Showing posts with label কাশ্মীর. Show all posts
Showing posts with label কাশ্মীর. Show all posts

Sunday, July 19, 2026

কাশ্মিরের শহীদদের দোহাই দিয়ে বলছি by হামিদ মীর

জম্মু-কাশ্মিরের রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনটি দিবস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি ২৩ মার্চ, দ্বিতীয়টি ১৩ জুলাই এবং তৃতীয়টি ১৪ আগস্ট। এই তিন দিবসের গুরুত্ব অনুধাবনে আসুন আমরা ১৯২৪ সালের ২১ জুলাই শ্রীনগরের রেশম কারখানায় কর্মরত হাজার হাজার কাশ্মিরি শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পটভূমি জেনে নিই। ওই কারখানাগুলোর মালিক ও কর্মকর্তা সবাই ছিলেন হিন্দু, যারা মোটা অঙ্কের বেতন পেতেন। অন্য দিকে মুসলিম শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র সাড়ে চার আনা মজুরি পেতেন। এ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাশ্মিরি মুসলিম শ্রমিকরা তাদের সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে মিছিল বের করেন। তারা মজুরি বাড়ানোর দাবি করেন। এ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের গ্রেফতার করা হয়। এ বিক্ষোভ কাশ্মিরি মুসলমানদের মধ্যে সেই রাজনৈতিক জাগরণের পরিচয় দেয়, যা ১৯২৩ সালে জম্মুতে ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। এরপরে ১৯২৯ সালে পুঞ্ছ অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় করের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়।

২৩ মার্চ, ১৯৩১ সালে লাহোরে ব্রিটিশ সরকার স্বাধীনতাকামী ভগত সিংকে ফাঁসি দিলে ওই দিন ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন ছাড়াও মীর ওয়ায়েজ মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ এই ফাঁসির তীব্র নিন্দা জানান। পরের দিন প্রতিবাদী বিক্ষোভও করেন। এই ফাঁসির কয়েক দিন পর ২৯ এপ্রিল, ১৯৩১ সাল ছিল ঈদুল আজহার দিন। জম্মুর মুসলমানরা শালিমার বাগে ঈদের নামাজ আদায় করছিলেন। মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক তার খুতবায় ফেরাউন ও নমরুদের অত্যাচার ও নিপীড়নের কথা উল্লেখ করলে সেখানে উপস্থিত ডোগরা পুলিশের অন্যতম ইন্সপেক্টর লালা খেম চাঁদ এই খুতবা বন্ধ করে দেন। ওই দিন ইয়ংমেনস মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন জম্মুর জামে মসজিদে একটি সভা করে। লালা খেম চাঁদকে বরখাস্ত করার দাবি জানায়।

৪ জুন, ১৯৩১ সালে জম্মুর সেন্ট্রাল জেলে লম্বুরাম নামে এক হিন্দু ইন্সপেক্টর কুরআন অবমাননা করেন। ৬ জুন এ ঘটনার বিরুদ্ধে পুরো জম্মুতে হরতাল পালন করা হয়। প্রতিবাদের এ ধারা মোজাফফরাবাদ ও রাওলাকোট থেকে মিরপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ৫ জুন, ১৯৩১ সালে শ্রীনগরের খানকায়ে মুয়াল্লায় কুরআন অবমাননার বিরুদ্ধে একটি বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ওই সমাবেশে আবদুল কাদির নামে এক পাখতুন যুবক ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে এক অগ্নিঝরা বক্তব্য প্রদান করেন; যার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। আবদুল কাদিরের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি সাধারণ আদালতে করার পরিবর্তে শ্রীনগরের সেন্ট্রাল জেলে করা হয়। হাজার হাজার কাশ্মিরি মুসলমান শ্রীনগর সেন্ট্রাল জেলের বাইরে জড়ো হয়ে আবদুল কাদিরের পক্ষে সেøাগান দিতে থাকেন। দিনটি ছিল ১৯৩১ সালের ১৩ জুলাই। নামাজের সময় হয়ে গেল। মুসলমানরা জেলের দেওয়ালে চড়ে আজান দেয়া শুরু করলে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। গুলিবর্ষণে ২২ কাশ্মিরি মুসলমান শহীদ হন। পরবর্তীতে দিনটিকে কাশ্মিরি শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এই ঘটনার পর শ্রীনগরে মার্শাল ল জারি করা হয়। চৌধুরী গোলাম আব্বাস ও শেখ আবদুল্লাহসহ সব শীর্ষস্থানীয় কাশ্মিরি নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ৩ আগস্ট গ্রেফতারকৃত সব নেতাকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু আবদুল কাদিরকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

এসব ঘটনার প্রতিবাদে ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্ট লাহোরের মোচি গেটের বাইরের বাগানে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আল্লামা ইকবাল কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঘোষণা দেন। এ দিনে অপর কিছু শহরেও কাশ্মির দিবস পালন করা হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ সালে মীর ওয়ায়েজ মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ শাহ ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দেন। এসব কিছু মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ঘটেছিল। ২৩ মার্চ সমগ্র জম্মু-কাশ্মির রাজ্য ভগত সিংয়ের ফাঁসির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। এরপর কুরআন অবমাননার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ১৩ জুলাই ২২ কাশ্মিরি মুসলমান শহীদ হন। সেই সাথে ১৪ সেপ্টেম্বর শ্রীনগর থেকে ডোগরা সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া আসে। এই তারিখগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, তখন পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে একটি পৃথক স্বদেশের আনুষ্ঠানিক দাবি উত্থাপিত হয়নি। কিন্তু জম্মু-কাশ্মিরের স্বাধীনতা আন্দোলন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল। চৌধুরী গোলাম আব্বাস ও সরদার ফতেহ কারেলবিসহ বেশ কয়েকজন কাশ্মিরি নেতা লাহোর এসে আল্লামা ইকবালের সাথে পরামর্শ করেন। একই সাথে ১৯৩২ সালে অল জম্মু-কাশ্মির মুসলিম কনফারেন্স নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৩৪ সালে জম্মু-কাশ্মির রাজ্যে প্রথমবারের মাতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম কনফারেন্স সব ক’টি মুসলিম আসনে জয়লাভ করে। ১৯৩৯ সালে শেখ আবদুল্লাহ মুসলিম কনফারেন্স ভেঙে ন্যাশনাল কনফারেন্স গঠন করেন। ১৯৪৫ সালে শেখ আবদুল্লাহ পণ্ডিত জওয়াহের লাল নেহরুকে ন্যাশনাল কনফারেন্সের বার্ষিক অধিবেশনে বিশেষ অতিথি করেন। এভাবে ন্যাশনাল কনফারেন্স কংগ্রেসের সুরে সুর মেলানোর পথ অবলম্বন করে। অন্য দিকে ২৩ মার্চ, ১৯৪০ সালে লাহোরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের অধিবেশনে মুসলিম কনফারেন্সের একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। ওই দলে জম্মু, শ্রীনগর, মোজাফফরাবাদ, পুঞ্ছ ও মিরপুরের পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ছিল। এভাবে মুসলিম কনফারেন্স প্রকাশ্যে মুসলিম লীগের পাশে এসে দাঁড়ায়।

১৯৪৪ সালে কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শ্রীনগর সফর করেন। তিনি শেখ আবদুল্লাহকে পুনরায় মুসলিম কনফারেন্সে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানান। শেখ আবদুল্লাহ তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৭ জুন, ১৯৪৪ সালে শ্রীনগরে মুসলিম কনফারেন্সের বার্ষিক অধিবেশনের বিশেষ অতিথি ছিলেন কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এসব ঘটনার পটভূমিতে ১৯ জুলাই, ১৯৪৭ মুসলিম কনফারেন্স শ্রীনগরে তাদের অধিবেশনে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব পাস করে।

প্রফেসর এম নাজির আহমদ তেশনার ‘তারিখে কাশ্মির (কাশ্মিরের ইতিহাস ৩২৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২০২১)’ গ্রন্থের তথ্যানুযায়ী, সরদার ইবরাহিম খানের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন চৌধুরী হামিদুল্লাহ খান। অন্য দিকে জম্মু থেকে চৌধুরী গোলাম আব্বাস, ডাক্তার গোলাম আহমদ জাররাহ, মিরপুরের কর্নেল আলি আহমদ শাহ ও চৌধুরী মুহাম্মদ রফিক, পুঞ্ছের হাজি মুহাম্মদ, মোজাফফরাবাদের মুহাম্মদ আলি কানওয়াল, শ্রীনগরের খাজা আহমদুল্লাহ রেজা, রাজৌরির মির্জা ফকির মুহাম্মদ, চৌধুরী নুর হোসাইন, প্রফেসর ইসহাক কুরাইশি, সোপুরের খাজা গোলাম মহিউদ্দিনসহ রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলের মুসলমান প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদনকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

পাকিস্তান ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু কাশ্মিরি মুসলমানরা ১৪ আগস্টের অনেক আগেই পাকিস্তানি হয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, ১৯ জুলাইয়ের প্রস্তাব অনুমোদনকারী নেতারা নিজেরাই স্বাধীন কাশ্মিরের সমর্থক হয়ে যান। তবে তারা পাকিস্তানের বিরোধী ছিলেন না। ঐতিহাসিক বাস্তবতা এটাই যে, কাশ্মিরিদের স্বাধীনতা ১৯৩১ সালের ১৪ আগস্ট শুরু হয়েছিল। আজো জম্মু-কাশ্মির রাজ্যের সব অঞ্চলে ১৩ জুলাই কাশ্মিরি শহীদ দিবস পালন করা হয়। এরা সেই সব শহীদ, যারা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর আগে শ্রীনগরে শহীদ হয়েছিলেন। আফসোস, আজ পাকিস্তান সরকারের কিছু মুসলিম লীগ মন্ত্রী দাবি করেন যে, তারা আজাদ কাশ্মিরের অধিবাসীদের পুরোপুরি কাশ্মিরি মনে করেন না। কারণ তাদের সংগ্রাম অধিকৃত কাশ্মিরের মানুষের চেয়ে কম। তাদের ভাষাও ভিন্ন।

১৯ জুলাই, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদনকারীদের দীর্ঘ তালিকায় শ্রীনগর থেকে জম্মু এবং মিরপুর থেকে মোজাফফরাবাদ পর্যন্ত রাজ্যের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের দিকে লক্ষ্য করুন, এতে প্রতিটি ভাষাভাষী মানুষ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ১৩ জুলাই কাশ্মিরি শহীদ দিবস শুধু শ্রীনগরেই নয়, রাওলাকোট ও বাগ থেকে শুরু করে নিলম উপত্যকা ও জম্মুতেও পালন করা হয়।

কাশ্মিরিদের ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ পাকিস্তানের অযোগ্য শাসকগোষ্ঠী যেন ভুলে না যায় যে, ১৯৮৭ সালে অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে কারচুপিই ভারত সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম দিয়েছিল। শ্রীনগর থেকে সৈয়দ ইউসুফ শাহ নামে একজন প্রার্থীর সাথে কারচুপি করা হলে, তিনি সশস্ত্র প্রতিরোধকারীদের জন্য সৈয়দ সালাহুদ্দিনরূপে আবির্ভূত হন। ভারত সরকার অধিকৃত জম্মু-কাশ্মিরে যে ভুল করেছিল, সেই একই ভুল যেন আজাদ কাশ্মিরে করা না হয়। শক্তির ব্যবহার কাশ্মিরে আরো বেশি বিদ্রোহের জন্ম দেবে। বিশ্বাস না হলে সৈয়দ সালাহুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করুন। নির্বাচনে কারচুপি আরো বেশি প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। লাখ লাখ কাশ্মিরি শহীদের দোহাই দিয়ে বলছি, আজাদ কাশ্মিরে জোরজুলুম ও কারচুপির পথ বেছে নেবেন না।

লেখক: হামিদ মীর, পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট পাকিস্তানের উর্দু দৈনিক জং থেকে ভাষান্তর: ইমতিয়াজ বিন মাহতাব

কাশ্মীরে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে
কাশ্মীরে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহী তৎপরতা চলছে। ছবি: বিবিসি

Monday, July 13, 2026

পূর্ণাঙ্গ রাজ্যের দাবি কি ট্রাম্পের কাছে জানাব: মোদি সরকারকে ওমর আবদুল্লাহর প্রশ্ন

নির্বাচনের পর দুই বছর কেটে গেছে অথচ কেন্দ্রীয় সরকার এখনো প্রতিশ্রুতিমতো জম্মু–কাশ্মীরকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেয়নি। দাবি আদায়ে জম্মু–কাশ্মীরের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্স তাই এবার দিল্লি অভিযানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০ জুলাই সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন যেদিন বসার কথা, ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ও জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ সেদিন সদলে দিল্লিতে আন্দোলন শুরু করবেন। গতকাল রোববার জম্মুতে এক জনসভায় তিনি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

জম্মু শহরে মহারাজা হরি সিং পার্কের ওই জনসভায় ওমর আবদুল্লাহ তাঁদের আন্দোলনকে দিল্লি নিয়ে আসার সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি কটাক্ষ করে বলেন, ‘নির্বাচনের পর দুই বছর কেটে গেল। এখনো সরকার তার প্রতিশ্রুতি পালন করল না। অথচ সেই কবে থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি নেতারা বলে চলেছেন, ঠিক সময়ে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এই প্রতিশ্রুতি তাঁরা সংসদেও দিয়েছিলেন।’

এরপরই ওমর আবদুল্লাহর প্রশ্ন, ‘দাবি আদায়ে আমাদের কি তাহলে এবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে যেতে হবে? বিজেপি বলে দিক, দিল্লি না গিয়ে আমরা কি তবে এবার হোয়াইট হাউসের সামনে ধরনায় বসব?’

জম্মু–কাশ্মীর রাজ্য দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ খারিজও সেই দিনে। সেই থেকে জম্মু–কাশ্মীর ও লাদাখ দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। যদিও বিজেপিশাসিত কেন্দ্রীয় সরকার বলেছিল, জম্মু–কাশ্মীরকে ঠিক সময়ে রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

পাঁচ বছর পর ২০২৪ সালে জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার নির্বাচন হয়। নির্বাচনী প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বারবার রাজ্যের হৃত মর্যাদা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেই প্রতিশ্রুতি এমনকি ভারতীয় সংসদেও দেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টকেও সরকারের পক্ষে বলা হয়েছে, ঠিক সময়ে রাজ্যের মর্যাদা ফেরানো হবে। সেই থেকে সাত বছর অতিক্রান্ত। অথচ এখনো সেই প্রতিশ্রুতি পালন করেনি মোদি সরকার।

জনসভায় বিশাল এক ব্যানার লাগানো হয়েছিল। তাতে লেখা, ‘দিল্লি চলো। আমরা আমাদের রাজ্য ফেরত পেতে চাই’। আরও ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমাদের রাজ্য আমাদের গর্ব, আমাদের রাজ্য আমাদের হক’।

মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমাদের অপেক্ষা, আমাদের নীরবতাকে ওরা দুর্বলতা ভাবছে। ওরা আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে। আমরা দুর্বল নই। আমরা ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি।’

জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেন্দ্রকে আমরা অনেক সময় দিয়েছি। দুই বছর ধরে নানাভাবে কথা বলেছি। বিভিন্ন উপায়ের খোঁজ করেছি। আর নয়। এবার অন্য কৌশল নিতে হবে। দিল্লি গিয়ে ধরনা দিতে হবে। ২০ জুলাই থেকে সেই নতুন অধ্যায় শুরু হবে।’

ওমর আবদুল্লাহ আরও বলেন, এই দাবি শুধু ন্যাশনাল কনফারেন্সের নয়; এই দাবি সবার। এমনকি বিজেপিরও। তারাও এই দাবি পূরণ হবে বলে ভোট চেয়েছিল। একজন বিজেপি নেতাকেও পাওয়া যাবে না, যিনি রাজ্যের বিরোধিতা করেছিলেন।

ওমর বলেন, ‘যতবার রাজ্যের কথা জানিয়েছি, প্রতিবার শুনেছি, ঠিক সময়ে তা দেওয়া হবে।’ তাঁর প্রশ্ন, সেই ঠিক সময়টা কবে আসবে? তাহলে কি তারা বিজেপির ক্ষমতায় আসার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে? তা–ই যদি হয়, তাহলে সেটা তারা স্পষ্ট করে জানাক।’

জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার বিরোধী নেতা বিজেপির সুনীল শর্মা গতকাল এ প্রসঙ্গে বলেন, সরকার পরিচালনায় ব্যর্থতা ঢাকতেই মুখ্যমন্ত্রী নতুন এই পথে হাঁটতে চলেছেন।

ওমর আবদুল্লাহ সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি তাঁর সরকার ফেলে দেওয়ার চক্রান্ত করছে। বলেছেন, তাঁর দলের শীর্ষ নেতাদের ভাঙিয়ে নিতে একেকজনকে ২০ থেকে ৩০ কোটি টাকার টোপ দিয়েছে।

গত শনিবারও মুখ্যমন্ত্রী বলেন, তাঁর দলের এক বিধায়ককে ৩০ কোটি টাকা দেবে জানিয়ে বিজেপি বলেছে, দল ত্যাগ করলে মন্ত্রী করবে এবং বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যের মর্যাদাও ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

ওমর বলেন, এমন একজন ওই প্রস্তাব দিয়েছেন, যিনি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী। কিন্তু একজন বিধায়ককেও ওরা পাবে না। ২০ থেকে ৩০ কোটি কেন, ১০০ কোটি দিলেও কেউ দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেবেন না।

গত নির্বাচনে জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভায় ৯০ আসনের মধ্যে ন্যাশনাল কনফারেন্স ৪২ ও কংগ্রেস ৬ আসনে জয়ী হয়। এই জোটের সঙ্গে ছিল সিপিএমও। তারা ১টি আসন জেতে। ৪৯ আসন জিতে সরকার গড়েন ওমর আবদুল্লাহ। বিজেপি জেতে ২৯ আসন। মেহবুবা মুফতির পিডিপি মাত্র ৩টি আসনে জয়ী হয়েছিল।

ওমর আবদুল্লাহর আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি এবার নজর দিয়েছে জম্মু–কাশ্মীরের ওপর। তাঁদের দল ভাঙিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসতে চাইছে। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, রাজ্যের দাবিতে ওমরের দিল্লি অভিযানের সিদ্ধান্ত বিজেপির সেই উদ্যোগ রোখা ও দলকে জোটবদ্ধ রাখা।

শ্রীনগরের হজরত বাল মসজিদে এক অনুষ্ঠানে মোনাজত করছেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। ১১ জুলাই ২০২৬, শ্রীনগর
শ্রীনগরের হজরত বাল মসজিদে এক অনুষ্ঠানে মোনাজত করছেন জম্মু–কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। ১১ জুলাই ২০২৬, শ্রীনগর। ছবি: এএনআই

Sunday, July 12, 2026

জনপ্রতি ৩০ কোটি রুপির প্রলোভন দিয়েছিল বিজেপি, আদর্শ বিক্রি করেননি ওমর আবদুল্লাহ

ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, তার দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের (এনসি) বিধায়কদের দলত্যাগে রাজি করাতে বিজেপি ২০-৩০ কোটি রুপি, মন্ত্রিত্ব এবং রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল।

গতকাল শনিবার কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের কাছে হজরতবালে আয়োজিত ন্যাশনাল কনফারেন্সের এক সমাবেশে ওমর আবদুল্লাহ এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, তার দলকে ভাঙতে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিজেপির ঘনিষ্ঠ সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী এনসির এক বিধায়কের কাছে দলত্যাগের বিনিময়ে ২০-৩০ কোটি রুপি, মন্ত্রিত্ব এবং জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যের পুনর্বহালের আশ্বাস দেন।

ওমর বলেন, ‘আল্লাহ সাক্ষী, আমার জম্মুর একজন বিধায়ক এসে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন।’ তার ভাষায়, যখন অর্থের লোভ দেখিয়ে কাজ হলো না, মন্ত্রিত্বের প্রলোভনও ব্যর্থ হলো, তখন বিধায়কদের বলা হচ্ছেÑ‘আমাদের সঙ্গে আসুন, আমরা আপনাদের রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেব।’

ওমর আবদুল্লাহ জোর দিয়ে বলেন, ন্যাশনাল কনফারেন্সের কোনো বিধায়কই টাকার বিনিময়ে নিজের আদর্শ বিক্রি করবেন না। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্র সরকার ও বিজেপিকে সতর্ক করে বলেন, ‘আমাদের ধৈর্য ও ভদ্রতার পরীক্ষা নেবেন না।’

তিনি জানান, জম্মু ও কাশ্মীরের পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি তিনি একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে বলা হয়েছে, ‘উপযুক্ত সময়ে’ এ মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘খোদার দোহাই, আমাদের বলুন সেই উপযুক্ত সময়টি কবে আসবে?’

ওমর আবদুল্লাহর এ মন্তব্য এমন এক সময়ে এলো, যখন জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবিধানিক মর্যাদা পুনর্বহালের দাবিতে কেন্দ্রের ওপর রাজনৈতিক চাপ আবার বাড়ছে। ২০১৯ সালের আগস্টে ভারতীয় সংসদ সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করার পর জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে ভেঙে জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ নামে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেও কেন্দ্র সরকারের দেওয়া এই আশ্বাস নথিভুক্ত করে যে, ‘উপযুক্ত সময়ে’ জম্মু ও কাশ্মীরকে পুনরায় রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ন্যাশনাল কনফারেন্স স্টেটহুড পুনর্বহালের দাবিতে তাদের আন্দোলন জোরদার করেছে। এ দাবির সমর্থনে দলটি আগামী ২০ জুলাই দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে। তাদের দাবি, জম্মু ও কাশ্মীরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং প্রকৃত ফেডারেল জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা পুনর্বহাল অপরিহার্য।

জনপ্রতি ৩০ কোটি রুপির প্রলোভন দিয়েছিল বিজেপি, আদর্শ বিক্রি করেননি ওমর আবদুল্লাহ
মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ

Monday, June 22, 2026

কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ পদত্যাগ করতে চান

ভারতনিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ পদত্যাগ করতে চাইছেন। বছরের পর বছর বন্দী থাকার জন্য সংসদ সদস্যের দায়িত্বপালনে অপারগ রশিদ দলের কাছে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

রশিদ বলেছেন, বন্দী থাকার কারণে তিনি সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এলাকার জনতার আশা–আকাঙ্ক্ষা মেটাতে পারছেন না। তাঁদের অভাব–অভিযোগের কথা সংসদে বলতে পারছেন না। প্রতিকার করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। কাজেই তিনি সংসদ সদস্য পদ ত্যাগ করতে চান।

রশিদের অনুরোধ দল বিবেচনা করে দেখবে জানিয়েছে। সে জন্য দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। দুই দিন ধরে সেই বৈঠক চলবে। তার পর দল সিদ্ধান্ত নেবে।

রশিদের দল আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি) এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে। রশিদ এআইপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

৫৮ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ার রশিদের আসল নাম শেখ আবদুল রশিদ। কিন্তু কাশ্মীর উপত্যকায় তিনি ইঞ্জিনিয়ার রশিদ নামেই পরিচিত। বিএসসি পাস করার পর তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা পান এবং জম্মু–কাশ্মীর প্রোজেক্টস কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশনে এক দশক ধরে কাজ করেন। সেই কারণেই তিনি পরিচিত হন ইঞ্জিনিয়ার রশিদ নামে। কিশোর বয়সে তিনি যোগ দিয়েছিলেন আবদুল গণি লোনের দল পিপলস কনফারেন্সে। বিচ্ছিন্নতাবাদী হওয়ার অভিযোগে তাঁকে প্রথম গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০০৫ সালে। সাড়ে তিন মাস জেল খাটার পর মুক্তি পান।

রশিদ ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার সদস্য ছিলেন।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইউএপিএ আইনে তিনি বন্দী। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্থ সাহায্য করেছিলেন। সেই থেকে সাত বছর তিনি বন্দী।

বন্দী থাকা অবস্থাতেই রশিদ এআইপি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বারামুল্লা কেন্দ্র থেকে তিনি দলের প্রার্থী হন। লক্ষাধিক ভোটে হারিয়ে দেন ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লাহকে।

ওই নির্বাচনে বিজেপি চেয়েছিল জম্মু–কাশ্মীরের ক্ষমতা দখল করতে। সে জন্য প্রথমে জম্মু–কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নিয়ে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হয়। বিধানসভা ও লোকসভা কেন্দ্রগুলোর সীমানা পুনর্নির্ধারণ বা ডিলিমিটেশন করা হয়, যাতে মুসলমানপ্রধান কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে হিন্দুপ্রধান জম্মুর আসনের তারতম্য কমে যায়। ওই ভোটে জিততে বিজেপি উপত্যকার ন্যাশনাল কনফারেন্স ও পিডিপির দলত্যাগী নেতাদের নিয়ে ‘জম্মু–কাশ্মীর আপনি পার্টি’ নামে নতুন এক রাজনৈতিক দল গড়তেও সাহায্য করে। ভোটে তাঁদের মদদও দেয়। ইঞ্জিনিয়ার রশিদের দলকেও কেন্দ্রীয় সরকার নানাভাবে মদদ দিয়েছিল। ভোটে প্রচারের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার রশিদের জামিনের বিরোধিতা করেনি। যদিও বিজেপির লক্ষ্য পূরণ হয়নি। উপত্যকা দখলে রেখে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের সহায়তায় ন্যাশনাল কনফারেন্স সরকার গড়ে। মুখ্যমন্ত্রী হন ওমর আবদুল্লাহ। ইঞ্জিনিয়ার রশিদকেও আবার ফেরত পাঠানো হয় দিল্লির তিহার জেলে।

রশিদের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দিতে বারামুল্লা সংসদীয় ক্ষেত্রের অন্তর্গত ১৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের দলীয় নেতাদের সঙ্গে এআইপি বৈঠক করেছে। এবার দলের শীর্ষস্থানীয় কমিটি দুই দিন ধরে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করবে।

রশিদ ইস্তফা দিলে বারামুল্লা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে। তাতে এআইপির জয়ের সম্ভাবনা কতটা, সেটাই হবে মুখ্য বিচার্য।

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ
ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের জেলবন্দী সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

Wednesday, March 4, 2026

কাশ্মীর নিয়ে ইরান কীভাবে ভারতকে বাঁচিয়েছিল by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথভাবে ইরান আক্রমণ ও সে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা নিয়ে নয়াদিল্লির ‘অস্বস্তিকর’ নীরবতায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় আজ মঙ্গলবার প্রকাশিত এক নিবন্ধে সোনিয়া লিখেছেন, আন্তর্জাতিক আলোচনা চলাকালীন এক ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা সমসাময়িক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে এক গভীর ও গুরুতর ফাটল।

খামেনিকে হত্যা এবং ইরানের সার্বভৌমত্বের প্রতি নির্বিচার আক্রমণ নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো শোকপ্রকাশ করেননি। সামরিক হানার নিন্দাও করেননি। এই নীরবতার সমালোচনা করতে গিয়ে সোনিয়া ওই নিবন্ধে মনে করিয়ে দিয়েছেন, পাকিস্তান যখন ১৯৯৪ সালে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাকে (ওআইসি) জোটবদ্ধ করে কাশ্মীর প্রশ্নে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনে ভারতের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার উদ্যোগ নিয়েছিল, এই ইরানই তখন ভারতের পাশে দাঁড়িয়ে তা বানচাল করে দিয়েছিল। কাশ্মীর সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ ঠেকাতে ইরান সেদিন ত্রাতার ভূমিকা নিয়েছিল। তাদের সেই ভূমিকা ছিল অতীব তাৎপর্যপূর্ণ।

সেই ইরানের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার নিন্দা তো দূরের কথা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখনো শোক জ্ঞাপন পর্যন্ত করেননি। এই নীরবতা সোনিয়া গান্ধীকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। তিনি মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা ভারত যদি কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বিনা প্রতিবাদে মেনে নেয়, বিধিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে কথা বলেও ঠিক মুহূর্তে যদি বৃহৎ শক্তির জবরদস্তির বিরুদ্ধে সরব না হয়, তা হলে অন্যদের কাছেও ভারত তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আস্থা হারাবে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর।

সোনিয়া খুবই সংক্ষেপে ১৯৯৪ সালের ভারতীয় কূটনীতির জয়ের প্রসঙ্গ টানলেও সে সময় যা ঘটেছিল, তা রীতিমতো থ্রিলার। ভারতীয় কূটনৈতিক সাফল্যের সে ছিল এক অভিনব দৃষ্টান্ত।

তার ঠিক আগের বছর দ্বিতীয়বারের জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন বেনজির ভুট্টো। ১৯৯৪ সালে তিনি উদ্যোগী হন ওআইসিকে জোটবদ্ধ করে কাশ্মীরে মানবাধিকার হরণ ও লঙ্ঘন নিয়ে এক প্রস্তাব গ্রহণ করে তা জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনে পেশ করার। প্রস্তাবটি পাস হলে বহু দশক পর কাশ্মীর সমস্যা আরও একবার আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠত। আলোচিত হতো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী তখন নরসিমা রাও। দুই বছর আগে বাবরি মসজিদ ধ্বংস ঠেকাতে না পেরে তিনি তখন সমালোচনার কেন্দ্রে। বেহাল অর্থনীতি সামাল দিতে সোনা বন্ধক রাখা ভারত তখনো টালমাটাল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর চিরবন্ধু রাশিয়াও তখন থিতু নয়। এ অবস্থায় নরসিমা রাও বাজি ধরেছিলেন ইরানের ওপর। তিনি বুঝেছিলেন, ইরান রাজি না হলে সর্বসম্মতির অভাবে ওআইসি প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনেও প্রস্তাবটি পেশ হবে না। কাশ্মীরের আন্তর্জাতিকীকরণের পাকিস্তানি স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে।

নয়াদিল্লির ইরান দূতাবাস পর্যন্ত নরসিমা রাওয়ের এই প্রচেষ্টা আন্দাজ করতে পারেনি। এর মাত্র কয়েক দিন আগেই ইরানের রাষ্ট্রদূত কাশ্মীরের হুরিয়ৎ নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ওআইসিতে প্রস্তাব পাস করাতে ইরান যথাসাধ্য করবে। নরসিমা রাও কীভাবে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, কাদের সাহায্য তিনি নিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে বরেণ্য নেতারা কীভাবে জোটবদ্ধ হয়েছিলেন এবং অসুস্থ শরীর নিয়ে সবার অলক্ষে কীভাবে কয়েক ঘন্টার জন্য তেহরান ঘুরে দিল্লি ফিরে এসেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং, সেই রোমহর্ষ কাহিনি টুকরা টুকরাভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে অভিষেক চৌধুরীর লেখা অটল বিহারি বাজপেয়ীর জীবনী ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য়। ইরানবিশেষজ্ঞ সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত এম কে ভদ্রকুমারও সেই থ্রিলার স্মৃতিচারণা করেছেন।

নরসিমা রাও যখন ঠিক করলেন, ওআইসিকে ঠেকাতে একমাত্র ইরানই হতে পারে তুরুপের তাস, সেই সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীনেশ সিং অসুস্থ অবস্থায় দিল্লির অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এইমস) ভর্তি। ১৯৯৪ সালের মার্চ মাস। দিল্লিতে শীতের কামড়ের তীব্রতা কমলেও তেহরান তখনো বরফের চাদরের তলায়। সেই তীব্র ঠান্ডায় কাকপক্ষীকে জানতে না দিয়ে এইমস থেকে স্ট্রেচারে শুইয়ে বের করা হয় দীনেশ সিংকে। সেনা বাহিনীর বিশেষ বিমানে তিনি তেহরান পৌছান। হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাঁকে নামিয়ে আনা হয় বিমান থেকে। সফরসঙ্গী একজন চিকিৎসক ও তিনজন সহযোগী। ‘মিশন সাকসেসফুল’ হওয়ার অনেক পরে জানা গিয়েছিল, কৌতূহলী ব্যক্তিদের নজর এড়াতে দিল্লির এইমস হাসপাতালে দীনেশ সিংয়ের বিছানায় সেদিন অন্য একজনকে শুইয়ে রাখা হয়েছিল।

দীনেশ সিংকে স্বাগত জানাতে তেহরান বিমানবন্দরে প্রটোকল ভেঙে হাজির হয়েছিলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলী আকবর বেলায়েতি। হুইলচেয়ারবন্দী দীনেশ সিংকে দেখে বিস্মিত তিনি সফরের কারণ জানতে চাইলে স্মিত হেসে দীনেশ তাঁর হাতে প্রেসিডেন্ট আলী আকবর হাসেমি রাফসানজানিকে লেখা প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওয়ের ব্যক্তিগত অনুরোধপত্রটি তুলে দিয়েছিলেন।

এর পরের কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলায়েতি ও ‘মজলিস’–এর (পার্লামেন্ট) স্পিকার নাতেক নৌরির কাছে কাশ্মীর পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছিলেন দীনেশ সিং। সন্ধ্যায় দিল্লি ফেরার আগে প্রেসিডেন্ট রাফসানজানি তাঁর ইতিবাচক মনোভাবের কথা দীনেশ সিংকে জানিয়ে দিয়েছিলেন। দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে দীনেশ সোজা ফিরে গিয়েছিলেন এইমসে, প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাওকে আশ্বস্ত করে। ভদ্রকুমারের কথায়, দীনেশকে রাফসানজানি বলেছিলেন, ভারতের যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, ইরান তা নিশ্চিত করবে।

পরের ৭২ ঘণ্টা ছিল টেনশনে ভরা। অবশেষে জানা যায়, ওআইসির প্রস্তাব ঠেকিয়ে দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের প্রস্তাব পেশের সময় ইরান বাধা দেয়। ইরানি প্রতিনিধি জানান, তাঁরা ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেরই বন্ধু। তাঁরা চান বিবাদের মীমাংসা নিজেদের আলোচনার মধ্য দিয়েই হওয়া উচিত। ঔপনিবেশিক শক্তিদের মধ্যস্থতার সুযোগ দেওয়া ঠিক নয়।

সেই তেহরানযাত্রা ছিল দীনেশ সিংয়ের শেষ বিদেশ সফর। পরের বছরের নভেম্বরে ৭০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। নরসিমা রাও অন্য খেলাও খেলেছিলেন। বাবরি মসজিদ ধ্বংস নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতবিরোধীরা তখন সক্রিয়। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে রাজনৈতিক বিবাদ ও বিভেদ ভুলে ভারত যে এককাট্টা, তা বোঝাতে জাতিসংঘের প্রতিনিধিদলের নেতা হিসেবে রাও বেছে নিয়েছিলেন বিরোধী দল বিজেপির শীর্ষ নেতা অটলবিহারি বাজপেয়ীকে। তাঁর সঙ্গে প্রতিনিধিদলে ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালমন খুরশিদ, জম্মু–কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ এবং অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং। জাতিসংঘকে রাও এই বার্তাই দিতে চেয়েছিলেন, ভারতীয় গণতন্ত্র বিরুদ্ধস্বর রোধ করে না। প্রত্যেককে সম্মান দেওয়া হয়। এমনকি কাশ্মীরিদের আওয়াজকেও।

জাতিসংঘের আসরে ফারুক আবদুল্লাহর ভাষণ ছিল জ্বালাময়ী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর প্রতি ইঙ্গিত করে আবেগ মিশিয়ে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে (বেনজির) কাশ্মীরে আসতে হবে আমার মৃতদেহ ডিঙিয়ে। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে আমি কাশ্মীর রক্ষা করে যাব।

পাকিস্তানের মদদপ্রাপ্ত সশস্ত্র জঙ্গিদের উদ্দেশে হুংকার দিয়ে তিনি বলেছিলেন, তোমরাই আমাদের সুন্দর দেশকে মৃত্যু উপত্যকা করে তুলেছ। ‘দ্য বিলিভার্স ডিলেমা’য় অভিষেক লিখেছেন, অলৌকিকভাবে ভারতকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল ইরান। তাদের আপত্তিতে কাশ্মীর নিয়ে ওআইসি সর্বসম্মত হতে পারল না। হতচকিত ও বিহ্বল পাকিস্তান প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয়। ভোটাভুটির প্রশ্নই আর থাকল না।

সেই ভারত ও আজকের ভারতে আসমান–জমিন ফারাক।

আজকের ইরান থেকে ভারতের মুখ ফিরিয়ে থাকা বিস্মিত করেছে সোনিয়া গান্ধীকে। ১৯৯৪ সালে ইরানের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, নীরবতার অর্থ দায়িত্ব এড়ানো। অথচ ভারত চেয়েছিল বিশ্ব বিবেকের কণ্ঠস্বর হতে!

ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি
ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আকবর হাশেমি রাফসানজানি। ছবি: রয়টার্স

Saturday, January 31, 2026

হিন্দুত্ববাদ কাশ্মীরকে যেভাবে গ্রাস করে ফেলছে by জাওয়াদ খালিদ

হিন্দুত্ববাদের ছায়া ধীরে ধীরে কাশ্মীরে নেমে আসছে। সম্প্রতি মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোর ওপর অধিক নজরদারি, আর মুসলিম শিক্ষার্থী-অধ্যুষিত একটি মেডিকেল কলেজ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এ বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আলাদা কোনো ঘটনা নয়। এটি ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ইসলামবিদ্বেষের মাধ্যমে তাদের ধীরে ধীরে বঞ্চিত ও কোণঠাসা করা হচ্ছে। গত ১০ বছরে ভারতের রাজনীতি ও সমাজে হিন্দুত্ববাদের প্রভাব এতটাই গভীর হয়েছে যে দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এখন এর শিকার।

ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থাকে গেরুয়াকরণ করার চেষ্টা নতুন নয়। তবে ভারতীয় জনতা পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা ও গণমাধ্যমের বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার পর এই প্রক্রিয়া নজিরবিহীন গতি পেয়েছে। গেরুয়াকরণ বা হিন্দুকরণ কখনোই ইসলামবিদ্বেষ থেকে আলাদা নয়; এটি সরাসরি মুসলমানদের প্রান্তিককরণের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

বারবার স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে দেশের সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নয়। গরু রক্ষা নামের সহিংসতা, লাভ জিহাদ ও ল্যান্ড জিহাদের মতো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, মসজিদ ভাঙা, প্রকাশ্য গণপিটুনি কিংবা দরিদ্র মুসলিম মহল্লায় বুলডোজার চালানো—সব ক্ষেত্রেই হিন্দুত্ববাদের ঘৃণার রাজনীতির প্রধান লক্ষ্য মুসলমানরাই।

এখন এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আঘাত গিয়ে পড়ছে কাশ্মীরি মুসলমানদের ওপর। ভারতের অন্য অঞ্চলের তুলনায় কাশ্মীরে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও ভয়, আতঙ্ক ও বর্জনের রাজনীতির মাধ্যমে তাদেরও সন্দেহভাজন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ উপত্যকাজুড়ে মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে লক্ষ্য করে একটি অনধিকারমূলক অভিযান শুরু করেছে। বহু পৃষ্ঠার ফরম বিতরণ করে ইমাম, ধর্মশিক্ষক ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির লোকদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য চাওয়া হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি সন্ত্রাসবিরোধী পদক্ষেপ। কিন্তু কাশ্মীরের অনেক মানুষের কাছে মনে হচ্ছে, এটি নিরাপত্তার চেয়ে সামষ্টিক সন্দেহ আর নজরদারির হাতিয়ার।

ধর্মীয় নেতা, নাগরিক সমাজের সংগঠন ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন করে। উপাসনালয় ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে নজরদারির আওতায় আনা পুরো সম্প্রদায়ের কাছে একটি বার্তা দেয় যে তাদের বিশ্বাস ও উপাসনার স্থান রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহের বিষয়।

জম্মুর শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্স বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা বঞ্চনার আরেকটি গভীরভাবে উদ্বেগজনক দিক তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রথম এমবিবিএস ব্যাচে ভর্তি হওয়া ৫০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪২ জনই ছিলেন মুসলিম। তাঁরা সবাই ভারতের জাতীয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর ডানপন্থী উগ্র গোষ্ঠীগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, একটি হিন্দু তীর্থস্থানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নেওয়ার কোনো অধিকার মুসলমানদের নেই। এর কিছুদিন পর জাতীয় মেডিকেল কমিশন অবকাঠামোগত ঘাটতির অজুহাতে কলেজটির স্বীকৃতি বাতিল করে দেয়।

এই ঘটনাগুলো একসঙ্গে দেখলে স্পষ্ট হয়, মুসলমানদের জীবন ও সাফল্যকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কাশ্মীরে এই বাস্তবতা আরও তীব্র। কারণ, অঞ্চলটি আগেই তল্লাশি অভিযান, চেকপোস্ট ও সার্বক্ষণিক নজরদারির ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকার–বিশেষজ্ঞরা জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের বিষয়ে গুরুতর সতর্কবার্তা দেন। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে পেহেলগামে হামলার পর প্রায় ২ হাজার ৮০০ জনকে আটক করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরাও ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার, নির্যাতন, বিচার ছাড়াই দীর্ঘ সময় আটক, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া, বাড়িঘর ভেঙে ফেলা এবং ভারতের বিভিন্ন স্থানে কাশ্মীরি শিক্ষার্থীদের হয়রানির তথ্য উঠে আসে।

কাশ্মীর ক্রমেই সারা ভারতের হিন্দুত্ববাদী প্রবণতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে। সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব সোসাইটি অ্যান্ড সেক্যুলারিজমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। এসব সহিংসতায় নিহত ব্যক্তিদের বড় অংশই ছিলেন মুসলমান। ওই বছর নথিভুক্ত ৫৯টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মধ্যে ৪৯টিই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে। ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ধর্মভিত্তিক ঘৃণাজনিত অপরাধের প্রায় ৯০ শতাংশই ঘটেছে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর।

ঘৃণামূলক বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যাচ্ছে। ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই ১ হাজার ৩০০টির বেশি ঘৃণামূলক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর বেশির ভাগই ঘটেছে বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোতে এবং মূল লক্ষ্য ছিল মুসলমান ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। গরু রক্ষার নামে সন্ত্রাসী দল, বুলডোজার দিয়ে শাস্তি দেওয়া এবং নাগরিকত্ব ও ধর্মান্তর–সংক্রান্ত বৈষম্যমূলক আইন সমষ্টিগত শাস্তি ও দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে।

কাশ্মীরে যা ঘটছে, তা আসলে বর্জন ও ভয়ের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পেরই স্বাভাবিক পরিণতি। যারা আগে থেকেই অবিরাম অবরোধ ও নজরদারির মধ্যে বসবাস করছে, সেই মুসলমানদের এখন আরও বেশি প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে তাদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের মুসলমানদের ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক মনে হয় না।

হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প ধীরে হলেও নিষ্ঠুরভাবে এগিয়ে চলেছে। এটি একদিকে প্রতিষ্ঠান দখল করছে, অন্যদিকে মানুষের চিন্তা ও বোধবুদ্ধিকেও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত ভারতের জনগণেরই। তারা কি ঘৃণা ছড়ানো শক্তি ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের হাতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রকে ছেড়ে দেবে এবং সাভারকারের কল্পিত ঘৃণা ও ভয়ের রাষ্ট্রে রূপ নিতে দেবে, নাকি গান্ধী ও নেহরুর কল্পিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করবে।

এ মুহূর্তে সেই উত্তরের ভেতরে খুব একটা আশার কারণ দেখা যাচ্ছে না।

* জাওয়াদ খালিদ, পাকিস্তানভিত্তিক লেখক ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক
- মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-01-22%2Fy3gmsw5r%2FkashmirbjpAFP.jpg?rect=14%2C0%2C1049%2C699&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাশ্মীরে বিজেপির বিস্তার। ফাইল ছবি: এএফপি

Wednesday, January 14, 2026

জম্মু–কাশ্মীরের মসজিদের খুঁটিনাটি পুলিশকে জানাতে হবে, নতুন আদেশ

জম্মু–কাশ্মীরের মসজিদগুলোর খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহে পুলিশি তৎপরতা বিভিন্ন মহলে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রশাসন প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে। এমন তৎপরতা এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে আগে দেখা যায়নি।

সমালোচনা শুরু হয়েছে কারণ, পুলিশ এই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মসজিদগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী হয়েছে। তারা জানতে চায়, কোন মসজিদ কবে তৈরি হয়েছে, কাঠামোর বিবরণ, মসজিদ তৈরিতে কত খরচ হয়েছে, কারা টাকা দিয়েছে, মসজিদ চালাতে কত খরচ অথবা বার্ষিক আয়ই–বা কত। শুধু এটুকুই নয়, জানতে চাওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট মসজিদের সঙ্গে কারা যুক্ত, তাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা কেমন, পাসপোর্ট, ব্যাংক খাতা, এটিএম ও ক্রেডিট কার্ডের বিবরণও।

পুলিশের এই অতি তৎপরতা উপত্যকায় ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। প্রশাসনও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বিভিন্ন মহলে এই পদক্ষেপের সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।

মিরওয়াইজ উমর ফারুখের সংগঠন মুত্তাহিদা মজলিস উলেমা (এমএমইউ) এই পুলিশি তৎপরতাকে ‘আক্রমণাত্মক তথ্য সংগ্রহ কর্মসূচি’ বলে বর্ণনা করেছে। জম্মু–কাশ্মীরের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের সংসদ সদস্য আগা রুহুল্লাহ মেহেদি বলেছেন, দক্ষিণপন্থী যে আদর্শ এখন দেশ চালাচ্ছে তা এখন ধর্মকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, দক্ষিণপন্থী আদর্শের সঙ্গে যারা সহমত নয় তাদেরকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।

এই উদ্যোগ ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ জানিয়ে রুহুল্লাহর প্রশ্ন, নিরাপত্তারক্ষী বাহিনীর কাছে সব তথ্য যখন রয়েছে তখন এই বাড়তি তৎপরতার প্রয়োজন কোথায়? তিনি বলেন, এর মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে প্রশাসন ভিন ধর্মাবলম্বীদের ভয় দেখাতে চাইছে। এর পর হয়তো দেখা যাবে, আরএসএস ও বিজেপি মসজিদের ইমামদের হুকুম করবে, প্রতি শুক্রবার তাদের লিখে দেওয়া ধর্মোপদেশই পাঠ করতে হবে।

সমালোচনা করেছে আওয়ামী ইত্তেহাদ পার্টিও (এআইপি)। এই দলের ব্যানারে গত লোকসভা ভোটে জিতেছিলেন ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। জেলে বন্দী থেকেও নির্বাচনে জিতে তিনি সংসদ সদস্য হন। এআইপি বলেছে, পুলিশ যা যা জানতে চাইছে তাতে স্পষ্ট তারা ধর্মাচরণকেও নজরবন্দি করতে চায়। দলের প্রধান মুখপাত্র ইনাম উন নবি গণমাধ্যমকে বলেছেন, যা হচ্ছে তা প্রশাসন নয়, নিরাপত্তা রক্ষাও নয়। মানুষকে স্রেফ ভয় দেখানো হচ্ছে। প্রশাসন যদি প্রতিটি ধর্মস্থলকে বিপদ বলে চিহ্নিত করে তাহলে ক্ষোভ বেড়ে যাবে। মানুষের আস্থাও হারাবে।

বিভিন্ন সংগঠন অবিলম্বে এই তৎপরতা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। প্রত্যেকেই মনে করে, এতে সর্বত্র ভুল বার্তা যাবে। প্রশাসনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হবে। ভয় বাসা বাঁধবে মনে। সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট হবে।

এমএমইউ মনে করে, নির্বাচিত সরকারের উচিত অবিলম্বে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা। তারা উপরাজ্যপাল মনোজ সিনহাকে অনুরোধ করেছে, দেরি না করে এই পুলিশি উদ্যোগ বন্ধ করতে।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদক্ষেপের বিষয়টি স্বীকার করেনি। যদিও পুলিশের এক সূত্র তাদের জানিয়েছে, এই কাজ কিছুদিন ধরেই চলছে। প্রতিটি মসজিদ কর্তৃপক্ষকে ফর্ম ভর্তি করে জমা দিতে বলা হয়েছে।

জম্মু–কাশ্মীর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। সেখানকার নির্বাচিত সরকার পূর্ণ ক্ষমতার অধিকারী নয়। বিশেষ করে পুলিশ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন্দ্রের হাতে। কেন্দ্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন উপরাজ্যপাল। তাঁর সম্মতি ছাড়া নির্বাচিত সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বলবৎ হয় না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2022-12%2Fca564205-757b-4376-aac6-e0b35d23fd99%2FUntitled_5.jpg?rect=0%2C0%2C1296%2C864&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif

Friday, January 2, 2026

কাশ্মীরে জৈইশ ও হিজবুল কমান্ডারদের খোঁজে ২০০০ সেনা জওয়ান

ভারতের কাশ্মীরে জৈশ ই মুহাম্মদ ও হিজবুল কমান্ডারদের খোঁজে বড় মাপের অভিযান শুরু  হয়েছে। প্রায়  ২০০০ সেনা জওয়ানকে এই অভিযানে নামানো হয়েছে বলে সংবাদ সংস্থার খবর। তুষারে ঢাকা উপত্যকা দিয়ে যাতে জঙ্গিরা অনুপ্রবেশ না করতে পারে, তার জন্য ধরে ধরে অপারেশন চালাচ্ছে সেনাবাহিনী। জানা গেছে, কাশ্মীরে জৈইশ ই মোহাম্মদির জঙ্গিদের ধরতে এই অভিযান শুরু হয়েছে। এরই সঙ্গে তাদের স্থানীয় কমান্ডারকেও ধরার চেষ্টায় রয়েছে সেনা জওয়ানরা।

এছাড়া হিজবুল মুজাহিদিনের কমান্ডারের খোঁজও করছে সেনাবাহিনী। ছাত্রু গ্রাম এবং আশেপাশের এলাকায় সেনার এই অভিযান বিগত এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলছে। সংবাদ সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, কাশ্মীরে জৈইশের স্থানীয় কমান্ডার সাইফুল্লাহ ও তার  সহযোগী  আদিল-  এই দু’জনেই এখন কিশতওয়ারের ডোডা অঞ্চলের পাহাড়ে লুকিয়ে আছে। এই জঙ্গিদের একেক জনের মাথার দাম ৫ লাখ  রুপি করে।

এই আবহে কিশতওয়ারের ছাত্রু নামক গ্রাম থেকে এই তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। ডোবা অঞ্চলের সেওজধারে চিরুনি তল্লাশি চলছে। পাশাপাশি কিশতওয়ারের এলাকাতেও অভিযান শুরু হয়েছে শনিবার থেকে। অন্যদিকে আরেক অভিযানে কিশতওয়ারের পাদ্দের সাবডিভিশনে হিজবুল জঙ্গি কমান্ডার জাহিঙ্গির সারুরির খোঁজ শুরু করেছে সেনা। এছাড়াও তার দুই সহযোগী মুদ্দাসির এবং রিয়াজেরও খোঁজ চালানো হচ্ছে।

mzamin

Tuesday, December 30, 2025

কাশ্মীর ফাইলস থেকে আরআরআর: ভারতীয় সিনেমা ‘সাবালক’ হবে কবে by ভামসি জুলুরি

প্রকাশ ২৭ ডিসেম্বর ২০২২ঃ কোনো সিনেমা ভারতে (এবং প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যে) ব্যবসায়িক সাফল্য পাওয়ার মানে এই নয় যে ছবিগুলো বিদেশি দর্শকেরা, বিশেষ করে একটি নিরবচ্ছিন্ন বৈশ্বিক প্রতিকূল প্রচারণায় ইতিমধ্যেই ভারত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা নেওয়া বিদেশিরা একইভাবে দেখবেন বা অনুভব করবেন।

সম্প্রতি ভারতীয় সিনেমা আমাদের সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশে আলোড়ন তৈরি করেছে। সুখের বিষয়, তেলেগু ব্লকবাস্টার আরআরআর দুটি গোল্ডেন গ্লোবের জন্য মনোনয়ন জিতেছে। অন্যদিকে কম আনন্দের বিষয় হলো, দ্য কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে ১৯৯০-এর দশকের কাশ্মীরি হিন্দু পণ্ডিতদের জাতিগত নির্মূল করা হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা গভীর আবেগ নিয়ে স্বাগত জানালেও সেটিকে একজন ইসরায়েলি নির্মাতা ‘অশ্লীল প্রোপাগান্ডা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

এই ছবি নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, এমনকি বিতর্ক কূটনৈতিক স্তরে পৌঁছে গেছে। সহিংসতার শিকার ব্যক্তিদের প্রতি কাশ্মীর ফাইলস–এর স্ক্রিপ্ট রাইটারের উদাসীনতায় ইসরায়েলি নির্মাতা নাদাভ লাপিদসহ অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। অবশ্য আমার কিছু চলচ্চিত্র নির্মাতা বন্ধুসহ অনেকেই আবার স্ক্রিপ্ট রাইটারের অবস্থানকে মহৎ বলে মনে করছেন।

এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দুই পরিচালকের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডাও হয়েছে। লাপিদ ছবিতে চিত্রায়িত ঘটনাগুলো আদতেই ঘটেছিল কি না, তা বলতে তঁার অক্ষমতা প্রকাশ করেছিলেন এবং ওই হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা ছবিটি দেখে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবেন, তা নিয়ে তিনি চিন্তিত ছিলেন।

লাপিদ বলেছেন, কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রচার হিসেবে বানানো ছবিও শৈল্পিক হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বিখ্যাত রুশ নির্মাতা সেরগেই নিকোলোভিচ আইজেনস্তাইন ও জার্মান নির্মাতা লেনি রেইফেনস্টাহলের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এই দুজনই প্রোপাগান্ডাভিত্তিক ছবি বানাতেন। কিন্তু এখন কেউই তাঁদের সেই ছবিগুলোকে আর প্রচারমূলক ছবি বলে না। কাশ্মীর ফাইলস সে রকমই কিছু নয় বলে তিনি জোর দিয়েছেন।

ছবিটির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রী বারবার উল্লেখ করেছেন, কেউ যখন বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে মত দেয়, তখনই তারা ‘প্রোপাগান্ডা’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর কাশ্মীর ফাইলস সিনেমায় চিত্রায়িত ভয়ংকর ঘটনাগুলোর সত্যতা নিয়ে কোনো বিতর্ক নেই এবং তিনি তঁার ছবির গল্পের জন্য ৭০০ ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন।

তবে বিতর্কটি এখন কিছুটা কমে আসছে বলে মনে হচ্ছে। সম্ভবত উভয় শিবিরেরই ইসলামবিদ্বেষ কিংবা হিন্দুবিদ্বেষ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হওয়া এর কারণ হতে পারে। কাশ্মীর ফাইলস থেকে আলোচনা এখন আরআরআর-এর দিকে সরে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই আমি বহু বছর ধরে ভারতীয় সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে অর্জিত অভিজ্ঞতা অ-ভারতীয় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।

ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সমালোচকদের যে মৌলিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি ভারতীয় ছবির দৃশ্য একজন ভারতীয় দর্শকের মনের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তা বিদেশিদের ক্ষেত্রে কাজ করে না।

আমরা ভারতের সিনেমা হলে গিয়ে হাম আপকে হ্যায় কৌন কিংবা মিস্টার ইন্ডিয়া ছবি দেখে যেভাবে উদ্বেলিত হয়েছি, বিদেশের ছাত্র বা দর্শকদের কাছে তা খুব কমই চিত্তাকর্ষক ছিল।

১৯৯০-এর দশক থেকে পরবর্তী বেশ খানিকটা সময় জুড়ে ‘বলিউড’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে একটি বিশেষ টান ছিল, যা শাহরুখ খান থেকে শুরু করে প্রবাসী ভারতীয় নির্মাতা মিরা নায়ার ও গুরিন্দর চাড্ডার মতো নির্মাতাদের বিশেষত্ব দিয়েছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলো ভারতীয়দের বয়ান বা ন্যারেটিভকে ভারতের বাইরে এগিয়ে নিতে পেরেছে।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখে, আমরা দর্শকদের রুচি, বিষয়বস্তু এবং ফর্ম সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক প্রশ্নের দিকে যেতে পারি।

আমাদের এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে হবে যে কেন আরআরআর–এর (এবং তার আগে বাহুবলী) মতো একটি সিনেমা ভারতীয় এবং অ–ভারতীয় উভয় শ্রেণির দর্শকদের মন কাড়তে পেরেছিল।

একই সঙ্গে এটিও একটি বড় প্রশ্ন যে কেন দ্য কাশ্মীর ফাইলস-এর মতো একটি সিনেমায় ১৯৯০-এর জাতিগত নির্মূলকরণের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের করুণ অবস্থা দেখে ভারতীয় দর্শকদের অনেকে অশ্রুপাত করলেও তা সব অভিনয়শিল্পীর সহানুভূতি অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছে?

ইস্যুটি কি শুধুই কট্টর পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির, যেখানে বৈশ্বিক মানবাধিকারের মানদণ্ডে হিন্দুদের মানবাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে গণনা করা হয় না? নাকি আমাদের সীমানার বাইরের দর্শকদের মনে জায়গা করার মতো গল্প বলার ক্ষমতা আমাদের নেই। আমাদের সক্ষমতার সেই সীমাবদ্ধতাগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়ার দরকার আছে।

কার্ল ভন ক্লজউইটজ লিখেছিলেন, যুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালানোর সময় তিন শ্রেণির দর্শক–শ্রোতার কথা মাথায় রাখতে হয়—সমর্থক, শত্রু এবং নিরপেক্ষ গোষ্ঠী। কিন্তু আমরা কয়েক বছর ধরে ভারতের প্রোপাগান্ডার যে গল্পগুলো দেখে আসছি, তা প্রায় একচেটিয়াভাবে প্রথমোক্ত গোষ্ঠীর প্রতি আলোকপাত করে বানানো।

ভারতীয় সিনেমাকে যদি বিশ্বমানের হতে হয়, ভারতের গল্পকে যদি সত্যিই বিশ্বের জন্য গ্রহণযোগ্য করতে হয়, তাহলে আমাদের কাউকে শত্রু বা বিরোধী হিসেবে ধরে না নিয়ে ভবিষ্যতে তিন শ্রেণির দর্শকের সঙ্গেই কথা বলতে শিখতে হবে।

যখন নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা দর্শকেরা গল্পের আখ্যানের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন, তখনই ভারতীয় সিনেমার বয়ান বিশ্বমানের বলে প্রতিষ্ঠা পাবে। যত দিন তা না হচ্ছে, তত দিন তা ‘আমাদের প্রচার, তাদের প্রচার’ মার্কা সিনেমা হবে; সেই সিনেমা ‘আমাদের’ এবং ‘তাদের’—এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সেতুবন্ধ গড়তে পারবে না।

* ভামসি জুলুরি, সান ফ্রান্সিসকো বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক
- ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে সরকারি প্রোপাগান্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে
কাশ্মীর ফাইলস ছবিটিকে সরকারি প্রোপাগান্ডা হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

Monday, December 29, 2025

ভারতে বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতা নিয়ে মুফতি পরিবারের উদ্বেগ

টেলিগ্রাফের রিপোর্টঃ জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির মেয়ে ইলতিজা মুফতি শুক্রবার মন্তব্য করেছেন যে, ভারত এখন যেন ‘লিঞ্চিস্তান’-এ পরিণত হয়েছে। তার দাবি, দেশে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং বাংলাদেশে লিঞ্চিংয়ের সমালোচনা যারা করছেন, ভারতে এমন ঘটনা ঘটলেও তারা নীরব থাকছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টেলিগ্রাফ। উল্লেখ্য, ইংরেজি শব্দ লিঞ্চিং অর্থ পিটিয়ে হত্যা করা। ইলতিজা ‘এক্স’-এ একটি পোস্টে ভারতকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, ‘না ইন্ডিয়া, না ভারত, না হিন্দুস্তান- তোমার নাম লিঞ্চিস্তান।’

তিনি ওই পোস্টে ওড়িশায় ১৯ বছর বয়সি বাঙালি মুসলিম অভিবাসী শ্রমিক জুয়েল শেখের লিঞ্চিং সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও শেয়ার করেন। তাকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল বলে তার দাবি। ইলতিজার মা ও পিডিপি প্রধান, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতিও দেশের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করেন। তার অভিযোগ, ভারতের বিচারব্যবস্থা গভীরভাবে রাজনীতিকরণে নিমজ্জিত। শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাম্প্রতিক জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ হাইকোর্টের রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেন। মেহবুবা বলেন, আমরা বহুদিন ধরেই বলে আসছি, দেশে অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। লিঞ্চিং হচ্ছে। বাংলাদেশে যা হচ্ছে, তা আমাদের কষ্ট দেয়। কিন্তু যারা সেগুলোর সমালোচনা করছেন, নিজেদের সামনে এমন ঘটনা ঘটলেও মুখ খোলেন না। তিনি জানান, ৭২ ঘণ্টায় হিমাচল, উত্তরাখণ্ড ও হরিয়ানায় কাশ্মিরি শাল ব্যবসায়ীদের হয়রানির তিনটি ঘটনা ঘটেছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণপন্থী কর্মীরা তাদের জোর করে নির্দিষ্ট স্লোগান দিতে বাধ্য করছেন। স্লোগান দিতে অস্বীকার করলে মারধর করছেন।

হাইকোর্টে তার পিআইএল (জনস্বার্থ মামলা) খারিজ হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিচারব্যবস্থার বড় অংশ রাজনৈতিক প্রভাবিত। সেই আবেদনে তিনি দেশের বিভিন্ন কারাগারে আটক কাশ্মিরি হাজতিদের জম্মু-কাশ্মীরে ফিরিয়ে নেয়ার দাবি করেছিলেন। কিন্তু আদালত তার আবেদনের সমালোচনা করে বলেন, এটি নাকি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মেহবুবা বলেন, আমার চরিত্র নিয়ে মন্তব্য করা বিচারব্যবস্থার কাজ নয়। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে প্রশ্ন তোলা আমার অধিকার।

প্রধান বিচারপতি অরুণ পাল্লি ও বিচারপতি রাজনেশ ওসওয়ালের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মন্তব্য করেন যে, তার আবেদন অপ্রমাণিত ও রাজনৈতিকভাবে অনুপ্রাণিত এবং আইনগত মানদণ্ড পূরণ করতে ব্যর্থ। রায়ে আরও বলা হয়, মেহবুবা মুফতি নাকি এই মামলা দায়ের করেছেন ‘রাজনৈতিক সুবিধা নেয়া এবং নির্দিষ্ট একটি জনগোষ্ঠীর পক্ষের ন্যায়যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার’ উদ্দেশ্যে।

রায় প্রসঙ্গে হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, প্রতিটি সাধারণ মানুষ যখন পিআইএল করতে পারে, তখন একজন রাজনীতিবিদ কেন পারবে না? তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, রাজনীতিবিদরাই তো মাঠের মানুষের সঙ্গে যুক্ত। আমি জানি গরিব পরিবারগুলো কত কষ্টে থাকে। নিজেদের আত্মীয়দের দেখা করতেও পারে না, বাইরের রাজ্যের জেলে থাকা অবস্থায় তারা কীভাবে নিজেদের মামলা লড়বে?

mzamin

Saturday, December 27, 2025

ইন্ডিয়া, ভারত বা হিন্দুস্তান নয়; তোমার নাম এখন লিঞ্চিস্তান: মেহবুবার মেয়ে ইলতিজা

ভারতের জম্মু–কাশ্মীর রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির মেয়ে ইলতিজা মুফতি গত শুক্রবার ভারতকে ‘লিঞ্চিস্তান’ বা ‘গণপিটুনির দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, দেশে অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং যাঁরা বাংলাদেশে গণপিটুনির সমালোচনা করছেন, তাঁরা নিজ দেশে এমন ঘটনা ঘটলে চুপ থাকছেন।

ভারতের ওডিশা রাজ্যে জুয়েল শেখ নামের ১৯ বছর বয়সী এক বাঙালি মুসলিম অভিবাসী শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে হত্যার খবরের একটি লেখা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে ইলতিজা লিখেছেন, ‘ইন্ডিয়া, ভারত বা হিন্দুস্তান নয়; তোমার নাম এখন লিঞ্চিস্তান (গণপিটুনির দেশ)।’
ইলতিজার মা ও পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) প্রধান মেহবুবা মুফতিও দেশের বিচারব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন, বিচার বিভাগ পুরোপুরি রাজনৈতিক হয়ে পড়েছে।

জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ হাইকোর্টের সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় গতকাল শুক্রবার মেহবুবা এক সংবাদ সম্মেলন করেন। ওই রায়ে আদালত তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আদালতকে ব্যবহারের দায়ে অভিযুক্ত করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে মেয়ের মন্তব্যের বিষয়েও তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়।

মেহবুবা বলেন, ‘আমরা বলে আসছি, দেশে অসহিষ্ণুতা বেড়েছে। গণপিটুনি হচ্ছে। বাংলাদেশে যা ঘটছে তা আমাদের ব্যথিত করে। কিন্তু যাঁরা সেটির সমালোচনা করছেন, তাঁরা যখন নিজেদের চোখের সামনে এমন গণপিটুনি দেখেন, তখন মুখ বন্ধ রাখেন।’

পিডিপি প্রধান আরও বলেন, গত ৭২ ঘণ্টায় হিমাচল, উত্তরাখন্ড ও হরিয়ানায় কাশ্মীরি শাল বিক্রেতাদের ওপর হামলার তিনটি ঘটনা ঘটেছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, উগ্র ডানপন্থী কর্মীরা তাঁদের নির্দিষ্ট স্লোগান দিতে বাধ্য করছে এবং তাঁরা অস্বীকার করলে মারধর করছে।

কাশ্মীরি বন্দীদের অন্যান্য রাজ্যের কারাগার থেকে জম্মু-কাশ্মীরে ফিরিয়ে আনার জন্য করা তাঁর একটি আবেদন (পিআইএল) সম্প্রতি হাইকোর্ট খারিজ করে দেন। আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, মেহবুবা বিচার বিভাগকে ‘পক্ষপাতমূলক’ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন।

জবাবে মেহবুবা বলেন, ‘আমার চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ করা বিচার বিভাগের কাজ নয়। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে যেকোনো প্রশ্ন তোলার অধিকার আমার রয়েছে।’

একটি ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি অরুণ পাল্লি এবং বিচারপতি রজনীশ ওসওয়াল সম্প্রতি জানান, তাঁর আবেদনটি ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আদালত তাঁকে অভিযুক্ত করে বলেন, মেহবুবা একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে নিজেকে ন্যায়বিচারের কান্ডারি হিসেবে প্রমাণের জন্য এবং রাজনৈতিক ফায়দা নিতে এই আবেদন করেছেন।

জম্ম–কাশ্মীরের সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী আদালতের রায়কে ‘দুর্ভাগ্যজনক এবং বিস্ময়কর’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি সাধারণ যে কেউ জনস্বার্থে পিটিশন (পিআইএল) করতে পারেন, তবে একজন রাজনীতিবিদ কেন পারবেন না?

মেহবুবা মুফতি আরও বলেন, ‘হাইকোর্ট ভুলে যাচ্ছেন, রাজনীতিবিদেরা মাটির মানুষের সঙ্গে যুক্ত। একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে আমি জানি সাধারণ দরিদ্র মানুষ কী ধরনের কষ্টের মুখে পড়েন। তাঁরা এমনকি বাইরের কারাগারে থাকা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতেও যেতে পারেন না। তাঁরা তাঁদের মামলা লড়বেন কীভাবে?’

মেহবুবা মুফতির মেয়ে ইলতিজা মুফতি
মেহবুবা মুফতির মেয়ে ইলতিজা মুফতি। ছবি: তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

Friday, November 21, 2025

জম্মুতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের ভর্তি বাতিলের দাবিতে উগ্রপন্থী বজরং দল ও ভিএইচপির বিক্ষোভ

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসঃ ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা এবার জম্মুর মেডিকেল কলেজ থেকে মুসলিম শিক্ষার্থীদের থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তুলেছে। জম্মু অঞ্চলে সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠন কাটরাভিত্তিক শ্রীমাতা বৈষ্ণদেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্সের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ভর্তির তালিকা বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেছে। তাদের মূল দাবি, নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯০ শতাংশ মুসলিম এবং তাঁরা কাশ্মীরের বাসিন্দা।

বিজেপির বিধায়ক আর এস পাঠানিয়া এই বিক্ষোভকে সমর্থন জানিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে রয়েছে ভিএইচপি এবং বজরং দল। তাঁর প্রধান যুক্তি হলো, বৈষ্ণদেবী মন্দিরের দান করা অর্থ দিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হয়েছে, সেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের আধিপত্য থাকা উচিত নয় এবং হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষিত রাখতে হবে।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বৈষ্ণদেবী মেডিকেল ইনস্টিটিউটকে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠান হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়নি। তাই বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী সেখানে হিন্দুদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়।

ভর্তির তালিকা ও বিক্ষোভের কারণ

জম্মু ও কাশ্মীর বোর্ড অব প্রফেশনাল এন্ট্রান্স এক্সামিনেশনস (জেকেবিওপিইই) বৈষ্ণদেবী মেডিকেল ইনস্টিটিউটের জন্য ৫০ জন প্রার্থীর একটি তালিকা প্রকাশের পরই এই বিক্ষোভ শুরু হয়।

নির্বাচিত ৫০ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪২ জন কাশ্মীরের এবং ৮ জন জম্মুর। কাশ্মীর থেকে ইতিমধ্যে ৩৬ জন এবং জম্মু থেকে ৩ জন ভর্তি হয়েছেন।

উগ্র হিন্দু্ত্ববাদী ভিএইচপি ও বজরং দল কাটরা ইনস্টিটিউটের বাইরে আজ বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করেছে এবং বৈষ্ণদেবী মন্দির বোর্ডের প্রধান কার্যনির্বাহী কর্মকর্তার কুশপুত্তলিকা দাহ করেছে।

ভিএইচপির জম্মু ও কাশ্মীর শাখার সভাপতি রাজেশ গুপ্তা দাবি করেছেন, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি স্থগিত রাখতে হবে এবং কর্তৃপক্ষকে তাদের ‘ভুল সংশোধন’ করে পরবর্তী ব্যাচে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি এবারের ৫০ জনের তালিকাটিকে ‘মেডিকেল কলেজটিকে ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র’ বলে উল্লেখ করেছেন।

বজরং দলের জম্মু ও কাশ্মীর শাখার সভাপতি রাকেশ বজরঙ্গি জেকেবিওপিইইর তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় পক্ষপাতের অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, মন্দির বোর্ড যেহেতু সারা দেশের ভক্তদের দানে চলছে, তাই কলেজটির উচিত ছিল কেন্দ্রীয় এনইইটি পুল থেকে সারা ভারতের প্রার্থীদের ভর্তি করা।

বিজেপির বিধায়ক পাঠানিয়া যুক্তি দেন, ‘যেহেতু এই প্রতিষ্ঠান সরকারের থেকে এক পয়সাও অনুদান নেয় না এবং সম্পূর্ণরূপে তীর্থযাত্রীদের দানে চলে, তাই এখানে হিন্দু শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা উচিত।’

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বিধিমালা

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিলের (এনএমসি) নির্দেশিকা অনুযায়ী ভর্তিপ্রক্রিয়া হয়েছে এবং এটি সম্পূর্ণ বৈধ। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী—

জম্মু ও কাশ্মীরের ১৩টি মেডিকেল কলেজের ১ হাজার ৬৮৫টি আসনে এনইইটির তালিকার ভিত্তিতে ভর্তি করতে হবে।

৮৫ শতাংশ আসন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে এবং ১৫ শতাংশ আসন দেশের বাকি অংশের প্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

জেকেবিওপিইইর কাজ হচ্ছে এনইইটি র‍্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে সরকারি কলেজগুলোতে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের কোটা এবং বেসরকারি কলেজগুলোর সব আসনের জন্য তালিকা তৈরি করা।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, এই প্রবণতা নতুন নয়। যদিও জম্মু অঞ্চলে কাশ্মীরের তুলনায় বেশি মেডিকেল আসন (জম্মুতে ৯০০, কাশ্মীরে ৬৭৫) রয়েছে, তবু কয়েক বছর ধরে কাশ্মীরের শিক্ষার্থীরাই বেশির ভাগ আসনে ভর্তি হচ্ছেন। তবে ইঞ্জিনিয়ারিং আসনগুলোর ক্ষেত্রে বিপরীত চিত্র দেখা যায়। সেখানে জম্মুর শিক্ষার্থীরা বেশি ভর্তি হন।

ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রতিক্রিয়া

ন্যাশনাল কনফারেন্সের জম্মু প্রদেশের সভাপতি রতন লাল গুপ্ত এই পরিস্থিতির জন্য কলেজ পরিচালনাকারী শ্রীমাতা বৈষ্ণদেবী বোর্ডকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্য এনএমসিতে আবেদন করার সময় তাঁদের সংখ্যালঘু মর্যাদার জন্যও আবেদন করা উচিত ছিল।

যেহেতু মন্দির বোর্ড সংখ্যালঘু মর্যাদার জন্য আবেদন করেনি, তাই জেকেবিওপিইইর কাছে এনইইটি-এ পাওয়া মেধার ভিত্তিতে ছাত্র নির্বাচন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিল না। গুপ্ত বলেন, উচ্চ মেধার অধিকারী বেশির ভাগ শিক্ষার্থী কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ভুক্ত (মুসলিম) ছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-20%2F9kd8fxk5%2FUntitled-5.jpg?rect=3%2C0%2C1743%2C1162&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাটরাভিত্তিক শ্রীমাতা বৈষ্ণদেবী ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল এক্সেলেন্সের বাইরে উগ্রপন্থী বজরং দলের কর্মীদের বিক্ষোভ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের

Tuesday, November 18, 2025

কেন্দ্রীয় সরকারের কাশ্মীর নীতির ব্যর্থতাই দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণ: মেহবুবা মুফতি

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করে পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি বলেছেন, দিল্লির লালকেল্লা বিস্ফোরণে কাশ্মীর নীতির ব্যর্থতাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

জম্মু–কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ছয় বছর কেটে গেছে। কাশ্মীরি জনতার সঙ্গে সরকার এখনো কোনো রকম আলোচনাই শুরু করল না। সব দরজা–জানালা তারা বন্ধ করে রেখেছে। সমস্যার সমাধানের পথে এগোনোর চেষ্টাও নেই। তল্লাশি আর তল্লাশি চলছে। নিরীহদের ধরপাকড়ও অব্যাহত। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ ছাড়া আর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

মেহবুবা মুফতি বলেন, মানুষের মন জয়ের কোনো চেষ্টা নেই। তরুণেরা বিচ্যুতির পথে সরে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে বিষাক্ত পরিবেশ। লালকেল্লার কাছে সাম্প্রতিক গাড়ি বিস্ফোরণে কাশ্মীর নীতির এই ব্যর্থতাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশে মেহবুবা বলেন, ‘আপনারা গোটা বিশ্বকে বলে চলেছেন, কাশ্মীর স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু আপনারা প্রতিশ্রুতি পালন করলেন না। আপনাদের নীতি দিল্লিকেও অনিরাপদ করে তুলেছে।’

কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারে কতজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক আছেন, জানি না। উচ্চশিক্ষিত তরুণ, চিকিৎসক যদি এভাবে মৃত্যুবরণ করেন, শরীরে আরডিএক্স বিস্ফোরক বাঁধতে পারেন, তাহলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, দেশটা কতখানি অনিরাপদ।’

কেন্দ্রীয় সরকারকে কটাক্ষ করে মেহবুবা বলেন, ‘হিন্দু–মুসলিম রাজনীতি করে আপনারা ভোটে জিততে পারেন। কিন্তু ভেবে দেখুন, দেশটা কোন রসাতলে যাচ্ছে।’

জম্মু–কাশ্মীরের শাসক দল ন্যাশনাল কনফারেন্সকে হারিয়ে বদগাম বিধানসভার উপনির্বাচনে জেতার পর পিডিপি নেত্রী গতকাল রোববার দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক ডেকেছিলেন। সেখানে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কাশ্মীর নীতির সমালোচনা করেন।

সরকারের উদ্দেশে মেহবুবা বলেন, যুদ্ধবাজ বিশ্বনেতাদের কথায় উদ্বুদ্ধ না হয়ে শীর্ষ নেতাদের উচিত গান্ধীজি ও অটল বিহারি বাজপেয়ীর দেখানো শান্তির পথে হাঁটা। সে জন্য নীতির বদল হওয়া জরুরি।

দিল্লির উদ্দেশে সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ভয়ের বাতাবরণ শেষ করুন। আত্মানুসন্ধান করুন। ভোটব্যাংকের রাজনীতি ছেড়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিক হোন। কাশ্মীরি জনগণের দুঃখ–দুর্দশা কষ্ট অনুভব করুন। গুটিকয় মানুষের ভুলের জন্য সব কাশ্মীরি জনতাকে দোষারোপ করবেন না।’

মেহবুবা বলেন, ২০১৯ সালের পর ছয় বছর কেটে গেছে। কাশ্মীরি ক্ষতে এখনো প্রলেপ পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরণের কড়া নিন্দা করে তিনি বলেন, এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য তদন্তে যাবতীয় সহযোগিতা করা উচিত।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-17%2F2uulw2wz%2FMehbuba.jpg?rect=0%2C0%2C600%2C400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পিডিপি নেত্রী মেহবুবা মুফতি। ছবি: এএনআই

Saturday, November 15, 2025

দিল্লিতে বিস্ফোরণের পর ভারতে আবার ইসলামবিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, কাশ্মীরে চলছে ধরপাকড়

ভারতের দিল্লির একটি জনাকীর্ণ সড়কে ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১৩ জন নিহত হওয়ার ঘটনার ২৬ দিন আগে নওগামে একটি সবুজ শিরোনামযুক্ত প্যাম্ফলেট দেখা গিয়েছিল। নওগাম হলো ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগরের উপকণ্ঠে অবস্থিত একটি নিরিবিলি এলাকা। ওই পোস্টারে ভাঙা ভাঙা উর্দুতে পাকিস্তানভিত্তিক নিষিদ্ধ সশস্ত্র গোষ্ঠী জয়েশ-ই-মোহাম্মদের নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পোস্টারটি ওই সংগঠনের সঙ্গেই সম্পৃক্ত।

প্যাম্ফলেটের ভাষা ছিল হুমকিতে পূর্ণ। সেখানে কাশ্মীরে অবস্থানরত ভারতীয় সরকারি বাহিনী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া স্থানীয় জনগণের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল।

প্যাম্ফলেটে লেখা ছিল, ‘স্থানীয় মানুষের মধ্যে যারা এই সতর্কবার্তা মেনে চলবে না, তাদের বিরদ্ধে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।’

এতে শ্রীনগর ও জম্মুর মধ্যবর্তী মহাসড়কের পার্শ্ববর্তী দোকানদারদেরও সতর্ক করা হয়েছিল। সরকারি বাহিনীগুলোকে আশ্রয় দিলে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছিল।

একসময় এ ধরনের সতর্কবার্তা দেওয়াটা সাধারণ ঘটনা ছিল। বিশেষ করে ১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে কাশ্মীরে ভারতীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আন্দোলন যখন তুঙ্গে ছিল এবং স্থানীয় ও পাকিস্তান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচারণা চালাত তখন এ ধরনের ঘটনা দেখা যেত।

২০১৯ সালের আগস্টে ভারত সরকার কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করে। রাজ্য হিসেবে এটির স্বীকৃতি বাতিল করে এবং এটিকে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করে দেওয়া হয়। এর পর থেকে এমন পোস্টার দেখা যাওয়ার ঘটনা অনেকটাই বিরল হয়ে গিয়েছিল। সশস্ত্র সহিংসতাও কমেছিল।

দক্ষিণ এশিয়ায় হামলা নিয়ে কাজ করা সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে সশস্ত্র হামলার সংখ্যা ছিল ৫৯৭। আর ২০২৫ সালে তা ১৪৫-এ নেমে আসে।

সম্প্রতি নওগামে নতুন করে প্যাম্ফলেট দেখা যাওয়ার পর তিন সপ্তাহ ধরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তল্লাশি অভিযান চালানো হয়। তদন্তে বলা হয়েছিল, একাধিক ব্যক্তি হামলার পরিকল্পনা করছিলেন। এর মধ্যে উমর নবী নামের এক চিকিৎসকও ছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, গত সোমবার নয়াদিল্লিতে মুঘল আমলের ঐতিহাসিক স্থাপনা লালকেল্লার কাছে বিস্ফোরিত হওয়া গাড়িটি তিনিই চালাচ্ছিলেন।

এ ঘটনায় এবং ভারতের অনেক মূলধারার সংবাদমাধ্যমে এ ঘটনা সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদনগুলো ইসলামবিদ্বেষ ও কাশ্মীরবিরোধী মনোভাবের নতুন ঢেউ তৈরি করেছে।

নওগামে প্যাম্ফলেটের উৎস খুঁজতে গিয়ে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণে মনোযোগ দেন। ফুটেজে যা দেখা যায়, তার ভিত্তিতে তাঁরা কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করেন। এর মধ্যে দক্ষিণ কাশ্মীরের সোপিয়ান জেলার এক ইসলামী চিন্তাবিদও আছেন। এক পুলিশ কর্মকর্তা আল–জাজিরাকে এ তথ্য দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় ওই কর্মকর্তা তাঁর নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।

আটক ২৪ বছর বয়সী ইসলামী চিন্তাবিদের নামে ইরফান আহমেদ। তিনি শ্রীনগরের একটি স্থানীয় মসজিদের পেশ ইমাম। আর ওই শ্রীনগরেই পোস্টারগুলো দেখা গিয়েছিল।

ইরফানকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে গিয়ে পুলিশের সামনে আসে আরেকটি নাম: আদিল রাঠোর। তিনি কুলগামের ওয়ানপোরা গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামটি শ্রীনগর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।

পুলিশ রাঠোরের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পায়নি। পরে তাঁকে উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর শহর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সেখানকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করছিলেন।

পুলিশ দাবি করেছে, তারা জম্মু ও কাশ্মীরের অনন্তনাগ গভর্নমেন্ট মেডিকেল কলেজে রাঠোরের লকারে একটি অ্যাসল্ট রাইফেল পেয়েছে। রাঠোর ওই কলেজে ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

এদিকে রাঠোরকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর বেরিয়ে আসে আরেক সহযোগীর নাম। তিনি হলেন, আরেক কাশ্মীরি চিকিৎসক মুজাম্মিল শাকিল গণাই। তিনি দিল্লির কাছে ফরিদাবাদের অবস্থিত আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ছিলেন।

ভারতীয় পুলিশের দাবি, তারা ফরিদাবাদে গণাইয়ের নামে ভাড়া নেওয়া দুটি বাড়িতে অভিযান চালাতে গিয়ে সেখান থেকে ২ হাজার ৯০০ কেজি দাহ্য রাসায়নিক ও অস্ত্র উদ্ধার করেন।

কাশ্মীরে মোতায়েন ভারতীয় পুলিশ দাবি করছে, এ গ্রেপ্তার অভিযানের মধ্য দিয়ে তারা এমন একটি ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক’–কে উন্মোচন করতে পেরেছে–যারা জইশ-ই-মোহাম্মদ এবং আনসার গাজওয়াত-উল-হিন্দ (এজিইউএইচ)-এর সঙ্গে যুক্ত। এজিইউএইচ হল একটি নিষিদ্ধ সংগঠন, যা আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ত সংগঠন হিসেবে পরিচিত।

২০১৯ সালের মে মাসে সরকারি বাহিনীর গুলিতে নিহত স্থানীয় কমান্ডার জাকির রশিদ কাশ্মীরে এজিইউএইচ নামের সংগঠনটি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই গোষ্ঠীর কার্যকলাপ অনেকটাই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। তবে ভারতীয় পুলিশের দাবি, প্রতিবেশী পাকিস্তান থেকে আসা নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে দলটি আবার সক্রিয় হয়েছে।

পুলিশের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চলমান তদন্তের সময় জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ একাধিক স্থানে তল্লাশি চালিয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মোট সাতজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক গণাই ও রাঠোর, ইসলামী চিন্তাবিদ ইরফান আহমেদ এবং আরও চারজন।

এই চারজনের মধ্যে উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌ শহরের এক নারীও রয়েছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলেছেন, তদন্ত করতে করতে উমর নবী নামে এক কাশ্মীরি চিকিৎসক সম্পর্কেও তথ্য পেয়েছিলেন তাঁরা।

তবে নবীকে গ্রেপ্তার করার আগেই গত সোমবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। তদন্তকারীরা বলছেন, ২৯ বছর বয়সী চিকিৎসক উমর নবীই বিস্ফোরকভর্তি ওই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন।

‘কাশ্মীরে ব্যাপক অভিযান’


নয়াদিল্লির ঘটনায় সিসিটিভির ফুটেজ প্রকাশ করেছে পুলিশ। এতে এক তরুণকে কালো মুখোশ পরে একটি গাড়ি নিয়ে দিল্লির টোল বুথ পার হতে দেখা যাচ্ছে। আরেকটি ক্লিপে দেখা যাচ্ছে, একই গাড়ি ধীরে ধীরে যানজটে ভরা চৌরাস্তা দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। এর পরই স্ক্রিনে হলুদ আলোর ঝলকানি দেখা যায়।

বিস্ফোরণের পর দেশব্যাপী নিরাপত্তা সতর্কতা জারি হয়। কাশ্মীরের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ব্যাপক অভিযান চালিয়েছে। ১২ নভেম্বর শ্রীনগরের রাস্তায় রাস্তায় ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পুলিশ এবং আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। বাড়িতে ঢুকে তল্লাশি চালিয়েছে তারা।

শুধু দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম জেলাতেই নিরাপত্তা বাহিনী ৪০০টি তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে এবং প্রায় ৫০০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। বারামুল্লা, পুলওয়ামা ও অবন্তীপুরেও একই ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে।

দিল্লিতে বিস্ফোরিত গাড়ির চালক উমর নবীর পরিবার দক্ষিণ কাশ্মীরের পুলওয়ামার কোইল গ্রামে থাকে।

নবীর ভাবী মুজামিল আখতার বলেন, ‘গত সোমবার সন্ধ্যায় পুলিশ আমার দেবরকে নিয়ে গেল এবং পরে আমার স্বামীকেও। সংবাদমাধ্যম ও পুলিশকে এখানে দেখে আমরা হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা কিছুই জানতাম না।’

মুজামিল আখতার বলেন, পুলিশ নবীর মাকেও ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নিয়ে গেছে।

মুজামিল আখতার, ‘আমাদের পুরো বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। আমি শুক্রবার উমরের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সে স্বাভাবিক ছিল এবং বলেছিল তিন দিনের মধ্যে বাড়ি আসবে। আমরা সবাই তাঁর আসার খবর নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলাম। আমরা এরকম কিছু আশা করিনি।’

স্বজনেরা বলছেন, শ্রীনগরে স্কুল ও মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় নবী অসাধারণ ছাত্র ছিলেন। পরিবারের মানুষেরা উমরের কৃতিত্বের জন্য গর্ববোধ করতেন।

নবীর বাড়ি থেকে এক কিলোমিটারও কম দূরত্বে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক চিকিৎসক গণাইয়ের বাড়ির অবস্থান। সেখানে নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।

মুজাম্মিল গণাইয়ের বাবা শাকিল গণাই আল–জাজিরাকে বলেন, গত মঙ্গলবার পুলিশ বলেছে, তাঁদের ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ফরিদাবাদ থেকে কাশ্মীরে এনেছে।

শাকিল গণাই বলেন, ‘কী ঘটছে আমরা জানতাম না। এমন কিছু ঘটতে পারে বলে আমাদের ধারণাই ছিল না।’

শাকিল গণাই বলেন, মুজাম্মিল কোইল গ্রামের স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। তিনি শ্রীনগরের শের-ই-কাশ্মির ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস নামের প্রতিষ্ঠান থেকে মেডিসিনে মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করেছেন। তিনি পরে আল-ফালাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে তিনি দুই বছর ধরে কাজ করছিলেন।

বাবা শাকিল গণাই বলেন, পুলিশ তাঁদের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে এবং তার অন্য ছেলেকেও আটক করেছে।

তবে তদন্ত চলার মধ্যেই ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ইসলামবিদ্বেষ ও কাশ্মীরবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়েছে।

গত ১২ নভেম্বর ভারতের গুরুগাঁও শহরের পুলিশ হাউজিং সোসাইটিগুলোকে ডেকে কাশ্মীরি বাসিন্দাদের তালিকা তৈরি করার নির্দেশ দেয়। এতে সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতেও সম্প্রতি কাশ্মীরিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের কেউ কেউ দিল্লি ও নয়ডার মতো শহরে বসবাসকারী কাশ্মীরি ভাড়াটিয়াদের বের করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

কাশ্মীরি ছাত্র এবং অধিকারকর্মী নাসির খুয়েহামি বলেন, ভারতের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার কাশ্মীরি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। তাদের বর্তমান উদ্বেগ মূলত নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নয়াদিল্লির বিস্ফোরণ এবং এ ঘটনার তদন্তের মধ্য দিয়ে কাশ্মীর ও সশস্ত্র গোষ্ঠী মোকাবিলায় ভারতের নীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

চলতি বছরের শুরুতে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাবি করেছিলেন, ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে এখন ‘সশস্ত্র বিদ্রোহীরা’ নতুন করে আর সদস্য নিয়োগ দিচ্ছে না। পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে কাশ্মীরে সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত সব যোদ্ধা বিদেশি নাগরিক ছিলেন।

তবে এখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ধরনের বক্তব্য বিভ্রান্তিমূলক।

নয়াদিল্লির ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের কার্যনির্বাহী পরিচালক অজয় সাহনি বলেন, সশস্ত্র গোষ্ঠীতে নিয়োগ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এমনটা নিশ্চিত করে বলার সুযোগ নেই। এই চিকিৎসকেরা সহকর্মী ছিলেন। তাদের চিন্তাভাবনা হয়তো এক রকম ছিল বা তাঁরা হযতো ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে উঠেছিল। আমি এটিকে নিয়োগ বলব না, বরং সংগঠিত করা বলব।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-14%2F0mwik6sn%2FDelhi.jpg?rect=4%2C0%2C612%2C408&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
দিল্লির লালকেল্লার কাছে গাড়ি বিস্ফোরণ স্থলে কাজ করছেন ফরেনসিক দলের সদস্য। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

দিল্লির বিস্ফোরণের ঘটনায় সন্দেহভাজন উমরের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী

ভারতের রাজধানী দিল্লির লাল কেল্লার কাছে বিস্ফোরণের ঘটনায় গাড়িচালক উমর নবীর জম্মু ও কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলার বাড়িটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। বিস্ফোরণের ঘটনায় তাঁকে সন্দেহ করছে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী।

ভারতের নিরাপত্তা বাহিনী আজ শুক্রবার বলেছে, বৃহস্পতিবার রাতে এবং শুক্রবার ভোরের মধ্যে সন্দেহভাজন চালক উমরের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার কাজ শেষ করা হয়েছে।

দিল্লির গাড়ি বিস্ফোরণ মামলার তদন্ত চলার মধ্যে কাশ্মীর, হরিয়ানা, দিল্লি এবং উত্তর প্রদেশের একাধিক সংস্থা তথ্যের সূত্রগুলো মেলাতে কাজ করছে। গতকাল বৃহস্পতিবার জম্মু-কাশ্মীরের একজন মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক এবং একজন ছাত্রসহ আরও দুজনকে উত্তর প্রদেশ থেকে আটক করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় মোদি সরকার ফরিদাবাদের আল-ফালাহ ইউনিভার্সিটির সব নথিপত্রের ফরেনসিক নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের দাবি, লাল কেল্লার কাছে বিস্ফোরণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা বা কাজ করতেন।

দিল্লি পুলিশ লাল কেলার কাছে বিস্ফোরিত হওয়া গাড়িটির চালক উমর নবীর শেষ কয়েক ঘণ্টার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেছে। ৫০টির বেশি সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে তাঁর গতিবিধি চিহ্নিত করা হয়েছে। ওই বিস্ফোরণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৩ জন নিহত হয়েছেন।

উত্তর প্রদেশসহ ভারতের বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে এমনকি কেন্দ্রীয় মোদি সরকার নানা অজুহাতে মুসলিমদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বশেষ কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন মুসলিমদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় মোদি সরকার।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-14%2Fb9wouarf%2FKashmir.png?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
কাশ্মীরে গুড়িয়ে দেওয়া উমর নবীর বাড়ি। দ্য হিন্দুর স্ক্রিনশট

Wednesday, October 22, 2025

কাশ্মীর নিয়ে লেখা বইয়ে ভারতের কেন এত ভয় by অনুরাধা ভাসিন

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বিশেষ মর্যাদা (ভারতের সংবিধানের ৩৭০ ধারা) বাতিল করে দেয়। রাজ্যটিকে দুটি ভাগে ভাগ করে সরাসরি নয়াদিল্লির নিয়ন্ত্রণাধীন কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদায় নামিয়ে আনা হয়।

কয়েক দিন আগে ওই ঘটনার ছয় বছর পূর্তির আগমুহূর্তে অঞ্চলজুড়ে নতুন করে বিভক্তি বা প্রশাসনিক পরিবর্তনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। শ্রীনগরের আকাশে যুদ্ধবিমানের অস্বাভাবিক ওড়াউড়ি দেখে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এতে ২০১৯ সালের ৫ আগস্টের আগে কাশ্মীরের আকাশে যুদ্ধবিমানের ওড়াউড়ি দেখে মানুষের মনে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, সেই ভয়ংকর স্মৃতি ফিরে আসে। কী ঘটতে যাচ্ছে, ভেবে সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

ছয় বছর পূরণের দিনে সরকার হঠাৎ ঘোষণা দেয়, জম্মু ও কাশ্মীরের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে লেখা ২৫টি বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারের অভিযোগ, এসব বই ‘মিথ্যা বয়ান’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ প্রচার করছে। কিন্তু অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করা হয়নি।

এসব বইয়ের মধ্যে আমার লেখা একটি বই আছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে হারপারকলিন্স থেকে প্রকাশিত বইটির শিরোনাম আ ডিসম্যান্টেলড স্টেট: দ্য আনটোল্ড স্টোরি অব কাশ্মীর আফটার আর্টিকেল ৩৭০। বইটি ২০১৯ সালের পরের কাশ্মীরের বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। বইটি মাঠপর্যায়ের গবেষণা, বিস্তৃত সাক্ষাৎকার এবং নানান তথ্যসূত্রের ওপর ভিত্তি করে লেখা। এটি সরকারের প্রচার করা ‘স্বাভাবিক পরিস্থিতি’র দাবি ভেঙে দেয়।

সরকার ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার পদক্ষেপকে ন্যায্যতা দিয়েছিল এই বলে যে এতে শান্তি ও উন্নয়ন আসবে; কিন্তু তারা যে নজিরবিহীন ফিজিক্যাল ও সাইবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল এবং তিনজন মুখ্যমন্ত্রীসহ ভারতীয় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বহু রাজনীতিক ও হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করেছিল, তা গোপন করেছে। কাঁটাতার আর সামরিক ব্যারিকেডে কাশ্মীরকে কারফিউ অঞ্চলে পরিণত করা হয়েছিল। ফোন ও ইন্টারনেট সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ছয় মাস পরে আংশিক ইন্টারনেট চালু হলেও দমন-পীড়ন আরও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাংবাদিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মী, মানবাধিকারকর্মীদের ওপর অভিযান তীব্র হয়েছিল। জননিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইন (এই আইনে বিনা অভিযোগে দুই বছর পর্যন্ত আটক রাখা যায়) ব্যবহার করে ব্যাপক ধরপাকড় চালানো হয়েছিল।

এই বাস্তবতার খুব কমই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেত। স্থানীয় পত্রিকাগুলো দমন-পীড়নের শিকার হয়েছে। যারা সরকারের সঙ্গে তাল মেলায়নি, তাদের আর্থিকভাবে চেপে ধরা হয়, বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলো বন্ধ হয়ে যায়। যারা মানিয়ে নিয়েছিল, তারা সরকারি বিজ্ঞাপন পেয়ে বেঁচে ছিল; তবে তারা বেঁচে ছিল সাংবাদিকতা ছাড়া।

এভাবে পত্রিকাগুলো হয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, নয়তো ভয় পেয়ে চুপ হয়ে যায়। সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তোলা বন্ধ করে দেন। কিছু পত্রিকার সমৃদ্ধ আর্কাইভ (যা কাশ্মীরের প্রতিদিনের জটিল ইতিহাস ধরে রাখত) সরিয়ে ফেলা হয় বা আর দেখা যায় না।

গত ছয় বছরে সরকার কোনো সমালোচনা সহ্য করেনি। সামান্য বিরোধী মত পেলেই শুরু হয় ভয় দেখানো, জিজ্ঞাসাবাদ, ডিভাইস বাজেয়াপ্ত, আয়কর বা মানি লন্ডারিং মামলা, সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ এবং কখনো স্বল্প বা দীর্ঘমেয়াদি আটক। স্থানীয় সাংবাদিকতা সরকারের জনসংযোগ দপ্তরের দালালে পরিণত হয়। নাগরিক সমাজের সব কণ্ঠ দমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তথ্যের বড় শূন্যতা তৈরি হয়।

এই শূন্যতা পূরণ করাই ছিল আমার বইয়ের উদ্দেশ্য। ১২টি অধ্যায়ে আমি ৩৭০ ধারা বিলোপের পর প্রথম দুই বছরের চিত্র তুলে ধরেছি। বেড়ে চলা দমননীতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংকোচন, বিরোধী মতকে অপরাধী করা, সরকারের শান্তি ও স্বাভাবিকতার দাবির বিপরীতে সন্ত্রাসবাদের অব্যাহত উপস্থিতি সেখানে তুলে ধরেছি।

এটি ছিল সত্যের অনুসন্ধান। এটি ছিল নগ্ন সত্য, যা সরকারের বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করেছে। একটি আতঙ্কগ্রস্ত রাষ্ট্র, যে কেবল সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে, বাসিন্দাদের দমন করে এবং সব বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করে কাশ্মীরে তার নিয়ন্ত্রণ চালায়, তারা আমার কাজে অস্বস্তি বোধ করেছিল। আমার বই সরকারকে সতর্ক করেছিল—এই নিয়ন্ত্রণনীতি, পুলিশ ও নজরদারি রাষ্ট্র গড়ে তোলা এবং ভুল উন্নয়ন মডেল টেকসই নয়, এটি ব্যর্থ হবে।

গত ছয় বছরে সরকার বিশ্বের চোখে ধুলা দিয়ে এসেছে। তারা দাবি করেছে, তারা শান্তি, স্বাভাবিকতা, পর্যটন ও উন্নয়ন এনেছে; কিন্তু এ বছরের ২২ এপ্রিল ২৬ জন নিরপরাধ বেসামরিক লোকের হত্যাকাণ্ড সেই বুদ্‌বুদ ফাটিয়ে দিয়েছে। এটি সরকারের জন্য কাশ্মীর নীতি পুনর্বিবেচনা করার সতর্কবার্তা ছিল।

কিন্তু তারা উল্টো দমন বাড়িয়েছে। কাশ্মীরিদের অপদস্থ করা, নির্বিচার আটক করা, বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ এই সময়েই কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদের প্রকাশ্য নিন্দা হয়েছে। মোমবাতি প্রজ্বলিত হয়েছে। সহিংসতা বর্জনের ডাক দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী ব্যক্তিরাও জানিয়েছিলেন, এই হত্যাকাণ্ডে বিদেশি জঙ্গিরা জড়িত, স্থানীয় ব্যক্তিরা নয়।

গত তিন মাসে সরকার দেখিয়েছে, কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা ও সর্বব্যাপী নজরদারির নীতি আরও তীব্র হবে। ২৫টি বইয়ের নিষেধাজ্ঞা (যার অনেকগুলোই গবেষণাসমৃদ্ধ, বহুমাত্রিক ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও আইনভিত্তিক রচনা) এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। এর মাধ্যমে বিকল্প বয়ান ও ভিন্ন স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে।

সরকার বিরোধী মত বা সরকারি বয়ানের সঙ্গে না মেলা সবকিছুকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে এখন এই বই বাজেয়াপ্ত ও ধ্বংস করতে পারবে। শুধু লেখাই নয়, পড়াকেও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলা হবে। এতে হয়তো চিন্তা ও স্মৃতি পুরোপুরি দমন করা যাবে না; কিন্তু মানুষ কী লিখবে ও পড়বে, তা আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

অনুরাধা ভাসিন, কাশ্মীর টাইমস–এর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
- আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা রদ করে ভারত সরকার। জম্মু-কাশ্মীর ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। কাশ্মীরকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে এক কাশ্মীরি। শ্রীনগর, কাশ্মীর,
জম্মু-কাশ্মীরের রাজ্যের মর্যাদা রদ করে ভারত সরকার। জম্মু-কাশ্মীর ভেঙে দ্বিখণ্ডিত করা হয়। কাশ্মীরকে অবরুদ্ধ করে রাখার প্রতিবাদে এক কাশ্মীরি। শ্রীনগর, কাশ্মীর, ফাইল ছবি: রয়টার্স

Saturday, October 4, 2025

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে আবার কেন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ল

আল জাজিরার এক্সপ্লেইনারঃ পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে থমথমে পরিস্থিতি। গতকাল বৃহস্পতিবার ওই অঞ্চল টানা চতুর্থ দিনের মতো অচল ছিল। গত কয়েক দিনে সেখানে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন পুলিশ কর্মকর্তাও আছেন।

কেন্দ্রীয় সরকার একটি আলোচক কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটির সদস্যরা গতকাল পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের রাজধানী মুজাফফরাবাদ পৌঁছেছেন। কমিটি আলোচনার মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএএসি) সঙ্গে বৈঠক করবে। জেএসিসি হলো এমন একটি সংস্থা, যা ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজভিত্তিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিত্ব করছে। এটি পুরো অঞ্চলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত।

অধিকারকর্মী শওকত নওয়াজ মীরের নেতৃত্বে জেএএসি গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে এমন অচলাবস্থা শুরু করেছে। এতে পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের (আজাদ কাশ্মীর) অনেক জায়গা পুরোপুরি থমকে গেছে। কাশ্মীর সরকার ইতিমধ্যে পুরো যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা মুঠোফোন ও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন না।

মুজাফফরাবাদে যেসব বাজার জমজমাট থাকে, সেগুলো এখন সম্পূর্ণ বন্ধ। রাস্তার পাশে যাঁরা পণ্য বিক্রি করেন, তাঁদেরও উপস্থিতি নেই। এমনকি রাস্তায় গণপরিবহনও চলছে না। এই স্থবিরতার কারণে সেখানকার প্রায় ৪০ লাখ মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

আজাদ কাশ্মীর সরকার এক বিবৃতিতে বলেছে, কর্তৃপক্ষ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে থাকা ‘প্রচার’ ও ‘ভুয়া খবর’-এর প্রভাবে বিভ্রান্ত না হতে জনগণের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে তারা। তাদের দাবি, নির্দিষ্ট কোনো অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে এমনটা করা হচ্ছে।

গত দুই বছরে এ নিয়ে তৃতীয় দফা বড় বিক্ষোভে নেমেছে জেএএসি। সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় তাদের ৩৮ দফা দাবির ব্যাপারে কোনো সমঝোতা হয়নি। সে কারণেই নতুন করে এই আন্দোলন শুরু হয়েছে।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের স্থানীয় সরকার ও তৃণমূলভিত্তিক আন্দোলনের দীর্ঘ দুই বছরের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বর্তমান এ সংকট তৈরি হয়েছে। এ সময়ে আন্দোলনকারীরা একাধিকবার রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছে।

কীভাবে বিক্ষোভ ছড়াল

২০১৭ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে জনসংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। এখানকার প্রশাসন আংশিক স্বায়ত্তশাসিত, যার নিজস্ব প্রধানমন্ত্রী ও আইনসভা রয়েছে।

বর্তমান অস্থিরতার মূল শিকড় ২০২৩ সালের মে মাসে। তখন প্রথমবারের মতো বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মানুষ রাস্তায় নেমেছিল। একই সঙ্গে ভর্তুকিপ্রাপ্ত গমের তীব্র ঘাটতি এবং ব্যাপক হারে আটা পাচারের অভিযোগও সামনে আসে।

২০২৩ সালের আগস্ট নাগাদ এসব বিচ্ছিন্ন অভিযোগ একত্র হয়ে সংগঠিত প্রতিরোধে রূপ নেয়। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে কয়েক শ কর্মী মুজাফফরাবাদে জড়ো হয়ে জেএএসি গঠন করেন। সেখানে অঞ্চলটির সব এলাকার প্রতিনিধিরা জড়ো হন।

এ আন্দোলন বড় আকার ধারণ করে ২০২৪ সালের মে মাসে। বিক্ষোভকারীরা মুজাফফরাবাদের দিকে দীর্ঘ মিছিল শুরু করলে সহিংস সংঘর্ষ হয়। এতে কমপক্ষে পাঁচজন নিহত হন। এর মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তাও ছিলেন।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো মেনে নেওয়ার পরই শুধু সহিংস বিক্ষোভ শেষ হয়। সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে খাবার ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে কোটি কোটি রুপি ভর্তুকি দেওয়া হয়।

তবে শান্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের আগস্টে জেএএসি ঘোষণা করেছে, তারা নতুন করে আন্দোলন শুরু করবে। এবার তাদের প্রতিবাদ শুধু অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

বিক্ষোভকারীরা কেন অসন্তুষ্ট

জেএএসির পক্ষ থেকে করা ৩৮ দফা দাবির মধ্যে আছে—বিনা মূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং প্রদেশের আইনসভা কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে বড় অবকাঠামো প্রকল্প চালু করা। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি হলো ‘ক্ষমতাসীন অভিজাতদরে বিশেষ সুবিধা’ বিলুপ্ত করা। এ দাবিটি আগের বিক্ষোভের সময়ও বারবার করা হয়েছে।

জেএএসি বলেছে, ২০২৪ সালের মে মাসে বিক্ষোভের পর সরকার উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য প্রদত্ত বিশেষ সুবিধাগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি বিচারিক কমিশন গঠন করার ঘোষণা দিয়েছে।

মন্ত্রীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য দেওয়া সরকারি সুবিধার মধ্যে রয়েছে—দুটি সরকারি গাড়ি, ব্যক্তিগত সহকারী ও নিরাপত্তা প্রহরী এবং সরকারি কাজে ব্যবহৃত গাড়ির জন্য সীমাহীন জ্বালানি।

জেএএসির দাবির তালিকায় এবার প্রথমবারের মতো দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। তা হলো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের আইনসভায় শরণার্থীদের জন্য নির্ধারিত ১২টি সংরক্ষিত আসন বিলোপ করা।

জেএসিসির ভাষ্য অনুযায়ী, শরণার্থী ও তাঁদের সন্তানেরা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে এসে বসতি গড়েছেন। আর এখন তাঁরা শক্তিশালী রাজনৈতিক জোট তৈরি করছেন এবং উন্নয়ন তহবিলের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন।

জেএএসির দাবির তালিকায় ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বিক্ষোভ চলাকালে আটক কর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করার কথাও বলা হয়েছে। কর ছাড়, কর্মসংস্থানের উন্নয়ন এবং পরিকাঠামোগত প্রকল্প চালুর দাবিও এর অন্তর্ভুক্ত।

পার্বত্য অঞ্চলকে পাকিস্তানের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত করবে—এমন নতুন সেতু ও সুড়ঙ্গ নির্মাণ করতে চায় কমিটি।

মুজাফফরাবাদে বর্তমানে একটি বিমানবন্দর থাকলেও তা বছরের পর বছর কার্যক্রমবিহীন। তবে বিমানবন্দরটি আবার চালু করার জন্য চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একটি কমিটি গঠন করেছেন। অঞ্চলটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মিরপুরে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের সম্ভাব্যতা পরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সরকার কী করছে

স্থানীয় প্রশাসন যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ করেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি আধা সামরিক বাহিনী ও পাকিস্তানের অন্য অঞ্চল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

জেএএসি এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছে। জেএএসির নেতা শওকত নওয়াজ মীর সাংবাদিকদের বলেছেন, স্থানীয় পুলিশ ইতিমধ্যেই দায়িত্বে থাকায় পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ড থেকে আধা সামরিক বাহিনীর কোনো প্রয়োজন নেই।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অর্থমন্ত্রী আবদুল মজিদ খান বলেছেন, প্রথম দফার আলোচনা শেষ হওয়ার পরও নতুন একটি কমিটি মুজাফফরাবাদে এসেছে। তারা বিশেষভাবে বিক্ষোভকারীদের দাবির সমাধান করবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘গত বছর আন্দোলন শুরু হওয়ার সময় দাবি ছিল মূলত বিদ্যুৎ ও আটার দাম নিয়ে, যা আমরা মেনে নিয়েছি। তবে তাদের বুঝতে হবে, সবকিছু রাতারাতি সম্ভব নয় এবং এতে সময় লাগে।’

তবে খান স্বীকার করেছেন, সরকার জেএএসির ৩৮ দফা দাবির অধিকাংশ মেনে নিলেও আলোচনায় দুটি বিতর্কিত বিষয় এখনো মীমাংসা হয়নি। সেগুলো হলো শরণার্থীদের জন্য ১২টি সংরক্ষিত আসন বিলোপ এবং ক্ষমতাসীন অভিজাতদের বিশেষ সুবিধা বাতিল করা।

দেশভাগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বাতিল করার যৌক্তিকতা নিয়ে মন্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা সেই মানুষদের পরিবার, যারা ভারত থেকে পাকিস্তানে এসেছে। সেখানে তারা জমিদার ও ব্যবসায়ী ছিল, কিন্তু সব সম্পদ পেছনে ফেলে এখানে এসে দারিদ্র্যের জীবন শুরু করতে হয়েছে। তবু জেএএসি মনে করে, তাদের জন্য সংরক্ষিত আসন দেওয়া অন্যায়। যদি আমরা এদের অধিকার না দিই, তবে তারা কেন এত কষ্ট করে এখানে এল?’

মন্ত্রী নিজেই সেই ২৭ লাখ মানুষের মধ্যে একজন, যাদের পরিবার ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে আজাদ কাশ্মীরে এসেছে।

মজিদ খান নতুন বিক্ষোভের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, জেএএসির আগের বেশির ভাগ দাবি ইতিমধ্যেই পূরণ হয়েছে। অনেক চলমান সমস্যার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ইসলামাবাদ থেকে ফেডারেল তহবিল নিতে হয়।

এরপর কী হবে

গতকাল কোনো সমাধান ছাড়াই সরকারি প্রতিনিধি এবং জেএএসির সদস্যদের মধ্যকার প্রথম দফার আলোচনা শেষ হয়। আজ শুক্রবার পরবর্তী দফার আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

উভয় পক্ষই প্রকাশ্যে সংলাপে যুক্ত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে বারবার প্রতিশ্রুতি এবং হতাশার চক্রের পর গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

জেএএসি বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পরও সরকার দাবি করছে, তারা বেশির ভাগ দাবি পূরণ করেছে। সংবিধান ও নির্বাচনী সংস্কারের জন্য আইনসভায় প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যা এক দিনে সম্ভব নয়।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আলোচনা থেকে যথাযথ অগ্রগতি হলে সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল পরিষেবা দ্রুত পুনঃস্থাপন করবে, যা ‘মাঠের পরিস্থিতির কারণে সীমিত রাখা হয়েছিল’।

আবদুল মজিদ খান ইঙ্গিত দিয়েছেন, আলোচনার ক্ষেত্রে গঠনমূলক অগ্রগতি হবে। ইন্টারনেট ও মোবাইল সেবা পুনঃস্থাপন করতে সরকার খুব দ্রুতই পদক্ষেপ নেবে।

মজিদ খান বলেন, ‘মুজাফফরাবাদে আলোচনা কমিটি উপস্থিত থাকায় আমি আশাবাদী। শিগগিরই এই স্থবির অবস্থার সমাধান হবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-03%2Ff3z8neni%2FKashmir-1.webp?rect=0%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
মুজাফফরাবাদে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি ছুড়ছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। ১ অক্টোবর, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

Thursday, October 2, 2025

কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত রাখলেন লাদাখের নেতারা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

লাদাখের আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা কেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করে দিলেন। তাঁরা বলেছেন, ২৪ সেপ্টেম্বরের সহিংসতার জন্য কারা দায়ী, তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। সেই তদন্তের ভার দিতে হবে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত কোনো বিচারপতিকে।

একই সঙ্গে আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, ম্যাগসাইসাই পুরস্কারপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ, প্রকৌশলী ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকসহ গ্রেপ্তার করা সবার নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

সোনম ওয়াংচুককে কেন্দ্রীয় সরকার ‘পাকিস্তানি চর’ বলেছে। বলেছে, জনতাকে তিনিই সহিংসতায় উসকানি দিয়েছেন। তাঁকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

লেহ্‌ অ্যাপেক্স বডির (ল্যাব) চেয়ারম্যান থুপস্টান ছেওয়াং ও কো-চেয়ারম্যান শেরিং দোরজি গতকাল সোমবার আলোচনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও গ্রেপ্তার করা সবাইকে মুক্তি না দেওয়া পর্যন্ত তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দাবিদাওয়া নিয়ে আলোচনায় অংশ নেবেন না।

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী–অধ্যুষিত লেহ্‌র আন্দোলনকারী নেতাদের এ সিদ্ধান্তকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছেন মুসলিমপ্রধান কারগিলের নেতারা। কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (কেডিএ) নেতা সাজ্জাদ কারগিলি একই দিন সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেন, ল্যাবের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁরা সম্পূর্ণ একমত। তাঁদেরও দাবি, ওয়াংচুকসহ গ্রেপ্তার করা সবাইকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

সাজ্জাদ কারগিলি বলেন, পৃথক রাজ্যের মর্যাদা ও লাদাখকে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত করার দাবি নিয়ে কোনোরকম আপস সম্ভবপর নয়। ল্যাব ও কেডিএ এই বিষয়ে অনড় থাকবে। দাবি না মেটা পর্যন্ত তাঁরাও আলোচনা স্থগিত রাখার পক্ষে।

লাদাখের দুটি জেলা। লেহ্‌ ও কারগিল। ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত এ ধূসর পার্বত্য অঞ্চলের বাসিন্দারা বৌদ্ধ ও মুসলমান। জনসংখ্যা মাত্র তিন লাখ। পৃথক রাজ্যের মর্যাদা ও ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার দাবিতে দুই সম্প্রদায়ই একমত। এ ছাড়া তাঁরা চান স্থানীয় লোকজনের চাকরির জন্য এক পৃথক পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন ও লোকসভায় আরও একটি আসন বৃদ্ধি। বর্তমানে গোটা লাদাখের জন্য লোকসভায় আসন রয়েছে একটি।

ল্যাবের সিদ্ধান্ত ও তাকে কেডিএ সমর্থন জানানোর পর গতকাল রাতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক বিবৃতি জারি করা হয়। তাতে বলা হয়, আলোচনার জন্য সরকারের দরজা খোলা থাকছে। কেন্দ্রীয় সরকারের গড়ে দেওয়া উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটির সঙ্গে আলোচনায় ইতিমধ্যে অনেক বিষয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। সরকার চায়, আলোচনা অব্যাহত থাকুক।

আগামী ৬ অক্টোবর সেই আলোচনার পরবর্তী দিন। কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বরের সহিংসতায় চারজনের মৃত্যু, বহু মানুষের আহত হওয়া ও সোনম ওয়াংচুকসহ অনেকের গ্রেপ্তার পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। লেহ্‌তে এখনো কারফিউ চলছে। যদিও কয়েক ঘণ্টার জন্য তা শিথিল করা হচ্ছে।

ল্যাব নেতা থুপস্টান ছেওয়াং ও শেরিং দোরজি এবং কেডিএ নেতা সাজ্জাদ কারগিলি দৃঢ়ভাবে জানিয়েছেন, এত দিন ধরে চলা আন্দোলন একমুহূর্তের জন্যও অশান্ত হয়নি। সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলনের শক্তি শান্তিপূর্ণ সত্যাগ্রহ, অনশন। তিনিও সব লাদাখির মতোই শান্তিপ্রিয় মানুষ, গান্ধীবাদী। কাজেই ২৪ সেপ্টেম্বর সহিংসতার জন্য কারা প্রকৃত দায়ী, তা জানা দরকার।

এই নেতারা বলেন, আন্দোলনের পেছনে ‘বিদেশি হাত’ থাকার অভিযোগ নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। লাদাখ অত্যন্ত স্পর্শকাতর এলাকা। এখানকার প্রত্যেক মানুষ দেশপ্রেমিক। লাদাখের দুই দিকে দুই দেশের সীমান্ত। কারগিলের দিকে পাকিস্তান, চীনের দিকে লাদাখের পূর্বাঞ্চল। যুদ্ধের সময় সেনাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লাদাখিরা লড়াই করেছেন। তাঁরা জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ। সেই মানুষদের ‘বিদেশি’ তকমা দেওয়ার অর্থ তাঁদের বিপথচালিত করার চেষ্টা।

সাজ্জাদ কারগিলি বলেছেন, তাঁরা পৃথক রাজ্যের দাবি তুলেছেন বিধানসভা পাবেন বলে। পৃথক রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া সম্ভব না হলে অন্তত বিধানসভা দেওয়া হোক; যাতে গণতান্ত্রিক অধিকার পাওয়া যায়, বর্তমানে তা নেই। যাবতীয় সিদ্ধান্ত ছয় বছর ধরে কেন্দ্রই নিচ্ছে।

লাদাখি নেতারা জানাচ্ছেন, ৩৭০ অনুচ্ছেদ থাকাকালীন তাঁরা অন্যদের অধীন ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের স্বাতন্ত্র্য বজায় ছিল, জনবিন্যাসে পরিবর্তন ঘটেনি। ৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহার করার পর তাঁরা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পেলেও স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলছেন। জনজাতি এলাকায় যেকেউ এসে জমি কিনছেন, জনবিন্যাসে পরিবর্তন ঘটিয়ে ফেলছেন। এটা রুখতেই তাঁরা ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত হওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।

আন্দোলনকারী নেতারা বলেছেন, ভোটের সময় বিজেপি নিজেই এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। অথচ এখন সরকার তা গায়েই মাখতে চাইছে না। লাদাখের জনগণ মনে করছেন, তাঁদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হচ্ছে।

লেহ্‌র সড়কে বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা। অদূরে অগ্নিসংযোগ করা পুলিশের গাড়ি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে
লেহ্‌র সড়কে বিক্ষোভকারী ব্যক্তিরা। অদূরে অগ্নিসংযোগ করা পুলিশের গাড়ি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে। ছবি: এএফপি

Wednesday, August 27, 2025

জম্মু-কাশ্মীরে ভূমিধস–হড়পা বান, ভূমিধসে নিহত ৩০

অবিরাম অঝোরধারায় বৃষ্টিতে ভূমিধস ও হড়পা বানে জম্মু–কাশ্মীরের জনজীবন বিপর্যস্ত। গতকাল মঙ্গলবার রাতে জম্মুতে বৈষ্ণোদেবী যাত্রাপথে ধস নামায় অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ২৩ জন। জম্মুর রিয়াসি জেলার এসএসপি পরমবীর সিং আজ বুধবার এই খবর জানিয়ে বলেছেন, ভারী বৃষ্টির দরুন উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে। ধসের নিচে মোট কতজন আটকে রয়েছেন, এখনই বলা যাচ্ছে না।

এবার গোটা উত্তর ভারতে অভাবনীয় বৃষ্টি হচ্ছে। হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখন্ড ও জম্মু–কাশ্মীরজুড়ে প্রকৃতির তাণ্ডব চলছে। প্রায় প্রতিদিনই হয় ভূমিধস নতুবা হড়পা বানে ভেসে যাচ্ছে জনপদ। মৃত্যু হচ্ছে মানুষ ও গবাদিপশুর। ভেঙে যাচ্ছে ঘরবাড়ি। ক্ষতি হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি ও ফসলের। প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের কারণে যোগাযোগব্যবস্থাও ভেঙে পড়েছে। রাস্তাঘাটের হাল শোচনীয়। বেশ কিছু সেতু ভেঙে গেছে। উপড়ে পড়েছে বিদ্যুতের খুঁটি। মোবাইল টাওয়ার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পানীয় জলের পাইপলাইনের।

জম্মু–কাশ্মীরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে তিন দিন ধরে। জম্মুর পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। এই অঞ্চলের ডোডা, কিস্তোয়ার, সাম্বা, কাটরা, রিয়াসি, উধমপুর ও জম্মু জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত। প্রতিটি নদী বইছে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে। বহু স্থানে হড়পা বানে ভেসে গেছে জনপদ। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস, আরও দুই–তিন দিন এমন বর্ষা চলবে।

বৈষ্ণোদেবী যাত্রাপথে গতকাল মঙ্গলবার প্রথম ধস নামে দুপুরে। পরে রাতে। বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী আগে থেকে তৈরি ছিল। ধসের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় উদ্ধারকাজ। সেই কাজে হাত লাগায় সেনাবাহিনীও। কিন্তু প্রবল বৃষ্টিতে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হতে থাকে।

গতকাল রাত পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার মানুষকে নিরাপদে সরানো হয়েছে। তাঁদের অস্থায়ী ত্রাণশিবিরে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসাশিবির খোলা হয়েছে। গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বৈষ্ণোদেবী মন্দির কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার রাতেই যাত্রা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার কথা জানিয়েছে।

হিমাচল প্রদেশের মানালির অবস্থাও শোচনীয়। বিপাশা নদীর প্লাবনে ভেসে গেছে শহরের বহু এলাকা। ভেঙে গেছে এক বহুতল হোটেলসহ বেশ কিছু দোকানঘর। মানালি–লেহ্ সড়কের বহু এলাকা প্লাবিত। আটকে রয়েছে বহু গাড়ি। স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন।

বিপর্যয়ের কারণে জম্মু–কাশ্মীরে রেল পরিষেবা বন্ধ হয়ে গেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবহাওয়ার উন্নতি ও ভেঙে যাওয়া রেললাইন মেরামত না হওয়া পর্যন্ত ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে। বিপর্যয়ের কারণে বিমান পরিষেবাও ব্যাহত হচ্ছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-27%2Fv9v3m2re%2Fjammu-kashmir.jpg?rect=0%2C0%2C5464%2C3643&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ভারতের জম্মুতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার পর পানিতে প্লাবিত হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি মন্দির। ২৬ আগস্ট, জম্মু। ছবি: এএফপি

Monday, August 25, 2025

সন্ধিক্ষণে দক্ষিণ এশিয়া: কোন পথে ভারত-পাকিস্তান by আসিম সাজ্জাদ আখতার

প্রায় আট দশক আগে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে। এর মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ইতিহাসের সেই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের সামনে নতুন সুযোগ খুলে গিয়েছিল।  ভেবেছিলাম, হয়তো আমরা নিজেদের ভাগ্য নতুনভাবে গড়তে পারব। কিন্তু সেই আশার অনেকটাই ভেস্তে গেছে; বরং দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের মূল সুর হয়ে উঠেছে সন্দেহ, শত্রুতা আর যুদ্ধের হুমকি।

আজ আমরা যখন প্রায় ৮০ বছরের সেই ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাই, তখন দেখতে পাই, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের জট শুধু বেড়েছেই। এর সঙ্গে নতুন নতুন ঝামেলা যোগ হয়েছে। জাতীয়তাবাদী রাজনীতি, ধর্মীয় উগ্রতা এবং সামরিকতাবাদ উভয় রাষ্ট্রের ভেতরে শক্তভাবে শিকড় গেড়েছে।

তরুণ প্রজন্ম, যাদের হাতে ভবিষ্যৎ, তারাও এই ঘৃণার রাজনীতির প্রভাবে বড় হচ্ছে। তারা পারস্পরিক ইতিহাস, যৌথ ঐতিহ্য বা ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবতে চায় না। যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের উত্তেজনা তাদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। এ এক ভয়াবহ বাস্তবতা। তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার এই বৃহত্তম ও জনবহুল অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? বিশ্লেষকেরা অন্তত তিনটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরেন।

প্রথম এবং সবচেয়ে সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো বর্তমানের ধারাবাহিকতা। ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি আরও গভীরভাবে সমাজে প্রভাব ফেলবে। বিজেপি, আরএসএস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মতো সংগঠনগুলো কেবল রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ও সাংস্কৃতিক পরিসরেও আধিপত্য বিস্তার করবে।

পাকিস্তানে সামরিক প্রভাব বা ‘খাকিরাজ’ আরও শক্ত হবে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো কার্যত সেনাশক্তির ছায়াতলে কাজ করবে। একই সঙ্গে ধর্মীয় ডানপন্থী শক্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রভাব বাড়াবে। এই প্রক্রিয়ায় দুই রাষ্ট্রই তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াই কিংবা জাতীয় ঐক্যের নামে আরও বেশি ক্ষমতা নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করবে। ফলাফল হবে, ঘৃণার রাজনীতি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা।

দ্বিতীয় সম্ভাবনা কিছুটা আশার আলো দেখায়। ভারতে হয়তো কংগ্রেস বা তাদের সহযোগীরা আবারও ক্ষমতায় আসতে পারে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের কিছু প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টা করতে পারে। পাকিস্তানেও রাজনৈতিক দলগুলো সেনাশাসনের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়তে পারে, যা অন্তত কিছু সময়ের জন্য শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেবে। কিন্তু এ আশাও সীমিত। কারণ, এই মধ্যপন্থী বা উদারপন্থী শক্তিগুলো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন কোনো দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে না। তারা একই উন্নয়ন মডেলের সঙ্গে যুক্ত, যা কিনা ভোগবাদ, পরিবেশবিধ্বংস আর বৈষম্যকে আরও বাড়ায়। ফলে তাদের নেতৃত্বও দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয়ে উঠতে পারে না। একসময় আবারও উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সামরিকতাবাদী শক্তিই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

তৃতীয় সম্ভাবনা সবচেয়ে কম বাস্তবসম্মত হলেও সবচেয়ে জরুরি। সেটি হলো সাধারণ মানুষের ঐক্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা প্রগতিশীল রাজনীতি। দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমজীবী মানুষ, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে যদি নতুন ধরনের রাজনৈতিক জোট গড়ে ওঠে, তবে স্থায়ী শান্তি ও সহযোগিতার পথ খোলা যেতে পারে। এর জন্য দরকার একটি বিকল্প অর্থনৈতিক দর্শন, যেখানে অগ্রাধিকার পাবে জনগণের মৌলিক চাহিদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান। বহুজাতিক কোম্পানি, ধনী ব্যবসায়ী বা সামরিক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা নয়, জনগণের কল্যাণই হবে মূল লক্ষ্য।

এই বিকল্প ভবিষ্যতের আরেকটি অপরিহার্য শর্ত হলো পরিবেশ পুনর্গঠন। উপমহাদেশের পাহাড়, সমভূমি, নদী-নালা ও উপকূলীয় অঞ্চল দ্রুত ধ্বংস হচ্ছে। এই ধ্বংস কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতারও জন্ম দিচ্ছে। পরিবেশের এই সংকট সমাধান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়।

তাই পরিবেশই হতে পারে নতুন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তবে এই ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের জন্য প্রগতিশীল শক্তিগুলোকে নতুন করে নিজেদের পুনর্গঠন করতে হবে। ভারতে হিন্দিভাষী অঞ্চলের আধিপত্য ভাঙতে হবে। কাশ্মীরি, নাগা, আদিবাসী ও দক্ষিণ ভারতের জনগণকে যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।

পাকিস্তানে বালুচ, পাখতুন, গিলগিট-বালতিস্তানি, কাশ্মীরি, সিন্ধি ও সারায়েকি জনগণের জাতীয় প্রশ্নকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি পাঞ্জাব ও অন্যান্য শহুরে অঞ্চলে শ্রেণিভিত্তিক রাজনীতি জোরদার করতে হবে।

সবশেষে, দক্ষিণ এশিয়ায় একটি আঞ্চলিক চেতনা গড়ে তোলার বিকল্প নেই। লাদাখ, বালতিস্তান, দুই কাশ্মীর, সিন্ধ, রাজস্থান, দুই পাঞ্জাব, দুই পাশের পাখতুন অঞ্চল কিংবা বালুচ ও নাগাদের স্বার্থকে যদি একসঙ্গে দেখা হয়, তবে একটি যৌথ মানবিক ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। কেবল এভাবেই সাম্রাজ্যবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ আর আগ্রাসনকে ইতিহাসের আবর্জনার স্তূপে পাঠানো যাবে।

আজ দক্ষিণ এশিয়ার সামনে প্রশ্ন একটাই, আমরা কি ঘৃণার রাজনীতিকে স্থায়ী করতে চাই, নাকি সাধারণ মানুষের ঐক্য আর শান্তিকে সামনে নিয়ে আসব? সময়ের দাবি হলো দ্বিতীয় পথটি বেছে নেওয়া। কারণ, যুদ্ধ নয়, সহযোগিতা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমেই প্রায় ২০০ কোটি মানুষের এই অঞ্চল টেকসই ভবিষ্যতের পথে এগোতে পারবে।

* আসিম সাজ্জাদ আখতার, ইসলামাবাদের কায়েদে আজম ইউনিভার্সিটির শিক্ষক
- দ্য ডন থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ভারত–পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয় কাশ্মীরিদের
ভারত–পাকিস্তান সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয় কাশ্মীরিদের। ছবি: এএফপি