Thursday, January 9, 2014

হতাশ হয়েছে বিশ্ব

বাংলাদেশ আর কখনো এভাবে প্রায় পুরো বিশ্বকে হতাশ করেছে বলে শুনিনি। ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। সেটা নিকটতম প্রতিবেশী, যার সহায়তা ও অঙ্গীকারগুলো সময়মতো পূরণ হলে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের জনসমর্থন হয়তো এতটা কমে যেত না। ফলে, বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নির্বাচনে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী সরকারকে বাস্তবে কোনো সাহায্য করবে কি না বলা মুশকিল; বরং ভারতবিরোধিতার রাজনীতির প্রচারণা উসকে দেওয়ায় তা সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করা এখন সহজ নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হতাশা জানানোর পালা শুরু হয় লন্ডন থেকে। তারপর ওয়াশিংটন, টরন্টো, জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তর হয়ে ক্যানবেরা ও টোকিও—সব জায়গা থেকে প্রায় অভিন্ন প্রতিক্রিয়া। তাদের হতাশার কারণ অনেক। প্রথমত, অর্ধেকের বেশি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং অবশিষ্ট এলাকাগুলোয় ভোটারদের অংশগ্রহণ কম হওয়ার বিষয়। দ্বিতীয়ত, বেআইনি সহিংসতায় বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানি, নাগরিকদের ভীতি প্রদর্শন এবং স্কুল-কলেজসহ সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা। তৃতীয়ত, শান্তিপূর্ণ ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য না হওয়া। কমনওয়েলথ দেশগুলোর জোট কমনওয়েলথের মহাসচিবের বিবৃতিতেও কোনো ব্যতিক্রম ছিল না।
নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগেই ইঙ্গিত মিলতে শুরু করে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নির্বাচন কীভাবে মূল্যায়ন করতে যাচ্ছে। কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেও এই নির্বাচন যে কমনওয়েলথের গৃহীত সনদের নীতিমালা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, সে কথা তারা তখন স্পষ্ট করেনি সম্ভবত কূটনৈতিক শালীনতার কারণে। তবে নির্বাচনোত্তর বিবৃতিতে সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের জন্য ব্যাখ্যা দিয়ে তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে কেন তারা পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারেনি। সেখানে তারা বলেছে, কমনওয়েলথ সনদের নীতিমালা, বিশেষ করে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনের সঙ্গে পরিস্থিতি সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় কমনওয়েলথের পর্যবেক্ষকেরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাননি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সমতুল্য কর্মকর্তা ক্যাথরিন অ্যাশটন অবশ্য খোলাসা করেই জানিয়ে দেন যে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হওয়ায় তাঁরা এটি পর্যবেক্ষণের কোনো প্রয়োজন দেখছেন না। গত ২০ ডিসেম্বর তাঁর মুখপাত্র পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানো স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে দেশটির প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো ব্যর্থ হওয়ায়’ তাঁরা এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্যতম মুখপাত্র জেন সাকি ২২ ডিসেম্বরেই তাঁদের হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের চোখে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ থাকলেও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল কোনো সমঝোতায় পৌঁছতে না পারায় তেমন নির্বাচন সম্ভব হচ্ছে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে যাওয়ায় এই নির্বাচনে যুক্তরাজ্য কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশার পর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিষয়েও ইঙ্গিতটা এসব বিবৃতিতে স্পষ্ট। কূটনীতির একটি প্রধান উপাদান হচ্ছে কঠিন কথা মিষ্টি ভাষায় বলতে পারা।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উন্নয়ন এবং বাণিজ্য-সহযোগী এসব দেশের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে তারা চায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতে দ্রুততম সময়ে প্রত্যাবর্তন। সে কারণেই অস্ট্রেলিয়া ও জাপান স্পষ্ট করে আরেকটি নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছে। আর অন্যরা কিছুটা ঘুরিয়ে বলেছে। যেমন ব্রিটিশ সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাকে জরুরি অগ্রাধিকার দিয়ে ভয় ও প্রতিশোধের আশঙ্কামুক্ত অংশগ্রহণমূলক ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একযোগে কাজ করা বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সাড়া দিয়ে শিগগিরই অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও অর্থবহ সংলাপের কথা বলেছেন। ‘অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’ যে আরেকটি নির্বাচন, সে কথা নিশ্চয়ই আমাদের রাজনীতিকদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে পাশ্চাত্যের এসব দেশ ও আন্তর্জাতিক জোট বা সংস্থার কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সহিংসতা, বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলাগুলোর নিন্দার ক্ষেত্রে বাইরের দুনিয়ায় কোনো ধরনের মতভিন্নতা নেই। ভারত এ ক্ষেত্রে বেশি উদ্বিগ্ন। তার কারণ, নির্যাতনের শিকার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হলে ভিটেছাড়া উদ্বাস্তুদের তাদেরই আশ্রয় দিতে হবে। তবে অন্যদের উদ্বেগও কম নয়। কেননা, বাংলাদেশে নির্বাচন হলেই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা গত কয়েক দশকে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সেগুলোর কোনোটিরই বিচার হয়নি। মানবাধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নতুন উপলব্ধি ও দায়িত্ববোধের পরিচায়ক কিছু উদ্যোগ বা পদক্ষেপ তাই মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়।
তবে এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক দায়িত্ব বর্তাবে সরকারের ওপর। শুধু বিরোধী দল বা জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ২০১২ সালের ডিসেম্বরের কথা। লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি কমিটিকক্ষে ব্রিটিশ রাজনীতিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠকেরা বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের প্রতিনিধিদের কাছে নির্বাচনোত্তর সংখ্যালঘু নিপীড়নের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন বলে কথিত অত্যন্ত প্রভাবশালী সাবেক আমলা এইচ টি ইমাম সরকারের পক্ষে অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন যে এ ধরনের হামলা প্রতিকারে সব ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হবে। বিরোধী দল বিএনপির এম কে আনোয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তাঁর দল এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তারের পর তাঁদের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপালে তা কতটা ধোপে টিকবে, বলা মুশকিল। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে না পারার বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা কতটা হালে পানি পাবে, বলা দুষ্কর। বিবিসিতে যশোরের পুলিশ সুপারের যে উদ্ধৃতি দেখলাম, তাতে এটা স্পষ্ট যে সরকারের কাছে জেদ-জবরদস্তির ভোটরক্ষা যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, নাগরিকের জীবনরক্ষা বা নিরাপত্তার বিষয়টির অগ্রাধিকার ততটা ছিল না। এ কারণে সব জায়গাতেই পুলিশ, প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা গেছেন হামলা হওয়ার পর। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর বেশি দিন চুপ থাকবে বলে মনে হয় না। হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই এ বিষয়ে তো আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।
বিরোধী দলকে মতপ্রকাশের সুযোগ না দেওয়া, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক হয়রানির প্রসঙ্গেও এসব বিবৃতিতে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। স্পষ্টতই তাঁদের উদ্বেগের প্রধান বিষয় হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী শাসনের পথে ধাবিত হয় কি না। নির্বাচন শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই নতুন করে বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সরকার বহির্বিশ্বে যে বার্তা পাঠাল, তা কতটা বিবেচনাপ্রসূত হলো, তা তারাই ভালো বলতে পারবে। বিরোধী দল দমন এবং শক্তি প্রয়োগে মতপ্রকাশের সুযোগ খর্ব করা অব্যাহত থাকলে অচিরেই মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো যে নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে, তাতে সন্দেহ নেই। আর সে রকম ক্ষেত্রে উন্নয়ন-সহায়তা ও বাণিজ্য-সুবিধার ওপর যে প্রতিকূল প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, তা আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না। নির্বাচন-পূর্ব বিবৃতিগুলো এবং নির্বাচনোত্তর প্রতিক্রিয়াগুলোয় পাশ্চাত্যের দেশগুলোর ব্যবহূত ভাষায় যে ধরনের মিল, তা স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখার বিষয়ে তারা অভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের কর্মকৌশলে সেই অভিন্নতা বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল। প্রতিটি বিবৃতিতেই বাংলাদেশে স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য দেশটির জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা রয়েছে। এটাকে অনেকেই নতুন সরকারের প্রতি সমর্থনের অঙ্গীকার বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা শঠতাপূর্ণ। যাঁরা কূটনৈতিক শালীনতা বজায় রেখেও গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন, তাঁরা সেই প্রহসনজাত নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা বজায় রাখবেন—এমনটি কল্পনা করে কেউ আত্মহারা হতে চাইলে অন্যদের আর কী করার আছে? এবার অন্য একটি দেশের কথা বলি। ২০০৮ সালের ২৯ মার্চ।
ব্যাপক সহিংসতার পর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে একযোগে ভোট অনুষ্ঠিত হলেও ভোট গ্রহণের ৩৬ ঘণ্টা পরও নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় অস্বীকৃতি জানাল নির্বাচন কমিশন। কারণ হিসাবে তারা বলল, ২১০টি আসনের পার্লামেন্টে ২৩টি আসনের ভোট পুনর্গণনা প্রয়োজন। এই কটি আসনের ফলাফল উল্টে দিতে পারলেই নির্বাচনে শাসক দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আবেদন-নিবেদন সবই উপেক্ষিত হলো। সরকারের প্রভাবাধীন হাইকোর্টও ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধে হস্তক্ষেপের জন্য বিরোধী দলের আবেদন প্রত্যাখান করলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও বিরোধী দল জয়ী হওয়ার দাবি জানাল, কিন্তু কমিশন সেই ফলাফলও স্থগিত রাখল। প্রায় এক মাস পর তারা বিতর্কিত ভোটগুলো পুনর্গণনার উদ্যোগ নিল এবং যথারীতি আশঙ্কা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিজয়ী ঘোষিত হলো। পশ্চিমা বিশ্বে রীতিমতো হইচই। এমনকি যে দেশটিতে এসব নির্বাচনী প্রহসন মঞ্চস্থ হলো, সেই দেশটির প্রতিবেশীদেরও অনেকে প্রকাশ্যেই এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের কথা বলল। তবে তাদের এক বৃহৎ প্রতিবেশী তাদের সমর্থনে অনড় থাকল। এ কারণে আঞ্চলিক জোটের দেশটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলো না। তবে নির্বাচনের প্রায় চার মাস পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেশটির বিরুদ্ধে নানা রকমের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। এরপর আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যস্থতায় আপস-রফার মাধ্যমে দেশটির দুই আপসহীন প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি করতে বাধ্য হলো। যে দেশটির কথা বলছিলাম, সেটির ক্ষমতাসীন দল ও তার নেতার কৃতিত্ব হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করে নিজেদের স্বাধীন করা। আর সেই ক্ষমতাসীন দলটি ছিল ওই দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল এবং তার স্বাধীনতাসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু দলটিও যেমন দিনে দিনে গণবিচ্ছিন্ন কোটারির রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল, তেমনি সেই নেতাও অপশাসন তথা দুঃশাসনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। দেশটির নাম জিম্বাবুয়ে। আর দলটির নাম জানু পি এফ এবং স্বাধীন দেশটির জনক হলেন রবার্ট মুগাবে। প্রতিবেশী হলো দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশের ভেতরে বিরোধীদের কোণঠাসা করে মুগাবে গত বছর আবারও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু দেশটি এখনো খুঁড়িয়ে চলছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে মুগাবে এখনো একঘরে।
কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

‘সংবিধান রক্ষায়’ সংবিধানবিচ্যুত শপথ

ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই দেশ শাসন করেছিলেন ১৬৪৩ থেকে ৭২ বছরের বেশি। ‘আমিই রাষ্ট্র’ কথাটি তাঁর জবানিতেই পরিচিত। অপ্রয়োজনে সংবিধান থেকে সরে আজই শপথ এবং ১২ জানুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রশ্নবিদ্ধ উদ্যোগ দেখে লুইয়ের কয়েকটি উদ্ধৃতি স্মরণে আসছে। লুই বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে জয় করতে পারে, তার সামনে আর সামান্যই কিছু টিকতে পারে।’ অবশ্য তিনি তাঁর অন্তিম শয়ানে বলেছিলেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু রাষ্ট্র সর্বদাই টিকে থাকবে।’ রকিব উদ্দীন কমিশন গতকাল গেজেট করে যা করল, তাতে মনে হয় তাঁরা লুইয়ের সপ্তদশ শতাব্দীর রাজকর্মচারী। তাঁরা লুইয়ের মনোবাঞ্ছা পূরণ করছেন। লুই বলতেন, ‘এটা আইনসম্মত, কারণ এটাই আমার অভিপ্রায়।’ এখন সরকার সংসদ ভাঙছে না অথচ ইসিকে দিয়ে সংবিধান ভাঙাচ্ছে। সরকারি মন্ত্রণাদাতারা ও তাদের তথাকথিত শুভানুধ্যায়ীরা উদ্ভট ও অসাংবিধানিক মন্ত্রণা দিচ্ছেন। তাঁরা নাকি বলছেন, নবম সংসদ ভাঙতে হবে না। শপথ নিলে এবং দশম সংসদ ডাকলেই নবম সংসদ বিলুপ্ত হবে। অথচ সংবিধান বলেছে, শুধু দুভাবে সংসদ লুপ্ত হবে। প্রথমত প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে রাষ্ট্রপতির আদেশে। দ্বিতীয়ত প্রথম বৈঠক থেকে পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরা হলে। এটা পুরা হবে ২৪ জানুয়ারি। এই তারিখ এলেই তবে সংসদ আপনাআপনি ভাঙবে। কাউকে ভাঙতে হবে না। এখন নাকি সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংসদ ভাঙতে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেওয়া হবে না। ২৪ জানুয়ারির জন্য অপেক্ষাও করা হবে না।
তালি বাজিয়ে নবম সংসদ উধাও করে দেওয়া হবে। রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও প্রত্যেক নির্বাচন কমিশনার শপথ নিয়েছিলেন, আমি সংবিধানের রক্ষণ ও সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করব। আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে আমার পদের কর্তব্য পালন করব এবং আমার সরকারি কার্য ও সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেব না। গতকাল নতুন নির্বাচনের ফলাফল সরকারি বিজ্ঞপ্তি দ্বারা প্রকাশ করে ইসি সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের তিন দফার শর্ত নির্দিষ্টভাবে লঙ্ঘন করল। স্পিকার শপথ পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে তাঁর শপথও লঙ্ঘন করলেন। এরপর বাকি থাকবেন রাষ্ট্রপতি। ১২৩ অনুচ্ছেদের বিধান নিম্নরূপ: ‘(৩) সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে: এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে: তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ দশম সংসদ নির্বাচন ওই (ক) উপদফা মতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং সংবিধান বলেছে, ‘নির্বাচিত ব্যক্তিগণ’ আগামী ২৪ জানুয়ারি অর্থাৎ ‘মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করবেন না।’ কিন্তু শপথ নিয়ে আজই তাঁরা কার্যভার গ্রহণ করছেন।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২(ক) দফায় শপথের বিধান আছে। তাই ১২৩ ও ১৪৮ অনুচ্ছেদ মিলিয়ে পড়তে হবে। ১৪৮(২ক) বলেছে, ‘১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে’ শপথ পড়াতে হবে। এই অনুচ্ছেদেরই ৩ উপদফা বলেছে, শপথ মাত্রই কার্যভার গ্রহণ। ইসি যদি ২৩ জানুয়ারিতেও গেজেট প্রকাশ করত, তাহলে ২৫ জানুয়ারিতেই শপথ পড়ানো সম্ভব ছিল। বহুল উচ্চারিত ‘সংবিধান রক্ষার’ জন্য তারা ১৫ দিন সময় অপেক্ষা করতে পারেনি। এর আগে ২৪ জানুয়ারির পর নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের চিন্তাভাবনা ছিল। এখন ‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাসহ বিদ্যমান পরিস্থিতির’ কথা বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে শপথ গ্রহণ করা হচ্ছে। পত্রিকায় এসেছে, গত সোমবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে শপথের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, রাষ্ট্রপতি সংবিধান ভঙ্গ করার সভায় পৌরোহিত্য করেছেন। শাসকগণ প্রমাণ দিচ্ছেন, মাত্র ১৫ দিন বিলম্বের চেয়ে সংবিধান ভাঙা অনেক সহজ। অথচ এঁরাই সংবিধানের কোনো বিচ্যুতি ঘটালেও বিরাট শাস্তির বিধান করেছেন। শাসকেরা চাইলেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে ১২৩ অনুচ্ছেদের ওই শর্তাংশ মুছে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তাতে বদনাম হবে। লোকে ধরে ফেলবে। সংবিধানে সংশোধনী আনা বদনামের। কিন্তু তাকে দলিতকরণ দোষণীয় বা দণ্ডনীয় নয়। লোকে ধরতে পারবে না। আমরা তথাকথিত সাংবিধানিক শাসনে কতটা আছি, এটা তার আরেকটি প্রমাণ। রকিব কমিশন সংবিধান ভাঙল। শপথ পড়ালে স্পিকারও তার ভাগীদার হবেন। এখন দেখতে হবে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হতে শেখ হাসিনাকে কবে কখন আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতি এটা করলে তাঁর তরফে একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিচ্যুতি ঘটানো হবে।
তিনি যদি সরকার করার আমন্ত্রণ জানাতে আরও ১৫ দিন সময় নেন, তাহলে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ বেঁচে যাবে। আমরা বুঝতে অপারগ থাকব, নবম সংসদের সত্তা মাঘের কুয়াশায় মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত কী করে তিনি দশম সংসদ ডাকবেন। ২৪ জানুয়ারির আগে রাষ্ট্রপতি দশম সংসদের কোনো সদস্যকে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বৈধভাবে নিয়োগ দিতে পারেন না। কারণ সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন।’ কিন্তু সংবিধানমতে আমি তো ২৪ জানুয়ারির আগে কার্যভার গ্রহণ-উপযোগী কোনো ‘সংসদ সদস্য’ দেখি না। সংবিধানবহির্ভূত শপথ আইনের চোখে বৈধ শপথ হবে না। তাই রাষ্ট্রপতি তাঁদেরকে সরকার গড়তে আহ্বান জানাতে বাধ্য নন। শুনেছি, রাষ্ট্রপতি সঠিক পরামর্শ দিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতি যদি ২৪ জানুয়ারির আগে দশম সংসদের কোনো সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী হতে আমন্ত্রণ জানান, তাহলে তিনি সংবিধানের ১২৩ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে। যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি সংবিধান কল্পনা করেছিল। তাই ৫৭(৩) অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকতে কোনো কিছুই অযোগ্য করবে না।’ আসলে ভয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ দলটি এখন তাদের লব্ধ ‘বিজয়’ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে শঙ্কিত। তাই সংবিধানের এমন শক্তিশালী রক্ষাকবচ সত্ত্বেও কখন কী হয় এ প্রশ্ন তাদের তাড়া করে ফিরছে। বস্তুত তাঁরা রাজার ইচ্ছা পূরণ করছেন। সংবিধানবিচ্যুত হয়ে সংবিধান রক্ষণের শপথ আজ। এই রাষ্ট্রে কার কাছে এর প্রতিকার চাইব?
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

আসুন, আক্রান্তের পাশে দাঁড়াই

রাষ্ট্রের দায়িত্ব জনগণের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নানাভাবে নিষ্পেষিত, অত্যাচারিত ও নিপীড়িত হচ্ছে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচন বা ভোট এলেই সংখ্যালঘুদের ওপর নানা রকম নির্যাতন-নিগ্রহ নেমে আসে। রাজনৈতিক দলগুলো যার যার সুবিধামতো সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করে। সারা দেশে পরিকল্পিতভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভোটদানে বিরত রাখার যড়যন্ত্র করা হয়। এ কারণে সংখ্যালঘুরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে সীমাহীন বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছে। অনেক স্থানে ভোটের আগে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার জন্য সংখ্যালঘুদের হুমকি দেওয়া হয়। আবার অনেক স্থানে সরাসরি সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর ওপর হামলা করা হয়। এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬-এর নির্বাচনেও কিছু কিছু এলাকায় সংখ্যালঘুদের ভোটদানে প্রতিবন্ধকতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ২০০১-এ দেখা গেছে একেবারে ভিন্ন চিত্র। ২০০১-এর ঘটনাগুলো পরিচালিত হয়েছে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পনামাফিক।
২০০১-এর অক্টোবরের নির্বাচনের অব্যবহিত পরে দেশে সংখ্যালঘু নিধন ও নির্যাতনযজ্ঞের এক ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে নিন্দা জানিয়েছিল সারা বিশ্ব। ২০০৮-এর নির্বাচনেও এ দেশের সংখ্যালঘুরা কমবেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এবার দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই পাবনা, বরিশাল, রাঙামাটিসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের বসতবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে ভিটেছাড়া করা হয়েছে। মানবসেবী ও সুশীল সমাজের কিছু মানুষ শুধু তাদের পাশে দাঁড়িয়ে অভয় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন বিকেলে আবারও সাম্প্রদায়িক শক্তি অসহায় সংখ্যালঘু মানুষগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়ায় সংখ্যালঘুদের ১৩০টি বাড়ি ভাঙচুর ও ১২টি পুড়িয়ে দেওয়া হয় (৬ জানুয়ারি, প্রথম আলো)। প্রাণভয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পালিয়ে গেছে অধিকাংশ গ্রামবাসী। নির্বাচনের সহিংসতা এখানেই থেমে যায়নি; পরদিন আবার ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার অপরাধে দিনাজপুরের চেহেলগাজী ইউনিয়নে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ভেঙে ধ্বংস করা হলো দুই শতাধিক দোকান ও বাড়িঘর। বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়ি ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে গতকালও। আমরা পত্রিকায় পড়েছি, টিভিতে দেখেছি হাজার খানেক সংখ্যালঘুর উদ্বিগ্ন মুখ, যারা ঠাকুরগাঁওয়ের গোপালপুরের আবাস ছেড়ে নিরাপত্তার জন্য ইসকন মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছে। সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া এবং যশোরের বিজয়রামপুরেও একই চিত্র।
সব মিলিয়ে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে সংখ্যালঘু জনগণকে। এবারের নির্বাচন তাদের জন্য ছিল উভয়সংকট। একদিকে নাগরিক হিসেবে ভোটাধিকার প্রয়োগ, অন্যদিকে ভোট দিলে সাম্প্রদায়িক জামায়াত-শিবিরনিয়ন্ত্রিত নির্বাচন প্রত্যাখ্যানকারী ১৮ দলের আক্রমণ। ভোট দেওয়ার অধিকার দেশের প্রত্যেক নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মানবাধিকার। আমাদের সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণ তার এই ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করে। এই ক্ষমতা প্রয়োগে কোনো নাগরিকের মধ্যে বৈষম্য করা যাবে না। কারণ, ২৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। তাই ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কাউকে অন্যায়ভাবে প্ররোচিত বা বাধ্য করা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভোটদান থেকে বিরত রাখার হীন উদ্দেশ্য আমাদের দেশের আইনের পরিপন্থী এবং সংবিধানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকারসংক্রান্ত দলিলের লঙ্ঘন। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বশর্ত এবং নির্বাচনে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের মতামতের প্রতিফলন ঘটা প্রয়োজন। কিছুসংখ্যক লোকের ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে বর্বরোচিত নির্যাতন করার রীতি চলছে, তা তাদের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে হরণ করে। সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্র হবে একটি গণতন্ত্র,
যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা থাকবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সংখ্যালঘু নির্যাতনের আলামত দেখা গিয়েছিল। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দেশের প্রত্যেক মানুষ যেন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তার নিশ্চয়তা বিধানের অঙ্গীকার করেছিল সরকার ও নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সে অঙ্গীকার রক্ষিত হয়নি অপশক্তির দাপটের কারণে। বিশেষ করে মৌলবাদী জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে বোমা মেরে, বাসে আগুন দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এই অবস্থায় দেশের সব শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের দায়িত্ব, আক্রান্ত সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। আর সরকারের দায়িত্ব হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়েই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা-নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছিল। এর সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিচার করা হয়নি। আওয়ামী লীগের শাসনামলে তার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, সেটি কারোরই কাম্য নয়। এখনই সময় এসেছে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিষদাঁত ভেঙে দেওয়ার।
আসুন, আমরা আক্রান্তের পাশে দাঁড়াই এবং আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলি।
সৌরভ সিকদার: অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

রাজনীতি আমাকে কাঁদায় by ইশরাত জাহান এ্যামি

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দু'কলম লেখার ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। কারণ এ রাজনীতি অনেক সৃষ্টির উল্লাসের সঙ্গে জড়িত। সুদূর অতীত ইতিহাসে যাব না। বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসেও কিন্তু রাজনীতি নামক শব্দটি আমাদের পরাধীনতার কবল থেকে মুক্ত করেছে, এটা কিন্তু কম কথা নয়। তবে দুর্ভাগ্য-সৌভাগ্য যা-ই বলুন না কেন স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ কিছুই দেখার সৌভাগ্য হয়নি। কারণ সবেমাত্র আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছি রাজনীতির বলীখেলা। যখন দেখি অস্ত্রের ঝনঝনানিতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় প্রকম্পিত হচ্ছে, যখন দেখি আমার সামনে প্রতিপক্ষ ছাত্রের গুলিতে আরেক ছাত্রের প্রাণ নিচ্ছে, আমার সামনে দিয়ে অস্ত্র হাতে নিয়ে হল দখল করছে, যখন দেখি বন্ধুর হাতে বন্ধু অবলীলায় খুন হচ্ছে, তখন ভাবি এ কেমন রাজনীতি? আমাকে কিন্তু আমার বন্ধুরা মিছিল করার হাতছানি দেয়, আমি বলি_ কেন মিছিলে যাব? কেন রাজনীতি করব? দেখছি রাজনীতি তো কিছু সৃষ্টি করছে না। রাজনীতি তো সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখছে না। রাজনীতি তো ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে অবদান রাখছে না। জাতীয় রাজনীতির তল্পিবাহক হিসেবে ছাত্রছাত্রীরা ব্যবহার হচ্ছে। আমি কিন্তু রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। আমার প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির প্রতি প্রচুর আগ্রহ। কারণ এ রাজনীতি দেশ-সমাজ-জাতিকে কম উপহার দেয়নি। কিন্তু আজ এই বাংলায় এই প্রজন্ম কী দেখছি? প্রতিদিন আন্দোলনের হোলিখেলায় প্রাণ যাচ্ছে। আমি বলি, এ রাজনীতি কার স্বার্থে এবং কেন? আমরা নেতা-নেত্রীরা তো বলি, আমরা দেশকে ভালোবাসি, দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করি। কই আমার তো মনে হয় না কোনো নেতা-নেত্রী দেশের স্বার্থে রাজনীতি করেন? আপনারা নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার মানসে রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠেছেন। আমার প্রশ্ন, আপনারা কেন আমাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারছেন না? আপনারা দুই নেত্রী কেন বলতে পারছেন না, আসুন জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আর কোনো ধ্বংস নয় আর কোনো জ্বালাও-পোড়াও নয় আর রাজপথে প্রাণহানি নয় আর হাজারো লাশের মিছিল নয়। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই। ক্ষমতার জন্য সবই ভুলে যাই। আপনাদের ভুলের মাশুল দিতে এ দেশের জনগণ আর কত মূল্য দেবে? এ দেশের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্য, অর্থনীতি সবকিছু কি মুখ থুবড়ে পড়বে? আসুন দেশের স্বার্থে, আগামী প্রজন্মের স্বার্থে একটি সুন্দর, সাবলীল এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পদ্ধতি গড়ে তুলি, যাতে এ জাতি আর রক্তের হোলিখেলায় মেতে উঠবে না। রাজনীতি যদি করেন দেশের স্বার্থে তাহলে আমি উভয় নেত্রীর কাছে অতি বিনয়ের সঙ্গে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হিসেবে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, রাজনীতি নামক শব্দটি যেন আমাকে আর না কাঁদায়, না হাসায়। রাজনীতি হোক সমগ্র জাতির কল্যাণে।
 ইশরাত জাহান এ্যামি :শিক্ষার্থী, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

হরতাল-অবরোধ বন্ধ হোক

নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন আছে, কিন্তু তার পরও এটা বাস্তব যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধীদলীয় জোট এবং জামায়াত-শিবির চক্র এই নির্বাচন বন্ধের জন্য কয়েক মাস ধরে হরতাল-অবরোধ থেকে শুরু করে পেট্রলবোমা-ককটেল ছুড়ে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ট্রাকে আগুন দেওয়ার মতো চরম সহিংস আন্দোলন—কোনোটাই বাদ রাখেনি। অনেক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু তার পরও যখন সেই নির্বাচন হয়েই গেল, এখন বিরোধী দলের একটু থেমে তাদের আন্দোলনের কৌশল পুনর্বিবেচনা করা দরকার। এটা এখন স্পষ্ট যে সহিংস আন্দোলন কোনো ফল দেবে না। সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায় না। এর প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা কী হবে, বিশেষত নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর, সে বিষয়ে বিএনপির কাছে মানুষ দায়িত্বশীল অবস্থানই আশা করে।
কিন্তু এটা দুঃখজনক যে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়েই বিএনপি-জামায়াত জোট একাদিক্রমে হরতাল-অবরোধ ডেকে চলেছে। নির্বাচনের আগে অনির্দিষ্টকালের জন্য যে অবরোধ ডাকা হয়েছিল, সেটা তো আছেই, উপরন্তু হরতালও ডাকা হচ্ছে। এর পরিণাম ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এখনো বিচ্ছিন্ন বোমা হামলায় মানুষের শরীর ঝলসে দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের হিংসাত্মক কর্মসূচি এখনই বন্ধ করা দরকার। লক্ষণীয় যে বিরোধী দল হরতাল-অবরোধ আহ্বান করলেও রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ শহরে তা কেউ মানছে না। এভাবে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল ভেঙে বেরিয়ে পড়তে থাকলে কর্মসূচি অকার্যকর হয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে বিএনপির মতো একটি দলের সেই কর্মসূচি দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। সরকারেরও দায়িত্ব কম নয়। বাছবিচারহীনভাবে বিএনপির নেতাদের গ্রেপ্তার করে সরকার কার্যত আরও হরতাল-অবরোধ ডেকে আনার পথ প্রশস্ত করছে। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পরও মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের কী এমন প্রয়োজন ছিল?
এসব রাজনৈতিক গ্রেপ্তার বন্ধ করে অবিলম্বে বিরোধীদলীয় নেতাদের মুক্তি দেওয়া দরকার। অন্যথায় বিরোধী দলের লাগাতার হরতাল-অবরোধের দায় সরকারের ওপরও বর্তাবে। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের প্রধান দায়িত্ব কিন্তু তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। নির্বাচন প্রতিরোধের নামে বিএনপি-জামায়াত শতাধিক স্কুল পুড়িয়ে দিয়েছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়ে চরম নিরাপত্তাহীন অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে। অথচ সরকার কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি আগেই প্রস্তুত থাকত, তাহলে কীভাবে দুর্বৃত্তরা সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত কয়েকটি জেলায় বারবার হামলা চালায়? ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো তো সরকার আগে থেকেই জানত। সেখানে যতটা নিরাপত্তা দেওয়া দরকার ছিল, তা কেন দেওয়া হয়নি? এ বিষয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তদন্ত এবং কারও অবহেলা থাকলে সে বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান, অবরোধ-হরতাল বন্ধ করুন। সরকারকে বলি, আর কোনো রাজনৈতিক গ্রেপ্তার ঠিক হবে না।

সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাহীনতা ও রাষ্ট্রীয় দায় by শরীফ আহমেদ

১৯৭১ সালে এ দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল ২ কোটি ১০ লাখ (প্রায়), আর ২০১৩ সালে এসে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৫৫ লাখে (প্রায়)। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এ দেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ। '১৯৫১ সালে এ অঞ্চলে মোট জনসংখ্যার হিন্দু ছিল ২২ শতাংশ, ২০০১ সালে ৯.২ শতাংশ আর ২০১১ সালে এ সংখ্যা কমে হয়েছে ৮.৫ শতাংশ (আদমশুমারি রিপোর্ট)।' এখনও বাংলাদেশের অনেক এলাকার হিন্দুদের জীবন কাটে উচ্ছেদ-উৎকণ্ঠা আর জীবনের নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্কের মধ্য দিয়ে। এখন ভিন্নমতাদর্শের কারণে ধর্মীয় প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার ভয় তাদের অন্তরাত্মাকে ধাওয়া করে প্রতিদিন-প্রতিনিয়ত। কী এমন মতাদর্শ যা একজন মানুষকে অন্যের ঘরে আগুন দিয়ে সোনার সংসারটাকে ভেঙে চুরমার করে দিতে প্ররোচিত করতে পারে! কী এমন মাইনাস ফর্মুলা যা ভিন্নমতাদর্শীকে মাইনাস করে একক বিশ্বাসীর রাজত্ব কায়েমের প্রচেষ্টায় কোনো ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে এমন উন্মাদ করে তুলতে পারে!
আজ রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ব্যর্থতার প্রতিফলন ঘটছে নিত্যনতুন আঙ্গিকে। এ দেশে দিন-দুপুরে, রাতের আঁধারে একদল লোক আরেক গোষ্ঠীর ওপর হামলা চালায়, বিধ্বস্ত করে বসতভিটা, উপাসনালয়! আর আগুনের দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা লেলিহান শিখা দেখে উন্মত্ত জয়োল্লাস করে একদল মধ্যযুগীয় বর্বররা। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি_ একই ইস্যু, একই ধরনের হামলাকারী, পূর্বপরিকল্পিত আক্রমণ আর শিকার শুধু এই অসহায় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। আমাদের প্রশাসনও বরাবরের মতোই নির্বিকার, কখনও দর্শকের ভূমিকায়, কখনও ওপরঅলাদের নির্দেশে লোক দেখানো ব্যস্ততার ভূমিকায় অবতীর্ণ। কিন্তু সেই রামু থেকে শুরু করে সাতক্ষীরার শ্যামনগর, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, লালমনিরহাটের হাতিবান্ধা, পাবনার সাঁথিয়া, বরিশালের চরকাউয়া এবং সর্বশেষ যশোরের অভয়নগরে হিন্দুদের ১২ বাড়িতে আগুন। সব জায়গায় যেন সংখ্যালঘুদের একই পরিণতি। এসব হামলার আক্রমণকারীদের খুঁজে বের করে আজ পর্যন্ত শাস্তির আওতায় আনতে পারেনি আমাদের কোনো প্রশাসন।
আমরা আর পত্রিকার পাতায় দেখতে চাই না_ ঘরদুয়ার পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া বাড়ির উঠানে বসা কোনো গৃহকর্ত্রীর করুণ আর্তনাদ আর আরাধনার দেবালয়ের এমন বেদনাঘন দৃশ্য। যে পোড়ায় তার যে দেবতা, আর যার পোড়ে তার যে দেবতা এক ও অভিন্ন সত্তা_ এই বোধ যতদিন না মানবের হৃদয়ে জাগ্রত হবে, ততদিন মানবতার এমন করুণ পরিণতি দেখে ভেতরটা হুহু করে কেঁদে উঠবে। আর নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদানে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অক্ষমতা দেখতে দেখতে ১৬ কোটি জনগণ দিনে দিনে হয়ে উঠবে আরও শঙ্কিত, ভীতসন্ত্রস্ত।
ধর্মানুভূতিতে আঘাতের অজুহাতে, উচ্ছেদ করে ভিটেমাটি-সম্পত্তি দখলের অভিপ্রায়ে ও রাজনীতির মাঠে ভোটব্যাংকের হিসাব করে এমন বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেসব সংখ্যালঘু বসতি এলাকায় তাদের রক্ষায় পূর্ব নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে নির্বাচনী সহিংসতা এড়ানো আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া অধিকাংশ সংখ্যালঘু মনে মনে দৃঢ় প্রশাসনিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করছে সরকারের কাছে। তবে তাদের নিরাপত্তাহীনতার দায় কিংবা এ ক্ষেত্রে ব্যর্থতার দায়ভার রাষ্ট্র তথা ক্ষমতাসীন সরকারকেই বহন করতে হবে। নতুবা বারংবার সংখ্যালঘুদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার প্রতিরোধ-প্রতিকার-প্রতিবাদহীনতার ব্যর্থতায় আরও বহুকাল আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়ে যাবে। কবি শামসুর রাহমানের সেই পঙ্ক্তিগুলো_ 'তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা, সিঁথির সিঁদুর মুছে গেল হরিদাসীর, আর কতকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়।'
শরীফ আহমেদ : শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় বাজিতপুরে ট্রেন লাইনচ্যুত, আহত ১৭

১৮ দলের হরতাল-অবরোধে দুর্বৃত্তরা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় বাহাদুরাবাদগামী নাসিরাবাদ মেইল ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়ে ১৭ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে ট্রাকে ও ঈশ্বরদীতে কাভার্ডভ্যানে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। পাবনার সুজানগরে প্রাইভেট কার ও সিএনজি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে প্রাইভেট কারের পাঁচ আরোহী কমবেশি আহত হলেও তাদের কেউ দগ্ধ হননি। এদিকে, সাতক্ষীরার রামচন্দ্রপুর মোড়ে একটি ট্রাক ভাংচুর করা হয়। সদর উপজেলার ধূলিহর এলাকায় একটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। অফিস, প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
কিশোরগঞ্জ :কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেললাইনের বাজিতপুর উপজেলার হালিমপুর রেলস্টেশনের কাছে দুর্বৃত্তরা ফ্লিশপ্লেট খুলে ফেলায় বাহাদুরাবাদগামী নাসিরাবাদ মেইল ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়। এতে চালকসহ ১৭ জন আহত হন। এর ফলে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের সঙ্গে কিশোরগঞ্জের ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে নাসিরাবাদ মেইল ট্রেনটি ভৈরব হয়ে সিরাজগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ওই রাতেই কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের হালিমপুর রেলস্টেশন পার হওয়ার পর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ইঞ্জিনটি লাইনচ্যুত হয়। রাতের বেলায় দুর্বৃত্তরা রেললাইনের দুটি ফ্লিশপ্লেট খুলে ফেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এতে ট্রেনের চালক নুরুল হক, যাত্রী আমিনুল ইসলামসহ ১৭ জন আহত হন। স্থানীয় রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ রেললাইন মেরামত করার পর ভৈরব থেকে অন্য একটি ইঞ্জিন এসে ট্রেনের বগিগুলো সরিয়ে নেয়। ময়মনসিংহ থেকে একটি রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পেঁৗছে লাইনচ্যুত হওয়া ইঞ্জিনটি উদ্ধার করে। কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার জয়ন্ত মজুমদার জানান, ইঞ্জিনটি উদ্ধারের পর বিকেল সোয়া ৩টায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পাবনা :সুজানগরে পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের দুলাইয়ে মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে দুষ্কৃতকারীরা যাত্রীবাহী প্রাইভেট কারে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে প্রাইভেট কারে থাকা মহিলা-শিশুসহ পাঁচজন কমবেশি আহত হলেও কেউ অগি্নদগ্ধ হননি।
মানিকগঞ্জ :দুর্বৃত্তরা মঙ্গলবার রাতে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার চারিপাড়া গ্রামে থেমে থাকা মাটি বহনকারী ট্রাকে (ঢাকা ট-১০৫৬) আগুন দেয়। এতে ট্রাকটির সম্মুখ অংশ পুড়ে গেলেও কেউ হতাহত হয়নি। বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঈশ্বরদী : মঙ্গলবার গভীর রাতে ঈশ্বরদীর জয়নগর মুন্নার মোড়ে এসএ পরিবহনের একটি কাভার্ডভ্যান পুড়িয়ে দিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। এ সময় ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া মহাসড়কে গাছ কেটে ও গুঁড়ি ফেলে মহাসড়ক অবরোধ করে ঈশ্বরদী থানার একটি গাড়ি, অন্তত ১০টি মালবাহী ট্রাকসহ প্রায় ৫০টি যানবাহন ভাংচুর করে তারা।
সাতক্ষীরা :বুধবার সকাল ৯টার দিকে সাতক্ষীরার রামচন্দ্রপুর মোড়ে অবরোধ সমর্থকরা একটি ট্রাক ভাংচুর করে। এর আগে ভোর ৫টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধূলিহর বেড়বাড়ী এলাকায় জহিরউদ্দীন চৌকিদারের বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পুলিশ সেখান থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতজনকে আটক করেছে। মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার বাবুলিয়া এলাকায় বৈকারীগামী দুটি ট্রাকে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
নাটোর :বুধবার নাটোরে বিএনপির নেতাকর্মীরা পণ্যবাহী ট্রাক আটকে সড়কের ওপর আড়াআড়ি রেখে পিকেটিং করে। শহরের হাফ রাস্তা এলাকায় তারা মিছিল করে। এ সময় রাজশাহীগামী একটি পণ্যবাহী ট্রাক আটক করার পর মিছিলকারীরা চাকার হাওয়া ছেড়ে দেয়। ট্রাকটি সড়কের ওপর আড়াআড়ি রেখে সড়ক অবরোধ করা হয়। এদিকে মঙ্গলবার রাতে বড়াইগ্রাম উপজেলার ধানাইদহে পাঁচটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়।
ঝিনাইদহ :ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা কৃষক দল সভাপতি মাহফুজুল হক খান বাবুর গ্রামের বাড়িতে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। আগুনে কম্পিউটার, ডিভিডি, আসবাব, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রায় তিন লাখ টাকার মালপত্র পুড়ে গেছে।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) :বুধবার দুপুরে উল্লাপাড়ার কাওয়াক গ্রামে ছানোয়ার হোসেনের খড়ের গাদা ও সেলিম রেজার মাছ ধরার শুকনো জালের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতাল সমর্থকরা।

ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় বাজিতপুরে ট্রেন লাইনচ্যুত, আহত ১৭

১৮ দলের হরতাল-অবরোধে দুর্বৃত্তরা কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে ফিশপ্লেট খুলে ফেলায় বাহাদুরাবাদগামী নাসিরাবাদ মেইল ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়ে ১৭ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে ট্রাকে ও ঈশ্বরদীতে কাভার্ডভ্যানে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। পাবনার সুজানগরে প্রাইভেট কার ও সিএনজি লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে প্রাইভেট কারের পাঁচ আরোহী কমবেশি আহত হলেও তাদের কেউ দগ্ধ হননি। এদিকে, সাতক্ষীরার রামচন্দ্রপুর মোড়ে একটি ট্রাক ভাংচুর করা হয়। সদর উপজেলার ধূলিহর এলাকায় একটি বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। অফিস, প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
কিশোরগঞ্জ :কিশোরগঞ্জ-ভৈরব রেললাইনের বাজিতপুর উপজেলার হালিমপুর রেলস্টেশনের কাছে দুর্বৃত্তরা ফ্লিশপ্লেট খুলে ফেলায় বাহাদুরাবাদগামী নাসিরাবাদ মেইল ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়। এতে চালকসহ ১৭ জন আহত হন। এর ফলে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহের সঙ্গে কিশোরগঞ্জের ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে নাসিরাবাদ মেইল ট্রেনটি ভৈরব হয়ে সিরাজগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাটের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। ওই রাতেই কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের হালিমপুর রেলস্টেশন পার হওয়ার পর ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ইঞ্জিনটি লাইনচ্যুত হয়। রাতের বেলায় দুর্বৃত্তরা রেললাইনের দুটি ফ্লিশপ্লেট খুলে ফেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এতে ট্রেনের চালক নুরুল হক, যাত্রী আমিনুল ইসলামসহ ১৭ জন আহত হন। স্থানীয় রেলওয়ে প্রকৌশল বিভাগ রেললাইন মেরামত করার পর ভৈরব থেকে অন্য একটি ইঞ্জিন এসে ট্রেনের বগিগুলো সরিয়ে নেয়। ময়মনসিংহ থেকে একটি রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পেঁৗছে লাইনচ্যুত হওয়া ইঞ্জিনটি উদ্ধার করে। কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার জয়ন্ত মজুমদার জানান, ইঞ্জিনটি উদ্ধারের পর বিকেল সোয়া ৩টায় ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।
পাবনা :সুজানগরে পাবনা-ঢাকা মহাসড়কের দুলাইয়ে মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে দুষ্কৃতকারীরা যাত্রীবাহী প্রাইভেট কারে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে প্রাইভেট কারে থাকা মহিলা-শিশুসহ পাঁচজন কমবেশি আহত হলেও কেউ অগি্নদগ্ধ হননি।
মানিকগঞ্জ :দুর্বৃত্তরা মঙ্গলবার রাতে মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার চারিপাড়া গ্রামে থেমে থাকা মাটি বহনকারী ট্রাকে (ঢাকা ট-১০৫৬) আগুন দেয়। এতে ট্রাকটির সম্মুখ অংশ পুড়ে গেলেও কেউ হতাহত হয়নি। বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঈশ্বরদী : মঙ্গলবার গভীর রাতে ঈশ্বরদীর জয়নগর মুন্নার মোড়ে এসএ পরিবহনের একটি কাভার্ডভ্যান পুড়িয়ে দিয়েছে হরতাল সমর্থকরা। এ সময় ঈশ্বরদী-কুষ্টিয়া মহাসড়কে গাছ কেটে ও গুঁড়ি ফেলে মহাসড়ক অবরোধ করে ঈশ্বরদী থানার একটি গাড়ি, অন্তত ১০টি মালবাহী ট্রাকসহ প্রায় ৫০টি যানবাহন ভাংচুর করে তারা।
সাতক্ষীরা :বুধবার সকাল ৯টার দিকে সাতক্ষীরার রামচন্দ্রপুর মোড়ে অবরোধ সমর্থকরা একটি ট্রাক ভাংচুর করে। এর আগে ভোর ৫টার দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধূলিহর বেড়বাড়ী এলাকায় জহিরউদ্দীন চৌকিদারের বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। পুলিশ সেখান থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতজনকে আটক করেছে। মঙ্গলবার রাতে সদর উপজেলার বাবুলিয়া এলাকায় বৈকারীগামী দুটি ট্রাকে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
নাটোর :বুধবার নাটোরে বিএনপির নেতাকর্মীরা পণ্যবাহী ট্রাক আটকে সড়কের ওপর আড়াআড়ি রেখে পিকেটিং করে। শহরের হাফ রাস্তা এলাকায় তারা মিছিল করে। এ সময় রাজশাহীগামী একটি পণ্যবাহী ট্রাক আটক করার পর মিছিলকারীরা চাকার হাওয়া ছেড়ে দেয়। ট্রাকটি সড়কের ওপর আড়াআড়ি রেখে সড়ক অবরোধ করা হয়। এদিকে মঙ্গলবার রাতে বড়াইগ্রাম উপজেলার ধানাইদহে পাঁচটি গাড়ি ভাংচুর করা হয়।
ঝিনাইদহ :ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলা কৃষক দল সভাপতি মাহফুজুল হক খান বাবুর গ্রামের বাড়িতে অগি্নসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। আগুনে কম্পিউটার, ডিভিডি, আসবাব, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ প্রায় তিন লাখ টাকার মালপত্র পুড়ে গেছে।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) :বুধবার দুপুরে উল্লাপাড়ার কাওয়াক গ্রামে ছানোয়ার হোসেনের খড়ের গাদা ও সেলিম রেজার মাছ ধরার শুকনো জালের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেয় হরতাল সমর্থকরা।

হরতালে রাজধানীতে ব্যস্ত জনজীবন

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের অবরোধসহ তিন দিনের হরতালের শেষ দিন বুধবার রাজধানীতে জনজীবন ছিল স্বাভাবিক। ব্যস্ত সময় পার করেছেন নগরবাসী। কোনো কোনো স্থানে যানজটের সৃষ্টি হয়। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। রাস্তায় প্রচুর গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলেছে। ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন গন্তব্যেও চলেছে বাস। পিকেটারদের কোনো তৎপরতা ছিল না। বিপণিবিতানসহ দোকানপাট খোলা ছিল। এদিকে গতকাল সন্ধ্যার পর ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন রুটে দূরপাল্লার বাস ছাড়তে শুরু করে।
গতকাল সন্ধ্যায় শেষ হয় এ হরতাল। সোমবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ডাকা হরতাল বাড়িয়ে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত করা হয়। মঙ্গলবার বিএনপির কয়েক নেতাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে বাড়ানো হয় এ কর্মসূচি। রোববারের নির্বাচনের ফল বাতিলের দাবিতে সোমবার থেকে ওই হরতাল ডাকা হয়েছিল। ১ জানুয়ারি থেকে চলে আসা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে বিএনপি। এদিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও আশপাশ এলাকায় হরতাল-অবরোধ সমর্থকদের কোনো তৎপরতা ছিল না। কার্যালয় ঘিরে যথারীতি নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি ছিল। হরতাল-অবরোধ পালনকালে নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা ও আহতদের সুস্থতা কামনায় আগামীকাল শুক্রবার দোয়া দিবস পালন করবে ১৮ দল। নির্বাচন বাতিলের দাবিতে শনিবার সারাদেশে জেলা-উপজেলা ও থানায় বিক্ষোভ পালন করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন এ জোট। গতকাল গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে সাভার, ধামরাই, পাটুরিয়া, মানিকগঞ্জসহ ঢাকার আশপাশের আরও কিছু গন্তব্যে বাস ছেড়ে যেতে দেখা গেছে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেটের কিছু বাস চলেছে।
এদিকে, টানা অবরোধ ও হরতালের মধ্যে গতকাল কিছু বিপণিবিতান ও দোকানপাট খোলা দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, দিনের পর দিন দোকান বন্ধ রেখে তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। বাধ্য হয়ে তারা ঝুঁকি নিয়েই দোকান খুলছেন। তা না হলে না খেয়ে মরতে হবে। ধানমণ্ডির জেনেটিক প্লাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শহীদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অবরোধের মধ্যেও মার্কেট খোলা রাখা হয়েছে। তবে ক্রেতা নেই। মালিকরা এখনও কর্মচারীদের ডিসেম্বর মাসের বেতন দিতে পারেননি। ব্যবসার বর্তমান যে অবস্থা, তাতে কবে নাগাদ বেতন দিতে পারবেন, তারও ঠিক নেই। সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী-শনির আখড়া-পুরান ঢাকা :পুরান ঢাকার কোথাও হরতালে সাড়া মেলেনি। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, শনির আখড়া, দোলাইরপাড় ও ডেমরা এলাকার জনজীবন ছিল স্বাভাবিক। ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি যাত্রীবাহী বাসও চলেছে। যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ এবং পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড়, বংশাল ও ফুলবাড়িয়া এলাকায় যানজট লক্ষ্য করা গেছে। এসব সড়কে পুলিশ-র‌্যাবের পাশাপাশি বিজিবির গাড়ি টহল দিয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের শনির আখড়া-সাইনবোর্ড এলাকায় সেনাসদস্যরা গাড়িতে টহল দিয়েছেন। এ এলাকার বেশিরভাগ দোকানপাট ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল খোলা। রাতে ছেড়েছে দূরপাল্লার বাস :বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থার মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ সমকালকে জানান, সন্ধ্যার পর ঢাকা থেকে দেশের সব রুটের বাস ছাড়তে শুরু করে। বুধবার রাতে অল্প সংখ্যক বাস চলাচল করলেও আজ বৃহস্পতিবার থেকে সব পরিবহনের বাস পুরোদমে চলবে বলেও জানান তিনি। সায়েদাবাদ আন্তঃজেলা ও নগর বাস টার্মিনাল শ্রমিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন সমকালকে বলেনন, সন্ধ্যায় হরতাল শেষ হওয়ার পর একটি-দুটি করে বাস ছাড়তে শুরু করে। রাতে শ্যামলী ও হানিফ পরিবহনের বাস চট্টগ্রাম; তিশা ও এশিয়া পরিবহনের বাস কুমিল্লা; যাত্রীসেবা ও একুশে পরিবহনের বাস নোয়াখালী এবং পদ্মা পরিবহনের বাস চাঁদপুরের উদ্দেশে সায়েদাবাদ টার্মিনাল ছেড়ে যায়।
গাবতলী বাস টার্মিনালে ঈগল পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার রাসেল সমকালকে জানান, রাত ১০টা ও ১১টায় তাদের দুটি বাস বরিশালের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ে। এ ছাড়া সাকুরা ও শাপলা পরিবহনের একটি করে বাসও গাবতলী থেকে ছেড়েছে।

জামায়াতের আগুনে দগদগে ক্ষত by তৌফিকুল ইসলাম বাবর, বাঁশখালী

'জামায়াত-শিবিরের নৃশংসতার আগুনে দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতই পোড়েনি, পুড়েছে এ দুই আদালতের কয়েক হাজার মামলার নথিপত্র ও জায়গা-জমির মূল্যবান কাগজপত্র। তাই আদালত ভবনের পোড়া দাগে রঙের প্রলেপ পড়লেও বাঁশখালীর মানুষকে দীর্ঘদিন এ ক্ষতি বইতে হবে।' বাঁশখালী আদালত ভবন চত্বরে দাঁড়িয়ে সমকালকে এ কথা বলেন বাঁশখালী আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট দিলীপ কান্তি সুশীল। গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রায় ঘোষণার পর বাঁশখালীতে স্মরণকালের ভয়াবহ তাণ্ডব চালায় জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। এতে পুড়ে যায় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আদালতের প্রায় ১৩ হাজার মামলার নথিপত্র। ভস্মীভূত উপজেলা পরিষদের আরও প্রায় পাঁচ হাজার নথি। এছাড়া আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণের জন্য রাখা হাজার হাজার বই। আগুন দেওয়া হয় সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, ভাংচুর চালানো হয় মঠ-মন্দিরেও। এমনকি মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে আসা এক বৃদ্ধকে পর্যন্ত কুপিয়ে হত্যা করে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা। এছাড়া বাঁশখালীতে বছরজুড়ে আরও কয়েক দফায় তাণ্ডব চালায় তারা। জামায়াত-শিবির অধ্যুষিত বাঁশখালীর বর্তমান অবস্থা জানতে খোঁজ নিয়েছে সমকাল।
সরেজমিনে দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্ত আদালত ভবন, উপজেলা পরিষদ কার্যালয় ও সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, মঠ-মন্দিরগুলোর গায়ে এখন আর পোড়া দাগ নেই। রঙের প্রলেপে রঙিন হয়েছে আদালত ও উপজেলা পরিষদ ভবন। পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি ও মন্দির। তাই সহজে দেখে বোঝার উপায় নেই আগুনে জ্বলেছিল এসব স্থাপনা। তবে এখনও নৃশংসতার ছাপ রয়েছে উপজেলা পরিষদের পুরনো এক হলরুমে। এখানে ছাইয়ের পাহাড় হয়ে পড়ে রয়েছে পুড়ে যাওয়া বই ও আসবাবপত্রগুলো। বিভীষিকাময় সেদিনের কথা মনে করতে গিয়ে এখনও শিউরে ওঠেন বাঁশখালীর মানুষ। জরুরি নথিপত্র না থাকায় নিত্য সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আদালত ও প্রশাসনকে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বাঁশখালী সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩-এর স্টেনোগ্রাফার আবদুল আউয়াল সমকালকে বলেন, 'নথি পুড়ে যাওয়ায় মামলাগুলো পুনর্গঠনে ব্যাপক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আদালত সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের মাধ্যমে ও পুলিশের কাছ থেকে নথি সংগ্রহ করে বাদীর উপস্থিতিতে মামলাগুলো পুনর্গঠন করতে হচ্ছে। এভাবে প্রায় ১০ মাসে বিচারাধীন মাত্র শ'খানেক মামলা পুনর্গঠন করা গেছে।'
দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিবরণ দিয়ে অ্যাডভোকেট দিলীপ কান্তি সুশীল জানান, এমন অনেক মামলার নথিপত্র পুড়ে গেছে, যেগুলো রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। নথি পুড়ে যাওয়ায় মামলাগুলো নতুন করে সাজাতে হচ্ছে। নতুন করে করতে হচ্ছে শুনানি। এতে বিচারপ্রার্থীদের বড় অঙ্কের অর্থ ও সময় লেগে যাবে। অনেক মানুষের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।'
আদালত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, 'নথির অভাবে ডাকাতি-হত্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ মামলার অনেক আসামির পার পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ডাকাতিসহ যেসব মামলার বাদী পুলিশ। নথি না থাকায় সেসব মামলার আসামিরা এখন আদালতে হাজিরাই দিচ্ছে না। তাদের বিচারের মুখোমুখি করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।'
বাঁশখালী থানার ওসি কামরুল হাসান সমকালকে বলেন, 'মামলার নথি পুড়ে যাওয়ায় আদালতকে নতুন করে নথি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। থানা থেকে ফৌজদারি মামলার যেসব নথি হচ্ছে আদালতে তা সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে অনেক আগের হওয়ায় নথিগুলো খুঁজে বের করতে সময় লেগে যাচ্ছে।'

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণে ঋণ দেবে এডিবি

অবশেষে ১২৮ কিলোমিটারের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা (৬২ কোটি ৫০ লাখ ডলার) ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। দক্ষিণ এশিয়া উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (সাসেক) রেলপথ সংযোগ স্থাপন কর্মসূচির আওতায় এ প্রকল্পে অর্থায়ন করবে এডিবি। সম্প্রতি রেলওয়ে মন্ত্রণালয়কে পাঠানো এক চিঠিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি। রেলপথ নির্মাণ হলে পর্যটন জেলা হিসেবে খ্যাত গোটা কক্সবাজারের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে যাবে। বছরে সাড়ে ১০ লাখ পর্যটক রেলপথে কক্সবাজার সফর করতে পারবেন। ২০১১ সালের ৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিত না হওয়ায় দীর্ঘ তিন বছর প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, সাসেক রেল সংযোগ কর্মসূচির আওতায় এ প্রকল্পে এডিবি ঋণ দিতে সম্মত হয়েছে। তিন বছরের ব্যবধানে প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণ ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। তাই নতুন করে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের আলোকে ডিপিপি সংশোধন করা হচ্ছে। সংশোধিত ডিপিপি অনুমোদনের পর দ্রুত প্রকল্পটির কাজ শুরু করা হবে। ট্রান্স এশিয়ান ও সাসেক রেলরুটভুক্ত হওয়ায় আঞ্চলিক ও উপ-আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ চালু করতে এ রেলপথ উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রকল্পটির আওতায় চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজারের রামু পর্যন্ত ৮৯ কিলোমিটার, রামু থেকে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের সীমান্ত ঘুনধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার সিঙ্গেল লাইন মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ রেলপথে ১০টি স্টেশন হবে_ সাতকানিয়া, কেউচিয়া, লোহাগাড়া, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ঈদগাহ, রামু, উখিয়া, ঘুনধুম ও কক্সবাজার। রেলপথটি নির্মাণে মোট ব্যয় হবে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মূল রেলপথ, স্টেশন ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
সাধারণ ঋণের আওতায় ৬০ কোটি ডলার ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ফান্ড থেকে আড়াই কোটি ডলার ঋণ দেবে এডিবি। জমি অধিগ্রহণ বাবদ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরকারের তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। এদিকে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সংশোধন করা হবে। শিগগিরই তা একনেকে পাঠানো হবে। প্রাথমিক ডিপিপি অনুযায়ী ২০১১ সালে শুরু হয়ে ২০১৩ সালে রেলপথটি নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল। এখন তা আগামী বছর শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হবে।

কান পাতলেই ক্ষোভ শোনা যায় by সঞ্জয় কুমার

'এ দেশে কী ঘটছে আমি জানি না। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাতায়াতে সমস্যার মুখোমখি হচ্ছি। এ নিয়ে আমি খুবই বিচলিত', বললেন ইমরান হক নামে বাংলাদেশের এক দিনমজুর। ঢাকার শহরতলি সাভারের দোকানদার আমানউল্লাহ চৌধুরী বলেন, 'আমি আমার দোকান খোলা রাখতে চাই, কিন্তু দোকান বন্ধ না রাখলেই বিক্ষোভকারীদের হাতে আক্রান্ত হতে পারি_ এই ভয় আমার মধ্যে কাজ করে। স্বাভাবিক জীবনযাপন আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। গত কয়েক মাসে আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।'
এসব দিনে ঢাকার রাজপথে কান পাতলেই ক্ষোভ ও হতাশা ভেসে আসবে। শেখ হাসিনার বাড়ির মনমেজাজ কিন্তু ভিন্ন। শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ বিজয়ী মানসিকতায় রয়েছে এবং সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের পর তাদের প্রতি জনসমর্থন রয়েছে বলে মনে করছে। রীতিমাফিক নির্বাচনের ফলাফলের পর ডাকা সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে আস্থাশীল মনে হয়েছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে তিনি তেমন একটা আমলেই নিতে চাননি। সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলবিহীন একটি সংসদ কীভাবে বৈধতা পেতে পারে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির দায় প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপান।
শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে ১২টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও উচ্চ আদালতের রায়ের কারণে জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারানোয় তাদের জোটসঙ্গী বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে। এর অর্থ এই নয় যে, নির্বাচন বৈধতা পায়নি। জনগণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে এটাই বৈধতার মাপকাঠি। এ ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও ছিল। সুতরাং এখানে বৈধতার প্রশ্ন আসার কোনো সুযোগ নেই। আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান বিষয়টি একেবারে খারিজ করে দেননি। তবে তিনি বলেন, নির্বাচন হবে কি হবে না সেটা সম্পূর্ণত নির্ভর করছে বিরোধী দল বিএনপির মনোভাবের ওপর।
শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করার পরও প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আমি তাদের বলেছিলাম, তারা নির্বাচনে এলে আমি সব দলের সদস্যদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে রাজি। নির্বাচনে আসার জন্য বিরোধীদলীয় নেতা যে যে মন্ত্রণালয় চান, সে সে মন্ত্রণালয়ই তাদের দেওয়ার কথা বলা হয়।
তিনি বলেন, 'তারা নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টাও করেছেন এবং উল্টো তারা সন্ত্রাসবাদী জামায়াতের সহায়তায় হরতাল ও সহিংসতা চাপিয়ে দিয়েছেন। হাসিনা আরও বলেন, 'বিএনপি নির্বাচনে বিশ্বাস করে না। তারা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। নির্বাচন আদৌ হবে কিনা সেটা নির্ভর করছে বিরোধীদের মনোভাবের ওপর। তারা কী করে, কী করছে এসব দেখতে হবে। সময় এলে অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।' তবে শেখ হাসিনার মন্তব্য বিস্তৃত প্রেক্ষিতে বিচার করলে, বিরোধী দল হরতাল ও সহিংসতার পথ ত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার ছায়া দেখা যায়নি, বরং তাকে আগের মতোই আস্থাশীল মনে হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা কেউ বাইরের মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নন বলেই মনে হয়েছে।
বিএনপি লাগাতার জনবিচ্ছিন্ন হরতাল-অবরোধ দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের একদিন পর সোমবার পুনরায় তারা হরতাল ডাকে। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এ ধরনের কর্মসূচিতে ৩০০'রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে_এই বাস্তবতায় তারা বিস্মৃত নয়। বিরোধীদের নৃশংসতাই অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী। আওয়ামী লীগ সরকার কি সংসদে তাদের চারভাগের তিনভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েও কার্যকরভাবে দেশ শাসনে সক্ষম হবে? কিন্তু নির্বাচনে এই বিরাট সাফল্য দেশে স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি নয়। নির্বাচনের আগে যেমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ছিল, নির্বাচনের পরও তার ইতরবিশেষ হয়নি। বিএনপি এবং তার জোটসঙ্গীরা হরতাল-অবরোধ ডেকেই চলেছে। এভাবে তারা কার্যত দেশকে অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। ঢাকার সিনিয়র সাংবাদিক নজরুল ইসলামের মতে, অনুুষ্ঠিত নির্বাচনটি অর্থহীন। দেশকে এ ধরনের সংকটে নিমজ্জিত করার জন্য সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই দায়ী করা চলে। দি ডিপ্লোমেটের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দুই প্রধান দলের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠানের ওপর জোর দেন। তার এ বক্তব্য বিএনপি নেতারাও অস্বীকার করেননি।
সিনিয়র বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু এ জন্য শাসক দলকে কিছুটা নমনীয়তা দেখাতে হবে, এ মুহূর্তে সেটা দৃশ্যমান নয়। দেশে এখন যে সংকট চলছে তার জন্য আমাদের দায়ী করা চলে না। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার পত্রিকা অচলাবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারছেন না বলেও পত্রিকাটি বলেছে। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী জোরের সঙ্গে এই নির্বাচনকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বলছেন; কিন্তু এতে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটবে না। তার মন্তব্য রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কাটানোর ক্ষেত্রে হতাশাজনক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারের কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একটি আপস-রফায় পেঁৗছতে পারেনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় যারা হত্যা, ধর্ষণসহ নানা যুদ্ধাপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের বিচার অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় চার বছর আগে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিহাব সুমন মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত আবেগঘন বিষয়। লাখ লাখ মানুষ ওই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তখন কতিপয় গ্রুপ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে। মানুষ চায় এদের শাস্তি হোক। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে দুই প্রধান বিরোধী দলের বিরোধ চরমে ওঠে। এ কারণেই খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসার জন্য অনেক সাধাসাধি করার পরও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
ডিপ্লোম্যাটের সঙ্গে কথা বলার সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করায় হাসিনার প্রশংসা করেছেন। এটা বিএনপির স্বার্থের অনুকূল এবং আওয়ামী লীগের বিচার সম্পন্ন করে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা। তখন বিএনপি ক্ষমতায় এলেও এই ট্রাইব্যুনাল বাতিল ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের গ্রেফতারকৃত নেতাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য জামায়াত বিএনপির ওপর চাপ দিতে পারবে না। ডেইলি স্টারের মতে, যারা নির্বাচনে অংশ নেয়নি তাদের সবাইকে ঢালাওভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ও অগণতান্ত্রিক বলা সঠিক নয়। পত্রিকাটির ভাষ্য হচ্ছে, তারা মনে করে না, যে ৭০ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে যায়নি তারা স্বাধীনতাবিরোধী। নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্বস্তি বয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু পপুলার ম্যান্ডেট ছাড়া নির্বাচনী ফলাফল সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ঘরে বদ্ধ থাকা কিন্তু অব্যাহত রয়েছে। এখন একমাত্র আশা হলো সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরিসরে নতুন নির্বাচন।
ভাষান্তরিত
জাপানভিত্তিক দি ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার দিলি্ল প্রতিনিধি

কান পাতলেই ক্ষোভ শোনা যায় by সঞ্জয় কুমার

'এ দেশে কী ঘটছে আমি জানি না। তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাতায়াতে সমস্যার মুখোমখি হচ্ছি। এ নিয়ে আমি খুবই বিচলিত', বললেন ইমরান হক নামে বাংলাদেশের এক দিনমজুর। ঢাকার শহরতলি সাভারের দোকানদার আমানউল্লাহ চৌধুরী বলেন, 'আমি আমার দোকান খোলা রাখতে চাই, কিন্তু দোকান বন্ধ না রাখলেই বিক্ষোভকারীদের হাতে আক্রান্ত হতে পারি_ এই ভয় আমার মধ্যে কাজ করে। স্বাভাবিক জীবনযাপন আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। গত কয়েক মাসে আমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে।'
এসব দিনে ঢাকার রাজপথে কান পাতলেই ক্ষোভ ও হতাশা ভেসে আসবে। শেখ হাসিনার বাড়ির মনমেজাজ কিন্তু ভিন্ন। শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ বিজয়ী মানসিকতায় রয়েছে এবং সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভের পর তাদের প্রতি জনসমর্থন রয়েছে বলে মনে করছে। রীতিমাফিক নির্বাচনের ফলাফলের পর ডাকা সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে আস্থাশীল মনে হয়েছে এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে তিনি তেমন একটা আমলেই নিতে চাননি। সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলবিহীন একটি সংসদ কীভাবে বৈধতা পেতে পারে সে ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির দায় প্রতিপক্ষের ঘাড়ে চাপান।
শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে ১২টি রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও উচ্চ আদালতের রায়ের কারণে জামায়াত নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারানোয় তাদের জোটসঙ্গী বিএনপি নির্বাচন বয়কট করে। এর অর্থ এই নয় যে, নির্বাচন বৈধতা পায়নি। জনগণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছে এটাই বৈধতার মাপকাঠি। এ ছাড়া নির্বাচন অনুষ্ঠানে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাও ছিল। সুতরাং এখানে বৈধতার প্রশ্ন আসার কোনো সুযোগ নেই। আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনার ব্যাপারে প্রশ্ন করলে ক্ষমতাসীন দলের প্রধান বিষয়টি একেবারে খারিজ করে দেননি। তবে তিনি বলেন, নির্বাচন হবে কি হবে না সেটা সম্পূর্ণত নির্ভর করছে বিরোধী দল বিএনপির মনোভাবের ওপর।
শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করার পরও প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। আমি তাদের বলেছিলাম, তারা নির্বাচনে এলে আমি সব দলের সদস্যদের নিয়ে একটি সর্বদলীয় সরকার গঠন করতে রাজি। নির্বাচনে আসার জন্য বিরোধীদলীয় নেতা যে যে মন্ত্রণালয় চান, সে সে মন্ত্রণালয়ই তাদের দেওয়ার কথা বলা হয়।
তিনি বলেন, 'তারা নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টাও করেছেন এবং উল্টো তারা সন্ত্রাসবাদী জামায়াতের সহায়তায় হরতাল ও সহিংসতা চাপিয়ে দিয়েছেন। হাসিনা আরও বলেন, 'বিএনপি নির্বাচনে বিশ্বাস করে না। তারা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। নির্বাচন আদৌ হবে কিনা সেটা নির্ভর করছে বিরোধীদের মনোভাবের ওপর। তারা কী করে, কী করছে এসব দেখতে হবে। সময় এলে অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।' তবে শেখ হাসিনার মন্তব্য বিস্তৃত প্রেক্ষিতে বিচার করলে, বিরোধী দল হরতাল ও সহিংসতার পথ ত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতার ছায়া দেখা যায়নি, বরং তাকে আগের মতোই আস্থাশীল মনে হয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধীদলীয় নেতা কেউ বাইরের মেজাজের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নন বলেই মনে হয়েছে।
বিএনপি লাগাতার জনবিচ্ছিন্ন হরতাল-অবরোধ দিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের একদিন পর সোমবার পুনরায় তারা হরতাল ডাকে। এসব পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এ ধরনের কর্মসূচিতে ৩০০'রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে_এই বাস্তবতায় তারা বিস্মৃত নয়। বিরোধীদের নৃশংসতাই অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী। আওয়ামী লীগ সরকার কি সংসদে তাদের চারভাগের তিনভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েও কার্যকরভাবে দেশ শাসনে সক্ষম হবে? কিন্তু নির্বাচনে এই বিরাট সাফল্য দেশে স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি নয়। নির্বাচনের আগে যেমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ছিল, নির্বাচনের পরও তার ইতরবিশেষ হয়নি। বিএনপি এবং তার জোটসঙ্গীরা হরতাল-অবরোধ ডেকেই চলেছে। এভাবে তারা কার্যত দেশকে অবরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। ঢাকার সিনিয়র সাংবাদিক নজরুল ইসলামের মতে, অনুুষ্ঠিত নির্বাচনটি অর্থহীন। দেশকে এ ধরনের সংকটে নিমজ্জিত করার জন্য সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই দায়ী করা চলে। দি ডিপ্লোমেটের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দুই প্রধান দলের মধ্যে আলোচনা অনুষ্ঠানের ওপর জোর দেন। তার এ বক্তব্য বিএনপি নেতারাও অস্বীকার করেননি।
সিনিয়র বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের আওয়ামী লীগের সঙ্গে আলোচনায় বসার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু এ জন্য শাসক দলকে কিছুটা নমনীয়তা দেখাতে হবে, এ মুহূর্তে সেটা দৃশ্যমান নয়। দেশে এখন যে সংকট চলছে তার জন্য আমাদের দায়ী করা চলে না। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার পত্রিকা অচলাবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে দায়ী করেছে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারছেন না বলেও পত্রিকাটি বলেছে। তাদের মতে, প্রধানমন্ত্রী জোরের সঙ্গে এই নির্বাচনকে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বলছেন; কিন্তু এতে বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কাটবে না। তার মন্তব্য রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কাটানোর ক্ষেত্রে হতাশাজনক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের চলমান বিচারের কারণে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একটি আপস-রফায় পেঁৗছতে পারেনি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় যারা হত্যা, ধর্ষণসহ নানা যুদ্ধাপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল, তাদের বিচার অনুষ্ঠানের জন্য প্রায় চার বছর আগে এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শিহাব সুমন মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশে একটি অত্যন্ত আবেগঘন বিষয়। লাখ লাখ মানুষ ওই যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। তখন কতিপয় গ্রুপ পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে। মানুষ চায় এদের শাস্তি হোক। তিনি আরও বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে দুই প্রধান বিরোধী দলের বিরোধ চরমে ওঠে। এ কারণেই খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসার জন্য অনেক সাধাসাধি করার পরও তিনি তা গ্রহণ করেননি।
ডিপ্লোম্যাটের সঙ্গে কথা বলার সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করায় হাসিনার প্রশংসা করেছেন। এটা বিএনপির স্বার্থের অনুকূল এবং আওয়ামী লীগের বিচার সম্পন্ন করে যাওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা। তখন বিএনপি ক্ষমতায় এলেও এই ট্রাইব্যুনাল বাতিল ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে তাদের গ্রেফতারকৃত নেতাদের ছেড়ে দেওয়ার জন্য জামায়াত বিএনপির ওপর চাপ দিতে পারবে না। ডেইলি স্টারের মতে, যারা নির্বাচনে অংশ নেয়নি তাদের সবাইকে ঢালাওভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে ও অগণতান্ত্রিক বলা সঠিক নয়। পত্রিকাটির ভাষ্য হচ্ছে, তারা মনে করে না, যে ৭০ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে যায়নি তারা স্বাধীনতাবিরোধী। নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণের জন্য স্বস্তি বয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু পপুলার ম্যান্ডেট ছাড়া নির্বাচনী ফলাফল সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের ঘরে বদ্ধ থাকা কিন্তু অব্যাহত রয়েছে। এখন একমাত্র আশা হলো সবার অংশগ্রহণের ভিত্তিতে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক পরিসরে নতুন নির্বাচন।
ভাষান্তরিত
জাপানভিত্তিক দি ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার দিলি্ল প্রতিনিধি

নারকীয়তা বন্ধ হোক by সৈয়দ আবুল মকসুদ

বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনই কারও জন্য পৌষমাস, কারও জন্য সর্বনাশ। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আমরা চারদলীয় জোটের দলগুলোর সহিংসতা দেখেছি। তারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক এবং বিশেষভাবে হিন্দুদের ওপর হামলা চালায়। সে এক মারাত্মক সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততা। সংখ্যালঘুরা যে শুধু তাদের সম্পদই হারান তা নয়, সম্ভ্রমও হারান তাদের বহু নারী।  দুর্বৃত্তায়িত দলীয় রাজনীতির সঙ্গে যদি সাম্প্রদায়িক হিংসা-প্রতিহিংসা যোগ হয় তাহলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু, জাতিগত সংখ্যালঘু ও যে কোনো দুর্বল জনগোষ্ঠীর জীবনে যে কী অভিশাপ নেমে আসতে পারে, গত ৩ দিনে আমরা তা লক্ষ্য করেছি। যশোরের অভয়নগর, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, ঠাকুরগাঁওয়ের গোপালপুর, দিনাজপুরের কর্ণাই, সাতক্ষীরার ক্ষেত্রপাড়া, বগুড়ার নন্দীগ্রাম, মাগুরার বাটাজোর প্রভৃতি এলাকায় হিন্দুদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে ব্যাপক অগি্নসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। ওই সব এলাকায় শত শত পরিবারের মানুষ_ শিশু ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা শীতের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে দিন-রাতযাপন করছেন। তাদের কান্নায় সেখানকার বাতাস ভারি। এ যে কত বড় বর্বরতা তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
এবার আক্রমণের কারণ তারা নির্বাচনে ভোট দিতে গেছেন। আর ভোট যখন দিতেই গেছেন নিশ্চয় নৌকায়ই দেবেন। প্রায় সব জায়গায়ই আক্রমণ চালিয়েছে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা। নির্বাচন বর্জনকারী বিএনপির ক্যাডাররাও থাকতে পারে।
ওই সব লোকালয়ের নিম্নবিত্ত মানুষের অপরাধ, তারা ভোট দিতে গেলেন কেন? ভোট দেওয়া বা না দেওয়া প্রত্যেক নাগরিকের ব্যক্তিগত মর্জি ও সাংবিধানিক নাগরিক অধিকার। সে জন্য কেউ কোনো সভ্য সমাজে নির্যাতন বা এ জাতীয় নারকীয়তার শিকার হতে পারেন না।
দুর্গত এলাকা থেকে যেসব সংবাদ পাওয়া গেছে তাতে জানা যায়, শুধু নির্বাচনবিরোধীরাই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারী নয়, যেসব মহাজোটের প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন তাদের কর্মী বাহিনীও এ জাতীয় বর্বরতায় অংশ নিয়েছে অথবা মদদ জুগিয়েছে।
নির্বাচন উপলক্ষে সম্ভাব্য গোলযোগ হতে পারে সে জন্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা, মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের অন্যতম দায়িত্ব। এবার চার লাখের বেশি নিরাপত্তা কর্মী নির্বাচনের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তা সত্ত্বেও হিন্দু পাড়াগুলোতে এমন নারকীয়তা হতে পারে কীভাবে? মহাজোটের নেতাকর্মীরাই-বা কোথায় ছিলেন?
জামায়াত-শিবিরের হুঙ্কার সত্ত্বেও প্রশাসন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়নি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে। সরকার তার দলীয় কর্মীদেরও সতর্ক করে নিয়োজিত রাখেনি। সুতরাং এ জঘন্য অপরাধের দায় তারা এড়াতে পারেন না।
আমরা মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুষ্কৃতকারীদের কঠোরতম শাস্তি চাই। অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন করার ব্যবস্থা চাই। শুধু নগদ কিছু খয়রাতি নয়, সর্বস্ব হারানো মানুষের ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দিতে হবে। যাদের দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুণ্ঠিত হয়েছে তাদের বিনা সুদে ব্যাংক ঋণ দিতে হবে; কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হলো_ সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা, যাতে এ জাতীয় নারকীয়তা আর কখনও না ঘটে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ :লেখক ও বুদ্ধিজীবী

কঠোর হস্তে দমন করুন by আবু সাঈদ খান

এ কোন বর্বরতা! এ কোন অসভ্যতা! একের পর এক ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িতে হামলা হচ্ছে, তারা ঘরছাড়া হচ্ছেন, দেশছাড়া হচ্ছেন। নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানের হিন্দু জনগোষ্ঠী দুর্বৃত্তের হামলার শিকার। টেলিভিশনের পর্দায় আতঙ্কিত শিশুর মুখ দেখছি। ভয়ার্ত নারীর আর্তনাদ শুনছি। এই কি সেই বাংলাদেশ, যে দেশের জন্য লাখ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছেন। দেশে মানবতা আজ পদদলিত। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার ভূলুণ্ঠিত। নতুন করে সংঘটিত হচ্ছে মানবতাবিরোধী অপরাধ। স্বাধীনতার চার দশক পর আমরা কী দেখছি? সাম্প্রদায়িক শক্তি বিভিন্ন অজুহাতে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের নর-নারীর ওপর হামলা করছে, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে ভাংচুর করছে, আগুন দিচ্ছে। সংখ্যালঘুরা দেশ ত্যাগে বাধ্য হচ্ছেন। নির্বাচনের পর যশোর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিত হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। কারণ হিসেবে যেটি জানা যাচ্ছে, বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করার পরও তারা কেন ভোট দিয়েছে। হিন্দুরা আওয়ামী লীগের সমর্থক, তাই তাদের শিক্ষা দিতে হবে, দেশছাড়া করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের বক্তব্য, সংবাদমাধ্যম ও পুলিশের বয়ানে এটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, প্রধানত জামায়াত-শিবির, কোথাও কোথাও বিএনপির কর্মীরা এই অপকর্মের হোতা। কিছু বিভ্রান্ত ও সাম্প্রদায়িক মানসিকতার লোকও উৎসাহ নিয়ে এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। ইতিপূর্বে রামুতে সংঘটিত বৌদ্ধপল্লীর হামলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের কর্মীদের মুখ্য ভূমিকায় দেখা গেছে। পাবনার সাঁথিয়াতে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলায় প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর লোকজন জড়িত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী নেতা অধ্যাপক আবু সাইয়িদের সভায় যোগ দেওয়ার কারণে প্রতিমন্ত্রীর লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে এ অপকর্ম সংঘটিত করে। এর প্রতিদানও মিলেছে। সারাদেশে জামায়াত-শিবির নির্বাচন বর্জন করলেও ওই এলাকায় জামায়াত-শিবিরের স্থানীয় নেতাকর্মীরা টুকু সাহেবের জন্য ক্যাম্পেইন করেছে বলে শোনা গেছে।
নির্বাচন-উত্তর সংঘটিত সহিংস ঘটনার দায় কেবল জামায়াত-শিবিরই নয়, এ দায় প্রধান বিরোধী দলের ওপরও বর্তায়। অনেক স্থানে বিএনপির কর্মীরা হামলায় অংশ নিয়েছে। তার চেয়ে বড় কথা, জামায়াত-শিবির বিএনপির ছত্রছায়ায় এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। রাজনীতিতে বিএনপি ও জামায়াত হাত ধরাধরি করে চলছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা নিয়ে বিএনপি কোনো উচ্চবাচ্য করছে না। দলের নেতারা বক্তৃতা-বিবৃতিতে পুলিশি ভূমিকার নিন্দা করছেন, নিহত দুর্বৃত্তদের জন্য সহানুভূতি জানাচ্ছেন। অথচ নিরপরাধ হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ব্যাপারে কিছুই বলছেন না। বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে এটিকে সরকারের ষড়যন্ত্র বলে অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করছেন।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ কাজে যেন তাদের অনুমোদন রয়েছে! অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে। প্রতিকারের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। হয়তো ভাবছে যে, বিরোধীদের এ অপকর্ম তাদের রাজনৈতিক প্রচার-প্রচারণার পুঁজিতে পরিণত হবে।
অভয়নগরের চাপাতলার ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন, এক ঘণ্টা আগে পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের জানানো হয়েছিল। কেউ এগিয়ে আসেনি। রাজনৈতিক দল হিসেবে কি এটি আওয়ামী লীগের কর্তব্য নয়? সামাজিক প্রতিরোধের যে ঐতিহ্য ছিল _সেটিও থিতিয়ে গেছে। এসব অপশক্তির মোকাবেলা করা রাজনৈতিক দলগুলোর তো বটেই, জনগণেরও এগিয়ে আসা কর্তব্য।
হিন্দুদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা যে, হয়তো আওয়ামী লীগকে সমর্থন করায় তারা জামায়াত-শিবির ও বিএনপির টার্গেটে পরিণত হয়েছে। সেই আওয়ামী লীগও তাদের পাশে নেই। কখনও কখনও আওয়ামী লীগ কর্মীদের থাবায় তাদের আক্রান্ত হতে হচ্ছে।
পুলিশ-প্রশাসনের গাফিলতি আমাদের বিস্মিত করে। নির্বাচন উপলক্ষে সারাদেশে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি-সেনাসদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতেও সংখ্যালঘুরা আক্রান্ত হচ্ছে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ রামুতে উঠেছিল। তা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। যশোরের অভয়নগরেও পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠেছে। এসব খতিয়ে দেখা দরকার, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।
এটি সত্য যে, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা মুষ্টিমেয় দুর্বৃত্তের কাজ। এর সঙ্গে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে এর পেছনে কতিপয় রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কারণ আছে। এ অপরাধের মূলোৎপাটন করতে হলে সেসব কারণ পর্যালোচনার দাবি রাখে। সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিস্থাপিত হলেও সমাজ ও রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির চর্চা হচ্ছে না। বরং হীন স্বার্থে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার হচ্ছে। মৌলবাদ-জঙ্গিবাদের চর্চা হচ্ছে। ফলে ধর্মাশ্রয়ী দলগুলো তো বটেই, এর বাইরের দল বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি প্রভৃতি দলের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা বাসা বেঁধেছে। অনেকেই পাকিস্তান আমলের মতো ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বলে গণ্য করছে। এর বাইরে রয়েছে সমাজের দুর্জনদের লোভাতুর দৃষ্টি। তারা অপেক্ষায় আছে_ কবে, কত জলদি হিন্দুরা দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেবে। আর তারা সুলভ মূল্যে হিন্দুদের বাড়িঘর, পুকুর, জমি খরিদ করতে পারবে। যে কারণে এই দুর্জনরা অপকর্মে মদদ দিচ্ছে। এসব রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে সংখ্যালঘুদের জন্য দেশটি ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ চেতনায় অসাম্প্রদায়িক। হাজার বছর ধরে সুফি-বৈষ্ণব-ভিক্ষু-পাদ্রি-বাউলরা এখানে মানবিক চেতনা লালন করে আসছেন। চণ্ডীদাস-লালন-মাইকেল-রবীন্দ্র-নজরুলের মানবপ্রেম ও সাম্যের গানে মানুষ সদা উদ্দীপ্ত হচ্ছে। লাখো শহীদের রক্তস্নাত এ দেশ। হক-ভাসানী-মুজিব-তাজউদ্দীনের ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ। এমন কর্ষিত মানবজমিনে সাম্প্রদায়িক বর্বরতা ঘটবে, সংখ্যালঘুরা আর্তনাদ করবে_ তা কি মেনে নেওয়া যায়?
বাংলাদেশের সংবিধানে আছে_ দেশের মালিক জনগণ। এর মানে এই যে, মুসলমানরা ধর্মীয় দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও এখানে মুসলমান নর-নারীর যতটুকু অধিকার, সংখ্যালঘু হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান নর-নারীর ততটুকু অধিকার। এ কথা জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসীদের ক্ষেত্রে সত্য। আমাদের সংবিধানের মর্মবাণী হচ্ছে_ বাংলাদেশে সব ধর্মের, সব জাতির, সব মানুষের সমঅধিকারের দেশ। দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার পর ধারণা দেওয়া হয়েছিল, এটি মুসলমানের দেশ। সেই অনুযায়ী পাকিস্তানের সংবিধানও প্রণীত হয়েছিল। বলা হয়েছিল, সেটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র। 'মুসলমানের দেশে' সংখ্যালঘুদের করা হয়েছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। সে সময় একাধিক দাঙ্গা বাধিয়ে হিন্দু বিতাড়ন ও নিধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ একাত্তরে ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার নামে হিন্দু নিধন চলেছিল। হিন্দুরা ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পয়লা টার্গেট। একাত্তরে লাখো শহীদের লাশের তলায় সেই দ্বিজাতিতত্ত্ব ও পাকিস্তানের কবর হয়ে গেছে। কিন্তু পাকিস্তানি ভূত এখন বাংলাদেশে আছর করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশকে কি আমরা মিনি পাকিস্তান বানাব, না বর্বরতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব? আর রুখে দাঁড়াতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সবধরনের সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নির্মূল করতে জাতিকে একাত্তরের চেতনায় ফিরে যেতে হবে। মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী রাজনীতি কঠোর হস্তে দমনের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে দেশ পরিচালনা করতে হবে, সেই সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজন একাত্তরের চেতনায় নবজাগরণ, নবউত্থান।
সরকার-প্রশাসনের একান্ত কর্তব্য হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সর্বাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। প্রধানমন্ত্রী 'জিরো টলারেন্সের' কথা বলছেন। সেই লক্ষণ আমরা দেখছি না। আমরা এসব দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানাই। এ ক্ষেত্রে নমনীয়তার সুযোগ নেই। সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে বিচার করাই হবে যৌক্তিক পদক্ষেপ।
রাজনৈতিক মতানৈক্যের ঊধর্ে্ব আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব দল ও মতের মানুষ ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐকমত্যে পেঁৗছবে_ সেটিই প্রত্যাশিত।
সাংবাদিক
ask_bangla71@yahoo.com

গুলিতে নিহত সাবেক মিস ভেনেজুয়েলা

মনিকা স্পেয়ার
অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের গুলিতে সাবেক মিস ভেনেজুয়েলা মনিকা স্পেয়ার ও তাঁর ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত স্বামী টমাস হেনরি বেরি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে তাঁদের পাঁচ বছরের মেয়ে। গত মঙ্গলবার ভেনেজুয়েলার ভ্যালেনসিয়া-পুয়ের্তো ক্যাবেল্লো মহাসড়কে স্পেয়ার দম্পতির গাড়িতে এই হামলা চালানো হয়। স্পেয়ার ২০০৪ সালে মিস ভেনেজুয়েলার মুকুট জেতেন। তিনি ছিলেন জনপ্রিয় টিভি তারকা। মঙ্গলবার রাতে মেরিদা শহর থেকে রাজধানী কারাকাসে ফেরার পথে হামলার শিকার হয় পরিবারটি। স্পেয়ার (২৯) ও বেরি (৩৯) দম্পতি ডাকাতের হামলার শিকার হন। ভেনেজুয়েলার তদন্ত পুলিশের প্রধান হোসে গ্রেগোরিও সিয়েরালতা বলেন, ছোট্ট মেয়ে মায়ার সামনে দুর্বৃত্তরা গুলি করে স্পেয়ার ও বেরিকে হত্যা করে। বিবিসি।

যুক্তরাষ্ট্রে এখন মঙ্গল গ্রহের চেয়ে বেশি শীত

ভয়াবহ শৈত্যপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার অধিকাংশ অঞ্চলে গত মঙ্গলবার জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এই অঞ্চলে তাপমাত্রা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এই তাপমাত্রা মঙ্গলপৃষ্ঠের চেয়েও কম বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে এবারের এই আবহাওয়া এতটাই শীতল যে সেখানে এক কাপ ফুটন্ত পানি শূন্যে উড়িয়ে দিলে তা মাটিতে নেমে আসার আগেই বরফে পরিণত হয়। মঙ্গলপৃষ্ঠ পরিভ্রমণকারী রোবটযান সেখানকার দৈনিক তাপমাত্রার যে তথ্য-উপাত্ত পাঠাচ্ছে, তাতে দেখা যায়, লাল গ্রহটির তাপমাত্রা মাইনাস ২৫ থেকে মাইনাস ৩১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করে। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউটের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, কিছু অঞ্চলে এখন তাপমাত্রা যে পর্যায়ে নেমেছে, তা মঙ্গলের তাপমাত্রার চেয়েও কম। আরেকটি বাস্তবসম্মত তুলনা হচ্ছে, দক্ষিণ মেরুর অ্যামুন্ডসেন-স্কট নামের একটি স্টেশনে গত মঙ্গলবার তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর একই দিনে শৈত্যপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি। শিকাগোর তাপমাত্রা এতটাই নেমে গিয়েছিল, সেখানকার লিংকন পার্ক চিড়িয়াখানার মেরুভালুকটি বিশেষ ব্যবস্থায় উষ্ণতা নিতে বাধ্য হয়। আর কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যে একজন পলাতক কয়েদি একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অসহনীয় ঠান্ডায় রাত যাপনের পর আবারও কারাগারের উষ্ণতর পরিবেশে ফেরার চেষ্টা করেন।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সব এলাকায় তাপমাত্রা ছিল শূন্যের নিচে। আর ক্রান্তীয় অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জেও গতকাল তাপমাত্রা শূন্যের নিচে নেমে যায়। সচরাচর রৌদ্রজ্জ্বল ও উষ্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত ফ্লোরিডা এবং ক্যালিফোর্নিয়ায়ও ছিল একই অবস্থা। তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক শীত পড়েছে মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে। বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি বিভিন্ন দপ্তর বন্ধ রাখা হয়। উড়োজাহাজ, ট্রেন, সড়কসহ প্রায় সব পথেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে গতকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মনটানায় মাইনাস ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ইলিনয়, ইন্ডিয়ানা, আইওয়া, মেরিল্যান্ড, মিশিগান, মিনেসোটা, নেব্রাসকা, নর্থ ডাকোটা, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া, সাউথ ডাকোটা, ভার্জিনিয়া, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ও উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের বিভিন্ন অংশের তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪০ থেকে মাইনাস ৫০ ডিগ্রি পর্যন্ত। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই কমবেশি প্রভাব পড়েছে এই শৈত্যপ্রবাহের। আর এতে ওই এলাকায় দুর্গত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ কোটি। এএফপি ও বিবিসি।

'কী জানি বাপু আবার কখন হামলা করে'

'এখনও আমরা ঘুমইতে পারি না রাতে। সারা রাত জাগে হেরে পাহারা দেই। পুরুষ-নারী কেহয় ঘুমায় না। খালি ঘুমায় ছুয়ালা। কী জানি বাপু আবার কখন বাড়িত হামলা করে?' ভয়ে আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে এভাবেই কথাগুলো বললেন সদর উপজেলার গড়েয়া ইউনিয়নের গোপালপুর ঝাকুয়া গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের গৃহবধূ নিয়তি রানী। তিনি আরও বলেন, 'হামাক বাড়িত আসে হেনে হুমকি দিয়া গেইছে বাড়িঘর ভাঙ্গে-চুরে জ্বালায় দিবে। হামাক এক এক করিয়ে বলে মারে ফেলাবে। এই ভয়ত কেহ বাড়ি থেকে বাহির হয় না।' হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ও এলাকাবাসী জানায়, গত রোববার নির্বাচনকালে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা হিন্দু সম্প্রদায়ের ৩০টি দোকানে হামলা চালায়। তারা এ সময় দোকানগুলো ভাংচুর ও লুটপাট করে। এ সময় তারা বেশ কয়েকটি বাড়িতেও ভাংচুর চালানোর চেষ্টা করে। এ ঘটনার পর থেকেই এ গ্রামের ২ শতাধিক সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবার আতঙ্কিত। তারা সবাই বাড়িঘর ছেড়ে রোববার সন্ধ্যায় আশ্রয় নেন স্থানীয় ইসকন মন্দিরে। সেখানেই অবস্থান করেন ৩ দিন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তারা নিজেদের বাড়িঘরে ফিরেছেন। তাদের হামলা আতঙ্ক কাটেনি। এ গ্রামের আরেক গৃহবধূ মুক্তিরানী জানান, ভয়ে আমরা সব সময় অস্থির থাকি। কয়েকটা বাসার লোক মিলে একত্রে থাকতে হচ্ছে। আমাদের এলাকার নারী-পুরুষরা লাঠিসোটা নিয়ে বাড়িঘর পাহারা দিচ্ছে। এ গ্রামের নরেশ চন্দ্র জানান, নাওয়া-খাওয়া আর কাজকর্ম ফেলে দিনরাত বাড়িঘর পাহারা দেই। আর কাজই বা কী করে করব? দেউনিয়া বাজারে হিন্দু সম্প্রদায়ের সব দোকানপাট ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। মুসলমানদের একটা দোকানও ভাঙ্গা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, দু'দিন ধরে অনাহারে-অর্ধাহারে পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব বিপদে আছি। এখনও কোনো সরকারি সহায়তা পাইনি আমরা। ঝাকুয়া গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত হিন্দু সম্প্রদায়ের দোকানি বিপুুল কুমার রায় জানান, 'আমার দোকানটিতে ৩ লাখ টাকার মাল ছিল। ভাংচুর ও লুটপাটের পর আমি কিছুই পাইনি। শুধু আমার দোকান নয়, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০টি দোকানে ভাংচুর ও লুটপাট করে বিএনপি-জামায়াতের লোকজন। আমরা তো রাজনীতি করি না। আমাদের কী দোষ? আমরা হিন্দু এটাই কি আমাদের অপরাধ? একই অবস্থা দেউনিয়াবাজার, বানিয়াপাড়া ও ঝাড়ডাঙ্গা গ্রামের আরও ২ শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের। সোমবার সকালে সদর উপজেলার মধুপুর গ্রামের অতুল চন্দ্র বর্মণ (৩০) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীর ওপর হামলা চালায় বিএনপি সমর্থকরা। হামলাকারীরা তাকে কুপিয়ে জখম করে। এ ঘটনায় ওই এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে মধুপুর গ্রামের হিন্দুু সম্প্রদায়ের লোকজন ভয়ে ওই এলাকার ইসকন মন্দিরে আশ্রয় নেন। এর আগে রোববার বিকেলে মিলনপুর ভোটকেন্দ্রে সেখানকার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিতাই চন্দ্রের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত কর্মীরা। সোমবার বিকেলে হিন্দু সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের বাড়িঘর, দোকানপাট পরিদর্শন করেন সাবেক পানিসম্পদমন্ত্রী ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নবনির্বাচিত এমপি রমেশ চন্দ্র সেন, জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার ফয়সল মাহমুদ ও নির্বাচনী দায়িত্বে থাকা সেনাবাহিনীর ৩২ রেজিমেন্টের কমান্ডার লে. কর্নেল শামসুল আরেফিন। এ সময় তারা নিরাপত্তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের নির্ভয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তারপরেও আতঙ্কে অনেক মানুষ এখনও রাতে ইসকন মন্দিরে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন। গতকাল বুধবার দুপুরেও হিন্দু সম্প্রদায়ের বেশকিছু মানুষকে ওই মন্দিরে অবস্থান করতে দেখা গেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা দিয়ে ওই এলাকায় দুটি অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প বসানো হয়েছে। একটি ইসকন মন্দিরে, অন্যটি গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে। গড়েয়া ইসকন মন্দিরের অধ্যক্ষ পুষ্পশীলা শ্যাম দাস ব্র?হ্মচারী জানান, সংখ্যালঘুদের দোকান, বাড়ি ও তাদের ওপর হামলার ঘটনা নিন্দনীয়। সহিংসতার পরে রোববার বিকেলে ২ সহস্রাধিক মানুষ অবস্থান নেয়। এ ব্যাপারে গড়েয়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান সঞ্জয় কুমার জানান, যাদের দোকানপাট ও বাড়িঘরে হামলা হয়েছে তাদের তালিকা করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তাদের সহায়তা দেওয়া হবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের পুনর্বাসনে উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সহায়তা চেয়েছি আমরা। ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি জসিয়ার রহমান মাস্টার বলেন, 'আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষদের পুনর্বাসনে উদ্যোগ নিচ্ছি।'

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধানে কার্যকর ব্যবস্থা নিন :বিএনপি

৫ জানুয়ারির পাতানো নির্বাচনে দেশ-বিদেশে প্রবল সমালোচনার মুখে জনদৃষ্টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে দেশব্যাপী সংখ্যালঘুদের ওপর পরিকল্পিপ্পত হামলা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছে বিএনপি। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল এক বিবৃতিতে এ অভিযোগ তুলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ, তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানান। এ ছাড়া দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাহবুবুর রহমান সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে সংখ্যালঘুদের ওপর
হামলায় জড়িত 'আসল' সন্ত্রাসীদের ধরে শাস্তি দেওয়ার দাবি জানান। বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের মানুষের ব্যাপক বর্জনের মুখে পাতানো নির্বাচনের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ থেকে মানুষের দৃষ্টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যেই সংখ্যালঘুদের ওপর এসব হামলা ঘটানো হচ্ছে।
সব ধর্ম-বর্ণ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে কোনো হামলা মোকাবেলায় ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে সতর্ক থাকতে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে আহ্বান জানান তিনি। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিধানে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।
'এই সমস্ত অপ্রীতিকর ও অমানবিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত দোষীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জোর দাবি' জানান তিনি।
মির্জা আলমগীর বলেন, সরকারের কোনো ষড়যন্ত্র, অপপ্রচার ও অপকৌশল তীব্র গণআন্দোলনকে কোনোভাবেই কলুষিত করে স্তব্ধ করতে পারবে না। জনতার যৌক্তিক দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে জনগণ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি চালিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর বলে জানান তিনি।
মির্জা আলমগীর অভিযোগ করেন, সরকার যৌথ বাহিনী দিয়ে বুধবার সারাদেশে বিরোধী দলের তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। একই সঙ্গে যৌথ বাহিনী ও তাদের সহায়তায় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাট ও অগি্নসংযোগ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মির্জা আলমগীর চলমান গণআন্দোলনের অংশ হিসেবে লাগাতার অনিদির্ষ্টকালের রাজপথ-রেলপথ-নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে যাওয়ার জন্য খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে ১৮ দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন।
আসল সন্ত্রাসীদের শাস্তি দিন_ লে. জে. (অব.) মাহবুব :বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত 'আসল' সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে.জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান। গতকাল বুধবার দুপুরে বনানীর ডিওএইচএসে তার নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ দাবি জানান।
হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, 'সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাচ্ছি।' তিনি বলেন, 'যারা এসব ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের অন্য কোনো পরিচয় থাকতে পারে না। তারা দুর্বৃত্ত। তারা আমাদের ঐতিহাসিক সাম্প্র্রদায়িক সম্প্র্রীতির ঐতিহ্যে কালিমা লেপন করতে চায়। সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দিতে চায়। অরাজকতা ও উচ্ছৃঙ্খলতাকে উস্কে দিতে চায়।' সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাকারীদের অবিলম্বে চিহ্নিত, গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান মাহবুব। সংখ্যালঘুদের ওপর এ ধরনের নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোরও আহ্বান জানান তিনি। মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, বিএনপির যে কর্মসূচি চলছে তা গণতান্ত্রিক ও অহিংস। তবে অনেক অপশক্তি স্বচ্ছ পানি ঘোলা করে সেই পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে। তারা গণবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে তৎপর। বিএনপি নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে যথেষ্ট সক্রিয় ও তৎপর রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ফ্রান্স ও জার্মানির প্রতিক্রিয়া নির্বাচনে জনমতের দুর্বল প্রতিফলন ঘটেছে

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কম ভোটারের উপস্থিতির কারণে এতে জনমতের দুর্বল প্রতিফলন ঘটেছে। ফ্রান্স ও জার্মানি পৃথক বিবৃতিতে এ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিবৃতিতে ইউরোপের এই দুই প্রভাবশালী দেশ বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানায়। ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে জানান, 'বাংলাদেশের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ফ্রান্স'। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'সহিংসতা এবং খুব কম সংখ্যক ভোটার উপস্থিতির মধ্য দিয়ে
অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ফ্রান্স।'
এতে বলা হয়েছে, 'আমরা বাংলাদেশের সব পক্ষকে শান্ত ও সংযমী হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকেই পুনরায় সংলাপ শুরুর আহ্বান জানাচ্ছি।'
জার্মানির বিবৃতি :জার্মানির বিবৃতিতে বলা হয়, 'বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন ঘিরে তার পরিবেশকে খুবই দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করেছে জার্মানি। এই নির্বাচনে নির্বাচকমণ্ডলীর ইচ্ছার খুব দুর্বল প্রতিফলন ঘটেছে।'
বিবৃতিতে বলা হয়, 'প্রচারের সময়ে এবং নির্বাচনের দিনে যত মানুষ হতাহত হয়েছে, তার সংখ্যা অনেক বেশি। আমরা নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার নিন্দা জানাই এবং সব রাজনৈতিক শক্তিকে যে কোনো প্রকার বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই।'
ভ্রমণ সতর্কতা বাড়িয়েছে অস্ট্রেলিয়া :অস্ট্রেলিয়া তাদের দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্কতার মাত্রা বৃদ্ধি করেছে। নির্বাচনকে ঘিরে সহিংস পরিস্থিতির কারণে 'সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন' পর্যায় থেকে 'ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করুন' পর্যায়ে উন্নীত করা হয়েছে। দেশটির চার স্তরবিশিষ্ট ভ্রমণ সতর্কতার মধ্যে 'ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বিবেচনা করুন' হলো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সতর্কতা। ফলে এই মুহূর্তে কার্যত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার ৭৭৯ জন নাগরিক অবস্থান করছেন।

'হাতি'র সওয়ারি ক্ষণিকের 'নৌকা'র সওয়ারি আজীবন by রাশেদ মেহেদী

মজার মানুষ হাজি সেলিম। একই সঙ্গে মজার রাজনীতিবিদও তিনি। আমাদের চেনাজানা ঘরানার রাজনীতিবিদ নন তিনি। তার ভুবন যেন সত্যি আলাদা। প্রায়ই আদি-অকৃত্রিম ঢাকাইয়া ভাষায় কথা বলেন। শুধু 'বলন'ই নয়, 'চলন'ও আলাদা। দলবল, সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে চলাফেরা করতে অভ্যস্ত তিনি। দুষ্টু লোকেরা বলেন, চাটুকার ও চামচাদের বড়ই পছন্দ হাজি সাহেনারাজ। তার বক্তব্য, ওরা সবাই আমাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে। ঢাকাইয়া ভাষায় বললেন_ কী যে কন ভাইছাব, যারা লগে থাকে অরা আমারে অন্তর দিয়া ভালোবাছে। অদের লগে রাখুম না তো রাখমু কারে?'
ঢাকা-৭ আসন থেকে 'স্বতন্ত্র' হিসেবে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য হাজি সেলিমের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হলো মঙ্গলবার পড়ন্ত বিকেলে পুরান ঢাকার তার নিজের ব্যবসাকেন্দ্র 'গুলশান আর শপিং সেন্টার'-এ। সঙ্গীদের নিয়ে খানাপিনায় ব্যস্ত হাজি সাহেব। আলাদা একটি কক্ষে নিয়ে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বললেন তিনি। শুরুতেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে অনুযোগ করে বললেন, তিনি তার বাসায় মিষ্টি নিয়ে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার না করে মিষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছেন। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন এ অভিযোগ নাকচ করে সমকালকে বলেন, 'আমি ও আমার স্ত্রী হাজি সাহেবের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কথা বলেছি, মিষ্টি নিয়েছি।'
সবাই জানেন, হাজি সেলিমের রাজনীতি শুরু বিএনপি কর্মী হিসেবে ১৯৯১ সালে। ১৯৯৪ সালে ওয়ার্ড কমিশনার পদে দলের মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে দুটি ওয়ার্ড থেকে কমিশনার নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে সাংসদ নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টুর কাছে মাত্র ১ হাজার ৯২ ভোটে পরাজিত হন তিনি।
হাজি সেলিম শুরুতেই সমকালকে ঢাকাইয়া ভাষায় বললেন, একটা কথা স্পষ্ট_ এ আসনে 'হাতি' নয়, 'নৌকা'ই জিতেছে। বিজ্ঞ ভোটাররা শুধু মাঝি বদল করেছেন।
সমকাল :নিজের দলের প্রার্থীকে হারিয়ে জিতলেন। কীভাবে জিতলেন?
হাজি সেলিম :ভাই, নিজের দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছি ঠিকই, আওয়ামী লীগ ছাড়ি নাই। দলে ছিলাম, আছি, থাকব। শেখ হাসিনাই আমার রাজনীতির আজীবনের আদর্শ। পুরান ঢাকার মানুষ জানে, তারা দেখেছে, বছরের পর বছর দৌড়ের ওপর থেকেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছাড়ি নাই, শেখ হাসিনাকে ছাড়ি নাই। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর চারদলীয় সরকার আমার বিরুদ্ধে ১৩৭টি মামলা দিয়েছে। আমার স্ত্রীকে অপারেশন ক্লিনহার্টের সময় নানা অত্যাচার-হয়রানি করেছে। আমার সঙ্গে রাজনীতি করা তিনজন তরুণ নেতাকে ক্রসফায়ারের নামে গুলি করে হত্যা করেছে। আমার মাকেও (প্রয়াত) হয়রানি করেছে। আমার ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বারবার। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ে নানা রকম হয়রানি হয়েছি। ২০০৮ সালে নির্বাচন করতে না পারলেও দলের সব কার্যক্রমে এলাকার সবার চেয়ে সক্রিয় ছিলাম। তার পরও এবারের নির্বাচনে নেত্রী মনোনয়ন দেননি। তবুও কষ্ট পাই নাই। এলাকার লোকজন এসে বলল, আপনাকে নির্বাচন করতে হবে। আমরা অন্য কিছু চাই না। এলাকার মানুষের ভালোবাসা আমার সবকিছু। তাদের দাবি-চাওয়াকে তো অস্বীকার করতে পারি না। তাই নির্বাচন করতে হলো। হাতি মার্কা হলেও আমার সঙ্গে এলাকার ত্যাগী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছিলেন। তারা নিজেরা দিন-রাত আমার জন্য কাজ করেছেন। আমি বিজয়ী হয়েছি। ভোটাররা 'নৌকা'র মাঝি বদল করেছেন।
সমকাল :নির্বাচনী প্রচারে কোনো বাধা পেয়েছেন? কোনো চাপ?
হাজি সেলিম :দুঃখের কথা কী বলব ভাই! আমার প্রতীক ছিল হাতি। নির্বাচনী প্রচারের সময় একটা সার্কাসের হাতি আসছে। আমি এর কিছুই জানি না। সার্কাসের হাতি নিয়া সার্কাস দল দোকানে দোকানে তোলা নিচ্ছে। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করলেন, আমি নাকি জ্যান্ত হাতি দিয়ে প্রচার চালাচ্ছি।
আমি এলাকার মানুষের নেতা। দুই যুগ ধরে এ এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গে আছি। তারা কোনো সমস্যার কথা জানালে ছুটে যাই, সাহায্য করি। সমস্যায় টাকা-পয়সাও দিতে হয়। আল্লাহ আমাকে অনেক দিয়েছেন। এত টাকা দান না করলে কী করব? সন্তানের জন্য যথেষ্ট রেখেছি। তার পরও অনেক আছে, সব তো দানই করব। অথচ দ্যাখেন, এটাও অভিযোগ করল_ আমি নাকি টাকা দিয়া ভোটারদের প্রভাবিত করছি। এসব অভিযোগের কারণে ভোটের তিন দিন আগে জজকোর্ট ভবনে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যেতে হলো। প্রতিপক্ষ প্রার্থী যখন বুঝতে পারলেন, ভোটের হাওয়া তার দিকে নাই, ভোটকেন্দ্র দখল করারও সুযোগ নাই, তখন তার লোকেরা কেন্দ্রে কেন্দ্রে বোম ফাটাইয়া ভোটার আসা ঠেকানোর চেষ্টা করল। বোমাবাজি না হলে ভোট আরও অনেক বেশি পড়ত।
সমকাল :পুরান ঢাকায় সন্ত্রাস, দখলবাজি বড় সমস্যা। আপনার বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে এর আগে...
হাজি সেলিম :আমি কখনও কোনো দিন সন্ত্রাস করি নাই; বরং ১৯৯৬ সালে এমপি হওয়ার পর, এলাকায় যারা সন্ত্রাসী ছিল, উল্টাপাল্টা কাজ করত, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা কাজে লাগাইয়া দিলাম। আসলে তো সন্ত্রাস, চুরি যা-ই বলেন, সব করে পেটের ক্ষুধার জন্য। ওইটার ব্যবস্থা হলে এসব আর করে না। আমি এবারও কোনো সন্ত্রাস হতে দেব না। আমার এলাকায় সন্ত্রাস থাকবে না, চাঁদাবাজি হবে না_ এটা জোর দিয়ে বলতে পারি।
সমকাল :পুরান ঢাকার মানুষের জীবনযাত্রায় অনেক সমস্যা, এসব সমস্যা দূর করার জন্য কোনো পরিকল্পনা নিয়েছেন?
হাজি সেলিম :সমস্যার কথা কয়টা বলব, ভাই। এখন শীতকাল, রাস্তাঘাটে চলা যায়। বর্ষার সময় আইলে দেখবেন কী ভয়ঙ্কর অবস্থা। রাস্তায় রাস্তায় হাঁটুপানি জইমা থাকে। আসলে কী জানেন, ঢাকার শুরু পুরান ঢাকা দিয়া। এর পর পরিবার বাড়ছে, আর ঘরের জায়গা কমছে। এখন এক ছটাক জায়গা নিয়াও টানাটানি, নতুন ঘর করলে হাঁটার জায়গা থাকে না। পানির লাইন পাওয়া যায় না। অনেক জায়গা আছে, পানির লাইন, স্যুয়ারেজ লাইন কোনটা_ বোঝাই যায় না। এ অবস্থার মধ্যে কী করব বলেন? আমি চেষ্টা করব, যাতে মানুষের কষ্ট কম হয়। অন্তত পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাসের সমস্যা কম হয়। রাস্তায় যেন পানি জমা বন্ধ হয়। কয়টা দিন যাক, আমি সিটি করপোরেশন, রাজউক সব জায়গায় ঘুইর‌্যা সমস্যা দূর করার চেষ্টা নেব।
সমকাল :পরাজিত প্রতিপক্ষের সহায়তা চাইবেন এলাকার উন্নয়নের জন্য?
হাজি সেলিম :সহযোগিতা তো চাইতেই তার বাসায় গেলাম। উনি আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলেন না।
হাজি সেলিম বললেন, প্রাণ খুইলা আপনার সঙ্গে আরও সুখ-দুঃখের কথা কইতে চাইছিলাম। দ্যাহেন, বাইরে ক-ত লোক। অ্যাহন বিদাই লই। সমকালে একদিন যামু। অনেক কতা জমা অইয়া আছে। সব কতা কমু। ভালো খাবারের ব্যবস্থা রাইখেন।বের। হাজি সেলিম অবশ্য এ অভিযোগ মানতে একদম

দেশজুড়ে বিক্ষোভ সমাবেশ

সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বুধবার মানববন্ধন করে রাজশাহী
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরকর্মীদের হামলা-ভাংচুর ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। এর প্রতিবাদে বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। ব্যুরো অফিস ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর_
যশোর :অভয়নগরের চাপাতলা মালোপাড়াসহ দেশব্যাপী সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে যশোর সাংবাদিক ইউনিয়ন (জেইউজে)। বুধবার প্রেস ক্লাবের সামনে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সভাপতি সাজ্জাদ গণি খান রিমন ও উদীচী যশোরের সাধারণ সম্পাদক ডিএম শাহিদুজ্জামান। মানববন্ধন চলাকালে বক্তব্য রাখেন যশোরের গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক কাজী আবদুস শহীদ লাল, জাসদের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা রবিউল আলম, দৈনিক কল্যাণ সম্পাদক একরাম-উদ-দৌলা, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। গোপালগঞ্জ :টুঙ্গিপাড়ায় নির্বাচন-পরবর্তী সারাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাংচুর, অগি্নসংযোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে। বুধবার উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে বালাডাঙ্গা গ্রাম থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। শৈলেন্দ্র নাথ মণ্ডলের সভাপতিত্বে সমাবেশে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আবদুল হালিম, ইউপি চেয়ারম্যান লাল বাহাদুর বিশ্বাস, নির্মল বিজয় বালা, তুষার কান্তি বাইন, সঞ্জয় বালা, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রেজাউল হক বিশ্বাসসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন।
রাবি :দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশব্যাপী সংখ্যালঘুদের ওপর বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্বে তাণ্ডব ও নির্যাতনের প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিষদ। বুধবার সিনেট ভবনের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াছ হোসেনের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা, অধ্যাপক আবদুর রহমান, অধ্যাপক জালাল উদ্দিন, অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক, অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম, জামাল উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।
চট্টগ্রাম :চট্টগ্রামে সমাবেশ ও মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নসহ (সিইউজে) বিভিন্ন সংগঠন। চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন (সিইউজে) সভাপতি শহীদ উল আলমের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব সভাপতি আলী আব্বাস, ডা. মাহফুজুর রহমান, ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম, মহসীন চৌধুরী, আসিফ সিরাজ, রিয়াজ হায়দার, ডা. বিনয় ভূষণ চৌধুরী, চৌধুরী ফরিদ, শওকত বাঙ্গালী প্রমুখ। বিকেলে প্রেস ক্লাবের সামনে 'যে হও বাঙালি তুমি রুখিয়া দাঁড়াও' শিরোনামে মানববন্ধন করেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি পরিষদ ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি চট্টগ্রাম। এতে বক্তব্য রাখেন ড. মাহবুবুল হক, সরোজ কুমার সিংহ হাজারী, আবু সুফিয়ান, অরুণ দাশগুপ্ত প্রমুখ।
রাজশাহী :মানবববন্ধন করেছে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন। বুধবার নগরীর সাহেববাজার জিরো পয়েন্টে এ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হাসান মিল্লাত, সাধারণ সম্পাদক মামুন-অর-রশিদ, সিনিয়র সাংবাদিক মুস্তাফিজুর রহমান খান আলম, সোনার দেশের সম্পাদক অধ্যাপক ফজলুল হক, ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি জাবীদ অপু প্রমুখ।
কুড়িগ্রাম :বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং নির্যাতনের প্রতিবাদে বুধবার কুড়িগ্রামে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে জেলা ছাত্রলীগ।
শহীদ মিনার চত্বর থেকে মিছিলটি বের হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ঘুরে শাপলা চত্বর এলাকার জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে এসে শেষ হয়। এখানে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি মিনহাজুল ইসলাম আইয়ুবের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম মণ্ডল, ওবায়দুর রহমান, রাশেদুজ্জামান বাবু ও পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান কাজিউল ইসলাম প্রমুখ।
গলাচিপা (পটুয়াখালী) :নির্বাচন-উত্তর সহিংসতা ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাবিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। গলাচিপা থানার সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন ইউএনও মো. মাহাবুব আলম। বক্তব্য রাখেন ওসি শিশির কুমার পাল, সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি মনিন্দ্র চন্দ্র পাল, কালীবাড়ি কমিটির সভাপতি সুনীল কুণ্ড, সাধারণ সম্পাদক রামকৃষ্ণ পাল, সাংবাদিক সমিত কুমার দত্ত মলয়, কাউন্সিলর সুশীল চন্দ্র বিশ্বাস, সমীর কৃষ্ণ পাল, ব্যবসায়ী তাপস দত্ত, বিশ্বজিৎ পোদ্দার প্রমুখ।
মৌলভীবাজার :প্রতিবাদে সিপিবি-বাসদ বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। বুধবার সিপিবি নেতা মকবুল হোসেনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জেলা সাধারণ সম্পাদক নিলিমেশ ঘোষ বলু, জেলা সিপিবি নেতা রমাপদ ভট্টাচার্য্য, বাসদের সদস্য সচিব মামুনুর রশিদ সুহেল, ছাত্র ইউনিয়নের জেলা সভাপতি আহমদ আফরোজ, ছাত্রফ্রন্টের জেলা আহ্বায়ক মাসুদ রানা প্রমুখ।
সিলেট :মুক্তমনা ও প্রগতিবাদী সংগঠন 'জাতীয় স্বার্থে আমরা তারুণ্য' গতকাল নগরীর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে। মানববন্ধন চলাকালে প্রগতিশীল ছাত্রনেতা পাপলু বাঙ্গালীর পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন কবি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শুভেন্দু ইমাম, মুক্তিযোদ্ধা কবি তুষার কর, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী, সম্মিলিত নাট্য পরিষদ সিলেটের সাবেক সভাপতি সৈয়দ মনির হেলাল, উদীচী সিলেটের সাধারণ সম্পাদক রতন দেব, গণজাগরণ মঞ্চ সিলেটের মুখপাত্র দেবাশীষ দেবু, ছাত্রনেতা প্রণবজ্যোতি পাল, অরুপ দাস ও দীপংকর দাশগুপ্ত।
মানিকগঞ্জ :বুধবার স্থানীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে জাতীয় হিন্দু মহাজোট মানিকগঞ্জ জেলা শাখা। মানববন্ধন চলাকালে জেলা শাখার আহ্বায়ক বাসুদেব সাহার সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গাজী কামরুল হুদা সেলিম, জেলা সিপিবির সভাপতি অ্যাডভোকটে আজাহারুল ইসলাম, সাবেক উপসচিব ইসকনের জেলা শাখার সভাপতি গুরুদাশ রাজবংশী প্রমুখ।
গাজীপুর :আইনজীবী ঐক্য পরিষদ গাজীপুর জেলা শাখার উদ্যোগে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনের সড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়। এ সময় বক্তব্য রাখেন পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট ওয়াজ উদ্দিন মিয়া, বিজন কুমার ধর, অখিলচন্দ্র পাল, সুষমা রানী মণ্ডল, রঞ্জিত কর, সাধন চন্দ্র শীল, নৃপেন কুমার দাস, রিপন চন্দ্র সরকার, সুস্মিতা দাস, লিটন কুমার সরকার, প্রণব কুমার সরকার, ধীরেন চন্দ্র সরকার, মনোজ কুমার দাস ও তুষার কুমার মণ্ডল প্রমুখ। পরে একটি মৌন মিছিল বের করা হয়।
জামালপুর :জামালপুর সম্প্রীতি মঞ্চের উদ্যোগে মশাল মিছিল বের হয়। গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় বকুলতলা চত্বর থেকে মশাল মিছিল নিয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে গেইটপাড় এলাকায় শেষ হয়।

ঘর গেছে, প্রাণ থাকবে তো? by আমিনুল হক ও বিপুল সরকার সানি

'বাড়িঘর গেছে, এবার যাবে জানটা'_ এই হুমকিতে ভীত হয়ে উঠেছে দিনাজপুর সদরের চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্ণাই গ্রামের সংখ্যালঘু পরিবারগুলো। নির্বাচনের দিন গত রোববার ভোট গ্রহণ শেষে দু'দফায় কর্ণাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশের গ্রামগুলোর সংখ্যালঘু পরিবারের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ভাংচুর, লুটপাট করাসহ পুড়িয়ে দেয় তাদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাট। ওই গ্রামে গতকাল বুধবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, গ্রামজুড়ে থমথমে ভাব। লোক দেখলেই হাউমাউ করে কেঁদে উঠছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা। বাড়িঘরসহ এসএসসি পরীক্ষার্থী মেয়ের বই পুড়ে যাওয়ায় কেঁদে কেঁদে ফণী বালা রায় আকুতি করে বললেন, 'মোর কী হইবে, মোর বেটির কী হইবে। হামার যে সব সউক শ্যাস হয়া গ্যালো।' পল্লী চিকিৎসক রাজকুমার রায়, সন্তোষ চন্দ্র রায়, গণেশ চন্দ্র রায়, রাজবালা, জয়ন্ত, রামবাবু রায়, তরণী কান্ত রায়, চয়ন বালা, চম্পলা রায়, লতা রানী রায়সহ অনেকে বলেন, তারা প্রায় সবাই অন্যত্র রাত কাটাচ্ছেন। তবে কোথায় তারা থাকছেন তা বলতে চান না। চয়ন বালা বলেন, 'ভয়ে পালায়ে থাকি, বাড়িত থাকি না। পল্লী চিকিৎসক রাজকুমার রায় কেঁদে কেঁদে বললেন, আমার সর্বস্ব গেছে। পুড়ে গেছে আমার দোকানের সব ওষুধ। ঋণে এসব ওষুধ ক্রয় করেছি, কীভাবে ঋণ শোধ করব?' মনোহার চন্দ্র রায় বলেন, 'আমার আয়ের একমাত্র অবলম্বন ভটভটি। সেটিও পুড়িয়ে দিয়েছে। আগুন লাগানোর সময় আমি পালিয়ে কেন্দ্রে অবস্থানরত পুলিশের কাছে যাই এবং তাদের সাহায্য প্রার্থনা করি। তবে তারা এগিয়ে আসেনি।' চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্ণাই গ্রামের বৈধ্যনাথপাড়া, স্কুলপাড়া, তেলীপাড়া, হাজিপাড়া ও প্রিতমপাড়ার অবস্থান ভোটকেন্দ্র কর্ণাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন। এসব পাড়ার সংখ্যালঘু পরিবারগুলো ভোট দিতে আসায় তাদের জন্য হয়েছিল কাল। এ অপরাধেই তাদের ওপর হামলা ও অত্যাচার চালায় দুর্বৃত্তরা। সেখানকার ভটিভটি চালক মনোহর চন্দ্র রায় ও মুকুল রায়কে গত মঙ্গলবার রাতেও মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হয়েছে_ 'বাড়ি ভাংচুর ও আগুন দেওয়া হয়েছে, এবার জান নেব।' বিষয়টি তারা কোতোয়ালি থানার ওসিকে জানিয়েছেন। তবে ওই পুলিশ কর্মকর্তার উত্তর পেয়েছেন_ 'এ রকম ভয় দেখাতে পারে, এসব ভুয়া, তোমরা নিশ্চিন্তে থাকো।'
তবে পুলিশের কথায় তারা শান্ত হতে পারেননি, সব সময় প্রাণনাশের ভয়ে রয়েছেন। কর্ণাই গ্রামের মেয়ে দিনাজপুর সদর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান জেসমিন আরা জোসনা জানান, 'ঘটনার দিন দুপুর আড়াইটার দিকে মোবাইল ফোনে ঘটনা জানতে পারি। ছুটে যাই সদর ইউএনও, কোতোয়ালি থানা ও সর্বশেষ জেলা প্রশাসকের কাছে। কিন্তু কোনো সাহায্য না পেয়ে রিকশা-ভ্যানে রওনা দিই কর্ণাই গ্রামের দিকে। পথে বাঁশের হাটে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে দেখা হয়। অনুরোধ করে তাদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাই। ততক্ষণে সব শেষ। ভাংচুর, লুটপাট ও পুড়িয়ে দেওয়া হয় প্রায় অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ও দোকানপাট। পালিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনাস্থলে চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্নাই এলাকার সংরক্ষিত মহিলা সদস্য অপর্ণা রানী রায়ের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, সংখ্যালঘুদের ভোট দেওয়াই যেন পাপ হয়েছে। এ অপরাধে তাদের ওপর চালানো হয় নির্যাতন। দিনাজপুর মহিলা পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক রুবিনা আখতার বলেন, নিরীহ মানুষের ওপর আক্রমণ দুঃখজনক। ভোট দেওয়া মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, আমরা এর নিন্দা জানাই।
চেহেলগাজী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি রায়হান শরিফ বলেন, 'পুলিশের সামনেই সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর ঘরবাড়ি লুটপাট ও পুড়িয়ে দেওয়া হলো। বারবার পুলিশকে অনুরোধ করেও তারা আসেনি।' তিনি বলেন, 'এই অভিযোগ আমরা এমপি ইকবালুর রহিমকেও বলেছি। অবশ্য এ অভিযোগ এমপি ইকবালুর রহিমেরও। তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা চেয়েও পাওয়া যায়নি, এটা বড়ই দুঃখজনক। কোতোয়ালি থানার ওসি আলতাফ হোসেন জানান, ঘটনার সময় আমরা নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত ছিলাম। তাই কর্ণাই গ্রামে ঠিকমতো পুলিশের সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এদিকে গতকাল বুধবার দিনাজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি লুৎফর রহমান মিন্টু সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, 'এ হামলার সঙ্গে ১৮ দলের নেতাকর্মীরা কোনোভাবেই জড়িত নয়। বরং ছাত্রলীগের কর্মীরা এর সঙ্গে জড়িত বলেই সেনাবাহিনীর কাছে হাতেনাতে ধরা পড়ে এবং তাদের থানায় সোপর্দ করা হয়। পরের দিন স্থানীয় এমপি প্রভাব খাটিয়ে তাদের ছাড়িয়ে নেন।'
এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারুকুজ্জামান চৌধুরী মাইকেল বলেন, 'ভোট দেওয়ার কারণেই ১৮ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা হিন্দু পরিবারগুলোর আক্রমণ, ভাংচুর, লুটপাট ও অগি্নসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে। মানবাধিকার কাউন্সিলের দিনাজপুর জেলা সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, 'প্রাথমিকভাবে এ ঘটনার সঙ্গে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাচ্ছে। তবে এখনই কাউকে দোষারোপ করতে চাই না, বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখতে হবে।'
দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈকত পাল জানান, ওই সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর যারা আক্রমণ করেছিল, সেইসব 'মালদইয়া'র দোকানপাটে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা করার চেষ্টা করে। এদিকে এ ঘটনায় দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় ৬০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ৭০০ জনের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা করা হয়। বুধবার সকালে কর্ণাই গ্রামে অস্থায়ীভাবে স্থাপিত পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তা এএসআই সোহেল রানা বলেন, '১৫ জন সদস্য নিয়ে এখানে দায়িত্ব পালন করছি। এলাকায় এখনও আতঙ্ক রয়েছে।'

'নিজেই খবরের শিরোনাম হবো কখনও ভাবিনি' by ইন্দ্রজিৎ সরকার

রাজধানীর পরীবাগে বাসে পেট্রোল বোমায় দগ্ধ শাহীনা আক্তার মঙ্গলবার গভীর রাতে ঢাকা মেডিকেলের
বার্ন ইউনিটে মারা যান (ইনসেটে)।বুধবার তার লাশ নিতে এসে মর্গের সামনে স্বামী
জামানের আহাজারি কাজল হাজরা
'সারাজীবন মানুষকে নিয়ে খবর লিখেছি। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তুলে ধরেছি। আমি বা আমার পরিবারের কেউ খবরের শিরোনাম হবো_ এ কথা কখনও ভাবিনি। হায় আল্লাহ, তুমি আমাকে এভাবে নিঃস্ব করে দিলে কেন!' স্ত্রী শাহীনা আক্তারকে হারিয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন দৈনিক নতুন সময় পত্রিকার খুলনা ব্যুরোপ্রধান এফ জামান। আমেরিকান লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তা ৪৫ বছর বয়সী শাহীনা গত ৩ জানুয়ারি পরীবাগে বাসে পেট্রোল বোমা হামলায় গুরুতর দগ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার রাত পৌনে ২টার দিকে তার মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় দগ্ধ ফল ব্যবসায়ী ফরিদ মিয়াও গতকাল বুধবার সকালে মারা যান। এ নিয়ে অবরোধ-হরতালে দগ্ধ ২৩ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন। আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল সমকালকে বলেন, ২৬ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত অবরোধ-হরতালে নাশকতার আগুনে দগ্ধ অন্তত ১৪০ জন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিতে আসেন। তাদের মধ্যে ৯৮ জন ইনডোরে (হাসপাতালে ভর্তি হয়ে) চিকিৎসা নেন। ৩৬ জন এখনও চিকিৎসাধীন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রয়েছেন শফিকুল নামের একজন।
শাহীনা আক্তারের স্বামী এফ জামান সমকালকে জানান, খুলনা শহরের টুটপাড়ায় তাদের বাড়ি। তবে চাকরির প্রয়োজনে শাহীনা তেজগাঁওয়ের এলেনবাড়ী এলাকায় বিমান বাহিনীর কোয়ার্টারে বোনের সঙ্গে থাকতেন। এফ জামান বেশ কিছুদিন ধরে হাইপার টেনশনে ভুগছেন। মাঝে ১৮ দিন তিনি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর সম্প্রতি খুলনা থেকে ঢাকায় ফেরেন শাহীনা। এরপর জামান ফের অসুস্থ হয়ে পড়লে শাহীনা উতলা হয়ে পড়েন। কিন্তু টানা অবরোধের কারণে তিনি বাড়িতে যেতে পারছিলেন না। ৩ জানুয়ারি শুক্রবার থাকায় সে দিন পথে কোনো নাশকতার মুখে পড়তে হবে না ভেবে বাসা থেকে বের হন। বাসে গুলিস্তানের দিকে যাওয়ার সময় পরীবাগে সকাল সাড়ে ৬টার দিকে পেট্রোল বোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। ওই ঘটনায় শাহীনার শরীরের ৬৪ শতাংশ পুড়ে যায়। দগ্ধ হন আরও তিনজন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের সামনে গতকাল দুপুরে কথা হয় এফ জামানের সঙ্গে। শোকে বিহ্বল জামান বলেন, এভাবে আর কতদিন? আর কত মানুষ মরবে এভাবে? প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার কাছে আমি জানতে চাই, কবে এসব বন্ধ হবে?
তিনি জানান, তাদের একমাত্র সন্তান আসিফুজ্জামান পেশায় মেরিন ইঞ্জিনিয়ার। পেশাগত কাজে তিনি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন। মায়ের মৃত্যুর খবর তাকে জানানো হয়েছে। ১২ জানুয়ারি তিনি দেশে ফিরবেন। এই ক'দিন ধানমণ্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালের হিমঘরে থাকবে শাহীনার লাশ। ১৩ জানুয়ারি খুলনায় তাকে দাফন করা হবে।
শাহীনা দগ্ধ হওয়ার ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা ৫০ হাজার টাকা হারিয়ে যায় বলে জানান তার স্বজনরা। সে সঙ্গে সাড়ে আট হাজার টাকা, তার মোবাইল ফোন ও একটি পাসপোর্ট আকারের ছবি আংশিক পুড়ে যায়। সে ছবিটি হাতে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জামান বলেন, ঘটনার আগের রাতেও মোবাইল ফোনে শাহীনার সঙ্গে আমার কথা হয়। আমি যেতে নিষেধ করি। কিন্তু আমার অসুস্থতার কথা শুনে ও স্থির থাকতে পারছিল না।
স্বামী ছাড়াও শাহীনার বোন ও অন্য আত্মীয়-স্বজন উপস্থিত হয়েছিলেন ঢামেক মর্গে। দুপুর দেড়টার দিকে শাহীনাকে গোসল করানোর সময় কান্নার রোল পড়ে। বোন নাইস, বিপু ও রিপা ফটোসাংবাদিকদের ছবি তুলতে নিষেধ করেন। তারা বলেন, ছবি পত্রিকায় ছেপে কোনো তো লাভ হচ্ছে না। কারও তো কোনো শাস্তি হচ্ছে না।
এদিকে সেদিনের ঘটনায় অগি্নদগ্ধ হন ৫০ বছর বয়সী ফরিদ মিয়া। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সকাল পৌনে ১০টার দিকে তার মৃত্যু হয়। তার শরীরের ৪৮ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। ফরিদ মিয়ার গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর বেলাবোর হোসেননগর গ্রামে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তিনি রাজধানীর মানিকদি বালুর ঘাট এলাকায় থাকতেন। ওই এলাকায়ই তিনি ফলের ব্যবসা করতেন।
গতকাল তার লাশ নিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। স্ত্রী হালিমা বেগম জানান, দোকানের মালপত্র (ফল) কেনার জন্য বাদামতলী যাচ্ছিলেন ফরিদ মিয়া। ছুটির দিন শুক্রবার কোনো নাশকতা হবে না বলেই তার ধারণা ছিল। তিনি বলেন, 'শুক্রবারও এইভাবে মানুষ পুড়ায়া মারব, এইডা কেমুন কথা? আমি ছোট পোলাপাইন লইয়া কই যামু? কেমনে সংসার চলব?'
ফরিদ মিয়ার চার ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় স্বপন একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী। তার ছোট দুই ভাই সুজন পঞ্চম এবং লিটন দ্বিতীয় শ্রেণীতে পড়ছে। বোন সালমার বিয়ে হয়েছে। সবার ছোট ৯ বছরের লিটন জানায়, মারা যাওয়ার আগে (মঙ্গলবার) বাবার সঙ্গে তার কথা হয়। ফরিদ মিয়া তাকে বলেন, 'তোমরা ঠিকমতো পড়ালেখা করবা। কোনো দুষ্টামি করবা না। আমি মনে হয় আর বাঁচব না।' তখন ছোট্ট লিটন বাবাকে আশ্বাস দিয়েছিল, 'তোমার কিছুই হইব না আব্বা।'
ফরিদের বোন রেণু আরা অসহায় পরিবারটিকে সহায়তা করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।