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য দলে তিনি মোদি’র সমালোচনা করে থাকেন, বিরোধিতা করেছেন তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বেরও। কিন্তু দলের অভিভাবক অটল বিহারী বাজপেয়ী’র আশীর্বাদপুষ্ট সুষমাকে এড়িয়ে যাওয়া সহজ ছিল না মোদি’র পক্ষে। বাজপেয়ীর আরেক আশীর্বাদধন্য লালকৃষ্ণ আদবানিকেও আপাতত এড়ানো গেলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে হয়তো প্রেসিডেন্টই করতে হবে। আর সঙ্ঘ পরিবারের ব্যাপারটা না বললেই নয়। সুষমা’র পিতা ছিলেন আরএসএস-এর একজন খ্যাতনামা সদস্য। সুষমা’র রাজনৈতিক ক্যারিয়ারও শুরু আরএসএস-এর সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ-এর সদস্য হিসেবে। তিনি প্রচারকও ছিলেন আরএসএস-এর। সংস্কৃত ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও আইনে স্নাতকোত্তর সুষমা এক অত্যুজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক হিসেবে বিবেচিত সঙ্ঘ পরিবারে। তাই বারাক ওবামা যে চিন্তা থেকে হিলারি ক্লিনটনকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছিলেন তেমন চিন্তা থেকে যে সুষমাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয় নি তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় কারও। তবে তাঁর এই সমালোচককে মোদি কতখানি কি কাজের সুযোগ দেন তা দেখার বিষয়, বিশেষ করে তিনি যেখানে গোটা মন্ত্রিসভাকে হাতের মুঠোয় নিয়ে কাজ করতে অভ্যস্ত। সার্ক দেশগুলোর সম্পর্ক উন্নয়ন ও চীনকে নরমে গরমে মোকাবেলার নীতি নিয়ে মোদির বিদেশনীতি আপাতত যাত্রা শুরু করলেও জাপান, ইসরাইল ও মারকিন সম্পর্ক যে ক্রমে গভীরভাবে যুক্ত হবে তা তাঁর গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রিত্বের ইতিহাস থেকেই বোঝা যায়। আর এই মুহূর্তে ইরাকে সুন্নি জঙ্গিদের হাতে আটক ৪০ ভারতীয় শ্রমিককে উদ্ধার করা হয়ে পড়েছে সুষমা’র জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ বিশেষভাবে জটিল হয়ে পড়েছে কড়া ভাষায় ওই সুন্নি জঙ্গিদের সমালোচনা করে নুরি আল-মালিকি সরকারকে সমর্থন দিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করায়। ওদিকে ইরাক থেকেই বেশির ভাগ তেল আমদানি করে ভারত। সেখানে দেখা দিয়েছে আরেক পরিস্থিতি। এই সময়ে আসছেন সুষমা স্বরাজ। তিনি জানেন ৫ই জানুয়ারির ‘নির্বাচন’ ও কংগ্রেস নেতৃত্বের সমর্থন সম্পর্কে। ওই জ্ঞানকে কোন কাজে লাগাবেন তিনি? প্রতিপক্ষের দুর্বলতা থেকে ফায়দা লোটার সুযোগটি? না, অন্য আর কিছু? সে আর কিছুই বা কি? নিজের দেশে গণতন্ত্রের চর্চা করে বিশ্ব চ্যামপিয়ন হলেও অন্য দেশের চর্চা নিয়ে তো কখনও মাথাব্যথা দেখায় নি ভারত। এরপরও যাঁরা কোনও বার্তা পেতে চান তাঁরা এই একটি ঘটনা থেকেই যেটুকু খুঁজে নিতে পারেন তা হলো- প্রধানমন্ত্রী ভুটান গেলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসছেন এখানে। তাঁর এ সফর থেকে  আমাদের দেখা শোনা জানা বোঝার আছে অনেক কিছু। তাই তাঁকে জানাই প্রাণঢালা অভিনন্দন, শুভেচ্ছা স্বাগতম্‌।

আওয়ামী লীগের একাল-সেকাল by কামাল আহমেদ

রাশেদ সোহরাওয়ার্দী, আওয়ামী লীগের আদর্শিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ছেলে। স্থায়ীভাবে লন্ডনে আবাস গড়লেও আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাঁর নাড়ির সম্পর্ক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা ব্রিটেনে এলে তাঁদের সঙ্গে তাঁর প্রতিবারই যোগাযোগ হয়। লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বাসভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। তবে তাঁর সঙ্গে কথাবার্তা খুব বেশি হয়নি। ১৩ জুন প্রথম সুযোগ হলো তাঁর কিছু কথা শোনার। কতিপয় সহানুভূতিশীল ব্রিটিশ রাজনীতিকের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর জন্য আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর বক্তব্যই ছিল সবচেয়ে তীব্র এবং সমালোচনামূলক। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি কমিটি কক্ষে আয়োজিত ওই সভায় তিনি আেক্ষপ করে বলেন যে আওয়ামী লীগে তাঁর বাবার কথা এখন আর কেউ উচ্চারণ করেন না। যে চার মূলনীতি গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ওপর দলটি প্রতিষ্ঠিত, তাঁর বাবা বেঁচে থাকলে সেই নীতিগুলোর প্রতি তিনি অবিচল থাকতেন। রাশেদ সোহরাওয়ার্দী বলেন, ‘কার্যকর বিরোধী দলহীন নির্বাচন’ গণতন্ত্রের পরিপন্থী এবং বাংলাদেশ এখন সে রকম এক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, দ্রুত বিরোধী দলকে নিয়ে নির্বাচন করা না হলে বাংলাদেশ আবারও ১৯৭৪-এর মতো একদলীয় শাসনব্যবস্থা বাকশালের রূপ নেবে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি আজীবন আওয়ামী লীগ করি, কিন্তু বাকশালকে তখন যেমন সমর্থন করিনি, এখনো তেমনি একদলীয় ব্যবস্থা প্রত্যাশা করি না।’
পেশাদার কূটনীতিক থেকে রাজনীতিতে আসা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এসব সমালোচনার জবাব না থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে তাঁকে বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারে এগিয়ে এসে সভার অন্যতম আয়োজক হাইকমিশনার মিজারুল কায়েস সোহরাওয়ার্দীপুত্রকে প্রবোধ দিয়ে বললেন, ‘আমরা কিন্তু আপনার বাবাকে সব সময়ই “গণতন্ত্রের মানসপুত্র” বলে সম্বোধন করে থাকি।’ একজন কূটনীতিকের এই কূটনৈতিক ব্যাখ্যায় আওয়ামী লীগের পরিবারতান্ত্রিক ভাবমূর্তির যে নিরসন ঘটে না, সে কথা বলাই বাহুল্য। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ধারণ ও অনুশীলন করতে না পারার এই সংকট থেকে বর্তমানের আওয়ামী লীগ আদৌ বেরোতে চায় কি না, সেটিও অবশ্য একটা বড় প্রশ্ন।
আওয়ামী লীগের ওয়েবসাইটে দলের যে জন্ম-ইতিহাস লেখা আছে, সেই বিবরণীর বয়ানে বলা হয়েছে, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীরা ঢাকার কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে সম্মিলিত হয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন, যার নামকরণ করা হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা আবদুল হামিদ খানকে দলের সভাপতি ও শামসুল হককে দলের সাধারণ সম্পাদক করা হয় এবং শেখ মুজিবুর রহমান হন দলের যুগ্ম সম্পাদক। ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণের প্রক্রিয়ায় পরে দলের নাম থেকে মুসলিম কথাটি বাদ দেওয়া হয়। যাঁর আদর্শের অনুসারীরা এই দল গঠন করলেন, তিনি কিন্তু তখন দলের নেতৃত্বে ছিলেন না। যদিও পরে আওয়ামী লীগের নেতা হিসেবেই তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। বৈরুতে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু না হলে দলের ওপর তাঁর প্রভাব হয়তো আরও বিস্তৃত হতো।
আওয়ামী লীগের আদর্শিক গুরু সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশিত গণতান্ত্রিক চেতনার অবক্ষয়ে তাঁর পুত্রের আেক্ষপের হয়তো তেমন একটা গুরুত্ব নেই। কারণ, তিনি লন্ডন–প্রবাসী এবং দেশে দলীয় কার্যক্রমে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই, যেমনটি আছে নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবারের। সম্ভবত সে কারণেই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কণ্ঠে শোনা যায়, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছে এই ওসমান পরিবারে। এখানে দল গঠন থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি হয়েছে। রাজনীতির নীতি-আদর্শ নিয়ে চলতেন জোহা কাকা। এই পরিবারের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল সব সময়। যদি তাদের প্রয়োজন হয়, দেখাশোনা করব’ (সমকাল, ৪ জুন, ২০১৪)। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে ওসমান পরিবারের ক্ষমতার মাহাত্ম্য টের পাওয়া যায়। নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক সাত খুনের ঘটনায় এই পরিবারকে ঘিরে আবারও বিতর্ক তৈরি হওয়ার পটভূমিতেই জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর এই সাফাই। রাশেদ সোহরাওয়ার্দীর আেক্ষপ আর ওসমান পরিবারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন—এ দুই মন্তব্যের দৃশ্যমান বৈপরিত্য নিঃসন্দেহে একটি ভাবনার বিষয়।
আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা আন্দোলনের দল এবং তার অর্জনও অনেক। কিন্তু শুধু অতীতের অর্জন আর ঐতিহ্যের ওপর ভর করে একটি দল যে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় অনন্তকাল ধরে তার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে না, তার সাম্প্রতিকতম নজির হচ্ছে ভারত। ভারতের স্বাধীনতা এনেছে যে রাজনৈতিক দল, সেই কংগ্রেসের ভরাডুবির কারণগুলো খতিয়ে দেখলে তা থেকে বাংলাদেশেরও অনেক কিছু শেখার আছে। দেশটিতে এই প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহ্য ও কৃতিত্বের রাজনৈতিক পুঁজি ভোটের বাজারে কোনো কাজে আসেনি। স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে অঙ্গািঙ্গভাবে মিশে থাকা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো দল যদি কতিপয় ব্যক্তি, পরিবার ও গোষ্ঠীর স্বার্থের নিগড়ে বন্দী থাকে, তাহলে সেই দলের বিকাশ রুদ্ধ হতে বাধ্য। তাই আওয়ামী লীগেরও সম্ভবত এখন প্রয়োজন আত্মবিশ্লেষণ, তাদের ৬৬ বছরের ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিক পর্যালোচনা। সেকাল ও একালের আওয়ামী লীগের ফারাকগুলো, আদর্শ ও মূল্যবোধ এবং নেতৃত্বের গুণগত দিকের ক্ষেত্রে—এই সবকিছুরই বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ও দলের মূল্যায়নকে অনেকেই দুই ভাগে ভাগ করে থাকেন। একটি হচ্ছে ’৭৫-পূর্ব আওয়ামী লীগ আর অপরটি ’৭৮-উত্তর। স্বাধীনতাযুদ্ধের ভূমিকা দলের ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু শুধু সেই অর্জনই কি দলের একমাত্র পাথেয় হয়ে থাকতে পারে? ’৭৫-এ বাকশাল গঠনের সময় আওয়ামী লীগের বিলুপ্তিকে অনেকে একটি অধ্যায়ের অবসান হিসেবে গণ্য করার যে দাবি করে থাকেন, তা বিবেচনায় না নিলেও যে সত্যটি অনস্বীকার্য তা হলো, আওয়ামী লীগ বলতে এখন যা বোঝায়, সেই রাজনীতির রূপকার হলেন শেখ হাসিনা। তিনি একটানা প্রায় ৩৩ বছর দলের সভানেত্রী, যেটি বৈশ্বিক পরিসরেও যেকোনো রাজনীতিকের জন্য একটি রেকর্ড বলে গণ্য হবে। সুতরাং দল হিসেবে একালের আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক কিংবা ব্যক্তিকেন্দ্রিক অথবা অংশগ্রহণমূলক কিংবা নির্দেশনামূলক যাই হোক, তার দায় বা কৃতিত্ব শেখ হাসিনার। দল যদি গুটিকয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের রক্ষক হয়ে থাকে কিংবা সুবিধাবাদ ও পেশিশক্তির পূজাির হয়ে থাকে, সেই দায়ও শেখ হাসিনারই। দলের অভ্যন্তরে বিকল্প নেতৃত্বের উন্মেষ অথবা গণতন্ত্র চর্চার উদ্যোগ কোনোটিই যে সুখকর হয়নি, তার নজিরও অগণিত। দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রস্তাব করে নাকাল হয়েছেন যাঁরা, তাঁদের হয় দল ছাড়তে হয়েছে, নয়তো পরিণতি হয়েছে নেত্রীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
দলীয় নেতৃত্বের ৩৩ বছরের মধ্যে শেখ হাসিনা সরকার পরিচালনার সুযোগ পেয়েছেন ১০ বছরেরও বেশি। সরকার পরিচালনায় তাঁর অনেক অর্জনও হয়তো আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে শািন্ত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিদ্রোহের অবসান তার মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অঙ্গীকারও হতে পারত সে রকম আরেকটি অর্জন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে যা রাজনৈতিকীকরণের দূষণে অনেকটাই বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। তবে, তাঁর অন্য সব অর্জনই ম্লান হতে চলেছে যে কারণে, তা হলো ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার বেপরোয়া চেষ্টা৷ রাশেদ সোহরাওয়ার্দী বর্ণিত ‘গণতন্ত্রের পরিপন্থী কার্যকর বিরোধী দলহীন নির্বাচন’।
৫ জানুয়ারি ভোটারদের বঞ্চিত করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনকে বৈধ বলে যাঁরা আত্মতৃপ্তি পাচ্ছেন, তাঁরা বিস্মৃত হচ্ছেন যে অতীতে একাধিকবার সামরিক শাসনও আদালতের অনুমোদন পেয়েছে। সাংবিধানিক প্রয়োজনীয়তা এবং আইনগত বৈধতার পাশাপাশি গণমানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস করার দায় দেশের প্রাচীনতম এই দলটির কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অপবাদ চিরস্থায়ী হওয়ার বিষয়টি এখন শেখ হাসিনার জন্য প্রায় অবধারিত। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ক্ষত কি তিনি আরও বিস্তৃত হতে দেবেন, নাকি তা দ্রুত সারিয়ে তুলতে বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজবেন?
১৩ জুনের ওই সভায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ব্রিটিশ এমইপি চার্লস ট্যানক বলেছিলেন, বাংলাদেশ থেকে কোনো খবর যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে না, সেটাই ভালো খবর। রানা প্লাজা ধস এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মতো নানা ধরনের বীভৎসতার খবর শুনে অভ্যস্ত চার্লস ট্যানকের মতো রাজনীতিকেরা চান না যে বাংলাদেশ থেকে আবারও কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা সংবাদে উঠে আসুক। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে জাতিসংঘের মহাসচিবের বৈঠকেও তাই রাজনৈতিক সংলাপের কথা এসেছে। কিন্তু জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রতিনিধির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি তাঁকে বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সবাই মেনে নিয়েছে এবং বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষে পাঁচ বছর পর সংলাপ হবে। রাষ্ট্রপতির এই মন্তব্যে যদি প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবের প্রতিফলন ঘটে থাকে, তাহলে তাকে দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে। এই দুর্ভাগ্য যেমন দেশের, তেমনি তা আওয়ামী লীগেরও।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

সুইস ব্যাংক, ভোগবিলাস, দারিদ্র্য ও একটি কল্পকাহিনী by মাহবুব কামাল

২০০২ সাল থেকে অর্থ পাচার রোধে বিশ্বব্যাপী মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ব্যাপকভাবে কার্যকর হয়। তখন থেকে সুইস ব্যাংক তাদের কাছে গচ্ছিত পাচার করা অর্থের দায় বহনে অস্বীকৃতি জানিয়ে গ্রাহকদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করে চলেছে। এখন যে কল্পকাহিনীটি পাঠক পড়বেন, তা ২০০২ সালের আগে প্রচলিত ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশের ক্রাউন প্রিন্স ঢুকেছেন সুইস ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীর রুমে। চেয়ারে বসেই তিনি বলতে শুরু করেন- আমার বাবা বুড়ো হয়ে গেছেন। কিন্তু তিনি ক্ষমতা ছাড়ছেন না। আর তাই আমিও প্রিন্স থেকে কিং হতে পারছি না। আমি আর কতদিন অপেক্ষা করব?
প্রধান নির্বাহী বললেন, কিন্তু আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করতে পারি?
-হ্যাঁ, আপনিই পারেন আমাকে রাজা বানাতে।
-কীভাবে?
-আমার বাবা আপনার ব্যাংকে যে টাকা রেখেছেন, তার একটা স্টেটমেন্ট দরকার আমার। ওই ব্যাংক-হিসাব কৌশলে ছড়িয়ে দিয়ে বাবার ভাবমূর্তি নষ্ট করে দেব আমি। তখন তিনি বাধ্য হয়ে অবসরে যাবেন। আর আমি তার স্থলাভিষিক্ত হব।
-কিন্তু আমি তো এটা করতে পারব না। ব্যাংক-হিসাব গোপন রাখাই আমাদের পলিসি।
-আমি আপনাকে ফাইভ মিলিয়ন ডলার দেব।
-সরি, আমি এটা পারব না।
-টেন মিলিয়ন ডলার।
-প্লিজ, আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
ক্রাউন প্রিন্স এবার পকেট থেকে একটি রিভলবার বের করলেন। পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জে সেটা তাক করলেন প্রধান নির্বাহীর দিকে। বললেন, আমি এখন এক থেকে দশ পর্যন্ত সংখ্যা উচ্চারণ করব। এর মধ্যে আপনি যদি রাজি না হন, আই উইল জাস্ট শুট ইউ।
ক্রাউন প্রিন্স ওয়ান, টু, থ্রি- এভাবে দশ পর্যন্ত উচ্চারণ করার পরও প্রধান নির্বাহী নিশ্চুপ রইলেন।
ক্রাউন প্রিন্স এবার রিভলবার নামিয়ে খুললেন তার ব্রিফকেস। সেটা ডলার দিয়ে ঠাসা।
তিনি হাসিমুখে বললেন, আমার একটা অ্যাকাউন্ট খুলুন, প্লিজ।
বলাবাহুল্য, এই কল্পকাহিনী সেকেলে হয়ে গেছে। এখন ঘুষের প্রলোভন কিংবা মৃত্যুর ভয় দেখানো দূরের কথা, সাধারণ অনুরোধেরও প্রয়োজন পড়ে না। সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নিজস্ব নিয়মেই ফি-বছর তাদের গ্রাহকদের ব্যাংক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করে চলেছে। তো এ বছর প্রকাশিত স্টেটমেন্ট থেকে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ীদের ৩ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা গচ্ছিত রয়েছে সুইস ব্যাংকে। দুঃসংবাদটি হচ্ছে, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের গচ্ছিত টাকার পরিমাণ প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। ২০১২ সালে যা ছিল ১ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা, ২০১৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ২৩৬ কোটি। ওদিকে বাংলাদেশী ধনাঢ্য শ্রেণীর টাকা যে শুধু সুইস ব্যাংকেই পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা নয়; ব্রিটেন, হংকং, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকেও ক্রমাগত পাচার হচ্ছে টাকা। আবার সাদা চোখে দেখা যায়, পাচারকৃত এমন টাকার হিসাব মেলানোও ভার। কানাডার বেগমপাড়া, মালয়েশিয়ার সেকেন্ড হোম প্রজেক্টসহ বিভিন্ন দেশে দ্বিতীয় বিলাসী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন অনেকেই।
এই যে কাঁড়ি কাঁড়ি, রাশি রাশি টাকা- এসব আসে কোত্থেকে, এ এক প্রশ্ন বটে। গার্মেন্ট মালিকদের টাকার রহস্য না হয় বোধগম্য। কার্ল মার্কসের ‘উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্বে’ এর ব্যাখ্যা রয়েছে। একজন পুঁজিপতি ১০০ টাকায় যে পণ্য বিক্রি করছেন, তা উৎপাদনে তার খরচ হয়েছে কত? কাঁচামাল ১০ টাকা, মেশিনারিজ খরচ ১০ টাকা আর শ্রমিককে দিয়েছেন ১০ টাকা। অর্থাৎ ৩০ টাকা উৎপাদন খরচের পণ্যে তিনি লাভ করেছেন ৭০ টাকা। এই অস্বাভাবিক লাভ তার হতো না, যদি তিনি শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দিতেন। তিনি আসলে শ্রম শোষণ করেই টাকার মালিক হয়েছেন। শ্রমিকের ন্যায্য ৬০ টাকা তাকে বুঝিয়ে দিলে তার লাভ থাকত ২০ টাকা এবং সেটাই হতো ন্যায়সঙ্গত। অনেক গার্মেন্ট মালিক এই ন্যায়সঙ্গত কাজটি না করে তাদের শ্রমিক শ্রেণীকে বস্তিতে ঠেলে দিয়ে কানাডার বেগমপাড়ায় গড়ে তুলছেন প্রাসাদ।
এখন কথা হচ্ছে, টাকা পাচারকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে সবাই তো আর এই শ্রেণীর গার্মেন্ট মালিক নন। তারা কারা এবং তাদের বিপুলাকার টাকার উৎস কী? তারা আসলে একক সত্তার ব্যবসায়ী নন। তাদের সত্তার সঙ্গে লেপ্টে আছে রাজনীতিক ও আমলার সত্তা। ত্রি-চক্রের এই সিন্ডিকেট দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসার কমিশনবাজি করে থাকে। মজুদদারির মাধ্যমে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নে ফাঁকি ইত্যাদি তো আছেই। আবার রাজনীতিক ও আমলাদের টাকা বানানোর মেশিনটি অপারেট করা সবচেয়ে সহজ। শুধু নিয়োগ বাণিজ্যেই তারা যা বাগাতে পারেন, তা দিয়ে আলাদা একটি ব্যাংকে বিগ সাইজের অ্যাকাউন্ট নির্বাহ করা যায়। যা হোক, এই প্যারার উপসংহারে নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত টাকার যে খবর আমরা পাই কিংবা বিত্তশালীদের যে চাকচিক্যময় বাহারি জীবন দেখতে পাই-সেগুলোর অন্তত ৯০ শতাংশের পেছনে রয়েছে কোনো না কোনো ফর্মের দুর্নীতি।
২.
সুইস ব্যাংক গ্রাহকদের ব্যাংক-হিসাব প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা রীতির সংস্কার করেছে। ভবিষ্যতে হয়তো এই ব্যাংকে টাকা রাখার পূর্বশর্ত হিসেবে সেই টাকার বৈধতা নিশ্চিত করার সংস্কারও করবে তারা। কিন্তু এ দেশের দুর্নীতিবাজদের মানসিকতার সংস্কার কবে হবে, তা অনিশ্চিত। তবে এটুকু অন্তত বুঝতে পারি, নিছক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা দ্বারা এ সংস্কার অসম্ভব। অর্থের প্রতি মোহ এক বড় কঠিন অসুখ। একটা বিষয় আমার কাছে এখনও রহস্যময়। বুড়োদের শারীরিক অসুস্থতা হয়, তা হতে পারে অবশ্যই। কিন্তু অর্থলোভের অসুখ কেন হয়? যৌবনে, এমনকি মধ্যবয়সেও অর্থের প্রতি মোহ থাকার একটা যুক্তি থাকতে পারে; উপভোগ করার মতো সময় পড়ে আছে তাদের সামনে। কিন্তু ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ওয়ান লেগ ইন দ্য গ্রেভ’- তারা কেন অর্থ-সম্পদের জন্য এত লালায়িত হয়ে থাকে? শেষ বয়সে মির্জা গোলাম হাফিজের বিরুদ্ধে যখন দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, তখন এক কলামে লিখেছিলাম- তিনি চোখে দেখেন না, কানেও শোনেন না, পারেন শুধু টাকা গুনতে। বুড়ো হাবড়া মন্ত্রী-এমপিদের বেশিরভাগেরই যথেষ্ট অর্থ-সম্পদ রয়েছে। কিন্তু তাতে তাদের চলে না। বড়জোর দু’চার-পাঁচ বছর বাঁচবেন জেনেও নতুন টাকার গন্ধ তাদের খুব পছন্দ। সেই টাকা কী কাজে লাগবে, আল্লাহ মালুম। সন্তান-সন্ততিরা ভোগ করবে? মরণকালে সন্তানদের জন্য জীবনাদর্শ না রেখে, রেখে যাব দুর্নীতির টাকা? তবে যেসব প্রবীণ ব্যবসায়ী দুর্নীতিমুক্ত অবস্থায় নতুন নতুন ভেঞ্চার ও প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে চলেছেন, তাদের ভোগ-বিলাসের ব্যাপারে কোনো কমপ্লেইন নেই এই লেখকের। বরং তারা শ্রদ্ধার পাত্রই।
এ এক ভয়াবহ বৈষম্যমূলক সমাজে বাস করছি আমরা। এখানে একটি শ্রেণী উড়োজাহাজের বিজনেস ক্লাসে লন্ডন-প্যারিস-জেনেভা ঘুরে বেড়াচ্ছে আর জয়পুরহাটের মর্জিনা বিবিরা কিডনি বিক্রি করে আহার জোগাচ্ছেন। এর নাম সিভিলাইজেশন! তবে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডিটা বুঝি এই যে, সাধারণভাবে দেশের দরিদ্র-শোষিত শ্রেণীটি কারও বিরুদ্ধে কোনো কমপ্লেইন করে না। বরং দরিদ্র বেকার যুবক কবিতা আওড়ায়- দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান! আর মর্জিনা বিবিরা বলেন, হাতের পাঁচ আঙুল কি সমান? ধনী-গরিব তো আল্লাহই বানিয়েছে।
৩.
কার্ল মার্কস শ্রেণীহীন, বৈষম্যমুক্ত একটি সমাজের আউটলাইন দিয়েছিলেন। সেই আউটলাইন নিয়ে বিতর্ক আছে প্রচুর। কিন্তু শ্রেণী-বৈষম্য ও শ্রমশোষণের যে কারণগুলো দেখিয়েছেন তিনি, সেগুলোর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কঠিন। মানবেতিহাসের বর্তমান পর্যায়ে এসে আমরা নিশ্চিত হয়ে গেছি যে, শুধুই গণতন্ত্র দিয়ে এই কারণগুলো দূর করা সম্ভব নয়। যদি তা সম্ভব হতো, তাহলে দীর্ঘ ৬৭ বছর গণতন্ত্র চর্চার পর ভারতে শ্রেণী-বৈষম্য এতটা প্রকট থাকত না। এটা একটা প্যারাডক্স বটে, মার্কস নির্দেশিত কমিউনিস্ট সমাজে শ্রেণী-বৈষম্য দূর হলেও সেখানে থাকবে না গণতন্ত্র আর পুঁজিবাদী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকলেও দূর হবে না বৈষম্য। এমনকি ইউরোপের পুঁজিবাদী দেশগুলো ওয়েলফেয়ার স্টেটের রূপ ধারণ করলেও সেখানে শ্রেণী-বৈষম্যের মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়নি।
আসলে আমাদের মতো একটি অনগ্রসর পুঁজিবাদী সমাজে দারিদ্র্যের মাত্রা ও ধনিক শ্রেণীর লুটপাট কমিয়ে আনতে প্রয়োজন অর্থনীতির ব্যাপক সংস্কার। বস্তুত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের আইনগুলোই এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, সেগুলো এমন এক মাকড়শার জাল সৃষ্টি করে, যেখানে দরিদ্ররা কীট-পতঙ্গের মতো আটকা পড়ে। এই আইনগুলোর পরিবর্তন ছাড়া অর্থনীতির সংস্কার সম্ভব নয়। আমরা নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার প্রশ্নে অস্থির হয়ে আছি, মানুষ ভোটাধিকার ঠিকমতো প্রয়োগ করতে পারল কি-না, তা নিয়ে হুলস্থূল বাধিয়ে ফেলছি। যে নির্বাচন নির্বাচকমণ্ডলীর দারিদ্র্য ঘোচাতে ব্যর্থ হয়, সেই নির্বাচনের মাহাত্ম্য কী? তার চেয়ে অর্থনীতির সংস্কারের এজেন্ডাই কি প্রাইম কনসিডারেশন হতে পারে না? যদি হতে পারে, তাহলে এই সংস্কার এমনভাবে হতে হবে যে, কর্মক্ষমতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে কেউ বিলিওনিয়ার-ট্রিলিওনিয়ার হতে পারলেও অসুবিধা নেই; কিন্তু দুর্নীতি করে কেউ যেন লাখ টাকারও মালিক হতে না পারে।
বিল গেটসের অজস্র টাকার ব্যাপারে আমেরিকানদের কোনো অভিযোগ নেই, ঈর্ষা নেই, এমনকি মাথাব্যথাও নেই। কারণ তার টাকা সৃজনশীলতার টাকা। দ্বিতীয়ত, একজন গড় আমেরিকান তার যাপিত জীবনে কোনো কষ্ট ভোগ করে না। তাই তাদের মেজাজও ঠাণ্ডা। কিন্তু এ দেশের মর্জিনারা তাদের নিয়তি মেনে নিলেও আমরা যারা শিক্ষিত দরিদ্র, দারিদ্র্য তাদের মেজাজ খিটখিটে করে রেখেছে। আমরা খিটখিট করবই। আমাদের সৌন্দর্যচেতনাও নষ্ট হয়ে গেছে। পৃথিবীর সবকিছুই আমরা অসুন্দর দেখি। দুর্নীতিবাজদের রকমারি ফ্যাশনেবল জীবনও আমাদের কুশ্রী লাগে। এটা কি অসুখ? যদি তা-ই হয়, তাহলে সুইস ব্যাংকের টাকাগুলো ফেরত এনে সেই টাকায় চিকিৎসা করান আমাদের।
পুনশ্চঃ ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত ভারতীয়দের টাকা ফেরত আনার অঙ্গীকার করেছেন।
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

মাদক ও বাংলাদেশের নারী সমাজ by মোঃ আবু তালেব

বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে মাদক ব্যবহার বা মাদকাসক্তির গতিপ্রকৃতির চালচিত্রের বলতে গেলে এখনও কিছুই আমরা জানি না। পত্রিকার সংবাদ বা ব্যক্তিগত সূত্র থেকে মাঝেমধ্যেই জানা যায় মাদকাসক্ত নারীদের গোপনে কোনো মনোরোগ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার সংবাদ। আশির দশক থেকে শুরু করে গত প্রায় ৩৫ বছর ধরে একটু একটু করে দেশের প্রায় সব নাগরিক জনপদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সরকারি-বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী মিলিয়ে তিন শতাধিক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠলেও তিন-চার বছরের আগে এসব স্থানে নারীরা একেবারেই অনুপস্থিত। সম্প্রতি দু-তিনটি স্থানে নারীদের জন্য মাদকাসক্তির চিকিৎসাসেবা চালু করা হলেও মাদকাসক্তিবিষয়ক তথ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীসমাজ এখনও ঐরফফবহ চড়ঢ়ঁষধঃরড়হ। কেননা এরা আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও এদের অস্তিত্ব প্রত্যক্ষভাবে দৃশ্যমান নয়। আমরা এদের অনুভব করি কিন্তু গণনায় পাই না। আমরা এদের নীরব উপস্থিতি অনুমান করি। কিন্তু বাস্তবে এরা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

বিভিন্ন বেসরকারি ও অসমর্থিত তথ্য সূত্রে বাংলাদেশের মাদকাসক্তদের এক-তৃতীয়াংশ নারী বলে উল্লেখ করা হলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের ডাটাবেইজে এরা প্রায় অনুপস্থিত বলা চলে। তবে বাংলাদেশের নারী সমাজে মাদকের উপস্থিতি বা মাদক সাম্রাজ্যে নারীদের বিচরণের নানা রকম সূচক বা ইঙ্গিতবাহী নির্দেশক রয়েছে। যেমন স্কুল-কলেজের ছাত্রদের পাশাপাশি ছাত্রীরাও হেরোইন, ফেনসিডিল, গাঁজা ও ইয়াবার নেশা করছে বলে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা শহরে ঐশী নামের এক স্কুলছাত্রী সম্প্রতি মাদক নেশায় আচ্ছন্ন হয়ে নিজ হাতে তার পিতা-মাতাকে হত্যা করে গণমাধ্যমে ও সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পত্রিকার পাতায় প্রায়ই মাদক সম্রাজ্ঞী, ইয়াবা সুন্দরী, ফেন্সি কুইন ইত্যাদি বিভিন্ন চমকপ্রদ অভিধায় যেসব নারী মাদক ব্যবসায়ীর নাম পাওয়া যায়, তাদের অধিকাংশই কেবল মাদক চোরাকারবারিই নয়, তারা রীতিমতো মাদকাসক্ত। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর প্রকাশিত ২০১২ সালের স্যুভেনিরে মাদকাসক্ত শিশুদের ওপর প্রকাশিত একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধে দেখা যায়, যেসব পথশিশু মাদক সেবন করে তাদের প্রায় অর্ধেক কিশোরী। ওই প্রবন্ধে আরও দেখা যায়, মাদকসেবী এসব শিশুর ৫১ শতাংশের মা মাদক সেবন করেন। সিনেমা, মডেলিং ও সঙ্গীতসহ সংস্কৃতি জগতের অনেক বিখ্যাত নারী ব্যক্তিত্বের মাদক সেবনের কথা মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়। ২০০৯ সালে আইসিডিডিআরবি পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকা শহরের প্রায় ৩৪ লাখ বস্তিবাসীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ নারী এবং এদের মধ্যে প্রায় ১ শতাংশ কোনো না কোনো মাদক সেবন করে।
বাংলাদেশে মাদকাসক্ত নারীরা কেবল মাদকাসক্তির চিকিৎসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত নয়, তারা সাধারণ চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত। এদের মধ্যে ৪২.৬ শতাংশ সাধারণ হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গেলে লাঞ্ছনা ও অবহেলার শিকার হয়েছে। ওই গবেষণায় দেখানো হয়েছে বাংলাদেশে মাদকাসক্ত চিকিৎসাসেবার যাবতীয় আয়োজন পুরুষকে ঘিরে। নারী মাদকাসক্তরা অবহেলিত তো আছেই, উপরন্তু পুরুষ মাদকাসক্তদের নারী যৌনসঙ্গীরা তাদের সংসর্গে থেকে মাদকাসক্ত ও এইচআইভি/এইডসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলেও তাদের কথা কেউ ভাবেও না। বাংলাদেশের নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তি একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যা হলেও তাদের যৎসামান্য যেটুকু চিকিৎসা সুবিধা আছে, তাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশেরই নাগালের বাইরে।
দেশে মাদকাসক্তির ক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের জন্য যেসব সেবা ও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তার সবই মূলত পুরুষ ইনজেকটিং ড্রাগ ব্যবহারকারীদের জন্য বলেও এ গবেষণা রিপোর্টে দেখানো হয়েছে। নারী মাদকাসক্তদের মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের যে বিশেষ আয়োজন দরকার, দেশের বর্তমান Drop in Center-গুলোতে তার কিছুই নেই বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে। ওই রিপোর্টে ঢাকার একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এক নারী মাদকাসক্তের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, এসব চিকিৎসা কেন্দ্রে তাদের যথাযথ চিকিৎসা দূরে থাক, ন্যূনতম মানবিক ব্যবহারটুকু পর্যন্ত করা হয় না। রিপোর্টের বর্ণনা থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে নারী মাদকাসক্তরা কেবল চিকিৎসাক্ষেত্রেই বঞ্চিত নয়, পরিবার ও নিকট আত্মীয়দের কাছেও তারা চরমভাবে লাঞ্ছিত, অবহেলিত ও ঘৃণিত। এক নারী মাদকাসক্ত বলেছেন, আপন বড় বোনের বাড়িতে তার কোনো জায়গা হয় না। যদি তিনি কখনও বড় বোনের বাড়িতে যান, তখন বড় বোন তার বাড়ির শুচিতা রক্ষার জন্য তাকে আগে গোসল করতে বাধ্য করে, তারপর অবহেলাভরে কিছু খেতে দেয় এবং খাওয়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য করে। তিনি যখন তার কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে যান, তখন সবাই তাকে চোরের মতো দূর দূর করে। আরেকটি নিরাময় কেন্দ্রের এক নারী মাদকাসক্ত অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তাদের কাছে মাঝেমধ্যে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারলে নানাভাবে হয়রানি ও মারধর করে। অতীতে তারা পুলিশকে ঘুষ দিয়ে ম্যানেজ করলেও বর্তমানে পুলিশের বর্ধিত দাবি মেটাতে না পেরে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপে পুলিশ তাদের সোজা জেলে ঢুকিয়ে দেয়।
বহু নারী মাদকাসক্ত না হয়েও বহু ক্ষেত্রে মাদকের নরক যন্ত্রণার শিকার। বিশ্বব্যাপী ধর্ষণের যত ঘটনা ঘটে, তার সিংহভাগই ধর্ষণকারীর মাদকাচ্ছন্নতার কারণে কিংবা উধঃব জধঢ়রহম-এর ক্ষেত্রে ধর্ষিতার অজান্তে তার ওপর মাদক প্রয়োগের ফল। বউ পেটানো স্বামীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় কিংবা নেশার টাকা জোগাড় করার জন্য বউ পেটায়। নারীরা নেশাগ্রস্ত সন্তান, ভাই, দেবর কিংবা ছেলেবন্ধুর হাতে পিটুনির শিকার হচ্ছে এমন সংবাদ গণমাধ্যমে হরহামেশা দেখা যায়। স্বামীর মাদকাসক্তির কারণে নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদ এবং সংসার ভাঙা বিশ্বের সব সমাজেই একটি চিরাচরিত ব্যাপার। কর্মস্থলে মাদকাসক্ত সহকর্মী থাকলে নারীরা ধর্ষণসহ নানা রকম নির্যাতনের শিকার হয়। ইভটিজিং, অপহরণ, ছিনতাই- এসব ঘটনার বেশিরভাগের পেছনে রয়েছে মাদকের প্রভাব। বহু নারী শুধু এ কারণে মাদকাসক্ত হয় যে, তাদের স্বামীরা মাদকাসক্ত। ঢাকার এক মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এক নারী অভিযোগ করেছেন, তার স্বামী নেশার জন্য প্রতিনিয়ত তার কাছে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে না পারলে তাকে বেদম প্রহার করে। কখনও কখনও তাকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে মেরে ফেলার ভয় দেখায়।
দেশে মাদকাসক্ত স্বামীদের কারণে নারীরা সামাজিকভাবেও লাঞ্ছনা ও ধিক্কারের শিকার হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাদকাসক্তদের স্ত্রীরা সামাজিকভাবে বয়কটের শিকার হয়। তাদের কেউ কাজ দিতে চায় না। সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব-পার্বণে তারা অবহেলার শিকার হয়। মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ক্রিয়া-এ চিকিৎসাধীন এক মাদকাসক্তের স্ত্রীর ভাষায়, সবাই তাদের এড়িয়ে চলে এবং সন্দেহের চোখে দেখে। তারা কারও কাছে গেলে তাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। তাদের পথে-ঘাটে সর্বত্র হিরোঞ্চির বউ নামে উপহাস করা হয়। স্বামীর মাদকাসক্তির কলংক নারীদের কেবল নিগ্রহের শিকার বানায় না, ভেতরে ভেতরে তাদের সব স্বপ্ন-সাধ, আশা-আকাক্সক্ষা ধূলিসাৎ করে দেয়। বহু নারী নিরূপায় হয়ে কেবল বিবাহ বিচ্ছেদের আশ্রয়ই নেয় না, অনেক সময় তাদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও ক্রোধ তাদের আত্মহননে প্ররোচিত করে। লাইট হাউজ-এ চিকিৎসারত এক মাদকাসক্তের স্ত্রীর অভিযোগ, তার স্বামী মাদকাসক্ত বলে তার সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করা হয়নি। আপন-এ চিকিৎসাধীন এক মাদকাসক্তের স্ত্রী ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, স্বামীর মাদকাসক্তির কারণে তার নিজের প্রতি ধিক্কার জন্মেছে। তারও ইচ্ছে করে স্বামীর মতো মাদক সেবন শুরু করে নিজেকে শেষ করে দিতে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসন
নারী মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ধারণাটি মাত্র গত ২ দশক ধরে গবেষক ও চিকিৎসকদের মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে। তৃতীয় বিশ্ব এ ব্যাপারে এখনও অন্ধকারে থাকলেও উন্নত বিশ্বে এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এসব গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকে যে কয়েকটি বিষয় সুন্দরভাবে উঠে এসেছে তা হল- নারীদের মাদকে হাতেখড়ি, মাদক গ্রহণের অন্তর্নিহিত জৈব রাসায়নিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পারিপার্শ্বিক কারণ পুরুষের থেকে অনেক ক্ষেত্রে আলাদা। নারীদের মাদক গ্রহণের পথ-পদ্ধতি ও প্রবণতা এবং পছন্দ-অপছন্দ ও ঝোঁক, তাদের দেহের নারীভিত্তিক বিশেষ জীববৈশিষ্ট্য ও জৈবরসায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মাদক গ্রহণজনিত মনোদৈহিক জটিলতা, বিকার ও বিপত্তিগুলোতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সাদৃশ্য থাকলেও নারীর আপন ভুবনে এক্ষেত্রে এমন কিছু ব্যাপার আছে যাকে কোনোভাবেই পুরুষের সমস্যার সঙ্গে সমীকরণ করা যায় না। নারী-পুরুষে আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জৈব-রাসায়নিক এবং মনন ও চেতন এবং আচরণভিত্তিক পার্থক্যের কারণে নারীর ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মৌলিক বিষয়গুলো যথা- Motivation, Counseling, Admission, Screening, Diagnosis, Detoxification, Crisis Management, Nutrition, Other disease control, Life skill training, Psychotherapy, Medication, Abscess Management, Overdose Management, Family Therapy, Aftercare, Follow up, Relapse Management ইত্যাদি বিষয়কে একটু ভিন্নভাবে দেখা দরকার। পুনর্বাসন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একজন পুরুষ মাদকাসক্তের জন্য যা প্রয়োজন, নারী মাদকাসক্তের তা নাও প্রয়োজন হতে পারে। মাদকাসক্তি ছাড়াও অন্য যেসব শারীরিক সমস্যা থাকে তাতে নারী-পুরুষের বিস্তর ব্যবধান থাকায় এক্ষেত্রে চিকিৎসা কার্যক্রমে ভিন্ন আয়োজন দরকার হয়। বিশেষত নারীদের গাইনোকলজি সম্পৃক্ত সমস্যাগুলো মোকাবেলায় পুরুষ থেকে নারী মাদকাসক্তদের সম্পূর্ণ আলাদা ব্যবস্থা থাকা দরকার। নারী মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে অনেক নারীঘটিত বিষয় মোকাবেলা করার জন্য নারী চিকিৎসা কর্মীর প্রয়োজন হয়। নারীদের আবাসন, স্যানিটেশন (প্রস্রাবখানা, গোসলখানা ইত্যাদি), খেলাধুলা, বিনোদন ও সামাজিকীকরণ কার্যক্রম পুরুষ থেকে বহুলাংশে আলাদা বলে এর জন্য ভিন্ন আয়োজন দরকার।
মোঃ আবু তালেব : অতিরিক্ত পরিচালক, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর

ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে প্রস্তাবটি বিবেচনা করুন by ড. ইকবাল হোসেন

বর্তমানে ফরমালিন এক অতি পরিচিত শব্দ, যা নিয়ে অনেকেই রয়েছেন এক ধরনের আতংকে। আবার কেউবা শব্দটিকে ব্যবহার করে চলেছেন রাজনীতিতে। মজার এক প্রয়োগ বটে! টেকনিক্যালি কী এই ফরমালিন? সংক্ষিপ্তভাবে, ৩৭ শতাংশ ‘ফর্মালডিহাইডে’র জলীয় দ্রবণই হল এ ফরমালিন। এক বাক্যে, ফর্মালডিহাইড একটি রাসায়নিক যা কার্বন, হাইড্রোজেন আর অক্সিজেনের সমন্বয়ে গঠিত। ফর্মালডিহাইডে রয়েছে হাইলি রিয়েক্টিভ, এন্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং প্রিজার্ভেটিভ গুণাগুণ। ফর্মালডিহাইড সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৮৫৯ সালে। আর এর শিল্প উৎপাদন শুরু হয় সর্বপ্রথম ১৮৮০ সালে জার্মানিতে। ফর্মালডিহাইড সাধারণ তাপমাত্রায় বায়বীয়। তবে বাণিজ্যিক সুবিধার্থে মূলত ৩৭ শতাংশ জলীয় দ্রবণ (যা ফরমালিন নামে পরিচিত) হিসেবে তরলাকারে সংরক্ষণ, পরিবহন ও ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটা ব্যবহৃত হয় বস্ত্র, প্লাস্টিক, পেপার, পেইন্ট এবং কনস্ট্রাকশন শিল্পে। কিছু কিছু ভ্যাক্সিনে ফর্মালডিহাইড/ফরমালিনের ব্যবহার অপরিহার্য। পচননাশক হিসেবে মৃতদেহ সংরক্ষণে রয়েছে এর ব্যাপক ব্যবহার।

নরমাল মেটাবলিজম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে যেমন ফলমূল, শাকসবজি, মাছ এবং মাংস ইত্যাদিতে কিছু কিছু পরিমাণে ফর্মালডিহাইড তৈরি হয়ে থাকে প্রাকৃতিকভাবেই। আপেল, কলা, ফুলকপি, নাশপাতি, ব্যাঙের ছাতা/ছত্রাক ও গরু-খাসি-পর্ক-পোলট্রির মাংসসহ আরও সামুদ্রিক খাদ্যেও থাকে এটা। তবে ‘লাইফ-টাইম’ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফরমালিন আকারে কৃত্রিমভাবে ফর্মালডিহাইড ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যে। খাদ্যদ্রব্যে ফর্মালডিহাইড ব্যবহারের সূচনা হয় বহু আগে। উনিশ শতকের শুরুর দিকে ফর্মালডিহাইড ব্যবহৃত হয় আমেরিকান মিল্ক প্লান্টে। ২০০৫-এ ইন্দোনেশিয়ায় এবং ২০০৭-এ ভিয়েতনামে দেখা যায় খাদ্যদ্রব্যে ফর্মালডিহাইড/ফরমালিনের ব্যবহার। এদেশেও চলছে ফর্মালডিহাইডের অবাধ ব্যবহার। সুতরাং এর ভয়াবহতা ও প্রতিরোধের উপায় যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচনার এক বিষয়।
ফরমালিনে বিদ্যমান ফর্মালডিহাইড আমাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। যেমন- চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, ফরমালিন/ফর্মালডিহাইড কিডনি, লিভার ও লাং-এ নানা রকম সমস্যা তৈরি করতে পারে। পারে ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগের জজন্ম দিতে। ফর্মালডিহাইড মানবদেহে ঘটাতে পারে আরও ছোটো-বড় অনেক সমস্যা। তবে এটাও প্রমাণিত যে, ফর্মালডিহাইড কিছু পরিমাণে মানবদেহের জন্য সহনশীল বা অক্ষতিকর। তবে কী সেই সহনশীল মাত্রা/পরিমাণ? সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্যের যথেষ্ট ঘাটতি এখনও রয়েছে। বলা হয়ে থাকে, ৩০ মিলিলিটার পরিমাণের ফরমালিন সেবন/গ্রহণ আমাদের জন্য প্রাণঘাতী। অর্থাৎ ফরমালিনযুক্ত খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমে কেউ যদি ৩০ মিলিলিটার পরিমাণের ফরমালিন একসঙ্গে গ্রহণ করে, তাহলে তার মৃত্যুর আশংকা থাকে।
আমাদের কেউ কেউ খাদ্যদ্রব্য থেকে ফরমালিন দূরীকরণের একটা চেষ্টা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট একটি পন্থা হল- খাদ্যদ্রব্য সম্পূণরূপে পানি দিয়ে ধুইয়ে পানিতে ৮০ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রায় ৫-১০ মিনিট ধরে সিদ্ধ করে নেয়া। এতে করে খাদ্যদ্রব্য থেকে ক্ষতিকর ফর্মালডিহাইড বের হয়ে আসার সম্ভাবনা থাকে। তবে গবেষণায় এটা প্রমাণিত যে, খাদ্যদ্রব্যে একবার ফরমালিন মিশ্রণের পর তা থেকে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিকর ফর্মালডিহাইড বের করে আনা অসম্ভব। সুতরাং খাদ্যদ্রব্য থেকে মিশ্রিত ফর্মালডিহাইড দূরীকরণের চেয়ে খাদ্যে ফরমালিন মিশ্রণ প্রতিরোধ করাই শ্রেয়।
খাদ্যে ফরমালিন মিশ্রণ বন্ধের লক্ষ্যে সম্প্র্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফার্মেসি অনুষদ থেকে ফরমালিন কটু গন্ধযুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ গুরুত্বের দাবিদার। তবে এখানে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় থাকতে হবে। ফরমালিন ইতিবাচকভাবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে আসছে। কটু গন্ধযুক্ত ফরমালিন সেসব ক্ষেত্রে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনায় ব্যবহার উপযোগী বা গ্রহণযোগ্য হবে কি-না, তা ভাবতে হবে।
খাদ্যে ফরমালিনসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক রাসায়নিকের ব্যবহার বন্ধের করণীয় সম্পর্কে মে-২০১৪ তে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণ করেন বহু জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পক্ষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ইচ্ছায় অংশগ্রহণ করি আমি নিজে। সভায় সংক্ষিপ্ত একটি প্রস্তাব করি যা ফরমালিনের অপব্যবহার রোধে ফলপ্রসূ হবে বলে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি। প্রস্তাবটি হল- এদেশে ফরমালিনের অবৈধ প্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে বৈধ ‘ইম্পোর্ট অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন’ কাঠামোতে একটি নীতি সংযোজন ও প্রয়োগ করা। যেমন- নিবন্ধনকৃত আমদানিকারকদের মাধ্যমে ফরমালিনের আমদানি হতে হবে পূর্বনির্ধারিত মোট পরিমাণের সাপেক্ষে। পূর্বনির্ধারিত মোট পরিমাণের চেয়ে বেশি পরিমাণে ফরমালিন কোনোভাবেই এদেশে প্রবেশ করতে পারবে না। এক্ষেত্রে প্রয়োজন একটি কমিটি বা টিম তৈরি করা, যার দায়িত্ব হবে এদেশে ফরমালিনের ইতিবাচক সব প্রয়োগ/ব্যবহার সঠিকভাবে বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করে বছরের শেষের দিকে একটি মোট পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়া। আর পরবর্তী বছরে এ পূর্বনির্ধারিত মোট পরিমাণের সাপেক্ষে ফরমালিনের সব আমদানি হয়ে থাকবে নিবন্ধনকৃত আমদানিকারকদের মাধ্যমে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণে। এক্ষেত্রে কোনো একটি আমদানির অনুমতি প্রদানের আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই ওই আমদানিকারক কর্তৃক আগের আমদানিকৃত ফরমালিনের যথাযথ ব্যবহার সংক্রান্ত সব নথি এবং বর্তমান (আবেদনকৃত) আমদানি থেকে আগত ফরমালিনের যথাযথ ব্যবহারের পূর্বপরিকল্পনা সঠিকভাবে যাচাই করে নিতে হবে। পাশাপাশি আমদানিকারকদের দাখিলকৃত নথিপত্রের ভিত্তিতে ফরমালিনের ইম্পোর্ট অ্যান্ড সাপ্লাই চেইনের বিভিন্ন পয়েন্টে র‌্যান্ডম অডিট করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বলা হয়, ইতিবাচকভাবে বছরে এদেশে ফরমালিন ব্যবহƒত হয়ে থাকে ১০০ টনেরও কম, কিন্তু বছরপ্রতি বর্তমানে আমদানি হয়ে থাকে প্রায় ৫০০ টন ফরমালিন। অতিরিক্ত এ আমদানিই ফরমালিনের অপব্যবহারে এক সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। সুতরাং প্রস্তাবিত নীতিটি প্রয়োগ করা গেলে খাদ্যে মিশ্রণসহ সব অপব্যবহারের জন্য ফরমালিনের প্রাপ্যতা দুষ্কর হয়ে উঠবে।
ফরমালিন আমদানিতে এ ধরনের নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে তেমন কোনো আইনি সমস্যা রয়েছে বলে আমার মনে হয় না। কেননা এ ধরনের নীতি এরই মধ্যে গৃহীতও হয়েছে। স্থানীয় এক প্রতিষ্ঠানের ইথিলিন অক্সাইড (যা একটি তীব্র দাহ্য রাসায়নিক) বাল্ক আকারে আমদানির অনুমতি চেয়ে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনার জন্য গত ২৩-১২-২০১৩ তারিখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। বুয়েটের প্রতিনিধি হিসেবে আমিই অংশ নেই সেই সভায়। আলোচনা করা হয় বিভিন্ন দিক নিয়ে। অবশেষে সবার সম্মতিতে অনুমতি দেয়া হয় আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে। তবে শর্ত হিসেবে বেঁধে দেয়া হয়, ইথিলিন অক্সাইডের আমদানি কোনোক্রমেই পূর্বনির্ধারিত মোট পরিমাণের চেয়ে বেশি হতে পারবে না। আর এ পূর্বনির্ধারিত মোট পরিমাণ সঠিকভাবে নির্ধারণ করে দেয়ার দায়িত্ব যৌথভাবে দেয়া হয় বুয়েট কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল টেকনোলজি ডিপার্টমেন্টকে।
খাদ্যে ফরমালিন মিশ্রণ বন্ধের লক্ষ্যে বহুমাত্রিক উদ্যোগের একটি অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত নীতিটি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ড. ইকবাল হোসেন : সহকারী অধ্যাপক, কেমিকৌশল বিভাগ, বুয়েট
iqbal1982m@gmail.com

সিরিয়া সংকট- শত্রু কীভাবে মিত্র হয় by রবার্ট ফিস্ক

এত মিথ্যা বলে তাঁরা কীভাবে পার পেয়ে যান? এদিকে টনি ব্লেয়ার বলছেন, সিরিয়া সংকটের সময় পশ্চিমা ‘নিষ্ক্রিয়তা’র কারণে ইরাকের চলমান সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কথা হচ্ছে, সিরিয়ায় বোমা বর্ষণ হলে দামেস্কে তো এই ইসলামপন্থীরাই ক্ষমতায় আসত—যাদের কারণে বাগদাদ এখন হুমকির মুখে। ফলে বারাক ওবামা যে টনি ব্লেয়ারের মতো মানুষের কথায় কান দেননি, তাতে আমরা একরকম বেঁচেই গেছি। গত কয়েক দিনে সিরিয়ায় তিনটি শহর চষে বেরিয়ে আমার মনে এ ধারণা জন্মেছে যে সিরিয়ায় ব্লেয়ার সাহেবের বন্ধুরা যা ঘটাচ্ছেন, সেগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করলে বহু কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে। এর জন্য শুধু পাঁচ মাইল লম্বা আলেপ্পো বিমানবন্দর সড়ক ধরে এগোন।

সরকারি বাহিনী সম্প্রতিই সেখানে ঢুকতে পেরেছে। কিন্তু এই শহরের আশপাশে ইসলামপন্থীরা এত এলাকা নিজেদের দখলে নিয়েছে যে সেখানে যেতে হলে রাতের আঁধারে ১৬ মাইল রাস্তা খুব দ্রুত পার হয়ে যেতে হবে। সে সড়কের ধারে শুধু বালু আর অপরিশোধিত ময়লার ভাগাড়। তার নিচে রয়েছে একটি অব্যবহৃত রেললাইন৷ আর এদিক-ওদিক থেকে ছোড়া লাল-ট্রেসার-গুলি কান ঘেঁষে চলে যাবে। ব্লেয়ার সাহেব চান, আমরা এই গুলিবর্ষণকারীদের সমর্থন করি। এই সড়কে ভ্রমণ করা সাপ-লুডু খেলার মতোই। সিরিয়ার সরকারি বাহিনী এই সড়কের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তাবেষ্টনী বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি চালায়। কখনো কখনো দেখা যাবে, ইসলামপন্থীরা মাত্র ২০০ মিটার দূরে।
আজকের আলেপ্পো শহরের ক্ষণিক চিত্রটি এ রকম—ব্লেয়ারের বন্ধুরা জিতলে এই শহরটি আরেকটি মসুলে পরিণত হতো, আর আসাদের সরকারের বিরুদ্ধে পশ্চিম ‘সক্রিয়’ হলে তো একদম পোয়াবারো হতো। রাস্তায় দেখলাম, সিরিয়ার সরকারি বাহিনী ও বেসামরিক মানুষজন ২০ ফুট গভীর পরিখা খুঁড়ছে। নুসরা ও আইসিস বাহিনী সেখানে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রেখেছে, যেখান থেকে তারা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করে। পরিখা খুঁড়ে তারা সেই সুড়ঙ্গ খুঁজছে। এদিকে আলেপ্পো শহরে সরকারনিয়ন্ত্রিত ভবন বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়। একদিকে আসাদের হেলিকপ্টার থেকে উত্তর আলেপ্পোয় বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে বোমা ফেলা হচ্ছে, এই বোমাবর্ষণ থেকে বেসামরিক এলাকাও বাদ যাচ্ছে না। আর এই সশস্ত্র বিদ্রোহীরা শহরের খ্রিষ্টান মহল্লায় মর্টার হামলা চালাচ্ছেন। আমরা ফ্রন্ট লাইনে ঘোরাঘুরি করলাম, দেখলাম শিশুরা খেলছে, এক বৃদ্ধ ময়লার ভাগাড়ের ওপর বসে সিগারেট ফুঁকছেন। আর মাত্র এক মাইল দূরেই একের পর এক মর্টারের গোলা পড়ছে। এক সিরীয় সেনা পুরোনো একটি পাথরের দেয়াল থেকে একখণ্ড পাথর খুলে নিলেন, সেকেন্ডের জন্য আমি ভ্রু কুঁচকে সেই ফুটো দিয়ে তাকালাম। জায়গাটা ছিল শহরের পুরোনো অংশের একটা প্রান্তে। এক ফুট দূরেই একটি পচা বালুর বস্তা ও ভাঙা কড়িকাঠের পেছনে আরেকটি ফুটো দেখলাম। সম্ভবত বিদ্রোহী সেনারা সেখান দিয়ে আমার ওপর নজর রাখছেন।
সিরীয় বাহিনীর মেজর সোমার পুরোনো শহরের নিচে অবস্থিত এই সুড়ঙ্গ সম্পর্কে বলছিলেন। বিদ্রোহীরা সেই সুড়ঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আব্বাসীয় আমলে নির্মিত মহান উমাইয়া মসজিদ ধসিয়ে দেন। তিনি বলেন, ‘মসজিদটি যখন ভেঙে পড়ে, তখন মনে হলো, এক হাজার ৫০০ বছরের সভ্যতা ধসে পড়ল। আমি রাস্তায়ই ছিলাম, মসজিদটি মড়মড় করে ভেঙে পড়ল—সে শব্দ এখনো আমার কানে বাজে। ভূমিকম্পের মতো মাটি কেঁপে উঠল। পুরো অালেপ্পো শহরের নিচেই বিদ্রোহীরা সুড়ঙ্গ খুঁড়ে রেখেছে। তারা প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে, আমাদের অবকাঠামো ভেঙে দিতে চেয়েছে৷ মুসলমানরা কেন এসব করে? কারণ, তারা মুসলমান নয়।’
আমাদের আশপাশে মুহুর্মুহু বোমা ও গুলিবর্ষণ হচ্ছিল। গুলি-বোমায় কারও মাথা উড়ে যাচ্ছে, আবার কেউ নিজের মাথা বাঁচাতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। সেনাবাহিনী আলেপ্পোর অবরোধ ভেঙে দেওয়ার পর শহরে খাবার এসেছে অনেক। সীমান্তের উত্তরে তুর্কিরা পানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় শহরে ছয় দিন ধরে পানি নেই। সরকারি ট্যাংক থেকে শিশু ও বৃদ্ধারা বালতিতে পানি নিয়ে আসছে। সেনাবাহিনী পুরোনো শহর কেন পুনরুদ্ধার করতে পারল না, সে প্রশ্ন করে লাভ নেই।
‘পর্যাপ্ত সেনা নেই’, একজন সিরীয় সাংবাদিক খোলাখুলি বললেন। সে কারণেই সরকার হোমস শহরের অবরোধ নিয়ে সৃষ্ট সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছে। সরকার বিদ্রোহীদের বিনা বাধায় উত্তরের দিকে যেতে দিয়েছে। বিদ্রোহীরা হোমস শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের আলেপ্পোর বাহিনীকে সহায়তা করতে চেয়েছিল। ২০০ মাইল দূরে আমি হামাস শহরে গেলাম। শহরময় ধ্বংসস্তূপের পাহাড়। মাইলের পর মাইলজুড়ে পরিত্যক্ত সুড়ঙ্গ পড়ে আছে। কয়েকজন খ্রিষ্টান নাগরিক আমাকে একটি গির্জার ভেতরে বাগানের মধ্যে নিয়ে গেলেন। দেখলাম, একটি গোলাপি রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার পড়ে আছে। একজন বললেন, ‘এখানেই ওরা ফাদার ফ্রান্সিসকে হত্যা করেছে। এই চেয়ারে ফাদারকে বসিয়ে তাঁর বাঁ চোখের ঠিক ওপরে ওরা গুলিটি করে।’
ফাদার ফ্রান্সিস ভ্যান ডার লাগট এই হোমস শহরের একজন শহীদ। বছরজুড়ে অবরোধের সময়ও তিনি তাঁর খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ও মুসলিম বন্ধুদের ফেলে শহর ছাড়তে চাননি। উল্টো তিনি এই শহরের অভুক্ত ও নির্দোষ মানুষদের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। নুসরা বাহিনীর সদস্যরা তাঁকে হত্যা করেছে। আসাদ সরকার এদের সন্ত্রাসী হিসেবেই চিহ্নিত করে। আসাদ সরকারের বিরোধীরা বলছেন, আসাদ যদি হোমস শহর অবরোধ না করতেন, তাহলে এই ৭২ বছর বয়সী ক্যাথলিক যাজক মারা পড়তেন না। যেখানে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, তার খানিকটা দূরেই ফাদারের সমাধি। কবরের ওপর সস্তা কাঠের ক্রুশ পোঁতা আছে। গির্জায় তাঁর একটা ছবি আছে, ছবিতে তাঁর চশমা পরিহিত মুখটা যেন আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। পোপ তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করেছেন।
আমার মনে হয়, পশ্চিম যদি গত বছর দামেস্কে বোমাবর্ষণ করত, তাহলে ফাদার ফ্রান্সিস হয়তো বেঁচে যেতেন, ব্লেয়ার সাহেব যেমন ২০০৩ সালে বাগদাদে বোমাবর্ষণ করেছিলেন। আবার তার আগেও তিনি ইসলামপন্থীদের হাতে মারা যেতে পারতেন। ইরাকি বাহিনী যেখানে প্রাথমিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল, সে রেখাটি এখন আসাদের বাহিনীর দখলেই আছে। নুসরা ও আল-কায়েদা হচ্ছে আসাদের শত্রু, ব্লেয়ার সাহেবের কথামতো দামেস্কে বোমাবর্ষণ করা হলে এরাই লাভবান হতো। এখন ইরান কি সেনা পাঠিয়ে শিয়াদের রক্ষা করবে, নাকি ইরাককে?
সামরিক বিমানে আলেপ্পো থেকে দামেস্কে যাওয়ার পথে এ চিন্তাই করছিলাম, স্থান-কালের বিবেচনায় এটি চিন্তার খোরাক হিসেবে খারাপ না। বিমানে প্রায় ৬০ জন সিরীয় সেনা ছিলেন। অনেকেই আহত ছিলেন। ২৫ বছর বয়সী দুজন গুলিবিদ্ধ সেনাও সেখানে ছিলেন, তাঁদের জোর করে সেনাবাহিনীতে ঢোকানো হয়েছিল। গত রাতে স্নাইপারের গুলিতে তাঁরা আহত হয়েছেন। অন্ধকারে আমাদের বিমানের নিচ দিয়ে মেশিনগানের গুলির ঝাঁক উড়ে গেল। দামেস্ক বিমানবন্দরে নামার পর আমাদের উল্টোদিকে পাঁচজন সিরীয় ফারসি ভাষায় কোনো দোয়া পড়লেন। তাঁরা বললেন, জাতীয়তায় তাঁরা আফগান, হাজারা গোষ্ঠীভুক্ত শিয়া। তাঁরা সিরীয় সেনাবাহিনীর পোশাক পরিহিত ছিলেন, তাঁদের হাতে ছিল রাইফেল। আর পাশে ছিলেন একজন ইরানি। পরদিন তাঁদের তেহরানে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। তার মানে, আফগান শিয়ারা এখন আসাদের পক্ষে লড়াই করছেন, আর আফগান সুন্নিরা বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়ছেন। আহা! ব্লেয়ার সাহেব, এ সময় আপনার আমাদের সঙ্গে থাকা মোটেও উচিত হবে না।

ইংল্যান্ডের ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
রবার্ট ফিস্ক: দি ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা।

ছবির হাট ও বাপের জায়গা by সৈয়দ আবুল মকসুদ

পিকাসোর মৃত্যুর পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কাছে সাংবাদিকেরা তাঁর মন্তব্য জানতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি একবার পিকাসোর দক্ষিণ ফ্রান্সের ক্যানের ভালোরিজের বাড়িতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে তাজ্জব কাণ্ড! গ্রামের সড়কপথে যাচ্ছিলাম। দুই পাশের গাছে দেখি ছবি টাঙানো। লোকে বলল, এগুলো পিকাসোর আঁকা পোস্টার। অন্যান্য শিল্পীর আঁকা ছবিও রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে প্রদর্শিত হয় ফরাসি দেশ, জার্মানি প্রভৃতি দেশে।’ পিকাসোকে আবেদিন দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন, কোনো কথা হয়নি। পিকাসোর যে চোখ, তাকানো যায় না। তাঁর চলাফেরার যে গতি, তাঁর সঙ্গে তাল দিয়ে হাঁটা যায় না। যাহোক, ওসব দেশে শিল্পীরা রাস্তাঘাট বা যেখানে খুশি সেখানে বসে শিল্পচর্চা করতে পারেন, কেউ বলে না—এখান থেকে ওঠো, এটা তোমার বাপের জায়গা না।

চারুকলা অনুষদ ও নজরুলের সমাধির উল্টোদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একচিলতে জায়গায় তরুণ শিল্পীরা বসে ছবি আঁকেন। তার নাম ছবির হাট। সেখানে তাঁরা আড্ডা দেন। শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন। কেউ কবিতা লেখেন, কেউ গান বাঁধেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের তা সইছে না। তাঁরা দারোগা-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে সেখানে গেছেন তাঁদের তাড়িয়ে দিতে। নতুন টিভি চ্যানেল যমুনার প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট কর্তাকে টেলিফোনে জানতে চান তাঁদের উচ্ছেদ অভিযান সম্পর্কে। নির্বাহী প্রকৌশলী সাংবাদিককে সীমাহীন ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলেন, ছবির হাটকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় ফেলা হয়েছে। ওটা কারও বাপের জায়গা না।
প্রায় এক যুগ ধরে ছবির হাট ওখানে বসছে। ওখানে যাঁরা বসেন ও যাতায়াত করেন, তাঁরা জানেন, ওটা আসলেই কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়, মায়ের জায়গাও নয়। রাষ্ট্রের জায়গা, জনগণের জায়গা। বৃষ্টি-বাদলার ঝাপটা থেকে বাঁচতে একটুখানি ছাউনির মতো করা হয়েছিল। তা না থাকারই শামিল। ওখানে বৈধ বা অবৈধ কোনো রকম স্থাপনারই অস্তিত্ব নেই। যার অস্তিত্ব নেই, তা উচ্ছেদের অভিযান পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছু নয়। তবে তা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চপেটাঘাত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়। ছবির হাট নামটির মধ্যেই আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আভাস রয়েছে। হাট একটি গ্রামীণ ব্যাপার। মহানগরে হাট কোথায়? এখানে তো সুপার মার্কেট এবং শপিং মল। ওখানে যদি রানা প্লাজার মতো আলিশান ইমারত তুলে পেইন্টিং গ্যালারি করতেন কেউ, তা হতো অন্য জিনিস। অবৈধ স্থাপনা৷ যদি কেউ ‘ছবির মজলিশ’ নামে কিছু করতেন, তাহলে বোঝা যেত ওটা মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের কাজ। ছবির হাট একেবারেই বাঙালির জিনিস। এ দেশের আদিবাসী সংখ্যালঘু জাতির মানুষও এর সঙ্গে যুক্ত।
ছবির হাটের হাটুরেদের দোষ যদি থেকেই থাকে, তা হলো তাঁরা মূলধারার প্রসিদ্ধদের মতো প্রো-গভর্নমেন্ট নন। তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা সরকারবিরোধী। তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করেন। অসত্য, অন্যায়, অবিচারের প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটে তাঁদের কাজে। তাঁরা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী। ওই মুক্তচিন্তা জিনিসটিই কোনো সরকারের পছন্দ নয়। সরকার হোক, বহুজাতিক কোম্পানি হোক—কেউ তাঁদের আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। তাঁদের কোনো স্পনসর নেই। তাঁরা তা চানও না। তাঁদের একটি নৈতিক অবস্থান আছে, যা স্বনামধন্যদের নেই।
ছবির হাটের মানুষেরা সমাজ প্রগতিতে বিশ্বাস করেন৷ যা কিছু বাঙালিত্ব, তাকে তাঁরা লালন করেন। তাঁরা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করেন। বর্ষার ছবি প্রদর্শন করেন। একুশেতে ছবির হাট বসান। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে আনন্দের হাট বসান। মে দিবসও উদ্যাপন করেন। রানা প্লাজার বিপর্যয় নিয়ে ছবি আঁকেন। মঙ্গল শোভাযাত্রায় তাঁদের অংশগ্রহণ সাবলীল। শাহবাগের আন্দোলনে তাঁরাই সবার আগে এগিয়ে আসেন। তাঁদের তাড়িয়ে দিতে মালকেঁাচা মেরে নেমে পড়া কতটা সমীচীন?
গোটা দেশটাই দখল করে ফেলেছে সরকারি দলের ক্যাডাররা। দেশে বৈধ স্থাপনা বেশি না অবৈধ স্থাপনা বেশি, তা বলা কঠিন। খাল-বিল, বনভূমি, নদীর তীর, খাসজমি—সব বেদখল। কোনো জায়গাজমি দখল করতে গেলে পেশিশক্তি, পিস্তল, রামদা, চাপাতি, কিরিচের দরকার। ছবির হাটের মানুষেরা ওগুলো এস্তেমাল করা তো দূরের কথা; পিস্তল, চাপাতি, রামদার ছবি পর্যন্ত আঁকার রুচি তাঁদের নেই। মহাজোট সরকার নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরে যা-ই করুক, তাদের সংস্কৃতিনীতি প্রশংসনীয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে ‘সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়’ তৈরি হবে। আমাদের আশা ও দাবি, সেই সাংস্কৃতিক বলয়ে ছবির হাটের জন্যও জায়গা বরাদ্দ থাকবে।
শিল্প-সংস্কৃতির বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। যেমন তাঁদের কাজে শিল্পী-সাহিত্যিকেরা নাক গলান না। চায়ের দোকান আর ছবির হাট এক জিনিস নয়। স্বাধীনভাবে মনের আনন্দে শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে প্রতিভার বিকাশ ঘটে না। একজন সুলতানকে পাওয়া যায় না। সৃষ্টিশীল মানুষদের মধ্যে যাঁরা শোষণমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, মৌলবাদবিহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখতে চান, রাষ্ট্রের কর্তব্য তাঁদের আনুকূল্য দেওয়া।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সাময়িক পরিচয়, তাঁর স্থায়ী পরিচয় তিনি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যশিল্পী। বাংলাদেশের প্রায় কোনো সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশেষ ধারণা ছিল না। জনাব নূর ব্যতিক্রম। ছবির হাটের শিল্পী, কবি ও কর্মীরা যাতে নিরুপদ্রবে তাঁদের শিল্পচর্চা অব্যাহত রাখতে পারেন, সে ব্যাপারে তাঁর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করি। আমি শুনেছি, বিষয়টি তাঁর বিবেচনায় আছে। এখন দরকার তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

সরকারকে পরামর্শ দিতে পারেন তিনি by হারুন-অর-রশিদ

মত দ্বিমত > সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন ও সংলাপ নিয়ে কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে৷ এ বিষয়ে দুজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর অভিমত এখানে দেওয়া হলো:

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের বৈঠকের খবরটি আমরা জেনেছি তাঁর প্রেস সচিব ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের বরাতে৷ মহামান্য রাষ্ট্রপতি বান কি মুনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ঠিক কী বলেছেন, সেটি তিনিই জানেন৷ তবে রাষ্ট্রপতিকে আমরা যতটুকু জানি, তিনি একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি ও প্রবীণ রাজনীতিক৷ এর আগে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন৷ দলমত-নির্বিশেষে তিনি সবার আস্থা অর্জন করেছেন৷
রাষ্ট্রপতি পদে আসীন থেকেও তিনি এমন কিছু করেননি, যাতে তাঁর প্রতি জনগণের সেই আস্থা নষ্ট হতে পারে৷ এর আগে বিএনপিদলীয় রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন দলীয়করণের মাধ্যমে ২০০৭ সালের নির্বাচনটিই ভন্ডুল করেননি, তিনি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার জন্য সংবিধানও লঙ্ঘন করেছিলেন৷
গণমাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বরাতে যে বক্তব্য এসেছে, তার দুটি দিক আছে৷ এক. ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি দেশের মানুষ মেনে নিয়েছে৷ দুই. সরকারের মেয়াদ শেষে বিরোধী দলের সঙ্গে অালোচনা হতে পারে৷
আমি মনে করি, তাঁর বক্তব্যের প্রথম অংশ নিয়ে বিতর্কের সুযোগ নেই৷ দেশের মানুষ নির্বাচন মেনে নিয়েছে, তার বড় প্রমাণ এই নির্বাচনের বিরুদ্ধে কোনো আন্দোলন হয়নি, কেউ রাস্তায় নেমে আসেনি৷ নির্বাচনের আগে বিরোধী দল যেভাবে চলন্ত বাসে আগুন দিয়ে জীবন্ত মানুষ হত্যা করেছে, যেভাবে হরতালের নামে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করেছে, তাতে নির্বাচনের পর জনগণ স্বস্তিই ফিরে পেয়েছেন৷ সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে জনমতেরই প্রতিফলন ঘটেছে বলে মনে করি৷
বলার অপেক্ষা রাখে না যে কেবল দেশের মানুষ নয়, বিদেশি রাষ্ট্রগুলোও িনর্বাচন মেনে নিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানসহ যেসব দেশ সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন চেয়েছিল, তারাও এখন বলছে, এই সরকারের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী৷ এমনকি হাইকোর্টে নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে যে রিট হয়েছিল, সেটিও খারিজ হয়ে গেছে৷ আদালত বলেছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বৈধ৷
তবে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশে ছিল বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের বিষয়টি৷ রাষ্ট্রপতি দেশের এক নম্বর ব্যক্তি এবং তাঁকেই রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়৷ যদিও সংসদীয় গণতন্ত্রে তাঁর তেমন ক্ষমতা নেই৷ প্রধানমন্ত্রীই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান৷ রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে পরামর্শ ও উপদেশ দিতে পারেন৷ কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন না৷ সে ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সরাসরি বক্তব্য না দেওয়াই ভালো৷
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির প্রতি বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ করেছেন, সেটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য৷ রাষ্ট্রপতি এখানে জনগণের সঙ্গে কোথায় বিশ্বাস ভঙ্গ করলেন? বরং জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গের ঘটনা বিএনপিই ঘটিয়েছে নির্বাচন বর্জন করে৷ নির্বাচনের আগে তারা অান্দোলনের নামে দেশব্যাপী যে নৈরাজ্য তৈরি করেছিল, নির্বাচনের পর তার অবসান হয়েছে৷ জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে৷
এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক৷ বর্তমানে দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ রয়েছে, তাও কেউ অস্বীকার করবেন না৷ তবে প্রধান বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে রেখে এই স্থিতিশীলতা কত দিন বজায় রাখা যাবে, সেটি ভাবনার বিষয়৷ গত রোববার বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঈদের পর হরতালের ডাক দেবেন বলে আগাম ঘোষণা দিয়েছেন৷ সে ক্ষেত্রে সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দলকে কীভাবে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা যায়, সে বিষয়টিও ক্ষমতাসীনদেরও ভাবতে হবে৷ আবার বিএনপির নেতৃত্বকেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতা মানতে হবে৷ সরকার অবৈধ, সংসদ অবৈধ—এ ধরনের কথাবার্তা না বলে তাদের উচিত হবে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় আসা৷ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনের আগে সেই সমঝোতার ব্যাপারে ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন৷ উভয় পক্ষ একমত হলে সুবিধাজনক সময়ে সবার অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচন হতে পারে৷
সে ক্ষেত্রে বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে গো না ধরে বর্তমান সংবিধানের আওতায়ই একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে৷ বিএনপি নেতৃত্ব যদি মনে করে থাকেন, জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ডানপন্থী দলকে নিয়ে আন্দোলন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করবেন, সেটি ভুল হবে৷ কেননা, জামায়াতে ইসলামীর ভিন্ন এজেন্ডা আছে৷ নতুন নির্বাচনের চেয়ে তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধেই সচেষ্ট থাকবে৷ তাই বিরোধী দলকে গঠনমূলক রাজনীতির প্রতিই মনোযোগী হতে হবে৷ আর ক্ষমতাসীন দলটিরও উচিত হবে, তাদের জন্য সেই সুযোগ করে দেওয়া৷ কিন্তু উভয় পক্ষ নিজ নিজ অবস্থানে অনড় থাকলে দেশে এখন যে স্থিতিশীল অবস্থা আছে, তা ধরে রাখা কঠিন হবে৷ সবাইকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে বৃহত্তর জনগণের স্বার্থের কথাই ভাবতে হবে৷
ড. হারুন-অর-রশিদ: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়৷

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আনুগত্যমূলক by দিলারা চৌধুরী

মত দ্বিমত > সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন ও সংলাপ নিয়ে কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে৷ এ বিষয়ে দুজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর অভিমত এখানে দেওয়া হলো:

নির্বাচন ঠিকমতো হয়েছে কি হয়নি, জনগণ মেনে নিয়েছে কি নেয়নি; রাষ্ট্রপতির এসব নিয়ে সিদ্ধান্তসূচক কথা বলার কথা নয়৷ আর তিনি কথাটা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের কাছে৷ তিনি যা বলেছেন, যেখানে বলেছেন, যেভাবে বলেছেন, তা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত৷ আমাদের দেশে সবকিছুরই অবনতি হচ্ছে; রাষ্ট্রপতি পদ ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সেই অবনতি দেখা যাচ্ছে৷
রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে৷ আমাদের রাষ্ট্রপতি বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন, গণতন্ত্রের জন্য তাঁর অবদান রয়েছে৷ গণতন্ত্রের রীতিনীতি তাঁর থেকে আর কে ভালো জানবে? তাঁর এই আচরণ গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেবে না, পিছিয়ে দেবে৷
বান কি মুনের সামনে রাষ্ট্রপতির এমন দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ পাওয়ায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করি৷ বান কি মুন যে তাঁর কথাকে মেনে নেননি, তার প্রমাণ দেখা যায় পরের বিবৃতিতে৷ সেখানে তিনি সংসদের বাইরের বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন৷ যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং জনগণ তা মেনেও নিয়েছে এবং দেশে স্থিতিশীলতাও বিরাজ করছে; সেখানে বান কি মুনের পক্ষ থেকে সংসদের বাইরের বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলা মানে তিনি মনে করছেন সংকট রয়ে গেছে৷ এই বিবৃতিই প্রমাণ করে দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷
নির্বাচন আমাদের দেশের মানুষ মেনে নেয়নি; আন্তর্জাতিকভাবেও নেয়নি৷ সেটা রাষ্ট্রপতি ভালো করেই জানেন৷ যে নির্বাচনে ১০-১৫ শতাংশ ভোট পড়ে, সে রকম নির্বাচনকে নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু বলতে চায় না৷ জনগণ মেনে নিয়েছে—এটা তিনি কিসের ভিত্তিতে বললেন? এ ব্যাপারে কি কোনো জনমত জরিপ করা হয়েছে? তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি সরকারি দলের প্রতি আনুগত্য ছাড়া তো আর কিছু দেখছি না৷
আমাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে পন্থা, তাতে আমরা হয় বিএনপির রাষ্ট্রপতি নয়তো আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পাই৷ এই পন্থা হলো নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের প্রবণতা৷ তাঁরা হয়তো মনে করেন প্রধান নেতার সুনজরে না থাকলে, তাঁদের যা কিছু অর্জন সব বিফলে যাবে৷ কেবল রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদই নন, আগের দুজন রাষ্ট্রপতিও এ রকম দলীয় পক্ষপাত দেখিয়েছিলেন৷ প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ছিলেন, অথচ তিনি ১৯ জন ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন৷ সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদও নিরপেক্ষ থাকতে ব্যর্থ হয়েছিলেন৷
যাঁরা দীর্ঘদিন রাজনীতি করে এসেছেন, তাঁরা উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করবেন, জাতিকে ভরসা দেবেন, ঐকমত্যের প্রতীক হবেন৷ এটাই আমরা আশা করি৷ ওই মাপের মানুষেরা যদি বিপরীত পথে চলেন, তাহলে নতুন নেতারা কী করবেন? আবদুল হামিদ যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন, তখন বিএনপিও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিল৷ স্পিকার হিসেবে তিনি অসাধারণ ছিলেন৷ তাই তঁার কাছে সবারই অন্য রকম প্রত্যাশা ছিল৷ কিন্তু তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজেকে বিতর্কিত করে ফেলছেন৷
এ অবস্থায় সমঝোতার সত্যিকার আশা দেখি না৷ রাজনীতিবিদেরা নানা স্তরে কথা বলবেন, মনোভাব বিনিময় করবেন; ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংলাপ চালাবেন৷ কিন্তু সেটাও আমাদের দেশে হয় না৷ কাজেই শক্তি প্রদর্শনই হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্দেশ্যসাধনের প্রধান উপায়৷ এখানে যে শক্তি দেখাতে পারবে, সে-ই এককভাবে সবকিছু করতে চাইবে৷ সমঝোতা হলে হয় বাইরের দেশের লোকের দ্বারা৷ বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণের হাত থেকে বেরিয়ে গেছে৷ এখন বাইরের শক্তিই সবকিছু ঠিক করে দেয়৷
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে মহাজোট সরকারের নেতারা বলেছিলেন, এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন৷ প্রকৃত নির্বাচন নিয়ে এর পরে কথা হবে৷ কিন্তু তাঁরা এখন বলছেন, ২০১৯ সালের তিন মাস আগে নির্বাচন নিয়ে কথা হবে—তার আগে নয়৷ যে কথা বলে তাঁরা নির্বাচন করেছিলেন, অংশগ্রহণহীন নির্বাচন মেনে নিতে বলেছিলেন, সেই কথা থেকে তাঁরা সরে এসেছেন৷ এটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা৷ তাঁরা তাঁদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছেন৷ প্রতিজ্ঞা করলে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে হয়, এটা আমরা শিশুদের শিখাই৷ এটা হলো ছলা-কলা-কৌশলের রাজনীতি৷ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার রাজনীতি৷
রাষ্ট্রপতি দেশে স্থিতিশীলতা দেখতে পাচ্ছেন৷ সত্যি যে আপাতভাবে জ্বালাও-পোড়াও-অবরোধ নেই৷ সেদিক থেকে দেশ স্থিতিশীল৷ কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা যথেষ্ট আছে৷ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ৷ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে৷ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে গেছে৷ এটা স্থিতিশীলতা নয়, এটা স্থবিরতা৷ স্থবিরতাকে অনেক সময় স্থিতিশীলতা বলে ভুল হয়৷ আমি বলব, এটা ঝড়ের আগের থমথমে ভাব৷
ড. দিলারা চৌধুরী: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অধ্যাপক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়৷

স্থানীয় সাংসদকেই দায় নিতে হবে- লাঞ্ছিত শিক্ষক

কলেজশিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ স্থানীয় সাংসদের একজন সমালোচক এবং তিনি জানতেন যে এ কারণে সাংসদ তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ। কিন্তু তিনি কখনো চিন্তা করতে পারেননি যে একজন সাংসদ ‘ক্ষুব্ধ’ হলে তার পরিণতি কী হতে পারে! ময়মনসিংহের মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজের এই শিক্ষককে সাংসদের সমর্থকেরা দিগম্বর ও লাঞ্ছিত করে তা জানিয়ে দিয়েছেন।

স্থানীয় সাংসদ ও সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকিরের সমর্থকেরা কেন এ কাজ করেছেন তা স্পষ্ট। উদ্দেশ্যটি ভয় দেখানো ও এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে কেউ সাংসদের সমালোচনা করার ‘সাহস’ না পায়।
অভিযোগ আছে, সাংসদের সমর্থকেরা বেশ আগে থেকেই এ ধরনের কাজের চর্চা করে আসছিলেন। এত দিন সাংসদের কার্যালয় ‘সেবালয়’-এ লোকজনকে ধরে এনে মাথা কামিয়ে দেওয়া বা লাঞ্ছনার মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ ছিল। এখন দিগম্বর করার পথ নিয়েছেন, সামনের দিনগুলোতে তাঁরা কোন পথ ধরবেন, কে জানে! সাংসদের সমর্থকেরা অবশ্য প্রকাশ্যেই বলেছেন, ‘এমপির নামে কোনো সমালোচনা করলে ইহজগতে থাকতে পারবে না।’
সমর্থকেরা এ ঘটনা ঘটালেও এর দায় সাংসদ মজিবুর রহমানেরই। কারণ, তাঁর চিহ্নিত ও আশ্রয়-প্রশ্রয় পাওয়া সমর্থকেরাই এ ঘটনা ঘটিয়েছেন এবং তাঁর কার্যালয়ে কলেজশিক্ষককে আটকে রাখা হয়েছিল। সাংসদের সমর্থকেরা যে ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে এবং যাঁরা এই জঘন্য ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, তাঁদের নাম গণমাধ্যমে এসেছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে, আইন যদি নিজের মতো চলে এবং স্থানীয় পুলিশ যদি সাংসদের প্রভাবমুক্ত হয়ে থাকে, তবে এখন তাদের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযুক্ত লোকদের গ্রেপ্তার করে অবিলম্বে বিচারের মুখোমুখি করা।
মুমিনুন্নিসা কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা তাঁদের একজন শিক্ষকের প্রতি এ ধরনের চরম অসভ্য আচরণের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করেছেন। আমরা শিক্ষক দিগম্বর করার ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় সাংসদ তাঁর সমর্থকদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

ছবির হাট ও বাপের জায়গা

ছবির হাট
পিকাসোর মৃত্যুর পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কাছে সাংবাদিকেরা তাঁর মন্তব্য জানতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি একবার পিকাসোর দক্ষিণ ফ্রান্সের ক্যানের ভালোরিজের বাড়িতে গিয়েছিলাম। যাওয়ার পথে তাজ্জব কাণ্ড! গ্রামের সড়কপথে যাচ্ছিলাম। দুই পাশের গাছে দেখি ছবি টাঙানো। লোকে বলল, এগুলো পিকাসোর আঁকা পোস্টার। অন্যান্য শিল্পীর আঁকা ছবিও রাস্তাঘাটে যেখানে-সেখানে প্রদর্শিত হয় ফরাসি দেশ, জার্মানি প্রভৃতি দেশে।’ পিকাসোকে আবেদিন দূরে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন, কোনো কথা হয়নি। পিকাসোর যে চোখ, তাকানো যায় না। তাঁর চলাফেরার যে গতি, তাঁর সঙ্গে তাল দিয়ে হাঁটা যায় না। যাহোক, ওসব দেশে শিল্পীরা রাস্তাঘাট বা যেখানে খুশি সেখানে বসে শিল্পচর্চা করতে পারেন, কেউ বলে না—এখান থেকে ওঠো, এটা তোমার বাপের জায়গা না। চারুকলা অনুষদ ও নজরুলের সমাধির উল্টোদিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের একচিলতে জায়গায় তরুণ শিল্পীরা বসে ছবি আঁকেন। তার নাম ছবির হাট। সেখানে তাঁরা আড্ডা দেন। শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন। কেউ কবিতা লেখেন, কেউ গান বাঁধেন। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের তা সইছে না। তাঁরা দারোগা-পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে সেখানে গেছেন তাঁদের তাড়িয়ে দিতে। নতুন টিভি চ্যানেল যমুনার প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট কর্তাকে টেলিফোনে জানতে চান তাঁদের উচ্ছেদ অভিযান সম্পর্কে। নির্বাহী প্রকৌশলী সাংবাদিককে সীমাহীন ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলেন, ছবির হাটকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় ফেলা হয়েছে। ওটা কারও বাপের জায়গা না। প্রায় এক যুগ ধরে ছবির হাট ওখানে বসছে।
ওখানে যাঁরা বসেন ও যাতায়াত করেন, তাঁরা জানেন, ওটা আসলেই কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়, মায়ের জায়গাও নয়। রাষ্ট্রের জায়গা, জনগণের জায়গা। বৃষ্টি-বাদলার ঝাপটা থেকে বাঁচতে একটুখানি ছাউনির মতো করা হয়েছিল। তা না থাকারই শামিল। ওখানে বৈধ বা অবৈধ কোনো রকম স্থাপনারই অস্তিত্ব নেই। যার অস্তিত্ব নেই, তা উচ্ছেদের অভিযান পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছু নয়। তবে তা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ওপর চপেটাঘাত। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়। ছবির হাট নামটির মধ্যেই আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আভাস রয়েছে। হাট একটি গ্রামীণ ব্যাপার। মহানগরে হাট কোথায়? এখানে তো সুপার মার্কেট এবং শপিং মল। ওখানে যদি রানা প্লাজার মতো আলিশান ইমারত তুলে পেইন্টিং গ্যালারি করতেন কেউ, তা হতো অন্য জিনিস। অবৈধ স্থাপনা৷ যদি কেউ ‘ছবির মজলিশ’ নামে কিছু করতেন, তাহলে বোঝা যেত ওটা মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের কাজ। ছবির হাট একেবারেই বাঙালির জিনিস। এ দেশের আদিবাসী সংখ্যালঘু জাতির মানুষও এর সঙ্গে যুক্ত। ছবির হাটের হাটুরেদের দোষ যদি থেকেই থাকে, তা হলো তাঁরা মূলধারার প্রসিদ্ধদের মতো প্রো-গভর্নমেন্ট নন। তার অর্থ এই নয় যে তাঁরা সরকারবিরোধী। তাঁরা স্বাধীনভাবে কাজ করেন। অসত্য, অন্যায়, অবিচারের প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটে তাঁদের কাজে। তাঁরা মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী। ওই মুক্তচিন্তা জিনিসটিই কোনো সরকারের পছন্দ নয়। সরকার হোক, বহুজাতিক কোম্পানি হোক—কেউ তাঁদের আনুকূল্য ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয় না। তাঁদের কোনো স্পনসর নেই। তাঁরা তা চানও না। তাঁদের একটি নৈতিক অবস্থান আছে, যা স্বনামধন্যদের নেই। ছবির হাটের মানুষেরা সমাজ প্রগতিতে বিশ্বাস করেন৷ যা কিছু বাঙালিত্ব, তাকে তাঁরা লালন করেন। তাঁরা বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন করেন। বর্ষার ছবি প্রদর্শন করেন। একুশেতে ছবির হাট বসান। স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে আনন্দের হাট বসান। মে দিবসও উদ্যাপন করেন। রানা প্লাজার বিপর্যয় নিয়ে ছবি আঁকেন। মঙ্গল শোভাযাত্রায় তাঁদের অংশগ্রহণ সাবলীল। শাহবাগের আন্দোলনে তাঁরাই সবার আগে এগিয়ে আসেন। তাঁদের তাড়িয়ে দিতে মালকেঁাচা মেরে নেমে পড়া কতটা সমীচীন?
গোটা দেশটাই দখল করে ফেলেছে সরকারি দলের ক্যাডাররা। দেশে বৈধ স্থাপনা বেশি না অবৈধ স্থাপনা বেশি, তা বলা কঠিন। খাল-বিল, বনভূমি, নদীর তীর, খাসজমি—সব বেদখল। কোনো জায়গাজমি দখল করতে গেলে পেশিশক্তি, পিস্তল, রামদা, চাপাতি, কিরিচের দরকার। ছবির হাটের মানুষেরা ওগুলো এস্তেমাল করা তো দূরের কথা; পিস্তল, চাপাতি, রামদার ছবি পর্যন্ত আঁকার রুচি তাঁদের নেই। মহাজোট সরকার নারায়ণগঞ্জ, লক্ষ্মীপুরে যা-ই করুক, তাদের সংস্কৃতিনীতি প্রশংসনীয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ে ‘সোনার বাংলা সাংস্কৃতিক বলয়’ তৈরি হবে। আমাদের আশা ও দাবি, সেই সাংস্কৃতিক বলয়ে ছবির হাটের জন্যও জায়গা বরাদ্দ থাকবে। শিল্প-সংস্কৃতির বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীদের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। যেমন তাঁদের কাজে শিল্পী-সাহিত্যিকেরা নাক গলান না। চায়ের দোকান আর ছবির হাট এক জিনিস নয়। স্বাধীনভাবে মনের আনন্দে শিল্পীদের কাজ করতে না দিলে প্রতিভার বিকাশ ঘটে না। একজন সুলতানকে পাওয়া যায় না। সৃষ্টিশীল মানুষদের মধ্যে যাঁরা শোষণমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, মৌলবাদবিহীন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দেখতে চান, রাষ্ট্রের কর্তব্য তাঁদের আনুকূল্য দেওয়া। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের সাময়িক পরিচয়, তাঁর স্থায়ী পরিচয় তিনি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও নাট্যশিল্পী। বাংলাদেশের প্রায় কোনো সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে বিশেষ ধারণা ছিল না। জনাব নূর ব্যতিক্রম। ছবির হাটের শিল্পী, কবি ও কর্মীরা যাতে নিরুপদ্রবে তাঁদের শিল্পচর্চা অব্যাহত রাখতে পারেন, সে ব্যাপারে তাঁর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করি। আমি শুনেছি, বিষয়টি তাঁর বিবেচনায় আছে। এখন দরকার তাঁর সুস্পষ্ট নির্দেশ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য আনুগত্যমূলক

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন ও সংলাপ নিয়ে কিছু বক্তব্য দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে৷ এ বিষয়ে দুজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীর অভিমত এখানে দেওয়া হলো: 
নির্বাচন ঠিকমতো হয়েছে কি হয়নি, জনগণ মেনে নিয়েছে কি নেয়নি; রাষ্ট্রপতির এসব নিয়ে সিদ্ধান্তসূচক কথা বলার কথা নয়৷ আর তিনি কথাটা বলেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের কাছে৷ তিনি যা বলেছেন, যেখানে বলেছেন, যেভাবে বলেছেন, তা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত৷ আমাদের দেশে সবকিছুরই অবনতি হচ্ছে; রাষ্ট্রপতি পদ ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও সেই অবনতি দেখা যাচ্ছে৷ রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিও তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে৷ আমাদের রাষ্ট্রপতি বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান ছিলেন, গণতন্ত্রের জন্য তাঁর অবদান রয়েছে৷ গণতন্ত্রের রীতিনীতি তাঁর থেকে আর কে ভালো জানবে? তাঁর এই আচরণ গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এগিয়ে নেবে না, পিছিয়ে দেবে৷ বান কি মুনের সামনে রাষ্ট্রপতির এমন দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ পাওয়ায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করি৷ বান কি মুন যে তাঁর কথাকে মেনে নেননি, তার প্রমাণ দেখা যায় পরের বিবৃতিতে৷ সেখানে তিনি সংসদের বাইরের বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপ ও সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন৷ যেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এবং জনগণ তা মেনেও নিয়েছে এবং দেশে স্থিতিশীলতাও বিরাজ করছে; সেখানে বান কি মুনের পক্ষ থেকে সংসদের বাইরের বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার কথা বলা মানে তিনি মনে করছেন সংকট রয়ে গেছে৷ এই বিবৃতিই প্রমাণ করে দেশের ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ নির্বাচন আমাদের দেশের মানুষ মেনে নেয়নি; আন্তর্জাতিকভাবেও নেয়নি৷
সেটা রাষ্ট্রপতি ভালো করেই জানেন৷ যে নির্বাচনে ১০-১৫ শতাংশ ভোট পড়ে, সে রকম নির্বাচনকে নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠু বলতে চায় না৷ জনগণ মেনে নিয়েছে—এটা তিনি কিসের ভিত্তিতে বললেন? এ ব্যাপারে কি কোনো জনমত জরিপ করা হয়েছে? তাঁর বক্তব্যের ভিত্তি সরকারি দলের প্রতি আনুগত্য ছাড়া তো আর কিছু দেখছি না৷ আমাদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যে পন্থা, তাতে আমরা হয় বিএনপির রাষ্ট্রপতি নয়তো আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি পাই৷ এই পন্থা হলো নেতার প্রতি আনুগত্য প্রকাশের প্রবণতা৷ তাঁরা হয়তো মনে করেন প্রধান নেতার সুনজরে না থাকলে, তাঁদের যা কিছু অর্জন সব বিফলে যাবে৷ কেবল রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদই নন, আগের দুজন রাষ্ট্রপতিও এ রকম দলীয় পক্ষপাত দেখিয়েছিলেন৷ প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ছিলেন, অথচ তিনি ১৯ জন ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন৷ সাবেক রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদও নিরপেক্ষ থাকতে ব্যর্থ হয়েছিলেন৷ যাঁরা দীর্ঘদিন রাজনীতি করে এসেছেন, তাঁরা উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করবেন, জাতিকে ভরসা দেবেন, ঐকমত্যের প্রতীক হবেন৷ এটাই আমরা আশা করি৷ ওই মাপের মানুষেরা যদি বিপরীত পথে চলেন, তাহলে নতুন নেতারা কী করবেন? আবদুল হামিদ যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন, তখন বিএনপিও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিল৷ স্পিকার হিসেবে তিনি অসাধারণ ছিলেন৷ তাই তঁার কাছে সবারই অন্য রকম প্রত্যাশা ছিল৷ কিন্তু তিনি অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজেকে বিতর্কিত করে ফেলছেন৷ এ অবস্থায় সমঝোতার সত্যিকার আশা দেখি না৷ রাজনীতিবিদেরা নানা স্তরে কথা বলবেন, মনোভাব বিনিময় করবেন;
ব্যক্তিগত পর্যায়ে সংলাপ চালাবেন৷ কিন্তু সেটাও আমাদের দেশে হয় না৷ কাজেই শক্তি প্রদর্শনই হয়ে দাঁড়িয়েছে উদ্দেশ্যসাধনের প্রধান উপায়৷ এখানে যে শক্তি দেখাতে পারবে, সে-ই এককভাবে সবকিছু করতে চাইবে৷ সমঝোতা হলে হয় বাইরের দেশের লোকের দ্বারা৷ বাংলাদেশের রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণের হাত থেকে বেরিয়ে গেছে৷ এখন বাইরের শক্তিই সবকিছু ঠিক করে দেয়৷ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে মহাজোট সরকারের নেতারা বলেছিলেন, এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার নির্বাচন৷ প্রকৃত নির্বাচন নিয়ে এর পরে কথা হবে৷ কিন্তু তাঁরা এখন বলছেন, ২০১৯ সালের তিন মাস আগে নির্বাচন নিয়ে কথা হবে—তার আগে নয়৷ যে কথা বলে তাঁরা নির্বাচন করেছিলেন, অংশগ্রহণহীন নির্বাচন মেনে নিতে বলেছিলেন, সেই কথা থেকে তাঁরা সরে এসেছেন৷ এটা জনগণের সঙ্গে প্রতারণা৷ তাঁরা তাঁদের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করেছেন৷ প্রতিজ্ঞা করলে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে হয়, এটা আমরা শিশুদের শিখাই৷ এটা হলো ছলা-কলা-কৌশলের রাজনীতি৷ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার রাজনীতি৷ রাষ্ট্রপতি দেশে স্থিতিশীলতা দেখতে পাচ্ছেন৷ সত্যি যে আপাতভাবে জ্বালাও-পোড়াও-অবরোধ নেই৷ সেদিক থেকে দেশ স্থিতিশীল৷ কিন্তু ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা যথেষ্ট আছে৷ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ৷ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা কাজ করছে৷ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ কমে গেছে৷ এটা স্থিতিশীলতা নয়, এটা স্থবিরতা৷ স্থবিরতাকে অনেক সময় স্থিতিশীলতা বলে ভুল হয়৷ আমি বলব, এটা ঝড়ের আগের থমথমে ভাব৷
ড. দিলারা চৌধুরী: রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অধ্যাপক নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়৷

আলোচনায় উরাক > অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতা কোথায়?

ব্রাজিলের সাবেক মিস বামবাম প্রতিযোগিতার রানার্সআপ এবার বিশ্বকাপ উপলক্ষে রিপোর্টার বনে গেছেন। বামবাম হলো ব্রাজিলের সেরা নিতম্বের অধিকারী নারী নির্বাচন করার একটি প্রতিযোগিতা। তার নাম উরাক। তিনি সমপ্রতি আলোচনায় এসেছেন নতুন করে। উরাক সাংবাদিক হিসেবে ঢুকতে চেয়েছিলেন পর্তুগিজ প্রশিক্ষণ শিবিরে। কিন্তু সেখানকার নিরাপত্তা রক্ষীরা তাকে বের করে দেয়। অবশ্য গত সপ্তাহে একটি ছেলে রোনালদোর অটোগ্রাফ নিতে নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে শিবিরে ঢুকে পড়ায় শিবিরের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়েছে। ঢুকতে না পেরে উরাক তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের অ্যাকাউন্টে ঝাল ঝেড়েছেন। তিনি লিখেছেন, আমি রোনালদোকে শুভকামনা জানাতে গিয়েছিলাম, কিন্তু আমাকে বের করে দেয়া হলো। অনুভূতি প্রকাশের স্বাধীনতা কোথায়?

বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের ভিসানীতি বদল

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের ঠিক দুদিন আগে ভারত সরকারের বাংলাদেশ নীতিতে পরিবর্তন ঘটেছে। ভিসা নীতি নিয়েই সরকারের পরিবর্তন সকলের চোখে পড়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক বাংলাদেশের দিক থেকে নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে বলে এখনও মনে করে। অথচ গত বছর ভারত ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীদের বৈঠকে ভিসা নীতি সরল করে অন্যান্য অনেক দেশের মত ভারত বাংলাদেশিদেরও ভিসা অন এরাইভেল দেবার ব্যাপারে একমত হয়েছিল। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তকেও খারিজ করে দিয়েছে ভারতের নতুন সরকার। বাংলাদেশিদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশ বা ভিসা অন এরাইভেলের কোনও সুবিধা দিতে রাজি নয় ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। এ ব্যাপারে নরেন্দ্র মোদীরও সমর্থন রয়েছে বলে জানা গেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের ঢাকা সফরের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে এ কথা বাংলাদেশকে জানিয়ে দেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের আলোচ্যসুচিতে বিষয় দুটি রাখার জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রক আগ্রহী ছিল। আর তাই এই দুটি বিষয়ে মতামতের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে পাঠানো হয়েছিল। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল গত বছরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশিদের ভিসা অন এরাইভেল ব্যবস্থা চালু করা হোক। আরেকটি প্রস্তাবে বলা হয়েছিল ১৮ বছরের নীচে ও ৬৫টি বছরের উপরের বাংলাদেশিদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়া হোক। পরে অবশ্য বয়সের সীমা সংশোধন করে ১২ বছরের নীচে এবং ৭০ বছরের উপরে করা হয়েছিল। কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দুটি প্রস্তাবই খারিজ করে দিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ইতিমধ্যেই পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রস্তাব খারিজ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। এর আগে এই দুটি প্রস্তাব নিয়ে আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ প্রবলভাবে সমালোচনা করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রকের প্রস্তাবের রেকর্ড তার কাছে রয়েছে। তিনি তিন তিনবার সাংবাদিক সম্মেলন করে মোদী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, দেশের স্বার্থ কোনভাবে ক্ষুন্ন হোক তা তিনি মেনে নেবেন না। তিনি জানিয়েছিলেন, এই ধরনের প্রস্তাবে দেশের নিরাপত্তাই বিপদের মুখে পড়বে। তবে ঢাকা সফরে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশিদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মাল্টিপল ভিসা দেবার বিষয়টি আলোচনা করতে পারেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশিরা এক বছরের জন্য মাল্টিপল এন্ট্রি টুরিস্ট ভিসা পেয়ে থাকেন। এই সময়সীমাকে ভারত ৫ বছর করতে আগ্রহী। তবে এ ব্যাপারে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক  ভারতে আসা বাংলাদেশিকে বছওে একবার ফরেনার রিজিওনাল রেজিস্ট্রেশন অফিসে হাজিরা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দিয়েছে।

প্র্রতিবেশি দেশে নিযুক্ত মিশন প্রধানদের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক : প্রতিবেশিদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শক্তিশালি করার লক্ষ্যে কোন কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনার জন্য ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রকে একটি কনক্লেভের আয়োজন করা হয়েছিল। সোমবারের সেই কনক্লেভে পাকিস্তান ও চীন সহ প্রতিবেশি সব দেশে নিযুক্ত ভারতীয মিশনের প্রধানদের যোগ দেবার জন্য ডেকে পাঠানো হয়েলিছ। বেশ কয়েকটি পর্বে ভাগ করে সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকে এই ধরণের কনক্লেভের আয়োজন এই প্রথম।  জানা গেছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ নিজে উপস্থিত থেকে নতুন সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলি তুলে ধরেন। প্রত্যেক দেশের জন্য আলাদা ফলোআাপ পরিকল্পনা তৈরি করে  নির্দিষ্ট সময় ভিত্তিক রূপায়নের উদ্যোগ  নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই প্রত্যেক প্রতিবেশির সঙ্গে সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রযোজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন বলে শোনা যাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় এসেই সার্ক দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের শপথগ্রহন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রতিবেশিদের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় রচনা করার উদ্দেশ্যে। সেই সময়েই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রত্যেক প্রতিবেশির সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে বৈঠক করেছেন। এরপরেই তিনি ছুটে গিয়েছেন ভুটান সফরে। এরপরেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে এককভাবে বাংলাদেশ সফরে যাবার নির্দেশ দিযেছেন। আগামী ২৫ জুন বাংলাদেশ দিয়ে এককভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর শুরুর আগে মিশন প্রধানদের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাকে বিশেষজ্ঞরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে মনে করছেন্। ইতিমধ্যেই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সুষমা স্বরাজ সহযোগিতার নানা ক্ষেত্র নিয়ে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন।

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা- কাগজে কলমেই প্রকল্প বাস্তবায়ন by মহিউদ্দীন জুয়েল

জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের কাছে ধরনা দিয়ে বড্ড ক্লান্ত চট্টগ্রামের মেয়র মনজুর আলম! ২৮৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি। গত ৪ বছর ধরে বিষয়টি ফাইল আকারে জমা দেয়া হলেও এখনও তা রয়ে গেছে কাগজে কলমে। সহযোগিতার জন্য বার বার টাকা চেয়েও পাননি কানাকড়ি বরাদ্দ। শেষমেশ তাই হাল ছেড়ে দিয়ে সীমিত অর্থেই কাজ করছেন চট্টগ্রামের এই নগরপিতা। শহরজুড়ে জলাবদ্ধতা। টানা ৩ দিনের বৃষ্টিতে কোমরপানি। দুর্ভোগে সাধারণ লোকজন। রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গেছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ধ্বংস করেছে কোটি টাকার পণ্য। প্রভাব পড়েছে বন্দরের আমদানি-রপ্তানির কাজেও। এমন পরিস্থিতিতে সবাই দুষছেন নগরপিতাকে। অথচ যাকে নিয়ে এতো আলোচনা সেই মেয়র কিনা সরকারের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন গত ৪ বছর ধরে। প্রকল্পটি আদৌ বাস্তবায়ন হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করার কথা জানিয়েছেন বর্তমান মেয়র মনজুর আলম।
বলেছেন, প্রবল বর্ষণে প্রতিবারই প্রচুর পানি জমে শহরের অলিগলিতে। তাতে দুর্ভোগ অনেক বেশি বাড়ে। কিন্তু যতবারই তিনি পানি নিষ্কাশনে নানামুখী উদ্যোগ নেন তখনই এই ব্যাপারে কোন ধরনের সহযোগিতা পান না সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি সূত্র জানায়, গত কয়েকদিনের অতি বৃষ্টিতে নগরীর প্রধান গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পানি জমায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে সাধারণ লোকজনকে। অতি পানির কারণে বন্ধ ছিলো সব ধরনের বড় গাড়ির চলাচলও। ঘরে পানিবন্দি হয়ে পড়েন এখনকার হাজার হাজার মানুষ।
নগরীর ষোলশহর, চান্দগাঁও, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, হালিশহর, বিবিরহাট, চকবাজার, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেইট, চান্দগাঁও, বাকলিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। একই রকম চিত্র দেখা গেছে কাপাসগোলা, কেবি আমান আলী  রোড, বাকলিয়া সৈয়দ শাহ রোড, রাহাত্তার পুল, বাকলিয়া, পুরাতন চান্দগাঁও থানা, বহদ্দারহাট ফরিদের পাড়া, মোহাম্মদপুর, সুন্নিয়া মাদরাসা সংলগ্ন এলাকায়ও।
সিডিএ এভিনিউ রোডের ষোলশহর দুই নম্বর গেইট মোড় থেকে মুরাদপুর পর্যন্ত এবং আরাকান রোডের পুরাতন চান্দগাঁও থানার সামনের রাস্তায় পানি জমে বন্ধ হয়ে যায় যান চলাচল। এতে সড়কের উভয়পাশে যানজট দেখা দেয়।
বহদ্দারহাট এলাকায় পানির চাপ কমাতে ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ২৮৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্পটি গ্রহণ করে। প্রকল্পের সীমানা নির্ধারণ হয় নতুন বহাদ্দারহাট বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত। যার প্রস্তাবিত দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয়েছিলো ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার একটি খাল খনন। সর্বশেষ প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ে জমা হলেও গত ৪ বছরে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন ধরনের পদক্ষেপ নেয়নি সরকার। কি কারণে কিংবা কেন তা আটকে আছে সেই বিষয়েও নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেনি সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে মানবজমিনের কাছে প্রকল্প আটকে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেন মেয়র মনজুর আলম। তিনি বলেন, ‘বহদ্দারহাটের ওই খালটি নির্মাণ করা গেলে প্রচুর পানি অপসারণ করা যাবে। যা সরাসরি চলে যাবে কর্ণফুলী নদীতে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের কাছে একাধিকবার গিয়েছে। কিন্তু যখনই যাই তারা বলে বরাদ্দ নেই। দেখছি, দেখবো এইসব আশার বাণী শোনান।’
জলাবদ্ধতা নিরসনে মেয়র আরো বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে নগরীতে নতুন তিনটি খাল খননের প্রস্তাব ছিল। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি হলে এই খালটি নির্মাণের সুপারিশ করে চট্টগ্রামের বিশেষজ্ঞ কমিটি। বৃষ্টির পানি নিয়ে আমাকে অনেক কথা শুনতে হচ্ছে। কিন্তু সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ পেতে আমাকে কি পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তা নগরবাসী জানেন না।
তবে কেবল বহদ্দারহাট প্রকল্পের ওই ফাইল নয়, রাজনৈতিক কারণে আটকে আছে খাল খননের আরো বেশ কিছু উদ্যোগও। যেগুলো মেয়র মনজুর আলম একাধিকবার বাস্তবায়নের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন বলে আলাপে জানিয়েছেন। তার মতে জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি সিডিএসহ সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন। ১৯৯৫ সালে মাস্টার প্ল্যানে ২০ বছর মেয়াদি যে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিলো তা যদি বাস্তবায়িত হতো তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে অনেকটুকু মুক্তি মিলতো সচেতন নাগরিকদের। রাজনৈতিক কারণে এই প্ল্যান বাস্তবায়িত না হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে।
অল্প বৃষ্টিতে পানি জমে জলাবদ্ধতা হওয়ার মূল কারণ বেশির ভাগ খাল ও নালা দখল হয়ে যাওয়া। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশন একাধিক উদ্যোগ নিলেও সব ক’টি খাল এখনও দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। নগরীর রেয়াজুদ্দিন বাজার ও জুবিলী রোডের জলাবদ্ধতার পেছনে রয়েছে সেখানকার বিদ্যমান কালভার্টের কম প্রশস্ততা।
অন্যদিকে সদরঘাট খাল ক্রমশ ছোট হয়ে আসায় অল্পতেই পানি জমে যায়। আগ্রাবাদ এলাকার মোগলটুলী খালের প্রস্ত ২ মিটার ও দৈর্ঘ্য ৪৭৫ মিটারে উন্নীত করা না গেলে সেখানে পানি নিষ্কাশন করা কখনোই সম্ভব হবে না। হালিশহর, কাট্টলি ও পাহাড়তলী এলাকায় জলাবদ্ধতা শহরের আমবাগান  থেকে আগ্রাবাদ পর্যন্ত রামপুরা খালটি বৃদ্ধি না হওয়ায় পানি জমে থাকে।
হালিশহর থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত মহেশখালটি ৮ থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত হওয়া জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ কমিটি। একই সঙ্গে চাক্তাই খাল দিন দিন দখল হয়ে যাওয়ার কারণে চকবাজার, দেওয়ান বাজার, জামাল খান, স্টেডিয়াম এলাকা, চাক্তাই খাতুনগঞ্জ এলাকায় জলাবদ্ধতা লেগে রয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল হুদা বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের বিকল্প নেই। এই জন্য প্রচুর অর্থের দরকার। পরিকল্পনা নকশা অনুযায়ী চট্টগ্রামে খাল খনন করা গেলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে রেহাই মিলবে নগরবাসীর।

সরকার টিকে থাকার বৈধতা খুঁজছে

বাংলাদেশে সরকার টিকে থাকতে বৈধতা খুঁজছে। এজন্য গত নির্বাচন ‘বিশ্বাসযোগ্য নয়’ বলে পশ্চিমা যেসব দেশ তীব্র সমালোচনা করেছিল তাদের দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ। তাই তারা নতুন বন্ধু হিসেবে চীন, রাশিয়া ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এর মধ্য দিয়ে তারা টিকে থাকার বৈধতা খুঁজছে। বাংলাদেশের এমন পদক্ষেপের প্রতি নিবিড় নজর রাখছে ভারত। গতকাল এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে ৫ই জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কড়া সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ সহ বিভিন্ন সংস্থা। তাদের উদ্বেগের সঙ্গে তাল মিলায়নি চীন, রাশিয়া ও জাপান। তাই এ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আল জাজিরার রিপোর্টে বলা হয়, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যমে পশ্চিমাদের দিকে অবজ্ঞাপূর্ণ আচরণ করছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার সরকারের বৈধতার ওপর যে আঘাত এসেছে তা ঠিকঠাক করাতে তিনি যখন বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করছেন তখন সেদিকে নিবিড় নজর রাখছে ভারত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর শাহিদুজ্জামান  বলেন, শেখ হাসিনার চীন সফরের ফলাফল কি তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় থাকতে পারে নয়া দিল্লির। তারা আরও বুঝতে পারছে যে, বাংলাদেশে যে সরকার এখন আছে তারা টিকে থাকতে পারবে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে চীন তাদেরকে সহায়তা দেয়। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, ৪০ বছর ধরে চীনের সঙ্গে ঢাকা দৃঢ় সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামাদি, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত প্রকল্পে এই চীন একটি বড় অংশীদার। কিন্তু ঢাকায় পররাষ্ট্র বিষয়ক বিশ্লেষকরা বলেন, তারা শেখ হাসিনার সর্বশেষ এই সফরকে দেখছেন চীন, রাশিয়া ও জাপানের মতো ওই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা, যেসব দেশ তার সরকারের বৈধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেনি পশ্চিমাদের মতো। পর্যবেক্ষকরা এ বিষয়টিকে দেখছেন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া সমালোচনার জবাব হিসেবে। ৫ই জানুয়ারির ওই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দল বিএনপি সহ ১৯ দলীয় জোট। ওই নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা হয়। ব্যাপক জালিয়াতি হয়। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ওই নির্বাচনের ফলকে অবিশ্বাসযোগ্য বলে মন্তব্য করে। দক্ষিণ এশিয়ার এদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কড়া সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি চীন সফর করেছেন। এটা করা হয়েছে শুধু ব্যবসায়ী উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, এটা করা হয়েছে বেইজিংকে একটি গন্তব্য হিসেবে ধরে নিয়ে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বাংলাদেশের সরকার নিয়ে মাথা ঘামায় না চীন। প্রফেসর শাহিদুজ্জামান বলেন, ক্ষমতাসীন সরকার এখন টিকে থাকতে বৈধতা খুঁজে বেড়াচ্ছে। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি ৬ দিনের চীন সফর সম্পন্ন করেন। এ সময় কয়লাচালিত ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক ও প্রযুুক্তিগত চুক্তি হয়। বন্যা প্রতিরোধ ও ব্যবস্থাপনা সহ বিভিন্ন ইস্যুতে কথা হয়। এ সময়ে দু’দেশ চট্টগ্রামে একটি চীনা অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ জোন গড়ে তোলা বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সোনাদিয়ায় দ্বিতীয় একটি বন্দর নির্মাণের বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই রিপোর্টে আরও বলা হয়, দু’দেশ ২০১৫ সাল জুড়ে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হবে। ওদিকে বিজিএমইএ’র সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম মুর্শেদি বলেছেন, গত বছর দু’দেশের মধ্যে ১০৩০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয়েছে। চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে।

রওশনের ইচ্ছা পূরণ হচ্ছে by মিজানুর রহমান

চেষ্টার কোন কমতি ছিল না। কিন্তু জাপান ও ওআইসিকে রাজি করানো যায়নি। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন জাতীয় পার্টি নেত্রী রওশন এরশাদ। তার দল সরকারেও আছে। বিদেশী বন্ধু উন্নয়ন সহযোগীরা সরকার ও বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করেন, এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার। কিন্তু অদ্ভুত পদ্ধতির এবারের অফিসিয়াল বিরোধী দলের নেতার সঙ্গে বৈঠক করেননি কিছু দিন আগে ঢাকা সফর করে যাওয়া জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা এবং ওআইসির মহাসচিব আয়াদ আমিন মাদানি। যদিও সরকারি পর্যায়ে অনেক বৈঠক করেছেন তারা। ওই নির্বাচন বর্জনের কারণে সংসদের বাইরে থাকা দেশের সবচেয়ে বড় জোট নেত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গেও তাদের বৈঠক হয়নি। জাপানের তরফে বৈঠকের আগ্রহ ছিল। বিএনপি তো প্রস্তুত ছিল-ই। কিন্তু বৈঠকটি হয়নি- এটাই সত্য। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিদায়ের পর জাপানের ঢাকাস্থ রাষ্ট্রদূত এ নিয়ে বিএনপির কাছে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ওই বৈঠকগুলো না হওয়ায় খালেদা জিয়া বিচলিত না হলেও বেজায় কষ্ট পেয়েছেন সংসদের বিরোধী নেতা রওশন এরশাদ। তিনি চিঠি লিখে তার দুঃখবোধের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। দশম সংসদের পাঁচ মাসেও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ঢাকা সফরে আসা বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের সঙ্গে বৈঠক না হওয়ার বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। একই সঙ্গে তার সহযোগিতা চান। বলেন, ঢাকা সফরে আসা বিদেশী ব্যক্তিত্ব ও প্রতিনিধি দলকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে তার সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রী  যেন তার দপ্তরের সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। রওশন বলেন, আমি বিশ্বাস করি, এটা আমাদের সরকার, সংসদ ও দেশের গণতান্ত্রিক চর্চার ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি এতে সংসদে বিএনপির অবস্থান সম্পর্কিত ভুল ধারণাও কেটে যাবে। চিঠি পাওয়ার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার অধস্তনদের তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দেন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে। কর্মকর্তারাও সেই নির্দেশ তামিল করেন। সরকারের তরফে ঢাকাস্থ বিদেশী মিশনগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে বর্তমান সরকার ও বিরোধী দলের কাঠামো সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। খালেদা জিয়া এখন আর বিরোধী দলের নেতা নন- সেটিও স্পষ্ট করা হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের আগামীকাল থেকে শুরু হওয়া সফরের মধ্য দিয়ে রওশন এরশাদের সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতে চলেছে। রওশনের দল জাতীয় পার্টি কিংবা তার রাজনৈতিক সচিব এখনও বৈঠকটির বিষয়ে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি, বা বলেননি। তবে সরকার ও কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, বৈঠকটি হচ্ছে। এ জন্য শুক্রবার সকালে একটি সিডিউলও প্রস্তাব করা হয়েছে। কোন ব্যতিক্রম না ঘটলে ওই বৈঠকের মধ্য দিয়েই সুষমার তৃতীয় দিন ও শেষ দিনের কর্মসূচি শুরু হবে। অবশ্য তার আগের দিনের অর্থাৎ ২৬শে জুন প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সেরে নেবেন সুষমা স্বরাজ। ওই দিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে বিস আয়োজিত একটি সেমিনারে ভাষণও দেবেন তিনি। শুক্রবার দুপুরে ঢাকা ছাড়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও ড. মশিউর রহমান ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানা গেছে।

কলেজ শিক্ষককে দিগম্বর করা নিয়ে তোলপাড়

সংসদ সদস্য ক্যাপ্টেন (অব.) মুজিবুর রহমান ফকিরের সমর্থকরা মুমিনুনেছা কলেজের অধ্যাপক এবং গৌরীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ (৫৯)-কে দিগম্বর করেছে। এ ঘটনায় ময়মনসিংহ ও গৌরীপুরে তোলপাড় চলছে। হামলাকারীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করার দাবিতে ময়মনসিংহ মুমিনুনেছা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল শেষে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে স্মারকলিপি দিয়েছে। এদিকে গৌরীপুরে এ ঘটনায় বিচারের দাবিতে সর্বস্তরের মানুষ বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সমাবেশ করে গৌরীপুরে আজ মঙ্গলবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। এ ঘটনার শিকার শিক্ষক ফরিদ বাদী হয়ে গৌরীপুর থানায় মামলা দায়ের করেছেন। গৌরীপুর সার্কেল এএসপি সালাহ উদ্দিন তালুকদার জানান মামলাটি তদন্ত চলছে। এদিকে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে ২টা পর্যন্ত গৌরীপুর সরকারি কলেজের সামনে মানববন্ধন ও  বিক্ষোভ মিছিল করে। বিক্ষোভ মিছিল চলাকালে পুলিশ বাধা দেয়। এসময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। মিছিলে  নেতৃত্ব দেন শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন ও গৌরীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আলী আহাম্মদ খান সেলভী ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থী সহ সর্বস্তরের মানুষ। নেতৃবৃন্দ  জানান, জড়িতদের গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

এই ঘৃণ্য ঘটনার শিকার শিক্ষক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ ময়মনসিংহ মুমিনুন্নিসা সরকারি কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং  গৌরীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অভিযোগ এনে ওই শিক্ষককে এভাবে জনসম্মুখে হেনস্থা করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তবে এ ঘটনার সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন না। স্থানীয় সূত্র জানায়, রোববার বিকালে মোটরসাইকেলযোগে বাড়ি ফিরছিলেন ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। এ সময় উপজেলার কলতাপাড়া এলাকায় তাল্লু স্পিনিং মিলের সামনে প্রতিমন্ত্রীর ২০-২৫ জন লোক তার গতিরোধ করে। এ সময় তার বিরুদ্ধে সাবেক প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে সমালোচনার অভিযোগ এনে তাকে  মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে শার্ট ও প্যান্ট খুলে নেয়া হয়। পরে তাকে মুজিবুর রহমান ফকিরের রাজনৈতিক কার্যালয়ে নিয়ে আটকে রাখা হয়। ফরিদ উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর ক্যাডাররা আমাকে সবার সামনে প্রকাশ্যে দিবালোকে শার্ট ও প্যান্ট খুলে নিয়ে দিগম্বর করে। পাশাপাশি আমার সঙ্গে থাকা সাড়ে ১১ হাজার টাকা ও মোবাইল সেট ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। পরে মোবাইল সেট ফেরত দিয়ে দেয়। তিনি বলেন, এমপি’র ক্যাডাররা আমাকে শাসিয়ে বলেছেন গৌরীপুরে থাকলে এমপি’র বিরুদ্ধে কোন কথা বলা যাবে না। কেউ এমপি’র সমালোচনা করলে এরকম পরিণতি হবে। শিক্ষক আরও বলেন, আমি নিজে ১৯৮৫ সাল থেকে ’৯১ পর্যন্ত গৌরীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। নিজের দল এখন ক্ষমতায়। অথচ আমাকে প্রকাশ্যে জনসম্মুখে অপমান-অপদস্থ করা হয়েছে। অথচ আমি যখন গৌরীপুরে আওয়ামী লীগের  নেতৃত্ব দিয়েছি তখন ক্যাপ্টেন মুজিব থানা আওয়ামী লীগের সদস্যও ছিলেন না। তিনি বলেন, স্থানীয় এমপি মুজিবুর রহমান ফকির উপজেলার বিভিন্ন মাদরাসা থেকে নিয়োগের জন্য টাকা নিচ্ছেন। উপজেলার কিল্লা বুকাইনগর সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার দু’জন প্রভাষকের বেতন আটকে রেখে তিনি ৩ লাখ করে টাকা দাবি করেন। আমি এ ঘটনার প্রতিবাদ করেছি। এ কারণেই ক্যাডার লেলিয়ে দিয়ে আমাকে এভাবে হেনস্থা করেছেন মুজিব ফকির।

৪ সুন্দরী রিপোর্টার

মাঠের রাজাদের রমণীদের নিয়েই যে কেবল হৈচৈ ও মাতামাতি তা কিন্তু নয়, গ্ল্যামারের দৌড়ে এগিয়ে আছেন ওরা চারজন। চারজনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বনামধন্য। তারা নারী ক্রীড়া সাংবাদিক। সাংবাদিক হয়েও হার্টথ্রব। ব্রাজিলের ফুটবল আসরে এই চারজন সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন। তবে কথা হলো এই চারের মধ্যেও হটেস্ট মুকুটে শোভিত যিনি- তিনি সারা কারাবোনেরো। ২০১০ সালের বিশ্বকাপে পরাজয়ের জন্য স্পেন রীতিমতো সরকারিভাবে তার দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছিল। গতকাল পর্যন্ত লন্ডনের ডেইলি মেইলের জনমত জরিপে ৩৯ ভাগ ভোট পেয়ে সেরা সুন্দরীর দৌড়ে এগিয়ে আছেন সারা। আবার এন্টারটেইনমেন্ট যে ৪ শীর্ষ সুন্দরী সাংবাদিকের নাম প্রকাশ করেছে তার মধ্যেও সারা শীর্ষে। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে আমেরিকার এফএইচএম তাকে ‘সেক্সিয়েস্ট রিপোর্টার অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ঘোষণা করেছিল। ২০১৩ সালের ৬ই জুলাই ঘোষণা আসে যে, ক্যাসিয়াস ও সারা বাবা-মা হতে চলেছেন। গত ৩রা জানুয়ারি সারা একটি পুত্র সন্তান জন্ম দেন। সারা স্পেনিশ টিভি উপস্থাপক এবং একজন নামী ক্রীড়া সাংবাদিক। স্পেনের গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াস বিদায় নিলেও এখনও মাঠের উঠোন আলোকিত করে আছেন ক্যাসিয়াস বান্ধবী সারা। ২০১০ সালের বিশ্বকাপের অনেক পরে জানা গিয়েছিল, ক্যাসিয়াস যে খারাপ খেলেছিলেন তার মূলে ছিলেন সারা। সারার কারণে ক্যাসিয়াস খেলায় মনোযোগ দিতে পারেননি। এ নিয়ে তুমুল ঝড় উঠেছিল। ইংলিশ ও স্পেনিশ প্রেস বহুদিন এ নিয়ে তেতেছিল। সেবার স্পেন অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে গিয়েছিল সুইজারল্যান্ডের কাছে। আরও বড় প্রশ্ন উঠেছিল সারার সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়ে। কারণ খেলার পরপরই ক্যাসিয়াসের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সারা। ২০১০ সালে স্পেনের মিডিয়া তার এত বেশি আলোকচিত্র ছেপেছিল যে, সারা ফুটবল তারকাদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। ক্যাসিয়াস ও সারা তাদের ছেলে মার্টিনকে রেখেই এবারে ব্রাজিলে এসেছেন। ক্যাসিয়াস নিজেই স্বীকার করছেন, তিনি এবারে ভাল খেলেননি। ‘এবারের খেলা আমার ক্যারিয়ারের মধ্যে নিকৃষ্টতম।’

 ডেইলি মেইল লিখেছে, এবারের বিশ্বকাপে সারাকে প্রথম ক্যামেরার পিছনে সক্রিয় থাকতে দেখা যায় গত শুক্রবার। মিডিয়া সেন্টারে তার ঝলমলে উপস্থিতি খেলার ইভেন্টকে ছাপিয়ে যায়। টেলিসিনকো টিভির হয়ে তিনি কাজ করছেন। ইনিস সেইঞ্জ গালো দে প্রেজ একজন মেক্সিকান ক্রীড়া সাংবাদিক। তিনি কাজ করছেন সিএনএন-এর পক্ষে। বিশ্বকাপ ফুটবলে স্পেনিশভাষী সাক্ষাৎকারগুলো তিনিই নিয়ে থাকেন। বক্সিং ম্যাচের হোস্টেস হিসেবেও তাকে দেখা যায়। এএফএইচএম ম্যাগাজিন ২০০৯ সালে তাকে  বিশ্বের ‘পঞ্চম সেক্সিয়েস্ট রিপোর্টার’ হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। সেইঞ্জ অবশ্য জানিয়েছিলেন যে, একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে তাকে মাঝেমধ্যে বিড়ম্বনা সইতে হয়। ২০১০ সালে আজটেকা টিভির একজন রিপোর্টার হিসেবে ফুটবলার মার্ক সেঞ্জের সাক্ষাৎকার নিতে তিনি মাঠে গিয়েছিলেন। এসময় মহড়া চলছিল। তিনি লক্ষ্য করেন যে, তার গায়ে লাগে এমন করে তার দিকে বল ছোড়া হয়েছিল। ফুটবল ক্লাব এনওয়াইজেটের লকার রুমে তাকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়। আর এ সময় ক্লাবের কর্মকর্তারা তাকে লক্ষ্য করে অযাচিত মন্তব্য করেছিলেন। তিনি সেখানে থেকেই টুইট করেন, ‘আমি লকার রুমে সাক্ষাৎকারের জন্য অপেক্ষা করছি। আমার অস্বস্তি লাগছে। আমি কান চেপে রাখতে সচেষ্ট।’ অবশ্য পরে ক্লাবের মালিক উডি জনসন ক্ষমা প্রার্থনা করলে তা তিনি গ্রহণ করেন। তবে মিডিয়া বলছে, এই মুহূর্তে মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার মধ্যে তাকেই সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে মনে করা হয়।
কে মারি আরেক অনিন্দ্য সুন্দরী টিভি সাংবাদিক। তিনি ব্রাজিলের বিশ্বকাপ কভার করছেন বেইনস্পোর্টস-এর জন্য। এটি উত্তর আমেরিকার একটি বিখ্যাত ক্রীড়া চ্যানেল নেটওয়ার্ক। এর মালিক আল জাজিরা। দোহায় সদর দপ্তর। আটটি দেশ এই চ্যানেলের নেটওয়ার্কে যুক্ত। মারি লন্ডনের মিডলসবরোর মেয়ে। বোরো টিভি দিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন। ২০১২ সালের মার্চে বিবিসি বলেছে, মারিকে সান্তিয়াগোর স্টেডিয়ামে একটি অন্যতম বৃহত্তম ফুটবল টুর্নামেন্ট কভার করতে দেখা গেছে।
গত ২০শে জুন ফ্যাবওয়াগস নামের একটি ওয়েবসাইটে সেক্সিয়েস্ট নারী রিপোর্টারদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। এতে তারা ৫ ফেভারিটের নাম দিয়েছে। এর শীর্ষে হলেন ভানিসা হাপেনকোথেন। ২৯ বছর বয়সী এই মেক্সিকান টিভি রিপোর্টারকে অনেকের মতে ‘হটেস্ট অব দ্য হটস’ বলেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। ফেসবুক ও টুইটারের সর্বত্র তারই জয়জয়কার। ওয়াগ না হয়েও তাকে নিয়ে উন্মাতাল গ্লামারস ওয়ার্ল্ড। তিনি সারা কারবারনোর মতো কোন হট ফুটবলারের  ওয়াগ নন। কিন্তু তারপরেও তার ভক্তদের কমতি নেই। ব্রাজিলে একটি পাতানো প্রীতি ফুটবল ম্যাচে তিনি স্বল্পবসনা হয়ে মাঠে তুফান তুলেছিলেন। সমুদ্রের বিচে তিনি ব্রাজিলের পতাকা হাতে ছোটাছুটি করেছেন। তিনি ক্রীড়া সাংবাদিক হিসেবে কতটা খ্যাতিমান সেই হিসাব নিকাশ টেবিলে উঠতেই পারছে না, তার অন্যান্য অসামান্য কাণ্ডকীর্তির কারণে। দুই চিলতে পোশাকে তাকে সমুদ্রের তীরে ফুটবলে লাথি মারতেও দেখা গেছে।

নারায়ণগঞ্জ-৫ উপনির্বাচন- নজরদারিতে ২৩ by বিল্লাল হোসেন রবিন

শেষ মুহূর্তে ঘোলাটে হয়ে উঠছে নারায়ণগঞ্জ উপনির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি। দুই প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে রীতিমতো মারমুখো অবস্থা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাল্টাপাল্টি বক্তব্য-বিবৃতিতে উত্তপ্ত নির্বাচনী মাঠ। এর মধ্যে নির্বাচনে ২৩ ব্যক্তিকে সম্ভাব্য গোলযোগকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ওপর নজরদারি করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এদের সবার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অপরাধে মামলা চলমান রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া নজরদারি রয়েছে সর্বত্র। নির্বাচনী এলাকায় টহল জোরদার করেছে র‌্যাব। পুলিশের তৎপরতাও রয়েছে। এছাড়া সোমবার বিকালে ৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এ নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসার।

নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নাই: আগামী ২৬শে জুন অনুষ্ঠেয় নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনের উপনির্বাচনে এখন পর্যন্ত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নাই অভিযোগ করলেও নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে আশাবাদী স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম আকরাম। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে সন্তুষ্ট নন এসএম আকরাম। তিনি বলেন, সিইসি কাজী রাকিব উদ্দিন আহমেদ নারায়ণগঞ্জের মতো স্পর্শকাতর উপনির্বাচনের সময় কেনিয়া চলে গেছেন। নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের কাছে এতদিন অভিযোগ করেও কোন ফল পাইনি। তারপরও আশা করি, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচন বরিশাল কিংবা মাগুরা নির্বাচনের মতো হবে না। এই নির্বাচন সরকার ও ইসির জন্য একটি বড় পরীক্ষা। তাই নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ইসি সবধরনের পদক্ষেপ নিবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
এসএম আকরাম অভিযোগ করেন, জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী সেলিম ওসমানের পক্ষে কালো টাকা ছড়ানো হচ্ছে। হলফনামা অনুযায়ী আমার সম্পদের চেয়ে সেলিম ওসমানের সম্পদ দেড় শ’ গুণ বেশি। তারা ভোটারদেরকে টাকা দিয়ে আইডি কার্ডের ফটোকপি রাখছে। ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। ভোট না দিলে পরে আইডি কার্ড দেখে শাস্তি দিবে।
এদিকে ‘আকরামের গোপন চিঠি ফাঁস’ শিরোনামে সোমবার নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে এসএম আকরামের প্রেরিত একটি চিঠির বরাত দিয়ে ওই সংবাদটি প্রকাশিত হয়। চিঠিতে বন্দরের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে এসএম আকরাম দাবি করেন, এটা কোন ভাবেই সত্য নয়। চিঠির নিচে দেয়া স্বাক্ষরটি কম্পিউটারের মাধ্যমে বসানো হয়েছে। তিনি বলেন, প্রকাশিত সংবাদটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। এতে আমার কোন বক্তব্য নেয়া হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে আকরামের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন, তার নির্বাচন পরিচালনা পরিষদের আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান, সদস্য সচিব এডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম, গণফোরাম জেলা শাখার সভাপতি দেলোয়ার হোসেন চুন্নু, জেলা সিপিবির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, জেলা ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিমাংশু সাহা, খেলাঘর আসরের কেন্দ্রীয় কমিটির সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য জহিরুল ইসলাম জহির প্রমুখ।
নারায়ণগঞ্জে চিহ্নিত ২৩ ব্যক্তির ওপর থাকছে বিশেষ নজর: এদিকে উপনির্বাচনে ২৩ ব্যক্তিকে সম্ভাব্য গোলযোগকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ওপর নজরদারি করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এদের সবার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন বিধিতে মামলা চলমান।
ইসির নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখা থেকে  গতকাল   মহাপুলিশ পরিদর্শকের কাছে পাঠানো একটি চিঠির মাধ্যমে এসব ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, নির্বাচনী এলাকায় সম্ভাব্য গোলযোগ সৃষ্টিকারীদের প্রয়োজনে গ্রেপ্তারের নির্দেশনা প্রদান করা যেতে পারে। যাদেরকে সম্ভাব্য গোলযোগকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে- নারায়ণগঞ্জ বন্দর থানার কেএনসেন রোডের শাহান শাহ, মুরাদপুরের মো. আ. রব, সালাহ উদ্দিন সালু, শামীম, টিটু, ফারুক, লিপু, কেওঢালার মোক্তার হোসেন, চাপতলীর মো. খোকন, মোসলেম, কুড়িপাড়ার বিল্লাহ হোসেন, লক্ষণখোলার আনোয়ার হোসেন, কামরুল ইসলাম কামলেট ও টিটু, চাঁনপুরের কামরুল ইসলাম (ব্যাঙ্গা কামু), সোনাপাড়া রামনগরের আনোয়ার হোসেন আনার, দক্ষিণ লক্ষণখোলার ফারুক, কেএনসেন রোডের শিমুল, কুমারবাড়ীর সোহেল, লক্ষণখোলার মো. শাহীন, সোনাকান্দার মন্নাক্কা, কুতুবপুরের উজ্জ্বল ও  মোফাজ্জল হোসেন।
ইসির জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব ফরহাদ হোসেন স্বাক্ষরিত ওই চিঠি থেকে জানা গেছে- চিহ্নিত এই ২৩ ব্যক্তির সবার বিরুদ্ধেই বিভিন্ন দণ্ডবিধিতে একাধিক মামলা চলমান। বিশেষ করে দ্রুত বিচার আইন, অস্ত্র আইন, জুয়া আইন, মাকদ দ্রব্য এবং বিস্ফোরক আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা বিচারাধীন।
ঝুঁকিপূর্ণ ১৭ কেন্দ্র: এছাড়া এ নির্বাচনে ১৭টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে- এসব কেন্দ্রের মধ্যে রয়েছে- কুড়েরপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র-১, ডিক্রিচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোগনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়  ভোটকেন্দ্র-১, চর সৈয়দপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র-১, নারায়ণগঞ্জ বার একাডেমি স্কুল ভোটকেন্দ্র-১, ১১-১২ নম্বর বংশাল বালক/বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাবুরাইল বালক/বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র-১ (পুরুষ) এর নীচ তলার ২টি কক্ষ ও দ্বিতীয় তলার ১টি কক্ষ, ১৩ নম্বর নলুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র-১ (পুরুষ), একরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লক্ষণখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (পুরুষ ও মহিলা ভোটকেন্দ্র), ফুলহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় (পুরুষ ও মহিলা ভোটকেন্দ্র), দাসেরগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেওঢালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাঙ্গাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘারমোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র-১, বিবি মরিয়ম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র (পুরুষ কেন্দ্র)।
রোববার বিএনপি-জামায়াত জোটের কর্মীদের ওপর নজরদারি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছিল ইসি।
আগামী বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচন। নির্বাচনে মোট ১৪১টি ভোট কেন্দ্রের ৬৭৪টি ভোটকক্ষে ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪০৫ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী একেএম সেলিম ওসমান (লাঙল প্রতীক), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার (গামছা প্রতীক), নাগরিক পরিষদের প্রার্থী আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্য এসএম আকরাম (আনারস প্রতীক) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী এডভোকেট মামুন সিরাজুল মজিদ (চিংড়ি প্রতীক)।
নাগরিক কমিটির মানববন্ধন: এদিকে উপনির্বাচনকে ঘিরে এসএম আকরামের পক্ষে লিফলেট বিতরণের সময় সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বিসহ কয়েকজনের ওপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, খুনি, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের ভোট না দেয়ার আহ্বান জানিয়ে লিফলেট বিতরণ করার সময় জাতীয় পার্টির নেতা আকরাম আলী শাহীনের নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে রফিউর রাব্বিসহ ৭ জনকে আহত করে। এ ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। এখনও নানাভাবে হুমকি ধমকি দিচ্ছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে জোর দাবি জানানো হয়। নাগরিক কমিটির সভাপতি এবি সিদ্দিকের সভাপতিত্বে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান, জেলা সিপিবির সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক পরিষদের সদস্য সচিব মাহবুবুর রহমান মাসুম প্রমুখ।
আজ শেষ হচ্ছে প্রচারণা, নামছে র‌্যাব ও বিজিবি: নারায়ণগঞ্জ-৫ উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী বৃহস্পতিবার। আজ মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হচ্ছে মিছিল-মিটিংসহ সব ধরনের প্রচার-প্রচারণা। একই সঙ্গে বন্ধ হচ্ছে সেখানে সব ধরনের যানবাহন চলাচল। নির্বাচনে সহিংসতা এড়াতে ইতিমধ্যে সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে আজ থেকে মাঠে নামবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও  র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব)। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সদস্য  টহল দেবে নির্বাচনী এলাকায়। নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, উপনির্বাচন উপলক্ষে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিয়ে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছতে পারে, এ জন্য  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।   এছাড়া, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে  প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে তাদের নির্দেশ  দেয়া হয়েছে। উপনির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় র‌্যাব ও বিজিবি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে  কাজ করবে। পাশাপাশি  মাঠে থাকবে এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ান আনসারসহ বিপুল সংখ্যক  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৫টি মোবাইল টিম ও র‌্যাবের পৃথক ১৬টি মোবাইল টিম টহল দেবে  উপনির্বাচনে। এছাড়া ৩ প্লাটুন কোস্টগার্ড ও ৪ প্লাটুন বিজিবি সদস্য স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকবে। আপরাধীদের তাৎক্ষণিক সাজা দিতে ১০ জন নির্বাহী ও ২ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়োগ করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ উপনির্বাচনে। ভোটগ্রহণের দিন সাধারণ কেন্দ্রে ১৮ জন  এবং ঝুঁকিপূর্র্ণ কেন্দ্রগুলোতে সার্বক্ষণিক ১৯ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হবে। উপনির্বাচন উপলক্ষে বৃহস্পতিবার  নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে ইসি। এদিন সকাল ৮টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩টি ওয়ার্ড, ৪টি আংশিক ওয়ার্ড ও ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন। ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪২ হাজার ৪০৫ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৪ হাজার ৩১১ এবং মহিলা ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ৯৪ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১৪১টি এবং ভোটার কক্ষ ৬৭৪টি। নির্বাচনে ৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন- জাতীয় পার্টির একেএম  সেলিম ওসমান, কৃষক, শ্রমিক, জনতা লীগের শফিকুল ইসলাম, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক  এমপি  এসএম আকরাম ও  মোহাম্মদ মামুন সিরাজুল মজিদ। এদিকে, নারায়ণগঞ্জ-৫ উপনির্বাচনে  ভোটাররা ভোট নম্বর ও ভোট কেন্দ্রের নাম  নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট ও মোবাইল ফোনে এসএমএস-এর মাধ্যমে জানতে পারবেন। মোবাইল ফোনে ভোট নম্বর ও ভোট কেন্দ্রের নাম জানতে  হলে মেসেজ অপশনে গিয়ে আইডি লিখে জাতীয় পরিচয় পত্রের নম্বর লিখে ২২৩৩ নম্বরে সেন্ড করতে হবে। এছাড়াও নির্বাচন কমিশন ওয়েবসাইট িি.িবপং.মড়া.নফ  থেকেও ভোট নম্বর ও ভোট কেন্দ্রের নাম জানা যাবে। গতকাল  নির্বাচন কমিশনের গণসংযোগ বিভাগের পরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানান।