Showing posts with label ছিটমহল. Show all posts
Showing posts with label ছিটমহল. Show all posts

Tuesday, October 22, 2019

ভারতে গিয়ে কষ্টে সাবেক ছিটমহলবাসী by অমর সাহা

বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা সাবেক ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দারা সুখে নেই। তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কলকাতার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছে।

সাবেক ছিটমহল–বাসিন্দারা কেমন আছেন, তার খোঁজ নিতে মাসুমের কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীরা ছুটে গিয়েছিলেন বিভিন্ন ক্যাম্পে। তাঁরা কথা বলেন সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে। পরিদর্শন শেষে গতকাল রোববার মাসুমের উদ্যোগে কোচবিহারে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এ সময় সাবেক ছিটমহলবাসীরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, এর চেয়ে তাঁরা বাংলাদেশেই ভালো ছিলেন। এখন তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা উভয় দেশের ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হয়। ভারতের ভূখণ্ডে বাংলাদেশের ৫১টি আর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল। এই ছিটমহল বিনিময়ের জন্য উভয় দেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। পরে দুই দেশের সরকার আইন বলে এই ছিটমহল বিনিময় করে। ফলে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশের সঙ্গে।

ভারতে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলের ১৪ হাজার ২১৫ জন বাসিন্দা সেদিন বাংলাদেশে ফিরে না গেলেও বাংলাদেশ থেকে ৯২৭ জন ফিরে এসেছিলেন ভারতে। বাংলাদেশে তখন ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দা ছিল ৩৭ হাজার ৩৩৪ জন। ফিরে আসা ৯২৭ জন ভারতীয়কে ঠাঁই দেওয়া হয় কোচবিহার জেলার দিনহাটা, মেখলিগঞ্জ ও হলদিবাড়ির অস্থায়ী ক্যাম্পে।

মাসুমের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি শনি ও রোববার পরিদর্শন করেন কোচবিহারের করলা-২, পশ্চিম বাকালির ছড়া ও ব্যাত্রীগাছি ছিটমহল। তাঁরা পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ থেকে আসা ভারতীয় ছিটমহলবাসীদের ঠাঁই দেওয়া দিনহাটা আশ্রয়শিবিরও। প্রতিনিধিদলে ছিলেন মাসুমের সম্পাদক কিরীটি রায়, মানবাধিকার নেত্রী অপর্ণা সেন, বোলান গঙ্গোপাধ্যায়, মুদার পাথেরিয়া প্রমুখ।

সাবেক ছিটমহলবাসীরা প্রতিনিধিদলের কাছে বলেন, তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তাঁদের কাজ নেই, চাকরি নেই, পর্যাপ্ত রেশনের ব্যবস্থা নেই। পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থা শোচনীয়। পানীয় জল ও চিকিৎসার অভাবে তাঁদের কষ্টে বাঁচতে হচ্ছে।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মাসুমের নেতারা অভিযোগের সুরে বলেন, সাবেক ছিটমহলবাসী সুখে নেই। তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁদের কাজ নেই। পর্যাপ্ত রেশন নেই। বিদ্যুৎ নেই। চিকিৎসা নেই। শৌচাগার ও পয়ঃপ্রণালির অভাব। সব মিলিয়ে তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিনা চিকিৎসায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মাসুমের নেতারা জানান, সম্প্রতি মারা গেছেন পূর্তি বর্মণ নামে ২০ বছরের এক নারী। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

মাসুমের নেতারা আরও জানান, দাসিয়াছড়া ছিটমহলের রশিদুল ইসলাম কাজ না পেয়ে কাজের জন্য দিল্লিতে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লিতে গিয়ে ধরা পড়েন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে।

সাবেক ছিটমহলবাসীর অভিযোগ, তাঁরা যে আশা নিয়ে ভারতে নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন, তাঁদের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। তাঁরা চাইছেন তাঁদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করুক প্রশাসন। কাজ দিক, বেকারত্ব জীবনের অবসান ঘটাক। তাঁদের দেওয়া জমির অধিকার নিশ্চিত করুক প্রশাসন।
সাবেক ছিটমহলবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় অপর্ণা সেন। ছবি: মাসুম থেকে পাওয়া

Wednesday, November 28, 2018

ভারতভুক্তির তিন বছর পর সাবেক ছিটবাসীরা জমির স্বত্ব পাচ্ছেন

ভারতভুক্তির তিন বছর পর সাবেক ছিটবাসীরা জমির স্বত্ব পাচ্ছেন। গত তিন বছরে  প্রশাসনের কাছে বহু অনুনয় করেও কাজ হয় নি। শেষ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কড়া নিদের্শের পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। গত সোমবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় সাবেক ছিটমহলে বসবাসকারীদের জমির স্থায়ী মালিকানা দিতে ভূমি আইনের সংশোধনী সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। এই বিল পাসের পর সাবেক ছিটবাসীরা খুশি। বিরোধীরাও আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে তারা একই সঙ্গে  সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের  সার্বিক নাগরিক সুযোগ সুবিধা দেওয়ার দাবিতে সরব হয়েছেন। বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, দু’বছর আগেই এটা হতে পারত।
কোচবিহারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টা বুঝেছিলেন। তাই তাড়াহুড়ো করে করা হল। এ দিন বর্তমান ভূমি আইনে ৩-বি নামে নতুন ধারা যুক্ত করে ছিটমহলের সব জমিকে খাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ৩-বি (২) ধারা যুক্ত করার ফলে ওই জমিতে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে জমির আইনি অধিকার দেওয়া সম্ভব হবে। ২০১৫ সালে ছিটমহল চুক্তির পরে বাংলাদেশ থেকে ভারত পায় ৭১০০ একরের কিছু বেশি জমি। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ছিটমহল বিনিময়ের পর নাগরিকত্ব বেছে নেওয়ার যে বিকল্প ছিটমহলের বাসিন্দাদের কাছে ছিল তা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশি ছিটমহলগুলির ৯২২ জন বাসিন্দা ভারতের নাগরিকত্ব নিয়েছেন। কিন্তু ভারতে থাকা বাংলাদেশি ছিটমহলগুলির ২৩,৩২৪ জনের কেউ বাংলাদেশে যান নি। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, কেন্দ্র সাবেক ছিটবাসীদের উন্নয়ন ও পরিকাঠামো খাতে ১০০৫ কোটি রুপি দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা এখনও পূরণ করে নি। এখন পর্যন্ত মাত্র ‘৫৭৯ কোটি টাকা কেন্দ্র দিয়েছে। এখনও ৪২৬ কোটি টাকা দেয় নি। জানা গেছে, সাবেক ছিটমহলকে এবার পঞ্চায়েতের আওতায় আনা হবে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, রাস্তা, হাসপাতাল অন্যান্য পরিকাঠামো সব হচ্ছে। সেখানকার মানুষদের রেশন, ভোটার কার্ড, বিদ্যুৎ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি সমস্যা আমরা দেখছি। বিরোধীদের দাবি মেনে ছিটমহলের বাসিন্দাদের ‘কন্যাশ্রী’, ‘সবুজসাথী’ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

Tuesday, November 24, 2015

এ দেখাই শেষ দেখা by জুনায়েত হাসান

‘জন্মভূমি ছেড়ে গেলাম। জানি না, ওখানে এমন মাতৃছায়া পাবো কি-না? হামার জন্য আশীর্বাদ চাই। হয়তো আর কোনদিন দেখা-সাক্ষাৎ হবে না। এ দেখাই শেষ দেখা।’ পাটগ্রাম উপজেলার বিলুপ্ত ১১৯ নম্বর বাঁশকাটা ছিটমহলের বর্মণপাড়ার সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী ইদ্রিস আলীকে এসব কথা বলেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন ষাটোর্ধ্ব উকল চন্দ্র বর্মণ। গতকাল সকালে নিজের জন্মভিটা বর্মণপাড়া থেকে চিরকালের জন্য ভারতের নয়া ঠিকানার উদ্দেশে চলে যান তিনি। ভারতে চলে যাওয়া বিলুপ্ত ৪টি ছিটমহলের ৩০টি পরিবারের ১২৯ ট্রাভেল পাসধারীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। চার ছেলে ও তিন মেয়ে তার। এক ছেলেকে বাংলাদেশেই বিয়ে দিয়েছেন। আর ৩ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন ভারতের কোচবিহার জেলার ধুবগুড়ি ও নয়ারহাট এলাকায়। তিনি ৪ ছেলে, স্ত্রী ও তার ছেলের স্ত্রীকে নিয়ে যান। মেয়েরা আগে থেকে ভারতে স্বামীর বাড়ি রয়েছেন।
বিচ্ছেদের কান্না শুধু উকিল বর্মণের একার নয়। তার মতো ১১৯ নম্বর বাঁশকাটা ছিটমহলের বর্মণপাড়ার স্কুলছাত্রী সুচরিতা রানী বর্মণ, জোসনা রানী বর্মণ, সুমন চন্দ্র বর্মণসহ অন্য সবার। তাদের কান্নায় ১১৯ নম্বর বাঁশকাটা, ১১২ নম্বর বাঁশকাটা, ১১৫ নম্বর বাঁশকাটা ও ১৫ নম্বর খরিখরি ছিটমহলের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। ভারতে চলে যাওয়াদের কান্নায় স্থানীয় প্রতিবেশীরাও আবেগাপ্লুত। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
দুপুর ১টায় বুড়িমারী স্থলবন্দর পুলিশ ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শেষে জিরোপয়েন্টে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলম ভারতের নয়া ঠিকানায় যাওয়া এসব নাগরিককে মিষ্টিমুখ করান এবং রজনীগন্ধার একটি করে স্টিক হাতে তুলে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান। এ সময় পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাবুল ও জোংড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ মাহমুদুন্নবী শাহীন উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, ভারতের কোচবিহার অতিরিক্ত জেলা শাসক আয়শা রানী ও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের প্রথম সচিব রামাকান্ত গুপ্তা উপস্থিত থেকে ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণকারীদের মিষ্টিমুখ করিয়ে হাতে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন। এ সময় পাশেই স্থাপিত মঞ্চে ভারতীয় শিল্পীরা নয়া নাগরিকদের গানে গানে বরণ করে নেন।
চিলাহাটি সীমান্ত দিয়ে ভারত গেলেন
ডোমার (নীলফামারী) প্রতিনিধি জানান, নীলফামারীর চিলাহাটি থেকে দুই দিনে ভারত গেলেন সদ্য বিলুপ্ত ৫ ছিটমহলের ২২৪ বাসিন্দা। রোববার বিকাল ৩টা ৪৫ মিনিটে প্রথম দফায় চিলাহাটি হলদিবাড়ী সীমান্ত দিয়ে কুচবিহার জেলার এডিএম আয়শা রানীর কাছে ৪৮ বাসিন্দাকে হস্তান্তর করেন নীলফামারী জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান। গতকাল দ্বিতীয় দফায় যান ১৭৬ বাসিন্দা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ৫৮ ব্যাটালিয়নের ডেপুটি কমান্ডার এ কে ঝা, ভারত জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন রঞ্জন ঝা, বিজিবির ৫৬ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জিএম সারোয়ার, ডোমার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বসুনিয়া, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবিহা সুলতানা প্রমুখ। এর আগে দুপুরে ভারত গমনে পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ছিটমহলের প্রথম দলের ২২৪ সদস্যের ইমিগ্রেশন নেয়া হয় ডোমার উপজেলার চিলাহাটি সীমান্তের আবদুর রউফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চত্বরে। ইমিগ্রেশন কাজে ছিলেন কাস্টমসসের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন হাফিজ, রাজস্ব কর্মকর্তা আহসান হাবিব, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ময়নুল ইসলাম, ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন অফিসের ফাস্ট সেক্রেটারি রমাকান্ত গুপ্ত, নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুজিবুর রহমান, ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জিএম সারোয়ার, ডোমার উপজেলার চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বসুনিয়া, ডোমার নির্বাহী কর্মকর্তা সাবিহা সুলতানা, পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল আউয়াল, ডোমার থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন প্রমুখ।
দুই দিনে ৫টি বাসযোগে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার কালিয়াগঞ্জ ইউপি চত্বরের অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে দুপুর ১২টা ৩৪ মিনিটে চিলাহাটি আবদুর রউফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চত্বরে নিয়ে আসা হয়। এখানে তাদের বরণ করতে নীলফামারীর জেলা প্রশাসনের পক্ষে রজনীগন্ধার একটি করে স্টিক হাতে তুলে দেয়া হয়। তাদের ইমিগ্রেশন শেষে তাদের ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। হস্তান্তরের সময় দুই সীমান্তে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন। এখানে তাদের শেষ বিদায় জানাতে আত্মীয়স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
কান্না থামছে না বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর
পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, কান্না থামছে না বিলুপ্ত ছিটমহলবাসীর। আপনজনদের মধ্যে কেউ কেউ যাচ্ছেন ভারতে। কেউ কেউ থেকে যাচ্ছেন বাংলাদেশে। এ অবস্থায় বিদায়বেলায় উভয়ই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। দ্বিতীয় দফায় গতকাল ভারত গেছেন পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত কোটভাজনী ও বালাপাড়া খাগড়াবাড়ী ছিটমহলের ২৮টি পরিবারের এক নবজাতকসহ ১৪৭ সদস্য। এ দুটি ছিটের ৩১ পরিবারের ১৭৭ জন ভারতে যাওয়ার কথা থাকলেও প্রস্তুতি না থাকায় ৩০ জন চতুর্থ দফায় ভারতে যাবেন বলে জানা গেছে। সকাল সাড়ে ৯টায় দেবীগঞ্জের গাজোকাটি বাজার মাঠের অস্থায়ী ক্যাম্পে পঞ্চগড়ের এডিএম মোহাম্মদ গোলাম আজম ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের ভারতীয় হাইকমিশনারের প্রথম সেক্রেটারি রমা কান্ত গুপ্তার কাছে ১৪৭ জন নতুন ভারতীয় নাগরিকদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ তাদের হস্তান্তর করেন। পরে ৪টি মিনিবাস ও ৭টি ট্রাকে করে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি ডাঙ্গাপাড়া সীমান্তে। সেখানকার আবদুর রউফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ইমিগ্রেশনের কার্যক্রম শেষ করা হয়। দুপুরে দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শফিকুল ইসলাম ভারতের কুচবিহার জেলার এডিএম আয়শা রানী ও বিএসএফের ডেপুটি কমান্ডার এ কে ঝার হাতে মালামালসহ নতুন নাগরিককে হস্তান্তর করেন। এ সময় নীলফামারীর ডোমার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবিহা সুলতানা, ডোমার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক বসুনিয়াসহ গণমাধ্যমকর্মী, প্রশাসনের কর্মকর্তা ও বিজিবি সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পরে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের বরণ করে নেয়।
আজ মঙ্গলবার তৃতীয় দফায় দেবীগঞ্জ উপজেলার বিলুপ্ত দহলা খাগড়াবাড়ী ছিটমহলের ২৯টি পরিবারের এক নবজাতকসহ ১৪৯ জন ভারতে যাবেন। তারা গতকালই প্রয়োজনীয় মাল-সামানাসহ দেবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পে উপস্থিত হয়েছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার দগলা খাগড়াবাড়ী ও দইখাতা ছিটমহলের ২৩টি পরিবারের ১০৮ জন সদস্য ভারতে যাবেন।

Monday, November 23, 2015

চোখের জলে বিদায়

নতুন নাগরিকত্ব নিয়ে প্রথম দফায় পঞ্চগড় জেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত বিলুপ্ত ছিটমহলের ১৪টি পরিবারের ৪৮ জন নারী-পুরুষ গতকাল ভারতে চলে গেলেও জন্মস্থান ছেড়ে যাওয়ার জন্য অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও কাছের লোকজনদের কাছে অতীতের ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা করে দেয়াসহ দোয়া চেয়ে বিদায় নিয়েছেন। এ সময় তাদের চোখে পানি লক্ষ্য করা যায়। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ন’টায় পঞ্চগড় জেলা প্রশাসনের পক্ষে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ গোলাম আযম বোদা উপজেলার কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর থেকে এসব নতুন ভারতীয়দের আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানান। এ সময় ভারতের বাংলাদেশস্থ হাইকমিশনের প্রথম সচিব রামাকান্ত গুপ্তা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। প্রথম দফায় বিলুপ্ত নাটকটোকা, কাজলদিঘী, বেলুয়াডাঙ্গা ও নাজিরগঞ্জ ছিটমহল থেকে ৫৫ জন ভারতে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারের ৪ সদস্য সিদ্ধান্ত পরিবর্তন ও অপর দু’টি পরিবারের ৩ সদস্য পরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করায় শেষ পর্যন্ত ৪৮ জন বিকাল সাড়ে ৩টায় পার্শ্ববর্তী নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার চিলাহাটি-হলদিবাড়ি সীমান্ত দিয়ে ভারতে যান। এ সময় সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে স্বজনদের কান্না আর বুকফাটা আর্তনাদের মধ্য দিয়ে প্রিয়জনদের বিদায় জানানোর দৃশ্য যেমন চোখে পড়ে তেমনি অন্যদিকে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারেই নতুন ভারতীয়দের বরণ করতে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। উৎসুক জনতার ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। এর আগে নতুন ভারতীয়দের নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের কাস্টমস আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা হয় কাজলদিঘী কালিয়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে। পণ্যবাহী ৩টি ট্রাকে জিনিসপত্রসহ তাদের দুটি বাসে নিয়ে যাওয়া হয় চিলাহাটী ডাঙ্গাপাড়াস্থ আব্দুর রউফ সরকারি প্রাইমারি স্কুল মাঠে। সেখানেই ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শেষ করা হয়। এরপর নতুন ৪৮ জন ভারতীয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসনের পক্ষে বোদা উপজেলার নির্বাহী অফিসার আবু আউয়াল ভারতের কুচবিহার জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আয়েশা রানীর কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় ৫৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল জিএম সারওয়ার, নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মুজিবুর রহমান, ডোমার উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাবিহা সুলতানা এবং ভারতের বিএসএফের ডেপুটি কমান্ডার একে ঝাঁ উপস্থিত ছিলেন। ভারতীয় নতুন এসব নাগরিকের উৎসবমুখর পরিবেশে বরণ করতে ভারতীয় অংশে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেখলিগঞ্জ-হলদিবাড়ি আসনের বিধায়ক পরেশ অধিকারী। বিশেষ অতিথি ছিলেন ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক দীপ্তিমান সেন গুপ্ত। পঞ্চগড় জেলা থেকে তিন ধাপে যাবে আরও ৪৩৪ জন। এর মধ্যে নতুন বাংলাদেশে জন্ম নেয়া ২ নবজাতকও রয়েছে।
বোদা উপজেলার সাবেক নাজিরগঞ্জ ছিটমহলের জয় প্রকাশ (৪৬), স্ত্রী হাসি রানী, মেয়ে টুম্পা রায়, প্রিয়াংকা, প্রিয়সী ও একমাত্র ছেলে নিরব রায়কে নিয়ে ভারতে গেছেন। বাংলাদেশে থেকে গেছেন তার ভাইবোনসহ আত্মীয়স্বজন। জয় প্রকাশ বলেন, জন্মস্থান ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না দাদা। কিন্তু ছেলেমেয়েদের ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা ও তাদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে যেতে হচ্ছে। আমাকে লেখাপড়া, চাকরিসহ বিভিন্ন সুযোগসুবিধা দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়েছে। ভারতে আমার অনেক আত্মীয়স্বজন রয়েছে। সদর উপজেলার সাবেক গারাতি ছিটমহলের দীজেন বর্মণ (৪২) সঙ্গে নিয়ে গেছেন স্ত্রী রত্না রায় ও দুই সন্তানকে। এখানে থেকে গেছেন তার বাবা, ৪ ভাই ও আত্মীয়স্বজন। ১৪ বছর আগে সম্পর্ক করে ভারত  থেকে দীজেন তার স্ত্রী রত্না রায়কে বিয়ে করে নিয়ে আসেন। দীজেন বর্মণ বলেন, স্ত্রীর দাবির কারণেই জন্মদাতা পিতা ও ভাইদের ফেলে ভারতে চলে যাচ্ছি। রত্না তাকে বলেছে না গেলে দুই সন্তানকে নিয়ে সে ভারতে চলে যাবে। তাই বাধ্য হয়ে সবাইকে ছেড়ে ভারতে চলে যেতে হচ্ছে। হয়তো আর কোনদিন তাদের দেখা হবে না। দেবীগঞ্জের সাবেক কোটভাজিনি ছিটমহলের কমলেশ্বর সরকার (৪৫) বলেন, এতো বছর থেকে একসঙ্গে বসবাসকারী ছিটমহলের লোকজনদের ভারতে চলে যাবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের পরিবারের ২০ জন সদস্যও  আবেদন করেছে। আবেদনকারী লোকজনদের জায়গায় যারা আসবে তাদের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় আমরাও ভারতে চলে যাচ্ছি। আজ সোমবার দ্বিতীয় দফায় একই রুট দিয়ে ভারতে যাবে দেবীগঞ্জের বিলুপ্ত কোটভাজনী ও বালাপাড়া খাগড়াবাড়ী ছিটের ৩১টি পরিবারের একজন নবজাতকসহ ১৭৭ জন। গতকাল রোববার বিকালে মালপত্র নিয়ে তারা হাজির হয় দেবীগঞ্জের গাজোকাটি বাজার মাঠে নির্মিত অস্থায়ী ক্যাম্পে। আগামীকাল মঙ্গলবার ৩য় দফায় দেবীগঞ্জ উপজেলার অভ্যন্তরের দহলা খাগড়াবাড়ী ছিটমহলের ২৯টি পরিবারের একজন নবজাতকসহ ১৪৯ জন ভারতে যাবেন। তাদের আজ সোমবার বিকালের মধ্যে দেবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে স্থাপিত অস্থায়ী ক্যাম্পে উপস্থিত হতে বলা হয়েছে।

Monday, October 19, 2015

দুর্গাপূজায় এক টুকরো মশালডাঙ্গা by অমর সাহা

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। আর পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ধর্মীয় উৎসবও এই দুর্গোৎসব। প্রতিবছরই এই দুর্গোৎসবকে ঘিরে মেতে ওঠে কলকাতাসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গ। তৈরি হয় নানা ভাবনার নানা পূজামণ্ডপ, নানা ধাঁচ আর বৈচিত্র্যের প্রতিমা। চলে দুর্গাপ্রতিমা আর পূজামণ্ডপ তৈরিতে থিমের লড়াই। লড়াই চলে সাবেকি পূজার সঙ্গে আধুনিক পূজারও।
প্রতিবছরই এই লড়াইয়ে মেতে ওঠে কলকাতাসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গ। শুধু কি তাই, মোটকথা ভারতে যেখানে বাঙালির বাস, সেখানেই দেবীদুর্গার আরাধনা। ত্রিপুরা, ঝাড়খন্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, আসাম, মেঘালয়, ছত্তিশগড়, বিহার, মহারাষ্ট্র—সর্বত্রই যেন চলে এই দেবীর আরাধনা। থিমের লড়াই। কারণ, এসব রাজ্যে রয়েছে প্রচুর বাঙালির বাস।
এবার কলকাতার পূজায় দুটি পূজামণ্ডপ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এর একটি ভারতের ভূখণ্ডে থাকা বাংলাদেশের সাবেক একটি ছিটমহলের জীবনধারাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আর অন্যটি এবার পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে নতুন ভাবনার সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ কলকাতার কসবার শক্তিসংঘ পল্লীবাসী দুর্গোৎসব কমিটি এবারের পূজামণ্ডপ করেছে কোচবিহারের দিনহাটা মহকুমার মধ্য মশালডাঙ্গা ছিটমহলের আদলে। ভারতের ভূখণ্ডে থাকা এই মধ্য মশালডাঙ্গা ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের। গত ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পর মশালডাঙ্গা ছিটমহল অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় ভারতের ভূখণ্ডে। আর সেই এক টুকরো মশালডাঙ্গাকে এবার তুলে আনা হয়েছে কসবার শক্তিসংঘের পূজামণ্ডপে। একেবারে মশালডাঙ্গা ছিটমহলই যেন এখানে ঠাঁই পেয়েছে। সেই খড় ও বাঁশের তৈরি বাড়ি। বাঁশঝাড়, কলাবাগান, গোশালা, বাড়ির উঠোন—কী নেই এখানে। রয়েছে ছিটমহলের ঐতিহাসিক শিবমন্দিরও। হঠাৎ এই পূজামণ্ডপে ঢুকলে মনে হবে যেন আমরা চলে এসেছি কোনো একটি ছোট্ট গ্রামে। শুধু কি তাই, উদ্যোক্তারা এখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মাধ্যমে শোনাচ্ছে ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের নানা জ্বালা-যন্ত্রণার কথা। আর এই এক টুকরো মশালডাঙ্গাকে দেখার জন্য ছুটে আসছে কলকাতার মানুষ।
আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও উঁচু দুর্গাপ্রতিমা গড়ে এবার রেকর্ড গড়েছে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গোৎসব কমিটি। বিশাল মাপের দুর্গা। মা দুর্গার মুখমণ্ডলই হলো ১২ ফুট লম্বা। ভাবা যায়! তবে পূজা কমিটির একজন বলেছেন, ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু এই দুর্গাপ্রতিমা। পূজা কমিটির সম্পাদক সুদীপ্ত কুমার বলেছেন, মণ্ডপ করা হয়েছে ১৬২ ফুট লম্বা ও ৯০ ফুট চওড়ার। দেবীকে দর্শন করা যাচ্ছে ৫০ ফুট দূর থেকে। এই পূজার সহযোগিতায় রয়েছে একটি সিমেন্ট কোম্পানি।
কসবা বা দেশপ্রিয় পার্কই নয়; এবার নানা ভাবনা আর নানা সৃষ্টিধর্মী মণ্ডপ এবং প্রতিমা তৈরি হয়েছে কলকাতাজুড়ে। দক্ষিণ কলকাতার বেহালার নতুন দল পূজা কমিটি এবার মণ্ডপ করেছে সেই পৌরাণিক কাহিনি সমুদ্র মন্থনের ধাঁচে। দেখানো হয়েছে অমৃতভান্ডের উত্থানকে। নিমতলা সর্বজনীন পূজা কমিটি পূজামণ্ডপে এবার এনেছে শ্রাবণধারা। বৃষ্টি। বৃষ্টিভেজা এক নতুন ভাবনার পূজামণ্ডপ। সোদপুরের শহীদ কলোনির পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছে নেপালের সেই ভূমিকম্পের ধাঁচে। আর সোদপুরের উদয়ন সংঘ মন্দির নির্মাণ করেছে পৌরাণিকের হস্তিনাপুর ও কুরুক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে। এখানেই দেখানো হচ্ছে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, কুরুপাণ্ডবদের পাশা খেলার দৃশ্যও। কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কয়ারে এবার পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছে ঘুরন্ত মণ্ডপের ধাঁচে। কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের মণ্ডপ এবার ‘উড়ন্ত চাকি, ঘুরন্ত প্যান্ডেল’। কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কের পূজার ভাবনা এবার দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গল সাফারিকে ঘিরে। আমেরিকার পার্লামেন্ট ভবনের ধাঁচে এবার মণ্ডপ তৈরি হয়েছে শিয়ালদহ অ্যাথলেটিক ক্লাবের, আর কলেজ স্কয়ার সর্বজনীন তাদের মণ্ডপ তৈরি করেছে হাঙ্গেরির পার্লামেন্টের আদলে। বারাসাতের চড়কডাঙ্গা পূজা কমিটি মণ্ডপ তৈরি করেছে থাইল্যান্ডের লোটাস টেম্পলের আদলে। আর্য সমিতি মণ্ডপ তৈরি করেছে বাউলদের বাদ্যযন্ত্র দিয়ে।
সেই গঙ্গা, যমুনা, কৃষ্ণা, গোদাবরী ও সরস্বতী—এই পঞ্চ নদীর সঙ্গম তুলে আনা হয়েছে খিদিরপুর পল্লী সমিতির দুর্গোৎসব। রাজডাঙ্গা নব উদয় সংঘ মন্দির তৈরি করেছে ইস্পাতের প্লেট দিয়ে। সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশকে ভাবনা করে মণ্ডপ তৈরি করেছে জগৎপুর জ্ঞানেন্দ্র পল্লীর অধিবাসীরা। আর দক্ষিণ কলকাতার সুরুচি সংঘ এবার পূজার থিম করেছে দক্ষিণ ভারতের তামিল স্থাপত্যকে নিয়ে। দাসপাড়া সর্বজনীন পূজার থিম এবার ‘লঙ্কেশ্বরের নরেশ’ বা লঙ্কার রাবণ। উত্তর কলকাতার পাতিপুকুর নতুন পল্লীর পূজামণ্ডপের এবারের ভাবনা তেভাগা আন্দোলন থেকে তেলেঙ্গানা আন্দোলন। আরও একটি আকর্ষণীয় পূজামণ্ডপ তৈরি করেছে গাঙ্গুলীবাগান রবীন্দ্র পল্লী দুর্গোৎসব কমিটি। এখানে বিশ্বের সেই সপ্তাশ্চর্যকে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের তাজমহল থেকে পেরুর ইনকা সভ্যতা, ব্রাজিলের আকাশছোঁয়া যিশু, জর্ডানের পেট্রা, ইতালির কলোসিয়াম, মেক্সিকোর চিচেন ইতজা আর চীনের ঐতিহাসিক প্রাচীর। এক অবিভক্ত বাংলার এক টুকরো ছবি তুলে এনেছে হরিদেবপুর বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব। অবিভক্ত বাংলার সেই মেলবন্ধনের ছবিকে তুলে ধরেছে উদ্যাপন কমিটি। আবার বৈষ্ণবঘাটায় ট্রামকে ভাবনা নিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে চিৎপুরের যাত্রা শুরু সংঘ। এখানেই তুলে ধরা হয়েছে চিৎপুরের যাত্রাপালার নানা দৃশ্যকে। উত্তরাখন্ডের সেই ঐতিহাসিক মন্দির কেদারনাথকে দেখা যাবে বারাসাতের কল্যাণকৃত পূজামণ্ডপে। কন্যাভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর ভাবনা নিয়ে মেয়েবেলার গল্পকাহিনি নিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে কলকাতার কাশী বোস লেনের পূজা কমিটি। কলকাতার বাদামতলার আষাঢ় সংঘ মণ্ডপ তৈরি করেছে গুজরাটের সেই ডান্ডিয়া উৎসবকে সঙ্গী করে। আহিরীটোলার মণ্ডপ তৈরি হয়েছে রুটি বেলার বেলন আর বসার পিঁড়ি দিয়ে। আর কলকাতার বিধাননগরের এফ ই বোলোকের মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে দিল্লির বাহাই লোটাস টেম্পলের আদলে।
সত্যি কথা কি, এমন ধরনের নানা ভাবনা আর চিন্তা নিয়ে কলকাতাসহ গোটা ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে দুর্গামণ্ডপ। বৈচিত্র্য আনা হয়েছে যেমন মণ্ডপ নির্মাণে, ঠিক তেমনি প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জায়ও।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

Wednesday, October 14, 2015

বদলে গেছে দাশিয়ারছড়া: তৈরি হলো সড়ক, এল বিদ্যুৎ by আশীষ-উর-রহমান ও সফি খান

কুড়িগ্রাম জেলার একসময়ের ছিটমহল
দাশিয়ার ছড়া বদলে গেছে। সেখানে চলছে
পাকা সড়ক নির্মাণের কাজ। ছবিটি
কলির হাট এলাকা থেকে তোলা -প্রথম আলো
দাশিয়ারছড়া বদলে গেছে। কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার এই সাবেক ছিটমহলটির নতুন নাম ‘মুজিব-ইন্দিরা দাশিয়ারছড়া ইউনিয়ন’।
কাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে এই ইউনিয়ন পরিষদের নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন। তৈরি হচ্ছে নতুন সড়ক। কাজ চলছে নতুন বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়ার। নতুন একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা খোলা হচ্ছে। বিপুল কর্মযজ্ঞ। তা দেখতে আশপাশের কয়েক গ্রামের মানুষ এসে ভিড় করছেন। পরিবেশ দেখে মনে হলো রীতিমতো পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে মাত্র মাস চারেক আগেও দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই নিরিবিলি জনপদটি।
দাশিয়ারছড়ায় একটিই বাজার, কালীরহাট। গত জুন মাসেও এখানে এসে দেখেছি টিনের বেড়া ও ছাউনি দেওয়া একটি চায়ের স্টল, আর বহু পুরোনো এক পাকুড়গাছের তলায় কয়েকটি দোকান। এই নিয়েই কালীরহাট বাজার। গতকাল মঙ্গলবার সকালে এসে জায়গাটিকে আর চেনাই যাচ্ছিল না। ইটের তৈরি নতুন নতুন দোকান, হোটেল, অফিস, উপ-তথ্যকেন্দ্র, ব্যাংক, মসজিদসহ অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানের ঘর উঠে গেছে ইতিমধ্যেই। আরও উঠছে। একপাশে নতুন টিনের বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। সাইনবোর্ডে লেখা শেখ হাসিনা বহুমুখী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়। লম্বা ঘরটি ঝলমল করছে রোদে।
পাকুড়গাছের তলায় কয়েক ডজন মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে রাখা। ব্যস্ত হয়ে নানা কাজে ঘোরাঘুরি করছেন লোকজন। গঙ্গাহাট থেকে কালীরহাট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার নতুন প্রশস্ত সড়ক তৈরি হচ্ছে। আপাতত ইট বিছানো হচ্ছে। শিগগিরই তার ওপর পড়বে পাথর-পিচের প্রলেপ। সাবেক ছিটমহলে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম পাকা সড়ক। সড়কের দুই পাশে গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে।
কালীরহাট বাজারে এক দোকানের সামনে খাতাপত্র নিয়ে বসেছেন পল্লী বিদ্যুতের লোকজন। গ্রামের ভেতরে খুঁটি বসিয়ে লাইন টানার কাজ শেষ হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সংযোগ দেওয়া হবে কাল। প্রধানমন্ত্রী বিদ্যুৎ-সংযোগ দেওয়ার কাজেরও উদ্বোধন করবেন। কর্তব্যরত ওয়্যারিং পরিদর্শক আবদুস সালাম জানালেন, ফেরতযোগ্য ৬০০ টাকার জামানত ও ২০ টাকার সদস্য ফি নিয়ে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। লোকজন লাইন দিয়ে প্রয়োজনীয় ফরম ও টাকা জমা দিচ্ছেন। প্রথম দিনেই ৮২৯টি পরিবারে সংযোগ দেওয়া হবে বলে জানা গেল।
নতুন সড়কের একপাশে তোড়জোড় চলছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডের (এসআইবিএল) শাখা খোলার। এটিও দাশিয়ারছড়া তো বটেই, সারা দেশের সাবেক ছিটমহলের প্রথম ব্যাংক। এই ব্যাংকের রংপুর শাখার ব্যবস্থাপক মো. নাজিম উদ্দিন এসেছেন কাজ তদারকির জন্য। তিনি জানালেন, নতুন এই শাখার কার্যক্রম শুরু হবে কাল থেকেই।
ব্যাংকের অদূরেই স্থাপিত হয়েছে সরকারি উপ-তথ্যকেন্দ্র। নতুন সার্ভারের যন্ত্রপাতি বসে গেছে। তবে ইন্টারনেট সংযোগ এখনো চালু হয়নি। এই উপ-তথ্যকেন্দ্রের দায়িত্ব পেয়েছেন দাশিয়ারছড়ারই তরুণ দম্পতি নূর হোসেন-আদিনা সরকার। খুশিতে ঝলমল করছিল তাঁদের মুখ। জানালেন, আপাতত দরখাস্ত বা এ ধরনের ছোটখাটো বিষয় তাঁরা কম্পিউটারে প্রিন্ট করে দিচ্ছেন। স্থানীয় ডেটাবেইস তৈরির কাজ চলছে। সার্ভার চালু হলেই সরকারি সব সেবা দেওয়া যাবে। তাঁদের কাছে জানা গেল, দাশিয়ারছড়ার আয়তন ৬ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার। জমির পরিমাণ ১ হাজার ৯০০ একর। সর্বশেষ ২০১১ সালের জনগণনা অনুসারে লোকসংখ্যা ৮ হাজার ৮০০। তবে স্থানীয় মানুষের মতে, ১২ হাজারের কাছাকাছি। দেশের সাবেক ছিটমহলগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়।
আপাতত ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে দাশিয়ারছড়ায়। কালীরহাট, রাসমেলা ও কামালপুরে হবে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এগুলো প্রস্তাবিত। আরও রয়েছে কালীরহাটে শেখ হাসিনা কালীরহাট বহুমুখী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, সমন্বয় পাড়া নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও দাশিয়ারছড়া ফজিলাতুন্নেছা দাখিল মাদ্রাসা।
গ্রামের পথে দেখা হলো ব্র্যাকের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী নাজমুন নাহার ও রেবতী রানীর সঙ্গে। তাঁরা কাজ করেন ফুলবাড়ী সদরে। জানালেন, ব্র্যাক এখানে স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে। তাঁরা এলাকা জরিপ করতে এসেছেন।

Friday, September 11, 2015

একটা নতুন উচ্চতায় পৌঁছনো গেল by কাজী আনিস আহমেদ

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে
আলোচনায় নরেন্দ্র মোদী, দিল্লি, ১৯ আগস্ট
কিছু কাল আগেও ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ দূরত্ব ছিল। ছিটমহল চুক্তি বাস্তবায়িত হওয়ায় দ্বিপাক্ষিক কূটনীতিতে এখন নতুন সম্ভাবনার পর্ব। এর পিছনে মোদীর জুন মাসের ঢাকা সফরের অবদান অনেকখানি।
কি ছু মানুষ নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে গেলেও  সমাধানে পৌঁছতে পারে না। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় নেতাদের মধ্যে এই প্রবণতা প্রবল। দেখেশুনে মনে হয়, চেষ্টাটাই সব নয়। চেষ্টা করেও সমস্যা একই ভাবে জিইয়ে রাখাটা আসলে বেশ সহজ। সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে হলে চেষ্টা ও সদিচ্ছার সঙ্গে একটা সাহসও থাকা চাই। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ছিটমহল সমস্যা নিরসনের মাধ্যমে একই সঙ্গে সেই সদিচ্ছা ও সাহসের পরিচয় দিলেন নরেন্দ্রভাই দামোদরদাস মোদী ও শেখ হাসিনা ওয়াজেদ।
দীর্ঘ ৬৮ বছরের আলোআঁধারি জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত ৩১ জুলাই ১৬২টি ছিটমহলের প্রায় ৫১ হাজার অধিবাসী পেল নতুন পরিচয়। ভারতের ভেতর ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ও বাংলাদেশের ভেতর ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বিনিময়ের মাধ্যমে জ্বলে উঠল স্বপ্নের বাতি। সূচিত হলো ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের নতুন একটি সম্ভাবনাময় পর্ব। পরিচয়হীন মানুষগুলোকে নাগরিক মর্যাদা দানের কৃতিত্ব শেখ হাসিনা এবং নরেন্দ্র মোদীই পাবেন, তবে কাজটা শুধু এই দুজনের জন্য হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধীর হাত ধরেই নতুন দিগন্তের দিকে যাত্রা শুরু হয়েছিল। মনমোহন সিংহ, সনিয়া গাঁধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সুষমা স্বরাজ ও ছিটমহল আন্দোলনের জনক দীপক সেনগুপ্তের অবদানও মনে রাখতে হবে।
ছিটমহলের চূড়ান্ত সমাধান আমাদের অন্যান্য অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক সমস্যার ব্যাপারেও এখন আশান্বিত করে তুলছে।  বাংলাদেশের দিক থেকে দেখতে গেলে ভারতের সঙ্গে তিস্তার পানিবণ্টনের চুক্তি দ্বিতীয় গুরুতর সমস্যা। আবার, ভারতের দিক থেকে দেখলে,  স্থল-যোগাযোগ  হল পরবর্তী জরুরি চিন্তা। স্থল-যোগাযোগের জন্য অবশ্য কলকাতা-আগরতলা বাসযাত্রা ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে, পরীক্ষামূলক যাত্রা হয়েছে ঢাকা-গুয়াহাটি রুটেও।
তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্য যাতে পিছিয়ে না থাকে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীকেই সেটা দেখতে হবে, আলোচনায় বসতে হবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। কোন দিকে এগোয় সেই আলোচনা, চুক্তি শেষ পর্যন্ত সম্পাদন না হওয়া পর্যন্ত তা নিয়ে বাংলাদেশের মনে অশান্তি থাকবেই। এক দিকে তিস্তাসহ সব দ্বিদেশিক নদীর পানি যথাযথ বণ্টন, অন্য দিকে ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটানের মধ্যে অবাধ স্থল-যোগাযোগ কার্যত এই পুরো অঞ্চলটাকেই অনেকগুণ শক্তিশালী ও শান্তিপূর্ণ করে তুলতে পারে, জোরালো অর্থনীতির বুনিয়াদের উপর দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
আজ যে ভারত-বাংলাদেশ এমন দুর্দান্ত সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তা কিন্তু আদৌ অবধারিত ছিল না। কিছু কাল আগেও দুই দেশের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল। অবৈধ অনুপ্রবেশ নিয়ে, এবং আলফার ঘাঁটি হিসেবে বাংলাদেশের ব্যবহার নিয়ে ভারত অনেক বার অভিযোগ করেছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ভারতের এই অভিযোগে তারা কর্ণপাতও করেনি। চট্টগ্রামে দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা বাংলাদেশেও সবাই জানে। কিন্তু বর্তমান আওয়ামি লিগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরই কেবল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা শোনা গেল। আজ দুদেশের মধ্যে আস্থার যে সম্পর্ক, তার ভিত্তিটা এখানেই।
তবে, ভারতের বিগত ইউপিএ সরকারের শাসনকালে আওয়ামি লিগ নানা কারণে এই জায়গাটায় পৌঁছতে পারেনি।  চেষ্টা থাকলেও এখনকার মতো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিন্তার সাহসটাই তখন দেখা যায়নি। এই মুহূর্তে আমাদের দুই দেশের নাগরিকদের দেখে মনে হয়, গত দুই দশকে তাঁরা যথেষ্ট পরিণত হয়েছেন। সস্তা জাতীয়তাবাদী বুলিতে তাঁরা সহজে বিচলিত হচ্ছেন না।  রাষ্ট্রনেতারাও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বস্তুটা আরও হিসেব করতে শিখেছেন, ছাড় না দিলে যে সমস্যার সমাধান হয় না, বোধহয় এটাও বুঝতে শিখেছেন।
বাংলাদেশে হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মনে করে, ভারত সরকারের জোরালো সমর্থনের সুবাদেই ২০১৪-র বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামি লিগ সরকার ক্ষমতায় টিঁকে গেছে। মোদীর ঢাকা সফরের সময় যে সব চুক্তি হয়েছে, স্বভাবতই এই প্রতিপক্ষের মতে তাতে বাংলাদেশের চেয়ে ভারতই বেশি লাভবান হয়েছে।
তবে বাংলাদেশে এমন একটা রাজনৈতিক পক্ষও আছে যারা বিশ্বাস করে আওয়ামি লিগ সরকারের উপর ভারত সরকারের ধারাবাহিক আশীর্বাদের ব্যাপারটা অনস্বীকার্য। তার হেতুটা ইতিহাসে লুকিয়ে নেই,  ব্যক্তিগত সম্পর্কেও নিহিত নেই। আছে আওয়ামি লিগ সরকারের সন্ত্রাসবিরোধিতার মধ্যে। ৯/১১ পরবর্তী যুগে বিএনপি যে ভাবে জঙ্গি গোষ্ঠীদের লালন করেছে, তাতে কেবল ভারত নয়, অনেক পশ্চিমি দেশের  কাছেই তাদের গ্রহণযোগ্যতা ঘোরতর প্রশ্নযোগ্য হয়ে পড়েছে।
পাশাপাশি এটাও বুঝতে হবে যে মোদীর পক্ষেও বাংলাদেশকে কোনও ধরনের অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া সহজ ব্যাপার নয়। নির্বাচনী প্রচারের সময় তিনি বাংলাদেশি অভিবাসীদের সম্পর্কে যে সব কথা উচ্চারণ করেছিলেন, তার পর বাংলাদেশের প্রতি তাঁর মনোভাব নিয়ে কম সংশয় ছিল না। অথচ তাঁর সফর দেখিয়ে দিল, একটি বড় শক্তিশালীতর দেশের নেতা হিসেবে কোনও প্রতিবেশীর আতিথেয়তা কী ভাবে নিতে হয়। গোটা সফরের যেন উদ্দেশ্য ছিল একটাই: বাংলাদেশকে যে ভারতবাসী শ্রদ্ধা করে, এই বার্তাটি একেবারে স্পষ্ট করে দেওয়া। ক্রিকেট খেলা নিয়ে দুর্বলতর বাংলাদেশকে ভারতীয়দের সোশ্যাল মিডিয়াতে ব্যঙ্গ করার মতো লঘু ব্যাপার থেকে শুরু করে সীমান্তে অনুপ্রবেশকারীদের গুলি করে মারার গুরুতর ঘটনায় ভারতের প্রতি বহু বাংলাদেশির মনেই অনেক দিনের জমাট ক্ষোভ। নরেন্দ্র মোদীর আচরণ কিন্তু এই উষ্মা অনেকাংশে হালকা করে দিতে পেরেছে।
হতেই পারে, মোদীর এই বার্তার মধ্যে অনেকটাই প্রতীক, অনেকটাই বাইরের আচরণ। কিন্তু কূটনীতিতে সেটাও জরুরি। দুটি দেশের সম্পর্ক তো শুধু নীতি কিংবা শুধু প্রতীকবাদ দিয়ে চলে না। দুটোই পাশাপাশি চালাতে হয়।  কোনটা প্রকাশ্য, কোনটা প্রচ্ছন্ন, কোনটা আসল, কোনটা নকল, সে সব পরবর্তী কূটনীতিতেই বোঝা যাবে। কিন্তু কথাটা হল, প্রকাশ্যেও যে এতখানি সংশয়ের বাতাবরণ ভেদ করে এতখানি আস্থা তৈরি করা গিয়েছে, সেটা কম কথা নয়। যে নরেন্দ্র মোদী আগে একের পর এক বাংলাদেশ-বিরোধী মন্তব্য করেেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিবেশী দেশে এসে সেই মোদীই বাংলাদেশের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারত-সহ ভুটান-নেপাল-শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড শুরুর উদ্যোগের কথা বলছেন, বাইশটি চুক্তি স্বাক্ষর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে একটা ‘মোমেন্টাম’ তৈরি করেছেন,  এবং দেশে ফিরে সেই চুক্তি সাধনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছেন।  বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা বড় সুখবর।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে হাসিনা সরকারের ভূমিকা ছিল দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ভিত রচনায় প্রথম পদক্ষেপ। আর মোদীর সফরকালে ভারতীয় পক্ষের নমনীয়তার প্রকাশ হল দ্বিতীয় পদক্ষেপ। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির বাস্তবায়ন হল দুই দেশের যুগপৎ অঙ্গীকার পালনের প্রথম বাস্তবায়ন। আশা করা যাক, এই পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার হাওয়াটা থাকতে থাকতেই তিস্তার পানিবণ্টন এবং স্থল যোগাযোগের বিষয়ে অগ্রসর হওয়া যাবে।
কে জানে, ভবিষ্যতে হয়তো সুযোগ সমান ভাবে বজায় রাখা যাবে না। সুতরাং এখনই এগোনো ভাল।  কেবল দুই দেশের জন্যই তো নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই এটা একটা বিরল সুযোগ।
আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে নেওয়া

Monday, August 24, 2015

এসব ছিটমহলবাসীর কী হবে? by তুহিন ওয়াদুদ

ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার কারণে ছিটমহলবাসীর অনেক বড়
একটি অংশ এখন হতাশায় নিমজ্জিত
ছিটমহল বিনিময়-প্রক্রিয়া সামান্য ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার কারণে ছিটমহলবাসীর অনেক বড় একটি অংশ এখন হতাশায় নিমজ্জিত। ৩১ জুলাই ছিটমহল বিনিময় হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের যারা ভারতের মূল ভূখণ্ডে যেতে চাইবে, আগামী ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তারা যেতে পারবে। যারা যাবে না, তারা বাংলাদেশের নাগরিক হবে। এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ জরিপ হয়। সেই জরিপে যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তারাই কেবল কোন দেশে থাকবে, সেই মতামত নেওয়া হয়েছে ৬ থেকে ১৬ জুলাইয়ের পরিসংখ্যানে। যারা তখন অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি, তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। তাহলে জরিপে যারা বাদ পড়েছে, তারা ছিটের মানুষ বলে আপাতত স্বীকৃতি পাচ্ছে না। ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়া ব্যক্তির সংখ্যা কত হবে, তা কেউই নির্দিষ্ট করে বলতে পারেন না। অনেকের অনুমান, এই সংখ্যা পাঁচ থেকে সাত হাজারও হতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরের বৃহৎ ছিটমহল দাশিয়ার ছড়া। ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়া ব্যক্তিদের বাস্তবতা বোঝার জন্য ঈদের আগের দিন গেলাম সেখানে। কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার খড়িবাড়ী বাজার থেকে দাশিয়ার ছড়া ছিটমহলে ঢুকেই ছোট কামাত এলাকায় এক বৃদ্ধকে দেখতে পেলাম। নাম মনমোহন রায়। জিজ্ঞাসা করলাম, ভারতে যাবেন, নাকি বাংলাদেশে থাকবেন? তিনি খুব হতাশ চিত্তে নাগরিকত্ব হারানোর কথা শোনালেন। তিনি জোর করে তাঁর বাড়ির ভেতরে আমাকে ডেকে নিলেন। অনেক পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাঁর জমির দলিল বের করে এনে বললেন, ‘আমার বাবা ও তাঁর বাবা এখানেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ২০১১ সালের জরিপে আমাদের নাম নেই। আমরা এখন কোন দেশের তাহলে?’ মনমোহন রায়ের সঙ্গে কথা বলতেই তাঁর উঠানে আরও কয়েকজন উপস্থিত হলেন, যাঁদের নাম নেই ২০১১ সালের জরিপে। তাঁদের একজন সুদীপ রায় বলছিলেন, ‘আমরা এখন না ভারতের নাগরিক, না বাংলাদেশের নাগরিক।’ মনমোহন রায় ভারতে যেতে চেয়েছিলেন। পাশেই দাঁড়ানো কমলিনী রায়, শ্বশুরবাড়ি ভারতে। তাঁরও ইচ্ছা ভারতে যাওয়ার। ২০১১ সালের জরিপে তাঁর নাম না থাকার কারণে মনঃকষ্ট নিয়ে আছেন। তিনি এর সমাধান চান।
যাদের দেশ থেকেও নেই, তাদের দেশ দেওয়ার চেষ্টাতেই ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে, কাউকে দেশহীন করার জন্য নয়। তাই যারা দেশহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে আছে, তারা কেউই যেন দেশহীন হয়ে না পড়ে।
কয়েক বাড়ি এগিয়ে গেলে বৃদ্ধা জাহানারার সঙ্গে কথা হলো। তিনিও জানালেন, অনেকেই বাদ পড়েছেন জনগণনা থেকে। তিনি বলছিলেন, ‘জরিপে বাদ পড়া লোকজন তো ইতিম হইল। তাদের এখন কোনো দেশ নাই। তবে একটু চেষ্টা করলেই এই ইতিমের মা-বাবা পাওয়া যাইবে। দুই দেশের সরকার যেন এদের মা-বাবাক আনি দেয়।’ আরও একটু এগিয়ে গেলে মোটরবাইক আর চালানো যায় না, এতটাই বেহাল দশা সড়কের। বাড়ির ভেতরের নারীর কাছে কণ্ঠ উঁচু করে জানতে চাইলাম, জরিপে এ বাড়ির কেউ বাদ পড়েছে নাকি? শরিফা নামের একজন এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমারই তো নাম নাই।’ মেয়েকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এরও নাম নাই।’ জানতে চাইলাম আশপাশে আর কারও নাম বাদ পড়েছে নাকি। তিনি জানান, পাশের বাড়ি রফিকুলের নাম বাদ পড়েছে। রফিকুলের বাড়ি গেলাম। সেখানে গিয়ে শুনলাম তাঁর পরিবার, তাঁর ভাইয়ের পরিবারসহ অনেকেরই নাম নেই ২০১১ সালের জরিপে।
মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার সঙ্গে। তিনিও জানান, অনেকেই বাদ পড়েছেন জরিপ থেকে। তিনি আমাকে একটু পাশেই মহির নামের একজনের নাম বাদ পড়ার কথা জানালেন। মহিরের বাড়ির উঠানে গিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন বসে আছেন। তাঁদের অনেকেই বাদ পড়েছেন। মহিরের পরিবারের ১১ জনের কারও নাম নেই। জহুরুল, খালেকসহ অনেকেই বলছিলেন তাঁদের নাম না থাকার কথা। সেখানে সাইকেল চালিয়ে এসে দাঁড়ালেন আফসার আলী। কণ্ঠ থেকে গড় গড় করে ক্ষোভ ঝরে পড়ছে। তিনি দিল্লিতে চাকরি করেন। দিল্লি থেকে এসে দেখেন নাম নেই।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশের সরকারের প্রচেষ্টাই হচ্ছে ছিটমহলবাসীর সুবিধা নিশ্চিত করা। সেখানে কোনো ত্রুটি পরিলক্ষিত হলে সেটা যথাসময়ে দূর করাও ভীষণ প্রয়োজন। ২০১১ সালে যে জরিপ হয়েছে, তখন ভারতে যেতে চাওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৭৪৩ জন। এখন সেই সংখ্যা ৯৭৯ জন। ২০১১ সালের জরিপ যে সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করা হচ্ছে, তা-ও নয়। আবার সেই জরিপের পর নতুন করে জন্ম নেওয়া এবং বৈবাহিক সূত্রে অধিকারপ্রাপ্তদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাহলে যারা ২০১১ সালে বাদ পড়েছে, তারা কেন নতুন করে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে না। বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ছিটমহল বিনিময়ে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদেরও অনেকেই বাদ পড়েছেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি এবং স্থানীয়দের সহযোগিতা নিয়ে বাদ পড়া প্রকৃত ছিটমহলবাসীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।’ দািশয়ার ছড়ার স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত ২০০২-২০০৭ মেয়াদের পঞ্চায়েতপ্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে জরিপের কাজ করে বাদ পড়া বৈধ ছিটমহলবাসীকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’
কয়েক হাজার ছিটমহলবাসীর নাম বাদ পড়েছে ২০১১ সালের জরিপ থেকে। ৩১ জুলাইয়ের পর জরিপে বাদ পড়া ছিটমহলবাসীর অবৈধ অভিবাসীতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা কম নয়। অবৈধ অভিবাসীদেরও নিজস্ব একটা দেশ থাকে। কিন্তু এরা হয়ে উঠবে দেশহীন। যাদের দেশ থেকেও নেই, তাদের দেশ দেওয়ার চেষ্টাতেই ছিটমহল বিনিময় হচ্ছে, কাউকে দেশহীন করার জন্য নয়। তাই যারা দেশহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে আছে, তারা কেউই যেন দেশহীন হয়ে না পড়ে; সেটাই আমরা বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের কাছে আশা করি।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail. com

Thursday, August 13, 2015

দূর হোক সব ছিটমহলবাসীর দীর্ঘশ্বাস by তুহিন ওয়াদুদ

স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর ছিটমহলবাসীর আনন্দমিছিল
গত ৬ মে ভারতের লোকসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের পর থেকে খুব দ্রুতই চলছে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ। ৩১ জুলাই মধ্য রাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হবে। সেই লক্ষ্যে ৬ জুলাই থেকে ছিটমহলবাসী কারা কোন দেশে থাকতে চায়, তার জরিপ শুরু হয়েছে, চলবে ১৬ জুলাই পর্যন্ত। যারা ছিটমহল ছেড়ে নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যেতে চায়, উভয় রাষ্ট্র তাদের জন্য ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ট্রাভেল পাস ইস্যু করবে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ী, বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা, সাহেবগঞ্জ-বাগবন্দর চেক পয়েন্ট দিয়ে তারা যাওয়া-আসা করতে পারবে।
চলমান জরিপের আগেই কিছু কিছু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি ছিল। ছিটমহলগুলোতে জমি নিবন্ধনের ব্যবস্থা না থাকার কারণে অনেক সময় সাদা কাগজে লিখে জমি বিক্রি হয়েছে। অনেকের জমি আছে কিন্তু দলিল নেই। সরকারিভাবে এই মালিকানার মূল্য নেই। এ রকম জমির মালিক ভারতের মূল ভূখণ্ডে গেলে তাঁর জমি ব্যবস্থাপনা কী হবে, তা তাঁরা জানতে চান।
২২ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জমি বিক্রি বন্ধ। ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট সময়ে যাঁরা নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যাবেন, তাঁরা নিজ নিজ স্থানীয় ডিসি/ডিএমের অনুমতি নিয়ে ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত জমি বিক্রি করতে পারবেন। ভালো হতো, যদি নিজ জন্ম ভূখণ্ড ছেড়ে যাওয়া লোকজনের জমি ওই দেশের সরকার কিনে নিত।
যাঁরা ভারতে যাবেন কিংবা বাংলাদেশে আসবেন, তাঁরা সরকারিভাবে কী কী সুবিধা পাবেন, সেটা তাঁরা জানেন না। বর্তমানে চলতে থাকা জরিপের আগেই যদি এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যেত, তাহলে অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্যে কে কোন দেশে থাকবেন তা নির্ধারণ করতে পারতেন।
ইংরেজিতে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট ফিল্ড ক্যাম্প’ লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে চলছে জরিপের কাজ। এ রকম একটি ক্যাম্পে দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলে ৮ জুলাই ভারতের একজন অবজারভার বিধানচন্দ্র সাধুখারকে আমি কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা ভারতে গিয়ে কী পাবেন? যাঁরা জমি রেখে যাবেন, তাঁদের জমি ব্যবস্থাপনা কী হবে?  যাঁরা ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়েছেন, তাঁদের কী হবে? এই জরিপের আগে কি এসব জানানো জরুরি ছিল না?’ উত্তরে তিনি আমাকে বলেন, ‘এসব আপনার ভ্যালিড কোশ্চেন। আমি ওপরে জানাব।’
চলতি জরিপে মানুষ গণনা হচ্ছে না। ২০১১ সালে যখন ছিটমহল বিনিময় হওয়ার কথা ছিল, তখন বাংলাদেশ-ভারত উভয় সরকারের উদ্যোগে ছিটমহলে জনসংখ্যা জরিপ চালানো হয়েছিল। সেই তালিকা ধরেই চলছে বর্তমান জরিপের কাজ। সেই জরিপে অনেকেই বাদ পড়েছিলেন। তাঁরা এখন ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন। বাদ পড়াদের মধ্যে যাঁরা ভারতে যেতে চান, ২০১১ সালের জরিপে নাম না থাকলে তাঁরা ভারতে যেতে পারবেন না, আবার বাংলাদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। একই পরিবারের কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আবার কারও হয়নি। দুঃখ করে কবিচন্দ্র নামের একজন বলছিলেন, ‘আমরা ছয় ভাই। দুই ভাইয়ের নাম নাই। একজন ভারতে যাই-যাই করছিল, তার নামই নাই। আমি রংপুরে অসুস্থ হয়া ছিলাম। আমারও নাম নাই।’ কমলিনী রায় বলছিলেন, ‘ডকুমেন্ট হিসেবে জমির কাগজ আছে, তা–ও নাম নাই। এখন আমাদের কী হবে?’ যাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন না, তাঁরা জমির মালিকানা পাবেন কী করে? যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে তাঁরা আমৃত্যু ভাসমান হয়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বৈবাহিক সূত্রে যে মেয়েরা ছিটমহলের বাসিন্দা হয়েছেন এবং ২০১১ সালের পর যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা ছাড়া আর কেউ নতুন জরিপে আসছে না। যঁারা ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়েছেন, তাঁদেরও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
অনেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজের সন্ধানে গেছেন। ১১১টি ছিটমহলের অনেকেই বৈধ পাস না থাকার কারণে আসতে পারছেন না। ছিটমহলের মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের কারণে ভারতে যাওয়ার বৈধ পাস না থাকলেও তারা জীবন ধারণের তাগিদে সেখানে গেছেন। সীমান্তে তাঁদের জন্য বিশেষ পাস থাকলে তাঁরা হয়তো সবাই নাগরিকত্ব পেতেন। আর তা সম্ভব না হলে ভারতে রেখেও তাঁদের এ জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ২০১১ সালের জরিপে এঁদের অনেকের নাম আছে, অনেকের নাম নেই। যাঁরা বাংলাদেশে থাকতে চান, তাঁদের কেউ কেউ ভারত থেকে চলে এসেছেন। আবার যাঁরা ভারতে থাকতে চান, তাঁদেরও কেউ কেউ জরিপে নাম লেখানোর জন্য এসেছেন। এ রকম দুজন আলমগীর ও জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা হলো কুড়িগ্রামের দাসিয়ার ছড়ায়। তাঁরা পাঁচ ভাই দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করেন। আলমগীর বলছিলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করি। ছিটমহলে না খায়া আছনোং। একটা ছেঁড়া লুঙ্গি পরি দিল্লি গেছি। আমরা ভারতে থাকব। ছিটমহলে যে টিনের বাড়ি দেখেন, এগুলা দিল্লিতে কাজ করার টাকায় হইচে।’
যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা অনেকেই ভীতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। ৮ তারিখ পর্যন্ত কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ার ছড়ায় একজনও ভারতে যাওয়ার জন্য নাম লেখেননি। তাঁদের আশঙ্কা, অনেকেই তাঁদের ওপর আক্রমণ করবেন। ৮ জুলাই বিকেলে ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ার ছড়া ইউনিটের সভাপতি আলতাব হোসেনের উঠানে বাংলাদেশ-ভারতের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তাঁদের কাছে ভারতে যেতে আগ্রহীরা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করছিলেন। সেখানেই গজেন চন্দ্র বর্মণ অভিযোগ করেন, একজন তাঁর পা কেটে ফেলার হুমকি দিয়েছেন।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় অংশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়ে ভারতে যেতে ইচ্ছুকগণ ৯ তারিখ থেকে জরিপে নাম লেখাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। উপস্থিত সবার মধ্যে আফতাব হোসেন ভারতে যেতে ইচ্ছুক ছিটমহলবাসীর অভিযোগের বিরোধিতা করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবাইকে আশ্বস্ত করেন এবং নিশ্চয়তা দেন, তাঁদের কোনো অসুবিধা হবে না। ফুলবাড়ীর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাও কেউ কোনো হুমকি দিলে অথবা অসুবিধা সৃষ্টি করলে লিখিত অভিযোগ করার কথা বলেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আমাকে বলেন, ‘আমরা কাউকে বাধা দিতে চাই না। যাঁরা ভারতে যেতে চান তাঁদেরও আমরা সহযোগিতা করতে চাই। যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা যেন কারও প্ররোচনায় কান না দেন এবং তাঁরা যেন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রশাসনের কাছে পরামর্শ নেন।’
কৃষ্ণকান্ত বর্মণ নামের একজন বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত উভয় সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, ভারতে যাওয়া পর্যন্ত দুই সরকার যেন আমাদের নিরাপত্তা দেয়।’ এই আকুতি ভারতে যেতে চাওয়া দাসিয়ার ছড়ার প্রায় সব ছিটমহলবাসীর।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের উচিত, যাঁরা নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যেতে চান, তাঁদের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করা। ছিটমহলে যাঁরা থাকবেন এবং যাঁরা ছিটমহল ছেড়ে মূল ভূখণ্ডে যাবেন, তাঁদের সবার জীবনই হোক আনন্দপূর্ণ।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

Wednesday, August 5, 2015

৬৮ বছর পর মানচিত্রের অংশ

ছিটমহল বিনিময়ের আনন্দে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের
বাঁশকাটা ছিটমহলে লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়
বাংলাদেশ এবং ভারতের মানচিত্রে দীর্ঘ ৬৮ বছর পর যাঁরা ছিলেন অস্তিত্বহীন, সেই ১৬২টি ছিটমহলের প্রায় ৫১ হাজার মানুষ এখন নিজ নিজ পছন্দের দেশের নাগরিক। যত দিন বেঁচে থাকবেন, এসব মানুষ তো বটেই, তাঁদের উত্তরাধিকারদের কাছে ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাত হবে বিশেষ এক দিন। কাঁটাতারের কোনো বেড়া ছিল না, ছিল না সীমানা পিলার। অথচ এক দেশের মানুষ হয়েও তাঁদের বসবাস করতে হয়েছে অন্য দেশের ভূখণ্ডে। দেশহীন, নাগরিকত্বহীন ‘ছিটের মানুষ’দের জীবনযাপনের কষ্ট, যাতায়াত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার কষ্ট, নিরাপত্তা ও বিচ্ছিন্নতার আজ অবসান ঘটতে চলেছে।
ছিটমহলগুলোর ইতিহাস মোগল আমলের রাজন্যবর্গের খামখেয়ালিপনা অথবা ক্ষমতার দ্বন্দ্বের নির্মম পরিণতির প্রতীক। ১৯৪৭-এ উপমহাদেশের বিভক্তির পর ব্রিটিশ আইনজীবী সেরিল র্যাডক্লিফকে সীমানা নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ওই বছরের ৮ জুলাই ভারতে এসে ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন, তার অনুসরণে ১৬ আগস্ট প্রকাশ করা হয় ভারত ও পাকিস্তানের মানচিত্র। হুটহাট এ ধরনের সীমান্ত নির্ধারণে ছিটমহলের মানুষগুলোর ভাগ্য ঝুলে থাকে। তাঁরা রয়ে যান মানচিত্রের বাইরের মানুষ হিসেবে।
সীমান্তের এই জটিলতা অবসানের জন্য ১৯৫৮ সালে সই হয় নেহরু-নুন চুক্তি। ওই চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর উত্তর দিকের অর্ধেক অংশ ভারত এবং দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর সংলগ্ন এলাকা পাবে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারতের অসহযোগিতায় তা মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে বেরুবাড়ীর দক্ষিণ দিকের অর্ধেক অংশ ও এর ছিটমহলের সুরাহা হয়নি।
১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি সই হয় বিষয়টি সুরাহার জন্য। বাংলাদেশ চুক্তিটি অনুসমর্থন করলেও ভারত তা না করায় চুক্তিটি বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর দুই দেশ ছিটমহলের আলাদাভাবে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে। কিন্তু দুই পক্ষের তালিকায় দেখা দেয় গরমিল। পরে ১৯৯৭ সালের ৯ এপ্রিল চূড়ান্ত হয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ও ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে। কিন্তু ওই চুক্তিও আলোর মুখ দেখেনি।
চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং স্থলসীমান্ত চুক্তির প্রটোকলে সই করেন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ভারতের সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক জোট সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাসে ব্যর্থ হয়। এবার নরেন্দ্র মোদির বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত মে মাসে সর্বসম্মতভাবে ভারতের লোকসভা ও রাজ্যসভায় ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল পাস হয়। অবসান ঘটে দীর্ঘ ৪১ বছরের অপেক্ষার।
এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৫৮ সালে সই হওয়া নেহরু-নুন চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময়ের উল্লেখ থাকলেও এ ব্যাপারে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সে দেশের সংবিধানের ১৪৩ ধারা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চান। তখন আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে হবে। পরে ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনী আর জনগণনার অজুহাতে বিলম্বিত হয়েছে ছিটমহল বিনিময়।
ছিটমহল বিনিময়ের পাশাপাশি ’৭৪-এর সীমান্ত চুক্তিতে দুই দেশের মধ্যে অপদখলীয় জমি বিনিময় ও সাড়ে ছয় কিলোমিটার সীমানা চিহ্নিত করার কথা রয়েছে। আর ২০১১ সালে সই হওয়া প্রটোকল অনুযায়ী ছিটমহল বিনিময়ের পাশাপাশি অপদখলীয় জমি ও সীমানা চিহ্নিত করার কাজ এগিয়ে চলেছে। ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে এ বিষয় দুটির চূড়ান্ত সমাধান হবে। অর্থাৎ অপদখলীয় জমি বিনিময় ও অচিহ্নিত সীমানা চিহ্নিত করে স্থলসীমান্ত চূড়ান্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পাবে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশীর মানচিত্রের।
পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ছিটমহল বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে নতুন করে ১০ হাজার একরের বেশি ভূমি যুক্ত হবে। আবার অপদখলীয় জমি বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ২ হাজার ৭৭৭ একর জমি ভারতকে এবং ভারত ২ হাজার ২৬৭ একর জমি বাংলাদেশকে ফিরিয়ে দেবে। এ ক্ষেত্রে ভারত অতিরিক্ত ৫১০ একর জমি পাবে।
চূড়ান্তভাবে কোন দেশের কত ভূমি নতুন করে যুক্ত হলো, সে ব্যাপারে দুই দেশ প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানাবে।
গত শুক্রবার বাংলাদেশে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের (আয়তন ১৭ হাজার ১৫৮ একর) বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সঙ্গে এবং ভারতে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (আয়তন ৭ হাজার ১১০ একর) ভারতের ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, ১৬২ ছিটমহলে ৫১ হাজার ৫৪৯ অধিবাসীকে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ হাজার ৩৩৪ জন ভারতীয় বাংলাদেশে অবস্থিত ছিটমহলগুলোতে বাস করে এবং ১৪ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশি ভারতের ছিটমহলগুলোতে বাস করে।
এসব লোকজনের মধ্যে বাংলাদেশে থাকা ভারতের ছিটমহলের ৯৭৯ জন ভারতে ফিরে যেতে চান। তবে তাঁদের রাতারাতি ভিটে ছাড়তে হবে না। সীমান্ত চুক্তি প্রটোকল অনুযায়ী যাঁরা এক দেশ থেকে অন্য দেশে ফিরতে চান, এ বছরের নভেম্বরের মধ্যে তাঁদের চলে যেতে হবে। ওই সময়ের আগ পর্যন্ত তাঁদের স্থানীয় প্রশাসন থেকে নিরাপত্তা ও সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের ছিটমহলের অন্য লোকজন যে যেখানে আছেন, সেখানেই থেকে যাবেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের যেসব ছিটমহল এখন বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে যুক্ত হচ্ছে, সেগুলোর বেশির ভাগের অবস্থান দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এসব ছিটমহলের ৫৯টি লালমনিরহাটে, পঞ্চগড়ে ৩৬টি, কুড়িগ্রামে ১২টি ও নীলফামারীতে চারটি। অন্যদিকে ভারতে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলগুলোর ৪৭টি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে এবং চারটি জলপাইগুড়ি জেলায়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, দুই দেশের জন্য ৩১ জুলাই একটি ঐতিহাসিক দিন। এখন থেকে সীমান্তের দুই পাড়ের ওই লোকজন যথাক্রমে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকত্ব ভোগ করবেন। দুই দেশের সরকার এসব লোকজনের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ অন্যান্য মৌলিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে।
ছিটমহলবাসীর নাগরিক সুবিধা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ছিটমহল বিনিময়ের পর সেখানকার লোকজনকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। তাঁদের কথা বিবেচনায় রেখে সরকার এবার বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রেখেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সেখান থেকে তাঁদের জন্য অর্থ খরচ করা হবে। এ কাজটি করার জন্য জেলা প্রশাসকদের বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই ‘নতুন নাগরিক’দের দোরগোড়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা কীভাবে এবং কবে নাগাদ পৌঁছানো হবে, সেই পরিকল্পনার বিষয়ে জেলা প্রশাসন সূত্রে বিস্তারিত জানা যায়নি।
ছিটমহল বিনিময়ের পর কোনো পরিবারের বাংলাদেশে থেকে যাওয়া সদস্য যদি ভারতে বা ভারতে থেকে যাওয়া সদস্য বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজনে তাঁর স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে চান, সে ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ পাস দেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে শহীদুল হক আরও বলেন, এমন কোনো পাস দেওয়া হবে না। স্বাভাবিক নিয়মে ভিসা নিয়ে দেখা করতে হবে।

বিলুপ্ত ছিটের নতুন উপাখ্যান-১, রাত জেগে পাহারা

সিদ্দিক আলম দয়াল/মিজানুর রহমান মিন্টু/রবিউল ইসলাম বেলাল, কুড়িগ্রাম, মিলন পাটোয়ারী, লালমনিরহাট থেকে
দীর্ঘ ৬৮ বছর পর মুক্ত হাওয়ায় নিঃশ্বাস নিয়েছে ছিটমহলবাসী। কিন্তু মুক্ত হাওয়ায়ও একপ্রকার আতঙ্ক বিরাজ করছে তাদের মধ্যে। এ আতঙ্ক জমি নিয়ে। দলিলহীন জমি কিংবা ভুয়া দলিল আর হলফনামার মারপ্যাঁচে আটকা তারা। অনেকে নিজ জমি রক্ষায় রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। এ নিয়ে রোববার দাসিয়ারছড়ায় সংঘর্ষও হয়েছে। এ খবর বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা ছিটমহলজুড়ে। এ অবস্থায় আতঙ্কমুক্ত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও আওয়ামী লীগ নেতারা গতকাল দাসিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারে মতবিনিময় করেছেন।
দাসিয়ার ছড়া কালিহাটের বাসিন্দা আবদুল হাকিম ও হাফিজুর রহমান জানান, ২০০৫ সাল থেকে ছিটমহলের জমি দলিল করা বন্ধ করে দেয় ভারত সরকার। এর আগে ভারতের দিনহাটা রেজিস্ট্রি অফিসে জমি কেনা-বেচার দলিল সম্পাদন করা হতো। কিন্তু সেখানে দলিল রেজিস্ট্র্রি বন্ধ করার পর ছিটমহলে নিজের আইন চালু হয়। দালালদের মাধ্যমে ভারত থেকে পাচার হয়ে আসে ভারতীয় স্ট্যাম্প। আর এই দিয়েই সম্পাদন হতো দলিল। কখনও আবার সাদা কাগজে লেখা হতো দলিল। স্বাধীনতার পতাকা উড়লেও এখানকার মানুষ ভয়ে আছে তাদের জমি নিয়ে। ইতিমধ্যে জমি নিয়ে শুরু হয়েছে দলাদলি। হানাহানি। দাসিয়ার ছড়া কালিরহাট গ্রামের সিরাজুল ইসলাম ২০ বছর আগে বালাটারী গ্রামের মতিয়ার রহমানের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকায় ১৫ শতক জমি কিনে নেন । কিন্তু জমি কেনা-বেচা হলেও ছিল না কোন দাগ নম্বর। তাছাড়া অন্যান্য ভাগিদারকে বাদ দিয়ে দলিল করে দেয়া হয়। আর এই জমির দখল নিয়েই রোববার সংঘর্ষ হয়। সেখানে পুলিশ অস্থায়ী ক্যাম্প বসানো হয়। তারপরও  থমথমে অবস্থা দাসিয়ারছড়ায়।
৭০ বিঘা জমি চেয়ারম্যান আজগর আলীর। তার সন্তানদের মধ্যে জমি নিয়ে শুরু হয়েছে কলহ।
কারণ কাগজপত্র ছাড়া জমির কোন দাম নাই। দাসিয়ারছড়ার মতিয়ার খন্দকারের কাছ থেকে মুখের কথায় আবদুল লতিফ ২০১২ সালে ১৩ হাজার টাকায় জমি কিনে নেন। কিন্তু কোন কাগজ নেই। মতিয়ার খন্দকার লতিফ মিয়াকে জানিয়ে দিয়েছে অনেক দিনতো জমির ফসল ভোগ করেছেন এখন ছেড়ে দেন। লতিফ মিয়া বলেন, আমার কি হবে। আমার তো দলিল নাই। তবে জান দেবো তবু জমি ছাড়বো না । গোটা বালাটারী গ্রাম জুড়ে মানুষের আতঙ্ক । কারণ এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষের জমির কোন দলিল নাই। দখল করে খাচ্ছেন যুগযুগ ধরে। ৮০ বিঘা জমি নিয়ে বিপাকে আছেন আলহাজ হাসমত আলী ও তার বড় ছেলে আজিজুল হক মণ্ডল । কারণ তাদের বেশির ভাগ জমির কোন দলিল নাই। ভাগ-বাটোয়ারা হয়নি। তবে বটলা গ্রামের একাব্বর হোসেন বলেন, অনেক দলিল ডাকাতি হয়েছে। এতোদিন জমি নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব হয়নি। সরকারিভাবে শিগগিরই জমি নিয়ে ফয়সালা না করলে বড় ধরনের গোলমাল হবে। যা সহিংসতার পর্যায়ে চলে যেতে পারে। এলাকাবাসী জানান, সরকারিভাবে বলা হয়েছে আপাতত যে যেখানে দখল করে আছেন থাকবেন। তারপর সিন্ধান্ত হবে। কুড়িগ্রামের সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদ আলম মানবজমিনকে বলেন, আতঙ্ক কাটাতে এবং সংঘর্ষ এড়াতে সেখানে পুলিশি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
লালমনিরহাট জেলায় ৫৯টি ছিটমহলের মধ্যে ১২টি ছিটমহল রয়েছে শুধু ভুমি বাকিটা জনবসতি। ৫৯টি ছিটমহলে ১৭ হাজার ৮শত ৩ একর জমি। লোক সংখ্যা ৯ হাজার ৭শ‘ ৫৩ জন। তার মধ্যে ভারতে যাচ্ছেন ১৯৫ জন। জেলায় ৫৯টি ছিটমহালের মধ্যে পাটগ্রাম উপজেলায় রয়েছে ৫৫টি। এ উপজেলার বাঁশকাটা ১১৯ নং ছিটের বাসিন্দা বলরাম চন্দ্র জানান, তার জমি ছিটমহলে ১৫৫ একর জমি দখল করেছে এক প্রভাবশালী। ছিটমহল মুক্ত হয়েছে। বলরাম এখন সরকারের কাছে চায় তার জমি ফেরত। বাঁশকাটার ছিটমহলের জমি দখল করে রেখেছে অনেকে। জমি উদ্ধারের অচিরে আন্দোলন যাওয়ার কথা জানিয়েছেন ছিটমহলবাসী। জমি কিভাবে ছিটমহলে জরিপ হবে এ নিয়ে চলছে আলোচনার ঝড়। ছিটমহলবাসীরা জানান, জমি জরিপ দখল সূত্রে না কাগজ সূত্রে হবে তা তারা জানে না। ৬৮ বছর ধরে ছিটমহলের জমি দলিলে বিক্রি হতো না। বিক্রি বা বন্দক হতো সাদা কাগজে বা বাংলাদেশী ৫০ থেকে ১শ’ টাকার স্ট্যাম্পে। জমিগুলোর নেই দলিল। অনেকের দলিল রয়েছে ভারতের কুচবিহার ও মেকলীগঞ্জ ভূমি অফিসে। জমির দলিল না পাওয়া গেলে জমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে বড় ধরনের সমস্যা সব বলে ধারণা করছে ছিটমহলবাসীও। তবে ছিটমহলের জমি ইতিপূর্বে অনেকে ক্রয় করে তারা পড়েছে সমস্যায়। অনেকে জমি ক্রয় করেছে সাদা কাগজে সই নিয়ে। তাদের নেই দলিল। যার কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছে সে ব্যক্তি মারা যাওয়ায় তার অংশীদাররা মানছে না ওই কাগজ। সাদা কাগজে সই দেয়ার সময় যারা সাক্ষী ছিল তারাও গেছে মারা এখন বিপাকে পড়েছে জমি ক্রেতা। এ সমস্য ৫৯টি ছিটমহলের সবখানেই। হাতীবান্ধা,পাটগ্রাম ও লালমনিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকতারা জানিয়েছেন সেই দিক গুলো বিবেচনা করেই জমি বণ্টন করা হবে। এ নিয়ে চিন্তার কোন কারণ নেই। বাঘডা, বাঁশকাটা ১১৯, বাঁশকাটা ১১২, ভোটবাড়ী, উত্তরগোতামারী, বাঁশপচাই, ভিতরকুঠি, তেঁতুলতলা, ইসলামপুর, খড়খড়ি, পানিশালা, বড়খাদীরসহ বিভিন্ন ছিটমহলে নিজ ভূখণ্ড জমি টুকু আঁকড়ে ধরে রয়েছে। রাত জেগে জমি পাহারা দিচ্ছে ছিটমহলবাসী। যাতে করে কেউ জমি দখল করে আকস্মিক বাড়ি তৈরি করতে না পারে। কখনও স্ত্রী ঘুমালে স্বামী পাহারা দেয় আবার কখনও স্বামী ঘুমালে স্ত্রী পাহারা দিচ্ছে তাদের শেষ সম্বলটুকু। বাঁশকাটা ছিটমহলের রঞ্জিত জানান, ছিটের জমি বলে দখল করে নিবে হাট-বাজারে সবাই আলোচনা করছে। লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ভূমি জরিপ কাজ দ্রুত শুরু  হবে। এজন্য কাজ-কর্ম করছে ভূমি অফিসগুলো। তবে আলোচনা চলছে বর্তমানে যে যে জমি দখলে রেখেছে সে সূত্র বা কারও জমির ভারতীয় দলিল ও জমি ক্রয়-বিক্রয় স্ট্যাম্প বা কাগজপত্র থাকলে তা যাচাই-বাছাই করে ভূমির মালিকানা দেয়া হবে।
প্রশাসনের দফায় দফায় বৈঠক
কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার সদ্য বিলুপ্ত দাশিয়ারছড়া ছিটমহলে সোমবার ছিল পুলিশ ও বিজিবির কড়া প্রহরা। এছাড়া, পুলিশের বিশেষ মোবাইল টিম সার্বক্ষণিক গোটা ছিটমহলে টহল দিচ্ছে। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দাশিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে দফায় দফায় শান্তি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। গত   রোববার জমি নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় ছিটমহলে ছিল থমথমে অবস্থা। পরিস্থিতির উন্নয়নে এসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মাহমুদ, সহকারী পুলিশ সুপার মাসুদ আলম, ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ বদরুদ্দোজা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী সরকার, বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খান, দাশিয়ারছড়ার সভাপতি আলতাফ হোসেন, দাশিয়ারছড়া  ছিটমহলের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তারা এ বৈঠকে দাশিয়ারছড়ার সকল অধিবাসীকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শান্ত থাকার পরামর্শ দেন। এছাড়া যে কোন সমস্যার উদ্ভব হলে তা প্রশাসনকে আগে জানানোর পরামর্শ দেয়া হয়।
বিলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি দাশিয়ারছড়ার সভাপতি আলতাফ হোসেন বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনাটি আমরা ২/৪ দিনের মধ্যে সমাধান করতে পারবো বলে আশা করছি। সোমবারে সমঝোতা বৈঠক থাকলেও সিরাজ মিয়া অসুস্থ থাকায় উপস্থিত হতে পারেননি। তবে উভয়পক্ষ মীমাংসায় সম্মতি জ্ঞাপন করেছে।
ফুলবাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ বদরুদ্দোজা জানান, আমরা বিবদমান দু’টি গ্রুপের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যেন আবার নতুন করে সহিংসতায় না জড়ায়। তারা নিজেরা নিজেদের সমস্যার সমাধান না করলে প্রশাসন বাধ্য হয়ে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তবে রোববারের ঘটনায় বলার পরও এখন পর্যন্ত  কোন পক্ষই অভিযোগ দাখিল করেনি। তারপরও পুলিশ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানোর জন্য দাশিয়ারছড়ায় সার্বক্ষণিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
 উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী সরকার বলেন, বর্তমান সরকারের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। যখন ছিটমহলবাসী আনন্দে আত্মহারা ঠিক সেই মুহূর্তে একটি অপশক্তির ইন্ধনে গোলযোগ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে। আমরা সজাগ আছি কোন ভাবে বিশৃঙ্খলা করতে দেয়া হবে না।
ফুলবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন মাহমুদ জানান, আমি নিজে সারাদিন ছিটমহলে উপস্থিত থেকে সার্বিক পরিস্থিতি মনিটরিং করেছি। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি হয়নি। রোববারের ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এখন সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে। তারপরও আমরা প্রশাসন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠক করে সাধারণ মানুষকে বোঝানো হচ্ছে। যেন কেউ আইন হাতে তুলে না নেয়।

Monday, August 3, 2015

পাটগ্রামের ছিটমহল সেজেছে সাধ্যমতো: কাজ বন্ধ রেখে উৎসব by আনোয়ার হোসেন ও এ বি সফিউল আলম

সাধ্যমতো সেজেছে লালমনিরহাটের পাটগ্রামের কিছু প্রত্যন্ত গ্রাম, যা ছিটমহল নামে এত দিন পরিচিত ছিল। গতকাল মধ্যরাত থেকে এগুলো বাংলাদেশের ভূখণ্ড, অধিকাংশ বাসিন্দা বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে গেছেন। বহুল প্রত্যাশিত এই মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করার জন্য দিনভর চলে নানা উৎসব-আয়োজন।
গত শুক্রবার সকালে পাটগ্রামের ২০ নম্বর লোথামারি ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায়, একটি বাড়ির উঠোনে শতেক মানুষ বসে পরিকল্পনা করছেন আর কী কী করলে উৎসব পূর্ণতা পাবে। এর পাশেই কামারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলছিল মঞ্চ তৈরির কাজ। স্কুলের প্রবেশপথে তৈরি করা হয়েছে গেট। রাতে সেখানে জেনারেটরের সাহায্যে আলোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দুপুরের দিকে পাটগ্রামের শ্রীরামপুর ও জোংড়া ইউনিয়নের পথে পথে যেসব উৎসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে, সেগুলোতে অংশ নেওয়ার জন্য মাইকে আহ্বান করা হয়।
বিকেল চারটার দিকে শ্রীরামপুরের ২০ নম্বর লোথামারিতে একদল শিশু-কিশোর আনন্দ মিছিল করছিল। তাদের হাতে বাংলাদেশের পতাকা। অনেক বয়স্ক মানুষকেও বেশ উৎসাহ নিয়ে এতে অংশ নিতে দেখা যায়। এঁদেরই একজন ২২ নম্বর লোথামারি ছিটমহলের ইমাম হাফেজ রেজাউল করিম। বয়স ৬০। অনুভূতি জানতে চাইলে শিশুর মতো হেসে ওঠেন। বলতে থাকেন, ‘জীবনে কোনো দিন জাতীয় পতাকা হাতে নেওয়ার সুযোগ হয়নি। এই অধিকারও ছিল না। আজ যে আনন্দ করছি, এর বহুগুণ আনন্দ হচ্ছে মনের ভেতরে। যা কেউ দেখতে পাচ্ছে না।’
পাটগ্রামে ছিটমহল আছে ৫৫টি। এগুলোতে বাসিন্দা আছেন প্রায় ৮ হাজার ৪৩৪ জন। এর মধ্যে ১৩৩ জন ভারতে চলে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন। বাকিরা সবাই এখন বাংলাদেশের নাগরিক।
কথা বলে জানা গেছে, এই বাসিন্দাদের বেশির ভাগই কৃষক। কেউ নিজের জমি, আবার কেউ কেউ অন্যের জমি বর্গা চাষ করেন। দিনমজুরের সংখ্যাও কম নয়। হাতেগোনা কিছু লোক ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা চাকরি করেন। ৬৮ বছরের এক রকম দেশহীন জীবনের অবসান উপলক্ষে বেশির ভাগ বাসিন্দাই দুদিন ধরে নিজের কাজে যোগ দেননি, নানা রকম উৎসব করেছেন।
অনেক বাড়ির উঠোনে দেখা যায় টং ঘরের মতো বসার স্থান। চারদিকে খোলা, ওপরে ছনের ছাদ। বসার জন্য রয়েছে মাচা। গাছঘেরা এসব স্থানে একসঙ্গে ১০-১৫ জনকে বসে উৎসবের আয়োজন নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। জমিজমার মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয় কি না, এমন শঙ্কাও দেখা গেল অনেকের মাঝে।
১৫৩ নম্বর রতনপুর ছিটমহলের বাসিন্দা করমত উল্লাহর বয়স প্রায় ৭০ বছর। তাঁর সঙ্গে কথা হয় এমনই একটি টং ঘরে। তাঁর বসতিটা ভারত সীমান্তের¯খুব কাছেই। করমত বলেন, সামান্য কৃষিকাজ করে দিন চলে। এরই মধ্যে গত ২০ বছরে তিনবার তাঁর বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। একবার তো পরনের বস্ত্রও ছিল না। থানা-পুলিশ করারও অধিকার নেই। সেই সময়টা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এ কথা বলতে বলতেই দুই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে করমতের। তিনি জানান, কয়েক দিন ধরেই নিজের কাজ ফেলে ছিটমহলবাসীদের নিয়ে নানা আয়োজনের চেষ্টা করছেন।
আনন্দের মধ্যেও কিছুটা অসংগতি আছে। উৎসব, অনুষ্ঠান ও আয়োজনে ছিটমহলের বাসিন্দাদের মধ্যে বেশ কিছু দল-উপদল সৃষ্টি হতে দেখা যায়। তবে সাধারণ বাসিন্দারা এসব বিভেদের মধ্যে জড়াতে আগ্রহী নন।
২০ নম্বর লোথামারি ছিটমহলের বাসিন্দা এবং অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নুরুল আমিন বলেন, ছিটমহলের বাসিন্দা হয়েও পরিচয় গোপন করে অনেকেই বাংলাদেশের নানা সুবিধা নিয়েছেন। তবে এটা ছিল খুবই অসম্মানের। নিজের মধ্যেই খচখচানি লাগত। নতুন প্রজন্মকে সেটা করতে হবে না। আর সরকার এখন স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও ভূমির মালিকানার বিষয়টি ঠিকঠাকভাবে সম্পন্ন করতে পারলেই আনন্দ পূর্ণতা পাবে।
বাংলাদেশের পতাকা। এ পতাকা এখন তাঁদেরও। ৬৮ বছরের ‘ছিটবাসীর’ গ্লানি শেষে আজ থেকে তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক। সেই আনন্দে পতাকা নিয়ে গতকাল বিকেলে গ্রামের পথে মিছিল বের করেন লালমনিরহাটের পাটগ্রামের ২২ নম্বর লতামারী ছিটমহলের শিশু-কিশোর-তরুণ আর বয়সীরা l ছবি: মঈনুল ইসলাম

Sunday, August 2, 2015

তবু দেশহারা দুই পরিবার -ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবর

কোচবিহারের বাংলাদেশি ছিটমহলগুলোর ১৪ হাজারের বেশি বাসিন্দা যখন ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য অপেক্ষা করছেন, সেখানকার আব্দুল হামিদ এবং তাঁর আত্মীয় সোবহান আলি শেখের দুই পরিবারের ভবিষ্যৎ তখনো অনিশ্চিত। বাংলাদেশে তাঁরা ‘বিশ্বাসঘাতক’, আর ভারতে ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এই দুটি পরিবারকে নিয়ে গতকাল শনিবার ভারতের দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একটি প্রতিবেদন ছেপেছে।
দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ছিটমহলবাসীদের নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া গতকাল শুরু হয়। ভারতীয় পত্রিকাটি জানায়, ৬২ বছর বয়সী হামিদ ও ৮২ বছর বয়সী সোবহান ১৯ বছর আগে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যান। ‘বিএসএফের ১২ জওয়ানকে বাঁচাতে’ তাঁরা ভারতে গিয়েছিলেন বলে দাবি করেন। ঘটনাটির স্মৃতিচারণা করে হামিদ বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ১২ জওয়ান ‘ভুল করে’ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি) সেনারা ওই ১২ জনকে দেখে ফেলেন। তখন হামিদ ও তাঁর আত্মীয়রা ওই বিএসএফ সদস্যদের পথ দেখিয়ে ভারতে পৌঁছে দেন।
হামিদ বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারী বিএসএফ সদস্যদের বাঁচানোর কারণে আমাদের “বিশ্বাসঘাতক” মনে করা হয়েছিল। এ কাজের “শাস্তি” হিসেবে দেশে ফিরে যাওয়ার আগেই সেউতি কুরশা এলাকায় ১৪২ নম্বর ছিটমহলে আমাদের বাড়িঘর ধ্বংস করা হয়। তারপর থেকে আমরা এখানকার শিবগঞ্জ ব্লকেই বাস করছি। এই জমির মালিক একজন হিন্দু এবং তিনি আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন। তিনি যদি আগামীকাল আমাদের চলে যেতে বলেন, আমাদের কোথাও যাওয়ার নেই।’
হামিদ আরও বলেন, তিনি দুই ভাই, তিন বোন, মামা সোবহান আলি শেখ ও তাঁর পরিবারকে নিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুটি পরিবার বড় হয়ে সদস্যসংখ্যা ৭৭ হয়েছে। তিনি প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে লিখে জানিয়েছেন, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। শুধু প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন, আর কিছু হয়নি। তাঁর সন্তানেরা বড় হয়ে বিয়ে করেছে। নাতি-নাতনির জন্ম হয়েছে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে তাঁদের কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এমনকি ছিটমহল বিনিময়ের সময় তাঁরা বাংলাদেশ বা ভারত—কোনো দেশের নাগরিক বলেই গণ্য হননি। স্থানীয় ছিটমহলবাসী সবাই ভারতীয় নাগরিকত্ব পাচ্ছে। তিনি মনে করেন, তাঁকে এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকেও ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া উচিত।
হামিদ দাবি করেন, তিনি যেহেতু বিএসএফ সদস্যদের বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করেছিলেন, ওই কাজের জন্যই তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত। ওই ঘটনার প্রমাণ হিসেবে তিনি স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের সনদও দেখাতে পারেন। কোচবিহারের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি উলগানাথন বলেন, হামিদের সমস্যাটির সমাধান কেবল কেন্দ্রীয় সরকারই করতে পারে। সরকার স্পষ্ট বলে দিয়েছে যে ২০১১ সালের আদমশুমারিতে যাদের নাম ওঠেনি, তারা কোনো সুবিধা পাবে না।

‘দেখেছেন না বাহে, হামরা বাংলাদেশি হইছি’ লাঠিখেলায় আনন্দ আয়োজন by আনোয়ার হোসেন ও এ বি সফিউল আলম

৬০ বছরের বৃদ্ধ বাহেদ আলীর হাতে একটি বাঁশের লাঠি। লাঠিটি দিয়ে তিনি আঘাত করার চেষ্টা করছেন ৩৫ বছর বয়সী নুরুজ্জামানকে। নানা কসরতে সেই আঘাতের চেষ্টা হাতের লাঠি দিয়ে ঠেকিয়ে পাল্টা আঘাতের চেষ্টা করেন নুরুজ্জামান। তা প্রতিহত করেন বাহেদ আলী।
বাহেদ আলী ও নুরুজ্জামান সম্পর্কে বাবা-ছেলে। তাঁদের এই ‘লড়াই’ পারিবারিক কোনো কলহ নয়। গ্রাম-বাংলার চিরায়ত উৎসব লাঠিখেলায় মেতেছিলেন তাঁরা। গতকাল শুক্রবার বিকেলে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার ১১৯ নম্বর বাঁশকাটা ছিটমহলে গিয়ে এই লাঠিখেলা দেখা গেল। স্থানীয় লোকজন বললেন, ৬৮ বছর পর বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার মুহূর্ত উদ্যাপনের অংশ হিসেবে এই লাঠিখেলার আয়োজন করা হয়।
বাবা-ছেলের লাঠিখেলা বেশ উপভোগ করেন বাঁশকাটা এলাকার কয়েকটি ছিটমহলের নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ সব বয়সের মানুষ। এঁদের মধ্যে ছিলেন বাহেদের স্ত্রী সুরাতন্নেছা, নুরুজ্জামানের স্ত্রী সামিনা খাতুনসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও। তাঁরা হাততালি দিয়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন দুজনকেই। দর্শকদের বেশির ভাগই ছিলেন নানা বয়সের নারী।
৪২ বছর বয়সী নুরনাহার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘কী কমো বাহে। দেখেছেন না বাহে, হামরা বাংলাদেশি হইছি। এ জন্য আনন্দ-উল্লাস করছি বাহে।’
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রাক্কালে এমন নানা উৎসবের আয়োজন করেছেন বাঁশকাটার ছিটমহলের বাসিন্দারা। গতকাল রাত ১২টার সময় ৬৮টি মোমবাতি জ্বালিয়ে উৎসব করেন তাঁরা। ওই এলাকায় ২১টি ছিটমহল রয়েছে। এর মধ্যে ১১টিতে কোনো বাসিন্দা নেই। বাকি ১০টি ছিটমহলের বাসিন্দা ২ হাজার ৮২৪ জন। এর মধ্যে বসটারি গ্রামের ৯৭ জন ভারতে চলে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অবশ্য তেমন কোনো উৎসব দেখা যায়নি।
ছিটমহল বিনিময় কমিটির নেতা ও বাঁশকাটার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, আজ শনিবার সকাল সাতটায় বাঁশকাটাতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হবে। এ সময় উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ ছিটমহলবাসীরা উপস্থিত থাকবেন।
ছিটমহলের নারীদের জন্য বিকেলে রয়েছে বালিশ খেলা। বিকেলে পুরুষেরা খেলবেন বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হা-ডু-ডু।
ছিটমহলের বাসিন্দা ও পল্লিচিকিৎসক রেজাউল করিম বলেন, ছিটমহলের বাসিন্দাদের জীবনে খেলাধুলা বা উৎসবের স্থান ছিল না। তাঁদের বিনোদন বলতে ছিল খেতে কাজ করা। এবার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়াটা উদ্যাপনের জন্য সবাই নানা আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। ছিটমহলের সব বাসিন্দার জন্য আজকের দিনটি ঈদের মতো।
ছিটমহলে মাঠ নেই। আনন্দ আয়োজনের এসব অনুষ্ঠান তাই গ্রামের বড় একটি বাড়ির উঠানেই সম্পন্ন হচ্ছে। বাড়ির বাসিন্দারাও সানন্দে এই আয়োজনে অংশ হতে পেরে গর্বিত বলে জানিয়েছেন।
লাঠিখেলা দেখতে আসা ছিটমহলের বাসিন্দা ৫০ বছরের রফিকুল ইসলামের চোখে-মুখেও ফুটে উঠেছিল উচ্ছ্বাস। তিনি বলেন, ‘হামরা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হমো বাহে। এই জন্যে আনন্দের শেষ নাই। বাংলার ঐতিহ্য খেলার মধ্য দিয়ে আরও একবার স্বাধীন হইনো।’
স্থানীয় লোকজন বললেন, লাঠিখেলায় দুজন খেলোয়াড় একসঙ্গে অংশ নেন। তাঁদের পালা শেষ হলে আসেন আরেক দল। এভাবে গতকাল বিকেল থেকে সাত-আটটি দল লাঠিখেলায় অংশ নেয়। এরা সবাই ছিটমহলের বাসিন্দা।

জিহাদ হুসেইন ওবামার জন্ম পরিচয় রক্ষার লড়াই

বারাক ওবামার সঙ্গে জিহাদ হুসেইন ওবামার কোনো সম্পর্ক নেই। জিহাদ কোনো কেউ কেটা নয়, সে একটা পাঁচ বছরের ছোট ছেলে। শুক্রবার মাঝ রাত অবধি সে ছিল একটা বাংলাদেশী ছিটমহল মশালডাঙ্গার বাসিন্দা আর চব্বিশ ঘন্টাও হয় নি সে ভারতের নাগরিক হওয়ার অধিকার পেয়েছে। কিন্তু এই নাগরিকত্বের অধিকার আদায়ের লড়াইতে জিহাদের বাবা-মা-র একটা বড় অবদান রয়েছে।     মায়ের সঙ্গে জিহাদ হোসেন ওবামা ছিটমহলের বেশিরভাগ মানুষকেই যেখানে চিকিৎসা বা শিক্ষা পাওয়ার জন্য বাবা-মা-স্ত্রী বা স্বামীর নাম পাল্টে ফেলতে হতো এত বছর, সেখানে জিহাদ-ই প্রথম ছিটমহলের সন্তান, যে নিজের বাবা-মায়ের আসল পরিচয়েই জন্মিয়েছে ভারতের হাসপাতালে। তার এই নামকরণের পিছনে একটা কাহিনী আছে, লড়াইয়ের কাহিনী – ভারতের সরকারি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এক ছিটমহলবাসী দম্পতির অসম লড়াইয়ের ঘটনা। এই লড়াইটা শুরু হয়েছিল যখন জিহাদের মা আসমা বিবি-র প্রসব বেদনা উঠেছিল। আসমা বিবি আর তার স্বামী শাহজাহান শেখ চেয়েছিলেন তাদের সন্তান আসল বাবা-মায়ের পরিচয় নিয়েই জন্মাক, কিন্তু বাধ সেধেছিল ভারতের দিনহাটা হাসপাতাল। তবে এক সময়ে ছিটমহলবাসীদের সম্মিলিত চাপের কাছে মাথা নোয়াতে হয় ওই হাসপাতালকে। নিজের নাম আর ছিটমহলের ঠিকানা দিয়েই আসমা ভর্তি হন আর জন্ম হয় জিহাদের। তবে শুক্রবার মধ্যরাতের পর থেকে আর কোনো জিহাদকে জন্মের পর নকল বাবা-মায়ের পরিচয় দিয়ে আইনের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে না বা স্কুল কলেজ-হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার জন্য স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয় গোপন করতে হবে না – তারা এখন সকলেই ভারতের নতুন নাগরিক – আর ছিটমহলের বাসিন্দা নয়।– বিবিসি

স্বামীদের ছেড়ে যাচ্ছেন দুই বোন দয়া ও ছবি by হারুন আল রশীদ ও শহীদুল ইসলাম

বাস্তবতা মাঝে মাঝে বড় নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। যখন আসন্ন মুক্তির আনন্দে ভাসছে পঞ্চগড়ের কোটভাজনী ছিটমহলের বাসিন্দারা, তখন নাটকীয়তায় ভরা বাস্তবতা কাঁদাচ্ছে দুই বোন দয়া রানী ও ছবি রানীকে। দুজনই তাঁদের স্বামীদের বাংলাদেশে রেখে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার কোটভাজনী ছিটমহলের নতুন বাজারে যখন বাংলাদেশ ও ভারতের সরকারি কর্মকর্তারা ভারতে যেতে আগ্রহীদের শুনানি গ্রহণ করছিলেন, তখনো দয়া ও ছবি ছিলেন সিদ্ধান্তহীন। কর্তৃপক্ষকে তাঁদের সিদ্ধান্ত জানানোর সময় গতকাল শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় পার হয়ে গেছে।
এর আগেই দুপুরে দয়া ও ছবির ভাই কমলেশ্বর কুমার প্রথম আলোকে জানান, তাঁর দুই বোন দয়া ও ছবি ভারতে চলে যাবেন। ছবির পাঁচ বছর বয়সী ছেলে দিগন্ত কুমার রায় ও দয়ার চার বছর বয়সী ছেলে বাঁধন চন্দ্র রায় তাঁদের সঙ্গে যাবে। দয়ার স্বামী হৃদয় কুমার রায় ও ছবির স্বামী ভূপেশ কুমার রায় বাংলাদেশে থেকে যাবেন। কমলেশ্বর আরও জানান, তাঁর বাবা-মা, চার ভাই ও তাঁদের স্ত্রী-সন্তানেরাও ভারতে চলে যাচ্ছেন।
দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী, ছিটমহলে ২০১১ সালের জনগণনায় যাঁদের নাম ছিল কেবল তাঁরা ভারতে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। এ ছাড়া ২০১১ সালের পর তাঁদের পরিবারে জন্ম নেওয়া এবং বৈবাহিক সূত্রে পরিবারের সদস্য হওয়া ব্যক্তিরা ভারতে যাওয়ার অনুমতি পাবেন। কিন্তু ২০১১ সালের জনগণনার তালিকায় দয়া ও ছবির নাম থাকলেও তাঁদের স্বামীদের নাম নেই।
হৃদয় ও ভূপেশ শুনানি গ্রহণকারী পঞ্চগড়ের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ গোলাম আজম ও কোচবিহারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৌমেন দত্তকে জানান, তাঁরা ঢাকায় কাজ করেন। যে কারণে ২০১১ সালের গণনার সময় তাঁরা উপস্থিত থাকতে পারেননি। দয়া ও ছবি বলেন, তাঁরা পারিবারিকভাবে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু স্বামীদের রেখে কীভাবে যাবেন?
তাঁদের প্রশ্নের জবাবে সৌমেন দত্ত বলেন, ‘নীতিমালা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। তবে আপনাদের সমস্যার বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব। তা ছাড়া আপনারা চাইলে বাংলাদেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’
বৃহস্পতিবার বিকেলেও দয়া ও ছবি ছিলেন সিদ্ধান্তহীন। তবে গতকাল দুই বোন প্রথম আলোকে তাঁদের সিদ্ধান্তের কথা জানান। দয়া বলেন, ‘না গিয়ে কোনো উপায় নেই। কারণ আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সবাই চলে যাচ্ছেন। আমরা নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ব।’
ছবি বলেন, ‘ভাইদের সঙ্গে আমরা ভারতে থাকব। সেখানে কোনো সমস্যা হবে না। ভারতে গিয়ে সরকারকে আমার স্বামীকে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করব।’

বাংলাদেশ–ভারত ছিটমহল বিনিময়: শিকল ভাঙা উল্লাসে মুক্তির নিশ্বাস

প্রায় সাত দশক। যাঁদের বয়স ৬৮ বছরের বেশি, তাঁরা দু-দুবার দেশ স্বাধীন হতে দেখেছেন, কিন্তু কোনো নাগরিকত্বের পরিচয় পাননি। তারপর যাঁদের জন্ম, তাঁরাও বঞ্চিত ছিলেন ওই জাতীয় পরিচয় থেকে, মৌলিক সব নাগরিক অধিকার থেকে। জন্মনিবন্ধন থেকে মৃত্যুসনদ, স্কুলে ভর্তি থেকে চাকরিবাকরি, জমি কেনাবেচা থেকে বিয়ে-শাদি—সবকিছুতেই মিথ্যা আর ভুল ঠিকানা। এবার এ মিথ্যারই শিকল ভাঙলেন তাঁরা। আর শিকল ভাঙার উল্লাসে, মুক্তির নিশ্বাসে প্রথম সূর্যোদয়ও দেখলেন তাঁরা।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তির পর গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিময় হয়েছে দুই দেশের মধ্যে থাকা ১৬২টি ছিটমহল। সেই সঙ্গে মিথ্যা ছেড়ে সত্যের আলোয় পথ চলা শুরু করেছেন এখানকার বাসিন্দারাও। এখন মুক্ত আকাশে নিশ্বাস নিতে পারছেন তাঁরা।
ভারতের ভেতর ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ও বাংলাদেশের ভেতর ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বিনিময় হওয়ার ফলে বাংলাদেশের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসীরা পাচ্ছেন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আর ভারতের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসীরা পাচ্ছেন ভারতের নাগরিকত্ব।
নতুন দেশ, নতুন পতাকা, নতুন জাতীয়তা, স্বাধীন পরিচয়—এ সবই এবার পাচ্ছেন দেশের মাটিতে পরগাছা হয়ে থাকা ছিটমহলবাসী। তাই তো এত সব পাওয়ার আনন্দে ঐতিহাসিক এ মাহেন্দ্রক্ষণকে তাঁরা বরণ করে নিলেন নেচে-গেয়ে, মিছিল-স্লোগানে মুখরিত করে। হাতে পতাকা, হৃদয়ে দেশপ্রেম ধারণ করে বিভিন্ন ছিটমহলে রাতভর এ মুক্তির উৎসবে মেতে ওঠেন তাঁরা। কেউ যত্নের সঙ্গে মাথায় বাঁধেন পতাকা।
রাত তখন ১২টা ১ মিনিট। লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামে কামারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে হাজারো কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো ‘আর নয় ছিটবাসী, আমরা সবাই বাংলাদেশি।’ মোমবাতি জ্বালিয়ে মশাল হাতে মুক্তির আনন্দে তাঁরা l মঈনুল ইসলাম
আনন্দে উদ্বেলিত ছিটের মানুষেরা ওড়ান ফানুস, পোড়ান আতশবাজি। করেন ব্যান্ড পার্টির তালেতালে নাচ। হয় মশাল মিছিলও। উৎসবের এ জোয়ারে যোগ দেন ছেলে-বুড়ো, কিশোর-যুবা, তরুণ-তরুণীনির্বিশেষে সবাই।
রংবেরঙের কাগজ, রঙিন বাতিতে সাজানো হয়েছে ছিটমহলগুলোর বাসাবাড়ি, স্কুল, হাট-বাজার, মেলামাঠ। রাত ১২টায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার প্রতিটি ছিটমহলেই প্রজ্বালন করা হয় ৬৮টি মোমবাতি। ৬৮ বছরের বন্দিজীবন অবসানের প্রতীক ছিল এসব মোমবাতি। মুক্তির আনন্দের বহুল প্রত্যাশিত এ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে এর আগে চলে নানা উৎসব-আয়োজন। হয় হা-ডু-ডু, লাঠিখেলা। কোথাও বা নৌকাবাইচ।
ছিটমহলগুলোর বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করা হয় সুদৃশ্য তোরণ। করা হয় বর্ণিল আলোকসজ্জা। বসানো হয়েছে উৎসবমঞ্চ। আজ শনিবার সেখান থেকে বিজয় সমাবেশ শেষে শোভাযাত্রা হওয়ার কথা আছে। সারা দিন ছিটমহলগুলোর নাগরিক কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন খেলাধুলা, গান ও নাটকসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছে।
আনুষ্ঠানিকভাবে বিনিময় হওয়ার পরপরই অনেক ছিটমহলে ওড়ানো হয়েছে জাতীয় পতাকা। গতকাল জুমার নামাজের পর ছিটমহলের মসজিদে মসজিদে দোয়া ও শোকরানা আদায় করেন মুসল্লিরা। আর সকাল থেকেই মন্দিরগুলোতে দল বেঁধে পূজা-অর্চনা করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা।
গত রাতে ছিটমহল বিনিময়ের পর এখানকার বাসিন্দারা নতুন করে জীবন উপভোগের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। দীর্ঘ প্রায় সাত দশক স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই রয়ে গেলেও এখন সেটা বাস্তবে রূপ নেওয়ার হাতছানি দিচ্ছে তাঁদের। অন্য দেশের বেষ্টনীতে পরগাছা হয়ে আর থাকতে হবে না তাঁদের।
একই আলো-বাতাসে মানুষ হলেও ৬৮ বছর ছিটমহলবাসী পাননি স্বাধীনতার স্বাদ। খাঁচার পাখির বন্দিজীবনের মতোই এতটা বছর কাটিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এক ভয়ানক জীবনযাপন করেছেন।
নিজ দেশের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে এসব ছিটমহলের সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকায় এখানকার বাসিন্দাদের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ছিল না। ভিনদেশের সীমানায় হওয়ায় হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, স্কুল-কলেজ বা বিচার-প্রশাসনও ছিল না। ফলে বাসিন্দাদের ইচ্ছা থাকলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর সুযোগ ছিল সীমিত। অনেকেই বাংলাদেশি বা ভারতীয় ঠিকানা ব্যবহার করে লেখাপড়া করলেও ছিটমহলের বাসিন্দা হওয়ায় চাকরির সুযোগ তাঁদের এত দিন হয়নি। তবে এবার সবই হবে বলে আশা তাঁদের।
এদিকে সুদীর্ঘ বঞ্চনা অবসানের আনন্দ ঘোরাফেরা করার মাঝেও ভারত, না বাংলাদেশ—ভিটেমাটি ছেড়ে ভূখণ্ড বেছে নেওয়ার এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে অনেক খণ্ড খণ্ড কষ্ট-যন্ত্রণাও জমাট বেঁধেছে ছিটমহলগুলোতে। যাঁরা ভারতে চলে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে চলছে অন্য রকম প্রস্তুতি।
জমিজমাসহ স্থাবর সম্পত্তি গতকাল পর্যন্ত বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। তবে অদরকারি আসবাব, গাছ ও গবাদিপশু বিক্রি করে দিচ্ছেন বাসিন্দারা। নতুন পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার যেমন উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, তেমনি জন্মভিটা ছেড়ে গিয়ে ঠিকমতো আবাস গড়ে তুলতে পারবেন কি না, সে শঙ্কাও দেখা গেছে অনেকের মধ্যে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে নানা বাস্তবতায়, আর্থিক অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কের টানাপোড়েনে।
{প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন: প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা}

মুক্তির আলো- ছবি: মঈনুল ইসলাম

৬৮টি মোমবাতি জ্বলল। শেষ হল ৬৮ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নের আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে সবার মধ্যে।  ছবি: মঈনুল ইসলাম
ছবি: মঈনুল ইসলাম।
‘আর না ছিট বাসী, আমরা এখন বাংলাদেশি’ এই স্লোগানে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামের কামারহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ১২টা এক মিনিটে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব অর্জন উদ্‌যাপন উপলক্ষে জ্বালানো হয়েছে মোমবাতি।
ছবি: মঈনুল ইসলাম।
মোমবাতি জ্বালিয়ে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার আনন্দ করছেন লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামের বাসিন্দারা। 
ছবি: মঈনুল ইসলাম।
দারুণ এক আনন্দের মুহূর্ত তাঁদের জন্য। তাঁরা এখন আর ছিট বাসী নন, বাংলাদেশের নাগরিক। হাতে মশাল নিয়ে, মোমবাতি জ্বালিয়ে সেই আনন্দ উদ্‌যাপন করছেন আজ তাঁরা।
ছবি: মঈনুল ইসলাম।
কুড়িগ্রামের দাশিয়ার ছড়ায় আজ ছিটমহল সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন সাবেক এমপি মো. জাফর আলী।
ছবি: মঈনুল ইসলাম।
কুড়িগ্রামের দাশিয়ার ছড়ায় মোমবাতির আলো জ্বালিয়ে আনন্দক্ষণ উদ্‌যাপন। ছিটমহল সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে মোমবাতি প্রজ্বলন করেন সাবেক এমপি মো. জাফর আলী।
ছবি: প্রথম আলো।
রাত ১২টা এক মিনিটে লালমনিরহাটের বাঁশপচাই ভিতরকুটির নূর আলমের বাড়িতে ৬৮টি মোমবাতি জ্বালানোর কর্মসূচিতে অংশ নেন সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩০২ এর এমপি সফুরা বেগমসহ অতিথিরা।

Saturday, August 1, 2015

আটষট্টি বছর পরে প্রকৃত স্বাধীনতা পেতে চলেছি

দুদুবার আমরা স্বাধীনতা দেখলাম, কিন্তু প্রকৃত অর্থে ছিটমহলে যারা থাকি, এখনও স্বাধীনতা পাই নি। এতগুলো বছর পরে আজ আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা পেতে চলেছি।
তার জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ-শাসনাধীন ভারতের নাগরিক হিসেবে। এর পর কয়েকবার নাগরিকত্ব বদলেছে তার। ৭৫ বছরের এক জীবনেই পোয়াতুরকুঠি ছিটমহলের বৃদ্ধ মনসুর আলি মিঞা ভারতীয় থেকে হয়েছেন পাকিস্তানী, তার পর বাংলাদেশী।
তার পর এখন আবার - ৬৮ বছর পর - তিনি ফেরত পাচ্ছেন তার আদি নাগরিকত্ব, বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে।
আনুষ্ঠানিক ঘটনাটা ঘটছে আজ মাঝরাতে। ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হবার মধ্যে দিয়ে শেষ হবে প্রায় ৫২ হাজার ছিটমহলবাসীর পরিচয়হীন অবস্থা।
ভারতের মধ্যে থাকা বাংলাদেশী ছিটমহল পোয়াতুরকুঠির বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী মনসুর আলি মিঞা বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ৬৮ বছর ধরে কীভাবে কেটেছে ছিটমহলবাসীর জীবন?
আমার জন্ম ১৯৪১ সালে। এখন বয়স ৭৫। আমরা বাপ-দাদা ১৪ পুরুষ এই গ্রামেরই বাসিন্দা।কিন্তু ভারতের স্বাধীনতার দু বছর পর।
মনসুর আলি বলছিলেন, ৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ভারত স্বাধীন হল হিন্দুস্তান পাকিস্তান ভাগ হয়ে গেল। আর ১৯৪৯ সালে কোচবিহারের রাজা ভারতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন আর তারা হয়ে গেলেন ছিটমহলের বাসিন্দা।
১৯৭১ সালে আবার পূর্ব পাকিস্তান থেকে জন্ম নিল বাংলাদেশ। দুদুবার আমরা স্বাধীনতা দেখলাম, কিন্তু ছিটমহলে যারা থাকি, তার এখনও প্রকৃত স্বাধীনতা পাই নি।
৬৮ বছর ধরে আমরা অন্ধকারের বাসিন্দা। নাগরিকত্ব নেই, প্রশাসন নেই মিথ্যার আশ্রয় করে বাস করতে হয় আমাদের।
এমনও হয়েছে যে স্ত্রীকে চিকিৎসার জন্য ভারতের হাসপাতালে নিয়ে গেলে স্বামীর নাম ভাঁড়াতে হয়। এভাবেই মামাকে বাবা বানিয়ে ভারতের স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করে আমাদের ছেলেপুলেরা।
আমাদের গ্রাম যেন জেলখানা।
মনসুর আলি মিঞা বলছেন, এরকমও হয়েছে, ১৯৬৬ সাল থেকে প্রায় সাত বছর আমরা গ্রাম থেকে বেরতে পারি নি। গ্রামে ফেরিওয়ালারা আসত। আমরা গ্রাম থেকে বেরলেই ভারতের পুলিশ তাড়া করত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কড়াকড়িটা কমে যায়। এতগুলো বছর পরে আজ আমরা প্রকৃত স্বাধীনতা পেতে চলেছি।
আমার তো বয়স হয়ে গেল কিন্তু পরবর্তী প্রজন্মকে যেন মনুষ্যেতর জীবন না কাটাতে হয় তারা যেন নিজের পরিচয় নিয়ে বাঁচতে পারে এটাই আমার আশা।
সূত্র: বিবিসি বাংলা