Thursday, March 28, 2019

এখনও নিখোঁজ অনেক, বাড়ছে লাশের সংখ্যা, উদ্বিগ্ন স্বজনদের অপেক্ষা- এ পর্যন্ত নিহত ২১

দুপুর পৌনে একটায় লাগা বনানীর এফ আর টাওয়ারের আগুন রাত আটটার দিকে নিভেছে। দিনভর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিটের পাশাপাশি যোগ দিয়েছে তিন বাহিনী। বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে চলেছে উদ্ধার তৎপরতা। সবশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ভয়াবহ এই আগুনে বিদেশি নাগরিকসহ অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে অর্ধ শতাধিক। উদ্ধার তৎপরতা চলছে। ফায়ার সার্ভিস ও উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত সূত্রগুলো বলছে ভবনটির অষ্টম তলা ১৩ তলা পর্যন্ত আগুনের উত্তাপ বেশি থাকায় এসকল ফ্লোরে হতাহতের সংখ্যা অনেক বাড়তে পারে।
বিকাল থেকে সবশেষ রাত আটটা পর্যন্ত উদ্ধারকৃত মরদেহের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে।
বিকাল থেকে বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাওয়ারা নিহতের তালিকায় যুক্ত হলেও সন্ধ্যায় নিরাপত্তাকর্মীরা ভবনের ভেতর প্রবেশ করলে চিত্র বদলাতে থাকে। এ সময়কালে উদ্ধার হওয়া বেশিরভাগই লাশ। সন্ধ্যা ৭ টার পর ভবনটির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ কক্ষগুলো থেকে একসঙ্গেই ১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।  ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত ফায়ার সার্ভিসের টানানো তালিকায় নিহত ও আহতের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে।
আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্টে জানা যায়, বিকেল সাড়ে ৪টায় তিনজনকে উদ্ধার করে ঢাকা  মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। এদের মধ্যে আব্দুল্লাহ আল ফারুক নামে এক ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করেছেন চিকিৎসকরা।
হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, আব্দুল্লাহ আল ফারুকের শরীরের শতকরা ৯০ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। তার সঙ্গে পাওয়া পরিচয়পত্র থেকে জানা যায়, তার নাম আব্দুল্লাহ আল ফারুকী। সে ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবি-এর শিক্ষার্থী। তার বাবার নাম মকবুল আহমেদ। এছাড়া আবু  হোসেন ও রেজাউল আহমেদ নামে দুইজনকে হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে।
আগুনের ঘটনায় অপর নিহত একজন হচ্ছেন শ্রীলঙ্কান নাগরিক।  নিরস  চন্দ্র (৪০) নামে শ্রীলঙ্কান এই নাগরিক আগুনের তাপ থেকে বাঁচতে ৭ তলা থেকে পাইপ বেয়ে নামতে গিয়ে আহত হলে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে। লাশ মর্গে আছে।
এছাড়া ইউনাইটেড হাসপাতালের চিকিৎকরা তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহতরা হলেন, মনির (৫০), মামুন (৩৬) ও মাকসুদুর রহমান (৩২)। ইউনাইটেড হাসপাতপালে চিকিৎসাধীন আছেন আরও পাঁচজন।
অন্যদিকে অ্যাপোলো হাসপাতালে মারা গেছেন আমেনা এবং বনানী ক্লিনিকে মারা গেছেন পারভেজ সাজ্জাদ।
চিকিৎসকরা জানান, মারা যাওয়া অধিকাংশ ব্যক্তিরা আগুন থেকে বাঁচতে ভবন থেকে লাফ দিয়েছিলেন। প্রাণ বাঁচাতে ভবনের ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন অনেকে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৩৫ জন, ইউনাইটেড হাসপাতালে ১৯ জন এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ১১ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বিকেল ৫টার দিকে স্বরাষ্ট্র সচিব শহিদুজ্জামান আহত ও দগ্ধদের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নিতে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান।

মুক্তি কিসে, স্বৈরশাসনে নাকি গণতন্ত্রের পুনঃউদ্ভাবনে?

বিবিসি একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার শিরোনাম হোয়াই উই নিড টু রিইনভেন্ট ডেমোক্রেসি? কেন দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের পুনঃউদ্ভাবন প্রয়োজন? গত ১৯শে মার্চ ২০১৯ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি লিখেছেন অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত রোমান কুরজানিয়ারিক। তিনি স্বনামধন্য পাবলিক ফিলোসফার। বৃটিশ দৈনিক অবজারভারের মতে, মি. রোমান ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় জনপ্রিয় দার্শনিকদের অন্যতম। রাজনৈতিক সমাজবিদ্যায় অক্সফোর্ড থেকে পিএইচডি করেছেন। দুই কিস্তিতে এর তরজমাভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো। প্রথম পর্ব পড়ুন আজ।
যখন রাজনীতিবিদরা আগামী নির্বাচন কিংবা সর্বশেষ টুইটের বেশি কিছু দেখতে ব্যর্থ হন, তখন তারা আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারের প্রতি তাদের উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটান। এই নিবন্ধটি বিবিসির একটি বিশেষ সিরিজের অংশ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। বিবিসি একটি নতুন  সিরিজ চালু করেছে।
যার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানবতা কে গভীরভাবে দেখা এবং বিশ্লেষণ করা।
সমাজতত্ত্ববিদ এলিস বোল্ডিং একদা বলেছিলেন, যদি মানসিকতা এমনটাই গড়ে ওঠে, যেসব সময় কেবল শুধু বর্তমান নিয়ে পড়ে থাকো, তাহলে ভবিষ্যৎ কি হবে, তা কল্পনা করার যে শক্তি তা শেষ হয়ে যাবে। আর সেটাই হচ্ছে বিবিসির চালু করা নতুন সিরিজ ডিপ সিভিলাইজেশন বা ‘গভীর সভ্যতা’ সিরিজের একটি অংশ।
কেন নির্বাচন, কেন বিতর্ক
দার্শনিক রোমান লিখেছেন, ১৭৩৯ সালে স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম ‘অরিজিন অফ সিভিল গভারনমেন্ট’-এ বেসামরিক সরকারের উৎপত্তি বিষয়ে লিখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, মানুষ রাতারাতি বদলে যেতে সমর্থ নয়। সেটা তারা নিজেরা পারে না।  অন্যকেও তারা বদলাতে পারে না। এটা আত্মার সংকীর্ণতা। আর সেটা আছে বলেই মানুষ কে দেখা যায়, তারা বর্তমানকে নিয়ে এমনই মাথা গুজে পড়ে থাকে যে, তার শেষ তলানি পর্যন্ত সে বর্তমান ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না।
মানুষ সম্পর্কে এই যে ধ্যানধারণা এটা স্কটিশ দার্শনিককে এই মর্মে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল যে, সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন রাজনৈতিক প্রতিনিধিগণ এবং সংসদীয় বিতর্ক,  মানুষ এসবের সঙ্গে যত বেশি নিজেকে যুক্ত করবে, সে ঘন ঘন নির্বাচন করবে, সে সংসদে ঘনঘন বিতর্ক করবে, কেন করবে, তার কারণ এই বিতর্ক করে ওই যে তার আত্মার সংকীর্ণতা, তার যে স্বার্থপরতার একটা দিক রয়েছে, তার মনের গভীরে  যেটা, সেটা বিসর্জন দিতে পারবে। সেটা সে কমাতে পারবে। যদি সেরকম একটি ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। এর ফলে  তার সহনশীলতা বাড়বে। তার  ধৈর্য বাড়বে এবং এর ফলে যেটা দাঁড়াবে সমাজবদ্ধ যে মানুষ, তখন তার সামাজিক যে দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ এবং কল্যাণ সেসব কারণগুলোর প্রতি একটা মূল্যায়ন করা তার পক্ষে সহজ হবে। একটা ভালো ভূমিকা রাখা সহজ হবে।
এই মন্তব্য করার পর রোমান লিখেছেন, এই যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখলে মনে হয়, এটা একটা কল্পনাবিলাস ছাড়া কিছুই নয়। কারণ ইতিমধ্যে এটা খুব স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, আমাদের রাজনৈতিক যে ব্যবস্থা সবাই মিলে গড়ে তুলেছি, তা স্বল্পমেয়াদি একটা উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার লক্ষ্য কিন্তু রোগব্যাধি যা সমাজে রয়েছে, রাষ্ট্রব্যবস্থায় রয়েছে, সেটা প্রতিকার করে নেয়ার দিকে মনোযোগ তাদের কম। আর সে কারণেই বহু রাজনীতিবিদ, আসলে আগামী নির্বাচনের পরে কি হবে, তার থেকে বেশি সে কিছুই দেখতে পায় না। আর সে কারণেই তাদেরকে দেখা যায় সর্বশেষ জনমত জরিপ কিংবা টুইটে কি বলা হয়েছে, তার প্রতিক্রিয়ায় মানুষ কি বলেছে, সেটা নিয়েই তারা নাচানাচি করে। আর সরকারগুলো ঐতিহ্যগতভাবে কোনো একটা সমস্যা তৈরি হলো, অমনি তারা উঠে পড়ে লাগে, ওটা দ্রুত কি করে নিরাময় করে ফেলা যায়। কেউ যদি কোনো অপরাধ করে অমনি তারা গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। আর গ্রেপ্তার পূর্ণ হবার পরেই তারা মানুষকে  ধারণা দিতে চায়, তারা সমাজে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেটা প্রতিকার করে ফেলেছে। আসলে সেটা মোটেই তা নয়। এই কাজ করার মধ্য দিয়ে তারা আসলে সমাজ এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে যে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা টিকিয়ে রাখে। তারা ধারণা দেয়, প্রতিকারের দিকে যেতে সেটা কোনো একটা বিহিত এনে দেবে। কিন্তু তা দেবে না, দেয় না।
রাজনীতির মায়োপিয়া
২৪/৭ নিউজ মিডিয়া (নিউ ইয়র্কভিত্তিক ডিজিটাল মার্কেটিং কোম্পানি, যার কাজ হচ্ছে ১২টি দেশে থাকা তাদের অফিসের মাধ্যমে খবর সরবরাহ করা) সর্বশেষ ব্রেক্সিট সমঝোতা কিংবা মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো উত্তপ্ত মন্তব্যকে পোস্ট করে দিচ্ছে। আর এসবই হচ্ছে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাজনীতির মায়োপিয়া বা অদূরদর্শিতা। সুতরাং এখানে একটি এন্টিডোট রয়েছে। আর সেই এন্টিডোট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিসীমার বাইরে নিয়ে যাচ্ছে। আর তাই  তিনি লিখেছেন, আসুন আমরা সমস্যার ধরন নিয়ে আলোচনা শুরু করি। আজকের দিনে চারপাশের ঘনটাবলী আমাদের গ্রাস করছে। বলা হচ্ছে, সেটার জন্য সামাজিক মিডিয়া, অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তি দায়ী। এই প্রযুক্তিগুলি রাজনৈতিক জীবনের গতিধারা কি হবে, সেটা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে যেভাবে নির্দিষ্ট করা হচ্ছে তা শুধু এখানে সীমিতভাবে দেখলে চলবে না।
এর শেকড় আরো বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। একটি বড় সমস্যার নাম হচ্ছে নির্বাচনী চক্র। এই নির্বাচনী চক্র অন্তর্গতভাবে ত্রুটিপূর্ণ এমন একটি ডিজাইন, যা নিরন্তর একটা সাময়িক রাজনৈতিক ঝড়কে সামনে এনে বড় করে দেখায়। সরকারগুলো জনগণকে এটা দেখাতে নির্বাচনকে বড় করে সামনে আনে। তারপর কিছু চটকদার প্রতিশ্রুতি দিতে থাকে। যেমন তারা পরিবেশের বিপর্যয় ঘটছে, সেটা ঠেকানো, পেনশন সংস্কার কিংবা শৈশবের শুরুতেই শিক্ষায় কিভাবে আরো বিনিয়োগ বাড়ানো যায় এই বিষয়গুলোর দিকে তারা যায় না। তারা সর্বদা চটকদার বক্তব্য দিয়ে  ভোটারদের মন জয় করতে আগ্রহী হয়ে থাকে।  তারা বরং ভোটারদেরকে এটা দেখায় যে, আমরা নির্বাচনে জিতলে তোমাদের ট্যাক্স কমিয়ে দিব।
উনিশ শ সত্তরের  দশকে এরকম একটি মায়োপিক নীতিনির্ধারণী বিষয় বৃটেনের রাজনীতিতে জায়গা করে নিয়েছিল। আর তার নামকরণ করা হয়েছিল পলিটিক্যাল বিজনেস সাইকেল। আরেকটা বড় বিষয় হচ্ছে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। তারা স্পেশাল ইন্টারেস্ট গ্রুপ। তাদের মধ্যে সব থেকে এগিয়ে আছে কর্পোরেশন। তারা রাজনৈতিক পদ্ধতিকে ব্যবহার করে। তাদের স্বল্পমেয়াদি যে উদ্দেশ্য সাধন করা দরকার, সেটা তারা বাগিয়ে নেয়। আর সেটা নিতে গিয়ে অবশিষ্ট সমাজের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের প্রতি তার কি প্রভাব পড়ছে, সেটা তারা বিবেচনায় নেয় না। নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থ জোগানো কিংবা বিগ বাজেট লবিং প্রচলিত রাজনীতিকে যে হ্যাক করছে, সেটা একটা বৈশ্বিক ফেনোমেনায় পরিণত হয়েছে। আর সেটা দীর্ঘমেয়াদি নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোকে এজেন্ডা থেকে একেবারেই দূরে রাখছে। এরপরে আমরা তৃতীয় যে দিকটির দিকে নজর দিতে পারি, সেটা হলো বর্তমানের রাজনীতি ভবিষ্যৎ লুটে নিচ্ছে। তারা সব লুটেপুটে খেয়ে ফেলছে, ভবিষ্যতের মানুষের কি স্বার্থ এবং সেটা যে পদ্ধতিগতভাবে হরণ করা হচ্ছে, সেদিকে কারো নজরই নেই।
 মি. রোমান সকৌতুকে বলেছেন, ভাবটা যেন আগামীকালের নাগরিক, তাদের অধিকার হলো কোনো অধিকার না থাকা।

বনানীতে বহুতল ভবনে আগুন, ভেতরে আটকা বহু মানুষঃ প্রাণ বাঁচাতে লাফ

রাজধানী ঢাকার বনানী এলাকায় এফ আর টাওয়ারে আগুন লেগেছে। ঘটনাস্থলের আকাশজুড়ে এখনো কালো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। ভবনটিতে বহু লোকজন আটকা পড়েছে। বাইরে থেকে তাদের কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছে। তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে এফআর টাওয়ারের ৯ম তলা থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুমের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন।
আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা। আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা ধারণা করছেন, ভবনের নীচে থেকেই আগুন লেগেছে।
এদিকে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে দায়িত্বরত কর্মীরা জানিয়েছেন, ১৭ নম্বর সড়কের এফ আর টাওয়ারের ৯ তলা থেকে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। পরে এই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে। আগুনে পুড়ে ভবনের গ্লাসগুলো খসে পড়ছিল। আশপাশের লোকজন জড়ো হয়েছেন ভবনের আশপাশে। বনানী সড়ক বন্ধ রয়েছে। চারদিকে আতঙ্ক বিরাজ করছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণের জন্য ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট কাজ করছে।
প্রাণ বাঁচাতে লাফ
বনানীর এফআর টাওয়ারের আগুন থেকে প্রাণ বাঁচাতে উপর থেকে  লাফিয়ে পড়ে আহত একজন মারা গেছেন। এছাড়াও আটকে পড়া অনেকে লাফিয়ে নামছে । লাফিয়ে পড়ে আহত দু’জনকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ভবনে আগুনের লেলিহান শিখা এখনো দাউদাউ করে জ্বলছে। কালোধোঁয়া ও মানুষের চিৎকারে ওই এলাকায় শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা দেখা যাচ্ছে। হাসপাতালের ইমার্জেন্সি অফিসার ফরিদা ইয়াসমিন  জানিয়েছেন আহতদের একজন মারা গেছেন। অপরজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বিবিসি বাংলা এ খবর দিয়েছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের ১৭টি ইউনিটের পাশাপাশি স্থানান্তরযোগ্য মই টার্ন টেবিল লেডার (টিটিএল) কাজ করছে বলে জানা গেছে। এছাড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে আশপাশের মানুষজন সহযোগিতা করছেন। বিমান বাহিনীর দুইটি হেলিকপ্টার আগুন টহল দিচ্ছে। নৌবাহিনীও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন।

বৃটিশ রাজনীতিতে নাটকীয়তা, সমর্থন দিলে পদত্যাগের প্রতিশ্রুতি তেরেসা মের

চরম এক নাটকীয়তা বৃটিশ রাজনীতিতে। ব্রেক্সিট ইস্যুতে নিজ দলের ভিতরে বিদ্রোহের মুখে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। অন্যদিকে সরকারের হাতছাড়া হয়ে গেছে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ। এমন অবস্থায় বিস্ময়কর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার উত্থাপিত ব্রেক্সিট চুক্তিকে সমর্থন দিয়ে পার্লামেন্ট পাস করলে নির্ধারিত সময়ের আগে পদত্যাগ করবেন তিনি। তবে কবে নাগাদ পদত্যাগ করবেন সে বিষয়ে কিছু বলেন নি। বেশ কিছুদিন ধরেই তার পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছিল নিজের দল কনজার্ভেটিভের বিদ্রোহী ও বিরোধী লেবার দলের পক্ষ থেকে। বলা হচ্ছিল, তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিলে ব্রেক্সিট চুক্তিতে সমর্থন দেবেন তারা।
এমন অবস্থায় বুধবার রাতে ব্রেক্সিটের বিকল্প আটটি প্রস্তাবের ওপর পার্লামেন্টে বিতর্কের পর ভোট হয়। কিন্তু কোনো প্রস্তাবের পক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়ে নি। ফলে ব্রেক্সিট ইস্যুতে তালগোল পাকিয়ে গেছে বৃটিশ রাজনীতি। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে উভয় সঙ্কটে পড়েছেন বলে রিপোর্ট করেছে অনলাইন স্কাই নিউজ।
বিবিসি লিখেছে, বুধবার পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট ইস্যুতে এমপিরা যে আটটি বিকল্প প্রস্তাব এনেছিলেন, তার কোনটিই নিম্ন-কক্ষের ভোটে স্পষ্ট সমর্থন আদায় করতে পারেনি। এর আগে কনজার্ভেটিভ পার্টির এমপিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। সেখানে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনকে বের করে আনতে তিনি যে চুক্তি করেছেন তাতে পার্লামেন্ট যদি সমর্থন দেয়ার নিশ্চয়তা দেয় তাহলে নির্ধারিত সময়ের আগেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যাবেন। তার এ ঘোষণায় কনজার্ভেটিভ দলের যেসব সদস্য তার বিরোধিতা করেছিলেন এর আগে, তারা নমনীয় হয়েছেন। ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা তেরেসা মে’কে সমর্থন দিতে পারেন। তবে ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। তারা বলেছে, তেরেসা মে ব্রেক্সিট ইস্যুতে যে চুক্তি করেছেন অব্যাহতভাবে তার বিরোধিতা করে যাবে তারা।
ব্রেক্সিট ইস্যুতে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে তেরেসা মের ওপর। তার এই চুক্তির বিকল্প হিসেবে এমপিরা বেশ কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করেন হাউস অব কমন্সে। সেখান থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ইউনিয়ন করে থাকা এবং যেকোনো চুক্তির বিষয়ে গণভোট সহ বাছাই করা আটটি প্রস্তাব কমন্সে অনুমোদন করেন স্পিকার বারকাউ। এ নিয়ে বিতর্ক হয়। তারপর ভোট হয়। এ ভোটে কোনো একটি প্রস্তাবও পাস হয় নি। ধারণা করা হয়েছিল, কিভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করতে হবে সে বিষয়ে একটি ঐক্যমত সৃষ্টি হবে এর মধ্যকার কোনো একটি প্রস্তাব থেকে। তাতে পার্লামেন্টে সৃষ্ট অচলাবস্থার অবসান ঘটবে। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে। এ অবস্থায় ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী স্টিফেন বারক্লে বলেছেন, ওই ভোটের ফল মন্ত্রীদের দৃষ্টিভঙ্গিকে শক্তিশালী করেছে। বোঝা গেছে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই শ্রেষ্ঠ।
বিবিসির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি কাস্টমস ইউনিয়নের প্রস্তাব, চুক্তি অনুমোদনের জন্য গণভোটের আহ্বান, নো-ডিল ব্রেক্সিটের প্রস্তাব থেকে শুরু করে ইইউয়ের সঙ্গে শুল্ক কাঠামো রক্ষা করে ব্রেক্সিট চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তাব সবই বাতিল হয়ে গেছে বুধবারের ভোটে। এ কারণে বৃটেনের একদিনের নাটকীয় পরিস্থিতির অবসান হয়েছে। বুধবারের এই ভোটে ব্রেক্সিট ইস্যুতে পার্লামেন্টের এতদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করলেও কোন নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছাতে না পারার ব্যাপারটিকে সমালোচকরা ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ব্রেক্সিট গণভোটের রায় অনুযায়ী এ বছরের ২৯ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। ব্রেক্সিট পরবর্তীকালে ইইউয়ে সঙ্গে বৃটেনের সম্পর্ক কেমন হবে তেমন কিছু শর্ত নির্দিষ্ট করে একটি খসড়া চুক্তি প্রস্তুত করা হয়েছিল। কিন্তু পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সে তা সংখ্যাগরিষ্ঠ এমপির সমর্থন আদায় করতে পারেনি। ভয়াবহ ভোটের ব্যবধানে তা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এরপর ১২ই মার্চ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ইইউ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে এমপিদের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে এমন একটি চুক্তি পার্লামেন্টে উপস্থাপন করেন। কিন্তু সেটাও পরাজিত হয়। এতে বড় রকমের অবমাননার শিকার হন তেরেসা মে।
এখন তিনি তৃতীয়বারের মতো ব্রেক্সিট চুক্তি পার্লামেন্টে উত্থাপন করতে চাইছেন। তবে তার আগে তিনি যথেষ্ট সংখ্যক এমপির সমর্থন নিশ্চিত করতে চান । এবার তিনি নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেয়ায় কনজার্ভেটিভ পার্টির অনেক এমপি তার চুক্তির প্রতি সমর্থন দিতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেলেও ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা এই চুক্তির বিরোধিতা করে যাবে।
তেরেসা মে নিজ দলের সদস্যদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আমাদের দেশ এবং আমাদের দলের জন্য যা সঠিক তা করার উদ্দেশ্যে আমি আমার দায়িত্ব আগে থেকেই ছেড়ে দিতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, তিনি জানেন যে কনজার্ভেটিভ দলের এমপিরা তাকে আর ব্রেক্সিটের পরবর্তী আলোচনার নেতৃত্বে দেখতে চান না এবং তিনিও সেই পথেই দাঁড়াবেন না বলে জানান। তবে তিনি কমিটির সভায় তার পদত্যাগের কোন দিনক্ষণ উল্লেখ করেন নি।
যে আটটি বিকল্প প্রস্তাবে এমপিরা ভোট দিয়েছেন
ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের সম্ভাব্য বিকল্পগুলো নিয়ে বিতর্ক শুরু করেছিলেন বৃটিশ আইন প্রণেতারা। এর আগে পার্লামেন্টে ১৬টি বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করা হলেও স্পিকার আটটি প্রস্তাব বেছে নেন। বিতর্কের পর আইন-প্রণেতাদের প্রত্যেকের সামনে আটটি বিকল্প প্রস্তাব সংক্রান্ত কাগজ তুলে দেয়া হয়। এরমধ্যে যে প্রস্তাবগুলোতে তাদের সম্মতি থাকবে, সেগুলোকে তারা ‘হ্যাঁ’ হিসেবে, আর যেগুলোতে তাদের আপত্তি থাকবে সেগুলোকে ‘না’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এই ভোটে মন্ত্রীপরিষদ বাড়ে কনজার্ভেটিভ দলের সব সদস্য ভোট দেয়ার অধিকার ভোগ করেছেন। অর্থাৎ তাদেরকে ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা দেয়া হয় নি। নিচে প্রস্তাবগুলো ও তার পক্ষে, বিপক্ষে কি পরিমাণ ভোট পড়েছে তা তুলে ধরা হলো-
কাস্টমস ইউনিয়ন - পক্ষে: ২৬৪, বিপক্ষে: ২৭২ ভোট।
নিশ্চিত গণভোট (কনফার্মেটরি রেফারেন্ডাম)- পক্ষে: ২৬৮, বিপক্ষে: ২৯৫ ভোট।
১২ই এপ্রিল চুক্তিবিহীন বেক্সিট বাস্তবায়ন- পক্ষে: ১৬০, বিপক্ষে: ৪০০ ভোট।
একক বাজার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব- পক্ষে: ১৮৮, বিপক্ষে: ২৮৩ ভোট।
ইএফটিএ এবং ইইএ সদস্যপদ- পক্ষে: ৬৫, বিপক্ষে: ৩৭৭ ভোট।
চুক্তিহীনতা এড়াতে ৫০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা- পক্ষে: ১৮৪, বিপক্ষে: ২৯৩ ভোট। 
লেবার পার্টির প্রস্তাবিত ব্রেক্সিট পরিকল্পনা- পক্ষে: ২৩৭, বিপক্ষে: ৩০৭ ভোট।
মল্টহাউজ প্ল্যান বি- পক্ষে: ১৩৯, বিপক্ষে: ৪২২ ভোট।

এতে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়া প্রস্তাবটি হলো ক্রস পার্টি প্ল্যান, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন রক্ষণশীল দলের সাবেক চ্যান্সেলর কেন ক্লার্ক। যেখানে ব্রেক্সিটের পরও বৃটেনের সাথে ইইউ-এর শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অব্যাহত থাকবে বলে বলা হয়েছে। এই চুক্তিতে সমর্থন দিয়েছেন কনজার্ভেটিভ পার্টির ৫ জন মন্ত্রী মার্ক ফিল্ড, স্টিফেন হ্যামন্ড, মার্গট জেমস, অ্যান মিলটন ও রোরি স্টিওয়ার্ট। ব্রেক্সিট সম্পন্ন হওয়ার পর কনজার্ভেটিভ দলের নেতৃত্বের লড়াই হতে পারে বলে জানা গেছে। সেটা কবে নাগাদ হবে তা নির্ভর করবে রক্ষণশীল দলের ওপর। দলীয় সদস্যদের মাধ্যমে নতুন নেতা নির্বাচিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকবেন।
ক্ষমতাসীন দলের কট্টর ব্রেক্সিটপন্থী আইন-প্রণেতাদের বিরোধিতার কারণে বৃটিশ পার্লামেন্টে দুই দফায় প্রত্যাখ্যাত হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর ব্রেক্সিট চুক্তি। এই চুক্তি নিয়ে নিজ দল রক্ষণশীল দলের সংসদ সদস্যদেরও বিরোধিতার মুখে পড়েন তিনি। তবে প্রধানমন্ত্রী এবার তার চুক্তির পক্ষে নিজ দলের এমপিদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এ ব্যাপারে তিনশ জনেরও বেশি কনজার্ভেটিভ দলের এমপিকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমি এই কক্ষের প্রত্যেককে চুক্তিটির প্রতি সমর্থন দেয়া জন্য বলছি, যাতে আমরা আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পূর্ণ করতে পারি, যেন বৃটিশ জনগণের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমরা একটি মসৃণ ও সুষ্ঠু উপায়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যেতে পারি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ২৯শে মার্চের পরিবর্তে ১২ই এপ্রিল যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন ইউরোপীয় নেতারা। তেরেসা মে’র চুক্তি অনুমোদন পেলে ব্্েরক্সিট কার্যকরের সময়সীমা ২২শে মে পর্যন্ত বাড়াতো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে কোনও বিকল্প পরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হলে ১২ই এপ্রিলেই কোন চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট সম্পন্ন করতে হবে।

হিমালয়ে বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ: বাংলাদেশে তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা

পরিবর্তিত জলবায়ু পরিস্থিতিতে হিমালয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে তীব্র পানি সংকটের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে পর্যটন ও তীর্থযাত্রাকে হিমালয়ের নগরায়ণ বৃদ্ধির নেপথ্য কারণ বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বেড়ে যাওয়ায় ঝরনা ও নদীনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনার প্রতি নির্ভরতাও বেড়েছে। প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, বরফ ও হিমবাহ-নির্ভর পানির এই দুই উৎস জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহে সক্ষম নয়। সে কারণে ভূগর্ভস্থ উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে, যা তীব্র পানি সংকটের কারণ হতে পারে। ওই প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, পরিবেশগতভাবে স্পর্শকাতর অঞ্চল হিমালয়ের এই দ্রুততর অপরিকল্পিত নগরায়ণ  নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কোটি কোটি মানুষ গভীর পানি সংকটে পড়বে। প্রতিবেদন অনুযায়ী,  হিমালয়কেন্দ্রিক যে ৮টি দেশের ওপর ওই সংকটের প্রভাব পড়বে, বাংলাদেশ তার অন্যতম। সংকট নিরসনে পার্বত্য এলাকায় নগরায়ণের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনটিতে।
পুরো হিমালয় অঞ্চল ছড়িয়ে আছে ৪২ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে, যা আটটি দেশের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য দেশগুলো  হলো: আফগানিস্তান, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান। পর্বত অঞ্চলে সংস্থান হয় প্রায় ২৪ কোটি মানুষের জীবিকা। অঞ্চলটিতে রয়েছে ১০টি বড় নদীর উৎপত্তিস্থল এবং বৈশ্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে স্বীকৃত ৩৬টি প্রাণবৈচিত্র্য সমৃদ্ধ স্থান। ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেইন ডেভেলপমেন্ট’ তাদের এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি জানিয়েছে, হিমালয় পর্বত অঞ্চল প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকায় ভূমিকা রাখে। এই অঞ্চল থেকে পাওয়া পানি ব্যবহৃত হয় খাদ্য ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। নিশ্চিত হয় বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য।
‘আরবানাইজেশন অ্যান্ড ওয়াটার ইনসিকিউরিটি ইন দ্য হিন্দু কুশ হিমালয়া: ইনসাইটস ফ্রম বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, নেপাল অ্যান্ড পাকিস্তান’ শিরোনামে ‘ওয়াটার পলিসি’ সাময়িকীর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপরিকল্পিত নগরায়ণ বেড়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চলে মারাত্মকভাবে বেড়েছে জনসংখ্যা। যে কারণে সেখানকার পানির উৎসগুলোর অতিব্যবহার ঘটছে, যা বাসিন্দাদের ক্রমেই ঠেলে দিচ্ছে এক হতাশাজনক পরিস্থিতির দিকে। গবেষক শ্রেয়সী সিং (নেপাল), এসএম তানভীর হাসান (বাংলাদেশ), মাসুমা হাসান (পাকিস্তান) ও নেহা ভারতীর (ভারত) তাদের যৌথ গবেষণায় বলেছেন, ভঙ্গুর ভূ-প্রকৃতির পার্বত্য অঞ্চলে এলোমেলোভাবে গড়ে ওঠায় নগর কেন্দ্রগুলো পানির সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।’ হিমালয় পর্বত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা পার্বত্য নগর কেন্দ্রগুলো ‘তাদের পৌর এলাকায় অবস্থিত পানির উৎসগুলো থেকে চাহিদা অনুযায়ী পানি সরবরাহ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।’ প্রতিবেদনটিতে সংকট প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, পর্বতে অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ভূগর্ভে থাকা পানির ওপর নির্ভরতা ক্রমাগত বাড়ছে। ইতোমধ্যে সেখানে দূরবর্তী উৎসগুলো থেকে পানি সংগ্রহের বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, নিকটবর্তী পানির উৎসগুলো বাড়তে থাকা চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পানি সরবরাহ করতে পারছে না। তবে অবকাঠামো ও বিদ্যুতের দামের কারণে পর্বতে পানি পরিবহনের বাস্তবতা সবসময় একইরকম থাকবে না। তখন ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা বাড়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ থাকবে না।
বাংলাদেশের বান্দরবান, ভারতের জম্মু ও কাশ্মির, সিমলা, হরিদুয়ার, হৃষিকেশ, দার্জিলিং ও দেশটির উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের রাজ্যগুলো, নেপালের বেশিরভাগ অঞ্চল এবং পাকিস্তানের হিমালয় পর্বত অঞ্চল হিমালয়কেন্দ্রিক বড় পর্যটন কেন্দ্রগুলোর অন্যতম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঝরনা কিংবা গভীর বা অগভীর কুয়া থেকে পানি সংগ্রহ করাটাই এখন পর্যন্ত পানির চাহিদা পূরণের উপায় হিসেবে গণ্য হচ্ছে। যদি যথাযথ পরিমাণে ও যথাযথভাবে পরিকল্পিত পানি সংগ্রহের ব্যবস্থা তৈরি করা না যায় তাহলে ভূগর্ভের পানির ওপর এই অত্যধিক নির্ভরতা ভবিষ্যতে আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে। পার্বত্য অঞ্চলের ভূগর্ভের পানি ধরে রাখে মাটির যে স্তরটি তা গঠনগতভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর প্রকৃতির। গত বছর সিমলায় প্রকট পানির সংকট দেখা দিয়েছিল। প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এ সংকটের কারণ ছিল বৃষ্টিপাত ও তুষারপাতের স্বল্পতা।
ওই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের গবেষক তানভীর হাসান। তিনি পরিবেশ-প্রতিবেশ সংক্রান্ত ওয়েবসাইট মোঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেছেন, ‘কেবল জলবায়ু পরিবর্তন হিমালয় অঞ্চলের পানি সংকটের কারণ নয়, অনিয়ন্ত্রিত এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণও এর জন্য দায়ী। এর কারণে পার্বত্য অঞ্চলে পানির সংকটের পাশাপাশি দূষণ ও মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে।’ সংকট সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত কৌশল প্রণয়নের তাগিদ দিয়েছেন তিনি। সতর্ক করেছেন, ‘তা না হলে পুরো অঞ্চলটি এবং এখানে বসবাস করা কোটি কোটি মানুষ চরম সংকটে পড়বে।’
নগরায়ণ সংজ্ঞায়নের পদ্ধতিগত দুর্বলতাকে সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে ওই গবেষণায়। বলা হয়েছে, ‘সমতল ও পর্বতে একই ধরনের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কোন নগরের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, পর্বতের ওপর অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থান এই সংজ্ঞায় নগর হিসেবে বিবেচিত হয় না। অথচ, পানি নিরাপত্তার দিক থেকে দেখলে সমতলের চেয়ে পার্বত্য অঞ্চলের সক্ষমতা কম।’ এতে বলা হয়েছে, পর্বতে জেলা সদর ও বাজারকেন্দ্রিক শহরের মতো ছোট ছোট বসতি সাধারণ নগর কেন্দ্রগুলোর মতোই। কিন্তু তারা আনুষ্ঠানিকভাবে নগর কেন্দ্র হিসেবে সংজ্ঞায়িত নয়। তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত নগরায়ণের সংজ্ঞায় পড়ে না। এজন্যই ভঙ্গুরতা, পানির সীমিত সরবরাহ ও দূরত্ব বিবেচনায় রেখে সেখানকার নগর কেন্দ্রগুলোর জন্য নতুন সংজ্ঞা দরকার।
ওই প্রতিবেদনে পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তুসংস্থান ও বনাঞ্চলে ঘেরা উপরের দিককার পানি সরবরাহকারী অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে পার্বত্য নগর কেন্দ্রগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এতে সতর্ক করা হয়েছে, ‘দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতা ব্যতিরেকে হিন্দু কুশ হিমালয়ান (এইচকেএইচ) অঞ্চল গভীরভাবে পানির সংকটের মুখোমুখি হবে, যার প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে।’
নেপালকে এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে হাজির করে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পর্বতে অবস্থিত কোন স্থানগুলোকে নগর কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হবে সে বিষয়ে পর্বতের বৈশিষ্ট্য সাপেক্ষে নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশি গবেষক তানভীর হাসানও মোঙ্গাবে-ইন্ডিয়াকে বলেছেন, ‘উন্নত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য আগে বাংলাদেশ, ভারত  ও পাকিস্তানে পর্বতের বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে নগর কেন্দ্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন, যা নেপাল করেছে।’

‘মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার চাই না’ by উদিসা ইসলাম

‘ত্রিশ লাখ মানুষ জীবন দিয়ে যে পতাকা এনেছেন, মৃত্যুর পর তা যেন আমার শরীরে না জড়ানো হয়। আমি গার্ড অব অনারও চাই না। তুমি লিখে দিও, আমাকে যেন শহীদ মিনারে না নেওয়া হয়। আমি এসব চাই না।’ অভিমান নয়, বিশ্বাস থেকে কথাগুলো বলেছেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী, সুরকার ও সংগীত পরিচালক সুজেয় শ্যাম। যাদের হাত দিয়ে সেরা সেরা দেশের গান পেয়েছে বাংলাদেশ, তাদের একজন সুজেয় শ্যাম। এখনও এই প্রজন্মের কেউ আগ্রহ দেখালে তিনি তাকে গান তুলে দেন।
এই শিল্পী পিঁপড়া বা কৃষক হয়ে পুনর্জন্ম নিতে চান। তার ভাষায়, ‘দলবদ্ধতার জন্য পিঁপড়া কীটপতঙ্গের মধ্যে শক্তিশালী। তাদের মতো শক্তিশালী এ দেশের কৃষকরা। কারণ, চোখের সামনে তারা দেখছেন ফসল ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু কিছুই করার নেই। আবারও ফসল করছেন। আমাদের এমন হলে কী করি, কেঁদে মরে যাই। এক একুশে পদক পাচ্ছি না সেই নিয়ে আমাদের কত হাহাকার। তাই পুনর্জন্ম হলে আমি আর শিল্পী হতে চাই না, পিঁপড়া কিংবা কৃষক হতে চাই।’
স্বাধীন বাংলা বেতারের এই শিল্পীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতি ও বর্তমান ভাবনা নিয়ে রবিবার (২৩ মার্চ) এই প্রতিবেদকের কথা হয়। যদিও মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এসব নিয়ে তিনি কথা বলতে চান না এখন।
এসব নিয়ে কেন কথা বলতে চান না- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বলে কী হবে? অনেক বলেছি, আর বলতে চাই না। কতজন কত কথা বলে এখন। স্বাধীন বাংলা বেতারের কথাই যদি বলি। হাতেগোনা কিছু শিল্পী স্বাধীন বাংলা বেতারে গান গেয়েছেন আর কয়েকজন সঙ্গে ছিলেন। এখন তাদের দাপটে টেকা দায়। সত্যিকার অর্থে উমা, কল্যাণী, কাদেরি কিবরিয়া, রথিন, রফিকুল আলম ও বুলবুল মহলানবিশ, রুপা, মালা, চট্টগ্রামের ও রাজশাহীর শিল্পী মিলিয়ে মোট ২০/২৫ জন। কিন্তু তালিকায় এখন ৪০ জনের বেশি।’
যুদ্ধ সময়ের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সে সময় শুরুতে আমি চেয়েছিলাম নিজের ও পরিবারের জীবন বাঁচাতে, অন্যকিছু না। এরপর যখন দেখলাম যুদ্ধের দামামা তখন যুক্ত হলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। আমার নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যে আমাকে বাঙালি বানিয়েছেন, আমি তাকে মানি। যুদ্ধের পুরোটা সময় আমি কোথাও যাইনি, কেবল স্বাধীন বাংলা বেতারে গান করেছি। আমার নিজের ৯টা গান ছিল। কিন্তু কী যেন হয়ে গেল। বিজয় দিবসে তৈরি হওয়া গান বিজয় নিশান উড়ছে ওই কয়জন জানে? জানে না। কারণ, পরবর্তীতে গান নিয়ে রাজনীতি হয়েছে। শিল্পীরা নানা সময়ে ব্ল্যাকলিস্টেড হয়েছে। ফলে একেক সময় একেক গান হারিয়ে গেছে।’
১৯৭১ সালে ৭ মার্চ এবং ২৬ মার্চ কোথায় ছিলেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৭ মার্চ ঢাকাতেই ছিলাম। ভাষণ শোনার পরে মনে হলো আমরা একটা জাতি। এর আগে তো আমাদের ভারতের দালাল গালি শুনতে হতো। এতো সুন্দর সে ভাষণ। কিছু লেখা নাই, অনর্গল বলে চলেছেন। শরীরে আলাদা উন্মাদনা তৈরি করে তা শুনলে। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। লাখ লাখ মানুষ একটা আঙুলের ইশারা দেখলেন। এরপর আমি ১৫ তারিখ সিলেট রওনা দেই। সিলেটের নিরালা রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দিচ্ছি, তখন একজন এসে খবর দিলেন ঢাকার অবস্থা ভালো না। এর পরপরই ৭৬ ঘণ্টার কারফিউ দেওয়া হলো। সে কী নৃশংসতা। শুরু হলো শহর থেকে মানুষ যাওয়া। আমি সীমান্ত পার করে দেওয়ার কাজে সহায়তা করতাম। এর কিছুই ডকুমেন্টেড না।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা কেবল ধর্ষণের দৃশ্য দিয়েই সমাপ্ত। কত মানুষ নেই, কতজন ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হলো সেসব উঠে আসেনি। আমাদের এলাকা থেকে যেতে যেতে শেষ বাড়ির মালিক যেদিন যায়, পুরো চাবির গোছা আমার হাতে দিয়ে যান, দেখে রাখতে দিয়েছিলেন। আমিও এর পরপরই রওনা দেই। যখন আমি সীমান্ত পার হবো, তখন দেখি বাড়িটা দাউ দাউ করে জ্বলছে।’
আমাদের এখানে সেই অর্থে সাংস্কৃতিক আন্দোলন নেই কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘৪৬ বছর অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া করে গেলাম। পাশের দেশ ভারতে যা কিছু হোক সংস্কৃতি ঠিক আছে। আমাদের সংস্কৃতিটা ধরে রাখতে পারিনি। আমরা যখন গান তৈরি করেছি আমরা হাফ কাপ চা, আধা সিঙ্গারা খেয়ে গান বেঁধেছি। এখন তো কাবাব, পেটিস ছাড়া গান হবে না। তাই আমাদের গানও হয় না।’
আপনি নানা বিষয়ে স্বচ্ছ সুস্পষ্ট কথা বলেন, এত সাহস পান কোথায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাহস পাবো না কেন? আমি তো মিথ্যা বলছি না। আমার বাসায় একটা গৃহকর্মী ছিল। রাতে হঠাৎ হঠাৎ তাকে পাওয়া যেত না। সে ছাদে চলে যেত। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতো, আজ সারা দিনে সে যা করেছে তা ভালো করেছে কিনা। তার কাছ থেকে আমি শিখেছি, বিবেকের কাছ থেকে সরে গেলে হবে না। আজকের দিনটাই শেষ না মনে রাখতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারতে হবে। আমার বিবেচনায়, শ্মশান সবচেয়ে ভালো জায়গা, নিজেকে বোঝার। আমি যুবক বয়সে প্রায় শ্মশানে যেতাম। নিজের মতো ভাবা যায় সেখানে। এখন যেতে পারি না। ভুলে গেলে চলবে না সবচেয়ে বড় নিজের বিবেক।’

‘বিছানা-বন্দী’ জীবন থেকে সফল ফ্রিল্যান্সার by মো. মিন্টু হোসেন ও কাজী আশিক রহমান

ফাহিমুল করিমের জন্য তাঁর শারীরিক বাধা কোনো ‘বাধা’ হয়ে ওঠেনি। ঘরে বসেই ওয়েবসাইট থেকে কাজ নিয়ে আয় করছেন এই তরুণ।
অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইভার ও আপওয়ার্কে কাজ করেন ফাহিমুল। তাঁর মতো বাংলাদেশের অনেকেই এখানে কাজ করছেন। তবে ফ্রিল্যান্সারদের গ্রুপে ফাহিমুলকে নিয়েই ব্যাপক আলোচনা।
মাগুরার ছেলে ফাহিমুলের (২১) জীবন আর সবার মতো নয়। ডুচেনেমাসকিউলার ডিসথ্রফি নামে জটিল রোগে আক্রান্ত তিনি। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে অল্প বয়সেই তাঁর শরীরের পেশি শুকিয়ে যায়। তবে রোগের কাছে হার মানেননি ফাহিমুল। মনোবল হারাননি। অদম্য লড়াকু ফাহিমুল এখন সফল ফ্রিল্যান্সার।
ছোটবেলায় সাইকেল চালাতেন ফাহিমুল। বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। পড়ালেখাতেও ছিলেন মেধাবী। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল। ২০১২ সালের শেষ দিকে জেএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে বিছানায় পড়ে যান। ধীরে ধীরে তাঁর পেশি শুকিয়ে যেতে থাকে। তারপর একেবারেই অকেজো হয়ে যায় হাত-পা থেকে শুরু করে পুরো শরীর। মাগুরা সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তেন ফাহিমুল। রোগে পড়ে একপর্যায়ে এই মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়।
ফাহিমুলের বাবা রেজাউল করিম। তিনি একটি বেসরকারি কোম্পানির বিপণন বিভাগে কাজ করতেন। মা হাজেরা খাতুন গৃহিণী। ছোট এক বোন নবম শ্রেণিতে পড়ে।
জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ফাহিমুলের জীবন অনেকটা ‘বিছানা-বন্দী’ হয়ে যায়। দৈনন্দিন কাজের জন্য তাঁকে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। ফাহিমুলের স্বপ্নটা সেখানেই স্থবির হয়ে যেতে পারত। কিন্তু দৃঢ় মনোবল তাঁকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। এই তরুণ বিশ্বাস করেন, শারীরিক অক্ষমতা মানেই সবকিছু থেমে থাকা নয়। মনের জোরে জেগে ওঠেন তিনি। একপর্যায়ে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ শুরু করেন। এখন আপওয়ার্কে প্রতি ঘণ্টায় তাঁর রেট ৮ ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৭০ টাকা।
ফাহিমুলের জীবন ও সংগ্রামের গল্পটা তাঁর কাছ থেকেই শোনা যাক। ফাহিমুল বলেন, ‘২০১২ সালের কথা ৷ আমি তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র৷ জেএসসি পরীক্ষার ঠিক ২-৩ দিন আগে আমার চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে যায় ৷ রোগটা ছোটবেলা থেকেই ছিল৷ ডাক্তার বলেছিলেন, একসময় এমন হবে। আস্তে আস্তে শরীর একদম শুকিয়ে যাবে। শক্তি হারিয়ে যাবে। এমনকি হয়তো ১৮ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকব৷ এই অবস্থাতেই জেএসসি পরীক্ষা দিই। ভালো রেজাল্টও করি ৷ কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নবম শ্রেণিতে আমার আর ভর্তি হওয়া হয় না। সেখানেই আমার পড়ালেখার ইতি ঘটে৷ ছোটবেলা থেকেই আমার নতুন বিষয় শেখার ব্যাপারে খুব আগ্রহ ছিল ৷ সেটা বই পড়ে হোক, কারও কাছ থেকে হোক বা টেলিভিশন দেখেই হোক। নবম শ্রেণিতে ভর্তি না হলেও বিজ্ঞান বিভাগের বইগুলো বাসায় এনে দিয়েছিলেন আম্মু৷ সেগুলো নিজে নিজে পড়তাম৷ একসময় আমি ছোট বাচ্চাদের প্রাইভেট পড়ানো শুরু করলাম ৷ সবাই আমার বাসায় এসে পড়ত’। প্রাইভেট পড়িয়ে ফাহিমুলের কিছু টাকা জমে। বাসা থেকে আর কিছু টাকা নিয়ে ২০১৪ সালের শেষ দিকে একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনেন তিনি৷ ইন্টারনেটে সংযুক্ত হন৷ তারপর ধরে ধীরে গুগল, ইউটিউব সম্পর্কে জানতে পারেন তিনি৷ ২০১৫ সালের মাঝামাঝি ফেসবুকের একটা পেজে ইন্টারনেটে আয় করা সম্পর্কে জানতে পারেন ফাহিমুল৷ তিনি প্রথমে জেনে ছিলেন টি-স্প্রিং সম্পর্কে ৷ ভেবেছিলেন মোবাইল দিয়েই কাজ করা যাবে৷ কয়েক দিনের চেষ্টায় ব্যর্থ হন। একটা কম্পিউটারের প্রয়োজনীয়তা খুব করে অনুভব করেন। বাসায় বলেন। কিন্তু বোঝাতে পারেননি। তা ছাড়া অর্থেরও সংকট ছিল।
হাল ছাড়েননি ফাহিমুল। তিনি বলেন, ‘পরে একটা গ্রুপে যুক্ত হলাম। নাম ছিল ওডেস্ক বাংলাদেশ (বর্তমানে আপওয়ার্ক বাংলাদেশ)৷ ওখানে দেখতাম, সবাই অনলাইনে কাজ নিয়ে কথা বলত৷ আমি সবার পোস্ট, কমেন্ট নিয়মিত পড়তাম৷ সেখানেরই একটা পোস্ট থেকে ওয়েব ডিজাইনের কথা জানতে পারি। ওখানে কিছু পিডিওফের লিংক দেওয়া ছিল। আমি সেগুলো ডাউনলোড করে পড়ে পড়ে এইচটিএমএলটা প্রায় শিখে ফেলি৷ কিন্তু কিছুদিন পর অধৈর্য লাগছিল৷ ভাবলাম, এভাবেও সম্ভব না। আমাকে নির্দিষ্ট কোনো কাজ শিখতে হবে৷ কাজ শিখতে চাই বলে গ্রুপে পোস্ট দিই। গ্রুপের একজন অ্যাডমিন আমার এলাকার একজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন৷ তিনি কিছুদিন পর আমার বাসায় এসে আমাকে কাজ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দেন। গ্রাফিকস ডিজাইন সম্পর্কেও ধারণা দেন ৷ কিন্তু তখনো আমার কম্পিউটার ছিল না৷’
পরিচিতদের উদ্যোগ, মায়ের জমানো টাকা ও ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে ২০১৬ সালের নভেম্বরে একটা ল্যাপটপ কেনেন ফাহিমুল৷ ল্যাপটপ ব্যবহার আয়ত্তে এলেও নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহারের আর্থিক সামর্থ্য ছিল না তাঁর৷ একটা ডিভিডি কিনে গ্রাফিকস ডিজাইন শেখা শুরু করেন তিনি৷ তারপর নিয়মিত চর্চা। শুরুতে শেখেন ফটোশপ। অন্য দরকারি বিষয়গুলো ইউটিউব দেখে শিখতে থাকেন তিনি। কম টাকায় ইন্টারনেটের অফার পেলে ফ্রিল্যান্স টিউটোরিয়ালের ভিডিও ডাউনলোড করতেন তিনি। শুরুতে বিজনেস কার্ড ও ব্যানার তৈরি শেখেন। এরপর অনলাইন মার্কেটপ্লেস ফাইভার সম্পর্কে জানেন।
ফাহিমুল বলেন, ‘ফেসবুকে সার্চ করে ফাইভার হেল্প বাংলাদেশ গ্রুপের খোঁজ পাই৷ গ্রুপের ডকুমেন্টগুলো পড়ে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফাইভারে গিগ (ফাইভারে প্রতিটি সার্ভিসের অফারকে গিগ বলে) খুলি ৷ গিগ খোলার অল্প দিনের মধ্যেই কাজ পেয়ে যাই ৷ ভাবতেও পারিনি, এত দ্রুত কাজ পেয়ে যাব ৷ আমি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজটা শেষ করি৷ বায়ার খুশি হয়ে আমাকে ৫ স্টার রিভিউসহ বোনাস দেন ৷ আমার প্রথম উপার্জন ছিল ১৫ মার্কিন ডলার ৷
তারপর ফাহিমুলকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি ৷ এক মাসেই তিনি লেভেল ওয়ান সেলার হয়ে যান ৷ তখন প্রচুর কাজ আসতে থাকে। তিনি বলেন, ‘এমনও হয়েছে, কাজের জন্য আমি খাওয়ার সময় পেতাম না। আম্মু হাতে করে খাইয়ে দিয়েছে, আর আমি কাজ করেছি ৷
প্রথম তিন মাসের মধ্যে ফাহিমুল লেভেল টু সেলার হয়ে যান ৷ তাঁর উপার্জন বাংলাদেশি টাকায় প্রায় চল্লিশ হাজার হয়ে গিয়েছিল৷ ২০১৭ সালের এপ্রিলে তাঁর বাবার চাকরি চলে যায় ৷ তখনই তিনি প্রথম কাজের টাকা তুলতে পারেন ৷ শুরুতে ৩৭ হাজার টাকা তোলেন। ২০১৭ সালে মাঝামাঝি আপওয়ার্কে অ্যাকাউন্ট খোলেন ফাহিমুল ৷ কয়েক দিন চেষ্টার পর অ্যাকাউন্ট অনুমোদন পায় ৷ আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আপওয়ার্কে দ্রুত কাজ পেয়ে যান। তিন মাসেই আপওয়ার্কের টপ লেভেলের ব্যাজ পেয়ে যান তিনি ৷ এখনো ফাইভারে লেভেল টু ও আপওয়ার্কে টপ রেটেড ব্যাজ ধরে রেখেছেন তিনি ৷ গত দুই বছরে সাড়ে চার শর বেশি প্রজেক্টে কাজ করেছেন ফাহিমুল ৷
ফাহিমুলের বাবা রেজাউল করিম জানান, তাঁর ছেলের রোগের বিষয়টি প্রথম ধরা পড়ে ২০০৬ সালে। দেশে বেশ জায়গায় চিকিৎসা করানোর পর ২০০৮ সালে ফাহিমুলকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের কলকাতায়। সেখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানান, ফাহিমুল ডুচেনেমাসকিউলার ডিস্থ্রফিতে আক্রান্ত। ধীরে ধীরে তাঁর পেশি দুর্বল হয়ে যাবে। বংশগত রোগটির কোনো স্থায়ী চিকিৎসা নেই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমস্যা জটিল হতে পারে। সেখান থেকে ফিজিওথেরাপির পরামর্শ ও পুনরায় চিকিৎসার জন্য যেতে বলা হয়। ফাহিমুল অচল হয়ে পড়লে আর্থিক সংকটের কারণে আর ভারতে যাওয়া সম্ভব হয়নি।
হাতের আঙুলগুলোও যাঁর ঠিকমতো কাজ করে না, তিনি কীভাবে এত দূর এলেন? ফাহিমুল বলেন, ‘হতাশ হয়নি। স্টিফেন হকিংয়ের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজেছি।’
ফাহিমুল জানান, শারীরিকভাবে অক্ষম হলেও তিনি মানসিকভাবে বেশ শক্ত। তাই তিনি আটকে থাকেননি।
ফাহিমুল বাস্তবতা বোঝেন। তাঁর ধারণা, তিনি দীর্ঘদিন ফ্রিল্যান্সিংয়ের এই কাজ করতে পারবেন না। তাই পরিকল্পনা করছেন, টাকা জমিয়ে কোনো ব্যবসা শুরুর। যেখানে আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
বর্তমানে পরিবারের খরচের একটা বড় অংশ আসে ফাহিমুলের আয় থেকে। ছেলের উপার্জিত অর্থে ইতিমধ্যে শহরে চার শতক জমি কিনেছে পরিবার।
বাবা রেজাউল করিম বলেন, ২০০৮ সালের পর বড় পর্যায়ে আর কোনো চিকিৎসা হয়নি ফাহিমুলের। এত দিন অর্থাভাবে করতে পারেননি। এখন ফাহিমুল যেহেতু উপার্জন করছেন, তাই এ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন।
ফাহিমুলের মা হাজেরা খাতুন জানান, ছেলে রাত জেগে কাজ করে। তাঁর কাছে থাকতে হয়। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে তাঁকে সব কাজে সহায়তা করতে হয়।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের কয়েকটি গ্রুপে মডারেটর হিসেবে আছেন ফাহিমুল। মাগুরাসহ দেশের অনেকে জায়গা থেকে অনেকেই তাঁর কাছে পরামর্শ চান।
ফাহিমুল জানান, ফ্রিল্যান্সার হতে হলে প্রচুর ধৈর্যের প্রয়োজন। এ কারণে অনেক তরুণ কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেন না। ফ্রিল্যান্সিংয়ে ইংরেজি জানা জরুরি ৷ তিনি বিভিন্ন ইংরেজি সিনেমা, শো ইত্যাদি দেখাসহ নানাভাবে ইংরেজি শিখেছেন ৷ বায়ারদের সঙ্গে কথা বলতে প্রথম প্রথম সমস্যা হতো। এখন অনেকটা আয়ত্তে এসে গেছে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নিজেকে প্রতিনিয়ত হালনাগাদ করা জরুরি বলে মনে করেন ফাহিমুল। তাই তিনি প্রতিদিনই নতুন কিছু শিখার চেষ্টা করেন।
ফাহিমুলের মতো যাঁরা জীবনসংগ্রামী, তাঁদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘কখনো ভাববেন না যে আপনি দুর্বল। কখনই ভেঙে পড়া যাবে না। আমি কখনো নিজেকে দুর্বল ভাবি না৷ অন্য মানুষের মতোই নিজেকে মনে করি। পরিবারের জন্য উপার্জন করতে হবে ভেবেই কাজ করি।’

মাদক পাচার ও বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী: অবজার্ভার রিসার্স ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষণ by শ্রীপর্না ব্যানার্জী

বাংলাদেশে ২০১৮ সালে মাদক ব্যবসা, বিশেষ করে ইয়াবার বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়। এ সময়ে রেকর্ড পরিমাণ অর্থাৎ ৫ কোটি ৩০ লাখ মেথামফেটামিন ট্যাবলেট (ইয়াবা) জব্দ করা হয়। প্রায় ৩০০ সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়। এর মধ্যে ৪০ জন টেকনাফে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের আশপাশের। গ্রেপ্তার করা হয়েছে প্রায় ২৫০০০ মানুষকে। এর মধ্যে কিছু রয়েছে রোহিঙ্গা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের রিপোর্ট অনুসারে, মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আইনকানুন বিহীন এলাকার কারখানা থেকে মাদক আনে এমন পাচারকারীদের জন্য বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে একটি বড় বাজার। কেন এবং কিভাবে রাষ্ট্রহীন এসব মানুষ এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তা খতিয়ে দেখা উচিত।
বাংলাদেশে বর্তমানে অতিমাত্রায় গাদাগাদি করে আশ্রয়শিবিরে অবস্থান করছে কমপক্ষে ৯ লাখ রোহিঙ্গা। এমনিতেই গাদাগাদি করে সেখানে অবস্থান করছে তারা, তার ওপর আছে নানা রকম বিধিনিষেধ। এসব ক্যাম্পে বসবাসের পরিবেশ নাজুক। বৈধ উপায়ে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে বিধিনিষেধ। এর ফলে অবৈধ উপায় অবলম্বনের পথ তৈরি হয়েছে রোহিঙ্গাদের জন্য। 
দেশে যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামগুলো ফেলে নারী, পুরুষ ও শিশুরা সীমান্ত অতিক্রম করে এপাড়ে এসেছেন। এ সময় তারা স্বামী বা স্ত্রী, পিতামাতা অথবা সন্তানদের ছাড়াই এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। কারণ, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংস দমনপীড়নের এসব মানুষকে হারিয়েছেন তারা। কেউ কেউ কিছু অর্থ ও কাপড় নিয়ে আসতে পেরেছেন। কিন্তু গ্রামে আগুন দেয়ায় অন্য বেশির ভাগ মানুষই ওরকম কিছু নিয়ে আসতে পারেন নি। এমন ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অধীনে তারা আশ্রয় পেয়েছেন অতিমাত্রায় ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয় শিবিরে। এসব আশ্রয় শিবিরের বাইরের এলাকায় কোনো কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের ওপর রয়েছে বিধিনিষেধ। মানবিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে যা ত্রাণ তারা পান তা দয়ামাত্র। আশ্রয়শিবিরের ভিতরে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশন (ইউএনএইচসিআর) যেসব কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, শুধু সেখানে কাজ করার অনুমতি আছে তাদের। এসব কাজের বিনিময়ে তারা যে অর্থ উপার্জন করেন, তার পরিমাণ এতটাই সামান্য যে, তা দিয়ে নিজেদের এবং পরিবারকে চালাতে হিমশিম খেতে হয়। খাদ্য সরবরাহ এখন সীমিত। তাই বাড়তি অর্থ হাতে এলে তা দিয়ে তারা ভাল খাদ্য ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারেন।
যদিও আশ্রয়শিবিরে শিক্ষামূলক কর্মসুচি চালু আছে, তবু জেআরপি রিপোর্ট ২০১৯ অনুযায়ী, শতকরা ৯৭ ভাগ যুবক ও কিশোরের মানসম্মত শিক্ষা অথবা শেখার সুযোগের অভাব রয়েছে।
ইয়াবা চালানের আকার কত বড় বা ছোট তার ওপর ভিত্তি করে তাদেরকে অর্থ দেয়া হয়। ঢাকা ও অন্য শহর এলাকায় ৫০০০ ইয়াবা ট্যাবলেট পৌঁছে দিয়ে তারা আয় করে ১০ হাজার টাকা। ফলে এটা তাদের কাছে একটি অতিমাত্রায় লোভনীয় কাজ। এভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা মাদকের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দিতে এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন।  
এসব খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে জড়িত যেসব বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা তারা সহজেই মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে চালান নিয়ে আসতে পারেন দুই দেশের মধ্যে প্রবহমান নাফ নদী অতিক্রম করে।
২০১৭-১৮ সালে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বেশ কিছু রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এবং তা নিশ্চিত করে যে, বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে ইয়াবার চাহিদা। এতে আসক্ত হয়ে পড়েছেন অনেক মানুষ। তার মধ্যে রয়েছেন গৃহবধূ থেকে শুরু করে কলেজ ছাত্র, পেশাজীবিরা পর্যন্ত। এক্ষেত্রে এই আশ্রয়শিবির সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে।
বিশাল চৌহদ্দির বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড)-এ উৎপাদিত মাদকের একটি ট্রানজিট দেশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশ। কক্সবাজারের টেকনাফ শহর এসব মাদক স্থানান্তরের জন্য এক কুখ্যাত প্রবেশপথ হিসেবে ব্যাপকভাবে লাইমলাইটে উঠে এসেছে। এখান থেকে বর্তমানে রাজধানীতে মাদক সরবরাহ দেয়ার কাছে নিযুক্ত ১৫টি সিন্ডিকেট। এই গেটওয়ের একেবারে প্রাণকেন্দ্রের খুব কাছাকাছি বসবাস রোহিঙ্গাদের।
মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, পাচারকারীরা এই আশ্রয়শিবিরের অনেক গভীরে সফর করে। অথবা ঘন বনের ভিতরে সাক্ষাত করে। অথবা পাশের কোনো রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে। তাদের কাছ থেকে এসব পাচারকারী তাদের প্যাকেজ গ্রহণ করে থাকে। তারপর তা গণপরিবহনের করে বাংলাদেশের বড় বড় শহরে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নিরাপত্তা তল্লাশিকে অতিক্রম করে তা সরাসরি চলে যায়।
এ কাজে বাহক হিসেবে পাচারকারীরা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদেরকেই বেশি পছন্দ করে। কারণ, এরা কম সন্দেহের তালিকায় থাকে। এভাবেই সন্দেহের বাইরে থাকা নারীরা মাদক ও তার সন্তান সহ নিরাপত্তা চৌকি অতিক্রম করে যায়। এসব মাদক অনেক সময় জুতার ভিতর, অন্তর্বাস, বেল্ট, পায়ুপথে আবার পেটের সঙ্গে বেঁধে পরিবহন করা হয়।
এভাবেই পাচারকারীরা বর্তমানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়শিবিরকে বড় বাজার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং আশ্রয়শিবিরকে ইয়াবা ‘গুদামঘর’ হিসেবে ব্যবহার করছে। শুধু যে মাদক আসছে এমন নয়। এর সঙ্গে ঘটছে আরো অনেক অপরাধ।
যদিও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো এ পরিস্থিতির গভীরতা সম্পর্কে জানে, মাঝে মাঝে তারা বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে অসহায় হয়ে পড়ে। অব্যাহতভাবে চলমান এ অপরাধ নিয়ে বহু বিতর্ক আছে। ১৯৯০ সালের মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনের ফাঁকফোকড় হতে পারে এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকার বড় কারণগুলোর একটি। আগের আইনে ইয়াবাকে মাদক হিসেবে ধরা হয় নি। এই মাদকটি সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। আগে মাদকের ডিলাররা সহজেই জামিন পেতেন। তাদেরকে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হতো না। ফলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে সরকার আগের আইনকে আরো কঠোর করে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন করে। এই আইনটি কাঙ্খিত সফলতা আনবে কিনা তা দেখার বিষয়।
গত মাসে টেকনাফ শহরে আত্মসমর্পণ কর্মসূচি পালিত হয়। সেখানে ১০২ জন মাদকের মাফিয়া ও খুচরা বিক্রেতা কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এটা একটি বড় সাফল্য হলেও, এখনও অনেকে পালিয়ে আছে এবং এ জন্য রোহিঙ্গাদেরকে এই ব্যবসার দিকে সরাসরি ঠেলে দিচ্ছে। এ বিষয়টি হিসাবে নিতে হবে। গরিব এসব রোহিঙ্গা পরিণতি এবং ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে কতটা অবহিত তা অনিশ্চিত।
মানবাধিকারের প্রেক্ষাপটে, রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি দেয়া নিয়ে কথা বলেছে জাতিসংঘের বেশ কিছু রিপোর্ট। এসব গ্রুপের সঙ্গে কাজ করছে যেসব আন্তর্জাতিক ত্রাণ বিষয়ক কর্মসূচি তারা রোহিঙ্গাদের মৌলিক জীবনধারণ উন্নত করার দিকে ফোকাস দিয়েছে। তারা আশা করছে, এই মৌলিক চাহিদার উন্নতি করা হলে আশ্রয়শিবিরে অপরাধ কমতে সাহায্য করবে। তহবিল হয়তো ভুলভাবে পরিচালনা করা হয়, না হয় তার অপব্যবহার হয়। সরকারসমূহ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন বিষয়ে যে হুঁশহাঁস প্রচেষ্টা দেখাচ্ছে তাতে নিরাপত্তা সমানভাবে খর্ব হচ্ছে। তাই জাতীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত সমাধানের বিষয়টিতে রয়েছে শুধুই গড়িমসি। যাতে দেখা যায় এই ইস্যু সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণে ঘাতটি রয়েছে। এটা অনুধাবন করা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমই এক্ষেত্রে ব্যাপকহারে মনোযোগ সৃষ্টি করতে পারে, যেখানে এইসব রাষ্ট্রহীন মানুষগুলোকে পুনর্বাসনের আনুষ্ঠানিক নীতি বেরিয়ে আসবে এবং তা থেকে বাস্তব সমাধান বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। 
(অনলাইন ইউরেশিয়া ভিউ থেকে অনুবাদ)

সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহর প্যারিস হংকং ও সিঙ্গাপুর

বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে ফ্রান্সের প্যারিস। একই সঙ্গে রয়েছে হংকং ও সিঙ্গাপুরের নামও। এবারই প্রথম প্যারিস শীর্ষ ব্যয়বহুল শহরের তকমা পেলো। গত বছর শহরটি ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় ব্যয়বহুল শহর। সর্বোচ্চ তিনটি শহরের শীর্ষস্থান দখলের ঘটনাও এবারই প্রথম। বিপরীতে সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল বা সস্তা শহরের তকমা পেয়েছে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস। বিবিসি’র খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন শহরের জীবনযাত্রার মূল্যমান তুলনা করে দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট প্রতিবছর এই জরিপ পরিচালনা করে থাকে। এবার ১৩৩টি দেশে এই জরিপ করা হয়।
গত ৩০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম প্যারিস, হংকং এবং সিঙ্গাপুরের নাম একসঙ্গে শীর্ষে স্থান পেয়েছে। গত বছরের শীর্ষ ১০ ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় প্যারিস দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। এ ছাড়া ঐ তালিকায় সেবার ইউরোপের আরো তিনটি শহরও ছিল। জরিপে ১৩৩টি দেশের খুব সাধারণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম তুলনা করা হয়।
যেমন- কোন শহরের পাউরুটির দাম কতো? আর এই তুলনামূলক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয় যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরকে। মূলত নিউ ইয়র্কের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মূল্যের সঙ্গে তুলনা করা হয় ওই ১৩৩টি শহরের জীবনযাত্রার দাম। তুলনা করা হয় সেই খরচ নিউ ইয়র্কের চাইতে কম নাকি বেশি। প্রতিবেদনটির লেখক রক্সানা স্ল্যাভচেভা বলেন, প্যারিস ২০০৩ সাল থেকেই সবচেয়ে ব্যয়বহুল শীর্ষ দশ শহরের তালিকায় ছিল। এ থেকে ধারণা করা যায় যে, বসবাস করার ক্ষেত্রে প্যারিস আসলেও ‘অত্যন্ত ব্যয়বহুল’ শহর।
ইউরোপের অন্য শহরগুলোর তুলনায় এখানে শুধুমাত্র মদ, পরিবহন ও তামাকের দামেই ভারসাম্য লক্ষ্য করা যায়। আর বাকি সবকিছুর দামই আকাশছোঁয়া। তিনি বলেন, ইউরোপীয় শহরগুলোতে সাধারণত সবচেয়ে বেশি খরচ হয় গৃহস্থালির পণ্য, ব্যক্তিগত যত্নের পণ্য, বিনোদন এবং বিনোদন সংক্রান্ত অন্যান্য নানা পণ্য ও সেবা কিনতে গিয়ে। আর এই প্রতিটি ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় প্যারিসবাসীদের। অন্যদিকে, মুদ্রাস্ফীতি ও অস্থির মুদ্রা বাজারের ফলে এ বছর সবচেয়ে সস্তা শহরের তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা গেছে। এবারে জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় অনেক পিছিয়ে পড়েছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, তুরস্ক ও ভেনিজুয়েলার মতো দেশগুলো। ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাস, এই বছরের জরিপে সবচেয়ে সস্তা শহর হিসেবে শীর্ষস্থান পেয়েছে। এর কারণ গত বছর দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ১,০০০,০০০%। যার কারণে দেশটির সরকার বাধ্য হয়েছিল ভেনিজুয়েলায় নতুন মুদ্রা চালু করতে। ব্লুমবার্গের মতে, গত ডিসেম্বরে রাজধানী কারাকাসে এক কাপ কফির দাম মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে বেড়ে ৪০০ বোলিভারে দাঁড়ায়। ডলারের হিসাবে যা কিনা মাত্র ৬২ সেন্ট। এ ছাড়া যুদ্ধ-বিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক শহর বিশ্বের দ্বিতীয় সস্তা শহর হিসেবে স্থান পেয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মতে, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ভাঙনের কারণে বিশ্বে সস্তা শহরের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে।
বিশ্বের শীর্ষ ব্যয়বহুল শহর:
১. সিঙ্গাপুর (সিঙ্গাপুর)
১. প্যারিস (ফ্রান্স)
১. হংকং (চীন)
৪. জুরিখ (সুইজারল্যান্ড)
৫. জেনেভা (সুইজারল্যান্ড)
৫. ওসাকা (জাপান)
৭. সিউল (দক্ষিণ কোরিয়া)
৭. কোপেনহেগেন (ডেনমার্ক)
৭. নিউ ইয়র্ক (যুক্তরাষ্ট্র)
১০. তেল আবিব (ইসরাইল)
১০. লস অ্যানজেলেস (যুক্তরাষ্ট্র)
কোন শহরের জীবনযাত্রা সবচেয়ে সস্তা?
বিশ্বের সস্তা শহরের তালিকা
১. কারাকাস (ভেনিজুয়েলা)
২. দামেস্ক (সিরিয়া)
৩. তাশখন্দ (উজবেকিস্তান)
৪. আলমাটি (কাজাখিস্তান)
৫. ব্যাঙ্গালুরু (ভারত)
৬. করাচি (পাকিস্তান)
৬. লাগোস (নাইজেরিয়া)
৭. বুয়েন্স আয়ার্স (আর্জেন্টিনা)
৭. চেন্নাই (ভারত)
৮. নয়াদিল্লি (ভারত)

সিনেমা হলের আধুনিকায়ন (পর্ব-২) by কামরুজ্জামান মিলু

বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম সিনেমা। আর এই সিনেমা দেখার জন্য চাই প্রেক্ষাগৃহ বা হল। দেশে কেমন ছিল সিনেমা হলের সূচনাকাল? আর তারপর ক্রমে উন্নয়ন, আধুনিকায়নের পথ পেরিয়ে সিনেমা হলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাজানো হয়েছে ধারাবাহিক প্রতিবেদন বাংলাদেশের সিনেমা হল। লিখেছেন কামরুজ্জামান মিলু। আজ প্রকাশ হচ্ছে এর দ্বিতীয় পর্ব ‘সিনেমা হলের আধুনিকায়ন
দেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকের কাছে ডিটিএস সাউন্ড সিস্টেম সমৃদ্ধ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ সময় স্বপ্ন ছিল। তবে ধীরে ধীরে দর্শকরা বেশকিছু সিনেমা হলে পেয়েছে এমন সুযোগ সুবিধা। প্রযুক্তির পরিবর্তনের পাশাপাশি সিনেমা হলের আধুনিকায়নের কাজও হয়েছে। অবশ্য সেই সংখ্যা এখনো অনেক কম।
দেশের সিনেপ্লেক্সগুলোর পাশাপাশি হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা হলে রয়েছে ডিটিএস সাউন্ড সিস্টেম। আর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হল রয়েছে বেশকিছু। কিন্তু বেশিরভাগ জেলা শহর বা থানা পর্যায়ে সিনেমা হলে এখনো ছবি দেখার ক্ষেত্রে এমন সুবিধা দর্শকরা পাচ্ছেন না। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর কলকাতার চিত্র ব্যবসায়ী খান বাহাদুর ফজলে দোশানি ঢাকায় চলে আসেন এবং পরে একটি সিনেমা হল নির্মাণ করেন। ১৯৫৩ সালে আগা খান এই সিনেমা হলের উদ্বোধন করেন।
এটি ছিল ঢাকার প্রথম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক সিনেমা হল। প্রথমে হলটির নাম ছিল ‘লিবার্টি’। পরে তা ‘গুলিস্তান’ করা হয়। ‘গুলিস্তান’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ফুলের বাগান। ঢাকার এই সিনেমা হল শুরু থেকেই ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। দেশি ছাড়াও বিশ্বের নানা দেশের সিনেমা এখানে দেখানো হতো। একই সময়ে ঢাকার ‘নাজ’ সিনেমা হলও ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এখন সিনেমা হল দুটি আর নেই। এগুলো ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছে শপিং মল। এদিকে ঢাকার ‘স্টার’, ‘মধুমিতা’, ‘বলাকা’, ‘সনি’, ‘পূর্ণিমা’, ‘আনন্দ’, ‘মুন’, ‘অভিসার’, ‘জোনাকী’সহ বেশকিছু সিনেমা হলে দর্শকরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুবিধা পেয়েছেন হলগুলোর সূচনা সময় থেকেই। চট্টগ্রামের ‘বনানী কমপ্লেক্স’, ‘আলমাস’, যশোরের ‘মণিহার’, খুলনার ‘স্টার’ এবং রাজশাহীর ‘উপহার’ সিনেমা হলও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুবিধা নিয়ে যাত্রা শুরু করে। তবে এগুলোর মধ্যে কয়েকটি এরইমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা সুদীপ্ত কুমার দাস বলেন, একটা সময় ১২০০ এর বেশি সিনেমা হল ছিল যা এখন ১৭৪-এ নেমে এসেছে। এখন ঢাকার হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা হল রয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। দর্শকরা একটা সময় অনেক সিনেমা হলে ছবি দেখতে এসে এমন সুযোগ সুবিধা পেয়েছে। তবে ধীরে ধীরে সিনেমা ব্যবসায় ধ্বস নামার কারণে বেশিরভাগ হলেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। সারা দেশে বর্তমানে ঢাকার ‘মধুমিতা’, ‘অভিসার’, ‘বলাকা’, ‘স্টার সিনেপ্লেক্স’, ‘যমুনা ব্লকবাস্টার’, চট্টগ্রামের ‘আলমাস’ ও যশোরের ‘মণিহার’ নামে হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমা হলেই শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় দর্শক সিনেমা উপভোগ করতে পারছেন। খুলনার ‘শঙ্খ’ সিনেমা হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুবিধা থাকলেও হলটি বন্ধ হয়ে গেছে। ঢাকার আধুনিক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হলের মধ্যে অন্যতম রাজধানীর মধুমিতা সিনেমা হল।
এটির যাত্রা শুরু ১৯৬৭ সালের ১লা ডিসেম্বর। পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই হলের উদ্বোধন করেছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পিকার বিচারপতি আবদুল জব্বার খান। ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের ৫০ বছর পূর্তি হয়েছে ২০১৭ সালে। মতিঝিল এলাকায় তিন বিঘা জায়গায় গড়ে উঠেছে এই প্রেক্ষাগৃহ। পুরোপুরি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই হলে ১ হাজার ২২১ জন দর্শক একসঙ্গে বসে ছবি দেখতে পারেন। মধুমিতা সিনেমা হলের বর্তমান কর্ণধার ইফতেখার উদ্দিন নওশাদ বলেন, দেশের অনেক সিনেমা হল যখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন আমরা আমাদের হল শুধু চালুই রাখিনি, দিনে দিনে আধুনিক করছি। আমি সব সময়ই চাই বাংলাদেশের সিনেমা যেন এগিয়ে যায়। এজন্য শুধু দেশ-বিদেশের ছবি প্রদর্শনী নয়, এ সিনেমা হলের অন্য একটি প্রতিষ্ঠান মধুমিতা মুভিজ থেকে ‘আয়না’, ‘মিস লংকা’, ‘আগুন’, ‘গুনাহ’, ‘দূরদেশ’, ‘নিশান’, ‘উৎসর্গ’সহ বেশ কিছু সুপারহিট সিনেমা নির্মাণ করা হয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এবং আধুনিক শব্দ (ম্যাগনেটিক সাউন্ড) সুবিধা নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল মধুমিতা সিনেমা হল। ১৯৯৭ সাল থেকে এ হলে ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে সিনেমা হলে বসার আসন, বাথরুম থেকে শুরু করে শব্দব্যবস্থা সবকিছুই আধুনিক। তিনি জানান, মধুমিতা কর্তৃপক্ষ কয়েকটি উন্নত মানের সিনেপ্লেক্স নির্মাণ করারও পরিকল্পনা করেছে।
সেখানে ফুডকোর্টের পাশাপাশি শিশুদের খেলার আয়োজনও রাখা হবে। সবশ্রেণির দর্শক এ সিনেপ্লেক্সগুলোতে যাতে সিনেমা দেখার অভ্যাস তৈরি করতে পারেন সে লক্ষ্যে আরো নানা আধুনিকায়ন করা হবে এখানে। সিনেমা হলে ব্যবসায়িক বিপর্যয় আর না ঘটলে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের স্বপ্নটা দ্রুত পূরণ করতে চান তিনি। এদিকে দেশের অন্যান্য সিনেমা হলের মালিকরাও নিজ নিজ প্রেক্ষাগৃহের আধুনিকায়ন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা। তবে এর আগে দরকার সারা দেশের সব সিনেমা হল বন্ধ করে দেয়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা থেকে উত্তরণের পথ বের করা।

তারেক রহমানকে ফেরত দিতে বৃটেনের প্রতি আইনমন্ত্রীর অনুরোধ

যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে ঢাকায় বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল সকালে আইনমন্ত্রীর গুলশানের কার্যালয়ে এক  বৈঠকের পর সাংবাদিকদের একথা জানান তিনি। সম্প্রতি দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশে আসা বৃটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে এটিই প্রথম বৈঠক উল্লেখ করে আনিসুল বলেন, আমি উনার কাছে তারেক রহমানের ইস্যুটা তুলে ধরেছি। আমি বলেছি যে, এরকম একজন ফিউজিটিভ, যে বাংলাদেশের আদালত দ্বারা দণ্ডিত, সে লন্ডনে আছে। আমরা তাকে ফেরত চাই।
বাংলাদেশ তারেক রহমানকে কেন ফেরত চাইছে, তার দুটো কারণ বৃটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমি বলেছি , একটি হচ্ছে যে- বাংলাদেশে দণ্ডিত এরকম অপরাধী যদি বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় পায়, তাহলে আমাদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, তাতে এরকম অনেক দণ্ডিত আসামি ভেগে ওইখানে গিয়ে অ্যাসাইলাম (রাজনৈতিক আশ্রয়) নেয়ার একটা দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, আমাদের আদালত ঠুঁটো জগন্নাথ নয়।
আমাদের আদালত একটা অপরাধীকে শাস্তি দিয়েছে। এখন তার একমাত্র জায়গা হচ্ছে কারাগার।
এক প্রশ্নে তারেক রহমানের বিষয় নিয়ে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সুসম্পর্ক ক্ষুণ্ন হোক তা বৃটেন চায় না বলে জানান হাইকমিশনার ডিকসন। তিনি বলেন,  বৈঠকে এ নিয়ে আমি দুটো বিষয় বলেছি। প্রথমত, এই বৈঠকের বিষয়টি আমি লন্ডনের সঙ্গে আলোচনা করবো। দ্বিতীয়ত, তারেক রহমান লন্ডনে বসবাস করছেন, আমাদের স্বাধীন বিচার ব্যবস্থায় তার ওইখানে বসবাস করার অনেক সুযোগ রয়েছে।
‘তাছাড়া বাংলাদেশে ফেরত আসার ব্যাপারে তারেক রহমান এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেননি, যা আমাদের বিচারিক ব্যবস্থায় বিবেচিত হতে পারে। আমি মনে করি, আমাদের বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে আমরা কোনোভাবেই চাই না, এই একটিমাত্র বিষয়ে বাংলাদেশ ও বৃটেনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ন হোক।

দেশ স্বাধীন হলেও আমরা স্বাধীন নই -বিএনপির স্বাধীনতা দিবসের র‌্যালি

মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে র‌্যালি করেছে বিএনপি। বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে র‌্যালিটি হয়ে উঠে বিশাল শোডাউন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটাই কার্যত বিএনপি’র বড় ধরনের শোডাউন। র‌্যালি-পূর্ব    সমাবেশের উদ্বোধনী বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আজকে প্রায় ৪৭ বছর হয়েছে স্বাধীনতা এসেছে। আমরা স্বাধীন হয়েছি। কিন্তু এখনো কি আমরা স্বাধীন হয়েছি? আমরা এখনো স্বাধীন ও মুক্ত নই। একটা পাথর আমাদের বুকের ওপর চেপে বসেছে। আজকে আমাদের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়া হয়েছে।
আমাদের মুক্ত চিন্তা, কথা ও লেখার স্বাধীনতা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের মাধ্যমে হরণ করেছে আওয়ামী লীগ।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে মির্জা আলমগীর বলেন, আমাদের নেত্রী- যিনি তার সারাজীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন, আজকে তাকে মিথ্যা মামলায় সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কারাগারে আটক করে রাখা হয়েছে। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ। তাকে চিকিৎসা পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে না। দলমত নির্বিশেষে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আজকে আসুন- এই অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্যদিয়ে দেশে যারা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে চায় তাদের আমরা অপসারিত করি। সব দলমত নির্বিশেষ ঐক্যসৃষ্টি করি। দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করি। একই সঙ্গে গণতন্ত্রকে মুক্ত করি। আজকে এই দিনে এটাই হোক আমাদের শপথ ও অঙ্গীকার। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, আওয়ামী লীগের চেতনার মধ্যে গণতন্ত্র নেই। বিএনপি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। এটাই হচ্ছে দুই দলের মূল পার্থক্য।
মহান স্বাধীনতা দিবস ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বিএনপির র‌্যালিতে প্রাধান্য পেয়েছে দলটির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি। উদ্বোধনী বক্তব্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেমন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কথা বলেছেন, ঠিক তেমনি র‌্যালিতে অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের বহনকৃত প্লেকাডের লেখাতেও মুক্তি চাওয়া হয় খালেদা জিয়ার। র‌্যালিতে নেতাকর্মীরা কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করে গোটা এলাকা। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিএনপির র‌্যালির ব্যানারে লেখা ছিল- ‘গণতন্ত্রের মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি চাই।’ র‌্যালিতে বেশ কয়েকটি পিকআপ ভ্যানে বাজানো হয় দেশত্ববোধক গান। পাশাপাশি ভ্যানের স্থাপিত সাউন্ড সিস্টেমের মাধ্যমে কারাবন্দি খালেদা জিয়া ও নির্বাসনে থাকা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে রচিত গানও বাজানো হয়।
মহাসচিবসহ সিনিয়র নেতারা পায়ে হেঁটে র‌্যালীতে অংশ নেন। মহিলা দলের নেত্রীরা লাল-সবুজের শাড়ি ও মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতাকর্মীরা টুপি এবং গেঞ্জি পরে র‌্যালিতে অংশ নেন। ছাত্রদলের মিছিলটির সামনের সারিতে সবার আগে একজন বহন করেন জাতীয় পতাকা। ছাত্রদলের নারী নেত্রীরা ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী মুক্তি পায়, গণতন্ত্রের মা’র মুক্তি পাই না’ শীর্ষক একটি প্লেকার্ড বহন করেন। এর আগে র‌্যালীকে কেন্দ্র করে দুপুর একটা থেকেই নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাকর্মীরা জড়ো হতে থাকেন। এক পর্যায়ে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিকাল সোয়া ৩টার দিকে নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে থেকে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ‘স্বাধীনতা র‌্যালি’ শুরু করেন বিএনপি মহাসচিব।
র‌্যালীতে অন্যদের মধ্যে- বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, ক্রীড়া সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক আমিনুল হক, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, শ্রমিক দল সভাপতি আনোয়ার হোসেন, অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ,যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার আবু আশফাক, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান, জাসাস সাধারণ সম্পাদক অভিনেতা হেলাল খান, মহিলা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরিন খানসহ বিএনপির কেন্দ্রীয়-মহানগর শাখা ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, মৎসজীবী দল, শ্রমিক দল, তাঁতী দল, ওলামা দল, জাসাস, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ড্যাব, ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর হাজার হাজার নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
স্বাধীনতা র‌্যালীতে অংশ নেয়া নেতাকর্মীদের হাতে ছিল ব্যানার, ফেসটুন, ধানের শীষের রেপ্লিকা, দলীয় ও জাতীয় পতাকা, বাদ্যযন্ত্র, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত পোস্টার। র‌্যালিটি কাকরাইল-শান্তিনগর-মালিবাগ মোড় হয়ে বিকেল ৪টায় বিএনপির কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। র‌্যালীকে কেন্দ্র করে নয়াপল্টন, কাকরাইল এলাকায় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যসহ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ছিল। যে কোন অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে র‌্যালীর সামনে ও পিছনে পুলিশ সদস্যরা ছিলেন সতর্ক অবস্থানে।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত

ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি বলে আগে যে মন্তব্য করেছে সেই অবস্থানেই অটল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এমনটা জানিয়েছেন মুখপাত্র রবার্ট প্যালাদিনো। তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এতে আমরা বলেছি, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত (জাতীয় সংসদ) নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। এতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তবে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সহযোগিতার যে দীর্ঘ ইতিহাস আছে তার প্রতি সম্মান দেখিয়ে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাবে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ব্যাপক প্রশংসা করেন।
এখানে প্রশ্নোত্তর আকারে ব্রিফিংয়ের বাংলাদেশ অংশটি তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: সম্প্রতি প্রকাশিত মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এটা সুস্পষ্ট, বিরোধী দল এই নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করেছে।
তাই আমি বিস্মিত। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও ভোটের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্র কি কি পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো, নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য হয় নি?
উত্তর:  আমি শুধু বলবো যে, আপনি যেমনটা সঠিকভাবে তুলে ধরেছেনÑ  সম্প্রতি আমরা মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশ করেছি। আমরা বলেছি যে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু ছিল না। এতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে আছে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা। বিরোধী দলীয় পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভীতিপ্রদর্শন। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে রয়েছে সহযোগিতা, সহনশীলতার দৃষ্টিভঙ্গির দীর্ঘ একটি ইতিহাস।  আছে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ-  যা তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করে, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান দেখায় এবং তার শাসন কাঠামো ও প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতি করতে চায়। বাংলাদেশে রয়েছে চিত্তাকর্ষক অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নজরকাড়া রেকর্ড। আছে গণতন্ত্র, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা। প্রতিযোগিতার লক্ষ্য নয় এসব। এতে আসলে অর্থনৈতিক উন্নতি শক্তিশালী হবে। তাই পারস্পরিক এসব লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে ক্ষমতাসীন সরকার ও বিরোধীদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে কাজ করে যেতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টি আমি এখানেই ছেড়ে দিতে চাই।

দেশের উন্নয়নে জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে বাকশাল গঠন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু -প্রধানমন্ত্রী



প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য বঙ্গবন্ধু জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ কৃষক, শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করে একটি প্লাটফরম করেন। যেটাকে অনেকে বাকশাল হিসেবে বলে। বাকশাল ছিল বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক আওয়ামী লীগসহ দেশের সব স্তরের মানুষের। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের। সবাইকে এক প্ল্যাটফরমে নিয়ে আসা হয়। তিনি বলেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দল, আমাদের সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ বাহিনী থেকে শুরু করে সকল প্রতিষ্ঠান, প্রশাসনের সব কর্মকর্তা সবাইকে একটি প্ল্যাটফরমে নিয়ে দেশের আর্থ-সামাজিক কাজে তাদেরকে সম্পৃক্ত করে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য এই জাতীয় ঐক্য তিনি গড়ে তোলেন। গতকাল মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেন, এই আওয়ামী লীগ জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন। মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে, স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছে, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছে। এই আওয়ামী লীগকে শেষ করে দেয়ার জন্য চেষ্টা করেছে আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া। কিন্তু পারেনি। কারণ আওয়ামী লীগের শেকড় জনগণের কাছে প্রোথিত, বাংলার মানুষের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শেকড় এমনভাবে প্রোথিত, এত চেষ্টায়ও এই সংগঠনকে শেষ করতে পারেনি। এটা দ্বারা প্রমাণিত হয়, যারা প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করে, তাদের শেষ করা যায় না। আর যারা উচ্ছিষ্ট ছিটিয়ে ক্ষমতা দখল করে, তাদের গোড়ায় কিছু থাকে না, সেজন্য ক্ষমতা ছাড়া তাদের অস্তিত্বই থাকে না। এটা এখন প্রমাণিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু ধাপে ধাপে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাঙালিকে স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। তার নেতৃত্ব-নির্দেশনায় বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর পর বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে মনোনিবেশ করেছিলেন, কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট তাকে নির্মমভাবে হত্যার মধ্যদিয়ে পরাজিত শক্তি বাঙালি জাতিকে নিঃশেষ করে ফেলার চেষ্টা চালায়। এরপর ভাষা আন্দোলনের সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান, তা মুছে ফেলা হয়েছিল, স্বাধীনতাযুদ্ধে তার নেতৃত্ব মুছে ফেলার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু পারেনি। ২১ বছর তারা সরাসরি বা সরাসরি নয়, এভাবে ক্ষমতায় ছিল। তখন দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া হয়। তোষামোদি, খোশামোদি, চাটুকারের দল সৃষ্টি করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। জনগণ তখন সত্যিকারের স্বাধীনতার সুফল ভোগ করে। আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য কাজ করেছে বলে দেশ এখন অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের অর্থ দিয়ে তারা মরুভূমিতে ফুল ফুটিয়েছিল, আর আমাদের মরুভূমিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। এর বিরুদ্ধেই ছিল বঙ্গবন্ধুর সংগ্রাম। এসময় তিনি বলেন, আমাদের পাট-চা থেকে শুরু করে বিভিন্ন অর্থকরী ফসল বিদেশে রফতানি করে সব অর্থ নিয়ে যেত পাকিস্তানিরা। তাদের ওখানে তিন বার রাজধানী পরিবর্তন হয়।
যতবার রাজধানী পরিবর্তন হয়েছে, ততবার অনেক টাকার প্রয়োজন হয়েছে। সব টাকা দিতে হয়েছে আমাদের। আর উন্নতি হয়েছে ওখানে। বাঙালিরা পাকিস্তানিদের চেয়ে এগিয়ে ছিল জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের চিন্তা-চেতনা, খাদ্যাভ্যাস কোনো কিছুতেই পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের কোনো মিল নেই। শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতি সবদিক থেকে আমরা উন্নত ছিলাম। সংখ্যা গরিষ্ঠের ওপর সংখ্যা লঘিষ্ঠের বৈষম্য-শোষণ-নির্যাতনের সময় ছিল সেটি। এমনকি দেশভাগ (১৯৪৭ সালে)-এর পর ভারতের হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে বাঙালিরাই এগিয়ে গিয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভারতের হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা বাঙালিরাই করেছে। পাকিস্তানের উঁচু-লম্বা সৈন্যরা কিন্তু এগিয়ে যায়নি, বাঙালি রেজিমেন্টই এগিয়ে গিয়েছিল। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে বাঙালি ছাড়া রক্ষা হতো না।
এরপর ১৯৬৬ সালে জাতির পিতা ছয় দফা দিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের ভূমিকার প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, দুই মাস পরপর আমাদের ঋতু বদলায়, সবই বদলায়। যার ফলে আমরা খুব বিস্মৃত পরায়ণ। নাহলে যে পাকিস্তানিরা বাঙালিকে অত্যাচার করেছে, স্বাধীনতার সময় কীভাবে একটা অংশ সেই পাকিস্তানিদের পক্ষে কাজ করলো। স্বাধীনতার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চ থেকে বাঙালি স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় ১৬ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ৯৬ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। এরপর বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর মিত্র বাহিনীকেও দেশে ফেরত পাঠান। এটা সম্ভব হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন স্বাধীনচেতা নেতা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মতো একজন নেতার কারণে। বিশ্বের কোনো দেশে মিত্রবাহিনী যুদ্ধের পর ফেরত যায়নি, শুধু বাংলাদেশেই এটা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ উত্তরোত্তর এগিয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এগিয়ে যাবো। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলব। এ দেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করব। এ দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলব। তিনি বলেন, এসব করতে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতাকর্মীকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। উন্নয়নের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলব।
সভায় দলের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য আমির হোসেন আমু, প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মোহাম্মদ নাসিম, রমেশ চন্দ্র সেন, কর্নেল (অব.) মুহম্মদ ফারুক খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজবাহ উদ্দিন সিরাজ, মহানগর আওয়ামী লীগের (উত্তর) সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ, (দক্ষিণ) সভাপতি আবুল হাসনাত, সাবেক ছাত্রনেতা আমিরুল আলম মিলন, আওয়ামী লীগ নির্বাহী কমিটির সদস্য এসএম কামাল হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করেন অধ্যাপক মেরিনা জাহান কবিতা। আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং সহ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম সভা পরিচালনা করেন।

কি ঘটছে আজ হাউস অব কমন্সে!

ব্রেক্সিট ইস্যুতে সরকারের কাছ থেকে আজ বৃটিশ পার্লামেন্টের নিন্মকক্ষ হাউস অব কমন্সের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছেন এমপিরা। সেখানে ধারাবাহিকভাবে কয়েক দফা ভোট হবে। এর মধ্য দিয়ে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়ার গতিপথ বেরিয়ে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একে বলা হচ্ছে ব্রেক্সিটের বিকল্প উপায়। আর ইংরেজিতে বলা হচ্ছে, ইন্ডিকেটিভ ভোট। এমপিরা সিদ্ধান্ত নেবেন বৃটেন নরওয়ের মতো অথবা একটি স্থায়ী কাস্টমস ইউনিয়ন চুক্তি করবে নাকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেই থেকে যাবে। প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র ক্ষমতাসীন কনজার্ভেটিভ দলের সাবেক মন্ত্রী স্যার অলিভার লেটউইন একটি প্রস্তাব এনেছিলেন এ সংক্রান্ত। তার প্রতি ভোট দিয়ে সমর্থন জানিয়েছেন এমপিরা।
সেই হিসেবে এখন পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ কার্যত এমপিদের হাতেই চলে গেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন স্কাই নিউজ।
কেন এই ইন্ডিকেটিভ ভোট?
বর্তমানে ওয়েস্টমিনস্টারে একরকম অচলাবস্থা বিরাজ করছে। প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ব্রেক্সিট নিয়ে যে চুক্তি করেছেন তা অনুমোদন দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে হাউস অব কমন্স। এ অবস্থায় ভিন্ন কোনো পথ অবলম্বন করা হবে কিনা সে বিষয়ে পার্লামেন্টকে ক্ষমতা দেয়ার দাবি জানাচ্ছিলেন কিছু এমপি। তাদের সেই আহ্বানে সাড়া পড়েছে।
কিভাবে এমন অবস্থানে এলো বৃটেন?
সোমবার রাতে ক্ষমতাসীন দলের কমপক্ষে ২৯ জন শক্তিধর বিদ্রোহী নেতার কারণে স্যার অলিভার লেটউইনের প্রস্তাবে সরকার হেরে যায়। লেটউইনের প্রস্তাবকে সমর্থন করেন হাউস অব কমন্সের সংখ্যাধিক্য এমপি। এর অর্থ হলো, বুধবার হাউস অব কমন্সে সরকারের কর্মকা- এই বিকল্প প্রস্তাবের ভোটের কারণে একপেশে হয়ে থাকবে। অর্থাৎ হাউস অব কমন্স থাকবে ব্রেক্সিটের বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে ব্যস্ত। এ সময়ে সেখানে যথারীতি যেভাবে স্বাভাবিক কর্মকা- পরিচালিত হয় তা হবে না। হাউস অব কমন্সে সরকারি কর্মকান্ডে এমন স্থগিত অবস্থাকে ১৯৪২ সালের পর থেকে সরকার ও পার্লামেন্টের মধ্যকার সম্পর্কের সবচেয়ে মৌলিক পটপরিবর্তনের অন্যতম বলে আখ্যায়িত করেছেন শিক্ষাবিদরা।
এমপিরা কিসের ওপর ভোট দেবেন?
হাউস অব কমন্সে ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া সম্পাদন নিয়ে এমপিরা বিভিন্ন রকম উপায় নিয়ে প্রস্তাব জমা দিয়েছেন মঙ্গলবার দিনের শেষ ভাগ পর্যন্ত। এর পরে আর এমন কোনো প্রস্তাব দেয়ার সুযোগ নেই। যেসব প্রস্তাব বা মোশন জমা পড়েছে তার মধ্যে রয়েছে-
বৃটেন-ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটি স্থায়ী কাস্টমস ইউনিয়ন।
নরওয়ের মতো ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা।
প্রধানমন্ত্রীর ব্রেক্সিট চুক্তির পরিবর্তে সেখানে বিকল্প আয়োজন করা।
বিরোধী দল লেবারদের বিকল্প ব্রেক্সিট পরিকল্পনা।
কোনো চুক্তি ছাড়া ব্রেক্সিট সম্পাদন।
ব্রেক্সিট চুক্তির বিষয়ে একটি নিশ্চয়তামূলক গণভোট।
লিসবন চুক্তির ৫০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা সংক্রান্ত নোটিফিকেশন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বৃটেনের বেরিয়ে যাওয়া বাতিল করণ।
কিভাবে এটা কাজ করবে?
বুধবার স্থানীয় সময় বিকাল ৩টার দিকে হাউস অব কমন্সের স্পিকার জন বারকাউয়ের ঘোষণা করার কথা রয়েছে যে, বিতর্ক ও ভোটে দেয়ার জন্য তিনি ব্রেক্সিট পরিকল্পনা নিয়ে কোন কোন প্রস্তাব বাছাই করেছেন। এরপর ওই প্রস্তাবগুলো নিয়ে সন্ধ্যা ৭টা নাগাদ বিতর্ক হওয়ার কথা। এতে বিভিন্ন রকম প্রস্তাবের ওপর ভোট দিতে এমপিদের আধা ঘন্টা সময় দেয়া হবে। এমপিদের প্রত্যেকজনকে একটি করে কাগজ দেয়া হবে। তাতে প্রতিটি প্রস্তাবের বিপরীতে ইংরেজিতে ‘আইই’ অথবা ‘নোই’ লিখতে বলা হবে। এভাবে ভোট নেয়ার পর হাউস অব কমন্সের কর্মকর্তারা ভোট গণনা করবেন। এতে এক ঘন্টা সময় লাগার কথা। গণনা শেষ হয়ে গেলেই রাত সাড়ে আটটার পরে ফল ঘোষণা হতে পারে। ব্রেক্সিট প্রস্তাবনা নিয়ে যেসব প্রস্তাব জমা পড়েছে তার পক্ষে বা বিপক্ষে কি পরিমাণ ভোট পড়েছে তা পড়ে শোনানোর কথা স্পিকারের।
এই ফলের অর্থ কি?
আইনগত দিক দিয়ে এই ভোটের কোনো অর্থই নেই। এই ভোটের ফল মেনে চলতেও বাধ্য নয় সরকার। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে এমপিদের বলে দিয়েছেন, সরকারকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে তিনি দেবেন না। যদি তা হাউস অব কমন্সে নির্দেশনামূলক ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়ও। যেসব প্রস্তাব এরই মধ্যে এসেছে তার কিছু ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সমঝোতার যোগ্য নয় বলে সতর্ক করেছেন তেরেসা মে। তবে ব্রেক্সিট নিয়ে নতুন এসব প্রস্তাবনার পক্ষে যদি বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসে হাউস অব কমন্সে, তাহলে তা রাজনৈতিকভাবে এড়িয়ে চলা তার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।

ক্ষতির মুখে পড়বেন বাংলাদেশের ইউটিউবাররা?

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বিতর্কিত কপিরাইট আইন পাসের পক্ষে ভোট দিয়েছে; সমালোচকরা বলছেন এই আইন ইন্টারনেট ব্যবহারের ধারা সম্পূর্ণ পাল্টে দিতে পারে।
নতুন নীতিমালায় (বিতর্কিত অনুচ্ছেদ ১৩ সহ) অনুমতি ছাড়া কপিরাইট আইন ভঙ্গ করে কোনো কিছু ইন্টারনেটে প্রকাশ করা হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তার দায়ভার নেবে।
তবে মিম এবং জিআইএফ শেয়ার করা এই নতুন আইনের অন্তর্ভূক্ত হবে না।
অনেক সঙ্গীতশিল্পী, চিত্র ও কারুশিল্পী মনে করেন এই নিয়ম বাস্তবায়ন হলে শিল্পীদের আর্থিক মূল্যায়ণ সঠিকভাবে হবে - কিন্তু অন্য অনেকেই মনে করে এর ফলে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের তৈরি করা কাজ, যেগুলোকে ইউজার-জেনারেটেড কন্টেন্ট বলা হয়, ধ্বংসের মুখে পড়বে।
কপিরাইট হলো একজন ব্যক্তির আইনি অধিকার, যা ঐ ব্যক্তির তৈরি করা কোনো কাজ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হবে তার সুরক্ষা নিশ্চিত করে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, বর্তমান আইনের অধীনে শিল্পীদের ন্যায্য সম্মানীই দেয়া হচ্ছে।
গুগল বলেছে, এই আইন 'ইউরোপের ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত' করবে।
এই বিতর্কিত আইনটি পাস করার পক্ষে ভোট দিয়েছেন ইউরোপিয়ান সংসদের ৩৪৮ জন সাংসদ, আর এর বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন ২৭৮ জন।
বিতর্ক তৈরি হচ্ছে কী নিয়ে?
আইনের যে দু'টি ধারা নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, সেগুলো অনুচ্ছেদ ১১ ও অনুচ্ছেদ ১৩ হিসেবে পরিচিত।
অনুচ্ছেদ ১১ অনুযায়ী, যে কোনো নিউজ ওয়েবসাইটের লিঙ্ক ব্যবহার করতে সার্চ ইঞ্জিন এবং নিউজ অ্যাগ্রিগেট প্ল্যাটফর্মগুলোকে অর্থ দিতে হবে।
অনুচ্ছেদ ১৩ অনুযায়ী, কপিরাইট লাইসেন্স ছাড়া যে কোনো কিছু পোস্ট করলে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়বদ্ধ করা হবে। কপিরাইট করা কাজ ব্যবহার করার ক্ষেত্রেও আরোপিত হবে কড়াকড়ি। এরই মধ্যে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কপিরাইট সহ পোস্ট করা গান এবং ভিডিও সরিয়ে নিয়েছে। বাংলাদেশের ইউটিউবাররা ক্ষতির মুখে পড়বেন?
নতুন এই নীতিমালা বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি করলেও তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জাকারিয়া স্বপন মনে করেন এটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
বিবিসি বাংলাকে মি. স্বপন বলেন, "আমি মনে করি এতদিন ইন্টারনেটে যতগুলো ভালো কাজ হয়েছে এটি তার মধ্যে একটি।"
মি. স্বপন বলেন, "আমরা অনেক সময়ই আরেকজনের তৈরি করা গান বা ভিডিও শেয়ার না করে ডাউনলোড করে আপলোড করে দেই। এই আইন বলবৎ করা হলে সেই অরাজকতা থামবে এবং একইসাথে সৃজনশীল কাজ করা শিল্পীরা এই আইনের মাধ্যমে তাদের মেধাস্বত্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবেন।"
তবে যেই ওয়েবসাইটগুলো ৩ বছরের মধ্যে তৈরি করা হয়েছে, যাদের বার্ষিক আয় ১০ মিলিয়ন ইউরোর নিচে এবং মাসিক ৫ মিলিয়ন বা ৫০ লাখ নতুন ব্যবহারকারী নেই - সেসব ওয়েবসাইট এই আইনের আওতাধীন হবে না বলে জানান মি. স্বপন।
কিন্তু এই আইন কার্যকর করার মাধ্যমে ইন্টারনেট ভিত্তিক মুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ্য কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
"এই আইনের সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছে গুগল এবং ইউটিউব। কারণ তারাই পৃথিবীতে ওপেন ইন্টারনেটের নামে কপিরাইট আইন লঙ্ঘন করছে - যেটি তাদের ব্যবসার মডেলের মধ্যেই পড়ে।"
মি. স্বপন বলেন, "এখানে বলে রাখা ভাল যে উইকিপিডিয়াকে এই আইনের আওতায় রাখা হয়নি।"
এই আইনের সবচেয়ে বেশি বিরোধিতা করছে ইউটিউব। মি. স্বপন মনে করেন নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থেই এই আইনের বিরোধিতা করছে তারা।
"যে ব্যক্তি নিজে কিছু তৈরি করছে, তার কন্টেন্ট তো বাধা দেয়া হচ্ছে না।
যারা ঐ একই কন্টেন্ট নিয়ে আবারো পোস্ট করছে তাদের বাধা দেয়ার জন্য এই আইন।"
তবে এই আইন কার্যকর হলে বাংলাদেশের অনেকেই ইউটিউব চ্যানেলে কন্টেন্ট তৈরি করে আয় করার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়বেন বলে মনে করেন মি. স্বপন।
"বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে এমন অনেক ইউটিউব চ্যানেল আছে যেখানে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির কন্টেন্টকে সামান্য পরিবর্তন করে আবারো আপলোড দেয়া হয় এবং সেসব ভিডিও থেকে অনেকেই অর্থ উপার্জনও করছেন।"
"নতুন আইন বলবৎ হলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তখন অরিজিনাল ভিডিওই শেয়ার করতে হবে।"
বাংলাদেশের মত যেসব দেশ সদ্যই ডিজিটাল পথে হাঁটতে শুরু করেছে সেসব দেশে এই আইনের প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করেন মি. স্বপন।
"যেহেতু আমাদের নিজেদের কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই এবং আমরা বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর নির্ভরশীল, তাই আমাদের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের বিশাল একটা অংশ কপিরাইট করা কন্টেন্টের ওপরই নির্ভরশীল।"
এই ব্যবহারকারীদের এখন নতুন নীতিমালার অধীনে আসতে হবে এবং কপিরাইট সংক্রান্ত আইনকে সম্মান করে চৌর্যবৃত্তির প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হবে বলে মন্তব্য করেন মি. স্বপন।
সূত্রঃ বিবিসি