Thursday, January 14, 2016

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনায় ইরানেরও দায় আছে by মাইকেল স্টিফেন্স

সৌদি আরবে শিয়াদের ধর্মীয় নেতা শেখ নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষুব্ধ জনতা সৌদি দূতাবাসে হামলা চালায়। এ ঘটনার পর সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দুই পক্ষ থেকেই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। সে বিষয়েই দুটি লেখা প্রকাশিত হলো।
সৌদি আরব যে তেহরান থেকে নিজের কূটনীতিকদের ফিরিয়ে আনল এবং রিয়াদ থেকে ইরানি কূটনীতিকদের বহিষ্কার করল, তা মধ্যপ্রাচ্যের এ দুই বিবদমান শক্তির সম্পর্ক নিয়ে আমাদের মধ্যে আরও উদ্বেগের জন্ম দিল। ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান সময়-সুযোগ পেলেই ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোম্যাটিক রিলেশনস ভঙ্গ করে। তাদের দেশের বিক্ষুব্ধ জনতা এবারই প্রথম সেখানকার কোনো বিদেশি দূতাবাসে হামলা করল না, সাম্প্রতিক অতীতে ২০১১ সালে তেহরানের যুক্তরাজ্য দূতাবাসেও হামলা চালিয়েছিল তারা।
এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য তেহরানে নিজেদের দূতাবাস এবং লন্ডনে ইরানের দূতাবাসও বন্ধ করে দেয়। সেই অর্থে সৌদি আরব যে কাজ করল, তা কিন্তু মোটেও অস্বাভাবিক বা নজিরবিহীন নয়, এমনকি আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তা স্বাভাবিক রীতির বাইরে নয়। শিয়া নেতা শেখ নিমর এক বড় খেলার বলি হলেন। তিনি যদি জীবিত থাকতেন, তাহলে হয়তো এ খেলায় অংশ নিয়ে তিনি তা রোখারও চেষ্টা করতেন। ২০১১ সালের ৭ অক্টোবর তিনি এক কুখ্যাত ভাষণ দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, তাঁর সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বাইরের কেউ যেন নাক না গলায়, এই বক্তব্য তিনি যেমন খামেনিকে উদ্দেশ করে দিয়েছিলেন, তেমনি আল সৌদকে উদ্দেশ করেও দিয়েছিলেন।
ফলে লোকে যে বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি দেশ তাঁর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক ত্যাগ করেছে, ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সে রকম নয়। এমন কথা বললে তা স্ববিরোধী মনে হয়। নিমরের বন্ধুর তালিকায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা কিন্তু শান্তিকামী মানুষ নন। তাঁর ধর্মচিন্তার গুরু ছিলেন ইরাকের কট্টরপন্থী ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আয়াতুল্লাহ্ মুহাম্মদ আল হুসেইনি আল-সিরাজি, যাঁর সঙ্গে ইরানের কিছু অপ্রীতিকর শক্তির সম্পর্ক ছিল। তা ছাড়া নিমরের উল্লেখযোগ্য বন্ধুর তালিকায় ছিলেন আবদ আল-রউফ আল-সাহেব, তিনি বাহরাইনের নাগরিক। সম্প্রতি ব্রিটেনে তাঁর কাছ থেকে জিহাদি কার্যক্রমের সহায়ক উপাদান ও তথ্য পাওয়ার জন্য তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
কিন্তু কয়েকজন কুখ্যাত আল-কায়েদা সন্ত্রাসীর সঙ্গে শেখ নিমরকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে সৌদি আরব তাদের এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। সন্ত্রাসবাদ তো সন্ত্রাসবাদই, তা সে যে ঘরানারই হোক না কেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুতে শিয়া সম্প্রদায় যেভাবে খেপেছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যেকে ঠান্ডা করার সাধ্য কারও নেই। দেশ দুটির সম্পর্ক কেন এমন টান টান অবস্থায় গেল, তা বোঝা দরকার।
১০ মহররম তারিখে কারবালায় ইমাম হোসেনের মৃত্যুবার্ষিকীতে মাতম করা একধরনের রীতিতে পরিণত হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে শিয়া-সুন্নি বিভেদ সব সময়ই আছে। কিন্তু ব্যাপারটা পুরো সত্য নয়। কারণ গোষ্ঠীতন্ত্র কখনো কখনো তীব্র হয়, আবার কখনো কখনো স্তিমিত হয়। এই বর্তমান উত্তেজনা শুরু হয়েছে সেই ১৯৭৮ সালে, যখন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শিয়া-অধ্যুষিত প্রদেশে আল সৌদের বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। ইরানের আয়াতুল্লাহ্ এই বিদ্রোহের সদ্ব্যবহার করে ১৯৭৯ সালে ক্ষমতায় যান।
খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শুধু ধর্মীয় কারণে গোষ্ঠীবিবাদ শুরু হয়। এটা সাধারণত সাংস্কৃতিক বিবাদের সঙ্গে জড়াজড়ি করে আসে, সঙ্গে থাকে অন্য পক্ষের নৃশংসতা ও নিপীড়নের বয়ান। ইদানীং দেখা যাচ্ছে, উভয় পক্ষের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা একে অপরের বিরুদ্ধে আইএস তোষণের অভিযোগ করছেন। কিন্তু এতে শুধু গোষ্ঠীগত বিভাজনই তীব্র হয়।
ওদিকে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপ্রেক্ষিতে নিজ পরিচয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে পেরেছে। বাহরাইন সৌদি আরবের পথ অনুসরণ করে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করলেও কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তাকে অনুসরণ করেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বাঁধন একটু আলগা করলেও তা ছিন্ন করবে না। এমন সম্ভাবনা আছে যে কাতারও একই কাজ করবে। এদিকে কুয়েত তেহরানে নিযুক্ত নিজের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠালেও এ মুহূর্তে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করার চিন্তা করাও তার জন্য ক্ষতিকর হবে।
ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিলের পক্ষে দাঁড়াতে পারস্য উপসাগরে নিজের উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করবে। আঞ্চলিক বিবাদের সমাধান হিসেবে যুদ্ধ কোনো তরিকা নয়। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি এই উত্তেজনা প্রশমিত করতে চায়, তাহলে উপসাগরের উভয় পারের এই দুই দেশকে তাকে দেখিয়ে দিতে হবে, আসল কর্তা কে। সমস্যা হচ্ছে, এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের কারণেই প্রথমত এই আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। আর শান্তি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ করার ক্ষেত্রে ওবামা প্রশাসনের অনিচ্ছাও এর জন্য দায়ী।
এই দ্বন্দ্ব মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। কারণ রিয়াদ ও তেহরানকে ঝগড়া করা থেকে বিরত রাখার মতো নিরাপত্তা-মাতব্বর না থাকলে নিরাপত্তাহীনতা শুধু বাড়বেই, সঙ্গে বাড়বে প্রতিযোগিতা, আর আবশ্যকীয়ভাবে গোষ্ঠী বিবাদও বাড়বে। ২০১৬ সালটা মনে হয় ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ যাবে।
আল জাজিরা থেকে নেওয়া; অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
মাইকেল স্টিফেন্স: কাতারের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ফেলো গবেষক।

সামনের দিনগুলো যে কেমনে যাবে, শঙ্কায় রাব্বী

পুলিশের হাতে নির্যাতিত হয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের
কর্মকর্তা গোলাম রাব্বী। তাঁর পাশে এখন সহমর্মিতার
শত হাত। তবু শান্তি পাচ্ছেন না তিনি। মানসিক আঘাতে
বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল
কলেজ হাসপাতাল থেকে তোলা ছবি l প্রথম আলো
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা গোলাম রাব্বীর এখনো আতঙ্ক ও হতাশা কাটেনি। কেমন আছেন জানতে চাইলে বলেন, ‘আল্লাহ রাখছে ভালোই। কিন্তু ঘুমাইতে পারি না। সামনের দিনগুলো যে কেমনে যাবে?’
আজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে এভাবেই বলছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের যোগাযোগ ও প্রকাশনা বিভাগের এই কর্মকর্তা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আজ তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। রাতে ঘুম হয়নি। সকাল থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদকর্মীদের ভিড় লেগে ছিল। এ ছাড়া পুলিশের পক্ষ থেকে দফায় দফায় জেরার কারণে চরম বিরক্ত এই কর্মকর্তা।
গোলাম রাব্বী বলেন, ‘জীবনে কখনো ভাবিনি পুলিশের কাছে স্টেটমেন্ট দিতে হবে। পুলিশ এসে বারবার ঘটনার সময়ের হিসাব চায়। আমি তো স্ক্রিপ্ট লিখতে বসিনি। এটা তো সিনেমা-নাটক না। পুলিশ আমার কাছ থেকে সময়ের গরমিল বের করে বলতে চায়, ঘটনা তো এটা না। আমার গায়ে ক্ষত নেই, আবার ক্ষত আছেও। তারা তা পরিমাপ করতে চায়।’
গত শনিবার রাত ১১টার দিকে গোলাম রাব্বী মোহাম্মদপুরে তাঁর খালার বাসা থেকে কল্যাণপুরে নিজের বাসায় যাচ্ছিলেন। পথে হঠাৎ পেছন থেকে পুলিশের এক সদস্য তাঁর শার্টের কলার ধরে বলেন, ‘তোর কাছে ইয়াবা আছে।’ তিনি অস্বীকার করলে, তাঁকে ধরে কিছু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ শিকদারের কাছে নিয়ে যান পুলিশের ওই সদস্য। এসআই মাসুদও তাঁকে বলেন, তাঁর (রাব্বী) কাছে ইয়াবা আছে। তিনি আবারও অস্বীকার করলে এসআই মাসুদসহ পুলিশের সদস্যরা তাঁকে নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে জোর করে পুলিশের গাড়িতে তোলা হয়। তারপর চালানো হয় নানা নির্যাতন।
পুলিশের হাত থেকে ‘প্রাণ’ নিয়ে ফিরে আসাটাকে রাব্বীর ভাষায় ‘পুনর্জন্ম’। তবে তাঁর মতো আর কাউকে যেন পুলিশের হাতে হেনস্তা হতে না হয়, সে কথা বলতে থাকেন বারবার।
রাব্বী বলেন, ‘কোনোমতেই ঘুম আসে না। শুধু ওই কথা মনে হয়। রাতে ঘটনা ঘটেছে, তাই রাতের বেলায় মাথার যন্ত্রণাটা বাড়ে কি না, কে জানে। শুধু ভাবি, আমার যে সম্মানহানি হলো, স্বাভাবিক জীবন কেড়ে নিল, গত সাত থেকে আট দিনের, সেকেন্ডের হিসাবে যে কোটি কোটি টাকা ক্ষতি হলো তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? হাসপাতাল থেকে বের হয়ে বাইরে যাব চিন্তা করলেই ভয় লাগে। আবার মনে হয়, বাইরে বের হলেই কি স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাব?’
হাসপাতালে থাকা রাব্বীর বন্ধু ওসমান গণি বলেন, ‘রাব্বী ঘুমিয়ে যায়, তবে একটু পরই লাফিয়ে ওঠে। মারল, ধরল, মা ওরা আমাকে মেরে ফেলল—এভাবে চিৎকার করতে থাকে। আর হাউমাউ করে কান্না। তখন কয়েকজন মিলেও ওকে সামলানো যায় না।’
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক বিভাগের রেজিস্ট্রার চিকিৎসক রশিদুল হক ‘প্রথম আলো’কে বলেন, ‘আমি দীর্ঘক্ষণ রাব্বীর সঙ্গে কথা বলেছি। বড় কোনো ধরনের ঘটনা ঘটার পর যে সমস্যা হয়, রাব্বীরও তাই হয়েছে। ও সারাক্ষণ ভাবছে, ওকে কেউ মেরে ফেলবে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ভবিষ্যতে কী হবে, সে চিন্তা মাথা থেকে তাড়াতে পারছেন না। ওষুধের পাশাপাশি মানসিক অবস্থার উন্নয়নে কাউন্সেলিং চলছে।’
আজও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা হাসপাতালে রাব্বীকে দেখতে যান।

ধনীর কৃচ্ছ্রসাধন আর নির্ধনের ভোগবিলাস by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

কৃচ্ছ্রসাধনের ভাঙা রেকর্ড দীর্ঘদিন ধরে বাজিয়েই চলেছি। আমাদের ভোগেও ভাটার লক্ষণ নেই, বাজানোর আগ্রহেও কমতি নেই। তবে পৃথিবীর এক-সহস্রাংশ ভূমির ওপর ২৪ সহস্রাংশ মানুষের বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষার দায়ভার যে দেশটি পালন করে যাচ্ছে, সেই বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানাতেই হয়। এর ৮৭ গুণ বেশি ভূমিতে ৭ গুণ কম মানুষের বাসস্থান অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় এটুকু সান্ত্বনা। কোনো সন্দেহ নেই এত মানুষের জীবন এত ক্ষুদ্র আবাসস্থলে নিশ্চিত করে মানবসভ্যতার সবচেয়ে দামি পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ। এই দায়িত্ব আরও সুচারুরূপে, আরও দক্ষতার সঙ্গে পালনের জন্য ব্যয়সাশ্রয়ী হওয়া প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভোগের অপসংস্কৃতি আমাদের মধ্যে জেঁকে বসেছে। তাই বিশ্বের বুকে আমাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে, উন্নয়ন অনুকূল সংস্কৃতির চর্চার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি উন্নয়ন প্রতিকূল সংস্কৃতির চর্চা থেকে বিরত থাকাও প্রয়োজন। এই সংস্কৃতি নিয়েই আজকের লেখা।
১.... লন্ডনে যানজটে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে যানবাহনকে টোল বেশি দিতে হয়। তাই যানবাহন ওই এলাকা এড়িয়ে চলার ফলে যানজট সহনীয় পর্যায়ে থাকে। আমাদের এমন ব্যবস্থা নেই। বিআরটিএ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে এসব নিয়ম চালু করলে ঢাকাসহ অন্যান্য যানজটপিষ্ট শহরের যাত্রীদের রেহাই দিতে পারে। শ্রেয়তর যাতায়াত–জীবন উপহার দেওয়ার পাশাপাশি এতে করে কর্মসময়, উদ্বেগ, গ্যাস, তেলের শ্রাদ্ধ থেকে দেশও বাঁচতে পারে। তা ছাড়া, গোটা ইউরোপ যেখানে রেলের মতো গণপরিবহনের ওপর নির্ভর করে, সেখানে এক যাত্রী নিয়ে ব্যক্তিগত গাড়িগুলো যানজটকে অসহনীয় মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। অপ্রতুল সড়ক কাঠামোতে যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন কঠোর করা তেমন কঠিন কাজ না। টানেল কিংবা রাস্তাঘাট নির্মাণে আমাদের দেশের ব্যয় নাকি উন্নত দেশের থেকেও বেশি। যখন-তখন রাস্তার ডিভাইডার ভাঙা ও গড়ার প্রয়োজনীয়তাও প্রশ্নবিদ্ধ। একইভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে ফ্লাইওভার তৈরি করে নিচের রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী করে রাখা। অর্থ ও ভৌত অবকাঠামোর এমন অপচয়ের কারণ খুঁজে বের করা উচিত।
২.... সাংহাই থেকে তাইপেই যাচ্ছি। বিমানবালার কাছে পানি চাইলে আগে দেওয়া এককালীন ব্যবহারোপযোগী গ্লাসটি কোথায় জিজ্ঞাসা করল। কৃচ্ছ্রসাধনের মাত্রা দর্শনীয় এবং তা আসছে মাথাপিছু আয় ৩৮ হাজার আমেরিকান ডলারের নাগরিকদের থেকে।
৩. বিশাল জনঘনত্বের দেশে অধিকতর ঘনত্বের রাজধানীতে প্রতিটি বাসায় ওয়াশিং মেশিন, যা মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে কিনে আনতে হয় এবং যা সপ্তাহে কেবল আধঘণ্টার জন্য সচল হয়। মূল্যবান সম্পদের এমন অপব্যবহার এবং তা কেবল নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উত্তীর্ণ (তাও আবার নানা ঋণ-সুবিধাদি নিয়ে) জাতির পক্ষে একেবারেই বেমানান। মাথাপিছু ৪৮ হাজার আমেরিকান ডলার আয়ের সুইজারল্যান্ডে যদি একাধিক ভবনের বাসিন্দারা যৌথভাবে ওয়াশিং মেশিন ব্যবহার করতে পারে, তাহলে অন্তত ঢাকা শহরের ক্যাম্পাসভিত্তিক শিক্ষিত মানুষেরা এই কাজটি করতে পারছে না কেন?
৪.... রাশিয়ার ইকেটেরিনবার্গ শহরে এক রাত নিজের পয়সায় হোটেলে থাকতে হবে। জানতে পারলাম আয়োজকেরা আমাদের যে দামি হোটেলে রাখবে, তারই কাছে সাশ্রয়ী হোটেল আছে। দেখতে গেলাম। রুমের দরজা খুলে দিতেই চারটি খাট সারি করে বসানো আছে। ওপরের দিকে তাকাতেই আরও চারটি দোতলার মতো করে। সবচেয়ে বড় দেশ রাশিয়া, যা পৃথিবীর ১১ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে আছে এবং যার প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে মাত্র ৮ দশমিক ৪ জন মানুষ। পক্ষান্তরে আমরা পৃথিবীর এক-সহস্রাংশ ভূমিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করি ১ হাজার ২২২ মানুষ। তাদের যদি এ রকম হোটেল থাকে, তাহলে আমাদের হোটেলগুলো কী রকম হওয়া উচিত? আমাদের বাসস্থানগুলোতেও কি আমাদের ভূমিশূন্যতার প্রভাব পড়া উচিত না? জানতে পারলাম বিলাতেও নাকি প্রতিটি বাসায় আমাদের মতো ৩/৪/৫টি করে বাথরুম নেই। ভূমির এমন অপব্যবহার আর কোনো দেশে আছে কি না সন্দেহ। একজন মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যতই ধনী হোক না কেন, সর্বোচ্চ জনঘনত্বের দেশে দেশের স্বার্থে কি তার ভূমিসাশ্রয়ী হওয়া উচিত নয়? অবশ্য উচ্চ করের বিনিময়ে কোনো ধনী ব্যক্তিকে অতিরিক্ত ভোগের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। আমাদের থেকে গণতন্ত্রচর্চায় যারা এগিয়ে, সেখানেও দেশের স্বার্থে ব্যক্তি অধিকারকে সমাজের উপযোগী করে সীমিত করা হয়।
প্রতিবছরই এতগুলো বই ছাপানো হবে এবং তা পরবর্তী বছরে ব্যবহার করা হবে না, কাগজের জন্য বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে যাবে, তাও কাঙ্ক্ষিত নয়।
৫.... সারা দেশের সড়কব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য যমুনা নদীতে ইতিমধ্যে সেতু স্থাপিত হয়েছে। বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীর অনধিকার চর্চাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত আমাদের হৃত সম্মান ও আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে সহায়ক। তবে এই দামি সেতুগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আশপাশের ভূমি যে পতিত রাখতে হচ্ছে এবং সেই জমির মালিকদের পুনর্বাসনের জন্য আবাদযোগ্য ভূমিতে বন্যা ঝড়ে ভেঙে-যাওয়া কুঁড়েঘর তৈরি করে নাগরিকদেরই অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ার মুখে ফেলা হচ্ছে না। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি উদ্যোগে যৌথ আবাসনের ব্যবস্থা করে মূল্যবান ও অপর্যাপ্ত ভূমির শ্রেয়তর ব্যবহার নিশ্চিত করা উচিত, যে সংস্কৃতি দেশব্যাপী সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
৬. অতি সম্প্রতি পটুয়াখালী গিয়েছিলাম। কুয়াকাটার পথে তিনটি নদীতে বড় বড় সেতু তৈরি হয়েছে। সম্ভবত আমাদের প্রাযুক্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে। তারপরও ফেরি সার্ভিস চালু আছে। উদ্বোধন না হওয়া পর্যন্ত সেতু ব্যবহার করা যাবে না। সেতু তৈরিতে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়ে থাকলে ব্যবহার না করলে দৈনিক কম করে হলেও তিন লাখ টাকার সুবিধা গ্রহণ করছি না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের চেন্নাই শহরে ১৩ ফ্লোরসমৃদ্ধ ১ দশমিক ৩ মিলিয়ন বর্গফুট আয়তনের তথ্যপ্রযুক্তির টাইডেল পার্ক ১৪ মাসে তৈরি হওয়ার পর নামীদামি ২৫-৩০টি কোম্পানি উদ্বোধনের অপেক্ষা না করে কাজ শুরু করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ি উদ্বোধন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। সীমিত ভৌত অবকাঠামোর দেশে সুযোগ-সুবিধা অব্যবহৃত রাখা উন্নয়ন অনুকূল কোনো সংস্কৃতি নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেশের ক্ষতি অনুধাবন করে যথাসময়ে উদ্বোধনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা উচিত।
৭.... একসময়ে ভারত সরকারের অর্থে বিমানভ্রমণ ভারতীয় জাতীয় পতাকাবাহী বিমানে করতে হতো। আমাদের দেশেও তা বাধ্যতামূলক করা উচিত, এমনকি আমাদের বাংলাদেশ বিমানের সেবার মান গ্রহণযোগ্য না হলেও। কয়েক দিন আগে গোটা পলাশীবাজার তন্নতন্ন করে খুঁজেও বাংলাদেশের তৈরি একটি শেভিং রেজর পাইনি, ভারত কিংবা পাকিস্তানের তৈরি আছে। আমাদের প্রদত্ত সেবা কিংবা তৈরি পণ্যের মান ভালো না হলে বিদেশিরা তা ব্যবহার নাও করতে পারে কিন্তু আমরাই হব যোগ্য সেবাগ্রহণকারী কিংবা পণ্য ব্যবহারকারী।
৮.... আমাদের সরকার প্রতিবছর ৩০-৪০ কোটি পাঠ্যবই বিনা মূল্যে ছাত্রদের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। আজ থেকে ৪০-৫০ বছর আগে একই বই আমরা বছরের পর বছর পালাক্রমে পড়তাম। পাঠ্যপুস্তক দিবস নিয়ে আমাদের জাতি গর্ববোধ করতেই পারে। তবে প্রতিবছরই এতগুলো বই ছাপানো হবে এবং তা পরবর্তী বছরে ব্যবহার করা হবে না, কাগজের জন্য বন-জঙ্গল উজাড় হয়ে যাবে, তাও কাঙ্ক্ষিত নয়। এই বিলাসিতা করা আমাদের ঠিক নয়। কারণ, এখনো আমরা বৈদেশিক ঋণের দিকেও তাকিয়ে থাকি।
শ্রেয়তর অর্থনৈতিক সংস্কৃতি, অপচয় রোধ, স্বদেশি পণ্যের ব্যবহারে গর্ব এবং দেশাত্মবোধ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনসংখ্যার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উন্নয়নের মাপকাঠিতে বিশ্বদরবারে আমাদের অবস্থান সুসংহত হবে, এটা আমাদের নতুন বছরের কামনা।
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

ভিখারির ঘরে বস্তা ভর্তি টাকা

আলেয়া বেগমকে এলাকার সবাই চেনে ‘তেল বুড়ি’ নামে। সেই তেল বুড়ির কাজ ছিল ভিক্ষা করা। আর নেশা ছিল সেই ভিক্ষার টাকা জমানো। তেল বুড়ির খুপড়ি ঘরে মিলেছে পলিথিনের সাতটি ব্যাগ ভর্তি টাকা। ছয়জন মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গুনেছে এসব টাকা। হিসাব মিলিয়ে দেখা গেলো টাকার পরিমান ৯৭ হাজার ২২১। কেবল টাকা না খুপড়ি ঘরে পাওয়া গেছে ১০১টি নতুন শাড়ি ও ২০০টি লাক্স সাবান। বুধবার বরিশাল নগরীর বটতলা এলাকার আদম আলী হাজি গলিতে এই ঘটনা ঘটে। আলেয়া নগরীর আদম আলী হাজি গলিতে বাবুল মিয়ার খুপড়ি ঘরে ভাড়ায় থাকতেন। গ্রামের বাড়ি বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরাদীতে। আলেয়ার স্বামীর নাম মোক্তার হোসেন। তিনি মারা গেছেন বহু আগেই। সোমবার ৭০ বছরের বেশি বয়স্ক আলেয়া মারা যান নিজের ঘরেই। স্থানীয় বাসিন্দারা তাকে মৃত অবস্থায় পান। ঘরের মালিক বাবুল মিয়ার উপস্থিতিতে তৈয়র আলী মালামাল বাইরে আনতে গিয়ে বিপাকে পড়েন। কারণ চালের পলিব্যাগে রাখা মালামাল কোনো ভাবেই তিনি নাড়াতে পারছিলেন না। বস্তাটি খুললে ভেতরে টাকার কয়েন বেরিয়ে আসে। এরপর ঘটনা পুরো এলাকা জানাজানি হয়ে যায়। স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে পৌঁছে টাকা উদ্ধার দেখতে ভিড় জমান। চালের একটি পলিথিনের বস্তা সবচেয়ে বেশি  দুই টাকার নোট ছিল। দুই টাকার নোট ছিল প্রায় ৬০ হাজার। এ ছাড়া ছয়টি ছোট ছোট শপিং ব্যাগে এক এবং পাঁচ টাকার কয়েন ছিল ২০ হাজার টাকার। স্থানীয়রা জানিয়েছেন ভিক্ষা করে আলেয়া টাকা জমাতেন। তিনি ওই টাকা দিয়ে কিছু কিনতেন না। এমনকি কারও কাছ থেকে কিছু চেয়ে আনলে তাও ব্যবহার করতেন না। ঈদের সময় নতুন শাড়ি চেয়ে আনলেও তিনি কখনও তা পড়েননি।

হিন্দু গুরু রামকৃষ্ণ গরুর মাংস খেতেন!

উপমহাদেশের বাঙালী হিন্দু গুরু ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ গরুর মাংস খেতেন। তার শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ থেকে কোনো জ্ঞান নেননি।
এমনই দাবি করেছেন দক্ষিণ ভারতের বিতর্কিত লেখক বাঞ্জাগেরে জয় প্রকাশ। তার এসব বিতর্কিত মন্তব্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে ভারতের একাধিক হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন সমাবেশও হয়েছে। কিন্তু লেখক তার মন্তব্য ফিরিয়ে নিতে নারাজ।
সম্প্রতি ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্ক কিরূপ হওয়া উচিত। তার উদাহরণ টানতে গিয়ে বিতর্কিত এই মন্তব্য করেন বাঞ্জাগেরে জয় প্রকাশ। বাঞ্জাগেরে দাবি, ‘উনবিংশ শতকের মা কালীর উপাসক রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আমিষ খেয়েছিলেন। এমনকি গরুর মাংসও খেয়েছিলেন’।
ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ ধূমপানেও আসক্ত ছিলেন বলে দাবি করেছেন লেখক জয়প্রকাশ। তার কথায়, ‘রামকৃষ্ণ দেব নিজে ধূমপান করলেও কখনও শিষ্য বিবেকানন্দকে ধূমপানে উৎসাহিত করেননি’। বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দকে তার গুরু রামকৃষ্ণ দেব আদৌ কোনও জ্ঞান প্রদান করেছিলেন কি-না সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
তার মতে, ‘রামকৃষ্ণ দেব তার শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দকে জীবনে চলার সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন। সেই পথে হেঁটেই সাফল্যের শিখরে যেতে পেরেছিলেন বিবেকানন্দ’। শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক এমনই হওয়া উচিত বলেই মনে করেন বাঞ্জাগেরে জয়প্রকাশ।
তার এহেন মন্তব্যে বিতর্কের সৃষ্টি হলেও তা নিয়ে ভীত নন দক্ষিণ ভারতের এই বিতর্কিত লেখক। নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে উপযুক্ত প্রমাণ দাখিল করতে পারবেন বলে দাবি করেছেন বাঞ্জাগেরে জয়প্রকাশ।

সাকরাইনের প্রস্তুতি

পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে কাল শুক্রবার পুরান ঢাকার বাড়িতে বাড়িতে চলবে ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন। এ উপলক্ষে ঘুড়ি বিক্রি হচ্ছে ধুমসে। পুরান ঢাকার মানুষ একে বলে ‘সাকরাইন’। ‘সাকরাইন-এর আগের দিনে ঘুড়ি কিনে ফিরছে এই দুই শিশু। ছবিটি আজ বৃহস্পতিবার শাঁখারীবাজার এলাকা থেকে তোলা। ছবি: হাসান রাজা।

রাজনৈতিক দল ভাঙাভাঙির ইতিবৃত্ত by সৈয়দ আবুল মকসুদ

এই জগৎ-সংসারে ভাঙার মতো জিনিস এত রয়েছে যে তা বলে শেষ করা যায় না। চিরকাল কোনো কিছুই অটুট থাকে না। বৃক্ষেরও ডাল ভাঙে। নদীর তীর ভাঙে। স্বামী-স্ত্রীর সংসার ভাঙে। মানুষের এবং কোনো কোনো জাতির কপাল ভাঙে। রাজনৈতিক দলই-বা ভাঙবে না কেন? তেলের শিশি ভাঙলে আমরা খুকির ওপর রাগ করি, অথচ ধেড়েরা যখন দল ভাঙাভাঙি করে, তখন আমরা উপভোগ করি।
রাজনৈতিক দল তেলের শিশি নয়, স্বামী-স্ত্রীর সংসারও নয়, তবু কেন ভাঙে? কারা ভাঙেন? ভাঙায় কার লাভ, কার ক্ষতি? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের যেতে হবে অতীতে।
গত ১০০ বছরে ভাঙেনি কোন দল? ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ভেঙেছে। নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ভেঙেছে। কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙেছে। আওয়ামী লীগ ভেঙেছে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ভেঙেছে। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আগেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ভেঙেছে। ইসলামী ঐক্যজোট ভেঙেছে। সাম্যবাদী দলও ভেঙেছে। সর্বহারার একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আগেই সর্বহারা পার্টিও ভেঙেছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল যে কতবার ভেঙেছে, তা তাদের নেতাদের পক্ষেও বলা সম্ভব নয়। ‘আসল বিএনপি’ বলে কোথাও কোনো কিছুর অস্তিত্ব আছে বলে নকল বিএনপির নেতাদের সম্ভবত কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু কয়েক দিন আগে ‘আসল’ ও নকলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সুচারু ব্যবস্থাপনায় নয়াপল্টনে যে যুদ্ধ হয়ে গেল, অতীতে গ্রিক ও রোমানদের মধ্যেও ওই রকম সংঘর্ষ হয়েছে কি না সন্দেহ। আসলের পদাঘাতে নকলের ঊরুর হাড় পর্যন্ত স্থানচ্যুত হয়েছে। এসব যে দল ভাঙাভাঙি নাটকের পূর্ব রাগ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সরকারি দলের মুখপাত্ররা বলছেন, বিএনপি ভেঙে চিনামাটি ও মেলামিনের বাসন-পেয়ালার মতো ‘খান খান’ হয়ে যাবে। জোটের আরেক দলের নেতা বলছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো মিটমাট হবে না, বিএনপিকে ধ্বংস করতে হবে। একটি জিনিস তাঁরা খেয়াল করছেন না যে নেতাদের ধ্বংস করা যায়, সমর্থকদের ধ্বংস করা সম্ভব নয়। ওদিকে উত্তাল সমুদ্রে দিগ্ভ্রান্ত সাম্পানের মতো টালমাটাল বিএনপির মুখপাত্ররা হাহাকার করছেন এই বলে যে তাঁদের দল ভাঙার জন্য সরকার হাতুড়ি-শাবল ঠুকছে। গোপনে গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই যে দল ভাঙাভাঙির একটা মহড়া চলছে, তাতে কারোরই সন্দেহের সামান্যতম অবকাশ নেই। এ বছরের শেষ বা আগামী বছরের প্রথম দিকে একটা নির্বাচন করতে চাইলে দল ভাঙাভাঙির বিলকুল প্রয়োজন রয়েছে।
রাজনৈতিক দল ভাঙার সঙ্গে নদীভাঙনের মিল রয়েছে। কবির ভাষায়—নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা। এক দল ভেঙে যদি দুর্বল হয়, আরেক দলের শক্তি বাড়ে। সাধারণত নৈতিকভাবে দুর্বল কোনো কেন্দ্রীয় সরকারই প্রতিপক্ষ বিরোধী দলে ভাঙন ধরিয়ে আনন্দ পায়। এই দল ভাঙাভাঙির খেলা বাংলার মানুষ দেখেছে পঞ্চাশের ও ষাটের দশকে। ক্ষমতার লোভে যাঁরা দল ভাঙেন বা দল ছাড়েন, ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে তাঁদের ঠাঁই হয় এবং দল ভাঙার প্ররোচনাকারীদের স্থান হয় ইতিহাসের নিন্দনীয়দের সঙ্গে।
গত ৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্ট বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে মধ্য ৫০-এ দল ভাঙাভাঙির লীলাখেলা শুরু হয়। প্রথমবার বিরোধী দলে গিয়ে মুসলিম লীগেও ভাঙন দেখা দেয়। ১৯৫৫ সালে প্রাদেশিক লীগের কাউন্সিল অধিবেশনের আগে সভাপতি নূরুল আমিন, সহসভাপতি নবাব হাবিবুল্লাহ, যুগ্ম সম্পাদক শাহ আজিজুর রহমান, প্রচার সম্পাদক খান এ সবুরসহ কয়েকজন পদত্যাগ করলে ভাঙন প্রকাশ্য রূপ নেয়।
যুক্তফ্রন্টের দলাদলিতে এবং ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় দল আওয়ামী লীগেও ভাঙন দেখা দেয়। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা সরকারের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করেন। তাতে নেতৃত্ব দেন আবদুস সালাম খান, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, খালেক নেওয়াজ খান, হাশিম উদ্দিন প্রমুখ। দলের মূলধারায় ছিলেন মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, আতাউর রহমান খান, এমনকি যুবনেতা তাজউদ্দীন আহমদ। ভাঙনপন্থী সালাম খানদের স্থান আদৌ ইতিহাসের কোথাও হয়েছে কি না, তা জানারও প্রয়োজন মনে করে না মানুষ।
আদর্শের কারণে দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে যদি কেউ আলাদা সংগঠন গঠন করেন, সেটা ভিন্ন বিষয়। সে রকম ঘটনা এ দেশের ইতিহাসে একবারই ঘটেছিল, ১৯৫৭-তে। যখন নিজেদের দল প্রদেশে এবং কেন্দ্রে ক্ষমতায়, চিফ মিনিস্টার ও প্রাইম মিনিস্টার নিজের দলের, তখনই আদর্শগত কারণে একটি পক্ষ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে অন্য কয়েকটি বাম দলকে নিয়ে গঠন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)।
আওয়ামী লীগে আর একবার সরকার ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করে মধ্য ৬০-এর দিকে। তখন আইয়ুবের একনায়কী শাসনকাল। তাঁর লোক মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর। আওয়ামী লীগ ছিল তাঁর দুই চক্ষের শূল। ১৯৬৪-তে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত করে রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করেন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। দলের অবস্থা তখন এখনকার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরদের দলের চেয়েও শোচনীয়। আওয়ামী লীগকে আরও দুর্বল করার জন্য এবং শেখ মুজিবকে নেতৃত্ব থেকে দূর করতে গভর্নর মোনায়েম নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নেন। দলকে ভাঙতে কয়েকজন সিনিয়র নেতাকে তিনি আলাদা আলাদাভাবে গভর্নর হাউসে চা খেতে আমন্ত্রণও জানান। অন্য দলের নেতাদের সঙ্গেও রাজনৈতিক সমঝোতার চেষ্টা করেন। মোদ্দা কথা, সংসদীয় গণতন্ত্র ও স্বায়ত্তশাসনের প্রবক্তা মুজিবকে মাইনাস করার জন্য নামীদামি নেতাদের হাত করে ফেলে সরকার। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে মুজিব-সমর্থকেরা ঘরোয়া সভা করার জন্য হলঘর ভাড়া পর্যন্ত পেতেন না ঢাকার কোথাও। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনেই অনেক সভা করতে হতো। এখনকার মতো এত বড় বড় বস্তাভর্তি টাকা তখন ছিল না। তবে মোনায়েমের থলেভর্তি টাকা অনেকেই পেয়েছেন মুজিবকে বিরোধিতা করার জন্য এবং সে টাকায় তাঁরা ধানমন্ডি-গুলশানে আম-কাঁঠালের বাগানসহ বড় বড় বাড়ি বানাতে পেরেছেন।
ছয় দফা ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের ভাঙন আর রোধ করা গেল না। যে কাউন্সিল অধিবেশনে ছয় দফা অনুমোদন করা হবে, তার দুই-তিন দিন আগেই দলের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশসহ কয়েকজন নাটকীয়ভাবে দল থেকে সটকে পড়েন। সেই সব নাটকীয় মুহূর্তের কথা দলের বাইরের লোক আমাদের যখন মনে আছে, বর্তমান আওয়ামী লীগের অনেক নেতারও মনে থাকার কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশে হোটেল ইডেনের প্রাঙ্গণে হয়েছিল কাউন্সিল অধিবেশন। সভাপতির পদটি খালি হচ্ছে এই সুখবরে সেখানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন ছয় দফাবিরোধী আবদুস সালাম খান। এখনকার পাঠকদের শুনতেই চোখ কপালে উঠবে, তা হলো ওই সম্মেলনে শাহ আজিজুর রহমানও যোগ দেন। আগ বাড়িয়ে কেউ এলে তাকে তাড়িয়েও দেওয়া যায় না।
ওই অধিবেশনটি ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সর্বসম্মতিক্রমে যাঁরা দলের নেতা নির্বাচিত হন তাঁরা হলেন: সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান, সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুস সালাম খান, খোন্দকার মোশতাক, শাহ আজিজুর রহমান প্রমুখ; সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী, মহিলা-বিষয়ক সম্পাদক আমেনা বেগম প্রমুখ। দল ভাঙে। তর্কবাগীশ, আতাউর রহমান খানরা আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। কিছুদিন পর সালাম খান, শাহ আজিজও স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেন।
রাষ্ট্রীয় জীবনে যত রকম নিকৃষ্ট কাজ আছে, তার মধ্যে দল ভাঙাভাঙি ও ক্ষমতার লোভে দলত্যাগ সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ও নোংরা কাজ। যখন রাজনীতিকদের নৈতিক অবস্থান দুর্বল থাকে, তখনই এসব হয়ে থাকে। সামরিক শাসন ও স্বৈরশাসনের মধ্যেই এ-জাতীয় ব্যাপার বেশি ঘটে। ব্যক্তিস্বার্থে এ রকম দলত্যাগীদের একবার আমার এই কলামে নাম দিয়েছিলাম মোতাজিলাপন্থী রাজনীতিক।
আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী ও নেলসন ম্যান্ডেলা যা করতে পারেননি, বিএনপির এক মোতাজিলাপন্থী ব্যারিস্টার তা করে দেখিয়েছেন। গত তিন বছরে তিনি তিন-তিনটি দল ও জোট গঠন করেছেন। আমাদের কোনো কোনো মিডিয়া চুটিয়ে এই জনপ্রিয় বঙ্গনেতাকে প্রচার দেয়। জনগণ বুঝতে পারে না তাঁর কাছে রাজনীতি বড়, না স্ত্রীকে রেলের ইজারা দেওয়া জমি রক্ষা বড়। কয়েক দিন আগে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর দল গঠিত হবে একেবারে তৃণমূল থেকে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রাধান্য না পেয়েই পারে না। ১০ বছর বিএনপির মন্ত্রী থাকাকালে তিনি যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রেখে শাহরিয়ার কবিরকে বিচিত্রা থেকে বিতাড়িত করেন এবং জাহানারা ইমামসহ বহু দেশপ্রেমিকের ললাটে এঁটে দেন দেশদ্রোহীর তকমা।
বহু দুঃখের ভেতর দিয়ে প্রতিষ্ঠিত যে দেশ, তাকে সবাই মিলেমিশে গড়ে তোলাই রাজনীতিকদের ব্রত হওয়া কাম্য। কোনো রকম ষড়যন্ত্র, তামাশা, নোংরামো পরিত্যাজ্য। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, মাটি কামড়ে যাঁরা দলে পড়ে থাকেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরাই লাভবান হন।
প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত তার নিজের চরকায় তেল দেওয়া। অন্য দলের ক্ষতি করার চেয়ে নিজ দলের কী করে জনপ্রিয়তা বাড়বে, সে চেষ্টা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কয়েক দিন যাবৎ পত্রপত্রিকায় দেখছি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিলম্বিত জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে মাস দু-তিনের মধ্যে। যেকোনো দলের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অপেক্ষাকৃত সৎ ও নিবেদিত নেতাদের নিয়ে জাতীয় কমিটি গঠিত হবে, এই প্রত্যাশা করি। কারণ, একটি আদর্শভিত্তিক ভালো দলই ভালো রাজনীতি দিতে পারে। ভালো রাজনীতিই সমৃদ্ধ জাতি গঠনের যোগ্যতা রাখে। দল ভাঙাভাঙিতে অর্থ ও শক্তি ক্ষয় করে দেশের কোনো লাভ হবে না। আমরা চাই, সুশৃঙ্খল জনকল্যাণকামী রাজনৈতিক দল।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক৷

ঢাকার বাইরের ৬০ শতাংশ চিকিৎসক পদ শূন্য

দেশের অধিকাংশ জেলা উপজেলাতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মারাত্মক সঙ্কট রয়েছে। ঢাকায় এবং এর আশপাশের জেলায় এ সমস্যা না থাকলেও উত্তরাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের অনেক জেলায় অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পদ শূন্য। প্রত্যন্ত এলাকায় ডাক্তারদের এই শূন্যতা কেন আর এর ফলে কী প্রভাব পড়ছে গ্রামীণ স্বাস্থ্য সেবায়?
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি আজ রা ৯.৩০ মিনিটে চ্যানেল আইয়ের ‘বিবিসি প্রবাহ’ অনুষ্ঠানে প্রচার হবে। এর আগে আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে বিবিসি বাংলার ওয়েব সাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সারা বাংলাদেশে সরকারিভাবে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভাব না থাকলেও দেশের প্রত্যন্ত জেলা উপজেলায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট রয়েছে। ডাক্তারদের নিয়োগ দেয়া হলেও প্রত্যন্ত জেলা উপজেলায় তাদের অনেকই থাকছে না। ঢাকা থেকে দূরের জেলা উপজেলাতেই ডাক্তারদের এই সংকট সবচে বেশি।
গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলায় মোট ২৪ জন চিকিৎসক পদে ১০ জনই নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১১টি পদের মধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট গাইনি, জুনিয়র কনসালটেন্ট সার্জারি, মেডিসিন এবং আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার পদ শূন্য রয়েছে।
সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা গৃহিণী ডালিয়া বলছিলেন, ‘আমরা তো মনে করেন যে জায়গায় ভালো সেবা পাব সেই জায়গায় যাব। এইখানে আসলে ডাক্তারও থাহেনা সেইভাবে, ভালো কোনো ডাক্তারও নাই’।
স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য আসা হাবিবুর রহমান বলেন, সব পরীক্ষাই বাইরে থেকে করতে হয়। বলছিলেন, ‘ডাক্তার তো দেহালাম দিছে টেস্ট, তাতো ভিতরে কিছু নাই। ভিতরে গেলাম তা কলো যে মাল মেডিসিন কিচ্ছু না।’
কাশিয়ানী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিসংখ্যানবিদ কামরুল ইসলাম জানান, ডাক্তাররা এসেই আবার কয়েক মাসের মধ্যে চলে যান।
তিনি বলেন, ‘কনসালটেন্ট ডাক্তার উনরা সাধারণত দেখা যায় জয়েন করার পরও ঢাকা বা উন্নত লেভেলের হাসপাতালে চলে যায়। কঠিনভাবে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ ‘কোটি কোটি টাকার ইনস্ট্রুমেন্ট দিছে সরকার যেগুলো ওইভাবে পড়ে আছে’।
শুধু উপজেলা নয় জেলা সদরেও চিকিৎসক সঙ্কট প্রভাব ফেলছে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবায়। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে এক মাস জেলা হাসপাতালে ছিলেন বড়াশি গ্রামের রশিদা বেগম।
তিনি বলছিলেন, ‘দুদিনও হতি পারলোনা কয় যে বের হয়ে যাও তোমরা বের হয়ে যাও। ক্লিনিকে দেখাও ৫শ’ টাকা ভিজিট দিয়ে। কোন ডাক্তার? সেই ডাক্তার, যে হাসপাতালের বড় ডাক্তার’। চিকিৎসকদের উপস্থিতি আর সেবার মান নিয়েও অসন্তোষ আছে গ্রামের সাধারণ মানুষের। একই গ্রামের কয়েকজন বলছিলেন, রাত আটটার পরে রোগী নিলে বলে কি হয়তো খুলনা নিয়ে যান, নয় ঢাকা নিয়ে যান, নয় ক্লিনিকে নিয়ে যান। এজাগা ডাক্তার এহন আর আসবে না’।
কোলের শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে গেলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলে জানালেন আরেকজন গৃহিণী। ‘সকাল নয়টার তে একটা পর্যন্ত, দুইটে পর্যন্তকও বইসে থাকি, কিন্তু ডাক্তাররে আর দেখাতি পারি না। পরে ওইভাবে চলে আসি’।
সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিনের হিসেবে সারাদেশে চিকিৎসক সঙ্কটে থাকা শীর্ষ পাঁচ জেলার মধ্যে গোপালগঞ্জ অন্যতম। ৬০ ভাগের বেশি শূণ্যপদ নিয়ে পুরো ঢাকা বিভাগের মধ্যে গোপালগঞ্জে চিকিৎসকের অভাব সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্কটের কথা শিকার করলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দীন মোহাম্মদ নূরুল হক।
তিনি বলেন, কনসালটেন্ট সারাদেশে সাড়ে তিন হাজার লাগে, আমাদের আছে হইলো পনেরশ’। রিসেন্টলি ৫শ’ ৮৮ জনকে মন্ত্রণালয় দিয়েছে, আমরা এদেরকে পোস্টিং দিয়েছি’।
সিনিয়র চিকিৎসকদের গ্রামে যেতে অনীহার কথা উল্লেখ করে নূরুল হক বলেন, ‘সিনিয়র ডাক্তার যারা কনসালটেন্ট এবং মোটামুটি সিনিয়র তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে একটা জায়গায় সেটেল করছে হটাৎ করে তাকে আমি একটা ডিস্ট্রিকে পাঠিয়ে দিলে অনেক সময় তারা যেতে চায় না’।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব সৈয়দ মন্‌জুরুল ইসলাম বলেন, তারা চিকিৎসকদের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘এই ঘাটতির কারণেই অনেকে এই সুযোগটা নিতে পারছেন, আমরা চেষ্টা করছি এই ঘাটতিটাকে যত দ্রুত সম্ভব পূরণ করা যায়। প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে কিংবা যেখানে একটু অবকাঠামোগুলো এখন পর্যন্ত সেরকম শক্ত হয়ে ওঠেনি, সেখানে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে চিকিৎসকদের রিটেনশন ওখানে রাখা একটু সমস্যা আছে’।
২০১৫ সালের স্বাস্থ্য বুলেটিনের হিসেবে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে ১৪টি জেলায় ৪০-৬০ভাগ পর্যন্ত চিকিৎসক পদে শূন্যতা রয়েছে। এর সবগুলোই দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলা।

পুরান ঢাকায় আজ ঘুড়িবাজদের দিন

বাংলাদেশের পুরনো ঢাকায় আজ শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব যাকে পৌষ সংক্রান্তি বা ঘুড়ি উৎসব বলেও বর্ণনা করা হয়। তবে বাংলা ক্যালেন্ডার এবং পঞ্জিকা তারিখের সঙ্গে কিছুটা পার্থক্যের কারণে অনেকে আগামীকালও এই উৎসবটি পালন করবেন। বলা যায়, পুরনো ঢাকার আকাশ আজ থাকবে ঘুড়িওয়ালাদের দখলে।
আগে এ উৎসবটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরান ঢাকায় সাড়ম্বরে পালিত হয় এ দিনটি। উৎসবে অংশ নেন সব ধর্মের সব বয়সী মানুষ। পুরনো ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মানুষ এ উৎসবে দিনব্যাপী ঘুড়ি উড়ান। আয়োজন করেন গানবাজনাসহ নানা খাবারের।
এছাড়া সন্ধ্যায় আগুন নিয়ে খেলা, আতশবাজী ফোটানো এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ছাদের উপর চলে গানবাজনা আর খাওয়া-দাওয়া। সে সঙ্গে আনন্দের উত্তাপকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয় ঘুড়ির কাটাকাটি খেলা।
উৎসবকে মাথায় রেখে টানা এক সপ্তাহ পুরনো ঢাকার বায়ান্নো রাস্তা তেপান্নো গলির অধিকাংশ গলিতে আর খোলা ছাদে হয়েছে সুতা মাঞ্জা দেওয়ার ধুম। রোদে সুতা শুকানোর কাজও চলেছে পুরোদমে।
পুরোনা ঢাকার বাসিন্দা বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশন ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আলমগীর শিকদার বলছিলেন “পুরনো ঢাকার ঘুড্ডি উৎসবটি শুরু হয়েছে ব্রিটিশ আমল থেকেই। তখন উৎসবটি সনাতন ধর্মের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল আর এখন বাংলাদেশের সব মানুষ এই উৎসব পালন করেন”।
পুরনো ঢাকার ছেলেমেয়ের সারা বছর এই ঘুড়ি উৎসবের অপেক্ষায় থাকে। চাটকা, চশমা, চোখবাজি ইত্যাদি বিভিন্ন নামের ঘুড়ি উড়ায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
আলমগীর শিকদার বলছেন "পুরনো আমলে গান বাজতো মাইকে, আর এখন লাউডস্পীকারে গান বাজানো হয়। আগে আমরা খিচুড়ি করতাম এখন হয়তো কেউ বিরিয়ানি রাঁধে। তবে কালচারে কোনও পরিবর্তন ঘটেনি, ঘুড়ির উৎসবের কায়দাটা ঠিকই বজায় আছে”।

নেপালের শেষ রাজার বিদ্যুৎ বিল বাকি

নেপালের শেষ রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ
নেপালের শেষ রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকে বিল দেননি। এ জন্য বারবার ধরনা দিয়েও কূল করতে পারছে না বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি গতকাল বুধবার এ তথ্য জানায়।
২০০৮ সালে নেপালে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। এ সময় সাবেক রাজপরিবারের সব সম্পত্তি সরকারীকরণ করা হয়। এ সময় রাজপ্রাসাদ নারায়ণহিতি রয়্যাল প্যালেস ছেড়ে জ্ঞানেন্দ্র নাগরজুনা প্যালেসে ওঠেন। আজ বৃহস্পতিবার টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়।
নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের (এনইএ) সহকারী পরিচালক মুকুন্দ মান চিত্রকর গণমাধ্যমকে বলেন, নগরজুনা প্যালেসে বারবার এনইএর পক্ষ থেকে বকেয়া বিল-সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানকার কর্মীরা চিঠি গ্রহণ করেননি। তাঁদের কথা, যেহেতু সাবেক রাজপরিবারের সব সম্পত্তি এখন সরকারের, তাই এই বিল দেওয়া সরকারের দায়িত্ব।
এনইএ জানায়, ১০ বছর ধরে এনইএন ৭০ লাখ রুপির বেশি লোকসানে রয়েছে।
নগরজুনা প্যালেসের কর্মীরা চিঠি গ্রহণ না করায় বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ নির্মল নিবাস নামের আরেকটি প্যালেসের দ্বারস্থ হয়। ২০০১ সালে রাজা বীরেন্দ্র রহস্যজনকভাবে সপরিবারে নিহত হওয়ার আগে সহোদর জ্ঞানেন্দ্র এই প্যালেসে থাকতেন।
জ্ঞানেন্দ্রর ব্যক্তিগত সচিব সাগর রাজ তিমিলসিনা বলেন, এই বিল পরিশোধের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের, নগরজুনা প্যালেসের নয়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত রাজপরিবারের সদস্যরা যেসব প্যালেসে ছিলেন সেগুলোর সব ধরনের বিল ও শুল্ক দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়ার নিয়ম।
বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী কোনো গ্রাহক যদি দুই মাস বিল বকেয়া রাখেন, তাহলে তাঁর বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হবে। এরপরও যদি কোনো গ্রাহক একনাগারে ছয় মাস ধরে বিল দিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পত্তি (যেমন জমি, বাড়ি) বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে। তাঁর পরের তিন প্রজন্মও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বেন।
জ্ঞানেন্দ্রর ক্ষেত্রে কেন আইন প্রযোজ্য হয়নি, জানতে চাইলে চিত্রকর বলেন, জ্ঞানেন্দ্র একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি এবং সাবেক রাজা। তাই বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। চিত্রকর বলেন, ‘তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেয়ে আমরা বরং সম্ভব হলে বকেয়া বিল আদায়ের চেষ্টা করব।’
২০০১ সালে রাজা বীরেন্দ্র রহস্যজনকভাবে সপরিবারে নিহত হলে তাঁর সহোদর জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। এর আগেই, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালেই নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন ধরেছিল এবং পুষ্পকমল দহলের নেতৃত্বে একদল তরুণ রাজতন্ত্রের পুরোপুরি উচ্ছেদসহ নানা দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেছিলেন। দহল ‘প্রচণ্ড’ নামেই পরিচিত।
২০০৬ সালের ৭ নভেম্বর প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য সাতটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ছয় দফা সমঝোতা হয়। গণ-আন্দোলনে রাজা জ্ঞানেন্দ্র পিছু হটতে বাধ্য হন। মাওবাদীরা ১০ বছরের সশস্ত্র লড়াই থেকে সরে আসে। ২০০৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম গণপরিষদের অভ্যুদয় ঘটে। গণপরিষদ প্রথমেই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়। রাজপ্রাসাদকে জাদুঘর বানিয়ে দেয় এবং ক্ষমতাচ্যুত রাজাকে আয়কর দিতে বাধ্য করে।

পরীক্ষাভীতি কাটাতে...

ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে হাঁটছে শিশু।
খালি পা। ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে হচ্ছে শিশুদের। এটা তাদের জন্য মানসিক পরীক্ষা। পরীক্ষাভীতি কাটাতেই নাকি এই আয়োজন। ভারতের গুজরাটে একটি কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়াতে ও পরীক্ষাভীতি দূর করতে ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে হাঁটানো হয়।
গতকাল বুধবার ১২ বছরের কম বয়সী প্রায় ৭০ জন শিক্ষার্থীকে এ পরীক্ষা দিতে বলা হয়। মনোবল বাড়ানোর এই ‘অস্বাভাবিক’ পরীক্ষার বিষয়টি গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
ভারতের কয়েকটি টিভি চ্যানেলে শিশুদের ভাঙা কাচের ওপরে হাঁটানোর দৃশ্য দেখানো হয়। ভিডিও ফুটেজ থেকে নেওয়া একটি ছবিতে দেখা যায়, এক মিটার লম্বা একটি পাতের ওপর বিছানো পাতলা, ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে দুটি শিশু খালি পায়ে হাঁটছে। এ ঘটনায় কেউ আহত হয়েছে কি না, তা পরিষ্কার নয়।
কোচিংয়ের পরিচালক রাকেশ প্যাটেল দাবি করেন, তাঁর এই অনুশীলনের পেছনে বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মন থেকে ভয় ও অবিশ্বাস দূর হয়। এই অনুশীলনের মধ্যে মঞ্চে ওঠার ভয়, পরীক্ষাভীতিসহ নানা সমস্যা দূর হয়। এ পরীক্ষায় অংশ নিতে অভিভাবকদেরও ডাকা হয়েছিল।
১২ বছর বয়সী এক শিশুর অভিভাবক বলেন, তিনি তাঁর শিশুর সঙ্গে এই অনুশীলনে অংশ নেন। প্রথমে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। তবে পরীক্ষার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তাঁর দেখাদেখি আরও দুটি মেয়ে এতে অংশ নেয়।
এর আগে ২০১০ সালে গুজরাটের একটি স্কুলে শিক্ষার্থীদের জ্বলন্ত কয়লা ও ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে হাঁটিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কৌশল শেখানোয় সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
ভারতে আগুনের ওপরে হাঁটা অনেক সংস্কৃতিতে ধর্মীয় ঐতিহ্য হিসেবে দেখা হয়। পশ্চিমা দেশেও এ ধরনের অনুশীলন জনপ্রিয় হচ্ছে।

জাকার্তায় সন্ত্রাসী হামলায় কয়েকজন নিহত

জাকার্তায় গুলি ও বিস্ফোরণের ঘটনার পর একটি
গাড়ির আড়ালে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে পুলিশ। -এএফপি
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তায় আজ বৃহস্পতিবার ধারাবাহিক বোমা হামলা হয়েছে। এতে বেশ কয়েকজন নিহত হয়। সেখানে এখনো গুলিবিনিময় হচ্ছে। বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।
হামলায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একেক রকমের তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, একাধিক বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিতে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছে।
কমপক্ষে চারজন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
বিবিসি অনলাইন বলছে, অন্তত তিনজন নিহত হয়েছে।
গণমাধ্যমের খবরে জানানো হয়, একাধিক স্থানে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর মধ্যে একটি বিপণিবিতানের একটি ক্যাফে রয়েছে। জায়গাটি দেশটির প্রেসিডেন্টের বাসভবন ও জাতিসংঘের কার্যালয়ের কাছেই অবস্থিত।
সিরিজ বোমা বিস্ফোরণ ও গুলিবিনিময়ের পর
জাকার্তার সড়কে পড়ে আছেন এক ব্যক্তি -এএফপি
রয়টার্স জানিয়েছে, ছয়টি স্থানে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে বলে গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অন্তত একটি বিস্ফোরণে একজন আত্মঘাতী বোমা হামলাকারী জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে। হামলায় অন্তত ১৪ জন বন্দুকধারী জড়িত।
ঘটনার পরপরই সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোতে পুলিশের আনাগোনা বেড়ে যায়। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ। একই সঙ্গে তারা সতর্ক অবস্থান নেয়। আরও হামলার আশঙ্কায় লোকজনকে ঘরের ভেতরে থাকতে বলেছে পুলিশ। কারা এই হামলা চালিয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি। এর আগে ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামপন্থী জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছিল।

খালেদার সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গললেও পরে ভারত আওয়ামী লীগকেই বেছে নেয়

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশের পরবর্তী পরিস্থিতিতে সেই ইতিবাচক পদক্ষেপ হাওয়ায় উড়ে যায়। সরকার সমর্থিত যুব শক্তি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে ভয়াবহ সংঘাত শুরু হয় রাজপথে। এতে আওয়ামী লীগকেই বেছে নিতে হয় ভারতকে।
আত্মজীবনী ‘দ্য আদার সাইড অব মাউন্টেইন’-এ এসব কথা লিখেছেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ। উল্লেখ্য, ভারতে কংগ্রেস সরকারের সময়ে ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করেন সালমান খুরশিদ। এ সময় তিনি ও ইউপিএ সরকার কিভাবে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করেছিলেন তার একটি চিত্র ওই বইয়ে তুলে ধরেছেন। তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাকে প্রথম যে কাজটি দিয়েছিলেন তা হলো নিকট প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের বিষয়ে নজর দেয়া। খুরশিদ তার বইয়ে পরিষ্কার করে বলেছেন যে, তাকে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কাজ করার জন্য বেশ বড় সুযোগ দেয়া হয়েছিল, বিশেষ করে যখন তা বাংলাদেশের মতো অতিনিকট প্রতিবেশীর বিষয় আসে। সালমান খুরশিদ লিখেছেন, একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আমার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছিল স্বাধীনতা। প্রতিবেশী, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ, চীনের সঙ্গে সহস্রাব্দের সংলাপ, জাপানের সঙ্গে তালমিলিয়ে চলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন।
ভারতে সাধারণ একটি ধারণা আছে যে, প্রথাগতভাবে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের কংগ্রেস পার্টির রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় থাকে তখন দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে সম্পর্ক সব সময়ই ঊর্ধ্বমুখী থাকে। বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ইন্দিরা গান্ধী যে ভূমিকা পালন করেছিলেন তার ফলেই বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সঙ্গে কংগ্রেস ফার্স্ট ফ্যামিলি গান্ধীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠতা পেয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে, যখন আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে ক্ষমতার বাইরে থাকলে থাকলে, অর্থাৎ অন্য দল বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকলে ভারত তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখেনি।
সালমান খুরশিদ তার বইয়ে তুলে ধরেছেন, দু’দেশের নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ব্যক্তিগত যোগাযোগ। তবে ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের চেয়ে কূটনীতিতে বড় হয়ে উঠেছে জাতীয় স্বার্থ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সালমান খুরশিদ যখন তার দায়িত্ব শুরু করেন তখন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিতে তিনি মনোনিবেশ করেছিলেন। তবে তার কাছে প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল ২০১২ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র চেয়ারপারসন বেগম কালেধা জিয়ার দিল্লি সফর। ওই বইয়ে তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তিক্ত রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার বিষয়ে কতটা সুক্ষè ভাবে কাজ করতে হয়েছিল। ওই বইয়ে তিনি লিখেছেন, আমি দেখতে পেলাম বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়ার মধ্যে কিভাবে কার্যত দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছিল। আমি আমার পূর্বসূরি এসএম কৃষ্ণার কাছ থেকে ক্ষমতা বুঝে নেয়ার মাত্র ২৪ ঘন্টারও কম সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়া ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের অতিথি হিসেবে ভারত সফর করছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার উষ্ণ ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়। আজমীর শরীফ জিয়ারতের পর নয়া দিল্লিতে প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জীর সঙ্গে তার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে সমর্থ হয়েছিলাম। বেগম জিয়া এই সাক্ষাত পেতে খুব উদগ্রিব ছিলেন। তবে এ সাক্ষাতের ফলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার সঙ্গে চমৎকার সম্পর্কে কোন নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে কিনা তা আমাদেরকে সতর্কতার সঙ্গে হিসাব করতে হয়েছে।
দিল্লিতে সাধারণভাবে রাজনৈতিক বলয়ে একটি ধারণা আছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জীর।  সালমান খুরশিদ তার বইয়ে লিখেছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুঝতে পারে যে, আমরা একটি বড় সাফল্য আনতে পেরেছি এবং খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বরফ গলাতে পেরেছি। আগের দিনগুলোতে তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা ছিল হিম ঠা-া। নতুন সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত হই যখন আমি কয়েক মাস পরে বাংলাদেশ সফরে যাই এবং বেগম খালেদা জিয়া আমাকে উষ্ণ আতিথেয়তায় অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন করেন। তিনি আমাকে নৈশকালীন খাবারের আগে পেস্ট্রি ও অন্যান্য উপাদেয় খাবারে আপ্যায়িত করেন। এমনকি খালেদা জিয়া বিরলভাবে আমাকে বিদায় জানিয়েছিলেন এবং তার ড্রইং রুমের বাইরে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এসব ইতিবাচক উদ্যোগ উদ্যোগ হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, যখন বাংলাদেশ সরকার সমর্থক ও জামায়াতে ইসলামীর কট্টরপন্থিরা ঢাকার রাজপথে ভয়াবহ সংঘাতে লিপ্ত হয়। এ সময় আমরা কার্যত আওয়ামী লীগকেই বেছে নেই। এ সময় ভারতকে একটি সিদ্ধান্তে যেতে হয়। এক্ষেত্রে অবস্থান নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া ও সেজন্য সুযোগ হারানোটা সত্যিই বিপজ্জনক ছিল। ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ জরুরি ভিত্তিতে চাইছিল তিস্তার পানি বন্টন ও ছিটমহল বিনিময় । তবে এক বছর পরে জুনে ছিটমহল বিনিময় হয়। তখন কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে। আর তিস্তার পানি বন্টন চুক্তিটি এখনও ঝুলে রয়েছে, যদিও ভারতের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে।

অবশেষে জামিন পেল শিশুটি

রাজনৈতিক মামলায় দুই বছর ধরে বন্দী শিশুটি অবশেষে জামিন পেল। গতকাল বুধবার একটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষে আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকার শিশু আদালতের বিচারক জেসমিন আরা বেগম শিশুটির জামিন মঞ্জুর করেন।
২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের ডাকা হরতাল চলাকালে বিমানবন্দর এলাকায় পটকা ফোটানোর মামলায় শিশুটি টঙ্গীর কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে বন্দী ছিল। এই মামলার অন্য সব আসামি জামিন পেলেও শিশুটি পায়নি। তার পক্ষে কোনো আইনজীবীও ছিলেন না। এ নিয়ে গতকাল প্রথম আলোয় ‘রাজনৈতিক মামলায় দুই বছর কারাগারে শিশুটি’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এরপর মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্টের পক্ষে আইনজীবী এ এম জামিউল হক আদালতে শিশুটির জামিনের আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, মামলার এজাহারে শিশুটির বয়স দেখানো হয়েছে ১৪ বছর। অথচ মেডিকেল পরীক্ষা করাননি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। কেবল এই ঘটনা নয়, এমন অনেক শিশুর বয়স পুলিশ ইচ্ছেমতো লিখে দিচ্ছে। এতে ওই শিশুরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তিনি এ ব্যাপারে পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন জানান।
শুনানি শেষে আদালত শিশুটির জামিন মঞ্জুর করেন। এ সময় বিচারক জেসমিন আরা বেগম আইনজীবী জামিউলের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা মানবাধিকার সংগঠনের লোকজন এত দিন কোথায় ছিলেন? কেন এই শিশুটি এত দিন আইনগত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলো? বিচার করার সময় দেখি, মানবাধিকার সংগঠনের লোকজন আদালতে উপস্থিত থাকেন না। অথচ অনেক শিশু আইনগত সুবিধা পাচ্ছে না।’
শিশুটির জামিনের বিষয়ে ব্লাস্টের আইনজীবী জামিউল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশুটিকে আইনগত সহায়তা দিতে খোঁজখবর নিচ্ছিলাম। এ নিয়ে প্রথম আলোয় প্রতিবেদন প্রকাশের পরপরই তার জামিনের আবেদন করা হলে আদালত আমার জিম্মায় শিশুটির জামিন মঞ্জুর করেন।’
প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় পটকা ফোটানোর ঘটনায় জড়িত সন্দেহে অন্য শিশুদের সঙ্গে এই শিশুকেও আটক করে থানায় নেয় পুলিশ। পরে অন্যদের ছেড়ে দিয়ে তাকে ওই ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এজাহারে তাকে ছাড়াও টঙ্গীর চা দোকানদার রোমান, কুদ্দুস, মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ী বাবুলসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়। এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় বিএনপির সাংস্কৃতিক সংগঠন জাসাসের উত্তরা থানা শাখার সভাপতি আসলাম হোসাইনকে। আসামিদের রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, আসলাম, কুদ্দুস ও রোমানের সহযোগিতায় ওই শিশু পটকা ফোটায়। তবে তদন্ত শেষে পুলিশ আসলাম ও কুদ্দুসকে অব্যাহতি দিয়ে অভিযোগপত্র দেয়। মামলার অন্য আসামিরা জামিন পেয়েছেন। টঙ্গীর কিশোর উন্নয়নকেন্দ্রে বন্দী শিশুটি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে।

ইরানের কাছে ক্ষমা চাইল যুক্তরাষ্ট্র

সমুদ্রসীমায় অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১০ নাবিককে মুক্তি দিয়েছে ইরান। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ক্ষমা চাওয়ার পরই তাদের মুক্তি দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ড নেভাল ফোর্সেসের কমান্ডাররা। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের বরাত দিয়ে বুধবার ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, নৌযান দুটি কুয়েত এবং বাহরাইনের মধ্যকার জলসীমায় একটি প্রশিক্ষণ অভিযানে অংশ নিচ্ছিল এবং একটি নৌযান কারিগরি ত্রুটির কারণে ইরানের জলসীমায় ভেসে যায়। মার্কিন এক কর্মকর্তা বিবিসিকে জানিয়েছেন, কুয়েত থেকে বাহরাইন যাওয়ার পথে তারা আটককৃত দুটি নৌযানের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেন। পরে ইরানীয়রাই তাদেরকে অবহিত করেন যে নাবিকরা নিরাপদ আছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র অনুপ্রবেশের কারণে ক্ষমা চাওয়ার পর তাদের মুক্তি দেয়া হয়। তদন্তে দেখা গেছে, নৌকাগুলো ‘দুর্ভাগ্যবশত’ ইরানের জলসীমায় প্রবেশ করে।
গ্রেফতারের পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফের সঙ্গে কথা বলেন। এরআগে ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ডের নৌবাহিনী প্রধান জেনারেল আলি ফাদাভি জানিয়েছিলেন, শিগগির গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেয়া হবে। তিনি দাবি করেন, গ্রেফতারকৃতরা ‘অপেশাদার’ আচরণ করেছেন। দুই মন্ত্রীর আলাপের সূত্র ধরে জেনারেল ফাদাভি বলেন, ‘তারা (গ্রেফতারকৃতরা) আমাদের সমুদ্রসীমায় অনুপ্রবেশ করেছে। এটা তাদের করা ঠিক হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের তাই ক্ষমা চাওয়া উচিত। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফের দৃঢ় অবস্থান ছিল।’ যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত নাবিকদের মধ্যে নয়জন পুরুষ ও একজন নারী ছিলেন। এর আগে ২০০৭ সালে ইরান ১৫ জন ব্রিটিশ নাবিক ও নৌ সেনাকে সমুদ্রসীমায় অনুপ্রবেশের অভিযোগে গ্রেফতার করেছিল। তাদের ১৩ দিন আটক রাখা হয়েছিল।

পাঠানকোটে তদন্ত দল পাঠাবে পাকিস্তান

ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের পাঠানকোট বিমান ঘাঁটিতে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহে পাঠানকোটে তদন্ত দল পাঠাতে চায় পাকিস্তান। ওই হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ইসলামপন্থী সংগঠন জইশ-ই মোহাম্মদের (জেইএম) কয়েকজন সদস্যকে বুধবার আটক করেছে দেশটি। জেইএমের কার্যালয়ও সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম পিটিভি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ ও সেনাপ্রধান রাহেল শরিফের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে সন্ত্রাসীদের ব্যাপারে শক্ত অবস্থান নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার পরই জয়েশ-ই মোহাম্মদের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। রাষ্ট্রীয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, পাকিস্তানে জয়েশ-ই মোহাম্মদের কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য সংগঠনটির কার্যালয় সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।
খবর দ্য হিন্দু, এপি। হামলার বিষয়ের ভারতের চাপে পাকিস্তান ও ভারতের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের দুই দিন আগে পাকিস্তান অভিযুক্তদের গ্রেফতার করল। এদিকে গ্রেফতারের পর এক যৌথ বার্তায় প্রেসিডেন্ট নওয়াজ শরিফ ও সেনাপ্রধান রাহেল শরিফ বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত চলছে। পাঠানকোট হামলার তদন্তকার্যে পরামর্শ ও সহায়তা প্রদানের জন্য পাকিস্তান একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল (স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম-এসআইটি) পাঠাতে আগ্রহী। রাষ্ট্রীয় বিবৃতিতে পাকিস্তান সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থা তুলে ধরার পর উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের মাটি ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনাকে ব্যাহত করতে পাকিস্তান অঙ্গীকারাবদ্ধ। ভারতে হামলার ঘটনায় পাকিস্তানিদের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে চলমান তদন্তে অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘আরও অগ্রগতির জন্য কিছু অতিরিক্ত তথ্য প্রয়োজন। আর সে কারণে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে দেশটিতে বিশেষ তদন্তকারী দল পাঠানোর কথা চিন্তা করছে পাকিস্তান।’ ২ জানুয়ারি রাতে পাঠানকোটের বিমান ঘাঁটিতে হামলা চালায় বন্দুকধারীরা। ওই ঘটনায় ৬ হামলাকারী আর নিরাপত্তা বাহিনীর সাত সদস্য নিহত হন।

ওবামার সাত বছরে যুক্তরাষ্ট্র কী পেল?

ক্ষমতার শেষ বছরে পা রেখে সর্বশেষ স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণ দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। গত সাত বছরে ওবামা তার সাফল্যের খতিয়ানের চেয়ে সমুজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখালেন। বহুত্ববাদী গণতন্ত্র, সবুজ জ্বালানি ও ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে তিনি তার ‘সুস্পষ্ট ভিশন’ বাস্তবায়নে জোর দিলেন। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নতুন দিগন্তে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এগিয়ে যাবে- তার দাওয়াই দিতে গিয়ে বললেন, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলকে ক্রুশবিদ্ধ করে পথের বাধা দূর করতে।
সম্প্রতি রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাশী টেড ক্রুজ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করেই তিনি এ বক্তব্য দিয়েছেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের ‘কার্পেট বোম্বিং’ প্রচারণাকে টার্গেট করেছেন ওবামা। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে, ট্রাম্প বা টেড ক্রুজ নয়, রিপাবলিকানদের ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে চান তিনি। ওবামার শাসনামলে প্রণীতি নানাবিধ নীতিকৌশলের সরাসরি বিরুদ্ধে রিপাবলিকান। কিছু ক্ষেত্রে নিজের নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করে ওবামা আইন বানিয়েছেন। মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানের কাছে কংগ্রেসের আধিপত্য হারিয়ে আরও ‘নিঃসঙ্গ ক্ষমতাধর’ হিসেবে আবির্ভূত হতে হয়েছে তাকে। শেষ সময়ে এসে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, অনেক ‘প্রত্যশার স্পর্ধা’ দেখিয়ে ওবামার হোয়াইট হাউস গমনের পর এতদিনে কী পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্লুমবার্গ নিউজ ও ফ্যাক্ট চেক অবলম্বনে সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হল।
অপরাধ ও অস্ত্র
বেশ আগে থেকেই আমেরিকায় গোপন হত্যা ও খুন-খারাবি চলে আসছে। গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন জনাকীর্ণ স্থানে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ, কৃষ্ণাঙ্গ হত্যা ও বন্দুকের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম ও জাতীয় বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে। কিন্তু ওবামা ক্ষমতা নেয়ার পর কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে এসব সহিংস তৎপরতার? ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে এফবিআই’র বার্ষিক অপরাধ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে ওবামার নির্বাচিত হওয়ার বছরে খুন-খারাবির তুলনায় ২০১৪ সালে ২২১৬টি কম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। খুনের বাইরে অন্যান্য সহিংস অপরাধ যেমনÑ ধর্ষণ, ডাকাতি, হামলা-ভাংচুরের ঘটনা ২০০৮ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ কম হয়েছে। ২০১৪ সালের তুলনায় ওই বছরে এসব অপরাধের ২,২৯,০৭৮টি ঘটনা বেশি ছিল। ২০০৮ সালে প্রতি ১০ হাজার অধিবাসীর মধ্যে খুনের ঘটনা ছিল ৫.৪ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে ৪.৫ শতাংশ হয়েছে। তবে এই সময়ে এসে আমেরিকায় অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। ২০০৮ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে ১ কোটি ৪২ লাখ বন্দুক বেশি বিক্রি হয়েছে। বিভিন্ন বন্দুক সহিংসতার জের ধরে শেষ পর্যন্ত ওবামা নির্বাহী আদেশে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছেন।
কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব
ওবামার দায়িত্ব গ্রহণের পর মার্কিন অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৯২ লাখ ৬৫ হাজার মানুষের। তবে বিল ক্লিনটনের সময় নতুন কর্মসংস্থানের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৩০ লাখ। এমনকি ওবামার আগের প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের সময় তার চেয়ে ১৩ লাখ কর্মসংস্থান বেশি হয়েছিল। যদিও দু-দুটো মন্দার পর ক্ষমতা পেয়েছিলেন ওবামা। বেকারত্বের হার কমানোর দিক দিয়ে ওবামা সফলতা পেয়েছেন। ক্ষমতায় আসার বছরে বেকারত্বের হার ছিল ৭.৮ শতাংশ। বর্তমানে তা কমে গিয়ে ৫ শতাংশে নেমেছে। ১৯৪৮ সালের এটি সর্বনিু বলা হচ্ছে।
বাজার-মুনাফা ও ভোগ্যপণ্যের দাম
কর্পোরেট মুনাফা ওবামার শাসনামলে গর্জন করে উঠেছে। ওবামার করবিষয়ক নীতি এক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রমাণিত হয়েছে। গত সাত বছরে ভোগ্যপণ্যের দাম কমেছে ১.৯ শতাংশ, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের গড় বৃদ্ধির অর্ধেকের চেয়েও কম। এ সময়ে আমেরিকানদের সাপ্তাহিক ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা
ওবামার বিশেষ স্বাস্থ্যনীতিতে উপকৃত হয়েছে মার্কিনিরা, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণীরা। ২০০৮ সালে স্বাস্থ্য বীমার বাইরে ছিল ৪ কোটি ৩৮ লাখ মানুষ। বর্তমানে যা মাত্র ১ কোটি ৫৩ লাখ।
জ্বালানি
যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন সম্প্রতি কমে গেলেও ওবামার শাসনে আগের তুলনায় দ্বিগুণ তেল উৎপাদন করা হয়েছে। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের বেশি থেকে বর্তমানে মাত্র ৩৬ ডলারে নেমে আসায় তেল উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এছাড়া ওবামা আমদানি তেলের ওপর নির্ভরতা অর্ধেক কমিয়ে এনেছেন। বিকল্প জ্বালানি হিসেবে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার ২০০৮ সালের তুলনায় ২৭৩ শতাংশ বেড়েছে।
সরকারি ঋণ ও ব্যয়
ওবামার আমলে সরকারি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ ১৩.৬ ট্রিলিয়ন ডলার- যা ২০০৮ সালের তুলনায় ১১৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ব্যয় খুব একটা বাড়েনি। ২০০৯ সালের তুলনায় মাত্র ৪.৮ শতাংশ বেশি। গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৩.৬৯ ট্রিলিয়ন ডলার।

সৌদি আরব চরমপন্থা উসকে দিচ্ছে by মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ

ক্রুদ্ধ জনতা হামলা চালায় তেহেরানের সৌদি দূতাবাসে। সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়
সৌদি আরবে শিয়াদের ধর্মীয় নেতা শেখ নিমর আল-নিমরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর ইরানের রাজধানী তেহরানে বিক্ষুব্ধ জনতা সৌদি দূতাবাসে হামলা চালায়। এ ঘটনার পর সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। দুই পক্ষ থেকেই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। সে বিষয়েই দুটি লেখা প্রকাশিত হলো।
সারা পৃথিবী শিগগিরই সেই ঐতিহাসিক চুক্তির বাস্তবায়ন উদ্যাপন করতে যাচ্ছে, যে চুক্তির মধ্য দিয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট বিপজ্জনক ও অপ্রয়োজনীয় সংকটের সমাধান হয়েছে। সবাই আশা করেছিল এবং এখনো বিশ্বাস করে—এই সমাধানের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের চরমপন্থা সমস্যাটির দিকে দৃষ্টি দেওয়া সম্ভব হবে, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা পৃথিবীকেই জেরবার করে দিচ্ছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানি বারবার বলেছেন, ইরানের পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত অগ্রাধিকার হচ্ছে প্রতিবেশীদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখা। আর চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বৈশ্বিক সহযোগিতাও তার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম লক্ষ্য। রুহানি ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ক্ষমতায় আসার পর ‘ওয়ার্ল্ড অ্যাগেইনস্ট ভায়োলেন্স অ্যান্ড এক্সট্রিমিজম (ওয়েভ)’ শীর্ষক এক উদ্যোগ নেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এতে অনুমোদন দিয়েছিল।
২০১৩ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন পরমাণু চুক্তি হওয়ার পর সৌদি আরব তা নস্যাৎ করার জন্য নানা চেষ্টা করে। তাদের ভয় ছিল, তারা মানুষের মনে যে ইরান-ভীতি সৃষ্টি করেছে, তা ভেঙে পড়ছে। আজ রিয়াদের অনেকেই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে শুধু বাধা হয়েই দাঁড়ায় না, তারা পুরো অঞ্চলকে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে বদ্ধপরিকর।
সৌদি আরবের ভয় হচ্ছে, তারা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যে ভীতি সৃষ্টি করেছিল, তা দূর হয়ে গেলে বিশ্বের সামনে আসল সমস্যা উন্মোচিত হবে: সহিংস চরমপন্থায় তার সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতা। বর্বরতাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। তারা নিজের ঘরে একই দিনে তলোয়ার দিয়ে ৪৭ জন বন্দীর মাথা কেটেছে, যাঁদের মধ্যে শ্রদ্ধাভাজন ধর্মীয় পণ্ডিত শেখ নিমর আল-নিমরও ছিলেন, যিনি জীবনভর অহিংসা ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন। আর বিদেশে মুখোশ পরা মানুষেরা ছুরি দিয়ে লোকজনের মাথা কাটছে।
আমরা যেন এই সত্য ভুলে না যাই: ১১ সেপ্টেম্বরের বীভৎসতা থেকে শুরু করে স্যান বার্নার্দিনোর হত্যাকাণ্ডসহ অন্যান্য চরমপন্থী হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং আল-কায়েদা ও নুসরা ফ্রন্টের প্রায় সব সদস্যই হয় সৌদি নাগরিক ছিলেন অথবা পেট্রো ডলারের টাকায় জীবিকা নির্বাহ করে এমন বক্তৃতাবাগীশ মানুষেরা তাঁদের মগজধোলাই করেছিলেন।
সৌদি আরবের কৌশল হচ্ছে পরমাণু চুক্তি নস্যাৎ করা এবং মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা জিইয়ে রাখা, এমনকি তা আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাওয়া। এই কৌশলের তিনটি উপাদান আছে: পশ্চিমকে চাপ দেওয়া, চরমপন্থাকে পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং ইয়েমেনে যুদ্ধ বাধিয়ে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা আরও তীব্র করা; আর ইরানকে সরাসরি উসকানি দেওয়া। রিয়াদ যে ইয়েমেনে যুদ্ধ লাগিয়েছে বা তারা যে চরমপন্থাকে সমর্থন দেয়, এটা সবাই জানে। ইরানের বিরুদ্ধে যে কত রকম উসকানি তারা দিয়েছে, সে কথা সবাই জানে। কিন্তু আমাদের প্রজ্ঞার কারণে সে খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়নি।
২ জানুয়ারি তেহরানের সৌদি দূতাবাস ও কনস্যুলেট ভবনে যে হামলা হলো, ইরান সরকার দ্ব্যর্থহীনভাবে তার সমালোচনা করেছে, তারা সৌদি কূটনীতিকদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছে। ইরান সরকার সৌদি দূতাবাসের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়, এমনকি সরকার হামলাকারীদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসার ব্যাপারেও নিজেদের সংকল্প ব্যক্ত করে। দায়িত্বরত অবস্থায় যারা দূতাবাসকে হামলার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি, সরকার তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে। আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু করেছে।
এর বিপরীতে সৌদি সরকার তিন বছর ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে ইয়েমেন, লেবানন ও পাকিস্তানের ইরান দূতাবাসে সরাসরি হামলা চালিয়েছে, এতে স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি ইরানি কূটনীতিকেরাও প্রাণ হারিয়েছেন। তা ছাড়া গতবারের হজে যে পদদলন ঘটল, তা সৌদি কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই ঘটেছে, সেখানে ৪৬৪ জন ইরানি হাজি মারা গেছেন। এরপর তারা বেশ কয়েক দিন ধরে শোকাহত পরিবারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি; এমনকি নিহত হাজিদের স্বজনেরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগের আবদেন করলেও সৌদি আরব তা নাকচ করেছে। হাজিদের মরদেহ ইরানে ফেরত পাঠাতেও রিয়াদ বিলম্ব করেছে।
ইরান এবং সব শিয়া মুসলমানের বিরুদ্ধে সৌদি সরকার ও তাদের মদদপুষ্টদের ঘৃণা ছড়ানোর কথা আর নাই-বা বললাম। শেখ নিমরের শিরশ্ছেদের আগে সৌদি আরবের একজন ইমাম শিয়াদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছেন, যিনি গতবার বলেছিলেন, ‘শিয়াদের সঙ্গে আমাদের মতানৈক্য কোনো দিনই দূর হবে না, ফলে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে আমাদের আত্মহননও শেষ হবে না।’
এত কিছু সত্ত্বেও ইরান সৌদি আরবের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা তো দূরের কথা, সম্পর্ক খারাপ পর্যন্ত করতে চায়নি। এত দিন ইরান বেশ নিয়ন্ত্রিত আচরণ করেছে, কিন্তু এই ‘নিয়ন্ত্রণ’ একতরফা চলতে পারে না।
সৌদি নেতাদের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে: তাঁদের হয় চরমপন্থা উসকে দিয়ে গোষ্ঠীবাদী ঘৃণার আগুনে ঘি ঢালতে হবে, না হয় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অর্জনে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা আশা করি, যুক্তির জয় হবে।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
মোহাম্মদ জাভেদ জারিফ: ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আইনভিত্তিক এশীয় ব্যবস্থার মডেল by স্কট এইচ সুইফট

২০১৬ সালের শুরুতে ঢাকায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী আয়োজিত ভারত মহাসাগরীয় নৌ-সিম্পোজিয়াম (আইওএনএস) উপলক্ষে এ অঞ্চল সফরের মধ্য দিয়ে এই বছর কেমন হবে, তা আগেই অনুমেয়। আইওএনএসে আঞ্চলিক নৌবাহিনীর কর্মকর্তারা একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সহযোগিতা গভীর করতে, আমাদের স্বার্থের মিল রয়েছে তা তুলে ধরতে এবং অমিলের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে। বাংলাদেশে আমার অনেক সফরের মধ্যে এই সফরটিও যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক বৃদ্ধির গুরুত্ব বহন করে।
এই সম্পর্ক সাগরের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার ব্যাপারে আমাদের সবার প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটায়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ডের একসময়ের হ্যামিল্টন-ক্লাস কাটার বিএনএস সমুদ্র জয় ও বিএনএস সমুদ্র অভিযান বঙ্গোপসাগরে এবং এর বাইরে পরিচালনা করছে। আমাদের বার্ষিক নৌ-অনুশীলন ‘কো-অপারেশন অ্যাফ্লোট রেডিনেস অ্যান্ড ট্রেইনিং’ (ক্যারাট) বাংলাদেশ গত অক্টোবরে চট্টগ্রামের সমুদ্রতীরে শেষ হয়েছে। ক্যারাট চলাকালে আমাদের দুই নৌবাহিনী জলদস্যুবিরোধী, চোরাচালানবিরোধী, সমুদ্রে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং বন্দর নিরাপত্তা বিষয়ে অনুশীলন করে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে, বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রথম দক্ষিণ এশীয় নৌবাহিনী হিসেবে সিঙ্গাপুরে ‘সাউথইস্ট এশিয়া কো-অপারেশন অ্যান্ড ট্রেইনিং’য়ে (সিক্যাট) পরিদর্শক হিসেবে অংশ নেয় এবং আমরা ভবিষ্যতে আরও অনুশীলনে অংশ নিতে তাদের স্বাগত জানাই।
কেউ ভাবতে পারেন, ‘ইউএস প্যাসিফিক ফ্লিট’ নাম থেকে যে আমরা শুধু মালাক্কা প্রণালির পূর্ব ও সিঙ্গাপুরের ওপর গুরুত্ব দিই; এর চেয়ে সত্যের অপলাপ আর কিছুই হতে পারে না। প্রণালির পূর্ব দিকে তাকালে দেখব সমুদ্রকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ের ফলে অনেক জাতি উপকৃত হয়েছে—এমন আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন। যা হোক, পশ্চিমের দিকে তাকালে আমি দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আঞ্চলিক নৌবাহিনীগুলোর মধ্যে সামুদ্রিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা দেখতে পাই।
তিনটি দেশই এ অঞ্চলে নেতৃত্বসুলভ মনোভাব দেখিয়েছে এ প্রক্রিয়ায় একমত হয়ে ও বিচার মেনে নিয়ে। আমি আশাবাদী যে অন্য এশীয় দেশগুলো দীর্ঘদিনের সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্বের সমাধানের জন্য এ উদাহরণ কাজে লাগাবে
প্রণালির উভয় পাশেই সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ক্রমবর্ধমান পারস্পরিক নির্ভরশীলতার মূলে রয়েছে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ বার্ষিক প্রায় ৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার শুধু দক্ষিণ-চীন সমুদ্র দিয়েই পরিচালিত হয়। প্রায় এক লাখ জাহাজ এই পণ্য সরবরাহ করে ভারত মহাসাগর থেকে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য পথ ধরে, যা শত শত বছর আগে যখন পালতোলা জাহাজ মৌসুমি বায়ুর গতিপথ কাজে লাগিয়ে চলাচল করত। বাণিজ্যের বাইরে, সমুদ্র তলদেশের তেল ও গ্যাস–সম্পদ এবং উপরিভাগের মৎস্যভান্ডার জীবনধারণের এক দীর্ঘস্থায়ী সম্পদের ক্ষেত্র।
একটি নিরাপদ সামুদ্রিক পরিবেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ চলাচলকে সহায়তা করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় আন্তর্জাতিক আইন কাজে লাগিয়ে দুটি দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় দ্বন্দ্বের শান্তিপূর্ণ সমাধান পরিলক্ষিত হয়। ২০১২ সালে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ল অব দ্য সিজ’ প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করে, যার ফলে দুই দেশই উপকৃত হয়েছে। আরেকটি সংস্থা ‘দ্য পারমানেন্ট কোর্ট অব আর্বিট্রেশন’ এর দুই বছর পর পশ্চিমে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করে। তিনটি দেশই এ অঞ্চলে নেতৃত্বসুলভ মনোভাব দেখিয়েছে এ প্রক্রিয়ায় একমত হয়ে ও বিচার মেনে নিয়ে। আমি আশাবাদী যে অন্য এশীয় দেশগুলো দীর্ঘদিনের সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে দ্বন্দ্বের সমাধানের জন্য এ উদাহরণ কাজে লাগাবে এবং আন্তর্জাতিক আইনকে স্বীকৃতি দিয়ে ফোরামে একই ধরনের মনোভাব পোষণ করবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে।
যখন জাতিগুলো সমুদ্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ও আগ্রাসন রুখতে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করে, তখন পুরো অঞ্চল অধিকতর নিরাপদ ও সমৃদ্ধিশালী হয়। সোমালিয়া উপকূলের ও গালফ অব অ্যাডেনের জলদস্যুতা মোকাবিলায় বহুজাতিক টহল একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এক দশকেরও আগে, ২০০৪-এর ভারত মহাসাগরে সুনামির জন্য ত্রাণ তৎপরতা এবং অতিসম্প্রতি নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বিমান এমএইচ-৩৭০-এর তল্লাশি আঞ্চলিক নৌবাহিনীর একসঙ্গে কাজ করার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এ ধরনের মর্মান্তিক পরিস্থিতি মোকাবিলা কোনো একটি দেশের একক ক্ষমতার বাইরে। এ ধরনের সব চ্যালেঞ্জ যেহেতু বজায় রয়েছে তাই যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ নৌবাহিনী ক্যারাট ও সিক্যাট চলাকালে প্রধান নৌ-দক্ষতাসমূহের অনুশীলন অব্যাহত রাখবে। এটা দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
আমি আবারও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ফিরে আসার আশা রাখি এবং এ বছরের শেষের দিকে হাওয়াইয়ে ‘রিম অব দ্য প্যাসিফিক’ অনুশীলন চলাকালে এ অঞ্চলের নৌবাহিনীগুলোকে আমন্ত্রণ জানাতে চাই। আমি এ পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে আমি মনে করি সেই দৃশ্য হবে অভূতপূর্ব।
অ্যাডমিরাল স্কট এইচ সুইফট: ইউএস প্যাসিফিক ফ্লিট কমান্ডার। (বর্তমানে বাংলাদেশ সফররত)

দুই সন্তান নীতি চাহিদা বাড়াবে by কোই জিন

গত বছরের অক্টোবরে চীন এক সন্তান নীতি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়। এর মধ্য দিয়ে দেশটি ৩৭ বছরের অনুসৃত নীতির অবসান ঘটাল, যে কারণে দেশটিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। দেশটির সরকার যে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কঠোর নীতি গ্রহণ করেছিল, তার ফলে সেখানকার মানুষের গড় উর্বরতা কমে যায়, ১৯৭০ সালে যেখানে শহরের পরিবারগুলোতে গড়ে তিন সন্তান ছিল, সেখানে ১৯৮২ সালে তা কমে দাঁড়ায় এক-এ। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশটির দুই সন্তান নীতি এক সন্তান নীতির ফলাফল প্রশমন করতে কতটা কার্যকর হবে।
বস্তুত, দুই সন্তান নীতির ফলাফল এক সন্তান নীতির চেয়ে অনেক সুদূরপ্রসারী ও সার্বিকভাবে অনেকটা ইতিবাচক হবে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদে এটা অনেকটাই সত্য হবে, কিন্তু আপেক্ষিকভাবে স্বল্পমেয়াদেও এর প্রভাব দৃশ্যমান হবে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে, পরিবারে অতিরিক্ত একটি সন্তান এলে দেশটির সামগ্রিক সঞ্চয় কমে আসবে, যেটা সামষ্টিক অর্থনীতির দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ করবে।
বর্তমানে চীনের সঞ্চয়ের হার এত বেশি যে তাকে প্রায়ই বৈশ্বিক ভারসাম্যহীনতার প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হয়, বিশ্বব্যাপী সুদের হার কমার কারণ হিসেবেও এটাকে চিহ্নিত করা হয়। তা ছাড়া চীন যে বর্তমানে রপ্তানিমুখী অর্থনীতি থেকে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও সেবামুখী অর্থনীতির দিকে যেতে চাইছে, এই নিম্ন সুদের হার তার পথেও বড় একটা বাধা। এই উত্তরণকে ত্বরান্বিত করতে দুই সন্তান নীতি অপরিহার্য হয়ে উঠতে পারে, অধিকাংশ পর্যবেক্ষকের প্রত্যাশার চেয়েও যে প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হবে।
এখন পর্যন্ত অর্থনীতিবিদেরা চীনের জনসংখ্যার কাঠামোতে যে পরিবর্তন আসন্ন সেখানেই নজর দিচ্ছেন। এই এক সন্তান নীতির কারণে অনূর্ধ্ব ২০ বছরের মানুষের সংখ্যা কমে গেছে, ১৯৭০ সালে যারা ছিল জনসংখ্যার ৫১ শতাংশ, ২০১০ সালের মধ্যে তাদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ শতাংশে। আর এ সময়ের মধ্যে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যাও ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ শতাংশে দাঁড়ায়। ফলে গড় বয়স ২০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫।
কর্মক্ষম মানুষের চেয়ে অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে যাওয়ায় আজকের তরুণ প্রজন্মের ওপর ব্যাপক চাপ পড়বে। বাস্তবে ব্যাপারটা এমন হবে যে ১৯৮০-এর দশকের এক সন্তান নীতির যুগের মানুষের গড়ে দুজন বৃদ্ধ মানুষের ভরণপোষণ করতে হবে। উল্লিখিত তরিকায় হিসাব করলে দেখা যাবে, আজকের দুই সন্তান নীতির যুগের মানুষ যখন মধ্যবয়সী হবেন, তখন তাঁদের গড়ে একজন বৃদ্ধ মানুষের ভরণপোষণ করতে হবে। ফলে বৃদ্ধ মানুষের ভরণপোষণজনিত অর্থনৈতিক যে চাপ তা অনেকটাই কমে আসবে। এর মধ্যে আবার আরেকটি ব্যাপার ঘটবে। এক সন্তান-উত্তর যুগের মানুষের শুধু বৃদ্ধদের নয়, বিপুলসংখ্যক তরুণেরও ভরণপোষণ করতে হবে।
যদিও ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে এক সন্তান নীতির যুগের মানুষের জন্য কঠিন হবে, কিন্তু এর একটি অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যাবে, ভোগের পরিমাণ বেড়ে গেছে। কারণ, তাদের অতিরিক্ত ব্যয় করা ছাড়া আর তেমন কিছু করার সুযোগ থাকবে না। ওই যুগে যাঁদের যমজ সন্তান হয়েছে আর যাঁদের এক সন্তান হয়েছে, তাঁদের মধ্যে তুলনা করলেই দেখা যাবে, ভোগের ক্ষেত্রে কতটা পরিবর্তন এসেছে। (যদিও যমজ সন্তানদের পিতা-মাতার অক্ষমতার কারণে এটাকে ঠিক যথার্থরূপে প্রতিনিধিত্বশীল বলা যাবে না)।
সঞ্চয়ের পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যায়, শহুরে পরিবারগুলোর মধ্যে যাঁদের দুই সন্তান আছে, তাঁরা উপার্জনের ১২ দশমিক ৮ শতাংশ সঞ্চয় করেছেন আর যাঁদের এক সন্তান আছে, তাঁরা ২১ দশমিক ৩ শতাংশ সঞ্চয় করেছেন। আয় যেমনই হোক না কেন, এই পার্থক্যটা কিন্তু বেশ বড়ই। এই দুই সন্তান নীতির কারণে পরিবারের ভোগ বাড়বে, এর প্রভাব নিঃসন্দেহে কোনো না কোনো খাতের ওপর পড়বে। প্রথমত, অতিরিক্ত একটি সন্তানের জন্য বাবা-মাকে অতিরিক্ত খাতা, খেলনা ও বাইসাইকেল কিনতে হবে। আর এই প্রজন্ম বড় হলে তাদের গৃহায়ণ, ওষুধ ও বিমার চাহিদা অনেকাংশে বাড়বে।
শিক্ষাব্যয়ের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় পার্থক্য সৃষ্টি হবে। ২০০৯ সালে শহুরে পরিবারের ওপর পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা যায়, চীনে যেসব পরিবারে একটি সন্তান রয়েছে, সেই পরিবার শিক্ষায় তাদের মোট আয়ের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যয় করেছে আর যাদের যমজ সন্তান আছে, তারা ব্যয় করেছে ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ। দুই সন্তানের পরিবারের সংখ্যা বাড়তে থাকলে চীনের সঞ্চয়ের পরিমাণও ৭-১০ শতাংশ কমে আসবে, আজ যেটা ৩০ শতাংশ, আগামী ১০ বছরে তা কমে ২২ শতাংশে নামতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আছে। অধিক সন্তান মানে কিন্তু সন্তানপ্রতি শিক্ষা বিনিয়োগ কমে যাওয়া, যার মানে দাঁড়ায় মানবীয় পুঁজি অর্জনের ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাওয়া। হ্যাঁ, যমজ সন্তানদের বয়স ১৫ হলে তো তাদের পেছনে ব্যয়ের পরিমাণ কমে যায়, এক সন্তানের তুলনায়, যেটা শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে বড় পার্থক্য সৃষ্টি করে। এক সন্তানের তুলনায় যমজ সন্তানদের কারিগরি বিদ্যালয়ে যাওয়ার হার ৪০ শতাংশ বেশি।
এত কিছু সত্ত্বেও চীনের দুই সন্তান নীতি গ্রহণের অত্যন্ত প্রয়োজনীয়তা ছিল। তবে সেটা শুধু জনসংখ্যার ভারসাম্য আনার জন্য নয়। এ পথ বন্ধুর হবে, এই তরিকায় অনেক ভুলও থাকবে, কিন্তু তা সত্ত্বেও চীন যে নিজের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রাখতে চাইছে, তার জন্য এটা আশীর্বাদ হয়ে আসবে।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কোই জিন: লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের অর্থনীতির অধ্যাপক।

গরু সম্পর্কিত রচনা by আতাউর রহমান

ছেলে পরীক্ষা উপলক্ষে শিখেছে গরু সম্পর্কে রচনা। কিন্তু পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে এসে গেছে ‘নদী’। অতএব, কী আর করা? সে গরুকে নদীর তীরে নিয়ে এল; লিখল, ‘আমাদের গ্রামে একটি নদী আছে। নদীর তীরে অনেক গরু চরে’। অতঃপর জুড়ে দিল গরু সম্পর্কিত শেখা রচনাটা। আর পরীক্ষার খাতায় দুই ভাইয়ের গরু সম্পর্কিত রচনায় হুবহু মিল পরিলক্ষিত হলে পরীক্ষকের জিজ্ঞাসার জবাবে দুই ভাই সমস্বরে বলে উঠেছিল, ‘তা তো হবেই; কারণ আমরা যে একই গরুকে দেখে লিখেছি।’
এবং গ্রামের এক লোকের গরু হারানো গিয়েছিল; বহু চেষ্টা করেও সেটার খোঁজ পাওয়া গেল না। প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের মতে, প্রতিটি গ্রামেই একজন করে পাগল থাকে। তো সেই পাগল এক ঘণ্টার মধ্যে গরুটি খুঁজে বের করে নিয়ে এসে বলল, ‘আমি চিন্তা করে দেখলাম, আমি গরু হলে কোথায় কোথায় যাইতাম। সেই সব জায়গায় গেছি, গরু পাইয়া গ্যাছিগা।’ আর গ্রামের অপর একজনের গরু হারালে পরে সে সকালে খুঁজতে বেরিয়ে দুপুরে শুষ্ক মুখে বাড়িতে প্রত্যাবর্তনের পর পুত্রকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে এক গ্লাস পানি আনতে বললে স্ত্রীর জিজ্ঞাসার জবাবে নাকি বলেছিল, ‘মা, গরু হারালে এমনই হয়।’
ছাত্রাবস্থায় ‘জরাসন্ধ’ রচিত কারাগার সম্পর্কিত গ্রন্থ লৌহকপাট-এ পড়েছিলাম, গরু চুরির অপরাধে ধৃত অপরাধীকে কারাগারে সবচেয়ে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হয়। কেননা, গরু চুরি নাকি সবচেয়ে সহজ কাজ, গরুকে গোয়ালঘর থেকে বের করে রাতটা কোনোরকমে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে রেখে ভোরের আলোয় মানুষের হাঁটাচলার রাস্তায় তুলে দিয়ে গরুর পেছনে পেছনে হাঁটা দিলেই ব্যস, আর কিছু করার দরকার নেই।
মানবদেহের জন্য প্রোটিন অত্যাবশ্যক, আর প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে গরুর মাংস ও ডাল এবং একসময় ডাল অনেক সস্তা ছিল বিধায় ডালকে বলা হতো ‘পুওর ম্যানস বিফ’ তথা গরিবের গরুর মাংস; কিন্তু এখন আর সেই সুদিন নেই। আর আমাদের মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জবাইকৃত গরুর মাংসই সারা বছরের প্রোটিনের ঘাটতি বহুলাংশে পুষিয়ে দেয়। তো গল্প আছে: পাশাপাশি মুসলমান ও হিন্দুর বাড়ি। মুসলমানের বাড়িতে কোরবানির মাংস রান্না করায় হিন্দু প্রতিবেশী কোর্টে কেইস করে দিলেন যে যেহেতু ঘ্রাণে অর্ধভোজন হয়ে যায়, অতএব তাঁর জাত গেছে। সময়টা ছিল ব্রিটিশরাজের; ব্রিটিশ বিচারক রায় দিলেন—মুসলমান প্রতিবেশীকে ৫০০ টাকা জরিমানা করা হলো; তবে ২০০০ টাকার পরিমাণ মুদ্রার ঝনঝনানি অভিযোগকারীর কানের কাছে এক ঘণ্টা শোনালেই তা আদায় হয়ে যাবে, যেহেতু ঘ্রাণে অর্ধভোজন আর শ্রবণে সিকি।
বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ বা শব্দগুচ্ছও এসেছে গরু থেকে। উদাহরণস্বরূপ: গোবেট, গোমূর্খ, গোধূলি, গোবর-গণেশ, মাথায় গোবর, গো-বেচারা, গোগ্রাসে গেলা, গোবরে পদ্মফুল, ওগায়রা-ওগায়রা
আমাদের দেশে ‘টল-টক্’ তথা লম্বা-চওড়া কথা বলায় ওস্তাদ একজন একবার গল্প করছিলেন, ‘আমার দাদার গোয়ালঘর এত বিশালাকৃতির ছিল যে তার এক প্রান্তে গাভি বাছুর বিয়ালে সেটা অপর প্রান্তে হেঁটে যেতে যেতে নিজেই আরেকটা বাছুর বিয়ানোর উপযুক্ত হয়ে যেত।’ এটা শুনে আরেকজন বলল, ‘আমার দাদার একটি বিশাল লম্বা বাঁশ ছিল, যেটা দিয়ে তিনি মেঘাচ্ছন্ন সকালে মেঘ সরিয়ে রোদ পোহাতেন।’ ‘তা তোমার দাদা এত লম্বা বাঁশটি মাটিতে রাখতেন কোথায়’? প্রথমোক্ত ব্যক্তির এই প্রশ্নের উত্তরে দ্বিতীয় ব্যক্তি জানালেন, ‘তোমার দাদার গোয়ালঘরে।’
গল্পটির একটি চায়নিজ সংস্করণও আছে: জনৈক চায়নিজ বললেন, ‘আমাদের বাড়িতে একটা দারুণ ঢাক আছে, যেটা বাজালে আওয়াজ ১০০ মাইল দূর থেকেও শোনা যায়।’ শুনে অপর চায়নিজ বলে উঠলেন, ‘আমাদের বাড়িতে একটি বিশালাকৃতির গরু আছে, যেটা নদীর এপারে যখন পানি খায়, তখন তার মুখ চলে যায় ওপারে।’ আগের ওস্তাদের ‘এত বিশালাকৃতির গরু কি থাকতে পারে’ প্রশ্নের উত্তরে এবার তিনি বললেন, ‘না থাকলে আপনাদের ওই ঢাকের চামড়া আসবে কোত্থেকে?’
ইসমাইলিয়া শিয়া সম্প্রদায়ের বর্তমান গুরু প্রিন্স করিম আগা খানের দাদা প্রিন্স আলী আগা খানকে একবার নাকি ইউরোপে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘এটা কি সত্যি যে আপনার ধর্মানুসারীরা আপনাকে পূজা করেন?’ তদুত্তরে তিনি মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘আরে, আমি যে ভারতবর্ষের অধিবাসী, সেখানে লোকজন গরুকে পূজা করে; আর আমি তো মানুষ।’
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের বেলায়ও গরুর একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। সিপাহিদের বন্দুকে যে কার্তুজ ব্যবহৃত হতো, সেটা দাঁত দিয়ে কাটতে হতো। তো গুজব রটে যায় যে এর সঙ্গে গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত আছে; তাই কার্তুজ ব্যবহার করলে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সৈন্যদেরই জাত যাবে। তাই দানা বাঁধে বিদ্রোহের, যেটা ব্রিটিশরা অনেক কষ্টে সামাল দিতে পেরেছিল।
গরু সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দেরও (যাঁর পারিবারিক নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত) একটি মজার উপাখ্যান আছে: একবার গিরিধারী লাল নামক এক ব্যক্তি স্বামী বিবেকানন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎপূর্বক বলল যে সে গো-রক্ষিণী সমিতির সম্পাদক; দুর্বল, রুগ্ণ, জরাগ্রস্ত গো-মাতাদের সেবা করাই তাদের ব্রত। এটা শুনে বিবেকানন্দ বললেন, ‘শুনেছি মধ্য ভারতে দুর্ভিক্ষে প্রায় নয় লাখ লোক মারা গেছে। এ ব্যাপারে আপনারা কী করেছেন? লোকটি বলল, ‘মানুষ মরছে নিজের কর্মফলে। তাদের বাঁচার দরকার কী? আর গাভি হচ্ছে আমাদের মাতা।’
এবারে স্বামীজি সহাস্যে মন্তব্য করলেন, ‘হ্যাঁ, গাভি যে আপনাদের মাতা, সেটা বিলক্ষণ বুঝেছি। কেননা, তা নইলে এমন সব ছেলে জন্মাবে কেন?’
আর গোপাল ভাঁড়ের গল্পেও গরু যথারীতি বিদ্যমান। একদা নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর ভাঁড় গোপালের বুদ্ধি পরীক্ষা করার জন্য বললেন, ‘কাল তুমি আমাকে একসের ষাঁড়ের দুধ এনে দিও।’ গোপাল তো চিন্তায় চিন্তায় অস্থির। তাঁর বউ বললেন, ‘চিন্তার কোনো কারণ নেই; আমি এটা সামাল দিচ্ছি।’ তিনি এক বোঝা কাপড় নিয়ে রাজবাড়ির সামনে নদীর ঘাটে কাচতে শুরু করে দিলেন। রাজা দেখতে পেয়ে প্রশ্ন করাতে তিনি বললেন, ‘আমার স্বামী প্রসব বেদনায় কাতর। তাই আমাকে এ কাজ করতে হচ্ছে।’ রাজা এটা শুনে বিস্ময় প্রকাশ করাতে গোপাল-পত্নী এবার বললেন, ‘রাজা মশায়, যে দেশে ষাঁড়ের দুধ পাওয়া যায়, সে দেশে ওটা এতই কি অসম্ভব!’ রাজা তখন বিষয়টা বুঝতে পেরে উচ্চ স্বরে হেসে উঠেছিলেন।
বাংলা ভাষায় অনেক শব্দ বা শব্দগুচ্ছও এসেছে গরু থেকে। উদাহরণস্বরূপ: গোবেট, গোমূর্খ, গোধূলি, গোবর-গণেশ, মাথায় গোবর, গো-বেচারা, গোগ্রাসে গেলা, গোবরে পদ্মফুল, ওগায়রা-ওগায়রা (ইত্যাদি ইত্যাদি)।
সুধী পাঠক, গরু এখন আর শুধু নিরীহ গৃহপালিত পশু নয়, রাজনীতির নিয়ামকও বটে। ভারতের বহু রাজ্যে গরু জবাই আইন করে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বহু রাজ্যে গরু জবাইতে শর্তও আরোপ করে দেওয়া আছে। সর্বোপরি সম্প্রতি ফ্রিজে গরুর মাংস রাখা হয়েছে—এই অভিযোগে নয়াদিল্লির নিকটস্থ উত্তর প্রদেশের দাদরি এলাকার বিসাদা নাম গ্রামে আখলাক নামের একজনকে পিটিয়ে মারা হয়েছে। পত্রিকার পাতায় প্রতিবেদনটি পড়ে গরু সম্পর্কিত কতিপয় মুখরোচক গল্প ও কথামৃত আপনাদের মনোরঞ্জনার্থে এ-স্থলে পেশ করে দিলাম।
ভালো থাকুন। বেঁচে থাক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি!
আতাউর রহমান: রম্য লেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

হে বন্ধু বিদায়, হে মহান বীর বিদায়- জেনারেল জ্যাকবের প্রয়াণ

বিদায় বন্ধু বিদায়। বাংলাদেশ তার মহান স্বাধীনতা আন্দোলনে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালনকারী জেনারেল জে এফ আর জ্যাকবকে হারাল। ৯২ বছর বয়সে দিল্লিতে তিনি গতকাল সকালে পরলোকগমন করেছেন। বাংলাদেশি মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও জনগণ তাঁর মৃত্যুতে গভীরভাবে শোকাহত। জ্যাকব ছিলেন বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম মানবতাবাদী বন্ধু। তিনি বাংলাদেশের মানুষকে ভালোবেসেছিলেন। এই ভূখণ্ডের মানুষের প্রতি তাঁর অনুরাগের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে, যখন তিনি তাঁর সেনাদল নিয়ে বার্মা ফ্রন্টে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি সব সময় বাংলাদেশ ও বাংলাদেশি জনগণের সাফল্য ও অগ্রযাত্রা কামনা করেছেন। আমরা হারালাম এমন একজন বিদেশি বন্ধুকে, যঁার হৃদয়ে সব সময় জাগরূক থেকেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বড় কোনো সাফল্যের খবরে তাঁর মুখে আমরা অনাবিল হাসি দেখেছি।
জ্যাকব ছিলেন সেসব শ্রদ্ধাভাজন ভারতীয় সেনানায়কের অন্যতম, যিনি একাগ্রচিত্তে একটি পরম সত্য কোনো প্রকারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই উচ্চারণে বরাবর অকপট থেকেছেন যে মুক্তিযোদ্ধারাই বাংলাদেশিদের স্বতঃপ্রণোদিত সমর্থনে বাংলাদেশ ছিনিয়ে এনেছেন। ভারতীয় বীর যোদ্ধারা তঁাদের সহায়তা দিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট কমান্ডের অধীনে কিংবদন্তিতুল্য ভূমিকা পালন করে যে কজন বীর ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন, জেনারেল জ্যাকব তঁাদের অন্যতম। বিশেষ করে ‘ঢাকার পতন’ ঘটাতে তিনি এক অবিস্মরণীয় স্ট্র্যাটেজিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল নিয়াজি ও জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার মধ্যে ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানটি সব থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি ছিলেন এর অগ্রগণ্য ব্যবস্থাপক। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নির্দেশে তিনি মধ্য ডিসেম্বরে ঢাকায় পা রাখেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরেই আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করতে তিনি মাঠপর্যায়ের মুখ্য রূপকার হয়ে উঠেছিলেন।
যত দিন বাংলাদেশ টিকে থাকবে, জ্যাকব ও তাঁর বর্ণাঢ্য স্মৃতি তত দিন ভাস্বর হয়ে থাকবে। আমরা এই বীরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন ও তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।