Tuesday, December 31, 2013

গণতন্ত্র ও জবাবদিহি- সুপ্রিম কোর্ট যখন সংবিধানবিচ্যুত by মিজানুর রহমান খান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আবারও উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করছেন। অবিরাম জলকামান দাগিয়ে ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ ভন্ডুলের পটভূমিতে তিনি গতকাল বলেছেন,
‘এক-এগারোর কুশীলবেরা আবার সক্রিয়। একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী অসাংবিধানিক সরকারকে ক্ষমতায় আনতে চান।’ এটা সত্যি, নাকি গোয়েবলসীয় প্রচারণা?

একজন রহস্যময় আবু সাফার লড়াইটা ছিল এইট পাসের তথ্য প্রকাশ না করা। হঠাৎ তাঁর অশরীরী আবির্ভাব ঘটে আপিল বিভাগে। প্রধান বিচারপতি পদে তখন জে আর মোদাচ্ছির হোসেন, যিনি ইয়াজউদ্দিনের অনুকূলে সেই নজিরবিহীন আদেশটি দিয়ে এক-এগারোর পথ প্রশস্ত করেছিলেন।
রাস্তায় রাজনীতিকদের খুনোখুনিটা চোখে পড়ে। কিন্তু সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কী করে রক্তাক্ত হয়, সেখানেও যে ‘ট্রাম্পকার্ড’ চলে, সেটা চোখে পড়ে না।
একটি রাষ্ট্রে অনেকগুলো নখদন্তযুক্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান অবশ্যই থাকতে হবে। যারা না থাকলে এ ধরনের প্রতিকারহীন স্বেচ্ছাচার ও ধস্তাধস্তি চলতেই থাকবে। অথচ গণতান্ত্রিক পন্থায় কারও প্রতিকার লাভের সুযোগ থাকবে না। যেমন এখন আমাদের অসহায় লাগছে। ক্ষমতাসীনদের সৃষ্ট পুলিশি রাষ্ট্র ও ত্রাসের শাসন প্রতিহত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখার কথা সুপ্রিম কোর্টেরই। কিন্তু তাঁরা তা পারবেন না। তাঁরা পারুন তা দুই নেত্রীও চান না। এই অবস্থা ‘একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী’ সৃষ্টি করেনি। ক্রান্তিকালে সুপ্রিম কোর্ট অতীতেও ভরসা ছিল না। এখনো নয়।
দলীয়করণের নখরে প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানই যে রক্তাক্ত তার প্রমাণ গতকালের ঢাকা নতুন করে দেখল। সুপ্রিম কোর্ট যদি নিজেকেই বাঁচাতে পারতেন, তাহলে তার চত্বরে কোনো দলেরই মিছিল-মিটিং হওয়ার কথা নয়। এক-এগারোর ভাঙচুর, ধর্মঘট ও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলার কেউ চূড়ান্ত আইনি পরিণতি দেখতে চায়নি।
আবু সাফার রায়দানকারী বিচারপতি এম এ মতিন যখন সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করলেন, তখন বিএনপি ক্ষমতায়। তাঁর বিরুদ্ধে আওয়ামীদের সে কি লম্ফঝম্ফ। রায়ের কপি পুড়ল। কালো ফিতা বেঁধে ‘বাকস্বাধীনতা হরণে’ প্রতিবাদ হলো। সেই রায় কাগুজে। দুই দল ওই রায় প্রতিদিন দলিত করে চলেছে।
আবু সাফায় আসি। এক-এগারো এসেছিল বলেই হাওয়া ঘুরল। না হলে সম্পদের বিবরণীর দেখা পেতাম না। ১১/১২/০৭। সুপ্রিম কোর্ট চূড়ান্তভাবে আবু সাফার আপিল ফেলে দিয়ে বিচারপতি মতিনের হাইকোর্টের রায় বরণ করলেন। এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব
সাবেক প্রধান বিচারপতি জে আর মোদাচ্ছিরদের পেশাগত অসদাচরণের বিচার আওয়ামী লীগাররা করেনি। বুলন্দ আওয়াজও তোলেনি। কুশীলব বিচারকদের জবাবদিহি কেউ নেয় না। নাগরিকদের বিরুদ্ধে এটা একটা অদৃশ্য চক্রান্ত। জবাবদিহি নিলে বেআইনি সরকারি অবরোধ ভেস্তে
দিতেন আদালত।
গণতন্ত্রের সাচ্চা অভিযাত্রা চাইলে তাই সুপ্রিম কোর্টকে নিয়ে আঁতাত ভাঙতে হবে।
বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, বিচারপতি শাহ আবু নঈম মোমিনুর রহমান, বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, বিচারপতি শরিফ উদ্দিন চাকলাদার, বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন প্রমুখ বিগত জরুরি অবস্থায় বিশেষভাবে আলোচিত হন। আইনজীবী রফিক-উল হক আবির্ভূত হয়েছিলেন জাতির দুর্ভাগ্যজনক ত্রাতা হিসেবে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনের ২৬ ধারায় কেউ সম্পদের বিবরণীর নোটিশ পেয়ে তথ্য গোপন করলে তিন বছর জেল। ২৭ ধারায় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের জন্য ১০ বছরের জেল। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর ওই দুই কারণেই দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরে তাঁরই আপিলের প্রথম শুনানি হলো। তাঁর মতো দণ্ডিতকে মন্ত্রিত্ব দেওয়া বিরাজনৈতিকীকরণ, নাকি তাঁর হলফনামা নিয়ে পত্রিকায় নতুন প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া ‘বিরাজনৈতিকীকরণ’? ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়’ বিরোধী দলের সভা ভাঙা ও গণগ্রেপ্তার চলবে, কিন্তু এর কি উত্তর পেতে হবে না?
দুর্নীতির মামলার বিচারে সুপ্রিম কোর্ট ক্রমাগতভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করছেন। কারণ, জনগুরুত্বসম্পন্ন মামলার কোনো আইনি ব্যাখ্যা তাঁর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়ার কথা।
৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ দুদকে কমিশন ছিল না। দুদকের সচিব সম্পদের বিবরণী চেয়ে নোটিশ দেন। এরপর ৫৪টি মামলা হয়। দুই দলীয় রুই-কাতলা মোটামুটি আধাআধি। এঁদের অনেকেই গতকালের ঢাকাই রঙ্গমঞ্চের পক্ষ-বিপক্ষের কুশীলব হিসেবে হাজির হয়েছেন।
রফিক-উল হক তবলায় চাটি মারলেন। কমিশন ছিল কি ছিল না সেটা ছিল ঠুনকো অজুহাত। অথচ সেটাই হলো ‘আইনের শাসন’। সুপ্রিম কোর্টের বাতাস ভারী হলো। সচিবের নোটিশ দেওয়ার এখতিয়ার ছিল না। সুতরাং ওই নোটিশ থেকে উদ্ভূত মামলাগুলো অবৈধ। তারেকের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, শেখ সেলিমের বিয়াই বিএনপির মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, মির্জা আব্বাস বিএনপির রাজনীতির শাহজাদারা অভিযুক্ত ছিলেন। অধ্যাদেশ দিয়ে ওই ত্রুটি ঘোচানো হলো। অথচ নির্বাচিতের লেবাস পরেই আওয়ামী লীগের প্রথম কাজ হলো ওই অধ্যাদেশটিকে হত্যা করা। বিএনপিও আনন্দে নাচল।
বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন আওয়ামী লীগ আমলে মহীউদ্দীন খান আলমগীরের মামলায় প্রথম রায়টি দিলেন। এটাই ছিল জরুরি অবস্থায় বিশেষ আদালতে দেওয়া সাজার বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগের প্রথম ফৌজদারি আপিলের রায়। সচিবের নোটিশকে অবৈধ বললেন। এটি যখন আপিল বিভাগে গেল, সেখানে অথর জাজ হলেন বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বললেন, ‘জেলে রেখে নোটিশ দেওয়া যাবে না। সচিব কেবলই কর্মচারী।’ মহীউদ্দীন খান অমনি খালাস। ওই রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ অবশ্য এখনো বিচারাধীন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়ে তিনি তাঁর মামলার তদবিরে দুদকে ফোন করেছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছে, স্যার, আপনি একা তো নন, অনেক মামলার ভাগ্য জড়িত।
এক-এগারোতে নোটিশ পাওয়া ৫৪ জনই মহীউদ্দীন খান মামলার রায় দেখিয়ে উদ্বাহু নৃত্য করলেন। দুদক বলল, জেলে থাকলে নোটিশ নয়, এটা অবিটার ডিকটা মানে পর্যবেক্ষণ, বাধ্যকর নয়। মওদুদের মামলায় বিচারপতি খন্দকার মূসা খালেদ এটা মানলেন। এর বিরুদ্ধে মওদুদ ছোটেন আপিল বিভাগে। লিভ মঞ্জুর হয়েছে। দেশ যুদ্ধাবস্থায় পৌঁছে গেছে। তবু জেলে রেখে নোটিশ তর্কের সুরাহা হলো না।
এক-এগারোতে শেখ হাসিনার মামলায় বিচারপতি শাহ আবু নঈম সম্পদ বিবরণী দাখিল করাকেই অবৈধ বলেছিলেন। সেটা ছিল দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রতি প্রথম বড় চপেটাঘাত। তারিখটি ছিল ২১ নভেম্বর ২০০৭। দুই দলের একশ্রেণীর রাজনীতিক বলেছিলেন, এই তো চাই। ওই একটি আদেশের ফলে সন্দেহভাজন দুর্নীতিগ্রস্তরা উল্লাসে ফেটে পড়েছিল। দুদক হতভম্ব হয়ে পড়েছিল।
২০০৮ সালের ১৩ মার্চ। আপিল বিভাগ ক্ষীণ কণ্ঠে অবশেষে মানলেন, নোটিশ ভালো জিনিস। এটা নিরীহ। সম্পদের বিবরণ জানতে কাউকে নোটিশ দেওয়া মানেই তাঁর বিরুদ্ধে কার্যধারা চালু নয়। বিচারপতি শাহ আবু নঈমকে নাকচ করলেন আপিল বিভাগ। তত দিনে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান লাটে উঠেছে। প্রায় ৫০টি ডাকসাইটে মামলা, যা গত কয়েক দিনে প্রকাশিত কিচ্ছাকাহিনির চেয়ে দুর্দান্ত, সেগুলো ওই রায়ের কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছিল।
দুদক বনাম ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর মামলায় আপিল বিভাগ কিন্তু বললেন, কমিশন চাইলে মহীউদ্দীন খানকে নতুন করে নোটিশ দিতে পারে। কিন্তু এক-এগারোর পরে দুদক ক্ষমতাসীন দলের তারকাদের কাউকেই নোটিশ দেয়নি।
বীর বাহাদুরের বাহাদুরিণীর সম্পদ বেড়েছে এক হাজার গুণের বেশি। অথচ তাঁর আয়ের উৎস অজ্ঞাত। এক-এগারোতে কতিপয় ডাকসাইটের স্ত্রীরা নোটিশ ও মামলা খেয়ে ঢোল হলেন। বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশীদ রায় দিলেন স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের অভিযুক্ত করতে হলে নোটিশ লাগবে। এর ফলে এক-এগারোয় শতাধিক মামলা মারা পড়ল। এ রায়ের বিরুদ্ধে লিভ মঞ্জুর হলো না। সরাসরি নাকচ হলো। তাঁর রায়টি টিকল।
বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ দস্তগীর হোসেন বললেন, আদালতে দুদকীয় মামলা ঠুকতে চার কিসিমের অনুমোদন লাগবে। আপিল বিভাগ বললেন, একটিতেই চলবে। চারটিকে একটিকে পরিণত করার মধ্যে শত মামলা ফসকে গেছে। এর দায় কে নেবে?
জরুরি অবস্থায় বিধি হলো যা এখনো বহাল, এজাহার দায়েরের পরে তদন্ত সেরে দুদক কর্মকর্তাকে ৬০ দিনের মধ্যে অভিযোগপত্র দিতে হবে। হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলায় দুদক যুক্তি দিল, এটা বাধ্যকর নয়, নির্দেশনামূলক। হাইকোর্টে বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক এটা মানলেন। আপিল বিভাগও সেটা বহাল রাখলেন। তবু এ দুই রায়ের ফাঁকে এ প্রশ্নে শত মামলায় রুল ও স্টে পড়ল। বিচারিক আদালতের বিচার লাটে উঠল।
মো. খুরশীদ আলম খান দুদকের প্যানেল আইনজীবী। গত পাঁচ বছরে সুপ্রিম কোর্ট কী দিলেন জানতে চাইলে তিনি যা বললেন তার অর্থ দাঁড়াল, অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ নিয়েই তিনি একটি ব্যর্থ লড়াই করেছেন। উচ্চ আদালতে দুদকের চার শতাধিক মামলা আছে। তিনি একাই এক শ থেকে দেড় শ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ সামলাতে দুই বিভাগে ছোটাছুটি করেছেন।
বলি, জনগণের লাভ কী? ফল কী? জানলাম একটি মামলাতেও কারও দণ্ড আপিল বিভাগ পর্যন্ত গিয়ে চূড়ান্ত হয়নি। এক-এগারোর দুই বছরেও নয়। নির্বাচিতের অহংকারের পাঁচ বছরেও নয়। কুশীলবেরা সাবধান!

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

এক কোটি রুপির জন্য নগ্ন পুনম পান্ডে!

নতুন বছর উদযাপন উপলক্ষে ভারতের ব্যঙ্গালুরুতে আয়োজন করা হয়েছে লাইভ কনসার্টের। আর তাতে নগ্ন হয়ে নাচবেন পুনম পান্ডে। আর নিজের নগ্নতার বিনিময়ে এক কোটি রুপি পারিশ্রমিক নিয়েছেন বলিউডের বিতর্কিত এ মডেল-অভিনেত্রী। এটাই পুনমের প্রথম লাইভ কনসার্ট। সম্প্রতি কানাড়া ভাষার ‘লাভ ইজ পয়জন’ ছবির টাইটেল গানে নাচেন পুনম। এই গানটির তালে তালে ব্যাঙ্গালুরুর ওই লাইভ কনসার্টে নগ্ন হয়ে নাচতে দেখা যাবে পুনমকে।

কনসার্টটিতে পারফর্ম প্রসঙ্গে পুনম বলেন, “আমি দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করার জন্য মুখিয়ে আছি। আশা করছি কনসার্টটির মাধ্যমে আমি দর্শকদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অনেক বেশি সাড়া পাবো।” বর্তমানে গানটির অনুশীলন নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন পুনম। ১০ জানুয়ারি মুক্তি পাচ্ছে ‘লাভ ইজ পয়জন’ ছবিটি। সম্প্রতি ছবির মূল নায়ক রাজেশের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। এজন্য আলোচনার শীর্ষে আছে ছবিটি।

বাংলাদেশ এখন কালো অধ্যায় পার করছে by ফারুক চৌধুরী

বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী
প্রথম আলো  আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে কি বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল?
ফারুক চৌধুরী  আমি তো মনে করি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এতটা নিচে আর কখনো নামেনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আমি কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের বাইরে ছিলাম। বিদেশে বসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওঠানামা লক্ষ করেছি। অনেকটা শ্রাবণের মেঘের মতো। কিন্তু এবার যা হলো, সম্ভবত আর কখনোই তা হয়নি।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল এক বিস্ময়। আমাদের স্বাধীনতার দুটি মাইলফলক ঘটনা আছে—২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। পৃথিবীর আর কোনো দেশের বিজয় দিবস নেই। অর্থাৎ, আমরা একটি দখলদার বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। সেই দ্বিমেরু বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারত বা তৎকালীন সোভিয়েত শিবির তো আমাদের সাহায্য করেছেই, কিন্তু যে পশ্চিমা বিশ্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করেনি; সেসব দেশের জনগণ নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।
প্রথম আলো  গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। গত ৪২ বছরেও আমরা সেটি করতে পারলাম না কেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা। তাঁরা ঠিক করতে পারেননি নির্বাচনটি কীভাবে করবেন। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা দখলের। ক্ষমতায় আসা মানে রাজনীতিবিদদের কাছে শুধু সরকার গঠন নয়; যা খুশি তাই করা। সরকারপ্রধানেরা হয়ে ওঠেন আইনকানুনের ঊর্ধ্বে। তাঁরা কাউকেই পরোয়া করেন না। দেশের বর্তমান সংকটের মূলেও এই মানসিকতা কাজ করেছে।
প্রথম আলো  বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তারাও তো একসময় সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে?
ফারুক চৌধুরী  নিশ্চয়ই দিয়েছে। পাকিস্তানে, ফিলিপাইনে, ইরানেও তারা স্বৈরশাসকদের মদদ জুগিয়েছে। এ কারণেই আমি বলব, আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এই যে কূটনীতিক দেবযানীকে নিয়ে ভারত আমেরিকার সঙ্গে একটি অবস্থান নিতে পেরেছে, তা তার নিজের সামর্থ্যবলেই। একই সঙ্গে এ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ঐকমত্যও এই অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে।
প্রথম আলো  ভারত প্রথম দিকে শক্ত অবস্থান নিলেও পরে মনে হয় কিছুটা সরে এসেছে, নমনীয় হয়েছে।
ফারুক চৌধুরী  দুটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিও কিন্তু এক নয়। অধিকতর শক্তিধরের বিরুদ্ধে লড়তে নানা হিসাব-নিকাশ করতে হয়। কিন্তু যেটুকু তারা নিতে পেরেছে, সেটি জাতীয় ঐকমত্যের কারণেই। আর আমাদের এখানে ঠিক তার বিপরীতটি ঘটেছে।
প্রথম আলো  কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাবকে কীভাবে দেখছেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি তাদের চরম নির্বুদ্ধিতা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বলার কিছু নেই। এর মাধ্যমে পাকিস্তান আবারও প্রমাণ করল, তারা একাত্তরের দৃষ্টিভঙ্গিতেই আচ্ছন্ন। কাদের মোল্লাকে তারা তাদের লোক বলে দাবি করেছে। এটাই হলো পাকিস্তানি মানসিকতা। আর ইমরান খানের রাজনীতি হলো তালেবানি রাজনীতি। তবে পাকিস্তানে এর প্রতিবাদও হয়েছে।
প্রথম আলো  কিন্তু এ নিয়ে বাংলাদেশে যে পাল্টাপাল্টি রাজনীতি হচ্ছে?
ফারুক চৌধুরী  যেখানে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন, সেখানে পাল্টাপাল্টি মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে দাবি করা হয়েছে। আমি মনে করি, সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে পাকিস্তানের অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা অবশ্যই করব।
প্রথম আলো  পাকিস্তানের ব্যাপারে আমরা যতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি, তুরস্কের ব্যাপারে সেটি দেখাতে পারিনি। তারা আরও নগ্নভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারে হস্তক্ষেপ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা হয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা নীরব থেকেছি।
ফারুক চৌধুরী  আমি মনে করি তুরস্কের ব্যাপারে আমাদের নমনীয় থাকার কোনো কারণ নেই। সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য থাকা উচিত।
প্রথম আলো  ৪০ বছর পর আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছি। এ ব্যাপারে বহির্বিশ্বে নানা অপপ্রচারও চলছে। এসব বন্ধে এবং বিচারের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে সরকারের যা যা করণীয় ছিল তা কি তারা করতে পেরেছে?
ফারুক চৌধুরী  সরকার করতে পারেনি। আমি বলব, এটি কূটনৈতিক দুর্বলতা।
প্রথম আলো  বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তার পেছনে দুটি ঘটনা কাজ করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচন।
ফারুক চৌধুরী  দুটি আলাদা বিষয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। যে বিচার শুরু হয়েছে, তা শেষ করতে হবে। কিন্তু সরকার ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে ফেললে তার ফল খুব নেতিবাচক হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তার বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকবে না। দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলতেন, দুই পক্ষের ঝগড়ায় কে হারবে, কে জিতবে—সেটি বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের ওপর এর প্রতিক্রিয়া কী হবে?
ইকোনমিস্ট-এর সঙ্গে আমি একমত নই যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে বাংলাদেশ হারবে। বাংলাদেশ হারবে না। আমি বলব, বাংলাদেশ একটি কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে। এমনকি পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও কিন্তু কঠিন সময়ের মুখোমুখি। কীভাবে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রথম আলো  এ অবস্থার জন্য বিরোধী দলেরও কি দায় নেই?
ফারুক চৌধুরী  অবশ্যই দায় আছে। বিরোধী দলের যে দায়িত্ব, তা কি তারা গত পাঁচ বছরে পালন করতে পারেনি? তারা সংসদে গরহাজির থেকেছে। বিএনপি এখন বসে বসে বিবৃতি দেয় এবং তাদের একটি কর্মসূচি পালনের জন্য আরেকটি বাহু আছে, তার নাম জামায়াত-শিবির। তারা দেশের ভয়াবহ ক্ষতি করেছে, তারা মানুষ মেরেছে, সরকারি স্থাপনায় হামলা করছে, পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে। এগুলো আন্দোলন নয়, সন্ত্রাস। আর জামায়াত-শিবিরই তা করতে পারে। কেননা, দেশের প্রতি তাদের দরদ নেই। থাইল্যান্ডেও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে তো সরকারি কোনো স্থাপনায় হামলা হচ্ছে না।
প্রথম আলো  বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে বলেই তারা এসব করতে বাধ্য হচ্ছে।
ফারুক চৌধুরী  বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জামায়াত-শিবিরকে দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। শান্তিপূর্ণ উপায়েই তারা সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে পারে।
তবে আবারও ম্যান্ডেলার কথায় ফিরে যেতে হয়। ১৯৯৭ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, ‘আমি দেশের প্রেসিডেন্ট। অতএব দেশটিতে যা কিছু ঘটুক না কেন, তার দায় আমাকেই নিতে হবে।’ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদেরও আমি সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
দেশে বর্তমানে জনজীবনে যে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার দায় এড়াতে পারে না। দুই দলে মুষ্টিমেয় লোক রাজনীতি করেন। আর সেই রাজনীতির জন্য গোটা দেশের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
প্রথম আলো  বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমাদের বন্ধু ও উন্নয়ন-সহযোগী রাষ্ট্রগুলো বলা যায় মুখোমুখি অবস্থানে। এর কারণ কী?
ফারুক চৌধুরী  আমার মতে, কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। সবাই নিজের স্বার্থ দেখবে। প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের স্বার্থ কতটা দেখছি।
প্রথম আলো  ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আরও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে?
ফারুক চৌধুরী  হ্যাঁ, তারা অবরোধ আরোপ করতে পারে। যেমন, অনেক দেশে করেছে। জিএসপি সুবিধা বাতিলও একধরনের অবরোধ। কিন্তু বাংলাদেশে চূড়ান্ত অবরোধ আরোপ করার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়েছে বলে মনে করি না।
প্রথম আলো  যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা জাতিসংঘ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলাদেশ কি তা বহন করতে পারবে?
ফারুক চৌধুরী  বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে। আমাদের রপ্তানি কমবে, বিনিয়োগ কমলে মানুষের কর্মসংস্থানও কমবে, বেকারত্ব বাড়বে। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের পক্ষে এসব দায় বহন করা কঠিন হবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করেছিল, তা ধুলায় মিশে যাবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারুক চৌধুরী  ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  সোহরাব হাসান ও রাহীদ এজাজ

বাংলাদেশ এখন কালো অধ্যায় পার করছে by ফারুক চৌধুরী

বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী

রাষ্ট্র ও অর্থনীতি- নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তি by সালেহউদ্দিন আহমেদ

জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি একটি দেশের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে দুটি কারণ কাজ করেছিল।
এক. পশ্চিম পাকিস্তান থেকে রাজনৈতিক মুক্তি, আরেকটি হলো অর্থনৈতিক মুক্তি। পাকিস্তান আমলে উন্নয়ন থেকে আমরা ছিলাম বঞ্চিত। ফলে রাজনৈতিক স্বাধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তি দুটিই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য।

নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ আমরা একটি পর্যায়ে উপনীত হয়েছি। এর মধ্যে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গণতন্ত্র। এরপর সরকার পরিবর্তন হচ্ছে; বিভিন্ন কার্যক্রমও গ্রহণ করা হচ্ছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে আরও দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করা যেত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সন্দেহ নেই, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর মানুষের মধ্যে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা আরও বেড়েছে। আমরা এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের যুগসন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছি।
সময় এসেছে অর্থনৈতিকভাবে মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার এবং দেশকে আর্থসামাজিক দিক থেকে আরও এগিয়ে নেওয়ার। বর্তমান সরকার মেয়াদের শেষ দিকে চলে এসেছে। এমন সময়ে সরকার পরিবর্তন এবং আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবার নির্বাচনের সময় অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় অর্থনৈতিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সামান্য সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। এতে আমরা পিছিয়ে পড়ব। উন্নয়নের পূর্বশর্তই হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
এ নিবন্ধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, ভবিষ্যতে আমাদের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর দৃষ্টিপাত করব।
হিসাব মিলিয়ে দেখতে হবে, আমরা কতটুকু অর্জন করেছি, কতটুকু ব্যর্থ হয়েছি, কেন ব্যর্থ হয়েছি এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে মোকাবিলা করব। সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আত্মপর্যালোচনা করলে সঠিক পথনির্দেশনা আমরা পাব। পরবর্তী সময়ে যে সরকার আসবে, তাদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা তৈরি হবে এতে, যাতে তারা ঠিকমতো দেশ পরিচালনা করতে পারে। পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সবার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এক হওয়া উচিত। আর সেটি হলো, অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিশ্বদরবারে দ্রুত মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্যও ছিল এটি।
সামষ্টিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, আমাদের প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সূচক সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। আমরা যে অবস্থায় উপনীত হয়েছি, তাতে ১৯৯১ থেকে ২০১৩ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিটি সরকারের ধারাবাহিক অবদান রয়েছে। তাদের কারও অবদান খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। অন্যান্য দেশের তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিতে আমাদের স্থিতিশীলতা সন্তোষজনক। বিখ্যাত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান গোল্ডম্যান স্যাকস ২০০৬ সালে ১১টি ‘নিউ ইমার্জিং’ বা উদীয়মান দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশ রয়েছে এ তালিকায়। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রবৃদ্ধি মোটামুটি ভালো। চীন-ভারত ৭, সাড়ে ৭, ৮ শতাংশের অধিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমাদের প্রবৃদ্ধি এ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারিনি। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। কিছুটা কমেছে, তবে একে সহনীয় করে তুলতে হবে। ইদানীং খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, উভয় মূল্যস্ফীতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন যাপনে প্রভাব ফেলে। সামগ্রিক সূচকে যেমনটা উন্নয়ন করা দরকার ছিল, সেটা আমরা করতে পারিনি। যতটুকু করতে পেরেছি, অর্থাৎ ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধিও খারাপ নয়। এর ফল অবশ্য সুষমভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। তাই প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পায়নি। সমস্যা এখানেই। ফলে দিনে দিনে ব্যক্তিগত আয়বৈষম্য বাড়ছে; আঞ্চলিক আয়বৈষম্যও বাড়ছে। অনেকে যুক্তি দেখান, আমাদের মাথাপিছু জিডিপি এক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এটি সত্য, তবে সেখানেও শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে। কেউ মাসে পাঁচ লাখ টাকা আয় করছে, কেউবা পাঁচ হাজার। গড় করলে বেশি তো দেখাবেই। পোশাকশিল্পের শ্রমিকের কথাই ধরুন। তাঁরা কি এক হাজার ডলার আয় করেন? এ ধরনের গড় মাথাপিছু আয় সুষম উন্নয়ন নির্দেশ করে না।
মানতে হবে, এদিক দিয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকে আরও উন্নতি করতে হবে আমাদের। উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ করে বিভিন্ন অঞ্চলে তা বণ্টন করতে হবে। এটি করা না গেলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। এখন পোশাকশিল্পে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে। তারা নানাভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এটি গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক নয়।
তৃণমূল মানুষের কথায় আসি। ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স প্রভৃতি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ পর্যায়ের মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছায়। এখন দারিদ্র্যের হার কমেছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন প্রশংসিত হবে। এগুলো হঠাৎ হয়নি। ধারাবাহিকভাবে অর্জিত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও আমাদের অগ্রগতি ভালো। গড় আয়ু বেড়েছে। এটি ভারতের তুলনায় ভালো। সহাস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও আমরা এগিয়ে। তবে কিছু লক্ষ্য অর্জনে আমাদের বেগ পেতে হবে। প্রথমেই আয় বৃদ্ধি করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতেও কয়েকটি লক্ষ্য, বিশেষ করে পুষ্টির ঘাটতি পূরণে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এখনো দেশের অধিকাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার। চরাঞ্চল ও দুর্গম অঞ্চলে এখনো পুষ্টির ঘাটতি রয়ে গেছে।
শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু এর মান বাড়েনি। শিক্ষা উপকরণের মান বাড়েনি, বাড়েনি শিক্ষকের মান। শিক্ষকদের বেতনকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি। বাংলাদেশের মতো দেশে বাজেটের বিরাট অংশ ব্যয় হওয়া উচিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন খাতে দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থেরও সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাড়তি বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যয়ের মানোন্নয়ন ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। সে জন্যই গুণগত স্বাস্থ্যসেবার পরিধি (বিশেষ করে দরিদ্রদের জন্য), শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে তেমন বরাদ্দ নেই। এ কারণে জনসম্পদ উন্নয়নে আমরা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছি।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন ব্যাংক, বিমা খাতে নানা অব্যবস্থাপনা, তদারকির অভাব ও কিছু প্রতিষ্ঠানের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সেভাবে উন্নয়ন ঘটছে না এবং সাধারণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছে না তারা। মোটা দাগে, এগুলোই আমাদের বড় সমস্যা। যতই বিনিয়োগের কথা বলা হোক, মনোপলি হলে, গুটিকতক ব্যবসায়ীর নিয়ন্ত্রণ থাকলে, বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো না হলে, উৎপাদনকারীকে ঠিকমতো সেবা দিতে না পারলে টেকসই ও সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হবে না। রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রভৃতির তদারকির অভাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি, অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসা, শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠানগুলো যথাযথ সততা ও দক্ষতার পরিচয় দিলে উন্নয়ন টেকসই ও সুষম হতো।
আমাদের মূল সমস্যা দুর্নীতি। নজিরবিহীন দুর্নীতির খবর বেরিয়ে আসছে। সক্ষমতা, প্রযুক্তি, অর্থ থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে পড়ছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যেকোনো ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও আমাদের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতিকে ‘ভালো’ বলা হচ্ছে সংখ্যা বা উপাত্ত দিয়ে। কিন্তু এর আড়ালে অনেক কিছু লুকিয়ে রয়েছে। সংখ্যা ও উপাত্ত দিয়ে অনেক কিছু বোঝানো যেমন যায়, তেমনি প্রকৃত সত্যও আড়াল করা যায়। মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে ক্রেতা তার প্রতিফলন দেখছে না, মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ার প্রমাণ মানুষ পাচ্ছে না।
ব্যাংকগুলোয় অস্বাভাবিকভাবে কুঋণ বেড়ে গেছে। কুঋণের বেশির ভাগ বড় মুষ্টিমেয় কিছু প্রতিষ্ঠানের। বিতর্কটা হচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে। কোটি কোটি টাকা পাচ্ছেন মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী-শিল্পপতি। আয়ের মতো ঋণ বিতরণেও বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। স্বল্পসংখ্যক ব্যক্তির কাছে ব্যাংকের ঋণ আটকে থাকার সঙ্গে সঙ্গে দেশের একাংশে অর্থ চলে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত আয়বৈষম্যের সঙ্গে আঞ্চলিক বৈষম্যও কমিয়ে আনা যাচ্ছে না।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল নয়। নব্বইয়ের পর থেকে ব্যাংকিং খাতে সংস্কার শুরু হয়েছিল এবং এটি অন্যান্য খাতের চেয়ে অধিকতর সুশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ইদানীং ব্যাংকিং খাতে বেশ কিছু সমস্যা ও দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারছে না। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান রাজনৈতিক প্রভাব এবং আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা দূর করতে হবে। সর্বোপরি ব্যাংক ও আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য বা নীতি কী? সরকারের কৌশলগুলোয় মারাত্মক কিছু সমস্যা রয়েছে। সরকার অনেক বিষয় আড়াল করার চেষ্টা করে। হল-মার্ক বা বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি আড়ালের চেষ্টা হয়েছে। এতে সমস্যা বেড়েছে বৈ কমেনি।
বিশ্বমন্দা চলাকালীন ২০০৭-০৮ অর্থবছরেও আমাদের অর্থনৈতিক সূচকগুলো ভালো ছিল। ওই সময় বিশ্বের বড় অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সূচক নেমে গিয়েছিল। দেশের সভরিন রেটিংয়ের সূচক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচকগুলো ভালো থাকলেই সরকারের কর্তাব্যক্তিদের আত্মতুষ্টিতে নিমগ্ন থাকা ঠিক নয়। দেখতে হবে বৃহৎ জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে কি না, স্বস্তিতে ও স্বাচ্ছন্দ্যে আছে কি না।
বারবার ভালো প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। এটি কোন কোন খাতে অর্জিত হচ্ছে—উৎপাদনশীল নাকি অনুৎপাদনশীল খাতে, তা-ও দেখতে হবে। কারণ, অনুৎপাদনশীল খাতে অর্জিত প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। দেশে ক্ষুদ্র-মাঝারি-বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে কি না, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে। কর্মসংস্থান, সাধারণ মানুষের আয় বাড়ছে কি না, তা-ও বিবেচনায় নিতে হবে। সময় এসেছে সংখ্যাভিত্তিক সূচক, পরিসংখ্যান এবং এসব পর্যালোচনার সঙ্গে গুণগত সূচক, জনগণের ধারণা ও উপলব্ধিকে বিবেচনায় নেওয়ার। এটাকে বলে সার্বিক সূচক, যেটি আরও বৃদ্ধি করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, অধ্যাপক, নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটি।

রাষ্ট্র ও অর্থনীতি- নাগরিকের অর্থনৈতিক মুক্তি by সালেহউদ্দিন আহমেদ

জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি একটি দেশের মূল লক্ষ্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে দুটি কারণ কাজ করেছিল।

আকৃতিতে বড় হলেও মর্যাদায় খুবই ছোট by মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার

গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে যেসব প্রতিষ্ঠান অবদান রাখে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল নির্বাচন কমিশন। কারণ, গণতন্ত্রে সরকার যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে সে নির্বাচনের আয়োজন করে নির্বাচন কমিশন। এ কারণে গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা দিয়ে গড়ে তোলা হয়, যাতে কমিশন সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন হলেও বাস্তবে প্রতিষ্ঠানটি এ দেশে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। পরিবর্তে, কমিশন ক্ষমতাসীন সরকারের ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কাজ করতে স্বচ্ছন্দবোধ করছে। নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতার প্রধান কারণ হল, কমিশনকে শক্তিশালী করতে সরকারগুলোর উদ্যোগ না নেয়া। কমিশন গঠনের জন্য সংবিধান প্রয়োজনীয় আইন তৈরির সুযোগ দিলেও ওই সুযোগ ব্যবহার না করে পরিবর্তে প্রতিটি সরকার মনপছন্দ নতজানু ও হুকুমবরদার ব্যক্তিদের সমন্বয়ে কমিশন গঠন করে তাদের কাছ থেকে আনুকূল্য নিয়ে রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে চেয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে মাত্রাভেদে বিতর্ক থাকলেও সাবেক হুদা এবং বর্তমান রকিব কমিশন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে সর্বাধিক আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে এর আগে বিচারপতি আজিজ কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। এরই মধ্যে গণমাধ্যমে রকিব কমিশনের যেসব বিতর্কিত ও সমালোচনাযোগ্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আলোচনা উপস্থাপিত হয়েছে, তার মধ্যে ডিসিসি নির্বাচন করতে না পারা, ভোটার তালিকা হালনাগাদ ও নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণে পেশাদারিত্ব প্রদর্শনে ব্যর্থতা, নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব করে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় করা, নিজ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও সরকারদলীয় প্রশাসনের ডিসিদের রিটার্নিং অফিসার করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে একমাত্র সরকারদলীয় প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই নির্বাচিত ঘোষণা করা, সরকারি প্ররোচনায় ভুইফোঁড় বিএনএফকে রেজিস্ট্রেশন দিতে বাড়তি আগ্রহ প্রদর্শন, আরপিওর ৯১-ই ধারা বাতিলের আÍঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে পরে তীব্র সমালোচনার মুখে আবার তা বহাল রাখা, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে তিন বছরের দলীয় সম্পৃক্ততার যোগ্যতা বাতিল করে দলগুলোকে মনোনয়ন বাণিজ্যের সুবিধা করে দেয়া ইত্যাদি। মন্ত্রণালয়ের ওপর ইসির নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গেও রকিব কমিশন জনগণকে টিনের বাক্সের বায়োস্কোপ দেখায়। উল্লেখ্য, হুদা কমিশন প্রদত্ত সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য চারটি মন্ত্রণালয়ের ওপর কমিশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রকিব কমিশন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২০১২ সালের জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে সিইসি বলেন, ‘নির্বাচনের সময় সরকারের ওপর নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া আছে। সরকার আন্তরিক থাকলে দলীয় বা নির্দলীয় যে ধরনের সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে।’ অথচ, এর তিন মাস পর মধ্য সেপ্টেম্বরে একই সিইসি ভিন্ন সুরে বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনকালে শুধু চারটি নয়, সরকারের সব মন্ত্রণালয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্তৃত্ব বজায় থাকতে হবে।’ এভাবে কমিশন একেক সময় একেক কথা বলে হেয় হয়েছে। এসব বিষয় পুনরালোচনার পরিবর্তে এ প্রবন্ধে রকিব কমিশনের সাম্প্রতিক কিছু সমালোচনাযোগ্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
নির্বাচনে সেনা মোতায়েনে কমিশনের হঠাৎ বাড়তি আগ্রহ দেখে সন্দেহ হয় যে, কমিশন হয়তো সরকারের অঘোষিত নির্দেশনায় সংসদ নির্বাচনে সেনা ব্যবহারে মনোযোগী হয়েছে। তা না হলে এ কমিশন দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে নির্বাচনে সেনা ব্যবহারের প্রতি যে অনীহা দেখিয়েছিল তাতে মনে হয়েছিল যে এরা হয়তো পুলিশ-বিজিবি দিয়ে সংসদ নির্বাচন করবে। কমিশন ডিসিসি নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণের পর রাজধানীর মতো সন্ত্রাসঅধ্যুষিত স্পর্শকাতর এলাকায় প্রতিদ্ব^ন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচনে অধিকাংশ সম্ভাব্য প্রার্থীর মতামত উপেক্ষা করে নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। সিইসি ২০১২ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে বলেছিলেন, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য আইন অনুযায়ী যা যা করা দরকার তা-ই করা হবে। এ কাজে পুলিশ বাহিনীই যথেষ্ট। প্রার্থীরা কেউ সেনা মোতায়েনের দাবি করলেও তাদের কথায় আমরা প্ররোচিত হব না। প্রয়োজনে ভিডিও ব্যবহার করা হবে। ভোটাররা সবকিছু সরাসরি দেখতে পেলে কেউ পেশিশক্তি ব্যবহারের সাহস পাবে না।’ পরে একই বছর অক্টোবরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় না করে সিইসি ১২টি দেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকে করে সংসদ নির্বাচনে সেনাবাহিনী ব্যবহার না করার কথা বলে সমালোচিত হয়েছিলেন। একজন কলামিস্ট লিখেছিলেন, সিইসি খেলোয়াড়দের চেয়ে দর্শকদের বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ, নির্বাচনের মাঠের মূল খেলোয়াড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় না করে বিদেশী রাষ্ট্রদূত, যারা নির্বাচনের পর্যবেক্ষক, তাদের তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। সিইসির এহেন বক্তব্য এবং পরে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ কতিপয় উপনির্বাচন এবং সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে প্রার্থীদের সেনা মোতায়েনের অনুরোধ উপেক্ষা করে পুলিশ বাহিনী দিয়ে ওই নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করায় নাগরিক সম্প্রদায় ভেবেছিল, কমিশন সংসদ নির্বাচনেও সেনা মোতায়েন না করে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে প্রয়োজনে বিজিবি ব্যবহার করে নির্বাচন করবে। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনে এ নির্বাচন বয়কট করে বিরোধী দলগুলো একে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়ায় সরকারি আগ্রহে কমিশন কেবল সেনাবাহিনী ব্যবহারে উদ্যোগ নেয়নি, অন্য অনেক সংসদ নির্বাচনের চেয়ে অধিক সময়ের জন্য সেনাবাহিনী ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তা ছাড়া অন্যান্য নির্বাচনে সেনাবাহিনী কেবল নির্বাচনে শান্তি-শৃংখলা রক্ষায় নিয়োজিত থাকে; কিন্তু এবার দলগুলো একদলীয়, একতরফা ও অপর্যবেক্ষণযোগ্য ব্যতিক্রমী এ নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার রাজনৈতিক আন্দোলনে থাকার কারণে সম্ভবত সরকারের অনুরোধে কমিশন সহিংসতা দমনের নামে পরোক্ষভাবে বিরোধীদলীয় আন্দোলন দমনে ব্যবহার করে কিনা সেটাই দেখার বিষয়। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে তাদের কাজের পরিধি ঠিক করতে হবে। সরকারি প্রভাবে কমিশনের অনুরোধে বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক আন্দোলন দমনে ব্যবহৃত হওয়া সেনাবাহিনীর উচিত হবে কিনা বা সেনাবাহিনীর সদস্যদের দিয়ে কমিশনের পুলিশ-আনসারের কাজ করানো যথার্থ হবে কিনা সে বিষয়ে যুগপৎ নির্বাচন কমিশন ও সেনাবাহিনীর ভাবার আছে। বিরোধী দল থেকে এরই মধ্যে একদলীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনী নামিয়ে তাদের ভাষায় ‘সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি করার’ অভিযোগ আনা হয়েছে।
দশম সংসদ নির্বাচনের নামে কমিশন যে তামাশার আয়োজন করতে যাচ্ছে, তা সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে নতুন নজির সৃষ্টি করবে। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে নির্বাচনের আগেই প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্ব^ন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে এ নির্বাচনকে একটি প্রহসনে পরিণত করেছে। বাকি ১৪৬ আসনের অনেক আসনেই আবার একই দলের দুই প্রার্থী বা কোথাও কোথাও নামসর্বস্ব ডামি প্রার্থী থাকায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে না। যেসব নির্বাচনী এলাকায় জাপার প্রার্থী রয়েছেন, তারা নির্বাচন করবেন কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাদের অনেকে অভিযোগ করেছেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলেও রিটার্নিং অফিসার অজ্ঞাত কারণে তা প্রত্যাহার করেননি। অনেক ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসারদের বিরুদ্ধে আরপিও বা কমিশনের নির্দেশনা না মেনে সরকারি দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যানের নির্দেশনায় কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হল এ উপমহাদেশে সংসদ নির্বাচন হয় উৎসবীয় আমেজে। তার জন্য প্রয়োজন হয় এমন সুশীল পরিবেশ, যে পরিবেশে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো সুস্থ প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে নির্বাচনী প্রচারণা করে নির্বিঘ্নে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু এ নির্বাচনের বেলায় এসবের কিছুই হচ্ছে না। এখানে না আছে উল্লেখযোগ্য প্রার্থী, না আছে নির্বাচনী পরিবেশ। সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ ও নির্বাচন প্রতিহত করার বিরোধীদলীয় জোটের ঘোষণার বিপরীতে সংবিধানের দোহাই দিয়ে অনেকটা জোর করে সরকার নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে এ তথাকথিত নির্বাচনের আয়োজন করছে। রেওয়াজ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে সন্ত্রাসীদের তালিকা তৈরি করে তাদের গ্রেফতারে অভিযান পরিচালিত হয়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হয়, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালনে প্রার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে কমিশন কর্মকর্তারা প্রার্থী ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেন, এ নির্বাচনে এসব কিছুই এখন পর্যন্ত (২৪-১২-১৩) হয়নি।
দশম সংসদ নির্বাচনের নামে রকিব কমিশন এমনই এক নির্বাচন করতে যাচ্ছে যে, নির্বাচনে কেবল ভোটার এবং প্রার্থীরাই আগ্রহ হারাননি, আগ্রহ হারিয়েছেন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও। এ নির্বাচন যথাযথভাবে এবং অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে না মনে করে এরই মধ্যে ইইউ ও কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষণযোগ্য গণ্য না করে এ নির্বাচনে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই রকম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে আমেরিকাও। অন্যান্য দেশী-বিদেশী নির্বাচন পর্যবেক্ষকরাও যে এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহ দেখাবে এমনটা মনে হয় না। কিন্তু কমিশনের হয়তো তাতে কিছুই আসে যায় না। তা না হলে গ্লোবাল ভিলেজে বাস করে ইসি কমিশনার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ কী করে বলেন, ‘ইইউ পর্যবেক্ষক না পাঠালে তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। তাদের এ সিদ্ধান্ত নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, দুয়েকটি প্রতিবেশী দেশ ব্যতীত প্রায় সব দেশ যদি এ নির্বাচনকে স্বীকৃতি না দেয় তাহলে এমন নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারকে তারা কতটা সহযোগিতা দেবে সে বিষয়ে ভাবার আছে। আলোচ্য নির্বাচনটি এমনই এক ব্যতিক্রমী নির্বাচন, যে নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগেও অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেনি, প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নিজ নিজ নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেনি, এমনকি প্রার্থীদের অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে এলাকায় না গিয়ে রাজধানীতে অবস্থান করছেন।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সরকারি দলের সঙ্গে কমিশনের কোনো বিরোধ দেখা যায় না। সরকার যেভাবে চাইছে কমিশন যেন সেভাবেই তার কাজ করে যাচ্ছে। এরপরও সরকারি দলের মন ভরছে না। সম্প্রতি কমিশন মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের দেয়া হলফনামার তথ্য প্রকাশ করায় সরকারদলীয় প্রার্থীরা কমিশনের ওপর নাখোশ হয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা নির্বাচন কমিশনের প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য প্রকাশ করাকে অযৌক্তিক মনে করছেন। তাতো তারা করবেনই। কারণ, পাঁচ বছরে দলীয় অনেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও নেতার শত শতগুণ বর্ধিত সম্পদের তথ্য প্রকাশ পেলে যে দলীয় প্রার্থীদর ভাবমূর্তির ক্ষতি হয়, তা অনুধাবনের মতো জ্ঞান তো সরকারদলীয় নেতাদের রয়েছে। সে কারণে আওয়ামী লীগের নির্বাচন কমিশন সমন্বয় উপকমিটি ২২ ডিসেম্বর সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে তাদের আপত্তি জানান। সিইসি এ আপত্তি আমলে না নিয়ে জোর গলায় বলতে পারতেন, প্রার্থীরা যদি অবৈধভাবে বিত্ত-বৈভবের মালিক না হন, তাহলে হলফনামায় প্রদত্ত সম্পদের তালিকা প্রকাশে তাদের অসুবিধা কোথায়? কিন্তু সরকারের প্রতি নতজানু সিইসি মহোদয় তা বলতে পারেননি। তিনি আওয়ামী লীগের উল্লিখিত আপত্তি আমলে নিয়ে কমিশনারদের সঙ্গে সলাপরামর্শ করে কীভাবে হলফনামার তথ্য প্রকাশ বন্ধ করা যায় তার উপায় অনুসন্ধান করছেন। সিইসির এমন নমনীয় ভূমিকায় অনেক দুর্নীতিবাজ এমপি খুশি হয়েছেন এবং পাঁচ বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যেসব এমপির হলফনামায় প্রদত্ত সম্পদের তালিকা এখনও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি তারা কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন।
নির্বাচনের সিডিউল ঘোষণার পর একটি বড় দলের প্রধানকে বাড়ি থেকে র‌্যাব কেন এবং কীভাবে তুলে নিয়ে গেল এবং কমিশন এ ব্যাপারে কীভাবে নীরব থাকল সে রহস্যের উন্মোচন প্রয়োজন। কমিশন এমনই নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করেছে যে, নির্বাচনের আইন-শৃংখলা বৈঠকে যোগদানের জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে ডিসি-এসপিদের পুলিশ প্রটেকশনে ঢাকায় আসতে হয়েছে। প্রথমবার ভোটার হওয়া লাখ লাখ তরুণ ভোটারকে ভোটবঞ্চিত করে কমিশন তাদের মন ভেঙে দিয়েছে। এভাবে রকিব কমিশনের কর্মকাণ্ড খুঁটিয়ে পরখ করে বলা যায়, পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এ কমিশন অতীতের সব কমিশনের চেয়ে আকৃতিতে বড় হলেও সাহসিকতা, স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও মর্যাদার দিক থেকে এ কমিশন সব কমিশনের চেয়ে ছোট। এ কমিশন যদি দশম সংসদ নির্বাচন করে ফেলতে পারে, তাহলে সংসদীয় নির্বাচনের ইতিহাসে তা একটি নিকৃষ্ট নির্বাচনের উদাহরণ হয়ে থাকবে।
ড. মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার : অধ্যাপক, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের জন্য সঠিক কাজটি করতে হবে by মইনুল হোসেন

গত শনিবার বিশিষ্ট নাগরিকদের পক্ষ থেকে অন্যায় কী বলা হয়েছে যার জন্য ক্ষমতাসীনদের গাত্রদাহ হতে পারে? আমিও তাদের সঙ্গে বক্তব্য রেখেছি। পৃথক পৃথকভাবে অনেকেই যে কথা বহুদিন ধরে বলে আসছেন, সে কথাই ঐক্যবদ্ধভাবে বলা হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের পরিস্থিতির জন্য সেদিন কারা অতি উৎসাহী ছিলেন তা কাদের না জানা? যারা সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন তারা তো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীই। তথাকথিত রাজনীতিবিদ। আওয়ামী লীগ নেতারাই দাবি করে আসছিলেন যে, ওয়ান-ইলেভেন তাদের আন্দোলনের ফসল। সুশীল সমাজের যারা শনিবারের মতবিনিময়ে অংশ নিয়েছেন তারা নিজেদের যোগ্যতায় সফল জীবনযাপন করছেন। তাদের রাজনীতি করে রাজকীয় জীবনযাপন করতে হয় না। তারা কারও কদর পাওয়ার ভিক্ষুকও নন। তারা বিপ্লবী হওয়ার চেষ্টা করেননি। কোনো আন্দোলনে যাওয়ার কথাও বলেননি। তারা দুই বিবদমান দলের মধ্যে সমঝোতায় পৌঁছতে সাহায্য করতে চেয়েছিলেন। তারা ৫ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় প্রহসনের নির্বাচন স্থগিত রেখে আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের সমঝোতায় আসতে বলেছেন। তারা গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই এ কথা বলেছেন। গণতন্ত্র সুশীল সমাজসহ সমগ্র জনগণের জন্য প্রয়োজন। রাজনীতিবিদরা তো স্বৈরশাসক হিসেবেও ক্ষমতায় থাকতে পারেন। রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
সমাজের উচ্চতম পর্যায়ের দায়িত্বশীল নাগরিকরা শেষ পর্যন্ত ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয় দুর্যোগের সময় ভূমিকা রাখার যে চেষ্টা করেছেন, তার গুরুত্ব অস্বীকার করা যাবে না। ব্যর্থ রাজনীতিকে নয়, দেশকে কেমন করে বাঁচানো যায়, আমাদের কী করণীয় আছে, সেটাই আমাদের সবার আত্মজিজ্ঞাসার বিষয় হতে হবে। দেশের জন্য কোনটা সঠিক সেটা আমরা জানি না তা তো নয়, কিন্তু আমরা অনেকেই স্বার্থপরতা ও সুবিধাবাদ দ্বারা চালিত হই। আমাদের অনেকেই টেলিভিশন টকে অংশ নেই এবং সংবাদপত্রে নিবন্ধ লিখি, উদ্ভূত সমস্যার ওপর আলোকপাত করি এই আশা নিয়ে যে, রাজনৈতিক নেতারা গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সবার অংশগ্রহণমূলক একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে যাবেন। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা আমাদের সতর্কবাণী শুনলেন না, সমঝোতার যুক্তি গ্রহণ করলেন না এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছতে ব্যর্থ হলেন।
আমরা রক্তপাত বন্ধ করতে পারলাম না, দেশের অর্থনীতির ধ্বংসও ঠেকাতে পারলাম না, কারণ সরকার অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা হারাতে চায় না। অথচ এই সরকারের না আছে শাসন করার দক্ষতা, না এটা জনগণকে দিতে পারে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। পুলিশের বাড়াবাড়ি দ্বারা কখনও রাজনৈতিক ইস্যুর সমাধান করা যায় না। রাজনৈতিক আন্দোলনকে নিছক আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই এবং তা মোকাবিলা করার দায়িত্বও পুলিশের নয়। বরং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদেরই উচিত রাজনৈতিক আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা।
যেনতেনভাবে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান করা নির্বাচন কমিশনের কাজ নয়। এর শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব হচ্ছে একটি সংসদীয় চরিত্রের গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোথাও বিদ্যমান সংসদের বিলুপ্তি না ঘটিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান হয় না। নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণ করার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন যদি সংসদ ভেঙে দেয়ার দাবি জানাত, তাহলে সেটা শাসনতন্ত্রের লংঘন হতো না। গণতান্ত্রিক নির্বাচনের অনুকূলে যা কিছু করণীয় ছিল তার সবকিছু করার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের ছিল। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতি ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শনের জন্য এ কাজটুকু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের করা উচিত ছিল। বর্তমান মারাত্মক সংকট যে গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নিচ্ছে তার মূলে রয়েছে আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধারদের, বিশেষ করে আইন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বার্থপরতা, সুবিধাবাদ ও গণবিরোধী মনোভাব। এটা তখন আরও প্রকট হয়, যখন অযোগ্য লোকদের রাষ্ট্রীয় উচ্চাসনে স্বাগত জানানো হয়।
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ভোগের নেশায় যে যা বলবে সরকারি লোকজনের তাই করতে হবে, দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় থাকবে না- এটা তো স্বাধীনতার শিক্ষা হতে পারে না। স্বাধীনতা ভোগের সুযোগ-সুবিধা রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে সবাইকে। স্বাধীন দেশের সরকারি কর্মচারী ব্যক্তি বা দলের কর্মচারী হলে জনগণের অর্থে নিযুক্ত জনস্বার্থ রক্ষার কাজ করার লোক কোথা থেকে আসবে?
নিজেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচয় দিলেই যে একজন সৎ, সাধু বা দেশপ্রেমিক হয় না, তার প্রমাণ ক্ষমতায় গিয়ে তারা কীভাবে শত শত কোটি টাকার অবৈধ মালিক হয়েছে তা দেখলেই পাওয়া যাবে। শাসনতন্ত্রের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে, রাজনীতিবিদরা ক্ষমতা দখলের জন্য সামরিক অভ্যুত্থানের মতো সাংবিধানিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র অসম্ভব করে মূল গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রকে বাতিল করা হয়েছে। পার্লামেন্টের আসন নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিজেদের ক্ষমতার সাংবিধানিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। যেটা হতাশাব্যঞ্জক তা হল, মুক্তিযুদ্ধের পর কিছু লোক মনে করেন, দেশে তারা যতই হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ান না কেন, অন্যত্র তাদের নিরাপদ আশ্রয়স্থান আছে। আমার কথা হল, দেশের লোকদের ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ না করে নিজের দেশেই নিরাপদে থাকার কথা ভাবা দূরদর্শিতার পরিচয় হবে।
আর নির্বাচন সম্পর্কে বেশি কিছু বলার নেই, এটা আমাদের জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে, গোটা বিশ্বের কাছে আমাদের অপমান করা হয়েছে এবং জনগণ যে নির্বাচনকে অস্বীকার করছে এবং ধিক্কার জানাচ্ছে, সে নির্বাচন মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এমনকি রাশিয়া পর্যন্ত এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানো সমীচীন মনে করছে না। যারা চিন্তা করেন আমাদের কেবল দুটি বন্ধু দেশ আছে- ভারত ও রাশিয়া, এখন তাদের শুধু বিদেশী পর্যবেক্ষক হিসেবে ভারতের ওপর নির্ভর করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস হচ্ছে, ভারতও এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আমার এই মুহূর্তের দুশ্চিন্তা হচ্ছে, একতরফা নির্বাচন দেশে না আনতে পারবে শান্তি, না আনতে পারবে স্থিতিশীলতা। ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য যারা আরেকবার মুক্তিযুদ্ধ শুরু করার ভয় দেখাচ্ছেন, তারা জানেন না যুদ্ধ কী! তারা দেশের ভেতরে একটা গৃহযুদ্ধ বাধানোর উসকানি দিচ্ছেন আর নিজেরা সব ধরনের পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে অবস্থান করছেন। দেশকে ব্যর্থ নেতৃত্ব এবং সহিংস ক্ষমতার লড়াই থেকে বাঁচানোর জন্য এখন আমি যেটা বলতে পারি তা হল, জরুরি ভিত্তিতে আমাদের মধ্যকার সুবিধাবাদকে বাতিল করে যা দেশের জন্য সঠিক সেই কাজটি করতে হবে। পুলিশ হিসেবে, সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের লোকদের হত্যা করতে পারি না, দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করতে পারি না। সুশীল সমাজ হিসেবে আমরা যে অপরাধ করেছি তা হল, ব্যর্থ নেতৃত্ব ও দুর্নীতির রাজনীতিকে দীর্ঘকাল সহ্য করতে গিয়ে জনগণের দুর্ভোগের মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছি। আমাদের গণতন্ত্রকে টেকাতে হলে শুধু পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করলেই হবে না, সেইসঙ্গে আইনি বাধাও আরোপ করতে হবে, যাতে কেউ দু’বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজা-রানী হিসেবে নিজেকে স্থায়ীভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার হস্তান্তর হতেই হবে। জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে গণতন্ত্র যাতে ভূমিকা রাখতে পারে তার জন্য নেতৃত্বে পরিবর্তন আনার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
সংক্ষেপে বলতে চাই, আমাদের ভোটাধিকার এবং আমাদের সেবার জন্য সৎ ও উপযুক্ত সরকার পছন্দ করার অধিকার রক্ষার সাহস ও চরিত্র আমাদের আছে কিনা, সেটা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকারের বিষয়টি কোনো দলবিশেষের সঙ্গে সমঝোতার বিষয় হতে পারে না। যে সরকার জনগণের অধিকার খর্ব করে থাকে, সে সরকারকেই তা পূরণ করতে হবে। এজন্য কোনো সংলাপ বা সমঝোতার দরকার হয় না।
আমরা অবশ্যই নিজেদের কাছে প্রশ্ন করব, আমরা নিজেদের জন্য, দেশের জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কী করতে পারি, যাতে আমরা শান্তি ও সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করতে পারি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগের স্থায়ী ব্যবস্থা যারা চাচ্ছেন তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নন। তারা দেশটিকে নিজেদের রাজত্ব হিসেবে দেখছেন। তারা নিজেরাও নিরাপদে বা শান্তিতে থাকার কথা ভাবছেন না, অন্যদেরও নিরাপদে বা শান্তিতে থাকতে দেবেন না। এটা কোনো সুস্থ চিন্তার প্রকাশ হতে পারে না।
ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

নেতাদের দায়িত্বহীন আচরণের সুযোগ নেই by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলেন, ভারত রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কী? উত্তরে নেহেরু বলেছিলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ইংল্যান্ড, এটা অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন হয়ে ভারতের অনুকূলে আসার সম্ভাবনা আছে। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করলে প্রতীয়মান হয়, পণ্ডিত নেহেরুর কথাই সত্য হতে যাচ্ছে। এ দূরদর্শিতার কারণেই জওহরলাল নেহেরুকে পণ্ডিত বলা হতো। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোয় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী- এ প্রশ্ন আজ রাজনীতিকদের কাছে, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের কাছে। কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্বের আছে বলে মনে হয় না। ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে যে নৈতিকভিত্তিহীন, ক্ষতবিক্ষত ও নড়বড়ে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং দেশে যে সাংঘর্ষিক ও বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, তাতে নিশ্চিত বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে বাংলাদেশ। ধ্বংসের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি, মুখ থুবড়ে পড়বে কৃষি, তৈরি পোশাক শিল্প ও জনশক্তি রফতানি কার্যক্রম।
বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছে কৃষি, জনশক্তি রফতানি ও তৈরি পোশাক শিল্প। এ তিনটি খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এ খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে দেশের ভবিষ্যৎ বলতে কিছু থাকবে না। এরই মধ্যে এ তিন খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আঘাত আসতে শুরু করেছে। জনশক্তি রফতানি প্রায় বন্ধ, তৈরি পোশাক শিল্পের অর্ডার চলে যাচ্ছে অন্যান্য দেশে; কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিলাপ করছে, উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কৃষকের শীতকালীন সবজি জমিতে পচে যাচ্ছে। এ সময়টায় কৃষকরা ঝুঁকি নিয়ে ঋণ করে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে থাকে। এ বিনিয়োগ উঠে না এলে কৃষকের মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে। আগামীতে চাষাবাদ তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাতে সার্বিক কৃষি উৎপাদনে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব। ফলে খাদ্য সংকটে পড়তে পারে দেশ। কৃষি ও শিল্প খাতে বিপর্যয় ঘটলে বিপর্যয় ঘটবে গোটা সামাজিক ব্যবস্থায়। তখন একটি দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির আশংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সহিংসতার আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে, আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে মানুষ কেবল মরছেই। এর মধ্যে রয়েছে নিরীহ মানুষ, অবহেলিত পোশাক শ্রমিক, পুলিশ-বিজিবি সদস্য। তাদের শ্রম-ঘামেই বাংলাদেশের মুদ্রার ভাণ্ডার স্ফীত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন কোন পথে হাঁটছে এবং কী কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত লাশ হচ্ছে, তা কেউ জানে না। নিরীহ মানুষকে হত্যা করে আÍতৃপ্তি লাভ করা রাজনীতিকদের জন্য কোনোভাবেই শোভনীয় নয়। এটা কোনো সংকট সমাধানের পথও নয়।
বর্তমানে দেশে যে সংকট চলছে, তা গত তিন বছর আগেও বাংলাদেশে ছিল না। সমস্যাগুলো সুকৌশলে সৃষ্টি করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্য দিয়ে মূলত সংকটের আবির্ভাব। সরকার একতরফা আদালতের ওপর দায় চাপিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে যে অবস্থা তাতে আরও দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দিয়েছেন উচ্চ আদালত। কিন্তু সরকার আদালতের মতকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি; আর তাতেই সংকটের সূত্রপাত।
বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তাদের প্রেরিত বৈদেশিক মুদ্রা ভারত ও চীন থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানির পেছনে ব্যয় হয়। তাতে চাঙ্গা থাকে ভারত ও চীনের অর্থনীতি। তাছাড়া ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে ব্যবসা করে কোটি কোটি ডলার তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং চলমান অস্থিরতায় বাংলাদেশে কোনো অনাকাক্সিক্ষত ও বিশৃংখল পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তা যেমন এ অঞ্চলকে সব দিক দিয়ে অশান্ত করবে, তেমনি এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সারা বিশ্বেই। তাই বাংলাদেশে যাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং সব দলের অংশগ্রহণে একটি পক্ষপাতহীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হাতবদল হয়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে বহির্বিশ্বের।
দেশের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও নিরীহ মানুষ হত্যার পেছনে বিপজ্জনক রাজনৈতিক খেলা কাজ করছে। আমরা মনে করি, এতে কোনো অশুভ শক্তির ইন্ধন রয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট ও ধর্মের ওপর আঘাত নিঃসন্দেহে বিপজ্জনক খেলা। এ খেলা খেলে সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ মানুষকে উত্তেজিত করে তোলা হচ্ছে। এ উত্তেজিত মানুষরা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে, যা বাংলাদেশে আগে কখনও দেখা যায়নি। গত কয়েক মাসে প্রচুর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, প্রচুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। একই দেশের মানুষের মধ্যে এ আত্মঘাতী ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে বোঝা যায়, সুকৌশলে জাতিকে ভয়ানক বিভক্তির দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, যাতে এ জাতি বিপন্ন জাতিতে পরিণত হয়। রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, রাষ্ট্রের ভিত্তিও জনগণ। জনগণকে বিপন্ন করে রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। এর ফলে একসময় এ রাষ্ট্রও বিপন্ন হবে। অযাচিত শক্তি প্রয়োগ করা সমস্যা সমাধানের পথ নয়। এভাবে সমস্যার সমাধান হয়েছে- পৃথিবীতে এমন নজিরও নেই। সমস্যা কেন সৃষ্টি হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
রাজনীতির মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে ক্ষমতাসীনরা দমন-পীড়ন ও হত্যার পথ বেছে নেয় এবং অযাচিত শক্তি প্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার শেষ চেষ্টা চালায়। বর্তমান ক্ষমতাসীন দলও তাই করছে। তারা রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনিক শক্তির ওপর ষোল আনা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটি তাদের জন্য ভবিষ্যতে নিঃসন্দেহে অশনি সংকেত হয়ে আবির্ভূত হবে। যারা দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাদের আচরণ দায়িত্বহীন হওয়ার সুযোগ নেই। দায়িত্বহীন নেতৃত্বের কাছে দেশের অগ্রগতি আশা করা যায় না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা হতে পারে। প্রশ্ন হল, দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা নয় কেন? সংবিধান অনুযায়ী দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ হাতে আছে। বর্তমান সংসদ ভেঙে দিলে সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিন সময় হাতে পাওয়া যাবে। সেই লক্ষ্যে সিইসি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সমঝোতা হলে ২৪ জানুয়ারির পরও নির্বাচন হতে পারে। সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করা যায় অনায়াসে। তাতে বর্তমান তফসিল কোনো বাধা হতে পারে না। এ তফসিলে যারা ভোটবিহীন নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের নাম এখনও গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। সুতরাং সদিচ্ছা থাকলে এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবলে বর্তমান তফসিল বাতিল করে নতুন তফসিল ঘোষণা করা অসম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে কোনো বাধাই বাধা বলে গণ্য হতে পারে না।
দেশের সর্বনাশ করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার মধ্যে যে কোনো প্রশান্তি নেই- এ চিন্তাটা রাজনীতিকদের থাকতে হবে, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে। সুতরাং একাদশ নয়, সমঝোতায় পৌঁছতে হবে দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে। তাহলেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে, চলমান অস্থিরতা কেটে যাবে। রাজনীতিকরা আসীন হবেন মর্যাদার আসনে।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

বিদায়ী বছরের ব্যর্থতাগুলো কাটিয়ে সামনে এগোতে হবে by তারেক শামসুর রেহমান

২০১৩ সালের বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে আস্থাহীনতা। বছরের পুরোটা সময় এ আস্থাহীনতা বজায় থাকে এবং এ আস্থাহীনতার অভাবেই একদলীয় একটি নির্বাচনের আয়োজন করতে হচ্ছে সরকারকে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোটকে সারাটা বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকার তথা নির্বাচনকালীন সরকারের ব্যাপারে আন্দোলন করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে সরকারকে দেখা গেছে সংবিধানের দোহাই দিয়ে প্রধান বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে এককভাবে নির্বাচনের পথে এগিয়ে যেতে। আস্থাহীনতার অভাবে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি নির্বাচনের আগে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করলেও সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হয়নি। একটি ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ গঠিত হয়েছে বটে, কিন্তু দেখা গেছে, যে দলগুলোকে নিয়ে মহাজোট গঠিত হয়েছিল, তারাই মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি মন্ত্রিসভায় স্থান পায়নি। এক্ষেত্রেও আস্থাহীনতা ছিল প্রধান কারণ। যদিও প্রধানমন্ত্রীকে একাধিকবার বিএনপিকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে বিএনপির অবস্থান ছিল মন্ত্রিসভায় যোগ দেয়া নয়, বরং নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন, সে ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর একটি সিদ্ধান্তের পক্ষে। বিএনপি বছরের শুরু থেকেই বলে আসছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিকল্প নিরপেক্ষ কোনো ব্যক্তিকে ‘নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান’ করা হলে তাদের নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো আপত্তি নেই। এ নিয়ে বিএনপি তথা ১৮ দলীয় জোট একের পর এক হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচি দিলেও সরকারের মনোভাবের এতটুকু পরিবর্তন হয়নি। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করলেও সরকার তার সিদ্ধান্তে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।
সরকার ও বিরোধী দলের মাঝে এ আস্থাহীনতা বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে একটি প্রশ্নের মাঝে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের চর্চা আন্তর্জাতিক আসরে প্রশংসিত হলেও আস্থাহীনতা যে একটি দেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে কত বড় বিপর্যয়ের মুখে ফেলে দিতে পারে এবং বিশ্ব আসরে দেশটির ভাবমূর্তি নষ্ট করতে পারে, ২০১৩ সালের বাংলাদেশের রাজনীতি তার বড় প্রমাণ। দুটি বড় শক্তির (বিএনপি আর আওয়ামী লীগ) মাঝে আস্থার সম্পর্ক ছিল বিধায় ১৯৯১ সালে আমরা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে পঞ্চম সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম। এমনকি ৭ম, ৮ম, ৯ম সংসদ নির্বাচনেও একটি আস্থার সম্পর্ক ছিল। এ সম্পর্কের অবনতি ঘটে সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করার পর।
চলতি বছর সারাটা সময়জুড়ে ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সহিংসতা। বিরোধী দল একের পর এক হরতাল, পরে লাগাতার অবরোধ দিয়ে রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা এনে দেয়। চলতি বছরের একটা বড় সময় আমরা দেখেছি একের পর এক বিদেশী দূতদের বাংলাদেশে আসা ও সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেয়া। তারানকো, ওয়ারসি কিংবা নিশার মতো বিদেশীরা চেষ্টা করেছেন সরকার ও বিরোধী দলকে একটা সমঝোতায় উপনীত করতে। দাতাগোষ্ঠী পুরোটা সময়েই একাধিকবার এটা স্পষ্ট করেছে যে, তারা চায় সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন হোক। কিন্তু তা হয়নি। বিদেশীদের মাঝে তারানকো আর সুজাতা সিংয়ের সফর নানা কারণে গুরুত্ব পেয়েছে বেশি। তারানকো জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত ও জাতিসংঘের কর্মকর্তা। আর সুজাতা সিং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব। তারানকোর উপস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী দল সংলাপে বসলেও তা কোনো ফল বয়ে আনতে পারেনি। এমনকি তারানকো বাংলাদেশ ত্যাগ করার পর সংলাপের ব্যাপারে সরকারি পক্ষের কোনো আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়নি। তারানকো বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে উভয় পক্ষকে ‘ছাড়’ দেয়ার যে মানসিকতার কথা বলে গিয়েছিলেন, তার প্রতি কোনো পক্ষই সম্মান দেখায়নি। তবে সুজাতা সিংয়ের বক্তব্য (যা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে) বাংলাদেশে যথেষ্ট বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। জাতীয় পার্টি প্রধান এইচএম এরশাদের সঙ্গে দেখা করার পর তার যে অভিমত পাওয়া যায় (নির্বাচনে জাতীয় পার্টির অংশগ্রহণ, আর বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় গেলে এখানে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটবে), তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ‘হস্তক্ষেপে’র শামিল বলে অনেকে অভিমত পোষণ করেছেন। অনেকেরই অভিমত, বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে ভারত বাংলাদেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কিংবা একটি রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে মন্তব্য করতে পারে না এবং কোনো ‘উপদেশ’ও দিতে পারে না। সেই একই ধরনের অভিযোগ ওঠে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যখন পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে কাদের মোল্লার ফাঁসির ঘটনায় একটি নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এখানে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের বলার কিছু নেই। চলতি বছর রাজনীতিতে দুটো বিষয় বেশি করে আলোচিত হয়। একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি, দ্বিতীয়টি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। বিএনপি তথা ১৮ দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে সারাটা বছর আন্দোলন করেছে। তারা সংবিধান সংশোধনেরও দাবি করে। এ দাবির পক্ষে একটা সর্বজনগ্রহণযোগ্যতাও লক্ষ্য করা যায়। বছরের শেষের দিকে, বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে সংলাপে সরকারকে কিছুটা নমনীয় হতে দেখা যায়। এক পর্যায়ে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর বদলে (যিনি সংবিধান সংশোধনীর ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধানের দায়িত্ব পান) রাষ্ট্রপতি অথবা স্পিকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন আয়োজন করারও প্রস্তাব দেয় বলে শোনা গেছে। কিন্তু সরকার তাতে ইতিবাচক মনোভাব দেখায়নি। ফলে সংকটের গভীরতা বৃদ্ধি পায়। এক পর্যায়ে বিএনপি নেত্রীকে একটি চূড়ান্ত কর্মসূচি দিতে দেখা যায়। খালেদা জিয়া গত ২৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা অভিমুখে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’র আহ্বান করেন। গণতন্ত্র রক্ষায় তিনি এ ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’র ডাক দেন। এমনকি স্থবির হয়ে যাওয়া সংলাপ শুরু করারও আহ্বান জানান তিনি। এটা বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা এনে দেয়। সরকার তার টার্ম শেষ করলেও সরকারের জন্য একটা বড় ব্যর্থতা ছিল, তারা দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে আনতে পারেনি। এমনকি ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির জন্য একটি কলংকজনক ঘটনা। এ ঘটনা প্রমাণ করে, নির্বাচন কমিশন এই ভোটারবিহীন নির্বাচন রোধ করতে পারেনি। বরং কমিশন কার্যত সরকারের একটি অঙ্গ সংগঠনে পরিণত হয়েছে। একটি শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন ছাড়া যে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তা আবারও প্রমাণিত হল। একজন দলীয় প্রধান হিসেবে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী যদি অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থেকে যান, তাহলে তিনি বা তার দল নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রভাব খাটাবেন। পঞ্চম সংসদে দ্বাদশ সংবিধান সংশোধনী (সংসদীয় রাজনীতি) এনে আমরা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রবর্তন করেছিলাম। কিন্তু বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড শুধু ভঙ্গই করেনি, বরং গণতান্ত্রিক চর্চার পেছনে ছুরিকাঘাত করেছে। জাতীয় পার্টির ঘটনা (নির্বাচনে আছে, নির্বাচনে নেই; মন্ত্রিসভায় আছে, মন্ত্রিসভায় নেই; পার্টি প্রধানের অসুস্থতা ইত্যাদি) জনমনে নানা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
এটা আবারও প্রমাণিত হয়েছে, এদেশের রাজনীতিতে দুই বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মাঝে একটি ‘শান্তিপূর্ণ’ সহাবস্থান ছাড়া কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। দুর্ভাগ্য এখানেই যে আমাদের রাজনীতিকরা এ সত্যটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের রাজনীতি এ দুটি প্রধান দলকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। এর বাইরে তৃতীয় কোনো জোট বা পক্ষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি। তবে রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রা যোগ হয়েছে, আর তা হচ্ছে ‘জোট রাজনীতি’। অর্থাৎ দুটি প্রধান দলকে ঘিরে ছোট ছোট অনেক দল জোটবদ্ধ হয়েছে। ধারাটি স্পষ্ট- একদিকে রয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি, একুশ শতকের সমাজতন্ত্রের অনুসারীরা, যারা এক ব্যানারে একত্রিত হয়েছেন। অন্যদিকে রয়েছে ইসলাম পছন্দ অনুসারীরা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও মুক্তবাজারের প্রবক্তারা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দুই ধারার রাজনীতির নেতৃত্ব দিচ্ছে। গেল এক বছরের রাজনীতিতে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ছোট ছোট রাজনৈতিক সংগঠন, যারা এ পরস্পরবিরোধী দুই ধারার রাজনীতি সমর্থন করে, তারা বড় দল দুটোর পেছনে একত্রিত হয়েছে। এবং বাংলাদেশে একটি জোট রাজনীতি শুরু করেছেন। এর বাইরে তৃতীয় একটি ‘জোটজন্মপ্রকাশ করলেও জনসাধারণের মাঝে তাদের আবেদন খুবই সীমিত। কাদের সিদ্দিকী, আসম রব, বি চৌধুরীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলেও দলীয়ভাবে তারা বড় দুর্বল। গেল এক বছর তারা ব্যক্তি পর্যায়ে থেকে সোচ্চার হয়েছেন, এটা সত্য। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে কোনো ‘আবেদন’ রাখতে পারেননি। এটা সত্যিই একটা উল্লেখ করার বিষয় যে, নয়াদিল্লিতে শুধু দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আম আদমি পার্টি ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল ‘দিল্লির মসনদ’ দখল করতে পেরেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে ড. কামাল হোসেনের মতো ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েও আদৌ কোনো আবেদন রাখতে পারেননি। গণফোরাম এখন শুধু ‘বেইলি রোডকেন্দ্রিক’ তার অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে। ২০১৪ সালে এসে বাংলাদেশের রাজনীতিকরা ভেবে দেখতে পারেন তাদের ব্যর্থতা কোথায়।
ডিসেম্বরে (২০১৩) পত্র-পত্রিকায় আমাদের রাজনীতিকদের (ইসিতে দেয়া হলফনামা অনুযায়ী) অর্থ সম্পদের যে বিবরণ ছাপা হয়েছে, তা দেখে অবাক হতে হয়। কী বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক তারা হয়েছেন! রাজনীতি কি তাহলে শুধু অর্থ সম্পদ বানানোর একটি মাধ্যম। আবার অর্থমন্ত্রীর মতো একজন প্রবীণ ও শিক্ষিত ব্যক্তি যখন বলেন, ‘ক্ষমতায় থাকলে অর্থ সম্পদ বাড়ে’ তখনও অবাক হতে হয়! একজন শিক্ষিত ব্যক্তি কিভাবে এমন কথা বলতে পারেন! একজন কেজরিওয়াল দেখিয়ে দিয়েছেন রাজনীতিতে যদি সততা ও কমিটমেন্ট থাকে, তাহলে লক্ষ্যে পৌঁছা সম্ভব। আমাদের রাজনীতিকরা কেজরিওয়ালের কাছ থেকে শিখবেন বলে মনে হয় না। ভারতের রাজনীতির সঙ্গে আমাদের পার্থক্য এখানেই।
চলতি বছর বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির একটি বিষয় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে আর তা হচ্ছে, দেশে একটি নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো বিকল্প নেই। ২০১৪ সালে এটা হচ্ছে রাজনীতির মূল বিষয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘তৃতীয়বারের মতো’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বটে। কিন্তু রাজনীতিতে স্থায়ী আবেদন রাখতে হলে তত্ত্বাবধায়কের বিকল্প একটি ‘নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করতে হবে। বিগত দিনের ঘটনাবলী প্রমাণ করে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সমাজের মতো বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিনির্মাণ অত সহজ নয়। পশ্চিমা সমাজের গণতন্ত্রের ‘স্পিরিট’ আমরা গ্রহণ করেছি, কিন্তু গণতন্ত্র চর্চায় পশ্চিমা সমাজকে আমরা অনুসরণ করিনি। পাশের দেশ ভারতের দিল্লির ‘হেভিওয়েট’ মুখ্যমন্ত্রী শীলা দিক্ষিত যখন অখ্যাত এক কেজরিওয়ালের কাছে হেরে যান, তখন সেখানে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি ওঠে না। ভারতের গণতন্ত্রের এটাই সৌন্দর্য। আমরা এ থেকেও কিছু শিখিনি। ইতিহাসে শেখ হাসিনা কিভাবে চিহ্নিত হবেন জানি না। কিন্তু তিনি তার ইমেজ পুনরুদ্ধার করতে পারবেন যদি তিনি নির্বাচনকালীন একটি সরকারের রূপরেখা দশম সংসদে পাস করে ২০১৪ সালেই আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। এক্ষেত্রে সবার মতামত তিনি নিতে পারেন। একটি কমিশনও গঠন করতে পারেন। যদি তিনি দলীয় লোকদের নিয়ে ‘কমিশন’ করেন, তাহলে তাদের লক্ষ্য হবে ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতায় রাখা। জাতি এ থেকে কিছুই পাবে না। তাই তিনি যদি নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি কমিশন করেন, আমার বিশ্বাস এতে তার সম্মান পুনরুদ্ধার হবে। তার উপদেষ্টারা তাকে সঠিক উপদেশ দিয়েছেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না। একটা ভুল সিদ্ধান্ত আরেকটি ভুল সিদ্ধান্তকে ‘টেনে’ আনে। জোর করে ক্ষমতায় থাকার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই। বরং সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া, তাদের মতামত নেয়া, তাদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই হওয়া উচিত রাজনীতির মূল লক্ষ্য। মানুষ চেয়েছে একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় সরকার। চেয়েছে সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে হলেও সত্য, তা হয়নি। এ থেকে যদি আমরা শিক্ষা নেই, তার মাঝেই আমাদের মঙ্গল নিহিত।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

আবার বিকিনি পরা সেক্সসিম্বল তনুশ্রী

গত কয়েক বছর ধরে বলিউডে অনুপস্থিত রয়েছেন সেক্সসিম্বল অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত। মূলত বিদেশমুখী ব্যস্ততার কারণেই বলিউডের ছবিতে এ সময়টাতে পাওয়া যায়নি তাকে। তবে ‘আশিক বানায়া আপনে’ ছবিতে ইমরান হাশমির সঙ্গে রগরগে দৃশ্যে কাজ করে আলোচনায় আসা এ অভিনেত্রী নতুন বছরের ভালবাসা দিবসে ফিরছেন বলিউডে। সম্প্রতি এমনটাই জানিয়েছেন তিনি।

তনুশ্রী দত্ত সর্বশেষ ‘রোক’ নামের একটি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। ভৌতিক সেই ছবিতে বেশ আবেদনময়ী চরিত্রে কাজ করেছিলেন তিনি। ছবিটি ব্যবসা সফল না হলেও তাতে তনুশ্রীর অভিনয়-পারফরমেন্স বেশ প্রশংসিত হয়। এবার সেই ছবি সিক্যুয়ালের মাধ্যমে ফিরছেন এ হট অভিনেত্রী। এরই মধ্যে ছবির কাজ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। মুম্বই ও দক্ষিণ অফ্রিকার বিভিন্ন স্থানে এর শুটিং হয়েছে। ছবিতে দীর্ঘ সময় পর আবারও হট তনুশ্রী দত্তকেই দর্শকরা দেখতে পাবেন। ছবিতে তনুশ্রীর ছোট বোনের চরিত্রে কাজ করেছেন আরেক আলোচিত অভিনেত্রী উদিতা গোস্বামী।
ছবির বেশ কিছু দৃশ্যে সুইমস্যুট ও বিকিনি পরা অনুশ্রীকে দেখা যাবে। ‘রোক-২’ নামের এই ছবিটি ফেব্রয়ারির প্রথম সপ্তাহে মুক্তি পাবে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে তনুশ্রী বলেন, প্রায় তিন বছর পর আমি ফিরছি। তাই অনুভূতিটা অনেক ভাল। ‘রোক-২’ ছবিটিতে আগের মতো হট তনুশ্রীকেই পাওয়া যাবে। ভৌতিক এ ছবিটির কাহিনী ও তাতে আমার চরিত্রটি অনেক চমৎকার ও চ্যালেঞ্জিং ছিল। আশা করছি দর্শকদের ভাল লাগবে।

ব্যাংককে বিরোধীদের বাঙ্কার কর্মসূচি

থাইল্যান্ডে সরকার পতন আন্দোলন দমিয়ে দিতে বিক্ষোভকারীদের ওপর বিক্ষিপ্তভাবে চোরাগোপ্তা হামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। শনিবার রাজধানী ব্যাংককের প্রাণকেন্দ্র চামাই মারুচেট ব্রিজের বিক্ষোভ শিবিরে মধ্যরাতের হামলায় একজনের মৃত্যুর পর রোববার ফের হামলা চালানো হয়েছে। রোববার মাক খাওয়ান র‌্যাংসান ব্রিজ নামের বিক্ষোভকারীদের আরেকটি শিবির লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে পাঁচজন আহত হয়। এ ঘটনার পর থেকেই নিজেদের জানমালের নিরাপত্তায় ব্যাংককে বাঙ্কার বা দুর্গ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বিরোধীরা। বিক্ষোভকারীদের প্রতিটি অবস্থান শিবিরে এই ‘বাঙ্কার’ কর্মসূচির আওতাভুক্ত করা হয়েছে। তবে স্বাভাবিক অর্থে বাঙ্কার বলতে যা বোঝায় এটি তা নয়। এর জন্য তারা কোনো খনন কর্মসূচি শুরু করেনি। পরিবর্তে আশ্রয় শিবির ঘিরে বালির বস্তার বড় বড় প্রাচীর তৈরি করছে বিরোধীরা। রাজধানীর উল্লেখযোগ্য স্থানগুলোতে প্রাথমিকভাবে এই বাঙ্কার তৈরি করা হবে। আততায়ীদের হামলা আরও বাড়লে পরবর্তীতে আরও নিরাপত্তা প্রতিরোধ ব্যবস্থার পরিকল্পনা হাতে নেবে বিরোধীরা। প্রত্যক্ষ্যদর্শীদের বিবৃতি মোতাবেক,
রোববার স্থানীয় সময় দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে অজ্ঞাত এক মোটরসাইকেল আরোহী মাক খাওয়ান ব্যাংসান ব্রিজ থেকে ইউনাইটেড ন্যাশন বিল্ডিং’র উদ্দেশে চলমান র‌্যালি লক্ষ্য করে বিস্ফোরণ ঘটায়। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-প্রধান কর্নেল সাঙ্গাপাল ওয়াথানাচাই বলেন, বিক্ষোভকারীদের উস্কে দেয়ার জন্য তৃতীয় কোনো শক্তি এই নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে। এদিকে থাই সরকারি চাকরিজীবীদের সংগঠন ‘দ্য সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন অব থাইল্যান্ড’ রোববার বিরোধীদের সঙ্গে একাÍতা ঘোষণা করে সরকারবিরোধীদের সংস্কার আন্দোলনের সমর্থন জানিয়েছেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, থাইল্যান্ডে সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংস্কার প্রয়োজন। সংস্কার বাদ দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধাগুলো এলিট শ্রেণী থেকে নামিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা এবং জনগণের মাঝখান থেকে রাজনৈতিক নেতা থাকার প্রথাটির সংস্কার করতে হবে। জনগণ যেন সরাসরি সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে তাদের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরতে পারে সে পথ খোলা রাখতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর থেকে রাজনীতিবিদদের অবৈধ হস্তক্ষেপ দূর করতে হবে। তারা যেন সম্মানের সঙ্গে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন সে বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতে গাধার দুধের চড়া দাম

গাধা সম্প্রদায় হাস্যরসের বিষয়বস্তু হলেও গাধার দুধের পুষ্টিগুণ মোটেই তামাশার কোনো বিষয় নয়। হাজার হোক এটা মিসরের রাজকন্যা ও রূপসম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার রূপের রহস্য ছিল বলে জনশ্র“তি আছে। ক্লিওপেট্রার গাধার দুধ ব্যবহারের বিষয়টি একেবারেই কাকতালীয় নয়। প্রতিদিন তিনি স্নান করতেন গাধার দুধে। আর শুধু তার জন্য প্রতিদিন ৭০০ গাধার দুধ দোয়ানো হত। সম্প্রতি ভারতেও এ দুধ বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে রাস্তাঘাটের সমস্যা ক্রমে বেড়ে চললেও উত্তর তেলাঙ্গনা এলাকা থেকে একদল যাযাবর একপাল গাধা নিয়ে হাজির হয়েছে উত্তরের উপকূলবর্তী এলাকায়। সেখানে তারা চড়া দামে গাধার দুধের রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের দাবি, গাধার দুধে নবজাতকদের জন্য রয়েছে ঔষধি গুণাগুণ।
বৃহস্পতিবার শিভাজিপালেম শহরে জি লিঙ্গামা নামের এক নারীকে একজোড়া গাধা নিয়ে গাধার দুধ বিক্রি করতে দেখা যায়। এসময় তাকে ঘিরে ক্রেতাদের ভিড় জমে। তিনি জানান, তেলাঙ্গনার আদিলাবাদ জেলা থেকে কয়েক দিন আগে চার পরিবারের প্রায় ২০ জনের একটি দল এখানে এসে পৌঁছেছে। তাদের সঙ্গে এসেছে ১৫ জোড়া গাধা। গাধার দুধে নবজাতকের অ্যাজমা এবং যেকোনো শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যার প্রতিকার আছে বিশ্বাস করা হয়ে থাকে। তারা এক কাপ টাটকা দুধ বিক্রি করছে ২০০ রুপিতে। কেউ বেশি পরিমাণ কিনতে চাইলে লিটারপ্রতি ২০০০ রুপিতে বিক্রি করা হচ্ছে। এত উচ্চ মূল্য হলেও গাধার দুধের পুষ্টিগুণের ওপর যাদের আস্থা রয়েছে তারা কোনো ধরনের দামাদামি ছাড়াই কিনছেন। দুধ বিক্রি করে প্রতিদিন একেকজন ৭০০ থেকে ৮০০ রুপি আয় করছেন।

বেনজির হত্যা মামলায় নতুন করে তদন্ত নয়

মুসলিম লীগের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান সরকার বলেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নতুন করে তদন্তের কোনো প্রয়োজন নেই; এর আগের তদন্ত প্রতিবেদনগুলোই এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের জন্য যথেষ্ট। শনিবার পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী পারভেজ রশীদ বলেছেন, পারভেজ মোশাররফ ও আসিফ আলী জারদারি সরকারের শাসনামলে যেসব তদন্ত হয়েছে তার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে সরকার। তিনি বলেন, ‘আমরা আদালতের নির্দেশের অপেক্ষায় আছি, নির্দেশ পেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী করণীয় ঠিক করব।’ প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ গত মে মাসের নির্বাচনের আগে বলেছিলেন, তার দল ক্ষমতায় এলে তিনি বেনজিরের হত্যাকারীদের স্বরূপ উন্মোচন করবেন।
এ বিষয়ে তথ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন থাকায় আমরা আলাদা তদন্ত শুরু করতে পারি না।’ ২০০৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডির লিয়াকতবাগের সামনে বোমা হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় বেনজির ভুট্টো নিহত হন। নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্য দিয়ে যখন তার হুড খোলা গাড়িটি যাচ্ছিল তখন হামলার স্বীকার হন তিনি। এ ঘটনায় পরবর্তী দুটি সরকার চারটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং চারটি তদন্ত প্রতিবেদনই আদালতে জমা দেয়া হয়েছে। উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তেহরিক-ই তালেবান পাকিস্তান ভুট্টোকে হত্যার দায়িত্ব স্বীকার করেছে; যদিও ওই দাবিকে আমলে নেয়নি দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। ডন।

বাংলাদেশ এখন কালো অধ্যায় পার করছে by ফারুক চৌধুরী

ফারুক চৌধুরী
বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী
প্রথম আলো  আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল থেকে কি বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল?
ফারুক চৌধুরী  আমি তো মনে করি, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যে অবস্থায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এতটা নিচে আর কখনো নামেনি। ১৯৭২ থেকে ১৯৮২ এবং ১৯৮৬ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত আমি কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের জন্য দেশের বাইরে ছিলাম। বিদেশে বসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওঠানামা লক্ষ করেছি। অনেকটা শ্রাবণের মেঘের মতো। কিন্তু এবার যা হলো, সম্ভবত আর কখনোই তা হয়নি। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল এক বিস্ময়। আমাদের স্বাধীনতার দুটি মাইলফলক ঘটনা আছে—২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। পৃথিবীর আর কোনো দেশের বিজয় দিবস নেই। অর্থাৎ, আমরা একটি দখলদার বিদেশি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করেছি। সেই দ্বিমেরু বিশ্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম বিশ্বসম্প্রদায়ের ব্যাপক সমর্থন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারত বা তৎকালীন সোভিয়েত শিবির তো আমাদের সাহায্য করেছেই, কিন্তু যে পশ্চিমা বিশ্ব পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে সমর্থন করেনি; সেসব দেশের জনগণ নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।
প্রথম আলো  গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর। গত ৪২ বছরেও আমরা সেটি করতে পারলাম না কেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা। তাঁরা ঠিক করতে পারেননি নির্বাচনটি কীভাবে করবেন। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা দখলের। ক্ষমতায় আসা মানে রাজনীতিবিদদের কাছে শুধু সরকার গঠন নয়; যা খুশি তাই করা। সরকারপ্রধানেরা হয়ে ওঠেন আইনকানুনের ঊর্ধ্বে। তাঁরা কাউকেই পরোয়া করেন না। দেশের বর্তমান সংকটের মূলেও এই মানসিকতা কাজ করেছে।
প্রথম আলো  বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে, তারাও তো একসময় সামরিক শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে?
ফারুক চৌধুরী  নিশ্চয়ই দিয়েছে। পাকিস্তানে, ফিলিপাইনে, ইরানেও তারা স্বৈরশাসকদের মদদ জুগিয়েছে। এ কারণেই আমি বলব, আমাদের সমস্যা আমাদেরই সমাধান করতে হবে। এই যে কূটনীতিক দেবযানীকে নিয়ে ভারত আমেরিকার সঙ্গে একটি অবস্থান নিতে পেরেছে, তা তার নিজের সামর্থ্যবলেই। একই সঙ্গে এ নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ঐকমত্যও এই অবস্থান নিতে সহায়তা করেছে। প্রথম আলো  ভারত প্রথম দিকে শক্ত অবস্থান নিলেও পরে মনে হয় কিছুটা সরে এসেছে, নমনীয় হয়েছে।
ফারুক চৌধুরী  দুটি দেশের অর্থনৈতিক শক্তিও কিন্তু এক নয়। অধিকতর শক্তিধরের বিরুদ্ধে লড়তে নানা হিসাব-নিকাশ করতে হয়। কিন্তু যেটুকু তারা নিতে পেরেছে, সেটি জাতীয় ঐকমত্যের কারণেই। আর আমাদের এখানে ঠিক তার বিপরীতটি ঘটেছে।
প্রথম আলো  কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার বিষয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নেওয়া প্রস্তাবকে কীভাবে দেখছেন?
ফারুক চৌধুরী  এটি তাদের চরম নির্বুদ্ধিতা। বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তানের বলার কিছু নেই। এর মাধ্যমে পাকিস্তান আবারও প্রমাণ করল, তারা একাত্তরের দৃষ্টিভঙ্গিতেই আচ্ছন্ন। কাদের মোল্লাকে তারা তাদের লোক বলে দাবি করেছে। এটাই হলো পাকিস্তানি মানসিকতা। আর ইমরান খানের রাজনীতি হলো তালেবানি রাজনীতি। তবে পাকিস্তানে এর প্রতিবাদও হয়েছে।
প্রথম আলো  কিন্তু এ নিয়ে বাংলাদেশে যে পাল্টাপাল্টি রাজনীতি হচ্ছে?
ফারুক চৌধুরী  যেখানে জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন, সেখানে পাল্টাপাল্টি মোটেই কাম্য নয়। কিন্তু কোনো কোনো মহল থেকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের যে দাবি করা হয়েছে। আমি মনে করি, সেই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনো আসেনি। তবে পাকিস্তানের অন্যায়ের প্রতিবাদ আমরা অবশ্যই করব। প্রথম আলো  পাকিস্তানের ব্যাপারে আমরা যতটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছি, তুরস্কের ব্যাপারে সেটি দেখাতে পারিনি। তারা আরও নগ্নভাবে যুদ্ধাপরাধের বিচারে হস্তক্ষেপ করেছে। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসে হামলা হয়েছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা নীরব থেকেছি।
ফারুক চৌধুরী  আমি মনে করি তুরস্কের ব্যাপারে আমাদের নমনীয় থাকার কোনো কারণ নেই। সব ক্ষেত্রেই ভারসাম্য থাকা উচিত। প্রথম আলো  ৪০ বছর পর আমরা যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু করেছি। এ ব্যাপারে বহির্বিশ্বে নানা অপপ্রচারও চলছে। এসব বন্ধে এবং বিচারের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে সরকারের যা যা করণীয় ছিল তা কি তারা করতে পেরেছে?
ফারুক চৌধুরী  সরকার করতে পারেনি। আমি বলব, এটি কূটনৈতিক দুর্বলতা।
প্রথম আলো  বাংলাদেশে বর্তমানে যে রাজনৈতিক সংকট চলছে, তার পেছনে দুটি ঘটনা কাজ করছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচন। ফারুক চৌধুরী  দুটি আলাদা বিষয়। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। যে বিচার শুরু হয়েছে, তা শেষ করতে হবে। কিন্তু সরকার ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচন করে ফেললে তার ফল খুব নেতিবাচক হবে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তার বিশ্বাসযোগ্যতাও থাকবে না। দক্ষিণ আফ্রিকার নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলতেন, দুই পক্ষের ঝগড়ায় কে হারবে, কে জিতবে—সেটি বড় কথা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের ওপর এর প্রতিক্রিয়া কী হবে?
ইকোনমিস্ট-এর সঙ্গে আমি একমত নই যে, আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতলে বাংলাদেশ হারবে। বাংলাদেশ হারবে না। আমি বলব, বাংলাদেশ একটি কালো অধ্যায় অতিক্রম করছে। এমনকি পুরোনো রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগও কিন্তু কঠিন সময়ের মুখোমুখি। কীভাবে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রথম আলো  এ অবস্থার জন্য বিরোধী দলেরও কি দায় নেই?
ফারুক চৌধুরী  অবশ্যই দায় আছে। বিরোধী দলের যে দায়িত্ব, তা কি তারা গত পাঁচ বছরে পালন করতে পারেনি? তারা সংসদে গরহাজির থেকেছে। বিএনপি এখন বসে বসে বিবৃতি দেয় এবং তাদের একটি কর্মসূচি পালনের জন্য আরেকটি বাহু আছে, তার নাম জামায়াত-শিবির। তারা দেশের ভয়াবহ ক্ষতি করেছে, তারা মানুষ মেরেছে, সরকারি স্থাপনায় হামলা করছে, পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে দিয়েছে। এগুলো আন্দোলন নয়, সন্ত্রাস। আর জামায়াত-শিবিরই তা করতে পারে। কেননা, দেশের প্রতি তাদের দরদ নেই। থাইল্যান্ডেও সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। সেখানে তো সরকারি কোনো স্থাপনায় হামলা হচ্ছে না। প্রথম আলো  বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে বলেই তারা এসব করতে বাধ্য হচ্ছে। ফারুক চৌধুরী  বিরোধী দলকে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়া অন্যায় ও অগ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে জামায়াত-শিবিরকে দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে হবে। শান্তিপূর্ণ উপায়েই তারা সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে পারে। তবে আবারও ম্যান্ডেলার কথায় ফিরে যেতে হয়। ১৯৯৭ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা বাংলাদেশে এসে বলেছিলেন, ‘আমি দেশের প্রেসিডেন্ট। অতএব দেশটিতে যা কিছু ঘটুক না কেন, তার দায় আমাকেই নিতে হবে।’ বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদেরও আমি সে কথাটি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। দেশে বর্তমানে জনজীবনে যে দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তার দায় এড়াতে পারে না। দুই দলে মুষ্টিমেয় লোক রাজনীতি করেন। আর সেই রাজনীতির জন্য গোটা দেশের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
প্রথম আলো  বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে আমাদের বন্ধু ও উন্নয়ন-সহযোগী রাষ্ট্রগুলো বলা যায় মুখোমুখি অবস্থানে। এর কারণ কী?
ফারুক চৌধুরী  আমার মতে, কোনো রাষ্ট্রই স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নয়। সবাই নিজের স্বার্থ দেখবে। প্রশ্ন হলো, আমরা আমাদের স্বার্থ কতটা দেখছি।
প্রথম আলো  ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘ, কমনওয়েলথ ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে, তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে না। আরও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে?
ফারুক চৌধুরী  হ্যাঁ, তারা অবরোধ আরোপ করতে পারে। যেমন, অনেক দেশে করেছে। জিএসপি সুবিধা বাতিলও একধরনের অবরোধ। কিন্তু বাংলাদেশে চূড়ান্ত অবরোধ আরোপ করার মতো পরিস্থিতি এখনো হয়েছে বলে মনে করি না।
প্রথম আলো  যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা জাতিসংঘ যদি শেষ পর্যন্ত কোনো কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়, বাংলাদেশ কি তা বহন করতে পারবে?
ফারুক চৌধুরী  বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ পড়বে। আমাদের রপ্তানি কমবে, বিনিয়োগ কমলে মানুষের কর্মসংস্থানও কমবে, বেকারত্ব বাড়বে। ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের পক্ষে এসব দায় বহন করা কঠিন হবে। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ যে সুনাম অর্জন করেছিল, তা ধুলায় মিশে যাবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
ফারুক চৌধুরী  ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  সোহরাব হাসান ও রাহীদ এজাজ

স্থিতিশীল বাংলাদেশই চায় বিশ্বসম্প্রদায় by শমসের মবিন চৌধুরী

শমসের মবিন চৌধুরী
বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক সংকট আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কী প্রভাব ফেলতে পারে, কীভাবে দেশে একটি সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসতে পারে, সে বিষয়ে প্রথম আলো মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শমসের মবিন চৌধুরীর
প্রথম আলো  নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি কম আন্দোলন করল না, ২৫ নভেম্বর থেকে দফায় দফায় টানা অবরোধ কর্মসূচি হলো, কিন্তু সরকার তো একতরফা নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে?
শমসের মবিন চৌধুরী  বিএনপির কর্মসূচি সফল হয়নি, তা বলা যাবে না। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে দেশের মানুষ এমন নির্বাচন চায় না। এটা তো শুধু ভোটারবিহীন নয়, প্রার্থীবিহীন নির্বাচন হচ্ছে। ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। জনগণকে আমরা সচেতন করতে পেরেছি। প্রার্থী যাঁরা হয়েছেন, তাঁরা ঠিকমতো প্রচার-প্রচারণাও করতে পারছেন না। এটা তো আমাদের আন্দোলনের ফলেই হয়েছে।
প্রথম আলো  আপনাদের চিন্তা-ভাবনা কী?
শমসের মবিন চৌধুরী  খালেদা জিয়া ২৪ ডিসেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গণতন্ত্র হচ্ছে আর্ট অব কম্প্রোমাইজ। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে এটা করতেই হবে। তিনি সেদিন এটা পরিষ্কার করেছেন যে দলের চেয়ে দেশ ও দেশের জনগণ বড়। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে বর্তমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের সময় ও সুযোগ আছে। আইনগত বা সাংবিধানিক—সবভাবেই তা সম্ভব। সংসদ এখনো বহাল রয়েছে, আমরা আজকেই সংলাপে বসে একটি পথ খুঁজে বের করতে পারি।
প্রথম আলো  বিএনপি কি আপস করতে প্রস্তুত রয়েছে?
শমসের মবিন চৌধুরী  আমরা তো সব সময়ই বলে আসছি সংলাপে বসলে দুই পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানে আসা সম্ভব। জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত তারানকোর সঙ্গে যখন আমরা বৈঠক করেছি, তখন আমরা বলেছি যে তফসিল বাতিল, আটক নেতাদের মুক্তি—এ ধরনের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হোক, আমরা আলোচনায় বসে সমাধানের একটি পথ খুঁজে বের করতে পারব। দেশকে বাঁচানোর সদিচ্ছা যদি সরকারের থাকে, তাহলে এটা সম্ভব। আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই, এখন সরকার যদি গায়ের জোরে একতরফা নির্বাচন করতে চায়, তাহলে তো আর হবে না।
প্রথম আলো  বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ যে দাবি আদায়ে দলটি দেশের জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে?
শমসের মবিন চৌধুরী  এটা নিছক অপপ্রচার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমাদের যে যোগাযোগ রয়েছে, সেটা গতানুগতিক। বিএনপি সব সময়ই জনগণের দল, নির্বাচনমুখী দল। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এবং জনগণের সমর্থনেই দলটি কাজ করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে আওয়ামী লীগেরও যথেষ্ট যোগাযোগ রয়েছে এবং তা আমাদের চেয়ে কোনোভাবেই কম নয়। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার অন্তত ছয়জন সরকার ও দলটির পররাষ্ট্রবিষয়ক দিকগুলো দেখছেন।
প্রথম আলো  বিএনপির রাজনীতিতে ভারতবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট, আবার এখন দেখা যাচ্ছে, ভারতের সমর্থন পাওয়ার বিষয়টিকেও দলটি গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে। বিএনপি কি অবস্থান পরিবর্তন করছে?
শমসের মবিন চৌধুরী  ২০১২ সালে বেগম খালেদা জিয়া যখন ভারত সফরে গিয়েছিলেন, তখন তিনি দেশটির রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতা থেকে শুরু করে সবার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তিনি এটা স্পষ্ট করেছেন, যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তি হচ্ছে পারস্পরিক লাভ ও পারস্পরিক সমমর্যাদা। ভারত এখন এটা বুঝতে পেরেছে যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে গেলে সেটা রাখতে হবে দেশটির জনগণের সঙ্গে, কোনো বিশেষ দলের সঙ্গে নয়। ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি যখন অর্থমন্ত্রী হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন, তখন তিনি এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছিলেন। ভারতের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখন এ বিষয়টি খুবই গুরুত্ব পাচ্ছে যে একটি দলের সঙ্গে বাড়তি সম্পর্ক রাখার বিষয়টি খুব কাজের কথা নয়।
প্রথম আলো  দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারত বাড়তি কোনো ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন কি?
শমসের মবিন চৌধুরী  দেখুন, জনগণের মধ্যে এ ধরনের একটি ধারণা রয়েছে। ভারতের কিছু কিছু গণমাধ্যমে এমন কিছু খবর বের হয়েছে, তাতে এটা মনে হওয়া খুব স্বাভাবিক যে এখনকার নির্বাচন নিয়ে দেশটির বাড়তি আগ্রহ রয়েছে। আগামী ৫ জানুয়ারি যে একতরফা নির্বাচন করতে যাচ্ছে সরকার, সেখানে এরই মধ্যে পর্যবেক্ষক না পাঠানের ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও কমনওয়েলথসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা। অর্থাৎ এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণেরও অযোগ্য। ভারত দেশ হিসেবে পর্যবেক্ষক না পাঠালেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সূত্রে পর্যবেক্ষক পাঠিয়ে থাকে। এই নির্বাচনের ব্যাপারে দেশটির কাছ থেকে আমরা এখনো স্পষ্ট করে কিছু শুনিনি। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ, সেখানে এর ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এখনকার গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রতিও ভারতের সমর্থন থাকাটাই স্বাভাবিক। আর বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ভারতের জন্যও একটি জরুরি বিষয়। অস্থিতিশীল বাংলাদেশ ভারতের স্বার্থের অনুকূলে যেতে পারে না।
প্রথম আলো  তারানকোর উদ্যোগ তো কার্যত ব্যর্থ হলো, যখন এই সমঝোতা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তখন আপনাদের প্রত্যাশা কী ছিল?
শমসের মবিন চৌধুরী  আমরা আসলে যা চেয়েছিলাম তা হচ্ছে, নির্বাচনের তফসিল স্থগিত করা এবং আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি করা। নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমাদের চাওয়া হচ্ছে নিরপেক্ষতা ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সেই নির্বাচনের পন্থাটি ঠিক হবে, সেটাই ছিল আমাদের প্রত্যাশা।
প্রথম আলো  বর্তমান পরিস্থিতিতে আপনারা জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তরফে নতুন কোনো উদ্যোগ আশা করছেন কি না?
শমসের মবিন চৌধুরী  জাতিসংঘ আবার কোনো উদ্যোগ নেবে কি না, সেটা তাদের ব্যাপার। জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সবাই বাংলাদেশে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখতে চায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এ ব্যাপারে সচেতন রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান ভৌগোলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক—সব বিবেচনাতেই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাওয়া। প্রথম আলো  সাম্প্রতিক কালে বিএনপির নেতৃত্বে ১৮-দলীয় জোট যে আন্দোলন করল, তাতে দুর্বৃত্তপনা ও সহিংসতার ঘটনাই বেশি ঘটেছে। আপনাদের পক্ষ থেকে এসব ঘটনার নিন্দা জানানো হয়নি। শমসের মবিন চৌধুরী  দেখুন, এসব ঘটনার সঙ্গে আমাদের কর্মসূচির সম্পর্ক নেই। সর্বশেষ বাংলামোটর এলাকায় পুলিশ সদস্যের দুঃখজনক মৃত্যুর ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন আমাদের কোনো কর্মসূচি ছিল না। আর এসব বর্বরতা ও সহিংসতার নিন্দা দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ২৪ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনেও নিন্দা জানিয়েছেন। আর প্রকাশ্যে নিন্দা- প্রতিবাদ জানানোর পথ তো সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের কোথাও সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না, সভানেত্রীর বাসা, অফিস অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। দলের কার্যালয়ে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রথম আলো  যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে আপনাদের অবস্থান কিন্তু এখনো পরিষ্কার নয়।
শমসের মবিন চৌধুরী  আমরা এখন বিরোধী দলে, সরকারে যখন যাব তখন পরিষ্কার হবে যে এ ব্যাপারে আমরা কী করব। বিরোধী দলে বসে তা পরিষ্কার করা কঠিন। যুদ্ধাপরাধের বিচার অবশ্যই অব্যাহত থাকবে, তবে বিচার-প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের করা হবে। এখন যাদের বিচার চলছে, এর বাইরেও অনেকে নানা রাজনৈতিক বিবেচনায় এই প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছেন, সবাইকেই বিচারের আওতায় আনা হবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
শমসের মবিন চৌধুরী  ধন্যবাদ।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন  এ কে এম জাকারিয়া

নির্বাচন ও অতঃপর

এক কঠিন ও অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ধাবিত হচ্ছে দেশ। সরকারি দলের শাসন প্রলম্বিত কিংবা বিরোধী দলের ক্ষমতায়নের জন্য প্রাণ দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। ক্ষতির শিকার হচ্ছে দেশের অর্থনীতি, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা ও শিক্ষা কার্যক্রম। বিরোধী দলগুলোর কাছে এমনকি সর্বদলীয় সরকারও গ্রহণযোগ্য নয়, চাই নির্দলীয় সরকার। কারণ, দলীয় লোকজনকে বিশ্বাস নেই, যদিও তাঁরাই দেশ পরিচালনা করবেন। অন্যদিকে সরকারের কাছে সংবিধান রক্ষা করাই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়। যদিও সন্ত্রাসী তৎপরতায় নিয়মিতভাবে জীবন দিচ্ছে সাধারণ নাগরিক, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের অর্থনীতি। যুগ যুগ ধরে আমাদের নেতৃত্বে দূরদর্শিতার অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। যারা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে যাবে না, তারা এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরোধিতা করছে।
আর যারা কেবল পাগল ও শিশু ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয় ভাবত, তারা এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ছাড়া নির্বাচনে অংশ নেবে না, যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে উভয় দল কম নাজেহাল হয়নি। এই অপরিণামদর্শিতার জন্য উভয় দলেরই জাতির কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। প্রাণী হিসেবে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য আমরা কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, জাতীয় স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলের এই মুখোমুখি সাংঘর্ষিক অবস্থানের পরিবর্তন হোক। দেশ রক্ষায় দুটি দল যদি একমতও হয়, ঘটনাগুলো এত দ্রুততার সঙ্গে ঘটবে যে স্বল্পকালীন যেকোনো সমাধান নিয়েই আমাদের সন্তুষ্ট থাকতে হবে এবং কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের বোধোদয় ঘটবে যে তা স্থায়ী সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ দেশ শাসনের নিয়মকানুন ঠিক করা দরকার, এমন সময়ে যখন কোনো দলই সরকারে নেই। কারণ, তখন তাদের লক্ষ্য প্রায় অভিন্ন হবে। এতৎসংক্রান্ত কিছু প্রস্তাব নিম্নে উত্থাপন করছি।
১. পরমতসহিষ্ণুতা ও মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। দলগুলোর মধ্যে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় নির্বাচনের মতো কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হলে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। সেই সমঝোতা প্রয়োজন তত্ত্বাবধায়ক/নিরপেক্ষ/ নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠায় কিংবা স্বাধীন কার্যকর নির্বাচন কমিশন গঠনে।
২. ’৯৬-এর নির্বাচনে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করার সিদ্ধান্তটি যে কতটা অপরিপক্ব ও অদূরদর্শী ছিল, তা বোঝার জন্য সাধারণ জ্ঞানই যথেষ্ট। সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি কে হবেন তা সরকার যেখানে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এ রকম ব্যবস্থা বিরোধী দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
৩. নিয়মিতভাবে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন এবং সাংসদ হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্রহণের বিষয়টি সংসদ ও সাংসদদের ভাবমূর্তি ম্লান করছে। সংসদ বর্জন এবং সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি আমাদের জাতীয় এবং সমাজ-জীবনে দারুণ ঋণাত্মক প্রভাব যে ফেলবে, তা বলাই বাহুল্য। এই বিষয়টি উভয় দলের ইশতেহারে বর্ণিত হওয়া উচিত।
৪. আমাদের সংবিধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে অপার ক্ষমতা দিয়েছে। তা-ই যদি হয়ে থাকে, তাহলে এ বিষয়েও সমঝোতা প্রয়োজন, তাও নির্বাচনের আগে, যাতে উভয় দলই একই সমতল থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৫. ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যাঁদের অবস্থান, তাঁদের বিত্তবৈভব অগ্রহণযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাংসদদের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে আমাদের সংবিধানে যদি বিধান থেকে থাকে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সংবিধান সমুন্নত রাখা অবশ্যই আমাদের সাংসদদের পবিত্র দায়িত্ব, যেমনটি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ। নেতারা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন অনুশীলন করেন, তা সাধারণ মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করবে। এ বিষয়ে নির্বাচনের আগেই উভয় দলের মধ্যে গ্রহণযোগ্য সমঝোতা প্রয়োজন।
৬. দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার, নির্বাচন কমিশনের গঠন কিংবা কার্যপরিধি, ক্ষমতার বিষয়েও নির্বাচনের আগেই উভয় দলের মধ্যে সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন। উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য মানুষ খুঁজে পেতে যথেষ্ট স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে টেলিভিশনের পর্দায় জনসমক্ষে তা করা সম্ভব, যাতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততাও থাকবে।
৭. সম্প্রতি ভারতে ‘না’ ভোট দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং তা সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। আমাদের দেশেও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নিতে পারলে তা আমাদের সাংসদদের জনকল্যাণমুখী কাজ করতে উৎসাহিত করবে।
৮. বিগত নির্বাচনগুলোর ফল বলে, একটি দলের সর্বমোট প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে সংসদে আসনসংখ্যার কো-রিলেশন সামান্যই। যেমন, গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি প্রাপ্ত ভোটের শতকরা ব্যবধান পাঁচ-সাত হলেও লীগ আসন পায় কয়েক গুণ কমবেশি। তাই প্রার্থীদের আঞ্চলিক জনপ্রিয়তা এবং দলগুলোর সাধারণ জনপ্রিয়তার বিষয়টিও বিবেচনা করে সম্ভবত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের বিষয়টি ভাবা দরকার, যাতে সংসদে দলগুলোর যথাযোগ্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।
৯. ভোগ করে নয় বরং ত্যাগ করেই আমাদের নেতারা সারা দেশের মানুষকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। জনপ্রতিনিধি হিসেবে কী কী সুযোগ-সুবিধা পাওয়া উচিত, তার থেকে সাধারণ জনগণের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত, তা নিয়ে ভাবলে ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হবে।
১০. আমাদের রাজনৈতিক কর্মীরা কাজ না করে বিভিন্ন সভা-সমিতিতে যখন-তখন অংশগ্রহণ, নেতাদের সংবর্ধনা জানাতে বিমানবন্দরে গমন এবং রাস্তাঘাটে যানজট তৈরিতে অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে দেশের সম্পত্তি রেল, যানবাহন ভাঙচুরসহ সব রকম ঋণাত্মক কাজেই রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের পাচ্ছি। খুব ভালো হতো জনকল্যাণমুখী কাজে যদি তারা নেতৃত্ব দিত। যেমন, বয়স্কদের শিক্ষার জন্য, রাস্তাঘাট মেরামতসহ অন্যান্য সামাজিক কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাসেবকের ভূমিকা পালন করা। তাহলে নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী ও সংগঠনের সদস্যদের প্রতি মনোভাব অনেক ইতিবাচক হতো। আশা করি, দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে উল্লিখিত বিষয়সমূহ আমলে নিয়ে কার্যকর স্থায়ী সমাধানে আমরা দূরদর্শিতার পরিচয় দেব।

সবাইকে নিয়ে নির্বাচন হোক

গত শনিবার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে চলমান রাজনৈতিক সংকট সম্পর্কে যে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষের মনোভাবই প্রকাশিত হয়েছে। সিপিডিসহ চারটি বেসরকারি সংগঠন আয়োজিত এই সেমিনারে বর্তমান সংকট নিরসনে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত এবং সমঝোতার ভিত্তিতে সংসদ ভেঙে দিয়ে তিন মাসের মধ্যে সবার অংশগ্রহণে যে বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছেন; তা সবারই মনের কথা। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেছেন, ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন চলমান সমস্যার গঠনমূলক সমাধান করবে না। একজন ব্যবসায়ী নেতা সংকট নিরসনে গণতান্ত্রিক দলগুলো ব্যর্থ হলে দেশে উগ্র মৌলবাদী শক্তির পুনরুত্থান ঘটবে বলে যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তার সঙ্গেও দ্বিমত করার কিছু নেই। এ ক্ষেত্রে দুই পক্ষেরই দায় রয়েছে। সরকার যেমন একতরফা নির্বাচন দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছে, তেমনি বিরোধী দলও সেই নির্বাচন প্রতিরোধের নামে দেশ ও জনগণকে জিম্মি করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচার বন্ধ করতে জামায়াত-শিবিরের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ। এর প্রতিকার কী?
আমরা মনে করি, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। বিচার চলবে। কিন্তু সেই বিচারের দোহাই দিয়ে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা যাবে না। আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক দল কেন ভোটারবিহীন ও প্রার্থীবিহীন নির্বাচনের কেলেঙ্কারি মাথায় নেবে? এ ধরনের একটি নির্বাচন করার ফলে দেশে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি দেখা দেবে, তাতে গত পাঁচ বছরে ক্ষমতাসীন দলটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে যে সাফল্য অর্জন করেছিল, তা-ও ম্লান হয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ যদি স্বৈরশাসকদের মতো পোড়ামাটি নীতি নিয়ে দেশ চালাতে না চায়, তাহলে তাদের উচিত হবে বর্তমান তফসিল বাতিল করে সমঝোতার ভিত্তিতে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে আন্দোলনের নামে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি প্রত্যাহার করতে হবে। নাগরিক সমাজের আহ্বানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমরা মনে করি।
দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় উপনীত হলে কেবল নির্বাচন নয়, দেশ শাসনের বিষয়েও মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময় তিন জোটের রূপরেখাই দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল। এ প্রসঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার সেই বাণী স্মরণ করতে বলব। তিনি বলেছিলেন, ‘বিবাদে আমি না প্রতিপক্ষ কে জয়ী হলো সেটি বড় কথা নয়, বড় হলো জনগণের ওপর এর প্রতিক্রিয়া কী পড়ল।’ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সম্প্রতি একটি সভায় বলেছেন, ‘সংবিধান রক্ষার চেয়েও বেশি জরুরি দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তা।’ আশা করি, সরকার সমঝোতার শেষ সুযোগটি হেলায় হারাবে না।

Monday, December 30, 2013

নতুন করে শিক্ষা নিয়ে ভাবুন by মোঃ মুজিবুর রহমান

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহেও দেশে যে ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হয় অস্থিতিশীল রাজনীতির উত্তাপ সহজে কমবে না। বরং দিন দিন তা আরও বাড়বে। এরই মধ্যে ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিকে এগিয়ে চলেছে দেশ। অন্যদিকে, নির্বাচন বর্জনকারী বিরোধীদলীয় নেতৃত্বাধীন জোট বর্তমান নির্বাচন অনুষ্ঠানের কার্যক্রম বাতিল করে নতুনভাবে তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তারা নবম সংসদ ভেঙে দেয়ারও দাবি উত্থাপন করেছে। নির্বাচন নিয়ে অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে প্রবাহিত হয় সেটাই দেখার বিষয় হয়ে রইল। এদিকে আমরা উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এরই মধ্যে একরকম ধ্বংসের মুখে ফেলে দিয়েছে; শিক্ষাকে এক ধরনের টেনে নিয়ে গেছে খাদের কিনারে। এ নিয়ে আমরা পত্র-পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে বহু আবেদন-নিবেদন করেছি, একই কথা বিভিন্নভাবে বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কার্যত আমাদের আবেদন-নিবেদন কোনো কাজে আসেনি। গণমাধ্যমও গুরুত্বের সঙ্গে এসব বিষয় তুলে ধরেছে, তাতেও তেমন কোনো ফল দেখা যায়নি। বরং রাজনৈতিক দলগুলো তাদের পরিকল্পনা মতোই এগিয়ে চলেছে। অথচ ধ্বংসাত্মক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এবং তাতে শিক্ষার্থীদের কী ক্ষতি হচ্ছে, সেদিকে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না! রাজনৈতিক পরিস্থিতির সর্বশেষ ঘটনাবলী পর্যবেক্ষণ করে আমাদের মনে এখন এমন ধারণার জন্ম হচ্ছে যে, আগামী দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য অপেক্ষা করছে আরও মহাবিপদ! কারণ আমরা দেখলাম, রাজনৈতিক ঝড়-ঝঞ্ঝার কবলে পড়ে ২০১৩ সালের পুরো বছর শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। রাজনৈতিক তাণ্ডবের মুখে বিপর্যস্ত হয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রাথমিক স্তর থেকে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সব ধরনের শিক্ষা বিঘ্নিত হয়েছে ব্যাপকভাবে। উচ্চশিক্ষা স্তরে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা, দেখা দিয়েছে সংশয়। এখনও প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে আছে। ২০১৪ সালের শুরুতেই যদি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসে তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে আর বাঁচানো যাবে কিনা তাতে ঘোর সন্দেহ রয়েছে। কারণ এমনিতেই শিক্ষার যতটুকু ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে, এখন আগামী দিনগুলোতে যদি শিক্ষা কার্যক্রম নিরাপদে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া না যায় তাহলে শিক্ষার্থীদের কপালে আরও দুর্ভোগ আছে- এটা একরকম নিশ্চিত করেই বলা যায়!
রাজনৈতিক কার্যক্রম কিভাবে চলবে তা রাজনীতিকদের ওপর নির্ভর করলেও শিক্ষা কার্যক্রম কিভাবে পরিচালিত হবে সেটা নিয়েও রাজনীতিকদের ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি নির্ভর করে স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। একইভাবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন নির্ভরশীল। যে দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি যত বেশি স্থিতিশীল, সে দেশ তত বেশি উন্নয়ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে পারে। অথচ আমাদের দেশে উন্নয়নকামী মানুষরা শিক্ষা নিয়ে সৃষ্টিশীল চিন্তা করবে কখন, তাদের অধিকাংশের সময় কাটে রাজনৈতিক মারপ্যাঁচের হিসাব করতে। আমরা দেখছি, বর্তমানে দেশে শিক্ষা যেন কোনো গুরুত্বই পাচ্ছে না। বরং এক কথায় বলা যায়, শিক্ষা সবচেয়ে অবহেলিত খাত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে শিক্ষায় যতটুকু সফলতা অর্জিত হয়েছিল তাও এখন মলিন হতে চলেছে। শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার প্রধান দায়িত্ব যেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, তেমনি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার দায়িত্বও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এড়াতে পারে না। বরং শিক্ষাসহ সব খাতের নিরাপদ পরিচালনা নির্ভর করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর। দেশে যদি সারা বছর রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করে তাহলে কোনো কার্যক্রমই স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। মোটা দাগে কথা হল, রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে সব ধরনের কর্মকাণ্ড মুখ থুবড়ে পড়ে, বিঘ্নিত হয় উন্নয়ন কার্যক্রম। শিক্ষা এমন একটি খাত যে খাতের স্বাভাবিক বিকাশ এবং সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। অথচ এটাই আমাদের দেশে সম্ভব হয়নি আজও।

এরা যদি অবরোধকারী, পিকেটার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী হয়ে থাকে, তাহলে সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত, দুষ্কৃতকারী কারা? by মহিউদ্দিন আহমদ

কিছু দিন ধরে খবর শুনতে দেখতে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো খুললে বা পত্রিকাগুলো হাতে নিলে আমার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। দুনিয়ার এতগুলো দেশে চাকরি করলাম, এতগুলো দেশে সরকারি বা ব্যক্তিগত সফরে গেলাম, কিন্তু কোথাও এসব দেশের টিভি চ্যানেলে বা পত্র-পত্রিকা, রেডিওর খবরে বোমা হামলাকারীদের সম্মানজনকভাবে বর্ণনা বা উল্লেখ করতে দেখিনি। এ কলামটি যখন লিখছি আজ (শুক্রবার) সকালে তখন ব্যাংকক, কায়রো, ইস্তাম্বুল, আংকারা, দক্ষিণ সুদান, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, ইউক্রেনে এই-সেই কারণে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, বোমা হামলা, মারামারি-কাটাকাটির খবর দেখছি বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা টিভি চ্যানেলগুলোতে। কিন্তু কোনো বিদেশী চ্যানেলেই তো দেশের প্রযোজ্য আইন-কানুন লংঘনকারীদের এমন মর্যাদা সম্মান দিয়ে বর্ণনা করা হচ্ছে না। কিন্তু আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর প্রতিটি নিউজ বুলেটিনে এমনটি করা হচ্ছে সৎ সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন-বিধিবিধান লংঘন করে।
গত ২৪ ডিসেম্বর মঙ্গলবার চ্যানেল আই-এর দুটার খবর দেখছিলাম। প্রথম ৫ মিনিটে ১০ বারের মতো ‘অবরোধকারী’ শব্দটি ব্যবহার করা হল দেশের বিভিন্ন জায়গার অবরোধের খবর দিতে গিয়ে। তারা বোমা হামলা চালিয়েছে, মানুষ মেরেছে, ককটেল ফুটিয়েছে, গাছ কেটেছে, রাস্তা কেটেছে, রেললাইন উপড়ে তুলেছে, গাড়িতে আগুন দিয়েছে, তারপরও তারা সন্ত্রাসী নয়, পিকেটার নয়, দুর্বৃত্ত নয়, দুষ্কৃতকারী নয়; তারা অবরোধকারী, পিকেটার, শিবির বা বিএনপির নেতাকর্মী!! ২৫ তারিখ বুধবার সকাল ৬টায় এটিএন নিউজে খবর দেখছিলাম। আগের দিন রাতে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়েছে বাংলামোটরের পুলিশের রিকুইজিশন করা বাসে আগুন দিয়ে। তখন দেখলাম ‘দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে’ শব্দগুলো ব্যবহার হতে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর আবার ‘অবরোধকারী’ শব্দে ফিরে গেল এটিএন নিউজ। আজ (শুক্রবার) ভোর ৬টায় এটিএন নিউজের প্রতি ঘণ্টার খবরের সঙ্গে ‘অবরুদ্ধ বাংলাদেশ’-এর ওপর আগামী দুই দিন বিশেষ খবর দেখানো হবে বলা হয়েছে। কিন্তু একই খবরে রাজশাহীর পুলিশ সদস্য সিদ্ধার্থ রায়ের হত্যা ১৮ দলীয় সমর্থকদের বোমা হামলায় ঘটেছে, বলা হয়েছে। এর বিপরীতে শুক্রবার সকাল ৭টায় চ্যানেল ’৭১-এর খবরে সিদ্ধার্থ রায়ের হত্যাকারীদের কয়েকবারই ‘দুর্বৃত্ত’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এক চ্যানেলের খবরে যারা ‘দুর্বৃত্ত’ অন্য চ্যানেলের খবরে তারা ‘সমর্থক’ কেন? এটিএন-এর বুলেটিনে যারা বোমা মেরেছে, ককটেল ফুটিয়েছে, তারা কি সন্ত্রাসী নয়? তাহলে তাদের আবার ‘অবরোধকারী’, ১৮ দলীয় সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করা হল কেন? অবরোধকারী তাদেরই বলা যাবে, যারা আইন মেনে শান্তিপূর্ণভাবে অবরোধ করবে। প্রতিবাদ করতে, রাস্তায় শুয়ে পড়তে এবং নিজ ইচ্ছায় দলে দলে গ্রেফতার হতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে এবং পরেও অনেক দেখেছি।
সেই ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের কয়েকটি ছবি ঐতিহাসিক মর্যাদা পেয়েছে। এমন একটি ছিল মওলানা ভাসানী রাস্তায় হাত তুলে নামাজের নিয়ত করছেন, আর একটিতে দেখি প্রেস ক্লাবের সামনের রাস্তায় পাকিস্তানের এক এয়ারফোর্স চিফ এয়ার মার্শাল (অবসরপ্রাপ্ত) আসগর খানের ওপর পুলিশের গাড়ি থেকে পানি ছিটানো হচ্ছে। একটি উদোম গায়ের সাত-আট বছরের এক শিশুকে আর একটি ছবিতে কচি হাত তুলে চিৎকার করে স্লোগান দিতে দেখি একটি মিছিলের আগে আগে। যতটুকু মনে পড়ছে ছবিটি তুলেছিলেন রশিদ তালুকদার। মনে রাখা জরুরি এবং ‘ফরজ’ যে, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানটি ছিল একজন সামরিক শাসক আইউব খানের বিরুদ্ধে, জাতীয় সংসদের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন নিয়ে বিজয়ী কোনো নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে নয়।
দুই.
দৈনিক ‘প্রথম আলো’ এবং ইংরেজি দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’কে দেশের প্রথম শ্রেণীর, প্রভাবশালী পত্রিকা হিসেবে বর্ণনা করতে গিয়ে আমি গত দুই-তিন বছরে কত জায়গায় যে সমালোচিত এবং নিন্দিত হয়েছি, তার বর্ণনা দিতে হলে আমাকে আলাদা একটি কলাম লিখতে হবে। কিন্তু তাই বলে আমি দমিনি। পত্রিকা দুটি বিভিন্ন সময়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে আমি তার তারিফ করি। কাদের সিদ্দিকীর (‘ব্রিজোত্তম’, এই উপাধিটি মুনতাসীর মামুনের) ওপর কয়েক বছর আগে প্রথম আলো যে বিশেষ সংখ্যাটি প্রকাশ করেছে তা এখনও আমি সংরক্ষণ করে চলেছি। বসুন্ধরা গ্র“পের পত্রিকা ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এ এই ‘ব্রিজোত্তম’ একজন মর্যাদাবান কলাম লেখক। কিন্তু এই ‘ব্রিজোত্তম’ টাঙ্গাইল-ময়মনসিংয়ের এতগুলো কন্ট্রাক্ট পেয়ে প্রায় সব টাকা তুলে নিলেন, কিন্তু ব্রিজগুলোর একটির কাজও কেন শেষ করলেন না- এ প্রশ্নটির জবাব এই কয়েক বছর দৈনিক প্রথম আলোর মতো আমিও খুঁজে চলেছি। ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ কি কোনো দিন তাকে এ প্রশ্নটি করেছে? গোলাম মাওলা রনি চার মাস আগে সাংবাদিক পিটিয়ে এই দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন অফিস থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেলেন, জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’-এর একজন বিশিষ্ট কলাম লেখক!! যেমন বিশিষ্ট লেখক নূরে আলম সিদ্দিকী! উদোম গায়ে নূরে আলম সিদ্দিকীকে প্রথম দেখি ছবিতে, ১৯৭২ এর প্রথম দিকে লন্ডনে সাংবাদিক সাইমন ড্রিং আয়োজিত বাংলাদেশের ওপর একটি ‘ফটোগ্রাফিক একজিবিশন’-এ। ছবিতে নূরে আলম সিদ্দিকীর কোমরে একটি রিভলবার, তখনও দাপটশালী চার খলিফার এক খলিফা। তারপর ডলার ব্যবসায়ে তার উত্থান পর্বে তাকে দেখি দ্বিতীয়বার সামনাসামনি, আমার সম্পর্কে চাচাতো ভাই মরহুম আমীর হোসেনের দিলকুশা সোনালী ব্যাংকের অফিসে। বিডিআরের ডাইরেক্টর জেনারেল শহীদ মেজর জেনারেল শাকিলের শ্বশুর মরহুম এই আমীর হোসেন তখন এই সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার। ডরিন টাওয়ার নিয়ে তার সব অপকীর্তি ডেইলি স্টার ছবিসহ প্রকাশ করেছে দুই বছর আগে। আওয়ামী লীগের টিকিটে ঝিনাইদহে এমপি নির্বাচনে দুইবার ব্যর্থ নূরে আলম সিদ্দিকী; এবার তার ছেলে একই নির্বাচনী এলাকা থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী!
দৈনিক প্রথম আলো এবং ডেইলি স্টার এই তিন জনপ্রতিনিধির ওপর বিভিন্ন সময়ে যেসব রিপোর্ট প্রকাশ করেছে সেগুলোকে আমি তারিফ করেছি। আমার ধারণা, প্রথম আলো তাদের অপকর্ম-অপকীর্তি উন্মোচন করেছে বিভিন্ন সময়ে; বসুন্ধরা গ্র“পের এই পত্রিকায় তাদের এত ইজ্জত-মর্যাদা-সম্মান। বিএনপির মিডিয়াপল্লী শিরোনামের রিপোর্টটিও আমি সংরক্ষণ করে চলেছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাকারী আমাদের কিছু পত্র-পত্রিকা এবং টিভি চ্যানেল বিএনপি-জামায়াত জমানায় কেমন সব সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে তার ওপরও কতগুলো ফাইল আমার কাছে আছে।
আমাদের কয়েকটি টিভি চ্যানেল এই-সেই উপলক্ষে যেসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেসব অনুষ্ঠানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণাকারী কুতুবমিনার সাইজের কিছু ‘সিভিল’কেও দেখি। গত ২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ টেলিভিশনের ৫০তম জন্মদিন উপলক্ষে একটি প্রাইভেট টিভি চ্যানেলকেও উৎসব করতে দেখলাম। সেখানে বড় বড় এই ‘সিভিল’দের সাক্ষাৎকারও ছিল। ভালো কথা। কিন্তু এইসব সিভিল, আমাদের সৈয়দ শামসুল হক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং অধ্যাপক আবু সায়ীদ কোনোদিন কি তাদের এইসব টিভিতে বিজ্ঞাপন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেছেন? তারপর এসব সিভিলের বোধ হয় জানা নেই; A corrupt media cannot fight corruption. দুর্নীতিগ্রস্ত গণমাধ্যম দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না। কথাটি আমার নয়। কথাটি বলেছেন তুরস্কের এক কলাম লেখক ইয়াভুজ বেদর (Yavuz Baydor)। গত ১৯ জুলাই দুনিয়ার পাঁচটি প্রভাবশালী দৈনিকের একটি, নিউইয়র্ক টাইমস-এ ‘In Turkey Media- Bosscs Are Undermining Democrac’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রবন্ধে।
বাংলাদেশেও তুরস্কের মতো এমনটি হচ্ছে না তো?
তিন.
আবদুল কাদের সিদ্দিকীর ওপর প্রথম আলোতে প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যাটির কথা প্রতিবারই মনে পড়ে যখন তার কোনো লেখা বা বক্তৃতা-বিবৃতি বা সাক্ষাৎকার পড়ি বা দেখি। গতকালই বোধ হয় বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ কাদের সিদ্দিকী বলেছেন, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়লেই দেশে শান্তি ফিরে আসবে। যোগ্য লোকের যোগ্য প্রেসক্রিপশন! মুক্তিযুদ্ধে কাদের সিদ্দিকীর বীরত্বের তারিফ করি। তারিফ করি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তার প্রতিরোধের চেষ্টা। তাকে সম্মান করি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিন থেকে তিনি কোনো দিন মাংস মুখে নেননি। কিন্তু তিনি এমন নিশ্চিত হলেন কি করে যে, জামায়াত নির্বাচনে না এলে বিএনপি নির্বাচনে আসবে? প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও বিএনপি কি তখন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পদত্যাগের দাবিতে আবার অবরোধ-হরতাল দেবে না? বিএনপির কি কখনও উছিলার অভাব হয়েছে?
প্রথম আলো ফজলে নূর তাপসের যে সম্পদ বিবরণী প্রকাশ করেছে- তা পড়ে আমি আঁতকে উঠেছিলাম। তার বাবা শেখ ফজলুল হক মণির নেতৃত্বে ৬০-এর দশকের প্রথমদিকে ছাত্রলীগ করতাম। ১৯৬১-তে সলিমউল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ প্রার্থীদের ‘ক্রেডেনসিয়েল’ কয়েকশ’ টাকার অভাবে ছাপাখানা থেকে যখন আনা যাচ্ছিল না, তখন এই মণি ভাই হাতের আঙুলের আংটিটি খুলে দিয়েছিলেন, স্মৃতিটা এখনও জ্বলজ্বল করে। একটি দৈনিক পত্রিকা- এমনি এমনিতে তো পত্রিকাটির পেইড সার্কুলেশন সাড়ে ৫ লাখ নয়। এতসব কৃতিত্ব পত্রিকাটির, কিন্তু এই পত্রিকাটি যে এখন বর্তমান মহাজোট সরকারবিরোধী তা আর প্রচ্ছন্ন নয়, বলতে গেলে এখন তা প্রকাশ্য। কিন্তু তাতেও আমার আপত্তি নেই। আমাদের এই দেশে তো দৈনিক সংগ্রাম, দৈনিক ইনকিলাব, দৈনিক নয়া দিগন্ত এবং দৈনিক দিনকালও আছে। দৈনিক প্রথম আলো তো এই পত্রিকাগুলোর মতো মৌলবাদের প্রচার করছে না, যদিও মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হই।
কিন্তু এই প্রথম আলো গত ১২ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার যে জনমত জরিপটি প্রকাশ করেছে, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। দৈনিক প্রথম আলো প্রতিদিন তার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রথম কলামে ‘অনলাইন ভোট’ শিরোনামে আগের দিন একটি বিষয়ের ওপর প্রশ্ন রাখে এবং এ প্রশ্নের পক্ষে-বিপক্ষে পরদিন প্রাপ্ত ভোট প্রকাশ করে থাকে। ১১ তারিখ বুধবারের প্রশ্নটি ছিল এমন- ‘১৮ দলীয় জোটের অবরোধ-কর্মসূচি শুক্রবার ৬টা পর্যন্ত বাড়ালো- সমর্থন করেন কি?
পরদিন বৃহস্পতিবার প্রথম আলোতে প্রকাশিত রেজাল্টটি ছিল এমন : অবরোধ বাড়ানোর পক্ষে হ্যাঁ, ৭০.৩২%; না, ২৭.০৫% এবং বক্তব্য নেই, ২.৬৩%!!
মানেটা কি দাঁড়াল? দেশের ৭০.৩২% মন্তব্যদানকারী বিএনপির নেতৃত্বে ১৮ দলের অবরোধ সমর্থন করে? তার মানেটা কি আরও এই যে, এই সমর্থনকারীরা অবরোধের পক্ষে? সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত ও দুষ্কৃতকারীদের এতসব নিরীহ মানুষ হত্যা, গাছ হত্যা, বাসে-গাড়িতে-সিএনজিতে আগুন দেয়ার পরও এত বিশাল সংখ্যার সমর্থক এই বাংলাদেশে?
যদি প্রথম আলোর এই জনমত সঠিক হয়ে থাকে তাহলে এতসব টিভি চ্যানেল, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ভয়ঙ্কর ভয়াবহ সব ছবি কি দেশের মানুষদের চিন্তাচেতনা-ভাবনায় কোনোই প্রভাব ফেলছে না! প্রথম আলোর বিভিন্ন পাতায় এতসব মর্মান্তিক ছবিসহ প্রকাশিত খবর সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয়র কোনোই কি আছর পড়ছে না? তাহলে দৈনিক প্রথম আলোই বা কেন এতসব সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় ছবি খবর ছাপাচ্ছে? মূল্যবান নিউজপ্রিন্টের এমন বিপুল অপচয় করছে? ১২ ডিসেম্বরের দৈনিক প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠাতেই একটি সড়কের ওপর বড় বড় ১০-১২টি কাঠের গুঁড়ি দিয়ে সড়ক অচল করে দেয়ার ছবি আছে। একই প্রথম পৃষ্ঠায় আরও একটি ছবি,- ছবিটির ক্যাপশন এমন : ‘জামায়াতে ইসলামীর নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় মঙ্গলবার রাতে কার্যকর করা হবে, এমন খবর প্রচার হওয়ার পরই দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাংচুর ও নাশকতার ঘটনা ঘটে। সেই রাতেই ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের শাহজাহানপুর উপজেলার ফত্কী সেতুর রেলিং ভাংচুর করেন শিবিরের কর্মীরা। গতকাল সকালে তোলা ছবি। প্রথম আলো।’ প্রথম আলোর ক্যাপশনের শেষ বাক্যটি আবার দেখুন! ‘ভাংচুর করেন শিবিরের কর্মীরা’। ভাংচুর করেন? এখানে দন্ত্য ‘ন’ দিতে হবে? দন্ত্য ‘ন’ যারা ভাংচুর করেছে তাদের জন্যও থাকবে? তারা ‘শিবিরের কর্মীরা’? তারা শিবিরের সন্ত্রাসী নয়? তারা শিবিরের দুর্বৃত্ত নয়?
শিবিরের সন্ত্রাসীদের সম্মান-মর্যাদা দিয়ে তাজীমের সঙ্গে উদ্ধৃত করতে হবে? লিখতে হবে? এই দিন ১২ ডিসেম্বরের প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় ‘২০ জেলায় জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব দ্বিতীয় শিরোনামের পরও?’ এই একই দিন পত্রিকাটির ভেতরের অন্যসব পাতায় অবরোধে সন্ত্রাসী, দুর্বৃত্ত, দুষ্কৃতকারীদের হামলা-ভাংচুর, মানুষ হত্যা, গাছ কাটার ওপর ১১টি মর্মান্তিক ছবি আছে। বাংলাদেশে বিএনপি, আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দল এবং দেশের কতগুলো টিভি চ্যানেল এবং পত্র-পত্রিকা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জামায়াত এবং ছাত্রশিবিরকে সমর্থন, মর্যাদা এবং গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এই জামায়াতের প্যারেন্ট রাজনৈতিক দল মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে মিসরের সরকার। মুসলিম ব্রাদারহুডকে একেবারেই সমর্থন করে না, পছন্দ করে না সৌদি সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার মুসলিম ব্রাদারহুডকে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছে মিসর সরকার। আর তাতে তাৎক্ষণিক সমর্থন জানিয়েছে সৌদি আরব। কিন্তু বাংলাদেশে মুসলিম ব্রাদারহুডের এক সন্তান জামায়াতে ইসলামকে বুকে কোলে তুলে নিয়েছে বিএনপি!!
চার.
বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা, টিভি সম্পর্কে আমি একটু খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করি। গত অক্টোবর-নভেম্বরে আমার নিউইয়র্ক সফর শেষে আমি যে বিশ-পঁচিশটি বই এনেছি, তার মধ্যে ১০-১২টি মিডিয়ার ওপর। একটি বই দুনিয়ার মিডিয়া মোঘল রুপার্ট মারডক এবং অন্য একটি আলজাজিরা টিভি চ্যানেলের ওপর। আমাদের এই গণতন্ত্রের দেশে আমাদের টিভি এবং পত্র-পত্রিকাগুলো সবার ওপরেই খবরদারি করে প্রত্যাশিতভাবেই। কিন্তু আমাদের মিডিয়ার ওপর কার্যকর খবরদারি করার কোনো ব্যবস্থা নেই এই দেশে। তথ্য জানার অধিকার আইনে সরকারের অনেক ধরনের তথ্য জানার অধিকার আমাদের মিডিয়ার তো আছেই, আছে আমাদের সাধারণ নাগরিকদেরও।
কিন্তু আমাদের এতসব পত্র-পত্রিকা, টিভি সম্পর্কে কিছুই জানার অধিকার রাখা হয়নি তথ্য অধিকার আইনে। বিশ্বাস হয়? কিন্তু আমাদের মিডিয়াকেও খোলামেলা স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিতামূলক হতে হবে নিজেদের স্বার্থে, বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হলে।
অন্যের জবাবদিহিতা চাইবেন প্রতিদিন, অথচ নিজেরা তার ঊর্ধ্বে থাকবেন, তা কি হয়? এ পর্যায়ে বিষয়ের ওপর সম্পাদক সাংবাদিক সাহেবদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
এক. মোহতারেমা খালেদা জিয়া গত ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় তার প্রেস কনফারেন্সে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় কার্যকর করার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করেছে তাতে মর্মাহত হয়েছেন বলেছেন, কিন্তু পাকিস্তানের এই প্রস্তাব গ্রহণকে তিনি নিন্দা জানাননি। তার এই ‘ওমিশন’টিকে আমি ইচ্ছাকৃত মনে করি। কূটনীতিবিদ হিসেবে আমাদের যা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, তাতে যা দৃশ্যমান তা যেমন আমরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করি, যা বলা হয়নি বা অদৃশ্য এবং যা যা সব ‘ওমিশন’, তার ব্যাখ্যাও আমরা করে থাকি। মোহতারেমার এই ওমিশনটি গুরুতর মনে করি।
দুই. ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতরা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের ভোরে সাভার স্মৃৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে না গিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং বিজয় দিবসকে অপমান করেছেন মোহতারেমা খালেদা জিয়া ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূতদের এই আচরণের ওপর কোনোই মন্তব্য করেননি তার প্রেস কনফারেন্সে। কেন তার এই ‘ওমিশন’?
তিন. প্রেস কনফারেন্সে মোহতারেমা খালেদা জিয়া কোনো সাংবাদিকের কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি। তার মানে তিনি কি আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের জবার দেয়া হবে না, সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্ন ‘এনটারটেইন’ করা হবে না?
তাহলে এই প্রেস কনফারেন্স এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, নয়াপল্টন এবং দেশের অন্যসব জায়গায় বা জাতীয় সংসদে তার দেয়া বক্তৃতার মধ্যে কী ফারাক থাকল? তাহলে প্রেস কনফারেন্স এবং প্রপাগান্ডা কনফারেন্সের কী পার্থক্য? আমরা অতীতেও দেখেছি, সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে তিনি চান না। তার জোট আরোপিত এতসব হরতাল-অবরোধে দেশের যে এত বিপুল বিশাল পরিমাণে ক্ষতি হচ্ছে, এতসব মানুষ আগুনে পুড়ে, বোমা, ককটেল হামলায় মারা যাচ্ছেন, তার কি কোনো জবাবদিহিতা থাকবে না? সম্পাদক সাংবাদিকরা যদি এই জবাবদিহিতা আদায় করতে না পারেন, গত কয়েক মাসে দেশের হাজার হাজার অসহায়, নিষ্পাপ শিশু, কিশোর-কিশোরী, মা-বাবা, ভাইবোন, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, বিধবার চোখের পানি বুকফাটা আর্তনাদও যদি প্রশ্ন করতে আপনাদের এতটুকু সাহস না জোগায়, তাহলে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের কী দায়িত্বটা আপনারা পালন করছেন?
সবশেষে একটি সতর্কবার্তা ও একটি প্রস্তাব। সতর্কতা,- বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আতাউর রহমান আবার ঢাকায় ফিরেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বায়ান্ন জনকে একই বছর ফার্স্ট ক্লাস দিয়ে তিনি ‘খ্যাতিমান’ হয়ে উঠেছিলেন। অনুমতি ছাড়া দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার কারণে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এক-এগারোর সরকারকে জায়েজ করার জন্য তিনি প্রবল ভূমিকা রেখেছিলেন। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আসলেই কী ঘটতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী জানতে বাংলাদেশ প্রতিদিন বা প্রথম আলো তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করতে পারে।