Sunday, July 12, 2015

পদদলিত, খানাখন্দ, উচ্চমূল্য এবং ঈদ by শাহদীন মালিক

যানজট সারা শহরে, বিশেষ করে গত কুড়ি বছরের প্রতিটি বছরের এই সময়ে শান্তিনগর, মগবাজার, মালিবাগে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। ফিরিস্তিতে অবশ্যই যোগ হবে ট্রেন আর দূরপাল্লার বাসের টিকিটের জন্য সংগ্রাম, টিকিট না পাওয়ার আহাজারি অথবা কালোবাজারির দৌরাত্ম্য। ভেজাল খাবার নিয়ে প্রতিনিয়তই প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় রিপোর্ট। আর এবার ঈদের বাজারে বাড়তি পাওনা মন্ত্রীর পদ হারানোর প্রথমে গুঞ্জন, পরে সত্যতা আর তারপর অদ্ভুত সব ‘কারণ দর্শানো’।
মন্ত্রী-মিনিস্টার দিয়েই শুরু করি। সব ঈদে এই পর্বটি তো থাকে না, তাই এবার বাড়তি পাওনা। ‘স্যার, শুনেছেন। আজ রাতে আসতেই হবে।’ শেষে বিকেলে এক টিভি চ্যানেল থেকে ফোন। না, কোনো কিছু তো শুনিনি। ‘সৈয়দ আশরাফ সাহেবের মন্ত্রিত্ব গেছে’। টক শোটা জমবে, তাই পীড়াপীড়িতে রাজি হলাম। একটু পরে অবশ্য সহকর্মীর মাধ্যমে অনলাইন বার্তা সংস্থার বরাতে জানলাম, খবর পাক্কা না, রাতে টক শো হলো ‘গমের মায়া আর মায়ার গম’ গোছের শিরোনামে। ১০ জুলাইয়ের প্রথম আলোর প্রধান শিরোনাম ছিল ‘গুঞ্জনই সত্য হলো’। পত্রিকা বলছে, আরও কিছু বিতর্কিত মন্ত্রী পদ হারাতে পারেন। দেখা যাক।
ময়মনসিংহ জেলা শহরের একটি ফ্যাক্টরি থেকে জাকাতের
কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু
সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মন্ত্রণালয় হারানোর পর দলের শীর্ষ নেতাদের উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলেছে, এতে তিনি নাকি দলকে আরও সময় দিতে পারবেন। মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের কাজে নাকি তিনি যথেষ্ট সময় দিতে পারেননি।
এটা বুঝতে পাঁচ বছর লাগল! পাঁচ বছর এ জন্য যে তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কোথায়, কোন কােজ কী সময় দিতে পারবেন তা বুঝতে বুঝতে এক বা দেড় বছর পেরিয়ে যেতে পারে। তারপরও আরও পাঁচ বছর?
অবশ্য বিষয়টা যখন ‘পদ’, তখন ছোটখাটো সাধারণ বিষয় বুঝতে অনেক কসরত লাগে। সারা দেশের পর ঢাকা মহানগর নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা মহানগরের দলীয় নেতা অর্থাৎ মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ারও মন্ত্রিত্বের কারণে তাঁর দলীয় দায়িত্ব পালনে অসুবিধা বা সময়ের টানাপোড়েনে পড়ার কথা। ‘আশরাফ লজিক’ কি এখানে প্রযোজ্য হবে? উদাহরণ যখন টানছি, তখন খোদ প্রধানমন্ত্রী? প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়াও তাঁকে সামাল দিতে হয় অন্তত আধা ডজন মন্ত্রণালয়। এত কিছু করে দলীয় সভাপতির দায়িত্ব সুচারু রূপে পালন করা কষ্টসাধ্য। অবশ্য সামান্য মন্ত্রীর ব্যাপারে যেটা প্রযোজ্য, সেটা খোদ প্রধানমন্ত্রীর বেলায় প্রযোজ্য না হওয়াই স্বাভাবিক। মোদ্দা কথা ‘আশরাফ লজিক’ বা দলের জন্য মন্ত্রিত্ব ছাড়া খুব জুতসই ঠেকছে না, শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। রাখঢাক করলে দলের জন্য ভালো হয় না।
ময়মনসিংহের নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরিতে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে
পদদলিত হয়ে শিশু ও নারীসহ অন্তত ২৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু
আপিল বিভাগের রায়ের পর মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া নিঃসন্দেহে সাংসদ থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েছেন। সংবিধানের কোনো কিছু লঙ্ঘন করলে কী শাস্তি বা পরিণতি হবে সেটা কোথাও বলা নেই, দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া। প্রথম ব্যতিক্রম, যেটা ১৯৭২-এর সংবিধানে ছিল এবং এখনো আছে, তা হলো কেউ সংসদ সদস্য না হয়েও সংসদ অধিবেশনে যোগদান করেন তাহলে ওইরূপ বেআইনিভাবে সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত হওয়ার জন্য প্রতিদিন জরিমানা হবে এক হাজার টাকা। মায়া সাহেব বিচারিক আদালতের রায়ে বর্তমানে একজন দোষী সাব্যস্ত হওয়া ১৩ বছরের কারাবাসের সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী। সত্য, রায়ের বিরুদ্ধে তাঁর আপিল বিচারাধীন। আপিল বিচারাধীন থাকলে যদি সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকে তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি মামলার ব্যাপারে কোনো বিএনপি নেতা-কর্মীর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। দোষী সাব্যস্ত হয়ে তাঁদের যদি সাজাও হয় তাঁরা সবাই আপিল দায়ের করে আপিল বিচারাধীন আছে এই যুক্তিতে আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। তখন সেটা হবে ‘মায়া লজিক’।
যে যেই পদের যোগ্য, সে সহজেই বিতর্ক এড়াতে বা বৃহত্তর স্বার্থে (যেমন: দলের ভাবমূর্তি, সহকর্মীদের মান-সম্মান, দেশ-গণতন্ত্র ইত্যাদি) পদত্যাগ করতে পারে। অধমের ধারণা, যারা পদ পাওয়ার যোগ্য নয়, তারা কোনোমতে একবার পদ পেলে যেকোনো মূল্যে তা ধরে রাখতে চেষ্টা করে। সরকার, দল, দেশ, গণতন্ত্র—সবকিছু ক্ষতিগ্রস্ত হোক, আমার পদে থাকা চাই-ই চাই। আরও একটা সমস্যা আছে। বিদেশে যে মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন তাঁদের পুরোনো পেশায় বা কাজে বা ব্যবসায় যোগ দিতে অসুবিধা হয় না অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায়। আমাদের বেশির ভাগ মন্ত্রীর এই ‘অপশন’টা নেই, তাই পদত্যাগের প্রশ্নই আসে না!
---২---
কয়েক দিন ধরে ‘নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ’ ‘মধ্যম আয়ের দেশ’ চিল্লাচিল্লিতে কান ঝালাপালা। সংবিৎ ফিরে পেলাম বিবিসি টেলিভিশনের ‘স্ক্রলে’ বাংলাদেশে পদদলিত হয়ে ২৭ জন মারা যাওয়ার শিরোনামে। সাততাড়াতাড়ি দেশি চ্যানেল ধরলাম।
আজকের (১১ জুলাই) পত্রিকায় খবর দেখলাম, পুলিশ বলছে জাকাতের শাড়ি, লুঙ্গি দিতে হলে আগেভাগে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে খবর দেওয়া উত্তম।
চাকরির জন্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত নিরীহ চাকরিপ্রার্থীর সলিলসমাধি হয়েছে। অধমের আদি নিবাস সিলেট অঞ্চল থেকে গত শতাব্দীর প্রথম ভাগে অর্থাৎ প্রায় এক শ বছর আগে থেকে কলকাতা হয়ে জাহাজে চড়ে বহু লোক বিলাতে গিয়েছিল চাকরির খোঁজে। এ ধরনের পরিণতি কারও হয়েছে বলে শুনিনি।
১৯৭১-এর পর গণকবরে শায়িত হলো বাঙালি, চাকরির খোঁজে যাওয়ার পরিণতি হিসেবে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রীর মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ব্যাপারে গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট (জিটুজি) নীতির পরিণামে গত তিন বছরে বৈধপথে মালয়েশিয়া যেতে পেরেছে মাত্র হাজার ১১, যেখানে যেতে পারত হয়তো লাখ তিনেক। তিন বছর ধরে গোঁ ধরে ছিলেন সরকার ম্যান পাওয়ারের ব্যবসা করবে। পরিণাম আমরা সবাই দেখলাম। দায়ী মন্ত্রীর উন্নতি হলো।
যেভাবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার কারণেই হয়তো—সঠিক কারণ জানা নেই—আজকাল ঢাকার সবচেয়ে দামি হোটেলগুলোর সবচেয়ে দামি রেস্তোরাঁয় ইফতার-ডিনার খেতে লাগে জনপ্রতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। অত্যন্ত অভিজাত সালোয়ার-কামিজের দোকানে সর্বনিম্ন মূল্য ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আর ঈদ উপলক্ষে পাঁচ-সাত দিনের ঈদ টুরে গৃহকর্মী, আয়াকে নিয়ে যাচ্ছেন বিমানে নানা রকমের আয়েশের টিকিট কেটে। সুইস ব্যাংকে ডলার, কানাডা-মালয়েশিয়ায় বাড়ি তো আছেই।
জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করার আগে পাঠক অবশ্যই পুলিশকে খবর দেবেন। জেলা প্রশাসনকেও বলতে ভুলবেন না।
বলা তো যায় না দেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। রাজনীতিবিদ, তাঁদের চাঁদাবাজ-টেন্ডারবাজ দোসর, আমলা-সরকারি কর্মকর্তা (আজকাল কর্মচারীরাও পিছিয়ে পড়তে নারাজ) আর ভেজালি ব্যবসায়ীদের জন্য এটা মারহাবা-মারহাবা করার দেশ।
পাঁচ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। তিন বেলা খেতে পায় না অন্তত দেড় কোটি মানুষ।
আর আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের উল্লাস করছি সামান্য একটা শাড়ির জন্য পদদলিত হয়ে পিষ্ট লাশের ওপর দাঁড়িয়ে।
ড. শাহদীন মালিক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।

দক্ষিণ আফ্রিকাও আর বাধা নয়

সৌম্য–মাহমুদউল্লাহর অসাধারণ জুটিতে স্মরণীয়
এক জয় পেল বাংলাদেশ। ছবি: শামসুল হক
৩ হাজার ১৮ দিনের অপেক্ষা! ৮ বছর, ৩ মাস, ৫ দিন! গায়ানার পর মিরপুর! অবশেষে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বহুল আকাঙ্ক্ষিত জয়। ২০০৭ বিশ্বকাপের সেই বহুল আলোচিত ম্যাচের পর আবারও প্রোটিয়াদের হারাল বাংলাদেশ।
প্রথম ম্যাচে ১৬০ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। গত বিশ্বকাপ থেকেই বিস্ময় উপহার দিয়ে চলা মাশরাফির দল হঠাৎ​ই যেন ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিল। টানা চারটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে হার! চারদিকে সমালোচনা আর সংশয়। সবকিছুর পাল্টা জবাব দিল বাংলাদেশ। প্রথমে প্রোটিয়াদের ১৬২ রানে অলআউট করে প্রথম ম্যাচের অর্ধেকটা জবাব দেওয়া হলো। এরপর ১৩৪ বল আর ৭ উইকেট হাতে রেখে জয়। ৮ উইকেটে জেতার পাল্টা জবাবটা সমানে সমানে দেওয়া যেত। কিন্তু জয় থেকে মাত্র ৪ রান দূরে থাকতে আউট হয়ে গেলেন মাহমুদউল্লাহ।
অবশ্য আউট হওয়ার আগে যা কাজ করার করে গেছেন। ২৪ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ফেলার ধাক্কা বাংলাদেশ সামলে উঠেছে সৌম্য-মাহমুদউল্লাহর ১৩৫ রানের রেকর্ড জুটিতে। ফিফটি করেই আউট হয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। সৌম্য অপরাজিত ছিলেন ৮৮ রানে। ছক্কা মেরে তিনিই জয়ের বন্দরে ভিড়িয়েছেন দলকে। এই জয়ে শুধু সিরিজেই ঘুরে দাঁড়াল না, বাংলাদেশ নিশ্চিত করে ফেলল চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অংশগ্রহণও।
এর আগে দুর্দান্ত বোলিংয়ে ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ের তিন নম্বর দলকে মামুলি এক দল বানিয়ে ফেলেছিল বাংলাদেশ। মুস্তাফিজ-নাসিরের দুর্দান্ত বোলিংয়ে মাত্র ১০০ রানে হারিয়ে ফেলেছিল ৬ উইকেট। গত দশ বছরে এর আগে তাদের স্কোরবোর্ডের এমন ছন্নছাড়া দশা হয়েছিল ১৩ বার। ১০০ কিংবা এর নিচে প্রথম ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলার সেই তালিকায় একবার দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশও। ২০০৭ বিশ্বকাপে গায়ানার সেই বিখ্যাত ম্যাচে। সেবার ৮৭ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলা দক্ষিণ আফ্রিকা অলআউট হয়েছিল ১৮৪ রানে। আজ গুটিয়ে গেল আরও ২২ রান কম করেই। প্রথমে ব্যাট করে এর আগে এর চেয়ে কম রানে মাত্র ১১ বার অলআউট হয়েছিল তারা।
দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছেন সৌম্য। ৭৯ বলে ১৩টি চার ও এক ছক্কায় অপরাজিত ৮৮। ৫৮ রানই এসেছে বাউন্ডারিতে। অসাধারণ সঙ্গ দিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ। ৬৪ বলে ৫০, ছয়টি চার।
সিরিজে এখন ১-১। লড়াইয়েও সমতা। বাংলাদেশ শেষ ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে তাদের ‘লাকি ভেন্যু’ চট্টগ্রামে। আগামী বুধবার জিতলে পাকিস্তান, ভারতের পর আরেক পরাশক্তিকে সিরিজে হারাবে বাংলাদেশ।

জাকাতদাতাসহ গ্রেপ্তার আটজন তিন দিনের রিমান্ডে

ময়মনসিংহে পদদলনে ২৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার আটজনকেই তিন দিন করে পুলিশ রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। জেলার দুই নম্বর আমলী আদালতের বিচারক আহসান হাবীব আজ রোববার এই রিমান্ড মঞ্জুর করেন। জাকাতদাতা নূরানী জর্দার মালিক শামীম তালুকদারসহ আট আসামিকে সকালে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মুশফিকুর রহমান প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ডের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। আদালত পরিদর্শক শুকরানা বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছেন।
জাকাতে পদদলনে ২৭ জন নিহতের ঘটনায় করা মামলায় আজ রোববার জাকাতদাতা ও নুরানি জর্দার মালিক শামীম তালুকদারসহ আটজনের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ময়মনসিংহের একটি আদালত। তাঁকে আদালতে আনা-নেওয়ার পথে তাঁর মুক্তির দাবিতে ওই কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ও সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেন। ছবি: প্রথম আলো
অন্য আসামিরা হলেন ‍- শামীম তালুকদারের ছেলে হেদায়েত ইসলাম, কারখানার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন এবং কারখানার পাঁচ কর্মচারী আরমান হোসেন, আলমগীর, আসাদুল হক, আবদুল হামিদ ও পারভেজ। গত শুক্রবার ভোরে শামীম তালুকদারের বাড়িতে জাকাত নিতে গিয়ে পদদলনে ২৭ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় হত্যা মামলা হয়। এদিকে, জাকাতদাতা শামীম তালুকদারকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় নূরানী জর্দা কারখানার কর্মচারীরা তাঁর মুক্তির দাবিতে রাস্তায় স্লোগান দেয় ও বিক্ষোভ করে।
জাকাতে পদদলনে ২৭ জন নিহতের ঘটনায় করা মামলায় আজ রোববার জাকাতদাতা ও নুরানি জর্দার মালিক শামীম তালুকদারসহ আটজনের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ময়মনসিংহের একটি আদালত। তাঁকে আদালতে আনা-নেওয়ার পথে তাঁর মুক্তির দাবিতে ওই কারখানার শ্রমিক-কর্মচারী ও সমর্থকেরা বিক্ষোভ করেন। ছবি: প্রথম আলো

মোশাররফকে সহযোগিতার আশ্বাস আশরাফের

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম
দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কাছ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস পেলেন স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন (এলজিআরডি) ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্ব পাওয়া মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন। সচিবালয়ে নতুন দপ্তরে বসার আগে আজ রোববার সকালে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে তাঁর বাসায় গিয়ে সাক্ষাৎ করেন তিনি।
খন্দকার মোশাররফ হোসেন বেলা ১১টা ৫ মিনিটে সৈয়দ আশরাফের ২১ বেইলি রোডের বাসায় যান। সেখান থেকে বেলা ১১টা ১৭ মিনিটে তিনি বের হয়ে যান।
এ সময় সৈয়দ আশরাফ সাংবাদিকদের বলেন, ’এটি সৌজন্য সাক্ষাৎ। যেহেতু আমরা একই দলের এবং একই পার্লামেন্টের সদস্য, সুতরাং নতুন মন্ত্রীর প্রতি আমার পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে।’ তবে নতুন এলজিআরডি মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি।
গত ৯ জুলাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দিয়ে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হয় এবং খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বেও থাকছেন।
৭ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুপস্থিত থাকায় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার গুঞ্জন উঠে। তবে ওই দিন সন্ধ্যায় নিজ জেলা কিশোরগঞ্জ শহরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত ইফতারে অংশ নেওয়ার সময় তিনি বিষয়টিকে গুজব বলে অভিহিত করেন। আর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকেও জানানো হয়, সরকারের পক্ষ থেকে তারা এমন কোনো সংকেত পায়নি।
সেই দিন একনেক সভায় উত্থাপনের জন্য আটটি প্রকল্প তালিকায় প্রথমেই ছিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’। পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলনকক্ষে এ সভার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরপরই প্রথম প্রকল্প হিসেবে এ প্রকল্প পাসের জন্য ওঠানো হয়। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এ এন সামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরী প্রকল্পটির বিস্তারিত তুলে ধরেন। এ সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী কেউই উপস্থিত ছিলেন না।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তখন বলেন, ছয় হাজার কোটি টাকার এত বড় প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দুজন মন্ত্রী রয়েছেন, একজনও আসেননি। তাই এ প্রকল্প একনেক সভা থেকে প্রত্যাহার করা হোক। তাঁদের মতামত নিয়ে প্রকল্পটি পাস করা দরকার। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঠিক আছে, মনে করেন আমিই মন্ত্রী। প্রকল্পটা প্রত্যাহার করবেন না।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ঠিক আছে, উনি যখন মিটিংয়ে আসেন না, আমি উনাকে সরিয়ে (চেঞ্জ করে) দিচ্ছি। এখানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব আছেন, আজকেই চেঞ্জ করতে বলব।’ এরপর একনেক সভার নিয়মিত কার্যক্রম চলতে থাকে। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা কথা বলেন।
মন্ত্রণালয়ে নিষ্ক্রিয়তার জন্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার কথা আলোচনায় থাকলেও কার্যত দীর্ঘদিন ধরেই দলের একটা অংশ তাঁকে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম সারির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়। তবে এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে কিছুটা থমথমে পরিস্থিতি থাকায় কেউ উদ্ধৃত হয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় রাজনীতিতে তাঁর থাকা না-থাকা নিয়েও দল এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নানা আলোচনা আছে। এ অবস্থার মধ্যে গতকাল শনিবার রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবে ঢাকাস্থ হোসেনপুর সমিতির ইফতার মাহফিলে সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘আমি লাভের জন্য রাজনীতি করি না। আমার পিতা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। নেতার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন। এটাই আমার রক্ত।’ হোসেনপুরবাসীর উদ্দেশে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী আশরাফ আরও বলেন, ‘আমার পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেইমানি করেননি। মৃত্যুকে বরণ করেছেন। আমি মন্ত্রী হই বা না হই, রাজনীতি করি বা না করি, সব সময় হোসেনপুরবাসীর সঙ্গে থাকব।’

টেলিফোনে রাগের মাশুল by কাফি কামাল

ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব। তার হাতেই ১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির। চারবার রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়া দলটি এখন এক অনিবার্য ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। বিএনপির জন্য এ এক অনিশ্চিত ঘোর অমানিশার সময়। কেন এই বিপর্যয়? বিএনপির শেষ গন্তব্যইবা কোথায়। এমন সব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করেছেন আমাদের রাজনৈতিক সংবাদদাতা কাফি কামাল। তার লেখা ‘বিএনপির ময়নাতদন্ত’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় পর্ব-
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিশ্চিতভাবেই প্রভাবশালী একটি দল বিএনপি। ৫ম থেকে ৯ম পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা এমনটাই নির্দেশ করে। কিন্তু এ শক্তি যতটা না সাংগঠনিক তার চেয়ে বেশি জনসমর্থনে। বিএনপির ব্যর্থতা হচ্ছে, মানুষের সমর্থনকে সাংগঠনিক শক্তিতে রূপান্তর করতে না পারা। যার কারণে দেখা যায়, ভোটের মাঠে বিএনপি প্রার্থীদের বাক্স ভরলেও আন্দোলনের মাঠে দলটির অবস্থান সব সময়ই টলোমলো।
দেশের উন্নয়ন ও বহুমতের ঐক্যের প্রতি জোর দিয়ে ১৯ দফা প্রণয়ন করেছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। যা দেশের বেশির ভাগ মানুষের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত আন্তঃরাষ্ট্রীয় ও বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতে ১৯ দফার সঙ্গে সংগতি রেখে যুগোপযোগী কর্মসূচি প্রণয়ন করতে পারেনি বিএনপি। এই ১৯ দফা নিয়ে বিএনপির অনেক নেতারই আগ্রহ কম, এর কোন হালনাগাদ দফাও দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করতে পারেনি তারা। দলটি ধরে রাখতে পারেনি বহুমতের ঐক্য, ত্যাগের মনোভাব, নির্লোভ আদর্শ ও স্বচ্ছ ইমেজের সমন্বয়ে গড়ে তোলা জিয়ার নীতি। জিয়াউর রহমান দল গঠনকালে ও সরকারের সর্বক্ষেত্রে সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন মেধাবী ও সাংগঠনিক লোকজনের। সে বিএনপিতে এখন ব্যবসায়ী ও আমলারাই প্রাধান্য পাচ্ছেন। জিয়াউর রহমানের সময়ে যেখানে সুবিধাবাদীরা তটস্থ থাকতেন, এখন সেখানে তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রণ। রাজপথে মিছিলে মুখর কণ্ঠ, সংগঠনে সক্রিয় ঘর্মাক্ত কর্মীর বদলে কেতাদুরস্তরাই আদরণীয়। জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রতি বিশ্বাসী, ত্যাগীদের হটিয়ে দলটিতে সুবিধাবাদীদের অবস্থানই মজবুত। ফলে জাতীয়তাবাদী আদর্শ, জিয়াউর রহমানের অবদান এবং বিএনপির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য দেশের নতুন প্রজন্ম দূরে থাক, দলের কর্মী-সমর্থকদের হূদয়েই প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি।
অন্যদিকে সরকার পরিচালনা, দল পরিচালনা ও আন্দোলনে জীবনে বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সিদ্ধান্ত গ্রহণে বহুবার নানামুখী জটিলতায়ও পড়েছেন তিনি। কখনও তার সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছে কখনওবা ভুল। নিজ সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কারণে একসময় পরিচিতি পেয়েছিলেন আপসহীন নেত্রী হিসেবে। রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় অভিজ্ঞতার কারণে খালেদা জিয়ার কাছে দ্রুত এবং কার্যকর সিদ্ধান্তই আশা করেন দেশের মানুষ এবং দলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতার একটি রেওয়াজ তৈরি হয় বিএনপিতে। ওয়ান-ইলেভেনের পর থেকে এ রেওয়াজটি রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব। নির্বাচন থেকে আন্দোলন, দল গোছানো থেকে কূটনীতি, সবখানেই নেতিবাচক ছাপ পড়েছে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দলটির এ দীর্ঘসূত্রতার। ভুল-শুদ্ধ যাই হোক বিএনপি দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারে, সেটা এখন অনেকেই ভাবতে পানে না। বিশ্বাসও করে না। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব পদে মির্জা ফখরুলকে এতটা দীর্ঘ সময় ধরে রাখার মধ্যেও কোন গতিশীলতার ছাপ নেই।  
রাজনৈতিক সংকট নিয়ে টানটান উত্তেজনার মধ্যেই ২০১৩ সালের ২৬শে অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎকালীন বিরোধী নেতা খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করে সংলাপের প্রস্তাব ও ২৮শে অক্টোবর গণভবনে নৈশভোজের দাওয়াত দেন। এ সময় তিনি সংলাপের প্রস্তাবকে স্বাগত জানালেও হরতাল প্রত্যাহারে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। বিএনপির যুক্তি ছিল, হরতালটি যেহেতু ১৮ দলের কর্মসূচি, তাই শেষ মুহূর্তে জোটের নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় নেই। তাই হরতাল শেষে যে কোন সময়, যে কোন জায়গায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত। কিন্তু অনেকেই একমত যে, প্রধানমন্ত্রীর ফোনের কারণে যদি তাৎক্ষণিক বিএনপি নেত্রী হরতাল তুলে নিতে তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারতেন, তাহলে প্রচারণার পাল্লা তার দিকেই বেশি ঝুঁকতো।  অবশ্য কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘোলাটে হয়ে যায় পরিস্থিতি। লিক হয়ে যায় কিংবা লিক করে দেয়া হয় দুনেত্রীর সংলাপ। প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন দুপুরে লাল টেলিফোনে ফোন দিলেও খালেদা জিয়া ধরেননি। জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, তার লাল ফোন অনেক দিন ধরেই বিকল। এ নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্কটির সঙ্গে যুক্ত হয় আরও কিছু ইস্যু এবং ৪০ মিনিটের বক্তব্যটি শেষ হয় রাগারাগির মধ্য দিয়েই। রাজনৈতিক নেতারা মনে করেন, সেদিন সহিষ্ণু আচরণের মধ্য দিয়ে হরতাল কর্মসূচি প্রত্যাহার করে প্রধানমন্ত্রী আমন্ত্রণ রক্ষা করলে পরিস্থিতি ইতিবাচক মোড় নিতে পারতো। সেখানেই শেষ নয়, টেলিফোন সংলাপের পর ২০১৩ সালের ৩রা নভেম্বর বিরোধী দলের প্রতি নির্বাচনীকালীন সর্বদলীয় সরকারে অংশ নেয়ার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কোন মিনিস্ট্রি চান। আপনি আসেন, কোন কোন মন্ত্রণালয় চান- আলোচনা করে আমরা ঠিক করি।’ কিন্তু পরদিনই আওয়ামী লীগ একতরফা নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে দাবি করে নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকারে অংশ নেয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিএনপি। রাজনৈতিক মহলের মতে, নির্বাচনকালীন সরকারে অংশ নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় চাইতে পারতো বিএনপি। সেখানে তারা কাজ করতে না পারলে শেষ মুহূর্তে সরে আসারও সুযোগ ছিল। এতে তাদের ওপর একগুঁয়েমির অভিযোগটি প্রতিষ্ঠা পেতো না। দেশভাগের আগে কংগ্রেসের সঙ্গে এরকম একটি কোয়ালিশন সরকার গড়তে রাজি হয়েছিলেন জিন্নাহ। লিয়াকত আলী খান (পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী) পেয়েছিলেন অর্থমন্ত্রণালয় এবং কংগ্রেস অভিযোগ করেছিল যে, মুসলিম লীগ তাদের সিদ্ধান্ত আটকে দিচ্ছে। সুতরাং দৃষ্টান্ত যে ছিল না, তা নয়।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। একইভাবে ভিন্নমত রয়েছে ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ১০ম জাতীয় নির্বাচন  নিয়েও। দলের নেতারা প্রকাশ্যে শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তিতর্ক তুলে ধরলেও ঘরোয়া আলাপে এ সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে কথা বলেন। অনেকেই মনে করেন, ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিতে পারতো বিএনপি। এতে সরকারই চাপে পড়তো তাদের বিজয় নিয়ে এবং নতুন পথে হাঁটতো। নির্বাচন হলে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও বিপুলসংখ্যক আসনে বিজয়ের মাধ্যমে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে কার্যকর চাপ তৈরি করতে পারতো সরকারের ওপর। ওই নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি বিদেশী অতিথিদেরও বিব্রত করেছেন। কারণ অফিসিয়াল অপোজিশন হিসেবে বিএনপির পরিবর্তে জাতীয় পার্টি ও তার নেত্রী রওশন এরশাদকেই তাদের গুরুত্ব দিতে হয়।
২০০৬ সালে আওয়ামী লীগ যে কৌশলটি নিয়েছিল তার থেকে কোন শিক্ষাই নিতে পারেনি বিএনপি। আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন। নির্বাচনের ৫ দিন আগে বিএনপির আরেক নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বরাত দিয়ে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টির এক তারবার্তায় দেখা যায়, বিএনপি নেতারা অভিযোগ করছেন, এ নির্বাচনে ভোটে নয়, সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পছন্দের ব্যক্তিদের জয়ী করানো হবে। সে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টির চেয়েও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধাদ্বন্দ্ব বিএনপিকে দুর্বল করেছিল। কারণ বিএনপি শেষ মুহূর্তে অপ্রস্তুত অবস্থায় সাড়া দিয়েছিল। এর ফলে নেতারা ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারেননি নির্বাচনে অংশগ্রহণের।
নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের বৃহত্তর প্লাটফরম গড়ে তুলতে জোটের পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল বিএনপি। ২০১৩-১৪ সালে একের পর এক রাজনৈতিক দল যুক্ত হয় বিএনপি জোটে। চারদলীয় জোট ১৪, ১৮ ও ২০ দলে পরিণত হয়। কিন্তু জোটের বেশির ভাগ দলই ব্যক্তি ও নামসর্বস্ব। জোটের অর্ধেক দলেরই নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নেই। কর্মী-সমর্থন, সংগঠন ও জনপ্রিয়তার দিক থেকেও বেশির ভাগ দলের উল্লেখযোগ্য কোন অবস্থান নেই। একপর্যায়ে জোটের শরিক দলের মধ্যেই তৈরি হয় মনকষাকষি। প্রগতিপন্থি ও ইসলামপন্থি পরস্পরবিরোধী দলগুলো বাস্তবিক অর্থে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। এছাড়া জোটের নেতাদের সামনের আসনে বসাতে গিয়ে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ ও বর্ষীয়ান নেতাদের পেছনে চলে যেতে হয়। সভা-সমাবেশসহ সবখানেই এটা নিয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে তৈরি হয় অসন্তোষ। সাম্প্রতিক সময়ে এ অসন্তোষের বিষয়টি আরও সামনে চলে এসেছে।
অন্যদিকে মনোমালিন্য কমলেও দলে বা জোটে ফেরানো যায়নি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব প্রফেসর ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ অনেক প্রভাবশালী নেতাকে। জিয়ার জন্মদিনে অধ্যাপক চৌধুরীকে প্রধান অতিথি করে বেগম খালেদা জিয়া মঞ্চে না বসে দর্শকের গ্যালারিতে বসেছিলেন। এটা ভাল নজির হয়েছে। কিন্তু তাঁকে দলে টেনে আনার সঙ্গে যে জটিলতা আছে তা দূর করতে যে ধরনের সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে, তার কোন লক্ষণ নেই।
এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্ত নেতাদের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কৌশলও কাজে লাগাতে পারেনি দলটি। সংস্কারপন্থি নেতাদের মধ্যে প্রভাবশালীরা অন্তর্কোন্দলের কারণে দলে ফিরতে পারেননি। ফলে বিএনপি সীমিত হলেও একটি শক্তিকে হাতছাড়া করেছে। আবার ২০ দলের আন্দোলন চলাকালে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক ইস্যুতে একাধিক বক্তৃতা-বিবৃতি দেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে তার কিছু বক্তব্যও বিতর্ক তৈরি করে।
১৫ই আগস্ট ইস্যুটি বিএনপির রাজনীতিতে আরেকটি ভুল হিসেবে বিবেচনা করেছেন রাজনৈতিক ও কূটনীতিক মহল। শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর কারণে দিনটি আওয়ামী লীগের কাছে যেখানে শোকের সেখানে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্মদিন হিসেবে আনন্দের উপলক্ষ হিসেবে পালন করে বিএনপি। এ ব্যাপারে দেশের রাজনৈতিক ও সুধী সমাজের তরফে নানা অনুরোধও গ্রাহ্য করেনি বিএনপি। এক তারবার্তায় মরিয়ার্টি লিখেছেন, ‘১৫ই আগস্টই বিএনপি ও আওয়ামী লীগের বিভাজন রেখা, এটাই বিরোধের উৎস। ৩৪ বছর পরেও এটা বাংলাদেশকে বিভক্ত রেখেছে। এ নিয়ে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দুই দলের মধ্যকার তিক্ততাই গত দুদশকের বাংলাদেশের রাজনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে। আমরা আশা করি, এ ইস্যুতে উভয় পক্ষের বিতর্ক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজকে প্রত্যাহার করে নেবে।’ অথচ তারেক রহমানের বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত ও আওয়ামী লীগ সরকার বঙ্গবন্ধু হত্যার এজাহার থেকে জিয়াউর রহমানের নাম বাদ দেয়ার মাধ্যমে বিএনপি-আওয়ামী লীগের সম্পর্কে নতুন এক মাত্রা যোগ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়েছে। ৫ম সংসদে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিলে সামাদ আজাদ-বি. চৌধুরী কিছুটা আলোচনা এগিয়েছিল। এমনকি তখন দেশের বহু স্থানে শিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ একসঙ্গে লড়াই করেছে। বিএনপির এমপিরাও জামায়াত নিষিদ্ধের দাবি তুলেছেন সংসদের ফ্লোরেই। রাজনীতির সেই ধারাটা বেগবান বা আর ফেরানোর সুযোগ জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আন্দোলন করে নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছিল বলেও অনেকে মনে করেন।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চলাকালে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ দিন কাটাচ্ছিলেন খালেদা জিয়া। এ সময় তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিরোধের ভেতরেও শোক জানাতে খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে ছুটে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু খালেদা জিয়া অসুস্থতার দোহাই দিয়ে বিএনপি নেতা ও চেয়ারপারসন কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অভ্যর্থনা জানাননি প্রধানমন্ত্রীকে। কার্যালয়ের সামনে কয়েক মিনিট অপেক্ষা শেষে ফিরে যান শেখ হাসিনা। কিন্তু সেদিন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের দেখা হওয়ার দৃশ্যটি দেখতে টেলিভিশনের সামনে অপেক্ষা করছিলেন গোটা দেশের মানুষ। দুই নেত্রীর মধ্যে সাক্ষাৎ হলে বা সেদিন প্রধানমন্ত্রীকে অন্তত কার্যালয়ে অভ্যর্থনা জানালে পরিস্থিতি উত্তরণে সরকারের ওপর একটি নৈতিক চাপ তৈরি হতো। এ ঘটনাকে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বুদ্ধিতা ও শিষ্টাচার লঙ্ঘনের একটি ক্ষতচিহ্ন হিসেবে দেখছে রাজনৈতিক মহল।

আশরাফকে সরাতে দলের একটি অংশ তৎপর ছিল

মন্ত্রী হই বা না হই, রাজনীতি করি বা না করি, হোসেনপুরবাসীর সঙ্গে থাকব মন্ত্রণালয়ে নিষ্ক্রিয়তার জন্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার কথা আলোচনায় থাকলেও কার্যত দীর্ঘদিন ধরেই দলের একটা অংশ তাঁকে কোণঠাসা করার প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিল। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ ও মধ্যম সারির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য পাওয়া যায়। তবে এখন আওয়ামী লীগের ভেতরে কিছুটা থমথমে পরিস্থিতি থাকায় কেউ উদ্ধৃত হয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ায় রাজনীতিতে তাঁর থাকা না-থাকা নিয়েও দল এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নানা আলোচনা আছে। এ অবস্থার মধ্যে গতকাল শনিবার রাজধানীর অফিসার্স ক্লাবে ঢাকাস্থ হোসেনপুর সমিতির ইফতার মাহফিলে সৈয়দ আশরাফ বলেন, ‘আমি লাভের জন্য রাজনীতি করি না। আমার পিতা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। নেতার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন। এটাই আমার রক্ত।’
হোসেনপুরবাসীর উদ্দেশে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী আশরাফ আরও বলেন, ‘আমার পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেইমানি করেননি। মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি মন্ত্রী হই বা না হই, রাজনীতি করি বা না করি, সব সময় হোসেনপুরবাসীর সঙ্গে থাকব।’
ইফতারের প্রায় ১৫ মিনিট আগে বক্তব্য দেওয়ার জন্য মাইক হাতে নিলেও দুই মিনিট বক্তব্য দিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করতে চান। তখন উপস্থিত এলাকাবাসী বলতে থাকেন, নেতা আরও বলেন। তারপরও তিনি আর বক্তব্য দেননি।
ওই অনুষ্ঠানে বক্তারা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাঁরা বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তে কিশোরগঞ্জ ও হোসেনপুরবাসী ক্ষুব্ধ। তবে আমরা নেতার সঙ্গে আছি এবং থাকব।
নুরুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব শাহ মো. মনসুরুল হক, মো. আবদুস ছাত্তার, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ারুল কবীর।
এদিকে আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক-এগারোর পর মহাজোট সরকার গঠন এবং আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির ঘটনায় দলের প্রভাবশালী কেউ কেউ সৈয়দ আশরাফের ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। আবার সৈয়দ আশরাফের সমসাময়িক নেতাদের কেউ কেউ তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিতও ছিলেন। দলের এই প্রভাবশালী নেতারা যুগপৎভাবেই তাঁর পেছনে লেগে থাকতেন।
আবার সৈয়দ আশরাফের নির্লিপ্ততা তাঁর বিরোধী অংশকে আরও সুযোগ করে দেয়। দল ও সরকারে দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি থাকায় দলীয় সভানেত্রীর সঙ্গে সৈয়দ আশরাফের কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। যে কারণে তাঁকে দপ্তরবিহীন হতে হয়েছে বলে দলের অনেকে অনুমান করেন। সৈয়দ আশরাফের দপ্তর কেড়ে নেওয়ার পর তাঁর বিরোধী অংশ এখন অনেক ফুরফুরে।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, সৈয়দ আশরাফকে সরাতে দলীয় সভানেত্রীর সঙ্গে তাঁর দূরত্ব সৃষ্টির জন্য দলের ওই অংশটি দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টায় ছিল। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আশরাফ একজন সৎ রাজনীতিক। এ ঘটনায় তিনি কোনো বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেননি।
শুধু একটি বৈঠকে অনুপস্থিত থাকার জন্য দলের সাধারণ সম্পাদককে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন না দলের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও স্বীকার করেছেন, সৈয়দ আশরাফকে মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক আগের।
দপ্তরবিহীন হওয়ার দুই ঘণ্টা পর যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে তিনি স্বাভাবিকভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দেন। গত দুদিনে তাঁর বাসভবনে আসা দলীয় নেতা-কর্মী ও শুভার্থীদের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। গত দুদিনে বাসভবনে গিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্যসহ কেন্দ্রীয় নেতারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। গতকাল আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের কর্মচারীরাও তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় সবার সঙ্গে বেশ হাসিখুশি মেজাজে কথা বলেন তিনি।
এদিকে দলের কয়েকজন নেতা জানান, দলের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কী বোঝাপড়া হয়েছে, তা তাঁরা অনুমান করতে পারছেন না। তবে প্রধানমন্ত্রী ও আশরাফের সম্পর্ক অনেক গভীর ও বিশ্বস্ততার—এটা সবাই স্বীকার করছেন। গত দুদিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং লন্ডনে অবস্থানরত তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা একাধিকবার সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া কোনো কোনো দেশের রাষ্ট্রদূতসহ কয়েকজন কূটনীতিক তাঁর বাসভবনে গিয়ে দেখা করেন বলে জানা গেছে।
আজ রোববার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের নবনিযুক্ত মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বেইলি রোডের বাসভবনে সৈয়দ আশরাফের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ১৫ জুলাই সৈয়দ আশরাফ ১৫ দিনের জন্য লন্ডন যাবেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে ঈদ করবেন। এ ছাড়া তাঁর ছোট ভাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানেও যোগ দেবেন তিনি।
আপডেট: জুন ০৮, ২০১৪ -প্রথম আলো
আ.লীগের জন্য কেউ অপরিহার্য নয়: সৈয়দ আশরাফ
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, আওয়ামী লীগ একটি বিরাট সংগঠন, এখানে যোগ্য লোকের অভাব নেই। দলের জন্য কেউ অপরিহার্য নয়। দলের মধ্যে যদি শৃঙ্খলা না থাকে, তা হলে সাংগঠনিক ভিত কখনো মজবুত হবে না।
আজ রোববার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলটির যুগ্ম ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠকে সৈয়দ আশরাফ এমন মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি ছিল রুদ্ধদ্বার। এতে দলটির সব যুগ্ম ও সাংগঠনিক সম্পাদকেরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচজন নেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, সংগঠনকে মজবুত করতে ধীরে ধীরে অন্যান্য সাংগঠনিক জেলাগুলোর কাউন্সিলের তারিখ চূড়ান্ত করা হবে বলে বৈঠকে সৈয়দ আশরাফ জানিয়েছেন। তবে তিনি নারায়ণগঞ্জ কিংবা ফেনীর সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে কোনো কথা বলেননি।
বৈঠকে একজন সাংগঠনিক সম্পাদক প্রস্তাব করেন, সংগঠনকে শক্তিশালী করতে হলে বিভাগীয় প্রতিনিধি সভা করতে হবে। বৈঠকে উপস্থিত সবাই এটি সমর্থন করেন।
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা চীন থেকে দেশে ফেরার পর যুগ্ম সম্পাদক ও সাংগঠনিক সম্পাদকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
আজকের বৈঠকে সাত সাংগঠনিক জেলার কাউন্সিলের সম্ভাব্য তারিখ ঘোষণা করা হয়। ২১ জুন মুন্সিগঞ্জে, ২৬ জুন বরগুনায়, ২৭ জুন পটুয়াখালীতে, ২৮ জুন কিশোরগঞ্জে, ১২ জুলাই ঠাকুরগাঁওয়ে, ১৫ জুলাই খুলনা মহানগরে এবং ১৯ জুলাই রাজশাহী মহানগরে কাউন্সিল করার তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলে তারিখগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
কাউন্সিলে শামীম ওসমান ও নিজাম হাজারীর মতো ‘বিতর্কিতরা’ স্থান পাবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেন, ‘আমরা চাই কাউন্সিলরা সত্, যোগ্য ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিতদের নেতা নির্বাচন করবে। বিতর্কিতদের তাঁরা বর্জন করবেন।’
‘বৈধ পথে শেখ হাসিনার পতন ঘটানো যাবে না’—সৈয়দ আশরাফের এমন বক্তব্যের ব্যাখ্যায় হানিফ বলেন, ‘এর অর্থ হচ্ছে শেখ হাসিনা যে উন্নয়ন করছেন তাতে দেশ ও মানুষ উপকৃত হচ্ছে। মানুষ তাঁকে চায়। এ জনপ্রিয়তার কারণে তাঁকে বৈধ পথে হটানো যাবে না। আশরাফ সাহেব এটাই বোঝাতে চেয়েছেন।’

আমার রক্ত বেঈমানি করে না -সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম

দপ্তরবিহীন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, আমার বাবা (বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেঈমানি করেননি। সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। বেঈমানি না করে বঙ্গবন্ধুর জন্য মৃত্যুকে বরণ করেছেন। এটাই আমার রক্ত। কিশোরগঞ্জ আর হোসেনপুরের সম্পদ। আমি সেই রক্তের উত্তরসূরি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হারানো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গতকাল রাজধানীর বেইলী রোডে অফিসার্স ক্লাব মিলনায়তনে এক ইফতার অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আমি লাভের জন্য রাজনীতি করি না। আমার পিতা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। নেতার জন্য মৃত্যুবরণ করেছেন। এটাই আমার রক্ত। বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও প্রবাসী সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে আশরাফ ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর শেখ হাসিনাসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বন্দি হওয়ার প্রেক্ষাপটে দলে সাধারণ সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার সরকারে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন আশরাফ। ২০১৪ সালে শেখ হাসিনা পুনরায় সরকার গঠন করলে দলের সাধারণ সম্পাদককে একই মন্ত্রণালয়ই দেন শেখ হাসিনা। গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আশরাফকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের পর ৩রা নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। ঢাকাস্থ হোসেনপুর উপজেলা সমিতি আয়োজিত ইফতার? মাহফিলে অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন সৈয়দ আশরাফ। তার নির্বাচনী এলাকা কিশোরগঞ্জ-১ এর অন্তর্ভুক্ত এই উপজেলা। হোসেনপুরবাসীর উদ্দেশ্যে আশরাফ  বলেন, আমার পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেঈমানি করেন নাই। আমি মন্ত্রী হই বা না হই, রাজনীতি করি বা না করি, সব সময় হোসেনপুরবাসীর সঙ্গে থাকবো। ইফতারের প্রায় ১৫ মিনিট আগে বক্তব্য দেয়ার জন্য মাইক হাতে নিলেও দুই মিনিট বক্তব্য দিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করতে চান। তখন উপস্থিত এলাকাবাসী বলতে থাকেন ‘নেতা আরও বলেন’- তারপরও তিনি আর বক্তব্য বাড়াননি। এর আগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হোসেনপুর সমিতির নেতারা বক্তব্যে আশরাফের সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে বক্তব্য দেন। অনেকে সৈয়দ আশরাফের দপ্তর কেড়ে নেয়ায় ক্ষোভও প্রকাশ করেন। হোসেনপুর এলাকার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আব্দুর রহিম বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তে আমরা কিশোরগঞ্জ ও হোসেনপুরবাসী ক্ষুব্ধ। তবে আমরা নেতার (আশরাফ) সঙ্গে আছি এবং থাকবো। হোসেনপুর উপজেলা সমিতির সভাপতি মো. নুরুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সাবেক অতিরিক্ত সচিব শাহ মো. মনসুরুল হক, আইডিবি’র প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা মো. আব্দুস ছাত্তার, সমিতির সাধারণ সম্পাদক খাদেমুল ইসলাম, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আনোয়ারুল কবীর বক্তব্য রাখেন।

বিমানে খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি by দীন ইসলাম

প্রথমে খেতে দেয়া হলো জুস ও বাদাম। গ্রোগ্রাসে গিললেন হাড্ডিসার মানুষগুলো। এর আধা ঘণ্টা পর একটু ভারী টাইপের খাবারের সঙ্গে কোক ও পানি দিতেই হুড়োহুড়ি লেগে গেল। শীর্ণকায় মানুষগুলো মিনিট দুয়েকের মধ্যে তাদের বরাদ্দকৃত খাবার খেয়ে ফেললেন। অনেকে তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করে কেবিন ক্রুকে কাকুতি মিনতি করে আরও খাবার চাইতে থাকেন। অনেক দিন খাই না। এ অনুরোধের পাশাপাশি এসব বাংলাদেশীরা দ্রুত খাবার শেষ করে কোমল পানীয় কোক ও পানি নেয়ার প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেন। এটি কোন বাংলা সিনেমার দৃশ্য নয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের ভেতরের চিত্র ছিল এমনই। ওই ফ্লাইটে সাগরযুদ্ধে জয়ীরা খাবার নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি করেছেন। বিমানের ওই ফ্লাইটে প্রত্যক্ষদর্শী এক যাত্রী জানান, ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে সাগরপথে যেসব বাংলাদেশীরা মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন তাদেরই একটি অংশ ছিলেন ওই ফ্লাইটে। সবার পরনে ছিল এক রঙের টি-শার্ট। পা খালি। কুয়ালালামপুরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে ওঠার পর পরই তাদের শিকল দিয়ে লাগানো হাতকড়া খুলে দেয়া হয়। মুক্ত জীবনে আসা এসব বাংলাদেশীকে বিমান উড্ডয়নের ১৫ মিনিট পর জুস ও বাদাম খেতে দেয়া হয়। মুহূর্তের মধ্যে ওই জুস বাদাম খাওয়া শেষ করে ফেলেন তারা। এরপর তাদেরকে বিমানের কেবিন ক্রু পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, আপনাদের কারও এক্সট্রা জুস লাগবে? একথা জিজ্ঞেস করা মাত্র ১০২ জনের সবাই হাত তুলে তাদের আরও জুস লাগবে বলে জানান। ফলে কেবিন ক্রুরা রীতিমতো বিপদে পড়ে যান। ফলে ২৮ লিটার জুস, ২৫ লিটার সফট ড্রিংক ও ৫০ লিটার পানি মুহূর্তের মধ্যে শেষ করে দেন ওই সব বাংলাদেশীরা। এক পাশের ওই সব কোমল পানীয় শেষ হলে অন্য পাশ থেকে ধার করে আনতে হয় কেবিন ক্রুদের। বিমানের অন্য পাশ থেকে খাবার এনেও তাদের চাহিদা মেটানো যায়নি। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ভারী খাবারের পর বিমানের স্টুয়ার্ডরা শেষ মুহূর্তের কাজ করায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। ২০ মিনিট পরই বিমান ল্যান্ডিং করবে বলে কেবিন ক্রুদের তাড়া দিতে থাকেন পাইলটরা। ওইভাবেই কাজ করছিলেন কেবিন ক্রুরা। এরপরও সাগর যুদ্ধে জয়ী কয়েক জন বাংলাদেশী কেবিন ক্রুদের কাছে এসে অনুনয় বিনয় করে বলতে থাকেন, স্যার আমাকে একটা খাবার দেয়া যায়, খুবই ক্ষুধা লাগছে। প্রতি উত্তরে স্টুয়ার্ডরা তাদের কাছে জানতে চান, আপনি না ১০ মিনিট আগে খাবার খেলেন। তখন অপলক দৃষ্টিতে তারা তাকিয়ে বলছিল, ক্ষুধা ত আর মিটে নাই স্যার! বিমানে দায়িত্বপালন করা একজন কেবিন ক্রু জানান, অবশিষ্ট কোন প্যাকেট না থাকায় বাধ্য হয়ে ‘ক্রু ফুড’ অর্থাৎ নিজের খাবারটি শীর্ণকায় বাংলাদেশীদের হাতে তুলে দেন তারা। তখনই ঘটে বিপত্তি। ওই খাবার নিয়ে মেঝেতে বসে দুই তিন জন মিলে খাওয়া শুরু করে দেয়। তাদের দেখাদেখি আরও কয়েক জন এসে আমার পা জড়িয়ে ধরে। কাঁদতে কাঁদতে তারা বলেন, স্যার আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে দুইটা খাইতে দেন। এ সময় অন্য ক্রুদের খাবারও দিয়ে দেয়া হয়। এ সময় তাদের কেবিন ক্রু বলেন, আপনাদের খেয়ে তাড়াতাড়ি সিটে যেতে হবে। এখনই বিমান ল্যান্ডিং করবে। তাদের মধ্যে কয়েক জন দাঁড়িয়ে হাত দিয়েই ৩-৪ মিনিটের মধ্যে খাবার শেষ করেন। খাবার শেষ করে যখন তারা সিটে বসছিল তখন কেবিন ক্রুদের উদ্দেশ্য করে ক্যাপ্টেন বলেন, দুই মিনিটের মধ্যে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান ল্যান্ডিং করবে। বিমান সূত্রে জানা গেছে, ১০২ জন বাংলাদেশীর এমন অবস্থা দেখে পাইলট ও কেবিন ক্রুরা আবেগতাড়িত হয়ে যান। নিজেদের খাবার দিয়ে দেয়ার পাশাপাশি অনেকে বিমানবন্দরে নেমে বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশীদের ফোন ও অর্থ সাহায্য দেন। বিমানের কেবিন ক্রুদের বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশীরা জানিয়েছেন, কয়েক মাস ট্রলারে করে মালয়েশিয়া যান তারা। এরপর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে চার মাস জেলে ছিলেন। জেলে থাকার সময় খাবার হিসেবে এক মুঠো ভাত ও অল্প শুঁটকি মাছ পানিতে সিদ্ধ করে দেয়া হতো। ময়লাযুক্ত খাবার পানি দেয়া হতো। থাকতে দেয়া হতো স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে, মানব পাচারের শিকার ৪৪৫ জন বাংলাদেশী আকাশ পথে ঢাকায় ফিরেছেন। তাদের বাংলাদেশী হিসেবে দূতাবাস মারফত শনাক্ত করার পরই ফিরিয়ে এনেছে সরকার। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার ফেরেন ১০২ জন। শুক্রবার ফেরেন আরও ৯৬ জন। এখনও মালয়েশিয়ার কারাগারে বন্দি বাংলাদেশীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে।

ফের সালমান-কারিনা জুটি

বডিগার্ড ছবির পর সালমান খান ও কারিনা কাপুরকে আর কোনো ছবিতে একসঙ্গে দেখা যায়নি। ‘বডিগার্ড’ এর পরিচালক কবির খান আবারও তাদের এক করছেন। নতুন এই ছবির নাম ‘বজরঙ্গি ভাইজান’। সালমানেরই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘সালমান খান ভেঞ্চারস’ এই ছবিটি প্রযোজনা করছে। ছবিতে বজরঙ্গি ভাইজানের চরিত্রে অভিনয় করবেন সালমান। কবিরের সঙ্গে বরাবরই সালমানের কাজের অভিজ্ঞতা দারুণ।
তাই নিজের ছবির পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে অনেকটা নির্ভার রয়েছেন সালমান। তবে ছবিতে নায়িকার ব্যাপারে সাল্লু নাকি কোনোরকম হস্তক্ষেপ করেননি। কবির খান কারিনার নাম বলতে একবাক্যেই তা মেনে নেন সালমান। কবির এর আগেও সালমানের সঙ্গে ‘এক থা টাইগার’ ছবিতে কাজ করেছেন। বডিগার্ড ছবিতে একসঙ্গে কাজ করে দারুণ আলোচিত হন সালমান ও কারিনা। নতুন ছবিতে এই জুটি নতুন কি রসায়ন তৈরি করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

পদপিষ্ট হয়ে ২৭ জনের মৃত্যু- এই নির্দয় দায়িত্বহীনতা বন্ধ করুন

জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে ২৭ জন অভাবী মানুষের মৃত্যুর মর্মান্তিকতা ও নির্দয় দায়িত্বজ্ঞানহীনতা মেনে নেওয়া যায় না। ইসলামের বিধান অনুসারে জাকাত দরিদ্রের অধিকার; সম্পদবানের জন্য তা বাধ্যবাধকতা। তাই জাকাত দিতে গিয়ে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ফেলা তো দূরের কথা, অসম্মান ও হয়রানিও অনুচিত। ফি বছর দেশের বিভিন্ন স্থানে জাকাতঘটিত কারণে গণমৃত্যু বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া তাই জরুরি।
ময়মনসিংহ শহরে জাকাতের কাপড় নেওয়ার হুড়োহুড়িতে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের ২২ জনই নারী এবং বাকি পাঁচজন কোলের শিশু। এক ধনীর দানবিলাসের খেসারত কি এই ২৭ প্রাণের অপচয়? নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের ঈদ কে কেড়ে নিল? জাকাত দেওয়ার চেয়ে এলাকায় ‘দাতা’ হিসেবে নাম করার ইচ্ছা কি এর জন্য দায়ী নয়?
ইসলামি দানের শর্ত হলো যাতে ডান হাতের দান বাঁ হাতও জানতে না পারে। অর্থাৎ জাকাতগ্রহীতাকে খাটো না করেই তার প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। এ জন্য ডেকে আনার চেয়ে তাদের কাছে গিয়ে জাকাতের অর্থ বা সামগ্রী দেওয়াই শ্রেয়। তাহলে পদদলিত হয়ে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় পুরোটাই লোপ পেত। দ্বিতীয়ত, যেখানে প্রতিবছর জাকাত নিতে গিয়ে মানুষের মৃত্যু ঘটছে, সেখানে ধনশালী ব্যক্তিদের উচিত সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, যেখানে আগাম ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ঘটানো হচ্ছে, সেখানে পুলিশ উপস্থিত থাকেনি কেন?
জাকাতসহ বড় আকারের দান-খয়রাতের জমায়েতে প্রায়ই গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। পদপিষ্ট হয়ে ১৯৮০ সালে ঢাকার জুরাইনে ১৩ জন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তিন শিশু, ১৯৮৭ সালে চারজন, ১৯৮৯ সালে চাঁদপুরে ১৪ জনের মৃত্যু হয়। সবচেয়ে বড় অঘটন ঘটে ১৯৯০ সালে, চট্টগ্রামে নিহত হন ৩৫ জন। দরিদ্রদের পায়ের নিচে দরিদ্রদের এমন মৃত্যু দারিদ্র্যের প্রতি মারাত্মক উপহাস নয় কি?
শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে দরিদ্রদের প্রাপ্য তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হোক। এ ধরনের ঘটনাকে সজ্ঞান অবহেলা হিসেবে নিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিচার হোক।
Update On July 10, 2015 ময়মনসিংহের নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরিতে যাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে নারী ও শিশুসহ কমপক্ষে ২৭ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক মানুষ। শহরের অতুল চক্রবর্তী সড়কে এই ঘটনা ঘটে। মধ্যরাত রাত থেকেই ময়মনসিংহ শহরের নূরানি জর্দা ফ্যাক্টরির সামনে যাকাতের কাপড় নিতে জড়ো হয়েছিলো কয়েক হাজার মানুষ। ভোর ৫টার দিকে শুরু হয় যাকাতের কাপড় বিতরণ। এক পর্যায়ে হুড়োহুড়ি শুরু হলে বহু লোক পদদলিত হয়। আহত ও নিহতদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। একজন প্রত্যাক্ষদর্শী জানান, ফ্যাক্টরির মালিক প্রতিবছরই যাকাত দেন। সেই ধারাবাহিকতায় শুক্রবারও যাকাত দেয়ার জন্য জর্দা ফ্যাক্টরির গেট খোলা হয়। এসময় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ এক সঙ্গে হুড়োহুড়ি করে গেটের ভেতরে ঢুকতে চাইলে পদদলিত হন অসংখ্য মানুষ। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২৭ জন নিহত হয়েছে। তবে হাসপাতালের ইমারজেন্সি মেডিকেল অফিসার ডা. ফরিদ হোসেন জানান, মৃতের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১৮ জন। তিনি আরো বলেন,মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে। অপর একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, এক সঙ্গে অনেক মানুষ গেটের ভেতরে ঢুকতে গিয়ে চাপা খাইয়া অনেকেই মরছে। গেটের ভেতরে কিছু মারামারিও হইছে। ঘটনার পর কারখানার সামনে বহু মানুষের ছেঁড়া জুতা, স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। পুলিশ সুপার মঈনুল হক জানান, আগে থেকে পুলিশকে কিছু জানানো হয়নি। তবে খবর শুনেই আমরা ঘটনাস্থলে আসি। পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হবে। ওই ঘটনায় জর্দা ফ্যাক্টরির মালিক নূরানী তালুকদার শামীমসহ ৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

কাঁদছে ময়মনসিংহ by মতিউল আলম

কাঁদছে ময়মনসিংহ। থামছে না স্বজনহারা মানুষের কান্না ও আহাজারি। প্রতিটি পরিবারে চলছে শোক আর মাতম। ক্ষোভে-দুঃখে অনেকে বলেছেন, গরিব হয়ে জন্ম নেয়াটাই দুঃখের। ঘটনাস্থলে একসঙ্গে এতগুলো লাশ মাটিতে পড়ে থাকার দৃশ্য ভুলতে পারছেন না ময়মনসিংহবাসী। গতকাল সরজমিন নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে এমন দৃশ্য। পাটগুদাম ব্রিজসংলগ্ন বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আবদুল বারেক। তিনি শহরের একটি স’মিলে কাজ করেন। স্ত্রী শামীমা (৫৫), মেয়ে সখিনা (৩৫) ও নাতনি লামিয়াকে (৪) হারিয়ে এখন বাকরুদ্ধ তিনি। আবদুল বারেক জানান, তার স্ত্রী-কন্যারা কখনও জাকাতের জন্য বাইরে যায়নি। এই প্রথম জাকাত নিতে গিয়ে তারা চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল। প্রতিবারের মতো এবার মেয়ে-নাতনিকে নিয়ে তার ঈদ করা হলো না। একই ক্যাম্পের বাসিন্দা মৃত সুলতানের স্ত্রী হাজেরা খাতুন (৭০) ৪ সন্তানের জননী। দরিদ্রতার জন্য অতিকষ্টে দিন কাটতো তার। একটি নতুন কাপড়ের জন্য জর্দা ফ্যাক্টরিতে গিয়ে আর ফিরেননি। একেবারে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। বৃদ্ধা মাকে হারিয়ে তার ছেলেমেয়েরা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। হাজেরা খাতুনের ছেলেমেয়েরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের কষ্টের কথা কী বলবো- গরিব হয়ে জন্ম নেয়াটাই দুঃখের। এ ঘটনায় নিহত সেহড়া ধোপাখোলার মসজিদ রোডের বাসিন্দা জামেনা খাতুুন (৫৮)। তিনি জাকাতের কাপড়ের জন্য গিয়েছিলেন পরিবারের কাউকে না জানিয়ে। সকালে তার পরিবারের লোকজন খবর পায় জামেনা খাতুনের লাশ পড়ে আছে হাসপাতালে। জামেনা খাতুনের ছোট ছেলে সোহেল জানান, বাবার মৃত্যুর পর মা তাদের বাবা হারানোর ব্যথা কখনও বুঝতে দেননি। কিন্তু এখন তাদের অনুভব করতে হচ্ছে মা-বাবা দুটো হারানোর কষ্ট। শহরের সেহড়া ধোপাখোলা দত্তবাড়ির গরিব অসহায় সুধারানী সরকার (৫৭) শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়ার কাজ করতেন। পরিবার তার ২ ছেলে ও ১ বিধবা মেয়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল মাকে হারিয়ে ছেলেমেয়েরা অসহায় হয়ে পড়েছেন।
আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে অনার্সপড়ুয়া লাবণী থাকেন শহরের থানাঘাট বস্তিতে। তার মা খোদেজা আক্তার নতুন একটি কাপড়ের আশায় বৃহস্পতিবার গভীর রাতে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু শুক্রবার সকালে ফিরেছেন লাশ হয়ে। স্বামীর মৃত্যুর পর খোদেজা আক্তার ছয় সদস্যের সংসারের ঘানি টানছিলেন অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করে। কাতর কণ্ঠে লাবণী বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর অন্যের বাড়িতে কাজ করে আমাদের লেখাপড়ার খরচ জোগাচ্ছিলেন মা। তার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষে যেন ভাল একটি চাকরি করি। কাঁদতে কাঁদতে লাবনী বলেন, এভাবে পদদলিত হয়ে মানুষের মৃত্যু বেদনাদায়ক। এখন কার জন্য পড়াশোনা করবো। আর সংসারই বা কীভাবে চলবে। সব স্বপ্নই যে এখন শেষ। ওদিকে থানাঘাট বেড়িবাঁধ বস্তির কৃষ্ণা মিয়া মেয়ের জন্য কেনা পায়ের নূপুর, ঝুমকা আর পুতুল হাতে নিয়ে নির্বাক কাঁদছিলেন। দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন স্ত্রী সখিনা খাতুন, শিশুকন্যা লামিয়া ও শাশুড়ি শামু বেগমকে। পরিবারের তিন সদস্যের এমন করুণ মৃত্যুতে এখন শোকে পাথর কৃষ্ণা মিয়া। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, স্ত্রী সখিনা দুধের শিশুকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয় গভীর রাতে। একটি শাড়ির জন্য পায়ের নিচে চাপা পড়ে নিজেও মরলো, মেয়েটাকেও মারলো।
এদিকে নিহত পরিবারগুলো ১০ হাজার টাকা করে সরকারি অনুদান পেলেও আহতরা সরকারি কোন অনুদান পায়নি বলে জানা গেছে। অর্থ-সাহায্য না পাওয়ার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে পারছে না তারা। গুরুতর আহত পাটগুদাম ব্রিজসংলগ্ন বিহারি ক্যাম্পের বাসিন্দা আসমা (৫০) ও তার ছেলে রাজ (২১) জানান, জাকাতের কাপড় আনতে তারাও ভোরে নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরিতে গিয়েছিল। রাজের মা নিচে পড়ে গেলে তাকে বাঁচাতে গিয়ে রাজও গুরুতর আহত হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে চিকিৎসাসেবা না নিয়েই তাদের বাসায় ফিরতে হয়েছে। ১৩ সদস্যের অভাবী পরিবারে এখন তারা যুক্ত হয়েছেন নতুন বোঝা হিসেবে। ক্ষতিগ্রস্ত এ পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে সরকার বা সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসবে- এমনটাই প্রত্যাশা স্বজনহারা হতদরিদ্রদের।
উল্লেখ্য, শুক্রবার ভোরে ময়মনসিংহ জেলা শহরের অতুল চক্রবর্তী রোডের নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরি থেকে জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে ২৭ জনের মৃত্যু ও অন্তত ২০ জন আহত হন। এ ঘটনায় ফ্যাক্টরি মালিক ও তার ছেলেসহ আটজনকে আটক করে পুলিশ। এদিকে শুক্রবার রাতেই নিহতদের দাফন-কাফন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
ওদিকে ময়মনসিংহে জাকাত ট্র্যাজেডির ২৭ জন নিহতের ঘটনার নূরানি জর্দ্দা ফ্যাক্টরির মালিক মোহাম্মদ শামীম ও তার ছেলেসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার জন্য কোতোয়ালী থানার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই সাইদুল ইসলামকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মুসফিকুর রহমান শামীমসহ এই ঘটনায় জড়িত ৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য  ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে গতকাল সকালে ময়মনসিংহ ১নং আমলী আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল  ম্যাজিস্টেট আহসান হাবিবের আদালতে হাজির করলে আদালত রিমান্ডের শুনানির জন্য  আজ রোববার  দিনধার্য করেছেন।
এদিকে নূরানি জর্দ্দা ফ্যাক্টরির মালিক শামীম তালুকদারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠছে ময়মনসিংহ। এই মর্মান্তিক ঘটনার শোকে স্তব্ধ ময়মনসিংহবাসী। শহরের প্রত্যেক সচেতন মানুষের কণ্ঠে একই আওয়াজ শামীমসহ সংশ্লিষ্টদের উপযুক্ত বিচার হোক। এই দাবিতে ময়মনসিংহে চলছে শহরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন। ময়মনসিংহে পদদলিত হয়ে হতাহতদের ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে গতকাল মানববন্ধন করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ময়মনসিংহ জেলা টিইউসি, জেলা যুব ইউনিয়ন ও ছাত্র ইউনিয়ন। গতকাল দুপুরে শহরের গাঙ্গিনারপাড় শহীদ-ফিরোজ জাহাঙ্গীর চত্বরে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচিতে জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. এমদাদুল হক মিল্লাত, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফেরদৌস আরা মাহমুদা হেলন, সাধারণ সম্পাদক মনিরা বেগম অনু, যুব ইউনিয়নের সভাপতি আবদুর রব মোশাররফ প্রমুখ অংশ নেন। এদিকে একই দাবিতে একই স্থানে সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ পৃথকভাবে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
জাকাতের কাপড় নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে ২৭ জন নিহতের ঘটনায় নূরানি জর্দ্দা ফ্যাক্টরির মালিক মোহাম্মদ শামীম ও তার ছেলেসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে শুক্রবার সন্ধ্যায় ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে এ মামলা করেন।
কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম জানান, মামলার আসামিরা হলেন- নূরানি জর্দ্দা ফ্যাক্টরির মালিক মোহাম্মদ শামীম (৬৫) ও তার ছেলে হেদায়েত তালুকদার (৩০), ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ইকবাল হোসেন (৩৫), ইকবাল (৪০), আরমান হোসেন (৩৫), আলমগীর হোসেন (৩৪), আরশাদুল ইসলাম (৩২), ড্রাইভার পারভেজ (৩৫) ও কর্মচারী আ. হামিদ (৩৬)। আসামিরা সবাই পুলিশের হাতে আটক রয়েছে।
শুক্রবার ভোরে ময়মনসিংহ জেলা শহরের অতুল চক্রবর্তী রোডের নূরানি জর্দ্দা ফ্যাক্টরি থেকে জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। আহত হয় আরও অন্তত ২০ জন। এ ঘটনায় ফ্যাক্টরি মালিক ও তার ছেলেসহ আটজনকে আটক করে পুলিশ।

গ্রিসের ভাগ্য নির্ধারণে বৈঠকে বসছেন ইউরোপীয় নেতারা: সিপ্রাসের প্রস্তাবে পার্লামেন্টের সমর্থন

গ্রিসের পার্লামেন্টে গতকাল ভোটাভুটির সময় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত
প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস l ছবি: রয়টার্স
ঋণ পেতে আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক দাতাদের কাছে গ্রিস সরকারের দেওয়া নতুন কঠোর সংস্কার প্রস্তাবে সমর্থন দিয়েছে দেশটির পার্লামেন্ট। গতকাল শনিবার পার্লামেন্টে অনুষ্ঠিত ভোটা–ভুটিতে প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের নিজ দলের একাংশের বিরোধিতার মুখেই ইউরোপপন্থী বিরোধী দলগুলোর সমর্থনে পাস হয় প্রস্তাবটি।
ইউরোজোনের অর্থমন্ত্রীরা গ্রিসের প্রস্তাবটি তৃতীয় দফা আর্থিক পুনরুদ্ধার কর্মসূচি পাওয়ার জন্য যথেষ্ট কি না, তা স্থির করতে গতকাল বৈঠকে বসেছেন। তাঁরা সন্তুষ্ট হলে গ্রিসের ইউরোজোন থেকে সম্ভাব্য বিদায় ঠেকানো যাবে। খবর এএফপি ও বিবিসির।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাসের দেওয়া প্রস্তাবকে ‘বিশদ’ বলে অভিহিত করে এর প্রতি অনুকূল মনোভাব প্রকাশ করেছিলেন। এখন গ্রিসের পার্লামেন্টের সমর্থন পাওয়ায় প্রস্তাবটির গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়ল।
ব্রাসেলসে ১৯ দেশের ইউরোজোনের অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকের পর আজ রোববারই শুরু হবে ইইউর পূর্ণ শীর্ষ সম্মেলন। সেখানে সিপ্রাসের প্রস্তাবের আলোকে গ্রিসের সঙ্গে ইউরোজোনের নতুন চুক্তি অনুমোদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা।
তিন বৃহৎ ঋণদাতা ইউরোপীয় কমিশন, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) এবং আইএমএফ ইতিমধ্যে সিপ্রাসের প্রস্তাবের ওপর তাদের যৌথ প্রাথমিক মূল্যায়ন ইউরোজোন মন্ত্রীদের কাছে পাঠিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইইউর একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তাঁরা যৌথভাবে ওই প্রস্তাবকে সমঝোতার ভিত্তি বলে বিবেচনা করছেন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্দ বলেন, গ্রিসের পার্লামেন্টে প্রস্তাবটি পাস হওয়ার ঘটনাকে তিনি বড় ধরনের অগ্রগতি বলে মনে করেন। তিনি আশা করেন, চলমান সংকট নিরসন হতে পারে।
অবশ্য ইতালির প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজি আশা প্রকাশ করেছেন, গ্রিসের প্রস্তাব শনিবারই গৃহীত হবে। আর এর ফলে রোববারের বৈঠকের কোনো প্রয়োজন হবে না। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদও আশাবাদী। তবে ইউরোপীয় বেশ কয়েকজন নেতা আজকে চুক্তি অনুমোদনের সম্ভাবনা অর্ধেক অর্ধেক বলে মন্তব্য করেন। তাঁরা অনেকেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের ব্যাপারে গ্রিসের সক্ষমতা নিয়ে সংশয়ে আছেন।
গ্রিসের ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম এখন সম্পূর্ণভাবে ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) ঋণের ওপর নির্ভরশীল। নতুন করে ঋণ না পাওয়ায় তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো বন্ধ রয়েছে। এখন সিপ্রাসের দেওয়া প্রস্তাবটিকেই গ্রিসের অর্থব্যবস্থা ভেঙে পড়া ঠেকানোর শেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
দাতাদের ব্যয় সংকোচন প্রস্তাবের অনেকগুলো শর্তই প্রধানমন্ত্রী সিপ্রাস মেনে নেওয়ায় তাঁর নিজ দলের একটি অংশ ক্ষুব্ধ।

সিভিল সোসাইটির একাল-সেকাল by উৎপল রায় ও সিরাজুস সালেকিন

দুই শিবিরে বিভক্ত বাংলাদেশ। সিভিল সোসাইটিও এর ব্যতিক্রম নয়। তারাও হয়ে গেছেন বিভক্ত। কমে যাচ্ছে নির্জলা সত্য বলার মানুষ। নেই তেমন কোন জাতীয় মুরব্বি। ব্যতিক্রম যে নেই তাও নয়। তবুও বিভক্তির কবলে পড়েছে মানুষের বিশ্বাস। কী ভাবছেন জাতির বিবেক বুদ্ধিজীবী ও সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধিরা? ধারাবাহিকভাবে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজছে মানবজমিন। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় পর্ব-
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বুদ্ধিজীবী ও সিভিল সোসাইটি এক নয়। সিভিল সোসাইটিকে সমাজের একটি অংশ বলা হলেও আমি মনে করি সিভিল সোসাইটি বলে কিছু নেই। কাউকে দেখতেও পাই না। এর বদলে কিছু ব্যক্তি, সংগঠন ও এনজিও আছে। যারা বিভিন্ন ইস্যুতে বক্তব্য- বিবৃতি দেয়, আন্দোলন করে। সিভিল সোসাইটি বলে ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এর কোন ভিত্তি আদৌ দেখি না। তিনি বলেন, সুশীল সমাজের মতবাদ একটা জায়গা থেকে আসছে না। বিভিন্নভাবে বিভিন্নজন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে না। সুশীল সমাজের একীভূত হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই উল্লেখ করে প্রবীণ এই শিক্ষাবিদ বলেন, তাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোন সুযোগ নেই। সবার দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা, চেতনা আলাদা।  রাজনীতিও সবক্ষেত্রেই থাকবে। কেউ এ দল করছে। কেউ ও দল করছে। তাই মতাদর্শের ভিন্নতার কারণে বিক্ষিপ্ত মনোভাব থাকতেই পারে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোই একসঙ্গে থাকতে পারে না, তারা (সুশীল সমাজ) ঐক্যবদ্ধ থাকবে কিভাবে? আর যদি তারা একীভূত হয়েই যায় তাহলে তো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের কোন তফাৎ থাকে না। তারাও রাজনৈতিক দল হয়ে যায়।
গবেষক, প্রাবন্ধিক, কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ এবিষয়ে বলেন, ‘সুশীল সমাজ’ কথাটি ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ নয়। এ জন্য যে, এই কথাটি কোন অর্থবহন করে না। যাকে ‘সিভিল সোসাইটি’ বলা হয় তার বাংলা প্রতিশব্দ সুশীল সমাজ হয় না। হয় নাগরিক সমাজ। তিনি বলেন, নাগরিক সমাজ সবক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নিরপেক্ষ। নাগরিক সমাজের নেতা বা সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন। তারা কারও কাছে দায়বদ্ধ নন। তবে মতপার্থক্য থাকতেই পারে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্য, ন্যায় ও জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটা উচিত নয়-যা বাংলাদেশে লক্ষ্য করা যায়। সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আমাদের নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটি বলতে যা বুঝায় আর তাদের মধ্যে যে মতপার্থক্য তা ব্যক্তিগত স্বার্থকে কেন্দ্র করে। আমাদের নাগরিক সমাজের অনেকেই ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থ ও জনগণের স্বার্থকে বড় করে দেখেন না। এদের অনেকেই আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। তাছাড়া বাংলাদেশে সরকার সমর্থক যে বিশাল কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, নাট্য কর্মী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আছেন তাদের সমর্থন পেয়ে সরকার অনেক সময় অগণতান্ত্রিক আচরণ করে। সেই জনবিরোধী কাজের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের যারা কথা বলেন তাদের থামিয়ে দেন সরকারপন্থি বুদ্ধিজীবী ও সরকারি নেতারা। তিনি আরও বলেন, ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকদের পক্ষে বাহুবলের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের দেশের রাজনীতি ক্যাডারনির্ভর। ক্যাডারদের সঙ্গে ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিক সমাজের নেতারা লড়াই করতে পারে না। তাই সুবিধাবাদীদের সঙ্গে ন্যায় ও সত্যের পক্ষে নাগরিক সমাজের মিল না হওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং নাগরিক সমাজের সরকারপন্থি ও সরকারবিরোধী বিভক্তি থাকাটাই স্বাভাবিক।
মানবাধিকার নেত্রী এডভোকেট সিগমা হুদা বলেন, দেশের বিভিন্ন অর্জনে সুশীল সমাজের একটা বড় ভূমিকা আছে। কিন্তু এটা অত্যন্ত দুঃখজনক যে আমাদের সুশীল সমাজ এখন দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। রাজনৈতিক কারণেই সুশীল সমাজ এমন হয়ে গেছে। তারা এত বেশি বিভক্ত হয়ে গেছে যে, বর্তমানে যে চিন্তাধারায় তারা বিশ্বাসী সেই চিন্তাধারা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারছে না। কিন্তু এটা কোনমতেই হওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, যেহেতু আমরা মানুষ তাই আমাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, চিন্তাধারা ভিন্ন হতে পারে। আমি যেটা চিন্তা করি সেটা অন্য কেউ চিন্তা নাও করতে পারে। কিন্তু দেশ ও জনগণের স্বার্থে জাতীয় ইস্যুতে আমাদের এক হতে হবে।  সিগমা হুদা আরও বলেন, দেশে গুম খুন হচ্ছে কেন? ক্রসফায়ার কেন হচ্ছে? ট্রাফিক জ্যাম কেন কমানো যাচ্ছে না? সুশীল সমাজ যদি মুখপাত্র হয়ে থাকে তাহলে  দেশবাসীর কাছে তারা তা তুলে ধরবে। কিন্তু কেন যেন এমনটি হচ্ছে না? সিগমা হুদা বলেন, কিছু ভাল কাজ করতে গেলে একপক্ষের ক্ষতি হবে। অন্যপক্ষ লাভবান হবে। কিন্তু দেশকে যদি রক্ষা করতেই হয়, দেশের ভালোর জন্য যে কাজটি সঠিক, সেই কাজটিই সিভিল সোসাইটিকে করতে হবে। তাদের বলতে হবে যে, আমরা যদি দেশকে রক্ষা করতে চাই তাহলে সঠিক কথা বলা ও এই ভাল কাজটি  আমাদের করতেই হবে। না করলে দেশ ও জনগণের ক্ষতি হবে।
সুশীল সমাজের বিভাজনের জন্য রাজনৈতিক বিভাজনকে দায়ী করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান। তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এখন জনগণই তো দুইভাগে বিভক্ত। সেভাবেই নাগরিক সমাজের বিভক্তিটা হয়ে গেছে। সকল ক্ষেত্রে এই বিভাজনটা হয়েছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, সিভিল সার্ভেন্ট সব ক্ষেত্রে। কিন্তু সবাই প্রকাশ করে না। কারণ তাদের প্রকাশ করলে সমস্যা আছে। তিনি আরও বলেন, আমরা কয়েকজন মুষ্টিমেয় আছি। যারা কোন দলের বিরোধিতা করি না। কোন লেজুড়বৃত্তি করি না। কিন্তু আমাদের ভয়েস তো খুব কম। এটাই সমস্যা আর কি। সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য গণমাধ্যমের সহায়তা কামনা করেন। তিনি বলেন, আমাদের আরও চেষ্টা করতে হবে। আমরা যারা নিরপেক্ষ দেশের জন্য চিন্তা করি। কারও ক্ষমতায় আনার জন্য বা ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য নয়। দেশে যে বিভাজন হয়েছে সেটা যারা সমর্থন করে না তাদের ঐক্যবদ্ধ করতে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, আমাদের দেশে সুশীল সমাজের সংজ্ঞাতেই সমস্যা আছে। মূলত সুশীল সমাজকে সংজ্ঞায়িত করলে দেখা যাবে আসলে কোন বিভক্তি নেই। সুশীল সমাজের মধ্যে যারা এই সরকারের আমলে বা আগের সরকারের আমলে বিভিন্নভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়েছেন, অথবা কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছে অথবা টেলিভিশনের লাইসেন্স পেয়েছেন, অথবা অর্থবিত্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য বিভিন্ন সরকারের আমলে পেয়েছেন তারা সিভিল সোসাইটির ভান ধরে থাকেন। তারা আসলে পার্টি দলের রাজনীতিই বহন করেন। শত নাগরিক কমিটি ও সহস্র নাগরিক কমিটির বহুলোক আছেন যারা সিভিল সোসাইটির মধ্যে পড়েন না। তারা আসলে পলিটিক্যাল সোসাইটি। তারা রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। তাদের মধ্যে বিভক্তি আছে। যেটা আগেও ছিল। তিনি আরও বলেন, নিঃস্বার্থভাবে যারা সকল সরকারের অন্যায়ের সম্পর্কে কথা বলে তাদের মধ্যে কোন বিভক্তি আসেনি। তারা সকল সময় ইস্যুভিত্তিক সরকারের সমালোচনা করেন। কোন সরকার ক্ষমতায় এটা তাদের বিবেচনার বিষয় না। যেটা খাটি সুশীল সমাজ সেটা রাজনৈতিক সমাজের অংশ হয় না। এর মধ্যে কোন বিভক্তি আসেনি।
সরকারের দমন নীতির কারণে প্রকৃত সুশীল সমাজ নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে দাবি করে তিনি বলেন, প্রকৃত সুশীল সমাজের মধ্যে বিভক্তি আসেনি। প্রকৃত সুশীল সমাজের একটা অংশ সরকারের দমন-নীতির কারণে, বিভিন্ন আইনের কারণে সরকারের বিভিন্ন হয়রানির কারণে নিষ্ক্রিয়, হতবুদ্ধি ও নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। এজন্য মনে হয় তাদের শক্তি কমে গেছে। আগে কখনই কোন গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে ভিন্নমত পোষণের জন্য, বাক স্বাধীনতা প্রয়োগের জন্য এই পরিমাণ দমন-নিপীড়ন বা ভোগান্তির শিকার হতে হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কেন্দ্র করে সুশীল সমাজের বিভাজন হয়েছে বলে মনে করেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক ও সুচিন্তা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ আরাফাত। তিনি বলেন, সুশীল সমাজের এ বিভাজন সকল সময়ে ছিল। যে যার জায়গা থেকে চিন্তা করে। তবে এ বিভাজন মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। একটা সুশীল সমাজ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। আবার কারও কারও অবস্থান ভিন্ন। এছাড়া এনজিও ও ননএনজিও সুশীল সমাজ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই বিভাজনের মাঝখানে নিরপেক্ষ কিছু বলার সুযোগ নেই। তবে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হবে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

ট্যানারির পানিতে জলাবদ্ধতা

রাজধানীর হাজারিবাগ এলাকার বিভিন্ন সড়কে প্রায়ই ট্যানারির বর্জ্য আটকে নিচু এলাকা ময়লা পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। বাড়ি-ঘরে ঢুকে পড়ে দুর্গন্ধযুক্ত রাসায়নিক পদার্থ মেশানো পানি। এলাকাবাসী জানায়, বারবার কর্তৃপক্ষকে জানালেও কাজ হয় না। সাময়িকভাবে সমস্যা সমাধান হলেও আবার একই সমস্যায় পড়তে হয় বাসিন্দাদের। ছবি: জাহিদুল করিম
শুক্রবার-শনিবার ছুটির দিন থাকায় এই পানি সরানোর ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের তোড়জোড় দেখা যায়নি। ছবিটি আজ শনিবার (১১ জুলাই ২০১৫) সকালে তোলা। ছবি: জাহিদুল করিম
হাজারিবাগের মনেশ্বর প্রথম লেন সড়ক জুড়ে ট্যানারির রাসায়নিক পদার্থযুক্ত পানি ঢুকে পড়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে পানি বাড়তে থাকে। ছবিটি আজ শনিবার (১১ জুলাই ২০১৫) সকালে তোলা। ছবি: জাহিদুল করিম
পথচারীরা বিপাকে পড়েছেন। ট্যানারির ক্ষতিকর আঠালো পানিতে বাধ্য হয়েই চলতে হচ্ছে তাঁদের। ছবিটি আজ শনিবার (১১ জুলাই ২০১৫) সকালে তোলা। ছবি: জাহিদুল করিম
মোটরসাইকেল আরোহী দুই পা উঁচু করে বিশেষ কায়দায় চলছেন। ছবিটি আজ শনিবার (১১ জুলাই ২০১৫) সকালে তোলা। ছবি: জাহিদুল করিম
যানবাহনগুলো একদিক দিয়ে চলছে ভয়ে ভয়ে। এই না কোনো গর্তে পড়তে হয়! ছবিটি আজ শনিবার (১১ জুলাই ২০১৫) সকালে তোলা। ছবি: জাহিদুল করিম

আজ দ্বিতীয় ওয়ানডে: মিরপুরে হঠাৎ ‘আতঙ্ক’ by তারেক মাহ্‌মুদ

দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে ম্যাচের আগের দিনগুলো কি তাহলে এভাবেই যাবে?
প্রথম ওয়ানডের আগের দিনটা জবুথবু থাকল বৃষ্টিতে। মাঠ সারা দিনই থাকল অবগুণ্ঠনের নিচে। বাংলাদেশ দল ইনডোরে গিয়ে কোনোরকমে অনুশীলন করলেও দক্ষিণ আফ্রিকা দল মিরপুরে যায়ইনি।
আজ সেই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডে। না, এবার আর খেলার আগের দিন ঝড়বৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশ দলকে এলোমেলো করে দিতে সেসবের প্রয়োজনও পড়ল না। টি-টোয়েন্টি সিরিজের পর প্রথম ওয়ানডেতেও মাশরাফি বিন মুর্তজার দলকে হারতে দেখে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসানই সপারিষদ কেমন জানি হয়ে গেলেন!
শুরু থেকেই বলা যাক। কথা ছিল দুপুর আড়াইটায় দলের প্রতিনিধি হয়ে বাংলাদেশের কোনো একজন খেলোয়াড় সংবাদ সম্মেলনে আসবেন। সেই অনুযায়ী বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজারের সঙ্গে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলনকক্ষের দিকে আসছিলেন নাসির হোসেন। কিন্তু কাছাকাছি আসার পর কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের ডাক শুনে আবার ফিরে গেলেন ড্রেসিংরুমের দিকে।
নাটকের সেই শুরু। প্রথমে খেলোয়াড়দের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা সারলেন কোচ। এরপর সবাই মিলে চলে গেলেন দোতলায় বিসিবির অফিসের বোর্ডরুমে। সভাপতি নাজমুল হাসান নাকি বসতে চেয়েছেন তাদের সঙ্গে। অবশ্য দলের সঙ্গে বসার আগে তিনি কথা বলেছেন টেকনিক্যাল কমিটির চার সদস্যের সঙ্গেও। এসব করে তিনটার অনুশীলন বাংলাদেশ দল শেষ পর্যন্ত শুরু করেতে পেরেছে বিকেল সোয়া চারটার দিকে। বৃষ্টি হয়নি, তবু প্রথম ওয়ানডের আগের দিনের মতোই এলোমেলো হয়ে গেল দ্বিতীয় ওয়ানডের আগের দিনটাও।
দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে দুই টি-টোয়েন্টি আর এক ওয়ানডের হারে কী এমন মহাপ্রলয় ঘটে গেল, তা অবশ্য বোঝা যাচ্ছে না। জিম্বাবুয়ে সিরিজ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত সিরিজে বাংলাদেশ দল সাফল্যের ভেলায় ভেসেছে। তার মানে কি এই—দলটা আর কোনো দিনই হারবে না? দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পেশাদার ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের দলের বিপক্ষেও বাংলাদেশ দাপুটে জয়ে জিততে থাকবে, কেউ এমন ভেবে থাকলে সেটা তার ক্রিকেটীয় চিন্তার সমস্যা। ক্রিকেটারদের নয়।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে এই সিরিজে একটা জয় খুবই প্রয়োজন বাংলাদেশ দলের। কিন্তু হাশিম আমলা-জেপি ডুমিনিদের বিপক্ষে যে কাজটা খুব সহজ নয়, সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীরাও তা বোঝেন। আর বোঝেন বলেই মাশরাফি-সাকিবদের ওপর প্রত্যাশার বোঝা তাঁরাও চাপাচ্ছেন না। অথচ বিসিবির অবস্থা দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত হতে হচ্ছে। ম্যাচের আগের দিন কোচ-খেলোয়াড়দের ডেকে সভা, টেকনিক্যাল কমিটির পরামর্শ নেওয়া এবং সবশেষে সংবাদ সম্মেলনে দাঁড়িয়ে একাদশ নিয়ে নিজেদের ভাবনা জানিয়ে দেওয়া, খেলোয়াড়দের কিছু কিছু ব্যাপারে ‘সতর্ক’ করার তথ্য প্রকাশ করা—এসব যে উল্টো দলটাকে চাপেই ফেলে দিচ্ছে, সেটা কি বুঝতে পারছেন তাঁরা?
গত তিনটি হারে বাংলাদেশের ক্রিকেট এমন কোনো খাদে পড়ে যায়নি যে অনুশীলন বিলম্বিত করে জরুরি সভায় বসতে হবে। যে টেকনিক্যাল কমিটির এত দিন কেউ খোঁজই নেয়নি, হঠাৎ তাদের ডেকে হারের ময়নাতদন্ত আর পরের ম্যাচের রূপরেখা নিতে হবে। এমনকি আজকের ম্যাচের একাদশ নির্বাচনে পর্যন্ত নাক গলানোর সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে সবাইকে। সাত-আট মাস ধরে যে কোচ-খেলোয়াড়-নির্বাচকেরা মিলে একটার পর একটা সাফল্যের পাপড়ি যোগ করলেন, হঠাৎ তাঁদের ওপর থেকে সব আস্থা উধাও! কেন?
বিসিবি কর্মকর্তাদের যা অবস্থা, ভবিষ্যতে কোচ-খেলোয়াড়দের সঙ্গে সভাগুলো হয়তো বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সরাসরি দেখানোর ব্যবস্থাও করা হবে। তবে কাল থেকেই সেটি শুরু হয়নি বলে আপাতত বিসিবি কর্মকর্তা, টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য আর খেলোয়াড়দের কথার ওপরই ভরসা করতে হচ্ছে। খেলোয়াড়েরা অবশ্য এ নিয়ে ‘স্পিকটি নট’। সংবাদ সম্মেলনে নাসির হোসেনই যা একটু কথা বলেছেন। সেটাও ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতো। ‘সভাপতি সাহেব আমাদের সব সময় সাহস দেন’, ‘খারাপ খেললে অনেকে অনেক ধরনের কথা বলবে। তবে উনি আমাদের সে রকম কিছু বলেননি’ ইত্যাদি।
এর চেয়ে বোর্ড সভাপতি নিজেই বেশি জানালেন সভা সম্পর্কে। কী বলেছেন তিনি ক্রিকেটারদের? উত্তরটা তাঁর মুখ থেকেই শুনুন— ‘আসলে ওদেরকে এই কথাগুলোই বলা...ভয়ের কোনো কারণ নেই। বলেছি, তোমরা ভালোই খেলো, এ মুহূর্তে হয়তো হচ্ছে না। মুশফিককে বললাম, থিতু হওয়ার পর তুমি ওই শটটা আরেকটু পরেও খেললে পারতা। মনে রেখো, তোমার ওপর দায়িত্ব অনেক বেশি। সৌম্য সরকারকে বলেছি, সেট হয়ে গেলে একজন ব্যাটসম্যানের দায়িত্ব অনেক বেশি থাকে। ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।’
ম্যাচের আগের দিন হঠাৎ এমন একটা সভা ডাকা কতটুকু ঠিক হলো, সেটা সরাসরিই জানতে চাওয়া হলো সভাপতির কাছে। এবার তাঁর ভাষাটা একটু ভিন্ন, ‘কিছু কিছু জায়গায় ওদের সতর্কও করে দিতে হয়, আমি সেখানটায় সতর্ক করে দিয়েছি। কিছু জায়গায় অলসতা আছে বা অন্যদিকে মনোযোগ সরে যাওয়ার ব্যাপার আছে। ওগুলো আমি নির্দিষ্টভাবে বলে দিয়েছি।’
কোথাও সমস্যা দেখলে ক্রিকেটের প্রধান অভিভাবক হিসেবে বিসিবি সভাপতির অবশ্যই অধিকার আছে সেটা নিয়ে বার্তা দেওয়া। কিন্তু সেই বার্তাটা বোধ হয় অন্যভাবেও দেওয়া যায়। সেটা অবশ্যই সিরিজের মধ্যে একটা ম্যাচের আগের দিন আতঙ্ক তৈরি করে নয়।
আশার কথা, বিসিবির উদ্ভট কর্মকাণ্ডকে মোটেও আমলে নিচ্ছেন না ক্রিকেটাররা। গত কয়েকটি ম্যাচে খারাপ খেলা ছাড়া নিজেদের মধ্যে আর কোনো সমস্যা দেখছেন না কেউ। সবার বিশ্বাস, এই খারাপ সময়টাও শেষ হয়ে যাবে অচিরেই। তখন আবার সবাই বাংলাদেশকে ‘আমাদের দল’ বলা শুরু করবে।

অব্যবস্থাপনায় প্রাণ গেল ২৭ জনের by সামছুর রহমান ও কামরান পারভেজ

ময়মনসিংহে জাকাতের কাপড় নিতে এই ফটক
দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে গিয়ে পদদলিত হয়ে
হতাহতের ঘটনা ঘটে। ফটকের সামনে পড়ে আছে
হতাহতদের স্যান্ডেল। পরে সেখানে মোতায়েন
করা হয় পুলিশ l ছবি: প্রথম আলো
৮ থেকে ১০ ফুট চওড়া ফটকের বাড়িটির সামনে তিন দিকে রাস্তা। রাতের অন্ধকারে সেখানে অপেক্ষায় কয়েক হাজার দরিদ্র নারী-পুরুষ-শিশু। কখন ফটক খোলা হবে, হাতে পাবে জাকাতের একটি শাড়ি-লুঙ্গি বা কিছু টাকা। ভোরের আলো ফোটার আগেই যখন ফটক খোলা হলো, সবাই একসঙ্গে ঢুকতে গেল ওই ছোট্ট ফটকটি দিয়ে। কেউ পড়ে গেলে জনতার স্রোত দিল তাকে মাড়িয়ে। পায়ের নিচে চাপা পড়ে কারও মুখ থেঁতলে গেল, কারও নাক-মুখ ফেটে বেরিয়ে পড়ল রক্ত। পিষ্ট হয়ে সেখানেই ঝরে গেল ২৭টি প্রাণ। আহত হলো আরও অন্তত ৪০ জন।
গত শুক্রবার ভোরে এ ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ শহরের অতুল চক্রবর্তী সড়কে। সেখানকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী শামীম তালুকদার প্রতিবছরের মতো এবারও জাকাতের কয়েক হাজার কাপড় ও টাকা বিতরণ করবেন—মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল এমন খবর। গৃহকর্তার দেওয়া কার্ড এবং লোকমুখে খবর পেয়ে কাপড়-পয়সা পাওয়ার আশা নিয়েই জড়ো হয়েছিল কয়েক হাজার মানুষ। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো ব্যবস্থাই রাখেননি গৃহকর্তা।
এ ঘটনার পর গৃহকর্তা মো. শামীম তালুকদার ও তাঁর ছেলে এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকসহ আটজনকে আটক করে তাঁদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে পুলিশ। ঘটনা তদন্তে গঠন করেছে তিন সদস্যের কমিটি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা হিসেবে ১০ হাজার টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকেই অভিযোগ করেন, কয়েক হাজার জাকাতের কাপড় বিতরণ করার ঘোষণা দিলেও জাকাতদাতার পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশ না রাখায় এবং অব্যবস্থাপনার কারণেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। জাকাতের কাপড় সংগ্রহের জন্য ওই বাড়ির সামনে কয়েক হাজার মানুষ জড়ো হয়েছিল। তাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
ময়মনসিংহের কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, এত মানুষকে জাকাতের কাপড় দেওয়ার আগে অবশ্যই জাকাতদাতার উচিত ছিল পুলিশি নিরাপত্তা নেওয়া। তাহলে হয়তো হতাহতের ঘটনা ঘটত না।
পুলিশ, এলাকাবাসী ও দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শহরের অতুল চক্রবর্তী সড়কের বাসিন্দা শামীম তালুকদারের জর্দা তৈরির কারখানা আছে। প্রতিবছর পবিত্র রমজানে তিনি তাঁর ওই বাড়ির সামনেই দরিদ্র মানুষের মধ্যে জাকাতের কাপড় বিতরণ করেন। গতকাল ভোরে এ বছরের জাকাতের কাপড় বিতরণ করার ঘোষণা দিয়ে অনেক দরিদ্র মানুষের মধ্যে কার্ড বিতরণ করা হয়। আবার কার্ড ছাড়াও দরিদ্র মানুষ গেলে তাদেরও কাপড় দেওয়া হবে বলে লোকমুখে খবর রটে যায়।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেহ্রির পর থেকেই জাকাতের কাপড় সংগ্রহ করার জন্য ময়মনসিংহ শহরের থানা ঘাট, কালীবাড়ি ঘাট, পাটগুদাম এলাকা ও ওই এলাকায় অবস্থিত আটকে পড়া পাকিস্তানি ক্যাম্প, আকুয়া, ব্রহ্মপুত্র নদের চরের বিভিন্ন গ্রাম থেকে এসে দরিদ্র মানুষ ভিড় করে।
কাপড় নিতে যাওয়া কমপক্ষে ২০ জন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগেভাগে কাপড় পাওয়ার আশায় বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত তিনটা থেকেই মানুষের ভিড় জমতে থাকে। ভোর সাড়ে চারটার দিকে ওই বাড়ির তিন দিকের সড়কে নারী ও শিশুদের উপচে পড়া ভিড় জমে। ভিড় দেখে পৌনে পাঁচটার দিকে বাড়ির সামনে দুজন দারোয়ান অবস্থান নিয়ে বাড়ির মূল ফটক খুলে দেন। তখন নারী ও শিশুরা স্রোতের মতো বাড়ির ভেতর ঢুকতে চাইলে হুড়োহুড়ি শুরু হয়। পেছন থেকে মানুষের চাপ আরও বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে ফটকের সামনে অবস্থান করা নারী ও শিশুরা নিচে পড়ে যায়। এ সময় পেছন থেকে আসা জনস্রোত তাদের ওপর আছড়ে পড়লে পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায় পুলিশ। পরে সেখান থেকে লাশগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া ঘটনাস্থল থেকে ১৩টি মৃতদেহ সরাসরি বাড়িতে নিয়ে যান নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। নিহত হওয়া ২৭ জনের মধ্যে ২২ জন নারী ও পাঁচটি শিশু। তার মধ্যে একই পরিবারের শিশুসহ তিন সদস্য রয়েছে।
মা খোদেজা বেগমকে হারিয়ে মিতু আক্তারের
আহাজারি l ছবি: প্রথম আলো
পদদলিত হয়ে নিহত নারী ও শিশুরা হলেন হামিদা বেগম (৪৫), নাজমা বেগম (৫০), ফাতেমা বেগম (৬০), জোহরা খাতুন (৫২), রেজিয়া আক্তার (৪০), ফাতেমা বেগম ফতে (৪২), সুফিয়া বেগম (৬০), খোদেজা বেগম (৫০), মো. ছিদ্দিক (১২), সখিনা (৪০), সখিনার মেয়ে লামিয়া (২) ও সখিনার মা শামীমা ওরফে সামু বেগম (৬০), ফজিলা বেগম (৭৫), হাজেরা বেগম (৭০), মেঘনা বসাক (৩৫), মরিয়ম (৫০), সুধা রানী সরকার (৫৫), রীনা রানী দে (৬০), মমতাজ বেগম ওরফে টুকু (৪০), আঙ্গুরী বেগম (৩৫), সাহারন বেগম (৪০), রুবি আক্তার (১২), খোদেজা আক্তার (৫০) ও তাঁর নাতনি বৃষ্টি (১২), রহিমা বেগম (৫৫) ও ইতি। একজনের পরিচয় জানা যায়নি। নিহত ব্যক্তিরা ময়মনসিংহ শহরের আকুয়া, কাঠগোলা, থানা ঘাট, কাছারি ঘাট, পাদগুদাম বিহারি ক্যাম্প ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরের কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দা।
এ ছাড়া পদদলিত হয়ে কমপক্ষে ৪০ জন আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে হেনা আক্তার, রাজ, ময়না, রাসেল ও কালাচান নামের পাঁচজনকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
অব্যবস্থাপনার অভিযোগ: পুলিশ ও জাকাত নিতে আসা অনেকে অভিযোগ করেন, কয়েক হাজার নারী ও শিশু কাপড় নেওয়ার জন্য জড়ো হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পুলিশ রাখা হয়নি। এ ছাড়া জাকাতদাতার পক্ষ থেকেও এত মানুষকে নিয়ন্ত্রণের জন্য ছিল না পর্যাপ্ত লোক।
পদদলিত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ময়না বেগম (৭০) নামের একজন প্রথম আলোকে বলেন, বাইরে কয়েক হাজার লোক থাকলেও ফটক খুলে দেওয়ার সময় ফটকের সামনে মাত্র দুজন নিরাপত্তারক্ষী (দারোয়ান) ছিলেন। পরে নারীদের পদদলিত হতে দেখে আরও কয়েকজন পুরুষ মানুষ বাড়ির ভেতর থেকে এসে পদদলিত মানুষকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য লাঠিপেটা করতে শুরু করেন। পরে অনেক মানুষ মারা যেতে পারে এমন আশঙ্কায় তাঁরা লাঠিপেটা বন্ধ করেন।
পুলিশের হত্যা মামলা: এ ঘটনায় ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রফিক বাদী হয়ে গৃহকর্তা মো. শামীম তালুকদারসহ আটজনের নামে একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশ ঘটনার পরপরই মো. শামীম তালুকদার, তাঁর ছেলে হেদায়েত ইসলাম, তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নূরানী জর্দা কারখানার ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেন এবং ঘটনার সময় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদেরসহ আটজনকে আটক করেছে।
তদন্ত কমিটি গঠন: ঘটনা তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শফিকুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত ওই কমিটিকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।