Wednesday, December 2, 2009

নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে সমাজকে এগিয়ে নিতে হবে -মা এখন অভিভাবক

একটি শিশুর জন্ম, প্রতিপালনসহ সব ক্ষেত্রেই মায়ের ভূমিকা মুখ্য হলেও রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন আর সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে আমাদের সমাজে মায়ের অবস্থান এখনো প্রান্তিক। মা তথা নারীর প্রান্তিক এ অবস্থা থেকে উত্তরণের পথে বড় ধরনের অগ্রগতির খবর পাওয়া গেল সরকারের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তে: ‘অভিভাবক হিসেবে শুধু মায়ের নাম দিয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করার পক্ষে মত দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।’ একটি সন্তানের মা-বাবা হিসেবে দুজনই একই মর্যাদায় অভিভাবকত্ব পাওয়ার দাবিদার। পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোয় এ উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে বড় ধরনের অগ্রগতি বলেই আমরা মনে করি।
শুধু মায়ের নাম ব্যবহার করলে ফরম অপূর্ণ বিবেচিত হবে কেন জানতে চেয়ে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও নারীপক্ষ হাইকোর্টে রিট আবেদন করে। হাইকোর্টের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের এই সিদ্ধান্ত। এর ফলে শিক্ষাক্ষেত্রে মায়ের অভিভাবকত্ব নিশ্চিত হলো। কিন্তু জীবনের অন্য ক্ষেত্রে? হাইকোর্ট এই রুল জারির সময় পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, কেবল এসএসসি বা এইচএসসির কথা না বলে সব পর্যায়ের শিক্ষা ও চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে এই দাবি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু সরকার শুধু এসএসসি ও এইচএসসির কথাই ঘোষণায় বলেছে। আমরা মনে করি, সরকারের উচিত হবে, শিক্ষা ও চাকরিসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে বাবার সমান্তরালে অভিভাবক হিসেবে মায়ের অধিকার নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা।
মা ও নারীদের ব্যাপারে নানা নীতিবাক্য সমাজে প্রচলিত থাকলেও সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এখনো মায়ের অধিকার যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এর মূল কারণ সমাজে মেয়েশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ। আজকের মেয়েশিশুই আগামীকালের মা। সুতরাং তার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ প্রত্যাশিত। পরিবার থেকেই এ বৈষম্য অবসানের উদ্যোগ নিতে হবে।
সমাজের অর্ধেক অংশকে অনগ্রসর রেখে একটি দেশ কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে অগ্রসর হতে পারে না। আমরা চাই, শিক্ষা এবং সামাজিক জীবনাচরণের সব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিশ্চিত হোক।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য কী বার্তা বয়ে আনবে -জলবায়ু সম্মেলন by আসাদউল্লাহ খান

বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ধনী ও গরিব সব দেশই এক কঠিন সমস্যা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অবস্থা এমন একপর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, বিশ্বের নীতিনির্ধারক মহল এ সর্বজনীন সমস্যা মোকাবিলায় ব্যর্থ হলে আগামী ১০ বছরের আগেই দেশগুলো একে অপরের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংঘাত, এমনকি যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়বে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে আঘাতটা আসবে প্রকৃতি এবং পরিবেশ থেকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ যথা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চল নিমজ্জন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে ফসলহানি ও ঘরবাড়ি নষ্ট হওয়ায় উদ্বাস্তুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে, যা সামাল দেওয়া দুর্ভোগকবলিত দেশগুলোর সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। আগামী ডিসেম্বর মাসে কোপেনহেগেনে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন সামনে রেখে কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলনের সভাপতি টিম ফ্লানারি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, বিশ্ব নেতারা কার্বন নির্গমনের ব্যাপারে যদি একটা সঠিক এবং সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন, তাহলে সমগ্র বিশ্বের জন্য তা বয়ে আনবে এক অশনিসংকেত।
বিগত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে প্রায় ১০০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কার্বন নির্গমনের যে হিসাব তিনি পেয়েছেন, তা একদিকে যেমন ভারসাম্যহীন, তেমনি অচিন্তনীয়। তাঁর কাছে বিশ্ব নেতাদের সবুজ সভ্যতা গড়ার আকুল আকুতি আসছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনজীবন ওলট-পালট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সাগরের উপকূলে অবস্থিত দেশগুলো। আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, হিমালয় অঞ্চলের বরফের চাঁইগুলো গলে যাওয়ার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার ৫০ কোটি মানুষ মারাত্মক পানিসংকটের মুখোমুখি হতে পারে। উত্তর চীনের বিরাট অংশ মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে। সাগরের উচ্চতা যেভাবে বাড়ছে তাতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত মাইক্রোনেশিয়ার ক্ষুদ্র দ্বীপাঞ্চল বেষ্টিত দেশটি সাগরে তলিয়ে যেতে পারে। দুঃসংবাদ এসেছে মৌরিতাস থেকে। সেখানকার জেলেরা বলছে, উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে তারা গভীর সমুদ্রে টুনা মাছ ধরতে পারছে না। মারাত্মক শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে গত বছর পেরুর জাতীয় আয় ৪.৫ শতাংশ কমে গেছে। ২০০৮ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত ৮০টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের এক সম্মেলনে পেরুর প্রেসিডেন্ট মিশেল বাশেলে এই ভঙ্গুর পৃথিবী নামের গ্রহের কথা উল্লেখ করে যথার্থই বলেছেন, ‘আমরা একে ধ্বংস করতে পারি, নয় তো পারি বাঁচাতে।’
বিশ্বের জন্য দুঃসংবাদ হলো, ২০০৭ সাল থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের দিক থেকে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়েরই কার্বন নিঃসরণের মাত্রা এখন ২০ শতাংশ, বাকি বিশ্বের ৪৯ শতাংশ, রাশিয়া ৫.৭ শতাংশ, ভারত ৪.৫ শতাংশ, জাপান ৪.৩ শতাংশ, জার্মানি সর্বনিম্ন ২.৯ শতাংশ। দুঃসংবাদ আমেরিকার দিক থেকেও আসছে, যদিও প্রেসিডেন্ট ওবামা ক্ষমতা পাওয়ার পর থেকে সবুজ শতাব্দীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমেরিকার এনার্জি কোম্পানিগুলো বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ১৫০টি কয়লাচালিত বিদ্যুত্ স্থাপনা তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে খবরে জানা গেছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই বিদ্যুত্ স্থাপনাগুলোর কয়েকটাও যদি স্থাপিত হয়, তাহলে গ্রিন হাউস গ্যাসের নিঃসরণ আরও অনেক বেড়ে যাবে এবং তা শুধু আমেরিকার পরিবেশের জন্য যে হুমকি হবে তা নয়, এই বিশ্ব নামের গ্রহটি বসবাসের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে পড়বে।
এ মাসে কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিতব্য জলবায়ু সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিশ্ব নেতাদের সামনে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বলার অপেক্ষা রাখে না একটি পরিবেশবান্ধব পৃথিবী তথা সবুজ পৃথিবী অর্থাত্ দূষণমুক্ত শিল্প-কারখানা, বিদ্যুত্শক্তি, পরিবহনব্যবস্থা এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণ করার উদ্যোগ আগেও গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে দূষণে ভারাক্রান্ত বিশ্বে এই প্রচেষ্টা অপরিসীম গুরুত্ব বহন করছে। বিশ্ববাসী আশা করে, কোপেনহেগেনের এই সম্মেলন থেকে একটি আস্থার জগতে ফিরে আসার পথপরিক্রমা শুরু হবে।
আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, সীমিত সম্পদের এই পৃথিবীতে প্রায় ৬৫০ কোটি মানুষ বাস করছে। খাবারদাবার, শস্য, বনজ, প্রাণিজ, এমনকি খনিজ যেসব বস্তু মানুষ এই পৃথিবী থেকে ১২ মাসে আহরণ করছে, তা পূরণ হতে সময় লাগে ১৪.৪ মাস। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন কিংবা দুর্বিপাকে মুক্ত জীবনযাত্রা চালানোর অর্থ হলো, আসলটা এই ভেবে খেয়ে না ফেলে জীবনের পাথেয় থেকে পাওয়া আসলের মুনাফার ওপর ভিত্তি করে চলা।
এই টেকসই জীবনযাত্রা কিংবা উন্নয়নের পথের প্রথম সিঁড়ি হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। আমাদের দেশের কথাই ধরা যাক। আমাদের দেশ এক বছরে যতটা খাদ্যশস্য উত্পাদন করবে, তা খরচ করার পর হাতে যেন কিছুটা উদ্বৃত্ত থাকে অনিশ্চিত সমস্যা যথা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, খরা, প্লাবন, ফসলহানি এবং অজানা দুর্বিপাক মোকাবিলা করার জন্য। এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশেরই হাতে এমন নগদ উদ্বৃত্ত তো নেই, উপরন্তু নিরন্তর সংকট এবং মারাত্মক ঘাটতির মধ্য দিয়ে চলতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও), ইউএনডিপি এবং ইউনিসেফের জরিপ প্রতিবেদন থেকে সম্প্রতি জানা গেছে, বর্তমান অবস্থায় পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ জনগোষ্ঠী আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনাহারের মুখোমুখি হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিশ্বের ২০০ কোটি জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ এবং পুষ্টিকর খাদ্যের কোনো নিশ্চয়তা নেই। আরও উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, এই সংখ্যার মধ্যে ৮০ কোটি এবং আরও সূক্ষ্ম হিসাবে ৩০ কোটি শিশু জন্মগতভাবে অপুষ্টির শিকার। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে সীমিত জমিতে কৃষি উত্পাদন বাড়াতে হবে এবং সেজন্য প্রয়োজন উন্মুক্ত সেচ, সার, এমনকি নিরাপদ জেনেটিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের উত্পাদন বাড়ানো। সম্প্রতি উগান্ডার জাতীয় কৃষি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ওই দেশ গবেষণার মাধ্যমে পোকামাকড় এবং রোগসহিষ্ণু শস্যবীজ উদ্ভাবন করেছে। এই বীজে নাইট্রোজেনের ঘাটতি আছে এমন মাটিতেও চাষ করে ভালো ফসল পাওয়া গেছে। আমাদের দেশে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা সংস্থা লবণসহিষ্ণু এবং নিমজ্জনপ্রবণ এলাকায় চাষযোগ্য ধানের বীজ উদ্ভাবন করেছে। এগুলো এখন মাঠপর্যায়ে এনে পরীক্ষা করে চাষ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ আজ অনেকগুলো সমস্যা এবং সংকটের আবর্তে আটকে গিয়ে মুক্তির পথ খুঁজছে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সংকট উত্তরণের ব্যাপারে যতটা কথা বলছে, মাঠপর্যায়ে তার সিকি ভাগও কাজ হচ্ছে না। সিডর ও আইলার আঘাত সহ্য করে যে মানুষগুলো বেঁচে আছে, তাদের অবস্থা দেখে এ কথা নিঃসংকোচে বলা যায়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ, অথচ এ ব্যাপারে বাংলাদেশের কোনো দায় নেই। সাগরের উপকূলে প্রায় চার কোটি লোক বাস করছে প্রতিনিয়ত ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করে। একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে হিমালয় এবং মেরু অঞ্চলে বরফের চাঁই গলে যাওয়ার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সাগরের কাছাকাছি নিম্ন উচ্চতায় লোকালয়ের অবস্থান, বিশাল প্লাবনভূমি, সাইক্লোন, সিডর, আইলা এবং জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে ঘরবাড়ি, সহায়-সম্পদ হারিয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ বাস্তুভিটা ত্যাগ করে নতুন আশ্রয় এবং জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছে। বেসরকারি এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সিডরের আঘাতে বরগুনা, পটুয়াখালী, কাউখালী, পিরোজপুর, সাউথখালী এবং বাগেরহাটের বলেশ্বর প্রভৃতি এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এ বছরের মে মাসে একই কারণে আইলার শিকার হয়েছে সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলার সাগরের কোল ঘেঁষে অবস্থিত শ্যামনগর, আশাশুনি, কয়রা, দাকোপ প্রভৃতি অঞ্চল। সুন্দরবনের অবস্থান এবং দিনের বেলায় আইলার তাণ্ডব ঘটায় প্রাণহানি কম হলেও, সাগর তীরবর্তী বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানি ঢুকে বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো লোনা পানিতে নিমজ্জিত। বেড়িবাঁধ নির্মিত না হওয়ায় আশ্রয়হীন মানুষ বাড়িঘর নির্মাণের জন্য শক্ত মাটি খুঁজে পাচ্ছে না। খাওয়ার পানির অভাব তাদের জীবনে বিভীষিকা সৃষ্টি করে চলেছে। বেড়িবাঁধের ওপরই আশ্রয়হীন মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
চরম দারিদ্র্য, ঘন জনবসতি, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, বেকারত্ব এবং কর্মসংস্থানের অভাবের সঙ্গে বারবার প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের আঘাত দেশটির ওপর মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাগরের তীর ঘেঁষে অন্তত ১৪ ফুট উঁচু সাইক্লোন এবং জলোচ্ছ্বাসের আঘাত সহ্য করতে পারে এমন মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, এই অঞ্চলে লবণাক্ততা এবং নিমজ্জনসহিষ্ণু উঁচু ফলনশীল বীজ ধান সরবরাহ করতে হবে, যাতে দুর্যোগ ও দুর্বিপাক সহ্য করে ধানের গাছগুলো দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং মানুষের আশা ভঙ্গ না হয়। এককথায় বলতে গেলে হিমালয়ের বরফ গলা পানি এবং সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের আঘাত সহ্য করে এ দেশটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভাগ্য বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথার পুনরুক্তি করে বলতে হয়, বাংলাদেশের দিকে গতানুগতিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে হবে না, অন্যের দায় মুক্তির জন্য খেসারত অর্থ দিতে হবে।
আসাদউল্লাহ খান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক।
e-mail:aukhanbd@gmail.com

মন্ত্রী পর্যায়ের এই সম্মেলন তেমন ফল দেবে না -ডব্লিউটিও by তৌফিক আলী

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপিত হয় মারাকাশ চুক্তির মাধ্যমে । এই চুক্তির চতুর্থ অনুচ্ছেদের প্রথম অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে সদস্যের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন প্রতি দুই বছর অন্তর অনুষ্ঠিত হবে। বিগত চারটি মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও এর চলতি সম্মেলন প্রসঙ্গে কিছু দিক তুলে ধরতে চাই।
১৯৯৬ সালের ডিসেম্বরে সিঙ্গাপুরে প্রথম মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে অনেক সুদূরপ্রসারী ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যেমন: এখানে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে (এলডিসি) তাদের বাণিজ্য সুযোগ বাড়ানোয় সহায়তা করার জন্য বিতর্কিত ‘স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সমন্বিত রূপরেখা’ গ্রহণ করা হয়। ১৯৯৮ সালের মে মাসে জেনেভায় দ্বিতীয় সম্মেলনটি অবশ্য ছিল মূলত আনুষ্ঠানিকতা, যেটা আবার গ্যাট/ডব্লিউটিওর ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের সঙ্গে মিলে যায়।
তবে ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে সিয়াটলের সম্মেলনটি ভিন্নমাত্রা নেয়। উরুগুয়ে রাউন্ড চুক্তির কিছু বিষয় এখানে পর্যালোচনার জন্য উঠে আসে। সম্মেলনকে ঘিরে নানা রকম তত্পরতা শুরু হয়, গঠিত হয় উচ্চাশা। তবে সম্মেলনে বাইরে বিক্ষোভ-সংঘাত অনেক বেশি মনোযোগ কেড়ে নেয়। আর শেষ পর্যন্ত সম্মেলনটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
২০০১ সালের নভেম্বর মাসে কাতারের দোহায় চতুর্থ সম্মেলনটি হয় আমেরিকায় ৯/১১ সংঘটিত হওয়া পর। তাই আবহটা ছিল বিষণ্ন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কমিশন তাদের নিজেদের স্বার্থে বাণিজ্য সমঝোতার একটি নতুন পর্ব শুরু করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। উন্নয়নশীল দেশগুলো এতে আপত্তি করেছিল। কিন্তু আমেরিকার চাপে পিছু হটে মেনে নেয়। ফলে এটি অল্প সময়ে অনেক কিছু করার বিরাট উচ্চাভিলাষ নিয়ে দোহা রাউন্ড বা দোহা পর্বের সূত্রপাত ঘটে। এ সম্মেলনেই সংস্থায় চীনের সদস্য পদ অনুমোদন করা হয়।
২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে কানকুন সম্মেলনটিকে ধরা হয়েছিল দোহা পর্বের মধ্য পর্যায়। তখন পর্যন্ত কৃষি ও অকৃষি পণ্যের বাজারসুবিধা নির্ধারণের বিষয়ে একটি মতৈক্য ছিল। কিন্তু বাস্তবে এসে সমঝোতা হতে পারেনি এবং আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে মতৈক্য হয়নি। এর মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষিস্বার্থ রক্ষার জন্য গঠিত হয় জি-২০ জোট। এর ফলে এত দিন ধরে চলে আসা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য সমঝোতার প্রবণতায় পরিবর্তন আসে। শিল্পোন্নত দেশগুলো আলোচনার টেবিলে যে খসড়া উপস্থাপন করবে, তা-ই হবে আলোচনার ভিত্তি—এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে যায়। এর জের ধরে কানকুন সম্মেলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, যা দোহা পর্বকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।
২০০৫ সালের ডিসেম্বরে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া ষষ্ঠ সম্মেলনকে সামনে রেখে সবাই সতর্কতার সঙ্গে প্রত্যাশার মাত্রা কমিয়ে আনে। সম্মেলনকে ঘিরে একটা কথাও শুরু হয় যে এতে ‘উন্নয়ন’ ইস্যুগুলো প্রাধান্য পাবে। অবশ্য ডব্লিউটিও প্রথাগতভাবে কোনো ‘উন্নয়ন সংস্থা’ নয়। তবে এর বিধিবিধানগুলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে। আমরা এলডিসির উদ্বেগগুলো তুলে ধরতে এই উন্নয়ন ধারার ওপর গুরুত্ব প্রদানকে পুরোপুরি কাজে লাগাই। এর ফলে প্রথমবারের মতো শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধার বিষয়টি আমরা বহুপক্ষীয় পর্যায়ে নিয়ে আসি। এর আগপর্যন্ত এই সুবিধার বিষয়টি পুরোপুরি সুবিধাদানকারী দেশের ইচ্ছের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
নিয়মমাফিক ২০০৭ সালেই সপ্তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও পরিস্থিতি এর অনুকূলে ছিল না। তাই সংস্থার দ্বিতীয় ক্ষমতাধর অংশ জেনারেল কাউন্সিল মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে ছাড় দেয়। আর ২০০৯ সালের মে মাসে সিদ্ধান্ত নেয় যে জেনেভায় এ বছরই সম্মেলন হবে। তবে ২০ অক্টোবর সপ্তম সম্মেলনের কর্মসূচির যে রূপরেখা ঘোষিত হয়, তাতে স্পষ্ট করে বলা হয় যে এটা বাণিজ্য সমঝোতার চেয়ে বরং ডব্লিউটিওর সকল কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আলোচনা ও নির্দেশনা প্রদানের সুযোগ তৈরি করেছে।
গতকাল ৩০ নভেম্বর শুরু হওয়া সম্মেলনে প্রতিটি সদস্য দেশের প্রতিনিধি প্রধানরা তিন মিনিট করে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দুই দিন দুটি কার্য অধিবেশনে দোহা কার্যসূচিসহ সংস্থার কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে সংস্থার অবদানের ওপর আলোকপাত করা হবে। পাশাপাশি চলবে প্লিনারি অধিবেশন। ২ ডিসেম্বর সম্মেলন শেষ হবে, যেখানে কোনো মন্ত্রী পর্যায়ের ঘোষণা আসবে না। এর বদলে সভাপতি একটি সারসংক্ষেপ প্রদান করবেন, যা অবশ্য পালনীয় নয়।
স্পষ্টতই, এ আয়োজন কোনো সমঝোতা বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য নয়। মাত্র তিন মিনিটের বক্তব্যে কারও পক্ষে তাঁর দেশের উদ্বেগ ও অবস্থান যথাযথভাবে তুলে ধরা সম্ভব নয়। তাহলে এই সম্মেলনের মানে কী? উত্তরটা লুকিয়ে আছে জেনেভায় বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতির মধ্যে।
মূল সম্মেলন শুরুর আগে সপ্তাহজুড়ে অনেক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। এ ছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়েছে। উন্মুক্ত বৈঠকে যেকোনো সদস্য দেশের প্রতিনিধি যোগ দিতে পারলেও রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শুধু আমন্ত্রিত ব্যক্তিরাই যেতে পারেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গ্রিনরুম বৈঠক। বিশ্ব রপ্তানি বাণিজ্যে মাত্র দশমিক ১০ শতাংশ হিস্যা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে আমন্ত্রণ পাওয়াটা কঠিন। তবে এলডিসি গ্রুপের সমন্বয়কারী এই বৈঠকে আমন্ত্রিত হয়ে থাকে। জেনেভায় আমি যখন রাষ্ট্রদূত ছিলাম তখন সব সময়ই আমন্ত্রণ পেয়েছি। কারণ, আমি বাণিজ্য ও পরিবেশ সমঝোতা গ্রুপের সভাপতি ছিলাম। এর ফলে এসব বৈঠকে আমাদের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করতে পেরেছি। একটি ছোট দেশের পক্ষে এ ধরনের উচ্চ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রিত বৈঠকে যোগদান করতে পারা ছিল নিঃসন্দেহে একটি বিরাট অগ্রাধিকার।
অবশ্য এসব বৈঠকে যোগদান এটা নিশ্চিত করে না যে যোগদানকারীর নিজ দেশের স্বার্থকে সামনে রাখতে পারবেন। এটা নির্ভর করে প্রস্তুতির ওপর। যেমন নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে বিষয়টা উত্থাপন করা হবে, তা নিয়ে আগে প্রধান দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সমর্থন নেওয়া হয়েছে কি না। এ রকম আরও অনেক কৌশল আছে। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের স্বার্থের বিষয়টা সুন্দরভাবে উপস্থাপনের জন্য যথেষ্ট দক্ষতা প্রয়োজন।
প্রশ্ন হলো, এবারের সম্মেলন থেকে কোনো দেশ কি কিছু পেতে পারে? দোহা পর্বকে প্রভাবিত করে ডব্লিউটিওর সপ্তম সম্মেলন থেকে এমন কোনো ফল পাওয়া যাবে না। কারণ, সম্মেলনটা সেভাবেই সাজানো হয়েছে।
তাহলে মূল সম্মেলনের বাইরে কি কিছু হতে পারে? এটা নিয়েই তত্পরতা চলছে। যেমন ২৪ নভেম্বর সেবা খাতবিষয়ক বৈঠকে সম্মতি মিলেছে যে এলডিসিসমূহকে সেবা খাতের বিষয়ে ছাড় দেওয়া হবে। এর মানে হলো, বিভিন্ন দেশ এলডিসিসমূহকে সেবা খাতে এমন বিশেষ সুবিধা দিতে পারবে, যা এলডিসি বাদে অন্য দেশকে দিতে হবে না। (এটা অবশ্য ডব্লিউটিরও এমএফএন নীতি থেকে বিচ্যুতি)। আমরা পণ্যেও ক্ষেত্রে এই ছাড় পেয়েছিলাম কিন্তু সেবা খাতে পাইনি। এ জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি তোলা হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ভারতসহ কিছু দেশ আমাদের দাবিকে সমর্থন দিয়েছে। এখন আশা করা যায়, আগামী বছর এ বিষয়টির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। বাকি অর্জনটুকু নির্ভর করবে জেনেভায় আমাদের প্রস্তুতির ওপর। তবে আমাদের বেশি আশা করা ঠিক হবে না। আমরা যে উচ্চ পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বৈঠকগুলোতেও আমন্ত্রণ পাব, এমনটা আমি মনে করি না।
ডব্লিউটিওতে এলডিসি গ্রুপ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তবে এর বর্তমান অবস্থা বাংলাদেশের স্বার্থের ততটা অনুকূলে নয়। দার-এস-সালামে এলডিসি মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে একটি ঘোষণা ও একটি কর্মসূচি গৃহীত হয়। এরপর থেকে বাংলাদেশের স্বার্থ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তেমন কিছুই করা হয়নি। বিশেষ করে শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধার ক্ষেত্রে। ২৯ নভেম্বর এলডিসি মন্ত্রীদের বৈঠক হলেও তা উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বা গ্রিনরুম বৈঠক প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এলডিসি গ্রুপ এবং বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমর্থন জোগাড় করার জন্য আরও অনেক বেশি কাজ করার প্রয়োজন ছিল।
আমরা জানি যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে রপ্তানির অবদান কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। অথচ বহুপক্ষীয় বাণিজ্য বিধিগুলো এ ক্ষেত্রে নতুন যোগদানকারীর সম্ভাবনাকে ক্রমেই বাধাগ্রস্ত করে তুলছে। আমাদের তাই বহুপক্ষীয় বাণিজ্য বিধিতে এলডিসি সহায়ক অবস্থান গড়ে তোলার জন্য প্রয়াস নিতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন বহুপক্ষীয় বাণিজ্যব্যবস্থা সম্পর্কে খুব ভালো বোঝাপড়া, অভ্যন্তরীণ নীতি কাঠামো এবং চমত্কার দরকষাকষির দক্ষতা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এখানে আছে। আমাদের কাজ হলো, অতীতের সাফল্যের ভিত্তিতে এগিয়ে যাওয়া এবং সুবিধাগুলো আমাদের অনুকূলে নিয়ে আসা।
তৌফিক আলী: জেনেভায় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত (২০০১—২০০৭)।
toufiqali@hotmail.com

নারী গৃহকর্মীদের নিয়তি -বাঘা তেঁতুল by সৈয়দ আবুল মকসুদ

একবার দিল্লি বিমানবন্দরে প্লেনের অপেক্ষায় বসেছিলাম। পাশের আরেকজন অপেক্ষমাণ যাত্রী মন দিয়ে একটি নভেলজাতীয় বই পড়ছিলেন। বইটির নাম চকোলেট। লেখকের, বোধহয় লেখিকাই হবে, নাম মনে নেই; একজন ভারতীয়। ও রকম পরিবেশে যা স্বাভাবিক—সময় কাটানোর জন্য খবরের কাগজ পড়া বা বইপত্র নাড়াচাড়া করতে হয়। পাশের যাত্রীর কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে বইটির পাতা ওল্টাতে থাকি। বইটির বিষয়বস্তু হলো, বালিকা ও কিশোরীরা ভারতীয় সমাজে কীভাবে পরিবারের নিকটাত্মীয়দের হাতে যৌন নিপীড়নের শিকার হয় তার বিবরণ। এবং প্রায় সব ক্ষেত্রেই সেক্সুয়াল মোলেসটেশন বা যৌন-উত্ত্যক্ত বা নিগ্রহের কথা তারা কাউকে না বলে আজীবন গোপন করে রাখে। তবে কারও কারও শৈশবের সেই অভিজ্ঞতার বিশ্রী স্মৃতি সারা জীবন তাদের তাড়া করে ফেরে। তাদের মনে স্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হয়। পরিণত বয়সে যা তাদের নানা রকম মানসিক সমস্যার কারণ হয়।
বাড়ির কোনো পুরুষ হয়তো চকোলেট-লেবেঞ্চুস নিয়ে প্রথমে ভাব জমায় বালিকা-কিশোরীদের সঙ্গে। তারপর সদ্য-পরিবর্তন আসা কিশোরীর শরীরে হাত দেয় তারই কোনো লম্পট নানা-দাদা, চাচা-মামা, খালু-ফুফা সম্পর্কের গুরুজন পর্যন্ত। কাজিন সম্পর্কের অর্থাত্ চাচাতো-মামাতো-খালাতো-ফুফাতো ভাই হলে তো কথাই নেই। বয়স্ক মুরুব্বি-স্থানীয়দের দ্বারা চুম্বনের অভিজ্ঞতা তো আছেই, ধর্ষণের ঘটনাও ঘটে। সবচেয়ে করুণ ব্যাপার হলো, ‘গুরুজনদের’ দ্বারা অপকর্মের শিকার হলে তা বাড়ির কাউকে বলা যায় না, বললেও অনেকে বিশ্বাস করে না। চকোলেট-এ বিষয়টিকে খুব প্রামাণ্যভাবে উপস্থিত করা হয়েছে।
বাড়ির নিকটাত্মীয়ের কাছেই যখন একজন বালিকা বা কিশোরী নিরাপদ নয়, সেখানে নিঃস্ব, দরিদ্র ও অসহায় বালিকা গৃহকর্মীদের যে কী অবস্থা তা অনুমান করা সহজ। কয়েক বছর আগের একটি ঘটনা মনে আছে। ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু ভবনের উল্টো দিকে লেকের পাড়ে দেখি তিন-চারজন পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে ১৫-১৬ বছরের একটি মেয়ে কাঁদছে। আমি সেখানে গিয়ে জানলাম যে মেয়েটি কোনো এক বাড়িতে কাজ করত। পালিয়ে এসেছে। ময়মনসিংহের দিকে কোথাও ওর বাড়ি। কোথা থেকে বাস ধরবে তা সে জানতে চাইছে।
কেন সে ওই বাড়িতে কাজ করবে না সে কথা মেয়েটি পুলিশকে বলছিল। ওর কাজ ছিল বিরাট ব্যবসায়ী গৃতকর্তার বৃদ্ধ বাবার দেখাশোনা করা। গৃহকর্ত্রী সকালে গাড়ি নিয়ে বেরোন, আসেন সন্ধ্যার পরে। গরম পানি করে বুড়োকে গোসল করিয়ে খাওয়াতে হয়। গোসলের সময় মেয়েটিকে বুড়ো তার শরীরে সাবান ঘষে দিতে বলে। সেটা দোষের কিছু নয়। কিন্তু মাঝেমধ্যেই এমন আচরন করে বসেন যা সঙ্গত নয়। লজ্জায় মেয়েটি সরে যেতে চাইলে বুড়ো দু-একটা দাঁত যা আছে তা বের করে বলে, ‘যাইস না, তুই তো আমার নাতনির মতোই।’ পুরুষীয় লাম্পট্যের কোনো বয়সসীমা নেই।
সম্প্রতি আমি দু-তিনটি কিশোরী গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা দূর থেকে আমার ইন্দ্রিয় চোখ ও কানের দ্বারা প্রত্যক্ষ করেছি। অমন নির্মমতা দেখে মাথা ঠিক রাখা কঠিন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে যেটুকু অনুভব করেছি, তা অবর্ণনীয়। মেয়ে দুটির আর্তনাদ অনেকেই শুনেছে, কিন্তু নিরুপায়। প্রতিকার তো দূরের কথা, প্রতিবাদ করে কার সাধ্য?
শ্রমিকসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান বিল্স-এর হিসেবে, তাদের কাছে তথ্য আছে, গত সাত বছরে দেশে ৬৪০টি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে নিহত হয়েছে ৩০৫ জন, পঙ্গু হয়েছে ২৩৫ জন, ধর্ষিত হয়েছে ৭৭ জন এবং অন্যান্যভাবে নিগৃহীত হয়েছে ২৩ জন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে দেশে বাসাবাড়িতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা এক লাখ এক হাজার ৬৭৬ জন। এর মধ্যে নারীশিশু ৮০ হাজার ৯৯৩ জন। বেসরকারি হিসাবে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ২০ লাখ।
কতভাবে শিশু গৃহপরিচারিকাদের যে নির্যাতন করা হয় তার তালিকা করা কঠিন। প্রায় সারা দিনই ওদের কাজ। ভালো খাবার খেতে দেওয়া হয় না। ঘরের কোনায় শুতে দেওয়া হয়। ঘরে তালা দিয়ে বন্দী করে রাখা খুব স্বাভাবিক রীতি। ভাত একটু নরম হলে, তরকারি পুড়ে গেলে, গ্লাস বা প্লেট ভেঙে ফেললে বা অতি সামান্য অপরাধে নেমে আসে নিপীড়ন। চড়-থাপড়, চুলের মুঠি ধরে মারধর, শরীরে গরম তেল ঢালা, গরম খুন্তি দিয়ে ছেঁকা দেওয়া, স্যান্ডেল-জুতা, পুতা বা ডাল-ঘুঁটানি দিয়ে পেটানো ও ঝাড়ুর বাড়ি ওদের অনেকেরই সইতে হয়। যৌন হয়রানি তো আছেই। ধর্ষণ, হত্যা খুবই ঘটছে। গর্ভপাত ঘটাতে গিয়েও মৃত্যু হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, সরকার ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ আচরণবিধি’র খসড়া চূড়ান্ত করেছে। তাতে গৃহকর্মীদের নিবন্ধনেরও ব্যবস্থা থাকবে। ন্যূনতম মজুরির ব্যবস্থাও থাকবে। গৃহকর্মীদের অধিকার রক্ষায় ও কল্যাণে যদি এই কাজটি সরকার করে তা হলে সরকারকে সাধুবাদ জানাব। কাজটি যত তাড়াতাড়ি হয় তত ভালো।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

দেশহীন মানুষের কথা: ধরিত্রী আমার নয়, আমিই ধরিত্রীর by সঞ্জীব দ্রং

পাহাড়ের কথা লিখতে গিয়ে সব সময় মহাশ্বেতা দেবীর কথা মনে পড়ে। এক যুগ আগে চিম্বুক পাহাড়ের কোলে, বাগানপাড়ায় মেননিয়াম ম্রোর বাড়ি গিয়েছিলাম। তারপর এম্পুপাড়ার পথে যেতে যেতে বাস্তার পাশে একটু দাঁড়িয়েছিলাম। বৃষ্টিশেষে রোদ উঠেছিল তখন। সামনে, পেছনে, দূরে, কাছে সব পাহাড়, অপরূপ সুন্দর এক বাংলাদেশ। নিচে মেঘমালা আর আর ছোট ছোট আদিবাসী গ্রাম। বাড়িগুলো বাঁশ ও ছন দিয়ে তৈরি। মাচাং ধরনের। এখানে ধরিত্রী, প্রকৃতি ও মানুষ পরিপূরক ও একাকার। মানুষ ধরিত্রীর, ধরিত্রী মানুষের নয়। বাঙালিরা বলেন, পৃথিবী আমার, ভূমি আমার। আমরা আদিবাসীরা বলি, পৃথিবী আমার নয়, আমিই পৃথিবীর। এই ভূমি আমার নয়, আমিই ভূমির। এই ধরিত্রী ও ভূমি কেনাবেচা করার, একে নষ্ট করার, ধ্বংস করার অধিকার মানুষের নেই। মানুষ ধরিত্রী ও ভূমির মালিক নয়, যত্নকারী ও রক্ষাকারী মাত্র এবং এ ধরিত্রীকে অনাগত শিশুদের জন্য সুন্দর করে রেখে যাওয়া তার দায়িত্ব।
কিছুদিন আগে আবার ম্রোদের পাড়ায় গেলাম। বান্দরবানে এসব পাহাড় ও ভূমি ছিল তাদের, আর খেয়াং, বম, লুসাই, ত্রিপুরা, পাংখুদের। মহাশ্বেতা দেবী তাঁর বিখ্যাত টেরোড্যাকটিল, পূরণসহায় ও পিরথা উপন্যাসের শেষের দিকে লিখেছেন, ‘আদিবাসীদের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের কোনো সংবাহন বিন্দু তৈরি করিনি আমরা। অনাবিষ্কৃত রেখেই ধীরে, সভ্যতার নামে ধ্বংস করেছি এক মহাদেশ। নো কমিউনিকেশন। একেবারে নেই? সেটা গড়ে তোলা কি অসম্ভব? গড়তে হলে যে অসম্ভব ভালোবাসতে হয় বহুকাল ধরে। কয়েক হাজার বছর ধরে আমরা ওদের তো ভালোবাসিনি, সম্মান করিনি। এখন সময় কোথায়, শতাব্দীর শেষ সময়ে? সমান্তরাল পথ, ওদের পৃথিবী আমাদের পৃথিবী আলাদা, ওদের সঙ্গেও কোনো প্রকৃত আদান-প্রদান হয়নি, যা আমাদের সমৃদ্ধ করত।’ পরে লেখক আবার বলেছেন, ‘ভালোবাসা, প্রচণ্ড, নিদারুণ, বিস্ফোরক ভালোবাসা পারে এ কাজে এখনো আমাদের ব্রতী করতে শতাব্দীর সূর্য যখন পশ্চিম গগনে, নইলে ভীষণ দাম দিতে হবে এই আগ্রাসী সভ্যতাকে। প্রতিবার আগ্রাসী সভ্যতা নিজেকে ধ্বংসই করে অগ্রসরণের নামে, ইতিহাস দেখ। ভালোবাসা, নিদারুণ ভালোবাসা, তাই হোক প্রথম পদক্ষেপ।’
চিম্বুকের এম্পুপাড়ার ওই পথে দাঁড়িয়ে মেল গিবসনের বিখ্যাত চলচ্চিত্র অ্যাপোক্যালিপ্ট-এর শেষ দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখনো এইচবিও ও স্টার মুভিতে ছবিটি মাঝেমধ্যে দেখানো হয়। মায়া আদিবাসীদের নিয়ে ছবি। ছবিতে আদিবাসী নায়ককে অস্ত্রশস্ত্রসহ তাড়া করছে শয়তানের দল। প্রাণপণে ছুটছে নায়ক বনের ভেতর দিয়ে। একসময় গভীর এক জলপ্রপাতের ভেতর নায়ক ঝাঁপিয়ে পড়ে। দূরে জলপ্রপাতের ওপারে শয়তানের দল দাঁড়িয়ে থাকে। নায়ক আদিবাসী যুবক ওদের দিকে চিত্কার করে বলে, ‘এই বন আমার। এখানে শিকার করেছিল আমার বাবা। এই বনে শিকার করব আমি, আমার সন্তান এবং ভবিষ্যতে আমার সন্তানদের সন্তান।’ এ ছবির শেষ দৃশ্যটি আরও অর্থবহ। শয়তানদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হয় নায়ক। কোলে তার নবজাত সন্তান চোখ বড় করে তাকিয়ে থাকে। স্ত্রী পাশে দাঁড়িয়ে। একটু দূরে সমুদ্রের তীরে কয়েকটি জাহাজ ভেড়ে। ওখানে অচেনা মানুষের দল। নায়ককে স্ত্রী প্রশ্ন করে ওরা কারা, আমরা কি তাদের সঙ্গে যাব? নায়ক তার নবজাত সন্তানের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ওরা এই বনে বহিরাগত মানুষ নিয়ে আসে। আমরা ওদের সঙ্গে যাব না, বনে ফিরে যাব, আমাদের সন্তানের জন্য নতুন স্বপ্ন রচনা করব।’ যে কেউ সিডির দোকান থেকে এ ছবির কপি কিনে দেখতে পারেন। বান্দরবানে ম্রোদের পাড়ায় দাঁড়িয়ে আমার অ্যাপোক্যালিপ্ট-এর দৃশ্য চোখে ভাসে।
ম্রোদের পাড়া থেকে যখন ফিরি তখন পশ্চিমে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। ওরা বলল, ওদের জুম বাগানভূমি, বিচরণক্ষেত্র, পূর্বপুরুষের অবারিত রেখে যাওয়া বিস্তীর্ণ বন ও পাহাড় বেদখলে চলে যাচ্ছে, কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ওদের অনুমতি তো দূরে থাক, ওদের কেউ জিজ্ঞেসও করেনি। শক্তিহীন, ক্ষমতাহীন, অর্থহীন এমনকি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এক আদিবাসী সমাজ, যারা ধরিত্রী ও প্রকৃতিকে, বনকে, পাহাড়ের বুকে বয়ে চলা নদী ও জলধারাকে, বৃক্ষ ও পরিবেশকে এতকাল রক্ষা করে এসেছে সবার জন্য, তারা এখন উপেক্ষিত বিলুপ্তপ্রায় অসহায় জাতি। এ ধারায় চললে একদিন ওরা হারিয়ে যাবে। প্রকৃতিকে ভালোবাসার যে শিক্ষা ওদের আছে, তা এই শহরে কোথায় পাব আমরা? ওরা হারিয়ে গেলে শুধু ওদের না, আমাদের দেশের ও পৃথিবীর অপূরণীয় ক্ষতি হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের যে ভয়াবহ চিত্র পৃথিবী প্রত্যক্ষ করছে, মেনে নিতে হবে যে আদিবাসী জীবন কাছ থেকে আধুনিক সভ্যতা ও রাষ্ট্র কিছুই শেখেনি। এ বিষয়ে মহাশ্বেতা দেবী ওই উপন্যাসের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘আদিবাসীদের সমাজব্যবস্থা, মূল্যবোধ, সংস্কৃতিচেতনা, সভ্যতা, সব মিলিয়ে যেন নানা সম্পদে শোভিত এক মহাদেশ। আমরা, মূলস্রোতের মানুষেরা, সে মহাদেশকে জানার চেষ্টা না করেই ধ্বংস করে ফেলেছি, তা অস্বীকার করার পথ নেই।...মূলস্রোতের ধাক্কায় এদের বারবার দেশান্তরী হতে হয়েছে। ফলে অনেক কিছু গেছে হারিয়ে। মূলস্রোত এ বিষয়ে যে অপরাধে অপরাধী তার ক্ষমা নেই।’
আমাদের রাষ্ট্রকে এই আদিবাসীদের জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিপন্নতার জন্য দায়ী করলেই তো হবে না, ওদের রক্ষা ও উন্নয়নের জন্য ব্যবস্থা নিতে হবে। সবার আগে দরকার ওদের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও জীবনের স্বীকৃতি। ধরিত্রী ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে বন্ধন ও মমতা তৈরি করে গেছে ওরা, তার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন।
>>>সঞ্জীব দ্রং: কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।
sanjeebdrong@gmail.com

গ্লানিমুক্তির ডিসেম্বর -সাদাসিধে কথা by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ডিসেম্বর মাসটি চমত্কার একটি মাস। এই মাসে শীতের একটা আমেজ পাওয়া যায়, বাগানে বাগানে রঙিন মৌসুমি ফুল ফুটতে শুরু করে, বাজারে শীতের সবজি উঠতে শুরু করে, বাচ্চাদের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়ে তাদের আনন্দ শুরু হয়, বিদেশ থেকে আপনজনেরা দেশে বেড়াতে চলে আসে, নানা ধরনের দেশি-বিদেশি কনফারেন্স শুরু হয়—কিন্তু এর কোনোটাই ডিসেম্বর মাসটিকে আলাদা করে দেখার কারণ নয়! ডিসেম্বর মাসটি চমত্কার একটি মাস, এর কারণ, এটি আমাদের বিজয়ের মাস। এই মাসে রাজাকাররা গর্তে ঢুকে থাকে—এই মাসে আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের আলাদাভাবে স্মরণ করি। এই মাসে মন্ত্রী না হয়েও আমরা গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ফেলি। আমাদের মধ্যে যারা একাত্তরের ভেতর দিয়ে এসেছি, তারা বিজয় দিবসের কথা স্মরণ করে এখনো এক ধরনের শিহরণ অনুভব করি।
মনে হচ্ছে, এই ডিসেম্বর মাসে আরও একটা বিষয় যোগ হবে—এই মাসে বহু বছর পর আমরা পৃথিবীর একটা নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞের বিচার শেষ করে গ্লানিমুক্ত হতে পারব। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডটা অনেক দিক থেকেই ছিল অবিশ্বাস্য। এই দেশের মাটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না। খুব সংগত কারণে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী অসংখ্যবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চেয়েছে; কিন্তু সাহস পায়নি। অথচ বাংলাদেশের জন্মের সাড়ে তিন বছরের মাথায় বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর কিছু অফিসার তাঁকে হত্যা করার দুঃসাহস দেখিয়েছিল—এটি এখনো বিশ্বাস করা যায় না। পৃথিবীর ইতিহাসে রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করার উদাহরণ খুব কম নেই। যুক্তরাষ্ট্রের লিংকন কেনেডি থেকে শুরু করে মিসরের আনোয়ার সাদাত, পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো বা ভারতের ইন্দিরা গান্ধী—ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই আমরা এ রকম অনেক উদাহরণ পেয়ে যাব। কিন্তু শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর পরিবারের সবাইকে হত্যা করার মতো নৃশংস ঘটনা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে? নববিবাহিত বধূ কিংবা ১০ বছরের শিশুসন্তান? এই হত্যাকাণ্ডের সময় ঠিক কী ঘটেছিল বহুদিন সাধারণ মানুষ সেটি জানতে পারেনি। বিচার প্রক্রিয়ার কারণে সেই হত্যাকাণ্ডের খুঁটিনাটি আবার নতুন করে প্রকাশ পেয়েছে। আমার ধারণা, যাঁরা সেই বর্ণনাগুলো পড়েছেন, তাঁদের অনেকেই ‘মানুষ’ প্রজাতির ওপর থেকেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন।
শুধু যে বঙ্গবন্ধু আর তাঁর পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছিল তা নয়, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আত্মীয়তা থাকার কারণে শেখ মণি এবং আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হত্যা করেছিল। সেনাবাহিনীর যে কর্মকর্তাকে সব মৃতদেহ সমাহিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তাঁর লেখা তালিকাটি পড়লে এখনো শিউরে উঠতে হয়। সেই দীর্ঘ তালিকায় বঙ্গবন্ধু, শেখ নাসের, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের পরিবারের সবার নামের সঙ্গে সঙ্গে রয়েছে একাধিক অজ্ঞাত পরিচয় ১০/১২ বছরের বালক কিংবা ‘১০ বছর বয়সী একটি ফুটফুটে বালিকা’-এর কথা। আমার খুব জানার ইচ্ছে করে, তারা কারা!
১৫ আগস্টের হত্যার মাঝে ছিল এক ধরনের পাশবিক নৃশংসতা। এর পরের হত্যাকাণ্ড, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ঠান্ডা মাথায় একটা সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র। নভেম্বরের ৩ তারিখ জেলখানায় বেছে বেছে সেই নেতাদের হত্যা করা হলো, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ধারণ করে বাংলাদেশকে সামনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখতেন। জেলখানায় বন্দীদের হত্যা করার মতো নৃশংস ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই, কিন্তু সেটি করা হয়েছিল, কারণ, এই খুনিচক্র তো শুধু পাশবিক আনন্দের জন্য খুন করেনি, তারা খুন করেছিল বাংলাদেশকে তার আদর্শ থেকে চিরদিনের জন্য লক্ষ্যচ্যুত করতে।
বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সবাইকে হত্যা করার নৃশংস ঘটনার পর সবাই হয়তো ভেবেছিল বর্বরতার সমাপ্তি হয়েছে। কিন্তু এই দেশের মানুষ শিউরে উঠে আবিষ্কার করল, সেই বর্বরতা শেষ হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। তার ৪১ দিন পর ২৬ সেপ্টেম্বর খন্দকার মোশতাক আহমদ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ নামে পৃথিবীর ইতিহাসের জঘন্যতম একটি দলিল প্রকাশ করলেন, যে দলিলে পরিষ্কার করে লেখা হলো, যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তাঁর স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূদের হত্যা করেছে, শিশু রাসেলকে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে এই দেশে কোনো মামলা করা যাবে না। পৃথিবীর নৃশংসতম খুনিরা শুধু খুনি নয়, তারা এই দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ—এই দেশের কোনো আইন তাদের স্পর্শ করতে পারবে না। ব্যাপারটি এখানেই শেষ হলো না, ১৯৭৯ সালে সামরিক আইনের অধীনে নির্বাচন করে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয় আর ১৯৭৯ সালের এপ্রিলের ৯ তারিখ কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ পঞ্চম সংশোধনী নামে আমাদের সংবিধানে স্থান করে নিল! এটি আমাদের সেই সংবিধান, যে সংবিধানটি এই দেশের মুক্তিযোদ্ধারা বুকের রক্ত দিয়ে যুদ্ধ করে অর্জন করেছিল। যে বঙ্গবন্ধু এই সংবিধানটি এই দেশকে উপহার দিয়েছিলেন, সেই সংবিধানে ঘোষণা করা হলো, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের এই দেশের মাটিতে বিচার করা যাবে না। এর চেয়ে উত্কট নিষ্ঠুরতার উদাহরণ কি এই পৃথিবীতে আছে?
বঙ্গবন্ধুর খুনিরা তখন দেশ-বিদেশে সগৌরবে তাদের হত্যাকাণ্ডের কথা ঘোষণা করে বেড়াচ্ছে। বহুদিন পর এই দেশের মানুষ টেলিভিশনে সেটি দেখেছে, যারা দেখেনি তারা ইন্টারনেটের ইউটিউবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী (bangabandhu killer) লিখে খোঁজ করলেই সেটা পেয়ে যাবে। সেই হত্যাকাণ্ডে জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততা কতটুকু ছিল, তাদের নিজের মুখে দেশের মানুষ, পৃথিবীর মানুষ শুনতে পারবে।
তার পর একদিন নয়, দুই দিন নয়, এক বছর নয়, দুই বছর নয়, ২১ বছর কেটে গেছে। জিয়াউর রহমানের সরকার, এরশাদের সরকার এবং খালেদার সরকার সেই খুনিদের টানা ২১ বছর বুক আগলে রক্ষা করেছে, দেশ-বিদেশে কূটনীতিকের চাকরি দিয়েছে, তাদের পদোন্নতি হয়েছে, সগর্বে তারা পৃথিবী চষে বেড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সেই ইনডেমনিটি বিলটিকে আমাদের সংবিধান থেকে অপসারণ করে প্রথমবার খুনিদের আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার ব্যবস্থা করেছে। খুনিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই বিচারকাজ শেষ হতে সময় লেগেছে ১৩ বছর।
মামলা করা যায়নি একুশ বছর, মামলা করার পর বিচারকাজ শেষ হতে সময় লেগেছে ১৩ বছর। এর মাঝে বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়নি, যাঁরা আছেন তাঁদের অনেকে বিব্রত হয়েছেন এবং সেগুলো দেখে আমরা শুধু বিব্রত হইনি, ক্ষুব্ধ হয়েছি এবং ক্রুদ্ধ হয়েছি। তার পরেও দেশের মানুষ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে। একটা ট্রাইব্যুনাল তৈরি করে ঝটপট বিচার করে খুনিদের ঝুলিয়ে প্রতিশোধের তীব্র আনন্দটুকু সহজেই পাওয়া যেত; কিন্তু সেটি করা হয়নি। এটি আমাদের দেশের বিশাল একটি অর্জন। আমরা এখন মাথা তুলে বলতে পারি, এই দেশের মাটিতে আমরা খুনিদের বিচার করে দেশকে, দেশের মানুষকে গ্লানিমুক্ত করেছি।
আত্মস্বীকৃত খুনিদের দম্ভোক্তিগুলো আমরা অসংখ্যবার শুনেছি, নতুন প্রজন্ম ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন আরও অনেক সহজে শুনতে পারে। বিচারকাজ চলার সময় আবিষ্কার করেছি, প্রাণ বাঁচানোর জন্য এখন তারা সব দায়দায়িত্ব অস্বীকার করে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করছে, তখন আমরা না চাইলেও আমাদের ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। আমি চাই, যখন তাদের গলায় জল্লাদেরা ফাঁসির দড়িটি পরাবে, তখন অন্তত একবারও যেন তাদের সামনে শিশু রাসেল এবং ১০/১২ বছরের নাম না জানা সেই বালক বা ফুটফুটে বালিকাদের চেহারাটা ভেসে ওঠে।

.
আমি আশা করছি, বর্তমান সরকার আত্মতুষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ১৯৭৫ সালের সেই সময়টুকুর কথা একবার ভাববে। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা সেই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর দুঃসাহস পেয়েছিল কারণ, তখন দেশটি ভালো চলছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ, অর্থনীতি বলে কিছু নেই, খাবার নেই, দুর্ভিক্ষ, বাকশাল, রক্ষী বাহিনী—সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ মানুষ ছিল হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। এত দিন পর আমরা জানি এর অনেকটুকু ছিল দেশ এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ফল, অনেকটুকুর ওপর কারও হাত ছিল না সেটি আমাদের দুর্ভাগ্য—কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারকে স্বীকার করতেই হবে, একটা বড় অংশ ছিল তাদের ভুলভ্রান্তি এবং অন্যায়-অবিচার। বঙ্গবন্ধুর দলের মানুষের অপকর্মের দায়ভারই নিতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুকে আর তাঁর পরিবারের মানুষকে। যদি সেই সময় আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থক আর কর্মীরা দেশটাকে এ রকম নৈরাজ্যকর একটা জায়গায় ঠেলে না দিত, এই খুনিরা তাহলে এত বড় একটা ঘটনা ঘটানোর দুঃসাহস পেত না।
আওয়ামী লীগ আবার দেশ শাসনের দায়িত্বটুকু পেয়েছে, দেশের মানুষ অনেক বড় স্বপ্ন দেখে তাদের ক্ষমতায় এনেছে। প্রতি মুহূর্তে তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে, আমার দলের মানুষ কি এই দেশের সাধারণ মানুষের মন বিষিয়ে দিচ্ছে? দলের মানুষ ছোট একটা লাভ করার জন্য কি পুরো দেশটাকে বিশাল একটা বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে?
আমি পুরো দেশের খবর জানি না, খবরের কাগজে অত্যন্ত খণ্ডিত একটা ছবি দেখি সেটা থেকে অনুমান করার চেষ্টা করি। সব সময় অনুমান সঠিক হয় না। কিছুদিন আগে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংগঠন বাউল সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। কোনো একটা কারণে ছাত্রলীগের ছেলেরা সেখানে হামলা করে স্টেজ ভেঙে চেয়ার-টেবিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে সাউন্ড সিস্টেম নষ্ট করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের সব খবরের কাগজে খবরটা ছবিসহ ফলাও করে ছাপা হয়েছিল। যে খবরটা ছাপা হয়নি সেটা হচ্ছে, তার পরেও সবাই মিলে অত্যন্ত চমত্কারভাবে দুই দিনের সেই বাউল সম্মেলন অনুষ্ঠানটি উদ্যাপন করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের বাইরের সবাই সেটি উপভোগ করেছে। কাজেই, খবরের কাগজ থেকে আমরা যে তথ্যগুলো পাই সেগুলো খণ্ডিত, সেগুলো পূর্ণাঙ্গ নয়।
কিন্তু যে বিষয়গুলো আমি নিজের চোখে দেখি, সেগুলো খণ্ডিত নয়, সেগুলো পূর্ণাঙ্গ। কাজেই, আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের চোখে দেখেছি, এখানে ছাত্রলীগের ছেলেরা নিজেদের ভেতর মারামারি করছে, একদল আরেক দলের ওপর হামলা করছে। সেই হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছে, ধর্মঘট ডেকে লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, নিজেরা নিজেদের কুপিয়ে আহত করে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ইন্টারনেট ব্রাউজ করার সবচেয়ে সুন্দর ল্যাবরেটরিটি ভেঙে গুঁড়ো করে দিয়েছে। আওয়ামী লীগের ম্যানিফেস্টোতে ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে। আমি অন্তত এই একটা ঘটনার কথা বলতে পারি, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে সুন্দর ডিজিটাল পরিবেশটি তারা অবলীলায় ধ্বংস করে দিয়েছে। (আমার এত মন খারাপ হয়েছিল যে আমি সেটি কখনো দেখতে যাইনি। বিশ্ববিদ্যালয় নিজের খরচে সেটি আবার ঠিক করে দিয়েছে।) শুধু যে দল বেঁধে এ রকম হাঙ্গামা হচ্ছে তা নয়, নীতিহীন নেতা তৈরি হচ্ছে, তারা মাস্তানি করছে, ছাত্রীদের অসম্মান করছে।
আমি জানি, আওয়ামী লীগের বড় নেতারা এই পুরো ব্যাপারটাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলবেন, সমগ্র দেশের বিশাল কর্মকান্ডের তুলনায় এটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র বিষয়! কিন্তু এই ছোট ছোট অসংখ্য ক্ষুদ্র বিষয় যখন একত্র হয়, তখন সেটি আর ক্ষুদ্র বিষয় থাকবে না। যখন দেশের মানুষ একদিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে, ‘ধুর! এদেরকে দিয়ে কিছু হবে না। সবই আসলে এক মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ!’ তখন তাদের বুঝতে হবে, একটা খুব ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে। আমরা নিজের চোখে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দেখেছি। তাই আমরা কোনোভাবেই হতাশ এবং ক্ষুব্ধ দেশবাসী দেখতে চাই না।
শুধু যে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অসহিষ্ণু ছাত্রলীগ- যুবলীগের তাণ্ডব হচ্ছে তা নয়, আরও বড় বড় ব্যাপারও ঘটছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর অত্যন্ত দক্ষ এবং কার্যকর ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। তিনি সত্ এবং নীতিবান মানুষ ছিলেন কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা তাঁর জীবনকে অতিষ্ঠ করে দিয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করিয়েছে। আমি যতদূর জানি, পদত্যাগ পত্রে তিনি স্পষ্ট করে সেই কথা লিখে দিয়েছেন। শুধু যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ রকম ঘটনা ঘটেছে তা নয়, পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়েও সেই একই ঘটনা ঘটেছে, ভাইস চ্যান্সেলরকে সরে যেতে হয়েছে। আমি দেশের অন্য অনেক কিছু না বুঝতে পারি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে কী হয় আর কী না হয় সেই জিনিসটা বুঝতে পারি। তাই আমি খুব স্পষ্ট ভাষায় বলতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে কাজগুলো ঘটছে, সেগুলো কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো যে শুধু অনৈতিক তা নয়, এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সঠিক মানুষকে নিয়োগ না দিয়ে দলীয় অপদার্থ মানুষদের জোর করে ঢুকিয়ে দিলে সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি আর কোনো দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। অন্যরা শুনছে কী না জানি না, আমরা কিন্তু এই দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্যুঘণ্টা শুনতে শুরু করেছি।
আওয়ামী লীগ সাধারণ মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে, তাদের অনেক বড় কাজ করার সুযোগ আছে। কিন্তু অত্যন্ত সংকীর্ণ দলীয় কিছু বিষয়ে নাক গলিয়ে তারা যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের মন বিষিয়ে না দেয়। এই অতি সাধারণ বিষয় বোঝার জন্য কি রকেটবিজ্ঞানী হতে হয়?

.
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই বড় কিছু ঘটে, তখন ছাত্র-শিক্ষক সবাই আমাদের লাইব্রেরির সিঁড়িতে এসে জড়ো হয়েছি। একজন-দুজন কিছু বলে অন্যরা শোনে। ১৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পর অনেকটা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ছাত্র-শিক্ষকেরা সেখানে উপস্থিতি হয়েছে। ছাত্ররা কথা বলেছে, শিক্ষকেরা কথা বলেছে। বক্তব্যের বিষয়বস্তু মোটামুটি এক, আমরা কলঙ্কমুক্ত হয়েছি, একই ধারাবাহিকতায় জেলহত্যা মামলার বিচার করে দ্বিতীয়বার কলঙ্কমুক্ত হব। আমাকে যখন কথা বলতে দিয়েছে, আমি তখন আরও একটি কথা যুক্ত করেছি, বলেছি, আজ যেমন এখানে এসেছি, ঠিক সেরকম কিছুদিনের ভেতর আবার এখানে এসে আমরা ঘোষণা করতে চাই, ‘যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে পুরো জাতি আজ কলঙ্কমুক্ত হলো।’
সরকার আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তারা যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবে, আমরা সরকারের সেই প্রতিশ্রুতিকে বিশ্বাস করেছি। আমরা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছি সেই প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ার জন্য। এটি ডিসেম্বর মাস, এটি বিজয়ের মাস। এই মাসে এই দেশের সবাই যেন নতুন করে ঘোষণা করে যে এই দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীর বিচার আমরা করবই করব।
বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করে আমরা প্রথমবার অনুভব করেছি গ্লানিমুক্তির অনুভূতিটি কী রকম। যুদ্ধাপরাধীর বিচার করে আমরা নতুন করে আবার সেই গ্লানি আর কলঙ্ক ধুয়ে-মুছে ফেলতে চাই।
নতুন প্রজন্মের চোখের দিকে তাকিয়ে তখন আমরা স্পষ্ট করে বলতে পারব, বাঙালি বীরের জাতি—এই জাতির ইতিহাসে কোনো গ্লানি নেই, কোনো কলঙ্ক নেই।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল: লেখক। অধ্যাপক, শাহাজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

ভোলায় লঞ্চডুবি -এতগুলো মৃত্যুর দায় কার?

ঈদের আগের দিন রাতে ভোলার লালমোহনে ঘটে যাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনা কয়েক শ পরিবারের জীবন কীভাবে তছনছ করে দিয়েছে, তা ভুক্তভোগী ছাড়া অনুমান করা কঠিন। এ ঘটনায় এ পর্যন্ত ৭৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ যাত্রীর সংখ্যা শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পঞ্চাশেরও বেশি। তাঁদের স্বজনেরা ঘটনার তিন দিন পরও অপেক্ষায় আছেন, অন্তত লাশটি যদি পাওয়া যায়! মর্মান্তিক! আমরা এই পরিবারগুলোর প্রতি আমাদের শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। নিহত ব্যক্তিদের আত্মার শান্তি কামনা করছি।
কেন এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা? এতগুলো মৃত্যুর দায় কার? প্রাথমিকভাবে যে কারণ জানা যাচ্ছে, তাতে দুর্ঘটনার শিকার এমভি কোকো-৪ লঞ্চের মালিকপক্ষকেই এ জন্য দায়ী করতে হচ্ছে। লঞ্চটিতে যেখানে ধারণক্ষমতা ছিল ৩৭০ জন, সেখানে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের দাবি অনুযায়ী, ঢাকা থেকে লঞ্চটি যাত্রা করেছিল তিন হাজার যাত্রী নিয়ে। বেশি লাভের আশায় মালিকপক্ষ এই অনৈতিক কাজ করেছে, এতে সন্দেহ নেই। মানুষের জীবনের মূল্য এখানে কোনো বিবেচনা পায় না। একদিকে বেশি যাত্রী বহন, অন্যদিকে টিকিট পরীক্ষার নামে আনসার দিয়ে যাত্রীদের লাঠিপেটা করে লঞ্চের একদিকে জড়ো করা—যে ঘটনাকে দুর্ঘটনার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে, কোনো কিছুতেই কম জুড়ি নেই এই মালিকপক্ষের। ঘাটের কাছে এসে লঞ্চটি ডুবে শেষ পর্যন্ত এতগুলো মানুষের প্রাণহানি ঘটাল। আরও একটি তথ্য হচ্ছে, ২০০৭ সালের পর এ লঞ্চটির ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়নি। কিন্তু লঞ্চটি নিয়মিত যাত্রী বহন করে গেছে।
সরকার বা অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকেও এ ঘটনার দায় সমভাবে নিতে হবে। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী যদি কোনো লঞ্চ বহন করে, তবে সেই লঞ্চের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব তো তাদের। সেই নজরদারি যে ছিল না, কোনো সন্দেহ নেই। কর্তৃপক্ষের কি জানা ছিল না যে ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ থাকবে এবং লঞ্চমালিকেরা সে সুযোগ নেবেন; তাঁরা বেশি যাত্রী বহন করবেন; বেশি ভাড়া আদায় করবেন? আর ২০০৭ সালের পর যে লঞ্চটির ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়নি, সেটি কীভাবে যাত্রী বহন করে যাচ্ছিল—এর কী জবাব দেবে কর্তৃপক্ষ?
সব লঞ্চ দুর্ঘটনার পর যা হয়, এবারও তা-ই হয়েছে; একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। হয়তো একটি প্রতিবেদনও পাওয়া যাবে এই কমিটির কাছ থেকে। কিন্তু লঞ্চমালিকদের অতিরিক্ত অর্থলিপ্সা আর কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতার ফলে এ ধরনের দুর্ঘটনা আর ঘটবে না, এর নিশ্চয়তা কি কর্তৃপক্ষ দিতে পারবে? আমরা সে নিশ্চয়তা চাই।

মহান বিজয়ের মাস -সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে

নতুন আশা, উদ্দীপনা, স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এল ডিসেম্বর—মহান বিজয়ের মাস। তিরিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ নিপীড়িত-অত্যাচারিত মা-বোনসহ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যাঁরা পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকে সম্ভব করেছিলেন, এই মাসজুড়ে তাঁদের সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার নানা উদেযাগ-আয়োজন চলবে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পেছনের মূল স্বপ্ন ও লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার ও প্রেরণা নবায়নের মাসও এই ডিসেম্বর।
স্বাধীনতাসংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মতো সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম ডিসেম্বর। সরকারের বিভিন্নমুখী ঘোষণা, পরিকল্পনা, উদেযাগ ও তত্পরতার মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয়, মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা নানাভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান জানানোর আন্তরিক আগ্রহ রয়েছে এ সরকারের।
যেমন, গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন, ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানিত নাগরিকের মর্যাদায় রেল, বাস ও লঞ্চে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের (ভিআইপি) মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। ইতিমধ্যে ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। শহীদ ও যুদ্ধাহত পরিবারগুলোর জন্য রেশনব্যবস্থা চালুর কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, তাঁদের সন্তানদের জন্য সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির কোটা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সামনে মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাস-ঐতিহ্যের মূর্ত প্রতীক হিসেবে স্মারক, স্মৃতিস্তম্ভ ইত্যাদি স্থাপনের উদ্যোগও চলছে।
তবে একটি উদেযাগে বিলম্ব ঘটছে, যা নিয়ে কিছু হতাশা, কিছু নেতিবাচক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ লক্ষ করা যাচ্ছে। সেটি হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়টি অন্যতম বড় অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের মন্ত্রী-সাংসদদের অনেক বক্তৃতা-বিবৃতি শোনা গেলেও প্রকৃত কাজ এখনো শুরু করা হয়নি। সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম থেকে হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এখন এ সংগঠনের তত্পরতা কিছুটা ঝিমিয়ে এসেছে বলে মনে হয়। সরকারি সূত্রে একবার সংবাদমাধ্যমে খবর বেরোল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে কিছু বিদেশি মহলের চাপ আছে; তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো চাপেই সরকার পিছপা হবে না। আসলে পিছপা হওয়ার কোনো উপায় নেই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতেই হবে। ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইম (ট্রাইব্যুনাল) কার্যকর রয়েছে; সে আইনের আওতায় যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়েছিল, যাঁরা নিম্ন আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন, কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ক্ষমা পেয়েছিলেন, তাঁদের সম্পর্কিত নথিপত্র পুনরুদ্ধার ও পর্যালোচনা করে বিচার ও দণ্ড প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু করা, বিশেষত চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার শুরু করা উচিত।
এই অসম্পন্ন কাজগুলো করার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ের এই মাসে যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন, যা থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে রয়েছি। সেই চেতনা ও স্বপ্ন হলো এক সুখী, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও শান্তিময় বাংলাদেশ। আমাদের সব কর্মতত্পরতার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে -মহান বিজয়ের মাস

নতুন আশা, উদ্দীপনা, স্বপ্ন নিয়ে ফিরে এল ডিসেম্বর—মহান বিজয়ের মাস। তিরিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ নিপীড়িত-অত্যাচারিত মা-বোনসহ মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যাঁরা পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিন্ন করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাকে সম্ভব করেছিলেন, এই মাসজুড়ে তাঁদের সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করার নানা উদেযাগ-আয়োজন চলবে। সেই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পেছনের মূল স্বপ্ন ও লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার ও প্রেরণা নবায়নের মাসও এই ডিসেম্বর।
স্বাধীনতাসংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দ্বিতীয়বারের মতো সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এই প্রথম ডিসেম্বর। সরকারের বিভিন্নমুখী ঘোষণা, পরিকল্পনা, উদেযাগ ও তত্পরতার মধ্য দিয়ে প্রতীয়মান হয়, মুক্তিযুদ্ধে যাঁরা নানাভাবে অবদান রেখেছেন, তাঁদের যথাযোগ্য সম্মান জানানোর আন্তরিক আগ্রহ রয়েছে এ সরকারের।
যেমন, গত ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন, ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মুক্তিযোদ্ধারা সম্মানিত নাগরিকের মর্যাদায় রেল, বাস ও লঞ্চে বিনামূল্যে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন। খেতাবপ্রাপ্ত ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নাগরিকের (ভিআইপি) মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি সরকারের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। ইতিমধ্যে ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। শহীদ ও যুদ্ধাহত পরিবারগুলোর জন্য রেশনব্যবস্থা চালুর কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে, তাঁদের সন্তানদের জন্য সরকারি-আধাসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির কোটা এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সামনে মুক্তিযুদ্ধের মহান ইতিহাস-ঐতিহ্যের মূর্ত প্রতীক হিসেবে স্মারক, স্মৃতিস্তম্ভ ইত্যাদি স্থাপনের উদ্যোগও চলছে।
তবে একটি উদেযাগে বিলম্ব ঘটছে, যা নিয়ে কিছু হতাশা, কিছু নেতিবাচক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ লক্ষ করা যাচ্ছে। সেটি হলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এ বিষয়টি অন্যতম বড় অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের মন্ত্রী-সাংসদদের অনেক বক্তৃতা-বিবৃতি শোনা গেলেও প্রকৃত কাজ এখনো শুরু করা হয়নি। সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম থেকে হতাশা ব্যক্ত করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। এখন এ সংগঠনের তত্পরতা কিছুটা ঝিমিয়ে এসেছে বলে মনে হয়। সরকারি সূত্রে একবার সংবাদমাধ্যমে খবর বেরোল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে কিছু বিদেশি মহলের চাপ আছে; তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো চাপেই সরকার পিছপা হবে না। আসলে পিছপা হওয়ার কোনো উপায় নেই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতেই হবে। ১৯৭৩ সালের ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইম (ট্রাইব্যুনাল) কার্যকর রয়েছে; সে আইনের আওতায় যেসব যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু হয়েছিল, যাঁরা নিম্ন আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছিলেন, কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ক্ষমা পেয়েছিলেন, তাঁদের সম্পর্কিত নথিপত্র পুনরুদ্ধার ও পর্যালোচনা করে বিচার ও দণ্ড প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু করা, বিশেষত চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের আইনের আওতায় এনে বিচার শুরু করা উচিত।
এই অসম্পন্ন কাজগুলো করার সঙ্গে সঙ্গে বিজয়ের এই মাসে যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত, তা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন, যা থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে রয়েছি। সেই চেতনা ও স্বপ্ন হলো এক সুখী, সমৃদ্ধ, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও শান্তিময় বাংলাদেশ। আমাদের সব কর্মতত্পরতার চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

টিপাইমুখে বাঁধ নির্মাণ পুনর্বিবেচনা করতে ভারতকে বলব -জকিগঞ্জে জর্জ গ্যালওয়ে

 টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের বিষয় পুনর্বিবেচনা করতে ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ব্রিটিশ এমপি জর্জ গ্যালওয়ে। গত রোববার সকালে বাংলাদেশে টিপাইমুখ বাঁধের ভাটি অববাহিক অঞ্চল সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলসীদ পরিদর্শনকালে তিনি এ আহ্বান জানান। জর্জ গ্যালওয়ে সেখানে কয়েক ঘণ্টা থেকে বাঁধবিরোধী অবস্থানের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
জর্জ গ্যালওয়ে বলেন, ‘পর্যবেক্ষণে মনে হচ্ছে, এ বাঁধ নির্মাণ সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের নদী অববাহিকা অঞ্চল পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আমি এ ব্যাপারটি নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারণা চালাব। একই সঙ্গে বাঁধ নির্মাণের বিষয় পুনর্বিবেচনা করতে ভারত সরকারকে বলব।’
জানা গেছে, সিলেটের বিয়ানীবাজারের সন্তান কাউন্সিলর আবজল মিয়া পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে নিয়ে জর্জ গ্যালওয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশে আসেন। গত ২৭ নভেম্বর তিনি সিলেট সফরে আসেন। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত রোববার সকাল নয়টায় তিনি অমলসীদের পথে রওনা হন।
দুপুর একটা থেকে বিকেল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত গ্যালওয়ে অমলসীদ এলাকায় ছিলেন।

ওয়াশিংটনে বন্দুকধারীদের হামলায় চার পুলিশ নিহত

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে একটি বিমান ঘাঁটির কাছে এক কফি শপে বন্দুকধারীদের অতর্কিত হামলায় চার পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। গত রোববারএই হামলার ঘটনা ঘটে।
পুলিশের মুখপাত্র এড ট্রয়ার সাংবাদিকদের বলেন, স্থানীয় সময় সকাল সোয়া আটটায় কফি শপের একটি টেবিলে চার পুলিশ বসেছিলেন। এমন সময় একজন বন্দুকধারী সেখানে প্রবেশ করে তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এতে চারজনই নিহত হয়। নিহতদের পরিচয় তািক্ষণকভাবে প্রকাশ করা না হলেও পুলিশ জানায়, নিহতদের মধ্যে তিন পুরুষ ও এক নারী। তাদের পরণে বুলেটপ্রুফ ওয়েস্টকোটসহ ইউনিফর্ম ছিল।
ট্রয়ার বলেন, লেকউড পুলিশ বিভাগের এই চার পুলিশই বিশেষভাবে হামলার লক্ষ্য ছিল। কফি শপের অন্য কেউ এ হামলায় হতাহত হয়নি। তিনি বলেন, বন্দুকধারী একজন কৃষ্ণাঙ্গ এবং তাঁর বয়স ২০ থেকে ৩০ এর মধ্যে। তিনি একটি হ্যান্ডগান নিয়ে কফি শপে প্রবেশ করে একের পর এক গুলি ছোঁড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে ভিড়

বগুড়ায় ঈদের ছুটিতে বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ঈদের আনন্দ বেশি পেতে ঝিনাইদহে দুলাভাই-শ্যালকদের মধ্যে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলার আয়োজন করা হয়। সমুদ্রসৈকত কুয়াকাটা পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে।
নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
বগুড়া: ঈদের দিন বিকেলে সাতমাথায় কুটির শিল্প, বেলুন, চটপটির দোকানে বসেছিল মেলা। ওয়ান্ডারল্যান্ডে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মোহাম্মদ আলী প্যালেস মিউজিয়াম, কারুপল্লী, নাজ গার্ডেন, পৌরপার্কগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় ছিল।
শহরের বাইরে পুণ্ড্রনগর খ্যাত মহাস্থানগড়ে ঘুরে বেড়িয়েছে অনেকে। হজরত শাহ সুলতান বলখি (রহ.)-এর মাজার, জিয়নকূপ, শিলাদেবীর ঘাট, মহাস্থানগড় জাদুঘর, গোকুলে বেহুলার বাসরঘরের মতো জায়গাগুলো ঘুরে দেখেছে শিশু-নারী পুরুষেরা।
ঝিনাইদহ: দুলাভাই-শ্যালকেরা খেলোয়াড়। আয়োজক শ্বশুরেরা। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতেই ঐতিহ্যবাহী খেলা দাঁড়িয়াবান্ধার আয়োজন। ঈদের পরের দিন কালীগঞ্জ উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে হয় এই খেলা। বিকেল চারটায় দৌলতপুর গ্রামের মাঠে শুরু হয় এই খেলা। খেলায় ভগ্নিপতি দলে অংশ নেন ওই গ্রামে ঈদুল আজহা উপলক্ষে আসা সব ভগ্নিপতি। আর প্রতিপক্ষ ছিল গ্রামের যুবকেরা, যাঁরা সম্পর্কে তাঁদের শ্যালক।
আয়োজকদের একজন আনছার মোল্লা জানান, ঈদের আনন্দ বেশি করে উপভোগ করতেই তাঁরা এই আয়োজন করেছেন। খেলোয়াড়দের একজন মাগুরার শালিখা উপজেলার দোবিলা গ্রামের নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘খেলায় তাঁদের জিততে না দেওয়ার জন্য ঈদের আগের দিন থেকে তাঁদের কম খেতে দেওয়া হয়েছে।’ অবশ্য শ্যালক দলের একজন তরিকুল ইসলাম বলেন, তাঁরা নিয়মিত খেলেন, তাই জিতেছেন। খেলায় ৭-২ কোটে জামাই দল পরাজিত হয়।
কলাপাড়া (পটুয়াখালী): রোববার সকাল থেকেই বেশির ভাগ পর্যটক কুয়াকাটায় আসে। সৈকতের জিরো পয়েন্ট, ইকোপার্ক, লেম্বুরচর, শুঁটকিপল্লী, রাখাইন মহিলা মার্কেটসহ আকর্ষণীয় সব পয়েন্ট দর্শনার্থীর পদভারে ছিল মুখরিত। খাওয়ার হোটেল, আবাসিক হোটেল সর্বত্রই পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। কলাপাড়া থেকে কুয়াকাটায় যাওয়ার প্রধান সড়কটির বেহাল দশার কারণে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে দর্শনার্থীদের।

দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য সাড়ে সাত লাখ কোটি রুপি দাবি -ভারতের পরিকল্পনা কমিশন

দেশে ৫০ কোটি দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য সরকারের কাছে সাড়ে সাত লাখ কোটি রুপি দাবি করেছে ভারতের পরিকল্পনা কমিশন। আগামী এক দশকে ভারতের সংগঠিত ও অসংগঠিত ক্ষেত্রে এই অর্থ খরচ করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশন কর্মকর্তা এম এন ছাইনি বলেন, ‘২০২২ সালের লক্ষ্য মাত্রা পূরণের জন্য আমরা সরকারকে সাড়ে সাত লাখ কোটি রুপি মঞ্জুর করার আবেদন করেছি।’ তিনি বলেন, সরকার ইতিমধ্যে এই প্রকল্পে ৩২ হাজার কোটি রুপি ব্যয় করে ফেলেছে। প্রকল্পকে গতিশীল করতে আরও টাকা প্রয়োজন।
দেশের মানুষের দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়িয়ে তাকে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার জাতীয় রীতি ঘোষণা করেছে।
এদিকে ভারতের ব্যবসায়ীদের অন্যতম সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রিজের (সিআইআই) এক প্রতিবেদনে আগামী ছয় বছরে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যে সেবা বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ হাজার কোটি ডলার। বর্তমান ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বছরে বাণিজ্যের পরিমাণ ছয় হাজার কোটি রুপি।
সিআইআই বলছে, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সেবা বাণিজ্যের বাজার স্থিতিশীল আছে।

বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে নিহত ১, আহত ৮৭

দেশের বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক দিনে পৃথক সংঘর্ষের ঘটনায় একজন নিহত ও ৮৭ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমাদের আঞ্চলিক কার্যালয় ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
সিরাজগঞ্জ: গতকাল সোমবার ও গত রোববার সকালে শাহজাদপুরে দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২৩ জন আহত হয়েছেন। শাহজাদপুরের রানীকোলা গ্রামের উত্তরপাড়া ও দক্ষিণপাড়ার মধ্যে কবরস্থানের কমিটি ও টাকা-পয়সা নিয়ে আব্দুর রশিদ ও আব্দুর রাজ্জাক ব্যাপারির মধ্যে কোন্দল চলে আসছিল। গত বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটির ঘটনায় উভয় পক্ষ আলাদাভাবে ঈদের নামাজ আদায় করে।
রোববার সকালে উত্তরপাড়ার ওমর আলী জমিতে কাজে গেলে দক্ষিণপাড়ার লোকজন তাঁকে ধরে মারধর করে ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখে। পরে উত্তরপাড়ার লোকজন তাঁকে উদ্ধার করতে গেলে উভয় পক্ষে সংঘর্ষ বাধে। দেড় ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ১৫ জন আহত হন। গতকাল সকালে এ ঘটনার জের ধরে পুনরায় উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হন। তাঁদের মধ্যে সুমন (১২) ও খালেককে (৪৫) তীরবিদ্ধ অবস্থায় সিরাজগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নড়াইল: সদর উপজেলার মাইজপাড়া ইউনিয়নের আড়ংগাছা গ্রামের বিলে মাছ ধরার ঘুনি পাতাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিশ্বাস ও মোল্লা পক্ষের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষে ৩০ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১২ জনকে নড়াইল সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ইউনুস বিশ্বাস ওই রাতে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান। এ ঘটনায় ওই গ্রামের ১৫টি বাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
চুয়াডাঙ্গা: দামুড়হুদা উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের ঈদগাহ ময়দানে চাঁদপুর ও পার্শ্ববর্তী কুনিয়া গ্রামের মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায় করেন। জামাতের ইমাম নূর ইসলাম ছয় তাকবিরে নামাজ পড়ার কথা বললে কুনিয়া গ্রামের জিয়াউর রহমান ১২ তাকবিরে পড়ানোর শর্ত জুড়ে দেন। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে ইমাম নামাজ পড়াতে চাইলে কুনিয়ার মুসল্লিরা ঈদগাহ ছেড়ে চলে যান। পরে কুনিয়া চাঁদপুর গ্রামের লোকজন মোনাজাতরত মুসল্লিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে চাঁদপুর গ্রামের সাতজন এবং কুনিয়া গ্রামের তিনজন জখম হন।
তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ): ঈদের জামাতের স্থান নির্ধারণ নিয়ে গত শনিবার উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের উত্তর তাহিরপুর গ্রামবাসীর দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে ১৪ জন আহত হন। রোববার সকালে উপজেলার বালিজুরী ইউনিয়নে দক্ষিণকুল গ্রামে সংঘর্ষে ছাত্রসহ পাঁচজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ওদুদ, নূর আহমদ ও মামুনকে সিলেট ওসমানী চিকিত্সা মহাবিদ্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ছয়জনকে আটক করেছে।

বিরোধীদলীয় প্রার্থী পোরফিরিও লোবোর বিজয় দাবি -হন্ডুরাসে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

হন্ডুরাসের বিরোধী ন্যাশনাল পার্টি দাবি করেছে, সে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাদের প্রার্থী পোরফিরিও লোবো জয়ী হয়েছেন। গত রোববার নির্বাচনের বুথ ফেরত জরিপ ও ভোট গণনার প্রাথমিক ফলাফলের ভিত্তিতে এ দাবি করে দলটি। ন্যাশনাল পার্টি জানিয়েছে, লোবো বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
তাঁর এই জয়ে দলীয় নেতা-কর্মীরা নেচে-গেয়ে উল্লাস প্রকাশ করেছেন। বিজয়ী ভাষণে লোবো বলেন, আজ হন্ডুরাস সব সংকট সমাধানে নিজের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। তিনি আরও বলেন, জাতীয় মতৈক্যের সরকার গঠন করা হবে। বিভক্তির আর সময় নেই।
নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি ভোট গণনায় লোবো পেয়েছেন শতকরা ৫৫ ভাগ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টির এলভিন সান্তোস পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন।
হন্ডুরাসে গত ২৮ জুন অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়াকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এর পর থেকে দেশটিতে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়, লোবোর জয়ের মধ্য দিয়ে তা দূর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, হন্ডুরাসের সেনাবাহিনী গত জুন মাসে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট ম্যানুয়েল জেলায়াকে উত্খাত করে নির্বাসনে পাঠানোর পর পাঁচ মাস ধরে যে সংকট চলছিল, রোববারের নির্বাচনের ফলে তার অবসান হলো। ৬১ বছর বয়সী লোবো রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে হন্ডুরাসকে বের করে আনতে সমর্থ হবেন।
ওয়াশিংটন এ নির্বাচনের প্রশংসা করেছে। তবে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ভেনেজুয়েলাসহ দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর বামপন্থী নেতারা বলছেন, সেনা অভুত্থানের নেতারা এ নির্বাচন অনুষ্ঠান করায় এর কোনো কার্যকারিতা নেই।
এ নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে জেলায়া বলেছেন, নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তি সত্যিকারের প্রেসিডেন্ট হবেন না।

কসবা ও বাগমারায় ছয় পুকুরে বিষ ঢেলে মাছ নিধন

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় বিষ দিয়ে চারটি পুকুরের মাছ নিধন করেছে দুর্বৃত্তরা। রাজশাহীর বাগমারায়ও দুই পুকুরে বিষ ঢেলে মাছ হত্যা করেছে সন্ত্রাসীরা।
কসবা উপজেলার কাইমপুর ইউনিয়নের কামালপুর ও মইনপুর গ্রামে একই রাতে চারটি পুকুরে বিষ ঢেলে দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। শুক্রবার রাতে এ ঘটনাটি ঘটেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা দাবি করেছেন, এতে তাঁদের প্রায় ১৫ লাখ টাকার পাঙাশ মাছসহ দেশীয় মাছ মরে গেছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কামালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন আবু মুছার একটি বড় পুকুরে বিষ ঢেলে দেওয়ায় পরদিন শনিবার সকালে পাঙাশ মাছসহ দেশীয় মাছ মরে গিয়ে ভেসে উঠছে। এ সময় জাল দিয়ে কিছু মাছ ধরে এক লাখ টাকা বিক্রি করেন। আরও প্রায় ৫০ মণ মাছ পচে যায়।
ওই দিন রাতে একই ইউনিয়নের মইনপুর গ্রামে জয়দুল মেম্বারের তিনটি পুকুরেও দুর্বৃত্তরা বিষ ঢেলে দিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার মাছ মেরে ফেলে।
পুকুরের মালিক আবু মুছা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, তিনি পুকুরটিতে মাছের খাবারসহ প্রায় নয় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। ১২ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করতে পারতেন। কিন্তু মাত্র এক লাখ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন।
অপর পুকুরের মালিক জয়দুল হোসেন জানান, তিনটি পুকুরে বিষ ঢেলে দিয়ে তাঁর প্রায় তিন লাখ টাকার মাছ মেরে ফেলেছে দুষ্কৃতকারীরা।
কসবা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহিরুল ইসলাম খান জানান, বিষ ঢেলে দিয়ে মাছ নিধনের বিষয়টি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা মৌখিকভাবে জানিয়েছেন।
বাগমারার কুতুবপুর গ্রামের মকলেছুর রহমান পাশের বসন্তপুর গ্রামে তাঁর একটি বড় পুকুরে মাছের চাষ করে আসছিলেন। গত শনিবার রাতে দুবৃর্ত্তরা তাঁর পুকুরে বিষ প্রয়োগ করে। এতে পুকুরের প্রায় ৫০ মণ রুই, কাতল, মৃগেলসহ বিভিন্ন জাতের মাছ মরে ভেসে ওঠে। গত রোববার সকালে লোকজন পুকুরে মরা মাছ ভাসতে দেখে মকলেছুর রহমানকে খবর দেয়। এতে তাঁর দুই লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানান।
তাঁর ভাষ্যমতে, এলাকার কিছু লোকের সঙ্গে তাঁর বিরোধ চলে আসছিল। তারাই এ কাজ করতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন।
একই রাতে উপজেলার মরুগ্রাম ডাঙাপাড়া গ্রামের আতোয়ার হোসেনের ইজারা নেওয়া পুকুরে দুবৃর্ত্তরা বিষ প্রয়োগ করে প্রায় ২০ মণ মাছ মেরে ফেলে। এ ব্যাপারে থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। থানার ওসি হারুণ-অর রশিদ জানান, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে তিন কোটি লোক সরকারি খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল

যুক্তরাষ্ট্রের সাড়ে তিন কোটি জনগোষ্ঠী এখন সরকারি খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। ‘ফুড স্টাম্প’ নামে বহুল পরিচিত সরকারি খাদ্য সহযোগিতার পরিসর সম্প্রতি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক মন্দার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সচ্ছল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোয়ও এখন ফুড স্টাম্প গ্রহণের লম্বা লাইন।
একসময়ের বহুল সমালোচিত সরকারি এ খাদ্য সহযোগিতা গ্রহীতার সংখ্যা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। প্রতি আটজন বয়স্ক নাগরিকের মধ্যে একজন এবং প্রতি চার শিশুর মধ্যে একজন এখন ফুড স্টাম্প গ্রহীতা।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে খাদ্য সহযোগিতা দেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালিত ফুড স্টাম্প কর্মসূচি দীর্ঘদিন থেকে চালু রয়েছে। নিম্ন আয়, দারিদ্র্যসীমার নিচে বা কাছাকাছি অবস্থানের জনগোষ্ঠী ফুড স্টাম্পের জন্য আবেদন করতে পারেন। নারী, বয়স্কজন ও শিশুদের জন্য এর আবেদনপ্রক্রিয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। হঠাত্ কর্মহীন, অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়া পরিবারগুলো সরকারের পক্ষ থেকে এ সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। বাসস্থান, চিকিত্সাসেবা বা অন্যান্য জরুরি সরকারি সাহায্যের বাইরে কেবল খাদ্য সহযোগিতার জন্য প্রতিজনকে গড়ে ১৩০ ডলারের অনুদান দেওয়া হয়ে থাকে। নগদ অর্থ দেওয়ার পরিবর্তে অনুদান গ্রহণকারীকে এখন কার্ড প্রদান করা হয়। ক্রেডিট কার্ডের মতো ব্যবহার করে নাগরিকেরা কেবল খাদ্যসামগ্রী কিনতে পারেন।
ফুড স্টাম্প কর্মসূচির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন থেকে সোচ্চার একটি মহল। মানবিক ও কল্যাণকর কর্মসূচি হিসেবে ফুড স্টাম্প অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কাছে পরিচিত। যদিও রক্ষণশীলেরা মনে করে, এ কর্মসূচি দীর্ঘস্থায়ী জনকল্যাণে একটি ব্যর্থ আয়োজন। ফুড স্টাম্প অনগ্রসর জনগোষ্ঠীকে আরও কর্মবিমুখ করে তোলে। তাদের মতে, সরকারি এ খাদ্য সহযোগিতা গ্রহণকারীরা দিনের পর দিন কর্মহীন থাকায় ও অতি ভোজনের ফলে ডায়াবেটিক, স্থূলতাসহ নানা রোগের শিকার হচ্ছে। এসব জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার জন্যও সরকারকে সহযোগিতা প্রদান করতে হয়। ফুড স্টাম্প ঢালাওভাবে চালুর পরিণামে স্থায়ীভাবে ব্যাপক কর্মহীন ও অতি ভোজনকারী জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হবে। খয়রাতি বরাদ্দের ব্যয়বহুল চক্রে ব্যয় হবে কর্মক্ষম ও করদাতা নাগরিকদের উপার্জনের অর্থ।
এসব সমালোচনা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময় ফুড স্টাম্প কর্মসূচি ব্যাপকভাবে চালু হয়। রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এ কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময় ফুড স্টাম্প অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নিরাপত্তার কর্মসূচি হিসেবে মনে করা হচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক মন্দা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুড স্টাম্পের জন্য রাজ্য সরকারগুলো কেন্দ্র থেকে বর্ধিত বরাদ্দ পাচ্ছে। উদারনৈতিক মহল ফুড স্টাম্পকে পুষ্টি কর্মসূচি হিসেবে এখনো আখ্যায়িত করেন।
নিউইয়র্ক টাইমস গত রোববার এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ফুড স্টাম্পের জন্য প্রতিদিন নতুন করে ২০ হাজার লোকের আবেদন জমা পড়ছে। ফুড স্টাম্পের জন্য যোগ্য জনগোষ্ঠীকে আবেদনের জন্য উত্সাহিত করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে। ওবামা প্রশাসনের কৃষিবিষয়ক সহকারী মন্ত্রী কেভিন কনকেনন বলেছেন, ‘সরকারি পরিসংখ্যান মতে দেশের আরও দেড় কোটি জনগোষ্ঠী ফুড স্টাম্প পাওয়ার যোগ্য।’
যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনগোষ্ঠীর ১২ শতাংশ এখন সরকারের খাদ্য সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।রক্ষণশীল সংগঠন হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের মুখপাত্র রবার্ট রেকটর সরকারি খাদ্য সহযোগিতার সমালোচনা করে বলেন, দারিদ্র্যবিরোধী দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে কর্মসূচিটি ক্ষতিকর। তিনি বলেন, এধরণের সহযোগিতা লোকজনকে কর্মবিমুখ করে তোলে।

সাইফুরপন্থীদের প্রাধান্য- সিলেট মহানগর বিএনপির কমিটি

সিলেট মহানগর বিএনপির কমিটি গতকাল সোমবার ঘোষণা করা হয়েছে। বিএনপির নেতা এম ইলিয়াস আলীর পক্ষের নেতাদের দাবি, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের অনুসারীরা রোববার রাতে মহানগর আহ্বায়কের বাসায় গোপন বৈঠক করে কমিটি গঠন করেছেন। অন্যদিকে সাইফুর রহমানের অনুসারীদের দাবি, কেন্দ্রের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন বাদ দিয়ে আম্বরখানায় মহানগর বিএনপির কার্যালয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি হয়েছে।
দলীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত ২৪ নভেম্বর সিলেট মহানগর বিএনপির কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইলিয়াস ও সাইফুর রহমানের অনুসারীদের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে সম্মেলনের ১২ ঘণ্টা আগে কাউন্সিল স্থগিত করা হয়। ৩০ নভেম্বর ছিল কাউন্সিল করার শেষ দিন। রোববার রাতে সিলেট মহানগরের আম্বরখানায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরীর বাসায় সাইফুর রহমানের অনুসারীদের বৈঠক হয়। বৈঠকে শাহরিয়ার হোসেনকে সভাপতি, যুগ্ম আহ্বায়ক নাসিম হোসাইনকে সাধারণ সম্পাদক এবং যুগ্ম আহ্বায়ক রেজাউল হাসান লোদীকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে কমিটি করা হয়। তাঁরা সবাই সাইফুর রহমানের অনুসারী বলে পরিচিত।
ইলিয়াসের অনুসারী নেতা হিসেবে পরিচিত মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আহ্বায়ক কমিটির দুই-তৃতীয়াংশ নেতাদের বাদ দিয়ে কাউন্সিল করা যায় না। আমরা খবর নিয়ে জেনেছি, এটা কাউন্সিল ছিল না। এটা ছিল ঘরোয়া পরিসরে একটি বৈঠক।’ তিনি জানান, মহানগর বিএনপির ৭৭ সদস্যের মধ্যে ৫০ জনই জানেন না কাউন্সিলের খবর। এ জন্য গতকাল রাতেই বিষয়টি কেন্দ্রকে জানানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে শাহরিয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘৩০ নভেম্বর কাউন্সিল করার সর্বশেষ তারিখ ছিল। তাই ত্বরিতগতিতে কাউন্সিল করতে হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন, আম্বরখানায় দলের মহানগর বিএনপির কার্যালয়ে রোববার বিকেল পাঁচটা থেকে ভোররাত চারটা পর্যন্ত কাউন্সিল হয়। এতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। কমিটির বাকি সদস্যের নাম শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। কাউন্সিলে কতজন কাউন্সিলর ভোট দিয়েছেন—এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সরাসরি উত্তর না দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ গঠনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাউন্সিল সমাপ্ত করেছি।’ দলের একাংশের বিরোধিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি অংশ দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে বিভিন্ন অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এর আগে ২৫ নভেম্বর সিলেট জেলা বিএনপির সম্মেলনে জেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই কমিটিতে ইলিয়াস আলীর অনুসারীরা প্রাধান্য পান।

শিরিন এবাদির নোবেল পদক বাজেয়াপ্ত করেছে ইরান

ইরানের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী শিরিন এবাদির নোবেল শান্তি পুরস্কার হিসেবে পাওয়া পদক ও মানপত্র বাজেয়াপ্ত করেছে সে দেশের সরকার। ইরানের বিপ্লবী আদালতের নির্দেশে সপ্তাহ তিনেক আগে ব্যাংকের বক্স থেকে এই পদক ও মানপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। উল্লেখ্য, ২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান শিরিন এবাদি।
শিরিন জানিয়েছেন, পদক বাজেয়াপ্ত করার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর হিসাবও (অ্যাকাউন্ট) জব্দ করা হয়েছে। ইরানের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক এবং এর বিরোধিতাকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
শিরিন এবাদি বার্তা সংস্থা এপিকে বলেছেন, নোবেল পদকের সঙ্গে ফরাসি সরকার ও জার্মানির সাংবাদিকদের দেওয়া পুরস্কার নিয়ে গেছে সরকারি বাহিনী।
ইরান সরকার অবশ্য এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার যে দেশ থেকে দেওয়া হয় সেই নরওয়ে এই ঘটনায় মর্মাহত। সে দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, পদক বাজেয়াপ্তের ঘটনা এই প্রথম।
লন্ডনে সাংবাদিকদের শিরিন বলেন, পুরস্কার পাওয়ার কারণে তাঁর কাছে ১৩ লাখ মার্কিন ডলার দাবি করে ইরান কর্তৃপক্ষ । কিন্তু স্থানীয় আইন অনুযায়ী তিনি পুরস্কারের অর্থ কর ছাড় পান।

তাঁদের বাড়িতে ঈদ আসে না by মো. সুমন মোল্লা, ভৈরব

দেশ স্বাধীন করার দৃপ্ত অঙ্গীকার নিয়ে একাত্তরে যাঁরা পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে মরণপণ লড়েছেন, তাঁরা অনেকেই আজ লড়ছেন দুবেলা দুমুঠো অন্ন জোগাতে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কবে যে একবেলা তৃপ্তির সঙ্গে খেয়েছিলেন, সে কথা স্মরণ করা যেন তাঁদের কাছে বিড়ম্বনা। ঈদ আসে, চলেও যায়, তাঁদের ঘরে আনন্দ উছলায় না। দারিদ্র্যের ভেতর তাঁদের দিন কাটে একঘেয়েভাবে। কিশোরগঞ্জের ভৈরবের প্রায় ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার এবারের ঈদ যাপনে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।
তাঁদের একজন হলেন মুক্তিযোদ্ধা ইদন মিয়া। ঈদের দিন দুপুরে ভৈরব পৌরশহরের আমলাপাড়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কাঁথা মুড়ে শুয়ে আছেন তিনি।
ইদন মিয়া (৬৫) জানান, রিকশা চালিয়ে তাঁর সংসার চলে। জটিল কয়েকটি রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর কয়েক মাস ধরে সেই কাজও বন্ধ। তিনি বলেন, ‘ঈদে কষ্ট বাড়ে। কারণ, দিনটিতে পরিবারের সদস্যদের জন্য আমার কিছুই করার থাকে না।’
কয়েক বছর ধরে বিছানায় শুয়ে দিন কাটছে উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আ. সাদেকের (৭০)। দুই ছেলে আর চার মেয়ে নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন পার করছেন তিনি। কেমন কাটল ঈদ—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশীর দেওয়া গোশত দিয়ে ভাত খাই। মনে করতে পারি না কবে নিজের পয়সা দিয়ে গোশত কিনেছিলাম।’
তাঁর মেয়ে শিখা বলেন, ‘এক ভাই রিকশা চালায়, আমি সেলাইয়ের কাজ করি। দুজনের আয় দিয়ে সংসার চলে। তবে প্রতিদিন ৪০ টাকা বাবার ওষুধের পেছনে যায়।’
একই গ্রামের ইদ্রিস মিয়া (৬০) একসময় দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালাতেন। অসুস্থতা তাঁর কাজ করার শক্তি কেড়ে নিয়েছে। স্ত্রী শেফালী বেগম ব্র্যাক স্কুলে শিক্ষকতা করে যা পান, তা দিয়েই সংসার চলে। তিনি বলেন, ‘কি পেলাম আর না পেলাম এ হিসাব মেলাতে যুদ্ধ করিনি। সবাই ভালো থাকলে ভালো লাগত। আমাদের মতো দেশের অনেকেই ভালো নেই, এখনো এসব বিষয় বেশি ভাবায়।’
একই গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম দিনমজুরের কাজ করেন। সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাওয়ার কারণে বড় ছেলে সোহাগের পড়ালেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। ছোট ছেলে সুহূদ স্থানীয় হাজি জহির উদ্দিন বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে। কষ্টের মধ্যে বড় হলেও বাবাকে নিয়ে তাঁর গর্ব অনেক ওপর। সে জানাল, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধার ছেলে। এ কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ আমার কাছ বেতন নেয় না।’
ভৈরব মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্র জানায়, ভৈরব উপজেলায় গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ৪৬২ জন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন নয়জন। এ পর্যন্ত ভৈরববাসী ১০৫ জন মুক্তিযোদ্ধা হারিয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মিজু সরকার, মাইনউদ্দিন সরকার, আবদুর সবুর, আবুল বাসার, আকবর আলী, মজিদ মিয়ার মতো অনেক মুক্তিযোদ্ধা চিকিত্সা না পেয়ে এবং অর্ধাহারে-অনাহারে থেকে মারা গেছেন। এখনো অন্তত ৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় দিন কাটাচ্ছেন।

ভারতে কোর্ট মার্শালের রায় খারিজ হতে পারে

ভারতে ‘কোর্ট মার্শাল’-এর রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে ওই রায় খারিজ হতে পারে। এত দিন কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করা গেলেও সেখানে প্রধানত রায়ের আইনি দিকটি খতিয়ে দেখা হতো। নতুন করে মামলার শুনানি হতো না।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র উইং কমান্ডার মহেশ উপসনি জানান, সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর চাকরিসংক্রান্ত যে মামলাগুলো এত দিন সাধারণত নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টে বিচার হতো, সেগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য এবার ‘আর্মড ফোর্সেস ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হয়েছে। ওই ট্রাইব্যুনালে কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে, যেখানে গোটা মামলার নতুন করে শুনানি হবে।
কলকাতায় হেস্টিংসে সেনা অফিসারদের পুরোনো কোয়ার্টার্সের সাজসজ্জা বদলে তৈরি করা হয়েছে ওই ট্রাইব্যুনালের আদালত কক্ষ। নতুন এই ট্রাইব্যুনালের ডিভিশন বেঞ্চের দায়িত্বে থাকছেন কলকাতা হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি সাধনকুমার গুপ্ত এবং সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মদন গোপাল।
এই আদালতে কোর্ট মার্শালের রায়েরও পরিবর্তন হতে পারে বলে জানিয়েছেন সাধনকুমার গুপ্ত। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কয়েক বছর আগে জন্মু-কাশ্মীরে এক সেনা জওয়ান এক সেনা কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যা করেন। ওই জওয়ানের বক্তব্য ছিল, মুখ ঢেকে রাখা ওই কর্মকর্তার কাছে তিনি পরিচয় জানতে চান। কিন্তু ওই কর্মকর্তা পরিচয় না দিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে তিনি গুলি চালান। কোর্ট মার্শালে ওই জওয়ানকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সম্প্রতি দিল্লিতে এই ট্রাইব্যুনালে কোর্ট মার্শালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন ওই সেনা জওয়ান। ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কলকাতা হাইকোর্টের সাবেক মুখ্য বিচারপতি অশোক মাথুর তাঁকে খালাস করে দেন।’
সাধনকুমার গুপ্ত বলেন, কোর্ট মার্শালের রায় অপছন্দ হলেও এত দিন তা মুখ বুজে সহ্য করা হতো। এবার আপিলের সুযোগ পাবেন সেনা, বিমান ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা। সেনা সূত্র জানায়, কোর্ট মার্শালে হুঁশিয়ারি থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত সাজা দেওয়া হয়ে থাকে। গুপ্তচরবৃত্তি বা দেশের নিরাপত্তার ক্ষতি করলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার উদাহরণও রয়েছে।
সেনা সূত্র আরও জানায়, রাস্তাঘাটে সাধারণ মানুষের সঙ্গে গণ্ডগোলে লিপ্ত হওয়া বা অন্য কোনো আইন ভাঙলে জওয়ান বা কর্মকর্তার বিচার সাধারণ আদালতে যেমন হচ্ছিল তেমনই চলবে। কিন্তু তাঁদের পদোন্নতি, পেনশন-সংক্রান্ত বহু অভিযোগও জমা পড়ত সাধারণ আদালতে। এবার সেগুলোর বিচার হবে ট্রাইব্যুনালে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও বিহার, ওড়িশা, ঝাড়খন্ড এবং আন্দামান নিকোবরও রয়েছে কলকাতা ট্রাইব্যুনালের অধীনে। সব মিলিয়ে প্রায় এক হাজারেরও বেশি মামলা জমে আছে। ট্রাইব্যুনালের বিচারে সন্তুষ্ট না হলে সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা যাবে।

চর দখল নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ, গুলিতে নিহত ১

ব্রহ্মপুত্র নদে জেগে ওঠা একটি চরের দখল নিয়ে গতকাল সোমবার শেরপুর ও জামালপুরের ছয়টি গ্রামের কয়েক হাজার গ্রামবাসীর মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় আবুল হোসেন (১৬) নামের এক কিশোর নিহত হয়েছে। পরিবারের দাবি, পুলিশের গুলিতে সে নিহত হয়েছে। পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সংঘর্ষে চারজন পুলিশ সদস্যসহ উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছে।
একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদে জেগে ওঠা কয়েক শ একর আয়তনের একটি চর নিয়ে শেরপুর সদর উপজেলার চরপক্ষীমারী ইউনিয়নের ভাগলগড়, জঙ্গলদী ও ডাকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং জামালপুর সদর উপজেলার পাথালিয়া, গোয়াবাড়িয়া ও নাওভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। গতকাল সকাল থেকে উভয় জেলার ছয়টি গ্রামের কয়েক হাজার বাসিন্দা ওই চরের দখল নেওয়ার জন্য দা, ফালা, লাঠি, বল্লমসহ দেশি অস্ত্র নিয়ে সেখানে সমবেত হয়।
সংবাদ পেয়ে শেরপুর ও জামালপুরের জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য সেখানে অবস্থান নেন। পুলিশের উপস্থিতিতেই উভয় পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় জামালপুর সদর থানার হাবিলদার মো. জোহায়ের আলীসহ পুলিশের চার সদস্য আহত হন। উত্তেজিত লোকজন জোহায়ের আলীর কাছ থেকে একটি শটগান কেড়ে নেয়। পরে অবশ্য তা উদ্ধার হয়।
একপর্যায়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গুলিবর্ষণ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে শেরপুর সদর উপজেলার ডাকপাড়া গ্রামের আবুল হোসেন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। তার বাবার নাম সমশের আলী।
আহত ব্যক্তিদের মধ্যে জামালপুর সদর থানার হাবিলদার জোহায়ের আলীকে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়েছে। উভয় পক্ষের সংঘর্ষের সময় শেরপুরের পাইঠাপাড়া ও ভাগলগড়ের ১৫-২০টি ঘর প্রতিপক্ষের লোকজন আগুনে পুড়িয়ে দেয়। এ সময় তারা লুটতরাজ চালায়।
শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে অবস্থানরত নিহত আবুল হোসেনের দুই চাচা মো. মোস্তফা (৫৫), মো. খোকা (৪৫) ও বড় ভাই মো. মিজান (২৬) অভিযোগ করেন, পুলিশের গুলিতেই আবুল হোসেন মারা গেছে। আবুল হোসেন সংঘর্ষের ঘটনা দেখতে চর এলাকায় যায়।
নিহত আবুল হোসেনের আত্মীয়স্বজনের অভিযোগ অস্বীকার করে জামালপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়দেব চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, আবুল কীভাবে মারা গেছে, তাঁরা তা জানেন না। তবে জামালপুর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শটগানের ৫১টি গুলি বর্ষণ ও কাঁদানে গ্যাসের ১০টি শেল নিক্ষেপ করেছে।
অপরদিকে শেরপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান বলেন, ঘটনার সময় শেরপুর পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো রকম গুলিবর্ষণ করা হয়নি। বর্তমানে চরের নিয়ন্ত্রণ পুলিশের হাতে রয়েছে।