Thursday, February 18, 2016

‘বাবু যত বলে পরিষদ বলে শতগুণ, মাহফুজ আনাম দেশপ্রেমিক, খালু বললো আশরাফকে খবর দাও’ -ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ কণ্যা শেখ রেহানার স্বামী ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক বলেছেন, মাহফুজ আনাম আমার ২-৩ বছরের সিনিয়র ছিলেন। উনি ডিবেট করতেন, আমিও করতাম। সে সুবাধে আমার পরিচয় হয়। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে ওনার ভূমিকা ভাল ছিলো। মাহফুজ আনামকে আমি মনে করি একজন দেশপ্রেমিক, শিক্ষিত স্বজ্জন ব্যক্তি। মাহফুজ আনামের মাফ চাওয়ার ঘটনাটা এটা আমি মনে করি আরও ৭ বছর আগে যখন গণতান্ত্রিক সরকার আসে তখন ক্ষমা প্রার্থনা করলে ভাল হতো।
বেসরকারি টিভি চ্যানেল বাংলাভিশনের টক শো নিউজ এন্ড ভিউজে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক আরও বলেন, সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের সহিংস রাজনীতি ছোট বেলা থেকে দেখছে। ৭৫ এর মর্মান্তিক ঘটনায় সে নানা-নানিকে, মামা-মামিকে হারিয়েছে। আমি যখন ৭৮ এ দিল্লি গেলাম জয়ের সঙ্গে প্রথম দেখা হলো। তখনই দেখেছি জয় মাঝে মাঝে নানা-নানু, মামা-মামিদের কথা ভেবে বিমর্ষ থাকতো। জয় অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। লন্ডনে যখন পড়াশুনা করতো প্রায় ২ বছর আমার কাছে থেকে পড়াশুনা করেছে। স্কুলের হেড মাস্টার বললো তুমি জয়কে নিয়া যাবা সেতো বাংলাদেশে গেলে এত ব্রাইট ছেলে ওর পড়াশুনার ব্যাঘাত হবে না? আমি বললাম না অসুবিধা হবে না। আমরা দেখবো সেটা। এরপরে ৮৩ পরে হাসিনা আপা গোলমাল রাজনৈতিক পরিবেশে জয় পুতুলকে দেশে রাখতে চাননি। ইন্ডিয়া পাঠিয়ে দিলেন বোডিং স্কুলে। জয় কিন্তু বোডিং স্কুল মোটেই পছন্দ করতো না। আমাকে বলছে কয়েকবার যে খালু বোডিং স্কুল জিনিসটা ভাল না। আমি বুঝলাম এই অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও বোর্ডি স্কুলে যেতে হচ্ছে। প্রথমে আমরা টাকা পয়সার জন্য জয়কে লন্ডনে রাখতে পারিনি। পরে জয় যখন বোডিং স্কুল পাস করলো। আন্ডার গ্রাজুয়েট কোর্স করতে আমেরিকায় যাইতে চাইলো। হাসিনা আপা রাগ করে আমাকে বললেন আমার কি টাকার বস্তা আছে ছেলেকে বিদেশে পড়ানোর অবস্থা আছে। তো কে খরচ দেবে । সেজন্য জয় বিএসসি ইন্ডিয়া থেকে করলো। পরে লেখালেখি করে পার্ট টাইম চাকরি করে সে পড়তে গেছে। সে জন্যই সে জানতো তার মা অত্যন্ত সাধারণ জীবন যাপন করে। ১/১১ তে করাপশনের চার্জ এটা জয় মোটেই পছন্দ করেনি। এ জন্য মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে জয়ের একটু রাগ থাকবে। সাতবছর পরে উনি এটা কেনও বললেন। ডেইলি স্টার পত্রিকা যেটা দেশে বিদেশে বহুল প্রচারিত। সত্যি ঘটনা বিচার না করে ওনার এটা পাবলিশ করা ভুল হয়ে গেছে। সে জন্য জয় ফেসবুকে ওনার বিরুদ্ধে একটা কমেন্ট করেছে এটা স্বাভাবিক। তোমার মা যদি অনেস্টভাবে চলে তার নামে যদি একটা মিথ্যা অভিযোগ করা হয় তুমি কি করতা আামি কি করতাম। জয়ের মত আমরা রিঅ্যাক্ট করতাম। সে জন্য এটা খারাপ মনে করি না। কিন্তু পরবর্তী ঘটনা আমার অবাক লাাগে এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি হয়েছে। সংসদে উঠেছে । মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে ৩৫ টা কেস হয়েছে। এখন আমার মনে হয় রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমিতে একটা কথা আছে না, বাবু যত বলে পরিষদ বলে শতগুণ। জয় কিন্তু কথা বলে ছেড়ে দিয়েছে কিন্তু কেস করে নাই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও কোন কেস করেননি। অন্য লোক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহী মামলা করছে। মাহফুজ আনাম দেশদ্রোহী নন। উনি ভিন্নমতের হতে পারেন। উনি একজন দেশপ্রেমিক। শতভাগ দেশপ্রেমিক মনে করি। আমি ভার্সিটি লাইফে দেখছি পরবর্তীকালে দেখেছি । মানহানির মামলা যার মানহানি হয়েছে সে করতে পারে। অন্য কেউ মামলা কিভাবে করে। জয় করতে পারতো , মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করতে পারতেন। তারা করেনি। এটা নিয়ে এত বাড়াবাড়ি হচ্ছে কেনও। নাসিম সাহেব সবচেয়ে ভালো স্টেটমেন্ট দিয়েছেন। বলেছেন, মাহফুজ আনাম যেহেতু দোষ স্বীকার করেছেন তার রিজাইন করা উচিত। এটা ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডের জন্য ঠিক। কিন্তু বাংলাদেশে রিজাইন করে না। সাধারনত ইন্ডিয়াতে দেখা যায়, ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটলো দায় স্বীকার করে রিজাইন করলো। একটা সন্ত্রাসী ঘটনা হইলো হোম মিনিস্টার রিজাইন করলো। পলিটিক্যাল পার্টি নির্বাচনে হেরে গেলো সঙ্গে সঙ্গে পার্টির নেতা রিজাইন করে। ইংল্যান্ডে আমেরিকায় সেটা এখানে  হয় না। সেই পয়েন্টে অমি মনে করি  এটা বিবেচ্য বিষয়। একই সঙ্গে অনেক পত্রিকা অনেক কিছু লিখেছিল তারা কি সব মাফ চাইছে। 
১/১১ এর সময়কার বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা করে ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, খালু (প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমান) বললেন বাবা আশরাফকে খবর দাও । এদের  জ্বালায় তো আমি বাঁচতেছি না। আশরাফ তখন লন্ডনে ছিলো। ছেলেকে ফোন করলাম আশরাফ মামাকে পাঠাও। আশরাফ আসার পরে জিল্লুর রহমান সাহেব কিছুটা শান্তিতে চালাইতে পারলেন। জিল্লুর রহমান সাহেব এত সুন্দর রোল প্লে করলেন। উনি ওয়ান ইলেভেনের সামরিক সরকারকে ভয় পাননি। পার্টিকে এক রাখার জন্য ওনার কন্ট্রিবিউশন সব থেকে বেশি। এ জন্য হাসিনা আপা উপযুক্ত সম্মান দিয়েছেন। তাকে পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছেন। আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে জিল্লুর রহমান খালুর এটা প্রাপ্য ছিলো। লাগলে সবার পিছে লাগো। সবার বিচার হওয়া উচিত। আওয়ামী লীগ যখন সরকার গঠন করলো। তখন হাসিনা আপা বললো আমি ক্ষমা করে দিয়েছি, ভুলি নাই। সে সময় সিনিয়র নেতৃবৃন্দ যারা উল্টা পাল্টা কাজে ইনভলব ছিলো একজনকেও হাসিনা আপা মিনিস্টার করেনি।  দোষতো সাবাই করছে। কিছু না কিছু করছে। মাহফুজ আনামের নামে ৩৫ টা কেস দেয়া মানহানির মামলা দেশদ্রোহী মামলা এটা তো টুমাচ হয়ে গেছে। একজনের পিছে এত লাগা তাকে ফেমাস করে দেয়া। মাহফুজ আনাম দোষ করছে তার থকে বেশি দোষ করেছে অনেকে। সেসময়ে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বন্দুকের নলের সামনে কয়জন সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়াইতে পারে। আমিতো মনে করি আমার সামনে বন্ধুক ধরলে আমিতো সারেন্ডার করবো সঙ্গে সঙ্গে। আমারতো এত মানসিক শক্তি নাই। আমি অসুস্থ মানুষ বৃদ্ধ বয়স । আামি মনে করি মাহফুজ আনামের বিষয়টা নিয়ে বহু ডিবেট হয়েছে। এটা এ- হওয়া দরকার।

মূল্যবোধের এত বিপর্যয় কেন?

নিহত তাজেল মিয়া
হবিগঞ্জের বাহুবলে চার শিশু হত্যার ঘটনাকে মূল্যবোধের বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন বিশিষ্টজনেরা। এ ধরনের নিষ্ঠুরতা বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধীদের বিকৃত মনোভাব এবং সমাজে শিশুদের অসহায় অবস্থার চিত্রই তুলে ধরছে।
একসঙ্গে চার শিশু হত্যার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘কী বলব? মূল্যবোধের এত বিপর্যয় কেন ঘটছে? শিশুদের সঙ্গে কারও কোনো দ্বন্দ্ব, সংঘাত থাকে না। তাদের শুধু ভালোবাসা পাওয়ার কথা। অথচ তারাই নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে। আর এ ধরনের ঘটনা আমাদের প্রতিনিয়ত সহ্য করতে হচ্ছে, যা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’ তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কাজ করে।
শিশুহত্যা ও নির্যাতন এবং তাদের অধিকারের বিষয়গুলোর তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (২৬৭টি বেসরকারি সংস্থার জোট)। ১০টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে করা ফোরামের পরিসংখ্যান বলছে, এ বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৯টি শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে কেরানীগঞ্জের স্কুলছাত্র আবদুল্লাহকে অপহরণ করে হত্যা করে লাশ ঘরের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়। গাজীপুরে অপহরণের পর হত্যা করা হয়েছে সোলায়মান নামে এক শিশুকে। কিশোরগঞ্জের নিকলীতে শিশুহত্যার অভিযোগে মাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে দুই শিশুকে বিষ খাইয়ে মা আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে একটি শিশু মারা গেছে।
আর গত চার বছরে দেশে ১ হাজার ৮৫টি শিশুকে হত্যা করা হয়। পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত লোভ অথবা স্বার্থ আদায়ের অস্ত্র হিসেবেই শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
হত্যার পাশাপাশি শিশু নির্যাতনও বেড়েছে। চলতি মাসেই রাজশাহীর পবা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামে মুঠোফোন চুরির অপবাদ দিয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে জাহিদ হাসান (১৫) ও ইমন আলী (১৩) নামের দুই কিশোরকে অমানবিক নির্যাতন করে সেই ঘটনার ভিডিওচিত্রও ধারণ করা হয়। নাটোরের বাগাতিপাড়ার মাকুপাড়া গ্রামে দোকানে চুরির অভিযোগে তিন শিশুকে পেছনে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে বাঁশের লাঠি দিয়ে বেদম পেটানো হয়।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘যা ঘটে চলেছে তা খুবই দুঃখজনক। শিশুহত্যার ঘটনা এত বেশি পরিমাণে কেন ঘটছে, এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না, তাও ভাবিয়ে তুলছে। তবে ঘটনা ঘটার পরই সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
নিহত জাকারিয়া আহমেদ
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেখেশুনে মনে হচ্ছে অপরাধীদের মধ্যে একধরনের বিকৃত মনোভাব তৈরি হয়েছে। অপরাধীরা জানে শিশুদের আক্রমণ করা সহজ। শিশুরা পাল্টা আঘাত করতে পারবে না। তবে যে কারণেই শিশুরা হত্যার শিকার হোক, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।
গত বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল সিলেটের শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন ও খুলনার মোহাম্মদ রাকিব হত্যা। দেশের সচেতন মানুষ এ ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামে। নিম্ন আদালতে দ্রুত এ মামলা দুটির নিষ্পত্তি হয়। রাজন হত্যার দায়ে প্রধান আসামি কামরুলসহ চারজনকে ফাঁসি ও সাতজনকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং রাকিব হত্যা মামলায় দুজনকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। তবে কেরানীগঞ্জে আবদুল্লাহ হত্যার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান এমরানুল হক চৌধুরী বলেন, এ ধরনের ঘটনা সমাজে শিশুদের অসহায় অবস্থার সার্বিক চিত্রটাই তুলে ধরছে। সুশাসনের অভাব ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়াও এমন অপরাধ সংঘটনের একটি বড় কারণ। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিশুহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা বাড়লেও দেশের রাজনীতিবিদেরা এ নিয়ে তেমন কথা বলেন না। সরকার দ্রুত এসব ঘটনার প্রকৃতি ও পুনরাবৃত্তিকে বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যমান সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো পর্যালোচনা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

‘গণতন্ত্র মানেই সবার সমান অধিকার নয়’ -তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, গণতন্ত্র মানেই সবার সমান অধিকার নয়। তাহলে গণতন্ত্রে কারাগার থাকতো না, বিচারালয় থাকতো না। গণতন্ত্রের নামে অপরাধী আর অপরাধীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্তকে এক পাল্লায় মাপা যায় না। ঠিক তেমনই নির্বাচনে অংশগ্রহণ বা নির্বাচনে জয়ী হলেই অপরাধীর অপরাধ হালাল হয়ে যায় না। গণতন্ত্রের নির্বাচনেও সকলের অংশগ্রহণের অধিকার দেয় না। বৃহস্পতিবার বেলা ১০টার দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে শহীদ ‘জোহা দিবস’ উপলক্ষে ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে জঞ্জালমুক্ত করতে হবে’ শীর্ষক স্মারক বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. শামসুজ্জোহার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ড. জোহার আত্মত্যাগ বাঙালি জাতির স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক উচ্চতর ধাপে নিয়ে গেছে। যা জাতিকে নিশঃঙ্ক চিত্তে আত্মবলিদানে অনুপ্রাণিত করেছে। উচ্চশিক্ষা জ্ঞান, মুক্তবুদ্ধির চর্চার কেন্দ্র হিসেবে জাতীয় জীবনের প্রয়োজনে যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় পালন করে, তা শহীদ ড. জোহা আত্মবলিদানের মাধ্যমে লিখে দিয়ে গেছেন।
এসময় বুদ্ধিজীবী ড. জোহার জীবনের খ-কালীন কিছু স্মৃতি তুলে ধরেন রসায়ন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আসিফা সুলতানা।
অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন। অন্যান্যের মধ্যে উপ-উপাচার্য প্রফেসর চৌধুরী সারওয়ার জাহান, কোষাধ্যক্ষ প্রফেসর সায়েন উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রসায়ন বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মো. নজরুল ইসলাম।
এর আগে সকাল ১০টায় রাজশাহী সদর আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা জোহার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সঙ্গে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ড. জোহার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এক যৌনদাসীর বয়ান

জঙ্গি গোষ্ঠী আইসিস যৌনদাসী হিসেবে বন্দি রেখেছিল নাদিয়া মুরাদ (২১)কে। লন্ডনের কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস হাউজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি খুলে বললেন দুঃষহ জীবনের সেই দিনগুলোর কথা। ইরাকের যুবতী নাদিয়াকে তিন মাস যৌনদাসী হিসেবে আটকে রেখেছিল আইসিস। সেখান থেকে কোনমতে জীবন নিয়ে পালিয়েছেন। এখন ইরাক সহিংসতার শিকার মানুষদের প্রতি সংহতি প্রকাশের জন্য এবং আইসিসের বিরুদ্ধে বিশ্বকে একত্রিত করার জন্য প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি। লন্ডনের ওই অনুষ্ঠানে তিনি বর্ণনা করেছেন কিভাবে আইসিস তার ৬ ভাই ও মাকে হত্যা করেছে। তিনি বলেন, যখন আমি কথা বলি তা শুধু আমার নিজের জন্য বলি না। আমি কথা বলি যুদ্ধকবলিত প্রতিটি এলাকার সব নারী ও শিশুদের জন্য। উল্লেখ্য, নাদিয়া মুরাদ ইরাকের ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের। তিনি বলেন, দু’মাস ধরে আমি প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। লোকজন আমাকে খুব ভালবাসে নিচ্ছে। কিন্তু ইয়াজিদিরা সেভাবে নিচ্ছে না। ইসলামিক স্টেটের হাতে বন্দি আছেন প্রায় ৫ হাজার ৮০০ ইয়াজিদি নারী ও শিশু। আইএস ইরাক, সিরিয়ায় অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে। বাস্তুচ্যুত করেছে লাখ লাখ মানুষকে। ইয়াজিদি সম্প্রদায়ে তারা হামলা করে পুরুষদের হত্যা করে। তারপর নারী ও শিশুদের বন্দি করে নিয়ে যায়। তারা এসব মানুষকে হত্যা করে। ধর্ষণ করে। অনেকেই মনে করতে পারেন আমার এ কাহিনী বিশ্বাস করার জন্য খুব জটিল। কিন্তু বাস্তবে এর চেয়েও করুণ কাহিনী আছে। আইসিস আমার ৬ ভাইকে হত্যা করেছে। কিন্তু এমনও পরিবার আছে যেখানে ১০ ভাইকেও হত্যা করা হয়েছে। নাদিয়া মুরাদ বলেন, এখনও আইসিসের হাতে বন্দি আছেন প্রায় ৩ হাজার ৪০০ নারী। অনেক নারীকে অপহরণ করে যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে। আমার নিজ শহর সিনজারে এমন অনেক গণকবর পাওয়া গেছে যেখানে প্রতিটিতে শতাধিক নারীর মৃতদেহ রয়েছে। তার ভাষায়, ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহত্যা চলছে প্রায় আড়াই বছর। প্রতিদিনই তারা মারা যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্ব শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে তা দেখছে। আমার মায়ের সামনে আমার ভাইদের হত্যা করা হয়েছে। তারপর তারা আমার মাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছে। আমার পিতা বেঁচে নেই। তাই আমি এতিম হয়ে পড়ি। এ অবস্থায় আইসিস সদস্যরা আমাকে নিয়ে যায় মসুলে। সেখানে আমাকে ধর্ষণ করা হয়। তারা নারীদের সঙ্গে এত নৃশংস আচরণ করে যে দুনিয়ার সমস্ত কষ্টের চেয়ে সেই কষ্ট বেশি হয়ে দেখা দেয়। কল্পনা করুন একজন যুবতীকে ধরে নিয়ে যৌনদাসী হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। তার কাছে অনুভূতিটা কেমন হতে পারে!

যখন শিশুর খুনে আমাদের হাত রঞ্জিত by সোহরাব হাসান

একে একে নিয়ে আসা হচ্ছে চার শিশুর মরদেহ।
বাহুবলের সুন্দ্রাটিকি গ্রামের এই চার শিশু গত
শুক্রবার বাড়ির পাশে মাঠে খেলতে যাওয়ার পর থেকে
নিখোঁজ ছিল। গতকাল সকালে তাদের লাশ
উদ্ধারের পর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছবি: আনিস মাহমুদ
বাবা বেঁচে আছেন। অথচ তাঁর শিশুপুত্র ঘাতকের হাতে নিহত। মা বেঁচে আছেন। অথচ তাঁর শিশুপুত্র আততায়ীর জিঘাংসার বলি। এখন এই সন্তানেরা কেবলই ছবি। কেবলই স্মৃতি। এই সন্তানহারা অসংখ্য বাবা-মাকে আমরা কী সান্ত্বনা দেব?
একের পর এক শিশু খুন হচ্ছে। অপহরণের শিকার হচ্ছে। কাউকে টুকরো টুকরো করে নদীতে ফেলা হচ্ছে। কাউকে জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়া হচ্ছে। সর্বশেষ হবিগঞ্জে চার শিশুকে হত্যা করে নদীর পাড়ে বালুর নিচে পুঁতে রাখা হয়। কয়েক দিন আগে কেরানীগঞ্জে হত্যা করা হয় এক শিশুকে। তারপর গাজীপুরে মুক্তিপণের টাকার জন্য চার বছরের শিশুকে জীবন দিতে হয়। একের পর এক শিশু হত্যার ঘটনা ঘটছে। অথচ প্রতিকার নেই। সমাজ নির্বিকার। রাষ্ট্রযন্ত্র ভাবলেশহীন।
বাবার সঙ্গে প্রতিবেশীর বিরোধ। পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশীর পরিবারের বিরোধ। সম্পত্তির হিস্যা নিয়ে আত্মীয়ের মধ্যে বিবাদ। শিকার হচ্ছে শিশুপুত্র বা কন্যা। কখনো প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে, কখনো মুক্তিপণের অর্থ আদায় করতে নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করা হচ্ছে। অপহরণ করা হচ্ছে। কখনো মুক্তিপণের অর্থ শোধ করেও বাবা-মা সন্তানকে ফিরে পাচ্ছেন না। তাঁদের জীবিত শিশুপুত্র বা কন্যা ফিরে আসে না। আসে নিথর লাশ। পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত লোভ অথবা স্বার্থ আদায়ের অস্ত্র হিসেবেই শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কী ভয়ংকর সমাজে আমরা বাস করছি?
এক হিসাবে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ২৯ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। আর গত চার বছরে দেশে ১ হাজার ৮৫ শিশুকে হত্যা করা হয়। ২০১৫ সালে প্রায় ২০০ শিশু হত্যার ঘটনা ঘটেছে। হামলার শিকার হয়েছে কয়েক হাজার। যারা এই শিশুদের খুন বা অপহরণ করেছে, তারা তো এই সমাজেরই লোক। আমাদের চারপাশেই তাদের বসবাস। কিন্তু সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কেউ তাদের হত্যাযজ্ঞ থামাতে পারছে না।
গত বছর সিলেটে শিশু রাজন হত্যার ঘটনা চারদিকে হইচই ফেলে দিয়েছিল। আমরা ভাবলাম, সমাজে শুভবোধের জাগরণ ঘটেছে। আর এ রকম নৃশংসতা ঘটবে না। কিন্তু এর কিছুদিন না যেতেই খুলনায় খুন হলো রকিবুল নামে আরেক শিশু। দুই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত লোকজন ধরা পড়ল। বিচার হলো। আসামিরা কঠিন শাস্তি পেল। ভাবলাম, এবার শিশুহত্যা বন্ধ হবে। কিন্তু হত্যা থামল না।
অপরাধীর শাস্তি অপরাধ দমনের একটি উপায় মাত্র। কিন্তু সমাজ থেকে অপরাধকে নির্মূল করতে হলে সমাজে শুভচিন্তা ও বোধ জাগ্রত করতে হয়। দুর্বৃত্তায়ন কঠোর হাতে দমন করতে হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে আইনের শাসন জারি করতে হয়। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হয়।
কিন্তু সেই কাজটি যে আমরা করতে পারিনি, শিশুহত্যাই তার প্রমাণ। আমাদের রাজনীতি, আমাদের সমাজনীতি এখন আর একের সঙ্গে অপরকে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে না। বিভেদ ও বিদ্বেষের অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত করে। আমরা খাদ্যের অভাব ঘোচাতে পারলেও ন্যায় ও সততার অভাব ঘোচাতে পারিনি। বক্তৃতা বিবৃতিতে আমরা একে অন্যের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে চলেছি।
একজন বয়স্ক মানুষের সঙ্গে আরেকজন বয়স্ক মানুষের স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। বৈরিতা ও প্রতিযোগিতা থাকতে পারে। কিন্তু শিশুরা কেন শত্রু হবে? তাকে কেন নিশানা করা হবে? আর কত মায়ের বুক খালি হলে সমাজপতিদের ঘুম ভাঙবে? আর কত প্রাণ ঝরে গেলে রাষ্ট্রের কুশীলবদের বোধোদয় ঘটবে?
শিশুহত্যা শুধু অপরাধ নয়, নিরাময়-অযোগ্য সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি নিরাময়ে কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ করি না। অথচ সব সম্ভবের বাংলাদেশে আমরা সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের রেকর্ড সৃষ্টি করতে দেখি। শত শত শিশুর লাশ ক্ষমতাবানদের বিচলিত করে না। বিক্ষুব্ধ করে সম্পাদকের সত্য ভাষণ।
যখন শিশুর খুনে আমাদের হাত রঞ্জিত, শিশুর রক্তে আমাদের হৃদয় রক্তাক্ত, তখন ক্ষমতাবানদের কি এই বালখিল্য শোভা পায়?

প্রেম, গোপন পরিচয়, খুন নিয়ে যে মামলা

ভারতের আলোচিত শিনা বোরা হত্যা মামলায় তার সৎ পিতা ও মিডিয়া টাইকুন পিটার মুখার্জির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বিবিসি। বিশ্বখ্যাত মিডিয়া মুঘল রুপার্ট মার্ডকের স্টার ইন্ডিয়া নেটওয়ার্কের সাবেক প্রধান নির্বাহী পিটার মুখার্জিকে গত নভেম্বরে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পিটার ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেছেন যে, শিনা বোরা হত্যাকান্ডের সঙ্গে তার কোন ধরণের সংশ্লিষ্টতা নেই বলে পূর্বে দেয়া বক্তব্য থেকে তিনি পিছু হটেননি।
শিনা বোরা হত্যাকান্ড ভারতজুড়ে ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। শুধুমাত্র সেলিব্রেটিযুগল পিটার ও ইন্দ্রানি মুখার্জি দম্পত্তির সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগের কারণে নয়; শিনা হত্যাকা-ের চাঞ্চল্যকর প্রকৃতিও এর অন্যতম কারণ। গত বছরও সবাই জানতো, শিনা বোরা ছিলেন পিটারের স্ত্রী ইন্দ্রানীর বোন! শিনা যুক্তরাষ্ট্রে পড়ালেখা করছেন বলেও সবাইকে বলেছিলেন ইন্দ্রানী। কিন্তু গত বছর একটি ঘটনায় ইন্দ্রানীর গাড়ি চালকের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে জানা যায়, শিনা আসলে ইন্দ্রানীর বোন নন, বরং তার প্রথম স্বামীর বা প্রেমিকের মেয়ে! এছাড়া ইন্দ্রানীর তৃতীয় স্বামী পিটারের আগের ঘরের সন্তান রাহুলের সঙ্গে প্রেম করায় শিনাকে ইন্দ্রানী নিজেই হত্যা করে লাশ পুতে রাখেন গহীন জঙ্গলে! পরে গাড়ি চালকের তথ্য মোতাবেক ওই লাশ খুঁজেও পায় পুলিশ। পুলিশ এ ঘটনায় ইন্দ্রানীকে মূল সন্দেহভাজন হিসেবে অভিযুক্ত করে। ইন্দ্রানীর প্রথম স্বামী, অর্থাৎ শিনার আপন পিতাকে এ হত্যার অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে আটক করে পুলিশ। সহযোগী হিসেবে গ্রেপ্তার হয় ইন্দ্রানীর সাবেক গাড়িচালকও। এএফপি বার্তা সংস্থার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিটার মুখার্জির বিরুদ্ধেও গতকাল একই অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়েছে, ২০০৯ সালে স্ত্রী ইন্দ্রাণীর সঙ্গে শিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন পিটার।
অভিযোগ গঠনের পর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাকে পিটার মুখার্জি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগসমূহ তিনি কারাগারে বসে নিরীক্ষা করবেন। তবে এ ঘটনায় তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই বলে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। প্রসঙ্গত, তার স্ত্রী ইন্দ্রাণীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলে, তিনি গণমাধ্যমকে জানান, শিনা যে তার শ্যালিকা নয়, বরং সৎ মেয়ে, এটি জানতে পেরে তিনি বিস্মিত!
কয়েক মাস ধরেই এ মামলাটি ঘুরপাক খাচ্ছে ভারতের পত্রপত্রিকায়। গোপন রাখা পরিচয়, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও মামলা সবই আছে খুনের এ মামলাটিতে। ২০১২ সালের দিকে খুন হওয়ায় তিন বছরেরও অধিক সময় ধরে শিনা নিখোঁজ ছিলেন। এ সময় পিটার ও ইন্দ্রাণী পরিচিতজনদের কাছে দাবি করতেন, শিনা যুক্তরাষ্ট্রে গেছে পড়াশুনা করতে। পুলিশের অভিযোগ, শিনার টেলিফোন ব্যবহার করে ইন্দ্রাণী নিজে যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন থেকে একাধিক বার্তা পাঠিয়েছেন। এর একটিতে একজনের সঙ্গে সম্পর্কের ইতি ঘটান শিনা রূপী ইন্দ্রাণী। এ ব্যাক্তি ছিলেন পিটারের আগের ঘরের ছেলে রাহুল। রাহুলের সঙ্গে শিনার প্রেম নিয়ে ইন্দ্রাণির পাশাপাশি পিটারও অস্বস্তিতে ছিলেন। এ ক্ষেত্রে পিটারের বক্তব্য ছিল, নিজের শ্যালিকার সঙ্গে নিজের ছেলের প্রেম তিনি মানতে পারেননি। তবে নিজের ছেলেকেই তিনি বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। এর বেশি কিছুতে তার কোন সংশ্লিষ্টতা ছিল না। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা আরও মারাত্মক। মূলত, পুলিশের উদ্ধারকৃত তথ্য অনুযায়ী, শিনা ও রাহুল ছিল পরস্পরের সৎ ভাই-বোন!
প্রসঙ্গত, পিটার ও ইন্দ্রাণী মুখার্জি দম্পত্তি বেশ অনেক আগ থেকে ভারতের মিডিয়া পাড়ায় পরিচিত মুখ। পিটার স্টার ইন্ডিয়া নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী ছিলেন। পরে ইন্দ্রাণীও মিডিয়া ব্যবসায় যোগ দেন। তারা দু’ জন মিলে আলাদা একটি টিভি নেটওয়ার্কও প্রতিষ্ঠা করেন। তাই এ ধরণের অস্বাভাবিক প্রকৃতির হত্যার ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ মামলাটিকে ভিন্ন মোড় দেয়। মিডিয়াও ফলাওভাবে এটি প্রচার করে।

ভুল স্বীকার করে মাহ্ফুজ আনাম কি ভুল করলেন? by আবুল মোমেন

কোনো সমাজে যদি ভুল স্বীকারের রেওয়াজ না থাকে, তবে তাকে কি সুস্থ ও পরিণত সমাজ বলা যাবে? ভুলকে অন্যায় বা অপরাধ হিসেবে গণ্য করা কি সমাজমানসের সুস্থতার লক্ষণ? দর্শন ও মনস্তত্ত্ব বলে ভুল স্বীকারের ক্ষমতা ব্যক্তির সৎসাহসের প্রমাণ দেয়। কোনো সমাজে ভুল স্বীকার করে কেউ যদি অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়, তাহলে সেই সমাজ সততা ও সত্য থেকে দূরে সরে যায়। প্রকারান্তরে সেখানে কপটতা ও মিথ্যারই জয়জয়কার চলতে থাকে।
ভুল স্বীকার অন্যায় নয়, অপরাধ তো নয়ই; ভুল স্বীকার মানুষের একটি প্রশংসনীয় গুণ বলেই বিবেচিত হয়। বিবেচ্য বিষয় হলো, কেউ একই ভুল বারবার করছে কি না, ভুলটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না। কিন্তু সেই বিচার বাদ দিয়ে বিষয়টিকে নিয়ে ব্যক্তিগত মানহানি বা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ঠুকে দেওয়ার মধ্যে বরং ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হয়রানি করা বা শাস্তি দেওয়ার মনোভাবের প্রকাশ ঘটে। তবু এ ক্ষেত্রে একই ভুল বারবার হয়েছে কি না বা ভুল ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, সে আলোচনা আমরা করব। তার আগে ভুল ও ভুল স্বীকার নিয়ে আরও কয়েকটি কথা বলা দরকার।
আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে থাকেন, তোমার মা-বাবার প্রতি কোন কারণে তুমি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ, আমি সব সময় নির্দ্বিধায় বলেছি, ভুল করার অধিকারসহ স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য। বলা হয়ে থাকে, ভুলত্রুটির মধ্য দিয়েই মানুষ শেখে। একজন সম্পাদক কখনোই ভুল করেন না, করবেন না বা ভুল করতে পারেন না—এমন ভাবনা অন্যায্য। মানবসমাজে এ ধরনের যুক্তি অচল। এই অপূর্ণতা নিয়েই মানুষ। ধর্মগ্রন্থে বারবার ভুল ও ভুল স্বীকার, ক্ষমা ও দয়ার প্রসঙ্গ এসেছে।
আমাদের সমাজ যে দিনে দিনে নির্দয় হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ প্রায় প্রতিদিন শিশু নির্যাতন আর ভয়ংকর মাত্রায় শিশু হত্যার ঘটনা থেকে পাওয়া যায়। যে শিশু, সে তো অন্যায়-অপরাধের আওতার বাইরে, বরং তার জীবন ভুলভ্রান্তিরই আওতায় থাকে। তা থাকে বলেই সে শেখে, বাড়ে, বড় হয়। কিন্তু এই সমাজ যে ভুল ও অন্যায়ের মধ্যে গুলিয়ে বসে আছে, তাই এটি শিশুর প্রতিও নির্দয়। এরই সূত্র ধরে চলে আসে অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার দাপট, ধৈর্যহীনতাসহ নানান মানবিক অক্ষমতা। যে সমাজ ভুলকে ধারণ করতে পারে না, সেই সমাজ অমানবিক হয়ে ওঠে। হয়ে পড়ে অবক্ষয়গ্রস্ত। তার মূল্যবোধের ভারসাম্য নষ্ট হয়। আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ করছি, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানছি সমাজে কতভাবে দুর্নীতি অর্থাৎ অন্যায় হচ্ছে, কত অবিচার, বঞ্চনা ও নিষ্ঠুরতার কাহিনি জমছে। এসবের প্রতিকার আমরা করি না। সৎ ও ন্যায়বান মানুষ বারবার নিষ্ঠুর অন্যায়ের শিকার হয় এখানে। তাই রবীন্দ্রনাথকে দেখি এই বাস্তবতায় তিক্ত হয়ে শেষে ঈশ্বরের কাছে নালিশ জানাতে: ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ আমরা অন্যায়কে কবির ভাষায়, তৃণসম দহন করতে পারি না, কিন্তু ভুল ঘটলে—তাও ভুল স্বীকারের পরে বুঝে—ব্যক্তির ওপর হামলে পড়ছি। এ হলো অক্ষমের বীরত্ব!
মানুষের উত্তরণ ও বিকাশ কীভাবে ঘটে? নিজের ভুলগুলো বুঝতে পারলে তবে। এভাবেই শিখতে শিখতে মানুষ অভিজ্ঞ হয়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে আমরা দেখব কীভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন মাঠের কর্মী, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো মার্কিনপন্থী গণতন্ত্রীর শিষ্য ক্রমে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মহানায়কের ভূমিকায় পৌঁছে যান। ভুলগুলো শুধরে শুধরে তিনি এগিয়েছেন। ভুল স্বীকার না করলে শোধরাতেন কী করে? অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনো দিন কষ্ট হয় নাই, ভুল হলে তা সংশোধন করে নেব, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে।’ (পৃ: ৮০)
বঙ্গবন্ধু বাঙালি চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন। আত্মজীবনীতে এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে তাঁর ভাষায় তিক্ত অভিজ্ঞতার রেশ স্পষ্ট ধরা পড়ে। সেটি হলো বাঙালির পরশ্রীকাতরতা। তিনি লিখেছেন, ‘বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, “পরশ্রীকাতরতা”।...এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ায় খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে।’ (পৃ: ৪৮) বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ কেবল বৈষয়িক ও স্থাপনাগত উন্নয়নে বাস্তবায়িত হবে না, তা আসবে প্রধানত উন্নত মানুষ সৃষ্টির মাধ্যমে। কিন্তু তারা যদি আজও ভুল ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে না শেখে, তাহলে বঙ্গবন্ধু-কন্যার সকল প্রয়াস সত্ত্বেও এ উন্নয়নের ভিত থেকে যাবে দুর্বল।
আচ্ছা, এ ভুল কি ডেইলি স্টার সম্পাদক একাই করেছিলেন? না, বরং একজন সম্পাদক ব্যতীত বাকি সব সম্পাদকই করেছিলেন। তাহলে একজনকে কেন শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা? এর নৈতিক ভিত্তি কী? মনে হবে না এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? আচ্ছা, মাহ্ফুজ আনাম কি ইচ্ছাকৃতভাবে এ ভুল করেছেন? যদি তা-ই হতো, তবে তাঁর মতো বিখ্যাত বিতার্কিক বাকপটু মানুষের পক্ষে সেদিন তরুণ সাংবাদিক মুন্নী সাহাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোনো কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু সেটি হতো কপটাচার। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে (অর্থাৎ অন্যায় করে) কেবল তারাই কপটতার আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষা করে থাকে। এ সমাজ কি বলতে চাইছে সততার অহংকার গুঁড়িয়ে দেব, সবার মতো কপট হওয়াই বাঞ্ছনীয়? আচ্ছা, এই প্রবীণ সাংবাদিক ও সম্পাদক কি এই একই ধরনের ভুল বারবার করেছেন? যদি আমরা আলোচ্য ২০০৮-০৯-এর সময়ের এবং সামগ্রিকভাবে ডেইলি স্টার-এর মোদ্দা ভূমিকা বিচার করি, তাহলে দেখব আদর্শের দিক থেকে এই পত্রিকা অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র, বাক্স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নাগরিক অধিকার, নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন, শিশু অধিকার ও সুরক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। মনে করুন ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতনের সময় ডেইলি স্টার-এর মূল কাগজ ও শুক্রবারের সাময়িকীর সচিত্র প্রতিবেদনগুলোর কথা। মনে করুন আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পরে লাল ব্যানার শিরোনামগুলোর কথা, এক–এগারোর পরে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে মাহ্ফুজ আনামের স্বনামে লেখা কলামের কথা। মনে করুন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এই পত্রিকার ভূমিকা। মনে করুন এই পত্রিকার শিশু, নারী, সংখ্যালঘু, বনবনানী, নদী-খাল-বিল, মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের অনুকূল অসংখ্য খবর ফিচারের কথা। গণমাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশকে বিদেশিদের কাছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, ভালোভাবে পরিচয় করাচ্ছে ডেইলি স্টার, সেটি প্রধানত ইতিবাচক ভাবমূর্তিই তো।
তা ছাড়া মাহ্ফুজ আনাম বিশ্বাস করেছিলেন সরকারের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর একটি অঙ্গের ওপর। দেশের সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থা রাখা কি দেশদ্রোহ? আমরা জানি, বিশেষ পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর কেউ কেউ ক্ষমতার পক্ষে বা জন্য নানা ভূমিকা নেয়, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সুশাসনের মানদণ্ডে মানা যায় না। এর বিরুদ্ধে কথা বলা, সংগ্রাম করার ঐতিহ্য আমাদের আছে। আর তাই মাহ্ফুজ আনাম সেই দিন ডিজিএফআইকে বিশ্বাস করে খবর ছাপানোকে তাঁর সম্পাদক-জীবনের একটি ব্যর্থতা ও ভুল বলে স্বীকার করেছেন। একে দেশদ্রোহ আখ্যায়িত করলে ডিজিএফআইসহ অনেককেই টানতে হবে।
এখানে এ কথা টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে বহু নিন্দিত ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের দুই বছরেই প্রথম আওয়ামী লীগের বাইরের কোনো সরকার পঁচাত্তরের পরে বঙ্গবন্ধুকে ভালোভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাঁর জন্মদিন পালন করেছে, মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবরে গেছেন সরকারপ্রধান। এই সরকার পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের নেতিকরণ এমনভাবে করেছিল যে তাতে ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাড়তি সুবিধা পেয়েছিল। এই সরকার তারেক রহমানের দুর্নীতি প্রকাশ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, অন্তত বহুকালের জন্য তাঁকে মাইনাস করার পটভূমি তৈরি করে দিয়েছে। এ কথাও মানতে হবে, ফখরুদ্দীন আহমদের নির্দলীয় সরকার দুই বড় দলের তীব্র সংঘাতময় ক্ষমতা-দ্বন্দ্বের পরে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। হ্যাঁ, তা বলে এই সরকারের ভুল কি ছিল না? ছিল। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বাড়াবাড়ি হয়েছে, মাইনাস টু তত্ত্ব ভুল ছিল। তবে তারা চেয়েছিল রাজনীতিতে অচলায়তন ভাঙতে, সংঘাতের বাস্তবতা দূর করতে। লক্ষ্য ঠিকই ছিল, পথ হয়তো ঠিক ছিল না।
আমার পর্যবেক্ষণে বুঝতে পারি, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মতোই চিন্তায় সৃজনশীলতাকে স্থান দেন, উত্তরণ ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য ভুল থেকে শিখে পথ নির্ধারণ করতে জানেন। আশা করি, এই অসুস্থ অপরিণত ব্যক্তি-নিধনের হুজুগ বন্ধ করতে তাঁর কাছ থেকে সময়োচিত পরামর্শ আসবে।
ব্যক্তিগতভাবে বলব, কোনো কোনো সময় বা ক্ষেত্রে ডেইলি স্টার এমন অনেক নীতি বা অবস্থান নিয়েছে, যার সঙ্গে আমি একমত হইনি। কিছু বিষয়ে আমার দ্বিমত বা ভিন্নমত রয়েছে। কিন্তু মাহ্ফুজ আনাম যে একজন সৎ, বিজ্ঞ সাংবাদিক, সফল সম্পাদক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি ভুল স্বীকার করে তাঁর এই সততার গৌরব আরও বৃদ্ধি করেছেন তিনি।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

মুসলিম তরুণদের উদ্দেশে খোলা চিঠি by রামজি বারুদ

যখন ছোট্ট বালক ছিলাম, স্বপ্ন দেখতাম- গাজার উদ্বাস্তুশিবিরের দুঃখ-দুর্দশা থেকে দূরে যেন আমার পুনর্জন্ম ঘটে। যেন ভিন্ন কোনো সময় ও স্থানে আমি আবার জন্মগ্রহণ করি, যেখানে নেই সৈন্য ও সামরিক দখলদারি; নেই বন্দিশিবির আর নিত্যদিনের যাতনা। আমার বাবা তার সন্তানদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়েছেন, আর কঠিন পরিশ্রম করেছেন জীবনের দুঃখকষ্ট আর অব্যাহত ভালোবাসার মধ্যে ভারসাম্য রাখার জন্য।
যখন বড় হলাম ও শৈশবের ওই সব ফ্যান্টাসির কথা স্মরণ করলাম, আমি উপনীত হলাম সম্পূর্ণ ভিন্ন এক উপসংহারে। যদি পারতাম, আমার অতীতের পুনরাবৃত্তি করতাম, এই অতীতকে বদলাতাম না কোনোভাবেই, অতীত যতই কঠিন হোক না কেন। অতীত দিনের প্রতিটি মুহূর্তকে আলিঙ্গন করতাম। প্রতিটি অশ্রুবিন্দু আর প্রত্যেক ক্ষতির পুনরাবৃত্তি ঘটাতাম। প্রতিটি বিজয় আবার উদযাপন করতাম, সে বিজয় যত ক্ষুদ্র হোক।
যখন বয়স থাকে কম, তখন আমাদের বলা হয় না যে, ব্যথাবেদনা ও দুঃখ-যাতনাকে ভয় করা উচিত নয়। শেখানো হয় না যে, একজন মানুষের পরিচিতির বিকাশ, জীবনের লক্ষ্যবোধ ও মানবিক চেতনার মুক্তির ক্ষেত্রে অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চেয়ে বড় পুরস্কার আর কিছু হতে পারে না। দাসত্বকে কখনো হজম করতে নেই, কিংবা ভুক্তভোগী হয়ে থাকাও উচিত নয়। দারিদ্র্য, যুদ্ধ ও অবিচারের প্রতিরোধ হচ্ছে আরো অর্থবহ অস্তিত্ব এবং উন্নততর জীবনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক প্রয়োজনীয় শর্ত।
এটা বলছি, কারণ আমি বুঝি তোমাদের অনেকে কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করছ। উদ্বাস্তুশিবিরবাসীদের মধ্যে যায় আমাদের প্রজন্ম, তারা এ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। আর তখন কেমন সহিংসতা বিরাজ করছিল, তা তোমরা কখনো কল্পনাও করতে পারবে না। মানবজাতির বেশির ভাগেরই জন্যই এখন বছরগুলো কঠিন চ্যালেঞ্জ বটে। তবে এ কথাটা বেশি সত্য, বিশেষ করে তোমাদের মতো তরুণ মুসলমানদের বেলায়। মার্কিন ও ইউরোপিয়ান রাজনীতিকদের বর্ণবাদের মধ্যে মুসলিমবিরোধী মনোভাবে পৃথিবীর বেশির ভাগই প্লাবিত। এ ক্ষেত্রে, স্বার্থপর ব্যক্তিরা জঘন্য অ্যাজেন্ডা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। তারা মানুষের ভীতি ও অজ্ঞতা নিয়ে খেলছে। সহিংসতা ও পাল্টা সহিংসতা (নিজেদের মুসলমান বলে দাবিদার কিছু গ্রুপ জড়িত) তাদের পুঁজি। এমন এক অবস্থায় তোমরা নিজেদের দেখছ ফাঁদে পড়া অবস্থায় এবং গতানুগতিকতা, মিডিয়ার ঘৃণা প্রচার ও সহিংসতার কারাগারে বন্দী হিসেবে। তোমরা দেখছ যে, তোমাদের টার্গেট করা হয়েছে; বিশেষ কোনো তকমা এঁটে দেয়া হয়েছে এবং তোমাদের ভীতির পাত্র বানানো হয়েছে অন্যায়ভাবে।
তোমাদের বেশির ভাগই জন্মগ্রহণ করেছে এবং বড় হয়েছে ওই সামাজিক ও রাজনৈতিক বন্দিত্বের মধ্যে। এমন কোনো সময়ের কথা তোমাদের মনে পড়ে না, যখন জীবন কিছুটা স্বাভাবিক ছিল; যখন তোমরা দুনিয়ার বেশির ভাগ ভ্রান্তির ক্ষেত্রে ‘বলির পাঁঠা’ হয়ে যাওনি। বাস্তবে তোমাদের স্বভাবচরিত্র গঠিত হয়েছে এই পক্ষপাতদুষ্ট বাস্তবতার ভিত্তিতে। তোমাদের বেঁচে থাকতে হয় দুর্ব্যবহারজনিত ক্রোধ, আত্মরক্ষার মরিয়া প্রয়াস, পরিবারের দেখাশোনা এবং নিজের কমিউনিটি, কালচার ও ধর্মের সপক্ষে দাঁড়ানোর মধ্যে।
সবচেয়ে গুরুত্ববহ হচ্ছে, তোমাদের প্রতিদিন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য। যেসব সমাজে তোমরা নিজেদের দেখতে পাও প্রত্যাখ্যাত ও বর্জিত হিসেবে, সেখানে নাগরিকত্ব অর্জনের সংগ্রাম করতে হয়। ‘ওরা’ চায়, ওদের সমাজে তোমরা মিশে যাও। কিন্তু যখন তোমরা তাদের কাছে যাও, তারা ঠেলে তোমাদের দূরে সরিয়ে দেয়। তাই মনে হয়, তোমাদের কাজটা অসম্ভব হয়ে উঠছে। ভুলভাবে তোমাদের তুলে ধরা এবং তোমাদের ধর্মের মহান মূল্যবোধগুলোর ভুল উপস্থাপনের বিরুদ্ধে তোমাদের ধাক্কা দেয়ার কাজটি এখনো বাকি। ওদের বর্ণবিদ্বেষ দিন দিন বাড়ছে মনে হয়। তোমরা তাদের বোঝানোর জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা চালালেও তাদের ঘৃণার প্রতিটি বেপরোয়া তীরের টার্গেট হচ্ছে ইসলাম।
প্রথম কথা হলো- কেন ইসলামের প্রসঙ্গ এনেছি, তোমরা কদাচিৎ তা উপলব্ধি করে থাকো। ইসলাম কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ করার জন্য যেতে আমন্ত্রণ জানায়নি। তোমাদের সভ্যতার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ এবং বিশ্বের অন্যান্য অংশে মুসলমানদের দুর্দশা সৃষ্টি করতেও বলা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রকে।
মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনকানুনের বাইরে গিয়ে গুয়ান্তানামো বন্দিশিবির তৈরি করার সময়ে ইসলামে পরামর্শ কী তা জানতে চাওয়া হয়নি। সম্পূর্ণরূপে আত্মস্বার্থ প্রণোদিত রাজনৈতিক মতলবে বিবদমান পক্ষগুলো সিরিয়া, ইরাক, লিবিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান প্রভৃতি স্থানে যুদ্ধে লিপ্ত। সেখানে ইসলাম মোটেও সম্পৃক্ত নয়।
ইহুদিবাদী মিলিশিয়া ব্রিটিশের সহায়তায় ফিলিস্তিনকে পদানত করেছে। পরে তা করা হয়েছে আমেরিকার সাহায্য নিয়ে। এতে বিগত শতাব্দীর বেশির ভাগ সময়েই পবিত্রভূমি পরিণত হয়েছে রণাঙ্গনে। স্থায়ী যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতের পাদপীঠে পর্যবসিত হয়েছে অঞ্চলটি। ইসলাম তো এ সব কিছুর জন্য দায়ী নয়।
এমন বহু নজিরই তুলে ধরা যায়, যা জেনে তোমরা নিজেরাও বিস্মিত হয়ে থাকো। উপনিবেশবাদে ও সাম্রাজ্যবাদ ইসলামের উদ্ভাবন নয়। বরং ইসলাম এশিয়া, আফ্রিকা ও আরবের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছে এসব নিষ্ঠুর অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য। পাইকারি হারে দাস বানানোর পথ তো ইসলাম দেখায়নি। অথচ, আমেরিকা-ইউরোপে কয়েক মিলিয়ন দাস ছিল মুসলমান।
ওদের এসব কথা জানাতে চেষ্টা করো। জোর দিয়ে বলো, আইএসের মতো ভয়াবহ গ্রুপগুলোর জন্ম ইসলাম দেয়নি। বরং এগুলো জন্ম নিয়েছে সহিংসতা, লোভ এবং বিদেশের হস্তক্ষেপের বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে। কিন্তু ‘ওরা’ এসব কথায় কান না দিয়ে পবিত্র গ্রন্থ থেকে সুবিধামতো কিছু কথা ব্যবহার করে থাকে। অথচ, এই আয়াতগুলো দিয়ে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি বোঝানো হয়েছিল। কুরআন শরিফের এমন আয়াতও তোমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছ যাতে উল্লেখ করা হয়েছে- ‘যদি কেউ একজন ব্যক্তিকে হত্যা করে, সে যেন পুরো মানবজাতিকে হত্যা করল এবং যদি কেউ একটি জীবন বাঁচায়, যেন সে গোটা মানবজাতির জীবন বাঁচিয়েছে’ (সূরা আল মায়িদাহ; আয়াত ৩২)। তোমার ধর্মে মানুষের জীবনের পবিত্রতাকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; তার কিছু উপলব্ধির আশা করা যায় এই আয়াত তুলে ধরে। তবে দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন আজো আসেনি।
তাই তোমরা হতাশা বোধ করো- তোমাদের অন্তত কেউ কেউ। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে বসবাসকারী কেউ কেউ অন্যদের জানাতে চায় না যে, তারা নিজেরা মুসলমান। সেসব দেশের সমাজে অসহিষ্ণুতা ক্রমে বাড়ছে। তাই তারা এমন কোনো কথাবার্তা এড়িয়ে চলে, যা তাদের সমাজচ্যুত করতে পারে। অপর দিকে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর কিছু লোক দুঃখজনকভাবে ঘৃণার জবাব দিচ্ছে ঘৃণা দিয়ে।
আমি যেমন ছোটবেলায় ভাবতাম, সম্ভবত তোমরাও ভেবে থাকো, ভিন্ন সময় ও স্থানে তোমরা বাস করলে কেমন হতো। কিন্তু এ সব কিছু সত্ত্বেও আমাদের এটা মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, জীবনের বোঝাগুলো ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক বিকাশের জন্য সর্বোত্তম শিক্ষা দিতে পারে। অবশ্যই তোমাদের বুঝতে হবে, একদল মানুষ ইতিহাসের ‘সামষ্টিক পরীক্ষা’ দেয়া থেকে বেঁচে গেছে। তারা নির্যাতন, বর্ণবাদ, অব্যাহত যুদ্ধবিগ্রহ, জাতিগত নিমূল অভিযানেরও শিকার হয়নি। মুসলমানেরা সিরিয়া ও ফিলিস্তিন থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা পর্যন্ত সর্বত্র এসব কিছুর শিকার হচ্ছে।
এসব কষ্ট ও যাতনা অতিক্রমের জন্য তোমাদের অবশ্যই প্রথমে জানতে হবে- তোমরা কারা। নিজেদের মূল্যবাধ ও পরিচয়ের জন্য তোমাদের হতে হবে গর্বিত। ঘৃণার মোকাবেলায় ভালোবাসা থেকে কখনো বিরত হওয়া চলবে না। তোমাদের পৌঁছতে হবে অন্যদের কাছে। শিক্ষা দিতে ও সচেতন করতে হবে অন্যদের। কারণ, তোমরা যদি বসে থাকো, বর্ণবিদ্বেষ জয়ী হবে এবং তোমরা এই অনন্য সুযোগ হারিয়ে ফেলবে।
মাঝে মধ্যে ওদের জন্য আমার করুণা হয়, যারা অনেক সুযোগ-সুবিধার মধ্যে জন্ম নিয়েছে। যদিও তাদের আর্থিক ও বৈষয়িক সুবিধা আছে, তাদের সে অভিজ্ঞতা নেই, যা পাওয়া যায় অভাব ও দুর্ভোগ থেকে। দুঃখ ও বেদনা যে জ্ঞান দেয়, তার সাথে কিছুই তুলনীয় নয়।
যখন তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা জন্ম নেয়, তখন স্মরণ করতে চেষ্টা করো, আল্লাহ ‘কাউকে তার সাধ্যাতীত কোনো কাজের ভার দেন না।’ (সূরা বাকারা, আয়াত ২৮৬)
ড. রামজি বারুদ
[কাউন্টার কারেন্টস ডট অর্গ-এর সৌজন্যে]
লেখক : ড. রামজি বারুদ ২০ বছর ধরে লিখছেন মধ্যপ্রাচ্যের ওপর। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত কলামিস্ট, গ্রন্থকার ও মিডিয়া কনসালট্যান্ট। তার উল্লেখযোগ্য বই : সার্চিং জেনিন, দ্য সেকেন্ড প্যালেস্টাইনিয়ান ইন্তিফাদা এবং সর্বশেষ লেখা- মাই ফাদার ওয়াজ অ্যা ফ্রিডম ফাইটার : গাজাস আনটোল্ড স্টোরি।’
ভাষান্তর : মীযানুল করীম

ওলামা লীগ কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে by মাসুদ মজুমদার

জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ওলামা লীগ
শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষানীতি ও পাঠ্যসূচি নিয়ে জাতি এখনো কোনো উপসংহারে পৌঁছেনি। বারবার দাবি উঠলেও সার্বজনীন দাবির ভিত্তিতে কোনো একক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তাদের মর্জি ও দলীয় ভাবনার প্রতিফলন ঘটানো হয়। বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে ব্যাপক সাফল্য দাবি করে, কিন্তু শিক্ষানীতি নিয়ে মৌলিক কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন, পাঠ্যসূচি রদবদলই এ সরকারের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে। প্রশ্নপত্র সৃজনশীল হবে কি হবে না, তাই গুরুত্ব পেয়েছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সরকার কোনো দৃঢ়তা দেখাতে পারেনি, বরং দলীয়করণ হয়েছে যাচ্ছেতাইভাবে। তারা জোর দিয়েছে দলীয় মর্জির প্রতিফলন ঘটানোর দিকে। তাই ধর্মনিরপেক্ষ হতে গিয়ে ধর্মহীন হতে চলেছে। মূলধারার আলেম-ওলামাদের মৌলবাদী, জঙ্গি ও চরমপন্থী সাজাতে গিয়ে ধর্মীয় নেতার চেয়ে খলনায়কের মতোই উপস্থাপন করেছে। বাংলা ভাই ও শায়খ রহমানসহ ক’জন ব্যতিক্রম চরিত্রের মানুষের সাথে সব আলেম-ওলামা ও পীর, মাশায়েখদের শ্রেণী চরিত্র গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। ধর্মশিক্ষা সঙ্কোচন করে, ইতিহাস পাল্টে, জাতির শিকড় ও ঐতিহ্য উপড়ে ফেলতে সচেষ্ট রয়েছে। ইসলামকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিপক্ষে তুলে ধরতে গিয়ে এক ধরনের বজ্জাতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তারই কিছু প্রতিক্রিয়া এখন দৃশ্যমান। অনেক প্রতিক্রিয়া বাদ রেখে আজ না হয় ওলামা লীগ প্রসঙ্গে আসা যাক।
‘বর্তমান শিক্ষা সিলেবাসের মাধ্যমে পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষাদানের নামে কোমলমতি মুসলিম শিশু-কিশোরদের এমন সব বিষয় শেখানো হচ্ছে, যা বিস্ময়কর। এসব বিষয় পড়ে কোমলমতি মুসলিম শিক্ষার্থীরা সঠিক আকিদা থেকে ভ্রষ্ট হচ্ছে। নষ্ট হচ্ছে তাদের ঈমান-আকিদা, যা ৯৫ শতাংশ মুসলমান অধ্যুষিত দেশে কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ সিলেবাস দিয়ে জামায়াতি-হেফাজতিদের আন্দোলনের ইস্যু করার সুযোগ সৃষ্টির পথ খোলাসা করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। এ কাজ বন্ধ করতে হবে এবং সরকারকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের থেকে বিচ্ছিন্ন করার গভীর ষড়যন্ত্রও প্রতিহত করতে হবে।’
একটি জাতীয় দৈনিকের বরাতে ওপরের তথ্যটি উদ্ধৃত করলাম। এ বক্তব্যগুলো বাংলাদেশ আওয়ামী ওলামা লীগসহ কথিত সমমনা ১৩টি ইসলামি সংগঠনের। তাদের আরো যেসব বক্তব্য রয়েছে তা তুলে ধরা আমরা সমীচীন মনে করিনি। কারণ তাতে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হিন্দুদের প্রতি বিদ্বেষ ফুটে উঠবে। কিছু কথিত প্রগতিশীল ভাবনা আক্রান্ত হবে। আমরা মনে করি, কোনো ব্যাপারে পক্ষে বলাটাই যথেষ্ট। বিপক্ষে বলা সব সময় জরুরি নয়। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ওলামা লীগের এত সব রগড়ে মন্তব্যধর্মী বক্তব্য নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ, জবাবী বক্তব্য, ব্যাখ্যা, ভিন্নমত কিছুই চোখে পড়েনি। তাহলে আমরা কী বুঝব? এটা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ‘উৎপাত’, এবং সাম্প্রদায়িকতার চাষবাস মাত্র। তা না হলে ধরে নিতে হবে- এসব অভিযোগ সত্য এবং আমলে নেয়ার মতো। উপমা হিসেবে ওলামা লীগের পক্ষ থেকে তথ্য দেয়া হয়েছে : ‘প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত গল্প ও কবিতার সংখ্যা ১৯৩টি। এর মধ্যে হিন্দু ও নাস্তিকদের লেখার সংখ্যা হলো ১৩৭টি, যা সর্বনিম্ন শতকরা ৫৭ ভাগ থেকে সর্বোচ্চ ৮২ ভাগ প্রাধান্য পেয়েছে। অবশিষ্ট ১৮ থেকে ৪৩ ভাগের মধ্যেও উদ্দেশ্যমূলকভাবে হজরত নবী-রাসূল আলাইহিমুস সালাম এবং আওলিয়ায়ে কেরামগণের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’ একই সংগঠন থেকে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র পালের প্রশ্রয়ে অধিকাংশ পাঠ্যপুস্তকে অন্য ধর্মীয় তত্ত্ববাদ ঢোকানো হয়েছে। ৯৫ ভাগ মুসলমানের দেশে মুসলমানি রীতি-ঐতিহ্য বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণে পাঠ্যপুস্তকে ইসলাম ও মুসলমানবিদ্বেষী প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, শব্দ প্রাধান্য দিয়ে ইসলামবিরোধী চেতনা প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমান সিলেবাস ও পাঠ্যসূচি দেখলে মনে হয়, এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এ দেশের কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের তাদের আত্মপরিচয় ভুলিয়ে অন্য ধর্মের আদর্শে প্রবেশ করানো।’ একই সভায় বলা হয়, ‘সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এ দেশে প্রত্যেকটি নাগরিক সাংবিধানিকভাবে তার ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণ করে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সব মুসলিম ছাত্রছাত্রীও তাদের সাংবিধানিক অধিকার সংরক্ষণ করার দাবি রাখে। পড়ালেখার মাধ্যমে তারা এমন কোনো কিছু শিখবে না, যা দিয়ে তাদের ঈমান ও আকিদা ধ্বংস হয়, এটা অবশ্যই তাদের সাংবিধানিক অধিকার। অথচ পাঠ্যপুস্তকের নামে অবুঝ ছাত্রছাত্রীদের যা শেখানো হচ্ছে তা নির্মম ধোঁকাবাজি ছাড়া অন্য কিছু নয়, এটা অবশ্যই তাদের সাংবিধানিক ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ন করার শামিল।’
এদের সব বক্তব্য হয়তো সমর্থনযোগ্য নয়। তারা কোন ‘আকিদা’ বুঝায় তাও জানি না। তবে তাদের বক্তব্যে কিছু দিক আছে, যেসব কথায় কিছু রূঢ় বাস্তবতা দৃশ্যমান। আবার অনেক অসঙ্গতিও দৃষ্টি এড়ায় না।
রেসক্লাবের সামনে ওলামা লীগের সংঘর্ষ
এ ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট ও খোলামেলা। তাদের দেয়া তথ্যগুলো কতটা হাওয়াই, কী পরিমাণ বস্তুনিষ্ঠ তা খতিয়ে দেখতে দোষ কী? এ প্রসঙ্গে আমাদের জিজ্ঞাসা ওলামা লীগ কি সত্যি আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন! সরকার পরিচালনা করছে আওয়ামী লীগ। এরা মূল দলের অনুমোদন নিয়ে এসব বক্তব্য দিচ্ছে তো! প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা, মাইক লাগিয়ে জনসভা করে এসব বক্তব্য দেয়া সরকারের অগোচরে কিভাবে হতে পারে! গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোথায়! পুলিশ কেন নির্লিপ্ত! ওলামা লীগের বক্তব্যের ধরন আলাদা, কিন্তু হেফাজতসহ অপরাপর ধর্মপন্থী দলগুলো এসব বক্তব্য আরো গোছালোভাবে যুক্তিনির্ভর করে উপস্থাপন করে। বরং তাদের বক্তব্য কারো বিরুদ্ধে হয় না, তাদের দাবির সপক্ষের হয় যেমন হেফাজতের দাবিগুলো। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন একজন সুশীল প্রকৃতির মন্ত্রী। তিনি এক সময় মস্কোপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। বাম ধারার রাজনীতি করেছেন। তাতে কি; তিনি তো বাঙালি মুসলমানের গড়পড়তা শ্রেণী চরিত্র পাল্টাননি। এখন তো তিনি বাম ঘরানার সাথে শখ্য বজায় রেখেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছেন। মন্ত্রণালয় চালাচ্ছেন তারই তত্ত্বাবধানে। যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তা তো প্রকারান্তরে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই তোলা হচ্ছে। তা হলে কেউ কি সর্প হয়ে দংশন করছে, আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ফুঁক দিচ্ছে? যারা এসব বক্তব্য দিচ্ছেন তারা শেখ হাসিনার ‘হায়াতে তৈয়বার জন্য দোয়া মুনাজাত করেন’, আবার তার সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলছেন- এই স্ববিরোধিতা কেন, কারা তাদের মাঠে নামিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতির স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে ‘নাটক’ করাচ্ছেন।
একজন আলেম ব্যক্তিগতভাবে দফতরে এসে জানিয়েছেন, কুরআনি মক্তবগুলো আগের মতো চালু নেই। কওমি মাদরাসা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা হচ্ছে। জঙ্গি অর্থায়নের ভীতি ছড়িয়ে দিয়ে দান-সদকা অনুদান খয়রাতি সাহায্য নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। আলিয়া ধারা না স্কুল, না মাদরাসা। স্কুলেও ধর্মশিক্ষার বিষয়টি এখন সঙ্কুচিত। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য আলাদা মৌলভি মাওলানা কিংবা হিন্দু পণ্ডিত রাখা হয় না। হিন্দু শিক্ষকও ইসলাম ধর্ম শিক্ষা পড়ান। মুসলিম শিক্ষকও হিন্দু ধর্ম শিক্ষার পাঠদান করেন। আমাদের স্কুলজীবন শেষ হয়েছে ১৯৬৬-৬৭ সালে। তখন স্কুলে দ্বীনিয়াত ও ইসলাম ধর্ম শিক্ষার জন্য আলাদা হুজুর ছিলেন। ফেনী পাইলট হাইস্কুলে আমরা বড় হুজুর, ছোট হুজুর নামে দু’জন ধর্মীয় শিক্ষক পেয়েছি। হিন্দু ছাত্ররা ব্যাকরণ শিক্ষক ভট্টাচার্য স্যারের কাছে হিন্দু ধর্ম শিক্ষার পাঠ নিত। কখনো কখনো ব্রজলাল স্যারও হিন্দু ধর্মের ক্লাস নিতেন।
ওলামা লীগের দুই অংশে সংঘর্ষ
এখন স্কুলগুলোতে নারী শিক্ষক নেয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। এটি অনেক দিনের প্রত্যাশিত। তবে স্কুল পর্যায় ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি মোটেও প্রাধান্য পাচ্ছে না। অথচ দেশে হাজার হাজার মাদরাসাপড়ুয়া লোক রয়েছেন। যাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে ছাত্রছাত্রীরা যেমন উপকৃত হবে, মাদরাসাপড়ুয়াদের যোগ্যতা অনুযায়ী সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল স্রোতে তাদের আত্তীকরণ কল্যাণকরও বিবেচিত হবে। আলেম সমাজের দীর্ঘ দিনের একটি দাবিও পূরণ করা সম্ভব হবে। আমরা পরিবারের গণ্ডির বাইরে মক্তবে কুরআন শিক্ষার সবক নিয়েছি। এর বাইরে স্কুলজীবনের শুরুতেই ধর্মশিক্ষার প্রাথমিক ধারণা পেয়েছি। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় আমরা সিলেবাস অনুযায়ী ৪০টি হাদিস মুখস্থ করেছিলাম। মদিনা সনদের মৌলিক কথাগুলো পড়ানো হয়েছে। বিদায় হজের ভাষণ আমরা পড়েছি অষ্টম শ্রেণীতেই। জানি না ধর্মশিক্ষা এখন এতটা উপেক্ষিত কেন। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান যে যার ধর্ম জানুক, মানুক, নৈতিক জ্ঞান অর্জন করুক, এটা তো সবার চাওয়া হওয়া উচিত। এখন ধর্মের বিকৃত উপস্থাপনার অভিযোগ ওঠে। ধর্মশিক্ষা এড়ানোর কথা বলা হয়। এরই ফলে ব্লগার নামে একটা ধর্মবিদ্বেষী শ্রেণী জন্ম নিয়েছে। ধর্ম-কর্ম কটাক্ষ করলে নাকি প্রগতিশীল হয়। সব ধর্ম প্রগতির মশাল জ্বালিয়ে শুরু হয়েছে। শাসকেরাই ধর্মকে জীবন থেকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছে, জনগণ নয়। ধর্ম না জানার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সম্পর্ক ও বৈপরীত্য কোথায়- এখনো জানলাম না। এখন পর্যন্ত সব ধার্মিক মানুষ যে ধর্মেরই হোক তারা ভালো মানুষ। তাদের নীতি-নৈতিকতাও উন্নত মানের। ধর্ম যারা জানে ও মানে, তারা আর যাই হোক অন্য ধর্ম নিয়ে বিদ্বিষ্ট হন না। সাম্প্রদায়িকতাও পোষণ করেন না। তারা এখনো বেশি প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। আমানতের হেফাজত করে। সহজেই পাপ করতে ও অপরাধে জড়াতে চান না। বলেন তো সত্য বলেন। অবশ্য বকধার্মিক এবং মুনাফিকদের কথা এবং লেবাছধারী ভণ্ডদের কথা আলাদা।
ওলামা লীগ সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ একেবারেই কম। এর প্রধান কারণ আমরা এদের শ্রেণী চরিত্র বুঝি না। মাইন্ডসেট জানি না। তারপরও আমরা বিবেচনায় নিতে চাই তাদের বক্তব্যগুলো সত্য কি না। যদি সত্য হয় সরকার দায় নেবে না কেন। মিথ্যা হলে ধর্মের নামে রাজনীতি করার অধিকার তাদেরও থাকা উচিত নয়। শাসকেরা সাধারণত তাদের অনুগত ও আশ্রিত একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী লালনপালন করে। অনেক দেশেই দরবারি আলেম, ধর্মগুরু ও পাদ্রি থাকে। এখনো আছে। বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষ ধারণায় এটাকে অপরিহার্য ভাবা হয়। এদের মাধ্যমে শাসকেরা জনগণের ধর্মপ্রীতিকে এক্সপ্লয়েট করে। এরা এক দিকে শাসকদের বৈধতা দেয়। অন্য দিকে ধর্মের পিউরিটার্ন কনসেপ্টকে ঠেকাতে শাসকদের সাহায্য করে। বাংলাদেশের শাসকেরা ব্যতিক্রম নন। সরকার যখন কোনো ইস্যুতে বক্তব্য দিতে চায় না, কিন্তু ভারসাম্য রক্ষার জন্য কিছু একটা করা দরকার, তখন এদের অনুগত ও আশ্রিতদের ব্যবহার করে। চেতনার সওদাগররা যেমন অনুগত এবং পোষ্য, তেমনি দরবারি আলেমরাও তাই। শাসকেরা সাধারণত একই ঝুড়িতে সাপ ও বেজি রাখে। একই ঘরে মুরগি ও শিয়াল পোষে। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য, ভাগ করে শাসন করার জন্য এমনটি করা হয়।
ইতিহাস যতটা পড়েছি, জীবনের যে বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছি, তাতে নিশ্চিত হয়েছি শাসকেরা ধর্ম মানেন না, মানার ভান করেন। ম্যাকিয়াভেলিও শিখিয়েছেন, ধর্ম মানো বা নাই মানো, মানার ভান করো। শিয়ালের মতো ধূর্ত, বাঘের মতো হিংস্র না হলে তাদেরকে ম্যাকিয়াভেলি শাসকের যোগ্য ভাবেননি। বাংলাদেশের মানুষ যে ধর্মেরই অনুসারী হোক, তারা চরমপন্থায় যায় না। কেউ গেলে ঠেকায়। তাদের সাম্প্রদায়িক চৈতন্য ষোলআনা চাঙা, কিন্তু সামান্য সাম্প্রদায়িকতাকেও এরা ঘৃণা করে। ধর্মীয় সংখ্যানুপাত বিসর্জন দিয়ে কাউকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিলে কিংবা ভোটব্যাংক হিসেবে আনুগত্য আদায় করতে অনৈতিক ছাড় দিলে বাংলাদেশের মানুষ টের পায়। সুযোগের অপেক্ষা করে। এর জন্য প্রতিশোধের খাজনা ট্যাক্স শাসকদেরই শোধ করতে হয়।
masud2151@gmail.com

আসলেই কি বাল্টিক আক্রমণ করবে রাশিয়া? by আসিফ হাসান

আন্তর্জাতিক অঙ্গন এখন বেশ উত্তপ্ত। ইরানের সাথে পাশ্চাত্য বিশ্বের বিরোধ অবসানের পর মনে হচ্ছিল, বিশ্বজুড়ে শান্তির বাতাস বইতে শুরু করবে। কিন্তু তা না হয়ে বরং নতুন করে অশান্তি শুরু হয়েছে। আর এতে রাশিয়ার ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন নিয়ে ন্যাটোর সাথে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রায় লেগেই গিয়েছিল। ক্রিমিয়ার পর ইউক্রেনের একটি অংশও রাশিয়া দখল করে নেবে কি না সে জল্পনা-কল্পনা চলছে। সেই উত্তেজনা একটু কমার আগেই সিরিয়া নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। সিরিয়ায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যকে রুখে দিতে রাশিয়া দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। প্রত্যক্ষ রুশ সমর্থন পেয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদও বেশ চাঙ্গা হয়ে উঠেছেন।
এমন এক প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান র‌্যান্ড করপোরেশন সম্প্রতি যুদ্ধ যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কৌতূহলপূর্ণ দৃশ্যপট উপহার দিয়েছে। র‌্যান্ডের বিশ্লেষক ডেভিড এ শ্লাপক ও মাইকেল জনসনের ‘রেইফরসিং ডিটারেন্স অন ন্যাটোস ইস্টার্ন ফ্রন্ট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে মূলত দুটি প্রশ্নের জবাব খোঁজার প্রয়াস চালানো হয় : রাশিয়া যদি বাল্টিক দেশ ও অঞ্চলটি পুনরায় নিজের করে নিতে চায়, তবে কী ঘটবে? এবং ন্যাটোর ভীতি এড়িয়ে সে কিভাবে কাজটি করবে?
প্রতিবেদনটিতে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে যে চিত্র আঁকা হয়েছে তা হলো : রাশিয়ার জর্জিয়া আক্রমণ, ক্রিমিয়াকে নিজের করে নেয়া এবং এর পরপরই ইউক্রেনে হস্তক্ষেপে গত দুই দশক ধরে ইউরোপে যে শান্তি তুলনামূলক স্থিতিশীল বৈশ্বিক-ব্যবস্থা ছিল তাতে চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হয়েছে। রাশিয়ার সামর্থ্য এবং সেই সাথে উদ্দেশ্য নিয়ে যে প্রশ্নই থাকুক না কেন, এটা স্বীকার করতেই হবে, সাবেক সোভিয়েত বলয়ভুক্ত এলাকায় সামরিকভাবে প্রাধান্য সৃষ্টির মতো সামর্থ্য এখনো আছে দেশটির।
প্রতিবেদনটিতে রাশিয়া বাল্টিক আক্রমণ করলে বাজে পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ন্যাটোর বর্তমান যে শক্তি রয়েছে, তা দিয়ে রুশ অগ্রগতি ঠেকানো সম্ভব নয়। রাশিয়া মাত্র তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে রিগা, তালিন ও ভিলনিয়াসে পৌঁছে যেতে পারবে। সাবেক সোভিয়েত আমলের ছায়া হওয়ায় রাশিয়া ভালোভাবেই ওই এলাকায় প্রবেশ করে বাল্টিক প্রতিরক্ষাকে তছনছ করে ফেলতে পারবে।
প্রতিবেদনটিতে ন্যাটো ও রাশিয়ার শক্তি কাঠামোর মধ্যকার পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। ন্যাটো বাহিনীর ১২টি ব্যাটালিয়ন থাকলেও সেগুলো মূলত হালকা কৌশলগত। আর রুশ ব্যাটালিয়নগুলো অনেক বেশি শক্তির, যান্ত্রিক। এমনকি রুশ বিমানবাহী ব্যাটালিয়নগুলোও তাদের ন্যাটো প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি সক্ষম।
এমন এক পরিস্থিতিতে ন্যাটো হয়তো কেবল তার আক্রমণাত্মক বিমানশক্তির ওপর নির্ভর করবে। এতে রুশ বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে। কিন্তু তাতে তাদের অগ্রগতি প্রতিরোধ করার সম্ভাবনা থাকবে খুবই কম। রাশিয়াও তাদের বিমান শক্তির সমর্থনে এবং বিমানবিধ্বংসী অস্ত্রের সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে।
তবে এমন হলে বাল্টিক রাষ্ট্রগুলো পড়বে আরো সমস্যায়। চেচেন বিদ্রোহের সময় রুশ বাহিনী যেভাবে রাজধানী গ্রোজনিকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, রাশিয়া-ন্যাটো সঙ্ঘাতে বাল্টিক নগরীগুলোর অবস্থাও তেমন হতে পারে।
দ্বিতীয় বিকল্পটি হলো স্নায়ুযুদ্ধকালীন পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি। সেক্ষেত্রে ‘মিচুয়ালি এসুরড ডেস্ট্রাকশন (এমএডি)’ সক্রিয় হয়ে উঠবে।
আর তৃতীয়টি হলো নতুন একটি স্নায়ুযুদ্ধের সৃষ্টি। এমনটা হলে ক্রিমিয়ার মতো বাল্টিকও রাশিয়ার বলে গ্রহণ করে নিতে হবে।
তাহলে রাশিয়াকে মোকাবিলা করা যায় কিভাবে? র‌্যান্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ন্যাটো যদি তার সাত ডিভিশন সৈন্য বাল্টিক এলাকায় মোতায়েন করে, তবেই কেবল রাশিয়াকে সেখানে অভিযান চালাতে বিরত রাখা সম্ভব হতে পারে।
প্রতিবেদনটি তাত্ত্বিকভাবে খুবই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু বাস্তবে অনেক প্রশ্নের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে, সামরিক অভিযান কতটুকু নির্ভুল হবে? আর এতে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটার সংস্থান হবে কিভাবে?
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নেরও সৃষ্টি হয়। বাল্টিক অঞ্চল দখল করে রাশিয়া কি করবে? এতে রাশিয়ার কি লাভ হবে? আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থায়ীভাবে রাশিয়া যে ক্ষতির শিকার হবে, সেটা কিভাবে দূর করবে?
তবে এগুলোর চেয়েও বড় কথা, বাল্টিক এলাকায় রাশিয়া হামলা চালাবে, সেটাকে দখল করবে, এমন কোনো আলামত কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। এই যেমন জর্জিয়ার উদাহরণটির কথা বলা যায়। ২০০৮ সালে অনেক সহজেই পুরো জর্জিয়া কিংবা এর কোনো অংশ দখল করে নিতে পারত। আবার সম্প্রতি ক্রিমিয়া দখল করে নিলেও পূর্ব ইউক্রেনে তেমনটি করার কোনো ইঙ্গিত দেখায়নি। এ নিয়ে ‘নভোরোসিয়া প্রজেক্ট’ নামের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে বলে পাশ্চাত্য মিডিয়া যে খবর প্রকাশ করছে, রাশিয়া সেটাও অস্বীকার করেছে। বরং বর্তমানে রাশিয়া মনে করছে, দখল করার চেয়ে সেখানে সঙ্ঘাতে ইন্ধন দিয়ে যাওয়ায় তার জন্য লাভজনক।
ন্যাটোর সাথে রাশিয়া স্বাভাবিক কারণেই যুদ্ধে অংশ নিতে চাইবে না। ন্যাটোর সাথে যুদ্ধ মানেই বিপুল ক্ষতি। কেবল রাশিয়ার নয়, বিশ্ব পর্যায়েই বিপর্যয় সৃষ্টি।
রাশিয়া স্বাভাবিকভাবেই এমন কোনো ঝুঁকি নিতে চাইবে না। তারা বরং তাদের স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আবার র‌্যান্ড রিপোর্টে যেমন বলা হয়েছে, আমেরিকার ভূমিকা তার উল্টা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রই ন্যাটোকে পূর্বগামী অগ্রযাত্রার যেকোনো পরিস্থিতি প্রথম সুযোগেই কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। ন্যাটো পূর্ব ইউরোপে প্রাধান্য বিস্তার করলে রাশিয়াকে নিজ ঘর সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকতে হবে। আর এতে করে মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য স্থানে মাথা ঘামানোর সুযোগই পাবে না বলে পাশ্চাত্যের অনেকে মনে করেন।
দ্বিতীয় আরেকটি বিকল্প পাশ্চাত্য গ্রহণ করতে পারে। সেটা হলো ন্যাটোকে তিনটি ব্লকে ভাগ করার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, রাশিয়ার ভয়ে সরাসরি ভীত এমনসব দেশ যেমন পোল্যান্ড, বাল্টিক দেশগুলো ও ইউক্রেন ন্যাটোর ইস্টার্ন ব্লক হিসেবে থাকতে পারে। তারা মার্কিন ছত্রছায়ায় একটি যৌথ কমান্ডে কাজ করবে। রুশ আক্রমণের মুখে তারা দ্রুত যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে ন্যাটোর বেশ দেরি হয়। ইস্টার্ন ব্লক হলে তারা নিজেরাই গোয়েন্দা তথ্য সহজে সংগ্রহ করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
এমন প্রেক্ষাপটে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, র‌্যান্ডের মতো প্রতিবেদনগুলো আসলে স্থিতিশীলতার সম্ভাবনা সৃষ্টির বদলে সহিংসতা উসকে দেয়ার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমন ধরনের রিপোর্টের ফলে ন্যাটো-রাশিয়া উত্তেজনা বাড়লে কারো জন্যই তা সুখকর হবে না।

মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে পশ্চিমাদের আরো নমনীয় হতে হবে by সুমাইয়া ঘানুশি

পশ্চিমারা সেনা সরিয়ে নিচ্ছে। একই সাথে অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকতে শুরু করেছে। যদিও তাদের আওয়াজ এখনো কমেনি। এখনো তারা নিজেদের প্রভু এবং অন্য দেশ-মহাদেশের ভাগ্য নির্ধারক বলে মনে করে। রাশিয়া, ইউক্রেন বা জর্জিয়া পূর্বের অংশ না পশ্চিমের? তুরস্কেরই বা অবস্থান কোথায়? এই দেশটির সর্ববৃহৎ শহর ইস্তাম্বুলে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ লোক বাস করে। ইউরোপে (?) এটিই হলো তৃতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল শহর। আর বলকানদের অবস্থাই বা কী? ওসমানীয় সাম্র্রাজ্যের নির্যাতনের চিহ্ন কি তারা আজো বয়ে চলেছে? সমাজতন্ত্রের বিষয়েই বা তাদের অভিজ্ঞতা কেমন হচ্ছে? তারা কাদের অংশ? পূর্বের না পশ্চিমের?
পশ্চিমাদের অবস্থান কি শুধুই ভৌগোলিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারণ করা হয়? অবশ্যই না। তাহলে তো অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের অবস্থান হতো এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায়। আর ইসরাইলের অবস্থান হতো আরব বিশ্বের মাঝখানে। তারা কোনো অবস্থাতেই ‘পশ্চিমা বিশ্বের’ অংশ হতো না। পশ্চিমা বিশ্বের যে সীমান্তরেখা আমরা আঁকি তা অনেকাংশেই কল্পনাপ্রসূত; বাস্তবভিত্তিক নয়। আবার সুনির্দিষ্টও নয়। রাজনীতি আর ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে অবিরাম এর সীমানা পাল্টাচ্ছে। অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজনৈতিক আদেশ দেয়ার কেন্দ্র ছিল লন্ডন। তাদের পরের অবস্থানই ছিল প্যারিসের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে। মোড়লের স্থানে গিয়ে বসে ওয়াশিংটন।
পশ্চিমের প্রাধান্য আজো প্রায় একই রকম। ক্ষমতা, উন্নতি, কারণ ও সৃজনশীলতা- সব ক্ষেত্রেই চালকের আসনে রয়েছে এরাই। পশ্চিমারা নিজেদের যেভাবে উপস্থাপন করে এবং বাস্তবিক অর্থে তারা যা, এর মধ্যে বেশ কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। বিশেষ করে তাদের নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাধান্য এবং বিশ্বের নেতৃত্ব দানকারী হিসেবে পরিচিতি। প্রাচ্যের ওপর তাদের প্রাধান্য দীর্ঘ দিনের। প্রাচ্য যে শুধু সামরিক, অর্থনৈতিক বা প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে, তাই নয়; বরং নৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবেও পশ্চাৎপদ, স্বৈরতান্ত্রিক, বদ্ধ ও অধীন।
সাংস্কৃতিকভাবে পশ্চিমারা বরাবরই নিজেদের সর্বোৎকৃষ্ট মনে করে আসছে। অবশ্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ঊনবিংশ বা বিংশ শতাব্দীতে পশ্চিমারা যা ছিল, তা আজ আর নেই। বিশ্বমোড়লের স্থানটি লন্ডন বা প্যারিসে না থেকে ওয়াশিংটনে চলে গেছে। এর অবস্থান বিশ্বের পশ্চিমাংশে নয়।
আমরা বহু মেরুর এক বিশ্বে বাস করি। যেটাকে অনেকেই কোনো মেরুমুখী ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে চান না। বাস্তবতা হলো, আজকের পৃথিবীতে এমন কোনো একক শক্তি নেই, যারা যেকোনো সঙ্কটকে নিজের উপায়ে বা তাদের দৃষ্টিতে সঠিক- এমন পদ্ধতিতে মিটিয়ে ফেলতে পারে।
বিশ্বব্যবস্থা এখন বহুমাত্রিক। এর কেন্দ্র ছড়িয়ে গেছে চীন, রাশিয়া, ভারত, জাপান বা ব্রাজিলে। বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক নয়, আঞ্চলিক পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রতিবেশীদের ওপর ইরান, তুরস্ক, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, মেক্সিকো ও ভেনিজুয়েলার প্রভাব বাড়ছে। এ ব্যাপারে তারা লন্ডন বা ওয়াশিংটনকেও ছাড়িয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে- বিশেষ করে সিরিয়া, মিসর, ইরাক, লিবিয়া অথবা ইয়েমেনে যা ঘটছে, তা ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজিত এবং সেনা সরাতে বাধ্য হওয়ার কারণে সৃষ্ট শূন্যতার ফলাফল।
এমনকি, রাষ্ট্রহীন কিছু গোষ্ঠীও ‘বৃহৎ শক্তিগুলোর’ চেয়ে জোরদার প্রভাব রাখতে সক্ষম হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলোর বেসামরিক ও সামরিক শক্তিও রয়েছে; যেমন- হামাস বা হিজবুল্লাহ। আবার ইসলামিক স্টেট (আইএস), আলকায়েদার মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও রয়েছে।
এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ এখন আর ওয়াশিংটন, লন্ডন বা প্যারিসের হাতে নেই। আরব বসন্তের সময়ই এরা বিস্ময়ে হতবাক হয়েছে। নিয়ন্ত্রণহীনতার সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্তই ছিল ওটা। এরপর প্রতিবিপ্লবের যে ধারা দেখা যাচ্ছে, এর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। প্রতি ক্ষেত্রেই তারা চালকের আসনে বসার চেষ্টা করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা খুব একটা সাফল্য পায়নি। এ দু’টি বিষয়ই তারা শুধু দেখে গেছে নীরব দর্শকের মতো।
মিসরের উদাহরণই নেয়া যাক, ২৫ জানুয়ারি যে বিপ্লবটি ঘটেছিল, তার মূল নায়ক সাধারণ মানুষ। এরপর ঘটনা এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব নেয় সেনাবাহিনী। তখনকার প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল তারা। এরপর রঙ্গমঞ্চে আসে উপসাগরীয় দেশগুলো। মিসরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করেছে তারা। এখন দেশটি আবারো সামরিক শাসনের অধীনে। পরিস্থিতি মোবারকের আমলের চেয়েও খারাপ।
সিরিয়ার ক্ষেত্রে এক দিকে ইরান ও রাশিয়া এবং অপর দিকে তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতার খেলে যাচ্ছে। ইরাকের ক্ষেত্রে খেলছে ইরান এবং আইএস। আর অতিরিক্ত খেলোয়াড়ের ভূমিকায় সাইড লাইনে বসে রয়েছে পশ্চিমারা। তিউনিসিয়ায় রাজনৈতিক অচলাবস্থা, মধ্যস্থতা এবং সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কাজটি হয়েছে অভ্যন্তরীণভাবেই। উত্তর আফ্রিকার এই দেশটিতে পশ্চিমাদের প্রভাব এ ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়নি। প্রতিবেশী লিবিয়ার ক্ষেত্রে তাদের বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বা ফ্রান্সের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব দেখা গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর, তুরস্ক ও কাতারের।
সুমাইয়া ঘানুশি
সংক্ষেপে বলতে গেলে, আজ আমরা এমন এক পশ্চিমাকে দেখছি, যারা সেনাবাহিনী প্রত্যাহারে বাধ্য হয়; যাদের অর্থনীতি সঙ্কুচিত হয়ে আসছে, যদিও প্রভুদের মতো কথা বলার স্বভাব এখনো তাদের যায়নি। এখন তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো নম্রতার শিক্ষা নেয়া। তাদের আচরণ, ধরন, ভাষার ব্যবহার এবং স্ব-আরোপিত ভাবমূর্তিতে নমনীয় হতে হবে।
[সুমাইয়া ঘানুশি ব্রিটিশ-তিউনিসীয় লেখক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ। মিডল ইস্ট আই-এ সম্প্রতি প্রকাশিত ও আলোচিত এ কলামটির অনুবাদ করেছেন তানজিলা কাওকাব]

পরিবর্তনশীল অঞ্চলে ইরানের বিপজ্জনক ভূমিকা by মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সাফল্য দেখে হয়তো মনে হতে পারে এটা একটা পরীক্ষা। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার যে হুমকি দিয়েছিল তার মনে হয় অবসান হতে যাচ্ছে। অথবা অন্তত বলা যায়, অবসান শুরু হলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটি বিশ্বের একটি পরিবর্তনশীল এলাকায় বিপজ্জনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। পাশের দেশগুলোর জঙ্গি গ্রুপগুলোকে সমর্থনদান এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্কট সমাধানের সুযোগকে গোপনে ক্ষতিগ্রস্ত করার ব্যাপারে তেহরানের একটি দীর্ঘ ট্রেক রের্কড রয়েছে।
ইরাকে ইরানের প্রক্সি যুদ্ধের কারণে সেখানে কর্মরত শত শত মার্কিন সৈন্যের মৃত্যুর জন্য এবং বাসার আল আসাদের প্রতি ইরানের আর্থিক ও সামরিক সমর্থনের কারণে সিরীয় নেতা তার নিজের লোকদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হচ্ছেন।
কিন্তু পরমাণু চুক্তি হচ্ছে একটি ইঙ্গিত, যা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হওয়ার একটি পথ খুলে দিয়েছে। এতে হয়তো ইরানের অভ্যন্তরে বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণপ্রক্রিয়া জোরদার হবে। ইরানের শাসনব্যবস্থায় আমেরিকাকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্ব নয় শত্রুতা জোরদার করাই হচ্ছে ইরানি সেন্টিমেন্ট। সম্প্রতি মার্কিন নাবিকদের ইরানি পানিসীমায় প্রবেশের পর তাদের যেভাবে অপমান ও হয়রানি করা হয় তাতে ইরানের উগ্র মার্কিনবিরোধী সেন্টিমেন্টই প্রকাশ হয়েছে। অথচ মার্কিন নাবিকেরা অনিচ্ছাকৃতভাবেই ইরানের পানিসীমায় প্রবেশ করেছিল। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন যে অগ্রগতি হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে তা ইরানি আদর্শ ও কৌশলগত স্বার্থকে অবশ্যাম্ভাবী পরিবর্তন করতে পারবে না। আর সে কারণেই ইরান মার্কিন নাবিকদের সাথে ওই ধরনের ব্যবহার করছে।
যাই হোক না কেন পরমাণু চুক্তির মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত ব্যয়-সুবিধা মূল্যায়নের ভিত্তিতে ইরানের বাস্তবভিত্তিক নীতিনির্ধারণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার প্রতি সাম্প্রতিক প্রমাণ দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পরে ইরানের অভ্যন্তরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হয়তো জোরদার হয়ে একটি বাঁক নিতে পারে। চূড়ান্তাভাবে সমঝোতা এবং জটিল ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিক্ত সম্পর্ককে দক্ষতার সাতে মোকাবেলা করা ব্যতীত ইরানি হুমকি সম্পূর্ণভাবে উপশম করা যাবে না।
সবার জন্য সঙ্কট সৃষ্টির দিকে তেহরানের ঝোঁক রয়েছে। তাদের আঞ্চলিক প্রভাবকে প্রায়ই অনেকটা বাড়িয়ে দেখানো হয়। আর ভয় দেখিয়ে নিবৃত্ত করায় আমেরিকান ক্ষমতা বা সামর্থ্য এখন আগের মতো নেই বলা চলে। ওই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার জন্যে অবশ্য এককভাবে ইরানই দায়ী নয়। মধ্যপ্রাচ্যের আরব শক্তিগুলো যাদের বেশির ভাগই হচ্ছে আমেরিকার মিত্রÑ ওই অঞ্চলে চরমপন্থা, গোষ্ঠীতন্ত্র ইত্যাদির ইন্ধন যুগিয়ে সেখানে সঙ্ঘাত ছড়িয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ওইসব মারাত্মক চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে আমেরিকার অধিকতর কার্যকর কৌশল ব্যতীত ইরানি হুমকির ব্যাপারে কোনো সমাধান আশা করা যায় না।

‘রবীন্দ্রনাথ নয়, গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দিয়েছিলেন একজন সাংবাদিক’

‘মহাত্মা গান্ধী’ নামেই তিনি বিশ্বব্যাপী পরিচিত। তার আসল নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী হলেও এ নামটি ‘মহাত্মা গান্ধী’ নামের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। এমনকি ‘মহাত্মা’ বললেও প্রথমে তার কথাই বুঝে থাকেন ভারতীয়রা। ভারতীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেন ১৯১৫ সালে। এত দিন পর্যন্ত এই তথ্য নিয়ে কারও মনেই কোনো ধরনের প্রশ্ন ছিল না। তবে এবারে এ তথ্যটিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে গুজরাটের সরকার। তাদের দাবি- রবি ঠাকুর নয়, গান্ধীজিকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দিয়েছিলেন গুজরাটেরই তৎকালীন এক অখ্যাত সাংবাদিক। এ খবর দিয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া। খবরে বলা হয়, গান্ধীকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মহাত্মা’ উপাধিতে ভূষিত করার প্রচলিত ঐতিহাসিক তথ্যটি ভুল দাবি করেছে গুজরাট সরকার। রাজকোটের জেলা পঞ্চায়েত শিক্ষণ সমিতি এই বিষয়ে প্রখ্যাত গান্ধীবাদী গবেষক নারায়ণ দেশাইয়ের গবেষণাকর্মকে প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সৌরাষ্ট্রের জেতপুরের এক নাম না জানা সাংবাদিক এক চিঠিতে প্রথম গান্ধীকে এই উপাধি দেন। ওই সময়ে গান্ধী দক্ষিণ আফ্রিকায় অবস্থান করছিলেন। গুজরাট হাইকোর্টে জেলা পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি হলফনামাও দাখিল করা হয়েছে। এতেও ওই সাংবাদিকের নাম জানা যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিতর্কের শুরু অবশ্য একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে। রাজকোটসহ আশপাশের আরও কয়েকটি জেলার রাজস্ব বিভাগের একটি নিয়োগ পরীক্ষায় ‘গান্ধীকে ‘মহাত্মা’ উপাধি কে দেন?’ প্রশ্নটি আসে। এমসিকিউ পদ্ধতির এই প্রশ্নের সম্ভাব্য চারটি উত্তরের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম ছিল শুরুতেই। শেষের সম্ভাব্য উত্তরে ছিল এক অজ্ঞাত সাংবাদিক। এই প্রশ্নের উত্তরে শুরুতে রবীন্দ্রনাথকেই সঠিক উত্তর হিসেবে গণ্য করা হয়। পরে তা বদলে দিয়ে অজ্ঞাত সাংবাদিকের অপশনটিকে সঠিক বলে ঘোষণা করা হয়। কেন এমনটি করা হয়েছে, তা জানতে চেয়েই গুজরাটের হাইকোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করেন ওই পরীক্ষায় অংশ নেয়া এক চাকরিপ্রার্থী। সন্ধ্যা মারু নামের ওই শিক্ষার্থী পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এমন আরও কয়েকটি বিতর্কের কথাও উল্লেখ করেন। পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক জে বি পারদিওয়ালা ক্ষুব্ধ হন এবং জেলা পঞ্চায়েতের আইনজীবী এইচ এস মুনশ’র কাছে জানতে চান তিনি এই প্রশ্নের উত্তরে কী লিখতেন। মুনশ জানান, তিনি এই প্রশ্নের উত্তরে রবীন্দ্রনাথের নামটিই লিখতেন। কারণ, তিনি ছোটবেলা থেকেই এই উত্তর জেনে এসেছেন বলে জানান বিচারককে। এরপর বিচারক পারদিওয়ালা নিয়োগকারী সংস্থার কাছে জানতে চান, স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা না দিয়েই কেন এই উত্তর বদলে দেয়া হয়েছে। প্রশ্নোত্তরে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা না রেখে পরীক্ষা গ্রহণের জন্যও নির্দেশনা দেন তিনি। আগামীকাল (বুধবার) এই রিটের পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা ও কিছু প্রশ্ন by কাজল ঘোষ

সবশেষ খবর অনুযায়ী ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ৬৪টি। আর টাকার হিসাবে কত হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে তা আর না-ই বললাম। শোনা যাচ্ছে, আরও অনেক সচেতন সরকার সমর্থক মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কোর্ট বারান্দায়। দলের আস্থাভাজন বলে পরিচিতি পাবার এর চেয়ে সহজ রাস্তা আর কী হতে পারে? সুতরাং এই সুযোগ কেউই মিস করতে চান না। প্রশ্ন জাগে, পঁচিশ বছরের সম্পাদনা জীবনে ডেইলি স্টার সম্পাদক কি এমন ভুল করলেন? আর এই ভুল স্বীকারের পরপরই সরকার সমর্থকরা কেউ মানহানি আর কেউ রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা টুকে দিচ্ছেন? তবে যেভাবে মামলা দেয়ার হিড়িক চলছে তাতে এদেশে আর কেউ কখনও ভুল স্বীকারের সৎ সাহস ভুল করেও দেখাবেন না। এটি সম্ভবত আমাদের চালাক রাজনীতিকরা জানেন। না হলে স্বাধীনতার ৪৫ বছরে কোনো ভুলের জন্য রাজনীতিকদের দায় স্বীকার করতে দেখা যায়নি। তাত্ত্বিকভাবে দেখলে, সাংবাদিকতায় ভুল হওয়া দোষের কিছু নয়। যদি সেই দোষের দায় নিয়ে সংশোধনের চেষ্টা হয়ে থাকে তবে তা পেশার সৌন্দর্যই বৃদ্ধি করে। কিন্তু যদি তা হয় চাপের কাছে বাধ্য হয়ে। ওয়ান ইলেভেনে যা ঘটেছিল এ দেশে। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন আর যারা বাইরে আছেন এ দেশের সচেতন নাগরিক মাত্রেই কী ঘটেছিল সেদিন তা অজানা নয়? তাহলে মাহফুজ আনাম সাংবাদিকতার সেই কালো অধ্যায়ের জন্য ভুল স্বীকার করায় বড় অপরাধ করে ফেললেন? আর সেই সরকারের ফসল হিসেবে ক্ষমতায় এলেন তাদের কোনো ভুল নেই। সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ? এদেশের আমজনতা কি সত্যিই সব ভুলে গিয়েছে?  নার্সিজম বলে পৌরাণিক একটি মিথ প্রচলিত আছে। এতে নার্সিসাস নিজের সৌন্দর্যে এতোই মুগ্ধ যে সবসময় সে আয়নায় কেবল নিজের চেহারাই দেখে থাকে। ধীরে ধীরে বদ্ধমূল ধারণা হয় নার্সিসাসের যে তিনিই হচ্ছেন বিশ্বের সেরা সৌন্দর্যের অধিকারী। তার সমকক্ষ কেউ নেই। ক্ষমতাসীনদেরও এখনও সেই অবস্থা। নিজেদের সবাই নার্সিসাস ভাবছেন। না হলে ওয়ান ইলেভেনে সুবিধাভোগী, মাইনাস ফরমুলার সঙ্গে যুক্তরাই বর্তমানে ক্ষমতার কেন্দ্রে অথচ তাদের ক্ষেত্রে বিচারের পরিবর্তে উলটোটাই ঘটছে। ক্ষমতার আয়নায় এরা সকলেই নিজেদের সাফসুতরো ভাবছেন। পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটলে দুর্গন্ধ বেরুতে শুরু করবে। লম্বা কথাই না গিয়ে শুধু কিছু প্রশ্ন যারা আজ মাহফুজ আনামের বিচার চাইছেন, পদত্যাগ চাইছেন, মামলা করছেন বিনয়ের সঙ্গে তাদের কাছে জানতে চাই-
শুরু থেকেই বর্তমানের সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে বলা হয়েছে ওয়ান ইলেভেন তাদের আন্দোলনের ফসল। বিএনপির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে এটা আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র। আর দৃশ্যত দেখা যাচ্ছে ক্ষমতায় এসেছে আওয়মী লীগ। তাছাড়া ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগতো ওয়ান ইলেভেনের একজন হোতাকেও কাঠগড়ায় নেয়নি। তাহলে সরল সমীকরণ কী বলে সে সময়ের অন্তর্বর্তী সরকার ছিল একটি অঙ্কের হিসাব।
যারা সেদিন টিএফআই সেলে জবানবন্দি দিয়েছিলেন তারাই এখন মন্ত্রিসভায় আছেন। সরকারের নীতিনির্ধারণী পদও অলংকৃত করছেন। অনেকেই সরকারের ক্ষমতা আরোহণের পরপরই ওয়ান ইলেভেনের হোতাদের বিচারও চেয়েছেন। কিন্তু অদৃশ্য কোনো এক রহস্যজনক কারণে সবাই বেলুনের মতো চুপসে গেছেন- এটা ভেবে দেখার মতো।
যারা আজ প্রকাশ্যে বড় বড় কথা বলছেন, ওয়ান ইলেভেনের সরকারের সমালোচনা করছেন সরকারের সেই বেশিরভাগ নেতারা সেদিন কোথায় ছিলেন জরুরি জমানায়? হিসাব মিলালে দেখা যাবে সে সময় প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়েছিল গণতন্ত্রের পক্ষে।
টিএফআই সেলে যে সকল নেতা সেদিন জবানবন্দি দিয়েছেন সেসকল দলিল ইন্টারনেট আর ইউটিউবে পাওয়া যায়। মাইনাস ফর্মুলা আর সংস্কারের নামে পরিবারতন্ত্রের বিরুদ্ধাচারণ করতে যে সকল নেতারা চেয়েছেন তাদের মন্ত্রিত্ব দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়েছে। সংস্থা বিশেষের বক্তব্য যারা পাঠিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত বা ব্যবস্থা না নিয়ে এখন উলটোই করা হচ্ছে।
ওয়ান ইলেভেনের পরপর যারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত তাদের দায়মুক্তি ফিরে ফিরে আলোচনায় আছে। প্রকাশ্যে ঘোষণাও দেয়া হয়েছে। কার্যত তা করাও হয়েছে। সে সময়ের জড়িতদের একজনকেও কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। অথচ সেদিনের সে ভুলের দায় স্বীকারের জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে শুধু একজন সম্পাদককে।
জরুরি জামানায় সংস্কার চেয়ে নানারকমের দৌড়ঝাঁপ করেছেন বড় দুদলের নেতারা। আর এর পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন খোদ শীর্ষ নেতৃত্বও। বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছেন দুই শীর্ষ নেত্রী। সে সময়ের বক্তব্য-বিবৃতি পরীক্ষা করে দেখলেই সকলের সত্যিকার চেহারা বেরিয়ে আসবে।
পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় দৈনিকসমূহেও ভুল হয়ে থাকে। তা সংশোধনেরও সুযোগ থাকে। তাছাড়া দেখা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের সময় আমেরিকা-বৃটেনসহ অনেক দেশেই রাজনৈতিক দলকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়া হয়। হিসেব অনুযায়ী যে দল সমর্থন দিয়েছে যদি তারা হেরে যায় তাহলেতো পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল বা বন্ধ করে দেয়ার কথা কিন্তু সে নজির কোথাও নেই।   
মূল বিষয় হচ্ছে, আমাদের সকল ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতার বড্ড অভাব। না হলে জরুরি জমানায় গণমাধ্যম কর্মীদেরই সবচেয়ে বেশি চাপ সইতে হয়েছে। গণতন্ত্রের জন্য সরব ভূমিকা নিয়েছে গণমাধ্যমই। সে সময় প্রকাশিত অসংখ্য সম্পাদকীয় আর প্রচারিত টকশোর আলোচনা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হওয়া যাবে। কিন্তু যারা দুর্বল গণতন্ত্রের জামানায় গণমাধ্যমকে চাপে ফেলতে আদাজল খেয়ে নেমেছেন তারা একবার নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করুন? সঠিক দায়িত্ব পালন না করায় একজন সম্পাদক সত্য স্বীকার করে দৃঢ়চিত্তের পরিচয় দিয়েছেন। আর যারা সেদিন প্রকাশ্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন তারা কিছু না শুনে বা কিছু না দেখার ভান করে উটপাখির মতো মাটির নিচে মাথা লুকিয়েছেন। জরুরি জমানায় গণমাধ্যমের কোথায় কোথায় ভুল ছিল তা নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু গণমাধ্যমের ওপর নানারকমের চাপ প্রয়োগ করে আখেরে ক্ষতি হবে দেশটারই। যদি পেছনে ফিরতে হয়, তবে ক্ষমতায় থাকা ও ক্ষমতার বাইরে থাকা অনেককেই ক্ষমা চাইতে হবে, বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

দক্ষিণ চীন সাগরে ‘ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে’ চীন

দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত একটি দ্বীপে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করেছে চীন। স্যাটেলাইটের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, আটটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য ও একটি রাডার ব্যবস্থার জন্য দুটি ব্যাটারি বসানো হয়েছে। এগুলো নিয়ে উডি বা ইয়ংসিং দ্বীপে নামানো হয়েছে পার্সেল। ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে তাইওয়ান। তবে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং য়ি এসব রিপোর্টকে পশ্চিমাদের বানানো বলে দাবি করেছেন। বেইজিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলি বিশপের সঙ্গে সাক্ষাতের পাশাপাশি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দক্ষিণ চীন সাগরে লাইটহাউজ বা আলোকবর্তিকা বসানো হয়েছে। সেটাকে ভুল করে এভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে মিডিয়ায়। জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।  এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে দীর্ঘদিন প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদি সত্যি চীন সেখানে ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করে তাহলে তাতে সেই উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পাবে। উডি দ্বীপকে চীনারা বলে থাকেন ইয়ংসিং দ্বীপ। কাছে এনে দেখানো হয়েছে সেখানকার সৈকত। তাতে দেখা যায় উত্তরাঞ্চলীয় উপকূলে বেশ কিছু জিনিস। তার মধ্যে রয়েছে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যাটারি। প্রতিটি ব্যাটারিতে রয়েছে চারটি লঞ্চার ও দুটি নিয়ন্ত্রণ যান।

ভারত কার মা, কার কাকিমা?

দেশদ্রোহী? ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ। জওহরলাল
নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি। ছবি: পিটিআই
ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় এসে একটি সরল সমীকরণের চল করেছে: কেউ দেশের নিন্দে করলেই, সে দেশদ্রোহী। আর দেশদ্রোহীকে ধরা-মারা হবে, আশ্চর্য কী? বিজেপি-র এক সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয় জেএনইউ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘যারা ভারতে থেকে পাকিস্তানের গুণ গায়, তাদের জিভ টেনে ছিঁড়ে নেওয়া যায় না?’ পরে আপশোস করেছেন, অবশ্য না, এটা তো গণতন্ত্র। এ যে কতটা খেদের বিষয়, এই উদ্ভট তন্ত্রটি এসে শয়তানদের উচিত-শাস্তি দেওয়া থেকে পবিত্র দেশপ্রেমিকদের বিরত রাখছে, তা নিয়ে এঁদের মুহুর্মুহু দীর্ঘশ্বাস। এঁরা ভারতকে গরগরে গণধোলাইধর্মী রাষ্ট্র করে তুলতে চান।
স্মৃতি ইরানি মেলোড্রামার লাইন নিয়েছেন। ‘এরা আমার মা’কে অপমান করেছে!’ ভারত কার মা, কার কাকিমা, প্রশ্নটা কিন্তু তা নয়। বরং, এই ‘মা, মা’ নাটুকে সম্বোধনটা বারবার আবৃত্তির মধ্যে একটা খুব বিপজ্জনক ফতোয়া নিহিত আছে। তা হল: ভারত যেহেতু আমাদের মা, সেহেতু তার নামে কিচ্ছুই বলা চলবে না। ধরা যাক, কারও মা পকেটমার। বা বিচ্ছিরি রকমের অভদ্র। বা খুনি। সে ক্ষেত্রে সন্তানের কর্তব্য কি হাতজোড় করে তাঁকে পুজো করা ও বলা, ‘মা যেমনই হোক, যা-ই করুক, আমি তবু মা’কে ভালবেসে চলব’? না কি, প্রকৃত সন্তানের কর্তব্য, মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলা, ‘মা, তোমার এই কাজগুলো আমার ভাল লাগছে না, এগুলো করলে কিন্তু আমি তোমাকে আর শ্রদ্ধা করতে পারব না।’ সন্তানের কাজ কি মা’কে নিঃশর্ত প্রেম ও শ্রদ্ধা করা, মা’র কাজ কি নয় সন্তানের প্রেম ও শ্রদ্ধার যোগ্য হয়ে ওঠা? আসলে, এক বার বদন ভরে ‘মা’ বলে দিলেই একটা আবেগ-থরথর চারিয়ে দেওয়া যায়। হাওয়ায় হিস্টিরিয়া বেড়ে যায়। এটা সচেতন ভাবে করা হয়, যাতে এই উত্তেজনাটা কাজে লাগিয়ে, অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলো চেপে দেওয়া যায়, আর সমালোচকদের ওপর অত্যাচারটা জাস্টিফাই করে নেওয়া যায়।
জেএনইউ-এর কিছু ছাত্র কী করেছেন? আফজল গুরুর ফাঁসির প্রতিবাদ করেছেন, ভারতের বিরুদ্ধে ও পাকিস্তানের সমর্থনে স্লোগান দিয়েছেন। কাশ্মীরকে স্বাধীনতা দাও, এ স্লোগানও তোলা হয়েছে। তাতে ঝামেলাটা কোথায়? আমি যদি ভারতকে ভীষণ ভালবাসি, তা হলেও তার যাচ্ছেতাই নিন্দে করতে পারি। তাকে আরও ভাল করে তোলার জন্য, শোধরানোর জন্য, আমার মতে তাকে এক আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য, রোজ তার তুমুল নিন্দে করে চিৎকার জুড়তে পারি। অনেকে বলছেন, ‘যেখানকার ভাত খেয়েছ, সেখানটাকে অপমান করছ কেন?’ আরে, এখানকার ভাত খেয়েছি খাচ্ছি খাব বলেই তো সেই ভাতে পোকা পড়লে চেঁচাবার অধিকার আমার সবচেয়ে বেশি! আমার বাড়ির সামনে নর্দমা খোলা থাকলে আমি চেঁচামেচি করব না তো কে করবে? আমার দেশ যদি বদ হয়, অসভ্য হয়, অসৎ হয়, অপদার্থ হয়, বা আমার পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, আমি রে-রে করে উঠব না? অবশ্যই করব। ভাত খেয়েছি বলে দাসখত লিখে দিইনি। আমি দেশের চাকর নই। আমি দেশের দায়িত্ববান নাগরিক। নাগরিকের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হল, দেশের ভুল দেখলে, তা নিয়ে সরব হওয়া। যাঁরা উদ্ধত ভাবে বলছেন, ‘হয় চুপ করে থাক, নইলে পাকিস্তানে চলে যা!’, তাঁরা ভাবছেন, অন্ধ ভাবে সরকারের হ্যাঁ-য়ে হ্যাঁ মিলিয়ে যাওয়াকে বলে দেশপ্রেম। আর চারিদিকে চেয়ে দেখে ভুল ধরাকে বলে দেশদ্রোহিতা। বরং উলটো। দেশপ্রেম মানে স্তাবকতা নয়। ফেল করা ছেলেকে যে লোক পিঠ চাপড়ে ‘বহুত অাচ্ছা’ বলে, সে তার উন্নতি চায় না, অধঃপাতের রাস্তাটাই সুগম করে। দেশ খারাপ কাজ করলে, তার নিন্দে না করে চুপ করে থাকাটাও অনেক সময় দেশদ্রোহ। দেশের নিন্দে করা আর দেশকে না-ভালবাসা এক নয়।
আবার, দেশকে না-ভালবাসার অধিকারও আমার আলবাত আছে। ভারতে থেকে আমি ভারতকেও ভালবাসতে পারি, ভারত এবং ব্রাজিলকে ভালবাসতে পারি, আবার ভারতকে না ভালবেসে শুধু বেলজিয়ামকে ভালবাসতে পারি। আবার, কোনও দেশকে না ভালবেসে, সব দেশ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত থাকতেও পারি। আমি কাকে ভালবাসব, আর কাকে ভালবাসব না, তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার কারও নেই। ‘এক্ষুনি ভালবাস বলছি, নইলে পেটাব’— এ তো ধর্ষকের উচ্চারণ। ভারতে থেকে আমি যদি পাকিস্তানকে ভালবেসে গলা ফাটাই, তা আমার অধিকার। নিজের মতো ভাবনার অধিকার। মত প্রকাশের অধিকার, বাক্‌স্বাধীনতার অধিকার। আমেরিকা যখন ভিয়েতনামের সঙ্গে যুদ্ধ করছে, সারা পৃথিবীর কোটি কোটি লোক আমেরিকার বিরুদ্ধে চিৎকার করে গলা ফাটিয়েছে। আমেরিকার মধ্যেও লাখ লাখ আমেরিকান, আমেরিকার বিরুদ্ধে চিৎকার করেছে। ‘যুদ্ধবাজ, দাদাগিরি-করা, জঘন্য রাষ্ট্র’ বলে গাল দিয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ যদি বলত, ‘আমি আমেরিকায় থাকব বটে, কিন্তু এর কাজকম্ম দেখে আমার ভালবাসা ঘুচে গেছে, আজ থেকে একে প্রাণ দিয়ে ঘেন্না করব’, তাতে অন্যায় কী? ঠিকই, একটা জায়গায় জন্মে গেলে, লোকে সাধারণত সেই জায়গাটাকে ও চারপাশের লোকজনকে ভালবেসে ফেলে। বাচ্চা প্রথম থেকে বাবা-মা’কে দেখে, তাদের ভালবেসে ফেলে। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু স্বাভাবিক বলেই বাধ্যতামূলক হবে কেন? সন্তানকে এই ফতোয়া দেওয়া যায় কি, ‘মা-বাবাকে না ভালবাসলে তোর মুন্ডু ছিঁড়ে নেব’? বড়জোর বলা যায়, ‘বুড়ো বয়সে মা-বাবাকে তোমায় দেখতেই হবে।’ অর্থাৎ, অনুশাসনটা কর্তব্য বিষয়ে, ভালবাসা বিষয়ে নয়। আমি যদি নাগরিকের যা যা কর্তব্য সব পালন করি, ট্যাক্স দিই, দেশের সম্পত্তি নষ্ট না করি, অন্য নাগরিককে না মারি-ধরি, তা হলে আমি ‘অ্যায় মেরে বতন কে লোগো’ শুনে কাঁদছি, না, ‘যত্ত প্যানপেনে আদিখ্যেতা’ বলে খ্যালখ্যাল হাসছি, তা দেখে সরকারের লেঠেল তো আমায় তাড়া করতে পারে না।
আরও: স্রেফ কাছ-ঘেঁষাঘেঁষির চোটে যে ভালবাসা, তার চেয়ে বুঝেশুনে যে ভালবাসা, তা কি অ-কুলীন? আমি যদি অনেকগুলো দেশের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে ওজন বিশ্লেষণ বিচার করে, তার পর মনে করি সুইডেনই পৃথিবীর সেরা দেশ, তা হলে সুইডেনের প্রতি আমার যে ভালবাসা, তা হল জেনে, দেখে, ভেবে ভালবাসা। আর সিঁথির মোড়ে জন্মেছি বলেই সিঁথির মোড়ের প্রতি আমার যে ভালবাসা, তা বরং একটু মাঠো, সংকীর্ণ, প্রতিবর্ত-ক্রিয়া টাইপ ভালবাসা। ভাবা দরকার: ওটা ভালবাসা তো, নাকি স্রেফ একটা অভ্যাস, রোজ ন’টায় বাথরুম যাই বলে শরীর ন’টাতেই ‘বেগ এসেছে’ বলে ওঠে যে রকম। কেউ ভৌগোলিক গণ্ডি নির্ধারিত ভালবাসাকে উড়িয়ে দিয়ে বলতেই পারে, আমি সারা পৃথিবীর সম্তান, কোনও নির্দিষ্ট দেশের প্রতি আমার আনুগত্য নেই, যখন যেটাকে ভাল দেখব, ভালবাসব, যা খারাপ দেখব, খারাপ বলব। ভারতের সব, সমস্ত জিনিসকে আমার খারাপ লাগে, তবু আমি এখানে থাকব। কারণ এটা পৃথিবীর একটা অংশ, আমি থাকতেই পারি। আমাকে এখান থেকে উৎখাত করার গা-জোয়ারি যে দেখাবে, সে গুন্ডা। অন্য জায়গায় যাচ্ছি না কেন? হয়তো সামর্থ্য নেই। একটা এঁদো ড্যাম্প দশ ফুট বাই দশ ফুট বাড়িতে থাকি বলে প্রতি  দিন নিয়ম করে ‘ইস, সাউথ সিটির তেত্রিশ তলা এর চেয়ে অনেক ভাল’ বলতে পারব না?
কেউ বলতেই পারেন, বাপু, দেশে থেকে দেশকে যাচ্ছেতাই নিন্দে করার অধিকার যদি তোমার থাকে, তোমার ওপর ভয়াবহ রেগে যাওয়ার অধিকারও তো আমার আছে। আমি দেশকে ভালবাসি, তা তো আমার অপরাধ নয়। অবশ্যই নয়। দেশকে আপনি উন্মত্ত ভালবাসতে পারেন, এবং জেএনইউ-এর স্লোগান-দেওয়া ছাত্রদের প্রতি প্রকাণ্ড রেগে যা-তা বলতে পারেন। তাঁদের বিরুদ্ধে মিছিল করুন, মিটিং করুন, কাগজে চিঠি লিখুন, টিভিতে ইন্টারভিউ দিন। তাঁরা যত চিৎকার করেছেন তার দশ গুণ চিৎকার করুন। এও তো বাক্‌স্বাধীনতাই। কিন্তু পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া হল কেন? ছাত্র সংসদের নেতাকে গ্রেফতার করা হল কেন? দেশদ্রোহের চার্জ আনা হচ্ছে কেন? দেশের নিন্দে ও অন্য দেশের সমর্থন মানে তো দেশদ্রোহ নয়। ইন্দিরা গাঁধীর মৃত্যুর পর শিখদের এক সভায় খালিস্তানের সমর্থনে স্লোগান তোলা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টে তা-ও সিডিশন বা দেশদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হয়নি। আইন অনুযায়ী: হিংসা বা গণ-বিশৃঙ্খলায় প্ররোচনা দিলে, তবেই তা দেশদ্রোহ। অর্থাৎ, কেউ যদি ব্রিজ উড়িয়ে দেয়, সেটা দেশদ্রোহ। কেউ যদি বলে, চলুন এই মিছিলের সবাই মিলে গিয়ে এক্ষুনি অমুক সম্প্রদায়ের বাড়িতে বাড়িতে আগুন লাগাই, এবং সবাইকে তা করতে উসকানি দেয়, তা হলে সেটা দেশদ্রোহ।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, উসকানি কাকে বলে? কতটা ওসকালে তবে ‘সিডিশন’? কেউ বলতেই পারে, আফজল গুরুর ফাঁসির বিরুদ্ধে স্লোগান তোলাও এক রকম উসকানি, তা থেকে অনেকের মনে ভারতবিরোধী আবেগ জেগে উঠতে পারে, আর তারা সবাই হিংসাত্মক হয়ে দেশের মানুষ ও সম্পত্তির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। তা পারে, কিন্তু ওই রকম ভাবে দেখতে গেলে তো কেউ যদি বলে ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতা ভাল লাগে না’, তা হলে তা থেকে প্রেরণা সংগ্রহ করে কেউ বিশ্বভারতীতে আগুন লাগিয়েও দিতে পারে। সেই আশঙ্কায় রবীন্দ্রনিন্দুকটিকে এক্ষুনি দমকলের লোক গিয়ে পেটাতে শুরু করতে পারে কি? পৃথিবীর যে কোনও মতামতের মধ্যেই কাউকে চটিয়ে দেওয়ার উপাদান থাকতে পারে, রাজনৈতিক মতামতের মধ্যে তো বটেই। পৃথিবীর যে কোনও উঁচু-গলায় নিন্দে বা স্লোগানের মধ্যে এই ইচ্ছেও নিহিত আছে: অনেক লোক আমার এই মতকে সমর্থন করুক। আভিধানিক ভাবে প্রতিটিকেই প্ররোচনা ভাবা যায়। ব্যাপারটা এত ভাসা-ভাসা বলেই আমাদের দেশে চমৎকার নিয়ম: কংগ্রেস বাক্‌স্বাধীনতার দুর্দান্ত সমর্থক যত ক্ষণ তা বিজেপিকে কামড়ে দিচ্ছে, বিজেপি বাক্‌স্বাধীনতার পেল্লায় সমর্থক যত ক্ষণ তা তৃণমূলকে ল্যাং মারছে, তৃণমূল বাক্‌স্বাধীনতার সোল্লাস সমর্থক যত ক্ষণ তা সিপিএমের গায়ে কালি ছেটাচ্ছে। নিজের গায়ে আঁচ লাগলেই তখন দ্রোহ-র সংজ্ঞাটা হঠাৎ খুব স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর প্রশাসনের লাঠিসোটা কাজে লাগিয়ে লোকটার টুঁটি টিপে ধরার মধ্যে কোনও অন্যায়ই দেখা যাচ্ছে না। অসীম ত্রিবেদী যখন ২০১২ সালে কার্টুনে আঁকছেন ভারতমাতাকে গণধর্ষণ করছে নেতা ও আমলা, ইউপিএ সরকার তাঁকে দেশদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করছে। আর বিজেপি নেতা আডবাণী অবাক হয়ে বলছেন, এ তো ইমার্জেন্সির চেয়েও খারাপ! আবার, হিন্দু মহাসভা যখন নাথুরাম গডসের মূর্তি গড়তে পয়সা তুলেছে, গাঁধী-বিরোধী স্লোগান দিয়েছে, তখন বিজেপির মাথায় দেশদ্রোহের অভিযোগ আনার কথা আসেইনি।
আসলে, এই গোছের ধরপাকড় সব সভ্য দেশ তুলেই দিয়েছে। ভারতে কিছু ক্ষমতাওয়ালা আছে, গণতন্ত্রের মানেটাই জানে না, অশিক্ষা ও জঙ্গিপনা মিলিয়ে ক্ষমতার কেক কামড়ায়, আর বিরোধিতা দুরমুশ করে স্বৈরতন্ত্র কায়েম করতে, এগুলো প্রয়োগ করে। এদের আবার হাতে-গরম পাবলিক-খেপানো মন্তরটি হল: ‘পাকিস্তানকে ঘেন্না করো। পাকিস্তানকে ভালবাসা মানেই দেশদ্রোহ।’ এটাই ভারতের দেশপ্রেমের ঠিক সংজ্ঞা, কারণ তা প্রেম দিয়ে নয়, ঘেন্না দিয়েই নির্ধারিত। (তাই তা তুমুল তীব্রতায় ফোটে ভারত-পাক ম্যাচের সময়, কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টে পড়ে থাকা দেশবাসীকে বাঁচাবার বেলায় এর টিকিটি মেলা ভার)। কিন্তু তা হলে তো বলতে হয়, কেউ যদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে, কিচ্ছুটি না-বলেকয়ে, আচমকা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে হাসি-হাসি মুখে হাজির হয়ে যান, দেশদ্রোহের অভিযোগে প্রথমে তাঁকেই হাতকড়া পরিয়ে জেলে পুরে দেওয়া উচিত!
সুত্র- আনন্দবাজার