Monday, September 23, 2013

বন্যা নিয়ন্ত্রন গাইড ওয়াল নির্মাণের ৬ মাসের মাথায় ভেঙে গেছে

কুতুবদিয়ায় গ্রামীন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষনের জন্য কুতুবদিয়া উপজেলার দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের কিলোমিটার সড়কের বন্যা নিয়ন্ত্রিন গাইড ওয়াল ভেঙে যাওয়ায় পথচারীরা চলাচলে মারাত্মক দূর্ভোগ পোহাচ্ছে।

উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর অর্থায়নে বরাদ্দের কাজ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় (এলজিইডি) কুতুবদিয়া উপজেলা প্রকৌশলী অফিস থেকে প্রক্কলন তৈরী করে নির্মিত দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের কিলোমিটার সড়কের গাইড ওয়াল নির্মানের ৬ মাসের মাথায় ভেঙে যাওয়ায় ঐ এলাকার প্রায় দুই হাজার পথচারীর চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে।
এ ব্যাপারে দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপির সদস্য মোক্তার আহমদ মঙ্গলবার (১৭ সেপ্টেম্বর ) কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার  (ইউএনও) নিকট কিলোমিটার সড়কের গাইড ওয়াল ভেঙে যাওয়ার বিষয়টি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। উপজেলা  প্রকৌশলী (এলজিইডি) মোহামদ মহসীন জানান, গত ২০১১-১২ অর্থ বছরের উপজেলা পরিষদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর অর্থায়নে দক্ষিণ ধুরুং ইউনিয়নের কিলোমিটার সড়কের গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য প্রায় ৭৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ৮০ ফুট লম্বা গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়।
গত শুস্ক মৌসুমে গাইড ওয়ালটি নির্মাণ করা হয়। চলতি বর্ষা মৌসুমে  বন্যার পানির স্রোতের চাপে গাইড ওয়ালের পাশের মাটি সরে যাওয়ায় ওয়ালটি ভেঙে পড়ে। অবশ্য রাস্তার গাইড ওয়াল ভেঙে যাওয়ার ঐ এলাকায় পূণমেরামত করার জন্য উদ্যোগ নেয়া হবে।
স্থানীয় ইউপির সদস্য মোক্তার আহমদ বলেন, গত বৈশাখ মাসের শুস্ক মৌসুমে কিলোমিটার রাস্তায় বন্যা নিয়ন্ত্রন গাইড ওয়ালটি নির্মাণ করা হয়।
কাজের গুণগতমান নিম্নমানের ইট,বালি ও সিমেন্ট কম ব্যবহার করায় নির্মাণের ৬ মাসের মাথায় গাইড ওয়ালটি ভেঙে যায়।
বর্তমানে এ রাস্তায় দিয়ে পথচারীদের যাতায়াতের চরম দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ প্রকল্পের ঠিকাদার মৌলভী ইলিয়াছ জানান, স্থানীয় জনগনের সহযোগিতায় গাইড ওয়ালটি নির্মাণ করা হয়েছে। কাজে ক্রুটি ছিলনা। গত ২০১১-১২ অর্থ বছরে ওয়ালটি নির্মাণ করা হয়েছে। বন্যার পানির স্রোতের চাপে ওয়ালটি ভেঙে গেছে।

টেলিভিশনের টকশো বিতর্ক by রাজীন অভী মুস্তাফিজ

রেডিও ও টেলিভিশনে আলোচনা অনুষ্ঠান বা টকশো নতুন কোনো বিষয় নয়। টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই টকশো প্রচার হয়ে আসছে। ১৯৫১ সালে আমেরিকান টিভি ব্যক্তিত্ব জো ফ্রাংকলিনের হাত ধরে টেলিভিশনে টকশোর যাত্রা শুরু হয়। এরপর নানা ধরনের পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেছে টিভি অনুষ্ঠানের এই বিশেষ ধরনটি। পশ্চিমা দেশে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ধরনের টকশো প্রচার হয়ে থাকে- যেমন দিনের শুরুতে ব্রেকফাস্ট টকশো, দিনের মধ্যভাগে লেট মর্নিং টকশো এবং ডে টাইম টকশো, তারকাদের নিয়ে সেলিব্রেটি টকশো, রাতের বেলা লেটনাইট টকশো এবং সাপ্তাহিক ছুটির দিনে উইক অ্যান্ড টকশো। একেকটি টকশোর বিষয়বস্তু একেক ধরনের হয়ে থাকে। যেমন ব্রেকফাস্ট টকশো সাধারণত রাজনৈতিক বিষয় এবং সংবাদ বিশ্লেষণের ওপর জোর দেয়। লেট মর্নিং টকশো বিনোদন ও লাইফ স্টাইল নির্ভরশীল। ডে টাইম টকশোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকরা অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা বিতর্কিত ব্যক্তিদের সরাসরি প্রশ্ন করতে, এমনকি সামনাসামনি সমালোচনাও করতে পারে। লেটনাইট টকশোগুলো সাধারণত একটু হালকা ধরনের হয়ে থাকে। এই টকশোর একটা চিরায়ত বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে উপস্থাপক ডেস্কের পেছনে অবস্থান করেন, সেখান থেকেই তিনি অনুষ্ঠানের শুরুতে দিনের বিভিন্ন খবর নিয়ে কৌতুক করেন এবং পরবর্তীকালে এক বা একাধিক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নিয়ে থাকেন। দর্শকদের একঘেয়েমি দূর করতে সঙ্গীতও লেটনাইট টকশোর একটি নিয়মিত অংশ। বাংলাদেশের সূচনালগ্ন থেকেই টকশো প্রচার হয়ে আসছে বিটিভিতে, তবে সেগুলো টকশো নামে প্রচারিত হতো না, প্রচারিত হতো আলোচনা বা আলেখ্য অনুষ্ঠান নামে। যেখানে দু-তিনজন দক্ষ আলোচক আসতেন, কোনো একটি বিষয়ের ওপর ভাবগম্ভীর আলোচনা করতেন, মানুষকে উপদেশ দিতেন এবং কোনো বিষয়ে কোনো ধরনের সমালোচনা না করে শুধুই ভালো ভালো কথা বলতেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশে টকশো এখন টিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান। প্রায় প্রতিটি চ্যানেলেই দিনের একটা বড় অংশজুড়ে থাকে টকশোর প্রাধান্য। তবে আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো দুটি বিষয়েই প্রাধান্য দিয়ে থাকে- সেলিব্রেটি টকশো যেখানে এক বা একাধিক তারকা আসেন এবং উপস্থাপক তাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করে থাকেন, অন্যটি হচ্ছে রাজনৈতিক টকশো যেখানে রাজনীতিক বা বোদ্ধাশ্রেণীর আলোচক আসেন এবং চলমান রাজনীতি নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করে থাকেন। এই টকশোগুলোর বেশিরভাগই সরাসরি সম্প্রচারিত হয় এবং দর্শকরা ফোন করে সরাসরি তাদের মতামত জানাতে পারে।
নব্বই দশকের শুরুতে গণতন্ত্রের শুভ সূচনার পর আমরা বিটিভিতে দেখতে পাই প্রথম রাজনৈতিক টকশো যার নাম ছিল ‘মুখোমুখি’। এ অনুষ্ঠানে সরকার ও বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য এবং প্রথম সারির রাজনীতিকরা উপস্থিত থাকতেন এবং আদালতের আদলে গড়া কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের ভেতর তাদের প্রতিপক্ষের গঠনমূলক সমালোচনা কিংবা কোনো বিষয়ে তাদের দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন অথবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতেন। যদিও খুব বেশিদিন প্রচারিত হয়নি সেই অনুষ্ঠানটি। বেসরকারি টিভি চ্যানেল যুগে প্রবেশের আগে আর খুব বেশি রাজনৈতিক টকশো উল্লেখযোগ্য নয়, যদিও ছিয়ানব্বইয়ের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ নামে একটি জবাবদিহিমূলক অনুষ্ঠান রাজনৈতিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছিল। আমাদের গভীর রাতের বর্তমান রাজনৈতিক টকশোগুলোর খুব চেনা একটা ছক আছে। একজন উপস্থাপক থাকেন এবং তার সঙ্গে থাকেন একাধিক রাজনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, যদিও মাঝেমধ্যে শুধুই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দেখা যায়। যা হোক রাজনীতিকদের আমন্ত্রণ জানানোর সময়ও এমনভাবে সেটা করা হয় যেন একজন সরকারদলীয় এবং একজন বিরোধীদলীয় হন। আবার রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের আমন্ত্রণ জানানোর সময়ও এই একই বিভাজনটি বিবেচনায় রাখা হয়। খুব সচেতনভাবে সরকার ও বিরোধীদলীয় লোকজনকে এমনভাবে নিয়ে আসা হয় যেন উভয়পক্ষের আলোচনাটি শেষ পর্যন্ত একটি বিতর্কে রূপ নেয়। বিশেষত রাজনীতিকদের আলোচনা শেষ পর্যন্ত প্রায় ঝগড়ার দিকে গড়ায়, দু’পক্ষই যার যার দলীয় সাফাই গাইতে থাকেন, বাস্তবতা যাই হোক না কেন, তারা শুধু দলীয় আনুগত্য প্রকাশেই ব্যস্ত থাকেন এবং আক্রমণাত্মক বাক্যের যথেচ্ছ ব্যবহার করে যান।
বিশ্লেষকরা রাজনীতিক নন। তাই তারা উচ্চস্বরে কথা বলেন না। অন্য কেউ কথা বলার সময় বাধা দেন না। অগণতান্ত্রিক কোনো আচরণও করেন না। তারা একজন আরেকজনকে সম্মান দেখান এবং প্রায়ই অন্য আলোচকদের সঙ্গে কিছু বিষয়ে একমত হন। তারা নিরপেক্ষতার সঙ্গে পরিস্থিতির বিচার-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নিরপেক্ষতার আড়ালেও কোনো দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব থাকে। পক্ষপাতিত্ব থাকে কারণ বর্তমান সময়ের টকশোগুলোর অনেক বিশ্লেষক, অবশ্য সবাই নয়, বর্তমান বা পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে সুবিধাভোগ করেছেন কিংবা অদূর ভবিষ্যতে কোনো সুবিধা পাওয়ার আশা করছেন। তাই তারা প্রচ্ছন্নভাবে তাদের সুবিধা প্রদানকারী দলের পক্ষে কথা বলেন এবং অনেক সময়ই সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেন। তবে দর্শকও এখন আর অতটা বোকা নয় যে, সবাইকে তারা সমানভাবে বিশ্বাস করে। অনেক বিশ্লেষকেরই দলীয় পক্ষপাতিত্বের বিষয়টি তাদের জানা। তাই তারা তাদের আর সেভাবে বিশ্বাস করতে পারেন না। কারণ দর্শক জানে কোনো কোনো বিশ্লেষক নিরপেক্ষতার ছদ্মবেশে শুধু গোপন এজেন্ডা বাস্তবায়নে আগ্রহী।
তারপরও কেন বাংলাদেশে গভীর রাতের রাজনৈতিক টকশোগুলোর এত জনপ্রিয়তা? আসলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে প্রতিদিনই আমরা এত সমস্যার সম্মুখীন হই যে প্রতি মুহূর্তেই আমাদের ভেতর নেতিবাচক শক্তি (নেগেটিভ এনার্জি) বা ক্ষোভ জমা হতে থাকে। এই ক্ষোভ প্রশমনের জন্য নিজের অজান্তেই কেউ কেউ হয়তো তার অধীনস্থদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে থাকে, কেউবা সামান্য কারণেই দাম্পত্য কলহে জড়িয়ে পড়ে, আবার কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে মন খুলে এসব বিষয়ে তাদের অসন্তোষের কথা অন্য সবার সামনে তুলে ধরেন। এমনি আরও অনেকভাবেই আমরা আমাদের ভেতরে জমা হওয়া নেতিবাচক শক্তি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চাই। এক্ষেত্রে টকশো, বিশেষত রাজনৈতিক টকশোগুলোর সঙ্গে দর্শক নিজেদের একাÍ করার একটা সুযোগ পান। সাধারণ দর্শক এসব টকশো ও আলোচকদের তাদের মতো অসহায় মানুষদের পক্ষে কথা বলার প্রতিনিধি বলে মনে করেন এবং বিশ্বাস করেন যে তাদের মতামতের কিছুটা হলেও প্রতিফলিত হয় গভীর রাতের রাজনৈতিক টকশো ও আলোচকদের মাধ্যমে। সে কারণে যখন কোনো আলোচক সরকার বা বিরোধী দলের কোনো সিদ্ধান্ত বা মতাদর্শের বিরুদ্ধে তত্ত্ব, তথ্য ও প্রমাণসহ যুক্তিযুক্তভাবে তাদের গঠনমূলক সমালোচনা করেন, তখন সাধারণ দর্শক সেই আলোচনা বা সমালোচনায় নিজেদের কথাগুলোর প্রতিধ্বনিই যেন শুনতে পায় এবং পুরো বিষয়টির সঙ্গে আরও বেশি একাত্ম হয়ে যায়, যার ফলে ঊর্ধ্বমুখী টকশোর জনপ্রিয়তা ও সংখ্যা।
এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, এদেশের টিভি চ্যানেলের টকশোগুলো সরকার বা বিরোধী দলের ভালো ও মন্দ কাজের বিশ্লেষণের অন্যতম একটি মাধ্যম। এ কারণে অগণতান্ত্রিক মতাদর্শ, সিদ্ধান্ত অথবা জনস্বার্থবিরোধী কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের আগে সরকার, বিরোধী দল এবং যে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে বাধ্য হয় যে, টিভি টকশোগুলো এসব বিষয় দর্শকদের সামনে তুলে ধরবে, যা সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরির পাশাপাশি তাদের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে এটাও সত্য যে, আমাদের টিভি চ্যানেলে প্রচারিত টকশোগুলোর মান নিয়ে যথেষ্ট সংশয় আছে। কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া যখন দুই-তিনজন আলোচক চলমান বিষয় নিয়ে বিশেষজ্ঞের মতামত প্রদান করেন, তখন প্রায়ই বোঝা যায় ওই বিষয়ে কথা বলার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ প্রস্তুত তারা সেই মুহূর্তে নন। এছাড়া আলোচনার বিষয়ভেদে আলোচকদের গ্রহণযোগ্যতারও একটি প্রশ্ন থাকে। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত টকশো প্রচার হওয়ার কারণে প্রায়ই নিুমানের অনুষ্ঠান প্রচার হচ্ছে। আবার একই আলোচক বিভিন্ন টকশোতে বারবার একই কথা বলে যাওয়ায় বৈচিত্র্যহীনতার সৃষ্টি হচ্ছে।
ইদানীং প্রায়ই বিভিন্ন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে টকশোকে ব্যঙ্গ করা হয়, হাস্যকরভাবে উপস্থাপন করা হয়, তুলে ধরা হয় আলোচকদের একরোখা মনোভাব, আপসহীন মানসিকতা এবং উপস্থাপকদের অসহায়ত্ব। বাংলাদেশের শীর্ষ রাজনীতিকদের কাছ থেকে যে অসহিষ্ণু আচরণ আমরা টকশোর মাধ্যমে দেখি, তা সত্যিই হতাশার সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের প্রত্যাশাও প্রায়ই পূরণ হয় না তাদের কারও কারও সুবিধাভোগী মানসিকতার জন্য। সে জন্য টকশোগুলোকে ঢালাওভাবে অপবাদ দেয়াটা অন্যায় হবে। প্রয়োজন আমাদের সহিষ্ণুতা, সচেতনতা এবং সর্বোপরি দেশপ্রেম।
রাজীন অভী মুস্তাফিজ : ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষক

সিরীয় সমঝোতা ও অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন by তারেক শামসুর রেহমান

জেনেভায় লেভারভ-কেরি সমঝোতা স্বাক্ষর এবং জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকদের তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের পরও সিরিয়া সংকটের সমাধান হয়েছে এটা বলা যাবে না। লেভারভ-কেরি সমঝোতায় আপাতত মধ্যপ্রাচ্যে একটি ‘যুদ্ধ’ এড়ানো গেছে সত্য, তবে বেশ কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন রয়ে গেছে, যার ওপর নির্ভর করছে সিরিয়ার ভবিষ্যৎ। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রী একটি সমঝোতায় উপনীত হলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক নীতিনির্ধারককে দেখেছি তারা রাশিয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। উপরন্তু পুতিনের নিউইয়র্ক টাইমসে দেয়া একটি উন্মুক্ত আবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে American Exceptionalism হিসেবে উল্লেখ করায় একটা প্রশ্ন থেকেই গেল যে, আগামীতে স্নায়ুযুদ্ধ সময়কার পরিস্থিতির জন্ম হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্ররা American Exceptionalism বা আমেরিকার রক্ষণশীলতাবাদ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন। মার্কসবাদীরা এ টার্ম এক সময় ব্যবহার করতেন, বিশেষ করে স্ট্যালিনের সময়কালে মার্কিন গবেষকরা অনেকেই এ বিষয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের ২০ বছর পার হয়ে যাওয়ার পর আমেরিকার যুদ্ধবাজরা আবার তৎপর হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ওবামা নিজে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার (২০০৮) পেলেও লিবিয়ায় তিনি যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। এখন সিরিয়ায় আরেকটি যুদ্ধের জন্য সারাবিশ্ব অপেক্ষা করছে। সারাবিশ্ব জানে, ইসরাইলি লবি এবং ইসরাইল নিজেও সিরিয়ায় যুদ্ধ চায়। এখন ‘কূটনীতি’ যুদ্ধবাজদের পূর্ণ পরাস্ত করতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না। এখনও যুদ্ধের সম্ভাবনা রয়েছে।
লেভারভ ও কেরির মধ্যে সমঝোতার পাশাপাশি আরও দুটি সংবাদ সম্প্রতি ছাপা হয়েছে, যা ওই অঞ্চল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিতে পারে। এক. জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল তাদের প্রতিবেদন নিরাপত্তা পরিষদের কাছে জমা দিয়েছে। ওই রিপোর্টে সরাসরি আসাদ সরকারকে রাসায়নিক অস্ত্র দিয়ে হামলার (২১ আগস্ট) ব্যাপারে অভিযুক্ত করা হয়নি। রিপোর্টে স্বীকার করা হয়েছে, সিরিয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কারা ওই অস্ত্র ব্যবহার করেছে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকলেও এ হামলার জন্য পরোক্ষভাবে আসাদ সরকারকেই দায়ী করা হয়েছে। দুই. লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফে’ আইএইচএস জেইন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, বর্তমানে সিরিয়ায় আসাদের বিরুদ্ধে যারা যুদ্ধ করছে (সংখ্যায় প্রায় এক লাখ), সেই বিদ্রোহী বাহিনীর প্রায় অর্ধেক জঙ্গি সংগঠন আল কায়দার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। এটা একটা উদ্বেগজনক খবর। যারা নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন, তাদের কাছে জেইনের গবেষণা কোনো অপরিচিত বিষয় নয়। জেইনের পক্ষ থেকে গবেষণাটি পরিচালনা করেন চার্লস লিস্টার। তিনি তার গবেষণায় এটাও উল্লেখ করেছেন, বিদ্রোহী বাহিনীর সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার লোক রয়েছেন, যারা আদৌ সিরিয়ার নাগরিক নন। এরা জঙ্গিবাদী সংগঠন আল নুসরা ফ্রন্ট, ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার ব্যানারে আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কোনো মহলে এমন ধারণাও জন্ম হয়েছে যে, সিরীয় যুদ্ধে লাভবান হচ্ছে নয়া আল কায়দা সংগঠনগুলো। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন হলে আসাদ সরকারের সব অস্ত্র চলে যাবে আল কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলোর হাতে। এমনকি রাসায়নিক অস্ত্র এদের হাতে পড়াও বিচিত্র কিছু নয়। চার্লস লিস্টার তার গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, মাত্র ২৫ ভাগ যোদ্ধা ধর্মনিরপেক্ষ তথা লিবারেলপন্থী। সিরিয়া সংকটে আল কায়দার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো যে শক্তিশালী হয়েছে, তা সম্প্রতি ওয়াশিংটনে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটির (সিনেটের) এক শুনানিতেও উল্লেখ করা হয়েছে। টম জোসেলিনের কমিটিতে সাক্ষ্যদানের খবর ইন্টারনেটে সার্চ দিলে পাওয়া যাবে। তাই একটা প্রশ্ন থেকেই গেল- রুশ-মার্কিন সমঝোতা সিরিয়া সংকটের কতটুকু সমাধান বয়ে আনবে? এটা সত্য, আপাতত যুদ্ধ হচ্ছে না। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। মার্কিন টিভি চ্যানেলগুলোয় এমনকি ফরিদ জাকারিয়ার মতো টিভি ব্যক্তিত্বও এ চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। অনেকেই বলেছেন, এ সমঝোতা কাজ করবে না। এখানে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। এক. সমঝোতা অনুযায়ী সিরিয়ায় পরিপূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণের কাজ শেষ হবে ২০১৪ সালের মাঝামাঝি। প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এতদিন অপেক্ষা করবে কি-না? এখানে প্রশ্ন উঠেছে, বাশার আল আসাদকে স্বীকার করা নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নকারী ও নীতিনির্ধারকরা এটা কি করবেন? দুই. এ অঞ্চলের ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে স্ট্র্যাটেজি তাতে দেখা যায়, ক্ষমতায় একনায়কতান্ত্রিক সরকারগুলোকে রেখে কোনো সমঝোতায় জট খোলেনি। ইরাকে সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ায় গাদ্দাফির ক্ষেত্রে কোনো জট খোলেনি। ফলে চূড়ান্ত বিচারে এদের উৎখাতের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের। এরা সাদ্দাম হোসেন, গাদ্দাফি আর বাশারকে এক কাতারেই দেখে। কোনো পার্থক্য করে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র কি বাশারকে আরও প্রায় এক বছর ক্ষমতায় রাখবে? তিন. সমঝোতায় সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্রের হিসাব, অবস্থান, মজুদ, অস্ত্রের ধরন, গবেষণা ইত্যাদির কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। নভেম্বরের মধ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়ার কথা। এখন যদি সিরীয় সরকার জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শকদের সঙ্গে সহযোগিতা না করে, তখন কী হবে? চার. রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, সিরিয়াকে পুরোপুরিভাবে রাসায়নিক অস্ত্রমুক্ত করার কাজটি অত সহজ নয়। কারণ ধারণা করা হয়, সিরিয়ায় মোট ৪০টি রাসায়নিক কারখানা অথবা এলাকা রয়েছে, যেখানে এসব অস্ত্র উৎপাদন করা হয় অথবা তা সংরক্ষণ করা হয়। প্রায় ১ হাজার মেট্রিক টন গ্যাস (সারিন ও মাস্টার্ড গ্যাস) সিরিয়া সংরক্ষণ করেছে। এসব গ্যাস ধ্বংস করা কঠিন কাজ। একজন গবেষক লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র গত ২৮ বছর ধরেই তাদের কাছে রক্ষিত রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করে আসছে। কিন্তু পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। এখানে সিরিয়া নিয়ে যে বড় সমস্যা হবে তা হচ্ছে, এসব অস্ত্র একটি নির্দিষ্ট প্লান্টে বা স্থানে ধ্বংস করতে হবে। সিরিয়ায় তা করা যাবে না। সিরিয়া থেকে সরিয়ে নিয়ে অন্য কোনো দেশে ধ্বংস করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের ১৩টি প্লান্টের মধ্যে ৯টি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইউরোপে পরিবেশবাদীরা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা যে কোনো পরিবহন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা গড়ে তুলবে। স্থানীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনও পরিবহন ব্যবস্থার বিপক্ষে। সুতরাং একটা প্রশ্ন থেকেই গেল। এ ক্ষেত্রে রাশিয়া একটা সমাধান হতে পারে। কিন্তু সিরিয়ার আসাদ সরকারকে রাশিয়ার সমর্থন এবং রুশ-মার্কিন সম্পর্কের টানাপোড়েন ইত্যাদি নানা কারণে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের বিষয়টি নিয়ে আগামীতে জটিলতা তৈরি হতে পারে। পাঁচ. সিরিয়ায় অস্ত্র পরিদর্শক হিসেবে কারা কারা থাকবেন, সেটা নিয়েও একটা জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে একটি সংস্থা রয়েছে- Organization for the Prohibition of Chemical Weapons (OPCW)। এ সংস্থাটি মূলত নিয়ন্ত্রণ করে আমেরিকানরা। এ ক্ষেত্রে পরিদর্শক টিমে যদি আমেরিকানদের সংখ্যা বেশি থাকে, তা সিরিয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। ছয়. এ সমঝোতার ব্যাপারে সিরীয় বিদ্রোহীরা তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে। বাশার সরকার বিদ্রোহীদের নিরস্ত্রীকরণের দাবি জানিয়ে আসছিল। কিন্তু সেই দাবি গ্রহণযোগ্য হয়নি। এখন বিদ্রোহীরা যদি তাদের আক্রমণ অব্যাহত রাখে, তাতে করে এ পরিদর্শন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। ভেঙে যেতে পারে সমঝোতা। সাত. এ সমঝোতার পেছনে মূল অ্যাক্টর দুই শক্তি- যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। অথচ সিরীয় সরকার ও বিদ্রোহী পক্ষের কোনো অংশগ্রহণ নেই। ফলে অনেকটা চাপিয়ে দেয়ার মতো হয়ে গেল বিষয়টা। আন্তর্জাতিক যে কোনো ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মাঝে যদি বিরোধ দেখা দেয়, তাহলে তা এই সমঝোতার ওপর প্রভাব ফেলবে। সমঝোতা ভেঙেও যেতে পারে।
সিরিয়ায় একটি ‘সমঝোতার’ মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের ব্যাপারে মার্কিন নীতিতে আদৌ কোনো পরিবর্তন আসে কি-না, সে বিষয়ে লক্ষ্য থাকবে অনেকের। মিসরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ‘ব্যর্থ’ হয়েছে। বলা হচ্ছে, সেখানে যে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার পেছনে ইসরাইলি লবি কাজ করেছিল। নিঃসন্দেহে মিসরে সামরিক অভ্যুত্থান মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একটা দোটানায় ফেলে দিয়েছে। ইরানের নতুন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ওবামা প্রশাসনের সম্পর্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও লক্ষ্য থাকবে অনেকের। বিশেষ করে নতুন প্রেসিডেন্ট ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান, তা দেখতে চাইবে মার্কিন নীতিনির্ধারকদের অনেকে। আর সিরিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ লেবাননের দিকে দৃষ্টি এখন অনেকের। পর্যবেক্ষকদের কারও কারও ধারণা, সিরিয়ার পর এখন লেবাননে অস্থিরতা দেখা দেবে। লেবাননের হিজবুল্লাহদের ব্যাপারে ইসরাইলের আপত্তি দীর্ঘদিনের। তাই সিরিয়ায় একটি সমঝোতা আমাদের সব প্রশ্নের জবাব দেবে না। মধ্যপ্রাচ্য উত্তপ্ত থাকবেই আরও বেশ কিছুদিনের জন্য।
হিউস্টন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মূল্যবোধ গঠনে যৌথ পরিবারের ভূমিকা by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

উন্নত মূলবোধসম্পন্ন একটি জাতি গঠনে সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম। সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা ছাড়া মূলবোধসম্পন্ন জাতি আশা করা অবান্তর। কথায় আছে, ‘একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করতে চাইলে আগে তার সংস্কৃতিকে ধ্বংস কর।’ বাংলাদেশের অবস্থা সেরকমই হয়েছে। মাদক আর অপসংস্কৃতির ছোবলে আমাদের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল সংস্কৃতি আজ ধ্বংস হতে বসেছে। যার জন্য স্বাধীনতার ৪২ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও আমরা উন্নত মূল্যবোধসম্পন্ন একটি জাতি গঠন করতে সমর্থ হয়নি। উপরন্তু কোন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিতে আমাদের প্রজন্ম বেড়ে উঠছে, তা আমরা নিজেরাই জানি না। তবে এটুকু জানি, একটা হ-য-ব-র-ল জাতি হিসেবে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি অন্ধকার গহ্বরের দিকে। অথচ স্বাধীন জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে হলে আগে প্রয়োজন উন্নত মূল্যবোধসম্পন্ন একটি জাতি গঠন আর এর জন্য দরকার সৎ, দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও শক্তিশালী সামাজিক নেতৃত্ব। কেননা সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক ওতপ্রোত, রাজনৈতিক সচেতনতা ছাড়া সুস্থ সংস্কৃতি চর্চা আশা করা যায় না। বিদেশী অপসংস্কৃতি, হেরোইন, ফেনসিডিল ও ইয়াবা জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের বেশিরভাগ পরিবারে। তৈরি করছে ঐশীর মতো মূল্যবোধহীন হাজারও সন্তান। তারা না চেনে নিজের দেশকে, না চেনে ধর্মকে, না চেনে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে; সর্বোপরি না চেনে নিজের বাবা-মাকে। এ সন্তানদের হাতে নৃশংসভাবে জীবন দিতে হয়েছে বাবা-মাকে। আবার বাবা-মায়ের হাতেও জীবন দিতে হচ্ছে সন্তানকে। আপন মমতাময়ী মাও আদরের সন্তানকে হত্যা করছেন নির্দয়, নিষ্ঠুর ও নৃশংসভাবে। অপরূপা রূপসীরাও তাদের ভালোবাসার স্বামীদের হাতে প্রাণ দিচ্ছেন। এমনকি শিক্ষকের কাছেও নিরাপদ নয় শিক্ষার্থী। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা লালসা চরিতার্থ করতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন শিশু ছাত্রীর ওপর। নেশা ও অপসংস্কৃতির জালে জড়িয়ে এমনই মূল্যবোধহীন একটি জাতি নিয়ে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে; বাংলাদেশকে ডিজিটাল ও মধ্যআয়ের দেশ করার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন রাজনীতিকরা। স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, যদি মূল্যবোধসম্পন্ন একটি জাতি গঠন করা না যায়। যদি না অপসংস্কৃতির বেড়াজাল থেকে জাতিকে বের করে আনা না যায়। মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকদের নৈতিক অধঃপতন যখন ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছে, তখন বোঝার আর বাকি থাকে না জাতি হিসেবে আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে। একজন শিক্ষকের চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ আর কে গ্রহণ করে? জাতি গঠনের লক্ষ্যে অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রীকে গড়ে তুলতে যে অপরিসীম জীবনীশক্তি লাগে, তা তো কেবল একজন শিক্ষকেরই থাকে। সে শিক্ষক কীভাবে পারেন ছাত্রীকে ধর্ষণ করতে? কীভাবে ছাত্রীদের ফাঁদে ফেলে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন?
দেশে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি ও পারিবারিক অপরাধ বৃদ্ধির পেছনে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের অপব্যবহার এবং বিদেশী স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ভূমিকা রয়েছে গাঁজা, ফেনসিডিল ও হেরোইনসহ অন্যান্য নেশাদ্রব্যের সহজলভ্যতাও। বাংলাদেশের প্রত্যেকটি পরিবারে জীবনসঙ্গীর মতো জায়গা করে নিয়েছে ভারতীয় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত মেগা সিরিয়াল। খাওয়া-নাওয়া ও সংসারের কাজকর্ম ফেলে রেখে গৃহবধূ ও তরুণীরা ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সিরিয়াল দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এসব ডেইলি সিরিয়ালে এমন সব পারিবারিক কল্প-কাহিনী থাকে, যা সহজেই প্রভাবিত করে মেয়েদের। তাদের মনমননে ভয়ানকভাবে বৃদ্ধি পায় অযাচিত চাহিদা ও চাওয়া-পাওয়ার আকাক্সক্ষা। ভারতীয় টিভি চ্যানেলে প্রচারিত এসব সিরিয়াল নিঃসন্দেহে ধ্বংস করছে বাংলাদেশের পারিবারিক কাঠামোকে, ধ্বংস করছে আমাদের হাজারও বছরের ঐতিহ্যবাহী ও গৌরবান্বিত সংস্কৃতিকে; ধ্বংস করছে পরোক্ষভাবে আমাদের রাষ্ট্রকেও।
ভালো মানুষ বা অন্য ভালো যা অর্জন, তা সর্বপ্রথম পরিবার থেকেই সূচিত হয়। সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা অনেকটা পরিবারের ওপর নির্ভর করে। একজন মানুষের প্রথম নিরাপত্তা তার পরিবারে। পরিবার বলতে টুকরো টুকরো পরিবার নয়, যৌথ পরিবার; যৌথ পরিবারে মানুষের মনমনন ও নৈতিকতা-মূল্যবোধ এবং মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। আয়-উন্নতিও যৌথ পরিবারে বেশি হয়। সুতরাং যৌথ পরিবার গড়তে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে, রাষ্ট্রকে দিতে হবে সব ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা; রাষ্ট্রের সার্বিক শাসন কাঠামোও হতে হবে যৌথ পরিবারমুখী। বাংলাদেশে যৌথ পরিবারের সংখ্যা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে বলে সমাজে দিন দিন ভয়ঙ্কর সব পারিবারিক অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারিবারিক অপরাধ বৃদ্ধির ফলে রাষ্ট্রের আইন-শৃংখলা অবনতির ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ট্রাজেডি, বাড়ছে মাদকাসক্তের সংখ্যাও। পরিবারে সংঘটিত নেতিবাচক ঘটনার প্রভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হয়। পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের নেতিবাচক প্রভাব কোনো না কোনোভাবে রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়, বাংলাদেশে তা-ই হচ্ছে। রাষ্ট্রকে ‘ক্রসফায়ারের’ নামে প্রতিনিয়ত মানুষ খুন করেই টিকে থাকতে হচ্ছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বাংলাদেশে ভয়ানক হারে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। এই পরিবার ভাঙার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে এগিয়ে মেয়েরা। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের গত এক বছরের ‘ডিভোর্স রেকর্ড’ পর্যালোচনায় পরিবার ভাঙার ক্ষেত্রে এগিয়ে মেয়েরা। শতকরা সত্তর ভাগ তালাক আবেদন জমা পড়েছে মেয়েদের তরফ থেকে। শুধু ঢাকা সিটি কর্পোরেশনই নয়, সমগ্র বাংলাদেশের চিত্রও একই। পরিবার ভাঙার ঘটনা ছাড়াও পরিবার একেবারে ধ্বংস করে দেয়ার ঘটনাও ঘটছে মেয়েদের তরফ থেকে বেশি, যা সমাজ বিশ্লেষকদের রীতিমতো স্তম্ভিত ও হতবাক করছে। যৌথ পরিবারের সংখ্যা দিন দিন হ্রাস পাওয়া এর কারণ বলে সমাজ বিশ্লেষকরা মনে করেন। কাজেই পরিবার ভাঙা নিরুৎসাহিত করতে হবে। যৌথ পরিবারকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে। পরিবার গড়তে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতাকে উদাহরণ হিসেবে নিতে হবে।
এশিয়ায় চীন ও জাপান ঐতিহ্যগতভাবে যৌথ পরিবারের উদাহরণ। যৌথ পরিবার ও পারিবারিক নিরাপত্তাই এ দুটি দেশকে দ্রুত মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করেছে। জাপান ও চীনের পরিবারগুলো এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত। অর্থনৈতিক ও বৈষয়িক উন্নতির জন্য একটি জাতির যেসব সামাজিক ও মানবীয় গুণাবলী প্রয়োজন তা নির্দ্বিধায় বলা যায় জাপানি ও চীনা পরিবারগুলোর মধ্যে আছে। জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা, মানবিক মূল্যবোধ, আধুনিক প্রযুক্তি ও কর্মনিষ্ঠা, স্বভাব-চরিত্র, অতিথিপরায়ণতা, পরপোকার, আত্মত্যাগ, আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদাবোধ বিশ্বে যে কোনো জাতির জন্য অনুসরণ ও অনুকরণযোগ্য। যৌথ পরিবার গড়েই জাপানিরা এমন উন্নত নৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের অধিকারী হয়েছে।
সমাজে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে পরিবারে ধর্মীয় অনুশাসন অপরিহার্য। শুধু ইসলাম নয়, প্রত্যেক ধর্মেই সৎ চরিত্র গঠনের নির্দেশনা দেয়া আছে। সন্তানদের ছোট থেকেই পড়ালেখার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষা দেয়াও বাধ্যতামূলক করতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসনে বেড়ে ওঠা সন্তানদের অন্তর্নিহিত শক্তি হয় পরিশুদ্ধ। অন্যায়, পাপাচার, কাম-ক্রোধ-মোহ ও যাবতীয় লোভ-লালসা এবং অযাচিত চাওয়া-পাওয়া তাদের মনোবৃত্তিকে দুর্বল করতে পারে না। ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায়-মহল্লায়, সর্বস্তরে এ আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। সভা, সেমিনার গোলটেবিল বৈঠক, টিভি টকশো, মতবিনিময় সভা ইত্যাদির মাধ্যমে এই সামাজিক আন্দোলনের অপরিহার্যতার বিষয়টি ‘ফোকাসে’ আনতে হবে। এ ছাড়াও আলেম সমাজ, মাদ্রাসার শিক্ষক, মসজিদের ইমামসহ সামাজিক দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। দেশের অসংখ্য যুবক শরীরে বেঁচে থাকলেও তারা ভেতরে ভেতরে মরে গেছে। মরণঘাতী নেশা ও অপসংস্কৃতির ছোবল তাদের জীবনীশক্তি কেড়ে নিয়েছে। নেশা ও অপসংস্কৃতির মরণব্যাধি তাদের কুরে কুরে খাচ্ছে। খাচ্ছে তাদের ইচ্ছাশক্তি, কল্পনাশক্তি, মেধাশক্তি, দৈহিক শক্তি ও মানসিক শক্তিকেও। যে দেশের যুব সমাজের বিরাট একটি অংশের এ পরিণতি, সে দেশের ভবিষ্যৎ কী? সে দেশটিকে বাঁচিয়ে রাখার উপায় কী? হ্যাঁ, উপায় হচ্ছে আত্মজাগরণ ও আত্মশুদ্ধি।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

নির্বাচন যদি হয় এবং না হয়- by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

সাউথ লন্ডনে এক বন্ধুপুত্রের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা ভোজে গিয়েছিলাম। আমন্ত্রিতদের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশী এবং অনেকে আমার পরিচিত। তারা শিক্ষিত, পেশাজীবী এবং দীর্ঘকাল বিলাতে বসবাসের ফলে নাসিকা একটু উচ্চ। দেশে এবং বিদেশেও বাঙালিরা কোথাও একত্রিত হলে যা হয়; সব আলাপের শেষ আলাপ রাজনীতি এবং তা নিয়ে জোর বিতর্ক। সেদিনও এর অন্যথা হল না। ভোজ শেষে আলাপ শুরু হল। বর্তমানে বিবাহ পদ্ধতির ব্যর্থতা, ডিভোর্সের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি নিয়ে খুচরা আলাপের পরই তা চলে গেল বাংলাদেশে নির্বাচন হবে কি হবে না সেই প্রসঙ্গে। একদল বললেন, নির্বাচন হতেই পারে না। দুটি বড় দলই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে বিপরীতমুখী গোঁ ধরে বসে আছে। এ গোঁ তারা ছাড়বে না এবং নির্বাচনও হবে না। শেষ পর্যন্ত আর্মিকে এগিয়ে আসতে হবে এবং হয় তারা সাময়িকভাবে ক্ষমতা নেবে অথবা তাদের সমর্থিত কোনো সিভিল সরকার ক্ষমতায় আসবে। তারা আবার কয়েক বছর পর একটা নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। এ ব্যাপারে পশ্চিমা দাতা দেশগুলোর, এমনকি ভারত ও আমেরিকারও সম্মতি ও সমর্থন থাকবে। আরেকদল বললেন, না, নির্বাচন হবেই। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী এবং আওয়ামী লীগ সরকারও এখন মুখে যাই বলুক, বিরোধী দলকে কোনো এক ধরনের ছাড় দিয়ে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে টানবে। এ নির্বাচনে বিএনপির জয় হবে। বেগম জিয়া এবার জামায়াতকে ঘোষিত বা অঘোষিতভাবে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় গিয়ে ২০০১ সালের মতো চণ্ডমূর্তি ধারণ করবেন না। গতবারের ভুল থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন। তাই বারবার বলছেন, তিনি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে যাবেন না। তিনি এবার একটি মডারেট সরকার গঠন করবেন। আওয়ামী লীগকে আবার পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য বিরোধী দলের অবস্থানে চলে যেতে হবে। সংসদেও তাদের সদস্য সংখ্যা জোর বড় একটা থাকবে না
এই বিবাহোত্তর সংবর্ধনা ভোজে সংখ্যাল্প হলেও একটি তৃতীয় গ্র“প ছিল। তারা বললেন, সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। তাদের ধারণা, এবার নির্বাচন হবে, তাতে বিএনপি জয়ী হবে। কিন্তু বিএনপির এ জয় হবে নামে; কাজে জামায়াত ভোল পাল্টে (স্বনামে আসত না পারলে) ক্ষমতায় আসবে। খালেদা জিয়া নামে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তার ছেলে তারেক রহমানও দেশে ফিরে দলের হাল ধরবেন। কিন্তু এবার আসল ক্ষমতা যাবে জামায়াতের হাতে। ওই সরকারের আসল চালিকাশক্তি হবে জামায়াত ও হেফাজত।
তারা ক্ষমতায় গিয়েই ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড বাতিল করবে। প্রশাসন থেকে ‘আওয়ামী লীগের ছাপমারা লোক’ এই ধুয়া তুলে অসাম্প্রদায়িক সব লোকের বিতাড়ন ও নিধন শুরু হবে। দেশের আধুনিক সমাজ, সংস্কৃতি ও শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আঘাত আসবে। মুক্তমনা মুদ্ধিজীবী, এমনকি হাফ মুক্তমনা বুদ্ধিজীবীদেরও দেশ ছেড়ে পালাতে হবে। আফগানিস্তানের মতো নারী শিক্ষাবর্জিত হবে। নারীরা অবরোধবাসিনী হবে। পুরোপুরি তালেবান রাষ্ট্র না হলেও বাংলাদেশ হাফ তালেবান রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। শেখ হাসিনা এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির ছোট বড় বহু নেতাকে কারাগারে নিক্ষেপ অথবা দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হবে। দেশে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এক বিরাট বিপর্যয় নেমে আসবে। দেশে গুপ্ত রাজনৈতিক হত্যার সূচনা হবে। নতুন চেহারায় বাংলা ভাইদের আবির্ভাব হবে।
আবার তৃতীয় গ্র“পের একজনের এই বিশ্লেষণটি শেষ না হতেই একজন তাকে বললেন, আপনার আশংকার কথাটি যুক্তির খাতিরে মেনে নিলাম। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশের ভোটদাতাদের একটা বড় অংশ না হয় ভুল করে বিএনপিকে ভোট দিতে গিয়ে জামায়াতকে ক্ষমতা দখলের সুযোগ দিল। জামায়াতও ক্ষমতায় গিয়ে মিসরের পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির মতো সামরিক-অসামরিক প্রশাসন জামায়াতিকরণ শুরু করল এবং সেকুলার ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ভিত্তি ভাঙার কাজে নিয়োজিত হল। তা কি বাংলাদেশের সাহায্যদাতা বৃহৎ শক্তিগুলো, বিশেষ করে ভারত ও আমেরিকা মেনে নেবে?
তার প্রশ্নের জবাব কেউ দেয়নি। তিনি নিজেই তার প্রশ্নের জবাব দিয়ে বললেন, মেনে নেবে না। ভারত এবং আমেরিকা বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রকৃত মিত্র না হতে পারে, কিন্তু পাকিস্তান, আফগানিস্তান বা মিসরের মতো বাংলাদেশেও জঙ্গি এবং মধ্যযুগীয় মৌলবাদের উল্লাসের আশংকায় তারা ভীত। মিসরের মুরসি প্রশাসন যেমন আমেরিকা বেশিদিন বরদাস্ত করেনি, সেনাবাহিনীকে দিয়ে তার পতন ঘটিয়েছে এবং জঙ্গি মৌলবাদীদের ক্ষমতা থেকে হটানোর কাজে মিসরের বহুধাবিভক্ত সেকুলার, গণতান্ত্রিক দল ও সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামরিক বাহিনীকে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়েছে, তেমন ঘটনা বাংলাদেশেও ঘটতে পারে।
আজ আওয়ামী লীগ সরকার সম্পর্কে ভারত ও আমেরিকাসহ বড় প্রভাবশালী দেশগুলো বিরক্ত হতে পারে। দেশের সুশীলসমাজের মাথাওয়ালা একটি অংশ এ সরকারকে নিজেদের স্বার্থ ও সুবিধার জন্য ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে উদগ্রীব হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতন যদি ঘটে এবং দেখা যায় বিএনপির আলখেল্লার আড়ালে মধ্যযুগীয় উগ্র মৌলবাদ ক্ষমতা দখল করেছে, তখন প্রতিবেশী ভারত তার নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে সতর্ক হবে এবং আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর টনক নড়বে। ভদ্রলোক বললেন, আমার মনে হয়, তখন দেশের ভেতরের এবং বাইরের কোনো কোনো শক্তির সমর্থন ও উৎসাহেই সামরিক বাহিনীকে একটা উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপির একটি আশা, ক্যান্টনমেন্ট সব সময় তাদের অনুকূলে থাকবে। এক/এগারোর সময় তাদের এই আশা পূর্ণ হয়নি, বর্তমানেও হবে না। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীতে এখন পাকিস্তানপন্থী ও জামায়াতপন্থীদের সংখ্যা দারুণভাবে হ্রাস পেয়েছে। নতুন জেনারেশনের আবির্ভাব হয়েছে; তারা আধুনিকমনা, শিক্ষিত এবং এনলাইটেন্ড। সেনাবাহিনীতে পেশাদারিত্ব বহুগুণ বেড়েছে। জাতিসংঘের শান্তিবাহিনীতে দলে দলে কাজ করে তাদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই পাল্টে গেছে।
এই সেনাবাহিনীর কাছ থেকে বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষপাত আশা করা হবে বোকার স্বর্গে বাস করা। বাংলাদেশে উগ্র মৌলবাদীদের ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র সফল হলে এবং সেনাবাহিনী তা ঠেকাতে চাইলে দেশে সেনাশাসন সম্পর্কে গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলো যতই অনিচ্ছুক হোক, মিসরের মতো সেনাবাহিনীর উদ্যোগে সমর্থন দিতে বাধ্য হবে। বর্তমানে তাদের মধ্যে রয়েছে অনৈক্য এবং আওয়ামী লীগের বিরোধিতাই তাদের কাছে অনেক বড়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে গেলে তখন দেশের বাস্তব পরিস্থিতি তারা সম্যক উপলব্ধি করবেন এবং মৌলবাদের দশানন রাবণকে হটানোর জন্য তখন যে কোনো শক্তি এগিয়ে আসুক তাকে সমর্থন দিতে বাধ্য হবেন। মৌলবাদী গোষ্ঠী এখন এতই শক্তিশালী, বিভক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ কেবল একার শক্তিতে তাকে হটাতে পারবে না। ফলে বাংলাদেশেও মিসরের মতো অবস্থার উদ্ভব ঘটতে পারে।
আসরের আরেকজন বলে উঠলেন (তিনি কোন গ্র“পের তা লক্ষ্য করিনি), বাংলাদেশে যদি মিসরের মতো অবস্থার উদ্ভব হয়, তাহলে এ দেশেও আর্মি সরাসরি ক্ষমতা নেবে না, একজন পশ্চিমা অনুগত সিভিলিয়ানকেই সরকার প্রধানের পদে বসাবে। এখানেই ড. মুহাম্মদ ইউনূস, ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, জেনারেল এরশাদ প্রমুখদের আশা এবং প্রতীক্ষা। নিজেদের শক্তির জোরে তারা ক্ষমতায় যেতে পারবেন না জেনে তারা এখন রাজনৈতিক স্টেজের পর্দার পাশে অবস্থান নিয়েছেন। যদি কেউ তাদের হাত ধরে স্টেজে টেনে নিয়ে সিংহাসনে বসায়। এ জন্য ড. ইউনূস ও ড. কামাল হোসেন আবার নতুন করে রাজনৈতিক তৎপরতায় নেমেছেন এবং জেনারেল এরশাদ তো বলেই ফেলেছেন তিনি নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে চান।
এ আসরে আমার পরিচিত বাংলাদেশের একজন প্রবীণ সাবেক কূটনীতিক হাজির ছিলেন। তিনি অনেকেরই পরিচিত এবং আলোচনার এক সময় অনেকে তার দিকে তাকালেন তার মতামত জানার জন্য। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, এখানে আজ আমার এক সাংবাদিক বন্ধু হাজির আছেন। আমি এ আসরে কিছু বললে তিনি হয় তো তার লেখায় তা প্রকাশ করবেন। তিনি আমার বক্তব্য প্রকাশ করুন আপত্তি নেই; কিন্তু আমার নামটা যেন প্রকাশ না করেন। আমি রিটায়ার্ড মানুষ। দেশের রাজনীতির কোনো বিতর্কে জড়াতে চাই না। তাছাড়া আমি যা বলব, তা যে ধ্র“ব সত্য হবে তারও নিশ্চয়তা দিতে পারি না। প্রবীণ কূটনীতিককে আশ্বাস দিলাম। আপনার অভিমত ইন্টারেস্টিং হলে তা নিয়ে আমার লেখায় আলোচনা করতে পারি। কিন্তু আপনার নাম প্রকাশ করব না; তবে আপনাকে আমি বহুকাল ধরে চিনি এবং আপনার মতামতকে গুরুত্ব দেই।
প্রবীণ সাবেক কূটনীতিক বললেন, আমি আজকাল শহরে বেশি থাকি না। গ্রামের বাড়িতেই বেশি সময় থাকি এবং কৃষিকাজ করে অবসর সময় কাটাই। ফলে সাধারণ মানুষের মনোভাব অনেকটা বুঝতে পারি। ৫ মে রাতে ঢাকার শাপলা চত্বরে হাজার হাজার হেফাজতি হত্যা সম্পর্কে বিএনপি ও জামায়াত সারাদেশে একটা মিথ্যার ধূম্রজাল সৃষ্টি করে দেশের অধিকাংশ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। ঠিক এ সময় পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন দেয়া আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে ঠিক হয়নি। এ নির্বাচনের ফল দ্বারা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এটাও ভাবা ঠিক হবে না।
বর্তমানে ৫ মের তথাকথিত হত্যাকাণ্ডের মিথ্যা প্রচারের কুয়াশা কেটে গেছে। শেখ হাসিনা যদি কঠোরভাবে তার দলে ও সংগঠনে পার্জিং চালান এবং সংগঠনকে পুনর্গঠন দ্বারা তুলনামূলকভাবে সৎ ও যোগ্য লোক নির্বাচনে মনোনয়ন দেন, সরকারের ভালো কাজগুলো ভোটারদের কাছে তুলে ধরতে পারেন, তাহলে বড় ভয়ের কোনো কারণ নেই। নির্বাচনে বিএনপিকে টানার জন্য নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতির প্রশ্নে তাকে কিছুটা ছাড় দিতেই হবে। নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশে মিসরের অবস্থার উদ্ভবের কোনো আশংকা নেই। কারণ বাংলাদেশের নির্বাচনে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো জামায়াতের একক ও বিরাট বিজয়ের সম্ভাবনা নেই। তিনি বললেন, তবে আমি যে আশংকাটা করি, তা হল, এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক বিজয়ের সম্ভাবনাও কম। হাং পার্লামেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের জন্য স্বতন্ত্র ও ছোট ছোট দলের সদস্যদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হবে বেশি। জেনারেল এরশাদ দোদিল বান্দা। এবার নির্বাচনে তার দল কতটা সাফল্য অর্জন করবে, সে সম্পর্কে আমার সন্দেহ আছে। এ জন্যই শেখ হাসিনার উচিত মহাজোটকে শক্তিশালী করা এবং মহাজোটের শরিক দলগুলোকে গুরুত্ব ও শক্তি অর্জনে সাহায্য করা।
দেশের মসজিদ-মাদ্রাসাগুলোর ওপর থেকে জামায়াত ও হেফাজতের অশুভ প্রভাব দূর করার জন্য আওয়ামী লীগের উচিত মৌলবাদী ও জঙ্গি নয় এমন ইসলামী দলগুলোর সাহায্য নেওয়া। এ জন্য আটরশির পীর, ইসলামী ঐক্যজোটের জামায়াতবিরোধী অংশ এবং এ ধরনের ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে আওয়ামী লীগের কাছে টানা উচিত। শেখ হাসিনার উচিত দলের নিষ্ক্রিয় অংশ ও নেতাদের সক্রিয় করা এবং পেশাজীবী সব মানুষ এবং তাদের সংগঠনকে গুরুত্ব দেয়া। সাবেক কূটনীতিক বললেন, বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য এটা খুবই সংকট মুহূর্ত। তবে আমি আশাবাদী। আমার ধারণা, বাংলাদেশ এ সংকট কাটিয়ে উঠবে। আগামী নির্বাচন হবে না, বাংলাদেশের অবস্থা হবে মিসরের মতো, এসব আশংকা তো আছেই। কিন্তু এ আশংকার পাশাপাশি রয়েছে নির্বাচন হওয়া এবং নির্বাচনের মাধ্যমেই সব সংকট উত্তরণের এবং গণতন্ত্রের বিপদমুক্ত হওয়ার বিরাট সম্ভাবনা। আমরা এখন মনের বাঘের ভয়েই অস্থির। তবে সত্যি বাঘ আছে কিনা তা খুঁজে দেখছি না। সেদিনের বিবাহোত্তর ভোজ সভায় কথা বলার সুযোগ আমার হয়নি। মনে হয় কথা না বলে ভালোই করেছি। দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেকেই আসরে মন খুলে কথা বলেছেন। তা শুনে নিজের মনের ভয় অনেকটা দূর হয়েছে। এ বিশ্বাস ফিরে এসেছে যে, বাংলাদেশের এ সংকটমুক্তি ঘটবেই।